Saturday, October 30, 2010

‘আমাদের জাদুঘর, আমরাই গড়ব’ by শিখ্তী সানী

১৯৭১ সালের ১৫ অক্টোবর। ৩৮ জন যুবক স্মরণীয় এক পদযাত্রায় নেমেছিলেন ভারতের মুর্শিদাবাদ থেকে দিল্লি পর্যন্ত। মুর্শিদাবাদের বহরমপুর থেকে যাত্রা শুরু। সাদা কেডস পরিহিত ৩৮ জন যুবক। বৃহৎ পথের উদ্দেশে তাঁদের যাত্রা। পায়ে হাঁটার পথ যা-ই হোক না কেন, লক্ষ্যের দূরত্বটা অনেক দূরে—তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক শাসকদের বর্বরতম আগ্রাসন ও গণহত্যার কথা জানাতে হবে পৃথিবীকে। তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে। সামান্য যে ব্যানার নিয়ে পদযাত্রা, সেখানে লেখা—বিশ্ববিবেক জাগরণ পদযাত্রা। তবুও যে প্রেরণা তাঁরা জাগিয়ে দিয়েছিলেন, সেটাই পুঁজি করে আরেকটি পদযাত্রায় অংশগ্রহণ করছেন এ যুগের তরুণদের প্রতিনিধিরা। ৪০ বছর পেরিয়ে গেছে। ১৫ অক্টোবর, ২০১০। একাত্তরের সেই পদযাত্রাকে অনুসরণ করে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের স্বেচ্ছাসেবক একটি দল তারুণ্যের পদযাত্রায় নেমেছে ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জ-ডলৌরা পর্যন্ত। লক্ষ্য ‘আমাদের জাদুঘর আমরাই গড়ব’।
১৯৯৬ সালের ২২ মার্চ সেগুনবাগিচায় একটি পুরোনো ভবন ভাড়া নিয়ে প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে যাত্রা শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের। বর্তমানে জাদুঘরের ব্যাপ্তি বেড়ে গেছে অনেক। এক হাজার ৪০০ স্মারক প্রদর্শিত হলো, জাদুঘরের সংগ্রহভান্ডারে জমা হয়েছে ১৫ হাজারের বেশি স্মারক। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাজধানীর আগারগাঁও এলাকায় জাদুঘর ট্রাস্টের অনুকূলে ০.৮২ একর ভূমি বরাদ্দ দেয়। এরপর থেকে আন্তর্জাতিকমানের সব সুবিধাসম্পন্ন আধুনিক একটি জাদুঘর নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ইতিমধ্যে নকশা তৈরি হয়ে গেছে, কিন্তু প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ অর্থের। তরুণদের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের সম্পর্কটা অনেক বেশি আত্মিক। তাই অনেক দায়িত্ব এসে যায় তরুণদের কাছেও। এ লক্ষ্যকে কেন্দ্র করেই স্লোগানটি নেওয়া হয়েছে, ‘আমাদের জাদুঘর, আমরাই গড়ব।’ তরুণ প্রজন্মের বিভিন্ন প্রতিনিধিদল সেই উদ্দেশ্যে কাজ করে যাচ্ছে সাধ্যমতো, নিজেদের স্থান থেকে নির্বিশেষে। পদযাত্রায় অংশগ্রহণ করা তরুণেরা তাঁদেরই অন্যতম। কাজী ইমরান, মন্টু বাবু সরকার, ইব্রাহীম হোসেন, মোহাম্মদ তৌহিদ হাসান, মো. নিজামউদ্দীন, এম ডি মোস্তফা, শাহাদত হোসেন, মির্জা মাহমুদ আহমেদ, সামি আহমেদ এবং এ দলটির দলনেতা শরীফ রেজা মাহমুদ জাদুঘরের জন্য অনুদান সংগ্রহের প্রচারণার উদ্দেশ্যে হেঁটে যাবেন ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জ পর্যন্ত। পথে নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, ভৈরব, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট, সুনামগঞ্জ ও ডলৌরার বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে যাত্রাবিরতি করবেন। সেখানে তাঁরা তুলে ধরবেন মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের কথা, অনুদানের আবেদনের কথা।
তারুণ্যের এ পদযাত্রার সঙ্গে একাত্তরের পদযাত্রাকে এক করে নেওয়ার উদ্দেশ্য—দুই প্রজন্মকে একটি মেলবন্ধনে একীভূত করা। ২০০৯ সালে আশ্চর্যভাবেই পরিচয় হয় দিলীপ নাগের সঙ্গে। যিনি একাত্তরে ‘বিশ্ববিবেক জাগরণ পদযাত্রায়’ অংশ নিয়েছিলেন। তাঁর মাধ্যমেই খোঁজ মেলে আরও কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে। ধীরে ধীরে ৩৮ জনের পরিচয়ও বেরিয়ে আসে। এ কারণে পুরো দলকে খুঁজে পাওয়ার পর জাদুঘর কর্তৃপক্ষ ও স্বেচ্ছাসেবকদের মধ্যে এক আশা-উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়। ইতিহাসের পাতা থেকে প্রায় হারিয়ে যাওয়া তাৎপর্যপূর্ণ এ পদযাত্রার পথিকদের নিয়ে আয়োজন করা হয় নতুন এ পদযাত্রা। তরুণদের এ পদযাত্রা এখন সিলেট শহর ছেড়ে সুনামগঞ্জের পথে। পথিকেরা প্রায় ৩৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাত্রাবিরতি দিয়েছেন। অনেক অভিজ্ঞতা, বহু মূল্যবান প্রেরণা, মুক্তিযুদ্ধের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা, আত্মার টান আর ভালোবাসা নিয়ে পদযাত্রা থামবে আজ ২৯ অক্টোবর ডলৌরাতে। পুরো এ অভিযাত্রায় তাঁরা মানুষের সাড়া পেয়েছেন অনেক। কমতি ছিল না ভালোবাসার।
দলনেতা শরীফ রেজা মাহমুদ জানান, ‘পুরো অভিযাত্রায় জনসাধারণের অংশগ্রহণ, এত আন্তরিক, এত স্বতঃস্ফূর্ত, যা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। ঢাকা থেকে ডলৌরি পর্যন্ত যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে গিয়েছি, তাঁদের সঙ্গে কথা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নিয়ে। ভ্রাম্যমাণ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর—এই প্রতিষ্ঠান আগেই বেরিয়ে গেছে, তাঁদের কাছে নিজেদের পরিবারের এমন কিছু স্মৃতির লেখা পাঠাতে বলেছে, যা একাত্তরকে আরও স্মরণীয় করে রাখবে। আমরা সেই লেখাগুলো নিয়েও আলাপ করেছি। এরপর আমরা নতুন জাদুঘরের কথা জানাই। আসলে এ জাদুঘর তো আমাদেরই। তাই বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিকের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অবদানকে গ্রহণ করেই তৈরি হবে আমাদের জাদুঘর।’
পথ চলতে চলতে একাত্তরের পদযাত্রায় দুই পথিক অভিভূষণ চক্রবর্তী ও দীলিপ নাগের সঙ্গেও দেখা করেছেন তাঁরা। কথা হয়েছে পথের নিত্যনতুন যাওয়া-আসার মানুষের সঙ্গে। কথা হয়েছে চা-বাগানের শ্রমিক ও বেদেদের সঙ্গে, যাঁরা আজ অবধি একাত্তর সম্পর্কে তেমন কিছুই জানেন না। তাই তারুণ্যের এ পদযাত্রার অর্জন অনেক—যা তারুণ্যেরই জয়গানকে প্রতিফলিত করে।
অতীতটা আসলেই কখনো হারিয়ে যায় না। অতীতই আজকের বর্তমানকে সুগঠিত করে, তাকে এনে দেয় গতি এবং দৃঢ়তা।

সমাজে আমানত রক্ষার তাগিদ by মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান

ইসলাম একটি সর্বজনীন কল্যাণকামী জীবনব্যবস্থা। সমাজজীবনে মানুষ একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। সমাজে মানুষের পরস্পরের মধ্যে আস্থা বা বিশ্বস্ততা না থাকলে জীবনে চলার পথ সুখকর হয় না। তাই মানবসমাজের প্রতিটি ধর্মপ্রাণ লোকের মধ্যে সততা, আমানতদারিতা, আস্থা ও বিশ্বস্ততা সৃষ্টির মধ্য দিয়ে সমাজকে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলাম আমানতদারিতার প্রতি সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করেছে। আরবি ‘আমানত’ শব্দের অর্থ হচ্ছে গচ্ছিত রাখা, নিরাপদ রাখা, প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করা প্রভৃতি। ইসলামের পরিভাষায় কারও কাছে কোনো অর্থ-সম্পদ গচ্ছিত রাখাই আমানত।
যিনি গচ্ছিত দ্রব্য যথাযথভাবে সংরক্ষণে করেন এবং এর প্রকৃত হকদার বা মালিক চাওয়ামাত্র তা অক্ষত অবস্থায় ফিরিয়ে দেন, তাঁকে ‘আমিন’ অর্থাৎ বিশ্বস্ত বা আমানতদার বলা হয়। পক্ষান্তরে অপরের গচ্ছিত সম্পদ যথাযথভাবে মালিকের কাছে প্রত্যর্পণ না করে আত্মসাৎ বা লোকসান করাই হচ্ছে খেয়ানত। যে ব্যক্তি লোভের বশবর্তী হয়ে অন্যের গচ্ছিত সম্পদ খেয়ানত করে, সে আত্মসাৎকারীরূপে বিবেচিত হয়। মানুষের অর্থলিপ্সা তাকে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য করে ফেলে এমনভাবে যে সে বৈধ-অবৈধ সব পন্থায় অর্থ-সম্পদ লাভে ব্রতী হয়। তাই ইসলামে আমানত সুরক্ষার জন্য বিশেষভাবে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের অর্থ-সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস কোরো না এবং মানুষের ধন-সম্পদের কিয়দংশ জেনে-শুনে অন্যায়ভাবে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে তা বিচারকের কাছে পেশ কোরো না।’ (সূরা আল-বাকারা, আয়াত-১৮৮)
আমানত রক্ষা করা মানবচরিত্রের একটি বিশেষ গুণ। ইসলামের সুমহান আদর্শ বাস্তবায়নে এবং সুখী-সমৃদ্ধ সমাজব্যবস্থা বিনির্মাণে আমানত রক্ষার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। কারও কাছে কোনো লোক যদি কিছু মালপত্র বা ধন-সম্পদ বা টাকা-পয়সা বা অন্য কোনো বিষয় ও দায়িত্ব আমানত রাখে, তা যত্নসহকারে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে হয়। আর যখন মালিক তা ফেরত পেতে চায়, সঙ্গে সঙ্গে হস্তান্তর করতে হয়—এটাই ইসলামের বিধান। তাই সমাজজীবনে আমানত রক্ষা করা এবং তা যথাযথভাবে ফেরত দেওয়া অপরিহার্য কর্তব্য। আল্লাহ তাআলা মানুষকে আমানত রক্ষার নির্দেশ দিয়েছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের আদেশ দিচ্ছেন যে তোমরা আমানত তার মালিককে প্রত্যর্পণ করবে বা ফেরত দেবে।’ (সূরা আন-নিসা, আয়াত-৫৮)
পার্থিব জগতে প্রতিটি নর-নারীর ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে তথা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্র পর্যন্ত কিছু দায়-দায়িত্ব রয়েছে। আল্লাহ তাআলা প্রত্যেকের ওপর অনেক দায়িত্ব দিয়ে দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্যগুলো আমানতের অন্তর্ভুক্ত। ব্যাংকের ম্যানেজার ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীর কাছে মানুষের টাকা-পয়সা, ধন-দৌলত, স্বর্ণালংকার প্রভৃতি মূল্যবান বস্তু গচ্ছিত রাখা হয়—এসবই আমানত। দোকানের কর্মচারীর কাছে দোকানটি ও শ্রমিকের কাছে কাঁচামাল বা তার উপাদান নিজের মালিকের আমানতস্বরূপ। রাষ্ট্রের শাসক ও তত্ত্বাবধায়কের কাছে সরকারি অর্থ-সম্পদ, গোপনীয় দলিলপত্র, নীতিনির্ধারণী কৌশল এবং জনগণের স্বার্থ ও অধিকার আমানতস্বরূপ। ব্যাপক অর্থে একের কাছে অন্যের জান-মাল, মান-সম্মান—সবই আল্লাহর আমানত। প্রত্যেকে নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে অবগত হয়ে তা যথাযথভাবে পালন করা দরকার। সব আমানতের পরিপূর্ণ রক্ষণাবেক্ষণ করাই একজন প্রকৃত মুসলমান আমানতদারের কর্তব্য। এই দায়িত্বগুলো পবিত্র কোরআন ও হাদিস শরিফে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত আছে।
কোনো ব্যক্তি যদি কারও কাছে গোপন কথা বলে, সে কথাও একটি আমানতস্বরূপ। বিনা অনুমতিতে তা প্রকাশ করা হলে আমানতের খেয়ানত করা হয়। এ সম্পর্কে নবী করিম (সা.) বাণী প্রদান করেছেন, ‘যখন কোনো কথা হয়, সে কথাও আমানতস্বরূপ।’ আমানত রক্ষা করা একজন প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, ‘আর (তারাই প্রকৃত মুমিন) যারা আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে।’ (সূরা আল-মুমিনুন, আয়াত-৮)
আমানতদারি ঈমানের অপরিহার্য অঙ্গ। যাদের ঈমান ঠিক আছে, তারা আমানতের খেয়ানত করতে পারে না। আর যারা অন্যের অর্থ-সম্পদ আত্মসাৎ বা খেয়ানত করে, তারা প্রকৃত মুমিন নয়, তারা প্রতারক, ভণ্ড ও মুনাফিক। তাই প্রত্যেক মুসলমানের আমানত রক্ষা করে ঈমানদার হওয়া উচিত। আমানত রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে ঈমান পরিপূর্ণতা লাভ করে এবং আমানতদারকে সবাই ভালোবাসে।
আমানত রক্ষা করলে মানুষের উত্তম চরিত্র গঠিত হয়। আমানত রক্ষা তাকওয়া অর্জনে সহায়তা করে। কোনো কিছু গচ্ছিত রাখলে মানুষের কুপ্রবৃত্তি তা ভোগ বা জবরদখল বা আত্মসাৎ করার প্ররোচনা জাগায়। কিন্তু আমানতদার ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি প্রকৃত মালিককে যথাযথ প্রত্যর্পণের মাধ্যমে তাকওয়া বা খোদাভীতির দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে। এভাবে আমানত রক্ষার মাধ্যমে পরকালের সুখের স্থান জান্নাতের পথ সুগম হয়। পবিত্র কোরআনে আমানতদারির পুরস্কার ঘোষণা করে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘(যারা আমানত রক্ষা করে) তারা ফেরদাউস নামক উদ্যানের অধিকারী হবে, সেখানে তারা চিরকাল অবস্থান করবে।’ (সূরা আল-মুমিনুন, আয়াত-১১)
ইসলামের দৃষ্টিতে আমানত একটি মহৎ মানবিক গুণ, যা আল্লাহর সব নবী-রাসুলের জীবনচরিতে বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে। বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন আমানতদারির মূর্ত প্রতীক। নবীজির আমানতদারির ও বিশ্বস্ততার সুখ্যাতি উজ্জ্বল দৃষ্টান্তস্বরূপ লোকের মুখে মুখে উচ্চারিত ছিল। ইসলামবিরোধী চরম শত্রুরাও মহানবী (সা.)-এর কাছে সম্পদ আমানত রাখতেন। তাই তদানীন্তন ঘোর তমসাচ্ছন্ন নীতিহীন বিশ্বে তিনিই জগৎশ্রেষ্ঠ ‘আল-আমিন’ উপাধি লাভ করেছিলেন।
সমাজের সব শ্রেণী-পেশার মানুষের মধ্যে যদি আমানতের মহৎ গুণটি বিকশিত হয়, তাহলে সমাজজীবনে পরিবেশ সুন্দর ও নির্মল হতে পারে। মানুষের পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বস্ততা ফিরে আসে এবং কাজ-কর্মে, লেনদেন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নিরাপত্তা বিরাজ করে। তখন সমাজে সুখ-শান্তি, সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও উন্নয়ন সমৃদ্ধিতে পরিপূর্ণতা লাভ করে। এভাবে প্রতিটি ধর্মপ্রাণ মানুষ নিজ পরিমণ্ডলে তাদের আমানত যথাযথভাবে পালন করার মাধ্যমেই একটি সুখী, সমৃদ্ধ সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে। তাই ইহকালীন জীবনে ঘুষ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, প্রতারণা ও আত্মসাতের প্রবণতা প্রতিরোধে শান্তি-শৃঙ্খলাপূর্ণ সুশীল সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য আমানতদারের বিকল্প নেই।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক একাডেমি ও বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ অ্যান্ড দাওয়াহ, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়।
dr.munimkhan@yahoo.com

কলম্বাসের ডায়েরি by শাহাদুজ্জামান

এই অক্টোবর মাসে আমেরিকা ‘কলম্বাস দিবস’ পালন করে থাকে। কলম্বাস ১৪৯২ সালের ১২ অক্টোবর আমেরিকার ভূখণ্ডে পা রেখেছিলেন। কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের বিজয়োৎসব পালন করে তারা। কিন্তু সবাই এদিনে উৎসব করে না, কেউ কেউ করে পরিতাপ। যেমন—আমেরিকার এক শিক্ষক বিল বিগলো কলম্বাস দিবসে ক্লাসে ঢুকে টেবিলের ওপর রাখা তাঁর ছাত্রীর পার্সটি বগলদাবা করে হাঁটতে শুরু করেন। ছাত্রীটি চেঁচিয়ে ওঠে, ‘এ কি! আপনি আমার পার্স নিয়ে যাচ্ছেন কেন?’ বিগলো বলেন, ‘নিলাম কোথায়, আমি তো এটা আবিষ্কার করলাম।’ ‘কলম্বাস এভাবেই আবিষ্কার করেছিলেন আমেরিকাকে।’ ছাত্রছাত্রীদের বলেন বিগলো। তিনি বলেন, ‘ওটা আবিষ্কার নয়, বরং স্রেফ লুটতরাজ। কলম্বাসের মহান বীরত্বপূর্ণ ইমেজকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বইটি লিখেছেন আমেরিকার বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক হাওয়ার্ড জিন এ পিপলস হিস্টরি অব ইউনাইটেড স্টেটস নামে। এ বইয়ে জিন-উপাত্ত হিসেবে বিশেষভাবে ব্যবহার করেছেন কলম্বাসের রেখে যাওয়া ‘লগ বই’ বা ডায়েরিটিকে। কলম্বাসের ডায়েরির পাতায় পাতায় যে মানুষটিকে পাওয়া যায়, তিনি নেহাতই বর্বর, ধূর্ত, উচ্চাকাঙ্ক্ষী এক লুটেরা মাত্র।
কলম্বাস ব্যবসার উদ্দেশে ভারতে যাত্রা করে ভুল করে পৌঁছেছিলেন বাহামা দ্বীপে। সেখানে পৌঁছানোর পর তাঁর প্রথম অভিজ্ঞতার কথা ডায়েরিতে লিখেছেন কলম্বাস। লিখেছেন, কীভাবে সেখানকার আরোয়াক আদিবাসীরা সৈকত থেকে সমুদ্রে নেমে গিয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা জানিয়েছিল। লিখেছেন, সেই আদিবাসীরা কত উপহার নিয়ে এসেছিল তাঁর জন্য। কলম্বাসের নিজের ভাষায়, ‘আরোয়াকরা খুব ভদ্র আর শান্তিপ্রিয় মানুষ। ওদের হাতে কোনো অস্ত্র নেই, অস্ত্র তারা চেনে না। আমি যখন ওদের হাতে একটা তলোয়ার তুলে দিলাম, ওরা তলোয়ারের ধারালো দিকটাতেই ধরল, তাতে ওদের হাত কেটে একেবারে একাকার।...এই আদিবাসীরা খুবই সরল আর সৎ এবং নিজেদের সম্পত্তি অন্যদের দিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে এরা খুবই উদার।’ এর পরই কলম্বাস লিখছেন, ‘আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, এরা দাস হিসেবে হবে চমৎকার। এদের সবাইকে বশে আনতে আমাদের জনা পঞ্চাশেক মানুষই যথেষ্ট। তারপর এদের দিয়ে আমরা যেমন খুশি কাজ করিয়ে নিতে পারব।’ অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে খুব অল্প সময়েই কলম্বাস বশে এনেছিলেন এই সরল মানুষগুলোকে এবং যেমন খুশি কাজ করিয়ে নিয়েছিলেন। তাঁর ডায়েরির প্রথম পাতাগুলোয় যে শব্দটি ঘুরেফিরে এসেছে অসংখ্যবার, সেটি হচ্ছে ‘সোনা’। আদিবাসীরা কলম্বাসের জন্য যে উপহার এনেছিল, তার অন্যতম ছিল সোনার খণ্ড। কলম্বাস অস্ত্রের মুখে আদিবাসীদের বাধ্য করেছিলেন বাহামার সব সোনা এনে তাঁর হাতে তুলে দিতে। কলম্বাসের জীবনীকার স্যামুয়েল মরিসন লিখেছেন, ‘প্রত্যেক আদিবাসীকে কলম্বাস প্রতিদিন এক নির্দিষ্ট পরিমাণ সোনা আনতে আদেশ করতেন। যারা সেই পরিমাণ সোনা আনতে ব্যর্থ হতো, তিনি কেটে ফেলতেন তাদের হাত। এ শাস্তি থেকে বাঁচতে কিছু আদিবাসী ভয়ে পাহাড়ে লুকিয়ে ছিল, কিন্তু কলম্বাস তাদের কুকুর দিয়ে ধরে আনেন। বহু আদিবাসী উপায়ান্তর না দেখে কাসাভা ফলের বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করে।’ মরিসন আরও জানাচ্ছেন, ‘যেহেতু আদিবাসীদের ব্যক্তিগত সম্পত্তির কোনো ধারণা ছিল না, ফলে তারা যেমন তাদের নিজেদের জিনিস কলম্বাসের স্প্যানিশ সঙ্গীদের এমনিতেই দিয়ে দিত, তেমনি অনেক সময় স্প্যানিশদের ব্যবহূত জিনিস নিয়ে যেত সঙ্গে করে। কিন্তু কলম্বাসের দল সেসব আদিবাসীকে চোর সাব্যস্ত করে হয় ফাঁসি দিয়েছে, নয়তো পুড়িয়ে মেরেছে।’ ইতিহাস আরও বলছে, কলম্বাসের সঙ্গীরা এই নতুন ভূখণ্ডে শুধু অস্ত্র নয়, সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন বসন্ত, হাম ইত্যাদি ধরনের বিবিধ নতুন রোগ, যার বিরুদ্ধে আদিবাসীদের ছিল না কোনো প্রতিরোধ। ফলে দ্রুত এসব রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে আদিবাসীরা। মরিসন হিসাব করে দেখিয়েছেন, কলম্বাস এই নতুন ভূখণ্ডে পা দেওয়ার বছর চারেকের মধ্যে ওই এলাকার জনসংখ্যা কমে হয়েছিল তিন ভাগের এক ভাগ। হত্যা, আত্মহত্যা আর রোগে আক্রান্ত হয়ে যখন আদিবাসীদের অবিরাম মৃত্যু হচ্ছে, কলম্বাস তখন তাঁর ডায়েরিতে লিখছেন, ‘ঈশ্বর সহায়, বিক্রির জন্য এখান থেকে যত খুশি দাস পাঠানো সম্ভব।’ কলম্বাস তাঁর প্রথম চালান হিসেবে ৫০০ জন আদিবাসীকে জোর করে ধরে এনে স্পেনের উদ্দেশে জাহাজে উঠিয়ে দিয়েছিলেন গাদাগাদি করে। অসুখে ও শীতে ধুঁকে ধুঁকে পথেই মারা যায় ২০০ জন।
এভাবেই শুরু হয়েছে কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের জয়যাত্রা। এভাবেই আদিবাসীদের জন্মভূমি থেকে তাদের বিতাড়িত করে শুরু হয়েছে কথিত নতুন সভ্যতার গোড়াপত্তন। নেহাত প্রান্তিক ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী হিসেবে রেড ইন্ডিয়ান নামে যে আদিবাসীরা আমেরিকায় টিকে গেছে, তাদের তথাকথিত সভ্য করে তোলার জন্য চলেছে অব্যাহত চাপ। আমেরিকার প্রাইভেটাইজেশনের আইনপ্রণেতা হেনরি লুইস ১৮৮০-তে সে দেশের আদিবাসী সম্পর্কে বলছেন, ‘...নিজে আলাদাভাবে উন্নতি করার কোনো স্পৃহা তাদের নেই। তোমার বাড়িটা যে তোমার প্রতিবেশীর চেয়ে আরও সুন্দর হতে পারে, এ বোধই তাদের মধ্যে কাজ করে না। তাদের ভেতর স্বার্থপরতার কোনো বোধ নেই, অথচ স্বার্থপরতাই তো সভ্যতার ভিত্তি।’ স্বার্থপরতার ভিত্তিতে যে সভ্যতা আমেরিকা গড়ে তুলেছে, তাতে সেই সরল আদিবাসীরা অবিরাম পিষ্টই হয়েছে কেবল। কিন্তু আদিবাসীরা আর তলোয়ারের ভুল প্রান্ত ধরে হাত রক্তাক্ত করতে রাজি নয়। দাবি উঠেছে, আমেরিকার প্রকৃত ইতিহাসের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির। এ বছর তাই আমেরিকায় অনেকেই কলম্বাস দিবসকে পালন করেছে আদিবাসীদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা দিবস হিসেবে।
>>>শাহাদুজ্জামান: কথাসাহিত্যিক।
zaman567@yahoo.com

বৈমানিকদের কর্মবিরতি ও বিপর্যস্ত বিমান - দায় ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের, ওপরের হস্তক্ষেপ জরুরি

বিমান চলছে না। শুধু উড়োজাহাজ নয়, প্রতিষ্ঠানটিই আসলে চলছে না। ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ত্রুটি ও অদক্ষতা রয়েছে বলেই একের পর এক সমস্যায় বিপর্যস্ত হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। এখন চলছে পাইলটদের কর্মবিরতি, এর কোনো সময়সীমাও নেই। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিমানের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের যে আচরণ দেখা যাচ্ছে, তাতে দায়িত্বশীলতার চেয়ে একগুঁয়ে ও অপেশাদার মনোভাবই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এ ধরনের ব্যবস্থাপনা দিয়ে বিমানের মতো একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান চলতে পারে না।
বর্তমান সমস্যার শুরু বৈমানিকদের অবসরের বয়সসীমা বৃদ্ধি নিয়ে। বিমান কর্তৃপক্ষ অবসরের বয়সসীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলে বৈমানিকদের সংগঠন বাংলাদেশ এয়ারলাইনস পাইলট অ্যাসোসিয়েশন (বাপা) তা বাতিলের দাবি জানায়। বাপা তাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি পুনর্নির্ধারণের দাবি তোলে। বিষয়টি খুবই সামান্য এবং আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে খুব সহজেই সমাধান করা যেত। কিন্তু বিমান কর্তৃপক্ষ যে পথ বেছে নিয়েছে, তা কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের আচরণ হতে পারে না। পরিস্থিতি এখন এমন হয়েছে যে একদিকে বৈমানিকেরা কর্মবিরতি করছেন আর অন্যদিকে বিমানের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ কঠোর অবস্থান নিয়ে বসে আছে, আলাপ-আলোচনা বা সমঝোতার পথে যাচ্ছে না।
বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বিমানকে কোম্পানিতে রূপান্তর করা হয়েছিল প্রতিষ্ঠানটিকে বাণিজ্যিকভাবে পরিচালনা ও লাভজনক করার জন্য। কিন্তু ব্যবস্থাপনার ধরন আগের মতো রয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ করার সুযোগ কমেছে কিন্তু একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনার মতো যোগ্য পরিচালনা পরিষদ গঠিত না হওয়ায় দিন দিন পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। অন্যদিকে, এ ধরনের প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য একজন পেশাদার সিইও বা প্রধান নির্বাহী প্রয়োজন হলেও প্রতিষ্ঠানটিতে পুরোনো আমলাতান্ত্রিকতা রয়েই গেছে।
এটা স্পষ্ট, বিমানের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হয়েছে এবং তাদের অদক্ষতার কারণেই এই অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বিমান একটি শতভাগ সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। ব্যবস্থাপকদের ব্যর্থতায় এ ধরনের অচলাবস্থা চলতে থাকবে, ফ্লাইট বিপর্যস্ত হবে, যাত্রীরা দুর্ভোগ পোহাবে—তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। বিমানের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ যেহেতু নিজেদের যোগ্যতায় পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হয়েছে, তাই এখন সরকারের আরও উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ জরুরি হয়ে পড়েছে। এ ক্ষেত্রে বিলম্ব করার কোনো সুযোগ নেই।

উত্ত্যক্তকরণ থেকে হত্যা - দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করুন

মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে নাটোরের লোকমানপুরে এক কলেজশিক্ষক ও ফরিদপুরের মধুখালীতে এক মায়ের হত্যাকাণ্ড আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, নারী উত্ত্যক্তকারী বখাটে-সন্ত্রাসীদের উপদ্রব কী ভয়ংকর মাত্রায় বেড়ে চলেছে। উত্ত্যক্তকারীরা কী নৃশংস হত্যাকারী হয়ে উঠছে।
মধুখালীর চাঁপা রানী ভৌমিক (৪৮) চেয়েছিলেন তাঁর দুটি কিশোরী মেয়ে যেন নির্বিঘ্নে বিদ্যালয়ে যাওয়া-আসা করতে পারে, বিদ্যালয়ের পথে বখাটেরা যেন তাদের উত্ত্যক্ত না করে, হাত ধরে না টানে, অপহরণের হুমকি না দেয়। অবশ্য তিনি থানা-পুলিশের কাছে যাননি; উপজেলা চেয়ারম্যান, নারী ভাইস চেয়ারম্যান ও মেয়েদের বিদ্যালয়টির ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যদের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। কিন্তু এর ফল হলো উল্টো, অতি ভয়ংকর। বখাটে সন্ত্রাসী চাঁপা রানীকে মোটরসাইকেল চাপা দিয়ে হত্যা করল।
নাটোরের কলেজশিক্ষক মিজানুর রহমানের হত্যার ঘটনাও ছিল একই রকম। তিনিও তাঁর ছাত্রীদের উত্ত্যক্তকারীদের সরাসরি কিছুই বলেননি, বলেছিলেন কলেজের অধ্যক্ষকে। অধ্যক্ষ উত্ত্যক্তকারী দুই বখাটে সন্ত্রাসীকে ভর্ৎসনা করেছিলেন—সেই ক্রোধে তারা মিজানুর রহমানের ওপর প্রথমে মোটরসাইকেল তুলে দিয়ে, পরে মাথায় ও চোখে আঘাত করে হত্যা করেছে। অর্থাৎ উভয় ক্ষেত্রেই নিগ্রহের শিকার মেয়েদের অভিভাবকেরা আইন-আদালত এড়িয়ে সামাজিকভাবে সমস্যাটির সমাধান প্রত্যাশা করেছিলেন।
মেয়েদের উত্ত্যক্ত করাকে এখন আর ‘ইভ টিজিং’ বলে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। ‘ইভ টিজিং একটা সামাজিক সমস্যা, এটা শুধু পুলিশিংয়ের মাধ্যমে নির্মূল করা সম্ভব নয়’—এমন কথা বলাও এখন আর যথেষ্ট নয়, যেমনটি বলেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক। যদি শুধু সামাজিক সমস্যাই হতো, তাহলে লোকমানপুরে বা মধুখালীতে—কোথাও হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত গড়াত না, কারণ দুটি ক্ষেত্রেই মেয়েদের অভিভাবকেরা সমাধান চেয়েছিলেন সামাজিক পন্থায়।
এখন অত্যন্ত কঠোর হাতে নামতে হবে উত্ত্যক্তকারীদের দমনের অভিযানে। গত এক বছরে ১২৬৯ জন উত্ত্যক্তকারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ নথিভুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু শাস্তি হয়েছে কজনের? দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলে উত্ত্যক্তকারীদের দৌরাত্ম্য হয়তো এতটা বাড়ত না। এই অপরাধকে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইনের আওতায় নিয়ে চাঞ্চল্যকর অপরাধের তালিকাভুক্ত করা উচিত। এর পাশাপাশি পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে মেয়েদের উত্ত্যক্তকরণ বিষয়ে সচেতনতা ও সংবেদনশীলতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন, যেন তাঁরা দ্রুত সাড়া দিয়ে নিগৃহীত মেয়েদের সাহায্যার্থে এগিয়ে যান। উত্ত্যক্তকারীদের হাতেনাতে ধরতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এলাকাসহ বিভিন্ন সামাজিক স্থানে সাদা পোশাকে পুলিশ সদস্যদের টহলের উদ্যোগ নিলে ভালো হয়।
সামাজিকভাবেও উত্ত্যক্তকরণ-বিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, মসজিদ-মন্দিরের ধর্মীয় নেতা, কিশোর-কিশোরীদের মা-বাবা ও পাড়া-মহল্লার গণ্যমান্য নাগরিকেরা—সবাই একজোটে চাইলে উত্ত্যক্তকারীদের দমন করা অসম্ভব কিছু নয়। আমরা দেখেছি, উত্ত্যক্তকরণের শিকার হয়ে অনেক মেয়ে আত্মহত্যা করেছে। এখন দেখা যাচ্ছে, উত্ত্যক্তকারীরা হত্যাকারী হয়ে উঠেছে। এই নৃশংস দুর্বৃত্তি আর বাড়তে দেওয়া যায় না। এখনই শক্ত হাতে এর রাশ টেনে ধরতে হবে। মিজানুর রহমান ও চাঁপা রানী ভৌমিকের হত্যাকারীদের অতি দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করুন।

প্রকাশ্যে গুলি করে দুই কিশোরীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর

গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে দুই কিশোরীকে জনসমক্ষে গুলি করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে সোমালিয়ার আল-কায়েদাসংশ্লিষ্ট জঙ্গি সংগঠন আল-শেবাব। গত বুধবার বিকেলে কয়েক শ স্থানীয় বাসিন্দার সামনে ফায়ারিং স্কোয়াডের সদস্যরা তাদের গুলি করে হত্যা করে। ইথিওপিয়ার সীমান্তবর্তী বেলেডোয়াইন শেবাবের প্রধান কার্যালয়ের সামনে এ ঘটনা ঘটে। কোনো নারীর বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে এ ধরনের শাস্তি দেওয়ার ঘটনা সে দেশে এটিই প্রথম।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পর শেবাবের আঞ্চলিক কমান্ডার শেখ ইউসুফ আলী উগাস জনতার উদ্দেশে বলেন, শহরে ওই দুই কিশোরী শত্রুপক্ষের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করছিল। গত সপ্তাহে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। দীর্ঘ তদন্তের পর তারা তাদের অপরাধ স্বীকার করেছে।
আলী নামের এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখেন ওই দুই কিশোরীকে পেছনে হাত বেঁধে মাটিতে বসিয়ে রাখা হয়েছে। একপর্যায়ে শেবাবের সদস্যরা মুখ ঢেকে পেছন থেকে তাদের লক্ষ্য করে গুলি করে।

লাদেনের হামলার হুমকি উড়িয়ে দিয়েছে ফ্রান্স

আল-কায়েদার প্রধান ওসামা বিন লাদেনের জঙ্গি হামলার হুমকি উড়িয়ে দিয়েছে ফ্রান্স। ফরাসি পাঁচ নাগরিককে অপহরণের দাবিও প্রত্যাখ্যান করেছে ফ্রান্স কর্তৃপক্ষ। তবে হামলার হুমকির তীব্র নিন্দা জানিয়েছে তারা। অডিও টেপটি যে আসলেই ওসামার তাও স্বীকার করে নিয়েছে তারা।
আল জাজিরা গত বুধবার ওসামার প্রায় দুই মিনিটের একটি অডিও টেপ প্রচার করে। ওই টেপে ওসামা বলেন, প্রকাশ্য স্থানে ফ্রান্স নারীদের বোরকা পরার ওপর যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, তা আল-কায়েদাকে তাঁদের হাতে আটক পাঁচ ফরাসিকে হত্যা করার বৈধতা দিয়েছে।
ওসামার ওই অডিও ভাষণের প্রতিক্রিয়ায় ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বার্নার্ড কুচনার গতকাল বৃহস্পতিবার বলেন, তাঁরা যেকোনো হামলার ব্যাপারে সতর্ক আছেন। তবে তাঁরা মনে করেন, ফরাসিদের অপহরণ করার পেছনে ওসামার হাত নেই। তিনি বলেন, ওসামা সাহারার অপহূত ব্যক্তিদের কথা বলে সুবিধা আদায় করতে চাইছেন। পাকিস্তানের দুর্গম এলাকায় লুকিয়ে থেকে সাহারার মতো দূরবর্তী এলাকার অপহরণকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার মতো সক্ষমতা ওসামার আছে বলে তাঁরা মনে করেন না।

কমেডি শোতে ‘রাশভারী’ ওবামা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, তিনি যে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা বাস্তবায়নে আরও সময় দরকার। গত বুধবার কেব্ল টিভি কমেডি সেন্ট্রালের একটি হাস্যরসাত্মক অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন তিনি। দ্য ডেইলি শো নামের অনুষ্ঠানটিতে অবশ্য বেশ ভাবগাম্ভীর্য বজায় রেখেই কথা বলেন ওবামা।
অনুষ্ঠানের উপস্থাপক জনপ্রিয় কমেডি অভিনেতা জন স্টুয়ার্ট ওবামাকে তাঁর পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতির প্রসঙ্গ তুলে বেশ কয়েক দফা নাজেহাল করার চেষ্টা করেন। তবে ওবামা তাঁর পরিবর্তনের নীতির পক্ষ সমর্থনে অটল ছিলেন।
ওবামাই প্রথম ক্ষমতাসীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ‘কমেডি সেন্ট্রালের’ কোনো অনুষ্ঠানে যোগ দিলেন। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে দলের পক্ষে প্রচারণা চালানোর অংশ হিসেবেই ওবামা ওই শোতে যোগ দেন।
জন স্টুয়ার্ট যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক মন্দা, বেকারত্বের হার বেড়ে যাওয়া প্রভৃতি স্মরণ করিয়ে দিয়ে ওবামাকে বলেন, তিনি (ওবামা) নির্বাচনী স্লোগান হিসেবে বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ, আমরা পারি।’ কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার পর আশানুরূপ অগ্রগতি না হওয়ায় এখন মার্কিনরা মনে করেন, সে সময় ওবামা ‘হ্যাঁ, আমরা পারি’ স্লোগানের সঙ্গে অদৃশ্য শর্তও জুড়ে দিয়েছিলেন।
স্টুয়ার্টের এ কথার জবাবে ওবামা বলেন, তিনি যখন ‘হ্যাঁ, আমরা পারি’ স্লোগানটি দিয়েছিলেন, তখন মার্কিন কোনো নাগরিকই মনে করেননি, ‘আমরা পারি’ বলতে তিনি ১৮ মাসের মধ্যে সব করে দেখানোকে বুঝিয়েছেন। এর জন্য সময় দরকার। রাতারাতি সবকিছু করে ফেলা সম্ভব নয়।

পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত মার্কিন গ্রেপ্তার

যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে পাতালরেলে সিরিজ বোমা হামলার পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে এক ব্যক্তিকে গত বুধবার গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত এই মার্কিন নাগরিকের নাম ফারুক আহমেদ (৩৪)। মার্কিন বিচার বিভাগের ভাষ্য, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন আল-কায়েদার সঙ্গে যোগসাজশ রয়েছে তাঁর।
ওয়াশিংটনের উপকণ্ঠে ভার্জিনিয়ার পাতাল রেলস্টেশন এবং পেন্টাগন ও আর্লিংটন জাতীয় সমাধি ক্ষেত্রের পার্শ্ববর্তী এলাকায় গত এপ্রিল থেকে ফারুক আহমেদের সন্দেহজনক চলাফেরা পর্যবেক্ষণ এবং ভিডিওচিত্র ও আলোকচিত্রের ভিত্তিতে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কর্মকর্তারা বলেছেন, আগামী বছর পাতালরেলে হামলা চালানোর উদ্দেশ্যে পরিকল্পনা করছিলেন তিনি।
ফারুক আহমেদের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, সম্ভবত সামরিক ব্যক্তিকে হত্যা করার পরিকল্পনা করেছেন তিনি। সবচেয়ে বেশি মানুষকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে কোন স্থানে বোমা পুঁতে রাখা হবে, তারও ছক কষছিলেন তিনি।
জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক সহকারী এটর্নি জেনারেল ডেভিড ক্রিস বলেছেন, ফারুক আহমেদের গ্রেপ্তারের ঘটনার মধ্য দিয়ে সন্ত্রাসী হামলার হুমকির বিরুদ্ধে অব্যাহত সতর্কতামূলকব্যবস্থা গ্রহণের যৌক্তিকতা প্রমাণিত হয়েছে। তা ছাড়া সন্ত্রাসীদের অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনের আগেই তাঁদের পরিকল্পনা কীভাবে নস্যাৎ করা সম্ভব, সে বিষয়টিও প্রমাণিত হয়েছে। তিনি বলেন, তাঁর বিশ্বাস, ফারুক আহমেদসহ অন্য সন্ত্রাসীরা পাতালরেলে বোমা হামলা চালানোর পরিকল্পনা করেন। কিন্তু নিরাপত্তাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রচেষ্টায় সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।
জানা যায়, ফারুক আহমেদ এপ্রিলে ভার্জিনিয়ার একটি হোটেলে এক ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এরপর কয়েক মাস ধরে হামলার ভিত্তি গড়ে তুলেন। হামলার লক্ষ্যস্থলগুলোর মধ্যে ছিল ব্যস্ততম পেন্টাগন সিটি ও কোর্ট হাউস। ফারুক আহমেদ ওই সব স্টেশন সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেন। এসব তথ্য তিনি গত মাসে এক ব্যক্তিকে সরবরাহ করেন। ধারণা করা হচ্ছে, ওই ব্যক্তির সঙ্গে আল-কায়েদার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে।

তারিক আজিজের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না করার আহ্বান

ইরাকের সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী তারিক আজিজকে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডাদেশের নিন্দা জানিয়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা। জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) তারিক আজিজের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না করার জন্য ইরাক সরকারের কাছে আহ্বান জানিয়েছে। অন্যদিকে এ সাজার নিন্দা জানিয়েছে ভ্যাটিকান।
তারিক আজিজকে গত মঙ্গলবার মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন ইরাকের সুপ্রিম কোর্ট। আন্তর্জাতিকভাবে দেশটির সাবেক শাসক সাদ্দাম হোসেন সরকারের সবচেয়ে পরিচিত মুখ ছিলেন তিনি।
জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের মুখপাত্র মার্টিন নেসার্কি গতকাল বৃহস্পতিবার বলেছেন, ‘মৃত্যুদণ্ডের ব্যাপারে জাতিসংঘের অবস্থান সুস্পষ্ট। জাতিংসঘ এ দণ্ডের বিরোধী। আমরা চাই না, তারিক আজিজের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হোক।’
ভ্যাটিকানের মুখপাত্র ফেডেরিকো লম্বার্দি গত বুধবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘মৃত্যুদণ্ডের ব্যাপারে ক্যাথলিক গির্জার অবস্থান স্পষ্ট। তারিক আজিজকে দেওয়া সাজা কার্যকর হবে না, এটাই আমরা আশা করছি।’ তিনি বলেন, ‘মারাত্মক বিপর্যয়ের পর দেশটির শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় তারিক আজিজকে ক্ষমা করে দেওয়া উচিত। তাঁকে রক্ষায় কূটনৈতিকভাবে চেষ্টা চালানো হবে।’
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান ক্যাথরিন অ্যাস্টন বলেছেন, তারিক আজিজের সাজার বাস্তবায়ন মেনে নেওয়া হবে না। তাঁর সাজা কমিয়ে আনার চেষ্টা চালানো হবে।
সাদ্দাম হোসেনের শাসনামলের বর্বরতা স্বীকার করলেও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও একই কথা বলেছে। সংগঠনটি তারিক আজিজের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না করার জন্য ইরাক সরকারের কাছে আহ্বান জানিয়েছে।

ফ্রান্সে পেনশন সংস্কার বিল রদের দাবিতে ধর্মঘটিদের সমাবেশ

সদ্য পাস হওয়া পেনশন সংস্কার বিল রদের দাবিতে ফ্রান্সে ধর্মঘট পালনকারী কয়েক হাজার শ্রমিক-কর্মচারী গতকাল বৃহস্পতিবার সমাবেশ করেছেন। দেশের বিভিন্ন স্থানে কমপক্ষে ২৭০টি সমাবেশের আয়োজন করা হয়। এ ছাড়া আন্দোলনকারী কর্মী ও শিক্ষার্থীরা গতকাল নবমবারের মতো এক দিনের গণবিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দেন।
প্রেসিডেন্ট সারকোজি সরকারের নেওয়া পেনশন সংস্কার কার্যক্রমে সরকারি কর্মীদের অবসর নেওয়ার বয়স ৬০ থেকে বাড়িয়ে ৬২ বছর এবং পূর্ণ অবসরকালীন ভাতা পাওয়ার বয়সসীমা ৬৫ থেকে বাড়িয়ে ৬৭ বছর করা হয়েছে। গত বুধবার সে দেশের পার্লামেন্টে এ সংক্রান্ত বিলটি চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে। সরকারের এই উদ্যোগের বিরুদ্ধে দুই সপ্তাহ ধরে বিক্ষোভ, সমাবেশ, ধর্মঘটসহ বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে আসছে ফ্রান্সের বিভিন্ন শ্রমিক সংঘ। তাদের এই বিক্ষোভ কর্মসূচিতে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও ব্যাপক সমর্থন জানিয়েছেন।
সাম্প্রতিক বেশির ভাগ বিক্ষোভ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হয়েছে। তবে বিভিন্ন শহরে তরুণ শিক্ষার্থীদের বিচ্ছিন্ন অংশের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। কর্তৃপক্ষ খুবই সতর্ক রয়েছে।
গতকাল দিনের শুরুতে ফ্রান্সের অর্থ ও অর্থনীতি মন্ত্রণালয়ের কার্যালয়ে এক ঘণ্টার জন্য বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সমাবেশে ধর্মঘটি কর্মীদের জড়ো হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। মূল বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করা হয় রাজধানী প্যারিসে। গতকাল দুপুরে ওই সমাবেশ শুরু হয়। ধর্মঘটের কারণে প্যারিসের ওরলি বিমানবন্দরের অর্ধেক এবং দ্য গল বিমানবন্দরের এক-তৃতীয়াংশ ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। রেল পরিবহন সেবাও বিঘ্নিত হয়েছে। কর্তৃপক্ষের হিসাবে ধর্মঘটি কর্মীদের সংখ্যা আগের তুলনায় কমেছে।
ফরাসি পত্রিকা লে প্যারিঁতে প্রকাশিত সাম্প্রতিক জনমত জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, শ্রমিক-কর্মচারীদের এই ধর্মঘট-বিক্ষোভ কর্মসূচির প্রতি সমর্থন জানাচ্ছে ৬৫ শতাংশ ফরাসি। কিন্তু যেহেতু বিলটি পার্লামেন্টে অনুমোদন পেয়ে গেছে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অর্ধবার্ষিক ছুটি চলছে, তাই গণবিক্ষোভ কর্মসূচিতে আগের দিনগুলোর মতো গণজমায়েতের আশা করছেন না বিভিন্ন শ্রমিক সংঘের নেতারা। শ্রমিক সংঘ ফোর্স ওভরিয়েরের নেতা জ্যঁ-ক্লদ মেইলি বলেন, ‘আমরা জানি, কিছুটা ক্লান্তি এসে গেছে এবং বিদ্যালয়গুলোতেও ছুটি চলছে। আমরা কোনো রেকর্ড ভাঙার চেষ্টা করছি না। তবে আমরা সরকারকে চাপে রাখতে চাইছি।’ আগামী ৬ নভেম্বরও বিক্ষোভ কর্মসূচির ঘোষণা রয়েছে।
এদিকে ফরাসি প্রেসিডেন্টের সহযোগীরা জানিয়েছেন, ১৫ নভেম্বর আইনে স্বাক্ষর করতে পারেন সারকোজি। এই আইন পাসের কারণে সারকোজির জনপ্রিয়তাও মাত্র ২৯ শতাংশে নেমে এসেছে বলে বিভিন্ন জরিপসূত্রে জানা গেছে। ক্ষমতায় আসার পর সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে তাঁর জনপ্রিয়তা। এএফপি।
বিশেষ আয়োজন ‘ফ্রান্স টালমাটাল’ পড়ুন চলতি বিশ্বে

চীনে রাস্তাঘাট পরিষ্কার রাখার অভিনব কৌশল

রাস্তাঘাট পরিষ্কার রাখার অভিনব কৌশল বেছে নিয়ে সফল হয়েছে চীনের শানজি প্রদেশের জিয়ানিয়াং নগর কর্তৃপক্ষ। রাস্তাঘাটে ফেলা সিগারেটের অবশিষ্ট অংশ (বাট) কুড়িয়ে জমা দেওয়ার বিনিময়ে পুরস্কার হিসেবে অর্থ দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়। এতে আশাব্যঞ্জক সাড়া মিলেছে। শানজি প্রদেশে রয়েছে এই জিয়ানিয়াং নগর। গত বুধবার চায়না ডেইলি পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে এ কথা জানা যায়।
গত সেপ্টেম্বর মাসে শুরু হওয়া এই কর্মসূচিতে এ পর্যন্ত ৭০ লাখ সিগারেটের বাট রাস্তাঘাট থেকে সরিয়েছে নগরবাসী। প্রতিটির জন্য স্থানীয় প্রশাসনের বরাদ্দ হচ্ছে চীনা মুদ্রায় পাঁচ ফেন (এক মার্কিন সেন্টের সামান্য কম) করে। সে অনুযায়ী প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২০ লাখ বাটের জন্য স্থানীয় বাসিন্দাদের এক লাখ ইউয়ান (১৫ হাজার ডলার) দেওয়া হয়। ৫০ লাখ বাটের টাকা পরিশোধ করা বাকি আছে এখনো। একজন ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি—সাড়ে সাত হাজার সিগারেটের বাট জমা দিয়ে ৩৭৫ ইউয়ান পেয়েছেন।
এই কর্মসূচি পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা হাউ জিয়ান বলেন, ‘নগরকে আরও পরিচ্ছন্ন ও উন্নত করার অংশ হিসেবে এই কর্মসূচি আমরা হাতে নিয়েছি। পরিবেশ নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে ও ধূমপানের ঝুঁকির ব্যাপারে সতর্ক করতে এ কর্মসূচি কাজে লাগছে।’

সিএসসি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে ভারত

আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) কনভেনশন অন সাপ্লিমেনটারি কমপেনসেশন ফর নিউক্লিয়ার ড্যামেজ (সিএসসি) চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে ভারত। গত বুধবার আইএইএর সদর দপ্তর ভিয়েনায় এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর আওতায় ভারতকে সে দেশে পারমাণবিক দুর্ঘটনা হলে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
এই চুক্তি স্বাক্ষরের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পরমাণু প্রতিষ্ঠানের ভারতের বেসামরিক বাজারে প্রবেশের পথ সুগম হলো। ওয়াশিংটনের আহ্বানে ভারত এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। আগামী ৫ নভেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ভারত সফরে যাওয়ার কথা।
আইএইএ জানায়, অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় আইএইএর সদর দপ্তরে সংক্ষিপ্ত এক অনুষ্ঠানে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। অস্ট্রিয়ায় নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত দিঙ্কার খুলার সিএসসি চুক্তিতে সই করেন।
১৯৯৭ সালের সেপ্টেম্বরে ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত আইএইএর সম্মেলনে ৮০টি দেশের প্রতিনিধিরা সিএসসি চুক্তির বিষয়ে একমত হন। এর আওতায় পারমাণবিক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
ভারত সম্প্রতি এ-সংক্রান্ত একটি বিল পাস করেছে। নয়াদিল্লি আশা করছে, সিএসসি চুক্তি স্বাক্ষরের ফলে এই বিল সম্পর্কে মার্কিন কোম্পানিগুলোর উদ্বেগ কমে আসবে।
দুই বছর আগে ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির মধ্যে পারমাণবিক জ্বালানির ক্ষেত্রে সহযোগিতাবিষয়ক চুক্তি স্বাক্ষর করে। স্নায়ুযুদ্ধের সময় বিপরীতমুখী অবস্থানে থাকা দুটি দেশের এই চুক্তি স্বাক্ষরকে একটি মাইলফলক হিসেবে দেখা হয়।

সাগরতলের নতুন যান

একজন ব্রিটিশ উদ্ভাবক এমন এক জলযান (আন্ডারওয়াটার স্কুটার) উদ্ভাবন করেছেন, এতে চড়ে পর্যটকেরা সাগরতলের প্রবালপ্রাচীরে স্বাচ্ছন্দ্যে ঘুরে বেড়াতে পারবেন। যাঁরা সাঁতার জানেন না বা সাঁতারের পোশাক পরে বিচরণ করা শেখেননি, তাঁরাও সহজে চালাতে পারবেন এই জলযান।
বিনোদনপ্রত্যাশী পর্যটক যাঁরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাগরতীরে বেড়াতে যান, তাঁদের জন্য খুব কাজ দেবে ‘হাইড্রোবব’ নামের এই জলযান। এর মাধ্যমে সাগরতলে ১০০ ফুট গভীরে বিচরণ করা যাবে।
হাইড্রোববের নকশাকার অ্যান্ড্রু স্নিথ। জলযানের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হাইড্রোডোমের প্রতিষ্ঠাতাও তিনি। স্নিথ বলেন, ন্যূনতম প্রশিক্ষণ নিয়ে একজন আরোহী এই জলযানে করে সাগরতলে ঘুরে বেড়াতে পারবেন। এ জন্য তাঁকে সাঁতারের জবড়জঙ্গ পোশাক পরতে হবে না।
স্নিথ একসময় বার্মিংহামের কাছে ব্রমসগ্রোভে একটি গাড়ি কারখানায় কাজ করতেন। এখন ব্যবসা পেতেছেন ফ্লোরিডায়। তিনি বলেন, হাইড্রোববে ঘুরে বেড়ানো একজনের জীবনে একটি ব্যতিক্রমী স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হবে।
হাইড্রোববে আরোহীর স্বাচ্ছন্দ্যে থাকার জন্য রয়েছে হেলমেটের মতো একটি আবরণ। এতে হরদম থাকে বাতাসের বুদ্বুদ। সংলগ্ন ট্যাংকি থেকে অবিরত এখানে অক্সিজেন সরবরাহ হতে থাকে। ট্যাংকিটি ঘণ্টা খানেকের বেশি সময় ধরে অক্সিজেন সরবরাহ করার মতো সুপরিসর। এই স্বচ্ছ আবরণের ভেতর দিয়ে আরোহী চারপাশের দৃশ্য ভালোভাবে দেখতে পারবেন।
আরোহীকে ডুবুরিদের মতো প্রচলিত চশমা, শ্বসনযন্ত্র ও সাঁতারের পোশাক পরতে হবে না। তবে আরোহী চাইলে সাধারণ চশমা পরতে পারবেন, এমনকি পানির নিচ থেকে কথাও বলতে পারবেন। আসনের নিচে বসানো একটি ১২ ভোল্টের ব্যাটারিতে চলে এই জলযান। এটি নিয়ন্ত্রণের জন্য রয়েছে একটি বাউন্স ব্যাগ, যা আধুনিক সাঁতারের পোশাকপরা ডুবুরিরাও ব্যবহার করে থাকেন।
বিশ্বের বিভিন্ন অবকাশকেন্দ্রে পর্যটকদের বিনোদনের লক্ষ্যে হাইড্রোডম এ পর্যন্ত ৩৫০টি হাইড্রোবব তৈরি করেছে।

আইসিবির ৪০ শতাংশ লভ্যাংশ অনুমোদন

ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) ২০০৯-১০ অর্থবছরের শেয়ারহোল্ডারদের জন্য মোট ৪০ শতাংশ লভ্যাংশ অনুমোদন করেছে। এর মধ্যে বোনাস শেয়ারে ২৫ ও নগদে ১৫ শতাংশ লভ্যাংশ প্রদান করা হবে।
ঢাকায় জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের সম্মেলন কেন্দ্রে গতকাল বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত আইসিবির ৩৪তম বার্ষিক সাধারণ সভায় এ লভ্যাংশ অনুমোদন করা হয়।
আইসিবির চেয়ারম্যান এম খায়রুল হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সভায় কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) দীনা আহসানসহ পরিচালকেরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় জানানো হয়, আইসিবি ২০০৯-১০ অর্থবছরে ২১৩ কোটি পাঁচ লাখ টাকার নিট মুনাফা অর্জন করে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৯০ দশমিক ৮৫ শতাংশ বেশি এবং আইসিবির প্রতিষ্ঠার পর থেকে সর্বোচ্চ। এই অর্থবছরে উভয় স্টক এক্সচেঞ্জে আইসিবি ও এর সাবসিডিয়ারি কোম্পানিগুলোর মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১২ হাজার ৪৩৫ কোটি টাকা, যা আগের বছরের চেয়ে ১২৯ শতাংশ বেশি।

স্থিতিশীলতা ও অবকাঠামো ছাড়া এফডিআই আসে না

প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা মশিউর রহমান বলেছেন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) বড় ধরনের অবদান রাখতে পারে। তবে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অবকাঠামোগত সুযোগ না থাকলে এফডিআই আসে না।
মশিউর রহমান বলেন, একটা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিদেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন না হলে আবার বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও ওই দেশে বিনিয়োগ করতে এগিয়ে আসে না।
গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকায় ‘এফডিআই এবং বিশ্ব বিনিয়োগ প্রতিবেদন ২০১০-এর প্রতিফলন’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মশিউর রহমান এসব কথা বলেন। ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি) এ সেমিনারের আয়োজন করে।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সিএ ভবনে আয়োজিত সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন আইসিএবির সভাপতি জামালউদ্দিন আহমেদ। মুক্ত আলোচনা পর্বে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন আইসিএবির সাবেক সভাপতি এম এ বারী। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আইসিএবি কাউন্সিল সদস্য মসিহ মালিক চৌধুরী।
মশিউর রহমান বলেন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সরকার বিদ্যুৎ, জ্বালানি, অবকাঠামোসহ যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে, যা বৈদেশিক বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করবে।
জামালউদ্দিন আহমেদ বলেন, ২০০৯-১০ অর্থবছরে দেশে ৬১ কোটি ৭৭ লাখ ডলার এফডিআই এসেছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় কম। তিনি আরও বলেন, ২০০৫-০৬ থেকে ২০০৯-১০ অর্থবছর পর্যন্ত দেশের ৮৮৯ কোটি ২০ লাখ ডলারের এফডিআই এসেছে, যা দেশের অর্থনৈতিক বিকাশে সহায়তা করেছে।
মূল প্রবন্ধে মসিহ মালিক চৌধুরী বলেন, বড় ধরনের স্থানীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধি ছাড়া কেবল এফডিআই কখনোই একা একা একটা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন করতে পারে না। তিনি আরও জানান, বাংলাদেশে ২০০৯ সালে ৯০ কোটি ডলারের এফডিআই এসেছে। এ ছাড়া ২০০৫ সালে ৮৪ কোটি ৫৩ লাখ ডলার, ২০০৬ সালে ৯৮ কোটি ৯০ লাখ, ২০০৭ সালে ৭৯ কোটি ৩০ লাখ এবং ২০০৮ সালে ৭৬ কোটি ৯০ লাখ ডলারের এফডিআই আসে।

সামাজিক ব্যবসা সব সামাজিক সমস্যার সমাধান করতে পারে: ড. ইউনূস

নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, সামাজিক ব্যবসা সব ধরনের সামাজিক সমস্যার সমাধান করতে পারে। সামাজিক ব্যবসায় এগিয়ে আসার জন্য সব বিত্তবান ব্যবসায়ীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
গতকাল বৃহস্পতিবার ‘গ্লোবাল সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি অব জার্মান বিজনেস কনফারেন্স’-এর প্রথম অধিবেশনের সামাজিক ব্যবসা বিষয়ে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে মুহাম্মদ ইউনূস এ কথা বলেন। বাংলাদেশ জার্মান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (বিজিসিসিআই) স্থানীয় এক হোটেলে এই সম্মেলনের আয়োজন করে। এতে সহায়তা করেছে ঢাকাস্থ জার্মান দূতাবাস ও জিটিজেড।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, বাংলাদেশের দারিদ্র্য দূরীকরণ, জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ, স্বাস্থ্য খাতের মান উন্নয়নে সামাজিক ব্যবসা বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ সামাজিক সমস্যার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সমস্যার সমাধান করা সম্ভব বলেও তিনি অভিমত দেন।
মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, প্রত্যেক মানুষই তার নিজ নিজ অবস্থান থেকে সামাজিক ব্যবসা করতে পারে। এ জন্য শুধু বড় বড় কোম্পানির দ্বারস্থ হতে হবে না। অপেক্ষাকৃত কম সামর্থ্যবান ব্যক্তি সামাজিক ব্যবসায় অল্প পুঁজি বিনিয়োগ করতে পারবেন। বিনিয়োগের সুযোগ থেকে কেউই বঞ্চিত হবেন না। সামাজিক ব্যবসা হলো এক ধরনের সৃষ্টিশীল চিন্তার বাস্তবায়ন।
গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা এই অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, সামাজিক ব্যবসা করতে গেলে মুনাফা নেওয়া যাবে না। শুধু বিনিয়োগকারী তাঁর বিনিয়োগের অংশ তুলে নিতে পারেন আর মুনাফার অংশ পুনর্বিনিয়োগ করবেন। আর প্রচলিত ব্যবসায় মুনাফা তুলে নিতে পারেন উদ্যোক্তারা।
মুহাম্মদ ইউনূস জানান, প্রচলিত ব্যবসা ও সামাজিক ব্যবসা—দুই ধরনের ব্যবসার বাজার, পণ্য ও ব্যবসার ধরন একই রকমের। সর্বোপরি পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু দুটির উদ্দেশ্য ভিন্ন।
মুহাম্মদ ইউনূস উদাহরণ দিয়ে বলেন, প্রচলিত ব্যবসায় বছর শেষে প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসাব করেন কী পরিমাণ মুনাফা হলো। আর সামাজিক ব্যবসায় হিসাব হচ্ছে এর ফলে সমাজের কতটা উপকার হলো। সামজিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অন্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মতো একই ধরনের বেতন পেতে পারেন।
গ্রামীণ ড্যানোনের শক্তি দই উৎপাদন সামাজিক ব্যবসার একটি বড় উদাহরণ বলে অভিমত দেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংকের সঙ্গে বিশ্বের নামকরা প্রতিষ্ঠানের যৌথভাবে সামাজিক ব্যবসার উদ্যোগ শুরু করার কথা জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশে প্রয়োজনের তুলনায় অর্ধেক সেবিকা (নার্স) রয়েছেন। ইতিমধ্যে তাঁর প্রতিষ্ঠান একটি নার্স কলেজ স্থাপন করেছে। আরও ১৩টি নার্স কলেজ স্থাপন করা হবে। নার্স তৈরির মাধ্যমে চিকিৎসা খাতে নার্সিং সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগও একটি সামাজিক ব্যবসা। এ ছাড়া কেমিক্যাল কোম্পানি বিএএসএফের সহায়তায় বিশেষ ধরনের মশারি তৈরির উদ্যোগ শুরু হয়েছে। এ ছাড়া বিশ্বখ্যাত পাদুকা প্রস্তুতকারী কোম্পানি অ্যাডিডাসের সঙ্গে জুতার ব্যবসা শুরুর বিষয়টি আলোচনা চলছে বলে ড. ইউনূস জানান।
সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন জার্মান রাষ্ট্রদূত হোলগার মাইকেল, বিজিসিসিআইয়ের সভাপতি সাইফুল ইসলাম, জার্মান কোম্পানি টুব সুড এজির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইং এক্সেল স্টিপকেন। প্যানেল আলোচক হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূস ছাড়াও ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খান, অটো গ্রুপের চেয়ারম্যান মাইকেল অটো, বিএএসএফের এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সভাপতি সোয়ারি ডুভার্গ। এতে সঞ্চালকের ভূমিকা পালন করেন ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম।
বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খান বলেন, সামাজিক দায়বদ্ধতা কার্যক্রমে বিনিয়োগ করলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে কর ছাড় দিয়েছে সরকার। অথচ বড় কোম্পানিগুলো সামাজিক দায়বদ্ধতা কার্যক্রমে অর্থ ব্যয় করতে চায় না।
মাইকেল অটো বলেন, সামাজিক ব্যবসার ধারণা আগামী দিনের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য একটি কার্যকর উপায়। দারিদ্র্য বিমোচনে এই সামাজিক ব্যবসা বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে।
মাহফুজ আনাম বলেন, যেকোনো সমাজে নতুন ধারণা সঙ্গে সঙ্গেই গ্রহণযোগ্য হয় না। সামাজিক ব্যবসায় মুনাফা রয়েছে, কিন্তু এর প্রভাব থাকে সমাজে। প্রচলিত ব্যবসায় মুনাফা সারাজীবন থাকে না। এর অন্যতম বড় উদাহরণ বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা।
বাংলাদেশের ইমেজ সম্পর্কে মাহফুজ আনাম বলেন, ‘দরিদ্র দেশ—এমন হীনম্মন্যতায় আমরা ভোগী। আমরা বলতে পারি না বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ। এই চ্যালেঞ্জ আমাদের নিতে হবে। কেননা আমাদের জিডিপির বার্ষিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ৬ শতাংশ। আমাদের এই মানসিকতা বদলাতে হবে।’
দিনব্যাপী সম্মেলনে দ্বিতীয় করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (সিএসআর) সংক্রান্ত সেমিনার হয়। এক দিনের এই সম্মেলনে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দেড় শতাধিক কর্মকর্তা অংশ নেন। বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে আয়োজকেরা সম্মেলনের নানা দিক সম্পর্কে তুলে ধরেন।

দেশের শেয়ারবাজারে সূচক ও লেনদেনের নতুন রেকর্ড

মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে গতকাল বৃহস্পতিবার দেশের শেয়ারবাজারে লেনদেনের পরিমাণ বেড়ে আবারও সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেল। শুধু লেনদেনই নয়, এদিন দুই স্টক এক্সচেঞ্জের সবগুলো সূচক এবং বাজার মূলধনের ক্ষেত্রেও হয়েছে নতুন রেকর্ড।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) গতকাল মোট লেনদেন হয়েছে দুই হাজার ৯৪৬ কোটি টাকার শেয়ার। স্টক এক্সচেঞ্জটির ইতিহাসের এখন পর্যন্ত এটিই এক দিনে সর্বোচ্চ লেনদেন। এর আগে গত মঙ্গলবার ডিএসইতে দুই হাজার ৮৩৬ কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছিল।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) গতকাল মোট লেনদেন হয়েছে ৩৪০ কোটি টাকা। এটি হচ্ছে সিএসইতে প্রথমবারের মতো লেনদেন ৩০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার রেকর্ড। সিএসইতে এর আগের সর্বোচ্চ লেনদেনের রেকর্ড ছিল ২৬২ কোটি ৩৫ লাখ টাকার।
এতে দুই স্টক এক্সচেঞ্জের সম্মিলিত লেনদেনের পরিমাণ গতকাল তিন হাজার ২৮৬ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে। এর আগে দুই স্টক এক্সচেঞ্জে সম্মিলিতভাবে সর্বোচ্চ লেনদেনের পরিমাণ ছিল তিন হাজার ১২০ কোটি টাকার কিছু বেশি।
তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে অপেক্ষাকৃত ভালো মৌলভিত্তি ও বড় মূলধনের কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে গতকাল, যা উভয় স্টক এক্সচেঞ্জের মূল্যসূচকগুলোকে ঊর্ধ্বমুখী করে তুলেছে।
ডিএসইর সাধারণ মূল্যসূচক গতকাল ৮৮ পয়েন্টের কিছু বেশি বেড়ে সাত হাজার ৯৩৭ পয়েন্ট হয়েছে। এর আগে ডিএসইর সাধারণ সূচক আর কখনো এই পর্যায়ে ওঠেনি। আর সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচকও এদিন ২৩০ পয়েন্টের বেশি বেড়ে ২২ হাজার ৭৪৩ পয়েন্ট হয়েছে। এটিও সিএসইর ইতিহাসে সার্বিক মূল্যসূচকের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠার নজির।
বাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, অতিরিক্ত তারল্যপ্রবাহের কারণে কয়েক মাস ধরে বাজার এমনিতেই বাড়ছিল। তা ছাড়া বাজারে নতুন প্রতিষ্ঠানের শেয়ার না আসায় অতিরিক্ত দাম দিয়েও বিনিয়োগকারীরা শেয়ার কিনছেন।
এ ছাড়া তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর প্রকাশিত ত্রৈমাসিক অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে শেয়ারপ্রতি আয়ের (ইপিএস) প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক ভালো হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম বাড়ছে। তবে বাজারে সরবরাহ যতই বাড়ুক, অতিমূল্যায়িত শেয়ারে বিনিয়োগ করলে ঝুঁকি থেকেই যাবে। তাই ঝুঁকি এড়াতে অতিমূল্যায়িত শেয়ারে বিনিয়োগ না করার পরামর্শ দিয়েছেন বাজার বিশ্লেষকেরা।
উল্লেখ্য, এর আগে গত মঙ্গলবার ১৯ দিনের মাথায় দেশের দুটি শেয়ারবাজারে লেনদেনের পরিমাণ, সবগুলো সূচক এবং বাজার মূলধন বেড়ে আগের সব রেকর্ড অতিক্রম করে। সেদিন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) মোট লেনদেন হয়েছে দুই হাজার ৮৩৬ কোটি টাকার শেয়ার। একই দিনে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) লেনদেন হয়েছে ২৬২ কোটি ৩৫ লাখ টাকার শেয়ার। ওই দিন ডিএসইর সাধারণ মূল্যসূচক প্রায় ৭৬ পয়েন্ট বেড়ে সাত হাজার ৮১৭ পয়েন্টে ওঠে। আর সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক ১৬০ পয়েন্ট বেড়ে ২২ হাজার ৪৫৬ পয়েন্টে উন্নীত হয়।
বাজার পরিস্থিতি: দুই স্টক এক্সচেঞ্জেই গতকাল লেনদেনের প্রথম থেকেই সূচক বাড়তে শুরু করে। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এ ধারা অব্যাহত ছিল। মূলত ব্যাংক, বিমা, অব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের ওপর ভর করেই সূচক বেড়েছে। এদিন ডিএসইতে মোট লেনদেন হয়েছে ২৩৭টি কোম্পানির শেয়ার। এর মধ্যে দাম বেড়েছে ১৩০টির, কমেছে ১০৬টির ও অপরিবর্তিত ছিল একটি কোম্পানির শেয়ারের দাম। অন্যদিকে সিএসইতে লেনদেন হয়েছে ১৮৭টি কোম্পানির শেয়ার। এর মধ্যে দাম বেড়েছে ৯৯টির, কমেছে ৭৯টির ও অপরিবর্তিত ছিল নয়টি কোম্পানির শেয়ার।

স্বপ্ন ধারণ করার যন্ত্র তৈরি করা সম্ভব

গবেষকেরা দাবি করেছেন, তাঁরা এমন একটি ব্যবস্থা উদ্ভাবন করেছেন, যার মাধ্যমে মস্তিষ্কের উচ্চপর্যায়ের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ধারণ করা সম্ভব। গত বুধবার বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী নেচার-এ গবেষকদের এই উদ্ভাবনের কথা প্রকাশিত হয়। এই গবেষণায় নেতৃত্বদানকারী গবেষক মোরান কারফ জানিয়েছেন, তিনি যান্ত্রিক পদ্ধতিতে স্বপ্ন ধারণ এবং এর ব্যাখ্যা করার পরিকল্পনা করছেন।
অতীতকাল থেকেই স্বপ্ন ও এর ব্যাখ্যা নিয়ে মানুষের নানা ধরনের কল্পনা বা ধারণা প্রচলিত রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, প্রাচীন মিসরে স্বপ্নকে ঈশ্বরের বাণী মনে করা হতো। সাম্প্রতিক সময়ে মনোবিজ্ঞানীরা মানুষের মনের অবচেতন অংশ সম্পর্কে জানার ক্ষেত্রে স্বপ্ন ব্যাখ্যা করাকে অন্যতম পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করেন। এ ক্ষেত্রে স্বপ্নের বর্ণনা জানার জন্য তাঁদের একমাত্র পথ হচ্ছে যিনি স্বপ্ন দেখেছেন তার কাছ থেকে যতটুকু সম্ভব তথ্য বের করে আনা।
মোরান কারফের এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো, এমন একটি ব্যবস্থা উদ্ভাবন করা, যার মাধ্যমে মনোবিজ্ঞানীরা স্বপ্ন দেখা ব্যক্তির মস্তিষ্কের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া যান্ত্রিকভাবে ধারণ করার মাধ্যমে তার স্বপ্নের ব্যাখ্যা করতে পারবেন। তিনি বলেন, ‘আমরা মানুষের স্বপ্ন বিশ্লেষণ করতে আগ্রহী। মানুষ কেন স্বপ্ন দেখে, তার কোনো স্পষ্ট উত্তর নেই। তবে একটি প্রশ্নের উত্তর জানাতে চাই আমরা, সেটি হচ্ছে আমরা কখন স্বপ্নটি তৈরি করি?’
প্রাথমিক গবেষণার ফলের ভিত্তিতে গবেষক মোরান কারফ এই স্বপ্নধারক যন্ত্র উদ্ভাবনের সাহস করছেন। গবেষণায় তিনি দেখতে পেয়েছেন, ব্যক্তির মস্তিষ্কের কোষের বা নিউরনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সুনির্দিষ্ট বস্তু বা ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যখন কোনো ব্যক্তি মেরিলিন মনরো সম্পর্কে ভাবেন, তখন একটি নির্দিষ্ট নিউরন সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই গবেষণায় স্বেচ্ছায় অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের ওপর গবেষণা করে কারফ ও তাঁর সহকর্মীরা অনেকগুলো ধারণা ও বস্তুর ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট সংবেদনশীল নিউরন শনাক্ত করতে পেরেছেন।
মোরান কারফ অবশ্য স্বীকার করেছেন, তাঁদের এই প্রাথমিক পর্যবেক্ষণকে একটি যন্ত্রের মাধ্যমে রূপান্তর করে স্বপ্ন ধারণ করার একটি ব্যবস্থা উদ্ভাবন করার জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।

মঙ্গলে আজীবনের জন্য পাঠানো হবে মানুষ

মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা নতুন একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের চিন্তাভাবনা করছে। এই প্রকল্পের আওতায় নভোচারীদের মঙ্গল গ্রহে নিয়ে গিয়ে আর ফেরত আনা হবে না। আজীবনের জন্য সেখানে তাঁদের রেখে আসা হবে। ব্যতিক্রমী এ প্রকল্পটির নাম ‘হান্ড্রেড ইয়ার্স স্টারশিপ’।
নাসার প্রধান গবেষণা কেন্দ্র ‘অ্যামিস রিসার্চ সেন্টার’-এর পরিচালক পেটি ওয়ার্ডেন জানান, এ প্রকল্পের কাজ শুরু করতে অ্যামিস রিসার্চ সেন্টার এরই মধ্যে ১০ লাখ ডলার পেয়েছে।
ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা বলেছেন, প্রযুক্তিগত কারণে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন সময়সাপেক্ষ। প্রযুক্তি হাতে পেলে দীর্ঘমেয়াদে দূর গ্রহে মানুষের বসতি স্থাপনের সূচনা করা যাবে। ভিন্ন কোনো গ্রহে বসতি স্থাপনের জন্য মঙ্গলই সবচেয়ে সম্ভাবনাময় গ্রহ। কেননা, পৃথিবীর সঙ্গে এ গ্রহের অনেক মিল রয়েছে। মঙ্গলে মাঝারি মাত্রার মাধ্যাকর্ষণ শক্তি, বায়ুমণ্ডল, প্রচুর পানি ও কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং প্রয়োজনীয় মাত্রার খনিজ সম্পদ রয়েছে।
ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ডার্ক স্কালজ-ম্যাকুচ বলেন, প্রথমে চারজন নভোচারীকে দুটি মহাকাশযানে করে পাঠানো যেতে পারে। প্রতিটি মহাকাশযানে থাকবেন দুজন নভোচারী।
অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির পদার্থবিদ পল ডেভিস বলেন, এ প্রকল্পের মানে এই নয় যে, বিজ্ঞানের স্বার্থে নভোচারীদের সেখানে ফেলে আসা হবে। প্রকৃতপক্ষে দীর্ঘমেয়াদে মানুষের উপনিবেশ গড়ে তুলতে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মঙ্গলে সিরিজ অভিযান চালানো হবে।
বিজ্ঞানীরা বলেন, মঙ্গলে যাওয়া নভোচারীদের জন্য নির্দিষ্ট সময় পরপর পৃথিবী থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পাঠানো হবে। একই সঙ্গে মঙ্গলের সম্পদকে কাজে লাগিয়ে চাষাবাদ ও সেই সম্পদের সদ্ব্যবহার করার বিষয়টি ক্রমাগতভাবে নিশ্চিত করা হবে। এর মাধ্যমে মঙ্গলের নভোচারীরা একদিন আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠবেন এবং সেখানে মানুষের উপনিবেশ বিস্তৃতির ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করবেন।
প্রথম দিকে মানুষের উপনিবেশ স্থাপনের জন্য মঙ্গলের একটি যথোপযুক্ত স্থান নির্বাচন করা হবে, যেখানে থাকবে বরফ গহ্বর অথবা পানি, খনিজ পদার্থের মতো প্রাকৃতিক সম্পদ।
অধ্যাপক স্কালজ-ম্যাকুচ বলেন, পানি ও অক্সিজেনের চাহিদা মেটাবে এই বরফগহ্বর। মঙ্গলে ওজোনস্তর নেই। তাই অতি বেগুনি রশ্মি প্রতিরোধেও এই বরফগহ্বর ভূমিকা পালন করবে। তা ছাড়া লাল এই গ্রহে কোনো মহাবিপর্যয় ঘটলে নভোচারীদের জন্য লাইফবোটের ব্যবস্থা করা হবে।
ম্যাকুচ ও পল ডেভিস উভয়েই স্বীকার করেছেন, আন্তর্জাতিক সাহায্য ছাড়া এ প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এ কাজে ঝুঁকিও রয়েছে। তাঁরা জানান, এক জরিপে দেখা গেছে, অনেকেই স্বেচ্ছায় এ অভিযানে যেতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের কেউ কৌতূহল মেটাতে, কেউ অ্যাডভেঞ্চার আবার কেউ বা মানবজাতি রক্ষার চেতনা থেকে দূর মঙ্গলে যেতে চান।

কারস্টেনকে চায় দক্ষিণ আফ্রিকা

মাত্রই কদিন হলো, বিশ্বকাপের পর সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন কোরি ফন জিল। এরই মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকার কোচ হিসেবে ফন জিলের উত্তরসূরি মনোনীত করে ফেলেছে ক্রিকেট দক্ষিণ আফ্রিকা। ঝামেলা হলো, তাঁকে পাওয়া যাবে কি না, সেটাই ঠিক নেই। অন্য একটি দেশের কোচ হিসেবে যে খুবই ভালো করছেন তিনি! তবে ঘরের ছেলেকে এবার ঘরে ফিরিয়ে আনতে চায় ক্রিকেট দক্ষিণ আফ্রিকা, কোচ হিসেবে চায় তারা গ্যারি কারস্টেনকে।
ভারতের কোচ হিসেবে আড়াই বছরের দায়িত্বে কারস্টেনের সাফল্যই উদ্বুদ্ধ করেছে তাঁর স্বদেশিদের। কারস্টেনের কোচিংয়ে টেস্ট র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে উঠেছে ভারত, তিন ধরনের ক্রিকেটেই পেয়ে আসছে ধারাবাহিক সাফল্য। ফন জিল যখন সরে দাঁড়াবেন, কারস্টেনের সঙ্গে ভারতের চুক্তিও শেষ হবে তখনই। তবে কারস্টেনকে পাওয়া খুব সহজ হবে না দক্ষিণ আফ্রিকার। শচীন টেন্ডুলকার, মহেন্দ্র সিং ধোনিসহ ভারতের সিনিয়র ক্রিকেটারদের অনেকেই বোর্ডকে অনুরোধ করেছেন কারস্টেনের চুক্তি বাড়ানোর জন্য। বিসিসিআই অবশ্য বিশ্বকাপের পারফরম্যান্স দেখেই সিদ্ধান্ত নিতে চায়। বিশ্বকাপে ভারত কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পেলে তাই কারস্টেনকে পাওয়া না-ও হতে পারে দক্ষিণ আফ্রিকার।

সেরা বিশে সিদ্দিকুর

শুরুটা অন্তত খারাপ হয়নি সিদ্দিকুর রহমানের। মালয়েশিয়ায় চলমান এশিয়া প্যাসিফিক ক্লাসিকের প্রথম রাউন্ড শেষে সেরা বিশে আছেন বাংলাদেশি গলফ খেলোয়াড়। পিজিএ ট্যুর কর্তৃপক্ষের প্রথম এই টুর্নামেন্টে যাওয়ার আগে যে স্বপ্নের কথা বলেছিলেন, সে পথেই আছেন তিনি।
৭১ পারের এই কোর্সে ৬৩ শট করে প্রথম রাউন্ড শেষ করে শীর্ষে আছেন যুক্তরাষ্ট্রের রিকি বার্নস। স্কোরের দিক থেকে সিদ্দিক আছেন যৌথভাবে সপ্তম স্থানে। প্রায় সবগুলো অবস্থানে যেহেতু একাধিক গলফার আছেন, তাই ৬৯ শট খেলা সিদ্দিকুরকে নিয়ম অনুযায়ী সেরা বিশে থাকা খেলোয়াড় বলতে হচ্ছে।
সিদ্দিকুরের আদর্শ আর্নে এলস অবশ্য প্রথম দিন শেষে দুর্দান্ত অবস্থানে নেই। ৭১ পারের চেয়ে ৪ শট কম খেলে দক্ষিণ আফ্রিকান এই তারকা আছেন সেরা দশে। গত আগস্টেই পিজিএ ট্যুরজয়ী ভারতীয় তারকা অর্জুন অটওয়াল সিদ্দিকুরের এক ধাপ ওপরেই, সেরা ষোলোতে আছেন।
এসব অবস্থান অবশ্য কোনো কিছুর নিশ্চয়তা দেয় না। বাকি তিন রাউন্ড শেষেই বোঝা যাবে, শিরোপা কার হাতে উঠছে।

উপভোগের শেষবিন্দু পর্যন্ত ক্রিকেট

ব্যাট হাতে প্রতিনিয়ত জবাব দিয়েই যাচ্ছেন, মাঝেমধ্যে দিচ্ছেন মুখেও। তবু বয়স যখন পেরিয়েছে সাঁইত্রিশ, প্রশ্ন তো উঠবেই। আর কত দিন থাকবেন মাঠে? কবে তুলে রাখবেন ব্যাট-প্যাড? স্মিত হেসে শচীন টেন্ডুলকার শুনিয়েছেন সেই পুরোনো কথাই, বয়স নিয়ে ভাবনা নেই!
লন্ডনের গ্রসভেনর হাউসের এশিয়ান অ্যাওয়ার্ড নাইটে এবার দুটি পুরস্কার পেয়েছেন টেন্ডুলকার। এই অনুষ্ঠানেই কথা বলেছেন তাঁর ক্যারিয়ার, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সাম্প্রতিক সিরিজ, আসন্ন অ্যাশেজ, কেভিন পিটারসেনের সমস্যা সবকিছু নিয়ে। কথা হয়েছে অবসর-ভাবনা নিয়েও। বরাবরের মতোই টেন্ডুলকার জানিয়ে দিয়েছেন, খেলে যাবেন যত দিন উপভোগ করছেন, ‘আমি এখনো ক্রিকেটটা পুরোপুরি উপভোগ করছি। নিজেও জানি না আমি কত দিন খেলব, কিন্তু যত দিন উপভোগ করছি এবং বুঝতে পারছি দলের জন্য অবদান রাখতে পারব, তত দিন খেলে যাব। বয়স আমাকে কখনোই ভাবায় না।’
টেস্ট সিরিজে অস্ট্রেলিয়াকে ২-০-তে হারানোর পর র‌্যাঙ্কিং শীর্ষে নিজেদের অবস্থান আরও সংহত করেছে ভারত। তবে দক্ষিণ আফ্রিকায় এখনো দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারানো হয়নি ভারতের। সেই আক্ষেপ ঝরল টেন্ডুলকারের কণ্ঠেও, ‘টেস্টে কোনো দলকে হারানোর কথা যদি বলতে হয়, আমি বলব দক্ষিণ আফ্রিকায় দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারানো। দেশের মাটিতে ওরা দারুণ শক্তিশালী, কন্ডিশনের সর্বোচ্চ সুবিধা নেয়।’
দরজায় কড়া নাড়ছে অ্যাশেজ, ইংল্যান্ডের ক্রিকেটমহল এখন অ্যাশেজময়। সেই দেশে গিয়ে অ্যাশেজ নিয়ে কথা না বললে কি চলে? অ্যাশেজে এবার ইংলিশদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা কেভিন পিটারসেনের ফর্ম। গত দুই বছরে টেন্ডুলকার যেখানে নিজেকে নিয়ে গেছেন নতুন উচ্চতায়, পিটারসেন সেখানে নিজেকে হারিয়ে খুঁজছেন। ইংলিশ ব্যাটসম্যানকে মুক্তির উপায় বাতলে দিয়েছেন টেন্ডুলকার, ‘পিটারসেনের চিন্তাভাবনা যদি সঠিক হয়, তাহলে সেটার প্রতিফলন খেলায় দেখা যাবে, রানও আসবে। আমি শুধু ওকে বলব, শান্ত থাকতে আর বলকে খুব কাছ থেকে দেখতে, প্রতিটি ব্যাটসম্যানের যেটা শোনা উচিত। চিন্তাভাবনা আগে পরিষ্কার করতে হবে, মনে রাখতে হবে অস্ট্রেলিয়া সেই আগের মতো নেই। এটা যদি করতে পারে, তাহলেই ফর্ম ফিরে পাবে।’
পরামর্শের জন্য টেন্ডুলকারের চেয়ে ভালো ব্যক্তি আর কে হতে পারেন, পিটারসেন নিশ্চয়ই মনোযোগী শ্রোতা বা পাঠক!

অ্যাশেজ শুরু হয়ে গেছে

আজ অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে বিমানে চড়ে বসবেন অ্যান্ড্রু স্ট্রাউসরা। ইংলিশ দলটার সঙ্গী হবে একটা স্বপ্নও—অস্ট্রেলিয়ার মাটি থেকে অ্যাশেজ জিতে আসা। সেই ২৩ বছর আগে, ১৯৮৬-৮৭ অ্যাশেজে সর্বশেষ অস্ট্রেলিয়াকে তাদের ঘরে হারিয়েছে ইংল্যান্ড। স্ট্রাউসের এই দলটার পক্ষে মাইক গ্যাটিংয়ের দলটার কীর্তির পুনরাবৃত্তি করা খুবই সম্ভব বলে এবার বলাবলি হচ্ছে।
একটা কারণ তো অবশ্যই ইংল্যান্ডের দুর্দান্ত ফর্ম। গত ছয়টি টেস্ট সিরিজে তারা অপরাজিত। জিতেছে এর পাঁচটিই। আরেকটি কারণ অস্ট্রেলিয়ার দুর্দশা। গত টানা পাঁচটি টেস্ট সিরিজেই হেরে র‌্যাঙ্কিংয়ের পাঁচে নেমে গেছে অস্ট্রেলিয়া। মাত্রই কদিন আগে ভারতে দুই টেস্টের সিরিজে হয়ে এসেছে হোয়াইটওয়াশ।
রিকি পন্টিং অবশ্য প্রতিপক্ষকে আগে থেকেই সাবধান করে দিচ্ছেন এই বলে, সাম্প্রতিক এই ফর্ম হিসাব করে অস্ট্রেলিয়ায় এসে সিরিজ জয়ের স্বপ্ন যেন ইংল্যান্ড না দেখে। শেষবেলায় তাহলে পুড়তে হবে স্বপ্নভঙ্গের বেদনায়। স্ট্রাউসরাও ছেড়ে কথা কইবেন কেন? এবার তো তাঁদের অ্যাশেজ জয়ের ‘গোল্ডেন চান্স’।
প্রথম টেস্ট সেই ২৫ নভেম্বর। কিন্তু অ্যাশেজ আসলে শুরুই হয়ে গেছে। অন্তত কথার লড়াইয়ে তো বটেই। অস্ট্রেলীয়রা লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে কেভিন পিটারসেনকে। বেচারার ফর্ম ভালো নেই। এরই মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক কোচ জন বুকানন বলে দিয়েছেন, ইংল্যান্ডের সবচেয়ে দুর্বল জায়গাটি এই পিটারসেনই। ২০০৫ অ্যাশেজে দুর্দান্ত অভিষেক দিয়ে শুরু করা পিটারসেনের পাল্টা জবাব, ‘উনি কী বললেন না-বললেন, তা নিয়ে আমি মোটেই মাথা ঘামাচ্ছি না। বুকানন? তিনি আবার কে? তিনি কেউ নন।’
এদিকে পন্টিং আবার বলে রেখেছেন, আসার সময় যেন ছাইয়ের ভস্মাধারটি সঙ্গে করে আনতে স্ট্রাউস ভুলে না যান। হাজার হোক, সেটা তো অস্ট্রেলিয়াতেই রেখে দেশে ফিরতে হবে! স্ট্রাউস কিছু বলেননি। তাঁর হয়ে জবাবটা দিয়েছেন জেমস অ্যান্ডারসন। এই পেসারের মন্তব্য, শুধু অস্ট্রেলিয়াকে হারানো নয়, তাদের লক্ষ্য টেস্ট র‌্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বর জায়গা। অ্যান্ডারসনেরও কিছু ব্যক্তিগত হিসাব চুকানোর ব্যাপার আছে। গত অ্যাশেজ সফরটা যে তাঁর জন্য ছিল দুঃস্বপ্ন, ৮২.৬০ গড়ে নিয়েছিল মাত্র ৫টি উইকেট।
অ্যাশেজ তো শুরুই হয়ে গেছে মনে হচ্ছে!

সাগরতীরে ক্রিকেট মেলা

সাগরতীরের মানুষ তারা। সাগর তাদের অবিরাম ডাকে। সেই ডাকে সাড়া দিয়ে মানুষগুলো নিত্যই ছুটে যায় সাগরতীরে। কালও গেল। একটা নয়, দ্বৈত আহ্বানে সাড়া দিয়ে। সমুদ্রের সঙ্গে কাল তাদের ডাক দিয়েছিল ক্রিকেটও।
ক্রিকেট ঠিক আছে। কিন্তু এটি সাগরপারের ক্রিকেট। সারা বিশ্ব যেটিকে চেনে বিচ ক্রিকেট বলে। বঙ্গোপসাগরের তীরে কক্সবাজার উপকূলে কাল শুরু হলো দুই দিনের এই মজার ক্রিকেট।
মজার ক্রিকেটই। এবি ব্যাংক ও মোবাইল ফোন কোম্পানি সিটিসেলের পৃষ্ঠপোষণায় উইকেন্ড ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশন (ওয়েকা) আয়োজিত তিন দিনের এই মিনি ক্রিকেটে নেই বাংলাদেশের বর্তমান ক্রিকেটারদের কেউ। ওমর খালেদ (রুমি), আতহার আলী, শাহরিয়ার হোসেন, শফিউল ইসলামদের মতো সাবেক ক্রিকেটাররাই খেলছেন এখানে।
মজার ক্রিকেট বলেই হয়তো সাবেক খেলোয়াড়েরা টুর্নামেন্ট খেলতে কেউ এসেছেন সহধর্মিণীকে নিয়ে, কেউ পুরো পরিবার নিয়ে। যাঁরা খেলতে এসেছেন, সেই সাবেক খেলোয়াড়েরাও এই আয়োজনটাকে দেখছেন মজার মেলা হিসেবে। এঁদের একজন শাহরিয়ার হোসেন। ‘এর মধ্যে অন্য কিছু খোঁজা ঠিক হবে না। কোনো বার্তা পাঠানোর জন্য নয়, আমার কাছে বিচ ক্রিকেট শুধুই মজার জন্য’—বলেছেন গত বছরের বিচ ক্রিকেট খেলার পর এই আবার ব্যাট হাতে নিলেন জাতীয় দলের সাবেক ওপেনার।
পারিবারিক ব্যবসা নিয়েই ব্যস্ত আছেন বলে ক্রিকেটটা এখন আর মজা করেও খেলা হয় না। তাই সাবেক সতীর্থ কিংবা ক্লাব ক্রিকেটের প্রতিপক্ষদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎও নেই শাহরিয়ারের। বিচ ক্রিকেট খেলতে এসে আবার অনেকের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। এটাকে তাই পুনর্মিলনী হিসেবেও দেখছেন নারায়ণগঞ্জের এই ক্রিকেটার।
আরেক সাবেক ক্রিকেটার ওমর খালেদের কাছে ক্রিকেট মাঠটা অচেনা ২০০১ সাল থেকে। তাঁর কাছেও এই আয়োজন একটা পুনর্মিলনী, বনভোজনে আসা, ‘মনে হচ্ছে, পিকনিক করতে এসেছি। খুব মজা করছি সবাই মিলে। এবার অবশ্য আমার ব্যাচের কোনো ক্রিকেটারকে পাইনি। আশা করছি, আমায় দেখে আগামী বছর আমাদের ব্যাচের আরও অনেকেই আসবে।’
৯ বছর পর এই ক্রিকেট খেলতে নেমেও পুরোনো সেই জিগীষাটা ঠিকই অনুভব করছেন নাকি রক্তে। তবে অমন অনুভূতি নিয়েও নিজের দল মিলেনিয়ামকে জেতাতে পারেননি খালেদ। তাঁদের বিপক্ষে ৪ উইকেটে জিতেছে শাহরিয়ারের দল। ৪ ওভারের খেলায় ৪ উইকেট হারিয়ে রুমির দল (তিনি নিজে করেছেন ২ রান) তোলে ২০ রান। ৩.৪ ওভারে ৬ উইকেট হারিয়ে প্রয়োজনীয় রান তুলে নেয় শাহরিয়ারের যোসেফাইটস।
কাল উদ্বোধনী দিনের আরেক ম্যাচে এসেন্ট রয়েল (৫২/৪) ৭ রানে হারিয়েছে অ্যাপেক্স গ্ল্যাডিয়েটরকে (৪৫/১)। মাত্র ৪ ওভারের ম্যাচ। নিছকই মজার ক্রিকেট। তবু যেন সমুদ্রসৈকতটা কম উত্তাল হলো না। এটি দেখতেই ভিড় করল হাজার দুয়েক মানুষ। আয়োজনটাকে আরও রঙিন করতে খেলা শেষে সন্ধ্যায় আয়োজন করা হয়েছে বিশেষ কনসার্ট। সেই কনসার্টে মমতাজ আর বাপ্পা মজুমদারের গানও ভালোই উপভোগ করেছে শ্রোতারা।

এবার গ্রেটব্যাচের ধোলাই

বাংলাদেশে থাকার সময় কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাননি, খুব বেশি কিছু বলেননি দেশে ফিরেও। ক্ষোভগুলো জমে জমে ভেতরে হয়তো কুণ্ডলী পাকিয়ে ছিল। হঠাৎ যখন সব উগরে দিয়ে মার্ক গ্রেটব্যাচ রীতিমতো বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দিলেন, তখন বাংলাদেশ সফরের পারফরম্যান্সের জন্য শিষ্যদের ধুয়ে ফেলেছেন নিউজিল্যান্ড কোচ। প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন টপ-অর্ডার ব্যাটসম্যানের শীর্ষ পর্যায়ে খেলার যোগ্যতা নিয়েও!
বাংলাদেশ সিরিজের পারফরম্যান্সকে গ্রেটব্যাচ বর্ণনা করেছেন ছাপার অযোগ্য ভাষায়। ‘লাইভস্পোর্ট’ রেডিওকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সাবেক ব্যাটসম্যানের মূল্যায়ন, ‘এতটা বাজে পারফরম্যান্সের পর উন্নতি না করে উপায় নেই। বাংলাদেশে আমরা স্রেফ বিধ্বস্ত হয়েছি। আমরা ‘‘...-র’’ মতো খেলেছি। তবে ইতিবাচক দিক হলো, আগামী সপ্তাহেই আমরা নিজেদের শোধরানোর সুযোগ পাচ্ছি।’ আহমেদাবাদ টেস্ট দিয়ে আগামী বৃহস্পতিবার শুরু ভারতের বিপক্ষে সিরিজ, গ্রেটব্যাচের ইঙ্গিত সেদিকেই।
প্রতি ম্যাচেই শুরুতে এক গাদা উইকেট হারিয়ে ফেলাকে বাংলাদেশ সিরিজে বিপর্যয়ের মূল কারণ বলেছিলেন অধিনায়ক ড্যানিয়েল ভেট্টোরি। কোচের মূল ক্ষোভও টপ-অর্ডার ব্যাটসম্যানদের ওপর, ‘আমার মনে হয়েছে ওদের (টপ-অর্ডার) কেউ কেউ এই পর্যায়ে খেলার মতো যথেষ্ট ভালো নয়। কেউ কেউ আবার যতটা না ভালো, নিজেদের তার চেয়ে ভালো মনে করে। সমস্যা আছে মানসিকতায়ও। পরিস্থিতি বুঝতে হবে, সে অনুযায়ী কখনো আক্রমণাত্মক আর কখনো রক্ষণাত্মক খেলতে হবে। পরিস্থিতি অনুযায়ী খেলা খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং আমাদের এই জায়গাটা নিয়েই বেশি কাজ করতে হবে।’
এই টপ-অর্ডারদের একজন, ব্রেন্ডন ম্যাককালাম আবার মুখোমুখি আরও বড় চ্যালেঞ্জের। টেস্টে উইকেটকিপিং ছেড়ে ম্যাককালাম এখন শুধুই ব্যাটসম্যান। ব্যাটিং করবেন সম্ভবত তিন নম্বরে। বাংলাদেশ সফরে চার ম্যাচে রান করতে পেরেছেন মাত্র ৮৬। এই ফর্মহীন অবস্থায় যাচ্ছেন টেস্ট র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ দেশে, সামনে তাই কঠিন চ্যালেঞ্জ। ম্যাককালাম অবশ্য পেছনে না তাকিয়ে চ্যালেঞ্জ নেওয়ার প্রস্তুতিই নিচ্ছেন, ‘বাংলাদেশে আমরা ভালো খেলিনি এবং এটা মেনে নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে। পরাজয়ের কথা ভেবে কান্নাকাটি করে কোনো লাভ নেই। এই পৃষ্ঠাটা এখন আমাদের উল্টাতে হবে, তাকাতে হবে সামনের সফরের দিকে। ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা যদি ওই সফরের কাজে লাগাতে পারি, তাহলেই নিউজিল্যান্ড ক্রিকেটের জন্য ভালো।’
ভারত সফরে নিউজিল্যান্ড খেলবে তিনটি টেস্ট ও পাঁচটি ওয়ানডে।