Showing posts with label স্মৃতি. Show all posts
Showing posts with label স্মৃতি. Show all posts

Friday, November 8, 2024

নাফিজকে বহনকারী রিক্সাটি গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে রাখা হবে : নাহিদ ইসলাম

ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মো. নাহিদ ইসলাম বলেছেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে শহিদ গোলাম নাফিজের দেহ বহনকারী রিক্সাটি জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে স্মৃতিচিহ্ন হিসাবে রাখা হবে।

উপদেষ্টা গতকাল গণভবনে নাফিজের দেহ বহনকারী রিক্সাটি দেখতে এসে একথা বলেন। গণভবনে রিক্সাটি হস্তান্তরের সময় তিনি রিক্সাচালক নূর মোহাম্মদকে তার সাহসিকতার জন্য ধন্যবাদ জানান এবং আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দেন। গত ৫ই নভেম্বর ‘নাফিজের নিথর দেহ পড়ে থাকা রিকশাটি বিক্রি করে দিয়েছেন নূরু’ শীর্ষক সংবাদের পরিপ্রেক্ষিতে উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম তাৎক্ষণিক  রিক্সা  ও রিকশাচালককে খুঁজে বের করার জন্য তার দপ্তরের কর্মকর্তাদের নির্দেশনা প্রদান করেন। উপদেষ্টার নির্দেশনা অনুযায়ী রিকশাচালক নূর মোহাম্মদ ওরফে নুরুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি তা (রিকশা) ৩৫ হাজার টাকায় লন্ডনপ্রবাসী আহসানুল কবীর সিদ্দিকী কায়সারের কাছে বিক্রি করেছেন বলে জানান।

পরবর্তী সময়  আহসানুল কবীর সিদ্দিকীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি  রিক্সাটি জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে হস্তান্তর করার ইচ্ছা পোষণ করেন। সে অনুযায়ী রিক্সাটি জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের যুগ্ম-আহ্বায়ক ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মাহফুজ আলমের নিকট হস্তান্তর করা হয়।

উল্লেখ্য, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ৪ঠা আগস্ট বিকেল সাড়ে চারটার দিকে ফার্মগেটের পথচারী-সেতুর নিচে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহিদ হন বনানী বিদ্যানিকেতন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী গোলাম নাফিজ। গুলিবিদ্ধ নাফিজকে পুলিশ যখন রিক্সার পাদানিতে তুলে দেয়, তখনো তিনি রিক্সার রডটি হাত দিয়ে ধরে রেখেছিলেন। রিক্সাচালক তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলেও শেষ রক্ষা হয়নি। পরবর্তী সময় এই রিক্সার ছবি কাঁদিয়েছে পুরো বাংলাদেশকে।

mzamin

Thursday, September 26, 2024

রুহুল আমীন গাজীর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা

অশ্রুসিক্ত শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় চিরবিদায় জানানো হয়েছে সাংবাদিক নেতা রুহুল আমিন গাজীকে। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে তার প্রতি  শেষ শ্রদ্ধা জানান সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীরা। তিন দফা জানাজা শেষে তাকে চাঁদপুরে দাফন করা হয়। বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সভাপতি ও দৈনিক সংগ্রামের প্রধান প্রতিবেদক রুহুল আমিন গাজী মঙ্গলবার রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। তার জানাজা প্রেস ক্লাবের টেনিস গ্রাউন্ডে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু টানা বৃষ্টির কারণে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে মিলনায়তনে আয়োজন করা হয়। জানাজায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান, সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, তথ্য ও সমপ্রচার উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম, বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক মাহবুব মোর্শেদ, পিআইবি মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি কবি হাসান হাফিজ, সাবেক সভাপতি কামাল উদ্দিন সবুজ, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব ভূঁইয়া, সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস খান, ডিইউজে সভাপতি মো. শহিদুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক মো. খুরশীদ আলম, সাংবাদিক নেতা ও কবি আবদুল হাই সিকদার, ডেইলি অবজারভারের সম্পাদক ইকবাল সোবহান চৌধুরী, বাসসের সাবেক এমডি আবুল কালাম আজাদ, বিএফইউজে-বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ওমর ফারুক, বিএফইউজে’র সাবেক সভাপতি এম আব্দুল্লাহ, বিএফইউজে’র সাবেক সভাপতি মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল ও মোল্লা জালাল, দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক সাইফুল আলম, ডিআরইউ’র সাবেক সভাপতি শাখাওয়াত হোসেন বাদশা ও মুরসালিন নোমানী, ডিইউজে’র সভাপতি সোহেল হায়দার চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক আকতার হোসেন, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সভাপতি সৈয়দ শুকুর আলী শুভ, সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম তার বক্তব্যে বলেন, রুহুল আমিন গাজী দেশে সাংবাদিকতার অঙ্গনে একজন সুপরিচিত ব্যক্তি। তিনি সাংবাদিকদের কল্যাণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি বলেন, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার নতুন বাংলাদেশ গড়ার কাজ শুরু করেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন বাংলাদেশ গড়তে গাজীর মতো নেতার প্রয়োজন ছিল। সাংবাদিক সমাজকে গাজীর পদাঙ্ক অনুসরণের  আহ্বান জানান তিনি। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি’তে তার দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে নিজ জেলা চাঁদপুরে তৃতীয় জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। রুহুল আমিন গাজী কিডনি ও ডায়াবেটিসসহ নানা রোগে ভুগছিলেন। বিশিষ্ট এ সাংবাদিক ফ্যাসিবাদী আওয়ামী শাসনামলে দীর্ঘদিন কারাবরণ করেন, যার ফলে তিনি বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হন। রুহুল আমিন গাজী চাঁদপুর সদর উপজেলার গোবিন্দিয়ায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মৌলভী কফিল উদ্দিন এবং মা আয়েশা খাতুন। তিনি চতুর্থ মেয়াদে বিএফইউজে’র সভাপতির দায়িত্ব পালন করছিলেন। এর আগে প্রবীণ এ সাংবাদিক বিএফইউজে মহাসচিব, ডিইউজে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।
mzamin

Thursday, January 11, 2018

বিলুপ্তির পথে আঠারবাড়ী জমিদার বাড়ী

বিলুপ্তির পথে ঈশ্বরগঞ্জের আঠারবাড়ী রাজবাড়ী। কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা, অবহেলায় আড়াইশ বছরের পুরনো এ জমিদার বাড়ীটি কালের স্বাক্ষী হয়ে আজো দাঁড়িয়ে আছে। আঠারবাড়ী জমিদার বাড়ী ময়মনসিংহ জেলার অর্ন্তগত ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার একটি সমৃদ্ধ এলাকা । ব্রিটিশ শাসন আমল থেকেই এলাকাটি ব্যবসা-ব্যাণিজ্যে ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় অগ্রসর। এমন একটি সমৃদ্ধ এলাকায় জমিদার প্রমোদ চন্দ্র রায়ের পরিত্যক্ত দৃষ্টিনন্দন সুবিশাল জমিদার বাড়ী এখনও ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে নিরব দাড়িয়ে আছে। চমৎকার কারুকার্যময় এ রাজবাড়ীটির বয়স প্রায় আড়াই শত বছর। ময়মনসিংহ কিশোরগঞ্জ মহাসড়কে ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার সদর থেকে ১৪ কিলোমিটার পূর্বে কিছু অগ্রসর হলেই চোখে পড়বে জমিদারের বিশাল অট্টালিকা। জানা যায়, ১৭৯৩ খ্রিষ্ঠাব্দ পর্যন্ত হোসেন শাহী পরগনা রাজশাহী কালেক্টরের অধিনে ছিল। সে সময় মহা রাজ রামকৃষ্ণের জমিদারি খাজনার দায়ে নিলামে উঠলেএ পরগনাটি খাজে আরাতুন নামে এক আর্মেনীয় ক্রয় করেন। ১৮২২ খ্রিষ্টাব্দে আরাতুনের ২ মেয়ে বিবি কেথারিনা, বিবি এজিনা এবং তার দুই আত্মীয় স্টিফেন্স ও কেসর্পাজ প্রত্যেক চারআনা অংশে এ পরগানার জমিদারী লাভ করেন। ১৮৫৩ খ্রিষ্টাব্দে আঠার বাড়ী জমিদার সম্ভুরায় চৌধরী, বিবি এনিজার অংশ কিংবা মতান্তরে কেসপাজেব্র অংশ ক্রয় করেন। পরে মুক্তাগাছার জমিদার রামকিশোর চৌধরী জমিদারী ঝনের দায়ে নিলামে উঠলেতা সম্ভুরায় চৌধরীর পুত্র মহিম চন্দ্র রায় চৌধুরী কিনে নেন। শুধু তাই নয়, ঊঁনিশবিশ শতাব্দীর প্রথম দিকে (১৯০৪ খ্রিষ্টব্দে) মহিম চন্দ্র রায় চৌধুরীর স্ত্রী জ্ঞানেদা সুন্দরীর স্বামীর উত্তরাধিকার ও ক্রয় সূত্রে পরনায় ১৪ আনার মলিক হন। বাকী দুই আনা অন্য এলাকার জমিদাররা কিনে নেন। জমিদারী প্রতিষ্ঠার পর তাদের আয়ত্তে আসে উত্তর গৌরীপুরের রাজবাড়ী, পশ্চিমে রামগোপাল পুর, ঢৌহাখলা দক্ষিনে কিশোরগঞ্জ জেলার হোসেন পুর ও নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলা। তাছাড়া বৃহৎত্তর ময়মনসিংহের জামালপুর জেলার কয়েকটি মৌজা, শেরপুর, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলার বেশ কিছু মৌজা ছিল এ জমিদারের দখলে। প্রতি বছরে নির্দিষ্ট এক সময়ে এসব জেলা শহরে স্থাপিত আঠারবাড়ী কাচারী বাড়ীতে নায়েব উপস্থিত হয়ে খাজনা আদায় করত। আজ ও এসব কাচারী আঠারবাড়ী বিল্ডিং নামে নিজ নিজ জেলায় পরিচিতি পেয়েছে। জমিদার সম্ভুরায় চৌধরীর পিতা দিপ রায় চৌধুরীর প্রথম নিবাস ছিল বর্তমান যশোর জেলায়।তিনি যশোর জেলার একটি পরগনায় জমিদার ছিলেন। সুযোগ বুঝে এক সময় দ্রীপ রায় চৌধুরী তার পুত্র সম্ভুরায় চৌধুরীকে নিয়ে যশোর থেকে আলাপ সিং পরগনায় অর্থ্যাৎ আঠারবাড়ী আসেন। আগে এ জায়গাটার নাম ছিল শিবগঞ্জ বা গোবিন্দ বাজার। দীপ রায় চৌধুরী নিজ পুত্রের নামে জমিদারি ক্রয় করে এ এলাকায় এসে দ্রুত আধিপত্য স্থাপন করতে সক্ষম হন এবং এলাকার নাম পরির্তন করে তাদের পারিবারিক উপাধি (রা) থেকে রায় বাজার রাকেন। আর রায় বাবু একটি অংশে এক একর জমির উপর নিজে রাজবাড়ী, পুকুর ও পরিখা তৈরী করেন। রায় বাবু যশোর থেকে আসার সময় রাজ পরিবারের কাজর্কম দেখাশুনার জন্য আঠারটি হিন্দু পরিবার সংঙ্গে নিয়ে আসেন। তাদের রাজ বাড়ী তৈরী করে দেন। তখন থেকে জায়গাটি আঠারবাড়ী নামে পরিচিত লাভ করে। দীপ রায় চৌধুরী মৃত্যুর পর তার পুত্র সম্ভুরায় চৌধুরী জমিদার লাভ করেন। তবে কোন পুত্র সন্তন না থাকায় তিনি নান্দাইল উপজেলায় খারুয়া এলাকা থেকে এক ব্রাম্মণ প্রমোদ রায় চৌধুরীকে দত্তক এনে লালন পালন করে এক সময় জমিদারী কর্ণধার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন।
১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর প্রমোদ রায় চৌধুরীর বংশধররা এখান থেকে ময়মনসিংহ জেলা সদরে চলে যান। কালের স্বাক্ষী হয়ে রয়ে যায় জমিদার বাড়ি। জমিদাড়ির বিলুপ্তির পর সরকার জমিদার বাড়িকে প্রতœত্ত্ব বিভাগের অধিনে নেয়। আঠারবাড়ির জমিদার প্রমোদ চন্দ্র রায় চৌধুরী ছিলেন শান্তিনিকেতনের ছাত্র। ওই সময় কবিগুরু রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন তার (সরাসরি) শিক্ষক। এ শেষ জমিদারের আমন্ত্রণেই কবিগুরু এসেছিলেন এ জমিদার বাড়িতে। ওই সময় ‘রবীন্দ্রনাথ কী জয়’ ধ্বনি তুলে রেলস্টেশন থেকে কবিকে বরণ করা হয়েছিল। হাতির পিঠে চড়িয়ে কবিকে নিয়ে আসা হয়েছিল এ জমিদার বাড়িতে। কবিকে জমিদার উপহার দিয়েছিলেন সোনার চাবি। ৯২ বছর আগের সেই স্মৃতি আজো অম্লান। এ স্মৃতি এখনো আগলে রেখেছে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জের আঠারবাড়ি ডিগ্রি কলেজ। ১৯২৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথম এসেছিলেন ঈশ্বরগঞ্জে। তিনি তার প্রতিষ্ঠিত শান্তিনিকেতনের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন। এ উপজেলার শিক্ষিত ও সুশীল সমাজ এক্ষেত্রে ছিলেন আবেগ উদ্দীপ্ত। অনেক ইতিহাস ঐতিহ্যে ও কালের স্বাক্ষী সেই আঠারবাড়ি জমিদার বাড়ি এখন জরাজীর্ণ। পড়ে আছে অযতœ-অবহেলায়। কবির ঘুরে যাবার ৪৩ বছর পর ১৯৬৮ সালে এখানেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আঠারবাড়ি ডিগ্রি কলেজ। জমিদারবাড়িতে কলেজ প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর প্রতœত্ব বিভাগ আর এখানে কর্তৃত্ব দেখায়নি। বর্তমানে স্থানীয় প্রভাবশালীদের কবলে পরে দিনে দিনে জমিদার বাড়ির মূল্যবান দরজা, জানালা, শাল কাঠের বিভিন্ন তৈজসপত্র সহ বিভিন্ন জিনিস লুট করে নিয়ে যাওয়ার পর এখন দালানের ইট খুলে নিয়ে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। অবহেলা অযতেœ ধ্বংসের দার প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা জমিদার বাড়িতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলেই কিছু কিছু স্থানে চলে অসামাজিক কাজ। নিত্যদিন বসে মদ. জুয়া সহ গাঁজার আড্ডা। এ জমিদার বাড়ি এখন অসামাজিক কার্যকলাপের কেন্দ্র বিন্দু বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর। এ ঐতিহাসিক স্থাপনাটির সংস্কার করা হলে এই জমিদারবাড়িটির ঘিরে গড়ে উঠতে পারে আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র। বাংলার গৌরবউজ্জল ইতিহাসের স্বাক্ষী এই জমিদারবাড়ীটি প্রতœত্ত্ব বিভাগের অধিনে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্রুত সংস্কার করা প্রয়োজন। ইতিহাসের নিদর্শন জমিদারবাড়ীটি সংস্কার কাজে প্রতœত্ত্ব বিভাগের এগিয়ে আসা উচিৎ বলে মনে করে সংশ্লিষ্ট সচেতন মহল।

Sunday, August 21, 2011

আমার বন্ধু মিশুক by ম. তামিম

যে কজন মানুষের সান্নিধ্যে আমার আজকের ‘আমি’র বুনিয়াদ বা ভিত্তি তৈরি হয়েছিল, আশফাক মুনীর মিশুক ছিল তার অন্যতম। আজ থেকে ৪৬ বছর আগে ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলে প্রথম শ্রেণীতে আমাদের জীবনের যাত্রা শুরু। আজ এই ২০১১ সালে এসে মিশুকের মৃত্যুতে আমার পরিণত এই দেহ ও মনের একটি গাঁথুনি যেন ভেঙে পড়ে গেল!
ছোটবেলার টুকরো টুকরো বেশ কিছু স্মৃতি হঠাৎ মনের কোণে উঁকি দিয়ে যায়—খেলার কথা, ক্লাস পালিয়ে মুহসীন হলের লিফটে ওঠানামা করা, নাটক, কবিতা, দেয়ালপত্রিকার প্রকাশনা ইত্যাদি। একটু বড় হওয়ার পর থেকেই ওর ছবি তোলা এবং ক্যামেরার প্রতি ঝোঁক মোটামুটি ওর পরিচয়ে পরিণত হয়। প্রথম থেকেই প্রথাগত লেখাপড়ার প্রতি ওর একটা অনাগ্রহ ছিল, যে কারণে ক্লাসের ভালো ছাত্র ওকে কখনোই বলা যেত না। কিন্তু তার পরও ওর সহজাত সৃষ্টিশীল প্রতিভাকে অস্বীকার করার উপায় ছিল না। ভালো ছাত্র না হয়েও বন্ধু ও শিক্ষকদের কাছে মিশুক ছিল অত্যন্ত প্রিয়। ওর সঙ্গের ছোটবেলার কোনো ঘটনা বা স্মৃতির বিস্তারিত বর্ণনা আমার মনে নেই, কিন্তু যেটি রক্তে-মাংসে-অস্থিতে প্রোথিত হয়ে আছে, সেটি হলো ওর ব্যক্তিত্ব; আর সেই সঙ্গে একটা প্রচণ্ড ভালো লাগার, ভালোবাসার ও বন্ধুতার অনুভূতি।
পৃথিবীতে সত্যিকার অর্থে চোখ ও মনখোলা উদারচিত্তের মানুষের খুবই অভাব। আর আমাদের দেশে তো সে রকম মানুষ পাওয়া এককথায় বিরল। মিশুক ছিল এ দেশের সেই সব বিরল মানুষের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। সদা হাস্য, জ্ঞান, বুদ্ধি, প্রতিভায় উদ্ভাসিত মিশুককে কখনো রাগ করতে দেখিনি। নিরহংকার, সহজ ও সত্যভাষী ছেলেটি প্রতিটি মানুষকে মানুষ হিসেবে প্রাপ্য সম্মান ও মর্যাদা দিয়ে কথা বলত—তার সামাজিক অবস্থান বা পদ দেখে নয়। যে কারণে মুহূর্তেই সবাই তাকে বন্ধু হিসেবে বরণ করে নিত। ওর নামের সার্থকতা জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত সবাইকে বুঝিয়ে দিয়ে গেছে।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র। ওর বাবা শহীদ মুনীর চৌধুরীকে আমরা বন্ধুর বাবা হিসেবেই দেখেছি। তাঁর মৃত্যুতে কিশোর মিশুকের মানসিক যন্ত্রণা, পারিবারিক সংগ্রাম—আমরা কিছুই বুঝতে পারিনি। শুধু ওর পছন্দের কাজের একাগ্রতাকে আরও শাণিত হতে দেখেছি। স্কুল-কলেজ পেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে যখন ভর্তি হলো, তখন ওর জীবনের দিকনির্দেশনা ঠিক হয়ে গেছে। সেই ছোটবেলায় ক্যামেরা খুলে দেখার মধ্যে কারিগরি অনুসন্ধিৎসার যে অঙ্কুরের জন্ম, সেটা ধীরে ধীরে প্রস্ফুটিত হয়েছে গণমাধ্যমে প্রযুক্তির ব্যবহারের ব্যুৎপত্তি লাভের মধ্য দিয়ে। এই প্রযুক্তির জ্ঞান কিন্তু ওর স্বশিক্ষা আর অন্বেষার ফল; কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সাহায্য ছাড়াই। সাত বছর জাতীয় জাদুঘরে আর ১০ বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পর ওর সব অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান প্রয়োগের সুযোগ আসে একুশে টেলিভিশনের সংবাদ বিভাগের দায়িত্ব লাভের মাধ্যমে। প্রচারবিমুখ ক্যামেরার পেছনের মানুষটি শুরু করে নতুন প্রজন্মের ক্যামেরার সামনের সৈনিক তৈরিতে।
মিশুক ২০০১ সালে ব্যক্তিগত কারণে কানাডায় পাড়ি দেয়। ১০ বছর পর গত বছর এটিএন নিউজের প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব নিয়ে ঘরের ছেলে আবার ঘরে ফিরে আসে। প্রায় ১০ বছর পর, এই বছরের শুরুতে মুন্নী সাহার অফিসে ওর সঙ্গে আমার আবার দেখা। চলন, বলন, আচরণ, হূদ্যতা, আন্তরিকতা, বুদ্ধির দীপ্তিতে আমি ফিরে পেলাম আমার সেই বালকবেলার মিশুককে। আনন্দ-উচ্ছ্বাসে দুজনই উদ্বেলিত হলাম। দেখলাম, আরও পরিণত, দায়িত্বশীল, অভিজ্ঞ এবং সর্বোপরি কাজ-পাগল, কিছুটা নতুন মিশুককে। ১৫ মিনিটের কথা বলে টানা দুই ঘণ্টা আড্ডা চলল। এর মাঝেই দেখলাম টেকনিশিয়ান, ক্যামেরাম্যান, রিপোর্টার ও আইটির ছেলেমেয়েদের একের পর এক নতুন ধারণা, প্রযুক্তি, পদ্ধতি শেখানোর ত্বরিত তৎপরতা। মনে হলো, ওর হাতে বোধ হয় একদমই সময় নেই। শিশুর মতো উচ্ছ্বাস ও আগ্রহ।
আমার সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছে মাস দেড়েক আগে আমাদের স্কুলের বান্ধবী ইয়াসমিনের বাসায়। সেদিন আমার স্ত্রী ও বড় কন্যাসহ আমরা তিন বন্ধু ওকে একরকম জোর করেই অফিস থেকে পাকড়াও করে ঘণ্টা চারেক আড্ডা দিয়েছি। কিছু পুরোনো স্মৃতি ছাড়া প্রায় পুরো সময়ই আমরা ওর অভিজ্ঞতা আর স্বপ্নের কথা শুনেছি। সেই স্বপ্ন ছিল বাংলার মানুষের সত্যিকারের মুক্তি ও সম্ভাবনার স্বপ্ন। মনে হয়েছে, এক জনমে ওর কাজ শেষ হবে না। এই প্রথমবারের মতো একাত্তর-পরবর্তী ওর ব্যক্তিগত সংগ্রামের অনেক কথা সেদিন আমাদের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছে। গভীর রাত হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করছিল না। মনে মনে ভাবছিলাম, আহ্! আমার কথা বলার বন্ধুটি ফিরে এসেছে; নানা না পাওয়ার মাঝে ঢাকায় থাকাটা আরেকটু আনন্দময়, অর্থময় হয়ে উঠবে। কিন্তু আলোকবাহী মিশুক আমাদের সবার জীবন আরেকটু অন্ধকার করে দিয়ে চলে গেল; কিছুতেই মানতে পারছি না!
ম. তামিম : মিশুকের বন্ধু ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী।

Saturday, January 29, 2011

যে তাহেরকে আমি জানতাম ব্য লরেন্স লিফশুলজ

তাহেরের সঙ্গে আমার পরিচয় ১৯৭৪ সালে। আমি তখন বাংলাদেশেই বাস করছি। ওই বছরে প্রচণ্ড বন্যায় দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় শস্য। রংপুর এলাকায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল বেশি। পাঁচ দিনের বেশি সময় ধরে জমির ফসল ছিল পানির নিচে। এর ফলে ভূমিহীন ও দরিদ্র কৃষক কাজের অভাবে খুব বিপাকে পড়েন। নিজেদের ক্ষুধা নিবারণেও তাঁরা চাল কিনতে পারেননি।
ওই শরতেই হাজার হাজার ক্ষুধার্ত চাষি খাদ্য, কাজ ও ত্রাণের আশায় শহরে ভিড় জমাতে শুরু করেন। আমি যখন অক্টোবরে রংপুরে পৌঁছাই, দুর্ভিক্ষ তখন শহর ও তার আশপাশের এলাকা গ্রাস করেছে। দৃশ্যটি দান্তের ইনফারনোর সঙ্গে তুলনীয়, যেখানে হাজার হাজার নারী ও শিশু খাদ্যের জন্য ভিক্ষা করছে। তাদের পরিবারের পুরুষ সদস্যরা কাজ কিংবা ত্রাণ ও বাড়িতে টাকা পাঠানোর আশায় বহু আগেই দূরবর্তী শহরে চলে গেছেন। অনেকেই তাঁদের কোনো খোঁজখবর পাচ্ছিলেন না।
এমনই একটি পরিবেশে আমি ঢাকায় আমার সহকর্মীদের কাছে জানতে চাইলাম, তাঁরা এমন কারও কথা জানেন কি না, বন্যা নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে যাঁর উন্নত ধারণা রয়েছে। এমন কেউ কি আছেন, যিনি বুঝতে পারেন, কেন বছরের পর বছর ধরে বারবার বন্যা হচ্ছে।
একজন সম্পাদক সহকর্মী আমাকে বললেন, তিনি এমন একজন সেনা কর্মকর্তাকে জানেন, যিনি সদ্য সাপ্তাহিক বিচিত্রায় এ বিষয়ে একটি নিবন্ধ লিখেছেন। তাঁর লেখায় যে বিষয়টি ফুটে উঠেছে, তা হলো তাঁর উদ্ভাবনীমূলক ধারণা, যাতে মনে হচ্ছে তিনি সমস্যা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখেন এবং কেন পৌনঃপুনিক বন্যা হচ্ছে তার সঠিক কারণও তাঁর জানা। এই কর্মকর্তার নাম আবু তাহের।
আমি তাহেরের সঙ্গে তাঁর অফিসে সাক্ষাৎ করি। তিনি সম্প্রতি সেনাবাহিনী ত্যাগ করেছেন এবং বর্তমানে সি-ট্রাক ইউনিট নামে এক অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন সংস্থার কর্তাব্যক্তি হিসেবে কাজ করছেন। আমি তাঁর সঙ্গে কথাবার্তা বলে চমৎকৃত হলাম। তিনি জানতেন, দেশের পৌনঃপুনিক বন্যা সমস্যার স্থায়ী ও টেকসই সমাধান না করে ভবিষ্যতের উপর্যুপরি দুর্ভিক্ষ প্রতিহত করা যাবে না। মোগল আমল থেকে বন্যা নিয়ন্ত্রণের যেসব কলাকৌশল ব্যবহার করা হয়েছে, তাহের সে সম্পর্কে ব্যাপক গবেষণা করেন। এমনকি ঔপনিবেশিক যুগের বন্যা-পরিস্থিতির বিষয়েও তাঁর ছিল ব্যাপক অধ্যয়ন। স্পষ্টতই ইতিহাসের এসব পর্ব থেকে এমন অনেক কিছু শিক্ষা নেওয়ার ছিল, যে সম্পর্কে আধুনিক বিশেষজ্ঞরা একেবারেই ওয়াকিবহাল ছিলেন না।
শুধু এই চিন্তাভাবনা দিয়ে তাহেরকে চেনার সুযোগ নেই। কিন্তু আমি একটি বিষয় পরিষ্কার বুঝতে পেরেছিলাম, আমি এমন একজন ব্যক্তির সাক্ষাৎ পেয়েছি, যিনি ছিলেন একজন ‘বিজ্ঞ সৈনিক’। যিনি ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে আজকের সমস্যার বাস্তব সমাধান খোঁজার চেষ্টা করছেন। আমি ঢাকায় অনেককেই জানতাম। একজন রিপোর্টার হিসেবে সেটাই ছিল আমার কাজ। কিন্তু এবারে আমি এমন একজন তাহেরকে জানলাম, যিনি অবিস্মরণীয়, বুদ্ধিদীপ্ত, বাস্তববাদী এবং বাংলাদেশের দারিদ্র্য ও অনুন্নয়ন দূরীকরণের চিন্তায় সমৃদ্ধ। আমি এরপর তাঁর সঙ্গে বহু সন্ধ্যা কাটিয়েছি এবং কথা বলেছি ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
আমি তাঁর কাছ থেকে জেনেছি গেরিলা যুদ্ধের কলাকৌশল, যা তিনি ১১ নম্বর সেক্টরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাস্তবায়ন শুরু করেছিলেন। আমি তাঁর কাছ থেকে আরও জানলাম, কুমিল্লা ব্রিগেডের দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর তিনি কীভাবে সেনাবাহিনীর জন্য একটি ‘নতুন দৃষ্টান্তের’ বাস্তবায়ন শুরু করেছিলেন। তাহের মনে করেছিলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী একটি সংযোগস্থলে দাঁড়ানো। এই সেনাবাহিনী হয় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কাঠামো ও সাংগঠনিক প্রকৃতিতে গঠিত হবে অথবা তার নিজস্ব উদ্ভাবনী শক্তি খাটিয়ে এমন একটি সেনাবাহিনী গড়ে তুলবে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় আগে কখনো দেখা যায়নি। যদি এই সেনাবাহিনী আদর্শগত ও কাঠামোগতভাবে পাকিস্তানি মডেল গ্রহণ করে, যেখানে প্রায় সব সেনাসদস্য প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছিলেন, সে ক্ষেত্রে কোনো সন্দেহ নেই যে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীও ভবিষ্যতে কোনো একপর্যায়ে একটি সামরিক কিংবা একটি সামরিক-বেসামরিক স্বৈরতন্ত্রের এজেন্সিতে পরিণত হবে।
তাহের মনে করতেন, যদি বাংলাদেশের স্বাধীনতা হয়ে থাকে হতদরিদ্র ও নিরন্ন মানুষের জীবনের মৌলিক পরিবর্তনের জন্য, সে ক্ষেত্রে এমন একটি সেনাবাহিনীর প্রবর্তন দরকার হবে, যারা দরিদ্র মানুষের স্বপ্ন পূরণে সচেষ্ট থাকবে। তাঁর ভাবনা ছিল, এটা সম্ভব হতে পারে, সেনাবাহিনী যদি গ্রামবাসী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাদের দৈনন্দিন আলাপ-আলোচনায় নিজেদের সম্পৃক্ত করে। এটা হবে এমন একটি সেনাবাহিনী, যারা অস্ত্র বহনকারী শক্তির চেয়ে অধিকতর কিছু। সে কারণেই তাহের সেনাবাহিনীর এই পর্যায়ের নামকরণ করেছিলেন, ‘উৎপাদনশীল সেনাবাহিনী’।
পাকিস্তান সেনাবাহিনী অন্যান্য প্রথাগত সেনাবাহিনীর মতোই দেশের মূল্যবান সম্পদ অপচয়ের কান্ডারি ছিল। বিপুল অর্থ ব্যয় হতো প্রতিরক্ষা খাতে। এর ফলে স্কুল, হাসপাতাল ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগে সম্পদের ব্যবহার সংকুচিত হতো। দশকের পর দশক ধরে বিরাজমান সামরিক একনায়কতন্ত্র ও আধিপত্য বজায় রাখার কারণে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কার্যত দেশের অর্থনীতির জন্য গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাহের মনে করতেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনী ছিল এক দানবীয় পরগাছা, যা সবকিছু শুষে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে গরিব ও পশ্চাৎপদ রেখেছিল।
তিনি নিজেকেই জিজ্ঞেস করতেন, একটি স্বাধীন বাংলাদেশে এ রকম একটি দানব গড়ে তোলার জন্যই কি লাখ লাখ মানুষ স্বাধীনতার জন্য প্রাণ উৎসর্গ করেছিল? তার জবাব ছিল, না এবং একজন সেনা কর্মকর্তা হিসেবে তিনি তা ঘটতে দিতে পারেন না। কীভাবে একটি নতুন দৃষ্টান্তে উত্তরণ ঘটানো যায়, তার পথ দেখাতে তিনি সচেষ্ট হন।
কুমিল্লা ব্রিগেডে তাহের তাঁর সেনাসদস্যদের ‘উৎপাদনশীল সৈন্য’ হিসেবে সংগঠিত করেন। তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্রিগেড তার খাদ্যের জোগান নিজেই নিশ্চিত করতে উদ্যোগী হয় এবং এ ক্ষেত্রে অনেকটা স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠে। এ প্রয়াসের লক্ষ্য ছিল সমাজের ওপর তারা যাতে কোনো অর্থনৈতিক বোঝার কারণ না হয়ে দাঁড়ায়। এই ব্রিগেডের সদস্যরা আশপাশের গ্রামগুলোতে নিয়মিত যাতায়াত করতেন। তাঁরা স্থানীয় কৃষকদের চাষাবাদ, ফসল কাটা এবং সেচব্যবস্থার কাজে সহায়তা করতেন। তাঁরা সেনাবাহিনীর অবশিষ্ট অংশের কাছে ‘লাঙল সেনা’ হিসেবে পরিচিতি পান। অনেকে ভাবতেন, এটা মজার বিষয়। কিন্তু অন্যরা দেখেছেন, এর পেছনে নিশ্চয় গুরুতর উদ্দেশ্য রয়েছে।
তাহের দেখেছিলেন, এভাবে সেনা ও সাধারণ লোকদের দৈনন্দিন আলোচনা সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরের সংস্কৃতি পরিবর্তন ঘটাতে পারে। সেনাদের ‘কর্তৃত্বের মানসিকতাই’ প্রকারান্তরে একটি সামরিক স্বৈরাচারের জন্মদানের মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি করে দেয়। তাহেরের এই নীতিই আসলে পরবর্তী সময়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জন্য গণবাহিনী গঠনের দর্শন হয়ে ওঠে। তাহের আমার কাছে ব্যাখ্যা করেছিলেন, তিনি সেনাবাহিনী ত্যাগ করেছিলেন এই কারণে যে তাঁর মতো যাঁরা সমমনা কর্মকর্তা, যাঁরা দুর্নীতির ভ্রূণের বিরুদ্ধে এবং একটি নতুন কাঠামোর প্রতি একটি আন্দোলন সৃষ্টির জন্য উদ্গ্রীব, তাঁরা কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন। প্রথাগত ধ্যান-ধারণাই তাঁদের পুনরায় আচ্ছন্ন করতে বসেছে। পাকিস্তান থেকে প্রত্যাগত কর্মকর্তা, বাংলাদেশের যুদ্ধের আদর্শগত প্রভাব যাঁদের স্পর্শ করেনি, ক্রমবর্ধমানভাবে তাঁরাই বৃহত্তর ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন।
তাহেরের সঙ্গে বৈঠকে মুজিব বিষয়টিতে সায় দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি আসলে বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারেননি। কর্তৃত্বপরায়ণতা ও সামরিক স্বৈরতন্ত্রের বীজ বপন হচ্ছিল। কিন্তু মুজিব তা দেখতে পাননি। পাকিস্তানি ঐতিহ্য অনুযায়ী একটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটবে। তাহের সেই দিনটি আসার আগেই একটি বিকল্প তৈরির প্রস্তুতি নিতে সেনাবাহিনীর বাইরে এলেন। সর্বশেষ বৈঠকে তাহের তাঁকে যা বোঝাতে চেয়েছিলেন, তা না বুঝতে পেরে মুজিব চড়া মূল্য দিলেন।
১৯৭৪ সালের শেষের দিকে আমি বাংলাদেশ ত্যাগ করি। আমাকে ফার স্টার্ন ইকোনমিক রিভিউ পত্রিকার দিল্লিভিত্তিক সংবাদদাতা নিয়োগ করা হয়। সুতরাং আমাকে গোটা দক্ষিণ এশিয়া কভারে মনোযোগী হতে হয়। আমি যখন তাহেরের কাছে বিদায় জানাতে গেলাম, তখন আসলে আমার কোনো ধারণাই ছিল না যে তিনি জাসদের একজন গোপন সদস্য। কিংবা তিনি সেনাবাহিনীর ভেতরে ও বাইরে একটি মোর্চা গঠনে সক্রিয়, যারা সেই মুহূর্তের জন্য নিজেদের তৈরি করছিল, যখন বাংলাদেশি সমাজের সবচেয়ে রক্ষণশীল অংশ একটি সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করবেন এবং যা একই সঙ্গে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অধিকারের কবর দিতে হুমকি সৃষ্টি করবে।
তাহেরের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা থেকে আমি যা বুঝতে পেরেছি তা হলো, তিনি বহু বছর ধরে ধীরে ধীরে নিজেকে একজন বিপ্লবী সমাজতন্ত্রীতে পরিণত করেছিলেন। তিনি মাঝেমধ্যে আমাকে এ বিষয়ে বিদেশ থেকে কোনো একটি নির্দিষ্ট বই বা সাময়িকী এনে দিতে বলতেন। স্পষ্টতই সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির বিতর্ক এবং উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা সম্পর্কে তাঁর দারুণ আগ্রহ ছিল। আমাদের আলোচনায় তাহেরের অন্তর্দৃষ্টি ও যুক্তিবাদী মননের প্রতিফলন ঘটত।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের বিদ্রোহের পর তাহেরের সঙ্গে আমার আবার দেখা হয়। আমি বিস্ময়ের সঙ্গে জানতে পারি, তিনিই ছিলেন সেই বিদ্রোহের সামরিক অধিনায়ক। এটা আমাকে বিস্মিত করলেও একই সঙ্গে আমার কাছে তা ছিল যৌক্তিক। তাহের আসলে তাঁর ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিতে চেয়েছিলেন।
তাহেরের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল সম্পূর্ণরূপে পেশাগত। নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ। তিনি আত্মগোপন করেছিলেন। এ অবস্থায় আমরা পুনরায় আলোচনা করি। ৭ নভেম্বরে যদিও তাহের জিয়ার জীবন রক্ষা করেন (জিয়া প্রকাশ্যেই এ কথা উল্লেখ করেছিলেন)। জিয়ার অবস্থান সম্পর্কে তাহের এবং জাসদের ইতিবাচক মূল্যায়ন ছিল ভুল। যদিও ঘরোয়াভাবে জিয়া দাবি করেছিলেন, একমাত্র সমাজতান্ত্রিক নীতি বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য ঘোচাতে পারে।
অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তাহেরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে সক্ষম হই। তাহেরের বড় ভাই আবু ইউসুফ খান এ ব্যাপারে সাহায্য করেন। আমরা প্রায় ৯০ মিনিট আলোচনা করেছিলাম। সেখানে আমি ৭ নভেম্বর সম্পর্কে তাহেরের বক্তব্য জানতে পারি। আমি তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিতে চাইলে তিনি বললেন, আবার তাঁকে স্বাগত জানাতে পারলে তিনি খুশি হবেন। তাহের ছিলেন আশাবাদী। তাঁর ভাবনা ছিল, তাঁদের দিন আসছে।
আমি তাঁকে স্মরণ করিয়ে দিলাম, যদি তাঁরা ক্ষমতায় আসেন, তাহলে তাঁকে ও তাঁর সহকর্মীদের ভিড় থেকে অনেক দূরে দাঁড়িয়ে অবলোকন করবেন। আমি বললাম, তাঁরা বিষয়টিকে কীভাবে নেন, তার ওপর নির্ভর করবে আমাকে তখন ‘স্বাগত’ জানানো হবে কি না। আমি তাঁকে বললাম, যদি গ্রেপ্তার কিংবা তার চেয়ে খারাপ কিছু ঘটে, তা রিপোর্ট করার ক্ষেত্রে আমিই হব প্রথম। তেমন পরিস্থিতিতে আমাকে স্বাগত নাও জানানো হতে পারে। তাঁকে স্মরণ করিয়ে দিই, আমি আসলে সব ক্ষমতা সম্পর্কেই সন্দিগ্ধ। তিনি মাথা ঝাঁকালেন, হাসলেন এবং বললেন, তিনি আমার ইঙ্গিত বুঝতে পেরেছেন। আমি বললাম, আপনি যদি আপনার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেন, তাহলে সে সম্পর্কে রিপোর্ট করার ক্ষেত্রেও আমি হাজির থাকব। নতুন সেনাবাহিনী গঠন করুন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ সমস্যা সমাধান করুন, দরিদ্রকে সাহায্য করুন, তাদের দারিদ্র্যের অবসান ঘটান—আমি সবকিছুরই বৃত্তান্ত লিখব।
আমরা বিদায় নিলাম। সেটাই ছিল তাহেরের সঙ্গে আমার শেষ দেখা। আমি এরপর তাঁকে আর দেখিনি। এরপর আমি অবশ্য তাঁর নিকট দূরত্বে উপস্থিত হয়েছিলাম। সেই দিনটিতে, যেদিন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে তাঁর গোপন বিচার শুরু হয়েছিল। আমি দাঁড়িয়েছিলাম কারাগারের সামনে।
২০০৬ সালের ২১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত আলোচনায় মূল বক্তৃতার শুরুতে প্রদত্ত স্মৃতিচারণা, ইংরেজি থেকে অনূদিত।
লরেন্স লিফশুলজ: প্রখ্যাত মার্কিন সাংবাদিক।

Thursday, November 4, 2010

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে কিছু সময় by শেখ হাসিনা

২৫ বৈশাখ, ১৪১৭। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরে প্রবেশ করলাম। যাওয়ার পথে দেখলাম, রাস্তায় রাস্তায় মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। চানখারপুল হয়ে আমার গাড়ি কারাগারের প্রধান ফটকে পৌঁছাল। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে এই এলাকায় ঘরে ঘরে গিয়েছি। ১৯৫৪ সাল থেকে আমরা ঢাকায় বসবাস শুরু করি। তখন থেকেই এই রাস্তায় যাতায়াত আমাদের এক রকম নিয়মিতই ছিল বলা যায়।
১৯৫৪ সালে আব্বা শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের মন্ত্রিসভায় মন্ত্রী ছিলেন। তারপর হঠাৎ করে কেন্দ্রীয় শাসন চালু হলে এবং ৯২(ক) ধারা দিয়ে জরুরি অবস্থা জারি করে কেন্দ্রীয় সরকার যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা ভেঙে দেয়। নেতাদের গ্রেপ্তার শুরু করে। আব্বা বন্দী হলেন। সঙ্গে আরও অনেক মন্ত্রী, এমপি। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকও তখন বন্দী হন।
সেই থেকেই জেলখানায় আব্বার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসতাম আমি, কামাল ও ছোট্ট জামাল। আমরা মায়ের হাত ধরে আব্বার সঙ্গে দেখা করতে আসতাম। মাসে দুবার দেখা করার সুযোগ পেতাম। এর আগেও আব্বা জেলে ছিলেন। ১৯৪৮ সাল থেকে তিনি বহুবার জেলে গেছেন। ১৯৪৯ থেকে ১৯৫২ সাল একটানা প্রায় তিন বছর জেলে কেটেছে তাঁর জীবন। তার পরও ১৯৬২, ১৯৬৪, ১৯৬৬, ১৯৭১ সালে বারবার গ্রেপ্তার হয়েছেন।
সেই জেলখানায় যাচ্ছি। আমরা গেটে পৌঁছালাম। গেট খুলে দেওয়া হলো। গাড়ি ভেতরে নিয়ে গেল। আমার সঙ্গে গাড়িতে বেগম সাজেদা চৌধুরী ছিলেন। আমরা নামলাম। আইজি প্রিজন স্বাগত জানালেন। জেল সুপার, জেলারসহ অন্যান্য কর্মকর্তা উপস্থিত। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা আপা ও স্বরাষ্ট্রসচিব এবং অন্য সবাই আছেন।
আমার বারবার রেহানার কথা মনে পড়ছিল। ওকে সঙ্গে নিয়েই আমার আসার কথা। জেলখানায় দুই বোন একসঙ্গে আসব, এটাই ছিল আমার চিন্তা। কিন্তু আজ রেহানাকে ছেড়ে এসে ভীষণ মন খারাপ লাগছে। যেখানে গাড়িটা থেমেছে, এই রাস্তা দিয়ে আব্বা হেঁটে আসতেন জেলগেটে। আমরা অধীর আগ্রহে তাকিয়ে থাকতাম রাস্তার দিকে। আজ আমি সেই রাস্তায়।
গার্ড অব অনার হলো। আমাদের সেই জায়গায় যেটা দেওয়ানি বলে পরিচিত, সেখানে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে একটি বেদি করা হয়েছে, সেই বেদিতে ফুল দিলাম। শামিম শিকদারের নির্মাণ করা ভাস্কর্য এখানে একটা স্তম্ভের ওপর স্থাপন করা হয়েছে। ছয়টা স্তম্ভের মাঝে মধ্যের স্তম্ভে ভাস্কর্যটা রাখা। বাকিগুলো জলের ফোয়ারা, পানি নামছে বিরাট জলাধারে, টলটলে পানি।
আমগাছটা ঘিরে বেদি করা হয়েছে। যে গাছে হলুদ পাখিরা এসে বসত। অগণিত কণ্ঠের কলকাকলিতে একাকিত্বের ভার লাঘব করত এসব পাখি। নিঃসঙ্গ জীবনের সঙ্গী ছিল ওরা। আমরা গেলাম সেই ঘরটা দেখতে। টিনের চাল দেওয়া ঘর। ছোট্ট খুপরি জানালা। পাশেই উঁচু দেয়াল। বাতাস আপন মনে আসতে চাইলেও ওই দেয়াল বাধা হয়ে দাঁড়াত। একটা চৌকি আছে, লম্বা ও আড়ে অত্যন্ত ছোট। আব্বা ছয় ফুট লম্বা মানুষ হয়ে কীভাবে ওই ছোট চৌকিতে দিনের পর দিন ঘুমিয়েছেন, ভাবতে অবাক লাগে। একখানা ছোট্ট টেবিল, সঙ্গে কাঠের একখানা চেয়ার। ছোট ছোট হাঁড়ি-কড়াই। চায়ের একটা কাপ। সামান্য কয়েকটা জিনিস রাখা আছে। পাশের দেয়ালে লেখা অজুখানা। সেখানে গিয়ে দেখলাম, একটা গর্ত, ওটা পায়খানা। পাশে একটুখানি জায়গা অজু করার জন্য। সেখান থেকে কিছু দূরে একটা গোসলখানা। একটা চৌবাচ্চা আছে পানি ভরে রাখার জন্য। তার পরই পাকের ঘর। একটা তোলা মাটির চুলা, লাকড়ি দিয়েই রান্না করা হতো। সেখানে গিয়ে আমি চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর এই ঘরে একাকিত্বের যন্ত্রণা নিয়ে কাটাতে হয়েছে আব্বাকে। ভাবতেও পারি না। আব্বার নিজের হাতে লাগানো সফেদাগাছটা অনেক বড় হয়ে গেছে। বুড়ো হয়ে গেছে গাছটা। কামিনী ফুলগাছ লাগিয়েছিলেন তিনি। এখনো আছে গাছটা। ফুলে ফুলে ভরে যায় আর ফুল ঝরায় এই গাছটা। সুগন্ধে ভরে ওঠে সমস্ত এলাকা।
১৯৬৬ সালে বাঙালির মুক্তি-সনদ ছয় দফা দেওয়ার অপরাধে আব্বা গ্রেপ্তার হন এবং ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়েছিল তাঁকে। তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দায়ের করা হয়েছিল। নিঃসঙ্গ এই কারাগারে বই পড়া, বাগান করাই ছিল তাঁর একমাত্র অবসর। গান শোনার জন্য একটা টেপরেকর্ডারের আবেদন করেও পাননি। তাঁকে মানসিক নির্যাতন করাই ছিল আইয়ুব-মোনায়েম সরকারের উদ্দেশ্য। বন্দী থাকা অবস্থায় ১৯৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারি জেলখানা থেকেই পুনরায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায় আব্বাকে। এরপর ১৯ জুলাই আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা শুরু হয়। মামলা শুরু হওয়ার আগমুহূর্ত পর্যন্ত প্রায় ছয় মাস আমরা জানতেই পারিনি আব্বা কোথায় আছেন, কেমন আছেন।
একটা দেশের মানুষের জন্য একজন মানুষ কতখানি কষ্ট করতে পারেন, কীভাবে জীবন বিপন্ন করতে পারেন, দিনের পর দিন যাতনা ভোগ করেও মানসিক শক্তি সবল রেখে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে পারেন, তা এখানে এলেই বোঝা যায়। বাংলার মানুষকে গভীরভাবে তিনি ভালোবাসতেন। বাংলার মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির জন্য সংগ্রাম করেছেন। দরিদ্র মানুষের কষ্ট তিনি সইতে পারতেন না। তাই ক্ষুধা ও দারিদ্র্য থেকে বাংলার মানুষের মুক্তি কীভাবে দেবেন, সেটাই ছিল তাঁর একমাত্র স্বপ্ন। দেশের প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসাই তাঁকে অনুপ্রেরণা দেয়। এত কষ্ট সহ্য করার মতো ক্ষমতাও তিনি পান দেশের জনগণের ভাগ্য ফেরানোর লক্ষ্যে।
যখনই জেলখানায় গিয়েছি আব্বার সঙ্গে দেখা করতে, তখনই ফেরার সময় কষ্ট যেন বেড়ে যেত। তখন জামাল ছোট ছিল, আব্বাকে ছেড়ে কিছুতেই আসতে চাইত না। এরপর রেহানা যখন আসত, একই অবস্থা হতো; কিছুতেই আসতে চাইত না। আমি ও কামাল বড় ছিলাম বলে কষ্টটা বাইরে ছোটদের মতো প্রকাশ করতে পারতাম না। সবার বাবা বাচ্চাদের স্কুলে নিয়ে যায়, দোকানে নিয়ে যায়, গল্প করে, খেলা করে; আর আমরা শুধুই বঞ্চিত হয়েছি বাবার স্নেহ-আদর-ভালোবাসার সান্নিধ্য থেকে। ছোট্ট রাসেল জেলখানায় গেলে কিছুতেই আব্বাকে ফেলে বাসায় আসবে না। আব্বাকে সঙ্গে নিয়ে বাসায় যাবে। আব্বা ওকে বোঝাতেন, ‘এটা আমার বাসা, আমি থাকি। তুমি মায়ের সঙ্গে তোমার বাসায় যাও।’ কিন্তু ছোট্ট রাসেল কি তা শুনত; জেদ ধরত, কান্নাকাটি করত। বাসায় এসে বারবার মাকে জিজ্ঞেস করত, আব্বা কোথায়? মা বলতেন, এই তো আমি তোমার আব্বা। আমাকে তুমি আব্বা বলে ডাকো।
আমরা এখান থেকে গেলাম জাতীয় চার নেতাকে যেখানে হত্যা করা হয়েছিল, সেই জায়গায়। সেখানে হেঁটেই গেলাম। আব্বার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহচর সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী ও কামরুজ্জামান—এই চারজনকে ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে কারাগারে বন্দী অবস্থায় নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরে ঢুকে হত্যা করার ঘটনা সভ্য জগতে বোধ হয় এই প্রথম। বাইরে থেকে অস্ত্রধারীরা ঢুকে একের পর এক হত্যা করে এই চার নেতাকে। এখানে বেদিতে ফুল দিলাম। চারটা স্তম্ভে চারজনের ভাস্কর্য করা হয়েছে। পানির ফোয়ারার ভেতরে এই ভাস্কর্যগুলো তৈরি করা হয়েছে। এখনো গরাদে বুলেটের চিহ্ন রয়ে গেছে। দেয়ালের গায়ে যে বুলেটের চিহ্ন ছিল, তা মেরামত করা হয়েছিল বহু আগেই। সেই চিহ্ন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। তাজউদ্দীন সাহেবের দুই মেয়ে রিমি ও মিমি, মনসুর আলী সাহেবের ছেলে মো. নাসিম এবং কামরুজ্জামান সাহেবের ছেলে রাজশাহীর বর্তমান মেয়র লিটন উপস্থিত ছিল।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের প্রথম রাষ্ট্রপতি এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি। সৈয়দ নজরুল ইসলাম ছিলেন প্রথম উপরাষ্ট্রপতি এবং বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। তাজউদ্দীন সাহেব প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এবং দলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও কামরুজ্জামান কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও মন্ত্রী ছিলেন। বঙ্গবন্ধু যেভাবে নির্দেশ দিয়েছেন, সেভাবেই তাঁরা স্বাধীনতাসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেছেন। প্রতিটি সংগ্রামে অংশ নিয়ে জেল-জুলুম-অত্যাচার সহ্য করেছেন। অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করে বিজয় অর্জন করেছেন। এই মুক্তিযুদ্ধের বিজয়টা ঘাতকের দল মেনে নিতে পারেনি; যে কারণে পরিকল্পিতভাবে ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করে আর ৩ নভেম্বর জেলখানায় এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়। মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তির দালালরা তাদের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে এই জিঘাংসা চরিতার্থ করে। জাতি চিরদিন এই খুনি ও ষড়যন্ত্রকারীদের ঘৃণা করে যাবে।
সেখান থেকে ফেরার পথে মহিলা ওয়ার্ডে গেলাম। সাজেদা চৌধুরী, মতিয়া চৌধুরী, দীপ্তি আমার সঙ্গে ছিলেন। অনেকেই এই কারাগারে বন্দিজীবন কাটিয়েছেন। তাঁদের নিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখলাম। যেসব কারারক্ষী সাবজেলে আমার ডিউটি করেছে, তাদের সঙ্গেও দেখা হলো। সেখান থেকে গেটে এলাম। যে কামরায় বসতে দিল, এই কামরায় আব্বার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল।
১৯৬৭ সালের ১৭ নভেম্বর আমার আক্দ হয় ড. এম এ ওয়াজেদের সঙ্গে। কয়েক দিন পর ইন্টারভিউর অনুমতি পেলে মা আমাকে ও ড. ওয়াজেদকে এখানে নিয়ে আসেন। জেলখানার ফুল দিয়ে আব্বা দুটি মালা তৈরি করেন, বিয়ের প্রথম ফুলের মালা আব্বার হাত থেকে পেলাম। আব্বা মালা পরিয়ে কন্যা সম্প্রদান করেন এই কামরায়। সেই জায়গায় আজ এসে বসলাম।
এক হাজার বন্দীকে মুক্তি দেওয়া হবে, সেই ঘোষণা দিলাম। বের হওয়ার পথে দেখতে গেলাম অন্য একটি কামরা। সেখানে সব সময় আব্বার সঙ্গে সাক্ষাৎ হতো। অনেক পরিবর্তন করা হয়েছে। পাশের কামরায় পেলাম সেই টেবিলটা। গোল গোল পায়া দেওয়া একটা টেবিল। এখনো আছে। আমরা ছোটবেলায় ওই টেবিলে পা ঝুলিয়ে বসতাম। জামাল খুব ছোট ছিল, ওই টেবিলের ওপরই বসিয়ে দিলে খেলা করত। এরপর রেহানা এল আমার মায়ের কোলজুড়ে। রেহানাও খেলা করেছে ওই টেবিলে। কারণ আব্বা তো বারবারই জেলে বন্দী হয়েছেন। এরপর ছোট্ট রাসেল এল আমার মায়ের কোলে। আমাদের সবার আদরের ছোট্ট রাসেলও ওই টেবিলে বসে খেলা করেছে। পেছনে টিনের শেড দেওয়া বারান্দা এখনো ওই রকমই আছে। আমরা ওখানে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতাম, কখন আব্বা আসবেন। কারণ অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হতো। জেলগেটে আসার পর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। অনুমতি এলে ভেতরে গিয়ে বসতাম। আমাদের ভেতরে বসিয়ে তারপর আব্বাকে আনতে যেত। মাত্র আধঘণ্টার জন্য দেখা পেতাম। এর বেশি অনুমতি ছিল না। মা ফ্লাক্সে করে চা বানিয়ে নিয়ে যেতেন, সঙ্গে কিছু নাশতা। আমরা যেখানে বসতাম, সেখানেও গোয়েন্দা সংস্থার দুজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা উপস্থিত থাকতেন। কী কথা হয় না-হয়, বোধ হয় তা ওপরে জানানোর কাজই তাঁদের ছিল।
বিকেল পাঁচটা থেকে প্রায় পৌনে সাতটা পর্যন্ত কারাগারে ছিলাম। সব বন্দীর জন্য বড় খানা দেওয়ার নির্দেশও দিয়ে এলাম। এখানে এসে বারবার এ কথাই মনে হচ্ছিল, আব্বা বাংলার মানুষকে এত ভালোবাসতেন। নিজের জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, চাওয়া-পাওয়া সব বিসর্জন দিয়ে এই দুঃসহ কষ্টকে আলিঙ্গন করেছেন শুধু একটাই কারণে, তা হলো বাংলার মানুষের মুক্তি, স্বাধীনতা। নিজের জীবনের কথা একবারও ভাবেননি। আমার মা ছায়ার মতো সারা জীবন তাঁকে অনুসরণ করে গেছেন, কোনো চাওয়া-পাওয়া তাঁর ছিল না। স্বামীকে কতটুকু পেয়েছেন? বছরের পর বছর তো তাঁর জেলে কেটেছে আর বাইরে থাকলে আন্দোলন-সংগ্রাম নিয়ে ব্যস্ত। ঘর-সংসার, ছেলেমেয়ে—সব দায়িত্ব আমার মা কাঁধে তুলে নিয়েছেন। সহযোগিতা করেছেন, যেন স্বামী তাঁর অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেন।
আমার দাদা-দাদির কথা খুব মনে পড়ছে। তাঁরাও এই কারাগারে এসে বন্দী সন্তানকে দেখে গেছেন। আমার আব্বা খুবই সৌভাগ্যবান ছিলেন যে এমন পিতা-মাতার ঘরে জন্ম নিয়েছিলেন। রত্নগর্ভা আমার দাদি; আব্বার প্রতিটি কাজে সহায়তা করেছেন, শক্তি ও সাহস জুগিয়েছেন, আর্থিক সহায়তা করেছেন। ছেলে দেশের ও দশের জন্য কাজ করছেন। বাংলার গরিব মানুষের জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছেন—এই গর্ব তাঁদের ছিল। কখনো আমার দাদা-দাদি আব্বার কাজে বাধা দেননি বরং উৎসাহ দিয়েছেন এবং সহযোগিতা করেছেন। এমন বাবা-মা না হলে, তাঁদের দোয়া না থাকলে মানুষ কি এত ত্যাগ স্বীকার করতে পারে? পারে না। এই দেশের স্বাধীনতার জন্য, মানুষের কল্যাণের জন্য গোটা পরিবারকেই আত্মত্যাগ করতে হয়েছে। তবেই না আমরা এই স্বাধীনতা পেয়েছি।
আজ স্বাধীনতা সবাই ভোগ করছে, কিন্তু এর পেছনে কত মানুষের কত ত্যাগ, কত কষ্ট, কত সাধনা, তা কি কেউ মনে রাখে?
গণভবন
শেখ হাসিনা: প্রধানমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।