Wednesday, January 1, 2014

কূটনীতি- বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ by ড্যান মজীনা

অনেকে ইতিমধ্যে জানেন, আমার কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব অনেক গভীর। আমি বাংলাদেশি মানুষের দ্বারা অত্যন্ত অনুপ্রাণিত এবং এ দেশের এশিয়ার ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক টাইগার হয়ে ওঠার উজ্জ্বল সম্ভাবনার প্রতি আমার দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য আমার প্রগাঢ় শ্রদ্ধার তাড়নায় আমি সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আমার মতামত প্রকাশ করছি। বাংলাদেশের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ থেকেই আমি বাংলাদেশের মানুষের জন্য যথোপযোগী সমাধান খোঁজার জন্য প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচেষ্টা কেন দ্বিগুণ ত্বরান্বিত করতে হবে, সে বিষয়ে আমার মতামত তুলে ধরছি।

আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশের মানুষ গণতন্ত্রের প্রতি দৃঢ়ভাবে নিবেদিত। তারা এমন একটি নির্বাচন চায়, তাদের এমন একটি নির্বাচন প্রয়োজন যা অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হবে। সুতরাং, প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এ রকম একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য এখনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি বলে আমি নিরাশ হয়েছি।

এ কথাগুলো যখন লিখছি, তখন আমি টেলিভিশনে এই সুন্দর দেশের রাস্তাঘাট ও গ্রামেগঞ্জে চলমান সহিংসতার জন্য বাংলাদেশি মানুষের হতাশা ও ভয়ভীতিও লক্ষ করছি। চলমান রাজনৈতিক অচলাবস্থা জাতির অবকাঠামোর ওপর ভয়ংকর প্রভাব ফেলেছে। মানবাধিকার ও অন্যান্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ২০১৩ সালে রাজনৈতিক সহিংসতায় চার শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। অসংখ্য মানুষ গুরুতর আহত কিংবা অনেক ক্ষেত্রে স্থায়ীভাবে জখম হয়েছে। জীবনযাত্রা ও ঘরবাড়ির ধ্বংসের ঘটনা দেশের প্রতিটি অংশে দেখা গিয়েছে। সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীগুলো অতিমাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সমাজ এক বাস্তব আতঙ্কে তটস্থ—ইচ্ছাকৃত বা অন্য কোনোভাবে হোক, কে হবে সহিংসতার পরবর্তী শিকার, এই প্রশ্নই এখন সবার মনে।

এমন অবস্থায় রবিঠাকুরের ও আমাদের সবার স্বপ্নের সোনার বাংলা কীভাবে বাস্তবায়িত হবে? কৃষকেরা তাঁদের শস্য বাজারজাত করতে না পারায় কিংবা তাঁদের শস্যের জন্য প্রয়োজনীয় বীজ ও সার সংগ্রহ করতে না পারায় অর্থনীতি এখন দোদুল্যমান। পণ্য প্রস্তুতকারীরা প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানি করতে পারছেন না এবং তৈরি হওয়া পণ্য রপ্তানি করতে পারছেন না। বিদেশি ক্রেতারা অর্ডার দিতে পারছেন না। কারণ, পণ্য সময়মতো পাওয়া যাবে বলে তাঁরা ভরসা পাচ্ছেন না। দিনমজুরেরা কাজের অভাবে না খেয়ে থাকছেন। কারণ, রাজনৈতিক অচলাবস্থা অর্থনীতিকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে। স্কুলে না যেতে পেরে শিক্ষার্থীরা হতাশাগ্রস্ত, তারা পরীক্ষা দিতে পারছে না। তারা যদি স্কুলেও না যেতে পারে, তাহলে আমরা পরবর্তী প্রজন্ম কীভাবে গড়ে তুলব?
এই রাজনৈতিক অচলাবস্থা অব্যাহত থাকলে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। কয়েক সপ্তাহ আগে আমি বাংলাদেশের কয়েকজন খ্যাতিমান ব্যবসায়ীর একটি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে হংকং সফর করি।

আমাদের লক্ষ্য ছিল হংকংয়ের অনেক আমেরিকান ও অন্যান্য দেশের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি করা, যাতে বাংলাদেশ আরও বিস্তৃত বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুফল উপভোগ করতে পারে। প্রধান পোশাক ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের সফরকালে একটি কঠোর বার্তা দেয়, সেই বৈঠকে প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিটি ব্র্যান্ড বাংলাদেশ থেকে তাদের ব্যবসা তুলে নেওয়ার একটি কৌশল ইতিমধ্যে গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি অর্ডারের প্রায় অর্ধেক হংকং থেকে আসে বলে আমরা অবগত। ফলে তাদের এমন কঠোর মনোভাব সম্পর্কে জানতে পেরে ওই প্রতিনিধিদল ও আমি স্তম্ভিত হয়ে যাই। প্রকৃতপক্ষে, বর্তমান সহিংস ও ধ্বংসাত্মক রাজনৈতিক অচলাবস্থা বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাতকে ধ্বংস করে দিতে পারে।
এটা হওয়া উচিত নয়।

আমার বিশ্বাস, অধিকাংশ বাংলাদেশি চায় জীবন শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধিতে অতিবাহিত করতে। তারা নিজ পরিবারের জন্য নিরাপদ, সুরক্ষিত আশ্রয়, পর্যাপ্ত ও পুষ্টিসম্মত খাদ্য, ভালো স্বাস্থ্যসেবা ও নিজ সন্তানদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা চায়। শত হলেও, বাংলাদেশ একটি সমৃদ্ধ দেশ: উর্বর জমি, পর্যাপ্ত পানি, তিনটি শস্য উৎপাদনের উপযোগী জলবায়ু, কয়লা ও গ্যাসের বিশাল মজুতের আশীর্বাদপুষ্ট। এটি এমন একটি দেশ, যার ভৌগোলিক অবস্থান একে একবিংশ শতাব্দীর বিশাল বাণিজ্যিক পথ ইন্দো-প্যাসিফিক ইকোনমিক করিডরের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে। অবশ্য বাংলাদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ হলো এর জনগণ। আমার জানামতে, বিশ্বের সবচেয়ে উদ্যমী, বৈচিত্র্যময়, পরিশ্রমী, সৃষ্টিশীল, উদার, উদ্যোগী ও সহনশীল মানুষ। সত্যিকার অর্থেই, বাংলাদেশ এশিয়ার পরবর্তী অর্থনৈতিক টাইগার হতে পারে, হওয়া উচিত। এতে লাখ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের বেড়াজাল ভেঙে মধ্য আয়বিশিষ্ট শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হবে। তবে, বর্তমান রাজনৈতিক জটিলতা এবং আনুষঙ্গিক অমানবিক সহিংসতা অর্থনীতিকে বিনষ্ট করছে। আমি আগেও আমার আশঙ্কার কথা উল্লেখ করেছি যে এই অবস্থা এশিয়ার অর্থনৈতিক টাইগারকে জন্মের আগেই মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেবে।

আমরা সবাই যে বাংলাদেশকে জানি ও ভালোবাসি, সেই বাংলাদেশ অনেক কিছু অর্জন করেছে। এই বাংলাদেশ পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু মৃত্যুহার ও মাতৃ মৃত্যুহার ব্যাপকভাবে হ্রাস করতে পেরেছে। একেবারে শূন্য থেকে এই দেশ একটি বিশাল পোশাক খাত গড়ে তুলেছে, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। একসময় তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে আখ্যায়িত এই বাংলাদেশ এখন কৃষি সম্পদে উপচে পড়া ঝুড়িতে পরিণত হচ্ছে। এই জাতি ইতিমধ্যে ধানে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে এবং খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই অর্জনগুলো অত্যন্ত চমৎকার এবং এসব সাফল্যের অনেকগুলোয় সহায়তার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের দৃঢ় অংশীদার হওয়ায় আমি গর্বিত।

যে বাংলাদেশকে আমি চিনি, যে বাংলাদেশে আমি বিশ্বাস করি; সেই বাংলাদেশ এই উল্লেখযোগ্য অর্জনগুলো হারাতে চায় না, সেই বাংলাদেশ এই রাজনৈতিক অচলাবস্থার শিকার হতে চায় না। লাইনচ্যুত ট্রেনে যে মায়ের ছেলে আহত হলো, যে শিশুর মা বাসে পুড়ে গেলেন, প্রত্যেক অভিভাবক ও সন্তান যাদের জীবন এই রাজনৈতিক অচলাবস্থার জন্য চিরতরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের প্রত্যেকেই একজন বাংলাদেশি; যার স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা ও আশা রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষের টেবিলে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়েছে। তাদের প্রত্যেকেই একজন বাংলাদেশি, যারা নিজ জীবনে এগিয়ে যেতে ও নিজ পরিবারের যত্ন নিতে চেয়েছিল।

গণতন্ত্রের প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার প্রকাশ করার একটি সুযোগ প্রদান করে নির্বাচন, এটি ১৯৭১ সালের বিশাল মূল্যের বিনিময়ে প্রাপ্ত আদর্শগুলো পূরণ করার সুযোগ প্রদান করে; প্রত্যেক অভিভাবক নিজের জন্য বা নিজ সন্তানের জন্য যে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে, সেটা গড়ে তোলার সুযোগ প্রদান করে; বাংলাদেশ যে পরবর্তী এশিয়ান টাইগার হতে পারে, হতে পারবে এবং বৈশ্বিক পটভূমিতে বাংলাদেশ নিজের প্রাপ্য অবস্থান গ্রহণ করতে পারবে, সেটা বিশ্বকে দেখিয়ে দেওয়ার সুযোগ দেয় একটি নির্বাচন।

তবে, সেটা অর্জন করতে এখনো অনেক কিছু করা বাকি। প্রথমত ও সর্বাগ্রে, সহিংসতা বন্ধ হতে হবে। যেকোনো ধরনের সহিংসতা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ নয়, এটা অগ্রহণযোগ্য এবং এখনই থামতে হবে। বাংলাদেশের জনগণের, হোক সে সংখ্যাগরিষ্ঠ কিংবা সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী, একটি অসহিংস ও ভীতিমুক্ত পরিবেশে নিজ জাতীয় প্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ প্রাপ্য। দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং যাঁরা নেতৃত্ব প্রদানের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করেন, তাঁদের আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে এবং সহিংসতা, উসকানিমূলক বক্তব্য ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করা থেকে বিরত থাকতে হবে। সব রাজনৈতিক দল ও বাংলাদেশি নাগরিকদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় শান্তিপূর্ণভাবে অংশগ্রহণের জন্য যুক্তরাষ্ট্র অনুপ্রাণিত করে। সহিংসতা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে।
দ্বিতীয়ত, প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে সংলাপ অব্যাহত রাখতে হবে এবং চলমান রাজনৈতিক অচলাবস্থার সমাধানের জন্য নিজ প্রচেষ্টাকে দ্বিগুণ ত্বরান্বিত করতে হবে। উভয় পক্ষের সামান্য সদিচ্ছার মাধ্যমে, দুই দলের নেতারা একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথ খুঁজে বের করতে পারবেন।

তৃতীয়ত, নাগরিক সমাজের সংগঠন-সংস্থাসহ সব রাজনৈতিক দল ও বাংলাদেশি নাগরিকের নিজ মতামত স্বাধীন ও শান্তিপূর্ণভাবে প্রকাশের অধিকার রয়েছে। এই মতামত প্রকাশের সুযোগ প্রদান করা সরকারের দায়িত্ব; একইভাবে, এই সুযোগ শান্তিপূর্ণভাবে ব্যবহার করা বিরোধী দলের দায়িত্ব।
যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে একই স্বার্থ ও একই মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা অনেক বছরের পুরোনো বন্ধুত্ব রয়েছে বলেই আমি আজ কলম হাতে ধরেছি। বাংলাদেশের প্রাণবন্ত নাগরিক সমাজ, এর উন্নয়নমূলক অর্জন, নারী ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে এর সাফল্য বিশ্বের জন্য মডেলে পরিণত হয়েছে বলে আজ আমি কলম হাতে ধরেছি। আমি আমাদের দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক উদ্যাপনের জন্য কলম হাতে নিয়েছি।

এই সম্পর্ক এর আগে এত বিস্তৃত, গভীর ও শক্তিশালী ছিল না।
যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে আছে বলে আমি আজ এই লেখা লিখছি; যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বন্ধু এবং এ দেশের স্থিতিশীলতা, সমৃদ্ধি ও প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে আমরা একই লক্ষ্য পোষণ করি।
আমি আজ লিখছি কারণ আমার কাছে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ, এই মহান জাতির চমৎকার জনগণ আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

আমি সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই, আমি বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানাই, এই মুহূর্তের সদ্ব্যবহার করতে, জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে। বাংলাদেশের মানুষ যে ধরনের নির্বাচন চায়, যে ধরনের নির্বাচন বাংলাদেশের মানুষের প্রাপ্য, সে রকম নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সবার সমর্থিত পথ খুঁজে বের করার সদিচ্ছা ও প্রতিশ্রুতি নিয়ে সংলাপের টেবিলে বসার জন্য আমি সরকার ও বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানাই।
বর্তমান পরিস্থিতির একটি আশু, শান্তিপূর্ণ সমাধান হওয়া অপরিহার্য, এটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং এটা বাংলাদেশের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ।

ড্যান মজীনা: বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত।

সুপ্রিম কোর্টে মিছিল সমাবেশ করবেন না আইনজীবীরা

উচ্চ আদালতের রায়ের প্রতি সম্মান দেখিয়ে সুপ্রিম কোর্ট এলাকায় সভা-সমাবেশ না করতে একমত হয়েছেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমর্থক আইনজীবী নেতারা। গতকাল মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের জাজেস লাউঞ্জে প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের সঙ্গে ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকে দু'দলের আইনজীবীদের মধ্যে এ সর্বসম্মত মতৈক্য হয়। সর্বোচ্চ আদালতের পবিত্রতা ও মর্যাদা সমুন্নত রাখতে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয় যে, সুপ্রিম কোর্টের মূল ফটকসহ আদালত অঙ্গনে কোনো সভা-সমাবেশ করা যাবে না। তবে পেশাগত বিষয়সহ কোনো কারণে সভা-সমাবেশ করার প্রয়োজন হলে আইনজীবী সমিতির ভবন ও চত্বর ব্যবহার করা যাবে। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান গেটের সামনেও সমাবেশ করা যাবে না। আর মিছিলসহ বাইরে যেতে চাইলে মাজার গেট থেকে বাইরে গিয়ে করতে হবে। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের সাত বিচারপতি, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এ এফ হাসান আরিফ, অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, সিনিয়র অ্যাডভোকেট হাবিবুল ইসলাম ভুঁইয়া ও ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি আবদুল বাসেত মজুমদার ও এ এফ এম মেজবাহউদ্দীন, বর্তমান সভাপতি এ জে মোহাম্মদ আলী, সাবেক সম্পাদক বশির আহমেদ, এ এম আমিনউদ্দিন, বদরুদ্দোজা বাদল, শ ম রেজাউল করিম, বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক রফিকুল হক তালুকদার রাজা প্রমুখ।
বৈঠক সূত্রে জানা যায়, প্রধান বিচারপতি গত ২৯ ও ৩০ ডিসেম্বরে সুপ্রিম কোর্ট এলাকার ঘটনা সম্পর্কে উপস্থিত প্রত্যেকের কাছে মতামত জানতে চান। রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে সমাবেশ ও মিছিল করার বিষয়েও জানতে চাওয়া হয়। উভয় পক্ষের আইনজীবীরা নিজ নিজ দৃষ্টিকোণ থেকে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ তুলে ধরলেও সবাই সংঘটিত ঘটনাকে 'অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনভিপ্রেত' বলে অভিহিত করেন। তবে একটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের উপস্থিতিতে বহিরাগতদের দিয়ে মিছিল করার বিষয়ে অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বৈঠক শেষে অ্যাডভোকেট শ ম রেজাউল করিম সাংবাদিকদের বলেন, সুপ্রিম কোর্টের মূল ফটকসহ আদালত অঙ্গনে কোনো সভা-সমাবেশ না করার বিষয়ে আমরা একমত হয়েছি।
গত রোববার বিরোধী দলের 'মার্চ ফর ডেমোক্রেসি' সমাবেশে যোগ দিতে সুপ্রিম কোর্ট থেকে মিছিল বের করার চেষ্টা করেন বিএনপি-জামায়াতপন্থি আইনজীবীরা। এ সময় প্রধান গেটের বাইরে থেকে জলকামান ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয় পুলিশ। এর পরও বিরোধী দল সমর্থকরা বিক্ষোভ-মিছিল করতে থাকলে একপর্যায়ে তাদের ধাওয়া দিয়ে সুপ্রিম কোর্ট গেট খুলে আদালত চত্বরে ঢুকে পড়ে সরকার সমর্থকরা। তাদের হামলায় বিরোধী দল সমর্থক তিনজন আইনজীবী আহত হন। পরদিন সোমবার সুপ্রিম কোর্টের প্রধান গেটে বিক্ষোভরত বিএনপি-জামায়াতের আইনজীবীদের সঙ্গে যুব মহিলা লীগ কর্মীদের পাল্টাপাল্টি ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। বিধিমালা অনুসারে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে মিছিল-সমাবেশ নিষেধ। ২০১২ সালে সর্বশেষ সংশোধিত সুপ্রিম কোর্ট (হাইকোর্ট বিভাগ) বিধিমালা, ১৯৭৩-এর বিবিধ অধ্যায়ে বলা হয়েছে, আইনজীবী, আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারী অথবা যে কোনো ব্যক্তি আদালত প্রাঙ্গণে বা আদালত ভবনের কোনো অংশে মিছিলের আয়োজন বা অংশ নিতে বা স্লোগান দিতে পারবেন না অথবা বিক্ষোভ প্রদর্শন বা সভা করতে পারবেন না। ২০০৬ সালে সর্বোচ্চ আদালতের রায় অনুসারে এ বিধিমালা প্রণীত হয়।

খালেদা জিয়া এখনও অবরুদ্ধ

গুলশানে নিজ বাসায় গতকালও কার্যত অবরুদ্ধ ছিলেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। রোববারের ঢাকামুখী অভিযাত্রা ও নয়াপল্টনে সমাবেশের ডাক দেওয়ার পর থেকেই কড়া পুলিশি পাহারায় কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে আছেন তিনি। দলের নেতাকর্মীদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন। নেতারা দেখা করতে গেলে তাদের আটক অথবা সরিয়ে দেয় পুলিশ। সাম্প্রতিক দিনগুলোর মতো গতকালও দলীয় নেতারা খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যেতে পারেননি। অবশ্য গ্রেফতার আতঙ্কে নেতারা চেয়ারপারসনের সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টাও করেননি।
২৪ ডিসেম্বর
ঢাকা অভিমুখে 'গণতন্ত্রের অভিযাত্রা' কর্মসূচি ঘোষণার পর থেকেই খালেদা জিয়ার বাসা ও গুলশানের কার্যালয় ঘিরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এর পরদিন বুধবার গুলশান কার্যালয়ে গিয়ে বড়দিন উপলক্ষে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সদস্যদের সঙ্গে তিনি শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। তবে দলীয় নেতাদের তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে দেওয়া হয়নি। বৃহস্পতিবারও তিনি গুলশানের কার্যালয়ে যান। দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে না দেওয়ায় একাকীই তিনি অফিস করেন। শনিবার পুলিশের কড়াকড়ির মুখে তিনি কার্যালয়ে যাননি। এর পর থেকেই তিনি গুলশানের ৭৯ নম্বর সড়কের ১ নম্বর বাড়িটিতে (ফিরোজা ভবন) অবরুদ্ধ হয়ে আছেন।
শনিবার থেকে খালেদা জিয়ার বাড়ির সামনে ৮ প্লাটুন পুলিশ মোতায়েন করা হয়। তার বাসার গলির মুখে পাঁচটি বালির ট্রাক দঁড়া করিয়ে রাস্তা বন্ধ রাখা হয়েছে। তারও আগে ট্রাকের সামনে গলির প্রবেশমুখে রাখা হয়েছে লোহার রোডব্লকের ব্যারিকেড। রোববার সাংবাদিকদের ব্যারিকেডের সামনে যেতে দিলেও পরদিন সে সুযোগও বন্ধ করে দেওয়া হয়। সোম ও মঙ্গলবার ব্রিটিশ হাইকমিশনার এবং মার্কিন রাষ্ট্রদূত খালেদা জিয়ার বাসায় আসার সময় দুটি ট্রাক সরিয়ে জায়গা করে দেওয়া হয়। তারা ফিরে যাওয়ার পর সেগুলো আগের জায়গায় এনে রাখা হয়। এ ব্যাপারে পুলিশের গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার চৌধুরী লুৎফুল কবীর সমকালকে জানান, বিএনপি চেয়ারপারসনের বাসার সামনে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশের সংখ্যা আগের তিন দিনের তুলনায় গতকাল মঙ্গলবার কমানো হয়েছে। বর্তমানে অর্ধশত পুলিশ সদস্য সেখানে রয়েছেন। এর আগে শতাধিক পুলিশ মোতায়েন ছিল বলে জানান তিনি। রাস্তার দু'পাশে বালুবোঝাই পাঁচটি ট্রাক দাঁড় করিয়ে রাখার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।

নিরাপত্তা- পুলিশ কেন হামলার শিকার হবে? by আলী ইমাম মজুমদার

২০১৩ সালের সূচনা থেকে পুলিশের ওপর অব্যাহতভাবে হামলার ঘটনা ঘটে চলছে। এই সময়কালে এ ধরনের নৃশংস হামলায় পুলিশের ১৫ জন সদস্য নিহত ও প্রায় আড়াই হাজার আহত হন।

খোলা হাওয়া- এ রকম বছর যেন আর না আসে by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

২০১৩ সালটা যত তাড়াতাড়ি আমরা ভুলে যেতে পারব, ততই মঙ্গল। না, এ বছরের ভালো দিকগুলো ভুলে যাওয়ার কথা আমি বলছি না, বলছি বছরজুড়ে চলা নৃশংসতা,

সময়চিত্র- এরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তি (!) by আসিফ নজরুল

২৯ ডিসেম্বর রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবে এসেছি। দেখি ব্যাডমিন্টন কোর্টের পাশে ম্লানমুখে বসে আছেন ঢাবি শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক আলমগীর হোসেন।

গণতন্ত্র ও জবাবদিহি- সুপ্রিম কোর্ট যখন সংবিধানবিচ্যুত by মিজানুর রহমান খান

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবারও উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা করছেন। অবিরাম জলকামান দাগিয়ে ‘গণতন্ত্রের অভিযাত্রা’ ভন্ডুলের পটভূমিতে তিনি গতকাল বলেছেন,

স্বাগত ২০১৪- এমন ক্রান্তিকাল কখনো আসেনি by আলী রীয়াজ

অস্থিতিশীলতা, অনিশ্চয়তা ও সহিংসতার মধ্য দিয়ে ২০১৪ সালের সূচনা হতে চলেছে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক—সব ক্ষেত্রেই এই বৈশিষ্ট্যগুলো স্পষ্ট।
যেকোনো নতুন বছরের গোড়ায় যেমন অনিশ্চয়তা থাকে, এ বছরের অনিশ্চয়তা তেমন নয়; বরং অতীতের তুলনায় এই বছরের শুরুর সময়টি অনেক বেশি উদ্বেগের এবং আশঙ্কার। ২০১৩ সালের ঘটনাপ্রবাহের কারণে যেকোনো নাগরিকের মনে দেশের আগামী দিনগুলো কেমন হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন ও দুশ্চিন্তা আছে। যাঁরা বাংলাদেশের রাজনীতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন, তাঁদের মনেও এই প্রশ্ন। বাংলাদেশের ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে সেই সময়কে বর্ণনা করতে ‘ক্রান্তিকাল’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, কিন্তু বোধ করি, আর কোনো সময়ই তা এতটা যথাযথ হয়নি, যতটা আজকে নতুন বছরে পা দিয়ে এবং সামনের দিনগুলোর কথা বিবেচনা করে আমরা বলতে পারি। এই অবস্থার সৃষ্টি যদিও এক দিনে হয়নি, এমনকি একটি বছরেও হয়নি, তথাপি এ কথা মানতেই হবে যে গত বছরের ঘটনাপ্রবাহ এই ক্রান্তিকালের দিকে দেশকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। বাংলাদেশের রাজনীতি ও সমাজে বিরাজমান পরস্পরবিরোধী প্রবণতা ও দৃষ্টিভঙ্গিসমূহ ২০১৩ সালে যেভাবে প্রকাশিত এবং মুখোমুখি অবস্থানে উপনীত হয়েছে, তেমনটি আমরা আগে কখনো দেখিনি।

গণতন্ত্র, শাসনব্যবস্থা, সামাজিক বৈষম্য, জবাবদিহি, দুর্নীতি, রাজনীতি ও ধর্মের সম্পর্ক, যুদ্ধাপরাধের মতো জাতির অসমাপ্ত দায় বিষয়ে বিভিন্ন চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি এবং আদর্শিক অবস্থান বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই ছিল। গত ৪২ বছরে অন্যান্য ইস্যুকে কেন্দ্র করে এগুলোর কোনো কোনোটি কখনো কখনো সামনে এসেছে, কিন্তু এর অনেকগুলো একার্থে অমীমাংসিত বিষয় হিসেবেই থেকে গেছে। যেকোনো সময়ে জাতি ও রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়ায় কিছু বিষয় অমীমাংসিত থাকা কোনো ব্যতিক্রম নয়। কোনো জাতি ও জাতিরাষ্ট্র যত পরিপক্ব হয়ে ওঠে, সেই রাষ্ট্র ও তার নাগরিকেরা একাদিক্রমে অমীমাংসিত বিষয়গুলোর মোকাবিলা করে; সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছু বিষয় প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে ফেলে, কিছু বিষয় আরও বেশি জরুরি হয়ে ওঠে।

গত বছরে আমরা একই সময়ে এই বিষয়গুলো রাজনীতির কেন্দ্রে এসে হাজির হতে দেখেছি। অবশ্যই বিষয়গুলো পরস্পরবিরোধী নয়, গণতন্ত্রের প্রতি আস্থাবান মানুষ সুশাসন ও সামাজিক বৈষম্যের অবসানের দাবি করতেই পারে। রাজনীতি ও ধর্মের সম্পর্কের প্রশ্নে গণতান্ত্রিক মনোভাবাপন্ন দুজন নাগরিকের ভিন্নমত থাকা অসম্ভব নয়। একইভাবে কোনো এক বিষয়ে কোনো নাগরিকের অবস্থান অন্য বিষয়ে তার কী অবস্থান হবে, তা নির্ধারণ করে না। ক্ষমতাসীন দল ও সরকারের জবাবদিহির দাবি তোলার মানে এটা নয় যে ওই নাগরিক অন্য প্রশ্নে সরকারের গৃহীত ব্যবস্থার সমর্থক হতে পারবে না। বিরোধী দলের দায়িত্বজ্ঞানহীন, আশু স্বার্থপ্রণোদিত আচরণের বিরোধিতা করা মাত্রই তাকে ক্ষমতাসীনদের অনুচর বলার সংস্কৃতি অগ্রহণযোগ্য। জবাবদিহি বা গণতন্ত্রের প্রশ্ন কোনো অবস্থাতেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিকে নাকচ করে দেয় না; এই দুটি পরস্পরবিরোধী নয়। দুজন নাগরিকের ভেতরে একটি বিষয়ে মতৈক্য মানে সব বিষয়ে তাদের মতৈক্য হবেই—এমন আশা করা অসমীচীন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ‘শত্রু’ বলে গণ্য করা, তার ন্যূনতম নাগরিক অধিকার হরণ করা এবং সহিংসভাবে প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক শক্তিরা নিজেদের জন্যই কেবল বিপদ ডেকে আনে তা নয়, তারা গণতন্ত্রের মৌলিক বিষয়কেই অস্বীকার করে, সমাজে অসহিষ্ণু সংস্কৃতি তৈরি করে, যার পরিণাম তাদেরও ভোগ করতে হয় আজ অথবা আগামীকাল।

জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের অগ্রাধিকার তৈরিতে নিঃসন্দেহে ভিন্ন মত থাকবে। কিন্তু গত বছরে দেশের রাজনীতি ও সমাজে অগ্রাধিকারের প্রশ্নে অন্যের ওপরে নিজের পছন্দ চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এটি গণতান্ত্রিক সমাজের লক্ষণ নয়। এই অবস্থা কেবল তাঁরাই পছন্দ করবেন, যাঁরা গণতন্ত্রের যে সামান্য অবশেষ এখনো বাংলাদেশে বিরাজমান, তাকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে একধরনের স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার অনুকূল সামাজিক ও মানসিক পরিস্থিতি তৈরি করতে চান। বল প্রয়োগ, ভীতি প্রদর্শন ও সন্ত্রাসী আচরণের মাধ্যমে, দাবি আদায়ের নামে, সাংবিধানিক ধারা চালু রাখার অজুহাতে, সংখ্যাগরিষ্ঠতার বাতাবরণ তৈরি করে, ধর্মকে আশ্রয় করে কিংবা অন্য যেকোনো আদর্শের নামেই তা করা হোক না কেন, তা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে এক অন্ধকার পথে চালিত করবে। অনুমান করতে পারি যে সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক রাজনীতি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা যতই অপসৃত হবে, এই প্রবণতা তত বেশি শক্তিশালী হবে। বছরের গোড়াতেই অনুষ্ঠেয় একতরফা নির্বাচন এবং তা প্রতিরোধে বিরোধীদের সহিংস আচরণ গণতন্ত্রের উল্টো পথেই বাংলাদেশকে এগিয়ে নেবে। বছরের শুরুটা এভাবেই হবে বলে আমরা জানি এবং তা আগামী দিনগুলোকে আরও কঠিন করে তুলবে। বাংলাদেশ গণতন্ত্রের উল্টো পথে এগোবে কি না, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে ২০১৪ সাল গুরুত্বপূর্ণ বলেই আমার অনুমান। বাংলাদেশ কোন পথে এগোবে, তা নিয়তি-নির্ধারিত নয়, রাজনীতিতে কোনো পথই অনিবার্য নয়। রাজনৈতিক নেতারা ও নাগরিকেরাই এই পথ নির্ধারণ করবেন। এ ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের দায়িত্ব অন্যদের চেয়ে বেশি। বাংলাদেশের নাগরিকেরা অতীতে গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে আপসহীন থেকেছে, ২০১৪ সাল তার ব্যতিক্রম হবে না বলেই আমার ধারণা।



দুই

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ২০১৩ সালে একধরনের মেরুকরণের সূচনা হয়েছে। প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে ঘিরে গড়ে ওঠা দুই কেন্দ্রের বাইরে যেসব দল ছিল, তাদের এক বড় অংশই এখন এই দুই কেন্দ্রমুখী হয়ে পড়েছে। বিএনপি ২০০১ সালের আগেই জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে যে চারদলীয় জোট গড়ে তুলেছে, তারই পরিবর্ধিত রূপ আমরা দেখতে পাই ১৮-দলীয় জোট হিসেবে। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ ২০০৬ সালে যে মহাজোট গড়ে তোলে, তার অনেক দল যেমন তা থেকে সরে গেছে, তেমনি অন্যদের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করার মধ্য দিয়ে এবং জেনারেল এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টিকে চাপের মুখে তাদের শরিক করে রেখেছে। এই ঐক্যে যেসব দল শরিক হয়েছে, তারা অচিরেই ভিন্ন অবস্থান নিতে সক্ষম হবে না। কিন্তু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীন দল যে ধরনের আচরণ করেছে, মন্ত্রী ও দলীয় নেতাদের সম্পদের যে চিত্র প্রকাশিত হয়েছে, তা ক্ষমতাসীন দল ও জোটের জন্য ভবিষ্যতেও স্বস্তির বিষয় হবে না। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট গঠন ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপিকে যতটুকু সুবিধা প্রদান করেছিল ২০০১-২০০৬ সালের সরকারে থাকা অবস্থায় এবং গত কয়েক বছরে তার চেয়ে বেশি মাশুল গুনতে হয়েছে দলটিকে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে কেন্দ্র করে জামায়াতের অব্যাহত সন্ত্রাসী তৎপরতা দেশের জন্য এক বিরাট হুমকি সৃষ্টি করেছে। জামায়াতের এসব আচরণ বিএনপির রাজনৈতিক দাবিকে গত বছরে পেছনে ফেলে দিয়েছে। অন্যদিকে, বিএনপি জামায়াত-নির্ভর হয়ে পড়েছে। জামায়াতে ইসলামী সাংগঠনিকভাবেই ১৯৭১ সালে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত এবং গত ৪২ বছরে তাদের ভূমিকার জন্য কখনোই ক্ষমা প্রার্থনা করেনি। যুদ্ধাপরাধী হিসেবে দলের নেতাদের বিচার ও শাস্তি দলটিকে দেশের এক বড় অংশের কাছে অগ্রহণযোগ্য করে ফেলেছে।

এই প্রশ্ন বিএনপি কীভাবে তা মোকাবিলা করবে, সেটা ২০১৩ সালে যতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল এই বছরে তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়বে। এই বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য বিএনপি তার অনুকূল রাজনৈতিক পরিবেশের অপেক্ষা করবে, নাকি ঝুঁকি নিয়ে হলেও একটি পদক্ষেপ নেবে তার ওপর কেবল দলের নয়, দেশের সাংবিধানিক নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির ভবিষ্যৎ অংশত নির্ভরশীল। দায়িত্বশীল বিরোধী দল হিসেবে আচরণে বিএনপির ব্যত্যয় হয়েছে। ক্ষমতাসীন দল যদি দেশে নিয়মতান্ত্রিক সাংবিধানিক রাজনীতির ধারাকে অব্যাহত রাখতে চায়, তবে কেবল কথায় নয়, কাজেও তা প্রমাণ করতে হবে। সহিংসতা মোকাবিলা করে নাগরিকের নিরাপত্তা দেওয়া যেমন রাষ্ট্রের দায়িত্ব, তেমনি নাগরিকের ভিন্ন মত প্রকাশ এবং তার পক্ষে সংবিধান প্রদত্ত গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের কর্তব্য। এর অন্যথা হলে অসাংবিধানিক শক্তিই কেবল লাভবান হবে। তার পরিণতির জন্য খুব বেশি সময় অপেক্ষা করতে হবে না; ২০১৪ সালেই আমরা তার বিবিধ পরিণতি দেখতে পাব বলে আমার আশঙ্কা। মেরুকরণের এই প্রক্রিয়ায় দুই কেন্দ্রের বাইরে যেসব দল রয়েছে, তাদের ভূমিকা মোটেই অকিঞ্চিৎকর নয়; তারা কী ভূমিকা নেয়, সেটাও লক্ষণীয়।



তিন

ভূরাজনৈতিক বিবেচনায় বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের কারণে বৈশ্বিক পরিসরে বাংলাদেশের ভূমিকা রাখার যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, সেই বিবেচনায় ২০১৪ সাল আলাদা গুরুত্ব বহন করে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি পরিবর্তনশীল, ফলে আজকে একটি দেশ যে গুরুত্ব বহন করে, তা ভবিষ্যতে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সেই ভূমিকা পালনের সুযোগ নাও থাকতে পারে। বিশ্বায়নের এই যুগে কোনো দেশের পক্ষেই বিশ্বরাজনীতির বাইরে থেকে তার সুবিধা নেওয়া সম্ভব নয়। সে ক্ষেত্রে গত বছরগুলোতে, বিশেষত আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গত কয়েক মাসে সরকারের ভূমিকার কারণে আন্তর্জাতিক সমাজের সঙ্গে যে ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তা দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উভয় ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নতুন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার উদ্ভব হচ্ছে। সেটি আফগানিস্তান থেকে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের উপস্থিতির অবসান ও সেখানকার নির্বাচন যেমন একটি দিক, ভারতে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা বদলের সম্ভাবনা, মিয়ানমারের নতুন গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক সুযোগ তেমনি আরেকটি দিক। এই অঞ্চলে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর নতুন বিন্যাস হচ্ছে। এসব ঘটনার যে অভিঘাত তৈরি হবে, বাংলাদেশ তাতে তার নিজস্ব অবস্থান নিয়ে অংশগ্রহণ করতে পারবে কি না, সেটা অনেকাংশেই নির্ভর করবে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির ওপরে। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে ইতিমধ্যেই অর্থনীতি বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে দেশের প্রধান রপ্তানিনির্ভর উৎপাদনশীল খাতই সবচেয়ে আগে ক্ষতির মুখোমুখি হবে।

এই যে নতুন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশের স্বার্থে বাংলাদেশকেই প্রতিনিধিত্ব করতে হবে, বাংলাদেশ যদি অন্য কোনো একক দেশের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাতে তার নিজস্ব স্বার্থেরই কেবল ক্ষতি হবে তা নয়, আঞ্চলিক ক্ষমতা ভারসাম্যের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। বহুজাতিক আন্তর্জাতিক সংগঠনের সঙ্গে অস্বস্তিকর সম্পর্ক তৈরি করে বাংলাদেশ তার নিজের স্বার্থানুকূল ভূমিকা নিতে পারবে—এটা মনে করার কারণ নেই।

আন্তর্জাতিক সমাজের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় ধরনের একটা প্রশ্ন উঠবে আসন্ন নির্বাচনের পরেই; সে কারণে এই প্রশ্নের উত্তরের ওপরে নির্ভর করবে ২০১৪ সালে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের রূপ কী দাঁড়াবে।

l আলী রীয়াজ: অধ্যাপক, রাজনীতি ও সরকার বিভাগ, ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র

মৃত্যুর নির্মমতায় থমকে গিয়েছিল গোটা বিশ্ব by শর্মী চক্রবর্তী

‘আমি ভাবি নাই বাঁচমু। বাঁচার জন্য পাগলের মতো করেছি। এদিকে ওদিকে খোঁজাখুঁজি করেছি। আওয়াজ দিছি। প্রথম কেউরে পাই নাই। হায়রে কি আর্তনাদ।
ও ভাই কেউ আছেন আমারে একটু বাঁচান না ভাই। আমার দু’পায়ের উপর ছিল দেয়ালের বিম। তার যে কি যন্ত্রণা। এখনো ভাবলে গা শিওরে উঠে। তখন ভাবছিলাম আর মনে হয় বাইর হইতে পারমু না, কেউ রে দেখতে পারমু না। তখন আল্লাহর কাছে মাপ চাইয়া নিছি। আল্লাহ আমার সব গোনাহ মাপ কইরা দিও আমার স্বামীরে ভালো রাইখো। তখন আল্লাহর দূত হইয়া আইসা আমারে এক উদ্ধারকর্মী ভাই উদ্ধার করছে। সে পর্যন্ত বিমের চাপায় আমার পা পচা শুরু হইছিল। ভবন ধসের ৪র্থ দিন আমারে সেখান থেকে উদ্ধার করা হয়। এখন কৃত্রিম পায়ের সাহায্যে চলছি। দুই পা হারাইয়া জীবন ফিরা পাইছি!’ এই ছিল জীবন নিয়ে ফিরে আসা রেবেকার কথা। শুধু রেবেকাই নন অনেক দরিদ্র শ্রমিক কেউ পা হারিয়ে, কেউ হাত হারিয়ে, কেউ অর্ধেক পঙ্গুত্ব নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে টিকে আছেন। হাজারো পরিবার এখনও স্বজনদের জন্য হাহাকার করছেন। ২৪শে এপ্রিল সকাল পৌনে ৯টা। অন্য আর দশটা দিনের মতোই শুরু হয়েছে নতুন আর একটা দিন। হঠাৎ বিকট শব্দে সাভারে ৯ তলা রানা প্লাজা ভবন ধসে পড়ে। প্রায় এক মিনিটের মধ্যে বহুতল ভবনটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। কিছু অংশ মাটির নিচে দেবে যায়। এসময় রানা প্লাজার আশপাশ ও সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকা কেঁপে ওঠে। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে পুরো এলাকা। আতঙ্কিত লোকজন দৌড়ে নিরাপদ স্থানে যেতে থাকেন। মৃত্যুর মিছিলে, স্বজনহারাদের আর্তনাদে, আহতদের আহাজারিতে শুধু সাভারই নয় সারা দেশ ছিল কষ্টে নিমজ্জিত। স্মরণকালের ভয়াবহ ভবন ধসের ধ্বংস বিভীষিকায় প্রাণ হারিয়েছে সহস্রাধিকের বেশি শ্রমিক। শুধু বাংলাদেশেই নয় বিশ্ব মিডিয়ায়ও ছিল এই আলোচনা। এবছর বিশ্বের শীর্ষ ১০ রিপোর্টের মধ্যে স্থান পেয়েছে সাভারের রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অসংখ্য রিপোর্টের ভেতর থেকে গুরুত্ব ও ভয়াবহতা বিচার করে বিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিন শীর্ষ ১০টি রিপোর্টের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। এর ৭ম স্থানে অবস্থান করছে বাংলাদেশের রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি। বিবরণে বলা হয়, ২৪শে এপ্রিল বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার অদূরে রানা প্লাজা ভবনধস স্মরণকালের সব থেকে ভয়াবহ শিল্প দুর্ঘটনা। ভবন ধসে ১১০০’রও বেশি কর্মী প্রাণ হারান। বাংলাদেশে ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী গুরুত্বপূর্ণ গার্মেন্ট খাতে নিম্নমানের কর্মপরিবেশের বিষয়টি ভয়াবহ পন্থায় মনে করিয়ে দিয়েছে ওই দুর্ঘটনা। ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে শীর্ষ সব ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের জন্য পোশাক তৈরি করা কারখানাগুলোর কর্মপরিবেশ উন্নতিকল্পে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনা শুরু হয়। নভেম্বর মাসে ওয়াল-মার্ট, গ্যাপ এবং এইচঅ্যান্ডএম সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গঠিত গ্রুপ তাদের কর্মীদের জন্য আরও উন্নত মান নিশ্চিত করতে সম্মত হয়। তবে সার্বিক অগ্রগতি তেমন হয়নি। ওই ভবন ধসের পরেও বিচ্ছিন্ন কিছু গার্মেন্ট কারখানায় আগুনের ঘটনায় কমপক্ষে ১৮ জন মারা গেছে। বাংলাদেশের গার্মেন্ট খাতের কর্মীরা এখনও মজুরি বৃদ্ধির আবেদন করে যাচ্ছে। বিশ্বের মধ্যে দেশটির কর্মীরা সব থেকে নিম্ন মজুরি উপার্জন করে থাকে। টাইম ম্যাগাজিনের শীর্ষ ১০ রিপোর্টের ৭ নম্বরে এভাবেই উঠে আসে রানা প্লাজা ভবন ধসের ঘটনা। বিদায়ী বছরের  সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ছিল এটি। টানা এক মাস ধরে এই ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার হয়েছে জীবিত ও মৃত মানুষ। ১১২৭ জন নিহত হন ভবন ধসের ঘটনায়। ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয় ২৪৩৮ জন জীবিত মানুষ, ১২ জন উদ্ধারের পর হাসপাতালে মারা যান, ৮৩৬ মৃতদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়, ২৯১ অ-শনাক্ত মৃতদেহ জুরাইন কবরস্থানে দাফন, ৩১৬ জন নিখোঁজ ব্যক্তির তালিকা রয়েছে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে, ২২৩ জন বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাদের অনেকেরই স্থান হয়েছিল সাভারের জাতীয় পক্ষাঘাত পুনর্বাসন কেন্দ্রে (সিআরপি)। অনেকে পরিবারের কাছে ফিরে গেলেও স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হচ্ছে। পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন অনেকে। ২৪শে এপ্রিল থেকে ১৪ই মে পর্যন্ত চলেছে উদ্ধার কাজ। টানা ২১ দিন উদ্ধারের পরও অনেকে ফিরে পায়নি তাদের স্বজনদের। নয় তলা ভবনের ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে ছিলো অনেকে। প্রথম দিন মধ্যরাত পর্যন্ত ১৩৫ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। এদের ৮০ জনের পরিচয় নিশ্চিত করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে সহস্রাধিক মানুষকে। তাদের অনেকের অবস্থা ছিল গুরুতর। এদের অনেকের হাত ও পা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ছিল বিচ্ছিন্ন। দিনে ভেতর থেকে তারা বাঁচার আকুতি জানালেও রাতে তাদের  সে আর্তনাদ ক্ষীণ হয়ে আসছিল। আগের দিন ভবনে ফাটল ধরা পড়ে। ফাটল ধরা পড়ার পর শিল্প পুলিশের পক্ষ থেকে কারখানাগুলো বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। ভবনটি ধসে পড়ার পরই দেখা যায় এক মর্মন্তুদ চিত্র। পিলার পড়ে কারও মাথা থেঁতলে পড়ে আছে। কারও পা টুকরা টুকরা হয়ে রডের সঙ্গে লেগে আছে। কারও শরীরের ওপর ছাদ পড়ে থেঁতলে  গেছে। রক্তে ভেসে গেছে মেঝ। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে বাঁচার আকুতি, কান্না আর মৃত্যু গোঙানি শুনে চোখের পানি ফেলেছেন উপস্থিত উদ্ধারকারীরাও।

ঘটনার পরপরই উদ্ধার কাজে ছুটে যান স্থানীয় লোকজন। একে একে বের করে আনেন নিহতদের নিথর দেহ। আহতদের রক্তাক্ত অবস্থায় বের করে  নেয়া হয় বিভিন্ন হাসপাতালে। উদ্ধারকাজে একে একে যোগ দেয় ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ফায়ার সার্ভিসের প্রশিক্ষিত  স্বেচ্ছাসেবীরাও অংশ নেন উদ্ধারকাজে। এছাড়াও সারা দেশ থেকে মানুষ ছুটে আসে উদ্ধারকাজে। সেখানে অনেকেই অনেককে চিনে না। কিন্তু প্রাণ রক্ষায় সবাই একত্রিত হয়ে কাজ করেছে। ছাত্রছাত্রীরাও ছুটে গেছে সেখানে। এছাড়া, বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠন এবং সাধারণ মানুষও ছুটে যায় সেখানে।  তবে পুরো ভবনটি ধসে পড়ায় এবং বিপজ্জনক অবস্থায় থাকায় উদ্ধারকাজে  বেগ পেতে হয়। অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি না থাকায় চাপা পড়া জীবিতদের উদ্ধার করতে অনেক সময় লেগে যায়। ধসে পড়ার সময় ৯ তলা ভবনের তিন, চার, পাঁচ, ছয়, সাত ও আট তলায় অবস্থিত ৬টি ফ্লোরে শ্রমিকরা কাজ করছিলেন। এছাড়া, প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় মার্কেট ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় ছিল। সব মিলিয়ে ওই ভবনে ৪/৫ হাজার লোক ছিলেন। এদের বেশির ভাগই ভবন  থেকে বের হতে পারেননি। ভবনধসের এ ঘটনা বিশ্বে বড় ধরনের একটি শিল্পবিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যা বাংলাদেশের তৈরী পোশাক খাতকে বিশ্ববাজারে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। নিহত ব্যক্তিদের দাফন খরচ বাবদ ২০ হাজার টাকা আর আহত ব্যক্তিদের প্রাথমিকভাবে পাঁচ হাজার করে নগদ টাকা দেয়া  হয়। সরকারি হিসাবে ৮৩৬টি মৃতদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ২৯১টি মৃতদেহ অ-শনাক্ত হিসেবে জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। শনাক্তের জন্য এই  দেহগুলো থেকে ডিএনএ নমুনা সংরক্ষণ করা হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের কাছে ৩১৬ জন নিখোঁজের তথ্য রয়েছে।
রানা প্লাজার ওপরের ছয়টি তলায় পাঁচটি  পোশাক কারখানা, দোতলা ও নিচতলার এক অংশে বিপণিবিতান, আরেক অংশে ব্র্যাক ব্যাংকের সাভার শাখার কার্যক্রম চলছিল। ২৩শে এপ্রিল সকালেই রানা প্লাজার তৃতীয় ও চতুর্থ তলার বিম,  দেয়াল ও স্তম্ভে ফাটল দেখা দেয়। ধসের আতঙ্কে পোশাক কারখানাগুলোর শ্রমিকেরা হুড়োহুড়ি করে বের হয়ে আসেন। ওই দিন ছুটি দিয়ে দেয়া হয়। খবর শুনে আসেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), পুলিশ ও গণমাধ্যমকর্মীরা। ওই দিন বিকালেই ইউএনও গণমাধ্যমকে বলেন, সে রকম কিছু হয়নি। পরদিন (২৪শে এপ্রিল) সকালে পোশাক কারখানাগুলোর মালিকেরা মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দিয়ে ফোন করিয়ে ডেকে আনেন শ্রমিকদের। শ্রমিকেরা যেতে না চাইলে  জোর করে তাদের কারখানায় ঢোকানো হয়। সকাল আটটার দিকে কাজ শুরু করার কিছু সময় পরই প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়ে বিকট শব্দে ধসে পড়ে নয়তলা ভবনটি। মাথার ওপর পড়া ইট-কংক্রিটে চিড়েচ্যাপ্টা হয়ে সেখানেই প্রাণ হারান সহস্রাধিক মানুষ। অনেকের গলিত লাশ বের করা হয় ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে। ধ্বংসস্তূপের ভেতরে সুড়ঙ্গ  কেটে জীবন বাজি রেখে ঢুকে পড়েন উদ্ধারকারীরা। হাঁকডাক দিয়ে আহতদের অবস্থান শনাক্ত করে একের পর এক বের করে আনছিলেন জীবিত মানুষদের। অক্সিজেনের অভাব, হাঁসফাঁস করা গরমে কাজ করতে করতে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন অনেকেই। তবু  থেমে থাকেনি উদ্ধারকাজ। ভবন ধসের পঞ্চম দিনে জীবিত উদ্ধার করা হয় কিউ এম এ সাদিক নামের পোশাক কারখানার এক কর্মকর্তাকে। তখন তৃতীয় তলায় শাহীনা নামের এক শ্রমিককে জীবিত উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছিলেন উদ্ধারকর্মীরা। কিন্তু রাত ১০টায় সুড়ঙ্গে আগুন ধরে যাওয়ায় শাহীনাকে আর জীবিত উদ্ধার করা যায়নি। সেই আগুনে দগ্ধ হয়ে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান উদ্ধারকর্মী এজাজউদ্দীন কায়কোবাদ।
মৃত্যুঞ্জয়ী রেশমা: সাভারের ভয়াবহ রানা প্লাজা ধসের ঘটনার ১৭ দিন (৩৯১ ঘণ্টা ৩০ মিনিট পর) পর উদ্ধার হয়েছে গার্মেন্ট কর্মী রেশমা। অলৌকিক! অবিশ্বাস্য ঘটনা। ক্ষণিকের জন্য হাজারো লাশের শোক ভুলিয়ে দিয়েছেন তিনি। সবার চোখে আনন্দাশ্রু ঝরেছে। উদ্ধার-মুহূর্ত ছিল সেখানে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। উপস্থিত হাজার হাজার মানুষ  মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রাণভিক্ষা  চেয়ে হাত তুলে মোনাজাত করেন।  কেউ কেউ দাঁড়িয়ে যান নামাজে। এমনই অবস্থায় যখন তাকে সুড়ঙ্গ কেটে বাইরে বের করে আনা হয় তখন আল্লাহু আকবর ধ্বনিতে প্রকম্পিত হয়ে উঠে এলাকা। মিরাকল এক ঘটনা। কিভাবে এ ১৭ দিন রানা প্লাজার কংক্রিটের স্তূপে চাপা পড়েছিলেন তিনি। ধ্বংসস্তূপের ভিতর জীবিত মানুষ পাওয়া যখন কোন আশাই ছিল না, তখনই ঘটে গেল এই অভাবনীয় ঘটনা। জীবিত অবস্থায় বের করা হয় পোশাক শ্রমিক রেশমাকে। গত ৩রা নভেম্বর রোববার ঢাকা মেডিকেল কলেজের ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরির পক্ষ থেকে ১৫৭ জনের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে। এদের মধ্যে ১১৬ জন নারী ও ৪১ জন পুরুষ। ফলাফল হস্তান্তর করা হয়েছে শ্রম মন্ত্রণালয়ে। অন্যদিকে পরিবারের সদস্যরা ডিএনএ’র ব্যাপারে কোন তথ্য না পাওয়ায় ১৬৫ জনের পরিচয় শনাক্ত হয়নি।         
সাভারে রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপে এখনো হাড়গোড়ের সন্ধান মিলছে। গত ২৭শে ডিসেম্বর পথশিশুরা রড ও বিভিন্ন পরিত্যক্ত মালামাল সংগ্রহ করতে গিয়ে এসব কুড়িয়ে পায়। এ নিয়ে গত ১৫ দিনে ধ্বংসস্তূপ থেকে একটি কঙ্কাল, দুটি মাথার খুলি ও হাড়গোড় পাওয়া  গেছে। ধ্বংসস্তূপে বার বার কঙ্কাল, মাথার খুলি ও হাড়গোড় পাওয়ার কারণে স্থানীয় জনসাধারণসহ নিখোঁজ শ্রমিকদের স্বজনেরা ধ্বংসস্তূপের ভেতরে তল্লাশির ব্যবস্থা করার দাবিও জানিয়েছেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে কুড়িয়ে পাওয়া হাড়গোড় উদ্ধার করে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠিয়েছেন। এর আগে ১৩ ও ২২শে ডিসেম্বর ওই ধ্বংসস্তূপ থেকে একটি কঙ্কাল ও মাথার খুলি পাওয়া গেছে।
ভবন ধসের ঘটনায় সারা বাংলাদেশের মানুষ একত্রিত হয়ে কাজ করেছে। শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া সহ সাধারণ মানুষও এগিয়ে এসেছিল আহতদের বাঁচাতে। জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলের একান্ত চেষ্টায় চলেছিল উদ্ধার কাজ। কেউ জানে না কি কার পরিচয়। তখন একটি পরিচয় ছিল সবার। সকলেই মানুষ। এই ভাবনা থেকেই এগিয়ে গিয়েছিলেন সবাই। তবে এই ভবন ধসের ঘটনা নিয়ে আলোচনা- সমালোচনা ছিলো মুখরিত। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর এই ঘটনায় বিরোধী দলকে দায়ী করে বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য দেন। তিনি বলেন- বিরোধী দলের হরতালে জামায়াত-শিবির ও বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা আন্দোলনের সময় বিল্ডিং- এর পিলার ধরে নাড়াচাড়া করায় সাভারের রানা প্লাজা ধসে পড়ে। এ বক্তব্যে দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। ভবনধসের ঘটনায় এখন পর্যন্ত চারটি মামলা হয়েছে। ধসে পড়া ভবনটির মালিক সোহেল রানা, তার বাবা আবদুল খালেক ও পাঁচটি কারখানার মালিকসহ ১১ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। এর মধ্যে আবদুল খালেক জামিনে ছাড়া পেয়েছেন। এখনও তদন্ত কাজ চলছে।

মৃত্যুর নির্মমতায় থমকে গিয়েছিল গোটা বিশ্ব by শর্মী চক্রবর্তী

‘আমি ভাবি নাই বাঁচমু। বাঁচার জন্য পাগলের মতো করেছি। এদিকে ওদিকে খোঁজাখুঁজি করেছি। আওয়াজ দিছি। প্রথম কেউরে পাই নাই। হায়রে কি আর্তনাদ।

আলোচিত দুই জাগরণ by কাজী সুমন

বিদায়ী বছরে দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল দুই জাগরণ। একটি গণজাগরণ অন্যটি হেফাজতে ইসলাম। সম্পূর্ণ ভিন্ন চেতনা থেকে দু’টি জাগরণ নতুন শক্তি হিসেবে আলোচনায় এসছিল দুনিয়া জুড়ে।

খালেদা বাড়িতে এরশাদ হাসপাতালে by অমিত রহমান

বাড়িতে বন্দি খালেদা। এরশাদ বন্দি হাসপাতালে। হাজার হাজার বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী কারাগারে। দেশের সর্বোচ্চ আদালত কলঙ্কিত।
ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের ভাষায় জানাজা পাঠ হয়ে গেছে। সাংবাদিকদের মিলনস্থল জাতীয় প্রেস ক্লাবের গায়ে কলঙ্ক লেপে দেয়া হয়েছে। সেখানে জঙ্গিরা আছেন সে খবর নাকি পুলিশ কমিশনারের কাছে পৌঁছেছে গোয়েন্দা রিপোর্টে। প্রেস ক্লাব কর্তৃপক্ষকে অবশ্য আরও সজাগ ও একপেশে রাজনীতি থেকে দূরে থাকা জরুরি বলে মনে করছি। প্রেস ক্লাবকে রাখা উচিত রাজনীতির ঊর্ধ্বে। বাংলাদেশের বিদেশী বন্ধুরা হঠাৎ চুপ হয়ে গেছেন। বড়দিন আর নববর্ষের কারণে ছুটি- এটাই কি প্রধান কারণ, নাকি তারা বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। বৃটিশ হাইকমিশনার রবার্ট গিবসনের হঠাৎ দৌড়ঝাঁপ কিছুটা আশারও সঞ্চার করেছে। যদিও তার সঙ্গে কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে বিএনপি নেতা শমসের মবিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে অবশ্য ছেড়ে দেয়া হয় আন্তর্জাতিক চাপে। খালেদার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজিনা জানিয়েছেন তার উদ্বেগের কথা। এখন বড় এক চ্যালেঞ্জ খালেদার সামনে। দলকে এক রাখতে সক্ষম হয়েছেন শত প্রলোভনের মুখে- এটাকে তার সাফল্য হিসেবে দেখা যেতে পারে। কিন্তু নীতিকৌশল প্রণয়নে মুন্সিয়ানায় যে ঘাটতি ছিল তাতে কোন সন্দেহ নেই। তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করার মধ্যে বড় ধরনের রাজনৈতিক কৌশল ছিল। এখনই তা হয়তো খোলাসা করে বলা ঠিক হবে না। সময়েই তা পরিষ্কার হয়ে যাবে। বিএনপি যাতে কখনও নির্বাচনমুখী না হয় সেটা ছিল সরকারি কৌশল। কেননা, সরকার জানে বিএনপি যেনতেন ব্যবস্থায় নির্বাচনে গেলেও জয় পেয়ে যাবে। মানুষ পরিবর্তন চায়। পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষায় তারা ভোট দেয়ার জন্য উদগ্রীব। এর মধ্যে পাঁচ পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন খালেদার ভাগ্য বিপর্যয় ঘটায়। শাসকরা তখন নিশ্চিত হয়ে যান নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার অর্থ হচ্ছে পরাজয় মেনে নেয়া। নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারার শামিল। তাই তারা এমন এক কৌশল নেন তাতে বিএনপির নির্বাচনে অংশ নেয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। খালেদা টের পেয়ে পথ খুঁজছিলেন। প্রেসিডেন্টের কাছেও গিয়েছিলেন। হাসিনাকে বাদ দিয়ে শাসক দলের যে কাউকে অন্তর্বর্তী সরকারে নেয়া হলে সে নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিতো। অন্তত বিদেশী কূটনীতিকদের কাছে বিএনপি এই আগ্রহের কথা জানিয়েছিল একাধিকবার। সে চেষ্টাও ব্যর্থ হয় শেখ হাসিনার কড়া মনোভাবের কারণে। তিনি নিজে প্রেসিডেন্টের কাছে গিয়ে বলে এসেছেন এমন কোন তৎপরতায় যেন লিপ্ত না হন। যদিও একপর্যায়ে প্রেসিডেন্ট যাতে বিএনপির সঙ্গে সমঝোতার একটি উদ্যোগ নেন সে জন্য অন্যপক্ষের মাধ্যমে বার্তা পাঠিয়েছিলেন। সর্বজনশ্রদ্ধেয় বর্ষীয়ান সাংবাদিক এবিএম মূসার কাছে যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকে পাঠিয়েছিলেন। ওবায়দুল কাদের যখন প্রস্তাবটি নিয়ে এবিএম মূসার কাছে যান তখন তিনি জানতে চেয়েছিলেন এটা কি তার প্রস্তাব, নাকি প্রধানমন্ত্রীর? কাদের তখন বলেন, আমাকে নেত্রী পাঠিয়েছেন। সড়ক ভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠক থেকে বের হয়ে এবিএম মূসা সরাসরি প্রেসিডেন্ট হাউসে ফোন করে সময় চান। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে সময় দেয়া হয়। প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পুরো বিষয়টি তাকে অবহিত করেন। এর আগে তিনি বিএনপির সঙ্গে কথা বলেন। মির্জা ফখরুল বলেন, তারা রাজি। বলাবলি আছে প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে সবুজ সঙ্কেত পাওয়ার পর খালেদা জিয়া তার ১৮ দলের সঙ্গীদের নিয়ে বঙ্গভবনে যান। এই যখন অবস্থা তখন প্রধানমন্ত্রী তার সিদ্ধান্ত স্থগিত করে নয়া কৌশল নেন। মাঝখানেই থেমে যায় আবদুল হামিদের সমঝোতা প্রচেষ্টা। শোনা কথা, বিএনপি যদি প্রেসিডেন্টের আন্ডারে কোন নির্বাচনে রাজি হয়ে যায় তখন সর্বনাশ হয়ে যাবে এমন যুক্তিতেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হয়। এর কয়েকদিন পর প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে প্রধানমন্ত্রী ভিন্ন এক প্রস্তাব দেন। এতে প্রেসিডেন্ট সায় দেননি। তখন সরকার একদম মরিয়া। যেনতেন প্রকারে নির্বাচন করতে হবে। তাদের কাছে খবর ছিল খালেদা নির্বাচনমুখী নন। এরশাদও দোটানায়। একপর্যায়ে এরশাদকে রাজি করানো হলো। তবে সংশয় ছিল গোড়া থেকেই। এরশাদ যে কোন সময় বেঁকে বসতে পারেন। হঠাৎ করেই এরশাদ বদলে যান। নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। এরপর এরশাদকে নানাভাবে চাপ দেয়া হয়। এরশাদ সিদ্ধান্তে অনড় থাকলে তাকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসার নামে কেবিনবন্দি করা হয়। শীর্ষস্থানীয় একজন চিকিৎসকের অধীনে এরশাদকে মানসিক রোগের চিকিৎসার জন্য রেফার করা হয়। রাখা হয় কম গুরুত্বপূর্ণ এক কেবিনে। কিন্তু এরশাদ কৌশল আঁটতে থাকেন। একদিন তিনি কর্তব্যরতদের রাজি করিয়ে গলফ খেলতে চলে যান। এ থেকে জাতির সামনে এই বার্তাই দেন যে, তিনি সুস্থ মানুষ। খালি খালি তাকে আটকে রাখা হয়েছে। এরশাদ এতটা সাহস কিভাবে করলেন তা নিয়ে অনেকেই অনেক অঙ্ক মেলাচ্ছেন। ওদিকে তার দলকে তিন টুকরো করে আরেক দফা চাপ সৃষ্টি করা হয়। কিন্তু এরশাদ তার সিদ্ধান্তে অনড়। বিভিন্নভাবে বার্তা পাঠিয়ে বলছেন, জেলে ছিলাম। আবার যাবো। তবুও সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করবো না। এরশাদ মনে করেন, ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন এক তামাশা। এই নির্বাচন বাংলাদেশকে, গণতন্ত্রকে কলঙ্কিত করবে। গৃহবন্দি খালেদা কি করবেন? দলের সক্রিয় নেতারা জেলখানায়। একের পর এক অবরোধ-হরতাল দিয়ে কাজ হচ্ছে না। সরকার টলছে না। তারা যেভাবেই হোক ক্ষমতায় থাকতে চায়। দেশের অর্থনীতি পঙ্গু। বিনিয়োগ বন্ধ। প্রায় ৫শ’ গার্মেন্ট কারখানায় তালা। জনদুর্ভোগ চরমে। অবরোধে সরকারের নড়া তো দূরের কথা, তারা নিজেরাই অবরোধ পরিস্থিতি তৈরি করে দুর্ভোগ আরও বাড়িয়েছে। ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির এ এক বীভৎস রূপ। আদালত প্রাঙ্গণের ঘটনা থেকে এটা বোধকরি কারও বুঝতে অসুবিধা থাকার কথা নয়। একজন মহিলা আইনজীবীর ওপর যেভাবে লাল ঘোড়া দাবড়ানোর মতো লাঠি পড়েছে, তাতে বাংলাদেশ কেন, বিশ্ববাসী চমকে উঠেছেন। ১৩৭টি দেশে এই ছবিটি ছাপা হয়েছে বার্তা সংস্থাগুলোর বদৌলতে। লাখ লাখ অনলাইনে এটা স্থান পেয়েছে শীর্ষ ছবি হিসেবে। ধীরস্থির খালেদা এখন হঠাৎ করেই মেজাজ খারাপ করছেন। এটা তার চরিত্রের সঙ্গে একদম বেমানান। বন্দিদশায় মিডিয়ার মুখোমুখি হয়ে একটি জেলার প্রতি তার রাগ দেখানোটা ঠিক হয়নি। এটা সবাই জানেন, বিশেষ জেলার প্রতি বর্তমান শাসকদের বড্ড বেশি টান। মনে হয় অন্য কোন জেলার লোকজনের প্রতি তেমন আস্থা রাখতে পারছেন না। এটা ভাল না মন্দ আখেরেই তা প্রমাণিত হবে। খালেদাকে উত্ত্যক্ত করা হয়েছিল এতে কোন সন্দেহ নেই। এতে তিনি উত্তেজিত হবেন কেন? যা-ই হোক, বাংলাদেশের রাজনীতি এখন অন্য পথে। আমরা সবাই জানি নৈরাজ্য আর রাজনৈতিক শূন্যতা থেকে দেশে দেশে একনায়কতন্ত্রের জন্ম হয়েছে। বাংলাদেশ সে পথে অনেক আগে থেকেই হাঁটতে শুরু করেছে। সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে একপক্ষীয় শাসনের যাত্রা চূড়ান্ত করা হয়েছিল। কিন্তু এরশাদ কি বুঝে হিসাব নিকাশ পাল্টে দিয়েছেন। এরপর কি? এখনও স্পষ্ট নয়। তবে সামনে যে ঘোর অন্ধকার তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন হয়ে গেলে অন্য এক বাংলাদেশ আমরা দেখতে পাবো। অন্য এক মডেলের গণতন্ত্র উকিঝুঁকি মারছে। যে গণতন্ত্রে ভিন্নমতের স্থান হয়তো হবে না। হলেও তা হবে একদম নিয়ন্ত্রিত। আর স্বাধীন গণমাধ্যম! তা নিয়ে পরে আলোচনা করবো। যদি সুযোগ থাকে।

খালেদা বাড়িতে এরশাদ হাসপাতালে by অমিত রহমান

বাড়িতে বন্দি খালেদা। এরশাদ বন্দি হাসপাতালে। হাজার হাজার বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী কারাগারে। দেশের সর্বোচ্চ আদালত কলঙ্কিত।

‘বাংলাদেশের ভবিষ্যত অনিশ্চিত’

সহিংস পরিস্থিতির মধ্যে বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন আসন্ন। বাংলাদেশের ভবিষ্যত অনিশ্চিত বলেই প্রতীয়মান। এর বেশ কিছু কারণ বিগত দিনের সহিংসতার মধ্যে নিহিত।
লন্ডনের সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের সিনিয়র ফেলো ও কিংস কলেজের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো শ্রীনাথ রাঘবনের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদক অশীষ যেচুরি। ‘১৯৭১: এ গ্লোবাল হিস্ট্রি অব দ্য ক্রিয়েশন অব বাংলাদেশ’ গ্রন্থের লেখক শ্রীনাথ বাংলাদেশ সৃষ্টির বিষয়টিকে বৈশ্বিক ঘটনা বলে উল্লেখ করেছেন। বাংলাদেশ সৃষ্টিতে বৈশ্বিক প্রভাব ছিল এবং ইসরাইলের সম্পৃক্ততার কথাও তিনি তার গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, ১৯৭১ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত প্রত্যক্ষ স্বাধীনতার কথা ব্যক্ত করেনি আওয়ামী লীগ।
নিচে সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো:
আপনার গ্রন্থটির নাম ‘১৯৭১: এ গ্লোবাল হিস্টি অব দ্য ক্রিয়েশন অব বাংলাদেশ’। বৈশ্বিক কেন?
সাধারণভাবে, বাংলাদেশ সৃষ্টির বিষয়টি উপমহাদেশের সঙ্গে সম্পর্কিত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একে দ্বিতীয় দেশ-বিভাজন হিসেবে দেখা হয়। এটা আমার কাছে খুব সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি মনে হয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনের যে ব্যাপক সম্পৃক্ততা রয়েছে এবং এর মাধ্যমেই যে নিষ্পত্তির বিষয়টি চূড়ান্ত হয়েছে, সংকীর্ণ এ দৃষ্টিভঙ্গিতে তা বিবেচনা করা হয় না। এটা ছিল বৈশ্বিক ঘটনা, অংশগ্রহণকারীরা নিজেরাও মনে করেছিলেন তাদের বৈশ্বিক সমর্থন নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল।
আপনার যুক্তিতে বাংলাদেশ সৃষ্টি অনিবার্য কোন বিষয় ছিল না। কিন্তু ১৯৭১ সালে বিভিন্ন পরিস্থিতি আপনি তালিকাভুক্ত করেছেন, যা বাংলাদেশ সৃষ্টিতে প্রধান ভূমিকা রেখেছিল। আপনি এ বিষয়টি কিভাবে সমন্বয় করবেন?
একত্রিত পাকিস্তানের অস্তিত্ব ছিল নড়বড়ে। ভৌগোলিকভাবে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যায়। একই দেশের দুটি ডানা ভারতের মাধ্যমে পৃথক হয়েছে। বাঙালি ও পশ্চিম পাকিস্তানি অভিজাত সম্প্রদায়ের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য, ভিন্ন সংস্কৃতি এবং ভারসাম্যহীন ক্ষমতা-বণ্টনের বিষয়গুলো নিয়ে তীব্র মতপার্থক্য ছিল। আমার যুক্তি হচ্ছে, স্বায়ত্তশাসন কিভাবে স্বাধীনতার দাবিতে রূপান্তরিত হলো, তা অনুধাবনের জন্য প্রকৃত অর্থেই পেছনের দৃশ্যপট আপনার জানার কোন প্রয়োজন নেই। বিষয়টি বুঝতে আমাদের প্রয়োজন আরও উদার দৃষ্টিভঙ্গি।
পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়া যদি এতো জোরালো না হতো, তবে স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টি হতো না বলে কি মনে করেন আপনি?
আপনি একটি দুর্বল বন্ধনযুক্ত রাষ্ট্র পেতেন, যা কিছু ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিবুর রহমান চেয়েছিলেন। ১৯৭১ সালের মার্চ মাস পর্যন্তও আওয়ামী লীগ প্রত্যক্ষ স্বাধীনতার কথা ব্যক্ত করেনি। তারা পূর্ব পাকিস্তানের কাছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা হস্তান্তরসহ একটি দুর্বল সম্পর্ক চেয়েছিলেন। আশা ছিল যে, দুর্বল সম্পর্কের ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু একটি নির্বাচন হলে, বাঙালিদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা কাজে লাগবে। আর, সেটা হলে পূর্ব পাকিস্তান অধিক ক্ষমতার পাশাপাশি তাদের ন্যায্য হিস্যা বুঝে পেতো।
‘১৯৬৮ সালের চেতনা’র সঙ্গে এ বিষয়টিকে সম্পৃক্ত করার কারণ কি?
আমার দৃষ্টিতে ১৯৬৮ সালের ছাত্র-আন্দোলন পাকিস্তানের ইতিহাসের মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা। ১০ বছর ক্ষমতায় ছিলেন আইয়ুব খান। বৈষম্য ও সম্পদ পুঞ্জিভূত করার সমস্যার মধ্যেও পাকিস্তান অর্থনৈতিকভাবে ভাল অবস্থায় ছিল। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে ছাত্র আন্দোলন পরিবর্তন ত্বরান্বিত করেছিল। ছাত্র আন্দোলন ছিল একটি বৈশ্বিক ঘটনাপ্রবাহ। আমি সিআইএ’র একটি নথি উদ্ধৃত করছি যেখানে তারা বলছে, এটা ছিল বৈশ্বিক ঘটনা। পাকিস্তানের ওই শিক্ষার্থীরা ছিল ভিন্ন প্রজন্মের। ১৯৪০-এর দশকে শেখ মুজিবুর রহমান নিজে একজন ছাত্রনেতা ছিলেন। ভিন্ন আকাক্সক্ষা নিয়ে তিনি পাকিস্তানের পক্ষে লড়াই করেছিলেন। ছাত্র আন্দোলনের আমূল সংস্কার আওয়ামী লীগকে বাধ্য করেছিল তাদের নমনীয় অবস্থান থেকে সরে আসতে।
এসব ঘটনা প্রবাহের মধ্যে ইসরাইল জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি আপনি উল্লেখ করেছেন। এ সম্পর্কে আরও কিছু বলবেন কি?
ভারতে অস্ত্র সরবরাহের ইতিহাস রয়েছে ইসরাইলের। ১৯৬৫ সালে ভারতের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও ১৯৬২ ও ১৯৬৫ সালে ভারতে অস্ত্র পাঠিয়েছিল ইসরাইল। ইসরাইলের সঙ্গে ভারতের গোপন লেনদেন ছিল। ১৯৭১ সালে ইসরাইল যে ভারতে অস্ত্র সরবরাহ করেছিল, সে সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র জানতো এমন কোন ইঙ্গিত নেই। ভারতের কাছ থেকে পূর্ণ কূটনৈতিক স্বীকৃতি ইসরাইলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ, সে সময় ইসরাইল বেশ বিচ্ছিন্ন ও একঘরে হয়ে পড়েছিল। তারা ভেবেছিল, ভারতে অস্ত্র সরবরাহের বিষয়টি তাদের সহযোগিতা করবে।

‘বাংলাদেশের ভবিষ্যত অনিশ্চিত’

সহিংস পরিস্থিতির মধ্যে বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন আসন্ন। বাংলাদেশের ভবিষ্যত অনিশ্চিত বলেই প্রতীয়মান। এর বেশ কিছু কারণ বিগত দিনের সহিংসতার মধ্যে নিহিত।

‘সমঝোতা হয়নি, আইনজীবীরা গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রায় থাকবেন’

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ জে মোহাম্মদ আলী বলেছেন, বিরোধী দলের শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের বিষয়ে কোনো ধরনের চুক্তি বা সমঝোতা হয়নি।

‘সমঝোতা হয়নি, আইনজীবীরা গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রায় থাকবেন’

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ জে মোহাম্মদ আলী বলেছেন, বিরোধী দলের শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের বিষয়ে কোনো ধরনের চুক্তি বা সমঝোতা হয়নি।
আইনজীবীরা গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রায় শামিল আছেন, থাকবেন এবং আন্দোলনে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না আসা পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকবে।

প্রধান বিচারপতির সঙ্গে গতকাল মঙ্গলবার আইনজীবীদের আলোচনার বিষয়ে সমিতির উদ্যোগে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে এ জে মোহাম্মদ আলী এসব কথা বলেন।

এ জে মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘আমি আবার পরিষ্কাভাবে বলতে চাই, গতকালের মিটিংয়ে কোনো দলীয় প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে বৈঠক বা আলোচনা ছিল না। ওই মিটিংয়ে কোনো সমঝোতা হওয়ার প্রশ্ন ওঠে না।’

এদিকে সংবাদ সম্মেলনের পরপরই বিরোধী দলের ডাকা অবরোধ কর্মসূচির সমর্থনে একদল আইনজীবী সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে মিছিল করেন। এরপর তাঁরা সমিতি ভবনের প্রাঙ্গণ সমবেত হন।

গতকাল প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের সঙ্গে গত ২৯ ও ৩০ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়ে বৈঠক করেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি-সমর্থিত জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা। গতকাল বেলা সোয়া দুইটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের জাজেস লাউঞ্জে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এ এফ হাসান আরিফ, আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি আবদুল বাসেত মজুমদার, এ এফ এম মেসবাহ উদ্দিন ও হাবিবুল ইসলাম ভূঁইয়া, বর্তমান সভাপতি এ জে মোহাম্মদ আলী, সাবেক সম্পাদক এ এম আমিন উদ্দিন, বশির আহমেদ, শ ম রেজাউল করিম, এম বদরুদ্দোজা ও বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক রফিকুল ইসলাম তালুকদার এবং জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন ও আনিসুল হক উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া আপিল বিভাগের ছয়জন বিচারপতিও এতে অংশ নেন।

সমিতির দক্ষিণ হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ জে মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘গতকাল প্রধান বিচারপতি এবং আপিল বিভাগের কয়েকজন বিচারপতি আমাদের সঙ্গে ২৯ ও ৩০ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে ঘটে যাওয়া ঘটনা সম্পর্কে আলোচনা শুরু করেন। প্রধান বিচারপতি তাঁর বক্তব্যে ২৯ ও ৩০ ডিসেম্বরের বহিরাগতদের সুপ্রিম কোর্টের আক্রমণের বিষয়ে নির্লিপ্ত থাকায় আমি আইনজীবী সমিতির সভাপতি হিসেবে বিস্ময় ও ক্ষোভ প্রকাশ করি। কারণ পুলিশের সহায়তায় সন্ত্রাসীদের হামলায় আমি না অসংখ্য আইনজীবীর নিহত হওয়ার সমূহ আশঙ্কা ছিল। সুপ্রিম কোর্টের বর্তমান সম্পাদককে নজিরবিহীনভাবে গ্রেপ্তার করা হয়।’

গতকালের আলোচনায় রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে আলোচনা করার জন্য কাউকে আহ্বান করা হয়নি দাবি করেন মোহাম্মদ আলী। তিনি বলেন, ‘আলোচনায় সিদ্ধান্ত হয় আলোচ্য বিষয়বস্তু আলোচকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় আলোচনার পরপরই আওয়ামীপন্থী আইনজীবী হিসেবে পরিচিত আইনজীবীরা এবং অ্যাটর্নি জেনারেল আমাদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন সম্পর্কে বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্য প্রদান করেন।’

জাতীয়তাবাদী আইনজীবীদের আদালত বর্জন

সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে আইনজীবীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে গতকাল মঙ্গলবার সারাদেশে আদালত বর্জন কর্মসূচি পালন করে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করা হয়। সমাবেশে বক্তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির দাবি করেন। ব্যুরো, নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :
বরিশাল : বরিশালে বিএনপি-জামায়াতপন্থি আইনজীবীরা আদালতের কোনো কার্যাক্রমে অংশ নেননি। আদালত বর্জনকারীরা জেলা জজ আদালত প্রাঙ্গণে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। মিছিলে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি নেতা মজিবর রহমান নান্টু, কাজী এনায়েত হোসেন বাচ্চু, আবুল কালাম আজাদ, মহসিন মন্টু প্রমুখ।
বাগেরহাট : বাগেরহাটের আইনজীবীরা মিছিল নিয়ে মহাসড়কে যেতে চাইলে পুলিশ বাধা দেয়। পরে আদালতের প্রধান ফটকে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সভাপতি হাওলাদার আবদুল মান্নানের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তৃতা করেন শেখ ওয়াহিদুজ্জামান দিপু, চাকলাদার আকরাম হোসেন, আসাদুজ্জামান, আবদুল ওয়াদুদ মুক্তা, এনায়েত হোসেন, এসকেন্দার হোসেন প্রমুখ।
সিলেট : সিলেটে আদালত চত্বরে মিছিলে উপস্থিত ছিলেন জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ঐক্য পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট আশিক উদ্দিন আশুক, আবদুল গাফফার, আতিকুর রহমান সাবু, নাসিরুজ্জামান নাজিম, মহসিন আহমদ চৌধুরী, কামাল হোসেন, আল আসলাম মুনিম, জিয়া উদ্দিন নাদের, আলিম উদ্দিন, বদরুল আহমদ চৌধুরী, আনোয়ার হোসেন, শফিউল আলম, দেলওয়ার হোসেন শামীম, আবদুর রব প্রমুখ।
মাগুরা : জেলা আইনজীবী সমিতির সামনে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন জেলা জাতীয়তাবাদী আইনজীবী পরিষদের সভাপতি মোকাদ্দেস হোসেন, ময়েন উদ্দিন, ওমর ফারুক, শাখায়াত হোসেন, আ. রশিদ, শাহেদ হাসান টগর, কাজী মিনহাজসহ অন্যরা।
কুড়িগ্রাম : স্থানীয় আইনজীবী সমিতি কার্যালয়ে ফখরুল ইসলামের সভাপতিত্বে প্রতিবাদ সভায় বক্তব্য রাখেন রেহেনা খানম বিউটি, মোখলেছুর রহমান, রেজাউল কবির দুলাল ও মাহবুবা আক্তার চুমকি প্রমুখ।
সুনামগঞ্জ : জেলা বিএনপির সভাপতি সাবেক হুইপ ফজলুল হক আছপিয়ার নেতৃত্বে বের হওয়া আইনজীবী ঐক্য পরিষদ মিছিল শেষে সমাবেশ হয়।

অবরোধের সমর্থনে ১৮ দলের বিক্ষোভ

কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল মঙ্গলবার ১৮ দলের উদ্যোগে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করা হয়। অফিস ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :
রাজবাড়ী :স্থানীয় রেলগেট শহীদ মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি চত্বরে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান লাল, এবিএম মঞ্জুরুল আলম দুলাল, রোকন চৌধুরী, চৌধুরী আহসানুল করিম, গাজী আহসান হাবীব প্রমুখ।
বাগেরহাট :জেলার সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি সৈয়দ নাসির আহমেদ মালেকের সভাপতিত্বে সভায় বক্তৃতা করেন জেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি অ্যাডভোকেট শেখ ওয়াহিদুজ্জামান দীপু, ওলিউজ্জামান মোজা, আসাদুজ্জামান, সুজা উদ্দিন মোল্লা সুজন, আবুল কালাম আজাদ বুলু, শেখ ইদ্রিস আলী, সেলিম ভুইয়া, লেন্টু সিকদার, জাকির হোসেন প্রমুখ।
নাটোর :মঙ্গলবার নাটোর শহরের স্টেশন বাজার, দত্তপাড়া, রামাইগাছি, মোহনপুর ও পিটিআই মোড় এলাকায় মিছিল-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে বক্তব্য রাখেন জেলা বিএনপির সহসভাপতি রহিম নেওয়াজ, অ্যাডভোকেট রুহুল আমিন তালুকদার, নাসিম খান, শহিদুল ইসলাম বাচ্চু, নজরুল ইসলাম খোকন, মকবুল হোসেন, জামাল হোসেন প্রমুখ।
সিলেট :সিটি পয়েন্টে আয়োজিত সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন জেলা মুক্তিযোদ্ধা দলের আহ্বায়ক আবদুর রাজ্জাক। মতিউল বারী চৌধুরী খুর্শেদের পরিচালনায় সমাবেশে বক্তব্য রাখেন আশিক উদ্দিন আশুক, সামসুজ্জামান জামান, এটিএম ফয়েজ, সরোয়ার আহমদ, ফরহাদ চৌধুরী শামীম, মুজিবুর রহমান মুজিব, নাজিম উদ্দিন লস্কর, অধ্যাপক আজমল হোসেন রায়হান প্রমুখ।
চাঁদপুর :জেলা বিএনপির সহসভাপতি অ্যাডভোকেট সলিমুল্লা সেলিমের নেতৃত্বে মিছিল শেষে প্রতিবাদ সমাবেশে ১৮ দলীয় জোটের নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন।
চাটখিল (নোয়াখালী) :পৌর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আহসানুল হক মাসুদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। পরে আনিতাস পেট্রোলপাম্প চত্বরে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন আলাউদ্দিন ভূঁইয়া, আহসানুল হক মাসুদ, জামায়াত নেতা মাওলানা মনিরুজ্জামান, নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া প্রমুখ।
জামালপুর :জামালপুর মহিলা কলেজ গেট থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। মিছিল-পূর্ব সমাবেশে বক্তব্য রাখেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও পৌর মেয়র ওয়ারেছ আলী মামুন, আমজাদ হোসেন, শহিদুল হক খান দুলাল, ফিরোজ মিয়া, মাঈনউদ্দিন বাবুল, সজীব খান প্রমুখ।
মৌলভীবাজার :কুসুমবাগে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন ইয়ামীর আলী, মতিন বক্স, হেলু মিয়া, আলাউদ্দিন শাহ, ফখরুল ইসলাম প্রমুখ। অন্যদিকে, বিএনপির আরেকটি সমাবেশে বক্তব্য রাখেন মিজানুর রহমান ভিপি মিজান, স্বাগত কিশোর দাশ চৌধুরী,গাজী মারুফ প্রমুখ।
মদন (নেত্রকোনা) :উপজেলা বিএনপির সভাপতি এমএ হারেছের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন সাধারণ সম্পাদক এন আলম, আবু তাহের আজাদ, চন্দন, মুজিবুর রহমান চৌধুরী, সাইফ আহম্মেদ সেকুল প্রমুখ।
ভাণ্ডারিয়া (পিরোজপুর) :উপজেলা যুবদল ও ছাত্রদল বিক্ষোভ মিছিল বের করার চেষ্টা করলে পুলিশি বাধায় তা পণ্ড হয়ে যায়। মিছিলে নেতৃত্ব দেন উপজেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন ও আবুল কালাম মলি্লক।
দিনাজপুর : মিছিলে জেলা বিএনপির সভাপতি লুৎফর রহমান মিন্টু, আখতারুজ্জামান জুয়েল, রকিব উদ্দিন চৌধুরী মুন্না প্রমুখ অংশগ্রহণ করেন।
কুড়িগ্রাম : ১৮ দলের বিক্ষোভ মিছিল ঘোষপাড়ায় এলে পুলিশ আটকে দেয়। এ অবস্থায় দলীয় কার্যালয়ে বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি আবু বকর সিদ্দিকের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা, আবদুল আজিজ, শফিকুল ইসলাম বেবু, হাসিবুর রহমান হাসিব, আবদুল মতিন ফারুকী প্রমুখ।
পাবনা :দলীয় কার্যালয়ে সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি একেএম মুসার সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন শেখ তুহিন, অধ্যাপক আবদুল গাফফার, মোসাব্বের হোসেন সঞ্জু, রেজাউল করিম, জহুরুল ইসলাম, আবদুর রব, ফজলুর রহমান, সেলিম সরদার, আজম প্রামাণিক প্রমুখ।

ফুলবাড়ী সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে প্রাণ হারান ৩ যুবক শাহিনুর রহমান শাহিন

ফুলবাড়ী সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে ২০১৩ সালে ৩ যুবক নিহত হন । এ সময় আহত হয়েছেন ৩০ গরু ব্যবসায়ী।
ফুলবাড়ী উপজেলায় প্রায় ৪০ কিলোমিটার সীমান্ত। স্থানীয় চোরাকারবারিরা রাখালের পেশায় সক্রিয় থাকায় প্রচুর টাকা লুটে নিচ্ছেন প্রতিরাতেই। তাদের এসব কার্যক্রম সীমান্ত এলাকায় দেখে সখ্য করে কিংবা দালালদের খপ্পরে পড়ে কলেজপড়ূয়া হতদরিদ্র ও নিম্নবিত্ত ছাত্ররা এ কাজে জড়িয়ে পড়ছেন। সীমান্তের রাস্তাঘাট তাদের চেনা না থাকায় বিএসএফের গুলিতে প্রাণ যাচ্ছে এসব ছাত্রের। উপজেলার জোম্মারপাড় এলাকার আবুল হোসেনের ছেলে মারুফ হোসেন মোকছেদ ছিলেন ফুলবাড়ী ডিগ্রি কলেজের বিএ প্রথম বর্ষের ছাত্র। দালালদের খপ্পরে পড়ে গরু পারাপার করার সময় ১৬ ফেব্রুয়ারি বিএসএফের গুলিতে মারা যান। একইভাবে ২৮ সেপ্টেম্বর মারা যান সীমান্তঘেঁষা ভারতের শুকারুকুটি গ্রামের কায়ছার আলীর ছেলে রফিকুল ইসলাম। কাঁটাতারের শক্ত বেড়া আর হাইভোল্টেজের সার্চলাইট ফাঁকি দিয়ে ১১ অক্টোবর গরু পারাপারের সময় বিএসএফের গুলিতে মারা যান ভারতের সীমান্তঘেঁষা নাগোয়া বাড়ি গ্রামের আয়নাল হকের ছেলে মফিদুল। আহত হয়েছেন ৩০ জন। এ ছাড়া এই অঞ্চলে আশ্বিন-কার্তিক মাসে কাজ না থাকায় শ্রমিকরা দালালদের পাল্লায় পড়ে পাচারের সময় এবং নোম্যান্সল্যান্ডে ভুলবশত যাওয়ায় বিএসএফের হাতে আটক হয় ১৫ জন। আটকদের স্বজন ছালাম ও জব্বার আলী জানান, দিলি্ল থেকে দেশে ফেরার পথে গত এক বছরে কোচবিহার জেলহাজতে ঠাঁই হয়েছে ৪৩ বাংলাদেশি নারী-পুরুষের। তারা বিনা দোষে কারাভোগ করছেন।
শিমুলবাড়ী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শরিফুল আলম সোহেল জানান, মারুফ হোসেন মোকছেদকে গরু ব্যবসায়ীদের পাল্লায় পড়ে অকালে প্রাণ দিতে হয়েছে।

নাশকতার আশঙ্কায় by গ্রেফতার ৪০

নাশকতার অভিযোগ ও আশঙ্কায় ১৮ দলের ৪০ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর_
ছাতক (সুনামগঞ্জ) :ছাতকে অভিযান চালিয়ে কফিল উদ্দিন ও আলাউদ্দিন নামে দুই সহোদরকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
বানারীপাড়া (বরিশাল) :বানারীপাড়ায় নাশকতা চেষ্টার অভিযোগে জামায়াত ও বিএনপির দুই কর্মীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার সকালে পূর্ব মলুহার গ্রাম থেকে জামায়াতকর্মী কামাল হোসেন ও পশ্চিম বাইশারী গ্রাম থেকে বিএনপিকর্মী তাহেরুল ইসলামকে গ্রেফতার করা হয়।
উখিয়া (কক্সবাজার) :পুলিশ মঙ্গলবার ভোরে বিএনপি-জামায়াতের ৩ কর্মীকে আটক করেছে। তারা হলো_ নুরুল আবছার, ছৈয়দ নুর ও নুরুল বশর।
জিয়ানগর (পিরোজপুর) : জিয়ানগর থানা পুলিশ জামায়াতকর্মী মুহিবুল্লাহ ও মনিরুজ্জামানকে আটক করে।
লক্ষ্মীপুর/কমলগঞ্জ : লক্ষ্মীপুর সদর, রামগঞ্জ, রায়পুর, রামগতি ও কমলনগর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সোমবার রাতে ও মঙ্গলবার সকালে অভিযান চালিয়ে ১৮ দলের ৭ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গ্রেফতারকৃতরা হলো_ দেলোয়ার হোসেন, বেলায়েত হোসেন, মামুন হোসেন, মো. স্বপন মো. শরীফ, মো. আবদুল করিম, মো. রায়হান, মো. জাফর, মো. রাছেল, মো. ইব্রাহীম, মাকছুদুর রহমান ও জহির উদ্দিন।
নড়াইল : নড়াইল জেলা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এনামুল কবীর চন্দনকে সোমবার সন্ধ্যায় গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
ঠাকুরগাঁও :বিএনপি-জামায়াতের ৯ কর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। এরা হলো_ মোখলেছুর রহমান, কালু, আছির উদ্দিন, জুয়েল ও আশরাফুল ইসলাম। বাকিদের নাম পরিচয় পাওয়া যায়নি।
টেকনাফ (কক্সবাজার) :উপজেলায় জামায়াত-শিবিরের ২ নেতাকে আটক করেছে পুলিশ। আটককৃতরা হচ্ছে_ টেকনাফ উপজেলা ছাত্রশিবিরের মো. হেলাল উদ্দীন ও জামায়াত নেতা বদি আলম।
মতলব (চাঁদপুর) :মতলব পৌর জামায়াতের সভাপতি গোলাম মাওলাকে মঙ্গলবার দুপুরে পুলিশ আটক করেছে।
ওসমানীনগর (সিলেট) :সোমবার রাতে অভিযান চালিয়ে ওসমানীনগর থানা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আহবাবুল, জামায়াত কর্মী সেবুল মিয়া, জাহাঙ্গীর আলম ও আবু সুফিয়ানকে গ্রেফতার করা হয়।
মাগুরা :মাগুরা সদর থানা পুলিশ মঙ্গলবার আবদুর রশিদ ও আল-আমিন নামে দুই বিএনপি কর্মীকে আটক করেছে।

এটিএম বুথে ডিজিটাল চোর!

পেনড্রাইভ সদৃশ ডিভাইসের মাধ্যমে [ইউএসবি ড্রাইভ] অটোমেটেড টেলার মেশিনে [এটিএম] ম্যালওয়্যার প্রবেশ করাতে সমর্থ হয়েছে ডিজটাল চোরেরা। প্রচলিত হ্যাকিংয়ের বদলে তারা ক্যাশ মেশিন কেটে ইউএসবি ড্রাইভের মাধ্যমে ম্যালওয়্যার প্রবেশ করিয়েছে। এই ম্যালওয়্যার এটিএম কার্ড ব্যবহারকারীদের নানা তথ্য পেঁৗছে গেছে চোরের হাতে। জার্মানিতে অনুষ্ঠিত হ্যাকার-থিমড চ্যাওস কম্পিউটিং কংগ্রেসে ইউরোপের একটি ব্যাংকের অর্থ চুরি করে নেওয়ার বিষয়টি প্রকাশ করা হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একদল গবেষক চুরির এ ঘটনা প্রকাশ করেছে। গবেষকরা জানান, হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে অর্থের পরিমাণ জানা যায় বলে হ্যাকার বা চোরেরা বেশি অঙ্কের অর্থ এটিএমে হামলা চালায়। তারা দলবদ্ধ হয়ে কাজ করে এবং একের পর এক মেশিন থেকে অর্থ তুলে নেয়। গত জুলাই মাসে হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে বেশ কয়েকটি এটিএম থেকে অর্থ চুরির ঘটনা ঘটে। এরপর ব্যাংক কর্তৃপক্ষ অনুসন্ধানের পর দেখতে পায়, ডিজিটাল চোরেরা ইউএসবি স্টিক ব্যবহার করে ক্যাশ মেশিনটিতে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়। এই স্টিকে ম্যালওয়্যার ছিল, যা পরবর্তী সময়ে এটিএম মেশিনে ইনস্টল হয়ে যায়। কোনো ব্যাংকের একটি মেশিনে ম্যালওয়্যারটি ইনস্টল হলে ব্যাংকের পুরো এটিএম সিস্টেমটি আক্রান্ত হয়ে পড়ে।

হেসে উঠবেই সম্ভাবনার বাংলাদেশ

গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জির ২০১৩ সাল বিদায় নিয়েছে। আজ শুরু ২০১৪ সাল। উষার দুয়ারে আঘাত হেনে এসেছে রাঙা প্রভাত। স্বাগতম নতুন বছর। এমন দিনে প্রিয় স্বদেশভূমির সবাইকে শুভেচ্ছা। বাঙালির নিজস্ব বর্ষপঞ্জি রয়েছে। বৈশাখের প্রথম দিনে এর শুরু। অনাবিল আনন্দে, প্রাণের আবেগে সব শ্রেণী-পেশা-বয়সের মানুষের প্লাবনে সিক্ত হয় দেশ। সর্বত্র বিরাজ করে উৎসবমুখর পরিবেশ। এ ছাড়াও আছে হিজরি সাল। ইসলাম ধর্মের অনুষ্ঠানগুলো এ পঞ্জিকা অনুসরণ করে পালিত হয়। তবে অফিস-আদালত ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যাবতীয় কাজে অনুসরণ হয় গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জি বা খ্রিস্টীয় পঞ্জিকা। অর্থবছর এ পঞ্জিকা মেনে চলে_ জুলাইয়ে শুরু, জুনে শেষ। দেবে আর নেবে মেলাবে মিলিবে_ এ মন্ত্রে উজ্জীবিত বলেই বাংলাদেশের জনমানসে এ তিনটি পঞ্জিকা কোনো সংঘাত সৃষ্টি করে না। একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে না। পহেলা জানুয়ারি পালনে বাংলা নববর্ষের মতো মানুষের ঢল নামে না ঠিকই, কিন্তু দিনটি যথেষ্ট গুরুত্ব পায় কমবেশি সব মহলেই। বিশেষ করে নানা আয়োজনে দিনটিকে স্মরণীয় করতে উদগ্রীব থাকে অভিজাত শ্রেণী ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য অংশ।
কিন্তু কেমন সূচনা হলো নতুন বছরের? কেমনই-বা কেটেছে বিদায়ী বছরটি? ২০১৩ সালকে স্বাগত জানিয়ে লেখা সম্পাদকীয়তে প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়েছিল_ রাজনৈতিক অঙ্গন যেন অনাবশ্যক উত্তপ্ত না হয়, 'জনজীবন যেন অকারণ বিঘ্ন ও যন্ত্রণায় দগ্ধ না হয়।' কিন্তু প্রত্যাশা ও বাস্তবতার এমন যোজন প্রমাণ ব্যবধান সম্ভবত অতীতে কখনোই দেখা যায়নি। প্রায় পুরো বছরই কেটেছে রাজনৈতিক অস্থিরতায়, অনিশ্চয়তায়। শুভবুদ্ধিকে বারবার গ্রাস করেছে হিংসা ও দ্বেষ। সুবচন নির্বাসনে গিয়েছে_ এমন হতাশাই সর্বত্র। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রধান রাজনৈতিক দল ও জোটের মধ্যে বিভাজন চরমে। কেউ কাউকে বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে রাজি নয়। প্রতিদিন শহর-বন্দর-গ্রামের অনেক স্থান রক্তাক্ত হচ্ছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেমে এসেছে চরম স্থবিরতা। এর অবসান কবে ও কীভাবে ঘটবে, কেউ বলতে পারে না। আমরা নতুন বছরটি শুরু করতে চলেছি প্রধান বিরোধী জোটের অনির্দিষ্টকালের জন্য ডাকা স্থল, নৌ ও রেলপথের উদাত্ত আহ্বানের মধ্য দিয়ে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের অর্জনের তালিকা বেশ দীর্ঘ। এখন আর কেউ আমাদের বাস্কেট কেস বা পরনির্ভর বলে অপবাদ দিতে পারে না। সরকারি ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে বাড়ছে কৃষি-শিল্প-সেবা খাতের উৎপাদন। ফসলের মাঠ দেখে সবার প্রাণে আসে প্রশান্তিস্ন। ফেব্রুয়ারি-মার্চে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চে তারুণ্যের উজ্জীবন আমরা দেখেছি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে পরিচালনার জন্য তাদের সংকল্পকে বিশ্ববাসী তারিফ করেছে। মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তদের বিচার কাজ অনেক দূর এগিয়েছে এবং বিদায়ী বছরেই একজন শীর্ষ অপরাধীর দণ্ড কার্যকর হয়েছে।
এমন দেশে কেন অশান্তি ও অস্থিরতা থাকবে? কেন দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে শুভবুদ্ধির সব হাত সম্মিলিত হবে না? কেন গণমানুষের উদ্যোগে প্রেরণা দেবে না রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক শক্তি? এমন সুন্দর ভোরে আমাদের একটিই প্রত্যাশা_ দূর হোক অশান্তি। শীতের কুয়াশা ভেদ করে ওঠা রাঙা প্রভাত আলোকিত করুক সবার জীবন। সম্ভাবনার বাংলাদেশ হেসে উঠবেই।

রাজনৈতিক বিরোধ ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি by ওয়াহিদ উদ্দীন মাহমুদ

এবারের বছর শুরুতে অর্থনীতি নিয়ে ইতিবাচক ভাবনার সুযোগ খুব নেই, বিশেষত স্বল্প মেয়াদের সম্ভাবনা নিয়ে। দেশের রাজনীতি এখন সম্পূর্ণ অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে অর্থনীতিও। চলমান রাজনৈতিক সংকটের কী করে রাত-দিনে সমাধান হবে। সে সম্বন্ধে বিবদমান দুই পক্ষের নেতৃত্ব যারা দিচ্ছেন তাদেরও কোনো ধারণা আছে বলে মনে হয় না। তাদের তৈরি সংকটের কারণে দেশের অর্থনীতিকে যে কত বড় মূল্য দিতে হতে পারে, সে সম্বন্ধে তাদের তেমন ভাবনা-চিন্তা আছে বলেও দেখা যাচ্ছে না। অর্থনীতির সাময়িক ক্ষয়ক্ষতি তো আছেই। তবে বিগত প্রায় দুই দশকের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারাবাহিকতা কতখানি ঝুঁকির মুখে যাচ্ছে, সেটি এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত প্রায় দুই দশকের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক উন্নয়নের নানা সূচকের বিচারে বাংলাদেশে অভূতপূর্ব অগ্রগতি হয়েছে। ১৯৯০ সাল থেকে বাংলাদেশ বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির হিসাবে উন্নয়নশীল বিশ্বের গড় হারের তুলনায় অনেক এগিয়ে আছে। দারিদ্র্যের হার প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। জনসংখ্যার গড় আয়ু, শিশুমৃত্যুর হার, মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার হার, সক্ষম দম্পতিদের জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণের হার ইত্যাদি সামাজিক উন্নয়নের সূচকে বাংলাদেশ সমপর্যায়ের উন্নয়নশীল অন্যান্য দেশ, এমনকি প্রতিবেশী ভারতকেও অনেক পেছনে ফেলতে সমর্থ হয়েছে।
বাংলাদেশের এ অর্জন বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ একটা কারণে_ বাংলাদেশ শুধু যে একটি মুসলিম প্রধান দেশ তাই নয়, এটি উত্তর আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর ভারতবর্ষ পর্যন্ত বিস্তৃত এমন একটি অঞ্চলের অংশ_ যেখানে রয়েছে মেয়েদের প্রতি বৈষম্যমূলক পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা। এ কারণেই বাংলাদেশের সামাজিক উন্নয়নের সূচকগুলোর এ অগ্রগতিকে একটি 'উন্নয়নের বিস্ময়' বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এর পেছনে কাজ করেছে জনগণের উন্নয়ন সচেতনতা, গোত্র-বর্ণের ভেদাভেদহীন সমাজ এবং সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর নানা কার্যকর কর্মসূচি ও সামাজিক উদ্যোগ। এর মাধ্যমে নানা ধর্মীয় গোঁড়ামিকেও ক্রমান্বয়ে অতিক্রম করা সম্ভব হয়েছে। এখন ধর্মের নতুন করে রাজনীতিকরণ বাংলাদেশের এ নীরব সামাজিক বিপ্লবকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। নব্বইয়ের দশক থেকে যে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এ পর্যন্ত আমরা টিকিয়ে রাখতে পেরেছি_ আর্থসামাজিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে তারও একটা ইতিবাচক প্রভাব নিশ্চয়ই আছে। আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতি আছে, দুর্নীতি, দলীয়করণ ও স্বেচ্ছাচারিতা অর্থনৈতিক সুশাসনকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তা সত্ত্বেও নব্বই-পরবর্তী প্রতিটি সরকারকে মেয়াদান্তে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের সম্মুখীন হতে হয়েছে। দুর্নীতি ও অপশাসনের একটা অলিখিত সীমারেখা অতিক্রম করার কারণে জনগণ প্রতিবার ক্ষমতাসীন সরকারকে প্রত্যাখ্যান করেছে। জনপ্রতিনিধিরা নিজেদের এলাকায় উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে নিজেরা অন্যায় সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন; কিন্তু নির্বাচনকে সামনে রেখে কিছুটা হলেও জনকল্যাণ সাধনের তাগিদ অনুভব করেছেন। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবীদ অমর্ত্য সেনের মতে, 'গণতন্ত্রে দারিদ্র্য নিরসন করা না গেলেও বড় ধরনের খাদ্যাভাব ও দুর্ভিক্ষ হয় না।' বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশে শুধু খাদ্য নিরাপত্তারই উন্নতি হয়নি, দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের মৌসুমি খাদ্যাভাব বা মঙ্গার সমস্যারও অনেকাংশেই নিরসন হয়েছে। নাগরিক সমাজ ও স্বাধীন গণমাধ্যম এ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি করে সরকারকে জবাবদিহি করতে পেরেছে। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সরকারেরও কৃতিত্ব আছে। এর আগের জাতীয় নির্বাচনগুলো ঘিরেও রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল এবং তাতে অর্থনীতি নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে যে আন্দোলন হয় তাতে টানা হরতালের কারণে চট্টগ্রাম বন্দর দুই মাস কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল। তা কাটিয়ে উঠতে পরবর্তী সময় অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল। তবে নানা কারণে এবারের রাজনৈতিক সংকটের জন্য অর্থনৈতিক ক্ষতি আরও অনেক ব্যাপক ও গভীর হওয়ার আশঙ্কা আছে। অতীতের তুলনায় বাংলাদেশের অর্থনীতির আকাশ যেমন বড় হয়েছে, তেমনি বিশ্ববাজারের সঙ্গে সম্পৃক্ততাও অনেক বেড়েছে। বিভিন্ন খাতের উৎপাদনের মধ্যে পরস্পর নির্ভরশীলতাও বেড়েছে। এর ফলে পণ্য উৎপাদন, পরিবহন, বাজারজাতকরণ ও জাহাজীকরণ_ এসব কিছু নিরবচ্ছিন্নভাবে সচল রাখা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এর কোথাও বিঘ্ন ঘটলে একাধিক খাতের ক্ষতির বোঝা পুঞ্জীভূত হয়ে অর্থনীতির ওপর বড় আঘাত আসতে পারে। চলমান সহিংস রাজনৈতিক বিরোধের ফলে তাৎক্ষণিক ক্ষয়ক্ষতি তো আছেই, সেই সঙ্গে আছে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা ও দেশের ভাবমূর্তির প্রশ্ন। লক্ষণীয়, অবরোধ শুরু হওয়ার আগে থেকেই কিন্তু সম্ভাব্য রাজনৈতিক বিরোধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত সূচকগুলোর অবনতি শুরু হয়েছিল। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের হিসাব থেকে দেখা যায়, বৈদেশিক সাহায্যের ব্যবহার। বিদেশি বিনিয়োগ, রেমিট্যান্স প্রবাহ_ সবই নিম্নমুখী। রফতানির প্রবৃদ্ধি এখনও ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও এর ওপর বিলম্বিত প্রভাব পড়বে। দেশের তৈরি পোশাক শিল্প এমনিতেই বিশ্বজুড়ে ভাবমূর্তির সংকটে আছে, তার ওপর আছে শ্রমিক অসন্তোষ। যুক্তরাষ্ট্র সে দেশের বাজারে জিএসপি সুবিধা ফিরে পাওয়ার জন্য শর্ত বেঁধে দিয়েছে। আরও আশঙ্কার বিষয়, ইউরোপীয় ইউনিয়নও আমাদের পোশাক রফতানির শুল্কমুক্ত সুবিধা বাতিলের বিষয়ে বিবেচনা করছে। এ মুহূর্তে আমাদের দরকার শক্তিশালী অর্থনৈতিক কূটনীতি, কিন্তু দেশে শক্ত গণতান্ত্রিক সরকার ছাড়া তা সম্ভব নয়। এবারের সংঘাতময় রাজনৈতিক সংঘাতের আরেকটা বৈশিষ্ট্য হলো_ এটা ঢাকাকেন্দ্রিক না হয়ে ছোট ছোট শহরে ও গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে পড়ছে। এ কারণে প্রত্যন্ত অঞ্চলে উৎপাদনের উপকরণ সরবরাহ ও উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণ দুটোই বিঘি্নত হচ্ছে। গ্রামীণ অর্থনীতির বৈশিষ্ট্য হলো যে, বাজার ব্যবস্থার প্রচলিত কাঠামো দিয়ে এটি তেমন নিয়ন্ত্রিত হয় না, বরং এর ভিত্তিগুলো সামাজিক অনুশাসন ও ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে ব্যক্তিগত আস্থার সম্পর্ক। অর্থনীতির ভাষায় এটা হলো এক ধরনের সামাজিক মূলধন_ যা গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে পড়া সহিংস রাজনৈতিক বিরোধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা হলো, গোত্র-বর্ণ দ্বারা বিভাজিত সমাজে গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। আশঙ্কার বিষয় হলো, আমাদের সমাজের রাজনৈতিক বিভাজন এখন গোত্র-বর্ণের বিরোধের পর্যায়ে গিয়ে পেঁৗছেছে।
গত দুই দশকের আমাদের অভিজ্ঞতা হলো, অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অন্ততপক্ষে একটা চলনসই গণতন্ত্র হলেই চলে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুশাসনের সঙ্গে সম্পর্কিত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবশ্যই ক্রমে আরও শক্তিশালী করতে হবে। তবে সুষ্ঠু প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনের মাধ্যমে জবাবদিহির নূ্যনতম ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই এখন আশু জরুরি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্ষ শুরুতে এটিই এখন জাতির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ, অর্থনীতি ও রাজনীতি দুই ক্ষেত্রেই। হ লেখক
অর্থনীতিবিদ
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা

রাজনৈতিক অপসংস্কৃতিই দায়ী by জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী

২০১৩ সাল শেষ হতে চলেছে। এবং এ বছরটায় দেশে অনেক কিছুই ঘটেছে। কেবল রাজনীতিতেই নয়, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি, কৃষি। এভাবে প্রতিটি ক্ষেত্র ধরে ধরে আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। তবে সাধারণভাবেই আমার যেমনটা মনে হয়েছে, তা হলো_ আমাদের জাতীয় জীবনের জন্য বছরটা খুব একটা ভালো যায়নি। কারণ এ বছরটা ছিল বর্তমান সরকারের মেয়াদকালের শেষ বছর। এ শেষ বছরে এসে একটা প্রশ্নই খুব বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, সামনে যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন_ তা কীভাবে সম্পন্ন হবে? কাদের অধীনে হবে? এ ক্ষেত্রে সরকার দল আওয়ামী লীগ প্রথম থেকেই একটা কথা বলে এসেছে যে, নির্বাচন বর্তমান সরকারের অধীনেই হবে; নির্বাচন কমিশন সবকিছুর দায়িত্বে থাকবে এবং নির্বাচনকালীন সরকার শুধু রুটিন কাজগুলো করবে। সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রায় সব দেশেই নিয়ম হিসেবে আমরা এটাই দেখি যে, সরকার থাকে তবে সরকার কোনো বড় সিদ্ধান্ত নেয় না এবং যাদের অধীনে নির্বাচন হবে, সেই নির্বাচন কমিশন এই সময়ে প্রকৃতপক্ষে নির্বাচন সম্পন্ন করার জন্য সরকারের দায়িত্বটা পালন করে। সরকারের কাজ শুধু নির্বাচন কমিশনকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা। এটাই সরকারের বক্তব্য এবং এ বক্তব্য থেকে সরকার এ পর্যন্ত সরেনি।
অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল বিএনপিও একইভাবে তাদের যে বক্তব্য_ সে বক্তব্যে অনড় আছে। তাদের বক্তব্যটা হলো কোনো দলীয় সরকারের অধীনে নয়, একটি নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে হবে। এই দুই যে পরস্পর বিরোধী বক্তব্য_ এটাই আমাদের রাজনীতিতে গত ছ'মাসের বেশি সময় ধরে মূল বিতর্কের বিষয়। পক্ষে এবং বিপক্ষে নানাজন নানারকমের কথা বলছেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে দেখা গেল যে, শেষ পর্যন্ত জাতিসংঘকে এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে। জাতিসংঘ বিষয়টির মীমাংসায় যথেষ্ট আগ্রহও দেখিয়েছে। জাতিসংঘের পক্ষ থেকে বিশেষ দূত এসে প্রচুর চেষ্টাও করলেন। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তিনি দু'দলকে এক টেবিলে বসালেন। তিনি চলে যাওয়ার সময় পর্যন্ত সে বৈঠক অব্যাহত ছিল এবং তিনি আশা করেছিলেন, বৈঠকের সুফল আমরা পাব। কিন্তু বাস্তবে তেমনটি আর হলো না।
যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের কথাও বলা যায়_ তিনিও অনেকের সঙ্গে বসেছেন, সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছেন। শেষ অবধি তিনিও বলেছেন, এ সমস্যার সমাধান আমাদের কারও হাতে নেই; এ দেশের রাজনৈতিক নেতাদেরই এ সমস্যার সমাধান করতে হবে। কিন্তু কেউ কাউকে ছাড় দিতে চাচ্ছে না। নিকটতম ভবিষ্যতেও ছাড় দেওয়ার কোনো লক্ষণ আমি দেখতে পাচ্ছি না। সুতরাং নির্দিষ্টতারিখ ৫ জানুয়ারি নির্বাচন হবে; সেই পথেই আমরা এগোচ্ছি। ইতিমধ্যে প্রধান বিরোধী দল যেহেতু নির্বাচন বর্জন করেছে; তারা এ নির্বাচনে কোনো প্রার্থী দেয়নি। পরিপ্রেক্ষিতে দেশে অদ্ভুত এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো, যে মোট ৩০০ আসনের মধ্যে দেড় শতাধিক আসনে আওয়ামী লীগ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে গেছে। অথচ সরকার এবং প্রধানমন্ত্রী সবসময় বলে আসছেন, আমরা জনগণের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য কাজ করছি। এটা বলছেন তারা, কিন্তু কার্যত দেখা গেল দেশের অর্ধেক অঞ্চলের ভোটার ভোট দেওয়ার সুযোগই পেল না। যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে তাতেও আমরা দেখতে পাচ্ছি আওয়ামী লীগ একতরফাভাবে নির্বাচিত হবে। দু'দলের এই বিবদমান অবস্থার কারণে দেশের যে ভয়ানক অবস্থা বিরাজ করছে_ দিনের পর দিন হরতাল আর অবরোধে জনজীবন ক্ষতিগ্রস্ত, মানুষ মারা যাচ্ছে; এই দিক থেকে দেখতে গেলে এর থেকে খারাপভাবে কোনো বছর শেষ হয়েছে বলে আমরা দেখিনি। একটা অমীমাংসিত সমস্যা নিয়ে শেষ হচ্ছে বছরটা। এ ছাড়াও কতগুলো ঘটনা ঘটেছে এ বছরে, যার জন্য সরকারের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের জালিয়াতি ধরা পড়েছে। গার্মেন্টে কারখানায় দুর্ঘটনা নতুন কিছু নয়, কিন্তু এ বছর রানা প্লাজার দুর্ঘটনা আগের সব নজিরকে ভেঙে ফেলেছে। এতবড় দুর্ঘটনা এর আগে ঘটেনি। দেশের জন্য তো বটেই, সরকারের জন্যও এ ঘটনা নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বর্তমান এই রাজনৈতিক অস্থিরতা সবচেয়ে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে শিক্ষা ক্ষেত্রে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় সব পর্যায়ে শিক্ষা কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। সব মিলিয়ে আমার শুধু নয়, সবার বিবেচনায়ই বলা যায় এ বছরটা ভালো যায়নি। তবু এত খারাপ সময় পার করেও বলা যাচ্ছে না যে, সুন্দর কিছু ঘটতে যাচ্ছে। রাজনৈতিক বিবাদ যে প্রক্রিয়ায় এগোচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে নাটকীয় কোনো ঘটনা ছাড়া এ অবস্থার আর উন্নয়ন সম্ভব নয়।
আরেকটি বিষয় হচ্ছে, যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয়টি শেষ পর্যন্ত সফলতার মুখ দেখেছে। অনেক দেরিতে হলেও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে। কিন্তু সেই সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে দেশকে মূল্য দিতে হচ্ছে অনেক। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে ভণ্ডুল করতে জামায়াত ভয়ানকভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা সারাদেশে সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি করে চলেছে। জামায়াতের যে ক্ষতি করার ক্ষমতা, দেশের স্বাভাবিকতাকে নষ্ট করার যে ক্ষমতা_ তা খর্ব করার জন্য সত্যিকারের কোনো ভালো প্রচেষ্টা সরকার নিতে পারেনি। বলা হচ্ছে, জামায়াতকে নিষিদ্ধ ঘোষণা কর। নিষিদ্ধ ঘোষণায় বিবেচনাযোগ্য নানা রাজনৈতিক দিক আছে, যা সরকার এখনও করতে পারেনি। কিন্তু দেশের যে ক্ষতি জামায়াত করছে, তাতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতের থাকার কোনো সুযোগ আছে বলে আমি মনে করি না।
অন্যদিকে শাহবাগে দেশের যে তরুণরা দিনের পর দিন আন্দোলন করেছে, যারা এই শাহবাগকে সম্ভব করেছে_ আগামী দিনের নির্বাচন ও জাতীয় কর্মকাণ্ডে তাদের কী ভূমিকা থাকবে? তারা আদৌ কোনো মজবুত ভূমিকা রাখতে পারবে কি-না সে প্রশ্নটাই এখন বাংলাদেশের ভবিষ্যতের বিষয়। শুধু শাহবাগ নয়, বস্তুত দেশের এই তরুণ প্রজন্ম মজবুত ভূমিকা রাখতে শুরু করে তাহলেই বোঝা যাবে যে, দেশের রাজনীতিতে এবং জাতীয় জীবনে নতুন রক্ত সঞ্চারিত হয়েছে, তরুণ প্রজন্ম রাজনীতিতে অংশ নিচ্ছে। অতীত ও বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশের তরুণরা রাজনীতি থেকে তাদের মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। যার প্রভাব আমাদের রাজনীতির ইতিবাচক বিবর্তনকে ব্যাহত করছে। তাই শুধু প্রতিবাদ নয়, তরুণ প্রজন্মের সত্যিকার রাজনীতিমনস্ক হওয়া প্রয়োজন। দেশে মূলত যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি চলছে, তা একটি অপসংস্কৃতি। দেশের সব ক্ষেত্রেই এ অপসংস্কৃতির কুপ্রভাব পড়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। ভরসা করার মতো নতুন রাজনীতিমনস্ক প্রজন্মই আমাদের এ অবস্থা থেকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। যারা এই ভয়ানক দানবীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে ভাঙার চ্যালেঞ্জ নিতে পারে। যারা দেশকে শুধু ভালোই বাসে না, দেশের প্রকৃত উন্নয়নকে অঙ্গীকার করে।

জাতীয় নির্বাচন নিয়ে দ্বন্দ্ব by এম মনিরুজ্জামান মিঞা

কোন প্রক্রিয়ায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত করে সরকারের পরিবর্তন হবে তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দুই প্রধান দল [১] আওয়ামী লীগ ও [২] বিএনপির মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছে। প্রকৃতপক্ষে উভয় দলের মধ্যে এ দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে_ তার কোনো সুরাহা হচ্ছে না। দ্বন্দ্বের ধরন বোঝার জন্য আমাদের কিছুটা পেছনের দিকে তাকাতে হবে। ১৯৯৬ সাল ছিল ওই সময়ে বিএনপি সরকারের শেষ বছর। ওই সময়ে সুযোগ বুঝে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলন আরম্ভ করে, যা ১৯৯৬ সালের শেষাংশে চরমে ওঠে। প্রকৃতপক্ষে বিএনপি সরকারের পাঁচ বছরে ১৭৩ দিন হরতালের শেষ পর্যায়ে সব কিছুই বন্ধ ছিল। বলা চলে দেশ প্রায় অচল ছিল। আন্দোলনকারী আওয়ামী লীগের সঙ্গে আর যারা যুক্ত ছিল তারা হলো জামায়াতে ইসলামী, যাদের সম্প্রতি যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচার করা হয়েছে এবং কারও কারও প্রাণদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আরও যারা এ আন্দোলনে যুক্ত ছিল তারা হলো জাতীয় পার্টি, যে দলের প্রধানকে আন্দোলনকারী দল আওয়ামী লীগ প্রায়ই স্বৈরাচারী বলে অভিহিত করে।
আমাদের রাজনীতির টানাপড়েন কীভাবে ঘটেছে তা বুঝবার জন্য একটু পেছনে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। ১৯৯০ সালে যখন এরশাদ সাহেব রাষ্ট্রক্ষমতায়, তখন তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনও একসঙ্গে আন্দোলন করে। প্রচণ্ড আন্দোলনের ধাক্কায় জেনারেল এরশাদ সরকারের পতন ঘটে। এ পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন ওঠে, কে হবেন রাষ্ট্রপ্রধান। আন্দোলনকারী সংগঠনগুলো তাদের ঐকমত্যের ভিত্তিতে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে নির্বাচন অনুষ্ঠান করার জন্য দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আন্দোলনকারী সব দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে সক্ষম হলেন। নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হলেন খালেদা জিয়া। এ নির্বাচনে জনগণের রায় তার প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ ভালোভাবে মেনে নেয়নি। আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা এমন কথাও উচ্চারণ করলেন যে, তিনি নতুন সরকারকে একদিনের জন্যও শান্ত পরিবেশে কার্য সম্পাদন করতে দেবেন না। তিনি করেছিলেনও তাই। প্রথম থেকেই তিনি বিভিন্ন দাবিদাওয়া উত্থাপন করে সরকারকে সর্বক্ষণ ব্যতিব্যস্ত করে রাখলেন। দাবিদাওয়া শেষ পর্যন্ত দাঁড়াল একটি দাবিতে। আওয়ামী লীগ প্রধান দাবি করলেন, বিএনপি সরকারের কার্যকাল শেষে একটি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যবস্থাপনায় নির্বাচন হতে হবে। আর এর জন্য সাংবিধানিক প্রয়োজন ছিল দুই-তৃতীয়াংশ সংসদ সদস্যের সমর্থন। কিন্তু তা যাতে বিএনপি সরকার না করতে পারে সেজন্য ৩০০ সংসদীয় সদস্যের মধ্যে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্ট ও জামায়াতের সর্বমোট ১৪৯ জন সংসদ সদস্য পদত্যাগ করলেন। বিএনপি সরকার কোনো উপায়ান্তর না দেখে সংসদ অধিবেশন আহ্বান করে বিরোদীদলের চাহিদা মতো তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় বিল সংসদে আনলেন। বিল পাসও হলো। প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তাৎক্ষণিক বঙ্গভবনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার পদত্যাগপত্র দাখিল করলেন এবং রাষ্ট্রপতিকে নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দান ও সরকার গঠনের অনুরোধ জানালেন। সে মোতাবেক এবং বিরোধী দল আওয়ামী লীগের দাবি অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নতুন সরকার গঠিত হলো। এ সময় রাস্তায় দণ্ডায়মান অসংখ্য মানুষ করতালি দিয়ে তার কাজের প্রশংসা জানালেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ বলতে চাইল_ যেহেতু ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছে অতএব এর প্রয়োগ অবৈধ। তবে বিষয়টির ভুল ব্যাখ্যা করা হয়েছে বলে আমরা মনে করি। বিচারপতি খায়রুল হক এ কথা বলেছিলেন যে, ত্রয়োদশ সংশোধনী সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কিন্তু তিনি তা বাতিল করতে বলেননি, বলেছিলেন আগামী দিনের কোনো এক সময়ে বাতিল বলে গণ্য করতে হবে। বরং তিনি বলেছিলেন, দশম ও একাদশ সংসদীয় নির্বাচন ত্রয়োদশ সংশোধনী অনুসারে হতে পারে।
বিচারপতি খায়রুল হক এ রায় দেওয়ার পর ২০১১ সালের ১০ মে একটি পূর্ণাঙ্গ রায় জমা দেন। এর পরবর্তী পর্যায়ে বিচারপতি আর একটি রায় দেন ২০১২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর। উল্লেখ্য, এ বিষয়ে কোনো কোনো বিচারপতি মন্তব্য করেন, বিচারপতি খায়রুল হকের ওই পদে অবস্থানের আর যোগ্যতা নেই, কেননা ওই সময়ে তিনি আর সর্বোচ্চ আদালতের বিচারক ছিলেন না। তাই বিচারক হিসেবে তার শপথও ছিল না। অতএব তার সর্বশেষ রায়ের ভিত্তিতে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে সংবিধান সংশোধন করা সম্পূর্ণভাবে অবৈধ। কিন্তু কে শোনে কার কথা! এই হচ্ছে আমাদের আইনের প্রতি শ্রদ্ধা, যার ভিত্তিতে সংবিধানের মতো পবিত্র দলিলটিও কাটা-ছেঁড়া করা হলো। কিন্তু কেন এমন করা হলো? অনেকের মতে নির্বাচনের সঙ্গে কোনো না কোনো কার্য সম্পাদন করবেন যারা, তাদের মধ্যে অনেকে সরকারি মতাদর্শে দীক্ষিত। ড. কামাল হোসেনের মতো একজন সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি এরূপ মন্তব্য করেছেন। কিন্তু তার ফলাফল কী হতে পারে তা অনুমেয়। সরকারি দলের সঙ্গে বিরোধী দলের মতাদর্শের সংঘর্ষ এখানেই। এর মধ্যে দেখা যাচ্ছে, আগামী ৫ জানুয়ারি নাকি শেখ হাসিনা হবেন নির্বাচনকালীন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু সে নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করবে না। এ কথা ওই পক্ষ দীর্ঘদিন থেকে বলে আসছে। আমরা জানি না, কী আছে এ জাতির ভবিষ্যতে? সবকিছু বিচার-বিবেচনা করে আমাদের সাধারণ জ্ঞানে বুঝি_ কেন বর্তমান সরকার এবং প্রধানমন্ত্রী নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দ্বারা পরিচালিত নির্বাচন চান না তা অনেকটা স্পষ্ট। এদিকে বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়া বারবার নির্বাচন নিয়ে অপর পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করতে চেয়েছেন। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি, যদিও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দোষারোপ করা হয়েছে বিএনপিকে। কিন্তু তা যে হলাহল মিথ্যা তা জানা গেল, যখন জাতিসংঘ প্রেরিত তারানকো কোনো সুরাহা না করতে পেরে ওয়াশিংটন ফিরে গেলেন, তার দিন কয়েকের মধ্যে জাতিসংঘের ঢাকা অফিস থেকে জানানো হয়েছে_ সরকার সংলাপ চায় না বলে জাতিসংঘের উদ্যোগ থেমে গেছে এবং জাতিসংঘ প্রেরিত দূত তারানকো স্বদেশ ফিরে গেছেন, তা ছাড়া আরও বলা হয়েছে, সরকার সংলাপ চায় না বলে জাতিসংঘের উদ্যোগ থেমে গেছে।
এ মুহূর্তে আমরা অনুমান করতে অপারগ কী হতে পারে পরবর্তী পর্যায়ে? 
লেখক
শিক্ষাবিদ
প্রাবন্ধিক

আবার বাংলাওয়াশ by নাজমুল হক নোবেল

নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ শুরু হওয়ার আগে বাতাসে ভাসছিল সেই 'বাংলাওয়াশ' শব্দটি। ব্যাপারটা এমন যে, নিউজিল্যান্ড-বাংলাদেশ ওয়ানডে সিরিজ মানেই যেন বাংলাদেশ জিতবে আর নিউজিল্যান্ড হারবে। অথচ দু'দলের মধ্যে আগে হওয়া ২১টি ওয়ানডের ১৬টিই জিতেছে কিউইরা। তিন বছর আগের '৪-০' ব্যবধানের সুখস্মৃতি অনুপ্রেরণা দিচ্ছিল মুশফিকুর রহিমদের। সে সঙ্গে ছিল টেস্ট সিরিজ ড্র করার তাজা স্মৃতি এবং সবাইকে চমকে দিয়ে আবারও কিউইদের হোয়াইটওয়াশ করে দিল বাংলাদেশ। ২০১০ সালের ফলাফলকে যারা ভাগ্যচক্রের ফের বলে এতদিন হিসাব করতেন, তাদেরও চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। টানা দুটি হোয়াইটওয়াশ তো আর এমনি এমনি হয় না! তবে এবার কাজটা এত সহজ ছিল না। তিন বছর আগের তুলনায় এবার নিউজিল্যান্ড দল ছিল অনেক গোছানো। দুর্দান্ত ফর্মেও ছিল তারা। জানুয়ারিতে দেশের মাটিতে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়েছে। মে-জুনে ইংল্যান্ডে গিয়ে ইংলিশদের হারিয়ে এসেছে। জুনে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে শ্রীলংকাকে হারানোর পর মাত্র ১০ রানে হেরে গিয়েছিল ইংল্যান্ডের কাছে। টেস্টের ফলাফল যাই হোক, ওয়ানডেতে কিন্তু নিউজিল্যান্ড বেশ সমীহ জাগানো দল। বাংলাদেশ দলের সামনে সুখস্মৃতি থাকলেও সিরিজ শুরুর আগের রাতে দলের সেরা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানকে হারিয়ে বেশ বড় একটা ধাক্কা খায় তারা। ২০১০ সালের বাংলাওয়াশে সাকিব ছিলেন নায়ক। মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম্যাচে প্রাথমিক বিপর্যয়ের পরও অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম এবং সাকিব বদলে দলে ঢোকা নাঈম ইসলামের ব্যাটিং নৈপুণ্যে ২৬৫ রান করে তারা। দিবা-রাত্রির এ ম্যাচে কিউইরা ভালোই জবাব দিচ্ছিল; কিন্তু বৃষ্টির পর রুবেল হোসেনের দুর্দান্ত এক স্পেলে গুঁড়িয়ে যায় নিউজিল্যান্ড। বৃষ্টি আইনে ৪৩ রানে হার মানে তারা। আর হ্যাটট্রিকসহ ৬ উইকেট দখল করেন ডানহানি পেসার রুবেল।
দ্বিতীয় ম্যাচে বাংলাদেশের ব্যাটিং খুব একটা ভালো হয়নি। শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে প্রথমে ব্যাট করে তামিম ইকবালের হাফ সেঞ্চুরিতে ২৪৭ রান করে টাইগাররা। তবে মাঝারি মানের এ পুঁজি নিয়েই জ্বলে ওঠেন বোলাররা। আর এতে নেতৃত্ব দেন মাশরাফি ও সোহাগ গাজী। সফরকারীদের ২০৭ রানে গুটিয়ে দিয়ে ৪০ রানে জিতে সিরিজও নিশ্চিত করে ফেলে মুশফিক বাহিনী। ফতুল্লায় শেষ ম্যাচের আগে পেটের মাংসপেশিতে টান পড়ায় বাদ পড়েন দলের আরেক তারকা তামিম ইকবালও। সিরিজের শেষ ম্যাচে কিউইরাও ঘুরে দাঁড়ায় বিপুল বিক্রমে। রস টেলরের সেঞ্চুরি এবং কলিন মনরোর মারকুটে ব্যাটিংয়ে ৩০৭ রান তুলে ফেলে তারা। বাংলাদেশের ওয়ানডে ইতিহাসে এত বড় স্কোর তাড়া করার নজির নেই। আবার বাংলাওয়াশের স্বাদ পেতে হলে যে এ অসম্ভব কর্মটি করতে হবে। এমন দিনে দাঁড়িয়ে গেলেন তামিমের জায়গায় সুযোগ পাওয়া শামসুর রহমান শুভ। তার ৯৬ রানের সঙ্গে নাঈম ও নাসিরের দুর্ধর্ষ ব্যাটিংয়ে ৪ উইকেটে ম্যাচ জিতে টানা দ্বিতীয় হোয়াইটওয়াশের স্বাদ নেন টাইগাররা। ২০১৩ সালের ক্রীড়াক্ষেত্রে অবশ্যই দেশের সবচেয়ে বড় অর্জন এ বাংলাওয়াশ।

ব্রাজিলের প্রত্যাবর্তন by মেহেদী হাসান রোমেল

আন্তর্জাতিক ফুটবলে বছরটা শুরু হয়েছিল আফ্রিকান নেশন্স কাপ দিয়ে। দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত আসরটির ২৯তম সংস্করণে শিরোপা জিতে নেয় আফ্রিকার সুপার ঈগল নাইজেরিয়া; কিন্তু সবচেয়ে বড় টুর্নামেন্টটি মাঠে গড়ায় বছরের মাঝামাঝি সময়ে ব্রাজিলে। ফিফা কনফেডারেশন্স কাপ। ছয় মহাদেশের চ্যাম্পিয়ন, স্বাগতিক দেশ এবং সর্বশেষ বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়নদের নিয়ে মোট আটটি দল অংশ নেয় টুর্নামেন্টটিতে। ১৫ জুন এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন জাপান এবং স্বাগতিক ব্রাজিলের মধ্যকার ম্যাচটি দিয়ে শুরু হয় কনফেডারেশন্স কাপের নবম আসর। ৩০ জুন ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয় ব্রাজিলের বিখ্যাত স্টেডিয়াম মারকানায়। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনের মুখোমুখি হয় পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। বিশ্বকাপের 'ড্রেস রিহার্সেল' আসরটির ফাইনালে লা রোজা'দের ৩-০ গোলে পরাজিত করে শিরোপা জিতে নেয় ব্রাজিল। সমর্থকদের প্রত্যাশা পূরণ করে আসরটির সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার 'গোল্ডেন বল' জিতে নেন নেইমার। প্রতিপক্ষ দলগুলো বুঝে যায়, ২০১৪ বিশ্বকাপ জয়ের জন্য আটঘাট বেঁধেই প্রস্তুতি নিচ্ছে স্বাগতিকরা।
আফ্রিকান নেশন্স কাপ এবং কনফেডারেশন্স কাপ ছাড়া আন্তর্জাতিক ফুটবলে তেমন কোনো বড় টুর্নামেন্ট এ বছর মাঠে গড়ায়নি। তবে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে লড়াই হয়েছে বছরজুড়েই। শেষ পর্যন্ত স্বাগতিক ব্রাজিলকে নিয়েই চূড়ান্ত হয়েছে মোট ৩২ দল। এর মধ্যে নাটকীয়ভাবে চূড়ান্তপর্বে জায়গা করে নেয় ফ্রান্স ও পর্তুগাল। ১৫ নভেম্বর কিয়েভে অনুষ্ঠিত প্লে-অফ ম্যাচের প্রথম লেগে স্বাগতিক ইউক্রেনের বিপক্ষে ২-০ গোলে পরাজিত হয় ফ্রান্স। ২০১৪ বিশ্বকাপের চূড়ান্তপর্বে জায়গা না পাওয়ার শঙ্কাটা ফরাসিদের মনে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে তখন থেকেই। কিন্তু চার দিন পর সেন্ট ডেনিসে ইউক্রেনকে ফিরতি লেগে আতিথ্য দিয়ে তাদের ৩-০ গোলে হারিয়ে দেয় দিদিয়ের দেশামের দল। রচিত হয় ইতিহাস। বাছাইপর্বের প্লে-অফ ম্যাচে ফ্রান্স ছাড়া আজ পর্যন্ত কোনো দলই প্রথম লেগে ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। পর্তুগালকে অবশ্য এতটা কষ্ট করতে হয়নি। এক ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর কাছেই হার মেনে যায় জল্গাতান ইব্রাহিমোভিচের সুইডেন। লিসবনের প্রথম লেগে রোনালদোর দেওয়া গোলেই সুইডিশদের বিপক্ষে ১-০ গোলের জয় পায় স্বাগতিকরা। স্টকহোমের ফিরতি লেগে ইব্রার জোড়া গোলের জবাবে রোনালদো করেন হ্যাটট্রিক। ২-৩ ব্যবধানের জয়ে ২০১৪ বিশ্বকাপের চূড়ান্তপর্বের টিকিট পেয়ে যায় পর্তুগাল।

ক্রিকেটের ফেয়ারওয়েল by জগন্নাথ বিশ্বাস

প্রায় এক যুগ আগের ঘটনা। শচীনের বয়স তখন ২৭। সবে ওয়ানডে ক্রিকেটে বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন। ক্রিকইনফোর আনন্দ বাসু একটা বিশ্লেষণী লেখা লিখেছিলেন। তাতে পরিসংখ্যানের কচকচি তেমন ছিল না। ছিল সময়ের ওপর শচীনের প্রভাব নিয়ে নানা ভঙ্গির আলোচনা। সেখানে শচীনকে 'ব্লাডি ফেনোমেনন' বলেছিলেন মি. বাসু। তখন শব্দটার মানে বোঝা না গেলেও ১৬ নভেম্বর ওয়াংখেড়ের 'ফেয়ারওয়েল' দেখার পর আর কারও বুঝতে বাকি নেই। আসলে অন্য তারকারা যদি ক্রিকেটের 'ফেনোমেনন' হন, শচীন তাহলে নিশ্চিতভাবেই 'ব্লাডি ফেনোমেনন'। ২০১৩ সালটা এহেন অদ্বিতীয় এক শচীন রমেশ টেন্ডুলকারের ফুরিয়ে যাওয়ার বছর। ক্রিকেটে শচীনের অর্জনের দিকে তাকিয়ে অনেকেই বলছেন, 'এক মহান ক্রিকেট সভ্যতার' অবসান। খুব সত্যি কথা। তবে এ লেখা সেই সভ্যতার প্রশস্তিগাথা নয়। এটা ক্রিকেটের প্রতি শচীনের আত্মনিবেদনের গল্প। শুরুটা হয়েছিল ১৯৮৯ সালে। করাচিতে। তারপর কেমন এক সন্মোহন নিয়ে কেটে গেল ২৪ বছর। ওয়াংখেড়েতে যখন শেষ দৃশ্যের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন শচীন, ক্রিকেটভক্তরা বিড়বিড় করছেন ... শচীন ইজ ফরটি, হি উইল প্লে ক্রিকেট নো মোর। বিদায়ের দৃশ্যটাও কী সকরুণ। তিনি একা হেঁটে গেলেন উইকেটের দিকে। শেষবারের মতো। হাতে ব্যাট নেই। মাঠে অপার্থিব নিস্তব্ধতা। উইকেটের ধুলো মাথায় নিলেন। শচীনের ক্রিকেট-প্রণাম সারা হলো। যেন বলতে চাইলেন ... আমারে তুমি অশেষ করেছো এমনই লীলা তব ... তারপর ... ফুরিয়ে গেল ২৪ বছরের যুদ্ধ, প্রেম আর মহানুভবতার গল্প। ফুরিয়ে গেল ক্রিকেটের জীবনতৃষ্ণা। দারুণ লিখেছিলেন রবি শাস্ত্রী_ 'শেষ ধন্যবাদটা তোলা ছিল সেই জায়গাটার জন্য, যা এতদিন ছিল শচীনের আসল ঠিকানা, ওর কর্মভূমি, উপাসনাস্থল, আশ্রয় ও অভয়কানন ওর মন্দির। চবি্বশ বছর ধরে বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন, সবচেয়ে দানবীয়, দুর্বোধ্য আর বিশ্বাসঘাতক পিচও শচীনের আধিপত্যের কাছে নতি স্বীকার করেছে। ক্রিকেটের সেই বাইশ গজকে ছুঁয়ে কুর্নিশ জানিয়ে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে গেল ও। ওর মধ্যে যেন এক ঋষি আর দুর্নিবার যোদ্ধার আদর্শ সহাবস্থান! শচীনের মতো কাউকে আমরা আর কখনও কোনোদিন দেখব না। ক্রিকেটার হিসেবেও না। মানুষ হিসেবেও না। দুর্বল, ভঙ্গুর মানুষদের মাঝে শচীন সত্যিই ঈশ্বরের মতো!'
আজ দিনপঞ্জির পাতা থেকে আলগোছে মুছে যাবে একটা বছর। নতুনের গর্ভে কী লুকিয়ে আছে জানা নেই। ইতিহাস শুধু জানা। যে ইতিহাস সোনার হরফে শচীনের বিদায় লিখে গেল। এ যেন সবুজ ঘাসে, ধূলির লিখন।

রানরেটে স্বপ্নভঙ্গ বাংলাদেশের

২৫ রানে ১ উইকেট নেন আবু হায়দার রনি; কিন্তু অনূর্ধ্ব-১৯ এশিয়া কাপে শ্রীলংকার বিপক্ষে জিততে পারেনি বাংলাদেশ
সব মঞ্চই প্রস্তুত ছিল। প্রথম দুই ম্যাচ জিতে এগিয়েও গিয়েছিলেন বাংলাদেশের যুবারা। যে শ্রীলংকার জন্য এই ম্যাচটা ছিল বাঁচামরার, তারাও চ্যালেঞ্জটা জিতল। বাংলাদেশ হারল ২ উইকেটে। হারলেও তেমন ক্ষতি হতো না। কিন্তু ক্ষতি করে দিল উপর্যুপরি পর্যুদস্ত মালয়েশিয়া! বাংলাদেশ-শ্রীলংকা ম্যাচের ফলাফল এসেছে লংকান ইনিংসের ১১ বল বাকি থাকতে। কিন্তু আফগানিস্তান-মালয়েশিয়া ম্যাচটা শেষ হয়েছে ২৬.৪ ওভারে। এর মধ্যে আফগানরা ৩.২ ওভারেই ৪১ রানের লক্ষ্যে পেঁৗছে মালয়েশিয়ানদের হারিয়ে দিয়েছে ১০ উইকেটে। বাংলাদেশের তাতেই স্বপ্নভঙ্গ! রানরেটে কাটা পড়ে এশিয়া কাপ অনূর্ধ্ব-১৯ টুর্নামেন্ট থেকে দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাদ পড়ে গেল প্রথম দুই ম্যাচে গ্রুপ-শীর্ষে থাকা বাংলাদেশ! গতকাল আবুধাবিতে টসে জিতে ব্যাট করে বাংলাদেশ ৬ উইকেটে ২০৩ রান তোলে। সর্বোচ্চ ৬২ (৮৮ বলে) রান করেন পাঁচ নম্বরে নামা নাজমুল হোসেন। চারে নামা মোসাদ্দেক হোসেন (৩২) ও ছয়ে নামা ইয়াসির আলী (৩৩) তাকে যোগ্য সাহচর্য দিলে বাংলাদেশ দুইশ'র ঘর অতিক্রম করে। শ্রীলংকার পক্ষে সেরা বোলিং সাফল্য রমেশ মেন্ডিসের (২২/২)। জবাবে শ্রীলংকা তিন নম্বর ব্যাটসম্যান কুশল মেন্ডিসের পুরোপুরি ১০০ রানের সেঞ্চুরি ও প্রিয়মল পেরেরার অপরাজিত ৬২ রানের সুবাদে ১১ বল বাকি থাকতেই ৮ হারিয়েও লক্ষ্যে পেঁৗছে যায়। বাংলাদেশের পক্ষে বোলিংয়ে সেরা সাফল্য নাহিদুজ্জামানের (২৭/২)। এই গ্রুপ থেকে শ্রীলংকা-আফগানিস্তান-বাংলাদেশের তিন ম্যাচে দুটি করে জয় হলেও (+১.০৭৩) রানরেটে বাংলাদেশ হয় তৃতীয়। শ্রীলংকা (+১.৭২২) ও আফগানিস্তান (+১.১৬১) সেমিতে পেঁৗছেছে। অন্য গ্রুপ থেকে তিন ম্যাচ জিতে পাকিস্তান ও দুই ম্যাচ জিতে ভারত পেঁৗছেছে সেমিতে। গতকাল পাকিস্তান (২৫৩/৮) চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতকে (২৫০/৭) ৩ বল থাকতে ২ উইকেটে পরাজিত করে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়।

দু'বন্ধুর লড়াইয়ে সাকিবের জয়

বিজয় দিবস টি২০ টুর্নামেন্টে বিজয়ের হাসি সাকিব-রুবেলদের।গতকাল ফাইনালে ইউসিবি-বিসিবি
একাদশকে হারিয়ে শিরোপা জয়ের পর ট্রফি নিয়ে প্রাইম ব্যাংকের ক্রিকেটারদের উল্লাস বিসিবি
সোহাগ গাজী নিজের বলে ফিরতি ক্যাচ নিয়ে সতীর্থদের সঙ্গে উল্লাসে মাতলেও উইকেটে ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলেন তামিম ইকবাল। শেষ পর্যন্ত আম্পায়ারের কথায় অতি কষ্টে ড্রেসিংরুমের দিকে রওনা হন। শুরুতেই তামিমকে এভাবে হারিয়ে মানসিকভাবে পিছিয়ে পড়া ইউসিবি-বিসিবি একাদশ আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। প্রাইম ব্যাংকের ১৭৪ রান তাড়া করতে নেমে ১১৯ রানে থেমে যেতে হয় তাদের। ৫৫ রানে ফাইনাল জিতে প্রথম বিজয় দিবস টি২০ ট্রফি নিজেদের ঘরে তুলেছে সাকিব আল হাসানের প্রাইম ব্যাংক। দুই বন্ধুর ফাইনালটা যতটা উত্তেজনা ছড়িয়ে ছিল, ততটা কিন্তু জমেনি। শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে উপস্থিত হাজারপাঁচেক দশর্ককে তাই অনেকটাই একপেশে ফাইনাল উপভোগ করতে হয়। তবে দ্বিতীয় ওভারে তামিম আউট হওয়ার পরও অবশ্য ভালোই জবাব দিচ্ছিলেন রনি তালুকদার ও ইমরুল কায়েস; কিন্তু চমৎকার খেলতে থাকা ওপেনার রনি পেসার রুবেলের বলে সৈকতের হাতে ক্যাচ দিয়ে বসেন। ইমরুল কায়েসকে ফেরান স্পিনার তাইজুল। লং-অফে প্রায় কুড়ি গজে দৌড়ে দুর্দান্ত ক্যাচটি লুফে নেন রুবেল। পরপর দুটি উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে যায় ইউসিবি-বিসিবি। গতকাল বোলিংও বেশ ভালো করেছেন রুবেল হোসেন। চার ওভারে ১৯ রান দিয়ে একটি উইকেট দখল করেন। এজন্য ম্যাচসেরার পুরস্কারও পেয়েছেন তিনি। তবে শুরুতে নিজের বিতর্কিত আউট নিয়ে বেশ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যাক্ত করেন তামিম ইকবাল। মাঠ থেকে ড্রেসিংরুমে গিয়ে আউট নিয়ে উচ্চবাচ্য করায় খেলা শেষে শুনানিতে তাকে দশ হাজার টাকা জরিমানাও করা হয়। তবু আউট নিয়ে অভিযোগ করলেন তামিম। ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, 'যে সিদ্ধান্ত আমার বিপক্ষে দেওয়া হয়েছে, সেটা জীবনে কোনো দিন দেখিওনি, শুনিওনি। ভবিষ্যতে শুনব বলেও মনে হয় না। সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ আমার ওপর দল অনেকটা নির্ভর করে থাকে। আমি যদি একটা ভালো শুরু করে দিতে পারতাম, তাহলে ১৭৫ তাড়া করা সম্ভব ছিল। ওই জায়গায় ছন্দ নষ্ট হয়েছে।'
টসে জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রাইম ব্যাংক গতকালও চমৎকার সূচনা করে। দুই ওপেনার এনামুল ও লিটন ৫৯ রান তুলে নেন। ফাইনালে তেমন কিছু করতে না পারলেও ২৯৮ রান করে টুর্নামেন্ট সেরার পুরস্কার পান এনামুল হক বিজয়। লিটন কুমার দাস গতকাল ৩৩ বলে হাফ সেঞ্চুরিতে পেঁৗছার পর ৬২ রানে আউট হন। শেষদিকে অলক কাপালি ৭ বলে ১৮ রান করে দলকে লড়াই করার মতো পুঁজি এনে দেন।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
প্রাইম ব্যাংক : ২০ ওভারে ১৭৪/৬ (লিটন ৬২, এনামুল ২৭, সাবি্বর ২৫, কাপালি ১৮, সাকিব ১৪; আল-আমিন ৩/৩১, মুক্তার ২/৩১, আরাফাত সানি ১/৩৪)। ইউসিবি-বিসিবি : ২০ ওভারে ১১৯/৮ (রনি ৩২, ইমরুল ২৩, মার্শাল ২১*, মিঠুন ১০; তাইজুল ২/২১, রুবেল ১/১৯, সাকিব ১/২৭, সোহাগ ১/২৯)। ফল : প্রাইম ব্যাংক ৫৫ রানে জয়ী। ফাইনালসেরা : রুবেল হোসেন। টুর্নামেন্টসেরা : এনামুল হক বিজয়।

আলোচিত দুই জাগরণ by কাজী সুমন

বিদায়ী বছরে দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল দুই জাগরণ। একটি গণজাগরণ অন্যটি হেফাজতে ইসলাম। সম্পূর্ণ ভিন্ন চেতনা থেকে দু’টি জাগরণ নতুন শক্তি হিসেবে আলোচনায় এসছিল দুনিয়া জুড়ে।
রাজধানীর শাহবাগ ও বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু মতিঝিলের শাপলা চত্বরে জনতার বিস্ফোরণ ঘটেছিল পৃথক দু’টি সময়ে। গণজাগরণ মঞ্চের জন্ম হয়েছিল জামায়াত নেতা আবদুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন রায়কে ঘিরে। অন্যদিকে ঈমান ও আকিদা রক্ষায় ১৩ দফার আল্টিমেটাম দিয়ে সরকারের ভীত নাড়িয়ে দিয়েছিল হেফাজত। গণজাগরণের মঞ্চের সূচনা হয়েছিল ৫ই ফেব্রুয়ারি। হেফাজতে ইসলামের আবির্ভাব ৬ই এপ্রিল। সংঘাতপ্রবণ বাংলাদেশের মূল ধারার রাজনীতিকে ধাক্কা দিয়েছিল এই দুই জাগরণ।

হেফাজতের ঝড়তোলা আবির্ভাব
৬ই এপ্রিল বাংলাদেশে আবির্ভাব ঘটেছিল এক নতুন শক্তির। বিরোধে-বিবাদে, দ্বন্দ্ব-সংঘাতে-সহিংসতায় সংক্ষুব্ধ রাজনীতির আকাশে উদিত হওয়া এ শক্তির নাম হেফাজতে ইসলাম। পরে স্মরণকালের বৃহত্তম গণসমাবেশ, লংমার্চ, সাংগঠনিক শক্তি দেখিয়ে তারা সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিল সরকারের প্রতি। ১৩ দফা দাবিতে আলটিমেটাম দিয়ে ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল সরকারের। তবে হেফাজতের সমাবেশকে ঘিরে ৫ই মে বাংলাদেশের ইতিহাসে রচিত হয় এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। দশ সহস্রাধিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ক্র্যাকডাউন শাপলা অভিযান পরিচালনা করে। হেফাজতে ইসলামের কর্মসূচি লাইভ সমপ্রচার করায় সরকার বন্ধ করে দেয় দিগন্ত ও ইসলামি টেলিভিশন। হেফাজতে ইসলামের আবির্ভাব বছর তিনেক আগে। ২০১০ সালের জানুয়ারি মাসে প্রতিষ্ঠিত হয় এই সংগঠনটির। এর প্রধান করা হয় আধ্যাত্মিক ধর্মীয় নেতা ও হাটহাজারী মাদ্‌রাসার পরিচালক আল্লামা শাহ্‌ আহমদ শফীকে। তখন সংবিধানে ‘আল্লাহ্‌র ওপর আস্থা ও বিশ্বাস’ বাদ দেয়ায় এবং নারী-নীতি ঘোষণার প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছিল তারা। মাঝে-মধ্যে চট্টগ্রাম, বিচ্ছিন্নভাবে ঢাকায় সমাবেশ করেছে। পুলিশ পাহারায় আন্দোলন করে আসা শাহবাগ চত্বরের গণজাগরণ মঞ্চের ব্লগারদের নাস্তিক আখ্যা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয় ৯ই মার্চ। ওইদিন তারা বক্তৃতা-বিবৃতি ও দাবি-দাওয়া জানিয়েছিল। কিন্তু সরকারের কার্যক্রমে হতাশ হয় সংগঠনটি। পরে ৬ই এপ্রিল রাজধানীর শাপলা চত্বরে মহাসমাবেশের করার ডাক দেন আল্লামা আহমদ শফী। সরকারের নানা বাধা সত্ত্বেও ৬ই এপ্রিল বাংলাদেশের ইতিহাসে বৃহত্তম সমাবেশ ঘটিয়ে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করে হেফাজতে ইসলাম। সমাবেশ শুরুর আগেই দক্ষিণে টিকাটুলি মোড়, উত্তরে ফকিরেরপুল বাজার, পূর্বে কমলাপুর বাজার, পশ্চিমে, দৈনিকবাংলা মোড়, পল্টন মোড় উপচিয়ে প্রেস ক্লাব পর্যন্ত লোকারণ্য হয়ে যায়। রাজধানীর চতুর্দিক থেকে পায়ে হেঁটে লাখ লাখ মানুষ সমাবেশে অংশ নেন। কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র শাপলা চত্বরের চারদিকের এলাকা। ওই সমাবেশে সরকারকে ১৩ দফা বাস্তবায়নের এক মাসের আলটিমেটাম দেন আল্লামা আহমদ শফী। নানা কর্মসূচির পাশাপাশি ৫ই মে ঢাকা ঘেরাও কর্মসূচি ঘোষণা দেন তিনি। ওইদিন হেফাজতের মঞ্চে গিয়ে তাদের সমর্থন জানায় বিএনপি ও জাতীয় পার্টি। এরপর ৫ই মে হেফাজতে ইসলাম ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি এবং ঢাকার মতিঝিলে তাদের দ্বিতীয় সমাবেশের আয়োজন করে। হেফাজতের ঘোরও কর্মসূচি ঠেকাতে দু’দিন আগে থেকেই সরকার দূরপাল্লার বাস, ট্রেন ও লঞ্চ বন্ধ করে দেয়। কিন্তু সরকারের সব বাধা উপেক্ষা করে জনতার স্রোত ধেয়ে আসে ঢাকা অভিমুখে। পরে বাধ্য হয়ে হেফাজতকে অনুমতি দেয় সরকার। বিকালে শাপলা চত্বরে মহাসমাবেশ করে সংগঠনটি। সমাবেশে সংগঠনটির আমীর আল্লামা আহমদ শফীকে আসতে না দেয়ায় রাতে শাপলা চত্বরে রাতে অবস্থান করে হেফাজতের কর্মীরা। সন্ধ্যায় হেফাজত কর্মীদের পাশে থাকতে দলের নেতাকর্মীদের নির্দেশ দেন বেগম খালেদা জিয়া। বিকাল থেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে হেফাজতে ইসলামের কর্মীদের তুমুল সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় বায়তুল মোকাররম, পুরানা পল্টন, শান্তিনগর, কাকরাইল  ও  নয়াপল্টন এলাকা। এ সময় ওই এলাকায় বহু প্রতিষ্ঠান ও ফুটপাতের দোকানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। গভীর রাতে হেফাজতের কর্মীদের মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা থেকে সরানোর উদ্দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১০ হাজার সদস্য অভিযান চালান। রাত আড়াইটার দিকে উচ্ছেদ অভিযান শুরু করেন তারা। যৌথবাহিনীর ওই অভিযানে হেফাজতকর্মী, পুলিশ, বিজিবি সদস্যসহ বহু হতাহতের ঘটনা ঘটে। এছাড়া সাংবাদিকসহ আরও অনেকে আহত হন। পরদিন দুপুরে লালবাগের মাদ্‌রাসায় আশ্রয় নেয়া আল্লামা শফীকে হেলিকপ্টারযোগে চট্টগ্রামে পাঠানো হয়। হেফাজতে ইসলাম এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করে, শাপলা চত্বরে তাদের হাজার হাজার কর্মী শহীদ হয়েছেন। ৬ই মে রাতে হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরীকে রাজধানী থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওইদিন বিএনপি নয়াপল্টনে গায়েবানা জানাজা কর্মসূচি পালন করে। ৮ই মে সংবাদ সম্মেলন করে ডিএমপি থেকে দাবি করা হয়, শাপলা অভিযানে ১১ জন নিহত  হয়। বছরের মাঝামাঝিতে চট্টগ্রামের এক ওয়াজ মাহফিলের বক্তৃতায় নারীদের তেঁতুলের সঙ্গে তুলনা করে ব্যাপক সমালোচিত হন শাহ্‌ আহমদ শফী। তবে তার পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে, তার বক্তব্য বিকৃত করা হয়েছে। শেষদিকে ২৪শে ডিসেম্বর ফের শাপলা চত্বরে সমাবেশ করার ঘোষণা দেয় হেফাজত। তবে সরকারের বাধায় সমাবেশ স্থগিত করে সংগঠনটি।
ঢেউ তোলা এক গণজাগরণ
বিদায়ী বছরের অন্যতম আলোচিত ঘটনা ছিল গণজাগরণ মঞ্চ। ৫ই ফেব্রুয়ারি সৃষ্টি হওয়া এই মঞ্চ বছরের শেষদিন পর্যন্ত ছিল আলোচনায়। তাদের আন্দোলনের সূত্র ধরে শেষ পর্যন্ত ফাঁসিতে ঝুলতে হয় জামায়াত নেতা আবদুল কাদের মোল্লাকে। অন্যদিকে গণজাগরণ মঞ্চের কারণেই ধূমকেতুর মতো আবির্ভাব ঘটে হেফাজতে ইসলামের। এই মঞ্চ বন্ধের দাবিতে দেশব্যাপী পাল্টা জাগরণ সৃষ্টি করে এই অরাজনৈতিক সংগঠনটিও। গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৩ জন। দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হয়েছেন বেশ কয়েকজন কর্মী। ৫টি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের ভরাডুবির অন্যতম কারণ ছিল ওই গণজাগরণ মঞ্চ। গণজাগরণ মঞ্চের স্লোগানকন্যা লাকীকে নিয়ে গল্প লিখে বিতর্কিত হন কথাশিল্পী হাসনাত আবদুল হাই। প্রথমদিকে গণজাগরণ মঞ্চকে স্বাগত জানালেও দ্রুততম সময়ে অবস্থান পাল্টে ফেলে বিরোধী দল। সারা বছর পুলিশি পাহারায় আন্দোলনরত গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীরা শেষ দিকে পাকিস্তানের দূতাবাস ঘেরাও করতে গিয়ে পিটুনির শিকার হন ওই পুলিশেরই। গত ৫ই ফেব্রুয়ারি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ঘোষণা করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বিকালেই রাজধানীর শাহবাগ চত্বরে ব্লগার অ্যান্ড অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নেটওয়ার্ক নামের একটি সংগঠনের ব্যানারে ১৫-২০ জন যুবক তার ফাঁসির দাবিতে বিক্ষোভ শুধু করে। সন্ধ্যা গড়াতেই ১৫-২০ জনের ছোট্ট বিক্ষোভের পরিসর বড় হয়ে যায়। বিক্ষোভে যোগ দেয় শ’ শ’ তরুণ। ব্যারিকেড দিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয় শাহবাগের যান চলাচল। কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে রাতভর অবস্থান করেন তরুণরা। যুদ্ধাপরাধীসহ জামায়াত-শিবিরের নামে নানা স্লোগান তৈরি করা হয়। স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে উঠে শাহবাগ চত্বর। পরদিন ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই শাহবাগ চত্বরে জড়ো হতে থাকেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বুকে ধারণ করা শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণী, ছাত্রছাত্রী থেকে শুরু করে সব শ্রেণী- পেশার মানুষ। ওই দিন বিভিন্ন বাম রাজনৈতিক সংগঠন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করে। তবে ৬ই ফেব্রুয়ারি গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করতে গিয়ে তোপের মুখে পড়েন সংসদের উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী ও সাবেক বন ও পরিবেশ মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশ নেয়ায় ওই দিনে রাতেই আন্দোলনের নেতৃত্ব নিজেদের হাতে নেয় ছাত্রলীগ নেতারা। নেপথ্যে আন্দোলনের নেতৃত্ব ছাত্রলীগের হাতে থাকলেও গণজাগরণ মঞ্চের আহ্বায়ক করা হয় ডা. ইমরান এইচ সরকারকে। ৭ই ফেব্রুয়ারি গণজারণ মঞ্চের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করতে গেলে আওয়ামী লীগ নেতা মাহবুবুল আলম হানিফকে লক্ষ্য করে বোতল নিক্ষেপ করে জনতা। ওই দিনই মহাসমাবেশ করার ঘোষণা দেয়া হয়। ৮ই ফেব্রুয়ারি মহাসমাবেশে লাখো মানুষকে শপথ পড়ান গণজাগরণ মঞ্চের আহ্বায়ক ইমরান এইচ সরকার। ওই দিনই কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে গণস্বাক্ষর অভিযান শুরু করে আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কমান্ড নামের একটি সংগঠন। ৯ই ফেব্রুয়ারি ইমরান এইচ সরকার ঘোষণা দেন, আন্দোলন কর্মসূচি ১৪ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে। আন্দোলনকারীদের দাবির প্রেক্ষিতে ওই দিনই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের আপিল সংক্রান্ত একটি ধারার সংশোধনের উদ্যোগ নেয় সরকার। ১০ই ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ঘেরাও করার ঘোষণা দেয় আন্দোলনকারীরা। ১১ই ফেব্রুয়ারি আন্দোলনের ৭ম দিন অভিনব কর্মসূচি ঘোষণা দেন ইমরান এইচ সরকার। তিনি বলেন, ১২ই ফেব্রুয়ারি বিকাল ৪টা থেকে তিন মিনিট স্তব্ধ থাকবে পুরো দেশ। যে যার স্থানে তিন মিনিটের জন্য দাঁড়িয়ে থাকবে। ওই দিন রাতে স্লোগানকন্যা লাকিকে মারধর করে ছাত্রলীগ নেতারা। ১৪ই ফেব্রুয়ারি আন্দোলনের দশম দিনে মোমবাতি প্রজ্বলন কর্মসূচিতে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও। সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী তার সরকারি বাসভবন গণভবনে এই কর্মসূচিতে অংশ নেন। ১৫ই ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পল্লবীর নিজ বাসার সামনে খুন হন গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী ব্লগার রাজীব হোসেন। ওই দিন আন্দোলন কর্মসূচি বিকাল ৩টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। কিন্তু রাতে ব্লগার রাজীব খুন হওয়ার পর ফের লাগাতার আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ১৬ই ফেব্রুয়ারি আন্দোলনের ১১তম দিনে নিহত ব্লগার রাজীবের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। ১৮ই ফেব্রুয়ারি বিকালে শাহবাগ গণজাগরণ চত্বরে সংহতি প্রকাশ করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন ব্লগার ও কার্টুনিস্ট তরিকুল ইসলাম শান্ত। ২১শে ফেব্রুয়ারি শাহবাগ চত্বরে মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে টানা ৩৩ দিনের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। ১লা মার্চ থেকে ২০শে মার্চ পর্যন্ত প্রতিটি বিভাগে গণজাগরণ মঞ্চের পক্ষ থেকে সংহতি সমাবেশ করার ঘোষণা দেয়া হয়। ২৩শে ফেব্রুয়ারি রাজধানীর রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে বেলা তিনটায় সমাবেশ ও শপথ অনুষ্ঠিত হয়। ১লা মার্চ শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরসহ দেশের সব গণজাগরণ মঞ্চে বেলা তিনটা থেকে প্রতিবাদী গান পরিবেশন করা হয়। ৩রা মার্চ পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ৫ই মার্চ যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তায় বেলা তিনটায় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ৬ই মার্চ নারায়ণগঞ্জে গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠক  রফিউর রাব্বির ছেলে তানভীর মোহাম্মদ ত্বকীকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ৭ই মার্চ রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের শিখা চিরন্তনে শ্রদ্ধা নিবেদন, সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ৮ই মার্চ শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরের নারী জাগরণ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ১৩ই মার্চ চট্টগ্রামে সমাবেশ করার জন্য রওনা হলে গণজাগরণ মঞ্চের গাড়িবহর ফেনী থেকে ফিরিয়ে দেয় পুলিশ। ৫ই এপ্রিল শাপলা চত্বরে সমাবেশ শেষে ফেরার পথে হেফাজতে ইসলামের কর্মীরা গণজাগরণ মঞ্চ ভাঙার চেষ্টা করে। এসময় গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীদের সঙ্গে হেফাজতে ইসলামের কর্মীদের সংঘর্ষ হয়। ৬ই মে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালিয়ে শাপলা চত্বরে অবস্থানরত হেফাজতে ইসলামের কর্মীদের হটিয়ে দেয়। একই সঙ্গে ভোররাতে গণজারণ মঞ্চও ভেঙে দেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। ব্যারিকেড তুলে দিয়ে শাহবাগ চত্বরের যান চলাচলও স্বাভাবিক করা হয়। এর সঙ্গে সঙ্গে টানা তিন মাস ধরে পুলিশ পাহারায় শাহবাগ চত্বরে অবস্থান করা গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের অবসান ঘটে। কিন্তু পরবর্তীতে মানবতা বিরোধী অপরাধে জামায়াতের নেতাদের মামলার রায়ের দিনগুলোতে অবস্থান করে গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীরা। ১৭ই সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় দেয়। সর্বশেষ ৯ই ডিসেম্বর বিকাল থেকে জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার মৃত্যু পরোয়ানা জারি হলে ফের শাহবাগ চত্বরে অবস্থান করে গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীরা। ১২ই ডিসেম্বর কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকরের রাতে আনন্দ উল্লাস ও মিষ্টি বিতরণের মধ্য দিয়ে শেষ হয় শাহবাগে তাদের অবস্থান কর্মসূচি।