Saturday, November 23, 2024

'সৈন্যের বিনিময়ে উত্তর কোরিয়াকে ক্ষেপণাস্ত্র পাঠিয়েছে রাশিয়া'

দক্ষিণ কোরিয়ার একজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তার মতে, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সমর্থন দেয়ার জন্য সৈন্য পাঠানোর বিনিময়ে রাশিয়া উত্তর কোরিয়াকে এন্টি-এয়ার মিসাইল এবং বিমান প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে। রাশিয়ায় আনুমানিক ১০ হাজার সৈন্য পাঠানোর মাধ্যমে উত্তরের কী লাভ হবে জানতে চাইলে দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিন ওন-সিক বলেন, মস্কো পিয়ংইয়ংকে অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রযুক্তি সহায়তা দিয়েছে। শুক্রবার প্রচারিত একটি সাক্ষাত্কারে দক্ষিণ কোরিয়ার সম্প্রচারকারী এসবিএসকে শিন বলেছেন, ‘এটা পরিষ্কার যে উত্তর কোরিয়ার  দুর্বল বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম এবং বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করা হয়েছে।’

রাজধানী পিয়ংইয়ং-এ একটি সামরিক প্রদর্শনীতে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন শুক্রবার ‘অতি-আধুনিক’ অস্ত্রশস্ত্রের  বিকাশ ও মানোন্নয়ন করার আহ্বান জানিয়েছেন এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন

রাশিয়া এই মাসে উত্তর কোরিয়ার সাথে একটি যুগান্তকারী পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি অনুমোদন করেছে।  ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন  তার প্রেক্ষিতে পিয়ংইয়ংয়ের সৈন্যরা  সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে লড়ছে।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের রাষ্ট্রীয় সফরের সময় জুনে পিয়ংইয়ংয়ে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এটি উভয় রাষ্ট্রকে অন্যের উপর আক্রমণের ক্ষেত্রে ‘বিলম্ব না করে’ সামরিক সহায়তা প্রদান করতে এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করতে আন্তর্জাতিকভাবে সহযোগিতা করতে বাধ্য করে। দক্ষিণ কোরিয়ার ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস এই সপ্তাহে আইনপ্রণেতাদের বলেছে যে রাশিয়ায় মোতায়েন করা সৈন্যদের একটি বায়ুবাহিত ব্রিগেড এবং স্থলভাগে মেরিন কর্পসে নিয়োগ করা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে, কিছু সৈন্য ইতিমধ্যেই যুদ্ধে প্রবেশ করেছে, ইয়োনহাপ বার্তা সংস্থা এখবর জানিয়েছে।

গোয়েন্দা সংস্থাটি সম্প্রতি আরও বলেছে যে, উত্তর কোরিয়া তার ক্ষয়প্রাপ্ত অস্ত্রের মজুদ পূরণ করতে ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে রাশিয়ায় ১৩,০০০ এরও বেশি কামান, ক্ষেপণাস্ত্র এবং অন্যান্য প্রচলিত অস্ত্র পাঠিয়েছে। সৈন্য পাঠানোর মাধ্যমে, উত্তর কোরিয়া রাশিয়ার যুদ্ধ অর্থনীতির মধ্যে অস্ত্র, সামরিক সহায়তা এবং শ্রম সরবরাহকারী হিসাবে অবস্থান করছে – সম্ভাব্যভাবে তার ঐতিহ্যবাহী মিত্র, প্রতিবেশী এবং প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার চীনকে বাইপাস করে । বিশ্লেষকদের মতে , রাশিয়া উত্তর কোরিয়াকে তার বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদ যেমন তেল ও গ্যাস সরবরাহ করতে পারে। উত্তর কোরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী চো সন হুই সম্প্রতি মস্কো সফর করেছেন এবং বলেছেন তার দেশ ‘বিজয় দিবস পর্যন্ত  রাশিয়ান কমরেডদের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াবে’। উত্তর কোরিয়া গত মাসে বলেছিল যে, রাশিয়ায় যে কোনও সেনা মোতায়েন করা  আন্তর্জাতিক আইনের  বিধানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু তারা যে সৈন্য পাঠিয়েছে তা নিশ্চিত করেনি।

সূত্র : আলজাজিরা

mzamin

‘আমরা জমিদার নই, মানুষের পাহারাদার’ by সেবন্তী ভট্টাচার্য্য

ছয় কেন্দ্রে বিধানসভার উপনির্বাচনের ফল দেখে উচ্ছ্বসিত পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছটি বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে বিরোধীদের দুরমুশ করে ছটিতেই জিতেছেন ঘাসফুল শিবিরের প্রার্থীরা। পাঁচ জেলার  ছ’টি আসনে উপনির্বাচন হয়েছে গত ১৩ নভেম্বর। কোচবিহারের সিতাই, আলিপুরদুয়ারের মাদারিহাট, পশ্চিম মেদিনীপুরের মেদিনীপুর, বাঁকুড়ার তালড্যাংরা এবং উত্তর ২৪ পরগনার হাড়োয়া ও নৈহাটিতে শনিবার সকাল থেকে শুরু হয় ভোটগণনা। ফলপ্রকাশের পর সোশাল মিডিয়া পোস্টে জয়ীদের শুভেচ্ছা জানালেন দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। উপনির্বাচনের ফল নিয়ে সমাজমাধ্যমের পোস্টে মমতা লিখেছেন, ‘‘আমার অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে মা-মাটি-মানুষকে জানাই প্রণাম।  আমরা জমিদার নই। মানুষের পাহারাদার। মানুষের আশিস আজীবন আমাদের হৃদয় স্পর্শ করে থাকবে।’’ তৃণমূলের এই ফলাফল অবশ্য প্রত্যাশিত ছিল। চিন্তা ছিল একমাত্র বিজেপির দখলে থাকা মাদারিহাট নিয়ে। শনিবার সকালে ভোটগণনার শুরু হয়। বেলা যত গড়িয়েছে, ততই ঘাসফুল শিবিরের জয়ের রাস্তা মসৃণ হয়েছে।  মাদারিহাটের গেরুয়া গড়ও  হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়েছে ঘাসফুলের দাপটের কাছে।  এদিকে এ বারের উপনির্বাচনে ঘোষিত বা অঘোষিত কোনও প্রকার জোট হয়নি বাম-কংগ্রেসের। উভয় দলই আলাদা আলাদা ভাবে প্রার্থী দিয়েছিল। কিন্তু একক ভাবে লড়েও ভোটের ময়দানে খুব একটা লাভ হলো না।  সর্বত্রই জামানত জব্দ হয়েছে বাম ও কংগ্রেসের। ভোটের যা ফলাফল, তাতে রাজ্যে কংগ্রেসের সাংগঠনিক দুর্বলতার কথা মানছেন প্রদেশ কংগ্রেসের অন্যতম মুখপাত্র সুমন রায়চৌধুরী। অন্যদিকে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের বক্তব্য,' আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গের পুনর্জাগরণ ঘটাতে গেলে বামপন্থার পুনর্জাগরণ অবশ্যম্ভাবী।”
mzamin

বয়সই মূল বাধা, নিঃসন্তান দম্পতিকে 'টেস্ট টিউব বেবি’ নেয়ার অনুমতি দিলো কলকাতা হাইকোর্ট by সেবন্তী ভট্টাচার্য্য

বয়স ষাট পেরিয়ে গেছে। এই বয়সেই সন্তান নিতে চান কলকাতার কাশীপুরের দম্পতি। সাহায্য নিতে চান টেস্ট টিউব পদ্ধতির। কিন্তু, বয়সের কারণে রয়েছে আইনি বাধা। স্বামীর বয়স বেশি হওয়ায় ‘টেস্ট টিউব বেবি’ বা আইভিএফ পদ্ধতিতে সন্তান নেওয়ার অনুমতি দিচ্ছিল না পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য দফতর। তারা দ্বারস্থ হয়েছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের। অবশেষে মুশকিল আসান করলেন কলকাতা হাইকোর্টের  বিচারপতি অমৃতা সিনহা।

আদালত সূত্রে জানা গিয়েছে, ১৯৯৪ সালে বিয়ে হয় ওই দম্পতির। ৩০ বছরের বৈবাহিক জীবনে তাদের কোনও সন্তান হয়নি। তবে উত্তরাধিকার নিশ্চিত করতে টেস্ট টিউব বেবি বা আইভিএফ পদ্ধতির মাধ্যমে সন্তান নিতে চান তারা। কিন্তু স্বাস্থ্য ভবন থেকে মেলেনি অনুমতি। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে ‘পিএইচএস ফার্টিলিটি ক্লিনিকে’ এই দম্পতি আইভিএফের মাধ্যমে সন্তান নেয়ার জন্য আবেদন জানান। কিন্তু গত ২৭ জুন ওই ক্লিনিকের তরফে ওই দম্পতিকে জানানো হয়, নিয়ম অনুযায়ী স্বামীর বয়স যা থাকা প্রয়োজন, তার তুলনায় বেশি। তাই স্বাস্থ্য ভবন থেকে বিশেষ অনুমতি নিয়ে আসতে হবে। নিয়ম অনুযায়ী, অ্যাসিস্টেড রিপ্রোডাক্টিভ টেকনোলজি-র মাধ্যমে সন্তান নিতে চাইলে পুরুষের বয়স হতে হবে ২১ থেকে ৫৫ বছর। আর মহিলাদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়স হবে ৫০ বছর। কিন্তু কাশীপুরের দম্পতির ক্ষেত্রে স্বামীর বয়স ৫৮। তাই স্বাস্থ্য ভবনের অনুমতি মেলেনি।

অগত্যা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন তারা।  তারপরই কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন ওই দম্পত্তি। সূত্রের খবর, শুনানি চলাকালীন দম্পত্তির উদ্দেশ্যে একগুচ্ছ প্রশ্নও করেন অমৃতা সিনহা। স্পষ্ট জানতে চান এই বয়সে তারা সন্তানের দায়িত্ব নিতে পারবেন কিনা। এমনকি সন্তান মানুষ করার জন্য তাদের কী পরিকল্পনা রয়েছে তাও জানতে চান। দম্পতির আইনজীবী স্পষ্ট জানান, তার মক্কেলের কোনও আর্থিক সমস্যা নেই। যা আছে তা সন্তান মানুষ করার জন্য পর্যাপ্ত। এমনকি সন্তান নেয়ার জন্য তারা দীর্ঘদিন মানসিক প্রস্তুতিও নিয়েছেন। তাই তাদের কোনও সমস্যা নেই। সমস্ত সওয়াল জবাব শেষে শেষ পর্যন্ত ওই দম্পতিকে টেস্ট টিউব বেবি নেয়ার অনুমতি দিয়ে দেয় কলকাতা হাইকোর্ট। আদালতে রায়ে খুশি কাশীপুরের ওই দম্পতি।

mzamin

আদানি গ্রুপের ঘুষকাণ্ড বিশ্ববাজারে কী প্রভাব ফেলবে: একদিনে ৩৪০০ কোটি ডলার হারিয়েছে

আদানিকাণ্ডে তোলপাড় পুরো বিশ্ব। তাদের জালিয়াতি, প্রতারণা নিয়ে সারাবিশ্ব সরব। এমন খবর প্রকাশ হওয়ার পর বৃহস্পতিবার একদিনেই আদানি গ্রুপ ৩৪০০ কোটি ডলারের বাজার হারিয়েছে শেয়ারবাজারে। এ নিয়ে অনলাইন বিবিসিতে সাংবাদিক সৌতিক বিশ্বাস লিখেছেন, মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও বিশ্বের অন্যতম সেরা ধনী গৌতম আদানি যুক্তরাষ্ট্রে নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের বিজয় উদযাপন করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্যুৎ ও অবকাঠামোগত প্রকল্পে ১০০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ পরিকল্পনার ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু এখন ৬২ বছর বয়সী ভারতীয় এই ধনকুবের এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশে এবং বিদেশে তার উচ্চাভিলাস সম্বলিত যে পরিকল্পনা করেছিলেন তা বিপন্ন হতে পারে। তার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতারণার অভিযোগ আনা হয়েছে। বিভিন্ন বন্দর ও নবায়নয়যোগ্য জ্বালানির বিস্তৃত সাম্রাজ্যে আছে তার ১৬৯০০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ।

যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল প্রসিকিউটররা অভিযোগ করেছেন তিনি ২৫ কোটি ডলারের ঘুষ দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে নিজের সম্পদ বাড়াতে চেয়েছেন। ২০ বছর ধরে এই প্রকল্প থেকে লাভ পাবেন এমন পরিকল্পনায় কাজ পাইয়ে দেয়ার জন্য তিনি ও তার নির্বাহীরা ভারতীয় কর্মকর্তাদের ঘুষ দিয়েছেন। তবে এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন দাবি করে তা অস্বীকার করেছে আদানি গ্রুপ। তারা অস্বীকার করলেও এরই মধ্যে এই গ্রুপ এবং ভারতের অর্থনীতিতে আঘাত আসা শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার আদানি গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারে ৩৪০০ কোটি ডলার হারিয়েছে। এর ১০টি কোম্পানির সম্মিলিতভাবে বাজারে মূলধন ১৪৭০০ কোটি ডলারের। অভিযোগের কেন্দ্র রয়েছে আদানি গ্রিন এনার্জি গ্রুপ। তারা ৬০ কোটি ডলারের বন্ড বিক্রি করতে পারেনি।

ভারতের ব্যবসা ও রাজনীতিতে এর প্রভাব নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন আছে। দেশটিতে এখনও অবকাঠামো খাতে শীর্ষ স্থানীয় আদানি গ্রুপ। তারা ভারতের অর্থনীতিকে গভীর থেকে নাড়া দিয়েছে। আদানি গ্রুপ পরিচালনা করে ১৩টি বন্দর (শতকরা ৩০ ভাগ মার্কেট শেয়ার), সাতটি বিমানবন্দর (শতকরা ২৩ ভাগ প্যাসেঞ্জার ট্রাফিক) এবং ভারতের দ্বিতীয় বৃহৎ সিমেন্ট ব্যবসা (বাজারের শতকরা ২০ ভাগ)। ৬টি কয়লাচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের মাধ্যমে বেসরকারি খাতে বিদ্যুতে আদানি ভারতের সবচেয়ে বড়  প্রতিষ্ঠান। একই সঙ্গে আদানি পরিবেশবান্ধব হাইড্রোজেন চালিত প্রকল্পে ৫০০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করার অঙ্গীকার করেছেন। পাশাপাশি ৮০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রাকৃতিক গ্যাস পাইপলাইন পরিচালনারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি ভারতের সবচেয়ে বড় এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করছেন। নবরূপে উন্নয়ন করছেন ভারতের সবচেয়ে বড় বস্তি। তার অধীনে কর্মসংস্থান হয়েছে কমপক্ষে ৪৫০০০ মানুষের। ফলে সারাদেশে তার বিনিয়োগ বড় রকম প্রভাব ফেলছে।

গৌতম আদানি: এশিয়ার শ্রেষ্ঠ ধনী
গৌতম আদানির বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষামূলক প্রকল্পের মধ্যে ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় আছে কয়লা খনি। আফ্রিকায় আছে অবকাঠামোগত প্রকল্প। তার প্রকল্পগুলোতে নরেন্দ্র মোদির অগ্রাধিকারমূলক নীতির প্রতিফলন আছে।  তার মধ্যে অবকাঠামো থেকে শুরু করে সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি। সমালোচকরা তার সমালোচনা করলেও পেছন দিকে ফিরে তাকাননি। এর মধ্য দিয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী মোদি ও গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রীর দিকে আঙ্গুল তুলেছেন। তারা দুজনেই আদানির প্রশংসা করেছেন। ভারতের সফল অন্য ব্যবসায়ীদের মতোই আদানি সুসম্পর্ক গড়ে তুলেছেন বিরোধী দলীয় অনেক নেতার সঙ্গেও। এর ফলে তাদের রাজ্যগুলোতেও বিনিয়োগ করেছেন আদানি।

ভারতীয় ব্যবসা নিয়ে দীর্ঘ লেখালেখি আছে সাংবাদিক পরানজয় গুহা ঠাকুরতার। তিনি বলেন, এই ঘুষ দেয়ার অভিযোগ বিরাট আকারের। দীর্ঘ সময় ধরে আদানি ও মোদিকে আলাদা করে দেখা যায় নি। এটা হলো ভারতে রাজনৈতিক অর্থনীতিকে প্রভাবিত করার একটি চেষ্টা। যুক্তরাষ্ট্রের হিন্ডেনবার্গ রিসার্সের ২০২৩ সালের একটি রিপোর্টে স্টক নিয়ে জালিয়াতি ও প্রতারণার অভিযোগ প্রকাশ করা হয়েছে। তারপর প্রায় দু’বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে নিজের ভাবমূর্তি গড়ে তোলার চেষ্টা করছিলেন আদানি। কিন্তু তার মধ্যেই এই আঘাত এসে হানা দিলো।

আদানি যদিও অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তবুও তাতে শেয়ারবাজারে ক্রয়বিক্রয়ে বড় রকম প্রভাব ফেলেছে। ভারতে শেয়ারবাজার রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠান এসইবিআই। তারা এই অভিযোগ তদন্ত করছে। উইলসন সেন্টারের মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, আদানি তার ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছেন এবং দেখানোর চেষ্টা করছেন যে, হিন্ডেনবার্গ গ্রুপ যেসব অভিযোগ করেছে তা বেশ আগের। তা সত্য নয়। তার কোম্পানি এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আসলেই খুব ভালভাবে কাজ করছে। গত এক বছরে তা সমসাময়িক সময়ে বেশ কিছু নতুন চুক্তি ও বিনিয়োগ নিয়ে চুক্তি হয়েছে। তার মধ্যে এই অভিযোগ এই বিলিয়নারের ওপর যেন শারীরিক আঘাত হিসেবে এসেছে।

এখন দেশের ভিতর যেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছেন তা কাটিয়ে উঠা আদানির জন্য খুব কঠিন হবে। নিরপেক্ষ বাজার বিশ্লেষক আম্বরিশ বালিগা বলেন, বাজারে যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে তা গুরুতর। বড় প্রকল্পগুলোতে এখনও বিনিয়োগ করবে আদানি। তবে তাতে বিলম্ব হবে। সর্বশেষ যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তাতে বিশ্বজুড়ে আদানি তার যে সম্প্রসারণবাদের পরিকল্পনা করেছিলেন তার প্রতিও একটি আঘাত। একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং বিতর্কিত বিদ্যুৎ চুক্তি করার কারণে তিনি এরই মধ্যে যথাক্রমে কেনিয়া ও বাংলাদেশে চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছেন। সিঙ্গাপুর ম্যানেজমেন্ট ইউনিভার্সিটির লি কং চোইন প্রফেসর নির্মলয়া কুমার বলেন, এই ঘুষকাণ্ড যুক্তরাষ্ট্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণ পরিকল্পনাকে থামিয়ে দেবে।

তারপর কি?

এরই মধ্যে গৌতম আদানিকে গ্রেপ্তারের জন্য জোর আবেদন করেছেন রাজনীতিক, বিরোধী দলীয় নেতা রাহুল গান্ধী। তিনি এ ইস্যুতে পার্লামেন্টকে উত্তপ্ত করে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। নির্মলয়া কুমার মনে করেন, ভারতীয় সরকারি কর্মকর্তাদের ঘুষ দেয়া নতুন কোনো খবর নয়। কিন্তু যে পরিমাণ অর্থ ঘুষ দেয়ার কথা বলা হয়েছে তাতে চোখ চড়কগাছ। আমি মনে করি এই ঘুষকাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের কিছু নাম সম্পর্কে জানে যুক্তরাষ্ট্র। ভারতের রাজনীতিতে এ নিয়ে হট্টগোল হওয়ার আশঙ্কা আছে। সামনে আরো অনেক কিছু আসছে। এখন নিজেদের রক্ষা করার জন্য আদানি টিম সর্বোচ্চ আইনজ্ঞদের ভাড়া করবেন এতে কোনো সন্দেহ নেই।

মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, সবে তো আমরা অভিযোগ সম্পর্কে জানতে পেরেছি। এখনও অনেক কিছু সামনে আসতে বাকি। যদিও যুক্তরাষ্ট্র-ভারত ব্যবসায়িক সম্পর্ক নজরদারিতে থাকতে পারে, তবে তার বড় কোনো প্রভাব থাকবে বলে মনে হয় ন। কুগেলম্যান বলেন, সম্প্রতি শ্রীলংকায় একটি বন্দরের প্রকল্প নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ৫০ কোটি ডলারের চুক্তি করেছে। গুরুতর অভিযোগ সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র-ভারত ব্যবসায়িক সম্পর্ক শক্তিশালী অবস্থানে থাকবে। এই দুই দেশের মধ্যে ব্যবসায়িক সম্পর্ক অনেক বড় ও বহুমুখী।

মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, এখনও এটা পরিষ্কার নয় যে, আদানিকে টার্গেট করা যাবে। বিষয়টি নির্ভর করে যুক্তরাষ্ট্রে আসন্ন নতুন প্রশাসনের ওপর। তারা এ বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়াকে কতটা সামনে এগিয়ে যেতে দেবে, তার ওপর নির্ভর করে অনেকটা।

mzamin

ডাউনিং স্ট্রিটের ইঙ্গিত: নেতানিয়াহু যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করলে তাকে গ্রেপ্তারের মুখোমুখি হতে হবে

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুক্তরাজ্যে প্রবেশ  করলে তাকে গ্রেপ্তারের মুখোমুখি হতে হবে। আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হওয়ার পরে এমনি ইঙ্গিত দিলো ডাউনিং স্ট্রিট । একজন মুখপাত্র সুনির্দিষ্ট মামলার বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকার করেছেন , তবে বলেছেন যে সরকার তার  আইনি বাধ্যবাধকতা পূরণ করবে।বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে নেতানিয়াহু সহ ইসরায়েলের প্রাক্তন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। যুক্তরাজ্য সহ আদালতের সদস্য দেশগুলি একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে যা তাদের এই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নিয়ে পদক্ষেপ নিতে  বাধ্য করে।নেতানিয়াহু যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করলে তাকে আটক করা হবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র কোনো অনুমানের ভিত্তিতে  মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে তিনি বলেছেন : "সরকার তার আইনি বাধ্যবাধকতা পূরণ করবে।  'আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত আইন ২০০১'  মোতাবেক  আদালত যদি গ্রেপ্তারের জন্য কোনো পরোয়ানা জারি করে, তাহলে একজন মনোনীত মন্ত্রী অনুরোধটি প্রেরণ করবেন... একজন উপযুক্ত বিচারিক কর্মকর্তার কাছে। তিনি  সন্তুষ্ট হলে  আইসিসি কর্তৃক জারি করা পরোয়ানা  যুক্তরাজ্য অনুমোদন করবে"।

প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র নিশ্চিত করেছেন যে সরকার আইনে বর্ণিত প্রক্রিয়া   মেনে চলবে  এবং  সর্বদা দেশীয়   ও  আন্তর্জাতিক  আইনি বাধ্যবাধকতা মেনে চলবে"। যদিও ওই মুখপাত্র  নিশ্চিত করে বলতে পারেননি রাষ্ট্রের  কোন  সেক্রেটারি এই প্রক্রিয়ায় জড়িত থাকবেন।  এই মামলার বিষয়ে সরকার যুক্তরাজ্যের শীর্ষ আইনজীবী  অ্যাটর্নি জেনারেল লর্ড হারমারের  কাছ থেকে আইনি পরামর্শ চাইছেন  কিনা সে সম্পর্কে প্রশ্নের উত্তর দেননি। দেশের প্রধানমন্ত্রী এখনও নেতানিয়াহুর সাথে কথা বলতে ইচ্ছুক কিনা জানতে চাইলে মুখপাত্র বলেছেন যে  ' বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইসরায়েল আমাদের  মূল অংশীদার। তাই  আমাদের ইসরায়েলের সাথে সমস্ত স্তরে সংলাপ চালিয়ে যাওয়া  উচিত।'গত মাসে লর্ড হারমার বিবিসিকে বলেছিলেন যে আইসিসি যদি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে তবে তিনি রাজনৈতিক বিবেচনাকে তার সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে দেবেন না। হারমার বলেছিলেন -  " নেতানিয়াহুর জন্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা সম্পর্কে  আইন মেনে  পদক্ষেপ নেয়া হবে। একটি সরকার কি করবে  তা নির্দেশ করা অ্যাটর্নির কাজ নয়। আইনের কী প্রয়োজন, আইনের বিষয়বস্তু কী এবং আইন আপনাকে কোথায় নিয়ে যায় সেই বিষয়ে নির্ভীক আইনি পরামর্শ দেওয়াই অ্যাটর্নির কাজ। এবং এটাই আমি করতে যাচ্ছি।' বৃহস্পতিবার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হওয়ার পরে, ডাউনিং স্ট্রিট বলেছে যে যুক্তরাজ্য সরকার আইসিসির স্বাধীনতাকে সম্মান করে।  গাজায় অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির জন্য জোর দেওয়ার দিকে মনোনিবেশ করেছে যুক্তরাজ্য সরকার। আদালত হামাসের সামরিক কমান্ডার মোহাম্মদ দেইফের জন্যও একটি পরোয়ানা জারি করেছে।  যাকে   ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর   ইসরায়েলের ওপর হামলার সাথে সম্পর্কিত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে   হত্যা করা হয়।

যুক্তরাজ্যের ছায়া পররাষ্ট্র সচিব ডেম প্রীতি প্যাটেল গাজায় ইসরায়েলের পদক্ষেপকে  ৭ অক্টোবরের হামাসের হামলার সাথে সমতুল্য করে দেখার জন্য আইসিসির সমালোচনা করেছেন।তিনি যুক্তরাজ্য সরকারকে আদালতের সিদ্ধান্তকে "নিন্দা ও চ্যালেঞ্জ" করার আহ্বান জানিয়েছিলেন, এটিকে "উদ্বেগজনক এবং উসকানিমূলক" হিসাবে বর্ণনা করেছেন। ক্ষমতায় জয়ী হওয়ার পর, নতুন লেবার সরকার আইসিসির গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করার অধিকারকে চ্যালেঞ্জ করা সংক্রান্ত পূর্বসূরির পরিকল্পনা বাতিল করে বলেছিল যে এটি বিচারকদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়। গ্রেফতারি পরোয়ানার  প্রভাব নির্ভর করবে আদালতের ১২৪ টি সদস্য রাষ্ট্র - যার মধ্যে ইসরায়েল বা তার মিত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অন্তর্ভুক্ত নয় - সেটি  কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেয় কি না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানাকে ‘আপত্তিকর’ বলে অভিহিত করেছেন, বলেছেন ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে তুলনা টানা অযৌক্তিক। তবে, বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশের কর্মকর্তারা আদালতের পাশে দাঁড়িয়ে বিবৃতি দিয়েছেন এবং বলেছেন যে তারা আদালতের  সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে । ইসরায়েল এবং হামাস উভয়ই আইসিসির করা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে, নেতানিয়াহু এই পরোয়ানাটিকে "বিদ্বেষপূর্ণ' বলে উল্লেখ করেছে।

সূত্র :বিবিসি

mzamin

তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে নিরাপদ থাকবে যেসব দেশ

তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। ঠিক এমন বিস্ফোরক বার্তাই দিয়েছেন ইউক্রেনের সাবেক সেনাপ্রধান। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, উত্তর কোরিয়ার দাপাদাপি অনেক সময়ই প্রশ্ন জাগিয়ে তুলছে, আসলেই কি শুরু হয়ে গেছে আরেকটা বিশ্বযুদ্ধ। ফলে স্বাভাবিকভাবেই হিসাব চলে আসে কোন কোন দেশ এই যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়ছে আর নিরাপদ থাকছেইবা কারা।

গ্লোবাল পিস ইনডেক্সের সবশেষ তথ্য বলছে, ইউরোপের দেশ হয়েও আইসল্যান্ড নিরাপদ থাকবে। এখানে যুদ্ধের আঁচ একেবারেই লাগবে না। মনে করা হচ্ছে- তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ থাকবে দেশটি। কারণ এর ভৌগোলিক অবস্থান। মার্কিন সামরিক জোট ন্যাটো সদস্য হলেও আইসল্যান্ডের অবস্থান আটলান্টিক মহাসাগরের মাঝখানে। এর নিজস্ব সেনাবাহিনী নেই।

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বেঁচে যাবে নিউজিল্যান্ডও। এখানে যুদ্ধের উত্তাপ পৌঁছানোর সম্ভাবনা খুবই কম। গ্লোবাল পিস ইনডেক্স অনুযায়ী, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এটি অন্যতম নিরাপদ দেশ হতে পারে। এটি বিশ্বের দ্বিতীয় শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে বিবেচিত হয়। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে রাশিয়া এবং আমেরিকা থেকে দূরে থাকায় এটি নিরাপদ জায়গা হতে পারে।

ডেনমার্ক পুরোপুরি নিরাপদ নয়। তবে সেখানে গ্রিনল্যান্ডের যে জায়গা রয়েছে সেটি নিরাপদ হতে পারে। কারণ তারা যুদ্ধ, ক্ষমতা, অস্ত্র, অর্থ এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না।

ইংল্যান্ডের পাশের দেশ আয়ারল্যান্ড। এটি NATO-র সদস্য নয়। কিন্তু ব্রিটেনের পাশে অবস্থিত। ফলে ব্রিটেন যদি সুরক্ষিত থাকে তাহলেই রক্ষা পেতে পারে আয়ারল্যান্ডও। তবে ইউরোপ-আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, ইরান, ইসরায়েল-উত্তর কোরিয়া যুদ্ধে জড়ালে ব্রিটেনের ছাড় পাওয়ার সুযোগ থাকবে না বলেই মনে করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।

গ্লোবাল পিস ইনডেক্সে কানাডার নাম রয়েছে। আমেরিকার পাশের দেশ হওয়ায় তাদের বসে থাকার সুযোগ থাকবে না বলেই মনে হচ্ছে। তার পরও কানাডা যেহেতু তুলনামূলক শান্তির দেশ এবং আমেরিকার সুরক্ষায় থাকবে ফলে তারাও বিশ্বযুদ্ধের সময় নিরাপদে থাকতে পারে।

অস্ট্রেলিয়া ন্যাটোর সদস্য নয়। তবুও ন্যাটোর সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে। বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে তারাও জড়িয়ে যেতে পারে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার ভূখণ্ড রক্ষা পেতে পারে তাদের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে। তাসমান পাড়ে খুব সহজে আছড়ে পড়বে না উত্তর কোরিয়ার ছোড়া পারমাণবিক বোমা।

প্রতীকী ছবি।
প্রতীকী ছবি।



সাংবাদিকদের হত্যা মামলায় জড়ানো নিয়ে ড. ইউনূসের বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়েছে আরএসএফ

পুরনো আইনের ভিত্তিতে সাংবাদিকদের জড়িয়ে হত্যা মামলার বিষয়ে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়েছে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (আরএসএফ)। বৃহস্পতিবার নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাপী সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক এই সংগঠন। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের দেয়া বিবৃতিকে স্বাগত জানাচ্ছে আরএফএস। প্রধান উপদেষ্টা তার বক্তব্যে বলেছেন, ১৪০ জনের বেশি সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ‘পুরনো আইনের’ মাধ্যমে তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ড. ইউনূসের এই বক্তব্যকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি বাংলাদেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে কাঠামোগত সংস্কারের পথে এগিয়ে যেতে প্রধান উপদেষ্টার প্রতি আহ্বান জানিয়েছে আরএসএফ নামের এই সংগঠনটি।

গত বুধবার ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারকে একটি সাক্ষাৎকার দেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সেখানে জুলাই-আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের ঘটনায় করা হত্যা মামলা নিয়েও কথা বলেন। সাক্ষাৎকারে ভিত্তিহীন হত্যা মামলা নিয়ে করা এক প্রশ্নের জবাবে ড. ইউনূস জুলাই-আগস্ট হত্যা মামলায় ১৪০ জনের বেশি সাংবাদিকের নাম আসার বিষয়টি ‘পুরনো আইন’ ও চর্চার ফল বলে মন্তব্য করেন। তড়িঘড়ি করে মামলা করতে গিয়ে এমনটি হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। প্রধান উপদেষ্টার এ ‘স্বীকারোক্তিকে’ স্বাগত জানিয়েছে আরএসএফ।
সাক্ষাৎকারে ১৬৭ জন সাংবাদিকের অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিলের বিষয়েও কথা বলেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, এ কার্ড বাতিল করার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের কাজ করতে বাধা দেবে না। এর মাধ্যমে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে তাদের প্রবেশাধিকার সীমিত হবে শুধু। এ প্রসঙ্গে আরএসএফের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের প্রধান সিলিয়া মার্সিয়া বলেন, অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বরাদ্দ ও বাতিল করার ক্ষেত্রে একটি স্বচ্ছ ও অরাজনৈতিক পদ্ধতি থাকা জরুরি।
ড. ইউনূসের সামপ্রতিক ওই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে নিপীড়নমূলক বিচার প্রক্রিয়া থেকে সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি জরুরিভিত্তিতে পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে আরএসএফ। সংগঠনটি বলেছে, আইনের শাসনের প্রতি সংগতি রেখে ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারের প্রতি অবশ্যই শ্রদ্ধা দেখাতে হবে।  সাক্ষাৎকারে ড. ইউনূস আরও বলেন, আমরা অতীতের সবকিছু ছাপিয়ে যাওয়ার একটি সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছি। আমরা যেন একই ভুল আর না করি। আমাদের সত্য পথে ও অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে আগাতে হবে। আমরা যদি ভুল করি, সেগুলো আমাদের ধরিয়ে দিন। আমরা স্বাধীন সাংবাদিকতাকে গুরুত্ব দিই। আমরা কী করতে পারি, সে বিষয়ে আপনাদের প্রতিক্রিয়া আমাদের সাহায্য করবে, নচেৎ তা এড়িয়ে যেতে পারে। তার এ বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়েছে আরএসএফ।
সংগঠনটি তাদের প্রতিবেদনে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলমের একটি বক্তব্যের প্রতিও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। সমপ্রতি জুলাই গণহত্যায় গণমাধ্যমের ভূমিকা শীর্ষক একটি আলোচনায় শফিকুল আলম বলেন, গত ১৫ বছরে বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় কী ঘটেছিল, সে সত্য আমলে না নিলে আরএসএফের মতো সংগঠনগুলো (বর্তমান) বাস্তবতা উপেক্ষা করবে। আরএসএফ তার এ বক্তব্য আমলে নিয়ে বর্তমান সরকারকে সাংবাদিকদের প্রতি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বন্ধের আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে প্রায় ১৪০ জন সাংবাদিক ছাত্র-জনতাকে হত্যার অভিযোগে করা ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের’ মামলার আসামি হয়েছেন। গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে ২৫ জন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বের বিরুদ্ধে। পূর্ববর্তী কোনো ধরনের অনুসন্ধান ছাড়াই এসব মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন পাঁচ সাংবাদিক।

mzamin

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের আগে ইউক্রেনে রুশ হামলা জোরদার পশ্চিমাদের কীসের বার্তা দেয়?

রাশিয়ার অভ্যন্তরে ইউক্রেনকে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অনুমতি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন যেন আগুনে ঘি ঢাললেন। ক্ষমতা ছাড়ার আগ মুহূর্তে বাইডেনের এমন সিদ্ধান্তে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে নতুন যে উত্তেজনা যোগ করেছে তাতে এ বিষয়টিই স্পষ্ট হয়েছে। কে না জানতো যে, ইউক্রেনকে ভারী মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি দিলে নিজেদের হামলা আরও তীব্র করবে রাশিয়া। বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত ডনাল্ড ট্রাম্প আসার আগে বাইডেন প্রশাসনের শেষ সময়ের এমন কাকতালীয় সিদ্ধান্ত মস্কো-কিয়েভের সংঘাতে নতুন উত্তেজনা যোগ করেছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন দ্য গার্ডিয়ান। এতে বলা হয়, বাইডেনের এমন সিদ্ধান্তের পর রাশিয়া বা ইউক্রেন কেউই জানে না আগামী জানুয়ারিতে ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তনে তাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে। কিন্তু এখন যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করছে তা যে ট্রাম্প প্রশাসনে স্থিতাবস্থা তৈরি করবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কেননা, ট্রাম্প নির্বাচিত হওয়ার আগেই ঘোষণা দিয়েছেন তিনি কোনো যুদ্ধ চান না।

গত সপ্তাহে ইউক্রেনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা এখনো জানে না ইউক্রেন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট কী পরিকল্পনা করছেন। তবে ট্রাম্পের আগাম ঘোষণার উপর ভিত্তি করেই ইউক্রেন নিজেদের সিদ্ধান্তের বাঁক বদল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। আর রাশিয়া চাইছে ইউক্রেনের কুরস্ক অঞ্চলের বেশ কিছু অঞ্চল নিজেদের দখলে রাখতে। এর মাধ্যমে যতটা সম্ভব ইউক্রেন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রকে চাপে রাখতে চাইছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসনও ট্রাম্পকে নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছে। এক্ষেত্রে ইতিমধ্যেই ইউরোপিয়ান দেশগুলোর সঙ্গে ইউক্রেন ইস্যুতে যোগাযোগ করছে বাইডেন প্রশাসন। তাদের ধারণা হচ্ছে ট্রাম্প ক্ষমতায় গেলেই ইউক্রেন তাদের ন্যায্য লড়াই থামাতে বাধ্য হতে পারে। এই আশঙ্কা থেকেই বাইডেন তার বিগত সময়ের সিদ্ধান্ত থেকে বেরিয়ে এসে রাশিয়ার অভ্যন্তরে যুক্তরাষ্ট্র নির্মিত এটিএসিএমএস নামের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন। এর পাশাপাশি ইউক্রেনকে ল্যান্ডমাইন ব্যবহারেরও অনুমতি দিয়েছে তার প্রশাসন। এ ছাড়া ইউক্রেনকে কারিগরি সাহায্যের জন্য মার্কিন সামরিক ঠিকাদার পাঠানোর কথাও জানিয়েছেন বাইডেন। যদিও এমন পরিস্থিতিতে বাইডেনের এই সিদ্ধান্ত গেম-চেঞ্জার হিসেবে কাজ করবে কিনা তা নিয়ে বেশ সন্দেহ প্রকাশ করেছেন কর্মকর্তারা। কেননা, তারা বলছেন বাইডেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে ইউক্রেনকে এমন অনুমোদন দেয়া থেকে বিরত ছিলেন। কিন্তু এখন শেষ সময়ে তার এই সিদ্ধান্ত ইউক্রেনের জন্য মঙ্গলজনক হবে কিনা সে বিষয়ে বেশ সন্দেহ তৈরি করেছে। জানুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে এসেই বাইডেনের এমন সিদ্ধান্ত নাকচ করে দিতে পারেন ডনাল্ড ট্রাম্প। তবে এক্ষেত্রে পুতিনের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্কের দিকটিও মাথায় রাখবে যুক্তরাষ্ট্র। কেননা, ট্রাম্প প্রশাসনে এবার সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেতে পারে মার্কিন বাণিজ্য খাত। সেক্ষেত্রে ট্রাম্প রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনায় বসলে তিনি এ বিষয়ে বেশ জোর দিতে পারেন বলা ধারণা করা হচ্ছে। বাইডেনের অনুমোদনের পরপরই ইউক্রেনে হামলার মাত্রা বাড়িয়েছে পুতিন। দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তনের ঠিক আগ মুহূর্তে ইউক্রেনে পুতিনের হামলার মাত্রা বৃদ্ধি পশ্চিমা মিত্রদের জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের।

mzamin

মিজানের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় by সুদীপ অধিকারী

রাজধানীর উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান মিজান। তবে মোহাম্মদপুরবাসীর কাছে তিনি ‘পাগলা মিজান’ নামেই বেশি পরিচিত। এক সময়ের ছিনতাইকারী-ছিঁচকে চোর কাউন্সিলর হয়ে এখন হাজার কোটি টাকার মালিক। এলাকায় আধিপত্য বিস্তারে তার রয়েছে নিজস্ব বাহিনী। আওয়ামী লীগের ক্ষমতাকে পুঁজি করে বাড়ি দখল, ফ্ল্যাট দখল, মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, টেন্ডার ছাড়া কাজ বাগিয়ে নেয়াসহ কী অভিযোগ নেই তার বিরুদ্ধে।

ডিএনসিসি’র ৩২ নম্বর ওয়ার্ডে গেলে ইশতিয়াক আহমেদ, এমদাদ হোসেন, রুবেল মিয়া, মো. জুয়েল, হাসান তালুকদারসহ বেশ কয়েকজন জানান, ওয়ার্ডটির সাবেক কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান মিজান ওরফে পাগলা মিজান শুধু মোহাম্মদপুরে নয় শ্যামলী-আদাবর এলাকাতেও তার ব্যাপক দাপট। সদ্য ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালীন ছাত্রলীগ-যুবলীগের সদস্যদের ব্যবহার করে বিপুল সম্পত্তির মালিক বনে গেছেন এই পাগলা মিজান। ১৯৭৩ সালে জীবিকার তাগিদে ঝালকাঠি থেকে ঢাকায় এসে হোটেল বয়ের কাজ নেন। অপরাধ জগতে তার হাতেখড়ি ম্যানহোলের ঢাকনা চুরির মাধ্যমে। ১৯৭৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে রাজধানীর খামারবাড়ি খেজুর বাগান এলাকায় ছিনতাই করতে গেলে পুলিশের ধাওয়া খেয়ে লালমাটিয়া মসজিদের পাশের পুকুরে নেমে পড়েন মিজান। যাতে পুলিশ কাছে আসতে না পারে সেজন্য কাপড় ছাড়াই উপরে উঠে আসেন। তার এ ধরনের কাজের জন্য পুলিশ তাকে ‘পাগলা’ আখ্যা দেয়। তখন থেকেই এলাকায় তার নাম ছড়িয়ে পড়ে ‘পাগলা মিজান’ হিসাবে। ’৮০ ও ’৯০ দশকে এই পাগলা মিজান সংসদ ভবন এলাকা থেকে শুরু করে মোহাম্মদপুর স্যার সৈয়দ রোড, ইকবাল রোড এলাকা ও মিরপুর রোড  এলাকার মেইন রোডের বিদ্যুতের খুঁটি থেকে বিদ্যুৎ মিস্ত্রি দিয়ে তামার তার চুরি করাতো। এভাবে একের পর এক সরকারি স্থাপনায় চুরি করতো মিজান বাহিনীর সদস্যরা। তখন মোহাম্মদপুরে আটকে পড়া পাকিস্তানিদের পরিত্যক্ত বাড়ি দখলেরও অভিযোগ ওঠে মিজান বাহিনীর বিরুদ্ধে। একের পর এক চুরি-ছিনতাই ও দখলের মাধ্যমে মোহাম্মদপুর এলাকায় অপরাধের সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন মিজান। ফ্রিডম পার্টির মাধ্যমে রাজনীতিতে হাতেখড়ির পর ১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দেন পাগলা মিজান। আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে নিজের পাগলা নাম পাল্টে হয়ে যান হাবিবুর রহমান মিজান। তৎকালীন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় এক নেতার আশীর্বাদে ’৯২ সালে কাউন্সিলর বনে যান  মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মিজান। ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণ নিতে থাকেন মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকা। ১৯৯৪ সালে বনে যান ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর মিজান হয়ে ওঠেন আরও বেপরোয়া। বাড়ি দখল, জমি দখল, খুন, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ অনেক অপরাধে যুক্ত থাকার অভিযোগ উঠতে থাকে তার বিরুদ্ধে। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, নিজ দলেরই কেউ তার ভয়ে মুখ খুলতে সাহস করে না। এক সময়ের জেনেভা ক্যাম্পের মাদক ব্যবসার এই নিয়ন্ত্রক মিজান মাদকের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে রাজধানীর নামি-দামি বড় বড় হোটেলে মিটিং করতেন, আড্ডা দিতেন। আর ক্যাম্পের মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে দৈনিক ৩০ হাজার টাকা নিতেন। ওই টাকা তোলার কাজে নিয়োজিত ছিল- মর্তুজা, জিলানীসহ বেশ কয়েকজন। এ ছাড়াও টোল মার্কেটের একক নিয়ন্ত্রণ ছিল মিজানের। মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্পের বাসিন্দা মো. শাহেদ বলেন, পাগলা মিজান আমাদের ক্যাম্পের বিদ্যুতের সংযোগের লাইন দু’টি ভাগে ভাগ করে একটি ক্যাম্পের বাসিন্দাদের দিতেন। আরেকটি ক্যাম্পের বাজারে সংযোগ দেয়া হয়। প্রায় ২৫০টি দোকান থেকে বিদ্যুতের জন্য আলাদাভাবে দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা আদায় করতো মিজানোর লোক। ২০১৯ সালে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে ভারতে পালানোর সময় ১১ই অক্টোবর মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের ফজলুর রহমানের (মৃত) বাসা থেকে হাবিবুর রহমান মিজানকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। ওই সময় তার কাছ থেকে একটি অবৈধ পিস্তল,  চার রাউন্ড গুলি,  একটি ম্যাগাজিন ও নগদ দুই লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়। তখন তাকে ঢাকায় নিয়ে এসে প্রথমে লালমাটিয়ায় তার কাউন্সিলর কার্যালয়ে এবং পরে মোহাম্মদপুরে আওরঙ্গজেব রোডে তার বাসায় অভিযান পরিচালনা করে র‌্যাব। তখন তার বাসা থেকে ছয় কোটি ৭৭ লাখ টাকার চেক ও এক কোটি টাকার এফডিআর উদ্ধার করা হয়। তৎকালীন র‌্যাব সদর দপ্তরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারোয়ার আলম অভিযান পরিচালনা শেষে বলেছিলেন, মিজানের আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়ায় দুটো বাড়ি ও গাড়ি রয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ থেকেই তিনি এসব সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া গেছে। এ ছাড়াও চাঁদাবাজি ও জমি দখলের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।’ তবে আওয়ামী লীগের ক্ষমতাবলে অল্প সময়ের মধ্যেই কারাগার থেকে জামিনে বের হয়ে আসেন পাগলা মিজান। বাইরে বের হয়ে আবারো  বীরদর্পে নিজের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শুরু করেন মিজান। গত জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনেও মোহাম্মদপুর এলাকায় আওয়ামী লীগের হয়ে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেন তিনি। নিজের বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে অস্ত্র হাতে ধাপিয়ে বেড়ান আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর। এতসব কাণ্ডে একাধিক মামলার আসামি হয়েও এখনো অধরা পাগলা মিজান। ছাত্রহত্যা মামলার আসামি হয়েও মিজান বর্তমানে নিজেকে বিএনপি’র সমর্থক দাবি করে দলটির নেতাকর্মীদের সঙ্গে গোপনে সখ্য গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ করেছে তার এলাকার বাসিন্দারা।  

মিজানের যত সম্পত্তি: মো. নিজামউদ্দিন নামে মোহাম্মদপুরের এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, আওয়ামী লীগের ছত্রছায়ায় যুবলীগ-ছাত্রলীগের সদস্য ও নিজের সন্ত্রাসী বাহিনীর দিয়ে মোহাম্মদপুর এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করে অঢেল সম্পত্তির মালিক হয়েছেন সাবেক এই কাউন্সিলর। মাদকের এই গডফাদার মোহাম্মদপুর এলাকায় ভূমিদস্যু হিসেবেই বেশ পরিচিত। জমি দখলকে কেন্দ্র করে গত বছর মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যান সংলগ্ন তুরাগ নদের ওপারে একটি রিয়েল এস্টেটের ছয় কর্মীকে গুলি এবং আরও ১৪ জনকে কুপিয়ে জখম করে মিজান বাহিনীর সদস্যরা। আবাসনের ওই জমি দখলকে কেন্দ্র করে তখন জুয়েল নামের এক যুবককে হত্যা করে লাশ তুরাগে ফেলে দেয়ারও অভিযোগ ওঠে মিজানের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া মিজান শ্যামলী মাঠের পশ্চিম পাশের জমির একাংশ দখল করে বানিয়েছেন মার্কেট। সেখানে তিন শতাধিক ঘর তুলে ব্যবসায়ীদের কাছে ভাড়া দিয়েছেন। মোহাম্মদপুর তিন রাস্তার মোড় থেকে একটু  এগিয়ে বছিলা রোডে ঢুকলেই চোখে পড়বে হাবিবুর রহমান মিজানের নিজের নামে  ‘হাবিব মার্কেট’। এরপর লাউতলা ভেতরের রোডে ঢুকলেই এক বিশাল প্লট (খালি জমি) রয়েছে মিজানের। চন্দ্রিমা হাউজিং এলাকাতেও তৎকালীন হাউজিং চেয়ারম্যান প্রয়াত আক্কাস হাজীর কাছ থেকে বেশ কিছু প্লট বাগিয়ে নিয়েছিলেন এই মিজান। লালমাটিয়া এলাকায় স্বপনপুরী হাউজিংয়ে রয়েছে তার আরও দু’টি বহুতল বাড়ি। লালমাটিয়া বি-ব্লকে একটি ছয় তলা বাড়ি (২৪/এ)। এরই পাশে ২৪/এ এর সি/ডি নম্বরে লালমাটিয়ায় আরও একটি ৭ তলা ভবন রয়েছে তার। মোহাম্মাদপুরের আওরঙ্গজেব সড়কে আছে আরেকটি ফ্ল্যাট, যেখানে তিনি নিজে বসবাস করেন। এ ছাড়াও রাজধানীর পল্টন এলাকার একটি পাঁচতলা ভবনের মালিক হাবিবুর রহমান মিজান। সেখানেও ১০টি ফ্ল্যাট রয়েছে তার। হাবিবুর রহমান মিজান ওরফে এই পাগলা মিজান মিশুক অ্যান্ড কোম্পানির মালিক। এ ছাড়া তিনি ঢাকার হজ কাফেলা অ্যান্ড ট্র্যাভেলসের মালিক বলে জানিয়েছেন মোহাম্মদপুরের স্থায়ী বাসিন্দারা। নিজের নামে ছাড়াও দেশে-বিদেশে নামে- বেনামে টাকার পাহাড় গড়েছেন ক্যাসিনো কাণ্ডের অন্যতম হোতা মোহাম্মদপুরের সাবেক এই কাউন্সিলর। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস এবং অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে মিজানের আলিশান দু’টি বাড়ি ও দামি গাড়ি রয়েছে। যা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে অনেক আগেই জনসম্মুখে এসেছে। তার ভাইদের নামেও রয়েছে শত শত কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ। সরকারি টেন্ডার ছাড়াই বিভিন্ন দপ্তরের কাজ বাগিয়ে নিয়ে মিজান তার ভাইদের দিতেন। পাঁচ ভায়ের মধ্যে মিজানের ছোট ভাই মোস্তাফিজুর রহমান ১৯৯৫ সালে দুষ্কৃতকারীদের গুলিতে নিহত হন। বর্তমানে ঠিকাদার হেলাল, দুলাল ও শাজাহান নামে তার আরও তিনটি ভাই রয়েছে। মিজানের ভাই শাজাহান লালমাটিয়া ওয়াসার অফিস নিয়ন্ত্রণ করতো। একই সঙ্গে আবাসিক গ্যাসলাইন নিয়ন্ত্রণ করে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। মিজানের আরেক ভাই হেলাল আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ঢাকা-১৩ আসনের সদ্য সাবেক এমপি’র আমলে বিনা টেন্ডারে ৫ থেকে ৬শ’ কোটি টাকার এলজিআরডি ও সিটি করপোরেশনের কাজ করছে। যার ভাগ এলাকাটির আওয়ামী লীগের সব বড় নেতার পকেটে ঢুকতো নিয়মিত।

পাগলা মিজানের শক্তি: হাবিবুর রহমান মিজান ওরফে পাগলা মিজানের এত ক্ষমতার উৎস বর্তমান আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির একজন সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও এলাকাটির সদ্য সাবেক সংসদ সদস্য। এ ছাড়াও এলাকাটিতে তার মাই ম্যান হিসেবে খ্যাত আদাবর থানা যুবলীগের আহ্বায়ক আরিফুর রহমান তুহিন। এই তুহিনের মাধ্যমেই আদাবর এলাকার নিয়ন্ত্রণ রাখেন মিজান। এ ছাড়া মোহাম্মদপুর এলাকায় রয়েছে সাবেক কাউন্সিলর রাজিব, আলা বক্সের ভাই ইয়াসিন বক্স, সাবেক ছাত্রলীগের সভাপতি মাসুদ রানা শাহীন, মজিবর প্রমুখ। যারা সকলেই মোহাম্মদপুর এলাকায়  আওয়ামী লীগের নেতা এবং পাগলা মিজানের সহকারী বলে সকলের কাছে পরিচিত। ছাত্র আন্দোলনের সময় এদের সকলকেই অস্ত্র হাতে রাস্তায় নামায় মিজান। এদের মধ্যে জুলাই বিপ্লবের সময় আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালাতে চালাতে গত ১৯শে জুলাই মোহাম্মদপুরের সলিমুল্লাহ্‌ রোডে শটগানে বুলেট আটকে যায় সাবেক ছাত্রলীগের সভাপতি মাসুদ রানা শাহীনের। সেদিন একটি পিস্তলও হারিয়ে ফেলেন শাহীন। তিনিও এই পাগলা মিজানের খাস লোক হিসেবে পরিচিত।

এসব বিষয়ে জানতে মিজানের বসবাস করা মোহাম্মদপুরের আওরঙ্গজেব সড়কের বাসা, লালমাটিয়ার বাড়ি, মার্কেটে একাধিকবার গেলেও তার খোঁজ পাওয়া যায়নি। ৫ই আগস্ট পট পরিবর্তনের পর থেকে তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন। তার ব্যবহৃত ফোন নম্বরও বন্ধ রয়েছে।

এবিষয়ে মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলী ইফতেখার হাসান বলেন, আমরা জুলাই বিপ্লবের বিরুদ্ধে জড়িত আসামিদের ধরতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে অভিযান পরিচালনা করছি। একই সঙ্গে সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনতে অবিরাম কাজ করে যাচ্ছি। কিন্তু এসব পাগলা মিজানের মতো অপরাধীরা আত্মগোপনে থাকায় কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে। আশা করছি তারাও আইনের জালে ধরা পড়বে।

mzamin

দেশে দেশে চাপে আদানি, কী করবে বাংলাদেশ

আদানি এখন বিশ্ব জুড়ে আলোচনায়। দেশে দেশে রয়েছে ভীষণ চাপে। এরই মধ্যে আদানি গ্রুপের সঙ্গে করা দু’টি চুক্তি বাতিল করেছে কেনিয়া। যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে বিপুল অঙ্কের ঘুষকাণ্ডে ফেঁসে গেছেন ভারতের ধনকুবের গৌতম আদানি। তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে নিউ ইয়র্কের গ্রান্ড জুরি। ওদিকে অস্ট্রেলিয়ায় আদানির কয়লা খনিতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। এ অবস্থায়   বিভিন্ন দেশে আদানির চুক্তিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। আর বাংলাদেশের সঙ্গে অসম বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি নিয়েও এখন কাঠগড়ায় আদানি গ্রুপ। এ অবস্থায় কী করবে বাংলাদেশ। ওদিকে বাংলাদেশের উচ্চ আদালতে এ চুক্তি নিয়ে একটি রিট করা হয়েছে। আদালত রুলসহ একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি করার নির্দেশ দিয়েছেন। রুলে অসম, অন্যায্য ও দেশের স্বার্থ পরিপন্থি দাবি করে চুক্তিটি কেন বাতিল করা হবে না তা জানতে চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জ্বালানি ও আইন বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। মঙ্গলবার বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও দেবাশীষ রায় চৌধুরীর হাইকোর্ট বেঞ্চ রুলসহ এ আদেশ দেন। শুধু তাই নয়, ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকা অনলাইনে আদানিকে নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, ঘুষকাণ্ডে নাম জড়ানোর পরেই শিল্পপতি গৌতম আদানিকে গ্রেপ্তার করার দাবিতে সরব হলেন কংগ্রেস, শিবসেনা, আপ-এর শীর্ষ নেতারা।

এ ছাড়া ভারতের কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীও আদানিকে অবিলম্বে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন আদানিকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করা উচিত।

রয়টার্সের এক খবরে বলা হয়েছে, ভারতের আদানি শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে ২৫০ কোটি ডলারের বেশি অর্থের চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে আফ্রিকার দেশ কেনিয়া। নিউ ইয়র্কের আদালতে ঘুষকাণ্ডের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আদানি এবং তার ভাতিজা সাগর আদানির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পরপরই এমন সিদ্ধান্ত জানিয়েছে কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম রুটো। বৃহস্পতিবার জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে এ কথা জানান তিনি। ভাষণে তিনি বলেন, আমাদের তদন্ত সংস্থা ও অংশীদার দেশগুলোর দেয়া নতুন তথ্যের ভিত্তিতে চুক্তিগুলো বাতিল করা হয়েছে। যদি দুর্নীতির বিষয়ে নিশ্চিত প্রমাণ বা বিশ্বাসযোগ্য তথ্য আসে, আমি কঠোর পদক্ষেপ নিতে পিছপা হবো না। তার এই বক্তব্যে কেনিয়ার সংসদ সদস্যরাও সায় দিয়েছে। কেনিয়ার জোমো কেনিয়াত্তা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দ্বিতীয় রানওয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে দেশটির সঙ্গে প্রায় ২০০ কোটি ডলারের চুক্তি ছিল আদানি গ্রুপের। পাশাপাশি জ্বালানি ও পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকেও অবিলম্বে চুক্তি বাতিলের নির্দেশ দিয়েছেন রুটো। কেনিয়ার তদন্তকারী সংস্থা ও অংশীদার দেশগুলোর কাছ থেকে পাওয়া নতুন তথ্যের আলোকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন রুটো।
যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে অভিযুক্ত আদানির সঙ্গে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গেও চলছে টানাপড়েন। কয়েকদিন আগে আদানির সঙ্গে দেশের ১৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চুক্তির তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশের হাইকোর্ট। ওই নির্দেশের এক দিন পরেই যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে ঘুষকাণ্ডে অভিযুক্ত হয়েছেন আদানি এবং তার কর্মকর্তারা। এক্ষেত্রে আদানি গ্রুপ বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও চাপে পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। দ্য হিন্দুর এক খবরে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের পতিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আদানি গ্রুপের চুক্তিটি শুরু থেকেই বেশ বিতর্কিত ছিল। কেননা, হাসিনা সরকার স্বাভাবিক নিয়ম মেনে এই চুক্তি করেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপরেও বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার ইতিবাচক ধারায় আগানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু মার্কিন আদালতে অভিযুক্ত হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের চলমান ধারা কিছুটা সংকুচিত হতে পারে বলে মনে করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) প্রফেসর ড. ইজাজ হোসেন। আদানি পাওয়ারের সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তিটি বর্তমানে অনেকটাই অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে জি-টু-জি চুক্তির অধীনে ভারত থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে। ৫ই আগস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের সঙ্গে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে আদানির ২০১৭ সালের বিদ্যুৎ চুক্তি। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পরপরই কয়লা, বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো যাচাইয়ে কমিশন গঠন করা হয়েছে। এই কমিশনের নেতৃত্বে রয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডি’র সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। আদানির সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার সংলাপের পথে হাঁটলেও মার্কিন মুল্লুকের খবরের পর তার বাঁক বদল হতে পারে। কার্যত চাপে পড়তে পারে আদানি ও তার প্রতিষ্ঠান।  
অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়াতেও চাপে পড়েছে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী গৌতম আদানি। সেখানে তার কয়লা খনির কর্মীদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। চলতি সপ্তাতেই এই অভিযোগের কবলে পড়েছে আদানির প্রতিষ্ঠান। কুইন্সল্যান্ড রাজ্যের নাগানা ইয়ারবাইন ওয়াঙ্গান অ্যান্ড জাগালিংগু কালচারাল কাস্টোডিয়ানস জানিয়েছে, ব্রাভাস মাইনিং অ্যান্ড রিসোর্সেস ইউনিটের বিরুদ্ধে গুরুতর বর্ণবৈষম্যের অভিযোগ এনে তারা এ সপ্তাহের শুরুতে অভিযোগ দায়ের করেছে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, আদানির কর্মীরা আদানির কারমাইকেল কয়লা খনির কাছে আদিবাসী গোষ্ঠীর সদস্যদের বিভিন্নভাবে বৈষম্যমূলক আচরণ করেছে। নাগানা ইয়ারবাইনের সিনিয়র কালচারাল কাস্টোডিয়ান আদ্রিয়ান বুরাগুব্বা এক বিবৃতিতে বলেন, আমরা বছরের পর বছর ধরে আদানির কাছ থেকে বৈষম্য সহ্য করেছি, আর সহ্য করা যাচ্ছে না। তারা বলেন, গত বছর আমাদের আইনজীবীরা আদানির কর্মীদেরকে তাদের উদ্বেগজনক আচরণের জন্য নোটিশ দিয়েছেন। কিন্তু তারপরেও তারা এর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে অস্বীকার করেছেন। এক্ষেত্রে আইনি লড়াইয়ের কথা জানিয়েছেন তারা।

তবে এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হচ্ছে আদানি ইস্যুতে দিল্লির সঙ্গে সম্পর্কে কোনো প্রভাব পড়বে কি-না। যেহেতু আদানি নরেন্দ্র মোদির ঘনিষ্ঠ লোকদের একজন। এক্ষেত্রে হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, তারা আদানির বিষয়ে অবগত রয়েছে। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি কারিন জিন পিয়ের বলেন, স্পষ্টতই আমরা আদানির বিরুদ্ধে অভিযোগ সম্পর্কে সচেতন। এক্ষেত্রে বাকি কিছু জানতে হলে সবাইকে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন এবং বিচার বিভাগের কাছে যেতে  হবে। জিন পিয়েরে যোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের সম্পর্কের বিষয়ে আমরা বিশ্বাস করি যে, এই সম্পর্ক আমাদের জনগণের। বৈশ্বিক সমস্যা নিরসনে আমরা উভয়ই একটি শক্তিশালী ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে আছি।

mzamin


সাবেক সচিব মিহিরের তুঘলকি কাণ্ড by শরিফ রুবেল

মিহির কান্তি মজুমদার। আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী অনুসারী। সাবেক সচিব ও পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের চেয়ারম্যান। বরগুনা সদর আসন থেকে নৌকার মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন সাবেক এই আমলা। নৌকার মনোনয়নপত্রও তুলেছিলেন। তবে টিকিট পাননি। কর্মজীবনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার নাম মিহির কান্তি মজুমদার। চাকরি জীবনে তিনি যে প্রতিষ্ঠানে গেছেন সেই প্রতিষ্ঠানকেই ডুবিয়েছেন। লোপাট করে পথে বসিয়েছেন। তবে প্রতিষ্ঠানকে হাতিয়ার বানিয়ে নামে-বেনামে বিপুল অর্থ তছরুপ করে বিপুল বিত্তের মালিক বনে গেছেন মিহির কান্তি। শুধু নিজে নয়, ধনী বানিয়েছেন স্ত্রী- সন্তান, ভাইবোনদেরও। দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা মিহির এখন টাকার বালিশে ঘুমান। কীভাবে তার এই উত্থান? কোন উপায়ে শতকোটি টাকার মালিক হলেন মিহির। এ নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন। দুর্নীতিতে সিদ্ধহস্ত মিহির তালতলী উপজেলায় এক আতঙ্কের নাম। নিজের পদ ব্যবহার করে হাজার কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন। দুর্নীতির মাধ্যমে আয়ের টাকায় গড়েছেন বাংলো বাড়ি, একাধিক প্লট-ফ্ল্যাট, মাছের ঘের, গরুর খামার, কুমিরের খামার, একরের পর একর জমি, হাউজিং কোম্পানি আরও কতো কি। শুধু বাংলাদেশে নয়, অঢেল সম্পদ কিনেছেন ভারতেও। আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে মিহির কান্তির সম্পদ বেড়েছে স্রোতের বেগে। সরকারি চাকরি শেষে অবসরে গিয়েও তেলেসমাতি দেখিয়েছেন সাবেক এই সচিব। অল্প সময়ে তিনি একাধিক এনজিও’র শীর্ষ পদ দখল করে আলোচনায় আসেন। এনজিওতে নিজস্ব বলয় সৃষ্টি করে কৌশলে শতকোটি টাকা সরিয়ে নেন। নামে-বেনামে অপ্রয়োজনীয় নানা কাগুজে প্রকল্প সৃষ্টি করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে এনজিওগুলোকে পথে বসিয়েছেন। মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই ‘প্রোব বাংলাদেশ’ নামের একটি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান গড়ে ভারতে শতকোটি টাকা পাচারের অভিযোগ রয়েছে মিহির কান্তি মজুমদারের বিরুদ্ধে। তবে কোনো কিছুই পাত্তা দেননি মিহির। পাত্তা দেননি মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষের তদন্ত প্রতিবেদনকেও। শেখ হাসিনা সরকার পতনের পরেও মিহিরের প্রভাবের কাছে ধরাশায়ী হচ্ছে উদ্দীপন নামের একটি এনজিও। ওই এনজিও থেকে  বেআইনিভাবে নামসর্বস্ব প্রকল্প নিয়ে ৭ বছরে প্রায় ২৩৫ কোটি টাকা সরিয়ে নেয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া এনজিও কর্মীদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দিয়ে পুরো এনজিওটি দখলের পাঁয়তারা করছে মিহির কান্তি। এমন বেশ কয়েকটি মামলার কাগজ মানবজমিনের হাতে এসেছে। গত কয়েকদিনে এনজিও অফিস ও মিহির কান্তির নামে-বেনামে গড়া প্রকল্পে সরজমিন ঘুরে অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মিহির কান্তি মজুমদার তার ছোট ভাই পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি বনজ কুমার মজুমদারের ক্ষমতা ব্যবহার করে বরগুনার তালতলী উপজেলায় সাড়ে ৯ একর জমি দখলে নিয়ে মাছের ঘের করেছেন। এ ছাড়া ওই এলাকায় তাদের আরও প্রায় ২৯ একর জমি রয়েছে। ২০২৩ সালে এক বিধবা নারীর ২ একর জমি জোরপূর্বক দখল করে সেখানে ড. এমকে মজুমদার নামে স্কুল নির্মাণ করেছেন। এ ছাড়া প্রোব বাংলাদেশ নামে একটি মেডিকেয়ার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিজয় দাশ নামের একজন ভারতীয় নাগরিককে ব্যবহার করে মিহির কান্তি ভারতে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা পাচার করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া কমিশনের বিনিময়ে পল্লী সঞ্চয়ের ১৭০০ কোটি টাকা মেঘনা ও রূপালী ব্যাংকে জমা রেখে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা সুবিধা নিয়েছেন মিহির কান্তি।

যেভাবে বিঘা বিঘা জমি দখল করেন মিহির: বরগুনা জেলার তালতলী উপজেলার  সোনাকাটা ইউনিয়নের বড় নিশানবাড়িয়া মৌজার এসএ ৬২, ৭২ ও ৪০৩ দাগে ৯ একর ২০ শতাংশ জমি দখলে নেন সাবেক বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সচিব মিহির কান্তি মজুমদার, তার স্ত্রী ড. গীতা রানী ও তার ভাই বনজ কুমার মজুমদার। ওই জমির প্রকৃত মালিক মোস্তফা কামাল। তিনি বিএনপিপন্থি হওয়ায় নানা চেষ্টার পরেও জমি উদ্ধার করতে পারেননি। জমি দখলের সময় বাধা দিলে স্থানীয় সন্ত্রাসী বাহিনী সোহেল, জুয়েল, সজীব, ফারুক খান, মাসুমের নেতৃত্বে মোস্তফার ওপর হামলা করে তার হাত-পা ভেঙে দেয়া হয়। এ ছাড়াও সচিব মিহির কান্তি মজুমদার, স্ত্রী গীতা রানী, ভাই বনজ কুমার ক্ষমতার অপব্যবহার করে একই এলাকার ফুল মিয়া ও  ফরিদা বেগমের ৩ একর জমি দখল করে সেই জমিতে ড. এমকে মজুমদার নামে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া তার স্ত্রী ডা. গীতা রানী নামে নিশানবাড়িয়া মৌজায় বিপুল পরিমাণ জমি রয়েছে। এর মধ্যে ৪০ নং খতিয়ানে ৫.৩২ একর, ৭২ নং খতিয়ানে ৫.২৭ একর, ৬২ নং খতিয়ানে ২.৪৭ একর, ১৯৯ নং খতিয়ানে ২.১৩ একর, ২১৪ নং খতিয়ানে ১.২৭  একর, ৩০৬ নং খতিয়ানে ২.২০ একর। মোট ১৮.৬৬ একর জমি রয়েছে মিহির কান্তি ও তার স্ত্রীর নামে। এ ছাড়া বনজ কুমার ও তার স্ত্রীর নামে রয়েছে ৭২ নং খতিয়ানে ৩.২৭ একর, ৬২ নং খতিয়ানে ২.২০ একর, ১৯৯ নং খতিয়ানে .৮৪ একর, ৩০৬ নং খতিয়ানে ১.৪৮ একর। মোট জমি রয়েছে ৭,৭৯ একর। একই মৌজায় মিহির কান্তির পার্টনার হিসেবে জমি দখলে রয়েছেন টিপু সুলতান ও নওশের ইসলাম নামের দুই ব্যক্তি। তাদের মধ্যে টিপু সুলতানের জমি ১৪.৬৭ একর। আর নওশেরুল ইসলামের জমি ৮.৫৫ একর। এসব জমির মধ্যে ১০ একর জায়গা জুড়ে মিহির কান্তির বিশাল মাছের ঘের রয়েছে। এ ছাড়া গাজীপুর কাপাসিয়া এলাকায় বনের জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে মিহির কান্তি মজুমদারের বিরুদ্ধে।

ঢাকায় যত ফ্ল্যাট, প্লট: ঢাকা শহরের শান্তিনগর, লালমাটিয়া, মোহাম্মদপুর, সেগুনবাগিচা, ধানমণ্ডি, গুলশানে মিহির কান্তি ও তার স্ত্রী গীতা রানী মজুমদারের নামে একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে। এরমধ্যে শান্তিনগর ডিবিএল রোল কটেজে দু’টি ফ্ল্যাট রয়েছে মিহির কান্তির। ফ্ল্যাট নং ৩-এ এবং ১-৭। মোহাম্মদপুরের আদাবরে একটি বাড়ি রয়েছে। একই এলাকার খিলজী রোডে ২২০০ স্কোয়ার ফিটের একটি ফ্ল্যাট রয়েছে স্ত্রী গীতা রানীর নামে। মোহাম্মদপুর জাপান গার্ডেন সিটির বিল্ডিং নম্বর-২ তে মিহির কান্তির আরও একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া বছিলায় দু’টি ৫ কাঠার প্লট রয়েছে বলেও জানা গেছে। এ ছাড়া পিরোজপুরের চালিতাখালিতে ২০ বিঘা জমিতে মিহির একটি বাংলো বাড়ি করেছেন। বাড়িটি উদ্দীপনের মৎস্য প্রজেক্টের পাশেই। বরগুনা উপজেলার আমতলী ও তালতলী উপজেলায় মিহির কান্তির দু’টি ডুপ্লেক্স বাড়ি রয়েছে। পৈতৃক নিবাস পিরোজপুরে হলেও মিহির কান্তি বরগুনার তালতলী উপজেলাকে গ্রামের বাড়ি হিসেবে উল্লেখ করেন।  সেখানেই তিনি বসবাস করেন। ওই আসন থেকেই তিনি নৌকার টিকিট চেয়েছিলেন।

একটি এনজিও থেকে ২৩০ কোটি টাকা সরান মিহির: অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৭ সালে উদ্দীপন নামের একটি এনজিওতে যোগদানের পর থেকেই এনজিওটির কার্যপ্রণালী ও মাইক্রোক্রেডিট অথরিটির অনুমতির বাইরে গিয়ে নামে-বেনামে শত শত প্রকল্প হাতে নেন মিহির কান্তি মজুমদার। উদ্দেশ্য ছিল কৌশলে টাকা সরিয়ে নেয়া। এ কাজে তাকে সহায়তা করেন এনজিওটির সাবেক চেয়ারম্যান শহীদ হোসেন তালুকদার। মিহির কান্তির অনিয়মে এনজিওর কর্মকর্তারা বাধা দিলে কয়েক জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়। অল্প দিনেই নিজস্ব বলয় সৃষ্টি করে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে মিহির কান্তি মজুমদারের বিরুদ্ধে। নামসর্বস্ব প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে উদ্দীপন এনার্জি (ইউইএল) ও উদ্দীপন রিনিউয়াল এনার্জি (ইউআরইএল), সোলার ইরিগেশন, রংপুর গোল্ড ব্রিকস ইটভাটা ক্রয়, ভাকুর্তা-১ ও ২ প্রকল্প, যশোর নার্সারি, ভালুকায় রেপটাইলস কুমিরের খামার ক্রয়, চালিতাখালী কৃষি প্রকল্প, এ অ্যান্ড পি ব্যাটারি কোম্পানি, সীডস বল প্রজেক্ট, সিমুলেশন টেক ল্যাব, ভাকুর্তা মিল্ক প্রসেসিং, উদ্দীপন এগ্রো লিমিটেড, উদ্দীপন টিভি, উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছ চাষ, কৃষি পাঠশালা, প্রাণিসম্পদ ব্যাংক, পাখি পল্লী সৃজন, কল সেন্টার, নারী ফার্মেসি, ভাসমান কৃষি, আমাদের গ্রাম ক্যান্সার হাসপাতাল, পল্লী এম্বুলেন্স, কচুরিপানা প্রজেক্ট, মেঘনা ব্যাংকে ৬০ কোটি টাকা বিনিয়োগ, রূপগঞ্জ প্রজেক্ট, বিউটি পার্লার, কল সেন্টার, ক্রিম অ্যান্ড ক্রিস্ট সুইটস, নার্সিং ইনস্টিটিউট, ইউআরইল প্রজেক্ট হাসপাতাল, হিসাব অ্যাপ, গ্রাম বাংলা সিস্টেম, স্বাস্থ্য আপা, হেলথ বক্স, স্বাস্থ্য কার্ড, প্রোব বাংলাদেশ, যানবাহন ও ক্লাউড ডাটাবেজ। এসব প্রকল্পের আড়ালে মিহির কান্তি মজুমদার প্রায় ৪০৬ কোটি টাকা ব্যয় করেছেন। যার মধ্যে ২৩০ কোটি টাকাই বিভিন্ন অনিয়ম করে হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। এমনকি মাইক্রোক্রেডিট অথরিটিও তাদের অনুসন্ধানে এসব অনিয়মের তথ্য সংবলিত প্রতিবেদন দিয়েছে। এ ছাড়া পিকেএসএফ ও মাইক্রোক্রেডিট অথরিটির অডিট রিপোর্ট ও অর্থ আত্মসাতের সমস্ত দলিলাদি মানবজমিনের হাতে সংরক্ষিত আছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উদ্দীপনের এক কর্মকর্তা মানবজমিনকে বলেন, সাবেক চেয়ারম্যান মিহির কান্তি এমন কিছু প্রকল্প নিয়েছেন যা উদ্দীপনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এম আর এ বারবার সতর্ক করার পরেও তিনি কিছু বেআইনি প্রকল্প নিয়েছেন। তিনি কারও কথা শোনেননি। তিনি প্রতিটি প্রকল্পে ৫ টাকা খরচ হলে ১০ টাকা তুলে নিয়েছেন। যার কোনো হিসাব উদ্দীপনকে আজও দেননি। যেমন ভাকুর্তা-১ ও ভাকুর্তা-২, রূপগঞ্জ প্রকল্পে জমি ক্রয়ে সর্বোচ্চ ৪ কোটি টাকা লাগার কথা। কিন্তু তিনি ৯ কোটি টাকা দেখিয়েছেন। ভাকুর্তায় জমি ক্রয় ও মিল্ক প্রসেসিং এবং গেস্ট হাউস নির্মাণে ৫ কোটি টাকা খরচ করা হয়। রূপগঞ্জ প্রকল্পে প্রায় ২ কোটি টাকা ব্যয় করে একটি বিল্ডিং ডেকোরেশন করা হয়। কচুরিপানা কাটার জন্য অতিরিক্ত দামে মেশিন ক্রয় করা হয়। ৯ কোটি টাকা খরচ করে রংপুরের মিঠাপুকুরে গোল্ড ব্রিকস নামে একটি ইটভাটা ক্রয় করা হয়। এই ইটভাটা ২ কোটির বেশি হবে না। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা এ বিষয়ে প্রতিবেদনও দিয়েছে। এ ছাড়া ভালুকায় কুমিরের খামারের নিলাম মূল্য উঠেছিল ২৩ কোটি তিনি ৪৩ কোটি টাকা দিয়ে কিনেছেন। কারণ মিহির কান্তির সঙ্গে পিকে হালদারের বন্ধুত্ব ছিল। তার মাধ্যমে আঁতাত করেই চড়া দামে এই খামার কেনা হয়েছে। চালিতাখালী কৃষি প্রকল্পে স্থানীয় বাজার মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যে ৩ কোটি ৫ লাখ টাকায় জমি কেনা হয়। ওই জমির দাম ১ কোটি টাকাও হবে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উদ্দীপনের একজন জোনাল ম্যানেজার মানবজমিনকে বলেন, হেলথ বক্স, স্বাস্থ্য কার্ড, প্রোব বাংলাদেশ, জোন পর্যায়ে ল্যাব প্রতিষ্ঠা করে প্রায় ২৫ কোটি টাকা সরিয়ে নেয়া হয়। এ ছাড়া এনজিওর জন্য একটি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করে হিসাব নামের একটি অ্যাপের মাধ্যমে ১৮ মাসে ১৫ কোটি টাকা সরিয়ে নেয়া হয়। অথচ এই অ্যাপ উদ্দীপনের এক পয়সারও কাজে আসেনি। কেউ কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে শাস্তির মুখে পড়তে হয়েছে। এই অনিয়ম নিয়ে এমআরএ তদন্ত করে মিহির কান্তির বিরুদ্ধে প্রতিবেদন দিয়েছে। সে এর কোনো সঠিক জবাব দিতে পারেনি। চেয়ারম্যানের পদ গেলেও তিনি আবার ফিরে আসার চেষ্টা করছেন। ফিরে আসলে আর উদ্দীপন থাকবে না। ২০১৭ সাল থেকে ’২৩ সাল পর্যন্ত তিনি শত শত কোটি টাকা সরিয়েছেন। উদ্দীপনের কেউ কিছু বলার সাহস পাননি।

প্রোব বাংলাদেশের মাধ্যমে টাকা পাচার: মিহির কান্তি মজুমদার ক্ষমতার অপব্যবহার করে হেলথ কমসূচি পার্টনার ভারতীয় কোম্পানি প্রোবের সঙ্গে একটি অসম চুক্তি করেন। এই প্রকল্পের মাধ্যমে ভারতীয় নাগরিক বিজয় দাসের মাধ্যমে ভারতে প্রায় ৩০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ রয়েছে।  প্রোবের হেলথ প্যাকেজে উদ্দীপনের পুরো টাকায় লস হয়েছে বলে জানিয়েছেন বোর্ড সদস্যরা।  এ ছাড়া এই বিজয় কুমারকে উদ্দীপনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দেড় বছর ধরে বিনা ভাড়ায় বসবাসের সুযোগ করে দিয়েছে মিহির কান্তি ও প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক বিদ্যুৎ কুমার বসু। তবে উদ্দীপনের পক্ষ থেকে একাধিকবার নোটিশ দিয়েও বিজয় কুমারকে কার্যালয় থেকে সরানো যায়নি।  

এমআরএ তদন্তে যা বেরিয়ে আসে: এদিকে মিহির কান্তি মজুমদারের স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ তছরুপের কারণে ডুবতে বসা উদ্দীপনকে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি। তাদের প্রাথমিক তদন্তেও বিপুল পরিমাণ অর্থ লোপাটের তথ্য উঠে আসে। পরে গ্রাহক স্বার্থ সংরক্ষণসহ প্রতিষ্ঠানের সার্বিক উন্নয়নে সহযোগিতার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানের সাধারণ ও পরিচালনা পর্ষদের সভায় অথরিটির পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল মান্নানকে ১ বছরের জন্য পর্যবেক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়।
যেভাবে ব্যাংক থেকে টাকা হাতিয়ে নেন: ২০১৮ সালে উচ্চ আদালতের নিষেধ থাকা সত্ত্বেও পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকে প্রায় ১৪৯ জনকে রাতের আঁধারে অবৈধভাবে সিনিয়র অফিসার পদে নিয়োগ দেয়া হয়। এমনকি তারা তড়িঘড়ি করে তাদেরকে বিভিন্ন উপজেলায় পদায়ন দেয়া হয়। এ ছাড়া পুরনো কর্মীদের বাদ দিয়ে নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে ব্যাংকটিতে ৪৮৫ জন ক্যাশ সহকারী নিয়োগ দেয়া হয়। নিয়োগে প্রক্রিয়ার ব্যাপক ঘুষ লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়। এদিকে ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠান  উদ্দীপনের দেয়া তথ্য বলছে, উদ্দীপনের পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত ছাড়া ২০২১-২২ অর্থ বছরে ১১৪ কোটি, ২০২২-২৩ অর্থ বছরে ৩৭ কোটি, জুন ২০২৩ বছরে ১০৪ কোটি টাকা। এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১২৩ কোটি টাকাসহ মোট ৩৭৮ কোটি টাকা রিশিডিউল করা হয়। এদিকে রিশিডিউল করে সংস্থায় ভুয়া লাভ দেখানোয় এনজিওটির মারাত্মক অর্থ ঝুঁকি ও সংকটে পড়ে। উদ্দীপনের দেয়া তথ্য বলছে, এনজিওটির নিয়োগ প্রতিক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি করেছেন মিহির কান্তি মজুমদার। নিজের পছন্দমতো কর্মী নিয়োগ ও পরিচিত ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ঋণ নিয়ে তা আর ফেরত দেনননি এমন অভিযোগও রয়েছে। এতে সাম্প্রতিক সময়ে উদ্দীপন ব্যাপক আর্থিক সংকটে ভুগছে।

স্বাস্থ্য কার্ড মিহিরের টাকা লোপাটের ট্রাম্পকার্ড: ২০২০ সালে বড় অশুভ পরিকল্পনা করেন মিহির কান্তি। ঋণ বিতরণের সময় উদ্দীপনের সারা দেশের লক্ষাধিক গ্রাহকের কাছ থেকে স্বাস্থ্যকার্ড বাবদ ১ হাজার ২০০ টাকা কেটে নেয়া হয়। এমআরটির নিয়মের বাইরে গিয়ে জোরপূর্বক এই প্রকল্প চালু করেন মিহির কান্তি। পরে এই প্রকল্পের মাধ্যমে ৩ বছরে গ্রাহকের কাছ থেকে প্রায় ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকা আদায় করে কৌশলে তা সরিয়ে নেয়া হয়।

যা বলছেন মিহির কান্তি মজুমদার: অভিযোগের বিষয়ে তিনি মানবজমিনকে বলেন, এমআরএ কি প্রতিবেদন দিয়েছে তা আমার জানা নেই। তবে আমি ব্যক্তিগভাবে কোনো প্রকল্প নেইনি। প্রতিটি প্রকল্প বোর্ডের অনুমতি সাপেক্ষে নেয়া হয়েছে। বোর্ড মিটিংয়ে যে সিদ্ধান্ত হয়েছে তা গৃহীত হয়েছে। আমার একার সিদ্ধান্তে কোনো প্রকল্প নেয়ার সুযোগ নেই। আর আমি এনজিও’র কেউ না। পরিচালনা বোর্ড যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আমি শুধুমাত্র তাতে স্বাক্ষর করেছি। এখানে অর্থ লোপাটের মতো কিছু ঘটেনি। উদ্দীপনের প্রকল্প এখনো দৃশ্যমান রয়েছে। তাদের সম্পদ তাদেরই রয়ে গেছে। আমি তাদের কোনো সম্পদ সরিয়ে নেইনি। এটা নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। যত অভিযোগ এসেছে সব মিথ্যা।

mzamin


গুলিতে বাবার মৃত্যু, জিদনীর সামনে অনিশ্চিত জীবন by ফাহিমা আক্তার সুমি

দর্জির কাজ করতেন জাকির হোসেন। ১৯শে জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পাঁচদিন পর মারা যান তিনি। তার পেটে গুলিটি বিদ্ধ হয়। জাকিরের গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর দশমিনায়। তিনি ঢাকার কামরাঙ্গীরচরে ভাড়া থাকতেন। সেখানে একটি কাপড়ের কারখানায় দর্জির কাজ করতেন। তিনি ছিলেন পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। স্বামীকে হারিয়ে দিশাহারা জাকিরের স্ত্রী। ভেঙে পড়েছেন একমাত্র সন্তান। সবসময় বাবার কথা বলে আর কাঁদতে থাকে। অল্প বয়সে বাবাকে হারিয়ে তার জীবন হয়ে পড়েছে অনিশ্চিত।

জাকিরের স্ত্রী ছালমা বেগম মানবজমিনকে বলেন, আমার একমাত্র মেয়ে জিদনী। সে সবেমাত্র সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চালাকালীন সময়ে গত ১৯শে জুলাই গুলিবিদ্ধ হয় ওর বাবা। সে ঘটনার দিন সকালে রায়েরবাগ বোনকে দেখতে তার বাসায় যায়। কামরাঙ্গীরচরে একটি কাপড়ের কারখানায় দর্জির কাজ শুরু করেছিল। শুক্রবার ঘটনাটি ঘটার আগে সোমবার বাড়িতে এসেছিল। ছোটবেলা থেকেই ঢাকায় থাকে। আগে মানুষের কাছে কাজ শিখে নিজে কাজ করতো। তারা আগে থেকেই খুব অভাবী ছিল। বাবা মানুষের বাড়িতে কাজ করতেন। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সে ছিল তৃতীয়। একমাত্র সন্তানকে নিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছি। এখন নিজের কাজ করতে হয়। ওর বাবার একার আয়ে আমাদের সংসার চলতো। সারা জীবনের জন্য বাবার ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হলো আমার মেয়েটি।

তিনি বলেন, স্বামী না থাকলে একজন নারীর জীবন কঠিন হয়ে যায়। বাবাহারা সন্তানের কতো কষ্ট, কতো আহাজারি সেটি শুধু সেই সন্তানই জানে। সে থাকলে তার কাছে আমাদের মা-মেয়ের সব আবদার থাকতো। এখন আমাদের আর কেউ নেই। প্রতি মাসে সে কাজ করে দশ হাজার টাকার মতো পাঠাতো সেটি দিয়ে মোটামুটি সংসার চলতো। মেয়েটাকে অনেক ভালোবাসতো। আমারও বাবা নেই, মা নেই। ছোটবেলায় মারা গেছেন। এখন আমি কোথায় যাবো? ছোটবেলা থেকে কষ্ট করছি, ভেবেছিলাম বিয়ের পর কষ্ট দূর হবে, হয়েছিল কিন্তু টিকেনি বেশিদিন। ওর বাবা থাকলে আমাদের জীবনে কোনো চিন্তা ছিল না।

ছালমা বেগম বলেন, ঘটনার দিন যখন আহত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যায় তখন আমাকে ফোনে জানায় পাশে থাকা শিক্ষার্থীরা। সেদিন সকালে তার সঙ্গে আমার মোবাইলে কথা হয়। তাকে বাইরে যেতে নিষেধ করেছিলাম। ওইটাই ছিল তার সঙ্গে আমার শেষ কথা। সে সময় পুরো কারফিউ চলছিল দেশে। শুক্রবার গুলিবিদ্ধ হয় আর আমি তার কাছে যেতে পারি মঙ্গলবার। গিয়ে দেখি হাসপাতালের বেডে শুয়ে কথা বলছে। আমার ও মেয়ের জন্য হয়তো বেঁচেছিল ততক্ষণ। ঘটনার দিন তিনটা বাজে গুলি লেগেছিল আর পরের দিন চারটা বাজে অপারেশন হয় তার। হাসপাতালের বেডে শুয়ে মেয়েটাকে দেখামাত্রই বুকে টেনে নিয়েছিল। মেয়েকে দেখেই ওর বাবা বলেছিল, ‘আম্মু তুমি ভালো আছো?’ বরিশাল থেকে ঢাকায় যাওয়ার পথে পদে পদে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে, অনেক ঝুঁকি ছিল। পাঁচটা দিন একটুও ঘুম ছিল না আমার স্বামীর চোখে, ক্ষত স্থানের যন্ত্রণায় ছটফট করছিল। পেটের নিচের দিকে গুলি লাগে। পরে ঢামেকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বুধবার রাতে মারা যায়। গ্রামে নিয়ে তার লাশ দাফন করা হয়। সে কখনো তার মেয়েটির সঙ্গে উচ্চস্বরে কথা বলতো না। তার লেখাপড়ার জন্য কোনো কিছুর অভাব বুঝতে দিতো না। মেয়ে যত বড় হবে তত তার বাবার অভাব বুঝবে। যখন সবার বাবাকে দেখবে তখন তার মুখটা কালো হয়ে যাবে।  ওর বাবার মৃত্যুর পরে অনেক নীরব হয়ে গেছে, কম কথা বলে। বাবার প্রাণ ছিল সে।

তিনি আরও বলেন, আমাদের বাড়িতে শুধু ভিটে আছে- কোনো জমি নেই। একটা ঘর তৈরি শুরু করেছিল সেটিও শেষ হয়নি পুরোপুরি। যে মারা গেছে তাকে তো আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। এখন মেয়েটাকে নিয়ে আমার যত চিন্তা। আমার মেয়েটাকে অনেক পড়াশোনা করাতে চাই, পড়াশোনা শেষে তার একটা ভালো চাকরি হবে একদিন। আমি মা আমার সবটা দিয়ে বড় করতে চাই, ভবিষ্যতে সেই আমাকে দেখে রাখবে। আমার একটা কাজের ব্যবস্থা হলে মেয়েটিকে ভালোভাবে মানুষ করতে পারতাম। সবেমাত্র সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে; এখন যদি শিখাতে না পারি তাহলে ভালো কিছু করতে পারবে না। আমি ছোটবেলা থেকে যত কষ্ট করে বড় হয়েছি আমি চাই না আমার সন্তান কষ্ট করুক।  

mzamin

অটোচালকদের অবরোধ, সংঘর্ষ

ঢাকা মহানগর এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল বন্ধে হাইকোর্টের দেয়া নির্দেশের প্রতিবাদে রাজধানীর জুরাইন এলাকায় দ্বিতীয় দিনের মতো বিক্ষোভ করেছেন ব্যাটারিচালিত  রিকশাচালকরা। গতকাল সকাল ১১টায় জুরাইন রেল গেইট এলাকায় অবস্থান নিয়ে অবরোধ শুরু করেন তারা। তাদের বোঝাতে গেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ধাওয়া দেয় বিক্ষুব্ধ রিকশাচালকরা। দিনভর রেলগেট অবরোধ করে রাখায় ঢাকা থেকে নারয়ণগঞ্জ ও দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের রেল চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা।

গত ১৯শে নভেম্বর দায়ের করা রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ঢাকা মহানগর এলাকায় তিন দিনের মধ্যে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল বন্ধের নির্দেশ দেন বিচারপতি ফাতেমা নজীব ও বিচারপতি মাহমুদুর রাজীর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ। একই সঙ্গে স্বরাষ্ট্র সচিব, স্থানীয় সরকার সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্টদের আদালতের এ আদেশ বাস্তবায়ন করতে বলা হয়। এতে ক্ষুব্ধ হন অটোরিকশা চালকরা। হাইকোর্টের রায়ের প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার রাজধানীর মহাখালী, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, জুরাইনসহ বিভিন্ন এলাকার সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। বৃহস্পতিবার দিনভর বিক্ষোভের পর শুক্রবারও রাজধানীর জুরাইন এলাকার রাস্তায় নেমে আসেন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালকরা। সকাল ১১টায় জুরাইন বাজার এলাকায় সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন কয়েক শ’ অটোরিকশা চালক। এ সময় এলাকাটির যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বেলা ১২টার দিকে এলাকাটিতে আসা পুলিশের গাড়ি ঘিরেও বিক্ষোভ করে অটোরিকশা চালকরা। তাদের তোপের মুখে পুলিশ ভ্যান নিয়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়। এরপর জুরাইন রেলগেটে গিয়ে রেললাইনে অবস্থান নিয়ে রেল চলাচল বন্ধ করে দেয় অটোরিকশা চালকরা। তাদেরকে বোঝাতে গেলে পুলিশ সদস্যদেরকেও ধাওয়া দিয়ে সরিয়ে দেয় তারা। উভয় গ্রুপের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় পুরো এলাকায় দিনভর আতঙ্ক বিরাজ করে। সাধারণ মানুষ তাদের দোকানপাট বন্ধ করে দেয়। চার ঘণ্টা যাবৎ রেললাইন অবরোধের জেরে জুরাইন রেলস্টেশনে আটকে পড়ে নারায়ণগঞ্জ কমিউটার। অন্যদিকে অবরোধের কারণে কমলাপুরের শহরতলী স্টেশনে আটকা পড়ে খুলনাগামী নকশিকাঁথা কমিউটার ট্রেন। পরে পুলিশ কয়েক রাউন্ড টিয়ারশেল ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বিকাল ৩টায় অটোরিকশা চালকরা রাস্তা ছেড়ে দিলে সড়কে যান চলাচল শুরু হয়। চালু করা হয় ট্রেন চলাচলও। বিক্ষোভে যোগ  দেয়া মো. হাসান নামে এক রিকশাচালক বলেন, আমরা কেউ ঋণ নিয়ে একেক জন এই রিকশা কিনেছি। কেউ মহাজনের কাছ থেকে ভাড়া নিয়ে রিকশা চালাই। সকলেই আমরা পেটের দায়ে এই অটোরিকশা নিয়ে বের হই। কিন্তু রিকশা নিয়ে সড়কে উঠলেই আমাদের ব্যাটারি খুলে নিয়ে নেয়া হয়। তার কেটে দেয়া হয়। কখনো কখনো রাস্তার উপরে রিকশা উল্টো করে রেখে দেয়া হয়। আমাদের সঙ্গে খুব খারাপ আচরণ করে ট্রাফিকের দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা। এরপর এখন পুরোপুরি আমাদের এই অটোরিকশা চলাচল বন্ধ করে দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এই রিকশা যদি চালাতে না পারি তাহলে আমরা খাবো কী? বউ-বাচ্চা নিয়ে কোথায় যাবো? তাই আমাদের দাবি আমাদের এই অটোরিকশা চলাচল যেনো বন্ধ করা না হয়। জুয়েল নামে আরেক ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালক বলেন, আমরা তো চুরি-ছিনতাই করছি না। আমরা তো কারোর কাছে হাত পাতছি না। চেয়ে খাচ্ছি না। আমরা কাজ করে খাই। আর আমাদের এই রুটি-রুজি যার মাধ্যমে আসে সেই অটোরিকশাই বন্ধ করে দেয়ার পাঁয়তারা চলছে। আমাদের পেটে লাথি মারা হচ্ছে। আমরা এই ঘোষণা কখনোই মানি না। দুইদিন পর না খেয়ে মরে যাওয়ার চেয়ে নিজের দাবি নিয়ে রাস্তায় মরে যাওয়া ভালো। তাই হয় আমাদের রিকশা চালাতে দিতে হবে; না হয় আমাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে।  

এদিকে ট্রেন চলাচল বন্ধের বিষয়টি নিশ্চিত করে কমলাপুর স্টেশন মাস্টার আনোয়ার হোসেন বলেন, জুরাইনে রেললাইন অবরোধের কারণে শুক্রবার দুপুর পৌনে ১২টার দিকে জুরাইন রেলস্টেশনে নারায়ণগঞ্জ কমিউটার আটকা পড়ে। একই কারণে খুলনাগামী নকশিকাঁথা কমিউটার ট্রেনটি কমলাপুরের শহরতলি স্টেশন থেকে ছেড়ে যেতে পারেনি। এতে করে ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের ফরিদপুর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনাগামী ছাড়াও ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জের রেল চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ ৪ ঘণ্টা পর বিকাল ৩টা থেকে পুনরায় ট্রেন চলাচল শুরু হয়।  

বিক্ষোভের বিষয়ে জুরাইন এলাকায় দায়িত্ব পালন করা শ্যামপুর থানার উপ-পরিদর্শক নাজমুন নাহার বলেন, শুক্রবার সকাল থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকরা জুরাইন এলাকায় রেললাইন দখল করে অবরোধ কর্মসূচি পালন করে। তারা রেললাইনে অবস্থান নিয়ে ট্রেন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হস্তক্ষেপে বিকাল তিনটায় তারা রাস্তা ছেড়ে দেয়।

mzamin

চট্টগ্রামে ‘তারুণ্যের গণসমাবেশ’ অন্তর্বর্তী সরকারকে আরও দু-এক বছর দেখতে চান নুরুল হক

ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে আরও দু-এক বছর দেখতে চান গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর। তবে সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, ‘আপনারা ভালো কাজ করবেন, আমাদের সমর্থন পাবেন। গণবিরোধী কর্মকাণ্ড করলে এক সেকেন্ডও সময় নেব না আপনাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে।’

আজ শুক্রবার চট্টগ্রাম নগরের লালদিঘি মাঠে আয়োজিত গণসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক। ‘তারুণ্যের গণসমাবেশ’ শিরোনামে এ সমাবেশের আয়োজন করে গণ অধিকার পরিষদ (জিওপি)। এতে গণ অধিকার, যুব অধিকার, ছাত্র অধিকার ও শ্রমিক অধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

সংস্কার ছাড়া কোনো নির্বাচন হবে না উল্লেখ করে নুরুল হক বলেন, ‘শুধু একটি নির্বাচনের জন্য কিংবা কাউকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য ছাত্র–জনতা জীবন দেয়নি। কাজেই নির্বাচন নিয়ে, ক্ষমতায় যাওয়া নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে অস্থির না হওয়ার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি। কোনো রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে বা চাপে ছাত্র-জনতা এই গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেয়নি। রাজনৈতিক দলের নেতাদের আমরা ৫৩ বছর দেখেছি। আমরা আরও দু-এক বছর ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে দেখতে চাই।’

এর আগে বেলা আড়াইটা থেকে লালদিঘি ময়দানে গণ অধিকার পরিষদ ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা জড়ো হতে থাকেন। এ সময় তাঁরা গণ অধিকারের সমর্থনে বিভিন্ন স্লোগান দেন।

অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতায় থাকার প্রশ্নে ‘ব্ল্যাংক চেক’ দেওয়া হবে না বলে উল্লেখ করে নুরুল হক নুর বলেন, ‘আমরা আপনাদের কাজকর্ম দেখে অটোরিনিউয়াল (স্বয়ংক্রিয় বৃদ্ধি) সময় দেব।’ ৫৩ বছর পর সুযোগ এসেছে উল্লেখ করে নুরুল হক বলেন, ‘হেলাফেলায় সুযোগ নষ্ট করা যাবে না। রাতারাতি নির্বাচন হলে এই ব্যবস্থার পরিবর্তন হবে না। গণ-অভ্যুত্থানে যারা নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে, সেই ফ্যাসিবাদের পুনর্বাসনের জন্য কোনো কোনো রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে স্পেস (সুযোগ) দেওয়ার কথা বলছে। আমরা ক্ষমতায় বসতে জীবন দিই নাই। আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন ঠেকাতে যদি প্রতিরোধের ডাক দিতে হয়, এই চট্টগ্রামের মাটি থেকে সে ডাক দেওয়া হবে।’

আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে জানিয়ে নুরুল হক বলেন, ‘আমরা আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধের দাবিতে প্রয়োজনে ঢাকায় মহাসমাবেশ করব, আপনারা প্রস্তুতি নিন।’

আওয়ামী লীগের প্রশ্নে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না জানিয়ে নুরুল হক বলেন, ‘আমরা শান্তি এবং সম্প্রীতির নতুন রাজনৈতিক পরিবেশ গড়তে চাই। তাই বলে আমার ভাইয়ের রক্তে যাদের হাত লাল হয়েছে, তাদের সঙ্গে হ্যান্ডশেক (হাত মেলানো) করব না। এত তাড়াতাড়ি এই নৃশংসতার স্মৃতি ভুলে যেতে পারব না। সব রাজনৈতিক দলগুলোকে বিনয়ের সঙ্গে অনুরোধ জানাব, যার যার রাজনীতি করুন। আওয়ামী লীগের প্রশ্নে আপনাদের পরিষ্কার করুন।’

সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন গণ অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান। সভাপতিত্ব করেন পরিষদের চট্টগ্রাম নগর শাখার সভাপতি মো. শাহ আলম। সঞ্চালনা করেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি মো. রবিউল ইসলাম ও দক্ষিণ জেলা গণ অধিকার পরিষদের সদস্যসচিব আরিফুল হক।

গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক ‘তারুণ্যের গণসমাবেশে’ বক্তব্য দেন। লালদিঘি, চট্টগ্রাম, ২২ নভেম্বর
গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক ‘তারুণ্যের গণসমাবেশে’ বক্তব্য দেন। লালদিঘি, চট্টগ্রাম, ২২ নভেম্বর। ছবি: জুয়েল শীল