Friday, November 1, 2013

সরল গরল- সমঝোতা চাইলে ফোনগেট বাধা নয় by মিজানুর রহমান খান

ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারিতে নিক্সন বিদায় নিয়েছিলেন। স্কাইপগেটে একজন বিচারপতি সরে দাঁড়িয়েছিলেন। দুই নেত্রী অবশ্য রীতিমতো দেশবাসীকে জানান দিয়ে ফোনালাপ করেছিলেন।

অরণ্যে রোদন- নেতাদের কাছে আকুল আবেদন by আনিসুল হক

কী কী ঘটতে পারে আগামী কয়েক দিনে? কেউ জানে না। এই প্রশ্নের উত্তর কারও কাছে নেই। ছয় মাস আগে যদি কোনো মন্ত্রীকে পেয়ে কোনো সাংবাদিক জিজ্ঞেস করতেন, কী হবে, জানেন কিছু?

খোলা চোখে- নির্বাচন, তারপর কী? by হাসান ফেরদৌস

বাংলাদেশে এখন আলোচনার একটাই বিষয়—রাজনীতি। পত্রপত্রিকা, টিভি বা ইন্টারনেট যা-ই বলুন—সবখানেই আলোচনা ঘুরেফিরে ওই এক বিষয়েই, তাও মুখ্যত নির্বাচন যথাসময়ে হবে কি না, আর হলে তাতে জিত হবে কার।

নির্বাচন- গণতন্ত্রের দাম কত? by এ কে এম জাকারিয়া

গণতন্ত্র সব বিবেচনাতেই দামি জিনিস। খ্রিষ্টপূর্ব তিন থেকে চার শ বছর আগে গ্রিক নগররাষ্ট্রে যে ‘গণতন্ত্রের’ শুরু, তাকে যতটা পথ পাড়ি দিতে হয়েছে, শুধু সময়ের হিসাব করলেই তা মহামূল্যবান।

রাজনীতি- রহস্যাবৃত পালাবদলের পালা! by মলয় ভৌমিক

তবে কি সাধারণ মানুষ রহস্যাবৃতই থেকে যাবে? একদিকে মানুষের জীবন যাচ্ছে, চলছে নজিরবিহীন পরিকল্পিত উগ্র সহিংসতা, অন্যদিকে পালাবদল নিয়ে বিস্তৃত হচ্ছে রহস্যের জাল।

রাষ্ট্র ও রাজনীতি- নিজের মঙ্গল নিজেকেই বুঝতে হবে by আবদুল মান্নান

দেশে এখন ক্ষমতার জন্য একরকম মরণপণ যুদ্ধ চলছে। খালেদা জিয়া তাঁর নেতৃত্বাধীন ১৮-দলীয় জোট নিয়ে সামনের নির্বাচনে যেকোনো উপায়ে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য মরিয়া।

গল্প- কবরস্থান by এলিনোর ক্যাটোন >অনুবাদ: ফাতেমা আবেদীন

‘মগের ভেতরে কফির দাগগুলো দ্যাখো’, বলে উঠল শ্যারন। ‘এটা দেখতে অনেকটা আবহাওয়া ম্যাপের মতো। দিন-ঘণ্টা, সপ্তাহ, বছর—সব আঁকা আছে। এই জায়গা আমাকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে।’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর- নোবেলজয়ের শতবর্ষ by জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেলপ্রাপ্তির শতবর্ষ পূর্ণ হচ্ছে এ বছরের ১০ নভেম্বর। গীতাঞ্জলি কাব্যের জন্য তিনি বয়ে এনেছিলেন এই দুর্লভ সম্মান।

সাক্ষাৎকার- ‘সাহিত্যে প্রতিযোগিতার কোনো স্থান নেই’ —এলিনোর ক্যাটোন

২০১৩ সালের ম্যান বুকার পুরস্কার পেয়েছেন নিউজিল্যান্ডের তরুণ লেখক এলিনোর ক্যাটোন। পুরস্কার ঘোষণার কিছুদিন আগে দ্য নিউজিল্যান্ড হেরাল্ড পত্রিকার জন্য তাঁর এই সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন সারাহ স্টুয়ার্ট সারাহ।

চারু শিল্প- নৈঃশব্দ্যের ছবি by মোবাশ্বির আলাম মজুমদার

অলিয়ঁস ফ্রসেজের গ্যালারি জুমের স্বল্প পরিসরে ১৫টি ছবি আমাদের দেখাল বিষয়-বৈচিত্র্যের আলোকচ্ছটা। প্রদর্শনীর শিরোনাম ‘দ্য সাইলেন্ট ওয়ার্ড’।

পদ্মাপারের টুকরো স্মৃতি by ফরহাদ খান

রাজশাহী শহরের সঙ্গে সম্পর্ক প্রায় ৫০ বছর হয়ে গেল। এক জীবনে অর্ধশত বছরের স্মৃতি কম নয়। ‘পদ্মাপ্রবাহচুম্বিত’ রাজশাহী শান্ত শহর।

স্মার্টফোনটি ভালো থাক by মো. কামাল হোসেন

স্মার্টফোনে কল করা ছাড়াও ইন্টারনেটসহ নানা কিছু করা যায়। এর পর্দা ছুঁয়ে ছুঁয়ে কাজ করতে হয়। তাই এ যন্ত্রটি ভালো রাখতে চাইলেচাই আলাদা যত্ন।

এক দেশে একদিন... by মুহাম্মদ রিয়াজুল আমীন

সকাল ১০টা। দেশের সরকারপ্রধান চিন্তিত মুখে তাঁর অফিসে বসে আছেন। তাঁর কপালে সূক্ষ্ম ভাঁজ। সকালেই তিনি খবর পেয়েছেন, সরকারের সবচেয়ে গোপন ভল্টে রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোর একটি চুরি গিয়েছে।

ডাকাতির অস্ত্রে বখতিয়ার খুন by নূরুজ্জামান

যে অস্ত্র দিয়ে ডাকাতরা বখতিয়ারকে খুন করেছিল, ওই অস্ত্রটিও ছিল ডাকাতির। তিন বছর আগে কদমতলী থানাধীন হাজী জালাল উদ্দিনের বাড়িতে হানা দিয়ে একটি বন্দুক ও একটি রিভলবার লুট করেছিল ডাকাত দল।

শুটিং শুরুর আগেই তিন চলচ্চিত্রে মিষ্টি

মডেলিং, উপস্থাপনার পর চলচ্চিত্রে নাম লেখাতে না লেখাতেই রীতিমতো চিত্রনায়িকা বনে যাচ্ছেন মিষ্টি জান্নাত।

বিবাদ নিরসনে শান্তিপূর্ণ সমঝোতা

সমাজে শান্তিশৃঙ্খলা, সুখ-সমৃদ্ধি, ঐক্য-সম্প্রীতি, সাম্য-মৈত্রী ও ভ্রাতৃত্বের নিদর্শনস্বরূপ মানুষের মধ্যে স্নেহ-মায়া-মমতা, শ্রদ্ধাবোধ, সহানুভূতি, ধৈর্য-সহনশীলতা, সততা, বিশ্বস্ততা, সংবেদনশীলতা প্রভৃতি সামাজিক গুণ অবশ্যই থাকা উচিত। সেখানে থাকতে পারে না কোনো প্রকার দ্বন্দ্ব-কলহ, ঝগড়া-বিবাদ, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, গোলমাল-হানাহানি, সংঘাত-সংঘর্ষ, ফিতনা-ফ্যাসাদ, সহিংসতা-উগ্রতা, হিংসা-বিদ্বেষ, অনিষ্ট ও অকল্যাণের অশুভ লক্ষণ। মানবসমাজে বিপর্যয় সৃষ্টিকারী কার্যকলাপকে ইসলাম সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছে।
পবিত্র কোরআনে নিষেধবাণী ঘোষিত হয়েছে, ‘পৃথিবীতে শান্তি স্থাপনের পর এতে তোমরা বিপর্যয় ঘটাবে না।’ (সূরা আল-আরাফ, আয়াত: ৫৬) কলহ-বিবাদ ও ফিতনা-ফ্যাসাদ সামাজিক অনাচার ও অত্যাচারের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য। দ্বন্দ্ব-কলহ মানুষের জীবনে অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা ঘটায়। মানবতার ঐক্য ও সংহতিতে ভাঙন সৃষ্টি করে সেখানে বিভেদ, অনৈক্য ও বিভক্তি নিয়ে আসে। ফিতনা-ফ্যাসাদের ফলে পরস্পরের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ, শত্রুতা ও হিংস্রতা সৃষ্টি হয়। অনেক সময় সামান্য তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে মারাত্মক ঝগড়া-বিবাদ ঘটে এবং তা বড় আকার বিশৃঙ্খলা ধারণ করে মানবসমাজে হত্যাকাণ্ডের ন্যায় পাপাচার সংঘটিত হয়ে থাকে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘ফিতনা হত্যা অপেক্ষা গুরুতর।’ (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৯১) ঝগড়া-বিবাদ, ফিতনা-ফ্যাসাদের কারণে সমাজে পরচর্চা, পরনিন্দা, কুৎসা রটনা, ঠাট্টা-বিদ্রূপ, হিংসা-বিদ্বেষ, অপবাদ, মিথ্যা দোষারোপ প্রভৃতি নানা ধরনের নিন্দনীয় কর্মকাণ্ডের বহিঃপ্রকাশ ঘটে।
এতে মানুষের সৎকর্ম নষ্ট হয়ে যায়। সাধারণত পারস্পরিক গালিগালাজ, ঝগড়া-বিবাদ, দ্বন্দ্ব-কলহ, অশ্লীল ও অশালীন কথাবার্তার মাধ্যমে ফিতনা-ফ্যাসাদ শুরু হয়। এমতাবস্থায় মানুষ ইমানদার থাকা তো দূরের কথা পশুর চেয়েও নিম্নস্তরে নেমে যায়। তাই সমাজ থেকে এসব অসদাচরণ অবশ্যই বর্জন করা দরকার। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা অন্যের দোষ-ত্রুটি অন্বেষণ করবে না, গুপ্তচরবৃত্তি করবে না, পরস্পরের সঙ্গে ঝগড়া-ফ্যাসাদ করবে না, পরস্পরের সঙ্গে হিংসা-বিদ্বেষ করবে না, পরস্পরকে ঘৃণা করবে না এবং পরস্পরের ক্ষতি সাধন করার জন্য পেছনে লাগবে না। আর তোমরা সবাই আল্লাহর বান্দা হিসেবে ভাই ভাই হয়ে যাবে।’ (বুখারি ও মুসলিম) পারস্পরিক আলাপ-আলোচনা তখনই সব সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান হয়, যখন উভয় পক্ষের মধ্যে সংলাপ বা সলাপরামর্শ, সত্য সন্ধান, বাস্তবতা অন্বেষণ ও তা প্রকাশ করার উদ্দেশ্যে সম্পন্ন হয়। লোকেরা যদি আলোচনার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য থেকে দূরে সরে যায় এবং উভয় পক্ষ বা অন্তত এক পক্ষ একগুঁয়েমি ও অপর পক্ষের ওপর ক্ষমতার জোর প্রতিষ্ঠা করার ওপর অটল থাকে,
তখন শত্রুতা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এমতাবস্থায় সমাজ-জীবনে দুই দলের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ হলে তা নিরসনে ইসলামের বিধান অনুসারে জনসাধারণ মীমাংসা করে দেবে। যদি একদল মীমাংসা করতে রাজি না হয় তাহলে সমাজের নেতৃস্থানীয় জনগণ ওই দলের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে এবং মীমাংসা মেনে নিতে বাধ্য করবে এবং ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে উভয় দলের মধ্যে সন্ধি ও শান্তিপূর্ণ সমঝোতা করে দিতে হবে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘মুমিনদের দুই দল দ্বন্দ্বে লিপ্ত হলে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেবে। অতঃপর তাদের একদল অপর দলকে আক্রমণ করলে তোমরা আক্রমণকারী দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে যতক্ষণ না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। যদি তারা ফিরে আসে তবে তাদের মধ্যে ন্যায়ের সঙ্গে ফয়সালা করে দেবে এবং সুবিচার করবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ সুবিচারকারীদের ভালোবাসেন।’ (সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ৯) ভ্রাতৃত্বের সম্পর্কের দাবিতে দুই বিবদমান ব্যক্তির কর্তব্য হলো তাদের ঝগড়া-বিবাদ নিরসন করা, কলহ মিটিয়ে ফেলা এবং সন্ধি-সমঝোতা সৃষ্টি করা। এ ক্ষেত্রে সুশীল সমাজেরও দায়িত্ব রয়েছে। বিনা কারণে তর্কবিতর্ক পাপ ও দুঃখ বয়ে আনে এবং মানুষের গোপন রহস্য বা দোষত্রুটি ফাঁস করে দেয়।
ফিতনা-ফ্যাসাদের বিরুদ্ধাচরণ করে নবী করিম (সা.) বাণী প্রদান করেছেন, ‘তুমি তোমার ভাইয়ের সঙ্গে বিতর্কে লিপ্ত হবে না।’ (তিরমিজি) ইসলাম বিনা কারণে ঝগড়া-বিবাদের মতো ঘৃণ্যতর কাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছে। কোনো বান্দা যে পর্যন্ত ঝগড়া-বিবাদ বর্জন না করবে, সে পর্যন্ত তার ইমানের বাস্তব রূপের পরিপূর্ণতা বিধান করতে পারবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) ঝগড়া-বিবাদ পরিহারকারীদের সুসংবাদ দিয়ে বলেছেন, ‘ওই ব্যক্তির জন্য বেহেশতের সর্বোচ্চ স্থানে একটি, বেহেশতের মধ্যভাগে একটি এবং বেহেশতের বাগানে একটি ঘর আমার জিম্মায় রয়েছে, যে এমনকি ন্যায়বাদী হওয়া সত্ত্বেও ঝগড়া-বিবাদ থেকে বিরত থাকে।’ ইসলাম ঝগড়া-বিবাদকে সবচেয়ে নিম্নস্তরের আমল বিনষ্টকারী বলে গণ্য করেছে। ধর্মপ্রাণ মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হলো, ঝগড়া-বিবাদ যতই হোক, বিপদ-আপদে, শত্রু-মিত্র বাছ-বিচার না করে বিপদগ্রস্তের উদ্ধারে ঝাঁপিয়ে পড়া।
ঝগড়া-বিবাদকারীরা সমাজের লোকের কাছে অপছন্দনীয়। কলহ-বিবাদ সৃষ্টিকারীদের যেমন সাধারণ মানুষ ঘৃণা করে, তেমনি আল্লাহ তাআলাও তাকে অপছন্দ করেন। তাই বলা হয়েছে, ‘তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে না, নিশ্চয়ই আল্লাহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীকে পছন্দ করেন না।’ (সূরা আল-কাসাস, আয়াত: ৭৭) সমাজে পারস্পরিক সহানুভূতি ও সহমর্মিতার মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অটুট রাখার ফলে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-দল-মতনির্বিশেষে সব মানুষের শান্তিপূর্ণ সমঝোতা ও সহাবস্থানে মন থেকে স্বার্থপরতা, নিষ্ঠুরতা, নির্মমতা ও হূদয়হীনতার পাশবিক বৈশিষ্ট্য দূর হয়ে যায়। মানবসমাজে শান্তিশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য যে ব্যক্তি তার সম্মান ও মর্যাদা সংরক্ষণ করতে চায়, তার সর্বাবস্থায় ফিতনা-ফ্যাসাদ ও ঝগড়া-বিবাদ থেকে বেঁচে থাকা বাঞ্ছনীয়।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক, গবেষক ও কলাম লেখক।
dr.munimkhan@yahoo.com

গণমাধ্যমের ওপর হামলা

সম্প্রতি বিরোধী দলের ৬০ ঘণ্টার হরতালের সময় বিভিন্ন গণমাধ্যমপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকর্মী এবং সংবাদপত্রের যানবাহনের ওপর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সম্পাদক পরিষদ, বেসরকারি টেলিভিশন ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন ও সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতারা। তাঁদের এই উদ্বেগের সঙ্গে আমরা একাত্মতা পোষণ করছি। একই সঙ্গে সরকারের কাছে প্রতিটি গণমাধ্যমপ্রতিষ্ঠান ও কর্মীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছি। স্বাধীন গণমাধ্যম যেকোনো গণতান্ত্রিক সমাজের পূর্বশর্ত। এটি যারাই লঙ্ঘন করবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বিকল্প নেই। উল্লেখ করা প্রয়োজন, কেবল রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের সময়ই গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে না, গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর বা মতামত যখনই যাদের বিপক্ষে যায় তারা গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর চড়াও হয়। এটা যেমন তাদের চরম অসহিষ্ণু মানসিকতারই প্রকাশ, তেমনি গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রতিও মারাত্মক হুমকি। দুর্ভাগ্যজনক যে গণমাধ্যমের ওপর এসব সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় রাজনৈতিক নেতৃত্ব হয় নিশ্চুপ থাকে, না হয় সুবিধামতো প্রতিক্রিয়া জানিয়ে দায় শেষ করে। তারা নিজ দলের কর্মীদের রক্ষা করতে প্রতিপক্ষের,
এমনকি গণমাধ্যমের ওপর দায় চাপাতেও দ্বিধা করে না। ফলে গণমাধ্যমের ওপর হামলাকারীরা বরাবরই ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে। বিরোধী দল গণমাধ্যমের যানবাহনকে হরতালের আওতামুক্ত ঘোষণা করেছিল। তার পরও কেন গণমাধ্যমকর্মী বা সংবাদপত্রের যানবাহনের ওপর হামলা চালানো হলো, সেই প্রশ্নের জবাব হরতাল আহ্বানকারীদের কাছে চাওয়া নিশ্চয়ই অযৌক্তিক হবে না। ‘সবকিছু সরকারের এজেন্টের কাজ’ বলেও তারা দায় এড়াতে পারে না। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণের দুটি পথ আছে। একটি হলো নানা রকম কালাকানুন জারি, অপরটি ভয়ভীতি ও হামলা। ক্ষমতাসীনেরা যেমন প্রথমটির সুযোগ নেয়, দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে বিরোধী দলও পিছিয়ে নেই। ৬০ ঘণ্টার হরতালের সময় গণমাধ্যমপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর সংঘটিত সন্ত্রাসী হামলার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হোক। অপরাধীরা শাস্তি পাক—এটা সবার দাবি। সরকার ও বিরোধী দলসহ দায়িত্বশীল সবার প্রতি আমাদের আহ্বান থাকবে, গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত থাকুন।

নেতাদের কাছে আকুল আবেদন

কী কী ঘটতে পারে আগামী কয়েক দিনে? কেউ জানে না। এই প্রশ্নের উত্তর কারও কাছে নেই। ছয় মাস আগে যদি কোনো মন্ত্রীকে পেয়ে কোনো সাংবাদিক জিজ্ঞেস করতেন, কী হবে, জানেন কিছু? উত্তর আসত, আপনি কিছু জানেন? এখনো অবস্থা তা-ই। কী হবে, কেউ জানে না। সম্ভবত প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রীও জানেন না, কী হবে। তাঁদের নিশ্চয়ই পরিকল্পনা আছে, ছক আছে, ছক ১, ছক ২, ছক ৩। কিন্তু ছক অনুযায়ী যে সব সময় সবকিছু হবে, তা তো নয়। ২০০৬ সালের আগে বিএনপির ক্ষমতাকেন্দ্রের খুব কাছের একজনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কী হবে। তিনি বলেছিলেন, হয় বিএনপি আবার নির্বাচিত হবে, না হলে অন্য কেউ ক্ষমতায় আসবে, আওয়ামী লীগ আর ক্ষমতায় আসবে না। কী হয়েছিল, আপনারা জানেন। তবে ২০০৬ সালের আগে আমার একটা ভবিষ্যদ্বাণী এই কলামেই প্রকাশিত হয়েছিল, আমি বলেছিলাম, ঠিক সময়ে নির্বাচন হবে এবং তার মাধ্যমে দেশের পরিস্থিতি ভালো হয়ে আসবে। আমার ভবিষ্যদ্বাণী সঠিক বলে প্রমাণিত হয়নি। এখন কী কী হতে পারে, আমরা একটা তালিকা করতে পারি। লক্ষণ দেখে মনে হচ্ছে: সংলাপ আসলে হবে না। সমঝোতা হবে না। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ই এখনকার খেলায় জয়লাভ করে নির্বাচনে যেতে চায়। উইন উইন পরিস্থিতি বলে কিছু নেই
 কাজেই কেউ ছাড় দেবে না বিন্দুমাত্র। সংলাপের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে, দুই নেত্রী বসতেও পারেন, কিন্তু সমঝোতা হবে না। রাজপথে কঠোর থেকে কঠোরতর আন্দোলন হবে। জ্বালাও-পোড়াও হবে। ঘটবে আরও অনেক মৃত্যু। এর মধ্যেই একতরফা নির্বাচন করার চেষ্টা করবে আওয়ামী লীগ। সেটা যদি ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬-এর মতো প্রহসনের নির্বাচন হয়, তাও। তারপর কঠোরভাবে দেশ শাসন করার চেষ্টা চালাবে। বিরোধী দলও কঠোরভাবে উৎখাতের আন্দোলন চালিয়ে যাবে। স্কুল-কলেজ বন্ধ। রাস্তাঘাট অচল। ব্যবসা-বাণিজ্য লাটে। অর্থনীতির অবস্থা হয়ে পড়বে কাহিল। আমদানি-রপ্তানিতে পড়বে ভাটা। মানুষ মারা যাবে। দেশ আর দেশের মানুষ পাবে সীমাহীন কষ্ট। এর পরিণতিতে যা যা হতে পারে, ক) ১৯৯৬-এর মতোই আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় নির্বাচন আয়োজন করবে, বিরোধী দলের দাবি মেনে নিয়ে, খ) বিরোধী দল একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়বে। দেশ কোনোরকমে চলতেই থাকবে। গ) অসাংবিধানিক কোনো সমাধান চেপে বসবে। ত্যক্তবিরক্ত মানুষ সেটাকেই স্বাগত জানাবে। অথবা ২০০৬ কিংবা ২০০৭-এর মতো একতরফা নির্বাচনের প্রস্তুতিকালেই পটপরিবর্তন ঘটে যাবে। এই বিকল্পগুলোর কোনোটাই আশাপ্রদ নয়। মানুষের ক্ষতি হবে। মানুষ মারা যাবে। জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হবে। একটা মানুষের জীবনও মূল্যবান। একটা মানুষেরও জীবন বিপন্ন হয়, এমন কোনো কর্মসূচি কোনো পক্ষেরই দেওয়া উচিত নয়। দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে এ রকম ভয়ংকর খেলা আমাদের নেতারা কেন করবেন? এটা তো কেবল তাঁদের নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি নয়, ১৬ কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ তাঁদের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। আর গণতন্ত্রের চেয়ে ভালো কোনো শাসনপদ্ধতি তো আপাতত আমাদের পৃথিবীতে নেই।
১৯৯০ থেকে এ পর্যন্ত গণতন্ত্রের ২২-২৩ বছরে আমাদের অনেক অপ্রাপ্তি আছে, আবার অনেক প্রাপ্তিও আছে। আমাদের ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে, আমাদের মেয়েরা কাজে যাচ্ছে, আমাদের দেশে আর কেউ না খেয়ে মারা যায় না, অনেকের বাড়িতেই স্যানিটারি ল্যাট্রিন হয়েছে, সবারই প্রায় টিউবওয়েল আছে, প্রবৃদ্ধি ভালো, প্রবাসীদের পাঠানো টাকায় আমাদের অর্থনীতি চাঙা, এদিক থেকে আমরা উভয় দলের আমলেই মোটামুটি ঠিক পথেই চলেছি, কৃতিত্ব উভয় রাজনৈতিক দলের সরকারকেই দিতে হবে। আবার আমাদের অনেক না-পাওয়া আছে। আমাদের এমন কতগুলো প্রাপ্তি আছে, যা আমরা পেতে চাইনি। যেমন জঙ্গি হামলা, যেমন অগণতান্ত্রিক আচার, যেমন দুর্নীতি, যেমন বল্গাহীন দলীয়করণ এবং গণতান্ত্রিক একনায়কতন্ত্র, নির্বাচিত স্বৈরাচার। তবু মোটের ওপর, আমাদের গণমাধ্যম স্বাধীন, তারা স্বাধীনভাবে কথা বলে, স্বাধীন মত তুলে ধরে। পুরোপুরি না হলেও অনেকটাই। সেসবের সুফলও আমরা পেয়ে আসছি। কাজেই আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের এমন পরিস্থিতি তৈরি করা উচিত নয়, যাতে গণতন্ত্র ব্যাহত হয়। আমরা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, আমাদের সরকারি দল ও বিরোধী দল উভয়ই দেশপ্রেমিক। আর যে কথা নেতারা নিজেরাই বলছেন, এক-এগারোর স্টিম রোলারটা সবচেয়ে বেশি যায় রাজনীতিবিদদের ওপর দিয়েই, সেটাও তো তাঁদের মনে রাখার কথা, মনে থাকার কথা। তাহলে তাঁদের বিবেকের কাছে আমাদের আকুল আকুতি, আপনারা বসুন। উভয় পক্ষের নেতারা সর্বোচ্চ ছাড় দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে বসুন। সংবিধান মোতাবেকই সর্বজন গ্রহণযোগ্য একটা নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা সম্ভব, যদি নেতারা আন্তরিক হন, যদি নেতারা বোঝেন, এটাই সবচেয়ে ভালো বিকল্প, একটা মানুষের জীবনও যদি তা দিয়ে বাঁচানো যায়, সেই চেষ্টা তাঁদের করা উচিত। আমার নিজের ধারণা হলো, মোটামুটি রকমের নিরপেক্ষ একটা সরকারের অধীনেই যদি নির্বাচন হয় এবং তা যদি খুব বিলম্বিত না হয়, তাতে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করবে।
এই সুযোগ কেন বিএনপি ছেড়ে দেবে? বানরের পিঠাভাগের গল্প না আবার হয়ে যায় শেষ পর্যন্ত। আমরা তাই দুই দলের শুভবুদ্ধির কাছে, সুবিবেচনার কাছে আরেকবার আকুল আবেদন জানাই। আপনারা বসুন। প্রথমেই যদি প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রী পর্যায়ে না হয়, তবে মহাসচিব পর্যায়ে আলোচনা শুরু হোক। উভয় দলের কাছে গ্রহণযোগ্য একটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনে আপনারা একমত হোন, সদস্য কারা হবেন, ঠিক করে ফেলুন। তারপর আসুন, সবাই মিলে নির্বাচন করি। নির্বাচনের উৎসবে মেতে উঠুক দেশ। দেশের মানুষ ভোট দিক। তারা তো এক দিনের রাজা। একটা দিনেই তারা পর্দাঘেরা ঘরে ঢুকে নিজের রাজাগিরি ফলায়। এবং আমরা বিশ্বাস করি, এ দেশের মানুষ রায় দিতে কখনো ভুল করে না। এবারও করবে না। আমার কলামের নামটাই অরণ্যে রোদন। আমার এই রোদন যেন অরণ্যে হারিয়ে না যায়। একবার, অন্তত একবার আমার কলামের নামকরণ মিথ্যা বলে প্রমাণিত হোক। কবীর সুমনের একটা গান বরং আপনাদের শোনাই:
মাঝে মাঝে কিছু ঝগড়াই হোক
হোক না ভীষণ বাগিবতণ্ডা
বিরুদ্ধমত ঝাঁজিয়ে উঠুক
মুলতবি থাক মিঠাই-মণ্ডা
জোর হোক শুধু গলার আওয়াজ
গায়ের জোরটা তোলাই থাকগে
ডান্ডার চেয়ে ঠান্ডাই ভালো
ষন্ডামি সব চুলোয় যাক গে
আওয়াজ যে যত পারে দিক। শুধু গায়ের জোর দেখানোর প্রতিযোগিতায় না নামলেই হলো। দুঃখের বিষয় হলো, সেটাও হচ্ছে। এত রক্ত, এত গুলি, এত কাঁদানে গ্যাস, এত রাবার বুলেট, এত ককটেল, এত বোমা, এত পেট্রল, এত আগুন কেন? বন্ধ করুন এসব। আমাদের নেতারা কবে বুঝবেন সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট। হে প্রভু, তোমার পতাকা যারে দাও, তারে বহিবারে দাও শকতি। যদি আমাদের কোনো প্রত্যাশাই পূর্ণ না হয়? যদি তাঁরা সমঝোতা না করে সংঘাতকেই একমাত্র পথ ও গন্তব্য করে তোলেন? তবু বলব, আশা ছাড়ব না। হয়তো ধ্বংসের মধ্য দিয়েই গড়ে উঠবে নতুন কোনো পথ, সৃষ্টির। বাঁচার। এগিয়ে যাওয়ার। যেখানে আমাদের ছেলেমেয়েরা নির্ভয়ে স্কুলে যাবে। যেখানে সকালবেলা বাড়ি থেকে বেরিয়ে স্বজন ফিরে আসবে কি আসবে না, এই নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকবে না। যেখানে ব্যবসায়ী জানবে, তার রপ্তানির গাড়ি ঠিক জায়গায় পৌঁছাবে, দোকানদার জানবে দোকান খুললে কোনো অসুবিধা নেই। এবার মাহমুদুজ্জামান বাবুর গানের কথায় বলি: ভোর হয়নি, আজ হলো না;
কাল হবে কি না তাও জানা নেই,
পরশু ভোর ঠিক আসবেই
এই আশাবাদ তুমি ভুলো না।
একটা জাতির গড়ে ওঠার ইতিহাসকে এক দিন, দুই দিন, এক মাস, দুই মাসের মাপকাঠিতে দেখলে তো চলবে না, মাপতে হবে যুগের হিসাবে। গত দুই যুগে আমরা অনেক এগিয়েছি, আগামী দুই যুগ পরে আমরা একটা আলোকিত দেশই দেখব। হয়তো আমরা তা দেখে যেতে পারব না, কিন্তু আমাদের সন্তানেরা পারবে, ঠিক পারবে।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

মাঠ গরম কর্মসূচি নয়

রাজনৈতিক কর্মসূচি মানেই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আর অনিশ্চয়তা। ৩ নভেম্বর সরকারি দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের মহাসমাবেশের পরদিন থেকে টানা তিন দিনের ঘোষিত কর্মসূচি রয়েছে বিরোধী দল বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮-দলীয় জোটের। নির্বাচনকালীন যে সময়ে দেশ এখন প্রবেশ করেছে, তখন যেখানে শান্তিপূর্ণ ও সমঝোতার পরিস্থিতি বিরাজ করার কথা, সেখানে অব্যাহত সহিংসতা ও সামনে আরও সংঘাতের আশঙ্কাই জোরদার হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরেই আমরা বলে আসছি যে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল ও জোটের মধ্যে যে বিরোধ রয়েছে, তা মিটমাট করার একমাত্র পথ হচ্ছে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা। ছাড় দেওয়ার মানসিকতা নিয়েই তা শুরু করতে হবে। আলোচনা শুরুর উদ্যোগ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার মধ্যে টেলিফোনে যে কথাবার্তা হয়েছে, তা হতাশাজনক হলেও নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে আলোচনায় বসার ব্যাপারে দুজনই তাঁদের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। ফলে যেকোনো ধরনের মাঠ গরম কর্মসূচির আগে দুই পক্ষের মধ্যে সংলাপের বিষয়টিই হচ্ছে সবচেয়ে জরুরি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সে ধরনের উদ্যোগ এখনো দৃশ্যমান নয়। নির্বাচনকালীন সময়ের শুরুতেই ৬০ ঘণ্টার টানা হরতাল কর্মসূচি পালিত হয়েছে। এ নিয়ে দুই নেতার মধ্যে কথা হওয়ার পরও সেই কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হয়নি। এই কর্মসূচির বলি হয়েছেন ১৩ জন। ৪, ৫ ও ৬ নভেম্বরের কর্মসূচি কি হরতাল, না অবরোধ, তা এখনো স্পষ্ট করেনি ১৮-দলীয় জোট। কিন্তু এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে জনগণের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
টেলিফোন আলাপে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা দুজনেই যখন আলোচনার কথা বলেছেন এবং বিশেষ করে, বিরোধী দলের নেতা ২৯ অক্টোবরের পর যেকোনো দিন আলোচনায় বসতে পারেন বলে জানিয়েছেন, তখন এই আলোচনা শুরু করতে সমস্যা কোথায়? আমরা এখন দুই পক্ষকে আলোচনার টেবিলে দেখতে চাই, কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি দেখতে চাই না। রাজনৈতিক সংঘাত ও সহিংসতায় এরই মধ্যে অনেক প্রাণ ঝরেছে, সম্পদ ধ্বংস হয়েছে এবং দেশের অর্থনীতির চরম সর্বনাশ হয়েছে। সামনে যেসব টানা কর্মসূচি দেওয়া হয়েছে, তা শিক্ষার্থীদের পরীক্ষাসহ শিক্ষা কার্যক্রম ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। মহাজোট ৩ নভেম্বর মহাসমাবেশ করতে চাইছে, আমরা মনে করি, এটা নিজেদের রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের সময় নয়, আলোচনা ও সমঝোতার সময়। অন্যদিকে বিরোধী পক্ষের উচিত ৪, ৫ ও ৬ নভেম্বরের কর্মসূচি প্রত্যাহার করে আলোচনা ও সমঝোতার ব্যাপারে নিজেদের আন্তরিকতার প্রমাণ দেওয়া। মুখে সংলাপ ও সমঝোতার কথা বলে সরকার ও বিরোধী দল যদি তাদের আন্তরিকতার প্রমাণ দিতে না পারে, তবে সামনের দিনগুলোতে যে সংঘাত ও সহিংসতা চরমে পৌঁছাবে, তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। দুই পক্ষকেই এর দায় নিতে হবে। আশা করব, দুই পক্ষই মাঠের কর্মসূচি বাদ দিয়ে আলোচনা ও সংলাপকেই তাদের প্রধান কর্মসূচি হিসেবে গ্রহণ করবে।

কবরস্থান by এলিনোর ক্যাটোন

‘মগের ভেতরে কফির দাগগুলো দ্যাখো’, বলে উঠল শ্যারন। ‘এটা দেখতে অনেকটা আবহাওয়া ম্যাপের মতো। দিন-ঘণ্টা, সপ্তাহ, বছর—সব আঁকা আছে। এই জায়গা আমাকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে।’ আমাকে উদ্দেশ করে শ্যারন বলল, ‘এদিকে দ্যাখো। আমার নষ্ট জীবনের সব বলিরেখা এখানে আঁকা রয়েছে।’ নিজের বক্তব্য প্রমাণ করতে কফির মগটিকে প্রবল বেগে ঘুরিয়ে আমাকে দেখানোর চেষ্টা করল সে। এরপর নিজে নিজেই বলল, ‘আমি প্রতিদিন ঝামা দিয়ে ঘষে সবকিছু পরিষ্কার করি, তবু দাগ থেকে যায়।’ শ্যারন আমার সহকর্মী। এই বিশাল বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে আমরা পাশাপাশি কাউন্টারে কাজ করি। আমার সঙ্গে কথা বলতে বলতে শ্যারন কাউন্টারে তার আসনে বসে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটিকে প্রশ্ন করে ডকুমেন্ট নাম্বার নিয়ে। তার নামের প্রথম অংশও জানতে চায়। সাধারণত কাজের সময় শ্যারন একটা ছোট্ট হাসি বা চোখাচোখি করেই কাজ সেরে নেয়। তবে দুটো কখনোই একসঙ্গে ব্যবহার করে না। এ ব্যাপারে খুবই সতর্ক মেয়ে সে। তার চাহনি অনায়াসে বশ করতে পারে যে কাউকে। লোকটি তার ডকুমেন্টের জন্য বেশ তাড়াহুড়া করছে। নাম বলল রিচার্ড। অস্ট্রেলিয়ান উচ্চারণে সেটি শোনা গেল ‘রেচ্ড।’ শ্যারনও দ্রুত টাইপ করে নিল সেটি।
তারপর মাথার ওপরের বাতিগুলোর দিকে তাকিয়ে দিল তার সেই মিষ্টি হাসিটি। রিসিট সংগ্রহ করে লোকটি দরজার দিকে পা বাড়ায়। ঘুরে তার চলে যাওয়া দেখে শ্যারন। রিচার্ডের চলে যাওয়ার পর দরজা বন্ধ হলে, চেঁচিয়ে ওঠে সে, ‘ওহ্ খোদা, এই অফিস একটা নরকের গর্ত। আমার মরণ হয় না কেন!’ এমন একটা স্বগতোক্তি করে সে আমার দিকে তাকাল; তার সে দৃষ্টিতে ছিল প্রত্যাশা। আমিও ‘মরতে চাই’—এ রকম সম্মতি দিয়ে তার প্রত্যাশা পূরণ করলাম। এবার আমার দিকে ঘুরে বলল শ্যারন, ‘আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না, এই প্রতিষ্ঠানে আমি দু-বছর কাটিয়ে দিয়েছি!’ ‘আমি নিজেও এটা বিশ্বাস করতে পারি না।’—প্রসঙ্গ ঘোরাতে আমি শোবার ঘরের কথা তুললাম। শ্যারনকে প্রশ্ন করি, ‘আমরা তো বেডরুমেই মরতে পারি, তাই না?’ ওর প্রিয় বিষয় শোবার ঘর আর অসুস্থতা। লোকজনের মধ্যে সে শুধু অসুস্থতা খুঁজে পায়। আর কারও মধ্যে নানা ধরনের রোগের উপসর্গ থাকলে তো কথাই নেই—সেটা হয়ে ওঠে তার সবচেয়ে প্রিয় বিষয়। লোকেরা যেমন শব্দজব্দ পছন্দ করে, শ্যারন তেমনই পছন্দ করে রোগের উপসর্গ মেলাতে বা রোগের রহস্যজট খুলতে। মনে করে এটাই তার বিশেষ গুণ। আজ সকালেই এক মহিলা এসেছিলেন—চেয়ার, কম্বল, ওয়েদার বোর্ডের যে অর্ডার দিয়েছিলেন সেটি বাতিল করতে। শ্যারন তাকে দেখেই বলে উঠল, ‘ক্ষুধামান্দ্যর রোগী।’ বলতে বলতে পাঁচ ডলার বাজিও ধরে ফেলল আমার সঙ্গে। আমি হেসে বললাম, ‘জানি, তুমি কী করে বললে। তার শুষ্ক ঠোঁট, কঙ্কালসার হাতের মুঠো আর চোখের নিচের কালি—এসব দেখেই তুমি এমন বলতে পেরেছ।’ আসলে শ্যারন জানে না, আমি তাকে কতটা চিনি।
প্রায় এক ঘণ্টা আগে এসেছিলেন মহিলাটি। তার পর থেকে আমরা এ নিয়েই আলোচনা করছি। এখন রীতিমতো বিরক্তবোধ করছি। সেটা কাটাতেই ১০ মিনিট ব্রেকের প্রস্তাব দিলাম আমি। এই সময়ে আমরা সিগারেট ফুঁকব। শ্যারন আর আমি বাইরে এসে ময়লার ঝুড়ির পাশের বেঞ্চে বসলাম। আমাদের দেখেই হাত নাড়ল নির্মাণশ্রমিকদের একটি দল। পার্কিং থেকে তারা তাদের গাড়ি বের করছিল। ওদের চেহারা রোদে শুকানো তামাকের মতো—হালকা গোলাপি আর ধূসর বর্ণের মিশ্রণ। আমার মুখে এমন অদ্ভুত কথা শুনে মুখ থেকে সিগারেট সরাল শ্যারন। বলল, ‘ওটা কী?’ ওর উঁচানো আঙুলের দিকে তাকিয়ে বুঝলাম, আমার কথায় সে অবাক হয়নি; অবাক হয়েছে অন্য কিছু দেখে। সেদিকে তাকালাম আমিও। রডোডেনড্রন ফুলের ঝোপের টেলিফোনবক্সের পাশে কিছু একটা দেখেছে সে। ঝোপটা মরে যাচ্ছে। আমাদের কথার মধ্যেই ঝোপের ধার ঘেঁষে একটি ট্রাক ঢুকল পার্কিংয়ের জন্য। আর তখনই মৃতদেহটি দেখতে পেলাম আমরা। ‘এটা মস্তকছিন্ন একটা কুকুর।’—আনমনে সিগারেট ঠোঁটে চেপে বলল সে। কাউকে জানানো প্রয়োজন বলেই তাকাল এদিক-সেদিক। মাথাবিহীন কুকুরের লাশ সে মানতে পারছিল না। হাত নাড়তেই আমাদের অফিস থেকে বেরিয়ে এল কাঠমিস্ত্রিরা। এর মধ্যে গোটা অফিস ও বাইরের শ্রমিক—সবাই জড়ো হয়ে গেছে মৃতদেহটি দেখার জন্য। এমনকি অ্যাকাউন্টসের মেয়েটা এসেও এক ঝলক দেখে গেল। ফর্কলিফট-চালক হামিশ পারলে তো সেটার ওপর তার বিশাল গাড়িই উঠিয়ে দেয়। আমরা সবাই প্রায় পাঁচ-ছয় মিটার দূরে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম সবকিছু। কেউই সামনে যাইনি,
হাজার হলেও লাশ বলে কথা! সবাই কথা বলছিল কাটা মাথা নিয়ে। ‘এ রকম বিকৃত মস্তিষ্কের কে আছে যে একটা কুকুরের মাথা কেটে ফেলতে পারে’, ড্রাইশপের গ্লিনই পশু অধিকার সুরক্ষা ও নিয়ন্ত্রকদের কথা তুলল প্রথম। আর উপস্থিত সবার কথাটা বেশ মনে ধরেছে বলে মনে হলো। গ্লিন জানাল, ‘তারা এসে মৃতদেহটি নিয়ে যাবে। এ নিয়ে আমাদের ভাবনা-চিন্তার দরকার নাই।’ শ্যারন তখনো সিগারেট ঠোঁটে ধরে চিন্তিত মুখে তাকিয়ে আছে। বিড়বিড় করে বলল, ‘কতক্ষণ এটা এখানে পড়ে রয়েছে কে জানে।’ শ্যারনের কথা কানে না তুলে গ্লিন শুরু করেছ তার কুকুরপ্রীতির গল্প। এই মৃত্যুতে সে-ই সবচেয়ে বেশি দুঃখ পেয়েছে বলে মনে হয়। নিজেকে ডগম্যান দাবি করল গ্লিন। পশু অধিকার সুরক্ষা ও নিয়ন্ত্রকদের অফিস থেকে জানাল, আসতে আরও ঘণ্টা খানেক লাগবে তাদের। ধূমপান শেষে যার যার কাউন্টারে ফিরে গেলাম আমরা। বিশাল দোকান ও অফিসঘরে ঢোকার মুখেই আমাদের নীল রঙের কাউন্টার দুটো। সেখানে ঢুকে আবার হাসি বিনিময় করলাম। এভাবে ক্রেতাদের দিকে চেয়ে আমরা দুজনই হাসি। আমি নিজে বেশি হাসিখুশি, কিন্তু সবাই কেন যেন শুষ্ক মুখের শ্যারনকেই বেশি পছন্দ করে। শ্যারনকে বললাম, ‘সম্ভবত কুকুরটা মারা যাওয়ার পর তার মাথা কাটা হয়েছে।
সেটা অনেক সহজ বিষয়। জীবিত কুকুর জবাই করা সম্ভব নয়।’ ‘কুকুর নিয়ে আমি চরম বিরক্ত।’—প্রসঙ্গটি বাদ দিতে চাইল শ্যারন। এক মহিলা এসে সে সময় জানতে চাইলেন, ওয়াশিং মেশিন কোথায় পাওয়া যাবে? ‘চার নম্বর করিডরে যেতে হবে।’—চিরাচরিত হাসি দিয়ে জানাল সে। একই সঙ্গে বুঝিয়ে দিল কোথায় কী পাওয়া যাবে। মহিলা চলে যেতেই দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। জানাল, ‘আমাদের আরেক সহকর্মী চার্লিকে ছয়টি অভিযোগের কারণে ট্রেড অফিসে ডেকে পাঠানো হয়েছে।’ কথা বলতে বলতে সামনে থাকা রাবার ব্যান্ডগুলো দিয়ে একটা টাওয়ারের মতো বানানোর চেষ্টা করছে শ্যারন। ‘চার্লির কথা কে বলেছে তোমাকে?’ ‘উইলি।’ শ্যারনের রাবারের টাওয়ার ধসে পড়ল। প্রচণ্ড বিরক্তি তার মুখে, ‘কাউন্টারে কাজ করতে বসলেই মনে হয় কবরস্থানে ঢুকেছি। আগামী গ্রীষ্মকাল কীভাবে যে এখানে কাটাব, জানি না। আমি মনে হয় পাগল হয়ে যাচ্ছি।’ ‘কুকুরের মাথাটা কে কাটতে পারে? আমি আসলে জানতে চাইছি, এই জঘন্য কাজ কাকে দিয়ে সম্ভব?’—প্রসঙ্গ বদলাতে বললাম আমি। শ্যারন কোনো উত্তর দিল না। বিষয়টি সে আর মনেই করতে চাইছে না। পশু অধিকার সুরক্ষা ও নিয়ন্ত্রণ অফিসে যখন ফোন করেছিলাম, এক মহিলা ধরেছিলেন, তিনি নিজেই বললেন, ‘এটা সম্ভবত কোনো নোংরা গ্যাংয়ের কাজ। ওরা ভয়ানক সব কাজ করে সবার মধ্যে ভয় ঢোকানোর চেষ্টা করে।’ ফোনে তৎক্ষণাৎ ভ্যান পাঠিয়ে দেওয়ার কথা জানালেন তিনি। ফোন রাখতে রাখতে মার্লিন নামের কাউকে ডাকছিলেন।
ভ্যানটি যখন এল, ঘর পরিষ্কারের জন্য ওপর তলায় গেছে শ্যারন। আমি তাদের স্বাগত জানাতে কার পার্কিংয়ের দিকে দৌড়ে গেলাম। গাড়ি থেকে কম বয়সী একটি মেয়ে নামল—ছোট চুল, হাতে চামড়ার ব্যান্ড লাগানো। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘চলুন, মাথা ছাড়া কুকুরটা দেখে আসি।’ গাড়ি থেকে অন্য সহকর্মীদের নামার তাড়া দিতে দুই হাতে তালি বাজাল সে। চারপাশের আলো ফিকে হয়ে আসছে। রডোডেনড্রন ঝোপের ওপর দিয়ে হেঁটে গেল মেয়েটি। কার পার্কিংয়ে তেমন কোনো গাড়ি নেই, কয়েকটা ট্রাক ছাড়া। কুকুর-মানব গ্লিন তখন ড্রাইশপ ঝাঁট দিতে ব্যস্ত। মেয়েটা আসার পর সাহসী হয়ে মস্তকছিন্ন কুকুরকে দেখার আশায় ঝোপের দিকে এগিয়ে গেলাম আমরাও। একেবারে ঝুঁকে মৃতদেহ পরীক্ষা করছিল মেয়েটি। আমি তাকিয়ে ছিলাম তার মুখে। আরও কাছ থেকে দেখার জন্য আমাকে ডাকল সে-ই। খুব বিনয়ের সঙ্গে মেয়ের দিকে এগোলাম আমি—ধুলোময়লায় একাকার হয়ে আছে মৃতদেহ। আশপাশে অনেক রুপালি রঙের ছেঁড়া প্যাকেট, উচ্ছিষ্ট, পানীয়ের দুমড়ানো-মুচড়ানো ক্যান। ওই মেয়েই আমাকে জানাল, এটি আসলে কুকুর নয়—এটি হলো মগি প্রজাতির বিশালাকার বিড়াল। দেহের নিচে ছোট্ট মাথাটা চাপা পড়ায় এটিকে মস্তকছিন্ন কুকুর বলে ভুল হয়েছিল সবার। এখনো চোখগুলো খোলা কিন্তু মৃত। এবার শুধু ‘ওহ্’ বললাম আমি। নিজ থেকেই মেয়েটি বলল, ‘আমার ধারণা, আপনারা কেউ এটাকে কাছ থেকে দেখেননি। তাই বুঝতে পারেননি।’ ‘আমরা আসলে দেখতে চাইনি।’ আমার সঙ্গে কথা বলে মেয়েটি আবার ফিরে গেল ঝোপের কাছে, যেখানে ঝোপের মধ্যে পড়ে আছে মৃত বিড়াল। ‘আমরা যেভাবে দেখেছি সেভাবে দেখলে এটাকে আপনার মাথাবিহীন কুকুরই মনে হবে।’—আত্মপক্ষ সমর্থন করে বোঝানোর চেষ্টা করলাম তাকে।
আমার মতো সেও পিছিয়ে এসে দেখার চেষ্টা করল এবং সায় দিল কথায়। ‘আসলে বিড়ালের মাথা খুব ছোট হওয়ায় সেটা আপনারা দেখতে পাননি। আর কুকুরের মতো লম্বা মুখও নেই বিড়ালের। তাই এমনটা মনে হয়েছে।’ হ্যাঁ-হুঁ স্বরে তার কথায় জোর সমর্থন জানালাম আমি। বেশ ক্লান্ত মনে হচ্ছিল মেয়েটিকে। হাত দিয়ে মুখ মুছল। এরপর আবার আমাদের বোঝানোর চেষ্টা করল, ‘আপনারা আসলে আমাদের বিষয়টা বুঝবেন না। মস্তকছিন্ন কুকুরের বিষয়টা আমাদের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এটা সহিংস ঘটনার পর্যায়ে পড়ে। আমরা তো পুলিশ ডাকতে যাচ্ছিলাম। এ ধরনের হত্যাকাণ্ড পুলিশের জন্যও বেশ গুরুতর। তবে বিড়ালের মৃত্যু এমন আহামরি কিছু নয়। মৃত বিড়াল হচ্ছে মৃত বিড়াল। হয়তো কেউ রডোডেনড্রন ঝোপের ওপাশ থেকে ছুড়ে ফেলেছে মৃতদেহটা। কিংবা নিজে নিজেই এখানে এসে মারা গেছে—খুব স্বাভাবিক একটি ঘটনা।’ মাথা ঝুঁকিয়ে তার কথায় সম্মতি দেওয়া ছাড়া আর কোনো কাজ ছিল না আমার। সেটাই করে যাচ্ছিলাম। ‘আমাকে কিনা একটা বিড়ালের মৃতদেহ নিয়ে অফিস যেতে হচ্ছে।’—চরম বিরক্তি নিয়ে মেয়েটি বলল। খুব অশ্লীল একটি শব্দও উচ্চারণ করল। বিড়ালটি নিয়ে যাওয়ার জন্য আমাদের কাছে চাইল প্লাস্টিক ব্যাগ। সে সময় আবার আগের মতো দুই হাতে তালি বাজাচ্ছিল সে। এক দৌড়ে তাকে এক গাদা পলিথিন ব্যাগ এনে দিলাম আমি। ব্যাগগুলোর এক পাশে রয়েছে আমাদের হার্ডওয়্যারের লোগো। কিছুটা নিচু হয়ে বিড়ালের পা ধরে চ্যাংদোলা করে এক ঝটকায় তাকে ব্যাগে ভরল মেয়েটি। তখনই বুঝতে পারলাম, দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করেছে। বিড়ালটি সে দুই দফা প্যাকেট করল।
আর আমি খুব মনোযোগ দিয়ে তাকে খেয়াল করতে করতে দেখলাম, বিড়ালের মাথাটা আগে ব্যাগের ভেতরে ঢুকিয়েছে সে। এটি আমার কাছে অস্বাভাবিক লাগল। ভ্যান ও লোকজন নিয়ে চলে গেল মেয়েটি। আমার কাউন্টারে ফেরার সময় ড্রাইশপে গ্লিনকে আমি জানালাম, এটা ছিল একটি বিড়াল এবং মস্তকহীন নয়, এর একটা মাথাও ছিল। ওটা কুকুর ছিল না শুনেই চরম খুশি গ্লিন। পারলে তখনই নাচানাচি শুরু করে দেয়। একসময় নাচতে নাচতেই ড্রাইশপ পরিষ্কারের কাজে ঝুঁকে পড়ল সে। আর যখন কাউন্টারে ফিরলাম আমি, সব বন্ধ করে দেওয়ার সময় হয়ে এসেছে। শ্যারন হিসাব করছে। আমার দিকে এক ঝলক তাকাল, ‘পশু অধিকার সুরক্ষা ও নিয়ন্ত্রণ অফিসের ওই মেয়েটি লেসবিয়ান।’—তার কণ্ঠে চরম আত্মবিশ্বাস। এমনকি পাঁচ ডলার বাজিও ধরে ফেলল আমার সঙ্গে। শ্যারনের এই আচরণ আমি চিনি। আমি শুধু উত্তর দিলাম, ‘জানি, তুমি কীভাবে সেটি নির্ণয় করেছ।’ এলিনোর ক্যাটোনের এই গল্পের মূল নাম ‘নেক্রোপলিস’। ২০০৭ সালে নিউজিল্যান্ডের জনপ্রিয় দৈনিক সানডে-স্টার টাইম আয়োজিত প্রতিযোগিতায় সেরা গল্পের পুরস্কার পেয়েছে গল্পটি। পরে এটি নিউজিল্যান্ডের সেরা ছোটগল্পের সংকলনের পঞ্চম খণ্ডে-ও স্থান পায়।
 অনুবাদ: ফাতেমা আবেদীন

সিরিয়ায় অবরোধ শিথিল মানুষ পালাচ্ছে

সিরিয়ার মোয়াদামিয়াহ শহরে সরকারি বাহিনী অবরোধ শিথিল করার ফলে সেখান থেকে হাজার হাজার লোক এখন পালিয়ে আসছে। গত মার্চ মাস থেকে শহরটি বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। বিবিসির একজন সংবাদদাতা জানান, সেনাবাহিনী অবরোধ শিথিল করায় মানুষ স্রোতের মতো শহরটি থেকে পালিয়ে রাজধানী দামেস্কের দিকে ছুটছে। দীর্ঘদিন সেখানে চলেছে ভারি বোমার বিস্ফোরণ। আর সরকারি বাহিনীও মোয়াদামিয়াহ শহরটি করে রেখেছিল এক অর্থে অবরুদ্ধ। ফলে খাবার, পানির অভাবে জীবন ধারণ হয়ে পড়ে এক অর্থে ভয়াবহ। সেখানে এতদিন আটকে থাকা এক মহিলা বলছিলেন তারা ঘাস, পাতা খেয়ে জীবন ধারণ করেছিলেন। বিবিসির একজন সংবাদদাতা রাজধানী দামেস্ক থেকে জানাচ্ছেন সরকারের পক্ষ থেকে শহরটির ওপর থেকে অবরোধ কিছুটা শিথিল করায় মানুষ সে াতের মতো রাজধানী দামেস্কের দিকে আসছে। এদিকে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ তার উপপ্রধানমন্ত্রী কাদির জামিলকে বরখাস্ত করেছেন। জেনেভাতে আমেরিকান একজন কূটনৈতিকের সঙ্গে সাক্ষাতের পর তিনি এই সিদ্ধান্ত নেন। সিরিয়ায় নিযুক্ত সাবেক এই মার্কিন রাষ্ট্রদূত রবার্ট ফোর্ড বিবিসিকে বলেছেন জামিল অনুরোধ করেছিলেন এই বৈঠকটি ব্যক্তিগত পরিসরে করার জন্য। ফোর্ড বলেন, ‘সিরিয়ার সরকার কাদির জামিলের ব্যাপারে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে ব্যাপারে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না।
আমি মনে করি তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেটা সেটা হল সিরিয়ার সহিংসতা বন্ধে সব দিক থেকে চেষ্টা করা উচিত।’ সাবেক এই কূটনীতিক আরও জানান, কাদির জামিলের সঙ্গে তার যে বৈঠকটি হয়েছে সেখানে একটি বিষয় ছাড়া তারা প্রায় সব বিষয়েই ভিন্ন মতো পোষণ করেছিলেন। আর যেটিতে একমত হয়েছিলেন সেটা হল সিরিয়ার সহিংসতা রোধ শুধু একটা রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমেই সম্ভব। সিরিয়ায় দুটি রাসায়নিক অস্ত্রাগার পরিদর্শন বাকি : সিরিয়ায় আন্তর্জাতিক রাসায়নিক অস্ত্র পরিদর্শক দল জানিয়েছে, নিরাপত্তাজনিত কারণে দুটি রাসায়নিক অস্ত্রাগার পরিদর্শন কাজ এখনও বাকি রয়েছে। ওপিসিডব্লিউ (অর্গানাইজেশন ফর দ্য প্রহিবিশন অব কেমিক্যাল উইপনস) তাদের এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ২৩ স্থাপনার ২১টিতেই পরীক্ষা কাজ সম্পন্ন হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করে স্থাপনাগুলোতে প্রবেশের ব্যবস্থা করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে বলে প্রতিষ্ঠানটি বিবৃতিতে উল্লেখ করে। রোববার সিরিয়া তাদের রাসায়নিক অস্ত্রভাণ্ডার ধ্বংস করার একটি পরিকল্পনা ওপিসিডব্লিউ’র কাছে উপস্থাপন করেছে। ১লা অক্টোবর থেকে জাতিসংঘ ও ওপিসিডব্লিউর মোট ৬০ জন পরিদর্শক সিরিয়াতে অবস্থান করছেন। এদিকে জাতিসংঘ আরব লীগ শান্তি দূত লাখদার ব্রাহিমি বুধবার সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সিরিয়ায় বাশার আল আসাদ অনুগত বাহিনী এবং বাশার বিরোধীদের শান্তিপূর্ণভাবে আলোচনার টেবিলে নিতে ব্রাহিমির এই উদ্যোগ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

দাদির মৃত্যুর শোকগাথা শোনালো নাতি-নাতনি

পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলার বিরুদ্ধে বিশ্বের মানবাধিকার সংগঠনগুলো যে হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছে তা খতিয়ে দেখার কাজ শুরু করেছে দেশটি। পাকিস্তানের এক ভুক্তভোগী পরিবারের মুখে ড্রোন হামলার নির্মমতার কথা শুনেছে মার্কিন কংগ্রেস। ড্রোন হামলার বৈধতা নিয়ে যখন কংগ্রেসে বিতর্কের সুর চূড়ায় উঠেছে তখন পাকিস্তানি এ পরিবারটির আত্মীয় বিয়োগের গল্প কংগ্রেসে রীতিমতো ঝড় তুলে দেয়ার মতো অবস্থা। পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় উপজাতি অধ্যুষিত উত্তর-ওয়াজিরিস্তানের এক পরিবারের তিন সদস্যকে কংগ্রেসে হাজির হওয়ার ব্যবস্থা করে দেন কংগ্রেসম্যান অ্যালান গ্রেসন। দুই মেয়ে নাবিলা ও জুবাইরকে নিয়ে বাবা রফিকুর রেহমান মুখোমুখি কংগ্রেসম্যানদের।
এ সময় জুবাইর ড্রোন হামলায় কীভাবে তার দাদির মৃত্যু হয়। ছবি আঁকিয়ে তা বোঝানোর চেষ্টা করে। ওই ছবিতে ফুটে উঠেছে তার মুখের ভাষা। জুবাইর জানায়, রান্নার সবজি তুলতে গিয়ে ড্রোন হামলার শিকার হন তার দাদি। ৬৭ বছরের বৃদ্ধা মানুষটি ঘটনাস্থলেই ছিন্নবচ্ছিন্ন হয়ে যান। বৃদ্ধার ছেলে কংগ্রেসকে বলেন, ভাবতেই পারেনি ড্রোনের ক্ষেপণাস্ত্র কেড়ে নেবে আমার নিরপরাধ মায়ের জীবন। তিনি আরও বলেন, আমার মাকে লক্ষ্য করে কেন সেদিন ড্রোন হামলা চালানো হয়েছিল তার উত্তর কেউ দেয়নি। সব গণমাধ্যম বলেছে, ওই হামলায় তিন, চার বা পাঁচ ব্যক্তি নিহত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে সেদিন নিহত হয়েছে একজন ... একজন স্নেহময়ী মা, একজন প্রিয় দাদি, মধ্যবয়সী এক নিরপরাধ নারী।” সেদিন সবজি তুলতে বুড়িমা’র (দাদির) সঙ্গে ঘর থেকে বেরিয়েছিল জুবাইরও। মাথার ওপর মার্কিন ড্রোন দেখেও সে ভয় পায়নি। জুবাইর বলেছে, ক্ষেতে দাদির সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আমি মাথার ওপর ড্রোন উড়তে দেখেছিলাম। কিন্তু আমি ভয় পাইনি। কারণ, আমি জঙ্গি নই। আমাদের ওপর হামলা হবে না। কিন্তু হঠাৎ ড্রোন থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুটে আসে আমাদের দিকে আমার দাদির দেহ মুহূর্তেই খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যায়।”
জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে নালিশ : পাকিস্তানে ড্রোন হামলার শিকার ও ভুক্তভোগীরা জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের গবেষণা দলকে তাদের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে। এদের মধ্যে হয় কেউ হামলার পরও বেঁচে আছে না হয় নিজ চোখে হামলার দৃশ্য দেখেছে অথবা তাদের পরিবারের কেউ এ ঘটনায় মারা গেছে। তেমন দু’জন ব্যক্তির জবানবন্দি তুলে ধরা হল- সাদা উল্লাহ ওয়াজিব (কিশোর) : সাদা উল্লাহর বাড়ি উত্তর ওয়াজিরিস্থানের মীর আলী এলাকার মাচি খেলে। ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে সে ড্রোন হামলায় গুরুতর আহত হয়। এ ব্যাপারে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে লিখিত অভিযোগ করেছে। সাদা উল্লাহ জানায়, ড্রোন হামলার শিকার হওয়ার আগে তার জীবন ছিল হাসি-খুশিতে ভরা। আমি স্কুলে যেতাম কিন্তু এখন যেতে পারি না। আমি পঙ্গু।
ওয়ালিদ সিরাজ (২২) : ওয়ালিদ সিরাজ স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থী ছিল। রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে পড়ছিল সে। ড্রোন নামক দুঃস্বপ্ন কেড়ে নিয়েছে তার সব স্বপ্ন। ওয়াহেদের সে দুঃসহ স্মৃতির বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, সেদিন ভোরে আমার বাবা আমাকে ঘুম থেকে ডেকে দেয় অন্য দশটা দিনের মতো। যথারীতি নামাজ শেষে পড়তে বসেছিলাম। আর তখনই একটি ড্রোন ক্ষেপণাস্ত্র এসে আঘাত করে আমাকে সেই থেকে আমি এক প্রতিবন্ধী। তথ্যসূত্র : রয়টার্স, দ্য নেশন।
পাকিস্তানে এমন ওয়ালিদ, সাদা উল্লাহর সংখ্যা অগণিত। হিশম আবরার খালিদ রাহিম, ফিরোজ আলী খান, মারোয়ান আলীম নাজিব সাদিক এরা প্রত্যেকেই আজ জাতিসংঘের শরণাপন্ন। তারা বিচার চায়- বিচার চায় এ বিচার বহির্ভূত নৃশংস হত্যাকাণ্ডের। জাতিসংঘের কাছে তারা জীবনের নিরাপত্তা চায়। নিরাপত্তা চায় সমস্ত বেসামরিক নাগরিকের। যেন আর কেউ তাদের মতো অকাল অথর্ব না হয়- আর কোনো মায়ের কোল যেন অবহেলায় শূন্য না হয়।
উল্লেখ্য, আমেরিকা ড্রোন হামলা চালিয়ে এ পর্যন্ত ৩ হাজার ৩২৫ জন পাকিস্তানিকে হত্যা করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট এ ধরনের হামলার নির্দেশ দিলেও আমেরিকার সব নাগরিক যে ড্রোন হামলাকে সমর্থন করছেন তা নয়। এ ধরনেরই একজন হলেন মার্কিন কংগ্রেসম্যান অ্যালান গ্রেসন। রেহমান পরিবারের দুর্দশা মার্কিন কংগ্রেসে তুলে ধরার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন তিনিই।