Tuesday, May 5, 2015

‘চিকিৎসা না দিয়ে নেতাদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া হচ্ছে’ -বিএনপি

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের শীর্ষ নেতাদের সুচিকিৎসা না দিয়ে কারাগারে রেখে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির মুখপাত্র ও দলের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন। আজ বিকালে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ অভিযোগ করেন। আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, আমরা অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছিÑ কারারুদ্ধ বিএনপি নেতৃবৃন্দকে বারবার রিমান্ডে নেয়ায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। নেতাদের সুস্থ অবস্থায় গ্রেপ্তার করা হলেও এদের কেউ  কেউ লাশ হয়ে ফিরছেন আবার কেউ হুইল চেয়ারে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসছেন। অন্যরা রোগ যন্ত্রণায় কারাভ্যন্তরে কাতর হয়ে পড়ছেন। মির্জা আলমগীরকে চিকিৎসা না দিয়ে কারাগারে পাঠানোর সমালোচনা করে রিপন বলেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব গুরুতর অসুস্থ হয়ে হুইল চেয়ারে বসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছেন। কিন্তু তাকে হাসপাতালে ভর্তি না করে আবারও কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় আমরা তার জীবন নিয়ে শঙ্কিত। কারণ মির্জা আলমগীর হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যারোটিড আর্টারিতে ব্লকসহ নানা জটিল রোগে  আক্রান্ত। দীর্ঘ পাঁচ মাস ধরে অসুস্থ অবস্থায় কারাগারে আটক রয়েছেন। তিনি বলেন, মির্জা  আলমগীর ছাড়াও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী, আবদুস সালাম পিন্টু, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও গাজীপুর সিটির মেয়র আবদুল মান্নান, শামসুজ্জামান দুদু, যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদ কারাগারে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। সুচিকিৎসার অভাবে তাদের জীবন সঙ্কটাপন্ন হয়ে উঠছে। এই অবস্থায়  নেতাদের পরিবার যেমন উৎকণ্ঠিত তেমনি আমরাও উদ্বিগ্ন। রিপন বলেন, সুচিকিৎসা না দেয়ায় বিএনপি নেতা নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টুর মৃত্যু হয়েছে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছেন, পিন্টুকে হত্যা করা হয়েছে। আমিও একই কথা বলছি। তাকে সুচিকিৎসা না দেয়ার তার মৃত্যু হয়েছে।   অবিলম্বে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সুচিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত হাসপাতালে স্থানান্তরসহ আটক নেতাকর্মীদের মুক্তি দাবি জানিয়ে রিপন বলেন, আমরা সরকারের কাছে মানবিক আচরণের প্রত্যাশা করছি। কারণ বিরোধী নেতারা বেঁচে থাকলেই সরকার তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধিতায় অবতীর্ণ হতে পারবেন। কিন্তু মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া চরম অমানবিক। তিনি বলেন, রাজনীতিতে মানুষের ভিন্নমত থাকবে। রাজনীতি মানে এই নয় কাউকে সমালোচনা করলে জেলে ঢুকিয়ে রাখা। সরকার ভিন্নমতের লোকজনদের জেলখানায় ঢুকিয়ে রেখেছে। সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির সহ-দপ্তর সম্পাদক আসাদুল করিম শাহীন, যুবদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি আবদুস সালাম আজাদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

পদ্মা সেতু বন্ধে বিশ্বব্যাংকে ফোন করিয়েছিলেন ইউনূস: প্রধানমন্ত্রী

জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক)
সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মন্ত্রীরা। ছবি: ফোকাস বাংলা
গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ও শান্তিতে নোবেল জয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস পদ্মা সেতু প্রকল্প বন্ধ করার জন্য তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনকে দিয়ে বিশ্বব্যাংকে ফোন করিয়েছিলেন বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্বব্যাংক প্রথম যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তা সংস্থাটির নিজস্ব সিদ্ধান্ত ছিল না।
আজ মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। সভায় অংশ নেওয়া একটি দায়িত্বশীল সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
একনেক সভায় নিমগাছি সমাজভিত্তিক মৎস্য চাষ প্রকল্পের ওপর বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) পরিদর্শন প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই সূত্রে জানা গেছে, সভায় দেশের ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থার সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ক্ষুদ্রঋণের ফাঁদে আটকে যাচ্ছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য যে ক্ষুদ্রঋণ মডেল, তা বাস্তবায়নের সময় দেখা গেছে এতে ব্যবসায়ী মনোভাব এসে পড়ে। কিন্তু রাষ্ট্র কখনোই ব্যবসায়ী মনোভাব দেখাতে পারে না। এটা বর্তমান সরকারের দর্শনও। তাঁর মতে, এ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে বাঁচানোর জন্য রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতেই হবে। তখন এ ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের মনোভাবের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে।
এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গ্রামীণ ব্যাংকের ৫৪টি সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এই ব্যা্ংকের ঋণের ফাঁদে আটকে আছে। গরিব মানুষের জন্য যা লাভজনক, তাতে কেউ যদি আঘাত করে, তবে সরকার তা মেনে নেবে না।
এ সময় শেখ হাসিনা আরও বলেন, ১৯৯৬ সালে মুঠোফোনের লাইসেন্স দেওয়ার দরপত্রে গ্রামীণফোনের অবস্থান ছিল চতুর্থ। শুধু প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সুবিধা পাবে-এ উদ্দেশে গ্রামীণফোনকে লাইসেন্স অনুমোদন দেওয়া হয়। এ জন্য তখন সমালোচনা হয়েছে। কথা ছিল প্রতিষ্ঠানটি যৌথ বিনিয়োগে হবে। কিন্তু ড. ইউনূস শেয়ার বিক্রি করে দেন।
উল্লেখ্য, আজকের একনেক সভায় নিমগাছি সমাজভিত্তিক মৎস্য চাষ প্রকল্পের ওপর বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) পরিদর্শন প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়।

রং লেগেছে ডালে ডালে by আশীষ-উর-রহমান

কৃষ্ণচূড়া। হাতিরঝিল লেকের পাড় থেকে তোলা ছবি l প্রথম আলো
বিদায় নিয়েছে শিমুল-পলাশ। তবে প্রকৃতি থেকে তাদের রঙের ছটা একেবারে মুছে যায়নি। বসন্তের সেই রক্তিম রেশ ধরে রেখেছে গ্রীষ্মের কৃষ্ণচূড়া। খররোদে তপ্ত দিনে এই ব্যতিব্যস্ত মহানগরের পথে পথে ঘন সবুজ পত্রপুঞ্জের ভেতর উজ্জ্বল হয়ে আছে লাল কৃষ্ণচূড়ার গুচ্ছ। রং লেগেছে কৃষ্ণচূড়ার ডালে ডালে।
শহরকে পুষ্পশোভিত করে তুলতে কৃষ্ণচূড়া অনন্য। চৈতালি হাওয়ার ঝাপটায় পাতা ঝরে যাওয়া কৃষ্ণচূড়ার শাখা গ্রীষ্মের শুরু থেকেই যখন অজস্র ফুলে ফুলে ভরে ওঠে, প্রখর রোদের দীপ্তিতে তখন তার এই বিপুল বর্ণবৈভব চোখে প্রায় ধাঁধা লাগিয়ে দেয়। দিনে দিনে গুচ্ছ গুচ্ছ ফুলের চারপাশ দিয়ে উদ্গত সবুজ পাতারা ফুলগুলোকে যেন সযতনে রচিত স্তবকে পরিণত করে তোলে। চলতি পথে আপনা থেকেই তার দিকে দৃষ্টি যায়। অনাবিল আনন্দের অনুভূতি মনকে প্রশান্ত করে।
ঢাকার পথে ফুলের শোভা বেশি চোখে পড়ে এই গ্রীষ্মেই। প্রধান ভূমিকা কৃষ্ণচূড়ার। জাতীয় সংসদ এলাকায় বিজয় সরণি, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, ধানমন্ডির সাত মসজিদ রোড, রমনা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, পুরোনো এলিফ্যান্ট রোড, বেইলি রোড, হাতিরঝিল, কাকরাইলের কৃষ্ণচূড়ার সারি লাবণ্যময় করে রেখেছে পরিবেশ। এ ছাড়া বিক্ষিপ্তভাবে বিভিন্ন পথের পাশে, দপ্তর প্রাঙ্গণে বা কোনো পুরোনো বাড়ির উঠানের কোণ থেকেও কৃষ্ণচূড়ার রঙিন উচ্ছ্বাস ব্যস্ত পথিকের দৃষ্টি ছুঁয়ে যায়। তাতে মন স্নিগ্ধতার স্পর্শ পায়। আবার কারও হয়তো মনে পড়বে কবি শামসুর রাহমানের সেই অমর কাব্যপঙ্ক্তি, ‘আবার ফুটেছে দ্যাখো কৃষ্ণচূড়া থরে থরে শহরের পথে/ কেমন নিবিড় হ’য়ে। কখনো মিছিলে কখনো-বা/ একা হেঁটে যেতে যেতে মনে হয়-ফুল নয়, ওরা/ শহীদের ঝলকিত রক্তের বুদ্বুদ, স্মৃতিগন্ধে ভরপুর।/ একুশের কৃষ্ণচূড়া আমাদের চেতনারই রঙ।’
কেবল আনন্দানুভূতির সঙ্গেই নয়, কৃষ্ণচূড়া কখন যেন জড়িয়ে গেছে আমাদের চেতনার অনুষঙ্গে। ফুলটিকে তাই বিদেশি বলে ভাবতেই বরং বিস্ময় জাগে। তবে সত্যি যে কৃষ্ণচূড়ার জন্ম এখানে হয়নি। তার আদি নিবাস সুদূর মাদাগাস্কারে। দ্বিজেন শর্মা তাঁর শ্যামলী নিসর্গতে লিখেছেন, জন্মভূমি মাদাগাস্কার থেকে ১৮২৪ সালে তার পর্যটন শুরু। প্রথমে মুরিটাস, সেখান থেকে রানির দেশ ইংল্যান্ড হয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের কাছে তার পরিচয় ‘ডেলোনিক্স রিজিয়া’।
আদি বাস যেখানেই হোক, বহু বছর থেকে কৃষ্ণচূড়া আমাদের দেশে বেশ যত্নেই লালিত-পালিত হচ্ছে। সে যেমন তার অনন্য রূপমাধুরী দিয়ে মানুষের মন ভরিয়ে দিয়েছে, তেমনি মানুষও তাকে ভালোবেসে আপন করে নিয়েছে। স্থান দিয়েছে কাব্যে, হৃদয়ে। তাই কৃষ্ণচূড়াকে আর পর বলে মনে হয় না। আসলে ভালোবাসাই দূরত্ব ঘুচিয়ে দেয় চিরকাল, আপন করে তোলে অপরকে; সেই যে রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেছিলেন, ‘দূরকে করিলে নিকট, বন্ধু, পরকে করিলে ভাই’। সুদূর থেকে নিকটে আসা কৃষ্ণচূড়া তোমার রূপমাধুরীতে বাংলার তপ্ত গ্রীষ্মকে রাঙিয়ে দাও অনন্তদিন।

যুক্তরাজ্যে সাধারণ নির্বাচন বৃহস্পতিবার, বাংলাদেশি প্রার্থীদের নিয়ে অন্য রকম আমেজ, আগ্রহ by তবারুকুল ইসলাম

যুক্তরাজ্যের সাধারণ নির্বাচনে প্রধান তিনটি দল থেকে এমপি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ১১ জন। এর মধ্যে লেবার পার্টি থেকে সাতজন, লিবারেল ডেমোক্র্যাটস (লিবডেম) থেকে তিনজন ও কনজারভেটিভ পার্টি থেকে একজন মনোনয়ন পেয়েছেন।
সাধারণ নির্বাচনে এবারই সবচেয়ে বেশিসংখ্যক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থী লড়ছেন। এ কারণে যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে তৈরি হয়েছে অন্য রকম আমেজ, আগ্রহ। এই নির্বাচনকে তাঁরা দেখছেন রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের একটি বড় মাইলফলক হিসেবে। আগামী বৃহস্পতিবার এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
গত রোববার ছিল নির্বাচনের আগে শেষ সাপ্তাহিক ছুটির দিন। দেশটির নির্বাচনী ভাষায় দিনটিকে বলা হয় ‘কি সিট ডে’। এদিন তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ (মার্জিনাল) আসনগুলোকে শেষবারের মতো ঝালাই করে নিতে প্রচারণা চালানো হয়। লন্ডনের এমন দুটি ‘কি সিট’ হ্যাম্পস্টেড অ্যান্ড কিলবার্ন আসনে টিউলিপ রেজওয়ানা সিদ্দিক এবং ইলিং সেন্ট্রাল অ্যান্ড অ্যাকটন আসনে রূপা হক লড়ছেন লেবার দলের প্রার্থী হিসেবে। আসন দুটি এবার লেবার দলের অন্যতম টার্গেট সিট। রোববার ওই দুই আসনে প্রচারণায় অংশ নেন রুশনারা আলী।
২০১০ সালে পূর্ব লন্ডনের বাংলাদেশি অধ্যুষিত বেথনাল গ্রিন অ্যান্ড বো আসনে লেবার দলের প্রার্থী রুশনারা আলী প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত হিসেবে এমপি নির্বাচিত হন। এবারও তিনি ওই আসনে প্রার্থী হয়েছেন। গত নির্বাচনে প্রায় ১১ হাজার ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হওয়া রুশনারার জন্ম ১৯৭৫ সালে সিলেটের বিশ্বনাথে।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহানার মেয়ে টিউলিপ রেজওয়ানা সিদ্দিক এমপি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন হ্যাম্পস্ট্যাড অ্যান্ড কিলবার্ন আসনে লেবার দলের মনোনয়নে। গতবার এ আসনে এমপি ছিলেন লেবার দলের গ্লেন্ডা জ্যাকসন। টিউলিপ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছেন কিংস কলেজ থেকে।
লন্ডনের ইলিং সেন্ট্রাল অ্যান্ড অ্যাকটন আসনে লেবার দলে র প্রার্থী রূপা হক কিংস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক। গত নির্বাচনে কনজারভেটিভদের দখলে যাওয়া এ আসনটি এবার লেবারের অন্যতম ‘টার্গেট সিট’। ১৯৭২ সালে ইলিংয়ে জন্ম নেওয়া রূপার আদি বাড়ি পাবনায়।
লেবার দল থেকে লন্ডনের অদূরে বেকেনহাম আসনে প্রার্থী হয়েছেন মেরিনা আহমদ। নারায়ণগঞ্জে জন্ম নেওয়া মেরিনা ছয় মাস বয়সে মা-বাবার সঙ্গে যুক্তরাজ্যে পাড়ি দেন।
লন্ডনের কাছের ওয়েলউইন অ্যান্ড হার্টফিল্ড আসনে লেবার দলের প্রার্থী আনোয়ার বাবুল মিয়া। তিনি লড়ছেন কনজারভেটিভ দলের চেয়ারম্যান ও মন্ত্রী গ্রান্ট শ্যাপের সঙ্গে।
নর্থ ইস্ট হ্যাম্পশায়ার আসনে লেবারের প্রার্থী আমরান হোসাইন। চিকিৎসাবিজ্ঞানে পড়াশোনা করা আমরানের জন্ম যুক্তরাজ্যে, বাড়ি সিলেটের গোলাপগঞ্জে।
লুটনের রিগেইট অ্যান্ড বেনস্ট্যাড আসনে লেবার দলের প্রার্থী আলী আকলাকুল। তাঁর জন্ম লুটনে, আদি বাড়ি সিলেটের বালাগঞ্জে।
লিবডেম থেকে মনোনয়ন পাওয়া তিন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থী হলেন প্রিন্স সাদিক চৌধুরী, আশুক আহমদ ও মোহাম্মদ সুলতান। সিলেটে জন্ম নেওয়া ব্যবসায়ী প্রিন্স সাদিক লড়ছেন নর্থ হ্যাম্পটন সাউথ আসনে। তিনি ২০০৭ সালে নর্থহ্যাম্পটনশায়ার কাউন্সিল নির্বাচনে বিজয়ী প্রথম বাংলাদেশি কাউন্সেলর।
আশুক আহমদ প্রার্থী হয়েছেন লুটন সাউথ আসনে। তাঁর জন্ম সিলেটের বিয়ানীবাজারে। ওয়েলসের আর্ফন আসনে লিবডেমের প্রার্থী মোহাম্মদ সুলতান। সিলেটের দক্ষিণ সুরমায় জন্ম তাঁর।
গত পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকা কনজারভেটিভ পার্টির একমাত্র বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থী মিনা রহমান। তিনি লড়ছেন লন্ডনের বার্কিং আসনে। লেবার দলের মার্গারেট হজ ১৯৯৪ সাল থেকে এ আসনের এমপি। এবারও প্রার্থী হয়েছেন মার্গারেট। এটি লেবার দলের একটি নিরাপদ আসন হলেও জয়ের লক্ষ্য নিয়েই প্রচার চালান মিনা। তাঁর জন্ম সিলেটের ছাতকে। আইন বিষয়ে পড়াশোনা করা মিনা চাকরি করেন আবাসন সংস্থার ব্যবস্থাপক হিসেবে।
স্কটল্যান্ডের অ্যাবার্ডিনশায়ারের বেনফ অ্যান্ড বুখান আসনে স্বতন্ত্র হিসেবে লড়ছেন সুমন হক। স্কটল্যান্ডে জন্ম নেওয়া সুমনের আদি বাড়ি সুনামগঞ্জের ছাতকে। তিনিও লেবার দলের মনোনয়ন পেয়েছিলেন। কিন্তু মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর অভিযোগে আদালতে হাজিরা দেওয়ায় তাঁর ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে দল।
২০১০ সালে লেবার দল থেকে রুশনারা আলীসহ চারজন, লিবডেম ও কনজারভেটিভ পার্টি থেকে একজন করে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। গতবার মনোনয়ন পাওয়া ছয়জনের তিনজনই ছিলেন বাংলাদেশি অধ্যুষিত বেথনাল গ্রিন অ্যান্ড বো আসনের প্রার্থী।
এবার বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশটির বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে আগ্রহও বেড়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশি অধ্যুষিত পূর্ব লন্ডনে নির্বাচনী আমেজ বেশি দৃশ্যমান। রোববার বিকেলে পূর্ব লন্ডনের ব্রিক লেইনের মধুবন রেস্তোরাঁয় বসে নির্বাচন নিয়ে আলাপ করছিলেন কয়েকজন বয়োজ্যেষ্ঠ বাংলাদেশি। কোন দলকে সমর্থন করেন—জানতে চাইলে তাঁরা অনেকটা সমস্বরে বললেন, লেবার পার্টি। কারণ হিসেবে বললেন, লেবার পার্টি অভিবাসীদের প্রতি ভালো আচরণ করে। অবশ্য যেকোনো দলের মনোনয়ন পাওয়া বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থীদের পক্ষেই তাঁদের অবস্থান। শুধু রেস্তোরাঁয় নয়, সামাজিক অনুষ্ঠান কিংবা অন্যান্য স্থানেও জমে উঠছে নির্বাচনী আলাপ। এসব বাংলাদেশির আশা, এবার ব্রিটিশ পার্লামেন্টে নিজেদের প্রতিনিধিত্ব বাড়বে।
বাংলাদেশি প্রার্থীদের মধ্যে কতজন বিজয়ী হবেন তা নিয়ে ভাবছেন না লন্ডনের ব্রেন্ট কাউন্সিলের বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কাউন্সিলর পারভেজ আহমদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘কতজন বিজয়ী হবেন সেটা বড় কথা নয়, বড় কথা হচ্ছে এসব বাংলাদেশি নিজেদের মেধা এবং যোগ্যতা দিয়ে দলের এমপি প্রার্থী হওয়ার টিকিট অর্জন করেছেন। এটি নতুন প্রজন্মকে মূলধারায় সম্পৃক্ত হওয়ার জন্য যে অনুপ্রেরণা ও সাহস জোগাবে সেটাই বড় অর্জন।’
মূলধারার রাজনীতিতে বাংলাদেশিদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে জানতে চাইলে লন্ডন মেট্রোপলিটান ইউনিভার্সিটির সোশ্যাল পলিসি বিষয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক শামসুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, নিজস্ব গণ্ডির বাইরে গিয়ে বাংলাদেশিদের এমন বিচরণ বেশ আশাব্যঞ্জক। অন্যান্য সম্প্রদায়ের মতো বাংলাদেশিরাও এ দেশে আসার পর থেকেই নিজেদের অস্তিত্ব ও অধিকার খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করেছেন। তারই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে আজকের এই অবস্থান। তিনি বলেন, বর্ণবাদ, বৈষম্য, অধিকার কিংবা অস্তিত্ব সবকিছুই রাজনৈতিক বিষয়। তাই টিকে থাকতে হলে একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হিসেবে রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন অত্যন্ত¯জরুরি। তাঁর মতে, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব না থাকলে বৈষম্য থেকে রেহাই পাওয়া কিংবা অধিকার আদায় সম্ভব হয় না।
এবার প্রধান তিনটি দল থেকে ১১ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতসহ এশীয় বংশোদ্ভূত মোট ১০২ জন এমপি পদে প্রার্থী হয়েছেন। এর মধ্যে কনজারভেটিভ পার্টি ৩৬, লেবার ৩৪ ও লিবডেম ৩২ জনকে মনোনয়ন দিয়েছে। এসব প্রার্থীর বেশির ভাগই ভারতীয় এবং পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত। গত মেয়াদে ভারতীয় ও পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত আটজন করে এমপি ছিলেন ব্রিটিশ পার্লামেন্টে।

‘দেশ স্বাধীন করে পাপ করেছি’ -বঙ্গবীর আব্দুল কাদের সিদ্দিকী

কৃষক শ্রমিক জনতালীগ সভাপতি বঙ্গবীর আব্দুল কাদের সিদ্দিকী বলেছেন দেশ স্বাধীন করে পাপ করেছি আর সেই পাপ মোচন করার জন্য এখন দেশের মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াচ্ছি।
দেশব্যাপি চলমান শান্তির জন্য অবস্থান কর্মসূচির অংশ হিসাবে মঙ্গলবার টাঙ্গাইলের ঘাটাইলের মাকড়াইয়ের কুমারপাড়ায় অবস্থান কর্মসূেিত মত বিনিময় সভায় তিনি  এ কথা বলেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়  সম্মুখযুদ্ধে তিনি অবস্থান কর্মসূচি স্থল মাকড়াইয়ে আহত হন। অবস্থান কর্মসূচির ৯৯ দিনের মত বিনিময় সভায় তিনি আরো বলেন, যে দেশের মানুষ যুদ্ধ করে ভোটাধিকার আদায় করেছে সে দেশের জনগণ আজ ভোটাধিকার বঞ্চিত। বর্তমান সবরকার জনগনের সেই ভোটাধিকার হরণ করেছে। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের পর আবার  সরকার তামাশার সিটি  নির্বাচন করল। হাসিনার কাছে মানুষের ভোটাধিকার বড় নয় তার কাছে ক্ষমতা বড়। তার কাছে দেশের মানুষ সবচেয়ে অপ্রিয়। মানুষের ভোটাধিকার নিহ্নিত করতে না পারলে দেশ এক ভয়াবহ সংকটে পড়বে। তাই শান্তির পক্ষে একত্রিত হওয়ার জন্য দেশের জনগণের প্রতি আহবান জানান। এসময় দলের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম  সাধারণ সম্পাদক ইকবাল সিদ্দিকী ও আনিসুর রহমান, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ফরিদ আহমেদ, কেন্দ্রীয় ছাত্র আন্দোলনের আহবায়ক রিফাতুল ইসলাম দীপ, যুব আন্দোলনের আহবায়ক হাবিবুন নবী সোহেল, টাংগাইল জেলার সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট রফিকুল ইসলাম ও ঘাটাইল উপজেলার কৃষক শ্রমিক জনতালীগের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

বাংলাদেশে প্রকাশ্যে প্রস্রাব ঠেকাতে আরবি ভাষা

ঢাকায় আরবিতে দেয়াল লিখন
বাংলাদেশে প্রকাশ্য স্থানে মূত্রত্যাগ ঠেকাতে রাজধানী ঢাকার দেয়ালে আরবি ভাষা ব্যবহারের এক অভিনব উদ্যোগ নিয়েছে ধর্ম মন্ত্রণালয় ও সিটি কর্পোরেশন।
এ লক্ষ্যে ঢাকার বিভিন্ন দেয়ালে আজকাল আরবি ভাষায় 'যেখানে সেখানে প্রস্রাব না করার' বার্তা লিখে দেয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশের ধর্ম মন্ত্রী মতিউর রহমানের এক বার্তা-সম্বলিত একটি ভিডিও আজকাল ইউটিউব এবং ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগ ওয়েবসাইটে ব্যাপক প্রচার পাচ্ছে। এতে মন্ত্রী বলছেন, দেখা যাচ্ছে ঢাকা শহরের মসজিদগুলোতে প্রস্রাবের জায়গা থাকলেও অনেকে বাইরে প্রস্রাব করছে। 'এখানে প্রস্রাব করিবেন না' লেখা দেয়ালেও লোকে প্রস্রাব করছে।
ভিডিওটিতে বলা হচ্ছে, ৯০ শতাংশ মুসলিম-অধ্যুষিত বাংলাদেশে আরবি একটি পবিত্র ভাষায় হিসেবে বিবেচিত, যদিও খুব কম লোকই এ ভাষা জানেন বা বোঝেন। তাই প্রকাশ্যে প্রস্রাব না করার বার্তাটি তারা রাস্তার পাশের দেয়ালগুলোতে আরবি ভাষাতে দেয়া লিখে দিচ্ছেন। কোথাও কোথাও আবার দিকনির্দেশক চিহ্নসহ আরবির পাশাপাশি বাংলাতেও লেখা হচ্ছে : '১০০ হাত দূরে মসজিদ' অর্থাৎ বলে দেয়া হচ্ছে যে সেখানে গেলে প্রস্রাবের জায়গা পাওয়া যাবে। এতে আরো বলা হয়, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের এই অভিনব উদ্যোগ ইতিমধ্যেই দারুণ কার্যকর হয়েছে।
ধর্মমন্ত্রণালয়ের সচিব ড. চৌধুরী মোহাম্মদ বাবুল হাসান বিবিসি বাংলাকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আরবি ভাষা পবিত্র কোরানের ভাষা, তাই সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মনে আরবি ভাষার ব্যাপারে একটা সম্মান ও ভীতির অনুভুতি কাজ করে, তাই দেয়ালে আরবি লেখা দেখলে সেখানে লোকের প্রস্রাব করবে না - এই ভাবনা থেকেই এ উদ্যোগ।
কিছুকাল আগে ধর্মমন্ত্রী সিটি কর্পোরেশনকে একটি চিঠি দিয়ে তার এই ভাবনার কথা জানিয়েছিলেন। সিটি কর্পোরেশনই এ দেয়াল লিখনের কাজটা করছে, বলে জানান তিনি।
তিনি আরো বলেন, এ উদ্যোগের ফলে ইতিমধ্যেই শহরে একটা পরিচ্ছন্ন ভাব এসেছে।
প্রকাশ্যে প্রস্রাব ঢাকার মতো শহরে একটি বড় সমস্যা
ঢাকার মতো জনবহুল শহরে পর্যাপ্ত টয়লেটের ব্যবস্থা না করে মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহার করে এ উদ্যোগ কতটা যথাযথ- এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে বলেন "কোনো মুসলমানই এমনটা মনে করবে না, বরং একটা ভালো কাজ হিসেবে একে সমর্থন করবে।"
ড. হাসান বলেন, সিটি কর্পোরেশন এ ছাড়াও নিজ উদ্যোগে ঢাকা শহরকে পরিচ্ছন্ন রাখার কাজ করছে।
সূত্র : বিবিসি

রামের জন্মভূমি অযোধ্যায় নয়, পাকিস্তানে

হিন্দু দেবতা রামের জন্মভূমি অযোধ্যায় নয়, পাকিস্তানে। এ দাবি করেছেন ভারতের মুসলমানদের সর্বোচ্চ সংস্থা অল ইন্ডিয়া মুসলিম পারসনাল ল' বোর্ডের সদস্য আবদুর রহিম কোরেশি।
ভারতের উত্তর প্রদেশের বাবরি মসজিদের স্থানটি রামের কথিত জন্মভূমি দাবি করে উগ্র হিন্দুরা সেটি ভেঙে ফেলে। ওই সময়ে দাঙ্গায় অন্তত দুই হাজার লোক নিহত হয়।
২০১০ সালে উত্তর প্রদেশের আদালত এক রায়ে জানায়, স্থানটি হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ভাগাভাগি করে দেয়া উচিত। হিন্দুরা পাবে দুই-তৃতীয়াংশ স্থান, বাকিটা মুসলমানেরা।
আবদুর রহিম রামের জন্মভূমি নিয়ে 'অযোধ্যা কা তানাজাহ' (অযোধ্যা বিতর্ক) নামে একটি বই লিখেছেন। এটির প্রকাশনা অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, তিনি প্রত্নতত্ত্ববিদ জশু রামের গবেষণার ভিত্তিতে বইটি লিখেছেন। তিনি বলেন, ও্রই গবেষকের মত অনুযায়ী, মের জন্মস্থান অযোধ্যায় নয়, সেটা পাকিস্তানের রামদেরি। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান হওয়ার পর স্থানটি নাম বদলিয়ে রহমানদেরি রাখা হয়।
তিনি আরো বলেন, রামের জন্মস্থান সম্ভবত হরপ্পায়। ওই স্থানটিও পাকিস্তানে।
তিনি বলেন, অযোধ্যায় ইতোমধ্যে তিন দফায় প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজ হয়েছে। কিন্তু তাতে রাম-আমলের কোনো জনবসতির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সূত্র : এক্সপ্রেস ট্রিবিউন।

পরিত্যক্ত ভবনে হাজার মানুষের বাস, এজিবি কলোনির ঝুঁকিপূর্ণ দুই ভবন by অরূপ দত্ত

রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের পূর্ব দিকে এজিবি
কলোনির পরিত্যক্ত ভবন দুটি যেকোনো সময় ভেঙে
পড়তে পারে। ছবিটি রোববার তোলা l সাজিদ হোসেন
১০ বছর আগে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হলেও রাজধানীর এজিবি কলোনির দুটি ভবনে বসবাস করছেন প্রায় এক হাজার মানুষ। আর ভবন দুটির ৮৮টি ফ্ল্যাট নিয়ে চলছে বাণিজ্য। গণপূর্ত অধিদপ্তর পরিত্যক্ত ঘোষণা করলেও এখানে কয়েকজন সরকারি কর্মচারীও পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন।
গতকাল সোমবার দুপুরে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের পূর্ব দিকে এজিবি কলোনিতে গিয়ে দেখা যায়, চারতলা ভবন দুটির বারান্দায় সিমেন্টের আস্তর থেকে রড বেরিয়ে গেছে। কিছু কিছু ঝুলে আছে। পাঁচটি ঘর ঘুরে দেখা গেল, ছাদের বেশির ভাগ অংশ ফাটা।
ভবন দুটির গায়ে সরকারি কর্তৃপক্ষের সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তিও সাঁটানো দেখে অনেকেরই নির্মম রসিকতা মনে হতে পারে। তাতে লেখা: ‘অত্র ভবন নং ৩৪ ও ৩৬ অতি পুরাতন, জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ। বিগত ২০/০৩/২০০৫ ইং তারিখে বসবাসের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। সেই জন্য এই ভবনে বসবাস মোটেই নিরাপদ নয়। এই ভবনে বসবাস করিলে ভবনজনিত কোন দুর্ঘটনার জন্য কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকিবে না।’
বিজ্ঞপ্তি দেখিয়ে অন্য ভবনের বাসিন্দা আবদুর রশিদ বলেন, ‘এমন বিজ্ঞপ্তি দিয়াই সরকার দায়িত্ব শেষ করেছে।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেল, দুটি ভবনে ফ্ল্যাটের সংখ্যা ১০৮। এর মধ্যে ২০টিতে থাকেন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থার লোক। বাকি ফ্ল্যাটগুলোর তিন শর বেশি পরিবার থাকে। এক একটি ফ্ল্যাটে তিনটি বা কোনোটিতে তারও বেশি পরিবার থাকে। সব মিলিয়ে লোকসংখ্যা প্রায় এক হাজার।
গত ২৫ এপ্রিলের ভূমিকম্পের পর ভবনগুলোর সব মানুষ নেমে এসেছিল নিচের মাঠে, রাস্তায়। দুপুরের ভূমিকম্পের পর রাতের বেলায়ও অনেক বাসিন্দা ঘরে ঢুকতে সাহস পাচ্ছিলেন না। কিন্তু বর্তমানে সব স্বাভাবিক।
ভবনে থাকার ঝুঁকি নিয়ে কথা হয় কয়েকজনের সঙ্গে। এক বৃদ্ধা বিরক্ত হয়ে বলেন, ‘বাড়ি ভাইঙা পড়লে আমরা মরুম, আপনের কী? আপনে কি আমাগোরে থাকতে দিবেন?’ বৃদ্ধার ছেলে আবদুর রহিম বলেন, নিতান্ত অসহায় হয়ে তাঁরা বাস করছেন। সবাই জানেন, যেকোনো মুহূর্তে ভবন ভেঙে পড়বে। কিন্তু তাঁদের অন্য উপায় নেই। এত কম ভাড়ায় এখানে বাসা পাওয়া যাবে না।
আবদুর রহিমের কথায় দু-তিনজন লোক খেপে গেলেন। একজন বললেন, ‘ভাড়া কিসের রে, আমরা তো বিনা ভাড়ায় থাকি।’ চুপ থাকেন আবদুর রহিম।
পরে নাম-পরিচয় গোপন রাখার শর্তে চারজন বাসিন্দা জানান, এখানে প্রায় সবাই ভাড়া দিয়েই থাকেন। একটি ফ্ল্যাটের ভাড়া ছয় থেকে সাত হাজার টাকা। বিদ্যুৎ ও গ্যাসলাইন কাটা। রাতে কুপিবাতি জ্বলে। বেশির ভাগ ঘরে রান্না হয় লাকড়ির চুলায়। পানির লাইন আছে, তবে তার জন্য আলাদা টাকা গুনতে হয়।
ভাড়া কাদের দিতে হয়—এ বিষয়ে বাসিন্দাদের কেউই মুখ খুলতে চান না। পরে জানা যায়, মো. আলম নামের এক ব্যক্তি ১০টি ফ্ল্যাট থেকে মোট ৭০ হাজার টাকা ভাড়া নেন। তিনি নির্দিষ্ট দিন সন্ধ্যায় কলোনিতে আসেন। এ ছাড়া কলোনিরই সরকারদলীয় লোকজন বাকি ফ্ল্যাটগুলোর ভাড়া ওঠান।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী কবির আহমেদ ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘দফায় দফায় উচ্ছেদ করা হলেও বসবাসকারীরা আবারও ঢুকে পড়ে। তাদের বিদ্যুৎ ও গ্যাসলাইন কেটে দিয়েও স্থায়ীভাবে বের করা যাচ্ছে না।’ তিনি বলেন, সরকারি ২০ জন কর্মকর্তার নামে এখানে ফ্ল্যাট বরাদ্দ ছিল। তাঁরা মামলা করায় ওঠানো যাচ্ছে না। এই ২০ জনকে অন্যত্র পুনর্বাসন করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ভবন
দুটি ভেঙে ফেলা হবে বলে প্রধান প্রকৌশলী জানান।
যারা ভাড়া নেয়, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না কেন—এই প্রশ্নে প্রধান প্রকৌশলী বলেন, যারা বাণিজ্য করছে, তারা নিশ্চয়ই মাস্তান শ্রেণির। চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জন্মের পরদিনই মায়ের কোলছাড়া শিশু

পল্টন মোড় এলাকা থেকে এই নারীকে
নবজাতকসহ পুলিশ আটক করে l প্রথম আলো
জন্ম দেওয়ার পরদিন নিজ সন্তানকে অন্যের কাছে তুলে দিয়েছিলেন এক মা। অভাব-অনটন ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে নিরুপায় হয়ে ওই সিদ্ধান্ত নেন বলে জানিয়েছেন মা পারভিন বেগম। শিশুটিকে নিয়ে ঢাকা ছাড়ার আগেই আটক হয়েছেন গুলজান বেগম নামের এক নারী। পুলিশ শিশুটিকে ভর্তি করেছে হাসপাতালে।
গতকাল সোমবার রাজধানীর পল্টনে জনতা শিশু চোর সন্দেহে গুলজানকে (৫৫) ওই নবজাতকসহ পুলিশের কাছে তুলে দেয়। এরপর বেরিয়ে আসে ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরদিন শিশুটির মায়ের কোলছাড়া হওয়ার কাহিনি।
বেলা পৌনে তিনটার দিকে পল্টন থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মনিবুর রহমান ওই ছেলেশিশু ও গুলজান বেগমকে নিয়ে যান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। মনিবুর সাংবাদিকদের বলেন, গুলজান মিনিবাসে করে যাওয়ার সময় শিশুটি খুব কাঁদছিল। অন্য যাত্রীরা জানতে চান, এত ছোট শিশু কার। গুলজান শিশুটি তাঁর বলে জানালে যাত্রীদের সন্দেহ হয়। তাঁরা বিষয়টি নিয়ে হইচই শুরু করলে চালক পল্টন মোড়ে বাস থামিয়ে দেন। যাত্রীরা গুলজানকে নামিয়ে এনে কিছু মারধরও করেন। এরপর পুলিশ গিয়ে গুলজানকে আটক করে।
হাসপাতালে গুলজান জানান, তিনি ধলপুরের ১৪ নম্বর বস্তিতে থাকেন। তাঁর প্রতিবেশী আক্তার মিয়া ও ফাতেমা দম্পতির কাছ থেকে শিশুটিকে নিয়েছেন তিনি। ফাতেমা একটি বেসরকারি সংস্থার ডেলিভারি সেন্টারের কর্মী।
গুলজান জানান, তাঁর ভাই ওদুদ নিঃসন্তান, ভাই-ভাবি ফরিদপুরের নগরকান্দায় থাকেন। ভাইয়ের ইচ্ছা শিশু দত্তক নেবেন। ভাইয়ের ইচ্ছার কথা তিনি ফাতেমাকে জানিয়েছিলেন। রোববার ফাতেমা দত্তক নেওয়ার মতো একটি শিশুর জন্মের খবর দিলে তিনি রাজি হন। কথা হয়েছিল, শিশুটির মাকে ‘খুশি হয়ে’ ২০ হাজার টাকা দিতে হবে। তিনি গতকাল দুপুরে শিশুটিকে নিয়ে ফরিদপুর যাওয়ার পথে ধরা পড়েন।
বিকেলে ধলপুর বস্তিতে গিয়ে জানা যায়, সেখানে গুলজান ও আক্তার-ফাতেমা দম্পতি প্রতিবেশী। শিশুটির হাতবদলের খবর বস্তির লোকেরা জানেন। বস্তির লোকজন গুলজানের মেয়ে পোশাকশিল্প কর্মী মুন্নী বেগমকে ডেকে দেন। তিনি জানান, এমন শিশুর খোঁজ দিতে দুই বছর আগে ফাতেমাকে অনুরোধ করেছিলেন তাঁর মা। গতকাল শিশুটিকে হাতে পান তাঁর মা।
আক্তার মিয়া জানান, গুলজানের অনুরোধে পারভিনের শিশুকে দত্তক দিতে মধ্যস্থতা করেন ফাতেমা। পারভিন সন্তান জন্ম দিতে ধলপুর ডেলিভারি সেন্টারে আসেন। তিনি ফাতেমাকে জানান, স্বামী তাঁর দেখাশোনা করেন না। তাঁর আরও দুটি শিশু রয়েছে। এই শিশুটি দত্তক দিতে চান। তখনই তাঁরা গুলজানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বেসরকারি সংস্থার ডেলিভারি সেন্টারে ছেলের জন্ম দেন পারভিন।
সন্ধ্যায় পুলিশ ফাতেমা ও নাজনীনকে হাসপাতালে নিয়ে আসে। সেখানে পারভিন জানান, তিনি প্লাস্টিকের কারখানায় কাজ করতেন। স্বামী হেলাল বোতল তৈরির কারখানায় কাজ করেন। তাঁদের আগের দুটি সন্তান আছে। সাত-আট মাস ধরে হেলাল তাঁদের খোঁজ নেন না। আয় না থাকায় গর্ভকালীন সময়টা খুব কষ্টে কেটেছে। তখনই সিদ্ধান্ত নেন, পেটের শিশুটিকে দত্তক দেবেন। সে অনুযায়ী গতকাল দুপুরে শিশুটি তিনি গুলজানকে দেন। তবে টাকা নিয়ে কোনো কথা হয়নি।
পল্টন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোর্শেদ আলম জানান, শিশুটি হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। শিশুটির মা, গুলজান ও ফাতেমাকে নিয়ে পুলিশের একটি দলকে ওই বস্তিতে পাঠানো হয়েছে। বস্তির লোকজন নিশ্চিত করেছেন, রোববার পারভিন শিশুটির জন্ম দিয়েছেন এবং গতকাল ফাতেমার মধ্যস্থতায় গুলজানকে শিশুটি দান করেন। এখন হাসপাতাল মনে করলে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে শিশুটির মাতৃত্বের বিষয়টি নিশ্চিত হতে পারে।
ওসি জানান, এ বিষয়ে শিশুর মায়ের যদি কোনো অভিযোগ থাকে তবে তিনি যাত্রাবাড়ী থানায় মামলা করতে পারেন। এমনিতে পুলিশ কোনো মামলা করছে না।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, শিশুটি আপাতত সুস্থ। তবে তার শ্বাসকষ্ট রয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে। শিশুটিকে ইনকিউবেটরে রাখা হয়েছে।

শহরিস্তান ও মুহতাসিব: নগর ও রাষ্ট্র by সৈয়দ আবুল মকসুদ

পঞ্চাশের দশকের প্রথম দিকে প্রথম ঢাকায় আসি। স্টিমারে যাত্রা। যখন ফতুল্লার কাছে পৌঁছে আমাদের স্টিমার, তখন সবে সন্ধ্যা পেরিয়েছে। নদীর ভেতর থেকে দেখতে পেলাম দূরে কোথাও অগণিত নক্ষত্রের মতো বিন্দু বিন্দু আলো। অত আলো আগে আর কোনো দিন দেখিনি। আব্বা বললেন, ওই তো ঢাকা দেখা যায়। রোমাঞ্চিত হলাম। গ্রামে সন্ধ্যার পর নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। শব্দের মধ্যে ঝিঁঝির ডাক। শহরে অন্ধকার নেই। সন্ধ্যা হতেই জ্বলে ওঠে আলো। পল্লি ও নগর দুই জিনিস।
পঞ্চাশের দশকের ঢাকা আর এখন নেই। গত ৬০-৬২ বছরে ঢাকা হয়েছে আরও আলো ঝলমল। নগর হয়েছে আরও অনেক বড়। ছিল প্রাদেশিক রাজধানী। পরে স্বাধীন দেশের রাজধানী। কারও কারও জন্য এই নগর স্বর্গ, কারও জন্য অভিশাপ। এই নগরে বাস করে দেড় কোটি মানুষ। কিন্তু কারও যে এই নগর নিয়ে কিছুমাত্র মাথাব্যথা আছে, তা গত ছয় দশকে বুঝতে পারিনি। মাস খানেক যাবৎ দেখতে পাচ্ছি, আমাদের নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের কল্যাণে এই নগরকে নিয়ে ভাবার মানুষও আছেন কেউ কেউ। এই নগর নিয়ে তাঁদের মহৎ পরিকল্পনার অন্ত নেই। কেউ দেখতে চান এই নগরকে ‘তিলোত্তমা’। কেউ বানাতে চান এই নগরকে ‘পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নগর’। নগরবাসীর জন্য কত কিছু যে তাঁদের করার পরিকল্পনা ও প্রতিশ্রুতি। তবে এই পৃথিবীতে সুবিধা এই যে কোনো মানুষই তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে বাধ্য নন। অথচ প্রত্যেক মানুষেরই যেকোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে।
৪৩ বছর যাবৎ দেখতে পাচ্ছি মানুষের প্রবল দেশপ্রেম। এবারই প্রথম দেখার সুযোগ হলো নগরপ্রেম কাকে বলে। গত ৩০ বছরে এই নগরের কল্যাণে এক ছটাক কাজ করেননি, কোনো বস্তিতে আগুন লেগে হাজারো মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে পড়লেও এক মিনিটের জন্যও তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়াননি, তিনিও বস্তিবাসী ও অট্টালিকাবাসীদের জন্য ঘোষণা করছেন মহৎ পরিকল্পনা। নগরবাসী তা আড়ি পেতে শুনছে টিভির পর্দায়। আর তারা স্বপ্ন দেখছে, রাত পোহালেই বদলে যেতে শুরু করবে এই নগর। রাষ্ট্র থাকবে রাষ্ট্রের মতো যথাপূর্ব, নগরের ঘটবে পুনর্জন্ম। অনেকের কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে, তাঁরা ঢাকাকে বানাতে চান প্রাচীন গ্রিসের একটি নগররাষ্ট্র—সিটি স্টেট।
প্রাক্-মধ্যযুগের ইউরোপের নগরগুলো ছিল স্বাধীন ও স্বশাসিত। পরবর্তী কালের আধুনিক রাষ্ট্রের নগর অন্য জিনিস। তা রাষ্ট্রেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। পৃথিবীতে অতীতে কত নগর গড়ে উঠেছে, আবার একসময় তা ধ্বংস হয়েছে, গড়ে উঠেছে নতুন নগর। এই যে ঢাকা নিয়ে আমরা বক্তৃতা দিচ্ছি, তারই দুই দিকে কয়েক শ বছর আগে গড়ে উঠেছিল দুটি নগর—একটি সোনারগাঁয়ে, আরেকটি ধামরাইয়ে।
একটি প্রবাদ আছে, অরণ্যের স্রষ্টা বিধাতা আর নগরের স্রষ্টা মানুষ। এই মহাজগৎ নিয়ে বিধাতার হাতে বহুবিচিত্র কাজ থাকায় মহানগর তৈরির কাজটি তিনি মানুষের হাতেই ছেড়ে দিয়েছেন। অতীতে দীর্ঘ সময় ধরে সুষ্ঠু পরিকল্পনার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে এক-একটি নগর। কথায় আছে, রোম ওয়াজ নট বিল্ট ইন আ ডে—রোম নগর এক দিনে তৈরি হয়নি। পাঁচ বছরে আরব্য রজনীর জাদুর চেরাগ হাতে বিরাট দৈত্য ছাড়া পৃথিবীর সবচেয়ে দক্ষ মানুষটির পক্ষেও কোনো বিপর্যস্ত নগরকে একটি আধুনিক নগরে পরিণত করা সম্ভব নয়।
কয়েক শ বছর আগে আমাদের চেয়ে কম যোগ্য মানুষই এই ঢাকাকে একটি আধুনিক নগরের রূপ দিয়েছিলেন। ইউরোপীয় ব্যবসায়ীরা নৌযানে এখানে বস্ত্র কিনতে এসে তাজ্জব হয়ে যেতেন পরিকল্পিত নগর দেখে। কেমন ছিল সেকালের মানুষদের পরিকল্পিত নগর, তার কিছু নমুনা যদি দেখতে চান কেউ, চলে যান ঠাটারীবাজার, তাঁতীবাজার, নবাবপুর, ইসলামপুর, বাংলাবাজার থেকে গেন্ডারিয়া, ফরাশগঞ্জ, সতীশ সরকার রোড পর্যন্ত। কোনো রকম বক্তৃতা না দিয়েই এবং মাস খানেক ছোটাছুটি না করেই সতীশচন্দ্র সরকার হয়েছিলেন ঢাকার নগরপ্রধান। গেন্ডারিয়ায় তাঁর সময় গড়ে ওঠে পরিকল্পিত উপশহর।
নির্বাচিত নগরপ্রধানের মধ্যে উনিশ শতকের শেষ দশকে খাজা মোহাম্মদ আসগর ঢাকাকে সম্প্রসারিত করায় বিরাট ভূমিকা রাখেন। নবাব বাহাদুর আহসানুল্লাহ ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা ছিলেন রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের অনুরাগী। উনিশ শতকের শেষ দিকে, ১৯০১ সালে স্বামী বিবেকানন্দের ঢাকায় আসার আগেই, রামকৃষ্ণভক্ত ঢাকার নগরপিতা খাজা আসগরের পৃষ্ঠপোষকতায় নগরের একপ্রান্তে ফাঁকা জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হয় রামকৃষ্ণ মিশন। পুরোনো কাগজপত্র থেকে জানা যায়, নবাববাড়ির মেয়েরা পর্যন্ত রামকৃষ্ণ মিশনে যাতায়াত করতেন টমটমে। আরেক নির্বাচিত নগরপিতা খাজা ইউসুফ ঢাকার উন্নয়নে জীবন উৎসর্গ করেন।
কোনো কোনো সরকার নিয়োজিত প্রশাসক ঢাকার উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখেছেন। ওয়ারী আবাদ করেন একটি অভিজাত এলাকা হিসেবে ঢাকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জে টি র্যা ঙ্কিন। তাঁর নামেই র্যা ঙ্কিন স্ট্রিট। এখন আমরা দেখলাম তিনটি বছর বসে বসে বেতন খেলেন কয়েকজন কর্মকর্তা এবং শুধু কেনাকাটায় সময় কাটিয়ে দিলেন। কাজ করার ইচ্ছা থাকলে মেয়র-টেয়র না হয়েও নগরের উন্নয়নের জন্য অনেক কিছুই করা যায়। কাজী আলাউদ্দিন আহমদ, সৈয়দ আওলাদ হোসেন, মোহিনীমোহন দাস ঢাকার জন্য কত কিছু করেছেন।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য ঢাকার সুনাম ছিল, বিশের দশক থেকে কংগ্রেস ও লীগের রাজনীতি তা নষ্ট করে দেয়। রামকৃষ্ণ মিশন ও ব্রাহ্মসমাজের রামমোহন লাইব্রেরি ও উপাসনালয় প্রতিষ্ঠায় যেমন ঢাকার নবাবেরা ভূমিকা রাখেন, তেমনি হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে চিশতী বেহেস্তীর মাজার এবং সচিবালয়ের পশ্চিমে হজরত আবদুল মালেক ইয়ামেনির এক গম্বুজবিশিষ্ট মাজারটি নির্মাণে ইট-সুরকি-টাইলস প্রভৃতি কেনার ব্যয় বহন করেছেন মোহিনী দাস। তিনি কোনো পদপ্রাপ্তির পরোয়া করেননি।
পৃথিবীর নগরসভ্যতায় মধ্যযুগের মুসলমানদের অবদান অতুলনীয়। এখন বোকো হারাম বা ইসলামিক স্টেটের মহামান্য খলিফার সিপাহসালাররা দেশে দেশে যা-ই করুন, শত শত বছর মুসলমানদের পরিচালিত নগরগুলো ছিল সেক্যুলার—সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ। সে নির্দেশ মহানবী (সা.) নিজেই দিয়ে গেছেন। রাসুলুল্লাহ মদিনা সনদের একটি অনুচ্ছেদে নগরের মানুষের পারস্পরিক নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব ধর্মবর্ণ-নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের ওপর ন্যস্ত করেছেন। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ইমাম বা নগরের নেতা নির্বাচনের ওপর তিনি জোর দিয়েছেন এবং বলেছেন, তা প্রত্যেক নাগরিকের কর্তব্য। যেমন ঢাকা ও চট্টগ্রামের মানুষ তাঁদের নগর-নেতা নির্বাচিত করতে যাচ্ছেন আজ।
বিশ্বের নগরসভ্যতার বিস্ময়কর বিকাশ ঘটেছিল স্পেনে মুসলমান শাসকদের হাতে। কর্দোভা, গ্রানাদা, মাদ্রিদ, সেভিল প্রভৃতি নগরসভ্যতার বিস্ময়কর উদাহরণ। এবং নগরগুলো ছিল ধর্মনিরপেক্ষ; শাসক মুসলমান হলেও ইহুদি, খ্রিষ্টান ও মুসলমানরা পরিপূর্ণ সম্প্রীতির মধ্যে বাস করেছেন। সেখানে পরবর্তীকালে ইহুদি ও মুসলমানদের কচুকাটা করেন খ্রিষ্টান শাসকেরা। দামেস্ক ও বাগদাদ শুধু দৃষ্টান্তমূলক মহানগরই ছিল না, ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চার কেন্দ্র। মধ্যযুগের নগরে বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন কর্মকর্তা (মেয়র) নিয়োগের প্রথা প্রচলিত হয়। মুসলিম নগরগুলোয় তাঁকে বলা হলো মুহতাসিব। সেকালের মুহতাসিবই একালের মেয়র। তাঁদের কাজ ছিল নগরের বাজারের ব্যবসা-বাণিজ্যের তদারক, জনস্বাস্থ্য তত্ত্বাবধান, গৃহহীনদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা, নাগরিক অধিকার রক্ষা, মাদ্রাসা-মসজিদ ও অন্যান্য ধর্মের উপাসনালয় তদারক, মাদক ও দুর্নীতি বন্ধ, রাস্তাঘাট নির্মাণ, সেতু নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ, জন্ম-মৃত্যুর হিসাব রাখা প্রভৃতি। এভাবেই মধ্যযুগে রাষ্ট্রের মধ্যে থেকেও নগরে প্রচলিত হয় স্বায়ত্তশাসন।
ফারসি শব্দ শহর-এর আক্ষরিক অর্থ হলো ‘ক্ষমতার কেন্দ্র’ বা ‘দুর্গবেষ্টিত শাসকের আবাস’—যার নাম ‘শহরিস্তান’। ঢাকা আমাদের শহরিস্তান। একটি সুবিন্যস্ত জীবনযাত্রা পরিচালনার লক্ষ্যে নগরের প্রতিষ্ঠা। মধ্যযুগের পর সাম্রাজ্য বিস্তারকারীরা আরবান বা নাগরিক কালচার গড়ে তোলেন। কোনো কোনো শাসক পুরোনো শহরের কাছেই তাঁর মর্জিমতো নতুন শহরিস্তানের পত্তন ঘটান। সেটা তাঁরা করেছেন কৌশলগত ও নিরাপত্তার কারণে। যেমন তুঘলক দিল্লি থেকে যান আগ্রা, আইয়ুব পিন্ডি থেকে ইসলামাবাদ।
আধুনিক মানুষ নগরনির্ভর হওয়ায় নগরের জন্য পৃথক নগর পরিচালনা কর্তৃপক্ষ বা পৌর প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় শাসকদের অনুমোদন সাপেক্ষে রাজকর্মচারীদেরই একটি অংশ নগর পরিচালনা করতেন। এই উপমহাদেশেও সব কালে নগর এক রকম ছিল না। মৌর্য যুগে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের সময় এক রকম। অশোকের সময় অন্য রকম। গুপ্ত যুগের নগর ছিল এক রকম। কনিষ্কের রাজত্বকালে এক রকম। সুলতানি আমলে আরেক রকম। গিয়াসুদ্দিন তুঘলক বা মুহম্মদ বিন তুঘলক ভারতবর্ষে অন্য রকম নগরের পত্তন করেন। যে দেশের শাসকেরা যেমন, সে দেশের নগরসভ্যতাও হবে সে রকম।
ঢাকার সমস্যা সমাধানে চার সপ্তাহে হাজারো অঙ্গীকার শুনেছি—মাত্র একটি ছাড়া। রাস্তায় মূত্রত্যাগ। ঢাকার রাস্তায় উবু হয়ে বসে অথবা দাঁড়িয়ে পুরুষ প্রজাতির প্রস্রাব করাটা বন্ধ করা গেলে নগরের পনেরো আনা সমস্যার সমাধান হতো। শুধু মুহতাসিব বা মেয়ররাই নগরকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে পারেন না। যে নগরে প্রত্যেক নাগরিকই এক-একজন স্বনির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলর নন, সে নগর অন্ধকারেই পড়ে থাকবে।
যে জাতি মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিতে শুধু অভ্যস্ত নয়, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি শুনতেও পছন্দ করে, তার অগ্রগতি ও অবস্থার পরিবর্তন অসম্ভব। যে রাষ্ট্রের মানুষ ও শাসক যেমন, তাঁদের রাষ্ট্রটিও তেমন হবে। রাষ্ট্র জনগণকে সৃষ্টি করে না, জনগণই রাষ্ট্র সৃষ্টি করে। রাষ্ট্রের ভেতরেই নগর, তার বাইরে স্বতন্ত্র কোনো সত্তা নয়। রাষ্ট্র যেমন হবে, তার নগরগুলোও সে রকম হবে। জার্মানি যেমন, বার্লিন, হামবুর্গ, মিউনিখও সে রকমই। ফ্রান্স যেমন, প্যারিস, মার্সাই, স্ট্রাসবোর্গ তেমনই। সুইজারল্যান্ড যেমন, জুরিখ, বার্ন, জেনেভাও তেমন। আফগানিস্তান যেমন, কাবুল, কান্দাহার, হেরাত সে রকম। সোমালিয়া যেমন, মোগাদিসু ঠিক তা-ই। বাংলাদেশ যেমন—
একটি বসবাসযোগ্য নগরের জন্য হাহাকার করে লাভ নেই। সে রকম একটি নগর চাইলে সেই রকম মানুষ হয়ে উঠতে হবে। তা কোনো একটি নির্বাচনের মাধ্যমে হওয়া সম্ভব নয়, কোনো এক্সিকিউটিভ ফরমানের মাধ্যমেও নয়। যে জাতির রক্তে তাড়াহুড়োর স্বভাব, তাদের পক্ষে বড় কিছু অর্জন সম্ভব নয়। বড় কিছু অর্জন কঠিন সাধনাসাপেক্ষ, দীর্ঘ এক প্রক্রিয়া।
রাত পোহালে যাঁরা নগরপ্রধান হিসেবে নির্বাচিত ঘোষিত হবেন, তাঁদের আগাম অভিনন্দন।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷

ধ্বংসস্তূপ থেকে বিনির্মাণ by মার্শা বার্নিকাট

দু্‌ ​ই বছর আগে রানা প্লাজার ভবন ধসের ঘটনা ঘটে, সেই দুর্ঘটনায় চাপা পড়ে মারা যান শ্রমিকেরা, সারা বিশ্বের নজর এসে পড়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে। মাত্র একদিনেই বাংলাদেশ হারায় ১১ শর বেশি প্রাণ। আজ আমরা সেই সব শ্রমিককে স্মরণ করছি। তাঁদের পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে এক হয়ে আমরাও শোক পালন করছি। আমরা যখন ভবিষ্যতের দিকে তাকাই, আমরা সেই বাংলাদেশকে দেখি, যার শ্রমিক ও কর্মকর্তারা এবং সরকার-বিশ্বের বিভিন্ন ব্র্যান্ড এবং আন্তর্জাতিক সহযোগীদের পাশাপাশি একসঙ্গে কাজ করছেন, যাতে এ রকম ট্র্যাজেডি আর না ঘটে। একসঙ্গে মিলে আমরা উন্নত এবং অধিকতর উৎপাদনশীল তৈরি পোশাকশিল্প খাত গড়ে তুলছি এবং বিশ্বের কাছে তুলে ধরছি-ব্যবসার সফলতা আর শ্রমিকের অধিকার ও নিরাপত্তা হাতে হাত ধরে চলে।
এ ধরনের কুখ্যাত কারখানা দুর্ঘটনা কেবল যে বাংলাদেশেই ঘটেছে তা নয়। ১৯১১ সালের ২৫ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের ট্রায়াঙ্গেল শার্ট তৈরির কারখানায় আগুনে পুড়ে মারা গিয়েছিলেন ১৪৬ জন শ্রমিক। রানা প্লাজার শ্রমিকদের মতো, ট্রায়াঙ্গেল শার্ট কারখানা দুর্ঘটনায় নিহত শ্রমিকদের মধ্যে ছিল অনেক তরুণী ছিল যাঁরা প্রথমবারের মতো কাজ করে উপার্জন করতে এসেছিলেন। রানা প্লাজার ভবন ধসের ঘটনার মতো ট্রায়াঙ্গেল শার্ট কারখানার আগুনও প্রতিরোধ করা যেত। ওই কারখানার মালিকেরা সিঁড়ি এবং বাইরে বের হয়ে যাওয়ার দরজাগুলো তালা দিয়ে বন্ধ করে রেখেছিলেন, যার ফলে অনেক শ্রমিকই আগুনে পুড়তে থাকা ভবনটি থেকে বের হয়ে যেতে পারেননি। বরং জীবন বাঁচানোর জন্য নারী শ্রমিকেরা যখন আট, নয় ও দশ তলা থেকে লাফিয়ে পড়ছিলেন আর মৃত্যুবরণ করছিলেন, তখন প্রত্যক্ষদর্শীদের দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।
এই দুর্ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসে, যার মধ্যে রয়েছে- কারখানার নিরাপত্তা-মানদণ্ড উন্নয়নের জন্য এবং আন্তর্জাতিক নারীশ্রমিক ইউনিয়নকে আরও শক্তিশালী করে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন। ফ্রান্সেস পার্কিন্সের নেতৃত্বে জননিরাপত্তাবিষয়ক একটি কমিটি গঠন করা হয়। এই পার্কিন্সই পরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম শ্রমমন্ত্রী হন। এই কমিটি সুনির্দিষ্ট সমস্যাগুলো শনাক্ত করে এবং নতুন আইনি প্রক্রিয়াকে সমর্থন করে যার মধ্যে ছিল এক কর্মসপ্তাহে সর্বোচ্চ কাজের সময় কমিয়ে আনার জন্য একটি বিল। কারখানাগুলো সরেজমিনে পরিদর্শনের জন্য মাঠ পর্যায়ে কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। নিউইয়র্ক শহরের দমকল বাহিনীর প্রধান জন কেনলন তদন্ত কর্মকর্তাদের বলেছিলেন যে আগুনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে এমন দুই শরও বেশি কারখানা চিহ্নিত করেছে তাঁর বিভাগ।
কারখানার নিরাপত্তা-ত্রুটিগুলো সারিয়ে তুলতে বাংলাদেশেও একই ধরনের পরিবর্তন শুরু হয়েছে। রানা প্লাজার দুর্ঘটনার পর থেকে এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৭ শর -এর বেশি পোশাকশিল্প-কারখানা পরিদর্শন করা হয়েছে, সেগুলোর অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ভবনকাঠামো ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি দেখার জন্য এবং বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত হওয়ায় ৩২টি কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের মানুষ শ্রম ও কর্ম মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে গেলে এ-বিষয়ক সব তথ্য দেখতে পারবে। মন্ত্রণালয় থেকে শতাধিক পরিদর্শক নিয়োগ করা হয়েছে এবং তাঁদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এই কাজ এখনো শেষ হয়নি; জাতীয় ত্রিপক্ষীয় কর্মপরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত ১ হাজারেরও বেশি কারখানা এখন পর্যন্ত পরিদর্শন করা হয়নি। আর যেসব কারখানা নিবন্ধন করা নেই; তাদের অবস্থা এখনো অজানা। বাংলাদেশের এগুলো নিয়ে যাঁরা কাজ করছেন এবং সব স্টেকহোল্ডারের প্রতি আমাদের অনুরোধ তাঁরা যেন প্রতিটি কারখানার নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন।
গুরুত্বপূর্ণ শ্রম অধিকার মানদণ্ড যথাযথভাবে পালনের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার শিল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে নেতৃত্বের পরিচয় দিতে শুরু করেছে। এখন পর্যন্ত তিন শর বেশি ইউনিয়ন নিবন্ধিত হয়েছে। একটি ওয়েবসাইট তৈরি করা হয়েছে, যেখানে গিয়ে ইউনিয়নসমূহ অনলাইনে নিবন্ধন করতে পারে। এসব ইউনিয়নের সদস্যরা যেন সমষ্টিগতভাবে দর-কষাকষি করার জন্য তাঁদের যে আইনগত অধিকার তা প্রয়োগ করতে পারেন, বহিষ্কার বা হয়রানি হওয়ার ভয় থেকে মুক্ত থাকতে পারেন এবং অবৈধ প্রতিশোধের বিষয়গুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য তাঁদের আইনি অধিকার প্রয়োগ করতে সক্ষম হন-সেসব নিশ্চিত করার জন্য আমরা সরকারকে উৎসাহিত করছি। আমরা শ্রমিক এবং ব্যবস্থাপকদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব যেন সংঘাতে রূপ না নেয় সে জন্য তা প্রতিরোধে বিকল্প বিরোধনিষ্পত্তি ব্যবস্থাকেও স্বাগত জানাই। আমরা অপেক্ষা করছি, যেসব নতুন পরিদর্শক আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন তাঁরা কারখানা পরিদর্শন করে শ্রম আইনে উল্লিখিত মজুরি ও অন্যান্য বিষয় পর্যবেক্ষণে কাজ করছেন। সে আলোকে শ্রম আইন বাস্তবায়নকারী বিধি জারি করার মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার মালিকপক্ষকে দ্রুতই একটি উন্নততর দিক-নির্দেশনা দেবে, শ্রমিকদের তাঁদের ভূমিকা বুঝতে সাহায্য করবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেবে যেন সঠিকভাবে আইন প্রয়োগ হয়।
দুর্ঘটনা থেকে পরিবর্তন শুরু হতে পারে এবং তাই হওয়া উচিত। শ্রমিকেরা, বিশেষ করে প্রথমবারের মতো কাজ করতে আসা হাজারো তরুণ বয়সী নারীকর্মীকে অবশ্যই তাঁদের উদ্বেগের বিষয়গুলো তুলে ধরার অধিকার দিতে হবে, তাঁদের প্রাপ্য সম্মান দিতে হবে ও নিরাপদ পরিস্থিতিতে কাজ করার অধিকার দিতে হবে। পরিদর্শকেরা যাতে প্রতিটি কারখানা পরিদর্শনের সুযোগ পান এবং সেসব কারখানাগুলোয় যে সমস্যা চিহ্নিত করা হবে সেগুলো সংশোধন নিশ্চিত করা বিজিএমইএ এবং বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্ব। কারখানার এসব সংস্কার কাজ উৎপাদনশীলতাও বাড়াবে। বাংলাদেশের অর্থনীতি ও নারীর ক্ষমতায়নে তৈরি পোশাকশিল্প যে অসামান্য অবদান রেখেছে, তা মাথায় রেখে এই খাতের ২০২১ সালের মধ্যে পাঁচ হাজার কোটি ডলার মূল্যমানের রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রার পরিকল্পনা এই জাতির উন্নয়নের লক্ষ্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ সরকার, শ্রমিকপক্ষ ও মালিকপক্ষের সঙ্গে অংশীদারত্বের সঙ্গে কাজ করে যুক্তরাষ্ট্র সারা বিশ্বকে দেখাতে চায় যে বাংলাদেশ শ্রমিকের অধিকার ও নিরাপত্তার ব্যাপারে নতুন মানদণ্ড তৈরিতে কাজ করছে, যা নিশ্চিত করবে-আর কোনো শ্রমিককে যেন এ রকম দুর্ঘটনার জন্য ভয় পেতে না হয়।
মার্শা বার্নিকাট, ঢাকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত

সব পক্ষকে রাজনৈতিক সমাধান খোঁজার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত জাতিসংঘের

জাতিসংঘের নিয়মিত প্রেস-ব্রিফিংয়ে গতকাল বাংলাদেশ বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি-মুনের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজাররিকের কাছে। প্রশ্নকর্তা সাংবাদিক জানতে চেয়েছিলেন, গত শুক্রবার মহাসচিব বান কি মুন টেলিফোনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সুনির্দিষ্টভাবে কি বলেছিলেন। জবাবে মুখপাত্র বলেন, বাংলাদেশে সব পক্ষকে রাজনৈতিকভাবে একটি সমাধান খুঁজে বের করার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেছেন মহাসচিব। এখানে জাতিসংঘে অনুষ্ঠিত ওই সংবাদ-সম্মেলনের বাংলাদেশ অংশটুকু তুলে ধরা হলো:
প্রশ্ন: আপনাকে ধন্যবাদ, স্টিফেন। গত শুক্রবার বাংলাদেশ বিষয়ে মহাসচিব বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে টেলিফোন করেছিলেন এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব বলেছিলেন, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সিটি নির্বাচনসহ সব ধরনের কর্মকা-ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন মহাসচিব। কিন্তু, এই নির্বাচনের পর আমরা জাতিসংঘ ও পুরো পশ্চিমা বিশ্বের বিবৃতি ও উদ্বেগ প্রত্যক্ষ করেছি। মহাসচিব বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে সুনির্দিষ্টভাবে ঠিক কি বলেছিলেন?
মুখপাত্র: এ ব্যাপারে আমাদের কাছে পড়ে শোনাবার মতো কোন তথ্য নেই। আমার মনে হয়, আপনি বলতে পারেন আমরা এখানে যেভাবে আমাদের মতামত প্রকাশ করে আসছি, সেভাবেই মহাসচিব তার মতামত ব্যক্ত করেছেন। তা হলো, বাংলাদেশে সব পক্ষকে রাজনৈতিকভাবে একটি সমাধান খুঁজে বের করার আহ্বান জানানো। ঠিক আছে।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, চারটি ধারা অসাংবিধানিক: আপিল বিভাগ

শুধুমাত্র মৃত্যুদন্ডের বিধান থাকায় ১৯৯৫ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের তিনটি ধারা ও পুরনো আইন চালানোর বৈধতা দিয়ে ২০০০ সালের আইনে আরেকটি ধারা সংযোজনকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে রায় দিয়েছেন আপিল বিভাগ। হাইকোর্টেও দেওয়া রায় বহাল রেখে মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ১৯৯৫-এর ৬ (২), (৩) ও (৪) ধারায় শুধুমাত্র মৃত্যুদন্ডের বিধান ছিল। ২০০০ সালের আইনের ৩৪ (২) ধারায় পুরনো আইনের ধারাগুলোতে বিচার চলার বৈধতা দেয়া হয়। আদালত সূত্রে জানা যায়, মানিকগঞ্জে ১৯৯৬ সালে শুক্কুর আলী (১৪) নামে এক কিশোর সুমি (৭) নামে এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করে। বিচারিক আদালত ২০০১ সালে তার মৃত্যুদন্ড দেয়। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ১৯৯৫-এর ৬ (২) এ বলা ছিল ধর্ষণ করে হত্যা করলে অপরাধীর একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদন্ড। এরপর ২০০৪ সালে হাইকোর্ট তার রায় বহাল রাখে। আপিল বিভাগও শুক্কুর আলীর রায় বহাল রেখেছিল। শুক্কুর আলীর রায়ের পর ২০০৫ সালে ব্লাস্টসহ দু’টি মানবাধিকার সংগঠন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের উল্লেখিত ধারাগুলোকে চ্যালেঞ্জ করে রিট আবেদন দায়ের করে। কেননা এই ধারাগুলোতে শুধুমাত্র মৃত্যুদন্ডের কথা বলা হয়েছে। অন্য কোনও দন্ডের বিধান রাখা হয়নি। এরপর হাইকোর্ট এই ধারাগুলোকে অসাংবিধানিক ও অবৈধ বলে রায় ঘোষণা করে। এরপর আপিল বিভাগে গেলে মঙ্গলবার আপিল বিভাগও সেই রায় বহাল রাখে। আদালতে আবেদনের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী এমআই ফারুকী। রাষ্টপক্ষে ছিলেন এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।

চট্টগ্রামের ভোটের ময়নাতদন্ত- এক কেন্দ্রে মনজুর কোন ভোটই পাননি

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোটের অস্বাভাবিকতা ধরা পড়েছে বিভিন্ন কেন্দ্রে। একটি কেন্দ্রে কোন ভোটই পাননি বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী এম মনজুর আলম। অন্য একটি কেন্দ্রে ভোট পড়েছে ৯৯ ভাগ। হালিশহর মেহের আফজল উচ্চবিদ্যালয়ের চারটি কেন্দ্রের একটিতে শূন্য ভোট পান মনজুর আলম। এই কেন্দ্রে আ জ ম নাছির পান ৭৪৬ ভোট। এ ছাড়া মনজুর আলম সাত ভোট পান দক্ষিণ পাহাড়তলী অলি আহমদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে। এ কেন্দ্রে নাছির পেয়েছেন ১৪২৩ ভোট। প্রায় ৯৯ শতাংশ ভোট পড়েছে দুটি কেন্দ্রে। নির্বাচন কমিশনের দেয়ার ভোটের তথ্যে এমনই চিত্র মিলেছে। এসব কেন্দ্রের ভোটের হিসাবই নির্বাচনে অনিয়মের চিত্র তুলে ধরে বলে নির্বাচন বিশ্লেষকরা বলছেন।
আগ্রাবাদের তালেবিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ২ হাজার ৪৬২ ভোটারের মধ্যে ভোট পড়েছে ২ হাজার ৪৩৩টি। ভোট গ্রহণের হার ৯৮ দশমিক ৮২ শতাংশ। এই কেন্দ্রে ছয়টি বুথ। সে হিসেবে গড়ে দেড় মিনিটের কম সময়ে একটি ভোট পড়েছে। বৈধ ভোটের ২ হাজার ১৮৯ ভোট  পেয়েছেন হাতি আ জ ম নাছির। কমলালেবু প্রতীকের মনজুর আলম পেয়েছেন ৮৩ ভোট। ২০১০ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এই কেন্দ্রে ভোট পড়েছিল প্রায় ৫৩ শতাংশ। বেশি ভোট পড়ার পাশাপাশি অস্বাভাবিক কম ভোট পড়েছে কয়েকটি কেন্দ্রে।  ১৯টি কেন্দ্রে ২০ শতাংশের কম ভোট পড়েছে। এর মধ্যে নৌ-বাহিনী আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ ভোট পড়েছে, যা শতাংশের হিসাবে সবচেয়ে কম। এখানে মোট ভোটার ৩ হাজার ৯০৫ জন। ভোট পড়ে মাত্র ৩৩৯টি। এ ছাড়া দক্ষিণ হালিশহর উচ্চবিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে ভোট পড়ার হার ১০ দশমিক ৭৬ শতাংশ। এই কেন্দ্রে ৩ হাজার ৬৪২ ভোটের মধ্যে পড়েছে ৩৯২ ভোট। দক্ষিণ কাট্টলি প্রাণহরি মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে বৈধ ভোট পড়েছে ১ হাজার ৮৬২টি। বাতিল  ভোট ২ হাজার ৪৬০টি। এই কেন্দ্রে ভোটারের সংখ্যা ৪ হাজার ৪২২। নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভোটের এই অস্বাভাবিক চিত্র ভোটের পুরো ফলকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

পিতার কবরে সমাহিত পিন্টু

নয়া পল্টনে পিন্টুকে শেষ শ্রদ্ধা খালেদার -ছবিঃ মানবজমিন
তিনদফা জানাজা শেষে ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি, বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক এমপি নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টুর মরদেহ রাজধানীর আজিমপুর কবরস্থানে পিতার কবরে সমাহিত করা হয়েছে। গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় আজিমপুরে পুরাতন কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। এর আগে দলের পক্ষ থেকে পিন্টুর কফিনে ফুল দিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। বিএনপির অঙ্গসংগঠনের পক্ষ থেকেও ফুল দিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়। এছাড়া পিন্টুর মৃত্যুতে শোক জানিয়ে কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারা দেশের জেলা ও থানা কার্যালয়ে কালো পতাকা উত্তোলন ও দলের নেতাকর্মীরা কালো ব্যাজ ধারণ করেন। উল্লেখ্য, রোববার দুপুরে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন নাসিরউদ্দিন পিন্টু। কারা কর্তৃপক্ষের চিকিৎসার অবহেলায় পিন্টুর অকাল মৃত্যু হয় বলে অভিযোগ করেছে তার পরিবার। এ ঘটনায় ঢাকা বিভাগীয় জিআইজি (প্রিজন) গোলাম হায়দারকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত টিম করেছে সরকার।
পিন্টুর কফিনে বিএনপির শ্রদ্ধা
গতকাল ভোর পৌনে ৬টায় অ্যাম্বুলেন্সে করে রাজশাহী থেকে পিন্টুর মরদেহ তার হাজারীবাগ মনেশ্বর রোডের বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। সেখান থেকে সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে পিন্টুর মরদেহ নেয়া হয় নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে। সকাল থেকে নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কোরআন তেলাওয়াত শুরু হয়। এদিকে ছাত্রদলের সাবেক এই সভাপতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সকাল থেকেই নেতাকর্মীরা জড়ো হতে থাকেন সেখানে। একপর্যায়ে সেখানে হাজার হাজার নেতাকর্মীর ভিড় জমে। কেউ বুকে কালো ব্যাজ ধারন করে কেউ বা আসেন ফুল নিয়ে। সহকর্মীর অকাল মৃত্যুতে বিএনপি ও অঙ্গদলের অনেক নেতাকর্মীকেই দেখা গেছে অশ্রুসজল। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নয়াপল্টন কার্যালয়ের সামনে পৌঁছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। গাড়ি থেকে নেমেই তিনি পিন্টুর কফিনের সামনে যান। এসময় কাফনের কাপড়ের বাঁধন খুলে পিন্টুর মরদেহ খালেদা জিয়াকে দেখানো হয়। পিন্টুর নিথর মুখ দেখে বিএনপি চেয়ারপারসন আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। এসময় তাকে টিস্যু দিয়ে চোখ মুছতে দেখা যায়। এরপর ছাত্রদলের সাবেক এই সভাপতির কফিনে ফুল দিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানান খালেদা জিয়া। ফুল দিয়ে পিন্টুর কফিনের পাশে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি। এরপর দলীয় পতাকা দিয়ে পিন্টুর কফিন ঢেকে দেন খালেদা জিয়া। এসময় তার রুহের মাহফিরাত কামনায় দোয়ায় শরিক হন তিনি। শ্রদ্ধা জানানো শেষে নয়াপল্টন থেকে বাসভবনে ফিরে যান খালেদা জিয়া। এরপর মহানগর বিএনপি, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, কৃষকদল, মহিলাদল, ছাত্রদল, ওলামা দল, মুক্তিযোদ্ধা দলসহ দলের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের পক্ষ থেকে পিন্টুর কফিনে ফুল দেয়া হয়। জানাজার জন্য নয়াপল্টনের পূর্বদিকের রাস্তা বন্ধ করে দেয়া হয়। বেলা পৌনে ১২টার দিকে পিন্টুর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে পিন্টুর রুহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া করা হয়। জাতীয়তাবাদী ওলামা দলের সভাপতি হাফেজ আবদুল মালেক তার নামাজে জানাজায় ইমামতি করেন। জানাজার আগে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, নাসিরউদ্দিন পিন্টু ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও সাবেক এমপি ছিলেন। পিন্টু কেবল একজন উদীয়মান নেতাই নন, দলের একজন সক্রিয় সংগঠকও ছিলেন। তার এই মৃত্যু আমাদের কাছে অপ্রত্যাশিত। তার অকাল চলে যাওয়া আমাদের জন্য মর্মান্তিক ও শোকের। আমি তার রুহের আত্মার মাগফিরাত কামনা ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাই। স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার বলেন, নাসির উদ্দিন আহম্মেদ পিন্টুর মৃত্যু রহস্যময়। আদালতের নির্দেশ অমান্য করে তাকে রাজশাহী নেয়া হয়েছিল। সেখানে তার মৃত্যু হয়েছে রহস্যময়ভাবে। পিন্টু এত তাড়াতাড়ি এভাবে চলে যাবেন, তা আমরা আশা করিনি। আমরা শোকাহত, মর্মাহত। স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্রিগেডিয়ার জে. (অব.) আ স ম হান্নান শাহ বলেন, সরকার বিনা চিকিৎসায় পিন্টুকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। চিকিৎসার বিষয়ে হাইকোর্টের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও সরকার তা মানেনি। ২৫শে এপ্রিল পিজি হাসপাতালে তার চিকিৎসা করার কথা ছিল। কিন্তু সরকারের নির্দেশে কারাকর্তৃপক্ষ চিকিৎসা করেনি। পিন্টুর এই মৃত্যুর জন্য তাদেরকে একদিন বিচারের মুখোমুখি করা হবে। এদিকে পিন্টুর মৃত্যুশোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করতে হবে বলে জানিয়েছেন ২০ দলীয় জোটের শরিক বাংলাদেশ ন্যাপের চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানি ও মহাসচিব গোলাম মোস্তফা ভূঁইয়া। জানাজায় বিএনপি ও ২০ দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ, ব্রি. জে. (অব.) আ স ম হান্নান শাহ, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, আহমেদ আজম খান, মো. শাহজাহান, শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, ড. আসাদুজ্জামান রিপন, খায়রুল কবির খোকন, ফজলুল হক মিলন, নাজিম উদ্দিন আলম, হাবিব-উন নবী খান সোহেল, হাবিবুর রহমান হাবিব, মাসুদ আহমেদ তালুকদার, আবদুল লতিফ জনি, আবদুস সালাম আজাদ, ইশতিয়াক আজিজ উলফাত, আনোয়ার হোসেন, এমএ মালেক, ২০ দলীয় জোট নেতা ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি মজিবুর রহমান মঞ্জু, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, সাঈদ আহমেদ, ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, গোলাম মোস্তফা ভূঁইয়াসহ বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের হাজার হাজার নেতাকর্মী অংশ নেন। এছাড়া মহিলা দলের নূরে আরা সাফা, শিরিন সুলতানা ও মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাস, বিলকিস ইসলামসহ শতাধিক নেত্রী পিন্টুর কফিনে শ্রদ্ধা জানান। নয়াপল্টন থেকে সাবেক এমপি পিন্টুর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় তার হাজারীবাগের বাসায়।
জানাজায় ভাইয়ের অভিযোগ
বিকেল ৫টা ৫০ মিনিটে হাজারীবাগ লেদার টেকনলজি কলেজ মাঠে নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টুর তৃতীয় ও সর্বশেষ জানাজায় হাজার হাজার মানুষ অংশ নেন। এরপর পিন্টুর মরদেহ আজিমপুর কবরস্থানে বাবার কবরে দাফন করা হয়। জানাজায় পিন্টুর ছোট ভাই নাসিমউদ্দিন আহমেদ রিন্টু বলেন, আমি আবারও বলতে চাই- আমার ভাইকে সরকার পরিকল্পিত ও ষড়যন্ত্র করে হত্যা করেছে। আমি রোববার রাজশাহী কারাগারে আমার ভাইয়ের লাশ আনার জন্য গিয়েছিলাম। সেখানে জেলার আমাকে একটি কাগজ ধরিয়ে দেন। ওই কাগজে সুস্পষ্টভাবে লেখা রয়েছে রোববার দুপুর ১২টা ২ মিনিটে আমার ভাই অসুস্থ হন। এরপর ১২টা ১০ মিনিটে তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। নিয়ে যাওয়ার পর আমার ভাইকে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। কিন্তু আমি চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি হার্ট অ্যাটাকের রোগী মাত্র ৮ মিনিটে মারা যেতে পারেন না। তাই তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে আমি মনে করি। এসময় তার ছোট ভাই নাসির উদ্দিন আহমেদ রিন্টু জানান, বৃহস্পতিবার বাদ আসর হাজারীবাগ মসজিদে পিন্টুর আত্মার মাগফেরাত কামনা করে কুলখানি ও দোয়া অনুষ্ঠিত হবে। এদিকে নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টু রোববার সকালে বুকে ব্যথা অনুভব করলে তাকে রাজশাহী কারাগার থেকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। তবে হাসপাতালে নেয়ার আগেই তার মৃত্যু ঘটে। পরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক ডিপার্টমেন্ট থেকে রোববার রাত ১১টায় পিন্টুর মরদেহ গ্রহণ করেন ভাই নাসিম উদ্দিন আহমেদ রিন্টু, চাচাতো ভাই সালাউদ্দিন ও আইনজীবী রফিকুল ইসলাম খান। এরপর মরদেহ ঢাকার আনার আগে রাত সাড়ে ১১টার দিকে রাজশাহীতে হেতেম খাঁ বড় মসজিদ চত্বরে পিন্টুর প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় ইমামতি করেন হেতেম খাঁ মসজিদের ইমাম মুফতি ইয়াকুব। এতে রাজশাহী জেলা ও মহানগর বিএনপির নেতাকর্মী অংশ নেন। এদিকে ডক্টরস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ- ড্যাব নেতৃবৃন্দও পিন্টুর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন।
পিন্টুর মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত কমিটি
স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী থেকে জানান, রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে বিএনপি নেতা নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টুর মৃত্যুর ঘটনায় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে সরকার। এই কমিটিকে আগামী ৭ই মে’র মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। গতকাল বিকালে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের ডিআইডি প্রিজন বজলুর রশিদ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, তদন্ত কমিটিতে ঢাকা ডিভিশনাল উপ-কারা মহাপরিদর্শক (ডিআইজি প্রিজন)  গোলাম হায়দারকে প্রধান করা হয়েছে। অপর দুই সদস্য হলেন- কাশিমপুর কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মিজানুর রহমান ও ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ইকবাল কবির চৌধুরী। তারা দ্রুত প্রতিবেদন জমা দেবেন বলে জানান তিনি।  তদন্ত কমিটির প্রতিনিধি দল ঢাকা থেকে রাজশাহীর উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন। তারা সোমবার রাতের মধ্যে  রাজশাহীতে পৌঁছার পর আজ থেকে তদন্তকাজ শুরু করবেন বলে জানান তিনি।

রাজকন্যার জন্ম নিয়ে রসাল বিতর্ক

বৃটিশ রাজপরিবারের নতুন রাজকন্যার জন্মের দুদিনের মাথায় শুরু হয়েছে অদ্ভুত এক বিতর্ক। রাশিয়ার একটি পত্রিকার প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, রাজকন্যার জন্ম ছিল ‘ভুয়া’। অনেক রাশিয়ান মনে করছেন হয় রাজকন্যার জন্ম হয়েছে তিন দিন আগে, না হয় কেট মিডলটন নন গর্ভ ভাড়া দেয়া কোন মায়ের গর্ভে জন্ম নিয়েছে রাজকন্যা। এমন ধারণার পেছনে তারা যে কারণ দেখিয়েছেন তা হলো, রাজকন্যাকে নিয়ে কেট প্রথম যখন জনসমক্ষে আসেন তখন তাকে সাবলীল, লাবণ্যময় দেখাচ্ছিল। একাধিক রাশিয়ান নারীর উদ্ধৃতি দিয়ে ‘কমসোমোলস্কায়া প্রাভদা’ প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে। এ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে বৃটিশ মিডিয়ায়ও। মিরর আর মেট্রোতে এসেছে পাল্টা প্রতিবেদন। এসব প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্রেমলিনপন্থি কমসোমোলস্কায়া প্রাভদা সংবাদপত্রের পাঠকরা উদ্ভট দাবি করেছেন। এসব পাঠক বলছেন, জন্ম দেয়ার পরপরই ডাচেস অব কেমব্রিজকে এতো সুন্দর দেখানোটা অসম্ভব। তারা এ প্রশ্নও তুলেছেন যে, ওইদিন নয় বরং কয়েক দিন আগে রাজকন্যার জন্ম হয়েছিল। এক নারী বলেন, তিনি যদি স্বাভাবিকভাবে প্রসব করে থাকেন তাহলে নিশ্চিতভাবে তা কয়েক দিন আগে। আরেক নারী বলেন, রাজকন্যা তিন দিন আগে জন্ম নিয়েছে। ধীরে সুস্থে এখন এ খবর জানিয়েছে তারা। শিশুটিকে দেখুন। তাকে একেবারেই সদ্যপ্রসূত বলে দেখায় না। তার বয়স কমপক্ষে তিন দিন। সেরা ডাক্তারদের সহায়তায় সন্তান প্রসব করলেও এমন কোন কিছু নাই যা একজন নারীকে জন্ম দেয়ার ৫ ঘণ্টার ব্যবধানে দাঁড়িয়ে পড়তে আর নিজের পায়ে ক্লিনিক ছেড়ে চলে যেতে সহায়তা করতে পারে। শুধু তাই নয়, এক নারী তো মন্তব্য করে বসলেন, নতুন রাজকন্যাকে কেট মিডলটন জন্মই দেন নি। তার ধারণা, গর্ভ ভাড়া দেয়া মায়ের গর্ভে জন্মগ্রহণ করেছে রাজকন্যা। আর কেট নিশ্চয়ই নিজেকে অন্তঃসত্ত্বা দেখাতে কৃত্রিম উপায়ে স্ফীত পেট দেখিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, জন্ম দেয়ার কয়েক ঘণ্টা পর হেঁটে বেড়ানো আর সাদা পোশাকে জনসমক্ষে হাত নাড়াতে পারা স্রেফ অবাস্তব। আপনি যদি কখনও সন্তানের জন্ম দিয়ে থাকেন তাহলে প্রসবের তিন চার ঘণ্টা বাদে নিজের অবস্থা স্মরণ করুন। প্রসব খুব সহজ হলেও, নারীরা এরপর কয়েকঘণ্টা যাবৎ শুধু ঘুমাতে চান। এটা লোকদেখানো এক পরিবারের রূপকথা। প্রতিবেদনের শেষে পাঠকরাও একইরকম মন্তব্য করেছেন। তাদের বক্তব্য, কেটকে এতোটা দীপ্তিমান দেখানো অসম্ভব। একজন তো মন্তব্য করেছেন, তিনি জন্ম দেননি, আমি নিশ্চিত। তার চোখে মাতৃত্বের বিশেষ কোন দৃষ্টি নেই- স্বাভাবিক এ বিষয়টা দৃশ্যমান নয়। ডায়ানাকে দেখুন। কেট স্রেফ বাকিংহ্যাম প্যালেস থিয়েটারের একজন অভিনেত্রী। মেট্রোর প্রতিবেদনে রাশিয়ান নারীদের মন্তব্যের প্রেক্ষিতে বৃটিশ নারীদের মন্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। এক বৃটিশ নারী মন্তব্য করেছেন, ফালতু যত সব কথা। সন্তান প্রসবের পরই আমি দাঁড়িয়েছিলাম। কয়েক ঘণ্টা বাদে রাতের খাবারও রেঁধেছিলাম। আমার মনে হয় কেট আর ডায়ানা দুজনই স্বর্ণকার! ডেব ক্যালাওয়ে নামের আরেক নারী টুইট করেছেন, ইডিয়টস! আমি সকালে সন্তান প্রসব করেছি। হাসপাতাল ছেড়েছি চা-নাস্তা খাবার সময় হতে হতে। বাড়ি যাওয়ার পথে চেইনশপে ঢুকে ঘুরেও দেখেছি। তবে মেনে নিলাম যে আমাকে সুন্দর দেখাচ্ছিল না। হ্যাটি প্লাম নামের আরেক নারীর টুইট ছিল, তিনি সন্তান প্রসব করেছেন। তার ব্রেন সার্জারি হয় নি! অনেকই নারীই জন্ম দেয়ার পর দ্রুত উঠে যেতে পারেন।

জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে রহস্য by আহমেদ জামাল

সদ্য সমাপ্ত ঢাকা ও চট্টগ্রামের তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। প্রার্থী মনোনয়ন, নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা এমনকি ভোটগ্রহণের দিনও তাদের আচরণ ছিল কৌশলী এবং রহস্যেঘেরা। ফলে ‘ভোট ডাকাতির’ অভিযোগে বিএনপির নির্বাচন বর্জনেও অর্জন করেছে তাদের রাজনৈতিক মিত্র জামায়াত। ঢাকায় তিন এবং চট্টগ্রামে দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর জয় তাদের অর্জনের বড় উদাহরণ- এমন অভিমত পর্যবেক্ষক মহলের। নজিরবিহীন কারচুপি ও অনিয়মের অভিযোগে ২৮শে এপ্রিল দুপুরের মধ্যে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয় বিএনপি। কিন্তু তারপরই নির্বাচন বাতিল এবং পুনঃনির্বাচনের দাবি জানিয়ে কৌশলী বিবৃতি দেয় জামায়াত। এ ক্ষেত্রে বর্জন শব্দটি এড়িয়ে যায় তারা। ফলে দিনের শেষে জামায়াতের পাঁচ কাউন্সিলর প্রার্থীর জয় নিয়ে শুরু হয় আলোচনা- পর্যালোচনা। এ নিয়ে ২০দলীয় জোটের মধ্যে দেখা দেয় চাপা ক্ষোভ এবং অসন্তোষ। তবে কৌশলগত কারণে সে অসন্তোষ তেমন প্রকাশ পাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, তিন সিটিতে মেয়র পদে কোন প্রার্থী ছিল না জামায়াতের। তবে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটিতে ২৬টি কাউন্সিলর প্রার্থী নিয়ে বিএনপির সঙ্গে টানাপড়েন চলে তাদের। শেষ পর্যন্ত এই টানাপড়েন চলতে থাকায় ২৬ কাউন্সিল প্রার্থীকে নিয়ে একলা চলা শুরু করে ২০ দলের শরিক দলটি। জামায়াতের দায়িত্বশীল সূত্রে বিষয়টি স্বীকার করা হলেও কৌশলগত কারণে মন্তব্য করেননি কেউ। সংশ্লিষ্টরা জানান, মেয়র পদে জামায়াতের প্রার্থী না থাকায় ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ মিলে ৯৩টি ওয়ার্ডের মধ্যে ২৬টি কাউন্সিলর পদ চেয়েছে তারা। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন  ‘আদর্শ ঢাকা আন্দোলন’ গত ১০ই এপ্রিল ২০দলীয়  জোট সমর্থিত প্রার্থীদের যে তালিকা প্রকাশ করে, তাতে জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীদের কোন নাম ছিল না। আদর্শ ঢাকা আন্দোলন ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণের ৯৩টি সাধারণ ওয়ার্ডে ৮৫ জন এবং দুই সিটির ৩১টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডে ২৯ জন প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে। এতে জামায়াত যে ২৬টি ওয়ার্ডে প্রার্থী দিয়েছে, তার ২৩টিতেই বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থী দেখা যায়। এ নিয়ে জোটের মধ্যে মান-অভিমান শুরু হলে ১৫ই এপ্রিল ২০দলীয় জোটের প্রার্থী পরিচিতি স্থগিত ঘোষণা করা হয়। তবে তার দু’দিন পর ১৭ই এপ্রিল গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয় থেকে ২০ দলীয় জোটের চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হয়। ওই তালিকায়ও জামায়াত প্রার্থীদের নাম দেখা যায়নি। প্রার্থী তালিকা ঘোষণার সময় জোটের শরিক বিজেপি, জাগপা, কল্যাণ পার্টি, বাংলাদেশ ন্যাপসহ ৫/৬টি দলের প্রতিনিধি থাকলেও জামায়াতের কেউ ছিল না। ঢাকা মহানগর জামায়াতের দায়িত্বশীল এক নেতা বলেন, এই নির্বাচনে সমন্বয়ের ব্যাপারে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আসম হান্নান শাহ এবং নজরুল ইসলাম খানের সঙ্গে জামায়াতের মহানগর সমন্বয়কারী নুরুল ইসলাম বুলবুল বহুবার যোগাযোগ করেছেন। কিন্তু কোন সাড়া পাওয়া যায়নি। এ পর্যায়ে বাধ্য হয়ে জামায়াত একলা চলা শুরু করে। দলের ২৬টি কাউন্সিল পদে প্রার্থীদের পক্ষে নেতাকর্মী ও সমর্থকরা যেখানে যেভাবে পারছেন নির্বাচনী প্রচার- প্রচারণা চালিয়েছেন। মেয়রপ্রার্থীসহ অন্য কোন কাউন্সিল প্রার্থী নিয়ে তাদের কোন তৎপরতা ছিল না। তবে আসম হান্নান শাহ এই অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ডিসিসি নির্বাচনে সমন্বয় করার জন্য আমি মহানগর জামায়াতের এক নেতাকে খবর পাঠিয়েছি তাদের দলীয় সাবেক এক কাউন্সিলরের মাধ্যমে। কিন্তু তারা কোন যোগাযোগ না করেই উল্টো আমাদের নামে ব্লেম দিচ্ছে। তারা (জামায়াত) আসলেই কিছু করছে না বলেও মন্তব্য করেন সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা। ওদিকে নির্বাচনের দুই দিন আগে হঠাৎ মান ভাঙে জামায়াতের। দলটির ভারপ্রাপ্ত আমীর মকবুল আহমাদ এক বিবৃতিতে ২০দলীয় জোটপ্রার্থীদের ভোট দেয়ার জন্য দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকসহ সর্বস্তরের ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানান। ভোটের আগের দিন নির্বাচনের নামে ভোট ডাকাতির আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। তার পরও ভোটগ্রহণের দিন ২৬ ওয়ার্ডের বাইরে জামায়াত নেতাকর্মী ও সমর্থকদের কোন ভূমিকা ছিল না বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। একই চিত্র দেখা গেছে চট্টগ্রামেও। জামায়াত সূত্র জানায়, ২০০২ সালের ডিসিসি নির্বাচনে জামায়াত ৬টি কাউন্সিলর প্রার্থী দিয়ে মতিঝিল এলাকার একটিতে জয়লাভ করে। এবার ওই ওয়ার্ডে প্রার্থী হয়েছেন গতবারের নির্বাচিত কাউন্সিলর খন্দকার আবদুর রবের স্ত্রী আঞ্জুমান আরা বেগম। এ ওয়ার্ডে তার বিপক্ষে লড়ছেন বিএনপির লোকমান হোসেন ফকির ও কাজী হাসিবুর রহমান। ঢাকা মহানগর জামায়াতের এক তরুণ সদস্য বলেন, গত ডিসিসি নির্বাচনে যে সব ওয়ার্ডে আমাদের প্রার্থীরা ভাল করেছে ওইসব মিলিয়ে ২৬টি ওয়ার্ডে প্রার্থী দিয়েছে জামায়াত। কিন্তু নির্বাচনের শেষ দিন পর্যন্ত বিএনপির তরফে কোন আলোচনা বা নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণী পরামর্শ করা হয়নি। এতে রাজধানীর ২৬ ওয়ার্ডের বাইরে জামায়াত কর্মী সমর্থকরা নিষ্ক্রিয় ছিল। তবে চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনে কাউন্সিলর পদে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে। সেখানে ৫৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে সাধারণ ও সংরক্ষিত মিলে ১০টি ওয়ার্ড জামায়াতকে ছেড়ে দেয় বিএনপি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে নয়জন ও দক্ষিণে ১০ জন জামায়াত-সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী ছিলেন। তারা হলেন ৩ নম্বর ওয়ার্ডে আশ্রাফুল আলম, লস্কর মো. তাসলিম (ওয়ার্ড ৪), এনায়েত  হোসেন (ওয়ার্ড ১৩), তারেক রেজা তুহিন (ওয়ার্ড ১৪), মোস্তাফিজুর রহমান (ওয়ার্ড ২২), মো. ইকবাল  হোসেন (ওয়ার্ড ২৯), মনজুরুল আলম (ওয়ার্ড ৩৫), সালেহ সিদ্দিকী (ওয়ার্ড ৩৬), শরীফ মিজানুর রহমান (ওয়ার্ড ২৬)।
ঢাকা দক্ষিণের প্রার্থীদের মধ্যে ছিলেন ১ নম্বর ওয়ার্ডে কবির আহমেদ, ৩ নম্বরে শহীদুল ইসলাম, ৫ নম্বরে উমর ফারুক মজুমদার, ৬ নম্বরে গোলাম শাফি মহিউদ্দিন, ১১ নম্বরে মোশাররফ  হোসেন, ১৩ নম্বরে আঞ্জুমান আরা রব, ৩৯ নম্বরে আতাহার আলী, ৪৬ নম্বরে আবদুল মান্নান, ৫২ নম্বরে শফিকুল ইসলাম ও ৫৩ নম্বর ওয়ার্ডে আহমাদ হাসান। এছাড়া ঢাকা উত্তরে চারজন ও দক্ষিণে তিনজন নারীকে সংরক্ষিত ওয়ার্ডে জামায়াত সমর্থন দিয়েছে। তারা হলেন- উত্তরে উম্মে সালমা (৪, ১৫, ১৬ নং ওয়ার্ড), মাসুদা আক্তার (১২, ১৩, ১৪ নং ওয়ার্ড), আমেনা বেগম (২২, ২৩, ৩৬ নং ওয়ার্ড), কাওসার জাহান (২৯, ৩০, ৩২ নং ওয়ার্ড); দক্ষিণে শামিমা আকতার (২, ৩, ৪ নং ওয়ার্ড), দিলারা বেগম (১৩, ১৯, ২০ নং ওয়ার্ড) ও হাসনা হেনা (৫২, ৫৩, ৫৪ নং ওয়ার্ড)।
এদের মধ্যে ঢাকা উত্তরের ২২, ২৩ ও ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত আসনে ডা. আমেনা বেগম গ্লাস প্রতীকে ২৪ হাজার ৭০ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। একই অংশের ১২, ১৩ ও ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের মাসুদা আক্তার ৩১ হাজার ৭৪২ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। এ ছাড়া ২৯.৩০ ও ৩২ নম্বর ওয়ার্ডে সংরক্ষিত আসনে কাওসার জাহান ১৬ হাজার ৮৭৯  ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। ওদিকে চট্টগ্রামের সাধারণ ওয়ার্ড ৩৭ মুনিরনগরে মো. শফিউল আলম ৪৫ হাজার ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। আর ৬ নং সংরক্ষিত ওয়ার্ডে ফারজানা ইয়াসমিন নিশাত ৩১ হাজার ৮০০ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। সম্পূর্ণ প্রতিকূল পরিস্থিতিতে জামায়াত প্রার্থীদের এই বিপুল ভোটে বিজয়ে হতবাক হয়েছেন অনেকেই।

কী চাই নতুন মেয়রের কাছে? by পলাশ আহসান

নতুন মেয়রদের কাছে কে কী চান, এ নিয়ে দেখলাম বেশ আলোচনা হচ্ছে গণমাধ্যমে। একই আলোচনা চলছে চায়ের দোকান, পাড়ার মোড় এবং জ্যামের মধ্যে যাত্রীবাহী বাসে। নির্বাচন কেমন হয়েছে, সে আলোচনার গতি এখন খানিকটা কম। মানুষ ভাবছে, এই নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দিয়ে কীভাবে কাজ করানো যায়।
দ্রুত নির্বাচনী জটিলতা ভুলে কেন মানুষ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে কাজ চাইছে, সে ব্যাখ্যা হয়তো একেকজনের কাছে একেক রকম। দীর্ঘদিন জনপ্রতিনিধি ছাড়া থাকার কারণে মানুষের বঞ্চনা বেড়েছে। মানুষ দ্রুত সেই বঞ্চনা থেকে মুক্তি চাইছে। কেউ না থাকার চেয়ে কেউ থাকা ভালো—সবাই হয়তো এটাই ভাবছে। আর নির্বাচন সুষ্ঠু হবে, এ আশাও মানুষের মনে তেমন একটা ছিল না।
জনপ্রতিনিধির কাছে মানুষের চাওয়া এখন পাহাড়সমান। কেউ রাস্তা চায়। কেউ ড্রেন চায়। কেউ জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি চায়। আবার কেউ বা চায় যানজট থেকে মুক্তি। মাদকসহ নানা অপরাধপ্রবণতার হাত থেকেও মুক্তি চায় কেউ কেউ। মোদ্দা কথা, এই নগরে মানুষের ভালো থাকার আকুতি প্রবল। কারণ, তারা ভালো নেই।
এই নগরে একজন মানুষ সকালে কাজে বের হয় এবং রাতে ঘরে ফেরে। এই দীর্ঘ সময়ে যতটা না কাজ করে, তার চেয়ে বেশি সময় তাকে নষ্ট করতে হয়। শুধু কি যানজট? হাজারো সমস্যায় পড়তে হয় তাকে। তবে সবচেয়ে বেশি শিকার হতে হয় প্রতারকের। দিনের শুরুতে সিএনজিচালিত অটোরিকশাওয়ালা ধমক দেয়, ‘ট্রাফিক জিগাইলে কইবেন মিটারে যাইতাছেন।’ বাসে উঠে নিরাপদে কখনো কখনো নামতে পারলেও নিস্তার নেই ভিড়ের মধ্যে রিকশার জন্য দাঁড়ালে। পকেট ফাঁকা হয়ে যাবে মুহূর্তেই।
এমন তো হওয়ার কথা নয়। রাস্তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেক সদস্য আছেন। কিন্তু তাঁদের কাজ যেন মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়া নয়। রাস্তায় বের হওয়া মানুষটি যদি নারী হন, তাহলে তাঁর সমস্যা আর লিখে শেষ করা যাবে না। এর জন্য সারা দিন তাঁকে অনুসরণ করতে হবে।
প্রতিটি সমস্যা খতিয়ে দেখলে বোঝা যায়, ৮০ শতাংশ কারণ অব্যবস্থাপনা আর স্বেচ্ছাচার। অব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের আর স্বেচ্ছাচার নাগরিকের নিজের। বেশির ভাগ নগরবাসীই নগরজীবনের সমস্যা তৈরি করে অথবা করার সুযোগ পায়। এই অব্যবস্থাপনা আর স্বেচ্ছাচারের দুষ্টচক্রই সব দুর্ভোগের কারণ। আঘাত করা দরকার এখানেই।
মেয়রদের ক্ষমতা সীমিত। তাঁদের পক্ষে গণ্ডির বাইরে যাওয়া সম্ভব নয়। তাঁরা সেই সীমিত ক্ষমতার মধ্যেই সব করার চেষ্টা করবেন, বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করবেন—এটাই সবার প্রত্যাশা।
লেখক: নাগরিক, ঢাকা

বোনদের ভূখণ্ডে সব নির্বাচনই অবাধ ও সুষ্ঠু

জনসমক্ষে তারা একে অপরকে আপা বলে সম্বোধন করেন। শীর্ষে আরোহণের আগে উভয়েই তারা একগুঁয়ে রাজনৈতিক সংগ্রামের জন্য সুপরিচিত। সীমান্তের উভয় দিকে এবারের পৌর নির্বাচনের মওসুমে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির মুখে এখন একই সুর। সেটা হলো, ‘নির্বাচন ছিল অবাধ ও সুষ্ঠু।’ দুজনের রাজনৈতিক দলই নির্বাচনে ঢালাওভাবে জয়ী হয়েছে। বাংলাদেশে পৌর নির্বাচনের লড়াই রাজনৈতিক দৃশ্যপটের আদলে হয় না। তবে দলগুলো পছন্দের প্রার্থীদের সমর্থন দিয়ে তাদের পছন্দ প্রকাশ করেন। মঙ্গলবারের নির্বাচনে ঢাকা উত্তর, দক্ষিণ ও চট্টগ্রামের পৌর নির্বাচনে ১৮২ জন বিজয়ীর মধ্যে ১৫২ জনই ছিলেন আওয়ামী লীগের আশীর্বাদপুষ্ট। মাত্র ২০ জন বিজয়ীর প্রতি ছিল বিএনপি-জামায়াতের সমর্থন। তিন সিটি করপোরেশনের প্রত্যেকটির মেয়র পদ গেছে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীদের অনুকূলে।
এদিকে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস বিরোধীদের ধরাশায়ী করেছে কলকাতার ১৪৪ ওয়ার্ডের ১১৪টিতে এবং বিভিন্ন জেলার ৯১টি পৌর কাঠামোর ৭০টিতে জয়ী হয়ে। সীমান্তের উভয় দিকে সাদৃশ্যের তালিকা এখানেই শেষ নয়। এক তরফা ভোটের ফলকে ইঙ্গিত করে ভারত ও বাংলাদেশের বিরোধী দলগুলো ক্ষমতাসীন দলগুলোর বিরুদ্ধে পুলিশ ও পোল প্যানেল ব্যবহার করে নির্বাচনে জালিয়াতির অভিযোগ এনেছে। নির্বাচনে অনিয়ম, জালিয়াতির অভিযোগ যখন পত্রপত্রিকা আর টিভি চ্যানেলে উঠে এসেছে, তখন ‘দুবোন’ই একই রকম উদ্যোমে মিডিয়াকে তিরস্কার করেছেন। এ ছাড়া জালিয়াতির অভিযোগ খণ্ডনে তারা বিরোধীদের পক্ষে পড়া ভোটের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। এ বছর ফেব্রুয়ারিতে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী যখন ভাষা দিবসে অংশ নিতে ঢাকা সফরে গিয়েছিলেন, তখন দুই নেত্রীর মুখেই ছিল একে অপরের স্তুতি।
বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পূর্ন ভিন্ন। আপনাকে বুঝতে হবে এখানকার বিরোধী দল ধ্বংসাত্মক রাজনীতি আর হত্যাযজ্ঞে লিপ্ত।’ ৩রা জানুয়ারি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে তার কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখার পর থেকেই বাংলাদেশের পরিস্থিতি স্ফুটনাঙ্কে। ওই ঘটনা থেকে দেশজুড়ে প্রতিবাদ কর্মসূচি শুরু হয়। এতে শতাধিক মানুষ নিহত হন। বিএনপি-জামায়াত সংশ্লিষ্ট প্রতিবাদকারীরা যানবাহনে ভয়াবহ পেট্রলবোমা হামলা চালায়। ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি বিএনপি নির্বাচন বর্জনের পর থেকেই খালেদা জিয়া ব্যাকফুটে রয়েছেন। বিএনপির তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি প্রত্যাখান করে আওয়ামী লীগ সরকার। রাজপথে কয়েক মাসের প্রতিবাদে শতাধিক মানুষের প্রাণহানি হওয়া সত্ত্বেও সরকার তাদের দাবি মেনে নেয় নি। একচেটিয়া নির্বাচনে পুনর্নির্বাচিত হন হাসিনা। এরপর বিএনপি এবং তাদের জোট শরিক কট্টরপন্থি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বের ওপর কঠোর চাপ সৃষ্টি করেন তিনি। রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে দীর্ঘ অনুপস্থিতির পর (যে সময়টায় বিএনপির সিনিয়র নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়) বিএনপি সিটি নির্বাচনে প্রার্থী দিতে সিদ্ধান্ত নেয়। এজন্য খালেদা জিয়াও প্রচারণায় নামেন। বিএনপি ও মিত্র দলগুলোর নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্তকে সমালোচনা করে আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, তারা বুঝতে পারে যে তাদের প্রার্থীরা পরাজিত হবে এবং নির্বাচনের দিন অনিয়মের মিথ্যা অভিযোগ দেখিয়ে তারা নির্বাচন বর্জন করে।
লেটনাইট টক শোতে আবিষ্ট বাংলাদেশে বিএনপির নির্বাচন বর্জন নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ফাঁস হয়েছে ফোনালাপ, যেখানে দলের নেতারা নির্বাচন থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়ার কৌশল আলোচনা করছেন। মিডিয়ার একটি অংশ প্রতিবেদন করেছে, নির্বাচন থেকে সরে আসাটা বিএনপির একটি পূর্বপরিকল্পিত চাল। বিএনপির মুখপাত্র মওদুদ আহমদ বলেন, ‘এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন। নির্বাচন স্বাভাবিক ও শান্তিপূর্ণ হবে এ প্রত্যাশায় আমরা নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলাম। কিন্তু নির্বাচনের দিন ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে পুলিশ সহযোগিতা করে ভোটকেন্দ্র দখল করে। এর পরও আপনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন যদি ১০ ভাগ ভোটকেন্দ্রে জালিয়াতি হয়। কিন্তু ৯৯ শতাংশ কেন্দ্রেই যদি জালিয়াতি হয় তাহলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা সম্ভব নয়। আমাদের ভোটার এবং প্রার্থীদের নিরাপত্তার জন্য আমাদের প্রত্যাহার করতে হয়েছে।’ বাংলাদেশের সংবাদপত্রগুলোতে নির্বাচনের কাভারেজে মওদুদ আহমদের অভিযোগগুলো প্রতিধ্বনিত হয়। ভোটারদের ভোটকেন্দ্র থেকে ফিরিয়ে দেয়া এবং বিরোধী পোলিং এজেন্টদের বের করে দেয়ার সত্যিকারের অভিযোগই শুধু নয়, মিডিয়াকে কিভাবে নির্বাচনী অনিয়ম ধারণ করতে বাধা দেয়া হয়েছে সে রিপোর্টও এসেছে। কিন্তু নির্বাচন থেকে বিএনপির প্রত্যাহার সমাজের আওয়ামী লীগ বিরোধী অংশও ঠিক ভালভাবে নেয় নি। ঢাকাভিত্তিক একজন প্রকৌশলী মন্তব্য করেন, আমি বিএনপির প্রতি হতাশ। তারা আবারও মাঠ ছেড়ে গেছে। তিনি প্রত্যাশা করেছিলেন অংশগ্রহণমূলক একটি নির্বাচনী প্রক্রিয়া দেশে শান্তি আনবে। সীমান্তের এপারে উদাহরণ রয়েছে, মাঠ থেকে সরে গেলে কোন উপকার হয় না। ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে পৌর নির্বাচনে বর্ধমান ও চকধা এলাকার পৌর বোর্ডের নিয়ন্ত্রণ নিতে তৃণমূল অবাধ জালিয়াতি করেছে অভিযোগ করে সিপিএম নির্বাচন বর্জন করে। এমন পদক্ষেপে তৃণমূলকে অস্বস্তিতে ফেলার পরিবর্তে তা বামপন্থি ক্যাডারদের মনোবল আরও দুর্বল করেছে। আর বর্ধমান ও নদীয়া উভয় এলাকায় ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তারা চরম পরাজয়ের মুখোমুখি হয়। রাজ্যে আরেকটি প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় বিজেপি। সাম্প্রতিক পৌর নির্বাচনে তৃণমূল একচেটিয়া জয়ী হলেও, সিপিএম নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট পশ্চিমবঙ্গজুড়ে ৫টি পৌর বডি জিততে সমর্থ হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের দ্বারা জালিয়াতির অভিযোগ সত্ত্বেও সিএমসিতে ১৫টি আসনে জয়ী হয় তারা। বাংলাদেশী এক টেলিভিশন চ্যানেলের সম্পাদক বলেন, আমরা জানি যে, পশ্চিমবঙ্গে বনধ চলছে, বিরোধী দলগুলো প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করছে। কিন্তু এখানে বিরোধী দলগুলো স্রেফ মাঠ ছেড়ে চলে গেছে যদিও কিছু প্রার্থী বিশেষ করে মেয়র প্রার্থীরা উল্লেখযোগ্য ভোট পাচ্ছিলেন। এখানে বিরোধীদের প্রতিক্রিয়া আদর্শ নয়।
লেখক: দেবদ্বীপ পুরোহিত, ভারতের অনলাইন দ্য টেলিগ্রাফে প্রকাশিত লেখার অনুবাদ

ব্লগার অভিজিৎ-বাবু হত্যা: তদন্তে অগ্রগতি নেই by নুরুজ্জামান লাবু

লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ডের ঘটনার দুমাস পেরিয়ে গেছে। কিন্তু নির্মম এ হত্যাকাণ্ডের তদন্তে কোন অগ্রগতি নেই। বলা চলে, ক্লু না থাকায় তদন্ত অনেকটা ঝিমিয়ে পড়েছে। যদিও তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, তারা সাধ্যমতো চেষ্টা করছেন। ইতিমধ্যে হত্যাকাণ্ডের মোটিভ সম্পর্কে তারা পরিষ্কার ধারণাও পেয়েছেন। কিন্তু এখনও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত কাউকে শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করতে পারেননি। অপরদিকে একই অবস্থা ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবু হত্যাকাণ্ডের তদন্তেও। হত্যাকাণ্ডের সময় স্থানীয় লোকজন যে দুই খুনিকে ধরে পুলিশে সোপর্দ করেছিল এর বাইরে আর কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের সময় তারা ৫-৬ জন ছিল বলেও স্বীকার করেছিল গ্রেপ্তারকৃত দুই তরুণ। ঘটনার পরপরই তারা পালিয়ে যায়। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তাদের নাম-পরিচয় পাওয়া গেছে। কিন্তু অবস্থান শনাক্ত করা যায়নি। এদিকে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদার ভারতীয় শাখার সমন্বয়কারী এক ভিডিও বার্তায় ড. অভিজিৎ রায় ও ওয়াশিকুর রহমান বাবুসহ ব্লগারদের হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছে। যদিও এ দাবির সত্যতা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
গত ২৬শে ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমির একুশে বইমেলা থেকে রাত ৯টার দিকে ফেরার সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির পাশে দুর্বৃত্তদের হামলায় নিহত হন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক অভিজিৎ রায়। দুর্বৃত্তরা চাপাতি দিয়ে তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাকেও কুপিয়ে আহত করে। রাফিদা সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে গেলেও ঘটনাস্থলেই নিহত হন অভিজিৎ রায়। ঘটনাটি সারা দুনিয়ায় আলোচিত হয়। ঘটনার দিনই লন্ডন থেকে করা এক টুইটবার্তায় দায় স্বীকার করে নেয় আনসার বাংলা-৭ নামে একটি সংগঠন। ঘটনা তদন্তে দেশে আসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা-এফবিআই। অপরদিকে পুলিশের সামনেই এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলা নিয়েও আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। তবে ডিএমপির পক্ষ থেকে গঠিত তদন্ত কমিটি পুলিশের দায়িত্বে অবহেলার বিষয়টি খুঁজে পায়নি। অপরদিেক অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের ৩২ দিনের মাথায় গত ৩০শে মার্চ তেজগাঁওয়ের দক্ষিণ বেগুনবাড়ি এলাকায় প্রকাশ্য দিবালোকে একই কায়দায় খুন হন আরেক ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবু। সকালে বাসা থেকে বেড়িয়ে কয়েক গজ হেঁটে যেতে না যেতেই পেছন থেকে চাপাতি দিয়ে হামলা করে দুর্বৃত্তরা। এতে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় বাবুর। আর পালিয়ে যাওয়ার সময় এক হিজড়ার সহায়তায় স্থানীয় লোকজন দুই দুর্বৃত্তকে ধরে ফেলে। গ্রেপ্তারের পর তারা সাংবাদিকদের কাছে আদর্শগত বিরোধের জের ধরেই তাকে হত্যা করেছে বলে স্বীকার করে। বর্তমানে দুটি ঘটনায় তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ-ডিবি।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মুখপাত্র ও ডিবির যুগ্ন কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, দুই ব্লগার হত্যাকাণ্ডের ঘটনাই গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের পর তদন্তে সহযোগীতার জন্য এফবিআই সদস্যরা এসেছিলেন। তারা তদন্তে প্রযুক্তিগত সহযোগীতা করছে। এছাড়া অভিজিত হত্যাকাণ্ডের কিছু আলামত এফবিআই ল্যাবে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। এসব প্রতিবেদন এখনো আসেনি। তিনি বলেন, অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে পাঁচের অধিক কয়েকজন সন্দেহভাজনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারের জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে। তারা সবাই আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য বলে জানিয়েছেন তিনি। সাম্প্রতি আল-কায়েদার দায় স্বীকার প্রসঙ্গে মনিরুল ইসলাম বলেন, দায় স্বীকারের ভিডিও বার্তাটি আমরা শুনেছি ও দেখেছি। এটি আসলেই আল-কায়েদার কিনা তা আমরা পর্যালোচনা করে দেখছি। তিনি বলেন, বাংলাদেশের আনসারুল্লাহ বাংলা টিম আল-কায়েদাকে অনুসরণ ও অনুকরণ করে থাকে। তারা আল-কায়েদার সঙ্গে অর্ন্তভূক্ত হওয়ার চেষ্টা করছে বলে আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে। পুরো বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের পর গোয়েন্দা পুলিশ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় একুশে বইমেলা ও টিএসসি এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়। তবে ফুটেজে বইমেলাতে একবারের জন্য অভিজিৎকে দেখা গেলেও সেখানে তার পিছু নেয়া কাউকে সনাক্ত করা যায়নি। এছাড়া বইমেলায় অভিজিতের সঙ্গে বুয়েট শিক্ষক ফারসীমসহ যাদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছিল, তাদের সম্পর্কেও গোয়েন্দা নজরদারি করা হয়েছে। এমনকি ফারসীমকে ডিবি কার্যালয়ে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়। তবে তাদের কাছে হত্যাকাণ্ড সম্পর্কিত কোনও তথ্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি। এছাড়া ঘটনার তিন দিনের মাথায় র‌্যাব ফারাবী শফিউর রহমান নামে এক তরুণকে গ্রেপ্তার করে। সে বিভিন্ন সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অভিজিৎকে হত্যার হুমকি দিয়ে আসছিল। ফারাবীকে গোয়েন্দা পুলিশ ১০ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞসাবাদ করে। কিন্তু ফারাবীও হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে কোনও তথ্য দিতে পারেনি। ফারাবীকে জিজ্ঞাসাবাদকারী এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, অভিজিতের হত্যাকাণ্ড সমর্থন করলেও ফারাবী হত্যাকাণ্ডে কারা অংশ নিয়েছিল তা জানাতে পারেনি। সমর্থনের কারণেই প্ররোচনা দিতে বিভিন্ন সময়ে সে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খুনের সমর্থন করে এসেছে সে। গোয়েন্দা সূত্র জানা গেছে, তদন্ত সংশ্লিষ্টরা অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধারকৃত আলামত ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে হুমকিদাতাদের একটি তালিকা পরীক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা-এফবিআইয়ের হাতে দিয়েছে। তবে গতকাল পর্যন্ত এসব পরীক্ষার কোনও প্রতিবেদন গোয়েন্দা সংশ্লিষ্টদের হাতে এসে পৌঁছায়নি। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা ও ঢাকার মার্কিন দূতাবাসে অবস্থানকারী চার এফবিআই কর্মকর্তা অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের তদন্তে সহযোগিতা করছেন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা এফবিআই সদস্যরা ফিরে গেলেও ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের এফবিআই সদস্য তদন্ত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করছেন বলে জানা গেছে। মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা ডিবির সহকারী কমিশনার (এসি) আরাফাত বলেন, ঘটনাটি স্পর্শকাতর। অনেক গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করছি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা জানান, তারা মোটামুটি নিশ্চিত হয়েছেন আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি) নামে একটি ধর্মীয় জঙ্গি গোষ্ঠী এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। এবিটির একটি স্লিপার সেল সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়। ওই সেলের সদস্যদের নাম-পরিচয়ও তারা পেয়েছেন। তবে গ্রেপ্তারের আগে তাদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি। ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, সন্দেহভাজন খুনি হিসেবে তাদের গ্রেপ্তারের জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু তাদের নির্দিষ্ট অবস্থান নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।
যোগাযোগ করা হলে অভিজিতের পিতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. অজয় রায় বলেন, পুলিশ তো আমার সঙ্গে যোগাযোগও করে না, তদন্তের অগ্রগতিও আমাকে জানায় না। তবে আমরা আশা ছাড়ছি না। আমার বিশ্বাস পুলিশ চাইলে খুনিদের গ্রেপ্তার করতে পারবে। তবে তাদের ইচ্ছে টা থাকতে হবে। ড. অজয় রায় বলেন, এত বড় একটা ঘটনা পুলিশকে আরো বেশি ত্বরিৎ গতিতে কাজ করা উচিত।
এদিকে অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের ৩২ দিনের মাথায় একই কায়দায় তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের দক্ষিণ বেগুনবাড়ি এলাকায় হত্যা করা হয় ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবুকে। প্রকাশ্য দিবালোকে চাপাতি দিয়ে খুন করে পালিয়ে যাওয়ার সময় জিকরুল্লাহ ও আরিফ নামে দুই তরুণকে ধরে পুলিশে দেয় স্থানীয় লোকজন। গোয়েন্দা পুলিশ এই দুই তরুণকে তিন দফায় ১২ দিন করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে। জিজ্ঞাসাবাদে জিকরুল্লাহ ও আরিফ জানায়, ঘটনার সময় তাদের সঙ্গে তাহের নামে আরও এক যুবক ছিল। আর মাসুম নামে এক ‘বড় ভাই’য়ের নির্দেশে তারা বাবুকে হত্যা করে। মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানায়, গ্রেপ্তারকৃত দুজন নিজেরা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করলেও তাদের সহযোগীদের যে নাম বলেছে তা ‘কোড নাম’ বলে তারা ধারণা করছেন। তাদের আসল নাম-পরিচয় উদ্ধার ও গ্রেপ্তারের জন্য চেষ্টা চলছে। গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি পশ্চিম) সাইফুল ইসলাম বলেন, গ্রেপ্তারকৃত দুজন আরও যাদের নাম বলেছে তাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে মনে হচ্ছে তারা আসল নাম না বলে ‘কোড নাম’ ব্যবহার করেছে। একারণে অন্যদের খুঁজে পাওয়া একটু দুষ্কর হয়েছে।