Wednesday, March 30, 2016

প্রেসিডেন্সি লায়ন্স ক্লাবের উদ্যোগে কদম মোবারক এতিমখানায় খাবার বিতরণ সম্পন্ন

প্রেসিডেন্সি লায়ন্স ক্লাবের উদ্যোগে গত ৩০শে মার্চ কদম মোবারক মুসলিম এতিমখানার ৪০০ নিবাসীর মধ্যে খাবার বিতরণ সম্পন্ন হয়ছে। ক্লাব সভাপতি লায়ন সৈয়দ মোরশেদ হোসেনর সভাপতিত্বে এ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন লায়ন্স ক্লাব ইন্টারন্যাশনাল ডিষ্ট্রিক্ট ৩১৫ বি-৪ জেলা গভর্নর লায়ন মোস্তাক হোছাইন। বিশেষ অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন প্রক্তন জেলা গভর্নর লায়ন এম সামশুল হক, জোন চেয়ারম্যান লায়ন আশরাফুল ইসলাম আরজু, ক্লাব সেক্রেটারী লায়ন অধ্যক্ষ ড. সানাউল্লাহ্। প্রতিষ্ঠানের তত্বাবধায়ক আবুল কাসেম। প্রধান অতিথি এ ধরনের মহতি উদ্যোগ গ্রহন করায় প্রেসিডেন্সি লায়ন্স ক্লাবেকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।

পেসারদের পারফরম্যান্সে খুশি স্ট্রিক

বিশ্বকাপ ব্যস্ততার পর ছুটি কাটাচ্ছেন কোচ-ক্রিকেটাররা।
এর মধ্যেই কাল ব্যক্তিগত কাজে বিসিবি কার্যালয়ে আসা
হিথ স্ট্রিক কথা বললেন সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সুপার টেনে বাংলাদেশ দলের অর্জন শূন্যই বলতে হবে। ব্যর্থতার ভিড়ে প্রাপ্তি বোলারদের পারফরম্যান্স, বিশেষ করে পেসারদের। চোটের কারণে টুর্নামেন্টে প্রায় অর্ধেক সময় বসে থাকা মুস্তাফিজুর রহমান মাঠে ফিরেই দেখিয়েছেন বোলিং জাদু। ইডেনে বাংলাদেশের ভরাডুবির শেষ ম্যাচে তাঁর দুর্দান্ত বোলিংই একমাত্র পাওয়া। বিশ্বকাপে ৮ উইকেট নেওয়া আল আমিনের বোলিংয়েও ছিল ধারাবাহিকতা। এমনকি নিষিদ্ধ হওয়ার আগে তাসকিন আহমেদও ছিলেন ছন্দে। দলীয় ব্যর্থতার মধ্যেও তাই খানিকটা স্বস্তি খুঁজে পাচ্ছেন হিথ স্ট্রিক। তবে শেষ কটি ম্যাচ হেরে যাওয়ার যন্ত্রণা ভুলতে পারছেন না জিম্বাবুইয়ান এই পেস বোলিং কোচও, ‘ফাস্ট বোলারদের পারফরম্যান্সে আমি খুশি। দলের পারফরম্যান্সের কথা চিন্তা করলে ভারতের বিপক্ষে হারে হতাশ। অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গেও সুযোগ ছিল। ভারতের বিপক্ষে হারের ধকল আমরা কাটিয়ে উঠতে পারিনি পরের ম্যাচেও। কয়েকটি ম্যাচে জিতে আসতে পারতাম।’ টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ দলের জন্য বড় ধাক্কা ছিল আরাফাত সানি ও তাসকিনের বোলিং অ্যাকশন অবৈধ হওয়া। বিসিবির পরামর্শে তাসকিন সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আবেদন করেও ব্যর্থ হয়েছেন খেলায় ফিরতে। কিন্তু স্ট্রিক আবারও বললেন, তাসকিনের অ্যাকশনে তেমন কোনো সমস্যা নেই, ‘যখন থেকে এখানে কাজ শুরু করেছি, তখন থেকে এখন পর্যন্ত তার অ্যাকশনে সন্দেহজনক কিছু দেখিনি। বেশ অবাকই হয়েছিলাম খবরটা শুনে। পরীক্ষায় তার সব ইয়র্কার, গুড লেংথ ডেলিভারি এবং বেশির ভাগ বাউন্সার বৈধ সীমার মধ্যেই ছিল। নয়টি ডেলিভারির মধ্যে মাত্র তিনটি ১৫ ডিগ্রির সীমা ছাড়ায়। এমনকি দ্রুতগতির বাউন্সারগুলোও বৈধ সীমার মধ্যে ছিল। সমস্যা হয়েছিল একটু ধীরে যাওয়া বাউন্সারগুলোতে। ক্লান্তির কারণেও এটি হতে পারে। আমার মনে হয় না এটা বড় কোনো সমস্যা।’ তাসকিনের বোলিং অ্যাকশনে যে সামান্য ত্রুটি আছে, সেটি শোধরানোর প্রক্রিয়া এর মধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। বাংলাদেশ দলের এই পেসার অবশ্য সপ্তাহ খানেকের জন্য দেশের বাইরে যাচ্ছেন ঘুরতে। দেশে ফেরার পর পুরোদমে শুরু হবে পুনর্বাসনপ্রক্রিয়া। স্ট্রিকের আশা, এরপর এক-দেড় মাসের মধ্যেই আবার পরীক্ষা দিতে পারবেন তাসকিন।

চট্টগ্রাম আবাহনীর সঙ্গী হলেন পাভলিক

যোশেফ পাভলিক
হঠাৎ চট্টগ্রাম আবাহনী ছেড়ে শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাবের দায়িত্ব নিয়েছেন শফিকুল ইসলাম মানিক। তাঁর শূন্যস্থানে চট্টগ্রাম আবাহনী নিয়ে এল সার্বিয়ান কোচ যোশেফ পাভলিককে। চট্টগ্রামের দলটি স্বাধীনতা কাপের প্রস্তুতি নিতে ঢাকার একটি হোটেলে আবাসিক ক্যাম্প করছে। বুয়েট মাঠে ফুটবলারদের নিয়ে অনুশীলনও শুরু করেছেন নতুন কোচ। এক মৌসুমের জন্য পাভলিকের সঙ্গে চুক্তি করেছে চট্টগ্রাম আবাহনী। কালই প্রথম তাঁকে বাফুফে ভবনে এনে সংবাদ সম্মেলনে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো। ২০০৫ সালে কোচিং ক্যারিয়ার শুরু করা এই সার্বিয়ান স্লোভাক লিগের ক্লাব এফসি নিতরার বয়সভিত্তিক দলের কোচ ছিলেন একাধিকবার। ক্লাবটির মূল দলের প্রধান কোচও হয়েছিলেন। তাঁর সর্বশেষ ক্লাব সে দেশেরই ভিওন জ্লাতে মোরাভসে। বাংলাদেশ সম্পর্কে খুব বেশি ধারণা ছিল না পাভলিকের। এসেই ধারণা পেয়েছেন এবার বড় বাজেটের দল গড়া চট্টগ্রাম আবাহনী সম্পর্কে। যে দলে আছেন একাধিক শীর্ষ ফুটবলার। তাই আশাবাদী হচ্ছেন পাভলিক, ‘মাত্র দুই সেশনের প্র্যাকটিস দেখেছি। তাই এখনই কিছু বলা ঠিক হবে না। তবে কিছুদিন গেলেই বুঝতে পারব কোথায় ফুটবলারদের উন্নতি করতে হবে। এই দলে অনেক সম্ভাবনাময় ফুটবলার রয়েছে। আমি জানি, বিশ্বের সব জায়গাতেই লিগ চ্যাম্পিয়ন হওয়াটা কঠিন একটা কাজ। তারপরও আমি চ্যাম্পিয়ন করতে চাই এই দলকে।’

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ কর্নার

ওয়াকার ইউনিস
ক্ষমা চাইলেন ওয়াকার
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ব্যর্থতার দায় মাথায় নিয়ে ফিরতে হয়েছে দেশে। সমালোচনার তির ছুটে আসছে পাকিস্তান কোচ ওয়াকার ইউনিসের দিকেও। এর মধ্যেই তাঁকে ছাঁটাই করার দাবি উঠেছে। পিসিবির সঙ্গে ওয়াকারের চুক্তি অবশ্য আগামী মে মাসেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। তবে পাকিস্তান কোচ জানিয়ে দিলেন, দরকার হলে তার আগেই নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য তিনি প্রস্তুত, ‘আমি চলে গেলে পরিস্থিতির যদি উন্নতি হয়, তাহলে দেরি না করে সেটাই করব।’
কিন্তু টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে পাকিস্তানের এমন ব্যর্থতার কারণ কী? ওয়াকার কোনো অজুহাত দাঁড় করালেন না, ‘আমি হাত জোড় করেই দেশের সবার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি।’ সঙ্গে অবশ্য পাকিস্তান ক্রিকেটের সংকটের জন্য দেশের মাটিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের অপ্রতুলতাকে দায়ী করেছেন কোচ, ‘ঘরের মাঠে খেলা না হলে ভিত্তি তো দুর্বল হবেই।’ এএফপি।
লেম্যানের বাজি ভারত
সেমিফাইনাল জিতে ফাইনালে ভারত না ওয়েস্ট ইন্ডিজ—এই প্রশ্নে অস্ট্রেলিয়ার কোচ ড্যারেন লেম্যানের বাজি ভারত। মোহালিতে দুর্দান্ত ইনিংসটি খেলে অস্ট্রেলিয়ার হাতে দেশে ফেরার টিকিট ধরিয়ে দিলেন বিরাট কোহলি, সেটি দেখার পর কে না এগিয়ে রাখবেন ভারতকে! অবশ্য লেম্যান জানাচ্ছেন মোহালি লড়াইয়ের আগেই তাঁর বিশ্বাস ছিল, ওই ম্যাচের জয়ী দল অনেক দূর যাবে। আর কোহলির অতিমানবীয় ইনিংসের পর অস্ট্রেলীয় কোচের বিশ্বাস, ‘ভারত হারবে বলে মনে হয় না আমার। এটা অবশ্য আমার ব্যক্তিগত মত।’ অস্ট্রেলীয় কোচের কথা শুনে ভারতীয় সমর্থকেরা বলতেই পারেন—ফুলচন্দন পড়ুক লেম্যানের মুখে! আইবিএন।
ইনজির বিশ্বাস
ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে পাওয়া জয় আফগানিস্তানের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেবে। বড় দলের সঙ্গে লড়াইয়ের প্রেরণা দেবে। এমনই বিশ্বাস আফগানিস্তানের কোচ ইনজামাম-উল হকের। গ্রুপ পর্বে নিজেদের শেষ ম্যাচে ৬ রানে ক্যারিবীয়দের হারিয়েছে আফগানরা। যা ইনজামামের আত্মবিশ্বাসও বাড়িয়ে দিয়েছে অনেক, ‘টুর্নামেন্টে আগের ম্যাচগুলোতেও ভালো লড়াই করেছি আমরা। আমাদের বিপক্ষে কোনো ম্যাচই একপেশে হয়নি। এমন হয়নি যে প্রতিপক্ষ ২০০ রান করেছে আর আমরা অলআউট হয়ে গেছি ১০০ কিংবা ১৫০ রানে। ভালো লড়াই করার বিশ্বাসটা সব সময় ছিল দলের। কিন্তু বড় দলগুলোর বিপক্ষে জিততে পারছিলাম না। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে এল সেই জয়। এটা অবশ্যই দলকে সাহায্য করবে।’ বড় দলগুলোর বিপক্ষে ম্যাচ খেলার সুযোগ পেতে এরই মধ্যে আইসিসির কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন আফগান অধিনায়ক আসগর স্টানিকজাই। একই দাবি ইনজামামেরই, ‘বড় দলগুলোর বিপক্ষে আমরা যত খেলব, তত বেশি বেশি শিখব। আমাদের পারফরম্যান্সও আরও ভালো হবে।’

দিল্লি নিয়ে‘চিন্তিত’ম্যাকমিলান

ক্রেইগ ম্যাকমিলান
এখন পর্যন্ত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ম্যাচ হারেনি নিউজিল্যান্ড। কিন্তু সেমিফাইনালের আগে দারুণ ছন্দে থাকে দলটির চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে দিল্লির ফিরোজ শাহ কোটলা! গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচের ভেন্যুটাই যে এখন পর্যন্ত নতুন তাদের জন্য! কিউই ব্যাটিং পরামর্শক ক্রেইগ ম্যাকমিলান বিশেষভাবে চিন্তিত ব্যাপারটা নিয়ে। তাঁর শঙ্কা, বিশ্বকাপজুড়ে দল যে দারুণ ছন্দে আছে, অপরিচিত ভেন্যুতে গিয়ে সেটা না আবার কেটে যায়, ‘টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের মূলই হলো ছন্দ। নিউজিল্যান্ড দল এই মুহূর্তে দারুণ ছন্দে আছে। কিন্তু আমরা এমন একটি ভেন্যুতে খেলতে যাচ্ছি, যে ভেন্যুর সঙ্গে দলের কেউই পরিচিত নয়।’ ম্যাকমিলানের আশার জায়গাও অবশ্য আছে, ‘এটাও তো সত্যি, বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে নিউজিল্যান্ডই। আশা করি, দিল্লিতেও এর কোনো ব্যত্যয় হবে না।’ আজ দিল্লিতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ড মুখোমুখি হবে ইংল্যান্ডের।

সেন্ট লুসিয়া ফেরাবে ইংলিশরা?

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে এখনো অপরাজিত নিউজিল্যান্ড।
দুর্দান্ত ফর্মে আছেন কিউই অধিনায়ক কেন উইলিয়ামসনও।
তবে দল ভালো করলেও ব্যাট হাতে এখনো অনুজ্জ্বল ইংলিশ
অধিনায়ক মরগান। আজ তাঁর ফর্মে ফেরার অপেক্ষায় থাকবে
ইংল্যান্ড। অনুশীলনে সেমিফাইনালের প্রস্তুতি সেরে নিলেন দুজনই।
২০১০ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ইংলিশদের কাছে হয়ে উঠেছিল দুঃখ মোচনের বিরাট উপলক্ষ। পল কলিংউডের দল সেন্ট লুসিয়ায় সেমিফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল শ্রীলঙ্কার। লঙ্কানদের ৪ রানে হারিয়ে ইংল্যান্ড প্রথমবারের মতো পা রেখেছিল টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে। এরপর দীর্ঘদিনের আক্ষেপ ঘুচিয়ে প্রথমবারের মতো বৈশ্বিক শিরোপা জিতে ঘরে ফিরেছিল ইংলিশরা। ছয় বছর পর আবারও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ড। এবার প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ড। ইংলিশরা কি পারবে দিল্লিতে ফেরাতে সেন্ট লুসিয়ার স্মৃতি? ফাইনাল খেলা সেই ইংলিশ দলের মাত্র একজন সদস্য আছেন বর্তমান দলে—এউইন মরগান; যাঁর নেতৃত্বে ইংলিশরা দেখছে আরেকটি শিরোপার স্বপ্ন। ২০১০-এর সঙ্গে এই দলটার পার্থক্য মরগানের চেয়ে ভালো বলতে পারবেন কে? দুই দলের যথেষ্ট সাদৃশ্যই খুঁজে পাচ্ছেন ইংলিশ অধিনায়ক, ‘হ্যাঁ, অনেক মিল রয়েছে। মূল কথা হলো, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সবাই কতটা নির্ভার থাকতে পারে, কতটা চ্যালেঞ্জ নিতে পারে এবং জিততে কতটা উন্মুখ থাকতে পারে। যা-ই করুন, সেটা উপভোগ করতে হবে। আমাদের এই দলটা নিজেদের সামর্থ্য দেখিয়েছে, যার সঙ্গে ২০১০-এর অনেক মিল।’ এবার অবশ্য তাদের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু হয়েছে হারের হতাশা দিয়ে। মুম্বাইয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ১৮২ রান করেও জিততে পারেনি তারা। ইংলিশদের বড় স্কোরটাও মামুলি হয়ে গিয়েছিল ক্রিস গেইলের দুর্দান্ত সেঞ্চুরিতে। সেই ইংল্যান্ডই পরের ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার ২২৯ রান টপকে গিয়েছিল ২ বল বাকি থাকতে। টানা তিন ম্যাচ জিতে উঠেছে শেষ চারে। তবুও এই ম্যাচে ইংল্যান্ড নয়, ফেবারিট তকমা নিয়ে খেলতে নামবে নিউজিল্যান্ডই। সুপার টেনে অপরাজিত থেকে সেমিফাইনালে উঠেছে কিউইরা। অবশ্য প্রতিপক্ষ নিয়ে মোটেও ভাবছেন না ইংলিশ অধিনায়ক, ‘সত্যি বলতে কী, এ নিয়ে একদমই ভাবছি না। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে আমরা ফেবারিট ছিলাম। আসলে সেমিফাইনালে কঠিন এক ম্যাচই হবে। আশা করি উইকেট ভালোই হবে। সেরা দলই জিতবে এখানে।’ টুর্নামেন্টে পারফরম্যান্সের বিচারে নিউজিল্যান্ডকে এগিয়ে রাখলেও একটি জায়গায় ইংল্যান্ড এগিয়ে। কিউইরা সুপার টেনের চারটি ম্যাচই খেলেছে ভিন্ন ভিন্ন মাঠে। আর ইংলিশরা দিল্লিতেই খেলেছে নিজেদের সর্বশেষ দুটি ম্যাচ (শ্রীলঙ্কা ও আফগানিস্তানের বিপক্ষে)। মরগান আশাবাদী, এই অভিজ্ঞতা তাঁদের কাজে দেবে, ‘দিল্লিতে আমরা ভালোভাবে থিতু হয়ে গেছি। আমাদের জন্য ভালো হয়েছে এটা। পিচের সঙ্গে আমরা মানিয়ে নিতে পেরেছি।’ দুই দলের মুখোমুখি লড়াইয়েও কিউইদের চেয়ে ঢের এগিয়ে ইংলিশরা। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ১৩ টি-টোয়েন্টি খেলে জিতেছে ৮টিতেই। পরিসংখ্যান, শেষ চারে অতীতের মধুর স্মৃতি—সব মিলিয়ে ইংলিশরা ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন দেখতেই পারে।

তবু মাটিতে পা কিউইদের

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে এখনো অপরাজিত নিউজিল্যান্ড।
দুর্দান্ত ফর্মে আছেন কিউই অধিনায়ক কেন উইলিয়ামসনও।
তবে দল ভালো করলেও ব্যাট হাতে এখনো অনুজ্জ্বল ইংলিশ
অধিনায়ক মরগান। আজ তাঁর ফর্মে ফেরার অপেক্ষায় থাকবে
ইংল্যান্ড। অনুশীলনে সেমিফাইনালের প্রস্তুতি সেরে নিলেন দুজনই।
টুর্নামেন্টের আগে তাদের ফেবারিট বলা লোকের সংখ্যা কমই ছিল। কয়েক বছর ধরে দলের ‘নিউক্লিয়াস’ হয়ে থাকা ব্রেন্ডন ম্যাককালাম কদিন আগেই বিদায় নিয়েছেন। তাঁর অভাব নিয়ে নিউজিল্যান্ড কতটা কী করতে পারবে, এ নিয়ে সংশয় ছিল। অথচ সেই নিউজিল্যান্ডই কিনা একমাত্র অপরাজিত দল হিসেবে উঠে এসেছে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে! আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলে ম্যাচের সঙ্গে ক্রিকেটপ্রেমীদের মনও জিতে নিয়েছে দলটা। সব মিলিয়ে আজ দিল্লিতে ইংল্যান্ডের সঙ্গে সেমিফাইনালে কিউইদেরই বলা হচ্ছে ফেবারিট। কেন উইলিয়ামসনের অবশ্য ওসব ‘ফেবারিট-তত্ত্বে’ ভীষণ আপত্তি। এত বড় ম্যাচের আগেও পা মাটিতে রাখার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন নিউজিল্যান্ড অধিনায়ক। এর আগে মাত্র একবারই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে খেলেছে নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত ২০০৭-এর আসরে। নয় বছর পর আরও একবার সেমিফাইনালের বড় মঞ্চে। তবে উইলিয়ামসন অত হিসাবে যেতে রাজি নন, ‘আগামীকাল (আজ) অনেক বড়, রোমাঞ্চকর একটা ম্যাচ খেলতে যাচ্ছি। তবে আমাদের পা মাটিতেই আছে। যতটা সম্ভব ভালোভাবে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করব।’ বড় ম্যাচের আগে স্নায়ুচাপ দূর করতে একটা মন্ত্র নাকি বেশ কাজে দেয়। ম্যাচটাকে ভাবতে হবে ‘অন্য যেকোনো ম্যাচের মতো।’ ২০০০ সালের আইসিসি নক আউট ট্রফি ছাড়া আর কোনো বৈশ্বিক শিরোপা জিততে না পারা কিউইদের জন্য এই সূত্রটা মেনে চলা আরও বেশি জরুরি। সর্বশেষ গত বছর ঘরের মাটিতে বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেও হেরে গিয়েছিল অস্ট্রেলিয়ার কাছে। মনস্তাত্ত্বিক চাপ তো নিউজিল্যান্ডের ওপরই বেশি আজ! কিন্তু উইলিয়ামসনের কথায় মনে হলো চাপটাপ আপাতত মনেই আনছেন না তাঁরা, ‘আমরা খুব বেশি দূরে তাকাতে চাইছি না। টি-টোয়েন্টি নিয়ে আসলে কিছুই বলা যায় না। আপনি জিততে পারেন, হারতেও পারেন। মাঠে নামুন, ভয়ডরহীন বুদ্ধিদীপ্ত ক্রিকেট খেলুন।’ টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত এই ক্রিকেট খেলেই ম্যাচের পর ম্যাচ জয় তুলে নিয়েছে নিউজিল্যান্ড। ব্যাট-বলের পাশাপাশি মস্তিষ্কের খেলায়ও হারিয়ে আসছে প্রতিপক্ষকে। সব ম্যাচের একাদশ দেখেই মনে হয়েছে, এটাই ওই দিনের উইকেটের জন্য সেরা দল। সাউদি-বোল্টদের মতো বোলাররাই টুর্নামেন্টে এখনো মাঠে নামতে পারেননি! কিউইদের বেশি ভরসা স্পিনারদের ওপর। তার প্রতিদানও দিয়েছেন স্যান্টনার-সোধিরা। টুর্নামেন্টে ২০ উইকেট নিয়েছেন কিউই স্পিনাররা। আর কোনো দলের স্পিনারদেরই এত উইকেট নেই। তবে একটা জায়গায় কিছুটা এগিয়ে ইংল্যান্ড। ফিরোজ শাহ কোটলায় এরই মধ্যে দুই ম্যাচ খেলে ফেলেছে ইংলিশরা। অন্যদিকে কিউইরা গ্রুপ পর্বের চার ম্যাচ খেলেছে চার ভেন্যুতে। তবু ভ্রমণক্লান্তির প্রশ্নে উইলিয়ামসনের হাসিমাখা উত্তর, ‘ভালোই তো, আমরা অন্য দলগুলোর চেয়ে ভারতে বেশি ঘুরতে পেরেছি। অবশ্যই ব্যাপারটা কাকতালীয়। তবে ছেলেরা এই চ্যালেঞ্জে ভালোই মানিয়ে নিয়েছে, ভিন্ন ভিন্ন ফ্লাইট আর হোটেল বেশ ভালোই উপভোগ করেছে।’ ব্ল্যাক ক্যাপ জার্সি ছাপিয়ে মাঠ ও মাঠের বাইরে উপভোগের মন্ত্রটাই এই নিউজিল্যান্ডের পরিচয়।

নুরুল হাসানের‘শিক্ষাসফর’by রানা আব্বাস

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে নুরুলের সুযোগ হয়নি একটি ম্যাচও খেলার।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সুপার টেনে ব্যর্থতায় বাংলাদেশ দলের সবাইকে সমালোচনার কাঠগড়ায় দাঁড় করালেও একজনকে অবশ্য পারবেন না—নুরুল হাসান। যে পুরো টুর্নামেন্টে মাঠেই নামতে পারেননি, তাঁর পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করবেন কীভাবে? নাসির হোসেনের তবুও সান্ত্বনা, খেলেছেন ১ ম্যাচ। নুরুলের সান্ত্বনা কি? দলের সবাই ফিরেছে ব্যর্থতার হতাশা নিয়ে। নুরুলের ক্ষেত্রে দলের ব্যর্থতার হতাশার সঙ্গে যোগ হয়েছে খেলতে না পারার আক্ষেপ। অবশ্য তাঁর নিষ্পাপ চেহারায় সেই আক্ষেপ কিংবা হতাশা খুঁজে পাওয়া কঠিনই। মিষ্টি হাসিটা যে লেগেই থাকে তাঁর মুখে। সেই হাসিটা আরও একবার হেসেই বললেন, ‘টিম ম্যানেজমেন্ট যা ভালো মনে করেছে, তাই করেছে।’ বছরটা তাঁর শুরুটা অবশ্য হয়েছিল এন্তার সুসংবাদ দিয়ে। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ডাক পেলেন বাংলাদেশ দলের প্রাথমিক দলে। বেশ চমকে দিয়ে সুযোগ পেলেন জিম্বাবুয়ে সিরিজেও। দুর্দান্ত উইকেটকিপার, লোয়ার মিডল অর্ডারে চটপটে ব্যাটসম্যান—তাঁকে দলে নেওয়ার পেছনে এই ছিল প্রধান যুক্তি। নিজের শহর খুলনায় হয়ে গেল আন্তর্জাতিক অভিষেক। শুরুটা একেবারে মন্দ হয়নি। জিম্বাবুয়ে সিরিজে ৪ ম্যাচে ৫২ গড়ে করলেন ৫২ রান। এশিয়া কাপে খেললেন শ্রীলঙ্কা ও আরব আমিরাতের বিপক্ষে ম্যাচ দুটিও। কিন্তু টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সুযোগই হলো না নুরুলের। দলের সঙ্গে এ ভেন্যু, ও ভেন্যু করেই কেটেছে পুরো টুর্নামেন্ট। সব মিলে ‘ভারত-ভ্রমণ’টা ভালোই হয়েছে নুরুলের! ভ্রমণের অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে ধর্মশালার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধতার কথা শোনালেন। বেঙ্গালুরুতে ঘোরাঘুরিটা মন্দ হয়নি। কলকাতায় অবশ্য বেশিরভাগ সময় থাকতে হয়েছে হোটেলবন্দী হয়ে। এই প্রথম বাংলাদেশ দলের হয়ে গেলেন বিদেশ সফরে। টুর্নামেন্টকে তিনি দেখছেন ‘শিক্ষাসফর’ হিসেবেই, ‘মাঠে নামতে না পারলেও এত বড় আসরে প্রথম যাওয়ার অভিজ্ঞতা হলো। অনেক কিছু শিখেছি। কোচের কাছ থেকে নানা পরামর্শ পেয়েছি। সিনিয়র খেলোয়াড়দের কাছে থেকেও অনেক কিছু জানতে পেরেছি, যেগুলো ভবিষ্যতে কাজে দেবে।’ বাংলাদেশ দলের এই উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যানের কাছে দলের প্রয়োজনই বড়। সমন্বয়, প্রতিপক্ষ, মাঠ, কন্ডিশন—নানা বিবেচনায় থেকেছেন একাদশের বাইরে। তবে দলের ব্যর্থতা ভীষণ স্পর্শ করছে তাঁকেও, ‘ভারতের সঙ্গে ম্যাচটা হেরে আসলে সবারই মন খারাপ। ভারতকে হারাতে পারলে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি অন্যরকম হতে পারত। দল হিসেবে ভালো করলে অনেক বেশি ভালো লাগত। আমার ম্যাচ না খেলার আফসোসও পুষিয়ে যেত।’ না খেলেও ব্যর্থতার অংশীদার হওয়া কতটা যন্ত্রণার, নুরুলের চেয়ে ভালো বুঝবে কে! তবে তিনি নিশ্চয় চাইবেন, ভবিষ্যতে একাদশে নিজের জায়গাটা আদায় করে নিয়েই দলের সাফল্যের সারথি হতে।

টেন্ডুলকার-কোহলি‘বিতর্কে’র শেষ টানলেন তাঁরাই

টেন্ডুলকার ও কোহলি;দুই যুগের নায়ক
চলমান টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপটায় যেন স্টেডিয়ামের বাইরের মাঠ হয়ে উঠেছে টুইটার। কত কী-ই না দেখা গেল এই টুইটারে! ঝগড়া-বিবাদ-প্রশংসা-মীমাংসা সব। গত কদিনে সেই টুইট-গ্যালারিতে সবচেয়ে বেশি কিচিরমিচির বিরাট কোহলিকে নিয়ে। এখন তো এমন বিতর্কও চলছে, টেন্ডুলকার সেরা নাকি কোহলি! মজার ব্যাপার হলো, টুইটার দিয়েই এই বিতর্কের ইতি টেনে দিয়েছেন ভারতের সাবেক ও বর্তমান এক নম্বর ব্যাটসম্যান। কেউ কেউ বলছেন, ইতিমধ্যেই 'লিটল মাস্টার'কে ছাড়িয়ে গেছেন কোহলি। অনেকে আবার কোহলির প্রশংসা করলেও এত জলদিই দুজনকে একই কাতারে ফেলতে নারাজ। কোহলি যেন এতে লজ্জাই পেয়েছেন। এখনই টেন্ডুলকারের সঙ্গে তুলনা! জিভে কামড়! টেন্ডুলকার কোহলিকে নিয়ে টুইট করেন, ‘বাহ কোহলি! স্পেশাল-ই বটে। দারুণ এক জয়, দারুণ এক লড়াই।’ একদম প্রাণখোলা প্রশংসা। একদিন পরে টুইটটি চোখে পড়ে কোহলির। যাকে সত্যিকারের 'গুরু' মানেন, তাঁর কাছ থেকেই এমন প্রশংসা! আপ্লুত হওয়াই স্বাভাবিক। তবে কোহলিও যে এখন অনেক পরিণত তা বুঝিয়ে দিলেন সেই টুইটের প্রতিক্রিয়ায়। খুব সমীহ করেই লিখলেন, ‘ধন্যবাদ শচীন পাজি। স্পেশাল হয়তো ছিল, কিন্তু আপনার মতো নয়।’ ভারতের ড্রেসিংরুমে সিনিয়রদের সম্মান করে ‘পাজি’ বলা হয়। বড় ভাই টেন্ডুলকার যে এমন অনেক স্পেশাল ইনিংস খেলেছেন, সেটাই মনে করিয়ে দিলেন কোহলি। তবে টুইটের পরস্পর পিঠ চাপড়ানোর শেষটা করলেন টেন্ডুলকারই। ঠিক যেরকম সৌন্দর্য আর স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে ব্যাট হাতে বল মাঠ ছাড়া করতেন, তেমনভাবেই এই বিতর্ক টাকেও অন্য গ্রহে পাঠিয়ে দিতে চাইলেন। ফিরে গেলেন ২২ বছর আগে, যেদিন তিনি ভারতের হয়ে প্রথম 'ওপেন' করেছিলেন। ১৯৯৪ সালে অকল্যান্ডে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সেদিন টেন্ডুলকারও করেছিলেন ৮২ রান। আর কাকতালীয়ভাবে সেদিনও ছিল ২৭ মার্চ। সব মিলিয়েই তিনি লিখলেন, '২৭ মার্চ নিয়ে প্রচুর বার্তা পাচ্ছি, অকল্যান্ড আর মোহালি! দুটি জায়গাতেই শেষ হাসি হেসেছে ভারত। আর এটাই সত্যিকারের 'স্পেশাল'। টেন্ডুলকার ও কোহলি; কেউ কাউকে ছাড়িয়ে যাননি। যাবেন না। বরং সত্যিটা হলো, দুজনই দুই যুগের নায়ক।

হারতে বসা ব্রাজিলের নাটকীয় ড্র

দানি আলভেসের গোল নাটকীয় ড্র এনে দিয়েছে ব্রাজিলকে।
আগের ম্যাচে ২-০ গোলে এগিয়ে থেকেও ড্র নিয়ে মাঠ ছাড়া যদি চূড়ান্ত হতাশার হয়ে থাকে, এদিন ব্রাজিল সমর্থকদের জন্য এল অনেকটা স্বস্তির খবর। এবার ২-০ গোলে পিছিয়ে থাকা দল যে নাটকীয় ড্র করেছে প্যারাগুয়ের সঙ্গে। ৭৮ মিনিট পর্যন্ত ম্যাচে হারতে বসা ব্রাজিল শেষ প্রান্তের দুই গোলে গুরুত্বপূর্ণ ১ পয়েন্ট তুলে নিয়েছে প্যারাগুয়ের মাঠ থেকে। গত ম্যাচে নিজে সমালোচনার শিকার হয়ে ক্লাব সতীর্থ নেইমারকে আগলে রাখা দানি আলভেস যোগ করা সময়ে গোল করে এ দিয়েছেন এই ড্র।  দিনের আগে ম্যাচে বলিভিয়াকে ২-০ গোলে হারিয়ে টানা তৃতীয় জয় নিয়ে বিশ্বকাপ বাছাইয়ে কক্ষপথে ফিরেছে আর্জেন্টিনা। টানা দ্বিতীয় ম্যাচে গোল করেছেন আর্জেন্টিনার তারকাবহুল দলের অখ্যাত খেলোয়াড় মার্কাদো। অন্য গোলটি লিওনেল মেসির। পেনাল্টি থেকে করা এই গোলে মেসি জাতীয় দলের জার্সি গায়ে করে ফেললেন গোলের ফিফটি। পয়েন্ট টেবিলের সেরা তিনে উঠে এসেছে আর্জেন্টিনা (১১ পয়েন্ট)। অবশ্য ব্রাজিল এখনো ছয়ে (৮ পয়েন্ট)। ৫১ মিনিটে করা কাভানির একমাত্র গোলে পেরুকে হারিয়ে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে উঠে এসেছে উরুগুয়ে। পঞ্চম রাউন্ড শেষেও অনেককে অবাক করে দিয়ে শীর্ষে থাকা ইকুয়েডর এদিন কলম্বিয়ার কাছে হেরেছে ৩-১ গোলে। তারপরও অবশ্য উরুগুয়ের সঙ্গে তাদের পয়েন্ট সমান (১৩)‍। পয়েন্ট টেবিলের এক থেকে পাঁচে থাকা দলের মধ্যে ব্যবধান মাত্র তিন পয়েন্টের। আবার তিন থেকে সাতে থাকা দলেও তিন পয়েন্টেরই ব্যবধান। দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চল এবার যেন রোমাঞ্চকর এক বাছাই পর্বের আভাসই দিচ্ছে। অবশ্য এখনো ১২ ম্যাচ বাকি। পথ অনেক বাকি থাকলেও এই অঞ্চলে দুই ফেবারিট ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার শুরুটা কিন্তু একদমই ভালো হয়নি। গত অক্টোবরে বাছাই পর্বের ম্যাচে ম্যাচে দুই দলেরই যাত্রা শুরু হয়েছিল ০-২ গোলের অপ্রত্যাশিত হার দিয়ে। চোটের কারণে মেসিকে ছাড়াই প্রথম চার ম্যাচ খেলা আর্জেন্টিনা জিতেছিল মাত্র একটিতে। গত সপ্তাহে চিলিকে ২-১ গোলে হারানো আর্জেন্টিনা এদিন করদোবায় নিজেদের মাঠে বলিভিয়ার মুখোমুখি হলো। এমনিতে পুঁচকে প্রতিপক্ষ হলেও প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচের সর্বশেষ চার দেখাতেই আর্জেন্টিনার কঠিন পরীক্ষা নিয়েছে এই বলিভিয়া। আর্জেন্টিনা অবশ্য ম্যাচের ১০ সেকেন্ডের মাথায় গোল পেতে বসেছিল। অ্যাঙ্গেল ডি মারিয়ার শট বলিভিয়া গোলরক্ষক ঠেকানোর পর ফিরতি বলে লাভেজ্জি ক্রসবারে মেরে দেন। তবে এই উজ্জ্বল শুরুই আর্জেন্টিনাকে বাকি সময়টায় রসদ জুগিয়ে গেল। ২১ মিনিটে গোল করলেন গত ম্যাচের নায়ক মার্কাদো। হিগুয়েনের শট লাইন থেকে ক্লিয়ার করার পর এবার ফিরতি শটও ঠেকিয়েছিল বলিভিয়ার রক্ষণ। কিন্তু সেই ক্লিয়ারটি হলো গোললাইনের অনেক ভেতর থেকে করা হেডে। জাতীয় দলের হয়ে তিন ম্যাচেই দুই গোল পেয়ে গেলেন মার্কাদো, এই ফুলব্যাক যেন লজ্জাই দিচ্ছেন ক্লাবের গোলের বন্যা বইয়ে জাতীয় দলে হাপিত্যেশ করা হিগুয়েইন-আগুয়েরোদের। ২৯ মিনিটে পেনাল্টি পায় আর্জেন্টিনা। পেনাল্টি-দুর্বলতাকে কাঁচকলা দেখিয়ে বাঁ পায়ের জোরালো শটে ৫০তম আন্তর্জাতিক গোল করেন অধিনায়ক। এই দুই গোলেই একদম একতরফা ম্যাচটি জিতল আর্জেন্টিনা। ব্রাজিল কিন্তু উল্টো ছবিটা দেখছিল। প্যারাগুয়ের সাজানো আক্রমণের ফাঁদে অসহায় দেখাচ্ছিল নেইমারকে-বিহীন ব্রাজিলকে
মেসি কাল পেলেন ৫০তম গোল।
। ৪০ ও ৪৯ মিনিটে দুই গোল খেয়ে বসার পর দুঙ্গাকে মনে হচ্ছিল পৃথিবীর অসহায়তম মানুষ। ৩৬-এর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা বুড়ো ফরোয়ার্ড রিদার্কো অলিভিয়েরা ৭৯ মিনিটে গোল করে নিভতে বসা দীপটা জ্বালিয়ে দেন। শেষ বাঁশির খানিক আগে বার্সা ডিফেন্ডার আলভেসের গোলে ড্র পায় ব্রাজিল। শীর্ষে থাকা উরুগুয়ের সঙ্গে ব্যবধানটাও​ মাত্র চার পয়েন্টের বলে এখনই ঘাবড়ানোর কিছু নেই। তবে দুঙ্গার চাকরিটা এখনো ঝুলছে সুতোর ওপর।
 হলুদ কার্ডের খাঁড়ায় অধিনায়ক নেইমার এ ম্যাচে ছিলেন না। ছিলেন না ডেভিড লুইজও। এই দলটা নেইমারের ওপর কতটা নির্ভরশীল, সেটা বোঝা গেল আজ। বিশ্বের তারকা সব স্ট্রাইকারের জন্ম দেওয়া ব্রাজিলকে কি না বাঁচাতে হচ্ছে এই বিস্মৃত নাম আর ডিফেন্ডারকে!

মেসির আরেকটি মাইলফলক

মেসি আজ ছিলেন এমনই দুরন্ত, দুর্বার
ম্যাচের তখনো মিনিট তিনেক বাকি। তিনি ঘেমে নেয়ে একশা। প্রতিটা মুহূর্ত নিজেকে উজাড় করে দেওয়ার সাক্ষী হয়ে আছে ঘামে ভেজা জার্সি। বাহুতে ঢিলে হয়ে যাওয়া অধিনায়কের ব্যান্ডটা টেনে তুললেন। ​কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন বড় করে ‘সি’ লেখা ব্যান্ডটার দিকে। লিওনেল মেসি এমন ভালোবাসা নিয়ে তাকান শুধু আন্তোনেলা রোকুজ্জোর সঙ্গে। এমন স্নেহময় দৃষ্টি পায় কেবল তাঁর দুই সন্তান। জাতীয় দলের হয়ে তাঁর শিরোপা না জেতা নিয়ে কম তো আর লেখা হলো না। এ যেন এক অমীমাংসিত রহস্য। জটিল এক ধাঁধা। পরপর দুই বছর বড় দুটি টুর্নামেন্টের ফাইনালে উঠেও শিরোপা জিততে না পারার দায় পুরোটাই নিতে হয় তাঁকে। বাকিদের পুঞ্জীভূত ব্যর্থতার ভারও। বইতে হয় পুরো জাতির প্রত্যাশা। সে​ই ভার বয়ে নিতে নিতেই মেসি আজ একটা মাইলফলক ছুঁয়ে ফেললেন। জাতীয় দলের হয়ে ৫০তম গোল। বলিভিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের ২৯ মিনিটে পেনাল্টি থেকে করা গোলে ফিফটি করে ফেললেন অনেকের মতেই সর্বকালের সেরা এই ফুটবলার। দলও জিত​ল ২-০ গোলে। উঠে এল পয়েন্ট টেবিলের তিনে। সব মিলে মেসির জন্য দারুণ তৃপ্তির এক রাত গেল করদোবায়। আর্জেন্টিনার সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ডটিও নিশ্বাস দূরত্বে। ৫৬ গোল নিয়ে সবার ওপরে বাতিস্তুতা। বাতিগোল অবশ্য ম্যাচ খেলেছিলেন ৭৮টি, সেখানে আজ ছিল মেসির ১০৭তম ম্যাচ। যদিও আর্জেন্টিনার হয়ে পুরোদস্তুর ফরোয়ার্ডের ভূমিকা মেসি খুব কমই পেয়েছেন। এখন তো আরও বেশি করে গোলদাতার চেয়ে গোল-কারিগরের ভূমিকায়। তবে এবার শুরু থেকেই বাছাই পর্বে যেন অন্য এক মেসিকে দেখা যাচ্ছে। নেইমার-সুয়ারেজ আসার পর বার্সেলোনায় অনেকটা চাপ কমেছে তাঁর ওপর। সেই সুযোগে পাওয়া বাড়তি প্রাণশক্তিটা যেন আর্জেন্টিনাকেই দিচ্ছেন। ক্লাবের জার্সি গায়ে তাঁর সেই বিখ্যাত সলো রান, একাই বল নিয়ে টানা ড্রিবল করে এঁকেবেঁকে যাওয়ার দৃশ্যটা কমে এসেছে। কিন্তু চিলি ম্যাচের পর আজ বলিভিয়ার বিপক্ষে একাধিকবার দেখা গেল সেই শিল্পিত দৌড়। আজ যেন মেসি একটু বেশিই উদ্দীপ্ত ছিলেন। বক্সে তিনবার হেড করার জন্য লাফিয়েছেন, এও তো মেসির জন্য বিরল। তিনটি দুর্দান্ত ফ্রি কিক। তিনটিতেই গোল হতে পারত। কিন্তু বাকি সব খেলোয়াড়ের তুলনায় ‘বেমানান’ অবিশ্বাস্য সেভগুলো করলেন বলিভিয়া গোলরক্ষক। না হলে হয়তো হ্যাটট্রিকটাও হয়ে যেত! তা না হোক। মেসি এখন এসবের থোড়াই হিসেব করেন। হ্যাটট্রিক, জাতীয় দলের হয়ে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড—এসবে তাঁর মোটেও আগ্রহ নেই। তাঁর আগ্রহের, আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রে আছে যেটি, সেই আরাধ্য ট্রফি জেতার সুযোগ আবারও এ বছর পাচ্ছেন। ২০১৬ কোপা আমেরিকায়। আর ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপ তো আছেই।

ক্যারিয়ার-সেরা অবস্থানে সাব্বির

র‍্যাঙ্কিংয়ের ওপরের দিকে উঠে এলেন সাব্বির-মুস্তাফিজ।
এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে ব্যাটসম্যানদের র‍্যাঙ্কিংয়ের ২০ তম স্থানে ছিলেন সাব্বির রহমান। বিশ্বকাপে তাঁর দারুণ পারফরম্যান্সে তিনি ৪ ধাপ এগিয়ে উঠে এসেছেন ১৬ তম স্থানে। বিশ্বকাপে ৭টি ম্যাচ খেলে ২৪.৫০ গড়ে তাঁর ব্যাট থেকে এসেছে ১৪৭ রান। এই মুহূর্তে আইসিসির টি-টোয়েন্টি র‍্যাঙ্কিংয়ের বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের মধ্যে সবার ওপরে আছেন সাব্বিরই।সাব্বিরের রেটিং পয়েন্ট ৬৩২। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে তাঁর রেটিং পয়েন্ট বেড়েছে ৫৮। ব্যাটসম্যানদের র‍্যাঙ্কিংয়ে প্রথম ১০০ জনের মধ্যে আছেন সাকিব আল হাসান (২৭), তামিম ইকবাল (৩৫), মাহমুদউল্লাহ (৬১) ও মুশফিকুর রহিম (৭৩)। টি-টোয়েন্টি বোলারদের র‍্যাঙ্কিংয়ে সাকিবের অবস্থান ১৩ তম। এটি ব্যাটসম্যান-বোলার মিলিয়ে বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থান। ৬৩১ রেটিং পয়েন্ট নিয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শেষ করেছেন। তবে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ শেষে সাকিবের রেটিং পয়েন্ট ছিল ৬৪৪। বোলারদের তালিকায় সাকিবের পর আছেন আল আমিন হোসেন। তাঁর অবস্থান ১৭। মুস্তাফিজুর রহমান এই প্রথমবারের মতো বোলারদের তালিকার প্রথম ২০ জনের মধ্যে উঠে এসেছেন। এবারের বিশ্বকাপে ৩টি ম্যাচ খেলে মুস্তাফিজ ৯.৫৫ গড়ে তুলে নিয়েছেন ৯ উইকেট। ৬০০ রেটিং পয়েন্ট নিয়ে তাঁর অবস্থান ১৯-এ। আল আমিনের রেটিং পয়েন্ট ৬১২। টি-টোয়েন্টি র‍্যাঙ্কিংয়ে ব্যাটসম্যানদের তালিকায় শীর্ষে উঠে এসেছেন বিরাট কোহলি। ভারতীয় ব্যাটিং সেনসেশন বিশ্বকাপ শুরুর আগে অস্ট্রেলীয় ব্যাটসম্যান অ্যারন ফিঞ্চের চেয়ে ২৪ রেটিং পয়েন্ট পেছনে থাকলেও বিশ্বকাপের ৪ ম্যাচে ১৮৪ রান করে তিনি পেছনে ফেলেছেন ফিঞ্চকে। বোলারদের তালিকায় শীর্ষে আছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্পিনার স্যামুয়েল বদ্রি।

প্রথম আলোর খবরে জেলা প্রশাসনের টনক নড়ে!by মশিউল আলম

কক্সবাজার
‘সরকারি পাহাড়ে আবাসন প্রকল্প’ শিরোনামের একটি প্রতিবেদন গত সোমবার প্রথম আলোর প্রথম পাতায় প্রকাশিত হওয়ার পরদিনই কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের টনক নড়ে গেল। মঙ্গলবার কক্সবাজার জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির মাসিক সভা বসল। সেখানে উপস্থিত ব্যক্তিদের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন জিজ্ঞাসা করলেন, প্রথম আলোর প্রতিবেদন সত্য কি না। উপস্থিত ব্যক্তিরা বললেন, সংবাদ সত্য, পাহাড় কেটে অবৈধ আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলা হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, ওই অবৈধ আবাসন প্রকল্প উচ্ছেদ করা হবে এবং সেটি গড়ে তোলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ‘ব্যবস্থা’ নেওয়া হবে। তার পরদিনের খবর: কক্সবাজারের ‘সৈকতপাড়া পাহাড়’ কেটে গড়ে তোলা অবৈধ আবাসন প্রকল্প উচ্ছেদ করা হয়েছে। কিন্তু জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ‘ব্যবস্থা’ নেওয়ার যে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, তার কোনো খবর নেই। জানা গেল, কারা জড়িত তা নিশ্চিত করতে অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে! আসলে অনুসন্ধান চালানোর প্রয়োজন নেই। ‘সৈকতপাড়া পাহাড়’ কেটে আবাসন প্রকল্পটি গড়ে তুলেছিলেন কক্সবাজার শহর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি আবদুর রহিমসহ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। এই তথ্য প্রথম আলোর সোমবারের প্রতিবেদনেই রয়েছে। আরেকটি বিষয় লক্ষ করার মতো, জেলা প্রশাসক মহোদয় ‘সৈকতপাড়া পাহাড়’ কেটে অবৈধ আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলার বিষয়ে প্রথম জেনেছেন প্রথম আলোতে এ-সম্পর্কে প্রতিবেদন প্রকাশের পর। এবং ওই প্রতিবেদনের তথ্য সত্য কি না, সেটাও তাঁর জানা ছিল না বলে তিনি সেদিনের সভায় উপস্থিত ব্যক্তিদের কাছে এর সত্যতা জানতে চেয়েছিলেন। অর্থাৎ, কক্সবাজারের কোথায় আইন লঙ্ঘন করে, প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস করে কত কত অবৈধ স্থাপনা দিনের পর দিন গড়ে উঠছে—এ-সম্পর্কে জেলা প্রশাসনের কোনো মনিটরিং বা নজরদারির ব্যবস্থা নেই। কিন্তু কক্সবাজারবাসীর চোখের সামনে দিন-রাত পাহাড় কেটে ঘরবাড়িসহ নানা ধরনের স্থাপনা নির্মাণের কর্মযজ্ঞ চলছে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর ধরে। জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলো যে এসব জানে না তা মোটেও নয়। আসলে তারা দেখেও দেখছে না। সৈকতপাড়া পাহাড়ের আবাসন প্রকল্প উচ্ছেদ করার পর পাহাড়টির যে চেহারা এখন দেখা যাচ্ছে, তার চেয়ে হৃদয়বিদারক আর কিছু হতে পারে না। অবৈধ প্রকল্প উচ্ছেদ করা হয়েছে বটে, কিন্তু যে পাহাড় ধ্বংস করা হয়েছে তার কী হবে? প্রাকৃতিক পাহাড় তো আর কখনোই ফিরে পাওয়া যাবে না। সৈকতপাড়া পাহাড়টি যখন কাটা শুরু হয়, তখনই যদি জেলা প্রশাসন তা থামিয়ে দিত, তাহলে পাহাড়টি ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেত। পাহাড় কেটে গড়ে তোলা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের অভিযান অতীতে অনেক দেখা গেছে। কিন্তু তার ফলে পাহাড় কাটা বন্ধ হয়নি। উচ্ছেদগুলো স্থায়ীও হয়নি। এই ভয়ংকর পরিবেশ-বিনাশী তৎপরতা স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হলে মাঝে মাঝে লোকদেখানো অভিযান না চালিয়ে নিয়মিত নজরদারির একটা স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। কেউ কোথাও পাহাড় কাটা শুরু করা মাত্র তা বন্ধ করতে হবে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী পাহাড় কাটা দণ্ডনীয় ফৌজদারি অপরাধ। কিন্তু যাঁরা এর সঙ্গে জড়িত, তাঁদের বিচার ও শাস্তি হয় না বলেই পাহাড় কাটার প্রবণতা এত ব্যাপক ও প্রবল। সরকারি প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সততা ও দায়িত্বশীলতার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। সরকারি পাহাড় কেটে অবৈধভাবে গড়ে তোলা আবাসন প্রকল্পে যদি পরিবেশ অধিদপ্তর বা জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদেরও প্লট থাকে, তাহলে এগুলো বন্ধ হবে কীভাবে?

একটুখানি বৃষ্টি হলেই...by শরিফুল ইসলাম ভূঁইয়া

খোঁড়াখুঁড়িতে বেহাল রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জাকির হোসেন সড়ক।
পল্লীকবি জসীমউদদীন তাঁর বিখ্যাত ‘আসমানী’ কবিতায় লিখেছেন—‘বাড়ি তো নয় পাখির বাসা ভেন্না পাতার ছানি, একটুখানি বৃষ্টি হলেই গড়িয়ে পড়ে পানি’। এই ছোট্ট পঙক্তিতেই আসমানীদের দুর্ভোগ ধারালো খড়গের মতো দৃশ্যমান। ছাউনি জুতসই না হলে যেমন আসমানীরা ভোগে, তেমনি সড়ক ভালো না হলে পথচারী তথা নগরবাসীর দুর্ভোগের শেষ নেই। আর এই দুর্ভোগের ষোলোকলা পূর্ণ হয় একটুখানি বৃষ্টি হলেই। গত শুকনো মৌসুমের পুরোটাজুড়েই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সাড়ম্বরে পানির পাইপ স্থাপনের কাজ হয়েছে। এতে দফায় দফায় বিভিন্ন রাস্তা ও গলিপথে পথচারী এবং যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়েছে। এর মথ্যে বিপত্তিকর ছিল বড় বড় গর্ত। অনেক এলাকায় এসব গর্ত ভালোভাবে বোজানো হয়নি। রাবিশ আর ময়লা ফেলায় সেগুলো বাড়তি বিড়ম্বনা তৈরি করেছে। আবার কোনো কোনো গর্ত রাস্তার চেয়ে উঁচু স্ল্যাব দিয়ে এমনভাবে ঢাকা হয়েছে, রাতবিরেতে পথচারীর হোঁচট খেয়ে হাত-পা ভাঙা বা নাক-মুখ ফাটানো বিচিত্র কিছু নয়। গাড়ি চলাচলের বেলায়ও এসব স্ল্যাব বিপত্তিকর। পাইপ বসানোর সময় যেসব রাস্তা কেটে, খুবলে যাচ্ছেতাই করা হয়েছে, এসব রাস্তার বেশির ভাগেই এখনো সংস্কারকাজই শুরু হয়নি। নাখালপাড়া, রাজাবাজার, মিরপুর, মোহাম্মদপুর—এসব এলাকার বিভিন্ন রাস্তায় একপাক ঘুরে এলেই এর প্রমাণ মিলবে। রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি যে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, এর মধ্যে গ্যাসের পাইপ লাইনে আগুন লাগার ঘটনা সে প্রমাণ দিয়েছে। সড়কের পাশে থাকা গর্ত যে মৃত্যুফাঁদ, কচি শিশুর প্রাণ বিসর্জনের ঘটনা এর জ্বলন্ত উদাহরণ। এমন আরও কত বিপদ যে ওঁৎ পেতে আছে, সেটা সময়ই বলে দেবে। তবে নগদ যে বিপদ সামনে খাড়া, তা হচ্ছে বৃষ্টিতে ব্যাপক জলাবদ্ধতা ও চলাচলে দুর্ভোগ। দেখা যাচ্ছে, এক পশলা জোরে বৃষ্টি হলেই নগরের বিভিন্ন রাস্তায় পানি জমে যাচ্ছে। এতে পয়ঃনালির পানি মিশে যোগ করছে বাড়তি বিড়ম্বনা। তপ্ত দুপুরে শীতল মেঘ দেখে নগরবাসী বৃষ্টির আশায় হাঁফ ছাড়েন, কিন্তু বৃষ্টি হওয়ার পর আর স্বস্তি অনুভব করেন না। বাসার সামনে জমে থাকা ময়লা পানির দুর্গন্ধ আর সেই পানি মাড়িয়ে চলাচলের বিড়ম্বনা বৃষ্টিভেজা শীতল হাওয়ায় প্রাণ জুড়ানোর আশায় ছাই ঢেলে দেয়। ঘটনা এখানেই শেষ নয়। বাসার সামনে আগুন বা পানি যা-ই থাকুক, পেশাজীবী মানুষকে জীবিকার তাগিদে ঘর থেকে বেরোতে হবেই। তখন নাকে রুমাল চেপে, প্যান্ট গুটিয়ে হাঁটুসমান ওই নোংরা জল মাড়িয়ে যেতে হবে গন্তব্যের দিকে। এ সময় সামনে যদি গর্ত থাকে, তাহলে কী ঘটবে তা সহজেই অনুমেয়। রিকশায় কেউ যাবে? এতেও নিস্তার নেই। ওই গর্তে রিকশার একটা চাকা পড়ে উল্টে যেতে পারে সেটা। আর তখন কালো জলে হয়ে যাবে একটা কাক-গোসল। সঙ্গে নারী বা শিশু থাকলে কী ঘটবে, সে কথা আর না-ই বা বললাম। এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে যাবে কালবৈশাখী। এরপরই আসবে বৃষ্টির মৌসুম। মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বৃষ্টি কম-বেশি থাকবেই। এ সময় বেহালে থাকা রাস্তা ও এর খানাখন্দ পথচারীদের জন্য অশেষ দুর্ভোগ বয়ে আনবে। কাজেই বৃষ্টির মৌসুম পুরোদমে শুরু হওয়ার আগেই এসব গর্ত ভরাট এবং রাস্তার সংস্কার করাটা জরুরি। এদিকে সিটি করপোরেশন নজর দিলে নগরবাসীর দুর্ভোগ কিছুটা হলেও কমবে।

একচোখা শোক ও আইএসের পেছনের হাত by ফারুক ওয়াসিফ

গত রোববার লাহোরের গুলশান-ই-ইকবাল পার্কে
হামলা চালায় তালেবান জঙ্গি। খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের
ইস্টার সানডে উপলক্ষে অনেক মানুষ জড়ো হয়েছিল পার্কটিতে।
ওই হামলায় এ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭২ জন
কিছু মানুষ বেশি মানুষ, কিছু মানুষ কম মানুষ! কিছু মৃত্যু শোকের আর কিছু মৃত্যু নিছকই খবরের কাগজের কালো কালো অক্ষরের বিবরণ। অথচ সবার অশ্রুই সমান নোনা, সব স্বজনহারারই শোক অসহনীয়। ব্রাসেলসের জন্য আমরা মর্মাহত, প্যারিসের জন্য কেঁদেছি, কিন্তু লাহোরের জন্য কাঁদছি না, মোম জ্বালাচ্ছি না জাকার্তা, ইস্তাম্বুল, বাগদাদ বা সানার জন্য। বদলাচ্ছি না ফেসবুকের প্রোফাইল পিকচার। অভিযোগটা কাকে করছি? করছি প্রভাবশালী পশ্চিমা গণমাধ্যমকে, তাদের রাষ্ট্রনেতাদের। যে হরিণের এক চোখ কানা, সে সরল পথে ছুটতে পারে না। বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসবাদী বোমার বিষয়ে সরল সত্যটাও তাই তারা দেখতে চায় না বা দেখাতে চায় না। গত সপ্তাহে বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে বোমা হামলায় নিহত হলেন ৩০ জন নিরীহ মানুষ। পরপরই পাকিস্তানের লাহোরে একই ধরনের বোমা হামলায় নিহত হলেন ৭২ জন, এর মধ্যে ২৯ জনই শিশু। সব সন্ত্রাসবাদীই যেমন জঘন্য অপরাধী, তেমনি তাদের সব বেসামরিক শিকারই শোকযোগ্য জীবনের অধিকারী। তার পরও বিশ্ব মিডিয়ায় ইয়েমেন নিয়ে কথা কম। ২০১৫ সাল থেকে সেখানে সৌদি আরবের হামলা, সৌদি মদদপুষ্ট বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও আইএসের হামলায় প্রায় সাত হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। সৌদি আরব যেহেতু ইউরো-মার্কিন পরাশক্তির জানপাসন্দ রাষ্ট্র, সেহেতু এই মৃত্যুগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় হইচই নেই। বিশ্বে এখন নতুন শক্তি হয়ে উঠেছে আইএস। বেশির ভাগ বোমা হামলার পেছনে আইএসের হাত আবিষ্কার করা যাচ্ছে। কিন্তু আইএসের পেছনে কারা, সেই প্রশ্নটা কি ততটা জোরালোভাবে ওঠে? আইএসের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, ইসরায়েল ও আরবের রাজতান্ত্রিক সরকারগুলোর সরাসরি ও পরোক্ষ মদদ থাকার অকাট্য অভিযোগ আছে। তবু চোখে ঠুলি পরে আইএসের বিরুদ্ধে সত্যিকার কোনো লড়াই চালায়নি বিশ্বশান্তির মোড়লেরা। কারণ, ইরাক থেকে সিরিয়া পর্যন্ত এলাকার মানচিত্র নতুন করে দাগানোর খোয়াবে মত্ত পাশ্চাত্যের আইএসকে দরকার। বাঘের আগে আসে ফেউ, ন্যাটোর অগ্রবর্তী বাহিনীর ভূমিকা নিয়েছে আইএস। এই অপশক্তির বিরুদ্ধে রাশিয়া সত্যিকার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে বটে, তবে তার পেছনেও মহানুভবতা ছিল না, ছিল ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ’ হিসেবে খ্যাত মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউক্রেন পর্যন্ত ছড়ানো রণাঙ্গনে নিজের দাপট প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা।  আইএস যতই রহস্যময় গুপ্তশক্তি হোক, আন্তর্জাতিক শক্তির মদদ, প্রশিক্ষণ ও রক্ষাকবচ ছাড়া তাদের পক্ষে বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাস চালানো সম্ভব নয়। সুতরাং আইএস দমনের নামে ইউরোপ অগণতান্ত্রিক ও মানবাধিকারবিরোধী পথ নিলে শুধু ইউরোপীয় সংহতিই নষ্ট হবে না, বিশ্বব্যাপী সাম্প্রদায়িক হানাহানি অভূতপূর্ব স্তরে উঠবে। আইএসের ষড়যন্ত্রের গোড়া রয়েছে পশ্চিমা দেশগুলোর যুদ্ধমুখী গোয়েন্দানীতিতে। আরেকটি গোড়া হলো মধ্যপ্রাচ্যসহ মুসলিম দেশগুলোর ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার অদম্য বাসনা। একেকটি সন্ত্রাসবাদী ঘটনা ঘটে আর ন্যাটোভুক্ত রাষ্ট্রে অগণতান্ত্রিক শক্তিগুলো আরও মুঠো শক্ত করে। ব্রাসেলসে হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের ‘নব্য ফ্যাসিবাদী’ প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ট্রাম্পের পালে আরও হাওয়া এসে লাগে। প্যারিসে হামলার পর ফরাসি প্রেসিডেন্ট দেশটিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছিলেন। প্যারিসে হামলার এক দিন আগে ফরাসি জরিপ সংস্থা আইএফওপির একটি জরিপের ফল প্রকাশিত হয় প্রখ্যাত লা ফিগারো পত্রিকায়। ওই জরিপে প্রশ্ন করা হয়েছিল, আবশ্যকীয় সংস্কার বাস্তবায়নে ফরাসিরা অগণতান্ত্রিক ধরনের সরকার মেনে নেবে কি না? ৬৭ শতাংশ অনির্বাচিত টেকনোক্র্যাটের পক্ষে বলেছেন। ৪০ শতাংশের পছন্দ অনির্বাচিত কর্তৃত্ববাদী সরকার। শার্লি এবদোর একটি সন্ত্রাসী ঘটনা ফরাসি জনমতকে কতটা বদলে দিয়েছিল, এই জরিপ তার ইঙ্গিত দেয়। প্যারিস হামলার পর থেকে ব্রাসেলসেও চলছিল নাগরিক অধিকার কর্তন এবং মুসলমান ও অভিবাসীদের তাড়িয়ে বেড়ানোর পুলিশি কার্যক্রম। নতুন বোমা হামলার পর এই পরিস্থিতি আরও তুঙ্গে ওঠার ভয় বাড়ল। জঙ্গিবাদের অভিশাপ দ্বিমুখী। জঙ্গি হামলার পর অনেক ‘সভ্য’ মানুষও প্রতিহিংসায় অন্ধ হন। তেমনি নিপীড়িতদের মধ্যে জন্ম দেয় আরও বেশি জঙ্গিত্ব। এবং পরিণামে দুইয়ে মিলেই মানবিকতা, ন্যায় ও সত্যের সম্ভাবনা ধ্বংস করে। অশুভ জঙ্গিবাদের শক্তিটা এখানেই যে তা আক্রান্তকে যেমন চরমপন্থার পথে টেনে নিয়ে যায়, তেমনি হতাশ ও বঞ্চিতদেরও জঙ্গিবাদের দিকে টানে। এই দুইয়ের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকার দায় সবার। বিশ্বের দেশে দেশে সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে ফাটল বাড়ছে। একদিকে সিরীয়-লিবীয় শরণার্থীদের ঢল, অন্যদিকে ইউরোপীয় মুসলিম নাগরিকদের সংখ্যা বৃদ্ধিতে মৌলবাদী শ্বেতাঙ্গরা ভীষণভাবে ক্ষিপ্ত। একসময় যেভাবে ডানপন্থীরা ইহুদিদের ইউরোপের অভিশাপ ঘোষণা করে বিতাড়ন করতে চেয়েছিল এবং সেই বিদ্বেষ পুঁজি করে হিটলারের নাৎসি পার্টি ইহুদিনিধনকে জায়েজ করতে লেগেছিল; ইউরো-মুসলিমদেরও সে রকম দশায় যে পড়তে হবে না, তা কে বলতে পারে? বেকারত্ব, দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক মন্দার পরিস্থিতিতে মুসলিমদের সব নষ্টের গোড়া ভাবার লোকের সংখ্যাও বাড়ছে। জঙ্গিবাদ যে ধর্মকেই অবলম্বন করুক না কেন, যতই তারা ধর্মের দোহাই দিক, তাদের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ইহজাগতিক। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রবার্ট পেপে ১৯৮০ সাল থেকে এ পর্যন্ত ঘটা প্রায় সব আত্মঘাতী বোমারুর‍-মোট সংখ্যা ৪ হাজার ৬ শর ওপর গবেষণা করে আসছেন।তিনি আমাদের জানাচ্ছেন, গত ৩৬ বছরে আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ঘটানো বোমারুদের ৯৫ শতাংশই ছিল ‘সেক্যুলার’। তাদের লক্ষ্য ছিল কোনো না-কোনো সেনাবাহিনীর দখল ঠেকানো। ধর্ম এখানে ব্যবহৃত হয় নতুন বোমারুদের রিক্রুট করার জন্য (সূত্র: http://goo.gl/WIcNs2 )। ঠিক যে কারণে রাজনীতি ও ব্যবসায় ধর্মকে কাজে লাগানো হয়, জঙ্গিবাদীরাও সেভাবে ব্যবহার করে ধর্মকে। জঙ্গিবাদ-বিষয়ক আরেক গবেষক জানাচ্ছেন, আইএসের সদস্যরা ইসলাম নিয়ে মারাত্মকভাবে অজ্ঞ। সুতরাং, যাঁরা সন্ত্রাসবাদের জন্য ধর্মকে দায়ী করেন, তাঁদের নতুন করে ভাবা দরকার। তা দরকার জঙ্গিবাদের অভিশাপ মোকাবিলার স্বার্থেই। এটা বুঝে আসা দরকার যে ধর্মগ্রন্থের পাতা থেকে জঙ্গি পয়দা হয় না, জঙ্গি পয়দা করে নিপীড়ন ও আগ্রাসন। আশির দশকে আফগানিস্তানে রাশিয়ার এবং নব্বইয়ের দশকে ইরাকে মার্কিন আগ্রাসন না হলে আল-কায়েদা অথবা আইএসের জন্ম হতো না। এককথায়, অভিশপ্ত জঙ্গিবাদ পাশ্চাত্যের আধিপত্যবাদী নীতিরই সন্তান, যার পিতৃত্ব তারা স্বীকার করতে নারাজ।

বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপনা

অব্যবস্থাপনার কারণে বিমানবন্দরে
যাত্রীদের ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনা ও যাত্রীদের যন্ত্রণা নিয়ে দীর্ঘদিন বিজ্ঞজনেরা বলে যাচ্ছেন, কিন্তু অবস্থা তথৈবচ। বলা হয়ে থাকে, বিমানবন্দর হচ্ছে একটি দেশের দর্পণস্বরূপ, যার দ্বারা পুরো দেশের দৃশ্যপট আন্দাজ করা যায়। কিন্তু এ বিমানবন্দরে অবতরণের আগে থেকেই লাগেজ পাওয়ার টেনশন শুরু হয়ে যায়, আর নামার পর শুরু হয় মশার উৎপাত। দীর্ঘক্ষণ যাত্রার পর শুধু লাগেজের জন্য দুই-আড়াই ঘণ্টা বসে থাকা চরম বিরক্তিকর, সময়ের অপচয়। কিছুদিন আগে ইউরোপ থেকে দীর্ঘ যাত্রা করে ভোরে বিমানবন্দরে নামার সঙ্গে সঙ্গে নাকে লাগল রাসায়নিকের উটকো গন্ধ। কানাডা থেকে আগত এক শিশু গন্ধ গন্ধ বলে চিৎকার শুরু করে দিল। এক কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, কেন এ অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে না? তিনি বললেন, জায়গার সংকট। কত ঠুনকো আমাদের পরিকল্পনা, কত সীমিত আমাদের দৃষ্টি! একটি দেশের প্রধান বিমানবন্দরে একটি রানওয়ে, যা প্রয়োজনবোধে বর্ধিত করার ব্যবস্থা রাখা হয়নি। অথচ বিমানবন্দরের উত্তর-পশ্চিমে কয়েক বছর আগেও জায়গা পাওয়া সম্ভব ছিল। এখনো পশ্চিম দিকে বেড়িবাঁধের আশপাশে প্রচুর খালি প্লট রয়েছে। ফলে কিছু মানুষকে অন্যত্র পুনর্বাসন করে বিমানবন্দরের সম্প্রসারণ করা সম্ভব। জাতির বৃহত্তর স্বার্থে সেসব মানুষকে কিছুটা ত্যাগে উৎসাহিত করা যায়। কারণ, নতুন বিমানবন্দর তৈরি করা এখন সত্যিই কঠিন হবে। আশা করি, কর্তৃপক্ষ দ্রুত বিষয়টি ভেবে দেখবে।

ঢাকার বায়ুদূষণ কমাতে উন্নত মানের ইটভাটা by বিয়ন লোমবোর্গ

বিয়ন লোমবোর্গ
উন্নয়ন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত, তা চিহ্নিত করার লক্ষ্যে গবেষণা করছে কোপেনহেগেন কনসেনসাস সেন্টার। অর্থনৈতিক উন্নতির পাশাপাশি সামাজিক, স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত উন্নয়নের ওপরও জোর দিচ্ছে সংস্থাটি। বাংলাদেশের জন্য ভিশন ২০২১ অর্জনে এই গবেষণাভিত্তিক কিছু নিবন্ধ প্রকাশ করছে প্রথমআলো। আজ প্রকাশ করা হলো চতুর্থটি। শুষ্ক মৌসুমে ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর একটিতে পরিণত হয়। বছরের এই সময়ে বায়ুদূষণের মাত্রা আন্তর্জাতিকভাবে নির্ধারিত মানের চেয়ে ১৩-১৬ গুণ বেশি বেড়ে যায়। রাজধানীতে বায়ুদূষণ কমাতে হবে—এটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু এই বায়ুদূষণ মোকাবিলায় যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হবে, তাতে জাতীয় বাজেট এবং দাতাদের ও সাধারণ নাগরিকেদের কাছ থেকে পাওয়া তহবিলে টান পড়বে। এসব অর্থ অন্যান্য আরও কল্যাণমূলক কাজের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। বাইরের বায়ুদূষণের মোকাবিলা করা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বেশ কঠিন হয়। কারণ, নানা উৎস থেকে এই দূষণ ঘটে। কিন্তু ঢাকার পরিস্থিতি ব্যতিক্রম, এখানে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বায়ুদূষণ ঘটে ইট উৎপাদনের কারণে। প্রতিবছর নির্মাণকাজের জন্য ঢাকার এক হাজারেরও বেশি ভাটা ৪০০ কোটি ইট তৈরি করে। এই ইটভাটাগুলো রাজধানীতে ৪০ শতাংশ বায়ুদূষণের জন্য দায়ী, যা প্রতিবছর প্রায় দুই হাজার মানুষের মৃত্যু ডেকে আনে। আর যেহেতু ইট শুধু শুষ্ক মৌসুমেই উৎপাদন করা যায়, সেহেতু ইটভাটাগুলো বছরের এই সময়টিতে বায়ুদূষণের পরিমাণ আরও বাড়িয়ে দেয়। বেশির ভাগ ইট প্রস্তুতকারক স্থায়ী চিমনি নামে পরিচিত ভাটা ব্যবহার করে থাকেন, যেগুলো জ্বালানি অপচয়কারী, উচ্চমাত্রায় দূষণকারী ও নিম্নমানের কয়লা পোড়ায়। বায়ুদূষণ কমানোর জন্য হয় ভাটাগুলোকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে প্রতিস্থাপন করতে হবে অথবা সেগুলোর সংস্কার করতে হবে। আমাদের গবেষণায় একটি সাধারণ সংস্কারের মাধ্যমে ভাটাগুলোকে ‘আঁকাবাঁকা’ আকৃতি প্রদান করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যা অনেকটা হাইব্রিড হফম্যান ভাটার মতো দেখতে হবে। হাইব্রিড হফম্যান ভাটাগুলো পরিবেশবান্ধব হলেও এ ধরনের একটি ইটভাটা তৈরিতে খরচ পড়ে ১৬ কোটি টাকা। সে তুলনায় একটি বিদ্যমান স্থায়ী চিমনির ভাটাকে সংস্কার করে আঁকাবাঁকা আকৃতির ভাটায় রূপান্তর করতে ৪০ গুণ কম খরচ পড়বে। যদি এ ধরনের আঁকাবাঁকা বা জিগজ্যাগ আকৃতির ভাটা ঢাকাজুড়ে ব্যবহৃত হতো, তাহলে বায়ুদূষণের পরিমাণ ৪০ শতাংশ কমে যেত। ভাটার পরিচালনা খরচ বাবদ এতে বার্ষিক প্রায় ৪০ কোটি টাকা খরচ হবে, কিন্তু উপকার হবে অপরিসীম। শুধু স্বাস্থ্য খাতেই বার্ষিক লাভ ১৭০ কোটি টাকার সমপরিমাণ হবে। কার্বন নিঃসরণ কমে যাওয়ার ফলে আট কোটি টাকার কল্যাণ বয়ে আনবে। এ ছাড়া ব্যক্তিগত ভাটা পরিচালকেরা বিভিন্ন ধরনের সুবিধা পাবেন, যেমন উন্নতমানের ইট ও নিম্ন জ্বালানি খরচ। সব মিলিয়ে বিনিয়োগকারী ও মালিকদের মুনাফায় অতিরিক্ত ১৪০ কোটি টাকা যোগ হবে। একটি স্থায়ী চিমনির ভাটাকে জিগজ্যাগ আকৃতির ভাটায় রূপান্তর করতে তিন মাস সময় লাগে এবং প্রতি ভাটায় খরচ হয় ৪০ লাখ টাকা। উন্নত ভাটাগুলো আরও কার্যকরভাবে ইটকে উত্তপ্ত করে, কারণ গরম বাতাস আঁকাবাঁকাভাবে ইটের ওপর দিয়ে বয়ে যায়। এই ভাটাগুলো জ্বালানি খরচ এক-পঞ্চমাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেয়, যে কারণে মালিক তাঁর বিনিয়োগকৃত অর্থ চার বছরেরও কম সময়ে তুলে ফেলতে পারেন। উন্নত মানের নকশার কারণে জিগজ্যাগ আকৃতির ভাটাগুলো উন্নত মানের ইটও প্রস্তুত করে, যা বেশি দামে বিক্রি করা যায়, আর এ কারণে ইটভাটার ব্যবসায়ীদের কাছে এ ধরনের ভাটা আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। সাভারের একটি ইটভাটার মালিক কাওসার আহমেদ। তিনি ২০১২ সালে তাঁর ইটভাটাকে জিগজ্যাগ আকৃতিতে রূপান্তর করেছেন। তিনি লক্ষ করেছেন কীভাবে উন্নত প্রযুক্তি অপচয় হ্রাস করে। তাঁর ভাষ্যমতে, আঁকাবাঁকা আকৃতিতে রূপান্তরের পর তাঁর ভাটায় প্রায় ৯০ শতাংশ উন্নত মানের ইট উৎপাদিত হচ্ছে। আগের ভাটায় ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ ভালো মানের ইট উৎপাদিত হতো। হাইব্রিড হফম্যান ভাটার ব্যবহারও সামগ্রিকভাবে অনেক সুবিধা বয়ে আনে। ঢাকার সব ইটভাটাকে হাইব্রিড হফম্যান ভাটায় রূপান্তর করলে প্রতিবছর ২৫০ কোটি টাকার স্বাস্থ্যসুবিধা পাওয়া যাবে। উন্নত মানের ইট উৎপাদনের মাধ্যমে মালিকপক্ষের মুনাফা হবে ৮৬০ কোটি টাকা। তবে এতে তাঁদের বছরে ব্যয় হবে ৩৩০ কোটি টাকা। ইট উৎপাদন খাতে কার্বন নিঃসরণ কমাতে আরও অনেক কিছুই করা যেতে পারে। ইটভাটায় নিম্নমানের কয়লার ব্যবহার থেকে বেরিয়ে আসা যেতে পারে। ভাটাগুলোকে জনসংখ্যা বেশি এমন এলাকা থেকে সরিয়ে দেওয়া যেতে পারে। এতে করে ঢাকা নগরীতে বায়ুদূষণের পরিমাণ কমতে পারে।

কিউবায় যুক্তরাষ্ট্র:কে কাকে বদলাবে?by আনু মুহাম্মদ

হাভানায় ঐতিহাসিক সফরের সময় প্রেসিডেন্ট ওবামা ও রাউল কাস্ত্রো
২৩ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা কিউবায় তিন দিনের সফর শেষ করলেন। ১৯৫৯ সালের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত অবরোধ ও বৈরিতা অকার্যকর হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র এখন সেই পথ পরিত্যাগ করতে চায় বলে জানিয়েছিলেন ওবামা। সেই ধারায় কিউবা-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফসল এই সফর। অনেকেই বলছেন, এর মধ্য দিয়ে কিউবার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হলো। এখানে বলা দরকার, কিউবা সব সময়ই সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চেয়েছে, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও জনচলাচল নিয়মিত করতে চেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রই অবরোধ ও চক্রান্ত দিয়ে সম্পর্কের জটিলতা তৈরি করেছে। কিউবা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবরোধ জারি করেনি, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টদের খুন করতে একের পর এক অভিযান চালায়নি, মার্কিনদের বিরুদ্ধে অন্তর্ঘাত ও চক্রান্ত চালায়নি, মার্কিন সরকারকে উৎখাতের কোনো চক্রান্ত করেনি, যুক্তরাষ্ট্রকে সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত করে তার সঙ্গে বাণিজ্য নিষিদ্ধ করেনি, সব আন্তর্জাতিক আইনকানুন ভঙ্গ করে যুক্তরাষ্ট্রকে তাক করে অবিরাম মিথ্যা প্রচারণা চালায়নি। অথচ কয়েক দশক ধরে এর সবগুলোই যুক্তরাষ্ট্র করেছে কিউবার বিরুদ্ধে। তাই যুক্তরাষ্ট্র যখন বলে আমরা কিউবার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চাই, তখন বরং যুক্তরাষ্ট্রের এত দিনের ভূমিকার পরাজয়ই নিশ্চিত হয়। কিউবাকে পুরো অধস্তন একটি রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রের অনেক পুরোনো। বিশ্বজুড়ে সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য প্রতিষ্ঠার আগে দক্ষিণ আমেরিকাই ছিল তার আগ্রাসনের লক্ষ্য। ১৮৮৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতাদের ভাষ্য বলতে গিয়ে সে সময়কার প্রভাবশালী একটি পত্রিকা দ্য ম্যানুফ্যাকচারার লিখেছিল: ‘কিউবাকে নিয়ে আমরা কী করব? জাতিগতভাবেই এরা খুব দুর্বল, অসুস্থ। এরা সব অলস, নৈতিকতার কোনো ঠিক নেই। একটা আধুনিক দেশে থাকার মতো কোনো যোগ্যতা এদের নেই। প্রাকৃতিকভাবেই এরা অক্ষম।’ এর কিছুদিন পরই হোসে মার্তি স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু করেন, যার শেষ হয় ১৯৫৯ সালের বিপ্লবের মধ্য দিয়ে। কিউবার জনগণই উচিত জবাব দিয়েছেন।১৮৯৮ সালে, যে বছর হোসে মার্তি যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধ করতে করতে নিহত হলেন, সেই বছর যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধমন্ত্রী কিউবা ও পুয়ের্তো রিকো কীভাবে দখল করতে হবে, তা সেনাবাহিনীর প্রধানকে জানাচ্ছেন এই ভাষায়: ‘পুয়ের্তো রিকো থেকে কিউবা আকারেও বড়, লোকসংখ্যাও বেশি। এখানে শ্বেতাঙ্গ আছে, কৃষ্ণাঙ্গ আছে, আদিবাসী আছে, আর আছে মিশ্র জনগোষ্ঠী। এটা স্পষ্ট যে আমাদের ফেডারেশনে এখনই এই অবস্থায় এর অন্তর্ভুক্তি হবে পাগলামি। তার আগে এটাকে পরিষ্কার করতে হবে। এর জন্য যদি আদিম পথ নিতে হয়, তা-ও ভালো। আমাদের কামানের সীমার মধ্যে যা পড়বে, সেসব ধ্বংস করতে হবে। আমাদের অবরোধও জোরদার করতে হবে, যাতে ক্ষুধা আর তার চিরদিনের সাথি প্লে­গ বেসামরিক জনসংখ্যা কমিয়ে দেয় এবং সেনাবাহিনীকে কাবু করে ফেলে।’ হিটলারের বয়স তখন নয় বছর। কিন্তু সেই বর্ণবাদী আর ফ্যাসিস্ট কণ্ঠ আমরা তখনই পেয়েছি ‘গণতান্ত্রিক’ যুক্তরাষ্ট্র থেকে। ১৯৫৯ সালে বাতিস্তা বাহিনীর শেষ চেষ্টা ব্যর্থ করে ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে বিপ্লবীরা কিউবার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র শুরু করে অন্তর্ঘাত, সরাসরি হামলা, গুন্ডাবাহিনী গঠন ও চক্রান্ত। ১৯৬০ সালের ৪ মার্চ হাভানা বন্দরে একটি ফরাসি জাহাজ উড়িয়ে দিয়ে এর আনুষ্ঠানিক শুরু। এতে নিহত হয় ৮১ জন মানুষ। কিউবার বিপ্লবের স্লোগান ওঠে ‘বিপ্লব অথবা মৃত্যু’। ১৯৬০ সালের ১৭ মার্চ তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মার্কিন আইজেনহাওয়ার কিউবান প্রতিবিপ্লবীদের দিয়ে কিউবা আক্রমণের জন্য সিআইএকে নির্দেশ দেন। যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী ভূমিকার কারণেই কিউবা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে সম্পর্ক দ্রুত গড়ে উঠেছিল। ১৯৬০ সালের ৮ মে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। কিউবা সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে তেল কিনে তা শোধনের জন্য তখন পর্যন্ত কার্যরত টেক্সাকো, এসো ও শেলের রিফাইনারিতে দিলে তারা সোভিয়েত তেল শোধন করতে অস্বীকার করে। কিউবা এরপর সব শোধনাগার জাতীয়করণ করে। জুনের ২৯ থেকে ১ জুলাইয়ের মধ্যে এ ঘটনা ঘটে। এরপরই ৬ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র কিউবা থেকে চিনি কেনা বন্ধ ঘোষণা করে। ৯ জুলাই সোভিয়েত ইউনিয়ন কিউবার চিনি কেনার ঘোষণা দেয়। ৬ আগস্ট কিউবা মার্কিন আগ্রাসনের প্রতিবাদে সব বৃহৎ মার্কিন ব্যবসা জাতীয়করণ করে। এর দুই মাসের মাথায় দেশি-বিদেশি ৩৮২টি বৃহৎ ব্যাংক জাতীয়করণ করা হয়। প্রেসিডেন্ট কেনেডির সময়ে ১৯৬১ সালের এপ্রিলে শুরু হয় সিআইএ  ও কিউবান প্রতিবিপ্লবীদের সরাসরি যৌথ হামলা। এই প্রজেক্টে যেসব সিআইএ এজেন্ট ও কিউবান সন্ত্রাসীরা অংশগ্রহণ করেছিল, তারা বিভিন্ন সময়ে তাদের ব্যর্থতার বিষয়ে সাক্ষাৎকারও দিয়েছে। ১৯৬১ সালের ১৫ এপ্রিল কিউবার দুই মাথায়—সান্তিয়াগো ও হাভানায়—বোমা হামলা হয়। ১৭ তারিখ সিআইএর প্রশিক্ষণে পুষ্ট প্রায় ১ হাজার ৫০০ জনের সন্ত্রাসী বাহিনী বে অব পিগসে হামলা করে। লক্ষ্য ছিল একটি অঞ্চল নিজেদের দখলে নিয়ে তারা অস্থায়ী সরকার গঠন করে যুক্তরাষ্ট্রকে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানাবে। ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তাদের পরাজিত করে কিউবার বিপ্লবী মিলিশিয়া। চে গুয়েভারাও এ যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। বস্তুত, ১৯৬১ সাল থেকে আরোপিত মার্কিন অবরোধের উদ্দেশ্যই ছিল কিউবাকে বাকি দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে পিষে মেরে ফেলা। এমন পরিণতি নিয়ে আসা, যাতে আর কখনো ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কেউ মাথা তুলে না দাঁড়াতে পারে, যাতে কেউ বিপ্লবের স্বপ্ন না দেখে। পারেনি যুক্তরাষ্ট্র, কিউবা তার স্বপ্ন ও শক্তি দিয়ে পুরো লাতিন আমেরিকাকে উদ্দীপ্ত করেছে। কিউবার মুক্তিসংগ্রামের প্রতীক হোসে মার্তির নাম ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র আর তার মাফিয়া দল কিউবান বিপ্লববিরোধী রেডিও প্রচার শুরু করেছে ১৯৬১ থেকেই। পরে টিভি স্টেশনও খুলেছে। এগুলোর নাম দিয়েছে রেডিও মার্তি, টিভি মার্তি। ২০টিরও বেশি রেডিও-টিভির মাধ্যমে এত বছর ধরে অব্যাহতভাবে বিপ্লববিরোধী, ফিদেলবিরোধী ও ভোগবাদ সম্প্রসারণের পক্ষে প্রচার চলছে। অন্যদিকে কিউবার সব রকম প্রকাশনা, অডিও-ভিডিও, এমনকি ভোগ্যপণ্য সবকিছুই যুক্তরাষ্ট্রে নিষিদ্ধ। ২০০৪ সালে বুশ প্রশাসন কিউবায় সন্ত্রাস পরিচালনা, প্রয়োজনে সামরিক আগ্রাসন ও ক্ষমতা দখলের কাজ গোছানোর জন্য ‘কমিশন ফর অ্যাসিস্ট্যান্স টু আ ফ্রি কিউবা’ নামে নতুন কমিশন করেছে। এর অংশ হিসেবে ২০০৫ সালের জুলাই মাসে কিউবা দখলের জন্য একজন ট্রানজিশন কো-অর্ডিনেটরও নিয়োগ করা হয়েছে। তবে শত চেষ্টা সত্ত্বেও মার্কিন অবরোধ কখনোই আন্তর্জাতিক সমর্থন পায়নি। সবচেয়ে বড় কথা হলো যে অবরোধ, হামলা, মনস্তাত্ত্বিক চাপ, আতঙ্ক ছড়ানো, অন্তর্ঘাত, হত্যা, হত্যার চক্রান্ত কোনো কিছুই কিউবার ‘অলস’ ‘অক্ষম’ মানুষদের ভীত করতে পারেনি, দমাতে পারেনি। এর ফলে একদিকে দেশের অভ্যন্তরে সব মানুষের অসীম শক্তি সব সময় সজীব, জোরদার, ঐক্যবদ্ধ রেখেছে। অবরোধকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দেশের ভেতর এক অসম্ভব পরিবর্তনের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা এবং অব্যাহত হুমকির মধ্যে নিজেদের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সক্রিয় রাখা, নিজেদের অবস্থা ও অবস্থান সম্পর্কে সারা দুনিয়াকে জানানোর বিষয়ে তাদের কখনো ক্লান্ত দেখা যায়নি। সে কারণে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে মার্কিন অবরোধ সব সময়ই বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছে। মার্কিন অবরোধ তুলে নেওয়ার কিউবান প্রস্তাব বিপুল ভোটে পাস হয়ে এসেছে সব সময়। এই ভোটাভুটিতে যুক্তরাষ্ট্র কখনোই কয়েকটির বেশি ভোট পায়নি, বিরত থাকার সংখ্যাও ক্রমাগত কমেছে। ১৯৯২ সালে পক্ষে ছিল ৫৯, বিপক্ষে ৩, আর বিরত ছিল ৭১। ১৯৯৪ সালে পক্ষে ছিল ১০১, বিপক্ষে ২, আর বিরত ছিল ৪৮। ২০০০ সালে পক্ষে ছিল ১৬৭, বিপক্ষে ৩, আর বিরত ছিল ৪। এর পরের বছরগুলোতেও এই অবস্থার পরিবর্তন হয়নি। পক্ষে ভোট বেড়েছে, বিপক্ষে ৪-এর বেশি ওঠেনি। কিউবার অবস্থান এতই স্বচ্ছ, নৈতিক ও যৌক্তিক যে যুক্তরাষ্ট্রের ধামাধরা দেশগুলোও এ ক্ষেত্রে তার বিপক্ষে ভোট দেওয়ার যুক্তি দাঁড় করাতে পারেনি।বিশ্বের সবচেয়ে বড় দানবীয় শক্তির ক্রমাগত আক্রমণ ও চক্রান্তের মুখে কিউবার টিকে থাকাই এক বিস্ময়। কিউবা শুধু টিকেই থাকেনি, পরিবেশসম্মত কৃষিব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে বিশ্বে মডেল হয়েছে। সব নাগরিকের জন্য খাদ্য, বাসস্থান, নিরাপত্তা, শিক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করেছে। বর্ণবাদী, যৌনবাদীসহ বৈষম্য ও নিপীড়নের গোড়ায় আঘাত করেছে কিউবা। চিকিৎসা–প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনায় কিউবা এখন বিশ্বের ১ নম্বর দেশ। এই জ্ঞান ও সেবা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে কিউবার প্রায় ৫০ হাজার চিকিৎসক বিভিন্ন দেশে কাজ করছেন। কিউবায় শিক্ষা, চিকিৎসা জনগণের অধিকার হিসেবে সর্বাধিক অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত, এটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আর এর মাধ্যমে কিউবা এ দুই ক্ষেত্রে এখন মহা সম্পদশালী যুক্তরাষ্ট্র থেকেও এগিয়ে। এখন যুক্তরাষ্ট্র সশরীরে কিউবায় হাজির। তার ইচ্ছা কিউবাকে পরিবর্তন করা। বিপ্লব–পূর্ব কিউবাই তাদের পছন্দের, যেখানে অবাধ মার্কিন বিনিয়োগ ছিল, উচ্চ মুনাফা নিশ্চিত করে তা ক্যাসিনো আর পতিতাবৃত্তির দেশে পরিণত করেছিল কিউবাকে। তা ফিরে পাওয়ার চেষ্টাই তারা চালাচ্ছে এত বছর ধরে। তখন কিউবার বেশির ভাগ মানুষ দারিদ্র্য-নির্যাতনের ভেতর তো বটেই, যাপন করত ভয়ংকর এক অসম্মানিত জীবন। বিপ্লব তাদের শুধু ক্ষুধা থেকে মুক্ত করেনি, দিয়েছে এক সম্মানজনক জীবন। এখন পণ্য, পুঁজি আর সমষ্টির বিনিময়ে ব্যক্তির জৌলুশ কিউবার সমাজে টোকা দিচ্ছে। বহুদিনের চেষ্টায় তার পক্ষে শক্তিও দাঁড়াচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র যখন কিউবার বিরুদ্ধে চক্রান্ত-অন্তর্ঘাতে পরাজয় স্বীকার করে নতুনভাবে সেখানে প্রবেশের পথ খুঁজছে, তখন খোদ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই ১ শতাংশের বিরুদ্ধে ৯৯ শতাংশের লড়াই দানা বাঁধছে। বৈষম্য, নিপীড়ন, যুদ্ধ, বিশ্বজুড়ে সহিংসতার বিরুদ্ধে চিন্তা ও সক্রিয়তা মার্কিন জনগণ, বিশেষত তরুণদের নাড়া দিচ্ছে বলেই প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীর নির্বাচনী প্রচারেও শোনা যাচ্ছে সেই সব কথা, যেগুলো ফিদেল কাস্ত্রো অনেক দিন থেকেই বলে আসছেন।সুতরাং কে কাকে বদলাবে সেটা এখন বড় প্রশ্ন।

শেয়াল ও ভাঙা বেড়া by সৈয়দ আবুল মকসুদ

গ্রামীণ জ্ঞানীরা বলেছেন, শেয়ালকে ভাঙা বেড়া দেখাতে নেই। শেয়াল বাঙালির চেয়ে কম ধূর্ত নয়। এবং শেয়াল বাঙালির মতোই প্রতিভাবান প্রাণী। একালের বাংলাদেশ যদি একটি ঘর হয়ে থাকে, তাহলে তার বেড়াটির বহু জায়গায় ভাঙা। এবং সবগুলো ভাঙা জায়গার খোঁজই শেয়ালেরা পেয়ে গেছে। মানুষ জানে যে নিঃস্বের হারানোর ভয় নেই। কিন্তু যার অগাধ সম্পদ, তার কিছু হারালেও ক্ষতি নেই। ডাকাত ও লুটেরারা রাহাজানি ও লুট করে কত আর নেবে, যার সম্পদ সীমাহীন। বাংলাদেশে আজ উপচে পড়ছে সম্পদ। তা থেকে যৎকিঞ্চিৎ কেউ হাতিয়ে নিলে দেশটির কিছুই আসে যায় না। যেমন চার হাজার কোটি টাকা। ওটা কিছু না। পিনাট (চিনাবাদাম)—নস্যি। পাঁচ হাজার কোটি টাকাও কিছু না। আর ৮০০ কোটি টাকা। সে তো হাতের ময়লা। বাংলাদেশ আজ ধনসম্পদে এতটাই পরিপূর্ণ যে তা থেকে কিছুটা হাতিয়ে নিতে পৃথিবীর চোরেরা বাংলার মাটিতে ঢুকে পড়েছে। দেশ-বিদেশের ব্যাংকে গচ্ছিত কোনো রাজনৈতিক দলের তহবিল নয়, জনগণের টাকা নানা রকম বেড়ার ভাঙা জায়গা দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে পুরুষ ও নারী শেয়ালদের হাতে। আমাদের মরমি কবি যে গেয়েছেন—‘আমার ঘরের চাবি পরের হাতে,’ কত দূরদর্শী ছিলেন তিনি। শুধু যে বাউল কবির ঘরের চাবি পরের হাতে ছিল তা-ই নয়, এখনকার বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে শুরু করে জাতির সবকিছুর চাবিই আজ পরের হাতে। নগদ টাকা হোক, সোনাদানা হোক, প্রাকৃতিক সম্পদ হোক, গোপনীয় তথ্য হোক—সবকিছুর চাবিই পরের হাতে। তাঁর দেশের পূর্ব দিকের অংশটির অবস্থা এমনটি হবে, তা অনুমান করে বাংলা ভাষার বৃহত্তম কবিও গেয়েছেন: ‘আমার যে সব দিতে হবে সে তো আমি জানি—/ আমার যত বিত্ত, প্রভু, আমার যত বাণী।।’ কবির ছিল মাত্র একজন প্রভু, বাংলাদেশের প্রভু যে কতজন, তা আমাদের সুযোগ্য পরিসংখ্যান দপ্তর পর্যন্ত বলতে পারবে না। বাংলাদেশের ধনদৌলত রাখার সিন্দুকগুলোর নকল ও ডুপ্লিকেট চাবি যে কত দেশে কতজনে কতগুলো বানিয়ে রেখেছে, তা আমাদের পক্ষে বলা সম্ভব নয়। অত ডুপ্লিকেট চাবি সম্ভবত ঢাকায় যত তালাচাবি মেরামতকারী আছেন, তাঁরাও বানাননি। সেই সব চাবি দিয়ে তালা খুলে যার যা প্রয়োজন তা দুহাতে থলে ভরে নিয়ে গেলেও তা দেখার বা বাধা দেওয়ার কেউ নেই। বর্তমান পৃথিবীতে চোর দুই প্রকার। একটি ছিঁচকে চোর বা পাতিচোর, অন্যটি মহাচোর। বাঙালি দুই ধরনের চুরিতেই দক্ষতার পরিচয় দেয়। ছিঁচকে চুরি এবং পুকুরচুরি। বাড়ির বাথরুমের বাল্বটা নষ্ট হয়ে গেছে। দোকান থেকে না কিনে ছুটির পর আসার সময় অফিসের একটা বাল্ব হাতব্যাগে নিয়ে দিব্যি হাঁটা দেওয়া হলো। গত ৪৫ বছরে বিভিন্ন সরকারি ও আধা সরকারি স্বায়ত্তশাসিত অফিস থেকে যত বাল্ব ও পানির কল চুরি হয়েছে, তার দাম দিয়ে হয়তো একটি ফ্লাইওভার বানানো সম্ভব। যদি অফিসের ভেতরের সেই ছিঁচকে চোরদের ধরে শাস্তি দেওয়া যেত, আজ ব্যাংকগুলো থেকে টাকা চুরি হতো না, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভও সুরক্ষিত থাকত। আমরা ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি, চুরিবিদ্যা বড় বিদ্যা যদি না পড় ধরা। বাঙালি জানে সে ধরা পড়বে না, পড়লেও শাস্তিটাস্তি কিছু হবে না। সুতরাং বিদ্যা হিসেবে যুক্তিবিদ্যা, তত্ত্ববিদ্যা, জীববিদ্যা ও পদার্থবিদ্যার চেয়ে চুরিবিদ্যাই বড় বিদ্যা ও প্রধান বিদ্যা বাঙালির কাছে। বাঙালির চৌর্যবিদ্যার ক্ল্যাসিক দৃষ্টান্ত গত কয়েক বছরে স্থাপিত হয়েছে। সব সমাজে সব বস্তু নেই। যেমন ধামা জিনিসটি বঙ্গদেশেরই নিজস্ব বস্তু এবং অতি প্রয়োজনীয় বস্তু। অন্যান্য দেশের ঝুড়িটুড়ি অনেক কিছুই আছে, কিন্তু ধামা নেই। এবং বঙ্গবাসীই একমাত্র জাতি, যে কিনা হাতে একটা ধামা নিয়েই চলাফেরা করে। কারণ কখন কোন নোংরা বা বিষ্ঠাজাতীয় কিছু চোখে পড়বে তা বলা যায় না, সেটা চাপা দেওয়ার জন্য প্রয়োজন হতে পারে ধামার। সেই থেকেই বাঙালির বাগ্‌ধারায় ধামাচাপা কথাটির উদ্ভব। একাত্তর থেকে আজ অবধি অনেক কিছুই আমরা ধামা দিয়ে চাপা দিয়েছি। এখনো দিচ্ছি। ভবিষ্যতেও দেব। ধামা ছাড়া আমাদের চলবে না। অতীতে বাংলাদেশ অনেক কিছুতেই রেকর্ড করেছে, যেমন দুর্নীতি। এবার তার মুকুটে যোগ হলো আর একটি কলঙ্কের পালক। কোনো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চুরি হওয়ার ঘটনা বাংলাদেশ ব্যাংকেরটিই প্রথম। এর আগে আর কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি হয়েছে, তা জানা নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকেরটিও জানা যেত না, কারণ আমাদের ধামা আছে, যদি ফিলিপাইনের দৈনিক দ্য ইনকোয়ারার ৮০০ কোটি টাকার সমপরিমাণ ১০ কোটি ডলার মানি লন্ডারিং হওয়ার সংবাদ ফাঁস না করত। আমেরিকার ওয়াশিংটন পোস্টও ‘বানান ভুলের কারণে ১০০ কোটি ডলার চুরির চেষ্টা ব্যর্থ’ শিরোনামে গত ফেব্রুয়ারিতেই জানিয়েছিল যে নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০০ কোটি ডলার চুরির উপক্রম হয়েছিল। ওই টাকা চুরি হলে বাংলাদেশের মুদ্রায় তা হতো ৮০০০ কোটি টাকা। সেটাই বা বেশি টাকা কী? ফিলিপিনো মায়া বেগম ও তার সহযোগী বন্ধুরা কোনো প্রস্তুতি ছাড়া এক দিনেই কী খেয়ালের বশে কাজটি করে ফেলেছে। প্রশ্ন জাগে, রিজার্ভ চুরির ঘটনাটি যদি বিপরীত হতো, তাহলে কেমন দাঁড়াত। ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভের টাকা যদি কোনো বঙ্গসন্তান চুরি করে ঢাকায় ‌নিয়ে আসত এবং আমাদের কোনো পত্রিকা সে সংবাদ ফাঁস করে দিত, সেই চোরদের ব্যাপারে কী ব্যবস্থা নিত আমাদের প্রশাসন। তাদের বিচারে শুনানির জন্য আমাদের পার্লামেন্ট প্রকাশ্যে কী ব্যবস্থা নিত। মায়া বেগম গং ধরা পড়েছে এবং তাদের বিচার হচ্ছে এই জন্য যে ওই দেশে দক্ষ ও নিরপেক্ষ প্রশাসন আছে। দায় সরকারকে নিতে হয়। কিন্তু রাষ্ট্রের যে আমলাশ্রেণি, তারা থাকে নিরাপদে। তাদের সহযোগিতা অথবা কর্তব্যে অবহেলা ছাড়া চুরি হোক, জনগণের সম্পদ আত্মসাৎ হোক, গোপনীয় তথ্য পাচার হোক—কিছুই সম্ভব নয় রিজার্ভের টাকা চুরির ঘটনায় বাংলাদেশের লজ্জায় ও দুঃখে ঘুম হারাম হওয়ার কথা। কিন্তু প্রবল উত্তেজনাবশত ব্যাংকের গভর্নর ও দুজন ডেপুটি গভর্নরকে সরিয়ে দেওয়া হলো। তাতে কী বার্তা পেল বিশ্ববাসী? মুহূর্ত বিলম্ব না করে নিযুক্ত করা হলো নতুন গভর্নর। আমরা সাধারণ মানুষ আশা করি, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও জাতীয় মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় তাঁর অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা প্রশ্নাতীত। দায়িত্ব নেওয়ার আগেই বিমানবন্দরে তিনি দেশবাসীকে আশার বাণী শুনিয়েছেন।  ঘটনাটি ঘটেছে। এক পক্ষ আরেক পক্ষকে কাঠগড়ায় খাড়া করার জন্য কোনো ত্রুটিই করছে না। নিজেরা নিজেরাই দুই-তিন পক্ষ। সব পক্ষেরই নিজস্ব মুখপত্র বা মিডিয়া আছে। বিশ্ববাসী সব পক্ষের কথাই শুনছে। এসব ঘটনায় বিরোধী দলের কোনো সম্পৃক্ততা আছে কি না, তা ‘খতিয়ে’ দেখলে নিশ্চয়ই কিছু পাওয়া সম্ভব। কারণ আসমান ও জমিনে যা কিছু ঘটুক, বঙ্গীয় বিরোধী দলের হাত যদি নাও থাকে, পা তো থাকতে পারে। নানা রকম শেয়াল বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর নানা রকম ভাঙা বেড়ার সন্ধান বহু আগেই পেয়ে গেছে। গত পাঁচ বছরে ব্যাংকের টাকা চুরির বহু ঘটনাই আমরা দেখেছি। এমন কিছু ঘটনা, যা আরব্য রজনীর কাহিনিগুলোকে হার মানায়। দীর্ঘ সুড়ঙ্গ খুঁড়ে ব্যাংকের মেঝে ফুটো করে বস্তা ভরে টাকা চুরি। খোদ বাংলাদেশ ব্যাংকের কাউন্টার থেকে টাকার বান্ডিল হাতিয়ে নেওয়া এবং হাতেনাতে ধরা পড়ার পরও আবার সেই ধামার ব্যাপার। ধামা আমাদের আছেই, শুধু চাপা দেওয়া। শেয়ারবাজার থেকে ১৫,০০০ কোটি টাকা, হল-মার্কের ৪,৫০০ কোটি টাকা, বেসিক ব্যাংকের ৪,৫০০ কোটি টাকা, বিসমিল্লাহওয়ালাদের ১,১০০ কোটি টাকা, ডেসটিনির ৪,১১৯ কোটি টাকা এবংএগুলোর বাইরে হাজার হাজার ছোট ও মাঝারি আত্মসাৎকারী যে কী পরিমাণ টাকা লোপাট করেছে, তার হিসাব কোথাও নেই। এসব অর্থ চুরির সঙ্গে সরকারের প্রিয়পাত্ররাই যে জড়িত থাকবেন, তা যেকোনো বালক-বালিকাও জানে। এটিএম বুথ থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে গ্রাহকদের টাকা চুরির সঙ্গে বিদেশি বন্ধুরা জড়িত তা ধরা পড়েছে, কিন্তু জানা গেছে তাদের সঙ্গে বন্ধুতা আছে থানার কর্তাদের কারও কারও। সুতরাং ওই সব ঘটনার জন্যও প্রয়োজন হবে ধামার। টাকা যদি চুরি হয়, তা পাওয়া গেলে ভালো, না পাওয়া গেলে কী আর করা। কিন্তু রাষ্ট্রের গোপনীয় তথ্য যদি চুরি হয়, সে ক্ষতি কোনো কিছুর বিনিময়েই পূরণ হয় না। শুধু ব্যাংক নয়, আরও আরও কত প্রতিষ্ঠানের কত অতি গোপনীয় তথ্য বিদেশি বন্ধুদের নোটবইতে টোকা আছে, তার খবর ফেরেশতারা ছাড়া আর কারও পক্ষে জানা সম্ভব নয়। বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশ আজ উন্মুক্ত। আমরা স্বচ্ছতায় বিশ্বাস করি, তাই আমাদের সবকিছু সবাই জানুক, তাতেই আমাদের সুখ।
দায় সরকারকে নিতে হয়। কিন্তু রাষ্ট্রের যে আমলাশ্রেণি, তারা থাকে নিরাপদে। তাদের সহযোগিতা অথবা কর্তব্যে অবহেলা ছাড়া চুরি হোক, জনগণের সম্পদ আত্মসাৎ হোক, গোপনীয় তথ্য পাচার হোক—কিছুই সম্ভব নয়। কর্মকর্তারা স্বেচ্ছাশ্রম দেন না। তাঁদের বেতন-ভাতার প্রতিটি পয়সা জনগণ দেয়। সেই জনগণের নিমক খেয়ে জনগণ ও রাষ্ট্রের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা খুব বড় রকমের অপরাধ। তেমন ক্রিমিনাল প্রজাতন্ত্রে অগণিত। অথচ আজ কতজন বিশ্বাসঘাতক কর্মকর্তা নাজিমউদ্দিন রোড ও কাশিমপুরের ভাত খাচ্ছেন, তা আমাদের জানা নেই। যাঁরা অযোগ্যতা ও অসততাবশত জনগণ ও রাষ্ট্রের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছেন, তাঁদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া না হলে যেকোনো ধরনের চুরি, তা অর্থ হোক তথ্য হোক, রোধ করা সম্ভব হবে না। সবকিছু ধামা দিয়ে চাপা দেওয়াও সম্ভব নয়।

তোমরা এই ব্যভিচারী প্রেসিডেন্টের পক্ষে আছ কী করে?

স্বাধীনতার এই মাসে আজ থেকে ৪৫ বছর ৩ মাস আগে মাওলানা ভাসানীর তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া সম্পর্কে উচ্চারিত কয়েকটি বাক্য কানে এখনো অনুরণন হয়। সময়টা ১৯৭০ সালের নভেম্বর, স্থান খুলনা সার্কিট হাউস। কথাগুলো বলেছিলেন তিনি সে সময় যশোর-খুলনা অঞ্চলের সামরিক প্রশাসককে উদ্দেশ করে তাঁর এবং খুলনার জেলা প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনার শেষে। শুধু বাক্য বললে কথাটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়, মাওলানা ভাসানী সেদিন তাঁর বক্তব্যে জেনারেল ইয়াহিয়াকে যেভাবে ভূষিত করলেন বিভিন্ন উর্দু বিশেষণে, তার সব আমার পক্ষে বিবরণ দেওয়া সম্ভব নয়। তবে সেদিনের কথোপকথনের প্রেক্ষাপট আর সারাংশটুকু দিচ্ছি। সেদিন সেখানে আমি ছিলাম। ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের পর ত্রাণকাজে পাকিস্তান সরকারের অমার্জনীয় অবজ্ঞা ও অবহেলার জন্য শেখ মুজিবুররহমানের সঙ্গে আর যেসব জননেতা প্রচণ্ড প্রতিবাদ জানান, মাওলানা ভাসানী ছিলেন তাঁদের অগ্রগামী। তিনি শুধু পাকিস্তান সরকারের ত্রাণকাজে ব্যর্থতার প্রতিবাদ করেননি, তিনি এ অবজ্ঞাকে পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে বৈষম্যমূলক ব্যবহারের আরেকটা নজির হিসেবে উল্লেখ করেন। ঘূর্ণিঝড়ের পর মাওলানা ভাসানী উপদ্রুত এলাকা সফর করেন এবং বিভিন্ন অঞ্চলে জনসভায় ভাসন দেন। এক জনসভায় তিনি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীকে ঘূর্ণিঝড়ে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোকে অবহেলার জন্য দায়ী করেন এবং বলেন, এ ধরনের আচরণের জন্য পূর্ব পাকিস্তান আলাদা হয়ে যেতে পারে। এটা হয়তো শুধু হুমকি ছিল, কিন্তু পাকিস্তান সরকার বিশেষভাবে সামরিক গোষ্ঠী মাওলানা ভাসানীর বক্তব্যে বেশ চিন্তিত হয়ে পড়ে। এর একটি প্রধান কারণ ছিল আসন্ন সাধারণ নির্বাচন, যা ইয়াহিয়া সরকার পরবর্তী মাসে ঘোষণা করেছে। ভাসানীর এ বক্তব্য নির্বাচনের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া ফেলতে পারে, তার চেয়ে আরও খারাপ, নির্বাচন বন্ধও করে দিতে পারে—এ আশঙ্কায় সামরিক সরকার ভাসানীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করতে থাকে ভাসানীর বক্তৃতার পরপর। আমি তখন খুলনায় শিক্ষানবিশ সহকারী কমিশনার, জেলা প্রশাসকের তত্ত্বাবধানে প্রশাসন, ম্যাজিস্ট্রেসি ইত্যাদি সম্পর্কে সবে শিখছি। সারা দিন খুলনা কালেক্টরেটে কাটিয়ে সন্ধ্যায় খুলনা ক্লাবে গিয়েছি বিলিয়ার্ড খেলার জন্য। হঠাৎ ক্লাবের এক বেয়ারা এসে বলল, জেলা প্রশাসক আমাকে ফোন করেছেন। ফোন ধরতেই জেলা প্রশাসক বললেন তাড়াতাড়ি খুলনা সার্কিট হাউসে চলে আসতে। তিনি সেখানে আছেন, জরুরি কাজ আছে। আমি ফোন রেখে তড়িঘড়ি সার্কিট হাউসের দিকে ছুটলাম। ভেবে পাচ্ছিলাম না সন্ধ্যায় জরুরি কাজ কী থাকতে পারে, বিশেষ করে আমার মতো শিক্ষানবিশের জন্য। এটাও অবাক লাগছিল যে জেলা প্রশাসক নিজের বাংলো থেকে ফোন না করে সার্কিট হাউস থেকে ডাকছেন, কারণ সার্কিট হাউস তখন সামরিক আইন প্রশাসনের দপ্তর হিসেবে কাজ করত। সার্কিট হাউস পৌঁছে দেখি, জেলা প্রশাসক অপেক্ষা করে আছেন, আর তাঁর সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের সামরিক কমান্ডার ও সামরিক আইন প্রশাসক ব্রিগেডিয়ার দুররানি। ব্রিগেডিয়ার দুররানিকে আমি আগেও দেখেছি, যশোর থেকে তিনি প্রায়ই খুলনা আসেন। খুলনা ক্লাবে প্রায়ই টেনিস খেলতে আসেন, আমিও তাঁর সঙ্গে খেলেছি। আমি পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গেই জেলা প্রশাসক জানালেন আমাকে তলব করার কারণ, আর কী সেই জরুরি কাজ।
জেলা প্রশাসক জানালেন, মাওলানা ভাসানী সেদিন সন্ধ্যায় বরিশাল থেকে খুলনা আসবেন সড়কপথে রূপসা ফেরিঘাট দিয়ে। আমার কাজ রূপসা ফেরিঘাট থেকে মাওলানা সাহেবকে খুলনা সার্কিট হাউসে নিয়ে আসা, জেলা প্রশাসক ও সামরিক আইন প্রশাসকের সঙ্গে একটি জরুরি সাক্ষাৎকারের কথা বলে। আমি শুনে কিছুটা হতভম্ব হয়ে প্রশ্ন করলাম, কিন্তু তিনি না আসতে চাইলে? তাঁকে কি গ্রেপ্তার করতে হবে? প্রশ্নের উত্তরে জেলা প্রশাসক বললেন, তাঁকে গ্রেপ্তার করার জন্য পুলিশ পাঠাতাম, তোমাকে না। তোমাকে পাঠাচ্ছি মাওলানা সাহেবকে কৌশলে নিয়ে আসতে। তুমি আমার গাড়ি নিয়ে যাবে, ওটিতে তাঁকে নিয়ে আসবে। ব্রিগেডিয়ার দুররানি বললেন ইংরেজিতে, আমরা তোমার ওপর ভরসা করে আছি। অগত্যা রওনা হলাম রূপসা ফেরিঘাটের উদ্দেশে জেলা প্রশাসকের সরকারি গাড়িতে, পেছনে জিপে কিছু পুলিশ, যাতে বিপদ হলে তারা সামাল দিতে পারে। ফেরিঘাটে যখন পৌঁছালাম, তখন রাত আটটা, গাড়ির চলাচল খুব কম। আমি সরাসরি ফেরিতে গাড়ি ঢুকিয়ে ফেরিচালককে বললাম ওপারে নিয়ে সে যেন ফেরি চলাচল বন্ধ রাখে। এ ধরনের আদেশ পেয়ে ফেরিচালক হতভম্ব হলেও সঙ্গে পুলিশ দেখে সে ভাবল, আমি কেউকেটা। তাই বিনা প্রতিবাদে ওপারে ফেরি নিয়ে গেল। ওপারে পৌঁছে আমি গাড়ি আর কূলে তুললাম না। আমার আর পুলিশের জিপ ফেরিতেই থাকল। উদ্দেশ্য, আর কোনো গাড়ি যেন না উঠতে পারে। আর সেই সুযোগে ঘাটে পৌঁছানোর পর মাওলানাকে যেন আমি আমার গাড়িতে ওঠাতে পারি। কিন্তু এমনই কপাল, কিছুক্ষণ পর মাওলানা ভাসানী একটি ছোট গাড়িতে এলেন, যেটা তাঁর ড্রাইভার কসরত করে ফেরিতে তুলে ফেলল। আমার কৌশল কাজে লাগল না। অগত্যা গাড়ি ফেরিতে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে আমি ভাসানীর গাড়ির পাশাপাশি দাঁড়িয়ে তাঁকে আমার পরিচয় দিয়ে বললাম যে আমি তাঁকে খুলনায় অভ্যর্থনা জানানোর জন্য দাঁড়িয়ে। এতে অত্যন্ত খুশি হয়ে ভাসানী গাড়ি থেকে বেরিয়ে আমার সঙ্গে হাত মেলালেন। আমার জীবনে এই প্রথম মাওলানা ভাসানীর সাক্ষাৎ, কিছুটা অভিভূত। তবু সাহস করে বললাম, স্যার, আপনাকে জেলা প্রশাসক আমন্ত্রণ জানিয়েছেন রাতের খাবারের জন্য সার্কিট হাউসে, সঙ্গে গাড়িও পাঠিয়েছেন। এই বলে সামনের গাড়িটি দেখালাম। গাড়ির দিকে যেতে যেতে ভাসানী জিজ্ঞেস করলেন জেলা প্রশাসকের নাম। বলতেই তিনি চিনলেন। ভাবলাম, আর কোনো চিন্তা নেই, তিনি আমার সঙ্গে যাবেন। হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, সার্কিট হাউসের নিমন্ত্রণে আর কেউ আছেন কি না। আমি কিছু না ভেবেই বললাম ব্রিগেডিয়ার দুররানির কথা। এ কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে ভাসানী পিছু ফিরে তাঁর গাড়িতে সটান উঠে পড়লেন। তিনি দরজা বন্ধ করার আগে আমি দৌড়ে তাঁর গাড়িতে পাশে বসে তাঁর হাত দুই হাতে ধরে বললাম, স্যার, দয়া করে একটু সার্কিট হাউস হয়ে যান। আমার ওপর জেলা প্রশাসক অনেক নির্ভর করে আছেন। আমার চাকরিজীবনের সবে শুরু। আমার মিনতির জন্য কি না জানি না, মাওলানা ভাসানী স্থির চোখে চেয়ে হেসে বললেন, চলো, তোমার জেলা প্রশাসকের সঙ্গে মোলাকাত করেই যাই, তবে ওই সরকারি গাড়িতে নয়, আমার গাড়িতে। বলে তিনি একটু সরে আমাকে জায়গা করে দিলেন। গাড়িতে ড্রাইভার ছাড়া আরও দুজন লোক ছিল, একজন সামনে, আরেকজন ভাসানীর ডান পাশে। আমি পাশে বসে চলতে চলতে আল্লাহকে শুকরিয়া জানালাম। সার্কিট হাউস পৌঁছানোর পর ভাসানীকে ভেতরে নিয়ে দেখি জেলা প্রশাসক অভ্যর্থনাকক্ষে নিজেই দাঁড়িয়ে, আর ব্রিগেডিয়ার দুররানি পাশে। দুজনই ভাসানীকে অভ্যর্থনা জানিয়ে হাত মেলালেন। পরে তাঁকে তাঁরা পাশের একটি কক্ষে নিয়ে গেলেন। আমাকে জেলা প্রশাসক বললেন অভ্যর্থনাকক্ষে অপেক্ষা করতে। পাশের কক্ষে মিটিং ঘণ্টা খানেক চলল। ঘরের ভেতর কথাবার্তা বেশ নিচু গলায় হচ্ছিল, তাই কিছু শুনতে পাচ্ছিলাম না। কিন্তু শেষের দিকে ভাসানী জোর গলায় কথা বলছিলেন। আগের কথা যদিও শুনিনি, তাঁর শেষের কথা শুনে মনে হলো, তিনি ব্রিগেডিয়ারকে উদ্দেশ করে বলছেন খাঁটি উর্দুতে, ‘দেখো, পাকিস্তান বাঙালি মুসলমান নে বানায়া, উও পাকিস্তান তোড়না নেহি চাহতে, তোমহারা প্রেসিডেন্ট ইসকো তোড়না চাহতা হ্যায়। (বাঙালি মুসলমানরা পাকিস্তান বানিয়েছে, তারা পাকিস্তান ভাঙতে চায় না, তোমার প্রেসিডেন্ট ভাঙতে চায়)।’ এই কথা বলতে বলতে দরজা খুলে ভাসানী বেরিয়ে আসেন, পেছন পেছন ব্রিগেডিয়ার দুররানি আর জেলা প্রশাসক। কিন্তু কথা তখনো তাঁর শেষ হয়নি।
মজলুম জননেতা মাওলানা ভাসানী
ভাসানী তাঁর স্বভাবসুলভ আঙুল উঁচিয়ে উর্দুতে বলেন, এভাবে পাকিস্তান থাকবে না। তারপর সোজাসুজি ব্রিগেডিয়ার দুররানিকে বলেন, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া একজন ব্যভিচারী। তোমরা (সেনাবাহিনী) এ প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছ না কেন? তোমাদের বুদ্ধি-বিবেচনা নেই? এ লোক শুধু মদখোরই নয়, অসৎ চরিত্র। এই লোকই পাকিস্তান ভাঙবে। ভাসানী বাইরে দাঁড়িয়ে আঙুল নাচাতে নাচাতে বলছেন আর আমি অবাক বিস্ময়ে দেখছিলাম লাল মুখ করে ব্রিগেডিয়ার দুররানি তাঁর কথা শুনে যাচ্ছেন নীরবে। আর কথা না বাড়িয়ে ভাসানী যখন গাড়িবারান্দার দিকে যাচ্ছিলেন, তখন জেলা প্রশাসক রাতের খাবারের কথা বললে তিনি জোরে মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন, রাতে তিনি বেশি খান না, এবং এখন বিশ্রামের জন্য তাঁর নির্দিষ্ট স্থানে যাবেন। আমি পেছনে পেছনে এলে তিনি বললেন, তাঁর সঙ্গে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। এই বলে তিনি তাঁর গাড়িতে উঠে গেলেন। গাড়িবারান্দায় দাঁড়িয়ে জেলা প্রশাসক ও ব্রিগেডিয়ার দুররানি তাঁকে বিদায় দিলেন। সেদিন ব্রিগেডিয়ার দুররানি মাওলানা ভাসানীকে কতখানি বোঝাতে পেরেছিলেন জানি না, কিন্তু যেভাবে ভাসানী সামরিক সরকার আর তার প্রধানকে সম্বোধন করেছিলেন বিশেষ বিশেষণে (তার কয়েকটি শব্দ আমি বাদ দিয়েছি), তা থেকে এটাই বুঝেছিলাম, তাঁর উদ্দেশ্য সফল হয়নি। বরং ভাসানীই তাঁকে শুনিয়ে গেলেন। ব্রিগেডিয়ার দুররানি চলে যাওয়ার পর জেলা প্রশাসকও বাড়ি ফিরে যান। তাঁর মুখ দেখে তাঁকে আমার আর কিছু জিজ্ঞেস করতে সাহস হয়নি। বাকি সব ইতিহাস।