Saturday, June 6, 2015

মমতা চান সাপ মরুক লাঠি না ভাঙুক -কলকাতার জার্নাল by সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

পশ্চিমবঙ্গের বঙ্গেশ্বরী মমতা ঢাকায় গেছেন। আজ (শনিবার) তার কলকাতায় ফেরার কথা। রাজনৈতিক মহল মনে করছে ‘সাপও মরে, আর লাঠিও যেন না ভাঙে’ এ পন্থাই নিয়েছেন তিনি। শনিবার সকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঢাকায় পৌঁছানের পর মাত্র কয়েক ঘণ্টা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেখানে থাকবেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার নাকি চুক্তি হয়েছে, তিস্তা নিয়ে আলোচনার সময় তিনি সেখানে থাকবেন না। তিস্তা নিয়ে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে মীমাংসা করার ব্যাপারে ভারত সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ১৯৭৪ সালে ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি অনুযায়ী ভারতে উৎস সমস্ত নদীর ব্যাপারে উভয় দেশকে আলোচনা করে পানি ভাগাভাগি করতে হবে। সরকার হলো পরম্পরা। ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি নিয়ে নরেন্দ্র মোদি কোনো একটি অঙ্গরাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর জেদের সামনে আত্মসমর্পণ করতে পারেন না। কিন্তু কার্যত তাই হচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মহল কিন্তু তা মেনে নিচ্ছে না। তারা চায় নরেন্দ্র মোদি তিস্তা চুক্তি সম্পন্ন করুন। এ রাজ্যের বিরোধী দলগুলোর তাতে সমর্থন থাকবে। কিন্তু মমতার জেদের কাছে তার এ আত্মসমর্পণের পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে কি-না তা রাজ্য বিজেপি নেতারাও জানেন না। তারাও চাইছেন তিস্তা চুক্তি হোক।
তৃণমূল সূত্রে আকার-ইঙ্গিতে বলা হয়, যেহেতু তিস্তার উৎস সিকিমে, উত্তরবঙ্গে শুষ্ক মওসুমে পানি কম থাকে। তাতে উত্তরবঙ্গের চাষের ব্যাপক ক্ষতি হয়। সে জন্য কয়েক মাইল তিস্তা ড্রেজিং করা দরকার। আর এই ড্রেজিংয়ের জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকার ভারত সরকারের কাছে পাঁচ হাজার কোটি টাকা দাবি করেছে। কিন্তু ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো অনুযায়ী নদীগুলোর পর্যবেক্ষণের জন্য কোনো অঙ্গরাজ্যকে টাকা দেয়া যায় না। এ কাজ করার দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সরকারের। এখানেই নাকি দিদির গোস্যা।
আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির চুক্তি সম্পন্ন হয়ে যাবে। তারপর স্থির হবে ছিটমহল পেরিয়ে কত লোক এপার বাংলায় আসবেন। কিন্তু তার আগেই মানুষদের পুনর্বাসনের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার ৩৮০০ কোটি টাকা মঞ্জুর করেছে।
কিন্তু এ রাজ্যের অর্থনীতিবিদরা জানাচ্ছেন, কত লোক এপারে আসবেন তা স্থির না হওয়া পর্যন্ত টাকা মঞ্জুর করা উচিত হয়নি। হয়তো এত টাকা লাগবেও না। কিন্তু বিজেপি-তৃণমূলের যাই বোঝাপড়া হোক না কেন, যে টাকা মমতার হাতে দেয়া হবে সেটা ভারতের জনগণের করের টাকা। গত চার বছরের রেকর্ড আছে কেন্দ্র থেকে পাঠানো টাকা খরচের কোনো হিসাব মমতা দেননি। এই প্রশ্ন তুলেছে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতৃত্ব।
মোদি-মমতার মধ্যে কী বোঝাপড়া হয়েছে তা নিয়ে নবান্ন এবং সাউথ ব্লকে রীতিমতো আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। বিভিন্ন চ্যানেলে বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলছেন, সঠিক কত লোক বাংলাদেশ থেকে এদেশে আসবেন তার হিসাব কে করেছে? শোনা যায়, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যসচিব সঞ্জয় মিত্র এরকম একটি হিসাব প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ে পাঠিয়েছেন। সঠিক তথ্য তখনই প্রকাশ পাবে যখন এদের পুনর্বাসনের কাজ শুরু হবে। মোদি যখন ঢাকায় পৌঁছবেন, ঠিক তখনই কলকাতায় পৌঁছবেন কংগ্রেসের সহ-সভাপতি রাহুল গান্ধী।

মোদি যে বক্তব্য দিলেন, তাতে তেমন নতুন কোনো চমক নেই by ইমতিয়াজ আহমেদ

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যে বক্তব্য দিলেন, তাতে তেমন নতুন কিছু পাওয়া গেল না। ফলে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরের প্রথম দিনটি অনেকটা চমকহীনভাবেই কাটল বলে ধারণা করি। একটা জিনিস লক্ষণীয় যে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীর সংখ্যা ছিল খুবই কম। এটা আসলে এ বার্তাই তুলে ধরে যে এ সফর থেকে তেমন কিছু মিলবে না। তিনি যদি একটা বড় প্রতিনিধিদল নিয়ে আসতেন, তাহলে বোঝা যেত নানা ক্ষেত্রে কার্যকর কিছু করার পরিকল্পনা নিয়ে তিনি এসেছেন। এ সফরে এ পর্যন্ত যেসব চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে, তা ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই ধরে নিতে পারি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এ সফর নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের মনে যে বড় ধরেনর আশাবাদ দেখা দিয়েছিল কিংবা গণমাধ্যমসহ নানা মহল থেকে যে ধরনের প্রত্যাশার কথা বলা হয়েছিল, তার তেমন প্রতিফলন অন্তত প্রথম দিনে টের পাওয়া গেল না।
তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির জন্য বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করে আসছে। সেই ২০১১ সালে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের সময়ই চূড়ান্ত হয়ে গিয়েও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। এ সফরে তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে চূড়ান্ত কিছু হবে এমন আশা নিশ্চয়ই করা হয়নি। কিন্তু তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট কোনো প্রতিশ্রুতি না পাওয়া একধরনের আশাভঙ্গই বলতে হবে। দেখা যাচ্ছে, এ ব্যাপারে ভারত সরকারের চেয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই বেশি ক্ষমতাবান নেতা। তাই নরেন্দ্র মোদি এ সফরে তিস্তা নিয়ে নতুন কোনো কথাই শোনাতে পারেননি।
কানেক্টিভিটি দিয়ে শুধু এপারের জিনিস ওপারে আসা–যাওয়া করলেই খুব ফল পাওয়া যাবে না দুই দেশের মধ্যে কানেক্টিভিটি বা সংযোগের কথা জোর দিয়ে বলা হয়েছে, কিন্তু এর সুফল কতটুকু ও কীভাবে মিলবে, তা খুব পরিষ্কার নয়। কানেক্টিভিটির ক্ষেত্রে ভারত ও বাংলাদেশের চাওয়া–পাওয়ার মধ্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে। কানেক্টিভিটি দিয়ে শুধু এপারের জিনিস ওপারে আসা–যাওয়া করলেই খুব ফল পাওয়া যাবে না। কানেক্টিভিটির ক্ষেত্রে আমাদের দরকার উৎপাদনকেন্দ্রিক অবকাঠামো। বাংলাদেশে ভারতীয় বিনিয়োগের কথা বলা হয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এ বিনিয়োগ কী ধরনের হবে তা পরিষ্কার নয়। আমরা ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল পাইনি। এ ধরেনর কিছু থাকলে অন্তত একটি বার্তা পাওয়া যেত।
ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সফর থেকে এটা মনে হচ্ছে যে ভারতের নতুন সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব এখনো কিছুটা রয়ে গেছে। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার সব সময়ই কংগ্রেসের সঙ্গে বিশেষ এবং কার্যত ব্যক্তিগত সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। এমনকি আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ভারতের নির্বাচনের আগে নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপির সমালোচনা করেছিলেন। কংগ্রেসের ক্ষেত্রে তিনি তা করেননি। এখন নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠনের পর ভারতের বিজেপি সরকারের সঙ্গেই সম্পর্ক ধরে রাখতে হচ্ছে। এটা দুই দেশের সরকারের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক বাধা হিসেবে কাজ করে থাকতে পারে।
এ ছাড়া বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রসঙ্গও নরেন্দ্র মোদির বিবেচনায় থাকতে পারে। আমাদের কাছে হয়তো তা স্পষ্ট নয়। নরেন্দ্র মোদি হয়তো এমন কোনো বার্তা দিতে চাচ্ছেন না, যাতে এটা মনে হয় যে শুধু বর্তমান সরকারের সঙ্গেই তারা সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী। মোদি হয়তো চান না যে তাঁর সফর থেকে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারি দল খুব বেশি লাভবান হোক বা অনেক কিছু অর্জিত হয়েছে—এমন দাবি করার ভিত্তি তৈরি হোক। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সমস্যা সমাধানের জন্য অপেক্ষা করার বিষয়টিও তাঁর কাছে বিবেচ্য হতে পারে।
ইমতিয়াজ আহমেদ: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

লিওনার্দো দেখতে কেমন?

খোঁজ মিলেছে লিওনার্দোর প্রতিকৃতির! ৫০০ বছরের বেশি পুরনো একটি কাঠ খোদাইয়ে লিওনার্দোর প্রতিকৃতি ফুটে উঠেছে। এক মার্কিন সঙ্গীতজ্ঞের দাবি, এই কাঠখোদাই-ই হবে ইতালির ক্ষণজন্মা শিল্পী লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির প্রাচীনতম চিত্রগুলোর একটি। এখন পর্যন্ত শিল্প ঐতিহাসিকরা যা জানেন তার ভিত্তিতে বলা হয়, লিওনার্দো জীবিত থাকার সময় তার তিনটি মাত্র প্রতিকৃতি তৈরি করা হয়েছিল। আমেরিকার ক্লিভল্যান্ড জাদুঘরে ১৯৩০ সাল থেকে এই কাঠখোদাই ছবিটি রাখা আছে। এতদিন মনে করা হতো ছবিটি আসলে গ্রিক পৌরাণিক চরিত্র অর্ফিয়ুসের। কিন্তু, সম্প্রতি আমেরিকার ওক বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগের অধ্যাপক রস ডাফিনের নজরে পড়ে ছবিটির চরিত্রর হাতে ধরা বাদ্যযন্ত্রটির প্রতি।
ওই শিক্ষক জানিয়েছেন, ছবিতে যে বাদ্যযন্ত্র দেখানো হয়েছে সেই ধরনের যন্ত্র তৈরি করা হয়েছিল চতুর্দশ শতাব্দীর শেষের দিকে। ইতালিতে তখন নবজাগরণ শুরু হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে ওই কাঠখোদাই ছবিটি ইতালীয় শিল্পী মার্কান্তোনিও রাইমন্দির হাতে সৃষ্ট। ডাফিন আরও বলেন, ছবির চরিত্রটির গালে দাড়ি দেখা যাচ্ছে। অর্ফিয়ুসের যত ছবি বা মূর্তি পাওয়া গেছে তার কোনোটারই দাড়ি দেখা যায়নি। ডেইলি মেইলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির এই ছবিটি খোদাই করেছিলেন ইতালির আরেক শিল্পী মার্কান্তোনিও রাইমন্দির। ১৫০৫ সালে একটি গিটার বাজানোর দৃশ্যে ভিঞ্চিকে ধারণ করেন তিনি। উল্লেখ্য, লিওনার্দো ১৪৫২ সালের ১৫ এপ্রিল ইতালির ভিঞ্চিতে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৫১৯ সালের ২ মে ফ্রান্সের আমবোইসে মৃত্যুবরণ করেন।

আসিফের আক্ষেপ ও আশা

‘সুযোগের অভাবে অলিম্পিক গেমসে স্বর্ণ জিততে পারিনি। সেই আক্ষেপ ঘোচাতে চাই স্বর্ণজয়ী শুটার তৈরি করে’, বললেন আসিফ হোসেন খান। ২০০২ ম্যানচেস্টার কমনওয়েলথ গেমসে স্বর্ণজয়ী এই শুটারের সময় এখন ভালো যাচ্ছে না। শুটিং অনেকটা ছেড়েই দিয়েছেন। কালেভদ্রে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে রাইফেল হাতে তুলে নেন। বৃহস্পতিবারও রাইফেল তুলে পদক না জিতলেও স্কোর খারাপ করেননি।
শুটিংয়ের চেয়ে কোচিংয়ের দিকেই মনোযোগ এখন আসিফের। বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (বিকেএসপি) খণ্ডকালীন কোচিংয়ের দায়িত্বে রয়েছেন সাফ গেমসে স্বর্ণজয়ী এই শুটার। তবে চাকরি স্থায়ী না হওয়ায় কিছুটা হতাশায় আচ্ছন্ন আসিফ। ২০০২ সালের ৩১ জুলাই। বাংলাদেশের শুটিং ইতিহাসে এক উজ্জ্বল দিন। ম্যানচেষ্টার কমনওয়েলথ গেমসে ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে ভারতের তারকা শুটার অভিনব বিন্দ্রাকে হারিয়ে স্বর্ণ জেতেন আসিফ হোসেন খান। সেদিন বিসলের (ইংল্যান্ড) শুটিং রেঞ্জে লাল-সবুজ পতাকা নিয়ে আসিফ যেন উড়ছিলেন। আসিফ আরও ওপরে উড়তে চেয়েছিলেন। অলিম্পিকে বাংলাদেশের পতাকা ওড়াতে চেয়েছিলেন।। ২০০৪ সালেও ইসলামাবাদ এসএ গেমসে বিন্দ্রাকে হারিয়ে স্বর্ণ জেতেন আসিফ। অথচ সেই বিন্দ্রাই ২০০৮ বেইজিং অলিম্পিক গেমসে ভারতকে স্বর্ণ এনে দিয়েছিলেন। বিন্দ্রার জন্য ভারত সরকার কোটি কোটি রুপি খরচ করেছে। অথচ আসিফ পাননি ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা। ২০০৬ মেলবোর্ন কমনওয়েলথ গেমসে হারিয়ে গেছে ম্যানচেষ্টারে পাওয়া স্বর্ণ। আসিফের জন্য উন্নত প্রশিক্ষণের সুযোগ-সুবিধা তো করা হয়নি। উল্টো ২০০৬ সালে দোহা এশিয়াডের আগে গুলশান শুটিং কমপ্লেক্সে আসিফদের ওপর চালানো হয় পুলিশের বর্বরোচিত হামলা। পুলিশের হামলায় আসিফের কব্জি ও মাংসপেশিতে সমস্যার দেখা দেয়। সেই থেকে পারফরম্যান্সের ঘাটতি। এসএ গেমস, ইন্দো-বাংলাদেশ বাংলা গেমস এবং অন্যান্য গেমসে স্বর্ণ জিতলেও দক্ষিণ এশিয়ার গণ্ডি আর পেরোতে পারেননি আসিফ। তার সঙ্গে যুক্ত হয় আর্থিক অনিশ্চয়তা। শিক্ষা জীবনটাও বেশিদূর এগোয়নি তার।
ছিলেন শুটার। তাই অন্য কোনো কাজ শেখা হয়নি। একটা চাকরির প্রয়োজনে অনেক ঘুরেছেন। কিন্তু কোথাও চাকরি মেলেনি। শেষ পর্যন্ত বিকেএসপি আসিফের পাশে দাঁড়ায়। প্রকল্পের আওতায় খণ্ডকালীন চাকরি পান আসিফ। কিন্তু বছরের কিছু সময় তাকে বেকার থাকতে হয় প্রকল্প না থাকায়। ২০১১ সালে বিকেএসপির শুটারদের কোচের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন আসিফ। ওই বছর বিয়ে করেন নাদিরা আক্তারকে। পাবনার মেয়ে নাদিরা। ১৬ অক্টোবর আসিফ ও নাদিরা ছেলের বাবা-মা হন। নাম রাখা হয় আলী বিন আসিফ খান। নাদিরা বিকেএসপি কলেজের চারুকলা বিভাগে শিক্ষকতা করছেন। আসিফ চান সবকিছু ঝেড়ে ফেলে শুটার তৈরিতে মন দিতে। নিজে শুটার থাকাকালে যে সুযোগ-সুবিধা পাননি, সেই সুযোগ-সুবিধা দিয়ে আগামীর অলিম্পিক গেমসে স্বর্ণজয়ী শুটার তৈরি করতে চান আসিফ। বৃহস্পতিবার শুটিং রেঞ্জে ছেলেকে কোলে নিয়ে ঘুরেফিরে দেখছিলেন। এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে আসিফ বলেন, ‘আমি বিকেএসপির কাছে কৃতজ্ঞ। আমাকে শুটিং কোচের দায়িত্ব দেয়ায়। তবে চাকরিটা যদি স্থায়ী হতো, তাহলে আমি কোচিংয়ে আরও বেশি মনোযোগী হতে পারতাম। আমার স্বপ্ন ছিল, অলিম্পিকে স্বর্ণ জেতা। নিজের স্বপ্ন পূরণ না হলেও আমার কোচিংয়ে বাংলাদেশের কোনো এক শুটার সেই স্বপ্ন পূরণ করবে সেই প্রহর গুনছি আমি।’

ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক সমাজই ছিল স্বাধীনতার লক্ষ্য by কুলদীপ নায়ার

ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি যে হিন্দুত্ববাদের প্রতি ঝুঁকে পড়ছে, সেটা সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক, কম করে বললেও অন্তত এটুকু বলতেই হয়। কিন্তু তার মানে এই নয়, যাঁরা সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে লড়াই করে আমাদের সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ চেতনাকে ঊর্ধ্বে তোলার চেষ্টা করছেন, তাঁরা যেন ভুল না বোঝেন।
স্বাধীনতার পর সংবিধান সভা-শাসনের নানা পন্থা নিয়ে আলোচনা করেছে। কিন্তু সমাজের সব পক্ষই ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের পক্ষাবলম্বন করেছে। সেটা ছুড়ে ফেলে দেওয়া মানে গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গঠনে যাঁরা অনেক ত্যাগ করেছেন, তাঁদের সেই ত্যাগের সঙ্গে মশকরা করা।
অভিযোগ আছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গুজরাটের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সঙ্গে জড়িত ছিলেন, যে দাঙ্গায় কয়েক হাজার মুসলমান মারা যায়। তিনি নিজেও ধর্মের ভিত্তিতে সমাজকে ভাগের অসারতা বুঝতে পেরেছেন। এটা খুবই ইতিবাচক অগ্রগতি যে মোদি নিজেই এখন জনসমক্ষে বলেন: সবার সরকার, সবার উন্নয়ন।
আবার এটাও দুর্ভাগ্যজনক, মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি এনজিওগুলোকে হয়রানি করছে, তাদের ডালকুত্তা দিয়ে তাড়া করছে। জনসংঘ ইন্দিরা গান্ধীর কর্তৃত্বপরায়ণ জামানাকে সফল রুখে দিয়ে জনতা পার্টির সঙ্গে একত্র হয়, তারা মানবাধিকার সমুন্নত রাখার সংগ্রামের অংশ ছিল। তৎকালীন ক্ষমতাসীন কংগ্রেস সে সময় মানবতা পায়ে মাড়ানো শুরু করেছিল। আর সেই লোকগুলোই কীভাবে এখন এনজিওবিরোধী হয়ে উঠল?
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর হিসাব অর্থ মন্ত্রণালয় নিয়মিত নিরীক্ষা করে। সব সরকারি তহবিল সরকারি চ্যানেলে আসত। ফলে তা নয়–ছয় করার সুযোগ ছিল খুবই কম। প্রক্রিয়া বদলানো মানে হয়রানি করা। প্রাক-সরকারি অনুমোদন মানে তহবিলের জন্য অনন্তকাল ধরে অপেক্ষা, যেখানে সেই টাকাটা হয়তো কর্মীদের জন্য খুবই প্রয়োজনীয় ছিল।
আমার বিস্ময় লাগে, বিজেপি কীভাবে ভুলে গেল যে গান্ধী পিস ফাউন্ডেশনের বিরুদ্ধে চলমান তদন্ত-প্রক্রিয়াকে ইন্দিরা গান্ধী ১৯৮০ সালে ক্ষমতায় আসার পর তিরস্কার করেছিলেন? তৎকালীন জনসংঘের কর্মীদের কঠোরভাবে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। বিজেপি হচ্ছে জনসংঘের নতুন অবতার, যারা ব্যক্তির বাক ও স্বাধীনতার দাবির আন্দোলনে শামিল হয়েছিল।
বিজেপির কিছু সদস্য আগ-পিছ না ভেবেই এবং আরএসএসের প্রভাবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর হামলে পড়ছে, ঘরে ফেরার নামে গির্জার ওপর হামলা চালাচ্ছে এবং সংখ্যালঘুদের ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা করছে। মোদিকে কোনো না কোনো সময় রাশ টেনে ধরতেই হবে, তা না হলে ভারতের খুব বদনাম হয়ে যাবে। কারণ, বহির্বিশ্বে ভারত তার সহনশীলতা ও সহাবস্থানের জন্য খ্যাত।
আমার মনে আছে, লন্ডনে ভারতের হাইকমিশনার থাকাকালে এক ইহুদি প্রতিনিধিদল আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। তারা ভারতের সহনশীলতার জন্য ধন্যবাদ জানাতে এসেছিল। তারা বলেছিল, ভারতই একমাত্র দেশ, যেখানে ইহুদিরা কোনো রকম বৈষম্যের শিকার হয়নি। সে সময় পর্যন্ত নয়াদিল্লি ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়নি। কিন্তু তারা সেটা নিয়ে কথাই বলেনি।
অস্বস্তির ব্যাপার হচ্ছে, রাষ্ট্রে ধর্মনিরপেক্ষতা এত দিনে অনেক গভীরে প্রোথিত হওয়ার কথা থাকলেও সেটা হয়নি। স্বাধীনতার পর থেকে গত ৬৮ বছরে অর্থনৈতিকভাবে ভারতের যেমন উন্নতি লাভ করার কথা ছিল, তেমন উন্নতি সে অর্জন করেছে। সম্ভবত দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্যেই এর উত্তর নিহিত রয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গ্রামের পশ্চাৎপদতা আমাদের ব্যর্থতার পরিচায়ক। কিন্তু গ্রামগুলোই সবচেয়ে বেশি ভুগছে। দেশের বিভিন্ন গ্রামে কৃষকদের আত্মহত্যার খবর দেখে বোঝা যায়, উৎপাদন তাঁদের কাছে পৌঁছায়নি। এমনকি নিরাপদ পানির মতো মৌলিক সুবিধাও তাঁদের কাছে গোলকধাঁধার মতো।
মহারাষ্ট্রের মতো সচ্ছল প্রদেশেও কৃষকেরা আত্মহত্যা করেছেন। গত মার্চ থেকে তিনিসহ নয়জন কৃষক আত্মহত্যা করলেন। অন্যান্য প্রদেশের খবর আরও নিদারুণ যন্ত্রণাকর। রাজস্থানের একজন কৃষক নয়াদিল্লির জনসভায় আত্মহত্যা করলে আমি ভেবেছিলাম, সবার টনক নড়বে, জাতি কৃষকের অবস্থার উন্নতিতে মনোযোগ দেবে। আমাকে স্বীকার করতেই হবে, আমি ভুল করেছিলাম।
ঠিক আছে, সংসদে এ নিয়ে বেশ শোরগোল তৈরি হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী মোদিও তাঁর দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। তারপর যে লাউ, সেই কদু। কৃষকদের সবাই ভুলে গেল। কৃষকদের অবস্থা উন্নতিতে কোনো নীল নকশা প্রণয়ন করা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। বস্তুত, ভূমি অধিগ্রহণ বিল সংসদে পেশ হওয়ার মাজেজা হচ্ছে, করপোরেট খাত তার পথেই হাঁটছে।
কৃষকদের ব্যাপারে চিন্তা করা অপরিহার্য হলেও তা এখন বাদ পড়ে গেছে। সেটা এখন দৃশ্যপটের বাইরে চলে গেছে। এমনকি সোনিয়া গান্ধীর নেতৃত্বে বিরোধীদের মিছিলও সুদূর অতীতের ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। এটা বোধ হয় মনে করিয়ে দেওয়ার দরকার হবে না যে দেশের ৬৭ শতাংশ মানুষ ভূমির ওপর নির্ভরশীল, যে ভূমি ক্রমেই খুনে জমিতে পরিণত হচ্ছে।
করপোরেট খাতকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া আমাদের স্বাধীনতাসংগ্রামের মূল্যবোধের বিরোধী, যদিও তারা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। মহাত্মা গান্ধী গ্রামের মানুষকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি ব্যস্ত শহর ছেড়ে ওয়ার্দার মতো নির্জন ছোট জায়গায় চলে গিয়েছিলেন, যেটা পরবর্তীকালে দেশের গুরুত্বপূর্ণ শহরে পরিণত হয়।
এনজিওগুলো মহাত্মা গান্ধীর শেষ না হওয়া কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। হিসাব যথাযথভাবে সংরক্ষণ না করার অভিযোগে যে ৯০০ এনজিওর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল, তা তুলে নেওয়া হয়েছে। তাদের আয় নিরীক্ষা করার উদ্দেশ্য হচ্ছে এটা দেখা যে তাদের তহবিল তছরুপ হচ্ছে না। তারা তাদের হিসাব সংরক্ষণ করবে, এটা আশা করা ভুল নয়। কিন্তু একদম পইপই করে হিসাব চাওয়াটা একটু বেশি হয়ে যায়, কারণ এদের কর্মীরা তৃণমূলে দৈনন্দিন কাজে নিয়োজিত।
মনে রাখতে হবে, স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সমাজের লক্ষ্যে, আর সমাজকেও তা ধরে রাখতে হবে।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
কুলদীপ নায়ার: ভারতের সাংবাদিক।