Thursday, February 1, 2018

নির্বাচন সামনে রেখে কিছু প্রশ্ন by আলী রীয়াজ

বাংলাদেশের সংবিধানের বর্তমান ভাষ্য অনুযায়ী আগামী ৩৬৫ দিনের মধ্যে দেশে একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন হওয়ার কথা। ইতিমধ্যে ক্ষমতাসীন দলের প্রধান এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনী প্রচারাভিযান শুরু করেছেন। যদিও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী নির্বাচন কীভাবে হবে, তা নিয়ে সংশয়ের কোনো কারণ নেই; তথাপি গণমাধ্যমের আলাপ-আলোচনা এবং সাধারণের কথাবার্তায় নির্বাচনের সময়কার সরকারের রূপ বিষয়ে অস্পষ্টতা ছিল। ১২ জানুয়ারি ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের আগে নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হবে’। এই বিষয়ে সংসদে তিনি ব্যাখ্যা দিয়েছেন: নির্বাচনকালীন সরকার আকারে ছোট হবে, রুটিনকাজের দায়িত্বে থাকবে এবং কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নেবে না। সংবিধানে যেহেতু ‘নির্বাচনকালীন সরকারের’ আলাদা কোনো ধারণাই উল্লেখিত নেই, সেহেতু যে ধরনের সরকার ক্ষমতাসীন দল এবং প্রধানমন্ত্রী তৈরি করবেন, তাকেই ‘নির্বাচনকালীন সরকার’ বলে বিবেচনা করতে হবে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি থেকে সরে এসেছে অনেক দিন আগেই, কিন্তু দলের বক্তব্য হচ্ছে তারা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন কোনো সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে না। বিএনপি নেতাদের প্রতিশ্রুত ‘নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের’ এখনো কোনো ইঙ্গিত মেলেনি। দলের প্রধান খালেদা জিয়া এবং তাঁর দলের অন্যরা তাঁদের বিরুদ্ধে রুজু করা অসংখ্য মামলা মোকাবিলায় এমন ব্যস্ত যে তাঁদের পক্ষে এই দিকে নজর দেওয়া সম্ভব কি না, সেটাও প্রশ্নসাপেক্ষ। তদুপরি, ক্ষমতাসীন দলের বক্তব্য অনুযায়ী এই রূপরেখা দেওয়া না দেওয়ায় কার্যত কিছু আসে যায় না; শুধু বিএনপি দাবি করতে পারবে যে তারা একটি বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছিল, যা ক্ষমতাসীন দল মানেনি। প্রধানমন্ত্রী এবং ক্ষমতাসীন দল নির্বাচন বিষয়ে কোনো রকম আলোচনার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। ফলে সংবিধান সংশোধিত না হলে বা প্রধানমন্ত্রী কোনো কারণে আগ্রহী না হলে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারকে ক্ষমতায় রেখেই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বিএনপি নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই ধরনের নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে না। এখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়া দোষী সাব্যস্ত হওয়ার প্রশ্ন। ৮ ফেব্রুয়ারি (বা পরে) দেওয়া রায়ে তিনি যদি দণ্ডিত হন, তবে তাঁর পক্ষে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া সম্ভব হবে না। সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের (২) (ঘ) অনুযায়ী, দুই বছর বা তার বেশি দণ্ডে দণ্ডিত ব্যক্তি সংসদ সদস্য হওয়ার অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।
বিএনপির বক্তব্য হচ্ছে খালেদা জিয়াকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে রেখে তারা নির্বাচনে যাবে না। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতা মহীউদ্দীন খান আলমগীরের অংশগ্রহণ এবং তাঁর সদস্য থাকা বিষয়ে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া থেকে দুটি বিষয় স্পষ্ট; প্রথমত দণ্ড বাতিল না হলে সংসদ সদস্যের অযোগ্যতা বিষয়ে ৬৬ অনুচ্ছেদই চূড়ান্ত কথা-দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি সংসদ সদস্য থাকতে পারবেন না; দ্বিতীয়ত এর অর্থ এই নয় যে নির্বাচনে খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্র দাখিলের সব পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ সম্প্রতি বলেছেন, ‘দণ্ডিত যদি উচ্চ আদালতে আবেদন করে এবং আবেদনের যুক্তি দেখে আদালত সন্তুষ্টি সাপেক্ষে মনোনয়নপত্র দাখিলের অনুমতি দেন, সে ক্ষেত্রে [দণ্ডিত] নির্বাচনে অংশ নিতে পারে’ (আমাদের সময়, ২৮ জানুয়ারি ২০১৮)। খালেদা জিয়া দণ্ডিত হলে তাঁর আইনজীবীরা যে সেই পথেই অগ্রসর হবেন অনুমান করতে পারি; কিন্তু তাঁদের আবেদনের ‘যুক্তি’ আদালতের ‘সন্তুষ্টি’ অর্জন করবে বলে ভরসা করার বাস্তবসম্মত কোনো কারণ নেই। ফলে সম্ভবত আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে খালেদা জিয়ার অংশগ্রহণের সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে এসেছে। এই মামলার রায় যা-ই হোক, শিগগিরই জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলারও রায় হতে পারে। তাতে দণ্ডিত হলেও খালেদা জিয়ার জন্য একই ভাগ্য অপেক্ষা করছে; আরও মামলা আছে যা আগামী ৩৬৫ দিনে কী হবে তা আমাদের জানা নেই। ফলে এই কিছুদিন আগে আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য বিএনপির আগ্রহ যতটা ছিল, এখন ঠিক ততটাই আছে তা মনে করার কারণ নেই। বিএনপি নেতারা এখনই সেটা স্পষ্ট করে বলবেন তা আমি মনে করি না। দলের কর্মীদের এক বড় অংশ বিভিন্ন মামলায় জর্জরিত, এখন দলীয় প্রধানের মাথায় কারাদণ্ড ঝুলিয়ে, তাঁকে আইনি প্রক্রিয়ার জটিলতায় আবদ্ধ রেখে বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণে উৎসাহিত হবে বলে আশা করা যায় না। উপরন্তু দলের নেতাদের মনে এই আশঙ্কাই তৈরি হয়েছে যে দলের নেতৃত্ব থেকে খালেদা জিয়াকে অপসারণ করে দলকে বিভক্ত করা হবে, সরকারি দলের নেতা হাছান মাহমুদ যখন বলেন যে বিএনপি কর্মীদের খালেদা এবং দলের মধ্যে একটা বেছে নিতে হবে (ইত্তেফাক, ২৯ জানুয়ারি ২০১৮), তখন সেই আশঙ্কার উৎস বোঝা যায়। এই আশঙ্কার কারণেই বিএনপির নেতারা তড়িঘড়ি করে দলের গঠনতন্ত্রের ৭ (ঘ) ধারা বাতিল করে দিয়েছেন। বিএনপির গঠনতন্ত্রের ৭ (ঘ) নম্বর ধারায় বলা হয়েছিল, ‘সমাজে দুর্নীতিপরায়ণ বা কুখ্যাত বলে পরিচিত কোনো ব্যক্তি দলের যেকোনো পর্যায়ে কমিটির সদস্য বা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের প্রার্থী হিসেবে অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।’ নৈতিক অবস্থান এবং সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতার বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত বিএনপির জন্য ইতিবাচক নয়। কিন্তু বিএনপির এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দলকে একত্রে রাখাকে এখন তারা জরুরি মনে করছে। এটা এ-ও ইঙ্গিত দেয় যদি আইনি ব্যবস্থায় খালেদা জিয়া মনোনয়নপত্র দিতে পারেন, তবে যেন দলের কোনো বিধান তাতে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। ফলে বিএনপির জন্য এখন সম্ভাব্য বিকল্প হচ্ছে দুটি; হয় ২০১৪ সালের মতো নির্বাচন বর্জন করা নতুবা (দণ্ডপ্রাপ্ত হলে) দণ্ডিত খালেদা জিয়াকে সামনে নিয়ে এই কারাদণ্ডকে একটা প্রতীকী বিষয়ে পরিণত করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা। অনেকেই বলবেন যে বিএনপির ২০১৪ সালে নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল না, এখনো ঠিক হবে না। গত চার বছরে ক্ষমতাসীন দলের ক্ষমতার বল্গাহীন ব্যবহার, শাসনের ক্ষেত্রে কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা এবং গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো সংকোচনের কারণ হিসেবে অনেকে বিএনপির নির্বাচন বর্জন এবং ২০১৫ সালের সহিংস আন্দোলনকে দায়ী করেন। কিন্তু প্রথমত বিএনপি বা কোনো দল নির্বাচন বর্জন করলেই ক্ষমতাসীন দলের অগণতান্ত্রিক আচরণের বা বলপ্রয়োগের বৈধতা তৈরি হয় না। দ্বিতীয়ত ২০১৪ সালের নির্বাচন বিএনপি একা বর্জন করেনি। ফলে বিরাজমান অবস্থার দায় যদি বিএনপির হয়, তবে তার অংশভাগ বর্জনকারী অন্যান্য দলের ওপরেও বর্তায়। ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর যাঁরা বলেছেন, বিএনপি আওয়ামী লীগের পাতা ফাঁদে পা দিয়েছিল, ২০১৮ সালের অবস্থাকে তাঁরা কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? বিএনপিকে তাঁরা কোন বিকল্প বেছে নিতে পরামর্শ দেবেন? ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জনকারী অন্য দলগুলোর প্রসঙ্গ উত্থাপন করলাম এই কারণে যে, যে যুক্তিতে তাঁরা সেই সময় নির্বাচন বর্জন করেছিলেন সেই অবস্থার বদল হয়নি; তাঁরা তাঁদের অবস্থান বদল করেছেন কি? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরের ওপরে নির্ভর করছে আগামী দিনগুলোর রাজনীতির ঘটনাপ্রবাহ।
আলী রীয়াজ, যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।

উনিশ বছরে যুগান্তর

সত্য প্রকাশে আপসহীনতার প্রমাণ রেখে যুগান্তর আজ ঊনবিংশ বর্ষে পদার্পণ করল। এ আনন্দঘন মুহূর্তে আমরা শুভেচ্ছা জানাই যুগান্তরের অগণিত পাঠক, লেখক, বিজ্ঞাপনদাতা, এজেন্ট, হকার ও শুভানুধ্যায়ীকে। তাদের সমর্থন ও সহায়তা ছাড়া তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ সংবাদপত্র জগতে যুগান্তরের প্রতিষ্ঠা লাভ সম্ভব হতো না। এটি দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক। প্রকাশের অল্পদিনের মধ্যেই যুগান্তর পাঠকের নজর কাড়তে সক্ষম হয়। ক্রমেই হয়ে ওঠে সব মহলে আলোচিত ও প্রশংসিত একটি দৈনিক। ‘সত্যের সন্ধানে নির্ভীক’ যুগান্তরের এ অগ্রযাত্রা অব্যাহত রয়েছে এখনও। এর প্রধান কারণ বস্তুনিষ্ঠ খবর ও বলিষ্ঠ মতপ্রকাশে পত্রিকাটির সাহসী ভূমিকা। দীর্ঘ পথপরিক্রমায় এজন্য যুগান্তরকে কম মূল্য দিতে হয়নি। রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রতিপত্তিশালী বিভিন্ন মহল থেকে বাধা এসেছে বারবার। সত্য প্রকাশ করায় ক্রুদ্ধ হয়ে যুগান্তর কর্তৃপক্ষের ওপরও আঘাত হেনেছে স্বার্থান্বেষী মহল। তবু সংবাদপত্রের কাছে প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন থেকে যুগান্তরকে বিরত করা যায়নি। অন্যায়ের কাছে মাথানত করিনি আমরা। নতুন একটি বর্ষে পা রাখার সময় আমরা আবারও সেই অঙ্গীকার ব্যক্ত করছি। একটি দৈনিক পত্রিকাকে প্রতিদিনই পাঠকের প্রত্যাশা পূরণে ভূমিকা রাখতে হয়; দিতে হয় পরীক্ষা। প্রকৃত সংবাদপত্রের দায়িত্ব পালন করে যুগান্তর আগামীতেও সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার প্রত্যয় রাখে। পত্রিকাটির সব বিভাগের কর্মী এ লক্ষ্যে উজ্জীবিত ও একাত্ম। যুগান্তর আপস না করে জনস্বার্থে সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতা করে আসছে। দেশে গণতন্ত্র ফিরে আসার পর একে সংহত ও সার্থক করার ক্ষেত্রে মিডিয়ার যথাযথ ভূমিকার বিষয়েও যুগান্তর সজাগ।
আমরা বিশ্বাস করি, প্রকৃত সংবাদপত্র কখনও জন-আকাক্সক্ষার বিপরীতে অবস্থান নিতে পারে না। সরকার পরিবর্তন হতে পারে; কিন্তু জনগণ ও দেশ স্থায়ী। যুগান্তরের কাছে দেশের স্বার্থ সব সময়ই সবকিছুর ঊর্ধ্বে স্থান পেয়েছে। যুগান্তর নিরপেক্ষভাবে সমস্যার কথা তুলে ধরার পাশাপাশি দেশের সম্ভাবনার ওপরও জোর দিয়ে এসেছে। এটা করতে গিয়ে সময়ে সময়ে মহলবিশেষ দ্বারা আক্রান্ত হলেও পত্রিকাটি অর্জন করেছে জনগণের আস্থা। এটাই যুগান্তরের সবচেয়ে বড় অবলম্বন। শুরু থেকেই খবর ও মন্তব্য প্রকাশের ক্ষেত্রে আমরা আঁকড়ে ধরেছি দলনিরপেক্ষতার নীতি। ঘটনার গভীরে গিয়ে সত্যানুসন্ধানের ক্ষমতা যুগান্তরকে করে তুলেছে বিশিষ্ট। ঘটনা, ইস্যু বা বিষয়ের ওপর সম্ভাব্য সব দৃষ্টিকোণ থেকে নিবন্ধ প্রকাশ আমাদের সব সময়ের নীতি। সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে যুগান্তর নিজে থেকেই এ বিষয়ে আন্তরিক। দায়িত্বহীন সাংবাদিকতাকে পাঠকও প্রত্যাখ্যান করে থাকে। সরকার ও বিরোধী দলসহ সংশ্লিষ্ট সব মহলের সমালোচনায় আমরা সব সময়ই দায়িত্বশীল। ভালোকে ভালো ও মন্দকে মন্দ বলতে দ্বিধান্বিত নই। জনগণ চায় বিদ্যমান অবস্থার পরিবর্তন এবং সম্ভাব্য সব ধরনের উন্নয়ন। এ লক্ষ্য অর্জনে সংবাদপত্রকে সহায়ক শক্তি হিসেবে পাশে দেখতে চায় তারা। আমাদের মতো দেশে যেখানে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো অবিকশিত, সেখানে সংবাদপত্রের সাহসী ও দায়িত্বশীল ভূমিকা বেশি করে প্রয়োজনীয়। এটা গভীরভাবে উপলব্ধি করেই পথ চলছি আমরা। পাঠকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে আরও নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত করে আরও বলিষ্ঠতার সঙ্গে এগিয়ে যাবে যুগান্তর- প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এটাই আমাদের অঙ্গীকার।

জাপানের বাধ্যতামূলক শিক্ষা by নাহো তানাকা

চরিত্র গঠনের শিক্ষা আপনি কোথা থেকে পেয়েছেন? ইতিহাস থেকে? গণিতবিদ্যায়? আমার তো মনে হয় অনেকে স্কুলে সেটা শিখেছে। আমিও সেখানে শিখেছি। স্কুলে অনেক কিছু শেখা যায়। যেমন ভাষা, চরিত্র ইত্যাদি। সেরকম শিক্ষা ছাড়াও, মানুষের সঙ্গে কথা বলার মতো সামাজিকতাও আমরা স্কুলে শিখতে পারি। সেরকম স্কুল আমাদের জন্য খুব জরুরি। জাপানের প্রাথমিক বিদ্যালয় আর মিডল স্কুল বা জুনিয়র হাইস্কুলের সঙ্গে আমি এখানে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেব।
জাপানের প্রাথমিক বিদ্যালয় আর মিডল স্কুল হচ্ছে বাধ্যতামূলক শিক্ষার পর্যায়। প্রাথমিক বিদ্যালয় ছয় বছর, মিডল স্কুল তিন বছর এবং দুটি একত্রে যোগ করে নিলে হয় মোট নয় বছর। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুরা ছয় বয়স থেকে যায়। সেই বয়স হলেই কেবল শিশুরা স্কুলে যেতে পারে। অনেক শিশু সরকারি স্কুলে যায়। তবে বেসরকারি স্কুলেও কেউ কেউ যায়। আগে আমি বলেছি, ছয় বছর বয়স হলে স্কুলে যাওয়া যায়। জাপানের প্রাথমিক স্কুলের ছাত্রছাত্রী যখন স্কুলে যেতে শুরু করে, তখন একটি টুপি ওরা পরে আর ‘রানদোশেরু’ নামের থলের ভেতরে পাঠ্যপুস্তক রাখে। টুপি একেক স্কুলের ভিন্ন রং আর আকারের হয়। কিছু স্কুলে একই রকম পোশাকের ব্যবস্থা আছে। তবে টুপির বেলায় স্কুলের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। আর রানদোশেরু দেখতে ব্যাক-প্যাকের মতো। সেটা বর্গাকারের ও একটু বাঁকানো এবং কঠিন ও বেশ মজবুত। সেটা নানা রঙের হয়ে থাকে। সাধারণত ছেলেরা কালো, তবে মেয়েরা লাল রঙের সেই ব্যাগ পিঠে ঝুলিয়ে স্কুলে যায়। তবে আজকাল নীল, আকাশি ও সবুজ রঙেরও দেখা যায়। শিশুর স্কুলে যাওয়ার সময় তখন সেগুলো পিঠে ঝুলিয়ে নেয় এবং বন্ধুদের সঙ্গে মিলে স্কুলের পথে ওরা হেঁটে যায়। স্কুলে আসার পর অনেক স্কুলে জুতা বদল করে করে ঘরের জুতা পরে নিতে হয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নানা রকমের ক্লাস আছে। যেমন জাপানি ভাষা, গণিতবিদ্যা, ইতিহাস, শরীরচর্চা, সংগীত ও শিল্প ইত্যাদি। শিশুরা বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে ক্লাস করে। সেরকম একেকটি ক্লাসে এদের সংখ্যা হচ্ছে ৩৫-৪০ জন। প্রতি ক্লাসের জন্য একজন শিক্ষক থাকেন। তিনি ক্লাসে শিশুদের বিভিন্ন বিষয় শেখান। কিন্তু সংগীত আর শিল্প শিক্ষার বেলায় বিশেষজ্ঞ শিক্ষক শিশুদের শেখান। এ ছাড়া জাপানের স্কুলে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ কিছু কাজকর্ম শিশুদের করতে হয়। যেমন দুপুরের খাবার সময়, পরিষ্কার করা সময় এবং সকালের সমাবেশের সময়। অনেক স্কুলে শিশুরা নিজের বাড়ি থেকে দুপুরের খাবার আনে না। স্কুলে খাবার তৈরি করা হয় এবং সেই খাবার ছাত্রছাত্রীদের খেতে দেওয়া হয়। সকালের ক্লাস শেষ হলে প্রতিটি ক্লাসে খাবার আসে। খাবার বড় পাত্রের ভেতরে রাখা থাকে। খাবারের মধ্যে যেমন আছে ভাত, রুটি, নুডলস, তরকারি, মাছ, মাংস ও ফল ইত্যাদি। প্রতিদিন সেটার পরিবর্তন হয়। তবে শুধু দুধ প্রতিদিন একই রকম থাকে। ক্লাসে খাবার এলে ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের প্লেটে সেগুলো তুলে নেয়।জাপানের স্কুলে ক্লাসরুম পরিষ্কারের দায়িত্বও ছাত্রছাত্রীদের। দুপুরের খাবার খাওয়ার পরে ও দিনের সব ক্লাস শেষ হয়ে যাওয়ার পর সেই কাজ ওরা করে। ক্লাসরুম ছাড়া বারান্দাও ওদের পরিস্কার করতে হয়। সেখানে ঝাড়ু দিয়ে, ধুলা ঝেড়ে তার তারপর কাপড় দিয়ে মেঝে ওরা মুছে নেয়। প্রতিদিন সেই কাজ ওরা করে।
সকালের সমাবেশ হচ্ছে ক্লাস শুরু হওয়ার আগে স্কুলের বাগান ও জিমনেসিয়ামে সব শিশুর মিলিত হওয়া। প্রধান শিক্ষক আর অন্য শিক্ষকেরা সেখানে কথা বলেন। সেই সমাবেশ অবশ্য প্রতিদিন হয় না।জাপানের স্কুলে শিক্ষা ছাড়াও নানারকম অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। যেমন খেলাধুলার প্রতিযোগিতা ও স্কুল উৎসব ইত্যাদি। এ রকম উৎসবের জন্য ছাত্রছাত্রীদের অনেক আগে থেকে তৈরি হতে হয়। তাই ওদের জন্য এসব হচ্ছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন। এর বাইরে স্কুল ভ্রমণও আছে। সেটা যেমন বনে ক্যাম্প করে থাকা কিংবা জাপানের অন্য শহর যাওয়া।এরপর আসছে মিডল স্কুলের কথা। জাপানে প্রাথমিক বিদ্যালয় শেষ হলে মিডল বা জুনিয়র হাইস্কুলে যেতে হয়। অনেকে সরকারি স্কুলে যায়। এর জন্য কোনো পরীক্ষা দিতে হয় না। তবে কেউ কেউ বেসরকারি স্কুলে যায়। সেরকম স্কুলে অবশ্য ভর্তি পরীক্ষার ব্যবস্থা আছে। মিডল স্কুল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো হলেও ভিন্ন কিছু দিকও সেখানে আছে, যার পরিচয় আমি এখানে দেব।মিডল স্কুল সকল ছাত্রছাত্রীর জন্য একই রকম কিছু ব্যবস্থা আছে। যেমন একই পোশাক এদের পরতে হয়, তবে ছেলেদের বেলায় ট্রাউজার হলেও মেয়েদের পরতে হয় স্কার্ট। এ ছাড়া নানারকম নিয়ম সেখানে মেনে চলতে হয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়েও নিয়মকানুন আছে, তবে মিডল স্কুলের নিয়ম হচ্ছে অনেক কঠোর। যেমন চুল রং করা নিষেধ এবং স্কার্ট যেন যথেষ্ট লম্বা হয় মেয়েদের সেদিকে খেয়াল রাখতে হয়।শিক্ষার বেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতোই বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে ছাত্রছাত্রীরা ক্লাসে যোগ দেয়। তবে একজন শিক্ষক সেখানে একটি ক্লাসে সব বিষয় শেখান না। প্রতিটি বিষয় বিশেষজ্ঞ শিক্ষক শিখিয়ে থাকেন। আর মিডল স্কুল থেকে লেখাপড়া শুরুর শিক্ষাও আছে, সেটা হচ্ছে ইংরেজি। প্রাথমিক বিদ্যালয়েও ইংরেজি শেখানো হয়, তবে মিডল স্কুলে ব্যাকরণের মতো আরও বিস্তৃত শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত।মিডল স্কুলে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা ছাত্রছাত্রীদের দিতে হয়। ছাত্রছাত্রীরা কোন হাইস্কুলে যাবে, সেই পরীক্ষার ফলাফলের ওপর তা নির্ভর করে। তাই তারা শেখার চেষ্টা সেখানে করে। সেই পরীক্ষা প্রতি সেমিস্টারে একটি কী দুটি হয়ে থাকে। আর মিডল স্কুল থেকে ক্লাব কাজকর্ম শুরু হয়। সেটা হচ্ছে খেলাধুলা, সংগীত আর শিল্পের মতো বিভিন্ন দিকে নিজেদের উৎসাহ অনুযায়ী ছাত্রছাত্রীদের সমবেত করা। যেমন ফুটবল, বাস্কেটবল, ব্রাশ ব্যান্ড-এ রকম ক্লাব স্কুলে আছে। সেখানে মজা করে ছাড়াও সামাজিকতাও ওরা শিখতে পারে। যেমন নিজের চেয়ে বয়সে বড় মানুষদের কীভাবে সম্মান করতে হয়, জাপানের সেই জ্যেষ্ঠতা ব্যবস্থার পাঠও সেখানে ওরা পায়। মিডল স্কুল শেষ করে অনেকে হাইস্কুলে গেলেও কেউ কেউ আবার কাজ করতে শুরু করে। হাইস্কুলে যাওয়ার জন্য সবাইকে পরীক্ষা দিতে হয়। কারণ হাইস্কুল বাধ্যতামূলক শিক্ষা নয়। স্কুল নিজের পছন্দের মতো ছাত্রছাত্রীদের বেছে নেয়। সে জন্যে তৃতীয় বর্ষের ছাত্রছাত্রীরা সেই পুরো এক বছরে পরীক্ষার জন্য বিভিন্ন বিষয় শেখার চেষ্টা করে।জাপানের স্কুল ব্যবস্থায় এ রকম নানারকম বৈশিষ্ট্য অনেক আছে। শিশুরা সেখানে দিনের অনেকটা সময় কাটায় এবং অনেক কিছু শিখতে পারে। আমার মনে হয় পরবর্তী জীবনে সেগুলো এদের জন্য খুবই উপকারী হয়ে দেখা দেয় বলে সেরকম শিক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
নাহো তানাকা: টোকিওর বিদেশ বিদ্যা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী

মাতৃভাষা নিয়ে লড়াই by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই ভাষা-সংখ্যালঘুদেরই করতে হয়। পাকিস্তান রাষ্ট্রে আমরা, অর্থাৎ বাঙালিরা সংখ্যাগুরু ছিলাম পরিসংখ্যানের বিচারে, ক্ষমতার বিচারে সংখ্যালঘু। সে জন্য ভাষা নিয়ে আমাদের সংগ্রাম করতে হয়েছিল। বাংলাদেশে বাঙালিরা সব অর্থেই গরিষ্ঠ, এখন মাতৃভাষা নিয়ে লড়াই করতে হচ্ছে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোকে। এর মধ্যে তাদের কিছু ভাষা হারিয়ে গেছে। বাকিগুলো থাকবে কি না, তা নির্ভর করছে রাষ্ট্রীয় সমর্থন, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং মাতৃভাষার প্রতি এই জাতিগোষ্ঠীগুলোর অঙ্গীকারের ওপর। আমরা আশা করব, এই ভাষার মাসে বিপন্ন মাতৃভাষাগুলোর প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতার কথাটা আমরা মনে রাখব। মাতৃভাষা নিয়ে এখন বাঙালিদের লড়াইয়ের চরিত্রটা পাল্টে গেছে। একটা সময় ছিল-স্বাধীনতার কিছুকাল পর পর্যন্তও-যখন বাঙালি মাত্রই ধরেই নিত, স্বাধীন বাংলাদেশে মাতৃভাষা হবে শিক্ষার মাধ্যম; এই ভাষায় সরকারি, বেসরকারি, বিচারিক সব কাজ করা হবে। এমনকি ব্যবসা-বাণিজ্যও বাংলাকে প্রধান মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করবে। স্বাধীনতার পর ৪৭ বছর চলে গেল-এখনো শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলার ব্যবহার সর্বজনীন নয়, উচ্চ আদালতের কাজকর্ম চলে ইংরেজিতে। ব্যবসা-বাণিজ্যের ভাষা, তথাকথিত করপোরেট ভাষা শুরু থেকেই ইংরেজি। সরকারি দপ্তরে বাংলার ব্যবহার আছে এবং সেটি প্রশংসনীয়, কিন্তু যথাযথ পরিভাষার অভাবে অনেক ক্ষেত্রেই ইংরেজির আবশ্যকতা থেকেই গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে মাতৃভাষায় কেন শিক্ষা দেওয়া হয় না, সেই প্রশ্ন তুললে বলা হয়, তাহলে বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় আমরা কোনো দিনই পেরে উঠব না। ভালো কথা, ইংরেজিতে পড়াশোনা করে আমরা বিশ্বকে হারাব, জ্ঞান-বিজ্ঞানের সব রাস্তায় হেঁটে আমরা মণিমাণিক্য কুড়াব। কিন্তু তা তো আর হয়নি। প্রকৃত অবস্থাটা হলো, আমরা ইংরেজিতে অতিশয় দুর্বল। যদি বুঝতাম ইংরেজিটা তেমন না শিখতে পারলেও বাংলা নিয়ে কোনো সমস্যা নেই, তাহলেও হতো। কিন্তু এখানেও বাস্তবতা ভিন্ন। মাতৃভাষায় নির্ভুলভাবে লেখা ও বলার ক্ষেত্রে আমাদের সামর্থ্য হতাশাজনক। মাতৃভাষা নিয়ে আমাদের লড়াইটা এখন আর এর অধিকার প্রতিষ্ঠাতেই সীমাবদ্ধ নয়। লড়াইটা এর যথাযথ শিখন, ব্যবহার ও চর্চা এবং এর বিকাশ নিয়েও। বাংলা এখন ভয়ানক মিশ্র একটি ভাষা। সব ভাষাই কমবেশি মিশ্র ভাষা, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু ভাষার অনেক রূপের মধ্যে একটি থাকে যা ব্যবহৃত হয় এর সৃজন ও মননশীল কল্পনা প্রকাশে। এই ভাষাটি সাহিত্য, বিজ্ঞান ও দর্শন সাধনা ও উন্নত চিন্তার প্রকাশের মাধ্যম। এর বাইরে আঞ্চলিক ভাষা থাকে, কথ্য ভাষা থাকে, খিস্তিখেউড়ের এবং চৌরাস্তার ভাষা থাকে। গণমাধ্যমও ভাষা তৈরি করে। তাতে তো সমস্যা নেই। কিন্তু যদি একটার সঙ্গে আরেকটা লেপ্টে যায়, জট বেঁধে যায় জ্ঞান প্রকাশের ভাষার সঙ্গে চৌরাস্তার ভাষার, তাহলে তো বিপদ। বিপদ আসে ভাষার ছয় আনা ইংরেজি শব্দের দখলে চলে গেলে। অনেকে অবশ্য এসবকে বিপদ মানতে রাজি নন। বলেন, এটিই স্বাভাবিক। যদি স্বাভাবিকই হয়ে থাকে, তাহলে এই দায়টা শুধু বাংলার কেন? এই ‘স্বাভাবিক’-এর প্রকাশ ইংরেজি বা স্প্যানিশ ভাষায় দেখি না কেন? চৈনিক ভাষায় এই স্বাভাবিকতা নেই কেন? ইংরেজি ভাষাটা আমাদের শিখতে হবে, যেহেতু বৈশ্বিক বাস্তবতা এটি শেখার পক্ষে।
কিন্তু বাংলার জায়গাটা যেন ইংরেজির হাতে আমরা ছেড়ে না দিই; এবং আরও গুরুত্বপূর্ণ যা, বাংলার বিশেষণ ও ক্রিয়াপদকেও যেন ইংরেজির হাতে তুলে না দিই। একই কথা খাটে আরবি, স্প্যানিশ বা ফরাসি ভাষারÿ ক্ষেত্রে। আমি একটি ভাষায় অন্য একটি ভাষার অনেক শব্দ অনিবার্যভাবে ঢুকে পড়াকে স্বাভাবিক বলি এবং এগুলো জোর করে বের করার প্রচেষ্টাকে অস্বাভাবিক বলি। একসময় পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষিতজনেরা বাংলা থেকে আরবি-ফারসি শব্দ বের করে দিয়েছিলেন। এতে বাংলা দুর্বল হয়েছিল। বাংলায় প্রতিবছরই নতুন বিদেশি শব্দ ঢুকবে কিন্তু সেগুলো হবে মূলত বিশেষ্য শব্দ এবং এতে বাংলা ভাষার মূল কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, অথবা প্রচলিত বাংলা শব্দকে এগুলো বিদায় করে দেবে না। আমি যাকে স্বাভাবিক বলতে রাজি নই, তা ভাষা নিয়ে অরাজকতা। একটি নির্ভুল বাক্য বলতে বা লিখতে না পারা, অকারণে ইংরেজি শব্দের দ্বারস্থ হওয়া, ইচ্ছা করেই ভাষাকে বিকৃত করা-এসব আমাকে হতাশ করে। আমি বিশ্বাস করি, কোনো ভাষা ব্যবহারকারীর ভাষায় যদি একটা নান্দনিক শৃঙ্খলা না থাকে, তার চিন্তাতেও শৃঙ্খলা আসবে না। একজন টিভি প্রতিবেদক যখন একটি সামান্য বিষয় বর্ণনা করতে গিয়ে ‘কিন্তু’ এবং ‘আসলে’র আক্রমণে তার বাংলাকে দুর্বল করে ফেলেন, দেখা যায় দুই মিনিটেও তিনি মূল কথাটিই বলতে পারছেন না। এ রকম কেন হবে? ভাষার মাসে আমি ভাষার সব রূপের বিকাশ চাই। স্বাস্থ্যবান মাতৃভাষা চাই, যা পরনির্ভর এবং অসুখপ্রবণ নয়, যার ভেতরের গানটা সুর-তাল হারাবে না। ভাষার মাস শুরু হয় বইমেলার দ্বারোদ্ঘাটন দিয়ে। আমাদের দেশে একসময় বই পড়ার একটা সংস্কৃতি ছিল। দৃশ্যমাধ্যমের প্রাবল্যে তা দুর্বল হয়েছিল। এখন মনে হচ্ছে, তা যেন ফিরে আসছে। বইমেলা বই পড়ার চর্চা বাড়ায়। এখন সারা দেশে সারা বছর বইমেলা হয়। অনেকে বলেন, প্রতিবছর ছাপানো বইয়ের সংখ্যা বাড়ছে বটে, কিন্তু মান কি বাড়ছে? আমি বলি বই যে ছাপা হচ্ছে, এ বিষয়টাকেই আমরা প্রথম উদ্যাপন করব। একটি বইয়ের মান আছে কি নেই, তা ঠিক করবেন পাঠক। পাঠকের হাতে এই দায় ছেড়ে দেওয়া যায়। ভাষা ব্যবহারের প্রথম তালিমটি একটি সন্তান পায় তার মা, বাবা অথবা পরিবারের অন্য কারও থেকে। তারপর স্কুলে। এই দুই জায়গাতেই এখন একটি অভাব দেখা দিয়েছে। পরিবারের ক্ষেত্রে অভাবটা সময়ের অথবা ইচ্ছার অথবা সামর্থ্যের, স্কুলেরÿ ক্ষেত্রে সুযোগের। এখন যে পরীক্ষাপ্রবণ, মুখস্থপ্রধান শিক্ষাব্যবস্থা চালু হয়েছে, তাতে একজন শিক্ষার্থীর পক্ষে সৃজনশীল ভাষা ব্যবহারের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। এখন মুখস্থ চর্চাই নিয়ম। শিক্ষকেরা এই নিয়মের বাইরে যেতে চান না। যে শিক্ষাব্যবস্থা কল্পনাশক্তিকে জাগায় না, মনের দরজা-জানালাগুলো খুলে দেয় না, শিক্ষার্থীর ভেতর তার চারপাশ ও বিশ্বকে নিয়ে কৌতূহল জাগায় না, সেই শিক্ষাব্যবস্থায় ভাষাচর্চাও হবে ধরাবাঁধা। সেটি সবল এবং সৃজনশীল হবে, তেমন ভাবার কারণ নেই। ভাষার মাসে শিক্ষা নিয়েও লড়াই করার একটা অঙ্গীকার আমাদের করতে হবে।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক।

ভাঙা সেতু জোড়া লাগানোর চেষ্টা by রস ডৌথাট

প্রেসিডেন্সির প্রথম বছরে নীতিগত বিষয়ে ট্রাম্পের অবস্থান খুবই সোজাসাপটা ছিল। ব্যাপারটা হলো, প্রার্থী হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প রিপাবলিকান পার্টির মনোনয়ন ও হোয়হাইট হাউস জয়ের জন্য রক্ষণশীলদের গোঁড়ামি উপেক্ষা করেছিলেন। নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার জন্য তিনি মানুষকে হাতে চাঁদ পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই প্রার্থী এমন এক প্রেসিডেন্টে পরিণত হলেন, যিনি জনতুষ্টিবাদী নির্বাচনী প্রচারণার ধারায় বাহিত হয়ে পল রায়ান ও মিচ ম্যাককনেলের হাতে নিজের অ্যাজেন্ডার নিয়ন্ত্রণ তুলে দিয়েছেন। 
অন্যদিকে তাঁর হাতে যে সীমিত রাজনৈতিক পুঁজি ছিল, তা দিয়ে তিনি প্রথাগত ডানপন্থী নীতি প্রণয়নের চেষ্টা করেছেন। স্বাস্থ্যসেবায় পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে তিনি অতটা সফল না হলেও করের বেলায় তিনি সফল। কিন্তু কোনো বেলায়ই তিনি মধ্যপন্থী বা দ্বিদলীয় সমর্থন পাননি। নানা কারণেই অত্যন্ত অজনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প প্রথম স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন বক্তৃতা দিলেন। মার্কিন দেশের অর্থনীতি মোটামুটি শক্তিশালী হলেও নির্বাচনের জনতুষ্টিবাদী প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থতা তাঁকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। সে কারণে এই বক্তৃতাকে তাঁর সমঝোতার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যায়। ভবিষ্যবাচ্য গোঁড়া আদর্শবাগিশ না হয়ে তিনি নিজেকে মধ্যপন্থী চুক্তি সম্পাদনকারী হিসেবে হাজির করলেন। প্রথম বছরে আইনি পরিবর্তনে নিজের ব্যর্থতা পেছনে রেখে তিনি মানুষ যে ফুলে তুষ্ট সেই ফুলেই তাকে পূজা দেওয়ার রীতিতে ফিরে গেলেন। কর হ্রাস নীতির সাফাই গাইলেও ট্রাম্প কার্যত ওবামাকেয়ার বাতিলে ভবিষ্যৎ চেষ্টার সম্ভাবনা নাকচ করে দিলেন। তবে তিনি ঘাটতি হ্রাস বা ব্যয় হ্রাস প্রসঙ্গে কথা বলেননি। হাউস স্পিকারের প্রিয় বিষয় অধিকারবিষয়ক সংস্কার নিয়েও কথা বলেননি তিনি। অভিবাসন বিষয়ে পুরোনো অবস্থান পরিবর্তন এবং বিচার বিভাগের নিয়োগে সায় দিলেও বক্তৃতায় তিনি শুধু পতাকা, বিশ্বাস, পরিবার প্রভৃতি সাধারণ বিষয়ে রক্ষণশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। আর গর্ভপাতের মতো মেরুকরণ সৃষ্টিকারী বিষয়ে তিনি শুধু আকারে-ইঙ্গিতে কথা বলেছেন। আর ইসলামিক স্টেট, উত্তর কোরিয়া ও গুয়ানতানামো বে ছাড়া পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে এই বক্তৃতা লক্ষণীয়ভাবে শূন্যগর্ভ ছিল। আর তাঁর যুক্তরাষ্ট্রই প্রথম নীতির মাজেজা হলো, শত্রু ছাড়া মার্কিন উপকূলের বাইরে আর কারও নাম মুখে না আনা। আর অভ্যন্তরীণ নীতির ক্ষেত্রে ২০২০ সালের নির্বাচনে বার্নি স্যান্ডার্স বেশ কিছু বিষয়ে প্রচারণা চালাতে পারেন: প্রেসক্রিপশনের ওষুধের দাম কমানো, অবকাঠামো খাতে দেড় লাখ কোটি ডলার ব্যয়, বেতনসহ পারিবারিক ছুটি। এগুলো কিন্তু রক্ষণশীল ধারণা নয়, খুবই জনপ্রিয়।
আমি ধারণা করি, এই অর্থে বক্তৃতাটি কার্যকর হয়েছে। এতে হয়তো ট্রাম্পের অনুমোদন হার সাময়িকভাবে ৩৮ শতাংশের ওপরে উঠে যাবে। কিন্তু কার্যকর বক্তৃতা আর কার্যকর অ্যাজেন্ডা এক জিনিস নয়। আর এই মুহূর্তে ট্রাম্পের জনপ্রিয় ধারণাগুলো কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাঁর দলের আদর্শবাগীশরা তাঁকে চান না। এমনকি সমর্থনলাভের জন্য ট্রাম্প তাঁদের সঙ্গে চুক্তি করুন, সেটাও তাঁরা চান না। অন্যদিকে তিনি যে বাগাড়ম্বর করলেন, হোয়াইট হাউস তার সমর্থনে নথিপত্রও দেখাতে পারবে না। এই ভাবনাগুলো প্রেসিডেন্ট সম্ভবত বাস্তবায়ন করতে চান, এর বেশি কিছু নয়। তিনি হয়তো একসময় এসব ভুলে যাবেন বা কংগ্রেস কখনো তা গ্রহণ করবে না। এ ক্ষেত্রে একমাত্র ব্যতিক্রম হচ্ছে অভিবাসন, যে ব্যাপারে তাঁর হাতে কিছু বিস্তারিত পরিকল্পনা আছে। একই সঙ্গে তিনি আবার অভিবাসীদের অপরাধের বিবরণ দিলেন। সে কারণে তাঁর প্রতিশ্রুতির ওজন কমে গেল। মার্কিন দেশের অভিবাসন নীতি ডেফার্ড অ্যাকশন ফর চাইল্ডহুড অ্যারাইভাল সম্পর্কে তিনি চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছেন, তা মূলত ভবিষ্যতে অভিবাসন হ্রাসের বিনিময়ে এই মুহূর্তে নাগরিকত্বের প্রস্তাব। আর ডেমোক্র্যাটরা মনে করেন, এমন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দর-কষাকষি করে লাভ কী, যিনি মনে করেন যে অভিবাসীদের অর্ধেকই সংঘবদ্ধ অপরাধী? অর্থাৎ এই স্টেট অব ইউনিয়ন বক্তৃতায় বোঝা যাচ্ছে, ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির অধিকতর সফল রূপটি কেমন হবে, যদিও তিনি অনেক বিষয়েই রক্ষণশীল কিন্তু প্রকৃতপক্ষে জনতুষ্টিবাদী। ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির দ্বিতীয় বছর প্রথম বছরের তুলনায় অধিক সফল হতে পারে-এমন ধারণাও আছে। কিন্তু সেটা বাস্তবায়ন করার মতো পরিকল্পনার অভাব আছে। ট্রাম্প যে সেতু পুড়িয়ে দিয়েছেন, সেই সেতু আবার গড়বেন, তেমন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সাময়িকভাবে জরিপের ফলাফলে ভালো করা ছাড়া এর ভিন্ন উদ্দেশ্য নেই। এখন থেকে ২০২০ সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত যেটা শোনা যাবে তা হলো, আপনি যদি এই অর্থনীতি পছন্দ করেন, তাহলে তাঁকেও আপনার পছন্দ করতে হবে। রাজনীতিকেরা এই ধরনের বার্তা দিয়ে পুনরায় নির্বাচনে জিতেছেন। কিন্তু তাঁদের মধ্যে খুব কম প্রেসিডেন্টকেই সাধারণ পছন্দ-অপছন্দ অর্জন করতে এত কিছু করতে হয়েছে, যেটা ডোনাল্ড ট্রাম্প করেছেন।
অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন, নিউইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া।
রস ডৌথাট, মার্কিন কলাম লেখক।

সিরিয়া যুদ্ধে নতুন সমীকরণ

নতুন মেরুকরণ শুরু হয়েছে সিরিয়া নিয়ে। গত সপ্তাহে বড় ধরনের মোড় নিয়েছে সিরিয়া ইস্যু। একদিকে সিরিয়াভিত্তিক কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদী মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে ক্রসবর্ডার সামরিক অভিযান শুরু করেছে তুরস্ক। সিরিয়ার অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে সেখানে তুরস্কবিরোধীদের শক্তি বৃদ্ধির সুযোগ দিতে চায় না আঙ্কারা। ইতোমধ্যে এই অভিযানে তারা হত্যা করেছে অনেক পিকেকে মিলিশিয়াকে। অন্য দিকে, রাশিয়ার সোচিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে সিরিয়ার সঙ্ঘাত নিরসনের লক্ষ্যে রাশিয়ার উদ্যোগে আয়োজিত সংলাপ, যা কংগ্রেস অব দ্য সিরিয়ান ন্যাশনাল ডায়ালগ নামে পরিচিত। শুরু হওয়ার আগেই অবশ্য বিভিন্ন কারণে এই সংলাপ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন বিশ্লষকেরা। এই দু’টি বিষয়ের মধ্যে নিহিত রয়েছে সিরিয়া সঙ্ঘাতের নানা সীমকরণ। সিরিয়ার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, পরাশক্তির দ্বন্দ্ব আর সেই সাথে আঞ্চলিক রাজনীতি জড়িয়ে আছে এর সাথে। একটির সাথে রয়েছে আরেকটি নেপথ্য সংযোগ। তুরস্ককে সিরিয়ার অভ্যন্তরে অভিযান চালাতে নীরব সমর্থন দিচ্ছে রাশিয়া, বিনিময়ে তারা চেয়েছে সোচি সংলাপে আঙ্কারার সমর্থন। তুরস্কের স্বার্থ নিজের সার্বভৌমত্ব সুরক্ষিত করা আর রাশিয়া চাইছে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সবচেয়ে বড় মিত্র বাশার আল আসাদের আধিপত্য বজায় রেখে সিরিয়ায় স্থিতিশীলতা আনতে। দু’টি ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রকে উপেক্ষা করা হয়েছে। তাই বিষয়টি আরো জটিল থেকে জটিলতর হবে বলে আশঙ্কা হচ্ছে। সঙ্ঘাত নিরসনের লক্ষ্যে সোচি সংলাপ আয়োজনের কথা বলা হলেও এই সংলাপ সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন করবে বলে ধারণা করা হয়েছিল। যার কিছু নমুনা পাওয়াও গেছে। কৃষ্ণসাগর তীরবর্তী রাশিয়ার সোচি নগরীর এক রিসোর্টে যে উদ্দেশ্যে মিলিত হওয়ার কথা বিভিন্ন পক্ষের, তা নিয়েও ছিল মতভেদ।
সিরিয়া ইস্যুতে রাশিয়া চাইছে জাতিসঙ্ঘের উদ্যোগকে পাশ কাটিয়ে যেতে। জাতিসঙ্ঘ অনেক দিন ধরেই জেনেভায় সিরিয়া নিয়ে সংলাপ আয়োজন করছে, যেটি মূলত বাশার সরকারের জন্য নেতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে। আর সে জন্যই মস্কো উদ্যোগ নিয়েছে পাল্টা শান্তি প্রক্রিয়ার। মস্কোর সব উদ্যোগের নেপথ্যে যে বাশার আল আসাদের ক্ষমতা সুসংহত করার, সেটি আর বলার অপেক্ষা রাখে না।জাতিসঙ্ঘের উদ্যোগটি মস্কোর জন্য দু’টি কারণে নেতিবাচক। এই পরিকল্পনা সফল হলে বা এই পথে সিরিয়ায় শান্তিপ্রক্রিয়া শুরু হলে তাতে বাশার আল আসাদকে নিশ্চিতভাবেই বিদায় নিতে হবে। আর দ্বিতীয় কারণ হচ্ছেÑ জাতিসঙ্ঘের প্রক্রিয়া অলিখিতভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছা-অনিচ্ছার প্রাধান্য থাকবে। যেটি রাশিয়ার জন্য এক অর্থে মর্যাদার লড়াই। ভøাদিমির পুতিনের শাসনামলে রাশিয়া আগের চেয়ে অনেকগুণ সুসংহত। সাম্প্রতিক কয়েক বছরের বিশ্ব রাজনীতিতেও বিষয়টির প্রভাব পড়েছে। তাই জাতিসঙ্ঘের মোড়কে মার্কিন সমাধান তারা মানতে চাইবে না সেটি স্বাভাবিক। এ দু’টি কারণেই হয়তো পুতিনের বিকল্প শান্তি আলোচনার উদ্যোগ। জাতিসঙ্ঘের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত শান্তি আলোচনা ইতোমধ্যেই কয়েক ধাপ পার করেছে। এমন অবস্থায় সেটিকে পাশ কাটিয়ে নতুন আরেকটি উদ্যোগ এই প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করবে। বাশারকে টিকিয়ে রাখতে মরিয়া পুতিন প্রশাসন তাই বিকল্প পথে হাঁটতে শুরু করেছে। বিষয়টিতে পুরোপুরিই এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। অনেকেই বলছেন, সোচি সংলাপে বাশার আল আসাদকে ক্ষমতায় রেখেই নতুন সংবিধান প্রণয়ন ও নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে জোর দিয়েছে রাশিয়া। সংলাপ কতটা সফল হয়েছে বা আদৌ হয়েছে কি না, সেটি স্পষ্ট হতে কয়েকদিন সময় লাগবে। তবে এ পর্যন্ত যা জানা গেছে, তাতে সফলতার পাল্লা শূন্য। সিরিয়ান নেগোসিয়েশন কমিটি নামের প্রধান বিদ্রোহী গ্রুপটি গত সপ্তাহে ভিয়েনা সংলাপের পরই জানিয়ে দিয়েছে তারা সোচি সংলাপে অংশ নেবে না। আলোচনায় অংশ নিতে আসা সিরিয়ার বিদ্রোহীদের আরেকটি গ্রুপ সোচি বিমানবন্দর থেকেই বের হতে চায়নি। সেখান থেকেই তারা ফিরতি ফ্লাইটে রাশিয়া ত্যাগ করার চেষ্টা করে। কারণ বিমানবন্দরেই তারা দেখেছে, সোচি সংলাপের প্রচার-প্রচারণায় সর্বত্র সিরিয়ার সরকারের পতাকা শোভা পাচ্ছেÑ যা মূলত বাশার সরকারের প্রাধান্যকেই ইঙ্গিত করে। তা ছাড়া তুরস্কের সীমান্তবর্তী কুর্দি অঞ্চলের বিদ্রোহীরা তুর্কি অভিযানের প্রতিবাদে আলোচনায় যোগ দেয়নি। যুক্তরাষ্ট্রকে উপেক্ষা করলেও এ ক্ষেত্রে রাশিয়া পাশে পেয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এই সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় তুরস্ককে। সিরিয়ার সাত বছরের গৃহযুদ্ধে বিদ্রোহীদের সমর্থন দিচ্ছে তুরস্ক। তারা চেষ্টা করেছে বিদ্রোহী গ্রুপগুলোকে সোচি আলোচনায় অংশ নেয়াতে। এর পেছনে রয়েছে কয়েকটি বিষয়। সবচেয়ে বড় কারণটি হলো সিরিয়ায় সামরিক অভিযানে রাশিয়ার মৌন সমর্থন। কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সশস্ত্র সংগঠন পিকেকের বিরুদ্ধে তুরস্কের লড়াই বেশ পুরনো। পৃথক কুর্দি ভূখণ্ডের দাবিতে তারা আন্দোলন করলেও তাদের সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হচ্ছে বেসামরিক নাগরিকরা। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে সিরিয়ার কুর্দি অধ্যুষিত অঞ্চল আফরিন ও মানবিজে একটি কুর্দি সশস্ত্র মিলিশিয়াগোষ্ঠী গঠনের চেষ্টার কথা জানার পরই তা আঁতুড়ঘরে ধ্বংস করে দিতে সামরিক অভিযান চালায় তুরস্ক। সীমান্ত এলাকায় নতুন করে কুর্দিরা সশস্ত্র হলে তা তুরস্কের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হয়ে দেখা দেবে। যে কারণে নিজ ভূখণ্ডের সুরক্ষায় তৎপর তুরস্ক বিষয়টিকে আর বাড়তে দিয়ে ঝুঁকি নিতে চায়নি। ‘অলিভ ব্রাঞ্চ’ নামে সামরিক অভিযান শুরু করেছে সেনা ও বিমানবাহিনী। সিরিয়ায় কুর্দি মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে তুরস্কের অভিযান চলছে এমন একটি সময়, যখন দেশটিতে রয়েছে রাশিয়ার সরাসরি উপস্থিতি। বাশার সরকারের দেশ পরিচালনা বিশেষ করে নিরাপত্তার বিষয়টি অনেকটাই রাশিয়ানির্ভর। তাই এমন সময়ে সে দেশে ঢুকে তুরস্কের অভিযান কিছুতেই রাশিয়ার সম্মতি ছাড়া সম্ভব নয়। তুরস্ক পিকেকেবিরোধী অভিযানে ব্যবহার করছে সিরিয়ার আকাশসীমা, যেটি পুরোপুরিই রাশিয়ার অধীন। রাশিয়ার বিমানসেনারা সরাসরি যুদ্ধ করছে দেশটিতে ঘাঁটি গেড়ে। ধারণা করা হচ্ছে, তিনটি কারণে রাশিয়া সমর্থন দিচ্ছে তুরস্কের সামরিক অভিযানে। এক. মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দেশ ও ন্যাটো সদস্য তুরস্কের সাথে সম্পর্কোন্নয়ন। যাদের সাথে মিত্রতাই রাশিয়ার জন্য লাভজনক। দুই. সোচি সংলাপ সফল করতে তুরস্কের সহযোগিতা ও সর্বশেষ তুরস্ক থেকে রাশিয়া পর্যন্ত গ্যাসপাইপ লাইন নির্মাণ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন। কুর্দিদের একটি অংশের সাথে রাশিয়ার সুসম্পর্ক রয়েছে। কুর্দিবিরোধী তুর্কি অভিযানে সমর্থন দেয়ার কারণে তারা ক্ষুব্ধ হয়েছে মস্কোর ওপর। কুর্দিদের পিপলস প্রটেকশন ইউনিটের (ওয়াইপিজি) কমান্ডার জেনারেল সিপান হেমো রাশিয়ার এই আচরণকে সরাসরি বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। রাশিয়া তার কুর্দি মিত্রদের তুলনায় সিরিয়ায় নিজের প্রভাব ধরে রাখা এবং বাশারকে টিকিয়ে রাখার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছে। অর্থাৎ বড় মিত্রকে বাঁচাতে ছোট মিত্রকে বিসর্জন দিয়েছে। যেমনিভাবে তুরস্ক সবার আগে দেখছে তার জাতীয় নিরাপত্তাকে। সোচি সংলাপে সিরিয়ার বিদ্রোহীদের দাবির যথাযথ বাস্তবায়ন হওয়ার সম্ভাবনা না থাকলেও তুরস্ক তার সার্বভৌমত্বের বিষয়টিতে কোনো আপস করতে চাইছে না। আর রাশিয়ার সম্মতি ছাড়া সিরিয়ায় সামরিক অভিযান চালানোও সম্ভব নয়। একদিক থেকে এটি তুরস্কের একটি বড় অর্জন যে, রাশিয়া তাদের সুযোগ দিয়েছে সিরীয় কুর্দি মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে। অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উদ্বেগের বিষয় হবে তুরস্ক ও রাশিয়ার এই সামরিক সমঝোতা। তুরস্ক আফরিন ও মানবিজকে নিরাপদ করতে পারলে সেটি সিরীয় উদ্বাস্তুদের জন্যও হবে আশাব্যঞ্জক। ওই দু’টি এলাকার কয়েক লাখ উদ্বাস্তু ইতোমধ্যেই দেশে ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে, যারা গৃহযুদ্ধের সময় আশ্রয় নিয়েছে তুরস্কে। পুরো বিষয়টির আরো একটি অধ্যায় রয়ে গেছে। সেটি হলো যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা। যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই মধ্যপ্রাচ্যের কুর্দিদের সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। পেন্টাগন নানাভাবেই তাদের সামরিক সহযোগিতা করে; কিন্তু তুরস্কের এই অভিযানের মুখে তারা কুর্দি মিত্রদের বাঁচাতে কোনো পদক্ষেপই নিচ্ছে না। এর আগে বাশার সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের বিজয়ী করতে পারেনি তারা। এবার কুর্দিরাও এই বার্তা পেল, ওয়াশিংটন তাদের বাঁচাতে সক্ষম নয়। ফলে সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আরো দুর্বল হয়ে যেতে পারে। সাত বছর আগে সরকারবিরোধী আন্দোলন কিংবা গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার দাবিতে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা এখন পুরোপুরিই পরাশক্তিগুলোর ছায়াযুদ্ধে রূপ নিয়েছে। যার ফলে প্রতিনিয়ত আরো দূরে সরে যাচ্ছে সিরিয়ার রাজনৈতিক সমাধানের স্বপ্ন। পুতিনের সমাধানের উদ্যোগ হয়তো সফল হচ্ছে না বা হলেও সেটি বাশার সরকারের অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন করবে। যার অর্থ, সেই বাশারের স্বৈরশাসন বহাল থাকা। আবার জাতিসঙ্ঘের শান্তির উদ্যোগ নিয়েও আশাবাদী হওয়ার মতো কিছু এখনো তৈরি হয়নি।

সিরিয়ায় তুর্কি বাহিনীকে রাশিয়ার মদত

গত ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে সিরিয়ার আফরিন প্রদেশে বিমান ও স্থল হামলা শুরু করেছে তুরস্ক। ‘অলিভ ব্রাঞ্চ’ নামে ওই অভিযানের লক্ষ্য সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশটির কুর্দি মিলিশিয়াদের ঘাঁটি নিশ্চিহ্ন করা। অভিযানের মাত্রা ক্রমেই বাড়ছে। তুর্কি বাহিনী এগিয়ে যাচ্ছে সিরিয়ার ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে। সিরিয়ায় এরকম একটি সামরিক অভিযান যে রাশিয়ার সম্মতি ছাড়া হতে পারে না সে ব্যাপারে অনেকেই নিশ্চিত। প্রথম কথা হচ্ছে, এই অভিযানের জন্য তুর্কি বিমানবাহিনীকে প্রবেশ করতে হচ্ছে সিরিয়ার আকাশসীমায়। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে বাশার আল আসাদের সরকারের পক্ষে সরাসরি যুদ্ধ করতে দেশটিতে আছে রাশিয়ার বিমান সেনাদের বড় একটি দল। তাই রাশিয়ার সম্মতি ছাড়া সিরিয়ার আকাশসীমায় তুর্কি বিমান প্রবেশ করা সম্ভব নয়। তদুপরি আফরিনের তুর্কি সমর্থিত ফ্রি সিরিয়ান আর্মিকে নতুনভাবে পরিচালিত করার জন্য আঙ্কারাকে রাশিয়ার কাছ থেকে এই নিশ্চয়তা পেতে হবে যে বাশার সরকার এই পরিস্থিতির সুবিধা নেবেন না এবং ইদলিবে তুর্কি নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলোও দখল করতে চেষ্টা করবে না। সিরিয়ার কুর্দি ও আরবদের যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত মিত্র সিরিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ফোর্সও (এসডিএফ) জানে যে, মস্কোর সাথে সমঝোতা ছাড়া তুরস্ক কিছুতেই অপারেশন অলিভ ব্রাঞ্চ শুরু করতে পারে না। যে কারণে এই গ্রুপটি মস্কোর ওপর ুব্ধ হয়েছে। এই বাহিনীর অংশ কুর্দিদের সশস্ত্র সংগঠন ওয়াইপিজি সরাসরিই মস্কোর এই মনোভাবকে কুর্দিদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। অপারেশন অলিভ ব্রাঞ্চের পরিকল্পনা হয়েছিল গত গ্রীষ্মে ইস্তাম্বুলে রাশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শোইগু ও তুর্কি সেনাপ্রধান হুলুসি আকারের বৈঠকে। সে সময়ই তুরস্ককে সিরিয়ার আকাশসীমা আংশিক ব্যবহারের অনুমতি দেয় রাশিয়া। মূলত এর ফলেই তুরস্কের অভিযানের পথ সুগম হয়।
এক মাস ধরে আঙ্কারা সিরীয় সীমান্তের কাছে তার শক্তি বৃদ্ধি শুরু করে। তুর্কি অভিযানে মস্কোর সম্মতির বিষয়টি আবারো প্রকাশ হয় যখন এই অপারেশন শুরুর দিনেই রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় আফরিন থেকে তাদের সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়। রাশিয়া এই ইস্যুতে তুরস্কের সাথে সমঝোতা করেছে নিজেদের স্বার্থেই। কুর্দিদের সাথে মস্কোর সম্পর্ক কখনোই দীর্ঘ মেয়াদি ছিল না। বিভিন্ন ইস্যুতে মস্কো কুর্দি কার্ড ব্যবহার করেছে নিজেদের স্বার্থে। বিশেষ করে তুরস্কের সাথে কোনো সমঝোতার বিষয়ে। কুর্দিরা তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকা বাশার সরকারের হাতে তুলে দেয়ার রুশ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। ওয়াশিংটনও তাদের মিত্র কুর্দিদের রক্ষা করতে এগিয়ে আসছে না। কাজেই রাশিয়া সুযোগ পেয়েছে মিত্রদের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতারণামূলক চরিত্র তুলে ধরার। রাশিয়ার সোচিতে সিরিয়া নিয়ে যে শান্তি আলোচনা শুরু হয়েছে সেটি সফল করতে হলে তুরস্কের সহযোগিতা দরকার মস্কোর। এই সম্মেলন সফল করে পুতিন তার আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ভোটারদের কাছে শান্তির বার্তাবাহক হিসেবে নিজের ইমেজ তৈরি করতে চাইছেন। এ ছাড়া তুরস্কের সহযোগিতা নিয়ে সিরিয়ার বিদ্রোহীদের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি ইদলিব ইস্যুতে বিনা যুদ্ধে সমঝোতায় পৌঁছতে চাইছেন পুতিন। রাশিয়া জানে এখানে সঙ্ঘাত হলে সেটি সিরিয়ার সরকারের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। সর্বশেষ বিষয় হচ্ছে, রাশিয়ার সাথে তুরস্কের আরেকটি দরকষাকষির বিষয় হলো গ্যাস পাইপলাইন। তুরস্ক থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস পেতে মস্কো খুবই আশাবাদী। এসব কারণেই কুর্দিবিরোধী অভিযানে তুরস্ককে সমর্থন দিচ্ছে রাশিয়া।

ভারতে নব-বধূদের কুরারিত্ব পরীক্ষা

হিন্দুদের পুরাণ 'রামায়ণ'-এ সীতাকে অগ্নি পরীক্ষা দিতে হয়েছিল। অনেক সীতাকে এখনো দিতে হয় অনেকটা সেইরকমই 'অগ্নি পরীক্ষা'। সীতাদের নাম হয়তো বদলে গিয়ে কোথাও হয়েছে অনিতা বা অন্য কিছু। ঘটনাও 'রামরাজ্য' অযোধ্যার পরিবর্তে হয়েছে মহারাষ্ট্রের কঞ্জরভাট নামে আদিবাসীদের সমাজ। ওই সমাজের সদ্য বিবাহিত নারীদের পরীক্ষা দিয়ে প্রমাণ করতে হয় যে বিয়ের দিন পর্যন্ত তাদের কৌমার্য বজায় আছে। নবদম্পতির বিছানায় পাতা সাদা চাদরে রক্তের দাগ লাগলেই পাওয়া যায় প্রমাণ। তবেই সমাজ মেনে নেয় যে বিয়ের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। আর নিজের কৌমার্য প্রমাণে ব্যর্থ হলে নববধূর কপালে জোটে জুতোপেটা, অথবা বের করে দেয়া হয় শ্বশুরবাড়ি থেকে। "আমি তখন বেশ ছোট। বছর ১২ বোধহয় বয়স। একটা বিয়ে বাড়িতে গিয়ে দেখেছিলাম যে নববধূকে অনেক লোকে মিলে জুতাপেটা করছে। বুঝতেই পারিনি কেন মারছে সবাই মিলে ওই নতুন বউকে। কিছুটা বড় হয়ে গোটা বিষয়টা পরিষ্কার হয় আমার কাছে। সদ্য বিবাহিতা ওই নারী আসলে কৌমার্যের পরীক্ষায় পাশ করতে পারেননি," বিবিসিকে বলছিলেন মারাঠি যুবক বিবেক তামাইচিকার। আর যাতে কোনো নববধূকে বিয়ের পরেই কৌমার্যের পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়ে জুতাপেটা না খেতে হয়, তার ব্যবস্থা করতে গিয়ে কয়েক দিন আগে বিবেক আর তার কয়েকজন বন্ধু নিজেরাই মার খেয়ে এসেছেন। এই প্রথা বন্ধের উদ্দেশ্যে সামাজিক মাধ্যমে প্রচার চালাচ্ছেন বিবেক। 'স্টপ দা ভি রিচুয়াল' নামে একটা হোয়াটস্ অ্যাপ গ্রুপও হয়েছে, যেটির ৬০ জন সদস্যের অর্ধেকই নারী। 'ভি রিচুয়াল' অর্থ ভার্জিনিটি রিচুয়াল, বা কৌমার্য পরীক্ষা। পুণে শহরে একটা বিয়েবাড়িতে বিবেক আর তার কয়েকজন বন্ধু এই কৌমার্য পরীক্ষা বন্ধের স্বপক্ষে প্রচার চালাতে গিয়েছিলেন। সেখানেই কঞ্জরভাট সম্প্রদায়ের মানুষজন মারধর করেন। পুলিশ সেখান থেকে চল্লিশ জনকে গ্রেপ্তারও করেছে। ছোট আকারে প্রকাশিত সেই সংবাদটা দেখেই খোঁজখবর করতে গিয়ে জানা গেল যে কৌমার্য পরীক্ষার মতো একটা মধ্যযুগীয় বর্বর প্রথা এখনও চলছে। কীভাবে নেয়া হয় কৌমার্যের পরীক্ষা? বিয়ের ধর্মীয় রীতি রেওয়াজ শেষ হওয়ার পরে নববিবাহিত দম্পতিকে একটা হোটেলের ঘরে পাঠানো হয়, সঙ্গে দেয়া হয় একটা সাদা চাদর। যদি হোটেলের ভাড়া দিতে নববিবাহিত দম্পতির পরিবার অক্ষম হয়, তাহলে পঞ্চায়েতই এগিয়ে এসে সেই ভাড়া মিটিয়ে দেয়। ঘরের বাইরে অপেক্ষায় থাকেন দুই পরিবারের আত্মীয় স্বজনরা। বিবেক তামাইচিকার বলছিলেন, "অনেক সময়ে ঘরের ভেতরে পাঠানোর আগে বরকে শিক্ষিত করে তোলার নাম করে মদ খাওয়ানো হয় আর পর্ণোগ্রাফি দেখানো হয়।" শারীরিক মিলনের শেষে যখন নবদম্পতি বাইরে আসেন, তখন দেখা হয় যে ওই সাদা চাদরে নববধূর রক্তের দাগ লেগেছে কী না। দাগ থাকলে নববধূ যে বিয়ের সময় পর্যন্ত কুমারী-ই ছিলেন, সেটাই মনে করা হয়। তবেই পঞ্চায়েত ওই বিবাহকে স্বীকৃতি দেয়। আর যদি সদ্য বিবাহিতা নারী সেই পরীক্ষায় ফেল করেন, তাহলে তার পরিণাম ভোগার জন্য তাকে তৈরি থাকতে হয়। স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ সোনিয়া নায়েক বিবিসিকে বলছিলেন, "প্রথমবার শারীরিক সম্পর্কের সময়ে যে নারীর দেহ থেকে রক্ত বেরবেই, এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। অনেক সময়ে প্রথমবার শারীরিক মিলন হলেও কুমারী মেয়েদের শরীর থেকে রক্ত নাও বেরোতে পারে। এর অনেক কারণ রয়েছে। কিন্তু রক্ত না বেরনো মানেই যেকোনো নারী কুমারী নন, এটা বলা অবৈজ্ঞানিক।" 'কুমারী না হওয়ার অপরাধে" নববধূকে বেইজ্জত তো করাই হয়, এমনকি পেটানোও হতে পারে। আর স্বামীটি পেয়ে যায় সদ্যবিবাহিত স্ত্রীকে সঙ্গে সঙ্গে ত্যাগ করার অধিকার। কৌমার্যের পরীক্ষায় ফেল করে গিয়েছিলেন অনিতা। [পরিচয় গোপন রাখার স্বার্থে নাম পরিবর্তন করা হল] তিনি বিবিসিকে বলছিলেন, "বিয়ের আগেই হবু স্বামীর সঙ্গে আমার শারীরিক সম্পর্ক হয়েছিল। তাই আমার স্বামীর একটা ভয় ছিল যে আমি হয়তো ভার্জিনিটির পরীক্ষায় পাশ করতে পারব না। ভেবেছিলাম আমার স্বামী পাশে দাঁড়াবে, কিন্তু সেই রাতে যা ঘটল, তার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না একদমই। " 'পরীক্ষা' দিয়ে বেরনোর পরে সকলের সামনে পঞ্চায়েত বসিয়ে তার স্বামীকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, যে অনিতা 'পবিত্র' না 'অপবিত্র'। "আমার স্বামী, নির্দ্বিধায় আঙ্গুল তুলে রক্তের দাগহীন সাদা চাদরটা দেখিয়ে দিলো। অথচ তার কথাতেই রাজি হয়ে আমি বিয়ের মাস ছয়েক আগে তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করেছিলাম। আর ওই কঠিন সময়ে সে আমাকেই অপবিত্র বলে দিতে একবারও দ্বিধা করল না! পঞ্চায়েত আমাকেই 'ফেক' বলে দিলো," বলছিলেন অনিতা। পুলিশ আর স্থানীয় সামাজিক আন্দোলনের কয়েকজন নেতাকর্মীদের মধ্যস্থতায় অনিতার সঙ্গে থাকতে রাজি হয়েছিলেন তার স্বামী। তবে স্বামীর ঘর করাটা দিনকে দিন অসহনীয় হয়ে উঠেছিল অনিতার কাছে। প্রতিদিনই মারধর করত অনিতার স্বামী। আবার পঞ্চায়েতও বেইজ্জত করত তাঁকে। কোনও ধর্মীয় বা সামাজিক অনুষ্ঠানে যেতে দেয়া হতো না। "আমি গর্ভবতী হওয়ার পরেও অবস্থা পাল্টায়নি। আমার স্বামী আমাকে সবসময়ে জিজ্ঞাসা করত যে পেটের বাচ্চাটার বাবা কে! সে তো জানত কার সন্তান রয়েছে আমার গর্ভে! শুধু স্বামী নয়, পঞ্চায়েতের লোকেরাও ওইসব বলত," জানাচ্ছিলেন অনিতা। সন্তান প্রসবের দুই মাসের মধ্যে সদ্যোজাতসহ অনিতাকে তাড়িয়ে দেয় তার স্বামী। অনিতা এখন নিজের বাবা-মায়ের কাছে থাকেন। আর তাকে যেহেতু পঞ্চায়েত 'অপবিত্র' বলে রায় দিয়েছে, তাই অনিতার দুই বোনের বিয়ে দিতেও সমস্যা হচ্ছে। "আমার বিয়ে ঠিক হয়ে আছে এবছরের শেষে। কিন্তু আমি তো পঞ্চায়েতকে ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছি যে আমার স্ত্রী কোনওমতেই ওই কৌমার্যের পরীক্ষা দেবে না। কিন্তু শুধু আমি বা আমাদের গ্রুপের সদস্যরা বললে তো হবে না। এগিয়ে আসতে হবে সমাজের বাকি অংশকেও," বলছিলেন বিবেক তামাইচিকার।

গুয়ানতানামো বে নিয়ে ভয়ঙ্কর পরিকল্পনা ট্রাম্পের

কিউবার গুয়ানতানামো বে এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটির কারাগার চালু রাখার একটি নির্বাহী আদেশে সই করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিজের প্রথম স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে এ আদেশের কথা ঘোষণা করেছেন ট্রাম্প। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বিতর্কিত ওই কারাগারটি বন্ধ করে দিতে চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু ব্যর্থ হন; আর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ওমাবার পুরোপুরি বিপরীত সিদ্ধান্ত নিলেন।
৯/১১ হামলার পর থেকে গুয়ানতানামো বের স্থাপনাটিকে ‘শত্রুপরে যোদ্ধাদের’ আটক রাখার জন্য ব্যবহার করতে শুরু করে ওয়াশিংটন। বর্তমানে ওই কারাগারটিতে মাত্র ৪১ জন বন্দী আছেন। ওবামার আমলে ওই কারাগারের কয়েক শত বন্দীকে অন্যান্য জায়গায় স্থানান্তর করা হয়। এই কারাগারটি বন্ধ করে দেয়ার প্রক্রিয়া থামিয়ে দেয়ার আদেশ দেয়া হয়েছে বলে হোয়াইট হাউজও জানিয়েছে। যখন প্রয়োজন হবে তখন মার্কিন প্রশাসন শত্রুপরে যোদ্ধাদের এই কারাগারটিতে রাখতে পারবে বলেও জানিয়েছে তারা। মঙ্গলবারের স্টেট অব ইউনিয়ন ভাষণে ট্রাম্প বলেন, ‘সন্ত্রাসীরা নিছক অপরাধী নয়। তারা নিষিদ্ধ শত্রুযোদ্ধা। বিদেশে যখন তারা ধরা পড়ে, তারা যেমন ধরনের সন্ত্রাসী তাদের সঙ্গে তেমনই ব্যবহার করা উচিত। অতীতে, আমরা বোকার মতো শত শত বিপজ্জনক সন্ত্রাসীকে ছেড়ে দিয়েছি, পরে লড়াইয়ের ময়দানে তাদের সাাৎ পেয়েছি।’ উদাহরণ হিসেবে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) নেতা আবু বকর আল বাগদাদির নাম উল্লেখ করেন তিনি। ২০০২ সালের জানুয়ারিতে গুয়ানতানামো বে কারাগারে প্রথম বন্দীকে পাঠানো হয়েছিল। তারপর থেকে সাত শতাধিক বন্দীকে ওই কারাগারটিতে রাখা হয়েছিল, এদের অনেককেই কোনো অভিযোগ ছাড়াই বিনাবিচারে আটকে রাখা হয়েছিল। কোনো অভিযোগ ছাড়াই বিনা বিচারে আটক রাখা ও বন্দীদের নির্যাতন করার অভিযোগে নিয়ে কারাগারটির বিরুদ্ধে সরব হয়ে ওঠে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো। ব্যাপক সমালোচনার মুখে ২০০৯ সালে ওবামা এক আদেশে সই করে কারাগারটি এক বছরের মধ্যে বন্ধ করার নির্দেশ দেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের আইনপ্রণেতাদের বাধার মুখে আট বছরেও নির্দেশ কার্যকর করতে পারেননি তিনি।
ট্রাম্পের নীতির পে ৬২ শতাংশ মার্কিনি
সিএনএন জানায়, স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপস্থাপিত নীতি-পরিকল্পনার সঙ্গে ঐকমত্য রয়েছে ৬২ শতাংশ মার্কিনির। তবে তিনি এইসব নীতি-পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে সম কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে তাদের একাংশের মনে। সামগ্রিকভাবে তার ভাষণকে ইতিবাচকভাবে নিয়েছেন ৪৮ শতাংশ মার্কিনি। ট্রাম্পের ভাষণের পর পরিচালিত জরিপে এইসব তথ্য উঠে আসে। ভাষণের দুই ঘণ্টা পরেই এই জরিপ চালানো হয়। জরিপের পরিসংখ্যান বলছে, ২৯ শতাংশ মার্কিনি সরাসরি নেতিবাচকভাবে নিয়েছেন। ২২ শতাংশ কিছুটা ইতিবাচক ছিলেন। আর ৪৮ শতাংশ মার্কিন নাগরিক একে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। ভাষণের পর ৬২ শতাংশ মার্কিনি বলেছেন, ট্রাম্পের এমন নীতিতে সঠিক পথেই এগিয়ে যাবে যুক্তরাষ্ট্র। আর ২৫ শতাংশের ভাষ্য এটি দেশকে ভুল পথে পরিচালিত করবে।

ট্রাম্প-মেলানিয়া সম্পর্কে চিড়

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‌দাম্পত্যজীবনে চিড় ধরতে শুরু করেছে, যা হোয়াইট হাউসের গণ্ডি ছাড়িয়ে বাইরেও দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। জানা গেছে, অনেক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প দম্পতিকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও এতে শুধু আমেরিকার ফার্স্টলেডি মেলানিয়া ট্রাম্পকেই দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি ফার্স্টলেডিস বক্স নামক একটি অনুষ্ঠানে ট্রাম্পকে সঙ্গে নিয়ে হাজির থাকার কথা থাকলেও সেখানে মেলানিয়াকে একা দেখা যায়।
ট্রাম্পের সঙ্গে পর্নোস্টার স্টোর্মি ড্যানিয়েলসের সম্পর্কের খবর প্রকাশ্যে আসার পরই মেলানিয়া ও ট্রাম্পের মধ্যে দুরত্ব বাড়তে শুরু করে। যার জের ধরে তিনি গত সপ্তাহে ট্রাম্পের সঙ্গে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে যাওয়ার পরিকল্পনাও বাতিল করেন। হোয়াইট হাউস সূত্রমতে, ট্রাম্প ও মেলানিয়ার দাম্পত্যজীবনে বেশ কিছু দিন ধরে সমস্যা চলছে। তারা দুজনই আলাদা থাকছেন। অন্য অতিথিদের সঙ্গে তারা বেশি সময় অতিবাহিত করছেন। তবে পৃথকভাবে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গেলেও ট্রাম্প ও মেলানিয়া একই গাড়িতে করে হোয়াইট হাউসে ফেরেন। এ বিষয়ে মেলানিয়ার মুখপাত্র স্টিফেনিয়া গ্রিসম বলেন, মিসেস ট্রাম্প তার অতিথিদের অ্যাপায়নে ব্যস্ত রয়েছেন। তাই তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সময় দিতে পারছেন না। এর পেছনে অন্য কোনো কারণ নেই।

টিকিট থাকা সত্ত্বেও বিমানে উঠতে পারল না ময়ূর

ভারতের জাতীয় পাখিকে নিয়ে বিমানে উঠতে চেয়েছিলেন এক নারী যাত্রী। কিন্তু তার সেই ইচ্ছা পূরণ হল না। ইউনাইটেড এয়ারলাইনস ময়ূর নিয়ে বিমানে উঠতে দেয়নি এক যাত্রীকে। তাই টিকিট থাকা সত্ত্বেও বিমানে ওঠা হল না ময়ূরের। ঘটনাটি ঘটেছে নিউইয়র্ক লিবার্টি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে।
ইউনাইটেড বিমান সংস্থা জানিয়েছে, ময়ূরটির ওজন বেশি হওয়ায় এবং আকারে বড় হওয়ায় বিমানে ওঠানো হয়নি। এ ছাড়া বিমানবন্দরে আসার আগেই কোনো পোষ্য নিয়ে যাওয়ার আগে সেই পোষ্যসংক্রান্ত তথ্য জমা দিতে হয়। যদিও ওই যাত্রীর কাছে নথিপত্র সবই ছিল। কিন্তু তা বিমানে ওঠার ৪৮ ঘণ্টা আগে বিমান সংস্থায় জমা দিতে হয়। মজার বিষয় হল- ওই নারী যাত্রীর কাছে ময়ূরটির জন্য আলাদা করে বিমান টিকিটও কাটা ছিল। তবে এ ঘটনাটির জন্য বিমান সংস্থার পক্ষ থেকে ওই যাত্রীর কাছে ক্ষমা চাওয়া হয়েছে। টিকিটের টাকাও ফেরত দেয়া হয়েছে।

ট্রাম্পকে মান্ধাতা আমলের মানসিকতা বদলাতে বলল চীন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘মান্ধাতার আমলের স্নায়ুযুদ্ধকালীন মানসিকতা’ থেকে বেরিয়ে আসতে বলেছে চীন। ট্রাম্প তার প্রথম ‘স্টেট অব দি ইউনিয়ন’ ভাষণে চীনকে ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ দেশ ঘোষণা দেয়ার পর তাকে এ আহ্বান জানাল বেইজিং। ওই ভাষণে ট্রাম্প বলেছিলেন- চীন ও রাশিয়ার মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো আমাদের স্বার্থ, আমাদের অর্থনীতি এবং আমাদের মূল্যবোধকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করেছে।
এর প্রতিক্রিয়ায় চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হুয়া চুনিং বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের মতপার্থক্যের চেয়ে যৌথ স্বার্থের পরিমাণ অনেক বেশি। কাজেই যৌথ স্বার্থরক্ষার জন্যই মার্কিন প্রেসিডেন্টকে স্নায়ুযুদ্ধের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। চুনিং বলেন, চীনের সঙ্গে যৌথ স্বার্থরক্ষার ক্ষেত্রগুলোতে কাজ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র মান্ধাতার আমলের স্নায়ুযুদ্ধের মানসিকতা পরিহার করবে বলে আমরা আশা করছি। এদিকে ট্রাম্পের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় চীনা প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াং বলেছেন, ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যকার যৌথ স্বার্থ আমাদের মতভেদ ও মতপার্থক্যের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। চীন ও আমেরিকার মধ্যে শক্তিশালী সম্পর্ক গোটা বিশ্বেরও স্বার্থরক্ষা করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

স্ত্রীর ফেসবুকে অশ্লীল ছবি পোস্ট, পুলিশ কনস্টেবল গ্রেফতার

স্ত্রীর ফেসবুক পেজে অন্য নারীর অশ্লীল ছবি পোস্ট করার অভিযোগে পুলিস কনস্টেবল স্বামীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ভারতের উত্তর ২৪ পরগনার অশোকনগর থানা এলাকায় এ ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, অশোকনগর থানায় কনস্টেবল পদে কর্মরত সোমনাথ চক্রবর্তী গাড়ির চালক হিসেবে কাজ করছিলেন। তার বাড়ি অশোকনগর থানার কাকপুল এলাকায়।
হাবড়া এলাকায় তার শ্বশুরবাড়ি। বেশ কয়েকমাস ধরে স্বামী-স্ত্রী মধ্যে অশান্তি শুরু হয়। বনিবনা না হওয়ায় তাদের মধ্যে বিয়ে বিচ্ছেদের মামলাও চলছিল। এরই মধ্যে দিন কয়েক আগে সোমনাথ তার স্ত্রীর ফেসবুক পেজে অন্য এক নারী অশ্লীল ছবি পোস্ট করেন। এ ঘটনায় মঙ্গলবার অশোকনগর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন তার স্ত্রী। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ রাতেই সোমনাথকে গ্রেফতার করে। যদিও এই অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে দাবি করেছে সোমনাথ। গ্রেফতারকৃত ও পুলিশ সদস্যকে বুধবার বারাসত আদালতে তোলা হয়। তদন্তকারী পুলিশ অফিসারের আবেদনের প্রেক্ষিতে বিচারক তার তিন দিনের জন্য পুলিশ হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

ট্রাম্প-মেলানিয়া সম্পর্কে চিড়

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‌দাম্পত্যজীবনে চিড় ধরতে শুরু করেছে, যা হোয়াইট হাউসের গণ্ডি ছাড়িয়ে বাইরেও দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। জানা গেছে, অনেক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প দম্পতিকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও এতে শুধু আমেরিকার ফার্স্টলেডি মেলানিয়া ট্রাম্পকেই দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি ফার্স্টলেডিস বক্স নামক একটি অনুষ্ঠানে ট্রাম্পকে সঙ্গে নিয়ে হাজির থাকার কথা থাকলেও সেখানে মেলানিয়াকে একা দেখা যায়।
ট্রাম্পের সঙ্গে পর্নোস্টার স্টোর্মি ড্যানিয়েলসের সম্পর্কের খবর প্রকাশ্যে আসার পরই মেলানিয়া ও ট্রাম্পের মধ্যে দুরত্ব বাড়তে শুরু করে। যার জের ধরে তিনি গত সপ্তাহে ট্রাম্পের সঙ্গে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে যাওয়ার পরিকল্পনাও বাতিল করেন। হোয়াইট হাউস সূত্রমতে, ট্রাম্প ও মেলানিয়ার দাম্পত্যজীবনে বেশ কিছু দিন ধরে সমস্যা চলছে। তারা দুজনই আলাদা থাকছেন। অন্য অতিথিদের সঙ্গে তারা বেশি সময় অতিবাহিত করছেন। তবে পৃথকভাবে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গেলেও ট্রাম্প ও মেলানিয়া একই গাড়িতে করে হোয়াইট হাউসে ফেরেন। এ বিষয়ে মেলানিয়ার মুখপাত্র স্টিফেনিয়া গ্রিসম বলেন, মিসেস ট্রাম্প তার অতিথিদের অ্যাপায়নে ব্যস্ত রয়েছেন। তাই তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সময় দিতে পারছেন না। এর পেছনে অন্য কোনো কারণ নেই।

রোহিঙ্গাদের ঠেকাতে স্টেনগান মরিচ গুঁড়া নিয়ে সীমান্তে বিএসএফ

আশ্রয়ের সন্ধানে জড়ো হওয়া মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের প্রবেশ বন্ধ করতে সীমান্তে স্টেনগান, ও মরিচ গুঁড়া নিয়ে কড়া নজরদারি চালাচ্ছে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীবাহিনী-বিএসএফ। তারা রোহিঙ্গাদের সীমান্ত থেকেই ফেরত পাঠিয়ে দিচ্ছে। ভারতের সুপ্রিমকোর্টে এ অভিযোগ জানিয়ে অসহায় রোহিঙ্গাদের প্রতি ‘ন্যূনতম মানবিকতা, নৈতিকতা’ দেখানোর আবেদন জানিয়েছেন তাদের আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ। এ আবেদনের পর প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চকে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে আইনজীবী তুষার মেহতা জানিয়েছেন, ভারত সরকার রোহিঙ্গাদের প্রবেশের বিষয়ে নমনীয়তা দেখাতে চায় না। তিনি বলেন, সরকারের সাধারণ অবস্থান হল তারা চান না ভারত শরণার্থীদের রাজধানী হয়ে উঠুক। তা হলে দুনিয়ার সব দেশের লোক ভারতে চলে আসবে। এটি এমন বিষয় যা নিয়ে আমরা কোনো ধরনের নমনীয়তা দেখাতে পারি না। ভারতে বসবাসকারী রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফেরত পাঠানো থেকে কেন্দ্রীয় সরকারকে নিরস্ত করার আবেদন জানিয়ে করা পিটিশনের শুনানিতে প্রশান্ত ভূষণ বলেন, কেউ সীমান্তে এসে যদি বলেন, ‘আমি শরণার্থী, আশ্রয় চাই’; তাকে সোজা মুখের ওপর ‘না’ বলে দেয়া যায় না।
সিনিয়র আইনজীবী রাজীব ধবন এ বক্তব্যে সায় দেন। বলেন, আবেদনকারী শরণার্থী কিনা তা স্থির করতে হবে। তবে সরকার যেমন কূটনৈতিকভাবে বিষয়টি মোকাবেলার চেষ্টা করছে, আদালতেরও নিজের মতো সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড় জানান, প্রশান্ত ভূষণের বক্তব্যের মানবতাবাদী দৃষ্টিকোণকে আদালত প্রাধান্য দিচ্ছে। তবে এ দেশের যে আইন ভারতের মাটিতে বসবাসকারী শরণার্থীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তা কি এ দেশে ঢোকার চেষ্টা করা লোকজনের ক্ষেত্রেও চলতে পারে? গত বছর এ মামলার শুনানির সময় ভারত সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল- রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পরিণতির বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার সরকারের হাতেই যেন বিচারপতিরা ছেড়ে দেন। তবে সুপ্রিমকোর্ট সরকারের এ বক্তব্য খারিজ করে দেন। প্রধান বিচারপতি মিয়ানমারের রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে তৈরি হওয়া পরিস্থিতিকে ‘বড় ধরনের মানবতাবাদী সংকট’ বলে মন্তব্যও করেন। তবে আদালত ভারত থেকে রোহিঙ্গাদের বহিষ্কারের পরিকল্পনা স্থগিত করে কোনো আদেশ দেয়নি। জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ভারতে বসবাসকারী রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা প্রায় ১৬ হাজার। তবে সরকারের দাবি, প্রকৃত শরণার্থীর সংখ্যা এর তিন গুণ।

প্রশ্নপত্র ফাঁস প্রমাণ হলে পরীক্ষা বাতিল: শিক্ষামন্ত্রী

প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে প্রমাণিত হলে সঙ্গে সঙ্গে পরীক্ষা বাতিল করা হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। প্রশ্নপত্র ফাঁস করলে কেউ রেহাই পাবে না বলেও তিনি জানান। আজ বৃহস্পতিবার ঢাকায় ধানমন্ডি গভ. ল্যাবরেটরি উচ্চবিদ্যালয়ে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা দেখতে গিয়ে শিক্ষামন্ত্রী সাংবাদিকদের এ কথা বলেন। মন্ত্রী বলেন, ‘এই পরীক্ষা নিরাপদ রাখতে মানুষের পক্ষে যা যা করা সম্ভব, এবার তা-ই করা হয়েছে।
প্রশ্নপত্র ফাঁস করলে কেউ রেহাই পাবে না। কী হবে আমি নিজেও বলতে পারি না। তবে চরম ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ মন্ত্রী এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব সোহরাব হোসাইন কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। পরীক্ষা শুরুর আগে এক সাংবাদিক মন্ত্রীকে বলেন, ফেসবুকে প্রশ্নপত্রের অনুলিপি ছড়ানো হয়েছে। মন্ত্রী, সচিব ও কেন্দ্রে দায়িত্বরতরা ওই অনুলিপি মূল প্রশ্নপত্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন। তবে অনুলিপিটি ভুয়া বলে প্রমাণিত হয়। মন্ত্রী পরে সাংবাদিকদের বিষয়টি জানান। সারা দেশে আজ সকাল ১০টার দিকে এসএসসি পরীক্ষা শুরু হয়েছে। মোট পরীক্ষার্থী ২০ লাখ ৩১ হাজার ৮৯৯ জন। সারা দেশে এসএসসি পরীক্ষা হচ্ছে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে। মোট ৩ হাজার ৪১২টি কেন্দ্রে পরীক্ষা হচ্ছে। আজ লিখিত পরীক্ষা শুরু হয়ে ২৫ ফেব্রুয়ারি শেষ হবে।

ফেসবুকে কবুতরের হাট



সাদা-কালো পালক, গোলাপি ঠোঁট—নজরকাড়া রেড লাহোর জাতের কবুতরটির ছবি ফেসবুক ওয়ালে। ছবির নিচের মন্তব্য ঘরে চলছে দরদাম। আহমেদ সাকিব নামের একজন চট্টগ্রাম নগরের চান্দগাঁও থেকে এই ছবি আপলোড করেন। জোড়া কবুতর ও একটি ছানার দাম হাঁকা হয়েছে ৩ হাজার টাকা। সঙ্গে দেওয়া আছে বিক্রেতার মুঠোফোন নম্বর। শুধু আহমেদ সাকিব নয়, আরও অনেকে কবুতরের ছবি আপলোড করেছেন একই নিয়মে। তাঁরা সবাই বিক্রেতা। কবুতর বিক্রির ডিজিটাল এই হাটের কারবার চলে ফেসবুকে। ‘সিটিজি অনলাইন পিজন বাই অ্যান্ড সেল’ নামের একটি গ্রুপ পেজের মাধ্যমে চলে বেচাকেনা। গ্রুপটিতে গতকাল বুধবার পর্যন্ত সদস্য হয়েছে ৪৭ হাজার ৩৯ জন। এই গ্রুপের অ্যাডমিনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পেজে মাসে গড়ে ১৫০ থেকে ২০০ জোড়া কবুতর বিক্রি হয়। গত ৩০ দিনে কবুতর বিক্রির পোস্ট দেওয়া হয়েছে ৩৬২টি। ফেসবুকে গ্রুপটি খোলেন সরোয়ার জামান চৌধুরী নামের এক ব্যক্তি। তিনি থাকেন কাতারে। গ্রুপটির বর্তমান অ্যাডিমন তাঁর ছোট ভাই সাইদুজ্জামান চৌধুরী। তিনি চট্টগ্রাম নগরের সদরঘাটস্থ ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে ফিন্যান্স বিভাগে স্নাতক (সম্মান) তৃতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছেন। থাকেন নগরের নাসিরাবাদ এলাকায়। সাইদুজ্জামান চৌধুরী গতকাল মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর ভাই শখের বসে কবুতর পালন করতেন। তিনিও তাঁকে সহযোগিতা করতেন।
তাঁরা তখন অন্য একটি গ্রুপে কবুতর বেচাকেনা করতেন। পরে তিনি তাঁর ভাইয়ের ফেসবুক আইডি থেকে এই গ্রুপটি খোলেন ২০১৬ সালের শুরুর দিকে। অল্প দিনের মধ্যে সেটি জনপ্রিয়তা পায়। তখন চট্টগ্রামের কবুতর বিক্রেতাদের কথা বিবেচনা করে এটি খোলা হয়, এখন ঢাকা, সিলেট ও রাজবাড়ী থেকে এখানে পোস্ট দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, এ পেজের সুবিধা হলো, যেকোনো সদস্য বিক্রির জন্য কবুতরের ছবি কিংবা ভিডিও পোস্ট দিতে পারেন, আবার কেনার জন্য সদস্যরা তাঁদের চাহিদা অনুযায়ী স্ট্যাটাস দেন। যাঁরা এই পেজের সদস্য তাঁরা নোটিফিকেশন পাবেন। অনেকে ইনবক্সে তথ্য আদান-প্রদান করে দর-কষাকষি করতে পারেন। যে স্ট্যাটাসে কবুতরের দাম ফিক্সড লেখা থাকবে সেখানে দর-কষাকষি হয় না। দরদাম ঠিক হলে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে কিংবা সরাসরি টাকার লেনদেন করে কবুতর নিয়ে যান। অনেকে টাকা একসঙ্গে দিতে না পারলে কিছু টাকা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বিক্রেতার কাছে পাঠিয়ে পছন্দের বায়না করতে পারেন। এ ছাড়া আগে টাকা পরিশোধ করতে পারেন ক্রেতা। পরে যেকোনো বাস সার্ভিসের মাধ্যমে কবুতর গন্তব্যে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়া কারও খামারে রোগবালাই দেখা দিলে গ্রুপে পোস্ট দিয়ে বিষয়টি জানাতে পারে। সে ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ খামারিরা তাঁদের সহযোগিতা করেন। অথবা কী করলে অসুবিধা থেকে মুক্তি পাবে তার পরামর্শ দেন গ্রুপের সদস্যরা। এ গ্রুপের কিছু অসুবিধার কথাও জানালেন সাইদুজ্জামান চৌধুরী। তিনি বলেন, অনেকে পুরোনো ছবি কিংবা অন্যের আইডি থেকে কপি করা ছবি পোস্ট দিয়ে দেন। কেনার পর দেখা যায় অসুস্থ, দুর্বল কবুতর পাঠিয়েছেন বিক্রেতা। অথবা যে টাকা কথা হয়েছে, সে টাকা পাঠান না ক্রেতা। এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেলে তাঁদের গ্রুপ থেকে বের করে দেওয়া হয়। এ রকম ৩ হাজারের মতো সদস্যকে গ্রুপ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। গ্রুপটিতে আমেরিকা, ব্রিটেন থেকে আমদানি করা এক জোড়া কবুতর সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা বিক্রি হয়েছিল। সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় ৪ থেকে ২০ হাজার টাকা দামের কবুতর। কবুতর বিক্রি হলে পোস্টে সোল্ড নামে একটি অপশন রয়েছে। সেখানে বিক্রেতা সোল্ড লিখে দেন। অনেক সময় পোস্টটি ডিলিটও করে দিতে পারেন। বেশি বিক্রি হওয়া কবুতরের মধ্যে রয়েছে শো-কিং, ফেন্সি, ব্লু-বার্লেস, বোখারা ট্রামপিটার, লাহোর (রেড, ব্ল্যাক), গিরিবাজ, জেকোবিন, শর্ট ফেসড, চেকারড (রেড, ব্লু), গ্রেভার বেলজিয়াম রেচার হোমা ও ময়ূরপঙ্খী। এই গ্রুপের মাধ্যমে কবুতর বিক্রি করেন সীতাকুণ্ডের তরুণ রায়হান উদ্দিন। তিনি বলেন, ২০০৫ সালে শখের বসে তিনি দেশীয় জাতের দুই জোড়া কবুতর পালন শুরু করেন। তখন তিনি শুকলালহাট, সীতাকুণ্ড, কুমিরাসহ বিভিন্ন বাজারে, গ্রামের বিভিন্ন স্থানে খাঁচায় করে নিয়ে কবুতর বিক্রি করতেন। ২০১২ সালে তিনি ফেসবুকে ঢাকা পিজন ক্লাব নামের একটি গ্রুপে যুক্ত হন। এরপর থেকে অনেক গ্রুপে তিনি কবুতর বিক্রি করেছেন। সর্বশেষ দেড় বছর আগে তিনি এই গ্রুপে বেচাকেনা করছেন। এই গ্রুপের মাধ্যমে জানুয়ারি মাসে ১০ জোড়া কবুতর বিক্রি করে ২০ হাজার টাকা আয় করেছেন বলে জানান।

‘পুলিশ সর্বোচ্চ কঠোর অবস্থানে থাকবে’

পুলিশের নবনিযুক্ত মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী বলেছেন, পুলিশের দায়িত্ব জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এই জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সর্বোচ্চ কঠোর অবস্থানে থাকবে। আজ বৃহস্পতিবার পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া সেন্টারে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে আইজিপি এসব কথা বলেন।
৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায় ও চলতি বছরে জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পুলিশের প্রস্তুতি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারী বলেন, ‘বাংলাদেশ পুলিশের অনেক অর্জন। তবে কতিপয় সদস্যের কিছু ঘটনা সামনে চলে আসে। অপেশাদার ওই সব আচরণের জন্য আমরা বিব্রত বোধ করি। ব্যক্তির অপরাধের দায় পুলিশ নেবে না। এ বিষয়ে নীতি হচ্ছে, কোনো ব্যক্তি যদি অপরাধ করে থাকে, তাহলে সে অপরাধী বলে গণ্য হবে। প্রচলিত নিয়মনীতির মধ্যে থেকে বিষয়টি দেখা হবে।’ জঙ্গি ও মাদক হলো পুলিশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। গতকাল বুধবারও যখন প্রধানমন্ত্রী র‍্যাংক ব্যাচ পরিয়ে দিচ্ছিলেন, তখনো আইজিপি মাদক নির্মূলের ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন, পুলিশের নীতি জিরো টলারেন্স। যত দিন না পর্যন্ত মাদকের চাহিদা শেষ হচ্ছে, তত দিন পর্যন্ত এটা নির্মূল করা যাবে না, নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। এটি কেবল পুলিশের দায়িত্ব নয়, এটি সবার দায়িত্ব। জাবেদ পাটোয়ারী সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হকের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন। গতকাল ৩১ জানুয়ারি শহীদুল হকের মেয়াদ শেষ হয়।

মুখ্যমন্ত্রীর ব্যাংক হিসাবে মাত্র আড়াই হাজার রুপি!

ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারের ব্যাংক হিসাবে আড়াই হাজার রুপিরও কম অর্থ রয়েছে। আর হাতে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ হাজার দেড়েক রুপি। বিধানসভা নির্বাচনে ধনপুর কেন্দ্রের প্রার্থী হিসেবে মানিক সরকারের দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, তাঁর হাতে রয়েছে মাত্র ১ হাজার ৫২০ রুপি। আর ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত তাঁর ব্যাংক হিসাবে অর্থের পরিমাণ ২ হাজার ৪১০ রুপি।
২০১৩ সালে ব্যাংকে অর্থের পরিমাণ ছিল ৯ হাজার ৭২০ রুপি ৩৮ পয়সা। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে প্রতি মাসে তিনি বেতন পান বেতন ২৬ হাজার ৩১৫ রুপি। বেতনের পুরোটাই তিনি তুলে দেন দলের তহবিলে। নিজ দল সিপিএম তাঁকে দেয় প্রতি মাসে ৯ হাজার ৭০০ রুপি। মানিক সরকারের স্ত্রী পঞ্চালী ভট্টাচার্য অবশ্য কেন্দ্রীয় সরকারের উচ্চপদে আসীন ছিলেন। ২০১১-১২ সালে শেষ দেওয়া আয়কর রিটার্ন অনুসারে তাঁর বার্ষিক আয় ছিল ৪ লাখ ৪৯ হাজার ৭৭০ রুপি। এখন তিনি অবসরে আছেন। পঞ্চালী ভট্টাচার্যের হাতে নগদ অর্থ আছে ২০ হাজার ১৪০ রুপি। ব্যাংকে আছে মোট ১২ লাখ ১৫ হাজার ৭১৪ রুপি। নিঃসন্তান এই দম্পতির আগরতলায় পারিবারিক সম্পত্তি রয়েছে শূন্য দশমিক ০১১ একর জমি। ৬৯ বছরের এই মুখ্যমন্ত্রী অবশ্য আগেই জানিয়েছেন, তিনি সেই সম্পত্তি বোনদের দান করবেন। ভারতের সবচেয়ে সৎ মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে পরিচিত মানিক সরকারের কোনো ব্যক্তিগত গাড়িও নেই। মানিক সরকার ১৯৯৮ সালের মার্চ মাস থেকে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। তিনি ভারতের মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরো সদস্য। ২০০৮ সালের মার্চে তিনি বামফ্রন্টের নেতা হিসেবে শপথ নেন এবং ত্রিপুরায় কোয়ালিশন সরকার গঠন করেন। ২০১৩ সালের লোকসভার নির্বাচনে তিনি চতুর্থবারের মতো মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন।

সাংবাদিকতা গুপ্তচরবৃত্তি নয়, অপরাধও নয় by কামাল আহমেদ

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যে সংকুচিত হতে হতে একটি বৃত্তের মধ্যে আটকা পড়তে যাচ্ছে, এই আশঙ্কার কথা বেশ কয়েক বছর ধরেই উচ্চারিত হয়ে আসছে। এখন মন্ত্রিসভায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়া অনুমোদিত হওয়ার পর আবার নতুন করে এই আলোচনা শুরু হয়েছে। সাংবাদিকতা এবং লেখালেখির পেশায় যাঁরা আছেন, তাঁদের প্রতিক্রিয়ায় প্রধানত দুটো ধারা স্পষ্ট হয়েছে।
একটি হচ্ছে, স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের সুযোগ পুরোপুরি বিলীন হয়ে যাবে এবং ক্ষমতাসীনদের ভাষ্যের বাইরে অন্য কিছু আর প্রকাশ করা সম্ভব হবে না। যাঁরা এমনটি ভাবছেন, তাঁদের মধ্যে আতঙ্ক এবং হতাশার ছাপটা স্পষ্ট। দ্বিতীয় ধারাটি হচ্ছে, রাজনৈতিক আনুগত্যের এবং তাঁরা এখনো বিশ্বাস করেন, সরকার তাঁদের পরামর্শে কান দেবে এবং খসড়াটি শেষ পর্যন্ত বদলে আইনটি গণমাধ্যমবান্ধব হবে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার প্রভাব যে শুধু গণমাধ্যমের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক থেকে শুরু করে রাজনৈতিক কর্মী এবং সাধারণ নাগরিকদের অনেকের দণ্ডিত হওয়ার ঘটনায় দেখেছি। কিন্তু সরকারবিরোধী রাজনীতির দৈন্যদশা এবং নাগরিক সমাজের অগ্রসর অংশের মধ্যে দোদুল্যমানতা অথবা সুবিধাবাদিতার পিছুটানের কারণে কোনো কার্যকর প্রতিবাদ-আন্দোলন গড়ে ওঠেনি। উদ্বেগ যতটুকু দেখা যাচ্ছে তা মূলত গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যেই। যাঁরা শঙ্কিত, তাঁদের আশঙ্কা-সাংবাদিকতা শেষ পর্যন্ত সরকারি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পুনর্লিখন এবং সম্পাদনাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে। রাষ্ট্র, সমাজ, শিল্প-সাহিত্য, ধর্মীয় ভাবনা, ব্যবসা-বাণিজ্য, জীবনযাত্রা ইত্যাদি সবকিছুর ক্ষেত্রেই কর্তৃপক্ষীয় ভাষ্য কিংবা প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়বে। সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহের বিবরণও ক্ষমতাসীনদের বিবেচনায় ক্ষতিকর গণ্য হলে তা-ও প্রকাশ করা সম্ভব হবে না। সোজা কথায় বাংলাদেশ টেলিভিশন, বেতার, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা বা তথ্য অধিদপ্তরের ভাষ্য প্রকাশের বৃত্তের মধ্যেই গণমাধ্যম আবদ্ধ হয়ে পড়বে। নতুন খসড়ার যেসব বিধান শঙ্কার কারণ হচ্ছে, সেগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে তথ্যপ্রযুক্তি আইন বা আইসিটি অ্যাক্টের বহুল নিন্দিত ৫৭ ধারার নবরূপে আবির্ভাব। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আগের খসড়াটিতে ১৯ নম্বর ধারায় ৫৭ ধারার সব উপাদানই ধারণ করা হয়েছিল এবং গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে তা নিয়ে বিপুল সমালোচনাও ওঠে। কিন্তু সেসব সমালোচনায় সরকারের যে কিছুই যায়-আসে না, এই পরিবর্তিত খসড়ায় তার সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। মন্ত্রিসভায় পেশ করা সারসংক্ষেপে কোনো ধরনের রাখঢাক ছাড়াই বলা হয়েছে যে বিষয়টি একই সঙ্গে দণ্ডবিধির ধারা ৪৯৯ এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইন ২০০৬-এর ধারা ৫৭-এর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। বিদ্যমান বাস্তবতার নিরিখে ওই ধারা ৫৭-এর উপাদানগুলো বিবেচনাক্রমে পৃথক ৪টি ধারায় (ধারা ২৫,২৮, ২৯ ও ৩১) বিন্যস্ত করা হয়েছে। অথচ আইনমন্ত্রী এবং তথ্যমন্ত্রীর গত বছরের বক্তব্য-বিবৃতিতে ধারণা তৈরি হয় যে সরকার ৫৭ ধারার কালো দিকগুলো স্বীকার করে নিয়ে তা বাতিলে সম্মত হয়েছে। আর দ্বিতীয় বিধানটি হচ্ছে ধারা ৩২, যাতে বলা হয়েছে ‘যদি কোনো ব্যক্তি বেআইনি প্রবেশের মাধ্যমে কোনো সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা সংবিধিবদ্ধ কোনো সংস্থার কোনো ধরনের অতিগোপনীয় বা গোপনীয় তথ্য-উপাত্ত কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ধারণ, প্রেরণ বা সংরক্ষণ করেন বা করিতে সহায়তা করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে কম্পিউটার গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধ।’ স্পষ্টতই এই আইন হলে আমলা এবং ক্ষমতাসীন দলের লোকজন ছাড়া অন্য যে কারও পক্ষেই সরকারি বা আধা সরকারি কোনো দপ্তরে ক্যামেরা, মোবাইল ফোন বা পেনড্রাইভের মতো ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার এখন বিপজ্জনক হয়ে পড়বে। এমনকি ওই দপ্তরের ই-মেইল বা কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে কাউকে কোনো তথ্য বা নথির কপি পাঠানোও গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। ৩২ ধারা বহাল হলে ভেবে দেখুন তো সেই ‘গুনে গুনে ঘুষ’ খাওয়া সরকারি কর্মকর্তার অপকর্মের ছবি তুলতেও তাঁর অনুমতি চাইতে হতো এবং পরে ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিককে জেলের ভাত খেতে হতো। অতীব ক্ষমতাধর সাংসদের ফারমার্স ব্যাংকের অর্থ লোপাটের তথ্য, খুনের মামলার ভিআইপি আসামিদের হাসপাতালে বিলাসী জীবনযাপন কিংবা হল-মার্কের কেলেঙ্কারি, ক্রেস্টের স্বর্ণের ১২ আনাই মিছে, ভুয়া সনদে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় সচিব হওয়ার কেলেঙ্কারির কোনো খবরই তাহলে আলোর মুখ দেখত কি না, সন্দেহ। যেকোনো অপকীর্তি, অনিয়ম বা বিব্রতকর বিষয় গোপন রাখার তাগিদ অবশ্য আমলাদের চেয়ে রাজনীতিকদের কোনো অংশেই কম নয়। সম্ভবত সে কারণেই সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীও বলতে পেরেছেন যে ‘আপনারা গণমাধ্যমে যেভাবে বিভিন্ন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে রিপোর্ট করেন, তাতে তাঁদের মান-ইজ্জত থাকে না। তাঁদের সম্মান ক্ষুণ্ন হয়। তাঁরা তো জনপ্রতিনিধি। এ আইনের বলে এখন হয়তো এমন পরিস্থিতি থেকে রেহাই পাওয়া যেতে পারে (ডিজিটাল গুপ্তচর শব্দ নিয়ে বিব্রত সরকার, বাংলা ট্রিবিউন, ৩০ জানুয়ারি ২০১৮)।’
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খড়্গ যে শুধু সাংবাদিকতার ওপর নামছে তা নয়, এটি পুরো সমাজেরই মুক্তচিন্তা এবং স্বাধীন চিন্তা ও মতপ্রকাশের পথে বাধার সৃষ্টি করবে। তবে সমাজের অন্যান্য অংশের চেয়ে সংবাদমাধ্যমের জন্য চ্যালেঞ্জটা একটু বেশিই। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় যাঁরা বিশেষজ্ঞ, তাঁরা অবশ্য সব সময়ই সংকটকে সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। কথাটি অনেকের কাছে ধূর্ত শিকারির মতো সুযোগসন্ধানীর দৃষ্টিভঙ্গি বলেও মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, আপনি যত বেশি বাধাবিপত্তি মোকাবিলায় সক্ষম হবেন, ততই আপনার যোগ্যতা প্রমাণিত হবে এবং আপনার প্রতি অন্যদের আস্থা বাড়বে। সুতরাং প্রকৃত সাংবাদিকতার জন্য এটি এমন একটি সুযোগ, যার সদ্ব্যবহার করতে পারলে যোগ্যরা আরও আস্থা অর্জন করবে। সাংবাদিকদের স্বার্থরক্ষায় কাজ করা বৈশ্বিক সংস্থা, কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্ট, সিপিজে যাকে মুক্ত সাংবাদিকতার শত্রু হিসেবে অভিহিত করেছিল, সেই ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। ট্রাম্পের নির্বাচন দেশটির মূলধারার গণমাধ্যমের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ বয়ে এনেছে। কেননা, ট্রাম্প প্রশাসন যেকোনো বিব্রতকর তথ্য প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই তথ্য ফাঁসের উৎস খুঁজে বের করাকেই অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করেছে। তথ্য ফাঁসের তদন্ত এবং বিচার তাঁর কাছে যতটা গুরুত্বপূর্ণ, বিব্রতকর তথ্যগুলো ততটা নয়। সেগুলোকে ভুয়া খবর বলে উড়িয়ে দেওয়ার অভ্যাসটা এখন তাঁর ভালোই রপ্ত হয়েছে। কিন্তু গণমাধ্যম এখন সেটিকেই চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে। তারা প্রায় প্রতিদিনই নতুন নতুন তথ্য ফাঁস করে চলেছে। এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আছে নিউইয়র্ক টাইমস এবং ওয়াশিংটন পোস্ট। শুধু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তাঁর প্রশাসনের কাজ-কারবারের বিষয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য পত্রিকাটি আট কোটি ডলার বরাদ্দের কথা জানিয়েছিল। আর সেই অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সুফলও পত্রিকাটি পেতে শুরু করেছে, তার কমতে থাকা প্রচারসংখ্যা এখন আবারও বাড়ছে, আয় বৃদ্ধিও ঘটছে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে অবশ্য মতপ্রকাশের যে অসীম স্বাধীনতার গ্যারান্টি দেওয়া আছে, সে রকম কিছু আমরা কল্পনাও করতে পারি না। কিন্তু বস্তুনিষ্ঠতা এবং জনস্বার্থের নিরিখে সাংবাদিকতা সাধারণত নির্বিঘ্ন এবং ঝুঁকিমুক্ত নয়। পেশাগত ঝুঁকি বা প্রফেশনাল হ্যাজার্ডের শিকার হয়ে বাংলাদেশে গত বছরেও প্রাণ দিতে হয়েছে সাংবাদিক আবদুল হাকিমকে, শারীরিক লাঞ্ছনা এবং মানহানির মামলায় হয়রানির শিকার হয়েছেন কতজন, তার তালিকা দিতে গেলে এই নিবন্ধের আকার দ্বিগুণও হয়ে যেতে পারে। প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নতিতে এখন সাধারণ নাগরিকেরাও সাংবাদিকতায় অবদান রাখতে সক্ষম। মোবাইল ফোনের ছবি, ভিডিও, ধারণকৃত কথোপকথন এখন হরহামেশাই সংবাদের বিষয় হয়ে উঠছে। মূলধারার সংবাদমাধ্যমে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় এখন নতুন করে নজর দেওয়া প্রয়োজন। এ জন্য প্রয়োজন আইনগত লড়াই, নিরাপত্তা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্য অর্থের সংস্থান ও প্রস্তুতি। কালাকানুনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এ পথটিতে ঝুঁকিটা একটু বেশিই, কিন্তু এর কোনো বিকল্প নেই। বস্তুনিষ্ঠতাই প্রমাণ করবে সাংবাদিকতা গুপ্তচরবৃত্তি নয়, অপরাধ তো নয়ই।
কামাল আহমেদ, সাংবাদিক।

ব্রেইন ড্রেইন নাকি ব্রেইন গেইন?

বিজ্ঞান গবেষণার আর্টিকেল প্রকাশের সংখ্যায় চীন এই প্রথমবারের মতো আমেরিকাকে ছাড়িয়ে গেছে। ২০১৬ সালে চীন প্রায় সোয়া চার লাখ আর্টিকেল প্রকাশ করেছে। আমেরিকা করেছে চার লাখ নয় হাজার। বিজ্ঞান ইতিহাসের এই স্বর্ণযুগে আমেরিকাকে ছাড়িয়ে শুধু চীনই এমন অর্জন করতে পেরেছে। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো, এই চীনের প্রায় ত্রিশ-চল্লিশ ভাগ সেরা সেরা তরুণ-তরুণী সারা দুনিয়াতে কাজ করে। তাহলে চীনের কি ব্রেইন ড্রেইন হচ্ছে না? যদি হয়েই থাকে, তাহলে এত ব্রেইন ড্রেইনের পর কী করে চীন এতটা হুংকার দিয়ে মাথা তুলে দাঁড়াল? আপনি যেটাকে দেখছেন সিক্স, সেটাকেই উল্টিয়ে কেউ দেখছেন নাইন। দুনিয়াতে কেউ যখন কোনো কিছুতে সমস্যা দেখে, কেউ দেখে সম্ভাবনা। আমরা যেটাকে বলি ব্রেইন ড্রেইন, চীন সেটাকে বলে ব্রেইন গেইন! চীন সরকার চায় তাদের আরও বেশি ছেলেমেয়ে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ুক।
সে লক্ষ্যে তাদের শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছে। চীনের তরুণেরা নিজ দেশে পড়াশোনা করে ইউরোপ-আমেরিকায় গিয়ে হিমশিম খায় না। চীন সরকার হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে মেধাবী তরুণদের আমেরিকায় পাঠায়। সে দেশ থেকে প্রতিবছর প্রায় দশ হাজার তরুণ-তরুণী শুধু আমেরিকায়  আসে এক্সচেঞ্জ রিসার্চ প্রোগ্রামে। চীনের ছেলেমেয়েরা গড়ে ২৬–২৭ বছর বয়সে ইউরোপ-আমেরিকা থেকে পিএইচডি শেষ করে। আমাদের দেশের ছেলেমেয়েদের ক্ষেত্রে সেটা গড়ে ৩০–৩২ কিংবা আরও বেশি। চীনের প্রায় নব্বই ভাগ ছেলেমেয়ে বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিতে এসে সফলতার সঙ্গে শেষ করে। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে সেটা অনেক কম (সম্ভবত পঞ্চাশেরও নিচে)। অজস্র ছেলেমেয়ে দেশের পাট চুকিয়ে বিদেশে এসে ঝরে পড়ে। কারণ, শিক্ষার মানে ব্যাপক ভারসাম‍্যহীনতা!চীন সরকার তার দেশের সেরা মেধাবীদের দেশে ফিরিয়ে নিতে বহু প্রকল্প চালু করেছে। মেধাবীরা বিদেশ থেকেই সেসব প্রকল্পের ফান্ডের জন্য আবেদন করতে পারে। প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে মেধাবীদের গবেষণার জন্য অর্থ প্রদান করা হয়। তাদের জন্য দেওয়া হয় অধিক সুযোগ-সুবিধা। সে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো লাল-নীল দল দিয়ে পূর্ণ করে রাখা হয়নি। চীনের পরিকল্পনা হলো, তাদের ছেলেমেয়েরা সারা দুনিয়ার সেরা সেরা প্রতিষ্ঠান থেকে শিখবে। সেসব তৈরিকৃত ছেলেমেয়েদের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে চীন তার নিজ দেশে ফিরিয়ে নিয়ে কাজে লাগাবে।আমার মতে, এই বিশ্বায়নের যুগে ‘ব্রেইন ড্রেইন’ বলে কিছু নেই। জ্ঞান অর্জন করতে পারলে, প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে সমাজের কাজে আসা যায়। তা ছাড়া যে সমাজ তার সম্ভাবনাকে পরিচর্যা করে না, সে সমাজে পড়ে থেকে নিজের সম্ভাবনাকে খুন করার নাম দেশপ্রেম নয়! বরং যেখানে গেলে মেধাকে বিকশিত করা যায় সেখানে গিয়ে বড় হয়ে, নিজের দেশের জন্যও নানা ভাবে কাজ করা যায়। অধিকন্তু, বিকশিত না হয়ে দেশকেও কিছু দেওয়া যায় না। বাংলাদেশের জাহিদ হাসান যদি আমেরিকায় না আসত, তাহলে জাহিদ হাসান হতে পারত না। প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির প্রফেসর হতে পারত না। ফার্মিয়ন আবিষ্কার করতে পারত না। সাইফ ইসলাম যদি আমেরিকায় না আসতেন, তাহলে ইউসি-ডেভিসের প্রফেসর হতে পারতেন না। তেমনি, সাইফ সালাহউদ্দিন এই তরুণ বয়সে হতে পারতেন না ইউসি-বার্কলের প্রফেসর।উন্নয়নশীল দেশের সরকার সকল শিক্ষার্থীদের গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ জোগান দিতে পারে না। সুযোগ-সুবিধা দিতে পারে না। সুতরাং উন্নয়নশীল দেশের ছেলেমেয়েদের মেধার বিকাশের জন্য উন্নত দেশের দ্বারস্থ হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। চীনের অসংখ্য ছেলেমেয়ে সারা দুনিয়া থেকে এই সুযোগটা নিয়েছেন। এখনো নিচ্ছেন। তাদের যোগ্যতা দিয়েই তারা এই সুযোগ নিচ্ছেন। তাদের দেশ তাদের এই সুযোগ লুফে নেওয়ার জন্য উপযুক্ত করে তৈরি করছে। গত পঞ্চাশ বছরে চীন এভাবেই দাঁড়িয়েছে। ভারত এভাবেই দাঁড়াচ্ছে। বাংলাদেশকেও এভাবেই দাঁড়াতে হবে। দেশের অভ্যন্তরীণ শিক্ষা ও গবেষণার মান উন্নয়ন করলে, প্রচুর ছেলেমেয়ে অনায়াসে বিদেশে পড়তে যেতে পারবে। বিদেশে পড়তে গিয়ে প্রচুর ছেলেমেয়ে ঝরে পড়বে না। তরুণেরা তাদের নিজের প্রচেষ্টা, মেধা ও শ্রম দিয়ে উন্নত দেশ থেকে শিখবে। রাষ্ট্র যদি তাদের সামান্য সুযোগ-সুবিধা দিয়ে দেশে ফিরিয়ে নিতে না চায়, তাহলে নিজ ভাগ্য হত্যা করে অন্যের ওপর দোষ চাপিয়ে দেওয়া যাবে। তাতে ভাগ্য পরিবর্তন হবে না। রাষ্ট্র উদ্যোগ নিলে, ব্রেইন ড্রেইন না হয়ে বহুগুণে ব্রেইন গেইন হবে। সে লক্ষ্যেই দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজ করতে হবে।
ড. রউফুল আলম, গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়া (UPenn), যুক্তরাষ্ট্র।
ইমেইল: <rauful.alam15@gmail.com>; ফেসবুক: <facebook.com/rauful15>

ট্রাম্পকে সমর্থন জুগিয়ে জনসমক্ষে মেলানিয়া

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে বসার পর গত মঙ্গলবার তাঁর প্রথম স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণের সময় উপস্থিত হয়েছেন স্ত্রী মেলানিয়া ট্রাম্প। এর মধ্য দিয়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে ট্রাম্প জড়িয়ে পড়ার পর এই প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে জনসমক্ষে নিজের উপস্থিতি স্পষ্ট করলেন মেলানিয়া। সুইজারল্যান্ডের দাভোসে গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সম্মেলনে মেলানিয়াসহ ট্রাম্পের অংশগ্রহণের কথা ছিল। কিন্তু মেলানিয়া তাতে যোগ দেননি। ফলে মেলানিয়াকে ছাড়াই দাভোসে যোগ দেন ট্রাম্প। এ ঘটনায় এই দুজনের দাম্পত্য সম্পর্ক নিয়ে ওয়াশিংটনে আগে থেকেই চলে আসা কানাঘুষা জোরালো হয়ে ওঠে।
১২ জানুয়ারি দ্য ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল এক খবরে বলেছে, ২০১৬ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচন অনুষ্ঠানের এক মাস আগে ট্রাম্প নিজেদের মধ্যকার অবৈধ সম্পর্ক ধামাচাপা রাখতে পর্নো তারকা স্টরমি ড্যানিয়েলসকে ১ লাখ ৩০ হাজার ডলার দেন। গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, ২০০৬ সালে মেলানিয়া সন্তান জন্মদানের মাত্র কয়েক মাস পর ড্যানিয়েলসের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন ট্রাম্প। তবে মঙ্গলবার রাতে স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণদান অনুষ্ঠানে হাস্যবদনে হাত নেড়ে মেলানিয়া ট্রাম্প যোগ দেন। এ সময় তাঁর পরনে ছিল উজ্জ্বল ক্রিম সাদা রঙের প্যান্ট স্যুট। কয়েক মিনিট পরই মঞ্চে উপস্থিত হন ট্রাম্প এবং স্ত্রীর সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। এদিকে প্রথা ভেঙে ট্রাম্প ও মেলানিয়া ক্যাপিটাল হিলে আলাদাভাবে হাজির হয়েছিলেন। ফার্স্ট লেডির মুখপাত্র স্টেফানি গ্রিশাম বলেন, মেলানিয়া অতিথিদের সঙ্গ দেওয়ার কারণেই এমনটা ঘটেছে। ভাষণ শেষে ট্রাম্প ও মেলানিয়া দুজনে একসঙ্গে হোয়াইট হাউসে ফিরে গেছেন কি না, সে বিষয়টিও তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট হয়নি। ৭১ বছর বয়সী ট্রাম্পের স্ত্রী ৪৭ বছরের মেলানিয়ার চিন্তাভাবনা ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য কোটি কোটি মার্কিনির কাছে এক রহস্য। প্রায় ২০০ বছরের মধ্যে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রথম বিদেশি বংশোদ্ভূত স্ত্রী হলেন সাবেক মডেল মেলানিয়া। নির্বাচনে জেতার পরপরই ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে উঠলেও মেলানিয়া সেখানে যাননি। তিনি ফার্স্ট লেডি হিসেবে তাঁর প্রথম মাস নিউইয়র্কে কাটান। ওই বছর ছোট ছেলে ব্যারনের স্কুলবর্ষ শেষ না করা পর্যন্ত হোয়াইট হাউসে উঠতে অস্বীকৃতি জানান। এরপর গত এক বছরে তাঁকে খুব কমই জনসমক্ষে বক্তৃতা দিতে দেখা গেছে। বিরল হয়ে দেখা দিয়েছেন ওয়াশিংটনে উপস্থিতির ক্ষেত্রেও।

বাধ্য হয়ে ওয়াশরুমেই বিয়ে!

হাত-মুখ ধোয়ার ঘরটা যতই ফিটফাট হোক না কেন, বিয়ের মতো জাঁকালো অনুষ্ঠান সেখানে সারতে কে চায়? ব্রায়ান আর মারিয়া জুটি অন্তত তা চাননি। কিন্তু সেই ওয়াশরুমেই বিয়ের পর্ব সারতে হলো তাঁদের। আর তা বর ব্রায়ান শুলজের মায়ের জন্য। এমনভাবে বিয়ে হবে—কল্পনাও করেননি তাঁরা। হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন বরের মা। গত ২ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের মনমাউথ কাউন্টি কোর্টহাউসের ওয়াশরুমে এই বিয়ে হয়। স্থানীয় সময় গত বৃহস্পতিবার ব্রায়ান দ্য নিউইয়র্ক পোস্টকে বলেন, ‘আমরা বিয়ের জন্য আদালত কক্ষের বাইরে বসে ছিলাম। হঠাৎ আমার মা ফোনে জানালেন, তাঁর শ্বাসকষ্ট হচ্ছে।’ খুঁজে খুঁজে মাকে তিনি ওয়াশরুমে পেলেন। মা ছিলেন দুর্বল, ঘামে ভেজা। কথাও বলতে পারছিলেন না। মনমাউথ কাউন্ট শেরিফ কার্যালয়ের কর্মকর্তারা ব্রায়ানের মায়ের শুশ্রূষা করেন। তাঁরা তাঁর জন্য অক্সিজেনের ব্যবস্থা করেন।
ফেসবুকে মনমাউথ কাউন্টি শেরিফের কার্যালয় জানায়, মায়ের এই অসুস্থতায় ব্রায়ান ও মারিয়া মানসিকভাবে খুবই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। তাঁরা বিয়ে পিছিয়ে দিতে চাইছিলেন। কিন্তু বিয়ের নতুন লাইসেন্স করতে তাঁদের আরও ৪৫ দিন অপেক্ষা করতে হতো। এদিকে ব্রায়ানের মাকে ওয়াশরুম থেকে সরানোও সম্ভব হচ্ছিল না। কারণ, সেখানেই তাঁর জন্য অক্সিজেনের বন্দোবস্ত করা হয়েছিল। এ কারণে কর্মকর্তারা তাঁর সামনেই বিয়ের আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেন। ওয়াশরুমে গিয়ে বিয়ে পরিচালনা করতে রাজি হন বিচারক কে গামার। এই ব্যতিক্রমী বিয়ের ভিডিও পোস্ট করা হয়েছে ফেসবুকে। ১০ হাজারেরও বেশিবার এটি দেখা হয়েছে। গত ২৫ জানুয়ারি এই ভিডিও প্রথমবার শেয়ার করা হয়।ভালো খবর হলো , যাঁর কারণে এমন বিয়ের আয়োজন, সেই মা এখন সুস্থ।

এক-চতুর্থাংশ শিশু যুদ্ধপীড়িত

বিশ্বের প্রতি চারটির মধ্যে একটি শিশু যুদ্ধ কিংবা দুর্যোগপীড়িত এলাকায় বসবাস করে। তাদের দুর্ভোগ অবর্ণনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। আক্রান্ত শিশুদের জন্য এই মুহূর্তে বড় ধরনের সহায়তা প্রয়োজন। জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ এই তথ্য দিয়ে আক্রান্ত শিশুদের জন্য এ যাবৎকালের সবচেয়ে বেশি পরিমাণ অর্থ সহায়তা চেয়েছে। কেবল ২০১৮ সালের জন্যই ৩৬০ কোটি ডলার সহায়তা প্রয়োজন ইউনিসেফের। সংস্থাটি জানাচ্ছে সহিংসতা, দারিদ্র্য এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ইতিমধ্যে ৫০ লাখের বেশি শিশু বাস্তুহারা হয়েছে। ইউনিসেফ যুক্তরাজ্যের নির্বাহী পরিচালক মাইক পেনরোস সতর্ক করে বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ এবং সহিংসতা বাড়ছে। তিনি বলেন, সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে ইয়েমেনের শিশুরা। যুদ্ধপীড়িত দেশটিতে কলেরা ছড়িয়ে পড়েছে ব্যাপক হারে। এতে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। সেখানে শিশুদের জন্য সবচেয়ে বেশি সহায়তা প্রয়োজন। আর জাতিগত সহিংসতা থেকে বাঁচতে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শিশুরাও কলেরার ঝুঁকিতে রয়েছে। সেখানেও বড় ধরনের অর্থ সহায়তার প্রয়োজন হবে। এর পাশাপাশি দক্ষিণ সুদান, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো এবং মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্রেও পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনে অধিকাংশ সরকারি সেবা খাত ভেঙে পড়েছে। সেখানে সুপেয় পানি এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষার উদ্যোগগুলো ব্যাহত হয়েছে।
ফলে আধুনিক ইতিহাসের ভয়াবহতম কলেরার প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। গত মঙ্গলবার ইউনিসেফ সতর্কবার্তা দিয়েছে, উত্তর কোরিয়ায় ৬০ হাজারের বেশি শিশু অনাহারে থাকার ঝুঁকিতে রয়েছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার ফলে অর্থনীতি ঝুঁকিতে রয়েছে এবং ত্রাণ সরবরাহে চলছে ধীরগতি। ক্রমবর্ধমান চাহিদা সত্ত্বেও ইউনিসেফ প্রয়োজনীয় পরিমাণ সহায়তা পাবে না বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে। গেল ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত ওই বছরে লক্ষ্যমাত্রার ৬৫ শতাংশ সহায়তা পেয়েছিল ইউনিসেফ। মাইক পেনরোস বলেন, ‘আমরা সব সময়ই প্রত্যাশা করি, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতা হচ্ছে, আমরা প্রায়ই তা পাই না।’ ২০১৭ সালে প্রাপ্ত সহায়তার অর্ধেকের বেশি গিয়েছে দক্ষিণ সুদান এবং সিরিয়ার শিশুদের জন্য। অন্য আক্রান্ত দেশগুলো অনেক কম সহায়তা পেয়েছে। গেল বছর ইউনিসেফে সর্বোচ্চ অর্থ সহায়তা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র—৫০ কোটি ডলারের বেশি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অর্থ সহায়তাকারী দেশ ছিল যুক্তরাজ্য। জাতিসংঘের সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০১৮ সালে পাওয়া সহায়তার ৮৪ শতাংশ যাবে যুদ্ধ ও সংঘাতপীড়িত দেশগুলোর শিশুদের সহায়তার জন্য। অর্থের উল্লেখযোগ্য অংশ যাবে সিরিয়া, জর্ডান ও লেবাননে। আর জর্ডান ও লেবানন শরণার্থীশিবিরে আশ্রয় নিয়েছে সিরিয়া থেকে যাওয়া অনেক শিশু ও তাদের পরিবার।

বাসের সমান ডাইনোসর

মিসরে সাহারা মরুভূমিতে লম্বা গলার চার পায়ের একটি ডাইনোসরের জীবাশ্মের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। স্কুলবাসের সমান বড় এই ডাইনোসর আট কোটি বছর আগে ওই অঞ্চলে ঘুরে বেড়াত বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। নতুন এই আবিষ্কার আফ্রিকায় ডাইনোসরদের বিচরণের সময়ের ওপর আলোকপাত করবে বলে বিশ্বাস তাঁদের।
গবেষকেরা জানিয়েছেন, ক্রিটেসিয়াস যুগের ওই ডাইনোসরটির নাম মানসোরাসরাস শাহিনি। ৩৩ ফুট লম্বা এই তৃণভোজী প্রাণীটির ওজন ছিল সাড়ে পাঁচ টন। যুক্তরাজ্যভিত্তিক নেচার পাবলিশিং গ্রুপের নেচার ইকোলজি অ্যান্ড ইভল্যুশন সাময়িকীতে গত সোমবার এ-বিষয়ক একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। মিসরের মানসোরা বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবাশ্মবিদ হিশাম সাল্লাম এই নিবন্ধের মূল লেখক। মানসোরাসরাস ডাইনোসররা বর্তমান ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী এলাকায় বাস করত। সাহারা মরুভূমির দাখলা মরূদ্যান থেকে ডাইনোসরটির খুলি, নিচের চোয়াল, কাঁধ, কশেরুকাসহ দেহের বেশ কিছু অংশ উদ্ধার করেছেন বিজ্ঞানীরা।

রাশিয়ার মতোই বড় হুমকি চীন

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চীন রাশিয়ার মতোই বড় হুমকি বলে মন্তব্য করছেন মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) প্রধান মাইক পম্পেও। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর গোপন প্রভাব বিস্তারে সচেষ্ট চীন। সিআইএ প্রধানের এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছে বিবিসি। এই গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানের দায়িত্ব নেওয়ার আগে পম্পেও মার্কিন কংগ্রেসে রিপাবলিকান পার্টির কট্টর সদস্য ছিলেন। ওই সাক্ষাৎকারে উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক তথ্য চুরি এবং শিক্ষাঙ্গন ও হাসপাতালগুলোতে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করেছে চীন। তাদের এই প্রচেষ্টা এখন যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপজুড়ে বিস্তৃত হয়েছে। মাইক পম্পেও বলেন, ২০১৮ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে যে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, তাতে রাশিয়া হস্তক্ষেপের চেষ্টা করতে পারে। তিনি বলেন, ‘দুই অর্থনীতির (রাশিয়া ও চীন) বিষয়টা ভাবুন। এ ক্ষেত্রে  চীনের সক্ষমতা বেশি।’
মার্কিন পর্যবেক্ষণ উড়োজাহাজকে রুশ যুদ্ধবিমানের তাড়া
সিএনএন জানায়, পেন্টাগন অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর একটি পর্যবেক্ষণ উড়োজাহাজকে গত সোমবার তাড়া করেছে রাশিয়ার একটি যুদ্ধবিমান। এ সময় রুশ যুদ্ধবিমানটি মার্কিন উড়োজাহাজের পাঁচ ফুটের মধ্যে চলে আসে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের তিন কর্মকর্তা বলেছেন, কৃষ্ণসাগরের ওপর আন্তর্জাতিক আকাশসীমা দিয়ে সোমবার উড়ে যাচ্ছিল নৌবাহিনীর উড়োজাহাজটি। এ সময় রাশিয়ার একটি এসইউ-২৭ যুদ্ধজাহাজ বিপজ্জনকভাবে কাছে চলে আসে।
রুশ ব্যক্তিদের তালিকা প্রকাশ
এএফপি জানায়, রাশিয়ার যেসব কর্মকর্তা ও ব্যবসায়িক নেতার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যায়, তাঁদের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ দপ্তর। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রুশ হস্তক্ষেপের অভিযোগে মস্কোকে সাজা দিতে এই তালিকা তৈরি করা হয়েছে। সোমবার প্রকাশ করা ওই তালিকায় ১১৪ জন রাজনীতিকের নাম রয়েছে, যাঁদের অধিকাংশই রুশ প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ সদস্য। ৯৬ জন ব্যবসায়ীও রয়েছেন, যাঁরা প্রেসিডেন্ট পুতিনের ঘনিষ্ঠ।

রাহুলের কালো জ্যাকেট নিয়ে বিজেপির টুইট

ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে মেঘালয় বিধানসভা নির্বাচন। নির্বাচনী প্রচারের কাজে মঙ্গলবার মেঘালয়ের রাজধানী শিলংয়ে যান মাস খানেক আগেই কংগ্রেসের সভাপতি হওয়া রাহুল গান্ধী। সেখানে একটি গানের কনসার্টে উপস্থিত হন। কথা বলেন শিল্পীদের সঙ্গেও। কিন্তু তাঁকে আক্রমণের নতুন একটি পন্থা বেছে নিয়েছে আগামী নির্বাচনে রাজ্যর ক্ষমতা নিজেদের দখলে ব্যস্ত থাকা বিজেপি। কনসার্টের সময় গাঁয়ে থাকা জ্যাকেট নিয়ে আপত্তি আর সমালোচনা শুরু করেছে রাজ্য বিজেপি।
রাহুল গান্ধী যুক্তরাজ্যর ফ্যাশন ব্র্যান্ড বরবেরির একটি কালো জ্যাকেট ও জিনস প্যান্ট পরে কনসার্টে যোগ দিয়েছিলেন। জ্যাকেটটির কারণে রাহুলের সমালোচনা করে টুইট করেছে মেঘালয় শাখা বিজেপি। সমালোচনা করে টুইটে বলা হয়েছে, তা হলে কি মেঘালয়ের সরকার ‘কালোটাকা’র স্যুট-বুটের সরকার? আমাদের দুঃখে গান গাওয়ার বদলে মেঘালয়ের অকর্মণ্য সরকারকে রিপোর্ট কার্ড দিতে পারেন! টুইটটির সঙ্গেই ওই জ্যাকেট গায়ে রাহুল গান্ধীর ছবিও জুড়ে দেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো ওয়েবসাইটে জ্যাকেটটির দামে বলা হয়েছে ৬৩ হাজার ৪০০ রুপি। কোথাও কোথাও ৭০ হাজার রুপিও বলা হয়েছে। নোট-বাতিল, জিএসটি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে শ্লথ গতিসহ নানা বিষয়ে নরেন্দ্র মোদি সরকারের বিরুদ্ধে সরব কংগ্রেস। মোদির ‘আচ্ছে দিন’ নিয়ে কটাক্ষ করেছিলেন রাহুল গান্ধী। এর আগে বিদেশ সফরে মোদি সরকারের পোশাক নিয়েও কটাক্ষ করতে ছাড়েনি কংগ্রেস। ২০১৫ সালে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে সাক্ষাতে মোদির গায়ে তাঁর নাম লেখা স্যুট ছিল। নিলামে মোদির ওই স্যুটটি ৪ কোটি ৩১ লাখ রুপিতে বিক্রি হয়েছে। তখন মোদি সরকারকে ‘স্যুট-বুট’ সরকার বলে কটাক্ষ করেছিল কংগ্রেস। এবার সুযোগ পেয়ে কংগ্রেসকে সে কটাক্ষেরই জবাব দিল বিজেপি। কংগ্রেস শাসিত মেঘালয় বিধানসভার ভোট আগামী ২৭ ফেব্রুয়ারি। আর ফল ঘোষণা করা হবে মার্চের ৩। তথ্যসূত্র: এনডিটিভি

নাগাল্যান্ড নিয়ে নাকাল বিজেপি সরকার

উত্তর-পূর্ব ভারতের নাগাল্যান্ড রাজ্যের সমস্যা দিন দিন জটিল হচ্ছে ভারত সরকারের জন্য। রাজ্যের বড় সব কটি রাজনৈতিক দল আগামী বিধানসভা নির্বাচনে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করার সিদ্ধান্তে অনড়। গতকাল মঙ্গলবার ১০ বিধায়ক ইস্তফা দিয়ে চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন। নাগাল্যান্ডের রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের বর্জনের ঘোষণা দেয় গত সোমবার। রাজধানী কোহিমায় বিজেপি, কংগ্রেস, এনপিএফসহ অন্যান্য দলের নেতারা বৈঠক করে এমন সিদ্ধান্ত নেন। এতে সাংবিধানিক সংকট দেখা দেয়। আসরে নামেন ভারতের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কিরেন রিজেজু। তিনি সব পক্ষকে বোঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু কেউ তাঁর আবেদনে কান দিতে নারাজ। আগামী ১৩ মার্চ রাজ্য বিধানসভার মেয়াদ শেষ হচ্ছে। তার আগে নতুন বিধানসভা গঠন জরুরি। কিন্তু শান্তিচুক্তির আগে ভোটে কোনো আগ্রহ নেই নাগাদের। গত রোববার নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন এনএসসিএন (আইএম) ভোটে না দাঁড়ানোর জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর ‘নির্দেশ’ জারি করে। সোমবার রাতেই সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, তথা বিজেপির জোট শরিক এনপিএফ নেতা টি আর জেইলিংও জানান, তিনি আগামী ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় বিধানসভা ভোটে না লড়ার সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত।
গতকাল নাগা ন্যাশনাল ফ্রন্টের (এনপিএফ) ১০ বিধায়ক পদত্যাগ করেন। বিধায়কদের একজন তোকেহ ইয়েপথোমি বলেন, ‘“সলিউশন বিফোর ইলেকশন” (আগে শান্তি পরে ভোট) নামে যে জনদাবি উঠেছে, তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েই আমরা পদত্যাগ করলাম। আগে নাগাল্যান্ডের সমস্যার সমাধান চাই।’ নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন এনএসসিএনরে সঙ্গে ভারত সরকারের শান্তি আলোচনা চলছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো সমাধান হয়নি। ২৬ জানুয়ারি প্রজাতন্ত্র দিবসে নাগাল্যান্ডের রাজ্যপাল পিবি আচারিয়া দাবি করেছিলেন, ‘নাগা শান্তিচুক্তি এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। সাত দশক পর শান্তি ফিরছে নাগাল্যান্ডে।’ তবে সরকারের এসব প্রতিশ্রুতিতে মন গলেনি নাগাদের। এখন দেখার বিষয়, নাগাল্যান্ডের সর্বদলীয় এই সিদ্ধান্তের পর নির্বাচন কমিশন কী সিদ্ধান্ত নেয়। তবে নাগাদের নাগালিম বা বৃহত্তর নাগাল্যান্ডের দাবি নিয়ে ইতিমধ্যেই উত্তর-পূর্ব ভারতের আরেক রাজ্য আসামসহ বিভিন্ন রাজ্যে দেখা দিয়েছে চরম উত্তেজনা।

মোদির ‘এক দেশ, এক নির্বাচন’ নীতিতে সমর্থন নীতিশের

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘এক দেশ, এক নির্বাচন’ নীতির প্রশংসা করেছেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী ও জনতা দল (সংযুক্ত) নেতা নীতিশ কুমার। তিনি বলেন, একসঙ্গে নির্বাচন হলে সময় এবং খরচ বাঁচবে। ভারতের লোকসভা নির্বাচন হওয়ার কথা আগামী বছরের এপ্রিল-মে মাসে। ২০১৪ সালে মোদি সরকার ক্ষমতায় এসেছে। সেই হিসেবে নির্বাচন হওয়ার কথা আগামী বছর।
কিন্তু খরচ কমাতে বিজেপি সরকার একসঙ্গে ভারতের লোকসভা এবং বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন একসঙ্গে করতে চাইছে। কেন্দ্রীয় সরকার চাইছে, বছরের শেষে কয়েকটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের সময়েই লোকসভা এবং বাকি সব রাজ্যের বিধানসভার নির্বাচন একসঙ্গে সেরে নিতে। এই লক্ষ্যে সরকার প্রয়োজনে নির্বাচন এগিয়ে আনতেও রাজি। এ জন্য জনমত তৈরির কাজে নেমেছে বিজেপি। গত সোমবার ভারতের সংসদে বাজেট অধিবেশনের অভিভাষণে ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দও লোকসভা ও বিধানসভার ভোট একসঙ্গে করার ওপর জোর দিয়েছেন। এরপর গত মঙ্গলবার রাষ্ট্রপতির ভাষণ নিয়ে বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএর এক বৈঠকেও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, একসঙ্গে লোকসভা এবং বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভার ভোট নিয়ে এখনই এনডিএ’র শরিক দলের সাংসদদের এলাকায় গিয়ে জনমত তৈরি করতে হবে।

পদায়ন ও বদলি

সরকারি চাকুরেদের এক দপ্তরে একনাগাড়ে তিন বছরের বেশি থাকার বিধান না থাকলেও শিক্ষা প্রশাসনে সেই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটে আসছিল দীর্ঘদিন ধরেই। এটা খুবই দুর্ভগ্যজনক যে এ নিয়ে নানা কথাবার্তা হলেও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিরা বিষয়টি আমলে নেননি। সম্প্রতি খোদ শিক্ষামন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তাসহ দুজন কর্মকর্তার উৎকোচ গ্রহণের দায়ে গ্রেপ্তার হওয়ার পর শিক্ষা প্রশাসন কিছুটা নড়েচড়ে বসেছে বলে ধারণা করা যায়। কিন্তু এটি লোকদেখানো না শিক্ষা প্রশাসনের চরিত্রবদল, সেই প্রশ্নের জবাব ভবিষ্যৎই দিতে পারে। শিক্ষা প্রশাসন যে এত দিনে নিয়মনীতি ছাড়া চলেছে, তার প্রমাণ মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি), ঢাকা শিক্ষা বোর্ড ও পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে (ডিআইএ) ৬১ জন কর্মকর্তা তিন বছরের বেশি সময় বহাল আছেন। তাঁদের কেউ কেউ ৯ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। দীর্ঘদিন একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করলে সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে কায়েমি স্বার্থ গড়ে ওঠা স্বাভাবিক। এ ক্ষেত্রেও তা ঘটেছে এমন মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব বলেছেন, নীতিমালা অনুযায়ী বদলির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের কাজ চলছে। কিন্তু এত দিনে কেন নিয়মনীতি অনুযায়ী পদায়ন ও বদলি হয়নি, সেই প্রশ্নের জবাবও খুঁজে বের করতে হবে। এর পেছনে কারা দায়ী, তাদের চিহ্নিত করে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষামন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তাসহ দুই কর্মকর্তার অপকর্মের বিষয়টি ফাঁস হওয়ার পর দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) শিক্ষা প্রশাসনের কাজকর্ম সম্পর্কে তত্ত্ব-তালাশের পাশাপাশি ৫২২ জন শিক্ষককে বদলির সুপারিশ করেছে। গত রোববার ঢাকা থেকে ২৫ জন শিক্ষককে প্রত্যন্ত অঞ্চলে পাঠানো হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, তাঁদের স্থলাভিষিক্ত কারা হবেন? শিক্ষকদের বদলির কারণে শিক্ষার্থীরা যাতে কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। দ্রুত শূন্য পদগুলো পূরণ করতে হবে। আমরা আশা করতে চাই, শিক্ষা প্রশাসনের নীতিমালা বাস্তবায়ন শুধু শিক্ষকদের মধ্যে সীমিত থাকবে না। পদমর্যাদা-নির্বিশেষে যেসব কর্মকর্তা তিন বছরের বেশি সময় একই প্রতিষ্ঠানে আছেন, তাঁদের অবিলম্বে বদলি করতে হবে। কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে তার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। উৎকোচের দায়ে দুই কর্মকর্তার গ্রেপ্তার হওয়ার অর্থ এই নয় যে শিক্ষা প্রশাসনের অন্য কর্মকর্তারা সাধু পুরুষ। রেলওয়ের কালো বিড়াল ধরতে গিয়ে সাবেক রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত নিজেই ‘ধরা’ খেয়েছিলেন। শিক্ষা প্রশাসনের কালো বিড়াল ধরবে কে?

পাকিস্তানকে শায়েস্তা করতে হবে by ব্রহ্ম চেলানি

সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে পাকিস্তানকে ২০০ কোটি ডলার নিরাপত্তা সহযোগিতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত স্থগিত করলেন, তা ঠিকই আছে। কারণ, দেশটি আন্তদেশীয় সন্ত্রাসীদের নির্মূল করতে চায়নি। কিন্তু এটাই যথেষ্ট নয়, ট্রাম্পকে আরও পদক্ষেপ নিতে হবে। পাকিস্তানকে চাপে রাখার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নানাবিধ কারণ আছে। এই দেশ এত দিন ভান করেছে যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র, অথচ তারা প্রতিবেশী আফগানিস্তানে সন্ত্রাসীদের সহযোগিতা দিয়েছে, যারা মার্কিন সেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও তাদের কতল করেছে। বস্তুত, আফগানিস্তান যে আজ ব্যর্থ রাষ্ট্র হতে যাচ্ছে, তার আংশিক কারণ হচ্ছে পাকিস্তানের এই সহায়তা; যার কারণে যুক্তরাষ্ট্র ইতিহাসের দীর্ঘতম যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তানে আক্রমণের ১৬ বছর পেরিয়ে গেছে।
অথচ দেশটির রাজধানী কাবুল এখন ঘেরাও হয়ে আছে, কাবুলের ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে সন্ত্রাসীদের হামলার মধ্য দিয়ে এটি বোঝা যায়। শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত এই হোটেলে বিস্ফোরকে ভর্তি এক অ্যাম্বুলেন্স ঢুকে গেলে এমনটি হয়। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র আফগান তালেবানদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে বড় ধরনের বিমান আক্রমণ চালিয়েছে। গত আগস্ট মাস থেকে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে যত বিমান হামলা চালিয়েছ, ২০১৫ ও ২০১৬ সাল-এ দুই বছরেও তারা এত হামলা চালায়নি। এই বিমান হামলা ও ট্রাম্প প্রশাসনের অতিরিক্ত তিন হাজার সেনা মোতায়েন সত্ত্বেও আফগানিস্তানের ক্রমাবনতিশীল পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটানো যায়নি। সেটা অর্জন করতে গেলে পাকিস্তানকে তাদের সীমান্তের উভয় পারে অভয়ারণ্য ভেঙে দিতে হবে, তালেবান ও তার সহযোগী হাক্কানি নেটওয়ার্ক যা ব্যবহার করে থাকে। আফগানিস্তানে মার্কিন সামরিক কমান্ডার জেনারেল জন নিকোলসন স্বীকার করেছেন, ‘যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রু বিদেশি সহায়তা ও নিরাপদ আশ্রয় পেলে সফল হওয়া খুব কঠিন।’ এখন সমস্যাটা হলো, পাকিস্তানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর জেনারেলরা পাকিস্তানের মাটিতে সন্ত্রাসীদের রক্ষা ও প্রশ্রয় দিতে অঙ্গীকারবদ্ধ। শুধু যেসব সন্ত্রাসী পাকিস্তানের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তারাই আইএসআইয়ের লক্ষ্যবস্তু হয়। কিন্তু পাকিস্তানি জেনারেলদের নিজ সেনাদের হত্যার জন্য কাঠগড়ায় দাঁড় না করিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তাদের এত বিপুল অঙ্কের সহায়তা দিয়েছে যে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বড় দানগ্রহীতায় পরিণত হয়েছে। এমনকি ওসামা বিন লাদেনকে ১০ বছর ধরে খোঁজার পর যখন তাঁকে পাকিস্তানের মূল সামরিক অ্যাকাডেমির পাশে পাওয়া গেল, তখনো তারা মুলা ঝোলানোর নীতিতে সে রকম বড় পরিবর্তন আনেনি। এতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পক্ষে আরও জেঁকে বসা সম্ভব হয়। দেশটির ভেতরে যে গণতান্ত্রিক উত্তরণের চেষ্টা চলছিল, তা দুর্বল হয়ে পড়ে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে পাকিস্তানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ থেকে বিরত করায় পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে, অথচ পাকিস্তান-সমর্থিত সন্ত্রাসীদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে ভারত। বরং দেখা গেছে, বেশ কটি মার্কিন প্রশাসন ভারতকে পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিকভাবে ঝামেলা মেটাতে চাপ দিয়েছে। এমনকি ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও পাকিস্তানের উপদেষ্টাকে ব্যাংককসহ বিভিন্ন জায়গায় গোপন বৈঠকে মিলিত হতে তারা পরামর্শ দিয়েছে। এই মনোভঙ্গির কারণে পাকিস্তানভিত্তিক সন্ত্রাসীদের পক্ষে মুম্বাই থেকে কাশ্মীর পর্যন্ত হামলা চালানো সম্ভব হয়েছে। অন্যদিকে হোয়াইট হাউসের নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের কারণে এটা নিশ্চিত হয়েছে যে ‘পাকিস্তানের ভেতরে ক্রিয়াশীল আন্তদেশীয় সন্ত্রাসীরা যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির কারণ হয়ে উঠেছে’। আমার এই উপসংহারে কিন্তু সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের কথার প্রতিধ্বনি রয়েছে। তিনি ২০০৯ সালে সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে পাকিস্তান ‘আমাদের দেশ ও পৃথিবীর নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি’। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাম্প প্রশাসন যে স্বীকার করেছে পাকিস্তানে তাদের নীতি ব্যর্থ হয়েছে, তা ভালো খবর। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, শুধু নিরাপত্তা সহযোগিতা বন্ধ করে পাকিস্তানের অর্থপূর্ণ পরিবর্তন আনা যাবে না, যেখানে তারা দেশটিকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছে। এর বাইরে আরেকটি অতিরিক্ত পদক্ষেপ হিসেবে তারা যেটা করতে পারে, তা হলো পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। যুক্তরাষ্ট্র যদি তা না-ও করে, তাহলে অন্তত ২০০৪ সালে দেশটিকে গুরুত্বপূর্ণ অ-ন্যাটো মিত্র হিসেবে যে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল, সেটা কেড়ে নেওয়া উচিত। এর মধ্য দিয়ে দেশটির অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মার্কিন অস্ত্র ও প্রযুক্তি পাওয়া বন্ধ হবে
 এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা উচিত। এমনকি যেসব জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা সন্ত্রাসীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখেন, তাঁদের সম্পদ ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে। অনেক পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তার সন্তানেরা যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন, তাই তাঁদের পরিবারবর্গকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে বাধা দেওয়াও কাজের কিছু হয়। শেষমেশ, যুক্তরাষ্ট্র যেহেতু পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার, সেহেতু যুক্তরাষ্ট্রের এই সুযোগ নেওয়া উচিত, তাতে এই তারল্য ঘাটতির দেশকে অর্থনৈতিকভাবে টাইট দেওয়া যাবে। ২০১৩ সাল থেকে পাকিস্তান রিজার্ভ সংকট মেটাতে ১০ বছরের ডলার বন্ড ছেড়ে আসছে। এই ঘাটতি মেটাতে পাকিস্তান যা করছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে সুযোগ এসেছে, যা তার ব্যবহার করা উচিত। একইভাবে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কাছ থেকে ৬৭০ কোটি ডলার নেওয়ার বিনিময়ে ৬৮টি রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত কোম্পানি বেসরকারি করতে রাজি হয়েছে। এখন যুক্তরাষ্ট্র যদি আর্থিক ও বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা বহুপক্ষীয় ঋণগ্রহণ প্রক্রিয়া পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেতে পারে এবং সামরিক সরঞ্জামের সরবরাহ বন্ধ করতে পারে, তাহলে সেটা হবে পাকিস্তানকে দৌড়ের ওপর রাখার আরেকটি কার্যকর পন্থা। এসব ঘটলে পাকিস্তান নিশ্চিতভাবে তার ভূমি ব্যবহার করে আফগানিস্তানে মার্কিন রসদ সরবরাহ বন্ধ করে দেবে। এতে মার্কিনদের রসদ সরবরাহের খরচ ৫০ শতাংশ বেড়ে যাবে। কিন্তু পাকিস্তান ২০১১ ও ২০১২ সালে শিখেছে, এমন কিছু করলে তার অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, বিশেষ করে তার সেনাশাসিত ট্রাকশিল্প ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এখন পাকিস্তানকে যদি দ্বৈত খেলা পরিহার করতে হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রকে পাকিস্তানের ‘মিথ্যা ও প্রতারণার’ বিনিময়ে সুবিধা দেওয়া বন্ধ করতে হবে। তার চেয়ে বড় কথা হলো, পাকিস্তানের এই দ্বৈত নীতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের উচিত তাকে শাস্তি দেওয়া। যুক্তরাষ্ট্রের নীতিপ্রণেতাদের দ্রুত কাজ করতে হবে, তা না হলে পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষক থেকে সন্ত্রাসীদের পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত রাষ্ট্রে পরিণত হবে।
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন।
ব্রহ্ম চেলানি: নয়াদিল্লিভিত্তিক সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের অধ্যাপক।