Showing posts with label আব্দুল কাইয়ুম. Show all posts
Showing posts with label আব্দুল কাইয়ুম. Show all posts

Sunday, February 2, 2025

মানবাধিকার সুরক্ষায় করণীয় by আব্দুল কাইয়ুম

মানুষের অধিকারই মূলত মানবাধিকার। শাব্দিক দিক দিয়ে এটি বেশ ছোট হলেও এর বুৎপত্তিগত অর্থের আয়তন বিশাল। এ ছাড়া বাস্তব ক্ষেত্রেও সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বোধহয় এটিই। কেননা, সব কিছুর উপরে মানুষ তার অধিকার নিয়েই বাঁচতে চায়। এভাবে বিবেচনা করলে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মানবাধিকারের ইস্যুটি এখন বেশ গুরুত্বপূর্ণ। নিউ ইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) প্রতিবেদনে সমপ্রতি পতিত সরকারের আমলে ঘটা মানবাধিকারের ভয়াবহ যে চেহারা প্রকাশিত হয়েছে তাতে উদ্বিগ্ন হওয়া অস্বাভাবিক নয়। মানবাধিকারের এমন কোনো বিষয় নেই যা লঙ্ঘন করেননি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার দল। বিরোধী মত দমনে জোরপূর্বক গুম, হত্যা, নির্বিচারে গ্রেপ্তার, একের জন্য অন্যকে সাজা দেয়া, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়া, বাকস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ থেকে শুরু করে মানুষের সকল অধিকারকেই ভূলুণ্ঠিত করেছে বিগত আওয়ামী রেজিম। যা পুনর্গঠনে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে বেশ কিছু সুপারিশ উত্থাপন করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।

বলা বাহুল্য যে, নিজেদের তৈরি রাজনৈতিক কাঠামোর উপর দাঁড়িয়েই মানবাধিকারের এমন করুণ পরিণতি ঘটিয়েছে আওয়ামী লীগ। যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জনগণের অধিকার রক্ষায় থাকবে সোচ্চার, তারা এখন মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত। আওয়ামী লীগ নিজ দলের স্বার্থেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করেছে। যার ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর ব্যাপক সংস্কারের সুপারিশ করা হয়েছে। কথা উঠেছে র‌্যাব বিলুপ্তির। পাশাপাশি পুলিশ বাহিনীর জন্য মানবাধিকার প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে বিশেষ তাগিদ দেয়া হয়েছে।
তবে এই সুপারিশ বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে সময় কোথায়? আওয়ামী লীগের পতনের পর দেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দল এখন বিএনপি (বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল)। তাদের পক্ষ থেকে নির্বাচনের আওয়াজ জোরালো হচ্ছে। যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচন দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের অপেক্ষাতেই রয়েছে দলটি। তাদের চাপ এবং রাজনৈতিক বাস্তবতায় ইউনূস সরকার যে সংস্কারের পূর্ণাঙ্গ সময় পাচ্ছে না তা নিশ্চিত। তবে দেশে মানবাধিকার বলবৎ করতে হলে দীর্ঘস্থায়ী মেয়াদে সংস্কার প্রক্রিয়া জারি রাখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। এক্ষেত্রে তারা ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগকে অবর্ণনীয় সুযোগ হিসেবে দেখছেন। সময় নিয়ে হলেও মানবাধিকার সমুন্নত করার পক্ষে মত দিয়েছেন তারা। এক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার না থাকলেও যেন এই সংস্কার প্রক্রিয়া চলমান থাকে- সে লক্ষ্যে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে আগামী মার্চে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে বিশেষ প্রস্তাব উত্থাপনের পরামর্শ দিয়েছে নিউ ইয়র্কভিত্তিক ওই মানবাধিকার সংস্থা।

দেশের সার্বিক রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায় যারাই সরকারে গিয়েছে তারাই মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত হয়েছে। বিশেষ করে বিরোধী দলকে দমন করতে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে গুমের নজির রয়েছে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন এই পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তনে নয়া রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ও বিকল্প শক্তির প্রয়োজন। বিশেষ করে মানবাধিকারকে সমুন্নত করে ক্ষমতা জনগণের হাতে ন্যস্ত করাই এখন রাজনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। যার জন্য প্রয়োজন নতুন রাজনৈতিক শক্তির। এক্ষেত্রে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন বাংলাদেশের মানুষের জন্য যুগান্তকারী একটি সুযোগ তৈরি করেছে। কেননা, এই আন্দোলন কেবল সরকার পতনের আন্দোলন নয়, বরং সকল বৈষম্য দূর করে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার গভীর পরিবর্তনকে প্রতিফলিত করেছে। বিগত সময়ে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘনের ফলেই পুলিশের তাজা বুলেটের সামনে বুক চেতিয়ে প্রতিরোধ গড়েছে ছাত্র-জনতা। এই প্রেক্ষাপটে দেশে মানবাধিকার পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে নয়া রাজনৈতিক বন্দোবস্ত এখন প্রয়োজনীয় বিষয়।

গত ১৫ বছরে দলীয়করণের ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। যেগুলোর ব্যাপক সংস্কারের প্রয়োজন। অন্যথায় দেশে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ব্যত্যয় ঘটতে পারে। এক্ষেত্রে প্রথাগত রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে নতুন আরেকটি রাজনৈতিক শক্তি অপরিহার্য। কেননা, জুলাই বিপ্লবের পর মাঠের রাজনীতিতে বিএনপি’র উল্লেখযোগ্য কোনো ভূমিকা চোখে পড়েনি। সমপ্রতি অনলাইন প্ল্যাটফরম ‘ডাক্কা রিভিউয়ের’ এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেখা গেছে- মাঠের রাজনীতিতে বিএনপি আসলে তেমন কোনো বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারেনি। দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থেকে শুরু করে ছাত্র সংগঠন-ছাত্রদলও ‘স্মার্ট পলিটিক্স’ করতে পারেনি। যার ফলে বিপ্লবের পরেও ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্রদলের অবস্থান খুব শক্তিশালীভাবে দেখা যায়নি। বিএনপি’র ৩১ দফা বেশ আশাব্যঞ্জক, ধরে নিলেও বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে শক্তিশালী বিরোধী শক্তি না থাকলে বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে ঠিক পথে রাখা কিংবা তারা বিপথে পরিচালিত হলে তাদের রাজনৈতিকভাবে চ্যালেঞ্জ করা কঠিন হয়ে পড়বে। আর বিএনপিকে মোকাবিলা করা কঠিন হলে দেশের মানবাধিকার আবারো চরম হুমকির মুখে পড়তে পারে। তাই রাজনৈতিক সুশীলদের অনেকেই মনে করছেন দেশের রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণ করে জনগণের অধিকার সুরক্ষায় নয়া রাজনৈতিক বন্দোবস্তের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।

মানবাধিকার সুরক্ষায় করণীয়

Monday, December 9, 2024

উল্লসিত ইসরাইল, কী পরিবর্তন আসছে মধ্যপ্রাচ্যে: আসাদের পতনের নেপথ্যে কে এই জোলানি? by আব্দুল কাইয়ুম

আবু মোহাম্মদ আল-জোলানি। রাতারাতি বিশ্ব জুড়ে পরিচিত এক নাম। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ পালিয়ে দেশ ছেড়েছেন। তিনি কোথায় গেছেন, ফার্স্টলেডি আসমা ও তাদের দুই সন্তান কোথায়- এর কোনো উত্তর নেই। এরই মধ্যে আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করার মাস্টারমাইন্ড হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন বিদ্রোহী গোষ্ঠী হায়াত তাহরির আল-শামস (এইচটিএস)-এর প্রধান আবু মোহাম্মদ আল-জোলানি। তবে আতঙ্ক আছে জোলানি ও এইচটিএস’কে নিয়ে। কারণ, আল কায়েদার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে এই বিদ্রোহী সংগঠনের। তবে সেসব উপচে গিয়ে এখন সবচেয়ে বড় আলোচনা জগদ্দল পাথরের মতো ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা আসাদের বিদায়। এ খবরে উল্লাস প্রকাশ করেছে ইসরাইল। সিরিয়ায় উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কড়া নজর রাখছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বাইডেন প্রশাসনও। তবে নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, আসাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তিনি তাকে আশ্রয় দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। এরপরই পালানোর সিদ্ধান্ত নেন আসাদ। সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতনের ফলে ইয়েমেনের হুতি ও লেবাননের হিজবুল্লাহ গ্রুপ দুর্বল হয়ে পড়বে। কারণ, সিরিয়ার মাধ্যমে তাদের হাতে অস্ত্র ও অন্যান্য সহায়তা যেতো। শুধু তাই নয়, গাজায় যুদ্ধরত হামাসও দুর্বল হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র সিরিয়া ও রাশিয়া। সিরিয়া তাদের হাতছাড়া হওয়ার পর ইরানও এক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে পড়বে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে সামনের দিনগুলোতে কূটনৈতিক সম্পর্কের নতুন সমীকরণ সামনে আসতে পারে। রাজধানী দামেস্কে অবস্থিত ইরানের দূতাবাসে হামলা হয়েছে। সিরিয়ার সঙ্গে গোলান মালভূমি। তার সীমান্তে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করেছে ইসরাইল। এ পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক উপয়ে এই সংকট সমাধান খুঁজে পাওয়ার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন সিরিয়ায় জাতিসংঘের দূত গিয়ের পেডারসেন। একই সঙ্গে তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। বলেছেন, নিজের দেশের সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডকে সুরক্ষিত রাখতে সক্ষম হওয়া উচিত সিরিয়ার। ওদিকে প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ পালিয়ে যাওয়ার পর মিডিয়ায় নানা জল্পনা। বলা হয়, তাকে হত্যা করা হয়েছে। তাকে বহনকারী বিমান গুলি করে ভূপাতিত করা হয়েছে। সন্ধান মিলছে না তার স্ত্রী আসমা আসাদ ও দু’সন্তানের। ফলে এসব তথ্যের কোনোটাকেই বিশ্বাস করার মতো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

রোববার বিনা বাধায় রাজধানী দামেস্ক দখলের পর আসাদ সরকারের পতনের ঘোষণা দিয়ে বিবৃতি দেয় এইচটিএস নামের গোষ্ঠীটি। এতে বলা হয়, দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন জালিম শাসক বাশার আল-আসাদ। সিরিয়া এখন মুক্ত। এর মধ্যদিয়ে একটি অন্ধকার যুগের সমাপ্তি হলো। আর সূচনা হলো একটি নতুন যুগের। দুই যুগের  বেশি সময় ধরে সিরিয়াকে  লৌহমুষ্টিতে শাসন করা আসাদের এমন করুণ পতনে গোটা বিশ্বই হতবাক। কেননা, কোনো ধরনের পূর্বাভাস ছাড়াই দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে একটি দেশের শক্তিশালী প্রেসিডেন্টের পতন নিশ্চিত করা নজিরবিহীন ঘটনাই বটে। তবে টানা ২৪ বছর পর আসাদের এমন পতনের পরিপ্রেক্ষিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন এইচটিএসের নেতৃত্বে থাকা আবু মোহাম্মদ আল-জোলানি। সকলেই জানতে চাইছে আসাদের পতনের নেতৃত্ব দেয়া নেপথ্যের নায়ক কে এই জোলানি। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে জোলানির অতীত-বর্তমান। কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে ওই নেতার নানা দিক। তাতে বলা হয়, আবু মোহাম্মদ আল-জোলানির আসল নাম আহমেদ হুসাইন আল-শারা। ১৯৮২ সালে তিনি সৌদি আরবের রিয়াদে জন্মগ্রহণ করেন। তখন তার পিতা সেখানে পেট্রোলিয়াম প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করতেন। ১৯৮৯ সালে তার পরিবার সিরিয়ায় ফিরে আসে। দামেস্কের অদূরে বসতি স্থাপন করে। দামেস্কে থাকাকালে জোলানি কী করতেন, তা জানা যায় নি। ২০০৩ সালে সিরিয়া থেকে ইরাকে এসে তিনি আল-কায়েদায় যোগ দেন। এই বছরই ইরাকে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। তিনি সেখানে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী প্রতিরোধ আন্দোলনে যোগ দেন। তখন থেকে তার নাম ছড়িয়ে পড়ে।

২০০৬ সালে জোলানি যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের হাতে গ্রেপ্তার হন। পাঁচ বছর আটক থাকেন। গণতন্ত্রের দাবিতে ২০১১ সালে সিরিয়ায় শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ শুরু হয়। বিক্ষোভ দমনে বাশার আল-আসাদ সহিংসতার পথ বেছে নেন। এর জেরে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। ২০১১ সালে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় জোলানি ছাড়া পান। এরপর তার নেতৃত্বে সিরিয়ায় আল-কায়েদার শাখা প্রতিষ্ঠা করা হয়, যা আল-নুসরা ফ্রন্ট নামে পরিচিত। সশস্ত্র গোষ্ঠীটি সিরিয়ার বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে, বিশেষত ইদলিবে শক্তিশালী হতে থাকে। প্রথম দিকের কয়েক বছর আবু বকর আল-বাগদাদির সঙ্গে কাজ করেন জোলানি। বাগদাদি ছিলেন ইরাকের ইসলামিক স্টেটের (আইএস) প্রধান। এই সশস্ত্র গোষ্ঠী পরে আইএসআইএল (আইএসআইএস) নাম ধারণ করে। ২০১৩ সালের এপ্রিলে বাগদাদি আকস্মিকভাবে আল-কায়েদার সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা দেন। সিরিয়ায় নিজেদের তৎপরতা বৃদ্ধিতে কাজ শুরু করেন। একটা পর্যায়ে আইএসআইএল আল-নুসরা ফ্রন্টকে বেশ ভালোভাবে নিজেদের সঙ্গে একীভূত করে ফেলে। তখনই আইএসআইএলের জন্ম হয়।
জোলানি এ পরিবর্তন প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি আল-কায়েদার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখেন। এ অবস্থায় ২০১৪ সালে আল-জাজিরাকে প্রথমবারের মতো টেলিভিশন সাক্ষাৎকার দেন জোলানি। এতে তিনি বলেছিলেন, তার গোষ্ঠী ‘ইসলামিক আইনের’ যে ব্যাখ্যা দেবে, সিরিয়া সেই অনুযায়ী শাসিত হবে। তবে কয়েক বছর পর জোলানির মধ্যে পরিবর্তন আসে। তিনি আল কায়েদার মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোয় ‘বিশ্বব্যাপী খেলাফত’ প্রতিষ্ঠার প্রকল্প থেকে সরে আসেন। এমন কিছুর পরিবর্তে সিরিয়া সীমান্তের ভেতরে নিজের গোষ্ঠীর তৎপরতা সীমাবদ্ধ করেন জোলানি। তার এ পরিবর্তনকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। তারা মনে করেন, এর মধ্যদিয়ে জোলানির গোষ্ঠীটি বহুজাতিক বা আন্তঃদেশীয় গোষ্ঠীর বদলে একটি জাতীয় গোষ্ঠী হিসেবে আবির্ভূত হয়।
২০১৬ সালের জুলাইয়ে বাশার সরকার আলেপ্পোর নিয়ন্ত্রণ নেয়। তখন বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো ইদলিবের দিকে চলে যায়। সিরিয়ার এ অঞ্চল তখনো বিদ্রোহীদের দখলে। ২০১৬ সালে জোলানি প্রকাশ্যে আল-কায়েদার সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করার ঘোষণা দেন। পাশাপাশি আল-নুসরা বিলুপ্ত করেন। গঠন করেন নতুন সংগঠন জাভাত ফাতেহ আল-শাম। ২০১৭ সালের শুরুর দিকে আলেপ্পো থেকে হাজার হাজার যোদ্ধা ইদলিবে পালিয়ে আসেন। এ সময়ে বিদ্রোহীদের ছোট ছোট অনেক গোষ্ঠী ও নিজের জাভাত ফাতেহ আল-শাম নিয়ে এইচটিএস গঠন করেন জোলানি। এইচটিএসের ঘোষিত লক্ষ্যই ছিল বাশার আল-আসাদের স্বৈরাচারী শাসন থেকে সিরিয়াকে মুক্ত করা। এইচটিএস আজ এই লক্ষ্য অর্জনের ঘোষণা দিলো।

এইচটিএসের অন্য লক্ষ্যের মধ্যে আছে সিরিয়া থেকে ‘ইরানের সব সশস্ত্র গোষ্ঠীকে বিতাড়িত করা’। নিজেদের দেয়া ‘ইসলামী আইনের’ ব্যাখ্যা অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করা। পর্যবেক্ষকদের মতে, বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ‘সবচেয়ে কার্যকর’ ভূমিকা পালন করেছে এইচটিএস ও এর প্রধান জোলানি।

আসাদকে কী হত্যা করা হয়েছে?
ক্ষমতা ছেড়ে কোনোমতে জীবন নিয়ে পালান সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ। যে বিমান তাকে নিয়ে আকাশে উড়েছে তাতে তার স্ত্রী আসমা এবং দুই সন্তান ছিলেন কিনা তাও কেউ বলতে পারছেন না। কেউই বলতে পারছেন না বাশার আল আসাদের শেষ গন্তব্য আসলে কোথায়? তাকে বহনকারী বিমানকেও আর শনাক্ত করতে পারেনি ফ্লাইটরাডার। এর আগে শোনা যায়, বিমানটি কিছুদূর যাওয়ার পর গতিপথ পরিবর্তন করে ইউটার্ন নেয়। এমন অবস্থায় সিরিয়ার দু’টি সূত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, যদি ওই বিমানে আসাদ থেকে থাকেন, তাহলে তাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। কারণ, তাকে বহনকারী বিমানটি ফ্লাইটরাডার ওয়েবসাইট থেকে অদৃশ্য হয়ে গেছে। কিন্তু শতভাগ সত্য কোনো তথ্য মিলছে না। ইথারে অনেক খবর। গত এক সপ্তাহ ধরে রাজনৈতিক উত্তাল অবস্থা মোকাবিলা করছিলেন বাশার আল আসাদ। জল্পনা আছে তিনি মস্কো বা তার প্রধান মিত্র ইরানের কাছে আশ্রয় চেয়ে থাকতে পারেন। সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় মিডিয়া থেকেও নিশ্চিত করা হয়নি তিনি কোথায় আছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প জানিয়ে দিয়েছেন, তাকে আশ্রয় দেননি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তাহলে কোথায় যেতে পারেন বাশার? তাকে বহনকারী বিমান যখন ইউটার্ন নিয়েছে এবং তা অদৃশ্য হয়েছে, এরপরই জল্পনা ছড়িয়ে পড়ে তাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। দু’জন সিনিয়র সেনা কর্মকর্তা বলেছেন, বিদ্রোহীরা রাজধানী দামেস্ক দখলে নিয়েছে। এর মধ্যদিয়ে ২৪ বছর পর ক্ষমতা থেকে উৎখাত হয়েছেন প্রেসিডেন্ট বাশার। এমন অবস্থায় তিনি রোববার দিনের একেবারে শুরুর দিকে একটি বিমানে করে অজ্ঞাত স্থানের উদ্দেশ্যে আকাশে পাখা মেলেন। এক সপ্তাহ আগে আকস্মিকভাবে বিদ্রোহীরা আক্রমণ তীব্র করে তোলে। তারা উত্তরাঞ্চলীয় আলেপ্পো শহর দখল করে নেয়ার পর অগ্রসর হতে থাকে রাজধানীমুখে। এরপর থেকে প্রকাশ্যে আর কোনো বক্তব্য দিতে দেখা যায়নি আসাদকে। পালিয়ে গেলেও তিনি, তার স্ত্রী এবং দু’সন্তান কোথায়, তাদের পরিণতি কি- এসব প্রশ্নের নিশ্চিত কোনোই উত্তর মিলছে না। রয়টার্স লিখেছে, বিদ্রোহীরা রাজধানী শহর দখলে নেয়ার পরই দামেস্ক বিমানবন্দর থেকে সিরিয়ার একটি বিমানে করে দেশ ছাড়েন আসাদ। ফ্লাইটরাডার এই তথ্য দিচ্ছে। এতে বলা হয়, প্রথমে সিরিয়ার উপকূলীয় অঞ্চল আসাদের শক্তিশালী ঘাঁটি আলাউয়িটের দিকে উড়ে যায় বিমানটি। তার পরপরই তা ইউটার্ন নেয় আকস্মিকভাবে এবং কয়েক মিনিট বিপরীত দিকে উড়তে থাকে। এরপরই তা মানচিত্র থেকে অদৃশ্য হয়ে যায়। বিমানে আসাদ ছিলেন বলে বলা হলেও তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না। তবে সিনিয়র কর্মকর্তারা বলছেন- তিনি ওই বিমানে থাকলে তিনি হত্যাকাণ্ডের শিকারে পরিণত হয়ে থাকতে পারেন। বিস্তারিত না জানিয়ে সিরিয়ার একটি সূত্র বলেছেন- বিমানটি রাডার থেকে অদৃশ্য হয়ে গেছে। সম্ভবত এর ট্রান্সপন্ডার বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি বিমানটি গুলি করে ভূপাতিত করা হয়েছে।
সারা দেশে ফ্রন্টলাইনে সরকারি বাহিনীর বড় পতন হয়। ফলে শনিবার রাজধানী দামেস্কের দিকে অগ্রসর হতে থাকে বিদ্রোহীরা। এর ফলে বাশার আল আসাদের জন্য টিকে থাকাই বড় রকম হুমকি সৃষ্টি হয়। রয়টার্স বলছে, রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহর হোমস বিদ্রোহীরা দখল করে নেয়ার পরপরই দামেস্ক ছাড়ে ওই বিমানটি। আসাদের রাশিয়ান মিত্রদের বিমান ও নৌঘাঁটি আছে- এমন স্থানের সঙ্গে তার সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

বদলে যাবে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি
ঠিক এক সপ্তাহ আগে বিদ্রোহীরা তাদের ইদলিব প্রদেশের ঘাঁটি থেকে সিরিয়ার শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিস্ময়কর আক্রমণ শুরু করে। তখনো প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের পতন হবে এ বিষয়টি ছিল অচিন্তনীয়। কিন্তু সিরিয়ায় সে ঘটনাই একটি টার্নিং পয়েন্ট হয়ে গেছে। প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের শুধু পতন হয়েছে এমনই নয়। তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। তার আগে ২৯ বছর ক্ষমতায় ছিলেন তার পিতা হাফিজ আল আসাদ। গত এক সপ্তাহে বিদ্রোহীরা হাফিজ আল আসাদের মূর্তি ভেঙে, তার ওপর প্রহার করেছে, যে যেভাবে পারে- অবমাননা করেছে। হাফিজ আল আসাদের মৃত্যুর পর ২০০০ সালে ক্ষমতায় আসেন তার ছেলে আসাদ। কিন্তু তিনিও পিতার মতো কঠোর হয়ে ওঠেন। সবকিছু লৌহমানবের মতো চালাতে থাকেন। তার পিতার প্রশাসন ও দেশের ওপর ছিল কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং তার ছিল নিষ্পেষণমূলক রাজনৈতিক কাঠামো। তার শাসনামলে বিরোধীদের মোটেও সহ্য করা হতো না। সেই ধারা উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছেন বাশার আল আসাদ। প্রথমে সবাই ধারণা করেছিলেন বাশার তার পিতার মতো হবেন না। তিনি উদার হবেন। মুক্ত হবেন। কম নিষ্ঠুর হবেন। কিন্তু সেই আশার মেয়াদ হয়েছে খুব কম। ২০১১ সালে তার শাসনের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ বিক্ষোভ শুরু হয়। কিন্তু তার ওপর তিনি সহিংসতা শুরু করেন। সেই সহিংসতার ফলে দেশটি গৃহযুদ্ধের দিকে ধাবিত হয়। এই যুদ্ধে কমপক্ষে ৫ লাখ মানুষ নিহত হয়েছেন। শরণার্থী হয়েছেন ৬০ লাখ মানুষ। রাশিয়া ও ইরানের সহযোগিতায় বিদ্রোহীদের দমন করতে থাকেন বাশার এবং তিনি ক্ষমতায় টিকে থাকেন। রাশিয়া তাকে আকাশপথের শক্তি এবং ইরান তার সামরিক সহযোগিতা পাঠিয়ে বাশার আল আসাদকে সহযোগিতা করে। কিন্তু সব শুরুর একটা শেষ আছে। শেষ পর্যন্ত ইরান ও রাশিয়ার তরফ থেকে সেই সহযোগিতা তিনি পাননি। তার মিত্ররা এবার তাকে পরিত্যাগ করে। তাদের সহায়তা ছাড়া আসাদের সেনারা বিদ্রোহীদের থামাতে পারেনি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা সেটা করেননি। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা ইচ্ছা করেই ইসলামিস্ট মিলিট্যান্ট গ্রুপ হায়াত তাহরির আল শামস (এইচটিএস) বিদ্রোহীদের বাধা দেননি। প্রথমেই গত সপ্তাহে তারা দখল করে নেয় দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর আলেপ্পো। এক্ষেত্রে তাদেরকে তেমন কোনো প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়নি। এর কয়েকদিন পরে দখল করে হামা এবং গুরুত্বপূর্ণ হোমস। বিদ্রোহীরা পূর্ব ও দক্ষিণ দিক থেকে অগ্রসর হতে থাকেন। তাদের আক্রমণের মুখে রাজধানী কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তারা রাজধানীতে প্রবেশ করেন এবং আসাদের মসনদ উল্টে ফেলেন। এর মধ্যদিয়ে পিতা হাফিজ আল বাশার ও ছেলে বাশার আল আসাদের মোট ৫৩ বছরের ক্ষমতার অবসান হয়। আসাদ পরিবারের কব্জা থেকে মুক্তি পায় সিরিয়াবাসী। এরপর এখন আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে দেশটি ভারসাম্য রক্ষায় চেষ্টা করবে। এর মধ্যদিয়ে কিন্তু ইরান আবারো একটি বড় রকমের আঘাত খেলো। আসাদের ক্ষমতার মেয়াদে ইরান ও লেবাননের যোদ্ধাগোষ্ঠী হিজবুল্লাহ’র মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রক্ষা করেছে সিরিয়া। এই সম্পর্ককে ব্যবহার করে হিজবুল্লাহ’র কাছে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহ দেয়া হতো। তবে ইসরাইলের সঙ্গে এক বছরের বেশি সময় যুদ্ধ করে করে হিজবুল্লাহও দুর্বল হয়ে গেছে। তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। অন্যদিকে ইরানের সমর্থনপুষ্ট ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুতি বার বার বিমান হামলা চালাচ্ছে। এসব অংশ, সঙ্গে ইরাকের মিলিশিয়া, গাজার যোদ্ধাগোষ্ঠী হামাসকে মিলে বলা হয় অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স।এই প্রতিরোধের অক্ষ সম্প্রতি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমন অবস্থায় বাশার আল আসাদের পলায়ন এবং হিজবুল্লাহ, হামাস দুর্বল হয়ে যাওয়া ইসরাইলের জন্য খুশির খবর। তবে তারা এখনো ইরানকে বড় রকমের হুমকি হিসেবে দেখে। অনেকে মনে করেন সিরিয়ায় সর্বশেষ ঘটনা বা প্রেসিডেন্ট বাশারকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত সম্ভব হতো না যদি তুরস্ক এইচটিএস’কে সমর্থন না দিতো। তবে এমন অভিযোগ তুরস্ক প্রত্যাখ্যান করেছে। কিছু সময় ধরে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান কূটনৈতিকভাবে সমস্যার সমাধান করার জন্য বিদ্রোহীদের সঙ্গে সমঝোতা আলোচনার জন্য আসাদকে চাপ দিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তাতে রাজি হননি আসাদ। ফলে আসাদের বিদায়ে বেশ খুশি তার দেশবাসী। এটা কি খুব খুশির খবর? এরপরে কী ঘটতে যাচ্ছে সিরিয়ায়? বলা হচ্ছে এইচটিএসের শিকড় রয়েছে আল কায়েদায়। তাদের আছে সহিংস অতীতও। এখন শাসকগোষ্ঠী পরিবর্তনের পর তাদের ভূমিকা কী হবে তা সময়ই বলে দেবে। একই সঙ্গে আসাদ পালিয়ে যাওয়ায় সিরিয়ার ক্ষমতায় এক বিপজ্জনক শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। তা দূর করতে প্রধানমন্ত্রী দ্রুত নির্বাচন দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।   

দামেস্ক এখন নিরাপদ
সিরিয়ার রাজধানী এখন নিরাপদ বলে জানিয়েছেন বিরোধী দলের নেতা হাদি আল-বাহরা। স্থানীয় গণমাধ্যম আল-আরাবিয়্যাকে এ কথা জানিয়েছেন তিনি। হাদি বলেছেন, আসাদ শাসনামলের অবসান হয়েছে এবং এর মধ্যদিয়ে সিরিয়া তার অন্ধকার যুগ শেষ করেছে। দ্য ন্যাশনাল কোয়ালিশন অব সিরিয়া রেভ্যুলুশন অ্যান্ড অপজিশন ফোর্সেস জোটের নেতৃত্ব রয়েছেন বাহরা। তিনি জনগণকে উদ্দেশ্য করে জোর দিয়ে বলেছেন দামেস্কের পরিস্থিতি এখন নিরাপদ। এক্সে দেয়া এক বার্তায় বাহরা বলেছেন, সকল সমপ্রদায়ের এবং ধর্মের মানুষকে লক্ষ্য করে এক্সের এক বার্তায় বাহরা বলেছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত না আপনি অন্য কারও উপর অস্ত্র তুলে ধরছেন বা ঘরে অবস্থান করছেন ততক্ষণ পর্যন্ত আপনি নিরাপদ। এখন থেকে কোনোরকম প্রতিশোধ গ্রহণ করা হবে না এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হবে না। এ ছাড়া সিরিয়ার সকল জনগণের মানবিক মর্যাদা রক্ষা করার ঘোষণাও দিয়েছেন বিরোধী দলের ওই নেতা।

গোলান মালভূমিতে প্রতিরক্ষা লাইন শক্তিশালী করার আহ্বান ইসরাইলি মন্ত্রীর
অধিকৃত গোলান মালভূমিতে নতুন করে প্রতিরক্ষা লাইন শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়েছেন ইসরাইলের প্রবাসী বিষয়ক মন্ত্রী অ্যামিচাই চিকলি। তিনি বলেছেন, সিরিয়ার বিদ্রোহীদের অগ্রগতি দেশটির জন্য ‘উদ্‌যাপনের কোনো বিষয়’ নয়। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা। এতে বলা হয়, সিরিয়ার বেশির ভাগ অংশ এখন ‘আল কায়েদা ও আইএসআইএল’-এর সহযোগী তাহরির আল-শামসহ অন্যান্য সংগঠনগুলোর নিয়ন্ত্রণে। সশস্ত্র এসব গোষ্ঠীর নেতৃত্বে যোদ্ধারা দামেস্কে প্রবেশ করেছেন বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। তবে সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেসের (এসডিএফ) শক্তিশালী উত্থানকে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন অ্যামিচাই চিকলি। এক্ষেত্রে তিনি মনে করেন, ইসরাইলকে অবশ্যই অধিকৃত গোলান মালভূমির মাউন্ট হারমন অঞ্চলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ পুনর্নবীকরণ করতে হবে। ১৯৭৪ সাল থেকে চলা গোলান মালভূমিতে যুদ্ধবিরতির ভিত্তিতে জোরালোভাবে নতুন প্রতিরক্ষা লাইন স্থাপনের আহ্বান জানিয়েছেন ইসরাইলের ওই মন্ত্রী। উল্লেখ্য, এসডিএফের ঘনিষ্ঠ মিত্র হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্ররা। সিরিয়ার গোলান মালভূমির বেশির ভাগ অংশই ১৯৬৭ সালে দখলে নিয়েছিল ইসরাইল।

mzamin


Thursday, October 31, 2024

রক্তাক্ত কাফনের কাপড় সরিয়ে মাকে দেখে মুষড়ে পড়লেন অ্যাম্বুলেন্স কর্মী by আব্দুল কাইয়ুম

রক্তাক্ত কাফনের কাপড় সরিয়ে দুঃসহনীয় মর্মান্তিক দৃশ্যের সাক্ষী হলেন ফিলিস্তিনি এক অ্যাম্বুলেন্স কর্মী। কেননা স্ট্রেচারে পড়ে থাকা কাফনে মোড়ানো মৃতদেহটি যে তার মা তা তিনি জানতেন না। ইসরাইলের বিমান হামলায় নিহত হন তার মা সামিরা বারদিনি। দেখার আগ পর্যন্ত এ সম্পর্কে কোনো খবরই পাননি তিনি। এ খবর দিয়েছে অনলাইন টিআরটি ওয়ার্ল্ড।

এতে বলা হয়, কাফনে মোড়ানো নিজের মাকে দেখে চিৎকার করে উঠেন আবেদ বারদিনি নামের এক অ্যাম্বুলেন্স কর্মী। তিনি বলেন, ওহ খোদা! শপথ করে বলছি- তিনি আমারই মা। না দেখলে কখনও জানতেই পারতাম না। এ দৃশ্য দেখে স্ট্রেচারের পাশেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন ওই যুবক।

ঘটনাস্থল থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে রক্তে রঞ্জিত মৃতদেহটি যখন আল-বালাহের আল-আকসা শহিদ হাসপাতালের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন তার পাশেই বসেছিলেন বারদিনি। তখনও তিনি জানতেন না যে কাফনে মোড়ানো মৃতদেহটি তার মায়ের লাশ।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, মাগাজি শরণার্থী শিবিরের কাছে একটি গাড়ি লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইসরাইল। এতে তিন ব্যক্তি নিহত হন। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন সামিরা বারদিনি। যিনি প্রথমে গুরুতর আহত হয়েছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে উদ্ধারের আগেই মারা যান ৬১ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি ওই নারী। গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে থাকায় সরাসরি বোমার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়েছিলেন তিনি। হামলার সময় ওই গাড়িতে আরও দুই ব্যক্তি নিহত হন। যারা গাড়ির ভিতরেই অবস্থান করছিলেন।

ঘটনাস্থলে পাঠানো দুটি অ্যাম্বুলেন্সের একটিতে ছিলেন আবেদ বারদিনি। বুধবার শেষ বিকেলের সূর্যের আলোতে যখন মৃতদেহটি স্ট্রেচারে করে হাসপাতালের ভিতরে নিয়ে যাচ্ছিলেন তখনই তিনি কাপড় সরিয়ে মুষড়ে পড়েন। দেখেন কাফনের ভিতরে পড়ে আছে তার মায়ের নিথর রক্তাক্ত দেহ।

mzamin

Wednesday, March 2, 2016

‘এই নাও তোমার চা’ by আব্দুল কাইয়ুম

মিষ্টি গলায় স্ত্রী বললেন, ‘এই নাও তোমার চা।’ সঙ্গে বিস্কুট। বেশ কিছুক্ষণ ধরেই রান্নাঘর থেকে টুংটাং শব্দ আসছিল। চা তৈরি হচ্ছে। স্ত্রী জানেন, দেরি হলে বাজখাঁই গলায় সাহেব চেঁচিয়ে উঠবেন, চা কোথায়? সেই সুযোগ তিনি দিতে চান না। চা দিয়েই তিনি আবার ছুটলেন রান্নাঘরে। সময় নেই। চুলায় ভাত। মাছও রাঁধতে হবে। টেবিলে নাশতা দিতে হবে। সাহেবের জন্য দুপুরের খাবার টিফিন বক্সে সাজিয়ে দিতে হবে। স্ত্রী নিজেও অফিসে যাবেন। আগের দিন দেরি হয়েছিল বলে বড় সাহেবের বকুনি খেতে হয়েছে। আজ অফিসে দেরি করার উপায় নেই...।
শেষ পর্যন্ত সবকিছুই হলো, শুধু স্ত্রী নিজেই নিজের তৈরি করা নাশতা খেতে পারলেন না। অফিসে দেরি করা চলবে না আজ। সংসারের অন্য সবাই খেয়েদেয়ে পরিপাটি হয়ে যার যার কাজে চলে যায়। স্ত্রীর তাতেই তৃপ্তি। ওই যে সকালে চা দেওয়ার সময় মিষ্টি হাসিটি ধরে রাখতে পেরেছেন এত চাপের মধ্যেও, সেখানেই তাঁর সার্থকতা!
আমাদের মধ্যবিত্ত ঘরের এটাই প্রতিদিনের চিত্র। সাহেব অফিস করবেন, তাঁর বড় চাকরি, বেতন বেশি। স্ত্রীর চাকরির তো কোনো দাম নেই, তা–ও করে করুক। কিন্তু সংসারের যাবতীয় কাজও তাঁকে করতে হবে হাসিমুখে। আর যাঁদের সংসারে স্ত্রী চাকরি করেন না, তাঁর জন্য তো কাজের শেষ নেই। রান্না, ঘর ঝাড়ু, ঘর মোছা, কাপড় ধোয়া, বাচ্চা মানুষ করা, স্কুলে নিয়ে যাওয়া, নিয়ে আসা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ আর কাজ। কিন্তু তাঁদের এসব কাজের কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি নেই। দামও নেই। আর্থিক বা সামাজিক মূল্যায়ন নেই। সরকারি হিসাবের খাতায়ও তাঁদের অবদান শূন্য।
গত রোববার প্রথম আলো ও মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত গোলটেবিল বৈঠকে এ বিষয়গুলো আলোচনা হয়। ‘মর্যাদায় গড়ি সমতা’ প্রচারাভিযান ও বিজ্ঞাপনী সংস্থা মাত্রাও ছিল আমাদের সঙ্গে। অ্যাকশন এইডসহ কয়েকটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার প্রধান কর্মকর্তা, গবেষক, অর্থনীতিবিদ এবং আরও অনেকে আলোচনায় অংশ নেন। তাঁরা সবাই বললেন, এটা নারীর প্রতি বৈষম্য। গৃহস্থালিসহ অন্য সব কাজের স্বীকৃতি ও মর্যাদা দিতে হবে। সমাজে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে।
গেটস ফাউন্ডেশনের সহপ্রতিষ্ঠাতা মেলিন্ডা গেটস ও তাঁর স্বামী মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস গত ২২ ফেব্রুয়ারি রাতে বিশ্বব্যাপী নারীদের এই সমস্যাকে ‘টাইম পভার্টি’ বা ‘সময়-দারিদ্র্য’ বলে অভিহিত করেছেন। অর্থাৎ মজুরিবিহীন কাজের বাইরে অন্য কাজ করার সময়ের অভাবে তাঁরা পীড়িত। এ বছর তাঁরা এই সময়-দারিদ্র্য দূর করার বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানান। সংসার সামলানোর কাজ নিশ্চয়ই অপরিহার্য। কিন্তু এ কাজের যথাযথ মূল্যায়ন হয় না এবং মজুরিসমৃদ্ধ কাজের চেয়ে একে কম মর্যাদা দেওয়া হয়। আর এই কাজগুলো যেহেতু নারীদেরই বেশি করতে হয়, তাই তাঁদের পক্ষে অন্য কাজ করা সম্ভব হয় না। মেলিন্ডা গেটস এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘নারীর মজুরিবিহীন শ্রম বিশ্বের সব সমাজে বৈষম্যের মূল এবং আমরা এ নিয়ে খুব বেশি কথা বলি না’ (সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, ২৩ ফেব্রুয়ারি)।
যুক্তরাষ্ট্রের মতো ধনী দেশেও এই বৈষম্য আছে, সংসারে পুরুষের চেয়ে নারীদের মজুরিবিহীন শ্রম বেশি দিতে হয়, যদিও গরিব দেশগুলোর চেয়ে সেটা কম। জাপানে এই সময়-পার্থক্য বেশি ছিল। সম্প্রতি কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে সংসারে সারাক্ষণ বাচ্চা দেখাশোনার কাজ থেকে নারীরা বেরিয়ে এসে অন্য কাজে যোগ দিতে পারেন।
বিশ্বব্যাপী নারীরা মজুরিবিহীন কাজে প্রতিদিন গড়ে প্রায় সাড় চার ঘণ্টা কাজ করেন, যা পুরুষের মজুরিবিহীন কাজের সময়ের দ্বিগুণ। নরওয়েসহ স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে এই পার্থক্য একটু কম। যেমন, নরওয়েতে নারীরা দিনে গড়ে সাড়ে তিন ঘণ্টা এবং পুরুষেরা তিন ঘণ্টা মজুরিবিহীন শ্রমের সাংসারিক কাজ করেন। ভারতে চিত্রটি ভিন্ন। নারীরা গড়ে ছয় ঘণ্টা এবং পুরুষেরা এক ঘণ্টারও কম সাংসারিক কাজ করেন।
বাংলাদেশে একজন নারী তাঁর সারা জীবনের প্রায় ১২ বছর রান্নাঘরে কাটান। অ্যাকশন এইড ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রজেক্টের আওতায় লালমনিরহাট ও গাইবান্ধা জেলার তৃণমূল নারী ও পুরুষের ব্যবহৃত বিভিন্ন কাজের সময়ের ভিত্তিতে ২০১৫ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরে পরিচালিত এক গবেষণায় এ তথ্য পাওয়া গেছে। এর চেয়ে হতাশাজনক অবস্থা আর কী হতে পারে! গবেষণায় দেখা গেছে, বাড়িতে একজন নারী যেখানে সারা দিনে সেবামূলক কাজে পৌনে সাত ঘণ্টা ব্যয় করেন, সেখানে পুরুষ ব্যয় করেন সোয়া এক ঘণ্টারও কম।
একজন নারী প্রতিদিন ১২টিরও বেশি কাজ করেন, যা মজুরিবিহীন এবং জাতীয় আয়ের (জিডিপি) হিসাবে যোগ হয় না। আর পুরুষ করেন তিনটিরও কম। নারীর যে কাজ জাতীয় আয়ের হিসাবে (জিডিপি) যোগ হয় না—এমন কাজের আনুমানিক বার্ষিক মূল্য জিডিপির প্রায় ৭৬ দশমিক ৮ শতাংশ। কৃষিতে নারীর অবদান হিসাব করলে অবাক হতে হয়। ধান উৎপাদনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ২৩টি ধাপের মধ্যে ১৭টির সঙ্গে নারী সরাসরি যুক্ত। কিন্তু নারীর এই অবদানের স্বীকৃতি কোথাও নেই। কারণ এ কাজে কোনো নগদ আয় নেই বা এ কাজের জন্য কাউকে মজুরি দিতে হয় না। উপরন্তু নারী কাজ যতই করুন, যেহেতু ফসলের মালিক পুরুষ বা তাঁর স্বামী, তাই কাজের স্বীকৃতিও পুরোটা তাঁরই পকেটে চলে যায়। আর উঠতে-বসতে স্ত্রীকে কথা শুনতে হয়। বলা হয়, ‘সারা দিন করো কী?’
সাধারণত পেশাগত পরিচয়ে বলা হয়, স্বামী অমুক চাকরি করেন আর স্ত্রী গৃহিণী! স্ত্রীর পরিচয়ে অনেক সময় বলা হয়, উনি কোনো ‘কাজ’ করেন না! স্পষ্টতই এখানে ‘কাজ’ বলতে মজুরি-বেতন-ভাতা বাবদ নগদ আয় হয়—এমন কাজ বোঝানো হয়। আর নারীরা ঘরের যত কাজ করেন, সেসব কোনো কাজ বলে গণ্য হয় না, কারণ সেখানে কোনো নগদ আয় নেই।
একবার একটি চমৎকার কার্টুনচিত্র দেখেছিলাম। একজন নারী দশ-পনেরো হাতে কাজ করছেন। রান্না, সন্তান লালন-পালন, পরিবারের সদস্যদের সেবাযত্ন, ঘর পরিষ্কার করা, ...সব কাজ। আর ছবির ওপরে-নিচে লেখা, ‘আমার বউ কাজ করে না’! প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গিতে কাজগুলো এতই অদৃশ্য। নারীর মজুরি ও স্বীকৃতিবিহীন কাজের এমন তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ খুব কমই দেখেছি। কার্টুনচিত্রটি একেবারে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, আমাদের সমাজে নারীর কাজের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি কত বৈষম্যমূলক ও ত্রুটিপূর্ণ।
নারীর সব কাজের স্বীকৃতি দিয়ে সঠিক মূল্যায়ন না করলে সমাজে অর্ধেক মানুষ উৎপাদনশীল কাজের বাইরে থেকে যাবে। যেহেতু নারীকে একাধারে ঘর ও বাইরের সব কাজ করতে হয়, তাই তাঁর স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে। নিজের অবসর বলতে কিছু থাকে না। তিনি যদি চাকরি করেনও, তা হলেও তাঁর পক্ষে প্রশিক্ষণ নিয়ে পেশাগত উৎকর্ষ লাভ করা সম্ভব হয় না। ফলে চাকরিতে গেলেও নারী সব সময় কম বেতনের নিম্নমানের কাজ করতে বাধ্য হন। সমাজের অর্ধেক কর্মশক্তি এভাবে পূর্ণ অবদান রাখতে ব্যর্থ হয়।
এর প্রতিকার কঠিন নয়। গৃহস্থালির কাজে পুরুষ সমান দায়িত্ব নিলে নারীর বোঝা অনেক কমে। তিনি পুরুষের সমান অবস্থানে থেকে চাকরি করতে পারেন। যেমন, স্বামী সপ্তাহে তিন-চার দিন সন্তানকে স্কুলে নিয়ে যাওয়া ও নিয়ে আসার দায়িত্ব নিতে পারেন। রান্নাঘরের কিছু কাজও ভাগাভাগি করে নেওয়া যায়। সরকারও নতুন কিছু আইন করতে পারে। চাকরিজীবীর জন্য বছরে ‘পরিবারের জন্য ছুটি’, ‘পিতৃত্ব ছুটি’র ব্যবস্থা করা যেতে পারে। অনেক দেশে এ রকম আছে। একই সঙ্গে গৃহস্থালির কাজে আধুনিক প্রযুক্তি সহজলভ্য করা দরকার। ওয়াশিং মেশিন, রাইস কুকার, ঘর মোছার মেশিন প্রভৃতি সবার হাতের নাগালে আনা গেলে ঘরের কাজে সময় ভাগাভাগি সহজ হয়। কিন্তু এ জন্য আর্থসামাজিক উন্নয়ন দরকার। আবার বিপরীতক্রমে সমাজের অর্ধেক শক্তি নারীকে বাদ দিয়ে সমাজের উন্নয়নও সম্ভব নয়, এটাও মনে রাখতে হবে।
এক হিসাবে দেখা গেছে, গৃহস্থালির কাজে নারীর কাজের সময় দুই ঘণ্টা কমানো গেলে দেশের শ্রমশক্তিতে তাঁদের অংশগ্রহণ ১০ শতাংশ বাড়ে।
আসুন, আমাদের দেশে নারীর জন্য আপাতত ১০ শতাংশ কর্মক্ষেত্র বাড়ানোর লক্ষ্যে তাঁদের গৃহস্থালির কাজের সময় অন্তত দুই ঘণ্টা কমানোর উদ্যোগ নিই।
এ জন্য পুরুষকে এগিয়ে আসতে হবে। নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে।
আব্দুল কাইয়ুম: সাংবাদিক।
quayum@gmail.com

Saturday, February 20, 2016

এই আমাদের পুলিশ! by আব্দুল কাইয়ুম

আমি তখন সংবাদ-এ। সাংবাদিক সন্তোষ গুপ্ত মজার মজার টীকা-টিপ্পনী কেটে আমাদের সম্পাদকীয় বিভাগ মাতিয়ে রাখতেন। একদিন বললেন, দু কড়ি যোগ + তিন কড়ি = পাঁচ কড়ি—এই শিরোনামে একটি সম্পাদকীয় লেখেন! আমরা নিজেদের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছি। কারণ, ঠিক বুঝতে পারছিলাম না, কী লিখব আর কেনই-বা লিখব। সন্তোষদা পরে গল্পটি বললেন। পাঁচ কড়ি নামের এক আসামি ধরার জন্য পুলিশ পাঠানো হয়েছে। দুই দিন পর দুই শিশুর কোমরে দড়ি বেঁধে থানায় এনে পুলিশ সদস্য ওসিকে বললেন, ‘এই যে আসামি।’ ওসি সাহেব তো অবাক। তখন পুলিশ সদস্য বুঝিয়ে বললেন, ‘স্যার, পাঁচ কড়ি বলে ওই গ্রামে কেউ নেই। তো দুজনকে পেয়েছি, এর নাম দু কড়ি আর ও তিন কড়ি। দেখলাম, দুই আর তিন যোগ করলে যেহেতু পাঁচ হয়, আর আমার দরকার পাঁচ কড়ি, তাই একসঙ্গে দুজনকে ধরে আনলাম!’
আমরা সেদিন খুব হেসেছি। ওটা যে নেহাতই গল্প, তা নিয়ে আমাদের সন্দেহ ছিল না। অবশ্য মজার সেই সম্পাদকীয় সেদিন লেখা হয়েছিল। কারণ, ও রকমই একটি কাণ্ড পুলিশ ঘটিয়েছিল। হুবহু এক ছিল না। তাই গল্পটি খাপ খাওয়ানোর জন্য কিছু কসরত করতে হয়েছিল।
আজ প্রায় ২৫ বছর পর হঠাৎ একটি খবর দেখে বুঝলাম, হুবহু ওই রকম ঘটনা এখনো ঘটছে। অপরাধ করেছেন ছোট বোন আর পুলিশ ধরে এনেছে বড় বোনকে। বিনা অপরাধে তাঁকে জেলে আটক থাকতে হয়েছে প্রায় তিন মাস। বড় বোনের নাম লাকি আর ছোট বোনের পাসপোর্টে নাম ছিল লাকি আক্তার মুক্তা। সোনা চোরাচালানের মামলায় আসামি ধরতে গিয়ে পুলিশ বড় বোনকে গ্রেপ্তার করে জেলে ঢোকায়। যাত্রাবাড়ী থানার উপসহকারী পরিদর্শক (এএসআই) বলেন, ‘বড় বোনের নাম লাকি। আবার ছোট বোনের নামের এক জায়গায় লাকি রয়েছে। এই দুজনের স্বামীর নামেও কিছু মিল আছে। বড় বোনের স্বামীর নাম হারুন দেওয়ান আর ছোট বোনের হারুন-অর-রশীদ। নামের মিল থাকায় লাকিকে গ্রেপ্তার করে আদালতে চালান করি (প্রথম আলো অনলাইন, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৬)!’
পরে ছোট বোন আদালতে আত্মসমর্পণ করলে বড় বোন মুক্তি পান, ছোট বোন জেলে যান।
এই আমাদের পুলিশ। এটা পুলিশের ভুল না ভেল্কিবাজি, তা কে জানে।
আজকাল পুলিশের নানা কাণ্ড নিয়ে কাগজে খবর বেরোয়। সেদিন মোহাম্মদপুরের শিয়া মসজিদের কাছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে পুলিশ রিকশা থেকে নামিয়ে একটি দোকানে ঢোকায়। দোকানিকে বের করে দিয়ে পুলিশ সেই ছাত্রীকে হেনস্তা করেছে বলে অভিযোগ ওঠে। বিচার বিভাগীয় তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। এ বিষয়ে আদালত ব্যবস্থা গ্রহণের আদেশ দেন।
এর আগে ৩ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মিরপুরে চা-দোকানি বাবুল মাতবরকে জ্বলন্ত চুলায় ফেলে পুড়িয়ে মারার ঘটনায় মিরপুরের শাহ আলী থানার তৎকালীন ওসিসহ পাঁচ পুলিশ সদস্যের দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পায় পুলিশেরই গঠিত দুটি তদন্ত কমিটি।
এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন কি না, তা পুলিশকেই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দেখাতে হবে। আমরা জানি, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ আমাদের এই পুলিশই হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। আমরা সব সময় পুলিশের সেই আত্মোৎসর্গ গর্বের সঙ্গে স্মরণ করি। তাদের সেই গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা ছিল রণাঙ্গনে আমাদের প্রেরণার উৎস।
স্বাধীন বাংলাদেশেও বিভিন্ন সময় পুলিশকে বেশ বুদ্ধিদীপ্ত ভূমিকা পালন করতে দেখেছি। বিশেষভাবে আশির দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় পুলিশ ছিল গণ-আন্দোলনের পক্ষে। ছাত্ররা তখন প্রায়ই পথসভা করতেন এবং পত্রিকায় কর্মসূচি ঘোষণা করে সবাইকে জানিয়ে দেওয়া হতো কোথা থেকে কোন সময়ে পথসভা শুরু হবে। পত্রিকার খবর দেখে কর্মীরা সেই সব স্থানে সমবেত হতেন, স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্লোগান দিয়ে রাজপথে মিছিল বের করতেন।
কিন্তু মুশকিল হলো, মিছিলের স্থান ও সময় শুধু আন্দোলনের কর্মীরাই নন, পুলিশও পেয়ে যেত। ছাত্ররা দেখতেন কর্মীদের আগে পুলিশ এলাকা ঘিরে ফেলেছে। প্রায়ই পুলিশের ধাওয়ার মুখে মিছিল পণ্ড হতো। পরে পুলিশই একটি বুদ্ধি বাতলে দিল। তারা ছাত্রদের পরামর্শ দিল, পত্রিকায় মিছিলের স্থান সদরঘাট উল্লেখ করে যেন বাহাদুর শাহ পার্ক থেকে মিছিল শুরু করা হয়। কর্মীদের যেন গোপনে পরিবর্তিত স্থান জানিয়ে দেওয়া হয়। তা হলে পুলিশ যাবে সদরঘাটে আর গরম মিছিল বের হবে বাহাদুর শাহ পার্ক থেকে। আন্দোলনও বেগবান হবে, পুলিশেরও চাকরিতে অসুবিধা হবে না।
এই বুদ্ধিটি পুলিশই দিয়েছিল। ফলে অনেক মিছিল-মিটিং সেই সময় নির্বিঘ্নে করা সম্ভব হতো।
মুশকিল হলো, আমাদের সমাজ এখনো স্বতঃস্ফূর্ততায় বেশি প্রভাবিত। ঝোঁকের মাথায় কাজ করা মানুষের অভ্যাস। ১৬ কোটি মানুষের ছোট এই দেশে শৃঙ্খলা রক্ষা কঠিন। তাই বিচ্যুতি সহজাত। এখানেই আমাদের চ্যালেঞ্জ।
১৯৭৭ সালে একবার রাজনৈতিক কারণে পুলিশ আমাকে গ্রেপ্তার করতে আসে। কিন্তু প্রথমে সেই কর্মকর্তা গ্রেপ্তারের কথা না বলে কৌশলে থানায় নিয়ে যেতে চান। আমি সরল মনে তাঁর সঙ্গে থানায় যেতে চাই। কিন্তু লক্ষ করি, সঙ্গের একজন পুলিশ সদস্য চোখের ইশারায় থানায় যেতে মানা করছেন। সেই পুলিশের সহযোগিতামূলক মনোভাব আমি বুঝতে পারিনি। তাই থানায় গিয়ে বিপদে পড়ি। কিছু সময় আটক ছিলাম। পরে সেই পুলিশ সদস্য আমাকে বললেন, ‘চোখের ইশারা বোঝেন না? আমি আপনাকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম। আপনি রাজনীতি করেন, দেশের জন্য কাজ করেন, আপনাকে রক্ষা করতে চেয়েছিলাম।’
এই পুলিশ আমাদেরই কাছের মানুষ। সব পেশায়ই এদিক-ওদিক কিছু হয়। তার মানে সবাইকে এক কাতারে ফেলে দেখতে হবে, তা নয়।
কয়েক বছর আগে আমার ঘনিষ্ঠ একজন বিসিএস দিয়ে পুলিশ বিভাগে চাকরিতে যোগ দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে অনার্স ও মাস্টার্স, এরপর আবার এমবিএ করে তিনি পুলিশে যান। কেন? জিজ্ঞেস করলে বলেন, তিনি লক্ষ করেছেন যে পুলিশে ভালো ও উন্নত মানের দক্ষ কর্মকর্তা গড়ে তুলতে আমেরিকা-ইউরোপ উদ্যোগী হয়েছে। তাই তাঁর বিশ্বাস, ভবিষ্যতে পুলিশ দেশের জন্য খুব মর্যাদাসম্পন্ন একটি শক্তি হিসেবে দাঁড়াবে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে অবদান রাখার জন্য তিনি পুলিশ ক্যাডার বেছে নিয়েছেন।
এখন পুলিশে অনেক কর্মকর্তা রয়েছেন, যাঁরা মানবাধিকার ও অন্যান্য বিষয়ে বিলাত-আমেরিকার নামীদামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করে এসেছেন। আমাদের পুলিশ নিয়ে গর্ব করার মতো অনেক কিছুই আছে। তবে অনেক ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে অনেক প্রশ্ন দেখা দেয়।
বিশ্বের উন্নত অনেক দেশেও পুলিশের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। কিন্তু পুলিশের যেকোনো বিচ্যুতির বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হয় বলে ওই সব দেশের মানুষ পুলিশের ওপর আস্থা হারায় না। যেকোনো পেশায় কোনো সদস্য ভুল করতে পারেন। অথবা অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়তে পারেন। কিন্তু এসব বিচ্যুতির বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা কতটা দৃঢ়, সেটাই বিচার্য। যদি ফাঁকফোকর বন্ধ করার ব্যবস্থা থাকে, তাহলে কিছু সদস্যের জন্য একটি পুরো প্রতিষ্ঠানের মুখে চুনকালি পড়ে না।
আমাদের দেশে এখন এদিকে জোর দিতে হবে। পুলিশের প্রশিক্ষণ এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করে। আমাদের পুলিশ প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলো গর্ব করার মতো। সেখানে নিয়মিত প্রশিক্ষণ হয়। দক্ষ ও আধুনিক পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলার বিকল্প নেই।
কিন্তু মুশকিল হলো, আমাদের সমাজ এখনো স্বতঃস্ফূর্ততায় বেশি প্রভাবিত। ঝোঁকের মাথায় কাজ করা মানুষের অভ্যাস। ১৬ কোটি মানুষের ছোট এই দেশে শৃঙ্খলা রক্ষা কঠিন। তাই বিচ্যুতি সহজাত। এখানেই আমাদের চ্যালেঞ্জ। মানুষই ঘুষ দিয়ে অবৈধ গ্যাসলাইন নেয়, আবার পুলিশ দিয়ে সেই অবৈধ লাইন কেটে দেওয়ার কয়েক দিনের মাথায় পুনরায় অবৈধ সংযোগ চালু হয়ে যায়।
এখানে আইনের সঠিক প্রয়োগও বেশ কঠিন। কিন্তু এই কঠিন কাজটিই আমাদের করতে হবে।
আব্দুল কাইয়ুম: সাংবাদিক।
quayum@gmail.com

Saturday, February 6, 2016

ঘড়ির কাঁটা ডান দিকে ঘোরে কেন? by আব্দুল কাইয়ুম

গণিত উৎ​সবে প্রতিবছরই আমরা তরুণ
শিক্ষার্থীদের বিকাশমান প্রতিভার পরিচয় পাই
আমাদের দেশের তরুণেরা যে কত গভীরে চিন্তা করতে পারে, শিরোনামের প্রশ্নটিই তার প্রমাণ। এই মজার প্রশ্নের উত্তর পরে দিচ্ছি। তার আগে কিছু জানার আছে। এ প্রশ্নটি করেছিল গত ৩১ জানুয়ারি টাঙ্গাইল গণিত উৎসবে একজন তরুণ শিক্ষার্থী। প্রশ্নোত্তর পর্ব চলছিল। সকালে সোয়া এক ঘণ্টার গণিত আঞ্চলিক অলিম্পিয়াড প্রতিযোগিতায় পরীক্ষার পর ঘণ্টা খানেকের জন্য এ পর্বটি চলে। স্কুল-কলেজের তরুণেরা প্রশ্ন করে আর উত্তর দেন মঞ্চ থেকে বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা সাধারণত ওই অঞ্চলের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও স্কুলের গণিত বা বিজ্ঞানের শিক্ষক।
সেদিনও এসেছিলেন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল অনুষদের ডিন মো. মতিউর রহমান, পদার্থবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান মাসুম হায়দার, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাজ্জাদ ওয়াহিদ প্রমুখ। আমাদের আমন্ত্রণে তাঁরা যে নিজ উদ্যোগে এসেছেন, সে জন্য আমরা কৃতজ্ঞ। গণিত উৎসব অনুষ্ঠিত হয় টাঙ্গাইল শহরের বিবেকানন্দ হাইস্কুল ও কলেজের মাঠে। শিক্ষা যে সত্যিই মহান পেশা এবং অধ্যাপকেরা যে তরুণদের জ্ঞানের ভিত্তি আরও একটু প্রসারিত করার জন্য একটা দিন ব্যয় করেন, সেটা সত্যিই গর্বের বিষয়।
ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ও প্রথম আলোর সহযোগিতায় বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি প্রতিবছর সারা দেশে গণিত উৎসব ও অলিম্পিয়াডের আয়োজন করে। প্রতিবছরই আমরা তরুণ শিক্ষার্থীদের বিকাশমান প্রতিভার পরিচয় পাই। এবারও পেয়েছি। তার প্রমাণ ওই সব প্রশ্ন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একজন তরুণ শিক্ষার্থী একটা মজার প্রশ্ন করেছিল, সাবানের রং ভিন্ন হলেও সব সাবানের ফেনা সাদা কেন? কক্সবাজারের এক তরুণ শিক্ষার্থীর প্রশ্ন শুনে তো আমাদের আক্কেল গুড়ুম! তাঁর প্রশ্নটি ছিল, আমাদের দেশের সব মোবাইল ফোন নম্বর শূন্য দিয়ে শুরু কেন?
প্রশ্নগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি আমাদের তরুণ প্রজন্ম অনেক বড় চিন্তাভাবনা করতে শিখে গেছে। ভালো প্রশ্ন করতে হলেও গভীর জ্ঞানের দরকার। বলুন তো, সব মোবাইল ফোনের নম্বর যে শূন্য দিয়ে শুরু হয়, সেটা আমরা যাঁরা বড়, তাঁদের কয়জনের মাথায় এসেছে? অথচ আমাদের ছোট ছোট ছেলেমেয়ে এ রকম কঠিন প্রশ্ন করতে শিখে গেছে। তাদের আর থামিয়ে রাখা যাবে না। প্রশ্ন যখন করতে শিখেছে, দেশকে তারা এগিয়ে নিয়ে যাবেই।
টাঙ্গাইলে আমি পঞ্চম শ্রেণির তিনজন ছাত্রীর সঙ্গে কথা বলছিলাম। আতিয়া আদিবা, রুসমিয়া করিম ও জান্নাতুল বুশরা। তাদের মায়েরা শিশুসন্তানদের নিয়ে এসেছেন এই শীতের সকালে গণিত উৎসবে। আতিয়ার মা শারমিনা আকতার বললেন, আমরা চাই মেয়েরা গণিতে পারদর্শী হয়ে উঠুক। রুসমিয়ার মা ইয়াসমিন আরা ও বুশরার মা নুসরাত তানজিন লিজাও একই কথা বললেন। তাঁদের মেয়েরা ক্লাসে ফার্স্ট-সেকেন্ড হয়। বিজ্ঞানের প্রতি তাদের দারুণ আগ্রহ। মেয়েরা, মায়েরা বুঝতে পারছেন, এগিয়ে যেতে হলে বিজ্ঞান, গণিত ও অন্যান্য শিক্ষায় চৌকস হতে হবে। এটা আমাদের দেশের জন্য একটা বড় প্রাপ্তি।
মোবাইল ফোন নম্বর শুরু হয় একটা শূন্য দিয়ে। কারণ, এই শূন্য হলো আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশনের স্বীকৃত বাংলাদেশের ভেতরের মোবাইল কল সংকেত। যদি দেশের ভেতর থেকে কাউকে মোবাইলে ফোন করি, তাহলে এই শূন্য সংকেত থেকে টেলিকমিউনিকেশনস সিস্টেম বুঝে নেবে যে এই কলটি বাংলাদেশের ভেতরে যোগাযোগ করতে চায়। যদি বাইরের কোনো দেশ থেকে কল করতে হয়, তাহলে প্রথমে ০০৮৮ লিখে তারপর ০ নম্বর টিপতে হবে। কারণ, ০০ অর্থ আন্তর্জাতিক কল, ৮৮ হলো বাংলাদেশ, তারপর ০ দিয়ে শুরু মানে মোবাইলে বাংলাদেশের ভেতর কল যাবে। বাংলাদেশের কোড হলো ৮৮০। যদি নম্বরটি ০১৭.. হয়, তাহলে সেটা হবে গ্রামীণ ফোনের, ০১৫... হলে সেটা হবে টেলিটক ইত্যাদি।
সাবানের ফেনা কেন সাদা? কারণ সাবানের ফেনা যদি আলোর সবগুলো রং প্রতিফলিত করে, তাহলে সেটা সাদা দেখাবে। অনেক সময় ফেনার কোনো অংশ বেগুনি, লাল বা সবুজও দেখায়। তার মানে ফেনার মধ্য দিয়ে কিছু আলো প্রতিসরিত হয়ে চলে যায়, আর নীল, বেগুনি বা সবুজ রং প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে ফিরে আসে, তখন সেই রঙের দেখায়। কিন্তু এটা সাবানের রঙের জন্য নয়। আসলে সাবানের মধ্যে যে ক্ষার থাকে, তার রং সাদা। এর ওপর সবুজ বা গোলাপি রং মিশিয়ে হয়তো সাবান রঙিন করা হয়। কিন্তু পানিতে গোলানোর পর সেই রং আর থাকে না।
এখন দেখা যাক, ঘড়ির কাঁটা কেন ডান দিকে ঘোরে। কারণ, ঘড়ি আবিষ্কার হয়েছিল ইংল্যান্ড বা ইউরোপের কোনো দেশে। এর আগে ছিল সূর্যঘড়ি। ইংল্যান্ড পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধে হওয়ায় সূর্য দক্ষিণ আকাশে হেলে থাকে। এ কারণে সূর্যঘড়ির যে দণ্ডের ছায়া দেখে সময় পরিমাপ করা হয়, সেই ছায়াটি বাঁ দিক থেকে ডান দিকে ঘোরে। কারণ, ওই স্থানটি উত্তর গোলার্ধে। ওখানে সূর্য যখন পূব থেকে পশ্চিমে যায়, তখন সূর্যঘড়ির দণ্ডের ছায়াটি বাঁ থেকে ডান দিকে ঘোরে। তাই ঘড়ি আবিষ্কারের সময় স্বাভাবিক ও অভিজ্ঞতালব্ধ চিন্তা অনুযায়ী ঘড়ির কাঁটা ডান দিকে ঘোরানোর পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। ঘড়ি যদি অস্ট্রেলিয়া বা নিউজিল্যান্ডে আবিষ্কার হতো, তাহলে হয়তো ঘড়ির কাঁটা বাঁ দিকে ঘুরত। কারণ, দক্ষিণ গোলার্ধে সূর্যঘড়ির ছায়া উত্তর গোলার্ধের বিপরীত দিকে, অর্থাৎ ডান দিক থেকে বাঁ দিকে ঘোরে!
গণিতে অনেক মজা আছে। যেমন, আমি টাঙ্গাইলের গণিত উৎসবে বললাম, তরুণেরা বন্ধুর জন্মদিনে গণিতের একটা মজার ধাঁধা ধরতে পারে। প্রথমে সে বলবে ৬১৭৪ একটি ম্যাজিক সংখ্যা। কেন ম্যাজিক? কারণ যে কেউ চার অঙ্কের একটি সংখ্যা বলুক, যার অন্তত একটি অঙ্ক অন্যগুলোর থেকে পৃথক হবে। তাহলে সে ওই চার অঙ্কের সংখ্যা থেকে কিছু সংখ্যা নির্দিষ্ট নিয়মে সাজিয়ে যোগ-বিয়োগ করে ৬১৭৪ সংখ্যাটি বের করে দেবে। এটি একটি চ্যালেঞ্জ। চার অঙ্কের সংখ্যাটি যা-ই হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত ৬১৭৪ সংখ্যাটি বের করার কৃতিত্ব সে নিতে পারে। যেমন, কেউ ৩৭২৫ সংখ্যাটি বলল। এখন এই সংখ্যার চারটি অঙ্ক দিয়ে সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে ছোট সংখ্যাটি বের করতে হবে। এরপর বড়টি থেকে ছোটটি বিয়োগ করতে হবে। যেমন, এ ক্ষেত্রে বড় সংখ্যাটি হবে ৭৫৩২ এবং ছোটটি হবে ২৩৫৭। এর বিয়োগ ফল হবে ৫১৭৫। এখন আবার একই নিয়মে ৫১৭৫-এর সবচেয়ে বড় ও ছোট সংখ্যাটি বের করে আবার বিয়োগ। এভাবে কয়েকবার বিয়োগফল বের করলে শেষ পর্যন্ত ৬১৭৪ সংখ্যাটি পাওয়া যাবে। উৎসাহী তরুণেরা নিজেরা এটা পরীক্ষা করে দেখতে পারেন।
সামান্য কিছু প্রশ্ন করে বিজ্ঞানের কত কিছু জানা যায়, এটা আমরা কয়জন জানি বা বুঝি?
ছেলেমেয়েরা কিছু জানতে চাইলে বা প্রশ্ন করলে আমাদের অভিভাবক বা শিক্ষকেরা অনেক সময় রেগে যান। কিন্তু এটা একেবারেই উচিত নয়। প্রশ্ন করলে যদি বড়দের বকা খেতে হয়, তাহলে তো শিশুরা দমে যাবে। ওরা প্রশ্ন করতে ভয় পাবে। আর যদি প্রশ্নই না করে, তাহলে তাদের নতুন জ্ঞান অর্জনের সুযোগ ও সম্ভাবনাও নষ্ট হয়ে যাবে। আমরা কি চাই আমাদের সন্তানেরা প্রশ্নবিমুখ হয়ে জ্ঞান অর্জনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকুক? না, এটা আমরা চাই না।
আমাদের শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বারবার একটা কথা বলেন, স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থীদের শারীরিক বা মানসিক নিপীড়ন করা যাবে না। বেত বা স্কেল দিয়ে মারধর করা, শাস্তি দেওয়া, কাউকে বকাঝকা করা বা সবার সামনে অপমান করে নিচু করা ঘোর অন্যায়। এসবের কারণে শিশুরা দমে যায়। তাদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। এভাবে আমরা দেশের কত সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ বিজ্ঞানীকে যে হারাচ্ছি, তার হিসাব–নিকাশ নেই। আমাদের এই খারাপ মনোবৃত্তি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
আমেরিকা, ইউরোপের কোনো দেশে শিক্ষার্থীদের মারধর বা হেয় করা যায় না। তাহলে শিক্ষকের শাস্তি হয়। বরং শিশুদের নানাভাবে উৎসাহিত করা হয়। আমাদের সেই উন্নত সংস্কৃতির দিকে যেতে হবে।
আমরা যে গণিত উৎসব ও অলিম্পিয়াড করি, তা হয়তো শিশুদের প্রশ্ন করতে উৎসাহ জোগায়। যত প্রশ্ন করবে শিশুরা, ততই ভালো।
আজকের শিশুরাই ভবিষ্যৎ। আমরা যেন তাদের মনের সুস্থ বিকাশ নিশ্চিত করতে যা কিছু করা দরকার, তা করি।
আব্দুল কাইয়ুম: সাংবাদিক।
quayum@gmail.com

Wednesday, December 30, 2015

‘বিয়ে দেবে’ নাকি ‘বিয়ে করব’ by আব্দুল কাইয়ুম

লজ্জার কথা যে বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে প্রথম আর বিশ্বের মধ্যে চতুর্থ। ইউনিসেফের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রতি তিনটি বিয়ের দুটিতেই কনের বিয়ের বয়স ১৮ বছর বা প্রাপ্ত বয়সের নিচে। মানে শিশু বয়সে বিয়ে, তারপর শিশু স্ত্রীর কোলে আরেক শিশুর আগমন। দুজনেরই স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে। সারা জীবন রোগশোকে কাটাতে হয়।
এর সমাধান কোথায়? নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা, বখাটেদের উৎপাত, প্রলোভন দেখিয়ে নারী পাচার, নির্যাতন–জুলুমের বিরুদ্ধে যেমন দরকার আইনের কঠোর প্রয়োগ, তেমনি দরকার সামাজিক প্রতিরোধ। মেয়েদের নিরাপত্তা দিতে হবে। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্লিপ্ততা চলবে না। নারী নির্যাতন বন্ধে যাকে বলে ‘জিরো টলারেন্স’, তার বাস্তবায়ন অবশ্যই চাই।
এরপরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। মেয়ে একটু বড় হলেই বাবা-মা মেয়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে বিয়ে দেওয়ার জন্য পাগল হয়ে ওঠেন। এই মনোভাব বদলাতে হবে। ২২ ডিসেম্বর ব্র্যাক ও প্রথম আলোর উদ্যোগে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে বিষয়টা খুব সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী। তিনি বলেন, ‘বিয়ে দেব’ কেন, কেন ‘বিয়ে করব’ নয়। আমাদের দেশে বাবা-মা বলেন, মেয়ের ‘বিয়ে দেব’, মেয়েরা কিন্তু ‘বিয়ে করব’ এই সম্মতিটুকু দেওয়ার সুযোগও পায় না। অথচ এটি তাদের অধিকার।
কখন কার সঙ্গে বিয়ে, সে বিষয়ে মা-বাবা, অভিভাবকের মতামত তো অবশ্যই থাকবে, কিন্তু মেয়ের সম্মতি এক নম্বরে স্থান পাবে। ১৮ বছরের আগেই মেয়ের আপত্তি সত্ত্বেও জোর করে কারও সঙ্গে বিয়ে দেওয়া যাবে না। যেদিন আমাদের বাবা-মায়েরা মেয়েদের ‘বিয়ে দেওয়ার’ প্রচলিত সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসবেন, মেয়েরা বলতে পারবে, কেউ ‘বিয়ে দেবে’ কেন, আমরা ‘বিয়ে করব’; সেদিন পরিস্থিতির গুণগত পরিবর্তন শুরু হবে। বাল্যবিবাহ বন্ধের ক্ষেত্রে ঘটে যাবে বিপ্লব।
আর একটু খুলে বলি। বাবা-মা ভাবছেন বখাটে ছেলেরা উত্ত্যক্ত করে, কবে উঠিয়ে নিয়ে যায়, মেয়েটার জীবন নষ্ট হয়ে যাবে। তার চেয়ে ভুয়া জন্ম সনদ নিয়ে বিয়ে ‘দিয়ে দিই’! সংসারের খরচ যেটুকু বাঁচবে, তা ছেলের পেছনে ব্যয় করে তাকে প্রতিষ্ঠিত করা যাবে। অথচ মেয়ে পড়াশোনা করছে। জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা দিল। চোখে তার স্বপ্ন—বড় হবে, বিদেশে লেখাপড়া করে স্বাবলম্বী হবে। সে কিন্তু বলতে পারছে না, এখন বিয়ে দিতে হবে না, সময় হলে, বয়স হলে, জীবনে কিছুটা প্রতিষ্ঠা পেলে ‘বিয়ে করব’। জোর দিয়ে এ রকম কথা বলার মতো আত্মবিশ্বাস তার নেই। এটা প্রতিষ্ঠা করতেই হবে।
বাল্যবিবাহ নিয়ে বিভ্রান্তি চলছে। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে মেয়েদের ১৮ বছরের নিচে বিয়ে নয়। আবার মন্ত্রিপরিষদের সভায় মাঝেমধ্যে ‘কিন্তু, তবে, যদি’—এ রকম শর্ত আইনের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়ার কথাও উঠছে। যদি আইনে বিয়ের বয়স ১৮ রেখেও ‘বিশেষ পরিস্থিতিতে’ অভিভাবক, মা-বাবা অথবা আদালতের অনুমোদনে ১৬ বছরের সুযোগ রাখা হয়, তাহলে কেউ কি আর ১৮ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করবে? ১৬ বছরই আইনসিদ্ধ হয়ে যাবে। সরকার ঠেকাবে কীভাবে?
বলা হচ্ছে, যদি বিয়ে হয়েই যায়, কী করা যাবে? এটা সমস্যা, সন্দেহ নেই। এই সমস্যা তো আগেও ছিল। আইন অনুযায়ী এ সমস্যার নিষ্পত্তিও হয়েছে অনেক ক্ষেত্রে। যদি সরকার কঠোর হয়, আর যদি সবাই বোঝেন বাল্যবিবাহ দিয়ে মেয়ে পার করতে গেলে কাঠগড়ায় যেতে হবে, কেউ পার পাবেন না, তাহলে ধীরে ধীরে সমস্যাগুলো কমে আসবে। একদিন দেশে বাল্যবিবাহ বলে কিছু থাকবে না।
আমরা নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলি। কিন্তু যদি বিয়ের ব্যাপারে মেয়ের ইচ্ছার দাম না থাকে, তাহলে কিসের ক্ষমতায়ন? এখনো এই আসল জায়গাতেই কিন্তু মেয়েরা অসহায়, ক্ষমতাহীন। এখানে পরিবর্তন আনতে হবে।
আমাদের দেশের মানুষ কখনো নারী-শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা সমর্থন করে না। সিলেটে শিশু রাজন ও খুলনায় রাকিবকে নির্মম অত্যাচার করে মেরে ফেলার ঘটনায় অভাবনীয় জনরোষ সে কথাই বলে। ত্বরিতগতিতে বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তি দিয়ে বিচার বিভাগ, সরকার ও প্রশাসন উদাহরণ স্থাপন করেছে। নারীর বিরুদ্ধে সব ধরনের সহিংসতার বিরুদ্ধে যদি একই রকম উদাহরণ সৃষ্টি করা হয়, তাহলে গ্রামেগঞ্জে, পাড়ামহল্লায় বখাটে, গুন্ডা, বদমায়েশরা পালানোর পথ পাবে না। সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হবে। মেয়েরা আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবে।
ব্র্যাক কাজ করছে। কাজ করছে অ্যাকশন এইড বাংলাদেশ, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, স্বর্ণ কিশোরী নেটওয়ার্ক, ব্লাস্ট, মহিলা আইনজীবী সমিতি, ইউএনএফপিএ, ইউনিসেফ, ইউএন উইমেন। এ রকম শত শত বেসরকারি সংস্থার নাম উল্লেখ করা যায়। ওরা সারা দেশে নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তাদের চেষ্টায় প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যায়ে কমিউনিটি ওয়াচ গ্রুপ গড়ে উঠছে। প্রথম আলো ইউএন উইমেনের সঙ্গে ‘হি ফর শি ক্যাম্পেইনে’ (নারীর পক্ষে পুরুষ) কাজ করছে। ফলে পরিবর্তন আসছে। নারীর প্রতি সমাজে বিদ্যমান ত্রুটিপূর্ণ ও বৈরী দৃষ্টিভঙ্গি ধীরে ধীরে বদলে যাবে নিশ্চয়ই।
গত কয়েক মাসে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে প্রথম আলো অন্তত এক ডজন গোলটেবিল বৈঠক করেছে। নারী ও শিশু নির্যাতন রোধ, বাল্যবিবাহ বন্ধ, নারীর প্রজনন স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিশেষজ্ঞরা আলোচনা করেছেন। সুপারিশগুলো তুলে ধরেছেন।
ইউএনএফপিএর সহযোগিতায় প্রথম আলো প্রতি মাসে ‘আমাদের কথা শোনো’ নামে ক্রোড়পত্র বের করছে। সেখানে কিশোর-কিশোরী-তরুণদের কথা আমরা ছাপাচ্ছি।
সরকারও কাজ করছে। আমাদের গোলটেবিল বৈঠকে কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল বাশার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান বললেন, তাঁরা বাল্যবিবাহ বন্ধে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছেন। খবর পেলেই বাল্যবিবাহ রোধে কঠোর পদক্ষেপ নেন। তাঁদের উপজেলায় নিয়মিত মা-সমাবেশ করেন। এতে মা ও মেয়েদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস দৃঢ়তর হয়।
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি তো আমাদের এক গোলটেবিল বৈঠকে বেশ জোর দিয়েই বললেন, মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮ বছরই থাকবে, কোনো তবে-টবে থাকবে না। এ রকম দৃঢ় অবস্থান আমাদের আশান্বিত করে। নারী নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে মাল্টি সেক্টোরাল প্রকল্প মহিলা অধিদপ্তরের আওতায় কাজ করছে। তাদের একটি টোল ফ্রি হেল্পলাইন রয়েছে। আপদে-বিপদে যে কেউ একদম বিনা পয়সায় ১০৯২১ নম্বরে ফোন করলেই সঙ্গে সঙ্গে অ্যাকশন! ২৪ ঘণ্টা ৩০টি লাইন চলছে। আরও আছে। ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার, নির্যাতিত নারীদের জন্য সেইফ হোম। তাদের বিনা পয়সায় সরকারি আইন সহায়তা ব্যবস্থা। আরও কত কী।
ব্যারিস্টার সারাহ হোসেন জানালেন, বিয়ের বিষয়ে সম্মতি মেয়েদের মৌলিক অধিকার। এ বিষয়ে আদালতের একটি খুব শক্তিশালী রায় আছে। কোনো মেয়েকে বাল্যবিবাহে বাধ্য করা যাবে না।
সংবিধানে অন্তত তিন-চারটি অনুচ্ছেদে নারীর অধিকার সুরক্ষার কথা আছে। অন্তত ছয়টি শক্তিশালী আইন দেশে আছে। এখন দরকার এগুলোর কার্যকর প্রয়োগ। সরকার বিভিন্ন এনজিওর সঙ্গে একত্রে কাজ করছে। আরও দরকার। এসব এনজিওকে একেবারে বিনা বাক্যব্যয়ে কাজ করতে দিলে বাল্যবিবাহ রোধসহ নারীর প্রতি সব ধরনের সহিংসতার বিরুদ্ধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি সহজ হবে।
একটি সমাজ কতটা আধুনিক, তা বোঝার অন্যতম শর্ত হলো সেই সমাজে নারীর অবস্থান কতটা উন্নত তা দেখা। যদি নারীর সম–অধিকার থাকে, মর্যাদা নিশ্চিত হয়, ১৮ বছরের আগে বিয়ে বন্ধ করা যায়। যদি তাদের শিক্ষার দ্বার অবারিত হয়। যদি শুধু বাইরে না, ঘরেও সিদ্ধান্ত গ্রহণে পুরুষের সমান অধিকার নারীর থাকে, তাহলে সত্যিকারভাবেই সেই সমাজ আধুনিক। সভ্য। আমরা এখনো সেই ‘আধুনিক ও সভ্য’ অবস্থানের সনদ প্রাপ্তি থেকে বেশ দূরে আছি।
কিন্তু এ রকম তো হওয়ার কথা নয়। আমাদের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদের স্পিকার, বিরোধী নেত্রী, নির্বাচিত মেয়র ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ স্তরে অনেক পদেই রয়েছেন নারী। আনুষ্ঠানিক ক্ষমতায়ন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সমাজটা এখনো চলছে পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে।
এখানে পরিবর্তন আনতে হবে। নারী-পুরুষ সবাইকে এক হয়ে দাঁড়াতে হবে।
আব্দুল কাইয়ুম: সাংবাদিক।
quayum@gmail.com

Tuesday, November 3, 2015

ইলিশের স্বাদ কিসে হয় by আব্দুল কাইয়ুম

ইলিশ বাঁচিয়ে রাখতে হবে
একজন কৃষি প্রকৌশলী নিয়াজ পাশার একটি চিঠি আজ প্রথম আলোয় ছাপা হয়েছে। তাঁর প্রশ্ন, বাজারে এখনো কেন ডিমসহ ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। ডিম পাড়া ইলিশ ধরার ওপর ১৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা পার হয়ে গেছে। তাও কেন ডিম পাওয়া যাচ্ছে। মাৎস্যবিজ্ঞানী এস এম নুরুল আমিনের বক্তব্য উল্লেখ করে তিনি জানিয়েছেন, এর কারণ হতে পারে এই যে পুরুষ ইলিশ বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হয়তো স্ত্রী ইলিশে রূপান্তরিত হয়!
বিষয়টা নিয়ে চিন্তার অবকাশ আছে। বাজারে যত ইলিশ কিনি তার প্রায় সবগুলোই স্ত্রী ইলিশ, ডিম প্রায় সব মাছেই। এ রকম কেন? তাহলে কি পুরুষ ইলিশ সত্যিই স্ত্রী ইলিশ হয়ে যায়?
আমি ফোন করলাম ঠাটারীবাজারের ইলিশ মাছের ব্যবসায়ীকে। চণ্ডীদাস বর্মণ। কেরানীগঞ্জে স্থায়ী আবাস। ঠাটারীবাজারে ইলিশ মাছ বিক্রি করছেন ৩৬ বছর ধরে। জিজ্ঞেস করলাম, পুরুষ ইলিশ কি নেই? কেন নেই? তিনি বললেন, আছে, নিশ্চয়ই আছে। চাইলে দিতে পারি। তবে খুব কম পাওয়া যায়। তাহলে কম কেন? তিনি হেসে বললেন, এর কদর কম। জেলেরা পায়ও কম।
গতকাল সকালে তাঁর কাছ থেকে দুটি মাঝারি আকারের ইলিশ কিনলাম দেড় হাজার টাকায়। কাটার পর দেখা গেল দুটিতেই ডিম। চণ্ডীদাস বললেন, পুরুষ ইলিশের মাথাটা একটু ছড়ানো, শরীর চিকন ও লম্বা। মাছে কোনো স্বাদ নেই। বাজারে এর দামও কম। তাই মাছ ধরার সময় পুরুষ মাছ পেলে জেলেরা সেগুলো তখনই নদীতে ছেড়ে দেয়। দু-চারটা আড়তে আসে, দাম কম। ক্রেতা কম। তাই বাজারে সাধারণত পুরুষ ইলিশ পাওয়া যায় না।
ড. মো. আবদুল ওহাবের সঙ্গে কথা বললাম। তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক। বর্তমানে ওয়ার্ল্ড ফিশে ইকো ফিশ প্রজেক্টে টিম লিডার হিসেবে কাজ করছেন। তিনি জানালেন, ভেটকি, কোরালসহ অনেক মাছ বয়ঃপ্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে লিঙ্গ পরিবর্তন করে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় সিকোয়েনশিয়াল হারমাফ্রোডিজম। মালয়েশিয়ার শাড টেরুবোক প্রজাতির মাছ ইলিশের কাছাকাছি। এটিও বড় হলে স্ত্রী মাছে পরিণত হয়। তবে বাংলাদেশের ইলিশের ক্ষেত্রে এটা সত্য কি না, তা আরও খোঁজখবর নিয়ে জানতে হবে।
গতকাল তিনি ফোন করে জানালেন, আমাদের দেশে প্রতি দুটি স্ত্রী ইলিশের জন্য রয়েছে একটি পুরুষ ইলিশ। ইদানীং এই অনুপাত কমছে, তিন থেকে পাঁচটি স্ত্রী ইলিশের জন্য একটি পুরুষ ইলিশ। তিনি জানালেন, আমাদের দেশের স্ত্রী ইলিশ কখনো পুরুষ ইলিশে পরিণত হয় না।
কিন্তু ডিম নিয়ে এত আলোচনা কেন? কারণ, ডিমের সঙ্গে স্বাদের একটি সম্পর্ক আছে। ডিম আসার সঙ্গে সঙ্গে মাছের শরীর তেলে ভরে যায়। ওটাই স্বাদের উৎস। ডিম পাড়ার ঠিক আগের মুহূর্তে সব পুষ্টি ডিমে সঞ্চিত হয়, মাছের স্বাদ কমে যায়। সব স্বাদ জমা হয় ডিমে। ডিম পাড়ার পরপরই ইলিশের স্বাদের ঘাটতি দেখা যায়। সে তো হবেই। সব স্বাদ তো ডিমেই চলে গেছে! তাই ইলিশ কিনতে গিয়ে আমরা বলি, ডিম ছাড়া ইলিশ আছে? তার মানে ডিম আসি-আসি করছে, সবে ডিম তৈরি হয়েছে বা ছোট আকারে রয়েছে। সেই মাছের স্বাদ অবর্ণনীয়। ও রকম একটি ইলিশ মাছ কুটে পানিতে ধুয়ে রাখতে গেলে আপনার হাত ইলিশের তেলে চকচকে ও পিচ্ছিল হয়ে যাবে। তখনই বুঝবেন ওই ইলিশ স্বাদে-গন্ধে অতুলনীয়, একেবারে ফাটাফাটি!
পুরুষ ইলিশে তো সেই তেলের ব্যাপার নেই। তাই পুরুষ ইলিশের কদর কম।
তাহলে পুরুষ ইলিশের দরকার কী? পুরুষ ইলিশ ছাড়া তো ডিম নিষিক্ত হবে না। ইলিশের বংশবৃদ্ধি হবে কীভাবে? ড. ওহাব বিষয়টি বিস্তৃতভাবে বললেন। মা ইলিশের পেটে ডিম যখন পরিপুষ্ট হয়ে ওঠে, তখন সে তার শরীরের মাঝামাঝি অংশের আঁশের ফাঁক দিয়ে এক ধরনের সুগন্ধি হরমোন পানিতে ছড়িয়ে দেয়। তার গন্ধে পুরুষ ইলিশ ছুটে আসে। সে স্ত্রী ইলিশের পেট ও লেজের দিকে ঠোকর দেয়, গায়ে ঘষা দেয়। এর প্রতিক্রিয়ায় মা ইলিশ পানিতে ডিম ছাড়ে। তখন পুরুষ ইলিশও পানিতে শুক্রাণু ছাড়ে। এভাবে ডিম নিষিক্ত হয়। এ সময় পুরো এলাকার পানি ঘোলা হয়ে ওঠে। ডিম থেকে বাচ্চা ফুটে নদীতে ছড়িয়ে পড়ে।
ছোট ডিমসহ স্ত্রী ইলিশই সবচেয়ে স্বাদের। তাই বলে ওই সব মাছ ব্যাপক হারে ধরা যাবে না। ডিম পাড়ার মূল মৌসুমের সময়টুকু অবশ্যই ইলিশ ধরা বন্ধ রাখতে হবে। কিন্তু তার আগে-পরেও স্বাদে ভরপুর কিছু ইলিশ পাওয়া যাবে। বাজারে পাওয়া যায়। ওগুলোই সেরা ইলিশ।
তবে ইলিশের স্বাদ পেতে আরও কিছু দরকার। মাছ কতটা টাটকা, সে তো নিশ্চয়ই বিবেচনায় রাখতে হবে। আপনি বাজার থেকে ভালো, তেল চকচকে ইলিশ কিনে এনে অনেকক্ষণ রেখে দিলেন। যত সময় যাচ্ছে, মাছের স্বাদ তত কমছে। কারণ, মাছের প্রোটিনের সেলগুলো মরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এর গুণ ও মান কমছে। মাছ ধরার সঙ্গে সঙ্গে বরফে বা ফ্রিজে রাখলে তার স্বাদ বেশি থাকে। আমরা অনেক সময় বলি, বরফ দেওয়া মাছ তো ভালো না। আসলে কথাটি ঠিক নয়। বরফ যদি ঠিকভাবে দেওয়া হয় এবং ‘কোল্ড চেইন’ রক্ষা করা হয়, তাহলে সেই মাছের স্বাদ অনেক বেশি হবে।
এরপর আসে রান্নার বিষয়। বাসায় রান্না করা যত ধরনের ইলিশ এ পর্যন্ত খেয়েছি, তার মধ্যে দুই পদের রান্না অতুলনীয় মনে হয়েছে। সবচেয়ে মজার রান্নাটি হলো—গুঁড়ো হলুদ-মরিচ, কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ দিয়ে কয়েক টুকরো ইলিশ মাখিয়ে লবণ, তেল ও সামান্য পানি দিয়ে ঢেকে চুলায় বসিয়ে দিন। মিনিট ১৫-২০। তারপরই সেরা স্বাদের রান্না ইলিশ। অপরটি হলো হলুদ-মরিচের গুঁড়ো মাখিয়ে তেলে ভেজে নিন। পরে পেঁয়াজ ও কাঁচা মরিচ ভেজে ছড়িয়ে দিন। এর চেয়ে মজার ইলিশ-ভাজা আর হয় না। এটিও ১৫-২০ মিনিটে রান্না হয়ে যায়। আপনারা একবার পরীক্ষা করে দেখতে পারেন।
পদ্মার ইলিশের তুলনা হয় না। তারও ওই একই কারণ। সাগর ছেড়ে ডিম পাড়ার জন্য ইলিশ পদ্মার স্রোতের বিপরীতে উজানে যেতে থাকে। এই সময় ডিম আসি-আসি করছে। ঠিক এই ইলিশই সবচেয়ে স্বাদের।
ইলিশ বাঁচিয়ে রাখতে হবে। আমাদের পদ্মা-মেঘনায় ইলিশ মাছ বাড়ছে। আরও বাড়বে, যদি আমরা সচেতন হই। জাটকা ধরা বন্ধ রাখি। ডিম পাড়ার ভরা মৌসুমে যদি অন্তত দুই সপ্তাহ ইলিশ ধরা বন্ধ রাখি। ইলিশ মাছ যখন দেখবে পদ্মা-মেঘনায় নিরাপদে ডিম পাড়া যায়, তখনই ওরা প্রতি মৌসুমে এখানে আরও বেশি আসবে। ঝাঁকে ঝাঁকে আসবে। ইলিশের জন্য আমাদের সবকিছু করতে হবে।
আব্দুল কাইয়ুম: সাংবাদিক।
quayum@gmail.com

Thursday, March 5, 2015

বিএনপি যাবে কোন পথে? by আব্দুল কাইয়ুম

সামনে ঢাকা ও চট্টগ্রামে তিনটি মেয়র নির্বাচন হতে যাচ্ছে। বিএনপি কি এই সুযোগ হাতছাড়া করবে? তারা কি মেয়র নির্বাচনে গিয়ে বাজিমাত করতে পারে না?
জানি, এটা হবে না। অনেকের কাছেই একটা অসম্ভব কথা বলে মনে হবে। কারণ খালেদা জিয়াকে সরকার এই ধরে তো সেই ধরে অবস্থা, তাঁর গুলশানের কার্যালয়ে এই বুঝি তল্লাশি শুরু হলো! তা ছাড়া চলছে পেট্রলবোমার সহিংস আন্দোলন। এর মধ্যে মেয়র নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণের কথাটা একেবারেই বেমানান শোনায়, তাই না? বিএনপি ধনুর্ভঙ্গপণ করেছে, যেভাবেই হোক ‘নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের’ অধীনে নির্বাচন আদায় করতেই হবে। যত দিন এ দাবি আদায় না হয়, অবরোধ চলতেই থাকবে। প্রতি রোববার থেকে প্রথমে ৭২ ঘণ্টা, তারপর সেটা বাড়িয়ে শুক্রবার ভোর ছয়টা পর্যন্ত হরতাল। মানুষ কথা না শুনলে গাড়ি-বাসে চোরাগোপ্তা হামলা চালাও, আগুন জ্বালাও, ককটেল-পেট্রলবোমা মারো। এই তো? সরকারও ধনুর্ভঙ্গপণ করেছে, যেভাবেই হোক সবকিছু ঠান্ডা করে দেওয়া হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চলবে। গাড়ি-বাস চলবে। তারপর কে কোথায় মরল, তা নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই।
বিএনপি তত্ত্বাবধায়কের নির্বাচন আদায় না করে ছাড়বে না। আর সরকার এখন নির্বাচনই দেবে না। মানুষও চোরাগোপ্তা হামলার মধ্যে কেনাকাটা, অফিস—সবকিছু চালিয়ে যাবে। এর তো একটা শেষ চাই। কীভাবে সেটা সম্ভব?
বিএনপি নিশ্চয়ই তাদের আপসহীন ভাবমূর্তি খুইয়ে আন্দোলন থামাতে পারে না। আর সরকার তো ভাবছে সবকিছু তাদের নিয়ন্ত্রণে। এ অবস্থায় সরকার একটা চাল দিয়েছে। হঠাৎ করে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছে। এরপর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচনও হবে। সরকার তো ধরেই নিয়েছে যে বিএনপি আসবে না। এই ফাঁকে দু-চারজন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে হারিয়ে তাদের সমর্থিত প্রার্থীকে অনায়াসে জিতিয়ে আনা যাবে।
এখন বিএনপিকে ভাবতে হবে, সরকারের ইচ্ছামতো সবকিছু চলতে দেওয়া হবে কি না। সংসদ নির্বাচন না-হয় ‘নির্দলীয়’ সরকারের অধীনে ছাড়া ওরা করবে না। কিন্তু মেয়র নির্বাচনে তো সেই প্রশ্ন ওঠে না। স্থানীয় নির্বাচন সব সময় ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনেই হয়। এ নিয়ে কারও কোনো প্রশ্ন নেই।
বিএনপি কি কৌশল হিসেবে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মেয়র নির্বাচনে অংশগ্রহণের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারে না? এটা বিএনপির পূর্ব অনুসৃত নীতির বাইরে কিছু হবে না। গত বছরের ৫ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের একতরফা নির্বাচন বর্জনের পরিষ্কার ঘোষণার মধ্যেও কিন্তু বিএনপি একের পর এক সিটি করপোরেশন নির্বাচনগুলোতে অংশ নিয়ে বিপুল ভোটে জিতেছিল। কুমিল্লা, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল এবং সর্বশেষ একেবারে রাজধানী ঢাকার নাকের ডগায় গাজীপুরে নির্বাচন করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের একেবারে ধরাশায়ী করে দিয়েছিল।
সে সময় মানুষের মধ্যে একটা আশার সঞ্চার হয় যে বিএনপি হয়তো জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে একইভাবে আওয়ামী লীগকে পরাজিত করে ক্ষমতায় পরিবর্তন আনবে, যা তখন দেশবাসী একান্তভাবে কামনা করছিল। কিন্তু বিএনপি সে পথে যায়নি। হয়তো ভেবেছিল, চারদিকে সিটি করপোরেশন নির্বাচনগুলোতে বিপুল বিজয়ের শক্তিতে নির্বাচন ছাড়াই ওরা সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারবে।
সাদামাটা নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় যাওয়ার চেয়ে ক্ষমতাসীন সরকারকে তুলার বস্তার মতো ছুড়ে ফেলে ক্ষমতায় যাওয়ার একটা সুবিধা আছে। তাতে একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী হওয়া যায়। বিএনপির মধ্যে হয়তো সে রকম একটা নেশা পেয়ে বসেছিল। কারণ, অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছাড়া ক্ষমতায় গিয়ে তাদের লাভ নেই। আওয়ামী লীগ যেভাবে সংবিধান পরিবর্তন করে ফেলেছে, তাতে পরিবর্তন আনতে না পারলে তাদের ১৯৭২-এর সংবিধানে চলতে হবে। এটা তাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যায় না। তাই হয়তো ওরা মেয়র নির্বাচনে বিপুল সাফল্য লাভ করলেও জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে। আশা ছিল, জনরোষের কবলে পড়ে সরকার ক্ষমতাচ্যুত হবে।
কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। বিএনপি নির্বাচন বর্জন করে আওয়ামী লীগ সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে পারেনি। খুব অদ্ভুত ব্যাপার যে অর্ধেকের বেশি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এবং বাকি প্রায় সব আসনে ‘আমরা আর মামারা’ প্রতিযোগিতাহীন নির্বাচন করে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। এ রকম অস্বাভাবিক নির্বাচন ঠেকাতে বিএনপি তেমন কিছুই করতে পারেনি। এবং বিএনপিকে ঠান্ডা করার জন্য সে সময় সরকারকেও খুব বেশি ডান্ডাবাজি করতে হয়নি, যেমন এখন করছে।
এখানে বিএনপি রাজনীতিতে বিরাট মার খেয়েছে। সরকারকে ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছে, কিন্তু বাস্তবে সরকার প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচন করেও দিব্যি চালিয়ে যাচ্ছে। এ আকাশ-পাতাল পার্থক্য কেন হলো, তা বিএনপিকে খুব ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখতে হবে।
এর একটা কারণ এই হতে পারে যে বিএনপি ভাবছিল মানুষ সনাতন রাজনীতির ধারায় ‘উৎখাতের’ লাইনে আছে। আর মানুষ ভাবছিল, নির্বাচনের মাধ্যমেই যখন সরকার পরিবর্তন সম্ভব, তাহলে বর্জনের ঝামেলায় কেন যাচ্ছে বিএনপি। এখানে মানুষের চিন্তার সঙ্গে বিএনপির রাজনৈতিক কৌশলের খুব বড় রকমের পার্থক্য হয়ে গেছে।
বিএনপির যুক্তি ছিল, সিটি করপোরেশন আর জাতীয় সংসদ নির্বাচন এক নয়। সরকার চালাকি করে সিটি করপোরেশনে বিএনপিকে জিতিয়ে তাদের জাতীয় নির্বাচনের ফাঁদে ফেলতে চায়। আর বিএনপি সেই ফাঁদে পা দিলেই ভরাডুবি হবে। নির্বাচনে সরকারি প্রভাব খাটিয়ে আওয়ামী লীগ সব আসন হাতিয়ে নেবে। কিন্তু গত বছর বিএনপির বিজয়োল্লাসের মাঝে সরকারের পক্ষে নির্বাচন ছিনতাই করা বাস্তবে কতটা সম্ভব ছিল, তা ভেবে দেখা দরকার।
গত বছরের ৫ জানুয়ারি বিএনপি অংশগ্রহণ করলে যদি আওয়ামী লীগ শুধু সরকারের জোরেই নির্বাচন ছিনতাই করার বিষয়ে নিশ্চিত হতো, তাহলে ওরা কেন তখন ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন দেয়নি? গাজীপুর সিটি করপোরেশনে ভরাডুবির পরই আওয়ামী লীগ নিশ্চিত হয় যে ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে নির্বাচন করেও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজেদের পরাজয় ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। তাই আইনের মারপ্যাঁচে রাজধানী ঢাকার মেয়র নির্বাচন সে সময় সরকার হতে দেয়নি। যদি হতো, তাহলে তাদের নিশ্চিত পরাজয় ঠেকানো কঠিন ছিল। আর রাজধানী ঢাকায় মেয়র নির্বাচনে হারলে কোন মুখে আওয়ামী লীগ সংসদ নির্বাচন করত? নির্বাচনে ভোটারদের সামনে দাঁড়ানোর পথই তো থাকত না।
গত বছর সংসদ নির্বাচনের আগে সব কটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করেছিল এই যুক্তিতে যে ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে স্থানীয় নির্বাচনে তাদের বাধা নেই। সেদিন যদি সরকার ঢাকায় মেয়র নির্বাচন দিত, তাহলে বিএনপি অবশ্যই অংশগ্রহণ করত। সেদিন বিএনপির বাধা না থাকলে আজ থাকবে কেন? আজ যদি বিএনপি ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে, তাহলে তাদের নীতিবিচ্যুতির কোনো আশঙ্কা নেই।
বরং নির্বাচন করলে তাদের দুটি লাভ। প্রথমত, পেট্রলবোমা মেরেও যে মানুষকে বিএনপি রাস্তায় নামাতে পারছে না, সেই মানুষই পিলপিল করে বিএনপির পেছনে এসে দাঁড়াবে, তাদের প্রার্থীর জন্য ভোটের সংগ্রামে নামবে। রাজপথে বিএনপির হরতালে সক্রিয় জনসমর্থনের যে ভাটা এখন দেখা যাচ্ছে, সেটা কেটে যাবে। মানুষ বিএনপির প্রার্থীদের পক্ষে ঢাকঢোল নিয়ে নামবে। তাদের জন্য এর চেয়ে বড় আশীর্বাদ আর কী হতে পারে?
আর দ্বিতীয়ত, যদি বিএনপি প্রার্থী দেয়, তাহলে নির্বাচনে জয়ের সম্ভাবনা শতভাগ। এটা তো তারাই দাবি করে এবং এই দাবি একেবারে ভিত্তিহীন বলা যাবে না। বিএনপি মেয়র নির্বাচন করলে মানুষ খুশি হবে। কারণ, বোমা-আগুন দিয়ে মানুষ মেরে সরকার হটানোর বদ চিন্তা থেকে বেরিয়ে এসে বিএনপি নির্বাচনী রাজনীতির ধারায় যুক্তিসংগত উপায়ে জোরেশোরে নামতে পারবে। এর ফলে তাদের নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি আরও শক্তি ও জনসম্পৃক্তি অর্জন করবে।
যেহেতু সরকার সিটি করপোরেশন নির্বাচন করছে, তাই নির্বাচনী সভা-সমাবেশে বিএনপিকে তাড়া করার সুযোগ সরকারের থাকবে না। খালেদা জিয়াকে গুলশানের অফিসে আটকা পড়ে থাকতে হবে না। তিনি মানুষের কাতারে এসে দাঁড়াবেন। সমাবেশের অনুমতি না দিলে তিনি নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে ঐতিহাসিক সমাবেশ করবেন। এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে?
বিএনপির সামনে আজ স্বর্ণসুযোগ এসেছে। মেয়র নির্বাচনে প্রার্থী ঘোষণা দিয়ে জোরেশোরে নেমে পড়া উচিত। এতে সহিংস রাজনীতির একটি যুক্তিপূর্ণ পরিসমাপ্তি ঘটবে। রাজনীতি গণতন্ত্রের ধারায় ফিরে আসবে। মানুষ বাঁচবে। দেশ বাঁচবে।
বিএনপির আর এক মুহূর্ত দেরি করা উচিত নয়।
আব্দুল কাইয়ুম: সাংবাদিক।
quayum@gmail.com

Wednesday, December 11, 2013

সপ্তাহের হালচাল- তারানকোর সফরের পর কী by আব্দুল কাইয়ুম

জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর সমঝোতা চেষ্টা কতটা সফল, তা আজ জানা যাবে। তবে স্বীকার করতেই হবে, তিনি একটি ভালো দৃষ্টান্ত রেখে যাচ্ছেন।

Wednesday, November 27, 2013

সপ্তাহের হালচাল- ‘কাল নয়, আজও নয়, এখনই’ by আব্দুল কাইয়ুম

পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশতে জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলন শেষ পর্যন্ত যে একটি সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে আসতে পেরেছে, তা বিশ্বের জন্য স্বস্তির কথা। সম্মেলনের শুরু থেকেই কয়েকটি বিষয় নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছিল।

Wednesday, November 6, 2013

সপ্তাহের হালচাল- আওয়ামী লীগ ও বিএনপির জন্য by আব্দুল কাইয়ুম

নির্বাচন-বিবাদ চিরতরে শেষ করার একটা ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের দেশের জন্য এটা এখন অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Friday, October 4, 2013

সপ্তাহের হালচাল- রংপুরের মেয়ে, প্রাণ যায় ঢাকার গার্মেন্টসে by আব্দুল কাইয়ুম

রংপুরে প্রথম আলো আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে জেলার উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র, অধ্যাপক, শিল্পপতি-ব্যবসায়ী, বিশিষ্ট নাগরিকেরা, নারী নেতৃত্ব, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব—সবাই এসেছেন।

Saturday, January 5, 2013

কা র্য কা র ণ- নতুন বছরে কি আরও স্মার্ট হতে চান? by আব্দুল কাইয়ুম

তাহলে নিয়মিত ব্যায়াম করুন। প্রতিদিন একটু হাঁটা, সামান্য জগিং আপনাকে সত্যিই স্মার্ট করতে পারে। প্রসিডিংস অব দ্য রয়েল সোসাইটি বি-এর ২০১৩ সালের জানুয়ারি সংখ্যায় যে নতুন নিবন্ধ প্রকাশিত হচ্ছে, তাতে বলা হয়েছে, আদি মানব শারীরিক পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে ক্রমে চৌকস হয়ে উঠতে পেরেছে।

Monday, November 5, 2012

রসকারণ- এক কাপ কফি কি আপনার মাথাব্যথা সারাতে পারে? by আব্দুল কাইয়ুম

অনেক ক্ষেত্রে মাথাব্যথা সারানোর জন্য আপনি এক কাপ কফি খেলে উপকার পাবেন। এর কৃতিত্ব ক্যাফেইনের, যা কফির মধ্যে থাকে। এক পরীক্ষায় দেখা গেছে, কফির সঙ্গে অ্যাসপিরিন মিশিয়ে খেলে খুব দ্রুত কাজ হয়।

Wednesday, July 18, 2012

সপ্তাহের হালচাল-পাকিস্তানেও নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার? by আব্দুল কাইয়ুম

পাকিস্তানে গণতন্ত্র টেকে কি টেকে না, এ অবস্থা চলছিল। এরই মধ্যে হঠাৎ জানা গেল যে সেখানে আগাম নির্বাচনের একটা চিন্তাভাবনা চলছে। নির্বাচনের ব্যাপারে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে বসে আলাপ-আলোচনা হয়েছে। তারা দুটি বিষয়ে একমত হয়েছে। প্রথমত, নির্বাচন হবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে।

Friday, July 9, 2010

দুঃসংবাদ আর সুসংবাদ চলেছে পাশাপাশি by আব্দুল কাইয়ুম

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. মোসলেহ উদ্দিনের সঙ্গে তাঁর কার্যালয়ে দেখা করতে গিয়েছি। আকাশ জুড়ে ঘন কালো মেঘ। আগের রাতে ঝুমবৃষ্টি হয়ে গেছে। সকালেও এক পশলা। মজার ব্যাপার হলো, বেশ কিছুক্ষণ মুষলধারে বৃষ্টি হয়, তার পরই আকাশ পরিষ্কার। মেঘ ও রোদের খেলা। ঢাকায় যখন বিরক্তিকর গরম, সিলেটে তখন প্রাণজুড়ানো বৃষ্টি। চারদিক সবুজে সবুজ।
সৌজন্য সাক্ষাতে গিয়েছি। কুশলবিনিময় করে চলে যাব সুনামগঞ্জের পথে। উপাচার্য বললেন, পত্রপত্রিকায় একটি খবর দেখে সকাল থেকে মনটা খারাপ হয়ে আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে সহিংসতা প্রায় নেই। অথচ আগের দিনের একটি সামান্য ঘটনার সংবাদ পত্রিকায় এমনভাবে লেখা হয়েছে, যেন বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংঘাতিক কিছু একটা ঘটে গেছে। ছাত্রলীগ ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের কর্মীদের মধ্যে কথাকাটাকাটি, ধাক্কাধাক্কি হয়েছে, হয়তো সামান্য মারামারিও হয়েছে। কিন্তু এর জের ধরে তো সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েনি। অর্থাৎ ঘটনা তত বড় কিছু ছিল না। আমরা তাঁর কথা মেনে নিলাম। পরে খোঁজ নিয়েছি। ঘটনা ছোটই ছিল, কিন্তু এর রাজনৈতিক তাৎপর্য বিবেচনায় হয়তো সংবাদটি গুরুত্ব দিয়ে পরিবেশন করা হয়েছে।
উপাচার্য আক্ষেপ করে বললেন, সব শুধু নেতিবাচক খবর, দেশে কি ভালো খবর কিছু থাকে না? আপনারা না লিখলে চলবে কেন?
এটা ঠিক যে অনেক সময় দুঃসংবাদগুলোই বড় হয়ে ওঠে। এ ব্যাপারে কিছু করার নেই। ঘটনা খারপ বা ভালো যা-ই হোক, তার খবর সবার কাছে বস্তুনিষ্ঠভাবে পৌঁছে দেওয়াই তো পত্রিকার কাজ। যাঁরা দেশ পরিচালনা করেন বা বিরোধী দলে থাকেন, তাঁরা কি দেশকে ভালো কিছু দিতে পারছেন? সিলেটে প্রধান দুটি দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। তারাই ঘুরেফিরে ক্ষমতায় আসে। বলা হয়, সিলেটে যে দল জিতে, তারাই দেশের সরকার গঠন করে। বিগত দিনে সিলেটে মূল প্রভাব ছিল বিএনপির, এখন আওয়ামী লীগের। অথচ এই দল দুটির অবস্থা খুব করুণ। কোনো দলেরই পূর্ণাঙ্গ কমিটি নেই। বিএনপি দুই গ্রুপে বিভক্ত। কয়েক দিন আগে তাদের দুই প্রতিপক্ষ প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে। আওয়ামী লীগের মধ্যেও চলছে নেতৃত্বের কোন্দল। দুই দলেরই কর্মীদের মধ্যে বাড়ছে ক্ষোভ।
বিভিন্ন কোচিং সেন্টার ও মেয়েদের স্কুল-কলেজের আশপাশে বখাটেদের উৎপাত সারা দেশের মতো সিলেটেও আছে। কয়েক দিন আগে বখাটেরা একজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষককে হত্যা করে। অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সেই সঙ্গে কোতোয়ালি থানার ওসিকেও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
বিএনপি সরকারের সময় মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরান বলতেন, তিনি বৈরী রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে কিছু করতে পারছেন না। কিন্তু এখন তো তাঁদেরই সরকার। দেড় বছর হয়ে গেল। তেমন কিছু তো করতে পারলেন না। জলাবদ্ধতা এখন সিলেটের স্থায়ী সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। কারণ পানি নেমে যাওয়ার খালগুলো (ছড়া) অবৈধ দখলদারদের খপ্পরে চলে গেছে। মহানগরের মধ্য দিয়ে নয়টি ছড়া সুরমা নদীতে মিশেছে। যে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ছড়া দখল করে রাখছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে করপোরেশন কেন ব্যবস্থা নিচ্ছে না। মেয়র যদি অন্যায়, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে না দাঁড়ান, তাহলে মানুষের জীবনে স্বস্তি আসবে কীভাবে?
এ রকম অনেক সমস্যা সিলেটে রয়েছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে সেখানে মন ভালো করার মতো ঘটনা নেই। উৎসাহিত হওয়ার মতো অনেক খবরও আছে। এই শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কথাই ধরা যাক। অনলাইন ও মোবাইল ফোনে ভর্তি ফরম বিতরণ থেকে শুরু করে ভর্তি চূড়ান্ত করার যাবতীয় ব্যবস্থা তো এই বিশ্ববিদ্যালয়ই প্রথম করেছে। এখানে প্রায় সারা বছরই পড়াশোনার সুষ্ঠু পরিবেশ থাকে। এই টেন্ডারবাজির যুগে এটা কম কথা নয়।
আমরা অনেকে খোঁজ রাখি না, সিলেটের আবদুল বাছিত সেলিম নামের একজন কৃষি-অন্তপ্রাণ ব্যক্তি রয়েছেন। তিনি সিলেট অঞ্চলের লুপ্তপ্রায় ৬০ জাতের ধানের চাষ করছেন। প্রায় ৪০০ একর জমিতে চাষ হয়। সুগন্ধি চালই রয়েছে ৪০ জাতের। বিরইন চালই প্রায় ১০ জাতের। আমরা বিন্নি (বিরইন) ধানের চালের কথা কবিতায় পড়েছি। কিন্তু সেই চালও যে এত রকমের তা কে জানত। আমরা জীববৈচিত্র্য রক্ষার কথা বলি। কিন্তু আমাদের দেশি জাতের কত ধান যে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, তার খবর কয়জন রাখি? সিলেটের এক কৃষি-পরিবারের সন্তান গ্রামবাংলায় ঘুরে ঘুরে দেশি জাতের ধান সংরক্ষণ করছেন, আবাদ করছেন, এটা কি কম কথা? সেলিম সাহেব বললেন, তিনি নিজের ব্যবস্থাপনায় কয়েক একর জমিতে চাষ করেন। এর বাইরে কৃষকদের সঙ্গে চুক্তির ভিত্তিতে উৎপাদন হয়। কৃষকদের বীজ, সার ও উৎপাদন প্রযুক্তি সরবরাহ করেন তিনি। লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, তিনি কোনো রাসায়নিক সার ব্যবহার করেন না। সব সবুজ সার ও গোবর। এতে দেশি জাতের চালের গন্ধ ও স্বাদ অটুট থাকে। তাঁদের চালের চাহিদাও প্রচুর। বিদেশে রপ্তানি হয়। ভালো দাম পান। তবে এখন রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা থাকায় শুধু পোলাওয়ের চালই সীমিত পরিমাণে রপ্তানি করা হয়।
সেলিম সাহেবের এই কৃষি কার্যক্রমের বিস্তৃত পরিচয় গত বছর ১৪ নভেম্বর প্রথম আলোয় ‘সেলিমের সুগন্ধি ধান’ শিরোনামে শনিবারের বিশেষ প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়। কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী তাঁর খামারে গিয়েছেন। চ্যানেল আইয়ের পরিচালক ও বার্তাপ্রধান শাইখ সিরাজও তাঁর খামারে গিয়েছেন, গণমাধ্যমে তুলে ধরেছেন তাঁর সাফল্যের কথা।
সুনামগঞ্জেরও আছে অনেক সাফল্যগাথা। সবচেয়ে বড় খবর হলো, সেখানে ছিনতাই, রাহাজানির উৎপাত প্রায় নেই। এটা কম কথা নয়। সুনামগঞ্জ নাগরিক সমাজের সবাই বললেন, গণমাধ্যম যেন দুর্নীতির বিরুদ্ধে সব সময় সোচ্চার থাকে। তাঁরা চান, প্রথম আলোর পাতায় যেন প্রতিদিন একজন করে কুখ্যাত দুর্নীতিবাজের পরিচয় তুলে ধরা হয়। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। সুনামগঞ্জের আলোকিতজনেরা সে কথাটাই স্মরণ করিয়ে দিলেন।
আমাদের বৈদেশিক মুদ্রাভান্ডারে যে প্রায় এক হাজার ১০০ কোটি ডলার জমা হয়েছে, তার একটা বড় অংশই আসে লন্ডনপ্রবাসী সিলেটের অধিবাসীদের পাঠানো অর্থ থেকে। অথচ এই প্রবাসীরা দেশে এসে নানা ঝুট-ঝামেলায় পড়েন। সিলেটের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অনেকে মনে করেন, ‘প্রবাসী আদালত’ স্থাপন করতে হবে। কারণ, দেশে জমির মামলা-মোকদ্দমার জন্য কেউ হয়তো লন্ডন থেকে আসেন, কিন্তু দিনের পর দিন মামলা চলতে থাকে, ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যায় অথবা চাকরি থাকে না। তাই এ ধরনের মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য প্রবাসী আদালতের বিশেষ ব্যবস্থা দরকার। বাস্তবে এটা কতটা সম্ভব তা কেবল আইন বিশেষজ্ঞরাই বলতে পারেন। তবে সমস্যাটা বাস্তব। এর একটা সমাধান দরকার।
আইনজীবী বদরুল আহমেদ চৌধুরী বিশেষভাবে অনুরোধ করলেন, প্রথম আলো যেন সিলেটকে একটি আকর্ষণীয় পর্যটন অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার গুরুত্ব তুলে ধরে। এখান থেকে দেশের প্রচুর আয় বাড়ানো সম্ভব।
তবে সবচেয়ে বড় সুসংবাদ দিয়েছেন সিলেটের মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরান। মেয়র হিসেবে তাঁর কাজের ভুলত্রুটি, অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার খবর যে আমরা বিভিন্ন সময় ছাপিয়েছি, সে কথা তো আগেই বলেছি। সাংবাদিকতার কর্তব্য হিসেবেই সেটা আমরা করি। কিন্তু এসব অপ্রীতিকর বিষয়ের ধারেকাছেও তিনি যাননি। শুধু বলেছেন, প্রথম আলোর কাছে বস্তুনিষ্ঠ খবর চাই, কাউকে ছোট করার জন্য নয়, ভুল শুধরে দেওয়ার জন্য প্রতিবেদন চাই। তাঁর কৌশলী শব্দচয়ন লক্ষ করার মতো। তাঁর শেষ কথাটি ছিল, ‘পত্রিকাটা আমাদের!’
>>>আব্দুল কাইয়ুম: সাংবাদিক।