Wednesday, August 20, 2014

ইন্দিরার হত্যাকারীরা ‘পাঞ্জাবের রত্ন’!

কম দে হেরে ছবির একটি দৃশ্য
ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ড নিয়ে নির্মিত একটি পাঞ্জাবি চলচ্চিত্র কম দে হেরে নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। এতে ইন্দিরার হত্যাকারী তাঁর শিখ দেহরক্ষী সতবন্ত সিং ও বিয়ন্ত সিংকে মহিমান্বিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খবর টাইমস অব ইন্ডিয়ার। বলা হচ্ছে গত শুক্রবার মুক্তি পাওয়া কম দে হেরে চলচ্চিত্রে সতবন্ত ও বিয়ন্তকে ‘পাঞ্জাবের রত্ন’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে। পাঞ্জাব রাজ্যে ছবিটির প্রদর্শনী বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বরাবর চিঠি লিখেছেন প্রয়াত ইন্দিরার দল কংগ্রেসের একজন কর্মী।
পাঞ্জাবের ক্ষমতাসীন আকালি দলকে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে বলেছেন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) একজন নেতা। চলচ্চিত্রটি নিয়ে বিতর্কের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ সিং বাদল তাঁর রাজ্যের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন। তবে রাজ্য সরকার বলছে, ছবিটি মুক্তি দেওয়ার দায় ভারতীয় সেন্সর বোর্ডের। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর গুলি করে হত্যা করেন তাঁর দুই দেহরক্ষী সতবন্ত ও বিয়ন্ত সিং। ওই হত্যাকাণ্ডের চার মাস আগে সেনাবাহিনী শিখ সম্প্রদায়ের পবিত্রতম ধর্মীয় স্থান স্বর্ণমন্দিরে জঙ্গিবিরোধী অভিযান চালিয়েছিল। ওই অভিযানের দৃশ্য দিয়েই কম দে হেরে ছবিটি শুরু হয়েছে।

১০০ বছরের মধ্যে হাতিশূন্য হবে আফ্রিকা!

হাতি
বন্য প্রাণী গবেষকেরা দাবি করেছেন, বর্তমান হারে শিকার চলতে থাকলে, আফ্রিকা মহাদেশ ১০০ বছরের মধ্যে হাতিশূন্য হয়ে যাবে। তাঁরা বলছেন, ২০১০ সাল থেকে আফ্রিকায় বছরে গড়ে প্রায় ৩৫ হাজার হাতি হত্যা করা হয়েছে। খবর বিবিসির। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেসের প্রকাশনা প্রসিডিংস অব দি ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস-এ প্রকাশিত হয় এই গবেষণার ফল। গবেষণার নেতৃত্বদানকারী জর্জ উইটিমাইয়ার বলেন, ‘আমরা হাতি প্রজাতির পুরো কাঠামো ধ্বংস করে ফেলছি। পুরো মহাদেশে ব্যাপকসংখ্যায় হত্যা করা হচ্ছে প্রাণীটিকে।’ হাতির দেহাংশের অবৈধ ব্যবসা সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপকহারে বেড়ে গেছে।
এক কেজি হাতির দাঁতের দাম কয়েক হাজার ডলার। গবেষকেরা বলছেন, ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর আফ্রিকায় ৭ শতাংশ হাতি শিকার করা হয়েছে। সেখানে প্রতিবছর হাতির সংখ্যা বাড়ে ৫ শতাংশ হারে। এর অর্থ হলো গত তিন বছরে হাতির জন্মহারের চেয়ে মৃত্যুহার বেশি। এই গবেষণায় কাজ করেছেন জুলিয়ান ব্ল্যাঙ্ক। তিনি বলেন, এভাবে চলতে থাকলে হাতির সংখ্যা ব্যাপকহারে কমে যাবে। তবে সব এলাকার চিত্র এক রকম নয়। বতসোয়ানার মতো কিছু এলাকায় হাতির সংখ্যা বেশ বাড়ছে। তবে কিছু এলাকায় শিকারের হার ব্যাপকভাবে বাড়ছে।

সমন্বিত গণমাধ্যম নীতিমালা দরকার by গোলাম রহমান

বিশেষ সাক্ষাৎকার: সরকার প্রণীত জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা নিয়ে বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা লক্ষ করা গেছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গোলাম রহমানের সাক্ষাৎকার প্রকাশ করা হলো।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মিজানুর রহমান খান
প্রথম আলো- সরকারকে সমালোচনা করছি আমরা। কিন্তু শূন্যস্থানটা মিডিয়াই সৃষ্টি করে রেখেছিল কি না? তারা নিজেরা আচরণবিধি করেনি।
গোলাম রহমান- তারা করেনি, এটা ঠিক। সম্প্রচারমাধ্যমের বিকাশ দুই দশকেরও নয়।
প্রথম আলো- আপনি কি যথার্থতা দিচ্ছেন যে তারা যথেষ্ট সময় পায়নি?
গোলাম রহমান- না। প্রেক্ষাপট বলছি। বেসরকারি চ্যানেলের আকস্মিক একটা রমরমা অবস্থা এল। এফএম রেডিও এবং কমিউনিটি রেডিওর অবশ্য কিছু নিয়ম আছে।
প্রথম আলো- সেটা ছাড়পত্র-সংক্রান্ত। সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ যে যুক্তিসংগত বিধিনিষেধ বলেছে, তার আলোকে তারা কিছু করেছে কি? রেডিও-টিভির জবাবদিহি আছে কি?
গোলাম রহমান- ৩৯ অনুচ্ছেদের প্রভাব কখনো কখনো পড়েছে। রামমন্দিরের ওপর সিএনএনের সম্প্রচার দেখানো হলেও পরে তারা নিয়ন্ত্রণ করে। সরকার আগে বন্ধ করতে বলেছিল।
প্রথম আলো- তার মানে সরকারকেই হস্তক্ষেপ করতে হয়েছিল। মিডিয়া নিজ থেকে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারেনি। কোনো ব্যবস্থা ছিল না।
গোলাম রহমান- এটা সত্যি। শুধু ছিল না, তাই নয়। এর তদারকিও সহজ নয়। কারণ, এটা তাৎক্ষণিক সম্প্রচার। ফিল্টার করে তথ্য প্রদানের কার্যসাধন-পদ্ধতি নেই। এটা সম্ভবও নয়।
প্রথম আলো- মুম্বাইয়ের হোটেলে সন্ত্রাসী হামলার লাইভ দেখানো নিয়ে বেশ বিরূপ প্রতিক্রিয়া হলো। সরকারও আপত্তি তুলল। এরপর মিডিয়াই কিন্তু ভারতের সাবেক প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে কমিশন করল। আচরণবিধি বানাল। এ রকম চিন্তার আকাল এখানে কেন? এটা অসম্ভব?
গোলাম রহমান- সম্ভব। তবে তারা তো অনেক ক্ষেত্রে নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা চায়। সেদিন এক টক শোতে এমন দাবি করতে শুনলাম। বললাম, এটায় আমি বিশ্বাস করি না।
প্রথম আলো- তবে আপনি কিছু ক্ষেত্রে নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা চাইতে পারেন।
গোলাম রহমান- সেখানে দায়িত্ববোধের ব্যাপার আছে। আমাদের গণমাধ্যম, বিশেষ করে সম্প্রচারের ক্ষেত্রে জবাবদিহির জায়গা কতটা তৈরি হয়েছে, সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ।
প্রথম আলো- বাংলাদেশে এটা কী মাত্রায় আছে?
গোলাম রহমান- সংবাদপত্রের দীর্ঘ ঐতিহ্য আছে।
প্রথম আলো- নীতিমালা করার ক্ষেত্রে সরকারের মূল উদ্দেশ্য কী?
গোলাম রহমান- সম্প্রচার-সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের দিক থেকে দাবি ছিল। এটা চাওয়ার দরকার ছিল না। কিন্তু তাঁরা অনেকটা চেয়ে নিয়েছেন। সরকারও একটা সুযোগ নিয়েছে। নৈতিক দিক থেকে একটি সংবাদপত্র কীভাবে চলবে, সেটা তার নিজস্ব ব্যাপার হওয়া উচিত। অবশ্য একটি আইনি ব্যাপার আছে। অন্যটি নীতিনির্ধারণী। দুটিকে এক করা যাবে না।
প্রথম আলো- মিডিয়ার কোনো কোনো প্রতিনিধি বলছেন, তাঁদের অভিমত সরকার অগ্রাহ্য করেছে।
গোলাম রহমান- প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে। অংশীজনের সঙ্গে আলোচনার সরকারি দাবি আংশিক সত্য।
প্রথম আলো- বাংলাদেশের মিডিয়া ন্যায়পাল নিয়োগে অনীহা দেখাচ্ছে। তারা জবাবদিহির পরিসর বাড়াতে কুণ্ঠিত নয় কি? এটা গণতন্ত্র পিছিয়ে থাকা, নাকি তাদের যোগ্যতা-সামর্থ্যের সূচক?
গোলাম রহমান- গণতন্ত্র তো সংবাদপত্রের চেয়ে পিছিয়ে আছে। সংবাদপত্র অনেক বেশি স্বাধীনতা ভোগ করছে। এই ভোগের ক্ষেত্রে কোথাও পদস্খলন ঘটছে। পিছলে পড়ছে। স্বাধীনতা দেখাতে গিয়ে তারা কখনো জনগণকে থোরাই কেয়ার করছে। ভুল সংবাদে ব্যথিত ব্যক্তিকে বেশির ভাগ পত্রিকা তোয়াক্কা করে না। তারা প্রতিবাদ ছাপে না। কোথাওবা দু-চার লাইন ছাপে। এর মানে দাঁড়াল, মিডিয়া এই প্রবণতা দেখাচ্ছে যে তারা যা বলছে, সেটাই চূড়ান্ত। কিন্তু প্রশ্ন দাঁড়াচ্ছে, স্বাধীনতা তারা দায়িত্বশীলতার সঙ্গে পালন করছে কি না? প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশনস আইন যে সরকার গভীরভাবে প্রয়োগ করছে, তাও নয়। সে কারণে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার একটি ঐতিহ্য দাঁড়িয়ে গেছে।
প্রথম আলো- যাকে ঐতিহ্য বলছেন, সেটা কি উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছে গেছে?
গোলাম রহমান- সব সংবাদপত্রকে এক করে দেখা সম্ভব নয়। কোথাও কোথাও সহনীয় মাত্রা অতিক্রান্ত। মিথ্যা খবর, মিথ্যা ছবি বের হচ্ছে, তবে সাধারণীকরণ করতে চাই না।
প্রথম আলো- কোনো সম্পাদক যদি নীতির বাইরে ধর্মকে উপজীব্য করেন, বানানো ছবি প্রকাশ করেন আর সংবাদপত্রজগৎ থেকে তা বন্ধের চেষ্টা না থাকে এবং সরকার বাড়াবাড়ি করে ফেলে। তখন সংকট হয়।
গোলাম রহমান- সেটাই হয়েছে। অনেক বেশি পেশাজীবীত্ব থাকলে এমনটা হয়তো ঘটত না। ঢালাওভাবে অপবাদ দেওয়া যাবে না। কোনো কোনো গণমাধ্যম বাড়াবাড়ি করেছে, অথচ প্রচলিত আইনে তার প্রতিকার হতে পারত। সেটা তো হয়নি। নতুন আইন লাগবে না। আইনের সঠিক প্রয়োগ দরকার।
প্রথম আলো- সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতির কথা মিডিয়ায় আসে। মিডিয়াও কি এসব থেকে মুক্ত?
গোলাম রহমান- মিডিয়া কীভাবে সংযুক্ত তা পরিষ্কার নয়, তবে মিডিয়া দুর্নীতির প্রচুর খবর ছাপে। টিআই যে সূচক ছাপে, তার অন্যতম সূত্র মিডিয়া।
প্রথম আলো- তার মানে মিডিয়ার দুর্নীতি সম্পর্কে আপনি সন্দিহান?
গোলাম রহমান- প্রমাণ তো নেই। তবে ধারণা করি, ব্যাপক দুর্নীতি আছে। মিডিয়ার অনেক মালিক বা অংশীদার মিডিয়ার নাম করে অন্য ব্যবসা-বাণিজ্য চালাচ্ছেন। মিডিয়া তাঁদের ঢাল।
প্রথম আলো- প্রতিকার কী? এর জবাবদিহি কে নিশ্চিত করবে?
গোলাম রহমান- আইনের শাসন। আমি মনে করি, মিডিয়ার প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির মাত্রা এখনো কম।
প্রথম আলো- সরকার দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে? সরকার এই নীতিমালা আকস্মিকভাবে করেনি। মিডিয়া তাকে রুখতে পারেনি। কারণ, তার দুর্বলতার কারণে।
গোলাম রহমান- অব্যবস্থাপনাগত কারণটাই প্রধান। তার ভেতরের অস্থিরতা তাকে দুর্বল করছে।
প্রথম আলো- সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতা কি হুমকির মুখে?
গোলাম রহমান- না। আমি সেটা বলব না। খেলার তো একটা নিয়ম থাকবে।
প্রথম আলো- সম্প্রচার নীতিমালার কোনগুলো বাতিলযোগ্য?
গোলাম রহমান- এতে দ্বিরুক্তি আছে। অনেক জায়গায় ঢালাও বলা আছে। একই বিষয় এক স্থানে নির্দেশনামূলক, আবার অন্যত্র নিষিদ্ধ করেছে। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে সম্প্রচারমাধ্যম খবর প্রকাশ করতে পারবে না।
প্রথম আলো- পাঁচটির কম ধারা বাতিল করলেই চলে কি না?
গোলাম রহমান- সেভাবে দেখলে চলবে না। অনেক ধারা আছে, যেগুলো বহাল রাখলে অপব্যবহারের সুযোগ আছে। কোনো কোনোটি তথ্য অধিকার, কপিরাইট আইন, এমনকি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এটা টিকতে পারে না। এর প্রায়োগিক ভিত্তি দাঁড়াবে না। সরকার বলছে আইন করবে। তাহলে এটা করা হলো কেন? সংবিধানের ৩৯ ধারাটা মাথায় রেখে আইন করলেই চলত।
প্রথম আলো- আপনার এই মন্তব্য আপনার আগের বক্তব্য খণ্ডন করল কি না?
গোলাম রহমান- যুক্তিসংগত বিধিনিষেধ অনেক ক্ষেত্রে আরোপ হয়নি। মিডিয়ার বর্তমান প্র্যাকটিস এবং প্রযুক্তির সম্প্রসারণ লক্ষ করলেই আপনি নতুন প্রেক্ষাপট পাচ্ছেন যে, এর চলার জন্য নতুন কানুন লাগবে। সব মিডিয়ার একই কেন্দ্র অভিমুখে যাত্রা (কনভারজেন্স অব মিডিয়া) দেখতে পাচ্ছি। তাদের আলাদা পরিচয় লোপ পাচ্ছে। একটি চিপস সব মিডিয়াকে ধারণ করবে।
প্রথম আলো- তাহলে আরেকটি কমিশন করা কেন, প্রেস কাউন্সিলকে মিডিয়া কাউন্সিল করলেই তো চলে।
গোলাম রহমান- আমি একমত। নীতিমালা অনুমোদনের দিনেই বলেছি, কেন আপনারা আলাদা সম্প্রচার নীতিমালা করছেন। একটি সমন্বিত গণমাধ্যম নীতিমালা এর সমাধান। এটাই করা সমীচীন।
প্রথম আলো- আপনাকে ধন্যবাদ।
গোলাম রহমান- ধন্যবাদ।

এভাবে চললে ইসরায়েল বিপদে পড়বে by ইউরি আভনেরি

হ্যাঁ, পরবর্তী যুদ্ধের জন্য আপনি ছক কষছেন। এর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন, প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন—যতক্ষণ না সবকিছু নিখুঁত হয়।
আর যখন যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়, তখন বিস্ময়ের সঙ্গে আবিষ্কার করলেন, যুদ্ধে আরেকটি পক্ষ আছে। তাদেরও একটি পরিকল্পনা আছে, তারাও এর জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে, প্রশিক্ষণ নিয়েছে। 
দুই পরিকল্পনা মিলে গেলে সবকিছুই ভুল প্রতিপন্ন হয়। উভয় পরিকল্পনাই ভেঙে পড়ে। কেউই জানে না, কী হতে যাচ্ছে। কীভাবে তা হবে। সে সময় পরিকল্পনা করেননি, সে রকম কাজ করতে হয়। সেটা যদি আবার বেশি বেশি হয়ে যায়, তখন এর থেকে বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। যুদ্ধ শুরু করার চেয়ে শেষ করা কঠিন। বিশেষ করে, যখন দুই পক্ষেরই বিজয় ঘোষণা করার তাড়া থাকে। আমরা আসলে ঠিক সে রকম একটি পর্যায়ে আছি। এটা কীভাবে শুরু হলো। কোথা থেকে আপনি শুরু করতে চান, তার ওপর সেটা নির্ভর করে।
গাজায় যা ঘটেছে, তা অন্য কোনো ঘটনার প্রতিক্রিয়া হিসেবেই ঘটেছে। অন্য পক্ষ কিছু করেছে বিধায় আপনি কিছু করেন। ইতিহাসের শুরু থেকেই এমনটা হয়ে আসছে। বা অন্তত স্যামসনের নায়ক হয়ে ওঠার পর থেকে এ রকম নজির ভূরি ভূরি পাওয়া যাবে।
স্মৃতি হাতড়ে দেখা যায়, ফিলিস্তিনিরা স্যামসনকে ধরে চোখ বেঁধে গাজায় নিয়ে আসে। সেখানে তিনি দর্শক ও নেতাদের ওপর মন্দির ভেঙে ফেলেন, নিজে আত্মহত্যা করার পাশাপাশি সবাইকে তিনি হত্যা করেন। চিৎকার করে স্যামসন বলেন, ‘আমার আত্মা যেন ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে মারা পড়ে!’

স্যামসনের নজির বেশি পুরোনো মনে হলে ১৯৬৭ সালের বর্তমান দখলদারির শুরুতে যাওয়া যাক। এক বন্ধু আমার এক নিবন্ধের কথা মনে করিয়ে দেন। এটি আমি লিখেছিলাম, ছয় দিনের যুদ্ধে পুনরায় গাজা দখলের দুই বছরেরও কম সময় পরে। সে সময় আমি দুজন নির্মাণশ্রমিককে দেখেছিলাম, একজন পশ্চিম তীরের, আরেকজন গাজার। তাঁরা একই কাজ করলেও গাজার শ্রমিক পশ্চিম তীরের শ্রমিকের চেয়ে কম মজুরি পান।
নেসেটেরএকজন সদস্য হিসেবে আমি বিষয়টা একটু খতিয়ে দেখলাম। একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আমাকে জানালেন, এটা নীতিগত ব্যাপার। এর লক্ষ্য হচ্ছে, আরবদের গাজা থেকে তাড়িয়ে পশ্চিম তীরে বসতি করতে বাধ্য করা। নিশ্চিতভাবেই তারা এ লক্ষ্যে খুব একটা সফল হতে পারেনি। যদিও চার লাখ থেকে গাজার জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখে।
তারপর ১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে আমি সতর্ক করে বলেছিলাম, এভাবে চলতে থাকলে আমরা মহাবিপদের মুখোমুখি হব। এর ফলে সেখানে মারাত্মক আকারে সন্ত্রাসবাদ ছড়িয়ে পড়তে পারে, অথবা আমাদের চরম নিবর্তনমূলক নীতি নিতে হবে, সেটা হলে সারা দুনিয়াই আমাদের দুয়োধ্বনি দেবে। নিজের ঢোল বাজানোর জন্য কথাটা বলছি না, যেকোনো একজন যুক্তি-বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষই এই নিপীড়নের ফল কী হবে, তা বুঝতে পারেন, সেটা বলার জন্যই এ কথা বললাম।
এ জায়গায় যেতে গাজার অনেক সময় লেগেছে। নব্বইয়ের দশকের মধ্যভাগের কথা মনে পড়ছে, একটি সম্মেলনে আমন্ত্রিত হয়ে সেবার গাজায় গিয়েছিলাম। গাজা তখন চমৎকার একটি জায়গা। শেষ বিকেলে কেন্দ্রীয় অ্যাভিনিউ ধরে হাঁটছিলাম। মানুষের সঙ্গে অনেক কথা হয়, আমরা যে ইসরায়েলি, সেটা বুঝতে পেরে‌ও তারা আমাদের সঙ্গে ভালোভাবে কথা বলে। গাজার অধিকাংশ স্থান থেকে যেদিন ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার করা হলো, সেদিনটির কথাও আমার মনে পড়ে। গাজা শহরের কাছে ইসরায়েলের একটি সুউচ্চ পর্যবেক্ষণ টাওয়ার রয়েছে। এটি এত উঁচু ছিল যে সেখান থেকে গাজার প্রতিটি ঘরের জানালা গলে ঘরের ভেতরটা দেখা যেত। সেনারা চলে গেলে আমি সবচেয়ে ওপরের তলায় উঠে যাই, সেখান থেকে ছেলেছোকরাদের চলাফেরা দেখে বাইবেলে বর্ণিত জ্যাকবের স্বপ্নে ফেরেশতাদের মইয়ে ওঠার গল্পের কথা মনে পড়ে গেল। তার পরও আমরা সুখী। সেই ছেলেরা বোধ হয় এখন হামাসের সদস্য।

সে সময় গাজার ভূমিপুত্র ইয়াসির আরাফাত ফিলিস্তিনে ফিরে এসে গাজায় তাঁর সদর দপ্তর স্থাপন করেন। একটি চমৎকার বিমানবন্দর নির্মাণ করা হয়েছিল। নতুন একটি সমুদ্রবন্দর স্থাপনের খবরও চাউর হয়ে গিয়েছিল। এই বন্দর স্থাপন হলে গাজাবাসীর জীবনমান উন্নত হতো, ফলে ইসলামি চরমপন্থী দলকে ভোট দেওয়ার প্রবণতাও কমে আসত। কিন্তু ইসরায়েলের কারণে এ বন্দর আর আলোর মুখ দেখেনি। অসলো চুক্তির বিপক্ষে গিয়ে ইসরায়েল গাজার সঙ্গে পশ্চিম তীরের যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নব সম্ভাবনা রুদ্ধ করতেই ইসরায়েল এ কাজ করেছিল।
কিন্তু শ্যারন এই উপত্যকাটি ফিলিস্তিনের হাতে তুলে দেননি। ফলে সেনা প্রত্যাহার হওয়ার পরও সেখানে কোনো সরকার ছিল না, দুই পক্ষের মধ্যে কোনো ঐকমত্য ছিল না; চরম নৈরাজ্য বিরাজ করছিল সেখানে। এরপর ২০০৬ সালে জিমি কার্টারের তত্ত্বাবধানে নির্বাচন হলে গাজার মতো পশ্চিম তীরের মানুষও হামাসকে নির্বাচিত করে। কিন্তু তাদের ক্ষমতায় যেতে দেওয়া না হলে সংগঠনটি জোরপূর্বক গাজা উপত্যকা দখল করে নেয়। জনগণও একে স্বাগত জানায়।
এর জবাবে ইসরায়েল নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। শুধু কিছু নির্দিষ্টসংখ্যক পণ্য সেখানে ঢুকতে দিয়েছে ইসরায়েল। এমনকি পাস্তাকেও নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে গাজায় ঢুকতে দেওয়া হয়নি। গাজার দক্ষিণে মিসর, উত্তর ও পূর্বে ইসরায়েল, পশ্চিমে ভূমধ্যসাগর। ফলে গাজা এখন ‘দুনিয়ার সবচেয়ে বড় উন্মুক্ত কারাগার’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
ইসরায়েল হামাসকে ধ্বংস করতে পারবে না, আমাদের আধা ফ্যাসিস্ট শাসকেরা যতই আস্ফালন করুন না কেন। তাঁরা আসলে সেটা চানও না। হামাস পরাজিত হলে গাজাকে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দিতে হবে। তার মানে, গাজা ও পশ্চিম তীরের মিলন ঘটবে। ফলে ইসরায়েলের এত কিছু সব ভেস্তে যাবে।
হামাস থাকলেও ইসরায়েল এই ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’কে বাড়তে দিতে চাইবে না। নিষেধাজ্ঞায় শিথিলতা এলেও তা আসবে খুবই স্বল্প সময়ের জন্য। হামাসের ওপর গাজার জনগণের আস্থা আরও বাড়বে। ইসরায়েলের এসব নারকীয়তার বদলা নেওয়ার জন্য তারা ফুঁসে উঠবে। তেমনটা হলে আরেকটি যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে, সব ইসরায়েলিই এটা মনে করে।
এ সমস্যা নিরসনে দুই রাষ্ট্রের তত্ত্বের ভিত্তিতে শান্তি আলোচনা শুরু করতে হবে, এটার শেষও হতে হবে যৌক্তিক সময়ের মধ্যে। এ আলোচনা থেকে যে ঐকমত্য হবে, হামাসের উচিত সেটা মেনে নেওয়া। ইসরায়েলের নিরাপত্তার বিষয়টি ঠিকঠাক গুরুত্ব দিতে হবে। গাজার বন্দর খুলে দিতে হবে, যাতে পুরো ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রই পণ্য আমদানি ও রপ্তানি করতে পারে।
এসব সমস্যা আলাদাভাবে সমাধান করা যাবে না, এগুলোর একত্র সমাধান হতে হবে। এ প্রক্রিয়া শুরু না হলে ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিরা এক অশেষ যুদ্ধের বাহুডোরে বাঁধা পড়ব।

কাউন্টারপাঞ্চ থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
ইউরি আভনেরি: ইসরায়েলি লেখক।

অপহরণের উৎস -সত্য উন্মোচন ও দুষ্টের শাস্তি নিশ্চিতের দায় সরকারের

গুম-খুন রয়ে গেছে। অতীতে যাঁরা অপহরণের পর নিখোঁজ ছিলেন, তাঁদের বিষয়ে সরকারের দায়িত্বশীলতা দেখা যায়নি। এর মধ্যে অপহরণের সাড়ে তিন মাস পর ছাড়া পেলেন যুক্তরাজ্যপ্রবাসী বিএনপি নেতা মুজিবুর রহমান ও তাঁর গাড়িচালক। মুক্ত হয়ে মুজিবুর রহমান যা বলেছেন, তাতে মানবাধিকার সংস্থাগুলোসহ দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকদের আশঙ্কাই সত্য মনে হয় যে এসব কোনো প্রশিক্ষিত ও সংঘবদ্ধ গোষ্ঠীর কাজ।
গত ৪ মে তিনি সুনামগঞ্জে বিএনপি আয়োজিত ‘হত্যা-গুম’-এর প্রতিবাদ সভা থেকে ফেরার পথে নিজেই গুম হন। পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করার সময় এবং মুক্ত হয়ে মুজিবুর রহমান নিজেই এর সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কোনো বাহিনীর জড়িত থাকার অভিযোগ করেছেন। মুজিবুর রহমান যুক্তরাজ্য বিএনপির নেতা এবং তিনি যুক্তরাজ্যের নাগরিকও বটে। বিষয়টির রাজনৈতিক ও মানবাধিকারগত গুরুত্ব থাকার পরও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো উদ্ধার করতে পারেনি; অপহরণকারীরাই তাঁকে ছেড়ে দিয়েছে।
অপহৃত মুজিবুর বিনা মুক্তিপণেই ছাড়া পেয়েছেন। এর আগে চট্টগ্রামের এক ব্যবসায়ী অনেক দিন আটক থেকে মুক্ত হয়ে র‍্যাবকে দায়ী করেছিলেন। আইনজীবী ও পরিবেশ আন্দোলনের নেত্রী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী আবু বকর সিদ্দিক অপহরণকারীদের হাত থেকে ছাড়া পেলেও এখনো এর রহস্য ভেদ হয়নি। আরও অনেকে ছাড়া পাননি। বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী ও তাঁর গাড়িচালকের খোঁজ এখনো মেলেনি। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য হচ্ছে, ২০১৩ সালেই অপহরণের শিকার হয়েছেন ৫৩ জন।
অনেক ঘটনাতেই সরাসরি র‍্যাব ও পুলিশ অভিযুক্ত হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুনের ঘটনায় র‍্যাবের কয়েকজন কর্মকর্তার স্বীকারোক্তিও আদালত জেনেছেন। যখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অধিকাংশ অপহরণ ও গুমের ঘটনার প্রতিকার করতে ব্যর্থ, যখন আসল-নকল পোশাকধারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জমছে, তখন তাদেরই দায়িত্ব অপহরণের ঘটনাগুলোর প্রতিকার করে জনমনের সংশয় ও উদ্বেগ দূর করা। 

কালোটাকার সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা by মইনুল ইসলাম

বাংলাদেশ সরকারের ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেটে আবারও কালোটাকা সাদা করার ব্যবস্থা বহাল রাখা হয়েছে এবং প্রতিবছরের মতো এবারও অর্থমন্ত্রী আফসোস করেছেন যে নানাবিধ চাপের কারণে তাঁকে এ ব্যবস্থাটা রাখতেই হলো। এ ধরনের সাফাই গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ এই অনৈতিক সিদ্ধান্তটি তাঁর সততার মিথকে শুধু যে ভেঙে দিয়েছে তা নয়, এটা দেশের অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তায়নকে ক্রমাগতভাবে ছত্রচ্ছায়া দিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে চলেছে। এ জন্য ইতিহাসের কাঠগড়ায় সরকারের পাশাপাশি একদিন তাঁকেও দাঁড়াতে হবে। কারণ, দুর্নীতিকে তাঁরা জেনেশুনে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে চলেছেন। দুর্নীতিবাজ ও দুর্বৃত্তদের পুরস্কার প্রদানের এই অনৈতিক ব্যবস্থা চালু রেখে নিয়মনিষ্ঠ করদাতাদের শাস্তি দেওয়ার অবস্থান থেকে কোনো সরকারকেই সরানো যাচ্ছে না! অথচ নৈতিকতার ইস্যুটা বিবেচনায় না নিলেও উন্নয়ন অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকেও এর যৌক্তিকতা নেই বললেই চলে। দুর্নীতির জন্য বিশ্বে একদা কুখ্যাতি অর্জনকারী কয়েকটা দেশের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা একেবারেই ভিন্ন শিক্ষা দিচ্ছে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংগ্রামে যেসব দেশ সফল হচ্ছে, তারাই উন্নয়নের প্রতিযোগিতায়ও জয়ী হয়ে চলেছে।

অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জনে সফল যেসব দেশকে সাম্প্রতিক কালে নজির হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে, তার মধ্যে সিঙ্গাপুর, হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, মালয়েশিয়া, কিউবা, গণচীন, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ইরানের নাম এসে যাচ্ছে। এগুলোর মধ্যে সিঙ্গাপুর দুর্নীতির ব্যাপারে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অবলম্বনের কারণে এশিয়ার সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। বিংশ শতাব্দীর সত্তরের দশক পর্যন্ত হংকং, ফিলিপাইন, ইরানে (এবং ইন্দোনেশিয়ার ক্ষেত্রে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত) দুর্নীতি ও পুঁজি লুণ্ঠন সংকটজনক পর্যায়ে ছিল। তার পর থেকে এই দেশগুলোতে অত্যন্ত বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন সংঘটিত হয়েছে। হংকং ব্রিটিশ উপনিবেশ থাকতেই দুর্নীতি দমনের জন্য অত্যন্ত শক্তিশালী ও স্বাধীন দুর্নীতি দমন ব্যবস্থা চালু করে এ ব্যাপারে দৃষ্টান্তমূলক সফলতা অর্জন করেছিল আশির দশকেই। ফলে ওই আশির দশক থেকেই হংকংয়ের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হারও নাটকীয়ভাবে বেড়ে গিয়েছিল। ১৯৯৭ সালে গণচীনের অংশ হওয়ার পর এখন হংকং খোদ গণচীনের জন্যই সুশাসনের পথ-প্রদর্শকে পরিণত হয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক শাসক পার্ক চুং হি অগণতান্ত্রিক সামরিক শাসক হলেও তেমন দুর্নীতিবাজ ছিলেন না। তাই তাঁর শাসনামলে দক্ষিণ কোরিয়া চমকপ্রদ অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জন করেছিল। প্রধানত, তাঁর নজির দেখিয়েই অনেক উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ ফতোয়া দিয়েছিলেন যে উন্নয়নের জন্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রয়োজন নেই। কিন্তু ১৯৮২ সালে তিনি নিহত হওয়ার পর আরও কয়েকজন সামরিক ডিক্টেটর ওই দেশে শাসনক্ষমতা দখল করলেও জনগণের প্রবল আন্দোলনের কাছে নতি স্বীকার করে পরবর্তী সময়ে গণতন্ত্র চালু করতে বাধ্য হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক এস্টাবলিশমেন্ট। এর ফলে গণতান্ত্রিক কোরিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়ন এখন সারা বিশ্বের কাছেই অনন্য নজির হয়ে আছে। দক্ষিণ কোরিয়া উন্নত শিল্পায়িত দেশের কাতারে শামিল হয়ে গেছে। (পার্ক চুং হির দুর্নীতির বদনাম ছিল না বলেই তাঁর কন্যা বর্তমানে জনগণের ভোটে ওই দেশের প্রেসিডেন্ট!) ফিলিপাইনের মার্কোস তাঁর সময়ে দুর্নীতিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ছিলেন। তাঁর পতনের পর কোরাজন একুইনো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে দুর্নীতিমুক্ত শাসনের নজির সৃষ্টি করা সত্ত্বেও ওই দেশ থেকে দুর্নীতি কমাতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে উত্তরসূরিদের কারণে। কিন্তু বেনিগনো একুইনো ও কোরাজন একুইনোর ছেলে একুইনো জুনিয়র প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর চার বছর ধরে আবারও তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ায় বর্তমানে ফিলিপাইন চমকপ্রদ জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার অর্জন করে চলেছে এবং এ বছর এই প্রবৃদ্ধির হার এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের আগে ইরান ছিল দুর্নীতির আখড়া। গত ৩৫ বছরে ইরান দুর্নীতি অনেকখানি কমাতে সক্ষম হওয়ায় ইরানের অর্থনৈতিক উন্নয়ন গতিশীল হয়েছে।
১৯৬৫ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত ইন্দোনেশিয়ার ক্ষমতার মসনদ জবরদখলকারী ডিক্টেটর সুহার্তো বিশ্বে এক নজিরবিহীন দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিক মডেল গড়ে তুলেছিলেন। এই মডেলে নিজের পরিবার, আত্মীয়স্বজন, তাঁর গোলকার পার্টি এবং খোদ ইন্দোনেশীয় সেনাবাহিনীর প্রতিটি স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীকে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির ফায়দাভোগীতে পরিণত করার ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়েছিল। সুহার্তোর পতনের পর এই ব্যবস্থাটিকেই উন্নয়ন তত্ত্বে ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’ বলে অভিহিত করা হয়েছে, যেটাকে ইন্দোনেশিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে প্রধান বাধা হিসেবে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে। তাঁর পতনে ইন্দোনেশিয়ায় গণতন্ত্রের রুদ্ধ দ্বার খুলে যায়। ফলে গত ১৬ বছরে ইন্দোনেশিয়াও প্রশংসনীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করে চলেছে। উল্লেখ করা প্রয়োজন যে ইন্দোনেশিয়ার জাতির পিতা সুকর্ণর কন্যা মেঘবতী সুকর্ণপুত্রী একবার গণতান্ত্রিকভাবে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেও সুশাসন দিতে ব্যর্থ হওয়ায় দ্বিতীয়বারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন। তাঁর সঙ্গে নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় বিজয়ী প্রেসিডেন্ট ইউধোইয়োনো দুর্নীতি কমানোর জন্য তাঁর দুই মেয়াদে যথাসাধ্য চেষ্টা চালানোয় এখন ইন্দোনেশিয়া দুর্নীতির করাল চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে এবং তাতেই ওই দেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধির পালে হাওয়া লেগেছে।
আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী ভারতের সাম্প্রতিক নির্বাচনে কংগ্রেস-নেতৃত্বাধীন ইউপিএ জোটের ভরাডুবির জন্য দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোনিয়া-রাহুল-মনমোহনের কঠোরতার অভাবকেই বিশ্লেষকেরা দায়ী করছেন। এটা টের পেয়ে নরেন্দ্র মোদি প্রথম থেকেই তাঁর দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানকে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য প্রাণপাত করে চলেছেন। এই অভিজ্ঞতাগুলো তুলে ধরছি এই কথাটাই আমাদের প্রধানমন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রীকে বলার জন্য, কালোটাকা আর কালো অর্থনীতির পৃষ্ঠপোষকতায় আল্লাহর ওয়াস্তে এবার ক্ষান্ত দিন।
হংকং থেকে প্রকাশিত বিশ্বখ্যাত পত্রিকা ফার ইস্টার্ন ইকোনমিক রিভিউ ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশকে অভিহিত করেছিল ‘স্মাগলারস প্যারাডাইস’ বলে। এরপর ২০০১ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর একাদিক্রমে বাংলাদেশ দুর্নীতিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ঘোষিত হয়েছিল বার্লিনভিত্তিক ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল দ্বারা। ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির অচিন্তনীয় নির্বাচনী বিপর্যয়ের পেছনে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল দুর্নীতি ও লুটপাট। ২০১৪ সালে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে আবারও একই কারণে আওয়ামী লীগ লজ্জাজনকভাবে পরাজয় বরণ করত বলে আমার দৃঢ়বিশ্বাস। খালেদা জিয়া এবং তাঁর পণ্ডিতপ্রবর পুত্রধনের মারাত্মক চালের ভুলে শেখ হাসিনার ভাগ্যে আবারও শিকে ছিঁড়েছে বলা চলে। কিন্তু, চাণক্য কৌশলের খেলায় জয়ী হয়ে তৃতীয়বার ক্ষমতা লাভের পর যেখানে তাঁর দলের হারানো জনপ্রিয়তা পুনরুদ্ধারের জন্য তিনি সর্বশক্তি নিয়ে কাজে নেমে পড়বেন বলে আশা করেছিলাম আমরা, তার পরিবর্তে তাঁকে আবারও পুরোনো চক্রে ঘুরপাক খেতে দেখে প্রবল আশঙ্কা জাগছে যে তিনি আদতেই ভুল থেকে শিক্ষা নেবেন কি না? দুর্নীতি ও লুটপাট যে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে ‘এক নম্বর প্রতিবন্ধক’, এ কথাও কি তিনি মানতে নারাজ? গত পাঁচটি বছর তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) প্রায় পুরোপুরি অকেজো করে রেখেছেন। এই পাঁচ বছরেও দুদকের একটি মামলার রায়ে কোনো দুর্নীতিবাজকে জেল খাটতে হয়েছে, এ রকম কোনো নজির কি সৃষ্টি হয়েছে? কোনো চিহ্নিত ব্যাংক ঋণখেলাপির বা কোনো রাঘববোয়াল ব্যাংক লুটেরা গ্রুপের কি শাস্তি হয়েছে? পুঁজি পাচার নিয়ে দেশে-বিদেশে এত হইচই হচ্ছে, এই বিষয়ে কি একটা শক্তিশালী তদন্ত কমিশন গঠন করা যেত না? টরন্টোর ‘বেগম পাড়ায়’ কাদের বেগম সাহেবানরা পলাতক পুঁজির ফায়দাভোগী হয়ে সপরিবার রয়েছেন, তার হদিস জানার কোনো প্রয়াস কি নেওয়া যেত না? মালয়েশিয়ার ‘সেকেন্ড হোমের’ বাংলাদেশি মালিকদের নাম জানা কি খুবই কঠিন কাজ?
এ কথা মানতেই হবে যে দুর্নীতি ও লুটপাট সত্ত্বেও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন খুবই আশাপ্রদ। কিন্তু তা নিয়ে আত্মপ্রসাদে ভোগার কোনো অবকাশ নেই। ওপরে উল্লেখিত ব্যাধিগুলো নিরাময়ের জন্য নিষ্ঠাবান প্রয়াস নিলে ক্ষমতাসীনদের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে তা সহায়ক হতো বলেই আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পালেও তা নিঃসন্দেহে হাওয়া জোগাবে।
এ পর্যায়ে বিভ্রান্তি নিরসনে বলা প্রয়োজন, রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান বৈধ-অবৈধ যেভাবেই অর্থ উপার্জিত হোক, কর ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে ‘অপ্রদর্শিত অর্থই’ কালোটাকা বলে যে সংজ্ঞা দিয়েছেন, তা প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে সঠিক হলেও অনুন্নয়নের রাজনৈতিক অর্থনীতি কালোটাকা এবং কালো অর্থনীতির আওতায় অবৈধভাবে অর্জিত আয় ও সম্পদকেই বিশ্লেষণের কেন্দ্রে নিয়ে আসে। অতএব, কালোটাকা এবং কালো অর্থনীতিকে দুর্নীতির অর্থনীতির আওতাভুক্ত বিষয় বিবেচনা করে সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে রাষ্ট্রকে তা দমনে যত্নবান হতে হবে, শুধু সরকারের আমলাতন্ত্রের মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান মিলবে না। কারণ, আমলারা কালোটাকা এবং কালো অর্থনীতির অন্যতম জন্মদাতা ও ফায়দাভোগী। রাজনীতিবিদ, আমলা এবং ব্যবসায়ী-পুঁজিপতিদের সফল আঁতাতের ফলেই দুর্নীতির সিস্টেম প্রাতিষ্ঠানিকতা অর্জনে সক্ষম হয়। তাই সর্বোচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সুস্পষ্ট সদিচ্ছা ও আন্তরিক প্রয়াস ব্যতিরেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম কোনো দেশেই সফল হয়নি।
আমার দৃঢ়বিশ্বাস, আগের দুই মেয়াদে দুর্নীতি দমনে লোক দেখানো তৎপরতা দেখিয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব জনপ্রিয়তা হারিয়েছিল, এবারের তৃতীয় মেয়াদে সর্বশক্তি দিয়ে দুর্নীতি দমনের কঠিন সাধনা প্রকৃত সদিচ্ছা নিয়ে শুরু করলে হারানো জনপ্রিয়তা ফিরে আসতে দেরি হবে না।    

মইনুল ইসলাম: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি।

সরকারকে কর দেবেন না : ইমরান

পাকিস্তানে সরকারের পদত্যাগ দাবিতে চলমান আন্দোলনের দ্বিতীয় দিনে জনগণের উদ্দেশে সরকারকে কর পরিশোধ না করার আহ্বান জানিয়েছেন পাকিস্তান তেহরিক-ই ইনসাফের (পিটিআই) প্রধান ইমরান খান। ডন নিউজ পিটিআই ও পাকিস্তান আওয়ামী তেহরিক-ই (পিএটি) শুরু করা যুগ্ম আন্দোলনে রোববার প্রচুর জনসমাগম লক্ষ্য করা গেছে। এ দিন ইমরান জনতার উদ্দেশে তার বক্তৃতায় বলেন, ‘কর দেবেন না... বিদ্যুৎ বিল দেবেন না... জিএসটি দেবেন না। যতক্ষণ না নওয়াজ (পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী) পদত্যাগ করছেন, ততক্ষণ এসব কর দেয়া বন্ধ রাখুন।’ তিনি বলেন, ‘আমি এটা আমার জন্য করতে বলছি না... আপনাদের জন্য করতে বলছি।’
কর না দেয়ার এ কার্যক্রম ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ সরকারের ওপর বিশাল প্রভাব ফেলবে বলেও মন্তব্য করেন সাবেক এ ক্রিকেট তারকা। এ সময় তিনি দেশটির প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে পদত্যাগের জন্য দুই দিনের সময় বেঁধে দেন। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পদত্যাগ না করলে প্রধানমন্ত্রী ভবন বরাবর লং মার্চের ঘোষণা দেন তিনি। ইমরান খান দেশটির পুলিশকে সরকারবিরোধী ভূমিকা নেয়ারও আহ্বান জানান। সোমবার টাইমস অব ইন্ডিয়া অনলাইনের প্রতিবেদনে জানানো হয়, সরকারের পদত্যাগের দাবিতে পথে নামা ইমরান খান রোববার অসহযোগ আন্দোলনের এই ঘোষণা দেন। রাজধানী ইসলামাবাদের আবপারা চকে অবস্থান নেয়া হাজারো নেতাকর্মীর উদ্দেশে দেয়া বক্তৃতায় ইমরান বলেন, ‘আমার জন্য নয়, আপনাদের জন্য আমি এই জন-অসহযোগ ডেকেছি। আমরা ট্যাক্স, বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিল দেব না।’ নওয়াজকে ইঙ্গিত করে পিটিআই প্রধান বলেন, ‘এই ব্যবসায়ীদের হাতে, যারা কেবল নিজেদের জন্য অর্থ বানাতে চায়, পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ অন্ধকার।’ দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেও রোববার পিটিআই ও পিএটির সমর্থকরা তাদের কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছেন। এদিকে, পাকিস্তানে ‘সরকারের প্রতি জনগণের অবাধ্য’ হতে ইমরান খানের আহ্বান মানছে না বিরোধী দলগুলো।
পাকিস্তানের প্রধান বিরোধী দল পিপিপি ও জামায়াতে ইসলামী এটাকে গণতন্ত্রের জন্য হুমকি বলে অভিহিত করেছে। রোববার ইমরান খান সরকারকে কর ও অন্যান্য বিল না দিতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, জনগণের টাকা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ নিজের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য বাড়াচ্ছেন। গত পাঁচ দিন ধরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ করছে ইমরান খান ও তাহির-উল কাদরির সমর্থকরা। পিপিপি নেতা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি বলেন, ‘ইমরানে গণঅবাধ্যতার আহ্বান গণতন্ত্র ও জাতির জন্য কোনো কাজে আসবে না।’ রাজনৈতিক সমাধানের জন্য অর্থপূর্ণ সংলাপের কথা বলেন তিনি। জামায়াতে ইসলামীর আমীর সিরাজুল হক সরকার ও ইমরান তাহিরের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছেন। তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয় এমন যে কোনো পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আমরা।’

শিরোপা ফেদেরার ও সেরেনার

সিনসিনাটি ওপেনের শিরোপা জিতে বছরের শেষ গ্র্যান্ডস্লাম ইউএস ওপেনের প্রস্তুতিটা ভালোই সেরে রাখলেন রজার ফেদেরার। ফাইনালে স্পেনের ডেভিড ফেরারকে হারিয়েছেন সুইজারল্যান্ডের এই তারকা। যুক্তরাষ্ট্রের সিনসিনাটিতে রোববার ফেরারের বিপক্ষে ফেদেরারের জয়টি অবশ্য সহজে আসেনি। ম্যাচটি তিনি জেতেন ৬-৩, ১-৬, ৬-২ গেমে। সিনসিনাটি ওপেনে এটি ফেদেরারের ষষ্ঠ শিরোপা। আর ক্যারিয়ারের ৮০তম। ২৫ অগাস্ট শুরু হবে হার্ড কোর্টের গ্র্যান্ডস্লাম টুর্নামেন্ট ইউএস ওপেন।
এদিকে ঘরের কোর্টের গ্র্যান্ডস্লাম ইউএস ওপেনের প্রস্তুতি ভালোই সেরে রেখেছেন সেরেনা উইলিয়ামস। সাবেক একনম্বর তারকা আনা ইভানোভিচকে হারিয়ে সিনসিনাটি ওপেনের শিরোপা জেতেন বর্তমানের এই একনম্বর তারকা। যুক্তরাষ্ট্রের সিনসিনাটিতে সার্বিয়ার তারকা ইভানোভিচকে ৬-৪, ৬-১ গেমে সহজেই হারান সেরেনা। সিনসিনাটি ওপেনে ছয়বার অংশ নিয়ে এবারই প্রথম শিরোপা জিতলেন উইলিয়ামস পরিবারের ছোট মেয়ে। আর এই শিরোপা জিতে যেন জানান দিলেন, এবার ঘরের কোর্টের টুর্নামেন্টে তাকে হারানো এত সহজ হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে এ বছরের ইউএস ওপেন শুরু হবে ২৫ আগস্ট। ওয়েবসাইট।

বাবা-মায়ের সঙ্গে নাদিয়ার দূরত্ব

একটি ছেলেকে ভালোবাসেন অভিনেত্রী নাদিয়া। বিয়েও করেছেন তাকে। পরিবারের পছন্দ না হওয়ায় ছেলেটিকে অমতেই বিয়ে করে ফেলেছেন। নতুন সংসারে গিয়ে শ্বশুর-শাশুড়ি সবাইকে বেশ মানিয়ে নিয়েছেন নাদিয়া। সবাইকে আপন করে ফেলেছেন খুব কম সময়ে। কিন্তু এতকিছুর পরও বাবা-মায়ের কথা তার খুব মনে পড়ে। বিয়ের পর থেকে ধীরে ধীরে দূরত্ব বেড়ে যায় তাদের সঙ্গে। আর এমন দূরত্ব কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা জানা যাবে ধারাবাহিক নাটক ‘দূরত্ব’তে। নাটকে এমন চরিত্রেই বাবা-মায়ের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছে নাদিয়ার।
রোকেয়া প্রাচীর পরিচালনায় নাটকটিতে অভিনয় প্রসঙ্গে নাদিয়া বলেন, ‘পারিবারিক গল্প নিয়ে নাটকটি নির্মিত হয়েছে। গল্পের মাঝে অনেক নাটকীয়তা দেখতে পাবেন দর্শক। পরিবারের একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন এ নাটকের মূল বিষয়বস্তু। আশা করছি দর্শক উপভোগ করবেন।’ এ নাটক ছাড়াও নাদিয়ার অভিনীত আরও বেশ কয়েকটি ধারাবাহিক নাটক বর্তমানে বিভিন্ন চ্যানেলে প্রচার হচ্ছে। দূরত্ব নাটকের শুটিং প্রায় শেষ হয়েছে। সব কাজ শেষ হলে শিগগিরই নাটকটি প্রচারে আসবে বলে জানিয়েছেন নির্মাতা।

ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান হয় না কেন? by হাসান ফেরদৌস

ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান হয় না কেন? এককথায় এ প্রশ্নের উত্তর: মধ্যপ্রাচ্যে সবাই যুদ্ধের বিরুদ্ধে, কিন্তু শান্তির পক্ষে নয়।

>>মধ্যপ্রাচ্যের এই ট্র্যাজিক নাটকের পুনরাভিনয় চলছে ৬০ বছর ধরে
১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের যে প্রস্তাব অনুসারে ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা, সেই একই প্রস্তাব অনুসারে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রেরও প্রতিষ্ঠা পাওয়ার কথা। সাড়ে ছয় দশক পরে ইসরায়েল এখন বিশ্বের অন্যতম শক্তিধর দেশ। আর ফিলিস্তিনবাসীর জন্য স্বাধীনতা অধরাই রয়ে গেছে। ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ ফিলিস্তিনকে বিভক্ত করে দুটি রাষ্ট্র (একটি ইহুদি, অন্যটি আরব) গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। অসম ও অন্যায্য
এই যুক্তিতে আরবেরা সে সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি। উল্টো ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র ঘোষিত হলে প্রতিবেশী চারটি আরব দেশ মিসর, সিরিয়া, জর্ডান ও ইরাক একযোগে ইসরায়েলকে আক্রমণ করে। সেই যুদ্ধে আরবেরা পরাজিত হয় এবং ইসরায়েল জাতিসংঘ পরিকল্পনায় তাদের জন্য বরাদ্দকৃত ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনের ৫৬ শতাংশের জায়গায় মোট ৭৭ শতাংশ দখল করে নেয়। এরপর যে এক চিলতে জমি পড়ে রইল, সেখানে স্বাধীন ফিলিস্তিন প্রতিষ্ঠা করা যেত। কিন্তু সেই পথে না গিয়ে মিসর ও জর্ডান তা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেয়। পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম গেল জর্ডানের বাদশাহর কবলে, গাজার দখল নিল মিসর।
এরপর গত ৬০ বছরে আরব সাগর দিয়ে অনেক পানি বয়ে গেছে, তার চেয়েও বেশি গেছে ফিলিস্তিনিদের কান্না ও লহু। আমরা সেই কাহিনিতে যাব না। চলে আসা যাক চলতি সময়ে। ১৯৯৩ সালে সম্পাদিত অসলো প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনি মুক্তি সংস্থার মধ্যে যে শান্তি চুক্তি সম্পাদিত হয়, তার ভিত্তিতে ১৯৯৬ সালে পশ্চিম তীর ও গাজায় নামকাওয়াস্তে ফিলিস্তিনি স্বায়ত্তশাসন কায়েম হয়। তত দিনে অবশ্য সেই অঞ্চলের একটা বড় অংশ ইসরায়েলের অবৈধ বসতির কবলে, অথবা সরাসরি সামরিক নিয়ন্ত্রণে। নামেই স্বায়ত্তশাসন, কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে চৌপ্রহর ইসরায়েলি প্রহরা, উঁচু দেয়াল, এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যেতে হলে ইসরায়েলি অনুমতি, ফলে এমন দেশকে স্বাধীন না বলে বান্টুস্থান বলাই অধিক সংগত। কিন্তু সেই প্রশাসনও দুই টুকরা হয়ে গেল ২০০৬ সালের নির্বাচনের পর। পশ্চিম তীর গেল ফাতাহর নিয়ন্ত্রণে, গাজা গেল ইসলামিক ব্রাদারহুডের মিত্র হিসেবে পরিচিত হামাসের। দুজনের সঙ্গে কথা বন্ধ, যখন-তখন বন্দুকযুদ্ধ। হামাস সন্ত্রাসবাদী দল ও ইসরায়েলের অস্তিত্ব স্বীকার করে না, এই অভিযোগে ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন দলটির সঙ্গে সব সম্পর্ক বর্জন করে। যত দিন না হামাস-ফাতাহ কাজিয়া মিটছে, ফিলিস্তিন প্রশ্নে শান্তি চুক্তি অসম্ভব। ‘সন্ত্রাসবাদী’ তকমা থাকায় হামাসের ওপর আক্রমণ করেও ইসরায়েল পার পেয়ে যায়, এমনকি নিজেকে নৈতিকভাবে শ্রেষ্ঠ দাবি করতে পারে। ফলে এই কাজিয়া চলতে থাকাই ইসরায়েলের জন্য লাভজনক। অন্যদিকে নিজেরা যে আলাপ-আলোচনা করে কাজিয়া মেটাবে, ফাতাহ বা হামাস—কেউই তাতে আগ্রহী নয়। কারণ, ঝগড়া মেটামাত্রই নির্বাচন হবে, আর সেই নির্বাচনে দুই দলের চলতি নেতৃত্বের প্রত্যেকে ঝেঁটিয়ে বিদায় নেবে, তাতে সন্দেহ নেই।
হামাস ও ফাতাহর মধ্যে দ্বন্দ্ব শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রশ্নে নয়, ইসরায়েলের প্রতি সম্পর্কের প্রশ্নেও। প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের সরকার আপসের পথ বেছে নিয়েছে। অনেকেই অভিযোগ করে, তাদের মূল লক্ষ্য ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা নয়, ফাতাহর চলতি নেতৃত্বকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখা। অন্যদিকে, হামাস সব ধরনের আপসের বিরোধী। সেটাই তাদের প্রধান রাজনৈতিক হাতিয়ার। কোনো কোনো মিসরীয় ও মার্কিন ভাষ্যকারের ধারণা, এবারের যুদ্ধ হামাসের উসকানিতে। ইসরায়েল ও মিসর এই দুই দিক থেকে অবরুদ্ধ হয়ে এবং সিরিয়া ও ইরানের সমর্থন খোয়ানোয় তারা বেপরোয়া হয়ে পড়ছিল। তাদের টাঁকশাল কার্যত শূন্য, সরকারি কর্মচারীদের বেতনের অর্থ পর্যন্ত নেই। এসব ভাষ্যকারের দাবি, একটা যুদ্ধ বাধলে গাজাবাসীর কাছে নিজেদের জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিকভাবে নিজের অবস্থা দৃঢ়তর করা সম্ভব হবে, সেই যুক্তিতে এই যুদ্ধ টিকিয়ে রাখা। তাদের কথা ঠিক হোক বা না হোক, মানতেই হবে গাজার সর্বশেষ যুদ্ধ হামাসকে নতুন জীবন দান করেছে। ফাতাহ ও হামাসের ওপর চাপ রয়েছে তাদের বিভেদ ভুলে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের। এ বছরের এপ্রিলে তেমন একটা চুক্তিও হয়েছে, যদিও তা কার্যকর হয়নি। এখন, ক্রমবর্ধমান চাপ ও বাস্তবতার কারণে সেই সরকার যদি গঠিত হয়, হামাসের আশা সেখানে তাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
আরব রাজা-বাদশারা চাইলে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার ব্যাপারে ইসরায়েলের ওপর চাপ দিতে পারত, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেনদরবার করতে পারত। কিন্তু এবারের হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধ থেকে আবারও পরিষ্কার হয়ে গেছে, প্রতিবেশী কোনো আরব দেশই এ ব্যাপারে কুটোটিও নেড়ে দেখবে না। অন্ততপক্ষে যত দিন হামাসকে তাড়ানো না যায়। মিসরের সেনাবাহিনী ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং সৌদি আরবের বাদশাহজাদারা ইসলামিক ব্রাদারহুডকে তাঁদের রাজনৈতিক অস্তিত্বের জন্য বিপজ্জনক মনে করেন। প্রেসিডেন্ট মোবারকের পতনের পর ব্রাদারহুডের প্রার্থী মোহাম্মদ মুরসি মিসরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তাঁর সঙ্গে হামাসের ওঠাবসা ছিল, তিনি দুই দেশের সীমান্তপথ খুলে দেন। অভিযোগ রয়েছে, সেই পথ দিয়ে হামাস অস্ত্র পাচার করেছে, গোপন সুড়ঙ্গ নির্মাণের মালামাল বয়ে এনেছে। সেই মুরসি এখন জেলে, তাঁর জায়গায় নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন জেনারেল সিসি। তিনি হামাসকে ঠিক ততটাই অপছন্দ করেন, যতটা ব্রাদারহুডকে।
ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে হামাস পর্যুদস্ত, সে ব্যাপারটা মিসরে রীতিমতো বিজয় হিসেবে উদ্যাপিত হয়েছে। ব্রিটিশ ঐতিহাসিক রিচার্ড ফালক গার্ডিয়ান পত্রিকায় মন্তব্য করেছেন, মিসর ও সৌদি আরব পশ্চাৎ থেকে ইসরায়েলকে ‘কাজ শেষ করার জন্য’ সমর্থন দিয়ে গেছে। না, শুধু হামাসের রকেট ও সুড়ঙ্গ ধ্বংস নয়, ‘সাপের মাথা হামাস’ যাতে চিরতরে ধ্বংস হয়, তারা সেই কাজে ইসরায়েলকে উৎসাহ দিয়েছে। মিসরের সরকারনিয়ন্ত্রিত তথ্যমাধ্যমে গাজার সর্বশেষ হামলার জন্য সব দোষ দেওয়া হয়েছে হামাসকে। এই যুদ্ধে মিসরসহ অন্য সব আরব দেশের নীরবতা এমন প্রকট হয়ে ওঠে যে নিউইয়র্ক টাইমস এক দীর্ঘ সংবাদ বিশ্লেষণে এই উপসংহারে পৌঁছায় যে আরব দেশগুলোর জন্য ইসরায়েলের চেয়ে বড় শত্রু হামাস। আর মিসরের আল-আহরাম–এর ভাষ্যকার আজ্জাসামি লিখেছেন, ‘ধন্যবাদ নেতানিয়াহু। আল্লাহ আমাদের আপনার মতো মানুষ দিন, যারা হামাসকে ধ্বংস করবে।’ সিএনএনের ভাষ্যকার ফরিদ জাকারিয়ার কথায়, সৌদি আরব, মিসর, জর্ডান ও উপসাগরীয় দেশগুলো মনে করে, হামাস ধ্বংস হলে তাদের প্রত্যেকের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাব্যবস্থা সুরক্ষিত হবে। বলা বাহুল্য, ইরানের প্রতি এদের সবার গাত্রদাহ আছে। ইরান ও হামাস ঘনিষ্ঠ মিত্র বলে ভাবা হয়। ফলে হামাসকে ঘায়েল করা গেলে ইরানের পিঠেও দুই ঘা দেওয়া যায়।
এ পর্যন্ত আমরা ফিলিস্তিন প্রশ্নে এক যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া বাকি সব প্রধান খেলোয়াড়ের অবস্থানের একটা চালচিত্র পেয়েছি। একমাত্র যে দেশ ইসরায়েলের ওপর সরাসরি প্রভাব বিস্তারে সক্ষম, সে হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এই দুই দেশ কৌশলগত মৈত্রীতে আবদ্ধ। এই দুই দেশে সরকার বদল হয়, নতুন নেতা আসেন, কিন্তু তাঁদের কৌশলগত আঁতাতের কোনো পরিবর্তন হয় না। যুক্তরাষ্ট্র বরাবর নিজেকে মধ্যপ্রাচ্য সমস্যার নিরপেক্ষ ‘সমঝোতাকারী’ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করে থাকে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের নিরপেক্ষতার অর্থ আগে ইসরায়েলের স্বার্থ, তারপর অন্য কথা। অনেকেই বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই একপেশে নীতি তার নিজের জাতীয় স্বার্থবিরোধী। সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী বব গেইটস সরাসরিই বলেছেন, বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের ভেতর যে মার্কিনবিরোধী মনোভাব, তার পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যনীতি। তা সত্ত্বেও ইসরায়েল প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পরিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনা কম। ১৯৪৮ সালে সৌদি বাদশাহ প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যানকে অনুরোধ করেছিলেন, ফিলিস্তিন প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র হয় নিরপেক্ষ থাকুক বা আরবদের সমর্থন করুক। ট্রুম্যান বলেছিলেন, দেশের ভেতর কোনো আরব লবি নেই, যাদের জোরে তিনি নির্বাচনে জিতবেন। ৬০ বছর পরেও এই বাস্তবতার কোনো পরিবর্তন হয়নি।
অনেকে ভেবেছিলেন, বারাক ওবামা নির্বাচিত হওয়ার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যনীতিতে পরিবর্তন আসবে। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, আগের যেকোনো মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে ওবামার নীতিগত কোনো প্রভেদ নেই। এবারের গাজা হামলার সময় যে হারে বেসামরিক নাগরিকদের মৃত্যু হয়েছে, তা গ্রহণযোগ্য নয় বলে ওবামা মন্তব্য করেছিলেন। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে নিজের নাগরিকদের সুরক্ষায় ইসরায়েলের সামরিক আগ্রাসনের সপক্ষে সাফাইও গেয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র এখনো ইসরায়েলকে প্রতিবছর তিন বিলিয়ন ডলার সামরিক ও অর্থনৈতিক সাহায্য দিয়ে থাকে। ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টায় সেই সাহায্যকে ব্যবহারের কোনো ভাবনাও তাঁর মাথায় নেই।
মধ্যপ্রাচ্যের এই ট্র্যাজিক নাটকের পুনরাভিনয় আমরা দেখে আসছি ৬০ বছর ধরে। পাত্রপাত্রীর সামান্য রদবদল হয়তো হয়, কিন্তু নায়ক-নায়িকা সবই অভিন্ন। এই অবস্থার হয়তো পরিবর্তন একদিন হবে, কিন্তু কবে ও কীভাবে, সে প্রশ্নের জবাব দেওয়ার যোগ্যতা আমার নেই।
হাসান ফেরদৌস: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷

পাকিস্তানে রাজনৈতিক সঙ্কট ঘনীভূত

পাকিস্তানে রাজনৈতিক সঙ্কট ঘনীভূত। টান টান উত্তেজনা রাজধানী ইসলামাবাদে। প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের পদত্যাগ দাবিতে রাজপথ দখলে নিয়েছে ইমরান খানের পাকিস্তান তেহরিকে ইনসাফ (পিটিআই) ও তাহিরুল কাদরির পাকিস্তান আওয়ামী তেহরিক (পিএটি)। সরকারের আলোচনা প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন তারা। গতরাতে রেড জোনে প্রবেশ করার কথা ইমরানের পিটিআই ও কাদরির পিএটি’র। গতরাতে ইমরান খান তার সমর্থকদের উদ্দেশে বলেছেন, আমি নেতৃত্বে থাকবো। আপনার আমাকে অনুসরণ করুন। এ ঘোষণার পরই তার রেড জোনে প্রবেশ করার কথা। এ সময় তিনি প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফকে হুঁশিয়ার করে দেন। বলেন, নওয়াজ আমি তোমাকে ছাড়বো না। পালিয়ে লন্ডনে গেলেও সেখানে তোমাকে ধরবো। রেড জোন এলাকায় অবস্থিত পার্লামেন্ট, প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ও কূটনৈতিক মিশনগুলো। রেড জোনে দলীয় নেতাদের প্রবেশ করার ঘোষণা দেয়ার পর পরই তাহিরুল কাদরি ও তার দলের ২৭ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে সন্ত্রাস বিরোধী আদালত। গুজরানওয়ালায় ৭৩ পুলিশ আহত করার ঘটনায় এ আদেশ দেয়া হয়েছে। গতকাল স্থানীয় সময় বিকাল ৫টার মধ্যে ‘নতুন আওয়ামী পার্লামেন্ট’ ঘোষণা করার কথা তাহিরুল কাদরির। এ দু’-নেতা আন্দোলনে নেমেছেন কঠোর অবস্থান নিয়ে। তাদের হুমকিতে সরকারের ভিতে নাড়া লেগেছে। রেড জোনের নিরাপত্তার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে সেনাবাহিনীকে। গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান এবং পয়েন্টে মোতায়েন করা হয়েছে সেনাসদস্য। চিফ অব আর্মি স্টাফ জেনারেল রাহিল শরীফের সঙ্গে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে অনুষ্ঠিত ওই আলোচনায় স্থান পায় পিটিআই ও পিএটি’র আন্দোলন কিভাবে বানচাল করা যায় তা। তাছাড়া পূর্ব নির্ধারিত পররাষ্ট্র সচিবদের বৈঠক ভারত সরকার বাতিল করার বিষয়ও আলোচনায় উঠে আসে। নিরাপত্তা জোরদার করতে মোতায়েন করা হয়েছে ৪০ হাজার নিরাপত্তারক্ষী। ১০ কোরের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল কামার বাজওয়া বলেছেন, ইসলামাবাদ পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও পার্লামেন্টের নিরাপত্তা কিভাবে নিশ্চিত করা যায় তা সমন্বয় করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও রেড জোনে প্রবেশ করার ঘোষণা দিয়েছেন পাকিস্তান তেহরিক-ই- ইনসাফ (পিটিআই) প্রধান ইমরান খান। তিনি একা নন, তার সঙ্গে যোগ দেয়া হাজার হাজার সমর্থককে নিয়ে গত রাতেই ওই এলাকায় প্রবেশের হুমকি দিয়েছেন তিনি। ওদিকে খাইবার পখতুনখাওয়া প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পারভেজ খাত্তাকের বিরুদ্ধে ওই প্রদেশের বিরোধী দল অনাস্থা প্রস্তাব এনেছে। পিটিআই ওই প্রদেশের পার্লামেন্ট ভেঙে দিতে পারে- এমন হুমকির জবাবে তারা এমন পদক্ষেপ নিয়েছে, যাতে মুখ্যমন্ত্রী প্রাদেশিক পরিষদ ভাঙতে না পারেন। মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাবের পক্ষে রয়েছেন পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ (পিএমএলএন), পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি), আওয়ামী ন্যাশনাল পার্টি (এএনপি) ও কওমি ওয়াতান পার্টি (কিউডব্লিউপি)। মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব জমা দেয়া হয়েছে প্রাদেশিক পরিষদের স্পিকার আসাদ কাউসার, মুখ্যমন্ত্রী পারভেজ খাত্তাক ও গভর্নর সরদার মাহতাব আহমেদ খানের কাছে। ইসলামাবাদে আন্দোলনরত পিটিআই ও পিএটির সঙ্গে আলোচনার জন্য সরকার গঠন করেছে দু’টি কমিটি। কিন্তু সে আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে তাহিরুল কাদরি হুমকি দেন, গতকাল স্থানীয় সময় বিকাল ৫টায় গঠন করার কথা নতুন আওয়ামী পার্লামেন্ট। তার নেতৃত্বে ইসলামাবাদের আবপাড়া স্কয়ারে অবস্থান করছেন হাজার হাজার সমর্থক। আওয়ামী পার্লামেন্ট গঠনের ভূমিকা কি ধরনের হবে এবং এর কাজই বা কি হবে সে সম্পর্কে তিনি কিছু বলেননি। তবে তিনি বলেছেন, এ পার্লামেন্টের সিদ্ধান্ত মেনে চলা হবে। আওয়ামী পার্লামেন্টই সিদ্ধান্ত নেবে ভবিষ্যৎ কর্মসূচি কি হবে এবং দেশের ভাগ্য পরিবর্তন হতে চলেছে কিনা। এ সময় তাহিরুল কাদরি বর্তমান পার্লামেন্টের সমালোচনা করেন। বলেন, যারা কারচুপির নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছেন তারা লজ্জার। তাহিরুল কাদরি দেশজুড়ে ধর্মঘট আহ্বান করেছেন। সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করতে সমর্থকদের নির্দেশ দিয়েছেন মহাসড়ক ও মোটরওয়েগুলো বন্ধ করে দিতে। জনপ্রিয় নীতি অনুযায়ী তিনি সমর্থকদের নির্দেশ দেন যেখানে তারা অবস্থান ধর্মঘট করবেন সে এলাকাকে যেন পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখেন। অন্যদিকে তার কাছাকাছি কাশ্মীর হাইওয়ের কাছে বিক্ষোভ করছিল ইমরান খানের পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ। তাদের মার্চের নাম দেয়া হয়েছে আজাদি মার্চ। গতকাল রাতেই রেড জোনে প্রবেশের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে জাতীয় পরিষদ ও তিনটি প্রাদেশিক পরিষদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। তার দলের অফিসিয়াল টুইটারে বলা হয়েছে, তার দলের সব এমপিই তাদের পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। পিটিআইয়ের সব এমপির পদত্যাগপত্র জমা নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন শাহ মেহমুদ কুরেশি।

গ্রেপ্তার ১৪৭
পাকিস্তানে সরকার পতনের দাবিতে বিক্ষোভ- আন্দোলনের পঞ্চম দিন অতিবাহিত হলো গতকাল। পুলিশ বলছে, পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের বিভিন্ন শহরতলি থেকে অভিযান চালিয়ে বিক্ষোভে নেতৃত্বদানকারী পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ দলের নেতা ইমরান খান ও প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতা তাহির-উল-কাদরির ১৪৭ সমর্থককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি। জনপ্রিয় ক্রিকেটার থেকে রাজনীতিবিদে পরিণত হওয়া ইমরান খান দেশজুড়ে গণ-অসহযোগের ডাক দেন। সোমবার প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের সরকারকে ক্ষমতা থেকে অপসারণে বদ্ধপরিকর ইমরান খান সরকারের প্রতি একটি ‘বাউন্সার’ও ছুঁড়ে দিয়েছিলেন। এক ঘোষণায় তিনি বলেছেন, জাতীয় পরিষদ থেকে তেহরিক-ই-ইনসাফ দলের সব পার্লামেন্ট সদস্য পদত্যাগ করবেন। জাতীয় পরিষদের ৩৪২টি আসনের মধ্যে ৩৪টি আসন নিয়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দল তেহরিক-ই-ইনসাফ। ইমরান ও কাদরির আহ্বানে সাড়া দিয়ে হাজার হাজার সমর্থক বিক্ষোভ করছেন পাঞ্জাব ও রাজধানী ইসলামাবাদে। এর মধ্যে বহু নারী-শিশুও রয়েছে। ১৫ মাস আগে ক্ষমতায় এসে সরকার বেকারত্বের উচ্চ হার, নৈমিত্তিক লোড-শেডিং ও তালেবান জঙ্গি ইস্যুগুলো নিয়ে চ্যালেঞ্জিং সময় অতিক্রম করছে। এরই মধ্যে বিরোধী দলের বিক্ষোভে নতুন সঙ্কট তৈরি হয়েছে। এক বক্তৃতায় নওয়াজের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে ইমরান বলেছেন, নওয়াজ শরীফ সব আইনকে পাশ কাটিয়ে যান এবং ভোট-জালিয়াতি ও দুর্নীতির আশ্রয় নেন। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে ২ দিন পর তার সমর্থকরা জোর করে ঢুকে পড়লেও তার করার কিছু থাকবে না বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন ইমরান। রাজধানী ইসলামাবাদে সমর্থকদের সঙ্গে নিয়ে বিক্ষোভ অব্যাহত রেখেছেন ইমরান খান। এবং নওয়াজ শরীফ পদত্যাগ না করলে রেড জোনে প্রবেশেরও হুমকি দিয়েছেন। পাকিস্তানের প্রখ্যাত ধর্মীয় নেতা তাহির-উল-কাদরিও নওয়াজের মাথাব্যথার কারণ। বিক্ষোভের ফলে এবং সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় পাকিস্তানের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এখন প্রশ্নের সম্মুখীন।
বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কট মোকাবিলায় সরকার ব্যর্থ হয়েছে বলে পাকিস্তানের বিরোধীদলীয় সিনেটররা সরকারের সমালোচনা করেছেন। একই সঙ্গে তারা ইমরান খানের অসহযোগ আন্দোলনের ডাক প্রত্যাখ্যান করেছেন। আজাদী ও ইনকিলাব নামের আন্দোলনের ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য পার্লামেন্টে প্রস্তাব আনে পাকিস্তান পিপলস পার্টি ও আওয়ামী ন্যাশনাল পার্টি। বিরোধীদলীয় নেতা সিনেটর ইজাজ আহসান বলেন, রেলমন্ত্রী ও পরিকল্পনা মন্ত্রী যেভাবে আন্দোলনকে গুরুত্ব দিয়েছেন সরকার সেভাবে দেখেনি। তাই ইমরান খান ও ড. তাহিরুল কাদরি কড়া কড়া কথা বলছেন। তবে ২০১৩ সালের জাতীয় নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি হয়েছিল বলে ইমরান খানের বক্তব্য সমর্থন করেন তিনি। ১৪টি আসনে কিভাবে নির্বাচনী কারচুপি হয়েছে এ বিষয়ে তিনি একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করছেন। তিনি বলেন, লাহোর হাইকোর্ট তার কাছে পিটিআই ও পিএটির আজাদি ও ইনকিলাব নামের মার্চ সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। এর জবাবে তিনি বলেছেন, আমি তাদেরকে বলেছি আন্দোলন অসাংবিধানিক নয়।

কালেমা পড়ে তৈরি হয়েছিলাম by রুদ্র মিজান

হঠাৎ পোশাক পরে তৈরি হতে বলা হয়। ভেবেছিলাম আর হয়তো বাঁচবো না। কোথাও নিয়ে গুলি করে মেরে ফেলা হবে। এমনটি মনে করে কালেমা পড়ে তৈরি হই। চোখ বাঁধা অবস্থায় হাতের বাঁধন খুলে যখন ছেড়ে দেয় তখনও মনে হয়েছিল আর বুঝি বাঁচবো না। কিন্তু কিছু সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর বুঝতে পারি আমি বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়েছি। আমি জীবন ফিরে পেয়েছি।’ কথাগুলো বলছিলেন সাড়ে তিন মাসের বন্দিদশা থেকে মুক্ত হওয়া বিএনপি নেতা মুজিবুর রহমান। রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে গতকাল মানবজমিনের সঙ্গে একান্তে কথা বলেন প্রবাসী এ নেতা। তিনি জানিয়েছেন কিভাবে তাকে অপহরণ করা হয়। অপহরণের পর তার সঙ্গে কেমন আচরণ করা হয়েছে। কি জানতে চাওয়া হয়েছে। অপহরণকারীদের বর্ণনাও দিয়েছেন তিনি। প্রায় সাড়ে তিন মাস নিখোঁজ থাকার পর সোমবার সকালে তাকে গাজীপুর এলাকায় ছেড়ে দেয় অপহরণকারীরা। এরপরই তাকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

অপহরণ ঘটনার বর্ণনা দিয়ে মুজিবুর রহমান বলেন, গত ৪ঠা মে সুনামগঞ্জ থেকে সিলেট যাওয়ার পথে টুকেরবাজারে পুলিশ তার গাড়ি থামায়। সড়কে তখন পুলিশের দু’টি গাড়ি। পাঁচজন পুলিশ সদস্য ছিলেন রাস্তায়। পুলিশ চালকের লাইসেন্স দেখতে চায়। লাইসেন্স ভুয়া দাবি করে গাড়িচালক রেজাউল হক সোহেলকে পুলিশ নিয়ে যায়। মুজিবের কাছে তার গাড়ির কাগজ খোঁজে পুলিশ। গাড়ির কাগজ সিলেট নগরীর বাসায় আছে জানালে পুলিশ তাকে বলে, আপনাকে গাড়িসহ থানায় নিয়ে যাবো। পরে বাসা থেকে কেউ কাগজ নিয়ে গেলে পুলিশ ড্রাইভার দিয়ে গাড়িসহ তাকে বাসায় পৌঁছে দেবে। এসব কথা বলেই দু’জন পুলিশ তার গাড়িতে ওঠে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঘটে এ ঘটনা। গাড়ির পেছনে বসা ছিলেন মুজিব। পুলিশের একজন ড্রাইভিং সিটে অন্যজন ড্রাইভিং সিটের পাশের সিটে। গাড়িতে উঠেই পাশের জন বলেন, গন্ধ লাগছে। এয়ার ফ্রেশনার দাও। অন্য পুলিশ সদস্য পেছনের দিকে মুজিবকে লক্ষ্য করে কিছু একটা সেপ্র করেন। ৩০ সেকেন্ডের মধ্যেই তিনি অচেতন হয়ে যান। তিনি বলেন, কর্মসূচি শেষে ফেরায় ঘুম ঘুম ভাব ছিল তাই পুলিশের সঙ্গে কোন তর্কে জড়াননি তিনি।
মুজিব বলেন, অপহৃত হওয়ার পর যখন জ্ঞান ফিরে তখন তিনি নিজেকে আবিষ্কার করেন হাতে হ্যান্ডকাফ, পা ও চোখ বাঁধা অবস্থায়। মেঝেতে পড়ে আছেন। টের পান পুরো শরীরে ব্যথা। শব্দ করে জানতে চান তার অবস্থান। সঙ্গে সঙ্গে পাশে থেকে ধমকের সুরে বলা হয়, শাটআপ বাস্টার্ড, উই উইল কিল ইউ...! চিৎকার করবি না- বলেই মুজিবকে সজোরে লাথি মারে একজন। কখন দিন কখন রাত তা টের পাওয়া ছিল দুস্কর। তবে জ্ঞান ফেরার প্রায় আট ঘণ্টা পর তিনি ফজরের আজান শুনেছেন। ওই সময়ে তাকে খাওয়ার জন্য কলা রুটি দেয়া হয়। সেখানে একাধিকবার পানি খাওয়ার পর অচেতন হয়েছেন তিনি। তার ধারণা পানির মধ্যে ওষুধ মিশিয়ে দেয়া হতো। বন্দি থাকা অবস্থায় তিন বার স্থান পরিবর্তন করা হয়। প্রথমবার ২০ থেকে ২৫ মিনিট গাড়ি চালিয়ে নতুন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। স্থান পরিবর্তনের সময় তাকে কাঁধে করে গাড়িতে তোলা হতো। স্থান পরিবর্তন হচ্ছে- এইটুকু টের পেয়েছেন।
সর্বশেষ মুক্ত হওয়ার পাঁচ-সাত দিন আগে স্থান পরিবর্তন করা হয়।  প্রথম দিকে ভাত খেতে না পারলেও পরে ভাত খেতেন মুজিব। আলু ও বেগুন ভর্তা এবং গরু ও খাসির মাংস খেতে দেয়া হতো তাকে। খাওয়ার সময়ও তার চোখ বাঁধা থাকতো। হ্যান্ডকাফ হাতে নিয়েই খেতে হতো। অপহরণকারীদের একজন প্লেট মুখের কাছে তুলে ধরতো। বন্দি অবস্থায় ১০ থেকে ১২ দিন পর পর গোসল করানো হতো তাকে। রমজানে তাকে যেখানে রাখা হয় সেখানে সেহরির সময় মসজিদের মাইক থেকে ঘুম ভাঙানোর জন্য ডাকা হতো। একাধিক মসজিদের আজানের শব্দ কানে আসতো। প্রায়ই রাজনৈতিক বিভিন্ন কর্মসূচির মাইকের আওয়াজ পেতেন তিনি। ঘুমানোর জন্য ফ্লোরে একটি বালিশ দেয়া হতো তাকে। অপহরণের পর তার মোবাইলফোন, ঘড়ি ও মানিব্যাগ আর খুঁজে পাননি তিনি। মুজিবের পাহারায় সবসময় অপহরণকারী দলের চার-পাঁচ জন থাকতো।
অপহরণের পর মারধর করা হতো উল্লেখ করে তিনি বলেন, অপহরণের প্রথম দিকে বেশি মারধর করা হয়েছে তাকে। জ্ঞান ফিরলেই লাঠি দিয়ে প্রহার করে বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হতো। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যে অবস্থানকারী বিএনপি নেতৃবৃন্দ সম্পর্কে তারা তথ্য চাইতো। যুক্তরাজ্য থেকে কি পরিকল্পনা হচ্ছে- এ সম্পর্কে জানতে চাইতো। মুজিব তখন তাদের বলেছেন, তারা সিনিয়র নেতা। আমি তাদের সম্পর্কে কিছু জানি না। তখন আরও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠতো তারা। শরীরে বিভিন্ন স্থানে, হাড়ের জোড়ায় লাঠি দিয়ে আঘাত করতো। লাঠির আঘাতে কালো হয়ে গেছে তার শরীরের বিভিন্ন স্থান। এছাড়া বিভিন্ন কাগজ এনে এতে সই নিয়েছে তারা। তাকে ছেড়ে দেয়ার কিছুদিন পূর্ব থেকে টাকা দাবি করতো অপহরণকারীরা। কখনও ১০ কখনও ১২ কখনওবা ১৫ কোটি টাকা ছিল তাদের দাবি। মুজিব বলতেন, আমাকে ছেড়ে দিন। আমি টাকা দেবো। না ছাড়লে টাকা দেবো কি করে। তবে মুজিবের কাছে মনে হয়েছে টাকার দাবিটা জোরালো ছিল না। তিনি বলেন, টয়লেট এবং গোসল করার সময়ও চোখের বাঁধন খোলা হতো না। এ অবস্থায় অপহরণকারী যে কোন একজনকে ধরে বাথরুমে যেতেন তিনি। তার হাতের ছোঁয়ায় মনে হয়েছে অপহরণকারীদের চুল খুব ছোট করে ছাঁটা। তারা লম্বা ও সুঠাম দেহের অধিকারী। তারা সব সময় ইংরেজি ও শুদ্ধ বাংলা ভাষায় কথা বলতো। তারা নিজেদের কাউকে স্যার বলে সম্বোধন করতো।
ফিরে আসার দিনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, গত সোমবার সকালে আন্ডারওয়ার পরতে বলা হয়। পোশাক পরতে বলা হয়। মুজিব জানান, তখন মনে হয়েছে আজ মেরে ফেলা হবে। হয়তো ‘ক্রসফায়ার’ করা হবে। তার মুখে তখন ট্যাপ লাগানো হয়। চোখ বাঁধা অবস্থাতেই তাকে বোরকা পরানো হয়। অপহরণকারীরা তাকে সিঁড়ি দিয়ে হাঁটিয়ে নামায়। পরে গাড়িতে তুলে প্রায় এক ঘণ্টা ঘুরে গাজীপুর এলাকায় ফেলে রেখে যায়। মুজিব মনে করেন ইচ্ছা করেই তাকে ভুল ধারণা দেয়ার জন্য গাড়িতে করে এক ঘণ্টা ঘোরানোর পর ছেড়ে দেয়া হয়। ছেড়ে দেয়ার সময় শুধু হাত থেকে হ্যান্ডকাফ খুলে নিয়ে যায় তারা। তাৎক্ষণিকভাবে চোখ খুলে পাশেই তার গাড়িচালক সোহেলকে দেখতে পান একই অবস্থায়। দু’জনে বোরকা খুলে সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে টঙ্গীতে পৌঁছান। সেখান থেকে অটোরিকশা নিয়ে গুলশানের বাসায় যান মুজিবুর রহমান মুজিব। পথিমধ্যে বাড়ি যাওয়ার উদ্দেশে হানিফ এন্টারপ্রাইজের কাউন্টারের সামনে নেমে যান গাড়িচালক সোহেল। এ সময় সোহেলকে এক হাজার টাকা দেন মুজিব। তবে অপহৃত অবস্থায় চালকের সঙ্গে দেখা হয়নি তার। ছাড়া পাওয়ার পর প্যান্টের পকেটে ৫৫০০ টাকা পান তিনি। অপহরণকারীরাই তাকে ছেড়ে দেয়ার আগে এই টাকা দেয়। উদ্ধারের পর রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে মুজিবুর রহমান মুজিবকে। তার শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তিনি এখনও দুর্বল, তার শরীরে রক্তের হিমোগ্লোবিন কমে গেছে। অপহরণকারীরা নির্যাতন করায় তার শরীরে, হাতে-পায়ে দাগ রয়েছে। গতকাল বৃটিশ হাইকমিশনার রবার্ড গিবসন তার প্রতিনিধি পাঠিয়ে মুজিবের খোঁজ নিয়েছেন। একই ভাবে বিএনপির সুনামগঞ্জ জেলার আহ্বায়ক ও সাবেক এমপি নাছির উদ্দিন চৌধুরী, সাবেক এমপি শফি আহমদ চৌধুরীসহ বিএনপি নেতৃবৃন্দ তাকে দেখতে যাচ্ছেন ও খোঁজ নিয়েছেন। রাতে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরীও হাসপাতালে মুজিবকে দেখতে যান। উল্লেখ্য, দেশব্যাপী গুম-হত্যার প্রতিবাদে সুনামগঞ্জে দলীয় কর্মসূচি শেষে সিলেটে ফেরার পথে নিজের গাড়িচালকসহ নিখোঁজ হয়েছিলেন যুক্তরাজ্য প্রবাসী এ বিএনপি নেতা। যুক্তরাজ্য যুবদলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মুজিবুর রহমান মুজিব সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির একজন সদস্য। সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার ভাতগাঁও ইউনিয়নের খেওয়ালীপাগা গ্রামের মৃত আসদ আলীর ছেলে। ব্যবসা ও রাজনৈতিক কারণে তিনি মাঝে-মধ্যে দেশে আসা-যাওয়া করেন। বছরখানেক ধরে দেশে বসবাসকারী মুজিবুর রহমানের পুরো পরিবার লন্ডনেই থাকেন। গ্রামের বাড়ির পাশাপাশি তার সুনামগঞ্জ শহরের হাজীপাড়ায় ও সিলেট নগরীর শামিমাবাদ এলাকায় দু’টি বাসা রয়েছে।

এরশাদ কি সত্য বলছেন?

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ কি সত্য বলছেন? গতকালই সাবেক এই স্বৈরশাসক দাবি করেছেন গণতান্ত্রিক হতে গিয়েই তিনি বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পারেননি। এরশাদ বলেছেন, আমার শাসনামলে একক সিদ্ধান্তে অনেক কিছু করেছি। একক সিদ্ধান্তে বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পারিনি। এটা পারলে তার নামের পাশে আমার নাম লেখা থাকতো। আমি সবার সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে  চেয়েছিলাম। এটা ছিল ভুল। তাই পারিনি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এরশাদের এ দাবির সত্যতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। বেশ কিছু কারণে সাবেক এই প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ দূতাবাসে কর্মরত ছিলেন। এরশাদ তাদের চাকরিচ্যুত করেননি অথবা তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেননি। মেজর শরীফুল হক ডালিম সে সময় হংকং এ কর্মরত ছিলেন। রশীদ, ফারুক ও অন্যরা দেশে ফিরে দল গঠন, পত্রিকা প্রকাশ, ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করে। খোন্দকার মোশ্‌তাক আহমাদের আমলে পাস হওয়া বিতর্কিত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের কারণে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের পথ বন্ধ ছিল। নয় বছরের শাসনামলে এরশাদ কখনওই তা বাতিলের কোন উদ্যেগ নেননি। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়। এতে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের পথ খুলে যায়। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের নিয়ে গঠিত দল ফ্রিডম পার্টি এরশাদের আমলে পুরোমাত্রাতেই সক্রিয় ছিল। ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো অংশ নেয়নি। ওই নির্বাচনে ফ্রিডম পার্টি ১১১টি আসনে প্রার্থী দেয় এবং দু’টি আসনে জয়লাভ করে। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশ বেতার রেডিও বাংলাদেশ নামে পরিচিত হয়। পাকিস্তানি ভাবধারায় তা করা হয়। এরশাদের সচিবালয়ে কর্মরত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত চরমপত্রের পাঠক এম আর আখতার মুকুল পুনরায় বাংলাদেশ বেতার নামকরণের প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু এরশাদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ওই প্রস্তাব নাকচ করে দেয়া হয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর আবার বাংলাদেশ বেতার নামকরণ করা হয়।

ওদিকে, গতকাল দুপুরে বনানী কার্যালয়ে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে জন্মাষ্টমীর শুভেচ্ছা বিনিময়কালে এরশাদ আরও বলেন, আমি একক সিদ্ধান্তে কাজ করতাম। উপস্থিত নেতাকর্মীদের  কাছে প্রশ্ন রেখে বলেন, একক সিদ্ধান্ত কি খারাপ? একক সিদ্ধান্তে উপজেলা করেছি। ঢাকার বাইরে হাইকোর্টের সাতটি বেঞ্চ করেছি। এগুলো কি স্বৈরাচারী কাজ? যদি তা হয়ে থাকে, তাহলে আমি স্বৈরাচার!। এরশাদ বলেন, গণতন্ত্র মানতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা করতে পারিনি। এখন দেশে কিসের গণতন্ত্র চলছে? গণতন্ত্র কোথাও দেখি না। গণতন্ত্র মানে সুশাসন। দেশে কি সুশাসন আছে? আমাদের ছেলেমেয়েরা স্কুল থেকে ফিরে আসতে পারে না। এ কেমন গণতন্ত্র? এরশাদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনি আপনার পিতা ও নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন এবার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করুন। তাহলে জনগণ আপনাকে মনে রাখবে। এ সময় প্রতিনিধিদল হিন্দু সমপ্রদায়ের ওপর নানা অত্যাচার ও নির্যাতনের কথা তুলে ধরে। এ সব অত্যাচারের কারণে হিন্দুরা এখন  দেশত্যাগে বাধ্য হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তারা। ভারতের বাবরি মসজিদের ভাঙার কথা উল্লেখ করে এরশাদ দাবি করেন, তার সময় ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দির, কালী মন্দির ও  চট্টগ্রামের কৈবল্যধাম মন্দির বাদে দেশের কোথাও হিন্দুদের ওপর হামলা হয়নি। এরশাদ হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের উদ্দেশ্যে আরও বলেন, আমাকে স্বৈরাচার বলা হলেও মানুষের দুঃখ বেদনা বুঝি। মানুষের কষ্টে আমার হৃদয় কাঁদে। আপনারা কখনই নিজেদের সংখ্যালঘু বলবেন না। এই মনোভাব নিয়ে চলবেন না। আপনারাও এ  দেশের নাগরিক। আপনাদের আমাদের সমান  অধিকার । শুভেচ্ছা বিনিময়কালে এরশাদ হিন্দু কল্যাণ ট্রাস্ট, জন্মাষ্টমীর ছুটি তার শাসনামলেই হয়েছিল উল্লেখ করে বলেন, সরকারের কাছে দাবি জানাই দূর্গাপূজার ছুটি যেন তিন দিন দেয়া হয়। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা এখন শুধুমাত্র বিজয় দশমীতে ছুটি পেয়ে থাকেন। এছাড়া সাম্প্রদায়িক হামলা বন্ধে নিজ দলের এমপিদের উদ্দেশ্যে বলেন, তোমাদের এলাকায় কোন হিন্দুদের ওপর হামলা হলে তোমরা দায়ী হবে। যার এলাকায় হামলা হবে তাকে মনোনয়ন দেয়া হবে না। এরশাদ বলেন, ‘একবার  নৌকা ছাড়া   ভোট দিয়ে দেখেন না কি হয়? কথা দিচ্ছি, আর  কোন অভিযোগ থাকবে না। শুধু একবার সুযোগ দিন।’ এরশাদ অন্যান্য দলের নেতাদেরও একই নির্দেশ দেয়ার দাবি জানান। শুভেচ্ছা বিনিময় সভায় আরও বক্তব্য রাখেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, সর্বজনীন পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি কাজল দেবনাথ, মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি জুয়েল ভৌমিক, এরশাদের বিশেষ উপদেষ্টা ববি হাজ্জাজ, জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য সুনীল শুভরায়, এস এম ফয়সল চিশতি প্রমুখ।