Friday, January 17, 2014

নতুন সরকার- সামনে এখন সুশাসনের চ্যালেঞ্জ by ইফতেখারুজ্জামান

বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের প্রয়াণের আগের দুই সপ্তাহের মধ্যে পর পর দুটি অনুষ্ঠানে তাঁর পাশে থাকার বিরল সৌভাগ্য হয়েছিল। এর একটি ছিল ইতিহাসের মহিরুহ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার স্মরণে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠান, যেখানে হাবিবুর রহমান বলেছিলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিবিদেরা ম্যান্ডেলার জীবনাদর্শ থেকে কিছুই শেখেননি।

সংলাপ-সমঝোতার বিকল্প নেই- শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের ডাক

১৮-দলীয় জোটের প্রধান নেতা ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আর কোনো হরতাল-অবরোধের কর্মসূচি ঘোষণা করেননি। এ জন্য তাঁকে ধন্যবাদ দিতে হয়। কারণ, কয়েক মাস ধরে এই নেতিবাচক কর্মসূচির ফলে বাংলাদেশের জনগণ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে; আন্দোলনের নামে মানুষের প্রাণহানি, ধ্বংসযজ্ঞ, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অচলাবস্থা ও জনজীবনে নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টির এই ধারা আর চলতে দেওয়া উচিত নয়।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নয় দিন পর গত বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে খালেদা জিয়া নতুন সরকারকে ‘অবৈধ সরকার’ আখ্যা দিলেও এ সরকারের সঙ্গে সংলাপ ও সমঝোতার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন—এটাকেও আমরা ইতিবাচক হিসেবে বিবেচনা করতে চাই। কারণ, সংলাপ-সমঝোতা ছাড়া চলমান রাজনৈতিক সমস্যা থেকে উত্তরণের কোনো বিকল্প নেই। সরকারের ‘বৈধতা’র প্রশ্নটির থেকে এখন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দুই পক্ষের মধ্যে কার্যকর রাজনৈতিক সম্পর্কের সূচনা ঘটানো। শুধু সংলাপের মাধ্যমেই সেটির সূচনা ঘটানো সম্ভব, যেখানে সমঝোতার মানসিকতা অপরিহার্য।
হরতাল-অবরোধের মতো সহিংস কর্মসূচির উল্লেখ না করে খালেদা জিয়া ‘গণতন্ত্রের জন্য শান্তিপূর্ণ আন্দোলন অব্যাহত’ রাখার যে ঘোষণা দিয়েছেন, তাতে আমাদের পরিপূর্ণ স্বস্তি বোধ হয় না। কারণ, তাঁর ভাষায় যে ‘শান্তিপূর্ণ আন্দোলন’ এত দিন চলে এসেছে, তা ‘অব্যাহত’ রাখা হলে জনজীবনে শান্তি ফিরে আসবে না। সবকিছুর আগে এই সহিংস ও ধ্বংসাত্মক আন্দোলনের ধারা বন্ধ করতে হবে। মুখে ‘শান্তিপূর্ণ’ আন্দোলনের কথা বলা আর কার্যত জবরদস্তিমূলক, সহিংস, আতঙ্ক সৃষ্টিকারী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়ে জনজীবনে অচলাবস্থা সৃষ্টি করা স্ববিরোধিতা। বিরোধী জোটের কর্মসূচিগুলোতে যেসব সহিংসতা ঘটেছে, সেগুলোর দায়দায়িত্ব সরকারের ওপর চাপিয়ে বিরোধী জোট দায়মুক্ত থাকতে পারে না। উপর্যুপরি সহিংস কর্মসূচির মধ্য দিয়ে জনসাধারণের সঙ্গে বিরোধী জোটের যে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হয়েছে, তা দূর করতে বিরোধী জোটের এযাবৎকালের আন্দোলনের ধারা ‘অব্যাহত’ রাখার ভাবনাটি বাদ দিয়ে ‘শান্তিপূর্ণ আন্দোলন’ কথাটির প্রতি আন্তরিকতার প্রকাশ ঘটাতে হবে বাস্তব ক্ষেত্রে।
সরকারকেও দমন-পীড়নের কৌশল পরিত্যাগ করে বিরোধী দলগুলোর সংবিধানপ্রদত্ত অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার অজুহাতে বিরোধী জোটকে গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো থেকে বঞ্চিত করা এবং তাদেরকে সম্পূর্ণ কোণঠাসা করে রাখার কৌশল বজায় রেখে সরকার সুষ্ঠুভাবে দেশ পরিচালনা করতে পারবে না। অর্ধেকের বেশি আসনে একেবারেই ভোট না হওয়া এবং অবশিষ্ট আসনগুলোতে প্রধান বিরোধী দলের অংশগ্রহণ না থাকায় নতুন সরকারের রাজনৈতিক বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তি দুর্বল। এই প্রেক্ষাপট স্বীকার করে নিয়ে সরকারকে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক সদাচরণের নীতি গ্রহণ করে সামগ্রিক সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রয়াস নিতে হবে; সর্বোপরি সমঝোতার মানসিকতা নিয়ে সংলাপ শুরু করতে হবে। বিরোধী জোটকে রাজনৈতিক আন্দোলনে বাধা না দিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে তা পালনে সহযোগিতা করা সরকারের দায়িত্ব বৈকি।

পাতানো নির্বাচন এবং একব্যক্তিক রাষ্ট্রের প্রশ্ন by মাহফুজ আনাম

১৯৪৯ সালে জন্মের পর থেকে আওয়ামী লীগ তার সব কর্মকাণ্ডে জনগণের ক্ষমতার ওপর নির্ভর করেছে। অথচ সেই দলটি নিষ্ঠুর, নির্দয় এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী সদ্য হয়ে যাওয়া নির্বাচন হাইজ্যাক করেছে এবং শুধু ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য জনগণের ভোটের অধিকারকে অস্বীকার করেছে।

নতুন সরকার- সামনে এখন সুশাসনের চ্যালেঞ্জ by ইফতেখারুজ্জামান

বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের প্রয়াণের আগের দুই সপ্তাহের মধ্যে পর পর দুটি অনুষ্ঠানে তাঁর পাশে থাকার বিরল সৌভাগ্য হয়েছিল। এর একটি ছিল ইতিহাসের মহিরুহ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার স্মরণে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠান, যেখানে হাবিবুর রহমান বলেছিলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিবিদেরা ম্যান্ডেলার জীবনাদর্শ থেকে কিছুই শেখেননি।
যুক্তি হিসেবে যে বিষয়ের ওপর তিনি বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন, তা হলো ম্যান্ডেলা দীর্ঘ ২৭ বছর কারাবাসের পর বর্ণবাদ-পরবর্তী দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদী নেতা হিসেবে জনরায়ে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পাঁচ বছরের এক মেয়াদ পালনের পর তাঁর প্রতি পরিপূর্ণ জনসমর্থন নিশ্চিত জেনেও ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। শান্তিপূর্ণ ও অহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে বিজয় অর্জন করে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, আইনের শাসন ও সম-অধিকারের মূলমন্ত্রের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার ছাড় না দিয়ে মৌলিক জাতীয় ইস্যুতে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার স্বার্থে কেমন করে প্রতিপক্ষকে সঙ্গে নিয়ে জাতি গঠনে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব, তার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে ম্যান্ডেলা হয়ে উঠেছিলেন বিশ্বমাপের নেতা, বিশ্বব্যাপী রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য অনুপ্রেরণা ও পথপ্রদর্শক।

ম্যান্ডেলার আদর্শের চর্চা বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বে পরিপূর্ণ প্রতিফলিত হবে—এমন আশা করা মূর্খের কাজ হবে। একদিকে ক্ষমতায় আরোহণ নিশ্চিত করার জন্য আন্দোলনের নামে নির্মম রক্তক্ষয়ী সহিংসতা ও অন্যদিকে ক্ষমতায় থাকার জন্য সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার নামে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ধূলিসাৎ করে জনরায়ের পথ রুদ্ধ করার যে অধ্যায় রচিত হলো, তা গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের জন্য আত্মঘাতী। নৈতিকতাবিবর্জিত ধ্বংসাত্মক ও নেতিবাচক রাজনীতি এ দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণের জন্য চরম হতাশাব্যঞ্জক, একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী।
৫ জানুয়ারির নির্বাচন সংবিধানের মর্ম ও চেতনার সঙ্গে কতটুকু সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তবে ভোটার অংশগ্রহণের মাপকাঠির পাশাপাশি যেসব কারণে এই নির্বাচনের ফলে গঠিত সংসদ ও সরকার নিশ্চিতভাবে আস্থাহীনতার সংকটের মুখোমুখি, তার মধ্যে অন্যতম জনগণের ম্যান্ডেটের অনুপস্থিতি। এ নির্বাচন ছিল নিতান্তই ক্ষমতাকেন্দ্রিক, এখানে নির্বাচনী ইশতেহার কোনো ভূমিকা পালন করেনি। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের আনুষ্ঠানিকতার ইশতেহার ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে বলা হয়েছিল, জনগণের ম্যান্ডেট পাওয়ার উদ্দেশ্যে এবার নির্বাচনী ইশতেহার ব্যবহূত হয়নি। অর্থাৎ সরকারের নিজস্ব অবস্থান অনুযায়ী সরকার জনরায়ের সংকটে, যা কাটিয়ে উঠে জনগণের আস্থা অর্জন যত দিন তাঁরা ক্ষমতায় থাকবেন, তত দিনের জন্য অন্যতম চ্যালেঞ্জ সঙ্গে থাকবে।
আস্থা অর্জনের প্রথম পদক্ষেপ হতে পারত প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অংশগ্রহণমূলক একাদশ সংসদ নির্বাচনের লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট সময়াবদ্ধ রোডম্যাপ ঘোষণার মাধ্যমে আলোচনার পথ সুগম করা। নির্বাচনের আগে থেকে বলা হয়েছিল যে ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পরই একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনার সূত্রপাত করা হবে, যদিও শপথ গ্রহণের পর সরকারের কর্তাব্যক্তিরা জানিয়ে দিচ্ছেন যে সরকার পুরো পাঁচ বছরই ক্ষমতায় থাকবে।
ম্যান্ডেটবিহীন সরকারের আস্থা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কতিপয় এজেন্ডার কথা বলা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা ও শান্তি প্রতিষ্ঠা, নিরবচ্ছিন্ন উন্নয়ন, সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদ দমন, আইনের শাসন, সুশাসন, দুর্নীতি দমন ইত্যাদি দেশবাসীর প্রাণের দাবি। আশার কথা, আগের আমলে যেসব মন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মসহ গগনচুম্বী সম্পদাহরণের অভিযোগ ছিল, তাঁদের অনেককেই নতুন মন্ত্রিসভায় রাখা হয়নি। প্রধানমন্ত্রী এও বলেছেন যে তাঁদের বিরুদ্ধে দুদক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে, তিনি কাউকে ছাড় দেবেন না। তবে সরকারের বি-টিমের ভূমিকায় লিপ্ত দুদক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও নির্বাচন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠান বাস্তবে জনপ্রতিনিধিত্বের অবস্থানে থেকে ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারবে, এরূপ আস্থা জনমনে নেই বললেই চলে।
সদিচ্ছা থাকলে অবশ্য সরকার দু-একটি পদক্ষেপ অনতিবিলম্বে নিতে পারে। নবম সংসদের শেষ অধিবেশনের শেষ মুহূর্তে দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের সংশোধনী বিল পাস করে দুদককে সম্পূর্ণ অকার্যকর করার আত্মঘাতী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, যা একদিকে সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের পরিপন্থী ও অন্যদিকে অসাংবিধানিক ও বৈষম্যমূলক। দশম সংসদের প্রথম অধিবেশনেই আইনটির যথাযথ সংশোধন করে দুদককে কার্যকর করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপটি সরকার নিতে পারে। দ্বিতীয়ত, মহাজোট সরকারের পুরো মেয়াদে সংঘটিত দুর্নীতির ওপর শ্বেতপত্র প্রকাশ করে তার পরিপ্রেক্ষিতে সুনির্দিষ্ট সময়াবদ্ধ কৌশল গ্রহণ করে দুর্নীতির অপরাধে দায়ী ব্যক্তিদের কোনো প্রকার ভয় ও করুণার ঊর্ধ্বে থেকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে পারে। এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে না পারলে দুর্নীতিবিরোধী সব ঘোষণা ফাঁকা বুলি হিসেবে আরও একবার প্রমাণিত হবে।
একদিকে পুরোনো-নতুনের সংমিশ্রণ ও অন্যদিকে তথাকথিত বিরোধী দলের সঙ্গে ক্ষমতার ভাগাভাগির এক অভিনব ও বিভ্রান্তিকর মন্ত্রিসভা আইনের শাসন, দুর্নীতি প্রতিরোধ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারবদ্ধ থাকবে—এরূপ ঘোষণা করা হয়েছে। ক্ষমতার রাজনীতির মূল উপাদান যে দুর্নীতি, ক্ষমতায় থাকলে পর্বতসম সম্পদ অর্জনের সুযোগকে যেভাবে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করা হয়েছে, রাষ্ট্রক্ষমতা যেভাবে দুর্নীতি-সহায়ক শক্তির করায়ত্ত হতে চলেছে, দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করার মানসিকতা যেভাবে রাজনৈতিক চর্চার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে বাস্তবে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হবে এই সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।
আর এই চ্যালঞ্জ মোকাবিলায় সরকার কতটুকু অনমনীয় থাকতে পারবে, তার এক তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর একজন বিশেষ দূত নিয়োগের মাধ্যমে। নির্বাচনে তাঁর দলের অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে মঞ্চায়িত সিরিজ নাটকে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা যে দর-কষাকষির অন্যতম উপাদান ছিল, তা গোপন কিছু নয়। বিশেষ দূত হিসেবে তাঁর ভূমিকা যা-ই হোক না কেন, আইনের শাসন আর দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের ঘোষিত অবস্থান যে মূলত দলীয় রাজনৈতিক এজেন্ডার হাতিয়ার, এই নিয়োগ তারই দৃষ্টান্ত হিসেবে ধরে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণের দিন সুশাসনের অঙ্গীকারের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সরকারি দলের একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি প্রতীকী অনশনের আরেক নাটক মঞ্চস্থ করে আট মামলার এক দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীকে আটকাবস্থা থেকে সগৌরবে ছাড়িয়ে আনতে পেরেছেন। জানামতে, তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গৃহীত হয়নি, হলেও তা কতটুকু কার্যকর হবে, তাও বোধ হয় সবারই জানা।
সুশাসনের পথে আরও চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে দশম সংসদকে কেন্দ্র করে। অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর মূলত বিরোধী দলের সংসদ বর্জনের কারণে সংসদ তার প্রত্যাশিত ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়েছে। নবম সংসদের মোট কার্যকালের প্রায় ৯০ শতাংশ তৎকালীন বিরোধী দল বর্জন করে রেকর্ড স্থাপন করে। নেতিবাচক রাজনীতিতে প্রতিপক্ষের তুলনায় খারাপ রেকর্ড করার প্রতিযোগিতা এমনই আত্মঘাতী যে এবারের সংসদকে রূপান্তরিত করা হয়েছে কার্যত বিরোধী দলহীন একচ্ছত্র ভুবনে। নির্বাচনী বৈধতার মুখোশ হিসেবে মঞ্চায়িত জাপা নাটকের শেষ দেখতে হয়তো আরও অপেক্ষা করতে হবে। তবে এটুকু নিশ্চিত বলা যায় যে, এবারের সংসদে থাকবে সরকারের আজ্ঞাবহ একধরনের ক্যাঙারু বিরোধী দল; থাকবে না কোনো অর্থবহ সংসদীয় কমিটি; থাকবে না কোনো কার্যকর সংসদীয় বিতর্ক, থাকবে না বাস্তব অর্থে কোনো গঠনমূলক সমালোচনা। বিরোধীদলীয় অবস্থান বাংলাদেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দলের জন্যই অগ্রহণযোগ্য; জাতীয় পার্টির জন্য তো বটেই। তবে নামে বিরোধী দল হয়েও মন্ত্রিত্বের জন্য যে আকুতি-মিনতি, আবার যেভাবে তার প্রশ্রয়, তা অভূতপূর্ব।
একদিকে ম্যান্ডেটহীন সরকার, অন্যদিকে সরকারের আজ্ঞাবহ সংসদ—এরূপ অবস্থায় আইনের শাসন যে আকাশকুসুম নয়, তা প্রমাণ করা হবে সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। আইনশৃঙ্খলা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে আইনের রক্ষক হয়ে উঠতে পারে ভক্ষক। নিরপরাধ সাধারণ মানুষ হতে পারে মিথ্যা মামলা, গ্রেপ্তার-বাণিজ্য আর জামিন-বাণিজ্যের সহজ শিকার। রয়েছে নির্যাতন, বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, ক্রসফায়ারের ঘটনা বৃদ্ধির ঝুঁকি। অন্যদিকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, বিশেষ করে বাক্স্বাধীনতার মতো মৌলিক অধিকার বৃহত্তর ঝুঁকির সম্মুখীন হতে পারে।
বিপরীতমুখী দুই পক্ষের ঊর্ধ্বে নিরপেক্ষতা ও বস্তুনিষ্ঠতার অবস্থানকে ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে চিহ্নিত করার অপচেষ্টা বৃদ্ধি পেতে পারে। সমালোচনামাত্রই বিবেচিত হতে পারে শত্রুতা হিসেবে। বার্তাবাহককে স্তব্ধ করার ঝুঁকি প্রকটতর হতে পারে কপটাচারীদের স্তাবকতার কারণে। এরূপ সম্ভাবনা ভুল প্রমাণ করতে চাই সমালোচনা সইবার ও ভুলত্রুটি সংশোধনের সৎ সাহস, যা হতে পারে জনগণের আস্থা অর্জনের অন্যতম চাবিকাঠি।

ইফতেখারুজ্জামান: নির্বাহী পরিচালক, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

এরশাদ- কার হাসি কে হাসে? by আলী ইমাম মজুমদার

২০০১ সালের নির্বাচনের আগে দুটো প্রধান শিবিরই এরশাদের জাতীয় পার্টিকে নিজেদের জোটে নিতে সক্রিয় ছিল। এর আগে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের পর তিনি আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় যেতে সমর্থন দেন। বিনিময়ে তাঁর পাঁচ বছরের বন্দিজীবনের আপাতসমাপ্তি ঘটে।
তবে সে সরকারের মেয়াদকালেই জনতা টাওয়ার মামলায় দুর্নীতির দায়ে দণ্ডিত হন তিনি। তাই ২০০১ সালে অভিমানে আওয়ামী লীগের দিকে হাত বাড়াননি। আস্থা-অনাস্থার দোলাচলে যাননি সরাসরি অপর পক্ষের দিকেও। ভেবেছিলেন ঝুলন্ত সংসদ হবে। তাঁর দল হবে ক্ষমতার নির্ণায়ক। যেমন কিছুটা হয়েছিল ১৯৯৬ সালে। সে প্রত্যাশায় ওই বছরে এককভাবেই প্রার্থী দেন। বারবার ঘোষণা করেন, শেষ হাসি তিনি হাসবেন। হাসতে পারেননি তিনি। সেই নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়েই চারদলীয় জোট সরকার গঠন করে। ২০০৭ সালের নির্ধারিত নির্বাচনের আগে মহাজোটের সঙ্গে করেন আঁতাত। সে নির্বাচনটি হয় ২০০৮ সালের শেষে। জানা যায়, মহাজোট নির্বাচিত হলে তাঁকে রাষ্ট্রপতি করাসহ আরও কিছু দাবি ছিল তাঁর। মহাজোটই বিজয়ী হয়েছিল।

মহাজোটের ছিল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা। তাই তারা এসব দাবি মেটানোর কোনো গরজই অনুভব করেনি। সেবারেও তিনি তাঁর সে ঈপ্সিত হাসি হাসতে পারেননি। ক্ষুব্ধ ছিলেন বরাবর। সমঝোতা ও মোকাবিলা দুই ধরনের নিয়েই মহাজোটের সঙ্গে চলেছেন। বারবার নেতা-কর্মীদের বলেছেন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাঁর দল এককভাবে অংশ নিয়ে জয়লাভ করবে। গঠন করবে সরকার। ‘শেষ হাসির’ কথা উল্লেখ না করলেও বক্তব্যের সুর অনেকটা সে ধরনের ছিল।
কিন্তু দশম সংসদ নির্বাচনের সময়সীমা ঘনিয়ে আসতেই তিনি ডিগবাজিতে নেমে পড়েন। তাঁর ডিগবাজির সঙ্গে দেশবাসীর পরিচয় দীর্ঘদিনের। উল্লেখ্য, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার সময় সেনাপ্রধান ছিলেন এরশাদ। খবর পেয়েই অসুস্থ উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাত্তারকে হাসপাতাল থেকে এনে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিতে মুখ্য ভূমিকা ছিল তাঁর। আরও ভূমিকা রেখেছিলেন, যাতে তিনি (বিচারপতি সাত্তার) দলের মনোনয়ন লাভ করেন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে। তা-ই ঘটেছিল। রাষ্ট্রপতি হন বিচারপতি সাত্তার। দ্রুত ভোল পাল্টে যায় এরশাদের। তিনি গণমাধ্যমে বিবৃতি দিতে থাকেন সামরিক বাহিনীকে ক্ষমতার অংশীদার করার দাবিতে। এক অন্ধকার রাতে বন্দুকের নলের মুখে নিজেই নিয়ে নেন রাষ্ট্রক্ষমতা। তবে সামরিক বাহিনীকে ক্ষমতার অংশীদার করেননি তিনি। করেছিলেন তাঁর আস্থাভাজন কিছু সামরিক-বেসামরিক ব্যক্তিকে।
তখনো বহু নাটক দেখেছে দেশবাসী। তারা জানল, তাদের রাষ্ট্রপতি একজন কবি আর প্রেমিকও বটে। ‘কবি’ এরশাদ কবিতা লিখে পীড়িত করেছেন জাতিকে। ‘প্রেমিক’ হিসেবে ভেঙেছেন বেশ কিছু সুখের সংসার। পাশাপাশি দেশবাসীকে দিয়েছেন গণতন্ত্রের নতুন পাঠ। দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলকে বিপরীতমুখী রেখে ক্ষমতার বলয় টিকিয়ে রাখেন লম্বা সময়। কিন্তু একসময় অঘটন ঘটে যায়।
অবশ্য অঘটন তাঁর জন্য। জাতির ঘটে রাহুমুক্তি। এর পরপর তাঁকে দীর্ঘ কারাবাস করতে হয়। মোকাবিলা করতে হয় অনেক মামলার। আবার প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের চরম বিপরীতমুখী অবস্থানের সুযোগ নিতে থাকেন তিনি। একবার এদিক, একবার সেদিক করে নিজের প্রয়োজনীয়তা ধরে রাখতে সফলও হন। আর সরকারপক্ষের দুর্বল প্রচেষ্টায় তিনি উভয় দলের সরকারের সময়ই বেশ কিছু মামলা থেকে মুক্তি পেয়ে যান।
দশম জাতীয় সংসদের নির্বাচনের বেশ আগে থেকেই বরাবরের মতো তিনি বিভিন্ন রকম অবস্থান নিতে থাকেন। কখনো মহাজোট ছাড়ার হুমকি আবার কখনোবা তাদের সঙ্গে চিরদিনের বন্ধনের কথাও বলতে থাকেন তিনি। তবে সর্বশেষ দুই মাসে মানুষ দেখেছে তাঁর নানা নাটক। একবার বললেন, সব দলসহ নির্বাচন না হলে তিনি তাতে যাবেন না। জনগণ থুতু দেবে। আবার কদিন বাদেই বলতে শুরু করেন, নির্বাচনে না গেলে জনগণ সব দলকেই থুতু দেবে।
মহাজোট থেকে বেরিয়ে এসে দলীয় প্রার্থীদের মনোনয়ন দেন তিনি। দাখিল করেন মনোনয়নপত্র। এমনকি নির্বাচনকালীন সরকারে নিজ দলের বেশ কয়েকজন সদস্যকে মন্ত্রী বা উপদেষ্টা নিয়োগ করা হয় তাঁর সুপারিশে। হঠাৎ আবার নির্বাচন থেকে সরে আসার ঘোষণা দেন। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার আর নির্বাচনকালীন সরকার থেকে সরে আসার লোক দেখানো চেষ্টাও চলে। অবশ্য তাঁর কথায় বিশ্বাস রেখে বেশ কিছু প্রার্থী মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। তবে মানুষ ধাঁধায় ছিল। একপর্যায়ে ১১ ডিসেম্বর রাতের বেলায় র‌্যাব তাঁকে সিএমএইচে ‘নিয়ে যায়’। বলা হয়, তিনি অসুস্থ। চিকিৎসার জন্য তাঁকে তথায় নেওয়া হয়েছে। সেখানেই ছিলেন ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত। সেখান থেকে তাঁর মাঝেমধ্যে
গলফ খেলার খবরও আসত। আবার তাঁর একজন মুখপাত্র দাবি করতে থাকেন, এরশাদকে আটকে রাখা হয়েছে। তিনি নির্বাচনে অংশ না নিতে সংকল্পবদ্ধ। তাঁর দলীয় প্রতীক লাঙ্গল কাউকে বরাদ্দ না দিতে তিনি সিইসিকে একটি চিঠিও দেন। কিন্তু তাঁকেসহ তাঁর দলের সবাইকে সে প্রতীক দেওয়া হয় রওশন এরশাদের সুপারিশে।
প্রধান বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ব্যতিরেকে নির্বাচনে যা হওয়ার, তা-ই হলো। নির্বাচনপর্ব শেষ হয় ৫ জানুয়ারি। এরশাদসহ তাঁর দল লাভ করল ৩৩টি আসন। এরশাদ তাঁর ভাষায় ‘বর্জন করা’ নির্বাচনে সাংসদ হলেন। দাখিল করা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের ‘আবেদনও করেছিলেন’ তিনি। তা সত্ত্বেও সাংসদ যখন হয়েই গেছেন, তা টিকিয়ে রাখতে শপথ গ্রহণ করতে হয়। প্রথম দিন দলের সঙ্গে যাননি। দলটির সংসদীয় নেতা নির্বাচিত হলেন রওশন এরশাদ। সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুসারে স্পিকার তাঁকে বিরোধী দলের নেতা বলে বিজ্ঞপ্তিও জারি করেছেন। এগুলো
কতটা এরশাদের ইচ্ছায় কিংবা দলের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহে, তা নিয়ে ভিন্নমত আছে। তবে অন্যদের শপথ দেওয়ার পরদিন জানা গেল, সিএমএইচ থেকে এরশাদ চুপিচুপি এসে সাংসদ হিসেবে শপথ নিয়ে আবার সেখানেই চলে যান।
প্রশ্ন আসছে, চুপিচুপি শপথ নিতে হবে কেন? উত্তরটাও সবার জানা। গণমাধ্যমের নজর এড়াতে। তাদের নজরে এলেই হাজার প্রশ্ন হবে—নির্বাচন বর্জন, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার, দলীয় সদস্যদের নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নাটক আর বর্জন করা নির্বাচনে বিজয়ের জাদুর কাঠি নিয়ে। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসবে, তাঁঁর কথিত অসুস্থতা ও র‌্যাবের সহায়তায় সিএমএইচে যাওয়া নিয়েও। সুতরাং যতক্ষণ সম্ভব
বা প্রয়োজন, ততক্ষণ তাদের নজর এড়িয়ে থাকতে পারলেই মঙ্গল। কিন্তু তারা নাছোড়বান্দা। তাঁর সঙ্গে দেখা হোক আর না-ই হোক, সংবাদ সংগ্রহ করে চলছে প্রতিযোগিতা করে। আর সেসব সংবাদ স্বাভাবিকভাবেই তাঁর ক্রমাগত ডিগবাজি খাওয়া অতীতকে সামনে নিয়ে আসছে।
জাতীয় জীবনের স্পর্শকাতর বিষয়গুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করতে তিনি পছন্দ করেন। এতে জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও লাভবান হয়েছেন তিনি। যেমন সংবিধানে রাষ্ট্রধর্মের বিধান সংযোজন আর সরকারি ছুটির দিন পরিবর্তন। পীর-দরবেশদের দরবারে আসা-যাওয়াও তিনি সুযোগ পেলেই করেন। উদ্দেশ্য একটিই—তাঁদের সমর্থন নিজের দিকে টেনে আনা। সম্প্রতি হেফাজতে ইসলামের কর্মসূচির প্রতি নৈতিক ও বৈষয়িক সমর্থন দিয়েছেন। নিয়েছেন তাঁদের কারোর দোয়া আর কারও বা বদদোয়া। কিন্তু এখন সাংসদ হিসেবে সে কর্মসূচি গ্রহণের জন্য সংসদে কি তিনি একটি সিদ্ধান্ত প্রস্তাব আনবেন? তাঁর অতীত অন্তত বলে, তিনি তা করবেন না। আর যদি করেনই, তাঁর দলের সমর্থন পাবেন বলে মনে হয় না। বিশেষ করে দলটি সরকারের অংশ হওয়ায় এ ধরনের কর্মসূচির সমর্থন দেওয়ার সুযোগই নেই।
পরিশেষে এল ১২ জানুয়ারি। বঙ্গভবনের দরবার হলে নতুন মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ। সে মন্ত্রিসভায় তাঁর দল থেকে একজন কেবিনেট মন্ত্রী ও দুজন প্রতিমন্ত্রী নেওয়া হয়। সেদিনই এক গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তিনি হন মন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত। ‘ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স’-এর বিধান অনুসারে তাঁর মানক্রম হবে মন্ত্রীর এক ধাপ নিচে। অবশ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি মানক্রমে মন্ত্রীর অনেক ওপরে। সুতরাং, নতুন নিয়োগ তাঁর মর্যাদা উন্নীত করেছে, এমনটি বলার সুযোগ নেই। বঙ্গভবনের জনাকীর্ণ দরবার হলে তিনি যখন প্রবেশ করেন, তখন তাঁর মুখ ছিল মলিন। প্রবেশের সময়ে কেউ দেয় করতালি, আর কেউবা হাসি। সে হাসি পরিহাস, কৌতুক কিংবা স্বাগতসূচক—যেকোনোটাই হতে পারে। যেটাই হোক, হেসেছেন অন্যরা। এবারেও তিনি হাসতে পারেননি।

আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

গদ্যকার্টুন- গাছেরটাও খান, তলারটাও কুড়োন... by আনিসুল হক

আপনার অসুখ করেনি। কিন্তু আপনাকে দেওয়া হলো অভিজাত চিকিৎসাসেবা। আপনি ভোটে দাঁড়াননি। কিন্তু আপনি হয়ে গেলেন নির্বাচিত সাংসদ। আপনি অসুস্থ, কিন্তু আপনি খেলতে গেছেন গলফ। আপনার বউয়ের সঙ্গে আপনার বিরোধ।
আপনি এখন বিরোধীদলীয় নেত্রীর সম্মানিত ও গর্বিত স্বামী। আপনার অবস্থান সরকারবিরোধী, কিন্তু আপনি হলেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত। আপনি শপথ করেছিলেন, আপনি সুইসাইড করবেন, শেষে আপনি শপথ নিলেন সাংসদ হিসেবে। আপনি ছিলেন ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচারী, এখন দুই গণতান্ত্রিক দলের সবচেয়ে কাম্য ধন।

আপনিটা কে?
আপনারা জানেন এই ধাঁধার উত্তর।
এটা ছড়িয়েছে ফেসবুকে। কেউ একজন রচনা করেছেন। আদিতে কে করেছেন জানি না, তাই কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতে পারলাম না।
আচ্ছা, আপনি কে? এই নিয়ে একটা কৌতুক প্রচলিত আছে। বুশ-সংক্রান্ত কৌতুক। এটা আগে বলে নিই।
বুশ গেলেন ব্রিটেনে। তিনি রানিকে জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা, ব্রিটেনে দেশ চালানো হয় কীভাবে?
রানি বললেন, বুদ্ধি দিয়ে।
কেমন?
আচ্ছা, এই যে টনি ব্লেয়ার। ওকে আমি জিজ্ঞেস করব একটা ধাঁধা। আচ্ছা টনি, বলো তো, একটা লোক, সে তোমার বাবার ছেলে, সে তোমার মায়ের ছেলে, তোমার আর কোনো ভাইবোন নেই। লোকটা?
টনি উত্তর দিল: আমি।
দেখলে, টনির কত বুদ্ধি? এভাবে টনি ব্লেয়ার বুদ্ধি দিয়ে দেশ চালায়।
বুশ আমেরিকায় ফিরে গেলেন। তাঁর মন্ত্রীদের ডেকে বললেন, বলো তো, একটা লোক, সে তোমার বাবার ছেলে, সে তোমার মায়ের ছেলে, তোমার আর কোনো ভাইবোন নেই, লোকটা কে?
পুরো মন্ত্রিসভা তখন নিশ্চুপ। কী কঠিন ধাঁধা রে বাবা!
তখন বুশ বললেন, পাওয়েল কই? পাওয়েল থাকলে নিশ্চয়ই এর উত্তর দিতে পারত। ডেকে আনা হলো পররাষ্ট্রমন্ত্রী কলিন পাওয়েলকে। তাঁকেও জিজ্ঞেস করা হলো একই প্রশ্ন: একটা লোক, সে তোমার বাবার ছেলে, সে তোমার মায়ের ছেলে, তোমার আর কোনো ভাইবোন নেই, লোকটা কে?
পাওয়েল বললেন, আমি।
বুশ বললেন, হয় নাই, গাধা! সঠিক উত্তর হবে, টনি ব্লেয়ার।
বুশের আরেকটা কৌতুক বলি।
বুশ গেছেন একটা স্কুল পরিদর্শন করতে।
একটা ছেলে বলল, আমার দুটো প্রশ্ন আছে। এক. আপনি কম ভোট পেয়েও কী করে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হলেন? দুই. ইরাকে কোনো ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র পাওয়া যায় নাই। এ সত্ত্বেও আপনি কেন ইরাকে হামলা করলেন? এতগুলো নারী-শিশুর মৃত্যুর কারণ হলেন?
ঢং করে ঘণ্টা বাজল। বুশ বললেন, এখন ১০ মিনিটের বিরতি। বিরতির পর আবার শুরু হবে।
এবার আরেকটা ছেলে দাঁড়াল।
সে বলল, আমার তিনটা প্রশ্ন আছে। এক. আপনি কম ভোট পেয়েও কী করে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হলেন? দুই. ইরাকে কোনো ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র পাওয়া যায় নাই। এ সত্ত্বেও আপনি কেন ইরাকে হামলা করলেন? এতগুলো নারী-শিশুর মৃত্যুর কারণ হলেন? তিন. বিরতির আগে দুটো প্রশ্ন করেছিল যে ছেলেটা, সে কোথায় গেল?
আমরাও কিন্তু একই প্রশ্ন করতে পারি।
একটা করতে পারি ম্যাডাম খালেদা জিয়াকে। আপনি যদি অবরোধ-হরতালের কর্মসূচি থেকে সরেই এলেন—সরে আসার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ—আর এখন সংলাপের কথা বলছেনই, সেই সরকারের সঙ্গে সংলাপ, যা আপনার ভাষায় অবৈধ, তাহলে কেন এই কাজ আগে করলেন না? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেদিন আপনার বেঁধে দেওয়া সময়ের আগেই আপনাকে কর্মসূচি স্থগিত করে সংলাপের জন্য আমন্ত্রণ জানালেন, সেদিন কেন আপনি হরতাল স্থগিত করে আলাপে গেলেন না? কী হতো গণভবনে গিয়ে এক কাপ চা খেলে? মধ্যখান থেকে এত যে মৃত্যু, এত যে অগ্নিদাহ, এগুলোর দায় কে নেবে?
আর শেখ হাসিনাকে প্রশ্ন করা যায়, আপনি ১৫৩টা আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়া সাংসদকে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত সাংসদ বলতে পারেন কি না?
আর এই কৌতুক-আলোচনার সূত্র ধরে ডা. দীপু মনি বলতে পারেন, ব্রিটেনের রানির ধাঁধার জবাবটা আমি দিতে পারব। আপনারা কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করছেন না কেন? আমি তো পারতাম।
আমি কয়েকজন সাধারণ মানুষ, রিকশাওয়ালা, আমাদের আত্মীয়স্বজনকে জিজ্ঞেস করলাম, বর্তমান পরিস্থিতিতে মানুষ কী বলছে?
তাঁরা সবাই নানা বাক্যে যা বলেছেন, তা হলো, মানুষ বলছে, ক্ষমতায় কে এল, কে গেল, আমাদের কিছু যায়-আসে না। আমরা শান্তি চাই। আমরা জানতে চাই, আমাদের পথ চলাচলের জন্য বাধাহীন হবে তো? বাড়ি থেকে বেরোলে আমি অক্ষত দেহে ফিরে আসতে পারবে তো? আমার গায়ে কেউ পেট্রলবোমা ছুড়ে মারবে না তো? আমি আমার দোকানপাট খুলতে পারব তো? আমার বাস-ট্রাক-অটোরিকশা নিয়ে আমি
যে রাস্তায় বেরোব, তাতে কেউ আগুন দেবে না তো? আমি যে সবজি বা দুধ উৎপাদন করছি, তা বিক্রি হবে তো? আপনারা থাকেন আপনাদের পলিটিকস নিয়ে, আমাদের বাঁচতে দিন। আমাদের কাজকর্ম করতে দিন। আমাদের শিশুদের স্কুলে যেতে দিন।
আমাদের প্রবৃদ্ধি এ বছর কমে যাবে, বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস। আমাদের এখন দরকার কাজ করা। দেশের মানুষ নিজের উদ্যোগে নিজের সৃজনশীলতা দিয়ে কাজ করে যাবে, যাচ্ছে। কিন্তু তাদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় রাজনীতি।
গণতন্ত্র নামের বাইসাইকেলের দুটো চাকা।
একটা সরকারি দল, একটা বিরোধী দল।
আমাদের সরকারি চাকাটা আমরা দেখতে পাচ্ছি। তাতে অবশ্য জাতীয় পার্টি, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টিরও স্পোক দেখা যাচ্ছে।
কিন্তু বিরোধী চাকা কোনটা? জাতীয় পার্টি?
জানি না। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এ ব্যাপারে ভালো বলতে পারবেন। গাছেরটাও খাবেন, তলারটাও কুড়াবেন...সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের বাচনভঙ্গিটা অননুকরণীয়। এটা কেউ নকল করতে পারবে বলে মনে হয় না। সে চেষ্টা না-হয় আমরা না-ই করলাম।
ওঁরা গাছেরটাও খান, তলারটাও কুড়োন, আমরা তো সেই খাবারের ভাগ চাইছি না। আমরা চাই, আমাদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলা পরিশ্রমের ফলটা নিয়ে যেন দারাপুত্রপরিবার মিলে একটু শান্তিতে দিন গুজরান করতে পারি।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

গদ্যকার্টুন- গাছেরটাও খান, তলারটাও কুড়োন... by আনিসুল হক

আপনার অসুখ করেনি। কিন্তু আপনাকে দেওয়া হলো অভিজাত চিকিৎসাসেবা। আপনি ভোটে দাঁড়াননি। কিন্তু আপনি হয়ে গেলেন নির্বাচিত সাংসদ। আপনি অসুস্থ, কিন্তু আপনি খেলতে গেছেন গলফ। আপনার বউয়ের সঙ্গে আপনার বিরোধ।

রাষ্ট্রীয় সম্মানে শেষকৃত্য সম্পন্ন- চলে গেলেন মহানায়িকা সুচিত্রা সেন by অমর সাহা @কলকাতা

দীর্ঘ ২৫ দিন লড়াই করে মৃত্যুর কাছে হার মানলেন মহানায়িকা সুচিত্রা সেন। আজ শুক্রবার সকালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি কলকাতার বেসরকারি হাসপাতাল বেলভিউতে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

রাষ্ট্রীয় সম্মানে শেষকৃত্য সম্পন্ন- চলে গেলেন মহানায়িকা সুচিত্রা সেন by অমর সাহা @কলকাতা

দীর্ঘ ২৫ দিন লড়াই করে মৃত্যুর কাছে হার মানলেন মহানায়িকা সুচিত্রা সেন। আজ শুক্রবার সকালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি কলকাতার বেসরকারি হাসপাতাল বেলভিউতে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

বিকেল পাঁচটার দিকে ঐতিহাসিক কেওড়াতলা মহাশ্মশানে রাষ্ট্রীয় সম্মানে সুচিত্রা সেনের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। তাঁর মরদেহ দাহ করা হয় চন্দন কাঠে। একমাত্র কন্যা মুনমুন সেন তাঁর মুখাগ্নি করেন। দেড়টার দিকে শ্মশানে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে কলকাতা পুলিশ মহানায়িকাকে ‘গান স্যালুট’ দিয়ে রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শন করেন। সেখানে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজ্যের বিভিন্ন মন্ত্রী, পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। শ্মশান চত্বরে ছিল কড়া নিরাপত্তা। শ্মশানের বাইরে ছিল ভক্তদের ভিড়। প্রিয় নায়িকাকে সেখান থেকেই ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা জানান তাঁরা।

দুপুরে সুচিত্রা সেনের মরদেহ হাসপাতাল থেকে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁর বালিগঞ্জের বাসভবনে। সেখানে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে মরদেহ কেওড়াতলা মহাশ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়।  রবীন্দ্র সদনে কিংবদন্তি সুচিত্রা সেনের ছবি রাখা হয়। বেলা দুইটা থেকে সেখানে ভক্তেরা শ্রদ্ধা জানান।

গত ২৩ ডিসেম্বর ফুসফুসে সংক্রমণ নিয়ে দক্ষিণ কলকাতার বেসরকারি হাসপাতাল বেলভিউয়ে ভর্তি হন সুচিত্রা সেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। একমাত্র কন্যা অভিনেত্রী মুনমুন সেন, নাতনি রাইমা ও রিয়া সেনসহ অগণিত ভক্ত ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন তিনি।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সুচিত্রা সেনের চিকিৎসায় সুব্রত মৈত্রের নেতৃত্বে একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করে। চিকিৎসকেরা জানান, গত তিন দিন তাঁর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল থাকলেও গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে অবনতি ঘটে। এরপর আজ সকালে তিনি হূদরোগে আক্রান্ত হন।

সুচিত্রা সেনের জন্ম ১৯৩১ সালের ৬ এপ্রিল, বাংলাদেশের পাবনায়। শৈশব কেটেছে সেখানেই। বাবা করুণাময় দাশগুপ্ত ছিলেন স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। মা-বাবার পঞ্চম সন্তান ছিলেন সুচিত্রা। ১৯৪৭ সালে কলকাতার বিশিষ্ট বাঙালি শিল্পপতি আদিনাথ সেনের ছেলে দীবানাথ সেনের সঙ্গে বিয়ে হয় তাঁর। তাঁদের ঘরে একমাত্র সন্তান মুনমুন সেন।

১৯৫২ সালে তিনি চলচ্চিত্র জগতে প্রথম পা রাখেন। প্রথম ছবি করেন শেষ কোথায়। তবে ছবিটি আর মুক্তি পায়নি। এরপর ১৯৫৩ সালে মহানায়ক উত্তম কুমারের সঙ্গে সাড়ে চুয়াত্তর ছবি করে সাড়া ফেলে দেন চলচ্চিত্র অঙ্গনে। সুচিত্রা সেন বাংলা ও হিন্দি ছবিতে অভিনয় করেন। তাঁর অভিনীত প্রথম হিন্দি ছবি দেবদাস (১৯৫৫)। সুচিত্রা সেন ১৯৭৮ সালে প্রণয় পাশা ছবি করার পর লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যান। এরপর থেকে তিনি আর জনসমক্ষে আসেননি। মাঝে একবার ভোটার পরিচয়পত্রে নাম অন্তর্ভুক্ত করতে ছবি তুলতে ভোটকেন্দ্রে যান। সুচিত্রা সেন ছিলেন রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের ভক্ত। একবার তিনি গোপনে কলকাতা বইমেলায় গিয়েছিলেন। বলিউড-টালিউডের বহু পরিচালক সুচিত্রা সেনকে নিয়ে ছবি করতে চাইলেও তিনি এতে সম্মত হননি। এমনকি দেশ-বিদেশের কোনো পরিচালক বা অভিনেতা বা অভিনেত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎও দেননি তিনি। সেই থেকে তিনি লোকচক্ষুর অন্তরালেই থেকে যান। যদিও তাঁর বাসভবনে তিনি কেবল কথা বলেছেন তাঁর একমাত্র মেয়ে মুনমুন সেন এবং দুই নাতনি রিয়া ও রাইমার সঙ্গে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুচিত্রা সেনের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিয়েছেন মুনমুনের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে। এ সময় শেখ হাসিনা সুচিত্রা সেনের দ্রুত আরোগ্যও কামনা করেছেন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বেশ কয়েক দিন বেলভিউ হাসপাতালে গিয়ে সুচিত্রা সেনের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিয়েছেন।
পুরস্কার ও সম্মাননা
সুচিত্রা সেন ১৯৬৩ সালে মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সাত পাকে বাঁধা ছবিতে অভিনয়ের জন্য সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পান।

১৯৭২ সালে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পদ্মশ্রী পান। ২০১২ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বাংলাবিভূষণ সম্মাননা দেওয়া হয় তাঁকে। ২০০৫ সালে সুচিত্রা সেনকে ভারতের চলচ্চিত্র অঙ্গনের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান দাদা সাহেব ফালকে পুরস্কার দেওয়ার প্রস্তাব করা হলে সুচিত্রা সেন দিল্লিতে গিয়ে ওই সম্মান গ্রহণ করতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

সুচিত্রা সেনের ছবি
সুচিত্রা সেনের প্রথম ছবি শেষ কোথায়। ১৯৫২ সালে ছবিটি নির্মিত হলেও তা আর মুক্তি পায়নি। ১৯৫৩ সালে অভিনয় করেন সাত নম্বর কয়েদি ছবিতে। ১৯৫২ থেকে ১৯৭৮ এই ২৬ বছরে তিনি ৬২টি ছবিতে অভিনয় করেন। ১৯৫৩ সালে মহানায়ক উত্তম কুমারের সঙ্গে তিনি প্রথম ছবি করেন সাড়ে চুয়াত্তর। এ ছবিটি বক্স অফিস হিট করে। সুচিত্রা সেনের অভিনীত উল্লেখযোগ্য ছবির মধ্যে রয়েছে: অগ্নি পরীক্ষা (১৯৫৪), গৃহ প্রবেশ (১৯৫৪), ঢুলি (১৯৫৪), মরণের পরে (১৯৫৪), দেবদাস (১৯৫৫-হিন্দি), শাপমোচন (১৯৫৫), সবার উপরে (১৯৫৫), মেঝ বউ (১৯৫৫), ভালবাসা (১৯৫৫), সাগরিকা (১৯৫৬), ত্রিযামা (১৯৫৬), শিল্পী (১৯৫৬), একটি রাত (১৯৫৬), হারানো সুর (১৯৫৭), পথে হল দেরী (১৯৫৭),জীবন তৃষ্ণা (১৯৫৭), চন্দ্রনাথ (১৯৫৭), মুশাফির (১৯৫৭-হিন্দি), রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত (১৯৫৮), ইন্দ্রানী (১৯৫৮), দ্বীপ জ্বেলে যাই (১৯৫৮), চাওয়া পাওয়া (১৯৫৯), হসপিটাল (১৯৬০), বোম্বাই কা বাবু (১৯৬০-হিন্দি), সপ্তপদী (১৯৬১), সাত পাকে বাঁধা (১৯৬৩), উত্তর ফাল্গুনী (১৯৬৩), মমতা (১৯৬৬), গৃহদাহ (১৯৬৭), কমললতা (১৯৬৯), মেঘ কালো (১৯৭০), ফরিয়াদ (১৯৭১), আলো আমার আলো (১৯৭২), হার মানা হার (১৯৭২), দেবী চৌধুরাণী (১৯৭৪), শ্রাবণ সন্ধ্যা (১৯৭৪), প্রিয় বান্ধবী (১৯৭৫), আঁধি (১৯৭৫-হিন্দি), দত্তা (১৯৭৬) এবং সর্বশেষ প্রণয়পাশা (১৯৭৮)।

জলদস্যুদের উৎপাত: কুতুবদিয়ায় শুঁটকি উৎপাদনে ধস by মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন @পেকুয়া

কক্সবাজারের কুতুবদিয়ায় চলতি বছর শুঁটকি উৎপাদনে মারাত্মক ধস নেমেছে। শীতের শুঁটকির উৎপাদনের ভরা মওসুমে সাগরে মাছ মিলছেনা আর জলদস্যুদের উৎপাতের কারণ বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা।

কুতুবদিয়া উপজেলার বেশ কয়েকটি শুঁটকি মহাল সরেজমিন গেলে উৎপাদনে বিপর্যায়ের কথা জানিয়েছেন মৎস্য ব্যবসায়িরা। তারা জানান, আলী আকবর ডেইল,তাবালের চর, স্টীমার ঘাট,বড়ঘোপ সমুদ্র চর,রোমাই পাড়া,কাজির পাড়া,ঘিলাছড়ি,বিন্দা পাড়া,দক্ষিন ধুরুং বাতিঘর পাড়া,উত্তর ধুরুং চুলার পাড়াসহ  সৈকত এলাকায় ছোট-বড় অন্তত: ২০০ অস্থায়ী শুঁটকি মহাল গড়ে উঠেছে। এ সব শুঁটকি মহালে মৎস্য শ্রমিক ছাড়াও প্রায় এক হাজার মৎস্য ব্যবসায়ি জড়িত। কার্তিক মাস থেকে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত শুঁটকি উৎপাদনে ভরা মওসুম থাকে। মহাল গুলোতে  ছুরি, লইট্টা,ফাইস্যা,চিংড়ি,উলা,পোহা প্রভৃতি মাছ ছাড়াও কাঁকড়া,বাসওয়া জাতের অখাদ্য শুকানো হয় পোল্ট্রি খাদ্য হিসেবে। তবে এবার সাগরে মাছ না মেলায় শুঁটকি উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে বলে ব্যবসায়িরা জানান।

দ্বীপের বড়ঘোপ সমুদ্র সৈকতের শুঁটকি ব্যবসায়ি মাহমুদুল করিম বলেন,গত বছর শুঁটকি মওসুমে  তিনি ৪৭ লক্ষ টাকার শুঁটকি উৎপাদন করেছিলেন। এবছর তার অর্ধেকেও হবেনা । সাগরে মাছ কম। ব্যবসায়ি কোরবান আলী,শফি আলম, সোনা মিয়া প্রমূখ ব্যবসায়িরা এবার মহালের কিলা ভাড়াও প্রদান করতে পারবেনা বলে তিনি জানান। চান মিয়া পাড়ার শুঁটকি ব্যবসায়ি বদি আলম,নুরুল ইসলাম বলেন,সাগরে বড় বড় ট্রলি জাল,বেহেঞ্জি জাল দিয়ে অবাধে পোনা মাছ নিধন করা ও বড় মাছগুলো গভীর সমুদ্রে চলে যাওয়ায় উপকূল মাছ ক্রমশ: কমে যাচ্ছে বলে তারা জানান।যে কারণে অনেকেই শুঁটকি উৎপাদন ব্যবসা ছেড়ে দিচ্ছেন। শুঁটকি মহালে নিয়মিত মাছ না থাকায়  কর্মরত শ্রমিকদের বেশির ভাগ বসে দিন কাটছে।

অপরদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জেলে জানান,সাগরের জাহাজখাড়ী,গুলিদ্দা,মোছখাড়ী প্রভৃতি স্থানে প্রতিনিয়ত জলদস্যুদের উৎপাত বেড়েই চলেছে। গত দু‘সপ্তাহ আগে ৭টি ফিশিং বোট জলদস্যুরা ছিনতাই করে নিয়ে যায়। প্রতিটি বোট থেকে ২০ হাজার টাকা করে মুক্তিপন নিয়ে ছেড়ে দেয়। এর ১৫ দিন আগেও দু‘টি বোট নিয়ে গিয়ে ৪০ হাজার টাকা আদায় করা হয়। ফলে অনেক মৎস্য ব্যবসায়ি সাগরে মাছ শিকার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছে বলে তিনি জানান। প্রতিবছর  বিপুল পরিমাণ অর্থ অর্জিত হয় শুঁটকি উৎপাদন থেকে। সাগরে যদি মাছের আকাল অব্যাহত থাকে এবং জলদস্যুদের দস্যুতা রোধ করা না গেলে শুঁটকি উৎপাদনে বিরাট বিপর্যয় নেমে আসবে বলে বিশিষ্ট বহদ্দারদের অভিমত।

কুতুবদিয়া থানার ওসি জহিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, দ্বীপ থেকে জলদস্যুদের নির্মূলে পুলিশ কাজ করছে।

কুতুবদিয়ায় ড.জাফর স্মরণে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত by এম.এ মান্নান

কুতুবদিয়ায় লেমশীখালী ষ্টুডেন্ট এসোসিয়েশন‘র উদ্যোগে লেমশীখালী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে বিশিষ্ট ইকোলজিষ্ট ও সামুদ্রিক বিজ্ঞানী মরহুম প্রফেসর ড.মোহাম্মদ জাফর‘র স্মরণ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
একই সাথে স্থানীয় লেমশীখালীতে জেএসসি,জেডিসি ও পিএসসিতে কৃতি ছাত্র-ছাত্রীদের সংবর্ধনা দেয়া হয়। সভায় লেমশীখালী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আলহাজ মোহাম্মদ শরীফ সভাপতিত্ব করেন।

এতে উপজেলা চেয়ারম্যান এটিএম নুরুল বশর চৌধুরী প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন। বিশেষ অতিথির মাঝে বক্তব্য রাখেন মরহুম ড. জাফরের ছেলে রাফি মোহাম্মদ ফয়সাল,দক্ষিন ধুরুং ইউপি চেয়ারম্যান আলা উদ্দিন আল আজাদ, কৃষি কর্মকর্তা আতিক উল্লাহ, সমাজ সেবক মোহাম্মদ তাহের, অধ্যক্ষ আবু মুছা, প্রধান শিক্ষক শুকুর আলম আজাদ, প্রেসক্লাব সেক্রেটারী হাছান কুতুবী ও প্রধান শিক্ষক আবু ইউছুফ প্রমূখ।

পরে জেএসসি, জেডিসি ও পিএসসি পরীক্ষায়  কৃতিত্বের জন্য ১২৬ জন শিক্ষার্থীর মাঝে পুরুষ্কার বিতরণ করা হয়। অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করেন মো.ইমতিয়াজ।

উল্লেখ্য, কুতুবদিয়া লেমশীখালীর কৃতি সন্তান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক বিজ্ঞানী প্রফেসর ড.মোহাম্মদ জাফর গত বছর ১৩ সেপ্টেম্বর ইন্তেকাল করেন।

প্রকৃতি ও জীবনের অন্বেষক : প্রকৃতিকথা

পাস্কাল তার এক খেরো খাতায় লিখেছিলেন- প্রকৃতি হচ্ছে এক অসীম পরিমণ্ডল যার কেন্দ্র আছে সর্বত্রই, কিন্তু পরিধি নেই কোথাও। বিভিন্ন শতাব্দীতে প্রকৃতিপ্রেমী চিন্তকশ্রেণী এ রূপকল্পটিকে নানাভাবে ধরতে চেয়েছেন। জিওদার্নো ব্র“নো ৫৮৪ সালে এ রূপকটিকে আরেকটু ভিন্নার্থে উচ্চারণ করেন- ‘আমরা নিশ্চিত বলতে পারি যে, বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডই হচ্ছে সবকিছুর কেন্দ্র অথবা বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের কেন্দ্র আছে সর্বত্রই এবং এর পরিধি নেই কোথাও। বিশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তক সের্গেই লুইস বোরহেস আজীবন ছুটেছেন এ রূপকার্থটি আবিষ্কার করতে। আর আমাদের রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতির পরিধি নির্ণয়ের কথা বাঙালি পাঠকমাত্রই জানেন। তার সেই শিমুলগাছ নিয়ে বলাই গল্পটি মর্মস্পর্শী। গত অর্ধশতকজুড়ে পৃথিবীতে যে শিল্পায়নের বর্জ্য পৃথিবী এবং প্রকৃতিকে দম বন্ধাবস্থায় নিয়ে দাঁড় করিয়েছে তার হিসাব করা দুঃসাধ্য। কিন্তু বিবেকবান প্রকৃতি প্রেমী মানুষরা বারবার হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন এ বিনাশ থামাও, কিন্তু থামেনি। আইএ ক্লাসের যখন ছাত্র তখন কবীর চৌধুরীর অনুবাদে বুলগেরিয়ার ছোট গল্প পড়েছিলাম- একটা গল্প ছিল ‘অরণ্যের আর্তনাদ’। গল্পের নায়ক বনরক্ষী এক সাচ্চা প্রকৃতিপ্রেমিক। রাতে সে বনখেকোদের উদ্দেশে সাবধান বাণী উচ্চারণ করত হেই বন কেট না। একদিন বনখাদকরা গুলি করে তাকে হত্যা করে। সেই বনরক্ষীর মতো বনরক্ষা করতে গিয়ে কত লোকের যে এখনও প্রাণ দিতে হচ্ছে তার ইয়ত্তা নেই। সম্প্রতি প্রকৃতিপ্রেমী মুকিত মজুমদার বাবু সম্পাদিত প্রকৃতিকথা এবং বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ গ্রন্থ দুটি- আমাকে উপহার হিসেবে দিলেন প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক ফরিদুর রেজা সাগর। মুকিত মজুমদার বাবু চ্যানেল আইতে প্রকৃতি ও জীবন নামে অনুষ্ঠান করেন- তিনি এ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। তার সম্পাদিত প্রকৃতি কথায় জলবায়ুর পরিবর্তন এবং আমাদের দেশে তার বিরূপ প্রভাব সম্পর্কে গণসচেতনতা সৃষ্টির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করবে। ৩৬ জন প্রকৃতি চিন্তকের লেখা সংকলিত হয়েছে গ্রন্থে। অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মার একটি সামান্য দাবি- লেখাটি আমাদের নিয়ে যাবে কৈশোরে সেই প্রিয় নদীটির কাছে। লেখাটি একটা গানের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে বারবার- আমার একটা নদী আছে জানাল নাত কেউ। দ্বিজেন শর্মার নদীটি পাহাড় এবং গাছ কাটার ফলে এখন মৃত প্রায়। আইনুন নিশাত পানি বিজ্ঞানী। তিনি নদীশাসন বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে চেয়েছেন- নদী শুধু পাড় ভাঙে না তলদেশ আরও গভীর করে। নদীশাসনের যে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি আছে তা না মেনে ভরাট করা- বাঁধ দেয়ার ফলে নদীর মৃত্যু হতে পারে। আলী ইমামের লেখালেখির অর্ধেকটাজুড়েই প্রকৃতি ও পাখি। তিনি এ ফ্যাকাসে ধূসর বৃক্ষহীন পৃথিবীর কথা বলতে গিয়ে বাংলা চলচিত্রের এক হৃদয়স্পর্শী গানের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন- শোনো বন্ধু শোনো/ প্রাণহীন এই শহরের ইতিকথা/ ইটের পাঁজরে, লোহার খাঁচায় দারুণ মর্ম ব্যথা/ এখানে আকাশ নেই/ এখানে বাতাস নেই/ এখানে আছে অন্ধগলির মুক্তির আকুলতা। এ গানটি এখন যে কোনো নগরবাসীর জন্য ভয়ংকরভাবে প্রাসঙ্গিক। আমাদের প্রতিবেশ এখন ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে তা যে কোনো মানুষও বুঝতে পারছে। বিপ্রদাস বড়–য়া বঙ্গোপসাগরের জীবনবৈচিত্র্য ও সৌন্দর্য নিয়ে কথা বলেছেন, তার লেখায় বঙ্গোপসাগরকে তিনি বলেছেন- সে রত্নাকর, শান্ত সুশ্রী, রুদ্র ভয়ংকর, শিক্ষকও প্রেয়সী- আমাদের শস্য ভাণ্ডার, রূপের ভাণ্ডার ইত্যাদি। লেখাটি গোলাম মোস্তফার ‘পদ্মা’ প্রবন্ধের কথা মনে করিয়ে দেয়। সেই পদ্মা আজ মরা খালে রূপান্তরিত হতে চলেছে। আমরা যেখানে বাস করি এ ঢাকা মহানগরী তার দুর্দশার অন্ত নেই- কত উদ্ভিদ বৃক্ষরাজি ফুল প্রজাপতি পাখি আজ আর নেই- আছে ‘লোহার ঘোড়া’ অর্থাৎ যানবাহন। চিনুয়া আচেবে তার Things fall apart বিখ্যাত উপন্যাসে এ শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছিলেন। ঢাকা সিটি কর্পোরেশন কি উদ্যোগী- এ বৃক্ষ বিনাশের ক্ষতিপূরণ পুষিয়ে দিতে, তা আমরা জানি না। মোকারম হোসেন তার নিবন্ধে রাজধানীর এক লোমহর্ষক হত্যা চিত্র তুলে ধরেছেন। বিশ্ব বিখ্যাত মিসরের ফারাওদের সভ্যতার একটা স্মারক প্যাপিরাস গাছ ঢাকার বলধা গার্ডেন আছে- কতদিন থাকবে তা জানি না। প্রত্যেকের লেখায় এ সত্যই প্রতিভাত যে- আমরা অজ্ঞানতা অপ্রেম আর সীমাহীন লোভের বশবর্তী হায়- নিজ হাতে ধংস করছি প্রকৃতি। গ্রন্থের সম্পাদক সব শেষে নিবন্ধ দিয়েছেন মুকিত মজুমদার বাবু- জলবায়ুর পরিবর্তনে আমাদের মনে উন্নয়নশীল দেশগুলো যে দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত তার একটা চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন- ১৯৫০ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত- শিল্পোন্নত দেশগুলোর কারণে পৃথিবী ক্ষতিকর কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ বেড়েছে ৭২ শতাংশ। মানব সৃষ্ট ক্ষতিকর প্রাণঘাতী এ সমস্যার দিকে তিনি সচেতন জনগোষ্টীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। লোক দেখানো নয় বরং তিনি মনে করেন প্রকৃতিকে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিয়ে যাওয়াই এখন মানব জাতির লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। কিছুদিন পরপর আইলা সিডরসহ যে ভয়ংকর প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের বিপর্যস্ত করছে তার কারণ প্রকৃতির প্রতি মানুষের বৈরিতা। বিশ্ব প্রতিষ্ঠান ম্যাপলক্রাফট মনে করে আগামী ৩০ বছরে বিশ্বের ১৬টি দেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগের শীর্ষে থাকবে- বাংলাদেশ তার একটি। আমরা কি এ সাবধান বাণীর তোয়াক্কা করি, সামনে যে এক বিনাশী শক্তি এগিয়ে আসছে তাকে প্রতিরোধ করতে হবে বৃক্ষ নদী আর পাখপাখালির সুরক্ষা দিয়ে। এ শংকা ও সাবধান বাণীর পাশাপাশি ‘বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ’ মুশফিক আহমদ শামীম আহমেদ ও মুকিত মজুমদার বাবু সম্পাদিত গ্রন্থের ছবিতে প্রকৃতি দেখে চোখ জুড়িয়ে যায় ভালো লাগে। এখনও বাংলাদেশ এত পাখি, সৈকত আর বন্যপ্রাণীর সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ। যে বিষধর গোখরা তার ও রুপালি ফনা মুগ্ধ করে- কি সবুজ সাপ- কি ভাগর চোখে চেয়ে আছে বিপন্নপ্রায় বানর জাতীয় প্রাণী উল্লুুক। প্রকৃতিতে বিস্ময়ের সীমা নেই সেই প্রকৃতি জীবনের নিবিড় জ্যামিতি যেন আমরা না ভুলি প্রকৃতি চিন্তক মুকিত মজুমদার বাবুর সেই কথাটিই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি সেই কথাটিই আমাদের বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন তার সম্পাদিত গ্রন্থে। আমরা প্রতীক্ষায় থাকব তার বৈচিত্র্যপূর্ণ আরও নতুন কাজের জন্য।
রেজাউদ্দিন স্টালিন

পেশা ছিল লেখা, লিখেই জীবনধারন করেছি

আল মাহমুদ বর্তমান বাংলা সাহিত্যের প্রধান কবি। আজকের এই সময়ে তার সঙ্গে কথা বলেন শ্যামল চন্দ্র নাথ
কী করছেন এখন, কীভাবে কাটছে সময় ?
আল মাহমুদ: চোখে দেখি না, কানেও শুনি না। লেখা ছাড়া তেমন কিছুই করতে পারি না এখন। তবে একটা মহাকাব্য লিখছি। এখন তো আর চাকরি জীবনের বাধ্যবাধকতা নেই।
চাকরি থকলে অথাৎ ব্যাস্ত থাকলে কী লিখতে পারতেন?
: চাকরি জীবনও ভালোই কেটেছে। আমি তো সাংবাদিকতা পেশায়ও ছিলাম। আবার শিল্পকলা একাডেমিতেও চাকরি করেছি। আমি রিচার্স অ্যান্ড পাবলিকেশনে কাজ করতাম। আমি অনেক প্রতিকুলতার মধ্যেই লিখেছি।
আপনার জলবেশ্যা গল্প নিয়ে কলকাতায় চলচ্চিত্র নির্মিত হচ্ছে
: হ্যাঁ, শুনলাম। ওদের টেকনিক্যাল দিকটাও ভালো। ওখানে যে ডিরেকশনটা দিচ্ছে সে খুব নামকরা পরিচালক, অভিজ্ঞ লোক। এ জন্য আমার বিশ্বাস খুব ভালো ছবি হবে।
আত্মজীবনী ‘বিচূর্ণ আয়নায় কবির মুখ’ লেখা শুরু করেছিলেন কিন্তু তা তো শেষ হল না...
: না, ওটা শেষ করতে পারি নাই। নানা কাজ, নানা রকম অসুবিধা আমার। তাছাড়া মহাকাব্য নিয়েও একটু ব্যাস্ত।
অবসর সময়ে বাইরে বেড়াতে যান ?
নিতান্ত জরুরি কোনো অনুষ্ঠান থাকলে বাইরে যাই। আজকাল বাইরে যাওয়া প্রায় ছেড়ে দিয়েছি। ঘরেই বসে থাকি, বন্ধু-বান্ধব থাকলে কথাবার্তা বলি। এখন কোনো বই পড়া হচ্ছে না। আমি তো আর একদম চুপচাপও থাকি না, কোনো না কোনো বিষয়ে মাঝে মধ্যে তো আমি লিখি।
আপনার সোনালি কাবিন নিয়ে তো অনেক আলোচনা হয়েছে কলকাতা এবং বাংলাদেশেও সোনালি কাবিনের ৪০ বছর পূর্তিও হল। কেমন লাগে সেই সময় মনে পড়লে ?
: সোনালি কাবিন তো ১৮ মাত্রার একটি প্রেমের কবিতা। । আমি তখন চট্টগ্রামে এঙ্গো এন্ডিয়ানদের এক বাসায় থাকতাম। ওরা সাধারণত কাউকে পাত্তা দিত না। কিন্তু আমি কবি বলে তারা আমাকে তাদের অনুষ্ঠানে দাওয়াত দিয়েছিল। তবে আমি ওদের প্রেমে পড়িনি।
আপনিতো ছোটদের জন্যও প্রচুর লিখেছেন এখনো কি ছোটদের জন্য লেখেন ?
: আমি ছোটদের জন্য অনেক লিখেছি। ছড়াসমগ্র রয়েছে আমার। তবে ওই কবিতগুলো ছোট বড় সবার জন্যই সমান আবেদন তৈরি করেছে। আমি তো এক সময় শিশুই ছিলাম। কাজেই শিশুদের বড় হওয়া তো আমি দেখেছি। শিশুদের বিষয় আমি বুঝতে পারি এবং তাদের কথা চিন্তা করে কবিতা, ছড়া, গদ্যও লিখেছি।
আপনার ‘কাবিলের বোন’ উপন্যাসকে এই সময়ে কীভাবে বিশ্লেষণ করবেন?
: কাবিলের বোন একটা বাস্তব জীবনের কাহিনী। যা আমি দেখেছি, যার ভেতর দিয়ে আমি এসেছি। তবে আমি দাবি করলে তো আর হবে না। মানুষ মেনে নিতে হবে। মানিক বাবুর পদ্মা নদীর মাঝির পর আমি তো আর উপন্যাস দেখি না। এটা আমার মতামত আর কিছু না।
ছাপার হরফে প্রথম যখন লেখা প্রকাশিত হল তখন আপনার অনুভূতি?
: সেটা তো অনেক আগে। খুবই ভালো অনুভূতি ছিল। তখন আমার বয়স খুব কম ছিল। আমি অনেক ছোট ছিলাম। সত্যযুগ পত্রিকায় আমার প্রথম লেখা প্রকাশিত হয়। এতে আমি খুবই আনন্দিত হয়েছিলাম। তখন আমি সারা পাড়ার মানুষকে দেখাতাম যে আমার লেখা ছাপা হয়েছে।
চলচ্চিত্র কেমন লাগে ?
: সামাজিক চলচ্চিত্র আমার ভালো লাগে। তবে আমাদের দেশে তো সামাজিক চলচ্চিত্র নেই বললেই চলে। ভালো মেকিং হয় না। ছবি হয় না তা বলছি না। কিন্তু ভালো ছবিও মাঝেমাঝে হয়। ভালো ছবির জন্য যে পরিশ্রম করা, হয়তো হয়েছে আমি ঠিক জানি না ।
সাহিত্যভিত্তিক চলচ্চিত্র কেমন লাগে ?
: আমি তো সত্যজিৎ রায় ঋত্বিক ঘটকের ছবি অনেক দেখেছি। তাদের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক খুব একবারে কম ছিল এরকম বলা যাবে না। আমি তো তখন ছোট একটা ছেলে তাদের ওখানে আসা যাওয়া করতাম। সত্যজিতের পথের পাঁচালি তো অসাধারণ।
জীবনের অপ্রাপ্তি...
: মানুষের জীবনের সবটা মানুষ পায় না। আমি এক দরিদ্র মানুষ। আমার কোনো সময় এমন পরিস্থিতি হয়নি খুব সচ্ছল, খুব টাকা-পয়সা এগুলো আমার ছিল না কোনোদিন। আমি গরিব মানুষ লিখে-টিকে খেয়েছি। আমার পেশা ছিল লেখা, লিখেছি, লেখা ছাপা হয়েছে পয়সা পেয়েছি। তবে কষ্টের জীবন কাটিয়েছি বলা যায়। হ্যাঁ, খ্যাতি হয়েছে। একজন কবি হিসেবে সবাই আলোচনা, সমালোচনা করুক এটা ভালো ব্যাপার। তবে শ্রদ্ধাও পেয়েছি। দেশব্যাপী লোকজন আমাকে চিনে। এই তো পেয়েছি। একজন লেখকের আর কি পাওয়ার থাকে।

নিউইয়র্ক খনি বিপর্যয় by অনুবাদ : রাফিক হারিরি

হারুকি মুরাকামি : জাপানিজ ঔপন্যাসিক ও ছোট গল্পকার হারুকি মুরাকামি গত কয়েক বছর ধরেই নোবেল তালিকায় মনোনীতদের শীর্ষে ছিলেন। তবে নোবেল তার ভাগ্যে এলো না। খনি বিপর্যয় বা মাইন ডিজেস্টার গল্পটি হারুকি মুরাকামির সর্বশেষ গল্প গ্রন্থ ব্লাইন্ড উইলো স্লিপিং উইমেন গ্রন্থের। এই গ্রন্থের গল্পগুলো ১৯৮১ থেকে ২০০৫ এর মধ্যে লেখা। ব্লাইন্ড উইলো স্লিপিংপিং উইমেন গল্প গ্রন্থটি লিখে হারুকি মুরাকামি বলেন, উপন্যাস লেখা আমার কাছে সব সময়ই চ্যালেঞ্জ। সেই তুলনায় গল্প খুব স্বচ্ছন্দে লেখা যায়। কারণ উপন্যাস লেখা হল বিশাল একটা বন তৈরি করা আর গল্প হল ছোট্ট সৌখিন বাগান তৈরির মতো। জাপানিজ ঔপন্যাসিক হারুকি মুরাকামির জন্ম ১৯৪৯ এ জাপানের কোয়েটায়। তার অন্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে নরওয়েজিয়ান উড, কাফকা অন দ্য শোর, হিয়ার দ্য উইন্ড সঙ্গ, অ্যা ওয়াইল্ড শিপ চেজ উল্লেখযোগ্য।
তারা সবগুলো বাতি ফু দিয়ে নিভিয়ে দিল পর্যাপ্ত বাতাস রক্ষা করার জন্য। তাদের চারপাশে অন্ধকার।
কেউ কথা বলছে না। তারা কেবল ছাদ থেকে প্রতি পাঁচ সেকেন্ড পর পর চুইয়ে চুইয়ে পানির ফোঁটা পড়ার শব্দ পাচ্ছে।
‘ঠিক আছে, সবাই একটু সাবধানে দম নেবেন আর ফেলবেন, যতটুকু সম্ভব শ্বাস কম নিয়ে বাতাস বাঁচানোর চেষ্টা করুন। আমাদের যথেষ্ট পরিমাণ বাতাস নেই।’ একজন বুড়ো খনি শ্রমিক বলল।
সে খুব নিচু গলায় প্রায় ফিসফিস করে কথা বলল, কিন্তু তারপরেও কথাগুলো ছাদের বিমে প্রতিশব্দ করে ফিরে এলো। অন্ধকারে খনি শ্রমিকেরা জড়াজড়া করে বসে আছে। সেখানে কেবল জীবনের প্রতিশব্দ ছাড়া আর কিছুই নেই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা তারা অপেক্ষা করছে।
ব্ইারে লোকজন গর্ত খুঁড়ে তাদের কাছে পৌঁছার চেষ্টা করছে। পুরো বিষয়টা কেমন সিনেমার দৃশ্যপটের মতো মনে হচ্ছে।
আমার এক বন্ধুর স্বভাব হল ঝড়ের সময় চিড়িয়াখানা দেখতে যাওয়া। এ কাজটা সে গত দশ বছর ধরে করে আসছে। ঝড়ের সময় যখন লোকেরা তাদের দোকানের ঝাপ বন্ধ করায় ব্যস্ত থাকে, মানুষ এদিক-সেদিক ছোটাছুটি করতে থাকে, কেউ কেউ বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ করে আবার অন্যেরা তাদের রেডিও ঠিক আছে কিনা সেটা চেক করে, ঠিক সেই সময় আমার বন্ধু ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে সংগ্রহ করা একটা সৈনিকদের জেকেট পরে পেন্টের পকেটে দুই কেন বিয়ার ভরে চিড়িয়াখানার উদ্দেশে বের হয়ে যায়। চিড়িয়াখানা তার বাসা থেকে মাত্র পনের মিনিট হাঁটা পথ।
তার ভাগ্য খারাপ হলে সে চিড়িয়াখানায় পৌঁছে সেটা বন্ধ পায়। তখন তার কিছুই করার থাকে না। চিড়িয়াখানার মূল ফটকের সামনে তখন সে একটা পাথরের ওপর বসে তার বিয়ারটা খেয়ে বাসায় ফিরে আসে। আর যখন সে চিড়িয়াখানার দরজা খোলা পায় তখন টিকিট কেটে সিগারেট ধরায়, তারপর ভেতরে ঢুকে একটার পর একটা প্রাণী দেখতে থাকে। অধিকাংশ পশুই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় তাদের আশ্রয়ে চলে যায়, কতগুলো নিষ্পলক চোখে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থাকে, আবার কতগুলো অস্থির হয়ে খাঁচার ভেতর ঘোরাঘুরি করে।
আমার বন্ধু সব সময় বেঙ্গল টাইগারের খাঁচার সামনে গিয়ে তার বিয়ারের কেনটা খুলে খেতে থাকে। ঝড়ের সময় বেঙ্গল টাইগার সবচেয়ে বেশি হিংস ভাব দেখায়।
দ্বিতীয় বিয়ারের কেনটা সে গরিলার খাঁচার সামনে খুলে। টাইফুনের সময় গরিলা তেমন কোনো অস্থির ভাব দেখায় না। সে বেশ শান্ত থাকে।
টাইফুনের বিষয়টা ছাড়া আমার বন্ধুর সঙ্গে অন্য কারও তেমন কোনো পার্থক্য নেই। আমার বন্ধু একটা এক্সপোর্ট কোম্পানিতে কাজ করে। সে বৈদেশিক বিনিয়োগ বিভাগের দায়িত্বে আছে। সে একা একা খুব পরিষ্কার একটা ফ্ল্যাটে থাকে। প্রতি ছয় মাস পর পর সে নতুন করে তার বান্ধবী পাল্টায়। কেন সে ঠিক ছয় মাসের মাথায় বান্ধবী পাল্টায় সেই রহস্য আমার কাছে অজানা।
আমার বন্ধুর খুব সুন্দর একটা ব্যবহৃত গাড়ি আছে, তার সুট কালো, জুতা কালো, টাই কালো। সব কিছুই শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার জন্য একদম ঠিক। আমি শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের কোনো নিমন্ত্রণ পেলেই ওর কাছ থেকে এ গুলো ধার করতাম। ওর সুটটা অবশ্য আমার একটু বড় হতো।
‘দুঃখিত তোমাকে আবারও বিরক্ত করতে আসলাম। আরেকটা শেষকৃত্যের নিমন্ত্রণ আছে।’ শেষবারের মতো তাকে বলেছিলাম।
‘কাজটা তুমি নিজেই করে নাও। তোমাকে খুব তাড়াহুড়া দেখাচ্ছে। সঠিক সময় কেন আস না?’ উত্তরে সে বলল।
আমি যখন তার বাসায় আসলাম দেখলাম সব কিছু সে প্রস্তুত করে রেখেছে। ফ্রিজের ভেতর ঠাণ্ডা বিয়ার, সুট ইস্ত্রি করা, জুতা পলিশ করে চক চক করে রেখেছে। এই হল আমার বন্ধু।
‘এক দিন চিড়িয়াখানায় আমি একটা বিড়াল দেখলাম।’ একটা বিয়ার সে খুলতে খুলতে বলল।
‘বিড়াল?’ আমি বললাম।
‘হ্যাঁ, দুই সপ্তাহ আগে। ব্যবসায়িক কাজে আমাকে হুকাইডু যেতে হয়েছিল, সেখানে একটা হোটেলের পাশেই চিড়িয়াখানা ছিল। বেড়াল লেখা একটা খাঁচার ভেতর আমি একটা বেড়ালকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখলাম।’
‘কি ধরনের বিড়াল ছিল এটা?’
‘খুব সাদামাটা। বাদামি রঙের ডোরা কাটা দাগ ওর শরীরে।’
যা হোক সেই বছরটা আমার জন্য ছিল শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের বছর। আমার বন্ধু, বন্ধুর বন্ধু এরকম অনেকেই মারা গেল। একের পর এক মরতেই থাকল। আমার বয়স আটাশ, বন্ধুদেরও প্রায় একই, কারও বয়স সাতাশ, কেউ আটাশ, কেউ ছাব্বিশ। মরে যাওয়ার জন্য বয়সটা উপযুক্ত ছিল না।
বাস্তবতা এবং অতিবাস্তবতার মাঝে প্রথম একটা পার্থক্য তৈরি করল আমাদেরই এক বন্ধু। সে আমাদের সঙ্গে কলেজে পড়েছে। জুনিয়র হাইস্কুলে ইংরেজি শিখেছে। বিয়ের তিন বছরের মাথায় তার স্ত্রী সন্তান প্রসবের জন্য বাবার বাড়ি যায়। রোববারের একটা স্বাভাবিক গরম পরা দিনে সেই বন্ধু দোকানে গিয়ে দুই কেন সেভিং ক্রিম কেনে, একটা ছুরি কেনে। ছুরিটা দিয়ে অনায়াসে একটা হাতির কান কেটে ফেলা যাবে। বাড়িতে ঢুকে বাথটাবে শুয়ে সে তার হাতের কব্জি কেটে ফেলে। রক্ত ঝরেই সে মারা যায়। দুই দিন পর তার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ বিবৃতি দিয়েছে এটা নির্জলা আÍহত্যা।
সে কোনো নোট লিখে যায়নি। তার ঘরে টেবিলের ওপর একটা গ্লাস, খালি হুইস্কির বোতল, দুই কেন সেভিং ক্রিম।
এর পরের বারো মাসে আরও অনেকেই মারা গেল।
একজন মারা গেল সৌদি আরবে তেলক্ষেত্রে, দু’জন মারা গেল হার্ট অ্যাটাকে জুন মাসে, অন্য আরেকজন ট্রাফিক দুর্ঘটনায়, জুলাই থেকে নভেম্বরটা শান্তিতেই ছিল, কিন্তু ডিসেম্বরে আরেক বন্ধু গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গেল।
আমার প্রথম বন্ধুর মতো বাকি বন্ধুরা টেরই পেল না যে তারা মরতে যাচ্ছে।
‘আমার বিছানাটা ঠিক করে দিবে?’ যেই বন্ধু হার্ট অ্যাটাকে মারা গেল সে মারা যাওয়ার আগে তার স্ত্রীকে বলেছিল। এই বন্ধুটা আসবাবপত্রের ডিজাইনার ছিল। তখন সকাল এগারোটা বাজে। সে নয়টার সময় ঘুম থেকে উঠে তার ঘরে কিছুক্ষণ কাজ করল। তারপর সে বলল, তার ঘুম ঘুম লাগছে। রান্নাঘরে গিয়ে সে কফি বানাল, কফি খেল। কফিতে তার তেমন কোনো উপকার হল না।
‘আমার মনে হয় একটু ঘুমাতে হবে। মাথার ভেতর কেমন বিজ বিজ শব্দ হচ্ছে।’ এটা ছিল তার সর্বশেষ কথা। সে বিছানায় শুয়ে পড়ল। তারপর ঘুমিয়ে গেল। কিন্তু ঘুম থেকে আর জাগল না।
যে বন্ধুটা ডিসেম্বরে মারা গেল সে ছিল আমাদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। একমাত্র মেয়ে বান্ধবী। তার বয়স ছিল মাত্র চব্বিশ।
ক্রিসমাসের আগে শীতের এক বৃষ্টিঘন সন্ধ্যায় একটা বিয়ারের বিশাল ট্রাকওয়ালা বান্ধবীটাকে চেপ্টা বানিয়ে দিল।
সর্বশেষ মৃত সৎকারের অনুষ্ঠানের পর আমার বন্ধুর ফ্ল্যাটে তার সুট-কোট ফেরত দেয়ার জন্য আমি গেলাম। ধন্যবাদস্বরূপ তাকে এক বোতল হুইস্কি দিলাম।
‘তোমাকে ধন্যবাদ। তুমি আবারও আমাকে সাহায্য করেছ।’ তার ফ্রিজ তখনও যথারীতি ঠাণ্ডা বিয়ারে ভর্তি ছিল।
সে কাপড়টা নিয়ে যথাস্থানে রাখল। তার চালচলন খুব ধীরস্থির ছিল।
‘আশা করি কাপড়ের মধ্যে কোনো মৃত সৎকারের গন্ধ নেই।’ আমি বললাম।
‘কাপড়টা গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হল এর ভেতরে কি আছে।’ সে বলল।
‘হিম’। আমি বললাম।
‘একটার পর একটা সৎকারের অনুষ্ঠান হচ্ছেই। কতগুলো অনুষ্ঠানে গেলে এই বছর?’ সে জিজ্ঞেস করল।
‘পাঁচজন।’ আমি হাতের আঙুল খুলে বললাম।
‘তুমি নিশ্চিত?’
‘যথেষ্ট মানুষ মারা গেছে এই বছর।’
‘মনে হচ্ছে এটা পিরামিডের কোনো অভিশাপ। আমি একটা বইয়ে পড়েছিলাম পিরামিডের অভিশাপ এমন, যখন এটা শুরু হয় তখন যথেষ্ট মানুষ মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত এই অভিশাপ শেষ হয় না।’ আমার বন্ধু বলল।
আমরা ছয় নম্বর পেক খাওয়া শেষ করে হুইস্কির দিকে ঝুঁকলাম।
‘তোমাকে কিছুটা বিষণ্ন লাগছে আজ।’ বন্ধু বলল।
‘আসলেই তেমন দেখাচ্ছে?’
‘রাত হলে তুমি মনে হয় এসব বিষয় নিয়ে খুব চিন্তা-ভাবনা কর। আমি রাতের বেলা এসব চিন্তা করা ছেড়ে দিয়েছি।’
‘তুমি কীভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ কর?’
‘আমি যখন খুব বিষণ্ন হয়ে পড়ি তখন বাড়িতে থেকে সব কিছু পরিষ্কার করার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। রাত যদি দুটো কিংবা তিনটা বাজে তাহলেও আমি এই কাজটা করি। ঘরের বাসন, থালা, রান্নাঘর সব কিছু পরিষ্কার করি। কাপড়গুলো আবার ধুয়ে ইস্ত্রি করি। তখন আমার আর কিছুই মনে থাকে না।’
আমি ঘরটার চারপাশে তাকালাম। ঘরটা সত্যিকার অর্থেই বেশ পরিচ্ছন্ন।
ফোন বেজে উঠল। আমার বন্ধু শোয়ার ঘরে ফোন ধরার জন্য উঠে গেল। তার মেয়ে বন্ধু ফোন করেছে। ফোনে সে কথা বলেই যাচ্ছে। আমি কিছু করার না পেয়ে টিভি ছেড়ে বসলাম। সাতাশ ইঞ্চির টিভি। চ্যানেল পাল্টানোর জন্য একটা রিমোট আছে। টিভির ছয়টা স্পিকারে বেশ ভালো শব্দ শোনা যায়। এ রকম দারুণ টিভি আমি সচরাচর দেখিনি।
বেশ কয়েকটা চ্যানেল আমি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কিছু সংবাদ দেখতে থাকলাম। কিছুক্ষণ পর আমার বন্ধু ফিরে এলো।
‘দারুণ কোনো সংবাদ আছে না কি?’
‘নাহ তেমন কিছু নেই।’
‘তুমি কি প্রচুর টিভি দেখো?’
আমি মাথা নেড়ে বললাম,‘আমার কোনো টিভি নেই।’
‘টিভিতে শুধু একটাই সুবিধা আছে। তুমি ইচ্ছে করলে যখন তখন এর মুখটা বন্ধ করে দিতে পারবে। টিভি তোমাকে কিছুই বলবে না। ’ আমার বন্ধুটি বলল।
আমার বন্ধু সুইচ অফ করে টিভিটা বন্ধ করে দিল। ঘরের ভেতর নীরবতা নেমে এলো। ঘর অন্ধকার হয়ে গেছে। বাইরে যে সব বাড়িতে আলো জ্বালানো ছিল সেই আলোগুলো জানালা দিয়ে ঘরের ভেতর ঢুকছে।
আমরা পাঁচ মিনিটের মতো চুপচাপ বসে থাকলাম। কেউ কোনো কথা বললাম না। হুইস্কি খেলাম। চুপচাপ বসে থেকে আমরা আরও নানা বিষয় নিয়ে আলাপ করলাম। প্যারিসের একটা চিড়িয়াখানার বিষয় নিয়েও কথা বললাম। আমার বন্ধুর বাসার শ্যামপেনটা সত্যিই দারুণ ছিল।
নতুন বছরের আগমন উপলক্ষে রুপুঙ্গির পানশালায় পার্টির আয়োজন করা হয়েছিল। পিয়ানো বাজছে, দারুণ সব খাবার আর পানীয় সাজিয়ে রাখা আছে। নতুন বছরের আগমনিতে এ ধরনের অনুষ্ঠানে আমার কিছু করার থাকে না। এ রকম অনুষ্ঠানে আমার কারও সঙ্গে কোনো কথা বলার কিংবা পরিচিত হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। আমার সেটা ভালোও লাগে না। তাই আমি চুপচাপ নিজের মতো এখানে সেখানে ঘুরে বেড়াই। কিন্তু নতুন বছরের সেই অনুষ্ঠানে কেউ একজন আমাকে এক নারীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল। অল্প কিছুক্ষণ স্বাভাবিক কথা বলে আমার মতো করে আমি এক কোনায় নিরিবিলি একটা জায়গায় চলে আসলাম। কিন্তু সেই মহিলাটা হাতে হুইস্কির গ্লাস নিয়ে আমাকে অনুসরণ করে আমার কাছে চলে এলো।
খুব বিনয়ের সঙ্গে আমার কাছে এসে বলল, ‘আমাকে আপনার সঙ্গে পরিচিত হতে বলা হয়েছে।’ মেয়েটা সুন্দরী আর আকর্ষণীয়, দামি একটা পোশাক পরা সে, হাতের তিনটি আঙুলে তিন রকমের আঙটি। ঠোঁটে মৃদু একটা হাসি ঝুলে আছে।
‘আপনাকে আমার খুব পরিচিত লাগছে। আপনার মুখের আকৃতি, কথা বলার ঢং, কাঁধের বিস্মৃতি সব কিছুই আমার পরিচিত মনে হচ্ছে। আমি এখানে আসার পর থেকেই আপনাকে লক্ষ্য করছিলাম।’ মেয়েটা বলল।
‘আপনি যার কথা বলছেন আমি যদি সত্যিই তার মতো হই তাহলে তার সঙ্গে আমার পরিচিত হওয়া দরকার।’ আমি বুঝতে পারছিলাম না এর চেয়ে ভালো কথা তখন আর কি বলা যেতে পারে।
‘আপনি সত্যিই তার সঙ্গে দেখা করতে চান?’ মেয়েটা বলল।
‘হ্যাঁ, আমি চাই। কারণ যে দেখতে হুবহু আমার মতো তার মুখোমুখি হওয়াটা আসলেই দারুণ একটা ব্যাপার হবে।’
‘কিন্তু আপনি তার সঙ্গে কোনোভাবেই দেখা করতে পারবেন না। এটা অসম্ভব।’
‘কেন?’
‘কারণ সে পাঁচ বছর আগে মারা গেছে। এখন আপনার যে বয়স মারা যাওয়ার সময় তার বয়সও এমন ছিল।’
‘এটা কি আসলেই সত্যি?’ আমি বললাম।
‘হ্যাঁ, সত্যি। কারণ আমিই তাকে খুন করেছিলাম।’
পার্টি জমে উঠেছে। পিয়ানোর সুর পাল্টে অন্য আরেকটা সঙ্গীত অনুষ্ঠানের ভেতর চলছে।
‘আপনি কি গান পছন্দ করেন?’ মেয়েটা জিজ্ঞেস করল।
‘যদি সেটা সুন্দর পৃথিবীতে হয় তাহলে সুন্দর গান শুনতে আমার খুব ভালো লাগে।’
আমার কথা শুনে মেয়েটা কিছুক্ষণ চুপ থাকল। তারপর মুখে একটা সিগারেট ধরাল। আমি লাইটার জ্বালিয়ে দিলাম।
‘হুম, আমরা সেই লোকটার বিষয়ে কথা বলছিলাম যে দেখতে ঠিক আপনার মতো ছিল।’ মেয়েটা তার সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে বলল।
‘আপনি কীভাবে তাকে খুন করেছিলেন?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।
‘আমি তাকে একটা মৌচাকের বাসার ভেতর ছুড়ে মেরেছিলাম।’
‘আপনি আমার সঙ্গে মশকরা করছেন?’
‘হ্যাঁ।’ মেয়েটা বলল।
আমি বরফে মিশ্রিত আরেক পেগ হুইস্কি খেলাম।
‘অবশ্য আইনগতভাবে কিংবা নৈতিকভাবে আমি খুনি নই।’ মেয়েটা বলল।
‘আইনগতভাবে কিংবা নৈতিকভাবে না হলেও আপনি খুনি। কারণ আপনি কোনো একজনকে খুন করেছেন।’
‘হ্যাঁ, খুন করেছি। এমন একজনকে যে দেখতে আপনার মতো ছিল।’ মেয়েটা তার মাথা নেড়ে বলল।
হলঘরে একজন লোক চিৎকার করে হেসে উঠল। তার চারপাশে যারা ছিল তারাও হাসতে থাকল। গ্লাসগুলো কেঁপে উঠল, সঙ্গে সঙ্গে আমার বুকটাও কেঁপে উঠল।
‘ওকে খুন করতে আমার মাত্র পাঁচ সেকেন্ড সময় লেগেছিল।’ মেয়েটা বলল।
আমরা কিছুক্ষণ চুপ থাকলাম। মেয়েটাও কথা বলার জন্য সময় নিল।
‘আপনি কি কখনও স্বাধীনতার বিষয়ে চিন্তা করেছেন?’ মেয়েটা জিজ্ঞেস করল।
‘কখনও কখনও ভেবেছি। কেন এমনটা জিজ্ঞেস করছেন?’
‘আপনি কি ডেজি ফুল আঁকতে পারবেন?’
‘মনে হয় পারব। এটা দিয়ে কি আপনি আমার ব্যক্তিত্ব যাচাই করছেন?’
‘অবশ্যই।’
‘আমি কি পাস করেছি?’
‘হ্যাঁ, আপনি পাস করেছেন।’
ঘরের ভেতর আবারও সঙ্গীত বেজে উঠল।
‘আপনি প্রাণী পছন্দ করেন?’ মেয়েটা জিজ্ঞেস করল।
‘হ্যাঁ, আমি পছন্দ করি।’ আমার বন্ধুর কথা তখন মনে পড়ল যে কি-না চিড়িয়াখানার প্রাণী দেখতে পছন্দ করে।
‘আপনার সঙ্গে কথা বলে খুব ভালো লাগল। ভালো থাকবেন।’ মেয়েটা বলল।
‘আপনিও ভালো থাকবেন।’ আমি বললাম।

প্রজ্ঞায় সমৃদ্ধ ও অঙ্গীকারে দৃঢ় একজন মানুষ

মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানকে আমি প্রথম দেখি ছাত্রজীবনে। তখনও আমি কলেজের ছাত্র। থাকতাম আজিমপুরের সরকারি কর্মচারীদের একটি এলাকায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশেই আমাদের চলাফেরা ছিল। সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ছাত্রসংসদের নির্বাচন ছিল একটি উৎসবের মতো। আমরা তার চাঞ্চল্যটা অনুভব করতাম। ওই ছাত্র সংসদেরই এক নির্বাচনে হাবিবুর রহমান সহসভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেই উপলক্ষেই তাকে আমার প্রথম দেখা। প্রথা ছিল যে মেধাবী ছাত্ররাই নির্বাচনে দাঁড়াবে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতো তাদের মধ্য। মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। তিনি নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন এবং নির্বাচিত হয়েছেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী প্রয়াত মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান অনেক দিক দিয়েই বিশিষ্ট ছিলেন। তার কর্মক্ষেত্র ছিল বিস্তৃত, আগ্রহ ছিল বিভিন্ন বিষয়ে। কিন্তু তার সব কাজের মধ্যেই দৃঢ়তা ও অভিনিবেশের প্রকাশ ঘটত। কোনো কাজই তিনি অমনোযোগের সঙ্গে করতেন না, যদিও সব কাজই করতেন স্বাচ্ছন্দ্যে। তিনি যে ‘যথাশব্দ’ নামে একটি গ্রন্থ সংকলন করেছিলেন তাতে তার দৃষ্টিভঙ্গির একটা প্রকাশ আমরা দেখতে পাই। ভাষার ব্যবহারে তিনি ছিলেন যথাযথ এবং তার সব কাজের মধ্যেই সুশৃংখলা ও যথার্থতা দেখা যেত। সহজভাবে লিখতেন এবং কথা বলতেন কিন্তু তার লেখা এবং কথায় দীপ্তি থাকত প্রজ্ঞা ও জ্ঞানের। জেনেশুনেই লিখেছেন এবং বলেছেন।
তার লেখার জন্য মানুষ প্রতীক্ষা করত। প্রত্যেক বছরই তার একাধিক বই বেরুত এবং সে বইয়ের জন্য পাঠকদের আগ্রহ থাকত। তিনি সভা, সমিতি ও সম্মেলনে খুব যে যেতেন তা নয়। কিন্তু যখনই যেতেন তখন আমরা দেখতাম তার বক্তব্যে কেবল যে মৌলিকতা আছে তা নয়, গভীরতাও রয়েছে। তার অনেক বক্তব্যই মানুষকে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করত, এমনকি চাঞ্চল্যেরও সৃষ্টি করত।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানকে আমি প্রথম দেখি ছাত্রজীবনে। তখনও আমি কলেজের ছাত্র। থাকতাম আজিমপুরের সরকারি কর্মচারীদের একটি এলাকায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশেই আমাদের চলাফেরা ছিল। সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ছাত্রসংসদের নির্বাচন ছিল একটি উৎসবের মতো। আমরা তার চাঞ্চল্যটা অনুভব করতাম। ওই ছাত্র সংসদেরই এক নির্বাচনে হাবিবুর রহমান সহসভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেই উপলক্ষেই তাকে আমার প্রথম দেখা। প্রথা ছিল যে মেধাবী ছাত্ররাই নির্বাচনে দাঁড়াবে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতো তাদের মধ্য। মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। তিনি নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন এবং নির্বাচিত হয়েছেন।
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনেও তিনি প্রত্যক্ষ যুক্ত ছিলেন। বাহান্ন সালে একুশে ফেব্র“য়ারিতে যে ঘটনা ঘটে তা ঐতিহাসিক। তার তাৎপর্য তখন এতটা বোঝা যায়নি যতটা পরে স্পষ্ট হয়েছে। সরকার ১৪৪ ধারা জারি করেছিল। ছাত্ররা ঠিক করেছিল তা ভঙ্গ করবে। সে বছর আমি ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হচ্ছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় যে সমাবেশ হয় সেখানে আমাদের অন্য অনেক সহপাঠীর সঙ্গে আমিও ছিলাম। ছাত্ররা সিদ্ধান্ত নিল ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হবে এবং ১০ জন ১০ জন করে গেট দিয়ে বের হয়ে যাবে। প্রথম যে ১০ জন বের হয় তার নেতৃত্বে ছিলেন মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান।
ওই যে ছাত্র সংসদের সহসভাপতি হলেন এবং রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে সামনে ছিলেন, এ দুটো ঘটনা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। বোঝা যায়, ছাত্র জীবনে তিনি মানুষের মুক্তির যে সংগ্রাম তার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ভালো ছাত্ররা কেউ কেউ রাজনীতিবিমুখ হয়। মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান তেমনটি ছিলেন না। ইতিহাস বিভাগের ছাত্র হিসেবে এমএ পরীক্ষায় তিনি প্রথম বিভাগে প্রথম হয়েছিলেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন। তখনকার দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করতে হলে পুলিশের ছাড়পত্র প্রয়োজন হতো। পুলিশ দেখত নিয়োগ প্রার্থী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত কিনা। মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে তারা রিপোর্ট দিয়েছিল। তা না হলে নিয়োগের পরপরই তিনি চাকরি হারাবেন কেন। চাকরি হারিয়ে তিনি যে হতাশ হওয়ার পাত্র ছিলেন না সেটা বোঝা গেল যখন তিনি ওই সলিমুল্লাহ হলেরই প্রবেশদ্বারে পান-সিগারেট বিক্রেতা হিসেবে দাঁড়িয়ে গেলেন। একটা ট্রের মধ্যে সিগারেট ও পান সাজিয়ে সেটি গলায় ঝুলিয়ে হকার হিসেবে অন্তত একদিন দাঁড়িয়ে ছিলেন। ট্রের গায়ে লেখা ছিল- ‘শেলী ইজ ওউন স্টল’। তার ডাক নাম ছিল শেলী এবং হাবিবুর রহমান শেলী নামে তখন তিনি পরিচিত ছিলেন।
ঘটনাটি চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। তখনকার দিনে প্রধান সংবাদপত্র ছিল পাকিস্তান অবজারভার। মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের বন্ধুরা ওই পত্রিকায় তার হকার হওয়ার ঘটনায় একটি সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। তার পরের দিন ভারতীয় একটি দৈনিকে প্রতিবেদনটি উদ্ধৃত করে বলা হয়, পূর্ববাংলার বেকার সমস্যা এমনই ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে যে, এমএতে প্রথম শ্রেণী পাওয়া ছাত্র সেখানে পান-সিগারেট বিক্রি করছে। এতে সরকার কতটা বিব্রত হয়েছিল আমরা জানি না কিন্তু হাবিবুর রহমান জগন্নাথ কলেজে চাকরি পেয়েছিলেন।
তার ওই নাটকীয় প্রতিবাদে অতিনাটকীয়তা ছিল এমনটা বলা যাবে না, কিন্তু মৌলিকত্ব অবশ্যই ছিল, সেই সঙ্গে ছিল একটি প্রসন্ন কৌতুকবোধ। এক তরুণ যুবকের দুঃসাহসও এ কাজের মধ্য দেখতে পাই। এ গুণগুলো মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের মধ্যে আমরা সব সময় দেখতে পেয়েছি। তার চিন্তায় যেমন গভীরতা থাকত, তেমনি থাকত মৌলিকত্ব। সেই সঙ্গে প্রকাশ পেত একটি প্রসন্ন কৌতুকবোধও।
ছাত্রজীবনে তিনি আইনও পড়েছেন। তার পিতা আইনজীবী ছিলেন সেই উত্তরাধিকার তিনি বহন করেছেন। বৃত্তি নিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য অক্সফোর্ডে যান। সেখানে আধুনিক ইতিহাসে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। কিন্তু সেই সঙ্গে লিংকনস ইন-এ তিনি ব্যারিস্টারি ডিগ্রিও নিয়েছেন। দেশে ফিরে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা শুরু করেন। আমরা যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত তারা খুশি হতাম যদি তিনি অধ্যাপনায় থাকতেন। কিন্তু সেখানে না থেকে তিনি আইনজীবী হিসেবে কাজ করার জন্য ঢাকায় চলে আসেন। এই নতুন পেশা তার জন্য একটা বড় কর্মক্ষেত্র তৈরি করে দেয়। কিন্তু বেশি দিন তিনি আইনজীবী থাকেননি, অল্প সময় পরেই হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। বিচারপতি হিসেবে সমধিক পরিচিত হন। তার অনেক রায়ের মধ্যেই বিচক্ষণতার পরিচয় পাওয়া যেত। প্রধান বিচারপতি হিসেবে অবসর গ্রহণের পরেই তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হন। সময়টা ছিল সমস্যাসংকুল। তিন মাসের সেই রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনেও তিনি যে দক্ষতার প্রমাণ দেন, তা এখনও স্মরণীয় হয়ে আছে। তার সব কাজেই প্রজ্ঞার পরিচয় পাওয়া যায়। দৃষ্টি ছিল স্বচ্ছ, জ্ঞান ছিল গভীর, অভাব ছিল না অভিনিবেশের। দেখা যেত তিনি অধ্যয়নে কখনও বিরতি দেননি। তার রচনাতে আমরা গবেষণামনস্কতারও প্রমাণ পাই। তিনি ইতিহাসের ওপর বই লিখেছেন ‘গঙ্গায় হৃদ্ধি থেকে বাংলাদেশ’ নামে। বোঝা যায়, ইতিহাস পাঠে তার আগ্রহ তাকে কখনোই পরিত্যাগ করেনি। রবীন্দ্রনাথকে নিয়েও তিনি গবেষণা করেছেন। ‘রবীন্দ্ররচনায় রবীন্দ্র ব্যাখ্যা’, ‘মাতৃভাষার স্বপক্ষে রবীন্দ্রনাথ’ এবং ‘রবীন্দ্র বাক্যে আর্ট সঙ্গীত ও সাহিত্য’ নামে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি বই লিখেছেন। তিনি কোরআন পাঠ করেছেন গভীর মনোযোগে এবং তার একটি স্বচ্ছন্দ বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করেছেন। ‘কোরআন সূত্রকোষ’ নামেও তার একটি গ্রন্থ রয়েছে।
নিজের জ্ঞানকে তিনি সর্বদাই অতি সহজে বহন করেছেন। এর প্রকাশ ছিল সহজ স্বচ্ছন্দ ও প্রসন্ন। যত্নের সঙ্গে লিখেছেন কিন্তু যত্নের কৃত্রিমতা প্রকাশ ভঙ্গিতে প্রশ্রয় পায়নি। পাঠক আকর্ষণ করার একটা স্বাভাবিক শক্তি তার রচনার মধ্যে ছিল। আলাপচারিতায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ। কথাবার্তায় একটা কৌতুকবোধের প্রকাশ দেখা যেত। তার শরীরের হার ভাঙলে স্টিল দিয়ে জোড়া দিতে হয়েছিল। এ নিয়েও তিনি কৌতুক করতেন, বলতেন আমি একজন স্টিলম্যান।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান উঁচুমাপের মানুষ ছিলেন। দৈহিক উচ্চতার কারণে ভিড়ের মধ্যে তাকে চোখে পড়ত। ওই উচ্চতা ছিল তার মেধাতেও। মেধাকে তিনি বিকশিত করেছেন অনুশীলনের দ্বারা। তার মধ্যে কোনো আলস্য ছিল বলে মনে হয় না। কাজকর্মেও বিরতি দেননি। সব কিছু ছিল আড়ম্ভরহীন। অঙ্গীকার ছিল অত্যন্ত দৃঢ়। সেই অঙ্গীকার একদিকে যেমন জ্ঞানের প্রতি, তেমনি সমাজ পরিবর্তনের দিকেও। সেই সমাজ পরিবর্তনের ব্যাপারেও তার অঙ্গীকার আমরা দেখেছি। ছাত্রজীবনে যেমন রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন, পরবর্তীতে প্রধানত পেশাগত কারণে সেটি থাকা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। কিন্তু কখনোই রাজনীতিবিমুখ ছিলেন না। তার জীবনযাপন ছিল স্বাভাবিক। মৃত্যুর মধ্যেও সেই স্বাভাবিকতাটাই আমরা দেখলাম। খুব সহজেই চলে গেলেন। যেন দিনের কাজ শেষ করে ঘুমিয়ে পড়েছেন, আবারও উঠবেন। আক্ষরিক অর্থে জেগে উঠবেন না নিশ্চয়ই, কিন্তু তিনি জেগে থাকবেন তার লেখা, কাজ ও দৃষ্টান্ত স্থাপনের মধ্যে।

অভ্যুত্থান এড়াতে পারবেন কী ইংলাক by মাসুদ আনোয়ার

থাইল্যান্ড এমন একটি দেশ, যে দেশকে পর্যটনের স্বর্গ বলা যায়। সারাবছরই এর সূর্যস্নাত সমুদ্রসৈকতে বেড়াতে আসে দুনিয়ার সব প্রান্ত থেকে লাখ লাখ মানুষ। পর্যটন খাত থাইল্যান্ডকে তুলে নিচ্ছে আর্থিক সক্ষমতার চূড়ায়। কিন্তু রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে দেশটিতে আবারও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। অভ্যুত্থানপ্রবণ দেশটি কি আরেকটি সামরিক অভ্যুত্থান এড়াতে পারবে_ এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে বড় অর্থনীতিসমৃদ্ধ দেশটিতে চলছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। আট বছর আগে দেশটিতে ৮০ বছরের ইতিহাসে ১৮ বারের মতো সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। তাতে ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত হন থাকসিন সিনাওয়াত্রা। এর পরের বছরগুলোয় থাই প্রধানমন্ত্রীদের ক্ষমতায় আসা আর যাওয়ার রিহার্সেল চলে যেন। শেষ পর্যন্ত দেশটির প্রধানমন্ত্রী হন থাকসিনের বোন ইংলাক সিনাওয়াত্রা। বর্তমানে থাইল্যান্ডের বিরোধী পক্ষগুলো তাকেও ক্ষমতা ছাড়ার জন্য আন্দোলন শুরু করেছে। প্রায় দু'মাস ধরে চলছে বিক্ষোভ। এখন তারা ব্যাংকক অবরোধ করার মতো চরম ব্যবস্থাও নিয়েছে। ফলে পুরো থাইল্যান্ডে চলছে অনিশ্চয়তা। বিক্ষোভকারীদের নেতা সুথেপ থাগসুবানের নেতৃত্বে চলতি সপ্তাহে রাজধানী ব্যাংককের ব্যস্ততম কিছু এলাকা দখল করে নিয়েছে হলুদ শার্টধারীরা। তিনি বলেন, জনগণ এ সরকারকে চায় না। তারা পদত্যাগ করুক। এ সরকার দুর্নীতিবাজ, ক্ষমতার অপব্যবহারকারী। তারা চায় অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে ক্ষমতা দিয়ে তারা সরে দাঁড়াক।
সরকার সমর্থকরাও পরিষ্কার বলে দিয়েছে, সরকার ২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন দিয়েছে। ক্ষমতায় কারা যাবে, সেটা ওই নির্বাচনেই নির্ধারণ করা হবে। বিরোধীরা এ নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছে। কারণ তারা জানে, জনগণ তাদের পেছনে নেই। তারা ভোটে জনগণের কাছে প্রত্যাখ্যাত হবে। অবশ্য জনগণের মধ্যে এমনও আছে, যারা শাসক পুয়ে থাই পার্টি কিংবা বিক্ষোভকারী বিরোধী দল ডেমোক্র্যাট_ কাউকেই চায় না। তারা দুই দলের বর্তমান হানাহানিতে অসন্তুষ্ট, শঙ্কিত। এরই মধ্যে আটজনের প্রাণহানি ঘটেছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আহত হয়েছে হাজার হাজার মানুষ। তাদের আশঙ্কা, এই হানাহানি আরও ব্যাপক আকার ধারণ করতে পারে। তারা চায়, বর্তমান অশান্তির একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান, একটি স্থায়ী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। কারণ রাজনৈতিক সহিংসতা তারা এর আগেও দেখেছে। থাকসিন সিনাওয়াত্রাকে সরাতে গিয়ে দেশ যে খাদের কিনারে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল, তারা সে অভিজ্ঞতার কথা মনে রেখেছে।
বুদ্ধিপংসে পুন্নাকান্তা থাইল্যান্ডের পিপলস ডেমোক্রেটিক রিফর্ম কমিটির নেতা। এই দলটি ব্যাংকক বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। এর পক্ষে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, 'ব্যাংকক বন্ধের ঘোষণা দিয়ে আমরা ঠিক কাজটিই করেছি। তার মতে, আবার নতুন করে নির্বাচন হবে। সে নির্বাচনে এমনকি ইংলাক সিনাওয়াত্রা যদি ফের নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় বসেন, তাতেও কোনো আপত্তি থাকবে না কারও। কারণ সে নির্বাচন হবে নতুন নিয়মের মাধ্যমে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। এ তো গেল একজন রাজনীতিবিদের মতামত। সাধারণ মানুষ কীভাবে ভাবছে? বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে থেকে বাঁশি বিক্রেতা চাম্পলপাত্রা পিনোরাশাদাপং বলেন, '২৪ নভেম্বর থেকে আমি এখানে বাঁশি বেচছি। ২০ হাজারেরও বেশি বাঁশি বেচা হয়ে গেছে এ পর্যন্ত।' কিন্তু চাম্পলপাত্রা পিনোরাশাদাপং চান না এভাবে চলতে থাকুক। তার মতে, দেশকে সামনে এগিয়ে নিতে হলে বিক্ষোভ বন্ধ করা উচিত। ইংলাকের সমর্থক লাল শার্টধারীদের একজন সমবাট বুঙ্গামাঙ্গোস বলেন, আমি চাই একটা নির্বাচন হোক, অবশ্যই নির্বাচনই সব সমস্যার সমাধান করে দেবে, এটা মনে করি না। কিন্তু নির্বাচন না হলে চলমান অবস্থা আরও খারাপের দিকে যাবে। কেউ কেউ অবশ্য এটাও বলছে, নির্বাচন হলেও তা হবে সহিংসতায় ভরা। কিন্তু না হলেও তার চেয়ে ভয়ানক অবস্থার জন্য তৈরি হতে হবে। কারণ দেশে এখন কোনো আইন আছে বলে মনে হয় না। সাধারণ একজন সরকারবিরোধী লানালি গামডি বলেন, আমি সব কিছু সংস্কার চাই। কারণ সিনাওয়াত্রা পরিবার রাষ্ট্রীয় সব কলকব্জা নিজেদের হাতে নিয়েছে। ফলে সরকার এখন ক্ষমতার অপব্যবহার করছে। মানুষ এজন্য তাদের বিরুদ্ধে ক্ষেপেছে। এখন থাইল্যান্ডের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন যেটা, তা হলো তারা কি মিসরের অবস্থায় নিজেদের নিয়ে যাবে, নাকি দক্ষিণ কোরিয়াকে অনুসরণ করবে? মিসরের মতো একটি দেশ অভ্যন্তরীণ গোলযোগের কারণে এখন পঙ্গু হয়ে গেছে। মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে দেশটিতে চলছে এখন যুদ্ধাবস্থা। পিরামিডের দেশ মিসর শুধু পর্যটন খাতে যে আয় করত, তাতে ভাটা পড়েছে। অস্থির মিসরে পর্যটক যাচ্ছে না। দ্রুত অর্থনৈতিক অবনতি গ্রাস করছে দেশটাকে। সূত্র : ব্লুমবার্গ

তালেবানি নিষ্ঠুরতা

দক্ষিণ আফগানিস্তানের একটি সামরিক চেকপোস্ট। একটি নয় বছরের মেয়ে শিশুকে আটক করেছে সেনারা। তার গায়ে পরা সুইসাইড ভেস্ট। পোজমাই নামের মেয়েটি এখন প্রাদেশিক সরকারের হেফাজতে। আটক হওয়ার পর মেয়েটি বলেছে, সন্ধ্যায় আমার ভাই আমাকে বাইরে নিয়ে গেল এবং এই ভেস্টটি পরতে বলল। সে আমাকে দেখাল কী করে এটাকে কাজে লাগাতে হয়। আমি বললাম, 'এটা যদি ঠিক মতো কাজ না করে তাহলে কী হবে?' আমার ভাই বলল, 'এটা কাজ করবে। চিন্তা করো না।' কথা না শোনায় সে আমাকে ভেস্টটি দিয়ে গায়ে সজোরে আঘাত করল। তবু আমাকে ইতস্তত করতে দেখে সে আমাকে ভেস্টটি পরিয়ে দিয়ে বাড়ির কাছের সেনা চেকপোস্টের কাছে ফেলে চলে গেল। এটা যে আত্মঘাতী ভেস্ট তা আমি বুঝতে পেরেছিলাম। কারণ এটা সাধারণ জামার চেয়ে অনেক বেশি ভারী। ও আমাকে বলেছিল, 'তুমি যদি এটা ঠিকমতো অপারেট করতে পার, তাহলে ওই চেকপোস্টের লোকগুলো সবাই মারা যাবে। তোমার কিছু হবে না।' কিন্তু আমি বুঝতে পারি এটা অপারেট করতে গেলে আমি নিজেও মারা যাব। সারারাত মরুভূমিতে পড়ে থেকে সকালে উঠে চেক পয়েন্টের কাছে একটি লোকের সঙ্গে দেখা হলে তাকে সব খুলে বলে। কমান্ডার তাকে বাড়ি চলে যেতে বললে সে রাজি হয়নি। সে বলে, আমি যদি এখন বাড়ি ফিরে যাই ওরা আমাকে খুব মারবে। কমান্ডার বলল, ঠিক আছে। তুমি যদি বাড়ি যেতে না চাও, তাহলে তোমাকে আমরা প্রাদেশিক রাজধানীতে নিয়ে যাব। তাকে নিরাপত্তা দেওয়ার কথা বলা হলেও সে বাড়ি ফিরে যেতে চায় না। সে বলে, আমাকে আবার এই কাজ দেওয়া হবে এবং আমাকে তা করতে হবে। আমার বাবাও এখানে এসে আমাকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল; কিন্তু আমি যাব না। আমি বরং আত্মহত্যা করব, তবু বাড়ি যাব না। পোজমাই বলে, আমি সরকারের কাছে সাহায্য চাই। সরকার যেন আমাকে বাড়িতে না পাঠিয়ে এখানে রাখে। বাড়িতে পাঠালে ওরা আমাকে মেরে ফেলবে। আমি আমার পরিবারকেও বলতে চাই, তোমরা আমাকে নিতে এসো না। আমি তোমাদের সঙ্গে যেতে চাই না। পোজামাই বলে, তার ভাইদের একজন তালেবান। তাকে কখনও দেখেনি সে। এক ভাই বিয়ে করেছে। তার ছোট যে, 'সে আমাকে বলেছে সুইসাইড ভেস্ট পরার জন্য। এটা চালানোর জন্য। ওর বয়স কত জানি না। তবে ও অনেক বড় শরীরের একজন দাড়িঅলা মানুষ।' আফগানিস্তানে শত শত শিশু-কিশোর এর আগে সুইসাইড বোমা বহন করতে গিয়ে নিরাপত্তারক্ষীদের হাতে ধরা পড়েছে। কিন্তু পোজমাই-ই একমাত্র মেয়ে শিশু, যাকে এ কাজে ব্যবহার করা হচ্ছিল। প্রথমে শোনা গিয়েছিল, রাতের বেলা পোজমাইর কান্না শুনে তাকে মরুভূমি থেকে নিরাপত্তা রক্ষীরা নিয়ে আসে। পরে আবার শোনা যায়, তাকে তাদের বাড়ি থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু এখন ছোট্ট মেয়েটির কথা শুনে বোঝা যাচ্ছে, আফগানিস্তানে তালেবান কী রকম বর্বরতা আর নিষ্ঠুরতা চালাচ্ছে। তবে তালেবান নেতারা পোজমাইর কথা প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, তাদের জানা মতে, এমন কোনো ঘটনা এখানে ঘটেনি। বিবিসি অবলম্বনে।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের উত্তরাধুনিক ছোটগল্প by তুষার তালুকদার

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম [জন্ম :১৮ জানুয়ারি ১৯৫১]
সমকালীন বাংলা সাহিত্যে ভাষা-দুর্বলতা, বাস্তব অভিজ্ঞতা ও গবেষণার অভাব মাড়িয়ে যে ক'জন ছোটগল্পকার পাঠকহৃদয়ে বিশেষভাবে স্থান করে নিয়েছেন, তাদের মধ্যে কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম অন্যতম। এক সাক্ষাৎকারে তিনি আমাকে জানান, গল্প বলায় ও লেখায় একটা সূক্ষ্ম তফাত আছে। আমাদের বাংলা সাহিত্যে রয়েছে গল্প বলার ঐতিহ্য; লেখার নয়। আর পাশ্চাত্যে রয়েছে গল্প লেখার ঐতিহ্য। গল্প বলতে গেলে ভাষার মৌখিকতাকে প্রাধান্য দিতে হয়। উদাহরণ হিসেবে তিনি লাতিন আমেরিকার সাহিত্যের কথা বলেছেন। বাংলা সাহিত্যের মতো লাতিন আমেরিকার সাহিত্য-সংস্কৃতিতে রয়েছে গল্প বলার ঐতিহ্য। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বাংলা সংস্কৃতিতে হাজার বছর ধরে বিদ্যমান ওই গল্প বলার ঐতিহ্যকে ধারণ করেছেন। তাই তার অধিকাংশ গল্পে আছে গল্প বলা ও লেখা উভয় ঐতিহ্যের এক অপূর্ব মিশ্রণ, যেমনটি আমরা পেয়ে থাকি উত্তরাধুনিক গল্পকথক মার্কেজ কিংবা বোর্হেসের মাঝে। তাই তাকে সমকালীন বাংলা সাহিত্যে উত্তরাধুনিকতার অন্যতম প্রবর্তক বললে অত্যুক্তি হবে না।
২. সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের প্রতিটি গল্পই সমাজে বিদ্যমান মানুষের সমস্যার সফল রূপায়ণ। সমকালীন সমাজে রাজনৈতিক অস্থিরতা, ব্যক্তিকেন্দ্রিক সমাজ, রাষ্ট্র, অর্থনীতি, রাজনীতি_ সবকিছু লেখকের বর্ণনার পরিসরভুক্ত। এ যাবত তার প্রকাশিত ছোটগল্প সংকলন সংখ্যা ৮। তবে এ আলোচনায় তার রচিত 'প্রেম ও প্রার্থনার গল্প' এবং 'সুখদুঃখের গল্প'_ এ দটো সংকলন থেকে কয়েকটি গল্প নিয়ে আলোচনা করব। উপর্যুক্ত সংকলনদ্বয়ের গল্পে লেখকের চরিত্র নির্মাণে এক ধরনের বিচিত্রতা ও ব্যাপ্তি বিদ্যমান। প্রেম ও প্রার্থনার গল্প সংকলনের গল্পে আমরা নানা শ্রেণী-পেশা মানুষের বর্ণনা পাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থেকে মজুর পর্যন্ত। এ থেকে তার শ্রেণী-বৈষম্যহীনতা ও মানব সচেতনতার পরিচয় প্রতীয়মান। আধুনিক জীবনের বিচ্ছিন্নতা আর নিঃসঙ্গতা, সুখ ও অসুখের মননশীল প্রকাশ এই সংকলনের প্রতিটি গল্প। এসব সংবেদী গল্পে জীবন ও জীবনহীনতা একইভাবে মূর্ত হয়। আধুনিক মানুষের বিচ্ছিন্নতা, হতাশা আর সমস্যা দিয়ে লেখকের প্রায় অধিকাংশ গল্পের শুরু। আবার এসব সমস্যা সমাধানে লেখক নিজেই সচেষ্ট ভূমিকা রাখেন। তার গল্পের প্রায় চরিত্রই গল্প শেষে এক ধরনের আশাবাদ ব্যক্ত করে। অতীত ও বর্তমানের মিশেলে বর্তমান বাস্তবতাকে উত্তরাধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ব্যাখ্যা করে থাকেন সৈয়দ ইসলাম। মানব-মনের চেতন ও অবচেতন দিক উন্মোচনেও তিনি অত্যন্ত পারদর্শী। নগর জীবনের দ্বান্দ্বিকতা তার গল্পে সব সময় খুব প্রাসঙ্গিক।
গল্পগুলো কেমন_ তার উদাহরণ হিসেবে প্রেম ও প্রার্থনার গল্প ও সুখদুঃখের গল্প গ্রন্থ দুটি থেকে কয়েকটি গল্প নিয়ে একটু বিস্তারিত আলাপ করা যাক।
৩. প্রেম ও প্রার্থনার গল্প ছোটগল্প সংকলনের 'ডিডেলাসে ঘুড়ি' গল্পে হোসেন মিয়ার গ্যারেজের কর্মচারী ইনাম লুকিয়ে ঘুড়ি ওড়ায়। যদিও ইনাম জানে, তার বাবা সেতু মিয়া ঘুড়ি ওড়াতে গিয়ে মারা গেছেন। হোসেন মিয়া নিজেও অপছন্দ করেন ঘুড়ি ওড়ানো। কারণ ঘুড়ি ওড়াতে গিয়ে তার বড় ভাই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেন। সাংবাদিক আবদুল মুয়ীদ তালুকদার হোসেন মিয়ার গ্যারেজে তার ভেস্পা ঠিক করতে দেন। হোসেন মিয়া ছুটির দিন থাকা সত্ত্বেও মুয়ীদ ভাইয়ের ভেস্পা রেভ দিয়ে দেন। কারণ সাংবাদিক মুয়ীদ তালুকদার হোসেন মিয়ার গ্যারেজ মেয়র সাহেবের লোকজনের হিংস্র থাবা থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন। এভাবেই শুরু গল্প। লেখক ঢাল্কা বাজারের ঘুড়ি তৈরির অন্যতম স্রষ্টা সেতু মিয়াকে গ্রিক পুরাণের ডিডেলাসের সঙ্গে তুলনা করেছেন। ইনাম গ্যারেজে তার হাতের কাজ সেরে আবার ঘুড়ি ওড়াতে চলে যায়। কিন্তু হায়! ঘুড়ি কানি্নর অভাবে শুধু ডান দিকে কানাচ্ছে। ইনাম এই ত্রুটি পূর্বে লক্ষ্য করেনি। ঘুড়ি মাঠের পার্শ্ববর্তী পাঁচ তলা ফ্ল্যাটের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা নারিকেল গাছে আটকে যায়। ঘুড়ি আনতে গিয়ে ইনাম একটি মেয়ের চিৎকার শুনতে পায়। সে দেখতে পায় ঢাল্কা বাজারের সবার চেনা দারোগা সাহেব উলঙ্গ মেয়েটিকে জাপটে ধরেছে। জাপটে ধরার পূর্বে মেয়েটি সাহায্য চেয়েছিল ইনামের কাছে। পরক্ষণেই সে ব্যালকনিতে দারোগা ও তার স্ত্রীকে দেখল। তারা দু'জনে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে মেয়েটিকে। ইনাম মুয়ীদ ভাইকে সব জানাল। মুয়ীদ ভাই কণ্ঠে ও লেখায় তীব্র প্রতিবাদ জানাল। এবং আছমা হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করল। গ্রেফতার হলো অবসরপ্রাপ্ত দারোগা কলিমুল্লাহ্ ও তদীয় স্ত্রী আলেফা বেগম। তবে সত্যধর্মে বিশ্বাসী মানুষজন দেখল রাজনৈতিক আশীর্বাদপুষ্ট দারোগা ও তার স্ত্রী দ্রুত ছাড়া পেল। বরং মামলার নতুন চার্জশিট হলো। এতে ইনামকে দারোগা সাহেবের ঘরের মূল্যবান সামগ্রী চুরির দায়ে অভিযুক্ত করা হলো। বলা হলো, 'ছেলেটা গাছ বেয়ে উঠত, আর আছমা পুঁটলা চালান দিত।' লেখক এ গল্পে সমকালীন রাজনীতির একটি অন্তঃসারশূন্য চিত্র অংকন করেছেন। আবার 'তারা ভাবে তারা সাপ, আসলে তারা রজ্জু' গল্পে লেখক দর্শনের শিক্ষক ওয়াকিলুর রহমানকে দাঁড় করান সমকালীন রাজনীতিতে নৈতিক স্খলনের বিপক্ষে একজন আদর্শনির্ভর মানুষ হিসেবে। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বর্তমান রাজনৈতিক দর্শন ও নৈতিকতার অধঃপতন লক্ষ্য করে দর্শনশাস্ত্র পাঠের প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করেছেন। লেখক তার নিজস্ব দর্শনচিন্তার প্রকাশ ঘটিয়েছেন ওয়াকিলুর রহমানের দর্শন-ভাবনার মধ্য দিয়ে। গল্পে ওয়াকিলুর রহমানের শ্যালক একজন রাজনীতিবিদ। দেশে অপারেশন ক্লিনহার্ট শুরু হওয়ার পর তিনি গা-ঢাকা দিয়েছেন। সহজে বোঝা যায়, রাজনৈতিক কোনো দৃঢ় আদর্শ ও নীতিবোধ তার ছিল না। তা না হলে পালানোর কী দরকার ছিল! লেখক এ প্রসঙ্গে ওয়াকিলুর রহমানের মাধ্যমে বলেছেন, 'বাংলাদেশের মানুষ যদি দর্শনশাস্ত্রকে জননী শাস্ত্র হিসেবে গ্রহণ করত, তাহলে এই অপারেশনের প্রয়োজন হতো না।' লেখকের এই গল্পটি খুবই সিম্বলিক। তবে গল্পটির মূল প্রসঙ্গ ছিল একটাই_ রাজনীতিবিদরা নিজেদের সাপ ভাবলেও আসলে তারা রজ্জুবৎ, অর্থাৎ দড়ি।
৪. এবার বলি সুখদুঃখের গল্প সংকলনের কথা। যেহেতু সুখ-দুঃখ নিত্যদিনের জীবনযাত্রায় অবধারিত উপাদান, তাই নিরবচ্ছিন্ন সুখ কিংবা দুঃখ কোনোটিই মানুষের জীবনে সম্ভব না। সুখ ও দুঃখের দোলাচলে মানবজীবনে প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হয় নানা উত্থান-পতন। সুখদুঃখে আছে স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন। আছে পাওয়ার সুখ, না পাওয়ার বেদনা। আছে কাম-ভোগ-বাসনা। রয়েছে রহস্যে ঘেরা মানব-মন। উত্তর-আধুনিকতার বৈশিষ্ট্য সংবলিত সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের প্রায় প্রতিটি গল্পের ভিত্তি শোনা বা দেখা ঘটনা। বলার অপেক্ষা রাখে না, শহীদুল জহিরের পর, সমকালীনদের মধ্যে তিনিই সর্বাপেক্ষা সফল উত্তরাধুনিক গল্প তৈরিতে। সুখদুঃখের গল্প সংকলনটির গল্পগুলো বাস্তব-অবাস্তব আর জাদুবাস্তবতার মিশেলে পরিবেশিত। নগর আর প্রান্ত বাংলার মানুষ গল্পগুলোর কুশীলব। সুখদুঃখের মনস্তাত্তি্বক বিশ্লেষণও গল্পগুলোতে পাওয়া যায়। মনজুরুল ইসলাম চেষ্টা করেছেন কারণের অন্তরালে যে কারণ তা খুঁজে বর্ণনা করতে। গল্পের চরিত্রগুলো সত্য-অসত্য, নৈতিকতা-অনৈতিকতা দিয়ে ঘেরা। উত্তর-আধুনিকতাবাদের যে বিষয়গুলো গল্পগুলোতে স্পষ্ট তা হলো, চরিত্র নির্মাণে গবেষণা, গতানুগতিক গল্পকাঠামো ও চরিত্র নির্মাণে অনাগ্রহ, গল্প কথনে নতুন ধারা সৃষ্টি, যরনৎরফরঃু ড়ভ পঁষঃঁৎব, মেদহীন বাক্যবিন্যাস এবং শব্দশক্তি উদ্ঘাটন।
৫. পাঠকের আগ্রহ নিবৃত্তায়নে সুখদুঃখের গল্প সংকলন থেকে দু'একটি গল্পের কিছু দিক নিয়ে আলাপ করা যাক । প্রথমেই বলি 'এক জীবন' গল্পটির কথা। গল্পটি বিভিন্ন চরিত্রের বিরতিহীন চৈতন্যপ্রসূ অভিজ্ঞতা ও ভাবনাচিন্তা নিয়ে তৈরি। মূলত এটি একটি কৌশল, যাকে ইংরেজি সাহিত্যে বলে ংঃৎবধস ড়ভ পড়হংপরড়ঁংহবংং ঃবপযহরয়ঁব. ইংরেজি সাহিত্যে এ কৌশল জেমস্ জয়েস ও ভার্জিনিয়া উলফ্ সফলভাবে ব্যবহার করেছেন । সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম 'এক জীবন' গল্পে এই কৌশলটি ব্যবহার করেছেন। গল্পে খুব একটা বহির্মুখী কর্মস্পৃৃহা চোখে পড়ে না। যা ঘটে তার সবটুকুই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলোর মনোরাজ্যে ঘটে যাওয়া চেতন চিন্তার সম্মিলন। এ ধরনের গল্পে সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । পুরো গল্পের সময়সীমা ভোর ৫টা থেকে রাত ১২.৩০-এর মধ্যে। গল্পকার অতি দ্রুত এক চরিত্রের ারবঢ়িড়রহঃ থেকে অন্য চরিত্রে যান। সময় ও চরিত্রগেিলার মনোরাজ্যে চেতন-চিন্তার মধ্যে এক ধরনের মেলবন্ধন তৈরি করেন। এ ধরনের ছোটগল্প লেখার অভিজ্ঞতা বাংলা সাহিত্যে খুব বেশি লেখকের নেই। এ মুহূর্তে মনে পড়ছে রশীদ করিমের নাম, যিনি প্রাগুক্ত ধারায় গল্প-উপন্যাস তৈরিতে পারদর্শী ছিলেন। যেমন তার উপন্যাস 'উত্তম পুরুষ' উক্ত কৌশল অবলম্বনে লেখা। যা হোক, সুখদুঃখের গল্প সংকলনের আরেকটি অসামান্য গল্প 'মেয়ে'। লেখক এখানে সমকালীন সমাজে নারী স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতার চিত্র দেখিয়েছেন। এবং একই সঙ্গে গল্প শেষে নারীর স্বাধীনচেতা রূপটিও দেখিয়েছেন। সামাজিক ভীতি, কুসংস্কার আর জড়তার ঊধর্ে্ব উঠে গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র তার দৃপ্ত প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। এককথায়, সুখদুঃখের গল্প সংকলনে আছে বাবা-মা, ছেলেমেয়ের পারিবারিক দ্বন্দ্ব, আছে বিদ্যমান সমাজ ব্যবস্থায় নারীদের অসহায়ত্ব। রয়েছে মানব-মানবীর শারীরিক ও অশরীরী প্রেম, আছে শুদ্ধ প্রেমাখ্যান। রয়েছে ভালোবাসা না থাকা সত্ত্বেও নারী-পুরুষের একত্রে দিনাতিপাতের কথা এবং আছে আশা-নিরাশার মাঝে বেঁচে থাকা একগুচ্ছ মানব-মানবীর গল্প।
৬. ছোটগল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস, সাহিত্য সমালোচনা ইত্যাদি বহুমাত্রিক সাহিত্য শাখায় সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের পদচারণা সমানভাবে বিস্তৃত। যদিও তিনি নিজেকে বহুমাত্রিক বলতে নারাজ। নিজেকে তিনি এমনকি কথাসাহিত্যিক হিসেবে মানতেও রাজি নন। তিনি নিজেকে কেবল গল্পকথক বলেন। পাঠক মহলে তিনি একজন অনবদ্য ছোটগল্পকার। লেখকের লেখা প্রতিটি ছোটগল্পেই তাই রয়েছে এক ধরনের স্বাচ্ছন্দ্যবোধের ছাপ। তার গল্পের প্রতিটি কাহিনীই প্রতীকাশ্রয়ী ও রূপক বর্ণনা। চলমান প্রতীকায়নে পাঠক কখনও গল্পের মূল কাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন হন না। প্রতিটি গল্পে লেখকের উপস্থিতি আমাদের তার আপন বাস্তবতায় নিয়ে যায়। ফলে আমরাও তার গল্পের পাত্রপাত্রী বনে যাই। সর্বোপরি, অনেকটা নিদ্বর্ির্ধায় বলা যায়, বহুকাল পরেও ভাষাশৈলী, গল্প বলার ধরন, নির্মাণ কৌশল এবং থিমের অনন্যতার জন্য সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের গল্পগুলো প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকবে।

শিক্ষার্থীদের প্রহার নয় by মুফতি এনায়েতুল্লাহ

শিশু শিক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষাবান্ধব আনন্দদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে
শিক্ষকতা পেশায় জড়িত থাকার সুবাদে অভিভাবকদের নানা অনুযোগ ও অভিযোগ কর্মজীবনের নিত্যসঙ্গী। অভিভাবকদের অভিযোগের অন্যতম হলো শিক্ষার্থীদের প্রহারজনিত। অথচ শিক্ষার্থীদের ওপর শিক্ষকের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সরকারিভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ইসলামও নির্দয়ভাবে শিক্ষার্থীদের প্রহারকে সমর্থন করে না। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের অন্যায়, ভুল কিংবা পড়াশোনায় অমনোযোগী হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। এর জন্য সংশিল্গষ্ট শিক্ষার্থীর অভিভাবকের পাশাপাশি সংশিল্গষ্ট শিক্ষকরাও সহনীয় মাত্রায় শিক্ষার্থীকে শাসন করে থাকেন। এটা নিয়ে অভিভাবকরাও উদ্বিগ্ন নন; কিন্তু শিক্ষার্থীদের বেদম প্রহার করে জখম করা কিংবা পিটিয়ে মেরে ফেলার মধ্যে কী মঙ্গল থাকতে পারে, এটা বোধগম্য নয়। শিক্ষার্থীর মঙ্গলকামী কোনো শিক্ষক এমন জঘন্য কাজ করতে পারেন না। শিশুদের বা অন্য কাউকে প্রহার করা সম্পর্কে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, 'যে ব্যক্তি কাউকে অন্যায়ভাবে প্রহার করবে কিয়ামতের দিন তার থেকে এর প্রতিশোধ গ্রহণ করা হবে।'-তাবারানি আল্লামা ইবনে খালদুন ছাত্রদের প্রহার ও কঠোরতাকে ক্ষতিকর বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, 'প্রহার ও কঠোরতার কারণে শিশুদের মাঝে মিথ্যা বলার মানসিকতা সৃষ্টি হয়। তাদের আত্মমর্যাদাবোধ ও উচ্চ চেতনা দূর হয়ে যায়। শিক্ষকের মারধর থেকে বাঁচার জন্য তারা নানা অপকৌশল, মিথ্যা ও প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণ করে। পরবর্তীকালে এসব ত্রুটি তাদের মধ্যে বদ্ধমূল হয়ে যায়। উত্তম চরিত্র ও সুন্দর মানসিকতার পরিবর্তে অসৎ চরিত্র ও অনৈতিকতার ভিত রচিত হয় তাদের মাঝে।' আমাদের শিক্ষকের মনে রাখা দরকার, শরিয়তের দৃষ্টিতে শিশুরা সব ধরনের দায়ভার ও জবাবদিহিতা থেকে মুক্ত। তারা শারীরিকভাবে যেমন দুর্বল তেমনি মানসিকভাবেও কোমল। তাই তাদের সঙ্গে কোমল আচরণ করতে হবে। তাদের শিক্ষাদান করতে হবে স্নেহ-মমতা দিয়ে। এ ক্ষেত্রে কঠোরতা পরিহার করে নম্রতা ও কোমলতা অবলম্বন করতে হবে। হাদিসে আছে, হজরত আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, 'আল্লাহতায়ালা কোমল আচরণকারী, তিনি সর্বক্ষেত্রে কোমলতাকে ভালোবাসেন।' -সহিহ বোখারি
ইমাম মুহিউদ্দীন নববি (রহ.) শিক্ষকের জন্য করণীয় বিষয় সম্পর্কে দীর্ঘ আলোচনায় বলেন, 'শিক্ষকের উচিত তার ছাত্রের সঙ্গে নরম ব্যবহার করা, তার প্রতি সদয় হওয়া। তার কোনো ভুল হলে বা অসৌজন্যমূলক আচরণ প্রকাশ পেলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখা। বিশেষত শিশু-কিশোরদের বেলায়।' আগেকার দিনের শিক্ষার্থীরা গুরুগৃহে শিক্ষা গ্রহণ করত। সেখানে শিক্ষক পরম স্নেহে ছাত্রকে শিক্ষা প্রদান করতেন। শাসন করতেন, তবে তা সীমা ছাড়িয়ে যেত না। তাদের শাসনের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীকে আদর্শবান করে গড়ে তোলা। বর্তমানে শিক্ষা অর্জনের সে পরিবেশ ও মনমানসিকতা যে একেবারে বিলীন হয়ে গেছে তা নয়। সরকারি-বেসরকারি অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এখনও শিক্ষার্থীরা পরমানন্দে শিক্ষা অর্জন করছে। সেখানে প্রচুর শিক্ষক-শিক্ষিকা আছেন, যারা অপত্য স্নেহে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করে থাকেন। এ কারণে প্রায়শই বলা হয়ে থাকে, ভালো বিদ্যালয় শিশু শিক্ষার্থীদের কাছে বাড়ির চেয়েও আপন। সেখানে শিক্ষকদের স্নেহ-ভালোবাসায় কঠিন বিষয়ও ছাত্রছাত্রীদের কাছে আনন্দদায়ক হয়ে ওঠে। হাসি-আনন্দে সময় কাটে শিক্ষার্থীদের।
শারীরিক ও মানসিক শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ভীতিকর স্থানে পরিণত করার প্রবণতাকে আমরা সমর্থন করতে পারি না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমন পরিবেশ সৃষ্টি করা উচিত, যাতে শিক্ষার্থীরা সেখানে থাকতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। নিষ্ঠুরভাবে প্রহার করলে আর যা-ই হোক শিক্ষার্থীর প্রতি শিক্ষকের ভালোবাসার প্রকাশ ঘটে না। শিক্ষার্থীদের প্রতি একশ্রেণীর শিক্ষকের এই আচরণ সম্পূর্ণ অমানবিক। এ বিষয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক সংগঠন, অভিভাবক ও প্রশাসনসহ সংশিল্গষ্ট সবাইকে তৎপর হতে হবে। শিক্ষক নামধারী কোনো মায়া-মমতাহীন ব্যক্তির স্থান যাতে শিক্ষায়তনগুলোতে না হয় সে ব্যাপারেও কর্তৃপক্ষকে খেয়াল রাখতে হবে। ইসলামের দৃষ্টিতে রাগান্বিত অবস্থায় শিশুদের প্রহার করা অন্যায়। এ প্রসঙ্গে এক হাদিসে এসেছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলে কারিম (সা.) ইরশাদ করেছেন, 'তোমরা শিক্ষাদান করো, সহজ ও কোমল আচরণ করো; কঠোর আচরণ করো না। যখন তুমি রাগান্বিত হবে তখন চুপ থাক। যখন তুমি রাগান্বিত হবে তখন চুপ থাক। যখন তুমি রাগান্বিত হবে তখন চুপ থাক (এ কথা তিনবার বললেন)।' -মুসনাদে আহমদ
শিশু শিক্ষার্থীদের প্রহার সম্পর্কে হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেন, 'কখনও রাগান্বিত অবস্থায় শিশুকে প্রহার করবে না। পিতা ও শিক্ষক উভয়ের জন্যই এ কথা।' বিখ্যাত ইসলামী স্কলার মুফতি শফি (রহ.) বলেছেন, 'শিশুদের প্রহার করা খুবই ভয়াবহ। অন্যান্য গুনাহ তওবার মাধ্যমে মাফ হতে পারে। কিন্তু শিশুদের ওপর অত্যাচার করা হলে এর ক্ষমা পাওয়া খুবই জটিল। কেননা এটা হচ্ছে বান্দার হক। আর বান্দার হক তওবার মাধ্যমে মাফ হয় না_ যে পর্যন্ত না যার হক নষ্ট করা হয়েছে সে মাফ করে। এদিকে যার ওপর জুলুম করা হয়েছে সে হচ্ছে অপ্রাপ্ত বয়স্ক। অপ্রাপ্ত বয়স্কের ক্ষমা শরিয়তের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। এ জন্য এ অপরাধের মাফ পাওয়া খুবই জটিল। তাই শিশুদের প্রহার করা এবং তাদের সঙ্গে মন্দ ব্যবহার করার বিষয়ে সাবধান হওয়া দরকার।'
শিশু শিক্ষার ক্ষেত্রে এসব ধর্মীয় দিকনির্দেশনা ও নীতি-নৈতিকতার বিষয়টি বাদ দিলেও শিশুদের প্রহারের অশুভ প্রতিক্রিয়া সমাজে নানাভাবে পরিলক্ষিত হয়। যেমন যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সুনামের সঙ্গে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে আসছে, শিক্ষার্থী প্রহারের দু'একটি ঘটনা তার সুনাম নষ্ট করে দেয়। সে সঙ্গে শিশুদের শিক্ষার প্রতি বিরূপ মানসিকতা সৃষ্টি হয়। ফলে এ অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায় যে, বাচ্চারা বিদ্যালয়ে যেতে চায় না_ শিক্ষকের মারধর ও কঠোরতার কারণে। অন্যদিকে মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষকদের ব্যাপারেও এ দুর্নাম রটে যায় যে, তারা সবাই ছাত্রদের প্রহার করেন। গুটিকয়েক শিক্ষকের জিঘাংসা ও অজ্ঞতামূলক আচরণের কারণে গোটা শিক্ষক সমাজকে দুর্নাম বহন করতে হয়। তাই আমরা আশা করব, আমাদের শিক্ষকরা শিশু শিক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে সহনীয় আচরণ করবেন, কোমলমতি এসব শিক্ষার্থীর স্নেহ, ভালোবাসা ও মায়া-মমতা দিয়ে তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নির্মাণে সচেষ্ট হবেন। নতুন শিক্ষা বছরের সূচনালগ্নে শিক্ষক সমাজের কাছে এ প্রত্যাশা রইল।
মুফতি এনায়েতুল্লাহ : শিক্ষক ও কলাম লেখক
muftianaet@gmail.com

বিচারের জন্য আর কত অপেক্ষা?

(মানিক সাহা হত্যাকাণ্ড) সাংবাদিক মানিক সাহা হত্যা মামলার বিচারকাজ এক দশকে শেষ করা যায়নি। গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীকে হাজির করতে না পারা, বারবার আদালত পরিবর্তনসহ নানবিধ কারণে মামলাটির নিষ্পত্তি হচ্ছে না। তদুপরি হত্যাকারীদের মধ্যে প্রভাবশালী কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গও থাকতে পারেন। হয়তো এই নির্ভীক সাংবাদিকের কোনো অনুসন্ধানী রিপোর্ট তাকে হত্যার টার্গেটে পরিণত করেছিল। তবে পুলিশের তদন্ত রিপোর্টে প্রধানত এজন্য ওই অঞ্চলের চরমপন্থিদের দায়ী করা হয়েছে। আর এটাই যদি সত্যি হয়ে থাকে তা হলে কাদের সিদ্ধান্তে, কারা তাকে হত্যা করেছিল, তাদের ঠিকুজিও পুলিশের জানা থাকার কথা। তারপরও অপরাধীরা কেন হত্যাকাণ্ডের এক দশক পরও ধরাছোঁয়ার বাইরে তা রহস্যজনক। বুধবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সাংবাদিক সমাজের ব্যানারে আয়োজিত তার স্মরণসভায় সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ হত্যাকাণ্ডটির উপযুক্ত তদন্তের জন্য বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠনের দাবি করেছেন। কিন্তু বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠন করলেই যে এর বিচার দ্রুত পাওয়া যাবে তার নিশ্চয়তা কী? আমাদের সমাজে অপরাধীরাই দোর্দণ্ড প্রতাপশালী এবং তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতাধরদের সহায়তা পেয়ে থাকে। এ কারণেই অনেক অপরাধের বিচার এ দেশে পাওয়া যায় না। সাংবাদিকরা যেহেতু সমাজে সম্মান পেয়ে থাকলেও সেই অর্থে ক্ষমতাধর নন এবং যেহেতু ক্ষমতাধরদের অনেক ক্ষেত্রেই চক্ষুশূল হয়ে থাকেন, তাই সাংবাদিক হত্যাকাণ্ড আমাদের সমাজের উপরতলায় কাঁপন ধরায় না। আর সামাজিকভাবে গণতান্ত্রিকতা প্র্যাকটিস না হওয়ার কারণে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর ন্যায়বিচার প্রশ্নে এখানে অনুচ্চ থাকে। সে কারণে মানিক সাহার মতো একজন নিবেদিতপ্রাণ সাংবাদিক হত্যা হলে তার বিচার শেষ হয় না। আমাদের দুর্ভাগ্য, এ দেশে অনেক সাংবাদিক হত্যার শিকার হলেও একমাত্র সমকালের ফরিদপুর ব্যুরোপ্রধান গৌতম দাস হত্যাকাণ্ডের বিচার শেষ করা গেছে। এটিও নিরন্তর চেষ্টা এবং সরকারের উচ্চ পর্যায়ের বলিষ্ঠ পদক্ষেপের কারণে সম্ভব হয়েছে। আমরা অবিলম্বে মানিক সাহা হত্যাকাণ্ডসহ সব সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডেরও বিচার চাই। দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনেই এসব হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

বাস্তবোচিত সঠিক সিদ্ধান্ত

(বিরোধী দলের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি) বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গণতন্ত্রের জন্য শান্তিপূর্ণ আন্দোলন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন এবং সরকারের সঙ্গে সংলাপ ও সমঝোতার জন্য তার দল ও জোটের আগ্রহ ব্যক্ত করেছেন। বিদ্যমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতার এ অবস্থান সাধুবাদ পেতে পারে। গত সোমবার সমকালের 'টানা অবরোধ স্থগিত/বিচক্ষণ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই' শিরোনামের সম্পাদকীয়তে লেখা হয়, দশম সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে না হলেও বিএনপিকে মনে রাখতে হবে যে, এই নির্বাচন সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার বাধ্যবাধকতার প্রেক্ষাপটে হয়েছে। এখনই সরকার পতনের আন্দোলনে সাড়া মিলবে বলে মনে হয় না। আশার কথা, সরকারপক্ষও রাজপথে বিরোধীদের পরাস্ত করার পথ থেকে সরে আসছে। বিএনপি এখন সংসদে নেই। তবে তারা একটি প্রধান রাজনৈতিক দল। তাই তাদের সঙ্গে অবশ্যই সংলাপে বসতে হবে। সরকারের তরফে উচিত হবে তাদের স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করা। বুধবারের সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি চেয়ারপারসন যে কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন তাতে অশান্তি সৃষ্টির সুযোগ কম। ১৮ দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে দুই দিন আগে তার বৈঠকের পর ২৯ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদের অধিবেশনের উদ্বোধনী দিনে হরতাল আহ্বান করা হবে_ এমন সংবাদ গণমাধ্যমে এসেছিল। হরতাল না ডেকে ২০ ও ২৯ জানুয়ারি দেশব্যাপী গণসমাবেশ ও কালো পতাকা মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। গত দুই বছর ধরে এ জোটের তরফে একের পর এক অবরোধ-হরতাল কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানানো হয়। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে খালেদা জিয়া 'প্রহসন' হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এবং নতুন সরকারকে 'অবৈধ' অভিহিত করে অনতিবিলম্বে এ 'বিপজ্জনক সরকারকে' সরিয়ে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়ে একটি জনগণের গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে যে ধরনের রাজপথের কর্মসূচিতে জনগণের সমর্থন নেই, তা সম্পূর্ণ পরিহার করেছেন। নতুন সরকার গঠনের পর কয়েকজন সিনিয়র মন্ত্রী সংলাপের ওপর জোর দিয়েছেন। গতকালও কূটনীতিকরা দ্রুত সংলাপ অনুষ্ঠানের তাগিদ দিয়েছেন। এখন উভয় দিক থেকেই আন্তরিক উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে। অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং জনজীবনে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য এখন নিরবচ্ছিন্ন শান্তি ও স্থিতি প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে চাই সব পক্ষের আন্তরিক সহযোগিতা। একে অপরকে ঘায়েল করার চিন্তা পরিহার করুন। দেশ ও জনগণের ওপরে কেউ থাকতে পারে না। এখন অপেক্ষাকৃত সুস্থির সময় চলছে। আশা থাকবে যে, উভয় পক্ষ এ সময়ে নিজেদের অতীত কর্মকাণ্ড ধৈর্যের সঙ্গে মূল্যায়ন করবে এবং ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা প্রণয়নে তার যথাযথ প্রতিফলন ঘটাবে। কোনো পক্ষেরই এখন এমন কিছু করা উচিত হবে না, যা হঠকারী হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তাতে দল, জোট কিংবা দেশের কোনো লাভ নেই।

ইংল্যাকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত শুরু

থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে দেশটির দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা। গতকাল বৃহস্পতিবার এ তথ্য জানিয়েছে সংস্থাটি। সরকারবিরোধী আন্দোলনের মুখে থাকা ইংলাক সরকারের জন্য এটি আরেক বড় আঘাত হয়ে দেখা দিতে পারে। থাইল্যান্ডের জাতীয় দুর্নীতিবিরোধী কমিশন জানায়, ধানচাষিদের জন্য গৃহীত ভর্তুকি প্রকল্পে প্রধানমন্ত্রী ইংলাক তার দায়িত্বে অবহেলা করেছেন কিনা এটিই তারা অনুসন্ধান করছে। গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে কমিশনের মুখপাত্র জানান, প্রধানমন্ত্রী ফৌজদারি আইন লঙ্ঘন করেছেন কিনা এটি খতিয়ে দেখা হবে। তবে অপরাধী প্রমাণিত হলে তার কী শাস্তি হতে পারে সে বিষয়ে কিছু জানায়নি সংস্থাটি। ইংলাকের সঙ্গে আরও ১৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনবে সংস্থাটি। তাদের মধ্যে সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রীও রয়েছেন। চাষিদের জন্য নেওয়া ওই প্রকল্পে ঘোর আপত্তি জানিয়েছিল ইংলাকবিরোধীরা। এর মাধ্যমে ইংলাক তার জনপ্রিয়তা বাড়াচ্ছেন বলে অভিযোগ ছিল তাদের। প্রায় মাস দুয়েক আগে বিরোধীদের আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকে নানামুখী চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে ইংলাক সরকারের ওপর। থাইল্যান্ডে এতদিন ধরে প্রায় শান্ত থাকা সরকারবিরোধী আন্দোলন এবার সহিংস হয়ে ওঠার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রা পদত্যাগে বাধ্য হলে পরিস্থিতি মোকাবেলায় তার সমর্থকরা বিপুল অস্ত্র মজুদ করছে বলে খবর ছড়িয়েছে। খবর টাইমস ও এপির।
গতকাল বৃহস্পতিবার চতুর্থ দিনের মতো 'ব্যাংকক অচল কর্মসূচি' নিয়ে রাজধানীতে অবস্থান করছে সরকারবিরোধী হলুদ শার্ট সমর্থক ও প্রধান বিরোধী দল ডেমোক্র্যাট পার্টির নেতাকর্মীরা। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কে অবস্থান নিয়েছে তারা। যদিও তাতে জনসমাগম কমে আসছে। গতকাল তারা আরও কয়েকটি সরকারি ভবন অবরুদ্ধ করে। আগে এসব ভবনে প্রবেশ করেনি তারা। ইংলাককে পদত্যাগে বাধ্য করতে এসব ভবন অবরুদ্ধ করে সরকারি কার্যক্রম অচল করে ফেলেছে তারা। দুই মাস আগে আন্দোলনের শুরুতেও বেশ ক'টি গুরুত্বপূর্ণ ভবন অবরুদ্ধ করেছিল বিক্ষোভকারীরা। ব্যাংকক পোস্ট নামের একটি থাই দৈনিক জানায়, প্রধানমন্ত্রী ইংলাক ও তার ভাই সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রার সমর্থক লাল শার্টধারীরা বিপুল অস্ত্রের মজুদ গড়ে তুলছে। সামরিক বা বিচার বিভাগের হস্তক্ষেপে ইংলাক যদি ক্ষমতা ত্যাগে বাধ্য হন_ এই পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখেই এ প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা। লাল শার্টধারীদের একটি সূত্রের উদৃব্দতি দিয়ে ব্যাংকক পোস্ট জানায়, 'লাল শার্টধারীদের মধ্যে প্রবল সামরিক অভ্যুত্থান ও আদালতবিরোধী মনোভাব রয়েছে। লাল শার্ট সমর্থকরা অস্ত্রের ব্যবহারের সঙ্গে পরিচিত ও অভিজ্ঞ।'
ইংলাকবিরোধীদের অভিযোগ হচ্ছে, তিনি তার ভাই ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রার নীতির ভিত্তিতে সরকার পরিচালনা করছেন। পারিবারিক সম্পদ ও রাষ্ট্রীয় তহবিল ব্যবহার করে ভোটারদের প্রভাবিত ও ক্ষমতা সুসংহত করছেন। ইংলাকবিরোধীরা মূলত দেশের দক্ষিণাঞ্চলের এবং শহুরে মধ্য ও উচ্চবিত্ত শ্রেণীর। কিন্তু সিনাওয়াত্রা পরিবারের প্রতি দেশের গ্রামীণ অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ দরিদ্র জনসাধারণের ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে। থাকসিন ক্ষমতায় থাকাকালে জনপ্রিয় কিছু কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে তাদের সমর্থন আদায় করেন। ২০০৬ সালে সেনা অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে স্বেচ্ছা নির্বাসনে রয়েছেন থাকসিন। গত নভেম্বরে থাকসিন পরিবারের প্রভাবমুক্ত রাজনীতি গড়ার ডাক দিয়ে ইংলাকের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে রাজা, সেনাবাহিনী ও অভিজাতদের সমর্থক হলুদ শার্টধারীরা। তাদের আন্দোলনের মুখে পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়ে ২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন ইংলাক। কিন্তু বিরোধীরা এতে অংশ নিতে অস্বীকার করেছে। কেননা থাইল্যান্ডে কোনো নির্বাচন হলে তাতে সিনাওয়াত্রা পরিবারই জয়ী হয়।

প্রিয়াংকার গ্গ্ন্যামারও কংগ্রেসকে বাঁচাতে পারবে না :মানেকা

ভারতের ক্ষমতাসীন কংগ্রেসের কঠোর সমালোচনা করলেন গান্ধী পরিবারেরই এক সদস্য ও বিজেপি সাংসদ মানেকা গান্ধী। সঞ্জয় গান্ধীর পত্নী মানেকা বলেন, রাহুল গান্ধী এমনকি তার বোন প্রিয়াংকা গান্ধীও এবার কংগ্রেসকে বিপর্যয় থেকে বাঁচাতে পারবে না। এ ছাড়া নরেন্দ্র মোদি ও রাহুল গান্ধীর লড়াইকে 'সিংহ ও পাখি'র মধ্যে লড়াই বলে মন্তব্য করেন তিনি। জিনিউজ অনলাইন। একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কংগ্রেসের কঠোর সমালোচনা করে মানেকা বলেন, গত ১০ বছরে দেশের সম্পদ লুটেছে কংগ্রেস। তাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ ভারতীয়রা আগামী লোকসভা নির্বাচনে এর কঠোর জবাব দেবে। রাহুল বলুন আর তার বোন প্রিয়াংকা বলুন, কোনো গান্ধীই কংগ্রেসকে এবার বাঁচাতে পারবে না। বিজেপির এই নেতা ইউপিএ সরকারকে ডুবন্ত জাহাজের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, 'দুর্নীতি কংগ্রেসকে ধ্বংস করেছে। তাদের সরকার এখন একটি ডুবন্ত জাহাজ। প্রিয়াংকা বা রাহুল কেউই সে জাহাজকে বাঁচাতে পারবে না।' এমনকি প্রিয়াংকার গ্গ্ন্যামারও না। এর আগে তারা রাহুলকে সামনে এনেছিল যা ব্যর্থ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং রাহুল গান্ধীর প্রশংসা করেছেন। এ বিষয়ে মানেকা বলেন, 'যিনি এ কথা বলেছেন তিনি কি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নাকি কংগ্রেসের প্রধানমন্ত্রী। ১০ বছর ধরে রাহুল ও সোনিয়া গান্ধী দেশ চালিয়েছেন। তাদের কাছ থেকে আমরা কী পেলাম? আসল কথা হলো কংগ্রেসে আর কোনো সৎ নেতা নেই, যে দেশকে সঠিক পথে নিয়ে যেতে পারে।

নতুন সংবিধানের পক্ষে রায় দিল মিসর

মিসরে নতুন সংবিধান অনুমোদনের জন্য গৃহীত দু'দিনের গণভোটে নতুন সংবিধানের পক্ষে ব্যাপক সমর্থন দিয়েছেন ভোটাররা। এ ছাড়া ভোটদানের হারও আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি বলে জানিয়েছেন নির্বাচনী কর্মকর্তারা। দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, ৯৫ শতাংশ ভোটার নতুন সংবিধানের পক্ষে রায় দিয়েছেন। অন্যদিকে, ভোটারের উপস্থিতি ছিল ৫০ শতাংশের বেশি। আজ শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে ফল প্রকাশ করা হতে পারে। গত মঙ্গল ও বুধবার_ দু'দিনে এই ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়। এখন চলছে ভোট গণনা। এই ভোটে মানুষের কাছ থেকে ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছে সামরিক বাহিনী সমর্থিত সরকার। মিসরের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মেজর জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ ওসমান বেসরকারি টেলিভিশন আল হায়াতকে বলেছেন, দেশের ৫৫ শতাংশের বেশি মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন এবং ভোটদাতাদের ৯৫ শতাংশের বেশি সংবিধানের পক্ষে রায় দিয়েছেন। দেশটির শীর্ষ নির্বাচনী কর্মকর্তা নাবিল সালিব জানান, 'আগের যে কোনো নির্বাচনের চেয়ে এবার ভোটারের উপস্থিতি ছিল অনেক বেশি। তবে কত শতাংশ ভোট পড়েছে, তা স্পষ্ট করে না জানিয়ে তিনি বলেন, 'আমরা আশা করছি, এ হার ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে।' বুধবার রাতে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা মেনা সরকারি কর্মকর্তাদের উদৃব্দতি দিয়ে জানিয়েছে, ৯০ শতাংশ ভোটার নতুন সংবিধান অনুমোদন করে 'হ্যাঁ' ভোট দিয়েছেন। তবে ব্রাদারহুড প্রভাবিত এলাকাগুলোতে ভোট কম পড়েছে বলে জানা গেছে।
এর আগে মুরসির শাসনামলে ৩৩ শতাংশ মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগ করে, যার মধ্যে ৬৪ শতাংশ 'হ্যাঁ' ভোট দিয়েছিল। মুসলিম ব্রাদারহুড ব্যাপক চাপে থাকায় তারা 'না' ভোটের পক্ষে তেমন কোনো প্রচারও চালাতে পারেনি। ভোটের দু'দিনে ৪৪৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে মিসরের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া পুলিশ ও সরকার সমর্থকদের সঙ্গে সংঘর্ষে ১১ জন নিহত হন। গণভোটের ফলাফলের ভিত্তিতে এখন সেনা অভ্যুত্থানের নায়ক জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২০১৩ সালের জুলাইয়ে সেনাবাহিনী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করে। মুরসির শাসনামলে প্রণীত সংবিধান বাতিল করে নতুন সংবিধান প্রণয়নের কাজ শুরু করে। সেই খসড়া সংবিধানের ব্যাপারে এ গণভোট অনুষ্ঠিত হলো। মিসরের ভঙ্গুর অর্থনীতি আর রাজনৈতিক অস্থিরতা দূর করতে নতুন সংবিধান প্রণয়নকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে মনে করা হচ্ছে। এ বছরের মাঝামাঝি সময়ে দেশটিতে প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচনের কথা রয়েছে।