Showing posts with label মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর. Show all posts
Showing posts with label মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর. Show all posts

Tuesday, February 2, 2016

যানজট: স্বল্পমেয়াদি কয়েকটি পদক্ষেপ by মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

রাজধানী ঢাকার যানজট অনেক আগেই অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। ঢাকায় বসবাসরত ও কর্মোপলক্ষে আগত কারও পক্ষে এখন ঢাকায় দিনে-রাতে দুটির বেশি প্রোগ্রাম করা সম্ভব নয়। যানজটকে বাস্তবতা মেনে নিয়ে রাজধানীর মানুষ এখন তাদের দিনের কর্মসূচি প্রণয়ন করে।
ঢাকার যানজট প্রচলিত অর্থে কোনো ‘স্থানীয়’ সমস্যা নয়। এ মহানগরে সারা দেশ থেকে প্রতিদিন মানুষ আসে নানা কাজে, নানা প্রান্তে তাদের যেতে হয়। এখানে সচিবালয়, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর অফিস, মন্ত্রীদের অফিস, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের হেড অফিস, দূতাবাস, বিদেশি সংস্থার অফিস, বেসরকারি সংস্থার প্রধান কার্যালয়, আরও কত কী!
যেকোনো সমস্যার তিন ধরনের সমাধান থাকে। স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি। যানজট নিরসনে সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি কয়েকটি সমাধানের কাজ করতে দেখা যাচ্ছে। ফ্লাইওভার ও মেট্রোরেল নির্মাণ। প্রথমটির ফল পেতে আরও দুই থেকে তিন বছর, দ্বিতীয়টির ফল পেতে পাঁচ থেকে সাত বছর লাগতে পারে। দুটোই গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় কাজ। মেট্রোরেল যানজট সমস্যার অনেকটা সমাধান করতে পারবে বলে মনে হয়। কারণ, মেট্রোরেল একসঙ্গে কয়েক হাজার যাত্রী নিয়ে চলাচল করবে। কিন্তু ফ্লাইওভার যানজট নিরসনে খুব একটা বড় ভূমিকা রাখতে পারবে না বলে অনেক বিশেষজ্ঞ বলেছেন। ফ্লাইওভার যেমন অনেক গাড়িকে রাস্তা থেকে ওপরে নিয়ে যাবে, তেমনি প্রতিবছর আরও হাজার হাজার নতুন গাড়ি রাস্তায় নামবে। গাড়ি কেনার ব্যাপারে বাংলাদেশে কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। টাকা থাকলে পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের জন্য অনেকে গাড়ি কিনছেন। কাজেই ফ্লাইওভার যানজট নিরসনে বড় ভূমিকা পালন করবে না। ঢাকার মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার ও চট্টগ্রামে বহদ্দারহাটের ফ্লাইওভার তার দুটি প্রমাণ। কিন্তু সরকার ফ্লাইওভার নির্মাণে দারুণ উৎসাহী।
সরকার যেদিকে মনোযোগ দিচ্ছে না, তা হলো স্বল্পমেয়াদি সমাধান। এ ব্যাপারে সরকার সক্রিয় নয় বলে যানজট সমাধানে সরকারের অনাগ্রহ প্রকাশ পায়। স্বল্পমেয়াদি সমাধান কী কী? এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞরাই ভালো বলতে পারবেন। তবে একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমরা কয়েকটি ধারণা এখানে বলতে পারি।
১. সরকার পর্যায়ক্রমে এক বছরের মধ্যে ৫০০ আধুনিক এসি ও নন-এসি বাস রাস্তায় নামানোর জন্য প্রাইভেট সেক্টরকে নানা প্রণোদনা দিতে পারে। বাস কোম্পানি গঠন, রুট প্ল্যান, বাস স্টপ, বাসের রং নির্ধারণ করে দিতে পারে। ঢাকার জন্য যারা বড় বাস আমদানি করবে (দুই বছর), তাদের নানা আর্থিক প্রণোদনা (ঋণ, কর হ্রাস, আয়কর দুই বছর মওকুফ) দিতে পারে। রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও লক্কড়ঝক্কড় বাসের মালিকদের বাস আমদানির জন্য অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে, যাতে তাঁরা ঢাকা শহরের মূল রাজপথে রিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা আর না চালান। রিকশা ও অটোরিকশার যাত্রীরা যেন প্রধান রাস্তার পাশে সব রকম গন্তব্যে বাসে করে যেতে পারে। পুরান ঢাকার জন্য কয়েকটি কোম্পানি করে নতুন ও পরিকল্পিত রুটে মাইক্রোবাস চালানোর ব্যবস্থা করা যায়। (বড় বাস সেখানে না চালানোই ভালো হবে।) ঢাকায় (এ মাথা থেকে ও মাথা, স্টপ, নন-স্টপ এক্সপ্রেস) পরিকল্পিত রুটে সীমিত কোম্পানির মাধ্যমে, এসি ও নন-এসি আধুনিক বাস চলাচল করলে আমাদের ধারণা ৫০ শতাংশ গাড়ির চলাচল কমে যাবে। পাশাপাশি নির্ধারিত স্থান ছাড়া গাড়ি পার্কিং করতে না দিলে, ‘নিষিদ্ধ’ জায়গায় গাড়ি পার্কিং করলে ন্যূনতম ৫০০ টাকা দণ্ড দিতে হলে, পার্কিং জোনেও এক বা দুই ঘণ্টার বেশি পার্কিং করলে ঘণ্টাপ্রতি টাকা দণ্ড দিতে হলে অনেকে কর্মদিবসে গাড়ি ব্যবহার করবেন না। শুক্র, শনি ও সরকারি ছুটির দিনে এসব শর্ত শিথিল করা যায়। এগুলো নতুন চিন্তা নয়। উন্নত দেশে এগুলো সবাই দেখেছেন। মন্ত্রী, সচিব, এমপিরাও দেখেছেন। কিন্তু তাঁরা বিদেশের এসব ভালো দৃষ্টান্ত নিজের দেশে বাস্তবায়ন করতে পারেননি। কেন পারেননি, সে কথা কোনো মন্ত্রী, সচিব ও এমপির মুখে কখনো শুনিনি।
সম্প্রতি উত্তর সিটির মেয়র আনিসুল হক বলেছেন, তিনি অচিরেই ঢাকায় ৫০০ বাস নামাবেন। তাঁর এই পরিকল্পনা বিস্তারিত জানা যায়নি। তবে এটুকু বলতে পারি, বাস নামানো তাঁর কাজ নয়। তা ছাড়া সরকারি কোনো সংস্থা বাস না নামালেই ভালো হয়। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘সরকারের কাজ ব্যবসা করা নয়।’ আমরা বিআরটিসির ব্যর্থতা দেখেছি। মেয়র সাহেব তাঁর পরিকল্পনার কথা যোগাযোগমন্ত্রীকে বলতে পারেন, যাতে মন্ত্রী ঢাকায় ৫০০ বাস নামানোর জন্য একটা নীতিমালা ও প্রণোদনা ঘোষণা করেন। বাসের ব্যবসা করবে প্রাইভেট সেক্টর।
২. ঢাকার হকার-অধ্যুষিত ফুটপাত পর্যায়ক্রমে মুক্ত করতে পারলে অনেক নাগরিক রাস্তা ছেড়ে ফুটপাত দিয়ে চলাচল করতে পারবে। তবে তার আগে থানা পর্যায়ে হকারদের জন্য নির্দিষ্ট এলাকা বরাদ্দ করতে হবে ঘণ্টা হিসেবে ভাড়া নিয়ে। সব হকারের দোকান হবে অস্থায়ী। তারও আগে হকারদের ফি দিয়ে লাইসেন্স নিতে হবে। উন্মুক্ত জায়গা পাওয়ার ভিত্তিতে হকার-সংখ্যা নির্ধারণ হবে। এভাবে ছয় মাসের মধ্যে ঢাকার হকারবহুল সব ফুটপাত হকারমুক্ত করা সম্ভব। শুক্র ও শনিবার বড় মাঠে বা বিশেষ এলাকায় ‘হলিডে মার্কেট’ (হকারদের) বসার অনুমতি দেওয়া যায়। নাগরিকেরা ফুটপাত ব্যবহার করে হেঁটে কাছের গন্তব্যে যেতে পারলে অনেকে বাস, রিকশা বা অটো নিতে আগ্রহী হবে না। এতেও যানবাহনের ব্যবহার কিছুটা কমবে, রাস্তা পরিষ্কার হবে।
৩. গাড়ি পার্কিং ঢাকার একটি সমস্যা। পার্কিং সম্পর্কে ঢাকায় কোনো সরকারি নীতি নেই। শুধু কিছু জায়গায় ‘নো পার্কিং’ সাইন দেখা যায়। তবে ‘ইয়েস পার্কিং’ কোথায়, তা চিহ্নিত নয়। ঢাকার কোনো কর্তৃপক্ষ পার্কিং-নীতি ঘোষণা করেনি। এ ব্যাপারে একটা নীতিমালা ঘোষণা করা দরকার। ‘নো পার্কিং’ ও ‘ইয়েস পার্কিং’ চিহ্নিত করা দরকার। এই মুহূর্তে শহরে খালি জায়গায় অন্তত কুড়িটি বহুতল পার্কিং ভবন সরকারিভাবে তৈরি করা উচিত। জনবহুল, অফিসবহুল এলাকায় বহুতল পার্কিং ভবন তৈরি করতে হবে। ঘণ্টা হিসেবে ফি দিয়ে গাড়ি পার্কিং করতে হবে। সরকারের এই প্রকল্প সফল হলে একই মডেলে প্রাইভেট সেক্টরকে সরকারি জমিতে বহুতল পার্কিং ভবন তৈরির জন্য প্রণোদনা দিতে হবে। কোনো ব্যস্ত সড়কে গাড়ি পার্কিং করতে দেওয়া যাবে না। মতিঝিলে সিটি সেন্টারে গাড়ি পার্কিং করতে হবে। নিজের অফিসের সামনে বা পাশে গাড়ি পার্কিং নিষিদ্ধ করতে হবে। অনেক দূর হেঁটে পার্কিং জোনে গাড়িতে ওঠার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। বিভিন্ন গন্তব্যে আধুনিক এসি বাস রুট চালু হলে এমনিতে গাড়ি চলাচল হ্রাস পাবে। তাতে পার্কিং সমস্যাও হ্রাস পাবে।
৪. ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহারে দিল্লির মতো জোড়-বেজোড় গাড়ি এক দিন পরপর চলাচলের নীতিটি ঢাকায়ও চালু করা যায়। তবে তার আগে ৫০০ নতুন বাস বিভিন্ন রুটে চালু করতে হবে। বিভিন্ন সরকারি অফিসে, সচিবালয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের (সচিবসহ) জন্য আধুনিক এসি মাইক্রোবাস (ছয়-সাতজন) দেওয়া যেতে পারে, যাতে এক যানবাহনেই ছয়-সাতজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এক অফিস ভবনে যাতায়াত করতে পারেন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা এভাবে চলাচল করেন। এতে তাঁদের সম্মানহানি হয়েছে বলে কেউ বলেননি।
৫. ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরে গাড়ি ক্রয়ের ব্যাপারে একটা নীতিমালা করা দরকার। শহরের রাস্তায় কত গাড়ি চলতে পারে, তার সংখ্যা নির্ধারণ করতে হবে। এ রকম কয়েকটি স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ নিলে ঢাকা ও চট্টগ্রামের যানজট অনেকাংশে হ্রাস পেতে পাবে।
অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, এই কাজগুলো কে করবে? আমাদের উত্তর: সরকার করবে। অনুমান করছি সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (ট্রাফিক পুলিশ ও পুলিশ), দুই সিটি করপোরেশন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় (বাস আমদানির উদার ব্যবস্থা) প্রধানত এই কাজগুলো বাস্তবায়ন করতে পারে। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, এসব মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীরা যদি এই উদ্যোগ নেন, তাহলে প্রধানমন্ত্রী তাঁদের সহায়তা করবেন। তবে মন্ত্রীরা নিজের উদ্যোগে অনেকে কাজ করতে চান না। তাঁরা চান প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা। সে রকম সমস্যা হলে প্রধানমন্ত্রীর কাছে কাজের তালিকাগুলো পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে। প্রধানমন্ত্রী সেভাবে নির্দেশনা দিতে পারেন। কে নির্দেশনা দিচ্ছেন, জনগণের কাছে তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। জনগণ চায় তাদের সমস্যার সমাধান হোক। দ্রুত হোক।
এসব পদক্ষেপ নেওয়ার ফলে যদি ঢাকা ও চট্টগ্রামের যানজট হ্রাস পায়, তাহলে কৃতিত্ব পাবেন বর্তমান সরকার, প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর মন্ত্রী-মেয়ররা। বিএনপি বা কোনো বিরোধী দল এই কৃতিত্বের দাবিদার হবে না।
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: মিডিয়া ও উন্নয়নকর্মী।

Sunday, January 17, 2016

টিভিতে রাজনৈতিক দলের প্রচার by মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

টেলিভিশন একটি শক্তিশালী গণমাধ্যম। বিভিন্ন দেশ এই মাধ্যম ব্যবহার করে বহু কিছু করেছে। আমরা এখনো এই মাধ্যমকে বিনোদন ও তথ্যের (খবর ও টক শো) জন্যই ব্যবহার করছি। বেশির ভাগ তথ্যই রাজনৈতিক। রাজনীতির বাইরে জ্ঞান-বিজ্ঞান, উন্নয়ন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবেশ ও আরও নানা বিষয়ের তথ্যও যে এই মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে প্রচার করার সুযোগ ছিল, তা আমরা করিনি। কয়েকটি বিষয়ে সামান্য ব্যবহার হয়েছে। কিন্তু জোর দিয়ে বলব, টিভি মাধ্যমটি পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার হয়নি। শুধু শিক্ষার প্রসার নিয়েই টিভি মাধ্যমে অনেক কাজ করার সুযোগ ছিল। কিন্তু না সরকার, না বেসরকারি খাত—কেউ এ ব্যাপারে মাথা ঘামায়নি। আমাদের ধারণা, শুধু শিক্ষা নিয়েই একটি সুপরিকল্পিত টিভি চ্যানেল জনপ্রিয় ও ব্যবসায়িকভাবে সফল হতে পারে।
টেলিভিশনকে রাজনীতির কাজেও ভালোভাবে ব্যবহার করার সুযোগ ছিল। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, সব টিভি চ্যানেলই তো দিন-রাত রাজনীতিই প্রচার করছে। তা আংশিক সত্য। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে রাজনীতি প্রচারিত হচ্ছে চ্যানেলের মালিক ও অনুষ্ঠান প্রযোজকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ যে যেভাবে দেখে বা বিশ্লেষণ করতে চায়, টিভি চ্যানেলে রাজনীতি সেভাবেই প্রচারিত হচ্ছে। কোনো দল তাদের বক্তব্য অসম্পাদিত বা অবিকৃতভাবে প্রচার করতে পারছে না। সংবাদপত্রের পাতাজুড়ে রাজনৈতিক দল বিভিন্ন উপলক্ষে তাদের বক্তব্য প্রচার করতে পারছে (ক্রোড়পত্র)। কিন্তু টিভি মাধ্যমে পারছে না। এটা বৈষম্য, সরকারের ভুল নীতি। এটা গণতন্ত্রচর্চার প্রতিবন্ধক।
২৯ ডিসেম্বর ২০১৫ প্রথম আলোয় প্রকাশিত একটা খবর থেকে জানতে পেরেছি, বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে বিএনপির একটি বিজ্ঞাপন প্রচারে সরকারের তরফ থেকে পরোক্ষভাবে বাধা দেওয়া হয়েছে। সরকার অবশ্য কোনো চিঠি লিখে বাধা দেয়নি। চিঠি ছাড়াও সরকার যে নানাভাবে বাধা দিতে পারে (তা প্রমাণও করা যায় না), সেই অভিজ্ঞতা আমাদের বহু আগেই হয়েছে। সংবাদপত্রের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বিভিন্ন টিভি চ্যানেল কর্তৃপক্ষ বিএনপির বিজ্ঞাপন প্রচারে অপারগতা জানিয়েছে। কেন অপারগতা জানিয়েছে, সেটা বোঝাও কঠিন নয়। কয়েক দিন আগে বেগম খালেদা জিয়ার সংবাদ সম্মেলনের লাইভ কভারেজও কোনো কোনো আগ্রহী টিভি চ্যানেলকে প্রচার করতে দেওয়া হয়নি। একটি গণতান্ত্রিক দেশে এগুলো নিন্দনীয়। আমরা টিভি মাধ্যমের শক্তি ঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারছি না।
বিষয়টা শুধু বিএনপি বা আওয়ামী লীগের নয়। বিএনপি বা আওয়ামী লীগের জন্য কোনো পৃথক নীতি হতে পারে না। তথ্য মন্ত্রণালয় এমন একটি নীতিমালা করতে পারে, যার ভিত্তিতে যেকোনো রাজনৈতিক দল, সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান টিভি চ্যানেলের সময় কিনে নিয়ে তাদের বক্তব্য প্রচার করতে পারবে। তবে লাইভ প্রচারে যেহেতু নানা সমস্যা থাকে (যেমন প্রচারযোগ্য নয় এমন ভাষায় কথা বলা), সে জন্য প্রথম পর্যায়ে আগে ধারণকৃত বক্তব্য বা অনুষ্ঠান প্রচার করার সুযোগ থাকা উচিত। ধারণকৃত বক্তব্য প্রচারিত হলে দলের বা ব্যক্তির জন্যও ভালো। দল নেতাদের লাগামহীন বক্তৃতা সম্পাদনা করে বক্তব্য সুন্দরভাবে প্রচার করতে পারে। অপ্রয়োজনীয়, অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্য ছেঁটে ফেলা যায়। সরাসরি সম্প্রচারে সেই সুযোগ থাকে না।
নীতিমালায় এ রকম কিছু শর্ত থাকতে পারে। কোনো টিভি চ্যানেল বিজ্ঞাপনের মতো টাকার বিনিময়ে রাজনৈতিক বক্তব্য প্রচার করতে চাইলে সরকারের বাধা দেওয়া উচিত নয়। তবে টিভি চ্যানেলকে নিজস্ব সেন্সর নীতি রাখতে হবে। যে ভাষা জনসমক্ষে প্রচার করা যায় না, সে রকম ভাষার বক্তব্য, ব্যক্তিগত অভিযোগ, বিদ্বেষ, হিংসা প্রচার টিভি চ্যানেল স্বউদ্যোগে বাদ দেবে, এটাই প্রত্যাশিত।
আমাদের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ছাত্রসংগঠন জনসভা, মিছিল ইত্যাদির নামে ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরে এমন তুলকালাম যানজট বাধিয়ে বসে, যার কোনো প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না। রাজনৈতিক দল ও ছাত্রসংগঠনের এসব কর্মসূচি দেখলে মনে হয়, এই শহরের মালিক কেবল তারাই। শহরে যে আরও মানুষ থাকে, তাদের নানা জরুরি কাজ থাকতে পারে, জনসভামুখী রাজনৈতিক কর্মীরা (অনেকে ভাড়াটে) তা গ্রাহ্য করেন না। জনসভা ও মিছিল শুধু সংসদ নির্বাচনের ছয় মাস আগে করলেই তো হয়। বছরের বাকি সময় রাজনৈতিক দল টিভি, বেতার ও সংবাদপত্রের মাধ্যমে প্রচারণা চালাতে পারে। বাস, ট্রাক ও লোক ভাড়া করে জনসভা আয়োজনের চেয়ে টিভি ও বেতারে একটা ‘বক্তৃতা অনুষ্ঠান’ করলে অনেক ভালো ফল পাওয়া যাবে। এখন তো শুধু ঢাকায় বড়জোর এক লাখ লোক রাজনৈতিক দলের জনসভা শুনতে আসে। টিভি ও বেতারে প্রচার হলে ১৬ কোটি লোক নেতাদের বক্তৃতা শুনতে পারবে। বিদেশেও শুনতে পারবে। মাঠে জনসভার বদলে একটি মিলনায়তনেও সভার আয়োজন করা যায়। এতে স্লোগান দেওয়ার সুবিধা থাকবে, ঝামেলাও অনেক কমে যাবে। সেই সভার বক্তব্য পরে সম্পাদনা করে টিভি ও বেতারে প্রচার করলে ব্যাপকসংখ্যক শ্রোতার কাছে তা পৌঁছানো সম্ভব।
বিভিন্ন টিভি চ্যানেল কর্তৃপক্ষ প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে মাসে একটি ‘দলীয় অনুষ্ঠান’ করার সুযোগ দিতে পারে। এটা মাসিক ভিত্তিতে হবে। এই অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক দল তাদের পরিকল্পনামতো সময়টা ব্যবহার করবে। ধরা যাক, এক ঘণ্টার অনুষ্ঠান। রাজনৈতিক দল এই এক ঘণ্টায় কোনো ইস্যুতে তাদের বক্তব্য, ভিন্ন দল বা সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা, তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, দর্শকদের চিঠির (ই-মেইল) জবাব ইত্যাদি বলবে। মোটকথা, এখানে চ্যানেল মালিক, অনুষ্ঠান প্রযোজক, মডারেটর তাঁদের গুপ্ত রাজনৈতিক এজেন্ডা দিয়ে ওই অনুষ্ঠানকে প্রভাবিত করতে পারবেন না। তবে চ্যানেল কর্তৃপক্ষের সম্পাদকীয় নীতি রাজনৈতিক দলকে মেনে চলতে হবে। সর্বোপরি এটা হবে আগে ধারণকৃত অনুষ্ঠান। চূড়ান্ত সম্পাদনার দায়িত্ব চ্যানেল কর্তৃপক্ষের, তা করা হবে দুই পক্ষের সম্মতিতে।
বর্তমানে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে ফাঁকা কথাসর্বস্ব অনেক টক শো প্রচারিত হয়। একই বক্তা প্রায় একই বক্তব্য অন্তত কয়েক শ বার টক শোতে বলেছেন। এ ধরনের টক শোর পরিবর্তে মাসে একটি অনুষ্ঠান রাজনৈতিক দলকে দিলে খুব খারাপ হতো না। এ ধরনের অনুষ্ঠান হলে রাজনৈতিক দলকেও দায়িত্বশীল হতে হবে। মাঠে-ময়দানে অনেক দায়িত্বহীন কথা বলা যায় করতালির লোভে। কিন্তু টিভি মিডিয়ায় দায়িত্বহীন কথা বলতে অনেক নেতাই আগ্রহী হবেন না। সেদিক থেকেও রাজনৈতিক বক্তব্য প্রদান বা বিপক্ষ দলের সমালোচনার সময় রাজনৈতিক নেতাকে সচেতন হতে হবে।
রাজনৈতিক দলের বক্তব্য টিভি বা বেতারে প্রচার হওয়া দোষের কিছু নয়। আর এই সুযোগ তো শুধু বিএনপি পাবে না, আওয়ামী লীগ ও অন্য দলও পাবে। রাজনীতিই তো গণতন্ত্রের মূলকথা। সেই রাজনীতিকে উপেক্ষা করলে গণতন্ত্রের আর থাকে কী! তা ছাড়া কোনো দল বা নেতাকে ফ্রিস্টাইলে টিভি মাধ্যম ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। প্রত্যেকের বক্তব্য হতে হবে দায়িত্বশীল, গঠনমূলক ও রুচিশীল ভাষায়। যেহেতু প্রতিটি অনুষ্ঠান রেকর্ডেড হবে, সেহেতু টিভি কর্তৃপক্ষের নিজস্ব নীতিমালা প্রয়োগেরও সুযোগ থাকবে।
আশা করি, সরকার টিভি চ্যানেলগুলোকে এসব ব্যাপারে চাপ দেওয়া থেকে বিরত থাকবে। টিভি চ্যানেল কর্তৃপক্ষ তাদের ব্যবসাকৌশল ও সম্পাদকীয় নীতি অনুযায়ী যেকোনো রাজনৈতিক দলের জনসভা, সংবাদ সম্মেলন, সেমিনার প্রচার করতে পারে। এর মাঝখানে সরকার যেন বাধা না হয়। শুধু পূর্ণাঙ্গ অনুষ্ঠান নয়, টিভিতে সরকার, সরকারি দল, বিরোধী দল তাদের সংক্ষিপ্ত বক্তব্য, স্লোগান, আবেদন, ঘোষণা ইত্যাদি যেকোনো কিছু শোভন ভাষায় ‘বিজ্ঞাপন’ আকারে প্রচার করতে পারে। এটা প্রত্যেকের গণতান্ত্রিক অধিকার। বহুদলীয় রাজনীতি ও গণতন্ত্রচর্চার জন্য এই সুযোগ থাকা দরকার।
টিভি মিডিয়াকে আমরা খুব সীমিতভাবে ব্যবহার করছি। টিভির শক্তি অনেক। সরকার চাইলে শিক্ষা, উন্নয়ন ও ক্রীড়ার জন্য বিশেষায়িত টিভি চ্যানেল স্থাপনে নানা রকম আর্থিক ও কর সুবিধা দিতে পারে। কোনো প্রাইভেট কোম্পানি একটি শিক্ষা বা উন্নয়ন টিভি চ্যানেল স্থাপনের কথা চিন্তা করতে পারে। আমাদের আশা, এ ব্যাপারে সরকার নানাভাবে সহযোগিতা করবে। যেহেতু এই ধরনের চ্যানেল ব্যবসায়িক স্পনসর কম পাবে, তাই সরকারের নানা প্রণোদনা প্রয়োজন হবে।
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: মিডিয়া ও উন্নয়নকর্মী।

Sunday, November 29, 2015

কেমন হবে পৌরসভা নির্বাচন? by মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

আগামী ৩০ ডিসেম্বর ২৩৪টি পৌরসভায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। মেয়াদ শেষ হলে বাকি পৌরসভাগুলোতেও নির্বাচন। ঢাকার বাইরে রাজনৈতিক অঙ্গনে পৌরসভা নির্বাচন নিয়ে চাঞ্চল্য দেখা যাচ্ছে।
আমাদের রাজনৈতিক আলোচনা ও বিতর্ক প্রধানত ঢাকাকেন্দ্রিক। এককেন্দ্রিক দেশ বলে রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ ঢাকাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত। বাংলাদেশ যদি আজ কয়েকটি প্রদেশে বিভক্ত হতো, তাহলে ঢাকাকেন্দ্রিক রাজনীতি থাকত না। বাংলাদেশের মতো জনসংখ্যা অধ্যুষিত উন্নয়নশীল দেশ এক কেন্দ্র থেকে শাসন করা ঠিক নয়। এতে উন্নয়ন ব্যাহত হয়। কিন্তু আমাদের বড় দুটি রাজনৈতিক দল (যারা পালা করে ক্ষমতায় যায়) ও কেন্দ্রীয় প্রশাসন তাদের সুবিধাবাদী স্বার্থে বাংলাদেশে এককেন্দ্রিক প্রশাসন টিকিয়ে রেখেছে। এই পটভূমিতে পৌরসভার নির্বাচন অনেকটা নিয়মরক্ষার ঘটনা। পৌরসভার মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে সুষ্ঠু প্রশাসন ও উন্নয়নের যে সম্ভাবনা ছিল, তা কেন্দ্রের ভুল নীতির জন্য যথাযথ বাস্তবায়িত হয় না। দলীয় ও নির্দলীয় কিছু মানুষ উপকৃত হয়। স্থানীয়ভাবে কিছু উন্নয়ন হয়।
প্রায় সে রকম অবস্থা ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের। কয়েক দিন আগে উত্তরের মেয়র আনিসুল হক এই বলে আক্ষেপ করেছিলেন যে তঁার কোনো ক্ষমতা নেই। রাস্তা ঝাড়ু দেওয়া ও কিছু ফুলের গাছ লাগানো ছাড়া। কিন্তু এই ক্ষমতাহীন মেয়রের নির্বাচন নিয়ে সরকারের উৎসাহের কমতি নেই। কারণ, পুরো ব্যাপারটাই নিয়মরক্ষার জন্য। দুই বড় দল স্থানীয় সরকারের এই ঘাটতিগুলো দূর করতে আগ্রহী নয়। কেন্দ্রীয় প্রশাসনও এ ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করে। কারণ, বর্তমান ব্যবস্থায় ক্ষমতার দাপট দেখানোর বহু সুযোগ রয়েছে।
এবারের পৌরসভা নির্বাচন গতানুগতিক নির্বাচন হবে না। সরকার সম্প্রতি নতুন আইন করে পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের প্রধান (মেয়র, চেয়ারপারসন) দলীয় ভিত্তিতে ও দলীয় প্রতীকে নির্বাচিত করার বিধান রেখেছে। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত স্থানীয় সরকারের সর্বস্তরের নির্বাচন নির্দলীয় ভিত্তিতেই অনুষ্ঠিত হয়েছে। সরকার দাবি করেছে, ‘তৃণমূল পর্যায়ে গণতন্ত্রচর্চার জন্য এটা উত্তম ব্যবস্থা।’ হয়তো তা-ই। কিন্তু সরকার এত বড় একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে কোনো আলোচনা ছাড়াই। স্থানীয় সরকারের স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করা সরকার প্রয়োজন মনে করেনি। এমনকি স্থানীয় সরকার নির্বাচনের নতুন আইন এক মাসের মধ্যে কয়েকবার পরিবর্তন করলেও তা কাদের সঙ্গে আলোচনা করে করেছে, তা জানা যায়নি।
স্থানীয় সরকারের কয়েকটি স্তরে নির্বাচিত পরিষদ কখনো স্থানীয় সাংসদ, কখনো ক্ষমতাসীন দলের নেতা, কখনো প্রশাসন নিযুক্ত আমলার কারণে ঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। অতীতে তার অনেক দৃষ্টান্ত আমরা দেখেছি নতুন আইনে বলা হয়েছে, পৌরসভার মেয়র পদপ্রার্থী হবেন দলের মনোনয়নে, নির্বাচন করবেন দলের প্রতীকে। বাকি কাউন্সিলররা নির্দলীয়, স্বতন্ত্র, বিভিন্ন প্রতীকে। অর্থাৎ পৌরসভার পরিষদে মেয়র হবেন একটি দলের নেতা আর তাঁর কাউন্সিলররা হবেন সব নির্দলীয়। এ রকম জগাখিচুড়ি নির্বাচিত পরিষদ এর আগে দেখা যায়নি। সরকার একবার চিন্তা করেছিল পৌরসভার সবাই দলের মনোনয়নে ও প্রতীকে নির্বাচন করবেন। কিন্তু নানা সমালোচনা ও কিছু বাস্তব কারণে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে শুধু মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন ও প্রতীক রেখেছে। অনেকের কাছে প্রশ্ন জাগতে পারে, সরকার কেন এটা করেছে? এর উত্তর সরকারই দিতে পারবে। তবে আমাদের ধারণা হচ্ছে, সরকার পৌরসভাগুলো দলের কবজায় রাখতে চায়। স্থানীয় সরকারের সব স্তরে ‘রাষ্ট্রপতি পদ্ধতিতে’ নির্বাচন হয়। কাজেই পৌরসভায়ও মেয়রই হবেন সর্বেসর্বা, সবচেয়ে ÿক্ষমতাবান। নির্দলীয় কাউন্সিলররা ততটুকুই ক্ষমতা ভোগ করবেন, মেয়র মহোদয় দয়াপরবশ হয়ে যতটুকু ক্ষমতা দেবেন। তাঁদের কোনো কণ্ঠ থাকবে না। তাই সরকার কাউন্সিলর নির্বাচন নিয়ে তেমন আগ্রহী হয়নি। কার্যত মেয়রই পৌরসভা চালাবেন। ঢাকা ও চট্টগ্রামের সিটি করপোরেশনের দিকে তাকান, একই চিত্র দেখবেন।
স্থানীয় সরকারের সব স্তরে ‘রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির’ নির্বাচন বহাল রয়েছে। অর্থাৎ সরাসরি ভোটে মেয়র নির্বাচন। অথচ কেন্দ্রে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার। প্রধানমন্ত্রীকে সাংসদদের ভোটেই নির্বাচিত হতে হয়। প্রধানমন্ত্রীকে চাইলে পরিবর্তন করা যায়। একজন মেয়রকে পাঁচ বছরের আগে পরিবর্তন করা যায় না। নির্বাচন পদ্ধতিতে এই স্ববিরোধিতা কেন? এর কোনো জবাব নেই। ‘রাষ্ট্রপতি পদ্ধতি’ যদি এত ভালো হয়, তাহলে কেন্দ্রেও রাষ্ট্রপতি পদ্ধতি চালু করলেই হয়। বর্তমান সংসদীয় পদ্ধতি কি রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির চেয়ে গুণগতভাবে ভিন্ন কিছু?
আমাদের স্থানীয় সরকারের কয়েকটি স্তর যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারে না। তাঁরা নির্বাচিত হয়েও যেন নির্বাচিত নন। বাংলাদেশে একমাত্র ‘সাংসদকেই’ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি মনে করা হয়। সরকারও তাঁদের বেশি গুরুত্ব দেয়। অন্য নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা যথাযথ গুরুত্ব ও মর্যাদা লাভ করেন না। ঢাকা ও চট্টগ্রামের তিন মেয়র এখনো তাঁদের স্ট্যাটাস পাননি। অথচ তাঁরা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি।
স্থানীয় সরকারের কয়েকটি স্তরে নির্বাচিত পরিষদ কখনো স্থানীয় সাংসদ, কখনো ক্ষমতাসীন দলের নেতা, কখনো প্রশাসন নিযুক্ত আমলার কারণে ঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। অতীতে তার অনেক দৃষ্টান্ত আমরা দেখেছি। সরকার সেই সমস্যার সমাধান করতে পারেনি। নতুন আইনে সেই সমস্যা আরও বেড়ে যাবে। দলীয় মেয়র তো নির্বাচিত কাউন্সিলরদের কোনো কথা শুনবেন বলে মনে হয় না। দলীয় নেতৃত্বের দোহাই দেবেন। বেচারা নির্দলীয় কাউন্সিলরদের তা মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় কি! তবে দলীয় মেয়র হওয়ায় একটা উপকার হলেও হতে পারে। পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা এসব প্রতিষ্ঠানে স্থানীয় সাংসদের ছড়ি ঘোরানো কিছুটা কমতে পারে। কারণ, স্থানীয় সরকারে নির্বাচিত ব্যক্তিরাও দলের নেতা। ‘যুদ্ধটা’ সেয়ানে সেয়ানে হবে।
বিএনপি দেশের অন্যতম বড় দল। দলীয় ভিত্তিতে পৌরসভা নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার কথা বিএনপির। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা কি হবে? বিএনপি অভিযোগ করেছে, ‘সারা দেশে তাদের হাজার হাজার নেতা ও কর্মীকে নানা অভিযোগে সরকার গ্রেপ্তার করেছে। অনেকে মামলার ভয়ে ফেরারি। অনেকে গ্রেপ্তার আতঙ্কে ঘরছাড়া।’ এঁদের মধ্যে অনেকেই পৌরসভার নির্বাচনে মেয়র ও কাউন্সিলর পদে প্রার্থী হতেন। অনেক জায়গায় বেশ শক্তিশালী প্রার্থীও বিএনপির রয়েছে। কিন্তু তাঁরা তো নির্বাচন করতে পারছেন না। বিএনপিকে কি তাহলে মামলাহীন, অভিযোগহীন, অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রার্থীকে মনোনয়ন দিতে হবে? এমনও হতে পারে আগামী সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি বা তাদের জোটের জনপ্রিয় প্রার্থীদের ‘পেট্রলবোমা সন্ত্রাসের’ অভিযোগে গ্রেপ্তার করে রাখা হবে। আজকাল বিভিন্ন সন্ত্রাসী ঘটনায় উসকানিদাতা, পরামর্শদাতা, অর্থদাতা ইত্যাদি অভিযোগে মামলা বা গ্রেপ্তার একেবারে ডাল-ভাত হয়ে গেছে। পেট্রলবোমা সন্ত্রাস সরকারকে একটা বড় সুযোগ করে দিয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো, ৩০ ডিসেম্বরের পৌরসভা নির্বাচন কোন মডেলের হবে? প্রশ্নবিদ্ধ ও ছকে সাজানো নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করতে নির্বাচন কমিশনের কোনো বিলম্ব হয় না। তবু আমরা আশাবাদী যে নির্বাচন কমিশন এ রকম কাজ আর করবে না। তবে কোনো দল, ভোটার বা স্বতন্ত্র প্রার্থী যদি সদ্য অতীতের কয়েকটি নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকে এ রকম আশঙ্কা করেন, তাঁদের কী বলব?
পৌরসভা নির্বাচন নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক অঙ্গন সরগরম হচ্ছে। এখন রাজনীতিতে যে স্থবিরতা বিরাজ করছে, তা হয়তো অনেকটাই দূর হবে। কিন্তু সুষ্ঠু নির্বাচনের নিশ্চয়তা কোথায় পাব? কার কাছে পাব?
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর : মিডিয়া ও উন্নয়নকর্মী।

Sunday, November 8, 2015

ছোট প্রকল্পগুলো কেন অগ্রাধিকার পায় না? by মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

অতি নিন্দুকও স্বীকার করবে যে বাংলাদেশে এখন উন্নয়নযজ্ঞ চলছে। পদ্মা সেতু, ঢাকায় কয়েকটি বড় আকারের ফ্লাইওভার, বিভিন্ন জেলায় প্রাইভেট সেক্টরে বিদ্যুৎকেন্দ্র, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রাথমিক কাজকর্ম, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, কয়েকটি সেনানিবাস, ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেনের রাস্তা, ডবলমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল, ঢাকা-ময়মনসিংহ চার লেনের রাস্তা, বাংলাদেশ-ভারত-নেপাল-ভুটান ট্রানজিটের জন্য ছোট-বড় নানা অবকাঠামো নির্মাণ, এমনই ছোট-বড় আরও বহু প্রকল্প এখন বাংলাদেশে বাস্তবায়ন হতে চলেছে। এগুলোকে ‘উন্নয়ন’ না বললে কাকে উন্নয়ন বলব?
নানা রকম উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য আমরা বর্তমান সরকারকে সাধুবাদ জানাই। বর্তমান সরকারের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ‘মধ্য আয়ের দেশ’ হতে চলেছে। বাংলাদেশের মতো পিছিয়ে পড়া দেশের জন্য এটা যে কত বড় সুখবর, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশ একটি দৃষ্টান্ত বলে বিশ্বনেতারা বাংলাদেশের প্রশংসা করছে, তা সরকার প্রায়ই দাবি করে। জাতিসংঘের এমডিজির অনেকগুলো লক্ষ্য বাংলাদেশ পূরণ করে ফেলেছে। যদিও সিপিডির গবেষণায় দাবি করা হয়েছে: ‘কয়েকটি লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশ এখনো অনেক পিছিয়ে।’ এমডিজির এসব লক্ষ্য অর্জন শুধু সরকারের কর্মসূচিতে হচ্ছে না, অসংখ্য এনজিও এসব কর্মসূচি নিয়ে বহু বছর যাবৎ কাজ করছে। সরকারের কোনো মন্ত্রীর বক্তৃতায় এনজিওগুলোর এই অবদানের কথা স্বীকার করা হয় না। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ জানে কারা কোন ইস্যু নিয়ে কত বছর যাবৎ কাজ করছে।
সরকারের হয়তো ধারণা, ঢাকার সব ফ্লাইওভার নির্মিত হলে যানজট স্বাভাবিক নিয়মেই কমে আসবে। কিন্তু নগর ও যানবাহন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ফ্লাইওভার যানজটকে তেমনভাবে কমাতে পারবে না একদিকে আমরা দেখছি, বাংলাদেশ মধ্য আয়ের দেশ হতে চলেছে। অপরদিকে দেখছি, বাংলাদেশে কতগুলো সাধারণ কাজ সরকার বাস্তবায়ন করতে পারছে না। অথচ একই সরকার অনেক বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। ছোট ছোট কাজ করার ব্যাপারে সরকারের দুর্বলতা কোথায়, তা আমাদের চিন্তায় আসেনি। সরকারের কোনো প্রতিনিধি বিষয়টা খোলাসা করবেন কি?
একটি আধুনিক দেশ বা শহরের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ব্যবস্থা থাকা দরকার। শুধু মধ্য আয়ের দেশ নয়, গরিব দেশেও এসব ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়। বর্তমান সরকার কী কী ছোট বিষয়ে (মেগা প্রকল্পের তুলনায়) মনোযোগ দেয়নি বা সফল হয়নি, তা এই কলামে তুলে ধরতে চাই।
১. সরকার ঢাকা বা চট্টগ্রাম শহরে একটি আধুনিক গণপরিবহনব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি। যাতে মানুষ স্বল্প খরচে ও সহজে যাতায়াত করতে পারে। যেকোনো বড় শহরের এটা প্রধান শর্ত। সরকার নিজে যদি গণপরিবহন ব্যবসা করতে না চায় (না করাই উচিত), তাহলে উপযুক্ত নীতি, পরিকল্পনা ও প্রণোদনা দিয়ে প্রাইভেট সেক্টরকে এ ব্যাপারে উৎসাহিত করতে পারত। সরকার তা করেনি। আমাদের যোগাযোগমন্ত্রী পদ্মা সেতু, চার লেনের রাস্তা, কর্ণফুলী টানেল ইত্যাদি নিয়ে যত কথা বলেন, গণপরিবহন নিয়ে তার ১ শতাংশ কথাও বলেন না। এর রহস্য কী? ঢাকা ও চট্টগ্রামে আধুনিক গণপরিবহনব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারা সরকারের একটা বড় ব্যর্থতা। ঢাকায় একটা মডেল প্রতিষ্ঠিত হলে অন্যান্য শহরেও পরে তা বাস্তবায়ন করা যায়।
২. রেল সার্ভিসও একটি নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন হতে পারত। বড়, মাঝারি ও ছোট দূরত্বে রেল আরও বিভিন্ন ধরনের সার্ভিস দিতে পারত। এখন দু-একটা নতুন সার্ভিস হয়েছে। তবে তা আরও বেশি পরিমাণে হতে পারত। পুরোনো রেল সার্ভিসের তেমন আধুনিকায়ন হয়নি; বরং অনেক ক্ষেত্রে অবনতি হয়েছে। গরিব ও মধ্যবিত্তের জন্য রেল একটি নির্ভরযোগ্য যানবাহন। অথচ সরকার রেলের ব্যাপারে তেমন মনোযোগ দেয়নি। রেলের রাস্তা বাড়েনি, বগি বাড়েনি, অন্তত দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির তুলনায়। অথচ প্রাইভেট সেক্টরে আন্তজেলা আধুনিক বাস সার্ভিস বিকশিত হয়েছে। এতে সরকারের কোনো কৃতিত্ব নেই। অভিযোগ আছে, সেই বাস সার্ভিসকে জনপ্রিয় করতেই রেলের কর্মকর্তারা ইচ্ছে করে রেলকে দুর্বল করে রেখেছেন। রেলের ‘কালোবিড়াল তত্ত্ব’ তো এক রেলমন্ত্রীই ফাঁস করে গেছেন। সেই কালোবিড়াল কিন্তু এখনো ধরা হয়নি।
৩. ফুটপাত প্রধানত পথচারীদের জন্য। কিন্তু ঢাকা ও অন্যান্য শহরের অন্তত ৫০ শতাংশ ফুটপাত হকারদের দখলে। কোনো মেয়র, জেলা প্রশাসন বা মন্ত্রণালয় ফুটপাত হকারমুক্ত করতে পারেনি। হকারদের বিকল্প জায়গার ব্যবস্থা করতেও পারেনি। সব হকারকে বিকল্প জায়গা দেওয়া সরকারের দায়িত্ব হতে পারে না। সরকার কয়েকটা হকার মার্কেটের জায়গা দিতে পারে। যেখানে নিয়মকানুনের ভিত্তিতে হকাররা ব্যবসা করতে পারে। এ ছাড়া নাইট মার্কেট, সান্ধ্য বাজার, উইকেন্ড মার্কেট ইত্যাদি নামে নানা কিছু হতে পারে। কিন্তু ফুটপাত হকারের জায়গা নয়, এটা পথচারীর জন্য। যারা শহরে এতগুলো ফ্লাইওভার বানাতে পারে, তারা ফুটপাত হকারমুক্ত করতে পারে না? অনেকে বলেন, এর জন্য আমাদের রুগ্ণ রাজনীতি, পুলিশের দুর্নীতি ও সরকারি নানা স্তরের কর্মকর্তাদের দুর্নীতিই বড় বাধা। ফুটপাত যদি পথচারীরা ভালোভাবে ব্যবহার করতে পারত, তাহলে বহু মানুষ স্বল্প দূরত্বে রিকশা, ট্যাক্সি বা বাসে চড়ত না, হেঁটেই যেত। ফুটপাতের হকারদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করা কঠিন কিছু নয়।
৪. নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত নাগরিকদের জন্য কোনো ব্যাপক আবাসন পরিকল্পনা সরকার গ্রহণ করতে পারেনি। রাজউক বেশি মনোযোগ দিয়েছে উচ্চমধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের জমির জন্য, যা সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত হয়নি। প্রতিটি বড় শহরে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) মাধ্যমে ছোট, মাঝারি ও বড় মাপের আবাসন প্রকল্প নেওয়ার সুযোগ ছিল।
৫. ঢাকার যানজট এখন দেশের প্রধান সমস্যা হয়ে উঠেছে। সরকার সেদিকে তেমন মনোযোগ দিচ্ছে না। সরকারের হয়তো ধারণা, ঢাকার সব ফ্লাইওভার নির্মিত হলে যানজট স্বাভাবিক নিয়মেই কমে আসবে। কিন্তু নগর ও যানবাহন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ফ্লাইওভার যানজটকে তেমনভাবে কমাতে পারবে না। কাজেই দেখা যাচ্ছে, কার্যকরভাবে যানজট কমাতে ও ঢাকা শহরে স্বাভাবিক চলাচলের নিশ্চয়তা দেওয়ার জন্য সরকার কোনো পরিকল্পনা এখনো করছে না। যানজট এ অবস্থায় থাকলে আর পাঁচ বছরের মধ্যে ঢাকায় চলাচলের জন্য ‘হেলিকপ্টার সার্ভিস’ গড়ে তুলতে হবে।
আমরা সবাই চাই, বাংলাদেশ যত দ্রুত সম্ভব মধ্য আয়ের দেশ হয়ে উঠুক। সরকার যেসব মেগা প্রকল্প গ্রহণ করেছে, তাও নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হোক। সরকার আরও কিছু মেগা প্রকল্প গ্রহণ করুক। কিন্তু যেসব প্রকল্পে সাধারণ মানুষ বেশি উপকৃত হবে, সরকার সেসব প্রকল্প কেন অগ্রাধিকার পাবে না?
আমরা চাই, এই নিবন্ধে উল্লিখিত কয়েকটি ছোট কাজে (মেগা প্রকল্পের তুলনায়) যেন সরকার মনোযোগ দেয়। এর ফলে জনগণ উপকৃত হবে, সরকারও জনপ্রিয় হবে।
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: মিডিয়া ও উন্নয়নকর্মী।

Sunday, October 11, 2015

ঢাকার টাস্কফোর্স ও স্বপ্নের পুত্রজায়া by মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

রাজধানী ঢাকার নানা সমস্যার সমাধান এবং একটি সুদূরপ্রসারী মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করার জন্য একটি সমন্বয় কমিটি গঠনের দাবি উঠেছে। ঢাকার দুই মেয়রও এই দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। মেয়র হওয়ার পর তাঁরা এখন বুঝতে পেরেছেন, মেয়রের ক্ষমতা খুব সীমিত। হাতে গোনা কয়েকটি ছাড়া বেশির ভাগ কাজই তাঁদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। সম্প্রতি ঢাকার দুই মেয়র প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে রাজধানীর উন্নয়ন ও নাগরিক সমস্যার সমাধানে একটি টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীকে এই টাস্কফোর্সের প্রধান করারও প্রস্তাব দেন দুই মেয়র। প্রধানমন্ত্রীও এই প্রস্তাবে নীতিগত সমর্থন দিয়েছেন বলে সংবাদপত্রের প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে।
আপাতদৃষ্টিতে অনেকের মনে হতে পারে, খুব ভালো প্রস্তাব ও উদ্যোগ। কারণ, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হলে তাতে ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে। এ জন্যই দুই মেয়র এই প্রস্তাব দিয়েছেন। তাঁদের দুজনের লক্ষ্য একটাই: তাঁদের মেয়াদকালে যেন ঢাকার কিছু সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।
কিন্তু রাজধানী ঢাকার বৃহত্তর প্রেক্ষাপট থেকে দেখলে এই প্রস্তাবটি ভালো হয়নি। কারণ, এতে মেয়রের ক্ষমতায়ন হবে না। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শক্তিতে মেয়র শক্তিমান হবেন। এটা কৃত্রিম। আমরা চেয়েছিলাম, ঢাকার নির্বাচিত মেয়র আইনের মাধ্যমে শক্তিশালী হোক। সব কাজে প্রধানমন্ত্রীর পদকে ব্যবহার করা ঠিক নয়। প্রধানমন্ত্রী সব সরকারি কমিটি বা টাস্কফোর্সেরও ওপরে। প্রধানমন্ত্রীকে যদি একটি কমিটি বা টাস্কফোর্সের প্রধান করা হয়, এতে প্রধানমন্ত্রীর পদকে ছোট করা হয়। ম্যাচে জেতার জন্য কোচ বা ম্যানেজারকে মাঠে নামতে বলা যেমন মানানসই হয় না, এটাও অনেকটা সে রকম।
প্রধানমন্ত্রী যদি এই টাস্কফোর্সের প্রধান হতে রাজিও হন, তাহলেও প্রশ্ন থেকে যায়। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনেও সমন্বয়হীনতার সমস্যা রয়েছে। তারা কী দোষ করল? প্রধানমন্ত্রী তো চট্টগ্রামেরও প্রধানমন্ত্রী। তাহলে আমরা প্রস্তাব দেব: প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে চট্টগ্রামেও একটা টাস্কফোর্স গঠন করা হোক। তা কি উচিত হবে? কোনো কিছু প্রস্তাব করার সময় আমরা অতশত ভাবি না। আমরা চাই, আমাদের কাজ উদ্ধার হলেই হলো।
অনেক অদক্ষ মন্ত্রী, মেয়র, এমপি তাঁদের নিজ নিজ কাজ উদ্ধারের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে তাঁদের কাজের সঙ্গে যুক্ত করে ফেলেন। প্রধানমন্ত্রীকে কমিটির প্রধান করেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে মিটিং করেন। প্রধানমন্ত্রীকে সশরীরে কমিটিতে রাখা হলে তাঁর মূল্যবান সময় নষ্ট হবে। প্রত্যেক বড় মাপের আন্তমন্ত্রণালয় কমিটি বা টাস্কফোর্সে প্রধানমন্ত্রী অনুমোদিত তাঁর অফিসের একজন সচিবকে সদস্য রাখলেই তিনি প্রত্যেক কমিটির কাজের অগ্রগতি ও সমস্যা সম্পর্কে অবহিত থাকতে পারবেন। প্রধানমন্ত্রীর অবহিত থাকাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিবের পরামর্শে প্রধানমন্ত্রী যখন যেখানে প্রয়োজন, সেখানে হস্তক্ষেপ করতে পারেন। প্রধানমন্ত্রীকে সারা দেশের নানা উন্নয়ন প্রকল্প এভাবেই তত্ত্বাবধান ও মনিটরিং করতে হয়।
আমাদের মতে, ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বেশি মাথা ঘামাবেন। সে কাজেই তাঁর বেশি সময় দেওয়া উচিত। একাধিক মন্ত্রণালয়, মন্ত্রী, মেয়র, এমপি, বিভাগ, অধিদপ্তর এসব সমস্যার সমাধান করার জন্য রয়েছে। এতগুলো লোক মিলে সমস্যার সমাধান করতে পারবেন না কেন? যদি রাজধানী ঢাকার বা চট্টগ্রামের সমস্যার সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর কোনো নির্দেশ দরকার হয়, সংসদে কোনো নতুন আইন পাস করার দরকার হয়, সে ব্যাপারে মন্ত্রী বা মেয়র কিংবা এমপি প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা চাইতে পারেন। কাজ এগিয়ে নেওয়ার পথে যদি কোনো সরকারি গিঁট লেগে যায়, প্রধানমন্ত্রী সেই গিঁট খুলে দিতে পারেন। যাঁরা প্রধানমন্ত্রীকে বিভিন্ন কমিটি বা টাস্কফোর্সের প্রধান করতে চান, তাঁরা প্রধানমন্ত্রীর পদটি ছোট করছেন।
দেশে একটা যুদ্ধ লাগলে, বড় আকারে বন্যা হলে, বড় আকারে ভূমিকম্প হলে, বড় আকারে দাঙ্গা হলে, হাজার হাজার মানুষ মারা গেলে অবশ্যই প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে টাস্কফোর্স হতে পারে। দেশের সব সরকারি প্রতিষ্ঠানকে তখন একযোগে কাজ করতে হবে। দেশের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। তবে সে ধরনের কাজ সাময়িক। তিন-চার মাসের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে চলে আসবে। এ ধরনের পরিস্থিতি খুবই ব্যতিক্রম।
রাজধানী ঢাকার সমস্যা সমাধান ও উন্নয়নকাজে সমন্বয় করার জন্য একটি স্থায়ী ব্যবস্থা করা দরকার। যেহেতু কাজগুলো বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত, সেহেতু একজন মন্ত্রীর নেতৃত্বে এই সমন্বয় কমিটি হওয়া বাঞ্ছনীয়। মেয়র ও সব সেবা সংস্থার বিভাগীয় প্রধানেরা এর সদস্য হবেন। এই কমিটি যা সিদ্ধান্ত নেবে, তা বাস্তবায়নে কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগ বাধা দিতে পারবে না—এই মর্মে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দেবেন। আপাতত এই নির্দেশই যথেষ্ট। এই কমিটিতে প্রধানমন্ত্রীকে প্রতিনিধিত্ব করবেন তাঁর দপ্তরের একজন কর্মকর্তা। তাতেও কাজ হবে না? প্রতিটি মিটিংয়ে প্রধানমন্ত্রীকে বসতে হবে? প্রধানমন্ত্রী কি শুধু ঢাকার প্রধানমন্ত্রী?
রাজধানী ঢাকার প্রশাসন পরিচালনার জন্য কোনো একক ওÿ ক্ষমতাবান নেতৃত্ব নেই। তাই আমরা ‘নগর সরকার’র কথা বলেছিলাম। বড় দুটি রাজনৈতিক দল এখনো নগর সরকারের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেনি। তাই নগর সরকারের লক্ষ্যে কোনো কাজ বা আইন প্রণয়নের কথা কোনো সরকারই চিন্তা করেনি। এখন যদি নিদেনপক্ষে একটি সমন্বয় কমিটি গঠন করা যায়, তাহলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নগর সরকার বা ঢাকায় একক ও ক্ষমতাবান নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে পারবে।
আমরা আশা করব, প্রধানমন্ত্রী ঢাকার উন্নয়নকাজে সমন্বয় করার জন্য একজন মন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি উচ্চÿক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করে দেবেন। এ জন্য বেশি সময়ক্ষেপণ করার প্রয়োজন নেই।
সচিবালয় স্থানান্তর?
একটা কথা শোনা যাচ্ছে, ঢাকার তোপখানা রোড থেকে সচিবালয় শেরেবাংলা নগরে শিল্প প্রদর্শনীর মাঠে স্থানান্তর করা হবে। যেহেতু এখন পূর্বাচলে চীন সরকার স্থায়ী ‘প্রদর্শনী হল’ নির্মাণ করে দিচ্ছে, কাজেই এই জায়গাটি খালি হয়ে যাবে। শেরেবাংলা নগরে এই জায়গাতে নতুন সচিবালয় নির্মাণ করার ব্যাপারে সরকারের নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তের কথা আমরা জানি না।
আমাদের ধারণা, এ রকম সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে তা ঠিক হবে না। শেরেবাংলা নগর এখন আর অত বড় ভবন করার উপযুক্ত নয়। এত গাড়ি, এত রকম যানবাহন, এত মানুষের চলাচলও ঠিক হবে না। সচিবালয় অনেক বড় একটি অবকাঠামো।
এ ব্যাপারে আমাদের কয়েকটি পরামর্শ রয়েছে। ১. রাজধানীর সচিবালয়, মন্ত্রী পাড়া, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন, সরকারি কর্মকর্তাদের বাসভবন, সেনানিবাস একবিংশ শতাব্দীর ঢাকার কোথায় নির্মাণ করা উচিত হবে, তা নিয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ, স্থপতি, নগর বিশেষজ্ঞ ও প্রকৌশলীদের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত। তাঁদের সঙ্গে আলোচনা না করে এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। ২. অ্যাডহক ভিত্তিতে এসব কাজ করা ঠিক নয়। যা করা হবে তা অন্তত ৫০-৭৫ বছরের ঢাকাকে (নির্মাণের পর) সামনে রেখে পরিকল্পনা করা উচিত। ৩. ঢাকার নতুন ডিটেইল এরিয়া প্ল্যানের মধ্যে সচিবালয়সহ বিভিন্ন বড় সরকারি ভবন চিহ্নিত করা যেতে পারে। ৪. কুয়ালালামপুরের পুত্রজায়ার মতো ঢাকা শহরের বাইরে (পূর্বাচল?) বিভিন্ন সরকারি ভবনের একটি পৃথক উপশহর নির্মাণের কথাও চিন্তা করা যায়। পুত্রজায়া আমাদের সামনে একটি বড় দৃষ্টান্ত।
এসব কাজ কখন শুরু হবে বা শেষ হবে, তা বড় কথা নয়। এ ধরনের কাজ আমাদের করতে হবে—এখন থেকে এই ভাবনা শুরু করা উচিত। কারণ, আমাদের জমির পরিমাণ সীমিত। কৃষিজমি আরও সীমিত। এসব কাজে অনেকগুলো ধাপ থাকে। কোনো একটি সরকার সব কাজ করার সুযোগ পায় না। বর্তমান সরকারের আমলে অন্তত এসব ব্যাপারে সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া যায় কি না, তার চেষ্টা করা উচিত। আমরা গণতান্ত্রিক দেশ বলে দাবি করি। তাই এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সরকার, সংসদের বিরোধী দল, অন্যান্য বড় রাজনৈতিক দল, বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজ, বিভিন্ন পেশাজীবী গোষ্ঠীর প্রতিনিধি—সবার সঙ্গে মতবিনিময় করা যেতে পারে। এতে এই বড় মাপের সিদ্ধান্তে সবার মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হবে। তার মূল্য কম নয়। পরের টার্মে যদি বর্তমান ক্ষমতাসীন দলই নির্বাচিত হয়, তাহলে তারা আরও পাঁচ বছর কাজ এগিয়ে নিতে পারবে। এ ধরনের বড় প্রকল্প ১৫-২০ বছরের আগে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে না।
আমরা আশা করব, সরকার এ ব্যাপারে ভাবনাচিন্তা শুরু করবে। অন্তত নির্দিষ্ট এজেন্ডা দিয়ে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটিকে প্রাথমিক ও খসড়া রূপরেখা তৈরির দায়িত্ব দেবে। প্রাথমিক কাজ হিসেবে সেটাও কম নয়। মনে রাখা দরকার, আমাদের জন্য এই ভাবনা আর কেউ ভাববেন না। আমাদেরই ভাবতে হবে।
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: মিডিয়া ও উন্নয়নকর্মী।

Thursday, July 2, 2015

নির্বাচন নিয়ে বিএনপির উভয় সংকট by মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

বিএনপির নেতা মওদুদ আহমদ সহকর্মীর সঙ্গে ফোনালাপে বলেছিলেন, ‘এই বিএনপি দিয়ে হবে না।’ লাখ কথার এক কথা। তিনি ঠিকই বলেছেন। এখন বিএনপির নেতা, কর্মী, খালেদা জিয়া, তারেক রহমান—তাঁদের আলাপ-আলোচনা ও বিতর্ক করে ঠিক করতে হবে এই বিএনপিকে কীভাবে মেরামত করা যাবে। এই গাড়ির পুরো ইঞ্জিন পাল্টাতে হবে। শুধু চাকা বদলালে হবে না।
আমরা চাই দেশে সুষ্ঠু রাজনীতি, সুষ্ঠু গণতন্ত্রের চর্চা, সুষ্ঠু নির্বাচন, সুষ্ঠু সংসদ। বর্তমান সরকারের নেতৃত্বে তার কিছুই পাচ্ছি না। এটা দেশের জন্য ভালো নয়। অনেকের মতে, এটা ছদ্মবেশী ‘বাকশাল’। ‘বাকশাল’কে সেদিনও মানুষ মন থেকে সমর্থন করেনি। এখন যে অবস্থা দেশে চলছে, তা-ও মানুষ মন থেকে সমর্থন করছে বলে মনে হয় না। সামাজিক মিডিয়া ও আড্ডার আলাপচারিতায় সেসবই শোনা যায়। বর্তমান পরিস্থিতির জন্য সরকার যেমন দায়ী, তেমনি দায়ী বিএনপিও। বিএনপি গণতান্ত্রিকভাবে খেলতে পারেনি। সেই যোগ্যতা বা দক্ষতা তারা দেখাতে পারেনি। যদিও সরকারের দমননীতি এ জন্য অনেকাংশে দায়ী। কিন্তু সরকার তো তা করবেই। বিএনপি যেন কখনো ক্ষমতায় আসতে না পারে, সেই লক্ষ্যে সরকার এগোচ্ছে। সরকারকে যারা নানাভাবে দেশে-বিদেশে সহায়তা করছে, তারাও বেশ শক্তিশালী।
প্রথম আলোয় খবর বেরিয়েছে, ‘আগাম নির্বাচনের অঙ্ক কষছে সরকার’। (২৪ জুন ২০১৫) রাজনীতির অঙ্গনে এ রকম খবর বেশ কিছুদিন থেকেই শোনা যাচ্ছিল। আরও শোনা যাচ্ছে: মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে সরকার কয়েকটি কাজ করতে চায়। ১) যত দ্রুত সম্ভব খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের দুর্নীতির মামলার শুনানি শেষ করে শাস্তি দিয়ে তাঁদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা। ২) নানা ফন্দিফিকির করে, লোভ দেখিয়ে ও ভয় দেখিয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের দুই গ্রুপে ভাগ করে নতুন বিএনপি গঠনে মদদ দেওয়া। ৩) জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্কচ্ছেদ করানোর সর্বাত্মক চেষ্টা। ৪) ২০-দলীয় জোটের কয়েকটি ছোট দলকে নানা টোপ দিয়ে জোট থেকে বের করে আনা ইত্যাদি। প্রথম আলোর খবরে মোটামুটি এসব ধারণারই প্রতিফলন রয়েছে। এ ধরনের খবর ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। আওয়ামী লীগের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া অস্বাভাবিক নয়। তারা তো চাইবেই নানা কৌশলে বিএনপিকে দুর্বল করতে। খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষিত হলে বিএনপি যদি এর প্রতিবাদে ও অন্যান্য দাবিতে আবার ‘নির্বাচন বর্জন’ করে, তখনই আওয়ামী লীগের এই ছক বাস্তবায়ন করার সুযোগ হবে। নির্বাচন প্রশ্নে বিএনপিতে তখন ভাঙন ধরানো সহজ হবে। তবে বিএনপি যদি খালেদা ও তারেক ছাড়াও নির্বাচন করতে চায়, তখন আওয়ামী লীগ হতাশ হয়ে পড়বে। তাদের ব্লুপ্রিন্ট তখন আর কাজে আসবে না।
লক্ষ করার বিষয়, আওয়ামী লীগ ও তার দোসররা বিএনপিকে জামায়াত ছাড়ার জন্য যত চাপ দিচ্ছে, জামায়াত নিষিদ্ধ করার জন্য তারা তত তৎপর নয়। অথচ সরকার আইনানুগভাবে জামায়াত নিষিদ্ধ করতে পারে, কিন্তু করছে না। সরকার চায় বিএনপি আগে জামায়াত ছাড়ুক। এখানে আওয়ামী লীগের অন্য একটা কৌশল কাজ করছে বলে সন্দেহ হয়। বিএনপির উচিত হবে জামায়াত না ছাড়া, বরং সরকার যেন জামায়াতকে নিষিদ্ধ করে, সে ব্যাপারে সরকারকে পরোক্ষভাবে উৎসাহিত করা। আওয়ামী লীগ ও তাদের নানা ধরনের সমর্থকগোষ্ঠী সবাই কিন্তু জামায়াত নিষিদ্ধ করার দাবিতে সমানভাবে সোচ্চার নয়। মনে হয় জামায়াত নিয়ে আওয়ামী লীগের কৌশলটা দলের অনেকে জানেন।
আগামী সংসদ নির্বাচন বিএনপির জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ। দেশের গণতন্ত্রের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ। বিএনপিকে মনে রাখতে হবে, আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পরাজয় মানতে পারবে না। কেন পারবে না, তা নিশ্চয় বিএনপি জানে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনের একটা মডেল তৈরি করেছে। ইতিমধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রামের মেয়র নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তার একটা রিহার্সেল দিয়েছে এবং তাতে পাসও করেছে। অনেকের আশঙ্কা, মেয়র নির্বাচনের মতো সংসদ নির্বাচনেও নির্বাচন কমিশন, পুলিশ, বিজিবি, নির্বাচনী কর্মকর্তাদের এক বড় অংশ সরকারের ব্লুপ্রিন্ট বাস্তবায়নে সহায়তা করবে। নির্বাচনী মাঠে বিএনপি থাকবে একা। ভোটাররা বিএনপির শক্তি হতে পারেন, কিন্তু সাধারণ ভোটাররা সন্ত্রাস প্রতিহত করতে পারেন না। কাজেই সরকার পরিবর্তনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মেয়র নির্বাচনের এই মডেল প্রয়োগ করতে পারে, তা বিএনপিকে বুঝতে হবে।
এই পরিস্থিতি কল্পনা করে বিএনপিকে ঠিক করতে হবে যে তারা আগামী সংসদ নির্বাচন করবে কি করবে না। বিএনপির সামনে এখন উভয় সংকট। ১. সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে আওয়ামী লীগের ভোট প্রহসন মেনে নেওয়া, ২. তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচনে অংশ না নেওয়া। না নিলে দলের অস্তিত্ব আরও দুর্বল হয়ে যাবে। অনেক নেতা ও কর্মী ব্যক্তিগতভাবে নির্বাচনে অংশ নেবেন। নেতা ও কর্মীরা খুবই হতাশ হয়ে পড়বেন। দল টিকিয়ে রাখাই মুশকিল হবে। কাজেই উভয় সংকট।
অনেকে বলতে পারেন, ‘সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও সরকার ভোট-সন্ত্রাস করবেই, তার নিশ্চয়তা কী?’ না, কোনো নিশ্চয়তা নেই। তবে এটা আমাদের ধারণা। নির্বাচনে জিততে হলে আওয়ামী লীগকে ভোট-সন্ত্রাসে যেতেই হবে। সাধারণ মত হচ্ছে, সুষ্ঠু ভোটে আওয়ামী লীগ জিতবে না। না জেতা মানে নিজের বিপদ ডেকে আনা। কী বিপদ, সেটা আওয়ামী লীগ জানে। আওয়ামী লীগ কীভাবে সরকার পরিচালনা করেছে, বিরোধী দলের ওপর কীভাবে নির্যাতন, নিপীড়ন করেছে, তা কি তারা জানে না? জানে। সে জন্যই সংসদ নির্বাচনে পরাজয় মেনে নেওয়া তাদের পক্ষে অসম্ভব। যেভাবেই হোক, আওয়ামী লীগকে জিততে হবে। এই সরকারের যারা (সরকারি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি) অন্যায়ভাবে বেনিফিশিয়ারি, তারা সবাই চাইবে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে জেতাতে। ২৮ এপ্রিলের মেয়র নির্বাচনই তার প্রমাণ।
বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধী দলকে এটা বুঝতে হবে। নাগরিক সমাজকেও এটা বুঝতে হবে। বক্তৃতা, বিবৃতি ও গোলটেবিল দিয়ে ভোট-সন্ত্রাস বন্ধ করা যাবে না।
দলীয় সরকারের অধীনে বিএনপি নির্বাচনে যাবে কি যাবে না, তা নিয়ে বিএনপিকে তৃণমূল পর্যায়ে আলোচনা করে ঠিক করতে হবে। নির্বাচনে না গেলে দলের কী কী ক্ষতি হতে পারে, তা-ও তৃণমূল পর্যায়ে আলোচনা করতে হবে।
দুর্ভাগ্য, আমাদের নাগরিক সমাজও খুব দুর্বল। নানা লোভ, প্রলোভন, ভীরুতা, হুমকি ইত্যাদিতে তারা বিপর্যস্ত। নইলে স্বাধীন নির্বাচন কমিশন, সবার ভোট দেওয়ার অধিকার, সুষ্ঠু নির্বাচন ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বন্ধের দাবিতে নাগরিক সমাজও আন্দোলন করতে পারত। কিন্তু দুর্বল নাগরিক সমাজের পক্ষে এই আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব হবে না।
দেশে গণতন্ত্রের এমনই অবস্থা, উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘বিরোধী ছাত্রসংগঠন’ বলে কিছু নেই। যে কয়েকটি ছোট সংগঠন রয়েছে, তারা দুর্বল হলেও কিছু করার চেষ্টা করছে। বিএনপির ছাত্রসংগঠন বলে এখন ক্যাম্পাসে কিছু নেই। কাজেই সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আন্দোলন করবে কে?
এই পরিস্থিতির পুরো সুযোগ নিচ্ছে সরকার। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর সরকার সব দল নিষিদ্ধ করে ‘বাকশাল’ গঠন করেছিল। শেখ হাসিনাকে কোনো গণতান্ত্রিক দল নিষিদ্ধ করতে হয়নি। তিনি এমন সব কৌশল ব্যবহার করেছেন, যাতে বড় বিরোধী দল বিএনপি নিজে নিজেই দুর্বল হয়ে গেছে। বেশির ভাগ নেতা জেলে বা গ্রেপ্তারের ভয়ে ফেরারি। আর অদৃশ্য শক্তির হাতে ‘গুম’ হয়ে যাওয়ার দৃষ্টান্তও রয়েছে। জীবনের মায়া কার নেই?
ছোট দলগুলো নিয়ে সরকারের মাথাব্যথা নেই। কারণ সিএনজি অটোরিকশার মতো তারাও বলছে, ‘আমি ছোট, আমাকে ধাক্কা দেবেন না।’ শেখ হাসিনা এতটা নির্দয় নন। ছোট দলকে ধাক্কা দিতে তিনি আগ্রহী নন।
আগামী নির্বাচন নিয়ে বিএনপি কী ভাবছে, এখন এটাই বিএনপির ইস্যু হওয়া উচিত। এটা জরুরি কাজ। কারণ বিএনপিকে অপ্রস্তুত রেখে সরকার হঠাৎ মধ্যবর্তী নির্বাচন দিয়ে দিতে পারে। তখন বিএনপি চিন্তা করারও সময় পাবে না।
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: মিডিয়া ও উন্নয়নকর্মী।

Saturday, May 30, 2015

২৮ এপ্রিলের ভোট মডেল by মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

নির্বাচন নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। অনেকের ধারণা ছিল, আমরা জিয়াউর রহমান ও এরশাদের অসুস্থ নির্বাচনী সংস্কৃতি পেছনে ফেলে ক্রমে সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে এগোচ্ছিলাম। ১৯৭৩-এর আওয়ামী লীগ সরকারের নির্বাচনী অনিয়মও আমরা ভুলে যেতে চাই। ’৯০-এর পরে বেশ কিছু ভালো নির্বাচনের দৃষ্টান্ত আমরা ইতিমধ্যে স্থাপন করেছি। ২০০৮ সালের সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা সবাই স্মরণ করেন। শুধু স্মরণ করতে চান না তখন কোনো দলীয় সরকার ক্ষমতায় ছিল না। নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পেরেছে। সেই অবস্থা এখন আর নেই।
‘সুষ্ঠু ভোট’ ও ‘ভোটাধিকার’ বলে শুধু বক্তৃতা দিলে কাজ হবে না। সুষ্ঠু ভোট ও সবার ভোটাধিকার নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর কোনো কৌশলের কথা এখন থেকে ভাবতে হবে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি সংসদ নির্বাচনে, এরপর উপজেলা নির্বাচনের শেষ দিকের কয়েকটি পর্বে, ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল তিন সিটি করপোরেশনের নির্বাচনী প্রহসনের পর সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পর্কে কি আর আশাবাদী হওয়ার সুযোগ আছে? নেই। কারণ, এই তিন সিটি নির্বাচন কোনো সরকার পরিবর্তনের নির্বাচন ছিল না। তিন সিটিতেই যদি বিএনপি জয়লাভ করত, তাহলেও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের তেমন ক্ষতি হতো না। আমাদের ধারণা, একটি মেয়র পদেও বিএনপিকে জিততে না দেওয়ার কারণ নৈতিক পরাজয়ের ঝুঁকি। তখন পেট্রলবোমার কার্ডটি সরকার আর আরাম করে খেলতে পারত না। কাজেই ভোট-সন্ত্রাস ছাড়া সরকারের বিকল্প ছিল না।
সরকার নিজের মুখ রক্ষা করতে গিয়ে সুষ্ঠু ভোট সংস্কৃতি, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন, জনগণের ভোটাধিকার ইত্যাদির বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। তাতে অবশ্য সরকারের কোনো ক্ষতি হয়নি। বর্তমান সরকার মিডিয়াকে পাত্তা দেয় না, জাতিসংঘকে পাত্তা দেয় না, আমেরিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রায় কাউকেই পাত্তা দেয় না। কারণ কী? এই সরকার পাঁচ বছরের জন্য ‘নির্বাচিত’ বলে একটি সরকারি গেজেটে বলা হয়েছে। এটাই সরকারের একমাত্র শক্তি। বলা বাহুল্য, এই শক্তিকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। আমাদের ধারণা, বাংলাদেশে সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়াই একটি দলের প্রধান শক্তি। আর কোনো কিছু তার প্রয়োজন নেই। একবার সরকার গঠন করতে পারলে বাকি সব সরকারি প্রতিষ্ঠান, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, কিছু মিডিয়া ও কিছু গণ্যমান্য ব্যক্তি সরকারের কাছে অবনত হয়ে থাকে। এটাই আমাদের ঐতিহ্য ও বাস্তবতা। এসব সত্ত্বেও অনেক দেশপ্রেমিক ব্যক্তি, সংগঠন, মিডিয়া সরকারের নানা সমালোচনা করবে। এতে সরকারের কিছুই যায় আসে না। জাতিসংঘ, আমেরিকা, অন্যান্য দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সমালোচনা গায়ে না মাখলেই হলো। কথায় বলে, ‘যার দু’কান কাটা তার লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই’। বর্তমান সরকার সে রকম একটা মডেল উপহার দিয়েছে। ভবিষ্যতে অন্য দলের সরকারও তা ব্যবহার করতে পারবে।
সিটি করপোরেশনের মতো নির্বাচনেও সরকার, সরকারি দল, অঙ্গ দল কী সন্ত্রাস করতে পারে, তা সবাই দেখেছেন। নির্বাচন কমিশনকেও দেখেছেন। এখন ভাবুন, ভবিষ্যতে সরকার পরিবর্তনের যে নির্বাচন হবে, তা কেমন হবে?
এ দেশের নির্বাচন ইস্যুতে আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি। সরকারি দলের সমর্থকেরা বারবার বলেছেন, ‘অতীতে বিএনপি আমলেও (২০০১) ভোট-সন্ত্রাস হয়েছে।’ কে অস্বীকার করছে? কিন্তু আমরা তো ২০০১-এর কালো অধ্যায় পেরিয়ে ২০০৮-এ সুষ্ঠু নির্বাচন করেছি। ২০১৪-তে তো ২০০৮-এর চেয়েও উন্নত মানের নির্বাচন হওয়ার কথা। ২০০৮-এর চেয়েও কড়া নির্বাচন কমিশন দেখার কথা। তা কি হয়েছে?
সবাই আশা করেছিল ২৮ এপ্রিল একটি সুন্দর ভোট হবে। কিন্তু সবার চোখের সামনে, মিডিয়ার সামনে, কিছু টিভি চ্যানেলের লাইভ কভারেজের সামনে এমন সব ঘটনা ঘটে গেল, যা শুধু অপ্রত্যাশিত নয়, অকল্পনীয়ও বটে। মনে হলো, আমরা জিয়া, এরশাদ জমানায় আবার ফিরে যাচ্ছি। ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ বাতিলে আওয়ামী লীগের এত উৎসাহ কেন, তা আরও স্পষ্ট হলো জনগণের সামনে। ‘নির্বাচন কমিশন’ যদি আজ্ঞাবহ ও মেরুদণ্ডহীন হয়, তাহলে এ রকম নির্বাচন করেও যে জয়ী হওয়া কোনো বাধা নয়, এটা সরকার জানে। তা ছাড়া, এই সরকার তো বেশি বিদেশি, জাতিসংঘ কারও সমালোচনাই তোয়াক্কা করে না। দু’কান কাটা হলে যা হয়।
২৮ এপ্রিলের ভোট মডেলটি বিরোধী দলের জন্য খুব ভয়ংকর। নির্বাচন কমিশন, নির্বাচনী কর্মকর্তা, আনসার, পুলিশ সবার সহযোগিতায় (ব্যতিক্রম ছাড়া) এ রকম ভোট-সন্ত্রাস হলে সেখানে তারা কী করতে পারে? সিটি নির্বাচনের মতো স্থানীয় সংস্থার নির্বাচনেই যদি সরকারি দল এ রকম ভোট–সন্ত্রাস করে, তাহলে সরকার পরিবর্তনের নির্বাচনে সরকার, সরকারি দল ও অন্যরা কী করতে পারে, তা এখন থেকে বিরোধী দলকে ভাবতে হবে। ভোটের আগের দিন পর্যন্ত সবকিছু সুন্দর, সুষ্ঠু ও গণতান্ত্রিক পরিবেশেই হয়তো হবে। যেমন ২৮ এপ্রিলের ভোটে হয়েছে। কিন্তু ভোটের দিন কী হবে, তা আগাম কেউ ভাবতে পারেনি। তবে এবার ভাবতে পারবে। যত ভোট–সন্ত্রাসই হোক না কেন, নির্বাচন কমিশন যদি তা আমলে না নেয় (যেমন এবার হয়েছে) তাহলে বিরোধী দলের কিছুই করার থাকবে না। যত বেশি ভোট–সন্ত্রাস হবে, তত দ্রুত ফলাফলের গেজেট ছাপা হবে। কারণ, সরকারি দলের দরকার ওই গেজেট। বাকি সব বাকির খাতায়। ‘নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল’ নামে একটি স্তর আছে বটে, তবে তা দিয়ে কোনো দল বা প্রার্থী অতীতে সুবিচার পেয়েছেন বলে শোনা যায়নি। কাজেই সরকারি দল ভোট-সন্ত্রাস করলে বিরোধী দলের জেতার কোনো সুযোগই নেই। বিরোধী দল পাল্টা ভোট-সন্ত্রাস করতে চাইলেও সুবিধা করতে পারবে না। এ রকম অবস্থায় শান্তিপ্রিয় ও নিরীহ ভোটার (যার এক বড় অংশ নারী) আর ভোট দিতে যাবে না। জাল ভোটের বাক্স ভর্তি করার সুযোগ এতে আরও বেড়ে যাবে। যেমনটি ২৮ এপ্রিল হয়েছে।
কাজেই আগামী সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগে বিরোধী দলকে ২৮ এপ্রিলের ভোট অভিজ্ঞতার আলোকে তাদের নীতি ও কৌশল ঠিক করতে হবে। মনে রাখতে হবে, সংসদ নির্বাচন ক্ষমতা বদলের নির্বাচন। বর্তমান সরকার তাদের আমলে যা যা করেছে, তাতে ক্ষমতা হারানোর ঝুঁকি তারা কোনোভাবেই নিতে পারবে না। কাজেই বর্তমান সরকারের মাধ্যমে পরিচালিত (পরোক্ষভাবে) আগামী সংসদ নির্বাচন ২৮ এপ্রিলের ভোট প্রহসনের চেয়ে আরও ভয়ংকর কিছু হওয়া বিচিত্র কিছু নয়।
এ দেশের বেশির ভাগ মানুষ সুষ্ঠু নির্বাচন চায়। প্রত্যেক ভোটার যেন তাঁর ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। জনগণ চায় একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিশন। যারা প্রত্যেক দল বা প্রার্থীর প্রতি একই আচরণ করবে। কিন্তু গত কয়েকটি নির্বাচনে আমরা তা পাচ্ছি না। যথারীতি ভোটের অনুষ্ঠান হচ্ছে। কিন্তু একে ভোট বলা চলে না। অথচ এই দেশেই ২০০৮ সালে সুষ্ঠু ভোট হয়েছে। কেউ কোনো অভিযোগ করেনি। তাহলে ২০১৫ সালে আমরা তা পারছি না কেন?
জনগণ সবচেয়ে ক্ষমতাবান গোষ্ঠী। এখন জনগণকে ভাবতে হবে কী পদক্ষেপ নিলে সরকার ও নির্বাচন কমিশন প্রকৃত ভোটের ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে। ২৮ এপ্রিলের ভোট ‘সাফল্য’ আওয়ামী লীগ সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে আত্মবিশ্বাসী করেছে। এই মডেল তারা ভবিষ্যতেও প্রয়োগ করতে পারে। কাজেই বিরোধী দল, সাধারণ ভোটার ও মিডিয়া—সবাইকে এখন থেকে ভাবতে হবে কী ধরনের পদক্ষেপ নিলে সরকার, সরকারি দল এ রকম ভোট-সন্ত্রাস করতে সাহস করবে না। মনে রাখতে হবে, আগামী সংসদ নির্বাচন বর্তমান সরকারের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ। সেই নির্বাচনে তারা যেকোনো মূল্যে জিততে চাইবে। কাজেই ‘সুষ্ঠু ভোট’ ও ‘ভোটাধিকার’ বলে শুধু বক্তৃতা দিলে কাজ হবে না। সুষ্ঠু ভোট ও সবার ভোটাধিকার নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর কোনো কৌশলের কথা এখন থেকে ভাবতে হবে।
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: মিডিয়া ও উন্নয়নকর্মী।

Wednesday, May 13, 2015

নিরস্ত্র সাংবাদিক কীভাবে দায়িত্ব পালন করবেন? by মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

ভোট কেন্দ্র থেকে ইসি, হামলার লক্ষ্যই যেন সাংবাদিক
এবারের তিন সিটি করপোরেশনের নির্বাচন নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়েছে। এই লেখার প্রসঙ্গ শুধুই গণমাধ্যম। অনেকে ভাবতেন, দেশের অন্য কোথাও ভোট ডাকাতি হলেও ঢাকা শহরে তা কখনো সম্ভব হবে না। কারণ, ঢাকায় রয়েছে ২৫টি টিভি চ্যানেলের অন্তত দুই শতাধিক সাংবাদিক ও ক্যামেরা। বিভিন্ন সংবাদপত্রের শত শত সাংবাদিক ও ক্যামেরাম্যান। অ্যামেচার বা ফ্রিল্যান্স ফটোসাংবাদিক ও ক্যামেরাম্যান তো আছেই। মোবাইল ফোন ক্যামেরাম্যানদের হিসাব এখানে ধরছি না। সেটা সারা দেশে রয়েছে। এত এত ক্যামেরা ও সাংবাদিকদের চোখের সামনে ঢাকা শহরে ভোট-সন্ত্রাস করা সম্ভব হবে না বলে মনে হতো। এসব ভোট ডাকাতি বা ভোট-সন্ত্রাস উপজেলায় বা অন্য শহরে সম্ভব।
কিন্তু গত ২৮ এপ্রিল ঢাকার দুই সিটি ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে আমাদের এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ভোট-সন্ত্রাসীরা গণমাধ্যমকে তোয়াক্কা করেনি। ২৯ এপ্রিলের অন্তত ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দৈনিকের রিপোর্টে বলা হয়েছে: ঢাকা ও চট্টগ্রামে অনেক ভোটকেন্দ্রে সাংবাদিকদের ঢুকতে দেওয়া হয়নি। অনেকের ভিডিও ক্যামেরা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। অনেকের স্টিল ক্যামেরাও ভেঙে দেওয়া হয়েছে বা ছবি ডিলিট করতে বাধ্য করা হয়েছে। অনেক সাংবাদিককে মারধর করা হয়েছে।
তবে আমাদের সৌভাগ্য, গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর এত সন্ত্রাস ও আক্রমণের পরও ঢাকা ও চট্টগ্রামের বহু সাংবাদিক ও রিপোর্টার সাহসিকতার সঙ্গে তাঁদের দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁদের অভিনন্দন জানাই। ২৮ এপ্রিল বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের লাইভ কভারেজ, সংবাদচিত্র, নির্বাচন পর্যালোচনা (টক শো) ইত্যাদির মাধ্যমে ঢাকা ও চট্টগ্রামের নির্বাচন প্রহসন অনেকটাই প্রতিফলিত হয়েছে। বেশির ভাগ সাংবাদিক, আলোচক ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ২৮ এপ্রিলের নির্বাচনকে তামাশা বলেই বর্ণনা করেছেন। সংযুক্ত ভিডিওচিত্র তাঁদের বক্তব্যকে আরও জোরদার করেছে। এটা হলো গণমাধ্যমের শক্তি ও ইতিবাচক দিক।
ভোট-সন্ত্রাসীরা জানত, যদি ভোটকেন্দ্রে গণমাধ্যম তাদের শতকরা ১০০ ভাগ দায়িত্ব পালন করতে পারে, তাহলে ভোট ডাকাতির যে চিত্র মিডিয়ায় উঠে আসবে তা হবে ভয়াবহ। প্রধান নির্বাচন কমিশনার শত বক্তৃতা দিয়েও তা ঢাকতে পারবেন না। এই প্রহসনের নির্বাচন বাতিল করা ছাড়া তাঁদের কোনো উপায় থাকবে না। তাই ভোট সন্ত্রাসীরা গণমাধ্যমকে ঠিকভাবে কাজ করতে দেয়নি। সন্ত্রাসীদের পেশিশক্তির কাছে সাংবাদিক ও ক্যামেরাম্যানরা পরাজিত হয়েছেন। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমকর্মীদের সহায়তা করতে পারত পুলিশ, র্যাব ও নির্বাচনী কর্মকর্তারা। প্রথমত, সব কেন্দ্রে পুলিশ, র্যাব ছিল না। অনেক কেন্দ্রে পাহারারত পুলিশ ও দায়িত্ব পালনরত ভোট কর্মকর্তারা সাংবাদিককে রক্ষা না করে ভোট–সন্ত্রাসীদের সহায়তা করেছে। এই যখন ভোটকেন্দ্রের অবস্থা তখন সাংবাদিক ও ক্যামেরাম্যানরা পেশাগত দায়িত্ব পালন করবেন কীভাবে? এবারের নির্বাচনে পুলিশ যেভাবে ভোট-সন্ত্রাসীদের সহযোগী হয়েছে, অতীতে তেমন দেখা যায়নি।
এবারের সিটি নির্বাচন প্রমাণ করেছে ক্যামেরা বা গণমাধ্যম নয়, আসলে বাস্তবে মাস্তান ও সন্ত্রাসীরাই শক্তিশালী। আর সন্ত্রাসীরা যদি ক্যামেরা ভেঙেই দিতে পারে, তাহলে ক্যামেরা আর সত্য চিত্র দেখাবে কী করে? আর পুলিশ ও নির্বাচনী কর্মকর্তা যদি ভোট-সন্ত্রাসের সহযোগী হয়, তাহলে এই নিরস্ত্র সাংবাদিক ও ক্যামেরাম্যানকে রক্ষা করবে কে? এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন যদি ‘নিরপেক্ষ’ ভূমিকা পালন করে ও ভোটের দিন জমা দেওয়া লিখিত অভিযোগ পড়ার সময় না পায়, তাহলে ভোট-সন্ত্রাস বন্ধ করবে কে?
দেশের বিভিন্ন সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন, টিভি চ্যানেল, এফএম রেডিও কর্তৃপক্ষ সবাইকে এই পরিস্থিতি পর্যালোচনা করার জন্য অনুরোধ করছি। সন্ত্রাসীরা যদি মিডিয়াকে বলপূর্বক বের করে দিতে পারে, ক্যামেরা ভেঙে দিতে পারে, তাহলে মিডিয়ার ভূমিকা বলে আর কিছু থাকে কি? এ রকম আচরণ করেও সিটি নির্বাচন যদি আইনি সমর্থন পেয়ে যায় তাহলে এই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে ভবিষ্যতে দুর্নীতিবাজ, জঙ্গি, রাজনৈতিক সন্ত্রাসী, টেন্ডারবাজ, স্থানীয় মাস্তান, চাঁদাবাজ এ রকম দুশ্চরিত্রের সবাই মিডিয়া কর্মীর ওপর বলপ্রয়োগ করার সাহস পাবে। তাঁর ক্যামেরা ভেঙে দেওয়ার সাহস পাবে। তখন নিরস্ত্র সাংবাদিক কী করবেন? এ ব্যাপারে একটা কৌশল নির্ধারণের জন্য সব পেশাজীবী সাংবাদিককে আলোচনায় বসতে হবে। সাংবাদিক ইউনিয়ন এ ব্যাপারে নেতৃত্ব দেবে কি না সন্দেহ। দলনিরপেক্ষ পেশাজীবী সাংবাদিকদের এই পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে হবে।
কোনো সংবাদপত্র, টিভি বা রেডিও ভোটের দিনের বিকৃত ছবি বা ভুল তথ্যসংবলিত খবর প্রকাশ করলে তাও নিন্দনীয়। গণমাধ্যম কোনো দলের বা প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে পারে না। যারা করছে তাদের পাঠক, দর্শক চেনেন। আমাদের ধারণা, বেশির ভাগ গণমাধ্যম দলনিরপেক্ষ ও সত্যনিষ্ঠ। সে জন্য ভোট-সন্ত্রাসীরা ভোটকেন্দ্রে সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হয়েছে।
আরেকটা অদ্ভুত মানসিকতা লক্ষ করা যাচ্ছে। তাহলো: যারা ভোটের দিনের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরেছে, তাদের ‘সরকারবিরোধী’ বা ‘আওয়ামীবিদ্বেষী’ বলে সমালোচনা করা হচ্ছে। এসব পত্রিকা বা টিভি নির্বাচনের কী কী ভুল তথ্য দিয়েছে বা কী কী বানোয়াট ছবি প্রকাশ বা প্রচার করেছে, তা কোনো সমালোচক তুলে ধরছেন না। তাঁরা ঢালাওভাবে ‘আওয়ামীবিদ্বেষী’ বলে প্রচার করে পাঠককে বিভ্রান্ত করছেন। আমরা মনে করি, কোনো পত্রিকা বা টিভির ভুল তথ্য প্রচার বা বিকৃত ছবি প্রকাশের অধিকার নেই।
অমিতাভ চৌধুরী
কলকাতার খ্যাতনামা সাংবাদিক অমিতাভ চৌধুরী ২ মে প্রয়াত হয়েছেন। বাংলা সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতাকে যাঁরা আধুনিক রূপ দিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে অমিতাভ চৌধুরীর নাম উল্লেখযোগ্য। ষাটের দশকে কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার বার্তা সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণের পর যেমন আনন্দবাজারকে তিনি জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে গিয়েছিলেন, তেমনি বাংলা সাংবাদিকতার একটি টেকসই আধুনিক রূপ দিতে পেরেছিলেন। সঙ্গে আরও ছিলেন সন্তোষ কুমার ঘোষ, গৌরকিশোর ঘোষ, নিখিল সরকারসহ আরও কয়েকজন নিবেদিতপ্রাণ সাংবাদিক। সেই আনন্দবাজার পত্রিকা এখনো পশ্চিমবঙ্গে বাংলা সাংবাদিকতায় নেতৃত্ব দিচ্ছে। অমিতাভ চৌধুরী বিশ্বভারতীর ছাত্র ও পরে শিক্ষক ছিলেন। রবীন্দ্র অন্তঃপ্রাণ। রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে কয়েকটি বইও লিখেছিলেন। তবে তাঁর সাংবাদিকতা জীবন নিয়ে স্মৃতিচারণামূলক বই সংবাদের নেপথ্যে (১৯৮১) একটি উল্লেখযোগ্য বই। বইটি সাংবাদিকেরা পড়লে উপকৃত হবেন। পেশাদারি সাংবাদিকতা পেশা সম্পর্কে বহু কিছু জানা যায় এই বই পড়ে। একজন জুনিয়র রিপোর্টার থেকে তিনি কী করে এত বড় জাঁদরেল সাংবাদিক হয়েছিলেন, সেই সংগ্রামের কথাও জানা যায় এই বই পড়ে। অমিতাভ চৌধুরীর মৃত্যুর সঙ্গে আধুনিক বাংলা সাংবাদিকতার একটি অধ্যায়ের অবসান হলো।
ফয়েজ আহ্মদ স্মারকগ্রন্থ
খ্যাতনামা সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও সংগঠক ফয়েজ আহ্মদ স্মরণে বাংলা একাডেমি একটি স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করেছে। সম্পাদনা করেছেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ও কামাল লোহানী। আমাদের দেশের সাংবাদিকতায় ফয়েজ আহ্মদ একটি বর্ণাঢ্য নাম। পঞ্চাশের দশকের শুরুতে রিপোর্টার পদে কাজ শুরু করে তিনি একাধিক সাপ্তাহিক ও জাতীয় সংবাদ সংস্থার প্রধান সম্পাদক হয়েছিলেন। ষাটের দশকে আজাদ ও ইত্তেফাক পত্রিকার চিফ রিপোর্টার হিসেবে তিনি ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। ইতিহাসখ্যাত ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ কভার করে তিনি বহু পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। স্বাধীনতাপূর্ব কালে সাপ্তাহিক স্বরাজ ও পরে বঙ্গবার্তা সম্পাদনা তাঁর আরেকটি উল্লেখযোগ্য কীর্তি। সাহিত্যজগতেও তাঁর বড় অবদান রয়েছে। পঞ্চাশের দশক থেকে তিনি একজন ছড়াকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। আশির দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলন, জাতীয় কবিতা পরিষদ গঠন, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট গঠন ও দেশের প্রথম আর্ট গ্যালারি ‘শিল্পাঙ্গন’ প্রতিষ্ঠায় তাঁর নেতৃত্ব ও অবদান সবাই শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। এই স্মারকগ্রন্থে বিভিন্ন লেখক তাঁর নানামুখী প্রতিভা ও অবদানের কথা তুলে ধরেছেন।
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: মিডিয়া ও উন্নয়নকর্মী।

Tuesday, April 14, 2015

সিটি করপোরেশনকে ঢেলে সাজাতে হবে by মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

প্রায় আট বছর স্থগিত থাকার পর ঢাকা সিটি করপোরেশনের (ঢাসিক) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। একটি ঠুনকো অজুহাতে আদালতে আটকা পড়েছিল ঢাসিক নির্বাচন। অনেকের ধারণা, আওয়ামী লীগ সরকার ঢাকা শহরে তাদের অবস্থা অনুকূল না দেখায় এত দিন তারা ঢাসিক নির্বাচনে আগ্রহী ছিল না। ওই সময় ঢাকার বাইরে প্রায় সব সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয় হয়েছে। তাই ঢাকাকে ঠেকিয়ে রাখা হয়েছিল। কেন্দ্রীয় রাজনীতির (ঢাকা) অঙ্গনে যখন বিএনপি বিপর্যস্ত, দলের বেশির ভাগ কেন্দ্রীয় নেতা হয় বন্দী বা পলাতক, তখন আদালতের গিঁটটা অতি দ্রুত খুলে যায়। এটা কারও ইচ্ছায় ঘটেছে, এমন বলা আমাদের অভিপ্রায় নয়। এটা কাকতালীয়ভাবেই হয়তো ঘটেছে। ঢাকাবাসীদের সৌভাগ্য, নির্বাচনের বাধাটি আদালত অবশেষে অপসারণ করেছেন। তাই আমরা আজ ঢাসিক নির্বাচন করতে পারছি। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোনো বাধা ছিল না। নিয়ম অনুযায়ীই চসিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে জাতীয় সংসদে একটা নতুন আইন করার জন্য প্রস্তাব করছি। নির্বাচনসংক্রান্ত কোনো রিট করা হলে তা তিন মাসের মধ্যে নিষ্পন্ন করতে হবে। আদালতের ব্যস্ততার জন্য তা করা সম্ভব না হলে পরবর্তী নির্বাচনে তা প্রযোজ্য হবে না। এর পরের নির্বাচনে তা প্রযোজ্য হবে। ভাবুন তো, সংসদ নির্বাচন নিয়ে এ রকম একটা রিট করার ফলে আট বছর জাতীয় সংসদ নির্বাচন স্থগিত রয়েছে! আশা করি, বাংলাদেশে কলেজ নির্বাচন থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সবখানে রিটের কারণে তিন মাসের বেশি নির্বাচন স্থগিত রাখার সুযোগ থাকবে না। এ জন্য প্রয়োজন হলে নতুন আইন করা যেতে পারে।
এবার প্রথমবারের মতো ঢাকা সিটি করপোরেশনে (ঢাসিক) দুই ভাগে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ঢাসিককে দুই ভাগ করা কোনো সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নয়। আমাদের ধারণা, ভবিষ্যতে অন্য কোনো সরকার এটা পরিবর্তন করে ঢাসিককে আবার আগের জায়গায় (একক সত্তা) নিয়ে যেতে পারে। ঢাসিকের অনেক সমস্যা। ঢাসিকের আয়তন, জনসংখ্যা, কাজের পরিধি, সেবার মান, সমন্বয় ইত্যাদি নিয়ে নানা সমস্যা রয়েছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা ঢাকার ৫৬টি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর মেয়রের (দুজন মেয়র হলেও) কোনো একক কর্তৃত্ব নেই। ফলে শুধু দুজন কেন, দশজন মেয়র নির্বাচিত হলেও এ সমস্যার সমাধান হবে না। বর্তমান আইন ও ব্যবস্থায় ঢাসিকের মেয়র মূলত একজন নিধিরাম সরদার। সরকার মূল সমস্যার সমাধানে মনোযোগ না করে অহেতুক ঢাসিককে দুই ভাগ করেছে।
ঢাসিকের আরেকটা সমস্যা হলো মেয়র ‘রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির’ মতো এককভাবে নির্বাচিত হন। কাউন্সিলরদের সঙ্গে তাঁর কোনো নির্বাচনী জোট বা বোঝাপড়া নেই। কেউ কারও কাছে দায়বদ্ধ নয়। মেয়র স্বাধীনভাবে একক কর্তৃত্বে সিটি করপোরেশন চালান। কাউন্সিলরদের উপেক্ষা করেও তিনি মেয়র অফিস চালাতে পারবেন। আইন বাধা হবে না। এটা একটা প্রহসন। উচিত ছিল ‘সংসদীয় পদ্ধতির’ মাধ্যমে নির্বাচন করা। সবাই কাউন্সিলর নির্বাচিত হবেন। তাঁরা হবেন শহরের ‘এমপি’। এই ‘এমপিরা’ ভোট দিয়ে সিটি করপোরেশনের মেয়র, ডেপুটি মেয়র ও স্পিকার নির্বাচন করবেন। তাহলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ অন্য রকম হতো। একই অবস্থা চসিকের জন্যও প্রযোজ্য।
আমাদের প্রস্তাব এবারের নির্বাচনের পর সরকার ‘সিটি করপোরেশন’-এর নির্বাচন ও কার্যাবলি পর্যালোচনার জন্য একটি কমিশন গঠন করবে। যে কমিশন অন্যান্য প্রতিবেশী দেশের অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশের জন্য নানা সুপারিশ দেবে। ঢাকা দুই ভাগ হবে, না চার ভাগ হবে, তা গবেষণা, জনমত জরিপ ও বিভিন্ন দেশের মডেল দেখে সিদ্ধান্ত নিলে ভালো হবে। কী ধরনের ব্যবস্থা নিলে ঢাকা বা চট্টগ্রামের সব সেবাদানকারী সংস্থা মেয়রের অধীনে আসবে, তা-ও এ কমিশন সুপারিশ করবে। মোট কথা, বড় সিটি করপোরেশনগুলো ঢেলে সাজাতে হবে।
এবার প্রথমবারের মতো ঢাকায় দুজন মেয়র নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন। তাঁরা কী ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হবেন, তা আমরা পরে জানতে পারব। বা দুজন মেয়র হওয়ায় কী কী সুবিধা হলো, তা-ও পরে জানা যাবে।
আশা করা যায়, নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠুভাবে এ নির্বাচন পরিচালনা করবে। যাতে তাদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের কোনো অভিযোগ উত্থাপিত না হয়। কিন্তু প্রধান নির্বাচন কমিশনার যেভাবে একক কর্তৃত্বে কমিশন পরিচালনা করছেন (সূত্র: প্রথম আলো) তাতে সন্দেহ হয়, তিনি এককভাবে কোনো এজেন্ডা বাস্তবায়নের দায়িত্ব নিয়েছেন।
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এমন যে বড় দুই দলের সাংগঠনিক অবস্থা এক রকম নয়। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সব সংস্থা সরকারের নিয়ন্ত্রণে। অপর দিকে বিএনপির বেশির ভাগ কেন্দ্রীয় নেতা নানা অভিযোগে হয় বন্দী, নতুবা মামলার ভয়ে ফেরারি। গত তিন মাস তাদের কেন্দ্রীয় কার্যালয় পুলিশ বন্ধ করে রেখেছিল। ঢাকা দক্ষিণে বিএনপি-সমর্থিত মেয়র প্রার্থী গ্রেপ্তারের ভয়ে আত্মগোপনে। বিএনপি-সমর্থিত অনেক কাউন্সিলর প্রার্থীও আত্মগোপনে। অন্যদিকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দল আওয়ামী লীগ তাদের সমর্থিত মেয়র বা কাউন্সিলর প্রার্থীরা স্বাধীনভাবে নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছেন। এবারের ঢাসিক নির্বাচন তাই সংগত কারণেই একটি অসম প্রতিযোগিতা হতে যাচ্ছে।
আমাদের মহামান্য আদালত ঢাসিক সীমানা নিয়ে মামলার নিষ্পত্তি করার জন্য এ সময়টা যে বেছে নিয়েছেন, এ জন্য দূরদর্শিতার প্রশংসা তাঁদের প্রাপ্য। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী যেসব প্রার্থীর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে, তাঁদের ও দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের জামিন দেওয়া যায় কি না, আদালত তা বিবেচনা করতে পারেন।
দলের এ রকম একটা দুঃসময়ে, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে এ অসম প্রতিযোগিতায় নামতে বিএনপি যে সম্মত হয়েছে, এ জন্য তারা প্রশংসার যোগ্য। ‘জিততেই হবে’ এ রকম মানসিকতা নিয়ে গণতন্ত্রচর্চা হয় না। গণতন্ত্রে ও খেলায় হার-জিতের জন্য মানসিক প্রস্তুতি রাখতে হয়। গত তিন মাস জনসম্পৃক্ততাহীন কর্মসূচির মাধ্যমে বিএনপি যে প্রায় নিষ্ফল আন্দোলন পরিচালনা করেছে, সিটি নির্বাচনে অংশ নিয়ে তার রাজনীতিকে সঠিক ট্র্যাকে আবার ফিরিয়ে আনার একটা সুযোগ পেয়েছে। সিটি নির্বাচনের পর তারা আন্দোলনের নতুন ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতি নিয়ে ভাবতে পারবে। সরকার যদি আগামী সংসদ নির্বাচনের জন্য সব দলের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেয়, তাহলে বিএনপিকে আর আন্দোলনের কর্মসূচিও দিতে হবে না। আশা করি, সরকার নতুন নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তার কথা উপলব্ধি করতে পারবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, বাংলাদেশে দ্রুত আরেকটি অর্থপূর্ণ ও সব দলের অংশগ্রহণে সংসদ নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসবে না।
চট্টগ্রামের পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে ভালো। দুই বড় দলের সমর্থন নিয়ে দুই মেয়র প্রার্থী নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন। চট্টগ্রামে অন্য ধরনের সমস্যা রয়েছে। বিরোধী দল থেকে মেয়র নির্বাচিত হলে কেন্দ্রীয় সরকার প্রত্যাশিত সহযোগিতা করে না। দোষ হয় মেয়রের। সরকারি দলের এমপি, মন্ত্রীরা তাতে আনন্দ পান। চট্টগ্রামে চসিকের সঙ্গে সিডিএর (চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) একটা দ্বন্দ্ব সরকার তৈরি করে রেখেছে। উন্নয়নে নেতৃত্ব দেবেন কে?
এ সমস্যার একটা সমাধান দরকার। চট্টগ্রাম বা জেলা শহরে উন্নয়নে নেতৃত্ব দেবেন কে? নির্বাচিত মেয়র? না সরকারি কর্মকর্তা? ঢাকার একটি সমস্যা চট্টগ্রামেও রয়েছে। সেবাদানকারী সরকারি সংস্থাগুলোর ওপর মেয়রের একক কর্তৃত্ব নেই।
সে জন্যই একটি ‘কমিশন’ গঠনের কথা বলেছিলাম। ঢাকা, চট্টগ্রাম বা অন্য সিটি করপোরেশনগুলো কীভাবে চলবে, কীভাবে নির্বাচন হবে, মেয়রের একক কর্তৃত্ব কীভাবে প্রতিষ্ঠা করা যায়, তার পথ বের করতে হবে। অন্যথায় নির্বাচিত মেয়ররা তেমন কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারবেন কি না সন্দেহ। আছে আইনের সীমাবদ্ধতা। সেই সীমাবদ্ধতা দূর করতে হবে পরের নির্বাচনের আগেই।
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: মিডিয়া ও উন্নয়নকর্মী।

Tuesday, March 31, 2015

গণমাধ্যমবিষয়ক কিছু খারাপ দৃষ্টান্ত by মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

বেশ কয়েক মাস ধরে খ্যাতনামা ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার-এর কোনো সাংবাদিককে প্রধানমন্ত্রীর কোনো অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ করা হচ্ছে না। বিনা আমন্ত্রণে ডেইলি স্টার-এর সাংবাদিক অনুষ্ঠানস্থলে গেলেও তাঁকে প্রবেশাধিকার দেওয়া হয় না। ডেইলি স্টার পত্রিকা বার্তা সংস্থা বা অন্য কোনো সূত্র থেকে প্রধানমন্ত্রীর খবর সংগ্রহ করছে। আমাদের সাংবাদিকতায় এ ধরনের সমস্যা আগে কখনো হয়েছে বলে মনে পড়ে না। যেকোনো সংবাদপত্রের জন্য এই অবস্থা অস্বস্তিকর। আর তা যদি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে হয়, তা শুধু অস্বস্তিকরই নয়, সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রতি হুমকিস্বরূপ।
অনেকে বলতে পারেন, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে নিষিদ্ধ করতে পারে। হয়তো পারে। তবে যেকোনো প্রতিষ্ঠান আর সংবাদপত্র বা টিভি এক জিনিস নয়। যেকোনো প্রতিষ্ঠান গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ নয়। যেকোনো প্রতিষ্ঠানকে ‘দ্য ফোর্থ এস্টেট’ বলা হয় না। একটি গণতান্ত্রিক দেশে স্বাধীন গণমাধ্যমের ভূমিকা বিরাট। এটা প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভর করে না। তার পরও প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর যদি এ রকম ব্যবহার করে থাকে, তা খুবই অন্যায় ব্যবহার হয়েছে বলে মানতে হবে। এ ধরনের আচরণ সামরিক শাসন বা স্বৈরাচারী শাসনে হয়তো সম্ভব। কারণ, তখন সংবাদপত্রের স্বাধীনতা বা গণতন্ত্রচর্চা স্বীকার করা হয় না। কোনো গণতান্ত্রিক সমাজে এ ধরনের আচরণ অকল্পনীয়।
ডেইলি স্টার পত্রিকা আইনের ঊর্ধ্বে নয়। পত্রিকাটির পক্ষে নানা ভুল-ত্রুটি করাও সম্ভব। পত্রিকাটি যদি এমন কিছু করে থাকে, যা আইনানুগ নয়, তাহলে তার বিচার হতে পারে, যা অন্য দশজন অভিযুক্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রেও ঘটছে। এ রকম কোনো প্রক্রিয়ায় না গিয়ে একতরফাভাবে ডেইলি স্টার-এর মতো অভিজাত ও খ্যাতনামা দৈনিকের প্রতিনিধিকে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে প্রবেশাধিকার না দেওয়া যুক্তিসংগত নয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কোনো ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের হেড অফিস নয়। এটা সরকারের প্রধান নির্বাহীর অফিস। অনুমতি সাপেক্ষে এখানে নীতিগতভাবে দেশের প্রত্যেক নাগরিকের প্রবেশাধিকার রয়েছে। কোনো সংবাদপত্র প্রতিনিধির প্রবেশাধিকার অন্য অনেকের চেয়ে বেশি রয়েছে। দেশের প্রধানমন্ত্রী দলমত-নির্বিশেষে সবার প্রধানমন্ত্রী। তিনি রাগ বা অনুরাগবশত কোনো কাজ করবেন না বলে শপথ নিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আচরণ তা প্রমাণ করছে না।
ডেইলি স্টার পত্রিকা যদি প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে ভুল তথ্য দিয়ে কিছু লিখে থাকে বা পত্রিকাটির কোনো মন্তব্য প্রতিবেদন বা কলাম প্রধানমন্ত্রীকে আহত করে থাকে, তাহলে তার প্রত্যুত্তরে আরও শক্ত লেখা বা প্রতিবাদ প্রধানমন্ত্রীর প্রেস বিভাগ পাঠাতে পারত। সংবাদপত্রে মত, ভিন্নমত, আরও নানা মত প্রকাশের সুযোগ রয়েছে। এটাই গণতন্ত্র ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার সৌন্দর্য।
দুই.
কয়েক দিন আগে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তাঁর গুলশান কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলন ডেকেছিলেন। বর্তমান রাজনৈতিক সংকট ও আইনশৃঙ্খলাজনিত পরিস্থিতিতে এই সংবাদ সম্মেলন খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সেখানে তিনি কী বলেছিলেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক ভাষ্যকারেরা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করছেন। এখানে সেই বিশ্লেষণ করছি না। শুধু একটা কথা লেখার জন্য এই বিষয়ের অবতারণা করেছি। তা হলো: তিনি বরাবরের মতো এবারও সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ দেননি। এটা খুবই অন্যায় হয়েছে।
খালেদা জিয়া একজন প্রতিষ্ঠিত ও জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ। তিনি তিনবার এ দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন। তিনি তাঁর দলকে দীর্ঘদিন ধরে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি কোনো নবিশ নন। কাজেই তাঁর দল বা জোটের রাজনৈতিক কর্মসূচি, চলমান আন্দোলন, বহুল নিন্দিত পেট্রলবোমা-সন্ত্রাস, ছাত্রছাত্রীদের পাবলিক পরীক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্যে ক্ষয়ক্ষতি ইত্যাদি সম্পর্কে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর তো তাঁকে দিতেই হবে। সাংবাদিকেরা তো তাঁকে ক্রিকেট খেলা সম্পর্কে প্রশ্ন করতেন না। দেশের রাজনীতি নিয়েই প্রশ্ন করতেন। সেই প্রশ্ন করার সুযোগ তিনি দেননি। এটা মোটেও নেতাসুলভ কাজ হয়নি। রাজনীতি করতে হলে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখোমুখি তাঁকে হতেই হবে। এটা খেলার নিয়ম। দুনিয়াজুড়ে রাজনীতিকদের এই নিয়ম মেনে চলতে হয়। খালেদা জিয়া কোনো ব্যতিক্রম হতে পারেন না। অন্য যেকোনো পেশার ব্যক্তি সাংবাদিকদের প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে পারেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দিতে তাঁরা বাধ্য নন। কিন্তু নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি বা রাজনীতিবিদের সেই সুযোগ নেই। খালেদা জিয়া অতীতেও তাঁর কয়েকটি সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নের উত্তর দেননি। এই প্রবণতা নিন্দনীয়। রাজনৈতিক নেতা হলে, দলের নেতৃত্ব দিলে তাঁকে উত্তর দিতেই হবে। শুধু নিজের বক্তব্য বলার জন্য কেউ সাংবাদিক বৈঠক ডাকেন না। গণমাধ্যমে প্রেস বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে বক্তব্য প্রচার করা যায়। বিএনপির প্রেস বিভাগকে এই পার্থক্যটা বুঝতে হবে। সাংবাদিকদের আমন্ত্রণ জানালে তাঁদের প্রশ্ন করার সুযোগ দিতে হবে। খালেদা জিয়া যখন বড় নেতা হয়েছেন, তখন তাঁকে বড় নেতার মতোই আচরণ করতে হবে।
তিন.
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নানা উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলন ডাকেন ও সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের জবাব দেন। তাঁর এই উদ্যোগ ও প্রবণতা খুবই প্রশংসনীয়। আজকাল তাঁর সংবাদ সম্মেলন কোনো কোনো টিভি চ্যানেলে লাইভ প্রচার করা হয়। সেই সুবাদে এই অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ আমার বহুবার হয়েছে। একজন রিপোর্টার হিসেবে সত্তরের দশকে বহু সংবাদ সম্মেলন আমি কাভার করেছি। কিন্তু এখন দেখি পরিস্থিতি অন্য রকম। প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী ঘরানার অ্যাকটিভিস্ট সাংবাদিকেরাই অংশ নেন। তাঁদের কারও কারও প্রশ্ন প্রশংসা বা স্তুতিমূলক। অনেকে প্রশ্নের বদলে প্রধানমন্ত্রীর কৃতিত্ব বর্ণনা করেন। এখন সাংবাদিকতা পেশায় নেই এমন ব্যক্তিও প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য স্তুতিমূলক প্রশ্ন করেন। সবটা মিলিয়ে অনুষ্ঠানটি একটা তৈলাক্ত জবজবে সাংবাদিক বৈঠক হয়ে ওঠে। যেখানে আর যা-ই থাকুক, পেশাদারি থাকে না। প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বসার জায়গায় আওয়ামী লীগের সাংসদ, মন্ত্রী, নেতারাও আসন গ্রহণ করেন। অনেকে করতালিও দেন। এগুলো কোনোটাই বাঞ্ছনীয় নয়। সংবাদ সম্মেলন শুধু সাংবাদিকদের জন্য আয়োজন করতে হয়; নেতাদের জন্য নয়। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব বোধ হয় এগুলো জানেন না। বা জানলেও বাস্তবায়ন করতে পারেন না। সংবাদ সম্মেলন কারও স্তুতি করার জায়গাও নয়। খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রশ্ন করার জায়গা।
চার.
দেশের একটি জনপ্রিয় টিভি চ্যানেল একুশে টিভি (ইটিভি) ঢাকাসহ দেশের অনেক স্থানে দর্শকেরা দেখতে পাচ্ছেন না। রাজধানী ঢাকায় প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকায় ইটিভির অনুষ্ঠান দেখা যায় না। ঢাকার বাইরে ৫০ শতাংশ জেলায় দেখা যাচ্ছে বলে ইটিভি সূত্রে জানা গেছে। ইটিভি কর্তৃপক্ষ বলেছে: কেব্ল অপারেটররা ওপরের নির্দেশে এই চ্যানেলের প্রচার বাধাগ্রস্ত করছে। উল্লেখ্য, একুশে টিভির মালিক ব্যবসায়ী আবদুস সালাম কিছুদিন আগে পর্নোগ্রাফি আইনে গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাঁর গ্রেপ্তারের সঙ্গে একুশে টিভির সম্প্রচার বাধাগ্রস্ত হওয়ার কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না জানি না। তবে কোনো কেব্ল টিভি চ্যানেল কেব্ল অপারেটরদের উদ্যোগে আংশিক বন্ধ করা যায়, এ রকম অভিজ্ঞতা আগে হয়নি। এ ব্যাপারে কোনো আইন আছে কি না, তা-ও জানি না। কেব্ল অপারেটররা ব্যবসায়ী সংস্থা। অর্থের বিনিময়ে তারা সার্ভিস দেয়। একুশে টিভি সম্পর্কে তাদের কোনো অভিযোগ আছে কি না, তা-ও তারা বলেনি। বিষয়টা পরিষ্কার করে গণমাধ্যমে কোনো পক্ষ কথা বলেনি। তথ্য মন্ত্রণালয়ও কিছু বলেনি। এভাবে কেব্ল অপারেটররা কোনো টিভি চ্যানেল বিনা অভিযোগে বন্ধ করে রাখার ক্ষমতা রাখে কি না, তথ্য মন্ত্রণালয় আমাদের জানাতে পারে। সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো: কেব্ল টিভি চ্যানেল মালিক সমিতির এ ব্যাপারে নীরবতা পালন। এসব সমিতি নিশ্চয় বনভোজন করার জন্য প্রতিষ্ঠা হয় না। তাদের অনেক দায়িত্ব রয়েছে। ইটিভি কর্তৃপক্ষ বলেছে: তারা এ ব্যাপারে আইনের আশ্রয় নিয়েছে।
বর্তমান সরকার গণমাধ্যম জগতে কয়েকটি খারাপ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আমাদের দূষিত রাজনীতির বৈশিষ্ট্য হিসেবে ভবিষ্যতে অন্য দল ক্ষমতায় গেলে তারা যে এসব দৃষ্টান্ত অনুসরণ করবে না, তা কি নিশ্চিত বলা যায়?
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: মিডিয়া ও উন্নয়নকর্মী।

Tuesday, March 10, 2015

নাগরিক সমাজ নিয়ে অভিযোগ কতটা সঠিক? by মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

একটি ফোনালাপ, গ্রেপ্তার ও মামলার সূত্র ধরে রাজনৈতিক সভায়, টিভির টক শো ও সংবাদপত্রে কেউ কেউ ‘নাগরিক সমাজকে’ অভিযুক্ত করছেন। নাগরিক সমাজের সমালোচনাও করছেন। এ অভিযোগ-সমালোচনা ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। সমালোচকেরা বুঝে না–বুঝে এ ব্যাপারে নাগরিক সমাজের সমালোচনা করছেন।
প্রথমে পরিষ্কার করা দরকার, ‘নাগরিক সমাজ’ বলতে আমরা কাদের বোঝাই। এ ব্যাপারে বিভিন্ন মত রয়েছে। আমাদের মত হলো, যাঁরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী বা সদস্য নন, যাঁরা সরকারি কোনো চাকরি করেন না, তাঁরা সবাই নাগরিক সমাজের অংশ। যাঁরা রাজনৈতিক দলের কর্মী বা সদস্য, তাঁদের নিজস্ব ফোরামে নিজের মতামত দিতে পারেন। অন্য নাগরিকদের সেই সুযোগ নেই। তাই তাঁরা বিভিন্ন নামে নাগরিক ফোরাম গঠন করেন, যে ফোরামে নাগরিকেরা সরকার, রাজনৈতিক দল, সরকারি-বেসরকারি নানা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে তাঁদের মতামত প্রকাশ করেন। তাঁরা সরকার, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক দলের ওপর নজরদারি করেন। নাগরিকদের কাছে এটা সরকারের একধরনের জবাবদিহি। তাঁরা কোনো দল, নেতা বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর স্বার্থে কোনো কথা বলেন না। তাঁরা শুধু নাগরিকদের স্বার্থের কথা বলেন। দুই বড় রাজনৈতিক দল প্রভাবিত কয়েকটি নাগরিক ফোরামও সমাজে রয়েছে। তারা বিশেষ কোনো দল বা নেতার স্বার্থে কথা বলে, কিন্তু নিজেরা সরাসরি রাজনীতি করে না। এ ধরনের নাগরিক ফোরাম ছদ্মবেশী। এরা প্রকৃত নির্দল নাগরিকদের প্রতিনিধিত্ব করে না।
‘নাগরিক ঐক্য’ একটি রাজনৈতিক দল। তাদের কর্মকাণ্ড পুরোটাই রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। এ উদ্যোগের সঙ্গে কোনো নাগরিক ফোরামের সম্পর্ক কখনো ছিল না। ‘নাগরিক ঐক্য’ নির্বাচন করবে। বিভিন্ন ‘নাগরিক ফোরাম’ কখনো নির্বাচন করার স্বপ্ন দেখেনি। ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্নও দেখেনি। এটা তাদের কাজও নয়। বর্তমান রাজনৈতিক সংকট দূর করা, পেট্রলবোমা ও সন্ত্রাসের অবসান এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি জাতীয় সনদ তৈরির প্রস্তাব নিয়ে কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিক সম্প্রতি একটি উদ্যোগ নিয়েছেন। তাঁরা মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে বিভিন্ন দলের সঙ্গে একটা আলোচনার ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দিয়েছেন। এ প্রস্তাব সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। এটা একটা সাময়িক উদ্যোগ। অনেকে বলতে পারেন, ‘কিছু রাজনৈতিক দলও সংলাপের প্রস্তাব করেছে। কাজেই তারাও নাগরিক সমাজ।’ খুব সরল ব্যাখ্যা। সিপিবি, বাসদ, জেএসডি, গণফোরাম—এসব দলও সংলাপের প্রস্তাব দিয়েছে। তাহলে এরাও নাগরিক সমাজ? এভাবে কোনো বিষয়কে ব্যাখ্যা করা যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ‘সুজন’সহ কয়েকটি নাগরিক ফোরাম বছরব্যাপী নানা ইস্যুতে তাদের মতামত ও সুপারিশ দিয়ে থাকে। শুধু বর্তমান সংকটের সময় দিচ্ছে এমন নয়।
নাগরিক সমাজের (বিভিন্ন ফোরামে বিভক্ত) নানা বক্তব্য ও দাবি কয়েকটি রাজনৈতিক দলের বক্তব্যের সঙ্গে মিলে যেতে পারে। সেটা দোষের কিছু নয়। একটা দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল দুর্নীতির অবসান চায়। নাগরিক সমাজও দুর্নীতির অবসান চায়। তাহলে তাদেরকে ‘একজোট’ বলতে হবে? এ রকম আরও বহু দৃষ্টান্ত দেওয়া যেতে পারে। নাগরিক সমাজের কোনো ব্যক্তি যদি কোনো ‘ষড়যন্ত্রের’ সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে প্রমাণিতও হয়, তবু তাঁর জন্য নাগরিক সমাজ সামগ্রিকভাবে দায়ী হতে পারে না। ওই বিশেষ ব্যক্তি দায়ী হতে পারেন। আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কোনো কোনো নেতা নানা অভিযোগে অভিযুক্ত এবং অনেকে আদালতের রায়ে দণ্ডও পেয়েছেন। শুধু ওই ব্যক্তিরা দণ্ড পেয়েছেন। আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগ দণ্ড পায়নি। গুরুতর অভিযোগে সরকার তাদের এক নেতাকে মন্ত্রীর পদ থেকে বরখাস্ত করেছে, দল তাঁর প্রাথমিক সদস্যপদ বাতিল করেছে। কোনো ব্যক্তির অপরাধ সমগ্র দলের অপরাধ হতে পারে না। অনেক সমালোচক বলেন, নাগরিক সমাজ নাশকতার সমর্থক। তাঁদের উদ্দেশে বলব, সুজন ও অন্য কয়েকটি নাগরিক ফোরামের সেমিনার, মানববন্ধন, বিবৃতি ও টক শোতে তাঁদের বক্তব্য পর্যালোচনা করে তারপর মন্তব্য করুন। নাগরিক সমাজ কঠোর ভাষায় পেট্রলবোমা–সন্ত্রাসের নিন্দা করেছে এবং দোষী ব্যক্তিদের শাস্তির দাবি করেছে। একই সঙ্গে নাগরিক সমাজ আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডেরও নিন্দা করেছে। নাগরিক সমাজ বর্তমান পেট্রলবোমা–সন্ত্রাস বন্ধ হওয়ার পর দেশে বিরাজমান রাজনৈতিক সংকট দূর করার জন্য সব দলকে নিয়ে মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে সংলাপ করার অনুরোধ করেছে। এ আবেদন ইতিবাচক পদক্ষেপ।
অনেকে টিভির টক শো ও এর আলোচকদের সমালোচনা শুরু করেছেন। এটাও আরেকটা বিভ্রান্তি। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, নাগরিক ঐক্য, সিপিবি, জাতীয় পার্টি, বাসদ এবং আরও নানা দলের নেতা টক শোতে অংশ নিয়ে থাকেন। টক শোতে রাজনীতিবিদেরা তাঁদের দলের অবস্থানের পক্ষে যুক্তি দিয়ে থাকেন। অনেক নির্দল বুদ্ধিজীবীও তাঁদের বিবেচনামতো বক্তব্য দেন। অনেক দলীয় বুদ্ধিজীবী বিশেষ দলের পক্ষে বক্তব্য দেন। দর্শক এসব আলোচনা উপভোগ করেন। উপভোগ না করলে টিভি কর্তৃপক্ষ এসব অনুষ্ঠান বছরের পর বছর প্রচার করত না। অনেকের মতে, টিভির টক শো একটা মিনি পার্লামেন্ট। আমাদের মূল পার্লামেন্টে তো বিতর্ক হয় না। সবই একতরফা প্রশংসা বা একতরফা সমালোচনা। দর্শক টিভির টক শোতে দেশের নানা ইস্যুতে রাজনৈতিক বিতর্ক দেখতে পান।
অনেকে টক শোতেও ‘ষড়যন্ত্রের’ গন্ধ পাচ্ছেন। কিন্তু টক শো তো প্রকাশ্য বিষয়। গোপনে রেকর্ড করারও দরকার নেই। সবার সামনে সবাই কথা বলছেন। এখানে ষড়যন্ত্র কোথায় ও কীভাবে হয়, তা আমরা বুঝতে পারি না। অনেক সমালোচক বলেন, ‘নাগরিক সমাজের নেতারা নাকি অসাংবিধানিক পথে সরকার পরিবর্তনে ইন্ধন জোগাচ্ছেন।’ এটাও একটা অপপ্রচার। প্রথমত, নাগরিক সমাজ সরকার পরিবর্তনে কোনো ভূমিকা রাখে না। সরকার পরিবর্তন হয় ভোটের মাধ্যমে। নাগরিক সমাজ নিরপেক্ষ, সবার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পক্ষে সব সময় কথা বলে আসছে। নাগরিক সমাজ সঠিক পদ্ধতির জন্য কথা বলে। ভোটে কে জিতবে, কে ক্ষমতায় যাবে—সেই লড়াইয়ে নাগরিক সমাজ জড়িত নয়। ভোটের ময়দানে নাগরিক সমাজের প্রত্যেকে একজন ভোটার মাত্র। নাগরিক সমাজের সদস্যরা বিভিন্ন দল বা প্রার্থীকে ভোট দিয়ে থাকেন। কোনো দলের প্রতীক নিয়ে নাগরিক সমাজে কখনো আলোচনা হয় না। সেটা পুরোপুরি রাজনৈতিক দলের ব্যাপার। অসাংবিধানিক পথে সরকার পরিবর্তন অতীতে হয়েছে সরকার ও রাজনৈতিক দলের ব্যর্থতার জন্য। কারণ, সরকারের নানা দুর্বলতা ও ভুল-ভ্রান্তির সুযোগ নিয়ে অতীতে অসাংবিধানিক শক্তি অস্ত্রের জোরে ক্ষমতা দখল করেছে। নাগরিক সমাজ এত ক্ষুদ্র শক্তি যে তাদের পক্ষে কোনো অসাংবিধানিক শক্তিকে ক্ষমতায় বসানো সম্ভব নয়। তা ছাড়া বর্তমানে সংবিধানে যে ধারা যুক্ত হয়েছে, তাতে এ রকম আশঙ্কা অমূলক। প্রত্যেকে নিজের জীবনকে ভালোবাসে। যারা এ ধরনের চক্রান্তে লিপ্ত, তারা দিবাস্বপ্ন দেখছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা তা নয়। নাগরিক সমাজ বাংলাদেশে এখনো খুব ক্ষুদ্র একটি শক্তি (সেটা আমাদের দুর্ভাগ্য)। কারণ, নির্দল নাগরিকেরা সংগঠিত নন। তাঁরা সুসংগঠিত ও সোচ্চার হলে কোনো সরকারই স্বৈরাচারী হতে পারত না। নাগরিক সমাজ দেশের সংকটকালে দেশের স্বার্থে কথা বলে। তা কখনো সরকারের, কখনো বিরোধী দলের বিপক্ষে যেতে পারে। তাই বলব, তথ্য-প্রমাণ ছাড়া নাগরিক সমাজ সম্পর্কে ঢালাও সমালোচনা ঠিক নয়।
যত সমালোচনাই করা হোক না কেন, নাগরিক সমাজ দেশের স্বার্থে, গণতন্ত্রের স্বার্থে, উন্নয়নের স্বার্থে ন্যায্য কথা বলে যাবে। ক্ষমতায় কোন দল আছে, সেটা তাদের বিবেচ্য নয়। আজ বিএনপি ক্ষমতায় থাকলেও নাগরিক সমাজের ভূমিকা একই হতো। তারা কোনো দলের প্রতিনিধিত্ব করে না। কোনো নেতার কৃপাপ্রার্থীও নয়। নাগরিক সামজের এই স্বাধীন ও সাহসী ভূমিকার ওপরই নির্ভর করছে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ।
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: মিডিয়া ও উন্নয়নকর্মী

Tuesday, February 24, 2015

সংলাপের এজেন্ডা ও রূপরেখা by মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

রাজনীতির অঙ্গনে এখন পেট্রলবোমা-সন্ত্রাসকে ছাপিয়ে উঠেছে সংলাপের দাবি। ‘উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজের’ পক্ষ থেকে পেট্রলবোমা-সন্ত্রাস বন্ধ করা ও সংলাপের দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে দেওয়ায় রাজনীতির অঙ্গন সংলাপ ইস্যুতে সরগরম হয়ে উঠেছে। সাধারণ মানুষ অনুভব করছে, নাগরিক সমাজের ব্যানারে একটা নির্দল গোষ্ঠী মধ্যস্থতা করার জন্য নিজেদের অস্তিত্ব ঘোষণা করেছে। দেশের এই দুঃসময়ে যখন একদল দুর্বৃত্ত পেট্রলবোমা-সন্ত্রাস করে সাধারণ মানুষের প্রাণ হরণ করছে এবং সরকার তার সব বাহিনীকে ব্যবহার করেও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে, তখন উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজের এই উদ্যোগ সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংলাপ ও সংলাপ আহ্বানকারীদের তির্যক সমালোচনা করেছেন। তিনি সাম্প্রতিক কালে বিএনপি-জামায়াতেরও এত সমালোচনা করেননি, যতটা নাগরিক সমাজের করেছেন। প্রধানমন্ত্রী কী কী কারণে নাগরিক সমাজের ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছেন, তা আমরা জানি না। আমরা সাদাচোখে দেখছি, নাগরিক সমাজ তাদের বক্তৃতা-বিবৃতিতে অবিলম্বে পেট্রলবোমা-সন্ত্রাস বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। তারা দোষী ব্যক্তিদের আইনানুগভাবে শাস্তি দিতে বলেছে। তারা ক্রসফায়ার বন্ধ করতে বলেছে। তারা আরও বলেছে, বিবদমান দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা করে বর্তমানে উদ্ভূত রাজনৈতিক সংকটের অবসান করতে হবে। এ ব্যাপারে তারা নিজেরা কোনো ভূমিকা পালন করার জন্য প্রস্তাব দেয়নি। তারা মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে সংলাপের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছে। এর মধ্যে কোন কথাটি প্রধানমন্ত্রীর অপছন্দ হলো, তা আমরা বুঝতে পারি না।
সরকার, আওয়ামী লীগ ও তাদের চৌদ্দ দল ছাড়া দেশের আর কোনো দল, জোট, সংগঠন, ফোরাম কি আছে, যারা সংলাপের বিরোধিতা করছে? সংলাপ হচ্ছে গণতন্ত্রের ভাষা। যেকোনো রাজনৈতিক বিবাদ দূর করতে আলাপ-আলোচনা প্রয়োজন। আলোচনায় বসা মানে আত্মসমর্পণ নয়। যারা আলোচনার বিরোধিতা করছে, তারা বোমা-সন্ত্রাস টিকিয়ে রাখতে চায়। আশা করি দেশের সচেতন মানুষ এই বিশেষ গোষ্ঠীর আকাঙ্ক্ষা পূরণ হতে দেবে না। জনগণ শান্তি চায়। তাই আশা করা যায় জনগণ আলোচনার পক্ষে।
হাইকোর্ট কয়েক দিন আগে হরতাল-অবরোধ ও পেট্রল-সন্ত্রাস বন্ধের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নিতে সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন। আশা করা যায় সরকার এবার সন্ত্রাস, অবরোধ ও হরতাল বন্ধে ‘কার্যকর ব্যবস্থা’ গ্রহণ করবে। এর ফলে যদি বোমা-সন্ত্রাস, অবরোধ-হরতাল বন্ধ হয়, তাহলে জনসাধারণ সরকারকে অভিনন্দন জানাবে। অবরোধ বা হরতালের ব্যাপারে হাইকোর্টের নির্দেশ সরকার কীভাবে পালন করবে, তা এখনো আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। দেশে গণতন্ত্র, সংসদ, সংবিধান ইত্যাদি বহাল রেখে হরতাল–অবরোধ বন্ধ করা সহজ কাজ হবে না। তবু হাইকোর্টের নির্দেশ বলে কথা। সরকারের আইন বিশেষজ্ঞরা নিশ্চয় এ ব্যাপারে একটা কৌশল বের করবেন।
হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী সরকার সন্ত্রাস বন্ধে ‘কার্যকর পদক্ষেপ’ গ্রহণ করলে পেট্রলবোমা-সন্ত্রাস হয়তো বন্ধ হবে, কিন্তু তাতে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকট দূর হয়ে যাবে না। নাগরিক সমাজ শুধু বর্তমান সংকট দূর করার জন্য সংলাপের প্রস্তাব করেনি। ভবিষ্যতে যাতে সরকার ও প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অগণতান্ত্রিক আচরণে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন বিঘ্নিত না হয়, সে জন্য একটি জাতীয় সনদ রচনা এবং তাতে সব দল যেন একমত হতে পারে, তারও উদ্যোগ নিয়েছে। নাগরিক সমাজের কমিটি কীভাবে সংলাপের লক্ষ্যে এগোতে পারে, তার একটা খসড়া রূপরেখা এই লেখায় তুলে ধরছি। কমিটিতে অনেক যোগ্য, অভিজ্ঞ, গুণী ব্যক্তি রয়েছেন, তাঁরা হয়তো সঠিকভাবেই তাঁদের কর্মসূচি তৈরি করছেন। তবু নানাজনের নানা চিন্তা তাঁদের সহায়ক হতে পারে।
সংলাপের প্রথম পর্ব: ১. আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বা জ্যেষ্ঠ কোনো নেতার সঙ্গে পেট্রলবোমা-সন্ত্রাস বন্ধের ব্যাপারে কথা বলতে হবে। তাঁদের বোঝাতে হবে যে বোমা-সন্ত্রাস কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি হতে পারে না। যদি তাঁরা বোমা-সন্ত্রাসের দায়িত্ব নিতে রাজি না হন, তাহলে এর প্রতিবাদে ও অপরাধীদের শাস্তির দাবিতে বিবৃতিসহ নানা প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করতে পরামর্শ দিতে হবে। আওয়ামী লীগ এসব কর্মসূচি পালন করেছে। তবে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের অনেকে বোমা-সন্ত্রাসে যুক্ত বলে সংবাদপত্রে নাম, ঠিকানা, প্রমাণসহ খবর বেরিয়েছে। ২. আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদককে বোঝাতে হবে যে বিএনপিসহ সব বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মসূচি অবাধে বাস্তবায়নের সুযোগ দিতে হবে। সরকারকে এই মর্মে একটি বিবৃতি দিতে হবে যে বিএনপির সব অফিস খুলে দেওয়া হয়েছে, অবাধে নির্দিষ্ট স্থানে সভা-সমাবেশ তারা করতে পারবে। প্রয়োজন হলে ডিএমপি এ ব্যাপারে কিছু শর্ত দিতে পারে, যা সব দলের প্রতি প্রযোজ্য হবে। ৩. রাজনৈতিক মামলায় আটক বিএনপির নেতা–কর্মীদের মুক্তি দিতে হবে। ৪. অবরোধ বা হরতাল থেকে পাবলিক পরীক্ষাকে অব্যাহতি দিতে হবে। ৫. রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনে কতগুলো শর্তে সব প্রধান দলকে একমত হতে হবে। ৬. সংলাপ চলাকালে অবরোধ–হরতালের কর্মসূচি স্থগিত রাখতে হবে।
দ্বিতীয় পর্ব: সংলাপের প্রথম পর্ব সফল হলে দ্বিতীয় পর্বে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের কাছে প্রস্তাব দিতে হবে: ১. চলমান সংকট নিরসনের জন্য সব প্রধান রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে হবে। ২. নাগরিক সমাজ ও সব কেন্দ্রীয় পেশাজীবী গ্রুপের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। ৩. সংবাদপত্রে, টিভিতে প্রশ্নমালা দিয়ে ই-মেইলে, ডাকযোগে সাধারণ মানুষের মতামত নিতে হবে। এই আলাপ–আলোচনার মধ্য দিয়ে সরকার রাজনৈতিক দল ও জনমতের একটা প্রতিফলন পাবে। এই আলাপ-আলোচনা ও প্রশ্নমালার সম্ভাব্য এজেন্ডা কী হতে পারে? ক. ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সম্পর্কে তাঁদের অবস্থান কী? খ. তাঁরা কি বর্তমান সরকারকে মেয়াদের বাকি সময় পর্যন্ত মেনে নিতে রাজি আছেন, নাকি ছয় মাসের মধ্যে একটি মধ্যবর্তী নির্বাচন চান? গ. নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা সম্পর্কে তাঁদের মতামত কী? (সংবিধান সংশোধন না করেও গ্রহণযোগ্য একটি পথ বের করা যায়।) ঘ. বর্তমান নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন, পুলিশ ও বিজিবির নেতৃত্ব সম্পর্কে তাঁদের মনোভাব কী?
এভাবে সরকার জনমতের একটা প্রতিফলন পাবে। এর পরের কাজ সরকারের। প্রতিনিধিত্বমূলক জনমত যদি সরকারের বর্তমান অবস্থানের পক্ষে যায়, তাহলে সরকার বিনা দ্বিধায় পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকবে এবং ২০১৯ সালে নির্বাচন দেবে। যদি জনমত এর বিপরীত হয়, তাহলে সরকার তাদের নিজেদের ও দেশের বৃহত্তর স্বার্থে পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে মধ্যবর্তী নির্বাচন দেবে। বিদেশে জনমতের চাপে মধ্যবর্তী নির্বাচন হওয়াও গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী গ্রুপের সঙ্গে আলোচনা ও প্রশ্নমালার মাধ্যমে জনমত জরিপ ইত্যাদি খুব পেশাদারি ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে করতে হবে। বিআইডিএস ও সিপিডির মতো প্রতিষ্ঠানকে যৌথভাবে এর পরিকল্পনা, পরিচালনা ও লজিস্টিকসের দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। এ দুটি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে কোনো পক্ষের আপত্তি থাকলে ভিন্ন নামও প্রস্তাব করা যায়। তবে তা উভয় পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে।
নাগরিক সমাজের উদ্যোগের মধ্য দিয়ে আমরা যে স্বপ্ন দেখছি, তা ‘দিবাস্বপ্ন’ কি না, জানি না। তবে বর্তমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে এর চেয়ে কার্যকর বিকল্প আর দেখি না। যাঁরা পুলিশ ও হাইকোর্ট দিয়ে এই রাজনৈতিক সংকটের সমাধান চান, তাঁরা সাময়িক শান্তি বা স্বস্তির কথা ভাবছেন। কিন্তু আমরা বর্তমান সংকটকে রাজনৈতিকভাবে দেখছি এবং এর রাজনৈতিক সমাধান চাইছি। সমাধান দেশ ও জনগণের স্বার্থেই হতে হবে।
নির্বাচন প্রশ্নে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হলে জাতীয় সনদ নিয়ে দ্বিতীয় রাউন্ড আবার আলোচনা শুরু হবে। কারণ সুষ্ঠু নির্বাচন গণতন্ত্র নিশ্চিত করছে না। নির্বাচিত সরকারকে আমরা ‘নির্বাচিত স্বৈরাচার’ হিসেবেও দেখেছি। এ জন্য নির্বাচনের আগেই জাতীয় সনদে একমত হওয়া খুব জরুরি। তবে বর্তমান সন্ত্রাস ও রাজনৈতিক সংকট দূর করার আগে জাতীয় সনদের প্রসঙ্গ বেশি আলোচনা করার প্রয়োজন নেই। সংলাপের প্রথম পর্ব সফল হলেই জাতীয় সনদ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা শুরু করা যাবে।
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: মিডিয়া ও উন্নয়নকর্মী।

Thursday, February 12, 2015

জাতীয় সংলাপ ও জাতীয় সনদ by মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

বিশিষ্ট নাগরিকদের উদ্যোগে জাতীয় সংলাপের উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। এই উদ্যোগ আরও একটি কারণে ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। কারণ, তাঁরা দেশে স্থায়ীভাবে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ বজায় রাখার জন্য সব দলের পালনীয় একটি ‘জাতীয় সনদ’ও রচনা করার উদ্যোগ নিয়েছেন। বড় দুই দল মিলে যে রাজনৈতিক অপসংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে, তাতে এ ধরনের সহিংসতা বা সংঘাত আবার কখনো শুরু হবে না, তা নিশ্চিত বলা যায় না। কাজেই আমাদের রাজনৈতিক দলের ও সরকারের অবশ্যপালনীয় এমন কিছু শর্তে সব দলকে একমত হতে হবে। নাগরিক সমাজ উদ্যোগ নিলেও নির্বাচন কমিশনকেই এ ব্যাপারে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। নইলে তা নব্বইয়ের তিন জোটের অঙ্গীকারের মতো হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে।
প্রথমত, বর্তমান সংকটের অবসান কীভাবে করা যায়, সে ব্যাপারে প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যে মতৈক্য হতে হবে। সেটা এই মুহূর্তে খুবই জরুরি। নানা ভঙ্গিতে দেশে দূষিত ও রুগ্ণ রাজনীতি রয়েছে। প্রধান কয়েকটি দলই এর পৃষ্ঠপোষক। রুগ্ণ রাজনীতি বজায় থাকলে দেশে আবার এ ধরনের বা অন্য ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। ‘পেট্রলবোমা’ ও ‘বালুর ট্রাক’ দুটোই আমাদের অসুস্থ ও দূষিত রাজনীতির সৃষ্টি। কোনো এক পক্ষকে দায়ী করে সমস্যার সমাধান করা যাবে না। রাজনীতির অঙ্গন থেকে একই সঙ্গে পেট্রলবোমা ও বালুর ট্রাক, দুটোকেই বিদায় দিতে হবে। অনেকে বলতে পারেন, ‘বালুর ট্রাক তো মানুষ মারেনি বা কাউকে অসহনীয়ভাবে আঘাত করেনি, যা পেট্রলবোমা করেছে।’ খুবই লাগসই যুক্তি। কিন্তু পেট্রলবোমার রাজনীতি যে বালুর ট্রাক থেকে সৃষ্ট, এ কথা অস্বীকার করার কি উপায় আছে? এখানে আমরা বালুর ট্রাককে নিছক একটি ‘ট্রাক’ হিসেবে দেখছি না। ‘বালুর ট্রাক’ হলো প্রধান বিরোধী দলকে তার বক্তব্য বা প্রতিবাদ প্রকাশ করার পথে সরকারি প্রতিবন্ধকতার প্রতীক। বালুর ট্রাক দিয়ে বাধা সৃষ্টি করার সময় সরকার একবারও মনে করেনি যে অদৃশ্য শত শত বালুর ট্রাক দেশের সব হাইওয়েতে দিনের পর দিন (এক মাসেরও বেশি) যান চলাচলে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। রুগ্ণ রাজনীতির প্রতিবাদ তো রুগ্ণ রাজনীতি দিয়েই হবে।
দেশে এখন রাজনীতির নামে পেট্রলবোমার সহিংসতা চলছে, যার নিন্দা করার ভাষা আমাদের নেই। এর নাম রাজনীতি হতে পারে না। এটা রাজনৈতিক প্রতিবাদের কোনো কর্মসূচিও হতে পারে না। এসব সন্ত্রাসীকে আইনের মাধ্যমে কঠোর শাস্তি দেওয়া প্রয়োজন। ক্রসফায়ার নতুন সংকট ডেকে আনতে পারে। সরকার দাবি করেছে, ‘বিএনপি-জামায়াত জোট এই বর্বরতা চালাচ্ছে।’ বিএনপি দাবি করেছে, ‘সরকারের এজেন্টরা এই বোমাবাজি করে বিএনপির ওপর দায় চাপাচ্ছে।’ অন্তত ছয় মাস আগে প্রথম আলো পত্রিকায় এক কলামে আমি লিখেছিলাম, ‘বিএনপি শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করতে চাইলেও সরকার তা হতে দেবে না। সরকারের এজেন্টরা আন্দোলনকে সহিংসতার দিকে নিয়ে যাবে। আর সহিংসতার অভিযোগে বিএনপির নেতাদের পাইকারিভাবে গ্রেপ্তারের সুযোগ পাবে।’
আজ আমরা কী দেখছি? অনেক সময় রাজনৈতিক ভবিষ্যদ্বাণী মিলে যায়। সব সময় মেলে না। বিএনপি এখানে সরকারের কৌশলের কাছে আবার হেরে গেছে। বিএনপির দাবি অনুযায়ী যদি সরকারের এজেন্টরা এই বোমাবাজি করেও থাকে, তবু জনগণের কাছে সরকার এটা বোঝাতে সফল হয়েছে যে এই বোমাবাজি বিএনপি-জামায়াতই করছে। জনগণ এ জন্য এখন বিএনপি-জামায়াতের ওপরই ক্ষুব্ধ। বিএনপি এই সরকারি প্রচারণার যে প্রতিবাদ করেছে, তা খুবই মৃদু। বোমাবাজির বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ বিএনপি করতে ব্যর্থ হয়েছে। এ জন্য সামনে আরও অনেক দিন বিএনপিকে এর ফল ভোগ করতে হবে। অনেক নিরীহ সাধারণ মানুষের অভিশাপ থেকে বিএনপি রেহাই পাবে না। এসব সাধারণ মানুষ রাজনীতির কূটচাল বোঝে না। সারা দেশে বিএনপির একটি খারাপ ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে। বোমাবাজির নীলনকশা করে এখানেই সরকারের সাফল্য (বিএনপির দাবি যদি সত্য হয়)।
জাতীয় সংলাপের ইস্যুতে আবার ফিরে আসি। অনেকে বলতে পারেন, ‘দেশের এই সংকট সমাধানের দায়িত্ব সরকারের। বিশিষ্ট নাগরিকদের এখানে করার কিছু নেই।’ আমরা মনে করি, এই ধারণা ঠিক নয়। কেন নয়, তার কয়েকটি কারণ দেখাতে চাই। ১. সরকার বিভিন্ন বাহিনীকে সর্বোচ্চ ক্ষমতা দিয়েও বোমাসন্ত্রাস, চোরাগোপ্তা হামলা বন্ধ করতে পারেনি। প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছে। বার্ন ইউনিটের আর্তনাদ আর সহ্য করা যাচ্ছে না। মানুষ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। হরতাল ও অব্যাহত অবরোধে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির। আকাশযান ছাড়া অন্য সব আন্তজেলা যানবাহন প্রায় বন্ধ বা অনিয়মিত। দেশে একটা অস্বস্তিকর অবস্থা বিরাজ করছে। এভাবে দেশ চলতে পারে না। তাই দেশের স্বার্থে কাউকে না কাউকে উদ্যোগ নিতে হবে।
২. দেশে আজ যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তার মূলে ৫ জানুয়ারির ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ নির্বাচন। ৩. দেশটা শুধু আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নয়। ১৬ কোটি মানুষের। বিশিষ্ট নাগরিকেরা সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে দেশের সংকটকালে যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তা সফল হলে বিশিষ্ট নাগরিকেরা লাভবান হবেন না। দিনের শেষে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই হবে। আর তাতে অংশ নেবেন রাজনৈতিক নেতারাই। বিশিষ্ট নাগরিকেরা নন।
৪. ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। ২০ শতাংশ ভোটারও তাতে অংশ নেননি। ১৫৪ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। সংসদে একটি কৃত্রিম ও গৃহপালিত বিরোধী দল সাজানো হয়েছে। এর কোনোটাই গণতন্ত্রের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। দেশে স্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জন্য একটি অংশগ্রহণমূলক গ্রহণযোগ্য নির্বাচন প্রয়োজন। ৫. দুটি বড় দলের ও দুই নেত্রীর জেদাজেদির জন্য আমাদের এই সম্ভাবনাময় দেশ, দেশের অর্থনীতি রসাতলে যেতে পারে না। ৬. দলের চেয়ে দেশ বড়। ৭. নির্বাচন পরিচালনা, নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নেও একটা সমঝোতা হতে হবে। আর এই সমঝোতার জন্য প্রয়োজন হবে একটি তৃতীয় পক্ষ। এঁরা হবেন দেশের নেতৃস্থানীয় ও নিজ নিজ পেশায় যাঁদের ব্যক্তিগত অবদান অতুলনীয়। শুধু রাজনীতিবিদেরা মিলে এই সমঝোতা করতে পারবেন না। রাজনীতিতে দলের বাইরে সাধারণ মানুষ ও নির্বাচনে সাধারণ ভোটারদের স্বার্থ খুব গুরুত্বপূর্ণ। ৮. শুধু একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হলেই দেশে শান্তি ফিরে আসবে না। কারণ, রুগ্ণ ও দূষিত রাজনীতি আমাদের সরকারের প্রশাসনিক কাঠামো, জাতীয় সংসদ, বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, বিচারব্যবস্থা ইত্যাদিকে অনেক দুর্বল করে দিয়েছে। দলীয়করণ ছাড়া বড় দুটি দল এখন সরকার পরিচালনার কথা চিন্তাই করতে পারে না। কাজেই নির্বাচনোত্তর দেশের পরিস্থিতির কথা চিন্তা করে রাজনৈতিক দলগুলোকে একটি ‘জাতীয় সনদে’ স্বাক্ষর করতে হবে।
আমরা মনে করি, ‘জাতীয় সনদ’ গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সুস্থ নির্বাচনে জয়ী দলও সরকার পরিচালনার নামে দেশে জমিদারি রাজ কায়েম করতে পারে। এটা গণতান্ত্রিক দেশ। এখানে কেউ যাতে ভবিষ্যতে ‘নির্বাচিত স্বৈরাচার’ বা ‘পরিবারতন্ত্র’ বা ‘জমিদারি ব্যবস্থা’ চালু করতে না পারেন, সে জন্য জাতীয় সনদে ব্যবস্থা থাকতে হবে।
তবে জাতীয় সনদ এখনো আমাদের কাছে পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। যদিও ‘সুজন’ তাদের ফোরামের পক্ষ থেকে কিছু বক্তব্য প্রকাশ করেছে। বৃহত্তর নাগরিক সমাজের কয়েকজন প্রতিনিধি জাতীয় সনদের মুসাবিদা করেছেন। আমরা অনুরোধ করব, গণমাধ্যমে এর খসড়া প্রকাশ করা হোক, যাতে সাধারণ মানুষ খসড়া সনদ সম্পর্কে তাঁদের মতামত দিতে পারেন। এমনকি রাজনৈতিক দল, নেতা-কর্মীরাও তাঁদের মতামত দিতে পারেন।
এসব কারণে বিশিষ্ট নাগরিকদের এই উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। এখানে উল্লেখ করা যায়, গুরুত্বপূর্ণ অনেক রাষ্ট্র ও জাতিসংঘের পক্ষ থেকে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বর্তমান সংকট নিরসনের জন্য সরকার ও রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। কাজেই নাগরিকদের এই উদ্যোগ বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। বরং আরও আগেই এই উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিল।
এই উদ্যোগ নির্দল নাগরিকদের উদ্যোগ। আমাদের ধারণা, রাজনীতিবিদ পরিচয়ে পরিচিত ব্যক্তিদের এই উদ্যোগে রাখা ঠিক হবে না। বরং এই কমিটি রাজনীতিবিদদের কথা শুনতে যাবে।
এ রকম একটি উদ্যোগের প্রতি সরকার কী অবস্থান গ্রহণ করবে, আমরা জানি না। সরকারের নানা মন্ত্রী, এমনকি প্রধানমন্ত্রী ‘সংলাপ’ নিয়ে নানা নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন। আশা করি সরকার পুরো পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে বিশিষ্ট নাগরিকদের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাবে এবং সহায়তা করবে। ‘সন্ত্রাসী দলের’ সঙ্গে কথা বলতে সরকার রাজি না হতে পারে, কিন্তু ‘বিশিষ্ট নাগরিকদের’ সঙ্গে দেশের স্বার্থে কথা বলতে সরকার রাজি হবে, এটাই আশা করা যায়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে একটা কথা সবাইকে মনে রাখতে অনুরোধ করি। এই দেশটার মালিক দুটি দল নয়। কোনো নেতাও এই দেশের মালিক নন। দেশের মালিক জনগণ। রাজনৈতিক দলের নেতা–নেত্রীরা অস্থায়ী। নেতা পরিবর্তনশীল। কিন্তু দেশ ও জনগণ পরিবর্তনশীল নয়। বড় দুই দলের প্রতিহিংসা ও দুই নেত্রীর জেদাজেদির কাছে আমাদের দেশ জিম্মি হতে পারে না।
বিশিষ্ট নাগরিকদের এই উদ্যোগ নিয়ে দেশব্যাপী ও মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনার ব্যবস্থা করে জনমত গঠন করা হোক। আশা করি জনমতের চাপেই সরকার একটা সমঝোতায় আসবে ও বিভিন্ন দল ‘জাতীয় সনদে’ স্বাক্ষর করবে। এই মুহূর্তে জনমত গঠন জরুরি।
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: মিডিয়া ও উন্নয়নকর্মী।