Monday, November 11, 2024

এমপি-মন্ত্রীদের স্ত্রীরা ছিলেন তার শয্যাসঙ্গী

এক বা দুজন নয়, ডজন খানেক নারীর সঙ্গে যৌনকর্মে লিপ্ত হয়েছেন জাতীয় আর্থিক দুর্নীতি দমন শাখার পরিচালক। এমন চারশ’র বেশি গোপন ভিডিও ফাঁস হয়েছে অভিযুক্ত সরকারি এ কর্মকর্তার। অবাক করার মতো বিষয় হল ভিডিওতে সরকারি এই কর্মকর্তার সঙ্গে অন্তরঙ্গ অবস্থায় থাকা নারীরা সাধারণ কেউ নয়। বরং সংশ্লিষ্ট নারীরা সকলেই সরকারের উচ্চপর্যায়ের বিভিন্ন কর্মকর্তাদের স্ত্রী। তারা অভিযুক্ত ওই কর্মকর্তার অফিসেই তার সঙ্গে অন্তরঙ্গ হয়েছেন। এরই মধ্যে এসব ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

শতাধিক নারীর সঙ্গে যৌনকর্মে লিপ্ত হওয়া এই কর্মকর্তার নাম বালতাসার ইবাং এনগোঙ্গা। তিনি আফ্রিকার দেশ গিনির জাতীয় আর্থিক দুর্নীতি দমন শাখার পরিচালক। সম্পর্কের সূত্রে তিনি দেশটির প্রেসিডেন্ট তেওডোরো ওবিয়াং এনগুয়েমার ভাতিজা। এমনকি ওবিয়াংয়ের মেয়াদ শেষে এনগোঙ্গাকেই গিনির পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে ভাবা হচ্ছিল।

বিভিন্ন ভিডিওতে এনগোঙ্গার সঙ্গে অন্তরঙ্গ নারীদের দেখে বুঝা যায় তারা কেউ কেউ এসব মুহুর্তের ভিডিও ধারণের ব্যাপারে জানতেন। ভিডিওতে এনগোঙ্গোর সঙ্গে প্রেসিডেন্টের আত্মীয়া, বিভিন্ন মন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তার স্ত্রীদের অন্তরঙ্গ হতে দেখা যায়।

বিবিসি জানিয়েছে, এসব ভিডিওর সত্যতা যাচাই করা যায়নি। দেশটিতে স্বাধীন সাংবাদিকতার কোনো অস্তিত্ব না থাকায় এসব ভিডিও উৎস সম্পর্কে খুব বেশি ধারণা পাওয়া যায় না। তবে এনগোঙ্গার ভিডিওগুলো টেলিগ্রাম, টুইটার, টিকটকের মতো বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

অভিযুক্ত এনগোঙ্গা জাতীয় অর্থনৈতিক তদন্ত কমিশনের প্রধান হিসেবে তার হাতে বেশ কিছু অর্থ পাচার সংক্রান্ত অভিযোগের নিষ্পত্তির দায়িত্ব ছিল। তবে যৌন ভিডিও ফাঁস হওয়ার কারণে তিনিই এখন তদন্তের আওতায় চলে এসেছেন। যদিও সরকার বলছে এগুলো তার বিরুদ্ধে গভীর কোনো ষড়যন্ত্রের অংশ। এমনকি এসব ভিডিও ছড়িয়ে পড়া আটকাতে বেশ প্রচেষ্টা চালিয়েছিল গিনি সরকার। তবে ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর এনগোঙ্গার মোবাইল ও কম্পিউটার জব্দ করে সরকার।

ভিডিও ফাঁসের পর ২৫ অক্টোবর এনগোঙ্গাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ এবং কেম্যান দ্বীপপুঞ্জের গোপন অ্যাকাউন্টে জমা করার অভিযোগ আনা হয়। গ্রেপ্তারের পর এনগোঙ্গাকে রাজধানী কোনাক্রির ব্লাক বিচ জেলখানায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সরকার বিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের আটক রেখে নির্দয় নির্যাতন চালানোর অভিযোগ করে আসছিল মানবাধিকার সংস্থাগুলো।

আলো ও অন্ধকারে নারী অবয়ব। ছবি : সংগৃহীত

গাজার বিশাল ভূখণ্ড দখলে নিয়েছে ইসরায়েল

যুদ্ধের মধ্যেই গাজার বেশ বড় একটি অংশ দখল করে নিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। সম্প্রতি ইসরায়েলের প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে এমন দাবির সত্যতা তুলে ধরেন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন বিশেষজ্ঞ ও নরওয়েজিয়ান শরণার্থী পরিষদের বিশেষ উপদেষ্টা আইতে এপ্সটেইন।

মাইক্রোব্লগিং সাইট এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, ইসরায়েল এরই মধ্যে গাজার ৫৬ বর্গকিলোমিটার ভূমি দখল করেছে। দখলকৃত এ ভূমির নাম দেয়া হয়েছে নেতজারিম টেরিটরি।

এপ্সটেইন জানান, উত্তর গাজা ও রাফাহতে একইভাবে আরও ভূমি স্থায়ীভাবে দখল করার পরিকল্পনা রয়েছে ইসরায়েলি বাহিনীর। এরই মধ্যে ইসরায়েলি হামলার মুখে ২২ লাখ ফিলিস্তিনি খান ইউনিস এবং আল বুরেজ শহরে মানবেতর জীবনযাপন করছে। অথচ গাজা ভূখণ্ডের মোট আয়তন মাত্র ৩৬৫ বর্গ কিলোমিটার। যা অবরুদ্ধ উপত্যকাটিতে বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলগুলোর একটিতে পরিণত করেছে।

এ সময় ইসরায়েলে কর্তৃক ফিলিস্তিনের সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুেদ্ধ সশস্ত্র বাহিনীর ব্যবহার আন্তর্জাতিক আইনে আগ্রাসনের নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে। এমনকি এটি আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি বলেও জানান এ মানবাধিকার কর্মী।

উল্লেখ্য, ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজায় এক বছর ধরে হামলা চালিয়ে আসছে ইসরায়েল। দেশটির অব্যাহত এ হামলায় সৃষ্ট ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করতে অন্তত ১৫ বছর সময় লাগবে। এ জন্য প্রতিদিন ১০০টি লরি ব্যবহার করতে হবে।

জাতিসংঘের হিসাবমতে, গাজায় ভবন ধসে এ পর্যন্ত ৪২ মিলিয়ন টনেরও বেশি ধ্বংসস্তূপ জমা হয়েছে। এ ধ্বংসস্তূপগুলো যদি একসঙ্গে এক জায়গায় রাখা যায়, তাহলে তা মিশরের ১১টি গ্রেট পিরামিডের সমান হবে। এ ধ্বংসস্তূপ সরাতে ব্যয় হবে ৫০০ থেকে ৬০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার বেশি)।

ইউএন এনভায়রনমেন্ট প্রোগ্রামের হিসাব অনুসারে, গাজায় ১ লাখ ৩৭ হাজার ২৯৭টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা অঞ্চলটির মোট ভবনের অর্ধেকের বেশি। ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের মধ্যে এক-চতুর্থাংশ পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। এ ছাড়া এক-দশমাংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এক-তৃতীয়াংশ বেশ খানিকটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব ভবনের ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে ফেলার জন্য ২৫০ থেকে ৫০০ হেক্টর জমির প্রয়োজন পড়বে

গাজাভিত্তিক জাতিসংঘের একজন কর্মকর্তা গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘অবকাঠামোর যে পরিমাণ ক্ষতি করা হয়েছে, তা পাগলামির পর্যায়ে পড়ে... দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে একটি ভবনও নেই যেখানে ইসরায়েল হামলা চালায়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রকৃত অর্থেই এ অঞ্চলের ভৌগোলিক চিত্র পরিবর্তিত হয়ে গেছে। যেখানে আগে পাহাড় ছিল না, এখন সেখানে পাহাড় হয়ে গেছে। দুই হাজার পাউন্ডের বোমাগুলো আক্ষরিক অর্থেই এ অঞ্চলের মানচিত্র বদলে দিয়েছে।’ 

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ও তাদের দখল করা অঞ্চল। ছবি : সংগৃহীত
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ও তাদের দখল করা অঞ্চল। ছবি : সংগৃহীত

বেসামরিকদের জোরপূর্বক নিয়োগে গভীর সংকটে মিয়ানমার

মিয়ানমারে জান্তা সরকার আসার পর থেকে তাদের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়েছে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী। দেশটিতে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এতটাই সফলতা দেখাচ্ছে যে, তাদের মোকাবিলায় হিমশিম অবস্থা মিয়ানমারের জান্তা সরকারের। এছাড়া দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই সংঘাতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সামরিক সদস্য হারিয়েছে দেশটি। অন্যদিকে দেশটির বেশ কিছু অঞ্চল নিজেদের দখলে নেয়ার দাবি করেছে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো। হারানো অঞ্চল পুনরায় ফিরে পেতে মিয়ানমারের বেসামরিকদের জান্তার হয়ে যুদ্ধ করতে বাধ্য করছে মিয়ানমারের জান্তা সরকার। ভুক্তভোগীর অভিযোগ হচ্ছে বেসামরিক লোকজনের অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাদের জোরপূর্বক সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। এ বিষয়ে বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়, চাউ সু (ছদ্মনাম) তার স্বামীকে শেষবার দেখেছিলেন গত মার্চে। সেসময় তাকে জোরপূর্বক মিয়ানমারের সেনাবাহিনীতে নিয়োগ দেওয়া হয়। চার মাস পরে চাউ সু জানতে পারলেন তার স্বামী যুদ্ধে নিহত হয়েছেন। বিবিসি’কে মিয়ানমারের এই নারী বলেন, সবসময়ই আমাদের জীবন দরিদ্রের এবং সংগ্রামের, তারপরেও তাকে ছাড়া এ জীবন বয়ে চলা বেশ কঠিন। মাত্র ২৫ বছর বয়সে বিধবা হলেন চাউ সু। যার জীবন পুরোটাই তার স্বামীর উপর নির্ভরশীল। বর্তমানে তিন সন্তানসহ চরম দুর্দশার মধ্যে পড়েছেন অল্প বয়সে বিধবা হওয়া এই নারী। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারের জান্তা সরকার একটি আইন জারি করে। যার মাধ্যমে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী পুরুষ এবং ১৮ থেকে ২৭ বছর বয়সী নারীদের দুই বছরের জন্য সেনাবাহিনীতে নিয়োগ বাধ্যতামূলক করা হয়। ২০২১ সালে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সুচি’কে ক্ষমতাচ্যুত করে ক্ষমতা দখল করে সামরিক সরকার। এরপর থেকেই দেশটিতে শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। পিপল’স ডিফেন্স ফোর্সেস (পিডিএফ) নামের সংগঠনের নেতৃত্বে বেশ কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠী সামরিক সরকারে বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে। টানা দুই বছর লড়াইয়ের পর ২০২৩ সালে বেশ সফলতা পেতে শুরু করে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো। দেশটিতে সামরিক শাসনে দমন-পীড়নের দীর্ঘ ইতিহাস থাকায় বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর প্রতি জনসমর্থন বেড়েছে। দাবি অনুযায়ী দেশটির দুই-তৃতীয়াংশ নিয়ন্ত্রণ এখন বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর হাতে। বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা সত্ত্বেও মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীতে বেসামরিকদের জোরপূর্বক নিয়োগ বর্তমান গৃহযুদ্ধকে আরও তরান্বিত করেছে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের।
mzamin

ট্রাম্প বিজয়ের পর যুক্তরাষ্ট্রে নারীদের ‘পুরুষ বয়কট’ আন্দোলন

ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়লাভ এবং রিপাবলিকান পার্টির কংগ্রেসে পুনঃবিজয়ের পর যুক্তরাষ্ট্রের নারীরা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগে রয়েছেন। ট্রাম্পের শাসনামলে পুরুষতান্ত্রিক ও কনজারভেটিভ নীতির প্রসার ঘটেছে, যা তাদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও অধিকারকে সংকুচিত করার আশঙ্কা তৈরি করেছে।

এই উদ্বেগ থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে আবার জেগে উঠেছে ‘ফোর বি’ আন্দোলন—একটি চাঞ্চল্যকর এবং প্রতিবাদী সংগ্রাম, যেখানে নারীরা পুরুষদের সঙ্গে সম্পর্ক, যৌনতা, বিয়ে এবং সন্তান ধারণ বর্জনের ডাক দিয়েছে।

ফরাসি সংবাদমাধ্যম ফ্রান্স-২৪–এর প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

এর আগে দক্ষিণ কোরিয়ার নারীরা প্রথম এ আন্দোলন শুরু করেন। যেখানে তারা পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে এবং নিজেদের মর্যাদা রক্ষার্থে একে একে নিজেদের ওপর চাপানো সামাজিক নিয়মগুলো যেমন সৌন্দর্য চর্চা এবং শারীরিক আকর্ষণের জন্য নির্দিষ্ট মানদণ্ড মেনে চলা প্রত্যাখ্যান করেন। এ আন্দোলনটি পরে বিশ্বের অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর চর্চা তীব্র হয়ে ওঠে।

এদিকে ট্রাম্পের বিজয়ের পর, যুক্তরাষ্ট্রের নারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ফোর বি’ আন্দোলন সমর্থন জানাতে শুরু করেছেন। এক পোস্টে বলা হয়েছে, ‘নারীরা, আমাদের এখন দক্ষিণ কোরিয়ার নারীদের মতো ‘ফোর বি’ আন্দোলন শুরু করার সময় এসেছে! বিয়ে নয়, সন্তান জন্ম নয়, পুরুষদের সঙ্গে ডেটিং নয়, আর কোনো যৌন সম্পর্ক নয়! যুক্তরাষ্ট্রের জন্মহার কমিয়ে দিতে হবে এবং আমরা পুরুষদের বিজয়ের হাসি হাসতে দিতে পারি না। আমাদের মরণ কামড় দিতে হবে!’

এই পোস্টটি মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় ২ কোটি ভিউ এবং প্রায় ৫ লাখ রিঅ্যাকশন পেয়েছে। টিকটকেও একই ধরনের প্রচারণা ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে নারীরা একে একে পুরুষদের বয়কট করার পক্ষে সাফ কথা বলছেন।

এ আন্দোলন যুক্তরাষ্ট্রের নারীদের মধ্যে সেই সংকটের প্রতিফলন, যা তারা ট্রাম্প প্রশাসনের শাসনকালে অনুভব করছেন। অনেকের আশঙ্কা, ট্রাম্পের কনজারভেটিভ নীতির কারণে নারী অধিকার সংকুচিত হতে পারে এবং নিজেদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে, ট্রাম্পের রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গি ও নারী-বিরোধী আইনি পদক্ষেপের কারণে নারীরা নিজেদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বিগ্ন।

প্রসঙ্গত, ফোর বি আন্দোলন দক্ষিণ কোরিয়াতে ২০১৯ সালে ‘মি টু’ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে শুরু হয়েছিল। সেখানে গোপনে নারীদের ভিডিও ধারণের প্রতিবাদে কট্টর নারীবাদীরা এ আন্দোলন গড়ে তোলেন, যার উদ্দেশ্য ছিল নারীদের শরীরকে যৌন বস্তু হিসেবে নয়, বরং একটি স্বাধীন ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখতে শেখানো। এ আন্দোলনটির সমর্থকদের দাবি, ‘আমরা নারীরা আর কোনো পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অংশ হতে চাই না। আমরা নিজেদের দেহ এবং জীবনের মালিক।’

তবে দক্ষিণ কোরিয়াতে এ আন্দোলনটি বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। কারণ অনেকেই মনে করেন, এর ফলে দেশে জন্মহার হ্রাস পেয়েছে, যা দেশের ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগজনক। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট ইউন সুক-ইওল এ বিষয় মন্তব্য করেন, ‘নারীবাদ পুরুষ ও নারীর মধ্যকার স্বাস্থ্যকর সম্পর্ককে বাধাগ্রস্ত করছে।’

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশেও এই আন্দোলনের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে, বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। একদিকে যেখানে ‘ফোর বি’ আন্দোলন নারীর ক্ষমতায়নের জন্য তীব্র প্রতিবাদ হিসেবে দাঁড়িয়ে, অন্যদিকে এটি যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে নতুন রাজনৈতিক এবং সামাজিক বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে। ট্রাম্পের বিজয়ের পর নারীদের মধ্যে এই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং তা সমাজের বিভিন্ন স্তরে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন।

উল্লেখ্য, ‘ফোর বি’ আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য হলো, নো ডেট উইথ মেন, নো ম্যারিজ, নো সেক্স, নো গিভিং বার্থ। অর্থাৎ, পুরুষদের সঙ্গে কোনো ডেটিং, প্রেম, যৌন সম্পর্ক বা সন্তান ধারণ থেকে বিরত থাকা।

যুক্তরাষ্ট্রে আন্দোলনরত নারীরা। ছবি : সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রে আন্দোলনরত নারীরা। ছবি : সংগৃহীত



যেভাবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করতে যাচ্ছেন ট্রাম্প!

প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে চলমান যুদ্ধ বন্ধে পদক্ষেপ নেবেন বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেই ঘোষণা বাস্তবায়নে এবার নিজের পরিকল্পনাও প্রকাশ করলেন তিনি। ট্রাম্প প্রস্তাবিত এই পরিকল্পনায় বলা হয়েছে রাশিয়া ও ইউক্রেনের সেনাদের মধ্যে ৮০০ মাইল দীর্ঘ একটি বাফার জোন প্রতিষ্ঠা করা হবে।

শুক্রবার (৮ নভেম্বর) ব্রিটিম সংবাদমাধ্যম ডেইলি মেইলের এক প্রতিবেদনে ট্রাম্প প্রস্তাবিত এই পরিকল্পনার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ইউক্রেনে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কোনো সেনা পাঠানো হবে না। বরং এই বাফার জোন প্রতিষ্ঠা করবে ইউরোপীয় ও ব্রিটেনের সেনারা।

ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুসারে, রাশিয়া ইউক্রেনের যে পরিমাণ ভূমি দখল করেছে এবং রুশ বাহিনী ইউক্রেনের রণক্ষেত্রে যে পরিমাণ অগ্রসর হয়েছে সেখানটাকেই সীমান্ত ধরে বাফার জোন প্রতিষ্ঠা করা হবে এবং ইউক্রেনকে ২০ বছরের জন্য ন্যাটোতে যোগদানের পরিকল্পনা স্থগিত রাখতে হবে।

রাশিয়া এবং ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা সীমিত করার পক্ষে ট্রাম্প। ইউক্রেনকে বাইডেন প্রশাসনের মতো একচেটিয়া সামরিক এবং অর্থনৈতিক সহায়তা করার পক্ষেও নন তিনি।

ট্রাম্পের মতে, রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাকি সদস্য দেশ এবং সামরিক জোট ন্যাটোর পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নির্ভরতা দিয়ে ইউক্রেন ইস্যু সমাধান করতে চান না ট্রাম্প।

পরিকল্পনার সাথে পরিচিত সূত্র বলছে, ৮০০ মাইল বাফার জোন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে রাশিয়া এবং ইউক্রেনের মধ্যে একটি নিরস্ত্রীকরণ এলাকা তৈরি করা হবে। যা ভবিষ্যতে দুই পক্ষের সংঘর্ষের সম্ভাবনা কমাতে এবং কূটনৈতিক আলোচনার জন্য কাজে আসবে।

পরিকল্পনায় আরও বলা হয়েছে, এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র সরবরাহ করবে, যেন রাশিয়া আবারও যুদ্ধ শুরু করতে না পারে। যুক্তরাষ্ট্র এই মিশন পরিচালনা বা তদারকিতে কোনো সেনা পাঠাবে না এবং অর্থায়নও করবে না।

ট্রাম্পের এক সহকারী মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে জানিয়েছেন, ‘আমরা প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য সহায়তা দিতে পারি, তবে বন্দুকের নল থাকবে ইউরোপিয়ানদের হাতে। আমরা মার্কিন পুরুষ ও নারীদের ইউক্রেনে শান্তি রক্ষায় পাঠাচ্ছি না। আর আমরা এর জন্য অর্থও ব্যয় করছি না বরং পোল্যান্ড, জার্মানি, যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্সকে এই দায়িত্ব নিতে বলা হবে।’

রাশিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং চুক্তির ওপর জোর দিয়ে আসছেন ট্রাম্প। তবে ইউক্রেন প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির অভিযোগ করে বলেছেন, ইউরোপকে রক্ষা করতে গিয়ে রাশিয়াকে তুষ্ট করার চেষ্টা আত্মহত্যার নামান্তর হবে। মূলত এই মন্তব্যের মাধ্যমে রাশিয়ার সঙ্গে শান্তিচুক্তির সম্ভাবনা কঠোরভাবে নাকচ করেছেন তিনি।

এদিকে ট্রাম্পের সিনিয়র উপদেষ্টা ব্রায়ান লানজা জানিয়েছেন, চলমান ইউক্রেন সংঘাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চিন্তা রাশিয়ার দখলকৃত অঞ্চল ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি না করে শান্তি অর্জনের দিকে হওয়া উচিত।

যদিও বাইডেন প্রশাসন এবং ন্যাটোর অনেকেই ক্রিমিয়া এবং ডনবাসের মতো অধিকৃত অঞ্চলগুলোকে ফিরিয়ে আনা সহ ইউক্রেনের সার্বভৌমত্বকে বহাল রাখতে হবে বলে জোর দিয়ে এসেছেন। তবে ট্রাম্পের উপদেষ্টারা আরও বাস্তববাদী অবস্থানের পক্ষে কথা বলছেন। ফলে ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত কোন প্রক্রিয়ায় থামে তাই এখন দেখার বিষয়।

ছবি : সংগৃহীত

ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতা থেকে সরে দাঁড়াল কাতার

ইসরায়েল এবং হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি আলোচনা ও মধ্যস্থতার দায়িত্ব থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছে কাতার।

শনিবার (৯ নভেম্বর) কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংবাদমাধ্যম আলজাজিরায় এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানায়।

বিবৃতিতে বলা হয়, গাজায় যুদ্ধের অবসান ঘটাতে 'দুই পক্ষের গুরুত্ব ও ইচ্ছা' না থাকলে, তারা আর মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করবে না। তবে, কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হামাসের রাজনৈতিক কার্যালয় বন্ধ করার দাবিকে নাকচ করেছে।

বিবৃতিতে আরও জানায়, দুই সপ্তাহ আগে বাইডেন প্রশাসনের পক্ষ থেকে কাতারের রাজধানী দোহায় হামাসের কার্যালয় বন্ধ করে দেওয়ার দাবি জানানো হয়। তবে কাতার এ দাবি তা প্রত্যাখ্যান করেছে।

এদিকে ইসরায়েল, হামাস এবং হিজবুল্লাহর মধ্যে যুদ্ধবিরতি আলোচনা অব্যাহত থাকলেও, যুদ্ধের সমাপ্তির কোনো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা এখনও পাওয়া যায়নি। এই অনিশ্চিত পরিস্থিতি বিবেচনা করে কাতার, মধ্যস্থতার দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে কাতার।

উল্লেখ্য, গত বছরের ৭ অক্টোবর হামাসের আক্রমণের পর থেকে গাজায় প্রতিশোধমূলক নির্বিচার গণহত্যা পরিচালনা করছে ইসরায়েল। হামাস নিয়ন্ত্রিত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, নিহতের সংখ্যা ৪৩ হাজার ৫০০ ছাড়িয়েছে, এবং আহতের সংখ্যা এক লাখেরও বেশি। জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই গণহত্যায় ৭০ শতাংশ হতাহতই নারী ও শিশু।

এদিকে গতকাল শনিবার গাজায় ইসরায়েলের সর্বশেষ হামলায় অন্তত ১৬ জন নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে আলজাজিরা।

গাজায় ইসরায়েলের হামলায় ধ্বংসস্তূপের পাশে শিশুদুটি বসে আছে, নীরবভাবে তাদের ভবিষ্যতের প্রতীক্ষায়। ছবি : সিএনএন
গাজায় ইসরায়েলের হামলায় ধ্বংসস্তূপের পাশে শিশুদুটি বসে আছে, নীরবভাবে তাদের ভবিষ্যতের প্রতীক্ষায়। ছবি : সিএনএন



‘বাবা, আমি মারা যাচ্ছি, আমার লাশটা নিয়ে যেও’

অভাব-অনটনের সংসার। তাই নাফিসা চেয়েছিলেন পড়াশোনা শেষে প্রবাসী মায়ের সাথে সংসারের হাল ধরতে। কিন্তু তার এ ইচ্ছে আর পূরণ হলো না। বুলেটের আঘাতে ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গেল তার স্বপ্নের আকাশ।

বলছিলাম সাভারের একমাত্র নারী শহীদ ও শিক্ষার্থী নাফিসা হোসেন মারওয়ারের কথা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে গত ৫ আগস্ট সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ডের পাকিজার সামনে ঘাতকের একটি বুলেট নিস্তব্ধ করে দেয় রাজপথের অগ্রসৈনিক নাফিসাকে। বুলেট বুকের একপাশ ভেদ করে পেছন দিক দিয়ে বেরিয়ে যায়। মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে দুঃসাহসী নাফিসা।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শুরু থেকেই সোচ্চার ছিল গাজীপুরের টঙ্গীর দত্তপাড়ার সাহাজুদ্দিন সরকার স্কুল এন্ড কলেজের এইসএসসির পরীক্ষার্থী নাফিসা হোসেন মারওয়া (১৭)। পিতা চা দোকানি আবুল হোসেন এবং মা কুয়েত প্রবাসী কুলসুম বেগম। গ্রামের বাড়ি গাজীপুরের টঙ্গীর এরশাদনগরে। প্রথমে সাভারের মামার বাড়িতে থেকে সাভার ল্যাবরেটরি কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে এইসএসসি পর্যন্ত পড়লেও পরবর্তীতে প্রত্যয়নপত্র নিয়ে বাবার কাছে গাজীপুরে এসে ভর্তি হন সাহাজুদ্দিন সরকার স্কুল এন্ড কলেজে। মা কুলসুম বেগম ভাগ্য ফেরাতে চা দোকানী স্বামীকে রেখে কুয়েতে যাওয়ার পর থেকেই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বনিবনা হচ্ছিল না। একপর্যায়ে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। নাফিসা হোসেন মারওয়া ছাড়াও সাফা হোসেন রাইসা (১২) নামের আরও একটি মেয়ে রয়েছে আবুল হোসেন-কুলসুম দম্পত্তির।

নাফিসা সাহাজুদ্দিন সরকার স্কুল এন্ড কলেজ থেকেই অংশ নেন ২০২৪ সালের এইসএসসি পরীক্ষায়। ফলও বের হয়। উত্তীর্ণ হন জিপিএ ৪.২৫ পেয়ে। কিন্তু রেজাল্ট দেখার সৌভাগ্য হয়নি নাফিসার। তার আগেই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে শহিদ হন তিনি। সেই সাথে ধুলিসাৎ হয়ে যায় খুঁড়িয়ে চলা একটি পরিবারের স্বপ্ন।

শহীদ নাফিসার বাবা আবুল হোসেন বলেন, আমার মেয়ে নাফিসা ছিল অত্যন্ত সাহসী। পড়াশোনায়ও ছিল ভালো। আমার সায় না থাকলেও কোটা সংস্কার আন্দোলনের শুরু থেকেই নাফিসা ছিল সোচ্চার। প্রতিটি আন্দোলনে অন্যান্য শিক্ষার্থীর সাথে ও রাজপথে থাকতো। আমার বাসা থেকে প্রায় এক সপ্তাহ আগে গত ২৭ জুলাই নাফিসার বড় মামা হানিফ আলীর বাড়ি ঢাকার ধামরাইয়ে যায়। সেখানে তিনদিন বেড়ানো শেষে ৩০ জুলাই চলে যায় ওর ছোট মামা হযরত আলীর বাড়ি সাভারের কোটবাড়ি এলাকায়। সেখানে থেকেই আগের বন্ধুদের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে যোগ দিত আন্দোলনে।

আবুল হোসেন বলেন, ওর মায়ের সাথে কথা না হলেও আমার মেয়ে নাফিসার সাথে আমার প্রায়ই কথা হতো। ঘটনার দিন গত ৫ আগস্ট দুপুরে হঠাৎ-ই আমার মেয়ে নাফিসা আমাকে বলে, বাবা তুমি কোথায়? তাড়াতাড়ি টিভি দেখ, স্বৈরাচার শেখ হাসিনা না কি পালাইছে, তখন আমি তাকে বলি মা আমরা গরিব মানুষ, আমি চা দোকানদার, আমাদের এসব দিয়ে কী হবে, তুমি বাড়ি চলে আসো, তখন আমার মেয়ে আমাকে বলে, ‘বাবা দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত আমি বাড়ি ফিরব না, আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব’। এর কিছুক্ষণ পর দুপুর আড়াইটার দিকে আবার আমাকে ফোন দিয়ে বলে, ‘বাবা আমি গুলি খেয়েছি, আমি মনে হয় আর বাচঁব না, আমি মারা যাচ্ছি, আমি ল্যাবজোন হাসপাতালে আছি, আমার লাশটা নিয়ে যেও’। তখন আমি দোকান ফেলে দ্রুত সাভারের উদ্দেশে রওনা দেই। আসতে আসতে পথিমধ্যে আমি আমার মেয়ের মোবাইলে ফোন দেই। তখন আমার মেয়ের মোবাইলটি অন্য কেউ রিসিভ করে আমাকে বলে, আপনি কে বলছেন, তখন উত্তরে আমি নাফিসার বাবা পরিচয় দিলে ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে আমাকে জানানো হয় আপনার মেয়ে আর নেই, মারা গেছেন, লাশ এখন সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ এন্ড হাসপাতালে রয়েছে। আসার পথে সড়কের অবস্থা ভালো না থাকায় আমার আসতে খানিকটা দেরি হওয়ায় হাসপাতাল থেকে নাফিসার ছোট মামা হজরত আলী নাফিসার মৃতদেহ নিয়ে আসে। পরে আমাদের গ্রামের বাড়ি গাজীপুরের টঙ্গীর এরশাদনগরে কবরস্থ করা হয় নাফিসাকে।

শহীদ নাফিসা হোসেন মারওয়ার একমাত্র ছোট বোন সাফা হোসেন রাইসা বলেন, আমার বড় বোন ছিল অত্যন্ত ভালো। আমাকে অনেক আদর করতো। অনেক জেদি হলেও মনটা ছিল অনেক ভালো। কারও সাথে বেশিক্ষণ রাগ করে থাকতে পারত না। রাগলেও পরক্ষণেই আবার হাসিমুখে কথা বলত। আমার বোনের কথা অনেক মনে পড়ে। তবুও আমার বোন আর আসে না। বোনকে আমি কোথায় পাব?

শহিদ নাফিসার নানা ইমান আলী বলেন, নাফিসা ছোটবেলা থেকেই ছিল অনেক জেদি আর সাহসী। যা বলতো তাই করত। কোটা সংস্কার আন্দোলনে প্রায়ই যেত নাফিসা। যেতে নিষেধ করলেও কারও কথা শুনতো না। গত ৪ আগস্টও নাফিসাসহ ওর অন্য বন্ধুরা মিছিল নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যায়। সেখান থেকে মিছিল নিয়ে আবার সাভার আসে। দুপুরে ওকে আমি ফোন দিয়ে বলি তুমি কোথায়, তখন ও বলে আমি সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ডে আন্দোলনে আছি। তখন আমি ওকে বাড়ী ফিরে আসতে বললে ও বাসায় চলে আসে। বাসায় এসে খাওয়া-দাওয়া করে। রাতে ও আমাকে পরদিন অর্থাৎ ৫ আগস্ট রোড মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচিতে অংশ নিতে রাজধানী ঢাকার গাবতলী যাওয়ার কথা বললে আমি তাকে বলি তোমার যাওয়ার দরকার নেই, তুমি ওখানে কিছু চিনবে না। তখন নাফিসা আমার সাথে রাগ করে পরদিন ঢাকা যাওয়ার জেদ ধরে। সে অনুযায়ীই পরদিন ৫ আগস্ট সকাল বেলা আন্দোলনে অংশ নেওয়ার উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হয়ে যায়।

শহিদ নাফিসার ছোট মামা হযরত আলী জানায়, নাফিসা আমার কাছে থেকেই পড়াশোনা করত। সম্পর্কে বোনের মেয়ে হলেও ওকে আমি মেয়ের মতোই স্নেহ করতাম। কিছুদিন হলো ও ওর বাবার কাছে গাজীপুর থেকে পড়াশোনা করছে।

মেয়ে হিসেবে নাফিসা অনেক সাহসী আর উদ্যমী ছিল উল্লেখ করে হজরত আলী আরও বলেন, পড়াশোনায় অত্যন্ত ভালো ছিল নাফিসা। সবার সাথেই সুসম্পর্ক ছিল তার। আমিই ওর মৃতদেহ হাসপাতাল থেকে নিয়ে আসি। কোথা থেকে কি হয়ে গেল কিছুই বুঝে উঠতে পারলাম না। নাফিসার মৃত্যুতে সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল।

নাফিসার নানি আমেনা বেগম জানান, নাফিসা ছিল অনেক ভালো। ও ছিল অনেক দায়িত্ববান। মা বিদেশে থাকলেও নিজেকে কীভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখতে হয় তা ও জানতো। এজন্য সবাই আমরা ওকে অনেক আদর ও স্নেহ করতাম। ভালোবাসতাম। আমাদের নাতনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। ওর মায়া আমাদের আজও তাড়া করে ফেরে। ওর স্মৃতি কিছুতেই ভোলা যাবে না।

প্রবাসে থাকা শহীদ নাফিসার হতভাগ্য মা কুলসুম বেগম মেয়ের মৃত্যু সংবাদ পেয়ে কুয়েত থেকে ছুটে আসেন বাংলাদেশে। বারবার হাতড়ে ফেরেন মেয়ে নাফিসার স্মৃতি বই-খাতাসহ অন্যান্য জিনিসপত্র। তবুও ভুলবার নয় মেয়ে হারানোর বেদনা। ছলছল চোখে মেয়ে হারানোর শোক সইবার চেষ্টা করছেন।

কুলসুম বেগম বলেন, পরিবারের স্বচ্ছলতা ফেরাতে আমি প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছিলাম। অভাব অনটনের সংসারে পড়ালেখা শেষে আমার সাথে সংসারের হাল ধরতে চেয়েছিল নাফিসা। কীভাবে ভুলি সেইসব স্মৃতি, আজ আমাদের সেই স্বপ্ন ধুলিসাৎ হয়ে গেছে। 

নাফিসা হোসেন মারওয়া। ছবি : সংগৃহীত
নাফিসা হোসেন মারওয়া। ছবি : সংগৃহীত

বিপজ্জনক খনি থেকে বছরে আসে ৮ হাজার কেজি সোনা

দক্ষিণ আফ্রিকা, বিশ্বের শীর্ষ স্বর্ণ উত্তোলনকারী দেশ। মূল্যবান খনিজ সম্পদই এই দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। প্রতিবছর সেখানে হাজার হাজার টন স্বর্ণ উত্তোলন করা হয়। দক্ষিণ আফ্রিকায় রয়েছে বিশ্বের গভীরতম ও সবচেয়ে বিপজ্জনক সোনার খনি। দেশটির সর্ববৃহৎ নগরী জোহানেসবার্গের দক্ষিণ-পশ্চিমে এমপোনেং নামের এই খনিটি অবস্থিত।

মূল শহর থেকে খনির দূরত্ব প্রায় ৭৫ কিলোমিটার এবং ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার গভীরে এটি। সুড়ঙ্গ দিয়ে যেখানে পৌঁছতে লাগে ১ ঘণ্টা। খনির ভেতরে এতটাই উত্তপ্ত যে তাপমাত্রা সেখানে ১৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠে যায়।

উচ্চতাপের কারণে এখানে কাজ করা শ্রমিকদের বিশেষ ধরনের তাপ নিরোধী পোশাক পরতে হয়। তবুও বিপজ্জনক এই খনিতে প্রায়ই ঘটে প্রাণহানির ঘটনা। সোনা উত্তোলনকালে শ্রমিক মৃত্যুর সংখ্যাও নেহায়েত কম না। এরপরও বিপজ্জনক এই খনি থেকে প্রতি বছর তোলা হয় ৮ হাজার কেজি সোনা। আর এই পরিমাণ সোনা তুলতে খোদাই করতে হয় ৫ হাজার ৪শ টন পাথর।

১৯৫০-৭০ এর দশকের শুরুতে এই অঞ্চলে একটি সিরিজ খনিজ আবিষ্কৃত হয়। পিটার জ্যাকবাস মারাইস একটি নদী থেকে সোনার প্যানিং এবং হেনরি লুইস একটি খামারে সোনার শিরা খুঁজে পান, যা ১৯৮৬ সালে উইটওয়াটারসরান্ড গোল্ড রাশের দিকে পরিচালিত করেছিল।

এই আবিষ্কারের ফলে সেখানে খনন কাজ শুরু হয়। সেসময় পশ্চিমি গভীর স্তরের দক্ষিণ খাদ বা নং ১ শ্যাফট নামে পরিচিত হয়েছিল একটি খনি। যা প্রায় ৫ বছর পর ১৯৮১ সালে ডুবে যায়। এরপর ১৯৮৬ সালে এমপোনেং আনুষ্ঠানিকভাবে খনির কাজ শুরু করে। এমপোনেং নামটি ১৯৯৯ সাল থেকে ব্যবহৃত হয়।

এমপোনেং এ খনন কাজ করে হারমনি গোল্ড। যেটি আফ্রিকার বৃহত্তম স্বর্ণ উৎপাদনকারী সংস্থা। ২০২০ সালে অ্যাংলো গোল্ড আশান্তি থেকে প্রায় $২০০ মিলিয়ন ডলারে এমপোনেং কিনেছিল হারমনি গোল্ড।

২০২০ সালের মার্চ মাসে একটি ভূমিকম্পে খনিতে অনেক প্রাণহানি ঘটে। ফলে খনির অপারেশন বন্ধ করে দেয়া হয়। পরবর্তীতে আবার উৎপাদন কাজ শুরু করা হয়। অনুমান করা হয় খনিটিতে যে পরিমাণ স্বর্ণ মজুদ আছে তা ২০২৯ সাল পর্যন্ত তোলা যাবে।

সোনার খনি। ছবি : সংগৃহীত
সোনার খনি। ছবি : সংগৃহীত



রাশিয়ার জন্য স্মরণকালের সবচেয়ে খারাপ মাস অক্টোবর: বৃটিশ প্রতিরক্ষা প্রধান

ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে স্মরণকালের সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে রাশিয়া। বিবিসি’কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এমনটাই জানিয়েছেন যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা স্টাফের প্রধান এডমিরাল স্যার টনি রাদাকিন। তিনি বলেন, ‘অক্টোবরে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১৫০০ সেনাসদস্য আহত বা নিহত হয়েছে রাশিয়ার। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোর পর থেকে মস্কোর প্রায় ৭ লাখ সেনাসদস্য হতাহতের শিকার হয়েছেন।’ এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। এতে বলা হয়, ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধে মোট কতোজন সেনা হারিয়েছে মস্কো তার কোনো পরিসংখ্যান প্রকাশ করেনি পুতিন প্রশাসন। তবে পশ্চিমা ব্লকের প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের দাবি অক্টোবরেই সবচেয়ে বেশি সেনা হারিয়েছে রাশিয়া। বিবিসি ওয়ানের সানডে উইথ লরা কুয়েনসবার্গ অনুষ্ঠানে দেয়া সাক্ষাৎকারে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা প্রধান বলেন, পুতিনের হামলার জন্য ‘চড়া মূল্য’ দিচ্ছে রুশ জনগণ। টনি রাদাকিন মনে করেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের জন্যই এমন যন্ত্রণা ভোগ করছে দেশটির জনগণ ও সেনাসদস্যরা। তিনি দাবি করেছেন দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে এ পর্যন্ত রাশিয়ার ৭ লাখ সামরিক ও বেসামরিক লোক হতাহত হয়েছেন। ভূখণ্ডের সামান্য অংশ নিজেদের দখলে নিতেই রাশিয়াকে এমন ভয়াবহ ক্ষতির মুখে ঠেলে দিয়েছে পুতিন। তবে এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, রাশিয়া কৌশলগত এবং আঞ্চলিক সুবিধার ক্ষেত্রে ইউক্রেনকে বেশ চাপে ফেলেছে। কিন্তু বৃটিশ প্রতিরক্ষা প্রধান উল্লেখ করেছেন যে, রাশিয়ার সরকারি আয়ের ৪০ শতাংশই প্রতিরক্ষা খাতে ব্যবহার করছে যা দেশটির জন্য সর্ববৃহৎ ব্যয় খাত। যেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত ডনাল্ড ট্রাম্প এবং তার মিত্ররা বলেছেন যে, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে সংঘাত এড়াতে হয়তোবা কিছুটা ভূখণ্ড ছাড় দিতে হবে, সেখানে স্যার টনি জোর দিয়ে বলেছেন, পশ্চিমা মিত্ররা ‘সময় ব্যয়ের’ পক্ষে অনড় থাকবে। অর্থাৎ তারা সময় লাগলেও ইউক্রেনকে সমর্থন দিয়ে যাবে। তার এই বার্তা প্রেসিডেন্ট পুতিনের জন্য একটি সতর্কবার্তা অন্যদিকে জেলেনস্কির জন্য আশার বাণী। ট্রাম্প ধারাবাহিকভাবে বলে আসছেন তিনি যুদ্ধের অবসান ঘটাতে চান। ইউক্রেনকে সামরিক এবং আর্থিক সহায়তা বন্ধ করে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয়ের খাত কমানোর পক্ষে ট্রাম্প। তবে তিনি কীভাবে এই নীতি বাস্তবায়ন করবেন তা এখনো স্পষ্ট করেননি। সম্ভবত ট্রাম্প বিভিন্ন উপদেষ্টার মতামতের ভিত্তিতে ইউক্রেনের জন্য ভবিষ্যৎ নীতির ওপর তার দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করবেন।
mzamin

সংস্কারে পুলিশ বিভাগে কী পরিবর্তন আসবে? by বদরুল হুদা সোহেল

পুলিশ কমিশন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য বাস্তবতার নিরিখে পুলিশ কমিশন আইন প্রণয়ন করতে হবে। এই কমিশন পুলিশকে জনগণের সেবক হিসেবে গড়ে তুলতে যা যা দরকার সবই করবে। পুলিশ সদস্যের দায়িত্ব-কর্তব্য নির্ধারণসহ পুলিশের কৃতকর্মের জবাবদিহিতা এবং অভিযোগ উত্থাপিত হলে দুদক বা অন্যান্য সংস্থার সহায়তায় স্বচ্ছতার মাধ্যমে তদন্তপূর্বক দোষীদের জন্য শাস্তির বিধান রাখবে এই কমিশন। তবে কর্মপরিধি বিবেচনায় মন্ত্রণালয় ও কমিশনের মধ্যে কোনো সাংঘর্ষিক আইন বা জটিলতা যেন সৃষ্টি না হয় এর জন্য পুলিশ কমিশন আইনের ক্ষমতা, কার্যাবলী ও আওতাধীন বিষয় নিয়ে স্পষ্টতা থাকতে হবে...

নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, জনসমষ্টি, সরকার ও সার্বভৌমত্ব-এ চারটি উপাদান মিলেই রাষ্ট্র। এর মধ্যে সার্বভৌমত্বকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অত্যাবশ্যকীয় উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটিকে রাষ্ট্রের চরম ক্ষমতা বলেও ধরা হয়, কারণ এ ক্ষমতার বলেই রাষ্ট্র তার অভ্যন্তরীণ সকল ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের উপর আইনি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারে এবং বাহ্যিক শক্তির আক্রমণ বা হস্তক্ষেপ থেকে দেশকে মুক্ত রাখতে পারে। আর আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে কোনো কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে গেলেই সবার আগে পুলিশ বাহিনীর কথা চলে আসে। এই পুলিশ বাহিনী নিয়ে আলোচনা করতে গেলে দেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে তাদের কথাই আগে উল্লেখ করতে হয়। কারণ আজকের এই পুলিশ বাহিনীই মূলত পাকিস্তানি সৈন্যের বিরুদ্ধে রাজারবাগে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তাহলে আজ এই পুলিশ বিভাগ সংস্কারে কমিশন গঠনের প্রয়োজন হলো কেন? স্বতন্ত্র পুলিশ কমিশন গঠনের কথা আসছে কেন? প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার আগে এ প্রশ্নগুলো কেন উত্থাপিত হচ্ছে তা নিয়ে আলোকপাত করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ পুলিশ দেশের অন্যতম প্রধান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা যা সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত। এই মন্ত্রণালয়ের অধীনে থেকেই একজন মহাপরিচালক সর্বময় কর্তা হিসেবে পুলিশ বাহিনীকে পরিচালনা করে আসছেন। যত নিয়মকানুন আর বিধির কথাই বলা হোক না কেন, মূলত বাংলাদেশ পুলিশের অনেক কিছুই পরিচালিত হয় ১৮৬১ সালের পুলিশ আইনের নির্যাসে। কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরেও স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য একটি যুগোপযোগী পূর্ণাঙ্গ পুলিশ আইন এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান হয়নি। বাংলাদেশ নামক দেশটির সীমারেখা  যে সময়ে বিশ্বমানচিত্রে অঙ্কিত হয়নি তখন বৃটিশদের করা আইনটি আমরা নিজেদের মতো করে যেভাবে যতটুকুই গ্রহণ করি না কেন তা আধুনিক বাংলাদেশের পুলিশ ব্যবস্থাপনার জন্য কতোটুকু সঙ্গতিপূর্ণ? উপমহাদেশে বৃটিশ শাসনের মাধ্যমে তাদের করায়ত্ত বজায় রাখার স্বার্থে ছিল এই আইন। তাই কোনো একটি স্বাধীন-সার্বভৌম ও গণতান্ত্রিক দেশের পুলিশ আইন আর ঔপনিবেশিক শাসনের স্বার্থ রক্ষার আইন এক হতে পারে না। এই অর্থে পুলিশ আইন নিয়ে আরও আগেই ভাবার দরকার ছিল।

‘পুলিশ জনগণের সেবক’ বা ‘পুলিশ জনগণের বন্ধু’ এ ধরনের উক্তি আমরা হরহামেশাই শুনে আসছি। কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে জনগণ পুলিশের বা পুলিশ জনগণের কতোটুক কাছাকাছি পৌঁছতে পেরেছে? অনেক সময় এমন হয় যে, আমাদের গণ্ড গ্রামের সাধারণ একজন মানুষ যখন প্রয়োজনে কোনো মামলা অথবা কোনো অভিযোগ দায়েরের উদ্দেশ্যে থানায় যেতে চায় তখন তিনি সেখানে একা যেতে স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করেন না। থানাওয়ালারা অনেক সময় ব্যক্তির জটিল কোনো সমস্যার ক্ষেত্রে গুরুত্ব দিতে চান না-এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অগত্যা অভিযোগকারীরা পুলিশের মনোযোগ টানার জন্য কখনো কখনো স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি বা রাজনৈতিক প্রতাপশালী ব্যক্তির সহযোগিতা নেয়ার চেষ্টা করেন এবং ফলশ্রুতিতে সাধারণ কোনো মামলাতেও রাজনীতির প্রভাব চলে আসে। এমন ঘটনার ক্ষেত্রে পুলিশ-অভিযোগকারী একে অপরকে দুষলেও বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে উভয়ের জন্য স্ববিরোধী মনে হলেও সত্য বিবর্জিত নয়।

যা শুরুতে বলতে চেয়েছিলাম, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যেকোনো সংকটে দেশের বহু পুলিশ অতীতে জীবন দিয়েছেন। দেশ ও জাতির কল্যাণে যেকোনো বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে প্রাথমিকভাবে এই বিভাগটিকেই কিন্তু জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠের মতো যাবতীয় কাজ করতে হয়। করোনাকালীন সংকট মোকাবিলায় ফ্রন্টলাইনার হিসেবে এ দেশের পুলিশ বাহিনীই জীবন ঝুঁকি নিয়েছেন। তাহলে পুলিশকে কেন বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক সরকারের রোষানলে পড়তে হচ্ছে? পুলিশকে ব্যবহার করে সরকার কেন ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করবে? যে পুলিশ দেশের নাগরিকের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মন্ত্রে তৈরি সেই পুলিশ জনগণের ওপর দমন-পীড়ন নীতি অনুসরণ করবে-এমনটা কাম্য নয়। রাষ্ট্রযন্ত্রে কর্তৃত্ববাদ, একচ্ছত্রবাদ বা একদলীয় শাসন কায়েম আর গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ কখনো এক হতে পারে না। গণতন্ত্রকে বাক্সবন্দি রেখে সরকার বা অন্য কেউ যদি ভিন্ন মনোভাব কায়েম করতে চায় তাহলে সে রাষ্ট্র পুলিশি রাষ্ট্রের ফর্মুলায় আটকে পড়ার সম্ভাবনা থাকে।  সেখানে না থাকে স্বচ্ছতা বা জবাবদিহিতা, না থাকে বাকস্বাধীনতা। তাই পুলিশ বাহিনীকে সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত করার জন্য স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন এখন সময়ের দাবি। পুলিশকে সত্যিকার অর্থে জনবান্ধব করতে চাইলে পুলিশ সদস্যের নিয়োগ, পদায়ন, পদোন্নতি, পদাবনতি (পুরস্কার ও শাস্তি) ইত্যাদি বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে বিদ্যমান আইনে পরিবর্তন আনতে হবে এবং এই সকল কর্মযজ্ঞ পুলিশ কমিশন দ্বারা পরিচালিত হতে হবে।

কমিশনের গঠন ও ক্ষমতা এমন হতে হবে যেন কোনো সরকার পুলিশ কমিশনের উপর হস্তক্ষেপ করে পুলিশের উপর অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্যকে ভিন্নখাতে পরিচালিত করতে না পারে। কারণ আমাদের দেশে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থের নিমিত্তে পুলিশকে ব্যবহার করার অভিযোগ কম নয়। সততা, দক্ষতা ও নৈতিকতার আলোকে কমিশন গঠিত হলে পুলিশে একদিকে দূর হবে স্বেচ্ছাচারিতা ও অন্যদিকে বজায় থাকবে পেশাদারিত্ব।

পুলিশ বাহিনীতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এড়ানোর জন্য পুলিশ কমিশন গঠন প্রক্রিয়ায় নিরপেক্ষতা বজায় রাখার স্বার্থে কমিশনের সদস্য নির্বাচনের প্রক্রিয়াকে কোনোভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ করা যাবে না। কমিশন যত সদস্য নিয়েই হোক, এতে কাদের অন্তর্ভুক্তি প্রয়োজন তার একটু ইঙ্গিত দিতে চাই। যেহেতু বিষয়টি পুলিশ সম্পর্কিত, সেহেতু পুলিশের অংশীজন একজন সাবেক আইজিপি বা অতিরিক্ত আইজিপি, মানবাধিকার কমিশনের যেকোনো সাবেক চেয়ারম্যান, সশস্ত্র বাহিনীর কোনো সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, দুদকের সাবেক চেয়ারম্যান বা সাবেক পরিচালক, কোনো অপরাধবিজ্ঞানী, সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারক বা সাবেক জেলা জজ, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, মানবাধিকার কর্মী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, সিনিয়র সাংবাদিক ও অন্তত দুজন নারী সদস্য মিলে এ কমিশন হতে পারে। প্রত্যেক সদস্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাদের অতীত কর্মকালীন সার্ভিসের ট্র্যাক রেকর্ড ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করতে হবে। সরকার ইচ্ছা করলে বিতর্কিত যে কাউকে কমিশনে স্থান দিতে পারবে-এমন কোনো ফাঁকফোকর কমিশন আইনে রাখা যাবে না। প্রয়োজনে কমিশনের রূপরেখা কেমন হবে- এ মর্মে পুলিশ বিভাগ থেকে লিখিত আকারে পরামর্শ চাওয়া যেতে পারে। কমিশন সরকারের কোনো বিভাগ বা দপ্তরের হস্তক্ষেপে যেন কাজ না করে সেজন্য কমিশন কারও কাছে সরাসরি দায়বদ্ধ হবে না। প্রশিক্ষণের আলোকে পুলিশকে পেশাদারিত্বের আওতায় এনে এ কমিশন একজন পুলিশ সদস্যের দায়িত্ব-কর্তব্য ও কর্মপরিধি ঠিক করবে।

গত ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের ঠিক পর কিছুদিন পুলিশ নিষ্ক্রিয় থাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কতোটা অবনতি হয়েছিল তা আমরা উপলব্ধি করেছি। তাই এটা নিশ্চিত যে, পুলিশ বাহিনীর সক্রিয়তা-নিষ্ক্রিয়তার উপর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বহুলাংশে নির্ভরশীল। গণতান্ত্রিক কাঠামোতে কোনো রাজনৈতিক সরকারের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শায়েস্তার জন্য পুলিশ ব্যবহৃত হতে পারে না। বরং দলমত নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের শান্তি ও সুরক্ষার জন্য রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকা পুলিশের জন্য অতীব জরুরি। আর একটি স্বাধীন-স্বতন্ত্র পুলিশ কমিশনই এ অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ দেখাতে পারে।
পুলিশ কমিশন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য বাস্তবতার নিরিখে পুলিশ কমিশন আইন প্রণয়ন করতে হবে। এই কমিশন পুলিশকে জনগণের সেবক হিসেবে গড়ে তুলতে যা যা দরকার সবই করবে। পুলিশ সদস্যের দায়িত্ব-কর্তব্য নির্ধারণসহ পুলিশের কৃতকর্মের জবাবদিহিতা এবং অভিযোগ উত্থাপিত হলে দুদক বা অন্যান্য সংস্থার সহায়তায় স্বচ্ছতার মাধ্যমে তদন্তপূর্বক দোষীদের জন্য শাস্তির বিধান রাখবে এই কমিশন। তবে কর্মপরিধি বিবেচনায় মন্ত্রণালয় ও কমিশনের মধ্যে কোনো সাংঘর্ষিক আইন বা জটিলতা যেন সৃষ্টি না হয় এর জন্য পুলিশ কমিশন আইনের ক্ষমতা, কার্যাবলী ও আওতাধীন বিষয় নিয়ে স্পষ্টতা থাকতে হবে। পুলিশের মানোন্নয়নের জন্য শুধু নীতি প্রণয়ন নয়, আধুনিকায়নে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে পুলিশের কোনো সদস্য যেন বৈষম্যের শিকার না হয় সেদিকে পুলিশ কমিশন খেয়াল রাখবে। কারণ বৈষম্য থেকে সৃষ্টি হয় ক্ষোভ, আর ক্ষোভ হলো ছাই চাপা আগুন যাকে বাইরে থেকে বুঝা না গেলেও এর উপর কিছু পড়লে দপ করে জ্বলে উঠা অসম্ভব কিছু নয়। দায়িত্ব পালনে পুলিশকে দিতে হবে স্বাধীনতা। পুলিশকে ভাবতে হবে তারা কারও হাতের পুতুল নয় যে কেউ তাদেরকে নিয়ে খেলবে।

অক্টোবর মাসের শুরুর দিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সাবেক সচিব সফররাজ হোসেনকে প্রধান করে পুলিশ সংস্কার কমিশন গঠন করেছেন। ডিসেম্বরের শেষ পর্যন্ত  প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে সময় পাচ্ছে এই কমিশন। সংস্কারের মাধ্যমে ভবিষ্যতে পুলিশ বিভাগ কী পাবে তা সময়ই বলে দিবে।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ইংরেজি বিভাগ, ঈশা খাঁ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, কিশোরগঞ্জ।

mzamin


লোকসান গুনছে ‘মিনি-বাংলা’

মধ্য কলকাতার দুই বর্গ কিলোমিটার অঞ্চল জুড়ে ১০০টিরও বেশি হোটেল এবং  ৩০০০টিরও বেশি দোকান রয়েছে, যারা  মূলত অতিথি এবং সীমান্তের ওপার থেকে আসা বাংলাদেশি গ্রাহকদের উপর নির্ভর করে।  কিন্তু সামপ্রতিক মাসগুলোতে এখানে বাংলাদেশিদের যাতায়াত কমে যাওয়ায়  ব্যবসা ৭০% কমে গেছে। মারকুইস স্ট্রিট, সাদার স্ট্রিট, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, রফি আহমেদ কিদওয়াই রোড, রয়ড স্ট্রিট এবং ইলিয়ট রোডের ১২০টি হোটেলে এখন গ্রাহকদের সংখ্যা ১০%-১৫%, যা অন্যান্য বছরের এই সময়ে ৮০% পূর্ণ থাকে।  ‘জুলাই থেকে মারকুইস স্ট্রিটে আমার হোটেলের ৩০টি ঘরের মধ্যে মাত্র চার বা পাঁচটিতে বাংলাদেশি অতিথিরা ছিলেন। ছাত্র  আন্দোলন এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার আগে, এক সময়ে ২৬-২৮ জন অতিথি এখানে থাকতেন।’ বলছেন কলকাতা হোটেল অ্যান্ড রেস্তরাঁ মালিক সমিতির নির্বাহী কমিটির সদস্য মনোতোষ সরকার। লোকসানে চলতে থাকায় কয়েকটি ছোট হোটেলকে সাময়িকভাবে শাটার ডাউন করতে হয়েছে।  কারণ মাত্র এক বা দুইজন  অতিথি নিয়ে হোটেল  চালানো সম্ভব নয়। মনোতোষ সরকার বলছেন, পরিস্থিতি প্রায় ২০২১ সালে কোভিডের সময়ের মতো হয়ে গেছে,  সেই সময়ে  ভ্রমণে  বিধিনিষেধের কারণে যেমন হোটেলগুলো পর্যটক শূন্য ছিল এখন ঠিক সেরকম অবস্থা। চট্টগ্রামের রেজেন বিশ্বাস, যিনি  নির্জন হোটেলে এখন প্রায়ই একাই থাকছেন।   বলছেন- ‘একসময়ে হোটেলের অন্যান্য ঘরগুলো আমাদের দেশের মানুষদের ভিড়ে গমগম করতো। উচ্চস্বরে আড্ডা চলতো।  বাংলাদেশে অভ্যুত্থানের পরে ভারত সরকার কর্তৃক  নতুন ভিসা  নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে। ফলে কলকাতায় বাংলাদেশিদের আগমন তীব্রভাবে কমে গেছে।’

রেজেন বিশ্বাসের কথায়, ‘আমার আগে থেকেই ভিসা ছিল, তাই কলকাতায় ভ্রমণ করতে পারছি। কিন্তু এখন যারা আবেদন করছেন তাদের জন্য, মেডিকেল ইমার্জেন্সি না থাকলে ভিসা দেয়া হচ্ছে না। সম্ভবত বাংলাদেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে এখানে।  

তার জেরেই ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ভিসা নিয়ে এত কঠোর নীতি নিয়েছেন। ডিসেম্বর-জানুয়ারির মধ্যে একবার ভিসার বৈধতা শেষ হয়ে গেলে, ১০%-১৫% আন্তঃসীমান্ত ভ্রমণও বন্ধ হয়ে যাবে। ‘নিউমার্কেটের দোকানদাররা, যারা সাধারণত কলকাতার বিভিন্ন অংশের তুলনায় বাংলাদেশ থেকে বেশি ক্রেতা পান, তারাও খুব  হতাশ। তারা উদ্বিগ্ন এই ভেবে যে, বাংলাদেশে এই অস্থিতিশীলতা আরও কয়েক বছর চলতে থাকলে এবং ভারতের জারি করা ভিসা  নিষেধাজ্ঞা বজায়  থাকলে এই অঞ্চলের মাইক্রো-ইকোনমি ভেঙে পড়বে।
চকো নাট, নিউ মার্কেটের একটি জনপ্রিয় দোকান যা চকলেট, বাদাম, মসলা এবং প্রসাধনী বিক্রি করে। তারা  একচেটিয়াভাবে বাংলাদেশি  গ্রাহকদের জন্য এই পণ্য সরবরাহ করে, আগে যেখানে দিনে ৩.৫ লাখ টাকা আয় হতো এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৫,০০০ টাকা। দোকানের মালিক মো. শাহাবুদ্দিন জানাচ্ছেন, ‘মেডিকেল ভিসায় এখানে থাকা কয়েকজন গ্রাহক এখন  দোকানে আসেন। তবে ট্রিপার বা যারা নিউমার্কেট থেকে পণ্য কিনে ঢাকায় বিক্রি করতেন তাদের আসা  পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। ‘প্রসাধনী দোকান রয়্যাল স্টোরের  পঞ্চম প্রজন্মের মালিক অজয় বলছেন, ‘পরিস্থিতি শুধুমাত্র আমাদের মতো ১২৪ বছরের পুরনো দোকানের জন্য নয়, পুরো বাজারের জন্যই ভয়াবহ।’ ২০০৮-০৯ সালের দিকে বাজারের চরিত্র বদলে যায়  যখন স্থানীয় গ্রাহকের সংখ্যা কমে যায়। নিউমার্কেট তখন থেকে বাংলাদেশিদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং প্রায় সব দোকানই তাদের চাহিদা  মেটাতে শুরু করে। কিন্তু বাংলাদেশে  চলমান সমস্যা এবং ভিসা ইস্যুতে গ্রাহকদের ভিড় কমে গেছে।  অজয় বলছেন,   প্রতিদিন গড়ে ২৫-৩০ জন বাংলাদেশি  গ্রাহক দোকানে আসতেন এবং প্রায় ১৫,০০০ টাকা খরচ করতেন।  এখন একদিনে হয়তো  সর্বসাকুল্যে পাঁচজন বাংলাদেশি এখানে আসেন। খরচ কমে দাঁড়িয়েছে ১০,০০০ টাকা।

সূত্র: টাইমস অফ ইন্ডিয়া

mzamin


কানাইঘাটে এ কেমন নির্মমতা! by ওয়েছ খছরু ও মুফিজুর রহমান

ফুলের মতো নিষ্পাপ শিশু মানতাহা। সহপাঠীদের সঙ্গে খেলা করছিল বাড়ির উঠোনে। সেই মানতাহাকে ধরে নিয়ে গলায় রশি পেঁচিয়ে খুন করলো ঘাতকরা। খুনের পর লাশ পাশের খালে মাটিচাপা দেয়া হয়। পুলিশ যখন ঘাতকদের একজনকে ধরলো তখনই বাড়িতে থাকা অন্যরা লাশটি গোপনে পুকুরে ফেলে দিতে চেয়েছিল। দেখে ফেলেন স্থানীয়রা। উদ্ধার হলো শিশুটি। পৃথিবীর আলোছায়ায় বেড়ে ওঠার আগেই শিশুটিকে হত্যা করলো ঘাতকরা। এমন ঘটনাটি ঘটেছে সিলেটের কানাইঘাটের বীরদল গ্রামে। গতকাল রোববার ভোররাতে যখন ঘটনাটি জানাজানি হয় তখন ঘুম ভেঙে জেগে ওঠা বীরদল গ্রামবাসীর মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ভোরেই তারা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় ঘাতক মার্জিয়ার বসতঘর। দিয়েছে আগুন। মানতাহা খুনের ঘটনায় ক্ষোভ বিরাজ করছে এলাকায়। মানতাহার বয়স পাঁচ কিংবা ছয়। সবেমাত্র নার্সারিতে পড়ে। গত ৩রা নভেম্বর এলাকায় ওয়াজ মাহফিল ছিল। বিকালের দিকে পিতা শামীম আহমদ তাকে নিয়ে ওয়াজ মাহফিলে যান। সেখান থেকে মানতাহা পছন্দের খেলনা কিনে নিয়ে আসেন। আর খেলনা নিয়ে সহপাঠীদের সঙ্গে নিজ বাড়ির উঠোনে খেলা করছিলেন। সন্ধ্যার একটু আগে হঠাৎ সে নিখোঁজ হয়ে যায়। ৭ দিন ধরে কোনো খোঁজ নেই মানতাহার। সবাই অস্থির তার জন্য। এক পর্যায়ে শনিবার রাতে কানাইঘাট থানা পুলিশ আটক করে মানতাহার পার্শ্ববর্তী ঘরের বাসিন্দা মার্জিয়া বেগমকে। মা আলিফজানকে নিয়ে শামীম আহমদের বাড়ির পাশেই বসবাস করতেন মার্জিয়া। রাতে তাকে থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার আশঙ্কা করেন বাড়িতে থাকা মার্জিয়ার মা আলিফজান বেগম। রাত ৩টার পর তিনি ঘর থেকে বের হয়ে খালে পুঁতে রাখা মানতাহার লাশ তুলেন।

এ দৃশ্য দেখে ফেলেন পূর্ব থেকে ওত পেতে থাকা এলাকার বাসিন্দা আব্দুল ওয়াহিদ। আলিফজান বেগম যখন শিশু মানতাহার মরদেহ নিয়ে যেতে চাচ্ছিলেন তখনই চিৎকার শুরু করেন তিনি। এরপর জাপটে ধরতে যান আলিফজানকে। এ সময় লাশ খালে ফেলে আলিফজান দৌড়াতে থাকেন। আব্দুল ওয়াহিদের চিৎকার শুনে ঘুম থেকে উঠে আসেন মানতাহার পরিবার ও আশপাশের লোকজন। তারা এসে আলিফজানকে আটক করেন। এ সময় তারা মানতাহার গলিত লাশ দেখতে পান। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন স্থানীয়রা। তারা রাতেই আলিফজানের বসতঘর ভাঙচুর করেন। এরপর দেন আগুনও। খবর পেয়ে কানাইঘাট থানা পুলিশ এসে আলিফজানকে আটক করে নিয়ে যায়। একই সঙ্গে শিশু মানতাহার মরদেহ উদ্ধার করে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন; মানতাহার গলায় রশি পেঁচানো ছিল। তাকে রশি দিয়ে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শী আব্দুল ওয়াহিদ মানবজমিনকে জানিয়েছেন, তিনি গভীর রাতে মানতাহার পিতার সঙ্গে কথা বলে নিজ বাড়িতে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি দেখতে পান বারান্দায় বসে আছেন আলিফজান। এতে তার সন্দেহ হয়। এরপর তিনি লুকিয়ে আলিফজানের গতিবিধি লক্ষ্য করতে গিয়ে দেখেন সে খালে মাটি খুঁড়ে লাশ বের করছে। আর এ দৃশ্য দেখে চিৎকার দিলে আশপাশের লোকজন এসে আলিফজানকে আটক করেন। তিনি বলেন- আলিফজান খালে পুঁতে রাখা লাশ পুকুরে ফেলে দিতে ভোররাতের দিকে একাই এ কাজটি করছিল। যখন আমি চিৎকার শুরু করি তখন সে লাশ ফেলে দৌড়াতে থাকে। আলিফজান ও তার মেয়ে মিলে এ ঘটনা ঘটিয়েছে বলে ধারণা করেন তিনি। যখন তার মেয়ে মার্জিয়া আটক হয়েছে তখন সে লাশ গুম করতে এই পথ বেছে নিয়েছে। এদিকে লাশ উদ্ধারের পর থেকে মাতম চলছে এলাকায়। শামীম আহমদ ও তার স্ত্রী মেয়ের শোকে পাথর হয়ে গেছেন।

শামীম আহমদ মানবজমিনকে জানিয়েছেন- ওরা এতটাই পিশাচ যে আমরা মেয়েকে খুঁজছি অথচ তারা ঘটনা ঘটিয়ে মুখ বন্ধ করে ছিল। তিনি নরপিশাচ মা ও মেয়ের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন। কেন এই ঘটনা ঘটিয়েছে সে ব্যাপারে তিনি কোনো ধারণা না দিতে পারলেও জানিয়েছেন; কয়েক মাস আগে মার্জিয়ার কাছে পড়ালেখা করতো মানতাহা। এই সুযোগে মানতাহাকে নিয়ে মার্জিয়া প্রায় সময় বাজারে সহ বিভিন্ন জায়গায় চলে যেতো। এ নিয়ে আমরা আপত্তি জানিয়েছি। এখন আর পড়তে যায় না। ওই সময় মানতাহার কয়েকটি ড্রেস মার্জিয়া চুরি করেছিল। লাশ উদ্ধারের পর দুপুরে কানাইঘাট থানায় এ নিয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন সিলেটের এডিশনাল এসপি রফিকুল ইসলাম। তিনি জানান- পুলিশ সক্রিয় হওয়ার পর মানতাহা গুম ও খুনের রহস্য উদ্‌ঘাটন করা হয়েছে। তবে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটককৃতরা জানিয়েছে; অপহরণের দিন সন্ধ্যায় মানতাহার গলায় রশি পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে। এরপর লাশ তারা খালে মাটিচাপা দিয়ে রেখেছিল। ঘটনার খবর পেয়ে বিকালে কানাইঘাটে মানতাহার বাড়িতে যান সিলেটের পুলিশ সুপার মাহবুবুর রহমান। তিনি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন; এই ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কিনা সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনার যাতে সুষ্ঠু বিচার হয় সে কারণে পুলিশ দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করে আদালতে চার্জশিট দেবে। এ সময় তিনি নিহত মানতাহার পিতা ও মাতাকে সান্ত্বনা দেন। সন্ধ্যায় কানাইঘাট জোনের সহকারী পুলিশ সুপার অলক কান্তি শর্মা জানিয়েছেন- বিকাল পর্যন্ত আটক হওয়া চার জনের বিরুদ্ধে থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। তাদের নিয়ে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে। কানাইঘাট সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আফসর আহমদ চৌধুরী জানিয়েছেন- মানতাহা গুম ও খুনের ঘটনায় এলাকার মানুষ আতঙ্কে আছেন। এমন ঘটনা তার এলাকায় অতীতে হয়নি। এ ঘটনার সঙ্গে নেপথ্যে যারা জড়িত তাদের গ্রেপ্তার ও শাস্তি দাবি করেন তিনি।  

mzamin

দুদকে অচলাবস্থা, কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া শুরু

শেখ হাসিনা সরকার পতনের পরপর সরকারের বিভিন্ন সংস্থার প্রধানরা পদত্যাগ করেন। কিন্তু সরে দাঁড়াননি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার। নানা আলোচনা-সমালোচনার পর গত ২৯শে অক্টোবর পদত্যাগ করেন তারা। তবে প্রায় দুই সপ্তাহ কেটে গেলেও সংস্থাটির নতুন  কমিশন গঠন হয়নি। অবশ্য রোববার দুদক গঠনে সার্চ কমিটি গঠন করেছে সরকার। এদিকে কমিশন গঠন না হওয়ায় অনুসন্ধান, মামলা ও অভিযোগপত্রের অনুমোদন কিছু মিলছে না। মোটাদাগে এসব কাজ না হওয়ায় দুদকে এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, একাধিক কর্মকর্তার হাতে বেশ কয়েকটি অনুসন্ধান প্রতিবেদন ও অভিযোগপত্র তৈরি রয়েছে। যেগুলো কমিশনের আইন অনুযায়ী চেয়ারম্যান এবং দুই কমিশনারের উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিক সভায় সিদ্ধান্ত ছাড়া সম্ভব নয়। এ ছাড়া প্রতিদিন শতাধিক অভিযোগ আসে দুদকে। এসব অভিযোগও চেয়ারম্যান-কমিশনারের সমন্বয়ে গঠিত কমিশনের অনুমোদন ছাড়া অনুসন্ধান শুরু করা যায় না।  

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের এক কর্মকর্তা মানবজমিনকে বলেন, যে কাজগুলো কমিশনের ক্ষমতা ছাড়া করা যায় না সেগুলো বন্ধ আছে। নতুন করে মামলার অনুমোদন, চার্জশিট অনুমোদন, ক্রোক সম্পত্তি অ্যাটাচমেন্ট, বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞার মতো বিষয়গুলো করা যাচ্ছে না। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, দুদক আইন ও বিধিতে চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের যে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে, সেগুলো ফাংশন করা সম্ভব না। তবে যেসব অনুসন্ধান ও তদন্তকাজ আগেই অনুমোদন হয়েছে, সেগুলো চলমান রয়েছে। কমিশন না থাকায় নতুন করে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া যাচ্ছে না।

দুদক সূত্র জানায়, অনুসন্ধান শেষ হয়ে মামলার অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে একশর বেশি ফাইল স্থবির হয়ে আছে। এ ছাড়া চার্জশিট তৈরি আছে অন্তত অর্ধশতাধিক। অন্যদিকে যাচাই-বাছাই শেষে নতুন করে অনুসন্ধানের জন্য ফাইল রয়েছে ৪০টির বেশি।
দুদকের চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার বিদায় নিয়েছেন ১১ দিন হয়েছে। এরমধ্যে গতকাল কমিশন নিয়োগে সার্চ কমিটি গঠন হয়েছে। তবে কার্যক্রম গতিশীল হতে কমিশন গঠন হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকতে হবে। এ বিষয়ে দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, কমিশন গঠন না হওয়ায় সিদ্ধান্ত দেয়ার মতো কাজগুলো বন্ধ আছে। নিয়োগ হয়ে গেলে সেসব কাজও গতিশীল হবে।

সার্চ কমিটিতে যারা আছেন: দুদকের চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার নিয়োগে গঠিত সার্চ কমিটির সভাপতি করা হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. রেজাউল হক। এতে সদস্য হিসেবে রয়েছেন হাইকোর্ট বিভাগের বিচারক বিচারপতি ফারাহ মাহবুব, বাংলাদেশের মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক মো. নূরুল ইসলাম, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোবাশ্বের মোনেম ও সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. মাহবুব হোসেন।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, বাছাই কমিটি, চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগে সুপারিশ প্রদানের উদ্দেশ্যে, উপস্থিত সদস্যদের অন্যূন ৩ জনের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে কমিশনারের প্রতিটি শূন্য পদের বিপরীতে ২ জন ব্যক্তির নামের তালিকা প্রণয়ন করে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাবে। অন্যূন ৪ জন সদস্যের উপস্থিতিতে বাছাই কমিটির কোরাম গঠিত হওয়ার কথা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ বাছাই কমিটির কার্য-সম্পাদনে প্রয়োজনীয় সাচিবিক সহায়তা দেবে।

২০ বছরে ছয় কমিশন
২০০৪ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনস্থ ‘দুর্নীতি দমন ব্যুরো’ বিলুপ্ত করে একই বছরের ২১শে নভেম্বর দুদক প্রতিষ্ঠা করা হয়। এ কমিশনের প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সুলতান হোসেন খান।
আইন হওয়ার তিন বছর পর ২০০৭ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন বিধিমালা হয়। দেরিতে বিধি হওয়ার কারণে প্রথম তিন বছর প্রথম কমিশনের কার্যক্রম ছিল সীমিত। ক্ষমতার পটপরিবর্তনে ‘এক-এগারোর’ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এলে ২০০৭ সালের ১০ই ফেব্রুয়ারি পদত্যাগ করে সুলতান হোসেন খান নেতৃত্বাধীন কমিশন। এরপর ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে সাবেক সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) হাসান মশহুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে পুনর্গঠিত হয় দ্বিতীয় কমিশন।

নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের এপ্রিলে হাসান মশহুদ চৌধুরী পদত্যাগ করেন। তখন পদত্যাগের কারণ হিসেবে সাংবাদিকদের তিনি জানিয়েছিলেন, কমিশনের কাজে গতি আনার জন্যই তার পদত্যাগ। তবে তার সঙ্গে নিয়োগ পাওয়া দুই কমিশনার হাবিবুর রহমান ও মনজুর মান্নান থেকে যান।

এরপর ২০০৯ সালের বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও সাবেক সচিব গোলাম রহমান দুদকের তৃতীয় চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান। আর হাসান মশহুদ চৌধুরীর কমিশনের দুই কমিশনার হাবিবুর রহমান ও মনজুর মান্নানের মেয়াদ শেষ হলে ২০১১ সালে নতুন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পান সাবেক জেলা জজ মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু (বর্তমান রাষ্ট্রপতি) এবং দুদকের এক সময়ের মহাপরিচালক মো. বদিউজ্জামান। এরপর মেয়াদ শেষে গোলাম রহমান চলে গেলে ২০১৩ সালের জুনে চেয়ারম্যান হন বদিউজ্জামান। তিনি প্রথমে কমিশনার এবং পরে চেয়ারম্যান পদে ২০১৬ সালের মার্চ পর্যন্ত দুদকের চতুর্থ চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। বদিউজ্জামানের মেয়াদ শেষে ২০১৬ সালের মার্চে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ সচিব ইকবাল মাহমুদ। পঞ্চম এ কমিশনে তার সঙ্গে কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন সাবেক সচিব মো. মোজাম্মেল হক খান।
ইকবাল মাহমুদ কমিশনের মেয়াদ শেষে ২০২১ সালের মার্চে ষষ্ঠ চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পান আরেক সাবেক সচিব মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ। তার সঙ্গে কমিশনার হিসেবে যোগ দেন সাবেক জেলা জজ মো. জহুরুল হক।

এদিকে, ইকবাল মাহমুদের কমিশনের সঙ্গে নিয়োগ পাওয়া কমিশনার মোজাম্মেল হক খানের মেয়াদ পূর্ণ হলে গত বছরের জুলাইয়ে সে পদে স্থলাভিষিক্ত হন সাবেক সচিব মোছা. আছিয়া খাতুন।

যেভাবে নিয়োগ হবে সপ্তম কমিশন
দুর্নীতি দমন কমিশনের ৬ ধারায় কমিশনারদের নিয়োগের কথা বলা হয়েছে। এতে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি কর্তৃক গঠিত বাছাই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ৫ বছরের জন্য নিয়োগ পাবেন তারা। এ আইনের ৭ ধারা অনুযায়ী কমিশনারদের নিয়োগের ক্ষেত্রে ৫ সদস্যের একটি বাছাই কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে।

প্রধান বিচারপতির মনোনীত আপিল বিভাগের একজন ও হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারপতি, মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান এবং সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত মন্ত্রিপরিষদ সচিব বাছাই কমিটির সদস্য হবেন। তবে তাকে না পাওয়া গেলে বা অসম্মত হলে বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ সচিব সদস্য হবেন।

আপিল বিভাগের বিচারপতি এ কমিটির সভাপতি হবেন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ বাছাই কমিটির কার্য সম্পাদনে প্রয়োজনীয় সাচিবিক সহায়তা করবে। কমিশনার নিয়োগে সুপারিশের উদ্দেশ্য বাছাই কমিটির সদস্যদের মধ্যে কমপক্ষে তিনজনের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে কমিশনারের প্রতিটি শূন্য পদের জন্য দুইজন ব্যক্তির নামের তালিকা প্রণয়ন করে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাবে।

mzamin

মণিপুরে কুকি নারী হত্যার জেরে এক মেইতেই নারীকে হত্যা

ভারতের মণিপুরে গতকাল শনিবার বিকেলের দিকে মেইতেই সম্প্রদায়ের এক নারীকে হত্যা করা হয়েছে। তিন সন্তানের মা ওই নারীকে বিষ্ণুপুর জেলায় একটি ধানের খেতে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে বলে পুলিশকে জানিয়েছেন তাঁর স্বামী। পুলিশ জানিয়েছে, কুকি জনগোষ্ঠীর সশস্ত্র ব্যক্তিরা ওই নারীকে হত্যা করেছেন। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়।

এ ঘটনাকে বৃহস্পতিবারের ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় পাল্টা হামলা বলে ধারণা করা হচ্ছে। আসামঘেঁষা পশ্চিম মণিপুরের জিরিবাম জেলায় এক নারীকে গত বৃহস্পতিবার রাতে ধর্ষণ করে জীবন্ত অবস্থায় পুড়িয়ে মারা হয়। তিনিও তিন সন্তানের মা ছিলেন।

জিরিবাম জেলার ওই নারী ছিলেন হামর গোষ্ঠীভুক্ত। হামর, জোমি ও কুকি—এই তিন আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীকে সম্মিলিতভাবে ‘জো’ বলে চিহ্নিত করা হয়। অনেক সময় এই তিন গোষ্ঠীসহ অন্য আরও ছোট গোষ্ঠীকে মিলিয়ে শুধু আদিবাসী বা কুকি বলে চিহ্নিত করা হয়। মণিপুরে আদিবাসীদের মধ্যে কুকিরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ।

পশ্চিম মণিপুরের জিরিবাম জেলায় বৃহস্পতিবার ওই নারীকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার পর গত শুক্রবার থেকে মণিপুরের মধ্য ও দক্ষিণ অঞ্চলে নতুন করে প্রবল উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। জিরিবামে নিহত নারীর পরিবারের জন্য বিচার চেয়ে শনিবার কুকি-অধ্যুষিত কাংপোকপি ও চূড়াচাঁদপুর জেলায় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে শনিবার বিকেলে মধ্য মণিপুরের বিষ্ণুপুর জেলার সাইতন এলাকায় মেইতেই সম্প্রদায়ের এক কৃষক নারীকে গুলি করে হত্যা করা হলো।

সাইতনসহ মণিপুরের নিচু উপত্যকা অঞ্চলের বেশির ভাগ গ্রাম এখনো পর্যন্ত রয়েছে কুকিসহ অন্যান্য আদিবাসী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে। ফলে মেইতেই অঞ্চলে কাউকে হত্যা করা হলে কুকি অঞ্চলে প্রতিহিংসার পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে এবং দুই ক্ষেত্রেই মারা যাচ্ছেন গ্রামের একেবারে সাধারণ মানুষ। দুই গোষ্ঠীর সদস্যদের কাছেই রয়েছে অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র। দুই পক্ষই তৈরি করেছে গ্রাম প্রতিরক্ষা স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী, যারা এই আগ্নেয়াস্ত্র নিজেদের আত্মরক্ষার দাবি তুলে পরস্পরের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে।

ভারতের সংঘাতবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের বড় অংশ মনে করছে, পরিস্থিতি সরকারের এবং দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। এ বিষয়ে এক সাক্ষাৎকারে কিছুদিন আগে উত্তর-পূর্ব ভারত বিশেষজ্ঞ প্রদীপ ফানজৌবাম প্রথম আলোকে বলেছিলেন, অবিলম্বে যাবতীয় অস্ত্র সরকার নিজের হাতে নিয়ে আসতে না পারলে মণিপুরে শান্তি ফেরানো অসম্ভব। কিন্তু বারবার আবেদন করেও লুট হওয়া অস্ত্র সরকারের হাতে ফেরত আসেনি। সে কারণেই ধারাবাহিকভাবে হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চলছে মণিপুরে। বিষ্ণুপুরের মেইতেই নারী হত্যার পর পরিস্থিতির আরও অবনতি হবে বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, রোববার মেইতেই গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়েছে।

২০২৩ সালের মে মাস থেকে ধারাবাহিক সংঘাতে মণিপুরে এখনো পর্যন্ত সরকারি হিসাবে প্রায় ২৫০ জন মারা গেছে। এখনো গৃহহীন প্রায় ৬০ হাজার মানুষ।

ভারতের মণিপুর রাজ্যের বিষ্ণুপুর জেলায় রকেট হামলার স্থান পরিদর্শন করছে মোবাইল ফরেনসিক ইউনিট, ৬ সেপ্টেম্বর
ভারতের মণিপুর রাজ্যের বিষ্ণুপুর জেলায় রকেট হামলার স্থান পরিদর্শন করছে মোবাইল ফরেনসিক ইউনিট, ৬ সেপ্টেম্বর। ছবি: এএনআই