Saturday, August 16, 2014

কিশোরী ক্যাটরিনার খোঁজে

‘বেঞ্জামিন বাটনে’র সেই ঘড়িটার খোঁজ কেউ কি জানে, যে ঘড়ি ঘোরে উল্টো দিকে? সময়টাকে পেছানো যে এখন খুব দরকার! ক্যাটরিনা কাইফের বয়স এখন ৩১। কিন্তু এমন একজন ক্যাটরিনাকে দরকার, যার বয়স ১১ থেকে ১৩-এর মধ্যে। কিন্তু মিলছে না। কিছুতেই মিলছে না।

অভিষেক কাপুরের নতুন ছবি ফিতুর-এ গল্পের প্রয়োজনে ক্যাটরিনার কিশোরী বয়সটার চরিত্র করার জন্য একজন অভিনেত্রী দরকার। কিন্তু ক্যাটরিনার সঙ্গে খাপ খায় সেই বয়সী কোনো মেয়েকেই মনে ধরছে না পরিচালকের। আদিত্য রয় কাপুরের ছোটবেলার অভিনেতা মিলে গেছে। মিলছে না ক্যাটেরটি। ক্যাটরিনার সেই বয়সের তোলা ছবি পুরো ভূভারতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আবেগঘন প্রেমকাহিনি ফিতুর-এ তিনটি চরিত্রের পারস্পরিক সম্পর্কের গল্প বলা হয়েছে। কাশ্মীরের ছেলে নূর, তাঁর স্বপ্নকন্যা ফিরদাউস এবং এক নারী বেগম। প্রথম দুটি চরিত্রে আদিত্য ও ক্যাটরিনা কাজ করছেন। বেগম চরিত্রে রেখা। মিডডে।

রাহুলের শেষ সুযোগ by সেলিম খান

২০০৩ সালের সেপ্টেম্বরের গোড়ার দিকের কথা। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে হঠাৎ রটে গেল প্রিয়াঙ্কা গান্ধী আজ আনুষ্ঠানিকভাবে কংগ্রেসে যোগ দেবেন। এই খবর পাওয়া মাত্র সাংবাদিকেরা হাজির হলেন কংগ্রেস নেতা সতীশ শর্মার সরকারি বাসভবনে। তিনি গান্ধী পরিবারের ঘনিষ্ঠ। ফলে কাঙ্ক্ষিত খবরটি তিনি জানাতে পারেন। আর গুরুত্বপূর্ণ এই মুহূর্তটি দর্শকদের কাছে পৌঁছে দিতে বড় বড় ওবি ভ্যান নিয়ে সরাসরি হাজির টেলিভিশনের সাংবাদিকেরা। তাঁদের সঙ্গে এই প্রতিবেদকও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
মিনিট যায়, ঘণ্টা যায় অপেক্ষার আর শেষ হয় না। কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষার পর বিফল মনোরথে ফিরে গেলেন সবাই। আসলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের কাছে গান্ধী পরিবারের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ছিলেন প্রিয়াঙ্কা, এখনো আছেন। তাঁর মধ্যে দাদি ইন্দিরার ছায়া খুঁজে বেড়িয়েছে সংবাদমাধ্যম। কিন্তু রাহুল গান্ধীর মধ্যে কারও কোনো ছায়া খুঁজে পাওয়া গেছে এমন কোনো দাবি তাঁর অতি বড় শুভানুধ্যায়ীও করেননি।
সংবাদমাধ্যমের এই অতিপ্রিয়তাকে কখনোই পাত্তা দেননি সোনিয়া গান্ধী। তিনি মেয়েকে সামনে আনার পরিবর্তে ছেলেকে এগিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু পুরোটা দেননি। রাহুলকে মন্ত্রী করার, এমনকি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার অনুরোধেও সাড়া দিতে দেননি সোনিয়া। (সাবেক কংগ্রেস নেতা নটবর সিং তাঁর প্রকাশিত বইয়ে দাবি করেছেন, অন্তরাত্মার ডাকে সাড়া দিয়ে নয় রাহুলের নিষেধের কারণে ২০০৪ সালে সুযোগ এলেও প্রধানমন্ত্রী হননি সোনিয়া গান্ধী। ওই সময় অন্তরাত্মার ডাকে সাড়া দেওয়ার দাবি করেছিলেন সোনিয়া।) এদিকে আবার দলের ক্ষেত্রে করেছেন উল্টোটা। কংগ্রেসের মতো শতবর্ষী দলের সভানেত্রী মা, সহ-সভাপতি ছেলে। এমন পারিবারিক সুরক্ষার বন্দোবস্তের নজির মেলা কঠিন।
গত লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের নজিরবিহীন পরাজয়ের পর থেকে বেশ তোপের মুখেই আছেন রাহুল গান্ধী। তাঁর মধ্যে জনমোহিনী ক্ষমতার লেশমাত্র খুঁজে না পেয়ে হতাশ কংগ্রেস নেতাদের কেউ কেউ মুখ খুলে দল থেকে বিতাড়িত হয়েছেন। কংগ্রেস নেতা জগমিত সিং ব্রার তো সোনিয়া-রাহুলকে দুই বছরের জন্য রাজনীতি থেকে নির্বাসনে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন। এসব ক্ষেত্রে শাস্তি দিয়ে দলীয় নেতাদের মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করলেও কোনো আশার আলো তাঁদের দেখাতে পারেনি কংগ্রেস।
বর্তমান লোকসভায় ১০% কম আসন পাওয়ায় বিরোধী দলের মর্যাদা জোটেনি কংগ্রেসের। এ জন্য দেনদরবার, এমনকি মামলার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু টলেনি বিজেপি। এর ওপর লোকসভার অধিবেশনে বসে রাহুল গান্ধীর নাক ডাকিয়ে ঘুম এবং সংবাদমাধ্যমে এর ফলাও প্রচার শুধু তাঁকে নয়, গোটা কংগ্রেস দলকে চরম বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। এ থেকে উত্তরণের পথ বাতলে দিতে খুব বেশি যে পরামর্শ এসেছে তা নয়। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের খবর, গান্ধী পরিবারের ঘনিষ্ঠ জর্নাদন দ্বিবেদী নাকি রাহুলকে পরামর্শ দিয়েছেন লোকসভায় আরও সক্রিয় হতে, দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে।
সেই পরামর্শেই হোক বা অন্য কোনো কারণে অন্য রকম রাহুলকে দেখল ভারতের জনতা। স্পিকারের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলে স্লোগান দিতে দিতে ওয়েলের দিকে এগিয়ে গেলেন রাহুল, যা তাঁর চরিত্রের সঙ্গে একেবারেই বেমানান। ‘মিকি মাউস’ রাহুলের হঠাৎ ‘অ্যাংরি ইয়ং ম্যানে’ রূপান্তর সবার কাছে বিস্ময়ের। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে এমনও লেখা হয়েছে ‘শোয়ে হুয়ে শের জাগ রাহা হ্যায়’ (ঘুমিয়ে থাকা বাঘ জেগে উঠছে)। রাহুলের মতো জনমোহিনী ক্ষমতাহীন একজন নেতার পক্ষে ‘শের’ হওয়া কতটা সম্ভব তা ভবিষ্যতই বলবে।
তবে এটাই বোধ হয় রাহুলের যোগ্য নেতা হওয়ার শেষ সুযোগ। ক্ষমতায় থেকে কিছু করতে পারেননি। এখন বিরোধী দলে থেকেও যদি জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো তুলে ধরে নরেন্দ্র মোদি সরকারকে বিপাকে ফেলতে কংগ্রেস তথা রাহুল গান্ধী ব্যর্থ হন, তাহলে ২০১৯-এ পরবর্তী লোকসভা নির্বাচনের আগে শেষ ভরসা প্রিয়াঙ্কাকে টেনে আনা ছাড়া সোনিয়ার সামনেও আর কোনো গতি থাকবে না।

রাজনৈতিক অর্থায়নে চাই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি by এম সাখাওয়াত হোসেন

আমাদের রাজনীতি নির্বাচনের মধ্যেই আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। বিরোধী দল বিএনপি ও এর শরিকেরা একটি বিশ্বাস ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এবং আশু নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনের হুমকি অব্যাহত রেখেছে। অপর দিকে সরকারি দল রাস্তায় আন্দোলনকে অঙ্কুরেই প্রতিহত করার দৃঢ়প্রত্যয় প্রায় প্রতিদিন জনমানুষকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। এসব বাদানুবাদের মধ্যে যা কখনো আলোচিত হয় না, তা হলো রাজনৈতিক দলগুলোর পরিচালনার ক্ষেত্রে দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের চর্চা, জনগণের কাছে জবাবদিহি এবং আর্থিক বিষয়ক স্বচ্ছতা। দলের পরিচালনার ক্ষেত্রে যেমন গণতন্ত্র চর্চার প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন আর্থিক স্বচ্ছতা। অপর দিকে প্রয়োজন নির্বাচনী ব্যবস্থাপনায় আরও গতিশীল, আরও স্বচ্ছতা এবং সব রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য সমান সুযোগ ও আকৃষ্ট করার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করা। এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনো দলেরই, বিশেষ করে বিএনপি জোটের কোনো উদ্বেগ দেখা যায় না।
গণতান্ত্রিক পরিবেশে সব রাজনৈতিক দলের লক্ষ্য স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং নির্বাচনের মাধ্যমে নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে দেশ পরিচালনা করা। সন্দেহ নেই, এসবই নিশ্চিত করা হয় নির্দিষ্ট কাঠামোর মাধ্যমে। নিয়ম-নীতি ও আইনের প্রয়োগের মাধ্যমে। নির্বাচন ব্যবস্থাপনার অন্যতম বিষয় হচ্ছে রাজনৈতিক অর্থায়নের ওপরে নজরদারি, রাজনৈতিক দল পরিচালনা ও নির্বাচনের জন্য অর্থ সংগ্রহ এবং ব্যয়ের ওপর একধরনের স্বচ্ছতা আনয়নে সহায়তা করা।
রাজনৈতিক অর্থায়ন মানে শুধু নির্বাচনের জন্যই নয়, দল পরিচালনার জন্য অর্থের সাশ্রয় করা। রাজনৈতিক অর্থায়ন হয় বিভিন্ন উপায়ে। এ বিষয়ে স্বচ্ছতা আনয়নের জন্য বিভিন্ন ধরনের আইন রয়েছে নানা দেশে। আমাদের দেশে অতীতে এমন আইন ছিল না। ২০০৮ সালে নির্বাচনী ও আইনের সংস্কারের অন্যতম উপাদান ছিল এই অর্থায়নের বিষয়ে রাজনৈতিক দলকে আরও স্বচ্ছ হতে উদ্বুদ্ধ করা। দল পরিচালনা ও নির্বাচনী খরচের সাশ্রয়ের কোনো জবাবদিহি না থাকায় ওই সময় এ ধরনের অভিযোগ সহজেই উত্থাপিত হয়। নেতাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠে। এসব কারণেই নির্বাচনী সংস্কারের সময় বাধ্যতামূলক রেজিস্ট্রেশনের যে আইন আরপিওতে (RPO) সংযোগ করা হয় আইনের ওই অধ্যায়ে ৯০ এফ(১) (a)(i)(ii) [90F(1)(a)(i)(ii)]-তে ব্যক্তিগত পর্যায়ে এবং কোম্পানি ও কোনো সংস্থা থেকে অর্থ অনুদানের একটি সীমা নির্ধারণ করে ধারা সংযোজন করা হয়েছিল। এবং ওই ধারার (২) উপধারায় [90F(2)] রাজনৈতিক দলের অর্থায়নের জন্য কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান ও বিদেশি অনুদানপ্রাপ্ত বেসরকারি সংস্থা বা এনজিও এবং বাংলাদেশি নয় এমন ব্যক্তি থেকে অনুদান গ্রহণ নিষিদ্ধ হয়েছিল।
রেজিস্ট্রেশন আইনের বিধিমালায় প্রতিবছর প্রতিটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলকে তাদের অ্যাকাউন্টের অডিট রিপোর্টসহ পুরো বছরের হিসাবনিকাশও বাধ্যতামূলকভাবে নির্বাচন কমিশনে দাখিল করার বিধি প্রণোয়ন করা হয়েছিল এবং ২০১০ সাল থেকে প্রতিটি রাজনৈতিক দল বিধির এ ধারা মেনে অডিট স্টেটমেন্ট দাখিল করে আসছে। এসব নতুন সংযোজন ছিল রাজনৈতিক অর্থায়নে যত দূর সম্ভব স্বচ্ছতা আনা।
যা–ই হোক, ওপরের সংশোধনীর আলোকে নিরীক্ষণ করা অ্যাকাউন্টের দাখিলের মাধ্যমে কিছুটা হলেও রাজনৈতিক দলের অর্থায়নের বিষয়ে স্বচ্ছতার সূত্রপাত হয়েছে। রাজনৈতিক দলের অর্থায়নের যে ব্যবস্থা আইন দ্বারা তৈরি করা হয়েছে, তা নিরূপণ করা সম্ভব নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত না আরও কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়। রাজনৈতিক অর্থায়ন যদি সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রিত ও জবাবদিহির ক্ষেত্র সম্প্রসারণ না করা হয়, তবে দেশের নির্বাচনীব্যবস্থা যেমন স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য হবে না, তেমনি রাজনৈতিক দলের স্বচ্ছতা ও গণতন্ত্রায়ণের প্রচেষ্টা আদৌ সফল হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। রাজনৈতিক অর্থায়নের বিষয় ছাড়াও রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তির নির্বাচনী অর্থের সাশ্রয় এবং খরচের বিবরণ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দাখিল করার বিধান রয়েছে যথাক্রমে ধারা ৪৪ সিসিসি (44 ccc) এবং ধারা ৪৪ সি (44c)। অন্যথায় প্রার্থীর ও দলের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও বিধান রয়েছে। তথাপি এসব জায়গায় আরও স্বচ্ছতা আনার জন্য আরও কিছু পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। নির্বাচনী ব্যবস্থাপনাকে আরও স্বচ্ছ, ভোটার তথা রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলতে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে নির্বাচনী ব্যবস্থাপনাকে আরও স্বচ্ছ করার এবং প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার।
রাজনৈতিক অর্থায়নের বিষয়টি শুধু বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে দুর্বল দিক তেমন নয়, বরং বহু উঠতি গণতান্ত্রিক দেশের বড় সমস্যা। প্রতিবেশী ভারতেও রাজনৈতিক অর্থায়নের বিষয়টি তেমন স্বচ্ছ নয়। তবে ভারতের নির্বাচন ব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক অর্থায়নের বিষয়টি অনেকটা নিয়ন্ত্রিত ও স্বচ্ছ রাখতে সে দেশের আইন ও বিচারব্যবস্থা যথেষ্ট সচেতন। সম্প্রতি কংগ্রেস নেত্রী ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে দলের তহবিল থেকে বাণিজ্যিক সংস্থাকে কর্জ দেওয়ায় কোর্টে অভিযোগ উত্থাপনের পর মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে। সোনিয়া গান্ধীর বিরুদ্ধে অভিযোগ যে ভারতে আইনগতভাবে রাজনৈতিক দলের কর মওকুফ অর্থ থেকে কংগ্রেসের মুখপত্র এক পত্রিকাকে দেওয়া এবং সেখান থেকে লাভবান হওয়ার প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি ফ্রান্সের সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলা সারকোজির বিরুদ্ধে নির্বাচনে অবৈধভাবে দলের জন্য অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ উঠেছে। এই অভিযোগে তিনি গ্রেপ্তারও হয়েছেন। সারকোজির বিরুদ্ধে অভিযোগ যে তিনি ২০০৭ ও ২০১২ সালে নির্বাচনী ব্যয়ের জন্য বেআইনিভাবে অর্থ জোগাড় করেছেন। তিনিই প্রথম সাবেক ফরাসি প্রেসিডেন্ট, যাঁকে কোনো অপরাধজনিত কারণে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানো হয়েছে। অপর দিকে ইতালির সাবেক প্রধানমন্ত্রী সিলভিও বারলুসকোনি এক ঘনিষ্ঠজন থেকে অর্থের বিনিময়ে তাঁর দলে ভেড়ানোর অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন। বাংলাদেশের নির্বাচনী আইনে কিছুটা নিয়ন্ত্রণের ধারা থাকলেও সেগুলো যেমন পর্যাপ্ত নয়, তেমনি প্রয়োগও সঠিকভাবে করা হচ্ছে না।
রাজনৈতিক দলের অর্থের প্রয়োজন যে কারণে হয়ে থাকে, তার মুখ্য উদ্দেশ্য নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য দলকে প্রস্তুতকরণ। অবশ্য এর মধ্যে সাংগঠনিক তৎপরতা ও দল পরিচালনার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত। সাধারণত যেসব খাতে দলের অর্থ ব্যবহৃত হয়, তার মধ্যে কয়েকটি খাতের উল্লেখ করছি। এক. নির্বাচনসংক্রান্ত ও দলীয় প্রার্থীর জন্য, দুই. পুনর্নির্বাচনে প্রার্থীর জন্য, তিন. দলের কর্মকর্তা ও সদস্যদের প্রশিক্ষণ, চার. দলের নীতিনির্ধারণী ধারণাপত্র তৈরি ও দলের মতবাদ প্রচার, পাঁচ. দল পরিচালনার জন্য দৈনন্দিন খরচ এবং ছয়. নির্বাচনী বিষয়ে ভোটারদের সচেতনতা বাড়ানো। বর্তমানে ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক কোম্পানিসহ অন্যান্য অনুমোদিত সংস্থা থেকে রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রদেয় অনুদান, স্বপ্রণোদিত প্রদানের সীমা বৃদ্ধি করা হলেও ওই সব খাত থেকে প্রাপ্ত অর্থের পরিমাণ নিরূপণ করা সম্ভব নয়। তদুপরি এসব অনুদান ঐচ্ছিক কি না, তা–ও জানার উপায় নেই।
২০০৮ সালে প্রথমবারের মতো নির্বাচন কমিশন থেকে রাজনৈতিক দলকে অনুদান প্রদানের যে সুপারিশ করা হয়েছিল, সেখানে অনুদান প্রদানকারীর এই অর্থ করমুক্ত রাখার সুপারিশ করা হয়েছিল কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাতে সায় দেয়নি। পরবর্তীকালে রাজনৈতিক সরকারের কাছে একই বিষয়ে পুনরায় সুপারিশ করা হলেও তা কার্যকর হয়নি। এ ব্যবস্থা ব্যক্তির অনুদানের জন্যও প্রযোজ্য হওয়া বাঞ্ছনীয়। সে ক্ষেত্রে একদিকে অনুদান প্রদানকারী যেমন উৎসাহিত হবেন, তেমনি অর্থায়নে স্বচ্ছতা আসবে। সরকারের পক্ষেও নিবিড় নিরীক্ষণ করা সম্ভব হবে। রাজনৈতিক অর্থায়নে অনুদান একটি স্বীকৃত পদ্ধতি; একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলের মোট অর্থে, যা বার্ষিক প্রতিবেদনে দেওয়া হয়ে থাকে, তা যতই অবাস্তব মনে হোক, কর রেয়াত দেওয়া যেতে পারে। তাতে আরও স্বচ্ছতা এবং সঠিক চিত্রও পাওয়া যেতে পারে।
রাজনৈতিক অর্থায়ন বিশ্বব্যাপী বহুল চর্চিত। বিষয়টি নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নির্বাচনে কালোটাকার ব্যবহার ঠেকাতে অর্থায়নের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পণ্ডিতদের মতে, এ অর্থায়ন প্রধানত তিনটি স্বীকৃত উপায়ে হয়ে থাকে। প্রথমত. রাজনৈতিক দলের সদস্যদের বৈধ চাঁদা, দ্বিতীয়ত. ব্যক্তি ও কোম্পানি থেকে অনুদান এবং তৃতীয়ত. সরকারি অনুদান বিশেষ করে নির্বাচনী ব্যয়ে কিছুটা সহায়তা প্রদান। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশে তৃণমূল পর্যায়েও স্বীকৃত পদ্ধতিতে ‘ফান্ড তৈরি’ জোগাড় করার বিধি রয়েছে। বর্তমান আরপিওতে উল্লিখিত প্রথম দুই পদ্ধতিতে অর্থায়নের উল্লেখ রয়েছে। তৃতীয় পদ্ধতি অর্থাৎ নির্বাচনী খরচ পাবলিক ফান্ড বা সরকারি কোষাগার থেকে প্রদান করা যায় কি না, তা নিয়ে অতীতে একবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এমনকি একটি খসড়াও তৈরি করাও হয়েছিল কিন্তু পূর্বতন নির্বাচন কমিশন সময়ের অভাবে এই প্রস্তাব চূড়ান্ত করতে পারেনি। বর্তমানে এ নিয়ে কোনো আলোচনাও শোনা যায় না। আমাদের মতো দেশে যেখানে নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা প্রতিনিয়ত দুর্বল থেকে দুর্বলতর হচ্ছে, সেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর শুধু নির্বাচন নিয়ে আন্দোলনে নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার কোনো উন্নতি হবে কি না, তা ভেবে দেখা প্রয়োজন। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও কালোটাকার অগাধ ব্যবহারের মতো সুযোগ বহাল রেখে যে পদ্ধতি বা সরকারের অধীনে নির্বাচন হোক না কেন, তাতে সুফল বয়ে আনবে কি না সন্দেহ রয়েছে।
আমাদের রাজনৈতিক অর্থায়নের চিত্র একধরনের চাঁদাবাজি, সরকারি টেন্ডারবাজি এবং বহুল আলোচিত মনোনয়ন-বাণিজ্য। এ ধরনের বেআইনি কর্মকাণ্ডের হাত থেকে দল, রাজনীতি ও নির্বাচন ব্যবস্থাপনাকে বের করে আনতে হলে রাজনৈতিক অর্থায়নের সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও প্রয়োগ বিশেষভাবে আবশ্যক। এর জন্য প্রয়োজন সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন। আমাদের মতো দেশে যেখানে রাজনৈতিক অর্থায়ন, বিশেষ করে নির্বাচনের প্রাক্কালে, মানে আইনবহির্ভূত উপায়ে অর্থায়ন, সে পথ থেকে কিছুটা পরিত্রাণ পেতে হলে আমি মনে করি, সরকারি কোষাগার থেকে অনুদানের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা অত্যাবশ্যক।
এম সাখাওয়াত হোসেন (অব.): অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক৷
hhintlbd@yahoo.com

মার্কিন অভিযান- আবার ভোগাবে ইরাক? by সুমন কায়সার

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা হয়তো কখনোই স্বীকার করবেন না, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক জঙ্গিবাদের জগতে নতুন সংযোজন আইসিসকে মোকাবিলায় তিনি হয়তো সত্যিই দেরি করে ফেলেছেন। যে সংগঠনটিকে ওবামা ‘জেভি টিম’ (জুনিয়র ভার্সিটি অর্থাৎ কিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কনিষ্ঠ শিক্ষার্থীদের দল) বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন, তাদের কাবু করতে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধবিমান পাঠাতে হলো। ওবামা এত দিন সিরিয়ায় (আর সম্প্রতি আইসিসকবলিত ইরাকে) সামরিক হস্তক্ষেপ করতে কেন যে গড়িমসি করেছেন, তা অবশ্য আজকাল চোখ-কান খোলা হাইস্কুলের ছেলেরাও বোঝে। ইরাক আর আফগানিস্তান সাম্প্রতিক মার্কিন প্রেসিডেন্টদের কাছে দুঃস্বপ্ন বৈ তো আর কিছু নয়। ওই তেতো স্মৃতির কারণেই ওবামা এখন বারবার মন্ত্রের মতো বলছেন, ইরাকের মাটিতে আর সেনা যাবে না, কখনো না।
ওবামা দৃশ্যত মনে করছেন, আকাশ কিংবা জাহাজ থেকে কিছু বোমা আর ক্ষেপণাস্ত্র ফেলেই কেল্লাফতে করা যাবে। বড়জোর কিছুসংখ্যক সামরিক বিশেষজ্ঞ পাঠিয়ে ইরাক সরকারকে মদদ দেবেন। কিন্তু পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, ইরাকের এবারের মিশন ওবামা যতটা মনে করছেন, ততটা সহজ হবে না। অথবা তিনি আসলে মনে মনে ঠিকই জানেন, কিন্তু স্বীকার করতে চাইছেন না। মার্কিন বাহিনী আরেক দফা ইরাকি মরীচিকার পেছনে ছুটে দুনিয়াজোড়া নিন্দামন্দের চোরাবালিতে হাবুডুবু খেতেও পারে। তা আগে থেকে লোককে বুঝতে দিয়ে জনপ্রিয়তা কমানোর ঝুঁকি নেবেন কেন?
লিবিয়ার কথা স্মরণ করা যাক। বেশ দেরিতে হলেও ওবামা স্বীকার করেন, তাঁর ঘোষিত লক্ষ্যের চেয়ে অনেক বেশি দূর বিস্তৃত হয়েছিল গাদ্দাফিবিরোধী মার্কিন অভিযান। এবারের ইরাক ‘অভিযানের’ যুক্তি আর লক্ষ্য নিয়ে ওবামাসহ বর্তমান রাজনৈতিক নেতারা আর সেনা কর্মকর্তাদের কথাবার্তায় যাদের খটকা লাগছে, তাদের মনে তাই লিবিয়ার স্মৃতি ভেসে আসতেই পারে। সত্যি বলতে কি, প্রেসিডেন্ট ওবামা যখন ৭ আগস্ট নাটকীয়ভাবে ঘোষণা দেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র (ইরাকে) সাহায্য করতে আসছে’, তখনই বেশ কয়েকজন নীতিনির্ধারক ও বিশ্লেষক ইরাকে মার্কিন লক্ষ্যের অস্পষ্টতার বিষয়টি উল্লেখ করেছিলেন। তাঁরা লক্ষ করেছিলেন, অভিযানের উদ্দেশ্য যেমন ঘন ঘন বদলে যাচ্ছে, তেমনি সময়সীমা সুনির্দিষ্টভাবে স্থির করা হচ্ছে না। ওবামা নিজেই এ পর্যবেক্ষণকে পোক্ত করেন, যখন তিনি বলেন, কয়েক সপ্তাহে এ সমস্যার সমাধান হবে বলে মনে হয় না। এ জন্য সময় লাগবে।
মানবিক প্রয়োজনে হস্তক্ষেপের আওতা বা মেয়াদ বাড়ানোর মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু নেই। এ নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলবে না। অনেক সময়ই দেখা যায়, স্বল্পমেয়াদে মানবিক হস্তক্ষেপে যত মানুষ প্রাণ হারায়, তার চেয়ে বেশি মানুষকে বাঁচানো যায়। ইউনিভার্সিটি অব পিটসবার্গের ২০০৮ সালে করা ১৭টি মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের পর্যালোচনায় দেখা যায়, এর মধ্যে নয়টিই অনেক মানুষের জীবন রক্ষায় সফল হয়েছে। তবে দুঃখজনকভাবে এগুলোর অনেক ক্ষতিকর দিকও আছে, সাম্প্রতিক ইতিহাসে তার ভূরি ভূরি উদাহরণ আছে।
১৯৯১ সালের ৭ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র তুরস্ক-ইরাক সীমান্তে স্থাপিত কুর্দি শরণার্থী শিবিরে উড়োজাহাজ থেকে খাদ্য, পানি আর কম্বল ফেলতে শুরু করে। ইরাকি সেনারা উত্তর ইরাকে এক আন্দোলন নিষ্ঠুরভাবে দমন করে ওই কুর্দিদের দেশছাড়া করেছিল। ওই একই দিন তখনকার প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশকে প্রশ্ন করা হয়, ইরাকের অভ্যন্তরে কত দিন মার্কিন সেনারা ভূমিকা রাখবে। বুশের জবাব ছিল, ‘এটা কয়েক দিনের বিষয়, কয়েক সপ্তাহ কিংবা কয়েক মাসের নয়।’
উত্তর ইরাকে মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের সুবিধার জন্য যুক্তরাষ্ট্র একই সঙ্গে দেশটির আকাশসীমার নির্দিষ্ট অংশে উড্ডয়ন নিষিদ্ধ এলাকা প্রতিষ্ঠিত করেছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল, ইরাকি বাহিনীকে প্রতিপক্ষের ওপর বিমান হামলা চালাতে না দেওয়া। পরে উড্ডয়ন নিষিদ্ধ এলাকা সম্প্রসারিত করা হয়। বুশ এক হিসাবে ঠিকই বলেছিলেন, ইরাকে মার্কিন হস্তক্ষেপ বেশ কয়েক সপ্তাহ বা মাস লাগেনি; ইরাকের উত্তর ও দক্ষিণের উড্ডয়ন নিষিদ্ধ এলাকা জারি ছিল সাড়ে ১০ বছর।
আবার ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে বুশ যখন প্রথম ঘোষণা করেন জাতিসংঘ বাহিনীর অংশ হিসেবে ২৮ হাজার মার্কিন সেনা সোমালিয়ায় মোতায়েন করা হবে, তখন তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদের মিশনের লক্ষ্য সীমিত: পণ্য সরবরাহের পথ খুলে দেওয়া, খাদ্য পরিবহন চালু করা এবং জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী যেন তা চালু রাখতে পারে, সে লক্ষ্যে ব্যবস্থা নেওয়া। প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন উত্তরাধিকার সূূত্রে পাওয়া এ অঙ্গীকার বহাল রাখেন। তবে ১৯৯৩ সালের জুন মাসে তিনিই ২৪ জন পাকিস্তানি সেনার মৃত্যুর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের আটক কিংবা হত্যার জন্য জাতিসংঘের ম্যান্ডেট বাড়ানো অনুমোদন করেন। এর দুই মাস পরেই কয়েক শ এলিট স্পেশাল ফোর্স সেনা সোমালিয়ায় মোতায়েন করা হয়। এর পরই ঘটে বহুল আলোচিত ‘ব্ল্যাক হক ডাউন’ ঘটনা। সোমালীয় যোদ্ধাদের হাতে প্রাণ যায় ১৮ মার্কিন সেনার। সেদিনের লড়াইয়ে কয়েক শ সোমালীয়ও নিহত হয়। এত সেনার মৃত্যুতে যুক্তরাষ্ট্রে এমনই নিন্দার ঝড় ওঠে যে ছয় মাসের মধ্যে সব সেনাকে দেশে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হন ক্লিনটন।
সংক্ষিপ্ত সময়ে মিশন গোটানোর এ ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা ভঙ্গের ঘটনা ঘটেছে সাবেক যুগোস্লাভিয়ার গৃহযুদ্ধের সময়ও। সেখানেও তথ্য গোপনের অভিযোগের পাশাপাশি মার্কিন সেনানায়কদের হিসাবে ভুল হওয়ার কথা বলা হয়। ইরাক যুদ্ধে যে ব্যয় ও সময়সীমার কথা তখনকার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডোনাল্ড রামসফেল্ডসহ অন্যরা বলেছেন, তার চেয়ে সময় ও অর্থ ব্যয় হয়েছে শতগুণ বেশি। সেই বারবার ঘরপোড়া গরু হয়েও ভয় না পাওয়া যুক্তরাষ্ট্র আবার মানবিক সহায়তা আর নিজের নাগরিকদের রক্ষার কথা বলে ইরাক সংঘাতে জড়াচ্ছে। কিন্তু তার সামনে কোনো কার্যকর রণকৌশল আছে বলে মনে হচ্ছে না।
ওবামা স্বাগত জানিয়েছেন, শিয়া গোষ্ঠীগুলোর মনোনীত এবং প্রেসিডেন্টের নিয়োগ দেওয়া প্রধানমন্ত্রী হায়দার আল-আবাদিকে। অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী নূরি আল-মালিকির কোনো উল্লেখই ওবামা করেননি। মালিকির ওপর এখন অনেকেই নাখোশ। কিন্তু তিনি তো ক্ষমতা ছাড়তে রাজি নন। ঘোষণা দিয়েছেন, আবাদিকে প্রধানমন্ত্রী করা সংবিধান লঙ্ঘনের শামিল। দরকার হলে তিনি আদালতে যাবেন। অন্তত বাগদাদভিত্তিক সেনাবাহিনী মালিকির প্রতি অনুগত। তারা যে বিনা যুদ্ধে হার মানবে, তা মনে হয় না। যদিও মালিকি গতকালই সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক বিষয়ে নাক না গলাতে বলে দিয়েছেন। কিন্তু তা কতখানি লোক দেখানো আর কতটা মনের কথা, সে শুধু মালিকিই জানেন। আইসিস যোদ্ধারা তো লড়াই করতে মুখিয়েই আছে। সব মিলিয়ে সামনের ছবিটা ঝাপসা হলেও তা যে খুব সুন্দর কিছু নয়, সেটা পরিষ্কার।

চাঁদের অপর পিঠ কেউ দেখে না by ফারুক ওয়াসিফ

ভালো সেনাপতি কখনো অপ্রশিক্ষিত সেনাদের রণাঙ্গনে পাঠান না। তাতে ক্ষতি দুই দিকেই—এরা বেশি মারে এবং বেশি মরে। বিখ্যাত স্টার ট্রেক চলচ্চিত্রে এ রকম এক সেনাপতির সংলাপ ছিল: আমার সেনারাই আমার পরিবার। আমাদের শিক্ষামন্ত্রী ভালো মানুষ, কিন্তু ভালো সেনাপতি নন। তিনি সবুজ শিক্ষার্থীদের এমন সব পাবলিক ‘পরীক্ষায়’ পাঠাচ্ছেন, যার জন্য তারা তৈরি নয়। আমি এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছি ১৯৯৪ সালে। আমাদের সময়েও পরীক্ষার আগে জ্বর আসত উত্তর জানা বা মুখস্থ করার কাজে। এখন জ্বর আসে পরীক্ষার আগেই প্রশ্নপত্র পাওয়া না-পাওয়ার উত্তেজনায়।
শিক্ষামন্ত্রী ঠিকই বলেন, সৃজনশীল পদ্ধতিতে মুখস্থের বালাই নেই। হয় জানতে হবে, নয়তো প্রশ্নফাঁসের সুফল নিতে হবে। পরীক্ষার ভীতিকর ঐতিহ্য তাঁর আমলেই দূরীভূত হলো। পরীক্ষা নামের এই মহাযজ্ঞে ‘পরীক্ষার্থীরা’ উপর্যুপরিভাবে পাস করেছে, জিপিএ–৫ পাচ্ছে। রেকর্ডের পর রেকর্ড গড়া হচ্ছে। বাংলার ঘরে ঘরে অনেক আনন্দ, পাড়া-গ্রামে মিষ্টির ফোয়ারা। কিন্তু একজন শিক্ষকের মন খুব খারাপ আজ। তিনি শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক মুহম্মদ জাফর ইকবাল। পরীক্ষার ফল শুনে বৃহস্পতিবারের প্রথম আলোয় তিনি বলেছেন, ‘আমার জানামতে, প্রায় সবাই এবার পরীক্ষার আগেই প্রশ্নপত্র পেয়েছিল। শুধু যেসব ছেলে-মেয়ে সৎ ছিল, তারা নেয়নি। সুতরাং এই পরীক্ষার ফল আমার পক্ষে গুরুত্বসহকারে নেওয়া সম্ভব নয়। তাই মূল্যায়নও করতে পারছি না।’
অথচ আমাদের শিক্ষামন্ত্রী কয়েক দিন আগেও সংসদে এলান করেছেন, ‘গত পাঁচ বছরে কোনো প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়নি’। মুহম্মদ জাফর ইকবাল একা নন। গণমাধ্যমের সংবাদে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিস্তর প্রমাণ হাজির রয়েছে। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী, সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালোবাসতে আমরা পারছি না। কারণ, এই সত্যের কোনো শক্তি নেই, সে কেবলই করে বঞ্চনা।
বঞ্চনার শিকার হয়েছে দেশের শিক্ষার্থীরা। অতীতে বঞ্চনার কারণ ছিল শিক্ষায় বৈষম্য, শিক্ষার মানের অবনতি ইত্যাদি। অতীতের সব বঞ্চনার ওপর সাড়ে ষোলো আনা হিসেবে তারা এখন যথাযথ পরীক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। না তারা, না শিক্ষার কান্ডারিরা—কেউই বলতে পারবে না, এখনকার উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা আসলে কেমন শিক্ষিত। যারা প্রশ্নপত্র নেয়নি, মুহম্মদ জাফর ইকবাল তাঁদের সৎ বলেছেন, বোকা বলেননি। যারা প্রশ্নপত্র দুর্নীতির ফল ‘লাভ’ করেছে, তাদেরও তিনি অসৎ বলেননি। তবে সরল বুদ্ধিতে তারা এবং তাদের অনেক অভিভাবক ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রের প্রলোভনের ফাঁদে পা দিয়েছেন। এই সরকারের আমলে তারা উত্তীর্ণ হয়েছে বটে, তবে জীবনের পরীক্ষায় তারা অপ্রস্তুত অবস্থায়ই প্রবেশ করল। তাদের নিয়ে ভয়, দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়, এত পাস, এত ডিগ্রি, এত সনদ; কিন্তু নিজেকে বা দেশকে এরা কী দেবে?
সত্যিকার পরীক্ষাগুলো হয় জীবনের পথে, চাকরিতে, উচ্চশিক্ষার সুযোগে। সেখানে তো কেউ তাদের ছাড় দেবে না। আজ যে পরীক্ষার্থী ৫০ নম্বর পাওয়ার যোগ্য, প্রশ্নপত্র ফাঁসের সুবাদে সে ৮০-৯০ পেয়ে উত্তীর্ণ হচ্ছে। কিন্তু জীবনের পরীক্ষা এমনই নিশ্ছিদ্র যে, এই বাড়তি নম্বর পাওয়ার খেসারত সেখানে বহুগুণে দিতে হবে। ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দিয়ে শিক্ষার্থীরা অসততার সবক নিয়েছে। অদৃষ্টপূর্ব পাস আর অসম্ভব জিপিএ–৫–এর বড়াই দিয়ে সরকার কৃতিত্ব দাবি করার সুযোগ পেলেও, শিক্ষার সর্বনাশ হচ্ছে এই পথেই।
শিক্ষামন্ত্রী যতই বড়াই করুন, নিশ্ছিদ্র পরীক্ষাপদ্ধতির নমুনা সোনার পাথরবাটিতে পরিণত হবে। আসলে প্রশ্নটা পরীক্ষাপদ্ধতি নিয়ে নয়, স্বয়ং পরীক্ষা নিয়েই। এভাবে উত্তীর্ণরা কতটা যোগ্য, তা বোঝা যাবে একটি পরিসংখ্যানে। ২০১২ সালে স্নাতক সম্মান প্রথম বর্ষে ক, খ ও গ ইউনিটে জিপিএ-৫ পাওয়া ৪৪ হাজার ৬৪২ জন শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় বসেছিলেন। এর মধ্যে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন ১৯ হাজার ৮৬৮ জন বা প্রায় ৪৫ শতাংশ। বাকি ৫৫ শতাংশ শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ দূরের কথা, পাসই করতে পারেননি। ২০১০ ও ২০১১ সালে এই অনুত্তীর্ণের হার ছিল যথাক্রমে ৫২ ও ৫৩ শতাংশ। আজকে ভালো ফল করা শিক্ষার্থীদের হাসি-খুশি-সুখী ছবি সবাই ছাপছে, প্রচার করছে। কিন্তু মাত্র কয়েক মাস পরে এদের অধিকাংশই যখন ভালো কোনো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে না পেরে হতাশায় নিমজ্জিত হবে, যখন হতাশা থেকে অনেকে ভুল পথে পা বাড়াবে, যখন তাদের জন্য তাদের পরিবারে নেমে আসবে অন্ধকার; সেই অন্ধকারের ছবি কোথাও প্রচারিত হবে না। কেউ তাদের মনে রাখবে না। প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রী পাসের রেকর্ড নিয়ে গর্ব করে যাবেন, কিন্তু এদের জীবনের দায়দায়িত্ব কীভাবে নেবেন তাঁরা? চাঁদের অপর পিঠ কেউ দেখে না।
ভালো ফল করা শিক্ষার্থীদেরই যখন এমন দুর্গতির ভয়, তখন যারা ভালো ফল করতে ব্যর্থ হয়েছে, তাদের কী হবে? পাবলিক পরীক্ষা পাবলিক তথা সর্বজনের পরীক্ষা। সরকার, শিক্ষাব্যবস্থা ও অভিভাবকের যত্ন ও নিষ্ঠা ছাড়া পাবলিক পরীক্ষার পাবলিক সুফল আসে না। কিন্তু আমরা দেখি, সরকার দায়িত্ব নেবে না, অভিভাবক বুঝতে চাইবেন না, সব দোষ হবে ওই সব শিক্ষার্থীর, যারা সোনার হরিণ ধরতে পারেনি। পাবলিক প্রতিষ্ঠানগুলো ভুল করবে, গাফিলতি করবে, কিন্তু তার দায় শোধ করতে হবে প্রাইভেট তথা ব্যক্তিগত জীবনে। একেই বলে পাবলিক সমস্যার প্রাইভেট ভোগান্তি।
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com

উন্নয়নের ডাক দিলেন মোদি

ভারতের ৬৮তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে গতকাল
নয়াদিল্লির লাল কেল্লায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে জাতির
উদ্দেশে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ছবি: এএফপি
রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি গত বৃহস্পতিবার তাঁর ভাষণে সাম্প্রদায়িকতা ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতার বিরুদ্ধে বলেছিলেন। গতকাল শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির স্বাধীনতা দিবসের ভাষণেও এর প্রতিফলন দেখা গেল। তিনি বললেন, জাতপাত ও সাম্প্রদায়িকতার লড়াই বন্ধ করতে হবে। এই বিষের হাত থেকে দেশকে বাঁচাতে হবে। প্রথা ভাঙা এ ভাষণে দেশকে এগিয়ে নিতে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করলেন নরেন্দ্র মোদি। বুলেটপ্রুফের ঘেরাটোপহীন: স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে লাল কেল্লা থেকে দেওয়া মোদির প্রথম ভাষণ নিয়ে আগ্রহ ছিল প্রবল। নানাভাবে প্রথা ভেঙে তিনি যেন সেই আগ্রহের যৌক্তিকতাই প্রমাণ করলেন। যেমন, ইন্দিরা গান্ধী নিহত হওয়ার পর থেকে লাল কেল্লায় প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার স্বার্থে বুলেটপ্রুফ কাচের যে ঘেরাটোপ ব্যবহৃত হয়ে আসছিল, মোদি তা প্রত্যাখ্যান করলেন। বৃষ্টি হলে (অবশ্য হয়নি) মাথায় ছাতা না ধরার হুকুমও দিয়েছিলেন তিনি। লিখিত ভাষণ পাঠ না করে লিখে আনা ‘পয়েন্ট’ ধরে দীর্ঘ (জওহরলাল নেহরুর পরে এটাই দীর্ঘতম) ভাষণও দিলেন তাঁরই মতো করে। আমন্ত্রিত আমজনতাও: এত বছর ধরে লাল কেল্লার প্রান্তর সাধারণ মানুষের জন্য নিষিদ্ধ ছিল। মোদির নির্দেশে সেই নিষেধাজ্ঞা বাতিল হলো। আমন্ত্রিত ব্যক্তিদের পাশাপাশি ১০ হাজার সাধারণ মানুষের বসারও বন্দোবস্ত করা হয়েছিল।
পোশাক নির্বাচনেও মোদি ছিলেন সজাগ। ক্রিম রঙের হাফ হাতা পাঞ্জাবি ও পাজামার সঙ্গে পরেছিলেন গেরুয়া রঙের পোলকা ডট প্রিন্টেড পাগড়ি, যার নিচের দিকটা ছিল সবুজ রঙের। অর্থাৎ, স্বাধীনতা দিবসের দিন ভারতের তেরঙায় মুড়েছিলেন শরীরকে। দেশকে এগিয়ে নিতে: দেশটাকে কীভাবে এগিয়ে নিতে চাইছেন, তার বহু ঘোষণা ও ইঙ্গিত এই ভাষণে দিলেন মোদি। উন্নত বিশ্বের প্রতি তাঁর আহ্বান, বেচুন যেখানে খুশি, কিন্তু আপনাদের জিনিস ভারতে তৈরি করুন। গ্রামের উন্নতির মধ্য দিয়ে দেশের উন্নতির জন্য ‘সংসদ আদর্শ গ্রাম যোজনা’ ঘোষণা করেন। এই পরিকল্পনায় প্রত্যেক সাংসদকে নিজের আসনে একটি করে গ্রামকে আদর্শ গ্রামে পরিণত করতে হবে। ক্রমেই এর পরিধি বাড়বে। এ ছাড়া ‘জন ধন যোজনা’র আওতায় সব গরিবের জন্য ব্যাংক হিসাব, ডেবিট কার্ড ও এক লাখ টাকা করে বিমা হবে। ‘ডিজিটাল ভারত’ গড়ার ওপরও জোর দিলেন। জানালেন, গান্ধীজির জন্মদিন থেকে দেশের প্রতি স্কুলে টয়লেট স্থাপনের কর্মসূচি নেওয়া হবে। যোজনা কমিশনের (পরিকল্পনা কমিশন) অবসান ঘটানোর কথাও তিনি ঘোষণা করেন। বলেন, যোজনা কমিশনের প্রয়োজন ফুরিয়েছে। সে জায়গায় নতুন সংস্থা হবে। লজ্জায় ফেলেছে ধর্ষণ: একের পর এক ধর্ষণ ভারতকে লজ্জায় ফেলেছে মন্তব্য করে মোদি অভিভাবকদের উদ্দেশ করে বলেন, ‘মেয়েসন্তানের ওপর দায় না চাপিয়ে আপনারা ছেলেদের সংশোধন করুন।’ প্রতিবেশীদের প্রতি: প্রতিবেশী দেশগুলোর ব্যাপারে তাঁর নীতি যে পূর্বসূরিদের চেয়ে আলাদা হবে, তার প্রমাণ মোদি এরই মধ্যে বারবার রেখেছেন। গতকালও তার ছোঁয়া পাওয়া গেল। পাকিস্তানের নাম না করে তিনি বলেন, ‘সংঘাতের রাস্তায় কেন? আমরা তো একযোগেই স্বাধীনতার লড়াই লড়েছি?’ উপমহাদেশ থেকে দারিদ্র্য দূর করতে প্রতিবেশী দেশগুলোকে হাতে হাত মিলিয়ে কাজে নামারও আহ্বান জানান মোদি। তিনি বলেন, ‘সার্কের সদস্য হিসেবে মানবজাতির কল্যাণে এটুকু অন্তত আমরা করতেই পারি।’

পাকিস্তানে ‘আজাদি মার্চে’ হামলা সরকারপন্থীদের, ব্যাপক সংঘর্ষ

ইমরান খান
পাকিস্তানে লাহোর থেকে রাজধানী ইসলামাবাদ অভিমুখী ইমরান খানের ‘আজাদি মার্চে’ গতকাল শুক্রবার হামলা চালিয়েছেন সরকার-সমর্থকেরা। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। ইমরানের অভিযোগ, তাঁর গাড়িবহর লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়েছে। তবে পুলিশ বলছে, কোনো গুলির ঘটনা ঘটেনি। তাৎক্ষণিকভাবে হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। খবর এএফপি, রয়টার্স ও জিয়ো টিভির। ইমরান খানের নেতৃত্বে তাঁর দল তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) নেতা-কর্মীরা সরকারের পদত্যাগের দাবিতে গত বৃহস্পতিবার পাঞ্জাবের লাহোর থেকে ইসলামাবাদ অভিমুখে আজাদি মার্চ শুরু করেন। গতকাল তাঁদের গাড়িবহর গুজরানওয়ালা শহরে পৌঁছালে সেখানে ক্ষমতাসীন দল পাকিস্তান মুসলিম লিগের (পিএমএল-এন) নেতা-কর্মীরা আজাদি মার্চে জুতা ও ইটপাটকেল ছুড়ে মারেন। ইমরান খান অভিযোগ করেছেন, তাঁর কর্মসূচিতে গুলি চালানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘সরকার-সমর্থকেরা পুলিশ ভ্যানের ওপর দাঁড়িয়ে আমাদের লক্ষ্য করে পাথর ছুড়েছে, গুলি চালিয়েছে।’ইমরানের মুখপাত্র আনিলা খান অভিযোগ করেন, সরকারপন্থীদের ছোড়া গুলি ইমরানের গাড়িতে লেগেছে। তবে পুলিশের একজন মুখপাত্র গুলির অভিযোগ নাকচ করে দেন। ঘটনাস্থলে থাকা বার্তা সংস্থা এএফপির এক আলোকচিত্রী জানান, তিনি গুলির মতো কোনো আওয়াজ শোনেননি। সর্বশেষ খবরে জানা যায়, ইমরান খান একটি বুলেটপ্রুফ গাড়িতে করে আলাদাভাবে ইসলামাবাদের পথে রওনা হয়েছেন। সরকারের পদত্যাগের দাবিতে লাহোর থেকে রাজধানী অভিমুখে ‘ইনকিলাব মার্চ’ নামে একই ধরনের মার্চ করছে আধ্যাত্মিক নেতা তাহির-উল কাদরির পাকিস্তান আওয়ামী তেহরিক (পিএটি) দল। আজাদি মার্চ ও ইনকিলাব মার্চকে কেন্দ্র করে দুই দিন ধরে রাজধানী ইসলামাবাদের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। গত সাধারণ নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন ইমরান ও কাদরি। ওই নির্বাচনে ক্ষমতায় আসা প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন করছেন এই দুই নেতা।

রবিন উইলিয়ামস পারকিনসনসে ভুগছিলেন

রবিন উইলিয়ামস
সদ্যপ্রয়াত অভিনেতা রবিন উইলিয়ামস মৃত্যুর কিছুদিন আগে পারকিনসনস রোগে ভুগছিলেন বলে জানিয়েছেন তাঁর স্ত্রী সুসান স্নেইডার। তবে এই রোগ প্রাথমিক অবস্থায় ছিল বলে জানান সুসান। খবর বিবিসির। সুসান বলেন, তাঁর স্বামী এই রোগ সম্পর্কে প্রকাশ্যে কিছু বলতে আগ্রহী ছিলেন না। তিনি বলেন, তাঁর স্বামী উদ্বেগ ও হতাশায় ভুগতেন।
গত সোমবার ৬৩ বছর বয়সী রবিন উইলিয়ামসের মরদেহ তাঁর বাড়ি থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। এক বিবৃতিতে সুসান বলেন, ‘তিন সন্তানের বাইরে তাঁর (রবিন উইলিয়ামস) সম্পদ ছিল অন্যদের আনন্দ ও বিনোদন দেওয়া। বিশেষ করে, যারা ব্যক্তিগত জীবনে কষ্টে আছেন তাদের।’ সুসান বলেন, তাঁর এই মনোভাব অটুট ছিল।

‘রাহুল দায়ী নন’

রাহুল গান্ধী
গত মে মাসে অনুষ্ঠিত ভারতের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের ভরাডুবির জন্য সহসভাপতি রাহুল গান্ধী দায়ী নন। দুই মাসের বেশি সময় ধরে নির্বাচনে দলটির অবস্থা পর্যালোচনার পর এ কে অ্যান্টনির নেতৃত্বাধীন কমিটি এ কথা ঘোষণা করেছে। নির্বাচনী প্রচারণা ও কলাকৌশলের প্রধান দায়িত্বে ছিলেন রাহুল।
সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও প্রভাবশালী সাংসদ এ কে অ্যান্টনি গতকাল শুক্রবার বলেন, নির্বাচনে কংগ্রেসের শোচনীয় পরাজয়ের জন্য কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী অথবা সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংও দায়ী নন। দলেই অভিযোগ উঠেছিল, নির্বাচনী প্রচারণায় কংগ্রেসের পিছিয়ে পড়ার জন্য রাহুলের ব্যর্থতা দায়ী। তবে কংগ্রেসের পরাজয়ের প্রকৃত কারণ ব্যাখ্যা করেননি অ্যান্টনি।

নওয়াজ পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আন্দোলন: ইমরান

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) প্রধান ইমরান খান। এই দাবিতে তিনি আজ শনিবার বিকেলে ইসলামাবাদে তাঁর সমর্থকদের নিয়ে অবস্থান কর্মসূচিতে বসবেন। পাকিস্তানের ডন অনলাইনের খবরে এ কথা জানানো হয়।
২০১৩ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত দেশটির সাধারণ নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলে তা বাতিল করে নতুন করে নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন ক্রিকেটার থেকে রাজনীতিক বনে যাওয়া ইমরান খান।
বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে জানানো হয়, ইমরান খান আজ সকালে রাজধানী ইসলামাবাদে পৌঁছে সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘জাতির সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে। প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আমি এখানে অবস্থান করব। কারচুপি করে ক্ষমতায় বসা প্রধানমন্ত্রীকে আমরা মেনে নেব না।’
ইমরান খানের নেতৃত্বে তাঁর দল পিটিআইয়ের নেতা-কর্মীরা সরকারের পদত্যাগের দাবিতে গত বৃহস্পতিবার পাঞ্জাবের লাহোর থেকে রাজধানী ইসলামাবাদ অভিমুখে ‘আজাদি মার্চ’ শুরু করেন। গতকাল শুক্রবার তাঁদের গাড়িবহর গুজরানওয়ালা শহরে পৌঁছালে সেখানে ক্ষমতাসীন দল পাকিস্তান মুসলিম লিগের (পিএমএল-এন) নেতা-কর্মীরা আজাদি মার্চে জুতা ও ইটপাটকেল ছুড়ে মারেন।

>>পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ইমরান খান। ছবিটি গতকাল শুক্রবার তোলা। ছবি: এএফপি
ইমরানের অভিযোগ, তাঁর গাড়িবহর লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়েছে। তবে পুলিশ বলছে, কোনো গুলির ঘটনা ঘটেনি। ঘটনাস্থলে থাকা বার্তা সংস্থা এএফপির এক আলোকচিত্রী জানান, তিনি গুলি ছোড়ার মতো কোনো শব্দ শোনেননি।

ত্বকী হত্যার অভিযোগপত্র অনিশ্চিত- আজমেরীসহ জড়িত ১১, ৯ জনই এখন বিদেশে by তানভীর সোহেল ও আসিফ হোসেন

নারায়ণগঞ্জে মেধাবী ছাত্র তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যার ঘটনায় জড়িত হিসেবে আজমেরী ওসমানসহ ১১ আসামির মধ্যে নয়জনই বিদেশে পালিয়ে গেছেন। একজন অন্য মামলায় কারাগারে আছেন। আরেকজন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী একটি বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন। র‌্যাবের তদন্ত দলের সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

র‌্যাবের সূত্র আরও বলছে, তদন্ত গুছিয়ে এনে তারা একটি খসড়া অভিযোগপত্রও তৈরি করেছে। তবে কবে নাগাদ অভিযোগপত্রটি চূড়ান্ত করে আদালতে জমা দেওয়া হবে, তা কেউই বলতে পারছে না। মামলার বাদীপক্ষের অভিযোগ, ওসমান পরিবার এই হত্যায় জড়িত থাকায় সরকারের উচ্চপর‌্যায় থেকে মামলাটির কার্যক্রম বন্ধ করে রাখা হয়েছে।
গত ৬ মার্চ ত্বকী হত্যার এক বছর পূর্ণ হওয়ার দিনে র‌্যাবের সহকারী মহাপরিচালক (এডিজি) জিয়াউল আহসান বলেছিলেন, শিগগিরই মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হবে। অবশ্য এরপর সাড়ে চার মাস পার হলেও অভিযোগপত্র দেওয়া হয়নি।
র‌্যাবের সূত্র জানায়, তদন্তে প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে ওসমান পরিবারের সদস্য আজমেরী ওসমানের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। আজমেরীর বাবা প্রয়াত সাংসদ নাসিম ওসমান। আর তার দুই চাচা হলেন বর্তমান সাংসদ শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমান।
তদন্তে পাওয়া তথ্যমতে, ত্বকী হত্যায় অংশ নেওয়া বাকি ১০ জন হলেন রাজীব, কালাম শিকদার, মামুন, অপু, কাজল, শিপন, জামশেদ হোসেন, ইউসুফ হোসেন ওরফে লিটন, সুলতান শওকত ওরফে ভ্রমর ও তায়েবউদ্দিন ওরফে জ্যাকি। র‌্যাব ও পুলিশের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এদের মধ্যে মাদক মামলায় লিটন কারাগারে আছেন। আর কালাম শিকদার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়েছিলেন। র‌্যাবের সূত্র জানিয়েছে, তিনি নিহত হয়েছেন এবং তাঁর লাশ গুম করা হয়েছে।
মামলার প্রধান আসামি আজমেরী ওসমান এখন কলকাতায় আছেন। এই হত্যা মামলায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়া একমাত্র আসামি সুলতান শওকত আছেন দুবাইয়ে। বাকি সাতজন বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে পালিয়ে আছেন বলে র‌্যাব ও পুলিশ জানতে পেরেছে।
অভিযুক্ত ১১ জনের মধ্যে প্রথম আলো ছয়জনের পরিবারের সদস্য ও দুজনের ঘনিষ্ঠজনের সঙ্গে কথা বলেছে। এর মধ্যে সাতজনের পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনেরা তাঁদের বিদেশে চলে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
জানতে চাইলে র‌্যাবের মহাপরিচালক মোকলেছুর রহমান বলেন, মামলার তদন্তে র‌্যাব অনেকটাই এগিয়েছে। কিছু কাজ বাকি আছে। সেগুলো শেষ করে অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘এটা ঠিক, কিছু সম্ভাব্য আসামি দেশের বাইরে পালিয়ে আছেন। অভিযোগপত্র দেওয়ার পর তাঁদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানো হবে।’
তবে পলাতকদের মধ্যে কালাম, শিপন, জামশেদ, লিটন, সুলতান শওকত ওরফে ভ্রমর ও তায়েবউদ্দিন ওরফে জ্যাকি বিভিন্ন সময়ে পুলিশের হাতে আটক বা গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। এদের মধ্যে শিপন ও জামশেদকে আটকের পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ভ্রমর ও ও জ্যাকি আদালত থেকে জামিন নিয়ে গোপনে দেশ ত্যাগ করেছেন। এর মধ্যে ভ্রমর গত মার্চে এবং জ্যাকি গত জুনে জামিন পান। র‌্যাব সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া যায়।
মামলার প্রধান আসামি আজমেরী গত ১ মে নারায়ণগঞ্জে এসেছিলেন। ওই দিন তিনি বাবা নাসিম ওসমানের জানাজায় ও দাফনে অংশ নেন। এরপর আবারও তিনি কলকাতায় পালিয়ে যান বলে তদন্তসংশ্লিষ্টরা নিশ্চিত হয়েছেন। হত্যার পর কিংবা বাবার মৃত্যুর পর কলকাতা থেকে দেশে ঢুকলেও তাঁকে গ্রেপ্তারে পুলিশ বা র‌্যাব কোনো উদ্যোগই নেয়নি।
র‌্যাবের তদন্ত নথিতে বলা হয়েছে, হত্যায় অভিযুক্ত ইউসুফ হোসেন সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত এবং আজমেরীর ঘনিষ্ঠজন। সুলতান শওকত নারায়ণগঞ্জ জেলা জাতীয় পার্টির সাবেক সভানেত্রীর ছেলে। অপরাধজগতে আজমেরীর ডান হাত বলে পরিচিত তিনি। অভিযুক্ত তায়েবউদ্দিনের পরিবারের সঙ্গে ওসমান পরিবারের রয়েছে পুরোনো সম্পর্ক। তাঁর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসেরও অভিযোগ আছে। অভিযুক্ত কালাম শিকদার আজমেরী ওসমানের অন্যতম ঘনিষ্ঠজন ও চাঁদাবাজ। আরেক অভিযুক্ত মামুন আজমেরী ওসমানের খালাতো বোনের জামাই। কাজলকে চাঁদাবাজ ও আজমেরীর অন্যতম ঘনিষ্ঠজন বলে বর্ণনা করা হয়েছে নথিতে। তাঁর ভাই স্থানীয় যুবলীগের একজন নেতা। অভিযুক্ত অপু আজমেরীর তথ্যদাতা। রাজীব ও শিপন আজমেরীর বেতনভুক্ত ক্যাডার। অভিযুক্ত জামশেদ আজমেরীর গাড়িচালক।
এই হত্যাকাণ্ডে শামীম ওসমানের ছেলে অয়ন ওসমানের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠলেও র‌্যাব দাবি করেছে, তারা তাঁর সম্পৃক্ততা পায়নি। অয়নের দুই সহযোগী সালেহ রহমান ওরফে সীমান্ত ও রিফাত বিন ওসমান বিষয়েও র‌্যাব একই কথা বলেছে। এই দুজন গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। এর মধ্যে সীমান্ত এখনো কারাগারে আছেন।
মামলার তদন্তের সঙ্গে যুক্ত র‌্যাবের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ত্বকীকে যারা হত্যা করেছে, তাদের এখন বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো খুবই কঠিন হবে। কেননা, মূল আসামিদের কেউই দেশে নেই। বিদেশ থেকে আসামিদের ফিরিয়ে এনে বিচার করা অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে প্রায় অসম্ভব।
মামলার বাদী ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি প্রথম আলোকে বলেন, তদন্তকারী সংস্থা খুনিদের চিহ্নিত করেছে। অভিযোগপত্র দেওয়ার সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন ছিল। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, হত্যায় ওসমান পরিবারের সদস্য আজমেরী ওসমান জড়িত থাকায় বিচার পাওয়াটা অনিশ্চিত হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘আমি জানি, একমাত্র প্রধানমন্ত্রী চাইলেই এই মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া সম্ভব হবে। নয়তো কোনো দিনই দেওয়া হবে না।’
মামলার সর্বশেষ অবস্থা জানতে চাইলে র‌্যাবের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অভিযোগপত্র দেওয়ার জন্য র‌্যাবের ওপর উচ্চ আদালত বা অন্য কোনো স্থান থেকে নির্দেশনা এলে অভিযোগপত্র দেওয়া সহজ হবে। তাঁরা অভিযোগপত্র প্রায় প্রস্তুত করে বসে আছেন।
তবে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান প্রথম আলোকে বলেন, স্পর্শকাতর এই মামলার অভিযোগপত্র শিগগিরই দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। তিনি বলেন, ‘হত্যায় অভিযুক্ত ব্যক্তিরা দেশে থাকুক আর দেশের বাইরে থাকুক, তাদের বিচার করা হবে।’
২০১৩ সালের ৬ মার্চ ত্বকীকে নারায়ণগঞ্জে নিজ বাসার কাছ থেকে অপহরণ করা হয়। ৮ মার্চ তার লাশ পাওয়া যায় শীতলক্ষ্যা নদীতে। উচ্চ আদালত র‌্যাবকে এই মামলার তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছেন।

ত্বকী হত্যার অভিযোগপত্র অনিশ্চিত- আজমেরীসহ জড়িত ১১, ৯ জনই এখন বিদেশে by তানভীর সোহেল ও আসিফ হোসেন

নারায়ণগঞ্জে মেধাবী ছাত্র তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যার ঘটনায় জড়িত হিসেবে আজমেরী ওসমানসহ ১১ আসামির মধ্যে নয়জনই বিদেশে পালিয়ে গেছেন। একজন অন্য মামলায় কারাগারে আছেন। আরেকজন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী একটি বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন। র‌্যাবের তদন্ত দলের সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

র‌্যাবের সূত্র আরও বলছে, তদন্ত গুছিয়ে এনে তারা একটি খসড়া অভিযোগপত্রও তৈরি করেছে। তবে কবে নাগাদ অভিযোগপত্রটি চূড়ান্ত করে আদালতে জমা দেওয়া হবে, তা কেউই বলতে পারছে না। মামলার বাদীপক্ষের অভিযোগ, ওসমান পরিবার এই হত্যায় জড়িত থাকায় সরকারের উচ্চপর‌্যায় থেকে মামলাটির কার্যক্রম বন্ধ করে রাখা হয়েছে।
গত ৬ মার্চ ত্বকী হত্যার এক বছর পূর্ণ হওয়ার দিনে র‌্যাবের সহকারী মহাপরিচালক (এডিজি) জিয়াউল আহসান বলেছিলেন, শিগগিরই মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হবে। অবশ্য এরপর সাড়ে চার মাস পার হলেও অভিযোগপত্র দেওয়া হয়নি।
র‌্যাবের সূত্র জানায়, তদন্তে প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে ওসমান পরিবারের সদস্য আজমেরী ওসমানের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। আজমেরীর বাবা প্রয়াত সাংসদ নাসিম ওসমান। আর তার দুই চাচা হলেন বর্তমান সাংসদ শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমান।
তদন্তে পাওয়া তথ্যমতে, ত্বকী হত্যায় অংশ নেওয়া বাকি ১০ জন হলেন রাজীব, কালাম শিকদার, মামুন, অপু, কাজল, শিপন, জামশেদ হোসেন, ইউসুফ হোসেন ওরফে লিটন, সুলতান শওকত ওরফে ভ্রমর ও তায়েবউদ্দিন ওরফে জ্যাকি। র‌্যাব ও পুলিশের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এদের মধ্যে মাদক মামলায় লিটন কারাগারে আছেন। আর কালাম শিকদার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়েছিলেন। র‌্যাবের সূত্র জানিয়েছে, তিনি নিহত হয়েছেন এবং তাঁর লাশ গুম করা হয়েছে।
মামলার প্রধান আসামি আজমেরী ওসমান এখন কলকাতায় আছেন। এই হত্যা মামলায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়া একমাত্র আসামি সুলতান শওকত আছেন দুবাইয়ে। বাকি সাতজন বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে পালিয়ে আছেন বলে র‌্যাব ও পুলিশ জানতে পেরেছে।
অভিযুক্ত ১১ জনের মধ্যে প্রথম আলো ছয়জনের পরিবারের সদস্য ও দুজনের ঘনিষ্ঠজনের সঙ্গে কথা বলেছে। এর মধ্যে সাতজনের পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনেরা তাঁদের বিদেশে চলে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
জানতে চাইলে র‌্যাবের মহাপরিচালক মোকলেছুর রহমান বলেন, মামলার তদন্তে র‌্যাব অনেকটাই এগিয়েছে। কিছু কাজ বাকি আছে। সেগুলো শেষ করে অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘এটা ঠিক, কিছু সম্ভাব্য আসামি দেশের বাইরে পালিয়ে আছেন। অভিযোগপত্র দেওয়ার পর তাঁদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানো হবে।’
তবে পলাতকদের মধ্যে কালাম, শিপন, জামশেদ, লিটন, সুলতান শওকত ওরফে ভ্রমর ও তায়েবউদ্দিন ওরফে জ্যাকি বিভিন্ন সময়ে পুলিশের হাতে আটক বা গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। এদের মধ্যে শিপন ও জামশেদকে আটকের পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ভ্রমর ও ও জ্যাকি আদালত থেকে জামিন নিয়ে গোপনে দেশ ত্যাগ করেছেন। এর মধ্যে ভ্রমর গত মার্চে এবং জ্যাকি গত জুনে জামিন পান। র‌্যাব সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া যায়।
মামলার প্রধান আসামি আজমেরী গত ১ মে নারায়ণগঞ্জে এসেছিলেন। ওই দিন তিনি বাবা নাসিম ওসমানের জানাজায় ও দাফনে অংশ নেন। এরপর আবারও তিনি কলকাতায় পালিয়ে যান বলে তদন্তসংশ্লিষ্টরা নিশ্চিত হয়েছেন। হত্যার পর কিংবা বাবার মৃত্যুর পর কলকাতা থেকে দেশে ঢুকলেও তাঁকে গ্রেপ্তারে পুলিশ বা র‌্যাব কোনো উদ্যোগই নেয়নি।
র‌্যাবের তদন্ত নথিতে বলা হয়েছে, হত্যায় অভিযুক্ত ইউসুফ হোসেন সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত এবং আজমেরীর ঘনিষ্ঠজন। সুলতান শওকত নারায়ণগঞ্জ জেলা জাতীয় পার্টির সাবেক সভানেত্রীর ছেলে। অপরাধজগতে আজমেরীর ডান হাত বলে পরিচিত তিনি। অভিযুক্ত তায়েবউদ্দিনের পরিবারের সঙ্গে ওসমান পরিবারের রয়েছে পুরোনো সম্পর্ক। তাঁর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসেরও অভিযোগ আছে। অভিযুক্ত কালাম শিকদার আজমেরী ওসমানের অন্যতম ঘনিষ্ঠজন ও চাঁদাবাজ। আরেক অভিযুক্ত মামুন আজমেরী ওসমানের খালাতো বোনের জামাই। কাজলকে চাঁদাবাজ ও আজমেরীর অন্যতম ঘনিষ্ঠজন বলে বর্ণনা করা হয়েছে নথিতে। তাঁর ভাই স্থানীয় যুবলীগের একজন নেতা। অভিযুক্ত অপু আজমেরীর তথ্যদাতা। রাজীব ও শিপন আজমেরীর বেতনভুক্ত ক্যাডার। অভিযুক্ত জামশেদ আজমেরীর গাড়িচালক।
এই হত্যাকাণ্ডে শামীম ওসমানের ছেলে অয়ন ওসমানের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠলেও র‌্যাব দাবি করেছে, তারা তাঁর সম্পৃক্ততা পায়নি। অয়নের দুই সহযোগী সালেহ রহমান ওরফে সীমান্ত ও রিফাত বিন ওসমান বিষয়েও র‌্যাব একই কথা বলেছে। এই দুজন গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। এর মধ্যে সীমান্ত এখনো কারাগারে আছেন।
মামলার তদন্তের সঙ্গে যুক্ত র‌্যাবের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ত্বকীকে যারা হত্যা করেছে, তাদের এখন বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো খুবই কঠিন হবে। কেননা, মূল আসামিদের কেউই দেশে নেই। বিদেশ থেকে আসামিদের ফিরিয়ে এনে বিচার করা অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে প্রায় অসম্ভব।
মামলার বাদী ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি প্রথম আলোকে বলেন, তদন্তকারী সংস্থা খুনিদের চিহ্নিত করেছে। অভিযোগপত্র দেওয়ার সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন ছিল। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, হত্যায় ওসমান পরিবারের সদস্য আজমেরী ওসমান জড়িত থাকায় বিচার পাওয়াটা অনিশ্চিত হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘আমি জানি, একমাত্র প্রধানমন্ত্রী চাইলেই এই মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া সম্ভব হবে। নয়তো কোনো দিনই দেওয়া হবে না।’
মামলার সর্বশেষ অবস্থা জানতে চাইলে র‌্যাবের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অভিযোগপত্র দেওয়ার জন্য র‌্যাবের ওপর উচ্চ আদালত বা অন্য কোনো স্থান থেকে নির্দেশনা এলে অভিযোগপত্র দেওয়া সহজ হবে। তাঁরা অভিযোগপত্র প্রায় প্রস্তুত করে বসে আছেন।
তবে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান প্রথম আলোকে বলেন, স্পর্শকাতর এই মামলার অভিযোগপত্র শিগগিরই দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। তিনি বলেন, ‘হত্যায় অভিযুক্ত ব্যক্তিরা দেশে থাকুক আর দেশের বাইরে থাকুক, তাদের বিচার করা হবে।’
২০১৩ সালের ৬ মার্চ ত্বকীকে নারায়ণগঞ্জে নিজ বাসার কাছ থেকে অপহরণ করা হয়। ৮ মার্চ তার লাশ পাওয়া যায় শীতলক্ষ্যা নদীতে। উচ্চ আদালত র‌্যাবকে এই মামলার তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছেন।

বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ এমপির সাথে একান্ত মুহুর্তে অধ্যক্ষ ড. লায়ন মো. সানাউল্লাহ


১৩ আগস্ট বুধবার ধানমন্ডি-৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধু ভবনের সামনের জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে আয়োজিত ‘ইতিহাস কথা কয়’ শীর্ষক আলোক চিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধনকালে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ও অধ্যক্ষ ড.সানাউল্লাহ্। আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ তিন দিনব্যাপী এ আলোক চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করে।

মার্চের ষড়যন্ত্র: ফারুক, চেসল ও কিসিঞ্জার by মিজানুর রহমান খান

শোকের মাস আগস্ট না হয়ে মার্চ হতে পারত। কারণ পঁচাত্তরের মার্চে বা তার আগেই কৃচক্রীরা অভ্যুত্থানের চেষ্টা করেছিল। অন্তত মার্কিন দলিলে তেমন ইঙ্গিত স্পষ্ট। পঁচাত্তরের ২২ মার্চ ঢাকা থেকে আরভিং চেসল আট পৃষ্ঠার এক গোপন তারবার্তায় সম্ভাব্য সামরিক অভ্যুত্থান নিয়ে আলোচনা করেন। এতে সম্ভাব্য একটি অভ্যুত্থানের খুঁটিনাটি ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সেনা, নৌ, বিমানবাহিনী, রক্ষীবাহিনী কার কী ভূমিকা হতে পারে, তা বিশ্লেষণ করেছেন চেসল। এমনকি ট্যাংকগুলোরও উল্লেখ করেছেন তিনি। এই কেব্ল আরও নির্দিষ্টভাবে এই প্রশ্ন সামনে এনেছে যে হেনরি কিসিঞ্জার মুজিবকে সতর্ক করার কথা জানতে চেয়েছেন, সেটি কে কবে কোথায় কখন কীভাবে করেছিল? সেই সতর্কীকরণের বয়ান সংবলিত নথি ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের উচিত প্রকাশ করা।
র–এর প্রধান আর এন কাও মুজিবকে অভ্যুত্থানকারীদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে পঁচাত্তরের মার্চে তাঁর এক বিশ্বস্ত সহচরকে পাঠিয়েছিলেন। আর এই মার্চেই চেসল লিখলেন, ‘আমাদের আরেকটি সন্দেহ হলো এমন সম্ভাবনা যে মুজিব তার নিজের বা ভারতীয় বা সোভিয়েত গোয়েন্দা সূত্রে ষড়যন্ত্র টের পেয়ে যেতে পারেন এবং তা ব্যর্থ করে দিতে পারেন। আমরা এটাও বাদ দিতে পারি না যে মুজিব হয়তো ষড়যন্ত্রকারীদের পরিচয় সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পেতে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারেন।’ চেসল এরপর আরও লিখলেন, ‘অপহরণ চেষ্টাকালে মুজিবকে যদি হত্যা করা হয়, তাহলে অভ্যুত্থানকারীরা প্রাথমিকভাবে বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়তে পারে।’ এই কেব্লটি লেখার ঠিক ৪৮ ঘণ্টা আগে যা ঘটল, তা–ও কি কাকতালীয়? আসুন আমরা ওই ট্যাংক সরবরাহকারী মিসর ঘুরে আসি।
নীল নদ বিধৌত মনোরম নগর আসওয়ান। হেনরি কিসিঞ্জারের মধ্যপ্রাচ্য ‘দৌড়ঝাঁপ কূটনীতি’র অন্যতম লীলাভূমি আনোয়ার সাদতের মিসর। ১৯৭৫ সালের মার্চ। এই কূটনীতির কারণেই কিসিঞ্জার আসওয়ানে এসেছেন।
১৯৭৫ সালের ২২ জানুয়ারি। সকাল ১০টা ২০। আরভিং চেসল ঢাকা থেকে পাঠানো ‘অভ্যুত্থানের গুজব’ শীর্ষক তারবার্তায় লিখেছিলেন, ‘সামরিক অভ্যুত্থান–সংক্রান্ত কিছু গুজব ইঙ্গিত দিচ্ছে যে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য মার্চ হলো সবচেয়ে অনুকূল সময়। দেশের সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে বাংলাদেশ সরকারের সামনে কোনো আশা নেই এবং কর্তৃত্ববাদের একটি বড় ডোজ গলাধঃকরণই এখন বঙ্গবন্ধুর জন্য অত্যন্ত লোভনীয় বিষয়।’
তবে মার্চ মাসটাই কেন ও কীভাবে সবচেয়ে অনুকূল মনে হলো, তার উত্তর আমরা ওই তারবার্তায় পাই না। তবে হেনরি কিসিঞ্জার নিয়ন্ত্রিত ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল নির্দিষ্টভাবে সিআইএ-কে সম্পৃক্ত করে মার্চেই একটি দলিল তৈরি করল। তার শিরোনাম হলো কিনা ‘সিআইএ এবং বাংলাদেশে একটি সম্ভাব্য অভ্যুত্থান’। যদিও এর দ্বারা সিআইএর সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে কোনো স্থির ধারণায় পেঁৗছা যায় না। ১৯৭১ সালটি শেষ হয়ে এলে কিসিঞ্জারের ক্ষমতা ও এখতিয়ারের আরও বিস্তৃতি ঘটেছিল।
তবে আজও এটা অজ্ঞাত যে আনোয়ার সাদত ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ-পাকিস্তানের রিকন্সিলিয়েশনে কীভাবে কী ভূমিকা রেখেছিলেন। বাংলাদেশিরা তাঁকে কেবল এক রেজিমেন্ট ট্যাংক (৩২টি) প্রদানের জন্য মনে রেখেছে। তোফায়েল আহমেদ আমাকে বলেছেন, ট্যাংক উপহার তাঁকে অবাক করেছিল। মিসরের সেই ট্যাংকে চেপে সৈয়দ ফারুক রহমান রক্তস্নাত অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ১৯৫ জন পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দীর যাতে বিচার না হতে পারে, সে জন্য হেনরি কিসিঞ্জার কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। পিকিংয়ে মাও সেতুংকে কিসিঞ্জার বলেছিলেন, বিষয়টি প্রয়োজনে তিনি মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির অংশে পরিণত করবেন। এ রকম প্রেক্ষাপটে সাদত ভুট্টোর পক্ষে মধ্যস্থতা করতে এগিয়ে এসেছিলেন। বাংলাদেশকে ট্যাংক প্রদান এবং ১৯৫ জন যুদ্ধবন্দীকে বিনা বিচারে ছাড়িয়ে নেওয়ার বিষয়টিও সাদত কাকতালীয়ভাবে এমন একটি প্রেক্ষাপটে করেছিলেন, যখন সবেমাত্র তিনি সোভিয়েতদের সঙ্গে তাঁর দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক সমাহিত করেছেন এবং হেনরি কিসিঞ্জারের সঙ্গে গোপন কূটনীতিতে জড়িয়ে পড়েছেন। সাদতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা কিসিঞ্জারের হোয়াইট হাউস ইয়ার্সে খুবই স্পষ্ট: ‘আমার সরকারি কর্মজীবনে সম্ভবত আনোয়ার সাদত ছাড়া চীনা প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাইয়ের সঙ্গেই আমার আলোচনা ছিল দীর্ঘ ও গভীরতর।’
‘অভ্যুত্থান ও সিআইএ’ শীর্ষক ওই নথি প্রস্তুত হয়েছিল ২০ মার্চ ১৯৭৫। বৃহস্পতিবার। রাত ১০টা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত তিনি সাদতের সঙ্গে বৈঠক করেন। ২১ মার্চ সকাল ১০টা ১০ মিনিটে কিসিঞ্জার আসওয়ান ত্যাগ করেন।
১৯৭৩ সালের ১৭ মার্চ দিল্লি থেকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মইনিহান কিসিঞ্জারকে জানিয়েছিলেন, মিসরীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী [মোহাম্মদ হাসান] আল জায়াত ৮ থেকে ১১ মার্চ ভারত সফর করেন। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (পশ্চিম এশিয়া উত্তর আমেরিকা বিভাগ) ও ভারতে মিসরীয় চার্জ পৃথকভাবে বলেছেন, ‘জায়েদ ২৩ মার্চ বাংলাদেশে যাবেন। সেখানে এখন তাঁদের ট্রেড মিশন আছে। মিসরীয় চার্জ বলেন, বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে ভারত বা বাংলাদেশ মিসরকে চাপ দিচ্ছে না। তবে মিসরীয় স্বীকৃতির সিদ্ধান্ত মিসর, সিরিয়া ও লিবিয়া একত্রে নেবে। ভারতীয় উপসচিব মনে করেন যে এ সিদ্ধান্ত নিতে মিসরকে তার অধিকতর রক্ষণশীল আর্থিক পৃষ্ঠপোষক সৌদি আরব ও লিবিয়া প্রভাবিত করবে।’
আমাদের অনুসন্ধানে ২০ মার্চ তারিখটি ইঙ্গিতবহ হয়ে ওঠে। কারণ, ঠিক এই দিনটিতেই ফারুক রহমান ঢাকায় জিয়াউর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। এর এক বছর আগেই ‘একজন ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তার নির্দেশে’ ফারুক মার্কিন দূতাবাসে গিয়েছিলেন। অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহান্স লিখেছেন, অনেক চেষ্টা–চরিত্র চালিয়ে ফারুক ১৯৭৫ সালের ২০ মার্চ জেনারেল জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে সক্ষম হন। দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা।
উল্লেখ্য, ফারুক যখন জেনারেল জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যান, তখন তিনি তৎকালীন অ্যাডজুটেন্ট জেনারেল কর্নেল মঈনকে জিয়ার বাসভবন ত্যাগ করতে দেখেন। প্রয়াত মেজর জেনারেল (অব.) মঈনুল হোসেন চৌধুরী এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য বইতে লিখেছেন, ‘পরদিন আমি অফিসে জেনারেল জিয়ার কাছে বিষয়টি তুলি। তিনি আমাকে বললেন, হ্যাঁ ফারুক এসেছিল। তিনি এভাবে জুনিয়র অফিসারদের তাঁর বাড়িতে আসা নিরুৎসাহিত করতে তাঁর ব্যক্তিগত সহকারীদের বলে দিয়েছেন।’ ম্যাসকারেনহান্স লিখেছেন, ‘জেনারেল জিয়া যদিও চক্রান্তকারীদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হননি। কিন্তু এটাও ঠিক যে তিনি ফারুককে গ্রেপ্তারও করেননি। উপরন্তু নিজেকে নিরাপদ রাখতে যখন তিনি পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, তখন তিনি চক্রান্তের দিকে চোখ বন্ধ করে রাখেন। ফারুকের বক্তব্য অনুযায়ী, জিয়া তাঁর এডিসিকে নির্দেশ দিয়েছিলেন ফারুক যাতে আর কখনো তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে না পারেন।’
ওই বার্তাটি যদি বাস্তবে আসওয়ানে না–ও পাঠানো হয়, তাহলেও সন্দেহাতীত ধারণা হয় যে ওই বার্তা আসওয়ানে পাঠাতে অন্তত একটা চিন্তাভাবনা ওয়াশিংটনে হয়েছিল। ‘সিআইএ এবং বাংলাদেশে একটি সম্ভাব্য অভ্যুত্থান’ হেনরি কিসিঞ্জারের মনোযোগ আকর্ষণ করার মতো একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। এবং সেই গুরুত্বের মাত্রা আমরা কিছুটা আন্দাজ করতে পারি যে দৃশ্যত গুজবনির্ভর একটা বার্তা সফররত কিসিঞ্জারের কাছে আসওয়ানে পাঠানো হয় কিংবা পরিকল্পনার মধ্যে আসে।
১৯৭৪ সালের ২২ আগস্ট ভারতে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল প্যাট্রিক মইনিহান বলেন, ‘ভারতীয় কর্মকর্তারা অন্তত স্বল্প মেয়াদে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত। শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ বিরোধী দল নেই। ভারতীয়রা যদিও বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীতে শৃঙ্খলা ও নৈতিকতার সমস্যা স্বীকার করেন, কিন্তু তাঁরা যুক্তি দেন যে সেখানে তিনটি উপদলের অস্তিত্ব রয়েছে। এবং সে কারণে সামরিক বাহিনীর পক্ষে ঐক্যবদ্ধ কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা অল্প।’
২০ মার্চের ওই দলিলের মূল মুদ্রিত বিষয়বস্তু পাইনি। এটি ‘ঢাকার মার্কিন দূতাবাস, সিআইএ, ভারত ও পাকিস্তানের মার্কিন দূতাবাসে পাঠানোর উল্লেখ দেখা যায়। এই দলিলটি ছাড়াও আরও চারটি তারবার্তা নির্দেশ করে যে ১৯৭৫ সালের মার্চে বাংলাদেশে একটি সম্ভাব্য অভ্যুত্থান বিষয়ে ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এবং ঢাকা ও দিল্লির মার্কিন দূতাবাসের মধ্যে বার্তা বিনিময় ঘটে। কিন্তু এই তারবার্তাগুলোর একটিরও মূল মুদ্রিত পাঠ পাওয়া যায়নি। যদিও চারটি তারবার্তারই শিরোনাম ‘অভ্যুত্থানের গুজব’। ১৯৭৫ সালের ২০ মার্চ থেকে ২৪ মার্চের মধ্যে প্রস্তুত চারটি পৃথক ইলেকট্রনিক তারবার্তার মধ্যে ওই তারবার্তাটির শিরোনামই কেবল ব্যতিক্রম। তবে প্রতিটি দলিলের অভিন্ন বৈশিষ্ট্য ও বিষয়বস্তু হচ্ছে, এগুলোর একটিও কনফিডেন্সিয়াল নয়, ‘সিক্রেট’। এর প্রতিটিতে মুজিবের ‘সরকার উৎখাত’ কথাটি রয়েছে। ২৪ মার্চের ইলেকট্রনিক তারবার্তাটির নম্বর ১৯৭৫নিউডিই০৩৯৮৮। সময়: বেলা একটা (সোমবার)। এটির মূল মুদ্রিত পাঠ্য ‘পাওয়া যায় না’ উল্লেখ আছে। এই তারবার্তার প্রেরক: দিল্লির মার্কিন দূতাবাস। প্রাপক: ঢাকার মার্কিন দূতাবাস। এটির একটি বৈশিষ্ট্য হলো, এর ট্যাগে ‘ইন্দিরা প্রিয়দির্শনী (নেহরু) গান্ধী। [গান্ধী, ইন্দিরা] কথাটি মুদ্রিত আছে।
পঞ্চাশের দশকে চেসল ইতিহাস ও পররাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়াতেন কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। ’৫৬ সালে গোয়েন্দা বিশেষজ্ঞ হিসেবে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে যোগ দিয়েছিলেন। ’৭২-৭৬ সালে ঢাকায় তিনি ডেপুটি চিফ অব মিশন ছিলেন। মার্কিন কংগ্রেস যদি একটি তদন্ত করত, তাহলে অনেক কিছুই জানা যেত। সেখানে নিশ্চয় কেনেডির মতো কোনো বাংলাদেশ বন্ধু, যিনি ফারুককে কিসিঞ্জারের দ্বারা রাজনৈতিক আশ্রয় মঞ্জুরের মুহূর্তে বিরোধিতা করেছিলেন, প্রশ্ন করতেন, মি. চেসল, ‘ভিত্তিহীন গুজবগুলোর’ ভিত্তি কী ছিল? চক্রান্তকারীদের সম্পর্কে আপনার কেন দরদ প্রকাশ পেল? কেন আপনি অভ্যুত্থানকারীদের সম্পর্কে লিখলেন, ‘তাঁরা ধৈর্য হারাচ্ছে। তা ছাড়া আরও বিলম্ব ঘটার জন্য ভয়ও পাচ্ছে। কারণ দেরি হলে তো ফাঁস হয়ে যেতে পারে। মুজিব যাতে ভারতপন্থী ও সোভিয়েতপন্থীদের সহায়তায় বাকশালকে সংহত করার সময় না পান, সে জন্য এখনই তাঁকে সরিয়ে দিতে হবে।’
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পদে শামীম ওসমানকে চাই by শাহদীন মালিক

দুঃখে কপাল চাপড়াচ্ছি। ১৩ আগস্ট চ্যানেল একাত্তরে প্রচারিত শামীম ওসমান-আইভী ‘টক শো’টা মিস করেছি। সকালে উঠে দেখি সংবাদমাধ্যম সরগরম।
দুঃখ আরেকটা, কিছু পুরোনো। মাস দুয়েক—হয়তো কিছু বেশি হয়েছে। এক টক–শোর জন্য বাসায় ক্যামেরা হাজির। অধমের বসার ঘর থেকে কিছু অংশ টক শোতে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। সামনে ক্যামেরা, কানে কিছু যন্ত্রপাতি লাগানো, যাতে স্টুডিওতে টক শোর অন্যান্য অংশগ্রহণকারীর কথা শোনা যায়। আমি অবশ্য দেখতে পারছি না অন্যদের। অনুষ্ঠান শুরুর দু-তিন মিনিট কিছু শুনতে পাইনি। বুঝতে পারিনি স্টুডিওতে অন্য কে কে অংশ নিচ্ছেন।
মাঝখান থেকে কানে লাগানো যন্ত্রে যখন কথাবার্তা শোনা শুরু হলো, ততক্ষণে অনুষ্ঠান চলছে। তিন-চার মিনিট লেগে গেল অনুধাবন করতে যে টক শোটিতে স্টুডিওতে আছেন খোদ শামীম ওসমান।
ওরে বাবা!
অধমের বাসায় চ্যানেলটির যে ক্যামেরাম্যান এবং আরও কর্মী এসেছিলেন, তাঁদের সঙ্গে সঙ্গে বলেছিলাম—বাবারে, আমি নাই। ফলে নিজের বাসাতেই ক্যামেরার সামনে থেকে দৌড়ে বাসার অন্য রুমে গিয়ে আশ্রয় নিলাম। পরে শুনেছি, অনুষ্ঠানটির সঞ্চালক নাকি বলেছিলেন যে অধম হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারছেন না।
আইভী সাহসী, অত্যন্ত সাহসী। অধমের মতো ভোঁ-দৌড় দেননি, নিজ বাসাতেই। দু-একটা চ্যানেল আছে, যারা খবরের নিরপেক্ষতার স্বার্থে বারবার শামীম ওসমানকে টক শোতে ডাকে। সব সময় আবার সবাইকে বলেও না যে মাননীয় সাংসদ অনুষ্ঠানটিতে থাকবেন। তাই রিস্ক এড়াতে ও রকম দু-একটা চ্যানেলের কোনো টক শোতেই যাই না। বলা তো যায় না, যদি তাঁর সামনে পড়ে যাই। আমি বরাবরই অত্যন্ত ভীতু প্রকৃতির।

২.
একাত্তর পুনঃপ্রচার করবে কি না জানি না, তবে ধারণা করছি ইউটিউবে সবাই দেখছে।
দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নাই। আছেন প্রতিমন্ত্রী। অতএব, পূর্ণ মন্ত্রী তো দরকার।
মন্ত্রীর পদত্যাগ চাইবার পরিবর্তে এবার অতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে করজোড়ে নিবেদন—মাননীয় সাংসদ শামীম ওসমানকে আপনার মন্ত্রিসভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পদে নিয়োগ দিয়ে আমাদের ধন্য করুন।
বলা বাহুল্য, কে ফুল মন্ত্রী, হাফ মন্ত্রী বা সিকি মন্ত্রী হবেন, সেটা অতি অবশ্যই অতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব ব্যাপার। তাই ধৃষ্টতার জন্য ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। তবে আমরা সুশীলরা যেহেতু সর্বক্ষণ মন্ত্রীদের পদত্যাগ চাওয়ার দোষে দুষ্ট, তাই সেই পাপের প্রায়শ্চিত্তের কারণেও এবার পদত্যাগের বদলে নিয়োগ চাইছি।
আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর খালি পদের জন্য শামীম ওসমান থেকে যোগ্যতর ব্যক্তি এখন আর কে-ই বা আছেন।
কারণ দর্শাই, আশা করি অতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মন গলবে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সংসদে ওসমান পরিবারকে বিপদে-আপদে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যা আমরা সবাই জানি। আওয়ামী লীগের জন্য ওসমান পরিবারের অবদান কিংবদন্তিপ্রায়। ষাটের দশকেরও বেশি সময় ধরে নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের ঝান্ডা উঁচিয়ে রেখেছে এই ওসমান পরিবার। আওয়ামী লীগের জন্য প্রয়োজনে ছল, বল, কৌশল—অর্থাৎ চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী, খুন, দখল, টেন্ডারবাজি সবই করতে হয়েছে এই পরিবারকে। প্রয়োজনে নির্বাচনে ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। আবার ভোটাররা ভোট না দিলেও ফলাফলে তাঁদের জয় ঠিকই হয়েছে। আওয়ামী লীগের মিটিং-সিটিংয়ে বাস-ট্রাক ভর্তি করে লোক জোগান দেওয়ার নির্ভেজাল ঐতিহ্য বহু দশকের।
দ্বিতীয় গুণ হলো, সারা দেশের লোক শামীম ওসমানকে এক নামে চেনে। প্রথম আলোর হার্ডকপি–সফটকপি মিলিয়ে প্রতিদিনের যে লাখ পঞ্চাশেক পাঠক, তাঁদের বেশির ভাগ শামীম ওসমানকে নিশ্চয় চেনেন আরও অনেক বেশি, প্রথম আলোয় বারবার তাঁর গুণকীর্তনের কারণে।
বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে বর্তমান মন্ত্রিসভার অর্ধশতাধিক মন্ত্রীর মধ্যে আধা ডজনের নামও বোধ হয় দেশের শতকরা ২০ ভাগ জনগণ বলতে পারবে না।
‘খবিশ’ বলা বা সভায় ঘুমিয়ে থাকা, স্থান-কাল না বুঝে যত্রতত্র ধূমপান করা ইত্যাদি কারণে এক সৈয়দ মন্ত্রীর নাম পুরোটা না হলেও আংশিক আমাদের মুখস্থ হয়ে গেছে। ধারণা করছি, মুরব্বি একজন ‘রাবিশ’ বলে যে খ্যাতি অর্জন করেছেন, তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণে ‘খবিশ’ বলে খ্যাতিমান হতে চাইছেন এই নতুন মন্ত্রী।
খাদ্যমন্ত্রীকে খাদ্য নিয়ে কথাবার্তা বলতে শুনিনি। তবে ‘খ’ অক্ষরটা নিশ্চয় তাঁর অতি প্রিয়। কারণ, তাঁর সব বক্তব্যের মূলেই ‘খ’ অর্থাৎ খালেদা জিয়া।
মোদ্দাকথা, শামীম ওসমান মন্ত্রী হলে আপনার পর অন্তত একজন মন্ত্রীর নাম দেশসুদ্ধ লোক অতি সহজেই মনে রাখতে পারবে। আপনার মন্ত্রিসভার খ্যাতি বৃদ্ধি হবে।
বিএনপির আন্দোলনের হুমকি-ধমকিতে ভীত হওয়ার কোনো কারণই নেই। তবু আগে থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা-পদক্ষেপ নেওয়া বিচক্ষণতার লক্ষণ। অথবা আগে থেকেই সাবধান হওয়া শ্রেয়।
বিএনপি যদি আসলেই আন্দোলনে নামতে পারে, তাহলে তাদের ঠেঙানোর জন্য শামীম ওসমানের চেয়ে যোগ্যতর ব্যক্তি সারা দেশে খুঁজে পাওয়া যাবে না। একসময় জয়নাল হাজারী, ইদানীং নিজাম হাজারী ইত্যাদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদের জন্য দরখাস্ত করতে পারতেন। কিন্তু ইদানীংকালের কীর্তিকলাপের আলোকে শামীম ওসমানের কাছে কেউ পাত্তাই পাবেন না।
অতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী! অধমের নিবেদনটা অন্তত মিনিট দুয়েক বিবেচনা করলেই অধমের যুক্তি উপেক্ষা করতে পারবেন না। শামীম ওসমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। কথাটা রটে গেলেই সব বিএনপি-জামায়াত নিমেষেই উধাও হয়ে যাবে। রাজপথ তো বহু দূর, কোনো ফুটপাতেও তাদের খুঁজে পাওয়া যাবে না।
আর কুল্লে একটা উদাহরণ টেনে শেষ করব। গতবার খালেদা জিয়ার বাড়ি ঘেরাও করতে চার-পাঁচটা ট্রাক লাগানো হয়েছিল। নচ্ছার সাংবাদিকেরা সেই চার-পাঁচটা ট্রাক টপকিয়ে বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে কথোপকথন করতে পেরেছিলেন। এখন শামীম ওসমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হলে নিমেষেই নারায়ণগঞ্জের অন্তত অর্ধেক বাস-ট্রাক দিয়ে বেগম খালেদা জিয়ার বাড়ি নয়, জামায়াত-বিএনপির যত অফিস, নেতাদের বাসা—সবই ঘিরে ফেলার জন্য একটা ওসমান পরিবারই যথেষ্ট।
শুরুতেই বলেছি, আইভী অনেক সাহসী। সাহসী বলেই বেশির ভাগ নারায়ণগঞ্জবাসী তাঁকে নেতা মানে। শামীম ওসমানের ধমকে-হুমকিতে তিনি কখনো ভীত হননি, হবেনও না। কিন্তু অধম এবং অধমের মতো অনেকেই হয়তো আইভীর মতো সাহসী না। তাই শামীম ওসমানকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বানালে ভয়ে আমরাও গর্তে ঢুকে যেতে পারি।
প্রধানমন্ত্রী! আপনি নিশ্চয় সমালোচকহীন দেশ চালাচ্ছেন। আপনার সেই উদ্দেশ্য সফল করতে শামীম ওসমান বড় বেশি সহায়ক হবে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নে আপনার প্রয়োজন শামীম ওসমানকে এবং তাঁর মতো আরও অনেক ওসমান। যুক্তির ফিরিস্তি দীর্ঘায়িত করব না। আগামী সপ্তাহে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে শামীম ওসমানের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে দাওয়াতের অপেক্ষায় রইলাম।
ড. শাহদীন মালিক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট; অধ্যাপক ও পরিচালক, স্কুল অব ল, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি।