Showing posts with label সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ. Show all posts
Showing posts with label সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ. Show all posts

Tuesday, December 10, 2024

আমলারাই এখন সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী

নাগরিক প্ল্যাটফরমের আহ্বায়ক ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, স্থানীয়ভাবে মানুষের এগোনোর জন্য কোনটি সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম- আমলা, রাজনীতিবিদ না ব্যবসায়ী? আমলারাই এখন সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী। সারা বাংলাদেশ ঘুরে আমরা সেটা পেয়েছি।

গতকাল রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে (বিআইসিসি) এক নাগরিক সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। ‘সুশাসনের জন্য জনকেন্দ্রিক সংস্কার: সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর আকাঙ্ক্ষা’- শীর্ষক এই নাগরিক সম্মেলন আয়োজন করে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে (বিআইসিসি) ৮ ও ৯ই ডিসেম্বর জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি), বাংলাদেশ এবং সুইস এজেন্সি ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কো-অপারেশনের (এসডিসি) সহযোগিতায় এ সম্মেলন আয়োজন করা হয়।

ড. দেবপ্রিয় বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী তথা আমলারা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। তবে তারা রাজনীতি ও ব্যবসায় জড়িয়ে যাচ্ছেন। আমলারা এখন নানা পরিচয়ে মানুষের সামনে হাজির হন, যা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের কাছে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন, কে বেশি ক্ষমতাধর- আমলা, রাজনীতিবিদ নাকি ব্যবসায়ী। এ প্রশ্নের জবাবে অংশগ্রহণকারীরা বলেন, ‘আমলারা’। এরপর তিনি বলেন, আমরা সারা বাংলাদেশ ঘুরে আলোচনা করেছি। সেসব আলোচনায় আমলাদের সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী হিসেবে বলা হয়েছে। আজকে যিনি আমলা, কাল তিনি রাজনীতিবিদ, পরের দিন ব্যবসায়ী। এটাই সমস্যা। উনারা বহুরূপে এখন আমাদের সামনে আসেন।

স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে একটি স্বাধীন কমিশন গঠনের পরামর্শ দিয়ে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, স্বাধীন স্থানীয় সরকার কমিশন হলে সাধারণ অজুহাতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বরখাস্তের সংস্কৃতি রোধ করা যায় এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বাজেট বরাদ্দ দেয়া যায়। সিপিডি’র এই সম্মানিত ফেলো রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী প্রতীক ব্যবহারের বিধান প্রত্যাহারের সুপারিশ করেন।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন দুদক সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. ইফতেখারুজ্জামান ও নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার। সিপিডি’র বিশেষ ফেলো রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক রওনক জাহানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন- সিপিডি’র বিশেষ ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান, ইউএনডিপি বাংলাদেশের ডেপুটি রেসিডেন্ট রিপ্রেজেন্টেটিভ সোনালি দয়ারত্নে প্রমুখ।

mzamin

Sunday, December 8, 2024

সংসদ সদস্যরা নিজ এলাকায় রীতিমতো জমিদার

সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ পর্যায়ে ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন ঘটেছে। সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ এলাকায় রীতিমতো জমিদার হয়ে যান। ফলে স্থানীয় সরকার অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। সেইসঙ্গে গত তিনটি নির্বাচন ছিল ত্রুটিপূর্ণ। সেই নির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা আবার কেবল রাবার স্ট্যাম্পের মতো কাজ করতেন। ফলে অবসরে তারা ব্যবসা-বাণিজ্যসহ বিভিন্ন কাজে সময় ব্যয় করেছেন বলে মন্তব্য করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান।

গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) উদ্যোগে আয়োজিত এবিসিডি সম্মেলনে অংশ নিয়ে রেহমান সোবহান এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিআইডিএসের মহাপরিচালক বিনায়ক সেন।
রেহমান সোবহান বলেন, বিগত সরকারের প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান ও গুণগত মান নিয়ে অনেক বিতর্ক থাকলেও সেই সময় দেশে দারিদ্র্য বিমোচনের গতি ভালো ছিল। দারিদ্র্যের বহুমুখী সূচকেও বাংলাদেশ ভালো করেছে। মানব উন্নয়নেও ভালো করেছে। শ্বেতপত্র কমিটির প্রতিবেদনে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। এ প্রতিবেদনেও দারিদ্র্য বিমোচনের বিষয়টি নিয়ে কেউ চ্যালেঞ্জ করেনি। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন উল্লেখযোগ্য। দারিদ্র্যের হার ৫৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশে নিয়ে আসা যেসব বিচারে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করি। পুষ্টিমান, শিশু মৃত্যু, পড়াশোনার সময়, পানের পানির প্রাপ্যতা, আবাসন- এসব ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য ও তাৎপর্যপূর্ণ অর্জন।

তিনি আরও বলেন, গবেষকদের কাজ হবে বাংলাদেশ প্যারাডক্সের নতুন রূপের সন্ধান করা। এতদিন সুশাসনের অভাবের মধ্যে কীভাবে প্রবৃদ্ধি হয়েছে, তা নিয়ে ছিল বিস্ময়। এখন দেখতে হবে, এ ধরনের অসম সমাজ ও অপশাসনের মধ্যে কীভাবে দারিদ্র্য বিমোচন ও মানবসম্পদ উন্নয়নে এতটা ভালো করল বাংলাদেশ। আমার বিশ্বাস, এ গবেষণা করতে গিয়ে অর্থনীতিবিদরা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বেন। দেশে বৈষম্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে কাঠামোগত সমস্যা আছে। যেভাবে ঋণখেলাপিরা সুবিধা পেয়েছেন, সরকারের এু জাতীয় নীতি দেশে অসমতা বৃদ্ধি করেছে।

অর্থনীতিবিদদের সমালোচনা করে রেহমান সোবহান বলেন, অসমতা পরিমাপের ক্ষেত্রে শুধু খানা আয়-ব্যয় জরিপের পরিসংখ্যান ব্যবহার করা হচ্ছে; এর বাইরে কেউ যাচ্ছে না। তার মত, এক্ষেত্রে আয়করের বিবরণী গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘খানা আয়-ব্যয় জরিপে শীর্ষ আয়ের মানুষের যে মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে, তা হলো- ১০ লাখ টাকার সম্পদ ও মাসিক ৩০ হাজার টাকা আয়। এ সম্পদ এবং আয় গুলশান ও বারিধারার বেশির ভাগ গাড়িচালকেরই আছে। তার মত, এ মানদণ্ড বিচার করা হলে আমাদের মতো অনেক মানুষই পরিসংখ্যান থেকে হারিয়ে যাবে।’ ফলে গবেষকরা যা করছেন, তা মূলত আলংকারিক ও ব্যক্তিগত পর্যায়ের বলে মনে করেন তিনি।

রেহমান সোবহান আরও বলেন, সমাজে বৈষম্য বাড়ছে। কিন্তু সেই বৈষম্যের চরিত্র যথাযথভাবে চিত্রিত করা হচ্ছে না। কোথায় কোথায় কোন খাতে বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে, তা নিরূপণ করা গেলে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব।

mzamin


Monday, November 25, 2024

দরিদ্র কমলেও বৈষম্য বেড়েছে

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) মনে করে, বাংলাদেশের দারিদ্র্য কমেছে। কিন্তু বৈষম্য বেড়েছে। দারিদ্র্যটা এমন অবস্থায় আছে যদি হঠাৎ করে একটা ধাক্কা আসে, তখন অনেক মানুষ আবার দরিদ্র হয়ে যাবে। সামাজিক নিরাপত্তায় অনেক দুর্বলতা আছে। ভাতা অনেকেই পায় না। আবার দীর্ঘদিন ধরে ভাতার পরিমাণ না বাড়ায় এর কার্যকারিতা হারাচ্ছে। কারণ দেশের আর্থিক সক্ষমতা খুব একটা ভালো না। ট্যাক্স জিডিপি রেশিও অনেক কম। রোববার রাজধানীর একটি হোটেলে ‘বাংলাদেশে ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকামের (ইউবিআই) কার্যকারিতা মূল্যায়ন’ শীর্ষক এক সেমিনারে এসব তুলে ধরে সিপিডি। সভাপতি হিসেবে অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন সিপিডি’র বিশেষ ফেলো এবং শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রধান ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। বক্তব্য রাখেন সিপিডি’র ট্রাস্টি বোর্ড চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান, বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও সিপিডি’র বিশেষ ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান, ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রহমান, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি উপস্থিত ছিলেন। এতে ইউবিআইয়ের কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সিপিডি’র জ্যেষ্ঠ গবেষক ড. তৌফিকুল ইসলাম খান।

উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও আয় বৈষম্যে সাধারণ জীবনযাপন বিঘ্নিত হচ্ছে দেশের বড় জনগোষ্ঠীর। কল্যাণ রাষ্ট্রের ভাবনা থেকে এসব মানুষের ন্যূনতম আয় নিশ্চিতের তাগিদ দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। এক্ষেত্রে কর্মসূচির ব্যাপ্তি অনুযায়ী বছরে ১৫ থেকে ৭৫ হাজার কোটি টাকা সরকারি নগদ সহায়তা দরকার। এমন কর্মসূচি বাস্তবায়নে দুর্নীতি, অপচয়রোধ করা গেলে দারিদ্র্যবিমোচন টেকসই হবে বলে মনে করেন বক্তারা।

সিপিডি’র গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, সবার জন্য ন্যূনতম জীবনমান নিশ্চিত করা যায় এজন্য ইউবিআই করা হয়। বাংলাদেশে এ ধরনের প্রোগ্রাম হাতে নেয়ার কী ধরনের সম্ভাবনা রয়েছে, তা এই গবেষণার উদ্দেশ্য। এই ইউবিআই শুধু উন্নত দেশেই নয়, নিম্ন মধ্য আয়ের দেশ এবং নিম্নআয়ের দেশেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে। সবাইকে ন্যূনতম আয় দেয়া হলে এটায় কোনো অসুবিধা নেই; কিন্তু এখানে বড় চিন্তার জায়গা হলো আর্থিক সক্ষমতা হবে কীভাবে।

বর্তমানে দেশে দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করে ২০ শতাংশের মতো মানুষ। এর বাইরে অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে আরও অনেকেই। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, দীর্ঘদিনের অপশাসনে বেড়েছে আয় বৈষম্য, নিত্যপণ্যের চড়া দামে নাজুক এসব নিম্নআয়ের মানুষের যাপিত জীবন।

আয় বৈষম্য কমিয়ে দারিদ্র্যের হার কমানো এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও উৎপাদন গতিশীল করতে সর্বজনীন ন্যূনতম আয় প্রস্তাব করেছে সিপিডি। প্রস্তাবে বলা হয়, জাতীয় পর্যায়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে এক কোটি ৪৭ লাখ ২৫ হাজার পরিবারের জন্য ৮০ হাজার ২১৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা দরকার হবে। এই অর্থ চলতি মূল্যে মোট জাতীয় উৎপাদন বা জিডিপি’র ১.৩৫ শতাংশ অর্থের সমান। এর ফলে দারিদ্র্য কমবে জাতীয় পর্যায়ে ৬.১৩ শতাংশ, দারিদ্র্যপীড়িত ৩৬ জেলায় ৩.৭২ শতাংশ, জলবায়ুর প্রভাবজনিত ৩৪ জেলায় ৩.০৭ শতাংশ এবং অতি দারিদ্র্যপীড়িত ১১ জেলায় ১.৪৬ শতাংশ।
সিপিডি’র গবেষণা বলছে, সারা দেশে প্রায় ৩৬ ভাগ পরিবার খেয়ে পরে বাঁচার লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়ছে। ন্যূনতম নিশ্চিত আয়ে পরিবারপ্রতি ৪ হাজার ৫৪০ টাকা মাসিক সহায়তা করতে সরকারি বাজেট বরাদ্দ দরকার ৭৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। অতি দরিদ্রপ্রবণ এলাকায় এমন কর্মসূচিতে খরচ হবে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা।

বক্তারা বলেন, গত ৫ই আগস্ট পরিবর্তনের মূল চেতনা ছিল দেশে বৈষম্যমুক্ত একটি কল্যাণমূলক সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলা। এখন আয় বৈষম্য কমানোর সময় এসেছে। তাই সর্বজনীন ন্যূনতম আয় একটি সময়োপযোগী প্রস্তাবনা। অন্তর্বর্তী সরকারের নীতি নির্ধারকরা এটি আগামী অর্থবছর থেকে বাস্তবায়ন করতে চাইলে আসছে জানুয়ারি থেকেই কাজ শুরু করতে পারেন।

ডিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রহমান বলেন, ইউবিআই যেসব দেশে আছে সেখানে ট্যাক্স টু জিডিপি রেশিও অন্তত ১০ শতাংশের বেশি। বাংলাদেশে উন্নতি হওয়ার পরে মাত্র ১.২ শতাংশ ট্যাক্স জিডিপি রেশিও বেড়েছে। এই রেশিও দিয়ে অর্থায়ন সম্ভব কিনা, সেটার পাশাপাশি অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ তো আছেই। তিনি বলেন, এটা যেহেতু প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাবে, এখানে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নেয়া জরুরি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এটার একটা রোডম্যাপ তৈরি করতে পারে।

কল্যাণ রাষ্ট্র বিনির্মাণে সার্বজনীন স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও দারিদ্র্যবিমোচনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন এই রাজনীতিবিদ। যেখানে বিতরণের দুর্বলতা এড়ানো সহজ। বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ১০ হাজার কোটি টাকার প্রজেক্ট ৩০ হাজার কোটি টাকার না করলে তো প্রবলেম হয় না। এটা তো আমরা দেখেছি বাংলাদেশে। আপনি যদি দেশের মানুষকে সার্ভিস দিতে পারেন সত্যিকার অর্থে, তখন আপনি ক্লেইম করতে পারবেন, ট্যাক্স কালেকশনটা আপনার জন্য তখন অনেক সহজ হয়ে যাবে।

জোনায়েদ সাকি বলেন, ২৪ লাখ মানুষ কর দেন অথচ ১ কোটিরও বেশি মানুষের ক্রেডিট কার্ড আছে। বিরাট একটা অংশের মানুষ কর দিচ্ছেন না, এটা বিবেচনায় আনতে হবে। তিনি বলেন, পাচার ও দুর্নীতি মোকাবিলা করতে পারবো কিনা, এটাই প্রধান সমস্যা। এটা মোকাবিলা করা গেলে ন্যূনতম মজুরি ও বাস্তবায়ন করা সম্ভব।

সিপিডি’র বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন যে সরকার গঠিত হয়েছে তাদের প্রতি মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষা বেশি। সরকারও মানুষের এ আশার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও সহনশীল। আমি এই মুহূর্তটাকে গণতন্ত্র এবং উন্নয়নের সন্ধিক্ষণ হিসেবে আখ্যায়িত করছি। এরকম সন্ধিক্ষণে আমাদের যত ধরনের স্বপ্ন, যত ধরনের আকাঙ্ক্ষা আছে সব তুলে ধরতে হবে। এটিই সঠিক সময়।

Sunday, November 17, 2024

রাষ্ট্রের মেরামত না হলে সংস্কার করে লাভ হবে না: ড. দেবপ্রিয়

বেরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ও অর্থনীতির শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রধান ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, রাষ্ট্রের মেরামত যদি না হয়, দুই পয়সার সংস্কার করে কোনও লাভ হবে না। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনা না গেলে, সংস্কারের পথে এগোনো সম্ভব নয়। শনিবার রাজধানীর মহাখালীতে ‘পলিসি ডায়ালগ অন ফিন্যান্সিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক রিফর্মস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এ মন্তব্য করেন। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি সৈয়দ ফরহাত আনোয়ারের সভাপতিত্বে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

দেবপ্রিয় বলেন, মাসোহারা দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরে লোক রাখা হয়েছিল। তারা টাকা ছাপিয়েছে, ভুয়া রিজার্ভ দেখিয়েছে। ব্যাংক চালানোর মতো যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও এমন ব্যক্তিকে ব্যাংকের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের দুটো কিডনি। একটি ফিন্যানসিয়াল সেক্টর, আরেকটি এনার্জি সেক্টর। দুটোই খেয়ে ফেলেছে বিগত সরকার। যারা এনার্জি সেক্টর খেয়েছে, তারাই আবার ফিন্যানসিয়াল সেক্টর খেয়েছে। আমরা মধ্যম আয়ের ফাঁদে পড়ে আছি। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনার পর, যদি দ্রুত সংস্কার না করা যায় তাহলেও এগোনো সম্ভাবনা হবে না বলেও মন্তব্য করেন সিপিডির এই বিশেষ ফেলো।

উন্নয়নের বয়ানের ব্যবস্থা করা না গেলে এগোনো সম্ভব নয় জানিয়ে দেবপ্রিয় বলেন, বিগত সরকারের আমলে প্রবৃদ্ধির তথ্য ও উপাত্তে মারাত্মক সমস্যা ছিল। তথ্যে রাজনীতিকীকরণ করা হয়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগ ছাড়া প্রবৃদ্ধি দেখানো হয়েছে, যেখানে ট্যাক্স জিডিপি বাড়েনি। ট্যাক্স নাই, বিনিয়োগ নাই আর দৃশ্যমান উন্নয়ন দেখাতে গিয়ে সামাজিক উন্নয়ন, স্বাস্থ্য শিক্ষায় গুরুতর অবমূল্যায়ন করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংককে ডিজিটালাইজ করতে হবে, অর্থনৈতিক লেনদেনে স্বচ্ছতা আনতে হবে উল্লেখ করে সেমিনারে এসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ লিমিটেডের (এবিবি) চেয়ারম্যান সেলিম আর এফ হোসাইন বলেন, সরাসরি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় অর্থনৈতিক সেক্টরে লুটপাট হয়েছে। যেখানে ব্যবসায়ী এবং রাজনীতিবিদরা জড়িত ছিলেন।

অর্থনৈতিক সংস্কার ছাড়া কোনো উপায় নেই উল্লেখ করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের কমিশনার ফারজানা লালারুখ বলেন, বিএসইসি মার্কেট রিফর্ম করতে চায়। বর্তমান মার্কেটকে উল্লেখযোগ্য জায়গায় নিয়ে যেতে কাজ করছি।

mzamin

Saturday, September 14, 2024

তাদের অবিচল লড়াই by মো. আল আমিন

সুজন, টিআইবি, সিপিডি, সিজিএস, মায়ের ডাকসহ নানা সংগঠন গণতন্ত্র, সুশাসন নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। কেউ কেউ দুর্নীতির বিরুদ্ধে ছিল উচ্চকণ্ঠ। এসব করতে গিয়ে তারা হয়েছেন নির্যাতিত। তারপরও হাল ছাড়েননি। চালিয়ে গেছেন লড়াই। বিশেষ করে গত ১৬ বছর তাদের লড়াই ছিল জনতার পক্ষে। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে। ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন নিয়ে কথা বলে গেছেন-

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন): দেশের সচেতন নাগরিকদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা সুজন। আওয়ামী স্বৈরশাসনামলে হুমকি, হামলা এবং চাপের  মুখেও নাগরিক ইস্যুতে সরব ভূমিকা রেখেছে সংগঠনটি। শেখ হাসিনা সরকারের দুঃশাসনের নানাচিত্র প্রতিনিয়ত তুলে ধরেছে নাগরিকের সামনে। এতে নানাবিধ সমস্যায় পড়তে হয়েছে সংগঠনটির। সুজনের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হলেন উন্নয়নকর্মী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, স্থানীয় সরকার ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. বদিউল আলম মজুমদার। বাংলাদেশের গণতন্ত্র, নির্বাচন, উন্নয়ন ও সুশাসন নিয়ে তিনি দেশের সুশীল সমাজের অন্যতম সরব কণ্ঠ। নাগরিক ইস্যুতে কথা বলার কারণে তিনি শেখ হাসিনা সরকারের বিরাগভাজন হয়েছেন। গোয়েন্দা সংস্থা থেকে হুমকি দেয়া, এনজিও ব্যুরো থেকে হয়রানি করা, তার প্রতিষ্ঠিত সংস্থা সুজন বন্ধ করে দেয়া, সংস্থার অনুদান বন্ধ করে দেয়া এবং ওয়েবসাইট হ্যাক করা, স্বজনদের হয়রানিসহ অনেক সমস্যায় পড়তে হয়েছে তাকে। কিন্তু এসব উপেক্ষা করেই সমাজের প্রয়োজনে কাজ করে গেছেন তিনি। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের এক মাস পর রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন গঠন করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন বদিউল আলম মজুমদার।

ওদিকে দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে কাজ করছে বেসরকারি সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। শেখ হাসিনা সরকারের দুর্নীতি ও দুঃশাসন নিয়ে তথ্য প্রকাশ করার ফলে সরকারের রোষানলে পড়তে হয় সংস্থাটির। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে প্রকাশিত টিআইবি’র প্রতিবেদনকে একপেশে, সরকারবিরোধী, অযৌক্তিক ও গোঁজামিলে ভরা বলে দাবি করে আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা বলেন, বিএনপি’র ভাষায় কথা বলে টিআইবি। বিএনপি’র ওকালতি করতেই এই রিপোর্ট। এ ছাড়া টিআইবি’র অন্য প্রতিবেদন নিয়েও কঠোর সমালোচনা করেছে সরকার। তবে সরকারের চাপের মধ্যেও নিরপেক্ষ তথ্য প্রকাশ করে গেছে সংস্থাটি। সর্বশেষ শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে সংস্থাটি। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর সরকারি দলের ছাত্রসংগঠন ও বহিরাগত সন্ত্রাসীদের হামলায় তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে টিআইবি। সেইসঙ্গে শিক্ষার্থীদের সকল দাবি মেনে নেয়ারও আহ্বান জানায় তারা। এদিকে টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্বে রয়েছেন ড. ইফতেখারুজ্জামান। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ডিবিতে আটক ছয় সমন্বয়কসহ অন্যদের নিঃশর্ত মুক্তি দেয়ার দাবিতে বিভিন্ন সভা-সেমিনার ও মানববন্ধনে অংশ নেন তিনি। তাকে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংস্কার কমিটির প্রধান হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)
: ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশি অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান দ্বারা প্রতিষ্ঠিত সংস্থাটি গবেষণা ও পলিসি ডায়ালগের মাধ্যমে দেশের নীতিনির্ধারণের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে। বিগত ১৬ বছর শেখ হাসিনা সরকারের শাসনামলে নিরপেক্ষ চরিত্র ধরে রেখেছে বেসরকারি এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি। অর্থনীতি ও গণতান্ত্রিক বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের নেয়া ভুল পদক্ষেপগুলো নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির সমালোচনা থেমে ছিল না। এতে সরকারের রোষানলে পড়তে হয় তাদের। আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ সিপিডি’র প্রতিবেদনকে নির্জলা মিথ্যাচার বলে আখ্যা দেন। সাবেক কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাকও সিপিডি’র বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে বলেন, একটি রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতায় আনতে জরিপ করে সিপিডি। এ ছাড়া খোদ শেখ হাসিনা সিপিডি’র নাম না করে তাদের প্রতিক্রিয়াকে ‘ভালো না লাগা’ পার্টি বলে আখ্যা দেন। বেসরকারি এই গবেষণা সংস্থাটির সম্মাননীয় ফেলো হলেন- বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ও অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশের অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র জানতে গত ২৮শে আগস্ট একটি শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি গঠন করেছে। এই কমিটির প্রধান করা হয়েছে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যকে এবং সদস্য হিসেবে রয়েছেন মোস্তাফিজুর রহমানও। এ ছাড়া সিপিডি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, জ্যেষ্ঠ গবেষক ও অর্থনীতিবিদ তৌফিকুল ইসলাম এবং গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। অর্থনীতি নিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের নেয়া পদক্ষেপগুলো নিয়ে সবসময় সমালোচনা করে এসেছে সংস্থাটির এই গবেষকরা।

বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে ২০১৪ সালে গঠিত হয় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। তবে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন কোটা সংস্কার ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে এই নেটওয়ার্কটি সবার দৃষ্টি কাড়ে। চব্বিশের জুলাইতে দ্বিতীয় কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এই প্ল্যাটফরমটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ১৪ই জুলাই একটি সংবাদ সম্মেলনে বিক্ষোভকারীদের সম্পর্কে হাসিনার অবমাননাকর মন্তব্যের পরে আন্দোলনটি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। পরের দিন, ছাত্রলীগের ও পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্মমভাবে হামলা চালায়, ফলে সারা দেশে ছয়জন শিক্ষার্থী নিহত হন। এর প্রতিক্রিয়ায়, ছাত্রলীগের সদস্যদের ছাত্রাবাস থেকে বহিষ্কার করা হয়, যার জেরে সরকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ করে দেয়। ১৬ই জুলাই রাতের মধ্যে, ছাত্রাবাসগুলো জোরপূর্বক খালি করা হয়েছিল। ১৭ই জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক ঢাবিতে শিক্ষকদের ওপর নিপীড়নের বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদ সভার আয়োজন করে। হত্যাকাণ্ড ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের নিন্দা জানিয়ে শত শত অধ্যাপক এতে যোগ দেন। এই প্রতিবাদ ছাত্র আন্দোলনকে আরও জোরদার ও নিপীড়ন মোকাবিলায় সহায়তা করে। বৈঠকের পর সংগঠনটির অধ্যাপকরা স্থানীয় থানা থেকে আটক ছাত্রদের উদ্ধার করেন এবং চিকিৎসা চলাকালীন শীর্ষ ছাত্র নেতাদের দ্বিতীয়বার আটক করার পরে কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করতে ২৭শে জুলাই গোয়েন্দা অফিসে যান। ৩১শে জুলাই, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এই সংগঠনের সদস্যরা একটি সমাবেশে ছাত্রদের গ্রেপ্তার করার জন্য সাদা পোশাকের পুলিশদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়, যার জেরে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়। ২রা আগস্ট দ্রোহযাত্রায় (বিদ্রোহীদের  কুচকাওয়াজ) অংশ নেন ইউটিএন’র  সদস্যরা। যেখানে সিনিয়র সদস্য আনু মুহাম্মদ কুচকাওয়াজের নেতৃত্ব দেন এবং হাসিনাকে পদত্যাগ করার আহ্বান জানান। প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংগঠনটি বিভিন্ন নাগরিক ইস্যুতে সরব ছিল।

মায়ের ডাক হলো আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের শাসনামলে সরকারি সংস্থা কর্তৃক বলপূর্বক গুমের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের প্ল্যাটফরম। গুমের শিকার ব্যক্তিদের ফিরিয়ে আনার দাবিতে গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে প্ল্যাটফরমটি। মায়ের ডাকের অন্যতম সমন্বয়ক হলেন সানজিদা ইসলাম তুলি। যিনি প্ল্যাটফরমটির প্রতিষ্ঠাতা। তার ভাই বিএনপি নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমনকে ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে ২০১৩ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস): বাংলাদেশভিত্তিক একটি থিঙ্ক ট্যাঙ্ক, যা সুশাসন, দুর্নীতি, মানবাধিকার, গণতন্ত্র এবং উন্নয়নের বিষয়ে গবেষণা ও মিডিয়া স্টাডি পরিচালনা করে। দ্রুত পরিবর্তনশীল জাতীয় ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সংগঠনটি ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশে ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন’ শীর্ষক এক আন্তর্জাতিক সংলাপের আয়োজন করে আলোচনায় আসে সিজিএস। বিশ্বের ৭০টি দেশের গবেষক, শিক্ষক, লেখক, সমরবিদ, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিকসহ বিভিন্ন পেশার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়ে এই সংলাপের আয়োজন করা হয়। চ্যানেল আই-এর টক শো তৃতীয় মাত্রার জনপ্রিয় সঞ্চালক জিল্লুর রহমান এই সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক। শেখ হাসিনা সরকারের শাসনামলে সিজিএসের উদ্যোগে বিদেশি রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারদের নিয়ে মিট দ্য অ্যাম্বাসেডর অনুষ্ঠান করেন জিল্লুর রহমান। ওই অনুষ্ঠানে আসা জাপানি রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য নিয়ে বেশ আলোচনা হয়। অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রদূত বলেন, আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভর্তির কথা আমিও শুনেছি। এতে অনেকটা বেকায়দায় পড়ে যায় আওয়ামী লীগ সরকার। এরপরই নানাভাবে হয়রানির শিকার হতে হয় জিল্লুর রহমান ও সিজিএসের কর্মকর্তাদের। তথ্য সংগ্রহের নামে জিল্লুর রহমানের পৈতৃক বাড়িতে যায় পুলিশ। এ ছাড়া জিল্লুর রহমানসহ সিজিএস সাবেক ও বর্তমান তিন কর্মকর্তাকে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সেখানে তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয় বিদেশ থেকে অর্থসহায়তা আসে কিনা, টাকা কীভাবে খরচ হয়। অন্যদিকে জিল্লুর রহমানের ব্যাংক হিসাবের তথ্য তলব করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা বিভাগ। এ সময় সিজিএসের ব্যাংক হিসাবের তথ্যও চাওয়া হয়। তারপরও সুশাসন, দুর্নীতি, মানবাধিকার, গণতন্ত্র এবং উন্নয়নের বিষয়ে সিজিএসের গবেষণা থেমে থাকেনি।

আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক): মানবাধিকার ও আইনি সহায়তা প্রদানকারী একটি বেসরকারি সংগঠন। গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটি মানবাধিকার সংরক্ষণ ও উন্নয়নে কর্মকৌশল দিয়ে আসছে। এই কর্মকৌশলগুলোর মধ্যে রয়েছে মানবাধিকার বিষয়ে সচেতনতা তৈরি, সালিশ ও মামলার মাধ্যমে আইনি সহায়তা প্রদান, মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও মানবাধিকার গবেষণা, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট মামলার সাহায্যে আইন ও নীতি সংস্কারের প্রয়াস এবং গণমাধ্যম ও নিজস্ব প্রকাশনার মাধ্যমে বিস্তারিত তথ্য প্রদান। বিগত ১৬ বছর আওয়ামী শাসনামলে বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার, বিচারের অপেক্ষায় কারাবাস, রাষ্ট্রীয় হেফাজতে মৃত্যু ও নির্যাতন, বস্তি উচ্ছেদ, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, মানবাধিকার রাজনৈতিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়া বিগত সরকারের নেয়া প্রহসনমূলক আইনগুলোর সমালোচনা করেছে তারা। এতে এনজিও ব্যুরো থেকে হয়রানির শিকারও হতে হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। বন্ধ করে দেয়া হয় বিদেশি অনুদানের অর্থছাড়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের চেয়ারপারসন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী এডভোকেট জেড আই খান পান্না।

ফোরাম ফর বাংলাদেশ স্টাডিজ (এফবিএস): বাংলাদেশ অধ্যয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত একাডেমিক, বিশ্লেষক এবং গবেষকদের প্ল্যাটফরম। এই ফোরাম ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বাংলাদেশ সংক্রান্ত সমসাময়িক বিষয়ের ওপর গবেষণা, মতামত এবং নীতি-নির্ধারণমূলক আলোচনার একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করে থাকে। এফবিএস গঠিত হয় ২০২২ সালে। এরপর থেকেই সুশাসন, অর্থনীতি, দুর্নীতি, মানবাধিকার, নির্বাচন ও সরকার ব্যবস্থা নিয়ে প্রতিনিয়ত ওয়েবিনারের আয়োজন করে আসছে প্ল্যাটফরমটি। ফোরাম ফর বাংলাদেশ স্টাডিজের ওয়েবিনারের আলোচক হিসেবে নিয়মিত মুখ হলেন-আটলান্টিক কাউন্সিলের অনাবাসিক সিনিয়র ফেলো এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর ড. আলী রীয়াজ, সুশাসনের জন্য নাগরিকের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন, স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. তোফায়েল আহমেদ, সাবেক সচিব আবু আলম মো. শহিদ খান, বিশিষ্ট সাংবাদিক মনির হায়দার, টেকসই উন্নয়ন বিষয়ক লেখক ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব, উন্নয়ন ও অর্থনীতি বিষয়ক গবেষক এবং জার্মান ফেডারেল শিক্ষা ও গবেষণা মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প গবেষক জিয়া হাসান, ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের রিসার্চ ফেলো মির্জা এম হাসান। এ ছাড়া দেশ-বিদেশের একাডেমিক, বিশ্লেষক এবং গবেষকরা অংশ নেন প্ল্যাটফরমটির ওয়েবিনারে।   
অধিকার বাংলাদেশভিত্তিক একটি মানবাধিকার সংস্থা। আদিলুর রহমান খান এবং সুশীল সমাজের অন্যান্য সদস্যরা ১৯৯৪ সালের ১০ই অক্টোবর অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন। শেখ হাসিনা সরকারের শাসনামলে হওয়া গুম-খুনের সঠিক তথ্য প্রকাশ করে হয়রানির শিকার হয় প্রতিষ্ঠানটির মানবাধিকার কর্মীরা। যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে শাহবাগে গণজাগরণ আন্দোলন শুরুর পর তার প্রতিক্রিয়ায় ২০১৩ সালের ৫ই মে হেফাজত সারা দেশ থেকে সংগঠনের কর্মী ও মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের ঢাকায় জড়ো করে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে অবস্থান নিয়েছিল। সরকারের বার বার আহ্বানেও তারা ওই স্থান না ছাড়ায় রাতে সমন্বিতভাবে অভিযান চালিয়ে তাদের সরিয়ে দেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সেই অভিযানে ৬১ জন নিহত হন বলে পরে অধিকার তাদের এক প্রতিবেদনে দাবি করে। যদিও পুলিশের দাবি, রাতের অভিযানে কেউ মারা যাননি। অধিকারের প্রতিবেদনে প্রকাশিত সংখ্যাটি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হলে গ্রেপ্তার করা হয় অধিকারের সম্পাদক আদিলুর রহমান খানকে। সংগঠনটির পরিচালক নাসির উদ্দিন এলান আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন নেন। তদন্ত শেষে ওই বছরের ৪ঠা সেপ্টেম্বর ঢাকার আদালতে আদিলুর ও এলানের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেয় পুলিশ। ২০১৪ সালে তাদের বিচার শুরু হয়। ৯ বছর পর ২০২৩ সালের ১৪ই সেপ্টেম্বর ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনাল তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় এই দুইজনকে দুই বছর কারাদণ্ড দেয়। এদিকে মানবাধিকার ইস্যুতে কাজ করার জন্য ২০২২ সালে অধিকারের নিবন্ধন বাতিল করে দেয় সরকার।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা): বাংলাদেশের অন্যতম একটি বেসরকারি আইনজীবী সংগঠন, যা পরিবেশ সংরক্ষণে আইনি সহায়তার প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯৩ সাল থেকে বেলার প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আইনজীবী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। সংস্থাটির হয়ে তিনি পরিবেশের ক্ষতিসাধনকারী নানা চক্র আর ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে আসছেন। শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী সহিংসতায় প্রাণহানির পাশাপাশি মিথ্যা মামলা ও নির্বিচারে গ্রেপ্তারের ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে তীব্র প্রতিবাদ করেন তিনি। অংশ নেন বিভিন্ন সভা-সেমিনার ও মানববন্ধনে। বর্তমানে তিনি মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টার দায়িত্ব পেয়েছেন।

Monday, August 19, 2024

উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কিনতে বছরে ক্ষতি ৪৫ হাজার কোটি টাকা: সিপিডি

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) মনে করে, উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কেনার কারণে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)

বছরে ৪৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে এবং বেসরকারি কোম্পানির কাছে বকেয়া বিল রয়েছে ৪৫ হাজার কোটি টাকা। সেই সঙ্গে বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদকদের সঙ্গে চুক্তির আওতায় ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধে প্রতিবছর ৩৭ হাজার ৯৩ কোটি টাকার বাড়তি বোঝা টানতে হচ্ছে বিপিডিবিকে। গতকাল ধানমণ্ডির সিপিডি কার্যালয়ে ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংস্কার সিপিডি’র প্রস্তাবনা’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এসব তথ্য তুলে ধরেন।

এতে দ্রুত বিদ্যুৎ ক্রয়ের বিশেষ আইন বাতিলসহ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত সংস্কারে ১৭টি প্রস্তাব দিয়েছে সিপিডি। যেগুলো বাস্তবায়ন জরুরি। অন্তর্বর্তী সরকারকে এগুলো বাস্তবায়নের কাজ অব্যাহত রাখতে হবে। চলমান প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নসহ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে অন্তর্বর্তী সরকারকে ১০০ দিনের বিশেষ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের তাগিদ দিয়েছে সংস্থাটি। সংবাদ সম্মেলনে কুইক ইনহ্যান্সমেন্ট অব ইলেক্ট্রিসিটি অ্যান্ড পাওয়ার সাপ্লাই অ্যাক্ট, ইন্টিগ্রেটেড এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার মাস্টার প্ল্যান (আইইএমপি), ন্যাশনাল এনার্জি পলিসি ও রিনিওয়েবল এনার্জি পলিসি সংস্কারের জোর দাবি জানায় সিপিডি।

গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারকে প্রথমে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বড় ধরনের সংস্কারে মনোনিবেশ করতে হবে। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে জবাবদিহিতা বাড়াতে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)কে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। বৈষম্য দূরীকরণ এবং ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে এই সংস্কারের অংশ হিসেবে প্রথমে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বিশেষ আইন ২০১০ বাতিল করতে হবে। তৃতীয় পদক্ষেপ হতে হবে, যেসব কোম্পানি বিদ্যুৎ কেনার চুক্তির জন্য অযাচিতভাবে নির্বাচিত হয়েছে, তাদের সঙ্গে লেটার অব ইনটেন্ট (এলওআই) বাতিল করতে হবে।

এ খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে পরিবর্তন আনার কথাও জানান তিনি। টেকসই জ্বালানি রূপান্তরে জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারে জোর দিতে হবে।

তিনি বলেন, ২০৪১ সালে বিদ্যুতের চাহিদা হতে পারে ২৭ হাজার মেগাওয়াট, রিজার্ভ মার্জিনসহ ৩৫ হাজার মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকতে পারে। কিন্তু বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনায় ৫৮ হাজার মেগাওয়াট ধরা হয়েছে লক্ষ্যমাত্রা, যা অযৌক্তিক। এই অতিরিক্ত লক্ষ্যমাত্রার সুযোগ নিয়ে বেসরকারি খাত এলএনজি, কয়লা আমদানির মতো অবকাঠামো তৈরির চাপ দিতে পারে। তাই এটার সংশোধন দরকার বলে আমরা মনে করছি।

নিবন্ধে বলা হয়, বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান সংস্কার করা দরকার। এর মধ্যে আছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা), বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি), বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি), বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। বিইআরসি’র ক্ষমতা খর্ব করা হয়েছে ধীরে ধীরে। আইন সংশোধন করে কমিশনকে আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনতে হবে। এটিকে যুগোপযোগী করে ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা দরকার। বিপিসি ও পিডিবি থেকে নিয়মিত তথ্য পাওয়া যায় না। তথ্য নিয়মিত ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে। বিপিসি’র স্বয়ংক্রিয় দাম নির্ধারণ প্রক্রিয়া ত্রুটিযুক্ত। এখানে মুনাফা দেখা হয়েছে, ভোক্তাস্বার্থ দেখা হয়নি। গত পাঁচ বছরে বিপিসি ও পিডিবি’র বার্ষিক প্রতিবেদন আন্তর্জাতিক সংস্থা দিয়ে পুনর্মূল্যায়ন করা জরুরি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গত কয়েক বছরের আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষা করা জরুরি। তবে এর দায়িত্ব দেশের কোনো অডিট ফার্মকে না দিয়ে আন্তর্জাতিক অডিট ফার্মকে দিয়ে প্রতিবেদন তৈরি হলে স্বচ্ছতা বজায় থাকবে বলে মনে করে সংস্থাটি।

সংস্কারের ক্ষেত্রে তিনটি ধাপে ছয় মাস, এক বছর ও তিন বছরের রূপরেখা তৈরি করতে পারে অন্তর্বর্তী সরকার। দ্রুত সংস্কারের বিষয়গুলো এ সময়ের মধ্যে রাখা যেতে পারে। এ ছাড়া স্বাধীন কমিটি গঠন করে বিদ্যুৎ খাতে ভুতুড়ে বিল তদন্ত করতে হবে প্রথম ছয় মাসেই। ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ খাতে নো ইলেক্ট্রিসিটি, নো পে অনুযায়ী, চুক্তি সংশোধন করলে, ভর্তুকির চাপ কমবে। গ্রাহককে বাড়তি দাম দিতে হবে না বলেও আমরা মনে করছি। তিনি বলেন, দুর্নীতির চেয়েও বেশি ক্ষতি করেছে বিভিন্ন নীতি। দেড় থেকে দুই গুণ বেশি চাহিদা হিসাব করে প্রক্ষেপণ তৈরি করা হয়েছে। এমন নীতি তৈরিই করা হয়েছে একটা গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে।

সিপিডি বলছে, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসতে পারে। কোনো আন্তর্জাতিক চাপে যেন আবার দেশি কয়লা উত্তোলনে জোর দেয়া না হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতা নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে। তবে এটা যেন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিভিত্তিক না হয়। সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানে তারা আসতে পারে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়নে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সহযোগিতার নতুন দিগন্ত সূচনা হতে পারে। ভারতের সঙ্গে সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। রাশিয়ার সঙ্গে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চলমান থাকবে। চীনের সঙ্গে কাজের ক্ষেত্রে কোনো জটিলতা তৈরি হবে না। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এএফবি’র মতো বৈশ্বিক আর্থিক সংস্থার সঙ্গে ব্যাপক অংশীদারিত্ব তৈরি হতে পারে।

তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধের দাবি জানিয়েছে সিপিডি। একই সঙ্গে নতুন করে রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তির মেয়াদ না বাড়ানোরও আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘আমাদেরকে এলএনজি ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বের হয়ে এসে নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রের দিকে অগ্রসর হতে হবে। এডিপিতে এলএনজি সংশ্লিষ্ট যেসব প্রকল্প রয়েছে সেগুলোর বিষয়ে পুনর্বিবেচনা করতে হবে।’

Tuesday, August 13, 2024

১৫ বছরে ব্যাংক খাতে ৯২ হাজার কোটি টাকা লুট

২০০৮ থেকে ২০২৩ এই ১৫ বছরে ২৪টি বড় ব্যাংক কেলেঙ্কারিতে প্রায় ৯২ হাজার ২৬১ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। আত্মসাৎ করা অর্থের পরিমাণ ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের ১২ শতাংশ বা জিডিপি’র দুই শতাংশের সমান। অন্যদিকে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮২ হাজার ২৯৫ কোটি টাকায়।

সোমবার রাজধানীর ধানমণ্ডির কার্যালয়ে ‘ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনতে করণীয়’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে সিপিডি নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন এসব তথ্য জানান। এ সময় সিপিডি’র বিশেষ ফেলো প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমান ও গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম উপস্থিত ছিলেন।

সিপিডি জানায়, গত ১৫ বছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরসহ প্রশাসনিক দায়িত্বপ্রাপ্তরা বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দেয়ার জন্য অনেক নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়েছেন। যার ফলে একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়েছে। এর সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির দাবি জানিয়েছে সিপিডি।
সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রশাসনিক দায়িত্ব যারা পালন করেছেন অর্থাৎ গত ১৫ বছরে গভর্নর যারা ছিলেন তারা যেসব নীতিমালা নিয়েছেন, ওইগুলো ব্যাংকিং নর্মসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তারা বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দেয়ার জন্য অনেক নিয়মে ব্যত্যয় ঘটিয়েছেন। যার ফলে বিশেষ গোষ্ঠীকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়েছে। এর প্রতিটি কেইস তদন্ত হওয়া উচিত। এর সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন তাদের শাস্তির আওতায় আনা প্রয়োজন। তিনি বলেন, খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েই চলছে।

২০০৯ সালে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত যার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮২ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি নিয়ে এখনো তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ করার জন্য সিআইডি ৭৯ বার সময় নিয়েছে। নতুন সময় ৪ঠা সেপ্টেম্বর। ভবিষ্যতে দেখা যাবে। আমরা চাই ওই তদন্ত প্রতিবেদন উন্মুক্ত করে দেয়া হোক।
সিপিডি নির্বাহী পরিচালক বলেন, বার বার পুনঃতফসিল করার কারণে ঋণখেলাপির পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে, এটা বন্ধ করতে হবে। ২০১২ সালের হলমার্কের ঋণ কেলেঙ্কারিতে দেখেছিলাম অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা দুর্বল ছিল, এখনো বিভিন্ন ব্যাংকে তা রয়ে গেছে। ২০২১ সালের তথ্যানুসারে ১১টি ব্যাংকের তথ্য-উপাত্ত গবেষণা করে বলেছিলাম শক্তিশালী প্রশাসক নিয়োগের সুপারিশ করছি। অনেকগুলো মৃতপ্রায়। এগুলো বেঁচে থাকার কথা নয়। ওইগুলো বন্ধ করা উচিত। যেগুলো দুর্বল রয়েছে, সেগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন করে যথাযথভাবে ঠিক করতে হবে। তা না হলে সক্রিয় করা সম্ভব নয়।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, অনেক আর্থিক মামলা আদালতে পড়ে আছে। ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আর্থিক আদালতে মামলার সংখ্যা ৭২ হাজার ৫০০টি। টাকার পরিমাণ ১ লাখ ৭৮ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা। ২০০৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই করে আর্থিক কেলেঙ্কারি খুঁজে বের করা প্রয়োজন। আমাদের গবেষণায় দেখিয়েছিলাম ২৪টি আর্থিক কেলেঙ্কারি হয়েছে, যার পরিমাণ ৯২ হাজার ২৬১ কোটি টাকা।

ব্যাংকগুলো মার্জ হওয়ার পূর্বশর্ত হলো অডিট করে ফাইনান্সিয়াল অবস্থা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করে দেখা। পরিচালনা পর্ষদের সদস্য নেয়ার ক্ষেত্রে কিছু ক্যাটাগরি ঠিক করে দিতে হবে। ২০০৯ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সরকার ১৫ হাজার ৭০৫ কোটি টাকা দুর্বল ব্যাংকগুলোকে পুঁজি হিসেবে দেয়া হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ে আর্থিক বিভাগ বাতিলের দাবি জানিয়ে সিপিডি বলছে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক বিভাগ অর্থাৎ এফআইডি রয়েছে। যার ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক স্বাধীনভাবে তার কার্যক্রম করতে পারে না। এটা সৃষ্টি করার প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো ব্যাংকিং সেক্টরকে প্রভাবিত করা। আমরা মনে করি অন্যায়ভাবে ঋণ কিংবা ভুল সিদ্ধান্ত যেগুলো নেয়া হয়েছে, তার একটি তদন্ত হওয়া উচিত। আমাদের সুপারিশ এফআইডি বন্ধ করে দেয়া উচিত, এই বিভাগের কোনো প্রয়োজন নেই।

সিপিডি বলছে, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে, বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা সমুন্নত রাখতে হবে এবং সময়মতো তথ্যের সততা ও সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। সিপিডি ব্যাংক খাতের স্বচ্ছতা আনতে একটি সুনির্দিষ্ট, সময় উপযোগী, স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্বাধীন ব্যাংকিং কমিশন গঠনের সুপারিশ করেছে। তারা বলছে, এই সংস্কার অবশ্যই রাজনৈতিকভাবে হতে হবে, কারণ স্বার্থান্বেষী মহল এতে বাধা তৈরি করবে। বেশ কয়েকটি ব্যাংকের অবস্থা সংকটজনক হলেও বেইলআউটের মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে উল্লেখ করে সিপিডি বলেছে, ধসের দ্বারপ্রান্তে থাকা ব্যাংকগুলোকে বন্ধ করে দিতে হবে।

সিপিডি জানায়, কিছু ব্যাংক মৃতপ্রায়, আর অনেক ব্যাংক ‘ক্লিনিক্যালি ডেথ’ হয়েছে। তবে মৃতপ্রায় ব্যাংকগুলোকে ফের একবার সচল করার চেষ্টা করা যেতে পারে বলেও সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। এসব ব্যাংক আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। স্বাভাবিকভাবে এদের মরে যেতে দেয়া দরকার। সরকার এসব ব্যাংকগুলোকে অর্থ দিয়ে, মূলধন দিয়ে পুনর্ভরণ করে চালাচ্ছে। তৃতীয় ও চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকগুলো ক্লিনিক্যালি ডেথ হয়ে গেছে। এক সময়ে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশে ভালো ব্যাংক ছিল। এটিকে দখলের পরে মুমূর্ষু হয়ে গেছে।

ব্যাংকিং খাতের সমস্যা চিহ্নিত ও সমাধানে তিন মাসের জন্য জন্য ব্যাংকিং কমিশন গঠন করার সুপারিশ করে সিপিডি বলেছে, ব্যাংক খাতে দ্বৈত প্রশাসন কমাতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বন্ধ করতে হবে। এ বিভাগের জন্য সরকারি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে নেই।
ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা খর্ব করা, নিয়মনীতি না মেনে বেসরকারি ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়াকে ব্যাংকখাতের মূল সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে সিপিডি।

সিপিডি’র বিশেষ ফেলো প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ছাত্রদের আন্দোলনে আমাদের নৈতিক সমর্থন ছিল। ছাত্রদের মুক্তির মিছিলে আমরা ছিলাম। যারা আত্মত্যাগ করেছে তাদের কাছে আমাদের এগুলো কিছুই না। আর্থিকখাতে দুর্নীতির শ্বেতপত্র তৈরি করতে হবে। ব্যাংকখাতে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংকিং খাতের দুষ্টু চক্র ভেঙে ফেলতে হলে ব্যাংক কমিশন গঠন করা প্রয়োজন।

সিপিডি’র গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ব্যাংকখাতের চ্যালেঞ্জগুলো আর্থিক খাতেও প্রযোজ্য। বাংলাদেশের পুঁজিবাজার অসুস্থ ও বিকলাঙ্গ। একইভাবে বীমা খাতও অগ্রহণযোগ্য অবস্থায় আছে। আর্থিক খাতে সুশাসনের জন্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক খাতগুলো বন্ধ করতে হবে।

Monday, September 9, 2019

চীনের বিআরআইএ লাভবান হবে বাংলাদেশ, তবে...

সঠিক পদক্ষেপ নিলে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড কার্যক্রমের সুফল পেতে পারে বাংলাদেশ। তবে, প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বাংলাদেশ যেন চীনা ঋণের ফাঁদে না পড়ে, সে বিষয়েও খেয়াল রাখতে হবে। প্রকল্প বাছাই ও বাস্তবায়ন, বিনিয়োগ, ঋণের শর্ত- এসব বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার। পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন রয়েছে। রোববার রাজধানীর একটি হোটেলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড: তুলনামূলক অবস্থান থেকে বাংলাদেশের অবস্থান’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। সিপিডির চেয়ারম্যান  অধ্যাপক রেহমান সোবহানের সভাপত্বিতে বক্তব্য রাখেন শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন, পররাষ্ট্র সচিব এম শহীদুল হক, সিপিডির বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, চীনে নবনিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাহবুব উজ জামান, চীনের ইউনান অ্যাকাডেমি অব সোশ্যাল সায়েন্স ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের অধ্যাপক চেং মিন, ভারতের রির্সাচ অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম ফর ডেভেলপিং কান্ট্রিসের মহাপরিচালক ড. শচীন চতুর্বেদী, সিপিডির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য সৈয়দ মঞ্জুর ইলাহী। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। সেমিনারে বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও নেপালের বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন।
সেমিনারে বহুল আলোচিত চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে’ বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরে বক্তারা জানান, ২০১৩ সালে এই উদ্যোগের সূচনা করে চীন। এটি ৭২টি দেশকে সংযুক্ত করবে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে চীনের এক্সিম ও ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ইতিমধ্যেই বিভিন্ন দেশের অবকাঠামো প্রকল্পে ১৯০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। এই প্রকল্পে চীন-বাংলাদেশ এক হয়ে কাজ করলে লাভবান হবে দুই দেশই। তবে রয়েছে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ। ভুল পদক্ষেপে ফল হতে পারে নেতিবাচক। তাই বাংলাদেশকে সতর্ক পদক্ষেপের পরামর্শ অর্থনীতিবিদদের।
শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন বলেন, বিআরআই উচ্চপর্যায়ের সহযোগিতার একটি প্লাটফর্ম। এটি বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ প্লাটফর্ম ব্যবহারের মাধ্যমে লাভবান হবে বাংলাদেশ। তিনি বলেন, কোনো দেশ একা উন্নয়ন করতে পারে না। যেহেতু আমাদের দেশের অর্থনীতিতে নানা ধরনের সমস্যা বিদ্যমান তাই অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে বাংলাদেশ-চীন দুই দেশ যৌথভাবে পথচলার মধ্যদিয়ে ব্যাপক লাভবান হতে পারে। বিআরআই নিয়ে যখন চীনসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে আলোচনা হবে, তখন উইন-উইন পরিস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, চীন দেশের অবকাঠামো, জ্বালানি খাতে আঞ্চলিক সহযোগিতা লাগবে। বিআরআই এই সুযোগ নেয়ার ফোরাম হতে পারে।
সিপিডি চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, চীন বর্তমানে বিশ্ববাণিজ্যের নেতৃত্বে আছে। এর সঙ্গে অন্য দেশের সমন্বয় করে চলতে হবে। এটি এখন বিশ্ব অর্থনীতির নতুন ব্যবস্থা। এটা যেন উপনিবেশবাদের মতো না হয়, এটা যেন অংশীদারত্বের ভিত্তিতে হয়। এতে দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতার সুযোগ আরো বাড়বে। তিনি বলেন, চীনের সঙ্গে বিআরআই প্রকল্পে যুক্ত হতে হলে চীনের অর্থনীতিটা বুঝে দর কষাকষি করতে হবে। কেননা যখন আমরা দর কষাকষি করব, তখন জাতীয় স্বার্থ সবার আগে বিবেচনা করতে হবে। আর সে জন্য গবেষণা প্রয়োজন। চীনের অর্থনীতিতে ভবিষ্যতে কী হচ্ছে, তাদের থিং ট্যাঙ্ক কী ভাবছে, সেজন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এরসঙ্গে পার্টনারশিপে যুক্ত করতে হবে। কেননা বিআরআই নিয়ে চীনে প্রচুর গবেষণা হয়েছে। বেল্ট অ্যান্ড রোডের অবকাঠামো নির্মাণে কোন দেশ কি পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করবে তা পরিষ্কার হওয়া জরুরি বলে মনে করেন সিপিডি’র চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, বিআরআই বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চীন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করছে এবং ভবিষ্যতে বিনিয়োগ আরো বাড়বে। বিআরআইয়ের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে ব্যাপক আলাপ-আলোচনা দরকার। তিনি বলেন, বিআরআইয়ের প্রকল্প বাস্তবায়নে অন্যদেশের সঙ্গে যেন দ্বি-পাক্ষিক সম্পর্ক নষ্ট না হয় সেদিকে নজর রাখতে হবে। প্রকল্পে বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশ যেন সমানভাবে উপকৃত হয় সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, বিচার বিবেচনা ছাড়া প্রকল্প নিলে তা হিতে বিপরীত হতে পারে। একইসঙ্গে প্রকল্প হতে হবে বাংলাদেশের সক্ষমতা বিবেচনায়।
পররাষ্ট্রসচিব শহীদুল হক বলেন, বর্তমানে বিশ্ববাণিজ্যে ইন্দো-প্যাসিফিক, ইউরো-এশিয়া ও বিআরআই উদ্যোগ আছে। আমরা সব উদ্যোগের সঙ্গে যাব। কোনো ক্ষতিকর কিছুর সঙ্গে থাকব না। যখন আমরা এসব নিয়ে দর কষাকষি করব, তখন জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেব।
সংলাপে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মঞ্জুর এলাহী বলেন, আমরা বাজার চাই, এটা সত্য। কিন্তু সবকিছু যাচাই বাছাই করে নেয়া উচিত।
মূল প্রবন্ধে ড. ফাহিমদা বলেন, বিআরআই-এর মাধ্যমে আমাদের যে প্রস্তাবগুলো দেয়া আছে আমরা তা নেব। কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে এই অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বিনিয়োগের শর্তগুলোর দিকে। দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে টেন্ডার থেকে শুরু করে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে, বিআরআই যে ঋণ দিচ্ছে সেই ঋণে সুদের হার যাতে কম হয়। আমরা কেন ৩ শতাংশ দেব? ঋণ যেন এক শতাংশের নিচে হয়। আমরা যাতে ঋণের ফাঁদে না পড়ি। আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য হতে হবে রাজনীতির বাইরে গিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন করা।

Friday, June 28, 2019

সিপিডি’র সেমিনার: এক শ্রেণির মানুষের উন্নয়নে এসডিজি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন করতে হলে দেশের প্রতিটি জনপদের মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন করতে হবে। শুধুমাত্র এক শ্রেণির মানুষের জীবনমান উন্নয়নের মাধ্যমে এসডিজি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এজন্য সুষম বণ্টন নিশ্চিত করে আয় বৈষম্য কমিয়ে আনা প্রয়োজন। গতকাল রাজধানীর গুলশানে ‘হোয়াট টাইপ অব ডেমক্রেটিক প্র্যাকটিস আর সুইটেবল ইন এসডিজি’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এ মন্তব্য করে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমানের সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশ নেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান, সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী, রাশেদ খান মেনন, বাংলাদেশে নিযুক্ত সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত ড. রিনি হলেনস্ট্রিন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সিপিডির বিশেষ ফেলো অধ্যাপক রওনক জাহান, ফাহমিদা খাতুন, গবেষণা পরিচালক  মোয়াজ্জেম হোসেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুইস লেখক পিটার নিগিলি।
মূল প্রবন্ধে পিটার নিগিলি বলেন, এসডিজির মোট ১৭ অভীষ্টের মধ্যে প্রধান ৬টি বাস্তবায়নে ৬৮টি লক্ষ্য ও ৯৫টি সূচক বেঁধে দেয়া হলেও বেশ কিছু লক্ষ্য ও সূচকে অগ্রগতির তথ্য বাংলাদেশে নেই। তবে শিক্ষা, শোভন কর্ম, অসমতা, জলবায়ু, শান্তি ও ন্যায়বিচার এবং উন্নয়ন অংশিদারিত্ব সংক্রান্ত ছয় অভীষ্টের মাত্র ৩৮টি লক্ষ্য ও ৫০টি সূচকের অগ্রগতির সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে।
আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি অর্জন করতে হলে একটি বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। উন্নয়ন যেন সর্বক্ষেত্রে হয় এবং দেশের প্রতিটি মানুষ যেন এ থেকে সুবিধা পেতে পারে। গত কয়েক বছরে নিম্ন মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার হার ১৯৯৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৩০ শতাংশ বেড়েছে। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) বাস্তবায়নকালের তুলনায় এসডিজি সময়কালে শিক্ষার হার বেড়েছে। তবে শিক্ষা সমাপ্তি, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষায় অন্তর্ভূক্তি, স্বাক্ষরতার হার বৃদ্ধি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ, প্রযুক্তি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করার মতো সূচকে আরও উন্নতি করতে হবে।
সিপিডির চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান বলেন, যা কিছুই করি না কেন আমাদের পরিবেশের দিকেও নজর দিতে হবে। তা না হলে পরিবেশ আমাদের সঙ্গে বিরূপ আচরণ শুরু করবে। টেকসই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এটিও একটি অন্যতম দিক। কার্বন উৎপন্ন হয় এমন যানবাহন এবং কলকারখানায় বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দেন তিনি। রেহমান সোবহান বলেন, এসডিজি লক্ষ্য অর্জনের পথে আমরা বলছি, নোবডি লেফট বিহাইন্ড। সেফটিনেটের নানা প্রোগ্রামও সরকার পরিচালনা করছে। প্রান্তিকের সুবিধাবঞ্চিত নাগরিক বা ব্রাত্যজন যাদের বলা হচ্ছে, তাদের এই প্রোগ্রামের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি সব ধরনের উন্নয়নকাজে তাদেরও অংশীদার করতে হবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, বর্তমান সরকরের বেশ কয়েকটি ভিশন ও মিশন রয়েছে। এর মধ্যে এসডিজি একটি। এমডিজির মতো আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজিও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, আগামী বাজেটেও দেশের প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য বেশকিছু কর্মসূচি রাখা হয়েছে। এছাড়া সরকার আমার গ্রাম আমার শহর কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে শহরের মতো গ্রামের মানুষের সব ধরনের নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত হবে। মানুষের আয় বৈষম্য যাতে কমে আসে সেজন্য কাজ করা হচ্ছে। পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষার আওতায় সেবা দেয়া হচ্ছে। এ কারণে দ্রুত দেশে দারিদ্র্যতা হ্রাস পাচ্ছে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য রাশেদ খান মেনন বলেন, আমাদের সংসদে যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয় তাতে প্রান্তিক জনগণের উন্নয়নের কথা খুব কম। মাত্র তিন মিনিট হয় গরীব মানুষের কথা বাকি সবসময় জুড়ে অন্যান্য আলোচনায় ব্যস্ত থাকে সংসদ। বর্তমান সংসদ গরিব মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে না।
সিপিডির বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, যে কোন দেশের উন্নয়নের জন্য প্রত্যেকটি মানুষকে জাতীয় কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে। এছাড়া উন্নয়ন টেকসই হবে না। পাশাপাশি ধনী গরিবের বৈষম্য যেন বৃদ্ধি না পায় সেদিকে নজর দেয়ার পরামর্শ দেন এই অর্থনীতিবিদ।
এদিকে এসডিজির মোট ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা, ১৬৯টি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য এবং ২৩০টি ইন্ডিকেটর রয়েছে। ১৭টি লক্ষ্যমাত্রার ছয়টি নিয়ে এ গবেষণা চালানো হয়। এসডিজি বাস্তবায়নের অগ্রগতি মূল্যায়নে পর্যাপ্ত অর্থ ও তথ্য সংকটকে অন্যতম বাধা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, এসডিজি বাস্তবায়নেও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে অর্থের সঙ্কট। আরেকটা সঙ্কট হলো তথ্যের অভাব।

Saturday, June 15, 2019

বাজেট: ২০১৯-২০, অর্থনৈতিক অপশাসনের সুবিধাভোগীদের পক্ষে গেছে -সিপিডি

মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত মানুষ নয়, অর্থনৈতিক অপশাসনের সুবিধাভোগীরাই প্রস্তাবিত বাজেটে সুবিধা পাবে বলে মনে করে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ। গতকাল বাজেট পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটি বলেছে, প্রস্তাবিত বাজেটে মধ্যবিত্ত ও বিকাশমান মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্তের মানুষ খুব বেশি উপকৃত হবে না। ফলে সমাজে বৈষম্য আরো বাড়বে। নির্বাচনের আগে দেয়া সরকারের প্রতিশ্রুতিও বাজেটে প্রতিফলিত হয়নি বলে মনে করে সিপিডি। রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে গরিব মানুষের জীবনমানের উন্নয়নে কাজ করার যে প্রতিশ্রুতি ছিল, তার প্রতিফলন এ বাজেটে দেখা যাচ্ছে না। এছাড়া তা পূরণের স্পষ্ট কোনো রূপরেখা বা কর্মসূচি বাজেটে রাখা হয়নি।
সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনা করেন সিপিডির ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। এ সময় সংলাপ পরিচালক আনিসাতুল ফাতেমা ইউসুফ, জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খানসহ গবেষকরা উপস্থিত ছিলেন।
ড. দেবপ্রিয় বলে, দেশের প্রবৃদ্ধি বাড়ছে, কিন্তু গরীব মানুষের মধ্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে সক্ষমতা বাড়ছে না।
বরং আয় বৈষম্য, ধনের বৈষম্য, ভোগের বৈষম্য বাড়ছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে এটা আরো প্রকট হচ্ছে। যারা অর্থনৈতিক অপশাসনের সুবিধাভোগী, এই বাজেট এবারও তাদের পক্ষেই গেছে। কারণ পরিবর্তনের জন্য যে রাজনৈতিক অঙ্গীকার বা অর্থনৈতিক কৌশল প্রয়োজন, তা বাজেটে নেই, অথচ তা ইশতেহারে ছিল। এটাই পরিতাপের বিষয়।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে যে ধরনের চাপ এই মুহূর্তে সরকারের আছে, সেই ‘চাপের স্বীকৃতি’ অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় নেই।
যেহেতু সমস্যাটারই স্বীকৃতি নাই, সেহেতু উনারা কোনো অভিনব কৌশল খোঁজেননি। মুদ্রানীতির ভেতরে, বাণিজ্যনীতির ভেতরে অথবা ভর্তুকি বিতরণের ক্ষেত্রে- কোনো ক্ষেত্রেই সেই ধরনের অভিনবত্ব নাই। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশহারে কী কী ছিল, বাজেটে তার কোন বিষয়ে কী আছে- সেই আলোচনা তুলে ধরা হয় সিপিডির পর্যালোচনায়।  দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে গরিব মানুষের জীবনমানের উন্নয়নে কাজ করার যে প্রতিশ্রুতি ছিল, তার প্রতিফলন এ বাজেটে দেখা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ আগামীতে পৌঁছে দেয়ার যে অঙ্গীকার নির্বাচনী ইশতেহারে ছিল, তা পূরণের স্পষ্ট কোনো রূপরেখা বা কর্মসূচি অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের প্রথম বাজেটে রাখা হয়নি বলে মন্তব্য করেন দেবপ্রিয়।তিনি বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয় সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ধরে ধরে এ বাজেট তৈরি করেছে বলে সিপিডি মনে করতে পারছে না। গৎ বাঁধা কিছু ভালো কথা থাকে, সেই কথাগুলো আছে। সেই কথাগুলো যখন আছে, সেগুলোর আবার কর্মসূচি নেই। এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, বাজেট প্রস্তাবে অর্থমন্ত্রী তিন কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনার কথা বলেছেন। কিন্তু কোন খাতে কত দিনে কতজন করে কাজ পাবে- তার কোনো প্রাক্কলন বাজেটে নেই।
বাজেটে বলা হয়েছে করদাতার সংখ্যা ১ কোটিতে উন্নীত করা হবে। কিন্তু কত বছরে, কীভাবে তা হবে এবং তার মাধ্যমে কত টাকা রাজস্ব আসবে- সে বিষয়ে কোনো রূপরেখাও বাজেটে নেই।  তিনি বলেন, বাতাসের ভেতরে কিছু আশ্বাসের বাণী হয়ত গেছে। আমরা মনে করি না সে রকম বাস্তবভাবে সেগুলো এসেছে। বাজেট নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড আর অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্যের মধ্যে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকার তফাৎ পাওয়ার কথা বলা হয় সিপিডির বাজেট পর্যালোচনায়। ফলে বাজেট নিয়ে স্বচ্ছতার অভাব থেকে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করেন দেবপ্রিয়।
তথ্যের ‘সামঞ্জস্যহীনতার’ উদাহরণ দিতে গিয়ে দেবপ্রিয় বলেন, ট্যাক্সের যে উৎসে কর কাটা হবে, সেটার স্ল্যাবগুলো কী হবে, সেটা বক্তৃতার ভেতরে আছে ২৫ লাখ টাকা। আর এনবিআর হিসাব দিয়েছে ১৫ লাখ টাকা। এখানে সমস্যা রয়ে গেছে।
তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতের ভূমিকার ক্ষেত্রে নতুন কিছু পাচ্ছি না। বৈদেশি আয়-ব্যয়ে ঘাটতি সৃষ্টি হচ্ছে, বাজেটে সেই বিষয়ে কোনো সচেতনতা লক্ষ্য করছি না। আর্থিক খাতের সংস্কার, ব্যাংক খাতের সুশাসন, পুঞ্জিভূত খেলাপি ঋণ নিয়ে এবারের বাজেটে কী পরিকল্পনা থাকছে, তা ছিল সবার আগ্রহের বিষয়।
মন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে দেবপ্রিয় বলেন, ব্যাংকিং খাতকে একটা আলোচ্য বিষয় বানিয়ে দিল! সেটার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে আলোচনায় সময়ক্ষেপনের ভেতরে চলে গেল আর কি। পুরো জিনিস ব্যাংক কমিশনের ?বিষয়। কোনো সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা স্বীকৃতিতে আসল না। সামষ্টিক বাজেট কাঠামো নিয়ে তিনি বলেন, অর্থমন্ত্রী এবার অনেক লক্ষ্যের ক্ষেত্রেই বাস্তবমুখী হয়েছেন। ফলে আগের দু-একটি বছরের তুলনায় রাজস্ব ও বিনিয়োগ লক্ষ্যমাত্রা কম। তিনি কর-বহির্ভূত আয় বাড়ানোর উদ্যোগ, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে উন্নয়ন ব্যয় ৭ শতাংশ রাখা, শত শত নতুন প্রকল্প না নেয়াসহ কয়েকটি ক্ষেত্রে অর্থমন্ত্রীকে সাধুবাদ জানান। পুঁজিবাজারে নেয়া পদক্ষেপ নিয়েও প্রশ্ন নেই বলে উল্লেখ করেন। তবে সুশাসন ছাড়া পুঁজিবাজারের পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। ভ্যাট আইনে জরুরি সেবা ও পণ্যে ছাড় দেয়ার বিষয়টিও ঠিকই আছে বলে উল্লেখ করেন।
সারচার্জের ক্ষেত্রে সম্পদশালীদের যে ছাড় দেয়া হয়েছে তা সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে মেলে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। সম্পদের পরিমাণ আড়াই কোটি টাকার নিচে হলে সারচার্জ দিতে হত না। অর্থমন্ত্রী এখন সেই সীমা বাড়িয়ে ৩ কোটি টাকা করার কথা বলেছেন। ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট কেনা এবং ভবন নির্মাণে বিনিয়োগের মত অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্কে শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রেও বাজেটে কালো টাকা সাদা করার যে প্রস্তাব রাখা হয়েছে, সে বিষয়েও কথা বলেন দেবপ্রিয়।
তিনি বলেন, অঘোষিত আয় ও বেআইনি আয়কে আলাদা করার সময় এসেছে।
প্রশ্নোত্তর পর্বে দেবপ্রিয় বলেন, এটা স্বচ্ছ যে, বাজেট উচ্চ আয়ের মানুষকে অনেক বেশি সুযোগ দিচ্ছে। অল্প আয়ের মানুষের জন্য প্রান্তিকভাবে একধরনের একটা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত, বিশেষ করে বিকাশমান মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত এটা থেকে খুব বেশি উপকৃত হবে না।
শিক্ষা-স্বাস্থ্যে ব্যয় মোট জিডিপি অনুপাতে বৃদ্ধি না পাওয়ার বিশ্লেষণ তুলে ধরে তিনি বলেন, যারা ব্যাংকক-সিঙ্গাপুরে গিয়ে শিক্ষা নিতে পারে না ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে পারে না, তাদের জন্য আপনি কী ব্যবস্থা নিচ্ছেন? গণপরিবহন সংকটে যারা, তাদের জন্য গণপরিবহন তৈরি হচ্ছে কি না, তাদের শিশুরা সে রকম মানে উচ্চ শিক্ষা পাচ্ছে কি না, এটিই বড় বিষয়।
দেবপ্রিয় বলেন, উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে যাওয়া নির্ভর করছে বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের জন্য আমরা কী করতে পারব, তার ওপর। বিকাশমান মধ্যবিত্তই হলো চালিকাশক্তি। চিন্তা-চেতনা, উপার্জন, বুদ্ধিমত্তা, সব ক্ষেত্রে এটি হলো চালিকা শক্তি। সেই চালিকা শক্তিকে যদি বাদ দেয়া হয়, তাহলে তা ইশতেহারের চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
যে সমাজে বৈষম্য বৃদ্ধি পায়, সে সমাজ আজ হোক কাল হোক টেকে না, এগোতে পারে না বলে মন্তব্য করেন দেবপ্রিয়। তিনি বলেন, যেভাবে বাংলাদেশে বৈষম্য বাড়ছে, তাতে ৭, ৮, ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি টেকানো কষ্টকর হবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা এসেছে বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে।
করদাতার সংখ্যা ১ কোটিতে উন্নীত করা ও তিন কোটি কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যের বিষয়ে বলতে গিয়ে বায়বীয় শব্দটি ব্যবহার করেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, আপনারা বলছেন যে করদাতার সংখ্যা ১ কোটি হবে, বলা হয়েছে শিগগিরই হবে। শিগগিরই কবে? কালকে? তিন বছর পর? ৫ বছর পর? কবে। এটা যতক্ষণ না বলা হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি অর্থনীতিবিদ হিসেবে আশ্বস্ত হই না। সাধারণ নাগরিক খুশি হতে পারে।
তিনি বলেন, জিডিপি প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং সরকারি বিনিয়োগের দিক থেকে আমরা মোটামুটিভাবে ভালো অবস্থানে আছি। তবে সাধারণভাবে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আমরা দুর্বল জায়গায় আছি। এর মূল কারণ ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ কমে গেছে। একইভাবে সঞ্চয় হারের ক্ষেত্রেও আমরা দুর্বল জায়গায় আছি।
সিপিডির বিশেষ এই ফেলো বলেন, অর্থনীতিতে কাঠামোগত পরিবর্তন হচ্ছে। এর অন্যতম লক্ষণ হলো কৃষিখাতের অবদান কমছে এবং শিল্পখাতের অবদান বাড়ছে।
তিনি বলেন, জিডিপির অংশ হিসেবে দেখলে দেখা যাবে আমদানি, রপ্তানি এবং রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে যে সমস্ত লক্ষ্যমাত্র ধরা হয়েছে তা ২০১৮-১৯ অর্থবছরের নিচে। এটাকে আমরা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য হিসেবে দেখতে চাচ্ছি।
গড় আয়ুর তথ্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বচ্ছল যারা আছে তাদের গড় আয়ু ৭২-৭৩ বছরের বেশি। আর গরিব মানুষরা কিন্তু বাঁচে ৭০ বছরের নিচে। ওই দুটিকে গড় করে গড় আয়ু করা হয়েছে।
বাজেট বাস্তবায়নে মূল্যনীতি এবং ভর্তুকির মধ্যে সামঞ্জস্যের আহ্বান জানিয়ে দেবপ্রিয় বলেন, ভর্তুকির কারণে গ্যাস ও বিদ্যুতের খুচরা মূল্য নীতিমালা প্রণয়ন প্রয়োজন। না হলে মধ্যবিত্তের ওপর চাপ পড়বে।
বাজেট সঙ্গতিপূর্ণ নয় জানিয়ে তিনি বলেন, বাজেটে কৃষিতে বরাদ্দ প্রতিনিয়ত কমছে, ভর্তুকির অনেক অর্থ অব্যবহৃত থাকায় কৃষকের প্রকৃত সুবিধাভোগ হচ্ছে না।

Friday, June 14, 2019

অর্থনীতিবিদদের চোখে বাজেট

নতুন অর্থ বছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেট গতানুগতিক, আগেরবারের ধারাবাহিকতা ও রিপিট হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের কথা- বাজেটে কংক্রিট কিছু নাই। প্রস্তাবিত বাজেটে আয়ের বিরাট অংক। কিন্তু আয় ও লক্ষ্য অর্জনের কোনো দিক-নির্দেশেনা নেই। জনকল্যাণমুখী ও জনবান্ধবমুখীও নয়। সার্বিকভাবে বাজেটের লক্ষ্যগুলো অর্জন করার কার্যকর পদক্ষেপগুলো দেখা যায়নি বলে তারা মনে করেন। এছাড়া আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে অসম্পূর্ণ বাজেট হয়েছে। সুষ্ঠু তদারকি ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব না হলে প্রতিবছরের মত এবারের বাজেটও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না বলে অভিমত তাদের।
অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাবিত বাজেট প্রতিক্রিয়ায় এসব মন্তব্য করেন তারা। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বাজেটটা সার্বিকভাবে গতবারের বাজেটই এবার রিপিট হয়েছে। আগেরকার বাজেটের মতোই গতানুগতিক ও ধারাবাহিকতা। স্বদিচ্ছার প্রকাশ হয়েছে অনেক কিছু করার। কিন্তু লক্ষ্যগুলো কিভাবে অর্জন করবেন সে ব্যাপারে কোনো দিক-নির্দেশেনা দেখা যায়নি বাজেটে। তিনি বলেন, এটা অর্থমন্ত্রীর দোষের ব্যাপার না। কারণ নির্বাচনের পর মাঝামাঝি সময়ে দায়িত্ব পেয়েছেন। ফলে সময় কম পেয়েছেন তিনি।
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, দ্বিতীয় দিক হলো- প্রস্তাবিত বাজেটের আয়ের বিরাট অংক। সেটা অর্জন করা, রাজস্ব আদায় করা, ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন করা ও ভ্যাট আদায়ের আধুনিকায়নের কোনো ব্যবস্থায় নেই এনবিআরের। তাই এই আয় অর্জন করা কঠিন হবে। অন্যদিকে ভ্যাটের উপর আমরা নির্ভরশীল। একটা পণ্যের ওপর ভ্যাট বসলে অন্য সব কিছুর দাম বাড়ে। কারণ একটা পণ্যের দাম আরেকটার ওপর নির্ভরশীল। তাই এবারের বাজেট জনকল্যাণমুখী ও জনবান্ধবমুখী খুব বেশি হয়েছে বলে মনে করেন না এই অর্থনীতিবিদ। পাশাপাশি বাজেটে খুব কংক্রিট কিছু নাই। বাজেটে সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নেবে। এতে করে ব্যক্তি খাতে ঋণ প্রবাহ কমবে। ফলে এই খাত কঠিন চাপে পড়বে বলে মন্তব্য করেন সালেহউদ্দিন আহমেদ। সার্বিকভাবে বাজেটের লক্ষ্যগুলো অর্জন করার কংক্রিট অ্যাকশনগুলো দেখা যায়নি। বাজেট গণমানুষের হতে পারেনি। এ কারণে আমাদের মতো দেশে অনেক চিন্তা-ভাবনা করে বাজেট প্রণয়ন করা দরকার বলে জানান সাবেক এই গভর্নর।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বাজেট পরবর্তী তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, অর্থমন্ত্রী নিঃসন্দেহে ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবতার নিরিখে করার চেষ্টা করছেন। তবে এতে সামগ্রিকভাবে বাস্তবতা প্রতিফলিত হয়নি। উনি প্রত্যাশা উচ্চাকাঙ্‌ক্ষার কথা বলেছেন, সেটা পরিপূরণের জন্য যে সুনির্দিষ্ট প্রকল্প-প্রস্তাবনা থাকে, বিশেষ করে নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে, তা অসম্পূর্ণ থেকে গেছে।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নির্বাচনী ইশতেহারে কতকগুলো সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি ছিল। আমাদের ধারণা ছিল সেই প্রতিশ্রুতিগুলোকে উল্লেখ করে, সেগুলোর জন্য কী কী পদক্ষেপ নেয়া হলো, সেরকম একটা ব্যবস্থা আমরা দেখবো। দুঃখজনকভাবে আমরা এই মুহূর্তে তা পেলাম না। যেসব পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে, যেমন তিন কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে ২০৩০ সালের মধ্যে। কিন্তু এটা কোন খাতে, কীভাবে সৃষ্টি হবে এবং এটা ব্যক্তি খাতে হবে, না সরকারি খাতে হবে, এটা কি গ্রামে হবে, নাকি শহরে হবে, এ ধরনের কোনও মূল্যায়নভিত্তিক বা কোনও সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনাভিত্তিক কৌশলপত্র আমরা সেভাবে লক্ষ্য করিনি। তিনি বলেন, যেসব প্রতিশ্রুতি আছে, সেগুলো অনেক ক্ষেত্রে কোন সময়ের ভেতরে বাস্তবায়ন হবে, তা বলা নেই। যেমন ব্যাংক খাতে কমিশনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, ‘আলাপ-আলোচনা করে করা হবে’। আমার কাছে এক কথায় মন্ত্রী নিঃসন্দেহে বাস্তবতার নিরিখে বাজেট করার চেষ্টা করেছেন, তবে সামগ্রিকভাবে বাস্তবতা তাতে প্রতিফলিত হয়নি। উনি প্রত্যাশা ও উচ্চাকাঙ্‌ক্ষার কথা বলেছেন, সেটা পরিপূরণ করার জন্য যে সুনির্দিষ্ট প্রকল্প-প্রস্তাবনা থাকে, বিশেষ করে নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে, সেটা কিন্তু অসম্পূর্ণ থেকে গেছে।
প্রতিক্রিয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি বিভাগের প্রফেসর আবু আহমেদ বলেন, বাজেটে পুঁজিবাজারে প্রণোদনার কথা বলা হয়েছে। ব্যক্তি পর্যায়ে কর দাতাদের হাতে পাবলিকলি ট্রেডের কোম্পানি হতে আয়ের করমুক্ত সীমা ২৫ হাজার থেকে বৃদ্ধি করে ৫০ হাজার টাকা করা হলেও বিষয়টি থেকে অনেকে সুযোগ নিতে পারবে না। স্টক ডিভিডেন্ডের উপর ১৫ শতাংশ কর প্রদানের বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে বিষয়টি ইতিবাচক।

Thursday, June 13, 2019

পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের নিরিখে আগামী বাজেট by ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্টের মতে, ‘জ্ঞানের উন্মেষ ঘটে ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে, এরপর তৈরি হয় উপলব্ধি আর তা শেষ হয় যুক্তি দিয়ে। যুক্তির ঊর্ধ্বে কিছুই নেই’। গত আড়াই দশকেরও বেশি সময় ধরে আমি জাতীয় বাজেট বিশ্লেষণে সক্রিয়ভাবে যুক্ত আছি। আর তা করতে গিয়ে তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে অনেক যুক্তিযুক্ত বক্তব্য দেওয়ার চেষ্টা করেছি। তবে সাধারণত: সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে তেমন যৌক্তিক সাড়া পাইনি। এবার দুই ধাপ (কান্টের মতে) পিছিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি মানুষের ইন্দ্রিয়কে উদ্দীপ্ত করলে যোগাযোগ আরও কার্যকর হয় কি না, তা বোঝার জন্য।
প্রাত্যহিক জীবনে পঞ্চ ইন্দ্রিয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমাদের সার্বিক উপলব্ধি তৈরিতে একটি ইন্দ্রিয় অন্যটির ওপর নির্ভরশীল।
পঞ্চ ইন্দ্রিয়গুলোর অনুক্রমের সমানুতার বিষয়ে কোনো সর্বসম্মত মতামত না থাকলেও, দর্শনেন্দ্রিয় বা চক্ষু সর্বোচ্চে অবস্থান করে। 
তাই প্রথমেই দেখা যাক, জাতীয় বাজেট নিয়ে আমাদের দর্শনেন্দ্রিয় কি বলে? আমি মনে করি, এটা হলো জাতীয় বাজেটের আর্থিক কাঠামো। যা নির্ধারিত হয় সরকারের আয়, ব্যয় ও ঘাটতির ওপর ভিত্তি করে। গত এক দশক ধরে বাংলাদেশ সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখলেও, পদ্ধতিগতভাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কর ও কর-বহির্ভূত রাজস্ব সংগ্রহে ব্যর্থ হয়েছে। জিডিপির অনুপাতে দেশের মোট রাজস্বের পরিমান বিশ্বে সর্বনিম্ন দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম! উপরন্তু, প্রত্যক্ষ  করের পরিমাণ মোট রাজস্বের এক-চতুর্থাংশ মাত্র এবং এই কর আদায়ের গতি উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। ভ্যাট সংক্রান্ত নতুন আইনের কার্যকর প্রয়োগ অবশ্যই এক্ষেত্রে একটি নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে যোগ হবে।
এ অবস্থায় নিজস্ব উদ্বৃত্ত রাজস্ব দ্বারা উচ্চাকাঙ্ক্ষী বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অর্থায়ন সরকারের পক্ষে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। সৌভাগ্যক্রমে, এডিপি বাস্তবায়ন এখন পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার নিচে রয়েছে। ফলে বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এডিপির আওতাধীন প্রকল্পগুলোর গুণগত মান ও বাস্তবায়ন প্রতি বছরই আমাদের উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। বর্তমানে, বেতন ও ভাতা খাতে সরকারের ব্যয় পৌনপুনিকভাবে অন্যান্য খাতের চেয়ে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে বাজেট ঘাটতি কীভাবে সামাল দেওয়া হয়? সরকার প্রতি বছরই অভ্যন্তরীণ ঋণের জন্য উচ্চ সুদের সঞ্চয়পত্র এবং উচ্চ সুদের বৈদেশিক ঋণের দ্বারস্থ হচ্ছে, যদিও বিদেশি অনুদান ও অল্প সুদে ঋণ নেওয়ার সুযোগ বিদ্যমান। সরকারের ঋণের বোঝা যে বাড়ছে তার প্রাথমিক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। তাই এটা পরিষ্কার যে দীর্ঘ মেয়াদে জিডিপির উচ্চ প্রবৃদ্ধির জন্য যে শক্তিশালী আর্থিক কাঠামো দরকার তা ক্রমশই দুর্বল হয়ে পড়ছে। তাই আগামী বাজেটে আর্থিক কাঠামোকে শক্তিশালী করার জন্য সরকার বিশ্বাসযোগ্য কী প্রস্তাব দেয়, আমরা তা দেখার অপেক্ষায় আছি।
আসন্ন বাজেটকে অনুধাবনের জন্য আমি দ্বিতীয় যে ইন্দ্রিয়ের কথা বলবো তা হলো- সাউন্ড বা শব্দ। যদিও এক্ষেত্রে সাউন্ড বা শব্দের অর্থ হলো কোলাহল, মিউজিক বা সংগীত নয়। আর ব্যাংকিং খাত এবং পুঁজিবাজার থেকে সৃষ্টি হচ্ছে উচ্চস্বরের সেই কোলাহল। ডেব্‌ট মার্কেট বা ঋণবাজার এবং ইকুইটি মার্কেট উভয়েই ক্ষয়িষ্ণু অবস্থায় রয়েছে যা আভ্যন্তরীণ পর্যায়ে বেসরকারি বিনিয়োগে হতাশাজনক পারফরমেন্সের ক্ষেত্রে প্রধান কারণগুলোর অন্যতম। গত চার বছর ধরে জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে বেসরকারি বিনিয়োগের হার স্থবির হয়ে আছে। প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের চিত্রও নিষ্প্রভ। ক্রমবর্ধমান ঋণ খেলাপির মধ্যেও সম্প্রতি সুদের হার নিয়ে সরকার যে নয়-ছয় করলো, তাতে এই খাতের মূল সমস্যা, ত্রুটিপূর্ণ শাসন ব্যবস্থা মোকাবেলা করতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। ব্যাংকিং খাত ও পুঁজিবাজারকে সঠিক ধারায় ফিরিয়ে আনতে, প্রথাগত আর্থিক প্রণোদনার বাইরে, আসন্ন বাজেটে সরকার নীতিগত কী সিদ্ধান্ত নেয়, তা আমরা দেখার অপেক্ষায় রইলাম।
দর্শন ও শ্রবণেন্দ্রিয়ের আপেক্ষিক গুরুত্বের বিপরীতে, অবশিষ্ট তিনটি ইন্দ্রিয়- যেমন স্পর্শ, স্বাদ ও ঘ্রাণের ক্রম সর্ম্পকে (গুরুত্বের বিবেচনায়) সর্বসম্মত কোন মতামত নেই। যাহোক, আমি উপরে উল্লিখিত ক্রম অনুসারেই বলছি।
আগামী বাজেটে যে খাতে সরকারের সূক্ষ্ম স্পর্শের প্রয়োজন তা হলো বহির্খাত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স প্রবাহ থাকা সত্ত্বেও আমদানির উচ্চ প্রবৃদ্ধির কারণে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য নেতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। সরকারের লেনদেনের ভারসাম্য ও চলতি হিসাব উভয়ই নিম্নগামী। আর আগেও বলেছি, সরকারের ঋণভার যে বাড়ছে তার পূর্বলক্ষণ দেখা যাচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ার লক্ষণও পরিষ্কার। সে জন্য টাকার বিনিময় হার চাপের মুখে আছে। মুদ্রা অবমূল্যায়নেরও প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টি হয়েছে। তবে মূল্যস্ফীতির চিন্তা করে সরকার টাকার মান না কমিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশি ও রপ্তানিকারকদের আর্থিক প্রণোদনা দিতে পারে। ব্যাপারটা হলো, ব্যালান্স অব পেমেন্ট নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে তাতে সরকারকে সূক্ষভাবে মোকাবেলা করতে হবে। বাজেটে সরকার এই বিষয়ে কী নীতি গ্রহণ করে তার মধ্য দিয়েই স্পর্শেন্দ্রিয়ের ব্যাপারটা বোঝা যাবে।
উৎপাদনশীল খাতের জন্য সরকার কী প্রস্তাব পেশ করে তার মধ্য দিয়েই আগামী বাজেটের স্বাদ বোঝা যাবে; বিশেষ করে দেশীয় বাজারভিত্তিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সরকার কী উদ্যোগ নেয়, তা দেখে ব্যাপারটা বোঝা যাবে। চলতি বছরে দুটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। প্রথমত, পাট খাতের দুরাবস্থার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রায়াত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর অস্থিতিশীল অবস্থার প্রকাশ পেয়েছে। এক্ষেত্রে, আসন্ন বাজেট কি পুঁজি সরবরাহের বাইরে উদ্ভাবনী কোন কর্মসূচী প্রস্তাব করবে? দ্বিতীয়ত, অতি অবহেলিত কৃষি খাত, যেখানে কৃষকেরা ধানের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, তাদের জন্য সরকার কী করে। এখানেও নতুনত্বের দরকার। বিপুল পরিমানে ও অধিক কার্যকরভাবে ধান কেনার প্রতিশ্রুতির বাইরেও বাজেটে কি বাজার ব্যবস্থা কৃষকের অনুকূলে আনার কোনো কার্যকর প্রস্তাব দেয়া হবে?
পরিশেষে আসা যাক, সর্বশেষ ইন্দ্রিয়ে। আগামী বাজেট কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক হয় তা দিয়ে বিবেচনা করা যেতে পারে বাজেট সুগন্ধ না কটু গন্ধযুক্ত। সামগ্রিক মানব উন্নয়ন সূচকের প্রেক্ষাপটে প্রধান উদ্বেগের বিষয় হলো শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব। এছাড়াও আয় ও সম্পদের বৈষম্য বেড়ে চলছে, যার ফলাফল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবার ঘাটতিতে সুস্পষ্ট। এখন দেখার বিষয়, স্বাস্থ্য বাজেট জিডিপির ১ শতাংশ ও শিক্ষা বাজেট জিডিপির ২ শতাংশের কোটা থেকে বেরোতে পারে কিনা? সার্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কোন অগ্রগতি হয় কি না, অনেকে আবার তাও দেখতে চাইবেন।
দেশের অর্থনীতিতে বিদ্যমান নানা চ্যালেঞ্জের কারণে আমাদের উচ্চ মধ্যম-আয়ের দেশ হওয়ার যাত্রাপথ বন্ধুর হয়ে যেতে পারে, মসৃণ ও টেকসই উত্তরণ ব্যাহত হতে পারে। এমনকি পঞ্চেন্দ্রিয়-নির্ভর একটি জাতীয় বাজেটের পক্ষেও তা করা সম্ভব হবে না, যদিও অনেকে এ নিয়ে আমার সঙ্গে তর্ক করতে পারেন। পঞ্চেন্দ্রিয় দিয়ে যা অনুভব করছি তার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, আমাদের ব্যাপক সংস্কারের দিকে যেতে হবে। এই অপশাসনের যারা অন্তর্নিহিত সুবিধাভোগী, তাদের প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসতে এই সংস্কার প্রয়োজন। এর জন্য, আমাদের নতুন অর্থমন্ত্রী এ ব্যাপারে কী ‘ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের’ পরিচয় দেন, তা দেখার জন্য রহস্যোপন্যাস পাঠের মতো অধীর আগ্রহ নিয়ে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।
লেখক: সম্মাননীয় ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি), ঢাকা

Wednesday, June 12, 2019

দেশের অর্থনীতি যে কোনো সময়ের চেয়ে চ্যালেঞ্জে আছে -সিপিডি’র পর্যালোচনা

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) মনে করে, বাংলাদেশের অর্থনীতির অগ্রগতি গত ১০ বছরে সীমান্ত রেখায় উপনীত হয়েছে। পাশাপাশি আলোচ্য সময়ে দেশের অর্থনীতি যে কোনো  সময়ের চেয়ে চাপের মুখে আছে। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে একটা শক্তি ছিল। সেই শক্তিতে চিড় ধরেছে। দেখা দিয়েছে দুর্বলতা। এটি রক্ষা করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এর মূল অনুষঙ্গ হলো- কর আহরণে দুর্বলতা, ব্যাংকিং খাতে সমস্যা এবং বৈদেশিক লেনদেনের স্থিতিতে চাপ।
গতকাল রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সিপিডি আয়োজিত ‘জাতীয় অর্থনীতির পর্যালোচনা ও আসন্ন বাজেট প্রসঙ্গ’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলেন সংস্থাটির বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির সিনিয়র গবেষক তৌফিকুল ইসলাম খান। উপস্থিত ছিলেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন, ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
সামষ্টিক অর্থনীতি চাপের মুখে উল্লেখ করে দেবপ্রিয় বলেন, দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে একটা শক্তি ছিল। সেই শক্তিতে চিড় ধরেছে। এর অনুসঙ্গগুলো হলো- কর আহরণে অপারগতা। বাংলাদেশের উন্নয়নে একটা অমোচনীয় প্রতিবন্ধকতায় পরিণত হয়েছে। এটাকে যদি অতিক্রম করা না যায় তাহলে বাংলাদেশের উন্নয়নের যে অভিলাষ তার জন্য বিনিয়োগের সুযোগ কমে যাবে। এছাড়া অন্য উৎস থেকে যদি বিনিয়োগের চেষ্টা করা হয় তাহলে সামষ্টিক অর্থনীতির পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে। তিনি বলেন, কর আহরণ করতে না পারার কারণে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হবে। রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় ভালো হলেও উচ্চ আমদানির কারণে লেনদেনের ঘাটতি বাড়ছে। এতে দেশের বৈদেশিক মজুত দ্রুত নেমে আসছে। এটা কিছুদিন আগে ৮ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সক্ষমতায় থাকলেও এখন ৫ মাসে নেমে এসেছে। এই অবস্থায় বাংলাদেশের টাকার মান অবনমন করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের টাকার ৩ শতাংশ অবনমন করা উচিত। কারণ বর্তমানে মূলস্ফীতির হার ৫ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। এই অবস্থায় টাকার অবনমন করা হলে মানুষের পক্ষ সহ্য করা সহজ হবে।
ব্যাংকিং খাতের বিষয়ে বলে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এ বিষয়ে যত কম বলা যায় ততই ভালো। তিন-চার বছর ধরে এ বিষয়ে বলতে বলতে এমন একটা অবস্থায় এসেছি অবশেষে ব্যাংক খাতের সংকট সবাই উপলব্ধি করছে। কিন্তু প্রতিক্রিয়ার দিক থেকে আমরা তার প্রতিফলন দেখি না। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ব্যাংকিং খাত নিয়ে যে কয়টা পদক্ষেপ নিয়েছে তার সবগুলোই আরো বেশি ক্ষতিকর হয়েছে।
তিনি বলেন, গত জানুয়ারি মাসে অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন খেলাপি ঋণ এক টাকাও বাড়বে না। অথচ তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার কোটি টাকা। তিনি বলেন, ব্যাংকের সুদের হার নিয়ে নাড়াচাড়া করে ব্যাংকিং খাতের সমস্যার সমাধান হবে না। এটা কাঠামোগতভাবে সুশাসন যদি আনা না যায় এবং যারা ব্যাংকের টাকা তসরুপ করেছে তাদের বিচারের আওতায় আনা না গেলে ব্যাংকিং খাতের মানুষের প্রতি আস্থার সংকট সৃষ্টি হবে। এটা কোনো দেশ ও জাতির জন্য ভালো হবে না।
উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সুদের হারকে নাড়াচাড়া করে যে কিছু করা যাবে না তার প্রমাণ হলো সুদের হার কমে গেলেও ব্যক্তি খাতের ঋণ প্রবাহ বাড়ছে না। ফলে ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট সৃষ্টি হয়েছে। ব্যাংকে কেউ টাকা রাখছে না, যারা ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে তারাও টাকা দিচ্ছে না। এই তারল্য সংকটের সমাধান সুদের হার নিয়ন্ত্রণ করে হুকুমের অর্থনীতির মধ্যে ফেলে দিলে কোনোভাবেই সুখকর হবে না।
তিনি বলেন, সামপ্রতিককালে কৃষকের প্রতি যে অন্যায় আচরণ করেছে ইতিপূর্বে এই রকম আচরণ করা হয়নি। গ্রামীণ অর্থনীতি ভিত্তি এখন শহরে চলে আসছে। আর সেটা শহর থেকে বিদেশে চলে গেছে। এটা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের কৃষকের পক্ষে আগামী দিনে টিকে থাকা সম্ভব হবে না। সরকার সময়মত ধান, চাল সংগ্রহ করেনি। আমদানি শুল্ক অনেক দেরি করে আরোপ করেছে। ফলে অর্থনীতির এই ধরনের অব্যবস্থাপনার চিত্র অন্য কোনো খাতে করা হয়নি।
সিপিডির এই ফেলো বলেন, আগামী বাজেটে ১ কোটি ৮০ লাখ কার্ডধারী প্রত্যেক কৃষককে ৫ হাজার টাকা করে ভর্তুকি দেয়া হোক। এটা করা হলে ৯ হাজার ১০০ কোটি লাগবে। অথচ রপ্তানিখাতে ঢালাওভাবে ৫ শতাংশ প্রণোদনা দাবি করা হচ্ছে এতে লাগবে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। ফলে কৃষকের সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বেশি না।
তিনি বলেন, প্রতিবছরই রাজস্ব ঘাটতি বাড়ছে। চলতি অর্থবছরে প্রথম ৯ মাসে রাজস্ব ঘাটতি ৫০ হাজার কোটি টাকা বলা হলেও বছর শেষে এই ঘাটতির পরিমাণ ৮৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।
এ সময় ‘কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া উচিত হবে না’- এমন অভিমত তুলে ধরে তিনি বলেন, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া হলে তা আওয়ামী লীগ সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের ব্যত্যয় ঘটবে। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হয়েছে- ঘুষ, অনুপার্জিত আয়, কালো টাকা, পেশি শক্তি মাধ্যমে উপার্জন করা, সেগুলোকে সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মাথাপিছু আয়ের সূচকে বাংলাদেশ ভালো অবস্থানে থাকলেও বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের দিক থেকে ততোটা ভালো অবস্থানে নেই। তাই এ বিষয়ে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে। দেবপ্রিয় বলেন, বাংলাদেশের ব্যক্তি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে, শিল্পায়নের ক্ষেত্রে ও সামাজিক ক্ষেত্রে আশানুরূপ উন্নতি দেখতে পাচ্ছি না। প্রবৃদ্ধির ধারার সঙ্গে অন্যান্য উন্নয়নের সূচকগুলোর একটি বৈসাদৃশ্য আছে।
এ সময় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন চিত্রের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এ বছর অর্ধেক এডিপি বাস্তবায়ন হচ্ছে মাত্র ৩ মাসে। এটা যে কী এডিপি হবে সেটা আর ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন পড়ে না।
বহুল আলোচিত ভ্যাট আইনের বিষয়ে তিনি বলেন, তারা একক ও কম হারের পক্ষপাতি।
অর্থনৈতিক নীতিমালা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয়ের যে নেতৃত্বমূলক ভূমিকা ছিল, তা সামপ্রতিককালে ‘দুর্বল’ হয়ে গেছে বলেও মনে করে সিপিডি।
ব্যাংকিং খাত ও শেয়ারবাজারে সুশাসন নিশ্চিতের তাগিদ দিয়ে সিপিডি বলছে, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে এসব খাতে প্রয়োজনীয় সংস্কারে সুবিধাভোগীদের প্রভাব কমানো জরুরি।
অনুষ্ঠান শেষে সিপিডির পক্ষ থেকে ১০টি সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে হলো- রাজস্ব আহরণের সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা। সরকারি ব্যয় সুশৃঙ্খলভাবে করা, যাতে অপচয় না হয়। কর ছাড়ের হিসাব সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। সঞ্চয়পত্রের সুদের হার সমন্বয় করা এবং সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণ কমিয়ে আনতে হবে। প্রত্যেক কৃষককে ৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দিতে হবে। ব্যাংক কমিশন গঠন ও সুদের হার বাজার ব্যবস্থাপনার ওপর ছেড়ে দিতে হবে। পুঁজিবাজারের সংস্কারের ক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিতে হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠান অডিট করে সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে। সামাজিক খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে এবং টাকার অবমূল্যায়ন করতে হবে।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ তুলে ধরেন সিপিডির সিনিয়র রিসার্স ফেলো তৌফিকুল ইসলাম। তিনি জানান, ব্যাংক খাতে পুঁজির সংকট বাড়ছে, তারল্য সংকট আগামীতে আরো বাড়বে। ঋণ খেলাপি কমাতে সরকারের নেয়া উদ্যোগগুলো কোনও কাজে আসছে না বলেও মন্তব্য করেন তৌফিকুল ইসলাম। তিনি উল্লেখ করেন, ব্যাংক খাতের সংস্কারের জন্য আশু পদক্ষেপ নতুন বাজেটে রাখতে হবে। এ জন্য ব্যাংকিং কমিশন গঠন করারও পরামর্শ দেন।

Saturday, April 27, 2019

সরকারের ১০০ দিন উদ্যম উদ্যোগহীন -সিপিডি’র মূল্যায়ন

সরকারের প্রথম ১০০ দিন উদ্যোগ, উদ্যম, উৎসাহ ও উচ্ছ্বাসহীন ছিল বলে মূল্যায়ন করেছে সেন্টার পর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। নতুন সরকারের ১০০ দিন উপলক্ষে গত ২৩ এপ্রিল ২০১৯, মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিষ্ঠানটির বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এ মন্তব্য করেন ড. দেবপ্রিয় বলেন, আশা ছিল ১০০ দিনে বড় ধরনের উত্থানের প্রতিফলন দেখতে পাব। কিন্তু তা না হয়ে শুধু ধারাবাহিক উদ্যোগ দেখা গেছে। যা মিশ্র ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে সরকারের কিছু ভালোর মধ্যে বিদেশি কর্মজীবীদের বিষয়ে জরিপ চালিয়ে করের আওতায় আনার উদ্যোগ, মানি লন্ডারিং বিধিমালা জারি করা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিজ্ঞাপনকে করের আওতায় আনা। এছাড়া ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন হবে কিনা জানি না। তবে এখন পর্যন্ত ইতিবাচক মনে হচ্ছে।
দেবপ্রিয় বলেন, সরকার যখন নতুনভাবে আসে, তখন গত সময়ের বিভিন্ন অভিজ্ঞতাকে ধারণ করে নতুন ধরনের উদ্যোগ নেয়।
সেই উদ্যোগটা তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। আমরা মনে করি সামপ্রতিক সময়ে যত নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশিত হয়েছে আওয়ামী লীগের এই নির্বাচনী (একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে) ইশতেহার সব থেকে সুচিন্তিত, সুলিখিত ও সুগঠিত।
নির্বাচনী ইশতেহার সম্পর্কে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, শাসক দলের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও রাষ্ট্রযন্ত্রের বাস্তবায়নের মধ্যে পার্থক্য আছে। শাসক দল বলছে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখানো হবে। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যে তা দেখছি না। আমরা দেখছি রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে, অন্যান্য সামাজিক সেবার ক্ষেত্রে সেই দুর্নীতি প্রকটভাবে রয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাময়িক হিসাব করা ৮.১৩ শতাংশ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধিকে ঈর্ষণীয় বলছে সিপিডি। সিপিডির মতে, এই হিসাব বাস্তবসম্মত নয়। অর্থনীতির সূচকগুলোর সঙ্গে এর মিল নেই। জিডিপির হিসাব আরো গভীরে গিয়ে করা উচিত। তা না হলে নীতি নির্ধারণে সমস্যা হবে।
রাজধানীর সিরডাপ অডিটরিয়ামে সিপিডি আয়োজিত ‘বাংলাদেশের উন্নয়নের স্বাধীন পর্যালোচনা: বর্তমান সরকারের প্রথম একশো দিন’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে সিপিডির বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান, গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম উপস্থিত ছিলেন। সিপিডির পর্যালোচনা উপস্থাপন করেন সংস্থাটির গবেষক তৌফিকুল ইসলাম খান ।
জিডিপি প্রবৃদ্ধি গণনার পদ্ধতির সমালোচনা করে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সামপ্রতিক সময়ে বাংলাদেশে দেখছি প্রবৃদ্ধি-নির্ভর অর্থনৈতিক আলোচনা। কেমন একটা প্রবৃদ্ধি আচ্ছন্নতা বা আকৃষ্টতা আমরা দেখতে পাচ্ছি। অথচ অর্থনৈতিক তত্ত্বের সামপ্রতিককালের চিন্তা দেখলে দেখা যাবে, সকলেই বলবে প্রবৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু যথেষ্ট নয়। এটা অর্থনীতি শাস্ত্রের দ্বৈতজ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
জিডিপির হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলে সিপিডি বলেছে, উৎপাদন খাত নির্ভর প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বিবিএসের হিসাব, চামড়া খাতে প্রথম প্রান্তিকে সাড়ে ৩২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। অথচ রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রবণতা রয়েছে। রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি মাত্র ৬ শতাংশ। কিন্তু চলতি মূল্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধি দেখানো হয়েছে ১২.৭ শতাংশ। আবার গত ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহে প্রবৃদ্ধি সাড়ে ১২ শতাংশ। কিন্তু গতবার একই সময়ে এই খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল সাড়ে ১৮ শতাংশ। সিপিডির মতে, বিবিএসের হিসাব অনুযায়ী, এই প্রবৃদ্ধি অর্জনের মানে হলো, শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা বেড়েছে।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, সামপ্রতিককালে অর্থনৈতিক যে প্রবৃদ্ধি দেখি তা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত উঁচু, প্রশংসনীয় এবং অনেকের কাছে ঈর্ষণীয়। তবে যেটুকু উন্নয়ন হয়েছে তাতে ব্যক্তিখাতের বাড়তি কোনো ভূমিকা আমরা দেখিনি। এই উন্নয়নের জন্য যে ধরনের কর আহরণ দরকার তা আমরা দেখলাম না। ব্যক্তিখাতে যে ধরনের ঋণপ্রবাহ বাড়ার কথা তা আমরা দেখলাম না। পুঁজিপণ্যের আমদানি প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। সেই সঙ্গে ব্যাংকখাতে ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে যে ধরনের চাঞ্চল্য থাকে তা-ও দেখলাম না। প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে যে ধরনের চলক থাকে, সে চলকগুলোর প্রতিফল কিন্তু আমাদের কাছে ধরা পড়ছে না। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে এমন কী প্রযুক্তি বা উদ্ভাবনীর রূপান্তর ঘটল যে শ্রমের উৎপাদন ক্ষমতা এমন বৈপ্লবিকভাবে বেড়ে গেল! এটা আমাদের এখন ভালো করে চিন্তা করে দেখতে হবে বলে মনে করেন সিপিডির এই ফেলো। তিনি বলেন, আমরা চাই প্রবৃদ্ধির অনুমিতি সঠিক হোক। সেটা থেকে যে ধরনের তাৎপর্য আসে সেটা যেন বাংলাদেশের নীতিকে সঠিকভাবে আগামী দিনে পরিচালিত করে। কোনো ধরনের অসম্পূর্ণ তথ্যের কারণে নীতিকে যেন বিভ্রান্ত না করে। এটাই আমাদের আকাঙ্ক্ষা। এছাড়া এখন থেকে শুরু করে বাজেট প্রকাশ পর্যন্ত সরকারকে বাস্তবমুখী কিছু পদক্ষেপ নেয়ার পরামর্শ দেন ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
দেবপ্রিয় বলেন, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি হলো পরিবর্তন, দিন বদল। কিন্তু তা আটকে রাখছে রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যে থাকা সুবিধাভোগীরা। আওয়ামী লীগের দেয়া নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাজনৈতিক নেতৃত্বকেই নিতে হবে। তা না হলে এই ইশতেহার কাল্পনিক দলিল হিসেবে ইতিহাস বিচার করবে। তিনি বলেন, সরকারের গত ১০০ দিন আমরা একটি উৎসাহহীন, উদ্যোগহীন, উচ্ছ্বাসহীন এবং একই সঙ্গে উদ্যমহীন হিসেবে দেখেছি। অথচ আমরা আশা করে ছিলাম এটি একটি বড় ধরনের ১০০ দিনের উত্থানের ওপর দিয়ে প্রতিফলিত হবে। সেটা আমরা লক্ষ্য করিনি।
আমরা যেটা লক্ষ্য করেছি গতানুগতিক ধারাবাহিকতা। নতুনভাবে সে রকম কিছু আমরা লক্ষ্য করিনি। বরং যে ধরনের উদ্যোগ আমরা দেখেছি, সে ধরনের উদ্যোগ মিশ্র ইঙ্গিত দিচ্ছে। মিশ্র ইঙ্গিত কী দিচ্ছে? আমরা লক্ষ্য করেছি বিভিন্ন কর ছাড় দেয়া হচ্ছে। আমরা দেখেছি সুদের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সুবিধা দেয়া হচ্ছে। এগুলোর ফলে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত হবে- এটা আমরা মনে করি না। মনে হয় যেন কোথাও সরকারকে একটি প্রতীত গোষ্ঠী করায়ত্ব করে নীতিনির্ধারণ করছে।
দেবপ্রিয় বলেন, উন্নয়নের যে ধারণা তার সঙ্গে নীতি প্রণয়নের ধারণার অসঙ্গতি দেখা যাচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধিদের যে ধরনের ভূমিকা সেটা আমরা দেখতে পারছি না। বাংলাদেশের উন্নয়নের ধারাবাহিকতার জন্য যে ধরনের কাঠামোগত সংস্কারের দরকার ছিল, সেগুলোর কিছু হয়নি। এই ১০০ দিনে আমরা আশা করেছিলাম অসঙ্গতিগুলো দূর করা যাবে। আমরা সে ধরনের সচেতনতাও দেখিনি, সে ধরনের পদক্ষেপও দেখিনি।
খেলাপি ঋণ নিয়ে প্রতিবেদনে সিপিডি বলছে, খেলাপি ঋণ কমানোর লক্ষ্যে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে দেয়া সুবিধার ফলে ঋণ খেলাপিরা ও দুর্বল ব্যাংক উৎসাহিত হবে। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তারল্য সংকট দেখা দেবে।
এ বিষয়ে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ব্যাংকিং ব্যবস্থা অর্থনীতির মূল স্তম্ভ। আমরা অতীতে দেখেছি, বড় বড় উদ্যোক্তাদের অর্থ জোগানের ক্ষেত্রে ব্যাংক ব্যবস্থার একটা ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু এখন আমরা এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছেছি ঋণ খেলাপি এটা একটা সমস্যা তা সবাই স্বীকার করছে। সরকারও স্বীকার করছে, যার ফলে আমরা দেখছি নানামুখী উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। কীভাবে এটা (খেলাপি ঋণ) কমানো যায়। কিন্তু দুঃখজনক হলো সত্যিকার অর্থে ঋণ খেলাপি না কমিয়ে, সুবিধা দেয়ার মাধ্যমে এটা কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। যার ফলে আমরা গুড প্রাকটিস থেকে ব্যাড প্রাকটিসে চলে যাচ্ছি। সুবিধা দেয়ার ফলে ঋণ খেলাপিরা উৎসাহিত হবে। সেইসঙ্গে দূর্বল ব্যাংকও উৎসাহিত হবে। তার ফলে তারল্যের ওপর প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক।
তিনি বলেন, ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগের জন্য যখন ব্যাংকের কাছে অর্থ চাওয়া হবে, তখন ব্যাংক যদি অর্থ দিতে না পারে তাহলে আমাদের বিনিয়োগ এবং অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হবে। ফাহমিদা বলেন, আমরা মনে করি খেলাপি ঋণের বিষয়ে যে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে তার ফলে আমরা উল্টো দিকে যাচ্ছি। এর ফলে ব্যাংকের প্রকৃত যে স্বাস্থ্য তা পুনরুদ্ধার করতে পারবে না। এটা ভাসা ভাসা একটা সমাধান। তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে আমরা একটি ব্যাংক কমিশনের কথা বলেছিলাম। আমরা সেটার জন্য কাজ করছি। সরকারের কাছে আমরা বার বার ব্যাংকিং কমিশনের কথা বলেছি। কিন্তু তারা এখনও পর্যন্ত সেরকম কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এখন আমরা শুধু ব্যাংকিং কমিশন নয়, নাগরিকদের নিয়েও কমিশনের চিন্তাভাবনা করছি।
সিপিডির বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, যেসব দেশে বৈষম্য কম, সেসব দেশে তুলনামূলকভাবে প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা সহজ হয়। তাই বৈষম্য কমানোর দিকে নজর না দিলে প্রবৃদ্ধি শ্লথ হতে পারে।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে সিপিডির সিনিয়র রিসার্স ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, খেলাপি ঋণের পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। বর্তমান সরকারের ১০০ দিনে ব্যাংক খাতের কোনো উন্নয়ন আমরা দেখছি না। সরকারের পক্ষ থেকে ভালো ঋণ গ্রহীতাদের ছাড় দেয়ার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু কারা ভালো ঋণ গ্রহীতা সে বিষয়ে দিক নির্দেশনা আসেনি। এটা নির্দিষ্ট করা উচিত।
পুঁজিবাজার নিয়ে খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, শেয়ারবাজারে কারসাজির সঙ্গে জড়িত দুষ্টচক্রকে থামাতে পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বড় কোনো উদ্যোগ নেয়নি। অনিয়মের বিরুদ্ধে যে ধরনের অর্থদণ্ড দেয়া হয় তাতে কারসাজি চক্র অনিয়ম করতে আরো উৎসাহিত হয়। কারণ আর্থিক দণ্ড তার জন্য খুব বেশি সমস্যার না। সুতরাং সুশাসনের ক্ষেত্রে ছাড় দিয়ে পুঁজিবাজারকে আস্থার জায়গায় নিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই বলে জানান তিনি। তিনি বলন, সুশাসনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট ছাড় দেয়ার প্রবণতা রয়েছে। বর্তমান সরকারের গত ১০০ দিনে শেয়ারবাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আনয়নে সুশাসন দেখা যায়নি। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক। তিনি বলেন, যে কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারে আনা হচ্ছে এবং এক্ষেত্রে যে রিপোর্টি জমা দেয়া হচ্ছে, সেগুলো নিয়ে অভিযোগ করা হচ্ছে। এমনকি বিএসইসির চেয়ারম্যানও রিপোর্টগুলো নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন।

Monday, January 28, 2019

ত্রুটিপূর্ণ প্রক্রিয়া পোশাকখাতে অসন্তোষের কারণ

তৈরি পোশাক শ্রমিকদের মধ্যে মজুরি নিয়ে অসন্তোষের প্রধান অন্তরায় মজুরি কাঠামোর ত্রুটিপূর্ণ প্রক্রিয়া বলে জানিয়েছে ‘সেন্টার ফর ডায়ালগ পলিসি (সিপিডি)’। ঢাকার পার্শ্ববর্তী কয়েকটি এলাকার তৈরিপোশাক শ্রমিক ও মালিকদের ওপর করা পর্যালোচনায় এ তথ্য পাওয়া গেছে বলে সংস্থাটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। এছাড়া শ্রমিকদের কাছে বেতন বৃদ্ধির তথ্য ঠিকভাবে পৌঁছানোয় ঘাটতি রয়েছে বলেও সিপিডির পর্যালোচনায় উঠে এসেছে। গতকাল রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে আয়োজিত ‘পোশাকখাতে সামপ্রতিক মজুরি বিতর্ক, কী শিখলাম?’ শীর্ষক সংলাপে সিপিডির করা গবেষণা পর্যালোচনা তুলে ধরেন গবেষক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম ও মোহাম্মদ আলী। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্সি। সিপিডির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানের সঞ্চালনায় ছিলেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। এছাড়া পোশাকশিল্প মালিক সংগঠনের নেতা এবং শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।
সিপিডির গবেষণা পর্যালোচনায় বলা হয়, সমপ্রতি নতুন মজুরি কাঠামো বাস্তবায়নের পর সেখানে কিছু অসঙ্গতি নিয়েই শুরু হয় শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ। যদিও সরকারের উদ্যোগে কয়েকটি মজুরি কাঠামোর গ্রেডে সংশোধন ও সংস্কার করলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
সংলাপে সিপিডি জানায়, ঢাকা, সাভার, আশুলিয়া, টঙ্গী, গাজীপুর অঞ্চলের ৬১ জন শ্রমিক, কারখানা মালিক ও ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া বেতনের দুই একটি গ্রেডের বেতন কাঠামো নিয়ে এখনও সমালোচনা রয়ে গেছে। এছাড়া সিপিডি পোশাক খাতের শ্রমিকদের অসন্তোষ দূর করতে বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরেছে গবেষণা পর্যালোচনায়।
শ্রমিক অসন্তোষ দূর করতে একটি নির্দিষ্ট শ্রমিক প্রতিনিধি দল তৈরি করতে হবে বলে অনুষ্ঠানে জানান বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্সি। তিনি বলেন, তৈরিপোশাক খাতে শ্রমিকদের সব রকম অসন্তোষ দূর করতে হলে তাদের সব পক্ষ থেকে পাঁচজনের একটি প্রতিনিধিদল করা দরকার। যারা মালিক পক্ষসহ সরকারের সঙ্গে শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্ব করবে। ভবিষ্যতে তাদের সঙ্গে কথা বলে আমরা সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করব।
শ্রমিক নেতাদের পক্ষ থেকে জানানোর প্রেক্ষিতে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, কোনো শ্রমিকই অন্যায়ভাবে মামলায় জড়িয়ে না পড়ে সেদিক লক্ষ্য রাখতে হবে। বিনা কারণে যেন ঢালাওভাবে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়া না হয়। এছাড়া কোনো শ্রমিককে যদি কোনো মালিক অন্যায়ভাবে ছাঁটাই করে সেটাও গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি বলেন, আমার কারখানার উদাহরণ টেনেই বলতে পারি একটি কারখানায় সকল শ্রমিক অন্যায়ে জড়ায় না। অল্পকিছু শ্রমিকের কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে দু-একটি কারখানার এমন অপ্রীতিকর ঘটনা এবং ত্রুটির কারণে অন্যান্য কারখানাগুলোকেও ইমেজ সংকটে পড়তে হয়।
মন্ত্রী বলেন, শ্রমিকদের বেতন বাড়ার কারণে উৎপাদন খরচ বাড়লেও বিদেশি ক্রেতারা সে তুলনায় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করছে না। ভবিষ্যতে বাড়বে এমন কোনো নিশ্চয়তাও নেই। এ নিয়ে আমাদের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে দীর্ঘমেয়াদে এই ব্যবসা করতে পারব কি-না তাও জানি না। ইফিসিয়েন্সি তো হঠাৎ করে বাড়বে না, বাড়ানোর জন্য তো চেষ্টা চলছে। আপনাদেরও সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, মালিকদের পক্ষ থেকে এবার বেতন কাঠমোতে সুপারিশ ছিল সর্বনিম্ন মজুরি সাত হাজার টাকা। তারা সব হিসাব মিলিয়ে এর বেশি পারবেন না বলেও জানিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর কাছে এটা নিয়ে যখন গেলাম তিনি আট হাজার টাকা করে দিলেন। এরপরে কারখানা মালিক শ্রমিক প্রতিনিধি মিলে এটা ঠিক করা হয়েছে। এছাড়া শ্রমিকদের অসন্তোষের পেছনে স্বার্থন্বেষী রাজনৈতিক দলের বি না কারণে অহেতুক বিবৃতিও রয়েছে বলে জানান। যেটা সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গেছে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এফবিসিসিআই) সভাপতি সফিউল ইসলাম শ্রমিক নেতাদের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ট্রেড ইউনিয়ন যেমন শ্রমিকের করার অধিকার রয়েছে, আবার না করারও অধিকার আছে। শ্রমিকদের এই অসন্তোষের পেছনে একটি গোষ্ঠী জড়িত থাকার কথা রয়েছে বলেও তিনি জানান। তিনি বলেন, রপ্তানিতে আমাদের চাহিদা কমছে। সব থেকে বড় ক্রেতা ইউরোপ এবং আমেরিকায় দরপতন হয়েছে। অথচ আমাদের উৎপাদন খরচ বেড়েই চলছে। এর বাইরে আমাদের প্রতিবেশী প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো বসে আছে। তাদের রপ্তানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ কারণে বৈদেশিক ক্রেতাদের তেমন চাপ দেয়া যাচ্ছে না। তাহলে তারা অন্যদিকের বাজারে চলে যেতে পারে।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, আমরা বিভিন্নভাবে শ্রমিকদের সঙ্গে রেখে চলছি। আমাদের মালিকদের দুটি সংগঠন আর শ্রমিকদের সংগঠন রয়েছে শাতাধিক। যাদের অর্ধশতাংশের নিবন্ধন নেই। এরপরেও আমরা তাদেরও আলোচনায় ডাকি। তিনি বলেন, আমরা বিগত সময়ের বেতন নিয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা এবার বেতন নিয়ে খুশি। তাদের যে সামান্য অসন্তোষ ছিল তা এখন আর নেই। বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, আমি চাই শ্রমিকদের নূন্যতম বেতন।
এটাও চাই তাদের দক্ষতা দেখে বেতন দিতে। এরই মধ্যে রপ্তানিতে আমাদের ডিমান্ড কমেই চলছে। বেতন আমি ঠিক করলাম কিন্তু দিতে পারলাম না এটা হয় না। আলোচনায় আরও অংশ নেন সিপিডির ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, ডিসিসিআই’র সাবেক সভাপতি আসিফ ইব্রাহিম, শিল্প উদ্যোক্তা মুমীনুর রহমান, ফারুক আহমেদ, আরসাদ জামান দীপু, শহীদুল আজিম, শ্রমিক নেতা মন্টু ঘোষ, বাবুল আকতার, কাজী রুহুল আমিন, নুরুল ইসলাম প্রমুখ।

Tuesday, December 11, 2018

১০ বছরে দ্রুত বেড়েছে ধনী-গরিব বৈষম্য -সিপিডির গবেষণা

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) মনে করে, গত ১০ বছরে অর্থনীতি ব্যবস্থাপনার গুণগত মান কমে দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে ধনী-গরিবের বৈষম্য। অর্থাৎ সামগ্রিক উন্নয়নের পাশাপশি বৃদ্ধি পেয়েছে বিভাজিত বৈষম্য। এসব বেড়েছে  রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা না থাকা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে। এজন্য প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রেখে বিভাজিত বৈষম্য কমানোর আহ্বান জানিয়েছে সিপিডি।
এছাড়া আগামী নির্বাচনে বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলোকে অর্থায়নের পদ্ধতি ইশতেহারে তুলে ধরার সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। এদিকে নির্বাচন এখন বড় বিনিয়োগে পরিণত হয়েছে। ফলে যোগ্য ও সৎ প্রার্থীরা মনোনয়ন পাচ্ছে না বলেও মনে করেছে সিপিডি। গতকাল ব্র্যাক সেন্টার মিলনায়তনে সিপিডি আয়োজিত ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি এবং আসন্ন জাতীয় নির্বাচন’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এসব কথা বলেন।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুনের সঞ্চলনায় সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, রিসার্চ ফেলো তৌফিক ইসলাম খান।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ১০ বছরে উন্নয়নের ধারায় বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু প্রথম ৫ বছরের চেয়ে দ্বিতীয় ভাগের ৫ বছরে এসে অর্থনীতি ব্যবস্থাপনার গুণগত মান কমেছে আর দ্রুত বেড়েছে ধনী-গরিবের বৈষম্য। উন্নয়নের জন্য নতুন নতুন উদ্যোগেও বেশ ঘাটতি দেখা গেছে। গত ৫ বছরে দেশের রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা কমে যাওয়ার সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকতে পারে বলেও ধারণা সিপিডির। আসন্ন জাতীয় নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক হলেও জীবন ও জীবিকা সম্পর্কিত বিষয়গুলো আলোচনার জন্য উঠে আসেনি। তাই আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনী ইশতেহারে এ বিষয়গুলো স্পষ্ট করার পাশাপাশি মানুষের জীবন মান বাড়ানোর বিষয়কে স্থান দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। গত ১০ বছর ধরে ছড়ানো ছিটানো উন্নয়ন এবং ব্যাপক বৈষম্য বৃদ্ধি পাওয়ায় এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো বৈষম্যকে হ্রাস করা।
দেবপ্রিয় বলেন, আমরা আগেই বলেছি নির্বাচনটা অনেক ক্ষেত্রে বড় ধরনের বিনিয়োগে পরিণত হয়েছে। এখানে যতখানি না মানুষের ভোটাধিকার, তার থেকে বেশি ওইখানে (বিনিয়োগ) গেছে। নির্বাচনী ব্যয় এখন অনেক সৎ ও যোগ্য প্রার্থীকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে বাধ্য করছে। এ ব্যয় নিয়ে তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সামর্থ্য নেই।
নির্বাচনী ব্যয় গণতন্ত্রের প্রতিবন্ধকতা হয়ে উঠছে কি না তা এখন বড় বিষয়- এমন মন্তব্য করে দেবপ্রিয় বলেন, নির্বাচনী ব্যয়কে আগামীতে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য করা যায় কি না দেখতে হবে। নির্বাচনী ব্যয়ে স্বচ্ছতা নিয়ে আসতে হবে। নির্বাচনী ব্যয়ের যে ঘোষণা দেয়া হয়, তা পরে পরিবীক্ষণ করার আগ্রহ বা সক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের আছে বলে অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের কাছে মনে হয়নি।
তিনি বলেন, হলফনামায় সম্পদের যে বিবরণ দেয়া হয় তা আনুষ্ঠানিকতা হিসেবেই থেকে যায়। এটাকে দলিল হিসেবে তার সত্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ কেউ নেয় না। নির্বাচন কমিশনের সেই সক্ষমতা না থাকলেও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সেই সক্ষমতা রয়েছে। সুতরাং এটা তাদের আগ্রহের বিষয় হওয়া উচিত।
ঋণখেলাপির বিষয়ে দেবপ্রিয় বলেন, ঋণখেলাপি হিসেবে যারা ধরা পড়েছেন, তাদের ঋণের পরিমাণ খুব বড় বিষয় না। আমরা প্রকাশ্যভাবে যেটুকু জানি, সেটা হলো- সব থেকে বড় বড় ঋণ গ্রহীতা যারা নির্বাচনে এসেছেন তারা বহু আগেই তাদের ঋণের প্রভাবগুলো অন্যান্য সংযোগ ব্যবহার করে ঋণকে সমন্বয় অথবা অন্য কোনো ব্যবস্থায় নতুন একটি ঋণ দিয়ে সেই ঋণের অর্থায়ন করে রেখেছেন। অর্থাৎ লোক দেখানো একটা ব্যবস্থার এর মধ্যে চালু রয়েছে। সেটার প্রকৃত মূল্যায়ন করার জায়গা হয় তো নির্বাচন কমিশনের নয়, সেটা দেখভাল করার দায়িত্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। এর জন্য নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে অন্যান্য নিয়ন্ত্রণ সংস্থার যে সমন্বয় থাকার কথা ছিল, সেটা আমরা দেখি না।
দেবপ্রিয় বলেন, গত এক দশ ধরে প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সময়কালে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষিত হয়েছে, ভৌত অবকাঠামো খাতে বড় ধরনে বিনিয়োগের ফলে জ্বালানি সংকট অনেকখানি নিরসন হয়েছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে যে ব্যাপকতা প্রয়োজন ছিল সেটাও অনেকখানি বিস্তৃত হয়েছে। এর সঙ্গে সঙ্গে আমরা দেখেছি সামাজিক সুরক্ষার জন্য এক ধরনের রাজনৈতিক সদিচ্ছা সেটাও কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রকাশিত হয়েছে। সমগ্রিকভাবে এই সময়কালে (২০০৮-১৮) বাংলাদেশের বড় ধরনের উন্নয়ন আমরা লক্ষ্য করেছি।
তিনি বলেন, আমরা দেখেছি অর্থনীতির গুণগতমান দ্বিতীয়ভাগে (২০১৪-১৮) এসে প্রথমভাগের তুলনায় পতন ঘটেছে। সামাজিক বিভিন্ন ধরনের বৈষম্য বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া সরকারের নতুন ধরনের নীতি নিয়ে নতুন উদ্যোগে যাওয়ার ক্ষেত্রে যে উদ্যম, সেই উদ্যমেও আমরা কিছুটা ঘাটতি লক্ষ্য করেছি। এর বড় একটি কারণ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা কমে যাওয়ার কারণে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা কমে গেছে।
দেবপ্রিয় বলেন, নির্বাচনী আলোচনায় কোনো অর্থনৈতিক বিষয় আসেনি। বাংলাদেশে এই মুহূর্তে নির্বাচনী প্রক্রিয়া যেভাবে আগাচ্ছে, তাতে নির্বাচন কিভাবে হবে? কেমন করে হবে? কারা করবে? কীভাবে করবে? এসব বিষয়ের প্রাধান্য রয়েছে। জীবন-জীবিকার বিষয় কিন্তু এখনো এই নির্বাচনী বিতর্কের মধ্যে স্থান লাভ করেনি। এটি বড় একটি পরিতাপের বিষয়।
নির্বাচনী ইশতেহারের বিষয়ে তিনি বলেন, মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো যখন নির্বাচনী ইশতেহার দিবেন তাকে শুধু এটা বললে হবে না উনারা কী চান। ওনারা কীভাবে এটা অর্জন করবেন, সে কথাটিও বলতে হবে। উনারা অনেক গগনস্পর্শী আকাঙ্ক্ষা আমাদের সামনে তুলে ধরবেন। কিন্তু সেটাকে অর্জন করার পদ্ধতি, তার অর্থায়নের সুযোগ একই সঙ্গে তাদের বলতে হবে।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে সিপিডির বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ২০১৪ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে কর-জিডিপির হার কমেছে। ২০১৪ সালে কর-জিডিপির হার ছিল ১০.৪০ শতাংশ, যা ২০১৭ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ১০.২০ শতাংশ। এই কর-জিডিপির হার কমার অন্যতম কারণ কর বহির্ভূত রাজস্ব কমে যাওয়া। ২০১৪ সালে কর বহির্ভূত রাজস্ব ছিল জিডিপির ১.৮০ শতাংশ, যা ২০১৭ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ১.২০ শতাংশ।
এ সময় তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে রাজস্ব আয় বাড়ার লক্ষ্যে প্রত্যক্ষ কর বাড়ানোর ক্ষেত্রে কি ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হবে তার সুনির্দিষ্ট ব্যক্তব্য দেয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, রাজস্ব সংশ্লিষ্ট আইনগুলো অনেকদিন ধরে হয়ে আছে। কিন্তু এগুলো আমরা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারছি না।
বাজেট বাস্তবায়নের হার নিয়েও কিছুটা সমালোচনা করে তিনি বলেন, প্রতি বছর বাজেটের আকার বাড়ছে। কিন্তু প্রকৃত বাস্তবায়নের হার কমছে। ২০১৪ অর্থবছরে বাজেট বাস্তবায়নের হার ছিল ৮১.৮০ শতাংশ, যা কমে ২০১৭ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ৭৫.৩০ শতাংশ। তিনি বলেন, ১৯৯৯ সালের পর ২০১৭-১৮ সালে আমাদের ব্যালেন্স অব পেমেন্ট প্রথমবারের মতো ঋণাত্মক হয়ে গেছে।

Friday, November 23, 2018

রাজনীতি এখন বড় ব্যবসায়িক উদ্যোগে পরিণত হয়েছে

বাংলাদেশে রাজনীতিই এখন বড় ব্যবসায়িক উদ্যোগে পরিণত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। এ সময় নির্বাচনী হলফনামায় দেয়া প্রার্থীদের সম্পদের তথ্য এবং ঋণ খেলাপি ও কর ফাঁকিবাজদের তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। গতকাল রাজধানীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে ‘দ্যা লিস্ট ডেভেলপমেন্ট কান্ট্রিস রিপোর্ট-২০১৮’র প্রকাশনা অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুনের সঞ্চালনায় উপস্থিত ছিলেন সিপিডির বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থাটির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। প্রবন্ধে ভবিষ্যৎ উদ্যোক্তা তৈরির দিক-নির্দেশনা ও অর্থনীতির কাঠামোগত রূপান্তর ও সরকারি নীতি সংস্কারের বিষয়ে উল্লেখ করা হয়।
দেশের রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের আধিক্যের কথা তুলে ধরে ড. দেবপ্রিয় বলেন, নির্বাচনের ভেতরে ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর উপস্থিতি যথেষ্ট দৃশ্যমান। রাজনীতিবিদদের চেয়েও হয়তো ব্যবসায়ী গোষ্ঠীরই তুলনামূলকভাবে দৃশ্যমান উপস্থিতি বেশি।
রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এখন প্রয়োজন বোধ করছেন। কারণ যে সমস্ত সুযোগ-সুবিধা তারা অনেক ক্ষেত্রে পেয়েছেন, সেটা একমাত্র রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য দ্বারাই সুরক্ষা করা সম্ভব। এর ফলে ব্যবসা এবং রাজনীতির ক্ষেত্রেই কলুষ সম্পর্ক গড়ে উঠছে।
তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করছেন। কিন্তু দাবি আদায় করতে পারছেন না। তারা তাদের স্বার্থের জন্য রাজনীতিকে ব্যবহার করছেন। সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের সম্পর্ক থাকার পরও ব্যাংকের অস্থিরতা, বন্দরের দুর্নীতি, রাজস্বে অনিয়ম, ব্যবসায়ী হয়রানির পরও কথা বলতে পারেন না। কারণ রাজনীতিতে নিজের স্বার্থে ব্যবসায় পরিণত করছেন তারা।
রাজনৈতিক দলগুলোর দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনাকে ইতিবাচক জানিয়ে দেবপ্রিয় বলেন, দেশে প্রতিযোগিতাপূর্ণ রাজনীতি না থাকলে, প্রতিযোগিতাপূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। ব্যবসা এবং রাজনীতির স্বার্থান্বেষী সম্পর্কের সমালোচনা করে আসন্ন নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে ভালো অর্থনৈতিক পরিকল্পনার প্রত্যাশা করেন তিনি। তিনি বলেন, কর অবকাশ থেকে শুরু করে যে কোনো লাইসেন্স বা নতুন ব্যাংক, এগুলো বিশেষভাবে আনুকূল্যের ভিত্তিতে হয়েছে। সেজন্য তারা রাজনীতি দিয়ে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে নিজেদের সুরক্ষা দিতে চান।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, গুটিকয়েক ব্যবসায়ীরা নিজেদের ব্যবসার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন। তাদের একচেটিয়া সুবিধা ভোগের কারণে ছোট ব্যবসায়ীরা রাষ্ট্রীয় সুফল পায় না। এ ক্ষেত্রে একটি সুষ্ঠু গ্রহণযোগ্য নীতিমালা থাকা দরকার। যেখান থেকে সবাই সমানতালে প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে ব্যবসার মুনাফা ভোগ করবে ও রাষ্ট্রীয় সুবিধা পাবেন।
দেবপ্রিয় বলেন, রাজনীতিবিদরাও এখন অনেক বেশি ব্যবসার দিকে যুক্ত হচ্ছেন। রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা একে অপরের সমর্থনে কাজ করছেন। নাগরিকরা কে রাজনীতিবিদ আর কে ব্যবসায়ী তা বুঝে উঠতে পারছে না। তাদের সামনে দৃশ্যমান হচ্ছে বাংলাদেশে রাজনীতিই এখন সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক উদ্যোগ। দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে উদ্যোক্তা শ্রেণির অনুকূলে যে ধরনের পরিবেশ দরকার সে রকম বাস্তবতা নেই বলে তিনি মনে করেন।
তিনি বলেন, আসন্ন নির্বাচনে রাজনৈতিক নেতাদের হলফনামার সত্যতা যাচাই করতে হবে ব্যাংক ও এনবিআরকে। একইসঙ্গে এসব হলফনামার কপি নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) দিতে হবে। নির্বাচনের পর ব্যাংক ও এনবিআরকে এসব হলফনামার আপডেট জানতে হবে। একটি স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল ও উন্নত রাষ্ট্রে যেতে হলে অবশ্যই এর স্বচ্ছতা জরুরি।
সিপিডির বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নির্বাচনী ইশতেহারে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পথে অর্থনীতির কাঠামোগত রূপান্তরের দিক সম্পর্কে সুস্পষ্ট প্রতিফলন থাকা উচিত। তিনি বলেন, কী ধরনের বাংলাদেশ রাজনৈতিক দলগুলো চান, সেটাতে তারা উদ্যোক্তা-রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে যেন এ অর্থনৈতিক পরিকল্পনাগুলো তারা আমাদের সামনে পেশ করেন, আমরা (যাতে) যাচাই-বাছাই করতে পারি সেগুলোর যৌক্তিকতা কী। আমরা উন্নয়নশীল দেশ হবো। উন্নয়ন রাষ্ট্র থেকে উদ্যোক্তা রাষ্ট্রে যেতে হবে। উদ্যোক্তা শ্রেণি সৃষ্টি করতে চাইলে সরকারের নীতিমালার সাহায্য লাগবে। নতুন উদ্যোক্তাদের লাইফ সাইকেল সাপোর্ট দিতে হবে। আগামী দিনে দক্ষিণ এশিয়ায় আমাদের বড় বাজার হবে। সেভাবে উদ্যোক্তা গড়ে তুলতে হবে।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, একটি সীমিত আকারে এক ধরনের উদ্যোগকে প্রমোট করা হচ্ছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে উদ্যোক্তা শ্রেণি বা উদ্যোগের বিকাশের জন্য সরকারের যে নীতিকাঠামো, যে ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ, যে ধরনের অবস্থান সেটি এখনো কিন্তু নেই।
গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল বা উন্নত দেশে যেতে হলে প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসা, সু-শাসন, নারী উদ্যোক্তার হার বাড়াতে হবে। এজন্য অর্থনৈতিক ফান্ড প্রয়োজন, লাইসেন্স, রেজিস্ট্রেশন, টেন্ডারের দুর্নীতি রোধ করতে হবে।
স্বল্পোন্নত দেশগুলোর ভালো উন্নয়নের জন্য উদ্যোক্তাদের উন্নয়নে জোর দিতে হবে উল্লেখ করে ব্যবসা-বাণিজ্য সংশ্লিষ্ট আইনগুলোর সঠিক বাস্তবায়ন ও বৈষম্যহীন নীতি নিশ্চিত করারও তাগিদ জানায় সিপিডি। শুধু তাই নয়, একটি উন্নয়নশীল দেশ হতে হলে আইনের সঠিক বাস্তবায়নের পাশাপাশি সুশাসনও নিশ্চিত করা দরকার বলে জানায় প্রতিষ্ঠানটি।

Wednesday, September 12, 2018

‘অতি ধনী’ বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশে

আড়াইশ’ কোটি টাকা বা সমমূল্যের সম্পদের মালিক, এমন ‘অতি ধনী’ মানুষের সংখ্যা অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে সর্বোচ্চ গতিতে বাড়ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে ‘অতি ধনী’ বৃদ্ধির হার ১৭.৩ শতাংশ, যা ভারত ও চীনের চেয়েও বেশি। লন্ডন ও নিউ ইয়র্ক ভিত্তিক সংস্থা ওয়েলথ-এক্সের রিপোর্টে এ তথ্য উঠে এসেছে। ‘ওয়েলথ অ্যান্ড ইনভেস্টেবল অ্যাসেটস মডেল’ ব্যবহার করে রিপোর্টটি তৈরি করেছে ওয়েলথ-এক্স। পূর্ববর্তী রিপোর্টে এই তালিকার শীর্ষস্থান চীনের দখলে ছিল। কিন্তু এবার বাংলাদেশ চীনকে টপকে শীর্ষস্থান দখল করেছে। গত ৫ই সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। সেখানে নগরায়ন, অবকাঠামোগত বিনিয়োগ বেড়েছে। ফলে দেশটি উন্নতি করছে। ভিয়েতনাম ও ভারতেও এমনটি ঘটছে বলে উল্লেখ করেছে ওয়েলথ-এক্স। ‘অতি ধনী’ বৃদ্ধির হার বিবেচনায় বাংলাদেশ বিশ্বে সবার চেয়ে এগিয়ে থাকায় বিস্ময় প্রকাশ করে সংস্থাটি তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, ‘অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, নতুন ধনী তৈরির ক্ষেত্রে বৈশ্বিক পরিসরে চীন এখন আর শীর্ষে নয়। সেখানে বাংলাদেশ সবার চেয়ে এগিয়ে। ২০১২ সাল হতে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৭ শতাংশ হারে অতি ধনীর সংখ্যা বেড়েছে। ভিয়েতনাম, কেনিয়া এবং ভারতও খুব বেশি পিছিয়ে নেই।’
সংস্থাটি তাদের গবেষণা প্রতিবেদনে বলেছে, অতি ধনী মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির হারে বাংলাদেশের পরেই রয়েছে চীন। দেশটিতে ১৩.৭ শতাংশ হারে ‘অতি ধনী’ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। বৃদ্ধির হারে তালিকার প্রথম দিকে থাকা অন্য দেশগুলো হলো- ভিয়েতনাম, কেনিয়া, ভারত, হংকং ও আয়ারল্যান্ড। তবে গত ৫ বছরে বিশ্বে অতি ধনীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে চীন ও হংকংয়ে। বিপরীতে জাপান, কানাডা, ইতালি ও যুক্তরাষ্ট্রে ‘অতি ধনী’ মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির গতি মন্থর হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে অতি ধনী মানুষের সংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি। দেশটির প্রায় ৮০ হাজার মানুষ ‘অতি ধনী’। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে জাপান। সেখানে অতি ধনী মানুষের সংখ্যা ১৮ হাজার। অল্প ব্যবধানে তৃতীয় স্থানে রয়েছে চীন। দেশটিতে অতি ধনী মানুষের সংখ্যা ১৭ হাজার। তালিকায় শীর্ষ দশে থাকা অন্য দেশগুলো হলো, জার্মানি, কানাডা, ফ্রান্ড, হংকং, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড ও ইতালি।
বাংলাদেশে ‘অতি ধনী’ বৃদ্ধির হার বৃদ্ধি নিয়ে ওয়েলথ-এক্স দেয়া রিপোর্টের বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘এই তথ্যে আমি মোটেও অবাক হইনি। কারণ গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে যে একটা গোষ্ঠীর হাতে এ ধরনের সম্পদ সৃষ্টি হচ্ছে সেটা আসলে দেখাই যাচ্ছে। এই সমপদ সৃষ্টির প্রক্রিয়া তো একদিনে তৈরি হয়নি। এটা কয়েক দশক ধরেই হয়েছে। এখন এটি আরো দ্রুততর হচ্ছে।’
‘অতি ধনী’ বৃদ্ধির দৌড়ে চীন ও ভারতকে পেছনে ফেলার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘চীন এবং ভারতে এক সময় যে রকম দ্রুত অর্থনৈতিক অগ্রগতি হয়েছে, সেখান থেকে অবস্থা একটু স্তিমিত হয়ে এসেছে। সেটা একটা কারণ। আরেকটা কারণ হচ্ছে বাংলাদেশে ধনী এবং গরিবের মধ্যে যে তফাৎ, এই তফাৎ অনেক বাড়ছে। বাংলাদেশে সম্পদের একটা কেন্দ্রীভবন হচ্ছে। অর্থাৎ উপরের দিকে যারা আছে তারা সম্পদশালী হচ্ছে ক্রমান্বয়ে। নিচের দিকে যারা আছে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি যতটা না হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি উন্নতি হচ্ছে উপরের দিকে যারা তাদের। উপরের পাঁচ শতাংশের হাতে আরো বেশি করে সমপদ পুঞ্জীভূত হচ্ছে। বাংলাদেশের ‘অতি ধনীরা’ কীভাবে সম্পদ অর্জন করছেন, এ প্রশ্নের উত্তরে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, মূলত শিল্প খাত এবং সেবা খাত, এই দুটি খাতেই তারা বিনিয়োগ করছে। শিল্প খাতে তৈরি পোশাক শিল্প, ওষুধ শিল্প, জাহাজ ভাঙা শিল্প, চামড়া শিল্পে অনেকে বিনিয়োগ করেছেন। এর পাশাপাশি বাংলাদেশে এখন ভৌত অবকাঠামো সৃষ্টির একটি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এখানে অনেক বড় বড় প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। এসব প্রকল্পের সঙ্গে যারা জড়িত আছে, তাদের সবারই কিন্তু এখানে একটা সম্পদ তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। আর তার পাশাপাশি সেবা খাতেও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক-বীমা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তথ্য-প্রযুক্তিও একটি বিকাশমান খাত হিসেবে এসেছে। অতি ধনী বৃদ্ধির পেছনে দুর্নীতির কোনো ভূমিকা আছে কিনা এ বিষয়ে ড. ফাহমিদা বলেন, ‘এ সম্পর্কে তো কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তবে এশিয়া বা আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যেটা হয়, যাদের হাতে সম্পদ আসে, সেটার পেছনে রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যের একটা বড় ভূমিকা থাকে। রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য যারা পায়, বা যাদের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার যোগাযোগ থাকে, প্রাথমিকভাবে তারাই সমপদের মালিক হয়। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যেহেতু সুশাসনের অভাব থাকে বা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা থাকে, তখন এই সুযোগটা একটা বিশেষ গোষ্ঠীর হাতে রয়ে যায়। খুব ক্ষুদ্র একটা গোষ্ঠী সম্পদের মালিক হয়, যাদের সঙ্গে প্রভাবশালীদের যোগাযোগ থাকে।
প্রতিষ্ঠানটির ‘ওয়েলথ অ্যান্ড ইনভেস্টেবল অ্যাসেটস মডেলের’ মাধ্যমে ব্যক্তিগত মোট সম্পদের আনুমানিক তথ্য পাওয়া যায়। পাশাপাশি সম্পদের মালিকানা ও বিনিয়োগযোগ্য সম্পদের বিবেচনায় জনসংখ্যার তুলনামূলক একটি চিত্রও এতে উঠে আসে। বৈশ্বিকভাবে সম্পদের এ ধরনের বিশ্লেষণ ছাড়াও শীর্ষ ৭৫টি অর্থনীতির দেশে সম্পদের ব্যাপ্তি ও প্রবৃদ্ধি ওয়েলথ-এক্সের গবেষণার বিষয়বস্তু। প্রতিবেদন তৈরিতে দুটি ধাপে তথ্য বিশ্লেষণ করে ওয়েলথ-এক্স ইনস্টিটিউট। প্রথম ধাপে ইকোনমেট্রিক কৌশল ব্যবহার করা হয়। এক্ষেত্রে পুুঁজিবাজারের আকার, জিডিপি, করহার, আয় ও সঞ্চয়ের তথ্য সংগ্রহ করে তারা। তথ্যের উৎস হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি) ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পরিসংখ্যান সরবরাহকারী কর্তৃপক্ষকে। দ্বিতীয় ধাপে জনপ্রতি সম্পদের পরিমাণ হিসাব করা হয়। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সম্পদের বণ্টন সংক্রান্ত তথ্যের ঘাটতি থাকায় সংশ্লিষ্ট দেশে মানুষের আয় বণ্টনের হিসাব বিবেচনায় নেয়া হয়। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটির কাছে থাকা বিশ্বব্যাপী অত্যধিক সম্পদশালী ১ লাখ ৬০ হাজারের বেশি মানুষের তথ্যভাণ্ডার ব্যবহার করা হয়। এতে আর্থিক স্থিতি, কর্মজীবন, ঘনিষ্ঠ সহযোগী, পারিবারিক তথ্য, শিক্ষাজীবন, আগ্রহ, শখসহ সম্পদশালীদের ব্যক্তিগত বিভিন্ন তথ্য রয়েছে। পাশাপাশি অর্জিত সম্পদের বিনিয়োগ ও ব্যয়প্রবণতার তথ্যও বিবেচনায় নেয়া হয়। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্পদের প্রকৃত ও গ্রহণযোগ্য চিত্র তুলে ধরে ওয়েলথ-এক্স।