Saturday, June 15, 2019

কয়েক বছর ধরে অবাস্তব সংখ্যার বাজেট পাস হচ্ছে: আকবর আলি খান

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা আকবর আলি খান বলেছেন, বাজেটে আয়–ব্যয়ের যে সংখ্যা বলা হচ্ছে, তা অর্জন হবে না। আর সমস্যা হলো, এই সংখ্যাগুলো কতটা বাস্তব। বাজেট যখন সংসদে পেশ হবে, তখন সংখ্যাগুলো বাস্তব হওয়া উচিত। কয়েক বছর ধরে অবাস্তব সংখ্যার বাজেট পাস করা হচ্ছে। রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক ইন সেন্টারে আজ শুক্রবার সকালে ব্র্যাক বিজনেস স্কুল আয়োজিত বাজেট প্রতিক্রিয়ায় আকবর আলি খান এ কথা বলেন।
আকবর আলী খান বলেন, ‘সংসদে বাজেট নিয়ে কোনো আলোচনা হবে না। এমন কোনো সংসদ সদস্য পাওয়া যাবে না, যিনি এই বাজেটের পুরোটাই পড়বেন। প্রধানমন্ত্রীর আশীর্বাদ নিয়ে অর্থমন্ত্রী যে বাজেট উপস্থাপন করেন, তা–ই অনুমোদন হবে। অথচ আমাদের সংবিধানে বলা হয়েছে, প্রতিনিধির মতামত ছাড়া কোনো কর আরোপ করা যাবে না। তাহলে খরচের ওপরও নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে। আমাদের কর আরোপ, খরচ কোনো কিছুতেই প্রতিনিধিদের মতামত নেওয়া হচ্ছে না।’
আকবর আলি খান বলেন, বাজেটের আকার প্রতিবছর বাড়ছে। সক্ষমতার ঘাটতির মাত্রা বাড়ছে। বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা ক্রমশ দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়ে উঠছে। আগামী অর্থবছরেও এ ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হবে। তিনি বলেন, দারিদ্র্য বিমোচনের বার্ষিক গড় হার কমে আসছে। এ অনাকাঙ্ক্ষিত অবস্থা থেকে কীভাবে উত্তরণ হবে, তার কোনো ঘোষণা নেই। আবার আঞ্চলিক বৈষম্যও প্রকট। অনেক জেলায় ৫০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে। এ বৈষম্য দূর করতে কোনো উদ্যোগ বাজেটে নেই।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম বলেন, বাজেটের আকার প্রতি বছর বাড়ছে। সক্ষমতার ঘাটতির মাত্রা বাড়ছে। বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা ক্রমশ দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়ে উঠছে। আগামী অর্থবছরেও এ ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হবে। ২০০৮ সালে জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ যা হয়েছে, গত তা খুব বেশি বাড়েনি। এর কারণ জ্বালানি স্বল্পতা, দুর্নীতি অদক্ষতা, সুশাসনের অভাব, ব্যবসায় সহজীকরণে পিছিয়ে থাকা। এ নিয়ে বাজেটে তেমন কোনো ঘোষণা নেই।
মির্জ্জা আজিজ বলেন, ব্যাংক কমিশন ও আইন সংস্কারের চেয়ে বেশি প্রয়োজন আইনের যথাযথ প্রয়োগ। এখন অর্থঋণ আদালতে অনেক টাকার মামলা আটকে গেছে। এর সমাধান না করতে পারলে সমস্যা কাটবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বাজেটের চ্যালেঞ্জ হলো সমতাভিত্তিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা। যেভাবে আয় বৈষম্য বাড়ছে, সেখানে প্রবৃদ্ধি হয়ে কী হবে। পাকিস্তান আমলে ছিল, আগে প্রবৃদ্ধি পরে বিতরণ। এই বাজেটে মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্তরা চাপে পড়ে যাবে। এটা কিছুদিন পরই বোঝা যাবে।’
আইপিডিসি ফাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমদানি কমাতে বিলাসজাত পণের ওপর কর আরোপ করা যেত, সেটা হয়নি। আমরা এখন আর্থিক খাত নিয়ে সমস্যায় থাকলেও দীর্ঘ মেয়াদে শিক্ষার মান নিয়ে সমস্যায় পড়ব। কারণ চতুর্থ শিল্পবিপ্লব চলছে, ফলে যে মানের লোকবল প্রয়োজন হবে, আমরা তা গড়ে তুলছি না।’
মহাখালীতে ব্র্যাক ইন সেন্টারে ব্র্যাক বিজনেস স্কুল আয়োজিত বাজেট প্রতিক্রিয়ায় (বাঁ থেকে) আকবর আলি খান, মির্জ্জা এম আজিজুল ইসলাম, সালেহউদ্দিন আহমেদ ও মমিনুল ইসলাম। ঢাকা, ১৪ জুন। ছবি: সাজিদ হোসেন

কালো টাকা সাদা করার সুযোগ অসাংবিধানিক- টিআইবি

প্রস্তাবিত বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রাখাকে অসাংবিধানিক, বৈষম্যমূলক, দুর্নীতিবান্ধব ও প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত শূন্য সহনশীলতার পরিপন্থি বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। শুক্রবার এক বিবৃতিতে বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানোসহ কয়েকটি উদ্যোগকে সাধুবাদ জানালেও সামগ্রিকভাবে ক্রমবর্ধমান সম্পদ ও আয়বৈষম্য নিরসনে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব না রেখে বরং অনিয়ম ও দুর্নীতির মহোৎসবের অবারিত সুযোগ সৃষ্টি করায় সম্পদ ও আয়বৈষম্য আরো বাড়বে বলে মন্ত্তব্য করে সংস্থাটি। টিআইবি বলছে, কালো টাকা ব্যবহারের সুযোগপ্রাপ্ত খাতে দুর্নীতির একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হবে, সৎপথে এসব খাতে আয় ও সম্পদ আহরণের সুযোগ ধূলিসাৎ হবে; এর প্রভাবে দুর্নীতির বিস্তৃতি ও গভীরতা আরো বৃদ্ধি পাবে। অন্যদিকে, সংকটাপন্ন ব্যাংক খাতের সংস্কারে কার্যকর কোনো পথ নির্দেশ বা পরিকল্পনা না থাকায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে টিআইবি।
২০১৯-২০২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের প্রতিক্রিয়ায় টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বিবৃতিতে বলেন, সুশাসন ও ন্যায্যতার পরিপন্থি হলেও দফায় দফায় কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিয়ে এসেছে একের পর এক সরকার। সংবিধানের ২০ (২) অনুচ্ছেদের সুনির্দিষ্ট লঙ্ঘন ও দুর্নীতির প্রতি প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত শূন্য সহনশীলতার পরিপন্থি হলেও এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে এই অনিয়মকে বাদ না দিয়ে বরং এর পরিধি আরো বাড়ানো হয়েছে। ফ্ল্যাটের পাশাপাশি এবার জমি কেনাকেও যোগ করা হয়েছে। এছাড়া বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্কে শিল্প স্থাপনে ১০ শতাংশ কর দিয়ে অপ্রদর্শিত আয় বিনিয়োগ করা যাবে।
তদুপরি এবার প্রথমবারের মত এই অবৈধটাকে পাঁচ বছরের জন্য বৈধতার প্রস্তাব করা হল। অর্থাৎ দুর্নীতির মহোৎসব ও বিচারহীনতাকে পাঁচ বছর মেয়াদি লাইসেন্স দেয়া হল।
বিবৃতিতে বলা হয়, চরম হতাশাজনক হলেও প্রশ্ন ওঠে, তাহলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর শূন্য সহনশীলতার ঘোষণার প্রতি শ্রদ্ধা জানাবার মত কি কেউ নেই সরকারি অঙ্গনে? কি হবে এই অঙ্গীকারের? এ উদ্যোগ যেমন অসাংবিধানিক তেমনি অনৈতিক, বৈষম্যমূলক এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের নামান্তর।
কেবলমাত্র ১০ শতাংশ হারে কর দিয়ে অবৈধটাকে বৈধতা দেয়ার অর্থ সমাজে বৈধভাবে উপার্জন করাকে নিরুৎসাহিত করা, যা অন্যদিকে চরম বৈষম্যমূলক, কারণ সৎপথে উপার্জনকারীকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কর দিতে হয়। দুর্নীতির কাছে রাষ্ট্রের এই আত্মসমর্পন কীভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে তা সরকারকে অনুধাবন করতে আহ্বান জানাই। অন্যদিকে, রেকর্ড পরিমান খেলাপি ঋণ, অনিয়ম, দুর্নীতি ও যোগসাজশের অপসংস্কৃতিতে ধুঁকতে থাকা সংকটাপন্ন ব্যাংক খাতের সংস্কারে বাজেটে সুনির্দিষ্ট কোন উদ্যোগ না থাকায় তা এ খাতকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাবে।
ড. জামান বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে তৈরি পোশাক শিল্প সংশ্লিষ্ট খাতে জনগণের করের টাকায় নতুন করে বাড়তি প্রণোদনার যে প্রস্তাব করা হয়েছে তা এ খাতের শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষায় কি কোনো ভূমিকা রাখবে এবং তা কীভাবে, সে ব্যাপারে সরকার, বা যাদের চাপে এটা করা হলো তাদের কোনো বিবেচনা রয়েছে এমন ইঙ্গিত নেই।
ক্রমবর্ধমান রাষ্ট্রীয় ঋণের বিষয়ে উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশাল অঙ্ক ব্যয়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে এমন বৃহৎ প্রকল্পসমূহে অর্থের যথার্থ ব্যয় এবং কার্যকর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতে প্রস্তাবিত বাজেটে সুনির্দিষ্ট দিক-নির্দেশনা ও প্রস্তাবনা না থাকা অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকারের ‘শূন্য সহনশীলতা’ অঙ্গীকারের সাথে সাংঘর্ষিক। রাষ্ট্রীয় ঋণের বোঝা বাস্তবিক অর্থে দেশের সাধারণ নাগরিকদেরই বইতে হয়। তাই প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থের ব্যবহারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতে সুনির্দিষ্ট কৌশলগত দিক-নির্দেশনার দাবি জানাই। এছাড়া, প্রতিরক্ষা খাতে বিশাল বরাদ্দের সমর্থনে যা-ই থাকুক, জনগণের এ অর্থ ব্যয়ের খাতওয়ারি কোনো তথ্য বা বিশ্লেষণের সুযোগ প্রতিবারের মত এবারও জনগণকে দেয়া হয় নাই যা এ বিষয়ে জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য অপরিহার্য।
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড (বিসিসিটিএফ) এর জন্য কোন বরাদ্দ না করায় হতাশা প্রকাশ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির প্রেক্ষিতে বাজেটে কোন বরাদ্দ না রাখাটা একবারেই অযৌক্তিক এবং উল্টো পথে হাঁটার সামিল। সুতরাং বিসিসিটিএফে কমপক্ষে ১,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ নিশ্চিত করার পাশাপাশি জলবায়ু বাজেটে ঝুঁকিপূর্ণ খাত ও এলাকা চিহ্নিতকরণ ও অগ্রাধিকারসহ ব্যয়িত অর্থের ব্যবস্থাপনা এবং ব্যবহারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতে কৌশলগত দিক-নির্দেশনার দাবি জানাচ্ছি।

বাজেট জনকল্যাণমূলক: যাদের মানসিক অসুস্থতা থাকে তাদের কিছুই ভালো লাগে না -প্রধানমন্ত্রী

সংসদে অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা পড়ে শোনানোর পর এবার বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনেও কথা বললেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে সংবাদ সম্মেলনে বাজেট নিয়ে বক্তব্য তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। জবাব দেন বিভিন্ন  প্রশ্নের। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল অসুস্থতার কারণে বৃহস্পতিবার পুরো বাজেট বক্তৃতা উপস্থাপন করতে পারেননি। শুক্রবার বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনেও আসতে পারেননি অর্থমন্ত্রী।
বিকাল তিনটায় রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বাজেট পরবর্তী প্রতিক্রিয়ার দিকে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের দেশে কিছু লোক থাকে, যাদের একটা মানসিক অসুস্থতা থাকে, তাদের কিছুই ভালো লাগে না। আপনি যত ভালো কাজই করেন, তারা কোনো কিছু ভালো খুঁজে পায় না। এটা ভালো না লাগা পার্টির অসুস্থতা।
গতকাল সকালে গবেষণা সংস্থা সিপিডির ‘বাজেট পর্যালোচনা’ অনুষ্ঠানে বলা হয়, দেশের মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্তের মানুষ নয়, যারা ধনী এবং ‘অর্থনৈতিক অপশাসনের সুবিধাভোগী’, তারাই নতুন অর্থবছরের বাজেট থেকে সুবিধা পাবে। প্রধানমন্ত্রীর বাজেট পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে একজন সাংবাদিক এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ এই বাজেটে খুশি কি না, বাজেটে তাদের উপকার হচ্ছে কি না- সেটাই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা জনকল্যাণমুলক বাজেট দিয়েছি।
তিনি বলেন, যখন দেশে একটা গণতান্ত্রিক পদ্ধতি থাকে, যখন দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি হয়, সাধারণ মানুষের উন্নতি হয়, তখন তারা কোনোকিছুই ভালো দেখে না। সব কিছুতেই কিন্তু খোঁজে। সিপিডি কী গবেষণা করে এবং তারা দেশের জন্য কী আনতে পেরেছে-সেই প্রশ্ন রেখে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারপরও তাদের একটা কিছু বলতে হবে। তো সেটা ভালো এত সমালোচনা করেও আবার বলবে-আমরা কথা বলতে পারি না। এ রোগটাও আছে। এটা অনেকটা অসুস্থতার মত। বাজেট নিয়ে সমালোচনার জবাব দিতে গিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আমার কথা হচ্ছে, সাধারণ জনগণ খুশি কি না। সাধারণ মানুষ খুশি কি না। সাধারণ মানুষগুলির ভালো করতে পারছি কি না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার এবার নিয়ে টানা ১১ বারের মত বাজেট দিল। আমরা যা করছি, তার সুফলটা কিন্তু মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে। আর এই ভালো না লাগা পার্টি যারা, তাদের কোনো কিছুতেই ভালো লাগবে না। সমালোচকদের জবাব দিতে গিয়ে একটি বাংলা কৌতুকের কথাও মনে করিয়ে দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, একটা গল্প আছে না, পড়াশোনা করছে ছেলে, বলা হলো পাস করবে না; পাস করার পরে বললো চাকরি পাবে না; চাকরি পাওয়ার পর বললো বেতন পাবে না; বেতন পাওয়ার পরে বললো বেতনের টাকা চলবে না। তো উনাদের সেই অসুস্থতা।
আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, সরকার দেশকে দারিদ্র্যমুক্ত করতে, উন্নত করতে, সমৃদ্ধশালী করতে এবং স্বাধীনতার সুফল যেন দেশের মানুষের ঘরে পৌঁছায়, সেই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। আমরা মনে করি, সেই লক্ষ্যে যথেষ্ট অগ্রগতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি। এখন বাইরে গেলে আগে যারা মনে করত আমরা ভিক্ষুকের জাত হিসেবে যাচ্ছি, এখন আর কেউ তা মনে করে না। এটাই হচ্ছে আমাদের সব থেকে বড় অর্জন। যারা সমালোচনা করার তারা করে যাক, ভালো কথা বললে আমরা গ্রহণ করব, মন্দ কথা বললে আমরা ধর্তব্যে নেব না। পরিষ্কার কথা। সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে এবারের বাজেটের বিভিন্ন দিক এবং সরকারের পরিকল্পনার কথা সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। পরে বাজেট নিয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। দেশে ক্রমাগত খেলাপী ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পত্রিকার মালিকরা কে, কোন ব্যাংক থেকে কত টাকা ঋণ নিয়েছেন এবং তা শোধ করেছেন কি না- সেই খোঁজ নেয়া উচিত। প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলেন, আপনারা দয়া করে সমস্ত ব্যাংকগুলো থেকে এ তথ্যটা আগে বের করেন। যত মিডিয়া এখানে আছে, যত পত্রিকায় কাজ করেন, প্রত্যেকে ব্যাংকে গিয়ে বলবেন, আমি অনুরোধ করেছি। আপনাদের প্রশ্নের জবাবে, কোন মালিক, কোন ব্যাংকের কত টাকা ঋণ নিয়ে কত টাকা সুদ দেয়নি বা খেলাপি হয়েছে; এখানে একটা হিসাব বের করলে আমাকে আর প্রশ্ন করতে হবে না।
আর মালিকদের বলেন, তাদের ঋণ খেলাপির টাকাগুলো পরিশোধ করতে, তাহলে আর খেলাপি থাকবে না। বর্তমান সরকারের আমলে অনেক ক্ষেত্রে সাফল্য থাকলেও ঋণখেলাপিদের কেন নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, যেহেতু আমাদের সুদের হার বেশি, চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ হয়, আর যখন হিসাবটা করা হয় তখন চক্রবৃদ্ধি হারে যেটা বলা হলো সেটা ধরে সুদসহ হিসাব দেয়া হয়। ফলে ঋণের পরিমাণটা দেখায় অনেক বড়। প্রকৃত ঋণটা যদি ধরা হয় তাহলে দেখা যাবে ঋণ তত বড় নয়। এর পেছনে নিশ্চয়ই বড় কোনো উদ্দেশ্য আছে যার ফলে চক্রবৃদ্ধি সুদসহ খেলাপি ঋণের পরিমাণ ধরা হয়। তবে খেলাপির ঋণের পরিমাণ যেন নিয়ন্ত্রণে থাকে সেজন্য সরকার ব্যবস্থা নিচ্ছে। কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়ায় সৎ ব্যক্তিরা হতাশ হবেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ সুযোগ দেয়া হয়েছে যাতে অর্থপাচার না হয়। অপ্রদর্শিত টাকা অনেকে পাচার করতে চান। সেই টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেয়া হচ্ছে। কালো টাকার স্তুপ যেন না জমে, তা যেন কাজে আসতে পারে, সেজন্য এ সুযোগ। তবে এজন্য যারা সৎ পথে উপার্জন করেন তাদের হতাশ হওয়ার কিছু নেই।
যারা সৎ থাকেন তাদের যাতে সুবিধা হয় তা আমরা দেখব। বাজেট বক্তব্যে উল্লেখ করা সোনালী যুদ্ধ বলতে কি বোঝাতে চাইছেন এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশকে উন্নতির সোপানে পৌঁছে দিতে আমার সরকার কাজ করছে। দেশকে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ করে গড়ে তোলার যে যুদ্ধ সেটাই সোনালী যুদ্ধ। ২০৩০ সালের মধ্যে ৩ কোটি লোককে কিভাবে কর্মসংস্থান করা হবে এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে তিন কোটি কর্মসংস্থানের কথা আমরা বলেছি, চাকরি দেয়ার কথা বলিনি। ১০০ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ রেখেছি। বাজেটে শিক্ষার কথা বলেছি; প্রযুক্তিগত শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, ভোকেশনাল ট্রেনিং। আর আমরা চাই ট্রেনিং নিয়ে শিক্ষিত হয়ে নিজের কাজ নিজে করতে শিখুক। তিনি বলেন, ৩ কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ আছে। আর আছে বলেই আজ ধান কাটার লোক পাওয়া যায় না। ধান কাটার জন্য এখন লোক পাওয়া যাচ্ছে না কেন? যদি এত বেশি বেকার থাকে; তাহলে ধান কাটার লোকের অভাব হতো না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, একজন মানুষ একদিন ধান কাটলে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পাবে। আবার তিন বেলা খাবার, দুই বেলা খাবে আর এক বেলা আবার বাড়ি নিয়ে যাবে। এরপরও কৃষক ধান কাটার জন্য লোক খুঁজে পায় না। কর্মসংস্থানের সুযোগ আছে বলেই এখন ধান কাটার লোকের অভাব হচ্ছে। আমরা কর্মসংস্থানের কথা বলি, আর সবার ধারণা হয়ে যায় চাকরি দেয়া। ১৬ কোটি মানুষকে কি চাকরি দেয়া যায়? পৃথিবীর কোনো দেশ দেয়? কর্মসংস্থান হচ্ছে, মানুষ যেন কাজ করে খেতে পারে, সেই সুযোগটা সৃষ্টি করা।
ব্যাংকের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সিঙ্গেল ডিজিট সুদে ঋণ দেয়ার ব্যাপারে ব্যাংকগুলোকে যে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে তা মেনে চলতে হবে। আমরা সবসময় চেষ্টা করেছি, যাতে সুদটা সিঙ্গেল ডিজিটে থাকে। এ জন্য ব্যাংকগুলোকে সুবিধাও দিয়েছি। কিন্তু অনেক বেসরকারি ব্যাংক সেটা মানেনি। এবার বাজেটে নির্দেশনা দেয়া আছে। এ ব্যাপারে কঠোর অবস্থানে যাওয়া হবে। সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় চার নেতা ও পঁচাত্তরের ১৫ই আগস্ট নিহতদের স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রশ্নোত্তরের আগে দেয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশ অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নেয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেট সেই লক্ষ্যমাত্রার পথে বাংলাদেশকে নিয়ে যাবে। বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৫ শতাংশের মধ্যে রাখা হয়েছে। কৃষি খাতের উন্নয়নে ২০ শতাংশ প্রণোদনা অব্যাহত থাকবে। ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ দেয়া হবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের ৯৩ শতাংশ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে। উৎপাদন ক্ষমতা ২১ হাজার ১৬৯ মেগাওয়াট। শতভাগ মানুষ বিদ্যুৎ পাবে। গ্রামের উন্নয়নে সরকারের বিশেষ দৃষ্টি অব্যাহত থাকবে জানিয়ে তিনি বলেন, গ্রাম হবে আধুনিক শহর। তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়ন আরও গতি পাবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দ্রুততম সময়ে ফাইভ-জির ব্যবস্থা করা হবে। বাজেট পরবর্তী এই সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর পাশেই বসেছিলেন সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এছাড়া শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন, পরিকল্পনামন্ত্রী আব্দুল মান্নান, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির, এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূইয়া উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানের সঞ্চালনায় ছিলেন অর্থ সচিব আবদুর রউফ তালুকদার।

লজিং থাকা সেই ছেলেটির হাতে আজ দেশের বাজেট by মোহাম্মদ ওমর ফারুক

ইন্টারমিডিয়েটের ফরম-ফিলাপের টাকা জোগাড়  করতে পারেননি তার বাবা। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে ঢাকা আসবার সময় পকেটে ট্রেন ভাড়াটাও ছিল না। তাই টানা দুই দিন ধরে কখনো হেঁটে ,কখনো ট্রেনের চেকারকে ফাঁকি দিয়ে কুমিল্লা থেকে ঢাকায় পড়তে আসতেন তিনি, পড়াশোনার চালাতে গিয়ে  অন্যের বাসায়  থেকেছেন লজিং। আজ সেই অন্যের বাড়িতে লজিং থাকা ছেলেটির হাতে সারা দেশের বাজেট।  বলছি দেশের ১১ তম অর্থমন্ত্রী  আ হ ম মুস্তফা কামালের  কথা। এটি অর্থমন্ত্রী হিসেবে তার প্রথম বাজেট। আর বাংলাদেশের ৪৯তম, আওয়ামী লীগ সরকারের টানা তৃতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর চলতি মেয়াদের প্রথম ও টানা ১২ তম বাজেট।  প্রাথমিকভাবে আসছে বাজেটের মোট ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১৮ দশমিক ১ শতাংশ।
৭২ বছর বয়সী এই অর্থমন্ত্রীর কাছে  সফলতার গল্প শুনতে চাইলে তিনি প্রায়ই বলেন, জীবন তো শুরুই হলো না। জীবনে আরো অনেক কাজ বাকি। আমাকে আরো কাজ করতে হবে।
চলুন জেনে নেয়া যাক তার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার নিয়ে। কুমিল্লার সন্তান মুস্তফা কামালের  শিক্ষার্থী জীবনে ছিলেন প্রচন্ড মেধাবী। ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের (তদানীন্ত পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান) মধ্যে সম্মিলিত মেধা তালিকায় চার্টার্ড একাউন্টেন্সি পরীক্ষায় প্রথম স্থান লাভ করে সর্বোচ্চ কৃতিত্বের রেকর্ড অর্জন করেন।  তিনি দুই দশকের অধিক সময় আবাহনী ক্রিকেট কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি দেশের একজন খ্যাতনামা হিসাব বিজ্ঞানীও।
কুমিল্লার লালমাই উপজেলার বাগমারা ইউনিয়নের দত্তপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাইমারি শিক্ষা শেষে বাগমারা উচ্চ বিদ্যালয় হতে ১৯৬২ সালে এসএসসি, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ হতে এইচএসসি, ১৯৬৪-’৬৭ সালে চট্টগ্রাম সরকারি বাণিজ্যিক কলেজ হতে বি.কম (অনার্স) ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬৭-’৬৮ শিক্ষাবর্ষে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে হিসাব বিজ্ঞান ও আইন বিভাগে কৃতিত্বের সাথে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন। মেধাবী এ নেতা ১৯৭০ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের (পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্তান) চার্টার্ড একাউনটেন্সী পরীক্ষায় মেধা তালিকায় সম্মিলিতভাবে প্রথম স্থান অর্জন করেন। পাকিস্তানের চার্টার্ড একাউন্টেন্সী পরীক্ষায় তিনিই একমাত্র বাঙ্গালী যিনি প্রথম স্থান অধিকার করার এক বিরল কৃতিত্বের অধিকারী। দুই পাকিস্তানের রেকর্ড সংখ্যক মার্ক নিয়ে পাস করে ‘লোটাস’ খ্যাতি পাওয়া সনদপ্রাপ্ত হিসাববিজ্ঞানী (চাটার্ড একাউন্ট্যান্ট) । চার্টার্ড একাউন্টেন্সি পরীক্ষায় প্রথমস্থান অর্জন করেছিলেন  তিনি।
মেধাবী  এই নেতার রাজনীতির হাতের খড়ি ছাত্রজীবন থেকেই।  কলেজ জীবনের পুরোসময়ই তিনি ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন, ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান এবং ৭০’র ঐতিহাসিক নির্বাচনের সময় তিনি আওয়ামী লীগের একজন নিবেদীত সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়নে প্রার্থী হয়ে ১৯৯৬ সালে তৎকালীন কুমিল্লা-৯ সদর দক্ষিণ (যা বর্তমানে কুমিল্লা-১০ সদর দক্ষিণ, লালমাই, নাঙ্গলকোট) সংসদীয় আসন থেকে প্রথমবারের মত সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এ সময়ে তিনি পাবলিক একাউন্টস কমিটির সদস্য, বিনিয়োগ বোর্ডের সদস্য, প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের সদস্য, অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য, যাকাত  বোর্ডের  সদস্য এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৪ সাল থেকে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে অর্ন্তভুক্ত আছেন। ২০০৬ সালের ১২ মে থেকে তিনি কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব লাভ করেন। পরবর্তীতে ২০১৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে তিনি কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
তিনি ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-১০ নির্বাচনী এলাকা থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে প্রার্থী হয়ে দ্বিতীয় বারের মত সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৯ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত তিনি অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তিনি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-১০ আসন থেকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মনোনয়নে প্রার্থী হয়ে তৃতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সর্বশেষ গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি একই আসন থেকে চতুর্থবারের মত সংসদ সদ্য হিসেবে বিজয়ী হন। আ হ ম মুস্তফ কামাল ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে সরকারের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।
তাঁর পরিবারে ৩ ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। তাঁর স্ত্রী কাশমেরী কামাল একজন সফল ব্যবসায়ী। তার দু’টি  কন্যা সন্তার রয়েছে। এর মধ্যে বড় মেয়ে কাশফী কামাল স্বপরিবারে প্রবাসী এবং ছোট মেয়ে নাফিসা কামাল তাঁর বাবার মতো ক্রীড়ানুরাগী ও কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের চেয়ারপার্সন। তার মেয়েও ক্রিকেটপ্রেমী হিসেবে সারা দেশে এবং বিশেষ করে কুমিল্লায় বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছেন।
অর্থমন্ত্রী শুধু রাজনীতি বা পড়াশোনা নিয়েই থাকেননি। খেলাধুলার প্রতি রয়েছে অসম্ভব ভালোবাসা।  বাংলাদেশ ও আর্ন্তজাতিক  ক্রিকেটে রয়েছে  তার  ব্যাপক পরিচিতি। তিনি ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর দায়িত্বকালে বাংলাদেশে ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ক্রিকেট সারা বিশ্বে প্রশংসিত হয়। তিনি গত ৩০ বছরেরও অধিক সময় ক্রিকেটের সাথে সম্পৃক্ত। এ সময়ে তিনি ক্রিকেটের উন্নয়নে বিভিন্ন দায়িত্বে থেকে প্রশংসনীয় অনেক উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। ২০১৪ সালের ১লা জুলাই থেকে তিনি আইসিসি’র নির্বাচিত সভাপতি হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এর আগে তিনি আইসিসি’র সহ-সভাপতি, অডিট কমিটির সভাপতি এবং এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৫ সালে তিনি আইসিসি প্রেসিডেন্টের পদ ত্যাগ করে বিশ্বজুড়ে বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন।

এলিয়েন কি চলেই এল?

অনেক সাই-ফাই ছবিতেই ভিনগ্রহের অধিবাসী বা এলিয়েনদের দেখানো হয়ে থাকে। এবার বুঝি সত্যি সত্যিই তাদের দেখা মিলল! যুক্তরাষ্ট্রের এক বাসিন্দা বলেছেন, তাঁর বাসার সিসিটিভি ক্যামেরাতে নাকি দেখা গেছে এক অদ্ভুত প্রাণীকে।
সিসিটিভি ক্যামেরাতে অদ্ভুত প্রাণী দেখার ঘটনার ভিডিওচিত্র প্রকাশিত হয়েছে ইন্টারনেটে। এরই মধ্যে তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির খবরে বলা হয়েছে, ভিভিয়ান গোমেজ নামের এক মার্কিন নাগরিক তাঁর বাসার সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ করা একটি ভিডিওচিত্র প্রকাশ করেছেন। তাতে দেখা গেছে, হ্যারি পটার সিরিজের চলচ্চিত্রে দেখানো কল্পিত প্রাণী ‘এলফ’-এর মতো কিছু একটা ভিভিয়ানের গাড়ির পাশ দিয়ে দুলে দুলে হাঁটছে। এই ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে আপলোড করেন ভিভিয়ান। এরপরই সাড়া পড়ে যায়। ফেসবুকে ভিডিওটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে ভিডিওটি শুধু ফেসবুকেই দেখা হয়েছে ৯০ লাখ বার। পরে ভিডিওটি আলাদাভাবে টুইটারেও আপলোড করা হয়। টুইটারে এখনো পর্যন্ত ৩ কোটিবার!
ফেসবুকে ভিভিয়ান গোমেজ লিখেছেন, ‘গত রোববার ভোরে ঘুম থেকে উঠে আমি বাসায় লাগানো সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ দেখছিলাম। হঠাৎ দেখি এই প্রাণীটি গাড়ির পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। প্রথমে আমি সদর দরজার ওপরে লাগানো ক্যামেরায় এর ছায়া দেখতে পেয়েছিলাম, পরে অন্য ক্যামেরায় পুরোটা দেখি...কেউ কি তাঁদের ক্যামেরায় কখনো এমন কিছু দেখেছেন?’ তবে ভিভিয়ান এও বলেছেন যে, কিছু কারণে অন্য দুটি ক্যামেরায় প্রাণীটির ছবি ওঠেনি।
এদিকে এই ভিডিওচিত্র নিয়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে তোলপাড় শুরু হয়েছে। অনেকে বলছেন, এই ভিডিওটি ভুয়া। তবে তাদের সন্দেহের জবাবে ভিভিয়ানের দাবি, এই ভিডিও শতভাগ সঠিক। এতে কোনো গ্রাফিকসের কৌশল খাটানো হয়নি।
সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে বেশির ভাগ ব্যবহারকারীই বলছেন, হ্যারি পটার সিরিজের কল্পিত প্রাণী (এলফ) ‘ডোবি’কেই নাকি দেখা গেছে ভিভিয়ানের ভিডিওতে! এ নিয়ে কেউ কেউ আবার নানা তত্ত্বও হাজির করছেন।
ভিভিয়ান গোমেজের সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ে সেই অদ্ভুত প্রাণী। ছবিটি ফেসবুক থেকে নেওয়া

বাজেট: ২০১৯-২০, অর্থনৈতিক অপশাসনের সুবিধাভোগীদের পক্ষে গেছে -সিপিডি

মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত মানুষ নয়, অর্থনৈতিক অপশাসনের সুবিধাভোগীরাই প্রস্তাবিত বাজেটে সুবিধা পাবে বলে মনে করে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ। গতকাল বাজেট পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটি বলেছে, প্রস্তাবিত বাজেটে মধ্যবিত্ত ও বিকাশমান মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্তের মানুষ খুব বেশি উপকৃত হবে না। ফলে সমাজে বৈষম্য আরো বাড়বে। নির্বাচনের আগে দেয়া সরকারের প্রতিশ্রুতিও বাজেটে প্রতিফলিত হয়নি বলে মনে করে সিপিডি। রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে গরিব মানুষের জীবনমানের উন্নয়নে কাজ করার যে প্রতিশ্রুতি ছিল, তার প্রতিফলন এ বাজেটে দেখা যাচ্ছে না। এছাড়া তা পূরণের স্পষ্ট কোনো রূপরেখা বা কর্মসূচি বাজেটে রাখা হয়নি।
সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনা করেন সিপিডির ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। এ সময় সংলাপ পরিচালক আনিসাতুল ফাতেমা ইউসুফ, জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খানসহ গবেষকরা উপস্থিত ছিলেন।
ড. দেবপ্রিয় বলে, দেশের প্রবৃদ্ধি বাড়ছে, কিন্তু গরীব মানুষের মধ্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে সক্ষমতা বাড়ছে না।
বরং আয় বৈষম্য, ধনের বৈষম্য, ভোগের বৈষম্য বাড়ছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে এটা আরো প্রকট হচ্ছে। যারা অর্থনৈতিক অপশাসনের সুবিধাভোগী, এই বাজেট এবারও তাদের পক্ষেই গেছে। কারণ পরিবর্তনের জন্য যে রাজনৈতিক অঙ্গীকার বা অর্থনৈতিক কৌশল প্রয়োজন, তা বাজেটে নেই, অথচ তা ইশতেহারে ছিল। এটাই পরিতাপের বিষয়।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে যে ধরনের চাপ এই মুহূর্তে সরকারের আছে, সেই ‘চাপের স্বীকৃতি’ অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় নেই।
যেহেতু সমস্যাটারই স্বীকৃতি নাই, সেহেতু উনারা কোনো অভিনব কৌশল খোঁজেননি। মুদ্রানীতির ভেতরে, বাণিজ্যনীতির ভেতরে অথবা ভর্তুকি বিতরণের ক্ষেত্রে- কোনো ক্ষেত্রেই সেই ধরনের অভিনবত্ব নাই। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশহারে কী কী ছিল, বাজেটে তার কোন বিষয়ে কী আছে- সেই আলোচনা তুলে ধরা হয় সিপিডির পর্যালোচনায়।  দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে গরিব মানুষের জীবনমানের উন্নয়নে কাজ করার যে প্রতিশ্রুতি ছিল, তার প্রতিফলন এ বাজেটে দেখা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ আগামীতে পৌঁছে দেয়ার যে অঙ্গীকার নির্বাচনী ইশতেহারে ছিল, তা পূরণের স্পষ্ট কোনো রূপরেখা বা কর্মসূচি অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের প্রথম বাজেটে রাখা হয়নি বলে মন্তব্য করেন দেবপ্রিয়।তিনি বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয় সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ধরে ধরে এ বাজেট তৈরি করেছে বলে সিপিডি মনে করতে পারছে না। গৎ বাঁধা কিছু ভালো কথা থাকে, সেই কথাগুলো আছে। সেই কথাগুলো যখন আছে, সেগুলোর আবার কর্মসূচি নেই। এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, বাজেট প্রস্তাবে অর্থমন্ত্রী তিন কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনার কথা বলেছেন। কিন্তু কোন খাতে কত দিনে কতজন করে কাজ পাবে- তার কোনো প্রাক্কলন বাজেটে নেই।
বাজেটে বলা হয়েছে করদাতার সংখ্যা ১ কোটিতে উন্নীত করা হবে। কিন্তু কত বছরে, কীভাবে তা হবে এবং তার মাধ্যমে কত টাকা রাজস্ব আসবে- সে বিষয়ে কোনো রূপরেখাও বাজেটে নেই।  তিনি বলেন, বাতাসের ভেতরে কিছু আশ্বাসের বাণী হয়ত গেছে। আমরা মনে করি না সে রকম বাস্তবভাবে সেগুলো এসেছে। বাজেট নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড আর অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্যের মধ্যে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকার তফাৎ পাওয়ার কথা বলা হয় সিপিডির বাজেট পর্যালোচনায়। ফলে বাজেট নিয়ে স্বচ্ছতার অভাব থেকে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করেন দেবপ্রিয়।
তথ্যের ‘সামঞ্জস্যহীনতার’ উদাহরণ দিতে গিয়ে দেবপ্রিয় বলেন, ট্যাক্সের যে উৎসে কর কাটা হবে, সেটার স্ল্যাবগুলো কী হবে, সেটা বক্তৃতার ভেতরে আছে ২৫ লাখ টাকা। আর এনবিআর হিসাব দিয়েছে ১৫ লাখ টাকা। এখানে সমস্যা রয়ে গেছে।
তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতের ভূমিকার ক্ষেত্রে নতুন কিছু পাচ্ছি না। বৈদেশি আয়-ব্যয়ে ঘাটতি সৃষ্টি হচ্ছে, বাজেটে সেই বিষয়ে কোনো সচেতনতা লক্ষ্য করছি না। আর্থিক খাতের সংস্কার, ব্যাংক খাতের সুশাসন, পুঞ্জিভূত খেলাপি ঋণ নিয়ে এবারের বাজেটে কী পরিকল্পনা থাকছে, তা ছিল সবার আগ্রহের বিষয়।
মন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে দেবপ্রিয় বলেন, ব্যাংকিং খাতকে একটা আলোচ্য বিষয় বানিয়ে দিল! সেটার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে আলোচনায় সময়ক্ষেপনের ভেতরে চলে গেল আর কি। পুরো জিনিস ব্যাংক কমিশনের ?বিষয়। কোনো সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা স্বীকৃতিতে আসল না। সামষ্টিক বাজেট কাঠামো নিয়ে তিনি বলেন, অর্থমন্ত্রী এবার অনেক লক্ষ্যের ক্ষেত্রেই বাস্তবমুখী হয়েছেন। ফলে আগের দু-একটি বছরের তুলনায় রাজস্ব ও বিনিয়োগ লক্ষ্যমাত্রা কম। তিনি কর-বহির্ভূত আয় বাড়ানোর উদ্যোগ, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে উন্নয়ন ব্যয় ৭ শতাংশ রাখা, শত শত নতুন প্রকল্প না নেয়াসহ কয়েকটি ক্ষেত্রে অর্থমন্ত্রীকে সাধুবাদ জানান। পুঁজিবাজারে নেয়া পদক্ষেপ নিয়েও প্রশ্ন নেই বলে উল্লেখ করেন। তবে সুশাসন ছাড়া পুঁজিবাজারের পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। ভ্যাট আইনে জরুরি সেবা ও পণ্যে ছাড় দেয়ার বিষয়টিও ঠিকই আছে বলে উল্লেখ করেন।
সারচার্জের ক্ষেত্রে সম্পদশালীদের যে ছাড় দেয়া হয়েছে তা সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে মেলে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। সম্পদের পরিমাণ আড়াই কোটি টাকার নিচে হলে সারচার্জ দিতে হত না। অর্থমন্ত্রী এখন সেই সীমা বাড়িয়ে ৩ কোটি টাকা করার কথা বলেছেন। ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট কেনা এবং ভবন নির্মাণে বিনিয়োগের মত অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্কে শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রেও বাজেটে কালো টাকা সাদা করার যে প্রস্তাব রাখা হয়েছে, সে বিষয়েও কথা বলেন দেবপ্রিয়।
তিনি বলেন, অঘোষিত আয় ও বেআইনি আয়কে আলাদা করার সময় এসেছে।
প্রশ্নোত্তর পর্বে দেবপ্রিয় বলেন, এটা স্বচ্ছ যে, বাজেট উচ্চ আয়ের মানুষকে অনেক বেশি সুযোগ দিচ্ছে। অল্প আয়ের মানুষের জন্য প্রান্তিকভাবে একধরনের একটা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত, বিশেষ করে বিকাশমান মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত এটা থেকে খুব বেশি উপকৃত হবে না।
শিক্ষা-স্বাস্থ্যে ব্যয় মোট জিডিপি অনুপাতে বৃদ্ধি না পাওয়ার বিশ্লেষণ তুলে ধরে তিনি বলেন, যারা ব্যাংকক-সিঙ্গাপুরে গিয়ে শিক্ষা নিতে পারে না ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে পারে না, তাদের জন্য আপনি কী ব্যবস্থা নিচ্ছেন? গণপরিবহন সংকটে যারা, তাদের জন্য গণপরিবহন তৈরি হচ্ছে কি না, তাদের শিশুরা সে রকম মানে উচ্চ শিক্ষা পাচ্ছে কি না, এটিই বড় বিষয়।
দেবপ্রিয় বলেন, উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে যাওয়া নির্ভর করছে বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের জন্য আমরা কী করতে পারব, তার ওপর। বিকাশমান মধ্যবিত্তই হলো চালিকাশক্তি। চিন্তা-চেতনা, উপার্জন, বুদ্ধিমত্তা, সব ক্ষেত্রে এটি হলো চালিকা শক্তি। সেই চালিকা শক্তিকে যদি বাদ দেয়া হয়, তাহলে তা ইশতেহারের চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
যে সমাজে বৈষম্য বৃদ্ধি পায়, সে সমাজ আজ হোক কাল হোক টেকে না, এগোতে পারে না বলে মন্তব্য করেন দেবপ্রিয়। তিনি বলেন, যেভাবে বাংলাদেশে বৈষম্য বাড়ছে, তাতে ৭, ৮, ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি টেকানো কষ্টকর হবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা এসেছে বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে।
করদাতার সংখ্যা ১ কোটিতে উন্নীত করা ও তিন কোটি কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যের বিষয়ে বলতে গিয়ে বায়বীয় শব্দটি ব্যবহার করেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, আপনারা বলছেন যে করদাতার সংখ্যা ১ কোটি হবে, বলা হয়েছে শিগগিরই হবে। শিগগিরই কবে? কালকে? তিন বছর পর? ৫ বছর পর? কবে। এটা যতক্ষণ না বলা হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি অর্থনীতিবিদ হিসেবে আশ্বস্ত হই না। সাধারণ নাগরিক খুশি হতে পারে।
তিনি বলেন, জিডিপি প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং সরকারি বিনিয়োগের দিক থেকে আমরা মোটামুটিভাবে ভালো অবস্থানে আছি। তবে সাধারণভাবে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আমরা দুর্বল জায়গায় আছি। এর মূল কারণ ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ কমে গেছে। একইভাবে সঞ্চয় হারের ক্ষেত্রেও আমরা দুর্বল জায়গায় আছি।
সিপিডির বিশেষ এই ফেলো বলেন, অর্থনীতিতে কাঠামোগত পরিবর্তন হচ্ছে। এর অন্যতম লক্ষণ হলো কৃষিখাতের অবদান কমছে এবং শিল্পখাতের অবদান বাড়ছে।
তিনি বলেন, জিডিপির অংশ হিসেবে দেখলে দেখা যাবে আমদানি, রপ্তানি এবং রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে যে সমস্ত লক্ষ্যমাত্র ধরা হয়েছে তা ২০১৮-১৯ অর্থবছরের নিচে। এটাকে আমরা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য হিসেবে দেখতে চাচ্ছি।
গড় আয়ুর তথ্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বচ্ছল যারা আছে তাদের গড় আয়ু ৭২-৭৩ বছরের বেশি। আর গরিব মানুষরা কিন্তু বাঁচে ৭০ বছরের নিচে। ওই দুটিকে গড় করে গড় আয়ু করা হয়েছে।
বাজেট বাস্তবায়নে মূল্যনীতি এবং ভর্তুকির মধ্যে সামঞ্জস্যের আহ্বান জানিয়ে দেবপ্রিয় বলেন, ভর্তুকির কারণে গ্যাস ও বিদ্যুতের খুচরা মূল্য নীতিমালা প্রণয়ন প্রয়োজন। না হলে মধ্যবিত্তের ওপর চাপ পড়বে।
বাজেট সঙ্গতিপূর্ণ নয় জানিয়ে তিনি বলেন, বাজেটে কৃষিতে বরাদ্দ প্রতিনিয়ত কমছে, ভর্তুকির অনেক অর্থ অব্যবহৃত থাকায় কৃষকের প্রকৃত সুবিধাভোগ হচ্ছে না।

২০১৯-২০ বাজেটে বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করা হয়েছে -মির্জা ফখরুল

২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ধনী ও ব্যবসায়ী শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করা হয়েছে বলে মনে করে বিএনপি। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, এই বাজেটের মাধ্যমে সরকার প্রকৃতপক্ষে ধনী ও ব্যবসায়িক শ্রেণিকে সুবিধা দিয়েছে। গরিব ও সাধারণ মানুষের স্বার্থ উপেক্ষিত হয়েছে। ক্ষুদ্র ও প্রকৃত ব্যবসায়ীদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়ে সরকারদলীয় স্বার্থান্বেষী মহলকে উপকৃত করা হয়েছে।
শুক্রবার বিকালে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বাজেট নিয়ে দলের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি এসব কথা বলেন। এসময় উপস্থিত ছিলেন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান ও আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সংবাদ সম্মেলনে মির্জা আলমগীর বলেন, বিদ্যমান উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও বেড়েই চলেছে। উপকৃত হচ্ছে সরকারদলীয় কিছু স্বার্থান্বেষী মহল।
নব্য ধনিক শ্রেণীর সৃষ্টি হয়েছে। ধনীক সৃষ্টিতে বাংলাদেশ বিশ্বমানচিত্রে ১ নম্বরে রয়েছে। আর এ সকল ধনিক শ্রেণীর সকলেই সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট। সংসদেও গরীব সাধারণের স্বার্থ উপেক্ষিত হচ্ছে। ধনিক ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠির স্বার্থই রক্ষিত হচ্ছে। অন্যদিকে ক্ষুদ্র ও প্রকৃত ব্যবসায়ীদের মেরুদন্ড ভেঙ্গে দেয়া হচ্ছে। আয় বৈষম্যের চেয়ে সম্পদ বৈষম্য আরও প্রকট হয়েছে। এটি বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।
তিনি বলেন, বাজেটের পরিকল্পনা, বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া, খাতভিত্তিক বরাদ্দ ও সমস্যা নির্ধারণ নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে। বাজেটে আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি ধরা হয়েছে। অনুৎপাদনশীল খাতে খরচ বেশি। প্রতিবছরই বাজেটে বিপুল পরিমাণ ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। ঘাটতি মেটাতে ঋণের পরিমাণও বাড়ছে। বাস্তবায়নের হারেও দেখা যায় নিম্নমুখিতা। বিএনপি মহাসচিব বলেন, সরকারের এই প্রস্তাবিত বাজেট একটি উচ্চাভিলাসী ও গণবিরোধী বাজেট। সরকার জনগণকে বাইরে রেখে যেভাবে নির্বাচন করেছে, একইভাবে বাজেটও দিয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের পুরোপুরি বিরুদ্ধে এই বাজেট দেয়া হয়েছে। এই বাজেটে সাধারণ জনগণের জন্য কিছু রাখা হয়নি। এর মাধ্যমে ধনিক শ্রেণিকে আরো ধনি হওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেয়া হয়েছে। এই বাজেট জনগণ মেনে নেয়নি। তারা সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছে। তিনি বলেন, জনগণের যে সমস্যাগুলো রয়েছে এই বাজেটের মধ্যে তার কিছুই আসেনি। মানুষের মৌলিক চাহিদা অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান এর কোনোটা পূরণ হচ্ছে না। এগুলোর জন্য যে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে সেটা তুলনামূলকভাবে কমানো হয়েছে। একটি ইংরেজি দৈনিক পত্রিকার প্রচ্ছদ স্টোরি দেখিয়ে মির্জা আলমগীর বলেন, এর মধ্যে বাজেটের পুরো জিনিসটা চলে এসেছে। ছবিতে দেখুন কৃষক থেকে সবকিছু বের করে নিচ্ছে সরকার।
মধ্যম আয়ের দেশের একটি বেলুন সবার উপরে উড়িয়ে রেখেছে। অন্যদিকে কালো টাকা আহরণ করে একটি যন্ত্রের মধ্য দিয়ে সাদা করে ফেলা হচ্ছে। অর্থনীতিকে বুটের তলায় রাখা হয়েছে। অন্যদিকে হাতির মতো মেগা প্রজেক্ট। এই হাতিকে পালতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী একটি ভিক্ষার থালা নিয়ে মানুষের কাছে ভিক্ষা করে বেড়াচ্ছেন। সাম্প্রতিক সময়ে এতো ভালো কাভার স্টোরি কোনো গণমাধ্যমে দেখিনি। মির্জা ফখরুল বলেন, অর্থমন্ত্রী ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার উচ্চাভিলাসী বাজেট ঘোষণা করেছেন। বাজেটের আকার বড় করার চমক সৃষ্টির প্রতিযোগিতায় নেমেছেন অর্থমন্ত্রী।
কিন্তু বাজেট বৃদ্ধির এই প্রবনতা বছর শেষে চুপসে যেতে দেখা যায়। এই বাজেট নিয়ে জনমনে কোনো উচ্ছ্বাস নেই। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা জনমত সৃষ্টির মধ্য দিয়ে ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের মধ্য দিয়ে জনগণের একটা সংসদে যেন এই বাজেট আসে তার জন্য আমরা কাজ করছি। সেই কাজটাকে আমরা আরো বেগবান করব। এই বাজেট জনগণই গ্রহণ করেনি। আমরা এটাকে প্রত্যাখ্যান করেছি কিনা সেটা বলেই দিয়েছি। তিনি বলেন, এই বাজেটের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের উপর চাপ পড়বে। তাদের প্রকৃতপক্ষে আয় কমে গেছে। ধনি গরীবের মাঝে বৈষম্য বাড়ছে। ধনিরা আরো ধনি হচ্ছে। দরিদ্ররা আরো দরিদ্র হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ভুগছে নিম্ন মধ্যবিত্ত। তাদের উপর চাপ আরো বাড়বে। তারা প্রত্যেকটা জিনের মাধ্যমে ভ্যাট দেয়। সামগ্রীকভাবে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠির উপর চাপটা আরো বাড়বে। এই বাজেট জনগণের প্রত্যাশা পুরণ করবে না।
লিখিত বক্তব্যে মির্জা ফখরুল বলেন, বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ লক্ষ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লক্ষ ৩৯ হাজার ২৮০ কোটি টাকা। সে হিসাবে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বেড়েছে ৩৮ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে এনবিআর নিয়ন্ত্রিত করের পরিমাণ ধরা হয়েছে ৩ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এনবিআর বহির্ভূত করের পরিমাণ ১৪ হাজার ৫০০ কোটি আর কর ছাড়া প্রাপ্তি ধরা হয়েছে ৩৭ হাজার ৭১০ কোটি টাকা। এছাড়া বৈদেশিক উৎস থেকে ধরা হয়েছে ৬৮ হাজার ১৬ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত বাজেটে বিশাল আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে যার সিংহভাগই ধরা হয়েছে এনবিআর থেকে। অথচ চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রায় বেশ ঘাটতি রয়েছে। তার উপর এবার আরও বড় আকারের আদায়ের পরিকল্পনা। এটা রাতারাতি সম্ভব না। বর্তমানে যে ব্যবস্থাপনা রয়েছে তাতে ঘাটতি বরং আরও বাড়বে।
মির্জা আলমগীর বলেন, ঘোষিত বাজেটের শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘সমৃদ্ধ আগামীর পথযাত্রায় বাংলাদেশ- সময় এখন আমাদের, সময় এখন বাংলাদেশের’। বর্তমান অর্থমন্ত্রী পরিকল্পনামন্ত্রী থাকাকালে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দেয়ালে লেখা দেখা গেছে ‘সময় এখন আমাদের ঃ সময় এখন বাংলাদেশের’। আবার বছর খানেক আগে টিভির পর্দায় একটি পণ্যের অ্যাডভার্টাইজমেন্ট হিসেবেও শোনা গেছে ‘সময় এখন আমাদের’। আসলে সময় এখন তাদের এবং একমাত্র তাদেরই। সেটা বাংলাদেশের মানুষের বুঝতে কোন অসুবিধা হচ্ছে না। বাজেটের শিরোনাম থেকেই উন্নয়নের গীত প্রকৃষ্ট হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই তথাকথিত উন্নয়নের গীত আর মানুষ শুনতে চায় না। কর আর দ্রব্যমূল্যের চাপে ভোক্তা সাধারণের এমনিতেই নাভিশ্বাস উঠেছে। আয়-বৈষম্য, বেকারত্ব, অর্থনৈতিক নৈরাজ্যের কারণে সামাজিক অস্থিরতার মুখোমুখি জনগণ এখন আর উন্নয়নের মিষ্টি কথায় সন্তুষ্ট হতে পারছে না। তিনি বলেন, বাজেটে ব্যয় বেড়েই চলছে। ব্যয় দুই প্রকার রাজস্ব ও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাবদ ব্যয়। ঘোষিত বাজেট অনুযায়ী মোট ব্যয় ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা। বিগত ১০ মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাবদ ব্যয় মোট বরাদ্দের ৫৫ শতাংশের কোঠায় থাকলেও মে ও জুন মাসে ব্যয়ের ঘাটতি মোকাবিলায় ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাবে। এমনিতেই ঋণের পরিমাণ ক্রমাগত বৃদ্ধির ফলে সুদ-আসল পরিশোধ করতেই বিশাল ব্যয় হচ্ছে। মির্জা আলমগীর বলেন, দক্ষ শ্রমশক্তি বিনির্মাণে, তথা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ছে না।
উপরন্তু ঋণের পরিমাণ সুদসহ জমতে জমতে পাহাড়সম হলেও পরিশোধের কোনো দিকনির্দেশনা এই বাজেটে নেই। এর দায়ভার চাপবে ভবিষ্যত প্রজন্মের ওপর। তিনি বলেন, একটি বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে বছরে যে পরিমাণ অর্থ পাচার হয় তা আমাদের বৈদেশিক আয় ও বিনিয়োগের চেয়েও বেশি। দেশ থেকে বছরে ৮-১০ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়ে যাচ্ছে। একদিকে বিশাল অংকের বাজেট অন্যদিকে টাকাশূন্য ভল্ট। একদিকে ব্যয়ের ব্যাপক আয়োজন অন্যদিকে টাকার জন্য ব্যাপক হাহাকার- এরকম এক বিপরীত অবস্থার মধ্যে দাবি করা হচ্ছে প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশে গিয়ে দাঁড়াবে। অথচ প্রাণ নেই ব্যাংক খাতে। বিনিয়োগের জন্য নেয়া শিল্প ঋণ পুরোটাই ব্যাংক খাত নির্ভর। সেখানেই চলছে তীব্র অর্থ-সংকট। সবার মনেই প্রশ্ন তা হলে ব্যাংকের এত টাকা গেল কোথায়? ঋণের টাকা ফেরত আসছে না ব্যাংক খাতে। খেলাপি ঋণ কেবল বাড়ছেই। বানিজ্যিক ব্যাংকগুলো বর্তমানে স্বল্প মেয়াদী আমানতের ওপর নির্ভরশীল। দীর্ঘমেয়াদী ঋণ দেয়ার ফলে এসব স্বল্প মেয়াদী আমানতকারীদের জন্য ঝুঁকি বাড়ছে যা আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে। তিনি বলেন, এই বাজেটে দেখা যাচ্ছে দেশের সাধারণ করদাতারাই ঋণ শোধ ও উন্নয়নের মূল উৎস হিসেবে কাজ করছেন। বারবার বলা হলেও আয়কর এখনো কর আদায়ের প্রধান উৎস নয়।
মূল্য সংযোজন করের মাধ্যমেই ব্যয় নির্বাহ করতে হচ্ছে। করের বোঝা পুরোটাই সাধারণ জনগণের কাঁধে চেপে বসছে। নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত জনগণের ওপর করের ভার বর্তাচ্ছে। বিপরীত দিকে উচ্চবিত্তদের কর পরিহার ও ফাঁকি দেওয়াটা খুব স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে! এর পরেও এবারের বাজেটে দুর্নীতিবাজদের কালো টাকা সাদা করার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। বাজেটে মৌলিক সমস্যা সমাধানের দিকে দৃষ্টি দেয়া হয়নি। অসমতা বাড়ছে হু হু করে। বিএনপি মহাসচিব বলেন, এই মুহূর্তে বাংলাদেশের অর্থনীতি এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি। চলতি বছর রেকর্ড পরিমাণ ধান উৎপাদন হলেও হতাশ কৃষক ধানের ন্যায্য দাম না পেয়ে ক্ষেতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হয়ে আসা, বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ না বাড়া, ফি বছর বেকারত্বের হার বৃদ্ধির কারণেও উন্নয়ন কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারছে না।
তিনি বলেন, বাজেটে সোনার দাম কমানো হয়েছে যা ব্যবহার করে সমাজের সুবিধাভোগী শ্রেণী। অথচ মোবাইল ফোন ব্যবহার করে দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষ সেই মোবাইল, সিম ও সার্ভিসের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। বাজেটে অর্থমন্ত্রী সিগারেটের দাম বাড়িয়েছে। কিন্তু সিগারেটের উপর শুল্ক না বাড়ায় সিগারেট কোম্পানির ৩১ শতাংশ আয় বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে! অথচ সারা বিশ্বে সিগারেট নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। এ এক শুভংকরের ফাঁকি। মির্জা ফখরুল বলেন, অনির্বাচিত সরকারের বাজেট দেয়ার কোনো নৈতিক অধিকার নেই। কারণ তারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয়। তারা জনগণের কাছে দায়বদ্ধও নয়। দেশের অর্থনীতি কিছু সংখ্যক মানুষের কাছে জিম্মি হয়ে গেছে। তারা বাজেট প্রণয়ন করছে। তারা অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে। আবার তারাই সরকার পরিচালনা করছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, সুবিধাবাদীদের সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়ার জন্য এই বাজেট। কিন্তু কেন তাদের সুবিধা দিতে হবে? যদি আমরা ৩০শে ডিসেম্বরের নির্বাচন ২৯শে ডিসেম্বর কেন করতে হল সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজি, তাহলে এই বাজেট কেন সুবিধাভোগিদের সুযোগ দিতে করা হলো সেই উত্তরও পেয়ে যাব।
ড. আবদুল মঈন খান বলেন, এই বাজেট সারা বছরে সরকারের ব্যর্থতার দলীল। এর মাধ্যমে জনগণের উপর করের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের প্রায় ৫০ বছরের ইতিহাসে কোনোদিন কোনো ব্যবসায়ী অর্থমন্ত্রী হয়নি। এবার হয়েছে। সুতরাং তিনি তো ব্যবসায়ীদের স্বার্থই দেখবেনই। জনসাধারণের স্বার্থ কেন দেখবেন?
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, যারা এই বাজেট দিয়েছে তারা প্রকৃতপক্ষে নির্বাচিত সরকার নয়। এরা একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠি। যারা আজকে রাজনীতিও করছে, ব্যবসাও করছে, আইন প্রণয়নও করছে আবার এগুলোর বাস্তবায়নও করছে। এসব করছে তাদের স্বার্থের জন্য। তিনি বলেন, দেশে যখন গণতন্ত্র থাকেনা, একটি গোষ্ঠি যখন ক্ষমতা নিয়ে নেয়, তখন তাদের স্বার্থেই সব কিছু হয়। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকলে, নির্বাচিত সরকার না থাকলে স্বাভাবিকভাবে যারা দেশ পরিচালনা করে তারা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকে না।

প্রিয়তি ধর্ষণ চেষ্টা, তদন্তে ইন্টারপোল!

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আইরিশ বিউটি কুইন মাকসুদা আক্তার প্রিয়তি অবশেষে মুখ খুললেন। ২০১৫ সালে ঢাকার একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করেছিলেন। আর এই বিষয়টি এখন ইন্টারপোল তদন্ত করছে। গত ২২শে মে তিনি তার জীবনের কিছু ব্যক্তিগত স্পর্শকাতর বিষয় তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, তিনি ভুয়া বার্তা পাচ্ছেন ফেসবুকের মাধ্যমে এবং তা সংখ্যায় শ’ শ’। তিনি দুঃখ ভুলে নিজের মতো করে দু’ সন্তান নিয়ে বাঁচতে চান। কিন্তু ফেসবুক তাতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মাকসুদা আক্তার সাবেক মিস আর্থ আয়ারল্যান্ড ২০১৫ এবং মিস আর্থ ইন্টারন্যাশনাল উইনার। তাকে ট্রল করা হয়েছে??‘বেশ্যা’ হিসেবে। কারণ তিনি একজন মডেল, একজন সিঙ্গেল মাদার। দুই সন্তানকে নিয়ে তিনি গত ১৮ বছর ধরে বসবাস করছেন ডাবলিনে। তিনি লন্ডনের মিরর পত্রিকাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, কী করে তিনি সামপ্রতিক দিনগুলোতে অনলাইন লাঞ্ছনার শিকার হচ্ছেন। তিনি এতটাই বিরক্ত হয়ে গেছেন যে, তার কখনও কখনও মনে হয় তার মডেলিং ছেড়ে দেয়া উচিত। আমার ধারণা, আমার মতোই অন্যান্য যারা মুসলিম মডেল রয়েছেন, তাদের অনলাইনে নিপীড়নের শিকার হতে হয়। কিন্তু আমি মনে হয় অনেক বেশি এই বিষয়গুলো সহ্য করছি। কারণ তারা এটা মেনে নিতে পারে না যে দুইটি সন্তান নিয়ে আমি মডেলিং করি, আমি আমার দেহ প্রদর্শন করি। তারা আসলে এটা মেনে নিতে পারছে না। প্রিয়তি মিররকে বলেন, আপনি যদি কিছু না মনে করেন তাহলে তারা আমাকে যেটা বলছে সেটা হচ্ছে এই ধরনের-তারা আমাকে ?‘হোর’ ভাবছে। তারা ভাবছে, আমি পতিতাবৃত্তি করে জীবযাপন করি।
আমি তখন কিশোরী, যখন আমি ডাবলিনে চলে এসেছি। বিশ্বাস করেন, ফেসবুক পেইজে শত শত বার্তা পাই প্রতি সপ্তাহে। তার বেশির ভাগই হয়তো আয়ারল্যান্ড থেকে আসছে এবং তারা নিশ্চিতভাবেই বাংলাদেশি। তারা বসবাস করতে পারে বিশ্বের অন্যান্য স্থানেও। একটি বার্তা পাঠানো হয়েছে বাংলায়, লেখা হয়েছে আপনার মুখের গড়ন ২৫ বছর বয়সীর মতো। পেটটা ৪৫ বছরের মহিলার, কি করে তুমি এতটা তরুণ থাকতে পারছ?
মাকসুদা একজন বাণিজ্যের স্নাতক। তিনি দাবি করেছেন, তিনি গুরুতর ভাবে যৌন হামলার শিকার হয়েছিলেন এবং তাকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছিল। যখন তিনি ২০১৫ সালে দেশে গিয়েছিলেন এবং ইন্টারপোল এখন সেটা অনুসন্ধান করে দেখছে সেই ঘটনা থেকে মাকসুদা ডিপ্রেশনে ভুগছিলেন। কারণ তার একটাই চিন্তা, তার দুই সন্তান অনলাইনের প্রতি খুবই অনুরাগী এবং তারা প্রযুক্তিকে ভালোবেসেছে। আর তার ভয় সেখানেই। সে মনে করছে, তার মাকে নিয়ে যেসব খারাপ কথা অনলাইনে রয়েছে, সেগুলো তারা পড়তে পারবে। মাকসুদা বলেন, আমি কঠোর পরিশ্রম করছি তাদের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে। কিন্তু কেউ আমাকে সাহায্য করছে না। আমি তো বুঝতেই পারি না, কি করে তারা এইসব আজেবাজে কথা আমার উদ্দেশ্যে লিখতে পারেন। মাকসুদা বাস করেন একা। তিনি নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে চাইছেন। কিন্তু সমপ্রতি তার মনে হয় অন্তত কয়েক মাসের জন্য হলেও মডেলিং বন্ধ করে দেয়া। কারণ যেসব তাকে ঘিরে হচ্ছে, সেটা তিনি আর নিতে পারছেন না। তিনি খোদাভীরু। আল্লাহ্‌কে বিশ্বাস করেন।
কিন্তু তার পক্ষে হয়তো পবিত্র কোরআনের সব নির্দেশাবলী সব সময় অনুসরণ করা সম্ভব হয় না। মাকসুদা বলেন, এসব কারণেই আমি বাংলাদেশি সমপ্রদায় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছি। কিন্তু আমি যেভাবে জীবন-যাপন করি, তা তারা নিতে পারে না বলেই আমি তাদের কাছ থেকে দূরে সরে এসেছি। তারা বলে, আমি নাকি স্বাধীনভাবে জীবন-যাপন করছি। তাই আমি আমার দেহ প্রদর্শন করি এবং এভাবেই আমি অর্থ উপার্জন করি। আমার দু’টি সন্তান এবং আমি আমার সন্তানদের বাবাকে বিয়ে করিনি। এটা তাদের কল্পনার বাইরে। তারা মনে করেন, এটা খুবই একটি বাজে বিষয় এবং ভাবটা যেন আমি সবার সঙ্গে শুয়ে বেড়াচ্ছি অথবা এ রকম কিছু একটা।
মাকসুদা জোর দিয়ে বললেন, তিনি পছন্দ করেন না কোনো একটা কক্ষে নিজেকে আবদ্ধ করে রাখতে। নিজেকে আবৃত করে রাখতে। এবং কারও সঙ্গে কথা না বলে থাকতে। এ জীবন তিনি চান না। তিনি বলছেন, মডেলিং আমাকে আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। আমি অবসাদগ্রস্ত হয়ে ছিলাম। সেটা থেকে কাটিয়ে উঠতে পেরেছি। মাকসুদা এমন অনেক অভিজাত অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন যেখানে ব্রিটিশ মন্ত্রীরা অংশ নিয়েছেন।
তিনি বিশ্বাস করেন এ বিষয়ে ফেসবুকের আরো বেশি কিছু করা উচিত। কারণ এইসব বার্তা ফেসবুকে লেখা সম্ভব হচ্ছে। আর তা মানুষের আত্মবিশ্বাসকে নষ্ট করে দিচ্ছে। মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকে ধ্বংস করছে এবং এটা ভালো পরিবেশ তৈরি করছে না। কিন্তু এই বিষয়গুলো প্রতিরোধে ফেসবুক যথেষ্ট পদক্ষেপ নেয়া থেকে বিরত রয়েছে। তারা অনেক অর্থ করছে। তাই তাদের আরো বেশি নজরদারি বাড়ানো উচিত। বিউটি কুইন আরো বলেছেন, তিনি এক ভয়ঙ্কর হামলায় যৌন আক্রমণের শিকার হন এবং তাকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়া হয়েছিল ।
তার বয়স যখন ২০-এর কোঠায়। তখন এক ব্যক্তি তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করে। মিস আর্থ ইন্টারন্যাশনাল উইনার নারীদের প্রতি আহ্বান জানান, নারীদের যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে তারা যেন আরও বেশি মাত্রায় সোচ্চার হতে পারেন।
১৮ বছর ধরে বসবাস করছেন আয়ারল্যান্ডে। ২০১৫ সালে তিনি বাংলাদেশ সফর করেন। ওই সময় তিনি যৌন আক্রমণের শিকার হন। সেখানে একটি অফিসে টিভি বিজ্ঞাপন নিয়ে আলোচনা করছিলেন। কোম্পানির মালিক বলেন, টাকা নিতে তোমাকে আমার অফিসে আসতে হবে ।
ডাবলিনের এই মেয়েটি বর্তমানে ইন্টারপোলকে সহায়তা দিচ্ছেন, যাতে তিনি ন্যায়বিচার পান। মাকসুদা বলেন, লোকটি ছিলেন একটি কোম্পানির মালিক। তিনি আমাকে বলেছিলেন, তোমাকে তোমার পাওনা বুঝে নিতে আমার অফিসে আসতে হবে, কারণ বাংলাদেশে কোনো ব্যাংক একাউন্ট ছিল না আমার।
পাইলটের যোগ্যতাসম্পন্ন মাকসুদা বলেছেন, একজন সেক্রেটারি আমাকে সেই অফিসে নিয়ে গিয়ে অফিস ত্যাগ করেন। এরপর লোকটি আসেন এবং তিনি তার হাত আমার পোশাকের উপরে রাখেন এবং আমাকে কোলে তুলে উপরে উঠান এবং টেবিলে নিক্ষেপ করেন। তিনি প্রকৃতপক্ষে আমাকে ধর্ষণের চেষ্টা করেছিলেন এবং তিনি তার হাত আমার প্যান্টের ভেতরে রেখেছিলেন এবং আমি তখন ভাবলাম, আচ্ছা তবে আমি ধর্ষিত হতে যাচ্ছি। আমি ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে গিয়েছিলাম। এবং আমি জানি না, আমি কেন তখন চিৎকার করিনি। অবশ্য অফিসে সুরক্ষিত ছিল। আমার চিৎকার শোনার মতো কেউ সেখানে ছিল না। সে ছিল একজন ক্ষমতাবান মানুষ। অর্থের জোরে তার সব ক্ষমতা মুঠোয়। তিনি আরো স্মৃতিচারণ করেন, তিনি তখন তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়ে খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন।
তিনি ভাবছিলেন আমি কী করে এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে পারি। আমি তখন বুদ্ধি করে বললাম। আমার একটা আইডিয়া আছে। আজকে এটা করার দরকার নেই। আমাকে আবার আসতে দিন। একটা সুন্দর পরিবেশে আমাকে কাজটা করতে দিন। তখন সে থামল মুহূর্তের জন্য এবং উঠে দাঁড়াল। আমি আমার কাপড় গুছিয়ে নিলাম। আমি তাকে বললাম, আমি আগামীকাল আসবো। আমার টাকার জন্য। এবং শেষ পর্যন্ত সে আমাকে চলে আসতে দিলো। ওই ঘটনার কয়েকদিন পরেই সন্তানদেরসহ ফিরে আসেন আয়ারল্যান্ডে।
তখন লোকটির টেলিফোন পাই এবং আমাকে বলল, আমি জানি তুমি কেন ফিরে আসনি। যদি তুমি তোমার মুখ খোলো, তাহলে তোমাকে ফেলে দিতে আমার দু’মিনিট লাগবে এবং আয়ারল্যান্ড আমার থেকে খুব বেশি দূরে নয়।
পরিষ্কার বাংলায় তিনি বলেছিলেন তিনি আমাকে হত্যা করতে যাচ্ছেন।
মিরর লিখেছে, একজন সিঙ্গেল মাদার হিসেবে তিনি তার দুই সন্তানকে বড় করেছেন। তিনি বললেন, আমি খুবই বিমর্ষ হয়ে পড়েছিলাম। উদ্বিগ্ন ছিলাম। আমি ঘুমাতে পারতাম না। আমি আত্মহত্যার চিন্তা করেছি। এবং আমি ট্যাবলেট খেয়ে পার করেছিলাম দু’বছর।

৭৫ বছর পর প্রেমিক-প্রেমিকার দেখা: জেনি, ‘আই লাভ ইউ গার্ল’

এমন কাহিনী সিনেমায় মেলে। কিন্তু তা বাস্তবেও আছে তারই প্রমাণ দিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ৯৭ বছর বয়সী যোদ্ধা কে টি রবিনস এবং তার ফরাসি প্রেমিকা ৯২ বছর বয়সী জেনি গানায়ে। জেনি পরবর্তীতে হয়ে যান পিয়ারসন। সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রবিনস ফ্রান্সে দায়িত্বে ছিলেন। তখন তিনি ২৪ বছরের টগবগে যুবক এক। আর পিয়ানসন ১৯ বছর বয়সী যুবতী। তাদের মধ্যে ওই সময় গভীর প্রেম গড়ে ওঠে। দু’জনে একসঙ্গে ছবি তোলেন। তারই দু’চারটা নিজের কাছে রেখেছিলেন রবিনস। যুদ্ধের এক পর্যায়ে অকস্মাৎ তাকে স্টেশন ত্যাগ করতে হয়। সেই যে গেলেন, আর ফেরা হয়নি। এরপর কেটে গেছে ৭৫ বছর। কারো সঙ্গে কারো দেখা হয়নি। এবার ফরাসি এক সাংবাদিককে রবিনস তার প্রেমিকার সেই ছবি দেখিয়ে বললেন তার নাম। ওই সাংবাদিক খোঁজাখুঁজি করেন। সত্যি পেয়ে যান পিয়ারসনকে। আয়োজন চলে তাদের দেখা-সাক্ষাৎ করিয়ে দেয়ার। সত্যি সত্যি ৭৫ বছর পর আবেগঘন এক রিইউনিয়নে তারা একত্রিত হন। চোখে চোখে বলা হয়ে যায়, ফেলে আসা ৭৫ বছরে মনের ভেতরে ক্ষরণের সব কথা। রবিনস তার প্রেমিকাকে দেখেই বলে উঠলেন, তুমি কখনো আমার হৃদয় থেকে হারিয়ে যাওনি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওই সেনা সদস্য রবিনস ফ্রান্সে দায়িত্ব পালন করতে এসে ফরাসি সুন্দরী পিয়ারসনের (১৮) প্রেমে পড়ে যান। পিয়ারসনের ছোট্ট শহরে দায়িত্ব পড়েছিল তার। তিনি প্রথম চোখ মেলে দেখেছিলেন পিয়ারসনকে। ১৯৪৪ সালের কথা সে। উত্তর-পূর্ব ফ্রান্সের ব্রাইয়ি শহরের ঘটনা। সেখানে রচনা হয়েছিল তাদের প্রেমের সম্পর্ক। ওই সময় রবিনসের পোশাক ধুয়ে দেয়ার জন্য কারো প্রয়োজন ছিল। এ কাজে সহায়তা করতে চেয়েছিলেন পিয়ারসন। তাতে তার মায়ের সম্মতি ছিল। কাপড় কাচতে গিয়ে রবিনসের প্রেম পড়ে যান তারা। এর মাত্র দু’মাস পড়ে রবিনসকে বলা হয়, তাকে দ্রুত ওই এলাকা ছাড়তে হবে। যোগ দিতে হবে ইস্টার্ন ফ্রন্টে। যুদ্ধ করতে হবে এক্সিস পাওয়ারসের বিরুদ্ধে।
ফ্রান্স ২ টেলিভিশন চ্যানেলকে রবিনস বলেন, আমি যাওয়ার আগে সম্ভবত পিয়ারসনকে বলেছিলাম- আমি আবার আসব। তোমাকে নিয়ে যাবো। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি। পিয়ারসন বলেন, যখন রবিনস চলে গেলেন, ট্রাকে উঠলেন, তখন চিৎকার করে কেঁদেছি আমি। আমার মনটা তখন ভেঙে যাচ্ছিল। আমি চেয়েছিলাম যুদ্ধের পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে না যান যেন।
১৯৪৫ সালে যুদ্ধ শেষ হলো। পিয়ারসন বেসিক ইংরেজি শিখতে লাগলেন। তার আশা ছিল, স্বপ্ন দেখানো যুবক রবিনস তার কাছে ফিরে আসবেন একদিন। কিন্তু ফিরে আসেননি রবিনস। তিনি ফিরে যান যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় লিলিয়ান নামের এক যুবতীর। তাকেই তিনি বিয়ে করেন। তার সঙ্গে ৭০ বছরের দাম্পত্য তার। মিসিসিপিতে একটি হার্ডওয়্যার স্টোরে ৫০ বছর ধরে পাশাপাশি কাজ করছিলেন এই দম্পতি। কিন্তু ২০১৫ সালে ৯২ বছর বয়সে মারা যান তার স্ত্রী লিলিয়ান। অন্যদিকে পিয়ারসনও নতুন করে প্রেমে পড়ে যান অন্য একজনের। ১৯৪৯ সালে তিনি বিয়ে করেন তাকে। তারপর ৫ সন্তানের মা তিনি।
দু’জনে আলাদাভাবে যার যার দেশে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলেও রবিনস কখনো তার ফরাসি প্রেমিকাকে ভুলে যাননি। তিনি সব সময় কাছে কাছে রাখতেন পিয়ারসনের সঙ্গে তার সাদাকালো ছবি। সেই ছবি এখনো তার কাছে আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বর্ষীয়ান যোদ্ধাদের ওপর রিপোর্ট করতে যুক্তরাষ্ট্রে যান একদল ফরাসি সাংবাদিক। তাদের সেই ছবি দেখালেন রবিনস। বললেন, তিনি পিয়ারসনের গ্রামে ফিরতে চান। সাক্ষাৎ করতে চান তার সঙ্গে। তার ধারণা ছিল পিয়ারসন মারা গেছেন। তার ভাষায়, নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলাম যে, তাকে আর দেখতে পাবো না।
ফ্রান্সে প্রথম যেখানে তাদের প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল সেখান থেকে প্রায় ২৭ মাইল দূরে মন্টিগনি-লেস-মেটজ, মোসেলে’তে অবসরে যাওয়া মানুষদের থাকার একটি আশ্রয়কেন্দ্রে পিয়ারসনকে খুঁজে পান তারা। ফরাসি ওই সাংবাদিকরা এই দুই প্রেমিক-প্রেমিকার সাক্ষাতের আয়োজন করলেন। রবিনস যখন পিয়ারসনকে জীবিত দেখার আশা হারিয়ে ফেলেছিলেন তখন তাকে সাংবাদিকরা বললেন, পিয়ারসন বেঁচে আছেন। আপনাকে দেখার জন্য প্রতীক্ষায় আছেন তিনি।
রবিনস চলে আসেন ফ্রান্সে। সেখানে তিনি প্রথম চোখ খুলতেই তার সামনে হাসিমুখে ৭৫ বছর আগের সেই পিয়ারসন। দু’জনের চোখে সে কি তৃপ্তি! সে কি অভিব্যক্তি। পিয়ারসনকে দেখেই রবিনস বললেন, সব সময়ই আমি তোমাকে ভালোবাসি। আমার হৃদয় থেকে কখনো মুছে যাওনি। রবিনস এরপর বের করেন সেই ঐতিহাসিক ছবি। পিয়ারসনকে বলেন, এতটা দশক ধরে এটা আমার বুকের কাছে আগলে রেখেছি। এই ছবিটায় যে সুন্দরীকে দেখতে পাচ্ছ, এটা তুমি।
জবাবে পিয়ারসন বললেন- ওয়াও!
চুম্বন বিনিময় হলো তাদের মধ্যে। একজন আরেকজনের মুখ হাতড়ে দেখেন ৭৫ বছরের পুরনো ভালোবাসাকে। বয়স হয়েছে। তাতে কি! সেই প্রেম এখনো তেমনই সতেজ আছে। সজীব আছে। তাই পিয়ারসন বললেন, আমি তো সব সময়ই তাকে ভেবেছি। ভেবেছি সে একদিন ফিরে আসবে। আমি সব সময় চেয়েছি সে ফিরে আসবে।
একসঙ্গে তারা কাটালেন বেশ কয়েকটি ঘণ্টা। এরপরই নরম্যান্ডিতে বিশ্বযুদ্ধের বিজয় উৎসবে যোগ দিতে ছুটে যেতে হয় রবিনস’কে। এখন রবিনসের স্ত্রী নেই। পিয়ারসনও বিধবা। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন আবার দেখা করবেন। বিদায় নেয়ার সময় রবিনস তাকে বললেন- জেনি, ‘আই লাভ ইউ গার্ল’।
সঙ্গে সঙ্গে শতবর্ষী ছুঁই ছুঁই এই প্রেমিক-প্রেমিকার দু’জোড়া চোখ ৭৫ বছর পরে সেই যৌবনের আবেগ নিয়ে ভিজে উঠলো অশ্রুতে। দু’জনের ঠোঁটে ঠোঁট মিশে গেল।

ভারতীয় রাজনীতির কিংমেকার এই কিশোর!

পলিটিক্যাল স্ট্র্যাটেজিস্ট। ‘রাজনৈতিক কৌশল রচয়িতা’ বললে হয়তো ইংরেজি এই শব্দবন্ধের কাছাকাছি পৌঁছনো যায়। কিন্তু প্রশান্ত কিশোরের প্রকৃত কাজ বা পেশাকে ঠিক বোঝানো যায় না। কিন্তু এটা ঠিক, তিনি যেখানে গেছেন, যার সঙ্গে থেকেছেন, তিনিই সাফল্যের স্বাদ পেয়েছেন। নিজে অন্তরালে থেকেও নিয়োগকর্তাকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে অধ্যবসায় চালিয়ে যান রাজনীতির ‘মেঘনাদ’ প্রশান্ত কিশোর ওরফে ‘পিকে’। যেখানে হাত দিয়েছেন, সেখানেই সোনা ফলেছে। ভারতের গুজরাত, বিহার, পাঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ, অন্ধ্রপ্রদেশ হয়ে এ বার এই প্রশান্তের গন্তব্য বাংলাদেশ লাগোয়া রাজ্য, পশ্চিমবঙ্গ। সৌজন্যে তৃণমূল। রাজ্যে দলের বিপর্যয় রুখে ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনকে পাখির চোখ করে এবং বিজেপিকে রুখে দিতে এই প্রশান্ত কিশোরেরই হাত ধরছেন মমতা ব্যানার্জি।
কিন্তু কে এই প্রশান্ত কিশোর? তার সাফল্যের রসায়নই বা কী? জন্ম বিহারের রোহতাস জেলার কোরান গ্রামে। কিন্তু উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পর তার বাবা পাকাপাকি ভাবে চলে যান বিহারেরই বক্সারে। অন্য দিকে ইঞ্জিনয়ারিং পড়তে হায়দরাবাদে যান প্রশান্ত। পড়াশোনার পাঠ চোকানোর পর কাজে যোগ দেন জাতিসঙ্ঘের স্বাস্থ্য বিভাগে। কর্মস্থল ছিল আফ্রিকা। আট বছর চাকরির পর ২০১১ সালে ফিরে আসেন দেশে। তৈরি করেন নিজের সংস্থা সিটিজেন্স ফর অ্যাকাউন্টেবল গভর্নমেন্ট (সিএজি)। নিজের সংস্থায় নিয়োগ করেন আইআইটি-আইআইএম-এর পেশাদার লোকজনকে। পরের বছরই বিধানসভার ভোট গুজরাতে। ভোটের রণকৌশল তৈরি করতে এই প্রশান্ত কিশোরকেই নিয়োগ করেন তখনকার গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
‘পিকে’র কাজটা সহজ ছিল না। কারণ ২০০১ সাল থেকে গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। উন্নয়ন হলেও দীর্ঘদিন সরকারে থাকায় প্রশাসন বিরোধী হাওয়া ছিল। কিন্তু মোদির সেই উন্নয়নের সঙ্গে ঐক্যের বার্তা জুড়ে ব্যাপক প্রচার-কৌশল রচনা করেন প্রশান্ত। সোশ্যাল মিডিয়া থেকে গোটা গুজরাত জুড়ে প্রচারের এমন কৌশল তৈরি হয়, যাতে ফের ক্ষমতায় আসতে অসুবিধা হয়নি মোদির। সেই সাফল্যের হাত ধরেই প্রশান্ত পান আরো বড় দায়িত্ব। গুজরাতের গণ্ডি ছাড়িয়ে জাতীয় স্তরে নিজেকে তুলে ধরার দায়িত্বও তার কাঁধেই সঁপে দেন মোদি। তার পরই তৈরি হয় ‘ব্লু প্রিন্ট’। সেই সময়ই প্রশান্তের মস্তিষ্ক থেকে বেরোয় ‘চায়ে পে চর্চা’, ‘রান ফর ইউনিটি’র মতো ‘মাস্টার স্ট্রোক’। আর সেই সবের হাত ধরেই ভারত জুড়ে বিপুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন মোদি। ফল ২০১৪ সালে গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী থেকে প্রধানমন্ত্রীর পদে উত্তরণ।
কিন্তু বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর দলের মধ্যেই শুরু হয় সঙ্ঘাত। মূলত অমিত শাহ এবং দলের আরো কয়েকজন নেতার সঙ্গে মনোমালিন্যে মোদির ‘সঙ্গ’ ছাড়েন প্রশান্ত। সেই সময়ই নিজের সংস্থা সিএজি পরিবর্তন করে গড়ে তোলেন ইন্ডিয়ান পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি (আইপিএসি)। মার্কিন মুলুকের কানাডার সংস্থা পিএসির অনুকরণে নিজের সংস্থার নামকরণ করেন প্রশান্ত। মার্কিন মুলুকে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের ভোটপ্রচার এবং রণকৌশল তৈরির পেশাদার কাজ করে এই সংস্থা।
এর মধ্যেই ২০১৫ সালের গোড়ায় যোগ দেন নীতীশ কুমারের রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজিস্ট হিসেবে। ওই বছরই বিহার বিধানসভার ভোট। জনতা পরিবার এবং কংগ্রেস মিলে মহাজোট তৈরি করে ভোটে লড়ে। তাতে বিপুল সাফল্য পায় মহাজোট। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হন নীতীশ কুমার। নীতীশের ঘনিষ্ঠ মহল সূত্রে জানা যায়, ওই সময় অঞ্চলভিত্তিক ভাগ করে সেখানকার সমস্যা বুঝে নীতীশের বক্তব্যের বয়ান তৈরি করে দিতেন প্রশান্ত। তাতে এলাকাবাসীও মনে করতেন তাদের কথাই বলতেন নীতীশ। নীতীশকে প্রায় সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দেয়ার জেরে এই সময়ই মূলত প্রচারের আলোয় আসেন প্রশান্ত। তার পরও নীতীশের উপদেষ্টা হিসেবে বেশ কিছু জনমুখী পরিকল্পনার রূপায়ন হয় তার হাত ধরেই।
নীতীশের জেডিইউ-এর সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ না করেও এ বার প্রশান্তের হাত ধরে কংগ্রেস। প্রথমেই দায়িত্ব পান ২০১৬ সালের পাঞ্জাব বিধানসভা নির্বাচনের। তার আগের দু’টি নির্বাচনে হেরে কার্যত খাদের কিনারে কংগ্রেস। সেখান থেকে তুলে এনে ক্যাপ্টেন অমরিন্দর সিংহের জয় নিশ্চিত করার কারিগর ছিলেন এই ‘পিকে’ই।
পরের বছরই উত্তরপ্রদেশ বিধানসভার ভোট। আবার দায়িত্বে প্রশান্ত কিশোর। কেরিয়ারের প্রথম এবং একমাত্র ধাক্কা প্রশান্ত খেয়েছেন গোবলয়ের এই রাজ্যেই। কংগ্রেসের রাজনৈতিক কৌশল তৈরি করলেও তার সেই রণনীতি পুরোপুরি ফ্লপ হয়। মাত্র সাতটি আসন পায় কংগ্রেস। প্রতিপক্ষ শিবিরে তিন শ'রও বেশি আসন নিয়ে উত্তরপ্রদেশে ক্ষমতায় আসে বিজেপি। রাজনৈতিক শিবিরে কান পাতলেই অবশ্য শোনা যায়, ওই সময়ই প্রিয়ঙ্কা গান্ধীকে প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে নিয়ে আসার প্রস্তাব দেন পিকে। কিন্তু প্রিয়ঙ্কা এবং কংগ্রেস রাজি হয়নি। প্রিয়ঙ্কা সেই সময় এলে কংগ্রেসের ফল কী হতো, সেটা অন্য কথা। কিন্তু ব্যর্থতা ব্যর্থতাই।
কিছুটা ব্যাকফুটে চলে যাওয়া প্রশান্ত অবশ্য তাতে দমে যাননি। পরের গন্তব্য অন্ধ্রপ্রদেশ। নিয়োগকর্তা তথা ওয়াইএসআরসিপি সুপ্রিমো জগনমোহন রেড্ডি। প্রায় দু’বছর ধরে কাজ করার পর জগনকেও বিপুল সাফল্য এনে দিয়েছেন প্রশান্ত। একই সঙ্গে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে অন্ধ্রের ক্ষমতায় বসে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন জগন। লোকসভাতেও ২৫ আসনের মধ্যে ২৩টি দখল করেছেন জগন। কার্যত ধুয়ে মুছে সাফ চন্দ্রবাবু এবং তার দল টিডিপি। মাঝে অবশ্য ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে নীতীশের দলেই যোগ দেন প্রশান্ত। যদিও সেই কেরিয়ার খুব বেশি উজ্জ্বল নয়।
এ বার ডাক পড়েছে কলকাতায়। তৃণমূল নেত্রী তথা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির দলের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধা কার্যত পাকা। লোকসভা ভোটে দলের বিপর্যয় আটকে বিজেপির বাড়বাড়ন্ত রুখে দেওয়ার রণনীতি তৈরি করবেন তৃণমূলের হয়ে। মমতার পাখির চোখ, ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে ফের ক্ষমতায় আসা। প্রশান্তের লক্ষ্য, মমতা ব্যানার্জিকে আরো এক সাফল্যের স্বাদ পাইয়ে দেয়া এবং নিজের বায়োডেটা আরো শক্তপোক্ত করা।
কিন্তু প্রশান্তের এই সাফল্যের রসায়ন কী? একাধিক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক এবং তার সঙ্গে কাজ করা নীতীশ-জগনের মতো নেতাদের ঘনিষ্ঠ সূত্রে খবর, প্রথম সূত্র রিসার্চ বা গবেষণা। কার্যত প্রতিটি বুথ ধরে সমীক্ষা করে সেখানকার সমস্যা জেনে নেয়া এবং সেই অনুযায়ী পরিকল্পনা তৈরি করা। দ্বিতীয়ত, পেশাদারদের দিয়ে অভিনব প্রচার ও রাজনৈতিক কর্মসূচি তৈরি করা এবং সেই অনুযায়ী পরিকল্পনা রূপায়ণের পন্থা বাতলে দেয়া। এর সঙ্গে পক্ষের এবং বিপক্ষের শক্তি-দুর্বলতা বুঝে সেই অনুযায়ী ঘুঁটি সাজানো। এর সঙ্গে বিভিন্ন রকম সমীকরণ নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করে তার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা, এবং খামতি দূর করে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে যাওয়ার পরিকল্পনা করাও প্রশান্তের সাফল্যের চাবিকাঠি।
সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা

মোদির সামনে যেসব চ্যালেঞ্জ

ভূমিধস জয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সবাইকে সঙ্গে নিয়ে সামনে এগুনোর প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু এ যাত্রায় তার সামনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। তার মধ্যে রয়েছে মুসলিম সংখ্যালঘুদের মধ্যে আতঙ্ক। কয়েক কোটি যুবক যুবতীর চাকরির ব্যবস্থা করা। আছে নির্বাচনী প্রচারণাকালে বিভক্তি সৃষ্টিকারী বিভিন্ন ইস্যু। দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি, সমৃদ্ধি ও অগ্রগতির মতো বিষয়। আছে জাতীয় নিরাপত্তার মতো গুরুত্বর ইস্যু। পাকিস্তানের সঙ্গে যে দা-কুমড়ো সম্পর্ক তা কোনদিকে মোড় নেয় তা দেখার বিষয়। কয়েকদিন আগে পারমাণবিক শক্তিধর ওই দেশটির সঙ্গে ভারতের যুদ্ধ তো বেঁধেই গিয়েছিল, অল্পের জন্য সেখান থেকে ফিরেছে দেশ দুটি। এখন নরেন্দ্র মোদি পাকিস্তান ইস্যুতে কি পদক্ষেপ নেন তা দেখার বিষয়। বার্তা সংস্থা রয়টার্স লিখেছে, ব্যবসায় নীতি নিয়ে বিদেশি কিছু প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে অভিযোগ করেছে। তার মধ্যে রয়েছে অ্যামাজন, ওয়ালমার্ট, মাস্টারকার্ড। তারা ব্যবসায়নীতির বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেছে, এসব নীতি গ্রহণ করা হয়েছে শুধু ভারতের ভেতরে তাদের বিরোধীপক্ষকে সুবিধা দেয়ার জন্য। এ ছাড়া কয়েক কোটি যুবক যুবতীর কর্মসংস্থান করতে হবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে। এসব যুবক-যুবতী আগামী দু’এক বছরের মধ্যে চাকরির বাজারে আসছে বলে বলা হচ্ছে। মুম্বইয়ের কেয়ার রেটিংসের প্রধান অর্থনীতিবিদ মদন সাবনাভিস বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সামনে তাৎক্ষণিকভাবে যে চ্যালেঞ্জগুলো আসবে তা হলো কর্মক্ষেত্র, কৃষিখাতের আয় ও ব্যাংকিং খাতকে পুনরুজ্জীবিত করে তোলা। তবে ঐক্য গড়ে তোলার জন্য মোদি যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা অর্জন করা খুব জটিল বিষয়। নির্বাচনী প্রচারণার সময় বিজেপি বিভক্তি সৃষ্টিকারী ইস্যু সামনে এনেছে। বিশেষ করে ভারতের মুসলিম সংখ্যালঘুরা আতঙ্ক প্রকাশ করেছেন। তারা বলেছেন, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠদের সন্তুষ্ট করেতে যে নীতি গ্রহণ করা হয়েছে, তাতে তাদের জীবনজীবিকা বিপন্ন হতে পারে। নরেন্দ্র মোদি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কাশ্মিরে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে যে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন তাতে পারমাণবিক অস্ত্রধর প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের সঙ্গে উত্তেজনাকেই শুধু উস্কে দিয়েছে, যদিও ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদিকে বিজয়ী হওয়ার কারণে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান অভিনন্দন জানিয়েছেন। টুইটারে ইমরান খান বলেছেন, দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির জন্য তার (মোদি) সঙ্গে আগামী দিনগুলোতে কাজ করতে চাই।
জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে বিজেপির রয়েছে কঠোর নীতি। তা ছাড়াও বিজেপির সদস্যরা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ওপর চাপ সৃষ্টি করবেন অথবা তারা চাইবেন যে, অযোধ্যায় যেখানে বাবরি মসজিদ ধ্বংস করা হয়েছিল ১৯৯২ সালে, সেখানেই রামমন্দির নির্মাণের একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হোক। রাজধানী নয়াদিল্লিতে বিজেপির একজন কর্মী শেখর চাহাল। তিনি বলেন, আমি চাই কাশ্মীর থেকে সন্ত্রাস নিমূর্ল করুন মোদি। পাকিস্তানকে চাপে রাখুন। আমি আস্থাশীল যে, মোদি অযোধ্যায় মন্দির নির্মাণ করবেন। তবে এমন উদ্যোগ নিলে তাতে ফের উত্তেজনা সৃষ্টি হতে পারে। বিজেপিতে এবার যারা বিজয়ী হয়েছেন তার মধ্যে এমন একজন আছেন যিনি মুসলিমদের বিরুদ্ধে বোমা হামলা পরিকল্পনায় জড়িত বলে অভিযোগ আছে। আসামে বিজেপি এনআরসি বা নাগরিকপঞ্জি সম্পন্ন করেছে। সমালোচনা আছে যে, এর উদ্দেশ্য সেখানে বসবাসকারী বাংলাভাষী মুসলিমদের বহিষ্কার করা। এক্ষেত্রে ভারতের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, তারা বাংলাদেশি অবৈধ অভিবাসী। শুধু আসামই নয়, এনআরসি ভারতের অন্যান্য রাজ্যেও সম্পন্ন করার প্রচারণা চালিয়েছে বিজেপি। বিশেষ করে বাংলাদেশের সঙ্গে লাগোয়া পশ্চিমবঙ্গে এই প্রচারণায়ই বিজেপি খুব বেশি সুবিধা পেয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। সেখানে বসবাসকারী কথিত অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীদের বের করে দেয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন বিজেপি নেতারা। তবে উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের হাতে যেসব মুসলিম নির্যাতিত হয়েছেন, নিহত হয়েছেন তাদের নৃশংসতায়, সে বিষয়ে কোনো কথা বলে নি বিজেপি। এমন কি প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসও এ বিষয়ে কথা বলে নি। কারণ, তাদের ভয় ছিল, মুসলিম নির্যাতন ইস্যুতে কথা বললে তাদের গায়ে সাম্প্রদায়িকতার তকমা লেগে যেতে পারে। ফলে নানা কৌশলের কাছে এবার মার খেয়েছে বিরোধীরা।

ভারতের নির্বাচনে ধর্মের উঁকিঝুঁকি, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এখন নিম্নমুখী by মালবী গুপ্ত

শুধু হাওয়ায় যে তরবারি চালানো যায় না - এবার মনে হয় তার থেকে কিছু শিক্ষা ভারতের রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীদের হবে। কারণ, ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি'কে 'গণতন্ত্রের পক্ষে বিপজ্জনক' বলে কারো কারো মনে হলেও, সপ্তদশ সাধারণ নির্বাচনে জনগণের রায় শেষ পর্যন্ত সেই দলের প্রতিই যে আস্থা জ্ঞাপন করল!
এবং আর যাই হোক 'ইভিএম ম্যানিপুলেট করে' ভারতের মতো বিশাল দেশে আসমুদ্র হিমাচলের তাবৎ ভোটদাতার সমস্ত রায়কে যে শাসক দলের পক্ষে বদলে ফেলা যায় না - নিতান্ত বুদ্ধিহীন না হলে, সেই দাবিও বোধহয় ভবিষ্যতে আর কেউ করবেন না।
তবে একথা সত্য যে, ভোট দাতাদের অশিক্ষা - অজ্ঞতা অনেক সময়ই দুর্নীতিগ্রস্ত, খুন, ধর্ষণ ও 'সন্ত্রাসবাদে অভিযুক্ত' অপরাধীকেও নির্বাচিত করে। এবং ক্ষমতার অপব্যবহার ও অর্থের মাধ্যমে তাদের ক্ষমতায় টিকে থাকার কৌশলের কাছে প্রায়শই হার মানতে হয় জনগণকে।
আর গণতন্ত্রের নামেই বছরের পর বছর ধরে সেই অন্যায়, অপশাসনের জোয়াল আম জনতাকেই কাঁধে বয়ে বেড়াতে হয় । কিন্তু গণতন্ত্রের এইসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তার প্রতি কি আমরা আস্থা হারাতে পারি?
নব-নির্বাচিত সাংসদ: ভোপালে বিজেপি প্রার্থী প্রজ্ঞা ঠাকুর ২০০৮ সালে মালেগাঁও মসজিদে বোমা হামলা মামলার একজন আসামী।
যদিও ভোটের আগে প্রত্যেকবারই দেখি দেশের গণতন্ত্র রক্ষায় সব নেতা-নেত্রীই -- নাহ, সবাই নন কেউ কেউ -- যেন এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতায় নামেন। আশ্চর্য হই এই দেখেও যে, যাঁদের হাতে গণতন্ত্র হত্যার রক্ত সবচেয়ে বেশি লাগে, তাঁরাই গণতন্ত্রের সব থেকে বড় রক্ষক হিসেবে নিজেকে দেখতে চান, দেখাতেও চান।
আর সেই দেখানোর চেষ্টায়, যে যত বড় ঢাক গলায় ঝোলাতে পারেন, তার আওয়াজও তত দূরপ্রসারী হতে থাকে।
কিন্তু মুশকিল হল আমজনতা যেন ঠিক বুঝে উঠতে পারে না - কোনটা সত্যি । ওই ঢাকের আওয়াজ, নাকি তাঁদের জীবনের নিত্য দলিত ও নিহত হওয়া অধিকারগুলি।
ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র: ভারতের রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার সংখ্যালঘুদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে কি?
আসলে মনে ধন্দ জাগে এই কারণে যে, একই সঙ্গে একই ব্যক্তি দ্বারা তো গণতন্ত্র রক্ষা ও তার হত্যা সংঘটিত হতে পারে না। তাই একটিকে সত্য মানলে, অপরটিকে 'মায়া' বলে মানতেই হয়।
অবশ্য মনে হয় আমজনতা ওই সত্য ও মায়ার তফাৎটা একদিন না একদিন ঠিক ধরে ফেলে । আর সেই সত্যের উপলব্ধি থেকেই তার অসীম ক্ষমতা প্রয়োগ করে সে একদিন নিজের ভ্রম সংশোধন করে। তারই একদা নির্বাচিত গদি সে উল্টে দেয়, পাল্টেও দেয়।
আর সেই উল্টে দেওয়া, পাল্টে দেওয়ার ধারাবাহিকতাতেই প্রতি পাঁচ বছর অন্তর নির্বাচিত দলীয় প্রতিনিধিরা ভারতের লোকসভা ও বিধানসভায় যান। এবং অনেকেই এই সমগ্র নির্বাচনী প্রক্রিয়াটিকে 'গণতন্ত্রের উৎসব' বলতেও ভালবাসেন।
হ্যাঁ, উৎসবই বটে। তবে মনে হয় সেই উৎসবের আনন্দে সবাই শামিল হতে পারেন না। এবং দেশের সর্বত্র তা ঠিক উৎসব হিসেবে পালিতও হয় না।
কারণ অনেক সময়, অনেক জায়গাতেই সে উৎসবের উপচারে থাকে দলীয় নেতা ও প্রার্থীদের পরস্পরের প্রতি কুৎসিত-কদর্য ভাষা-সন্ত্রাসের দাপট। সে উৎসবে থাকে টাকার বিনিময়ে ভোট কেনা-বেচা। থাকে ভয় দেখানো, খুন জখম সহ নানাবিধ অত্যাচারের সাজানো নৈবেদ্যও।
কলকাতায় উৎসব: নির্বাচনী উৎসবের আনন্দে সবাই শামিল হতে পারেন না।
তাই কোন কোন জায়গায় সেই উৎসবের আনন্দের গায়ে লেগে যায় রক্তের ছিটে। আছড়ে পড়ে স্বজন হারানোর কান্না। এবং সেই আশির দশকের শেষ থেকেই রাজ্যে এই ট্র্যাডিশনে কখনো ছেদ পড়তেও দেখিনি ।
আসলে, কী দেশে, কী রাজ্যে, যতবারই পালাবদলে ভিন্ন ভিন্ন দলের আবির্ভাব ঘটুক না কেন, সরকার গঠনের সময় মন্ত্রীদের পক্ষ থেকে যত লম্বা চওড়া প্রতিশ্রুতির বন্যা বইয়ে দেওয়া হোক না কেন, যতই সংবিধানের কসম খেয়ে বুক ঠুকে গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে নিজেদের জাহির করার আপ্রাণ চেষ্টা থাক না কেন, গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে ভারতের স্থান কিন্তু ক্রমশই নিম্নগামী।
ইকনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট'র বাৎসরিক রিপোর্ট বলছে, গ্লোবাল ডেমোক্রেসি ইনডেক্স অনুযায়ী এক বছরের মধ্যে ভারতের স্থান ৩২তম থেকে ৪২তমতে নেমে এসেছে। আর তা ঘটেছে মূলত দেশে গোঁড়া ধর্মীয় আদর্শের উত্থান এবং সংখ্যালঘু ও ভিন্নমত পোষণকারীর প্রতি দলগত হিংসা, আক্রমণের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায়।
গণতান্ত্রিক দেশ তালিকার শীর্ষে: নরওয়ের রাজধানী অসলোতে সংসদ ভবন।
স্বাধীন দেশগুলিতে সত্যি কতটা গণতন্ত্র বজায় আছে, পৃথিবীর ১৬৫ দেশে সেই সমীক্ষা চালানো হয়। তাতে দেখা যায় আগের মতোই নরওয়ে আছে প্রথম স্থানে। যথাক্রমে ২য় ও ৩য় স্থানে আইসল্যান্ড ও সুইডেন। এবং প্রথম ১৯টি দেশে রয়েছে 'ফুল ডেমোক্রেসি'।
তবে ভারত সহ বহু দেশেই কিন্তু চলছে 'ফ্লড ডেমোক্রেসি' - অর্থাৎ ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র। আর ওই ১৬৫ দেশের মধ্যে ৫৫ দেশের মানুষ, যা বিশ্বের জনসংখ্যার ৪৩ শতাংশ, কিন্তু ওই 'ফ্লড ডেমোক্রেসি'তেই বাস করে।
তাই আমার আশঙ্কা হচ্ছে যে, ভবিষ্যতে চীন, রাশিয়া বা মিয়ানমারের মতো ভারতে 'অথরিটারিয়ান রেজিম' না হোক, প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ (৯২তম), নেপাল (৯৪তম), ভুটান (৯৯তম) ও পাকিস্তান (১১০তম), এর মতো 'হাইব্রিড রেজিম' হয়ে উঠবে না তো?
এমনিতে ভারতে ভোট ব্যাঙ্ক পলিটিক্স'র চর্চা বহু যুগ ধরেই চলছে। তাতে জাতপাতকে টেনে আনা হয়। 'ধর্ম'ও সেখানে উঁকিঝুঁকি মারে। কিন্তু এবারের নির্বাচনী প্রচারে তার তীব্রতা টের পাওয়া গেল।
'ধর্ম'র উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য ভাবে ঘটেছে। তাতে দেশের কতটা মেরুকরণ হল, আমাদের নেতা-নেত্রীদের এবার তা ভাবার সময়। কারণ বাড়িতে আগুন লাগলে সেই আগুনের আঁচ কিন্তু সবারই গায়ে এসে লাগে।
অবশ্য আশঙ্কার পাশাপাশি এখন এই আশা করছি যে, এবার দেশের নেতা-নেত্রীরা মানুষকে যেন আর অত বোকা না ভাবেন। নিজেদের আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য ব্যক্তিগত স্বার্থকে, জনগণের স্বার্থ বলে তুলে ধরার ভুল না করেন।
মনে এই আশাও লালন করছি যে, প্রকৃত তথ্য ও প্রমাণ ছাড়া চমক সৃষ্টির চেষ্টা না করে যেন দায়িত্বশীল হয়ে ওঠেন - যাতে ভারতীয় গণতন্ত্রের অধোগতিকে রুদ্ধ করার পথ তাঁরা শেষ পর্যন্ত খুঁজে পান।
মালবী গুপ্ত, সাংবাদিক, কলকাতা

শিশুর দৈর্ঘ্য ৯ ইঞ্চি ওজন ১১ আউন্স!

সদ্যোজাত শিশু তো ছোটই হয়, কিন্তু এত ছোট হবে তা মা-বাবার তো ধারণার বাইরে ছিল, ডাক্তাররাও কল্পনা করতে পারেননি।
গত জুলাই মাসে মাত্র ১১ আউন্সের ওজন নিয়ে পৃথিবীতে এসেছিল কনোর নামের ওই শিশু। যার দৈর্ঘ্য টেনেটুনে ৯ ইঞ্চি। আর ওজন হিসেব করল তা ছিল একটি সোডা ক্যানের থেকেও কম! খুবই বিরল এ ঘটনা দেখে চিকিৎসকেরা বলেছিলেন, জন্ম নেয়ার মতো আকারই আসলে ছিল না কনোরের। জন্মের পরে কনোরের বাবা নিজের এক হাতের তালুতে ধরে রাখতে পারতেন ওই শিশুকে। আবার তার হাতের তালুতেই পুরো শুইয়ে দেয়া যেত কনোরকে।
নিউইয়র্কের ওয়েস্টচেস্টার কাউন্টিতে ব্লাইথেডেল চিলড্রেনস হাসপাতালের শিশুবিভাগের প্রধান ডেনিস ডেভিডসন জানান, কনোর সম্ভবত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বেঁচে থাকা সবচেয়ে ছোট শিশুদের অন্যতম।
যখন চিকিৎসকেরা কনোরকে জ্যামি এবং জন ফোরিওয়ের সাথে অর্থাৎ তার মা-বাবার সাথে বাড়ি যাওয়ার অনুমতি দেন তখন তার ওজন বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১ পাউন্ড, জন্মের সময়ের ১৫ গুণ বেশি!
২৯ বছর বয়সী জ্যামি ফোরিও বলেন, জন্মের সময় মাত্র নয় ইঞ্চি লম্বা ছিল কনোর। কিন্তু নিজের লড়াইয়ে জিতে গিয়েছে সে। ডেভিডসন বলেন, ওর বাবা মা অবিশ্বাস্যভাবে কনোরের কিনিকাল অবস্থার সামান্যতম বিষয়গুলোও পর্যবেক্ষণ করত, এর মধ্যে ছিল দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের রোগ, নিউরোডেভেলপমেন্ট ডিসঅর্ডার এবং খাওয়ানোর সমস্যা ইত্যাদি।
কনোরের বাবা জন বলেন, “আমরা অবশেষে ওকে এখানে আনতে পেরে খুব খুশি, কিন্তু এখন আরও কাজ ও দায়িত্ব বাড়ছে। এখন আমাদেরকেই তার পুরো যতœ নিতে হবে। ডাক্তাররা বলেছেন যে সম্ভবত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ওর সম্পূরক অক্সিজেন বন্ধ করা হবে। জন বলেন, ভবিষ্যতে আমার আশা, ও একটি স্বাভাবিক শৈশব পাবেই।
উল্লেখ্য, একটি জরুরী সি-সেকশন জন্মের মধ্যে দিয়ে ডেলিভারি হয় কনোরের এবং মারিয়া ফেরারি চিলড্রেনস হাসপাতালের নবজাতকদের আইসিইউতে পাঁচ মাস রাখা হয় তাকে, পরে ব্লাইথেডেল চিলড্রেন হাসপাতাল রাখা হয় আরো চার মাস।
জ্যামি ফোরিওর গর্ভধারণের ২৫তম সপ্তাহে চিকিৎসকেরা তাকে জানিয়েছিলেন, যে কনোরের বিকাশের জন্য পর্যাপ্ত পুষ্টি পাওয়া যাচ্ছে না। জ্যামির প্ল্যাসেন্টার মধ্যে কিছু সমস্যা থাকায় কনোর স্বাভাবিক হারে বেড়ে ওঠার জন্য পর্যাপ্ত পুষ্টি গ্রহণ করতে পারছিল না। এক সপ্তাহ পরেই, চিকিৎসকরা সিদ্ধান্ত নিলেন যে একটি জরুরি সি-সেকশন প্রয়োজন।
জ্যামি ফোরিও বলেন, আমরা জানতাম যে এটা ঝুঁকিপূর্ণ, তারপরও আমরা বলতাম, যা যা করা আমাদের পক্ষে সম্ভব তার সবই করবো। তাদের আশা ছিল, যাই কিছু হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত সুস্থ ও শক্তিশালী হয়ে উঠবেই তাদের সন্তান।
তাদের সে আশা বিফলে যায়নি। ক্রমেই সুস্থ হয়ে উঠছে কনোর। আশা করা যাচ্ছে, কিছুটা দুর্বলতা থাকলেও এক সময় পূর্ণ সুস্থ হয় ওঠবে বিরল জন্মের এই শিশু।

বাংলাদেশ, মিয়ানমারের সঙ্গে কানেকটিভিটিতে জোর দিয়েছে ভারত

দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার দু’সপ্তাহ পরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কেন্দ্রীয় সরকার পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিবেশীদের সঙ্গে কানেকটিভিটি বা সংযুক্তি উন্নত করতে নতুন কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে মিনি ইন্টিগ্রেটেড চেক পোস্ট (আইসিপি), বাংলাদেশ সীমান্তে সড়কে ট্রাফিক সঙ্কট সমাধানে রেলভিত্তিক রো-রো সার্ভিস চালু, মিয়ানমার ও মণিপুরের মধ্যে বাস সার্ভিস শুরু করা। এ খবর দিয়েছে ভারতের দ্য হিন্দুর বিজনেস লাইন। 
আগেই ধারণা করা হয়েছিল ভারতে নতুন সরকার বিবিআইএন (বাংলাদেশ, ভুটান, ইন্ডিয়া ও নেপাল) এবং বিমসটেকভুক্ত (বাংলাদেশ, ইন্ডিয়া, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, নেপাল ও ভুটান) দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য ও সংযুক্তিতে মনোযোগ দেবে। এসব প্রকল্প কার্যকর করতে বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বয় জোরালো দেখা যাচ্ছে। পরিকল্পনায় শীর্ষস্থানীয় ভূমিকা রাখছে এনআইটিআই আয়োগ। পাশাপাশি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে সম্প্রতি গঠিত লজিস্টিকস ডিপার্টমেন্ট সরকারের বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে একযোগে কাজ করানোর বিষয় নিশ্চিত করছে।
প্রত্যাশা করা হচ্ছে বিভিন্ন বাণিজ্যিক সুবিধা বিষয়ক প্রকল্পগুলোর দক্ষতা বৃদ্ধি করা হবে, যেখানে যোগবাণীতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্থল বন্দর কর্তৃপক্ষ ভারতীয় অংশে নির্মাণ করছে আইসিপি।
অন্যদিকে নেপাল অংশে আইসিপি নির্মাণে অর্থায়ন করছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে দু’দেশের মধ্যে সংযুক্তিতে কাজ করছে রেলওয়ে।
উত্তম সমন্বয় কিছু উদ্ভাবনী সমাধান নিয়ে আসছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কলকাতা ও বাংলাদেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় স্থল সীমান্তে পেট্রাপোল-বেনাপোলের মধ্যে সার্ভিস শুরু করার প্রস্তাব করেছে রেলওয়ে। এটা হলে লোড করা ট্রাক রোল ইন এবং রোল আউট  (রো-রো) সহজ হবে। সেন্ট্রাল ওয়্যারহাউজিং করপোরেশন (সিডব্লিউসি) একটি অনলাইন প্লাটফর্ম প্রস্তুত করছে, যাতে আগেভাগেই আইসিপি পেট্রাপোলে ভারতীয় ট্রাকগুলো পার্কিং স্পেস বুকিং করতে পারে। এর উদ্দেশ্য হলো কলকাতা থেকে পেট্রাপোল পর্যন্ত ৭০ কিলোমিটার সংযোগ সড়কে যানজট কমিয়ে আনা এবং সীমান্ত শহর বনগাঁয় উৎকোচ আদায়কারী স্থানীয় চক্রগুলোর ইতি ঘটানো।
বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সীমান্তে বাণিজ্য ও যাত্রী চলাচল সহজ করার জন্য ১০টি স্থল কাস্টমস স্টেশন আধুনিকায়নের মাধ্যমে মিনি আইিসিপিতে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এসব স্টেশন দিয়ে অবকাঠামোর অভাবে পণ্য চলাচল হওয়ার ঘটনা বিরল।  বিদ্যমান আইসিপিগুলো (মনিপুরের মোরে, পশ্চিমবঙ্গের পেট্রাপোল এবং ত্রিপুরার আখাউড়া) এবং আসন্ন আইসিপিগুলোর (আসামের সুতারকান্দি, ত্রিপুরার সাব্রম ও মেঘালয়ের ডাউকি) ঊর্ধ্বে থাকবে এসব।
আধুনিকায়নের জন্য যে তালিকা করা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে মিয়ানমারের সঙ্গে অরুণাচল প্রদেশের নামপং এবং মিজোরামের জোখাওথার। এর মধ্যে ত্রিমুখী হাইওয়ে হিসেবে (ভারত থেকে থাইল্যান্ড) মনিপুর হয়ে ভারতকে সংযুক্ত করবে জোখাওথার সীমান্ত। অন্যদিকে বাংলাদেশ সীমান্তে মেঘালয়ের মহেন্দ্রগঞ্জ, মেঘালয়ের শেইলা বাজার এবং ত্রিপুরার শ্রীমান্তপুর এবং রঘনাবাজার রয়েছে মিনি আইসপি প্রস্তাবনায়।
তবে এই তালিকা চূড়ান্ত করা হবে বিস্তারিত পর্যালোচনা বা পর্যবেক্ষণের পর। যতক্ষণ এই কাজ চলবে ততক্ষণ নাগাল্যান্ড এবং মিয়ানমারের মধ্যে বাণিজ্য উন্মুক্ত করতে একটি যুৎসই স্থান খুঁজছে সরকার। উল্লেখ্য, নাগাল্যান্ডের কোনো বাণিজ্যিক সুবিধা নেই। এরই মধ্যে মিয়ানমারের মান্দালয় এবং মনিপুরের ইম্ফলের মধ্যে বাস সার্ভিস শুরু করা নিয়ে গত সপ্তাহে বৈঠক করেছেন ভারত ও মিয়ানমারের কর্মকর্তারা। দীর্ঘ প্রটোকল এড়িয়ে দ্রুততার সঙ্গে এ সার্ভিস চালু করতে চাইছে দুই দেশের সরকার।
একজন কর্মকর্তা বলেছেন, মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে উন্নত সমন্বয় উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর জন্য শুভকর হবে। যদিও বিভিন্ন মন্ত্রণালয় তাদের মোট বাজেটের শতকরা ১০ ভাগ উত্তর-পূর্বের জন্য বরাদ্দ রাখার কথা বলেছে, কিন্তু এসব অর্থ অনেক সময়ই সমন্বয়ের অভাবে অব্যবহৃত থেকে যায়।

টেকনাফের ছোট নৌকার জেলেদের বড় বিপদ by আব্দুল কুদ্দুস

বিশ্বের দীর্ঘতম কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের পাশে ৮৪ কিলোমিটারের দৃষ্টিনন্দন মেরিন ড্রাইভ সড়ক। সড়কের ওপর এবং পশ্চিম পাশে (সমুদ্রের দিকে ঝাউবাগানের কাছে ) সাজানো অবস্থায় পড়ে আছে শত শত রঙিন নৌকা। স্থানীয় লোকজন বলেন ‘ডিঙি নৌকা’। ভ্রমণে আসা পর্যটকেরা নৌকার পাশে দাঁড়িয়ে তুলছেন ছবি কিংবা সেলফি। নৌকাগুলো বিনোদনের খোরাক মেটালেও নৌকার মালিক ও জেলেশ্রমিকেরা আছেন মহাবিপদে। ১ মাস ধরে জেলেরা সাগরে মাছ ধরতে না পারায় আর্থিক টানাপোড়েনে সময় পার করছেন। সরকারি নিষেধাজ্ঞায় গত ২০ মে থেকে টানা ৬৫ দিনের জন্য সাগরে মাছ ধরা বন্ধ কর্মসূচি চলছে। এতে টেকনাফ উপজেলার তিন হাজার নৌকার অন্তত ৪০ হাজার জেলে বেকার হয়ে পড়েছেন। পাশের উপজেলা উখিয়ারও কয়েক হাজার জেলে পরিস্থিতির শিকার।
জেলেরা বলেন, গত রোজার ঈদে মৎস্য বিভাগ নিবন্ধিত জেলার ৪৬ হাজার জেলে পরিবারে সরকারিভাবে ৪০ কেজি করে চাল বিতরণ করা হয়। এর মধ্যে টেকনাফের সাত হাজার জেলেও ছিলেন। তবে ছোট নৌকার আরও অন্তত ৪০ হাজার জেলে ত্রাণসহায়তা পাননি। তাঁদের ঈদ কেটেছে চরম কষ্টে। আগামী আরও এক মাস সাগরে মাছ ধরা বন্ধ থাকবে। তখন জেলেদের কী অবস্থা হবে এই ভেবে পরিবারগুলো চরম শঙ্কার মধ্যে।
গত রোববার দুপুরে মেরিন ড্রাইভ সড়কের টেকনাফের মহেশখালীয়াপাড়া অংশে গিয়ে দেখা গেছে, সড়কের পাশে সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়েছে কয়েক শ রঙিন নৌকা। পাশের ঝাউবাগানের ভেতরে রাখা হয়েছে অসংখ্য নৌকা। নৌকায় কোনো জেলে নেই। নেই মাছ ধরার জাল। ৫-৭টা নৌকা মিলে পাহারা দিচ্ছেন একজন করে জেলে। বিকেলে উখিয়ার রেজুখালের রেজুব্রিজ এলাকায় দেখা গেছে শতাধিক নৌকা।
মহেশখালীয়াপাড়ার জেলে আবুল কালাম (৪০) বলেন, ডিঙি নৌকাগুলো সমুদ্রের এক কিলোমিটারে গিয়ে ছোট আকৃতির লইট্যা, পোপা, ছুরি, ছিটকিরি, ফাইস্যা, চিংড়ি, বাটামাছ ধরে আনা হয়। দিনের বেলায় ধরা হয় এসব মাছ। তারপর বালুচরে বিক্রি হয় মাছগুলো। ৮০ শতাংশ মাছ টেকনাফ, উখিয়া ও কক্সবাজার শহরের হাটবাজারে বিক্রি হয়। স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে কিছু মাছ সরবরাহ হয় চট্টগ্রাম ঢাকায়। এখন এক মাস ধরে মাছ ধরা বন্ধ থাকায় স্থানীয় হাটবাজারে মাছের তীব্র সংকট চলছে। অন্যদিকে বেকার জেলেদের হাহাকার অবস্থা।
টেকনাফ নৌকা মালিক সমিতির উপদেষ্টা ও সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক ইউপি সদস্য সুলতান আহমদ বলেন, এ সমিতির আওতায় দেড় হাজার ডিঙি নৌকা আছে। সমুদ্রের একেবারে তীরে নৌকার জেলেরা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তবে ৫০ থেকে ১০০ কিলোমিটার গভীর সাগরে গিয়ে ইলিশ, কোরাল, রুপচান্দা, লাক্ষাসহ বড় মাছ ধরে কক্সবাজারের আরও পাঁচ হাজার ট্রলার। গভীর সাগরে মৎস্য ভান্ডার সমৃদ্ধ করতে ভারী ট্রলারগুলোর ৬৫ দিন মাছ ধরা বন্ধ ঘোষণা দিয়েছে সরকার। কিন্তু উপকূলের ডিঙি নৌকাগুলো নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত করায় উপকূলের দরিদ্র জেলেরা হতাশ।
নৌকা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক নুর মোহাম্মদ গণি বলেন, ‘টেকনাফের ৪০ হাজার জেলের দুরবস্থার চিত্র তুলে ধরে গত ২৬ মে কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবরে আমরা স্মারকলিপি পাঠিয়েছিলাম। এ পর্যন্ত সাড়া মেলেনি।’ এর আগে কক্সবাজার শহর ও টেকনাফ পৌরসভা এলাকায় ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে টেকনাফ উপকূলের ক্ষুদ্র নৌকার জেলেদের মাছ ধরার সুযোগ দাবি করে জেলেরা মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত জেলেরা মাছ ধরার অনুমতি পাননি।
জেলেরা বলেন, ৬৫ দিন সাগরে মাছ ধরা বন্ধ থাকলে উপকূলের হাজারো জেলে পরিবারে বিপর্যয় নেমে আসবে। কয়েক লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর চাপে নাকাল টেকনাফে জেলেদের মাছ ধরা ছাড়া বিকল্প কোনো কাজও নেই।
টেকনাফ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুল আলম বলেন, ইয়াবা চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকানোর লক্ষ্যে ২০১৭ সালের ৩ এপ্রিল থেকে গত দুই বছর টেকনাফের নাফ নদীতে জেলেদের মাছ ধরা বন্ধ রাখা হয়েছে। এখন সমুদ্র উপকূলের কাছাকাছিতে দৈনিক ভিত্তিতে ডিঙি নৌকার জেলেদের মাছ ধরাও বন্ধ আছে। এতে ৪০ হাজার জেলে পরিবারে অভাব-অনটন ও হতাশা দেখা দিয়েছে।
টেকনাফ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, সরকারি সিদ্ধান্তে মাছ ধরা বন্ধ রাখা হয়েছে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশরাফুল আফসার বলেন, নাফ নদীতে মাছ ধরার বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসছে। শিগগিরই জেলেরা মাছ ধরতে পারবেন।
সাগরে মাছ ধরা বন্ধ, মেরিন ড্রাইভ সড়কের টেকনাফের মহেশখালীয়াপাড়া অংশে অলস পড়ে আছে কয়েক শ রঙিন নৌকা। ছবি: আব্দুল কুদ্দুস

যে কারণে চিরঘুমে এই যুবক

বিছানায় ফোন চার্জে রেখে ঘুমিয়েছিলেন ২২ বছরের এক যুবক। গভীর ঘুমে মগ্ন সেই যুবকের হাত মোবাইলের চার্জারের ওপর পড়েছিল। আর এতেই বিদ্যুতায়িত হয়ে ঘুম থেকে চিরঘুমে চলে গেছেন ওই যুবক।
ব্রিটিশ দৈনিক ডেইলি মেইল এক প্রতিবেদনে বলছে, গত ২৭ মে সোমবার মধ্যরাতে এ ঘটনা ঘটেছে থাইল্যান্ডের নাখন রাতচ্যাশিমা প্রদেশে। ওই যুবক তার কক্ষে রাতে একাই ঘুমিয়েছিলেন।
সকালের দিকে পরিবারের সদস্যরা ওই যুবকের কক্ষে প্রবেশ করে বিছানার ওপর নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখেন। কিন্তু তার ডান হাত মোবাইল চার্জারের তারের ওপর রাখা। তখনও মোবাইলের চার্জার ওয়াল সকেটে লাগানো।
তার ডান হাতে পুড়ে যাওয়ার দাগ রয়েছে। মরদেহের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিবারের স্বজনরা কক্ষে প্রবেশের প্রায় পাঁচ ঘণ্টা আগেই ওই যুবক মারা গেছেন।
নিহত যুবকের মা বলছেন, তার ছেলে কঠোর পরিশ্রমী ছিল। তিনি বলেন, একেবারে ছোটবেলা থেকেই স্থানীয় বাজারে বাবার সবজি বিক্রিতে সহায়তা করে আসছিল সে।
মাত্র কয়েকমাস আগেই থাইল্যান্ডে একটি কারখানার শ্রমিকের প্রাণহানি ঘটে প্রায় একইভাবে। ওই শ্রমিক রাতে মোবাইল ফোন চার্জে রেখে কানে হেডফোন লাগিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল।
পরদিন সকালে তাকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। পরে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে চিকিৎসকরা জানান, কানে হেডফোন রেখে ঘুমিয়ে পড়ায় ওই ব্যক্তি বিদ্যুতায়িত হয়ে মারা গেছেন।