Showing posts with label খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ. Show all posts
Showing posts with label খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ. Show all posts

Sunday, June 14, 2015

বাজেট ২০১৫–১৬: ধারাবাহিকতা আছে, বৈষম্য কমানোর নির্দেশনা নেই by খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ

২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেটে চলমানতা বজায় রয়েছে। ২০০৮ সালের পর থেকে দীর্ঘদিন একই রাজনৈতিক জোট ক্ষমতায় রয়েছে। রাজনৈতিক চলমানতার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক ধারাবাহিকতাও দৃশ্যমান। অর্থনৈতিক নীতি ও অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে তেমন বড় কোনো দিক পরিবর্তন ঘটেনি। গত কয়েক বছরের বাজেটগুলোকে পাশাপাশি রেখে পর্যালোচনা করলে সামঞ্জস্য ও ধারাবাহিকতা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। এবারের বাজেটও ব্যতিক্রম নয়। নতুন পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার পরিপ্রেক্ষিতে বাজেটে নতুন ধারা সৃষ্টির কথা কেউ কেউ বলছিলেন। তাঁদের মনে রাখতে হবে, পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাও একই ধারাবাহিকতায় প্রণীত। এখানে স্বপ্ন আছে, বিস্তৃতির প্রক্ষেপণ আছে, বৈচিত্র্যায়ণের সুযোগও রয়েছে। কিন্তু নৈতিক বাঁক পরিবর্তনের সুযোগ নেই। এ রকম দুর্লভ ধারাবাহিক চলমানতায় অর্জন কতটা হয়েছে, সে বিষয়ে মাননীয় অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় কিছুটা উল্লেখ করেছেন। অর্জনটা আরও অধিক হতে পারত কি না, সে প্রশ্ন থাকতেই পারে।
এবারের বাজেটে করপোরেট করের হার কিছুটা কমেছে। এটি ব্যবসাবান্ধব। বাংলাদেশে এই হার সর্বোচ্চ ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত ছিল। এটি অবাস্তব ও নিপীড়নমূলক। করপোরেট বিনিয়োগে প্রতিবন্ধকও বটে। ব্যাংক-বিমা কোম্পানির করের হার ৪২.৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪০ শতাংশ করা হয়েছে, যা উচ্চহার হিসেবেই বিবেচিত। মুনাফা ঠিক রেখে উচ্চহারে কর প্রদানের ফলে ব্যাংকের সুদের উচ্চহার বজায় রয়েছে। করের হার কমিয়ে সুদের হার কমানোর চাপ প্রয়োগ করা উচিত। উল্লেখ্য, ভারত অর্থনৈতিক উল্লম্ফনের জন্য বিনিয়োগ আকর্ষণের কৌশল হিসেবে আগামী চার বছরের মধ্যে করপোরেট করের হার ২৫ শতাংশে কমিয়ে আনার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এ ধরনের কৌশল বাংলাদেশেও সুফল আনবে। নীতি পর্যায়ের একটি ঘোষণা এ বাজেট অধিবেশনেই প্রদান করা হোক। প্রস্তাব রাখছি, আগামী পাঁচ বছরে করপোরেট করের হার সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনার নীতি ঘোষণা দেওয়া হোক। এর ফলে বিনিয়োগ সচল হয়ে উঠবে।
অবশ্য বাজেটে পুঁজিবাজারভুক্ত কোম্পানিগুলোর করের হার ২৭ দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। এটি অনুপ্রেরণামূলক হলেও পুঁজিবাজারের বিবিধ কারণে গড়ে ওঠা অনাস্থা দূর হবে না। ইমেজ-সংকট কাটাতে হলে আরও কিছু দৃশ্যমান সংস্কার করতে হবে।
ব্যক্তি পর্যায়ে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত আয়করমুক্ত রাখা হয়েছে। এটি করদাতাবান্ধব সিদ্ধান্ত। তবে করজাল সম্প্রসারণের জন্য উপজেলা পর্যায়ে আয়কর অফিস স্থাপনের বিষয়টি কস্ট বেনিফিট বিবেচনায় সন্তোষজনক হবে না। উচ্চ আয়ের জনগোষ্ঠী কয়েকটি নগর অঞ্চলে বাস করে। গ্রামে তাদের বাড়ি থাকলেও তারা শহুরে করদাতা। পল্লি এলাকায় কিছু মার্জিনাল করদাতাসহ মধ্য আয়ের স্বল্পসংখ্যক মানুষ রয়েছে। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কর আদায়ে কর কর্মকর্তাদের সাফল্য নেই। ফলে সংস্থাপন ব্যয় ওঠানোর জন্য দুর্বল মার্জিনাল করদাতাদের ওপর চাপ পড়তে পারে। উপজেলা পর্যায়ে স্বনির্ধারণী পদ্ধতিতে প্রদত্ত আয়কর ফাইনাল সেটেলমেন্ট হিসেবে গ্রহণের মাধ্যমে আস্থা অর্জন করা প্রয়োজন। ভীতি সৃষ্টি না করে জনবান্ধব কৃষ্টি গড়ে তোলার জন্য উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ ও নির্দেশ দেওয়ার প্রয়োজন হবে।
বৈষম্য দূরীকরণের বিষয়টি বাজেটে যথাযথ দৃশ্যমান হয়নি। ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলে সম্পদ চুইয়ে পড়বে, এমন ধারণা অমূলক। বিশ্বব্যাংকের এই পুরোনো ধারণা এখন অচল। এবারের বাজেটের সবচেয়ে দুর্বল দিক হচ্ছে স্ফীত আয় খাত। রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক আদায়যোগ্য কর ধরা হয়েছে ১.৭৬ লাখ কোটি টাকা। পূর্ববর্তী বছরের বাজেটে এই খাতে আয় ধরা হয়েছিল ১.৫০ লাখ কোটি টাকা, যা সংশোধিত হয়ে দাঁড়িয়েছিল ১.৩৫ লাখ কোটি টাকায়। অর্থাৎ ৩০ শতাংশ বর্ধিত আয় এবার। এই বৃদ্ধির উপাদান-কারণ বর্ণিত হয়নি। অর্জনের উপায় বিশ্লেষণ না করে বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের দোহাই দিয়েছেন, যা প্রথাসম্মত নয়। একজন সরকারি কর্মকর্তাকে বলির পাঠা সাজানো অনৈতিক। রাজস্ব বোর্ডের পক্ষে ১.৭৬ লাখ কোটি টাকা অর্জন সাধ্যাতীত বলেই শঙ্কা হয়। সে ক্ষেত্রে ঘাটতি বিশাল আকার ধারণ করবে এবং বাজেট বাস্তবায়ন দুঃসাধ্য হয়ে উঠবে। প্রায় তিন লাখ কোটি টাকার বাজেট আনন্দদায়ক, কিন্তু আয়ের নড়বড়ে স্তম্ভের ওপর দাঁড় করানো বাজেটটি ধসে পড়ার বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন প্রয়োজন।
৬ শতাংশের চক্র ভেদ করে জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশে উন্নীত করার প্রত্যয় ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী। বৃদ্ধির জন্য যে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, সে কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি। কিন্তু বিনিয়োগ বৃদ্ধির কৌশল বাজেটে খুব একটা প্রতিফলিত হয়নি। করপোরেট কর সামান্য অবনয়নের ফলে ব্যাপক বিনিয়োগ আসবে, এমনটা মনে হয় না। বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণ অন্যত্র। বিদ্যুৎ-গ্যাসের সংযোগ এখনো সহজলভ্য নয়, স্পিড মানি না দিলে পাওয়াই যায় না, এমন অভিযোগ সর্বত্র। শিল্প-জমি দুষ্প্রাপ্য। অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরির ঘোষণা গত বছরের বাজেট বক্তৃতায় ছিল, কিন্তু বাস্তবায়িত হয়নি। দ্রুত প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উভয় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা একটি ব্যাধি।
এটি দূর করতে হলে ‘বোর্ড অব ইনভেস্টমেন্টের’ স্থলে অথবা তার পাশাপাশি ‘ইনভেস্টমেন্ট প্রোমোশন বডি’ স্থাপন করতে হবে। বিনিয়োগ বোর্ড একটি রেগুলেটরি সংস্থা। প্রমোশনাল সেবা দিতে পারছে না। রেগুলেটর আর প্রমোটরের কাজের ধরনই ভিন্ন। পরিচালকদের মানসিকতা ও দক্ষতাও ভিন্ন। সে কারণে ব্যক্তি খাতের মানসিকতা ও প্রধান উদ্যোক্তা সমন্বয়ে প্রমোশন সংস্থা গঠন করা যেতে পারে।
বৈষম্য দূরীকরণের বিষয়টি বাজেটে যথাযথ দৃশ্যমান হয়নি। ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলে সম্পদ চুইয়ে (Parcolate) পড়বে, এমন ধারণা অমূলক। বিশ্বব্যাংকের এই পুরোনো ধারণা এখন অচল। অবশ্য বৈষম্য হ্রাসে সম্পদ বণ্টন-প্রক্রিয়ায় প্রবৃদ্ধির গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু সম্পদ বণ্টনের জন্য ‘ইন্টারভেনশন’ একান্ত প্রয়োজন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আওয়ামী লীগ পরিচালিত সরকার বাজেটে ধারাবাহিকভাবে সোশ্যাল সেফটিনেট বা সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগের মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য ইন্টারভেনশন সৃষ্টি করেছে।
কৃষি খাতে ভর্তুকিও একটি ফলপ্রসূ ইন্টারভেনশন বিবেচিত হয়েছে। এ বছরের বাজেটে সফল ইন্টারভেন দুটির উপস্থিতি আশানুরূপ হয়নি।
বাজেট বা জাতীয় আয়ের শতকরা হার হিসাবে বর্তমান বাজেটে সেফটিনেটে বরাদ্দ হ্রাস পেয়েছে, যদিও উপকারভোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে মর্মে উল্লেখ করেছেন অর্থমন্ত্রী। বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার। কল্যাণ অর্থনীতির প্রবক্তা বর্তমান সরকারের সম্পদ বণ্টন তথা বৈষম্য হ্রাসকরণ নীতিমালার বাঁক পরিবর্তন না ঘটে, এমনটাই আশা। পুঁজিবাদী অর্থনীতির চাবুক খেয়ে বৈষম্য পরিমাপক গিনি কো-এফিশিন্টের ক্রম ঊর্ধ্বগতিতে বৈষম্য যখন প্রকট থেকে প্রকটতর হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তখন শেখ হাসিনা দৃঢ়চিত্ততার সঙ্গে বৈষম্য রোধক ইন্টারভেনশন জোরদার করেছিলেন। ফলে গিনি কো-এফিশেন্ট দশমিক ৪৭ পর্যায়ে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে, অর্থাৎ প্রবল বৈষম্য বাড়ছে না বটে, তবে হ্রাসও পাচ্ছে না।
উল্লেখ্য, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে গিনি কো-এফিশেন্টের মাত্রা ছিল দশমিক ২৭, যা সহনীয় বৈষম্য হিসেবে বিবেচিত। পঁচাত্তরের পর থেকে প্রবৃদ্ধির চেয়েও বেশি বেড়েছে বৈষম্য। এখন চরম বৈষম্য অবস্থা বিদ্যমান। এর জন্য বাজেটে আরও দৃঢ় ও ব্যাপক অভিঘাত প্রয়োজন।
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ: ব্যাংকার, সাবেক ডেপুটি গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক।

Friday, October 31, 2014

শেয়ার বাজার কারসাজির সঙ্গে জড়িত সবার শাস্তি হোক by খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ

২০১০ সালে শেয়ারবাজার পতনের কারণে বহু মানুষ রিক্ত হয়েছেন। সেই ঘটনার পর সরকার এর কারণ খতিয়ে দেখতে আমাকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। সেই কমিটির নির্ধারিত সময় ছিল দুই মাস। কমিটি যথাসাধ্য চেষ্টা করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন পেশ করে। তবে বলার অপেক্ষা রাখে না যে, দুই মাসের মধ্যে এত বড় একটি ঘটনার তদন্ত করা খুব কঠিন কাজ। তার পরও আমরা এ সময়ের মধ্যে কিছু অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছিলাম। আমাদের তদন্তে বেরিয়ে আসে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) দুর্বলতার কারণে শেয়ারবাজারে এত বড় কেলেঙ্কারি ঘটেছিল।

বিশেষ করে অমনিবাস অ্যাকাউন্টবিষয়ক অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা আমরা খুঁজে পেয়েছিলাম। এই অমনিবাস অ্যাকাউন্ট ভুতুড়ে অ্যাকাউন্ট হিসেবে পরিচিত ছিল। এই অ্যাকাউন্ট নিয়ে সরকার বা বিএসইসি কেউই তেমন একটা মাথা ঘামাত না। এতে বোঝা যায়, এসব অ্যাকাউন্ট যাঁরা পরিচালনা করেন, তাঁরা অনেক শক্তিশালী। অনুসন্ধানে আমরা অমনিবাস অ্যাকাউন্টে দুর্নীতির সত্যতা খুঁজে পেয়েছিলাম। এ কথাও সত্য যে, সময়ের অভাবে আমরা এই কয়েক লাখ ছায়া হিসাব পরীক্ষা করতে পারিনি। আমরা পুনর্গঠিত বিএসইসিকে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছিলাম।
কিন্তু আমরা তদন্ত প্রতিবেদন পেশ করার পর অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বললেন, এ প্রতিবেদন ধারণাসম্মত, বাস্তবতার প্রতিফলন এখানে নেই। সরকারের আরও কোনো কোনো মন্ত্রী নেতিবাচক মন্তব্য করেছিলেন বলে শুনেছি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এ তদন্ত কমিটিতে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা কেউই ধারণার ওপর ভিত্তি করে এত বড় একটি ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন পেশ করবেন, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।
পরবর্তীকালে, আমাদের সুপারিশ অনুসারে বিএসইসি তদন্ত করে আমাদের অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পেয়েছে। এমনকি আমাদের কিছু সুপারিশ বাস্তবায়িতও হয়েছে। অর্থমন্ত্রী এখন তাঁর সেই বক্তব্য প্রত্যাহার করবেন বলে আশা করি। আমরা সুপারিশ করেছিলাম, শেয়ারের ডিমিউচুয়ালাইজেশন করতে হবে। বিএসইসি দেরিতে হলেও তা করেছে। এর ফলে পুঁজিবাজারে এখন বড় কোনো উল্লম্ফন নেই, আবার বড় পতনও নেই। বলা যায়, বাজারে একধরনের স্থিতিশীলতা এসেছে। এটা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক ঘটনা।
সরকার অ্যান্টি মানি লন্ডারিং অ্যাক্ট করতে গিয়ে একটি শর্ত পূরণ করতে বাধ্য হয়। কারণ, এ আইনটি করতে গেলে প্যারিসভিত্তিক এগমন্ট গ্রুপের সদস্য হতে হয়। তাদের শর্তানুসারে কোনো দেশ অ্যান্টি মানি লন্ডারিং অ্যাক্ট করতে গেলে তাকে আগে অমনিবাস অ্যাকাউন্ট বন্ধ করতে হবে। ফলে সরকার অমনিবাস অ্যাকাউন্ট বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে এ প্রক্রিয়া একরকম ধীরগতিতে চলছে। বলাবাহুল্য, আমরা প্রতিবেদনে অমনিবাস অ্যাকাউন্ট বন্ধের সুপারিশ করেছিলাম। একই সঙ্গে এখন বিএসইসির নজরদারিব্যবস্থা আরও উন্নত হয়েছে। এ কাজে লোক নিয়োগ করা হয়েছে, সফটওয়্যার প্রবর্তন করা হয়েছে। একটি সাির্ভল্যান্স বিভাগ চালু হয়েছে। এর ফলে শেয়ারবাজারের দুর্নীতি তারা এখন আরও দক্ষতার সঙ্গে চিহ্নিত করতে পারবে বলে আমি আশা রাখি।
এবার দুজন ব্যক্তিকে শেয়ারবাজার কারসাজি করার অভিযোগে জরিমানা করা হয়েছে। এটাকে শুভ সূচনা হিসেবে বিবেচনা করা যায়। আমরা আরও অনেকের বিরুদ্ধেই অমনিবাস অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে কারসাজি করার অভিযোগ এনেছিলাম, আশা করি তাঁদের বিরুদ্ধেও তদন্ত করে বিএসইসি যথাযথ ব্যবস্থা নেবে। অর্থাৎ অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে, আর প্রমাণিত না হলে তাঁদের নির্দোষ ঘোষণা করবে।
শুধু শেয়ারবাজার নয়, বলা হয়ে থাকে বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে মাফিয়া চক্রের প্রভাব খুব বেশি। সরকারের ওপরও এদের প্রভাব অনেক। অতীতে আমরা হাওয়া ভবন দেখেছি, এখন হয়তো হাওয়া ভবন নেই, কিন্তু কাজগুলো ঠিকই হচ্ছে। এখানে একটা উদাহরণ দিতে পারি, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির পর আমরা যখন তদন্তের কাজ করছিলাম, তখন একদিন শেয়ারবাজারে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি আমাদের কাছে এলেন। পুরো তদন্ত কমিটির সামনে তিনি বললেন, ‘স্যার, আমাদের ঘাঁটায়েন না। কিছু করতে পারবেন না।’ আমি তখন তাঁকে বললাম, আমরা ঘাঁটানোর কে, তদন্তে যা বেরিয়ে আসবে, তাই আমরা তুলে ধরব। ঘাঁটাবে তো সরকার। তখন তিনি বললেন, ‘স্যার, ওটা ঠিক আছে। আপনারা ঘাঁটায়েন না।’ তখন তিনি আরও বললেন, ‘আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে আমরা সামনে থাকি আর বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে অন্যরা সামনে আসবে, আমরা পেছনে থাকব।’
বিএসইসি শেয়ারবাজার কারসাজির দায়ে মোসাদ্দেক আলী ফালু ও গোলাম মোস্তফাকে যথাক্রমে এক কোটি ও তিন কোটি টাকা জরিমানা করেছে। এর মাধ্যমে এটাই প্রমাণিত হলো যে প্রভাবশালীরা যত শক্তিশালীই হোন না কেন, তাঁরা আইনের ঊর্ধ্বে নন। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, শেয়ারবাজার কারসাজির সঙ্গে জড়িত অন্যদের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সে ক্ষেত্রে কেউ এসে তদন্ত কমিটিকে এ কথা বলার সাহস পাবে না যে আমাদের ঘাঁটায়েন না। সরকারের উচিত এ ধরনের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া।
তবে শেয়ারবাজার তথা আর্থিক খাতের অনিয়ম রোধ করতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাই বড় বিষয়। শুধু একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি হলেই সে কাজ করতে পারে না। ওই প্রতিষ্ঠানকে একটি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়াতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক অনেক দিন ধরে কাজ করতে করতে এখন একটি পর্যায়ে এসেছে। এটি যদি খুব খারাপও চলে, তার পরও অনেক অনিয়ম বেরিয়ে আসবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও বিএসইসির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ সম্পন্ন হয়নি। আমরা তদন্তের কাজ করতে গিয়ে দেখলাম বিএসইসির তেমন কোনো অর্গানোগ্রাম নেই,
আবার লোকবলেরও যথেষ্ট ঘাটতি ছিল তখন। ব্যবস্থাপনায় একটি কথা বলা হয়, একটি প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ও সুশাসন নির্ভর করে ওই প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ ব্যবস্থাপকদের ওপর। তাঁরা যেভাবে আচরণ করবেন, প্রতিষ্ঠানও সে রকম আচরণ করবে।
বিএসইসির আগের কমিশনের মধ্যে অদক্ষতার পাশাপাশি দুর্নীতিও আমরা দেখতে পেয়েছি। মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম ও ফারুক আহমেদ সিদ্দিকীর পর ওই মাপের যোগ্য নেতৃত্ব বিএসইসিতে আর দেখা যায়নি। সে জন্য বিএসইসির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ও সুশাসনের বিষয়টি বেশ সময়সাপেক্ষ বলে আমার মনে হয়। আমি ব্যবস্থাপনার ছাত্র ছিলাম। সেখানে আমাদের ব্যবস্থাপনাবিষয়ক বিষয়গুলো শেখানো হতো। বলা হতো, প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীরা যদি দুর্নীতিপরায়ণ বা অযোগ্য হন, তাহলে প্রতিষ্ঠানও সে রকম হবে।
আশার কথা, আমাদের সুপারিশ অনুসারে বিএসইসি পুনর্গঠন হয়েছে, যদিও সেটা করতে বেশ কিছুটা সময় লেগেছে। নতুন বিএসইসি প্রথম দিকে অতটা আস্থা নিয়ে কাজ করতে পারেনি। তবে এখন তারা আস্থার সঙ্গে কাজ করছে। এ পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হচ্ছে বিএসইসি, এ সংস্থাটি যদি ঠিকঠাক কাজ না করে, তাহলে মানুষ পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরে পাবে না। ফলে তাদের তরফ থেকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া খুব জরুরি।
দেরিতে হলেও বিএসইসি যে দুজনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে, এটা ভালো লক্ষণ। কারণ, অনিয়মের শাস্তি না হলে তা আরও বাড়ে। তবে এই দুজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্য দিয়েই যেন বিএসইসির কার্যক্রম থেমে না যায়। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে যদি তারা অভিযুক্ত আরও কয়েকজনকে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসতে পারে, তাহলে সেটা বাজারের জন্য খুবই ইতিবাচক ব্যাপার হবে। তবে এ ক্ষেত্রে বিএসইসির কঠোর সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কারণ, তারা যদি সরকারি দলের অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বাঁচিয়ে কেবল অভিযুক্ত বিএনপি ও অন্য দলের লোকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়, তবে শেয়ারবাজারের কারসাজিও যেমন বন্ধ হবে না, তেমনি ন্যায়বিচারও নিশ্চিত হবে না। আমরা চাই শেয়ারবাজারের কারসাজির সঙ্গে জড়িত সবার শাস্তি হোক।
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ: ব্যাংকার, সাবেক ডেপুটি গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক।

Sunday, September 8, 2013

কৃষকের কণ্ঠস্বর শাইখ সিরাজ by খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ

শাইখ সিরাজ হয়ে উঠছেন কৃষকের মুখপাত্র। আমাদের দেশে বিভিন্ন পেশা ও ধরনের মানুষের পক্ষে কথা বলার জন্য তাদের প্রতিনিধি রয়েছে, ফোরাম রয়েছে, লোকজন রয়েছে। ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের আছে মহাশক্তিশালী সংগঠন চেম্বার। সরকারের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে এমনকি কখনও কখনও সরকারকে বাধ্য করার ক্ষেত্রে তারা সক্ষমতা প্রদর্শন করেছেন। অনেকে বলেন, তারা সব সময়ে সরকারের মধ্যেই ঢুকে থাকেন এবং সরকার তাদের স্বার্থেই কাজ করে থাকেন। এছাড়া সাংবাদিকদের রয়েছে শক্তিশালী সমিতি। বিভিন্ন পেশাজীবীরও নিজ নিজ মঞ্চ রয়েছে তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য। এমনকি শ্রমিকদেরও রয়েছে দোর্দণ্ড প্রতাপশালী ইউনিয়ন। দেশের সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষ কৃষিকাজে নিয়োজিত। তারা সংগঠিত নন। তাদের পক্ষে কথা বলার মতো উল্লেখযোগ্য কোনো সংগঠন নেই। কৃষকদের নামে কিছু রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠন আছে, যারা দলের স্বার্থে কাজ করে, কৃষকের স্বার্থে নয়। সরকারে কৃষকদের প্রতিনিধি নেই। জাতীয় সংসদে ব্যবসায়ী-শিল্পপতি রয়েছেন, আইনজীবী-পেশাজীবী রয়েছেন। কোনো কৃষক নেই। তাই কৃষকদের কথা বলার কেউ নেই। এই শূন্যস্থানটিতে এগিয়ে এসেছেন শাইখ সিরাজ। তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে নয়। জনপ্রতিনিধি হিসেবেও নয়। তিনি স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে কৃষকদের লবিস্টের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। বিশ্বময় লবিস্টরা মোটা অংকের ফি পেয়ে থাকেন। শাইখ সিরাজ কৃষকদের কাছ থেকে ফি আদায় করেন না। যুগ যুগ ধরে অবহেলিত, অসহায়, দরিদ্র কৃষকদের পক্ষে কাজ করা বুঝি তার ব্রত। শিক্ষকতা যেমন শিক্ষকদের ব্রত ও পেশা, তেমনি সাংবাদিকতা শাইখ সিরাজের পেশা ও ব্রত। এ পেশার মাধ্যমেই তিনি মানবসেবার ব্রত পালনে আগ্রহী। কর্মজীবনের শুরু থেকেই মিডিয়া জগতে তার প্রবেশ ঘটে। বেতার-টেলিভিশনে অনুষ্ঠান উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে তার সাংবাদিকতায় প্রবেশ। লক্ষণীয়, সে সময় থেকে এ পর্যন্ত অনেকেই সংবাদ পরিবেশনা, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, বিনোদন, কথা-সাংবাদিকতা প্রভৃতি মিডিয়া অঙ্গনে অবদান রেখেছেন, সুখ্যাতি কুড়িয়েছেন। কিন্তু এসব পরিচিত ক্ষেত্র রেখে শাইখ সিরাজ বেছে নিয়েছিলেন স্বল্প পরিচিত একটি অঙ্গন, কৃষি সাংবাদিকতা। মাটি ও মানুষ নিয়ে তার পুরনো দিনের অনুষ্ঠানগুলো এখনও অনেকের স্মৃতিপটে জেগে রয়েছে।
তার এই ব্যতিক্রমী পেশা নির্বাচন পরিকল্পিত, না দৈব ঘটনা তা আমি জানি না। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় দেখেছি, নতুন কোনো ডিপার্টমেন্ট খোলা হলে অনেক ভালো ছাত্র বহুল পরিচিত ও কাক্সিক্ষত বিষয়ে ভর্তি না হয়ে নতুন বিভাগটিতে ভর্তি হয়। অনেকটা ‘ঐ নতুনের কেতন ওড়ে’ কবিতার ছন্দে। কৃষি সাংবাদিকতার অকর্ষিত ক্ষেত্রেও তেমন মনোভাব নিয়ে শাইখ সিরাজ এসেছিলেন কি-না, তা তিনিই বলতে পারবেন। তবে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, সে সময়ে দেশের জাতীয় আয়ে কৃষির অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি। কৃষি-শ্রমিক তথা কৃষিজীবীর সংখ্যা ছিল জনসংখ্যার কমবেশি অর্ধাংশ। অথচ সংবাদপত্রে কৃষি বা কৃষকের কোনো খবর ছাপা হতো না। রেডিও-টিভিতে সংবাদ প্রচারে কৃষির খবর ছিল না। ফিচার অনুষ্ঠানেও কৃষি থাকত না। অবশ্য কৃষকের জন্য রাষ্ট্রীয় মিডিয়ায় একটি নিয়মিত অনুষ্ঠান হতো। এমন একটি সম্ভাবনাময় অথচ পিছিয়ে থাকা ক্ষেত্র শনাক্তকরণে শাইখ সিরাজের সক্ষমতা তার বাস্তবমুখিতার পরিচয় বহন করে। মাটি ও মানুষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি কৃষিকে চিনতে শিখেছেন এবং কৃষিক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন। তখনকার অনুষ্ঠানগুলো ছিল তথ্য প্রদানমূলক। কোন সার কতটুকু দিতে হয়, কোন কীটনাশক কখন কী পরিমাণে প্রয়োগ করতে হয়- এসব তথ্য পরিবেশনই ছিল অনুষ্ঠানের প্রধান উপজীব্য। কৃষকরা চিঠিপত্রের মাধ্যমে প্রশ্ন করতেন। এখনকার মতো তাৎক্ষণিক টেলিফোনে নয়। এভাবেই দক্ষতার সঙ্গে কৃষি অনুষ্ঠান করে শাইখ সিরাজ সুপরিচিত হয়ে ওঠেন।
তারপর দ্বিতীয় অধ্যায়। ফরিদুর রেজা সাগরের নেতৃত্বে ব্যক্তিখাতে চ্যানেল আই সম্প্রচার শুরু করল। শাইখ সিরাজ এর সঙ্গে যুক্ত থেকে নতুন আঙ্গিকে শুরু করলেন কৃষি-সাংবাদিকতা। বিষয় পুরনো, মাত্রা নতুন। শাইখ সিরাজ চ্যানেল আইতে কৃষিবিষয়ক প্রামাণ্য অনুষ্ঠান ও সংবাদ পরিবেশন শুরু করলেন। তিনি ও তার দল গ্রামগঞ্জ চষে সচিত্র কৃষি সংবাদ সংগ্রহ করতে লাগলেন। শুধু সংবাদই নয়, সংশ্লিষ্ট মানুষদের কথাও। কৃষকের মুখ থেকে ক্যামেরায় ধারণ করা শুরু হল সংবাদের পেছনের কথা। টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে কৃষক। এ ছিল অচিন্তনীয়। কিন্তু কৃষক যখন ক্যামেরার সামনে সহজ সরল ভাষায় অকপটে তার মনোভাব ব্যক্ত করতে শুরু করল, তখন শহুরে সাংবাদিক তথা দর্শকের বোধোদয় ঘটতে লাগল। শহর আর গ্রামের সীমানাপ্রাচীর ধসে পড়ল। একদিকে শহরে কৃষি ও কৃষক পরিচিত হয়ে উঠল, অন্যদিকে টেলিভিশন মিডিয়া বিশাল গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করল।
শাইখ সিরাজের সর্বশেষ অবদান হল কৃষকের লবিস্ট হিসেবে তার কর্মযজ্ঞ। প্রতিবছর জাতীয় বাজেট প্রস্তুতকালে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সব সেক্টরের স্টেকহোল্ডাররা নিজ নিজ সমিতি, মঞ্চ, চেম্বার প্রভৃতির মাধ্যমে লবিং শুরু করে দেন বাজেটে তাদের স্বার্থ সুরক্ষার জন্য। দেশের বড় অর্থনৈতিক সেক্টর কৃষির কথা বলার কেউ নেই। কৃষকের দাবি পেশ করার কেউ নেই। এগিয়ে এলেন শাইখ সিরাজ। দীর্ঘকাল কৃষি আর কৃষক নিয়ে কাজ করার ফলে তাদের সমস্যা সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল ছিলেন তিনি। তিনি এক অনন্য পন্থা গ্রহণ করলেন। গত কয়েক বছর ধরে তিনি জাতীয় বাজেটের আগে কৃষকের বাজেট প্রণয়ন করেন এবং কৃষকদের পক্ষ থেকে তা যথারীতি অর্থমন্ত্রীর কাছে পেশ করে আসছেন। কাজটি করছেন গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে। দেশের পাঁচ-ছয়টি পল্লী এলাকায় কৃষক সমাবেশের আয়োজন করা হয়। কয়েক হাজার কৃষক সমবেত হন প্রতিটি সমাবেশে। শাইখ সিরাজ চ্যানেল আই-এর ক্যামেরা নিয়ে হাজির হন সভায়। সঙ্গে নিয়ে যান অর্থমন্ত্রী বা নীতিনির্ধারকদের কাউকে। একবার আমিও গিয়েছিলাম। সমবেত কৃষকেরা ক্যামেরার সামনে মাইকে বর্ণনা করেন তাদের দাবি-দাওয়া এবং সেই সঙ্গে বলেন কেমন বাজেট চাই। শুরুতে কৃষকেরা বাজেট বুঝতেন না। এখন তাদের কথা শুনলে মনে হয়, কৃষকেরা সংসদে বসলে বাজেট প্রণয়নও করতে পারবেন। এসব কৃষক সমবেশ থেকে বেরিয়ে আসা কথাবার্তা অবলম্বনে শাইখ সিরাজ তৈরি করেন কৃষকের বাজেট। তারপর তা পেশ করা হয় অর্থমন্ত্রীর কাছে। সব কিছুই কৃষকদের জানিয়ে দেয়া হয় চ্যানেল আই-এর মাধ্যমে। এভাবেই শাইখ সিরাজ হয়ে উঠেছেন কৃষকের বিশ্বাসযোগ্য লবিস্ট। তথাকথিত কৃষক সংগঠনগুলো এতকালে যা পারেনি, শাইখ সিরাজ তা পেরেছেন এবং প্রতিবছর করে যাচ্ছেন স্বউদ্যোগে এবং কৃষকের অংশগ্রহণে।
গতকাল ছিল শাইখ সিরাজের জন্মদিন। কামনা করি তিনি সুস্থ থাকুন, দীর্ঘজীবন লাভ করুন এবং স্বপ্রণোদিত হয়ে কৃষকদের জন্য কাজ করে যান। এ প্রক্রিয়ায় বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা কৃষকসমাজ ধীরে ধীরে সংগঠিত হয়ে উঠবে এবং নিজেদের দাবি-দাওয়া নিয়ে নিজেরাই সোচ্চার হবে। অন্তত সে পর্যন্ত শাইখ সিরাজকে এ কাজটি চালিয়ে যেতে হবে।
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক

Thursday, June 27, 2013

স্মরণ-একজন সৃজনশীল ব্যাংকারের স্মরণে by খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ

২৪ জুন ২০১৩ সকাল সাড়ে ৮টায় না ফেরার দেশে চলে গেলেন সৃজনশীল ব্যাংকার লুৎফর রহমান সরকার। যখন ব্যাংকিং পেশা ছিল অবাঙালিদের নিয়ন্ত্রণে এবং শিক্ষিত বাঙালিরাও যখন ব্যাংকিং পেশা গ্রহণে আগ্রহী ছিলেন না,

Wednesday, January 16, 2013

হত্যার বিচার ও প্রতিক্রিয়া by খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ

অনেক বাধা-বিঘ্ন, জটিলতা অতিক্রম করে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায় কার্যকর হতে শুরু করেছে। পাঁচজনের দণ্ড কার্যকর হয়েছে। বাকিরা পলাতক। ধরা পড়লে কার্যকর হবে। হত্যা মামলার রায় কার্যকর হওয়ায় জনগণ স্বস্তি প্রকাশ করেছে।

Wednesday, September 26, 2012

নির্বাচনকালীন সরকার-আগডালে বসে গোড়া যেন না কাটি by খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ

তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিষয়ক রায় প্রকাশিত হয়েছে। রায়ে বিদায়ী এবং বর্তমান প্রধান বিচারপতিসহ চারজন বিচারক একমত পোষণ করেছেন। তাদের মতে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। দু'জন বিচারপতি তেমনটা মনে করেন না।

Saturday, September 8, 2012

মত দ্বিমত- আস্থা ফিরিয়ে আনুন by খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ

হলমার্ক কেলেঙ্কারির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার গভীর সংকট প্রতিফলিত হয়েছে। এ বিষয়ে কী করণীয়, তা নিয়ে মতামত দিয়েছেন একজন ব্যাংকার ও একজন অর্থনীতিবিদ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সোনালী ব্যাংক থেকে একটি কোম্পানি যে দুই হাজার ৬০০ কোটি টাকা, আর কয়েকটি কোম্পানি মিলে সাড়ে তিন হাজার থেকে চার হাজার

Friday, September 7, 2012

স্মরণ- আমার স্মৃতিতে অধ্যাপক নোমান by খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ

একধরনের মানুষ থাকেন, যাঁরা নিজ কর্মে এমন নিবেদিত যে তাঁদের চেহারাতেই যেন কর্ম বিমূর্ত হয়ে ওঠে। তাঁদের দেখলেই শ্রদ্ধা জাগে, মনে অনুপ্রেরণা সঞ্চারিত হয়। অধ্যাপক নোমান ছিলেন এমনই এক ব্যক্তি।১৯৫৭ সালে ঢাকা কলেজে ভর্তি হলাম। বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম। ইংরেজি এবং বাংলা আমাদের পাঠ্য ছিল।

Tuesday, July 17, 2012

সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ-স্বউদ্যোগে পদ্মা সেতু নির্মাণ সম্ভব by খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ

আত্মসম্মানের সঙ্গে আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠার এই প্রয়াসে জাতীয় ঐক্য অপরিহার্য। জাতীয় ঐক্যের পথে চেতনা বিকাশের আলো আমরা দেখতে পাচ্ছি। স্বতঃস্ফূর্ততাকে হালকা আবেগ ভাবা ঠিক হবে না। আবেগ ছাড়া বড় কোনো কাজ করা যায় না। ভালোবাসাও আবেগ।

Monday, July 16, 2012

উন্নয়ন-আত্মশক্তির উদ্বোধন চাই by খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ

বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু চুক্তি বাতিল করেছে। দোষ দিয়েছে বাংলাদেশকে। দুর্নীতির অভিযোগ এনেছে। ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে, ‘Give a bad name before you kill a dog’ অর্থাৎ একটা কুকুরকে মারতে হলেও মারার আগে ওকে বদনাম দাও। যেমন ‘কুকুরটা বড্ড ঘেউ ঘেউ করে’ অথবা ‘কুকুরটা কামড়াতেও তো পারে’।

Wednesday, June 6, 2012

মৃদুকণ্ঠ-বাজেট ও উন্নয়ন দর্শন by খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ

বাজেট নিয়ে প্রতিবছরের মতো এবারও অনেক আলাপ-সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। গোলটেবিল, সেমিনার, টক শো প্রভৃতির মাধ্যমে সুপারিশমালা উঠে এসেছে নাগরিক সমাজের বিভিন্ন অংশ থেকে। এ ছাড়া বিভিন্ন ব্যবসায়ী চেম্বার বা সমিতি নিজ নিজ সেক্টর থেকে প্রস্তাব রেখেছে।

Friday, May 11, 2012

মৃদুকন্ঠ-আগাম জামিনের প্রাসঙ্গিকতা by খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ

জামিন প্রদান বিচারকের একটি ডিসক্রিশন বা বিবেচনামূলক অধিকার, যা সুবিবেচনার সঙ্গে প্রয়োগ করা হলে বিচারপ্রার্থীর দুর্ভোগ লাঘব হতে পারে। জামিন প্রদানে সুবিবেচনার অভাব ঘটলে সুবিচার বিঘি্নত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। এ কারণে জামিন একটি স্পর্শকাতর বিষয়।

Tuesday, May 1, 2012

রাষ্ট্র-ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের স্বপ্ন by খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ

২০০৫ সাল থেকেই বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন আগামী বাংলাদেশের রূপকল্প নিয়ে আলাপ-আলোচনা শুরু করেছে। দৃষ্টিভঙ্গি এক না হলেও সবারই দৃষ্টি ২০২১-২৫ সালের বাংলাদেশের দিকে। কেমন হবে তখন আর্থ-সামাজিক অবস্থা? কেমন হবে রাজনৈতিক অবস্থা? দারিদ্র্য কমবে কি? দুর্নীতি সহনশীল পর্যায়ে নেমে আসবে কি?

Saturday, April 21, 2012

বিশেষ সাক্ষাৎকার-আইনে আটকাতে না পারলেও চরিত্র উন্মোচন করতে পারব by খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ। জন্ম ১৯৪১ সালের ৪ জুলাই, গোপালগঞ্জে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূগোল ও ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেওয়ার পর তিনি ব্যাংকিং পেশায় যোগ দেন। সোনালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক ও বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে অধিষ্ঠিত থাকার পর তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর

Thursday, April 5, 2012

মৃদুকণ্ঠ-দায়মুক্ত হয়ে বিদায় নিলেন by খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ

প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক দায়িত্ব শেষে বিদায় নিয়েছেন। চিরন্তন নিয়মে। আগমন হলে নির্গমন ঘটবেই। দায়িত্ব গ্রহণ করলে সমাপন করতেই হবে। সমাপন শেষে বিদায়ও নিতে হবে। এর ব্যত্যয় ঘটে না। তাঁর ক্ষেত্রেও ঘটেনি। বিচারপতি খায়রুল হক তাঁর ১৩ বছরের বিচারিক জীবনে অসীম সাহসিকতা, দেশপ্রেম ও নিষ্ঠার যে পরিচয় রেখেছেন, তা

Tuesday, February 28, 2012

মৃদুকন্ঠ-সংস্কৃতিই সংহতির ধারক by খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ

পহেলা বৈশাখ ঢাকার রাস্তায় মানুষের ঢল নেমেছিল প্রতিবছরের মতো এবারও। গ্রামগঞ্জে যেন উৎসবের জোয়ার এসেছিল। সমগ্র বাঙালি জাতি যেন এক প্রাণ, যেমনটা দেখেছিলাম একাত্তরে। একাত্তর বুঝি প্রতি বছর পহেলা বৈশাখ নববর্ষের উৎসবে যোগ দিতে ছুটে আসে বাংলাদেশে।

Thursday, February 23, 2012

অর্থনীতি-সৎ ব্যাংক পরিচালকের সন্ধানে by খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ

ব্যাংক পরিচালনায় কল্যাণ নীতির ধারাবাহিকতা লক্ষণীয়। অন্য ব্যবসায়িক কোম্পানির সঙ্গে ব্যাংক কোম্পানির একটা মৌলিক পার্থক্য হলো, অন্যান্য কোম্পানি মালিকের মূলধন বা পুঁজিতে চলে। কিন্তু ব্যাংক পরিচালিত হয় আমানতকারীর জমা রাখা অর্থে। ব্যাংকে শেয়ারহোল্ডারদের মূলধন সামান্যই। বরং অ্যাকাউন্ট হোল্ডারদের অর্থই বেশি।

Monday, February 20, 2012

মৃদুকন্ঠ-গণতন্ত্র, ধনতন্ত্র ও কল্যাণতন্ত্র by খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ

গণতন্ত্র একটি রাষ্ট্রশাসন প্রক্রিয়া। জনগণের ইচ্ছা অনুসারে, জনগণের জন্য, জনগণের প্রতিনিধিদের দ্বারা গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হয়। শাসনব্যবস্থায়ও প্রকারভেদ রয়েছে। কিন্তু সব ধরনের রাষ্ট্রশাসন ব্যবস্থার সঙ্গে অর্থনীতির প্রগাঢ় সম্পর্ক। অর্থনীতি-নিরপেক্ষ কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার কথা আমাদের জানা নেই। বিশ্বে কোনো উদাহরণও নেই।

Friday, February 17, 2012

মৃদুকন্ঠ-সরকার বদলের সাবলীলতা by খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ

সম্প্রতি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে। দীর্ঘ তিন দশকেরও অধিককাল পর বামফ্রন্ট ক্ষমতাচ্যুত হলো। অনেকটা অবিশ্বাস্য ভরাডুবি। বিজয়ীর বেশে ক্ষমতায় আসীন হলেন তৃণমূলের মমতা ব্যানার্জি। মমতার ক্ষমতা গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পরাজিত বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য।

Wednesday, February 15, 2012

মৃদুকন্ঠ-সমদর্শীদের দর্শন-বিভ্রাট by খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ

সমদর্শী' শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হলো সব কিছুকে সমান দৃষ্টি দিয়ে দেখা। ব্যাখ্যা করলে এমনটা দাঁড়ায়_একটি ক্ষুদ্র জলবিন্দু আর সাগরকে জলজ্ঞানে একই রকম ভাবা। ছোট্ট একটি টিলা আর সুউচ্চ পর্বতকেও সমান করে দেখা। সামান্য স্খলন আর মহাপাপকে সমান জ্ঞান করা। তবে 'সমদর্শী' শব্দটির প্রায়োগিক অর্থ এমনটা নয়। প্রায়োগিক অর্থে সমদর্শী হলো ছোটকে ছোট দেখা, বড়কে বড় দেখা।