Sunday, November 24, 2013

অন্তত শিশুদের কথা ভাবুন by বিমল সরকার

আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে মুখস্থ করা রামসুন্দর বসাক প্রণীত বাল্যশিক্ষা বইয়ের একটি বাক্য আজ আমার খুব মনে পড়ছে। বাক্যটি হচ্ছে- শিশুর মুখ অতুল সুখ। শিশুর মুখ দেখলে যে সুখানুভূতির সৃষ্টি হয়- এর বুঝি কোনো কিছুর সঙ্গেই তুলনা চলে না। আর সেই মুখটি যদি হাসিমাখা হয়, তাহলে সুখ বা প্রশান্তির মাত্রা কী পরিমাণ বেড়ে যায়, তা অবশ্যই অংক বা হিসাব-নিকাশ করে দেখানোর বিষয় নয়। বলার অপেক্ষা রাখে না, শিশুরা এবং তাদের কচি মুখের মধুমাখা হাসি সবার জন্যই অনাবিল সুখ, শান্তি ও বিমল আনন্দের অপরিমেয় আধার। কিন্তু আমাদের দেশের ক্ষমতালিপ্সু রাজনীতিকদের অদূরদর্শিতা, খামখেয়ালিপনা, সংকীর্ণ মনোবৃত্তি, চিন্তার দৈন্য, সর্বোপরি একগুঁয়েমির জাঁতাকলে পিষ্ট হতে চলেছে অন্য অনেক কিছুর মতো শিশুদের মুখের প্রাণোচ্ছল হাসিটুকুও! শিশু-কিশোরদের মুখ আজ মলিন। তাদের মুখে হাসি নেই। বড়দের মতোই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ওদের মাঝেও ভর করেছে। ছয় মাস আগে তারিখ ঘোষণা করা হলেও লাগাতার হরতালের কারণে জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষার সময়সূচিতে ছন্দপতন ঘটেছে। পরীক্ষার্থী কম নয়। প্রায় ২০ লাখ। এছাড়া সামনেই রয়েছে প্রাথমিক ও এবতেদায়ি সমাপনী পরীক্ষা। রয়েছে মাধ্যমিক স্কুল, মাদ্রাসা এবং কারিগরি স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা। বিরাজমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে লাখ লাখ শিশু-কিশোর আজ অজানা আতংকে প্রতীক্ষার প্রহর গুনছে। কেবল শিশু-কিশোর নয়, এরই মধ্যে শুরু হয়েছে দুই শতাধিক সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল কলেজে কয়েক লাখ শিক্ষার্থীর ভর্তি কার্যক্রমও। যে কোনো স্তরেরই হোক পরীক্ষার সঙ্গে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার পাশাপাশি আশা-আকাক্সক্ষা বা আবেগ-অনুভূতিরও একটি বিষয় জড়িত থাকে। কিন্তু রাজনীতিকদের কাণ্ডজ্ঞানের কাছে শিশু-কিশোরদের আকুতি এবং তাদের আশা-আকাক্সক্ষা ও আবেগ-অনুভূতিটুকুও আজ ভূলুণ্ঠিত! একটি হরতালের মেয়াদ শেষ হতে না হতেই নতুন করে হরতাল ডাকার আতংকে গোটা জাতি দিশাহারা।
পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর পূর্ব পাকিস্তান মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড স্থাপিত হলে গোটা পঞ্চাশের দশকজুড়ে এসএসসি (প্রবেশিকা) এবং সমমান পরীক্ষা গ্রহণ করতে সময় লাগত ১২-১৩ কিংবা বড়জোর ১৫ দিন। একইভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা ষাটের দশকে পৃথক পৃথক মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড স্থাপিত হলে এসবের অধীন গোটা পাকিস্তান আমলে এইচএসসি বা সমমান পরীক্ষা সম্পন্ন করতেও ১৫-২০ দিনের বেশি সময় কখনও লাগেনি। এছাড়া দেড় থেকে দুই মাসের মধ্যে এসএসসি বা এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ ছিল একটি স্বাভাবিক রেওয়াজ। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ডিগ্রি (পাস) পরীক্ষা নিতে এবং ফলাফল প্রকাশ করতেও নির্দিষ্ট সময়ের বেশি লেগেছে এমন দৃষ্টান্ত বলতে গেলে নেই। টানা নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে শিক্ষাক্ষেত্রে সঙ্গত কারণেই কিছু বিশৃংখলা দেখা দেয়। তা সত্ত্বেও শিক্ষাবোর্ডগুলো মাত্র ১৫-১৬ দিনে এসএসসি এবং ২০-২১ দিনে এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে দুই থেকে আড়াই মাসের মধ্যে এসবের ফলাফলও জানিয়ে দিতে পেরেছে। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর আমলে ১৯৭৫ সালের এসএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছিল মাত্র ১৫ দিনে (৩০ এপ্রিল থেকে ১৫ মে)।

অন্তর্বর্তী অবস্থায়ও কি রাষ্ট্রপতির ভূমিকা একই থাকবে? by ইকতেদার আহমেদ

বাংলাদেশের জনগণের রাষ্ট্রপতি শাসিত, সংসদীয়, সেনা শাসিত, তত্ত্বাবধায়ক ও সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অবলোকনের সুযোগ হয়েছে। বাংলাদেশ অভ্যুদয়-পরবর্তী সংবিধান প্রণয়ন অবধি ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ দ্বারা দেশ শাসিত হতো। সংবিধানের অবর্তমানে মূলত সে ব্যবস্থাটি ছিল রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা। সংবিধান প্রণয়ন-পরবর্তী সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থার আগমন ঘটলেও মাত্র দু’বছরের ব্যবধানে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হলে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থায় ছেদ পড়ে। অতঃপর ১৯৯১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী প্রণয়ন অবধি দীর্ঘ ২১ বছরের অধিককাল রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা বহাল থাকলেও এ সম্পূর্ণ সময় নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি দ্বারা দেশ শাসিত হয়নি। এ সময়ে দুঃখজনক ঘটনার মাধ্যমে দু’জন নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির মৃত্যু ঘটলে দু’বার দেশ সামরিক শাসনের কবলে পড়ে। তাছাড়া গণআন্দোলনের মুখে একজন নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি অসাংবিধানিকভাবে পদত্যাগে বাধ্য হলে অসাংবিধানিকভাবেই একজন কর্মরত প্রধান বিচারপতির অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি রূপে আগমন ঘটে। যদিও সংবিধানের পঞ্চম, সপ্তম ও একাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দু’দফার সামরিক শাসন এবং একদফার কর্মরত প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বেসামরিক শাসনের অনুমোদন দেয়া হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তী সময়ে উচ্চাদালত কর্তৃক পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করা হলেও একাদশ সংশোধনীর ব্যাপারে কাউকে অদ্যাবধি আদালতের দ্বারস্থ হতে দেখা যায়নি। সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রবর্তিত সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা অদ্যাবধি অব্যাহত থাকলেও এ সময়ের মধ্যে তিনবার সাংবিধানিকভাবে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং একবার অসাংবিধানিকভাবে গঠিত সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দ্বারা দেশ শাসিত হয়।
আমাদের রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। রাষ্ট্রপতিকে তার দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা এবং পরামর্শ দানের জন্য একটি মন্ত্রিপরিষদ ছিল। কিন্তু পরিষদ বা মন্ত্রী আদৌ কোনো পরামর্শ দান করেছেন কি-না এবং করে থাকলে কী পরামর্শ দান করেছেন, কোনো আদালতকে সে বিষয়ে কোনো প্রশ্নের তদন্তের অধিকার দেয়া ছিল না। রাষ্ট্রপতি তার বিবেচনায় সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে কিংবা সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যদের মধ্য থেকে একজন প্রধানমন্ত্রী এবং তার কাছে যেরূপ আবশ্যক মনে হতো সেরূপ অন্যান্য মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী নিয়োগের ক্ষমতা ভোগ করতেন, যদিও কোনো প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী পরিষদের সদস্য হওয়া থেকে বারিত ছিলেন। রাষ্ট্রপতি পরিষদের সভায় সভাপতিত্ব করতেন অথবা তিনি সেসব সভায় উপ-রাষ্ট্রপতি অথবা প্রধানমন্ত্রীকে সভাপতিত্ব করতে নির্দেশ দিতে পারতেন। মন্ত্রীরা রাষ্ট্রপতির সন্তোষানুযায়ী সময়সীমা পর্যন্ত স্বীয় পদে বহাল থাকতেন। রাষ্ট্রপতির উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে কোনো মন্ত্রী স্বীয় পদ ত্যাগ করতে পারতেন।
রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থায় প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী কর্তৃত্ব রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত ছিল এবং সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি কর্তৃক তা প্রত্যক্ষভাবে অথবা তার অধীনস্থ কর্মচারীর মাধ্যমে প্রযুক্ত হতো।
রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থায় জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার বিধান ছিল। কিন্তু আমাদের বর্তমান সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে নির্বাচিত হন। বর্তমান সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে সবার ঊর্ধ্বে স্থান লাভ করলেও প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক প্রযুক্ত হয়। সংসদীয় পদ্ধতির বর্তমান সরকার ব্যবস্থায় মন্ত্রিসভা যৌথভাবে সংসদের কাছে দায়ী থাকে। এ ব্যবস্থায় সরকারের সব ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির নামে গৃহীত বলা হলেও তিনি প্রকৃতপক্ষে কোনো নির্বাহী ক্ষমতা ভোগ করেন না। যদিও অনুচ্ছেদ নং ৪৮(৩)-এর বিধান অনুযায়ী বলা আছে, সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদের (৩) দফা অনুসারে কেবল প্রধানমন্ত্রী ও ৯৫ অনুচ্ছেদের (১) দফা অনুসারে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ছাড়া রাষ্ট্রপতি তার অন্যসব দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী করবেন, কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে উভয় বিষয়ে রাষ্ট্রপতির স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ একেবারে সীমিত। প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের ক্ষেত্রে যে সংসদ সদস্য সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন, তাকে ছাড়া অন্য কাউকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের কোনো সুযোগ নেই। সুতরাং এখানে রাষ্ট্রপতি তার স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে সংসদ সদস্য হিসেবে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন নন এমন কাউকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করতে পারেন না।
অনুরূপভাবে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে আপিল বিভাগের বিচারকদের মধ্যে যিনি জ্যেষ্ঠ তাকেই দু-একটি ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছাড়া প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগ দেয়া হয়ে আসছিল। আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারককে প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগ দেয়া হলে এক্ষেত্রে স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা প্রয়োগের কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু জ্যেষ্ঠকে অতিক্রম করে কনিষ্ঠ কাউকে যদি প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগ দেয়া হয় সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা প্রয়োগে নাকি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী তা করা হয়েছে সে প্রশ্নটি এসে যায়।
সংবিধানের বর্তমান বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী সংসদ আগে ভেঙে না দিয়ে থাকলে প্রথম বৈঠকের তারিখ থেকে পাঁচ বছর অতিবাহিত হলে সংসদ আপনাআপনি ভেঙে যাবে। কিন্তু প্রজাতন্ত্র যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার কারণে সংসদের মেয়াদ বৃদ্ধি আবশ্যক বিবেচিত হলে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়া তা কার্যকর করার সুযোগ নেই। সংবিধানের বর্তমান ব্যবস্থায় সংসদ ভেঙে যাওয়ার পর এবং সংসদের পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগে যুদ্ধাবস্থা বিদ্যমানতার জন্য ভেঙে দেয়া সংসদ পুনরাহ্বানের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতিকে দেয়া আছে। কিন্তু এ ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ গ্রহণের আবশ্যকতা রয়েছে। প্রশ্ন দেখা দিতে পারে, সংসদ ভেঙে যাওয়ার পর রাষ্ট্রপতি কিভাবে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ নেবেন? এ বিষয়ে সংবিধানের ৫৭ অনুচ্ছেদে দেখা যায়, একজন সংসদ সদস্য প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হওয়া পরবর্তী পদত্যাগ অথবা সংসদ সদস্য পদে বহাল না-থাকা অথবা সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের সমর্থন হারানোর কারণে তার পদ শূন্য হলেও তার উত্তরাধিকারী কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত তিনি স্বপদে বহাল থাকেন। সুতরাং এক্ষেত্রেও সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদের ব্যত্যয়ে রাষ্ট্রপতির কোনো ধরনের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ নেই।
মন্ত্রিপরিষদের সদস্য নিয়োগ, মন্ত্রীদের মধ্যে দফতর বণ্টন, সাংবিধানিক পদসহ প্রজাতন্ত্রের উচ্চতর সামরিক-বেসামরিক পদগুলোয় নিয়োগ, সংসদ অধিবেশন আহ্বান ও সমাপ্তি প্রভৃতি রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী সম্পাদন করে থাকেন। এর কোনোটির ক্ষেত্রেই কখনও কোনোরূপ স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থার অধীনে রাষ্ট্রপতিকে সাংবিধানিকভাবে দেয়া হয়নি।
একজন প্রধানমন্ত্রী সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদ সদস্যের আস্থাভাজন থাকাবস্থায় অপর কোনো সংসদ সদস্যকে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগের সুযোগ যেমন নেই, ঠিক তেমনি রাষ্ট্রপতি কর্তৃক সংসদ ভেঙে দেয়ারও সুযোগ নেই। তবে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো সংসদ সদস্য সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদ সদস্যের আস্থাভাজন না হলে সংসদ ভেঙে দেয়ার ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রপতির প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শের প্রয়োজন হবে। তাই এক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে, রাষ্ট্রপতি যে কোনো অবস্থায়ই কোনো ধরনের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা প্রয়োগ থেকে সাংবিধানিকভাবে বারিত ।
সংবিধানে বলা আছে, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে ক্ষেত্রমতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত কিংবা রাষ্ট্রপতি পুনরায় স্বীয় কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। অনুরূপভাবে স্পিকারের অনুপস্থিতিতে ডেপুটি স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে একজন সংসদ সদস্যের স্পিকারের দায়িত্ব পালনের বিধান রয়েছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে কে তার দায়িত্ব পালন করবেন সে বিষয়ে সংবিধান নিশ্চুপ থাকায় প্রধানমন্ত্রীর নিরংকুশ ক্ষমতা তার উত্তরাধিকারী কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত অক্ষুণ্ন থাকে।
রাষ্ট্রপতির ক্ষেত্রে দেখা যায়, একদিকে তার কোনো নির্বাহী ক্ষমতা নেই, আর যে দুটি বিষয়ে তাকে একক ক্ষমতা দেয়া হয়েছে তাও প্রকৃতপক্ষে স্বেচ্ছাধীন না হওয়ায় সব বিষয়ে কার্য সম্পাদনের ক্ষেত্রে তিনি নিজস্ব বিবেক ও বুদ্ধি বিবেচনা প্রয়োগ করতে পারেন না। প্রধানমন্ত্রীর নিরবচ্ছিন্ন ক্ষমতা যেন কোনোভাবে ক্ষুণ্ন না হয় সে বিষয়টিকে মাথায় রেখে যেমন তার অনুপস্থিতিতে দায়িত্ব পালনের জন্য কাউকে যোগ্য করা হয়নি, ঠিক তেমনি রাষ্ট্রপতির ক্ষেত্রে তার অনুপস্থিতিতে দায়িত্ব পালনের বিষয়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে যোগ্য করায় তার ক্ষমতা সীমিত, সর্বোপরি তিনি সীমিত গণ্ডিতে আবদ্ধ। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিষয়ে সংবিধানে বর্তমানে যে বিধান রয়েছে তা হলো- মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভেঙে যাওয়ার ৯০ দিন আগে এবং মেয়াদ অবসান ছাড়া অন্য যে কোনো কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভেঙে যাওয়ার ৯০ দিন পর সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সংসদ ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী এ দুটি সময়ের যে কোনো একটি সময় হল অন্তর্বর্তী সময় এবং এ অন্তর্বর্তী সময়ে সংসদীয় পদ্ধতির গণতন্ত্র অনুসৃত হওয়ায় প্রায় সব দেশেই মন্ত্রিসভা স্বল্পসংখ্যক সদস্য নিয়ে শুধু সরকারের দৈনন্দিন কার্যাবলি সম্পাদন করে থাকে এবং কোনো নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে বিরত থাকে।
জনগণের পরোক্ষ অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদ সদস্যের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি সংবিধানের বর্তমান ব্যবস্থায় নিজ বিবেক ও বুদ্ধি বিবেচনা প্রয়োগে এককভাবে কোনো ধরনের নির্বাহী সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাপ্রাপ্ত না হওয়ায় তার পদটি যে ঠুঁটো জগন্নাথ এ বিষয়ে কি কোনো বিতর্কের অবকাশ আছে? আর নেই বলেই তো দেখা গেছে, সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত একজন ব্যক্তি সংবিধান লংঘন করা সত্ত্বেও তাকে উচ্চতর সাংবিধানিক পদে নিয়োগে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শের বিপরীতে রাষ্ট্রপতির পক্ষে কিছুই করা সম্ভব ছিল না। তাছাড়া অভিজ্ঞতা থেকে ধারণা পাওয়া যায়, একজন বিদায়ী রাষ্ট্রপতি ২০০১ সালে বিজিত দলের নেত্রীর দাবি অনুযায়ী নির্বাচনের ফলাফল বাতিল না করায় তার দল থেকে প্রাপ্য সম্মান প্রাপ্তিতে বঞ্চিত হচ্ছেন। ২০০২ সালে একজন রাষ্ট্রপতিকে কিছুটা স্বাধীনভাবে দলীয় আবরণের বাইরে চলতে গিয়ে অপরিপক্ব বিদায়ের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। সর্বশেষ ২০০৯ সালে দলীয় বিবেচনায় নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদকালীন কর্মকাণ্ড দলের প্রতিকূলে বিবেচিত হওয়ায় ক্ষোভ, হতাশা ও অসম্মান নিয়ে তাকে ইহলোক ত্যাগ করতে হয়েছিল।
সংবিধানের অনুচ্ছেদ নং ৪৮(৫)-এর বিধানে যে কোনো বিষয় মন্ত্রিসভায় বিবেচনার জন্য রাষ্ট্রপতির অনুরোধে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক উপস্থাপনের কথা বলা হলেও তা প্রতিপালনের জন্য প্রধানমন্ত্রী বাধ্য নন। তাছাড়া যে কোনো অন্তর্বর্তী সময় ছাড়া অন্য কোনো সময়ে রাষ্ট্রপতি এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করলে তা যদি প্রধানমন্ত্রীর মনঃপুত না হয় সেক্ষেত্রে তার অভিশংসনসহ বিভিন্ন হয়রানির আশংকা উড়িয়ে দেয়া যায় না। তাই দেশের অন্তর্বর্তী অবস্থায় যে কোনো সংকটের সময় রাষ্ট্রপতি বিধানটির প্রয়োগে উদ্যোগী হলে তার মাধ্যমে দেশবাসীর প্রত্যাশা প্রতিফলনের অবকাশ সৃষ্টি হয়। স্বভাবতই অন্তত দেশের অন্তর্বর্তী সময় রাষ্ট্রপতির পদটি যে ঠুঁটো জগন্নাথ নয়, তার প্রমাণ তিনি রাখতে পারেন। আর এর মাধ্যমে তিনি যে কোনো বিপর্যয় থেকে দেশকে রক্ষা করতে পারেন।
ইকতেদার আহমেদ : সাবেক জজ; সংবিধান, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

দেশে এখন উদারনৈতিক রাজনীতির বড়ই প্রয়োজন by কাজী সাইফুল ইসলাম

উদার রাজনীতি আর পরিশীলিত গণতন্ত্রে নাগরিকের ভাগ্যোন্নয়ন ঘটে অতি দ্রুত। উদার গণতন্ত্র চর্চার মধ্য দিয়েই গোটা জাতি এগিয়ে চলে সামনের পথে। শিক্ষা, কর্মমুখিতা, সংস্কৃতি আর ধর্মকে মেনে নিয়ে গড়ে ওঠে একটি সুন্দর সভ্য জাতি এবং পরিণত হয় সফল রাষ্ট্রে। অন্যদিকে অনুদার রাজনীতি বা যেমনিভাবে গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে, ঠিক তেমনি এর অভাব একটি রাষ্ট্রকে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য যথেষ্ট। বাংলাদেশ এখন সেই ব্যর্থ আর অকার্যকর একটি রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার জন্যই দিন গুনছে। যদি রাজনীতির এই অচল অবস্থাটা দূর না হয়, তাহলে দেশের সব নাগরিককে নির্বিকার হয়ে দেখতে হবে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির রেষারেষিতে দেশটা কিভাবে অকার্যকর একটি রাষ্ট্রে পরিণত হয়। বাংলাদেশ এখন পুরোপুরিই দুটি ভাগে বিভক্ত। এটাই হচ্ছে মহাশঙ্কার কথা। আওয়ামী লীগের জোটে থাকা দলগুলো বিএনপি এবং বিএনপির জোটে থাকা দলগুলোকে সব সময়ই বলছে- জঙ্গিবাদী। এর কারণ হিসেবে তারা যুক্তি দাঁড় করিয়েছে, ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো সব বিএনপির সঙ্গে জোট বেঁধেছে এবং তারা রক্ষণশীল, উদার নীতিতে বিশ্বাস করে না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ধর্ম পালন করলেই কি মানুষ জঙ্গি হয়ে যাবে? শুধু কি মুসলমানরাই ধর্ম পালন করছে এ দেশে? হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিস্টানরা কি ধর্ম পালন করেন না? তারা কি ধার্মিক নন?
ঠিক একইভাবে বিএনপির সঙ্গে জোটভুক্ত দলগুলো মনে করে আওয়ামী লীগ বা আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটভুক্ত দলগুলোর মধ্যে কেউ কেউ ধর্মে বিশ্বাস করে না। এদের হাতে দেশের শাসনভার মানেই ধার্মিকদের অসুবিধায় পড়তে হয়। এখন প্রশ্ন হল, উদার ধর্মবিশ্বাস বা ধর্মনিরপেক্ষতার মানেই কি ধর্মহীনতা?
সত্যি কথা হচ্ছে, এসব কথাবার্তা দু’দলেরই অপপ্রচার ছাড়া আর কিছুই নয়। সবই হচ্ছে রাজনৈতিক চালবাজি। সাধারণ মানুষকে ধোঁকা দেয়া আর প্রতিশোধের রাজনীতিকে প্রতিষ্ঠিত করা। দল দুটি একই নীতিতে বিশ্বাস করে। একই আদর্শের মধ্যেই নিজেদের ধরে রেখেছে এখন পর্যন্ত। একদল ডান রাজনীতির ছোট দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে নিজেদের দল ভারি করছে। অপর দলটি বাম রাজনীতির ছোট দলগুলোকে নিজেদের বগলদাবা করে রাখতে মহাব্যস্ত। এর বাইরে আর কিছুই নয়।
এর বড় উদাহরণ হচ্ছে, আওয়ামী লীগ জামায়াতে ইসলামীকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপির বিপক্ষে রাজপথে আন্দোলন করেছিল। কেন করেছে? রাজনৈতিক ফায়দা নেয়ার জন্য। ঠিক এই সময়ে হেফাজতে ইসলাম এবং জামায়াতে ইসলামী আওয়ামী লীগের চোখে বিশাল জঙ্গি আর যুদ্ধাপরাধী। ঠিক কালকেই যদি জামায়াতে ইসলামী আর হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে আওয়ামী লীগের কোনো রকম কোয়ালিশন হয়েই যায়, আর বাম ঘরানার দলগুলো যদি আওয়ামী লীগকে ত্যাগ করে, তাহলে বিএনপি কি বাম দলগুলোকে সঙ্গে না নিয়ে জামায়াতে ইসলামী এবং হেফাজতের জন্য শোক পালন করবে? কখনোই নয়। আওয়ামী লীগও ঠিক তাই করবে। আজ যদি বাম দলগুলো তাকে ত্যাগ করে, কালকেই সে ডান দলগুলোকে সঙ্গে নেয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগবে। তখন স্বৈরাচার আর যুদ্ধাপরাধী বলে কিছুই থাকবে না।
আওয়ামী লীগ দলটির তৃণমূলের নেতাকর্মী থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যেও একটি মুখস্থ বুলি চালু রয়েছে। তারা মুক্তিযুদ্ধের দল, উদার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বিশ্বাস করে। এই বুলিটা যদি সত্যি হতো তাহলে দেশের জন্য এর চেয়ে ভালো আর কিছুই হতো না। কিন্তু বাস্তবতা কী বলে? দলটি যখন ক্ষমতায় যায় তখন কি সত্যিই উদার রাজনীতির চর্চা হয় এদেশে? না, হয় না। কোনো দিন হবে কিনা তাও বলতে পারবে না কেউ। তবে বর্তমান সময়ে যে নোংরা রাজনীতির মধ্যে জড়িয়ে আছে দলগুলো, তা থেকে অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে। মানুষ এখন আর দলগুলোর মিথ্যা প্রতিশ্র“তিতে বিশ্বাস করছে না। বরং বিরক্ত হচ্ছে। এদেশের প্রত্যেকটি নাগরিকের পিঠ দেয়ালের সঙ্গে ঠেকে আছে। যে মানুষটি দল করছে সেও যেমন ক্ষেপে আছে এই পরিবারতন্ত্রের ওপর, যে মানুষটি দলের সাথেপিছে নেই সেও চরমভাবে ক্ষিপ্ত।
একটি কথা সবারই মনে রাখা দরকার। নাগরিকের ওপর শোষণ-নির্যাতন চালিয়ে কোনো দলই টিকে থাকতে পারে না। যদি টিকেই থাকা যেত, তাহলে সারা জীবন ধরে পৃথিবীর শাসনকর্তা হয়ে থাকত হিটলার। আর সাদ্দাম হোসেনের বাথ পার্টিও চিরদিন ইরাক শাসন করত।
ইহুদিদের ওপর হিটলারের নির্মমতার বর্ণনা দেয়া প্রায় অসম্ভব। হিটলার ইহুদিদের নিজের শত্র“ মনে করত। অথচ ইহুদিরা জার্মানিরই নাগরিক ছিল। একটি রাষ্ট্রের মধ্যে বিভিন্ন মতের, বিভিন্ন জাতি আর বিভিন্ন ধর্মের নাগরিক থাকবে এটা খুবই স্বাভাবিক। তাই বলে মুসলিম শাসক যদি হিন্দু বা বৌদ্ধ নাগরিকের ওপর অন্যায়ভাবে অত্যাচার চালিয়ে তাদের একেবারেই নিশ্চিহ্ন করে দিতে চায়, তাহলে সেটা কতটুকু সভ্যতার স্বাক্ষর বহন করবে? বা তার পরিণামই বা কি হতে পারে?
আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির মধ্যে কতগুলো মুখস্থ শব্দের চালবাজি রয়েছে। রাজাকার, যুদ্ধাপরাধী, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি, বিপক্ষের শক্তি, নাস্তিক, ধর্ম নিয়ে রাজনীতি ইত্যাদি। সঠিকভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে গেলে এসব শব্দগুলো কতটা জরুরি, আমি বুঝি না। কে দেশপ্রেমিক আর কে দেশদ্রোহী, কে রাজাকার আর কে মুক্তিযোদ্ধা এ খবর দেশের দশ বছর বয়সী নাগরিকের কাছেও রয়েছে। এসব অতিকথনের কারণে বরং অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের গুরুত্ব হারিয়ে যাচ্ছে দিন দিন।
রাষ্ট্র চালাতে গিয়ে উন্নত রাষ্ট্রনীতি বা সঠিক পরিকল্পনা কখনোই করতে পারেনি আওয়ামী লীগ অথবা বিএনপি। একবার ক্ষমতায় গেলে জোর করে টিকে থাকার মানসিকতা এই আধুনিক যুগেও তারা ধরে রেখেছে অসভ্য প্রাগৈতিহাসিক যুগের মতো। বাংলাদেশের নাগরিক মোটেও পিছিয়ে নেই, বিশ্বের ধনিক দেশগুলোর নাগরিকদের সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রেই তাল মিলিয়ে চলছে তারা। কিন্তু শুধু উদার রাজনীতি আর পরিশীলিত গণতন্ত্রের অভাবের কারণেই এগিয়ে যাচ্ছে না বাংলাদেশ।
বর্তমানে একটি কথা খুবই উচ্চারিত হচ্ছে। সেটি হচ্ছে কন্সার্ন (Concern)- উদ্বেগ বা উৎকণ্ঠা। সত্যি বলতে কী, গোটা জাতিই আজ উৎকণ্ঠিত। রাজনৈতিক এই অচল অবস্থা থেকে মুক্তি চায় জাতি। কিভাবে এই সমস্যার নিরসন হবে হয়তো অনেকেই বুঝতে পারে না। কিন্তু যে কোনোভাবেই হোক তারা চায় বড় দল দুটির মধ্যে সমঝোতা। আরেকটি বিষয় নিয়েও জাতি উৎকণ্ঠিত। যদি দল দুটির মধ্যে সমঝোতা না হয়ে সংঘর্ষ বেধে বসে, তাহলে সুবিধাবাদীদেরই লাভ হবে সব থেকে বেশি। কেউ কেউ দেশটা লুটে নিতে পারবে নির্দ্বিধায়। কেউ আবার গদি দখলে ব্যস্ত হবে। কেউ কেউ আবার ধর্মের নামে জঙ্গিবাদের ক্ষেত্র রচনার মহা-উদ্যোগ নেবে। ইতিহাস তাই বলে।
আর এসব হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের নাগরিক। তারপর আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো। তাছাড়া আওয়ামী লীগ যদি বিএনপির মতোই একতরফা নির্বাচনে যায়, তাহলে তারা দুটি ক্ষতির মধ্যে পড়বে। এক, তারা যে উদার গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে তার কোনো মূল্য থাকবে না। অন্যটি, তারা যদি নির্বাচন করে ক্ষমতায় টিকে থাকতে না পারে তাহলে বিএনপির মতোই ভরাডুবি হবে তাদের। সেটা দেশের জন্যও ভালো হবে না।
আওয়ামী লীগ যদি মনে করে, তারা উদার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে এবং দেশের মঙ্গলের জন্য যে কোনো ত্যাগ তারা স্বীকার করতে পারে, তাহলে এখনই বিরোধী জোটের সঙ্গে তাদের একটা সমঝোতায় আসা উচিত। তাহলে দেশের জনগণ তাদের এই সুচিন্তিত ত্যাগকে অবশ্যই বিবেচনায় নেবে। এটা ইতিহাসও হয়ে থাকবে। কারণ, গত নির্বাচনে সম্পূর্ণ একগুঁয়েমি করেছিল বিএনপি। বর্তমান পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ যদি দেশকে একটা নির্বাচন উপহার দিতে পারে (যে নির্বাচন হবে সর্বদলের অংশগ্রহণে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ), তাহলে দেশের জনগণের কাছে আওয়ামী লীগের গ্রহণযোগ্যতা অনেক গুণ বেড়ে যাবে। হতে পারে, এবার তারা সরকারে যেতে পারছে না, তাতে কী। এদেশে আওয়ামী লীগ দলটি যেসব নীতির কথা বলে, তা মানুষের কাছে পরিষ্কার হবে। আর দেশের স্বার্থও বিশালভাবে রক্ষা হবে।
কাজী সাইফুল ইসলাম : কলাম লেখক

আসন্ন নির্বাচনে জনগণের শান্তির উপায় কী? by আল আমীন চৌধুরী

সংসদ নির্বাচন এলেই সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে যে কদর্য ও সহিংস ক্ষমতার লড়াই শুরু হয়, তার একাধিকবারের শিকার হয় এদেশের মানুষ। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, যারা ইংরেজ শাসনবিরোধী সংগ্রামে, ভাষা আন্দোলনে এবং মুক্তিযুদ্ধে জয়ী হয়েছিল, এমনকি স্বাধীনতার পর সামরিক শাসনের পতন ঘটিয়েছিল, তারা কি এহেন নৈরাজ্য থেকে মুক্তি পাবে না? আর মুক্তির পথে বাধাই বা কোথায়? আসলে যে কোনো মহান অর্জনের জন্য যেমন চাই একটি চেতনা ও সংকল্পবদ্ধ প্রজন্ম, তেমনি চাই একটি নিষ্ঠাবান ও নিঃস্বার্থ নেতৃত্ব। স্বাধীনতাসহ সব অর্জনের ক্ষেত্রেই কমবেশি এ তিনটি উপাদানই ছিল বিদ্যমান। ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে ত্যাগ-তিতিক্ষা ও নিঃস্বার্থ সেবার আদর্শ নিয়ে যে রাজনীতির যাত্রা শুরু হয়েছিল, মুক্তিযুদ্ধ নাগাদ সে ধারাই অনেকটা অব্যাহত থাকে। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের পরও বহু বছর রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্তদের অধিকাংশই সে ধারা থেকে বিচ্যুত হয়নি। সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও মানুষের বাঁচার মতো বাঁচার স্বপ্ন তখনও মুক্তিযোদ্ধা, ছাত্র-জনতার হৃদয়ে দেদীপ্যমান ছিল। ফলে বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিসরে কিংবা ছাত্র-যুব রাজনীতিতে ব্যবসা-বাণিজ্য বা চাঁদাবাজি, দখলবাজি ইত্যাদি স্থান করে নিতে পারেনি। এজন্যই সম্ভব হয়েছিল গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সামরিক শাসনের পতন ঘটানো।
তবে রাজনীতিকে রাজনীতিকদের জন্য কঠিন করে তুলতে যে কৌশল সামরিক শাসনামলে গ্রহণ করা হয়েছিল, তার সর্বনাশা ফল ভোগ করছে এদেশের সাধারণ মানুষ, রাজনীতিকরা নয়। ওই কৌশলের অংশ হিসেবে টাকা ও নানা সুবিধার বিনিময়ে রাজনৈতিক দলে বিভাজন, পেশাজীবী, বুদ্ধিজীবীসহ দেশের প্রায় সব সংগঠনে বিভক্তি, স্থানীয় পর্যায়ে আধিপত্য বিস্তার ও অর্থ আহরণের সুযোগ দিয়ে দলের সমর্থক ও কর্মী সৃষ্টির যে অপকৃষ্টি চালু হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে নির্বাচনী-গণতন্ত্রে, বলতে গেলে, তা আনুষ্ঠানিক রূপ নেয়। দুর্ভাগ্যের বিষয়, নির্বাচনে জয়লাভের পর নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা না করে বিজয়ী দল সারাদেশের একচ্ছত্র মালিক হয়ে বসে। শুরু হয় স্বার্থান্বেষী, অর্থকেন্দ্রিক, দখল ও লুণ্ঠনের রাজনীতি। নেতাকর্মী, ছাত্র-যুবসহ সমাজের প্রায় প্রতিটি স্তরে তা বিস্তৃত হতে থাকে। সরকারপরম্পরায় তা শুধু পাল্লা দিয়ে বাড়তেই থাকে। একই সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায়ও চলে দুর্বৃত্তায়ন। এ পুরো কর্মযজ্ঞে সহায়তা করার জন্য প্রশাসনসহ রাষ্ট্রের অন্যান্য অঙ্গে চলে দলীয়করণ। এক কথায়, এসবের ফলে সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় যে কায়েমি স্বার্থ গেড়ে বসেছে- তাকে পরাভূত করে জাতীয় মুক্তি ও বৃহত্তর কল্যাণে যে কোনো অর্জন আগের চেয়ে আজ অনেক দুরূহ।
এ কঠিন অবস্থায় মুক্তি অর্জনের জন্য প্রয়োজন আগে উল্লিখিত তৃতীয় উপাদান- একটি নিষ্ঠাবান ও নিঃস্বার্থ নেতৃত্ব। যারা সব ধরনের দুর্বৃত্তায়ন ও দুর্নীতি নিরোধ করে, সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী, সংগঠন ও গোষ্ঠীর মধ্যে কৃত্রিম বিভাজন অবসান করে দেশকে একটি সুখী শান্তিপ্রিয় ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, আমাদের নেতৃত্ব অনেকটা যেন এর উল্টো ধাঁচের। ক্ষমতা ও নিজেদের স্বার্থের জন্য জনস্বার্থ শুধু নয়, জনজীবন বিসর্জন থেকে শুরু করে আমাদের রাজনীতিতে বিদেশীদের অনধিকার চর্চার অবাধ সুযোগ করে দেয়াসহ যে কোনো কিছু করতে তারা দ্বিধা করে না। যে দুর্নীতি ও দুুর্বৃত্তায়ন সমাজদেহে ক্যান্সারের মতো ছড়িয়ে পড়ছে, তাকে তারা স্বতঃসিদ্ধ ধরে নিজেদের কৌশল ঠিক করে নিয়েছে- এর বিরোধিতা নয়, একে উল্টিয়ে ফেলার চেষ্টা তো নয়ই বরং এর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়াই তাদের একমাত্র করণীয়!
উপরোক্ত আলোচনার আলোকে বলা যায়, ক্ষমতার লড়াইয়ের ধ্বংসাত্মক পরিণতি থেকে জনগণের মুক্তি যেমন কঠিন, মুক্তির পথও তেমনি বন্ধুর।
চলুন এখন আসন্ন সংসদ নির্বাচনের সর্বশেষ পরিস্থিতি দেখা যাক। এরই মধ্যে জাতীয় পার্টির ছয়জনসহ সর্বদলীয় নামে মহাজোটের মোট ২৯ জন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী নিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা হয়েছে। মন্ত্রীদের মধ্যে দফতরও বণ্টন হয়ে গেছে। সরকার পক্ষ থেকে মন্ত্রিসভায় যোগদান করার এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার জন্য বিএনপির প্রতি আহ্বান জানানো সত্ত্বেও তাদের কেউ মন্ত্রিসভায় যোগদান করেননি এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অধীন ছাড়া তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকার পূর্বাবস্থানে অনড় রয়েছেন। হরতাল ও আন্দোলনের মাধ্যমে নির্বাচন প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছেন। অসাধারণ কিছু না ঘটলে দু’পক্ষের মধ্যে আলোচনা ও সমঝোতার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এদিকে নির্বাচন কমিশন এ সপ্তাহের মধ্যেই নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফলে সংঘাত ও সহিংসতা অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছে। আর এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা বাজার অর্থনীতির এ যুগে সহজও হয়ে উঠেছে। দলীয় লোকেরা যদি এ কাজ না করতে চায় তাহলে ‘আউটসোর্সিং’ বা বাইরের কাউকে দিয়ে করানো এবং ব্যবস্থাপনা ঠিকাদারের মাধ্যমে পরিচালনা করা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জানা যায়। তাই শেষ মুহূর্তে ১৮ দলীয় জোট যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে তাহলে হরতাল, অবরোধ, ধ্বংসযজ্ঞ চলবে; অস্থিরতা, জনদুর্ভোগ অব্যাহত থাকবে। তবে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে নির্বাচন প্রতিহত করা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে সব দলের অংশগ্রহণে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান সবার কাম্য। কিন্তু এর সম্ভাবনা কম বলে মহামান্য রাষ্ট্রপতির সক্রিয় সহায়তায় নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও বিচার বিভাগ যদি নিরপেক্ষ ভূমিকা নিয়ে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান করে এবং গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ ও দেশী-বিদেশী পর্যবেক্ষক দল যদি নির্বাচনে নিবিড় নজরদারি চালায়, সেক্ষেত্রে শেষ মুহূর্তে যদি ১৮ দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে এবং জয়লাভ করে তাহলে সোনায় সোহাগা। একদিকে পরাজিত সরকারি দল বুক ফুলিয়ে বলতে পারবে, অবাধ, নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানে তাদের অঙ্গীকার অক্ষরে অক্ষরে সত্য; অন্যদিকে এর মাধ্যমে সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের স্থায়ী ব্যবস্থার প্রতি আস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতার একটি ঐতিহ্য গড়ে উঠবে। এর অন্যথায় অর্থাৎ নির্বাচন যদি অবাধ ও নিরপেক্ষ না হয় অথবা তাতে কারচুপি হয়, তাহলে বিরোধী দল সহজেই এবং সঙ্গত কারণেই সরকার পতনের একটি সফল আন্দোলন গড়ে তুলতে পারবে।
তৃতীয় সম্ভাব্য পরিস্থিতি হচ্ছে, ১৮ দল বাদেই মহাজোট নিজেরা ছাড়াও অন্য কিছু দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করল এবং তাতে বিপুল ভোটারের উপস্থিতি নিশ্চিত হল এবং প্রার্থীদের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা সৃষ্টি হল। এ রকম একটি নির্বাচন দেশ-বিদেশের সবার কাছে গ্রহণযোগ্য না হলেও তার বিশুদ্ধতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা সম্বন্ধে কারও সন্দেহ থাকার কথা নয়। এমন অবস্থায় বিরোধী দল অবশ্য হরতালসহ বিভিন্ন কঠিন কর্মসূচি দিয়ে প্রতিবাদ ও আন্দোলন চালিয়ে যাবে, কিন্তু নৈতিক বা আইনগত কোনো শক্ত অবস্থান নিতে অপারগ হবে। ফলে জনজীবন বিপর্যস্ত হবে, অর্থনীতিতে ধস নামবে। কিন্তু সরকারি দল সহজে এবং স্বল্পসময়ের মধ্যে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে বিরোধী দলের দাবি মেনে নিয়ে আবার নির্বাচনের কোনো উদ্যোগ নেবে বলে মনে হয় না।
সর্বশেষ সম্ভাব্য দৃশ্য হতে পারে এমন, যেখানে বিরোধী দলের প্রবল প্রতিরোধের মুখে ভোটারহীন বা নগণ্যসংখ্যক ভোটারের অংশগ্রহণে নির্বাচন হল। তথাপি সফল নির্বাচনে জয়ী হয়েছে বলে দাবি করে মহাজোট সরকার গঠন করল। ঠিক যেমনটি হয়েছিল বিএনপি সরকারের আমলে ১৯৯৬ সালের ফেব্র“য়ারি মাসের নির্বাচনে। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় না, আসন্ন নির্বাচন সেরূপ ভোটারহীন হবে বা পরবর্তী সময়ে একই অবস্থার পুনরাবৃত্তি হবে।
পাঠক, মনে রাখতে হবে, বর্তমান রাজনৈতিক অচলাবস্থা আমাদের রাজনীতিক ও তাদের দল এবং জোটের সৃষ্ট। তাই তাদেরই এর নিরসন করতে হবে। কোনো বিদেশী গোষ্ঠী বা তৃতীয় কোনো শক্তি নয় এবং তা অভিপ্রেতও নয়। একটি দেশে দুই দশকের অধিক গণতন্ত্র চর্চার (নির্বাচনসর্বস্ব হলেও) পরও যদি আমরা একটি সরকারের মেয়াদ শেষে শান্তিপূর্ণ উপায়ে নির্বাচন ও ক্ষমতা হস্তান্তরের মতো বুনিয়াদি ব্যবস্থাতেই একমত হতে না পারি বা বিশ্বাস স্থাপনে অসমর্থ হই, তাহলে নিজেদের ধিক্কার দেয়া ছাড়া আর কি-ই বা করার আছে?
নিবন্ধটি এ প্রশ্ন দিয়ে শেষ করতে খারাপ লাগছে বলে বিরাজমান অবস্থায় পূর্বোক্ত দ্বিতীয় উত্তম বিকল্পটি অক্ষরে অক্ষরে এবং মর্মে মর্মে কার্যকর হোক- যেখানে শেষ মুহূর্তে হলেও ১৮ দলীয় জোট নির্বাচনে অংশ নেবে- সে আশা নিয়ে আজ বিদায় নিতে চাই।
আল আমীন চৌধুরী : সাবেক সচিব ও কলাম লেখক

আবার আওয়ামী লীগ সরকার

এ সাক্ষাতের সুবাদে রাজনৈতিক অচল অবস্থা কাটবে কি?
বাংলাদেশে আশাবাদী লোকের সংখ্যা প্রচুর। বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবকে আলোচনা শুরু করতে বলেছেন। তাঁর এই দেড় মিনিটের মামুলি আহ্বানের পর আমার কাছে বিস্ফোরিত কণ্ঠে ফোন আসে কয়েকটি টিভি চ্যানেল থেকে। তাদের ধারণা, বিরাট এক ঘটনা ঘটে গেছে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানের কারণে। সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাচ্ছে এই আশাবাদ ব্যক্ত করে কেউ কেউ পরামর্শ দিলেন যে এমন একটা মাহেন্দ্রক্ষণে কিছু একটা অবশ্যই বলা উচিত।
আমি নিজেকে বাস্তববাদী মানুষ মনে করি। অহেতুক আশাবাদের উচ্ছ্বাস এবং আশাবাদী মানুষের ইমেজ গড়ার ইচ্ছা নেই। আমার বরং ধারণা, এই আহ্বান অনেকাংশে আনুষ্ঠানিকতা এমনকি লোক দেখানো হতে পারে। কয়েক দিন আগে বিএনপির নেতা যে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করেছেন, তা-ও ছিল অনুরূপ কিছু। আশাবাদী মানুষ নিশ্চয়ই আমার সঙ্গে একমত হবেন না। এঁদের অনেকে আগে খালেদা জিয়ার কাছে প্রধানমন্ত্রীর টেলিফোনের পর শান্তিপূর্ণ নির্বাচন প্রায় হয়ে গেছে ধরে নিয়েছিলেন। আমার ধারণা, তাঁদের আশাবাদও ভুল প্রমাণিত হতে চলেছে। বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন সবার অংশগ্রহণমূলক হওয়ার সম্ভাবনা কম, শান্তিপূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা আরও কম। বাংলাদেশে আসলে শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের ইতিহাস নেই। বর্তমান বাস্তবতায় এর সম্ভাবনা আরও নেই। নেই যে তার প্রধান কারণ, ক্ষমতাসীনদের দুর্নীতি, সন্ত্রাস, দলীয়করণ— সর্বোপরি নানা ধরনের দুঃশাসনের তাণ্ডব। ২০০৬ সালে বিএনপি সরকার কর্তৃক দুঃশাসন ও বিরোধী দলের প্রতি নির্যাতন এমন মাত্রায় পৌঁছেছিল যে ক্ষমতা হারালে নানা ধরনের হয়রানি ও নিপীড়নের শিকার হওয়ার আশঙ্কা তাদের ছিল। ছিল ক্ষমতা যেকোনো মূল্যে ধরে রাখার লোভও। বর্তমান সরকারের আমলে একই ঘটনা ঘটছে।
এই আমলে কিছু ক্ষেত্রে বরং বিরোধী দলের প্রতি নির্যাতন ও দমননীতি আরও বেড়েছে। ফলে গত বিএনপি সরকারের মতো এবারের আওয়ামী লীগ সরকারও ক্ষমতা হারানোর ঝুঁকি নিতে চাইবে না, এটিই স্বাভাবিক। সাম্প্রতিক কালের স্থানীয় নির্বাচনগুলোর ফলাফল ও জনমত জরিপগুলোয় এটি স্পষ্ট যে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বড় ধরনের পরাজয়ের আশঙ্কা রয়েছে। এই পরাজয় এড়ানোর সহজ রাস্তা হচ্ছে বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রাখা। আর বিএনপি নির্বাচনে এলে তাতে কারচুপির সুযোগ সৃষ্টি করে রাখা। আওয়ামী লীগ সরকার সে পথেই এগোচ্ছে বলে মনে হয়। আওয়ামী লীগের দৃশ্যমান প্রথম টার্গেট বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রাখা। এটি করা গেলে কারচুপি না করেই আগামী নির্বাচনে নিশ্চিতভাবে জিতে আসবে আওয়ামী লীগ। বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রাখার জন্য প্রথমে অত্যন্ত বিতর্কিতভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতি বাদ দেওয়া হয়েছে এবং এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সামর্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করার লক্ষ্যে বিরোধী দলের প্রতি অপপ্রচার, দমননীতি ও নির্যাতন চালানো হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় নির্বাচন-পূর্ব ৯০ দিন সময়েও আওয়ামী লীগ সরকার বিভিন্ন অনৈতিক ও অন্যায় পদক্ষেপ অব্যাহত রেখেছে। মেরুদণ্ডহীন ও জি হুজুর ধরনের নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে বিএনএফ নামের একটি ভুঁইফোড় সংগঠনকে বিএনপির যৌক্তিক আপত্তি সত্ত্বেও নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে, আরপিও একতরফাভাবে সংশোধন করে বিএনপির যেসব নেতা সুবিধাবাদী হতে চাইবেন, তাঁদের যেকোনো দল থেকে নির্বাচন করার পথ উন্মুক্ত করা হয়েছে,
জাতীয় পার্টিকে দৃষ্টিকটুভাবে মন্ত্রিত্ব এবং সম্ভবত আরও বিভিন্ন ধরনের উৎকোচ প্রদান করে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় নিয়ে আসা হয়েছে, বিএনপির জোটসঙ্গীদের বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে বিএনপিবিহীন সর্বদলীয় মন্ত্রিসভায় নিয়ে আসার তৎপরতা চালানো হচ্ছে এবং তথাকথিত সর্বদলীয় সরকারে প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতাকে আরও বলীয়ান করা হয়েছে। গত ২৭ অক্টোবর থেকে নির্বাচন-পূর্ব ৯০ দিন সময়ে সরকারের সবচেয়ে সাম্যমূলক ও গণতান্ত্রিক আচরণ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অথচ এই সময়ে বিএনপির প্রতি দমননীতি ও বৈষম্যমূলক পদক্ষেপ আরও তীব্রতর করা হয়েছে। যেমন হাস্যকর মামলায় বিএনপির জ্যেষ্ঠ পাঁচজন নেতাকে নজিরবিহীনভাবে পুলিশি রিমান্ডে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে, বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনের সবচেয়ে সক্রিয় নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে বা গ্রেপ্তারের চেষ্টা করা হচ্ছে, ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে মাঝারি স্তরের নেতা ও সক্রিয় কর্মীদের কারাদণ্ড দেওয়া হচ্ছে এবং নির্বাচনকালীন ৯০ দিন সময়ে বিএনপির সভাসমাবেশের ওপর পুলিশি নিয়ন্ত্রণ আরোপের পাশাপাশি আওয়ামী লীগকে অবাধে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করতে দেওয়া হচ্ছে। এই ৯০ দিন সময়ে সরকারি ক্ষমতা ও সরকারি প্রচারমাধ্যম ব্যবহার করে অবাধে চলছে সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের প্রচারণা। সরাসরিভাবে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার শামিল এসব কর্মকাণ্ডকে ব্যাপকতর সমালোচনা থেকে রক্ষা করার জন্য নির্বাচন কমিশন নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা থেকে এখন পর্যন্ত বিরত রয়েছে। বিএনপিকে এখন নির্বাচন করতে হলে তা করতে হবে অত্যন্ত অসমতল ভূমি থেকে। নির্বাচনে অংশ নিতে হবে গত পাঁচ বছরে চরম দলীয়করণের মাধ্যমে সৃষ্ট জনপ্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও নির্বাচনী প্রশাসনকে মেনে নিয়ে।
সংবিধান, রুলস অব বিজনেস ও বর্তমান ‘সর্বদলীয়’ (যা প্রকৃত অর্থে এখন পর্যন্ত সম্পূর্ণভাবে মহাজোটীয়) সরকারকাঠামো দেখলে এটি স্পষ্ট যে এই সরকারে বিএনপি যোগ দিলেও এসব প্রশাসন পরিবর্তন করার কোনো ক্ষমতা তাদের থাকবে না। এই ক্ষমতা শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় অন্য কোনো দলের মন্ত্রীর যে একেবারে নেই, তা মিজানুর রহমান খান প্রথম আলোয় অত্যন্ত স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা করেছেন। এসব মেনে এবং শেখ হাসিনার মনমতো গঠিত সরকারে যোগ দিয়ে নির্বাচন করলে মাঠ-রাজনীতির মনোবলও নাটকীয়ভাবে আওয়ামী লীগের পক্ষে চলে যাবে। এসব পরিস্থিতি আর যা-ই হোক, নির্বাচনে বিএনপির অংশ নেওয়ার পথ সুগম করার ইচ্ছা থেকে সৃষ্টি করা হয়নি। বিএনপির জন্য ‘অবভিয়াস চয়েস’ করে রাখা হয়েছে নির্বাচন বর্জন। এই রাজনীতিকে পরাভূত করে বিএনপি যদি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার নাটকীয় সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে তাদের তা করতে হবে কারচুপির ক্ষমতাসম্পন্ন একটি নির্বাচনী সরকারকে মেনে নিয়ে। বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্বাচনে সরকার ও প্রশাসনের কারচুপি করার ইচ্ছা থাক আর না থাক, কারচুপি করার ক্ষমতা যে রয়েছে, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। আর কারচুপি ও বৈষম্য করার ক্ষমতাসম্পন্ন একটি নির্বাচনী সরকারকাঠামো সৃষ্টি করা হয়েছে কারচুপি না করার সদিচ্ছা থেকে, এটি বিশ্বাস করার লোক বাংলাদেশে বা বহির্বিশ্বে খুব বেশি নেই বলে আমার ধারণা। নির্বাচনকালীন একটি মোটামুটি ধরনের নিরপেক্ষ সরকার ও প্রশাসন গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিএনপির জন্য একমাত্র পথ হচ্ছে, এটি করতে আওয়ামী লীগ সরকারকে বাধ্য করা।
২০০৬-০৭ সালে রাজপথের তীব্র আন্দোলনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ এমন একটি সরকার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল। তেমন আন্দোলন গড়ে তোলার মতো বিপুল জনসমর্থন বিএনপির হয়তো রয়েছে, কিন্তু বিশেষ করে ঢাকায় বড় ধরনের আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মহানগর বিএনপি এখন পর্যন্ত ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। এই ব্যর্থতা দ্রুতই কাটিয়ে উঠতে না পারলে এবং ব্যাপক গণ-আন্দোলন গড়ে তোলার সামর্থ্য না দেখাতে পারলে বিএনপিকে বৈরী, বৈষম্যমূলক ও একপেশে ক্ষমতাসম্পন্ন একটি নির্বাচনকালীন সরকারকে মেনে নিতে হবে। এমন একটি সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে বিএনপি তাতে অংশ নিলেও, আওয়ামী লীগ জিতে আসতে পারে। আমার ধারণা, এমন একটি নির্বাচনী অঙ্ক আওয়ামী লীগের রয়েছে। এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগ কর্তৃত্বাধীন সরকারের যা উদ্যোগ আয়োজন, তাতে নির্বাচন-প্রক্রিয়াকে বিতর্কমুক্ত রাখার তেমন কোনো অর্থবহ প্রচেষ্টা তাই লক্ষ করা যায়নি। এমন একটি নির্বাচনের মাধ্যমে আবার একটি আওয়ামী লীগ সরকারকে ভবিষ্যতে আমরা নির্বাচিত হতে দেখতে পারি। তবে সে সরকার হবে জনসমর্থনের দিক দিয়ে এবং নৈতিকভাবে ২০০৮ সালের সরকারের চেয়ে অনেক দুর্বল। সেই ভবিষ্যৎ সরকারকে ক্ষমতায় টিকে থাকতে হলে আরও অনেক বেশি দমনমূলক ও স্বৈরাচারী পদক্ষেপ নিতে হবে। একপেশে ও বহুলাংশে বিতর্কিত একটি নির্বাচনী সরকারের মাধ্যমে আবারও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে তাই তারা বিজয়ী হবে সাময়িকভাবে। কিন্তু তাতে দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বাংলাদেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি।
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

‘চাকরি খুঁজব না, চাকরি দেব’

তুমি কেরানির চেয়ে বড়ো, ডেপুটি-মুন্সেফের চেয়ে বড়ো, তুমি যাহা শিক্ষা করিতেছ তাহা হাউইয়ের মতো কোনোক্রমে ইস্কুলমাস্টারি পর্যন্ত উড়িয়া তাহার পর পেন্সনভোগী জরাজীর্ণতার মধ্যে ছাই হইয়া মাটিতে আসিয়া পড়িবার জন্য নহে, এই মন্ত্রটি জপ করিতে দেওয়ার শিক্ষাই আমাদের দেশে সকলের চেয়ে প্রয়োজনীয় শিক্ষা, এই কথাটা আমাদের নিশিদিন মনে রাখিতে হইবে। এইটে বুঝিতে না পারার মূঢ়তাই আমাদের সকলের চেয়ে বড়ো মূঢ়তা। আমাদের সমাজে এ কথা আমাদিগকে বোঝায় না, আমাদের ইস্কুলেও এ শিক্ষা নাই।’—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ‘আমি যখন চাকরি করতাম, তখন একবার ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছিলাম। ব্যাংকের কর্মকর্তারা বেশ খাতিরই করেছিলেন। এরপর আমি নিজে একটা সফটওয়্যার তৈরির প্রতিষ্ঠান শুরু করি। এখন সেখানে ১৪ জন প্রোগ্রামার ও কর্মী রয়েছে। তারা সবাই ব্যাংকঋণের উপযুক্ত। কিন্তু আমার প্রতিষ্ঠানটি এখনো ব্যাংকঋণের জন্য উপযুক্ত হয়নি। কারণ, আমাদের স্থাবর “জামানত” নেই।’ অভিজ্ঞতার গল্প করছিলেন মুক্ত সফটওয়্যার লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী তামিম শাহরিয়ার। তামিম অভিজ্ঞতার গল্প বলছিলেন তাঁর মতো আরও কয়েকজন তরুণ উদ্যোক্তার জন্য আয়োজিত উদ্যোক্তা বুট ক্যাম্পে।
সামাজিক যোগাযোগের সাইট ফেসবুকভিত্তিক সংগঠন ‘চাকরি খুঁজব না, চাকরি দেব’ গ্রুপের উদ্যোগে সম্প্রতি নবীন উদ্যোক্তাদের একটি বুট ক্যাম্প হয়েছে ঢাকায়। সেখানে ২৬ জন নবীন ও হতে চাওয়া উদ্যোক্তা জড়ো হয়েছিল নিজেদের দক্ষতা, জ্ঞান এবং নেটওয়ার্কিংকে সমৃদ্ধ ও ঝালাই করতে। তাদের কেউ কেউ পণ্যের গায়ে প্রিয়জনের ছবি ছাপিয়ে দেয়, কেউ ‘সুখ’-এর বাণিজ্যিকীকরণ নিয়ে ভাবে, আর কেউবা ভাবে, কীভাবে ফ্রিল্যান্সিং থেকে উদ্যোক্তা হবে। একই দিন সকালে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রথম আলো জবসের আয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকদের চাকরিপ্রাপ্তির সমস্যা নিয়ে একটি গোলটেবিল বৈঠক হয়েছে। সেখানে উপস্থিত দেশীয় করপোরেটগুলোর প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, তাঁরা তাঁদের কাঙ্ক্ষিত মধ্য লেভেলের ব্যবস্থাপক পাচ্ছেন না। এরই মধ্যে তৈরি পোশাকশিল্পে শ্রীলঙ্কা ও ভারত থেকে ব্যবস্থাপকেরা আসতে শুরু করেছেন! আমাদের দেশে এখন প্রতিবছর প্রায় ২১ লাখ তরুণ-তরুণী কর্মবাজারে প্রবেশ করে। তাদের মধ্যে প্রায় সাত লাখই বিদেশে পাড়ি জমায়। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে কয়েক লাখের কর্মসংস্থান হয়। কোনো রকম প্রণোদনা ছাড়াই আমাদের গ্রামীণ হাটবাজারগুলো প্রতিবছর গড়ে তিনজনকে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেয়।
তার পরও প্রায় ১০ লাখের কোনো গতি হয় না। তাদের অনেকেই ‘একটি চাকরি’র জন্য জীবনপণ করে লড়তে থাকে। সরকারি চাকরির সোনার হরিণ ধরার জন্য সর্বশেষ বিসিএস পরীক্ষায় মাত্র দুই হাজার পদের বিপরীতে দুই লাখ ২১ হাজার প্রার্থী আবেদন করেছে। এর মধ্যে অনেকেই কয়েকবার করে এই বৈতরণি পার হওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে চলেছে। আর আমরা যতভাবেই হিসাব করি না কেন, প্রায় সোয়া দুই লাখ চাকরিপ্রত্যাশীর মধ্যে দুই লাখ ১৯ হাজারেরই চাকরি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। একটু ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে যদি আমরা ব্যাপারটাকে দেখতাম, তাহলে হয়তো কিছুটা হলেও এই সমস্যার সমাধান করা যেত। সেটি হলো আমাদের তরুণ প্রজন্মকে চাকরির পাশাপাশি আত্মকর্মসংস্থানে আগ্রহী করে তোলা। এর জন্য সবচেয়ে বেশি দরকার সমাজকে উদ্যোক্তাবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলা। গ্রামের কোনো এক তরুণ মাত্র ৫০ হাজার টাকার অভাবে নিজের পুকুরটিকে একটি লাভজনক খামারে পরিণত করতে পারে না। কিন্তু সেই তরুণ যখন মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমিকের চাকরি করার জন্য দালালের খপ্পরে পড়ে, তখন অবলীলায় তিন লাখ টাকাও জোগাড় হয়ে যায়! প্রতিবছর কর্মপ্রত্যাশীদের মাত্র ১০ শতাংশকেই যদি আমরা আত্মকর্মসংস্থানে আগ্রহী করে তুলতে পারতাম,
তাহলে আমাদের অনেক সমস্যারই সমাধান করে ফেলতে পারতাম। আশার কথা হলো, আমাদের তরুণদের অনেকেই এখন নানা বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে এই পথে হাঁটার চেষ্টা করছে। সম্প্রতি বাংলাদেশি-ব্রিটিশ তরুণ উদ্যোক্তা সাবিরুল ইসলামের বাংলাদেশ সফরের সময় আমরা এর কিছুটা নমুনা দেখেছি। না, কোনো কনসার্ট বা জাদু বা অভিনয়শিল্পীদের সমাগম নয়, একজন সফল উদ্যোক্তার গল্প শোনার জন্য দেশের বিভিন্ন শহরে তরুণেরা দল বেঁধে হাজির হয়েছে। এই তরুণদের কেউ কেউ এরই মধ্যে পথে নেমে পড়েছে। তাদের রয়েছে নিজের প্রতিষ্ঠান গড়ার চেষ্টা। আবার অনেকেই বেছে নিয়েছে স্বতন্ত্র উদ্যোক্তা হওয়ার পথ। দেশের একটি স্বনামখ্যাত পারিবারিক করপোরেট প্রতিষ্ঠান গত ৫০ বছরে প্রায় ৪৫ হাজার কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে, ইন্টারনেটকে নির্ভর করে এখন দেশের প্রায় ৩০ হাজার তরুণ-তরুণী নিজেদের ‘ভার্চুয়াল’ কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি করেছে। এই তরুণেরা এখন প্রতিদিনই প্রায় এক কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আনছে দেশে। তাদের এক-দশমাংশকে যদি প্রয়োজনীয় সহায়তা, যেমন কিছু উদ্যোগ-সম্পর্কিত প্রশিক্ষণ, ইংরেজি ভাষাজ্ঞানের দক্ষতার বিকাশ এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ার জন্য কিছু আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া যেত,
তাহলে তারাই বছরে নতুন তিন লাখ কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করতে পারত! আর এসব ছোট প্রতিষ্ঠান আমাদের বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ব্যবস্থাপক পর্যায়ের কর্মকর্তার জোগানদার হয়ে উঠত। গোলটেবিল বৈঠকে জেনেছি, ১০ বছর পর আমাদের প্রতিবছর প্রায় এক লাখ উচ্চপর্যায়ের ব্যবস্থাপক প্রয়োজন হবে। সেই লক্ষ্যমাত্রার ২০ শতাংশই পূরণ হবে না, যদি আমাদের জোগানের সংখ্যা না বাড়ে! কাজেই আমাদের যা কিছু আছে, তা-ই নিয়ে নতুন আর হবু উদ্যোক্তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আত্মকর্মসংস্থানের মূল বিষয়গুলো শিক্ষাক্রমের আওতায় আনতে হবে। ক্যারিয়ার ক্লাবের পাশাপাশি এন্ট্রাপ্রেনিউর ক্লাব বানাতে হবে। শিক্ষার্থীরা জীবনবৃত্তান্ত লেখা যেমন শিখবে, তেমনি ঋণের প্রস্তাব আর উদ্যোগের পরিকল্পনাও করতে শিখবে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে কিছু কিছু ব্যবসা উদ্যোগ-সম্পর্কিত প্রতিযোগিতা ইদানীং শুরু হয়েছে। এসব প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পাওয়া উদ্যোগগুলো যাতে শেষ পর্যন্ত বাস্তবে রূপ নিতে পারে, তার জন্য চেষ্টা চালাতে উদ্যোক্তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। দেশে যেন ভেঞ্চার ক্যাপিটাল আর এনজেল ইনভেস্টরদের উদ্যোগগুলো প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি ভিত্তি পায়, সে জন্য আরও তৎপর হতে হবে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে।
কয়েকটি ছোট নীতিমালা হলেই প্রবাসীরা তরুণদের উদ্যোগে বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের মাত্র ১০ শতাংশকে যদি জমির দাম বাড়ানো থেকে বিনিয়োগে রূপান্তর করা যায়, তাহলেই বছরে নতুন দেড় লাখ উদ্যোক্তার সংস্থান হয়ে যেতে পারে। প্রতিবছর ১৮ থেকে ২৪ নভেম্বর বিশ্ব উদ্যোক্তা সপ্তাহ হিসেবে পালিত হয়। এ বছর এটি আমাদের দেশেও নানাভাবে পালিত হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে আয়োজিত হয়েছে শুরুতে উল্লেখ করা ‘উদ্যোক্তা বুট ক্যাম্প’। হচ্ছে আরও নানা আয়োজন। কেবল সাহস আর অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে পুঁজি করে অনেক তরুণ-তরুণীই এখন পথ না হারানোর পথে নেমে পড়েছে। তাদের জীবনের মূল মন্ত্র হয়ে উঠছে, তারা ‘চাকরি খুঁজবে না, চাকরি দেবে’। পরিবার, ব্যাংক, স্থানীয় করপোরেট, সরকার আর সমাজ—সবাই মিলে আমরা যেন তাদের ভরসা হতে পারি। মুনির হাসান: সমন্বয়কারী, যুব কর্মসূচি, প্রথম আলো ও সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি।

আত্মপরিচয়ে আত্মবঞ্চনা

চাকরিসূত্রে অন্য দেশে গিয়ে রুমমেট পেয়েছিলাম ফ্রান্সের একজন মেয়েকে। কারও ব্যক্তিগত বিষয় জানার কৌতূহল দমন করার শিক্ষা ছিল। কিন্তু কয়েক দিন যেতেই আমার রুমমেট গড়গড় করে নিজে থেকেই নিজের কথা বলে গেল। তার বাবা ছোটবেলায় তার মাকে ছেড়ে চলে গেলে সে তার নানির কাছে বড় হয়। মা আবার বিয়ে করলে মায়ের কাছে ফিরে গেলে তার নতুন বাবা তাকে মারধর করত। একদিন নতুন বাবা তার প্রতি অশোভন ইঙ্গিত করলে সে পালিয়ে চলে যায়। সে দত্তক হিসেবে বেড়ে ওঠে অন্য এক মায়ের কাছে। সে খুবই কৃতজ্ঞ যে তার সেই মা তাকে লেখাপড়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন বলে সে এখন ভালো চাকরি করতে পারছে। কিন্তু তার একটাই দুঃখ যে সে কোনো দিন মা হতে পারবে না। কেন, প্রশ্ন করা ঠিক হবে কি না, তা ভাবতে না-ভাবতেই সে বলে দিল যে তার ছেলেবন্ধু অস্বীকার করেছিল যে তার গর্ভের সন্তানটি তার নয়। তাই সে রাগ করে ভ্রূণ নষ্ট করতে গেলে তার সন্তান ধারণের অঙ্গটি অকার্যকর হয়ে যায়। এসব কাহিনি সে কত সহজে বলে দিল। অথচ আমরা এখনো জমিদারের নাতি হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিতে উঠেপড়ে লাগি। পশ্চিমের ওরা যারা অনেক পরিশ্রম, অনেক প্রতিকূল অবস্থা মোকাবিলা করে সমাজে প্রতিষ্ঠা পায়, তারা নাকি তাদের অতীত অনুকূল থাকলেও নিজের চেষ্টায় বড় হয়েছে বলতেই বেশি ভালোবাসে।
স্বনির্মাণের চেয়ে বড় কোনো সাফল্য মানুষের হতে পারে বলে তাদের জানা নেই। পৃথিবীর বিখ্যাত মানুষদের অনেকেই শৈশব-কৈশোরে অত্যন্ত দরিদ্র ও সীমাহীন কষ্ট ভোগ করে নিজের চেষ্টায় বড় হয়েছেন। অপরা উইনফ্রের মতো বিখ্যাত টিভি ব্যক্তিত্ব যে গল্প বলতে একবারও দ্বিধা করেন না, তা হলো একটা অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে কেবল মায়ের তত্ত্বাবধানে বড় হওয়া উইনফ্রে নয় বছর বয়সে ধর্ষণের শিকার হন, ১৪ বছর বয়সে মা হন এবং যাকে তিনি বাবা বলে ডাকতেন, তিনি ছিলেন একজন হতদরিদ্র নাপিত। অন্যদিকে, আমরা আশরাফ-আতরাফ নিয়ে এখনো মাঠ গরম করি। পূর্বপুরুষের হাতিশালে হাতি, ঘোড়াশালে ঘোড়া, ১০ তলা বাড়ি, তিনতলা পুকুর—এ ধরনের গালগল্পে মেতে ওঠেন অনেকেই, যাঁরা নিজেরা কোনো দিন চেষ্টা করেননি সফল হতে। আর যাঁরা অনেক চড়াই-উতরাই পার করে বড় হয়েছেন, তাঁরা তাঁদের অতীত তুলে ধরতে লজ্জা বোধ করেন। যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করি, সেখানে প্রতিবছর আত্মকর্মসংস্থানে দৃষ্টান্তমূলক অবদানের জন্য সফল তরুণ-তরুণীদের জাতীয় পুরস্কার দেওয়া হয়ে থাকে। সারা দেশের যোগ্য প্রার্থীদের কাছ থেকে আবেদনপত্র আহ্বান করা হয়। সাধারণত যাঁরা অনেক অভাব, দুঃখ, দুর্দশা, বেকারত্ব ও হতাশা মোকাবিলা করে ইচ্ছাশক্তি, আত্মবিশ্বাস ও স্বনির্ভরতার স্বপ্নে নিজেকে প্রতিষ্ঠার বেদিতে দাঁড় করাতে সক্ষম হন, তাঁরাই এ পুরস্কার পেয়ে থাকেন। নিয়মানুযায়ী আবেদনপত্রে তাঁদের সাফল্যের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস বর্ণনা করতে হয়। যিনি যত বেশি প্রতিকূলতা অতিক্রম করে জীবনযুদ্ধে জয়ী হন, তাঁর যোগ্যতা তত বেশি গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়।
ইতিহাস লেখার সময় তাঁরা সত্যি কথা লেখেন। কিন্তু পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁদের সফলতার কাহিনি বলার জন্য যে পুস্তিকা প্রকাশের প্রস্তুতি নেওয়া হয়, সেখানে তাঁরা, বিশেষ করে পদকপ্রাপ্ত তরুণীরা তাঁদের কাহিনি অন্যভাবে লেখার অনুরোধ জানান। দু-তিন বছর আগে পুরস্কারের জন্য মনোনীত হস্তশিল্পে সফলতার স্বাক্ষর রাখা এক তরুণী তাঁর কাহিনি অন্যভাবে লেখার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। মা-বাবা এসএসসি পরীক্ষার আগেই তাঁর বিয়ে দিলে তাঁকে আর পড়াশোনা করতে দেয়নি তাঁর শ্বশুরবাড়ির লোকেরা। তাঁকে উদয়াস্ত পরিশ্রম করাতেন, যৌতুকের জন্য দফায় দফায় চাপ দিতেন। কিছুদিন পর এক কন্যাসন্তান জন্ম দিলে অত্যাচারের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। তিনি নিজে ও সন্তানটির বেঁচে থাকার জন্য পালিয়ে বাবার বাড়ি চলে যান। সেখানে গিয়ে পোশাক তৈরির প্রশিক্ষণ ও ঋণ নিয়ে মায়ের সহায়তায় ছোট আকারে প্রকল্প গড়ে তোলেন। সেই তাঁর শুরু। প্রকল্প সম্প্রসারিত হতে হতে তিনি এখন জাপান, আমেরিকা ও জার্মানিতে তাঁর তৈরি পোশাক রপ্তানি করছেন। বর্তমানে প্রকল্প থেকে তাঁর মাসিক আয় ৭৯ হাজার টাকা। মেয়েকে ভালো স্কুলে দিয়েছেন, গাড়ি কিনেছেন, ফ্ল্যাট কিনেছেন, মাস্টার্স শেষ করেছেন। এর সবই জানা তাঁর জীবনেতিহাস থেকে। কিন্তু যখন তাঁকে মঞ্চে উঠে পুরস্কারপ্রাপ্তিতে তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করতে বলা হলো, তিনি তাঁর সংগ্রামের কথার কিছুই বললেন না। উপরন্তু তাঁর স্বামীর সহযোগিতার কথাই বললেন।
আরও একজন সফল তরুণী শ্বশুরবাড়ি থেকে কোনোরকমে প্রাণে বেঁচে এসে অন্য এক সহমর্মী পুরুষের সাহচর্যে জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিলেন, তিনিও তাঁর পরম বন্ধুটির কথা কোথাও উল্লেখ করলেন না। অন্য একজন ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় জানালেন, স্থানীয়ভাবে শীর্ষ পুরস্কারটি গ্রহণের দিন তাঁর স্বামী তাঁকে অনুষ্ঠানে যেতে নিষেধ করেন। তিনি নিষেধ অমান্য করে বের হলে যাওয়ার পথে তাঁকে মেরে গুরুতর আহত করেন। কিন্তু এসব কষ্টের কথা জনগণ জানুক, তা তাঁরা চান না। এসব বললে নাকি সমাজ তাঁদের ভালো চোখে দেখবে না, তাই। বিখ্যাত প্রাবন্ধিক প্রমথ চৌধুরীর ‘আমরা ও তোমরা’ প্রবন্ধটা অনেকেই পড়েছেন। প্রবন্ধের শেষে তিনি বলছেন, ‘প্রাচী ও প্রতীচী পৃথক। আমরাও ভালো, তোমরাও ভালো—শুধু তোমাদের ভালো আমাদের মন্দ ও আমাদের ভালো তোমাদের মন্দ। সুতরাং অতীতের আমরা ও বর্তমানের তোমরা, এই দুয়ে মিলে যে ভবিষ্যতের তারা হবে—তাও অসম্ভব।’ তবে এখন ‘অসম্ভব’ শব্দটি অনেকেই অভিধান থেকে তুলে দিতে চাইছেন। স্যাটেলাইটের বদৌলতে আমরা আর ওরা অনেক কাছাকাছি। সত্যের সহজ স্বীকারোক্তিতে মানুষ ছোট হয় না, বরং তার সংগ্রামের কাহিনি হতাশাগ্রস্ত ও অকৃতকার্য ব্যক্তিদের কাছে সফল হওয়ার প্রধান মূলমন্ত্র।
উম্মে মুসলিমা: কথাসাহিত্যিক।

মার্কিন কংগ্রেসের উদ্বেগ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্ট (ইইউ) একই দিনে যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, তা কার্যত শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সর্বদলীয় মন্ত্রিসভার প্রতি একটি অনাস্থার বহিঃপ্রকাশ। আমাদের সংসদ ও সরকার নিষ্ক্রিয় না থাকলে দুটি বিদেশি সংসদের সক্রিয় হওয়ার সুযোগই থাকত না। এর কারণ, প্রধান বিরোধী দলের সঙ্গে কোনো ধরনের আলাপ-আলোচনায় না গিয়ে শেখ হাসিনা একতরফাভাবে একটি মন্ত্রিসভা করে প্রকারান্তরে একতরফা নির্বাচনের পথে পা বাড়িয়েছেন। ফলে সংকট ঘনীভূত হয়েছে। বিএনপি ও তার মিত্ররা ওই সরকারে যোগদানে ন্যূনতম আগ্রহ দেখায়নি। উপরন্তু দেখা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর হাতে ক্ষমতা আরও কুক্ষিগত হয়েছে। নির্বাচনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্বরাষ্ট্র এবং আইন ও বিচার নতুন করে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি করতলগত হয়েছে।
এতে অবস্থার আরও এক ধাপ অবনতি ঘটেছে। যেকোনো দেশের উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সম্পর্কে মার্কিন কংগ্রেস বরাবরই এ রকম শুনানি করে আসছে। বাংলাদেশ নিয়েও শুনানি নতুন নয়। যদিও প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম কংগ্রেসের শুনানির উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ইঙ্গিত করেছেন, জামায়াত পয়সা খরচ করে লবিস্ট নিয়োগ করে এ শুনানি করিয়ে থাকতে পারে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে মার্কিন কংগ্রেসের শুনানিতে নিক্সন-কিসিঞ্জারের ভূমিকা সমালোচিত হয়েছিল। ক্ষমতাসীনদের উচিত হবে এর প্রক্রিয়ার দিকে না তাকিয়ে সারবত্তার প্রতি মনোযোগ দেওয়া। কংগ্রেসের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপকমিটির চেয়ারম্যান এড রয়েস পাকিস্তানের পরিস্থিতির সঙ্গে বাংলাদেশের পরিস্থিতির কোনো সাযুজ্য আছে কি না, তা জানতে চান। তিনি মন্তব্য করেন পাকিস্তানের সমস্যা অঙ্কুরে বিনষ্ট করা যায়নি বলেই গভীর হয়েছে। আশা করব, এড রয়েস যে কথা পরিষ্কার করে উচ্চারণ করেননি, তার নিহিতার্থ আমাদের নেতারা, বিশেষ করে বিরোধীদলীয় নেতা গুরুত্বের সঙ্গে নেবেন।
কারণ, মৌলবাদ ও জঙ্গি দমনে তাঁর কৌশল কী হবে, তা তিনি এখনো খুব স্পষ্ট বা নির্দিষ্ট করেননি। কংগ্রেসের শুনানিতে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও মাদ্রাসাশিক্ষা নিয়েও আলোচনা হয়। সম্ভাব্য সেনা হস্তক্ষেপ সম্পর্কেও সেখানে কথা হয়েছে। প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশের একজন অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল বলেছেন, ‘সহিংসতা চলতে থাকলে’ তাদের ‘অনিচ্ছা সত্ত্বেও’ সে সম্ভাবনা নাকচ করেননি। এ ধরনের ইঙ্গিত প্রায়শ উচ্চারিত হয়ে থাকে। কিন্তু এটাকে দরকার একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক করে তোলা। আর সে জন্য এখনই সংলাপ শুরু করতে হবে। ইইউ বিরোধী দলকে নির্বাচন বর্জন না করতে বলেছে। তারা লক্ষণীয়ভাবে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে রাষ্ট্র ও মানুষের নিরাপত্তার স্বার্থে দুই মেয়াদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চলতে পারার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। আর ইসিকে বলেছে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ উপায়ে নির্বাচন পরিচালনা ও তদারকির ব্যবস্থা করতে। তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে বিরোধী দলকে ফেলে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও অহিংস নির্বাচন বাংলাদেশে বাস্তবে সম্ভব কি না? অবশ্যই সংলাপ লাগবে। সেটা শুরুর প্রাথমিক দায় প্রধানমন্ত্রীকেই নিতে হবে।

১২ লাখ ডলারের ক্যামেরা

বিরল একটি লাইকা ক্যামেরা নিলামে উঠতে যাচ্ছে হংকংয়ে। এর সম্ভাব্যমূল্য ধরা হয়েছে ১২ লাখ মার্কিন ডলার। সোনা দিয়ে মোড়ানো লাইকা লেক্সাস-২ মডেলের এই ক্যামেরাটি ১৯৩২ সালে তৈরি করা হয়। এটি ওই সিরিজের মাত্র চারটি ক্যামেরার একটি বলে বিবিসি জানিয়েছে। বাকি তিনটি ক্যামেরা কোথায় রয়েছে তা অজ্ঞাত। এই ক্যামেরাটি ছিল ওয়েলসের একজন অধিবাসীর। তিনি ২০১২ সালে মারা যান। ২০০১ সালে বিবিসির অ্যান্টিক রোডশো অনুষ্ঠানে এই ক্যামেরাটি প্রদর্শন করা হয়। তখন এটির মূল্য অনুমান করা হয়েছিল মাত্র ৮ হাজার ১শ’ ডলার।
৮৮৮৪০ সিরিয়াল নম্বরের ক্যামেরাটি সোনার পাত দিয়ে মোড়ানো এবং এর ওপর গিরগিটির কৃত্রিম চামড়ার আবরণ দেয়া। এটি একটি কুমিরের চামড়া দিয়ে তৈরি বাক্সে রক্ষিত ছিল। বোনহামস নিলাম হাউস এই নিলামের আয়োজন করেছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, লাইকার এই বিষয়টি এরআগে সবাই জানলেও এইবারই প্রথম উদাহরণ হিসেবে আলোর মুখ দেখল। ক্যামেরাটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ওয়ালসের বার্ডপোর্টের একজন ব্রিটিশ নাগরিকের হাতে আসে। অ্যান্টিক রোডশোতে এর মূল্যমান যাচাই করার আগে তিনি কয়েকদশক ধরে এটি ব্যবহার করেন। ১৯২৫ সাল থেকে লাইকা ক্যামেরা বিক্রি শুরু হয়। হালকা ওজনের এবং দেখতে আধুনিক হওয়ায় এই লাইকার ক্যামেরাগুলো অন্যান্য ক্যামেরার তুলনায় বেশি জনপ্রিয়তা পায়। আর এর মাধ্যমে ৩৫ মিলিমিটার ফিল্মভিত্তিক ফটোগ্রাফির বিপ্লব শুরু করে। ২০১২ সালে ভিয়েনায় এক নিলামে ১৯২৩ সালে নির্মিত লাইকার জিরো-সিরিজের একটি ক্যামেরা ২৭ লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলারে বিক্রি হয়েছিল। ওই নিলামের মধ্যদিয়ে ক্যামেরা বিক্রিতে নতুন বিশ্বরেকর্ড সৃষ্টি হয়। সিনহুয়া।