Sunday, May 31, 2015

বিএনপির রাজনীতিকে পরিচ্ছন্ন করার আহ্বান -জিয়ার মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা নিবেদন

সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে গতকাল
মতিঝিল এজিবি কলোনি কমিউনিটি সেন্টারে দুস্থ ব্যক্তিদের
মধ্যে খাবার বিতরণ করেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া
সাবেক রাষ্ট্রপতি ও দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ৩৪তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। গতকাল শনিবার দুপুর ১২টার দিকে চন্দ্রিমা উদ্যানে দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের নিয়ে তিনি জিয়ার কবরস্থানে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এ সময় সমবেত নেতা-কর্মীরা বুকে কালো ব্যাজ ধারণ করে নীরবে দাঁড়িয়ে প্রয়াত নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
শ্রদ্ধা জানানোর আগে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, এ মুহূর্তে বিএনপির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে জিয়াউর রহমানের আদর্শে দলকে পুনর্গঠিত করে গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনা। দল পুনর্গঠন করলেই হবে না, বিএনপির রাজনীতিকেও পরিচ্ছন্ন করতে হবে। জিয়াউর রহমানের আদর্শে দলকে পুনর্গঠন করতে হবে। এগুলো করতে পারলেই দেশে গণতন্ত্র ফিরে আসবে এবং একটি জাতীয় ঐক্য গঠিত হবে।
বিএনপির এই নেতা আরও বলেন, জিয়াউর রহমান গণতন্ত্রের কথা বলে গেছেন। আরও বলে গেছেন বিএনপি চরম ডানপন্থী দল হবে না। এটা হবে মধ্যমপন্থী উদার গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল একটি দল। এটা মনে রাখতে হবে।
এ সময় খালেদা জিয়ার সঙ্গে ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমান, ভাইস চেয়ারম্যান চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, আবদুল্লাহ আল নোমান, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শাহজাহান ওমর, মুশফিকুর রহমান, রুহুল আলম চৌধুরী, দলের মুখপাত্র আসাদুজ্জামান রিপন, যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ শাহজাহান, মাহবুবউদ্দিন খোকন প্রমুখ।
ফুল দিয়ে আরও শ্রদ্ধা জানায় মহানগর বিএনপি, যুবদল, শ্রমিক দল, কৃষক দল, মহিলা দল, জাসাস, ড্যাব, অ্যাব, উলামা দল, মৎস্যজীবী দল, তাঁতী দল, ছাত্রদল, সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদসহ সমমনা বিভিন্ন সংগঠন।
সেখানে ওলামা দল আয়োজিত কোরআনখানি ও মিলাদে অংশ নেন খালেদা জিয়া। এরপর দিনভর রাজধানীর ২৫টি স্থানে দুস্থ ব্যক্তিদের মধ্যে খাবার বিতরণ করেন তিনি। আজও খাবার বিতরণ কর্মসূচিতে অংশ নেবেন তিনি।
গতকাল মাগরিবের নামাজের পর চেয়ারপারসনের গুলশানের কার্যালয়ে প্রয়াত নেতার মাগফিরাত কামনায় মিলাদ হয়। এ ছাড়া ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) ও জিয়া সাংস্কৃতিক সংগঠন (জিসাস) সমাধি প্রাঙ্গণে স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি এবং নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা দেয়।

বৃটেনে বাংলাদেশীদের সংঘর্ষ

বৃটেনে একটি কমিউনিটি সেন্টারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বাংলাদেশীদের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ হয়েছে। সংঘর্ষের সময় এক পক্ষ অন্য পক্ষের দিকে চেয়ার ছুড়ে মারে। কেউ কেউ এ সময় লাঠি হাতে তেড়ে যায়। এতে বেশ কিছু লোক আহত হয়েছে। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন দ্য টেলিগ্রাফ। এতে ওই সংঘর্ষের বেশ কিছু ছবি প্রকাশ করা হয়েছে। রিপোর্টে বলা হয় ইংল্যান্ডের লিডস শহরের বাংলাদেশী কমিউনিটি সেন্টারে ওই সংঘর্ষ সৃষ্টি হয়। কে ওই কমিউনিটি সেন্টার পরিচালনা করবে তা নিয়ে বাংলাদেশী দু’গ্রপের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে তা সংঘর্ষের রূপ নেয়। লিডস সিটি কাউন্সিলের হারেহিল এলাকার প্রতিনিধিত্ব করেন আরিফ হোসেন। তিনি বলেন, ওই কমিউনিটি সেন্টার পরিচালনা নিয়ে এজিএম চলছিল। তখন দু’পক্ষই এর দায়িত্ব নিতে চায়। তিনি বলেন, এমন ঘটনায় আমি মর্মাহত। এমন ঘটনা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ কমিউনিটি সেন্টারের সদস্য ৮০২ জন। তাদেরই সিদ্ধান্ত জানানোর কথা কে এই কমিউনিটি সেন্টার পরিচালনা করবে, যেমনটা হয় এমপি বা কাউন্সিলরের ক্ষেত্রে।

বিচার বিভাগকে পাশ কাটিয়ে কোনো কাজ নয় -নির্বাহী বিভাগের উদ্দেশে প্রধান বিচারপতি

প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার (মাঝে) হাতে
শ্রদ্ধা স্মারক তুলে দিচ্ছেন বিচারপতি নাজমুন আরা
সুলতানা। পাশে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক l প্রথম আলো
বিচার বিভাগকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য সব ক্ষেত্রে আইন মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। গতকাল শনিবার এক সংবর্ধনা সভায় তিনি বলেন, ‘বিচার বিভাগ রাষ্ট্রের একটি অঙ্গ। একে পাশ কাটিয়ে কেউ যেন কাজ না করে।’
বাংলাদেশ মহিলা জজ অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত সংবর্ধনা সভায় গতকাল এ কথা বলেন প্রধান বিচারপতি। রাজধানীর বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের মিলনায়তনে এ সভার আয়োজন করা হয়।
প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আমরা বিচারকেরা ট্রেড ইউনিয়নের মতো দাবি-দাওয়া নিয়ে হাজির হব না। বিচার বিভাগ রাষ্ট্রের একটা অঙ্গ। এটাকে বাইপাস (পাশ কাটিয়ে) করে কেউ যেন কাজ না করে। আমরা চাই নির্বাহী বিভাগের সঙ্গে সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করতে।’ আইনমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনি তো আমাদের পরিবারের সদস্য। আপনি জানেন যে আমাদের কাজ করতে হয় বেশ কিছু প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে। তবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানমর্যাদা রক্ষার্থে কিছু ন্যায্য দাবি বিচারকদের আছে। এ ব্যাপারে যদি কিছু বলে থাকি আমি, কাউকে আঘাত করার জন্য আজ পর্যন্ত কিছু বলিনি।’ তিনি বলেন, ‘আমি বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য বলি। সরকারের বাকি দুটি অঙ্গের (নির্বাহী ও আইন বিভাগ) বিষয় আমরা কোনোভাবে অস্বীকার করছি না। এ দুই প্রতিষ্ঠান যা-ই করুক না কেন, বিচার বিভাগের সহযোগিতা ছাড়া প্রশাসনিক বা নির্বাহী বিভাগের কোনো কাজ কার্যকর করা সম্ভব নয়।’
বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেন, জনপ্রশাসনের লোকবলের তথ্যভান্ডার সব মন্ত্রণালয়ের কাছে আছে, কিন্তু বিচার বিভাগের লোকবলের তথ্যভান্ডার আইন মন্ত্রণালয়ে নেই। এ জন্য নিম্ন আদালতে শূন্য পদে লোক দিতে ছয় মাস লেগে যায়। এতে মামলাজট বাড়ে। তিনি বলেন, পদ শূন্য হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো পূরণ করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ কার্যক্রমের প্রশংসা করে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘বিচার বিভাগের ডিজিটালাইজেশনে আমরা বিচারকেরা পিছিয়ে আছি।’ আইনমন্ত্রীকে উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, ‘আগামী তিন মাসের মধ্যে মাঠপর্যায়ের প্রত্যেক বিচারককে ল্যাপটপ দেওয়া হবে। তখন আর হাতে নয়, কম্পিউটারে রায় লেখা হবে। এ ছাড়া ভয়েস রেকর্ডিংয়ের মাধ্যমে সাক্ষ্য গ্রহণ করা হলে হাতে লেখা নথি কারসাজির ঘটনাও ঘটবে না।’
নারী বিচারকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতি বলেন, সুপ্রিম কোর্টে ডে-কেয়ার সেন্টার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শুধু বিচারক নন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য এ সুবিধা থাকবে। তবে সারা দেশে ডে-কেয়ার সেন্টার চালুর বিষয়টি বাস্তবসম্মত নয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিচার বিভাগে নারীদের যোগদান বাড়ছে উল্লেখ করে প্রধান বিচারপতি বলেন, যেখানে ইংল্যান্ডে নারী জজ ১০ শতাংশ, বাংলাদেশে ১৯ শতাংশ নারী বিচারক রয়েছেন। সেটা বাড়তে বাড়তে হয়তো খুব শিগগির ৫০ শতাংশ হয়ে যাবে।
সংবর্ধনা সভায় প্রধান বিচারপতির হাতে শ্রদ্ধা স্মারক তুলে দেন মহিলা জজ অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা ও আপিল বিভাগের বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা। বক্তব্য দেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, আপিল বিভাগের আরেক সদস্য বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন প্রমুখ। মহিলা জজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নুরুন্নাহার ওসমানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন আয়োজক সংগঠনের মহাসচিব উম্মে কুলসুম। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন আইনসচিব আবু সালেহ শেখ মো. জহিরুল হক, সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার সৈয়দ আমিনুল ইসলাম, প্রধান বিচারপতির স্ত্রী সুষমা সিনহা প্রমুখ।

ভূমধ্যসাগরে অভিযান: ৪,২৪৩ অভিবাসী উদ্ধার

ঝুঁকিপূর্ণ বোটে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে আশ্রয় নিতে যাওয়া ৪,২৪৩ অবৈধ অভিবাসীকে উদ্ধার করা হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টা ধরে পরিচালিত ব্যাপক অভিযানে তাদের উদ্ধার করা হয়। ইতালি, আয়ারল্যান্ড, জার্মানি, বেলজিয়াম ও বৃটেনের জাহাজগুলো ব্যাপক এ উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়। ২২টি অভিযান চালিয়ে মাছ ধরার বোট ও রবারের তৈরি ডিঙ্গি জাতীয় বোট থেকে ৪ হাজার ২৪৩ জন অভিবাসীকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। ইতালির সমুদ্র উপকূলরক্ষী বাহিনী এ তথ্য দিয়েছে। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। গত শুক্রবার ও শনিবার উদ্ধার করা অভিবাসীদের অধিকাংশই সপ্তাহের শেষ দিকে ইতালির দক্ষিণাঞ্চলীয় সমুদ্র বন্দরে পৌঁছাবে বলে মনে করা হচ্ছে। গত মাসে লিবিয়ার সমুদ্র উপকূলে ২০ মিটার দীর্ঘ একটি মাছ ধরার বোটডুবির ঘটনায় প্রায় ৮০০ অভিবাসীর সলিলসমাধি হয়। এরপরই ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত রাষ্ট্রসমূহ মানব পাচারকারী চক্রগুলো চিহ্নিত ও তাদের সদস্যদের গ্রেপ্তারে এবং অভিবাসীদের উদ্ধারে সম্মিলিত সমুদ্র অভিযানে সম্মত হয়। গত শুক্রবার ইতালির নৌবাহিনী জানায়, লিবিয়ার সমুদ্র উপকূলে একটি বোটে ১৭ জনের মৃতদেহ পাওয়া যায়। তবে তাদের জাতীয়তা বা কিভাবে তাদের মৃত্যু হয়, সে ব্যাপারে কোন তথ্য প্রাথমিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। গতকাল রাতে ইতালির নৌবাহিনীর একটি জাহাজে ওই মৃতদেহগুলো এবং ২ শতাধিক বেঁচে যাওয়া অভিবাসীকে সিসিলির পূর্বাঞ্চলীয় অগাস্টা সমুদ্র বন্দরে নেয়া হয়। এদিকে বছরের এ সময়টা সমুদ্র অপেক্ষাকৃত শান্ত থাকায় অভিবাসীরা এ সময়টাকেই বেছে নেয়। জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইতালিতে বছরের শুরু থেকে মে মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ৩৫,৫০০ অবৈধ অভিবাসী আশ্রয় নিয়েছে। প্রায় ১,৮০০ অভিবাসী মৃত অথবা নিখোঁজ রয়েছে। আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধবিধ্বস্ত ও দারিদ্রপীড়িত দেশগুলো থেকে প্রাণ বাঁচাতে অসহায় মানুষগুলো জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্র পাড়ি দিচ্ছেন।

থাইল্যান্ডে ৮১ মানব পাচারকারীর বিরুদ্ধে পরোয়ানা, গ্রেপ্তার ৫১

সমুদ্রপথে বাংলাদেশী ও মিয়ানমারের রোহিঙ্গা অভিবাসীদের মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডে পাচারের সঙ্গে জড়িত চক্রের সদস্য ও মূল হোতাদের চিহ্নিত করা হচ্ছে। থাইল্যান্ডে এ পর্যন্ত সন্দেহভাজন ৮১ মানব পাচারকারীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। গতকাল ৪ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। এদিকে এ পর্যন্ত পরিচালিত অভিযানে সন্দেহভাজন প্রায় ৫১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বাকি ৩০ সন্দেহভাজন পাচারকারীকে ধরতে সঙ্খলা, সাতুন ও রানোং প্রদেশে পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। থাইল্যান্ডভিত্তিক অনলাইন সংবাদপত্র ‘দ্য নেশন’ এ খবর দিয়েছে। গতকাল পুলিশ মানব পাচারকারীদের শিবির শনাক্তে ১২ রোহিঙ্গা অভিবাসীকে সঙ্খলা প্রদেশের সাদাও জেলার গ্লাস মাউন্টেন এলাকায় নিয়ে যায়। পাহাড়ি জঙ্গলে শিবির স্থাপন করে ওই অভিবাসীদের আটক রেখেছিল মানব পাচারকারী চক্রের সদস্যরা। অভিবাসীরা বন্দি-শিবিরের পথ মনে রাখতে পেরেছিলেন। ওই বন্দি-শিবিরগুলোর বিস্তারিত তথ্য তারা পুলিশকে দেন। পুলিশকে ওই শিবিরগুলোতে নিয়ে যান অভিবাসীরা এবং সন্দেহভাজনদের চিহ্নিতও করেন তারা। পুলিশ বিভিন্ন বন্দি-শিবিরের ছবি তুলে সেগুলো সন্দেহভাজন মানব পাচারকারীদের দেখায়। তারা তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ স্বীকার করে এবং কোন শিবিরে তারা কাজ করতো, ওই ছবিগুলোর মধ্য থেকে সেটি শনাক্ত করে। সম্প্রতি একটি ২ শতাধিক অভিবাসীসহ একটি বোট উদ্ধার করে মিয়ানমার নৌবাহিনী। ওই বোটের মালিক এক থাই নাগরিককেও সম্পৃক্ততার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ৫২ বছর বয়সী ওই ব্যক্তিকে দেশটির বৃহত্তম শহর ইয়াঙ্গুনে আটক রাখা হয়েছে। তবে কখন তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে কি ধরনের অভিযোগ গঠন করা হয়েছে, তা প্রাথমিকভাবে জানা যায়নি।

নারী নিগ্রহ- আক্রান্ত মেয়েটির পাশে রাষ্ট্র দাঁড়াক by সুলতানা কামাল

চলন্ত মাইক্রোবাসে একজন তরুণীকে তুলে নিয়ে গণধর্ষণের ঘটনাটি আমাদের সমাজের বিকট ও বীভৎস চেহারাই তুলে ধরেছে। এ ধরনের ঘটনা যখন শুনি কিংবা পত্রিকায় পড়ি, তখন প্রচণ্ডভাবে বিক্ষুব্ধ হই, বিচলিত বোধ করি। ভাবি, এর প্রতিকার করা যাঁদের দায়িত্ব তঁারা কী করছেন? এই ঢাকা শহরে এ রকম একটি ঘৃণ্য ঘটনা ঘটতে পারল, অথচ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দুর্বৃত্তদের ধরতে পারল না। তাদের নিস্পৃহতা ও নিষ্ক্রিয়তার সুযোগেই একের পর এক নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে চলেছে। অথচ অপরাধীরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
বাংলাদেশে যেন এক প্রতিকারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। পয়লা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় দুর্বৃত্তদের হাতে যে মেয়েরা নিগৃহীত হলো, সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উদাসীনতা ছিল অমার্জনীয়। সিসিটিভি বসানো হয়েছে কেন? সিসিটিভি মনিটর করার দায়িত্ব যাঁদের, তাঁরা কী করছিলেন? মেয়েদের লাঞ্ছনার ছবি সিসিটিভিতে আসার সঙ্গে সঙ্গে কেন বিষয়টি সংশ্লিষ্ট বিভাগে জানানো হলো না? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গেলে তো তাৎক্ষণিকভাবে দুর্বৃত্তদের ধরা যেত। এখানে তাঁরা সুস্পষ্টভাবে কর্তব্য পালনে অবহেলা করেছেন। পরবর্তীকালে সেই নারী লাঞ্ছনার প্রতিবাদ করতে গিয়েও নারীরা পুলিশের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছেন। সেই ঘটনায় কেবল পুলিশ নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরও তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন। তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি জানানোর পরও তিনি গুরুত্ব দেননি। রাষ্ট্র ও সমাজে পদাধিকারী ব্যক্তিরা যদি যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন না করেন, তাহলে অপরাধ দমন হবে কীভাবে? দুর্বৃত্তদের বিচারের আওতায় আনা যাচ্ছে না বলেই নারী লাঞ্ছনাসহ সব অপরাধের মাত্রা বেড়ে চলেছে। অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
বৃহস্পতিবারের রাতের ঘটনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দুর্বৃত্তরা পরিকল্পিতভাবে এই অপরাধ ঘটিয়েছে। তারা আগেই জানত, মেয়েটি কখন দোকানে আসে, কখন দোকান থেকে বাড়িতে যায়। তারা সুযোগ বুঝে মেয়েটির ওপর আক্রমণ চালিয়েছে। কিন্তু এই দুর্বৃত্তদের ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি সতর্ক দৃষ্টি রাখত, তাহলে তারা সংঘবদ্ধ হয়ে অপরাধ ঘটাতে পারত না। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, আগে এ ধরনের অপরাধ করত একক ব্যক্তি; অনেকটা লোকচক্ষুর আড়ালে। এখন সংঘবদ্ধ হয়ে তারা অপরাধ করছে। আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম, তখন দেখেছি একটি মেয়ে রাস্তায় একটি ছেলেকে দেখলে ভয় পেলেও একাধিক ছেলে থাকলে ভয় পেত না। ভাবত, এদের সবাই নিশ্চয়ই খারাপ নয়; কেউ না কেউ অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে। এখন সংঘবদ্ধ হয়ে নারীর ওপর নির্যাতন চালানো হলেও সমাজ থেকে সেভাবে প্রতিবাদ হচ্ছে না। এর পেছনে এই ধারণাটিই কাজ করে যে প্রতিবাদ করে কোনো লাভ হবে না। দ্বিতীয়ত অনেক সময় প্রতিবাদ করলেও নির্যাতনের শিকার হতে হয়। এমনকি আক্রান্ত নারীর স্বজনেরা প্রতিবাদ করলে তাদের ওপরও আক্রমণ হয়। দুর্বৃত্তরা ভয়ভীতি দেখায়। অনেক ক্ষেত্রে আক্রান্ত নারী আত্মহননের পথ বেছে নেয়। এটি সামগ্রিকভাবে সমাজের অসংবেদনশীলতার ফল।
দুর্বৃত্তরা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ার কারণেই একের পর এক নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। এই দুর্বৃত্তদের নিয়ন্ত্রণ করা যাদের দায়িত্ব, অনেক সময় দেখা যায়, তারাই তাদের সহযোগীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছে। কখনো কখনো অপরাধীরা রাজনৈতিক মহলের আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়ে থাকে। কিন্তু সেটি তো পাওয়ার কথা নয়। আইনের শাসনের মূল কথা হলো দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন। কিন্তু আমাদের সমাজে এর উল্টোটাই ঘটে চলেছে। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব যাদের, তারাও জনগণের ওপর নির্ভর না করে দুর্বৃত্তদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
বৃহস্পতিবার রাতে যে মেয়েটি সংঘবদ্ধ দুর্বৃত্তদের হাতে নিগৃহীত হলো সে গারো সম্প্রদায়ের। সে একটি দোকানে কাজ করত; কাজ শেষে বাড়ি যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিল। এ সময়ই দুর্বৃত্তরা অস্ত্রের মুখে তাকে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায়। আমাদের সমাজের দুর্বল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী নানাভাবেই নিগৃহীত হচ্ছে। পাহাড়ে ও সমতলে আদিবাসী মেয়েরা নিগৃহীত হচ্ছে। কিন্তু কোনো প্রতিকার হচ্ছে না। অপরাধীরা ধরা পড়ছে না। বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদছে। দুর্বৃত্তদের মধ্যে এ রকম ধারণা হয়েছে যে, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর কোনো মেয়ে লাঞ্ছিত হলে প্রতিবাদ হলেও হতে পারে। কিন্তু মেয়েটি যখন গারো বা আদিবাসী সম্প্রদায়ের, তখন আর তারা প্রতিবাদ করার সাহস পাবে না। একই চিত্র দেখেছি ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বেলায়। সমাজে যখন মানবিক বোধ ও চেতনা হারিয়ে যায়, তখনই এ রকম পরিস্থিতির তৈরি হয়। আমরা চাই, দুর্বৃত্তদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক। আক্রান্ত মেয়েটির পাশে রাষ্ট্র দাঁড়াক।
প্রথমেই যে প্রশ্নটি আসে তা হলো, যে গাড়িতে মেয়েটিকে তুলে নেওয়া হয়েছে, সেই গাড়ির মালিক আছেন। চালক আছেন। এ রকম ঘৃণ্য অপরাধ ঘটনার পরও সেই গাড়িটি কেন খুঁজে বের করা যাবে না? গাড়ি খুঁজে পেলে তার আরোহীদের বের করা কঠিন নয়। কোথাও নারী নিগ্রহের ঘটনা ঘটলেই অনেকে মেয়েটি কোথায় ও কেন গিয়েছিল, কী পোশাক পরেছিল, তার সঙ্গে কেউ ছিল কি না, এসব প্রশ্ন করেন। এসব প্রশ্ন তাঁরাই করেন, যাঁরা চান না মেয়েরা ঘরের বাইরে যাক। আমি তাঁদের জিজ্ঞেস করতে চাই, ছেলেরা যদি বাইরে বেরোতে পারে, মেয়েরা কেন পারবে না? কেন একটি মেয়েকে সমাজ ও রাষ্ট্র নিরাপত্তা দেবে না? একটি মেয়ে কেন ঘর থেকে নিরাপদে কাজের জায়গায় যেতে কিংবা কাজের জায়গা থেকে ঘরে ফিরতে পারবে না? দেশটা তো নারী–পুরুষ সবার।
বাংলাদেশের সংবিধানের ১০ নম্বর ধারায় জনজীবনে নারীর পূর্ণ অধিকার স্বীকৃত। ২৭ ও ২৮ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, নারী-পুরুষভেদে কোনো রূপ বৈষম্য দেখানো যাবে না। ২৮ নম্বর ধারার ক অনুচ্ছেদে সমাজের পশ্চাৎপদ অংশকে অগ্রবর্তী অংশের সমপর্যায়ে নিয়ে আসার কথা বলা হয়েছে।
আমরা যে মুক্তিযুদ্ধ করেছি, তার মূলেও ছিল নারী-পুরুষ, ধর্মবর্ণনির্বিশেষে সামাজিক ন্যায় ও সমতা। তাহলে নারীর ওপর এসব বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে কেন? সমাজের সবক্ষেত্রে নারী সম-অধিকার ভোগ করবে, স্বাধীনভাবে চলাফেরা করবে, সেটাই সভ্য সমাজের রীতি। এ কথাও সত্য যে বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু রাষ্ট্র যদি তাদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, দুর্বৃত্তদের নিবৃত্ত করতে না পারে, তাহলে আমাদের সব অর্জনই তো ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।
রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যখনই আমাদের আলোচনা হয়, তখন তাঁরা বলেন, অপরাধ সব সমাজে ও সব রাষ্ট্রেই ঘটছে। আমরাও স্বীকার করি, এটি পৃথিবীব্যাপী সমস্যা। কিন্তু অন্য দেশের সঙ্গে আমাদের পার্থক্য হলো, সেখানে অপরাধ করলে তার বিচারও হয়, অপরাধীরা ধরা পড়ে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের এখানে বিচার হয় না। অপরাধীরা ধরা পড়ে না। অর্থাৎ সমাজে বিচারহীনতা ও প্রতিকারহীনতার সংস্কৃতি চলছে। কোনো সমাজে বা রাষ্ট্রে যখন অপরাধ করে কেউ পার পায়, অপরাধীকে বিচারের আওতায় আনা না যায়, তাহলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয়।
একটি দেশ বা সমাজে সভ্যতার মাপকাঠি হচ্ছে সেখানে অপরাধের বিচার হচ্ছে কি না। সাম্প্রতিক কালে অনেকগুলো নারী নিগ্রহের ঘটনা ঘটলেও দু-একটি ব্যতিক্রম বাদে অপরাধীরা ধরা পড়েনি। ধরা পড়লেও তাদের শাস্তি হয়নি। এই বিচারহীনতাই অপরাধীদের উৎসাহিত করছে। কেবল নারী নিগ্রহ নয়, মুক্তবুদ্ধির চর্চা যাঁরা করেন, তাঁদের ওপরও আঘাত হানছে দুর্বৃত্তরা। মুক্তবুদ্ধির কয়েকজন ব্লগার ও লেখককে হত্যা করেছে তারা। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের ধরতে পারেনি। দেশে আইনানুগ সরকার থাকা সত্ত্বেও দুর্বৃত্তরা মুক্তচিন্তার মানুষকে প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে।
মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত বাংলাদেশের জন্য এর চেয়ে বেদনাদায়ক আর কী হতে পারে?
সুলতানা কামাল: আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা।

জিনপিংয়ের ছবি এঁকে শিল্পি শ্রীঘরে

চীনের কমিউনিস্ট নেতা শি জিনপিংয়ের ব্যঙ্গচিত্র আঁকার কারণে এক চিত্রশিল্পীকে আটক করেছে পুলিশ। একটি মানবাধিকার গ্র“প এ খবর জানায়। সাংহাই পুলিশের হাতে আটক হওয়া চিত্রশিল্পীর নাম দাই জিয়ানইয়ং। তিনি একজন আলোকচিত্রীও বটে। চীনা ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার গ্র“পগুলোর একটি জোট চাইনিজ হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডারস জানায়,
দাই বুধবার শি জিনপিংয়ের ব্যঙ্গচিত্রটি অনলাইনে প্রকাশ করে। ব্যাঙ্গচিত্রে চীনা প্রেসিডেন্ট ও কমিউনিস্ট পার্টি প্রধান শি জিনপিংকে নাৎসি জার্মানির নেতা এডলফ হিটলারের মতো গোঁফওয়ালা এবং কপালে ভাঁজ পড়া দেখানো হয়েছে। এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য শুক্রবার থাই পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। দাইকে সাংহাইয়ের চাংনিং জেলার কর্তৃপক্ষ প্রশাসনিক আটকাবস্থায় রেখেছে। তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেফতার করা হতে পারে। মিড ডে।

দশ রুপিতে গান্ধী নেই

দশ টাকার (ভারতীয় রুপি) নতুন নোট থেকে তুলে দেয়া হয়েছে ভারতীয় জাতির জনক মহাত্মা গান্ধীর ছবি। সম্প্রতি ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংকের (আরবিআই) ছাপানো নতুন ১০ রুপির নোট থেকে কেন তার ছবি সরানো হল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে দেশটির গণমাধ্যমে। আরবিআইয়ের ছাপানো নতুন এই নোট নিয়ে বিভ্রান্তিও তৈরি হয়েছে। গান্ধীর ছবি বাদ দিলে নতুন নোটের সঙ্গে পুরনো দশ টাকার নোটে আর কোনো পার্থক্য নেই। এটির ছবি ওয়েবসাইটে দেয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সাল থেকে ব্যাংক নোটে মহাত্মা গান্ধীর ছবি ছাপা শুরু হয়। প্রথমে ৫ ও ১০ টাকার নোটে চালু হলেও ক্রমে ২০, ১০০, ৫০০ এমনকি হাজার টাকার নোটও গান্ধী সিরিজের আওতায় আসে। এই সিরিজের সব ব্যাংক নোটের সামনের দিকে তার ছবি দেয়া হয়। নোটের আর এক পাশে সাদা জায়গায় গান্ধীর ওয়াটার মার্কও থাকে।

নতুন নামে পুরান দল

দলের নাম পরিবর্তনের পর দলীয় নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া ফিলনের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছেন ফ্রান্সের সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজি। মাঝে বসে দুই নেতার এ উল্লসিত করমর্দন দেখছেন সারকোজি পত্নী সাবেক ফার্স্ট লেডি কার্লা ব্র“নাই।
‘ইউনিয়ন ফর অ্যা পপুলার মুভমেন্ট’ (ইউএমপি) নাম পরিবর্তন করে দলের নতুন নাম রেখেছেন ‘দি রিপাবলিকানস’। শুক্রবার দলটির ৮৩ ভাগ সদস্য নতুন নাম অনুমোদন করেছেন। সারকোজির দলের এ পদক্ষেপ ফ্রান্সে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি করেছে -এএফপি

এগিয়ে থেকেও হার মামুনুলদের

প্রীতি ম্যাচে প্রীত হতে পারেননি বাংলাদেশের দর্শকরা। এগিয়ে থেকেও ২-১ গোলের হার নিয়ে মাথা নিচু করে মাঠ ছাড়ে বাংলাদেশ দল। শনিবার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত প্রীতি ম্যাচটি নিজেদের করে নিল সিঙ্গাপুর। আহামরি নৈপুণ্য দেখাতে পারেনি বাংলাদেশ দল। দর্শক সংখ্যা ছিল হাজার দুই। তাদের মন ভরেনি। নিদেনপক্ষে ড্র করা উচিত ছিল মামুনুলদের। ম্যাচের শুরুতেই গোল পায় বাংলাদেশ। মাত্র চার মিনিটে অধিনায়ক মামুনুলের ফ্রিকিকে দর্শনীয় হেডে সিঙ্গাপুরের জালে বল পাঠান ডিফেন্ডার নাসির উদ্দিন (১-০)।
মিনিট সাতেক পর ব্যবধান বাড়ানোর সুযোগ পেয়েও কাজে লাগাতে পারেনি বাংলাদেশ। বক্সের বাইরে থেকে হেমন্তের গড়ানো শট আটকে দেন সিঙ্গাপুরের গোলকিপার আবদুল্লাহ সানি। সুযোগ পেয়েছিল সিঙ্গাপুরও। ডিফেন্ডার ইসা বিন নায়েনের চমৎকার ফ্রিকিক যখন নিশ্চিত গোলে পরিণত হচ্ছিল, ঠিক তখনই বাংলাদেশকে রক্ষা করেন গোলকিপার মাজহারুল ইসলাম হিমেল। দুর্দান্তভাবে ফিস্ট করে বল থামিয়ে দেন হিমেল। ২৪ মিনিটে মামুনুলের কর্নার থেকে সোহেল রানার শট সিঙ্গাপুরের গোলকিপার ক্লিয়ার করেন। তার মিনিট ছয়েক পর ম্যাচে ফেরে সিঙ্গাপুর। ডিফেন্ডার হাফিজ বিন আবু সাজিদের ক্রস থেকে ফরোয়ার্ড নাহিদ নওয়াজের হেড পোস্টে লেগে ফিরে আসে। ফিরতি বল ক্লিয়ার করতে পারেননি বাংলাদেশের ডিফেন্ডার ইয়ামিন মুন্না। আবারও বল পান নওয়াজ। জোরালো শটে মাজহারকে হার মানান এই ফরোয়ার্ড (১-১)। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই গোলের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল বাংলাদেশের।
৫১ মিনিটে মামুনুলের কর্নারে ডিফেন্ডার ইয়াসিন খানের হেড অল্পের জন্য নিশানা খুঁজে পায়নি। ৬৩ মিনিটে হেমন্তের শট গোলকিপার আবদুল্লাহ সানির তৎপরতায় জালে জড়ায়নি। এর মিনিট দশেক পর বাংলাদেশের কপালে হারের তিলক লেপ্টে দেয় সিঙ্গাপুর। কর্নার থেকে দর্শনীয় হেডে বাংলাদেশের জালে বল জড়িয়ে দেন সিঙ্গাপুরের ফরোয়ার্ড কামাল (২-১)। হেরেও আশিভাগ তৃপ্ত বাংলাদেশ দলের কোচ ডি ক্রুইফ। তার কথা, ‘আমার ছেলেরা যা খেলেছে, তাতে আমি খুশি। তারপরও খেলায় ভুলভ্রান্তি ছিল। আশা করছি, পরবর্তী ম্যাচে ছেলেরা তা কাটিয়ে ওঠতে পারবে।’ অন্যদিকে সিঙ্গাপুরের কোচ বলেন, ‘বিশ্বমানের পৌঁছাতে হলে সিঙ্গাপুর ও বাংলাদেশ দু’দলকেই অনেক পথ পারি দিতে হবে। বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক মামুনুল, জামাল ভূঁইয়ার খেলা আমার মনে দাগ কেটেছে।’

ঈদে তাহসান ও মেহজাবিনের প্রিয়তমেষু

সঙ্গীত জগতের জনপ্রিয় মুখ তাহসান গানের পাশাপাশি অভিনয়ে দর্শকের মন জয় করতে পেরেছেন খুব সহজেই। নিয়মিত অভিনয় না করলেও বিশেষ দিবসে তিনি নাটকে কাজ করেন। সম্প্রতি ঈদ উপলক্ষে ইমরাউল রাফাতের চিত্রনাট্য রচনা এবং পরিচালনায় নাটক প্রিয়তমেষু’তে তাকে অভিনয় করতে দেখা যাবে। এরইমধ্যে রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় নাটকটির দৃশ্যায়ন করা হয়েছে। নাটকটি প্রসঙ্গে তাহসান বলেন,
‘এ নাটকে আমাকে রাফি চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা যাবে। রাফি কখনও নিজের মুখে তার ভালোবাসার কথা বলতে পারে না। একসময় সে চিঠি দিয়ে তার ভালবাসার কথা জানানোর সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু রাফি পড়ালেখা না জানার কারণে অন্যকে দিয়ে চিঠি লেখানোর সিদ্ধান্ত নেয়। আর সেই চিঠিকে কেন্দ্র করে ঘটে নানা ঘটনা।’ নাটকে তার বিপরীতে জেবিন চরিত্রে অভিনয় করেছে মেহজাবিন। এতে অভিনয় প্রসঙ্গে মেহজাবিন বলেন, ‘এমনিতেই তাহসান ভাই আমার প্রিয় গায়কের তালিকায় রয়েছেন। তার সঙ্গে অভিনয় করতে পেরে বেশ ভালো লেগেছে। আশা করি দর্শকেরও ভালো লাগবে।’ ঈদ উপলক্ষে একটি বেসরকারি চ্যানেলে নাটকটি প্রচার হবে বলে নির্মাতা সূত্রে জানা যায়।

কল্পনা চাকমা অপহরণ- ১৯ বছর পর শুনানি by জোবাইদা নাসরীন

মাসটি জুড়েই নারীর ওপর নিপীড়নের খবর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি স্কুলের ঘটনার পর সর্বশেষ গারো মেয়েটির মাইক্রোবাসে গণধর্ষণ—কোনোটিই বিচ্ছিন্ন নয়। বরং সবই নারীর ওপর ধারাবাহিক নিপীড়নের চিত্র। বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং তদন্তে গড়িমসি, সময়ক্ষেপণ এ ধরনের নির্যাতনের অনুঘটকগুলোকে ধারালো করে। যার কারণে নিপীড়ন বন্ধ হওয়ার পরিবর্তে আরও বেশি শক্তি নিয়ে এগিয়ে চলে। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতির একটি বড় উদাহরণ কল্পনা চাকমা অপহরণ মামলা। ১৯ বছর ধরে চলছে এই মামলার কাজ। মামলার ২২তম শুনানি হবে আজ ২৭ মে।
কল্পনা চাকমা আমার বন্ধু ছিল। ছিল বললে ভুল হবে। কারণ, পার্বত্য চট্টগ্রাম মানেই আমার কাছে এখনো কল্পনা চাকমা। অপহরণের দিন পর্যন্ত কল্পনা চাকমা ছিলেন অবিভক্ত হিল উইমেন ফেডারেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক, পাহাড়ের প্রতিবাদী মুখ। বলার অপেক্ষা রাখে না কেন তাকে অপহৃত হতে হয়েছে। পাহাড়ে নির্যাতন আর আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়ছিল কল্পনা। ঘনিয়ে এল ১৯৯৬-এর সাধারণ নির্বাচন। কল্পনা জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে এসেছিল ইপিজেডে একটি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষা দিতে। অপহৃত হওয়ার সপ্তাহ খানেক আগে সেই সময়ে আমার সঙ্গে তার দেখা। ১১ জুন নির্বাচনের রাতেই কল্পনাকে অপহরণ করা হয় তার গ্রামের বাড়ি রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার নিউ লাল্যাঘোনা গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে। অপহরণের পরদিন কল্পনা চাকমার ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বড় ভাই কালিন্দী কুমার চাকমা বাদী হয়ে স্থানীয় থানায় একটি মামলা করেন। কল্পনার অপহরণ নিয়ে দেশের ভেতরে ও বাইরে তোলপাড় চলে। প্রতিবাদ ওঠে। সেই প্রতিবাদের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্মারক নং স্ব.ম.(রাজ-২) পার্বত্য ৩/৫ (অংশ) ৭/৯/৯৬ তারিখে দ্য কমিশন অব ইনকোয়ারি অ্যাক্ট ১৯৫৬-এর ৩ প্যারার ক্ষমতাবলে তিন সদস্যের তদন্ত কমিশন গঠন করে। এই কমিটি ১৯৯৮ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি রিপোর্ট পেশ করে। কিন্তু কোনো সরকারই এই রিপোর্ট প্রকাশ করেনি। ১৯৯৬ সাল থেকে এই পর্যন্ত ৩৫ জন কর্মকর্তার হাতে ঘুরেছে মামলা। নেওয়া হয়েছে ৯৪ জনের সাক্ষ্য।
মামলা দায়ের করার ১৪ বছর পর ২০১০ সালের ২১ মে মামলাটির প্রথম চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। ১৪ বছর তদন্তাধীন থাকার পর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে আসামিদের ‘অজ্ঞাতনামা’ উল্লেখ করে প্রতিবেদন পেশ করা হয়। বাদী ওই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে নারাজি দিলে পরবর্তী সময়ে অধিকতর তদন্তের জন্য আদালত মামলাটি সিআইডির কাছে হস্তান্তর করেন। সিআইডি দুই বছর সময় নিয়ে অবশেষে ২০১২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করে। এই রিপোর্টের ভিত্তিতে গত ১৩ জানুয়ারি ২০১৩ রাঙামাটি মুখ্য হাকিম আদালতে মামলাটির প্রথম দফা শুনানি হয় এবং ১৬ জানুয়ারি আদালত অধিকতর তদন্তের জন্য রাঙামাটি জেলা এসপিকে আদেশ দেন। সেই নতুন তদন্তের পরিপ্রেক্ষিতেই অনুষ্ঠেয় শুনানি। এই মামলার সর্বশেষ তদন্ত করেছেন রাঙামাটিতে দায়িত্বে থাকা সাবেক এসপি আমেনা বেগম। এখন তিনি আবার বদলি হয়ে গেছেন। নিয়মমাফিক নতুন তদন্ত কর্মকর্তা আসবেন। আবারও আবেদন পড়বে নতুন তদন্তের। আর এভাবেই ফাইলের ফিতা খোলা হবে, বন্ধ করা হবে।
কিন্তু মামলার সুরাহা হবে না। বরং নতুন মামলাটি চালিয়ে নিচ্ছেন যাঁরা, তাঁরা বলছেন, ভিকটিমকে না পেলে তদন্ত শেষ করতে পারবেন না বলে জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা। ফলে এখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে পুরো তদন্ত প্রক্রিয়াই। গত বছরের জুনে আদালতে জমা দেওয়া এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘মামলার ঘটনাটি যেহেতু দেড় যুগ আগের, ১৮ বছরে ভিকটিমের চেহারার পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। যেহেতু এই মামলার মূল সাক্ষী ভিকটিম কল্পনা নিজেই, তাই ওই কল্পনা উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত কিংবা তার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না পাওয়া পর্যন্ত মামলার তদন্ত শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে মামলার ভিকটিম কল্পনা চাকমাকে উদ্ধারের জোর তৎপরতা অব্যাহত আছে।’ (সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন, ২৫ মে ২০১৫) কল্পনাকে খুঁজে পাওয়ার জন্য যে মামলা, অপহরণের বিচারের জন্য যে মামলা, সেই মামলায় এখন কল্পনাই একমাত্র সাক্ষী? তার সাক্ষ্যই একমাত্র অবলম্বন?
যেকোনো অপরাধের ঘটনা তদন্তে প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্যকেই সবচেয়ে গুরুত্ব দেওয়ার কথা। অথচ তদন্ত কমিটি আশ্চর্যজনকভাবে প্রত্যক্ষদর্শী কালিন্দকুমার ও লালবিহারী চাকমার সাক্ষ্যকে গুরুত্ব দেয়নি। বরং খারিজ করা হয়েছে নানা ছুতায়। লালবিহারী চাকমা (তদন্ত রিপোর্টের ২ নম্বর সাক্ষী) স্পষ্টভাবেই অপহরণকারীদের মধ্যে তিনজনকে চিনতে পেরেছিলেন এবং তাদের সঙ্গে থাকা জিনিসপত্রের বিবরণ দিয়েছিলেন। কল্পনার ভাইদের অভিযোগ, মামলার আলামত নষ্ট করা হয়েছে অপহরণকারীদের অব্যাহতি দেওয়ার জন্য। কিন্তু পুলিশের এফআইআরে এই চিনতে পারা অপরাধীদের নাম না লিখে ‘অজ্ঞাত’ লেখা হয়।
বর্তমানে কল্পনা চাকমা অপহরণ মামলাটি রাঙামাটি জেলা পুলিশ সুপারের অধীনে পুনঃ তদন্তাধীন। গত মে মাসে মামলার প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করার কথা থাকলেও তদন্ত কর্মকর্তা তা দিতে সমর্থ হননি। বরং তিনি এ মামলার তদন্তভার থেকে অব্যাহতি চেয়ে মামলাটি আবারও সিআইডির কাছে হস্তান্তরের জন্য আবেদন করেছেন। তদন্ত কমিশন, পুলিশ, সিআইডি—ফাইল ঘুরছে, ঘুরবে…তারপর?
আমরা চাই ধর্ষণের শিকার গারো নারীটি বিচার পাক। আজ থেকে ২০ বছর আগে ঢাকায় ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন আরেক গারো নারী মারিয়া মারাক। বিচার হয়নি সেটিরও। গিদিতা রেমাকেও আমরা ভুলিনি। মরিয়ম মুর্মুকে ধর্ষণ করেই ক্ষান্ত ছিল না ওরা। গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখেছিল তাঁর লাশ। একাত্তরের তিন লাখ নারী ধর্ষণকে আমরা এখনো সবচেয়ে কষ্টের জায়গা হিসেবে মনে করি এবং ‘হায়েনা’দের নির্যাতন হিসেবে চিহ্নিত করি। কিন্তু স্বাধীন দেশেই প্রতিদিনই যৌন হয়রানি, ধর্ষণ ঘটছে। সেখানে ১৯ বছর পর অপহরণের শিকার পাহাড়ি যোদ্ধা কল্পনার তদন্তকারী কর্মকর্তা বলছেন, এই মামলার ভিকটিম কল্পনা নিজেই, তাই তাকেই সাক্ষ্য দিতে হবে। তাই মনে হয়, ‘তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ, আমি আজ চোর বটে।’
জোবাইদা নাসরীন: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
zobaidanasreen@gmail.com

কৃষি খাতে ভর্তুকি কমানোর প্রবণতা বন্ধ হোক -সাক্ষাৎকারে : মাহবুব হোসেন by মশিউল আলম

মাহবুব হোসেন ১৯৬৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি বিষয়ে স্নাতক, ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৭০ সালে পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (এখনকার বিআইডিএসের পূর্বসূরি) স্টাফ অর্থনীতিবিদ হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৭৭ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি। ১৯৮৮ সালে বিআইডিএসের মহাপরিচালক হন। ১৯৯২ সালে ফিলিপাইনে আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে ব্র্যাকের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
. সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মশিউল আলম
প্রথম আলো . এবার ধানের ফলন খুব ভালো হয়েছে। দেখা যায়, যখন যে ফসলের ফলন ভালো হয়, কৃষকেরা তার দাম কম পান, তাঁদের খুব ক্ষতি হয়। আবার দেশে চালের দাম কম থাকুক, এটাও মানুষ চায়। এবারও সে রকম পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। এই সমস্যার সমাধান কী?
মাহবুব হোসেন . কৃষিপণ্যের চাহিদা সব সময় মোটের ওপর স্থির থাকে, শুধু জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে কিছু চাহিদা বাড়ে। সারা বছর চাহিদা মোটামুটি একই রকম থাকে; শুধু রোজার মাসে কিছু পণ্যের চাহিদা বাড়ে, তা ছাড়া সারা বছর চাহিদা একই রকম থাকে। এই অবস্থায় কৃষিপণ্যের জোগান যদি হঠাৎ করে বেড়ে যায়, তাহলে তার দামের ওপর একটা প্রভাব অবশ্যই পড়ে। এটা শুধু অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির ক্ষেত্রে ঘটে, এখন এর সঙ্গে আরেকটা বড় ফ্যাক্টর যোগ হয়েছে, সেটা হলো বৈশ্বিক অর্থনীতি। আমরা চাই বা না চাই, বিশ্ববাজারের একটা প্রভাব বাংলাদেশের বাজারের ওপর পড়ে।
প্রথম আলো . দেশের ভেতরেই ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে, তার ওপর ভারত থেকে চাল আমদানি করার কারণ কী?
মাহবুব হোসেন . কারণ হলো, আন্তর্জাতিক বাজারে হঠাৎ করে চালের দাম কমে গেছে। অনেকটা থাইল্যান্ডের কারণে এটা ঘটেছে। সে দেশের সরকার চাষির কাছ থেকে বেশি দামে চাল কিনে সংরক্ষণ করে পরে বিক্রি করত। এটা করতে গিয়ে থাইল্যান্ড সংকটে পড়ে গেছে এবং এ কারণে এর আগের সরকারের পতন ঘটেছে। তারপর তারা এই নীতি ত্যাগ করার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদার তুলনায় চালের জোগান বেড়ে গেছে। তার ফলে গত এক বছরে চালের দাম টনপ্রতি ৫০ থেকে ১০০ মার্কিন ডলার কমে গেছে। ভারতের চালের বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা দেখছেন, বিশ্ববাজার থেকে চাল আমদানি করে দেশের বাজারে বিক্রি করলে তাঁদের বেশ লাভ হয়। আমাদের দেশে যথেষ্ট পরিমাণ চাল আছে কি না, এটা কিন্তু ব্যবসায়ীদের বিবেচনায় নেই।
প্রথম আলো . এই সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে সরকারের কিছু করণীয় নেই?
মাহবুব হোসেন . অবশ্যই আছে এবং আমরা সেটা বলেছিও। সেটা হলো, চালের ওপর আমদানি শুল্ক আরোপ করা। দেরিতে হলেও সরকার আমাদের এ পরামর্শ গ্রহণ করেছে। এ ছাড়া যে বছর ধানের জোগান বাড়ে, সে বছর অতিরিক্ত ধান সরকারি উদ্যোগে কম দামে কিনে রাখা এবং যে বছর ধানের ঘাটতি কম হয় এবং দাম বাড়ে, সে বছর ওই সংরক্ষিত ধান বাজারে ছাড়া। কম দামে কিনে বেশি দামে বিক্রি করলে সরকারের অপারেশনাল ব্যয়টা সেখান থেকেই উঠে আসে, অতিরিক্ত সরকারি বরাদ্দের প্রয়োজন হয় না। এটা অনেক বছর ধরেই চলছে, কিন্তু সরকার এই খাতে পর্যাপ্ত অর্থের জোগান দেয় না এবং যে পরিমাণ ধান সংগ্রহ করা দরকার, সে পরিমাণ সংগ্রহ করে না। অর্থের জোগান ও সংগ্রহ বাড়ানো প্রয়োজন।
প্রথম আলো . বাংলাদেশের কৃষিতে ধানের প্রাধান্য খুব বেশি, ফসলবৈচিত্র্য কম। ফসলবৈচিত্র্য বেশি হলে কি কৃষকদের ক্ষতির ঝুঁকি কমতে পারত না?
মাহবুব হোসেন . ফসলবৈচিত্র্য কিছু আছে। সাম্প্রতিক সময়ে ভুট্টার চাষ বেশ বাড়ছে, শাকসবজির চাষও বেড়েছে। আগের তুলনায় শহরাঞ্চলের বাজারে শাকসবজির বৈচিত্র্য ও পরিমাণ অনেক বেশি বেড়েছে। কিন্তু ধান চাষের জন্য যে বিপুল পরিমাণ জমি ব্যবহার করা হয়, সেটা আমাদের মোট জমির প্রায় ৭৫ শতাংশ। শাকসবজি চাষের জন্য ব্যবহৃত হয় মাত্র ১ শতাংশ জমি। এখন ধান থেকে যদি ১ শতাংশ জমিও সরানো হয়, তাহলে শাকসবজির উৎপাদন দ্বিগুণ হয়ে যাবে এবং এটার একটা প্রভাব বাজারে পড়বে।
প্রথম আলো . শহরের বাসিন্দাদের যে দামে শাকসবজি কিনতে হয়, সে দাম তো কৃষকেরা পান না। এটাও তো একটা বড় সমস্যা।
মাহবুব হোসেন . এর একটা বড় কারণ পরিবহন খরচ। গ্রামের সঙ্গে শহরের যোগাযোগব্যবস্থা বেড়েছে এবং উন্নত হয়েছে। এর ফলে পরিবহন খরচ কমে যাওয়ার কথা, কিন্তু সেটা হচ্ছে না। তার অন্যান্য কারণও আছে: একটা হলো জ্বালানি তেলের দাম বেশি, এ ছাড়া আছে জায়গায় জায়গায় চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক অস্থিরতা ইত্যাদি। এসবের ফলে খরচটা বেড়ে যায় এবং সেই খরচ ব্যবসায়ীরা সংগ্রহ করেন উৎপাদক ও ভোক্তাদের কাছ থেকে। আরেকটা ফ্যাক্টর হলো খুব বেশি লোক কৃষিপণ্যের ব্যবসায় নিয়োজিত থাকা। যে পরিমাণ ব্যবসা একজন লোক করতে পারেন, গ্রামে সেই পরিমাণ ব্যবসা ১০-১২ জন লোক করছেন এবং এটার একটা কারণ হলো যে লোকজনের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নেই। তিনি অন্য কিছু করতে পারছেন না, তাই ৫ হাজার, ১০ হাজার টাকা নিয়ে ছোটখাটো ব্যবসায় নেমে পড়লেন। তাঁকে তো তাঁর সংসারের খরচটা জোগাড় করতে হবে। তার ফলে শাকসবজির দামের মার্জিনটা খুব বেশি হয়। তবে এই ক্ষেত্রে একটা ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। গ্রামের মানুষ শহরমুখী হচ্ছেন, ফলে গ্রামে ছোট ব্যবসায়ীর সংখ্যা আস্তে আস্তে কমছে। এটা কমলে সবজিচাষি ও ভোক্তা পর্যায়ে সবজির দামের যে বিরাট পার্থক্য, সেটাও কমবে।
প্রথম আলো . কৃষিকাজ ও কৃষিপণ্য পরিবহনের সঙ্গে জ্বালানি তেলের দামের সম্পর্ক নিবিড়। বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমে গেছে। কিন্তু আমাদের দেশে কমানো হয়নি। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?
মাহবুব হোসেন . বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের বিপণন হয় সরকারের নির্ধারিত মূল্যে। এটা যদি মুক্তবাজারে ছেড়ে দেওয়া হতো তাহলে বিশ্ববাজারে তেলের দামের ওঠানামার সঙ্গে সঙ্গে এই দেশের বাজারেও তেলের দাম বাড়ত এবং কমত। কৃষি উন্নয়নের নীতি হিসেবেই তেলের মতো সার ও অন্যান্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপকরণের দাম নির্ধারিত করে দেওয়া হয়। সরকার হয়তো ডিজেলের ক্ষেত্রে একসময় ভর্তুকি দিয়েছে, এখন বিশ্ববাজারে দাম কমে যাওয়ায় সরকারও ডিজেলের দাম কমাতে পারে। কিন্তু তা করছে না, তারা হয়তো ভাবছে আগে যে ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে এখন তা তুলে নেওয়া যাবে। কিন্তু এই ক্ষেত্রে দেখতে হবে, সরকারের নির্ধারিত দাম যে বিশ্ববাজারের তুলনায় অনেক বেশি না হয়ে যায়, তাহলে সেটা হবে কৃষকের জন্য শোষণমূলক।
প্রথম আলো . আমরা এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ, কিন্তু জনসংখ্যা বাড়ছে ১ দশমিক ২ শতাংশ হারে, প্রতিবছর গড়ে ১৮ লাখ। এই হারে জনসংখ্যা বাড়লে আমরা কি একটা সময় খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ থাকতে পারব?
মাহবুব হোসেন . আমাদের কৃষি উন্নয়ন হয়েছে প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে। ২০-৩০ বছর আগে আমরা যখন মান্ধাতার আমলের ধান চাষ করতাম, তখন এক বিঘাতে আট মণ ধান পেতাম এবং বছরে হয়তো একটাই ধান হতো। কারণ, ধান চাষ ছিল বৃষ্টিনির্ভর। এখন আমরা এক বিঘাতে বোরো ধান পাই ২০-২২ মণ, আমন পাই ১৫-১৬ মণ। সারা বছরে দুইটা ধান করে পাওয়া যাচ্ছে ৩৮ থেকে ৪০ মণ ধান, আগে যেখানে পাওয়া যেত মাত্র আট মণ। এভাবেই অতিরিক্ত জনসংখ্যার খাদ্যচাহিদা মেটানো গেছে। আপনার প্রশ্ন অনুযায়ী, এই প্রক্রিয়াটা আর কত দূর টানা যায়? খুব বেশি দূর টানা যাবে না, এর একটা সীমা আছে এবং সেই সীমায় গিয়ে এটা থেমে যাবে। আমাদের দেশে যেসব জমি সেচের আওতায় আছে, সেগুলোতে এই প্রক্রিয়া শেষ সীমার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। এখন আমন আর আউশের ক্ষেত্রে কিছু করার আছে, অবশ্য কিছু কিছু প্রযুক্তি ইতিমধ্যে উদ্ভাবিত হয়েছে, কিন্তু সেগুলোর সম্প্রসারণ ঘটেনি। সম্প্রসারণ করা গেলে আমন ও আউশের উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব। এখন আমাদের নজর দিতে হবে সারা বছরে উৎপাদন বাড়ানোর দিকে।
প্রথম আলো . সামনে আগামী অর্থবছরের জাতীয় বাজেট ঘোষণা করা হবে। দেখা যায় প্রাক্-বাজেট আলোচনায় নানা খাতের, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষেরা নিজেদের দাবি-দাওয়া তুলে ধরে। কিন্তু কৃষকদের পক্ষ থেকে কোনো দাবি-দাওয়া ওঠে না। আপনি কৃষি খাতের তরফ থেকে আগামী জাতীয় বাজেটের জন্য কী পরামর্শ দেবেন?
মাহবুব হোসেন . আমাদের দেশে এখন প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ কৃষক আছেন, তাঁরা প্রান্তিক কৃষক। অন্যান্য খাতের মানুষের মতো তাঁরা সংগঠিত নন বলে তাঁদের কণ্ঠস্বর শোনা যায় না। আমরা লক্ষ করি, বাজেট বক্তৃতায় সব সময়ই বলা হয় যে কৃষি আমাদের অগ্রাধিকারের খাত। কিন্তু আমরা যখন বাজেটে অর্থ বরাদ্দ দেখি, তখন দেখা যায়, বছরে বছরে কৃষির ভাগটা আস্তে আস্তে কমে যাচ্ছে। এই সরকারের আমলেই গত পাঁচ বছরে জাতীয় বাজেটে কৃষির ভাগ ১১ শতাংশ থেকে ৭-৮ শতাংশে নেমে এসেছে। প্রথমেই এ প্রবণতা বন্ধ করা দরকার। আরেকটা হলো, কৃষি বলতে মূলত শস্য খাতকে বোঝানো হচ্ছে। কিন্তু কৃষিতে মৎস্য খাত, পশুপালন খাতও গুরুত্বপূর্ণ। এই দুই খাতের ওপর জোর দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। এ বছর সরকারকে সারে ভর্তুকি কম দিতে হবে, কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম কমে গেছে। এখানে যে অর্থ বাঁচবে তা মৎস্য ও পশুপালন খাতে ব্যবহার করা যেতে পারে। শস্য খাতে গবেষণায় আরও অনেক কিছু করার আছে। এ জন্য অর্থ প্রয়োজন। আর মৎস্য ও পশুপালন খাতে রোগবালাই নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; এদিকেও বেশি নজর দিতে হবে, এ জন্য অর্থ বরাদ্দ বাড়াতে হবে।
প্রথম আলো . আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
মাহবুব হোসেন . আপনাকেও ধন্যবাদ।

খাদ্যের অধিকার প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগ গ্রহণের তাগিদ

দক্ষিণ এশিয়া খাদ্য অধিকার সম্মেলনে উপস্থিত প্রধানমন্ত্রী
শেখ হাসিনা ও শান্তিতে নোবেল বিজয়ী কৈলাশ সত্যার্থী
দারিদ্র্য দূরীকরণে আঞ্চলিক উদ্যোগ গ্রহণের এবং খাদ্যের অধিকার প্রতিষ্ঠায় গতিশীল আন্দোলন গড়ে তোলার তাগিদ দিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শান্তিতে নোবেল বিজয়ী কৈলাশ সত্যার্থী।
রাজধানীর খামারবাড়িতে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে গতকাল শনিবার তিন দিনব্যাপী দক্ষিণ এশিয়া খাদ্য অধিকার সম্মেলনে তাঁরা এ তাগিদ দেন। খবর বাসসের।
অ্যান্টি-পোভার্টি প্ল্যাটফর্ম (এপিপি) নামের একটি সংগঠন এ সম্মেলন আয়োজন করে। দারিদ্র্য দূরীকরণ কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত ৪৩টি সরকারি, বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার ফোরাম হলো এপিপি।
সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর সরকার খাদ্য ও কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির বিষয়ে আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এবং সব মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি নিশ্চিত করতে সচেষ্ট থাকবে।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী দারিদ্র্য ও ক্ষুধা দূর করতে আঞ্চলিক উদ্যোগ গ্রহণ এবং অনতিবিলম্বে সার্ক খাদ্যব্যাংক প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক ভয়াবহ ভূমিকম্প আঞ্চলিক খাদ্যনিরাপত্তা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়া থেকে দারিদ্র্য ও ক্ষুধা দূরীকরণে সম্মিলিত উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ার একজন মানুষকেও যেন খাদ্যের অভাবে প্রাণ হারাতে না হয়, সে জন্য সার্ক খাদ্যব্যাংক হোক বিপদের বন্ধু।’ শস্যবীজের ক্ষেত্রে এ অঞ্চলের কৃষকদের অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে সার্ক বীজব্যাংক স্থাপনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্যও তিনি সবার প্রতি আহ্বান জানান।
সম্মেলনে সম্মানিত অতিথি ছিলেন শান্তিতে নোবেল বিজয়ী কৈলাশ সত্যার্থী। অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে লাখ লাখ শিশুকে ক্ষুধার্ত রেখে বিচ্ছিন্নভাবে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। খাদ্যনিরাপত্তা, শিক্ষা ও উন্নয়নের জন্য সব উদ্যোগ হাতে হাত রেখে চালিয়ে যেতে হবে। দক্ষিণ এশিয়ার জনগণকে তাদের খাদ্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য একটি গতিশীল আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন আয়োজক কমিটির সভাপতি কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ। খাদ্যমন্ত্রী মো. কামরুল ইসলাম ছিলেন বিশেষ অতিথি। বক্তব্য দেন সম্মেলন আয়োজক কমিটির কো-চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক।

ডিজিটাল যুগের নব্য দাসত্ব by আতাউর রহমান

আমেরিকান কৃষ্ণাঙ্গ লেখক আলেক্স হেলির বিখ্যাত উপন্যাস রুট্স যাঁরা পড়েছেন কিংবা ওই টিভি সিরিয়ালটি দেখেছেন, সর্বাগ্রে তাঁদের স্মৃতির খুঁটিকে একটু প্রবলভাবে নাড়া দিতে চাই। মিস্টার হেলির সপ্তম পূর্বপুরুষ কুন্তা কিন্তে বিন ওমর ছিলেন আফ্রিকার গাম্বিয়া রাজ্যের জ্যুফুর গ্রামের একজন গর্বিত নাগরিক। তিনি যখন ১৭ বছর বয়সের টগবগে তরুণ, তখন একদিন জঙ্গলে কাঠ কাটতে গিয়ে শ্বেতাঙ্গ ‘স্লেইভ-ক্যাচার’ তথা দাস-ধরা এবং ওদের স্থানীয় দোসরদের খপ্পরে পড়ে যান। ওরা তাঁর চিৎকার-চেঁচামেচি উপেক্ষা করে তাঁকে লোহার শিকল পরিয়ে আরও অনেকের সঙ্গে জাহাজে করে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দেয়, সময় লাগে মোট আড়াই মাস। ওই সময়টায় জাহাজে তাদের ওপর অমানুষিক অত্যাচার করা হয়।
জাহাজটি যখন উত্তর আমেরিকার অ্যানোপলিস বন্দরে ভেড়ে, তখন জাহাজের ১৪০ জন দাসের মধ্যে কুন্তা কিন্তেসহ ৯৮ জনকে জীবিত পাওয়া যায়, অবশিষ্ট ৪২ জনের পথেই সলিল সমাধি ঘটে। অতঃপর জীবিত ব্যক্তিদের জীবজন্তুর মতো নিলামে চড়ালে জনৈক শ্বেতাঙ্গ সাহেব তাঁর প্ল্যান্টেশন কাজ করার জন্য কুন্তাকে কিনে নেন। বারাক হোসেন ওবামা স্বেচ্ছায় খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করে বারাক ওবামা হয়েছেন, আর কুন্তাকে গায়ের জোরে খ্রিষ্টান বানিয়ে নাম দেওয়া হয়েছিল টবি। কিন্তু তিনি এই নতুন নামকরণ ও দাসত্ব—কোনোটাই মেনে নিতে পারেননি; তাই বারবার পালানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হচ্ছিলেন। চতুর্থবার ধরা পড়ার সময় তাঁর পায়ের পাতার অর্ধেক কেটে ফেলে তাঁকে নিরস্ত করা গিয়েছিল। মি. হেলি প্রায় ২০০ বছর পর শিকড়ের সন্ধানে জ্যুফুর গ্রামে উপস্থিত হলে তাঁর পরিচয় পেয়ে সেই গ্রামের আবালবৃদ্ধবনিতা যখন তাঁকে ‘মিস্টার কিনতে’ বলে সম্বোধন করতে লাগল, তখনকার মনোভাব হেলি ব্যক্ত করেছেন এভাবে: ‘আমার মনে হলো যেন ইতিহাসে মানুষ-ভাইদের বিরুদ্ধে মানুষের অবিশ্বাস্য নৃশংসতা, যেটা বোধ করি মানব জাতির সবচেয়ে বড় বিচ্যুতি, সেটার জন্য আমি বিলাপ করে কাঁদছিলাম।’
কুন্তার দাসত্ব শুরুর সাল ছিল ১৭৬৭; আর এটা ২০১৫ সাল, ডিজিটাল যুগ। পেছনে ফেলে আসা আড়াই শ বছরে মিসিসিপি-মিসৌরি আর পদ্মা-যমুনা দিয়ে কত সহস্র কোটি কিউসেক পানি প্রবাহিত হয়েছে; মহাত্মা আব্রাহাম লিংকন ১৮৬৭ সালে আমেরিকায় দাস প্রথার বিলোপও সাধন করেছেন, যে কারণে কুন্তার উত্তরসূরিরা স্বাধীন ও সুশিক্ষিত হতে পেরেছে। দাসত্ব প্রথা আজ পৃথিবী থেকে বিলুপ্তপ্রায়; কিন্তু কিছু লোভাতুর অমানুষের কারণে আজও সেটা নব্যরূপে বিদ্যমান। পত্রিকার প্রতিবেদনে প্রকাশ, থাইল্যান্ডের সংখলা প্রদেশের সাদাও উপকূল হচ্ছে ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ তথা সৃষ্টির সেরা জীব মানুষের বেচাকেনার হাট। সমুদ্রপথে ট্রলারে করে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার থেকে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে যাওয়া লোকদের জঙ্গলে জিম্মি করে দালালরা মুক্তিপণ আদায় করে এবং যাদের বেলায় মুক্তিপণ আদায় করা সম্ভব হয় না, তাদের হয় বিক্রি করে দেয় নতুবা মেরে ফেলে। অনুজার নামের জীবিত উদ্ধার এক বাংলাদেশি যুবক বলেছেন, তাঁকে নাকি কক্সবাজার থেকে অপহরণ করা হয়েছে, ঠিক যেমন কুন্তা কিন্তেকে তাঁর গ্রাম থেকে অপহরণ করা হয়েছিল। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয়েই থাকে এবং ইতিহাস প্রায়ই বড় নির্মম।
প্রসঙ্গত মনে পড়ে গেল, আমি সৌদি আরবের রিয়াদের বাংলাদেশ দূতাবাসে লেবার কাউন্সিলর পদে কর্মরত থাকাকালে এক মধ্যবয়সী নারী আমার কাছে ঘটনাচক্রে এলেন, যাঁর দেশের বাড়ি ফরিদপুর জেলায়। তিনি বাংলাদেশে প্রথম সৌদি রাষ্ট্রদূত কর্তৃক গৃহকর্মী হিসেবে সে দেশে নীত হন এবং ওই সময়ে রাষ্ট্রদূতের মেয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দেড় দশক যাবৎ তিনি দেশের খবরাখবর পান না, দেশে যেতেও পারেন না। দেশে তাঁর দুই ভাই আছেন, যাঁদের কেবল ডাকনাম তিনি জানেন। তবে নিকটতম শাখা ডাকঘরটির নাম তাঁর জানা থাকায় আমি ক্লু পেয়ে গেলাম। সরাসরি পোস্টমাস্টারের কাছে চিঠি লিখলাম, ভাইদের খুঁজে বের করে বোনের উদ্দেশে লেখা তাঁদের চিঠি আমার কাছে পাঠাতে। ১৫ দিনের মধ্যেই ঈপ্সিত ফল পাওয়া গেল। ওই নারীকে দূতাবাসে ডেকে এনে আমি যখন তাঁর ভাইয়ের দীর্ঘ চিঠি পড়ে শোনাচ্ছিলাম, তখন পুঁথির ভাষায়, তাঁর ‘কপোল বহিয়া যায় নয়নের জলে’। সে দৃশ্য আমি আজও ভুলতে পারিনি এবং বলাই বাহুল্য, আমি ডাক বিভাগের ওপরতলার কর্মকর্তা ছিলাম বলেই এটা সম্ভব হয়েছে। সৌদিরা ফিলিপাইন আর নেপাল থেকে ইদানীং নারী গৃহকর্মী না পেয়ে আমাদের দিকে হাত বাড়িয়েছে এবং আমরাও সম্মতি জ্ঞাপন করেছি। ভবিষ্যতে কত ধরনের মানবিক ঘটনার উদ্ভব হবে, কে জানে!
যাকগে। ফিরে আসি রুট্স-এ। কুন্তাকে শৈশবে তাঁর দাদি আয়িশা একটা মজার গল্প শুনিয়েছিলেন: একটি বাচ্চা ছেলে একদিন নদীর পাড় দিয়ে হাঁটতে গিয়ে দেখতে পেল যে এক কুমির শিকারিদের পাতা জালে আটকা পড়েছে। কুমির তাকে সাহায্যের আবেদন জানালে সে কাছে যেতেই কুমিরটা খপ্ করে দাঁতের ফাঁকে তাকে আটকে দিল। ‘তুমি কি এভাবে ভালোকে মন্দ দিয়ে প্রতিদান দিতে চাও?’ ছেলেটি এই প্রশ্ন করতেই কুমির জবাব দিল, ‘অবশ্যই, এটাই তো সংসারের নিয়ম।’ ছেলে এটা মানতে রাজি না হওয়ায় কুমির ওই পথ দিয়ে গমনরত প্রথম তিনজন সাক্ষীর মতামত না নিয়ে তাকে খাবে না বলে আশ্বস্ত করল। প্রথমেই এল এক বুড়ো গর্দভ। গর্দভ ছেলেটার মুখে সবটা শুনে শুধু বলল, ‘আমি বুড়ো হয়ে গেছি এবং কাজ করতে পারি না বলে আমার মালিক আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছে, যাতে আমি চিতাবাঘের পেটে যাই।’ অতঃপর এল এক বুড়ো ঘোড়া। সেও একই কথা বলল। ‘দেখলে তো?’ কুমির ছেলেটিকে বলল। এই সময়ে এগিয়ে এল এক স্পষ্টভাষী খরগোশ। সে সবটা শুনে বলল, ‘বেশ তো, আমি প্রথম থেকে ব্যাপারটা যেভাবে ঘটেছে সেটা না দেখে মতামত দিতে পারব না।’ কুমির তাতে অখুশি হয়ে সজোরে প্রতিবাদ করার জন্য যেই না মুখ খুলেছে, অমনই ছেলেটি লাফ দিয়ে ডাঙায় উঠে এল।
শৈশবে আমি দাদিকে পাইনি, তবে আমার মা অনুরূপ একটি মজার গল্প বলেছিলেন, যেটা চূড়ান্ত বিশ্লেষণে প্রমাণ করে যে পৃথিবীতে আমরা সবাই আদম ও হাওয়ারই সন্তান:
ব্রাহ্মণ ঠাকুর সকালে জঙ্গলে ঢুকেই দেখতে পেলেন এক বাঘ। শিকারিদের পাতা ফাঁদে আবদ্ধ। বাঘ তাকে মুক্ত করার জন্য মিনতি জানালে ব্রাহ্মণ দয়াপরবশ হয়ে বাঘকে মুক্ত করে দিতেই সে ব্রাহ্মণকে দিয়ে সকালের নাশতা সারতে চাইল এবং যুক্তি দেখাল, ‘তোমাদের মনুষ্য সমাজে এটাই তো নিয়ম, তোমরা উপকারীর অপকার করে উপকারের শোধ দাও।’ ব্রাহ্মণ এটা মানতে রাজি না হওয়ায় তিনজন সালিসের রায় নেওয়ার মতৈক্যে পৌঁছা গেল। তো প্রথমে যাওয়া হলো এক বিরাট বৃক্ষের কাছে। বৃক্ষ সবটা শুনে বলল, ‘আমি মানুষকে ছায়া দিই, ফল-ফসল দিই, অথচ তোমরা আমার বুকের ভেতর দিয়ে করাত চালাও। বাঘ তোমাকে খাবে।’ এরপর এক গাভির কাছে গেলে গাভিও বলল, ‘আমি মানুষকে দুধ দিই, বাছুর দিই, সেই বাছুর বড় হয়ে হালচাষে সাহায্য করে। অথচ তোমরা আমাকে শান্তিতে মরতেও দাও না, একটু বয়স হলেই গলায় চাকু চালাও। বাঘের কথাই সঠিক।’
অতঃপর তৃতীয় সালিসের মতামতের আর তেমন প্রয়োজনই ছিল না। কিন্তু ব্রাহ্মণ মরিয়া হয়ে এক শিয়ালের কাছে যেতেই শিয়াল সবটা শুনে বলল, ‘আমি সরেজমিনে সবকিছু প্রত্যক্ষ না করে কিছু বলতে পারব না। যে যে অবস্থানে ছিলে সেখানে ফিরে যেতে হবে, তারপর আমি বুঝে-শুনে রায় দেব।’ বাঘ রাজি হয়ে ফাঁদের ভেতর ঢুকতেই শিয়াল ব্রাহ্মণকে পালিয়ে যেতে ইশারা করল। এভাবে বুঁদিয়াল বুদ্ধি প্রয়োগে বোকা মানুষটিকে বাঁচিয়ে দিল।
আতাউর রহমান: রম্য লেখক৷ ডাক বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক৷

নারী লাঞ্ছনা- আমরা তোমার পাশে আছি by সঞ্জীব দ্রং

ঘরে-বাইরে কোথাও নারী নিরাপদ নয়। একের পর এক নারী নিগ্রহের ঘটনা ঘটলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অপরাধীদের ধরতে পারছে না। অনেক ক্ষেত্রে তাদের দ্বারাও নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। এই প্রেক্ষাপটে নারী নিগ্রহ নিয়ে লিখেছেন আদিবাসী নেতা সঞ্জীব দ্রং
আমি আক্রান্ত গারো আদিবাসী মেয়েকে হাসপাতালে দেখতে গেলাম। হাসপাতালে অনেক আত্মীয়স্বজন এসেছেন। মেয়েটিকে যেখানে রাখা হয়েছে, বলা হলো ওখানে সবার প্রবেশাধিকার নেই। পুরুষের প্রবেশাধিকার তো নেই-ই। তবু দেখলাম দু-একজন বের হলেন। আমি পুলিশ ভাইকে বিনীতভাবে বললাম, মেয়েটি আমার আত্মীয়, স্বজন আমাদের সবার। বললাম, মেয়েটির বড় বোনও আছে আমার সঙ্গে। আমরা তাকে একটু দেখতে চাই। একটু সহানুভূতি জানানো, একটু সাহস দেওয়া প্রয়োজন। পুলিশ ভাইটি ভালো আচরণ করলেন এবং অনুমতি দিলেন। মেয়েটিকে বারান্দায় নিয়ে আসা হলো। অনেকক্ষণ পরে সম্ভবত দুই বোনের দেখা হলো। আবেগময় ওরা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে ছিল। যাতে এখনই ওরা কেঁদে না ফেলে, তার জন্য আমাদের মান্দি ভাষায় ওদের বোঝালাম। আক্রান্ত (ধর্ষিতা শব্দটি ব্যবহার করতে চাই না। গারো ভাষায় ‘ধর্ষণ’ শব্দের প্রতিশব্দ নেই) মেয়েটির পাশে দাঁড়িয়ে তাকে বললাম—শোনো, সব ঠিক আছে, কিছুই হয়নি তোমার। তোমার বোনেরা আছে, মা আছেন গ্রামে, বাড়ির পাশে অবারিত সবুজ বন, যাদের ফেলে শহরে এসেছিলে, সবাই আছে। মেয়েটিকে বললাম, আমি তো তোমাদের গ্রামে গিয়েছি। অনেক সুন্দর গ্রাম। গ্রামের পাশে অনেক বড় বিল আছে। সারি সারি আনারসের বাগান। বললাম, সব ঠিক আছে। মান্দি ভাষায় বললাম, তোমার কিছুই হারায়নি, আমরা আছি। মেয়েটি থরথর করে কাঁপছিল। ভয় পেলাম যদি পড়ে যায়! বড় বোন ওর হাত ধরল। বললাম, তোমার আরেক বোন বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, তোমার বাবা এসেছেন, মামা এসেছেন, অনেক ছেলে এসেছে জগন্নাথ হল থেকে। বললাম, মান্দি সমাজ অনেক ভালো সমাজ। এখন তোমার বন্ধু ও স্বজন বেড়ে গেছে। মেয়েটি তাকিয়ে ছিল। মহিলা পুলিশ সদস্য কঠিন মনোভাব দেখিয়ে মেয়েটিকে ভেতরে নিয়ে গেলেন। আমি এই পুলিশ বোনটির কোনো দোষ দেখি না। অতিরিক্ত ডিউটি করতে করতে এবং চাপ নিতে নিতে মনে হয় তাঁর কোমল মানবিক সত্তা হারিয়ে যেতে বসেছে। মহিলা পুলিশ সদস্য বললেন, আপনারা চিন্তা করবেন না, এখানে সে নিরাপদে থাকবে। আমি ফিরে এলাম। হাসপাতালের নিচে এসে অনেক গারো স্বজনের সঙ্গে কথা বললাম। তরুণ গারো ছাত্রদের বললাম, তোমরা রাতে এসে একটু ঘুরে যেয়ো। পরে শুনেছি গারো ছেলেরা প্রশংসনীয় কাজ করেছে।
গত রোববার আমরা ৩০টির অধিক আদিবাসী ও মানবাধিকারকামী সংগঠন মিলে যে বড় প্রতিবাদ সমাবেশ করেছি, সেখানে আক্রান্ত মেয়েটির বড় বোন এসেছিল। অনেক টিভি চ্যানেল ওর সাক্ষাৎকার নিতে চেয়েছিল এবং আমাকে অনুরোধ করেছিল। অনেক টিভি রিপোর্টার বলেছেন, তাঁরা বড় বোনকে ক্যামেরায় দেখাবেন না, পেছন থেকে কথা রেকর্ড করবেন। আমি জানলাম, মেয়েটির মন ভালো নেই। ও কথা বলতে চায় না ক্যামেরার সামনে। এমন কোনো পদ্ধতি কি বের করা যায় না, ভিকটিম বা তার পরিবারের কারও সঙ্গে ক্যামেরা ছাড়া কথা বলে তথ্যানুসন্ধান করা যায়? সেটি হলে ভালো হয়।
আমি অবাক হই, এখনো সরকারের পক্ষ থেকে নির্দিষ্টভাবে কোনো বক্তব্য আসেনি। বিএনপি অভিযোগ করেছে, আদিবাসী নারী ধর্ষণের ঘটনায় সরকার নীরব ভূমিকা পালন করছে। কেন এখনো স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মেয়েটিকে দেখতে গেলেন না? নারী ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি হাসপাতালে গেছেন, তাঁকে ধন্যবাদ।
আমার অভিজ্ঞতা বলে, এই আদিবাসী মেয়েটিকে অন্যান্য ঘটনার মতো দীর্ঘ মামলা–প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। এত দীর্ঘ পথ সে পাড়ি দেবে কীভাবে? আমরা আদিবাসী সংগঠনসমূহ সামান্য শক্তি নিয়ে তার পাশে থাকব। কিন্তু রাষ্ট্রকে তো মূল দায়িত্ব পালন করতে হবে। আমি চাই, রাষ্ট্র এই আদিবাসী মেয়েটির নিরাপত্তাসহ সব দায়িত্ব গ্রহণ করুক।
আর আসুন, আমরা সবাই আজ মমতার হাত বাড়িয়ে দিই। সবার স্নেহ-মায়া-মমতায় যেন আদিবাসী মেয়েটি নতুন স্বপ্ন দেখতে পারে। মেয়েটির গ্রাম ছিল মধুপুর বনাঞ্চলের অংশ। এত সুন্দর গ্রাম ছেড়ে একটু ভালো থাকা ও সুন্দর জীবনের আশায় মেয়েটি এই শহরে এসেছিল। তাহলে এই শহর কি ওর সব স্বপ্ন ছারখার করে দিল? নিশ্চয় আমরা এটি বিশ্বাস করতে চাই না। নিষ্ঠুর এই শহরে ২১ বছরের মেয়েটি কি একাকী হয়ে যাবে? আমি শুনে খুব খুশি হয়েছি, এই আক্রান্ত মেয়েটিকে দেখতে নতুন মেয়র আনিসুল হক ও তাঁর স্ত্রী ছুটে গিয়েছিলেন। সান্ত্বনা দিয়েছেন, হয়তো একটু সাহস জুগিয়েছেন, সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
দিনে কিংবা রাতে এই শহর যেন সব নারীর জন্য নিরাপদ হয়। মেয়েরা যেন বলতে পারে, এ শহর তাদেরও।
সঞ্জীব দ্রং: কলাম লেখক ও সংস্কৃতিকর্মী।
sanjeebdrong@gmail.com

চীনে ‘পাপের শহরে’ লুকিয়ে চলছে অন্য ব্যবসা

চীনের দক্ষিণাঞ্চলের উৎপাদন-কেন্দ্র বলে পরিচিত ডোংগুয়ানের ব্যবসায়ী হ্যান ইউলাই। তার বহু গ্রাহক যখন কারখানা সফর ও বাণিজ্যমেলায় অংশ নিতে সেখানে যান, তখন তিনি সব সময়ই তাদের কিছু একটার প্রস্তাব দিয়ে থাকেন। তিনি একে বলছেন, ‘ডোংগুয়ান স্ট্যান্ডার্ড’ হিসেবে। বিকালের দিকে তিনি তাদের নিয়ে যান কেটিভিতে। ডোংগুয়ানকে বলা হয় ‘চীনের পাপের শহর’। সেখানকার কেটিভি নামের কারাওকে বিনোদন কেন্দ্রটি মূলত যৌন-সেবারই নামান্তর। এসব পতিতালয় ব্যবসার দায়িত্বে থাকা নারীটির নাম মামাসান। তিনি ওই গ্রাহকদের বহু তরুণীকে দেখাবেন। তাদের বেশির ভাগই চীনা, তবে জাপানি ও কোরিয়ানও রয়েছে। তবে এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দামি হলো রাশিয়ান তরুণীরা। হ্যান বলেন, আপনি একজন বা দুজন তরুণীকে নিয়ে গান গাইতে পারেন, কিছু পান করতে পারেন; কিছুটা মজাও নিতে পারেন। এরপর ওপরতলার একটি কক্ষে চলে যেতে হবে। সেখানে কোন ভালবাসা চলবে না, শুধু ব্যবসা চলবে। এ ‘ব্যবসা’ দিয়ে তিনি মূলত পতিতাবৃত্তিকেই বুঝিয়েছেন। কারণ, চীনে পতিতাবৃত্তি অবৈধ। তাই হ্যানদের অনেক রাখঢাক রেখে কথা বলতে হয়। এখন এ ধরনের ব্যবসা করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ডোংগুয়ানের যৌন ব্যবসার বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান শুরু করে সরকার।
দুই সহস্রাধিক হোটেল, ম্যাসাজ পার্লার সে সময় বন্ধ করে দেয়া হয়। হাজার হাজার ব্যক্তিকে আটক করা হয়। এদের মধ্যে অনেকে ছিল পতিতা ব্যবসার সন্দেহভাজন পরিচালক। এ ছাড়া বহু উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা, দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশ কর্মকর্তাদেরও গ্রেপ্তার করা হয়। শহরের সরকারি নিরাপত্তা ব্যুরোর প্রধান ও ভাইস মেয়রকে তখন পদচ্যুত করা হয়েছিল। এক বছর পরও সে অভিযানের প্রভাব এখনও অনুভূত হয় শহরটিতে। তাই বিভিন্ন হোটেলে ম্যাসাজ পার্লার এখনও বন্ধ। কোন সড়কেই চীনা পতিতাদের দেখা যাবে না। বিভিন্ন সেলুনে আগে যৌনসেবা দেয়া হতো। কিন্তু সেখানে এখন গ্রাহকদের চুল সম্পর্কিত সেবাই দেয়া হয়। অন্য কিছুর সেবার দেখা মিলে না। ধারণা করা হয়, চীন সরকারের ওই অভিযানে এ-সংক্রান্ত ব্যবসায় ক্ষতি হয়েছে অন্তত ৮০০ কোটি ডলার! ব্যবসায়ী হ্যানও বিষয়টিতে একমত পোষণ করেছেন। তিনি বলেন, এক বছর আগের চেয়ে বর্তমানে অনেক কম গ্রাহক পাই আমরা। কিন্তু তাই বলে ব্যবসা তো থেমে থাকবে না। বিভিন্ন পতিতালয় ডোংগুয়ানে এখন অতীত। এর মানে এই নয়, পতিতা ব্যবসাও শেষ হয়ে গেছে! বরং ব্যবসাটি এখন চলছে গোপনে। হ্যান এখন তার গ্রাহকদের সরাসরি কেটিভিতে নিয়ে যাতে পারেন না ‘ডোংগুয়ান স্ট্যান্ডার্ডের’ জন্য। কিন্তু নজরদারি এড়িয়ে চলাচলের উপায়ও কম নেই। আমি যখন আমার হোটেলে ফিরে যাই, সেখানের ম্যাসাজ পার্লার বন্ধই দেখেছি। তবে এক রাতে এক লবি-বয় এসে আমায় জিজ্ঞেস করে, তুমি কি ‘ম্যাসাজ’ পছন্দ করো? মাত্র ১৬০ ডলারের বিনিময়ে আমার কক্ষে এসে দুই ‘সুন্দরী’ চীনা নারী ৯০ মিনিট ম্যাসাজ করবে। সে আমাকে ওই দুই নারীর নম্বরও দিলো। হোটেলে আরেক ব্যক্তিও আমাকে এ ধরনের প্রস্তাব দিয়েছিল। এমনকি আমাকে সে তার কার্ডও দিয়ে গেল। একদিনেরও কম সময়ে আমি দুবার প্রস্তাব পেলাম।
যৌনসেবার চাহিদা ও জোগানের জন্য সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশনও ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষ করে চীনের প্রধান ইন্সট্যান্ট ম্যাসাজিংসেবা উইচ্যাট ব্যবহৃত হচ্ছে বেশি। কেটিভিতে যেহেতু নারীরা আর কাজ করতে পারছে না, তারা বিভিন্ন ভবনের ধারে দাঁড়িয়ে খদ্দের জোগাড়ের চেষ্টা করে। উইচ্যাটে ‘পিপল নিয়ারবাই’ ও ‘ফিমেল অনলি’ অপশনে গেলে আপনি ওই এলাকার অন্যান্য উইচ্যাট ব্যবহারকারীর তালিকা পাবেন। এদের প্রোফাইলের ছবিতে খেয়াল করলে পতিতাবৃত্তির সঙ্গে জড়িত নারীদের বুঝতে আপনার অসুবিধে হবে না। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ব্যবহার করে এ সেবা অব্যাহত রাখাটা জটিল হয়ে উঠছে। কেননা, চীনের ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ ইন্টারনেট থেকে যৌনতা সম্পর্কিত বিষয়সমূহ নিয়মিত সরিয়ে ফেলে। চীনা গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, যৌনসেবা এখন ঘরে ঘরে প্রচারণা চালিয়ে ও ফোন ব্যবহার করে চলছে। ডোংগুয়ানে ২০১৪ সালের অভিযানের আগে ২৫ হাজার যৌনকর্মী ছিল বলে ধারণা করা হতো। ওই অভিযানের সমালোচকরা বলছেন, ব্যবসাটি এখন গোপন দিকে চলে যাওয়ায় যৌনকর্মীরা বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়েছেন। পুলিশ ও খদ্দেররা প্রায়ই তাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন। ওই অভিযানের পর পরিস্থিতি একই অবস্থায় রয়েছে। এখনও যৌনকর্মীরা সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। গত বছর বন্ধ হওয়া বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্রের বেশির ভাগ এখন খোলার অনুমতি দেয়া হয়েছে। এপ্রিলে আরও কঠোর নীতি প্রয়োগের পর এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ব্যক্তিগত তালাবদ্ধ কক্ষে কিংবা আলো নিভিয়ে ম্যাসাজ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া রাত্রিকালীন সময়ে অতিথিদের পরিচয় সম্পর্কে স্থানীয় পুলিশকে জানানো এবং ম্যাসাজ পার্লারের প্রস্তাব দেয়া লোকদের প্রতিষ্ঠান থেকে বের করার নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে। কিন্তু এখনও বিভিন্ন এলাকার দোকানের পাশে ভায়াগ্রা বিক্রির বিজ্ঞাপন প্রদর্শিত হচ্ছে। এদের কিছু আসল; কিছু আবার নকল। একজন চিকিৎসককে জিজ্ঞেস করা হলো, অভিযানের পর এখনও কি গর্ভধারণ-নিরোধক পিলের চাহিদা রয়েছে? তিনি হেসে জবাব দিলেন, হ্যাঁ। বিশেষ করে রাতে।

ধর্ষক ছেলের মুখ দেখতে চান না বাবা-মা

রাজধানীর কুড়িলে চলন্ত মাইক্রোবাসে এক গারো তরুণীকে ধর্ষণের ঘটনায় গ্রেপ্তার আশরাফ হোসেন ওরফে তুষারের মুখ দেখতে চান না তার বাবা আবদুল মান্নান খান ও সৎমা ফাতেমা বেগম। তারাও চাইছেন তুষারের উপযুক্ত শাস্তি।
গতকাল আমতলীর চুনাখালী গ্রামে তুষারদের বাড়িতে গেলে সাংবাদিক আসার খবর শুনে সেখানে ভিড় করেন গ্রামের অনেক নারী-পুরুষ। মান্নান খান জানান, তার ছয় সন্তানের মধ্যে তুষার মেজো। পূর্ব চুনাখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ার পর সে চুনাখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও মা রেণু বেগমের মৃত্যুর পর তুষারের আর লেখাপড়া করা হয়নি। ১৯৯৯ সালে তুষার ঢাকায় পাড়ি জমান এবং গাড়ি চালানো শিখে চাকরি নেন। গ্রেপ্তার হওয়ার আগে তিনি ঢাকার ‘সিগনেট’ বায়িং হাউজে গাড়িচালক হিসেবে কাজ করছিলেন। তুষারের চাকরির টাকায় সংসারের অভাব কিছুটা ঘুচলেও তার জঘন্য অপরাধ কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না তার বাবা। তুষারের সৎমা ফাতেমা বেগম বলেন, ‘মাইনষের কাম কইরা গুরাগাড়া লইয়া কোনো রহম খাই। তুষার মাসে দেড়-দুই হাজার ট্যাহা দিতো, হেইয়া ওর বাপের অসুখের পেছনে খরচ অইয়া যায়। অসুস্থ স্বামী কোনো কাম করতে পারে না। ও যে কাম করছে, হ্যার বিচার অওন দরকার।’ কয়েকজন প্রতিবেশী জানান, ধর্ষণের ঘটনার পরদিন তুষার বাড়ি যায়। অল্প সময় থেকে কাউকে কিছু না বলে আবার চলেও যায়। তুষারের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চেয়েছেন চুনাখালী গ্রামের কৃষক জয়নালও। আমতলী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জি এম দেলওয়ার হোসেন বলেন, তুষারের অপরাধ ক্ষমার অযোগ্য। তার শাস্তি হওয়া দরকার।
গত ২১শে মে রাজধানীর যমুনা ফিউচার পার্কের একটি দোকানের বিক্রয়কর্মী এক গারো তরুণীকে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করে কয়েকজন। এ ঘটনায় মঙ্গলবার রাতে আশরাফ হোসেন তুষারকে (৩৫) পটুয়াখালীর কলাপাড়া থেকে ও জাহিদুল ইসলাম লাভলুকে (২৬) ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা ধর্ষণের দায় স্বীকার করেছে বলে র‌্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়। ঢাকার মহানগর হাকিম অমিত কুমার বৃহস্পতিবার পুলিশের আবেদনের ওপর শুনানি শেষে ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

১৯৭১: ভারতের সামরিক ইতিহাসের অনন্য মুহূর্ত by প্রণব মুখার্জি

সম্প্রতি ভারতের রাষ্ট্রপতি এবং বাংলাদেশের বন্ধু হিসেবে পরিচিত কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা প্রণব মুখার্জির বই ‘দি ড্রামেটিক ডিকেড দি ইন্দিরা গান্ধী ইয়ার্স প্রকাশ করেছে দিল্লির রুপা পাবলিকেশন্স। এ বইয়ের একটি অধ্যায় ‘মুক্তিযুদ্ধ: দি মেকিং অব বাংলাদেশ’-এর অবিকল তরজমা...
(পঞ্চম শেষ কিস্তি)
১৯৭১ সালের ৩০শে মার্চে ইন্দিরা গান্ধী সংসদের উভয় কক্ষে পূর্ব পাকিস্তান পরিস্থিতির ওপর একটি সিদ্ধান্ত প্রস্তাব উত্থাপন করেন এবং সেখানে তিনি ভারত সরকারের ভূমিকা কি হবে সে বিষয়ে একটি রূপরেখা দেন:
‘ভারতের পার্লামেন্ট একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জীবনযাপনের জন্য পূর্ববাংলার জনগণের প্রতি প্রগাঢ় সহানুভূতি ও সংহতি প্রকাশ করছে। শান্তির প্রতি ভারতের যে স্থায়ী স্বার্থ তা  মেনে রেখে ও মানবাধিকার সুরক্ষা ও সমুন্নত রাখার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ থেকে অনতিবিলম্বে শক্তি প্রয়োগ ও নিরস্ত্র জনগণকে হত্যা বন্ধ করার জন্য আহ্বান জানাচ্ছে ... এই হাউস তার অবিচল আস্থার রেকর্ড রাখছে যে, পূর্ব-বঙ্গের সাড়ে সাত কোটি মানুষের ঐতিহাসিক গণজাগরণ সফল হবে। এই হাউস তাদেরকে আশ্বস্ত করছে যে, তাদের সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ ভারতীয় জনগণের সর্বান্তকরণে সমর্থন ও সহানুভূতি পাবে।’ (সিলেক্টড স্পিচেচ অব ইন্দিরা গান্ধী : দি ইয়ার্স অব এন্ডেভার: আগস্ট ১৯৬৯-আগস্ট ১৯৭২)।
১৫ই জুন বাজেট অধিবেশনে আমি রাজ্যসভার ফ্লোরে একটি অলোচনা সূচনা করি যে, মুজিবনগরের নির্বাসিত বাংলাদেশ সরকারকে ভারতের উচিত হবে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেয়া।  যখন একজন সদস্য জিজ্ঞেস করলেন যে, কিভাবে এই সমস্যার মোকোবিলা করা হবে তখন আমি বললাম, ‘আমি এমন একটি রাজনৈতিক সমাধানের কথা বলছি, যাতে নির্দিষ্টভাবে সার্বভৌম বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। রাজনৈতিক সমাধানের অর্থ হলো একটি সার্বভৌম গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ সরকারকে বস্তুগত সাহায্য দেওয়া...।’ আমি বিশ্ব ইতিহাস থেকে অনেকগুলো ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিলাম, যখন একই ধরনের পরিস্থিতিতে হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে।
‘ভারত ও সংসদের মধ্যে যে উদ্দীপনা দেখা গিয়েছিল, তার পরিপ্রেক্ষিতে ইন্দিরা গান্ধী বিশ্বকে উজ্জীবিত করতে পশ্চিম-ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাবেন। এটা ঠিক করা হয়েছিল এমন একটি প্রেক্ষপটে যখন হেনরি কিসিঞ্জার ইঙ্গিত করেছেন, বাংলাদেশ প্রশ্নে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ হলে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে সমর্থন দেবে না। তাই এসব প্রচেষ্টা ভারতে ও বহির্বিশ্বে নেয়া হয়েছিল, যুদ্ধের সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করার জন্য। পররাষ্ট্রমন্ত্রী শরণ সিং এবং অন্য আরো অনেক মন্ত্রী এবং অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন ‘স্বাধীন’ ব্যক্তিত্ব জয়প্রকাশ নারায়ণ পূর্ব ও পশ্চিম ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকা ও এশিয়ার উল্লেখযোগ্য দেশগুলোতে একটি ব্যাপকভিত্তিক কূটনৈতিক প্রচারণায় অংশ নিলেন। এসব মিশনে একটি অভিন্ন বার্তা বয়ে নিয়ে যওয়া হলো: যদি দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে সুরক্ষা দিতে হয়, তাহলে আওয়ামী লীগের কাছে  গ্রহণযোগ্য একটি রাজনৈতিক সমাধানে পৌঁছাতে পাকিস্তান সরকারকে চাপ দেওয়া। ... এই কূটনৈতিক প্রয়াস সম্পর্কে পাকিস্তানের উপর আন্তর্জাতিক চাপ দিতে যদি নয়া দিল্লির কোন ভাবালুতা থেকেও থাকতো, তাহলে তা ইতিমধ্যে উবে গেছে যখন ভারতের প্রেরিত সর্বশেষ মিশন জুলাইয়ের গোড়ায় দেশে ফিরে এল। ... দ্বিতীয় কূটনৈতিক মিশনে পাঠানো হলো সেপ্টেম্বরে, প্রথমত লাতিন আমেরিকা ও অফ্রিকান দেশগুলোতে, তাদেরকেও এটা বলতো যে, অক্টোবরে শুরু হওয়া জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে ভারত এটা তুলবে এবং তাদেরকে প্রস্তত করতে যে, ভারত সরাসরি সামরিক শক্তি প্রয়োগ করবে।’ (রিচার্ড সিসন ও লিও রোজ, ওয়ার অ্যান্ড সেশন: পাকিস্তান, ইন্ডিয়া অ্যান্ড দি ক্রিয়েশন অব বাংলাদেশ (নিউ দিল্লি, ১৯৯০)
আমি ইন্দিরা গান্ধীর কাছ থেকে বিপুলভাবে স্বীকৃতি পেলাম, এই বিষয়ে ভারতের অবস্থানের প্রতি একটি সমর্থনসূচক পরিরেবশ সৃষ্টির জন্য যখন তিনি আমাকে বিদেশে পাঠালেন। ইন্টার পার্টি ইউনিয়নের ৫৯তম সম্মেলনে (২-১০ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১) ভারতের প্রতিনিধি দলের অন্যতম সদস্য হিসেবে আমরা সেখানে উপস্থিত বিপুল সংখ্যক প্রতিনিধি দলের কাছে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা এবং পূর্ব-পাকিস্তানের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে তাদের সরকারের কাছে যাতে তারা তুলে ধরে সেজন্য অনুরোধ রাখলাম। পরে একই ম্যান্ডেট নিয়ে আমাকে যুক্তরাজ্য এবং ফেডারেল রিপাবলিক অব জার্মানিতে পাঠানো হলো।
১৯৭১ সালের ৩রা ডিসেম্বর গোধূলি লগ্নে পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে প্রিএম্পটিভ আক্রমণ চালালো।
‘ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার সীমান্ত লড়াই একটি সর্বাত্মক যুদ্ধে রূপান্তরিত হলো। পশ্চিম পাকিস্তানের জেট ভারতের অন্তত চারটি বিমানবন্দরের ওপর আক্রমণ চালিয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে আটটি যুদ্ধক্ষেত্রে আঘাত হেনেছে।... পাকিস্তানি বিমান হামলার প্রাথমিক খবর অস্পষ্ট কিন্তু উভয় রাজধানী নিশ্চিত করেছে যে, ভারতের অমৃতসর, পাঠানকোট, অবন্তিপুর এবং শ্রীনগরে আঘাত হানা হয়েছে। ভারত সরকার জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। (১৯৭১: পাকিস্তান ইনসেনটিফাইজ এয়ার রেইডস অন ইন্ডিয়া, বিবিসি নিউজ, ৩রা ডিসেম্বর , ১৯৭১)
এবং এভাবে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার ১২৩ দিনব্যাপী যুদ্ধের সূচনা ঘটল। পাকিস্তান ভারতীয় সেনাবাহিনী ও বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর যৌথ বাহিনীর বিরুদ্ধে আক্রমণ চালালো।
যুদ্ধে জয় এসেছে দ্রুত। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনী আত্মমর্পণের পরে ইন্দরা গান্ধী লোকসভায় ঘোষণা করলেন :
‘মি. স্পিকার স্যার। আমি এখন এমন একটি ঘোষণা দিচ্ছি যা শোনার জন্য এই সংসদ বেশ কিছু সময় ধরে অপেক্ষা করেছিল। পশ্চিম পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকায় নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করেছে। আত্মসমর্পণের দলিল আজ ঢাকায় আইএইচটি ১৬.৩১ ঘণ্টায় সই করেছেন পাকিস্তান ইস্টার্ন কমান্ডের পক্ষে লে. জে. এএকে নিয়াজি। পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের ভারত-বাংলাদেশ বাহিনীর জিওসি-ইন-সি হিসেবে লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা আত্মসমর্পণ গ্রহণ করেছেন। ঢাকা এখন থেকে একটি মুক্ত দেশের মুক্ত রাজধানী।’
ইন্দিরা গান্ধী পূর্ব-পাকিস্তানের স্বাধীনতা সংগ্রামকে দৃঢ়তার সঙ্গে সমর্থন করে একটি প্রচণ্ড ঝুঁকি নিয়েছিলেন বিশেষ করে যেখানে পাকিস্তানের সমর্থক মার্কিন  যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে বড় ধরনের সংঘাতে জড়িয়ে ভয়ানক বিপদ ডেকে আনার আশঙ্কা ছিল। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী চাপ  এবং চীনা ঠাট-ঠমকের মুখে অবিচল দাঁড়িয়ে থাকেন এবং প্রমাণ করেন যে, তিনি পিতার উত্তরাধিকার বহনে সক্ষম। ইন্দিরা গান্ধী তাঁর একাগ্রচিত্ত-পরিচালিত জাতীয়তাবাদী কূটনীতি দিয়ে ভারতকে বিজয় দেখিয়েছেন- প্রতিকূলতা সত্ত্বেও একটি যুদ্ধজয় ঘটেছে, যা ভারতের সামরিক ইতিহাসের একটি অনন্য মুহূর্ত।
(সম্প্রতি ভারতের রাষ্ট্রপতি এবং বাংলাদেশের বন্ধু হিসেবে পরিচিত কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা প্রণব মুখার্জির বই ‘দি ড্রামেটিক ডিকেড দি ইন্দিরা গান্ধী ইয়ার্স প্রকাশ করেছে দিল্লির রুপা পাবলিকেশন্স। এ বইয়ের একটি অধ্যায় ‘মুক্তিযুদ্ধ: দি মেকিং অব বাংলাদেশ’ এর অবিকল তরজমা)

অভিযোগের স্তূপ নারী নির্যাতন সেলে

অভিযোগের সংখ্যা বেশি কিন্তু সুরাহা খুবই কম। রাজধানীর ইস্কাটনস্থ নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সেলে নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিদিনই জমা হচ্ছে অসংখ্য অভিযোগ। বিপরীতে সমাধান চিত্র খুবই কম। মহিলা অধিদফতরের অন্তর্ভুক্ত এই সেলে অসহায় নারীরা বিনা টাকায় বিচার পাওয়ার আশায় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন। টেবিলে অভিযোগের পর অভিযোগ জমা হয়। বেশির ভাগই রয়ে যায় ফাইলবন্দি। বিচার না পেয়ে অনেকেই ফিরে যান হতাশা নিয়ে। রাজধানীর ইস্কাটনের মহিলাবিষয়ক অধিদফতরের নিচতলায় নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সেলে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন বিচারপ্রার্থী নির্যাতিত ৪০ থেকে ৫০ জন নারী আসেন। মাসে গড়ে দেড় হাজার নারী আসেন বিচারের আশায়। পরিসংখ্যান মতে প্রতিদিনই নির্যাতিত নারীদের অভিযোগ বাড়ছে। এসব নারীর বেশির ভাগই যৌতুকের কারণে স্বামী-শাশুড়ি দ্বারা নির্যাতনের শিকার। ফেনী জেলার রাবেয়া জানান, বছর সাতেক আগে পুরান ঢাকা লালবাগের রাজু রহমানের প্রেমের টানে বাবা-মায়ের ঘর ছেড়েছেন। সংসারের প্রথম এক বছর দুজনে সকাল সন্ধ্যা টিউশিনি করে দারুণ সুখে ছিলেন। দুই বছরের মাথায় একটি কন্যা সন্তান আসে ঘর আলো করে। একই সময়ে স্বামী ভাল  বেতনের চাকরি পান একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। সংসার তিন বছরে না গড়াতেই শুরু হয় ছন্দপতন। সংসার-সন্তানের প্রতি উদাসীন সে (স্বামী)। পরে জানতে পারি পরকিয়ায় মজেছে তারই পুরোনো প্রেমিকার সঙ্গে। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি সেই প্রেমিকার সংসারেও অশান্তি এই অবৈধ সম্পর্কের কারণে। এ নিয়ে আমি কিছু বলতে গেলেই চলে শারীরিক নির্যাতন। চার বছরের মাথায় রাজু সংসার-সন্তানের কথা পুরো ভুলে যায়। জানতে পারি সে তার পুরোনো প্রেমিকাকে বিয়ে করেছে। কাবিনের টাকা দিতে হবে বলে আমাকে ডিভোর্স দিচ্ছে না। আবার ঘরেও আসছে না। সব মিলিয়ে আমি আমার মেয়েকে নিয়ে যেন সমুদ্রে পড়ে যাই। সবাই মামলা-মকদ্দমার কথা বললেও আমি আরও দুই বছর অপেক্ষায় থাকি তার (স্বামী) ফিরে আসার। না আসেনি। পরে এক বন্ধুর পরামর্শে গত বছর এখানে (নির্যাতন প্রতিরোধ সেল) আসি। এখানেও কোন কূলকিনারা পাচ্ছি না। শুধু তারিখ পড়ে, আশ্বাস পাই। আর কিছুই হয় না। নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সেলে আরেক অভিযোগকারী তাসলিমা। দুই বছর ধরে অন্তত ২৫টি হাজিরার তারিখে উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু এখনও পর্যন্ত একদিনও শুনানি হয়নি। এর কারণ বিবাদীর কাছে নোটিশ যাওয়ার পরও সে উপস্থিত হয়নি। তাসলিমা জানান, ২০১৩ সালের মার্চ মাসে স্বামী ও শাশুড়ির নির্যাতন সইতে না পেরে আমি নারী নির্যাতন সেলে অভিযোগ করেছিলাম। আমার স্বামী একটি তারিখেও উপস্থিত হননি। ফলে এখন পর্যন্ত কোন বিচার পাইনি। তিনি বলেন, প্রায় ৯ বছর আগে পারিবারিকভাবে শরিয়তপুরের আবদুর রহমানের সঙ্গে বিয়ে হয়। বিয়ের পর ভালই কাটছিল সংসার। ২ বছর পর আমাদের একটা মেয়ে হয়। এরপর থেকেই শুরু হয় সংসারে অশান্তি। আর এর কারণ হলো যৌতুক। স্বামী আবদুর রহমান প্রতিদিন বাবার বাড়ি থেকে টাকা আনার জন্য চাপ দিত। টাকা দিয়ে সে ব্যবসা করবে এই কথা বলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাতো। বলতো টাকা না আনলে আমাকে বের করে দিবে। তাই হলো। বাবা-মার কাছ থেকে টাকা আনতে না পারায় আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয় স্বামী-শাশুড়ি। পরে আমি একজনের পরামর্শে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সেলে অভিযোগ করি। ২ বছর হয়ে গেল এখনও পর্যন্ত আমি নির্যাতনের কোন বিচার পেলাম না। নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর আইন থাকলেও এর কার্যকর প্রয়োগ না হওয়া এবং বিচারে দীর্ঘসূত্রতার কারণে দেশে বেড়েই চলেছে নারী নির্যাতনের ঘটনা। এজন্য উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মানবাধিকার ও নারী অধিকার আন্দোলনের কর্মীরা। নারী সংহতির সভাপতি শ্যামলী শীল বলেন, নারী নির্যাতন দমনের যে আইন আছে, তা যথেষ্ট কঠোর। কিন্তু নির্যাতনের হাত থেকে নারীকে রক্ষা করা বা নির্যাতিত নারীকে ন্যায়বিচার পেতে খুব সাহায্য করে না। শ্যামলীর প্রশ্ন, নারী নির্যাতন বন্ধে আইনের সঠিক প্রয়োগ হবে কবে? তার মতে, শুধু আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং ঘটনায় বিচার নিশ্চিত করা গেলেই দেশে নারী নির্যাতন অনেক কমে আসবে। নারী নির্যাতন মামলার বিচারে দীর্ঘসূত্রতার কারণেই অন্যরাও নির্যাতনে উৎসাহিত হচ্ছে। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে রয়েছে বিভিন্ন আইন। এত আইন ও আইনে বর্ণিত কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা কার্যকর হচ্ছে না শুধু আইন প্রয়োগে ব্যর্থতার কারণে।
নারী নির্যাতন সেল সূত্রে জানা যায় ২০১১ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত গত ৪ বছরে পারিবারিক নির্যাতন, যৌতুক, শারীরিক নির্যাতন, ২য় বিয়ে, পরকীয়া, তালাক এসব বিষয়ে অভিযোগ জমা হয়েছে ৫২,১৫৭টি। এর মধ্যে সুরাহা হয়েছে মাত্র ১২৭৬টি অভিযোগের। এর মধ্যে ২০১১ সালে অভিযোগ জমা হয়েছে ১৩,৩৫৪টি। ফয়সালা হয়েছে ৩০৩টি। ২০১২ সালে অভিযোগ জমা হয়েছে ১৪,৪০৫টি। ফয়সালা হয়েছে ৩৩৫টি। ২০১৩ সালে অভিযোগ জমা হয়েছে ১০,৯৯৭টি। ফয়সালা হয়েছে ৩৪০টি। ২০১৪ সালে অভিযোগ জমা হয়েছে ১৩,৪০১টি এবং অভিযোগ ফয়সালা হয়েছে ২৯৮টি। এ বছর গত মাস (এপ্রিল) পর্যন্ত অভিযোগ পড়েছে প্রায় ৭ হাজার। সুরাহার তথ্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নারী নির্যাতন সেলের দাত্বিপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট ফেরদৌসি বেগম বলেন, সংসার ভাঙ্গা আমাদের মূল টার্গেট নয়, ভাঙ্গা সংসারটাকে জোড়া লাগানোর চেষ্টাটাই মূলত আমরা করে থাকি। সে জন্যই আমাদের কাছে আসা অভিযোগগুলো নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতার প্রয়োজন হয়। তাছাড়া সংশ্লিষ্টদের অসহযোগিতাতো রয়েছেই। যে অভিযোগগুলো এখানে সমাধান করা সম্ভব হয় না সেই মামলাগুলো কোর্টের পারিবারিক আদালতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। দীর্ঘসূত্রতার পরেও অভিযোগ সুরাহা কম হওয়ার কারণ হিসেবে নানা সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখানে অভিযোগ করার পর আমাদের প্রক্রিয়ায় অভিযুক্তকে নোটিশ পাঠাই। ২টি নোটিশের পর ওই এলাকার পুলিশের মাধ্যমে সংবাদ পাঠাই। এর পরেও অভিযুক্ত ব্যক্তিগণ আদালতে হাজির না হওয়ায় অসংখ্য অভিযোগ অমীমাংসিত রয়ে যায়। তবে আমাদের কাছে যদি ওয়ারেন্ট জারি করার ক্ষমতা থাকত তাহলে অব্যশই সব অভিযোগের সুরাহা হতো। এতে তাদের মধ্যে একটা ভয় কাজ করত যে, সেখানে উপস্থিত না হলে তাকে জেলে যেতে হবে। এতে করে অধিকাংশ অভিযোগই দ্রুত সুরাহা করা সম্ভব হতো এবং নির্যাতিতরা সুবিচার পেতেন।

ঢাকায় মানব পাচার সিন্ডিকেটের ফাঁদ by রুদ্র মিজান

রাজধানীর আরামবাগ এলাকার কয়েকটি হোটেলে মালয়েশিয়াগামীদের ভিড় থাকে প্রায়ই। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে জড়ো করা হয় তাদের। তুলনামূলক অল্প টাকায় বিদেশে যাওয়ার এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চান না তারা। তাই সহজেই দালালদের খপ্পরে পড়েন সহজ-সরল মানুষগুলো। চট্টগ্রাম থেকে নৌপথে মালয়েশিয়া পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব দালালের। তার নাম কার্তিক চন্দ্র মল্লিক। মানব পাচার নিয়ে তোলপাড় শুরু হওয়ার পর থেকে পলাতক রয়েছেন তিনি। শুধু কার্তিক চন্দ্র নয়। মানব পাচারে জড়িত রয়েছে রাজধানীর শতাধিক দালাল। জালের মতো দেশব্যাপী ছড়িয়ে আছে তাদের কর্মীরা। ঢাকা থেকে মালয়েশিয়া, দুবাই, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে পাচার হচ্ছে নারী-পুরুষ। দালালদের খপ্পরে পড়ে পাচার হওয়া ব্যক্তিদের অনেকেরই খোঁজ পান না স্বজনরা। মানব পাচারের অভিযোগে মামলা হলেও প্রভাবশালী দালালরা থাকেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, অসাধু পুলিশ কর্মকর্তাদের যোগসাজশেই ঘটছে মানব পাচারের ঘটনা। জড়িত আছেন ট্রাভেলস এজেন্সির মালিকদের অনেকে।
সূত্রে জানা গেছে, গত বছরে মানব পাচার আইনে সারা দেশে মামলা হয়েছে ৩৯২টি। অপহরণের শিকার হয়েছেন ১হাজার, ৬২৫ জন। এর মধ্যে উদ্ধার হয়েছেন মাত্র ৫১২ জন। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৫১৭ জনকে। তার আগের বছর এই আইনে মামলা হয়েছে ৩৭৭টি। এসব মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে ১হাজার ৫শ’ ৯ জনকে। অপহরণের শিকার হয়েছেন ১ হাজার ৩৫৩ জন। এর মধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে ১ হাজার ১২৫ জনকে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৪৭২ জনকে। শুধু রাজধানীতে ২০১৪ সাল থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত মানব পাচার আইনে মামলা হয়েছে ৩৬০টি। এর মধ্যে ২৫৫টি মামলার অভিযোগপত্র দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে পুলিশের তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ১০৫টি মামলারই চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীতে একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। শতাধিক দালালের এই সিন্ডিকেট বিভিন্ন দেশে মানব পাচারে জড়িত রয়েছে। কার্তিক চন্দ্র মল্লিক, কবির গাজী, হায়দার, পনির, সোহেল, নাজমা, মঞ্জু বেগমের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট রয়েছে। এই গ্রুপের সঙ্গে রয়েছে ভারতীয় নাগরিক বর্তমানে ডেমরার বাসিন্দা তানভীর রাজা চৌধুরী। সূত্রমতে, এই চক্রটি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ফ্ল্যাট ভাড়া করে অফিস ও বাসা করে। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে নারী ও পুরুষদের এসব অফিসে ও বাসায় এনে রাখা হয়। তারপর বিভিন্ন দেশের দালালদের কাছে তাদের বিক্রি করে দেয়া হয়। এই গ্রুপের দালাল কার্তিক চন্দ্র মল্লিক নৌপথে মালয়েশিয়ায় মানব পাচার করে থাকে। এ বিষয়ে তার বিরুদ্ধে শ্যামপুর থানায়  নারী ও শিশু নির্যাতন দমন  ট্রাইব্যুনালে মামলা রয়েছে।
সারা দেশ থেকে বিদেশগামীদের মতিঝিলের আরামবাগের কয়েকটি হোটেলে জড়ো করার পরে সুযোগমতো চট্টগ্রামে থেকে নৌপথে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়। এই চক্রের কবল থেকে এ পর্যন্ত অনেককে উদ্ধার করা হয়েছে। এই চক্রের কবল থেকে আইরিন নামে এক কিশোরীকে উদ্ধার করেছিল পুলিশ। চক্রের গাজীপুরের কাপাসিয়ার রানীগঞ্জের সোহেল ও পটুয়াখালীর হাওলাদার বাড়ির লিটন মিলে আইরিনকে অপহরণ করে। ভারতে পাচারের উদ্দেশ্যে ফরিদপুরের রথখোলার নাজমা বেগমের বাসায় রাখা হয় তাকে। খবর পেয়ে হিউম্যান রিসোর্স অ্যান্ড হেলথ ফাউন্ডেশনের কর্মীরা পুলিশের সহযোগিতায় তাকে উদ্ধার করেন। উদ্ধারের পর আইরিন জানায়, তাকে ত্রিশ হাজার টাকায় নাজমার কাছে বিক্রি করে দেয় সোহেল ও লিটন। সেখান থেকে ভারতের এক দালালের কাছে ৫০ হাজার টাকায় বিক্রির পাঁয়তারা চলছিল। শুধু আইরিন নয় এরকম শ’ শ’ নারীকে এভাবেই পাচার করা হয় ভারতে।
সূত্রমতে, এয়ারপোর্ট রোডের নিউ শেরাটন, মগবাজার ও  বংশাল এলাকার কয়েকটি বাসা নিয়ন্ত্রণ করে হায়দার, মঞ্জু ও সাথী। তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে মানব পাচার আইনে একাধিক মামলা রয়েছে। অসাধু পুলিশ কর্মকর্তাদের ছত্রছায়ায় দালাল চক্রটি অবাধে মানব পাচারে লিপ্ত রয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগ রয়েছে যাত্রাবাড়ী, শ্যামপুর, মতিঝিল  ও পল্টন থানার কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। এর মধ্যে গত বছরের ২৮শে ফেব্রুয়ারিতে মানব পাচার মামলার আসামি নাজমাসহ কয়েক জনকে আটকের পরও ছেড়ে দেয় যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ। যদিও যাত্রাবাড়ী থানার ওসি অবনি শঙ্কর কর এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। একই ভাবে শ্যামপুর থানায় দায়েরকৃত একটি মামলায় তদন্ত না করেই প্রতিবেদন দেন তদন্তকারী কর্মকর্তা আইয়ূব হোসেন। এ বিষয়ে  হিউম্যান রিসোর্স অ্যান্ড হেলথ ফাউন্ডেশনের অর্ডিনেটর মিয়াজী সেলিম জানান, আসামিদেরর রক্ষা করার জন্য ওই প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে। যদিও এতে উল্লেখ করা হয়েছে এসব এলাকা থেকে আগে মানব পাচার হতো। ওই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি দিয়েছেন মামলার বাদী নুরুল ইসলাম। এসব বিষয়ে আইজিপি একেএম শহীদুল হক সাংবাদিকদের বলেছেন, মানব পাচার রোধে পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে। এতে কোন পুলিশ সদস্য জড়িত থাকার তথ্য-প্রমাণ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান তিনি।