Sunday, September 1, 2024

ঢামেকে চিকিৎসকের ওপর হামলা নিয়ে সারজিসের কড়া বার্তা

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) চিকিৎমকের ওপর হামলা নিয়ে কড়া বার্তা দিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলম।

রোববার (০১ সেপ্টেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক ভিডিওবার্তায় তিনি এ আহ্বান জানান।

সারজিস আলম বলেন, আমার ডাক্তার ভাইদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, তাদের উপরে যে বা যারা হাত তুলেছে তাদের উপযুক্ত বিচার করতে হবে।

তিনি বলেন, যদি কোনো পেশেন্টের মৃত্যুর জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বা কোনো ডাক্তার দায়ী থাকে তবে তদন্ত সাপেক্ষে তারও বিচার হতে হবে । আন্দোলনের এ সমস্বয়ক বলেন, আমার মনে হলো আর আমি কারো গায়ে হাত তুলে ফেললাম, এই স্পর্ধা কখনো মেনে নেয়া যায় না। সকল চক্রান্তের বিরুদ্ধে ছাত্রজনতা সোচ্চার আছে।

এদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভাঙচুর ও চিকিৎসকদের মারধরের ঘটনায় সেবা বন্ধ করে দিয়েছেন চিকিৎসকরা। একই সঙ্গে মারধরের ঘটনায় জড়িতদের বিচার ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবিতে দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে শাটডাউন ঘোষণা দিয়েছেন তারা।

জানা গেছে, শনিবার (৩১ আগস্ট) ঢামেকে নিউরো সার্জারি বিভাগের তিন চিকিৎসককে মারধরের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় সিসি টিভি ফুটেজ দেখে দোষীদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের আল্টিমেটাম দেওয়া হয়।

ঢামেক হাসপাতালে চিকিৎসকদের ওপর হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে পোস্ট গ্রাজুয়েট প্রাইভেট ট্রেইনি ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন এবং বাংলাদেশ স্বাস্থ্য সেবা সংস্কার পরিষদ।

শনিবার (৩১ আগস্ট) রাতে এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে চিকিৎসকদের ওপর হামলার ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত নিশ্চিত করে দোষীদের আইনের আওতায় আনা না হলে এবং চিকিৎসকদের সুরক্ষা আইন বাস্তবায়ন করা না হলে ইমার্জেন্সি অপারেশন/চিকিৎসা ছাড়া সকল প্রকার অপারেশন এবং সেবা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হবে।

অন্যদিকে ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসকদের ওপর হামলার খবরে ফেসবুক লাইভে আসেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ। তিনি জানান, কিছুক্ষণ আগে ঢামেক হাসপাতালে অপ্রত্যাশিত ঘটনা হয়েছে। রোগী মারা যাওয়ায় সংক্ষুব্ধ একটি পক্ষ এই হামলা চালিয়েছে। এ বিষয়ে তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে যথাপোযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেন। একইসঙ্গে বলেন, চিকিৎসকদের তাদের মতো করে কাজ করতে দেওয়া উচিত বলেও মনে করেন।

হাসনাত বলেন, একটি বিষয়ে আমি আপনাদের স্পষ্ট করতে চাই, আমাদের গণঅভ্যুত্থান যে মূল স্পিরিট ছিল, আমাদের গণঅভ্যুত্থানের যে জায়গাটি ছিল, সেই জায়গাটি ন্যায্যতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হবে। একটি সিস্টেম ডেভেলপ করবে এবং এই সিস্টেমের মধ্য থেকে আমাদের সমাজ, আমাদের রাষ্ট্র, তথা আমাদের দেশ পরিচালিত হবে। এখন বিভিন্ন জায়গা থেকে এই ধরনের কাজগুলো করা হচ্ছে, আজকে ডাক্তাদের ওপর অতর্কিত হামলা করা হলো।

তিনি আরও বলেন, আপনি যদি ফোর্স করেন যে আমার রোগীকে বাঁচিয়ে দিতে হবে, এখনই বাঁচিয়ে দিতে হবে, বাঁচিয়ে দিতেই হবে—এটা তো প্রফেশনালিজমের মধ্যে পড়ে না।

শেখ হাসিনাকে নিয়ে কূটনৈতিক উভয় সঙ্কটে ভারত -টেলিগ্রাফের রিপোর্ট

কূটনৈতিক উভয় সঙ্কট। বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওয়াজেদ বর্তমানে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারকে বেকায়দায় ফেলেছেন। তাকে ফেরত পাঠাতে ঢাকা থেকে রাজনৈতিক দাবি উঠেছে। তাকে অব্যাহতভাবে আশ্রয় দেয়ার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য প্রতিকূলতা সম্পর্কেও সমান সচেতনতা রয়েছে। অনলাইন টেলিগ্রাফে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব কথা লিখেছেন সাংবাদিক দেবাদীপ পুরোহিত। তিনি আরও লিখেছেন, রাজপথের সহিংস বিক্ষোভের মুখে গত ৫ই আগস্ট বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে নয়া দিল্লির কাছে হিন্দোন বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করেন শেখ হাসিনা। তখন থেকেই তিনি ভারতে একটি অজ্ঞাত স্থানে কঠোর নিরাপত্তায় আছেন। শেখ হাসিনার কূটনৈতিক পাসপোর্ট বাতিল করা হচ্ছে কিনা অথবা তাকে দেশে ফেরত পাঠানোর আনুষ্ঠানিক কোনো দাবি আছে কিনা এমন প্রশ্ন শুক্রবার এড়িয়ে গেছেন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল।

এক প্রশ্নের জবাবে রণধীর বলেন, আপনি যে প্রশ্ন করেছেন তা হাইপোথিসিসের মধ্যে রয়েছে। এমন হাপোথেটিক্যাল প্রশ্নের উত্তর দেয়ার অভ্যাস আমাদের নেই।

বাংলাদেশি মিডিয়ার একাংশ যখন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিক্রিয়াকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার কৌশল হিসেবে তুলে ধরেছে এবং শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেয়ার জন্য ভারতের সমালোচনা করেছে, তখন উভয় দেশের সিনিয়র রাজনীতিকদের কথোপকথনে এটা বোঝা যায় যে, প্রত্যার্পণ এখন পর্যন্ত প্রকৃতপক্ষে অনুমানভিত্তিক।

শেখ হাসিনা হত্যা থেকে শুরু করে মানবতাবিরোধী কমপক্ষে ১০০ ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি। টেলিফোনে টেলিগ্রাফের এই প্রতিনিধিকে হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের প্রধান রাজনৈতিক বিরোধী পক্ষ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের এখন তাকে (শেখ হাসিনা) ফেরত পাঠাতে বলার দায়িত্ব এবং তাদের সেটা বলা উচিত।

মির্জা ফখরুল প্রকাশ্যে শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর দাবি জানিয়েছেন। বলেছেন, ড. ইউনূসের সঙ্গে মিটিংয়ে তিনি এ বিষয়টি উত্থাপন করেছেন। বর্ষীয়ান এই রাজনীতিক আরও বলেন, আমরা অন্তর্বর্তী সরকারে নেই। কিন্তু তাকে (হাসিনা) ফেরত আনার দাবি জানিয়েছি। তিনি যেসব অপরাধ করেছেন তার সবটার বিচার হতে হবে বাংলাদেশে। আমি জানি না কেন ভারতের কাছে এ বিষয়টি তুলে ধরেনি অন্তর্বর্তী সরকার।

মির্জা ফখরুলের মন্তব্য ভারতের এস্টাবলিশমেন্টের প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তারা বলেছে, হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর কোনো অনুরোধ ভারত চাপা দিয়ে রাখেনি। শেখ হাসিনা ভারতেই থাকতে পারবেন না অন্য কোনো দেশে যাবেন এ নিয়ে জল্পনার মাঝে রণধীর জয়সওয়াল বলেন, আমরা আগেই বলেছি বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খুবই স্বল্প সময়ের নোটিশে ভারতে এসেছেন। এ বিষয়ে আমরা আর বাড়তি কোনো কথা বলবো না।
শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যার্পণ এবং তিনি কোথায় আছেন এ বিষয়ে নয়া দিল্লিতে ক্ষমতাসীন এস্টাবলিশমেন্টের ভিতরের একজন ব্যক্তি স্পষ্ট ছিলেন। এ বিষয়টিকে আজকের প্রেক্ষাপটে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অন্যতম ‘লিঞ্চপিন’ হিসেবে দেখছেন অনেকে। ওই সূত্রটি বলেছেন, বিএনপি (শেখ হাসিনাকে) ফেরত পাঠানোর কথা বলছে। কিন্তু তারা সরকারে নেই। তাকে (হাসিনা) ভারতে অবশ্যই আমন্ত্রণ করে আনা হয়নি। তবে তিনি ভারতে পৌঁছে ঘোষণা দিয়েছেন যে, ভারতকে তাকে গ্রহণ করতে হবে। কারণ, তিনি একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।

গত তিন সপ্তাহে বা তারও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং সারাবিশ্বে, বিশেষ করে ভারতের প্রতি সাধারণ মনোভাব উভয় ক্ষেত্রেই যথেষ্ট পরিবর্তন হয়েছে। প্রশাসন ও বিচার বিভাগকে আওয়ামী লীগের দুর্নীতিমুক্ত করার নামে বিচারক, সিনিয়র সরকারি কর্মকর্তা ও শিক্ষকদেরকে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। এতে মূলত ছাত্র আন্দোলন ও ইসলামপন্থি দলগুলোর তরুণ নেতৃত্ব ভূমিকা রেখেছে।

প্রফেসর ড. ইউনূস যখন একটি সুষ্ঠু ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তখন সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা অব্যাহত রয়েছে। অনেক সাংবাদিক, নাগরিক সমাজের সদস্য এবং আওয়ামী লীগের নেতাদের মামলার জালে জড়ানো হচ্ছে। এটা সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করেছে। হত্যা মামলায় অভিযুক্ত করার পর একজন সিনিয়র সাংবাদিক পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। তিনি বলেছেন, মিডিয়ার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে তারা (তরুণ নেতারা ও ইসলামপন্থিরা)। বাংলাদেশে আর কোনো মুক্ত মিডিয়া বা মত প্রকাশের স্বাধীনতা বিদ্যমান নেই। কিছু তরুণ নেতা এখন জাতীয় বীর। বর্তমানে সামাজিক

যোগাযোগ মাধ্যমে ভারত বিরোধিতা ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। তাতে বাংলাদেশে ভারত বিরোধী সেন্টিমেন্ট তুঙ্গে। এতে প্রশ্ন উঠেছে যে, এই দুই দেশ নিকট ভবিষ্যতে  স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখবে কিনা। বিএনপির একজন সিনিয়র নেতা একমত যে, তরুণ নেতাদের প্রতি এক মাস আগেও জনগণ সমর্থন দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন তাদের বাড়াবাড়ি জনগণ ভালভাবে নেয়নি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই নেতা বলেন, এসব নেতার অভিজ্ঞতা বা বিশেষজ্ঞ নয়। এটাই অনিশ্চিয়তা সৃষ্টি করছে। এ জন্যই আমরা দ্রুত একটি নির্বাচন দাবি করছি। যাতে নির্বাচিত সরকার দেশ চালাতে পারে এবং তাদের জবাবদিহিতা থাকে।

ভারতের এস্টাবলিশমেন্টের একটি সূত্র বলেছেন, বাংলাদেশের নতুন শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করতে উদগ্রীব নয়া দিল্লি। কিন্তু পুরো প্রক্রিয়া অনুকূলে নেই। এটা অনিশ্চিয়তার ফলে সৃষ্টি হয়েছে। এর একটি উদাহরণ হলো, পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তের আইনশৃংখলার কথা মাথায় রেখে পূর্ণাঙ্গ ভিসা সার্ভিস বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত। এই প্রতিনিধিকে বিএনপির জয়েন্ট সেক্রেটারি জেনারেল এমরান সালেহ প্রিন্স বলেছেন, ভারতের জনগণের সঙ্গে আমাদের জনগণের যোগাযোগ চাই আমরা। আমরা বিশ্বাস করি এই সম্পর্ক গড়ে উঠতে হবে সমতা ও পারস্পরিক বিশ্বাসের নীতির ওপর। আমার প্রশ্ন হলো, (শেখ হাসিনাকে) ভারত আশ্রয় দিয়ে কি বাংলাদেশের জনগণের সংবেদনশীলতায় আঘাত করছে না?

ভারতীয় অনেক সূত্র বলেছেন, তারা বিষয়টি বোঝেন। তবে তাকে (হাসিনা) এই মুহূর্তে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে মত নেই। কিছু বিশেষজ্ঞ বিশ্বাস করেন, ভারতের জন্য সবচেয়ে ভাল সমাধান হলো শেখ হাসিনার স্বেচ্ছায় অন্য কোনো দেশে চলে যাওয়া। কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে তা সম্ভব বলে মনে হচ্ছে না। নয়া দিল্লির একটি সূত্র বলেছেন, তার (হাসিনা) বৃটেন যাওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তার সম্ভাব্য বৃটেন যাওয়ার বিষয়টি পররাষ্ট্র সচিবের কাছে উত্থাপন করেছিলেন বাংলাদেশ হাই কমিশন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও অনানুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে কিছু খোঁজখবর নিয়েছে। এই বিষয়গুলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তবে এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি।

ভ্যানে লাশের স্তূপ ভয়ঙ্কর ভিডিও একটি অনুসন্ধান by শরিফ রুবেল

মাত্র ১৪ সেকেন্ডের একটি ভিডিও। তাও পুরোটা চোখ মেলে দেখার সাহস পাননি অনেকে। তরুণদের গুলি করে হত্যার পর ভ্যানে স্তূপ করা হয় লাশ। লাশের স্তূপে প্রাণ ছিল এমন মানুষও ছিল। এই ভিডিওটি সামাজিক  যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে জনমনে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কতোটা বর্বর আর নিষ্ঠুর হয়ে উঠেছিল তার একটা প্রমাণ হিসেবে হাজির হয়েছে এই ভিডিও চিত্র। শুরুতে ভিডিওর স্থান নিয়ে জিজ্ঞাসা ছিল। তবে গতকাল সকালে নিশ্চিত হওয়া যায় এটি আশুলিয়া থানা এলাকার ঘটনা। ঘটনার বিষয়ে মানবজমিন বিস্তারিত অনুসন্ধান চালিয়ে সেদিনের বর্বরতার আরও অনেক তথ্য পেয়েছে। সেই দিনের ছাত্র-জনতার হত্যাকাণ্ডে আশুলিয়া থানা পুলিশের পাশাপাশি ঢাকা জেলা উত্তর গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল ছিল সেখানে।

তাদের গুলিতেই হতাহতের ঘটনা ঘটে। নির্মম এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত পুলিশ সদস্যের অনেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কর্মস্থলে ছিলেন। ভিডিও প্রকাশের পর থেকে তারা আত্মগোপনে চলে যান। ইতিমধ্যে ঘটনায় জড়িত অনেক পুলিশ সদস্যের পরিচয়ও প্রকাশ পেয়েছে।

সরজমিন জানা গেছে, পুলিশের ভ্যানের লাশের স্তূপ করে রাখা মর্মান্তিক ঘটনাটি আশুলিয়া বাইপাইল এলাকার থানা রোডের গলিতে। থানার পাশেই ইসলাম পলিমারস অ্যান্ড প্লাস্টিসাইজারস লিমিটেডের অফিসার ফ্যামিলি কোয়ার্টারের দেয়াল ঘেঁষে গুলিবিদ্ধ ৭ শিক্ষার্থীর মরদেহ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে ছিল। পুলিশ লাশগুলো একত্রিত করে ভ্যানের উপর স্তূপ করে রাখে। এরপরে ঘটে আরও মর্মান্তিক ঘটনা। যার ছবি বা ভিডিও চিত্র ছিল না।
কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী মানবজমিনকে বলেন, গত ৫ই আগস্ট দুপুরে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালানোর পরপর বাইপাইল এলাকায় বিজয় মিছিল বের হয়। মিছিল শেষে বিকালে উত্তেজিত জনতা আশুলিয়া থানা ঘেরাও করে। এতে পুলিশ সদস্যরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। থানার আশপাশে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা দৌড়ে থানা ভবনে ঢুকে পড়েন। ঢুকেই তারা থানার গেট বন্ধ করে দেন। তখন বিকাল সাড়ে ৪টা। মাত্র ৫ মিনিটের মধ্যে আন্দোলনকারীরা চারদিক থেকে থানা ঘিরে ফেলেন। তারা থানা ভবনে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকেন। কেউ কেউ গেট ভাঙতে এগিয়ে যান। অবস্থা বেগতিক দেখে আশুলিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ এ এফ এম সায়েদ পুলিশ সদস্যদের অস্ত্র রেডি করতে বলেন। গুলি লোড করতে বলেন। এই কথা শুনে  উপস্থিত ছাত্র-জনতা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। আশপাশে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ওই সময় থানা ভবন থেকে বেরিয়ে এসে সশস্ত্র ৩০ থেকে ৩৫ জন পুলিশ সদস্য থানার গেটে অবস্থান নেন। তখন বিকাল ৪টা বেজে ৪০ মিনিট। প্রথমে ওসি সায়েদ গেইটে এসে উত্তেজিত জনতাকে নিবৃত করার চেষ্টা করেন। তখন আন্দোলনকারীরা পুলিশকে উদ্দেশ্য করে ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দিতে থাকেন। ছাত্র-জনতা পুলিশকে আত্মসমর্পণ করতে বলেন। তখন ওসি এ এফ এম সায়েদ আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্য করে বলেন, আমরা হেরেছি। আপনারা জিতেছেন। আমাদের মাফ করে দেন। সবাই বাড়ি ফিরে যান। একপর্যায়ে এস আই মালেক, ঢাকা উত্তর ডিবির ওসি তদন্ত আরাফাত হোসেন, এসআই মো. রকিবুল, এসআই আবুল হাসান, এসআই হামিদুর রহমান, এসআই নাসির উদ্দিন, এসআই আব্দুল মালেক, এএসআই সুমন চন্দ্র গাইন, এসআই জলিল ছাত্র-জনতাকে উদ্দেশ্য করে গুলি ছোড়েন। গুলিতে থানার গলিতে কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় পড়ে যান। পুলিশের মুহুর্মুহু গুলিতে লোকজন দৌড়ে পালিয়ে যান।

থানার সামনের ভবন থেকে পুরো ঘটনা দেখা রনি আহমেদ নামের এক ব্যক্তি মানবজমিনকে বলেন, বিকালে থানা ফটকের সামনে উত্তেজিত জনতার ওপর পুলিশ গুলি ছোড়ে। এতে ১০ থেকে ১২ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে যান। কয়েক মিনিট ধরে ওখানে গোলাগুলি চলে। পরে জীবিত কয়েকজনকে ছাত্ররা নিচু হয়ে এসে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যান। তারপরেও ৬ থেকে ৭ জন ওখানে পড়েছিল। তখন আশপাশের সব অলিগলি জনগণ ঘিরে ফেলে। রাস্তা থেকেও লোকজন থানার দিকে রওনা হয়। পরে থানা থেকে সব পুলিশ সশস্ত্র হয়ে একযোগে বেরিয়ে আসে। তারা গুলি করতে করতে বেরিয়ে আসে।
পলিমারস অফিসার ফ্যামিলি কোয়ার্টার গেটের অপর পাশে সাদিয়া রাজশাহী কনফেকশনারি অ্যান্ড মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের মালিক ফাহিমা আক্তার মানবজমিনকে বলেন, ঘটনাটি আমার দোকানের সামনেই ঘটেছে। ৫ই আগস্ট বিকাল সাড়ে ৪টা হবে। সেদিন গুলি খেয়ে থানার গলিতে পড়ে থাকা মরদেহগুলো ভ্যানে তুলছিলেন পুলিশ সদস্যরা। আমাদের চোখের সামনেই তুলেছে। প্রথমে লাশগুলো তুলে ব্যানার দিয়ে ঢেকে থানার সামনে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে  আগুন জ্বালিয়ে দেয়া হয়। সেই ঘটনা এখনো চোখের সামনে ভাসে।

ওইদিন ঘটনাস্থলে থাকা রকি আহমেদ নামের এক পোশাক শ্রমিক মানবজমিনকে বলেন, পুলিশ প্রথমে গেটে এসেই ইসলাম পলিমারসের সামনে পড়ে থাকা গুলিবিদ্ধ ৭ জনকে একটি প্যাডেল ভ্যানে তুলেন। পরে তাদের থানার সামনে আনেন। লাশগুলো থানার পার্কিংয়ে থাকা পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যানে তুলে আগুন দেয়া হয়। ৭ জনের লাশ আগুনে পুড়িয়ে থানা থেকে সব পুলিশ বেরিয়ে গলি দিয়ে হাঁটতে শুরু করে। আর গুলি ছুড়তে থাকে। আগুনে পুড়ে যাওয়া একজনের হাতে তখনো হাতকড়া ছিল।

লাশের স্তূপ করা জায়গাটি হাত দিয়ে দেখিয়ে আসলাম হোসেন নামের এক ব্যক্তি মানবজমিনকে বলেন, ভিডিওতে যে পোস্টারটি দেখা যাচ্ছে। সেটা এখনো দেয়ালে অক্ষত আছে। কিছু বালুর বস্তা ছিল, সেগুলো সরিয়ে নেয়া হয়েছে। সেদিন পুরো থানা রোডেই লাশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। পুলিশ ভ্যান নিয়ে সব লাশ এক জায়গায় জড়ো করে। পরে লাশগুলো থানার সামনে এনে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। এই ঘটনা দেখেনি আশপাশে এমন কোনো মানুষ ছিল না।  এ এক ভয়ানক ঘটনা। মনে পড়লে এখনো গা শিউরে উঠে।

আশুলিয়া থানার সামনে পুড়িয়ে দেয়া লাশের মধ্য জামগড়া শাহিন স্কুলের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী আস-সাবুরও ছিলেন। নিহত আস-সাবুরের বড় ভাই রেজওয়ানুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, আমার ভাই গুলিবিদ্ধ হয়ে থানার সামনে রাস্তায় পড়ে ছিল। পরে পুলিশ তার নিথর দেহ রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে পিকআপ ভ্যানে ঢুকিয়ে আগুন দিয়ে দেয়। ভাইটি আমার জীবিত ছিল নাকি মৃত সেটা জানার সুযোগও হয়নি। তারা কোনো সুযোগ দেয়নি। গুলিবিদ্ধ ৭ জনকেই আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয়। কে জীবিত কে মৃত তাও পুলিশ দেখেনি। আমার ভাই নীল গেঞ্জি পরিহিত ছিল। আমরা গেঞ্জি দেখে পোড়া লাশ শনাক্ত করি।

আফজাল হোসেন নামের আরেক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, সেদিন পুলিশ থানা থেকে বের হওয়ার সময় কারও কারও হাতে দুটি অস্ত্র ছিল। অনেকে সিভিল ড্রেসে ছিলেন। অনেকের হাতে অচেনা অস্ত্র দেখেছি। তারা গুলি করতে করতে বের হয়। কখনো গুলি বন্ধ করেনি। মেইন রোডে এসে একটি পিকআপ ভ্যানে আগুন দেয়। ওই পিকআপ ভ্যানেও ৫ থেকে ৬টি গুলিবিদ্ধ মরদেহ ছিল। বিকালে যারা গুলিতে মারা গেছে তাদের ওই ভ্যানেই রাখা হয়েছিল। তারা নির্বিচারে গুলি চালাচ্ছিল। গুলি কখনো বন্ধ করেনি। অলিগলিতে, রাস্তায়, বাসাবাড়িতে যেখানে খুশি সেখানেই গুলি করেছে পুলিশ। তারা দলবদ্ধ ছিল। ১৩০ জনের বেশি হবে।

বাইপাইল বাসস্ট্যান্ডের এক অটোরিকশা চালক মানবজমিনকে বলেন, পুলিশ থানা থেকে মেইন রোডে এসে হাতের ডান- বাম দু’পাশেই গুলি চালিয়েছে। রাস্তার দু’পাশে গুলি চালাতে চালাতে তারা নবীনগরের দিকে আগাতে থাকে। তখন মানুষ জীবন বাঁচাতে যে যার মতো দৌড়ে পালিয়েছে। এক মিনিটের জন্যও পুলিশ গুলি বন্ধ করেনি। যতক্ষণ হেঁটেছে ততক্ষণই তারা গুলি ছুড়েছে। রাস্তার দু’পাশে পথচারী, বাসাবাড়ি ও দোকানপাটের শত শত মানুষ ওইদিন গুলিবিদ্ধ হয়। এমন দিন কখনো দেখেনি বাইপাইলবাসী।

সেদিনের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আরও কয়েকজন পথচারী মানবজমিনকে বলেন, পুলিশ থানা রোড থেকে গুলি করতে করতে সোহেল হাসপাতাল পর্যন্ত যায়। তখন গুলির শব্দ ছাড়া কিছুই শোনা যায়নি। চারদিকে মানুষের চিৎকার। বাঁচাও বাঁচাও। মনে হয়েছে যুদ্ধ লেগেছে। তখন মানুষ বাসাবাড়ি ছেড়েও পালাতে শুরু করেন। রাত তখন ৯টার বেশি বাজে। পুলিশ সামনের দিকে হেঁটে যাচ্ছিল। আর গুলি ছুড়ছিল। এভাবে তারা পল্লী বিদ্যুৎ পর্যন্ত চলে যায়। এই সময়ে শত শত মানুষ গুলি খেয়ে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখেছি।

একটি সূত্র মানবজমিনকে জানান, ৫ই আগস্ট সন্ধ্যায় আশুলিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ এ এফ এম সায়েদ, ওসি ইনটেলিজেন্স মিজানুর রহমান মিজান, ওসি অপারেশন নির্মল কুমার দাস, ওসি তদন্ত মাসুদুর রহমানের নেতৃত্বে পুলিশের ৯০ থেকে ১৩০ জন সদস্য অস্ত্রসহ থানা থেকে বের হয়ে আসেন। বাইপাইলে পুলিশের নির্বিচারের গুলির খবর পেয়ে সাভার সেনানিবাস থেকে সেনাবাহিনীর একটি টহল টিম বাইপাইলের দিকে রওয়া হয়। পল্লী বিদ্যুৎ পার হলে তারাও পুলিশের গুলির মুখে পড়েন। এতে দুই সেনাসদস্য গুলিবিদ্ধ হন। পরে সেনাবাহিনীর একাধিক টিম এসে পুলিশের সকল সদস্যকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। তাদের আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন। পরে কয়েক মিনিটের মধ্যেই পুলিশ সদস্যদের আটক করে নেন। তখন সবার হাতের আগ্নেয়াস্ত্র জব্দ করা হয়। এরপর শত শত মানুষ পুলিশকে ঘিরে ফেলে। পুলিশের কাছে জনগণের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানোর কারণ জানতে চান। জনগণই বিচার করবে বলে পুলিশ সদস্যদের ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেন। এরপর সেনাবাহিনী তাদের নিরস্ত্র করে আটক করে নিয়ে যান। সেদিন রাত ১০টার দিকে নবীনগর সেনানিবাসের গেটে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হন। পরে সেনাসদস্যরা জনতাকে নিবৃত করার চেষ্টা করেন।

সেদিন অস্ত্র হাতে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন: প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, অস্ত্র হাতে সাধারণ মানুষের উপর গুলি ছোড়েন ওসি তদন্ত মাসুদুর রহমান, এসআই মো. রকিবুল, এসআই আবুল হাসান, এসআই হামিদুর রহমান, এসআই নাসির উদ্দিন, এসআই আব্দুল মালেক, এসআই মো. আরাফাত উদ্দিন, এসআই অমিতাভ চৌধুরী, এসআই সোহেল মোল্লা, এসআই অপূর্ব সাহা, এসআই শরীফ আহম্মেদ, এসআই মো. বদিউজ্জামান, এসআই নোমান সিদ্দিক, এসআই মো. আউয়াল হোসেন, এসআই জোহার আলী, এসআই বিপুল হোসেন, এসআই মো. নুর আলম, এসআই আনোয়ার হোসেন, এসআই মো. সজীব হোসেন, এসআই মো. মোতালেব, এসআই মো. মোস্তফা কামাল, এসআই সিকদার হারুন অর রশিদ, এসআই শিব শংকর, এএসআই মনিরুল ইসলাম, এএসআই আব্দুল জলিল, এএসআই সুমন চন্দ্র গাইন, এএসআই কামরুল হাসান, এএসআই নুরুল ইসলাম, এএসআই আনোয়ার হোসেন, এএসআই ফিরোজ মিয়া সরকার, এএসআই মো. আলাউদ্দিন, এএসআই ইমারত হোসেন, এএসআই এনায়েত হোসেন, এএসআই সিরাজুল ইসলাম, এএসআই মিজানুর রহমান, এএসআই আমির হামজা, এএসআই বিশ্বজিৎ, এএসআই আনুয়ারুল মানার, এএসআই মো. নূর নবী, এএসআই মাসুদ রানা, এএসআই সাহাবুদ্দিন, নায়েক মাহাবুব হোসেনসহ আরও ১০১ জন কনস্টেবল।

সেদিন নিহতের স্বজন ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ৫ই আগস্ট সকাল ৯টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত পুলিশ, ছাত্রলীগ, যুবলীগের গুলিতে অন্তত ৩১ জন নিহত হন। পরদিন গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও ১৫ জন মারা যান। এতে ওই ঘটনায় মোট নিহতের সংখ্যা ৪৬ জন। এ ছাড়া গুলিবিদ্ধ হয়ে ধামরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, আশুলিয়ার নারী ও শিশু হাসপাতাল, আশুলিয়ার হাবিব ক্লিনিক, গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক হাসপাতাল, এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সাভারের বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন আছেন প্রায় দেড় হাজারের বেশি মানুষ।

তদন্ত কমিটি গঠন:

ঢাকা জেলা উত্তর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক বর্তমান ঢাকা উত্তর (ডিবি) পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ বিপ্লব বলেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া ভেস্ট পরা যুবকটি আমাদের ঢাকা জেলা গোয়েন্দা বিভাগ উত্তরের পরিদর্শক আরাফাত হোসেন। তিনি বলেন, আরাফাত আমার সঙ্গে কাজ করে। আমি কেন তাকে চিনবো না। ওইটা আরাফাত। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে সে আরাফাত সহ আরও অনেকেই আশুলিয়া থানা পুলিশকে সাপোর্ট দিতে সেখানে যায়। সেদিন সকাল থেকেই আমরা ওখানে ছিলাম। তবে সেদিন ছাত্র-জনতার দিকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়িনি। তিনি বলেন, আমরা সেদিন ঢাকা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্‌)  আব্দুল্লাহিল কাফীর নির্দেশনা পালন করেছি। ডিবি’র ওসি বলেন, আরাফাত ঘটনার পর নিয়মিত অফিসও করেছেন। দুই একদিন আগে তার বাবা অসুস্থ হওয়ায় তিনি ছুটি নিয়ে গ্রামের বাড়ি বরিশালে যান।

বিষয়টি নিয়ে ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার আহম্মদ মুঈদ বলেন, এ বিষয়ে আমরা একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। কমিটির সদস্যরা বিষয়টি নিয়ে আরও যাচাই-বাছাই করবেন। আমার বিশ্বাস শুধু আরাফাত নয় পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মধ্যদিয়ে সকল দোষীর নামই উঠে আসবে। এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত কাউকেই আমরা ছাড় দিবো না। বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে সকলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। 

mzamin

মনিরুলের আনা ২৫ কোটি টাকা গেল কোথায়? by মরিয়ম চম্পা

নিয়োগ, টেন্ডার বাণিজ্য, কেনাকাটা, নারী কেলেঙ্কারিসহ নানা অভিযোগ উঠছে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি)-এর প্রধান কর্মকর্তা অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মো. মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শেষের দিকে পুরোটা সময় মনিরুল পুলিশ সদরদপ্তর ও ডিএমপি’র কন্ট্রোলরুমে কাটিয়েছেন। সূত্রমতে, আন্দোলন দমন-পীড়নের কাজে খরচের জন্য গণভবন থেকে সর্বশেষ গত ৪ঠা আগস্ট সকালে প্রায় ২৫ কোটি টাকা আনেন এই মনিরুল। পুরো টাকাটাই তার এসবি অফিসের নিজস্বকক্ষে সুরক্ষিত ছিল। ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ থেকে পালানোর পর মনিরুল আর অফিস করেননি। এসবি সূত্র জানায়, এ সময় এসবি’তে কর্মরত তার হেল্পিং হ্যান্ড হিসেবে পরিচিত দুই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পুরো টাকাটাই গায়েব করে দেন। সূত্র জানায়, জঙ্গি অভিযান নাটকের মাধ্যমে পুলিশ বাহিনীতে নাম ছড়িয়ে পড়ে মনিরুলের। এ সময় তার প্রধান ও বিশেষ সহযোগী হিসেবে ছিলেন সাবেক কাউন্টার টেরোরিজম (সিটিটিসি) প্রধান এবং অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. আসাদুজ্জামান ও পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (অ্যাডমিন) পদে দায়িত্বরত এক কর্মকর্তা। সূত্র জানায়, গত ৪ঠা আগস্ট গণভবন থেকে ২৫ কোটি টাকা ছাত্র আন্দোলন দমাতে প্রণোদনা হিসেবে এসবি’র ডিউটিরত সদস্যদের মধ্যে বিতরণ করতে এ টাকা আনেন মনিরুল। এসবি’র এসএস (অর্থ) এবং এসবি প্রধানের স্টাফ অফিসার পুরো বিষয়টি জানতেন।

এসবি’র অতিরিক্ত ডিআইজিকে (প্রশাসন ও অর্থ) তারা বিষয়টি জানালে তিনজন মিলে সব অর্থ আত্মসাৎ করার সিদ্ধান্ত নেন। গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট আছে অজুহাতে এই টাকা আত্মসাতের উদ্দেশ্যে ৫ই আগস্ট সরকার পতনের পর এসবি প্রধানের অফিস কক্ষ, তার বেইলি রোডের বাসা এবং সিটি এসবি’র ডিআইজি অফিসে তারা তিনজন তালা লাগান। ৬ই আগস্ট এসবি কার্যালয়ের সকল সিসিটিভি ও ডিশ লাইন কেটে দেন। ৬ই আগস্ট থেকে ১২ই আগস্ট পর্যন্ত এই সময়ের ভেতর এসবি প্রধান মনিরুলের দপ্তরে রাখা ২৫ কোটি টাকা তিনজন মিলে আত্মসাৎ করেছেন বলে জানিয়েছে সূত্র।
এসবি’র একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে সূত্র জানায়, মনিরের নিজস্ব একটি সিন্ডিকেট ছিল। যেই সিন্ডিকেটে সাবেক মহানগর গোয়েন্দা প্রধান হারুন অর রশীদ, মনির, সারোয়ার নজরুলসহ একাধিক কর্মকর্তা ছিলেন। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পুলিশের পোস্টিং, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি, টেন্ডার বাণিজ্য চালিয়েছেন। জানা গেছে, মনিরুলের কানাডায় নিজস্ব দু’টি বাড়ি এবং সিঙ্গাপুরে রয়েছে নিজস্ব ব্যবসা। ঢাকা, কেরানীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, সিলেট, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিদিন বাজারের ব্যাগে করে টাকা আসতো মনিরুলের বাসায়। এসব টাকার ক্যারিয়ার হিসেবে কাজ করতেন এসবি’র বর্তমান এক ডিআইজি, এসএস ফাইন্যান্স এবং আরেক কর্মকর্তা। মনিরুলের ছিল স্থায়ী দুই রক্ষিতা। তাদের মধ্যে একজন হচ্ছেন বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় এক চলচ্চিত্র অভিনেত্রী। সম্প্রতি তিনি এক নির্মাতাকে ঘটা করে বিয়ে করেন। এই অভিনেত্রীকে মনিরুল বেইলি রোডে একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট উপহার দিয়েছেন। যেখানে মনিরুল নিয়মিত অবকাশ যাপন করতেন। আরেকজন বতর্মান সময়ের খ্যাতিমান বিজ্ঞাপন নির্মাতা এবং টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র পরিচালকের সাবেক স্ত্রী এবং অভিনেত্রী। সরজমিনে দেখা গেছে, রাজকীয়ভাবে কয়েক কোটি টাকা খরচ করে এসবি প্রধান মনিরুলের নিজস্ব অফিস ও মিটিংরুম সাজিয়েছেন। মনিরুলের গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর থানার বাহাড়া গ্রামে। মনিরুলের বড় ছেলে ইংল্যান্ডে পড়াশোনা করছেন এবং ছোট মেয়ে কানাডায়। তার স্ত্রী সংশ্লিষ্ট এক মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব পদে কর্মরত।

ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট গঠনে মূল ভূমিকা পালন করেছিলেন মনিরুল। এ ইউনিটের প্রধান হিসেবে তিনি পরবর্তীতে দায়িত্ব পালন করেন। ডিএমপি ও কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) এর প্রধান থাকা অবস্থায় জঙ্গি অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে একদিকে যেমন সরকারের আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। অন্যদিকে তার কপাল খুলে যায়। এ সময় বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের দমন-পীড়নের নামে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন মনিরুল। সিটিটিসিতে থাকা অবস্থায় তার সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন পুলিশ সদর দপ্তরের এক ডিআইজি (এডমিন)। মনিরুলের ঘনিষ্ঠ এক এসবি সূত্র জানায়, ৫ই আগস্ট পর্যন্ত মনিরুল, সাবেক পুলিশের মহাপরির্দক, গোয়েন্দা প্রধান হারুন, সিটিটিসি’র ডিআইজি মনির, ডিএমপি কমিশনার, সিআইডি প্রধানসহ একাধিক কর্মকর্তা পুলিশ সদর দপ্তর ও ডিএমপি’র অপারেশন কর্নার এবং কন্ট্রোলরুমে অবস্থান করেন। সরকার পতনের শেষের দিকে তারা এই দুই স্থানে বসে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। ফিল্ডে দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের বিভিন্ন ধরনের দিক- নির্দেশনা দিতেন। ১লা আগস্ট থেকে অফিসে আসা বন্ধ করে দেন মনিরুল, সারোয়ার এবং নজরুল। মনিরুলের প্রতারণা থেকে বাদ যায়নি একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে একজন ঠিকাদারকে দিয়ে মনিরুল প্রায় ৪১ লাখ টাকার কাজ করালেও পরবর্তীতে তিনি বিল পরিশোধ করেননি। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী ঠিকাদার হতাশায় ছাদ থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। অভিযোগের বিষয়ে সম্প্রতি মানবজমিন’র সঙ্গে মনিরুলের হোয়াটসঅ্যাপে কথা হয়। তিনি বলেন, ২৫ কোটি টাকা কোথা থেকে আসবে। ছাত্র আন্দোলনের সময় আমি আমেরিকায় ছিলাম একটি সেমিনারে। ২০শে জুন দেশে ফিরি। গণভবন থেকে টাকা আনার বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা। ভিত্তিহীন। এটার কোনো সুযোগ নেই। কানাডায় ২টি বাড়ি, সিঙ্গাপুরে নিজস্ব ব্যবসা সম্পর্কে তিনি বলেন, আমি কখনো কানাডা যাইনি সেখানে বাড়ি থাকার প্রশ্নই আসে না। কানাডা কেন দেশেও আমার নিজ নামে কোনো ফ্ল্যাট নেই। নিয়োগ বাণিজ্য, ব্যাগভর্তি টাকা, টেন্ডার বাণিজ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, প্রতিটি অভিযোগ মিথ্যা। বর্তমানে এসবিতে যারা কর্মরত আছেন বিশেষ করে ডিআইজি সারোয়ার তিনি এসব দেখে থাকেন। এগুলো আমার বিষয় না। তিনি বলেন, অভিনেত্রী-মডেলদের সঙ্গে আমার সম্পর্কের কথা বলে চরিত্র হননের চেষ্টা করা হচ্ছে। বর্তমানে কোথায় আছেন জানতে চাইলে মনিরুল প্রথমে বলেন, ৫ই আগস্ট সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে করে  ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে আশ্রয় নেন তিনি। বর্তমানে এক আত্মীয়ের বাসায় আছেন।

বিদ্যমান সংবিধান দিয়ে কোনো গণতান্ত্রিক সরকার চলতে পারে না -সিজিএস’র সংলাপ

বিদ্যমান সংবিধান দিয়ে কোনো গণতান্ত্রিক সরকার চলতে পারে না উল্লেখ করে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা সংবিধান সংশোধন বা পুনর্লিখন করার দাবি জানিয়েছেন। গতকাল সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কারের অগ্রাধিকার ক্ষেত্রগুলো নিয়ে ধারাবাহিক সংলাপের ‘সংবিধান বিষয়ক’ আলোচনাটি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে তারা এই দাবি জানান। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সিজিএস’র নির্বাহী পরিচালক জিল্লুর রহমান।

সংলাপে অন্তর্বর্তী সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় উপদেষ্টা এ এফ হাসান আরিফ বলেন, ১৯৭১ এবং ২০২৪-এর প্রত্যাশা অভিন্ন নয়। একাত্তরের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বিধায় চব্বিশের এই গণঅভ্যুত্থানের ঘটনা ঘটেছে। অনেক রক্তের বিনিময়ে আমরা যে স্বাধীন দেশ পেয়েছিলাম, তাকে সমুন্নত রাখার জন্যই দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র গঠনের প্রয়োজন। ১৯৭১-এর পর সংবিধান রচনায় যে ধরনের আলোচনা হয়েছিল, তা থেকে আমরা দিকনির্দেশনা পেতে পারি। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সংবিধানের পরিবর্তন করা হয়েছে বিভিন্ন দেশে। সংবিধান জীবিত ডকুমেন্ট, তাকে নিয়ে কাজ করা সম্ভব। গোঁজামিল দিয়ে সংবিধানকে সংশোধন করা হয়েছে বার বার, তা নিয়ে পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। সকল ধরনের মতামতকে সঙ্গে নিয়েই গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের দিকে এগিয়ে যাবে দেশ। সরকার সিদ্ধান্ত দিবে না, সিদ্ধান্ত দিবে ছাত্র-জনতা বলে আশা ব্যক্ত করেন তিনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর ড. আলী রীয়াজ বলেন, সংবিধানে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, এটি পুনর্লিখন ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। যদি কোনো দল নির্বাচনে ৩০০ আসনও পায় তারাও এই সংবিধান পরিবর্তন করতে পারবে না। কারণ সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে ‘এ’ ধারায় এমন কিছু জিনিস আনা হয়েছে যেটি সংশোধন করার কোনো উপায় নেই। তিনি বলেন, সংবিধান এমনভাবে পরিবর্তিত করা হয়েছে তাতে ব্যক্তিস্বার্থ বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর হাতে অবাধ ক্ষমতা থাকায় দলীয়, রাষ্ট্রীয় সকল ক্ষেত্রে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সাংবিধানিক পুনর্লিখন ব্যতীত এই ক্ষমতার এককেন্দ্রীকরণ বন্ধ করা সম্ভব নয়। সাংবিধানিক পদগুলোতে কেন, কীভাবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল? তা আমাদের অজানা নয়। এমনকী রাষ্ট্রপতি নিয়োগের সিদ্ধান্ত একমাত্র প্রধানমন্ত্রীর ছিল, ক্ষমতার অপব্যবহারে এর চেয়ে বড় উদাহরণ আর কী হতে পারে? নির্বাচন কমিশন কারা নিয়ন্ত্রণ করে? রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও এর সমাধান হতে পারে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, সমান প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতকরণ। তিনি বলেন, ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি সংবিধান সংস্কার নয়, পুনর্লিখন প্রয়োজন। যাতে নতুনভাবে কোনো দল ক্ষমতায় এসে সংবিধানে নিজেদের মতো পরিবর্তন করতে না পারে। সংবিধানে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে, মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। সাংবিধানিকভাবে সংখ্যাগুরুর অত্যাচার বন্ধের উপায় খুঁজে বের করতে হবে। সংবিধান সংশোধন নাকি নতুন করে পুনর্লিখন প্রয়োজন তা বিতর্কের বিষয়। কে পুনর্লিখন করবে? কে সংশোধন করবে? এই দায়িত্ব কোনো নির্দিষ্ট সরকারের নয়, এই দায়িত্ব জনগণের। সরকারের দায়িত্ব সকল স্তরের জনগণকে পথ তৈরি করে দিতে হবে সংবিধান প্রণয়নে অংশগ্রহণ করবার জন্য।

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মাহফুজ আলম বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক কাঠামোতেও পুনর্গঠন প্রয়োজন। সংবিধান পুনর্লিখনের প্রয়োজন বলা হচ্ছে, কিন্তু জনগণের মতের প্রতিফলন আদৌ হচ্ছে কিনা এইটাও দেখার প্রয়োজন। ধারাবাহিক আকারে সংবিধানে সংশোধন করতে হবে। আদর্শিক ও রাজনৈতিক দিকগুলো থেকে জনগণের সদিচ্ছাকে গুরুত্ব দিতে হবে। ১৯৭১-এর প্রেক্ষাপট থেকে ধারাবাহিকতা বজায় রেখে সংবিধানে নতুনত্ব আনতে হবে। সকল প্রতিষ্ঠানকে বিগত সরকার এমনভাবে ধ্বংস করে গেছে যে, ব্যক্তি পর্যায়েও স্বৈরাচারিতা চলে গেছে, এর থেকে বের হয়ে আসতে হবে।
আইন ও শালিস কেন্দ্রের (আসক) চেয়ারম্যান এডভোকেট জেড আই খান পান্না বলেন, বর্তমান সংবিধান ১৯৭১-এর প্রেক্ষিতে লেখা হয়েছিল। গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের জন্য সংস্কার প্রয়োজন। যে আইন ছিল শাসক শ্রেণির শোষণের জন্য, সেই আইন এখনো কীভাবে বিদ্যমান থাকে?
ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ পত্রিকার সম্পাদক নূরুল কবীর বলেন, সংসদের কাজ হলো সংবিধান বাস্তবায়ন করা, একই সংসদ সংবিধান প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে জড়িত থাকলে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। একটা দেশের সংবিধান সেই দেশের রাজনৈতিক জীবনবৃত্তান্ত। সার্বভৌমত্ব জনগণের জন্য হওয়া প্রয়োজন ছিল, যার প্রতিফলন দেখা যায়নি। মৌলিক অধিকার, সমতার কথা আছে, কিন্তু তা বাস্তবায়নের কথা নেই সংবিধানে। প্রত্যক্ষ প্রতিবিম্ব থাকা প্রয়োজন সংসদীয় আলোচনায়। নানা রাজনৈতিক বৈষম্যের কারণে পিছিয়ে পড়া মানুষদের কথা তুলে আনতে হবে। সংবিধানের সংশোধনের নামে দলীয়করণ করেছে প্রতিটি সরকার। সকল ক্ষমতা একজনের হাতে থাকলে স্বৈরাচার তৈরি হবেই।

সুশাসনের জন্য নাগরিক’র (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে দায়িত্ব নিতে হবে সংবিধানের পুনর্লিখন বা সংশোধনের। সংবিধানের যে এক তৃতীয়াংশ সংশোধনযোগ্য নয়, তা কিন্তু সংবিধানের মৌলিক কাঠামো নয়। মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন না করেই সংবিধান সংশোধনযোগ্য করা সম্ভব। পঞ্চদশ সংশোধনী স্থগিত করে সংবিধানকে পুনরায় সংশোধন সম্ভব।
সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের সভাপতি মাহবুব উদ্দিন খোকন সবার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করে বলেন, সংবিধান পুনর্লিখনের ভিত্তিটা কী? যে আন্দোলন হয়েছে তা ছিল প্রথমত কোটা বিরোধী আন্দোলন, সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলন নয়। পরিবর্তন সবাই চায়, পরিবর্তন হওয়া উচিত। দরিদ্রতার জন্য গণতন্ত্রের সুবিধা ভোগ করতে পারছে বিশাল জনগোষ্ঠী। শ্রেণিবৈষম্য, অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে হবে, গণতন্ত্রের ফল আস্বাদন করতে হলে। বেআইনি কাজকর্মকে আইনি করা হয়েছে আদালতের মাধ্যমে। আইন প্রণয়ন হয় সচিবালয়ে। তিনি বলেন, মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। আদালতকে ব্যবহার করে আর কোনো অবৈধ রায় দেয়া যাবে না।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, বৈষম্য এখনো চলমান। সংবিধান সম্পূর্ণরূপে বাদ দিয়ে নতুন করে লেখা বেশ কঠিন। নতুন বাংলাদেশে নতুন সংবিধানে মৃত্যুদণ্ডকে বাদ দেয়া প্রয়োজন। মত প্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে মৌলিক অধিকারের ওপরও জোর দেয়া প্রয়োজন। সংবিধানের ব্যাখ্যা আসা প্রয়োজন প্রধান বিচারপতির পক্ষ থেকেই। সংবিধানের সংশোধনের জন্য প্রয়োজন ভিন্ন মত ও সকল ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণ।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ও সকল জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি প্রয়োজন। বর্তমান সংবিধান নিয়ে কোনো গণতান্ত্রিক সরকার চলতে পারে না। বাংলাদেশ যে ভয়াবহ সংকটের মধ্যদিয়ে যাচ্ছে তা উত্তরণের জন্য সংবিধান পুনর্লিখন বা সংশোধন প্রয়োজন বলে মনে করেন এই অধ্যাপক।
ফেয়ার ইলেকশন মনিটরিং অ্যালায়েন্স’র (ফেমা) সভাপতি মুনিরা খান বলেন, আমরা গণআন্দোলনের মাধ্যমে মত প্রকাশের স্বাধীনতা পেয়েছি। সংবিধান সংশোধনে সদিচ্ছার প্রয়োজন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেয়া নির্বাচনের মাধ্যমে যে সংসদ আসবে তা যেন জনগণের মতের প্রতিফলন সংবিধানে নিয়ে আসে। সংবিধানের সংশোধন না করে একনায়কত্বকে প্রতিরোধ করা যাবে না। সংবিধান লিখনের দায়িত্ব সবাইকেই নিতে হবে।
চাকমা সার্কেলের প্রধান ও আইনজীবী রাজা দেবাশীষ রায় বলেন, সংবিধানে সংখ্যা যাই হোক, প্রধান বিষয় হোক মৌলিক অধিকারের। ভবিষ্যৎ সংবিধানে কী হবে? তা আমাদেরকেই ঠিক করতে হবে। নতুন সংবিধানে সমতলের আদিবাসী, পাহাড়ি আদিবাসী, ধর্মীয় বিভিন্ন গোত্রের জনগোষ্ঠী সবারই অন্তর্ভুক্তি প্রয়োজন। বিভিন্ন দেশের সংবিধান থেকে শিক্ষা নিয়ে সকল জাতিগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে দেশে গণতন্ত্রের পুনর্গঠন সম্ভব।
সাবেক বিচারক ইকতেদার আহমেদ বলেন, সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা সীমাবদ্ধ। বিচারকদের সীমাবদ্ধতা থাকায়, শপথ দ্বারা বাধিত হওয়ায় সংবিধান প্রণয়নে সুপ্রিম কোর্টের কোনো ভূমিকা থাকে না, ব্যাখ্যা দেয়া ছাড়া। গণভোটের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করা প্রয়োজন। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সর্বদাই প্রশ্নের সম্মুখীন। সারা বিশ্বের বিচার বিভাগ নাগরিকদের অধিকার আদায়ের প্রতিষ্ঠান, আর বাংলাদেশের বিচার বিভাগ অধিকার হরণের প্রতিষ্ঠান।
 ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সাবেক ছাত্র হাবিবুর রহমান বলেন, সংবিধান অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন দিতে বাধ্য বর্তমান সরকার, নাহলে এই সরকারও ১/১১ এর সরকার হয়ে যাবে। সংবিধান সংশোধনে দুইটি উপায় অবলম্বনের প্রস্তাব করে তিনি বলেন, ১) জাতীয় সংবিধান প্রণেতা কমিটি ২) জাতীয় অধিবেশনের মাধ্যমে সকলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। মূল সমস্যাকে চিহ্নিত করে আগাতে হবে। স্বৈরাচারী সরকার থেকে বিচারিকতন্ত্রে যেন আমরা না চলে যাই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. বোরহান উদ্দিন খান বলেন, ইতিহাস বিকৃত করে সংবিধানকে হাতিয়ার বানানো হয়েছে। সংবিধানের এক তৃতীয়াংশ যেহেতু সংশোধনের কোনো উপায় নেই, তাই সংবিধান পুনর্লিখন প্রশ্নের বিষয়। আদালত সংবিধান সংশোধন করতে পারে না, ব্যাখ্যা দিতে পারে। আইনজীবীরা কেউ চ্যালেঞ্জ না করায় আইন মন্ত্রণালয় থেকে সংবিধান বারংবার সংশোধিত হয়ে এসেছে। সংসদের কাজ হবে সংবিধান সংশোধনের। পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল করলে পরবর্তীতে অন্য সংশোধনীগুলোও আদালত বাতিল করে দিবে। আদালতের হাতে সকল ক্ষমতা দেয়া যাবে না।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড জাস্টিস’র নির্বাহী পরিচালক মনজুর হাসান বলেন, ১৯৭২-এর সংবিধান অনেক বেশি প্রগতিশীল ছিল। এমনভাবে সংবিধানকে পরিবর্তন করা হয়েছে যে, এখন আর এটি জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন করে না, একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর ইচ্ছার প্রতিফলন দেখতে পাই। সংবিধান পুনর্লিখন করা প্রয়োজন, তবে একদম শূন্য অবস্থান থেকে নয়। রাজনীতি, সুশাসন, আইনের শাসন আনতে হলে ভবিষ্যতে সংবিধান পুনর্লিখন প্রয়োজন।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী দিলরুবা শরমিন বলেন, রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্ষমতাসীন দলগুলোর কাছে সংবিধান কুক্ষিগত ছিল। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে ক্ষমতাগুলো পেয়েছেন তা সাংবিধানিকভাবেই প্রতিষ্ঠিত। কোনো কিছু করতে গেলেই সংবিধানবিরোধী, রাষ্ট্রবিরোধী কাজ হিসেবে বলা হয়ে থাকে। সাংবিধানিক জুজুর ভয় নাগরিকদের কাটিয়ে ওঠা প্রয়োজন।
সিজিএস’র নির্বাহী পরিচালক জিল্লুর রহমান বলেন, বিগত ১৫ বছরে আমাদের কোনো বাক-স্বাধীনতা ছিল না, গুম-খুনের শিকার হতে হয়েছে সবসময়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) “গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের জন্য সংলাপ” শীর্ষক একটি ধারাবাহিক সংলাপ আয়োজনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। শুধুমাত্র রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ নয়, সমাজের সর্বস্তরের মানুষের বক্তব্য তুলে আনার প্রচেষ্টা থাকবে আমাদের এই সংলাপগুলোর মাধ্যমে। সেইসঙ্গে প্রতিটি সংলাপের সারসংক্ষেপ প্রকাশের মাধ্যমে, আমরা সরকারের কাছে আমাদের দাবি-দাওয়া পেশ করতে পারবো।

উচ্চ শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতির রক্তক্ষরণ

নতুন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ। সব সেক্টরে চলছে সংস্কার। ছাত্র-জনতার রক্তের বিনিময়ে এসেছে এই সংস্কারের অধ্যায়। এই সংস্কারের অন্যতম রূপকার উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রীতিমতো প্রতিযোগিতা করে পদত্যাগ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক ভাইস চ্যান্সেলররা। পূর্বে দাপটের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা এসব শিক্ষক নীরবেই সরে দাঁড়িয়েছেন। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে কেন সরে দাঁড়াচ্ছেন তারা? ক্যাম্পাসগুলো হয়ে উঠেছিল একপাক্ষিক রাজনৈতিক মঞ্চ, চলেছে বন্দনা। সপাটে চলেছে বিরোধী মতের দমন, গণরুম, নির্যাতন, দুর্নীতি। নিয়োগগুলো হয়েছিল রাজনৈতিক মত ও চর্চার যোগ্যতায়। আওয়ামী লীগের লিটমাস টেস্ট পার করতে পারলেই পেয়েছেন এসব দায়িত্ব। এসব কারণেই পট পরিবর্তনে নিঃস্ব হয়ে ওঠেন তারা। অধিকাংশ ভিসিই আন্দোলন বা দাবির আগেই সরে দাঁড়িয়েছেন এসব পদ থেকে। ২০২২ সালের এক প্রতিবেদনে উঠে আসে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৮ ভিসির ৩৯ জনই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত।

এতটাই দলকানা ভিসিদের নিয়োগ দেয়া হয়েছিল যে প্রায়শই পড়তেন সমালোচনায়। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড. মীজানুর রহমান ২০১৯ সালে বেসরকারি একটি টেলিভিশনে বলেছিলেন, যুবলীগের দায়িত্ব পেলে তিনি ভিসির পদ ছেড়ে দেবেন। ভিসিরা শিক্ষার্থীদের অভিভাবক। কিন্তু নিজেদের পদ ধরে রাখতে শিক্ষার্থীদের উপর লাঠিচার্জ কিংবা গুলিবর্ষণের ঘটনার পরও মুখে আঙ্গুল দিয়ে, চেয়ার আঁকড়ে বসেছিলেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ফরিদ উদ্দিন আহমেদ। ২০২২ সালের এই ঘটনার পরও ছিলেন স্বপদে। রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া ফরিদ উদ্দিন আহমেদ শিক্ষক হিসেবে কুড়াতে ব্যর্থ হয়েছেন মর্যাদা। তাইতো সরকার পতনের পরই ছাড়তে হয় পদ। চলতি বছরের মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনস্থ বটতলায় মাহে রমজানকে স্বাগত জানিয়ে কোরআন তেলাওয়াত আসরের আয়োজন করে আরবি সাহিত্য পরিষদ নামে একটি সংগঠন। এই অনুষ্ঠানে প্রশাসনিকভাবে বাধা দেয়া হলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে রমজান মাসেই পালিত হয় ‘হোলি উৎসব’। এতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি প্রশাসন। রমজান মাসে কুরআন তিলাওয়াত না হলেও শিক্ষার্থীরা নেচে গেয়ে হোলি উৎসব পালন করায় ব্যাপক সমালোচনা হয়। তবে ওই সময় চলমান বিতর্কের কোনো সুরাহা না করায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন তৎকালীন ভিসি এএস এম মাকসুদ কামাল।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. মশিউর রহমান নিয়মিত অংশ নিতেন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। তার বক্তব্যের অধিকাংশই থাকতো রাজনৈতিক বয়ান। তিনি এমনভাবে বক্তব্য দিতেন যেকোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিও উষ্মা প্রকাশ করবেন। সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির আস্থাভাজন হওয়ায় নানা দৃষ্টিকটু সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। বাংলাদেশ মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)’র নির্দেশনা অমান্য করেই অন ক্যাম্পাস ভর্তি করিয়েছেন। এ ছাড়াও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন প্রো-ভিসি হিসেবে ড. মিজানুর রহমানকে দুপুরে নিয়োগ দিয়ে রাতে সরিয়ে দেয়া হয়।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি জয়নুল হক জানান, গত ১১ই আগস্ট জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম, রেজিস্ট্রার, প্রভোস্টসহ পুরো প্রক্টরিয়াল বডি পদত্যাগ করায় পরে স্থবির হয়ে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক কার্যক্রম। এ অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের কার্যক্রম সচল ও স্বাভাবিক করতে কাজ করছেন ট্রেজারার অধ্যাপক ড. হুমায়ুন কবীর চৌধুরী।  
ভিসি ও প্রক্টরিয়াল বডির পদত্যাগের পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের দখলকৃত ১২টি হল উদ্ধার, নতুন ক্যাম্পাসের কার্যক্রম, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্য থেকে নতুন ভিসি নিয়োগসহ নানা সংস্কারের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল, লিফলেট বিতরণ, গণস্বাক্ষর কর্মসূচি ও বহিরাগত ভিসি ঠেকাতে গেট লক কর্মসূচি পালন করেছেন।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি নাঈম আহমদ শুভ জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো ক্লাস পরীক্ষা শুরু হয়নি। আওয়ামী লীগের আমলে ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডই ছিল মুখ্য। আওয়ামী মতাদর্শের না হলে মিলতো না পদ। প্রশাসনিক দায়িত্বে ভিসির পছন্দই ছিল শেষ কথা। বিভিন্ন প্রোগ্রামাদিতে ভিসি প্রোভিসি রাজনীতিবিদদের মতো বক্তব্য দিতেন এবং আওয়ামী লীগের পক্ষে জনমত গঠনের নির্দেশ দিতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের চাটুকারিতা ছিল ব্যাপক। নিজের স্বার্থ আদায় ও টাকা আত্মসাতের বিষয়টি তাদের কাছে ছিল মুখ্য। এই মুহূর্তে যোগ্য ও বিচক্ষণ ব্যক্তিকে প্রশাসনিক বডিতে রাখা, রিসার্চ ডেভেলপমেন্টে কাজ করা, মনিটরিং সেল গঠন, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম উন্নয়ন, একাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুসরণ, পরীক্ষার ফলাফল দ্রুত দেয়া ও শিক্ষকদের পাঠদান পদ্ধতির আধুনিকায়ন, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি গঠন, বই পড়ার জন্য আলাদা রিডিং রুম স্থাপন, হলের খাবারের মান উন্নয়ন ইত্যাদি সংস্কার করা প্রয়োজন। এ ছাড়া সর্বক্ষেত্রে সবাইকে জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি শিক্ষার্থীদের।
শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি সিফাতুল্লাহ আমিন জানান, আওয়ামী সরকারের পতনের পরবর্তীতে রাজধানী ঢাকায় অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়টির বিভিন্ন দায়িত্বে থাকা শিক্ষকদের পদত্যাগ করার প্রেক্ষিতে অভিভাবকশূন্য হয়ে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা। স্থবির হয়ে পড়া সকল একাডেমিক কার্যক্রম দ্রুত চালুর নিমিত্তে শিক্ষার্থীরা মিছিল ও আন্দোলন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের  রেজিস্ট্রারের সিগনেচারকৃত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয় আগামী রোববার থেকে ক্লাস শুরু হবে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় অভিভাবকশূন্য থাকলেও ক্যাম্পাসে বিভিন্ন সংস্কারমূলক কাজ এগিয়ে চলেছে শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মধ্যদিয়ে। এর ধারাবাহিকতায় ক্যাম্পাসে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা বস্তি উচ্ছেদের উদ্যোগ নিয়েছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। যে বস্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট ভূমির এক চতুর্থাংশ জুড়ে বিস্তৃত ছিল। ক্যাম্পাসে বিশ একরের বেশি জমি বস্তি হিসেবে থাকলেও সেই জমি উদ্ধারের বিষয়ে আমাদের তখনকার অভিভাবকরা গুরুত্ব না দিয়ে ক্যাম্পাসের বাইরে সাভার অঞ্চলে জমি খুঁজতে গিয়েছিলেন। যা স্পষ্টতই লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি মুতাছিম বিল্লাহ রিয়াদ জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর একে একে পদত্যাগ করেছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, প্রো-ভিসি ও ট্রেজারার প্রশাসনের শীর্ষ ১২ কর্তাব্যক্তি। ফলে স্থবির হয়ে পড়েছে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম। দুর্বল হয়ে পড়েছে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও। শীর্ষ পদগুলো শূন্য থাকায় এখনো ক্লাস-পরীক্ষা শুরুর সিদ্ধান্ত হয়নি। ব্যাহত হচ্ছে প্রশাসনিক কার্যক্রমও। বিভিন্ন দপ্তরে জমা হয়েছে ফাইলের স্তূপ। চলমান অচলাবস্থা কাটাতে ভিসিসহ শীর্ষ পদগুলোতে দ্রুত সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিকে নিয়োগ দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি আরিফ হোসাইন জানান, আন্দোলনের মুখে ২০শে আগস্ট বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ও প্রক্টরের পদত্যাগের পর পদত্যাগের হিড়িক লেগে যায়। হলগুলোর প্রভোস্টসহ একে একে পদত্যাগ করেন অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০ শিক্ষক-কর্মকর্তা। এতে কিছুটা স্থবির হয়ে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস-পরীক্ষাসহ প্রশাসনিক কার্যক্রম। তবে সেদিনই বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মনিরুল ইসলাম ববি প্রেস ক্লাবের মাধ্যমে এক ভিডিও বার্তায় জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ হবে না, যথা নিয়মে চলবে। এতে কিছুটা স্বস্তি পায় শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে ২১শে আগস্ট পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করেন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক। তবে বাস্তবচিত্রে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু কিছু ডিপার্টমেন্টে ক্লাস-পরীক্ষা একটু মন্থর গতিতেই চলছে। বেশিরভাগ ডিপার্টমেন্টই স্থগিত হওয়া ক্লাস-পরীক্ষা হচ্ছে, নতুন রুটিন প্রকাশিত হয়েছে।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরে একটিমাত্র প্রজেক্টের কাজ হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে রয়েছে পর্যাপ্ত ক্লাসরুম, ল্যাবরুম, পরিবহন ও আবাসিক সংকট। বিশ্ববিদ্যালয় ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী আবাসিক সুবিধা বঞ্চিত। বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই কোনো জিমনেসিয়াম ও অডিটোরিয়াম। দীর্ঘদিন থেকে এসব সমস্যার সম্মুখীন হয়ে আসলেও দলকানা ভিসিরা এসব নিয়ে মাথা ঘামাতেন না। তারা সবসময় শেখ হাসিনা, বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী সরকারের তোষামদেই ব্যস্ত থাকতেন, তাদের বক্তব্য শুনলে মনে হতো রাজনৈতিক দলের বক্তব্য। তাই শিক্ষার্থীদের চাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন যোগ্য ভিসি নিয়োগ ও সংকটগুলো নিরসন।
গণবিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি আফসানা মিমি জানান, বিভিন্ন আন্দোলনের মধ্যদিয়ে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। হাসিনা সরকারের আমলে বেশকিছু নিয়ম তৎকালীন রেজিস্ট্রার তৈরি করেছিল যা ছিল নিয়মবহির্ভূত। ইচ্ছেমতো নিয়োগসহ দুর্নীতি, ছিল চাটুকারিতা। রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও মাঝেমধ্যেই রাজনৈতিক নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হতো বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। এখন সেইসব অনিয়ম দূর করতে বেশকিছুদিন ধরে ক্লাস বর্জন করে আন্দোলন করে যাচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। সাম্প্রতিক কিছু কিছু দাবি প্রশাসন মেনে নিয়েছে, ইতিমধ্যে রেজিস্ট্রার পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন এবং সেইসঙ্গে নতুন করে আবারো প্রষ্টরিয়াল বডি তৈরি করা হয়েছে।

ছোট গল্প: জীবন নামক গহীন জঙ্গলে ডানপিটে মেয়ে আর লাজুক ভাই by সাগুফতা শারমীন তানিয়া

সাগুফতা শারমীন তানিয়া
চন্দনা আর সঞ্জু যমজ দুই ভাইবোন। হ্যান্সেল আর গ্রেটেল। হাতে রুটির টুকরো নিয়ে তারা বনে ঢুকেছিল। যেন হারিয়ে না যায়। যেন ফিরে আসতে পারে সূত্রবদ্ধ পক্ষীর মতো নিজ-পিঞ্জরে। সেই গহীন বনের নাম জীবন।
শহরের ছেলেমেয়েরা যেভাবে বড় হয় সেভাবেই বড় হচ্ছিল তারা, সকালের রিকশায় ইশকুলে যাওয়া, দুপুরে ফিরে এসে ভাত (তখন বাচ্চারা স্কুলফেরতা ভাতই খেত), বিকেল ফুরিয়ে আসছিল শহরের জীবন থেকে কারণ খেলবার মাঠ ছিল না — 'নোনতা বলো রে' ঝঙ্কার দেবার আঙিনাও কমে আসছিল, ছিল গাড়িবারান্দার সামনে চিলতে জায়গা, সন্ধ্যায় দ্বিগুণ বেগে বড় হবার জন্য হরলিক্স।
ভয় পেলে তারা অন্ধকার পেরোতে পেরোতে বলতো— ''ভূত আমার পুত, পেত্নী আমার ঝি, রামলক্ষণ বুকে আছে ভয়টা আমার কী!''
মায়ের পেটে অ্যামনিয়টিক ফ্লুইডে ভাসমান থাকতে থাকতে তারা কী আদানপ্রদান করেছিল কে জানে, ওদের মা বিরক্ত হয়ে বলতো, তার মেয়ের ''বুকভরা কইলজ্যা'' আর ছেলেটা ফ্যাপসার মতো ন্যাতানো।
কখনো ফ্যাপসা, কখনো ত্যানা এইসব ডেকে ছেলেকে সখেদে পেটাতো ওদের বাপ। মাতৃকায় ভাসতে থাকার সময়ে কী বজ্রগুণন ঘটেছিল তা কেউ বুঝিয়ে বলতো না বাপমাকে, তারা দেখতো চন্দনা ধেইধেই করে বড় হচ্ছে আর রিংএ ঝুলিয়ে রেখেও সঞ্জুকে ঠিক তেমন তেমন লম্বা করা যাচ্ছে না। 
যতই টানা হোক, ইলাস্টিক জিনিস যেমন তার পুরনো গড়নে ফিরে আসে, তেমন করে সঞ্জু আকারে ছোট হয়েই রয়েছে, মনে আর শরীরে। হাতে লাল ক্রিকেট বলটা গুঁজে দিয়ে ওদের বাপ সঞ্জুকে স্পিন করতে শেখাচ্ছে আর বকছে, এদিকে চন্দনা ডাকাবুকো ফাস্ট বোলারদের মতো দৌড়ে এসে বল ছুঁড়ে পাশের বাসার জানালা ভেঙে ফেলছে।
রাতে দাদীর দু'পাশে শুয়ে দু'জন লালকমল আর নীলকমলের গল্প শুনছে, একটা লোহার ঢেলা, আরেকটা সোনার ডেলা, দুটোই গিলে ফেলছে রাক্ষসী। রাক্ষসীর নাম জীবন।
চন্দনা আর সঞ্জুর চেহারায় খুব মিল। চন্দনার শরীরে একটা পুরুষালি শোভা আর অনমনীয়তা, সঞ্জু ছিল খানিকটা মেয়েলি গোছের সুকুমার। আড়ালে মশারির নীচের সখ্যতায় তারা গলাজড়াজড়ি করে বলতো— ''আমরা দু'টি ভাই, শিবের গাজন গাই।''
ওদের বাপ ছিল ক্রীড়াপাগল, সারাদিন ক্রিকেট কমেন্ট্রি শুনতো রেডিওতে (এইসব ছাদে উঠে অ্যান্টেনায় এলুমিনিয়ামের সরা লাগিয়ে দূরদর্শনের 'রামায়ণ' দেখবার ঠিক দু'বছর আগের কথা, তখনো টেলিভিশনে রিচি বেনোর 'জিলেট ওয়ার্ল্ড স্পোর্ট স্পেশ্যাল' ছাড়া বাংলাদেশের লোকের গতি নেই।)
বাচ্চাদের প্রাইমারি বৃত্তি পরীক্ষার আগে ওদের মা ঘরগুলোর ঘুলঘুলি (দুই ঘরের মাঝখানের দেয়ালে তখন ঘুলঘুলি থাকতো তো) আইকা আঠা দিয়ে ক্যালেন্ডারের কাগজ সেঁটে বন্ধ করে দিয়েছিল যেন রেডিওর শব্দ না যায়।
'দিস স্পোর্টিং লাইফ'এর নায়কের (বিটিভির 'মুভি অভ দ্য উইক'এ সম্প্রচারিত) মতোই খেলাধুলার অবশেষ হিসেবে যেটুকু হৃদয়ে রয়ে যেত সেটা ওদের বাপ বের করে দিত সহিংসতায়, ছেলেমেয়ের প্রতি, স্ত্রীর প্রতি।
এইসব কোলাহলের ভেতর সঞ্জুকে বাধ্যতামূলকভাবে পড়তে হতো 'আনন্দমেলা'য় ক্রিকেট নিয়ে যা যা লেখা হতো। সেসব লেখার শিরোনাম 'ঝড়ের নাম চন্দ্রশেখর' পড়েই ভেতরটা নেতিয়ে আসতো সঞ্জুর।
ঠিক ধরেছেন, চন্দনা বরং শিখে ফেলেছিল কত কত নাম— মহম্মদ নিসার, লালা অমরনাথ, ফারুখ এঞ্জিনিয়ার, কিরমানি। চন্দনা সঞ্জুকে শেখাতো— 'ক্যাচেজ উইন ম্যাচেজ'।
আড়ালে সঞ্জু ভালবাসতো জিন কেলি আর ফ্রেড অ্যাস্টেয়ারের নাচ নকল করতে, একটা ম্যাগাজিন থেকে সে কেটে লুকিয়ে রেখেছে নুরায়েভের গ্রন্থিল পেশীময় শরীরের সাদাকালো ছবি।
নাচের ইশকুলে ভর্তি করিয়ে দেবার পরেও 'খাম্বার মতো' হয়ে থাকতো চন্দনা। তাই মা সেখান থেকে নাম কাটিয়ে এনেছে। চন্দনা সঞ্জুকে তাক লাগিয়ে দেয় পুকুরে ঢিল ছুঁড়ে ব্যাঙবাজি খেলায়।
বছর দুয়েক পর যখন এলুমিনিয়ামের সরার কল্যাণে ভারতবর্ষ ওদের ঘরে ঢুকলো পাকাপাকিভাবে, সঞ্জু দেখলো মুনমুন সেন 'নিরমা'য় কাপড় ধোয় আর মীনাক্ষী শেষাদ্রি 'ইমামী' কি 'তুহিনা' মাখে। চন্দনা দেখলো দীলিপ ভেঙসারকার স্যুটের অ্যাডে কাকে যেন গোলাপ ফুল দেয় আর গান হয়— ম্যায় তুমহে লাজওয়াব ক্যাহতি হুঁ।
লাজওয়াব হয়ে উঠবার বয়স আসছে ইমামী ট্যাল্কের ঐসব গোলাপি গোলাপি ফুল উড়িয়ে।
বুলিমামা পড়তে এলো শহরে, উঠলো ওদের বাড়িতে। মামা ট্র্যান্সলেশনে খুব কাঁচা, তাই নিয়ে হেসে গড়াগড়ি দেয় চন্দনা, মুখ সরু করে বলে - শেফার্ড না মামা, বলো শেপার্ড।
রাতে ওরা মামার কোল ঘেঁষে বসে দ্যাখে 'হোয়াটজ দ্য নেইম অফ দ্য গেইম' জিজ্ঞেস করতে করতে অ্যাবার সদস্যরা কেমন করে লুডো খেলছে, চন্দনা আর সঞ্জু মনশ্চক্ষে দ্যাখে নায়কদের মতো করে বুলিমামাই যেন বাবা জর্দা খাচ্ছে আর 'রাজদূত' মোটরবাইকে চড়ছে।
মা-বাপের অত্যাচারে অতিষ্ঠ শৈশবের মরুভূমিতে একটি ঝকঝকে আরল হ্রদ ছিল বুলিমামা। চন্দনাদের জন্য শীতবিকেলের ভাজা জলখাবার আনতো— আদাছেঁচা ফুলকপির শিঙারা... পেটের অসুখের ভয়ে তথা পেটখারাপজনিত ইশকুলকামাইয়ের ভয়ে বাইরের খাবার সহজে ঢুকতো না ওদের বাড়িতে।
বুলিমামা চেনাতো আমঝুপি বেগুন কেমন সাইজের, হাতখরচের টাকা জমিয়ে একবার সঞ্জুকে কিনে দিল শিয়ালকোটের ব্যাট, শাদা উইলোকাঠের...আসলে তো খেলবে চন্দনাই, সঞ্জু এইসব স্পিনে দিশেহারা।
সেকালে মামাদের নাম হতো মিলন, সোহাগ, পরাগ। পরাগায়নের ডিটেইলে আমরা যাব না। ইংরেজিতে ফেল করে বুলিমামা আবার অখ্যাত গ্রামে ফিরে গেল। স্বভাবলাজুক সঞ্জুর বুলি ফুটলো এরপর। আর চন্দনা পালিয়ে গেল একদিন।
চন্দনাকে অনেকেই খুঁজল কিন্তু পাওয়া গেল না বলে সভয়ে এবং সামাজিক লজ্জায় ওদের বাপমা পাড়া ছেড়ে চলে গেল অন্যত্র। সঞ্জুর ইশকুল বদলালো। অপরের সন্তানকে কৃপা করলে তার কত বিষম প্রতিদান পাওয়া যায় তা নিয়ে মাঝে মাঝে কেঁদে উঠতো চন্দনার মা, ওদের বাপ তার মুখ সবলে চেপে ধরতো।

টুনটুন আর ঝুনঝুন

চন্দনা আর সঞ্জু মধ্যবিত্ত পরিবারের দু'টি ছেলেমেয়ে, যারা আড়ালে একজন আরেকজনকে ডাকতো টুনটুন আর ঝুনঝুন।
ঝুনঝুন চলে যাবার পরে সঞ্জুর আকাশপাতাল জ্বর হলো একদিন। জ্বরের ঘোরে সে টের পেল সে গর্ভতরলে ভাসছে, অদূরে তার বোনের হাত, আদমের হাতের কাছে আলগোছে রাখা ঈশ্বরের হাতের মতো, যেন হাত বাড়ালেই মিলবে নাগাল।
সেরে উঠবার পর সে একেবারে অন্য মানুষ। আড়ালে আর নাচে না ক্লিক-ক্লিক করে জুতো বাজিয়ে। মৃদু গলায় পাউডারের বিজ্ঞাপনের গান গায় না। তন্ময় হয়ে কখনো ভাবে, তার বোনটা গেল কোথায়?
বাড়ি থেকে পালিয়ে সুন্দরবন যাবার বা দার্জিলিং যাবার অবিশ্বাস্য সব রোডম্যাপ বানাতো তারা, সে ভাবতো ক্যানিং গেছে তার ডাকাতিয়া বোন, হেঁতাল ঝোপের নিভৃতে বাঘের পাশে বসে তাকে মাউথ অর্গ্যান বাজিয়ে শোনাচ্ছে, পশুর নদীতে ক্যানৌ ভাসিয়ে চলেছে সমুদ্রে আর তার পাশে পাশে সাঁতরে চলেছে অজস্র ঘড়িয়াল।
চন্দনা সোনারঙ মুখে মেখে দেখছে কাঞ্চনজঙ্ঘায় আছড়ে পড়া প্রথম সূর্যোদয়, গলায় রাণীর মতো গনগনে রক্তমানিক্যের গয়না। প্রত্যন্ত কোনো গ্রামে পুকুরের তালপৈঠায় উবু হয়ে বসে চন্দনা বুলিমামার কাপড় কাচছে এটা সে ভাবতেই পারতো না। বেঁচে আছে তো তার ঝুনঝুন? পদস্খলন হলে কি আর জীবনের মূল্য থাকে না মেয়েদের? বোনের সাথে আরেকবার দেখা হবার অপেক্ষায়- যন্ত্রণায় চোখে কনকনে জল এসে যেত সঞ্জুর।
একদিন সত্যি চন্দনার সাথে দেখা হলো সঞ্জুর। দেখলো বিদ্যুৎহীন অন্ধকার গ্রামে ফিরে আসবে বলে মেয়ে ক্রিকেটাররা কিংবা ফুটবলাররা এক বাস রাজ্যের হাবিজাবি লোকের সাথে বসেছে, লোকগুলোর কনুই লাগছে তাদের বুকে আর পিঠে, তাদের কোলের কাছে জড়ো করা ব্যাগ। শিরোপাজয়ী খেলোয়াড় মেয়েরা।
অভ্যর্থনাহীন। অভিবাদনহীন। তাদের ভিতর একটি মেয়ের চেহারা হুবহু সঞ্জুর মতো, মানেই তো চন্দনার মতো। কপাল অবারিত, বলিষ্ঠ হাসি-হাসি মুখ, রোদে পুড়ে মলিন রঙ। কী আশ্চর্য, এতদিনেও ঝুনঝুনের বয়স বাড়েনি একটুও, অক্লান্ত সাহসী চেহারা এখনো, অথচ সঞ্জু বুড়িয়ে গেছে, ভারী হয়েছে, পুরু হয়েছে।
ঝুনঝুনের বয়স এতদিনেও বাড়েনি তাতে এতটুকু খটকা লাগলো না সঞ্জুর, সে ছবির ভিতর ঢুকে গিয়ে অসহ্য আগ্রহে তাকালো মেয়েটির দিকে। মেয়েটির পাশের মেয়েটিকেও দেখতে ঝুনঝুনের মতো। তাহলে কি ঝুনঝুনের যমজ মেয়ে হয়েছিল? কিন্তু সামনের সীটে বসা মেয়েটাও তো ঝুনঝুনের মতো দেখতে।
সারা বাস বোঝাই চন্দনা ঝুনঝুনিয়ে চলেছে অপ্রসন্ন গন্তব্যের দিকে। মধ্যবয়স্ক সঞ্জু দশবছরের সঞ্জুর মতো হাত বাড়িয়ে দেয় — কতদিন পর দেখা ঝুনঝুন আর টুনটুনের।
অভ্যর্থনাহীন, অভিবাদনহীন: কালসিন্দুরের মেয়েদের মাঝে চন্দনাকে খুঁজে পায় সঞ্জু।

শ্বেতপত্র কী এবং কী কাজে আসবে?

নয়া দিগন্তঃ শেখ হাসিনা সরকারের ১৫ বছরের দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে সরকারের দেয়া বক্তব্যের সাথে ভিন্নমত রয়েছে বিশ্লেষক ও বিরোধীদের। আওয়ামী লীগ সরকারের দেয়া তথ্য, বক্তব্য ও পরিসংখ্যানে বক্তব্যে দেশের অর্থনীতির সঠিক চিত্র দেখা যায়নি বলে তাদের অভিযোগ রয়েছে।

এমন প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশের অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র জানতে গত ২৮ আগস্ট একটি শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি গঠন করেছে।

গত বৃহস্পতিবার প্রথম সভায় শ্বেতপত্রের মূল উদ্দেশ্য ও কাজের পরিধি নিয়ে আলোচনা হয়।

ওই কমিটির প্রধান, অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য শ্বেতপত্র প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘এর মাধ্যমে বর্তমান সরকার উপলব্ধি করবে, কী ধরনের উত্তরাধিকারের অর্থনীতিতে তাদের কাজ করতে হবে। সেই ভিত্তিভূমি নিরূপণ করাই আমাদের কাজ।’

শ্বেতপত্রে ‘মেগা প্রকল্প' নিয়ে পর্যালোচনা করার কথাও জানান তিনি।

৯০ দিনের মধ্যে এটি সরকারকে জমা দেয়ার কথা বলা হয়েছে প্রজ্ঞাপনে।

এবার কি তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতির‘সত্যিকার চিত্রটি' দেখা যাবে?

শ্বেতপত্র কী, কেন করা হয়?
শ্বেতপত্রের ধারণাটি এসেছে যুক্তরাজ্যের সংসদীয় ব্যবস্থা থেকে।

‘সরকারের দ্বারা প্রকাশিত কোনো নীতিগত নথি যেখানে সংসদীয় প্রস্তাবনা থাকে, সেগুলোই শ্বেতপত্র,‘ যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের ওয়েবসাইটে এভাবেই শ্বেতপত্রের বর্ণনা দেয়া আছে।

এর ফলে, অধিকতর আলাপ-আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়।

অর্থনীতি ও বিনিয়োগ বিষয়ক জ্ঞানকোষ ইনভেস্টোপিডিয়া থেকে জানা যাচ্ছে, উনবিংশ শতাব্দীর ব্রিটেনে পার্লামেন্ট রিপোর্টের প্রচ্ছদ থাকতো নীল রঙের। যদি রিপোর্টের বিষয়বস্তু সরকারের জন্য কম গুরুত্বপূর্ণ হতো নীল প্রচ্ছদ বাদ দিয়ে সাদা প্রচ্ছদেই সেগুলো প্রকাশ করা হতো। সেই রিপোর্টগুলোকে বলা হতো হোয়াইট পেপারস্।

তবে, আগে ‘বাংলাদেশে এ প্রথার প্রচলন সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী‘ দেখা গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে জাতীয় জ্ঞান কোষ বাংলাপিডিয়ায়।

সেখানে বলা হয়েছে, ‘এ প্রথা কোনো প্রস্তাবিত নীতি বা জনস্বার্থ সম্পর্কিত সমস্যার সাথে যুক্ত নয়। বরং কোনো রাজনৈতিক দলের সরকার পরিচালনার পরবর্তী সময়ে অন্য কোনো রাজনৈতিক দল কর্তৃক শাসক দলের কুকীর্তির দলিল হিসেবে শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হয়।‘

যদিও, এবারেরটি ‘দুর্নীতি ধরার কমিটি নয়‘ বলে জানিয়েছেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

‘দুর্নীতি কেন হয়েছে এবং মাত্রাটা কী, সেটা বলবে এই কমিটি,‘ যোগ করেন তিনি।

‘কিন্তু কে দুর্নীতি করেছে, কেন করেছে সেটা বলা আমাদের দায়িত্ব না,‘ উল্লেখ করে ভট্টাচার্য বলেন, এর জন্য সরকারের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান আছে।

বাংলাদেশে শ্বেতপত্র প্রকাশের ঘটনা এবারই প্রথম নয়।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ২০০১ সালে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করে।

তাতে আওয়ামী লীগ সরকারের আগের মেয়াদের বিভিন্ন অসঙ্গতির কথা তুলে ধরা হয়।

২০২১ সালে একদল বেসামরিক নাগরিকদের, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা একটি গণকমিশন গঠন করেন।

তারা পরের বছর ‘বাংলাদেশে মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের ২০০০ দিন‘ নামে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করে।

তবে,‘ইসলাম বিদ্বেষ' এর অভিযোগে এটি নিয়ে সেসময় বিতর্ক দেখা দেয়।

অর্থনীতির‘হেলথ চেক আপ'
চলতি বছরের মে মাসে বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, সাত বছরে দ্বিগুণ হয়েছে বাংলাদেশের ঋণ।

জানা যায়, ২০২৩ সালের শেষ প্রান্তিকে বাংলাদেশের সার্বিক ঋণ ১০০.৬৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।

এর মধ্যে ৮০ ভাগই সরকারের ঋণ।

আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তাদের সময়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক দায় নিয়ে কয়েকটি স্থানীয় গণমাধ্যমও প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়, শেখ হাসিনার সরকার ঋণ রেখে গেছে ১৮ লাখ কোটি টাকা।

বিগত বছরগুলোতে মূল্যস্ফীতি, অর্থ পাচার, ব্যাংক ও আর্থিক খাতের অবস্থাসহ বিভিন্ন প্রকল্পের দুর্নীতি সংবাদের শিরোনাম হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে কেমন অর্থনৈতিক অবস্থা পেলো সেটি বুঝতে অর্থনীতির একটা ‘হেলথ চেক আপ‘-এর কথা বলেছেন শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য জাহিদ হোসেন।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক এই প্রধান অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘বর্তমানে অর্থনীতি কোন অবস্থায় আছে, উত্তরাধিকারসূত্রে কী পাওয়া গেছে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কীভাবে চলছে সেগুলোকে চিত্রায়িত করার কাজটাই করবো। এটা স্বাস্থ্য পরীক্ষার মত।‘

এছাড়া ‘মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষাও করা হবে‘ বলে তিনি বলছেন। এর ব্যাখ্যা হিসেবে জাহিদ হোসেন বলেন, পলিসি বা নীতিগত দিকটা কীভাবে চলছে, সেই পর্যালোচনাও থাকবে শ্বেতপত্রে।

বৃহস্পতিবার প্রথম বৈঠক শেষে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘আমরা ব্যাংক ও আর্থিক খাতের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করব না। তারল্যসঙ্কট, নামে-বেনামের ঋণ, সঞ্চিতি ঘাটতি এসব বিষয়ে পর্যালোচনা করা হবে।‘

‘আর যেন টাকা পাচার না হয়, টাকা পাচার করলে শাস্তি পেতে হবে, এমন কথা বলা থাকবে শ্বেতপত্রে,‘ যোগ করেন তিনি।

পর্যালোচনায় থাকবে মেগা প্রকল্পও

গত ১৫ বছরে বাংলাদেশে বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়।

এর মধ্যে আকৃতি ও প্রভাব বিবেচনায় বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্পও রয়েছে। কোনো কোনো মেগা প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে, কোনোটির কাজ চলমান।

আওয়ামী লীগ সরকার তাদের অর্জন হিসেবে এসব মেগা প্রকল্পের কথা বেশ জোরেসোরেই প্রচার করে আসছিল।

তবে, পদ্মাসেতুসহ মেগাপ্রকল্পগুলোতে ব্যাপক দুর্নীতি অভিযোগ করে আসছে বিএনপিসহ সরকার বিরোধীরা।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার স্বার্থে প্রকল্প নিয়ে কাজ করবে শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি।

সময় স্বল্পতার কারণে সব প্রকল্প বিশ্লেষণ করবেন না জানিয়ে তিনি বলেন,‘তবে আমরা মেগা প্রজেক্ট নিয়ে আলোচনা করবো। মেগা প্রজেক্ট নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে যদি কোনো একটি বিশেষ প্রজেক্টের ওপর মনোযোগ দিতে হয় সেটা হয়তো আমার সহযোগীরা দেবেন।‘

কোন কোন মেগা প্রকল্প পর্যালোচনায় থাকতে পারে এমন প্রশ্নে কমিটির অন্যতম সদস্য জাহিদ হোসেন সময়ের বাধ্যবাধকতার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘এখনই নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়, কাজগুলো কতদূর পর্যন্ত করা সম্ভব হবে।‘

সঠিক চিত্র পাওয়া যাবে?
সম্প্রতি রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসের রফতানি আয়ের হিসেবে বড় ধরনের অসামাঞ্জস্য ধরা পড়ে।

রফতানির বাৎসরিক হিসেবে প্রকৃত পরিমাণের চেয়ে ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বেশি দেখানোর ঘটনা বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়।

সরকারি সংস্থাগুলো পরিসংখ্যান নিয়ে অর্থনীতিবিদদের বিভিন্ন সময় সংশয় প্রকাশ করতেও দেখা গেছে।

ফলে তাদের দেয়া তথ্য উপাত্তের ওপর ভর করে পাওয়া চিত্র কতটা সঠিক হবে তা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়।

বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির সদস্য জাহিদ হোসেনও বলেন, ‘তথ্যেরও তো অনেক ধরনের সমস্যা আছে।‘

‘যা তথ্য অ্যাভেইলেবল আছে অর্থাৎ, বিবিএস (পরিসংখ্যান ব্যুরো), ইপিবি এবং অন্য সংস্থাগুলোর কাছে যা আছে তার ভিত্তিতে অর্থনীতির একটা বস্তুনিষ্ঠ চিত্রায়ণ এখানে আশা করা যেতে পারে,‘ যোগ করেন তিনি।

শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটিতে অর্থনীতিবিদ ছাড়াও জ্বালানি, অভিবাসন, উন্নয়ন ও সুশাসনের মত বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞ রয়েছেন।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘নীতি বিশ্লেষক‘ বা ‘বিষয় বিশেষজ্ঞ‘ হিসেবে কমিটির সদস্যরা তাদের মতামত দেবেন।

সূত্র : বিবিসি

নিষিদ্ধ ও গভীর রহস্যের দেশ তিব্বত

অদ্ভুত এক দেশ তিব্বত। নিষিদ্ধ দেশ নামেও এটি পরিচিত। নিষিদ্ধ হওয়ার পেছনে রয়েছে হাজার বছরের পুরনো ইতিহাস। রহস্যের বেড়াজালে ঘেরা তিব্বতের রাজধানী লাসাকেই মূলত নিষিদ্ধ বলা হয়ে থাকে। তবে বহির্বিশ্বের সবাই পুরো তিব্বতকেই নিষিদ্ধ বলে জানে। সেখানকার বাসিন্দারাও নিষিদ্ধ দেশের নাগরিক হিসেবে বেশ গর্ববোধও করে থাকেন।

১৯১২ সালে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে নিজেকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করে তিব্বত। এর রাজধানী লাসা। যার মানে দেবতাদের ভূমি। তিব্বতের আয়তন প্রায় ১২ লাখ ২৮ হাজার ৪০০ বর্গকিলোমিটার। ১৯৬৯ সাল থেকে তিব্বতিরা ধর্মগুরু হিসেবে দালাইলামার অধীনে চীনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিতে থাকে। কিন্তু সে আন্দোলন সফলতার মুখ দেখেনি। চীন এখনো তিব্বতকে নিজেদের অংশ বলে মনে করে থাকে। এর বর্তমান পরিচয় স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসেবে। তিব্বতীয়দের ভাষা চীনা। বুদ্ধিস্ট ছাড়াও মঙ্গল ও মাঞ্চু সংস্কৃতি সমৃদ্ধ করেছে এই অঞ্চলকে।

তিব্বত নিষিদ্ধ হওয়ার পেছনে রয়েছে এর প্রাকৃতিক পরিবেশ আর বাসিন্দাদের জীবনযাত্রা। আরও একটি সূক্ষ্ম কারণ রয়েছে, যা খতিয়ে দেখেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, তিব্বত বছরের প্রায় ৮ মাস বরফে ঢাকা থাকে। এ কারণে এক পর্যায়ে এটি দুর্গম স্থান বলে বিবেচিত হয়। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা আর উচ্চতায় বসবাস করাও বেশ কষ্টের।

তিব্বতের রাজধানী লাসায় দীর্ঘদিন অন্যদেশের নাগরিকদের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ ছিল। ফলে গোটা রাজ্যই চলে যায় রহস্যের আড়ালে। ১৯৮০ সালে সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে দেওয়া হয়। জানা যায়, তিব্বতে কারও মৃত্যু হলে সঙ্গে সঙ্গেই তাকে সৎকার করা হয় না! তিব্বতিরা আত্মায় প্রবল বিশ্বাসী। তারা বিশ্বাস করেন, মৃত মানুষের আত্মা মরে যাওয়ার পরও এই জগতে বিচরণ করতে থাকে। তাই যে পর্যন্ত তাদের আত্মা জগৎ না ছাড়ে, সে পর্যন্ত তারা মৃতের সৎকার করেন না! আর ততক্ষণ সেই মরদেহ তাদের বাসাতেই রেখে দেন।

তিব্বতিদের অদ্ভুত সংস্কৃতি বা তাদের পরিবেশ, আবহাওয়া ইত্যাদি যেন ছাড়িয়ে গেছে নিষিদ্ধ দেশের খেতাবে। হিমালয়ের এই দেশে কার না ঘুরে বেড়াতে মন চাইবে? এতো শুভ্র সুন্দর, মনোরম দেশ পৃথিবীর বুকে আর কোথাও মেলা ভার। 

তিব্বতের দৃষ্টিনন্দন এলাকা। ছবি : সংগৃহীত

নির্বাচন আয়োজনে অযৌক্তিক সময় নষ্ট করা হবে না : প্রধান উপদেষ্টা

জাতীয় নির্বাচন আয়োজনে অন্তর্বর্তী সরকার অযৌক্তিক সময় নষ্ট করবে না বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। শনিবার (৩১ আগস্ট) বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠককালে এ কথা বলেন তিনি। বৈঠক শেষে দলগুলোর প্রতিনিধিরা সংবাদমাধ্যমকে এ তথ্য জানান।

নেতারা জানান, প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে দ্রুত সময়ে নির্বাচনী পরিবেশ তৈরির জন্য প্রধান উপদেষ্টার কাছে দাবি জানানো হয়।

তারা আরও জানান, সংলাপে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য নিশ্চিত করা, দুইবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী না হওয়া, নির্বাচনী ব্যবস্থাসহ সাংবিধানিক বেশ কিছু সংস্কারের দাবিও উপস্থাপন করেছেন নেতারা।

এ সময় প্রধান উপদেষ্টা যৌক্তিক সময়ে সব কিছুর সমাধান করে দেশকে নির্বাচনের দিকে নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বলেও মন্তব্য করেন তারা।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর নির্বাচন আয়োজন নিয়ে রাজনৈতিক দল এবং জোটের সঙ্গে মতবিনিময় শুরু করেছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

এর আগে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক করেন খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামী, খেলাফত আন্দোলন, ইসলামী আন্দোলন এবং নেজামে ইসলাম বাংলাদেশ- এই ৭টি সংগঠনের শীর্ষ নেতারা।

খেলাফত মজলিসের নেতৃত্ব দেন সংগঠনটির আমির মাওলানা আবদুল বাছিত আজাদ। প্রতিনিধি দলে ছিলেন দলটির মহাসচিব অধ্যাপক আহমদ আবদুল কাদের, নায়েবে আমির মাওলানা সাখাওয়াত হোসেন, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব জাহাঙ্গীর হোসেন, যুগ্ম মহাসচিব মুনতাসীর আলী ও প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক কাজী মিনহাজুল ইসলাম মিলন।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নেতৃত্ব দেন দলটির আমির মাওলানা ইউসুফ আশরাফ। তার প্রতিনিধি দলে ছিলেন মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক ও যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা জালাল উদ্দিন।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেন দলের আমির চরমোনাই পীর মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম। তার সঙ্গে ছিলেন মুফতি ফয়জুল করীম, অধ্যক্ষ ইউনুস আহমেদ, মাওলানা গাজী আতাউর রহমান, আশরাফুল আলম প্রমুখ।

জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের একাংশের নেতৃত্ব দেন সংগঠনের মহাসচিব মাওলানা মনজুরুল ইসলাম আফেন্দি।

হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্ব দেন মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমান। তার সঙ্গে ছিলেন আজিজুল হক ইসলামাবাদী, কেন্দ্রীয় নেতা মুনীর হোসেন কাশেমী।

নেজামী ইসলামের নেতৃত্ব দেন দলটির নির্বাহী সভাপতি মাওলানা আশরাফুল হক। তার সঙ্গে ছিলেন মহাসচিব মাওলানা মোমিনুল ইসলাম। খেলাফত আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন নায়েবে আমির মাওলানা মজিবুর রহমান হামেদি।

শিগগিরই সংস্কারের রূপরেখা দেবেন প্রধান উপদেষ্টা

রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে শিগগিরই সংস্কারের একটি রূপরেখা দেবেন অন্তর্বতীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সেই লক্ষ্যে তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।

শনিবার (৩১ আগস্ট) বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় মতবিনিময় করেন প্রধান উপদেষ্টা। যা শেষ হয় রাত ৮টার দিকে। পরে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।

তিনি বলেন, মতবিনিময়ে হেফাজতে ইসলামের নেতারা বলেছেন, তাদের দুইশোর মতো মামলা এখনো রয়ে গেছে। সেগুলো প্রত্যাহার করতে হবে। ২০১৩ সালে হেফাজতের ওই সমাবেশের সময় একটা বড় ধরনের হত্যাকাণ্ড হয়েছিল। এরপরে ২০১৬ এবং ২০২১ সালে যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে এসেছিলেন তখন ওই সময় প্রতিবাদে অনেকেই মারা গেছেন। এসব বিষয়ে নেতৃবৃন্দ নতুনভাবে তদন্ত চেয়েছেন যাতে ওনারা জানতে পারেন ঠিক কতজন মারা গেছেন।

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব বলেন, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ শিক্ষানীতি নিয়েও কথা বলেছেন। তারা বলেছেন যে, তারা শিক্ষানীতির সংস্কার চান। ইসলামী দলগুলো তাদের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছেন। বিশেষ করে গ্রেপ্তারের পর হেফাজতে যে নির্যাতন করা হয়, কয়েকজনকে খুব বেশি নির্যাতনের কথাও তারা বলেছেন। অনেকগুলো রাজনৈতিক দল প্রকৌশল রিপ্রেজেন্টেশনের কথা বলেছেন।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রেস সচিব বলেন, একটি রূপরেখা প্রধান উপদেষ্টা শিগগিরই দেবেন। তার আগে তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে মতবিনিময় করছেন। তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর কথা ভালোভাবে শুনছেন। আগামীতে আরো অনেক কথা হবে। এরপরই তিনি একটির উপর দাঁড় করাবেন।

তিনি বলেন, এর আগে কিন্তু বিএনপির সঙ্গেও কথা হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় আজকে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক হচ্ছে। আপনারা জানেন যে, ছাত্র জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে এ সরকার এসেছে। তাহলে এই সরকারের কাছে ছাত্র জনতার চাওয়াটা কি? মূল চাওয়াটা হচ্ছে সংস্কার কিভাবে হবে। আপনি কি সেটা এই সংবিধান দিয়ে করবেন। নাকি সংবিধান সংশোধন করবেন। এই কথাগুলো তো পলিটিক্যাল পার্টিগুলোই জানাবে। আর এই কথাগুলোই উনি জানতে চেয়েছেন পলিটিক্যাল পার্টিগুলোর কাছ থেকে।

‘অনেকেই এই কথাগুলো বলেছেন। যেমন জাতীয় পার্টি বলেছে যে, সংবিধান সংশোধন করার কথা। একইসঙ্গে তাদের একজন নেতা বলেছেন যে, বিদ্যমান কাঠামোতেই সংবিধানকে নতুনভাবে লেখা যায়। গণফোরামের পক্ষ থেকেও একই ধরনের মন্তব্য করা হয়েছে। তবে তারা এটি আরো কংক্রিট আকারে জানাবেন। কেননা তাদের দলেরই কয়েকজন এটা নিয়ে ডিফার করছেন,’ বলেন তিনি।

শফিকুল আলম বলেন, মোটকথা হলো বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের মাত্র তিন সপ্তাহ হয়েছে এই সময়ের মধ্যে উনি প্রায় প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বসছেন এবং তিনি জানতে চাচ্ছেন যে কি করলে কি করা যায়। অনেকেই বলেছেন প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা একটু বাড়ানো হোক। আবার যিনি প্রধানমন্ত্রী হবেন তিনি যেন দুইবারের বেশি না হতে পারেন এ ধরনের কথা অনেকবার এসেছে।

সপ্তাহব্যাপী যুদ্ধবিরতিতে সম্মত ফিলিস্তিনি যোদ্ধারা

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যাকায় বর্বর হামলা চালিয়ে আসছে ইসরায়েল। দেশটির এ হামলায় প্রতিনিয়ত প্রাণ হারাচ্ছে বিপুল সংখ্যক মানুষ। দুই দেশের মধ্যকার হামলা-পাল্টাহামলা ঠেকাতে যুদ্ধবিরতির চেষ্টা চালিয়েছে একাধিক দেশ। তবে নানা কারণে তা আলোর মুখ দেখেনি।

এমন পরিস্থিতিতে গাজায় ভয়াবহ সংক্রামক পোলিও হানা দিয়েছে। এর মধ্যে সপ্তাহব্যাপী যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামীদের সংগঠন হামাস।

ইরানের সংবাদমাধ্যম ইরনার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বল বলা হয়েছে, জাতিসংঘ মহাসচিবের প্রস্তাবের সঙ্গে একমত হয়েছে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। তারা গাজায় সপ্তাহব্যাপী যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছেন। গোষ্ঠীটির মুখপাত্র জিহাদ তাহা এ তথ্য জানিয়েছেন।

ইরনা জানিয়েছে, সংবাদমাধ্যম নিউ আরবের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের প্রস্তাবিত সপ্তাহব্যাপী যুদ্ধবিরতিতে তারা সম্মত হয়েছে। গত ১৬ আগস্ট প্রস্তাব মেনে শর্ত ঘোষণা করে হামাস।

হামাস মুখপাত্র বলেন, তারা গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য সব মানবিক সংস্থা এবং প্রতিষ্ঠানকে তাদের মানবিক বাধ্যবাধকতা পূরণের আহ্বান জানিয়েছে। ইসরায়েলকে এ যুদ্ধবিরতিতে অবশ্যই সম্মত হওয়া উচিত। এটি এড়ানো বা স্থগিত করার জন্য বিকল্প শর্তারোপ করা উচিত নয়। এছাড়া ইসরায়েলকেও গাজায় মানবিক যুদ্ধবিরতি মেনে চলার আহ্বান জানান তিনি।

জিহাদ তাহা বলেন, ইসরায়েলের অমানবিক কর্মকাণ্ডকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অবশ্যই ব্যর্থ করে দিতে হবে। বিশেষ করে গাজার ১০ বছরের কম ছয় লাখ ৪০ হাজার শিশুর পাশাপাশি গত ৭ অক্টোবরের পর জন্ম নেওয়া ৫০ হাজার শিশুকে টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত করার অপচেষ্টা রুখে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

কিছু মিশরীয় সূত্রের বরাতে নিউ আরব জানিয়েছে, গাজায় পোলিও টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়নের পথ প্রশস্ত করতে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে গাজায় একটি মানবিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হতে পারে।

ভ্যানে লাশ তোলার ভাইরাল ভিডিওর পুলিশ কর্মকর্তা আ.লীগ নেতার ছেলে

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে নিহত রাস্তায় পড়ে থাকা লাশ একটি ভ্যানগাড়িতে স্তূপ করছে পুলিশ।

ভিডিওতে লাশের স্তূপ করতে ব্যস্ত এক পুলিশ সদস্যকে দেখা যায়। তিনি হলেন- ঢাকা জেলা উত্তর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক (তদন্ত) আরাফাত হোসেন। তার গ্রামের বাড়ি বরিশালে। প্রায় দুই বছর আগে ঢাকা জেলার গোয়েন্দা বিভাগে যোগ দেন। তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগে পড়াশোনা করেন।

আরাফাতের বাবা মো. আরিফ হোসেন বদরটুনী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক এবং হরিনাথপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি।

ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর থেকে আরাফাতকে আর পাওয়া যাচ্ছে না। আত্মগোপনে চলে গেছেন তিনি। তার মোবাইলফোন নম্বরটিও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।

এদিকে ভিডিওর চিত্রটির স্থান সম্পর্কে জানা গেছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া এই ভিডিওটি সাভারের আশুলিয়া থানার।

এর আগে শুক্রবার (৩০ আগস্ট) সারা দিন ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ভাইরাল হয়। ভিডিওটি আশুলিয়া থানার সামনের ভবনের দ্বিতীয়তলা থেকে ধারণ করা বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

আর ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর থেকে আরাফাত হোসেন ফোন বন্ধ করে গা-ঢাকা দিয়েছেন। ভিডিওতে থাকা অন্যান্য পুলিশ সদস্যদের পরিচয় এখনো পাওয়া যায়নি।

ভাইরাল হওয়া ১ মিনিট ১৪ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, দুজন পুলিশ সদস্যের একজন হাত ও একজন পা ধরে ভ্যানে নিক্ষেপ করছেন। এর আগেই ভ্যানে লাশের স্তূপ করে কাপড় দিয়ে ঢেকে দেন তারা। সর্বশেষ লাশটি তুলে একটি ব্যানার দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। শেষে পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতি দেখা মেলে।

ভিডিওর ১ মিনিট ৬ সেকেন্ডে একটি পোস্টার দেখা যায়, যা স্থানীয় ধামসোনা ইউনিয়ন সভাপতি প্রার্থী ও ৭নং ওয়ার্ডের মেম্বার প্রার্থী আবুল হোসেনের। সেই পোস্টারটি দেখে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে ভিডিওটির ঘটনাস্থল আশুলিয়া থানার পাশে।

মহাসড়ক থেকে থানার দিকে অগ্রসর হয়ে এসবি অফিসের দিকে চৌরাস্তায় এ ঘটনা ঘটেছে। ভেতরে ভিডিওতে থাকা বালুভর্তি বস্তাগুলো এসবি অফিসের দিকে যেতে থাকা ভবনের সামনে স্তূপ করা ছিল। কিন্তু থানা পরিষ্কারের সময় সেগুলো অপসারণ করা হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, একটি ড্রোন উড়িয়ে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার অবস্থান শনাক্ত করা হয়। তবে সেটি পুলিশের ড্রোন কি না তা জানি না। থানার বিভিন্ন গলিতে ছাত্র-জনতা প্রবেশ করলে তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে পুলিশ। এসময় বেশ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। পুলিশ লাশগুলো তাদের থানার সামনে নিয়ে যায়। সেখানে একটি পুলিশভ্যানে লাশগুলো রেখে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়।

এব্যাপারে ঢাকা জেলা উত্তর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ বিপ্লব সংবাদমাধ্যমকে বলেন, আরাফাতের ছবিটি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়ার পর আরাফাত ভেঙে পড়েছে।

তিনি কোথায় আছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আরাফাত এখনো অফিসে আসেনি। আমরা সেদিন ছাত্র-জনতার দিকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়িনি যোগ করেন তিনি।

তিনি বলেন, আমরা সেদিন ‘ঢাকা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্) আব্দুল্লাহিল কাফীর নির্দেশনা পালন করেছি।

প্রসঙ্গত, বৈষম্যবিরোধী কোটা আন্দোলনকারীরা গত ৫ আগস্ট ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বাইপাইল এলাকায় জমায়েত হতে থাকেন। পরে শেখ হাসিনার দেশ ত্যাগের খবরে আন্দোলনকারীরা আশুলিয়া থানার দিকে অগ্রসর হয়। এসময় আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে পুলিশ। এ ঘটনায় ৫ আগস্ট আশুলিয়ায় ১৫ জনের মৃত্যু হয় (ভ্যানে তোলা লাশের হিসাব বাদে)।

জানা গেছে, সাভার ও আশুলিয়ায় গত ১৮ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন ৭৫ জন। গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন সাড়ে ৪ শতাধিক মানুষ। যাদের অনেকেই চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেছেন।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতাবিরোধী সব কালাকানুন বাতিলের দাবি সাংবাদিক নেতাদের

সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টসহ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বিরোধী সকল কালাকানুন বাতিল, সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনিসহ সাংবাদিক হত্যার বিচার, সাংবাদিক সুরক্ষা আইন প্রণয়ণ এবং সাংবাদিক নেতৃবৃন্দের নামে বানোয়াট নিউজ পরিবেশনের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন সাংবাদিক নেতারা।

শনিবার (৩১ আগস্ট) সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) উদ্যোগে সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টসহ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বিরোধী সকল কালাকানুন বাতিল, সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনিসহ সাংবাদিক হত্যার বিচার, সাংবাদিক সুরক্ষা আইন প্রণয়ণ এবং সাংবাদিক নেতৃবৃন্দের নামে বানোয়াট নিউজ পরিবেশনের প্রতিবাদে অনুষ্ঠিত সাংবাদিক সমাবেশে নেতৃবৃন্দ এসব দাবি জানান।

সমাবেশে সাংবাদিক নেতৃবৃন্দের নামে মিথ্যাচারের ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়।

ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. শহিদুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে অন্যদের মধ্যে বিএফইউজে সভাপতি, বীর মুক্তিযোদ্ধা রুহুল আমিন গাজী, মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক, সভাপতি ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কবি আবদুল হাই শিকদার, দ্য নিউনেশনের সাবেক এডিটর মোস্তফা কামাল মজুমদার, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক খুরশীদ আলম, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও দৈনিক আমার দেশের নির্বাহী সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমদ, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক সভাপতি মোরসালিন নোমানী, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মোহাম্মদ শাহ নওয়াজ, রংপুর সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি সালেকুজ্জামান সালেক, মুন্সীগঞ্জ সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি কাজী বিপ্লব হাসান ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ রুবেল, বিএফইউজে'র সহসভাপতি খায়রুল বাশার, সাবেক সহসভাপতি জাহিদুল করিম কচি, সাংবাদিক নেতা বাছির জামাল, এরফানুল হক নাহিদ, শাহীন হাসনাত, খন্দকার আলমগীর, সাঈদ খান বক্তব্য দেন। সমাবেশ সঞ্চালনা করেন ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক দিদারুল আলম।

সমাবেশে রুহুল আমিন গাজী বলেন, ফ্যাসিবাদ পতনের পর কোনো দাবি দাওয়ার জন্য রাজপথে নামতে হবে এটা আমাদের প্রত্যাশিত ছিল না। তবে দুঃখের বিষয় হচ্ছে— সাগর রুনি হত্যাকাণ্ডের বিচার চাইতে আমাদের রাজপথে নামতে হচ্ছে। সাগর-রুনির হত্যার বিচার চাইতে হবে কেন? এটা নিয়ে এত টালবাহানা কেন। কেন আপনারা একটি তদন্ত কমিটি গঠন করলেন না। কেন কোনো পুলিশের ইনকোয়ারি করেন নাই, তা আমার কাছে বোধগম্য নয়। অবিলম্বে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের বিচার করতে হবে।

সমাবেশে সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে বিএফইউজের সভাপতি বলেন, ষড়যন্ত্র করে গণতন্ত্রকে নস্যাৎ করতে পারবেন না। ছাত্র জনতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে নতুন বাংলাদেশ গঠিত হয়েছে, সে বাংলাদেশকে কলুষিত করার ক্ষমতা আপনার নেই। সুতরাং, সব ষড়যন্ত্র থেকে বেরিয়ে আসুন। সোজা পথে চলেন, আমরা আপনাদের সঙ্গে নিয়ে চলতে চাই। যদি সোজা পথে না চলেন, তাহলে দায়-দায়িত্ব আপনাদেরকে বহন করতে হবে, আমরা করব না।

তিনি সাংবাদিক নেতৃবৃন্দের চরিত্র হনন করে ভুয়া বানোয়াট সংবাদ পরিবেশনের নিন্দা জানিয়ে বলেন, এ কেমন সাংবাদিকতা? অপসাংবাদিকতা সাংবাদিক সমাজ সহ্য করবে না। মানুষের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করার জন্য, সাংবাদিকদের চরিত্র হনন গণমাধ্যের কাজ নয়।

তিনি আরও বলেন, একটি পত্রিকার সম্পাদক আমাকে বললেন গণভবনে আমি দাওয়াত পেলাম না কেন? আমি এখন থেকে পত্রিকায় আপনার বিরুদ্ধে লিখব। এদের কিছুতেই ছাড় দেওয়া যাবে না।

কবি আবদুল শিকদার বলেন, ১২ বছরেও সাগর-রুনি হত্যার বিচার না হওয়া দুঃখজনক। এ হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। গত ১৫ বছরে ৬৪ জন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি খুনের শিকার সাংবাদিকদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ প্রদানের দাবি জানান।

সাংবাদিকদের এ নেতা বলেন, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যে সাংবাদিক নেতারা লড়াই করেছেন তাদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা করা হচ্ছে, মিথ্যাচার করা হচ্ছে। এসব বন্ধ করতে হবে।

সমাবেশে বিএফইউজের মহাসচিব কাদের গণি চৌধুরী বলেন, সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনির হত্যার ১২ বছর হয়ে গেছে। কিন্তু আমরা কোনো বিচার পাইনি। যেহেতু ফ্যাসিবাদ মুক্ত হয়েছে, তাই বর্তমান সরকারকে বলতে চাই— অবিলম্বে সাগর রুনি হত্যাকাণ্ডের বিচার করতে হবে। আমরা যেমন সাংবাদিক সুরক্ষা আইন চাই, ঠিক একইভাবে আর কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মসূচিতে গিয়ে যেন কোনো সাংবাদিক আহত না হয় সেটাও চাই।

সভাপতির বক্তব্যে মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যারা লড়াই করেছেন সে সব সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে কিছু মিডিয়া মিথ্যাচার করছে। তাদের চরিত্র হনন করছে। এটা সহ্য করা হবে। যারা এসব অপকর্মে জড়িত তাদের খুঁজে বের করতে তিন সদস্যের তদন্ত করা হবে। তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। সাংবাদপত্রকে ব্যবহার যাচ্ছেতাই করবেন এটা হতে পারে না।

সমাবেশে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) প্রধান প্রতিবেদক মোরসালিন নোমানি বলেন, আমি তিনটি বিষয়ে কথা বলতে চাই। প্রথমটি হচ্ছে, সাগর রুনির হত্যাকাণ্ড। এই হত্যাকাণ্ডের ১২ বছরের বেশি সময় পার হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের সময় বলা হয়েছিল, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের ধরা হবে। কিন্তু এত দিনেও তা ধরা হয়নি। আমার দাবি হচ্ছে, সাগর-রুনির হত্যার সময় তৎকালীন যনি পুলিশ প্রধান ছিলেন, তাকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হোক।

‘দ্বিতীয়টি হচ্ছে, স্বৈরাচার সরকারের পতনের সময় যে চার জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন, তাদের পরিবারের দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে। আর তৃতীয়টি হচ্ছে, ১৬ বছর ফ্যাসিস্ট সরকার ক্ষমতার সময়ে যে সব সাংবাদিক তেল দেওয়ার কাজ করেছিল, তাদের চিহ্নিত করতে হবে। যাতে করে আর তারা কোনও সংবাদ সম্মেলন না করতে পারে।’

তিনি সাংবাদিক নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে বানোয়াট সংবাদ পরিবেশেনের নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে নোংরামি থেকে সংশ্লিষ্টদের সরে আসার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আমাদের নেতাদের চরিত্র হনন করবেন এসব সহ্য করা হবে না।

যুবদলের নামে চাঁদাবাজি করতে গিয়ে ছাত্রলীগ নেতা ধরা

জাতীয়তাবাদী যুবদলের নাম ভাঙিয়ে এক ছাত্রলীগ নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। শনিবার (৩১ আগস্ট) দিবাগত রাত সোয়া ১২টার দিকে গুলশান-২ এর ৬২ নম্বর রোডে মোস্তাফিজুর রহমান সিজারের বাসায় চাঁদাবাজি করতে যান গুলশান থানা ছাত্রলীগ নেতা সাব্বিরসহ পাঁচজন।

পরে তাদেরকে ধরে গুলশান থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

শনিবার দিবাগত রাত পৌনে ১টার দিকে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের আহ্বায়ক শরিফ উদ্দিন জুয়েল কালবেলাকে জানান, বিএনপির কেন্দ্রীয় তথ্য বিষয়ক সম্পাদক আজিজুল বারী হেলাল ও যুবদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়নের মাধ্যমে তিনি চাঁদাদাবির বিষয়টি জানতে পারেন।

তিনি বলেন, এরপর চাঁদাবাজদের ধরতে তাৎক্ষণিকভাবে গুলশান ও বনানী থানার যুবদল নেতাদের সেখানে পাঠাই। দেখা যায়, গুলশান থানা ছাত্রলীগ নেতা সাব্বিরের নেতৃত্বে মোট পাঁচজন মোস্তাফিজুর রহমান সিজারের বাড়িতে গিয়ে যুবদলের নামে চাঁদা দাবি করেছে। পরে তাদেরকে ধরে গুলশান থানা পুলিশের নিকট হস্তান্তর করা হয়।

বিষয়টি নিশ্চিত করে গুলশান থানার ডিউটি অফিসার (এসআই) আনোয়ার হোসেন খান কালবেলাকে বলেন, আটকৃতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ব্যাপক বাগ্‌বিতণ্ডা

ফিলিস্তিনের গাজায় যুদ্ধবিরতি ও হামাসের হাতে জিম্মি ব্যক্তিদের বিষয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের মধ্যে ব্যাপক বাগ্‌বিতণ্ডা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে দেশটির নিরাপত্তাসংক্রান্ত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ ঘটনা ঘটে।

ইসরায়েলের বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, কোনো চুক্তির অংশ হিসেবে ফিলাডেলফি করিডোর থেকে ইসরায়েলি সেনারা সরে যাবেন কি না, এমন প্রশ্নে ঝগড়া করেন নেতানিয়াহু ও গ্যালান্ট। ১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই করিডর গাজা-মিসর সীমান্তে অবস্থিত।

বর্তমানে ফিলাডেলফি করিডর ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। গাজায় যুদ্ধবিরতি চলাকালে এই করিডরে ইসরায়েলি সেনা মোতায়েন রাখা নিয়ে হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে বিবাদ রয়েছে। হামাসের দাবি, যুদ্ধবিরতি চলাকালে সীমান্ত এলাকা থেকে ইসরায়েলি সেনাদের সরিয়ে নিতে হবে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবারের বৈঠকে নেতানিয়াহু একটি ম্যাপ দেখিয়ে বলেন, মন্ত্রিসভার অনুমোদন সাপেক্ষে তিনি ফিলাডেলফি করিডরে ইসরায়েলি সেনা মোতায়েন করে রাখতে চান। তখন গ্যালান্ট বলেন, এতে হামাস একমত হবে না। ফলে তারা কোনো যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে যাবে না। এর জেরে জিম্মি ব্যক্তিদেরও ইসরায়েলে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না।

বিষয়টি নিয়ে নেতানিয়াহু ও গ্যালান্টের মধ্যে বেশ কিছু সময় উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় চলে। একপর্যায়ে গ্যালান্ট বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীই যেহেতু সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তিনি সব জিম্মিদের হত্যার বিষয়েও সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। ৩০টি মানুষের জীবন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।’

পরে নেতানিয়াহুর উপস্থাপন করা ম্যাপের অনুমোদনের জন্য ভোটাভুটির আয়োজন করা হয়। নেতানিয়াহুর পক্ষে ভোট পড়ে আটটি। বিপক্ষে ভোট দেন শুধু গ্যালান্ট। আর ভোটদানে বিরত ছিলেন ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভির।

গত ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের হামলা চালিয়ে প্রায় আড়াই শ জনকে জিম্মি করে হামাস। ওই হামলায় নিহত হন অন্তত ১ হাজার ১৩৯ জন। সেদিন থেকে গাজায় হামলা চালিয়ে আসছে ইসরায়েল। এতে এখন পর্যন্ত ৪০ হাজার ৬৯১ জন নিহত হয়েছেন। এমন পরিস্থিতে গাজায় যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে হামাস ও ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশ।

একের পর এক বিলাসবহুল গাড়ি বের হওয়ার ভিডিও, যা জানা গেল

চট্টগ্রামের একটি কারখানা থেকে বিলাসবহুল কয়েকটি গাড়ি বের হওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে দেখা যায়, একটি কারখানা থেকে একের পর এক দামি গাড়ি বের হচ্ছে। সেখানে কয়েকজন ব্যক্তি তা তদারক করছেন।

যাঁরা ভিডিওটি শেয়ার করেছেন, তাঁদের ভাষ্য, গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর গাড়িগুলো বের হয়। এগুলো শিল্প গ্রুপ এস আলমের গাড়ি এবং যাঁরা তত্ত্বাবধানে আছেন, তাঁরা একটি রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী।

বিষয়টি নিয়ে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে ওই শিল্প গ্রুপ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক সূত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তবে এ বিষয়ে তাঁরা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এদিকে এ ঘটনার পর দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু সুফিয়ানসহ তিন নেতাকে কারণ দর্শানোর চিঠি দিয়েছে দলটি। এই নেতারা হলেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু সুফিয়ান, যুগ্ম আহ্বায়ক এনামুল হক এবং কর্ণফুলী থানা বিএনপির আহ্বায়ক এসএম মামুন মিয়া।

এর আগে শনিবার দুপুরে নগরের নিউমার্কেট এলাকায় দোস্ত বিল্ডিং কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছিল দক্ষিণ জেলা বিএনপি। সেখানে উপস্থিত ছিলেন এই তিনজন। এ সময় তাঁরা গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়া সংবাদ এবং সামাজিক মাধ্যমে ওঠা দাবিগুলো মিথ্যা ও বানোয়াট বলে মন্তব্য করেন।

তাঁদের দাবি, মীর গ্রুপের একটি পেপার মিলে তাঁরা গিয়েছিলেন। তবে বিএনপির নামে চাঁদাবাজির একটি অভিযোগ পেয়ে সেখানে গিয়েছিলেন তাঁরা। গাড়ির বিষয়ে তাঁরা কিছু জানেন না।

স্থানীয় একটি সূত্র জানিয়েছে, মীর গ্রুপের মালিকদের সঙ্গে এস আলম গ্রুপের মালিকদের আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে।

দেশের আলোচিত ও সমালোচিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম (এস আলম)। দেশের ছয়টি ব্যাংকের মালিকানা ছিল এই গ্রুপের। দেশে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর একে একে সামনে আসে এস আলম গ্রুপের দুর্নীতি।

সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ৫৩ সেকেন্ডের ওই ভিডিওটিতে দেখা যায়, একটি কারখানার ভেতর থেকে একে একে কয়েকটি গাড়ি বের হচ্ছে। এসব গাড়ি বের করার বিষয়টি তদারক করছেন কয়েকজন ব্যক্তি।

নগরের কালুরঘাট শিল্প এলাকায় মীর গ্রুপের যে পেপার মিলের কথা বলা হচ্ছে, সেটি মূলত মীর পাল্প অ্যান্ড পেপার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। কালুরঘাট বিসিক শিল্প এলাকা রোডের শেষ প্রান্তে অবস্থিত। একই ভবনে হাসান ওয়েল মিলস নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

শনিবার সন্ধ্যায় এই এলাকার পাঁচ প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তাঁরা কেউ নাম বা পেশা প্রকাশ করতে চাননি। তবে বৃহস্পতিবার রাতে মীর গ্রুপের কারখানা থেকে অনেকগুলো গাড়ি বের হতে দেখেছেন তাঁরা। কিন্তু কার গাড়ি কিংবা লোকজন কারা ছিল, তাঁরা চেনেন না।

বিষয়টি নিয়ে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে এস আলম ও মীর গ্রুপের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে গাড়িগুলোর মালিক সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়নি।

সংবাদ সম্মেলন, শোকজ

শনিবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু সুফিয়ান। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, মীর গ্রুপের প্রতিষ্ঠানের নম্বরে একটি নম্বর থেকে প্রথমে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নামে এবং পরে বিএনপির নামে চাঁদা চাওয়া ও হুমকি দেওয়া হয়।

সেখানে আরও বলা হয়, চাঁদাবাজির অভিযোগটি এনামুল হককে জানালে তিনি আবু সুফিয়ানকে জানান। পরে বৃহস্পতিবার বিএনপির কয়েকজন নেতা–কর্মীকে নিয়ে কালুরঘাটে মীর গ্রুপের প্রতিষ্ঠানে যান। তাঁরা ওই প্রতিষ্ঠানে সর্বোচ্চ ৩০ মিনিট ছিলেন বলে জানান তাঁরা।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এনামুল হক জানান, বিএনপির নেতাদের সামনে এস আলমের গাড়ি সরানোর বিষয়টি মিথ্যা। আর যেখনে গিয়েছিলেন, সেটি কোনো ওয়্যারহাউস ছিল না। মীর গ্রুপের পেপার মিল ছিল। গাড়িগুলো এস আলমের কি না, সে বিষয়ে তাঁরা কিছু জানেন না।

শনিবার সন্ধ্যায় কারণ দর্শানোর চিঠি প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বিভিন্ন গণমাধ্যমে এস আলমের গাড়ি সরানোর অভিযোগ ওঠায় দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়কসহ তিনজনের কাছে কারণ ব্যাখ্যা চাওয়া নেওয়া হয়েছে দল থেকে।

জানতে চাইলে কারণ ব্যাখ্যা চিঠি এখনো হাতে পাননি বলে জানান দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহবায়ক আবু সুফিয়ান।

এ ধরনের বিষয়গুলো তদন্ত করা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন সনাক-টিআইবি চট্টগ্রামের সভাপতি আখতার কবির চৌধুরী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, একটি শিল্প গ্রুপের নাম এসেছে এবং একটি রাজনৈতিক দলের নাম এসেছে। বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত করে দেখা উচিত।

ভ্যানে লাশের স্তুপ করা ভিডিও আশুলিয়া থানা রোডের by শরিফ রুবেল

কি মর্মান্তিক! হৃদয় বিদারক। গা শিউরে ওঠা ভিডিও। গুলিবিদ্ধ মরদেহ গুনে গুনে প্যাডেল ভ্যানে তুলছে পুলিশ। ভ্যানে তুলেই একটি পরিত্যক্ত ব্যানার দিয়ে লাশগুলো ঢেকে দেয়া হচ্ছে। গুলিবিদ্ধ একজন তখনো জীবিত ছিলো। নিথর দেহ ঝাঁকুনি দিয়ে উঠছে। নড়াচড়া করছেন। এক মিনিট ১৪ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। যা নিয়ে তোলপাড় চলছে। মানুষ জানতে চাচ্ছে।

ঘটনাটি কোথায়। কখন, কিভাবে ঘটেছে। তবে কেউই সঠিক তারিখ ও ঘটনাস্থল বলতে পারছে না। কেউ কেউ অনুমান নির্ভর তথ্য শেয়ার করছেন। তবে মানবজমিন অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে প্রকৃত ঘটনা। কোথায়, কিভাবে,  এই ঘটনার পেছনের আদ্যপান্ত তুলে আনার চেষ্টা করেছে মানবজমিন।

সরজমিন জানা গেছে, পুলিশের ভ্যানের লাশের স্তুপ করে রাখা মর্মান্তিক ঘটনাটি আশুলিয়া বাইপাইল এলাকার থানা রোডের গলিতে। থানার পাশেই ইসলাম পলিমারস এন্ড প্লাস্টিসাইজারস লিমিটেডের অফিসার ফ্যামিলি কোয়াটারের দেয়াল ঘেষে গুলিবিদ্ধ ৭ শিক্ষার্থীর মরদেহ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে ছিলো। পরে পুলিশ লাশগুলো একত্রিত করে ভ্যানের উপর স্তুপ করে রাখেন। এরপরে ঘটে আরো মর্মান্তিক ঘটনা। যে ঘটনা বর্ণনা করাও কঠিন।

৫ আগষ্টের কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী মানবজমিনকে বলেন, গত ৫ আগষ্ট দুপুরে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়ার পরপর বাইপাইল এলাকার বিজয় মিছিল বের হয়। মিছিল শেষে বিকেলে উত্তেজিত জনতা আশুলিয়া থানা ঘেরাও করেন। এতে পুলিশ সদস্যরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। থানার আশপাশে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা দৌড়ে থানা ভবনে ঢুকে পড়েন। ঢুকেই তারা থানার গেইট বন্ধ করে দেন। তখন বিকেল সাড়ে ৪টার বাজে। মাত্র ৫ মিনিটের মধ্যে আন্দোলনকারীরা চারদিক থেকে থানা ঘিরে ফেলেন। তারা থানা ভবনে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকেন। কেউ কেউ গেইট ভাঙতে এগিয়ে যান। অবস্থা বেগতিক দেখে আশুলিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ এ এফ এম সায়েদ আহমেদ পুলিশ সদস্যদের অস্ত্র রেডি করতে বলেন। গুলি লোড করতে বলেন। এই কথা শুনে  উপস্থিতরা আরও চড়াও হন। আশপাশে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ওই সময় থানা ভবন থেকে বেরিয়ে এসে ৩০ থেকে ৩৫ জন পুলিশ সদস্য থানার গেইটে অবস্থান নেন। বিকেল ৪টা বেজে ৪০ মিনিট। ওসি সায়েদ আহমেদ গেইটে এসে উত্তেজিত জনতাকে নিবৃত করার চেষ্টা করেন। তখন আন্দোলনকারীরা পুলিশকে উদ্দেশ্য করে ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দিতে থাকেন। এক পর্যায়ে ওসি পুলিশ সদস্যদের অস্ত্র হাতে নিয়ে রেডি হতে বলেন। তখন ঘটনাস্থলে থাকা জনগণের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্রজনতা পুলিশকে আত্মসমর্পণ করতে বলেন। তখন ওসি সায়েদ আহমেদ আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে বলেন, আমরা হেরেছি। আপনারা জিতেছেন। আমাদের মাফ করে দেন। সবাই বাড়ি ফিরে যান। একপর্যায়ে এসআই মালেক, ডিবির ওসি তদন্ত আরাফাত, এসআই আফজালুল, এসআই জলিল ছাত্র-জনতাকে উদ্দেশ্য করে গুলি ছোড়েন। গুলিতে থানার গলিতে কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় পড়ে যান। মুহুর্মুহু গুলিতে লোকজন দৌড়ে পালিয়ে যান।

থানার সামনের বিল্ডিং থেকে পুরো ঘটনা স্বচক্ষে দেখা রনি আহমেদ নামের এক ব্যক্তি মানবজমিনকে বলেন, বিকেলে থানা ফটকের সামনে উত্তেজিত জনতার ওপর পুলিশ গুলি ছোড়ে। এতে থানার গেইটের সামনেই ১০ থেকে ১২ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে যান। কয়েক মিনিট ধরে ওখানে গোলাগুলি চলে। পরে জীবিত কয়েকজনকে নিচু হয়ে এসে ছাত্ররা টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যান। তারপরেও ৬ থেকে ৭ জন ওখানে পড়েছিল। তখন আশপাশের সব অলিগলি জনগণ ঘিরে ফেলে। রাস্তা থেকেও লোকজন থানার দিকে রওনা হয়। পরে থানা থেকে সব পুলিশ সশস্ত্র হয়ে একযোগে বেরিয়ে আসেন। তারা গুলি করতে করতে বেরিয়ে আসেন।

ভ্যানে লাশের স্তুপ করা জায়গাটি পলিমারস এন্ড প্লাস্টিসাইজারস লিমিটেডের অফিসার ফ্যামিলি কোয়াটারের গেইটে। ওই গেইটের অপরপাশে সাদিয়া রাজশাহী কনফেকশনারী এন্ড মিষ্টান্ন ভান্ডারের মালিক ফাহিমা আক্তার মানবজমিনকে বলেন, ঘটনাটি আমার দোকানের সামনেই ঘটেছে। ৫ আগষ্ট বিকেলে সাড়ে ৪টা হবে। সেদিন গুলি খেয়ে থানার সামনে পড়ে থাকা মরদেহগুলো  ভ্যানে তুলছিলেন পুলিশ। আমাদের চোখের সামনেই তুলেছে। প্রথমে লাশগুলো তুলে ব্যানার দিয়ে ঢেকে থানার সামনে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে আগুন জ্বালিয়ে দেয়া হয়। সেই ঘটনা এখনো চোখের সামনে ভাসে।

ওইদিন ঘটনাস্থলে থানা রকি আহমেদ নামের এক পোশাক শ্রমিক মানবজমিনকে বলেন, পুলিশ প্রথমে গেইটে এসেই ইসলাম পলিমারস এন্ড প্লাস্টিসাইজারস লিমিটেডের অফিসার ফ্যামিলি কোয়াটারের সামনে পড়ে থাকা গুলিবিদ্ধ ৭ জনকে একটি প্যাডেল  ভ্যানে তুলেন। পরে তাদের থানার সামনে আনেন। পরে লাশগুলো থানার পার্কিংয়ে থাকা পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যানে তুলে আগুন দেয়া হয়। ৭ জনের লাশ আগুনে পুড়িয়ে থানা থেকে সব পুলিশ বেরিয়ে থানা গলি দিয়ে হাঁটতে শুরু করেন। আর গুলি ছুড়তে থাকেন। আগুনে পুড়ে যাওয়া একজনের হাতে তখনো হাতকড়া ছিলো।

লাশের স্তুপ করা জায়গাটি হাত দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে আসলাম হোসেন মানবজমিনকে বলেন, ভাল করে দেখেন। ভিডিওতে যে পোস্টারটি দেখা যাচ্ছে। সেটা এখনো দেয়ালে অক্ষত আছে। কিছু বালুর বস্তা ছিলো সেগুলো সরিয়ে নেয়া হয়েছে। সেদিন পুরো থানা রোডেই লাশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলো। পুলিশ ভ্যান নিয়ে সব লাশ এক জায়গায় জড়ো করে। আম টোকানোর মত করে পুলিশ গলি দিয়ে লাশ টুকিয়েছে। পরে লাশগুলো থানার সামনে এনে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। এই ঘটনা দেখেনি আশপাশে এমন কোনো মানুষ ছিলো না।  এ এক ভয়ানক ঘটনা। মনে পড়লে এখনো গা শিউরে উঠে।

আশুলিয়া থানার সামনে পুড়িয়ে দেয়া লাশের মধ্য জামগড়া শাহিন স্কুলের দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী আসশাবুরও ছিলেন। নিহত আসশাবুরের বড় ভাই রেজওয়ানুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, আমার ভাই গুলিবিদ্ধ হয়ে থানার পাশেই রাস্তায় পড়ে ছিলেন। পরে পুলিশ তার নিথর দেহ রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে পিকআপ ভ্যানে ঢুকিয়ে আগুন দিয়ে দেয়। ভাইটি আমার জীবিত ছিলো নাকি মৃত সেটা জানার সুযোগও আমাদের হয়নি। গুলিবিদ্ধ ৭ জনকেই আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয়। কে জীবিত কে মৃত তাও পুলিশ তা দেখার সুযোগ দেয়নি। আমার ভাই নীল গেঞ্জি পরিহিত ছিলো। আমরা গেঞ্জি দেখে পোড়া লাশ শনাক্ত করি।

আফজাল হোসেন নামের আরেক প্রত্যক্ষদর্শী মানবজমিনকে বলেন, পুলিশ থানা থেকে বের হওয়ার সময় কারও কারও হাতে দুটি অস্ত্র ছিল। অনেকে সিভিল ড্রেসে ছিলেন। অনেকের হাতে অচেনা অস্ত্র দেখেছি। তারা গুলি করতে করতে বের হন। কখনো গুলি বন্ধ করেনি। মেইন রোডে এসে একটি পিকআপ ভ্যানে আগুন দেন। ওই পিকআপ ভ্যানেও ৫ থেকে ৬টি গুলিবিদ্ধ মরদেহ ছিল। বিকালে যারা গুলিতে মারা গেছে তাদের ওই ভ্যানেই রাখা হয়েছিল। তারা নির্বিচারে গুলি চালাচ্ছিল। গুলি কখনো বন্ধ করেনি। অলিগলিতে, রাস্তায়, বাসাবাড়িতে যেখানে খুশি সেখানেই গুলি করেছে পুলিশ। তারা দলবদ্ধ ছিল। ৮০ থেকে ৯০ জন হবে।

বাইপাইল বাসস্ট্যান্ডের অটোরিকশা চালক মানবজমিনকে বলেন, পুলিশ থানা থেকে মেইন রোডে এসে ডান বাম দু’পাশেই গুলি চালায়। রাস্তার দু’পাশে গুলি চালাতে চালাতে তারা নবীনগরের দিকে আগাতে থাকেন। তখন মানুষ জীবন বাঁচাতে যে যার মতো দৌড়ে পালিয়েছে। এক মিনিটের জন্যও পুলিশ গুলি বন্ধ করেনি। যতক্ষণ হেঁটেছে ততক্ষণই তারা গুলি ছুড়েছে। রাস্তার দু’পাশে পথচারী, বাসাবাড়ি ও দোকানপাটের শত শত মানুষ ওইদিন গুলিবিদ্ধ হয়। এমন দিন কখনো দেখেনি বাইপাইলবাসী।

সেদিনের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন পথচারী মানবজমিনকে বলেন, পুলিশ থানা রোড থেকে গুলি করতে করতে সোহেল হাসপাতাল পর্যন্ত যায়। তখন গুলির শব্দ ছাড়া কিছুই শোনা যায়নি। চারদিকে মানুষের চিৎকার। বাঁচাও বাঁচাও। মনে হয়েছে যুদ্ধ লেগেছে। তখন মানুষ বাসাবাড়ি ছেড়ে পালাতে শুরু করেন। রাত তখন ৯টার বেশি বাজে। পুলিশ সামনের দিকে হেঁটে যাচ্ছিলেন। আর গুলি ছুড়ছিলেন। এভাবে তারা পল্লী বিদ্যুৎ পর্যন্ত চলে যায়। এই সময়ে শত শত মানুষকে গুলি খেয়ে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখেছি।

সেদিন নিহতের স্বজন ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ৫ই আগস্ট সকাল ৯টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত পুলিশ, ছাত্রলীগ, যুবলীগের গুলিতে অন্তত ৩১ জন নিহত হোন। পরদিন গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও ১৫ জন মারা যান। এতে ওই ঘটনায় মোট নিহতের সংখ্যা ৪৬ জন। এ ছাড়া গুলিবিদ্ধ হয়ে ধামরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, আশুলিয়ার নারী ও শিশু হাসপাতাল, আশুলিয়ার হাবিব ক্লিনিক, গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক হাসপাতাল, এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সাভারের বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন আছেন প্রায় দেড় হাজারের বেশি মানুষ।

একটি সূত্র মানবজমিনকে জানায়, ৫ই আগস্ট সন্ধ্যায় আশুলিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ এ এফ এম সায়েদ, ওসি ইনটিলিজেন্স মিজানুর রহমান মিজান, ওসি অপারেশন নির্মল কুমার দাসের নেতৃত্বে পুলিশের ৯০ থেকে ১০০ জন সদস্য অস্ত্রসহ থানা থেকে বের হয়ে আসেন। বাইপাইলে পুলিশের নির্বিচারের গুলির খবর পেয়ে সাভার সেনানিবাস থেকে সেনাবাহিনীর একটি টহল টিম বাইপাইলের দিকে রওনা হয়। পল্লী বিদ্যুৎ পার হলে তারাও পুলিশের গুলির মুখে পড়েন। এতে দুই সেনাসদস্য গুলিবিদ্ধ হন। পরে সেনাবাহিনীর একাধিক টিম এসে পুলিশের সকল সদস্যকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। তাদের আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন। পরে কয়েক মিনিটের মধ্যেই পুলিশ সদস্যদের আটক করা হয়। তখন সবার হাতে থাকা আগ্নেয়াস্ত্র জব্দ করা হয়। এরপর শত শত মানুষ পুলিশকে ঘিরে ফেলেন। পুলিশের কাছে জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালানোর কারণ জানতে চান। জনতাই বিচার করবে বলে পুলিশ সদস্যদের ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেন। এরপর সেনাবাহিনী তাদের নিরস্ত্র করে আটক করে সেনানিবাসে নিয়ে যান। সেদিন রাত ১০টার দিকে নবীনগর সেনানিবাসের গেইটে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হন। পরে সেনাসদস্যরা জনতাকে নিবৃত করার চেষ্টা করেন। এসময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত সেনাবাহিনীর একজন মেজর উত্তেজিত জনতাকে নিবৃত করতে বক্তব্য দেন।

সংস্কার ও নির্বাচনের সময়সীমা নিয়ে আলোচনা: দলগুলোর সঙ্গে সরকারের সংলাপ

রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। শনিবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় বিকাল তিনটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে এ মতবিনিময় করেন তিনি। আলোচনায় ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী রাষ্ট্র সংস্কার, নির্বাচন বিষয়ে আলোচনা হয়। তবে নির্বাচন কবে হবে তা নিয়ে স্পষ্ট কোনো বার্তা মেলেনি। দলগুলো সম্ভাব্য সংস্কার শেষে দ্রুত সময়ে নির্বাচন আয়োজনের পরামর্শ দিয়েছে। প্রধান উপদেষ্টাও এ বিষয়ে একমত পোষণ করেন। আলোচনা শেষে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। তিনি জানিয়েছেন, প্রধান উপদেষ্টা দলগুলোর মতামত নিচ্ছেন। সবার মতামত নেয়ার পর তিনি একটি রূপরেখা দেবেন। বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান ও ধর্ম বিষয়ক উপদেষ্টা ড. এএফএম খালিদ হোসেন ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মাহফুজ আলম উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে দলগুলোর পক্ষ থেকে প্রধান উপদেষ্টাকে লিখিত প্রস্তাবনা দেয়া হয়।

মতবিনিময়ে অংশ নেয়া প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক দলই তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল, সংস্কার, যৌক্তিক সময়ে নির্বাচনের রোডম্যাপ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অসম চুক্তি বাতিল, গণহত্যার দায়ে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের ব্যবস্থা করা, গত ৫৩ বছরের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের দাবি জানায়।

মতবিনিময় শেষে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, উপদেষ্টা দলগুলোর কাছে জানতে চেয়েছেন সংবিধান নতুন করে লেখা হবে নাকি সংস্কার করা হবে। অনেকেই বলেছেন, ক্ষমতা প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ভাগ করে দেয়ার কথা। তিনি বলেন, হেফাজতে ইসলাম নেতারা বলেছেন- তাদের সমাবেশে ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আগমনের সময় কতো মানুষ মারা গেছেন তা নতুন করে তদন্ত করা হোক। যাতে জনগণ জানতে পারবে কতোজন মারা গিয়েছেন। এ ছাড়াও শিক্ষানীতির আমূল পরিবর্তন করার কথা বলা হয়।

শফিকুল আলম বলেন, প্রধান উপদেষ্টা একটা রূপরেখা দেবেন। এখন শুধুমাত্র তাদের কথা শুনছেন। সংস্কারের কথাগুলো জানতে চাইছেন। ছাত্র-জনতা রাষ্ট্রের মেরামত চাইছেন। এটা কীভাবে হবে, সেটাও জানতে চাইছেন। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মাহফুজ আলম বলেন, আমরা আশা করি, একটা কমিপ্রহেন্সিভ রিফর্ম হবে। সংস্কারের রূপরেখার মাঝেই সময় নিহিত থাকবে। এসময় উপস্থিত ছিলেন উপ-প্রেস সচিব আজাদ মজুমদার।

হেফাজতে ইসলামসহ ৭টি ইসলামী দলের সঙ্গে সভা: শুরুতে ৭টি ইসলামী দলের নেতাদের সঙ্গে সভা করেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এতে তারা দেশের প্রধানমন্ত্রী পদে এক ব্যক্তির দুই মেয়াদের বেশি না থাকার প্রস্তাব দিয়েছেন। পাশাপাশি একটা যৌক্তিক সময় নিয়ে সংস্কারগুলো করে জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন করতে বলেছেন। সভায় হেফাজতে ইসলাম আগামী ১ মাসের মধ্যে তাদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সকল মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। প্রথম সভায় অংশ নেন  খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, হেফাজতে ইসলাম, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, খেলাফত আন্দোলন এবং নেজামে ইসলাম পার্টির নেতারা। এরপর অংশ নেন ইসলামী আন্দোলনের নেতারা। প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে খেলাফত মজলিসের নেতৃত্ব দেন দলের আমীর আবদুল বাছিত আজাদ। তার সঙ্গে ছিলেন মহাসচিব আহমাদ আবদুল কাদের, নায়েবে আমীর সাখাওয়াত হোসেন, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব জাহাঙ্গীর হোসেন, যুগ্ম মহাসচিব মুনতাসীর আলী ও প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক কাজী মিনহাজুল ইসলাম মিলন। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নেতৃত্ব দেন দলটির আমীর ইউসুফ আশরাফ। তার প্রতিনিধিদলে ছিলেন মহাসচিব মামুনুল হক ও যুগ্ম মহাসচিব জালাল উদ্দিন। জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের একাংশের নেতৃত্ব দেন সংগঠনের মহাসচিব মনজুরুল ইসলাম আফেন্দি।

হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্ব দেন মহাসচিব সাজেদুর রহমান। তার সঙ্গে ছিলেন আজিজুল হক, কেন্দ্রীয় নেতা মুনীর হোসেন কাশেমী। নেজামে ইসলামের নেতৃত্ব দেন নির্বাহী সভাপতি মাওলানা আশরাফুল হক। তার সঙ্গে ছিলেন মহাসচিব মাওলানা মোমিনুল ইসলাম। খেলাফত আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন নায়েবে আমীর মজিবুর রহমান হামিদী। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেতৃত্বে ছিলেন চরমোনাই পীর সৈয়দ মোহাম্মদ রেজাউল করীম। তার সঙ্গে ছিলেন সিনিয়র নায়েবে আমীর সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম, মহাসচিব ইউনুস আহমাদ, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান ও যুগ্ম মহাসচিব আশরাফুল আলম।

সভা শেষে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ও হেফাজত নেতা মামুনুল হক বলেন, প্রত্যেক দল যার যার পক্ষ থেকে সংস্কার প্রস্তাবনাগুলো তুলে ধরেছে। সেখানে মৌলিকভাবে যে প্রস্তাবগুলো এসেছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার। নির্বাচন কমিশনসহ সমস্ত বৈষম্যমূলক প্রতিষ্ঠান, যেটি দলীয় ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়েছে, সেটিকে ঢেলে সাজাতে হবে। নতুন ভাবে সংস্কার করে যেন নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা যায়। তার জন্য আমূল পরিবর্তনের একটি সংস্কার প্রস্তাবনা নিয়ে এসেছি। দেশব্যাপী সব ভোটাধিকার প্রয়োগকারীদের প্রতিনিধিত্ব যেন জাতীয় সংসদে নিশ্চিত করা যায় সে রকম একটা প্রস্তাব আমরা দিয়েছি।

তিনি বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমরা দেখছি- সর্বোচ্চ ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ ভোটারের প্রতিনিধিত্ব জাতীয় সংসদে থাকে। যারা বিভিন্ন আসনের প্রতিনিধিত্ব করছেন দেখা যায় তাদের বিপক্ষে ভোটদানকারীর সংখ্যা বেশি। কাজেই এ ব্যবস্থার আমূল সংস্কার এনে এমন একটি ব্যবস্থা হয় যেন অধিকাংশ ভোটারের প্রতিনিধিত্বকারীরা কোনো না কোনোভাবে জাতীয় সংসদে থাকে। এ ছাড়া বিচার বিভাগ, শিক্ষা বিভাগ ও প্রশাসনে আমূল পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীকেন্দ্রিক ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার যে পদ্ধতি যার মাধ্যমে স্বৈরতন্ত্রের উদ্ভব সে জায়গা যেন ভারসাম্য তৈরি করা হয় এমন একটি প্রস্তাব করা হয়েছে। সংবিধানে আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থা ও বিশ্বাসের যে ধারাটি ছিল সেটি যেন পুনর্বহাল করা হয়। দুই বারের বেশি যেন কেউ এক সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতে না পারেন, সেটারও সংবিধানে সংস্কার করার কথা বলেছি। এ ছাড়া হেফাজতে ইসলামের বিভিন্ন আন্দোলনে অনেক হতাহত ও নিখোঁজদের একটা প্রতিবেদন যেন আমাদের সামনে আনা হয়। সকল হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে এর নির্দেশদাতা ও অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছি।

মামুনুল হক বলেন, হেফাজতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বহু মামলা রয়েছে সেগুলো যেন নির্বাহী আদেশ ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এক মাসের মাধ্যমে প্রত্যাহার করা হয়। এ ছাড়া দেশে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে ইসলামবিরোধী যেনো কোনো আইন প্রণয়ন না করা হয় সে দাবিও করেছি আমরা। প্রধান উপদেষ্টা আমাদের বক্তব্য অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে শুনেছেন। তিনি ধন্যবাদ জানিয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকারকে রাষ্ট্র পরিচালনায় সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন। আমরা তার আহ্বানে সাড়া দেয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছি। সে সঙ্গে যৌক্তিক সময় নিয়ে সংস্কার করে অযথা কালবিলম্ব না করে নির্বাচনের আয়োজন করার কথা বলেছি আমরা। প্রধান উপদেষ্টাও এ কথার সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন। প্রয়োজনীয় সংস্কারের পর তারাও নির্বাচনে চলে যেতে আগ্রহী।

লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি: আলোচনায় লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতৃৃত্ব দেন কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ। প্রতিনিধিদলে ছিলেন ড. রেদোয়ান আহমেদ, নেয়ামূল বশির, নুরুল আলম তালুকদার এবং আওরঙ্গজেব বেলাল। সভায় ৮৩ প্রস্তাব দিয়েছে এলডিপি। অলি আহমেদ বলেন, জামায়াতের যদি ছোট ছোট তুচ্ছ কারণে নিবন্ধন বাতিল করা যায় তাহলে আমাদের হাজার ছাত্রদের হত্যা ও ১৫ বছর অসংখ্য গুমের জন্য তাদেরটা (আওয়ামী লীগ) কেন বাতিল হবে না। না হলে আগামীতেও স্বৈরাচার তৈরি হবে। পর্যায়ক্রমে নির্বাচনের জন্য একটা সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা করার কথা বলেছি। এটা হলে দলগুলো প্রস্তুত হতে পারবে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এটা সবার জন্য ভালো। সংস্কার সম্পূর্ণ করেই এই নির্বাচন হতে হবে। পাঠ্যপুস্তকগুলোয় ধর্মবিরোধী কথা বাদ দিতে হবে। আর আমরা প্রধান উপদেষ্টার কাছে ৮৩ প্রস্তাব রেখেছি। যেগুলো প্রয়োজন এগুলো গ্রহণ করবেন। আমাদের মূল লক্ষ্য পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ। এখনো কোর্ট কাচারিতে ন্যায়বিচার মিলছে না। এখনো বাংলাদেশ চাঁদাবাজমুক্ত হয় নাই। আমরা বলেছি যে, ইসলাম ধর্ম মানে না তাকে ছাড় দেবার কোনো কারণ নাই।

ওদিকে ১২ দলীয় জোটের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তারা জোটের পক্ষে প্রধান উপদেষ্টার কাছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল এবং সংস্কার শেষে স্বল্পতম ও যৌক্তিক সময়ে নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণাসহ ১২ দফা প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়। জাতীয় পার্টির (জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দারের নেতৃত্বে ১২ দলীয় জোটের নেতারা আলোচনায় অংশ নেন। এনপিপি চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদের নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট আলোচনায় অংশ নেয়।

জাতীয় পার্টি: সভা শেষে জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, সবারই কমবেশি ভুল-ত্রুটি আছে। আমাদের অনেক ভুল ত্রুটি আছে বলে নির্বাচনে যাওয়ার। তখনকার প্রেক্ষাপটে নির্বাচন করেছি। এই কাজগুলো এখন এই সরকার করতে পারবে। বিচার বিভাগ নিরপেক্ষকরণের কাজ করতে হবে।  তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার সামঞ্জস্য, একই ব্যক্তি যাতে প্রধানমন্ত্রী ও দলের নেতা না হয় এগুলো বলেছি। এ ছাড়া সংস্কারে যতটুকু সময় লাগে ততটুকু সময় দেয়া হবে বলে জানিয়েছি।  সভায় জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান জিএম কাদের, কো-চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, প্রেসিডিয়াম সদস্য মনিরুল ইসলাম মিলন ও মাসরুর মওলা উপস্থিত ছিলেন।

গণফোরাম: দলটির ৮ সদস্যের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সভা করেন প্রধান উপদেষ্টা। দলের নেতৃত্ব দেন প্রতিষ্ঠাতা ড. কামাল হোসেন। সভা শেষে গণফোরাম নেতা ডা. মো. মিজানুর রহমান বলেন, আমরা কয়েকটি দাবি রেখেছি। এরমধ্যে প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্টের মাঝে ক্ষমতার ভারসাম্য আনা দরকার। সকল ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতে যাতে না থাকে, সে বিষয়ে প্রস্তাব রাখা হয়। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রধান উপদেষ্টা জানতে চেয়েছেন কীভাবে সংবিধান সংশোধন করা যেতে পারে। আমরা সময় নিয়েছি। বলেছি, কংক্রিট একটা সংস্কারপন্থা উত্থাপন করা হবে।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ:
বর্তমান সংবিধান বাতিল করে একটি সাংবিধানিক কমিশন গঠন করে নতুন ‘সংবিধানের’ খসড়া তৈরি এবং জাতীয় নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করাসহ ১৩ দফা প্রস্তাবনা দিয়েছে ইসলামী আন্দোলন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমীর ও চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিমের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের প্রতিনিধিদল এই সভায় অংশ নেন। সভা শেষে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমীর সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিম বলেন, আমরা প্রধান উপদেষ্টাকে বলেছি, আওয়ামী লীগের দ্বারা যেসব সম্পদ পাচার হয়েছে তা ফিরিয়ে আনা সম্ভব না হয়, তবে দেশে থাকা সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হোক। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী যদি শেখ হাসিনার মতো হয় তাহলে দুইবার না, একবারও চাই না।

বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (বাংলাদেশ জাসদ): সভায় অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে ৮ দফা প্রস্তাবনা দিয়েছে বাংলাদেশ জাসদ। সেগুলো হলো- বিদ্যমান সংবিধান সংস্কার করে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যাতে আবার নতুন কোনো স্বৈরাচার চেপে না বসে, দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট সংসদ কায়েম, উচ্চ কক্ষের স্পিকার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হতে পারে, দেশকে ৫/৬টি প্রদেশের বিভক্ত করে ফেডারেল কাঠামোতে শাসনব্যবস্থা বিন্যস্ত করা, নির্বাচনের ক্ষেত্রে বর্তমান পদ্ধতির পাশাপাশি রাজনৈতিক দলসমূহের প্রাপ্ত ভোট অনুযায়ী সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি চালু করা, লুটপাট ও সম্পদ পাচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ও দায়ীদের বিচার করা এবং লুণ্ঠিত টাকা উদ্ধার ও জাতীয় রাজনীতিতে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা, পুলিশ পুনর্গঠন, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, কালাকানুন বাতিল করা, বৈষ্যমূলক রাজনৈতিক দলবিধি বাতিল, শিক্ষা কমিশন ও স্বাস্থ্য কমিশন গঠন। জাসদের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া।