Sunday, September 23, 2018

সংঘাত এড়াতে চট্টগ্রাম কলেজের নিয়ন্ত্রণ নিল পুলিশ

ঘোষিত কমিটি নিয়ে চট্টগ্রাম কলেজে ছাত্রলীগের বিবাদমান গ্রুপের মধ্যে টানা সংঘর্ষ চলছে। এরমধ্যে ৫ দিনের মাথায় রবিবার সকাল থেকে কলেজ ক্যাম্পাসের নিয়ন্ত্রণ নেয় পুলিশ। ফলে কোনোরকম সংঘর্ষের ঘটনা আজ ঘটেনি।
তবে ছাত্রলীগের দুপক্ষ ঠিকই মুখোমুখি অবস্থানে ছিল। যাদের হাতে ছিল না গত চারদিনের মতো কোনোরকম আগ্নেয়াস্ত্র। কারণ কলেজ ক্যাম্পাসে প্রবেশের সময় পুলিশ শিক্ষার্থীদের পরিচয়পত্র দেখার পাশাপাশি শরীরেও তল্লাশি চালায়।
এ জন্য চট্টগ্রাম কলেজ ক্যাম্পাস ঘিরে তিন শতাধিক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানান চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের চকবাজার জোনের সহকারী কমিশনার নোবেল চাকমা।
তিনি বলেন, কয়েকদিন ধরে চট্টগ্রাম কলেজে তান্ডব চালিয়েছে ছাত্রলীগ। তবে এদের মধ্যে বহিরাগত ছিল বেশি। যাদের হাতে বন্দুকসহ নানা রকম আগ্নেয়াস্ত্র দেখা যায়। কলেজ ক্যাম্পাসে এরা ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। সড়ক অবরোধ করে জনগণের দুর্ভোগ বাড়িয়েছে। সংঘাত-সংঘর্ষে জড়িয়ে চট্টগ্রাম কলেজ ক্যাম্পাসকে দুর্বিসহ করে তোলেছে।
টানা সংঘাত-সংঘর্ষের কারণে আজ রবিবার সকাল থেকে কলেজ ক্যাম্পাসের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে পুলিশ। যারা কলেজ ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা জোরদার করেছে। পরিচয়পত্র প্রদর্শণ ছাড়া কাউকে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে না দেওয়ায় এবং শরীর তল্লাশি করে প্রবেশ করার ফলে কলেজে আজ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি। কোনো বিস্ফোরণের শব্দও শুনা যায়নি।
তবে আজও ছাত্রলীগের দুইপক্ষ মুখোমুখি অবস্থানে ছিল। পদবঞ্চিতরা ক্যাম্পাসে অবস্থান নিয়ে আছেন। তারা মিছিল করার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। অন্যদিকে নবগঠিত কমিটির নেতাকর্মীরাও ক্যা¤পাসে অবস্থান করছিল। কিন্তু পুলিশ কাউকে মিছিল করতে দেয়নি।
এর আগে গত শনিবার সকালেও দুপক্ষ মুৃখোমুখি অবস্থান নিয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এ সময় ককটেল বিস্ফোরণের শব্দ শুনা যায়। একটি পক্ষ সড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে তাদের তাড়িয়ে দেওয়া হয়। ফলে শনিবার সড়কে কোনোরকম প্রতিবন্ধকতা ছিল না। এর আগে বৃহস্পতিবার, বুধবার ও মঙ্গলবার তিনদিনই সড়ক অবরোধ করে ছাত্রলীগ। ফলে দুর্ভোগে পড়েন নগরবাসী।
এছাড়া মঙ্গলবার ও বুধবার দু‘দিন সশস্ত্র সংঘর্ষে লিপ্ত হয় ছাত্রলীগ। এ সময় বন্দুক উচিয়ে গুলি করতেও দেখা যায় কয়েকজনকে। এদের মধ্যে সাব্বির সাদিক নামে এক ছাত্রলীগ নেতাকে গ্রেপ্তারও করে পুলিশ। তার কাছ থেকে গুলিসহ উদ্ধার বন্দুকটিও উদ্ধার করা হয়।
এছাড়া ধারালো অস্ত্র ও মুর্হুমুর্হু ককটেল বিস্ফোরণে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় চট্টগ্রাম কলেজ ও আশপাশের এলাকা। এতে চরম অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ফলে আজ রবিবার সকাল থেকে চট্টগ্রাম কলেজ ক্যাম্পাসের নিয়ন্ত্রণ নেয় পুলিশ। এরপর সংঘাত-সংঘর্ষ না হলেও চট্টগ্রাম কলেজ ক্যা¤পাসজুড়ে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে বলে জানান তিনি।
প্রসঙ্গত, গত সোমবার রাতে চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগের ২৫ সদস্যের কমিটি ঘোষণা করে চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগ। এতে মাহমুদুল করিমকে সভাপতি ও সুভাষ মল্লিক সবুজকে সাধারণ স¤পাদক করে কমিটি অনুমোদন দেয় নগর ছাত্রলীগের সভাপতি ইমরান হাসান ইমু ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ স¤পাদক দস্তগীর চৌধুরী।
মাহমুদুল করিম প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী এবং সবুজ প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসির অনুসারী। আর এই কমিটি প্রত্যাখান করে মঙ্গলবার সকাল থেকে ক্যা¤পাসে বিক্ষোভ শুরু করেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দিনের অনুসারী ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। নতুন কমিটিতে পদ পাওয়া মেয়রের ছয়জন অনুসারী কমিটি থেকে পদত্যাগও করেন। 
যারা ক্যা¤পাস থেকে বের হয়ে মঙ্গলবার সকালে চট্টগ্রাম কলেজের সামনে সড়কে অবস্থান নেন। তারা সড়কের উপর টায়ার জ্বালিয়ে দেন। এসময় ওই সড়ক দিয়ে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ক্ষুব্ধ কয়েকজন নেতাকর্মী এ সময় কয়েকটি গাড়িও ভাংচুর করেন।
বিক্ষুব্ধ নেতাদের অভিযোগ, টাকার বিনিময়ে কমিটিতে ছাত্রদল ও শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্তদের পদ দেওয়া হয়েছে। ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে রাতের আঁধারে এ কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। যা কোনভাবেই মেনে নেবেন না তারা।
টানা তিনদিন সংঘর্ষের পর বৃহস্পতিবার বিকেলে ঘোষিত কমিটি বাতিল চেয়ে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনও করেন মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ স¤পাদক ও সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনের অনুসারী মহানগর ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি এম. কায়সার উদ্দিন ও নেতাকর্মীরা।
অন্যদিকে নবগঠিত কমিটির সভাপতি মাহমুদুল করিম ও সাধারণ স¤পাদক সুভাস মল্লিক সবুজের নেতৃত্বে শতাধিক নেতাকর্মী দুপুরে গরীব উল্লাহ শাহর মাজার সংলগ্ন কবরস্থানে খুন হওয়া ছাত্রলীগ নেতা তবারকের কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায়। এসময় তারা পূর্বসূরীদের আদর্শ ধারণ করে মৌলবাদের বিরুদ্ধে রাজনীতি করে যাওয়ার শপথ নেন।
এরপর শনিবার সকাল থেকে তারা পুনরায় তারা মুখোমুখি অবস্থান নিলে ক্যাম্পাস উত্তপ্ত হয়ে উঠে। যার মুখে রবিবার সকাল থেকে চট্টগ্রাম কলেজের নিয়ন্ত্রণ নেয় পুলিশ।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন: স্বাধীন সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে -মাহফুজ আনাম

ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন করতে গিয়ে স্বাধীন সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর সম্পাদক মাহফুজ আনাম। তিনি বলেছেন, এই আইন সাংবাদিকতার মূলনীতির পরিপন্থি। যে কারণে সম্পাদক পরিষদ আইনটি প্রত্যাখ্যান করেছে। গত বুধবার বহুল আলোচিত ‘ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট-২০১৮’ সংসদে পাস হয়। সম্পাদক পরিষদ সহ বিভিন্ন মহলের আপত্তি সত্ত্বেও আইনটি সংসদে ওঠে। বৃহস্পতিবার এই আইন নিয়ে কথা বলতে চ্যানেল আই’য়ের টকশো তৃতীয় মাত্রাতে উপস্থিত ছিলেন মাহফুজ আনাম। অনুষ্ঠানটি উপস্থাপন করেন জিল্লুর রহমান।
মাহফুজ আনাম বলেন, সংবিধানে ৩৯ ধারার ২ এর এ এবং বি’তে আমাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। আমরা মনে করি এই আইন তার একেবারেই পরিপন্থি। দ্বিতীয়ত- আমরা মনে করি, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের যে মূল আদর্শ তার মধ্যে মত প্রকাশ, স্বাধীনতা ইত্যাদি ছিল তা ক্ষুণ্ন হয়েছে এবং তা গণতান্ত্রিক কাঠামোর পরিপন্থি। সাংবাদিকতার যে নীতিমালা তাতেও সম্পূর্ণভাবে পরিপন্থি।
এই কারণেই আমরা সাংবাদপত্র পরিষদ থেকে প্রত্যাখ্যান করতে বাধ্য হয়েছি। অংশীজন এবং সংসদে একাধিক বিরোধীদলের সদস্যের মতামতকে উপেক্ষা করে আইনটি পাস করা হল। আপনার কী ধারণা সরকার কোনো বিবেচনায় কার স্বার্থে আইনটি করল? সামনে নির্বাচন এর ঠিক আগ মুহূর্তে গণমাধ্যমকে একটু ক্ষেপিয়ে তোলা এটি সরকারের বিবেচনায় নিশ্চয়ই কাজ করেছে। উপস্থাপকের এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি প্রথমেই বলতে চাই, এই আইনটির ব্যাপারে তাদের উদ্দেশ্য মহৎ। ডিজিটাল জগতের নিরাপত্তা নিয়ে তারা চিন্তিত।
ডিজিটাল প্লাটফর্মটা মানি ট্রান্সফার, ব্যাংকিং, সিকিউরিটি, হেলথ, পুলিশের ইনফরমেশন ইত্যাদি যুক্ত আছে। কিন্তু গণমাধ্যমের মূলমন্ত্র মুক্তচিন্তা তারাও এই প্লাটফর্ম ব্যবহার করে। ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন করতে গিয়ে স্বাধীন সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে। তারা এই আইন করতে গিয়ে জায়গাটি যথেষ্ট গুরুত্ব সহকারে দেখেননি, দেখছেন না। আপনাদের সঙ্গে আলোচনা করেই কি এটি করা হয়েছে?- উপস্থাপকের এমন প্রশ্নের পরিপেক্ষিতে মাহফুজ আনাম বলেন, তারা আমাদের বারবার বলেছেন এই আইন সাংবাদিকতার পরিপন্থি হবে না, সাংবাদিকদের স্বাধীনতা খর্ব হবে না।
তখন আমি বলেছিলাম, তাহলে আইনে কোথাও একটা ডিসক্লেমার দেয়া যায় কিনা, যে এই আইনে যা আছে তা সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। একাত্তর  টেলিভিশনের সম্পাদক মোজাম্মেল বাবু বলেছিলেন, সংবাদ সংশ্লিষ্ট যাই আসবে এটা প্রেস কাউন্সিলের মাধ্যমে আসুক। তাহলে একটা ফিল্টারিংয়ের জায়গা থাকবে। তারা দু’দিন শুনেছেন দু’সেশনে। তারপর মন্ত্রী বলছেন, আমাদের সব ব্যাপার উনি মেনে নিয়েছেন কিন্তু আমার স্মৃতিতে তা মিলছে না।
মাহফুজ আনাম বলেন,  ফারমার্স ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক এই যে লোপাট করে নিচ্ছে। এই তথ্যগুলো আমরা বের করে নিয়ে এসেছি। তাহলে এগুলোও অফিসিয়াল সিক্রেট অ্যাক্টে পড়ে। সড়ক নিরাপত্তা নতুন আইনে জণগণের সড়কে মৃত্যু হলে চালককে দেয়া হবে সর্বোচ্চ ৫ বছরের সাজা। আর আমি সাংবাদিক সিক্রেট অ্যাক্ট ভায়োলেট করলে সাজা হবে ১৪ বছর। তিনি বলেন, একটি ধারা খুবই দুশ্চিন্তার কারণ সেটা হলো, ৪৩ ধারা। ধরেন পুলিশের সন্দেহ হলো ডেইলি স্টারের সার্ভারের মধ্যে কিছু তথ্য-উপাত্ত আছে, যেটা ওনার জানা দরকার। সন্দেহবশত আমার সার্ভারটিকে জব্দ করলেন। তাহলে ওইদিন তো আর ডেইলি স্টার বের হবে না। সংবাদপত্র বন্ধের নির্দেশ ছাড়াও সংবাদপত্র বন্ধ হয়ে যাবে। এছাড়া পুলিশ যদি সন্দেহ করে সে আমার একজন রিপোর্টার, এডিটর বা আমাকেও গ্রেপ্তার করতে পারবে।
আপনারা বলছেন, স্বাধীন মতপ্রকাশ ও গণতন্ত্রের জন্য একটি দুঃখজনক দিন আবার অন্যদিকে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তফা জব্বার বলেন, এই আইন স্বাধীন সাংবাদিকতার বাধা হবে না। ভবিষ্যতে ডিজিটাল যুদ্ধ হবে, এই যুদ্ধে পরাজিত হলে ক্ষতি আমাদেরই হবে। রাষ্ট্র নিরাপত্তা সাধনে আমরাও সহযোগিতা করতে চাই। কিন্তু রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে এটা কারো কী কাম্য হতে পারে। কেউ কেউ মনে করে সত্য কথাকে বন্ধ করে শুধু এক ধরনের কথা চালু রেখে রাষ্ট্র শক্তিশালী হয়। আর আমরা মনে করি ভিন্ন মত প্রকাশে রাষ্ট্র শক্তিশালী হয়।
ইতিহাস কী বলে এসব করার মাধ্যমে দেশ দুর্বল হয়। তিনি বলেন, গুজবের কারণে গ্রেপ্তার। কে গুজব রটালো, কোন গুজব রটালো এটা প্রমাণের কোনো প্রক্রিয়া নেই। আপনার বিচার কবে শুরু হবে তার কোনো ঠিক নেই। দেশের স্বাধীনতা যে অধিকার দিয়েছে সেটা নিয়মিত লঙ্ঘন হচ্ছে। এতো বছরের সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতায় সাংবাদিকতার স্বাধীনতাকে কিভাবে বিচার করবেন? এমন প্রশ্নে মাহফুজ আনাম বলেন, একটা অনুচ্চারিত ঘটনা, ফোন আসে। এটা একটা অস্বাস্থ্যকর চর্চা। আর একটি ঘটনা, যেমন আমাদের বিজ্ঞাপন আসে না। প্রায় ৪০ শতাংশ বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে ঐশ্বরিক কাজ করেছে বাংলাদেশ by মিজানুর রহমান

পাঁচদিন ধরে জাতিসংঘের ৭৩তম অধিবেশন চলছে। হার্ট অব দি নিউ ইয়র্ক ম্যানহাটন এখন সরগরম। পুরো এলাকা ঢেকে দেয়া হয়েছে নিরাপত্তার চাদরে । এমন অবস্থা পিন পড়লেও তার আওয়াজ পাচ্ছেন সিক্রেট সার্ভিসের সদস্যরা। বিশ্ব নেতারা আসতে শুরু করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পও আসছেন। কাল পৌঁছাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ট্রাম্পের আগমন আগামী মঙ্গলবার থেকে শুরু হতে যাওয়া উচ্চ পর্যায়ের আলোচনা বা হাই লেভেল সেগমেন্টে বাড়তি মাত্রা যুক্ত করছে- এমনটাই জানিয়েছেন জাতিসংঘে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী প্রতিনিধি নিকি হ্যালি। মার্কিন প্রেসিডেন্টের জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগদানের প্রস্তুতি ও কর্মসূচির বিস্তারিত জানাতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নিকি হ্যালি এ নিয়ে উচ্ছাসও প্রকাশ করেন। তিনি বিশ্ব নেতৃবৃন্দের এ মিলনমেলাকে ‘স্পিড ডেটিং’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
মার্কিন দূত জানিয়েছেন, এবারে যুক্তরাষ্ট্রের তরফে এমন সব বিষয় সাধারণ পরিষদের আলোচনার টেবিলে আনা হবে, যা এ ধরণীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিকি হ্যালির সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত মানবজমিনের ওই রিপোর্টার জানতে চেয়েছিলেন- জাতিসংঘ অধিবেশনে আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরকার যে প্রায়োরিটি লিস্ট বা অগ্রাধিকার তালিকা করেছে তার মধ্যে এই মুহূর্তে বাংলাদেশ তথা বিশ্ব সমপ্রদায়ের গভীর উদ্বেগের বিষয় রোহিঙ্গা ইস্যুুতে আর স্পষ্ট করে বললে বিদ্যমান এ সংকটের টেকসই সমাধান প্রশ্নে সুনির্দিষ্ট আলোচনার কোনো চিন্তা বা পরিকল্পনা আছে কি-না? জবাবে মার্কিন দূত মিজ হ্যালি কেবল হ্যাঁ বোধক জবাবই দেননি, এ নিয়ে আলোচনা যে কতটা জরুরি সেটি সবিস্তারে তুলে ধরেন। বরাবরের মতো রোহিঙ্গাদের ওপর বর্মীদের বর্বর আক্রমণের তীব্র নিন্দা এবং এ নিয়ে বাংলাদেশের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন তিনি। বলেন, নির্যাতনের মুখে প্রাণে বাঁচতে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় সীমান্ত এবং হৃদয় খুলে দিয়ে বাংলাদেশ ঐশ্বরিক কাজ করেছে।
নিকি হ্যালি রোহিঙ্গা তথা মানবতার প্রতি বাংলাদেশ সরকার এবং গোটা দেশবাসীর মহানুভবতাকে গর্ডস ওয়ার্ক বা ‘স্রষ্টার কাজ’ বলে মন্তব্য করেন। সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন দূত অং সান সুচির নাম উল্লেখ করেই মিয়ানমারের সরকারের কর্মকাণ্ডের কড়া সমালোচনা করেন। বলেন, এই মুহূর্তে (চলমান জাতিসংঘ অধিবেশনে) হাই টপিক বা অগ্রাধিকারে থাকা বিষয় হচ্ছে- বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের কোন পথে বা কীভাবে নিরাপদে বার্মায় ফেরানো যাবে? সেটি খোঁজা। কিন্তু এ নিয়ে যে বার্মা সরকার  কোনো পদক্ষেপই নিচ্ছে না তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে তিনি তার নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। বলেন- এ নিয়ে বার্মা সরকার তেমন কিছুই করছে না।
রোহিঙ্গা সমপ্রদায়ের ওপর যে বর্বর অত্যাচার করা হয়েছে তার দায় এখনো নেয়নি বর্মী সেনাবাহিনী। আর অং সান সুচি, তিনি সেদিন বললেন, রয়টার্সের দুজন রিপোর্টারের কারাদণ্ড সেটিও নাকি সঠিক! বর্মী নেতৃত্বের দায়িত্বহীন ওই সব বক্তব্য এবং আচরণে খেদোক্তি করে মার্কিন দূত বলেন, এটাই প্রকৃত সমস্যা। গত বছর রোহিঙ্গা সংকট ভয়াবহ রূপ ধারণ করায় অর্থাৎ রোহিঙ্গা ঢলের সূচনা থেকে সংকটটির সমাধানে সোচ্চার জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক নিকি হ্যালি বর্মী নেতৃত্বের প্রতি খোঁচা মেরে বলেন, আমার মনে হয় এখানে কমিউনিকেশনেরও ঘাটতি রয়েছে।
কারণ তারা (বার্মা সরকার) কি বলে এটা কেউ বুঝে না। আর আমরা তথা বিশ্ববাসী যা বলি এতে তারা (বর্মীরা) কর্ণপাত করে না বা শুনে না। মার্কিন দূত বার্মা বা মিয়ানমারের বন্ধু যারা কূটনৈতিকভাবে বিশেষত জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ, হিউম্যান রাইটস কাউন্সিল এবং থার্ড কমিটির মতো গুরুত্বপূর্ণ ফোরামেও তাদের পাশে থেকে রক্ষার চেষ্টা চালায় তাদের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে এ সংকটের সমাধানে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের জন্য জরুরি হচ্ছে এক সুরে অভিন্ন ভাষায় কথা বলা। মার্কিন দূত বলেন, বৃটেনের আয়োজনে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে মন্ত্রী পর্যায়ের একটি  বৈঠক হবে জাতিসংঘ অধিবেশনের সাইড লাইনে। আমি তাতে অংশ নেবো এবং সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান তুলে ধরবো।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করবেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে একটি রেজুলেশন আনা হবে বলে জানিয়েছেন জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি মাসুদ বিন মোমেন। প্রধানমন্ত্রীর সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশগ্রহণ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই তথ্য জানান। এ অধিবেশন চলাকালীন প্রধানমন্ত্রী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও’র সঙ্গে বৈঠক করবেন বলে জানান। রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে এবারের অধিবেশনে গতবারের মতো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন অর্জনে বাংলাদেশের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে উল্লেখ করে মাসুদ বিন মোমেন বলেন, রোহিঙ্গা বিষয়ে আমাদের সর্বাত্মক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে যা দৃশ্যমান। জাতিসংঘে আমরা সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পর্যায়ে এ বিষয়ে বিশ্ব সম্প্রদায়ের আরো জোর সমর্থন অর্জনের চেষ্টা করবো।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, প্রধানমন্ত্রী নিউ ইয়র্ক পৌঁছাবেন ২৩শে সেপ্টেম্বর দুপুরে। এদিন সন্ধ্যায় যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশি কম্যুনিটি আয়োজিত এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন তিনি। পরের দিন ২৪শে সেপ্টেম্বর বিকালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে লেনসন ম্যান্ডেলা পিস সামিটে ভাষণ  দেবেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। এর আগে সকালে বিশ্ব মাদক সমস্যা বিষয়ে বৈশ্বিক আহ্বান সংক্রান্ত একটি উচ্চ পর্যায়ের সভায় যোগ দেবেন। ইভেন্টটির আয়োজক যুক্তরাষ্ট্র। অন্যান্য ২৯টি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশ এর সহ-আয়োজক। উপস্থিত থাকবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও জাতিসংঘ মহাসচিব। একই দিনে শরণার্থী বিষয়ক বৈশ্বিক কম্প্যাক্ট ও শিক্ষা বিষয়ক দুটি উচ্চ পর্যায়ের হাই-লেভেল ইভেন্টে অংশ  নেবেন প্রধানমন্ত্রী।
এ ছাড়া দুপুরে ইউএস চেম্বার অব কমার্স আয়োজিত একটি রাউন্ড টেবিল আলোচনায় তিনি অংশগ্রহণ করবেন। প্রধানমন্ত্রী ২৫শে সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ও জাতিসংঘের নিরস্ত্রীকরণ বিষয়ক কার্যালয়ের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত সাইবার সিকিউরিটি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিষয়ক একটি উচ্চ পর্যায়ের সভায় বক্তব্য রাখবেন। এতে জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, এস্তোনিয়া ও সিঙ্গাপুর কো-স্পন্সর করছে। জাতিসংঘ মহাসচিবের আয়োজনে অ্যাকশন ফর পিস কিপিং বিষয়ক উচ্চ পর্যায়ের সভায় অংশগ্রহণ করবেন। পিস কিপিং বিষয়ক এই ইভেন্টে প্রদেয় বক্তব্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের শান্তিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ক্রমাগত উন্নতির বিষয়গুলো তুলে ধরবেন।
এ ছাড়া তিনি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের চতুর্থ শিল্প বিপ্লব সম্পর্কিত একটি প্যানেলে যোগ  দেবেন। জাতিসংঘ মহাসচিবের আমন্ত্রণে ২৬শে সেপ্টেম্বর জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক উচ্চ পর্যায়ের সভায় যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। ২৭শে সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী সাধারণ পরিষদের জেনারেল ডিবেট অধিবেশনে ভাষণ দেবেন। প্রতিবারের মতো এবারও প্রধানমন্ত্রী বাংলায় ভাষণ দেবেন। রোহিঙ্গা ইস্যুতে গতবারের উত্থাপিত পাঁচ দফা সুপারিশমালার ধারাবাহিকতায় এবারেও প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বক্তব্য রাখবেন। এর আগে লিথুনিয়ার প্রেসিডেন্ট আয়োজিত ‘নারীর ক্ষমতায়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন’ বিষয়ক সাইড ইভেন্টে ভাষণ  দেবেন প্রধানমন্ত্রী। শিক্ষা ও নারী অধিকার বিষয়ক উচ্চ পর্যায়ের ইভেন্টগুলোতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নারীর শিক্ষা ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের অর্জনসমূহ তুলে ধরবেন তিনি।
এসব ইভেন্টগুলোতে উপস্থিত থাকবেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী, লিথুয়ানিয়ার প্রেসিডেন্ট, জাতিসংঘ মহাসচিবের বৈশ্বিক শিক্ষা বিষয়ক বিশেষ দূত গর্ডন ব্রাউন। ২৮শে সেপ্টেম্বর সকালে প্রধানমন্ত্রী তার এই সফর নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করবেন। এর পাশাপাশি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কয়েকটি দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান, জাতিসংঘ মহাসচিব, কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধানদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নিয়ে পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করবেন।
জাতিসংঘ মহাসচিবের সঙ্গে আলোচনায় রোহিঙ্গা বিষয়টি প্রাধান্য পাবে। প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আয়োজিত একটি রিসেপশন এবং জাতিসংঘ মহাসচিব আয়োজিত মধ্যাহ্নভোজে অংশগ্রহণ করবেন বলে আশা করা যাচ্ছে। এ ছাড়া প্রতিবারের মতো এবারো প্রধানমন্ত্রী কয়েকটি অ্যাওয়ার্ড পেতে যাচ্ছেন বলে মাসুদ বিন মোমেন জানান।
উল্লেখ্য, ২৩-২৯শে সেপ্টেম্বর ২০১৮ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৩তম অধিবেশনে অংশগ্রহণ করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিউ ইয়র্ক আসছেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এবারের অধিবেশনে তিনি ৯০ সদস্যবিশিষ্ট বাংলাদেশ সরকারি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হবেন।

জামায়াতকে বাদ দিয়ে নতুন ধারার রাজনীতির সূচনা: ৩০শে সেপ্টেম্বরের মধ্যে নিরপেক্ষ সরকার গঠনের দাবি

নতুন এক ধারার সূচনা হয়েছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে। জামায়াত বাদে নানা মত আর পথের রাজনৈতিক দল শামিল হয়েছে এ প্রক্রিয়ায়। ডান-বাম-মধ্যপন্থি-ইসলামপন্থি সব ধারার দলের নেতাদেরই দেখা গেছে গতকাল মহানগর নাট্যমঞ্চে। নির্বাচন আর রাজবন্দিদের মুক্তির ইস্যুতে অভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে সমাবেশ থেকে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠনে ৩০শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকারকে সময় দিয়ে বলা হয়েছে এর অন্যথা হলে ১লা অক্টোবর থেকে সারা দেশে ঐক্য প্রক্রিয়া সভা-সমাবেশের কর্মসূচিতে যাবে। ন্যায় বিচার প্রক্রিয়াকে অগ্রাহ্য, ব্যাহত ও অকার্যকর করে খালেদা জিয়াকে অন্যায়ভাবে কারারুদ্ধ করে রাখা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে ঘোষণাপত্রে।
জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার ব্যানারে আয়োজিত নাগরিক সমাবেশে বিএনপি ও ২০ দলের অন্যান্য শরিক দল, যুক্ত ফ্রন্ট, গণফোরামের নেতারা ছাড়া আরো কয়েকটি দলের প্রতিনিধি ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন। ২০ দলের শরিক জামায়াতকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি এ সমাবেশে। সিপিবি-বাসদ নেতৃত্বাধীন বাম গণতান্ত্রিক জোটের অংশীদার গণসংহতি আন্দোলনের শীর্ষনেতা জোনায়েদ সাকিও সমাবেশে বক্তব্য দেন। সমাবেশ শেষে ঘোষণাপত্রও উপস্থাপন করেন বাম সমর্থিত তেল-গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা জাফরুল্লাহ চৌধুরী, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন ও আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য সুলতান মো. মনসুর আহমেদও যোগ দেন সমাবেশে। বিকল্পধারা বাংলাদেশের চেয়ারম্যান অধ্যাপক বি. চৌধুরী সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নিয়ে কড়া বক্তব্য রেখেছেন জাতীয় ঐক্যের পক্ষে। সমাবেশ থেকে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন অন্য নেতারাও। আয়োজকরা জানিয়েছেন, জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া বৃহত্তর ঐক্য গড়ার যে লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে নাট্যমঞ্চের সমাবেশের মাধ্যমে এর ভিত রচিত হলো। সামনে এ প্রক্রিয়া বৃহত্তর ঐক্যে রূপ নেবে।
সভা, করবো, অনুমতির তোয়াক্কা করবো না
সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিকল্পধারা বাংলাদেশের সভাপতি ও সাবেক প্রেসিডেন্ট ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী সরকারের প্রতি প্রশ্ন রেখে বলেন, কেন এ স্বাধীন দেশে মায়েরা-বোনেরা আতঙ্কে থাকে দিনে রাতে, ঘুমোতে পারে না। কেন বৃদ্ধ মা-বাবা শঙ্কিত থাকে তার সন্তান কি ঘরে ফিরবে কিনা? কেন এ হত্যা, গুম, সন্ত্রাস? কেন, কেন, কেন? সারা দেশে অধিকার হারা ও লুণ্ঠিত জনগণের এ অভিযোগ আজ সরকারের কাছে। তারা আজ রুখে দাঁড়াবে। স্বাধীন বাংলাদেশে কেন মায়েরা নির্যাতিত হবে, কেন শিশুদের ওপর নির্যাতন হবে। তিনি বলেন, পুলিশ-র‌্যাব আমাদের সন্তান। তাদের কেন আমাদেরই সন্তানদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে। জবাব দিতে হবে। প্রবীণ এ নেতা বলেন, ঘুষকে স্পিড মানি হিসেবে সরকারিকরণ করা হয়েছে। সরকারের প্রতি চ্যালেঞ্জের পর চ্যালেঞ্জ দিচ্ছি, কোন মন্ত্রণালয়টায় দুর্নীতি নেই জবাব দেন। কিন্তু দিতে পারে না। কেন একটি জাতির নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটালেন? কোটি কোটি টাকা চুরি করে, দুর্নীতি করে; লজ্জা নেই? স্কুলের শিক্ষার্থীদের কেন নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তায় নামতে হলো?
সড়কটাকেও নিরাপদ করতে পারলেন না? কোটা সংস্কার আন্দোলন ছিল মেধাবীদের পক্ষে। কিন্তু হাতুড়ি, লাঠি, পিস্তল নিয়ে তাদের পেছনে ধাওয়া করলেন। আপনাদের লজ্জা নেই, শরম নেই। বি. চৌধুরী প্রশ্ন রেখে বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মুক্তির যে স্বপ্ন আমরা দেখি তার জন্য প্রয়োজন মেধাবীদের। সেগুলো কি নির্বোধ লোকরা করবে? আর মেধাবীদের আপনি হাতুড়ি দিয়ে পেঠাবেন? স্বাধীন দেশে প্রতিবার সভা করার জন্য কেন পুলিশের কাছে অনুমতি নিতে হবে? আপনারা পুলিশকে অপদস্থ ও কলঙ্কিত করতে চান আমাদের চোখে। কিন্তু আমরা তো জানি, পেছনের লোকটি তো আপনি। স্বার্থসিদ্ধির জন্য পুলিশকে ব্যবহার করে চলেছেন। আমরা সভা করবো। অনুমতির তোয়াক্কা করবো না। আমাদের অনুমতি দেবে জনগণ।
সাবেক এ প্রেসিডেন্ট বলেন, আমার ভোট আমি দেব, পছন্দ করে উপযুক্ত লোককে দেব। কেন দিতে পারবো না? পারি না কি জন্য জানেন? কারণ আপনি (প্রধানমন্ত্রী) চান আপনার সরকার। আপনার সরকার সূক্ষ্মতম কারচুরির মাধ্যমে ভোট জেতার জন্য সাতদিন আগ থেকে সমস্ত এজেন্টদের গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। আর পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে থাকে নির্বাচন কমিশন। সূক্ষ্ম কারচুপির মাধ্যমে আপনি কেন আমার ভোট দিতে দেবেন না, এ অধিকার কে আপনাকে দিয়েছে। তিনি বলেন, এমন দলীয়করণ করেছেন, রাজনীতি করতে হলে আপনার পক্ষে থেকে করতে হবে। এটা কোন কথা হলো? আমি স্বাধীনভাবে রাজনীতি করতে চাই, স্বাধীনভাবে বাঁচতে চাই, স্বাধীনভাবে ভাবতে চাই। স্বাধীনভাবে ভোট দিতে চাই।
বি. চৌধুরী বলেন, সারা পৃথিবী পরিত্যাগ করেছে যে ইভিএম যন্ত্র, সে যন্ত্রের যন্ত্রণা আমাদের উপর চাপিয়ে দিতে চান জোর করে? সে জন্য ৪ হাজার কোটি টাকা ছুড়ে ফেলে দিতে পারেন না। ছুড়ে ফেলে দেব আমরা। এই ইভিএম ছুড়ে ফেলে দিবো। ইভিএমের বদলে যদি সাহস থাকে, বুকের পাটা থাকে তাহলে কেন্দ্রে কেন্দ্রে সিসি টিভি লাগান। কেবল বুথ ছাড়া সব জায়গায়, যেন বাইরে থেকে সাধারণ সবাই সেটা দেখতে পান। সাহস আছে? সরকারকে জবাব দিতে হবে, কেন সিসি টিভি দেবে না, কেন ইভিএম ফেলে দেবে না। তিনি বলেন, আমরা বিদেশি পর্যবেক্ষক চাই। তবে ১৪ বা ২৪ জন নয়। তারা থাকেন কয়দিন, দুইদিন। কি নির্বাচন দেখেন? যেসব জায়গায় লিখে দেন ওইখানে যান। সেখানে বেড়িয়ে আসেন। লিখে দেন চমৎকার নির্বাচন। কমপ্লিট ননসেন্স, আপনাদের (সরকার) ভাষা ধার নিয়ে বলছি, রাবিশ। বাইরে থেকে যেসব পর্যবেক্ষক আসবে তাদের এক মাস আগে আনতে হবে। জাতিসংঘ থেকে ১০০ প্রতিনিধি নির্বাচন করতে হবে। তারা এক মাস আগে এসে দেখবে, কোথায় চুরি ডাকাতি হচ্ছে, কেমন করে জুলুম নির্যাতন হচ্ছে, কেমন করে রেজাল্ট বিরোধী দলের ওপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। দেখবে, বুঝবে, তারপর লিখবে রিপোর্ট, তারপর নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা হয় কিনা তা দেখতে আরো সাতদিন থাকবে। পারবেন? পারবেন না। কেন পারবেন না। কারণ দুরভিসন্ধি ছাড়া কোনো কারণ নেই।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্দেশে বি. চৌধুরী বলেন, ক্ষমতা দেখাচ্ছেন? আসল জিনিসই তো বুঝেননি। আপনাকে দেশের জনগণ ভোট দেয় ক্ষমতা দেখানোর জন্য নয়, তাদের দায়িত্ব পালন করার জন্য। আগের অনেকে বুঝতে চায়নি, এখনো অনেকে চায় না। তারা চায় ক্ষমতা, ক্ষমতা। নো ক্ষমতা, দায়িত্ববোধের রাজনীতি করেন। আওয়ামী লীগের উদ্দেশে বলেন, আপনারা শাসন করেছেন ১০ বছর। বাংলাদেশের ইতিহাসে কোন দল ১০ বছর শাসন করেনি। তাতেই এত সাহস, তাতেই এত নির্যাতন, গণতন্ত্র হত্যা! কিন্তু তার পরও তো আমরা গঙ্গার পানি পাইনি। তার পরও তিস্তার পানি পাইনি। এতে কি প্রমাণ হয়, প্রমাণ যাই হোক, আপনাকে জবাব দিতে হবে। ডা. বি. চৌধুরী বলেন, কোনো দেশ, কোনো রাষ্ট্র আমাদের চিরকালীন শত্রু হতে পারে না। কোনো রাষ্ট্র চিরকালের মিত্রও হতে পারে না। ভারত আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু। আমাদের দাবি যখন ন্যায়সঙ্গত হবে আমরা বন্ধুর মতো ভাববো। আগেও বলেছি ভারত বন্ধু রাষ্ট্র, এখনো বলি বন্ধু রাষ্ট্র। কিন্তু বলতে হবে বন্ধু রাষ্ট্র, তুমি কোথায়? আমার পানি কোথায়? ভারত বন্ধু রাষ্ট্র তাহলে আপনারা পানি আনতে পারেননি কেন? বন্ধু রাষ্ট্রের কাছে আদায় করতে পারলেন না তাহলে রাষ্ট্র পরিচালনার যোগ্যতা তো আপনার নেই।
সাবেক এ প্রেসিডেন্ট বলেন, এতগুলো কেন’র যদি জবাব দিতে হয় তাহলে সরকার কোথায় যাবে? যাবে কোথায়? জোর গলায় বলা যাবে না? নাকি খালি ঝগড়াই করবো? কাজেই আজকে রুখে দাঁড়ানোর সময়। বাংলাদেশের মানুষ রুখে দাঁড়াতে জানে। আগে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, আমাদের দাবি আদায় ও অর্জনের সময়। এখন যদি ঐক্য করতে না পারেন কবে করবেন? গণতন্ত্রের স্বপক্ষের সব শক্তিকে আমরা আহ্বান করেছি ঐক্য হোক। আমরা বিএনপির সঙ্গে আলোচনা করেছি। যুক্তফ্রন্টের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। আমি অত্যন্ত আশান্বিত, ভবিষ্যতে এ প্রক্রিয়ার একটি সুফল হবে। তিনি বলেন, আমরা যে কাগজটি সই করেছি, সেখানে পরিষ্কারভাবে কথাগুলো লেখা আছে। আর তিন সপ্তাহ বেঁচে থাকলে ৮৮ বছর পূর্ণ করবো। কিন্তু আমার কি অসুখ-বিসুখ হতে পারবে না। এ গ্যারান্টি কে দেবে? কেন এগুলো নিয়ে মানুষ তামাশা করে।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জননেত্রী খালেদা জিয়া আমার চেয়ে ১৫ বছরের ছোট। তিনি অসুস্থ। আমিই তো বলেছিলাম, তার টিআইএ হয়েছে। এতে কখনো কখনো অঙ্গহানিও হয়ে যায়। আমি প্রথম স্টেটমেন্ট দিয়েছি। কিন্তু তারপরও একটি বোর্ড হয়েছে। তিনি নাগরিক সমাবেশে উপস্থিত বিএনপি নেতাদের দিকে তাকিয়ে বলেন, এখানে অনেক আইনবিদ আছেন। তারা কি জানেন না? আমার স্বাস্থ্যের ব্যাপারে আমার একটি অধিকার আছে। আমি যাকে মনোনীত করিনি সে আমার রোগের ইতিহাস নিতে পারে না। শরীরে হাত দিতে পারে না। আমার গোপনীয় রিপোর্টগুলো দেখতে পারে না। কিন্তু আপনারা (বিএনপি) বসে রইলেন, আমরা দেখলাম। এরপরও খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য মেডিকেল বোর্ড করে তারা কেমন করে তার ইতিহাস নিতে গেল? কেমন করে গায়ে হাত দিলো। কেমন করে তার গোপনীয় রিপোর্ট দেখলো। প্রশ্ন করলেন না? করা উচিত ছিল।
জাতীয় ঐক্যের ব্যাপারে বি. চৌধুরী বলেন, স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এই জন্য স্বাধীনতার মর্মতো তারাই বুঝে সবচাইতে বেশি। যারা রক্ত দিয়েছি। আর যারা অস্তিত্বে বিশ্বাস করেনি তারা কি আমাদের মতো বুঝবে। একটি বেদনা কি থাকবে না? আমরা কি কিছু বলবো না? আসুন গণতান্ত্রিক শক্তি ঐক্যবদ্ধ হই। কিন্তু যারা এ দেশ স্বাধীন করার জন্য রক্ত দিয়েছে, জীবন দিয়েছে, সম্ভ্রম দিয়েছে আজ দেশমুক্ত করার সময় আমরা কি তাদের কথা ভাববো না, তাদের ভুলে যাবো? এতবড় বেঈমান আমরা হতে পারবো না। আমরা স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির ঐক্য চাই। যারা মানচিত্রে বিশ্বাস করবে না তাদেরকে আমরা কীভাবে বিশ্বাস করবো। যারা আমার পতাকাকে অন্তর থেকে শ্রদ্ধা করতে জানবে না তাদের কীভাবে বিশ্বাস করবো। যারা আমাদের এই বাংলাদেশকে এখনো স্বীকার করবে না আমি তাদের কেমন করে স্বীকার করবো।
বি. চৌধুরী বলেন, আমি মুক্ত গণতন্ত্র চাই, এ সরকারের পতন চাই। কিন্তু বেগম জিয়ার মুক্তি চাই। সমস্ত রাজবন্দির মুক্তি চাই। একবিন্দু এদিক-ওদিক নেই। পরিষ্কার লেখা আছে। নির্বাচন করতে হলে আমরা খালেদা জিয়ার মুক্তি চাই, সমস্ত রাজবন্দির মুক্তি চাই। আমরা বলেছি, ১০০ দিন আগে থেকে আমাদের সেনাবাহিনীকে নামাতে হবে। যারা বিশ্বের নানা দেশের শান্তি রক্ষা করে তাদের নিজ দেশের শান্তি রক্ষা করার অধিকার থাকবে না? এটা কেমন কথা হলো? এর মধ্যে অনেকে সামরিক শাসনের গন্ধ পান। আপনাদের নাকই পচা ভাই। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, ড. কামাল হোসেন, যুক্তফ্রন্ট, বিএনপিসহ অন্যান্য দল তারা কেউ সংবিধানের বাইরে অন্য কোনো সরকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে রায় দেবে না।
ভবিষ্যতের জন্য রক্ষাকবচ তৈরির তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে স্বেচ্ছাচারী, গণতন্ত্রবিরোধী আরো একটি সরকার আসবে সেটা বন্ধ করতে হবে। ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের সরকার আর কখনো না আসে। আপনারা সেটা চান না? এ জন্য রক্ষাকবচ তৈরি করতে রাজি আছেন? এ জন্য ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার কথা বলেছি। পিছু হটা যাবে না। তিনি বলেন, আমরা চাই জাতীয় ঐক্য, আমরা চাই এ অপশাসন দূর হয়ে যাক। আমরা চাই জনগণের পরিত্যক্ত এ সরকার ১০ বছরের মধ্যে আর যেন উঠতে না পারে। আমরা এও চাই গণতন্ত্র ফিরে আসুক, যারা সরকার গঠন করবে তারা শুধু ক্ষমতার সরকার করবে না। তারা দায়িত্ব বোধের পরিচয় দেবে। তরুণ সমাজ যারা ধীরে ধীরে রাজনীতির বিপক্ষে চলে যাচ্ছে তাদের কাছে আনতে হবে। শেষকথা একটাই- মন খুলে বলেছি, অপব্যাখ্যা করবেন না, ভুল করবেন না। ভবিষ্যতের শান্তি-সুখের বাংলাদেশ চান, সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ চান? তাই যদি হয় তাহলে ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের সরকার না আসে তার রক্ষাকবচ চান? সেটা করতে হবে।
সমাবেশে দেয়া বক্তব্যে ন্যূনতম কর্মসূচি ও দাবি-দাওয়ার ভিত্তিতে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দাবি আদায়ের আন্দোলনে শুরুর তাগিদ দিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। নাগরিক সমাবেশে প্রধান বক্তার বক্তব্যে মির্জা আলমগীর বলেন, আমরা ইতিমধ্যে ঐক্যের পথে একধাপ এগিয়ে গেছি। আশা করব, দাবিগুলো অর্জন করে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারব। সবাইকে জনগণের অধিকার ফিরে পাওয়া ও অধিকার প্রতিষ্ঠার এ আন্দোলনে শরিক হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। আসুন আমরা ন্যূনতম কর্মসূচির ভিত্তিতে, ন্যূনতম দাবি-দাওয়াসহ জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দাবিগুলো আদায় করতে একটি আন্দোলন শুরু করি। সে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমরা দেশনেত্রী খালেদা জিয়াসহ সকল রাজবন্দিকে মুক্তি দিতে এ সরকারকে বাধ্য করবো। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দিতে বাধ্য করতে হবে।
এ জন্য আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। বক্তব্যের শুরুতেই তিনি জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার উদ্যোগ নেয়ায় গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের প্রতি ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, জাতির এ চরম দুর্দিনে, যখন সবাই একটি মুক্তির পথ খুঁজছে তখন তিনি একটি পথ দেখিয়ে জনগণকে সামনে নিয়ে এসেছেন। বাংলাদেশের মানুষকে তাদের হারিয়ে যাওয়া গণতান্ত্রিক অধিকার, ভোট ও বেঁচে থাকার অধিকারকে ফিরিয়ে আনার জন্য আন্দোলনে একতাবদ্ধ হয়ে একমঞ্চে উপস্থিত হওয়ার জন্য জাতীয় নেতৃবৃন্দকে ধন্যবাদ জানান তিনি। মির্জা আলমগীর বলেন, গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করায় গণতন্ত্রের নেতা খালেদা জিয়াকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। দেশনেত্রী খালেদা জিয়াকে এখন একটা স্যাঁতসেঁতে পরিত্যক্ত নির্জন কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে। তার চিকিৎসা সুচিকিৎসা হচ্ছে না। তাকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।
দেশে অপশাসন ও দুঃশাসন চলছে: ড. কামাল
সভাপতির বক্তব্যে গণফোরাম সভাপতি ও ঐক্য প্রক্রিয়ার আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেন বলেন, দেশের বিভিন্নস্থান থেকে আপনারা এসেছেন একটি আকাঙ্ক্ষা নিয়ে তা হচ্ছে হারানো গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা। আপনারা এসেছেন একটি প্রতিজ্ঞা নিয়ে তা হচ্ছে লুণ্ঠিত ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা করা। আমাদের সবার প্রত্যাশা সুখী, সমৃদ্ধ, উদার, গণতান্ত্রিক ও বহুমতের বাংলাদেশ। ড. কামাল বলেন, দেশে এখন অপশাসন ও দুঃশাসন চলছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে প্রতিনিয়ত হয়রানি ও অপদস্থ করা হচ্ছে। বাংলাদেশের জনগণ গণতন্ত্রের জন্য অনেক সংগ্রাম করে জয়ী হয়েছে।
আবার হোঁচট খেয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বঙ্গবন্ধু বলতেন মানুষ ঐক্যবদ্ধ হলে কেউ তাদের দাবিয়ে রাখতে পারে না। ড. কামাল দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বলেন, আমরা শুধু ক্ষমতার রাজনীতি করি না। আমরা জনগণের ক্ষমতায়নে বিশ্বাস করি।
জনগণের ক্ষমতা জনগণের নিকট ফিরিয়ে দেয়াই আমাদের লক্ষ্য। আমরা আমাদের সাধ্য অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছি। আমরা জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে চাই। তিনি বলেন, বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের ইতিহাস যেমন আছে, গণতন্ত্রকে হত্যা করে জনগণের ভোটাধিকার হরণ করার ইতিহাসও আছে। দেশে উন্নয়নের নামে লুটপাট চলছে মন্তব্য করে ড. কামাল হোসেন বলেন, ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুণ্ঠন করা হচ্ছে। মেগা প্রকল্পের নামে জনগণের টাকা অপচয় করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকে টাকা ও স্বর্ণ গচ্ছিত রাখাও নিরাপদ না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ধনী বাড়ার যে প্রবণতা তাতে বাংলাদেশের নাম সবার আগে। এটা আমাদের জন্য লজ্জার বিষয়।
জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া সম্পর্কে ড. কামাল বলেন, আমরা প্রকাশ্য সভা করছি। কোনো গোপন বৈঠক করছি না। যারা জনগণের শক্তিকে ভয় পায়, তারা জনগণের সংগঠিত হওয়ার প্রচেষ্টাকে ষড়যন্ত্র বলে তারা জনগণকেই অপমান করছে। তিনি বলেন, আমি বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্য পেয়েছি। বঙ্গবন্ধু আমাকে সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশের সংবিধান রচনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। এটা আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া। ব্যক্তিগতভাবে আমার আর চাওয়া-পাওয়ার কিছু নাই।
সংবিধান অনুসারে জনগণের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করাই একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমার পবিত্র দায়িত্ব। তিনি বলেন, মৌলিক বিষয়ে মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে আছে। এখন সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করার সময় এসেছে। তিনি বলেন, আমি বিশ্বাস করি আমাদের প্রচেষ্টা সফল হবে। তিনি উপস্থিত নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে বলেন, আপনারা নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলুন। মুক্তিরবার্তা নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ান। মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করুন। অতীতে জনগণের বিজয়কে কেউ ঠেকাতে পারেনি, ভবিষ্যতেও পারবে না।
সমাবেশে ঘোষণাপত্র:
নাগরিক সমাবেশ শেষে জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়ার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। পরে কণ্ঠভোটে ও হাত তুলে প্রস্তাবটি পাস করেন নাগরিক সমাবেশে অংশ নেয়া রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা। ৩০শে সেপ্টেম্বরের মধ্যে সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠনের আহ্বান জানানো হয়েছে জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়ার সমাবেশ থেকে। সমাবেশের ঘোষণাপত্রে এ দাবি জানিয়ে বলা হয়েছে ৩০শে সেপ্টেম্বরের পর ১লা অক্টোবর থেকে সারা দেশে সভা-সমাবেশ শুরু হবে। এতে জাতীয় নেতৃবৃন্দ অংশ নেবেন। ঘোষণাপত্রে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার আইনগত ও ন্যায়সঙ্গত অধিকার নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। এতে বলা হয়, কোটা সংস্কার এবং নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ছাত্রছাত্রীসহ সকল রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে আনীত মিথ্যা মামলাসমূহ প্রত্যাহার করতে হবে এবং  গ্রেপ্তারকৃতদের মুক্তি দিতে হবে।
এখন থেকে নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করা যাবে না। এ নাগরিক সমাবেশ থেকে সরকারের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি যে, সরকার আগামী ৩০শে সেপ্টেম্বর ২০১৮’র মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ- আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠন এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি করার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবেন এবং তফসিল ঘোষণার পূর্বে বর্তমান সংসদ ভেঙে দেবেন। আমরা দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি-এ গণদাবি আদায়ের লক্ষ্যে প্রতিটি জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে মুক্তিসংগ্রামের চেতনায় বিশ্বাসী সকল রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি শ্রেণি-পেশা ও নাগরিক সমাজের সমন্বয়ে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য’র কমিটি গঠন করুন এবং দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধভাবে নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ গণজাগরণের কর্মসূচি অব্যাহত রাখুন।
জনগণের ঐক্য হলে স্বৈরাচার পালায়
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেন, জাতীয় ঐক্য মানে জনগণের ঐক্য। জনগণের ঐক্য যখন হয় তখন স্বৈরাচার পালায়। দেশ খুন, গুম, অপরহণ ও বেওয়ারিশ লাশের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। সবাইকে মাঠে নামতে হবে। ব্যাংকে টাকা নেই, ভল্টে সোনা নেই, খনিতে কয়লা নেই। সব লুট হয়ে গেছে। দেশ লুটের মালে পরিণত হয়েছে। কবে মানচিত্র চুরি হয়ে যায় সেই চিন্তায় আছি। দেশকে কোথায় নিয়ে যাবে। জাহান্নামের পরে যদি কিছু থাকে সেখানে নিয়ে যাবে না কি। এজন্য মুক্তিযুদ্ধ করিনি। রক্ত দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার অর্জন করিনি।
এই সরকার তা বাতিল করেছে। নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন চাই। পার্লামেন্ট বাতিল করে আপনিও নির্বাচনে আসতে পারেন। তাতে আপনি রাজি হলে ও জিতলে, জনগণ যে ভোট দেবে তা আমরা মেনে নেব। দেশে এক টাকার উন্নয়ন হয়েছে, একশ টাকা লুট হয়েছে। আসুন ঐক্য প্রক্রিয়া গড়ে তুলি। এর বিকল্প নেই। রাজবন্দিদেরকে কারাগারে রাখতে পারবেন না। মুক্তি দিতে হবে। সমাবেশে তিনি বিভিন্ন স্লোগান ধরেন। তা হলো, সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে, এবার গদি ছাড়তে হবে। বেহুদার ইভিএম, মানি না মানব না ইত্যাদি।
জাতিকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে
নাগরিক সমাবেশে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেছেন, সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের যে উন্নয়ন হয়েছে তা হচ্ছে কেন্দ্রীভূত উন্নয়ন। এখন সারা দেশের মানুষকে চিকিৎসা, বিচার এমনকি মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা নেয়ার জন্য ঢাকায় আসতে হয়। এই কেন্দ্রীকতার উন্নয়ন জাতিকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। গ্রামের মানুষ, গার্মেন্টেসের কর্মীদের কোনো উন্নয়ন হয়নি। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য কী করণীয় তা করতে হবে। দেশ এখন ‘র’ ও ‘মোসাদ’ দ্বারা পরিচালিত। সুষ্ঠু নির্বাচন করার জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি অনুরোধ জানান।
দুঃশাসনের বিরুদ্ধে জনগণ ঐক্যবদ্ধ
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন বলেন, ঐক্য প্রক্রিয়ার প্রতি আমাদের সমর্থন আছে। দুঃশাসনের প্রতি জনগণ ঐক্যবদ্ধ। প্রয়োজন ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্ব। আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক। দেশ আমাদের, সরকার আমাদের। কিন্তু ভোট আমাদের হবে না তা তো হবে না। বাক্সে ভোট আমাদের, ফলাফল ঘোষণা হবে অন্য স্থান থেকে, তা হবে না। ক্ষমতা না ছাড়ার নীলনকশা করা হচ্ছে। সংসদ ও গণতন্ত্রের নিয়মে নির্বাচন হতে হবে। কয়েক লাখ লোক হত্যা করার ভয় আপনাদের দেখাতে হবে না। জনগণ অপরাজেয়। জনগণের বিষয় নিশ্চিত।
বিনা ভোটের সরকার হঠাতে হবে
ডাকসুর সাবেক ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ বলেন, এখানে  সকল দল-মতের মানুষ একত্রিত হয়েছেন। বঙ্গবন্ধু যাকে সংবিধান প্রণয়নের দায়িত্ব দিয়েছিলেন সেই ড. কামাল হোসেন সভাপতিত্ব করছেন। শুধু দলে দলে, নেতায় নেতায় নয়; পাড়ায় পাড়ায়, ঘরে ঘরে ঐক্য হতে হবে। বিনাভোটের সরকার হটিয়ে দলনিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে হবে। তিনি বলেন, এই আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধু ও তাজ উদ্দীনের আওয়ামী লীগ নয়। লুটেরা আওয়ামী লীগ। বঙ্গবন্ধুর চামড়া দিয়ে যারা ডুগডুগি বাজানোর কথা বলেছিল তাদের আওয়ামী লীগ।
গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু বলেন, ছাত্ররা আমাদের দেখিয়েছে। রাস্তায় শৃঙ্খলা এনেছে। পুলিশকে শিক্ষা দিয়েছে। জনগণ সবকিছু দিয়ে এই আন্দোলন করে যাবে।
বিকল্প ধারা বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক মেজর (অব.) আব্দুল মান্নান বলেন, জাতি আজ রুগ্ন। জনগণ সব অধিকার হারিয়েছে। অধিকার ফিরিয়ে আনতে হবে। কেড়ে আনতে হবে। এখানে দলগুলো অনেক দাবি নিয়ে এসেছে।
দেশের ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে
সমাবেশে গণসংগতি আন্দোলনের আহ্বায়ক জোনায়ের সাকি গত বৃহস্পতিবার পুলিশের পিটুনিতে আহত হন। একহাত গলায় বাঁধা অবস্থায় নিজদলের পক্ষ থেকে তিনি সমাবেশে যোগ দেন। বক্তব্যে তিনি বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের সবাই জানে যে, স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে আমরা আছি। এটা এক ব্যক্তির স্বৈরতন্ত্র নয়। ব্যবস্থাগত স্বৈরতন্ত্র। দেশের স্বৈরতান্ত্রিক কাঠামো কাজে লাগিয়ে এতদিন তা কার্যকর রয়েছে। জনগণ গণতন্ত্র পায়নি।
যে ক্ষমতা কাঠামোর অধীনে এক দল বলে- ‘আসুন। পারলে ঠেকান। ক্ষমতা হারালে আমাদের লোক ঘরে থাকতে পারবে না।’ তাহলে দেখুন, এরা আবার ক্ষমতায় আসলে বিরোধীশক্তি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। সংকট ও সংঘাতকে পুনরাবৃত্তির মধ্যে ফেলেছে। আমাদের নতুন একটি গণতান্ত্রিক কাঠামো আমরা একটা জাতীয় এক্য চাই। সংবিধান সংস্কার করা প্রয়োজন। আগামী নির্বাচনসহ ভবিষ্যতে আরো ৩টা নির্বাচন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে হতে হবে।
বাংলাদেশ বহু আন্তর্জাতিক চক্রান্তের মুখোমুখি ও দেশের ভবিষ্যৎ নানাভাবে হুমকির মুখে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, দেশে এখন নির্বাচিত সরকার নেই। গণতান্ত্রিক সরকার নেই। একটি অবৈধ অনির্বাচিত সরকার আছে। ভোটাধিকার এই সরকার ধ্বংস করে দিয়েছে। সমাবেশে আরো বক্তব্য রাখেন, জাতীয় ঐক্য ঢাকা মহানগরীর যুগ্ম আহ্বায়ক ড. মোমেনা খাতুন, যুব শাখার নেতা মো. হানিফ, গণফোরামের ঢাকা মহনগরীর সভাপতি সাইদুর রহমান ও ঐক্যবদ্ধ ছাত্র সমাজের সভাপতি আজম অপু।
ড. কামাল হোসেনের সভাপতিত্বে ও জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সদস্য সচিব আ ব ম মোস্তফা আমিনের পরিচালনায় নাগরিক সমাবেশে আরো বেশ কয়েকটি দলের প্রধান ও শীর্ষ নেতৃবৃন্দ যোগ দেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন- বিজেপি চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরী, ২০ দলীয় জোটের নেতা জুনায়েদ বাবু নগরী, জাতীয় পার্টি (জাফর) মোস্তফা জামাল হায়দার, লেবার পার্টির মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, স্বদেশ পার্টির সভাপতি রফিকুল ইসলাম মন্টু, আম জনতা ডেমোক্রেটিক পার্টির চেয়ারম্যান মো. মশিউর রহমান শংকু, বাংলাদেশ শরীয়া আন্দোলনের আমীর মাওলানা মুহাম্মদ মাসুম বিল্লাহ, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি-জাগপার সাধারণ সম্পাদক খন্দকার লুৎফর রহমান, খেলাফত মজলিসের ড. আহমেদ আবদুল কাদের ও আহসান হাবীব লিংকন প্রমুখ। বেলা ৩টায় সমাবেশ শুরুর আগে দুপুরের পর থেকে শুরু হয় গণসঙ্গীত পরিবেশনা। সমাবেশের শুরুর দিকে গণসঙ্গীত পরিবেশ করেন, উদীচীর কেন্দ্রীয় সঙ্গীত সম্পাদক সুরাইয়া পারভীন ও মাইশা সুলতানা উর্বী।
জাতীয় ঐক্য ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে: মোশাররফ
বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, আজকের এই সমাবেশের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচার ও ফ্যাসিস্ট সরকার থেকে দেশকে রক্ষা করার প্রক্রিয়ার সূচনা হলো। আজ এই সমাবেশে উপস্থিত নেতারা বর্তমান সরকারকে সরানোর জন্য একটি জাতীয় ঐক্য চাইছে। কিন্তু আমাদের নেত্রী খালেদা জিয়া অনেক আগেই জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছিলেন। আমি মনে করি সারা দেশের মানুষের মধ্যে জাতীয় ঐক্য ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। তিনি বলেন, যে নেত্রী ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেননি বলে কোনো নির্বাচনই হয়নি- এই জন্য তাকে আজ কারাগারে রাখা হয়েছে। তাকে কারাগারে রেখে আবার ৫ই জানুয়ারির মতো আরেকটি নির্বাচন করতে চায়। তিনি আরো বলেন, এই সরকার নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগকে ধ্বংস করে দিয়েছে। এটার প্রমাণ হয়েছে গত ১লা সেপ্টেম্বর থেকে এ পর্যন্ত বিরোধী নেতাকর্মীদের নামে পুলিশ যতো ভুতুড়ে মামলা দিয়েছে তার মাধ্যমে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, আজকের এই সমাবেশ নতুন মাইলফলক।
যার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক রাজনীতির নতুন যাত্রা শুরু হয়েছে। এই ঐক্যপ্রক্রিয়া দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষকে আরো সুসংহত করবে। ড. কামাল হোসেনকে বাংলাদেশের গৌরব আখ্যায়িত করে তার উদ্দেশ্যে বলেন, আইনের শাসন, ভোটের অধিকার রক্ষায়, গণতন্ত্র রক্ষায় আমরা এক সঙ্গে কাজ করতে চাই। ভোটের অধিকার রক্ষায় আপনারা কাজ করেন। আমরা আপনাদের সঙ্গে আছি। ইনশাআল্লাহ ভবিষ্যতেও থাকবো। মওদুদ বলেন, আমি মনে করি ৫টি দাবি নিয়ে ঐক্যপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। নির্বাচনকালীন সরকার নিরপেক্ষ হতে হবে, সংসদ ভেঙে দিতে হবে, নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে, ইসি পুনর্গঠন করতে হবে ও নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার বাতিল করতে হবে। এই দাবিগুলোর সঙ্গে আমরা যারা বিএনপি করি তাদের আরেকটি দাবি হলো- দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তি দিতে হবে। সকল নেতাকর্মীকে মুক্তি দিতে হবে। কোনো নতুন গ্রেপ্তার চলবে না। 
স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান বলেন, আজকে থেকে ৪৭ বছর আগে এ দেশের কোটি কোটি মানুষ স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। লক্ষ লক্ষ মানুষ রক্ত দিয়েছিল। অথচ স্বাধীনতার এত বছর পরেও আমাদের বলতে হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা আজ মৃত। অল্প সংখ্যক মানুষের কাছে সব সম্পদ চলে যাচ্ছে। আর দরিদ্র মানুষ আরো দরিদ্র হয়ে যাওয়া দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নিম্নের দিকে যাচ্ছে বাংলাদেশ। তিনি বলেন, এসব অনাচার থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য একটি জাতীয় ঐক্য দরকার। আসুন আমরা সকলে মিলে একটি জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলি।
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদীন বলেন, ইতিমধ্যে সারা দেশের জনগণের ঐক্য হয়েছে। সারা দেশের আইনজীবীরাও ঐক্যবদ্ধ হওয়া শুরু করেছে। আশা করি দেশনেত্রী খালেদা জিয়াসহ সকল নেতৃবৃন্দ মুক্তি পাবে। আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করি আমাদেরকে এই দাজ্জাল শাসকের হাত থেকে রক্ষা করুন।
খালেদা জিয়াসহ রাজবন্দিদের মুক্তি দিতে হবে: মান্না
নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, দেশে আজ গভীর সংকট। আর মাত্র সাড়ে তিন মাস পরে নির্বাচন। অথচ গতকালও সারা দেশে সাড়ে তিন শত বিরোধী নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হয়েছে। ঈদের পর থেকে আজ ২২শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অন্তত ২২ হাজার বিরোধী নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলা হয়েছে কতো জনের নামে তার হিসাব নেই। এসময় তিনি বলেন, আমি খালেদা জিয়াসহ সকল রাজবন্দির মুক্তি দাবি করছি। তাদের মুক্তি দিতে হবে।
যদি কেউ পুলিশ দিয়ে, র‌্যাব দিয়ে গায়ের জোরে ক্ষমতায় থাকতে চায় তাদের উদ্দেশ্যে বলবো- আমরা এত জোরে আওয়াজ তুলবো যে, আপনারা কথাই বলতে পারবেন না। মান্না বলেন, আজকে আমরা যে দাবি করছি আওয়ামী লীগ ও ১৪ দল ছাড়া সকল দল সেই দাবি করছে। সুতরাং জাতীয় ঐক্য তো হয়েই গেছে। আমরা এখন সারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই জাতীয় ঐক্যের বার্তা ছড়িয়ে দেব। তিনি বলেন, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে একটি নির্বাচন দিতে হবে।
যারা এই সরকারে আসবেন তারা কোনো নির্বাচন করতে পারবেন না। ভোটের আগের দিন, ভোটের দিন ও ভোটের পরের দিন সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে। তিনি বলেন, ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি নির্বাচনে রাস্তার মানুষ ঘরে ছিল। আমরা যতোই চেষ্টা করেছি মানুষ রাস্তায় নামেননি। এবার এমন ব্যবস্থা করতে হবে যাতে ঘরের মানুষ রাস্তায় নামবে। আর রাস্তার সকল দুর্বৃত্ত ঘরে ঢুকে যাবে। সরকারের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ওরা একটা গোষ্ঠী। ওরা চোর, ডাকাত। ওরা ভোট চুরি করে, শেয়ার বাজার লুট করে। আগামী নির্বাচন যেন ৫ই জানুয়ারির মতো ফোর টুয়েন্টি মার্কা নির্বাচন না হয় তার দাবিতে বামফ্রন্ট মিছিল করেছে। তাদের পুলিশ লাঠিপেটা করেছে।

মেজর মান্নানের প্রতিবাদ আমাদের ব্যাখ্যা

গত ২০শে সেপ্টেম্বর মানবজমিন-এর প্রথম পাতায় ‘মেজর মান্নান স্বাধীনতা বিরোধী’- শীর্ষক সংবাদের বিষয়ে বক্তব্য পাঠিয়েছেন বিকল্প ধারা বাংলাদেশের মহাসচিব মেজর অব. আবদুল মান্নান। নিচে তার বক্তব্যটি হুবহু তুলে ধরা হলো। আমি ১৯৬৮ সালের আগস্ট মাস থেকে ১৯৭১ এর ২৫শে মার্চ পর্যন্ত পাকিস্তান আর্মির ৩য় কমান্ডো ব্যাটালিয়নে পোস্টেড ছিলাম এবং চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে কর্মরত ছিলাম। ৭ই মার্চ থেকে ২৫শে মার্চ পর্যন্ত আমি কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট-এ ৩ কমান্ডো ব্যাটালিয়ানের রিয়ার হেড কোয়ার্টার এর দায়িত্বে ছিলাম। এই সময় আমার কমান্ডিং অফিস (সিও) কর্নেল জেডএ খান ঢাকায় ইস্টার্ন কমান্ড এ কর্মরত ছিলেন। ওই ১৮দিন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রস্তুতির পটভূমিকায় অত্যন্ত ঘটনা বহুল ছিল। সে সময় আমাদের কমান্ডো অফিসারের জন্য কোনো রাজনীতিবিদদের সাথে যোগাযোগ করা নিষেধ ছিল।
একজন বাঙালি হিসেবে আমি এ বিষয়টি মেনে নিতে পারিনি। আনুমানিক ১৪/১৫ মার্চ কুমিল্লা ব্রিগেড হেড কোয়ার্টার থেকে ঢাকায় অবস্থানরত আমার সিও এর নিকট আমার বিরুদ্ধে ১টি অভিযোগ পাঠানো হয়েছিল, অভিযোগে বলা হয়েছিল যে, আমি আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছি এবং অনতিবিলম্বে আমাকে কমান্ডোর দায়িত্ব থেকে সরানো উচিত।
কারণ তার ১ মাস আগে কমিউনিস্ট পার্টির নেতা জনাব তোয়াহা আমার সাথে কমান্ডো মেচে দেখা করেছিলেন এবং দুপুরে আমার সাথে খাওয়া খেয়েছিলেন। প্রায় একই সময়ে আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল মালেক উকিল (পরবর্তীতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মহান জাতীয় সংসদের স্পিকার হন) আমার সাথে কুমিল্লা মেচে দেখা করে তার ছেলে গোলাম মহিউদ্দীন লাতু এবং মুজিব বাহিনীর নেতা বেলায়েত হোসেন, যাদের তৎকালীন নোয়াখালীর ডিসিকে লাঞ্ছিত করার দায়ে ৩ বছরের কারাদণ্ড হয়েছিল। যা আমি কুমিল্লা ডিভিশনের মার্শাল ‘ল’ এডমিনিস্ট্রেটর ব্রিগেডিয়ার শফি আহমেদকে ব্যক্তিগতভাবে অনুরোধ করে পুরো সাজা মওকুফ করেছিলাম।
যাই হোক আমার কমান্ডিং অফিসার (সিও) কর্নেল জেডএ খান কুমিল্লা ব্রিগেড হেড কোয়ার্টার এর অনুরোধ অনুযায়ী আমাকে পাকিস্তানের চেরাটে অবস্থিত হেড কোয়ার্টারে ট্রান্সফারের সুপারিশ করেন সে অনুযায়ী ২৬শে মার্চ তারিখ আমার ট্রান্সফার অর্ডার কুমিল্লায় পৌঁছায়।
২৭শে মার্চ বিকালে পাকিস্তান থেকে আগত ১টি প্লাটুন এর ৩০ জন কমান্ডো, প্রথম কমান্ডো ব্যাটালিয়নের সিও কর্নেল সোলাইমান ও ক্যাপ্টেন সিকান্দার এর নেতৃত্বে চট্টগ্রামে দেওয়ানহাটের মোড়ে কনভয় আকারে যাওয়ার সময় ইপিআর এর এ্যাম্বুশে সবাই নিহত হয়, ৩০ জন কমান্ডো সৈন্য ও ২ জন অফিসারের মৃত্যু একটি ভয়াবহ ঘটনা বিধায় পুরো পাকিস্তান আর্মিতে তোলপাড় শুরু হয় এবং এই এ্যাম্বুশ ঘটনায় আমাকেও সন্দেহ করা হয়। পরের দিন ২৮শে মার্চ সকালে ক্যাপ্টেন সোলেমানের নেতৃত্বে ৩০ জন সৈন্য হেলিকপ্টারযোগে চট্টগ্রাম পাঠানো হয়।
ওই রাতে অর্থাৎ ২৮শে মার্চ রাতে ৩০ জন কমান্ডোর ফোর্স ক্যাপ্টেন সোলেমানের নেতৃত্বে কালুরঘাট রেডিও স্টেশন উড়িয়ে দেয়ার জন্য যাওয়ার পথে বোমা বিস্ফোরণে ২০ জন সৈন্য নিহত হয়। পরপর ২ দিনে ৫২ জন কমান্ডো সৈন্য নিহত হওয়ায় সারা পাকিস্তান আর্মিতে এবং বিশেষ করে তখনকার পূর্ব-পাকিস্তান ইন্টার্ন কমান্ড হেডকোয়ার্টারে ঝড় উঠে এবং টিক্কা খানের আদেশে আমাকে ২৯ তারিখ সকাল ৯টায় কমান্ডো অপারেশন সেন্টার (ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে আদমজী স্কুল) থেকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের ৩১ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট কোয়ার্টার গার্ডে বন্দি করে। একই কোয়ার্টার গার্ডে দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টের সিও কর্নেল মাসুদও ছিলেন।
তার সাথে আমার পূর্বের পরিচয় ছিল না এবং সে জানালো তার ২য় বেঙ্গল রেজিমেন্ট জয়দেবপুর থেকে বিদ্রোহ করে ইন্ডিয়ার আগরতলায় চলে যায়। তাই তাকে গ্রেপ্তার করে ৩১ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট কোয়ার্টার গার্ডে বন্দি করেছে। তখনই আমি কোয়ার্টার গার্ডের হাবিলদারের মাধ্যমে আমার সিও জেডএ খানকে আমার গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানিয়ে এবং আমাকে মুক্ত করার অনুরোধ জানিয়ে ১টি চিঠি পাঠাই। এদিকে আমার পরনের ১ সেট ইউনিফর্ম ছাড়া কোনো কাপড় ছিল না, আমি তখন ইস্টার্ন কমান্ড এ নিয়োগরত মেজর আবদুস ছালাম, পরে বাংলাদেশ আর্মির লে. জেনারেল এবং সিজিএস হয়েছিল এর নিকট ১ সেট স্লিপিং পাজামা চেয়ে গার্ড কমান্ডারকে পাঠালাম, তার বাসা থেকে পাওয়া ১টি সাদা পায়জামা ও সাদা হাফ সার্ট পরেই কোয়ার্টার গার্ডে ২ দিন কাটিয়েছিলাম।
৩০শে মার্চ বিকাল ৪টায় কর্নেল জেডএ খান এবং ইস্টার্ন কমান্ড এ পোস্টেড মেজর আলী আহমদ হঠাৎ করে কোয়ার্টার গার্ডে এসে আমাকে মুক্ত করে সোজা তেজগাঁও বিমানবন্দরে নিয়ে করাচিগামী ১টি পিআইএ ফ্লাইট-এ উঠিয়ে দেয়।
কলম্বো হয়ে প্লেনটি ৩১ তারিখ ভোর ৬টায় করাচি বিমানবন্দরে অবতরণ করে। সেখান থেকে আমি আর্মি ট্রানজিট ক্যাম্প এর সহায়তায় ট্রেনে করে চেরাট কমান্ডো হেড কোয়ার্টারে পৌঁছি। প্রায় ৬ মাস ধরে ৫০ জন সৈন্য ও ২ জন অফিসার নিহত হওয়ার কারণ উদঘাটনের জন্য আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। অবশেষে সেপ্টেম্বর এর শেষ সপ্তাহে আমাকে কমান্ডো হেডকোয়ার্টার থেকে পোস্টেড আউট করে পাঞ্জাব রেজিমেন্ট সেন্টারে বদলি করা হয়, যেহেতু আমি ১ জন আর্টিলারি রেজিমেন্টের কমিশনপ্রাপ্ত অফিসার ছিলাম, পাঞ্জাব রেজিমেন্ট আমাকে সাদরে গ্রহণ করে নাই এবং আমাকে কোনো ব্যাটালিয়নে পোস্টিংও দেয় নাই। ১ জন এক্সট্রা অফিসার হিসেবেই আমি পাঞ্জাব রেজিমেন্ট সেন্টারে ১৬ই ডিসেম্বর পর্যন্ত ছিলাম। তারপর আমাকে অন্যান্য বাঙালি অফিসারদের সাথে সাঘাই রিপেট্রিয়েশন ক্যাম্পে পাঠানো হয়।
কমান্ডো হেডকোয়ার্টার-এ ৬ মাস অবস্থান আমার জন্য অত্যন্ত অপমানজনক ও কষ্টকর ছিল। ১ দিন প্রশ্ন-উত্তরকালে ১ জন সিনিয়র কমান্ডো অফিসার (প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের ভাগিনা, মেজর বুনিয়াদ হোসেন সাইয়েদ) হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে ইন্দিরা গান্ধী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে গালিগালাজ করে, আমি প্রতিবাদ করলে সে আরও উত্তেজিত হয়ে “ইউ আর এ বেঙ্গলি ট্রেইটর বাস্টার্ড” বলে আবারও গালি দেয়, আমি বিষয়টি সহ্য করতে না পেরে তাকে আঘাত করি। যেখানে উপস্থিত ৪/৫ জন পাঞ্জাবি অফিসার তার পক্ষে সমর্থন দেয় এবং সবাই আমাকে খুবই তিরস্কার ও গালাগালি করে। পরে কোর্ট অব ইনকোয়ারি হলে সবাই আমাকে দোষারোপ করে এবং ১ জন সিনিয়রকে আঘাত করার দায়ে আমার বিরুদ্ধে কোর্ট মার্শাল অর্ডার হয়, কমান্ডো হেডকোয়ার্টার থেকে আমার পোস্টেড আউট হওয়ার পর সেই কোর্ট মার্শালের কোনো অগ্রগতি হয়নি।
আমাকে ২ বছর বন্দি অবস্থায় একে একে প্রায় ৮টি রিপেট্রিয়েশন ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। যেমন মার্দানে দরগাই ফোর্ট, পরে লান্ডিকোথালে সাঘাই ফোর্ট, বান্নুতে খাজুরি ফোর্ট, হাঙ্গুতে মিরালি ফোর্ট, সেখান থেকে কোহাট ফোর্ট, পরে লায়ালপুর জেল, সেখান থেকে বান্নু ক্যান্টনমেন্ট, সেখান থেকে বান্নু জেল। কোন ক্যাম্পের অথরিটিই আমাকে রাখতে চায় নাই। সবাই আমাকে ভয় করতো, কমান্ডো হওয়াটাই আমার অপরাধ ছিল।
’৭২ সনের শেষের দিকে খাজুরি ফোর্টে আটককৃত প্রায় ২০০ অফিসারের সাথে ফোর্ট অথরিটি অফিসারদের ১টি দ্বন্দ্ব হয়, সেটাকে কেন্দ্র করে আমাকেসহ ৫ জন অফিসারকে গ্রেপ্তার করে মীর আলি ক্যাম্পে নিয়ে যায়। ইনকোয়ারি শেষে আমাকে কোহাট ফোর্টে এবং বাকি ৪ জন (ব্রিগেডিয়ার আজিজ, ব্রি. সানোয়ার হুদা, ক্যাপ্টেন সিনহা এবং ক্যাপ্টেন বাহারাম আলী বেগ)-কে সাঘাই ফোর্টে নেয়া হয়। পরে জানতে পারি সাঘাই ফোর্ট অথরিটি আমাকে গ্রহণ করতে অসম্মতি জানায়। কোহাট ফোর্টে জেনারেল নূরউদ্দিন, জেনারেল চিশতি, জেনারেল আমসা আমিনসহ প্রায় ১০০ জন অফিসার ছিলেন।
কোহাট ফোর্ট থেকে লায়ালপুর জেলে পৌঁছার পর ১০ জন অফিসারকে নিয়ে জেল থেকে পালানোর জন্য ১টি সুড়ং খননের জন্য কাজ শুরু করি, যা ৩ মাসে ১৫০ গজ খনন হয়। পালাবার দিন বিকালে পূর্বেকার খাজুরি ফোর্টের মিথ্যা অভিযোগে আমাকে গ্রেপ্তার করে বান্নু ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায়। বাকি ১০ জন অফিসার ওই সুড়ং পথ দিয়ে পালিয়ে বাংলাদেশে ফিরে আসে, তাদের মধ্যে নেভির এডমিরাল তাহের ছিলেন। দীর্ঘ ৬ মাস ধরে কোর্ট মার্শালে বিচার চলে। আমার সাথে একই অভিযোগে ব্রিগেডিয়ার আজিজ ২ নং আসামি হিসেবে ছিল। বিচার শেষে আমাদের ২ জনকে বান্নু জেলে পাঠানো হয়। বান্নু জেলে সাধারণ কয়েদি হিসেবে আমরা ২ জন ৩ মাস ছিলাম এবং রেডক্রসের মাধ্যমে ২৪শে জানুয়ারি ১৯৭৪ সনে বাংলাদেশে আসি।
দীর্ঘ আড়াই বছর পাকিস্তান আর্মির নানা ধরনের অত্যাচারে আমি অতিষ্ঠ ছিলাম, এদিকে বাংলাদেশ আর্মিতেও সিনিয়রটি হিসেবে আমাদের পাকিস্তান ফেরত অফিসারদের প্রকৃত মূল্যায়ন হয়নি, তাই আমি বাংলাদেশ আর্মি থেকে ’৭৫ এর ১৪ই মার্চ স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করি।
আমি দ্বিধাহীনভাবে বলতে চাই যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে আমার ত্যাগ অপরিসীম ছিল।
মেজর (অব.) আবদুল মান্নান
মহাসচিব
বিকল্পধারা বাংলাদেশ।
আমাদের বক্তব্য: প্রকাশিত সংবাদটি পুরোটাই ছিল লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের উদ্ধৃতি। এতে মানবজমিন-এর কোনো বক্তব্য ছিল না। যমুনা টেলিভিশনের টকশো অনুষ্ঠান ২৪ ঘণ্টায় অংশ নিয়ে তিনি ওই বক্তব্য দেন। অডিও রেকর্ড  থেকে ওই বক্তব্যটি ছাপা হয় যা মানবজমিন-এর হাতে সংরক্ষিত আছে।