Wednesday, October 15, 2025

ওষুধ শিল্পে সংস্কার: চীন ও ভারত যেভাবে সাফল্য পেয়েছে, আমরা কেন পারব না by এস এম সাইফুর রহমান

ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পে অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (এপিআই) উৎপাদন এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি খাত। চীন ও ভারত এই খাতে বৈশ্বিক নেতৃত্ব অর্জন করেছে। তাদের সফলতার পেছনে মূলত ছিল সরকারি প্রণোদনা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও নীতিগত সংস্কার। এ সাফল্যের পেছনের কৌশল ও বাস্তবতা আমাদের জানা দরকার। সেই সঙ্গে প্রাসঙ্গিকভাবে বোঝা দরকার, এই খাতে বাংলাদেশের অবস্থা যেখানে অতি মূল্যায়িত মুদ্রা ও সীমিত সরকারি সহায়তা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রথমে চীনের দিকে তাকানো যাক। ১৯৫০ থেকে ১৯৭০ সালের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানাগুলো মূলত মৌলিক ওষুধ উৎপাদনের মাধ্যমে চীনের ফার্মাসিউটিক্যাল বুনিয়াদ তৈরি করে। এরপর ১৯৮০ ও ’৯০-এর দশকে দেং শিয়াওপিংয়ের অর্থনৈতিক সংস্কারে গঠিত স্পেশাল ইকোনমিক জোন বিনিয়োগের পথ খুলে দেয়। এই সময়ে ব্যক্তিমালিকানাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বাল্ক ড্রাগস উৎপাদন শুরু করে, যা পরে বড় আকারের এপিআই রপ্তানিতে রূপ নেয়।

ভারতে স্বাধীনতার পর (১৯৫০-১৯৭০) পর্যন্ত উচ্চ শুল্ক আর আমদানি নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্প সুরক্ষিত রাখা হয়। এতে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে ফর্মুলেশন তৈরিতে দক্ষ হয়ে ওঠে। ১৯৭০ সালের পেটেন্ট আইনে পণ্য পেটেন্টের বদলে কেবল প্রক্রিয়া পেটেন্টকে স্বীকৃতি দেওয়ার কারণে দেশি কোম্পানিগুলো বিভিন্ন বিকল্প পদ্ধতিতে বিদেশি ওষুধ উৎপাদনে সক্ষম হয়। এই জেনেরিক ওষুধবিপ্লব এপিআই খাতকেও সমৃদ্ধ করে তোলে।

চীন ও ভারত উভয়েই তুলনামূলকভাবে শিথিল মেধাস্বত্ব (আইপি) সুরক্ষার সুবিধা নিয়েছে। ভারতের ক্ষেত্রে ২০০৫ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ট্রিপস চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য করার আগপর্যন্ত স্থানীয় নির্মাতারা ভিন্ন প্রক্রিয়ায় বিদেশি ওষুধের অনুলিপি তৈরিতে সক্ষম হয়েছে। চীনে ২০০১ সালে ডব্লিউটিওতে যোগদানের আগে এ–সংক্রান্ত আইনের প্রয়োগ ছিল অনেকটাই দুর্বল। ফলে পেটেন্টমুক্ত হওয়ার আগেই ওই ওষুধ সহজেই পুনরুৎপাদন করা যেত।

২০০০-এর দশক থেকে চীন তার পঞ্চবার্ষিক জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় ফার্মাসিউটিক্যাল স্বনির্ভরতার ওপর জোর দেয়। ২০০৮ সালে চালু হওয়া ন্যাশনাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি মেজর প্রজেক্ট ফর ড্রাগ ইনোভেশন প্রচুর পরিমাণে গবেষণা ও উন্নয়নের অর্থায়ন করেছে। পাশাপাশি ‘থাউজেন্ড ট্যালেন্টস’ বা সহস্র মেধা কার্যক্রমের আওতায় বিদেশে কর্মরত বা অধ্যয়নরত উচ্চ দক্ষতার বিজ্ঞানীদের আকর্ষণ করে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। স্থানীয় সরকারগুলোও নিম্নমূল্যের জমি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে ছাড় এবং অতীতে অপেক্ষাকৃত শিথিল পরিবেশগত নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে খরচ কমিয়ে রাখে। বর্তমানে পরিবেশগত নিয়মকানুন কিছুটা কঠোর হয়েছে, তবে দীর্ঘদিনের শিথিলতার সুযোগ নিয়ে অনেক কোম্পানি উৎপাদন খরচ কমাতে পেরেছে।

চীন বিভিন্ন সময়ে ট্যাক্স রিবেট ও আর্থিক ভর্তুকি দিয়েছে এপিআই রপ্তানিকারকদের। বিশেষ করে ১৩ শতাংশ পর্যন্ত ভ্যাট ফেরতের সুবিধা, হাইটেক অঞ্চলের করছাড়, স্বল্প সুদের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ, এমনকি নির্দিষ্ট রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা ছাড়ালে অতিরিক্ত আর্থিক অনুদান—সব মিলিয়ে তাদের রপ্তানি ব্যয় অনেকাংশে কমে গেছে। ২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, চীনের মুদ্রা রেনমিনবি প্রায় ২৮ শতাংশ অবমূল্যায়িত ছিল। এর ফলে বিদেশি বাজারে চীনা পণ্যের দাম ছিল তুলনামূলকভাবে সস্তা। অনেক গবেষণা অনুযায়ী, চীনে এপিআই উৎপাদন খরচ ভারতের চেয়ে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কম।

চীন ও ভারত উভয় দেশেই এপিআই খাতকে আরও গতিশীল করে তুলতে স্বল্প সুদে ঋণসুবিধা, ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম ও গবেষণা অনুদান চালু রয়েছে। চীনে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো কম সুদের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ প্রস্তাব করে। অন্যদিকে ভারতেও উৎপাদন খাতকে উৎসাহ দিতে সরকারি ও বেসরকারি খাতে ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম চালু করা হয়েছে, যাতে উদ্যোগী ব্যক্তিরা সহজ শর্তে মূলধন সংগ্রহ করতে পারেন। এ ছাড়া উভয় দেশেই গবেষণা ও উদ্ভাবন কর্মসূচিতে বড় অঙ্কের অনুদান দেওয়া হয়, যার ফলে নতুন পণ্য উন্নয়ন ও উৎপাদনপ্রক্রিয়া উন্নতকরণে অগ্রগতি সহজতর হয়। স্বল্পমূল্যের উৎসে অর্থায়ন সম্ভব হওয়ায় এপিআই নির্মাতারা দ্রুত প্রযুক্তিগত সম্প্রসারণ ও আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে পারছেন।

অবকাঠামো ও ইউটিলিটি খাতেও চীন ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। অনেক শিল্পপার্ক ও স্পেশাল ইকোনমিক জোন গড়ে উঠেছে, যেখানে কম খরচের জমি, সাশ্রয়ী মূল্যের বিদ্যুৎ এবং যৌথ সলভেন্ট পুনরুদ্ধার ও বর্জ্য নিষ্পত্তির সুবিধা রয়েছে। আমদানিপ্রক্রিয়া সহজ করায় এপিআই উৎপাদনের সরঞ্জাম ও কাঁচামাল আনা দ্রুততর হয়েছে। ২০১০ সালে চীনের জিএমপি নিয়মকানুন আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়। ২০১৭ সালে আন্তর্জাতিক আইসিএইচ কাঠামোয় যুক্ত হওয়ায় বিশ্ববাজারে চীনা এপিআই অধিক গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।

এর ফলে চীন আজ বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ এপিআই রপ্তানির জোগান দেয়। গত দুই দশকে চীনা এপিআই রপ্তানি প্রায় ১০ গুণ বেড়ে গেছে। এই সাফল্যের পেছনে কর প্রণোদনা, বিশাল অবকাঠামো বিনিয়োগ এবং তুলনামূলক কম উৎপাদন ব্যয় মুখ্য ভূমিকা রেখেছে।

ভারতে রিয়াল ইফেকটিভ এক্সচেঞ্জ রেট (আরইইআর) প্রতিযোগিতামূলক রাখতে রিজার্ভ ব্যাংক বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে থাকে, তবে চীনের মতো ব্যাপক অবমূল্যায়ন সেখানে খুব একটা দেখা যায় না। ২০২০ সালে চালু হওয়া প্রোডাকশন-লিংকড ইনসেনটিভ (পিএলআই) স্কিমের অধীন নির্দিষ্ট এপিআই ও ইন্টারমিডিয়েট উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে আর্থিক সুবিধা দেওয়া হয়। পরিবেশগত ছাড়পত্রের প্রক্রিয়াও দ্রুততর করা হয়েছে। নির্দিষ্ট উৎপাদন ও বিনিয়োগের শর্ত পূরণ করলে এপিআই/ইন্টারমিডিয়েটের জন্য প্রায় ১২ শতাংশ এবং ফারমেন্টেশন পণ্যের জন্য ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকি দেওয়া হয়। এ ছাড়া ফর্মুলেশন প্রাইসিং পলিসিতে সুবিধা, অবকাঠামো খাতে মর্যাদা প্রদান, বিদ্যুৎ ও পানি খরচ অর্ধেক করার প্রস্তাব ইত্যাদি উদ্যোগ রয়েছে।

এদিকে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশি টাকা (বিডিটি) অতি মূল্যায়িত। আইএমএফের হিসাবে এটি প্রায় ২৫ শতাংশ অধিক মূল্যে রয়েছে, যা রপ্তানি পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। রপ্তানি শক্তিশালী করতে মুদ্রার মান সমন্বয়ের সুপারিশ করলেও বাংলাদেশ ব্যাংক এখনো তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করেনি। এর ফলে শিল্প খাত, বিশেষ করে এএপিআই উৎপাদন, প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশ এপিআই অ্যান্ড ইন্টারমেডিয়ারিজ ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাইমা) সরকারের সঙ্গে ২০১৮ সাল থেকে আলোচনা করছে। দেশে দৃশ্যমান কোনো উল্লেখযোগ্য করছাড়, ভর্তুকি বা প্রশাসনিক সুবিধা নেই। তারা সরকারের সঙ্গে আলোচনা চালালেও সময় উপযোগী সুনির্দিষ্ট নীতি বা আর্থিক প্রণোদনা এখনো সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত করা যায়নি।

সব মিলিয়ে বলা যায়, এপিআই সেক্টরের বিকাশে চীন ও ভারত যে রূপরেখা অনুসরণ করেছে, তাতে অনেকগুলো বিষয় একত্রে কাজ করেছে, যেমন প্রাথমিক পর্যায়ে শিথিল পেটেন্ট আইন, সরকারি বিনিয়োগ, করছাড়, মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো ও ইউটিলিটি পুঁজি এবং মানসম্মত নিয়ন্ত্রক কাঠামো। চীনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রায়ত্ত উদ্যোগ, বড় শিল্পপার্ক ও অবমূল্যায়িত মুদ্রার প্রভাবে উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়। অন্যদিকে ভারত প্রোডাকশন-লিংকড ইনসেনটিভসহ বেশ কিছু উদ্যোগ হাতে নিয়ে নিজেদের এপিআই সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। আর বাংলাদেশে অতি মূল্যায়িত মুদ্রা ও জুতসই সরকারি সহযোগিতার অভাবে এই খাত প্রত্যাশিত সাফল্য পাচ্ছে না।

* এস এম সাইফুর রহমান সভাপতি, বাংলাদেশ এপিআই অ্যান্ড ইন্টারমেডিয়ারিজ ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাইমা)

চীন ও ভারত উভয়েই তুলনামূলকভাবে শিথিল মেধাস্বত্ব (আইপি) সুরক্ষার সুবিধা নিয়েছে।
চীন ও ভারত উভয়েই তুলনামূলকভাবে শিথিল মেধাস্বত্ব (আইপি) সুরক্ষার সুবিধা নিয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

ভারতের একের পর এক উসকানি, পাকিস্তান এখন কি করবে? by মালিহা লোধি

গত সপ্তাহে ভারতের যুদ্ধংদেহী বক্তব্যের জেরে নয়াদিল্লি ও ইসলামাবাদের মধ্যে আবারও শুরু হয়েছে বাগ্‌যুদ্ধ। গত মে মাসে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে চার দিনের সংঘাতের পর থেকেই ভারতীয় কর্মকর্তাদের হুমকি ও উসকানিমূলক বক্তব্য থেমে থেমে চলছিল; কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের ধারাবাহিক মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে।

গত সপ্তাহে ভারতের পক্ষ থেকে তিনটি উসকানিমূলক মন্তব্য দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা চরমে নিয়ে যায়। সবচেয়ে আগ্রাসী মন্তব্যটি করেন ভারতের সেনাপ্রধান উপেন্দ্র দ্বিবেদী। তিনি হুমকি দিয়ে বলেন, ‘পাকিস্তান যদি সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ বন্ধ না করে, তবে তাকে পৃথিবীর মানচিত্র থেকেই মুছে দেওয়া হবে।’ তিনি আরও বলেন, ভারত এবার ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর সময়কার মতো সংযম দেখাবে না।

সেনাপ্রধান জানান, ‘ভারত প্রয়োজনে যেকোনো সীমান্ত অতিক্রম করতে পারে।’ তিনি সেনাদের প্রস্তুত থাকতে বলেন। কারণ, তাঁর ভাষায় ‘শিগগিরই যুদ্ধে নামতে হতে পারে।’

এরপর ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং অভিযোগ করেন, পাকিস্তান সির ক্রিক এলাকায় সামরিক স্থাপনা বাড়াচ্ছে। তিনি হুঁশিয়ারি দেন, পাকিস্তান যদি এখানে কিছু করার সাহস দেখায়, ‘তাহলে এমন জবাব দেওয়া হবে, যা ইতিহাস ও ভূগোল দুটিই বদলে দেবে।’

বলে রাখি, সির ক্রিক হচ্ছে ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সংকীর্ণ খাঁড়ি বা নদীর শাখা। এর পানি জোয়ার-ভাটার সঙ্গে ওঠানামা করে। এটি ভারতের গুজরাট রাজ্যের রণ অব কচ্ছ অঞ্চলে অবস্থিত এবং ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সীমান্তের অংশ হিসেবে বহুদিন ধরে বিতর্কিত। দুই দেশই দাবি করে, এই খাঁড়ির নির্দিষ্ট অংশ তাদের নিজেদের ভূখণ্ডের অন্তর্ভুক্ত।

আরও এক ধাপ এগিয়ে ভারতের বিমানবাহিনীর প্রধান অমর প্রীত সিং দাবি করেন, মে মাসের সংঘর্ষে ভারত নাকি ৯-১০টি পাকিস্তানি যুদ্ধবিমান ধ্বংস করেছে, যার মধ্যে দুটি এফ-১৬–ও ছিল। তিনি আরও বলেন, ভারতীয় বিমানবাহিনী পাকিস্তানের যেকোনো স্থানে থাকা সন্ত্রাসী ঘাঁটিতে ‘নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম’ এবং যেকোনো সময় তা করতে পারে।

পাকিস্তান এই মন্তব্যগুলোর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের সামরিক বৈঠকের পর প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়, ভারতীয় নেতৃত্ব যদি কোনো ‘নতুন বাস্তবতা’ তৈরি করতে চায়, তবে পাকিস্তান তার ‘দ্রুত ও প্রতিশোধমূলক জবাব’ দেবে।

এর আগে পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) ভারতীয় নেতৃত্বের বক্তব্যকে ‘উসকানিমূলক ও যুদ্ধপ্রবণ’ বলে অভিহিত করে। বিবৃতিতে বলা হয়, এসব বক্তব্য আসলে আগ্রাসনের অজুহাত তৈরি করার আরেকটি প্রচেষ্টা। আইএসপিআর আরও সতর্ক করে দিয়ে জানায়, ভবিষ্যতে কোনো সংঘাত শুরু হলে তা ‘বিপর্যয়কর ধ্বংস’ ডেকে আনতে পারে। কারণ, পাকিস্তান তখন আর সংযম দেখাবে না। সেনাপ্রধানের হুমকির জবাবে বলা হয়, যারা ‘মুছে ফেলা’র কথা বলছেন, তাঁদের জানা উচিত ‘মুছে দিতে গেলে মুছে যাওয়ার ঝুঁকিও আছে।’

এখন প্রশ্ন হলো ভারতের এই তীব্র বক্তব্যের পেছনে কারণ কী এবং তা কতটা গুরুত্বসহকারে নেওয়া উচিত। একটি ব্যাখ্যা হলো এসব বক্তব্য মূলত দেশীয় রাজনীতির জন্য, বিশেষত শাসক দলের হিন্দু ভোটব্যাংককে উজ্জীবিত করতে এসে থাকতে পারে। কারণ, পাকিস্তানবিরোধী মনোভাব উসকে দেওয়া বিজেপির বহুদিনের কৌশল।

আগামী বছর বিহারে গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য নির্বাচন এবং তার পরপরই পশ্চিমবঙ্গে ভোট। মে মাসের সংঘাতে সরকারের ব্যর্থতার অভিযোগে যখন মোদি সরকার চাপে, তখন এই যুদ্ধংদেহী ভাষণ দেশীয় রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা হতে পারে।

তবে এটিই একমাত্র কারণ নয়, ভারত এখনো মে মাসের সংঘাতে পাকিস্তানের হাতে পরাজয়ের ক্ষত মেনে নিতে পারেনি। পাকিস্তান তখন কয়েকটি ভারতীয় যুদ্ধবিমান নামিয়ে দেয়, যা ভারতের জন্য ছিল বড় অপমান। তাই এই বক্তব্যগুলো হয়তো সেই পরাজয় ঢাকতে কিংবা প্রতিশোধের মানসিকতা প্রকাশ করার জন্য।

ভারতের এই মানহানির প্রতিকার করতে চাওয়ার মানসিকতা থেকেই আবারও কোনো ধরনের সীমান্ত অতিক্রম বা সামরিক অভিযান হতে পারে, এমন আশঙ্কা অমূলক নয়। ভারতীয় নেতারা এখন বারবার বলছেন, ‘যুদ্ধের নিয়ম ও সীমারেখা বদলে গেছে।’

বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিবেশ ভারতের জন্য অনুকূল নয়। পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক এখন আগের চেয়ে উষ্ণ। অন্যদিকে দিল্লি-ওয়াশিংটন সম্পর্ক টানাপোড়েনে। চীনের কূটনৈতিক ও সামরিক সমর্থন পাকিস্তানের প্রতি অটল আর পাকিস্তান-সৌদি কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তি দক্ষিণ এশিয়ার ভারসাম্য নতুনভাবে তৈরি করেছে।

গত মে মাসে পাকিস্তানে ভারতীয় বিমান হামলার সময় ভারত আন্তর্জাতিক সমর্থন পায়নি; এখন পরিস্থিতি আরও প্রতিকূল। তবু কেউ কেউ মনে করেন, বিশ্বে যখন শক্তি প্রয়োগই এখন ‘নতুন স্বাভাবিকতা’, তখন ভারত হয়তো সেই সীমা পরীক্ষা করতে চাইবে।

যাহোক, পাকিস্তানের এখন কোনো ঝুঁকি নেওয়ার সুযোগ নেই। বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের গাজা ‘শান্তি পরিকল্পনা’র অধীন মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক অংশগ্রহণের চিন্তা থাকলে তা আপাতত স্থগিত রাখা উচিত। দেশের পূর্ব সীমান্তের নিরাপত্তাই এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া প্রয়োজন। বাইরে সামরিক সম্পৃক্ততা পাকিস্তানকে আরও ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

ভারতের সংবাদমাধ্যম ও সাবেক কূটনীতিকদের মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, ভারতের ভেতরেও এখন গভীর উদ্বেগ বিরাজ করছে। তাঁরা আশঙ্কা করছেন, পাকিস্তান নতুনভাবে তার কৌশল সাজাচ্ছে, নতুন জোট গঠন করছে এবং আঞ্চলিক ভারসাম্য পুনর্গঠন করছে, যা ভারতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

ইন্ডিয়া টুডের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পাকিস্তান তার ‘কৌশলগত খেলার নিয়ম’ নতুন করে লিখছে, যা আঞ্চলিক বাস্তবতাকে বদলে দেবে।

অন্যদিকে কিছু বিশ্লেষক বলছেন, ‘ট্রাম্পের পাকিস্তান ঝোঁক’ ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশল হতে পারে। বাংলাদেশ নামের ঘনিষ্ঠ মিত্রকেও হারিয়ে ভারতের চারপাশে শত্রু শক্তিগুলোর নতুন জোট গঠনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

কংগ্রেস বারবার অভিযোগ করছে, মোদি সরকার ভারতের আন্তর্জাতিক অবস্থান দুর্বল করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করেছে এবং বিশ্বরাজনীতিতে ভারতের প্রভাব হারিয়ে ফেলেছে।

দেশের ভেতরের এই চাপ বিজেপি সরকারকে বেপরোয়া পদক্ষেপে ঠেলে দিতে পারে। আবার, পাকিস্তানের সঙ্গে যেকোনো সংঘর্ষের অনিশ্চিত ফলাফল তাদের কিছুটা সতর্কও করতে পারে।

* মালিহা লোধি, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জাতিসংঘে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত
- ডন থেকে নেওয়া। অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

আফগানিস্তান নিয়ে সম্প্রতি ভারত–পাকিস্তানের মধ্যে নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়েছে
আফগানিস্তান নিয়ে সম্প্রতি ভারত–পাকিস্তানের মধ্যে নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ছবি: রয়টার্স

দেশ ও মানুষের ভাগ্য এবার বদলাবে তো? by বুলবুল সিদ্দিকী

এক বছর পার হলেও গণ-অভ্যুত্থানের যে আশা-আকাঙ্ক্ষা আমাদের মধ্যে ছিল, তার অনেক কিছুই বাস্তবতার মুখ দেখেনি। যে কারণে রাজনৈতিক দলগুলো সরকারকে নির্বাচনের জন্য ক্রমাগত চাপের মধ্যেই রেখেছিল। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকদের মধ্যে অনেকে নির্বাচনের অনিবার্যতার যুক্তি দিয়ে আসছিল।

ইতিমধ্যে আমরা প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যের মাধ্যমে জানতে পারি যে ২০২৬–এর ফেব্রুয়ারিতেই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। তবে নির্বাচনের সময় নিয়ে সুনির্দিষ্ট ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে প্রস্তাবিত নানা সংস্কার বাস্তবায়ন নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন অনেকেই।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি মানুষের আকাশচুম্বী প্রত্যাশা থাকলেও তারা সংস্কারবিষয়ক তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি করতে পারেনি। বছর পার হয়ে গেলেও সংস্কার বিষয়ে তেমন একটা অগ্রগতি না হওয়ার কারণে অনেকেই হতাশা প্রকাশ করছেন। গবেষক, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা গণ–অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করছেন। সেই প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের এটাও মনে রাখতে হবে যে এত কম সময়ে এমন একটি অস্থায়ী এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষে আসলে কতটা সংস্কার করা সম্ভব?

যে উচ্চাভিলাষী প্রত্যাশা এবং আকাঙ্ক্ষা নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাদের সংস্কার এবং রাষ্ট্র বিনির্মাণের কার্যক্রম শুরু করেছে, সেটি এই স্বল্প সময়ে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। তাই বর্তমান বাস্তবতায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যেসব সংস্কার নির্বাচনের আগে বাস্তবায়ন করা জরুরি, সেদিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মনোযোগ দিতে হবে। এ প্রসঙ্গে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে জায়গায় তাদের মনোযোগ দিতে হবে সেটি হলো, একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও উৎসবমুখর নির্বাচন আয়োজনের জন্য ন্যূনতম যেসব সংস্কার জরুরি, সেসব সংস্কার করে ফেলা।

পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নির্বাচনগুলো যেন একটি সুষ্ঠু এবং স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় করা যায়, সে ধরনের স্থায়ী একটি কাঠামোর দিকে জাতিকে নিয়ে যাওয়া। কেননা, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষে এই অল্প সময়ের মধ্যে এখন আর অনেক সংস্কার করা সম্ভব নয়।

আমরা যদি বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশের দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাই যে যারা সংস্কারের মধ্য দিয়ে দেশের উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন করতে পেরেছে, তারা কেউই একটা স্বল্প সময়ে দেশের সব সংস্কারপ্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে পারেনি। সংস্কারকে তারা একটি চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে নিয়েছে এবং তার ফল এখন তারা ভোগ করছে।

এর মধ্যে চীনের কথা বিশেষ করে আমরা উল্লেখ করতে পারি। প্রাথমিক ও মৌলিক সংস্কারের জন্য তারা বছরের পর বছর সময় নিয়েছে। আর বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এখন আমরা বুঝতে পারি যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ওপর অপ্রত্যাশিত আকাঙ্ক্ষার বীজ ছড়িয়ে দেওয়ার কারণেও আমাদের মধ্যে সেই আকাশচুম্বী প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল।

এক বছর পর যখন আমরা গণ-অভ্যুত্থানের দিকে ফিরে তাকাই, তখন বাস্তবতার নিরিখে বিবেচনা করলে আমাদের এই বিস্তর প্রত্যাশা আসলে বাস্তবতা বিবর্জিত ছিল। সেদিক দিয়ে আমি বলব না, তারা সম্পূর্ণ ব্যর্থ; তবে যে কর্মযজ্ঞ এই সরকার শুরু করে দিয়েছে, একে ইতিবাচকভাবে টেনে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব এখন রাজনৈতিক দলগুলোর।

যেহেতু এখন আমরা জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতির দিকে যাচ্ছি, আমাদের সব দৃষ্টি নির্বাচনের দিকে থাকবে। তাই সংস্কার প্রক্রিয়াকে যেন আমরা ভুলে না যাই, সেদিকে নজর দিতে হবে। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতের নির্বাচিত সরকার যেন পরবর্তী সংস্কারগুলো ধাপে ধাপে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, সেদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যেন একটি মতৈক্য গড়ে তোলা যায়, এ বিষয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ঐকমত্য কমিশন কিছু কাজ এগিয়ে রাখতে পারে।

পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোকেও ঐকমত্যে রাজি হওয়া বিষয়গুলো নিয়ে তাদের নির্বাচনের ইশতেহারে নিয়ে আসা বা তার সঙ্গে সমন্বয় করার দিকেও ইতবাচকভাবে নজর দিতে হবে। যেহেতু নির্বাচন খুব শিগগির; অর্থাৎ আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, সেহেতু রাজনৈতিক দলগুলো যদি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের মধ্যে একমত হওয়া সংস্কারের বিষয়গুলো যুক্ত করে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করে, তাহলে তাদের জনসমর্থন যেমন বাড়বে, সংস্কার বাস্তবায়ন নিয়েও মানুষের মধ্যে একটি আস্থা তৈরি হবে। দেশগঠনে যা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। আর নির্বাচিত দল যদি পরবর্তী সময়ে সংস্কারের মাধ্যমে দেশ পুনর্গঠনে নজর না দেয়, সেটি আমাদের জাতির জন্য একটি হতাশার বিষয় হবে।

আমরা অনেকবারই দেশকে বিনির্মাণ করার সুযোগ পেয়েছিলাম, কিন্তু সেই সুযোগ আমরা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারিনি। বারবার আন্দোলন–সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সরকার বদলের যে ঐতিহ্য আমাদের দেশে গড়ে উঠেছে, সেটি একটি গণতান্ত্রিক দেশের উদাহরণ হতে পারে না। কেননা, গণ-অভ্যুত্থানে ঝরে যাওয়া প্রাণের কোনো বিনিময় হতে পারে না।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলো যখন দেশের স্বার্থে গণতন্ত্রের বিশেষায়িত দিকের বাস্তবায়নের জন্য কাজ করছে, সেখানে আমরা এখনো সেই ঐতিহ্যবাহী গণতান্ত্রিক ধারাতেই রয়ে গেছি। আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলো নতুন গণতান্ত্রিক ধারাকে মেনে নিতে একধরনের সংশয় এর মধ্যে আছে, অথচ দেশের উন্নয়নের জন্য যা প্রয়োজন, তাকে গ্রহণ করে বাস্তবায়ন করলে দেশ উন্নয়নের দিকে আরও দ্রুত অগ্রসর হবে। দীর্ঘ সময় গণতন্ত্রহীনতায় থাকার সঙ্গে সঙ্গে বিগত সময়ে আমাদের দেশে আইনের শাসনের অনুপস্থিতি লক্ষণীয়, রয়েছে বিচারহীনতার সংস্কৃতিসহ আরও নানা অনিয়ম। রয়েছে মতপ্রকাশের সীমাবদ্ধতা।

এসব থেকে মুক্তি পেতে একটি সুষ্ঠু রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নানাবিধ প্রস্তাবনাগুলো থরে থরে সাজিয়ে রাখা রিপোর্ট হিসেবে যেন থেকে না যায়, সেদিকে নির্বাচন–পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে হবে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে আমরা কত কমিশন হতে দেখলাম, তারা কত রিপোর্ট তৈরি করে, রাষ্ট্রপ্রধানের হাতে হস্তান্তর করল, কিন্তু দেশ সেই একই জায়গায় রয়ে গেল। কেননা, আমরা তাদের সঠিক বাস্তবায়ন দেখলাম না। সাধারণ মানুষের মুখেও আর হাসি ফুটল না। সাধারণ মানুষ খুব বেশি কিছু চায় না। তারা চায়, আয় ও ব্যয় এর সমন্বয় করে যেন তারা দিন কাটাতে পারে, বাজারব্যবস্থা যেন সিন্ডিকেটমুক্ত হয়; তারা চায়, ঘরে ও বাইরের নিরাপত্তা। আমাদের সব স্থানের নিরাপত্তা প্রয়োজন।

আমাদের সন্তানেরা যেন বাসার বাইরে নিরাপদ বোধ করে, পিতা-মাতাদের যেন তার সন্তানদের জন্য সারাক্ষণ দুশ্চিন্তায় মগ্ন থাকতে না হয়। আইনের শাসনের বাস্তবায়নের মাধ্যমে যেন এই বিষয়গুলোর যথাযথ নিশ্চয়তা দেওয়া হয়।

মোটকথা, আমাদের মৌলিক অধিকারগুলো যেন সঠিকভাবে নিশ্চিত করার মাধ্যমে উন্নয়নের সুফলগুলো যেন দেশের সব মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা হয়, এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রাখতে হবে। বারবার গণ-অভ্যুত্থানে আমাদের সন্তানদের আর হারাতে পারব না। সন্তানহারা পিতা-মাতার অসহায় মুখ যেন আমাদের আর দেখতে না হয়।

তাই দেশগঠনের জন্য সব রাজনৈতিক দলগুলোকে একসঙ্গে ঐকমত্যের ভিত্তিতে কাজ করে যেতে হবে। এবারের গণ-অভ্যুত্থান যে অনন্য সুযোগ নিয়ে এল, তা যেন সত্যিকার অর্থেই আমরা দেশ গড়ার কাজে লাগাই, সেই প্রত্যাশা থাকবে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি।

আপনারা যেন আমাদের দেশের অসহায় জনতাকে ভুলে না যান, সেটা নিশ্চিত করবেন। যদিও আমরা দেখেছি যে মানুষ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে চায় না; কিন্তু আমি মনেপ্রাণে চাই, আমার এই ধারণা যেন এবার ভুল প্রমাণিত হয়। আমরা যেন অতীত ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারি, সেই প্রত্যাশা থাকবে।

* বুলবুল সিদ্দিকী, অধ্যাপক, রাজনীতি ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

দেয়ালে দেয়ালে দ্রোহ, মুক্তি আর সম্প্রীতির বারতা। ছবিটি রাজধানীর মিরপুর-১৩ এলাকা।
দেয়ালে দেয়ালে দ্রোহ, মুক্তি আর সম্প্রীতির বারতা। ছবিটি রাজধানীর মিরপুর-১৩ এলাকা। ছবি: মো. রায়হানুল হক

যুদ্ধ ও আগ্রাসন: যুগপৎ মানবসভ্যতা ও বিবেকের মৃত্যুঘণ্টা by আবুল মোমেন

বধ্যভূমি হয়ে ওঠা গাজায় প্রতিদিন শিশুসহ নরহত্যা ‘উৎসব’ চলছে। এখন শুরু হয়েছে অপুষ্টি ও অনাহারে মৃত্যু। সঙ্গে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে মাথা গোঁজার ঠাঁই। সব দেখে এখন বুঝতে পারি মানুষের বিবেক ও চেতনারও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। গাজায় যাঁরা অবিরাম নিষ্ঠুরতার শিকার হচ্ছেন, তাঁদের তো এখন জৈবশক্তির জোরেই টিকে থাকতে হচ্ছে।

আক্রমণকারী শক্তি ইসরায়েল নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত রণাঙ্গন ছাড়বে বলে মনে হয় না। অতীতে দেখা যেত, সংঘাতের বাইরের দর্শক বাকি বিশ্বের নেতাদের চাপে এমন নিষ্ঠুরতা থামাতে হতো। হামাসের ৭ অক্টোবরের (২০২৩) হামলার প্রতিশোধ নেওয়া শুরু করেছিল ইসরায়েল নভেম্বর থেকে। তার মিত্রদের যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোভুক্ত পশ্চিম ইউরোপের পরামর্শে তারা ১৯ জানুয়ারি ২০২৫ একবার যুদ্ধবিরতি মেনে ছিল; কিন্তু তারপর মার্চ থেকে আবারও পূর্ণোদ্যমে গাজার নিরস্ত্র বেসামরিক জনগণের ওপর যে নৃশংস হামলা শুরু করেছে, তা আর বন্ধ করছে না।

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধবিরতির সব প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্র ভেটো দিয়ে ইসরায়েলের অবিরাম নিষ্ঠুরতার পক্ষে কাজ করে চলেছে, শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ বন্ধ করে নিজেরাও সাম্প্রতিককালের এই গণহত্যার অংশীজন হয়ে গেল। মোটকথা তারা শান্তি আলোচনার সুযোগ রুদ্ধ করে রেখেছে। প্রায় ২১ মাসের একতরফা হামলার মধ্যে ইসরায়েল তার লক্ষ্য কয়েক দফায় বিস্তৃত করেছে। এটা তারা করেছে মুরব্বি যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপীয় মিত্রদের নব্য ঔপনিবেশিক নীলনকশার পুরোভাগের বাহিনী হিসেবে।

পুরো বিশ্বের ওপর পশ্চিম ইউরোপীয় সাতটি দেশের আধিপত্যের শুরু মহাসাগরীয় অভিযাত্রার কালে (পঞ্চদশ–অষ্টাদশ শতাব্দী) দুই আমেরিকা ও সর্বশেষ অস্ট্রেলিয়ায় স্থানীয় ভূমিসন্তানদের নির্মম-নিষ্ঠুরতায় সম্পূর্ণ, কোথাও আংশিক বিনাশ করে ইউরোপীয় বসতি স্থাপনের মাধ্যমে। দীর্ঘ লাগাতার চক্রান্ত, মিথ্যা আশ্বাস এবং চরম নিষ্ঠুরতার পরও যারা বেঁচে গিয়েছিল, তাদের নিজস্ব ভাষা-কৃষ্টির ওপর ঔপনিবেশিক ইউরোপীয় ভাষা-সংস্কৃতির বাধ্যতা চাপানো হয়েছিল, যেমনটা ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষের উত্তরাধিকারের দায় আমাদেরও বইতে হয়েছে, হচ্ছে।

যে দুটি মহাদেশ পূর্ণাঙ্গ দখলের বাইরে ছিল, সেই এশিয়া ও আফ্রিকায় তারা উপনিবেশ স্থাপন করে অবিরাম লুণ্ঠন ও নিষ্পেষণ চালিয়ে গেছে। এভাবে শিল্পবিপ্লব-পরবর্তী ঊনবিংশ শতক নাগাদ বিশ্বের ভূমি এবং সম্পদ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির হাতেই পুঞ্জীভূত হয়ে যায়।

বিশ্বের ভূমি ও সম্পদের ওপর দখল কায়েমের প্রকল্প ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর ঠান্ডা মাথার পরিকল্পনায় হয়েছিল। ১৮৮১ সালে প্রাশিয়ার জেনারেল অটো ফন বিসমার্ক বার্লিনে নিজেদের মধ্যে আফ্রিকার ভাগ–বাঁটোয়ারা নিয়ে সম্মেলন ডেকেছিলেন, ইতিহাসে এটি ‘স্ক্র্যাম্বল ফর আফ্রিকা’ বা আফ্রিকার জন্য কাড়াকাড়ি নামে আখ্যায়িত হয়েছে। পশ্চিম ইউরোপের সাতটি দেশ—যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন, পর্তুগাল নিজেদের মধ্যে মহাদেশটি ভাগাভাগি করে নিয়েছে। পরে তাতে ইতালি ও যুক্তরাষ্ট্র যোগ দিয়েছিল। বাদ ছিল শুধু দুটি দেশ—ইথিওপিয়া ও লাইবেরিয়া।

প্রথম মহাযুদ্ধের পর অটোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটলে তারা মুসলিম অধ্যুষিত মধ্যপ্রাচ্য, মিসর প্রভৃতি অঞ্চল পুনর্গঠনের মাধ্যমে তাদের আধিপত্য আরও বিস্তৃত ও দৃঢ় করার চেষ্টা চালিয়েছিল। ১৯২৯-৩০ সালের মহামন্দা ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ধকলে ইউরোপীয় শক্তি হ্রাস পাওয়ায় উপনিবেশগুলো ছেড়ে দেওয়ার বাস্তবতা তৈরি হয়। এর পেছনে স্থানীয় কারণ হলো দেশগুলোতে স্বদেশ ও স্বাধীনতা চেতনার বিকাশ এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের তীব্রতা। এখন সময়ের ব্যবধানে বিচার করলে মনে হয়, যেসব দেশে প্রত্যক্ষ ঔপনিবেশিক শাসন চলেছে, সেখানে ঔপনিবেশিক শক্তি শাসনকাজে স্থানীয় সহায়ক শ্রেণি তৈরি করতে গিয়ে স্বদেশ ও স্বাধীনতা চেতনায় উজ্জীবিত কিছু মানুষের জন্ম দেয়।

এমন মানুষদের নেতৃত্বে উপনিবেশায়িত দেশে দেশে তীব্র জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে গত শতকের মধ্যভাগ থেকে এশিয়া-আফ্রিকায় নতুন স্বাধীন দেশের আবির্ভাব হতে থাকে। এই বাস্তবতা এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্থানের প্রেক্ষাপটে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর সূচিত হয় স্নায়ুযুদ্ধ। যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউরোপ পুনর্গঠনের দায় এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তির নেতৃত্ব চলে আসে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। শিল্পবিপ্লব যেমন সবার জন্য সুযোগ তৈরি করলেও এর আঁতুড় যুক্তরাজ্য ও আঙিনা পশ্চিম ইউরোপের ফসলের উত্তমর্ণ হিসেবে নিয়ন্তার ভূমিকায় ছিল, তেমনি আজকের নতুন প্রযুক্তির প্রভাব ও বিশ্বায়নের ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। এতে শরিক হতে হচ্ছে সব দেশ ও জাতিকে এবং এর লভ্যাংশে সবার সুযোগ থাকলেও উত্তমর্ণের নিয়ন্তা-ভূমিকা পাল্টায়নি। মঞ্চ তাদের জন্যই সাজানো আছে।

বিশ্ব নিয়ন্ত্রণে তাদের সমকক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকলেও পুরোনো পারমাণবিক শক্তির দেশ রাশিয়াকে গণ্য করতে হয় এবং রাশিয়া-চীন জোট বাঁধলে তা মাথাব্যথার কারণ হয়। ইউক্রেন আক্রমণের জন্য রাশিয়াকে দায়ী করেও এ যুদ্ধ প্রলম্বিত করার গূঢ়ার্থ খেয়াল করতে হবে। ন্যাটোর প্রসারণের হুমকি বজায় রেখে তারা এ যুদ্ধকে মদদ দিয়ে যাচ্ছে মূলত দীর্ঘ মেয়াদে রাশিয়ার অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি খর্ব করার লক্ষ্য নিয়ে।

বিস্তৃত কথা বাদ দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে নজর দিলে দেখা যায়, তারা যেকোনো মূল্যে ইসরায়েলের স্বার্থ সুরক্ষা করতে তো চায়ই, সেই সঙ্গে এ অঞ্চলে এবং উত্তর আফ্রিকায় হুমকিস্বরূপ কোনো স্বাধীনচেতা শাসকের উত্থান যেন না ঘটে, তা–ও নিশ্চিত করতে চায়। সে কারণেই দুই স্বাধীনচেতা শাসক ইরাকের সাদ্দাম হোসেন ও লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে হত্যা ও উৎখাত করা হলো। যে অজুহাতে ও যে প্রতিশ্রুতিতে এই দুই দেশে সামরিক অভিযান হয়েছিল, তা সত্য ছিল না, হয়নি। কিন্তু এ দুজনের অনুপস্থিতিতে এ অঞ্চল থেকে তাদের জন্য হুমকি হয়ে ওঠার মতো কেউ যেমন থাকল না, তেমনি দেশ দুটি বহুকালের জন্য ধ্বংসাত্মক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে গেল।

নতুনভাবে ইরান এখন পশ্চিমের মাথাব্যথার কারণ। তারা ইসরায়েলের নিরাপত্তার অজুহাতকে বরাবর প্রয়োজনের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে এবং এর জন্য অন্যদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করতে এবং সেই অন্যদের প্রতি চরম অমানবিক হতে বিন্দুমাত্র ভাবেনি। একটি কথা অবশ্য মনে রাখতে হবে আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর গোত্র-বিভক্ত অনেক দেশে জাতি গঠনের যে দুর্বলতা, তারও সুযোগ নেওয়ার ইতিহাস রয়েছে।

বাস্তবতা হলো বিশ্বটা দাবার ছক হয়ে থাকলে তাতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা বিশ্ব একতরফা খেলে যাচ্ছে—বিশেষত সমাজতান্ত্রিক দ্বিতীয় বিশ্বের পতন ও বিশ্বায়নের সুবাদে। আপাতত তারা খেলছে যুগপৎ রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের সমর ও অর্থশক্তির বিরুদ্ধে। একদিকে ইউক্রেন, অন্যদিকে ইসরায়েল রণাঙ্গনে লড়ছে, তবে সত্যিকার অর্থে ইসরায়েলের বাস্তব প্রতিপক্ষ আর নেই। মাঠে হামলা চালিয়ে যাওয়ার অজুহাত নেই।

মনে হচ্ছে, তবু পশ্চিমা শক্তি ইসরায়েলকে দিয়ে অন্যায় যুদ্ধ চালিয়ে যাবেই। হামাস বা হিজবুল্লাহ প্রতিরোধ না করলেও যুদ্ধবিরতি চুক্তির জন্য বারবার সম্মতি জানানো সত্ত্বেও ইসরায়েল হামলা বন্ধ করতে চায় না। বরং ইরানকে নতুন প্রতিপক্ষ খাড়া করেছে। পশ্চিম ইউরোপ চুপচাপ। মৌনতা সম্মতির লক্ষণ—অবশ্যই ইসরায়েলের অনুকূলে। প্রতিদিন তারা মানুষ মারছে—এমন একতরফা নৃশংসতা এত দীর্ঘদিন চলতে আগে দেখেনি বিশ্ব। কিন্তু তা চলছে, চলতে পারছে, সম্ভবত নৃশংসতা নেওয়ার সামর্থ্য আর মানব–বিবেকের নেই। অসাড় হয়ে যাওয়া বিশ্ববিবেকের সুযোগ নিয়ে ইসরায়েল এবং তার পৃষ্ঠপোষক পশ্চিমা দুনিয়া মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে নতুন পরিকল্পনায় মত্ত হয়ে আছে।

আমরা নিজেদের এবং নিজেদের দেশ নিয়ে ব্যতিব্যস্ত আছি। পশ্চিমা পরিমণ্ডলের বাইরের বিশ্বের ছোট–বড়, ধনী-দরিদ্র সব দেশেই অভ্যন্তরীণ সংকট বাড়ছে, কোথাও দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক সংঘাত চলমান। অথচ এই ফাঁকে বিশ্ব-বিবেকের টুঁটি চেপে ধরা হয়েছে। প্রশ্ন হলো এটাই কি মানবজাতির ভবিতব্য? নাকি কোথাও থেকে প্রশ্ন উঠবে, প্রতিরোধের ডাক আসবে? অন্তত অতীতের জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের মতো একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ মঞ্চ তৈরি হবে আবার—এমন প্রত্যাশা এবং উদ্যোগ ছাড়া দিনযাপনের গ্লানি তো আর টানা যাবে না। বিশ্বশান্তি, সভ্যতার নিরাময় এবং বিবেক রক্ষার একটা কোনো উদ্যোগ তো নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।

* আবুল মোমেন, সাংবাদিক ও লেখক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

বুদ্বুদের মধ্যে কাটলো যে ছেলের জীবন

হাসপাতালে ডেভিড ভেটার
উনিশশো চৌরাশি সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আমেরিকায় এক ছেলের মৃত্যু হয় যে বিশাল একটি প্লাস্টিকের গোলাকার ঘরের মধ্যে সারাটা জীবন কাটিয়েছে। বিরল এক ধরনের জেনেটিক ত্রুটির শিকার এই ছেলেটিকে সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত পরিবেশে রাখতে হতো, কারণ তার দেহে কোন ধরনের রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা ছিল না। পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে এই ছেলেটিকে ডাকা হতো 'বয় ইন দ্যা বাবল' নামে।
ডেভিড ভেটারের মা ক্যারল অ্যান ডেমারেট বলছেন, তার ছেলে ডেভিড যে জিনগত রোগ নিয়ে জন্মেছিল তার নাম 'সিভিয়ার কম্বাইন্ড ইমিউনোডেভেশিয়েন্সি ডিজিজ'। মানুষ প্রতিদিন যে জীবাণুর সাগরের মধ্য দিয়ে চলাফেরা করে, ডেভিড কিংবা এই রোগে আক্রান্ত অন্য যে কোন বাচ্চার দেহে তার বিরুদ্ধে কোন ধরনের প্রতিরোধক ক্ষমতা থাকে না।
ক্যারল অ্যান ডেমারেট যে রোগের কথা বলছেন, সংক্ষেপে তার নাম 'স্কিড'। এই 'স্কিড' যাদের হয় তাদের মুখে কোন টনসিল থাকে না, তাদের দেহে কোন লিম্ফনোড থাকে না, থাকে না কোন থাইমাস। বলা যায় জীবাণুর সংক্রমণের মুখে তাদের দেহ থাকে সম্পূর্ণ অরক্ষিত।
এক বছর আগে ক্যারল ডেমারেটের প্রথম সন্তানও একই রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। তখনই তাকে জানানো হয়েছিল যে তার পরের সন্তানের স্কিড হওয়ার সম্ভাবনা ৫০%। এর পর তিনি আবার যখন সন্তান ধারণ করলেন তখন এই রোগের কথা বিবেচনা করে তাকে গর্ভপাতের প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ক্যারল ডেমারেটের পরিবার রোমান ক্যাথলিক খ্রিস্টান, এবং তারা গর্ভপাত-বিরোধী। সেজন্য এমন প্রস্তুতি নেয়া হলো যাতে সন্তানের জন্ম হয় বাইরের জগত থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, জীবাণুমুক্ত এক পরিবেশে। জন্ম হওয়ার পর জানা গেল ডেভিডও স্কিড রোগ নিয়েই জন্ম নিয়েছে।
ডেভিডের জন্মের প্রস্তুতি কীভাবে নেয়া হয়েছিল তা বলছিলেন ক্যারল অ্যান ডেমারেট, "হাসপাতালের ডেলিভারি রুমটিকে সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত করা হয়। অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ঐ ঘর থেকে সরিয়ে ফেলা হয়। সার্জনের যে দলটি জন্মদানে সাহায্য করেন তদের সংখ্যাও ইচ্ছে করেই নূন্যতম পর্যায়ে রাখা হয়।"
"ডেভিডের জন্মের ৪৮ ঘণ্টা আগে থেকে হাসপাতালের ভেতরে আমাকে অন্যান্যদের থেকে সম্পূর্ণভাবে আলাদা করে ফেলা হয়। ঘরে উপস্থিত সবার মুখে ছিল মাস্ক। তারা কোন কথা বলছিল না। দু'সপ্তাহ পর জানা গেল যে ডেভিডেরও স্কিড রয়েছে।"
ক্যারল ডেমারেট যখন জানতে পারলেন যে তার এই ছেলেও স্কিড আক্রান্ত তখন তিনি দু:খিত হলেও মনোবল ধরে রেখেছিলেন।
তিনি বলছিলেন, "খবরটা শুনে আমার হৃদয় একেবারে ভেঙে গিয়েছিল। কিন্তু আমরা জানতাম এই শিশুটির প্রতি আমাদের একটা দায়িত্ব রয়েছে। সেই দায়িত্ব পালনের জন্য আমরা সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলাম।"
'সিভিয়ার কম্বাইন্ড ইমিউনোডেভেশিয়েন্সি ডিজিজ'-এ আক্রান্ত হওয়ার ব্যাপারটি নিশ্চিত হওয়ার পর ডেভিডকে হাসপাতাল থেকে সরাসরি নিয়ে যাওয়া হয় বিশেষভাবে ডিজাইন করা জীবাণুমুক্ত একটি গোলাকার ঘরে যেটি তৈরি করা হয়েছিল স্বচ্ছ পিভিসি প্লাস্টিক দিয়ে। সেই ঘরের সাথে একটি কালো গ্লাভস লাগানো হয়েছিল যাতে হাসপাতালের কর্মীরা কিংবা ডেভিডের পরিবার তাকে নিরাপদে নাড়াচাড়া করতে পারে।
ডেভিড ভেটার, তার বাব্‌লের ভেতরে
সে দিনগুলোর কথা ক্যারল অ্যান স্মরণ করছিলেন এভাবে: "ডেভিডকে যখন আমি দুধ খাওয়াতাম তখন ঐ গ্লাসের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে তার বিছানা থেকে তাকে তুলে আনতাম এবং বুকের কাছাকাছি এনে দুধের বোতল তুলে দিতাম তার মুখে। যখন তাকে অনেকক্ষণ ধরে রাখতাম, তার দেহের উষ্ণতা গ্লাসের ভেতর দিয়ে আমার হাতে পৌঁছুতো। আমার মনে হয় আমার শরীরের ওমও সে নিশ্চয়ই টের পেত।"
"আমি যে তাকে স্পর্শ করতে পারতাম না, প্রতিটা মুহূর্তে সেটা আমার মনে পড়তো। মনে হতো প্লাস্টিকের দেয়ালটা যদি কোনভাবে অদৃশ্য হয়ে যেত। কিন্তু আমি সচেতনভাবেই সেই ধরনের ভাবনাকে দূরে সরিয়ে রাখতাম।
সে সময়টাতে স্কিডের একমাত্র নিরাময় ছিল বোন ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট। আশা করা হচ্ছিল, বড় বোন ক্যাথরিনের সাথে ডেভিডের হাড়ের মজ্জার মিল পাওয়া যাবে। কিন্তু সেটা হয়নি। সেটা ছিল একটা বড় আঘাত। জীবাণুর সংক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য ডেভিডের জন্য তৈরি করা হয় বেশ কয়েকটি গোলাকার প্লাস্টিকের ঘর। একটি ঘর তার ঘুমানোর জন্য, একটিতে তার জিনিসপত্র রাখার জন্য এবং অন্য একটি ঘর তার খেলাধুলার জন্য। প্রতিটি ঘর অন্যটির সাথে সংযুক্ত ছিল। এই ঘরগুলো তৈরি করা হয়েছিল ডেভিডের বাড়ির মধ্যে। এই ঘরগুলো তৈরি হলে জন্ম নেয়ার দু'মাস পর ডেভিডকে হাসপাতাল থেকে প্রথমবারের মতো তার বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।
ক্যারল অ্যান ডেমারেট বলছিলেন তাকে মূলত সবসময়ের জন্য বাড়ির ভেতরেই থাকতে হতো। তাতে যে খুশিই ছিল। ডেভিড প্রথমবারের মতো কথা বলে বাড়ির ভেতরে। হাঁটার জন্য প্রথম পা ফেলে বাড়ির ভেতরে।
ডেভিড যখন বড়ো হচ্ছিল সে সময়ে সংবাদমাধ্যমে তাকে ডাকা হতো 'বয় ইন দ্যা বাবল' নামে। ক্যারল ডেমারেটকে শুধু ডেভিডকে দেখাশোনার দায়িত্বই পালন করতো হতো না, ডেভিডের অদ্ভুত জীবনধারার জন্য তাকে মানসিকভাবেও তৈরি করা হচ্ছিল।
ক্যারল অ্যান ডেমারেট বলছিলেন, প্রথম যে বিষয়টা তারা ডেভিডকে শেখাতে চেয়েছিলেন, সেটা হলো যে সে একজন বিশেষ মানুষ, অন্য সবার চেয়ে আলাদা। তার পরিস্থিতি যতই আলাদা হোক না কেন তাকে শেখানো হয়েছিল যে সে কোন একজনের ছেলে, কোন একজনের নাতি, কোন একজনের ভাই।
ছেলেবেলার স্বাভাবিক জীবন কেমন হতে পারে, সেই ধারণাটা ডেভিড পেয়েছিল তার বোন ক্যাথরিনের কাছ থেকে।
"ক্যাথরিন স্কুলের নানা অনুষ্ঠানে অংশ নিতো। তার জন্য আমি যেসব পোশাক তৈরি করতাম, সেটা আমি বানাতাম আমার সেলাইয়ে মেশিন দিয়ে। সেলাই মেশিনটি নিয়ে আমি ডেভিডের ঘরের দেয়ালের পাশে বসে যেতাম এবং কাপড় সেলাই করতাম। ডেভিড তা দেখতে পেতো। ক্যথরিন তার স্কুলের বন্ধুদের নিয়ে বাড়ির উঠোনে রিহার্সাল করতো। ডেভিড তার ঘরের জানালা দিয়ে তা দেখতো এবং লম্ফঝম্ফ করে তাদের উৎসাহ যোগাতো।"
সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে ডেভিডের জনপ্রিয়তা বাড়ছিল। এক টিভি চ্যানেল তার ওপর একটি অনুষ্ঠান প্রচার করার পর, মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসা ডেভিডের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে। তারা প্রস্তাব দেয় যে তারা ডেভিডের জন্য একটি স্পেস সুট অর্থাৎ মহাকাশচারীদের পোশাক তৈরি করে দেবে। এটি পরে ডেভিড তার গোলাকার ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে আসতে পারবে এবং নিরাপদে ঘোরাফেরা করতে পারবে।
মায়ের সাথে ডেভিড
ডেভিডের বয়স যখন ১২ বছর, তখন তার বাবা--মাকে একটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। বয়স বাড়ার সাথে সাথে ডেভিডের ঘরের আয়তন ছোট হয়ে আসছিল। ডাক্তাররা তার জন্য আরো বড় ঘর তৈরি করতে পারছিলেন না। সে সময় তার পরিবারকে ডাক্তাররা জানিয়েছিলেন যে বোন ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্টের ক্ষেত্রে নতুন গবেষণার ফলাফলে জানা যাচ্ছে যে সম্পূর্ণভাবে মিলে না গেলেও একজনের হাড়ের মজ্জা অন্যজনের দেহে বসানো যায়।
ক্যারল অ্যান ডেমারেট বলছিলেন, "সে সময় মনে হয়েছিল এটা করা যেতেই পারে। পুরো বিষয়টা ডেভিডকে ব্যাখ্যা করে বোঝানো হয়েছিল। সেও রাজি হয়েছিল।"
"আমাদের তিনজনের বোন ম্যারো পরীক্ষা করা হয়েছিল। তার মধ্যে ক্যাথরিনের বোন ম্যারোর নমুনা ছিল সবচেয়ে উপযোগী। তাই ক্যাথরিনকেই ডোনার হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়েছিল।"
তারপর বোন ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট হয়ে গেল। গোঁড়ার দিকে বিষয়টা ভালই ছিল। ডেভিডকে বাড়ি ফিরিয়ে আনা হলো।
"১৯৮৩ সালের নববর্ষের রাত। ডেভিডের শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে গিয়েছিল। আমি তার ডাক্তারকে ফোন করে জানালাম যে ডেভিডের তাপমাত্রা এক-দুই ডিগ্রি বেড়েছে। ডাক্তাররা সাথে সাথে তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেল। তারপর থেকেই তার অবস্থা ধীরে ধীরে খারাপের দিকে যেতে হতে শুরু করে। "
১৯৮৪ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি ডেভিড ভেটার মারা যায়। পরে পরীক্ষা করে জানা যায় যে তার বোন ম্যারোর মধ্যে এপস্টিন বার নামে একটি ভাইরাস সুপ্ত অবস্থায় ছিল, যেটি পরে লিম্ফোমায় রূপ নেয়। ভাইরাস থেকেও যে কারও ক্যান্সার হতে পারে তার ঐ পরীক্ষা থেকেই প্রথমবারের মতো জানা গিয়েছিল।
ক্যারল অ্যান ডেমারেট এখন ইমিউন ডেফেশিয়েন্সি ফাউন্ডেশনের ট্রাস্টি বোর্ডের একজন সদস্য। তিনি এখনও টেক্সাস চিলড্রেন্স হসপিটালে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করছেন। ডেভিড তার ছোট্ট জীবনের একটি অংশ কাটিয়েছিল এই হাসপাতালেই।
>>>তার দেহের উষ্ণতা গ্লাসের ভেতর দিয়ে আমার হাতে পৌঁছুতো। আমার মনে হয় আমার শরীরের ওমও সে নিশ্চয়ই টের পেত। -ক্যারল অ্যান ডেমারেট, ডেভিডের মা।
(ইতিহাসের সাক্ষীর এই পর্বটি পরিবেশন করেছেন মাসুদ হাসান খান।)

দাসপ্রথা বিলোপে দাসদের কি কোনো ভূমিকা ছিল by মো. মিন্টু হোসেন

লাখো আফ্রিকানকে বন্দি করে অমানবিক পরিশ্রমে বাধ্য করা হয়েছিল দাসপ্রথায়। ১৭৯১ সালের হাইতির বিদ্রোহ ও ব্রিটেনে আন্দোলনের জোরে ১৮০৭ সালে আইন পাস হয়, ১৮৩৮ সালে দাসরা মুক্তি পায়। আজও মানব পাচার আধুনিক দাসত্বের রূপ।

বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর ২৩ আগস্ট পালিত হয় দাস–বাণিজ্য বিলোপের আন্তর্জাতিক দিবস। দাস–বাণিজ্য ইতিহাসের এমন এক সময়কে নির্দেশ করে, যখন কৃষ্ণাঙ্গ মানুষকে সম্পূর্ণ বৈধভাবে কেনাবেচা করা হতো। আটলান্টিক মহাসাগর ঘিরে গড়ে ওঠা বাণিজ্যিক পথে লাখ লাখ মানুষকে দাস হিসেবে ক্রয়-বিক্রয় করা হতো।

কিন্তু ১৭৯১ সালের ২২ থেকে ২৩ আগস্টের রাতে সান্তো দোমিঙ্গোতে (আজকের হাইতি ও ডোমিনিকান রিপাবলিক) যে বিদ্রোহ শুরু হয়, সেটি দাস–বাণিজ্য বিলোপে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

জাতিসংঘের নেতৃত্বে দিনটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আলোচনা সভার মাধ্যমে পালন করা হয়। এর উদ্দেশ্য হলো মানব ইতিহাসের এই লজ্জাজনক অধ্যায়কে মনে করিয়ে দেওয়া এবং মানুষকে সচেতন করা।

দাস–বাণিজ্যপ্রথা কী

দাস–বাণিজ্যের ইতিহাস অনেক ভয়াবহ। ১৫০০ সালের দিক থেকে দাস কেনাবেচার মাধ্যমে বিপুল অর্থ উপার্জন করা হতো। যুক্তরাজ্যের লন্ডন, লিভারপুল, ব্রিস্টলসহ বিভিন্ন বন্দর থেকে দাসবাহী জাহাজ পশ্চিম আফ্রিকার উদ্দেশে যাত্রা করত। এসব জাহাজে থাকত কাপড়, অস্ত্রসহ নানা সামগ্রী, যা দাস ব্যবসার বিনিময়ে ব্যবহৃত হতো।

এসব সামগ্রীর বিনিময়ে অপহৃত নারী, পুরুষ ও শিশুকে কেনা হতো। আবার অনেক সময় আফ্রিকার স্থানীয় শাসক বা প্রধানদের কাছ থেকেও দাস ক্রয় করা হতো।

ফলাফল ছিল ভয়াবহ—লাখ লাখ পরিবার ভেঙে ছিন্নভিন্ন হয়ে যেত। এরপর বন্দীদের দাসবাহী জাহাজে গাদাগাদি করে মাসের পর মাস সমুদ্রপথে যাত্রা করানো হতো। এই পথকে বলা হতো মিডল প্যাসেজ। ভয়াবহ দুরবস্থার কারণে এই যাত্রাপথেই বহু মানুষ মারা যেত।

গবেষকেরা মনে করেন, পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে দাস ব্যবসায় কমপক্ষে ২ কোটি ৪০ লাখ আফ্রিকানকে বিক্রি করা হয়েছিল।

দাসদের নিলাম ও শোষণ

ক্যারিবীয় অঞ্চল, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা থেকে তুলে নেওয়া আফ্রিকানদের নিলামে সর্বোচ্চ দরদাতার কাছে বিক্রি করা হতো। এরপর তাঁদের কোনো মজুরি ছাড়াই বিশাল কৃষিভূমি বা গাছ রোপণের কাজ করতে বাধ্য করা হতো। সেখানে তাঁরা আখ, কফি প্রভৃতি ফসল উৎপাদনে প্রাণান্ত পরিশ্রম করতেন।

এই মানুষগুলোর কোনো অধিকার ছিল না। বরং তাঁদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ করা হতো। দাসদের উৎপাদিত পণ্য যেমন চিনি, কফি ও তামাক জাহাজে করে ব্রিটেনে নিয়ে যাওয়া হতো এবং সেখানে সেগুলো বিক্রি করা হতো।

এই বাণিজ্য থেকে অসংখ্য মানুষ বিপুল ধনী হয়ে ওঠে। আর এই দাস ব্যবসা ব্রিটেনের অর্থনীতিতেও বিশাল লাভ এনে দেয়।
দাসদের জীবনযাপন ও দুর্বিষহ বাস্তবতা

দাস হিসেবে জীবন ছিল অকল্পনীয় কষ্টকর। আজকের দিনে সেটি কল্পনা করাও কঠিন। অধিকাংশ দাসের কোনো অধিকারই ছিল না। অনেককে নিজের নাম পরিবর্তন করে মালিকের দেওয়া নাম নিতে বাধ্য করা হতো।

দাসদের দিনে প্রায় ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত অমানবিক পরিবেশে খাটতে হতো। খাবার ছিল অপ্রতুল ও নিম্নমানের, কোনো চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল না। অনেক সময় প্রচণ্ড গরম রোদে মাইলের পর মাইল হাঁটতে হতো, তাঁরা থাকতেন জরাজীর্ণ কুঁড়েঘরে এবং ঘুমাতেন কাদামাটির মেঝেতে।

দাসদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে মালিকেরা শারীরিক সহিংসতাও অবলম্বন করতেন। কোনো দাস একবার মাঠে কাজ শুরু করলে অমানবিক পরিশ্রমের কারণে তাঁদের আয়ুষ্কাল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেত। সংক্ষেপে, দাস হওয়া মানেই ছিল এক কঠিন, শোচনীয় ও দুর্দশাগ্রস্ত জীবন।

দাস ব্যবসা কীভাবে বিলুপ্ত হলো

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে ব্রিটেনে দাসপ্রথাবিরোধী আন্দোলন ক্রমশ শক্তিশালী হতে থাকে। প্রথম দিকে ধর্মীয় কিছু গোষ্ঠী, যেমন কোয়েকাররা এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়।

মানুষেরা দাসপ্রথাকে সমর্থন না জানাতে চিনির ব্যবহার বন্ধ করতে শুরু করে। কারণ, আখের চাষে দাসদের ওপর নির্যাতন চালিয়েই এসব চিনি উৎপাদিত হতো।

থমাস ক্লার্কসন টানা সাত বছর ধরে ঘোড়ায় চড়ে প্রায় ৩৫ হাজার মাইল ভ্রমণ করে ব্রিটেনজুড়ে জনসমর্থন সংগ্রহ করেন। ১৭৮৭ সালে তিনি এমপি উইলিয়াম উইলবারফোর্সকে রাজি করান পার্লামেন্টে দাস ব্যবসা বন্ধের দাবি উত্থাপন করতে।

একই সময়ে দাসরাও নিজেদের ওপর চালানো নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন ওলাউদাহ ইকুইয়ানো—একজন সাবেক দাস, যিনি নিজের স্বাধীনতা কিনে নিয়েছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে একটি বেস্টসেলার বই প্রকাশ করেন, যা দাসপ্রথার ভয়াবহতা সবার সামনে তুলে ধরে।

অবশেষে ১৮০৭ সালে ২৫ মার্চ ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ‘দাস ব্যবসা বিলুপ্তি আইন’ পাস করে। এ আইনে বলা হয়, কোনো ব্রিটিশ জাহাজে দাস পাওয়া গেলে প্রতি দাসের জন্য জাহাজমালিককে ১০০ পাউন্ড জরিমানা দিতে হবে। সেই সময় এত বড় অঙ্কের জরিমানা ছিল কার্যত ব্যবসা ধ্বংস করে দেওয়ার মতো কঠোর শাস্তি।

দাস ব্যবসা আইন করে বন্ধ হওয়ার পরও দাসপ্রথা একেবারে হঠাৎ শেষ হয়নি। প্রথমে দাসদের মুক্তি দেওয়া হলেও তাঁদের অনেককে জোর করে পাঁচ বছরের জন্য শিক্ষানবিশ ব্যবস্থায় আবার সাবেক প্রভুদের অধীন কাজ করানো হতো।

অবশেষে ১৮৩৮ সালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে দাসপ্রথা থেকে আসা সব দাসকে আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তি দেওয়া হয়। তবে পৃথিবীর অন্যান্য স্থানে তখনো দাসপ্রথা চলতে থাকে।

মুক্তি পেলেও দাসরা এত বছরের বিনা মজুরির কাজের কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি। বরং আশ্চর্যের বিষয় হলো, দাসদের মালিকদের ‘ক্ষতিপূরণ’ দেওয়া হয়েছিল।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এক্সেটারের বিশপ তাঁর ৬৬৫ জন দাস ‘ত্যাগ’ করে প্রায় ১২ হাজার ৭০০ পাউন্ড ক্ষতিপূরণ পেয়েছিলেন। সেই অর্থ আজকের দিনে হলে অঢেল সম্পদের সমান হতো।

আজও কি দাসপ্রথা আছে

দুঃখজনক হলেও সত্যি, আজও পৃথিবীর কিছু অপরাধী মানুষকে দাস বানিয়ে রাখে। এটি সম্পূর্ণ অবৈধ। এমন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিরা ধরা পড়লে আদালতে বিচার হয় এবং অন্যান্য গুরুতর অপরাধের মতোই শাস্তি দেওয়া হয়।

আজকের দিনে মানুষকে জোরপূর্বক অন্য জায়গায় কিংবা অন্য দেশে নিয়ে গিয়ে দাস হিসেবে ব্যবহার করাকে মানব পাচার বলা হয়।

এটাই মূল পার্থক্য, ঐতিহাসিক দাস ব্যবসা একসময় বৈধ ছিল, কিন্তু আধুনিক দাস ব্যবসা আজ সম্পূর্ণ বেআইনি।

দাসদের অধিকার: অতীত ও বর্তমান

অতীতে অধিকাংশ দাসের কোনো অধিকারই ছিল না। কিন্তু এখনকার দাসপ্রথার সঙ্গে তার বড় পার্থক্য রয়েছে। আজকের দিনে যদি কাউকে জোরপূর্বক খারাপ পরিবেশে আটকে রাখা হয় এবং ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করানো হয়, তবে তাঁরও অন্য সবার মতোই অধিকার আছে। কেউ পালিয়ে আসতে পারলে পুলিশ তাঁকে সুরক্ষা দেবে।

কিন্তু ঐতিহাসিক দাস ব্যবসায় পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তখন যদি কোনো দাস পালিয়ে যেতেন, পুলিশ বরং তাঁকে আবার প্রভুর কাছে ফিরিয়ে দিত। এরপর সেই দাসকে অবাধ্যতার শাস্তি পেতে হতো।

তথ্যসূত্র : বিবিসি, ইউনেসকো

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-08-23%2Fjwlu7e9m%2Fchild.jpg?rect=46%2C0%2C503%2C335&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে এখনো দাসপ্রথার মতো বিষয়টি চালু আছে। ছবি : রয়টার্স