Saturday, March 21, 2015

অসহযোগ থেকে জনগণের রাজ by রেহমান সোবহান

গেল শতকের ষাটের দশকে ‘এক দেশ দুই অর্থনীতি’র প্রবক্তা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান খুব কাছ থেকে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সূচনাপর্বের ঘটনাবলি প্রত্যক্ষ করেছেন। পরবর্তী সময়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে বহির্বিশ্বে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ছিলেন রেহমান সোবহান। ১৯৭১ সালের মার্চের ঘটনাবলি তাঁর পর্যবেক্ষেণ উঠে এসেছে, যা প্রথম ছাপা হয়েছিল তাঁর সম্পাদিত ফোরাম–এ। তিন কিস্তিতে তাঁর এই ধারাবাহিক রচনাটি প্রকাশিত হচ্ছে...
বাংলাদেশে আজ যা ঘটছে, তার নজির ইতিহাসে খুব একটা দেখা যায় না। এক সপ্তাহের ব্যবধানে ইসলামাবাদ সরকারের কাছ থেকে কার্যত ক্ষমতা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে হস্তান্তরিত হয়েছে। না, মহারণ বিজয়ের মাধ্যমে হয়নি, আবার বিদেশিদের হস্তক্ষেপেও হয়নি। আবার শাসকশ্রেণি আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছে, ব্যাপারটা তা–ও নয়। মুখ্যত শান্তিপূর্ণ উপায়েই ক্ষমতা হস্তান্তর হয়েছে। কিন্তু অনেকে বলেন, গত এক সপ্তাহের বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ও নিপীড়নের বিনিময়ে এটা সম্ভব হয়েছে।
এই পরিস্থিতির অনন্য ব্যাপার হচ্ছে, শান্তিপূর্ণ অসহযোগ আন্দোলন এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে জনগণের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সক্রিয় সহযোগিতার প্রশ্ন আর নেই। সব স্বাধীনতা সংগ্রামেই অসহযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এটা অর্থনীতি ও প্রশাসনকে পঙ্গু করে দেয়। শাসকদের জীবন অতিষ্ঠ করে তোলে। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামেও দেখা গেছে বেসামরিক প্রশাসন, বিচার বিভাগ ও অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সব সময়ই রাস্তায় নেমেছেন। আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য পুলিশকে মাঠে নামতে হয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে নজিরবিহীন ব্যাপার হচ্ছে, ইসলামাবাদের শাসকদের সঙ্গে এই অসহযোগ সর্বাত্মক। গত সপ্তাহে প্রশাসনের একজনও ইসলামাবাদের সঙ্গে সহযোগিতা করেননি। পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি থেকে শুরু করে প্রধান সচিব পর্যন্ত সবাই এই কাতারে যোগ দিয়েছেন। সাম্প্রতিক ইতিহাসে দুনিয়ার কোথাও এমন ঘটেছে বলে আমার জানা নেই।
রেডিও পাকিস্তানে এক অসাধারণ ঘটনা ঘটেছে। সেনা সরকার প্রথমে শেখ মুজিবের ৭ মার্চের ভাষণ সম্প্রচারের অনুমতি দিলেও পরবর্তীকালে তা প্রত্যাহার করে। প্রতিবাদে রেডিও পাকিস্তানের কর্মীরা সব বন্ধ করে বাড়ি চলে যান। হঠাৎ করে সম্প্রচার বন্ধ করায় মানুষ ধারণা করে, শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়। সর্বোচ্চ ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত চেক ভাঙানোর অনুমতি দেওয়া হয়। পরবর্তী দিন বেতন ও মজুরি দেওয়ারও অনুমতি দেওয়া হয়, তবে সংশ্লিষ্ট ট্রেড ইউনিয়নের সত্যায়ন সাপেক্ষে। সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য এটা করা হয়। মাত্র দুই ঘণ্টার জন্য ব্যাংক খোলা রাখায় নানা সমস্যার সৃষ্টি হয়। পরবর্তীকালে ব্যাংকিংয়ের সময় অবশ্য বাড়ানো হয়। পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে যাতে টাকা আর না যায়, সে জন্য এসব করা হয়েছে।
একইভাবে ৯ মার্চের ডিক্রিতে সরকারি কার্যক্রম শুরুর ডিক্রি জারি করা হয়। স্টেট ব্যাংকও প্রয়োজন অনুযায়ী সীমিত আকারে খোলা হয়। কৃষকদের সুবিধার্থে কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনও খোলা হয়। পাট ও ধানের চারা বিতরণ শুরু হয়। ১২ মার্চ আরও বৃহৎ এক ডিক্রির মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট অসহযোগ আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
তবে আমলারা বসে থাকেননি। তাঁরা অসহযোগ আন্দোলনকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সহযোগিতার পথে হাঁটেন। একদল সমস্যা চিহ্নিত করে শেখ মুজিবের কাছে পেশ করে। নতুন এক সচিবালয় গড়ে ওঠে, যেখানে সরকারি কর্মচারী ও ব্যবসায়ীরা জড়ো হয়ে সমস্যার সমাধান খোঁজেন। কিন্তু অভিজ্ঞতার অভাবই প্রধান প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়।
যা-ই হোক, জনগণের প্রতিনিধিরাই কার্যত দেশ শাসন করতে থাকেন। সচিব, ডিসি, সার্কেল অফিসার, পুলিশ—সবাই তাঁদের নির্দেশে কাজ করতে থাকেন। পুলিশ আওয়ামী লীগের স্বেচ্ছাসেবীদের সঙ্গে কাজ করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে। মফস্বল এলাকার কর্তৃপক্ষ সংগ্রাম পরিষদের নির্দেশ মেনে কাজ করতে থাকে। সবকিছুর উৎস কিন্তু একটাই—আওয়ামী লীগ।
আমলারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে সহযোগিতা করলেও জনগণের উৎসাহ-উদ্দীপনার কাছে তা কিছুই না। দেখা গেল, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরাই তাঁদের কর্মকর্তাদের ওপর ছড়ি ঘোরাচ্ছেন। যেখানে প্রশাসনিক কার্যক্রম চালু হয়েছিল, সেখানে তাঁদের অতি উৎসাহে প্রশাসনে স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছিল। দলের কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কেউ যেন অন্তরায় সৃষ্টি করতে না পারেন, সেই লক্ষ্যে তাঁরা এককাট্টা হন। ফলে আমলারা নিজেদের কর্তৃত্ব পনুরুদ্ধারে ৩২ নম্বরে দৌড়ানো শুরু করেন। বেসরকারি ব্যাংক ও কারখানায়ও শ্রমিকেরা বাংলাদেশের স্বার্থ অক্ষুণ্ন রাখার চেষ্টা করেন। তাঁদের বড় কর্তারা যাতে কোনো অন্তর্ঘাত করতে না পারেন, সেটা তাঁরা নিশ্চিত করেন।
আওয়ামী লীগের যে সীমিত কর্তৃত্ব ছিল, তা কোনো আদালতে বলবৎযোগ্য ছিল না। আবার তাদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের কোনো কার্যকর ব্যবস্থাও ছিল না। ফলে বেসরকারি ব্যাংক থেকে তাঁরা টাকা তোলার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করলে বা অনাদিষ্ট কাজে টাকা না তোলার নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলেও তা বলবৎ করার কেউ ছিল না।
জনগণের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সহযোগিতা ও সীমাহীন আনুগত্যের কারণে এটা সম্ভব হয়। পুলিশ প্রতিবেদনে জানা যায়, সে সময় অপরাধের পরিমাণও কমে এসেছিল। অপরাধীরা আওয়ামী লীগের সবুজ টুপিধারী স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে কাজ করেছে শুধু সহিংসতা বন্ধ করতে নয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে। গুলশান ও ধানমন্ডির মধ্যবিত্তরা কিছু ভয়ের মধ্যে ছিলেন। কিন্তু স্বেচ্ছাসেবকেরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাঁদের উপস্থিতি জানান দিয়েছেন।
তবে এটা বলা ঠিক হবে না যে বাংলাদেশে এক শান্তিপূর্ণ নির্বাণ নেমে এসেছিল। শোনা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানাগার ও পিসিএসআই থেকে বন্দুকাধারী ব্যক্তিরা রাসায়নিক ও বিস্ফোরক নিয়ে গেছে। ভিআইপিদের রক্ষীদের কাছ থেকে অস্ত্র কেড়ে নেওয়া হয়েছে। সংগ্রামের আরেকটি রূপও ঘনীভূত হচ্ছিল। ভবিষ্যতে কোনো সহিংসতা হলে তা একপক্ষীয় হবে না।
নিরাপত্তা বাহিনী প্রতিরোধের স্বতঃস্ফূর্ততার মধ্যেও জঙ্গিত্ব দেখিয়েছে। তাদের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতেও দেখা গেছে, সিলেট ও যশোরে তাদের ঘাঁটিতে সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। কৃষকেরা দেশের বিভিন্ন স্থানের রাস্তায় প্রতিবন্ধক তৈরি করেন। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে এমভি সোয়াতে যে পাকিস্তানি সেনা ও অস্ত্রের প্রথম চালানটি আসে, সেটা আংশিক নামানো হয় ওয়াগনে। কিন্তু শ্রমিকেরা নিজের উদ্যোগে মাল খালাস বন্ধ করে দেন। তাঁরা অচল ওয়াগনটি সেখান থেকে সরিয়ে ফেলেন। অর্থাৎ কৃষক, শ্রমিক ও আমজনতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে মাঠে নেমে আসেন। এটা তাঁদের কাছে ছিল বাঁচার সংগ্রাম।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে সব মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। তাঁর যেকোনো দিন আসার কথা ছিল। লে. জেনারেল ইয়াকুব ৯ মার্চ ঢাকা ত্যাগ করেন, তাঁর স্থলাবিষিক্ত হন গভর্নর মর্যাদার লে. জেনারেল টিক্কা খান। জানা যায়, ইয়াকুবের মধ্যে খুনির বৈশিষ্ট্য ছিল না। এ দেশের ভাষা শিখেছিলেন তিনি, এখানকার সংস্কৃতিরও তিনি খুব তারিফ করতেন। নিরাপত্তা বাহিনী সংঘর্ষ এড়াতে ব্যারাকের মধ্যেই ছিল। আকার-ইঙ্গিতে বোঝা যাচ্ছিল, তারা ইয়াহিয়ার আগমনের অপেক্ষায় ছিল।
গত সপ্তাহে ইয়াহিয়ার কৌশল ছিল পুরস্কার ও শাস্তিদানের, যখন যেটা কাজে লাগানো যায়। তাঁর ৬ মার্চের বক্তৃতা বাংলাদেশের প্রতি চূড়ান্ত আক্রমণাত্মক ছিল। ফলে শর্তহীনভাবে অধিবেশন শুরু হওয়ার তারিখ ঘোষণা করার অর্থ ছিল অযৌক্তিক আচরণের স্বীকৃতি দেওয়ার শামিল। কিন্তু তাঁর এলএফওর উল্লেখ ও ইয়াকুবের বদলে এক তীক্ষ্ণ দৃষ্টিসম্পন্ন মানুষকে বসানোর ঘটনায় বোঝা যায়, কোথাও বন্দুক ওঠানো হচ্ছে। তবে টিক্কা খান ঢাকায় আসার পর যথেষ্ট সংযত আচরণ করেছেন।
এরপর আমরা দেখলাম, পিপিপির চেয়ারম্যান ভুট্টো মৃত ব্যক্তিদের জন্য মায়াকান্না কাঁদছেন আর মুজিবকে পাঠানো তারবার্তায় সমর্থনের ভাষায় কথা বলছেন।
তবে এসব ঘটনায় জনগণের মধ্যে সন্দেহ সৃষ্টি হয়। অনেকে মনে করেন, এটা ছিল চূড়ান্ত আঘাত হানার আগে সময়ক্ষেপণ। ইয়াহিয়া যখন ছয় দফা নাকচ করেছেন, তখন এসব ঘটছে। এর মধ্যে শক্তি বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হবে।
আরেক দল মনে করত, ইয়াহিয়া বাংলাদেশের পরিস্থিতির সঙ্গে আপস করছেন। কারণ, ইসলামাবাদের হাতে তখন ক্ষমতা নেই। সেটা পুনরুদ্ধার করতে হলে প্রদেশের প্রতিটি অঞ্চল একটার পর একটা পুনরুদ্ধার করতে হবে। এই অবস্থায় ইয়াহিয়া কার্যত মুজিবের দাবি মেনে নেবেন। তিনি বাংলাদেশে ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন না। সামরিক আইন প্রয়োগ না করে তিনি সামরিক শাসনের শেষ টানবেন। এর মধ্য দিয়ে যে সদ্বিশ্বাস তৈরি হবে, তা শেখ মুজিবের সংসদে আসার জন্য যথেষ্ট হবে।
তাহলে মুজিবকে ঠিক করতে হবে, কার্যত ক্ষমতার বদলে তাঁর আইনগত ক্ষমতার দাবি সংঘর্ষ এড়াতে যথেষ্ট কি না। এত দিনে তিনি নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন যে ইসলামাবাদের হাতে ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ থাকলে তার তেমন আকর্ষণ থাকবে না। অভ্যন্তরীণ রাজস্ব, বৈদেশিক মুদ্রা ও সহায়তার ওপর তাঁর তেমন নিয়ন্ত্রণ নেই। তিনি তাঁর খসড়া পাস করে নিলেও ভেটোর সম্মুখীন হতে পারেন, যদি ইয়াহিয়া না বোঝেন যে বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর যুদ্ধে ছয় দফাই সবচেয়ে খতরনাক।
মুজিব ছয় দফায় সমর্থন পেলে রাষ্ট্রব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে পারবেন, বিপ্লবীদের ঠেকিয়ে রাখতে পারবেন। কিন্তু ইয়াহিয়া আবার ভেটো দিলে বা ভুট্টো আবারও অন্তর্ঘাত করলে তাঁর রাস্তায় নেমে আসা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। তখন তাঁকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তিনি কি পূর্ণাঙ্গ জনযুদ্ধে নেতৃত্ব দেবেন, নাকি জনগণের পরবর্তী ও চূড়ান্ত আন্দোলনে নিজেকে বাড়তি মানুষে পরিণত করবেন।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
সূত্র: ফোরাম, ১৩ মার্চ ১৯৭১।
রেহমান সোবহান: অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের চেয়ারম্যান।

মেরন সান স্কুল এন্ড কলেজে বঙ্গবন্ধুর জম্মদিন ও জাতীয় শিশুদিবস অনুষ্ঠিত

সবার কাছে পৌঁছে দিতে হবে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার ইতিহাস মেরন সান স্কুল এন্ড কলেজে বঙ্গবন্ধুর জম্মদিন ও জাতীয় শিশুদিবসের আলোচনা সভায় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক
বঙ্গবন্ধু ছিলেন পিছিয়ে পড়া পরাধীন জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আলোকবর্তিকা । তিনি বাঙ্গালী জাতির মুক্তির জন্য সারাজীবন রাজনীতি করে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করে গেছেন। তিনি ৬৬ সালের ৬ দফা স্বাধিকার আন্দোলন, ৭১সালে ৭ মার্চে ঐতিহাসিক ভাষণ পরবর্তীতে স্বাধীনতার যুদ্ধে ৯ মাসে বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন রাষ্ট্র পৃথিবীর মানচিত্রে জম্ম দিয়েছেন। তা সম্ভব হয়েছে বঙ্গবন্ধুর মতো নেতার জম্ম হয়েছে বলে। স্বাধীনতার অগ্রযাত্রাকে ধরে রাখতে শিক্ষিত জাতির বিকল্প নেই । বঙ্গবন্ধু একটি প্রেরণা একটি অধ্যায় এই মূল্যবোধ আগামী প্রজম্মকে স্বাধীনতার চেতনায় ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত বাংলাদেশ বিনিমার্ণে অগ্রণী ভুমিকা রাখবে। বাংলাদেশের আগামীর ভবিষ্যৎ বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার কারিগর কোমলমতি এসকল শিশুদের কাছে তুলে ধরতে হবে বাংলাদেশের সঠিক ইতিহাস। সবার কাছে পৌছে দিতে হবে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার ইতিহাস,যে সোনার বাংলা গড়ে তুলতে গিয়ে স্ব-পরিবারে প্রান হারান ষড়যন্ত্রকারীর কাছে। জাতির পিতার সোনার বাংলা গড়ে তুলবে আজকের এই শিশুরা। আগামী প্রজম্মের হাতে রইল বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ে তোলার দায়িত্ব। মেরন সান স্কুল এন্ড কলেজের বঙ্গবন্ধুর জম্মদিন ও জাতীয় শিশু দিবসের আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন একথা বলেন। গত ১৭ মার্চ চট্টগ্রাম নগরীর চান্দগাঁও এক কিলোমিটারস্থ মেরন সান স্কুল এন্ড কলেজের চান্দগাঁও ক্যাম্পাসের উদ্যোগে বঙ্গবন্ধুর জম্মদিন ও জাতীয় শিশুদিবসের আলোচনা সভা প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক ক্রিড়া সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান প্রিন্সিপাল ড.মোহাম্মদ সানাউল্লাহ্ সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। প্রধান অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন , বিশেষ অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের পরিচালনা পষর্দের ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ মোরশেদ হোসেন, কলেজিয়েট স্কুলের সিনিয়ার শিক্ষিকা শাহনাজ পারভিন, মেরিট বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের পরিচালক জয়নাল আবেদিন লিটন, প্রতিষ্টানে উপাধ্যক্ষ নুর কাশেম তালুকদার,অনুষ্টান সঞ্চালনায় করেন শিক্ষক ওসমান বেনিজি । শিশু দিবসের আলোচনাা শেষে বার্ষিক ক্রিড়া সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার ইভেন্ট বিজয়ী শিক্ষার্থীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয় ।

একদলীয় নৈরাজ্যের পদধ্বনি by শিমুল বিশ্বাস

শিমুল বিশ্বাস
বিএনপি চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারি
স্বাধীনতা-পরবর্তী আওয়ামী লীগের প্রথম শাসন আমলে দুর্নীতি, নৈরাজ্য এবং চরম দলবাজির কারণে বাংলাদেশ প্রত্যক্ষ করেছিল দুর্ভিক্ষ। স্বাধীনতাকামী জনগণের স্বাধীনতাযুদ্ধের চরম আত্মত্যাগকে পদদলিত করে আওয়ামী লীগ নেতারা দেশকে দুঃশাসন আর লুণ্ঠনের নরকরাজ্যে পরিণত করেছিল। শাসক দল সে সময় বিরোধী পক্ষকে নির্বিচারে অপহরণ ও খুনের মাধ্যমে তাদের কণ্ঠ রোধ করে। প্রশাসনে অন্তহীন দলীয়করণ করা হয় ও মানুষের বাকস্বাধীনতা রুদ্ধ হয়ে পড়ে। প্রবর্তন করা হয় একলীয় শাসনব্যবস্থা ‘বাকশাল’। ‘বাকশাল’ সম্পর্কে নতুন করে কিছু লিখতে যাওয়া আর বেদনার মহাকাব্য লেখা সমার্থক। সরকারি দল সে সময়ে ভিন্ন মতকে দমনের জন্য বিরোধী রাজনৈতিক দলের প্রায় ৪০ হাজার নেতাকর্মীকে খুন করে। আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের ভুক্তভোগী জনগণ হারিয়েছিল তাদের স্বাধীন মানুষ হয়ে বেঁচে থাকার সব অধিকার। স্বাভাবিক মৃত্যু ছিল অতি অস্বাভাবিক চাওয়া। প্রখ্যাত সাংবাদিক নির্মল সেন স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চেয়ে এক ঐতিহাসিক নিবন্ধ লিখে সারা দুনিয়ায় হইচই ফেলে দিয়েছিলেন। এতদসত্ত্বেও আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারানোর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত চরম নির্লজ্জের মতো সব অরাজকতা ও ব্যর্থতার জন্য বিরোধী পক্ষকে দোষারোপ করে মিডিয়ায় একতরফা মিথ্যা প্রচার করত। সংগঠনিকভাবে আওয়ামী লীগের বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়। এগুলো হলো-
  1.     অপশাসন, গুম, খুন, অপহরণ, মানবতাবিদ্বেষী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিরোধী ও ভিন্ন মতের কণ্ঠ রোধ করা।
  2.     এক-নায়কতান্ত্রিক মতবাদ অনুসরণ করা এবং পরিকল্পিতভাবে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো সর্বোচ্চমাত্রায় দলীয়করণের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে অকার্যকর করে ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থ হাছিল করা
  3.     তথাকথিত আদর্শের মোড়কে চরম ব্যক্তিবন্দনার ছদ্মাবরণে সীমাহীন অর্থলিপসা ও লুটপাট করা।
  4.     জাতীয় স্বার্থ অগ্রাহ্য করে ব্যক্তিস্বার্থ সিদ্ধি করা।
  5.     নগ্ন ও পৈশাচিক প্রতিহিংসাপরায়ণতা।
  6.     তাদের সব অপকর্মের দায় বিরোধী পক্ষের ওপর চাপানো এবং তাদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা ও মিথ্যা দোষারোপ করা।
  7.     বাকস্বাধীনতা হরণ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কুক্ষিগত করে মিথ্যা দলীয় প্রচারণার মাধ্যমে জনগণকে বোকা বানিয়ে তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল করার চেষ্টা করা।
  8.     সর্বগ্রাসী সন্ত্রাসের মাধ্যমে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে সাধারণ জনগণকে রাজনীতি বিমুখ রাখা।
প্রাসঙ্গিকভাবে এখানে স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রথম সরকারের দুর্নীতি এবং গণমাধ্যম নিপীড়নের কিছু উদাহরণ দেয়া প্রয়োজন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে মুক্তিযুদ্ধের ব্যয় নির্বাহের জন্য মুজিবনগর সরকার কর্তৃক সংগৃহীত ৭৫ কোটি টাকার কোনো হদিস পাওয়া গেল না (সরকারিভাবে ১৭ কোটির কথা স্বীকার করা হয়েছিল)। মুক্তিযুদ্ধের নামে জোগাড় করা সেই অর্থের কোনো হিসাব কেউই দিতে পারল না। এই অর্থ কিভাবে ব্যয় হলো, কে ব্যয় করল, আর যদি ব্যয় না-ই হয়ে থাকে তবে কোথায় গেল- এই প্রশ্নগুলো উঠতে শুরু করল। (সূত্র : গণকণ্ঠ. ৪ জানুয়ারি, ১৯৭৪)
ভারত থেকে স্বাধীনতার পর ঢাকায় এসেছিলেন তৎকালীন ইন্দিরা গান্ধী প্রশাসনের প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি পি এন হাকসার। হাকসার ঢাকায় এসে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেন সরকারের সাথে। আলোচনাকালে সামনে আসে মুজিবনগর সরকারের সেই টাকার প্রসঙ্গ, যা তখন ভারতীয় ব্যাংকে গচ্ছিত ছিল। মঈদুল হাসানের স্মৃতিচারণ অনুসারে, ইন্দিরা গান্ধী প্রশাসনের প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি পি এন হাকসার বলেন, ‘ভারত সরকার এই টাকাটা ফেরত দিতে চায় কিন্তু কীভাবে আমরা ফেরত পাঠাব? ব্যাংক ড্রাফট করে পাঠাব, নাকি তোমরা জিনিসপত্র কিনবে? জিনিসপত্র কিনলে তার বিপরীতে আমরা ব্লক হিসেবে সেই টাকা দেবো। তবে আমরা বিদেশী মুদ্রায় দিতে পারব না, ভারতীয় মুদ্রায় দেবো।’ তখন আওয়ামী সরকারের পক্ষ থেকে টাকাগুলো ট্রাকে করে ঢাকায় পাঠিয়ে দিতে বলা হয়। বিস্মিত পি এন হাকসার সরকারকে বললেন, ‘ট্রাকে করে টাকা কিভাবে দেবো? আমাদের তো সরকারি হিসাব-পদ্ধতি আছে, ব্যাংকিং নিয়ম আছে।’ তারপর সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয় ‘সামনে আমাদের নির্বাচন, এই টাকা সে জন্য আমাদের দরকার হবে।’ গণকণ্ঠ, ৪ ঠা জানুয়ারি ১৯৭৪
পি এন হাকসার তৎকালীন সরকারের এই নীতিবহির্ভূত আচরণ ও অর্থলিপ্সায় ব্যথিত হয়েছিলেন। তিনি মিসেস গান্ধী ও তার সহকর্মীদের এ কথা জানান। ১৯৭২ সালের জুন মাসে ভারতের তৎকালীন পরিকল্পনামন্ত্রী ডি পি ধর মঈদুল হাসানকে এ ঘটনার কথা জানান। পরে ১৯৮১ সালে খোদ পি এন হাকসারও এর সত্যতা স্বীকার করেন। (মঈদুল হাসান, মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর কথোপকথন। পৃষ্ঠা-১৪৩)
গণমাধ্যমের প্রতি তৎকালীন সরকারের যে ধরনের আক্রোশ ছিল এবং যেভাবে সেই আক্রোশের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে, তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। ১৯৭২-৭৫ সালের মধ্যে অনেক দৈনিক-সাপ্তাহিক পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া হয়। সাংবাদিকদের ঝাঁকে ঝাঁকে গ্রেফতার করা হয়। সর্বশেষ পঁচাত্তর সালে শেখ মুজিবুর রহমান যখন বাকশাল কায়েম করে দেশে চারটি সংবাদপত্র বাদে বাকি সব সংবাদপত্র বন্ধ করে দেন, তখন অনেক সাংবাদিক চাকরি হারিয়ে জীবন-জীবিকা নিয়ে হুমকির মুখে পড়েন। স্বাধীনতা লাভের প্রথম বছরেই শেখ মুজিব সরকার পাকিস্তানি স্বৈরশাসক আইয়ুব খান প্রণীত প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স অর্ডিন্যান্স ১৯৬০ পুনর্বহাল করে সংবাদমাধ্যম দলনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। গণশক্তি, হক-কথা, লাল পতাকা, মুখপত্র, বাংলার মুখ, স্পোকসম্যান- এই সাপ্তাহিক পত্রিকাগুলো নিষিদ্ধ হয়। বেশ কয়েকটির সম্পাদকও গ্রেফতার হন। বাহাত্তর সালেই অন্তত ১০টি পত্রিকার প্রকাশনা স্থগিত এবং একটি পত্রিকা বাজেয়াপ্ত হয়। সাপ্তাহিক হক-কথার প্রকাশক ও প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন খোদ মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। ১৯৭২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স অর্ডিন্যান্সের ২৬ ধারা অনুসারে হক-কথার প্রকাশনা বাতিল হয়। পত্রিকাটির ছাপাখানা শান্তি প্রেসকে ওই অধ্যাদেশের ২৩ (ক) ধারায় বই, সংবাদপত্র না ছাপানোর নির্দেশ দেয়া হয়। এর আগেই টাঙ্গাইল থেকে প্রকাশিত হক-কথার সম্পাদক ইরফানুল বারীকে ১৯৭২ সালের ২৩ জুন গ্রেফতার করা হয়। এর পর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। ১৯৭২ সালে মওলানা ভাসানী শেখ মুজিবের প্রতি লেখা খোলা চিঠিতে আক্ষেপ করে লেখেন, ‘স্বাধীন বাংলাদেশে পত্রিকা প্রকাশের সাধারণ অধিকারটুকুও না থাকলে আমি এ দেশে থাকতে চাই না। হয় পত্রিকা প্রকাশনার অনুমতি দানের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দাও, নয়তো আমাকে এ দেশ থেকে বহিষ্কার করো। (গণমাধ্যম নিপীড়ন, হাসান শান্তনু, পৃষ্ঠা-১২ )
১৯৯৬ সালে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে নির্বাচিত বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় পার্টি যুগপৎভাবে আন্দোলন করেছিল। আন্দোলনের মোড়কে তারা সে সময় সন্ত্রাসের রাজ্যত্ব কায়েম করে, যার নেতৃত্বে ছিল আওয়ামী লীগ। তারা তখন যাত্রীবাসে গান পাউডার দিয়ে যাত্রাবাড়ীতে ১৮ জন, শেরাটন হোটেলের সামনে ১১ জন মানুষ পুড়িয়ে হত্যা ও ১২ জন দগ্ধ যাত্রী বার্ন ইউনিটে প্রাণ হারান এবং গুপ্ত হত্যার মতো ঘৃণ্য কাজ করে, যা সবাইকে হতবাক করে দেয়। তাদের আন্দোলনের কারণে এসএসসি পরীক্ষা তিন মাস পিছাতে হয়েছিল, চট্টগ্রাম বন্দর অচল এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংসের মাধ্যমে তারা দেশের উন্নয়নকে থমকে দেয়।
এ সময় সামরিক বাহিনীতে উসকানি দিয়ে জেনারেল নাসিমের মাধ্যমে ‘ক্যু’ সংঘটনের চেষ্টা করা হয়, যা সমসাময়িক প্রচারমাধ্যমে বিশদভাবে প্রকাশিত হয়। তখনো আওয়ামী নেতাদের নিলর্জ্জ মিথ্যাচার ও গলাবাজি কারো অজানা নয়। জাতির বৃহত্তর স্বার্থ চিন্তা করে বিএনপি সে সময় তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা মেনে নেয়। ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে এবং আবার তাদের পুরনো ‘বাকশালী’ দুঃশাসনের চিরায়ত রূপে স্বদম্ভে আত্মপ্রকাশ করে। শুরু হয় বিরোধী রাজনৈতিক দলের ওপর অপহরণ ও খুনের সেই স্বভাবসিদ্ধ সংস্কৃতি। সব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে চলে নগ্ন দলীয়করণ। দেশ ক্রমেই গণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য হারিয়ে এক-নায়কতন্ত্রে রূপান্তরিত হতে থাকে। গণতন্ত্র ও উন্নয়নকামী জনতা সেই দুঃশসান থেকে মুক্তির জন্য ক্ষোভে ফেটে পড়ে। আওয়ামী লীগ সেই গণ-আন্দোলনকেও কালিমা লেপনের জন্য স্বভাবসিদ্ধভাবে প্রচারমাধ্যমে মিথ্যাচার ও বিরোধী দলের কুৎসা রটনায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু তাদের কোনো দুরভিসন্ধিই শেষ পর্যন্ত স্থায়ী হয়নি, জাগ্রত জনতা ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপিকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে পুনরায় নির্বাচিত করে। ২০০১ সালে বিএনপি নিরঙ্কুশভাবে বিজয়ী হয় এবং আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গঠিত হয় জনগণের সরকার। কিন্তু আওয়ামী লীগ এ দেশের সাধারণ মানুষ ও ভিন্নমতকে কখনোই সম্মান ও মর্যাদা দেয়নি। তারা কখনোই দলীয় এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সবার কথা ভাবতে পারেনি। আওয়ামী লীগ কখনোই সাধারণ জনগণকে নিজেদের পক্ষের শক্তি মনে না করে শত্রুপক্ষের মতো মনে করে আসছে। ফলে তারা জনগণের সম্মতি ছাড়া বাঁকা পথে ক্ষমতা দখলের হীন উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সর্বতোভাবে আত্মনিয়োগ করে থাকে। তারা গণতান্ত্রিক ধারার বিরুদ্ধে সামরিক বাহিনীকে উসকানি দিয়ে ২০০৭ সালে ১/১১ এর মতো অনির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতায় বসায়। তারা স্বভাবসুলভ কূটিলতার মাধ্যমে জনগণকে পাশ কাটিয়ে এবং নানাভাবে প্রভাবিত করে ১/১১-এর অবৈধ সরকারকে দিয়ে প্রহসনের ভোটগ্রহণের নামে ২০০৯ সালে ইচ্ছামতো সংসদীয় আসন বণ্টনের নীলনকশা বাস্তবায়ন করে। ২০০৯ সালে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা গ্রহণের পরে আটঘাট বেঁধে আওয়ামী লীগ পুনরায় বিরোধী দলশূন্য রাজনীতি চর্চার পথ অনুসরণ করে আসছে। আবার শুরু হয় শেয়ার মার্কেট, ব্যাংক, বিদ্যুৎসহ সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে লুটপাট, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, টপটেররদের দৌরাত্ম্য, অপহরণ, গুম ও খুন। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী, পাবলিক সার্ভিস কমিশন ও অন্য সব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে নির্লজ্জ দলীয়করণ অতীতের সব মাত্রাকে অতিক্রম করে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ জনগণের সব প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের মাধ্যমে দলীয় অনুসারীদের অনৈতিকভাবে পদোন্নতি ও পদায়নপূর্বক চরম ক্ষত সৃষ্টি করেছে। ফলে বিডিআর বিদ্রোহের মেতো কলঙ্কজনক ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুদ্ঘাটিত থেকে যায়। এ ঘটনায় সামরিক বাহিনীর ৫৭ জন চৌকস অফিসার প্রাণ হারান এবং তাদের পরিবারবর্গ নির্যাতনের শিকার হয়।
৫ জানুয়ারি ২০১৪ সালের ভোটারবিহীন একদলীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তাদের কুকর্মের পারাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী, প্রশাসন ও দলীয় লোকদের যৌথ প্রচেষ্টায় মঞ্চস্থ হয় ইতিহাসের ঘৃণতী ভোট জালিয়াতি আর কারসাজির নির্বাচন। জনগণের ভোটের অধিকার পুনর্বার লুণ্ঠিত হয়। স্বাধীনতাপ্রিয় জনগণ হয়ে পরে আওয়ামী দুঃশাসনের অধীন। স্বাধীন জীবন, মুক্ত চিন্তা হয়ে পড়ে শৃঙ্খলিত। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনচেতা জনগণ এই দমনপীড়ন ও জবরদখল কখনো মেনে নেবে না। জনগণ আজ ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে, তারা স্বশাসন ও মুক্তির প্রতীক ‘গণতন্ত্র ও ভোটের অধিকার’ ফিরে পেতে চায়। সরকার ও তাদের বশংবদ বাদে বাকি সবাই একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চায়। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনই কেবল জনগণের ক্ষমতাকে সংরক্ষণ ও উন্নয়নকে নিশ্চিত করতে পারে। তাই এই গণ-আন্দোলনে সমগ্র দেশবাসীর সমর্থন রয়েছে। ৮৫ শতাংশের অধিক মানুষ আজ একটি নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এই গণ-আন্দোলনকে বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ করতে সরকারি দল ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে তাদের অনুগত ব্যক্তি দ্বারা বিভিন্ন নাশকতা, মানুষ পোড়ানো, অপহরণ, লুটপাট, বিরোধী পক্ষের ঘরবাড়ি পোড়ানো, খুন, সরকারি ভবনে আগুন দেয়ার মতো ঘৃণ্য কাজে মেতে উঠেছে। এবার নতুন করে যোগ হয়েছে ‘গুম ও পেট্রলবোমার সংস্কৃতি’। গুম হচ্ছেন বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা ও সাধারণ মানুষ।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে দলীয় বাহিনীর মতো সাজানো হয়েছে। তাদের সব অপকর্মের জন্য ‘মৌখিক ইনডেমনিটি’ দেয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে। দলীয় কর্মী ও অনুগত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যোগসাজশে বাংলাদেশ এখন গুমের রাজ্য। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে ক্রসফায়ারের নামে ঠাণ্ডা মাথায় খুন, গুম, পায়ে গুলি করে অঙ্গহানি করার মতো পৈচাশিক কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছে। এদিকে, বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে সমস্বরে তাদের স্বভাবসিদ্ধভাবে বিরোধী দলের ওপর দোষ চাপানোর ধারা অব্যাহত আছে। সংবাদপত্রের নিয়ন্ত্রণের এই চরম দু’সময়েও দু’একটি প্রিন্ট ও অনলাইন মিডিয়ার কল্যাণে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে পড়ে, যা থেকে এটা সবার কাছে স্পষ্ট যে, সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা এই নাশকতা নিয়ন্ত্রণ করছে। সুকৌশলে তারা বার্ন ইউনিটে ক্ষতিগ্রস্তদের সমবেদনার নামে মেকি আহাজারি করে মানুষকে বোকা বানিয়ে মূল সমস্যা থেকে দৃষ্টি ভিন্ন খাতে সরানোর চেষ্টা করছে।
আমরা একটি খুন বা প্রাণহানিকেও সমর্থন করি না। আমরা ক্রসফায়ার, গুপ্তহত্যা, পেট্রলবোমাসহ সব নাশকতার নিন্দা জানাই। মানুষ পোড়ানো, ক্রসফায়ারের নামে বিচারবহির্ভূতভাবে মানুষ হত্যা, গুপ্ত হত্যা, গুমসহ সব মানবতাবিরোধী অপরাধের সাথে জড়িতদের শাস্তি চাই। চলমান আন্দোলন মানুষের ভোটের অধিকার ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য, যা ইতোমধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের সমর্থন অর্জন করেছে। আওয়ামী লীগকে জনগণ আর বিশ্বাস করে না, যা তাদের বিভিন্ন সভা-সমাবেশে লোক সমাগম দেখে অতি সহজেই অনুমান করা যায়।
বিএনপি একটি শান্তিপ্রিয় গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল। গণতান্ত্রিক পথে রাজনৈতিক চর্চাই তার মূল লক্ষ্য। বিএনপি আজ সব মানুষের অধিকার ও গণতন্ত্র রক্ষার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। বিএনপি মূলত ‘রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের দল’; তাই মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা গণতন্ত্র রক্ষার জন্য প্রকৃত ত্যাগ বিএনপিই করতে পারে। অপর পক্ষে, আওয়ামী নেতাদের প্রায় সবাই মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রত্যক্ষ যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতের বিভিন্ন ক্যাম্পে বিলাসী জীবন বেছে নিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে আওয়ামী লীগের মুখে বিএনপির সমালোচনা শোভা পায় না। বিএনপি রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে গড়া প্রকৃত একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল। ‘বামের ডানে এবং ডানের বামে’ সেন্টার ফরোয়ার্ড মূলধারার মধ্যপন্থী রাজনৈতিক দল বিএনপি। বারবার নিপীড়ন নেমে এসেছে, দলে দলে নেতাদের ভাগিয়ে নেয়া হয়েছে, তবে মূলধারার আদর্শ অনুসরণ করায় বিএনপি ঠিকই ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় বিএনপিকে নির্মূল বা দমন করার কোনো অপচেষ্টাই সফল হবে না।
গণতন্ত্রে নির্মূল মানসিকতার কোনো স্থান নেই। গণতন্ত্রে ভিন্ন মতের প্রতি যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শন ও শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা বদলের ধারা অনুসরণ করা সবার জন্য বাধ্যতামূলক। সব দলের কাছে গ্রহণযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা গঠন ও পরিবর্তন না হাওয়ার কারণেই আজ গণতন্ত্র হুমকির মুখে পড়েছে। গণতন্ত্রে একদলীয় ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার কোনো স্থান নেই। এ পথ অনুসরণকারীদের করুণ পরিণতি ইতিহাসের ছত্রে ছত্রে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে। ইতিহাস সাক্ষী রয়েছে, বিশ্বের কোথাও ন্যায্য আন্দোলন কখনো বৃথা যায়নি। এবারো জনগণের আন্দোলন বৃথা যাবে না।
দেশবাসী আবারো দেখছে আওয়ামী দুঃশাসন আজ তার সর্বোচ্চ উচ্চতায় অবস্থান করছে। সময়ের দাবি এই দুঃশাসন ও জবরদখলের হাত থেকে গণতন্ত্র, ভোটের অধিকার রক্ষা করতে হবে। সবাইকে যার যার অবস্থান থেকে সক্ষমতা অনুযায়ী অবদান রাখতে হবে। মানুষের স্বাধীনচিন্তা বিনিময়যোগ্য নয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব সুরক্ষা, গণতান্ত্রিক চিন্তা ও অবাধ ভোটের অধিকারের চলমান আন্দোলন অবশ্যই জয়লাভ করবে।
লেখক : বিআইডব্লিউটিসি’র সাবেক চেয়ারম্যান ও বিএনপি চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারি

দুই বাসনা থেকেই বর্তমান সঙ্কটের জন্ম by এ কে এম মহীউদ্দীন

বাংলাদেশে আজকের এই মহারাজনৈতিক দুর্যোগের পেছনে রয়েছে এ দেশের একটি শক্তিশালী গোষ্ঠীর সর্বনাশা দু’টি বাসনা। এক. এ দেশকে তারা একমাত্র তাদেরই ভাবে এবং চায়, যেভাবেই হোক তারাই চিরকাল রাষ্ট্রমতায় থাকবে। সে মতাও হতে হবে সীমাহীন। দুই. একই সাথে তারা চায় অন্য কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে দেশ থেকে নির্মূল করতে। ইচ্ছা দু’টি একটি অপরটির পরিপূরক। চিরকাল মতায় থাকতে হলে যারা এ পথে বাধা হতে পারে তাদের নির্মূল করা প্রয়োজন। আবার নির্মূল করতে গেলে সীমাহীন রাষ্ট্রমতা ও একচেটিয়া দলীয় কর্তৃত্ব প্রয়োজন। দু’দিক দিয়েই সুবিধা পেতে চায় গোষ্ঠীটি। তারা চায় এমন একটা শাসনব্যবস্থা কায়েম করতে, যাতে ‘গণতান্ত্রিক’ নামের আড়ালে বাস্তব অর্থে একটি একদলীয় রাষ্ট্রই কায়েম হবে।
আজকের এই চলমান সঙ্ঘাত বেধেছে এ কারণে যে, নির্মূল করার চেষ্টা করা হচ্ছে যাদের তাদের কেউ খুশি মনে নির্মূল হতে এবং একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে চিরকালের মতো রাষ্ট্রমতা ছেড়ে দিতে রাজি হতে পারছে না। তারা এক দিকে নির্মূল হওয়া থেকে বাঁচতে চায় এবং একই সাথে রাষ্ট্রমতা সবার জন্য যাতে সমানভাবে উন্মুক্ত থাকে, তা নিশ্চিত করতে চায়।
স্বাধীনতার পর থেকেই রাষ্ট্রমতা কুগিত করে রাখা এবং প্রতিপক্ষ নির্মূল করার চিন্তা সক্রিয়। এই চিন্তা থেকেই তখন রীবাহিনীর জন্ম হয়। প্রতিকূল পরিবেশে মাঝখানে কিছু দিন নির্মূল কার্যক্রম স্তিমিত থাকে। কিন্তু চিন্তাটা মনের মধ্যে থেকেই যায়। ১৯৭৫-এর পর প্রথমবার মতায় এসে তারা রাজনীতিতে আবার নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে। দ্বিতীয়বার ২০০৯ সালে মতায় আসার ফলে আবার একটা সুযোগ আসে এবং এটা পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়। তারা মতা স্থায়ীকরণ ও নির্মূলকরণের কার্যক্রম শুরু করে দেয়। রাষ্ট্রীয় শক্তি এবং রাষ্ট্রের ছত্রছায়ায় দলীয় শক্তির সমন্বিত প্রয়োগ করে তারা। ধাপের পর ধাপ তাদের কার্যক্রম এগিয়ে চলে। মতা হাতে পেয়ে পাঁচ বছর ধরে রাষ্ট্রের সব কিছুকে তারা নিজেদের দলীয় কব্জায় নিয়ে আসে। রাষ্ট্র পরিণত হয় একটি স্বেচ্ছাচারী দলীয় প্রতিষ্ঠানে। এরপর নিজেদের মতা আরো পাকাপোক্ত ও দীর্ঘায়িত করতে আনা হয় সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী।
রাষ্ট্রের সব দিক ও বিভাগের ওপর নিজেদের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব নিশ্চিত করার পর হাতে নেয়া হলো তাদের নির্মূল কার্যক্রম। এ জন্য শুরু হয় যারা নির্মূলের ল্য তাদের বিভিন্ন কৌশলে দুর্বল করে ফেলা। স্বাধীনভাবে স্বচ্ছন্দে তাদের স্বাভাবিক রাজনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব করে ফেলা হয়। এ জন্য আইনি-বেআইনি সব রকম অস্ত্রই প্রয়োগ করা হয়। মামলা, হামলা, অপপ্রচার, চলাচলে বাধাÑ কোনো কিছুই বাদ থাকে না। রাষ্ট্রীয় ও দলীয় সব শক্তিই প্রয়োগ করা হয় তাদের নাগরিক ও রাজনৈতিক জীবনকে অবরুদ্ধ করে ফেলা এবং তাদের একেবারে পঙ্গু ও অসহায় বানিয়ে দেয়ার কাজে।
এর পরবর্তী ধাপে ঘটানো হয় ২০১৪ সালের অকল্পনীয় এক নির্বাচন। এখন চলছে ওই প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে অর্জিত জনসমর্থনহীন মতা জোর করে ধরে রাখার মরিয়া চেষ্টা। যেকোনো মূল্যে মতা ধরে রাখতে গিয়ে এক দিকে দেশের মানুষকে করে ফেলা হয়েছে রাষ্ট্রশক্তির হাতে বন্দী ও অসহায়; অন্য দিকে নির্মূলের ল্য যারা তাদের জন্য অবস্থাটা হয়ে গেছে তাদের গলা টিপে ধরার মতো। শ্বাস রুদ্ধ হয়ে মরে যাওয়ার আগে তারা বাঁচার একটি চেষ্টা করতে চায়। এটাই কি স্বাভাবিক নয়?
কিন্তু ‘নির্মূল’ বলতে যা বোঝা যায়, এই ১৬ কোটি অস্থির ও উত্তেজনাপ্রবণ মানুষের দেশে কিভাবে তা সম্ভব হতে পারে? দীর্ঘমেয়াদি গৃহযুদ্ধ এবং লাখ লাখ প্রাণহানি ছাড়া কি তা সম্ভব হতে পারে? সামনের কাতারের কিছু মানুষকে নির্মূল করলেই কি সবাই নির্মূল হয়ে যাবে? পেছনের কাতারগুলোতে যারা আছে, তাদের সংখ্যা কি একেবারেই কম? কোটি কোটি নয় কি? নির্মূল অভিলাষীদের কথা ও কাজ দেখে মনে হয়, তারা ভাবে সব অসম্ভবই সাধন করতে পারবে তারা।
সন্ত্রাসী ও জঙ্গি গালাগাল দিয়ে কিছুটা সুবিধা পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু খুব বেশি নয়? এ কৌশল পৃথিবীর বিভিন্ন এলাকায় অনেকেই কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু তাদের কেউ কি খুব বেশি লাভবান হয়েছে? নাকি উল্টো নতুন নতুন এবং আরো কঠিন প্রতিরোধ সামনে চলে এসেছে? নতুন করে কি জঙ্গি সৃষ্টি হয়নি? এই কৌশলে জঙ্গি দমন না হয়ে বরং জঙ্গি উৎপাদিত হয়েছে। মাঝখান থেকে দেশের কী অবস্থা হয়েছে? সঙ্কট কি এতে আরো বিস্তৃত, জটিল ও দীর্ঘায়িত হয়নি? কোনো পই জিততে পারেনি। কিন্তু দেশটা একটা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। মানুষের স্বাভাবিক জীবন বিপর্যস্ত হয়ে গেছে আর স্বভাব-চরিত্র বিকৃত হয়ে গেছে। এমনভাবে বিপর্যস্ত ও বিকৃত হয়েছে যে, স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সমতাও তারা হারিয়ে ফেলেছে। মতা কুগিত করে রাখার অভিলাষী নির্মূলওয়ালারা আমাদের এই ভয়ঙ্কর পরিণতির দিকেই ঠেলে দিচ্ছে।
এ কথা আজ আর না বলে উপায় নেই যে, এ দেশের একটি গোষ্ঠীর যেকোনো মূল্যে মতায় থাকার এবং যেভাবেই হোক অন্যদের নির্মূলের রাজনীতিই হচ্ছে বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কটের মূল কারণ। নির্মূল চিন্তার মানুষগুলোর এবং তাদের একদলীয় রাষ্ট্র বানানোর বাসনার কারণেই স্থিতিশীলতা ও শান্তি আসতে পারছে না বাংলাদেশে। নির্মূলের রাজনীতি এবং একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা যত দিন থাকবে, সঙ্কটও বারবার ঘুরেফিরে আসতে থাকবে এবং ক্রমাগত তা বিস্তৃত, কঠিন ও জটিল হতে থাকবে। মতার একচেটিয়া দখলদারিত্বের বাসনাই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা। এই দুই অশুভ বাসনাই হচ্ছে বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কটের মূল কারণ।

পানি সংগ্রহে ২০ কোটি ঘণ্টা by কাজী সোহাগ

প্রতিদিন পানি সংগ্রহ করতেই নারীদের ব্যয় হয় ২০ কোটি ঘণ্টা। একই কাজে শ্রম ও সময় ব্যয় করছে এ দেশের শিশুরাও। ক্ষতি হচ্ছে তাদের শিক্ষা কার্যক্রম। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাহাড় বেয়ে বহুদূরের ছড়া থেকে মাথায় করে অল্প পরিমাণ পানি বাড়িতে বহন করে আনে শিশুরা। প্রায় একই চিত্র হাওর ও সমুদ্রতীরবর্তী লবণাক্ত এলাকায়ও। যে কোন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে এসব এলাকার অধিবাসীর জন্য পানি সংগ্রহ হয়ে ওঠে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জের। জাতিসংঘ ও এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেলথের গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। রোববার বিশ্ব পানি দিবসের আগে এ তথ্য প্রকাশ করে এ দুটি প্রতিষ্ঠান। ১৯৯৩ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। এ বছরের প্রতিপাদ্য নিরাপদ পানি ও টেকসই উন্নয়ন। জাতিসংঘ এর আওতায় ৭টি মূল ক্ষেত্র নির্ধারণ করেছে, যার প্রতিটিই বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পানিসম্পদের সর্বাধিক গুরুত্বের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯২ সালে জাতিসংঘের পরিবেশ ও উন্নয়নবিষয়ক ৪৭তম অধিবেশনে প্রতি বছর ২২শে মার্চ বিশ্ব পানি দিবস উদ্‌যাপনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। জাতিসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী নিরাপদ পানি একটি মানবাধিকার। এর সঙ্গে সাম্যতা বিষয়টি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। কিন্তু দেশের অসংখ্য দুর্গম ও পিছিয়ে পড়া অঞ্চল ও জনগোষ্ঠীর জন্য এখনও নিরাপদ পানির সংস্থান করা যায়নি। জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাবে ইতিমধ্যে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়া, বৃষ্টির পরিমাণ কমে যাওয়া, নদী শুকিয়ে যাওয়া ইত্যাদি প্রক্রিয়ায় সুপেয় পানির পরিমাণ কমতে শুরু করেছে। ৩০ বছর ধরে পানি নিয়ে নিয়মিত গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেলথের ম্যানেজার অ্যাডভোকেসি সাহা দীপক কুমার মানবজমিনকে বলেন, লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় দুর্গম উপকূলে বসবাসকারী জনগোষ্ঠী ঢাকার তুলনায় প্রায় ৩০০ গুণ বেশি দাম দিয়ে পানি কেনেন। অথচ চলতি বছরের বাজেটে এ বিষয়টিকে সরাসরি উপেক্ষা করা হয়েছে। কারণ বাজেটে পার্বত্য ও হাওর অঞ্চলের জন্য কোন বরাদ্দই রাখা হয়নি। এছাড়া প্রতিবন্ধীবান্ধব নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনসহ অন্যান্য অবকাঠামো তৈরিতেও কোন বরাদ্দ রাখা হয়নি। এদিকে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বাংলাদেশে ভবিষ্যতে মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয় দেখা দিতে পারে বলে উল্লেখ্য করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, উচ্চ বরেন্দ্র এলাকায় ২০০০ সালে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ছিল ৬২ ফুট। বর্তমানে তা ১০৫ ফুট নিচে নেমে গেছে। তাদের তথ্য মতে, ২০৫০ সাল নাগাদ তলিয়ে যেতে পারে ৮টি জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল। ধানের উৎপাদন কমতে পারে ৮ ভাগ। জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান হার বজায় থাকলে ২১০০ সাল নাগাদ বাংলাদেশ জিডিপির ৯ ভাগ হারানোর ঝুঁকিতে থাকবে। ওদিকে এনজিও ফোরামের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশব্যাপী মোট বস্তিবাসীর সংখ্যা ৫ দশমিক ৪ মিলিয়ন হলেও বেশিরভাগ বস্তি ওয়াসার পানি সরবরাহ ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত নয়। ওয়াসার পানির লাইনে দাঁড়ানো বা অন্য কোন উপায়ে পানি সংগ্রহ করতে গিয়ে একজন বস্তিবাসী তার কর্মঘণ্টা থেকে মূল্যবান সময় হারান। এছাড়া দেশব্যাপী সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোতে পর্যাপ্ত নিরাপদ পানি সরবরাহ ব্যবস্থা নেই। প্রতিবেদনের তথ্য মতে দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা দরিদ্র কর্মজীবী জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মস্থলে পানির কোন ব্যবস্থা নেই। ঢাকায় প্রতিদিন সৃষ্টি হচ্ছে প্রায় ১২ লাখ ২০ হাজার ঘনমিটার পয়ঃবর্জ্য। এর ৭০ ভাগ শোধনাগারে পৌঁছানোর বা শোধনের কোন ব্যবস্থা নেই। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিল্পকারখানার পণ্য উৎপাদন প্রক্রিয়ায় বিপুল তরল বর্জ্য সৃষ্টি হয়। ঢাকার চারপাশের ৭ হাজার শিল্পকারখানা থেকে প্রতিদিন ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন কিউবিক মিটার তরল বর্জ্য বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ ও বালু নদীতে গিয়ে পড়ে। পাগলায় অবস্থিত বাংলাদেশের একমাত্র পয়ঃশোধনাগারটি মোট তরল শিল্পবর্জ্যের ১০ ভাগ শোধন করার ক্ষমতা রাখে। সিডর-আইলাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত বরগুনা জেলায় অবৈধভাবে ইটের ভাটায় ব্যবহারের জন্য প্রতি মাসে অন্তত চার লাখ ৬২ হাজার মণ কাঠ পোড়ানো হচ্ছে। এতে বলা হয়েছে, সিডর-আইলাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে ঝড় ও জলোচ্ছ্বাস ঠেকিয়ে এসব বৃক্ষই জানমালসহ নিরাপদ পানি প্রযুক্তি ও বিভিন্ন স্থাপনার সুরক্ষা কবচ হিসেবে কাজ করেছে। সিলেটের সারী নদীর আশেপাশে কয়লার কারবারে যত্রতত্র নদী খুঁড়ে শুরু হয় কয়লা উত্তোলন ও বেচাকেনা। ফলে পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ সারী নদীসহ সমগ্র এলাকার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।

প্রান্তসীমায় সীমান্তের নারীরা

কাকন চক্রবর্তী (সর্বডানে) ব্যাতিক্রমী এক উদাহরণ যিনি উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন
জিরো লাইন থেকে সাকুল্যে ৩ কিলোমিটার দূরে ছোট্টগ্রাম হাকিমপুর। মাটির ঘরের ভেতর কাঠের দরজার পেছন থেকে সাবধানে উঁকি দিলো এক কিশোরী। ১৭ বছর বয়সী নাজিয়া আজম (ছদ্মনাম) সারা দিন নিজের ঘরের ভেতরই থাকেন। তার বয়স যখন ১৫, তখন তার এক কাজিনের বন্ধু শেখ শওকত তাকে অপহরণ করে। সে জানায়, আমি পাশের গ্রামে মুহররমের অনুষ্ঠান দেখতে গিয়েছিলাম। তখন কিছু লোক এসে আমাকে ধরে শওকতের বাড়িতে নিয়ে যায়। আমি পরের ৭ মাস একটি কক্ষে তালাবদ্ধ অবস্থায় ছিলাম। এ সময় আমাকে মানসিক ও শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। নাজিয়াকে অপহরণকারীরা বলেছিল, তার বাবা-মা তাকে শেখ শওকতের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। তার ভাষায়- শেখ আমাকে বলেছিল, যদি আমি সহযোগিতা করি, তাহলে সে আমাকে পুনে ও হায়দরাবাদে অন্য পুরুষদের কাছে পাঠিয়ে দেবে। একদিন আমি তাদের বলি, আমার পেট খুব ব্যথা করছে। এরপর তারা আমাকে স্থানীয় এক ভিখারির কাছে নিয়ে যায়। আমি তার সহায়তায় পালিয়ে আসি। কথাগুলো বলতে গিয়ে থরথর করে কাঁপছিল নাজিয়া। স্পষ্টত, এখনও তাকে দুঃসহ স্মৃতি তাড়া করে বেড়ায়। সে পালিয়ে আসার পর শেখ শওকতকে পুলিশ আটক করে। তবে কিছুদিন পরই জামিনে মুক্তি পায়। এরপর নাজিয়ার বাবা-মা আর তাকে স্কুলে পাঠানোর সাহস পাননি। নাজিয়া জানায়, সে (শেখ শওকত) এখন মুক্ত। তাই আমরা সবাই ভীত। আমার সবচেয়ে বড় আফসোস হচ্ছে, আমি স্কুলে যেতে পারছি না। আমি ভাল ছাত্রী। আমি একজন সমাজকর্মী হতে চাই। একই ধরনের মানবপাচারের ঘটনা নাজিয়ার আগেও তার গ্রামের একজনের সঙ্গে হয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের আশপাশে বসবাসকারী তরুণী মেয়েরা সবসময় ভয়ে থাকে- হয়তো তারাও মানবপাচারকারীদের খপ্পরে পড়তে পারে। সন্ধ্যার পর কোন মেয়েই আর ঘরের বাইরে বের হয় না।
সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে ব্যাপক দারিদ্র্যতা রয়েছে; বিশেষ করে বাংলাদেশী অংশে। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে কারা-হেফাজতে নির্যাতনের শিকার মানুষদের নিয়ে কাজ করে মাসুম (বাংলার মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ) নামের একটি এনজিও। সংগঠনটির সচিব কিরিটি রায় বলেন, সকল পর্যায়ের লোকজন দারিদ্র্যের সুযোগ নেয়। সরকারি কর্মকর্তা থেকে শুরু করে পুলিশ, রাজনীতিবিদ, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ পর্যন্ত; এক কথায় প্রত্যেকে। যখন নারীরা কোন চাকরির খোঁজে আসে, তখন তাকে প্রলুব্ধ করে অনেকে। এদেরকে পাঠিয়ে দেয়া হয় নানা দেশে, বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলোতে। বিদেশে পাঠানো না গেলে, মুম্বই, দিল্লি বা কলকাতায় পাঠানো হয়। সোনাগাছির কুখ্যাত পতিতাপল্লী এলাকার যৌনকর্মীদের নিয়ে কাজ করে কলকাতা ভিত্তিক এনজিও দুর্বার। এনজিওটির প্রধান উপদেষ্টা স্বরজিত জানা বলেন, যেসব মেয়ে যৌন ব্যবসায় আসেন, তাদের ১০০ জনের মধ্যে মাত্র ২ জন পাচার হয়ে আসে। তিনি বলেন, গল্পটা একই। দারিদ্র্যই মূল কারণ। দেশের সবচেয়ে গরিব এলাকার মেয়েরাই সোনাগাছিতে আসে কেবল টাকা কামাতে। বাংলাদেশের অনেক নারীও সীমান্ত পার হয়ে এখানে আসে। যদিও তারা নিজেদের নাগরিকত্বের কথা স্বীকার করবে না। যেহেতু তারা ভারতীয় বাঙালিদের মতো দেখতে ও একই ভাষায় কথা বলেন, সেহেতু এখানে মিশে যাওয়া তাদের জন্য সহজ। বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে অবস্থিত বনগাঁ এলাকার ২৫ বছর বয়সী সামিরা হোসেন জানালেন, তিনি যৌনকর্মী হতে চান! তার বাবা মারা গেছেন, মা অসুস্থ। সংসারে আছে ২ স্কুলপড়ুয়া ভাই। তাই সংসারের উপার্জনের কাজটা তাকেই করতে হবে। তিনি বলেন, আমি টাকা আয় করতে চাই। আমি তেমন পড়ালেখা করিনি। আমার এক বন্ধু জানালো, এখানে এসে আমরা ভালো অর্থ আয় করতে পারবো। তাই আমি সোনাগাছিতে এসেছি এবং আমি সত্যিই একজন যৌনকর্মী হতে চাই। সীমান্তের কাছে অবস্থিত গ্রামগুলোর বেশির ভাগ মেয়ে মাত্র দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছে। তাদের ভাইয়েরা হয়তো সপ্তম বা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছে। তারালি গ্রামের রেশমা বিবির বিয়ে হয়েছিল ১৭ বছর বয়সে। তিনি হেসে জানান, ধান চাষে আমি আমার স্বামীকে সাহায্য করি। আমরা একদিন কিছু জমির মালিক হওয়ার স্বপ্ন দেখি। তবে আশাব্যঞ্জক ব্যতিক্রম কদাচিৎ দেখা যায়। যেমন রেশমার প্রতিবেশী ২১ বছর বয়সী কাকন চক্রবর্তী ভূগোলে মাস্টার্স করছেন। তিনি জানালেন, আমি ও আমার ছোট বোন যখন ছোট ছিলাম তখন আমার মা মারা যান। আমার পিতা এরপর আমাদেরকে নানীর ঘরে রেখে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। আমার বোন বর্ধমানে লেখাপড়া করছে। সেখানে এক আন্টির কাছে থাকছে সে। চক্রবর্তীর গল্প উৎসাহব্যঞ্জক হলেও, কেবলই একটি ব্যতিক্রম। দারিদ্র্য ও উন্নত জীবনের প্রত্যাশা সীমান্তের নারীদের প্রান্তসীমায় এনে দাঁড় করিয়েছে। কম্যুনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়ার সংসদ সদস্য ও মুখপাত্র মোহাম্মদ সেলিম এ প্রসঙ্গে বলেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছার পরিষ্কার অভাব রয়েছে। একই সঙ্গে ব্যবস্থাপনায় রয়েছে ব্যাপক দুর্নীতি। দারিদ্র্যের কারণে আমাদের নারীরা সরবরাহ আর চাহিদার কলুষিত এক চক্রে আটকে পড়ছে। কলুষিত? জিজ্ঞেস করে নাজিয়া। এটা বললে সমস্যাকে খাটো করে দেখা হবে। আমাকে এখন কেউই বিয়ে করবে না। আমার শিক্ষাজীবন শেষ। কোন আশা নেই। আপনার কোন ধারণাই নেই আমার জীবনটা আসলে কেমন। কষ্টমিশ্রিত হাসি নিয়ে কথাগুলো বলছিল নাজিয়া আজম।
(বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী মানুষের জীবনযাত্রা আর বাস্তবতা নিয়ে খালিজ টাইমসের তিন অংশের সিরিজ প্রতিবেদনের তৃতীয় ও শেষ অংশের অনুবাদ)

বাংলাদেশের পোশাক বাজার চলে যাচ্ছে ভারতে

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা আর চীনের তৈরী পোশাক উৎপাদন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতির কারণে এ দেশ দুটি থেকে বিশ্ব বাজারের মনোযোগ সরে আসছে। আর এতে সুবিধা পাচ্ছেন ভারতীয় পোশাক রপ্তানিকারকরা। বাংলাদেশ ও চীনের বাজার থেকে  গার্মেন্টের বড় বড় সব অর্ডার চলে যাচ্ছে ভারতে। ইকোনমিক টাইমসের এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়। এতে আরও বলা হয়, এ পরিস্থিতিতে ভারতীয় পোশাক রপ্তানি সুবিধা পেতে যাচ্ছে। ১৫ অর্থবছরের এপ্রিল থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভারতের তৈরী পোশাক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৩.৪ শতাংশ। কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রি (সিটি)-এর মহাসচিব ডি কে নায়ার ইকোনমিক টাইমসকে বলেন, চলমান অর্থবছরে তৈরী পোশাক রপ্তানিতে উৎসাহব্যঞ্জক ক্রমবৃদ্ধি দেখা গেছে। বাংলাদেশের তৈরী পোশাক শিল্প নিয়ে তিনি মন্তব্য করেন, ‘দেশটির রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার পাশাপাশি নিরাপত্তা ইস্যুগুলো সেখানকার পোশাক শিল্পের জন্য গুরুতর সমস্যা হয়ে আবির্ভূত হয়েছে।’ বাংলাদেশের কিছু বিদেশী ক্রেতা এখন ভারত থেকে পোশাক ক্রয়ের আগ্রহ দেখাচ্ছেন। এ বছর ফেব্রুয়ারিতে ভারতের পোশাক রপ্তানি ছিল ১৫৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার। যা ছিল আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ৮.৭ শতাংশ বেশি।

প্রশাসনিক বিভাগ সৃষ্টির দাবি ও বাস্তবতা by আলী ইমাম মজুমদার

উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া আমাদের প্রশাসনব্যবস্থায় বিভাগ একটি স্তর। একগুচ্ছ জেলা নিয়ে হয় বিভাগ। ইদানীং নতুন একটি বিভাগ করার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর সীমানা নির্ধারণসহ অন্যান্য প্রাসঙ্গিকতা শেষ হলে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পাবে। তারপর প্রয়োজনীয় জনবল নিয়ে যাত্রা শুরুর কথা। তবে তৈরি করতে হবে ভৌত অবকাঠামো। এরই মধ্যে আরেকটি পুরোনো জেলা শহরে একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রী বলেছেন, সেই বৃহত্তর জেলাটি নিয়েও আরেকটি বিভাগ হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। অন্যান্য আরও কিছু বিভাগ করার দাবি কোথাও কোথাও হচ্ছে। দেখা গেছে, নতুন বিভাগের দাবির সঙ্গে সেই স্থানের জনগণ একাত্ম হয়ে যায়। আবার যেসব অঞ্চল নতুন বিভাগে অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব আসে, সেগুলোর কোনো কোনোটি এর বিরোধিতায় নেমে পড়ে। মজার দিক হচ্ছে, এসব দাবি বা পাল্টা দাবি অনেকটাই সর্বদলীয়। অঞ্চলগুলোর জনগণের আবেগ-অনুভূতি থাকে এসব দাবির প্রতি। তাই সিদ্ধান্ত নিতে সরকারকে যথেষ্ট সতর্ক হতে হয়।
দেখা যেতে পারে, বিভাগ বা প্রশাসনিক অন্য যেকোনো ইউনিট প্রতিষ্ঠার দাবি কেন আসে? এর জবাবে হয়তো বলা হবে, জনগণ সেবা পেতে প্রশাসনকে তাদের কাছাকাছি চায়। তাদের এ প্রত্যাশা নেহাত যৌক্তিক। আর জনকল্যাণকামী রাষ্ট্রের এসব দাবির প্রতি সংবেদনশীল হওয়াই তো স্বাভাবিক। তবে সেই প্রশাসনিক ইউনিটটির সঙ্গে জনগণের সংশ্লিষ্টতা কতটুকু, আর প্রতিষ্ঠার অপরিহার্যতাও বিবেচনার আবশ্যকতা রয়েছে। কেননা, একটি বিভাগ, জেলা কিংবা উপজেলা নতুনভাবে করতে গেলে অবকাঠামোগত ব্যবস্থাদি ছাড়াও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার জন্য অনেক অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন হয়।
উল্লেখ্য, জাতীয় স্তরে মন্ত্রণালয় বা বিভাগের অধীনস্থ পরিদপ্তর, অধিদপ্তর ও সংস্থা থাকে। এর পরের স্তরগুলো হচ্ছে বিভাগ, জেলা আর উপজেলা। জেলা আর উপজেলায় জনগণকে যেতে হয় প্রায়ই। উন্নয়নমূলক কার্যক্রম, আইনশৃঙ্খলাব্যবস্থা, ভূমি প্রশাসন আর বিভিন্ন ধরনের নাগরিক পরিষেবা দান জেলা-উপজেলাতেই হয়ে থাকে।
প্রশ্ন আসবে, তাহলে বিভাগ কেন? বিভাগ মূলত একটি তদারকি স্তর। সাধারণ প্রশাসনে বিভাগীয় কমিশনার তদারকির কাজ ছাড়াও ভূমি ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত কিছু আপিল নিষ্পত্তি করে থাকেন। তবে তদারকি স্তর হিসেবে বিভাগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভাগীয় পর্যায়ের অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাজ পরিদর্শন ও পর্যালোচনা করে অধিকতর উন্নতি বিধানের জন্য নির্দেশনা দিয়ে থাকেন। মূল্যায়ন করেন তাঁদের কার্যক্রম। তাঁরা জেলা ও জাতীয় পর্যায়ের সঙ্গে ক্ষেত্রবিশেষে সংযোগমাধ্যম হিসেবে কাজ করেন। তবে প্রকৃত অর্থে সীমিত কিছু ক্ষেত্র ছাড়া জাতীয় পর্যায় থেকে জেলা পর্যায়ের সঙ্গেই যোগাযোগ করা হয়। অবহিত রাখা হয় বিভাগীয় স্তরকে। একইভাবে অনেক ক্ষেত্রে জেলা থেকেও সরাসরি জাতীয় পর্যায়ে যোগাযোগের বিধান রয়েছে। আর প্রকৃতপক্ষে মূল কাজ জেলা ও উপজেলায় হয় বলে এ ধরনের যোগাযোগই স্বাভাবিক। তবে তদারকি স্তর হিসেবে বিভাগকে উপেক্ষা করা যায় না। কিন্তু এটা অনস্বীকার্য যে বিভাগীয় পর্যায়ের সঙ্গে জনগণের সরাসরি যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা খুবই কম।
তা সত্ত্বেও বিভিন্ন স্থান থেকে সময়ে সময়ে বিভাগ করার দাবি আসে। সেসব দাবি ক্ষেত্রবিশেষে সরকার বিবেচনায়ও নেয়। তবে বিচ্ছিন্নভাবে তা না করে গোটা দেশের বিভাগীয় পর্যায়ের প্রশাসনিক স্তরটি বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিলে অধিকতর যৌক্তিক হবে। দেখা দরকার কয়টি নতুন বিভাগ করা প্রয়োজনীয় আর কোন কোন স্থানে। এ প্রসঙ্গে কিছুটা অতীতে যাওয়া যেতে পারে। মাঠ প্রশাসনের মূল স্তর হিসেবে এই উপমহাদেশে জেলা গঠিত হয় ১৭৭২ সালে হেস্টিংসের শাসনামলে। আর ইংরেজ শাসনাধীন অঞ্চল বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে এই জেলাগুলোর তদারকি স্তর হিসেবে বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮২৯ সালে লর্ড বেন্টিংকের শাসনকালে। প্রশাসনের স্তর হিসেবে জেলা এই উপমহাদেশের সবগুলো দেশে রয়েছে। তবে বিভাগ সেভাবে নেই। ভারতেই ২৯টি রাজ্যের মধ্যে ১২টিতে নেই কোনো বিভাগ। কতগুলো রাজ্য ছোট বলে এমন হতে পারে। তবে আমাদের দেশের প্রায় সম-আয়তনের ও জনবহুল তামিলনাড়ু ও অন্ধ্র প্রদেশে নেই কোনো বিভাগ। কিছুটা ছোট রাজ্য হলেও সাড়ে তিন কোটি লোকসংবলিত ১৪টি জেলার কেরালায়ও কোনো বিভাগ নেই। অবিভক্ত বাংলায় ১৯৪৭ সালে ছিল ২৯টি জেলা আর পাঁচটি বিভাগ। পূর্ব বাংলার ভাগে ১৬টি জেলা এবং আসাম থেকে ভাগ হওয়া সিলেট পাওয়া যায়। এই অঞ্চলে ছিল তিনটি বিভাগীয় সদর দপ্তর। অবশিষ্ট অঞ্চল পশ্চিম বাংলায় এখন ২০টি জেলা ও তিনটি বিভাগ। তারা মহকুমা স্তরটি বিলুপ্ত করেনি। ১৯৪৭-এর পর পূর্ব বাংলায় খুলনা বিভাগ চালু হয়। ১৯৯১-৯৬ মেয়াদে বিএনপি সরকার বরিশাল ও সিলেটে বিভাগ প্রতিষ্ঠা করে। মহাজোট সরকারের গত মেয়াদে প্রতিষ্ঠিত হয় রংপুর বিভাগ। অর্থাৎ আমাদের ৬৪টি জেলা রয়েছে সাতটি বিভাগের আওতায়।
বিভাগ থাকা আর না থাকার বিতর্ক ব্রিটিশ শাসনামলেও ছিল। অবিভক্ত বাংলার শাসনব্যবস্থা পর্যালোচনার জন্য ১৯৪৭-এর কিছু আগে রাওল্যান্ড কমিশন বিভাগ বিলুপ্তির সুপারিশ করে। তবে সেই প্রতিবেদন গৃহীত হয়নি। ভারতে একই ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছিল স্বাধীনতার পর পর মধ্যপ্রদেশ ও তখনকার বোম্বাইতে (এখন মহারাষ্ট্র ও গুজরাটে বিভক্ত)। বিলুপ্ত হয়েছিল বিভাগ। আট বছর পর প্রয়োজনের তাগিদে আবারও তা গঠিত হয়। আমাদের দেশেও বিভাগীয় প্রশাসনের স্তরটির প্রয়োজনীয়তা সময়ে সময়ে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। তবে একে উপেক্ষা করা যায়নি বলে এখনো টিকে আছে। শুধু তা-ই নয়, আসছে নতুন নতুন বিভাগের দাবি। তবে নতুন বিভাগ করার আগে অনেকগুলো বিষয় খতিয়ে দেখা দরকার। এসব বিষয়ের মধ্যে রয়েছে প্রস্তাবিত বিভাগটিতে কয়টি জেলা নেওয়া হবে। জেলার সংখ্যা সব বিভাগে সমান না হলেও কিছুটা সামঞ্জস্য থাকা দরকার। ভৌগোলিক নৈকট্য, সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। অতীতে যা হওয়ার হয়ে গেছে। ভবিষ্যতে এমনটা হতে থাকবে, এটা সংগত নয়।
আমাদের মহকুমা স্তরটি ভেঙে দেওয়ায় জেলার সংখ্যা বেড়েছে। জেলাগুলোর কার্যক্রমের সমন্বয় বিধানের জন্য বিভাগের প্রয়োজনীয়তাও নতুনভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এরই মধ্যে সাতটি বিভাগ হয়ে গেছে। আরও হওয়ার প্রয়োজন থাকতে পারে। এর সমর্থনে বলা হয়, জেলার সংখ্যা বৃদ্ধি ও সরকারের কাজকর্মের সঙ্গে জনগণের সম্পৃক্ততা অনেক গুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় বিভিন্ন প্রশাসনিক স্তরের ইউনিটগুলোর সংখ্যা বৃদ্ধি যৌক্তিক। উপজেলা ও জেলার প্রশ্নে জনসম্পৃক্ততার বিষয়টি থাকে; বিভাগের ক্ষেত্রে নয়। আর জেলা করতে গিয়েও কিছু কিছু ক্ষেত্রে সুবিবেচনার পরিচয় দেওয়া হয়নি বললে ভুল হবে না। রাজনীতির বাইরে থেকে আসা শাসকেরা বেসামরিক ক্ষমতার ভিত সম্প্রসারণের লক্ষ্যে এগুলো করেছেন। কেউ করেছেন দু-তিনটি থানা নিয়ে মহকুমা। এর পরেরজন করলেন সেগুলোকে জেলা। প্রশাসনকে আমরা জনগণের দোরগোড়ায় নেওয়ার নামে কিছু ক্ষেত্রে যুক্তি ও প্রয়োজনীয়তাকে উপেক্ষা করেছি।
জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং প্রশাসনের সঙ্গে জনগণের অধিকতর সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশাসনিক ইউনিটের সংখ্যা বৃদ্ধির যে দাবি, তা যথেষ্ট বিচার-বিশ্লেষণ করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। জনসংখ্যা যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি উন্নত হয়েছে যোগাযোগব্যবস্থা। এখন অতি দ্রুত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়া যায়। তদুপরি তথ্যপ্রযুক্তির সম্প্রসারণ শুধু দেশ নয়, গোটা বিশ্বকেই ক্রমান্বয়ে ছোট করে ফেলছে। ঢাকার সচিবালয় থেকে কোনো একটি পরিপত্র গ্রুপ মেইলে কয়েক মিনিটে সব জেলা প্রশাসককে পাঠানো যায়। অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব সেদিনই তাঁদের কাছ থেকে জবাব পাওয়া। ভিডিও কনফারেন্স এখন জেলা ও রাজধানীর মধ্যে মতবিনিময়ের জন্য ব্যবহৃত হতে শুরু করেছে। ক্রমান্বয়ে ঘটবে তথ্যপ্রযুক্তির আরও প্রসার। তা সত্ত্বেও স্থানীয় স্তরে, বিশেষ করে জেলা ও উপজেলায় প্রয়োজন হবে প্রশাসনের কার্যকর উপস্থিতি। তেমনি তাদের তদারক ও মূল্যায়নের জন্য বিভাগীয় স্তরও অপরিহার্য। তবে নতুন বিভাগ করার প্রস্তাব সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা সংগত হবে।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

নোয়াম চমস্কির সাক্ষাৎকার, যুক্তরাষ্ট্রে একটাই দল আছে: বিজনেস পার্টি by মোহাম্মদ হাসান শরীফ

প্রশ্ন : সাম্প্রতিক এক নিবন্ধে আপনি বলেছেন, ওবামা স্রেফ একজন উদার-রণশীল, মডারেট রিপাবলিকান এবং নিক্সন প্রশাসন ছিল মার্কিন ইতিহাসের সবচেয়ে উদার।
চমস্কি : নিক্সন ছিলেন দারুণ লোক। মানদণ্ড বদলে গেছে। বর্তমানের মানদণ্ডে নিক্সনকে উদার মনে হয় এবং আইজেনহাওয়ারকে মনে হয় প্রচণ্ড চরম।
প্রশ্ন : অর্থাৎ ওবামা বামঘরানার প্রেসিডেন্ট নন?
চমস্কি : যুক্তরাষ্ট্রে বাম পরিভাষাটি কেন্দ্র থেকে মডারেট হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কারণ দেখার স্থানটি বদলে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে একটি কৌতুক প্রচলিত আছে তা হলো দেশটি আসলে একদলীয় রাষ্ট্র (বিজনেস পার্টি), যার দু’টি উপদল আছে (ডেমোক্র্যাটস ও রিপাবলিকানস)। এটা একসময় সত্য ছিল। এখনো দেশটিতে একদলীয় রাষ্ট্রই রয়েছে। তবে মাত্র একটি উপদল আছে, সেটা হলো মডারেট রিপাবলিকানস। এটাই একমাত্র সক্রিয় রাজনৈতিক দল। ডেমোক্র্যাটস নামে যাদের অভিহিত করা হয়, তাদের আসলে মডারেট রিপাবলিকানস বলা যায়।
প্রশ্ন : বর্তমানে নব্যরণশীলেরা কী করছেন?
চমস্কি : দলটি দু’টি ল্য অর্জন করতে কাজ করছে : একটি হলো দেশটিকে ধ্বংস করা এবং এ কাজটি ডেমোক্র্যাটরা করছে বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা। দ্বিতীয়টা হলো ধনী ও মতাধরদের সহায়তা করা। তারা ইভ্যানজেলিক্যাল খ্রিষ্টানসহ অন্যদের িেপয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। তারা শ্বেতাঙ্গদের মনে এই ভয়ও ধরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে যে, নিজ দেশে তারা সংখ্যালঘু হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে হিসপানিকদের সংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে।
প্রশ্ন : মুসলমানদের ব্যাপারেও কি?
চমস্কি : মুসলিমদের ব্যাপারেও। তবে হিসপানিকরা হলো আসল ভয়ের কারণ।
প্রশ্ন : আপনি কি এখনো আশাবাদী হওয়ার কারণ খুঁজে পান?
চমস্কি : কিছু পাওয়া যায়। আশাবাদী হওয়ার কারণের অভাব না থাকলেও মানুষকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা টিকে থাকবে নাকি তাদের সামনে আসা দু’টি মারাত্মক ও আসন্ন হুমকি স্রেফ পরিত্যাগ করবে। হুমকি দুটি হলো : পরিবেশগত বিপর্যয় এবং পারমাণবিক যুদ্ধ। পারমাণবিক যুদ্ধের হুমকি বাড়ছেই। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, আমরা এখন পর্যন্ত যুদ্ধ এড়াতে পেরেছি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক অস্ত্রের আধুনিকায়ন ও উন্নত করার কাজে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে। রাশিয়াও একই কাজ করছে, ছোট ছোট শক্তিগুলোও তা করছে।
প্রশ্ন : কিন্তু পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে বলতে গেলে কেউই কথা বলছে না।
চমস্কি : কৌশলগত বিশ্লেষক, অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্টরা ছাড়া কেউ তা নিয়ে কথা বলছে না। অথচ ভয়াবহ সব হুমকি রয়েছে। একটি হলো ইউক্রেন নিয়ে। আমরা আশা করতে পারি, শক্তিগুলো পিছু হটবে, কিন্তু তারা যে তা করবেই, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। আমরা জানি, এসব শক্তি কাছাকাছি হয়েছিল। একটা মাত্র উদাহরণ দেই। ১৯৮০-এর দশকের শুরুর দিকে, রিগ্যান প্রশাসন রাশিয়ার প্রতিরাব্যবস্থা যাচাই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এর জের ধরে তারা রাশিয়ার বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্রসহ বিমান ও নৌ হামলা চালানোর ভান করল। তারা কী করতে চায়, তা রাশিয়াকে বলেনি, কারণ তারা ভান করেনি, বরং প্রকৃত হুমকিকে উসকে দিতে চেয়েছিল। তা ছিল চরম উত্তেজনার মুহূর্ত। রিগ্যান সবেমাত্র তারকা যুদ্ধের মতো কৌশলগত প্রতিরা উদ্যোগের কথা ঘোষণা করেছেন, যেটাকে সব পরে বিশ্লেষকেরা প্রথম আঘাত হানার অস্ত্র হিসেবে উপলব্ধি করেছিল। কার্যকর বিবেচিত হলে, সেটা পেণাস্ত্র প্রতিরা হিসেবে নয়, বরং প্রথম আঘাতের জন্য ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হতো। রুশ আর্কাইভ উন্মক্ত করার প্রোপটে মার্কিন গোয়েন্দারা এখন বুঝতে পারছেন যে, হুমকিটি ছিল মারাত্মক। একটি গোয়েন্দা বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিলেন তারা।
প্রশ্ন : তাহলে কি স্রেফ ভাগ্যের জোরে আমরা বেঁচে আছি?
চমস্কি : আমি এখন আপনার প্রথম প্রশ্নে যাচ্ছি : আশাবাদ? এটা সব সময়ই একই কাহিনী। বিশ্ব যতই বদলাক না কেন, বিষয়টা সেই একই থাকে। আপনার হাতে বিকল্প থাকে মূলত দু’টি : আপনি হতাশাবাদী হতে বলতে পারেন, কোনো আশা নেই, তারপর সব চেষ্টা ছেড়ে দিতে পারেন। এ েেত্র আপনি খারাপ পরিস্থিতির প্রতিই কিছু ভূমিকা রাখলেন। কিংবা আপনি যতটুকুই আশা থাক না কেন, (সব সময়ই কিছু আশা থাকেই) সেটা উপলব্ধি করে আপনার ভূমিকাটা সর্বাত্মকভাবে পালন করলেন। এটা করার মাধ্যমে আপনি বিপর্যয় এড়াতে সম হতে পারেন কিংবা আরো উন্নত বিশ্ব গড়ার কাছে একটু এগিয়ে গেলেন।
প্রশ্ন : সার্বিকভাবে আশাবাদী হওয়ার মতো কি কিছু আছে?
চমস্কি : সফলতা আছে, কেবল আমরা নই। বিশেষ করে সহিংসতা, আগ্রাসন ও অসাম্যের প্রবল বিরোধিতার কারণে তা হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সিভিল রাইটস মুভমেন্টের কথা বলা যায়। তাতে তাৎপর্যপূর্ণ সাফল্য এসেছে।
প্রশ্ন : গত ৫০ বছরের মধ্যে এখন ইউরোপ সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়ে ডুবে গেছে।
চমেস্কি : তাৎপর্যপূর্ণ সাফল্য এলেও তা এসেছে একটি বাধার বিপরীতে। বিশ্বের জনসংখ্যার বিরুদ্ধে ওই বাধাটি খারাপ অবস্থায় পড়ে ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে এবং ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করে রিগ্যান ও থ্যাচারের আমলে। এখন মন্দার মধ্যে ওইসব অর্থনৈতিক উন্মাদনামূলক নীতির ভয়াবহ শিকার হচ্ছে ইউরোপ। ওইসব নীতির কারণে কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের ধারণাকে তিগ্রস্ত করছে, শ্রমকে দুর্বল করছে, ধনী ও সুবিধাভোগী লোকদের শক্তি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
প্রশ্ন : সমাজ এই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে শুরু করেছে। আপনি কি মনে করেন, পরিবর্তন সম্ভব?
চমস্কি : নব্যউদারবাদী আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ দেখা যাচ্ছে। এটা একটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটছে দণি আমেরিকায়। আমি বলতে চাচ্ছি, ৫০০ বছর ধরে দণি আমেরিকা ছিল পাশ্চাত্যের (অতিসম্প্রতি আমেরিকার) আধিপত্যে। ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে তারা ওই জোয়াল ভাঙতে চাচ্ছে। এ ঘটনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ লাতিন আমেরিকা ছিল ওয়াশিংটনের সবচেয়ে বশ্য ও আনুষ্ঠানিক শাসনের আওতায়।
প্রশ্ন : আঙিনায়...
চমস্কি : লাতিন আমেরিকা সেখান থেকে উঠে এসেছে, পুরোপুরি পারেনি অবশ্য। তবে অর্ধ সহস্রাব্দের মধ্যে এই প্রথম এখানকার দেশগুলো স্বাধীনতার পূর্বশর্ত একত্রিত হওয়ার দিকে পদপে নিচ্ছে। আগে তারা ছিল পরস্পর থেকে আলাদা, এখন তারা ঐক্যবদ্ধ হতে শুরু করেছে। একটি প্রতীক হলো, লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্র তার সব সামরিক ঘাঁটি খুইয়ে ফেলেছে, শেষেরটি ছিল ইকুয়েডর-সংশ্লিষ্ট। এখানকার দেশগুলো আমেরিকা ও কানাডার বিরুদ্ধে একত্রিত হচ্ছে, অতীতে যা কখনো হয়নি।
প্রশ্ন : গুয়ান্তানামো এখনো একটি ইস্যু। আপনি কি মনে করেন, কিউবাকে যুক্তরাষ্ট্র দ্বীপটি ফিরিয়ে দেবে?
চমস্কি : আমি নিশ্চিত, কিউবা সেটি ফিরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করবে।

সালাহউদ্দিনের নিখোঁজ রহস্য ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব by এম কে বাশার

সালাহউদ্দিন আহমেদকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে ১০ মার্চ মঙ্গলবার রাত ১০টায় রাজধানীর উত্তরার একটি বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে তার পরিবার অভিযোগ করেছে। সালাহউদ্দিনকে তুলে নেয়ার পর থেকেই তার পরিবারের সদস্যরা পুলিশ ও র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে খোঁজ নেন। কিন্তু প্রতিটি সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে সালাহউদ্দিন আহমেদ নামে কাউকে তারা আটক করেনি। এরপর তার পরিবারের পক্ষ থেকে প্রথমে গুলশান থানায় ও পরে উত্তরার (পশ্চিম) থানায় জিডি করতে গেলে পুলিশ জিডি নেয়নি। এরপর সালাহউদ্দিনের স্ত্রী হাসিনা আহমেদ হাইকোর্টে রিট করেন। কিন্তু পুলিশের সব শাখা ও র‌্যাবের পক্ষ থেকে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করে বলা হয়েছে, সালাহউদ্দিন আহমেদ তাদের হেফাজতে নেই।
অথচ সালাহউদ্দিন আহমেদকে গ্রেফতারের জন্য বেশ কিছু দিন ধরেই চেষ্টা করছিল পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। এ জন্য একাধিকবার তার গুলশানের বাড়িতে পুলিশ গেছে, তল্লাশিও চালিয়েছে বলে জানিয়েছেন তার স্ত্রী হাসিনা আহমেদ। তিনি জানিয়েছেন, সালাহউদ্দিন নিখোঁজ হওয়ার তিন দিন আগে তার দুই গাড়িচালক ও ব্যক্তিগত কর্মীকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের বাসাবাড়িতেও তল্লাশি চালানো হয়। কিন্তু এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, তারা তার খোঁজ পাচ্ছে না। অথচ পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ ও সাংবাদিকদের সাথে আশপাশের লোকজনের কথোপকথনে জানা যায়, সালাহউদ্দিনকে অপহরণের রাত অর্থাৎ ১০ মার্চ রাতে উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরের ১৩ বি নম্বর সড়কের একটি বাসা থেকে তাকে ধরে নেয়ার আগে একটি বাহিনীর পিকআপ সেখানে গিয়েছিল। ওই ভ্যানে আসা ব্যক্তিরা ১৩ বি নম্বর সড়কটির অবস্থান জানতে চেয়েছিলেন সেখানে কর্তব্যরত ৩ নম্বর সেক্টর কল্যাণ সমিতির নিয়োগ করা নিরাপত্তা কর্মীদের কাছে। কর্তব্যরত নিরাপত্তা কর্মীদের একজন সোমবার রাতে (১৬ মার্চ) প্রথম আলোকে বলেন, আনুমানিক রাত ৯টার দিকে তিনি উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টর কল্যাণ সমিতির কার্যালয়ের কাছেই কর্তব্য পালন করছিলেন। তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি পিকআপ ভ্যান এসে সেখানে থামে। তিনি বলেন, ‘বাহিনীর গাড়ি দেখে আমি আগায়া যাই। স্যারেরা আমাকে বলল, ১৩ বি নম্বর রোড কোন দিকে। আমি সালাম দিলাম। দেখায়া দিয়া বললাম, স্যার মাঠের পাশ দিয়া যাইতে হবে। এরপর ওরা চলে গেল।’ এসব প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণে সালাহউদ্দিনের নিখোঁজের ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে।
এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, তারা জানে না সালাহউদ্দিন কোথায়। তা হলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের উদ্রেক হয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিছু না জানলে সালাহউদ্দিন সাহেবের গাড়িচালককে তারা আটক করেছিল কেন? কেন ‘নিখোঁজের’ আগে তার গুলশানের বাসায় ও আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে একাধিকবার তাকে ধরার জন্য তল্লাশি চালানো হয়েছে? এখন স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠবে দেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক হঠাৎ করে কোথায় উধাও হয়ে যাবেন? এত দিনেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তার সন্ধান পাচ্ছে না কেন? আমাদের দেশটি কি এখন সত্যি সত্যি মগের মুল্লুকে পরিণত হয়েছে? দেশে কি কোনো দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ তথা সরকার নেই? হাইকোর্টের রুলের ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে বক্তব্য দিয়েছে, তা কতটুকু বিশ্বাসযোগ্য ভেবে দেখা প্রয়োজন।
সালাহউদ্দিনের স্ত্রী ও পরিবার তাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আকুল আবেদন জানিয়েছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেছেন, সালাহউদ্দিনকে খুঁজে না পাওয়া রাজনীতির জন্য অশুভ লক্ষণ। জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের অপহরণের তালিকায় সর্বশেষ যুক্ত হলেন সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে দলের কর্মসূচি ঘোষণা করে আসছিলেন। এর আগে এই দায়িত্ব পালন করছিলেন দলের আরেক যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
তাকে গ্রেফতার করে রিমান্ডের পর রিমান্ডে নিয়ে চরম নির্যাতন করা হচ্ছে। সালাহউদ্দিনের নিখোঁজ রহস্য উদঘাটনের দায়িত্ব সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। দেশের প্রতিটি নাগরিকের জানমাল ইজ্জত আব্রুর নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব সরকারের। এ দায়িত্ব সরকার কিছুতেই এড়াতে পারে না। এ ধরনের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি মোটেই কাম্য নয়। সরকার অবিলম্বে সালাহউদ্দিন আহমেদকে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে তাদের যথাযথ দায়িত্ব পালন করবেÑ এটাই দেশবাসী আশা করে। সালাহউদ্দিনের অন্তর্ধানের সাথে সরকারের ভাবমূর্তি জড়িত। তাই এই রহস্য উন্মোচন করে সরকার তার ভাবমর্যাদা রক্ষা করবেÑ এটাই সবার প্রত্যাশা।

রণনীতির সন্ধানে ডিফেন্স এগেইনস্ট হুম by আবু রূশ্দ

“We were getting out of touch with reality… and living in an artificial world of our own creation.” (চীন-ভারত যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে পণ্ডিত জওয়াহেরলাল নেহরুর উক্তি)
১৯৬২ সালে যখন চীন-ভারত যুদ্ধ শুরু হয় তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওয়াহেরলাল নেহরু শ্রীলঙ্কা সফরে ব্যস্ত ছিলেন। অবশ্য যাত্রার প্রাক্কালে পালাম বিমানবন্দরে মিডিয়ার কাছে ক্যাজুয়ালি বলেছিলেন, তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীকে সীমান্ত থেকে ‘চীনাদের বিতাড়িত করার নির্দেশ’ দিয়ে যাচ্ছেন। এ দিকে যুদ্ধ শুরুর আগপর্যন্ত রাজনৈতিকভাবে তার প্রিয়পাত্র ভারতীয় সেনাবাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফÑ সিজিএস লে. জেনারেল বি এম কাউল সব সময় পণ্ডিত নেহরুকে অনবরত ধারণা দিয়ে আসছিলেন যে, পাকিস্তানই ভারতের একমাত্র শত্রু, চীন থেকে ভয়ের কিছু নেই।
চীনা বাহিনীর তাড়া খেয়ে ভারতীয় বাহিনী যখন লেজ গুটিয়ে পশ্চাৎপসারণ করছে তখন পণ্ডিতজী তড়িঘড়ি ফিরে আসেন। তবে এর মাঝেই চীনা সেনাবাহিনী অরুণাচলের বিশাল এলাকা দখল করে আসামের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। ভারতীয় সেনাবাহিনী চীনা বাহিনীর হিউম্যান ওয়েভের সামনে দাঁড়াতে পারেনি। তবে বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, চীন ভারতের ভূখণ্ড দখল করেছিল ঠিকই, কিন্তু কোনো কারণ না দেখিয়েই তারা আবার হঠাৎ করে সামনে না এগিয়ে দখলকৃত ভূমি ছেড়ে চলে যায়। কেন চীনারা ওভাবে চলে গিয়েছিল তা নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, চীন যদি আরো সামনে বাড়ত বা ভারতের জায়গা দখল করে রাখত, তাহলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো কোরিয়া যুদ্ধের মতো আরেকটি রণক্ষেত্র তৈরি করত চীনের জন্য। হতে পারে, কারণ ভারতের ওই বিপদে মার্কিন পরিবহন বিমান টনকে টন যুদ্ধাস্ত্র ও সমরোপকরণ সরবরাহ করা শুরু করেছিল কলকাতা বিমানবন্দরে। কমিউনিস্ট চীনের সাথে তখন মার্কিনিদের কোনো আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্কও ছিল না। সে সময় আরো কিছু মজার ঘটনা ঘটে এই উপমহাদেশে। তখনকার আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পাকিস্তান ছিল পশ্চিমাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র। অন্য দিকে চীনের সাথেও পাকিস্তানের তখন পর্যন্ত কোনো স্ট্র্যাটেজিক সম্পর্ক সৃষ্টি হয়নি। তার পরও পাকিস্তানের কিছু রাজনীতিবিদ ও জেনারেল ফিল্ডমার্শাল আইয়ুব খানকে উৎসাহিত করেছিলেন ভারতের চরম দুর্দিনের সুযোগ নিয়ে কাশ্মির দখল করে ফেলতে। তাদের যুক্তি ছিলÑ এমন ঈশ্বরপ্রদত্ত সময় আর আসবে না, ভারতের ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা। তাই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। কিন্তু আইয়ুব খান তাদের কথায় সাড়া দেননি, বরং তিনি ভারতের কাছে ভিন্ন চ্যানেলে বার্তা পাঠিয়েছিলেনÑ পাকিস্তানের পক্ষ থেকে তাদের আক্রান্ত হওয়ার কোনো ভয় নেই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট কেনেডিও আইয়ুব খানকে ভারতের সহায়তায় এগিয়ে না এলেও সংযত থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন। সে সময় পাকিস্তান যদি চাইত, তাহলে সামরিকভাবে কাশ্মির দখল করে নিতে পারত; ভারতের কিছুই করার ছিল না। আইয়ুব খান যে কারণেই হোক, নিষ্ক্রিয় থাকাকেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন।
১৯৬২ সালের এই চীন-ভারত যুদ্ধের প্রায় তিন বছর আগে আইয়ুব খান আরো একটি বড় উদ্যোগ নিয়েছিলেন ভারতের সাথে সমঝোতায় আসতে। ১৯৫৯ সালে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে আসার পথে দিল্লিতে স্বল্পকালীন যাত্রাবিরতি করেন পাক প্রেসিডেন্ট। সেখানে পণ্ডিত নেহরুর সাথে আলাপকালে আইয়ুব খান দৃঢ়ভাবেই পণ্ডিতজীকে হকচকিত করে প্রস্তাব করেন, ভারতের সাথে পাকিস্তানের জয়েন্ট ডিফেন্সের। প্রস্তাবানুযায়ী দুই দেশের সশস্ত্রবাহিনী এক কমান্ডের আওতায় থাকবে, আর তাতে তা হয়ে উঠবে অন্যতম বৃহৎ ও শক্তিশালী বাহিনী। পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে থাকবে অনাক্রমণ চুক্তি। এমন প্রস্তাব অস্বাভাবিক ও অনেকটা ইউটোপিয়ান হলেও জওয়াহেরলাল নেহরু খুবই ঠাণ্ডাকণ্ঠে বলেনÑ ‘ডিফেন্স এগেইনস্ট হুম?’ ‘জয়েন্ট ডিফেন্স’ প্রস্তাব তো ভারত গ্রহণ করলই না, বরং আইয়ুবের প্রস্তাবের ওইখানেই ইতি ঘটে। (সূত্র : দি ওয়ার উই লস্ট, বি জি ভারগিস, তেহেলকা ডট কম, ১৩ অক্টোবর ২০১২, ইস্যু ৪১, ভলিউম ৯)।
নেহরু যদি ১৯৫৯ সালে আইয়ুবের ‘জয়েন্ট ডিফেন্স’ প্রস্তাব মেনে নিতেন, তাহলে এ উপমহাদেশের ইতিহাস হয়তো ভিন্ন হতো। চীনের সাথে যুদ্ধে ওরকম মার খেতে হতো না ভারতীয় সেনাবাহিনীকে, ঘটত না ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধ; এমনকি ১৯৭১ সালে কী হতো আল্লাহই জানেন! অবশ্য লে. জেনারেল বি এম কাউলের মতো ‘ফুট লিকার’ বা পদলেহনকারী সব সময় সব দেশে ছিল, আছে ও থাকবে এবং এরা এমনই বিশেষ প্রজাতির যে, পণ্ডিত নেহরুর মতো ঝানু স্টেটসম্যানকেও ঘোল খাওয়াতে পারঙ্গম।
যা হোক, পৃথিবীর প্রতিটি দেশ তার রণনীতি নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে ‘ডিফেন্স এগেইনস্ট হুম’ অর্থাৎ প্রতিরক্ষা কার বিরুদ্ধে এই মূলনীতির ওপর ভিত্তি করেই তৈরি করে। অনেক সময় অনেকের কাছে মনে হতে পারে, অনেক অঞ্চলে পাশাপাশি অনেক দেশ বন্ধুপ্রতিম, যেমনÑ মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর বা ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো। কিন্তু তার পরও তো এদের সবারই সশস্ত্রবাহিনী রয়েছে, আছে সুনির্দিষ্ট রণনীতি। সিঙ্গাপুর মালয়েশিয়ার কাছ থেকে স্বাধীনতা পেয়েছে। খুবই ছোট একটি দেশ। বিপরীতে মালয়েশিয়ার আকার বিশাল। কিন্তু সিঙ্গাপুরের সশস্ত্রবাহিনী যেভাবে অস্ত্রসজ্জিত ও সুপ্রশিক্ষিত তাতে আজ কোনোভাবেই কারো পক্ষে সিঙ্গাপুরের গায়ে হাত দেয়া সম্ভব নয়। এর বাইরে সিঙ্গাপুর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে এমনই সামরিক অ্যালায়েন্স তৈরি করেছে যে, ছোট হলেও তার নিরাপত্তাবলয় অনেক বড় হয়ে গেছে। কারণ তারা বোঝেÔThe fact should be remembered that a little bear can not live with a giant wolf in a totally insecure condition.Õ ( Md. Nuruzzaman, ÔNational security of BangladeshÕ, BIISS Journal Vol.12,No.3, 1991)। মূলত এ কারণেই ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলো যতটুকু সম্ভব নিজ সামর্থ্য থেকে সশস্ত্রবাহিনীকে সজ্জিত করে ও বৃহৎশক্তির ছত্রছায়া নিয়ে বাকি লুপহোলগুলো দূর করে। অবশ্য জোটবদ্ধতার ক্ষেত্রেও প্রতিটি দেশের কিছু নিজস্বতা থাকে, স্বকীয় নিরাপত্তানীতি থাকে ও ‘ডিফেন্স এগেইনস্ট হুম’Ñ এ বিষয়টিও থাকে সুনির্দিষ্ট। এসবের ওপর ভিত্তি করেই কোন সূত্র থেকে সমরাস্ত্র সংগ্রহ করলে ভালো হবে, কোন কোন অস্ত্রশস্ত্র আসলেই প্রয়োজন তার প্রাধিকার তৈরি করে। অর্থনীতির ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করে অবকাঠামো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দিকটি।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র রাষ্ট্র। তবে লোকসংখ্যার দিক দিয়ে ছোট নয়। আবার অর্থনৈতিক বিবেচনায় আমাদের সামর্থ্য এখনো অনেক কম। কিন্তু বিপদের বিষয় হলো, বাংলাদেশের অবস্থান ‘পৃথিবীর সবচেয়ে বিপদসঙ্কুল এলাকা’ দক্ষিণ এশিয়ায়। দুই পারমাণবিক শক্তি পাকিস্তান-ভারত ছাড়াও এ অঞ্চলের ঠিক পাশে রয়েছে বিশ্বশক্তি চীন। তবে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব বিশ্বের চলতি ক্ষমতার ভারসাম্যে ক্রমেই বেড়ে চলেছে বে অব বেঙ্গল বা বঙ্গোপসাগরের জন্য। এ শতকে বিশ্বশক্তিগুলোর প্রাধান্য বিস্তারের চারণভূমি হচ্ছে এই বঙ্গোপসাগর এলাকা। চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজিক দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাত কেন্দ্রীভূত হতে চলেছে দক্ষিণ চীন সাগর এলাকা ছাড়িয়ে বে অব বেঙ্গল নিয়ে। এর ব্যাখ্যা অনেক বড়। তবে এ কারণেই বাংলাদেশ ও এর সংশ্লিষ্ট সমুদ্র এলাকা নিয়ে নজর পড়েছে ভারত, চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ রাশিয়ার। এ দিকটিকে সামনে রেখেই বাংলাদেশকে তার প্রতিরক্ষানীতি পুনর্বিন্যাস করতে হবে। এখানেই এসে যায় ‘ডিফেন্স এগেইনস্ট হুম’ কথাটি। তবে প্রতিরক্ষানীতির ক্ষেত্রে আমাদের আসলেই কখনো কোনো ‘হুম’ ছিল কি না তাই সন্দেহ! পৃথিবীতে হয়তো বাংলাদেশই একমাত্র রাষ্ট্র, যার পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষানীতি কয়েক বছর পরপর পরিবর্তিত হয়। এক দল ক্ষমতায় এলে ‘হুম’ হয় একটা, আরেকজন এলে ‘হুম’ কথাটিই গায়েব হয়ে যায়!
অস্বীকার করার উপায় নেই যে, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনীর যথেষ্ট উন্নয়ন হয়েছে। তিন বাহিনীতে অনেক অবকাঠামোগত পরিবর্তন এসেছে। পদ-পদবির সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে। বেড়েছে সুযোগ-সুবিধা, সেনানিবাসগুলোকে সাজানো হয়েছে অপরূপ সাজে। সৈনিকদের বাসস্থান সমস্যার বেশখানিকটা দূর হয়েছে। অন্য দিকে নতুন অনেক অস্ত্রশস্ত্র, সাজসরঞ্জাম যুক্ত হয়েছে। নৌবাহিনীতে এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। ফ্রিগেট, সার্ভে শিপ, কর্ভেট, মিসাইল ক্রাফট কেনা হয়েছে; সাবমেরিন সংগ্রহ করা হচ্ছে। বিমানবাহিনীতেও যুক্ত হয়েছে রাশিয়ার ইয়াক-১৩০ গ্রাউন্ড অ্যাটাক এয়ারক্রাফট, চীন থেকে আনা হয়েছে এফ-৭ জঙ্গিবিমান, কে-৮ প্রশিক্ষণ বিমান। সেনাবাহিনী পেয়েছে বহুপ্রতীক্ষিত মেইন ব্যাটল ট্যাংক এমবিটি-২০০০, সেলফ প্রপেলড হাউইটজার, রাশিয়া ও চীনের অত্যাধুনিক ট্যাংকবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রসহ আরো অনেক কিছু। গঠন করা হয়েছে নতুন দু’টি ডিভিশনÑ একটি সিলেটে, আরেকটি বৃহত্তর চট্টগ্রামের রামুতে। আরেকটি প্রক্রিয়াধীন। যদিও এই নতুন ডিভিশনগুলোকে পরিপূর্ণরূপে সজ্জিত করতে অনেক অর্থসম্পদ প্রয়োজন, দরকার সময়ের। এ পদক্ষেপগুলো ইতিবাচক। আমরা দুর্বল থাকতে চাই না, চাই শক্তি। কারণ, ÔTo be weak is not virtuous, being prepared is not being provocative.Õ (Quoted in Ashequa Irshad, ÔIndian military Power and PolicyÕ, BIISS Journal, Vol.10.No.4, 1989, p.480)।
আমরা আমাদের সশস্ত্রবাহিনী নিয়ে গর্বিত। সশস্ত্রবাহিনী সব দেশের গর্ব ও ঐতিহ্যের প্রতীক। আমাদের এটা মনে রাখতে হবে, মূলত ‘রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য সেনাবাহিনী গঠনের মুখ্য উদ্দেশ্য হলো বহিঃশত্রুর হামলা থেকে দেশের ভৌগোলিক সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা এবং অভ্যন্তরীণ বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রচেষ্টা প্রতিহত করা। মানবতাবোধ এখনো যুদ্ধপ্রবণতাকে পরাজিত করতে পারেনি বলে এবং আন্তর্জাতিক আইন এখনো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ ছাড়া আগ্রাসন রোধে অক্ষম বলে প্রতিটি জাতিই তাদের নিজ নিজ সেনাবাহিনী গঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে।’ (নাজিম কামরান চৌধুরী, ‘বাংলাদেশ : রাজনীতি, অর্থনীতি ও সশস্ত্রবাহিনী’, পৃ. ৪৪-৪৫)। কিন্তু প্রশ্ন হলোÑ ‘ডিফেন্স এগেইনস্ট হুম’? এই ‘হুম’টি কে বা কারা তা ঠিক না করা পর্যন্ত কার্যকর প্রতিরক্ষানীতি প্রণয়ন যেমন সম্ভব নয় তেমনি অবকাঠামোগত উন্নয়ন করলেও ‘লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যটি’ থেকে যাবে ধোঁয়ার আড়ালে।
শেষে আবারো ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধ দিয়ে লেখাটি শেষ করছি। সে সময়ের ভারতের লজ্জাজনক পরাজয় নিয়ে লন্ডনের ইকোনমিস্ট পত্রিকা ‘ÔPlain Tales From the HillsÕ শিরোনামের সম্পাদকীয়তে মন্তব্য করেছিলÑ ÔWhen the fog cleared, the Chinese were there!Õ আশা করি, আমাদের কখনো সেরূপ অবস্থা হবে না।
লেখক : সাংবাদিক, বাংলাদেশ ডিফেন্স
জার্নাল-এর সম্পাদক

আমি বিজয় দেখিনি by আশান উজ জামান

আমাদের গ্রামটা ঠিক একটা দ্বীপের মতো। চারপাশেই পানি।  তিন পাশে বিশাল বাঁওড়। আত্মীয়-কুটুমবাড়ি, ইশকুল, মাদ্রাসা, হাট-বাজার—সবই ওপারের গ্রামগুলোয়। আর এক পাশে চিরকেলে বিল। বিল পার হলে মাটির পথ। পথটা পায়ে পায়ে থানা বাজারে গিয়ে উঠেছে। তবে খুব বেশি দরকার না হলে লোকজন ও পথ মাড়ায় না। সব কাজ তাদের ওই বাঁওড়ে। আর বাঁওড়ের ওপারে। আর বিলে। এখন যদি ও গ্রামে কেউ যায় দেখতে পাবে দু-একটা ইটের ছাড়া ঘর, ঠিক সে রকমই ছিল একাত্তরেও। যাতায়াতের জন্য নৌকো আর ডুঙ্গাই ছিল ভরসা। যাদের এসব ছিল না তারা চলত ভেলায়। তবে সে ছিল এক বিরাট ঝক্কি! অধিকাংশ লোকই তাই পারাপার হতো নৌকোয়। ভাড়া দিয়ে। ভাড়া-নৌকোটা ছিল মঈজদ্দি মোড়লের। গ্রামের সবচেয়ে ধনী ছিলেন তিনি। লোকজন তাই মেনেই চলত তাঁকে। ভাড়া খাটা নৌকোটা ছাড়াও পারিবারিক কাজের জন্য আরেকটা নৌকো ছিল তঁার। সেটা চালানোর জন্য একজন লোক রাখা ছিল। নাম আরব আলি। একটা পা খোঁড়া ছিল লোকটার। কেউ কেউ তাকে তাই ‘খোঁড়া মাঝি’ বলেও ডাকত। ওই লোকটাই আমার বাবা।
আমার মা-ও মোড়লবাড়িতে কাজ করত। রান্না আর কাপড়চোপড় ধোয়ার কাজ। আমাদের আসল বাড়ি ছিল বাঁওড়ের ওপারে। খামারপাড়ায়। দাদা-দাদি মারা গেছেন আব্বার ছোটবেলায়। জমি-জায়গা নেই। অচল পা নিয়ে কিছু করারও নেই। এবাড়ি ওবাড়ি চেয়ে খেয়ে দিন কাটে। সেই অসময়ে মঈজদ্দি মোড়লই তাকে কাজে লাগিয়েছিলেন। আশ্রয় দিয়েছিলেন।
সেই থেকে এ বাড়িতেই থাকা। এ গ্রামই আমাদের ঠিকানা।
তখন যুদ্ধের কাল।
শোনা যাচ্ছে, মিলিটারিরা গ্রামে গ্রামে আসছে। ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিচ্ছে। মানুষ মেরে ফেলছে।
সহজে আসার পথ নেই বলে আসতে পারেনি আমাদের গ্রামে। তবু লোকজন গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে লাগল। মোড়লবাড়ির অনেক কাজের লোকও চলে গেল।
আশপাশের গ্রামের অবস্থা আরও খানিকটা খারাপ হলে মোড়ল বাকি লোকদের ডেকে বললেন, ‘অবস্থা খারাপ হই গেচে। আত্তো থাকা যাবে নাই। কাইল বিয়ান বেলা শিকেরপুর গিরামে হামলা হয়েচে। বাঁওড় পারোয়ে এদিকিও তো চলে আসতি পারে যেদিন সেদিন। আমাদের চলে যাওয়াই উচিত মনে হচ্চে।’ যাওয়ার জন্য মুখিয়ে ছিল সবাই, রাতের মধ্যেই গোজগাজ সেরে রওনা হয়ে গেল।
মা-বাবাও গুছিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু আমরা ‘গেলি বাড়িঘর দ্যাখবেনে কিডা? আর গেলিই বা কী? সব গিরামের তো একই হাল। একেনে যেমন, সেকেনেও তেমন। ভালো হয় তুমরা থাকো। ধান চাইল সব থাইকল। দেকেশুনে রাকো। আর সারা জীবনের জন্যি তো যাচ্চিনে। দুদিন পর সব ঠান্ডা হয়ে গেলি আমরা চলে আসবানে।’ আব্বা কখনো মোড়লের কথার ওপর কথা বলে না। এবারও বলল না।
আমরা তাই থেকে গেলাম। সেই একলা গ্রামে, একলা বাড়িতে আমরা একা তিনজন। মা প্রায়ই বলত, ‘চারদিক কেমন ছমছম করচে।’ আব্বা সাহস দিত মাকে, ‘ওরে কিচ্চু হবে নাই। বাঁওড় পারোয়ে আসা ওই শালাগের কম্ম না। এত সহজ নাকি?’ মা তবু সাবধানে থাকতে বলত। আর সারাক্ষণ বিড়বিড় করত। দোয়া পড়লে নাকি বিপদ আসে না।
বিপদের কিছু আমি বুঝতাম না। আমার ভালোই লাগত। আগে কত ঝামেলা ছিল। কত মানুষ, কত কাজ। মা সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকত। আব্বাকে তো দিনের বেলা প্রায় দেখতেই পেতাম না। সারা দিন শুধু বাঁওড় আর মাঠ। বিল আর বাজার। কিন্তু ওই সময় বাড়ি থাকত। আমাদের সাথে থাকত।
মাঝে মাঝে আমি কিছু ঝামেলা বাধাতাম। ওরা দুজন মিলেই তা সামলে নিত।
মা আমাকে গান গেয়ে শোনাত। আব্বা বাঁশি বাজাত সন্ধে হলে।
মাঝে মাঝে আমরা বাঁওড়ে যেতাম। নৌকো চড়তাম।
আব্বা চালাত। মা বসে থাকত। আব্বা কথা বলত। মা কথা বলত। কখনো আমার সাথে। কখনো আমাকে নিয়ে।
খুব ভালো লাগত আমার।
মা আমাকে বাঁওড়ের সুন্দর নীল পানি দেখাত। মাছরাঙা আর বক দেখাত। মাছের ঝাঁক দেখাত। আর পানির মধ্যে আকাশের ছবি দেখাত, ‘দেকিচাও, কি সুন্দর পানি! পানির মদ্যি আকাশ কিরাম করে শুয়ে রয়েচে, দ্যাকো!’ আমি দেখতাম। আমার ভালো লাগত।
একদিন দেখি পানিতে একটা লোক ভাসছে। মা অক অক করে উঠল!
সেদিন থেকে আর আমাদের বাঁওড়ে নিয়ে গেল না আব্বা। একা একা বের হতো। ফিরে এসে নানা রকম খবর দিত। ওই গ্রামে এই হয়েছে, ওই হয়েছে। এত মানুষ ধরেছে। এভাবে মেরেছে। অমুক গ্রামে আগুন। তমুক গ্রামে ক্যাম্প। সাত-সতেরো।
খুব ভয় করত আমার।
একদিন দেখি আব্বা একদল লোককে নিয়ে এসেছে। কেমন গরিব-গরিব চেহারা সবার। পিঠে কী একটা করে জিনিস। নলমতো। মা বলল ওটা ওদের অস্ত্র। ওরা মুক্তি।
ওদের জন্য রান্না হলো। ওরা খেলো।
ভেবেছিলাম কুটুম আসার মতো চলে যাবে। কিন্তু গেল না। কাজের মানুষদের থাকার জন্য আমাদের ঘরের পাশে যে ঘরগুলো আছে, ওগুলোতে থাকা শুরু করল।
মা-বাবার ব্যস্ততা গেল বেড়ে। আবার। আগের মতো।
মা সারাক্ষণ রান্নার জোগাড়-যন্ত্র নিয়ে থাকে। আগে আমার সাথে কত কথা বলত, এখন বলতে গেলে বলেই না। গল্প করে না। গান শোনায় না। ওই মুক্তিরাই যেন সব। তার কাজই যেন শুধু রান্না করা আর ওদের খাওয়ানো। খাওয়ানো আর রান্না। আগ বাড়িয়ে আবার দু-একজনের কাপড়ও ধুয়ে দিত। আমার রাগ হতো।
আব্বা তো আরও বেশি! প্রায়ই রাতে ওদের নিয়ে চলে যেত। কোথায় যেত জানি না। মা বলত ‘উরা যুদ্দ কত্তি যায়।’ আব্বা না ফেরা পর্যন্ত মা শুত না। পিদিমটা জ্বালিয়ে কাঁথা সেলাই করত। আর আমার সাথে গল্প করত। নানাবাড়ির গল্প। ভূতের বাড়ির গল্প। আমার ভালো লাগত। সবচেয়ে ভালো লাগত বাঁওড়ের তলায় সোনার দেশের গল্প।
আমাদের বাঁওড়ের তলায় নাকি একটা সোনার দেশ ছিল। ঘরবাড়ি, দালানকোঠা সবই সোনার। সে দেশের মানুষ খুব ভালো। আর দয়াবান। চাইলেই তারা মানুষকে সাহায্য করত। তবে চাইতে হতো কায়দা করে। যেমন কারও মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে বাসনকোসন লাগবে। তাহলে তাকে বাঁওড়ের ধারে ইয়া বড় গাবগাছটার নিচে যেতে হবে। সন্ধ্যার সময়। পূর্ব দিকে মুখ করে চোখ বুজে মনে মনে সোনার দেশের রাজার কাছে অনুরোধ করতে হবে তাকে কিছু প্লেট-গ্লাস দেওয়ার জন্য। পরের দিন ভোরবেলা দেখা যাবে গাবগাছের শিকড়ের ভেতর সোনার বাসন সোনার গ্লাস সোনার বাটি সোনার গয়না থরে থরে সাজানো। কাজ শেষে এসব আবার গুনে গুনে ফেরত দিতে হবে সেখানেই। এবং মনে মনে ধন্যবাদ দিতে হবে। এই ফেরত দিতে গিয়েই একবার কে যেন রেখে দিয়েছিল একটা গ্লাস। তার পর থেকে আর সোনার দেশের লোকেরা মানুষের কথা শোনে না।
ইশ্! যদি এখনো সব আগের মতো থাকত! আমি শুধু দুটো কানের দুল চেয়ে নিতাম। মায়ের এক জোড়া সোনার দুলের খুব শখ। এসব ভাবতে ভাবতে আর গল্প শুনতে শুনতেই আমি ঘুমিয়ে পড়তাম।
মাঝে মাঝে উঠোনে গিয়ে গিয়ে আমরা দেখে আসতাম মুক্তিরা আসছে কি না। তারপর আবার শুরু হতো কথা। মা আমাকে যুদ্ধের কথা বলত, স্বাধীনতার কথা বলত, ‘একদিন স্বাদিনতা আসবে। আমরা স্বাদিন হব। আরেট্টু বড় হলি তুমিও স্বাদিন হবা। তকন তুমাকে নানিবাড়ি নিয়ে যাব। ভূতবাড়ি দেকাব।’
ভূতবাড়ি দেখার খুব শখ আমার। তাই নানিবাড়ি যেতে ইচ্ছে করত খুব। স্বাধীন হতে ইচ্ছে করত। খুব।
মাঝরাতে কখনো, কখনো শেষ রাতে ফিরে আসত বাবা। মুক্তিরা যে যার মতো শুয়ে পড়লে আব্বা আসত আমাদের কাছে। আমাকে একটু আদর করে শুয়ে পড়ত।
সকালে আমার ঘুম ভাঙতেই দেখতাম মা কাজ শুরু করে দিয়েছে। আমি আবার পর হয়ে গেছি।
আব্বা আর মুক্তিরা উঠত অনেক বেলা করে। গান-বাজনা করত। রেডিও শুনত। ওদের সাথে আব্বা-মাও শুনত। আমিও।
কোনো কোনো দিন খুব খুশি থাকত ওরা। কোনো কোনো দিন মনমরা মা বলত মুক্তিরা সবাই খুব ভালো। আমারও তা-ই মনে হতো। বাড়ির লোকেদের মতো ওরা কেউ আব্বা-মাকে গালাগাল দিত না। বকাবকি করত না। আপনি আপনি করে কথা বলত। আমার ভালো লাগত। একদিন এক মুক্তিকে ধরাধরি করে আনল ওরা। কাপড়ে রক্ত আর রক্ত। সব ধুয়েমুছে পরিষ্কার করল মা। কাপড় বেঁধে দিল। লোকটা কাঁদছে না। কিন্তু চোখে পানি। ভাবলাম মুছে দিই। মা দিতে দিল না। আমি চলে আসতে চাচ্ছিলাম। পারলাম না। মা না আসলে আমি আসি কী করে?
আর একজন লোক এল ও রকম আহত হয়ে।
ওদের দেখাশোনার দায়িত্ব পড়ল মায়ের ওপর। মায়ের ব্যস্ততা আরও বাড়ল।
একটা লোক মারা গেল। মোড়লবাড়ির পেছনে একটা খেজুরবন আছে। ওখানে একটা গর্ত করে তাকে পুঁতে দিল মুক্তিরা। আমার খারাপ লাগছিল খুব। সবাই ওপরে থাকবে আর একটা মানুষ মাটির নিচে! একটা গর্তে একা! ভয় করবে না লোকটার? মা দেখলাম কাঁদছে। ঘরে এসে আমাকে বলল, ‘মরা মানুষের জন্যি ওই গত্তই হচ্চে ঘর। তুমার নানানানিও ওইরাম দুটো ঘরে শুয়ে আচে।’ ঘরটা আবার একটু দেখতে ইচ্ছে করছিল আমার। মা আর নিয়ে গেল না। শুয়ে শুয়ে কাঁদল। সবাই খুব মনমরা হয়ে থাকল কদিন। তারপর আবার সেই আগের মতো। যাওয়া আর আসা। ঘুম আর যাওয়া।
একদিন রাতে মায়ের কথা শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে গিয়েছি। আব্বা কখন এসেছে জানি না। হঠাৎ চিৎকার-চেঁচামেচি। ঘুম ভেঙে গেল আমার। মায়ের সাথে বাইরে বের হয়ে দেখি অনেক মানুষ। সবার গায়ে একই রকম পোশাক। মাথায় টুপি। পায়ে বুট। হাতে মুক্তিদের মতো অস্ত্র। চারদিকে ধোঁয়া। মুক্তিদের থাকার ঘরে আগুন জ্বলছে। আর ভীষণ শব্দ হচ্ছে। ঠাশ ঠাশ ঠাশ।
মুক্তিরা সব দৌড়াচ্ছে। কারও কাছে অস্ত্র, কারও হাত খালি। কয়েকজন দেখলাম উঠোনে পড়ে আছে।
মা ওদের দিকে যেতে চাইল। আব্বা যেতে দিল না। বলল, ‘পলাও’। মা পালাল না। দাঁড়িয়েই থাকল।
আব্বা চিৎকার করে বলল, ‘বের হও, পলাও তাড়াতাড়ি।’
এরপর মা ছোটা শুরু করল। ঘরের পেছন দিকে গলি দিয়ে। ছুটছে তো ছুটছেই। সঙ্গে আমি।
চারদিক থেকে শব্দ আসছে। চিৎকার-চেঁচামেচি। আর ঠাশ ঠাশ।
আমরা বিলের দিকে যাচ্ছি। মায়ের কষ্ট হচ্ছে খুব। আমার কষ্ট হচ্ছে খুব। আমরা আর পারছি না। সামনেই খেজুরবাগান। বাগানে ঢুকব এমন সময় একটা গুলি এসে লাগল মায়ের গায়ে। মা পড়ে গেল। আমিও পড়ে গিয়েছি। ওঠার চেষ্টা করছি। পারছি না। বাবাকে খুঁজছি । দেখছি না কোথাও।
মা চিৎকার করছে। হাত-পা ছুড়ছে।
একজন লোক এল আমাদের দিকে। লোকটাকে আমি আগেও দেখেছি। আমাদের গ্রামের। তার হাতেও অস্ত্র। কাছে এসে মাকে দেখল। লাথি মারল। অস্ত্রটা দিয়ে খোঁচা দিল। মা ককিয়ে উঠল।
এবার দেখলাম আব্বাকে। খোঁড়া পা-টা টেনে টেনে আসছে। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। কাঁদছে। গালি দিচ্ছে।
আমি আব্বার দিকে তাকিয়ে আছি। পেছনের বাড়িঘরের দিকে তাকিয়ে আছি। পুড়ে যাচ্ছে সব।
লোকটা আব্বাকে দেখল। আব্বার দিকে চলে গেল। হাতে অস্ত্র। আব্বা আসছেই। থামছে না।
আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল। খুব ইচ্ছে করছিল লোকটাকে ধরতে। থামাতে। মারতে।
কাঁদতে ইচ্ছে করছিল খুব।
ইচ্ছে করছিল মাকে ছেড়ে আসতে। বিজয়ী হতে। স্বাধীন হতে।
পারিনি। কারণ তখনো পারতে শিখিনি।
মার পেটে ছিলাম। সেখানেই থেকে গেলাম।
না হলে হয়তো আমি স্বাধীন হতাম। বিজয় দেখতাম।

ইয়েমেনকে অশান্ত করতে আত্মঘাতী হামলা : হাদি

ইয়েমেনকে ‘বিশৃঙ্খলা-নৈরাজ্য, সহিংসতা ও অভ্যন্তরীণ লড়াইয়ের মধ্যে ঠেলে দেয়ার উদ্দেশ্যে শিয়া হাউছি মসজিদে আত্মঘাতী বোমা হামলা ঘটানো হয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট এ কথা বলেছেন। শুক্রবার এই হামলায় অন্তত ১৪২ জন নিহত হয়। জঙ্গি গ্রুপ ইসলামিক স্টেট (আইএস) রাজধানী সানা ও হাউছি বিদ্রোহীদের উত্তরাঞ্চলীয় ঘাঁটি সা’দা শহরের দুটি মসজিদে তিনটি বিস্ফোরণের দায় স্বীকার করেছে। গত মাসে হাউছি বিদ্রোহীরা রাজধানী সানা দখল করার পর প্রেসিডেন্ট আবদুর রব্বু মানসুর হাদি গৃহবন্দী অবস্থা থেকে পালিয়ে দক্ষিণাঞ্চলীয় এডেন শহরে আশ্রয় নেন। হতাহতদের পরিবারের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে তিনি এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে হামলাকে সন্ত্রাসী ও কাপুরুষোচিত কাজ বলে অভিহিত করেন।
শুক্রবার প্রেসিডেন্টের অফিস থেকে প্রকাশিত এই চিঠিতে তিনি বলেন, ‘এমন জঘন্য হামলা শুধু জানি দুশমনরাই করতে পারে যারা ইয়েমেনকে বিশৃঙ্খলা, সহিংসতা ও অভ্যন্তরীণ লড়াইয়ের মধ্যে টেনে আনতে চান।’
বার্তায় তিনি আরো বলেন, ‘সশস্ত্র হাউছি বিদ্রোহীদের শিয়া চরমপন্থা এবং আলকায়েদার সুন্নি চরমপন্থা একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। তাদের কেউই ইয়েমেন ও এর জনগণের শান্তি ও স্থাতিশীলতা চায় না।’
গত বছর সেপ্টেম্বরে সাবেক প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সাহেহর অনুগত বাহিনীর সহায়তায় হাউছিরা রাজধানী সানা অবরোধ করে এবং সেই থেকে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান শক্তিশালী হয়। কিন্তু তারা দক্ষিণাঞ্চলে তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকা বিস্তৃত করার ক্ষেত্রে আলকায়েদার মিত্র সুন্নি উপজাতিদের প্রচণ্ড প্রতিরোধের মুখোমুখি হয়, যারা আগে থেকেই ইয়েমেনে ব্যাপক শক্তিশালী অবস্থানে আছে। হাউছিরা এখন রাজধানী সানা দখল করে রাখায় প্রেসিডেন্ট হাদি এডেনকে তার অস্থায়ী রাজধানী ঘোষণা করেছেন।
দায় স্বীকার আইএসের
রয়টার্স জানায়, ইয়েমেনের রাজধানী সানায় দু’টি মসজিদে আত্মঘাতী হামলার দায় স্বীকার করেছে ইসলামিক স্টেট (আইএস)। এই হামলায় অন্ততপে ১৪২ জন নিহত ও তিন শ’র বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। বিবিসি জানায়, ২০১৪ সালের নভেম্বরে ইয়েমেনে জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস তাদের শাখা প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথম হামলার দায় স্বীকার করল।
আক্রান্ত দু’টি মসজিদেই জাইদি শিয়া নেতৃত্বাধীন হাউছি মুভমেন্টের সদস্যরা নামাজ পড়ে থাকেন। মসজিদ দু’টি তারাই নিয়ন্ত্রণ করেন।
কয়েক বছর ধরে ইয়েমেনের রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে হাউছি বিদ্রোহীরা দেশটির ২১ প্রদেশের মধ্যে ৯টিতে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। বদর এবং আল-হাসুস নামে দু’টি মসজিদই মূলত শিয়া মুসলিম হাউছি গোষ্ঠীর। এ গোষ্ঠীটি ইয়েমেন সরকারের নিয়ন্ত্রণ দখল করেছে।
ইয়েমেনে আইএসের গণমাধ্যম কার্যালয়ের একটি অনলাইন বার্তার উদ্ধৃতি দিয়ে সিনহুয়া বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, ‘পাঁচ আইএস যোদ্ধা বিস্ফোরক বেল্ট পরে ইয়েমেনে আত্মঘাতী অভিযান চালায়। চারজন যোদ্ধা যায় রাজধানী সানার বদর এবং হাসুস মসজিদের দু’টি শিয়া হাউছি সদর দফতরে। আর পঞ্চমজন যায় সাদা প্রদেশের হাউছি ঘাঁটিতে।’ নিহতদের মধ্যে বদর মসজিদের প্রধান ইমাম মুর্তাদা আল-মাহাদোয়ারি রয়েছেন বলে জানিয়েছে হাউছি আল-মাসিরা টিভি। হাসুস মসজিদে হামলায় নিহত হন দুই হাউছি কমান্ডার। আহতদের অনেকের অবস্থা গুরুতর।

জান্নাতি হুর আর দুধ-মধুর নহর বৃত্তান্ত! by গোলাম মাওলা রনি

ইদানীংকালে বাংলাদেশের অপরাপর শান্তিপ্রিয় মানুষের মতো আমিও দুনিয়ার চাইতে আখেরাত নিয়ে চিন্তা-ভাবনা বেশি করি। জমিনের দিকে না তাকিয়ে আসমানের দিকে তাকাই। আসমানের তারা, চাঁদ এবং উড়ন্ত পাখি দেখতে আমার বড়ই ভালো লাগে। আগে কিন্তু লাগত না। ইতিপূর্বে আমি জমিনের ওপরকার বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ, গাছপালা, বনভূমি এবং পশুপাখির বিচরণ দেখতে দেখতে হৃদয়ে পুলক অনুভব করতাম। সবচেয়ে বেশি দেখতাম মানুষজন এবং তাদের বাহারি সৃষ্টিগুলোকে। ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে, বালক-বালিকা, কিশোর-কিশোরীদের চপলতা এবং দুষ্টামি আমার হৃদয়কে প্রশস্ত করত। মেধাবী মানুষ এবং সুন্দরী নারী আমাকে যতটা না মুগ্ধ করত তারচেয়ে বেশি মুগ্ধ করত মেধাবী কণ্ঠস্বর। ইদানীংকালে সবকিছুতেই কেমন জানি মড়ক লেগেছে। কোনো কিছু দেখতে বা শুনতে আর মন সায় দেয় না। নির্ভয়ে কোনো কিছুই শুনতে পারি না, আর আনন্দচিত্তে দেখতেও পারি না- তাই সময় পেলেই আসমানের দিকে তাকিয়ে থাকি এবং মনের আনন্দে তারা গুনতে গুনতে আখেরাতের কথা চিন্তা করি।
রাস্তাঘাটে চলতে ভীষণ ভয় হয়। পেট্রলবোমা, ককটেল এবং ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার, ইট-পাটকেল-টিয়ারসেল ও বুলেটের চেয়েও মহাবিপদ হিসেবে উদয় হয়েছে সাম্প্রতিককালের গণপিটুনি এবং পুলিশের সন্দেহ। ভিড়ের মধ্যে কে বা কারা বোমা মেরে চম্পট দেওয়ার সময় জোরে ধর ধর বলে আওয়াজ তোলে। পথচারীরা এমনিতেই ভয়ের চোটে ঠক ঠক করে, তার ওপর বোমার শব্দ হলে তো কথাই নেই- মুখ বন্ধ করে ভো দৌড় মারে। কোনো কিছুতে গুঁতা লেগে পড়ে গেলে ভিন্ন কথা বা কেউ যদি কলার চেপে, হাত ধরে বা অন্য কিছু চেপে ধরে থামায় তাহলে তার মনের অবস্থা হয় আজরাইল (আ.)-এর সামনে পড়ে সবকিছু ভুলে যাওয়ার সময়ের মতো। এ অবস্থায় যদি পুলিশ এসে উদয় হয় তবে তো কথাই নেই- আক্রান্ত ব্যক্তি প্রথমে মৃদু কম্পনে পরিধেয় বস্ত্র গন্ধময় করে, তারপর ওল্টাপাল্টা বলতে থাকে অনেকটা বিকারগ্রস্ত মানুষের মতো। অন্যদিকে পুলিশও মনে মনে বলে- পাইছি ব্যাটারে। চল চানমনি-ডিবি অফিসে চল!
দুটি পৃথক দুর্ঘটনার বাস্তব উদাহরণ দিলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। প্রথমটি ঘটেছিল বেলা ১১টা-সাড়ে ১১টার দিকে। সচিবালয়ের উল্টোদিকে তোপখানা রোডের বড়সড় একটি ভবনের নামকরা একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে এক যুবক বহুদিন ধরে। ঘটনার দিন সে নিচে অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। এমন সময় দড়াম দড়াম বেশ কয়েকটি ককটেল ফাটার শব্দে শুরু হয় দৌড়াদৌড়ি, হৈচৈ, গালাগালি এবং পুলিশের লাঠি-বাঁশির শব্দ। যুবকটি ভেবে পাচ্ছিল না তার তখন কী করা উচিত। সে কি অন্যদের মতো দৌড়ে অজানা গন্তব্যের দিকে যাবে নাকি ২০/২৫ ফুট পেছনে ফিরে নিজ অফিস ভবনের নিচতলায় আশ্রয় নেবে। এরই মধ্যে পুলিশও তার কাছাকাছি এসে গেল। দৌড়রত এক বৃদ্ধকে ধরে পুলিশ জিজ্ঞাসা করল বোমা কে মেরেছে? একে তো বোমার শব্দ, তার ওপর দৌড়াদৌড়ির কারণে বুড়া মিয়ার কলিজায় পানি ছিল না। ফলে পুলিশের মূর্তি দেখে এবং শব্দ শুনে বেচারার জান তখন গলা পেরিয়ে ঠোঁটে চলে এলো। সে কাঁপতে কাঁপতে হাতখানা তুলে দেখিয়ে দিল- ওই ছ্যামড়ায় বোম মারিছে- বুড়ার কথায় শুরু হয়ে গেল রোজ কেয়ামত। দৌড়রত মানুষজন হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেল। ধর হালারে- পিডা হালারে! লাত্থি মার! ঘুষা মাইরা হালার নাকের বদনা ফাটাইয়্যা দে, কষাইয়্যা লাত্থি মার- লাত্থি। মাইরা গুয়া ফাটাইয়া দে- ব্যস! ২/৩ মিনিটের মধ্যেই যুবকটি চিৎ পটাং হয়ে পড়ল আর অমনি পুলিশ তাকে উঠিয়ে নিয়ে গেল। দ্বিতীয় ঘটনা ঘটেছিল আজিমপুরে। ১০/১২ জন যুবক দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিল হোম ইকোনমিক্স কলেজের সামনে। যুবকদের প্রায় সবাই এসেছিল তাদের বোন অথবা স্ত্রীকে নিয়ে একটি সরকারি চাকরির লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করানোর জন্য। চাকরি প্রার্থীদের পরীক্ষা কেন্দ্রে ঢুকিয়ে দিয়ে তারা চা খাওয়ার জন্য ফুটপাথের চায়ের দোকানের সামনে ভিড় করে। হঠাৎ ১০/১২টি মোটরসাইকেলে করে পুলিশের একটি দল এসে তাদের ঘেরাও করে ফেলে। যুবকরা কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই পুলিশ শুরু করে অকথ্য ভাষায় গালাগাল। সবাইকে ধরে সারা শরীরে তল্লাশি করতে করতে শাসাতে থাকে- বোমা কই! বোমা মারছিস কেন। ততক্ষণে যুবকরা আন্দাজ করে ফেলে যে, কিছুক্ষণ আগে তারা যে ঠাস করে একটি ট্রান্সফরমার ফাটার শব্দ শুনেছিল সেই শব্দের সূত্র ধরেই হয়তো পুলিশ এসেছে। একজন যুবক সাহস করে আঙ্গুল উঁচিয়ে পুলিশকে বলল- ভাই! বোমা ফুটেনি। ওইখানে ট্রান্সফরমার ফেটেছে। কয়েকজন পুলিশ এগিয়ে যখন ঘটনার সত্যতা বুঝতে পারল তখন যুবকদের রেহাই দিল।
দেশের চলমান সহিংস অবস্থার বাস্তব চিত্র নিয়ে হররোজ তৈরি হতে পারে অসংখ্য চলচ্চিত্র, নাটক কিংবা গীতি কবিতা। পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের কথাবার্তা শুনলে হৃদয়-মন ভারাক্রান্ত হয়। লোকগুলোর কি আল্লাহ-খোদার ভয় নেই? দেদারসে যা মুখে আসছে তাই বলে যাচ্ছে! বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির যেসব রক্ষাকবচ জনগণকে অতীতকালে রক্ষা করত তাও আজ বিলীন হতে বসেছে। মজলুম এমনভাবে নিজেকে ছোট এবং অসহায় করে ফেলছে যাতে মনে হতে পারে লোকটি হয়তো তারই মতো কোনো বান্দা বা বান্দিকে সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক মনে করছে। প্রভাবশালীরা এমনভাবে অহংকার করছে, যা দেখে মনে হতে পারে লোকটি হয়তো আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ইয়াদ অর্থাৎ চাদর ধরে টানাটানি করছে। জ্ঞানীরা চুপচাপ বসে আছে- আর মূর্খরা সব আগ বাড়িয়ে কথা বলছে। অভদ্ররা মঞ্চে দাঁড়িয়ে দাপাদাপি করছে এবং ভদ্রলোকেরা সব আড়ালে চলে গেছে।
অস্থির সময়ে বিপদে-আপদে মানুষ আল্লাহ-খোদাকে বেশি ডাকাডাকি করে। অন্যদিকে দরিদ্র লোকজনই দুনিয়ার চেয়ে আখেরাত নিয়ে একটু বেশি চিন্তাভাবনা করে। ধনীরা ধন সম্পদের মোহ এবং কাম-বাসনা চরিতার্থ করার সব উপকরণ হাতের নাগালে পাওয়ার কারণে বাদবাকিতে খুব কমই বিশ্বাস করে। অর্থাৎ চোখের সামনের সহজলভ্য বিত্ত-বিলাসের সামগ্রী বাদ দিয়ে মৃত্যু, তারপর কবর, এরপর কেয়ামত, হাশর, মিজান, এরপর জান্নাতে গিয়ে সবকিছু পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করে না। অন্যদিকে দরিদ্ররা যখন ওসব কিছু পায় না তখন সে মনপ্রাণ দিয়ে একান্ত অনুগত বান্দা হিসেবে জান্নাতে গিয়ে সবকিছু পাওয়ার আশায় দিনাতিপাত করতে থাকে।
জান্নাতের নেয়ামতের গুণকীর্তন শেষ করা যাবে না। নেয়ামতের সংখ্যাও অসীম। অসংখ্য নেয়ামতের মধ্যে প্রতিটি পুরুষের জন্য ৭০ জন হুর, সরাবান তহুরা নামক একশ্রেণির পানীয়, দুধ, মধু এবং সুসজ্জিত বিশাল বিশাল বাগান-ঝরনা সমন্বিত প্রাসাদের কথা আমরা ছোটকাল থেকে শুনে এসেছি। দুনিয়া এবং জান্নাতি নেয়ামতের মধ্যে অনেক গুণগত এবং বস্তুগত পার্থক্য রয়েছে। দুনিয়ার সবকিছু পচে যায়, ক্ষয়ে যায় এবং অধিক ব্যবহারে বিতৃষ্ণার সৃষ্টি হয়। দুনিয়াতে ভোগের মাত্রা সীমিত। মানুষ ইচ্ছা করলেও সারাদিন খেতে পারবে না কিংবা ৭০ জন বিবির সঙ্গে সারাক্ষণ রমণ করতে পারবে না। দুনিয়ার প্রতিটি বস্তুর জন্য ভোগীকে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়- দিতে হয় বিনিময় মূল্য। ভোগের পর ক্ষেত্রবিশেষে অভক্তিও এসে যায়। অন্যদিকে জান্নাতে ভোগের ক্ষেত্রে কোনো ঝক্কি-ঝামেলা নেই। সবকিছু করা যাবে ইচ্ছামতো, সবকিছু স্বয়ংক্রিয়ভাবে হাজির হবে আকাঙ্ক্ষা করা মাত্র। একটি মানুষ যদি সারাদিন শুধু খেতে চায় কিংবা ঘুমোতে চায় অথবা কোনো ক্রীড়া-কৌতুক করতে চায় তবে সমস্যা নেই। তিনি ইচ্ছামতো সবকিছু করতে পারবেন- কোনো ক্লান্তি অবসাদ অথবা বিরাগ-বিতৃষ্ণা তাকে স্পর্শ করবে না।
ঢাকার কোনো বুদ্ধিমান যুবককে যদি বলা হয় তোমাকে গুলশান এলাকায় ১০/১২ বিঘা বাড়ির ওপর নির্মিত বিশাল একটি প্রাসাদ দেওয়া হলো। প্রাসাদের মধ্যে তোমার জন্য সবকিছু মজুদ রয়েছে, আর রয়েছে ৭০ জন সুন্দরী নারী যাদের তুমি স্ত্রী অথবা দাসী হিসেবে ব্যবহার করতে পার। বুদ্ধিমান যুবকটির মনে প্রশ্ন আসবে বাড়ির বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস বিল, কর্মচারীদের বেতন কে দেবে, কতদিন দেবে? ৭০ জন বউ বা দাসী দিয়েইবা সে কী করবে। বহু বিবাহের কুফল এবং স্ত্রী কর্তৃক স্বামীকে ছ্যাচা দেওয়ার বহু কাহিনী তার মনে উদয় হবে। ৭০ জন বিবির যদি ২/৩টা করে বাচ্চা হয় আর যদি তারা সামনে এসে বলে- ও বাজান, কলা খাব! লেবেনচুস খাব- তাহলে তো কথাই নেই! মুহূর্তের মধ্যে উন্মাদ হওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।
মানুষ তার সহজাত অভ্যাস এবং চিরায়ত মনমানসিকতার জন্য সব সময় সর্বোচ্চ সংখ্যক ভোগের সামগ্রী পেতে চায়। কিন্তু বিনিময়ে পরিশ্রম, দায়িত্ব গ্রহণ, ত্যাগ স্বীকার, সাধনা করতে রাজি নয়। এ জন্য দুনিয়ার নেয়ামত খুব অল্প লোকের পক্ষেই অর্জন করা সম্ভব হয়। এই দুনিয়ার তাবৎ লোক জীবনযুদ্ধের মাঠে না গিয়ে কিংবা জীবনযুদ্ধের ঝক্কি-ঝামেলার ভয়ে বিকল্প পথে নেয়ামত লাভের চেষ্টা করে। ফলে হঠাৎ লক্ষ্য করা যায় সমাজে কর্মবীরের তুলনায় জান্নাতলোভীর সংখ্যা বেড়ে যায়। সমাজে যদি গণ্ডগোল, হানাহানি, মারামারি বেশি হয় তাহলে সঙ্গত কারণেই কাজের পরিবেশ নষ্ট হয়ে যায়। জীবিকার পথ রুদ্ধ হলে মানুষ জীবনসংগ্রামে অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে। ক্লান্ত-বিধ্বস্ত মানুষ তখন বেঁচে থাকার পরিবর্তে শয়নে-স্বপনে মৃত্যু কামনা করে। কিন্তু তারা মরতে ভয় পায় দুটি কারণে।
প্রথমত, স্বাভাবিক মৃত্যু হলে তারা জান্নাতি হতে চায়। কিন্তু মানুষ তার কর্মকাণ্ডের কথা গভীরভাবে চিন্তা করলে জাহান্নাম ছাড়া অন্য কিছু দেখতে পায় না। দ্বিতীয়ত, স্বাভাবিক মৃত্যুর বাইরে মরার জন্য একটি উপায় হলো আত্দহত্যা। কিন্তু এক্ষেত্রেও ভয়ানক দুটি বিপত্তি রয়েছে। প্রথমটি হলো- সাহস এবং দুনিয়ার মায়া-মমতা, প্রেম-ভালোবাসা এবং আকর্ষণ ত্যাগ করা যা কিনা বেশির ভাগ লোকেরই থাকবে না। আত্দহত্যা নিঃসন্দেহে একটি ভয়াবহ দুঃসাহসিক ঘটনা। যেনতেন লোক এ কাজ করতে পারে না। দ্বিতীয়টি হলো- জাহান্নামের ভয়। আত্দহত্যা করলে নির্ঘাত জাহান্নামে যেতে হবে এই ভয়ে লোকজন ওমুখো হয় না। কাজেই মানুষ তখন বিকল্প পথে সহজে মরার রাস্তা খোঁজে যে রাস্তার শেষ প্রান্তে জাহান্নামের পরিবর্তে জান্নাতের স্বপ্ন থাকে। জীবনযুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত মানুষ ছাড়াও অলস-ভীরু এবং পরিশ্রমে অনীহা রয়েছে তখন সব নর-নারীও কিন্তু বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যেতে বেশি আগ্রহ প্রকাশ করে।
এবার শিরোনাম প্রসঙ্গে আসি। জীবন মৃত্যু-দুনিয়া আখেরাতের চিন্তা করতে গিয়ে আমার বার বার জান্নাতের নানাবিধ আকর্ষণীয় নেয়ামতের কথা মনে আসছিল। আর এসব আমি চিন্তা করছিলাম সাম্প্রতিককালে ঘটমান বাংলাদেশের সর্বনিকৃষ্ট সন্ত্রাস, মারামারি-হানাহানি, অর্থনৈতিক বিপর্যয়, সামাজিক ও পারিবারিক অসন্তোষ ও অনিশ্চয়তার কারণে। এ অবস্থা যদি চলতে থাকে তবে বাংলাদেশের খুব কমসংখ্যক মানুষই বেঁচে থেকে জীবনযুদ্ধে অংশগ্রহণের কর্মপ্রেরণা দ্বারা পরিচালিত হবে। তারা হুটহাট করে ভবলীলা সাঙ্গ করে সরাসরি জান্নাতে ঢুকে হুর এবং দুধ-মধুর স্বাদ গ্রহণের জন্য সংক্ষিপ্ত পথ খুঁজবে। কিছু লোক তো সারা দুনিয়ায় সর্বকালেই ছিল- যারা মানুষের এ মানবিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে গড়ে তুলতে পেরেছিল আইএস, আল-কায়েদা এবং বোকো হারামের মতো সংগঠন। বাংলাদেশের সমাজবিজ্ঞানী এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের উচিত অতি দ্রুত দেশের চলমান অবস্থার অবসানকল্পে বিকল্প পথের সন্ধান করে তা জাতির সামনে তুলে ধরা। অন্যথায় আমরা হয়তো আফগানিস্তান, সিরিয়া কিংবা নাইজেরিয়ার মতো দুর্ভাগা জাতিতে পরিণত হবো। আর সবাই মিলে কপাল চাপড়ালেও লাভ হবে না।
লেখক : কলামিস্ট

দম্ভ ও জেদের কাছে সমঝোতার সম্ভাবনা বিলুপ্ত by নূরে আলম সিদ্দিকী

দেশের জাগ্রত জনতা, বিবেকতাড়িত সবাই আজ সমঝোতার প্রত্যাশায় তৃষিত চাতকের মতো 'দুই নেত্রী'র দিকে চেয়ে আছে। এই প্রশ্নে আমি বার বার বলেছি যে, বাংলাদেশ আজ এতটাই আতঙ্কের গভীরে নিমজ্জিত সামাজিক বিপর্যয় এমনকি সোমালিয়ার মতো (আল্লাহ না করুক) গৃহযুদ্ধের দিকে ধাবিত হতে পারে। পৃথিবীর আরেকটি দেশের নাম অন্তত আমার জানা নেই, যেখানে রাজনৈতিক আদর্শ, মতের ভিন্নতাকে সহ্য না করার এই অসহিষ্ণু প্রতিহিংসাপরায়ণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিরাজমান। গণতন্ত্রের প্রতিশব্দই হচ্ছে সহনশীলতা। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সর্বত্রই ভিন্ন ভিন্ন মত ছিল, আছে এবং থাকবেই। পৃথিবীর বহু দেশ গণতন্ত্রের ভিন্ন মাত্রায় পৌঁছে গেছে। রাজনৈতিক সংগঠন তো দূরে থাক- প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা এমনকি জনগণ পর্যন্ত একটি আদর্শকেন্দ্রিক মননশীলতার প্রত্যয় ও প্রতীতির আঙ্গিকে এমন স্তরে পৌঁছে গেছে যে, সেখানে গণতন্ত্র সত্যিকার অর্থে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। সেসব দেশেও রাজনীতিকরা মিশনারি নন। সেখানেও ক্ষমতার প্রত্যাশা আছে, ক্ষমতার জন্যই রাজনীতি এটা স্বাভাবিক বাস্তবতা। আমেরিকার সাবেক রাষ্ট্রপতি জন এফ কেনেডি একটা ঐতিহাসিক উক্তি করেছিলেন- 'রাষ্ট্র কী দিল তা না ভেবে রাষ্ট্রকে কি দিলাম সেটি ভাবাই শ্রেয়।' এটা কৌতুক নয় বাস্তব। সেটাও তিনি রাষ্ট্রপতি হয়েই বলেছিলেন। রাজনীতি ও রাজনৈতিক সংগঠন আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম নয়। বরং ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে দলীয় কর্মসূচি অনুসরণ করে দেশের জন্য কাজ করবেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ক্ষমতা এবং একমাত্র ক্ষমতা ছাড়া অন্য কোনো বিষয় লক্ষ্যবস্তু হবে না। জনগণের আতঙ্ক, উৎকণ্ঠা, আশঙ্কা, মননশীলতাকে কোনো বিবেচনায় নেওয়া হবে না। দেশ জাহান্নামে যাক, অর্থনীতি লণ্ডভণ্ড হয়ে যাক, শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাক- এই বাস্তবতাকে বিবেচনায় আনবেন না- এটা কল্পনাতীত। এই বাস্তবতায় আনলে রাজনীতির আঙ্গিকটাই বদলে যেত। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটিই নির্মম ও নিষ্ঠুর বাস্তবতা। পদ্মপত্রে এক ফোঁটা শিশির মুক্তার মতো জ্বলজ্বল করে। পত্রপল্লবে শোভিত সেই শিশির বিন্দুটি সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাসে নয়, স্নিগ্ধ সমীরণে টস করে ঝরে পড়ে। এটি বিবেচনায় আনলে রাজনীতির আঙ্গিকটাই বদলে যেত। গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেত। দেশটি কোনো অবস্থায়ই সামাজিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতো না। ছিন্নমূল খেটে-খাওয়া মানুষ থেকে শুরু করে সমাজের সর্বস্তরের বিশেষ করে ব্যবসায়ী মহল নিঃস্ব ও রিক্ত হতে চলেছে। তাদের হৃদয়ের দগদগে ঘা-টি তেমনভাবে রাজনীতিকদের দৃষ্টিগ্রাহ্য হচ্ছে না। বার্ন ইউনিটে দগ্ধীভূত মানবতার আর্তনাদ শুধু আমরাই নই, সারা বিশ্ব অবহিত এবং উৎকণ্ঠিত। শুধু বেগম খালেদা জিয়া একটা বিবৃতি দিয়ে সমবেদনা পর্যন্ত প্রকাশ করেননি। ওদেরকে দেখতে যাওয়া তো দূরে থাক, ওদের চিকিৎসার জন্য একটি পয়সা দিয়েও সহমর্মিতা প্রকাশ করেননি। এই হীনম্মন্যতা কোনো মানুষেরই বোধগম্য নয়। ডেইলি স্টারের সম্পাদক একটি নিবন্ধে খালেদা জিয়ার এই মানসিকতা ও কার্যাবলীর প্রতি নিন্দা প্রকাশ করে একটি যৌক্তিক মন্তব্য করেছেন- এই অবস্থায় খালেদা জিয়া ক্ষমতায় থাকলে অবস্থাটা আরও বীভৎস হতো।
অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে এই মন্তব্যের বিরোধিতা করার যুক্তি কারও কাছে আছে বলে আমার মনে হয় না। কোনো সভ্য দেশে টানা প্রায় দুই মাস ধরে লাগাতার অবরোধ আর মাঝে মাঝে হরতাল চলতে পারে না। এ প্রশ্নে খালেদা জিয়ার প্রতি দেশবাসীর অভিব্যক্তি থেকে সাংগঠনিকভাবে বিএনপির দেউলিয়াত্ব আজ স্পষ্ট। তার ছত্রছায়ায় সন্ত্রাসী ও জঙ্গিরা যে বীভৎসতা চালিয়ে যাচ্ছে সেটি মুক্তিযুদ্ধকালীন পৈশাচিক শক্তির বীভৎসতাকেও হার মানায়। বাচ্চাদের পরীক্ষা, কৃষকের আর্তনাদ, সমগ্র জাতির বুক-চাপা ক্রন্দন- কিছুই তার কর্ণকুহরে প্রবেশ করছে না। অন্যদিকে জাতিসংঘও সমস্যা সমাধানে ক্ষমতাসীন শীর্ষ নেতৃত্বের যে নৈতিক দায়িত্ব- ক্ষমতার দাম্ভিকতায় তা তারা পরিপূর্ণ বিস্মৃত। ভিয়েতনাম যুদ্ধ আলোচনার টেবিলে সমাধান হতে পারে, যে কোনো জাতীয় সমস্যায় বিশ্বের যে কোনো দেশ এমনকি পার্শ্ববর্তী ভারতেও আমরা দেখি- যে কোনো সমস্যায় সর্বদলীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু বাংলাদেশে শীর্ষ নেতৃত্বকে বন্দনা করার জন্য যে নির্লজ্জ প্রতিযোগিতা তা পরিস্থিতিকে আরও জটিলতর করে তুলছে। ক্ষমতাসীনদের কাছে আমার প্রশ্ন, ঘরে আবদ্ধ বিড়াল মারতে চান, না বের করতে চান? যদি বধ করতে চান তবে সে তো মরণ থাবা দেবেই। আর বের করতে চাইলে প্রস্থানের একটা পথ তো খোলা রাখতে হবে। বিষয়টি যত শিগগির বুঝবেন- যদি অনুধাবন করতে পারেন তাহলেই জাতি এই দুর্বিষহ পরিবেশ থেকে নিষ্কৃতি পেতে পারে।
এ কথা অনস্বীকার্য যে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনটি বাংলাদেশের আপামর জনগণ ও বিশ্বজনমতের কাছে প্রতিনিধিত্বশীল নির্বাচন হিসেবে স্বীকৃত হয়নি। উপরন্তু ১৫৩ জনের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টি গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো। আমি বিস্ময়াভিভূত হয়ে, আশ্চর্যান্বিত হয়ে নিজের মনকে প্রশ্ন করি, এত কিছু আটঘাট বাঁধার পরও শেখ হাসিনা কি তবে সরকার গঠনের ব্যাপারে নিঃসংশয়চিত্ত ছিলেন না? তা না হলে এই নির্বুদ্ধিতা প্রদর্শন করলেন তিনি কোন যুক্তিতে এবং কাদের পরামর্শে? এবং আজকে প্রশাসনের সর্বস্তর থেকে উচ্চকিত কণ্ঠে যারা বার বার বলছেন ২০১৯ সালের আগে কোনো নির্বাচন বা আলোচনা হবে না। অথচ নির্বাচনের আগে বলা হয়েছিল, শাসনতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য নির্বাচন। নির্বাচনের পরে জাতীয়ভাবে আলোচনার মধ্য দিয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্তসমূহ গৃহীত হবে।
সেটিই ছিল প্রাসঙ্গিক, সঙ্গত ও যৌক্তিক। অনর্থক ও অকারণে এই পরিস্থিতিটি হয়তো সৃষ্টি করা হলো। আমার দগ্ধীভূত হৃদয়ে প্রশ্ন জাগ্রত হয়- ৫ জানুয়ারির সভাটি করতে দিলে উদ্ভূত পরিস্থিতিটি সৃষ্টি হতো না। আমি পুনরুল্লেখ করতে চাই- থাইল্যান্ডের লালশার্ট বা মিসরের ব্রাদারহুডের মতো সাংগঠনিক শক্তি যে বিএনপির নেই ২০১৩ সালের ২৯ ডিসেম্বরই তো সেটি সুস্পষ্ট প্রমাণিত। অন্যদিকে সভা-সমিতি, শোভাযাত্রা, বিরোধী দলের রাজনৈতিক তৎপরতা প্রকারান্তরে নিষিদ্ধ করলে পরিণতি উপসংহারে শুভ হয় না- এটা ঐতিহাসিকভাবেই প্রমাণিত। বিরোধী দলের পেট্রলবোমা, মানুষ হত্যা পৈশাচিক ও অমানবিক। এটা যে কোনো বিবেকবান মানুষ ঘৃণা করেন এটা যেমন সত্য, তেমনি ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়টুকু বাদ দিলে পাকিস্তান আমাদের বঙ্গবন্ধুসহ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কিছু নেতৃস্থানীয় মানুষকে হত্যা বা গুম করলে অবস্থাটা কী দাঁড়াত। সামরিক শাসন থাকা অবস্থায়ও '৭০-এর নির্বাচনে নিরঙ্কুশ রায়টি আমরা যদি অর্জন করতে না পারতাম তাহলে রক্তস্নাত মুক্তিযুদ্ধের অন্তর্নিহিত শক্তির উৎসটি আসত কেমন করে। আমি দলকানা নই, রাজনীতির জটিল বিদ্যাও আমার অজানা। তবে ৬০ দশকের প্রারম্ভ থেকে আজ পর্যন্ত ৫০ বছরেরও বেশি সময়ের অভিজ্ঞতায় আমি বলতে পারি, রাজনীতিতে ক্ষমতার দম্ভ, সন্ত্রাস ও জীবনঘাতী রাজনৈতিক কার্যকলাপ অচলাবস্থা সৃষ্টি করে। সামাজিক বিপর্যয়কে অবশ্যম্ভাবী করে তোলে এমনকি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে অনভিপ্রেত সংকটের মুখে ফেলে দেয়। আজকের প্রেক্ষাপট পাশ্চাত্যের গণতান্ত্রিক দেশগুলোর কথা বাদ দিলেও পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে হলেও রাজনৈতিক গোলটেবিল বসত। আলোচনা-পর্যালোচনার মধ্যে জয়পরাজয়ের বিষয় থাকে না বরং তাতে সমস্যা সমাধানের একটি রাস্তা তৈরি হতে পারে। এই উদ্যোগ নেওয়ার নৈতিক দায়িত্ব অবশ্যই ক্ষমতাসীনদের।
যদি সংলাপ হয়, কোনোভাবে যদি একটি সমঝোতা হয়, সেই সংলাপ বা সেই সমঝোতার উদ্দেশ্য যেন অবশ্যই গণতন্ত্র হয়। হামাস ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে যদি আলোচনা হতে পারে, মিয়ানমারে সু চি'র সঙ্গে সে দেশের সামরিক জান্তার আলোচনা হতে পারে, তবে আমাদের কেন নয়। বাংলাদেশে বর্তমানে যারা সুশীল সমাজের প্রতিনিধিত্ব করছেন বা প্রতিনিধি হিসেবে নিজেদের দাবি করছেন- তারা প্রায় সবাই কোনো না কোনো এনজিও কর্মকর্তা বা আধিকারিক। এদের একটি বিরাট অংশ দারিদ্র্যের বেচাকেনা করেন। প্রায় ক্ষেত্রে তারা দেশে কখনো রহস্যজনক, আবার কখনো সমঝোতার উদ্যোগ নেন বটে কিন্তু ক্ষেত্রবিশেষে এই সংকটময় মুহূর্তেও দেশের বিরুদ্ধে কথা বলে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা আদায় করে থাকেন। অবশ্য ড. ইউনূসকে আমি এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম মনে করি। কিছু কিছু এনজিও প্রতিষ্ঠানের এই দ্বিমুখী আচরণ সমস্যা সমাধানের সহায়ক তো হয়ই না বরং উভয় পক্ষকে উসকে দিয়ে সংঘাতময় পরিস্থিতির অনুপ্রেরক হিসেবে কাজ করে।
নূরে আলম সিদ্দিকী
২০০৮ সালে যিনি প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন তিনিও আজ গালভরা কথা বলছেন। মনে হয় যেন ২০০৮-এর নির্বাচনের পটভূমি তিনি সম্পূর্ণ বিস্মৃত। বিএনপিকে ২৮টি আসন দিয়ে বিদায় করায় তার সূক্ষ্ম কৌশলী পদক্ষেপ জাতি যে বিস্মৃত নয় সেটি তিনি অনুধাবন করছেন না। তা সত্ত্বেও বিএনপি তার মধ্যস্থতার প্রস্তাবে সম্মতি প্রকাশ করেছিল। কিন্তু শেখ হাসিনা তার উদ্যোগকে আমলে নেননি। অন্যদিকে শেখ হাসিনা প্রায়ই ওয়ান-ইলেভেনের কঠোর সমালোচনা করেন। মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীনদের নিয়ে পরিহাস করেন, বিষোদগার করেন। তিনি কি একবারও মনে করেন না ২০০৬ সালের ২২ জানুয়ারি নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হলে ২০০৮-এ বিএনপির যে পরিণতি হয়েছিল তাকেও সেই একই পরিণতি ভোগ করতে হতো? এবং আজকেও দিশাহারা অনিশ্চিত সমুদ্রের স্রোতধারায় নৌকায় বসে খালেদা জিয়ার পরিণতি ভোগ করতে হতো। আজকের অবস্থা অবলোকন করে আমার মনে হয় রাজনীতি মানুষের কাছে আজ কোনো আবেদন রাখে না। যারা একদিন কামানের গোলার সামনে বুক চিতিয়ে দিয়েছে তারাই আজ নির্বাক, নিস্পৃহ। তাদের কাছে হাসিনা-খালেদা মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ। এই দুই মহিলা ক্ষমতাসীন হওয়ার আগে অকুতোভয় জনতা পথে নেমেছিল। নূর হোসেন, ডা. মিলনরা গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা চেয়েছিল। তাদের সেই আত্দত্যাগ নির্মমভাবে শুধু ব্যর্থই হয়নি, স্বৈরাচার আরও পাকাপোক্ত হয়েছে। দুই নেত্রীর অসহিষ্ণু প্রতিহিংসাপরায়ণতায় দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব আজ হুমকির সম্মুখীন। একমাত্র আল্লাহতায়ালাই এই যুগসন্ধিক্ষণে তার অপরিসীম করুণা দিয়ে এই নিমজ্জিত জাতিটাকে রক্ষা করতে পারেন। আমি নিজেও সেই ফরিয়াদ করি এবং দেশবাসীর কাছে সেই ফরিয়াদ করার জন্য আকুল নিবেদন জানাই।
লেখক : স্বাধীন বাংলা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের অন্যতম নেতা।