Friday, October 15, 2010

আবার এল পুজো by মৃত্যুঞ্জয় রায়

আসি আসি করেও শরৎ আসছে না। কদিন আগেও আশ্বিনে চৈত্রের দাবদাহ। এরপর বৃষ্টিপাতে সারা দেশের জনজীবন বিপর্যস্ত, জলোচ্ছ্বাসে উপকূল লন্ডভন্ড। বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে তলিয়ে গেছে অনেক গ্রাম, মাঠের ফসল। সেসব গ্রামের মানুষদের মনে আনন্দ নেই। তাদের দুর্গতির শেষ নেই। ঝড়ে ঘরচাপা পড়ে, পানিতে ডুবে ও বজ্রপাতে ভোলা, বরগুনা, কক্সবাজার ও বাগেরহাটে কমপক্ষে ১৫ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। শরতে তো এমনটা হওয়ার কথা নয়।
শরৎ এক পুলক-জাগানো ঋতু। বর্ষার জল-কাদার পর শরৎ এ দেশে যেন এক আনন্দ-জাগানিয়া ক্ষণ। বাংলার শরৎ মানে চারদিকে শিউলি-টগর ফোটা; বিলের ধারে, খালের পাড়ে, নদীর কোলে রাশি রাশি কাশফুল ফোটা; শরৎ মানে নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা ভেসে বেড়ানো; দিগন্তবিস্তৃত সবুজ-শ্যামল ধানখেতের বুকে ভোরের পাতলা কুয়াশা নামা—এর পরই ঝলমলে সোনারোদে দিনটা উজ্জ্বল হয়ে ওঠা। কিন্তু সেসব কই? তবে শরৎ তার চিরাচরিত রূপের ডালা সাজিয়ে না এলেও এসেছে কাশফুল, এসেছে শিউলি। সেই সঙ্গে আসছেন দেবী দুর্গা। হাজারো কষ্টের মধ্যে বাঙালিদের মনে তাই একটি আনন্দক্ষণের প্রতীক্ষা, দেবীকে আবাহনের অপেক্ষা। তিনি সবার মনকে আনন্দে ভরিয়ে দেন। তাই তো তিনি আনন্দময়ী, তিনি সবার দুর্গতি নাশ করেন। তাই তো তিনি দুর্গা। তিনি বিনাশ করেছেন দুর্গ নামে এক অবিনশ্বর দৈত্যকে, এ থেকেই তাঁর নাম হয় দুর্গা। যিনি দুর্গা, তিনিই পার্বতী, তিনিই উমা। এ রকম ১০৮টি বিশেষণ নামে তিনি বিভূষিতা। এ জন্যই কিনা জানি না, শ্রীরামচন্দ্র ১০৮টি নীলপদ্ম দিয়ে অকালে দেবীর পূজা করেছিলেন। সে জন্য এ পূজার আরেক নাম অকালবোধন। আমরা শ্রীরামচন্দ্রের সেই অকালকেই কাল ধরে এখনো দেবী দুর্গার পূজা করে আসছি। আর কালের দুর্গাপূজা হয়ে গেছে এখন বাসন্তীপূজা।
একটি বছর পর মা তাঁর সন্তান-সন্ততিদের নিয়ে পিত্রালয়ে বেড়াতে আসেন পাঁচটি দিনের জন্য। তাই তো তাঁর আগমনকে স্বাগত জানাতে, তাঁকে নিয়ে পাঁচটি দিন আনন্দে মাতোয়ারা হতে বাঙালির এত উচ্ছ্বাস, আয়োজন শারদীয় দুর্গোৎসবের। তাঁর আগমনে বাঙালিদের মনে আনন্দ জাগে। সাগরিকা শর্মার ‘দেবী আসছেন’ কবিতায় দেখতে পাই মর্ত্যলোকে দেবীর আগমনের এক শাশ্বত চিত্র—
শিউলি গাছগুলোতে রাশি রাশি ফুল
গাছের নীচেও অজস্র ছড়িয়ে।
কার চরণকমলে ওরা অঞ্জলি হতে চায়?
ভোরের স্নিগ্ধতায় ভৈরবী গান
স্থলপদ্মগুলি হাওয়ায় দুলছে
ওরা যেন কার চরণছন্দ শুনতে উন্মুখ
কাশফুলগুলি আনন্দে টলমল
ওরা জানে আসছেন
শারদীয়া দেবী।
সব অপশক্তি ও শত্রু বা অসুরের বিরুদ্ধে বিজয়ের জন্য সব দেবাদিদেবের পুঞ্জীভূত তেজ থেকে জন্ম হয় দেবী দুর্গার। তাঁর দশটি হাত দশটি দিক ও দশপ্রহর ধারণের প্রতীক। ‘কুমারসম্ভব’ কাব্যের প্রথম সর্গে কবি কালিদাস চমৎকারভাবে বর্ণনা করেছেন দেবীর জন্মদিন। কবি বর্ণনা করেছেন, দক্ষরাজ কন্যা সতী সবার সামনে যজ্ঞস্থলে দেহত্যাগ করার পর জন্ম নেন হিমালয়রাজ ও তাঁর স্ত্রী মেনকার মেয়ে হয়ে। কৈলাসের সেই আদুরে মেয়েই পরবর্তীকালে মোষের ছদ্মবেশধারী এক প্রবল পরাক্রমশালী অসুর নিধনের জন্য হয়ে ওঠেন দেবী দুর্গা।
বৈদিক যুগে যজ্ঞাগ্নিতে দেবীর পূজা করা হতো। তখন যজ্ঞকুণ্ডের নাম ছিল ‘দক্ষ-তনা’, যা থেকে পরে দেবীর এক নাম হয়েছে দক্ষ-তনয়া। যজ্ঞকুণ্ডে অগ্নি রাখা হতো এবং কুণ্ড অগ্নিকে আলিঙ্গন করত বলে বৈদিকোত্তর যুগে ধারণা করা হতো, দুর্গার পতি মহাদেব। মহাদেব শিবই আসলে বেদে উল্লিখিত অগ্নি বা রুদ্রদেব। পরবর্তী সময়ে যজ্ঞকুণ্ড বা যজ্ঞবেদি থেকে দেবী দুর্গার পুজো শুরু হয় ঘটে, এরপর পটে। দীর্ঘদিন ধরে কোনো প্রতিমা বা মূর্তি না গড়ে তাঁর স্বরূপ কল্পনা করে এই ঘটে-পটে পূজাই চলে এসেছে।
স্বামী বিবেকানন্দ লিখেছিলেন, ‘দশপ্রহরধারিণী মায়ের মৃন্ময়ী মূর্তি মঠে এনেছিলাম। তাঁর এক চরণ সিংহপরি অপরখানি অসুরের উপর। মায়ের দুপাশে তাঁর দুই কন্যা, ধন-ঐশ্বর্যের দেবী লক্ষ্মী এবং বিদ্যা-সঙ্গীতের দেবী সরস্বতী—তাঁরা কমলদলের ওপর দণ্ডায়মান। তাঁর দুদিকে দুই পুত্র—যুদ্ধ দেবতা কার্তিক এবং জ্ঞানের দেবতা গণেশ।... হাজার হাজার ভক্ত আনন্দ করেছিল।’
যত দূর জানা যায়, বাংলাদেশে দুর্গাপূজা শুরু করেন বরেন্দ্র ব্রাহ্মণ বংশীয় রাজশাহীর তাহেরপুরের জমিদার কংসনারায়ণ। তিনি সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহের (১৪৯৩—১৫১৯) সমসাময়িক ছিলেন। শোনা যায়, সে পূজায় তিনি সেই আমলে আট লাখ (মতান্তরে সাড়ে আট লাখ) টাকা খরচ করেছিলেন। ওই আনন্দধারা সেই আমল থেকে এখনো বাংলাদেশে প্রবহমান, খরচের ধারাটিও। তবু আমরা দেবীর আগমনকে স্বাগত জানাই, প্রণাম জানাই তাঁকে তাঁর আসার ক্ষণে—
নমঃ দেব্যৈ মহাদেব্যৈ শিবায়ৈ সততং নমঃ
নমঃ প্রকৃত্যৈ ভদ্রায়ৈ নিয়তাঃ প্রণতাঃ স্ম তাম্\
(অর্থ: দেবীকে, মহাদেবীকে প্রণাম। সতত মঙ্গলদায়িনীকে প্রণাম। সৃষ্টিশক্তিরূপিণী প্রকৃতিকে প্রণাম। স্থিতিশক্তিরূপিণী ভদ্রাকে প্রণাম। আমরা সমাহিত চিত্তে তাঁকে বারবার প্রণাম করি।)

উদ্ধারকাজ: খালের ও খনির by সৈয়দ আবুল মকসুদ

দুটি উদ্ধারকাজ দেখলাম গত কয়েক দিনে। একটি বাংলার মাটিতে। মাটিতে বললে ভুল হবে—বাংলার পানিতে। আরেকটি চিলিতে। চিলির মাটিতেও নয়—মাটির নিচে। সোনা ও তামার খনিতে। একেবারে পাতালে। মাটির ওপর থেকে আধা কিলোমিটারেরও বেশি নিচে।
বাংলার মাটির উদ্ধারকাজটি আমাদের চ্যানেলগুলোয় দেখেছি। চিলির পাতালে আটকে পড়া শ্রমিকদের উদ্ধারকাজ দেখেছি বিবিসিতে। তারা সরাসরি সম্প্রচার করেছে।
সালেহপুর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে তুরাগ নদ। শীর্ণ তুরাগও নয়, তুরাগের একটি শাখাবিশেষ। কিন্তু টিভি চ্যানেলের সংবাদকর্মীদের সামনে মুখে খইফোটা আমাদের কর্মকর্তাদের বাচনে জানা গেল, তুরাগের শাখাটিই পৃথিবীর সবচেয়ে খরস্রোতা নদী। উত্তাল তার স্রোত। তুরাগের তুফানের কাছে আমাজান, আমু দরিয়া, হোয়াংহো তুচ্ছ। তুরাগের তরঙ্গের সামনে ম্লান হয়ে গেল আমাদের সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, ফায়ার ব্রিগেড, র‌্যাব, পুলিশ প্রভৃতি বাহিনীর কর্মকর্তাদের প্রতিভা। একটি হতভাগ্য বাস এবং হতভাগ্যতর প্রাণহীন যাত্রীদের দেহ পড়ে রইল পানিতে, ডাঙায় দাঁড়িয়ে শুধু পানির দিকে তাকিয়ে রইল হাজার হাজার কৌতূহলী মানুষ। যাঁদের মধ্যে ছিলেন হতভাগ্যদের প্রিয়জনেরাও।
সালেহপুর সেতুতে যা ঘটেছে, তা কোনো দুর্ঘটনা নয়—একটি রোমাঞ্চকর দুঃসাহসিক অভিযান। কোনো রকমে আমরা বাসের বডি বানাতে শিখেছি, ইঞ্জিন বানাতে পারি না। পারলে এমন শক্তিসম্পন্ন ইঞ্জিন বানাতাম, যার গতি হতো ঘণ্টায় ৫০০ কিলোমিটার। আমরা বীরের জাতি। তাই কম গতির বাস চালকের পছন্দ নয়। অন্যের পেছনে যাওয়াও কোনো বীরের জাতির পক্ষে সম্ভব নয়। সামনের চাকা পাংচার হলো তো কী! তবুও আরেক বাসকে অতিক্রম করতে হবে। তা করতে গিয়ে ব্রিজের ওপর থেকে যদি চালককে ৫০ জন যাত্রী নিয়ে বাসটিসহ ৪০ ফুট পানিতে লাফিয়ে পড়তে হয়, তাতে দোষ কী?
তাই সালেহপুরের ঘটনাকে দুর্ঘটনা বলে না। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আমাদের মেয়ে মনোয়ারা খাতুন তারা বাসের ভেতর থেকে নিজের শক্তিতে বেরিয়ে এসেও বাঁচতে পারল না। হয়তো সে ওই বাসের যাত্রী না হলেও এই সমাজে বাঁচতে পারত না। কোনো লম্পটের লালসার শিকার হয়ে একদিন ওকে আত্মহননের পথ বেছে নিতে হতো। পানিতে হোক, ডাঙায় হোক—এ সমাজে নারী ও দুর্বল বাঁচতে পারে না।
অন্যদিকে বাঁচার অদম্য আকাঙ্ক্ষা দেখেছি চিলির মানুষের মধ্যে। অবশ্য সালেহপুর খাল থেকে সান হোসে খনি অনেক দূর। সান হোসে খনিতে ৩৩ জন শ্রমিক ৭০ দিন ধরে আটকে ছিলেন—শ্বাসরুদ্ধকর ঘটনা। বিশ্বব্যাপী মানুষ উদ্বেগে। আমাদের বড়পুকুরিয়ায় হলে অনেক আগেই হতভাগ্যদের চেহলাম অথবা আদ্যশ্রাদ্ধ করে ফেলতে হতো। জ্বালানিমন্ত্রী ও উপদেষ্টা শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সান্ত্বনা দিয়ে বাণী দিতেন। ৩৩ জনের বিনা খরচায় শেষকৃত্য হয়ে যেত।
প্রশান্ত মহাসাগরের কোলে লাঠির মতো লম্বা দেশ চিলি। কোনো সাংঘাতিক উন্নত দেশ নয়। তার অতীত ও বর্তমান রাজনৈতিক ইতিহাস আমাদের মতোই বেদনাদায়ক। বাঙালি কবি-সাহিত্যিকদের কাছে পাবলো নেরুদার দেশ বলেই পরিচিত চিলি। চিলির সংবাদ সংস্থার সাবেক সম্পাদক ইউজেনিও অবলিতাজ আমার বন্ধু। হামবুর্গ ও বার্লিনে আমরা পাশাপাশি কামরায় অনেক দিন ছিলাম। তখন মার্কসবাদী সালভাদর আলেন্দেকে সরিয়ে অগাস্টো পিনোশে ক্ষমতা দখল করেছেন। অবলিতাজ ছিলেন পিনোশের মানুষ। ওর সঙ্গে কথা বলে বুঝতাম, নানা রকম গাভির একই রকম দুধ, জগৎ ঘুরে দেখা যাবে সব দেশের মধ্যশ্রেণীই একই রকম সুবিধাবাদী। তা সত্ত্বেও স্প্যানিশভাষী চিলির মানুষ স্বাজাত্যবোধে বাংলাদেশের মানুষের চেয়ে অগ্রসর।
আমি যখন লেখাটি লিখছি, আমার সামনে টেলিভিশন খোলা। দেখছি শ্বাসরুদ্ধকর উদ্ধারকাজ। উদ্ধারকর্মীদের নৈপুণ্য ও দক্ষতা। বহুদিন ধরে তৈরি করা ৬২৫ মিটার দৈর্ঘ্যের সুড়ঙ্গ দিয়ে ২১ বর্গ ইঞ্চি একটি ক্যাপসুল চলে যাচ্ছে আটকে পড়া শ্রমিকদের কাছে। ঝুঁকিপূর্ণ লিফটে চড়ে প্রথম যিনি উঠে এলেন, তাঁর নাম ফ্লোরেনসিও আভাতোজ। বয়স ৩১। ৭০ দিন পর দুনিয়ার আলো দেখলেন। সুড়ঙ্গের মুখের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল তাঁর ছয়-সাত বছরের ছেলে ও স্ত্রী মনিকা। এত দিন পর বাবাকে দেখে ছেলেটি ভীষণভাবে কাঁদতে লাগল। পৃথিবীর যেকোনো নারীর মতো মনিকার আবেগও একই রকম। দ্বিতীয় যে শ্রমিককে তোলা হলো, তাঁর নাম মারিও সেপালভেদা।
৩৩ জনের মধ্যে একজন বলিভিয়ার নাগরিক। সে জন্য উদ্ধারকাজ দেখতে ছুটে এসেছেন বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেস। আভাতোজ উঠে আসার পর সংযত ভাষণ দিলেন চিলির প্রেসিডেন্ট সেবাস্তিয়ান পিনেরা। নিজের কৃতিত্বের জন্য বড়াই করেননি। কথা বললেন বহুবচনে: ‘আমরা’।
চিলির চেয়ে আমরা চৌদ্দ গুণ বেশি মানুষ। উত্তাল তুফানের কারণে কচুরিপানা ভাসা খালের মধ্যে একটি বাস শনাক্ত করে তুলতে লাগল ৫৪ ঘণ্টা। ৩৯ বছরে সরকারি কোনো ক্ষেত্রে আমরা দক্ষ জনশক্তি ও বিশেষজ্ঞ তৈরি করতে পারিনি। অথচ সব বিভাগে মানুষ গিজ গিজ করছে। বেতনভাতা দিয়ে পোষা হচ্ছে। মানি আমাদের কোনো প্রবলেম নয়। চাপিয়ে দেওয়া বৈদেশিক ঋণের টাকা বারোআনা খেয়ে ফেলেছি। বাকিটুকু দিয়ে কিনেছি অদরকারি ভোগ্যপণ্য, চেয়ার-টেবিল প্রভৃতি। কর্তাদের বিশাল চেয়ারখানির পেছনে বড় তোয়ালে মেলে দিয়েছি। চেয়ারের পেছনেই কোট-টাই ঝুলিয়ে রাখার স্ট্যান্ড বা আলনা দিয়েছি। মাথার চুল ঘন ঘন আঁচড়ানের জন্য দেয়ালে ঝুলিয়ে দিয়েছি আয়না। লাঞ্চ করার জন্য পার্টিশন দিয়ে ঘের দিয়েছি। দুপুরের পরে ভাতঘুমের জন্য কোনো কোনো আমলার ঘরে আছে বিশাল ইজি চেয়ার। ২০০১ থেকে অজুর বদনাও প্রত্যেকের ঘরে দেওয়া হয়েছে। বদনা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পোয়াবারো। বাড়ি এবং গাড়ির কথা বলা নিষ্প্রয়োজন। একটি মাঝারি দুর্ঘটনার উদ্ধারকাজ চালানোর যন্ত্র আমাদের নেই।
সালেহপুরের হতভাগ্যদের জন্য শোক প্রকাশ করা ছাড়া করার কিছুই নেই। চিলির সান হোসের খনির পাতাল থেকে উদ্ধার করা শ্রমিকদের জন্য আমাদের গভীর আনন্দ। সুদক্ষ উদ্ধারকারীদের জানাই সশ্রদ্ধ অভিবাদন। চিলির সরকারকেও আমাদের অভিনন্দন।
সৈয়দ আবুল মকসুুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

উদীয়মান ভারতের তলার অন্ধকার by পঙ্কজ মিশ্র

গত ১ অক্টোবর বিকেলে উত্তর ভারতের সাধারণ স্থানগুলো ছিল পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য দিয়ে বোঝাই। হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয় ‘গোলযোগ সৃষ্টির’ অভিযোগে। মোবাইল ফোন থেকে গণখুদেবার্তা প্রেরণ নিষিদ্ধ করা হয়। দুই দিন পর কমনওয়েলথ গেমসের উদ্বোধনের সঙ্গে এসব সতর্কতামূলক ব্যবস্থার কোনো সম্পর্ক ছিল না। বহু ভারতীয় আশা করেছিল, এই আসরের মধ্য দিয়ে বিশ্বশক্তি হিসেবে ভারতের প্রতীকী আবির্ভাব ঘটবে।
আসলে সেদিন পুলিশ মোতায়েনের পেছনে কারণ অযোধ্যা শহরের একটি বিতর্কিত স্থান নিয়ে আদালতের রায় ঘোষণা। হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা স্থানটিকে রামের জন্মভূমি হিসেবে দাবি করে আসছে। এ ভূমিতে নির্মিত ষোড়শ শতাব্দীর একটি মসজিদ হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা ১৯৯২ সালে ভেঙে দিলে যে ভয়ানক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছিল, সরকার তার পুনরাবৃত্তি দেখতে চায়নি।
আদালতের রায়ে হিন্দুরা পেল দুই ভাগ, আর মুসলমানেরা পেল এক ভাগ। রায় ঘোষণার কিছুক্ষণ পর আমি হিমালয়ের পাদদেশে আমার বাড়ির কাছের একটি গ্রামের ভেতর দিয়ে হাঁটছিলাম। এ গ্রামটি অযোধ্যা থেকে ৬০০ মাইল দূরে। এখানেও গ্রামবাসীরা বেশ সতর্ক। মার্কেট অংশত বন্ধ। দোকানের ঝাঁপ ফেলে টেলিভিশনে ছিল দোকানিদের চোখ।
এই পাহাড়ি গ্রামে বাইরে থেকে আসা শ্রমিকেরাই শুধু তখনো কাজ করছিলেন। এঁরা মধ্য ভারত থেকে শত শত মাইল পেরিয়ে এখানে এসেছেন। পাহাড়ের পাদদেশের নির্মাণ-প্রকল্পগুলোয় ভারী পাথর মাথায় বয়ে নিয়ে যাচ্ছিল নারী, পুরুষ, এমনকি শিশুশ্রমিকেরাও। বাইরে থেকে আসা শ্রমিকদের সহজেই চেনা যায়। মা-বাবা ছোটখাটো হালকা-পাতলা গড়নের; রোগা ও শ্যামলা। তাঁদের শিশুদের পেট ফোলা, ময়লা পড়া বাদামি চুল। অপুষ্টির লক্ষণ স্পষ্ট। সারা দিন ধরে তাঁরা দিল্লির বিত্তশালীদের জন্য গ্রীষ্মকালীন আবাস নির্মাণ করেন, আর রাতে টিনের চালার নিচে গাদাগাদি করে বসবাস করেন।
শ্রমিকেরা আদালতের রায়ের কথা শোনেননি। আবহাওয়া যতই ঠান্ডা হতে থাকে, নিজেদের সুরক্ষার ভাবনা ততোই প্রধান হয়ে ওঠে। এই গ্রীষ্মের বৃষ্টিতে তাঁদের ঘরের চাল উড়ে গেছে। এসব শ্রমিক পশ্চিমা দেশে ভারতের ভাবমূর্তি নষ্ট হওয়া বিষয়ে নিস্পৃহ থাকবে, সেটাই সংগত মনে হয়।
তাহলে ধনী দেশগুলোর কাছে ভারতের ভাবমূর্তি নিয়ে কারা উদ্বিগ্ন? বিত্তশালী অল্পসংখ্যক অভিজাতেরা? গত কয়েক মাসে তাদের দুর্ভাবনার লম্বা তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন ছিল অযোধ্যা নিয়ে সহিংসতার আশঙ্কা। এমন ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, ‘আমরা নতুন ভারত রচনার যত চেষ্টাই করি না কেন...পুরোনো ভারত এখনো আমাদের লজ্জায় ফেলার ক্ষমতা রাখে।’
ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর উপত্যকায় গত জুন মাস থেকে গণবিদ্রোহ চলছে। ফিলিস্তিনিদের ইন্তিফাদার সঙ্গে এর মিল অনেক। সেখানে কঠোর কারফিউ উপেক্ষা করে, বিপুলসংখ্যক কাশ্মীরি মুসলমান ভারতীয় নিরাপত্তারক্ষীদের দ্বারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছে। বিক্ষোভে তরুণেরাই বেশি। বিক্ষোভকারীদের পাথর নিক্ষেপের জবাবে সেনারা গুলিবর্ষণ করেছে। গুলিতে নিহত হয়েছে শতাধিক কাশ্মীরি, যাদের বেশির ভাগই কিশোর। গুলিবর্ষণের ফলে আসবে জঙ্গিবাদীদের পাল্টা আঘাত, আর ফায়দা লুটবে পাকিস্তানের কট্টর ইসলামপন্থীরা।
মধ্য ভারতে পূর্ণমাত্রার বিদ্রোহ চলছে। মাও সে তুংয়ের রণকৌশলে উদ্বুদ্ধ গেরিলা যোদ্ধারা সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রস্তুত। তারা মনে করে, উপজাতীয় জনগণকে খনিজ-সমৃদ্ধ ভূমি থেকে বঞ্চিত করার ষড়যন্ত্রে বহুজাতিক করপোরেশনগুলোর সঙ্গে সরকারও সক্রিয়। রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের প্রতীক রেলপথ, অস্ত্রাগার ও পুলিশ স্টেশনে মাওবাদীরা আক্রমণ করে চলেছে।
ভারতের অপ্রতিরোধ্য উত্থানের যে বিভ্রম বিত্তবান ভারতীয়দের মনে তৈরি হয়েছে, তাতে সাম্প্রতিক কালে সবচেয়ে বড় আঘাত হেনেছে কমনওয়েলথ গেমস। দিল্লিকে আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য দীর্ঘ সময় ধরে বেদনাদায়ক প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে। অনেকে মনে করেছেন, এই প্রতিযোগিতা ভারতের ধর্মীয় ও শ্রেণীগত সংঘাতের পুরোনো ভূত নামাবে, আর আন্তর্জাতিক পরাশক্তির উচ্চাসনে বসার দাবি জোরালো করবে।
কিন্তু আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের বহু আগেই এ প্রতিযোগিতার ওপর কলঙ্কের ছাপ পড়ে। দুই সপ্তাহ আগে প্রধান স্টেডিয়ামটির সঙ্গে যুক্ত একটি বড় ফুটওভারব্রিজ ভেঙে পড়ে। গেমসের পরিচালনাকারী ফেডারেশন বলেছে, অ্যাথলেটদের থাকার জায়গা ‘বসবাসের অযোগ্য’। বন্য প্রাণীর উপদ্রব থেকে ভেন্যুগুলোকে রক্ষার জন্য লেঙুর বানরের এক বাহিনী নিয়োগ করতে হয়েছে। সরকারের ‘ইনক্রেডিবল ইন্ডিয়া’ পর্যটন প্রচারণাতে উঠে আসা সুন্দর নিসর্গভূমির চেয়ে অনেক বেশি ছড়িয়েছে ভঙ্গুর মাঠ আর নোংরা টয়লেটের ছবি।
রেটিং এজেন্সি মোডি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, এই ব্যর্থতা ভারতের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে। ক্ষুব্ধ স্থানীয় পর্যবেক্ষকেরা তুলোধোনা করেছেন ‘জাতীয় লজ্জার’ জন্য দায়ী রাজনীতিক ও কর্মকর্তাদের।
ভারতের নিজস্ব ভাবমূর্তির জন্য এ আঘাত খুব পীড়াদায়ক। আবার নতুন ভারত নিয়ে যে ভ্রান্তি ছড়িয়েছে, তা খুবই অবিবেচনাপ্রসূত। অর্থনৈতিক বৃদ্ধির তেজি ভাব, সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ভারতীয় বড় ব্যবসায়ীদের নজরকাড়া উপস্থিতি, আর দেশের বাইরে সফল ভারতীয়দের ঔজ্জ্বল্য ছড়ানো—এসব মিলে ভারতের কিংবা বলা যায় ইংরেজি-ভাষী ভারতীয়ের যে চেহারা নিয়েছে, তা পশ্চিমা মডেলের আধুনিকতার সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খায়।
ভারতে বহু গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান আছে, যা অধিকাংশ অপশ্চিমা সমাজে দেখা যায় না। এটা ভারতের নিজস্ব ভাবমূর্তি নির্মাণে সহায়ক হয়েছে। এসবের কারণে আন্তর্জাতিক স্তরে কর্তৃত্বপরায়ণ চীনের চেয়ে ভারতকে বেশি ‘স্থিতিশীল’ গণ্য হয়। তবে বেইজিংকে মধ্য ভারত ও কাশ্মীরের বিদ্রোহের মতো গুরুতর রাজনৈতিক সমস্যা কিংবা অতিরিক্ত চাপের কারণে হাজার হাজার কৃষকের আত্মহত্যার মতো বড় ট্র্যাজেডি মোকাবিলা করতে হয় না।
ভারত একটি উদ্যমী গণতন্ত্র আর সমৃদ্ধ অর্থনীতির দেশ, এ বয়ানটিতে যতটুকু বাস্তবতা ফুটে ওঠে, তার চেয়ে বেশি আড়াল হয়। ফোর্বর্স ম্যাগাজিনের বিলিয়নিয়ার তালিকায় ভারতীয়দের সংখ্যা বাড়ছে। পাশাপাশি একদমই গ্রাহ্যে আনা হচ্ছে না সমাজের গভীরে প্রোথিত অসমতা; ধনী-গরিবের মধ্যে আয় ও সম্পদের ক্রমবর্ধমান ফারাক।
একটি চালু কথা হলো, ভারতে একই সময় কয়েক শতাব্দীর দেখা মেলে। শুধু তা-ই নয়, ভারত বহু বয়ানেরও দেশ। বয়ানগুলো অবিরত, কখনো কখনো বেদনাদায়কভাবে পরস্পরকে ছাপিয়েযায়। কমনওয়েলথ গেমস ভারতের প্রগতির প্রদর্শনী। এটি আয়োজন করতে গিয়ে দিল্লির সবচেয়ে বঞ্চিত এক লাখ মানুষকে হতে হয়েছে ছিন্নমূল। চীন যেভাবে অত্যাধুনিক নগরে বেমানান গরিব মানুষদের বিতাড়ন করে, দিল্লি থেকে এসব মানুষকে উচ্ছেদ তার চেয়ে কোনো অংশে কম নির্মম নয়।
আমার গ্রামে যে শ্রমিকেরা শহরের সুবিধাভোগী মানুষদের ছুটি কাটানোর নির্জনবাস নির্মাণ করছেন, তাঁরা ভারতের নানা প্রান্তের উদ্বাস্তু মানুষ।
সচ্ছল ভারতীয়দের আশঙ্কা, অযোধ্যা রায়ের মাধ্যমে হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠার ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভয় পেয়ে চলে যেতে পারে। কিন্তু একের পর এক মুসলমানবিরোধী প্রচারণা চালিয়ে ১৯৯৮ সালে হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা ক্ষমতাসীন হয়ে এমন সব নীতি অনুসরণ করে, যা দেশের অসম অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করে এবং রাজনীতিতে করপোরেটের বিশেষ স্বার্থকে প্রোথিত করে। হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা ভূগর্ভে পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়, আর পাকিস্তানকে সর্বাত্মক যুদ্ধের হুমকি দেয়। ফলে জন্ম নেয় চরমপন্থী জাতীয়তাবাদ। এর উত্তরাধিকার এখন বহন করে চলেছে ভারত। দিল্লির পরবর্তী সরকারগুলো এবং কাশ্মীরে ভারতীয় সেনাবাহিনী এই মন্ত্রের দ্বারাই চালিত হচ্ছে।
বর্তমান মধ্যপন্থী কংগ্রেস সরকারের সঙ্গে হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের অর্থপূর্ণ কোনো তফাত খুঁজে না পাওয়ার জন্য নিশ্চয়ই কাশ্মীরের ৪০ লাখ মুসলমানকে দায়ী করা যায় না। কাশ্মীরবাসী প্রতিদিন পৃথিবীর সর্ববৃহৎ দখলদারির নৃশংসতার শিকার। একটি বিকারগ্রস্ত জাতিরাষ্ট্রের অন্তহীন অবরোধের ভেতর আটকে থাকা সংখ্যালঘুর ভাগ্যই তারা বরণ করে রয়েছে।
রাষ্ট্রের কোথাও লাখ লাখ ভারতীয়ের স্বর শোনা যায় না। তাদের মতোই আমার গ্রামের সেই নির্মাণশ্রমিকেরা পুরোনো সামন্ততান্ত্রিক সমাজের নিপীড়ন আর নতুন ব্যবসামনস্ক ভারতের নির্দয় শোষণের মধ্যে কোনো তফাত বুঝতে পারে না। তাদের নাজুক বাসস্থান ধ্বংস হওয়ার মধ্যে কী প্রতীক আছে। ভারতের ভাবমূর্তির জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ হয়তো এখানেই যে, এসব মানুষ হয়তো একদিন চালাঘরে একসঙ্গে গুটিসুটি মেরে আর থাকবে না; মধ্য ভারতের মানুষদের মতোই সশস্ত্র বিদ্রোহে নামবে।
এই গ্রীষ্মে ভারতের ভাবমূর্তির যে ক্ষতি হয়েছে, তা হয়তো শিগগিরই স্মৃতি থেকে বিলীন হবে। কিন্তু ভারতের আধুনিকতার উচ্ছ্বসিত বয়ানকারীদের প্রতি তাদের নসিহত অত্যন্ত স্পষ্ট। জার্মান দার্শনিক ওয়াল্টার বেঞ্জামিন একদা লিখেছিলেন, ‘সভ্যতার এমন কোনো দলিল নেই, যা একই সঙ্গে বর্বরতারও দলিল নয়।’ ‘উদীয়মান’ ভারত-সম্পর্কিত সব বয়ানে এই বিষণ্ন সত্যের স্বীকৃতি থাকতে হবে। নয়তো ভাঙা সেতু আর নষ্ট টয়লেটের ছবিই বারবার ফিরে আসবে।
নিউইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ: আহসান হাবীব।
পঙ্কজ মিশ্র: ভারতীয়ঔপন্যাসিক।

অতীতের পুনরাবৃত্তি চাই না by আবুল মোমেন

স্বাধীনতা-পরবর্তী দিনগুলোর কথা মনে পড়ছে। সে সময় স্বয়ং বঙ্গবন্ধুর পক্ষেও সম্ভব হয়নি তাঁর দল, প্রশাসনযন্ত্র কিংবা বিরোধী দলের ওপর সরকারের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। প্রশাসনে দুর্নীতি ও অনিয়ম ছিল, বিরোধী দলের ছিল বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের দাবিতে সরকারের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সংগ্রামের ডাক, আর তাঁর দলের একশ্রেণীর উচ্চাভিলাষী নেতা-কর্মী ব্যক্তিগত সম্পদ ও ক্ষমতার মোহে হয়ে উঠেছিল বেপরোয়া।
বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী নেতা ছিলেন, সম্ভবত প্রথমে ভেবেছিলেন, তিনি মাঠে নেমে হাঁকডাক দিয়ে সব ঠিক করে ফেলতে পারবেন। কিন্তু যে যুদ্ধ সমগ্র দেশ ও দেশবাসীকে নানা মাত্রায় নানাভাবে জড়িয়ে ফেলেছিল, তা মুক্তিযুদ্ধ হলেও তার গতিপথ সবার জন্য একই রকম হওয়ার কথা নয়। তাই অভাবনীয় ধ্বংস ও বিপর্যয়ের অভিজ্ঞতা স্বাভাবিক শৃঙ্খলাবোধ, এমনকি অনেকের ভেতরকার নীতিনৈতিকতার বোধও ভেঙে দিয়েছিল। আমরা দেখলাম, দেশের নামে স্বাধীনতার জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগের জন্য প্রস্তুত ছিল যারা, তাদের মধ্যে অনেকেই ক্ষুদ্র স্বার্থ ও বেপরোয়া লোভের ফাঁদে পা দিয়ে স্বাভাবিক ন্যায়বোধ হারিয়ে বসেছিল। দেশে একটা অস্থিরতা এবং তা থেকে অনিশ্চয়তার বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল।
আমরা লক্ষ করলে দেখব, উদার দৃঢ়চেতা ও সিংহহূদয়ের বঙ্গবন্ধু ক্রমেই কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে উঠছেন—বিশেষ ক্ষমতা আইন, রাষ্ট্রপতি পদ্ধতি এবং অবশেষে বাকশাল-ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে এই পরিবর্তন প্রকটভাবে ধরা পড়েছে। তিনি কখনো বিরুদ্ধতাকারী ও বিশৃঙ্খলাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর হচ্ছেন, আবার কখনো তাঁর অসহায়তার প্রকাশও ঘটছে। সিরাজ শিকদারের বন্দিত্ব ও মৃত্যু কিংবা লালঘোড়া দাবড়ানোর হুঁশিয়ারি তাঁর কঠোর অবস্থানকে প্রকাশ করে, আবার যখন নিকটজনদের কাছে আক্ষেপ করে বলেন, ‘সব চাটার দল খেয়ে নিল’, তখন শাসক হিসেবে তাঁর অসহায়তা আর ঢাকা থাকে না।
কঠোরতা বা কর্তৃত্বপরায়ণতার পথে শেষরক্ষা হয় না। ষড়যন্ত্রকারীরা প্রত্যাঘাত করার সুযোগ পেয়ে যায়। তাতে দেশের জন্য কোনো ভালো ফল আসে না। বাংলাদেশ তার জলজ্যান্ত প্রমাণ।
একদিকে বহু খেসারত, চরম নির্যাতন, দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার এই অভিজ্ঞতা এবং অন্যদিকে বিপুল জনসমর্থন ও বিশাল জয়, দেশের শিক্ষিত জনগোষ্ঠী-তরুণসমাজ-আমলাতন্ত্রের সমর্থন সত্ত্বেও আবারও একশ্রেণীর দলীয় নেতা-কর্মীর বাড়াবাড়ির মাধ্যমে দেশে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার আলামত শুরু হয়েছে। তাই বলছিলাম, স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ের কথা মনে পড়ছে।
আমলাতন্ত্র যথারীতি দুর্নীতিগ্রস্ত আছে, হয়তো ষড়যন্ত্র হলে তাতেও অনেকেই যুক্ত হবে। মূল বিরোধী দল বিশাল পরাজয়ের ধাক্কা সামলে উঠতে না পারলেও সরকারি দলের অস্থির বেপরোয়া অংশ ধীরে ধীরে তাদের হাতে ইস্যু তুলে দিচ্ছে রাজপথে আন্দোলনে নামার জন্য। ফলে সাধারণ মানুষের মনে ২০০৯ যে রঙিন স্বপ্ন ও আশাবাদ নিয়ে শুরু হয়েছিল, দেড় বছরের মাথায় তা অনেকটা ফিকে হয়ে গেছে এবং আশঙ্কার মেঘ ঈশান কোণে জমতে শুরু করেছে। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে একে বিশ্লেষণ করে বোঝা দরকার।
এ কথা ঠিক, বিএনপি একজন ক্ষমতাপ্রাপ্ত ও ক্রমে ক্ষমতাপাগল হয়ে ওঠা জেনারেলের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য সৃষ্ট দল। এটি একদিকে আওয়ামী লীগবিরোধীদের আর অন্যদিকে জিয়া ও খালেদার ক্যারিশমায় তৈরি রাজনৈতিক মঞ্চ হয়ে ওঠে। এটি আজও ঠিক রাজনৈতিক দল হয়ে উঠতে পারেনি। ফলে এবারের বিশাল পরাজয়ের ফলে বিএনপির অবস্থা ’৫৪-র নির্বাচনে ভরাডুবির পর তার পূর্বসূরি মুসলিম লীগের যেমনটা হয়েছিল, সে রকমই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কিন্তু আওয়ামী লীগ তাকে লাইফলাইন দিয়ে চলেছে, দলের একশ্রেণীর নেতা-কর্মী মূলত ক্ষমতা-বিত্তের লড়াইয়ে নেমে একের পর এক বেআইনি কাণ্ড বাধিয়ে বসলে এই পরিণতিই স্বাভাবিক। তবে আওয়ামী লীগের বর্তমান নেতৃত্ব ঘটনাগুলোর নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে অসচেতন এ কথা বলা যাবে না। প্রধানমন্ত্রী ও দলের সভানেত্রী, মন্ত্রী ও দলের সাধারণ সম্পাদক, কেন্দ্রীয় নেতা ও অনেক মন্ত্রী জোরালো ভাষায় এসব ঘটনার নিন্দা জানাচ্ছেন এবং নিরপেক্ষভাবে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলছেন। এ রকম আশ্বাস ও অঙ্গীকার তাঁরা গোড়া থেকেই দিয়ে এলেও তাতে কাজ হচ্ছে না। বরং দিনে দিনে ঘটনা বাড়ছে এবং ঘটনার বহর ও ভয়াবহতার মাত্রাও বেড়ে চলেছে। বোঝা যায়, নেতৃত্ব সদিচ্ছা প্রকাশ করলেও তা সত্যিই বাস্তবায়নে হাত দেওয়ার ব্যাপারে দ্বিধাগ্রস্ত। তাঁরা হয়তো ভাবছেন, ধমক-ধামক দিয়ে, কিছু মামলার ভয় দেখিয়ে, দল থেকে বহিষ্কার করে বা জেল খাটিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে। ব্যাপারটা সম্ভবত সে রকম নয়। এর কারণটা প্রধানমন্ত্রীসহ আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতার কথায়ই প্রকাশ পেয়েছে। তাঁরা কেউ অভিযোগ করেছেন, কেউ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে আওয়ামী লীগ ও তার বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনে, বিশেষত ছাত্রলীগে, জামায়াত-শিবির-ছাত্রদলসহ অন্যান্য বিরোধী ছোট নেতা ও সাধারণ কর্মীরা ঢুকে পড়েছেন। অভিযোগ হোক, আশঙ্কা হোক, তা সত্য হওয়াই স্বাভাবিক বলে মনে হয়, এমনটা আমরা ঘটতে দেখেছি স্বাধীনতার পরেও। ক্ষমতাবদলের সঙ্গে সঙ্গে দলবদলের ঘটনা তো দেশে আকসার ঘটেই। তা ছাড়া আওয়ামী লীগ তো এবার আদর্শের লড়াইয়ে নেমেছে, যুদ্ধাপরাধী অর্থাৎ জামায়াত ও তার সহযোগীরা সত্যিই এবার কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এদের জন্য তাঁর ব্যাকুলতা এবং সরকারের প্রতি এ কারণে রাগ-ক্ষোভ প্রকাশে কুণ্ঠিত হচ্ছেন না।
আদর্শিক লড়াই সব সময় সর্বাত্মক হয়—তাতে সাধারণত সব পক্ষই সব শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। জামায়াত আপাতদৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ ও অপেক্ষার নীতি নিয়েছে বলে মনে হয়। তবে ধরে নেওয়া যায় যে তারা পাল্টা আঘাতের কিংবা এ অবস্থা বানচাল করার জন্য সব কৌশল অবলম্বন করবেই। বিএনপি দৃশ্যত তাদের সঙ্গে গাঁটছড়া না বাঁধলেও মাঠে তাদেরই এজেন্ডা পূরণে সক্রিয় থাকবে। এর অর্থ হলো নানা অঘটনের মধ্য দিয়ে তারা একদিকে সরকারের প্রতি জনসমর্থন কমাতে চাইবে, অন্যদিকে জনগণের মধ্যে এসব ঘটনার শিকার একটি সংক্ষুব্ধ অংশ তৈরি করে তোলার চেষ্টা করবে।
মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি আদর্শিক লড়াই। কিন্তু বিজয়ের পর থেকে আওয়ামী লীগের একটি অংশ সে কথা ভুলে আদর্শ জলাঞ্জলি দিয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থ ও লাভের পেছনে ছুটে সরকারকে বেকায়দায় ফেলেছিল। এবারের নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রসঙ্গকে সামনে নিয়ে এসে একটি আদর্শিক লড়াইয়ের পটভূমি তৈরি করেছিল। এখানে স্বীকার করতে হবে, এই আদর্শিক অবস্থানের কারণেই কিন্তু দেশের তরুণসমাজ অনেক দিন পরে আওয়ামী লীগের পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করেছিল। যার ফলে মহাজোট বিপুল বিজয় অর্জন করেছিল। ফলে এই বিজয়কে মানতে হলে এখন আওয়ামী লীগকে আদর্শিক লড়াইটি চালিয়ে যেতে হবে। আর তার অর্থ হলো, আদর্শকে জলাঞ্জলি দিয়ে যারা টেন্ডারবাজি, দখলদারিসহ নানা বেপরোয়া বেআইনি কাজে লিপ্ত হচ্ছে, তাদের নিয়ন্ত্রণে সরকার ও দলকে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার ব্যাপারটা কিন্তু সংক্রামক, যদি দেখা যায় পাবনা ও নাটোরের ঘটনায়, ইব্রাহিম ও সানাউল্লাহ হত্যার ঘটনায় সরকারের গৃহীত ব্যবস্থা স্পষ্টভাবে আইনানুগ নয় বা আইন অবাধে নিজস্ব গতিতে চলছে না, কিংবা যদি বোঝা যায় যে মনকে চোখ ঠেরে বুঝ দেওয়ার চেষ্টা চলছে, তাহলে অপরাধীরা আশকারা পায়। তাতে অপরাধ বেড়েই চলবে। এভাবে চললে একসময় সরকারের পক্ষে পরিস্থিতি সামলানো হবে মুশকিল। এমনিতে দারিদ্র্যের চাপ, এমনিতে বঞ্চনার ক্ষত, তার ওপর আছে দ্রব্যমূল্য আর ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডারদের দৌরাত্ম্য—মানুষের ধৈর্য বেশি দিন বাঁধ মানবে বলে মনে হয় না।
আমার বিশ্বাস, এই অনিয়ন্ত্রিত বেপরোয়া বাহিনীকে সামলানো খুব যে কঠিন তা নয়। কেবল সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে সরকার ও দলের নেতৃত্বকে বোঝাতে হবে যে তাঁরা মূলত একটি আদর্শিক লড়াইয়ে আছেন। এটা বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার ব্রত হিসেবেই তাঁরা গ্রহণ করেছেন। এরই অংশ হিসেবে বিচার বিভাগকে প্রশাসন থেকে পৃথক করা, পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনী বাতিল করা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যবস্থা করা, নতুন যুগোপযোগী একটি শিক্ষানীতি প্রণয়ন, ডিজিটাল বাংলাদেশের অঙ্গীকার, রূপকল্প ২০২১ ঘোষণা ইত্যাদি সরকারের যাত্রাপথ স্পষ্ট করে দেয়। সেই সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিচার বিভাগ থেকেও এসেছে কয়েকটি যুগান্তকারী রায়, এমনকি প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন ভাষণে কখনো শিল্পে দেশীয় ভাষা প্রয়োগের কথা বলে, কখনো শিশুদের ওপর মুখস্থবিদ্যার বোঝা না চাপানোর কথা বলে একটি আধুনিক মানবিক সমাজ ও রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন আমাদের। এটিই যে বাংলাদেশের সঠিক যাত্রাপথ, তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। এই স্বপ্ন ও সম্ভাবনাকে যেন চাটার দল ও ষড়যন্ত্রীর দল নষ্ট করতে না পারে, সে ব্যাপারে হুঁশিয়ার হতে হবে সরকারকে এবং ক্ষমতাসীন দল ও জোটকে।
এই যে বাংলাদেশের একটি যাত্রাপথ স্পষ্ট হয়ে উঠছে, তাতে সবাইকে শরিক হওয়ার আহ্বান জানাতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, ইচ্ছুক সবাই যেন সক্রিয়ভাবে এই যাত্রায় অংশ নিতে পারে, সেদিকটা খেয়াল রাখতে হবে। এই সূত্রে আবারও যুদ্ধদিনের কথা স্মরণ করিয়ে দেব। একাত্তরের সেই মুক্তিযুদ্ধের দিনে কেবল আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ নয়, সব দেশপ্রেমিকের জন্য দেশের কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। আর তাই সেদিন মুষ্টিমেয় রাজাকার-আলবদর ব্যতীত দেশের বাকি সব মানুষ কোনো না কোনোভাবে মুক্তিযুদ্ধে অবদান রেখেছিল। সেদিন বাঙালি সব ক্ষুদ্রতা, ব্যক্তিস্বার্থ, হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে মহৎ আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে এক ও বড় হয়ে উঠেছিল। ত্যাগ করেছিল নিঃস্বার্থভাবে। তাতেই আমরা স্বাধীনতার মতো এত বড় সাফল্যের অধিকারী হয়েছি।
আজও ঠিক একাত্তরের মতো বিপথগামী জাতি ও ভ্রষ্ট দেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়ে তোলার কঠিন সংগ্রামে আমরা লিপ্ত। এ কাজ মুক্তিযুদ্ধের চেয়েও কঠিন ও বড়।
তাই নেতৃত্বের কাছে অনুরোধ, দেশ গড়ার মহান কর্মযজ্ঞটি স্পষ্ট করুন, সবাইকে এতে শরিক হওয়ার সুযোগ দিন। নিজেরা সংকীর্ণতা ও ক্ষুদ্রতার ঊর্ধ্বে উঠতে পারলে মাঠপর্যায়েও ক্ষুদ্রতার বিকার ক্রমে বন্ধ হবে। একাত্তরে যদি আমরা পেরে থাকি, একবিংশ শতাব্দীতে কেন পারব না?
আবুল মোমেন: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।

রেলওয়ের জমি বেদখল

সারা দেশে প্রভাবশালী মহল বাংলাদেশ রেলওয়ের হাজার হাজার একর জমি অবৈধভাবে দখল করে রেখেছে। এখনো নানাভাবে রেলওয়ের জমিতে ঘরবাড়ি, দোকানপাট, কার্যালয় নির্মাণ অব্যাহত আছে। জয়পুরহাট রেলওয়ে স্টেশনের জমি অবৈধভাবে দখল হওয়ার সংবাদ জানাচ্ছে গতকাল বুধবারের প্রথম আলো। উদ্বেগের ব্যাপার হলো, এখানে প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের কার্যালয় গড়ে তোলা হয়েছে। রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রীয় সম্পদ বেদখল করে রাখলে তা বাজে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করে। এতে ভূমিগ্রাসীরা উৎসাহিত বোধ করে। দখলের এ প্রবণতা রোধ করতে না পারলে তাদের আগ্রাসন আরও বাড়তেই থাকবে।
অতীতে দেখা গেছে, সব সময়ই সরকারি দলের নেতা-কর্মীদের ছত্রচ্ছায়াতেই ভূমি দখল হয়েছে। দখলবাজিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে তফাত নেই। যে দল ক্ষমতায় যায়, তারাই দখলবাজিতে মেতে ওঠে। এবারও সে ধারাবাহিকতাই যেন অক্ষুণ্ন রেখে চলেছেন বর্তমান শাসক দল ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতা-কর্মীরা।
অপেক্ষাকৃত নিরাপদ, আরামদায়ক, সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব হিসেবে যাত্রী ও মালামাল পরিবহনে সারা দুনিয়ায় বর্তমানে রেলপথ অত্যন্ত জনপ্রিয়। দেশে দেশে রেল সম্প্রসারণের চিন্তা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু আমাদের দেশের চিত্রটি পুরো বিপরীত। দুর্নীতি, অবহেলা আর অদক্ষতার বলি হয়ে চলেছে রেলওয়ে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য রেলওয়ের আধুনিকীকরণের দিকে সরকারের দৃষ্টি দেওয়ার পাশাপাশি দরকার বেদখল হয়ে যাওয়া সব সম্পদ পুনরুদ্ধার করে তার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা।
রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা সমাজের সচেতন অংশ। রাষ্ট্রীয় সম্পদ অবৈধভাবে দখল করে রাখা তাঁদের মানায় না। ন্যায়নীতির স্বার্থেও অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া আবশ্যক। এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ কোনো ধরনের উদাসীনতা দেখালে রেলওয়ের জমি স্থায়ীভাবে হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। রেলওয়ের বেদখল হওয়া জমি উদ্ধারে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।a

আফগানিস্তানে মালবাহী বিমান বিধ্বস্ত, আট আরোহী নিহত

আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের কাছে পার্বত্য এলাকায় গত মঙ্গলবার একটি মালবাহী উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়েছে। এতে একজন ভারতীয়সহ উড়োজাহাজের আটজন যাত্রীর সবাই নিহত হন। উড়োজাহাজটি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ন্যাশনাল এয়ার কার্গোর পক্ষে কাজ করছিল।
মালবাহী উড়োজাহাজটি আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র পরিচালিত বৃহত্তম সামরিক ঘাঁটি বাগরাম থেকে উড্ডয়ন করে। ওই ঘাঁটিটি কাবুল থেকে ৪০ মাইল উত্তরে অবস্থিত। উড়োজাহাজে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ন্যাটো বাহিনীর মালামাল ছিল।
নিহত ক্রুদের মধ্যে ছয়জন ফিলিপাইনের, একজন ভারতের ও একজন কেনিয়ার নাগরিক রয়েছেন। ন্যাটো ও আফগান নিরাপত্তাবাহিনী দুর্ঘটনাস্থলে উদ্ধার অভিযান শুরু করেছে।

চট্টগ্রাম বন্দরে ধর্মঘট ব্যাধি

ধর্মঘটরত শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা ব্যর্থ, তাই সেনা মোতায়েন করে চট্টগ্রাম বন্দর চালুর পদক্ষেপ নিয়েছেন নৌমন্ত্রী। গত রোববার রাত থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের ১৬ জেটির ১২টিতেই শ্রমিকদের কর্মবিরতি চলছে। সেনা ডেকে, ১৪৪ ধারা জারি করা হয়তো সাময়িক সমাধান হবে। কিন্তু বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের সঙ্গে বন্দর কর্তৃপক্ষের বিবাদের স্থায়ী মীমাংসা না হলে বন্দর অচলের ব্যাধি ফিরে ফিরেই আসবে। ইতিমধ্যে সেখানে জারি করা ১৪৪ ধারা ভঙ্গের ঘটনায় লাঠিপেটা ও গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটেছে। সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান শ্রমিকদের দায়িত্বশীল আচরণ এবং বন্দর প্রশাসনের আন্তরিকতা ছাড়া হওয়ার নয়।
চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দেশের অর্থনীতির অন্যতম জীবননালি। এই নালির মাধ্যমে অর্থনীতিতে যেভাবে রক্ত সঞ্চালিত হওয়ার কথা, শ্রমিক ধর্মঘটে ও কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনায় প্রায়শই তা থমকে যাচ্ছে। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বন্দরের পরিচালনা পদ্ধতির সংস্কার থেকেই বর্তমান সমস্যার জন্ম। নতুন নিয়ম অনুযায়ী দরপত্রের মাধ্যমে কাজ পাওয়া বেসরকারি বার্থ অপারেটরদের শ্রমিক নিয়োগের ক্ষমতা দেওয়ার ব্যবস্থা বন্দরশ্রমিকেরা মানছেন না। এ ছাড়া আগের ওই সংস্কারের সময় শ্রমিকদের প্রাপ্য অধিকার ও সুবিধাও কাটছাঁট করা হয়েছে বলেতাঁদের অভিযোগ। নতুন নিয়মের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো তাঁরা ফিরে পেতে চান। তাঁদের দাবি, বন্দরের আগের নিয়ম অনুযায়ীই পণ্য ওঠানো-নামানোর কাজ করতে হবে। বন্দর কর্তৃপক্ষের ইস্যু করা শ্রমিক পরিচয়পত্রও রয়েছে তাঁদের চাহিদার তালিকায়।
দাবিগুলো মীমাংসার অযোগ্য নয় এবং আলোচনার মাধ্যমেই তা হতে পারত। তাহলে বন্দর অচল করায় ধর্মঘট ডাকা এবং তা সচল করায় সেনা মোতায়েনের প্রয়োজন পড়ত না। ন্যায্য দাবি জানানোর অধিকার প্রত্যেকেরই রয়েছে। কিন্তু সেটা নিশ্চয়ই বৃহত্তর স্বার্থের ক্ষতি করে নয়। এ ছাড়া তুচ্ছ কারণে আন্দোলনে ‘ধর্মঘট কৌশল’-এর অতিব্যবহার ও অপব্যবহারও এর কার্যকারিতাকে কমিয়ে দিয়েছে।
জাতীয় অর্থনীতিতে চট্টগ্রাম বন্দরের ভূমিকা খুবই স্পর্শকাতর। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি কেন্দ্রকে হঠাৎ করে অচল করে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একইভাবে গ্রহণীয় নয় বেসরকারি বার্থ অপারেটরদের একগুঁয়েমি। অভিযোগ রয়েছে, এই কর্মবিরতির সঙ্গে চট্টগ্রামের রাজনীতির প্রভাবশালী মহলের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। একদিকে শ্রমিকদের বিভক্ত করে দলীয় ও গোষ্ঠীগত স্বার্থে ব্যবহার, অন্যদিকে কায়েমি গোষ্ঠীর কোটারি স্বার্থের কাছে জিম্মি হয়ে থাকছে বন্দরের গতিশীলতা। এ ঘটনায় ইতিমধ্যে দেশের অনেক আর্থিক ক্ষতি হয়েছে; আর নয়।
দেশের আমদানি-রপ্তানির ৯০ শতাংশ চলে যে বন্দরের মাধ্যমে, চরম প্রয়োজনে ছাড়া সেখানে ধর্মঘট গ্রহণযোগ্য নয়। শ্রমিকদের এই বাস্তবতা বুঝতে ও মানতে হবে। প্রয়োজনে শ্রমিকদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া যেতে পারে। কর্তৃপক্ষেরও বোঝা উচিত, শ্রমিকবান্ধব নীতির মাধ্যমেই শ্রমিকদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা সম্ভব।
জরুরিভাবে বন্দর চালু করায় গৃহীত কঠোর পদক্ষেপগুলো অস্থায়ী হোক এবং স্থায়ীভাবে শ্রমিক-অসন্তোষ দূর করায় বন্দর কর্তৃপক্ষ আন্তরিক হোক, এটাই প্রত্যাশিত।

কালো তালিকা থেকে আরও তালেবানের নাম বাদ দেওয়া হবে

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের কালো তালিকা থেকে আরও কয়েকজন তালেবান জঙ্গির নাম বাদ দেওয়া হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আফগানিস্তানে তালেবান নেতাদের সঙ্গে দেশটির সরকারের শান্তি আলোচনার পথ প্রশস্ত করতে এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ফিলিপ ক্রাউলি এই তথ্য জানান।
সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ক্রাউলি বলেন, অতীতেও কালো তালিকা পরিবর্তনে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন দিয়েছে। এই তালিকায় পরিবর্তন আনা অবশ্যই সম্ভব। তিনি জানান, আফগান পিস কাউন্সিল গুয়ানতানামো বে কারাগারে আটক তালেবান জঙ্গিদের ছেড়ে দিতে ওয়াশিংটনকে প্রস্তাব দিয়েছে।

আগামী পাঁচ বছরে যক্ষ্মায় এক কোটি মানুষ মারা যেতে পারে

বিশেষজ্ঞরা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, যক্ষ্মা প্রতিরোধের লড়াইয়ে আন্তর্জাতিক অর্থসহায়তা বাড়ানো না হলে আগামী পাঁচ বছরে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে এক কোটি মানুষের মৃত্যু হতে পারে। গতকাল বুধবার যক্ষ্মা প্রতিরোধবিষয়ক জোট ‘স্টপ টিবি পার্টনারশিপ’ এই সতর্কবার্তা জানিয়েছে। বিভিন্ন দেশের সরকার, অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক সংস্থা মিলে যক্ষ্মা প্রতিরোধবিষয়ক এই পার্টনারশিপ গড়ে তুলেছে।
স্টপ টিবি পার্টনারশিপের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান সময় থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে ৫০ লাখ মানুষের জীবন বাঁচাতে চার হাজার ৭০০ কোটি ডলার দরকার। প্রতিবছর ৯০ লাখ মানুষ যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়। এদের মধ্যে আক্রান্তের হার এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি (৫৫ শতাংশ) আর আফ্রিকায় ৩০ শতাংশ। মোট আক্রান্তের মধ্যে শুধু চীনেই আক্রান্তের হার ৩৫ শতাংশ।
‘গ্লোবাল প্ল্যান টু স্টপ টিবি’ নামের ওই প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়েছে, প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ মানুষ ফুসফুসের সংক্রমণে মারা যায়, যাদের বেশির ভাগই যক্ষ্মায় আক্রান্ত।

দেশে এনে মোশাররফের বিচার করার আহ্বান নওয়াজ শরিফের

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তান মুসলিম লিগের (নওয়াজ) নেতা নওয়াজ শরিফ বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগে সাবেক স্বৈরশাসক পারভেজ মোশাররফের বিচার দাবি করেছেন। মোশাররফকে সবচেয়ে দুর্নীতিবাজ শাসক বলে অভিহিত করেন তিনি। একই সঙ্গে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে এনে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে ইন্টারপোলের সহায়তা নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন শরিফ।
গতকাল বুধবার মোশাররফের বিরুদ্ধে নওয়াজ শরিফ বেশ কয়েকটি অভিযোগ তুলে বলেন, পাকিস্তানের সবচেয়ে দুর্নীতিবাজ, বিবেকহীন, নীতিবর্জিত ও নির্মম শাসক ছিলেন মোশাররফ। ১১ বছর আগে রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের ঘটনায় ক্ষমতাচ্যুত হন শরিফ এবং মোশাররফ ক্ষমতা নেন। নতুন দলের মাধ্যমে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু করতে মোশাররফ যখন দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, এ সময় তাঁর বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ তুললেন শরিফ। তাঁর দলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, মোশাররফ যেসব অপকর্ম করেছেন, এর মধ্যে রয়েছে সামরিক আইন জারি, কারগিল অভিযান, বালুচ জাতীয়তাবাদী নেতা নওয়াব আকবর বুগাতিকে হত্যা ও ইসলামাবাদে লাল মসজিদ হত্যাকাণ্ড।

গৃহবন্দী করায় সরকারের সমালোচনায় সিয়াওবোর স্ত্রী

অবৈধভাবে গৃহবন্দী করে রাখায় গতকাল বুধবার চীন সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছেন এবারে শান্তিতে নোবেলজয়ী লিউ সিয়াওবোর স্ত্রী লিউ সিয়া।
সামাজিক যোগাযোগের নেটওয়ার্ক টুইটারে লিউ সিয়া লিখেছেন, ‘আমাকে অবৈধভাবে গৃহবন্দী করে রাখায় সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। এ অবস্থা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।’
চীনের কারাবন্দী মানবাধিকার কর্মী সিয়াওবোকে গত শুক্রবার নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হয়। এর পর থেকেই তাঁর স্ত্রী লিউ সিয়াকে কার্যত গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছে। তবে গত রোববার তিনি পুলিশের পাহারায় তাঁর স্বামীর সঙ্গে দেখা করেন।
লিউ সিয়াকে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে দেওয়ার জন্য চীন সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। একই সঙ্গে সিয়াওবোকে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অপরাধে সিয়াওবোকে গত ডিসেম্বরে ১১ বছরের কারাদণ্ড দেয় চীন।
লিউ সিয়া এর আগে জানান, নরওয়ের দুই কূটনীতিক তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গত মঙ্গলবার তাঁর বাড়িতে যান। কিন্তু তাঁদেরকে বাড়িতে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।
বেইজিংয়ে নরওয়ের দূতাবাসও বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। দূতাবাসের মুখপাত্র টোনি হেলেন অ্যারাভিক বলেন, তাঁর (সিয়া) অবস্থা জানার জন্য কূটনীতিকেরা সেখানে গিয়েছিলেন। কিন্তু বাড়ির ফটকের ভেতরে তাঁদের ঢুকতে দেওয়া হয়নি।

আফগানিস্তান থেকে ডাকযোগে রকেট

আফগানিস্তান থেকে ডাকযোগে একটি শক্তিশালী রকেট পাঠানো হয়েছিল ব্রিটেনে। বিপজ্জনক নয়—এমন বস্তু হিসেবে প্যাকেট করে আফগানিস্তানে অবস্থিত ব্রিটিশ সামরিক প্রকৌশলীরা ফ্ল্লিচেট নামের রকেটটি পাঠান। গত বুধবার দ্য সান পত্রিকা এ কথা জানায়।
দুই বছর আগে ঘটলেও সম্প্রতি ঘটনাটি প্রকাশ পেয়েছে।
সাফোকের এক বিমানঘাঁটিতে প্যাকেটটি খোলার পর ৭০ জন প্রতিরক্ষাকর্মী নিরাপত্তার জন্য সরে যেতে বাধ্য হন। এটি বিশ্বের শক্তিশালী অন্যতম। মেরামতের জন্য পাঠানো লঞ্চারের ভেতর রকেটটি রয়ে গিয়েছিল।

থাইল্যান্ডে ১৫ পাকিস্তানি আটক

সন্দেহজনক তহবিল সংগ্রহের কাজে জড়িত থাকার অভিযোগে থাইল্যান্ডের পুলিশ গতকাল বুধবার পাকিস্তানের ১৫ জন নাগরিককে আটক করেছে। সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে তাদের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, সেটা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পিয়ান্ত চালর্মশ্রী জানান, দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশ ইয়ালা থেকে তাদের আটক করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের একজন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িত এক পাকিস্তানি নাগরিকের কাছে ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ পাঠানোর চেষ্টা করছিল। তবে এখনো তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কোন সংগঠনের কাছে অর্থ পাঠানো হচ্ছিল, সে ব্যাপারে অবশ্য মুখ খোলেননি ওই কর্মকর্তা।
আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে থাইল্যান্ডে অবৈধভাবে কাজ করার অভিযোগ আনা হয়েছে। অবশ্য পুলিশের কাছে তারা জানিয়েছে, পাকিস্তানের বন্যাদুর্গত লোকজনের সাহায্য করতে তারা ওই তহবিল সংগ্রহের জন্য মাঠে নামে। তাদের ইয়ালার একটি কারাগারে রাখা হয়েছে।

মিসরে উপমন্ত্রীসহ ১১ জনের তিন বছরের কারাদণ্ড

মিসরে একজন উপমন্ত্রী ও জাদুঘরের পরিচালকসহ ১১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে কর্তব্যে অবহেলার দায়ে তিন বছর করে কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে। কায়রোর মাহমুদ খলিল জাদুঘর থেকে নেদারল্যান্ডের খ্যাতনামা শিল্পী ভ্যান গঘের একটি শিল্পকর্ম চুরির ঘটনায় তাঁদের বিরুদ্ধে কর্তব্যে অবহেলার অভিযোগ আনা হয়। আদালত একই সঙ্গে ১১ জনকে এক হাজার ৭৫০ ডলারের বিনিময়ে জামিন দেওয়ার নির্দেশ দেন।
কায়রোর ওই জাদুঘর থেকে গত ২১ আগস্ট দিনদুপুরে ভ্যান গঘের ওই চিত্রকর্ম চুরি হয়। এটি ‘পপি ফ্লাওয়ার্স’ ও ‘ভাস অব ফ্লাওয়ার্স’ উভয় নামে পরিচিত। চিত্রকর্মটি ফ্রেম থেকে কেটে নেওয়া হয়। এটির মূল্য পাঁচ কোটি ডলারের বেশি। তদন্তে দেখা গেছে, ঘটনার সময় জাদুঘরের একটি বিপদ-সংকেতও কাজ করেনি। ৪৩টি নিরাপত্তা ক্যামেরার মধ্যে চালু ছিল মাত্র সাতটি। এ ছাড়া নিরাপত্তারক্ষীও ওই সময় কম ছিল। তদন্তে প্রমাণ মিলেছে, বেশির ভাগ সময় মাত্র একজন রক্ষী জাদুঘরের পাহারায় থাকে।
চুরির ঘটনায় করা মামলার বিচার চলাকালে জাদুঘরের কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, নিরাপত্তাবিষয়ক সমস্যার কথা তাঁরা জানতেন। কিন্তু সমস্যা সমাধানে তাঁদের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করা হয়নি। এসব কারণে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী মোহসিন শালানসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে কর্তব্যে অবহেলার অভিযোগ আনা হয়।

ইরানে রেভল্যুশনারি গার্ডের ঘাঁটিতে বিস্ফোরণে নিহত ১৮

ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় লোরেস্তান প্রদেশে গত মঙ্গলবার সে দেশের অভিজাত বাহিনী রেভল্যুশনারি গার্ডের একটি ঘাঁটিতে বিস্ফোরণে ১৮ জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া আহত হয়েছেন ১৪ জন। গার্ডের কমান্ডার ইয়াদুল্লাহ বুয়ালির বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা ফারস গতকাল বুধবার এ তথ্য জানায়।
ফারসকে বুয়ালি জানান, মঙ্গলবার প্রদেশের রাজধানী খোররমাবাদের নিকটবর্তী ইমাম আলী ঘাঁটির গোলাবারুদের একটি গুদামে আগুন লেগে ওই বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ১৮ জন নিহত ও ১৪ জন আহত হয়েছেন। তবে তাঁরা গার্ডের সদস্য কি না, তা তিনি নির্দিষ্ট করে জানাননি।
তবে ইরানের আরবি ভাষায় প্রচারিত আল-আলম টেলিভিশন একটি সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানায়, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে গার্ডের সদস্যরাও রয়েছেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের শাসনাধীনে রেভল্যুশনারি গার্ড দেশটির শক্তিশালী বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। ১৯৭৯ সালে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের পর অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি হুমকি প্রতিহত করার জন্য রেভল্যুশনারি গার্ড গঠন করা হয়।

ইসরায়েলের সীমানা চিহ্নিত করতে বলল ফিলিস্তিন

ইসরায়েলের সীমানা চিহ্নিত করার জন্য মার্কিন প্রশাসন ও ইসরায়েলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ। শান্তি আলোচনায় ফিরে আসতে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কোনো শর্ত আছে কি না—ওয়াশিংটন জানতে চাওয়ার পর গতকাল বুধবার তারা এ কথা জানিয়েছে।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ইয়াসির আবেদ রাব্বো বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ এবং মার্কিন প্রশাসন ইসরায়েলের সীমানা নির্ধারণ করে একটি মানচিত্র আমাদের দিক, যার ভিত্তিতে তারা আমাদের কাছ থেকে স্বীকৃতি চায়। এটাই আমাদের আনুষ্ঠানিক দাবি।’
গত সোমবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ যদি ইসরায়েলকে ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, তাহলে আলোচনা শুরুর জন্য যা করা প্রয়োজন, তা তিনি করবেন। কিন্তু এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ফিলিস্তিনিরা জানান, শান্তি আলোচনার সঙ্গে এই দাবির কোনো সম্পর্ক নেই।
নেতানিয়াহু বলেন, ‘ফিলিস্তিনি নেতারা তাঁদের জনগণকে যদি দ্ব্যর্থহীনভাবে জানান, তাঁরা ইসরায়েলকে ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন, তাহলে আমি আমার মন্ত্রিপরিষদের কাছে বসতি স্থাপনের ওপর আরেকটি স্থগিতাদেশের প্রস্তাব করতে রাজি আছি।’
নেতানিয়াহুর কাছ থেকে এই প্রস্তাব আসার পর শান্তি আলোচনার মধ্যস্থতাকারী যুক্তরাষ্ট্রই ফিলিস্তিনিদের কাছে জানতে চেয়েছিল, তাদের তরফে কোনো প্রস্তাব আছে কি না। এরই জবাবে ইসরায়েলের সীমানা চিহ্নিতকরণের দাবি জানিয়েছেন ফিলিস্তিনিরা।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গত মাসে ওয়াশিংটনে শুরু হওয়া ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সরাসরি শান্তি আলোচনা টিকিয়ে রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে পশ্চিম তীরের ইসরায়েলি বসতি স্থাপন। আলোচনা শুরুর সময় পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনের কাজ সাময়িকভাবে স্থগিত রেখেছিল ইসরায়েল। গত ২৬ সেপ্টেম্বর ওই স্থগিতাদেশের মেয়াদ শেষ হয়।

কাশ্মীরে উত্তেজনা প্রশমনে তিন আলোচক নিয়োগ

ভারতনিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মীরের সাম্প্রতিক উত্তেজনা প্রশমনে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসার জন্য তিনজন আলোচকের নাম ঘোষণা করেছে ভারত সরকার। গতকাল বুধবার কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরম এ কথা জানান। তাঁরা হলেন ভারতীয় সাংবাদিক দিলীপ পদগায়োংকর, তথ্য কমিশনার এম এম আনসারি ও শিক্ষাবিদ রাধা কুমার।
আলোচকেরা কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী ও সাধারণ জনগণের সঙ্গে কথা বলবেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আলোচকদের সহযোগিতা করার ব্যাপারে জম্মু ও কাশ্মীরের সর্বস্তরের জনগণের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। তাঁরা খুবই আস্থাভাজন ব্যক্তি এবং যত দ্রুত সম্ভব তাঁরা কাজ শুরু করবেন। পরে আমরা আরও একজন আলোচককে অন্তর্ভুক্ত করতে পারি।’
ভারতীয় মন্ত্রিসভার নিরাপত্তাবিষয়ক কমিটির ২৫ সেপ্টেম্বরের বৈঠকে এই আলোচকদের নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। আলোচকেরা জম্মু, কাশ্মীর ও লাদাখ অঞ্চলে কাজ করবেন।
দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নেলসন ম্যান্ডেলা ইনস্টিটিউট অব পিসের প্রধান রাধা কুমার এরই মধ্যে কাশ্মীরের মধ্যপন্থী নেতা মিরওয়াইজ ওমর ফারুক ও কট্টরপন্থী সৈয়দ আলী শাহ গিলানির সঙ্গে কথা বলেছেন।
সাংবাদিক দিলীপ এর আগে ভারতীয় প্রখ্যাত আইনজীবী রাম জেঠমালানির নেতৃত্বাধীন কাশ্মীর কমিটির সদস্য ছিলেন। তথ্য কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার আগে আনসারি একজন অধ্যাপক এবং দিল্লির হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক ছিলেন। কাশ্মীরে উত্তেজনা প্রশমনে সরকারের ঘোষিত আট দফা কর্মসূচির অংশ হিসেবে এই তিন আলোচকের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। এ ছাড়া গত ১১ জুনের পর থেকে সেখানে যারা নিহত হয়েছে, তাদের পরিবারের জন্য ত্রাণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি এ পর্যন্ত যাদের আটক করা হয়েছে, তাদের আটকের কারণ পর্যালোচনা করে দ্রুত নির্দোষ ব্যক্তিদের মুক্তি দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য রাজ্য সরকারের প্রতিও আহ্বান জানিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার।
তবে কট্টরপন্থী নেতা গিলানি সরকারের এই পদক্ষেপকে অসার পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ধাপ্পা দেওয়ার জন্য ভারত সরকার এ উদ্যোগ নিয়েছে। এ থেকে কোনো ফল আসবে না।
গত জুন মাসে গুলিতে এক ছাত্রের নিহত হওয়ার ঘটনায় কাশ্মীরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় ব্যক্তিদের দাবি, পুলিশ গুলি করে ওই ছাত্রকে হত্যা করেছে। এরপর চলমান সহিংসতায় এ পর্যন্ত শতাধিক কাশ্মীরি নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার কয়েক দফা কারফিউ জারি করে এবং সেনাবাহিনী মোতায়েন করে। গত মাসের এক জরিপে দেখা গেছে, ওই অঞ্চলের বাসিন্দাদের দুই-তৃতীয়াংশ স্বাধীনতা চায়।

মেক্সিকো উপসাগরে তেলকূপ খননের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার

মেক্সিকো উপসাগরে তেলকূপ খননের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এ ঘোষণা দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কেন সালাজার জানিয়েছেন, কূপ খননের জন্য নতুন নিরাপত্তা শর্ত আরোপ করা হয়েছে।
সালাজার এবং উপকূলে কূপ খননে মার্কিন সরকারের নতুন কর্মকর্তা মাইকেল ব্রোমউইচ গত মঙ্গলবার নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করেন। তাঁরা জানান, উপকূল থেকে তেল উত্তোলনের ক্ষেত্রে আগামী দিনে যাতে কোনো ভয়াবহ বিপর্যয় না ঘটে, সে জন্য নতুন নিয়ম-নীতি চালু করার লক্ষ্যে কাজ করছে প্রশাসন।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র রবার্ট গিবস বলেন, ‘আমি মনে করি, খুব শিগগির এ কাজ শেষ করা যাবে। নতুন নীতিমালায় মার্কিন সরকার এবং জনগণের মধ্যে এ আস্থা সৃষ্টি করা হবে যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে সে দায় কোম্পানির কাঁধেই পড়বে এবং তা মোকাবিলা করার মতো সক্ষমতা তাদের আছে।’
গত এপ্রিল মাসে মেক্সিকো উপসাগরে ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম পরিচালিত একটি তেলক্ষেত্রের রিগে বিস্ফোরণের পর ওই এলাকায় ছয় মাসের জন্য কূপ খননের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা।

খুলনায় রিটার্ন দাখিল করেননি ৬০% টিআইএনধারী

খুলনা অঞ্চলে টিআইএনধারী ব্যক্তিদের মধ্যে আয়কর রিটার্ন দাখিল না করার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। চলতি ২০১০-১১ করবর্ষে এই অঞ্চলের মোট টিআইএনধারী ব্যক্তির অর্ধেকেরও বেশি আয়কর রিটার্ন দাখিল করেননি।
খুলনা বিভাগের ১০টি জেলা নিয়ে গঠিত খুলনা কর অঞ্চলে এবার মোট এক লাখ ২৮ হাজার টিআইএনধারী ব্যক্তির (ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার বা কর শনাক্তকরণ নম্বর) মধ্যে আয়কর রিটার্ন দাখিল করেছেন ৫২ হাজার ৭৫ জন। এতে কর আদায় হয়েছে ১৩ কোটি ১৩ লাখ টাকা। আর এ বছর ৭৫ হাজার ৯২৫ জন বা ৫৯ দশমিক ৭১ শতাংশ টিআইএনধারী ব্যক্তি রিটার্ন দাখিল করেননি।
এর আগের ২০০৯-১০ করবর্ষে খুলনা কর অঞ্চলে এক লাখ ২৩ হাজার ৬৩৫ জন টিআইএনধারী ব্যক্তির মধ্যে রিটার্ন দাখিল করেছিলেন ৫৫ হাজার ৬০২ জন। আর আয়কর রিটার্ন দাখিল করেননি ৬৮ হাজার ৩৩ জন বা ৫৫ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ টিআইএনধারী। ওই বছরে খুলনা অঞ্চলে কর আদায় হয় ১৩ কোটি ৬৮ লাখ টাকা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, খুলনা বিভাগে ইতিপূর্বে ২০০৮-০৯ করবর্ষে এক লাখ ১৪ হাজার টিআইএনধারী ব্যক্তির মধ্যে আয়কর রিটার্ন দাখিল করেছিলেন ৫১ হাজার ৭৫৫ জন। ওই করবর্ষে রিটার্ন দাখিল করেননি ৫৪ দশমিক ৬০ শতাংশ। ২০০৭-০৮ করবর্ষে এক লাখ আট হাজার টিআইনধারী ব্যক্তির বিপরীতে রিটার্ন দাখিল করেছিলেন ৪৮ হাজার ৫০৬ জন। রিটার্ন দাখিল করেননি ৫৯ হাজার ৪৯৪ জন বা ৫৫ দশমিক ১ শতাংশ টিআইএনধারী। ২০০৬-০৭ করবর্ষে এক লাখ চার হাজারের বিপরীতে রিটার্ন দাখিল করেন ৪৪ হাজার ৬৮২ জন। রিটার্ন দাখিল করেননি ৫৯ হাজার ৩১৮ জন বা ৫৭ শতাংশ টিআইএনধারী।
১৮টি সার্কেল কার্যালয়ের মাধ্যমে খুলনা অঞ্চলের কর প্রশাসন পরিচালিত হয়। এই অঞ্চলের উপ-কর কমিশনার গণেশ চন্দ্র মণ্ডল প্রথম আলোকে বলেন, ‘যাঁরা রিটার্ন দাখিল করেননি তাঁদের মধ্যে এমন অনেকেই আছেন, যাঁরা সাত-আট বছর ধরেই এ কাজ করছেন না।’

চিটাগাং কেমিক্যাল কমপ্লেক্স এ বছরই চালু হতে পারে

চিটাগাং কেমিক্যাল কমপ্লেক্স এ বছরই চালু হতে পারে। শিল্প মন্ত্রণালয়ে গত সপ্তাহে এ নিয়ে বৈঠক হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এই কমপ্লেক্স চালু করার বিষয়ে চার সদস্যের যে কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়েছিল তার প্রতিবেদন প্রস্তুতও চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। কিছু কারিগরি ও আর্থিক বিষয়ে আলোচনা চলছে। এগুলো চূড়ান্ত হলেই আনুষ্ঠানিকভাবে মিলটি চালুর ঘোষণা দেওয়া হবে।
এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে তবে শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া বলেন, ‘এ বছরই মিলটি চালু হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী যে কমিটি করে দিয়েছেন, তাদের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। আশা করি দ্রুত মিলটির কার্যক্রম আবারও শুরু হবে।’
প্রসঙ্গত, গত ৩ মে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশক্রমে বিনিয়োগ বোর্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যানকে সভাপতি করে একটি কমিটি গঠন করা হয়, যেখানে সদস্য হিসেবে শিল্প মন্ত্রণালয়ের দুজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিনিধি রাখা হয়েছে।
সরকারি প্রজ্ঞাপনে কমিটির কার্যপরিধি সম্পর্কে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি চালু করা হলে সার্বিক উৎপাদন, পরিচালনা, লাভ-লোকসান পর্যালোচনা, উৎপাদিত পণ্যের ব্যয় এবং সম্ভাব্য বাজার কী হতে পারে, কমিটি সেসব বিষয় বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদন তৈরি করবে।
এ ছাড়া চিটাগাং কেমিক্যাল কমপ্লেক্সের আর্থিক ব্যবস্থাপনার বাণিজ্যিক সংস্কার সাধনের প্রয়োজনীয় সুপারিশ করবে তারা।
এই কমিটিকে ৯০ দিনের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কাছে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন পেশের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হলেও নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন তৈরির কাজ শেষ করা যায়নি। তবে অচিরেই প্রধানমন্ত্রীর কাছে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে বলে শিল্প মন্ত্রণালয় সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
১৯৬৫ সালে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে প্রায় ৯২ একর জমির ওপর বার্ষিক প্রায় ২২ হাজার টন রাসায়নিক পণ্য উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন চিটাগাং কেমিক্যাল কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠিত হয়।
এখানে সাত হাজার টন কস্টিক সোডা, চার হাজার ৬০০ টন তরল ক্লোরিন, সাত হাজার টন হাইড্রোলিক অ্যাসিড, ৬০০ টন ব্লিচিং পাউডার এবং দুই হাজার ৪০০ টন ক্যালসিয়াম হাইড্রোক্লোরাইড উৎপাদন ক্ষমতা রয়েছে। দীর্ঘ তিন দশকের ওপরে প্রতিষ্ঠানটি লাভজনকভাবে চালু ছিল।
কিন্তু সরকার বিরাষ্ট্রীকরণ নীতি অনুসরণ করতে গিয়ে ২০০২ সালে কারখানাটির উৎপাদন বন্ধ করে দেয়। আর ২০০৩ সালে শ্রমিক-কর্মচারীদের পাওনা বুঝিয়ে দিয়ে পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয় চিটাগাং কেমিক্যাল কমপ্লেক্স।
এরপর দীর্ঘ সাত বছর প্রতিষ্ঠানটির জায়গাজমি ও যন্ত্রপাতি সম্পূর্ণ অব্যবহূত অবস্থায় পড়েছিল।
বিগত জোট সরকার অবশ্য একাধিকবার কারখানাটি বিক্রির উদ্যোগ নেয়। তবে তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর নতুন করে মিলটি আবারও চালু করার ঘোষণা দেয়। কিন্তু এক বছরের বেশি সময় অতিবাহিত হওয়ার পর মিলটি এখনো চালু করতে পারেনি সরকার।
এদিকে বাংলাদেশ রসায়ন শিল্প করপোরেশন (বিসিআইসি) সূত্রে জানা যায়, সংস্থার দেওয়া ২৭ কোটি টাকা বিনিয়োগের একটি প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে আছে। যন্ত্রপাতি সংস্কার ও কারখানাটি নতুনভাবে চালু করার জন্য বিসিআইসি নিজস্ব তহবিল থেকে এই বিনিয়োগ করার প্রস্তাব দেয়।
প্রস্তাব অনুযায়ী কারখানাটি চালু হলে প্রাথমিক পর্যায়ে ২১ কোটি টাকার পণ্যসামগ্রী উৎপাদন হবে এবং তা থেকে প্রতিবছর এক কোটি টাকা মুনাফা হবে। নতুন করে কর্মসংস্থান হবে ২৫০ জন লোকের।

এডিবির সঙ্গে ১০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি স্বাক্ষর

ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির সংযোগ লাইন নির্মাণের জন্য বাংলাদেশ সরকার এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কাছ থেকে ১০ কোটি ডলার বা ৭০০ কোটি টাকা ঋণ নিচ্ছে। গতকাল বুধবার অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে এ ঋণের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
বাংলাদেশের পক্ষে ঋণচুক্তিতে স্বাক্ষর করেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব মোশাররফ হোসেন। এডিবির পক্ষে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক থিবা কুমার কানদিয়া।
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের সম্মেলন কক্ষে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে এই চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে এডিবির থিবা কানদিয়া বলেন, এই প্রকল্প দক্ষিণ এশিয়ায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতার দুয়ার খুলে দিয়েছে। এতে দক্ষিণ এশিয়ার বিদ্যুতের আরও দক্ষ ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠবে এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা ও বাণিজ্য বাড়বে।
প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫ কোটি ৮৬ লাখ ডলার বা এক হাজার ১১০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১০ কোটি ডলার বা ৭০০ কোটি টাকা দেবে এডিবি।
আর বাকি পাঁচ কোটি ৮৬ লাখ ডলার বা ৪১০ কোটি টাকা সরকারকেই জোগান দিতে হবে।
এডিবির কাছ থেকে ৩২ বছর মেয়াদে এই ঋণ নেওয়া হচ্ছে। প্রথম আট বছর আসলের কিস্তি পরিশোধ করতে হবে না। তবে এ সময় বছরে ১ শতাংশ হারে সুদ দিতে হবে। পরবর্তী ২৪ বছরে দেড় শতাংশ হারে সুদ দিতে হবে আসলের কিস্তি পরিশোধসহ।
এই প্রকল্পের অধীনে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আনতে গিয়ে ৪০০ কেভি ক্ষমতাসম্পন্ন ৪০ কিলোমিটার ট্রান্সমিশন লাইন স্থাপন করা হবে। এ ছাড়া কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি সাবস্টেশন তৈরি হবে। প্রকল্পের কাজ শেষ হবে ২০১৩ সালে।
এ ছাড়া একই অনুষ্ঠানে উচ্চমানের সবজি, মসলা ও ফলমূল চাষাবাদের জন্য সহায়তা হিসেবে এডিবির সঙ্গে চার কোটি ডলারের আরেকটি ঋণচুক্তি স্বাক্ষর করা হয়।
শস্য বহুমুখীকরণ প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের আওতায় ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে এসব চাষাবাদে এই ঋণের অর্থ ব্যবহার করা হবে।
প্রসঙ্গত, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় গত ১১ জানুয়ারি দুই দেশের মধ্যে বিদ্যুৎ খাতে সহযোগিতার উদ্দেশ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। তারপর দুই দেশের বিদ্যুৎ সচিব পর্যায়ের যৌথ স্টিয়ারিং কমিটির দুটি এবং যুগ্ম সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নেতৃত্বাধীন যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের দুটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এর মাত্র সাড়ে ছয় মাসের মাথায় ২৬ জুলাই বিদ্যুৎ আমদানির অবকাঠামো নির্মাণের অংশ হিসেবে দুই দেশের মধ্যে ৩৫ বছর মেয়াদি বিদ্যুৎ সঞ্চালনের একটি চুক্তি সই হয়। ওই চুক্তির আওতায় ২০১২ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ভেড়ামারা দিয়ে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি শুরু হবে।

দুই প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শাতে বলেছে এসইসি

পুঁজিবাজারের নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগে তালিকাভুক্ত দুই কোম্পানিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)।
নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি একই সঙ্গে দুই কোম্পানির চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পরিচালকসহ কোম্পানি সচিবকে শুনানিতে তলব করেছে। অভিযুক্ত কোম্পানি দুটি হলো পাইওনিয়ার ইনসু্যুরেন্স এবং বাংলাদেশ ওয়েল্ডিং ইলেকট্রোডস।
এসইসি সূত্র জানায়, সম্প্রতি পাইওনিয়ার ইনস্যুরেন্সের বিশেষ সাধারণ সভায় (ইজিএম) রাইট শেয়ার ছাড়ার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। কিন্তু কোম্পানিটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রাইট শেয়ার ছাড়ার আবেদন এসইসিতে জমা দেয়নি।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ওয়েল্ডিংয়ের একটি মূল্য সংবেদনশীল ঘোষণায় শেয়ারের অভিহিত মূল্য ১০ টাকার পরিবর্তে ১০০ টাকা উল্লেখ করা হয়েছিল।
এর মাধ্যমে পাইওনিয়ার ইনস্যুরেন্স সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (রাইট ইস্যু) বিধিমালা, ২০০৬-এর ৭ নম্বর ধারা এবং বাংলাদেশ ওয়েল্ডিং সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯-এর ১৮ নম্বর ধারা ভঙ্গ করেছে বলে জানিয়েছে এসইসি।
বিধিমালার সংশ্লিষ্ট ধারা অনুযায়ী ইজিএমে অনুমোদন পাওয়ার পরবর্তী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে রাইট শেয়ার ছাড়ার অনুমোদন চেয়ে এসইসিতে আবেদন জমা দিতে হয়। গত ৯ মে ইজিএমে রাইট ছাড়ার সিদ্ধান্ত হলেও কোম্পানিটি ১০ আগস্ট এই আবেদন জমা দিয়েছে।

এডিবির সঙ্গে ১০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি স্বাক্ষর

ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির সংযোগ লাইন নির্মাণের জন্য বাংলাদেশ সরকার এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কাছ থেকে ১০ কোটি ডলার বা ৭০০ কোটি টাকা ঋণ নিচ্ছে। গতকাল বুধবার অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে এ ঋণের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
বাংলাদেশের পক্ষে ঋণচুক্তিতে স্বাক্ষর করেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব মোশাররফ হোসেন। এডিবির পক্ষে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক থিবা কুমার কানদিয়া।
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের সম্মেলন কক্ষে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে এই চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে এডিবির থিবা কানদিয়া বলেন, এই প্রকল্প দক্ষিণ এশিয়ায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতার দুয়ার খুলে দিয়েছে। এতে দক্ষিণ এশিয়ার বিদ্যুতের আরও দক্ষ ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠবে এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা ও বাণিজ্য বাড়বে।
প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫ কোটি ৮৬ লাখ ডলার বা এক হাজার ১১০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১০ কোটি ডলার বা ৭০০ কোটি টাকা দেবে এডিবি।
আর বাকি পাঁচ কোটি ৮৬ লাখ ডলার বা ৪১০ কোটি টাকা সরকারকেই জোগান দিতে হবে।
এডিবির কাছ থেকে ৩২ বছর মেয়াদে এই ঋণ নেওয়া হচ্ছে। প্রথম আট বছর আসলের কিস্তি পরিশোধ করতে হবে না। তবে এ সময় বছরে ১ শতাংশ হারে সুদ দিতে হবে। পরবর্তী ২৪ বছরে দেড় শতাংশ হারে সুদ দিতে হবে আসলের কিস্তি পরিশোধসহ।
এই প্রকল্পের অধীনে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আনতে গিয়ে ৪০০ কেভি ক্ষমতাসম্পন্ন ৪০ কিলোমিটার ট্রান্সমিশন লাইন স্থাপন করা হবে। এ ছাড়া কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি সাবস্টেশন তৈরি হবে। প্রকল্পের কাজ শেষ হবে ২০১৩ সালে।
এ ছাড়া একই অনুষ্ঠানে উচ্চমানের সবজি, মসলা ও ফলমূল চাষাবাদের জন্য সহায়তা হিসেবে এডিবির সঙ্গে চার কোটি ডলারের আরেকটি ঋণচুক্তি স্বাক্ষর করা হয়।
শস্য বহুমুখীকরণ প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের আওতায় ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে এসব চাষাবাদে এই ঋণের অর্থ ব্যবহার করা হবে।
প্রসঙ্গত, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় গত ১১ জানুয়ারি দুই দেশের মধ্যে বিদ্যুৎ খাতে সহযোগিতার উদ্দেশ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। তারপর দুই দেশের বিদ্যুৎ সচিব পর্যায়ের যৌথ স্টিয়ারিং কমিটির দুটি এবং যুগ্ম সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নেতৃত্বাধীন যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের দুটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এর মাত্র সাড়ে ছয় মাসের মাথায় ২৬ জুলাই বিদ্যুৎ আমদানির অবকাঠামো নির্মাণের অংশ হিসেবে দুই দেশের মধ্যে ৩৫ বছর মেয়াদি বিদ্যুৎ সঞ্চালনের একটি চুক্তি সই হয়। ওই চুক্তির আওতায় ২০১২ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ভেড়ামারা দিয়ে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি শুরু হবে।

দুই প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শাতে বলেছে এসইসি

পুঁজিবাজারের নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগে তালিকাভুক্ত দুই কোম্পানিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)।
নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি একই সঙ্গে দুই কোম্পানির চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পরিচালকসহ কোম্পানি সচিবকে শুনানিতে তলব করেছে। অভিযুক্ত কোম্পানি দুটি হলো পাইওনিয়ার ইনসু্যুরেন্স এবং বাংলাদেশ ওয়েল্ডিং ইলেকট্রোডস।
এসইসি সূত্র জানায়, সম্প্রতি পাইওনিয়ার ইনস্যুরেন্সের বিশেষ সাধারণ সভায় (ইজিএম) রাইট শেয়ার ছাড়ার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। কিন্তু কোম্পানিটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রাইট শেয়ার ছাড়ার আবেদন এসইসিতে জমা দেয়নি।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ওয়েল্ডিংয়ের একটি মূল্য সংবেদনশীল ঘোষণায় শেয়ারের অভিহিত মূল্য ১০ টাকার পরিবর্তে ১০০ টাকা উল্লেখ করা হয়েছিল।
এর মাধ্যমে পাইওনিয়ার ইনস্যুরেন্স সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (রাইট ইস্যু) বিধিমালা, ২০০৬-এর ৭ নম্বর ধারা এবং বাংলাদেশ ওয়েল্ডিং সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯-এর ১৮ নম্বর ধারা ভঙ্গ করেছে বলে জানিয়েছে এসইসি।
বিধিমালার সংশ্লিষ্ট ধারা অনুযায়ী ইজিএমে অনুমোদন পাওয়ার পরবর্তী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে রাইট শেয়ার ছাড়ার অনুমোদন চেয়ে এসইসিতে আবেদন জমা দিতে হয়। গত ৯ মে ইজিএমে রাইট ছাড়ার সিদ্ধান্ত হলেও কোম্পানিটি ১০ আগস্ট এই আবেদন জমা দিয়েছে।

দুই বাজারেই সূচক নতুন উচ্চতায়

দেশের শেয়ারবাজারকে দীর্ঘ মেয়াদে স্থিতিশীল রাখার প্রায় সব উদ্যোগই ব্যর্থ হওয়ার পথে। তারল্যপ্রবাহ কমাতে ঋণ নিয়ন্ত্রণ, ঋণবহির্ভূত শেয়ারের আর্থিক সমন্বয়সুবিধা বাতিল, নজরদারি জোরদার করাসহ নিয়ন্ত্রক সংস্থার সতর্কতা, উদ্বেগ ও শঙ্কা কিছুই আর কাজে আসছে না।
বাজার নিয়ন্ত্রণে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলে বড়জোর দু-এক দিন সূচক কিছুটা কমে। তারপর আবার আগের চেয়েও বেশি গতিতে বাড়তে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় দেশের দুই স্টক এক্সচেঞ্জের সাধারণ মূল্যসূচক আবারও অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে গতকাল বুধবার।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সাধারণ মূল্যসূচক আগের দিনের চেয়ে ৫০ পয়েন্ট বেড়ে সাত হাজার ৫১৩ পয়েন্ট ছাড়িয়ে গেছে। এটি ডিএসইর ইতিহাসে সর্বোচ্চ মূল্যসূচক। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সাধারণ মূল্যসূচক ১২১ পয়েন্ট বেড়ে ২১ হাজার ৮৫৯ পয়েন্ট ছাড়িয়েছে। এটি সিএসইর সর্বোচ্চ সূচক।
আর এভাবে সূচক বাড়তে থাকায় তালিকাভুক্ত বিভিন্ন কোম্পানির সম্মিলিত বাজার মূলধন তিন লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি ছাড়িয়ে গেছে, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৪৭ শতাংশ। জুলাই মাসেও বাজার মূলধন জিডিপির ৪০ শতাংশের মতো ছিল।
বাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, গত কয় বছরে বাজার মূলধন যে হারে বেড়েছে, বাজারের গভীরতা সেই হারে বাড়েনি। শেয়ারের সরবরাহ বেড়ে যদি মূলধন বাড়ত, তাহলে তা হতো সবার জন্যই স্বস্তির। কিন্তু কেবল মূল্য বাড়ার কারণে মূলধন বাড়ায় ঝুঁকির মাত্রা বেড়ে গেছে।
তাঁরা আরও বলেন, দেশের শেয়ারবাজার এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। তাই এ মুহূর্তে কেউ বিনিয়োগ করলে নিজ দায়িত্বেই করতে হবে। এ জন্য বিনিয়োগকারীদের উচিত হবে ভালো মৌলভিত্তির তুলনামূলক কম মূল্যের শেয়ারে বিনিয়োগ করা। এতে মূল্য সংশোধনের সময় ঝুঁকির মাত্রা কমে আসবে।
বাজার পরিস্থিতি: ডিএসইতে গতকাল লেনদেনের শুরুর প্রথম ৪০ মিনিটের মধ্যে সাধারণ মূল্যসূচক ৮০ পয়েন্টের মতো বেড়ে যায়। এরপর সূচক কখনো বেড়েছে কখনো কমেছে। কিন্তু কখনোই তা ৫০ পয়েন্টের নিচে নামেনি।
সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি রেইসের বাজার পর্যালোচনা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গতকালের বাজারে সূচক বাড়ার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়েছে ব্যাংক, বিমা ও অব্যাংকিং আর্থিক খাতের কোম্পানি।
ডিএসই সূত্র জানায়, স্টক এক্সচেঞ্জটির মোট লেনদেনের ৬৭ শতাংশজুড়েই ছিল ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক খাতের শেয়ার। সম্মিলিতভাবে এই তিন খাতে মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল এক হাজার ৩৬০ কোটি টাকা। ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষ ১০টি কোম্পানির সাতটিই ছিল ব্যাংকিং খাতের শেয়ার। আর বাকি তিনটির মধ্যে দুটি ছিল অব্যাংকিং আর্থিক খাতের এবং অপরটি ছিল বিদ্যুৎ খাতের শেয়ার।
ডিএসইতে গতকাল ২৪৩টি কোম্পানির শেয়ার লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে দাম বেড়েছে ১৪৭টির, কমেছে ৯৫টির এবং অপরিবর্তিত ছিল একটি কোম্পানির শেয়ারের দাম। সিএসইতে লেনদেন হয়েছে ১৮৪টি কোম্পানির। এর মধ্যে দাম বেড়েছে ১০৪টির, কমেছে ৭৫টির ও অপরিবর্তিত ছিল পাঁচটি কোম্পানির শেয়ারের দাম।

আইসিসির গ্লোবাল ক্রিকেট একাডেমি

একের পর এক কলঙ্কিত ঘটনা ভদ্রলোকের খেলা ক্রিকেটকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে ঠিকই, পাশাপাশি ক্রিকেটকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টাও কিন্তু থেমে নেই। বিশ্ব ক্রিকেটকে আরেক ধাপ এগিয়ে নিতে গতকালই দুবাইতে উদ্বোধন করা হলো আইসিসি গ্লোবাল ক্রিকেট একাডেমি।
ইনডোর অনুশীলনের সুবিধাসহ এই একাডেমিতে আছে ফিল্ডিং অনুশীলনের পর্যাপ্ত জায়গাও। আছে ভিন্ন চরিত্রের সাতটি উইকেট, যার কয়েকটি ফাস্ট বোলার-বান্ধব। অনুশীলন পর্যবেক্ষণের জন্য ইনডোরে বসানো থাকবে ক্যামেরা। ইনডোরে একাধিক শ্রেণীকক্ষ, বৈঠককক্ষ ও একটি ব্যায়ামাগার আছে। এ ছাড়া আউটডোর অনুশীলনের জন্য আছে ফ্লাডলাইডসমৃদ্ধ মাঠ। মাঠে আছে ৩৮টি উইকেট; যার ২৮টিই ঘাসের উইকেট। উইকেটগুলো বানানো হয়েছে বিভিন্ন টেস্ট খেলুড়ে দেশের কন্ডিশনের আদলে।
এই একাডেমি হওয়ায় সুবিধা হলো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারদের সঙ্গে এখানে অনুশীলন করতে পারবে স্থানীয় ক্রিকেটাররাও। একাডেমিতে ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিংয়ের জন্য তিন বিশেষজ্ঞ কোচ হিসেবে থাকছেন অস্ট্রেলিয়ার সাবেক উইকেটরক্ষক রডনি মার্শ, সাবেক পাকিস্তানি অলরাউন্ডার মুদাসসর নজর ও নিউজিল্যান্ডের সাবেক ফাস্ট বোলার রিচার্ড হ্যাডলি। একাডেমি উদ্বোধন করতে গিয়ে আইসিসির সভাপতি শারদ পাওয়ার বললেন, ‘এই একাডেমি ক্রিকেটার, ক্রিকেট প্রশাসক, কোচ, আম্পায়ার ও কিউরেটর—সবারই উপকারে আসবে।’

কলঙ্কের তিলমোচন পাকিস্তানের

একটা অপবাদ থেকে আপাতত মুক্তি পেল পাকিস্তানের ক্রিকেট। গত ইংল্যান্ড সফরে তৃতীয় ওয়ানডে ম্যাচটি নিয়ে সন্দেহ জেগেছিল আইসিসির। এ নিয়ে তদন্তও করেছে আইসিসির দুর্নীতিবিরোধী বিভাগ (এসিএসইউ)। কিন্তু কাল ক্রিকেটের অভিভাবক সংস্থাটি জানিয়েছে, এ সংক্রান্ত যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তৃতীয় ওয়ানডের আগে ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড সান আইসিসিকে সতর্ক করেছিল, ওই ম্যাচটির নির্দিষ্ট কিছু ওভারে কত রান উঠবে, সেটি আগে থেকেই ঠিক করা। টেস্ট সিরিজেই স্পট-ফিক্সিং নিয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত ছিল। ওই সময় সান-এর এমন অভিযোগ। পত্রিকাটির তোলা সন্দেহের সঙ্গে মিলে গিয়েছিল পাকিস্তানের ইনিংসের দুটো ওভারের রানও। তখনই আইসিসি জানায়, এই ম্যাচ নিয়ে তদন্ত করবে এসিএসইউ।
বিভাগটির তদন্ত আপাতত শেষ হয়েছে। কাল আইসিসির বিবৃতিতে পাকিস্তানের জন্য অবশ্য একটা অস্বস্তিও থেকে গেল, ‘ভবিষ্যতে এ ব্যাপারে নতুন কোনো প্রমাণ পেলে এসিএসইউ নতুন করে তদন্ত করবে।’ পাকিস্তানের তিন অভিযুক্ত ক্রিকেটার অবশ্য এখনই স্বস্তি পাচ্ছেন না। এ মাসের শেষে তাঁদের অভিযোগ নিয়ে শুনানি হবে। তখনই জানা যাবে মোহাম্মদ আসিফ, সালমান বাট আর মোহাম্মদ আসিফ আসলেই নিষ্পাপ কি না।
এদিকে কাল দুবাইয়ে আইসিসির বোর্ড সভায় টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ অনুমোদন করা হয়েছে। ২০১৩ সালে টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ চারটি দল নিয়ে হবে লিগ পদ্ধতির টেস্ট টুর্নামেন্ট। ওই সময়ের মধ্যেই টেস্ট খেলুড়ে দশটি দেশকেই (মে মাসে জিম্বাবুয়েও ফিরে আসছে টেস্ট ক্রিকেটে) হোম-অ্যাওয়ে সিরিজ খেলে ফেলতে হবে। ফলে ভারত সফরের জন্য বাংলাদেশের দীর্ঘ প্রতীক্ষা এবার অবসান হতে চলেছে। একইভাবে আলাদা একটি ওয়ানডে লিগও চলবে।
ওয়ানডে বিশ্বকাপ স্বমহিমাতেই থাকছে। যদিও ২০১৫ থেকে দলের সংখ্যা কমিয়ে দশটি করা হয়েছে। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দল ১২ থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ১৬টি।

শ্যুটিংয়ের অর্ধেক পদকই ভারতের

১৫ সোনা, ১১ রুপা, ৪ ব্রোঞ্জ—কমনওয়েলথ গেমস শ্যুটিংয়ে ৫৪টি পদকের ৩০টিই জিতে নিয়েছে ভারত!
ভারতীয় শ্যুটিংয়ের অগ্রযাত্রার এটিই বড় প্রমাণ। ভিত্তিটা তৈরি করেন হাঙ্গেরিয়ান কোচ ওজিল। ৮ বছরে স্থানীয় অনেক কোচও তৈরি হয়েছে তাঁর হাতে। সেই ওজিল এখন ইরানের কোচ। বাংলাদেশ দলের সবার মুখে আফসোস, ‘ওজিলের মতো এমন একজন কোচ যদি আমরা পেতাম!’
গত আসরের শ্যুটিংয়ে মোট সোনা ছিল ২৭টি, ভারত জিতেছে ১৬টি। এবার তিনটি ইভেন্ট বেড়েছে, একটি সোনা কম পেয়েছে ভারত। তবে মোট পদকের হিসাবে কমনওয়েলথ গেমসে এটিই ভারতের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
তৃপ্ত সানি টমাস। ১৭ বছর ধরে ভারতীয় শ্যুটিং দলের এই কোচ অবসরে যাচ্ছেন শিগগিরই। কাল বলছিলেন, ‘সামগ্রিকভাবে ভালো ফল করেছি আমরা। আগামী কয়েক বছরে প্রতিটি ইভেন্টেই আমাদের বিশ্বমানের শ্যুটার বের হবে।’
অভিনব বিন্দ্রা, গগন নারাংরা বিশ্বমানে পৌঁছেছেন আগেই। ১৯তম কমনওয়েলথ গেমসে সবচেয়ে বেশি সোনা (৪টি) জিতে সেই মর্যাদাও রাখলেন গগন। পিস্তল শ্যুটার বিজয় কুমার ও ওঙ্কার সিং জিতেছেন তিনটি করে। শ্যুটিং রেঞ্জে ভারতীয়দেরই জয়জয়কার।
হবে না-ই বা কেন? সাফল্য নিশ্চিত জেনেও ভারতীয় শ্যুটিং ফেডারেশন পদকজয়ীদের জন্য ২০-১০-৫ লাখ রুপি অর্থ পুরস্কার ঘোষণা করেছে। শ্যুটিংয়ের উন্নয়নে ভারতের আন্তরিক চেষ্টার এটি আরেকটি উদাহরণ।

শেখ রাসেলের শিরোপা

ঢাকা মহানগরী টেবিল টেনিস লিগে সিনিয়র ডিভিশনে হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়ন হয়েছে শেখ রাসেল। পল্টন উডেনফ্লোর জিমনেসিয়ামে শেষ ম্যাচে শেখ রাসেল কাল ৩-০ সেটে হারায় শিশিরণ একাডেমিকে। মহিলা লিগে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বিমান। লিগের শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে বিমান ৩-১ সেটে হারিয়েছে আবাহনীকে। প্রথম বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে মোলার টিটি। এবার সিনিয়র ডিভিশনে ১০টি, প্রথম বিভাগে ১৭টি ও মহিলা লিগে ৭টি দল অংশ নেয়। খেলা শেষে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন ফেডারেশনের সভাপতি আবদুল করিম।

বাজল যখন শেষের বাঁশি

অ্যাথলেটরা ফুরফুরে মেজাজে ঘুরছেন। প্রায় সবার হাতেই একটা করে শপিং ব্যাগ। শেষের বাঁশি বাজলে যা হয়...।
অক্ষরধামের বিশাল এলাকাজুড়ে গেমস-পল্লি। গত কয়েক দিনের চেনা দৃশ্যগুলো উধাও। মাঠে যাওয়ার তাড়া নেই। বেশির ভাগ খেলোয়াড়ই ‘দর্শক’ হয়ে গেছেন। আজ ম্যারাথনসহ আর দু-একটি খেলা আছে। এ নিয়ে আর কে আগ্রহ দেখায়। এখন যে শুধু বাড়ি ফেরার পালা।
গত ৩ অক্টোবর শুরু হয়েছিল ১৯তম কমনওয়েলথ গেমস। আজ বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা সাতটায় নেহরু স্টেডিয়ামের আলো ঝলমলে পরিবেশে পর্দা নেমে যাবে ৭১টি দেশের মহামিলনের।
নিরাপত্তা, অব্যবস্থাপনা নিয়ে কত কথাই না গেমস শুরুর আগে লিখেছে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম। এখন সেই কথা তাদেরই গিলতে হচ্ছে। ইংল্যান্ডের সাংবাদিক বার্নার্ড ফেরেকা আয়োজন নিয়ে বলছিলেন, ‘ইয়া ইটস গুড।’
প্রথম দিকে ভেন্যু তেমন দর্শক টানতে না পারলেও মাঝামাঝি এসে ছবিটা পাল্টেছে। নেহরু স্টেডিয়ামে অ্যাথলেটিকস দেখেছে ৫০ হাজারের ওপরে দর্শক। দর্শকপ্রিয় অন্য খেলাগুলোতেও ছিল প্রচণ্ড ভিড়।
গেমসের ১৭টি ভেন্যই অত্যাধুনিক। খেলোয়াড়দের আবাসস্থল ‘গেমস-পল্লি’ অনন্য। পাঁচ তারকা হোটেলের সঙ্গে তুলনীয় হচ্ছে নির্দ্বিধায়। শৃঙ্খলা, সময়ানুবর্তিতা, আন্তরিকতায় দশে দশই পাওয়ার দাবি রাখে দিল্লি।
তবে গেমসটা ডোপমুক্ত থাকতে পারেনি। দ্রুততম মানবীর সোনার পদক পাওয়া নাইজেরিয়ার ওসায়েমি ওলুদামেলা দ্বিতীয় দফায়ও পজিটিভ। কাল সকালের বুলেটিন, ‘ধরা পড়েছেন এক ভারতীয় খেলোয়াড়’। কমনওয়েলথ গেমস ফেডারেশনের সভাপতি সংবাদ সম্মেলনে এসে হতাশাই জানালেন, ‘মাদকের ব্যাপারটা কঠোর হাতে দমন করতে চাই। কিন্তু তার পরও অনেকেই পজিটিভ।’
আজ থেকে গোটা আয়োজনটাই স্মৃতির পাতায় ঠাঁই নিচ্ছে। ‘সফল’ এই আয়োজনের পর অলিম্পিক আয়োজন করতে চাইবে ভারত? সংবাদ সম্মেলনে আয়োজক কমিটির প্রধান সুরেশ কালমাডি কূটনৈতিক উত্তরই দিলেন, ‘গেমসটা শেষ হতে দিন। তারপর ভাবব।’
কয়েকটি কমনওয়েলথ গেমসের ধারাবাহিতকায় কাল বিকেল পর্যন্ত ৭০টি সোনাসহ ১৬০ পদক জিতে যথারীতি শীর্ষে অস্ট্রেলিয়া। সাইক্লিং, সাঁতার, জিমন্যাস্টিকসসহ আরও কয়েকটি খেলায় অস্ট্রেলিয়া দেখিয়েছে একক প্রাধান্য। সাইক্লিংয়ের ১৫ সোনার ১৩টিই চ্যাম্পিয়নদের!
এসব পরিসংখ্যান নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার দৈনিক সান-এর রিপোর্টার ফিন ব্রাডশো খুবই নিরাবেগ, ‘ইংল্যান্ড কিন্তু সাইক্লিংয়ে সেরা দল না পাঠায়নি। আমরা সেরা হব, এটা তো জানাই!’
দ্বিতীয় স্থান নিয়ে লড়াইটা জমে উঠেছে। দ্বিতীয় থেকে কাল বিকেলে ভারত নেমে গেছে তিনে। ভারত-ইংল্যান্ড দুই দলেরই সোনা ৩২টি। পদকের হিসাবে (ভারত ৯১, ইংল্যান্ড ১২৮) শেষ মুহূর্তে অস্ট্রেলিয়ার পর ইংল্যান্ড। ২০০২ ম্যানচেস্টার কমনওয়েলথ গেমসে ৩০ সোনা, ২২ রুপা, ১৭ ব্রোঞ্জসহ রেকর্ড ৬৯টি পদক জিতেছিল ভারত। এবারই কমনওয়েলথ গেমসে নিজেদের সেরা সাফল্য পেল ভারত।
সোনা শিকারে এরপর আছে কানাডা (২৬), দক্ষিণ আফ্রিকা (১২), নাইজেরিয়া (১১), কেনিয়া (১০)। সোনাজয়ী ২১টি দেশের তালিকায় আছে সাফভুক্ত পাকিস্তান (২টি) ও শ্রীলঙ্কা (১টি)। কাল বিকেলে বক্সিং শ্রীলঙ্কার অপেক্ষার অবসান ঘটিয়েছে। আর বাংলাদেশ?
পুরুষ ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে পাওয়া দলীয় ব্রোঞ্জটাই একমাত্র প্রাপ্তি। বাংলাদেশের ৩৬ জন খেলোয়াড়ের দু-চারজন ছাড়া অন্যদের পারফরম্যান্স জঘন্য। এসএ গেমসেও পাতে তোলার মতো নয়। অনেক খেলোয়াড়ই প্রতিটি বিদেশ সফরে থাকেন, কিন্তু ঘুরেফিরে ১০ জনে দশম। বাংলাদেশ দলের শেফ দ্য মিশন নুরুল ফজল (বুলবুল) বলছিলেন, ‘নতুন করে সবকিছু ভাবা উচিত।’
কত ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী এই মঞ্চ থেকে মাথা উঁচু করে বেরোচ্ছে! ১৯৬২ সালে নিউজিল্যান্ড থেকে স্বাধীনতা পাওয়া ৮ বর্গমাইলের দেশ নওরু পর্যন্ত একটি সোনা জিতেছে। কমনওয়েলথ গেমসের শেষ বাঁশির শোনার সঙ্গে ক্ষুদ্র দেশগুলোর কাছেও কি লজ্জা পেল না বাংলাদেশ!

সত্যিই রিয়াল ছাড়ছেন কাকা

একদিকে স্বদেশি রোনালদিনহোর হাত বাড়িয়ে ডাকা। অন্যদিকে মরিনহোর কাছে ব্রাত্য হয়ে পড়া। সব মিলিয়ে রিয়াল মাদ্রিদে আর বেশি দিন থাকা হচ্ছে না বলে ধরে নিচ্ছে অনেকেই। কাকা নিজেও সেই ইঙ্গিত দিচ্ছেন। বলছেন, আর অল্প কয়টা দিনই নাকি রিয়াল মাদ্রিদে আছেন। তা কত দিন? আসছে গ্রীষ্ম পর্যন্ত—বলে দিয়েছেন ব্রাজিলিয়ান প্লে-মেকার।
যে ধাম ছেড়ে এসেছেন, সেখানেই নাম লেখাতে পারেন কাকা। চারদিকে গুঞ্জনটা সে রকমই। এসি মিলানও তাঁকে আবার ফিরিয়ে নিতে ইচ্ছুক। কাকাকে আবার দলে নিলে শুধু আরেকজন মহারথীর দলভুক্তিই নিশ্চিত হয় না; সঙ্গে রোনালদিনহোর ‘যাই যাই’ করাটা বন্ধ করা যায়। বেশ কিছুদিন ধরেই এসি মিলান ছেড়ে নিজের দেশ ব্রাজিলে চলে যাওয়ার কথা ভাবছেন সাবেক ফিফা বর্ষসেরা খেলোয়াড়। কিন্তু কাকা মিলানে নাম লেখালে আর যাবেন না বলেছেন তিনি।
এটা হলে কিন্তু বেশ হয়। এসি মিলানে তৈরি হয় একটা ব্রাজিলিয়ান বলয়। রোনালদিনহো, পাতো আর রবিনহো তো আছেনই। কাকা যুক্ত হলে তো ত্রয়ী হয়ে যাবে চতুষ্টয়। এটা কি সত্যি হবে? হতেই পারে। কাকা তো বলেই দিলেন, ‘পুরো সেরে উঠলে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে খেলব। এই গ্রীষ্ম পর্যন্ত মাদ্রিদেই থাকছি।’

পিসিবি ‘আলী বাবা ও চল্লিশ চোর’

স্পট ফিক্সিং ঘটনার পর পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড সদস্যদের (পিসিবি) কত কিছুই না শুনতে হয়েছে। তবে ইংল্যান্ডে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত ওয়াজিদ শামসুল হাসান পিসিবির ম্যানেজমেন্টকে একেবারেই অন্যরকম একটা তকমা দিয়েছেন। ‘পিসিবির ম্যানেজমেন্ট হচ্ছে আলী বাবা ও চল্লিশ চোর’—বলেছেন ওয়াজিদ।
পাকিস্তান জাতীয় সংসদের স্থায়ী কমিটির এক বৈঠকে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারির কাছে লেখা ওয়াজিদের এই চিঠির ভাষ্য প্রকাশ করা হয়। বৈঠকটি হয়েছিল পাকিস্তানের ইংল্যান্ড সফরের সময় ঘটে যাওয়া স্পট ফিক্সিং নিয়ে। এত তকমা থাকতে পিসিবি ম্যানেজমেন্টকে ‘আলী বাবা ও চল্লিশ চোর’ বললেন কেন? ব্যাখ্যাটা শুনুন ওয়াজিদের চিঠি থেকেই, ‘পিসিবি আসলে ওয়ানম্যান “শো”। যত জটিল বিষয়ই হোক, এখানে কেবল একজনের সিদ্ধান্তই বড়, সেই সিদ্ধান্ত দেওয়ার লোকটি ইজাজ বাট। পুতুল গভর্নিং বডি মাথা নিচু করে শুধু তাতে সায় দেয়।

টেন্ডুলকারই সর্বকালের সেরা

সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যান কে? স্যার ডন ব্র্যাডম্যান নাকি শচীন টেন্ডুলকার? কিছুদিন আগে আরও কয়েকটি নাম ছিল। কিন্তু সবাইকে পেছনে ফেলে বিতর্কটা এখন ডনের সঙ্গে কেবল টেন্ডুলকারেরই। এবার বুঝি স্যার ডনের নামটি আসলেই পেছনে পড়তে শুরু করল। অস্ট্রেলিয়ানরাই যে নির্বাচন করে ফেলল—শচীন টেন্ডুলকারই সর্বকালের সেরা! ব্যাঙ্গালোর টেস্টে টেন্ডুলকারের ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ ডাবল সেঞ্চুরি করার পর পরই ‘শচীন টেন্ডুলকারই কি সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যান?’ এই প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে জনমত জরিপে নামে অস্ট্রেলিয়ার জনপ্রিয় দৈনিক সিডনি মর্নিং হেরাল্ড। ব্র্যাডম্যানের দেশের পত্রিকার জরিপ উপহার দিয়েছে বিস্ময়। অনলাইনে অংশ নেয় ১৪৬০০ জন, ৮৪ শতাংশ ভোট পড়েছে ‘হ্যাঁ’ বাক্সে। মানে টেন্ডুলকারকে সেরা মেনে নিয়েছেন ৮৪ শতাংশ ভোটার। মাত্র ১৬ শতাংশ ভোট গেছে টেন্ডুলকারের বিপক্ষে! ওয়েবসাইট।
নিন্দুকেরা অবশ্য বসে নেই। তারা চটজলদি খুঁজে বের করেছে একটা খুঁত। তাদের কথা, জরিপে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানরত অনেক ভারতীয় ভোটার টেন্ডুলকারের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। কিন্তু এটি ধরে নিলেও এও সত্য, উল্লেখসংখ্যক অস্ট্রেলিয়ানের কাছে টেন্ডুলকারই সেরা।

ঐতিহাসিক মুহূর্তের অপেক্ষা

বাংলাদেশ আজ এমন জায়গায় দাঁড়িয়ে, যেখানে এর আগে কখনোই আমরা দাঁড়াতে পারিনি। হ্যাঁ, ওয়েস্ট ইন্ডিজের মতো দলের বিপক্ষেও আমরা সিরিজ জিতেছি। কিন্তু সেই দলের সঙ্গে এই নিউজিল্যান্ডের কোনো তুলনা চলে না। এই প্রথম আমরা সত্যিকারের একটা বড় দলের বিপক্ষে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে সিরিজ জয়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি।
বাংলাদেশ দল যেন খেলছে, সেটা আমার চোখে প্রায় নিখুঁত ক্রিকেট; অন্তত আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে। তাই এ অবস্থায় দলের প্রতি কোনো উপদেশ চলে না। শুধু ঐতিহাসিক এই সময়ের জন্য কিছু টিপস দেওয়া যাক খেলোয়াড়দের—
যা করতে হবে
 খেলাটা উপভোগ করো। আমার কাছে সবচেয়ে ভালো লাগছে আমাদের দলের শারীরিক ভাষাটা। বোঝাই যাচ্ছে, খেলা খুব উপভোগ করছে ওরা। সিরিজে কী হবে না হবে, ভুলে যাও। যদিও আমি স্বপ্ন দেখছি, আজই সিরিজ জিতে যাব আমরা। কিন্তু দল যেন সেটা ভুলে শুধু ক্রিকেট উপভোগ করতে মাঠে নামে।
 ইতিবাচক চিন্তা করতে হবে। এখন আর এই দলটাকে ইতিবাচক চিন্তা করা শেখানোর কিছু নেই। দুই ম্যাচেই এই চিন্তার প্রতিফলন দেখলাম। সেটা ধরে রাখলেই হবে।
 ব্যাটিংয়ে ভালো শুরু ধরে রাখতে হবে। তামিম না থাকায় ওপেনিং নিয়ে অনেকেই একটু চিন্তায় পড়েছিল। কিন্তু শাহরিয়ার নাফীস প্রমাণ করে দিয়েছে, সে আগের চেয়েও বেশি কার্যকর ব্যাটসম্যান। নাফীস ও ইমরুল গত দুই ম্যাচে যেমন শুরু করে দিয়েছে সেটা করতে হবে।
 রস টেলর, ব্রেন্ডন ম্যাককালাম ও ড্যানিয়েল ভেট্টোরির ওপর চোখ রাখতে হবে। নিউজিল্যান্ড দলের ব্যাটসম্যানদের মধ্যে টেলর ও ভেট্টোরি সবচেয়ে ভালো স্পিন খেলে। আইপিএলের কল্যাণে ম্যাককালামও ভালো খেলছে। ভেট্টোরি ও ম্যাককালাম এখনো পর্যন্ত খুব বিপদ হতে পারেনি। টেলর কিন্তু দুই ম্যাচেই রান পেয়েছে। ফলে এই তিন ব্যাটসম্যানকে দ্রুত ফেরাতে হবে। অবশ্য টেলর একা রান করে গেলে অন্য প্রান্তে কেউ না থাকলে ওরা আর কী-ই বা করবে!
 গেমপ্ল্যান যেন এমনই থাকে। সিরিজ জয়ের কাছাকাছি বলে পরিকল্পনায় বৈপ্লবিক কোনো পরিবর্তন আনা যাবে না। এখন পর্যন্ত দুটি ম্যাচেই আমাদের পরিকল্পনা দারুণ মনে হয়েছে। ফলে ওটা থেকে সরে যাওয়ার কোনো কারণ নেই।
যা করা যাবে না
 আতঙ্কিত হওয়া চলবে না। নিউজিল্যান্ডের ব্যাটসম্যানরা স্পিন নিয়ে অনেক কাজ করছে। যেকোনো একজন বা দুজন আজ রান পেয়ে যেতেই পারে। তাতে একটুও আতঙ্কিত হওয়া যাবে না। আমাদের ব্যাটিংও খুব ভালো। ভয় পাওয়ার কারণ নেই।
 দ্রুত উইকেট পড়ে গেলেও হাল ছাড়া যাবে না। জুটি গড়তেই হবে। নিজেদের ওপর বিশ্বাস হারানো চলবে না। ব্যাটিং খারাপ হলেও বা ভয়ের কী! বোলাররা ম্যাচে ফেরাতে পারবে।
 নিউজিল্যান্ডকে অতিমূল্যায়ন আর কেউ করবে বলে মনে হয় না। তবে অবমূল্যায়ন বা ওদের ছোট করে দেখা যেন না হয়। নিউজিল্যান্ড কিন্তু হেলাফেলা করার দল নয়।
 পাওয়ার প্লেতে কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা নয়। পাওয়ার প্লে ছাড়া আমাদের বোলাররা দারুণ করছে। এখানে বৈচিত্র্য আনতে গিয়ে ‘লুজ বল’ করা যাবে না।

হোয়াইটওয়াশও হয় অস্ট্রেলিয়া

হাতে সময় ছিল বিস্তর। কিন্তু তর সইছিল না তাঁর। টানা পাঁচ বল ডট হওয়ার পর একটু অস্থিরই যেন দেখাল। ষষ্ঠ বলে প্যাডেল সুইপ করে ছুটলেন চিতার ক্ষিপ্রতায়। জোরে দৌড়ে দুই রান নিয়ে ছুঁয়ে ফেললেন জয়ের ফিনিশিং লাইন। এরপর শূন্যে হাত ছুড়ে যেভাবে জয় উদ্যাপন করলেন, এতটা আবেগমথিত শচীন টেন্ডুলকার আসলেই বিরল। প্রবল প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে নিজের সম্ভাব্য শেষ টেস্ট সিরিজটায় হোয়াইটওয়াশের আনন্দের সঙ্গে যে মিলে গিয়েছিল তাঁর ব্যাটেই জয়ের বন্দরে পৌঁছানোর উচ্ছ্বাস!
ম্যাচ শেষে দুটো স্টাম্প উপড়ে নিলেন জয়ের স্মারক হিসেবে। সবকিছুই টেন্ডুলকার পেলেন আসলে বেশি বেশি। ম্যাচ-সেরার পাশাপাশি সিরিজ-সেরার পুরস্কারও উঠল তাঁরই হাতে। ব্যাঙ্গালোর টেস্টটা ৭ উইকেটে জিতে অস্ট্রেলিয়াকে প্রথমবারের মতো হোয়াইটওয়াশ করার গর্ব নিয়ে মাঠ ছাড়ল ধোনির দল। বাংলাদেশ, জিম্বাবুয়ের মতো দুর্বল প্রতিপক্ষ বাদ দিলে মাত্র তৃতীয়বারের মতো সিরিজের সবগুলো ম্যাচ জিতল ভারত।
মোহালি টেস্টের মতো অবশ্য প্রত্যাশিত নাটক জমেনি শেষ দিনে। আগের দিনের সঙ্গে আর ২১ রান যোগ করেই শেষ তিন উইকেট হারায় অস্ট্রেলিয়া। ২২৩ রানে অলআউট হওয়ায় ভারতের সামনে লক্ষ্যস্থির হয় মাত্র ২০৭ রানের। দিনের তখনো ৮০ ওভারের মতো খেলা বাকি।
তার পরও ভারতের জন্য জয়টা সহজ হবে বলে অনুমান করা কষ্টকর ছিল। একে তো ব্যাঙ্গালোরের সঙ্গে ভারতের বৈরী সম্পর্ক, ১৫ বছর ধরে এ মাঠে জিততে না পারার ব্যর্থতা, তার ওপর বল রিভার্স সুইংও করছিল। মূল হুমকি শেবাগকে মাত্র ৭ রান করে ফিরিয়েও দিয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। অন্য ওপেনার মুরালি বিজয়ও ৩৭ রান করে ফিরে গেলে নাটক সত্যিই জমে ওঠার আভাস দিচ্ছিল চিন্নাস্বামী স্টেডিয়াম।
কিন্তু রাহুল দ্রাবিড়ের একক সম্পত্তি হয়ে যাওয়া তিন নম্বর জায়গাটায় ব্যাট হাতে নেমেছিলেন যে ২২ বছর বয়সী তরুণ, নিজেকে প্রমাণের শেষ সুযোগটা হাতছাড়া করতে রাজি ছিলেন না মোটেই। ৮৯ বলে খেলা ৭২ রানের ইনিংসটায় চেতেশ্বর পূজারা এই ম্যাচের ফলাফলটাই শুধু নির্ধারণ করে দিলেন না, একাদশে স্থায়ী জায়গার দাবিও জানিয়ে রাখলেন।
কিন্তু তখনো ছবিটায় শেষ তুলির আঁচড় বাকি ছিল। যোগ্যতম শিল্পীটাই নেমে পড়লেন তুলি হাতে। প্রথম ইনিংসে ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ ডাবল সেঞ্চুরি করা টেন্ডুলকার এবার করলেন অপরাজিত ফিফটি। তাঁর সৌজন্যেই বোর্ডার-গাভাস্কার ট্রফিটা আরও একবার হাতে তুললেন ধোনি।
খোদ গাভাস্কারের হাত থেকেই ট্রফিটা বুঝে নিয়েছেন ভারত অধিনায়ক। এর আগে তাঁর প্রতিক্রিয়ায় টেন্ডুলকারকে প্রশংসার বৃষ্টিতে ভিজিয়েছেন। ব্যাটিং মায়েস্ত্রো নিজে অবশ্য কৃতিত্ব ভাগ করে দিয়েছেন পুরো দলকে। বিশেষ করে তিন নম্বরের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নেমে খেলা ইনিংসটার জন্য পিঠ চাপড়ে দিলেন পূজারাকে।
হোয়াইটওয়াশের লজ্জার পর পন্টিংয়ের অধিনায়কত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। শেন ওয়ার্ন এরই মধ্যে প্রশ্ন তুলেছেনও। যদিও পন্টিং বলছেন, ‘এই সিরিজে আমরাও ভালো খেলেছি। সমস্যা হলো ভারত আমাদের চেয়ে আরও বেশি ভালো খেলেছে।’

খোলসবন্দী নিউজিল্যান্ড

নিউজিল্যান্ডের খেলোয়াড়েরা মাঠে নামতেই হাতে ভীষণদর্শন ওয়াকিটকি নিয়ে সাংবাদিকদের কাছে ছুটে এলেন এক ভদ্রলোক। তিনি বিসিবির নিরাপত্তা কমিটির কেউ হয়তো। চোখমুখ শক্ত করে ইংরেজিতে যা বললেন, তার সারমর্ম—নিউজিল্যান্ডের ক্রিকেটাররা কোনো সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলবেন না। কোনো সাংবাদিক যেন তাঁদের ‘জেরা’ না করেন!
‘জেরা’ শব্দটা ভদ্রলোক নিজে বললেন, নাকি নিউজিল্যান্ডের কর্তৃপক্ষই বলেছে, বোঝা গেল না। তবে এটা ঠিক, ‘ব্ল্যাক ক্যাপস’দের কাছে সাংবাদিকদের প্রতিটি প্রশ্ন এখন ‘জেরা’র মতো মনে হচ্ছে। এই জিজ্ঞাসাবাদের হাত থেকে মুক্তি পেতে চায় তারা!
নিউজিল্যান্ড ক্রিকেটাররা হঠাত্ এমন মুক্তিপাগল কেন হয়ে উঠলেন, সেটা বুঝতে মোটেও আইনস্টাইন হতে হয় না। সিরিজ জয়টাকে রাডারে নিয়ে বেচারারা বাংলাদেশে এসেছিল উপমহাদেশীয় কন্ডিশনের সঙ্গে পরিচিত হতে, বিশ্বকাপের প্রস্তুতি নিতে। আহা, কী প্রস্তুতিই না হলো!
যে বাংলাদেশকে এত কাল অবহেলে, গুনে গুনে হারিয়েছে নিউজিল্যান্ড; সেই বাংলাদেশই কি না পর পর দুই ম্যাচে তাদের হারিয়ে সিরিজ জয়ের পথে! নিউজিল্যান্ডের ক্রিকেটাররা কেন ‘জেরা’ থেকে মুক্তি চাইবেন না?
ক্রিকেটাররা তো কথা বললেনই না। কিন্তু নিউজিল্যান্ডের অমায়িক ম্যানেজার মাইকেল শার্পও কথা বলার সময় কৃপণ। কথা বলতে গেলে যে শার্প একগাল হাসি নিয়ে এগিয়ে আসেন, কাল তাঁর মুখের হাসি থাকল বিষণ্নতায় ভরা।
হেসেই বললেন, ‘আমরা বিসিবিকে তো বলে দিয়েছি, আজ সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনো কথা হবে না।’ কেন হবে না? হতাশা, নাকি চাপ! ‘তোমার যেটা খুশি অনুমান করতে পারো। হতাশা তো আছেই’—এবার শার্পের কথাতেই মূর্ত নিউজিল্যান্ডের অবস্থাটা।
আসলে হতাশ হওয়ার বাস্তব কারণও আছে। এই দলটি কখনোই বিশ্বসেরাদের কাতারে ছিল না। কিন্তু একেবারে ‘ফেলনা’ দলও তারা নয়। নিউজিল্যান্ডকে ‘ক্রিকেটের জার্মানি’ বলতে পারেন। জার্মানির মতো বিশ্বকাপ ট্রফি তারা ছুয়ে দেখতে পারেনি। তবে ইউরোপের ফুটবল পরাশক্তির মতোই ধারাবাহিকতা আছে নিউজিল্যান্ডের।
এ পর্যন্ত ৯টি ওয়ানডে বিশ্বকাপের ৫টিরই সেমিফাইনাল খেলেছে নিউজিল্যান্ড, প্রথম বিশ্বকাপেই তারা সেমিফাইনালে খেলেছে। এ পর্যন্ত খেলা ৫৯০টি ওয়ানডেতে ২৯৮টি পরাজয়ের বিপরীতে ২৫৬টি জয় আছে। মানে, বেশ ধারাবাহিক দল।
কিন্তু সেই দলটিই কিছুদিন ধরে জিততে ভুলে গেছে। গত ১০ ম্যাচে ২টি মাত্র জয় তাদের। কারণ হিসেবে বলতে পারেন, নিউজিল্যান্ড গত বছর কয়েক তাদের সবচেয়ে কার্যকর খেলোয়াড়দের অনেককেই হারিয়ে প্রায় রিক্ত। তার পরও তো ভেট্টোরি, ম্যাককালাম, রস টেলররা আছেন। তাঁরা কী করছেন?
এই প্রশ্নের উত্তর নিশ্চয়ই ভেট্টোরিদের কুরে কুরে খাচ্ছে। সাকিব আল হাসানের সঙ্গে মিলে সিরিজের ট্রফি উন্মোচন করতে এসেছিলেন। সাকিব ট্রফির নিচে হাত দিয়ে শক্ত করে ধরলেন, পাশে হাত দিয়ে ট্রফিটা যেন ছুঁয়ে রাখলেন ভেট্টোরি।
এই ট্রফিতে নিরঙ্কুশ অধিকার তো এরই মধ্যে হারিয়েছেন নিউজিল্যান্ড অধিনায়ক। এখন ট্রফিটাই হারানোর শঙ্কা!

গল্প- 'পান্নালালের বাস্তু' by সিউতি সবুর

৭ই ডিসেম্বর ২০০৩
স্নেহের মনি ও আক্তার ,
আশা করি তোমরা সকলে ভাল আছো। ভগবানের কৃপায় গতকাল আমি কোন প্রকার সমস্যা ব্যতিরেকে কোলকাতা পৌঁছেছি। যাত্রাপথে কোন অসুবিধা হয় নাই, তবে এইবার শীত একটু আগেভাগেই পড়েছে। ভাগ্যিস মনি বুদ্ধি করে প্যান্টের সাথে কোট আর আলোয়ানখানা দিয়েছিলে। বর্ডারে তেমন কোন সমস্যা হয়নি। আজকাল বুড়ো হয়েছি বলেই বোধ হয় ওরা করুণা করে ছেড়ে দেয়।

গল্প- 'আচারকাহিনি' by মোহাম্মদ আজম

ই কাহিনি হয়তবা সম্পূর্ণরূপে আপনাদের কানে যাবে; কিংবা, এমনও হতে পারে—যেমনটা প্রায়ই হয়ে থাকে—আধখেচড়া হয়ে বেগানা কারো হাত ধরে পৌঁছে যাবে আপনার দ্বারে। যেভাবেই পৌঁছাক না কেন, আপনি এর অসাধারণত্ব কম-বেশি আঁচ করতে পারবেন। আপনি নিজগুণে ফাঁকা ফাঁকা ভাংতিগুলোকে কাটাস্থান জোড়া লাগানোর মতো করে অনায়াসে ভরিয়ে দিয়ে চিক্কন-নধর দেবীপ্রতিমার মতো আখ্যানটি আস্বাদন করে থাকবেন। অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, এ সময় কিছুতেই আপনার পাঁচ বছরের দীর্ঘ সময়কে ফালি ফালি করে কেটে দেখার উৎসাহ জাগবে না। পাঁচ বছর অনেক দীর্ঘ সময়।

গল্পিকা- 'সেল প্রেম' by আবদুশ শাকুর

—তোমার হৃদয়ে এসে চুপটি করে বসে থাকব এসএমএসের মতো—উপমা।
—তোমার মনের মধ্যে ভালোবাসার সুর বাজাবো রিংটোনের মতো—রূপক।
—তুমি কিন্তু সারাক্ষণ বিজি হয়ে থেকো না নেটওয়ার্কের মতো—উপমা।
—থাকবো না, তবে তুমিও একটি সিম কার্ড সারাক্ষণ ফ্রি রাখবে—রূপক।
—রাখবো এবং আমার প্রেম কখনোই শেষ হয়ে যাবে না ব্যালেন্সের মতো, যদিও আমি পরস্ত্রী—তোমার প্রেমিকা।
—আমার প্রেমও ফ্লেক্সিলোডে ভরা থাকবে সর্বদা, যদিও আমি বিপত্নীক—তোমার প্রেমিক।

গল্প- 'ভ্রম অথবা ভ্রমণ বিষয়ক গল্প' by ইফফাত আরেফীন তন্বী

রিকশার পিছনের পর্দাটা তুলে টুক করে দেখে নেয় সুজলপুরের শেষ ব্রীজটা। ব্রীজের গোড়ায় এক বিশাল পাইন গাছ, পাইন গাছের কথা বিদেশী গল্প উপন্যাসে পড়েছে। ছোটবেলায় ভাবতো পাইন বুঝি কোনো ফল। চীন দেশের ছবিতে আঁকা রূপকথার বইতে একবার দেখেছিলো সাদা রঙের ফল। শাড়িতে গোলাপী পাড়ের মতো শেড দেওয়া সেই ফলে। সেই গাছে গল্পের বাঁদর গুলো ঝুলছিলো।

গল্প- 'রুখসানার হাসব্যান্ড' by মাহবুব মোর্শেদ

রুখসানার হাসব্যান্ড একটা অপদার্থ, গুড ফর নাথিং। সারাদিন বইসা বইসা ঘোড়ার ঘাস কাটে। ঘোড়া হইলো দুনিয়ার এক আজীব প্রাণী। এই প্রাণী কাটা ঘাস খায় না, একেবারে জীবন্ত দণ্ডায়মান ঘাস নিজ মুখে খায়াই নাকি ঘোড়ার সুখ। রুখসানার হাসব্যান্ড কোন দুনিয়ার ঘোড়ার জন্য বইসা বইসা ঘাস কাটে এই বুঝা বড় কঠিন। অন্য কেউ তো দূরের কথা স্বয়ং রুখসানা পারভীনও বুইঝা উঠতে পারে না তার অকর্মা স্বামী করেটা কী? মানে দিনটা সে কেমনে কাটায়।

গল্প- 'সরল রেখা' by শামীমা বিনতে রহমান

ইসক্রিমটা খাওয়ার পর মনে হলো, মাথায় ছোট ছোট দুইটা চ্যাপ্টা পা দিয়ে বেশ কিছুক্ষণ আটকে থাকা এক ঝাঁক চড়ুই ঠাস করে উড়া শুরু করলো। তিরু সামনে তাকালো। সামনে মোজাইকের ফ্লোরের ওপর একটা আলোর রম্বস। জানালা কাম ভেন্টিলেটর দিয়ে ঢুকে পড়া এই রম্বসাকৃতির সুরুজ বাতির বিকিরণটা তিরুর অনেক ভাল্লাগে। এই সময়টায়, মানে যখন সে সারাদিন বাসায় থাকে, সেই দিনের দুপুর সাড়ে তিনটার রোদ—তাকে আপ্লুত করে ফেলে। সে মাঝে-মধ্যে ডিভাইডার আর ফতুয়া খুলে সেই রম্বসের মধ্যে শুয়ে থাকে।

গল্প- 'অমর প্রেম অথবা আমার প্রেম' by ইমরুল হাসান

থা ও কাহিনি
এইরম গাদলা দিনে বসে আবার মনে পড়লো লিবা’র কথা। আসলে এই কাহিনির কোন মাথা-মুণ্ডু নাই। আমি যত ভাবি আর বলতে চাই, ততই অবাক হই। কিভাবে এই কাহিনি বলা যাইতে পারে, যেখানে সমস্তু কিছুই অনির্দিষ্টতা, মনে করে নেয়া অথবা যেখানে অস্তিত্ব এতোটাই বিহ্বল যে চেতনা আর সাড়া দেয় না, সবকিছু এতোটাই স্পষ্ট এবং ধোঁয়াটেও একইসাথে… ভালোবাসার আসলেই কি কোন বর্নণা সম্ভব আর? এই দ্বিধা কাহিনিটার পরতে পরতে আর মাঝে মাঝে ভাবি এইখানে শুধু পরির্পাশ্বই আছে, কোন ঘটনা আর নাই। তারপরও অব্যক্ততার আরো আছে, কত যে কথা!

গল্প- 'ভরযুবতী ও বেড়াল' by সাগুফতা শারমীন তানিয়া

পরাহ্ন
চৈত্রমাসের দুপুর — সারা আকাশ কালো করে ঝড়বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো। কারেন্ট চলে গিয়ে ঘটাং ঘটাং শব্দ করতে করতে মাথার ওপর পাখাটা বন্ধ হয়ে গেল। রঙ্গন চুপচাপ শুয়ে শুয়ে শোবার ঘরের ছাদ দেখছিল। পায়ের কাছে তুলতুলে বিড়ালছানা ঘুমাচ্ছে, রঙ্গন ওর নাম দিয়েছে ‘তুলোট’। অবশ্য ইদানীং মনে হচ্ছে ওর নাম হওয়া উচিত ছিল ‘উদরপরায়ণ’। ভরপেট খেয়েদেয়ে ভাতঘুম দিচ্ছে পড়ে পড়ে। রঙ্গন বসে বসে চুল আঁচড়াচ্ছিল।

গল্প- 'কক্ মানে মোরগ: উদ্ভ্রান্ত মোরগজাতি ও তাহাদের বিহ্বল প্রতিপালকগণ' by মানস চৌধুরী

[এই গল্পের সকল পাত্রপাত্রী অকল্পনীয়, ফলে সত্যিকার দুনিয়ার সঙ্গে নানাবিধ মিল পেয়ে যাওয়া আকস্মিক নয়।]

শালা হতে আমি শালায় চলি। আমি অতিথিশালা থেকে বেরিয়ে চিত্রশালার দিকে হাঁটি। খুবই কাছে বিধায়, হাঁটা ভিন্ন অপর কিছু না করলেও চলে। কিন্তু হাঁটতে শুরু করেই রিকশাগুলোতে আমি উত্তেজিত হই। এবং একটাতে চড়ে বসি। রিকশাওয়ালা জানতে চায় না যে কই যাব। ফলে আমার মনে পড়ে যে আমি বলি নাই। তাই বলি। বলি ২৭ নম্বর। তাকে বলা যেত যে আমি চিত্রশালায় যাব। কিন্তু নিরর্থকতার ভয়ে আমি বলি না।

গল্প- 'কামলাঘাটা' by অবনি অনার্য

মেডিকেল পূর্বগেটের পুবপাশে, কিংবা রায়েরবাজার বস্তির পাশের খোলা মাঠে, অথবা তারাগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডের পশ্চিম-উত্তর বা উত্তর-পূর্ব পাশে রাস্তার ধারে জড়ো হয়ে আছে জনাদশেক বা পনেরো বা আঠারো নরনারী, যাদের বয়স বিশ-বাইশ-ছত্রিশ-ছাপ্পান্ন বা এইমতো, কিন্তু কার বয়েস কতো এইসব নিয়ে মাথা ঘামাবার প্রয়োজন বৃথা, কেননা কলাকুশলীরা নিজেরাই নিজেদের বয়েস সাধারণ গণিতের হিসেবে গণনা করতে পারে না, বড়জোর তাদের বয়স সম্পর্কে একটা অনুমান করা যেতে পারে তাদের মুখ থেকে শোনা বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনাবলী দিয়ে, তাও আবার পাল্টা-প্রশ্নের উত্তর সাপেক্ষে, এই যেমন ঘটনা তিনি নিজের চোখে দেখেছেন কি-না, নাকি তার বাবা কিংবা দাদা, বা দাদার বাবার অথবা হতে পারে মা কিংবা নানী বা নানীর মা’র মুখে শুনেছেন — এইসব বিচার করে। জয়নালের, কিংবা হতে পারে সে নুরুল বা কামরুল বা জলিল বা বদরুল, তার কিংবা তাদের, গায়ে আজ সবুজ রঙের শার্টটা নেই, আলকাতরা রঙের পলিস্টারের কোর্তাটাও নেই, এমনকি বুকপকেটঅলা নোংরারঙের পাঞ্জাবিটাও নয়। ছাইরঙা ফুলহাতা গেঞ্জি, যা এই ভয়ংকর শীতে সোয়েটারের বিকল্প হিসেবে ব্যবহারে তেমন বাধা নেই, ঝুলে আছে বদরুলের হাতের কব্জি পেরিয়ে খানিকটা। মুহূর্তের মধ্যেই হাত দিয়ে হয়তো তার কানের পাশটা, বগলের পেছনটা বা পিঠের মাঝবরাবর কিংবা রানের কুঁচকি চুলকানোর চেষ্টা করে, অথবা করে না। পায়ের পাশে বা সামনে পড়ে থাকা কোদাল আর বাঁশের ঝুড়িটা অনড় থাকে, অন্তত যতক্ষণ না জয়নালের পায়ের ঠেলায়, কিংবা মৃদু ধাক্কায় সেগুলোর অবস্থানের পরিবর্তন হয়। এতো ঘটনার মধ্য দিয়েও তবু কুয়াশা ঝরছে অনবরত, বা থেকে থেকে, এবং মাথার উন্মুক্ত চুলগুলো কুয়াশায় শাদারঙ ধারণ করলেও কামরুলের মনে পড়ে বগুড়ার কিংবা গাইবান্ধা বা পায়রাবন্দের কোল্ডস্টোরেজের স্মৃতি। শেষদিন মালিকের পক্ষ থেকে বকেয়া পরিশোধের ঘোষণা থাকলেও, এবং সেটা পাবার শতভাগ সম্ভাবনা থাকলেও, জলিলের মনটা বিষাদময় বা অন্য কোনো মনখারাপকরা-অনুভূতিময় হয়ে ওঠে। সকাল ৭টার সার্জারি ক্লাস বা সাড়ে সাতটার বনানীগামী বাস কিংবা সাতটা পয়ত্রিশে হাজিরাখাতায় সই করার লাইন ধরার জন্য তাদের পাশ দিয়ে যে আমি হেঁটে কিংবা রিকশায়, মাঝে মধ্যে টেম্পুতে চড়ে যাই, তাতে ঘটনার এইসব পরম্পরায় কিছুটা এদিক-সেদিক ঘটে, বটে — কিন্তু এতোসব ঘটনার কার্যকারণ নিয়ে তবুও সন্দেহ প্রকাশ করেন জাহাঙ্গীর মাসুদ বাদশা, কিংবা আবুল ফাতেহ হিমু, নাজমুল হক, শাহরিয়ার পারভেজ, এমনকি আফরোজ আল মামুনও। অথচ ডন কিংবা মিথুন, রুমানা কিংবা স্নিগ্ধা, এপি কিংবা দীনা (মানে বোরখাদীনা), অথবা এদের সকলেই কিন্তু এসব ঘটনার একটি কিংবা দুটি কিংবা কয়েকটির কিংবা অনেকগুলোর সাক্ষী। নুরুলের ঠ্যাং তবু ঠকঠকে কাঁপে, শীতে কিবা অন্য কারণে।

নুরুল কিংবা জলিল কিংবা ধরা যাক জয়নালেরই ঠ্যাং কিংবা শরীরের অন্য যেকোনো স্থানের কাঁপুনী কিন্তু কামলাঘাটার মূল মহাজন শামীম কিংবা রাসেল কিংবা রহিমের উপস্থিতির সম্ভাবনাকে নাকচ করে দেয় না। নুরুল জয়নাল কিংবা মইনুলের ছেলে, বা ভাই¯Íা রফিকুল কিংবা শরীফুল একটা জীর্ণ সাইকেল ধরে দাঁড়িয়ে আছে অদূরেই, কিন্তু তার বাপ কিংবা চাচা কিংবা জ্যাঠার অনুকরণে তাকেও কাঁপুনীতে পেয়েছে, অবশ্য শুধুই ঠ্যাংয়ে। সে তার বাপ-চাচা-জ্যাঠার নিঃশব্দে কাঁপুনী স’য়ে যাওয়ার প্রাগৈতিহাসিক ক্ষমতাকে কোনোমাত্র গুরুত্ব না দিয়ে হঠাৎ করেই ক্যাঁক করে উঠলো — বাবা, কিংবা বড়-আব্বা কিংবা ছোট-আব্বা, মোর ঠ্যাং কাঁপতাছে, অথবা সে এইভাবেও চিল্লায়া উঠতে পারে, বাপ-কাকা-জ্যাডা, আমার ঠ্যাং কিন্তু কইলাম কাঁপতাছে। যেভাবেই কুঁকিয়ে উঠুক-না কেন, তাতে তার বাপ-চাচা-জ্যাঠার কাঁপুনী থামে না, এমনকি কাঁপুনীর মাত্রা বাড়েও না। তবে একটা ব্যাপার ঘটতে দেখা যায়, শামীম কিংবা রহিম কিংবা রাসেল, মানে কামলাঘাটার মহাজনের মোটরসাইকেলের ড্রাইভারের মাথা দেখা যায় এহেন কুয়াশার মধ্যেও। কিন্তু এটা যে রফিকুল বা শরীফুলের চিৎকারের সঙ্গে সঙ্গেই হয়েছে সেটা নিশ্চয় করে বলা যায় না। সেটা বলা না গেলেও, মহাজনের মোটরসাইকেলের ড্রাইভারের মাথা দেখা যাওয়ার অর্থ যে তার পেছনে স্বয়ং মহাজন আছেন সেটা বলা যায়। এতোটাই নিশ্চয় করে বলা যায় যে, এমনকি প্রত্যাশিত মহাজনের মৃত্যু হলেও ঘটনা ঠিক এভাবেই ঘটবে বা ঘটে। কেননা, মহাজনের উত্তরসূরী তার ছেলে, কিংবা ছোট ভাই বা বড় ভাই, নেহাত আগের ড্রাইভারকে দেখা যাবে পুরনো কিংবা নতুন কোনো ড্রাইভারের পেছনে। তবে তাতে কিন্তু জয়নাল কিংবা নুরুল কিংবা আমিনুলদের দাঁড়িয়ে থাকা, বা কাঁপুনী বা সাইকেল ধরে থাকা তাদের ছেলে কিংবা ভাইস্তা শরীফুল কি রফিকুলের চিৎকারের মাত্রাগত কোনো পরিবর্তন হয় না। কিন্তু মহাজনের আগমণে পরিস্থিতি নগদে পাল্টে যায়। কেননা, একমাত্র এই প্রভুই জানেন আজ কোথায় কী উপায়ে কী মাত্রায় রুটি-রুজির ব্যবস্থা হবে। এখানে রুটি শব্দটির ব্যবহার নিয়ে ফলিত অর্থনীতিবিদদের মধ্যে কানাঘুষা অব্যাহত থাকবে, কেননা রুটি শব্দটি যেহেতু নিদেনপক্ষে আটার সঙ্গে সম্পর্কিত, এবং আটা শব্দটি জয়নাল বা নুরুল বা নাসিমুলদের সঙ্গে দ্ব›দ্বমূলক কোনো সম্পর্কে জড়ায় না, মানে জড়ায়নি এতোকাল, তাই এতোকালই এ-নিয়ে কারোর কোনো আপত্তি ছিলো না, কিন্তু এই দুইহাজারআট সালের ২৫ জুলাই তারিখে বসে নাসিমুল বা করিমুলদের সঙ্গে আটা কিবা রুটি শব্দটির ব্যবহার আদালত অবমাননারও শামিল হতে পারে, বিশেষ দ্রষ্টব্য দিয়ে লেখা উচিত যে জরুরী অবস্থা এখনো জারি আছে।

এই সমাবেশে জোছনা কিংবা শাপলা বা জরিনা থাকলে মহাজন তার দিকে তাকিয়েই মোটরসাইকেল থেকে নেমে পানের পিক ফেলেন, কিংবা সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়েন, না থাকলে অবশ্য তাদের দিকে তাকিয়ে পানের পিক ফেলেন না, এমনকি সিগারেটের ধোঁয়াও ছাড়েন না। এসব গুরুত্বপূর্ণ নারীবাদী ইস্যুতে নুরুল কিংবা জয়নাল কিংবা নাসিরুলের কিছুই এসে যায় না, কেননা তারা নায়কোচিত কোনো সিনেমা বা আর্ট ফিলিমের কেন্দ্রীয় বা পার্শ্বীয় ভূমিকায় অবতীর্ণ বা উত্তীর্ণ হয় নাই। তারা বরং মহাজনের মুখের দিকে, কিংবা মুখের সামান্য উপর বা নিচ বরাবর, তাকিয়ে থাকে। মহাজনের মুখ থেকে কর্মক্ষেত্রের ঠিকানা, যাবার উপায়, কী ধরনের কাজ, কার সঙ্গে দেখা করতে হবে ইত্যাদি তথ্য একে একে বের হতে থাকে। প্রথম থেকেই মহাজনের বর্ণনা সব শুনলেও তাদের সবার, বা অন্তত কারো কারো, বা অনেকেরই, প্রতীক্ষা থাকে “তো কে কে যাইবা আগায়া আসো” বা “তোমরাগুলা কারা কারা যাইবেন আগায় আইসেন বাহে” প্রশ্নের কিংবা প্রস্তাবনার দিকে। প্রায় প্রতিদিনই, কিংবা অধিকাংশ দিনই, বা নিদেনপক্ষে কোনো কোনো দিন তো বটেই, ওই প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গে সবাই, বা অনেকেই, বা কেউ কেউ এতোক্ষণ বর্ণিত পুরো ঘটনা বা ঘটনার অংশবিশেষ ভুলে সামনের দিকে আগায়া আসে, মানে পা নাড়ালেই হলো, অর্থাৎ সামনের দিকে আগানোর উদ্যোগ নিলেই তালিকায় তার নাম উঠে যায়। এরপর তারা হয়তো আরেকবার নিশ্চিত হবার গুরুত্বসহ প্রশ্ন করে জেনে নিতে চায় কর্মক্ষেত্রে গিয়ে যার সঙ্গে দেখা করতে হবে তার নাম। কেননা, এরপরে এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রশ্নের উত্তরে মহাজন হয়তো নিজেই নামটা উচ্চারণ করেন, নয়তো ড্রাইভারের দিকে নির্দেশ করে বলেন যে, তারা যেন তার কাছ থেকেই নামটা জেনে নেয়। কিন্তু এরই মধ্যে এমন যদি হয় যে, নুরুল কিংবা আরিফুল বা আশিকুল হয়তো কাজের জায়গার নাম শুনে যেতে অসম্মতি জানায়, মানে নিজের মনে মনে অসম্মতি, মানে মহাজনের সামনে অপ্রকাশিত রেখে, তখন সে কিংবা তারা বাড়িতে বৌ-ঝির অসুস্থতার কথা জানিয়ে আজ বরং কাজে না যাবার সিদ্ধান্ত ক্ষীণকণ্ঠে জানিয়ে দেয় ড্রাইভারের কাছে, কিংবা না জানিয়েই চোরের মতো সরে পড়ে। পরে হয়তো বিলের দিকে যায়, এবং এখন যেহেতু মঙ্গামাস, অর্থাৎ এমনকি আলুর মৌসুমও শেষ, তথা কোল্ডস্টোরেজের কাজও শেষ, উপরন্তু শীতকাল আসন্ন, ফলে কাজ জোটে না, ফলে বিলের ধার থেকে বাস স্টপেজে বা রেল স্টেশনে গিয়ে কুলির কাজ করার চেষ্টা চালায়, কিন্তু ওখানকার স্থানীয় কুলি বা বাটপারদের ধাওয়া খেয়ে হয়তো কোনো ঠেলার হেলপার হবার বাসনা ব্যক্ত করে, কিন্তু যার কাছে এ-বাসনা ব্যক্ত হয়, সে নিজেই হেলপার হবার কারণে তাকে রিকশা চালানোর বুদ্ধি দেয়, কিন্তু ততক্ষণে দুপুর হয়ে গেছে, রিকশা সব ভাড়ায় চলে গেছে, আর তাছাড়া রিকশায় হেলপার নেয়ার সিস্টেম নেই, ফলে অর্ধেক বেলায় কোনো কাজ জুটলেও চাকরিদাতা প্রশ্ন তোলে কার লোক, এবং কারোরই লোক নয় উত্তর পেয়ে দলছুট হবার কারণে বকাবকি করেন, এবং কারো-না-কারোর, অর্থাৎ কোনো-না-কোনো মহাজনের লোক হবার পরামর্শ দেন, এবং কিছু খেয়ে এসেছে নাকি এমন প্রশ্নের উত্তরে না শুনে “খালি পেটে আর কী কাজ করবা” বলে “ঠিক আছে করো, কুড়ি টাকা পাইবা” বলে কাজ দেখিয়ে দেন। ফলে বাকিবেলা না-খেয়ে থাকার নিশ্চয়তা পাওয়া যায়, এবং কাজের ফাঁকেই পরের দিন থেকে মহাজনের পরামর্শ মতো যেকোনো দূরত্বে কাজে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়, এটা মেনে নিয়েই যে, ভবিষ্যতে আরো অসংখ্যবার সিদ্ধান্তটি নিয়ে তাকে ভাবতে হবে, কেননা অতীতেও হয়েছে।

এরই মধ্যে নুরুল মইনুলের কাছে, কিংবা মইনুল নুরুলের কাছে, অথবা আরিফুলের কাছে কিংবা আরিফুল নাসিমুলের কাছে জানতে পেরেছে যে চিটাগাঙের দিকে নোয়াখালি বা মাইজদি বা দত্তেরহাট বা সোনাপুরের দিকে মজুরি পাওয়া যায় দিনে একশো বিশ কি দেড়শো কি দুশো টাকা, এবং অবগত হবার পর পারস্পরিক বোকা বনে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়, এবং তারা মাইগ্রেশনের চিন্তাভাবনা করতে থাকলে আরিফুল কিবা জয়নাল বা তারা সকলেই মহাজনের কথা ভাবতে থাকে, নিজের এবং অনেকের বা সকলের অজান্তেই। ফলত তারা আবার পরেরদিন কামলাঘাটায় সমবেত হবার সিদ্ধান্ত পাকাপাকি করে, এবং আবার হয়তো দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পালিয়ে আসে, এবং আবার আধবেলা না খেয়ে আলোচনাশেষে পরেরদিন কামলাঘাটায় সমবেত হয়, বা অন্তত এবার সত্যি সত্যিই বিদেশে যাবার পরিকল্পনা করে। কিন্তু মহাজন আর নোয়াখালি বা মাইজদি বা দত্তেরহাট বা সোনাপুরের কথা বলে না, বা একদিন হয়তো বলেই ফেলে। এবং এবার হয়তো জয়নাল বা মমিনুল রাজি হয়ে যায়, বা তারা রাজি হয় না, নুরুল কিংবা আরিফুল হয়তো রাজি হয়, এবং ছেলে কিংবা ভাইপোকে সাইকেল নিয়ে চলে যেতে বলে, এবং পাড়ার মেম্বারের দোকান থেকে বাকিতে চাল ইত্যাদি নিয়ে যেতে বলে, এবং সন্ধ্যার পরপরই বাড়িতে ফেরার নিশ্চয়তা দেয়, এবং নিজের পোয়াতি বৌকে গিয়ে সান্ত্বনা দিতে বলে এই ব’লে যে, চিন্তা নাই, অথচ নিজেরাই চিন্তা করতে থাকে অথবা করে না, কেননা এর আগেও পাঁচটা বা চারটা বা তিনটা বাচ্চা হয়েছে ব’লে নিজেরাও নিশ্চিন্তে কোদাল আর ঝুড়ি হাতে নেয়। আবার হয়তো সাইকেল নিয়ে চলে যাওয়া ছেলে বা ভাইপোর রাস্তার দিকে তাকিয়ে আনমনা হয়, বা হয় না, কিন্তু মহাজনের মোটরসাইকেলের ড্রাইভারের তাড়া খেয়ে তাদের জন্য অপেক্ষমান ট্রাকের দিকে অগ্রসর হয়, অথবা রাস্তার ধারে পেশাব করার জন্য এগিয়ে গিয়ে, এবং অনাকাক্সিক্ষত বিলম্ব করে বাড়ির কথা ভাবতে থাকে, অথবা ভাবতে থাকে না, অথবা নতুন দেশের কথা ভাবতে থাকে, কিংবা ওই দেশের যে-ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করতে হবে তার কথা ভাবতে থাকে, বা তার নামটা বারবার মনে করার চেষ্টা করে, এবং পারে না, কিংবা হয়তো পারার সম্ভাবনা দেখা দিলে ট্রাকের স্টার্ট দেবার শব্দ শুনতে পায়, এবং তখন হয়তো সবেমাত্র পেশাব করতে শুরু করেছে এ-অবস্থায় উঠে পড়তে গিয়ে লুঙ্গির প্রান্তভাগ কিংবা হয়তো মধ্যভাগ বা অন্য কোনো ভাগ ভিজে যায়, বা ভেজার উপক্রম হলে সামলে নিয়ে পুরো লুঙ্গিটাই উঠিয়ে ধরে, এবং আবার বসে পেশাব করতে থাকে, কিংবা হয়তো মাঝপথে পেশাব করা বন্ধ রেখেই দৌড়াতে থাকে ট্রাকের দিকে, এবং কোদাল-ঝুড়ি পড়েই থাকে, সেটা খেয়াল করে ফের সেদিকে দৌড়াতে থাকে, এবং সবকিছু ঠিকঠাক নিয়ে ট্রাকের কাছে এসে শুনতে পেলো ট্রাকড্রাইভারের ডায়রিয়ার কারণে আসতে একটু দেরি হবে, কিংবা বিকল্প ড্রাইভারের খোঁজে হয়তো ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন মহাজনের মোটরসাইকেলের ড্রাইভার, কিংবা মহাজন নিজেই। ফলে আধভেজা লুঙ্গি বা পুরোপুরি শুকনো লুঙ্গি নিয়ে, এবং সবুজ রঙের শার্ট বা আলকাতরা রঙের পলিস্টারের কোর্তা বা বুকপকেটঅলা নোংরারঙের পাঞ্জাবিটা অথবা ছাইরঙা ফুলহাতা গেঞ্জি পরেই নুরুল কিংবা জয়নাল কিংবা কামরুল বা জলিল বা বদরুল বসে থাকে রাস্তার পাশে, বা রাস্তার উপরেই, এবং হয়তো কাঁপতে থাকে, শীতে কিবা অন্য কারণে।

একসময় সত্যি সত্যিই চলমান ট্রাকের শব্দ ভেসে আসে, এবং বদরুল বা জয়নাল কিংবা কামরুল অথবা জলিল থেমে থাকা ট্রাকটির দিকে একযোগে বা ভিন্নভিন্নযোগে তাকায়। ট্রাকড্রাইভারের খোঁজে ব্যস্ত কামলাঘাটার মহাজন কিংবা মহাজনের মোটরসাইকেলের ড্রাইভারও হয়তো তাকায়, কিন্তু তাদের একজন বা উভয়েই টের পায় যে, ট্রাকটা আসছে সৈয়দপুর বা দিনাজপুর বা পঞ্চগড়ের দিক থেকে, এবং একটু পরেই বুঝতে পারে যে, ট্রাক আসলে দুটো, এবং ট্রাক দুটো আরো এগিয়ে আসলে দেখা যায় বহনকারী গরুদের কারো মাথা, শিংসহ বা শিংছাড়া বা ভাঙাশিংঅলা, কোনো গরুর পিঠ বা বুক ইত্যাদি। কামলাঘাটার মহাজন কিংবা মহাজনের মোটরসাইকেলের ড্রাইভার বা দুজনেই একসঙ্গে বা ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে ট্রাক থামানোর জন্য হাত নাড়ায়, এবং ট্রাকগুলো প্রথমে জোরে হর্ন বাজিয়ে চলে যাবার ভান করে পরে ধীরে ধীরে গতি কমিয়ে থামায়, এবং একটি বা দুটো ট্রাকেরই ড্রাইভার বা হেলপার নেমে আসে, এবং তার বা তাদের সঙ্গে মহাজন কিংবা মহাজনের মোটরসাইকেলের ড্রাইভারের বা দুজনেরই কথা হয়, এবং সে কিংবা তারা বদরুল বা কামরুল অথবা জলিল কিংবা জয়নালদেরকে পেছনের ট্রাকটিতে চটজলদি উঠে পড়তে বলে, কেননা পেছনের ট্রাকটির অর্ধেকটা বা খানিক বেশি বা কম জুড়ে আছে গরু, কিংবা পেছনের ট্রাকের অর্ধেকটা বা খানিক বেশি বা কম এখনো খালি। ফলে বদরুল বা জয়নাল কিংবা কামরুল অথবা জলিলরা তাড়াতাড়ি উঠে পড়ে নির্দেশ মোতাবেক, এবং ট্রাকে উঠতে গিয়ে কারো হয়তো কোদাল কিংবা ঝুড়ি বা অন্য কিছু পড়ে গেলে সে বা তারা পেছনের দিকে তাকিয়ে থাকে, কেউ হয়তো এ-সুযোগে বাড়ির দিকে তাকিয়ে থাকে, অথচ এরই মধ্যে হয়তোবা ট্রাক মোড় ঘোরার কারণে দিক-পরিবর্তন হয়ে গেছে, অথচ তারা এখনো ট্রাকের পেছনের দিকে তাকিয়ে আছে, ফলে তারা হয়তো আর বাড়ির দিকে তাকিয়ে নেই, কিংবা হয়তো দিকভুল না করে বাড়ির দিকেই তাকিয়ে আছে, হতে পারে সে-বাড়িটা অন্য কারো।

ট্রাক ছুটছে অপার্থিব কোনো যানের মতো, এবং ঠাণ্ডা হাওয়াও বইছে সেইমতো, এবং ফলে বদরুল বা জয়নাল কিংবা কামরুল অথবা জলিলদের হয়তো কাঁপুনী ধরেছে, বা ধরেনি কেননা তাদের সামনেই, যারা পেছন ফিরে বসেছে তাদের পেছনে, বা কারো কারো পাশেই দাঁড়িয়ে আছে কুরবানী কিংবা ওইজাতীয় কোনো উদ্দেশে আমদানীকৃত গরুর দল। বদরুল বা জয়নাল কিংবা কামরুল অথবা জলিলরা গরুগুলোর দিকে তাকিয়ে বা না তাকিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে থাকে, এমনকি কোনো একজন গরু বা দুজন বা কয়েকজন গরুর চনা গড়িয়ে পড়লেও, এবং এর ফলে তাদের দু’একজন বা কয়েকজন বসা থেকে দাঁড়িয়ে থাকেন কিছুক্ষণ, পরে অন্য একটা নিরাপদ জায়গা দেখে ফের বসে পড়েন, এবং আবার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে থাকেন গরুগুলোর প্রতি, মতান্তরে তাদের কেউ কেউ খানিক দুঃখও প্রকাশ করেন গরুগুলোর জন্য, কেননা ঠাণ্ডা হাওয়ার প্রায় পুরোটাই গরুগুলোর উপর দিয়ে যাচ্ছে, এবং এভাবে গরুগুলোর প্রতি তারা বেশ সহানুভূতিশীল হয়ে পড়েন ক্রমশই, একসময় একাত্মই হয়ে পড়েন হয়তোবা। কিন্তু গরুগুলো সব সামনের দিকে তাকিয়ে বা না তাকিয়ে আছে বলে গরুগুলির মুখোমুখি হওয়া সম্ভব হচ্ছে না বদরুল বা জয়নাল কিংবা কামরুল অথবা জলিলের পক্ষে, ফলে তাদের মনক্ষুণ্ন হবার কারণ দেখা দেয়, এবং তাদের দু’একজন বা কয়েকজন বা সবাই আকিজ বা হরিণ বা মুকুটবিড়ি ধরায়, এবং এমন সময় বা খানিক পরে, বা বেশ খানিকটা পরে, সামনের ট্রাকটি পেছনের লালবাতি দেখিয়ে থামবার সংকেত দেয়, এবং দুটো ট্রাকই সাময়িক যাত্রাবিরতি দেয়, এবং সামনের ট্রাকের চালকের শারীরিক অসুবিধার কারণে হেলপারের হাতে ট্রাকচালনার ভার অর্পণ করেছেন বলে পেছনের ট্রাকটিকে সামনে যাবার পরামর্শ দেয়া হলে, এবং সামনের ট্রাকটিকে অতিক্রম করামাত্র ওই ট্রাকের গরুগুলির মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ পেলে বদরুল বা জয়নাল কিংবা কামরুল অথবা জলিলরা সোৎসাহে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টিতে বা কয়েকদৃষ্টিতে গরুগুলির দিকে তাকিয়ে থাকে। এবং তাকিয়েই থাকে। অথবা তাকিয়েই থাকে। অথচ তাকিয়েই থাকে।
===========================
অবনি অনার্য 
কবি

জন্ম : নোয়াখালি, ৩১/৭/১৯৮০
পড়াশোনা: চিকিৎসাশাস্ত্রে স্নাতকোত্তর।

প্রকাশিত বই
১. লঘুচালে চোরাবালি খেলা; কাব্যগ্রন্থ; ২০০৪; অন্ত্যজ, ঢাকা।
URL: www.geocities.com/sristi_mag/ebook/auboni/index.html

২. উন্মাদ; খালিল জিবরানের দ্য ম্যাডম্যান-এর অনুবাদ; বইমেলা ২০০৬; ইত্যাদি প্রকাশনী, বাংলাবাজার, ঢাকা।

৩. জেগে উঠছে ইরান, শিরিন এবাদি’র ইরান অ্যাওয়াকনিং-এর অনুবাদ; বইমেলা ২০০৭; সন্দেশ প্রকাশনী, আজিজ সুপার মার্কেট, শাহবাগ, ঢাকা।

৪. সরস সতী; কাব্যগ্রন্থ; বইমেলা ২০০৮; সন্দেশ প্রকাশনী, বইপাড়া, ১৬ আজিজ সুপার মার্কেট, শাহবাগ, ঢাকা।

৫. চে স্মৃতিকথা; ফিদেল কাস্ত্রোর চে: আ মেমোয়ার-এর অনুবাদ; বইমেলা ২০০৮; সন্দেশ প্রকাশনী, বইপাড়া, ১৬ আজিজ সুপার মার্কেট, শাহবাগ, ঢাকা।

৬. আমার ক্ষোভ আমার অহংকার; ওরিয়ানা ফাল্লাচির দ্য রেইজ অ্যান্ড দ্য প্রাইড-এর অনুবাদ; বইমেলা ২০০৮; সন্দেশ প্রকাশনী, বইপাড়া, ১৬ আজিজ সুপার মার্কেট, শাহবাগ, ঢাকা।

৭. কবিসঙ্গ অনুষঙ্গ; মুক্তগদ্য; জুলাই ২০০৮; যেহেতু বর্ষা, ২৭৫/জি ধানমণ্ডি ২৭, ঢাকা।

৮. WOMB TO-LET; দ্বিভাষিক কাব্যসংকলন; জুলাই ২০০৯; ঢাকা।

৯. আমাদের আর তাহাদের আমেরিকা; একুশে বইমেলা ২০১০; সন্দেশ; বইপাড়া, ১৬ আজিজ সুপার মার্কেট, শাহবাগ, ঢাকা।

১০. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ (প্রা.) লি.; কাব্যগ্রন্থ; একুশে বইমেলা ২০১০; সন্দেশ; বইপাড়া, ১৬ আজিজ সুপার মার্কেট, শাহবাগ, ঢাকা।

সম্পাদিত পত্রিকা
করুল, ২০০৫-
ই-মেইল: aunarjo@gmail.com
==============================
গল্প- আলিমের নিভৃতিচর্চা by রাশিদা সুলতানা   গল্প- প্রত্যাবর্তন: আমার ‘ফেরা’ নিয়ে যে কাহিনী না ..মানষ চৌঃ   গল্প- 'বীচিকলায় ঢেকে যায় মুখ ও শিরোনাম' by আনোয়ার ...  গল্প- 'প্রীত পরায়া' by সিউতি সবুর   গল্প- 'চলিতেছে' by মাহবুব মোর্শেদ   গল্প- 'গোপন কথাটি' by উম্মে মুসলিমা   গল্প- 'রূপকথা' by লুনা রুশদী  সঞ্জীব চৌধুরীর কয়েকটি গল্প   গল্প- 'অস্বস্তির সঙ্গে বসবাস' by ফাহমিদুল হক   গল্প- 'মঙ্গামনস্ক শরীরীমুদ্রা' by ইমতিয়ার শামীম   গল্প- 'হাজেরার বাপের দাইক দেনা' by জিয়া হাশান  গল্প- ‘অপঘাতে মৃত্যু’ ও ‘সাদামাটা’ by লীসা গাজী   গল্প- 'দ্বিতীয় জীবন' by ইরাজ আহমেদ  গল্প- 'পুষ্পের মঞ্জিল' by সাগুফতা শারমীন তানিয়া   গল্প- 'একশ ছেচল্লিশ টাকার গল্প' by কৌশিক আহমেদ  গল্প- 'একে আমরা কাকতালীয় বলতে পারি' by মঈনুল আহসান..   গল্প 'গহ্বর' by জাহিদ হায়দার    গল্প- 'পুরির গল্প' by ইমরুল হাসান  গল্প- 'নওমির এক প্রহর' by সাইমুম পারভেজ  গল্প- 'মরিবার হলো তার সাধ' by আহমাদ মোস্তফা কামাল   গল্প- 'নিষুপ্ত শেকড়' by নিরমিন শিমেল   গল্প- 'লাল ব্যাসার্ধ্ব' by শামীমা বিনতে রহমান  গল্প- 'সেদিন বৃষ্টি ছিল' by মৃদুল আহমেদ   ক. কিছুদিন হয় সেই নগরে কোন বৃষ্টি হচ্ছিল না। কিছুদ.. গল্প- 'তুষার-ধবল' by সায়েমা খাতুন  গল্প- 'কোষা' by পাপড়ি রহমান  গল্প- 'কর্কট' by রাশিদা সুলতানা   গল্প- 'তিতা মিঞার জঙ্গনামা' by অদিতি ফাল্গুনী  গল্প- 'সম্পর্ক' by তারিক আল বান্না  গল্প- 'অনেক দিন আগের দিনেরা' by রনি আহম্মেদ  গল্প- 'গাদি' by ইফফাত আরেফীন তন্বী



bdnews24 এর সৌজন্যে
লেখকঃ অবনি অনার্য


এই গল্পটি পড়া হয়েছে...
free counters