Saturday, October 19, 2019

ক্যাসিনোর অন্দরমহল: সিঙ্গাপুরে ঢাকাইয়া সম্রাটদের ফেরা শুরু by মিজানুর রহমান

ঢাকার ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে উদ্বেগ আর অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল সিঙ্গাপুরেও। সিঙ্গাপুরে সম্রাটের সহযোগী মুমিনুল হক সাঈদ ওরফে সাঈদ কমিশনার ছাড়া কেউ প্রকাশ্যে ছিলেন না। গাঢাকা দিয়েছিলেন জুয়াড়িরা। বলতে গেলে গত ক’দিন প্রাণহীন ছিল ‘বাঙালিপাড়া’। ঢাকা থেকে নিয়মিত যাওয়া ভিআইপি বা সাধারণ গেস্ট-জুয়াড়িদের সংখ্যাও কমে গিয়েছিল। এমনকি সিঙ্গাপুরে থাকা বাংলাদেশি হুন্ডি কারবারিরা স্থান বদল করেছিলেন । কিন্তু সম্রাটের আটকের পরদিন অন্য ইস্যু সামনে এসে যায়। আবরার হত্যাকাণ্ডে প্রশাসনের ব্যস্ততা বেড়ে যাওয়ায় অভিযানের ধারাবাহিকতা নিয়ে তৈরি হয় সংশয়।
আর এমন পরিস্থিতিতে জুয়াড়ি আর হুন্ডি ব্যবসায়ীরা স্ব-স্থানে ফিরতে শুরু করেছেন। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে নিয়মিত বা অনিয়মিত জুয়ার নেশায় বুঁদে থাকা ঢাকাইয়া ক্যাসিনো সম্রাটরা বিরতি শেষে সিঙ্গাপুরের ক্যাসিনোতে সক্রিয় হতে শুরু করেছেন।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সিঙ্গাপুরের এক্সক্লুসিভ ট্যুরিজম জোন সন্তোষা ক্যাসিনো এবং রাতে দেশটির বড় জুয়ার আস্তানা মেরিনা বে সেন্ডস ক্যাসিনো ঘুরে তাদের সক্রিয়তার প্রমাণ মিলেছে। সরজমিন দেখা গেছে, আগের দু’দিনের তুলনায় ঢাকা থেকে যাওয়া বাংলাদেশির সংখ্যা বেড়েছে। কোনো ধরনের টেনশন বা দুশ্চিন্তা ছাড়াই তারা নিজেদের মতো করে খেলছেন। দুই ক্যাসিনোতেই জুয়ায় পারদর্শী বাংলাদেশি সাধারণ শ্রমিকদের খেলা দেখার সুযোগ হয়েছে। বিদেশি শ্রমিক বা কর্মী যারা পিআর কার্ড পায়নি তাদের ক্যাসিনোতে খেলতে কোনো ট্যাক্স দিতে হয় না। সিঙ্গাপুরের নাগরিকদের ক্যাসিনোতে নিরুৎসাহিত করতে সরকার নাগরিক বা পিআরদের ক্যাসিনোতে প্রবেশে ২৪ ঘণ্টায় দেড়শ’ ডলার ট্যাক্স বসিয়ে রেখেছে। আরো কত কি? সিঙ্গাপুরের নাগরিকদের ক্যাসিনোতে গেলে নানা ধরনের জবাবদিহি করতে হয়। তিরস্কার সহ্য করতে হয়।
এত ঝক্কি ঝামেলার কারণে সিঙ্গাপুরের নাগরিকরা ক্যাসিনোতে যান না বললেই চলে! ক্যাসিনোগুলোতে চীন, ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার নাগরিকরা বেশি যান। তবে বাংলাদেশিদের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। ঢাকা থেকে যাওয়া ও বসবাসরত সাধারণ শ্রমিক মিলে সিঙ্গাপুরের দুটি ক্যাসিনোতে প্রতিদিন ১৫-১৭ পারসেন্ট হবে বাংলাদেশি নাগরিক। এর মধ্যে বেশির ভাগই খেলেন মেরিনায়। সন্তোষা ক্যাসিনো বেশ দূরে, আগে বাংলাদেশিরা এত দূর যেতেন না। কিন্তু এখন নানা কারণে তারা ওই মুখী হচ্ছেন। বাংলাদেশি সাধারণ জুয়াড়িদের সহায়তায় বৃহস্পতিবার রাতে মেরিনায় দেখা মিলেছে তুলনামূলক পরিচিত বাংলাদেশি দুটি দম্পতির। স্ত্রীরা স্বামীদের খেলা নির্বিঘ্ন রাখতে ডলার ভাঙানো বা সরবরাহে কেবল ব্যস্তই থাকেননি, তারাও পূর্ণ মনোযোগী হয়ে দক্ষ জুয়াড়ির মতোই মেশিনকে হারানোর চেষ্টা করেছেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। দু’জন পুরুষ এবং দু’জন নারী, যারা পরস্পর বন্ধু এবং ফ্যামিলি ফ্রেন্ডস বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। ওই দুই দম্পতির  মধ্যরাতে  মেরিনা  বে  সেন্ডসে অপলক নেত্রে রুলেট খেলা অবস্থার একটি ছবি পাওয়া গেছে। এক ফ্রেমেই তাদের ধারণ করা গেছে। বলাবলি আছে, ওই চারজনই সম্রাটের ঘনিষ্ঠ। একজন তার পরিবারেরই। ইলেক্ট্রনিক এবং ম্যানুয়েল দুই বোর্ডেই   খেলেন তারা। তাদের টানা এবং নির্বিঘ্ন খেলা সবার পছন্দ। ‘বাদল গ্রুপের  মেম্বার’ নামেই বাংলাদেশিরা তাদের চেনেন। ওই গ্রুপে একাধিক এমপিও যুক্ত হন। মূলত তারা রুলেটই  খেলেন।
১৯ বছর ধরে সিঙ্গাপুরে আছেন আশুলিয়ার একজন। ক্যাসিনোতে খেলছেন দীর্ঘ ১২-১৩ বছর ধরে। অঙ্কের হিসাব বলে- ওই জুয়াড়ির এতদিনে পাইজা প্লাটিনাম  মেম্বার কার্ড অর্জনের কথা। কিন্তু লেনদেন কম হওয়ার কারণে কার্ডে পজিশন বাড়েনি। এটা তার আফসোস। অবশ্য তার নিজের ব্যর্থতা এবং সীমাবদ্ধতার কথাও অকপটে স্বীকার  করেন।
তার বন্ধু পাইজা রুমে খেলেন। তিনি নিচ তলায়। কিন্তু সেখানেও ঘটিয়ে বসেছেন অঘটন। টানা নির্ঘুম রাত কাটানো, অর্থকড়ি হারিয়ে পাগলপারা অবস্থা। এক রাতে ক্যাসিনোতে ঘুমন্ত অবস্থায় পেয়ে যায় সার্ভিলেন্স টিম। যা হওয়ার তাই হয়। তাকে তাৎক্ষণিক বের করে দেয়া হয়। একই সঙ্গে তার শাস্তিও হয়ে যায়। ক্যাপিটাল পানিশমেন্টের আওতায় এক বছরের জন্য মেরিনায় নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় এলোমেলো চুল-দাড়ির  কারণে ‘পাগলা বাবা’ বা ‘শিখ বাবা’ নামে পরিচিতি পাওয়া ওই জুয়াড়ির। তার নামডাক আগেই শুনেছি। কাল তার  দেখা পাওয়া যায় সন্তোষায়। আশুলিয়ার ওই জুয়াড়ি সম্রাটের খেলা দেখেছেন। তার স্টাইল অব প্লে’র ভক্ত তিনি। তবে ক্যাসিনোর ওই  চোরাবালিতে তার মতো কেউ যেনো না হারিয়ে যায়! এটাই বারবার বলছিলেন তিনি। সিঙ্গাপুরে বসবাসরত  কুমিল্লার বরুড়ার বাসিন্দা একজন জুয়াড়ির সঙ্গে দেখা হয়েছিল মঙ্গল ও বুধবার দু’দিনই। স্থান মেরিনা। দফায় দফায় কথা হয়েছে। এখানে তার শেয়ারে একটি  কোম্পানি আছে। যার কার্ড  শেয়ার করছেন। তার দাবি এক মাস হয় তিনি এ জগতে। মোটে ১০-১২ দিন খেলেছেন। প্রথম দিন খুইয়েছেন ৩০০০ ডলার। পরদিন নিচতলায় ব্যাংকার প্লেয়ার খেলে মধ্যরাতে সাড়ে ৭ হাজার ডলারের মতো লাভ করেছিলেন। নতুন পরিচিত এবং বন্ধু হওয়া লোকজনের থেকে বিদায়ও নিয়েছিলেন রুমে ফিরে যাওয়ার জন্য। কিন্তু ফিরতে পারেননি। দোতলা হয়ে বের হতে হয় মেরিনা। বিশাল এলাকা। দোতলায় বড় দানের খেলা।
লাভ-লোকসানও বেশি বেশি।  লোভ সংবরণ করতে পারেননি। দাঁড়িয়ে যান। মুহূর্তেই ফতুর। লাভ-মূলধন সবই  শেষ। তার মতে, এরপর  থেকে প্রায় প্রতিদিন তিনি আসছেন ওই অর্থ তুলতে। লাভ করতে। অল্প ডলার নিয়ে কাজ শেষেও ঢুকে পড়েন। কিছু আসে। কিন্তু রাত শেষে সবই দিয়ে আসতে হয়। ভোর সাড়ে ৬টায় মেট্রোরেল বা এমআরটি যখন খোলে তখন খালি হাতেই বাড়ির পথে যেতে হয়। নব্য ওই জুয়াড়ি বলছিলেন দেশে তার স্ত্রী আছেন, সাড়ে ৩ বছরের একটি মেয়েও আছে। ক্যাসিনোতে সময় কাটানোয় এখন তার কাজকর্ম, সাব-কন্ট্রাক্টের ব্যবসা লাটে ওঠেছে। ক্যাসিনোতে এ পর্যন্ত প্রায় ১৫ হাজার ডলার খুইয়েছেন। তার সাব-কন্ট্রাক্টের কাজে লোক ডাকেন, কিন্তু কেউ যায় না। বাড়িতে টাকা তো নয়ই, ক্যাসিনোতে রাত কাটানোর কারণে ঠিকমতো বউ-বাচ্চার সঙ্গে কথাও বলতে পারেন না।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত বলেই নৃশংস ঘটনা ঘটছে : -সাক্ষাৎকারে রোকেয়া হায়দার by কাজল ঘোষ

‘আমি হতে চেয়েছিলাম ব্যারিস্টার। সাংবাদিক হবো- এমন স্বপ্ন বা আকাঙ্ক্ষাই ছিল না। তবে যখন যা করেছি নিষ্ঠার সঙ্গেই করেছি। নিজেকে একজন নারী সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিতে কখনই স্বস্তিবোধ করি না’-
বলছিলেন রোকেয়া হায়দার। যিনি বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর। সাংবাদিকতায় দৌড়ঝাঁপে পোশাক বিন্যাস বড় বিষয়। কিন্তু তিনি একাট্টা। শাড়িতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
বাঙালিয়ানাকে সঙ্গী করে দুনিয়া ঘুরেন। পশ্চিমা দুনিয়ায় বড় বড় সেমিনার আর খেলার মাঠে খবর খুঁজে ফেরেন এ পোশাকেই। কাজের ক্ষেত্রে এ পোশাক নেতিবাচক না হয়ে বরং ইতিবাচক- এমনটাই মনে করেন তিনি। বলেন, এর জন্য বাড়তি সুবিধাও পেয়েছি। দুনিয়ার তাবৎ মিডিয়াকে ফিরিয়ে দিলেও মাদার তেরেসাঁ তাকে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন শাড়ি পরা দেখেই।

রোকেয়া হায়দারের সাংবাদিকতা শুরু বিটিভি দিয়ে। খবর পড়তে ভালোবাসতেন। ১৯৮১ সালে পাড়ি জমান ওয়াশিংটনে। ভয়েস অব আমেরিকাতে। একমাত্র নারী প্রতিনিধি হিসেবে বাংলা বিভাগে যোগ দেন। কালে তিনিই ২০১১ সালে বাংলা বিভাগের প্রধান হন। পরে একই বিভাগের ব্যবস্থাপনা সম্পাদকের দায়িত্বও লাভ করেন। কোনো আন্তর্জাতিক মাল্টিমিডিয়া প্রতিষ্ঠানে বাংলা বিভাগের প্রধান হওয়ার কৃতিত্ব তারই। নিজ কর্মদক্ষতার স্বীকৃতিও পেয়েছেন। ১৯৯০ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্সিয়াল অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হন। স্পষ্ট উচ্চারণ, বলিষ্ঠ কণ্ঠ আর দৃঢ়চেতা মনোভাব এই মানুষটিকে নিয়ে গেছে অন্য উচ্চতায়। যিনি বিশ্বাস করেন সততা, সাহস আর ইচ্ছা থাকলে নির্ভয়ে যেকোনো খবর প্রকাশ সম্ভব। জোর দিয়ে বলেন, কাউকে তুষ্ট করার জন্য সাংবাদিকতা করবো এই মনোভাব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। মুক্ত গণমাধ্যম, মিডিয়ায় সেল্‌ফ সেন্সরশিপ, কনফ্লিক্ট  রিস্যলুশান নিয়ে মানবজমিনের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেন তিনি।

দীর্ঘ পথপরিক্রমায় কোনো প্রতিকূলতার মধ্যে পড়েছেন কিনা?
কোথাও কোনো প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে পড়িনি। বিরাট কোনো দুর্ঘটনাও ঘটেনি। তবে পেশাগত অভিজ্ঞতায় কিছু বিরূপ প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হয়েছি। তা হচ্ছে প্রেস ফ্রিডম বা যেটাকে আমরা বলি মুক্ত গণমাধ্যম তা নিয়ে। একজন সাংবাদিকের পুরোপুরি প্রেস ফ্রিডম এখনো নেই। আমার কাজের শুরুতেও তা ছিল না। বর্তমানেও তা সীমিত। আর তা কেবল বাংলাদেশেই নয় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতেই এ অবস্থা বিদ্যমান। এখানকার মিডিয়ায় এখনো কথা বলার অধিকার সীমিত।
আমি দেখেছি, এখানে সকলেই চিন্তাভাবনা করে কথা বলে। বর্তমানে মিডিয়া বেড়েছে, পত্র-পত্রিকা, রেডিও বেড়েছে বলে হয়তো অনেককেই সোচ্চার হতে দেখা যায়। কিন্তু আমি জানি না, কতজন নির্ভয়ে সঠিক তথ্য তুলে ধরতে পারছেন। কারা নির্ভয়ে কথা বলতে পারছেন? বুয়েটে সাম্প্রতিক সময়ে আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ড থেকে কিছুটা হলেও কি প্রমাণিত হয় না যে, নির্ভয়ে কথা বলার অধিকার এদেশে এখনো সীমিত। বুয়েটের মতো একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, যেখানে মেধাবী ছেলেমেয়েরা পড়াশুনা করতে যায় সেখানে আমরা কি দেখতে পাচ্ছি, সেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত বলেই এ ধরনের নৃশংস, বর্বরোচিত ঘটনা ঘটছে। এটা খুবই দুঃখজনক।

ভয়েস অব আমেরিকাতে দীর্ঘদিন কাজ করছেন, দু’ একটি অভিজ্ঞতার কথা বলবেন?
আমাদের টার্গেট এরিয়া বাংলাদেশ এবং দুনিয়ায় যেখানে বাংলাদেশিরা আছেন। আর সে লক্ষ্য নিয়েই আমরা কাজ করি। একটু লক্ষ্য করে দেখবেন, ভয়েস অব আমেরিকাতে আমরা নির্দ্বিধায় লিখছি, পড়ছি। দেশের সর্বোচ্চ পদে যিনি আছেন তার বিরুদ্ধেও বা তার পক্ষে যা কিছু বলার প্রয়োজন হলে তা অত্যন্ত সোচ্চারভাবেই আমরা বলছি। সেখানে সরকারি কোনো চাপ নেই, আমরা নির্দ্বিধায় যা বলার তা বলতে পারছি। এমনকি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রে যে ধরনের সমালোচনা তা প্রচার করছি। বহু গণতান্ত্রিক দেশেই তা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের গণমাধ্যমকে কীভাবে দেখেন যুক্তরাষ্ট্রে বসে?
বাংলাদেশের গণমাধ্যম কর্মীদের বলবো, তোষামোদের রাজনীতি না করে কিছুটা স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের ঝুঁকি নিতে। আমি কাউকে তুষ্ট করার জন্য সাংবাদিকতা করবো এই মনোভাব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। যদি কোনো সুবিধা লাভের আশায় সাংবাদিকতা করি তাহলে বিষয়টি অন্যরকম হবে। বহু দেশেই আমরা দেখি অনেকে থাকেন যারা সাংবাদিকতার তকমা লাগিয়ে বাড়তি সুবিধা আদায়ের চেষ্টায় লিপ্ত থাকেন, যার মাধ্যমে বিশেষ সুযোগ পাওয়া যায়। বাংলাদেশেও এ ধরনের ঘটনা কমবেশি ঘটে থাকে। এটা কীভাবে ঘটে? যেমন আমি একজনের বিষয়ে কিছু তথ্য জানি। এখন আমি যদি তাকে গিয়ে বলি, তার বিষয়ে আমার কাছে তথ্য আছে তা আমি প্রকাশ করবো। সাংবাদিক শুনে অনেকেই শঙ্কিত হন। অনেকেই আছেন এমন একটা অবস্থানে থাকেন তারা চান না তাদের বিষয়ে কিছু প্রকাশ হোক। সুতরাং এসব ক্ষেত্রে অসৎ সাংবাদিকরা সুযোগ নিয়ে থাকে।

সরকার বলছে, মিডিয়ায় সেন্সরশিপ নেই, কিন্তু একটি সেল্‌ফ সেন্সরশিপ আলোচনায় আছে?
দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ- পূর্ব এশিয়া ছাড়াও অনেক বড় দেশেও সেল্‌ফ সেন্সরশিপ রয়েছে। অনেক উন্নত গণতান্ত্রিক দেশেও এটা লক্ষ্য করা যায়। আর স্বৈরশাসন যেসব দেশে সেখানে তো বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে এটা পারসন টু পারসন ভেরি করে। কথা হচ্ছে,  আমি সাংবাদিক হিসেবে সেই সুবিধা নিতে চাই কিনা। আমি সত্য প্রকাশ করলাম তার প্রতিক্রিয়া কি হলো, কে কি ভাবলো, কতটা ভীত সেটা ভেবে আমি কতটা সন্ত্রস্ত বা আমি চাই না এ ধরনের কোনো পরিস্থিতিতে পড়ি।
খবর প্রচারের ক্ষেত্রে হয়তো এ বিষয়গুলো কাজ করে। ব্যক্তিগতভাবে অনেকেই ভাবেন যে, আচ্ছা এই খবরটি আমি প্রকাশ করবো এর প্রতিক্রিয়া কি হবে? আমি একটু যাচাই করে, চিন্তাভাবনা করে দেখি। এই খবরটি প্রকাশ করে আমারই বা কি লাভ হচ্ছে আর তার প্রতিক্রিয়ায় আমি কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবো। এই যে আমি ভাবি, এটা করে আমার কি লাভ হবে, এটা ভেবে অনেকেই চুপ করে যান। আবার অনেকেই মনে করেন যে, না এটা আমাদের বলা উচিত। এরকম কিছু মানুষ মিডিয়ায় আছেন যেটা আমরা আশা করি। কথায় আছে, অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা তারে যেন তৃণসম দহে। অর্থাৎ উভয়েই সমান অপরাধী। হয়তো এসবের মধ্য থেকেই সত্যিকার সাহসী সাংবাদিক বেরিয়ে আসবে এবং যার পদাঙ্ক অনুসরণ করবে অনেকেই।

বাংলাদেশে সৎ, সাহসী সাংবাদিকতা নিয়ে আপনি কতটা আশাবাদী?
ধারা একদিন না একদিন পাল্টে যাবেই। পাল্টাতে বাধ্য। আমি যদি সারাজীবন মনে করি, না একইভাবে চলবে তা হবে না। আপনি নিজেই দেখুন, এতকিছু আড়াল করার পরও এখন অনেক কিছু বেরিয়ে আসছে। এখন অবাধ সংবাদ সরবরাহের দিন। আপনি মোবাইলে একটি চিত্র ধারণ করলেন বা সিসিটিভির একটি ফুটেজ সোস্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করে দিলেন তা তো আমি অস্বীকার করতে পারি না। আপনার মুঠোফোন এখন অনেক বেশি শক্তিশালী। যেটাকে আমরা সিটিজেন জার্নালিজম বলছি। আপনি যদি অন্যায় কিছু চিন্তা করেন যে, আমি একটি ছবি তুলে আটকে দেবো, সেই মনোবৃত্তি ছাড়া আমি সঠিক তথ্যটি তুলে ধরবো এমন চিন্তা করলে, সততা নিয়ে কাজ করলে, আপনি সমাজের অনেক চিত্রই তুলে ধরতে পারবেন।

কি চেয়েছিলেন আর কি হলেন?
ব্যারিস্টার হতে চেয়েছিলাম। সাংবাদিক হওয়ার চিন্তা ছিল না। বাবা-মা চেয়েছিলেন ডাক্তার হই। আমার খবর পড়তে ভালো লাগতো। সেই ভালোলাগা থেকেই এতদূর। অমি নিজেকে এখনো পুরোপুরি সাংবাদিক হিসেবে গড়ে তুলতে পেরেছি বলে মনে করি না। এ পেশায় এসেও অনেক কিছু করতে চেয়েছি কিন্তু তা হয়ে ওঠেনি। চার ছেলেমেয়েকে দেখাশুনা করার জন্য অনেক সময় দিতে হয়েছে। তবে যেটাই করতে চেয়েছি, সেটা একেবারে সর্বোচ্চ মানে গিয়ে করবো তা ভেবেছি সবসময়। যাই করি খুব ভালোভাবে করবো এবং নিষ্ঠার সঙ্গে করবো এবং সেটাই লক্ষ্য ছিল। বিখ্যাত হবো বা নাম করবো এমন কোনো লক্ষ্য ছিল না। চার দশকের সাংবাদিকতায় মনে হয়েছে, টেলিভিশনে যখন খবর পড়েছি সে সময়ই আমার কাছে স্বর্ণযুগ। কেউ দূর দেখে দেখলে এখনো বলে, আপনি বাংলাদেশের খবর পাঠিকা। এই যে খবর পড়ে এতটা জনপ্রিয় হওয়া যায়- এটা ভাবতেই ভালো লাগে।

নিজেকে নারী সাংবাদিক বলতে নারাজ?
এটা আমার একদম ভালো লাগে না। নারী সাংবাদিক হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতে স্বস্তিবোধ করি না। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে আমি একজন মানুষ। আমি যদি ডাক্তার হতাম আর খুব ভালো কাজ করতাম তাহলে আমাকে কেউ মহিলা ডাক্তার হিসেবে দেখলে আমি এটাও পছন্দ করতাম না। তেমনি আমার খুবই অপছন্দ নারী সাংবাদিক বলাটা। আমি যে পেশায় আছি সে হিসেবে পরিচিত হতে চাই। সেই কাজের স্বীকৃতি চাই। আমি কতটা ভালো কাজ করতে পারছি তার স্বীকৃতি চাই নারী বা পুরুষ হিসেবে নয়। তবে হ্যাঁ কথা থাকে হয়তো নারীদের জন্য সাংবাদিকতা অনেক ক্ষেত্রে কঠিন। সেটা তো অন্য পেশার সময়ও আছে। একটি পরিবারে বাবা যদি একদিন রান্না করেন তাহলে তাকে বাহবা দেয়া হয়, কিন্তু মা তো প্রতিদিন রান্না করেন তার কাজের স্বীকৃতিটা কে দেয়? ঠিক তেমনি নারীদের যেকোনো কাজে সফলতা আনতে হলে দ্বিগুণ না দশগুণ কাজ করতে হয়। এখন নারীরা অনেক ক্ষেত্রেই এগিয়ে এসেছে। তারা সর্বস্তরে কাজ করছে। রাস্তার ইট ভাঙা থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পরিচালনা পর্যন্ত নারীরা। পোশাক শিল্পে কাজ করে নারীরাই আশি শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছেন দেশের জন্য। যেমন খেলাধুলার মাঠেই বলুন, আগে মেয়েদের খুব একটা দেখা যেত না। এখন অনেক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আসছে মেয়েদের থেকে। একইভাবে মেয়েরা আগের চেয়ে অনেক বেশি হারে সাংবাদিকতায়ও এসেছে। আমি যখন শুরু করি ১৯৮১ সালে, তখন ভয়েজ অব আমেরিকাতে একজন মাত্র নারী কাজ করতেন। আজ দিন বদলেছে সেখানেও।

সাংবাদিকতায় স্পোর্টস বাছাই করলেন কেন?
আমার বাইরে বেড়াতে খুব ভালো লাগতো। আর খেলার মাঠে যাওয়া মানেই বাইরে যাবার সুযোগ। অন্যদিকে খেলার মাঠে প্রাণের জোয়ার, তারুণ্যের জোয়ার দেখা যায় তা অন্য কোনো কিছুতে সম্ভব নয়। তারুণ্যের জোয়ার দেখতে মাঠে যেতে আমার খুব ভালো লাগে। খেলার মাঠে অবাধে চলাফেরা করতে পারতাম, স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারতাম- এটাও একটা কারণ। সেখানে কোনো রাজনৈতিক চাপ ছিল না। ফলে খুব সহজেই স্পোর্টস নিয়ে কাজে মেতেছি। খেলার মাঠে বড় বড় তারকাদের সঙ্গে দেখা হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে। কিংবদন্তির ফুটবল তারকা পেলের সাক্ষাৎকার নিয়েছি, সেফ ব্লাটারের সাক্ষাৎকার নিয়েছি। বিশ্বকাপ ফুটবলের ট্রফি ছুঁয়ে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে।

মাদার তেরেসাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন?
এটি একটি স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। আমেরিকাতেই মাদার তেরেসাঁ এসেছিলেন তার প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম দেখতে। সেখানেই ওনার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। আমি যখন মাইক্রোফোন নিয়ে ওনার সাক্ষাৎকার চাইলাম প্রথমদিকে তিনি মাইক্রোফোন সরিয়ে দিয়েছিলেন। তখন আমি বললাম, আমি আপনারই দেশ থেকে এসেছি। আমি বাঙালি। আমার পোশাক দেখেই বুঝতে পারছেন, আমি আপনাদেরই লোক। তারপর তিনি কথা বলতে শুরু করলেন। এটা আমার জীবনে অসাধারণ পাওয়া।

তরুণ প্রজন্মের সাংবাদিকদের জন্য আপনার কি পরামর্শ?
একটাই কথা বলবো, প্রেস ফ্রিডমে বিশ্বাস করেন। সততার সঙ্গে নির্ভয়ে দায়িত্ব পালন করেন। আমি অন্তত এটি বলতে পারি, যতদিন সাংবাদিকতা করছি নির্ভয়ে এবং সততার সঙ্গে করছি। ১৯৪২ সালে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ভয়েস অব আমেরিকা শুরু হয়েছিল দুটি লাইনের ওপর ভিত্তি করে- খবর ভালো হোক মন্দ হোক, আমরা প্রকৃত তথ্য তুলে ধরবো। এতদিন পরও এর ভিত্তিতেই আমরা কাজ করে যাচ্ছি প্রেস ফ্রিডম নিয়ে।

কখনও সহকর্মীদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে সমস্যা হয়েছে?
কনফ্লিক্ট রিস্যলুশান বলে একটি বিষয় আছে। আমি এই প্রশিক্ষণও নিয়েছিলাম। যেখানে বলা হয়েছে দু’পক্ষেরই কথা শুনতে হবে। অন্যের মতকে গুরুত্ব দিতে হবে। সবসময় নিজের মত ঠিক নাও হতে পারে। এটা তো আমার কাজের জায়গা। সুতরাং অনেক কিছু মেনে নিতে হয়।

জনগন আমাদেরকে ভোট দেয় নাই :- রাশেদ খান মেনন (এমপি)

বাংলাদেশের ওয়াকার্স পার্টির কেন্দ্রীয় সভাপতি কমরেড রাশেদ খান মেনন (এমপি) বলেছেন, আমিসহ যারা নির্বাচিত হয়েছি আমাদেরকে দেশের কোন জনগন ভোট দেয় নাই। ভোটাররা কেউ ভোট কেন্দ্রে আসতে পারেনি। বিগত জাতীয়, উপজেলা এবং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে কোথাও ভোট দিতে পারেনি দেশের মানুষ।’ আজ দেশের ভোটাধিকার হরণ করেছে সরকার। সরকার দেশব্যাপী উন্নয়নের রোল মডেল করেছে দেশ-বিদেশে প্রশংসিত হচ্ছে, উন্নয়নের নামে দেশের গণতন্ত্রকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি বলেন, উন্নয়নের নামে আজ দেশের মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছে সরকার, তাই কেউ মুখ খুলে মত প্রকাশ করতে পারে না।
আজ অশ্বিনী কুমার টাউন হলে আয়োজিত বাংলাদেশের ওয়াকার্স পার্টির বরিশাল জেলা কমিটির সম্মেলনের প্রথম অধিবেশনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি একথা বলেন।
বরিশাল জেলা কমিটির সভাপতি অধ্যাপক নজরুল হক নিলুর সভাপতিত্বে জেলা সম্মেলনে প্রধান বক্তা ছিলেন কেন্দ্রীয় পলিট ব্যুরো সদস্য কমরেড আনিছুর রহমান মল্লিক। আরো বক্তব্য রাখেন জেলা সাধারণ সম্পাদক সাবেক এমপি এ্যাড. শেখ মোহাম্মদ টিপু সুলতান, কমরেড শান্তি দাশ, কেন্দ্রীয় সদস্য অধ্যাপক বিশ্বজিৎ বাড়ৈ, কমরেড টি. এম শাহজাহান হাওলাদার, কমরেড আ. মন্নান,ফায়জুল হক বালী ফারহিন, সীমা রানি শীল ও শাহিন হোসেন।
মেনন বলেন, বিগত সরকারের প্রধান খালেদা জিয়া ও ও তার হাওয়া ভবনে বসে দুর্নীতি লুঠপাট করার কারণে কেউ সাজা ভোগ করছে, অন্যরা পালিয়ে গেছে। তিনি প্রশ্ন রাখেন, এখন সরকারে থেকে যারা দুর্নীতি লুঠপাট সহ বিদেশে অর্থ পাচার করছে তাদের বিচার করবে কে?
তিনি বলেন, শেখ হাসিনা দুর্নীতিবাজ লুটেরাদের আড়াল করে যতই শুদ্ধি অভিযান চালান তাতেই কিছুই হবে না। ক্যাসিনো মালিকদের ধরা হচ্ছে, দুর্নীতিবাজদের ধরা হচ্ছে, কিন্তু দুর্নীতির আসল জায়গা নির্বিঘ্নে আছে।
সেই দুর্নীতিবাজদের বিচার কবে হবে, তাদের সাজা কবে হবে, তাদের সম্পদ কবে বাজেয়াপ্ত হবে- প্রশ্ন রাখেন তিনি। আমাকে ১৪ দলের পক্ষ থেকে নৌকা প্রতীক দিয়েছে তাদের প্রয়োজনে।
মেনন আরো বলেন, বর্তমান সরকার ২০০৮ সালে গণতন্ত্রের কথা বলে ক্ষমতায় গিয়ে তারাই আজ এদেশের গণতন্ত্রকে গলা  কেটে হত্যা করেছে। এসব কৃষক-ক্ষেত-মজুর ও শ্রমজীবি মানুষের জন্য দেশে পেনশন স্কিম চালু করার দাবি জানান।
এর পূর্বে সকাল ১১টায় টাউন হল চত্বরে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করেন রাশেদ খান মেনন এমপি ও স্থানী দলীয় নেতৃবৃন্দ।
পরে জেলা সভাপতি ও জেলা সাধারণ সম্পাদক সহ দলীয় নেতা কর্মীরা লাল পতাকা নিয়ে নগরীতে র‌্যালি বেড় করে র‌্যালিটি শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় টাউন হল চত্বরে এসে শেষ করেন।

ইরাকে সাম্প্রতিক সহিংস বিক্ষোভের নেপথ্য কারণ

ইরাকে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ
ইরাকের সাম্প্রতিক সহিংসতা ও প্রতিবাদ সমাবেশ পশ্চিম এশিয়ার অন্যতম আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। গত বছরের মতো এবারের বিক্ষোভ সমাবেশও সহিংসতায় রূপ নেয়। ইরাকের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে সাম্প্রতিক সহিংসতায় ১০০ জনের বেশি নিহত এবং ছয় হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছে।

গত কয়েক বছর ধরে আমরা লক্ষ্য করছি ইরাকে কোনো না কোনো ইস্যুকে কেন্দ্র করে প্রায়ই সরকার বিরোধী বিক্ষোভ হচ্ছে। এসব বিক্ষোভের বেশিরভাগই সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে। গত বছর সেপ্টেম্বর বসরায় সরকার বিরোধী বিক্ষোভ হয় এবং এক পর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা সেখানে অবস্থিত ইরানের কনস্যুলেটে হামলা চালায়। বেশ কিছু কারণে গত কয়েক বছরের প্রতিবাদ সমাবেশ গত পাঁচ বছর আগের প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রথমত পার্থক্য হচ্ছে, ইরাকের সাম্প্রতিক বিক্ষোভ ও সহিংসতায় ১০০এর বেশি নিহত এবং ৬ হাজারের বেশী মানুষ আহত হয়েছে যা অতীতে হয়নি।

দ্বিতীয় পার্থক্য হচ্ছে, বিগত দিনে সরকার বিরোধী বিক্ষোভ সমাবেশ হতো সাদরের মতো নেতাদের নির্দিষ্ট দল, মত বা গোষ্ঠীর সমর্থকদের নিয়ে। কিন্তু সাম্প্রতিক এসব প্রতিবাদ সমাবেশে সুনির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর পরিচয় নেই। এমনকি প্রভাবশালী শিয়া নেতা মোক্তাদা সাদর জনগণকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। এ অবস্থায় কারা এই প্রতিবাদ সমাবেশ ও সহিংসতার পেছনে মদদ দিচ্ছে সেটাই এখন প্রশ্ন।

তৃতীয়ত পার্থক্য হচ্ছে, এবারই প্রথম সরকার বিরোধী বিক্ষোভ সমাবেশে ইরাকের শীর্ষ ধর্মীয় নেতাদের বিরুদ্ধে শ্লোগান দেয়া হয়েছে। অথচ ২০১৪ সালে ইরাকের শীর্ষ শিয়া ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ সিস্তানির ফতোয়া অনুযায়ী দায়েশ বিরোধী হাশদ আশ্‌ শাবি সংগঠন গড়ে তোলা হয়েছিল যেখানে ইরাকের সর্বস্তরের জনগণ অংশ নিয়েছিল। এ থেকে একদিকে ধর্মীয় নেতাদের প্রতি ইরাকের জনগণের গভীর শ্রদ্ধা ও আনুগত্যের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে অন্যদিকে, এটাও প্রমাণিত হয়েছে ইরাকের বিচক্ষণ ধর্মীয় নেতারা সবসময় জনগণের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন।

চতুর্থ পার্থক্য হচ্ছে, এবারের প্রতিবাদ সমাবেশে যারা অংশ নিয়েছিল তারা ইরাকের বর্তমান শাসন ব্যবস্থা উৎখাতের জন্য শ্লোগান দিয়েছিল। অথচ এসব শ্লোগান কেবল স্বৈরাচার সরকারের বিরুদ্ধে দেয়া মানায়। কারণ  ইরাকে একটি নির্বাচিত সরকার রয়েছে। প্রতি চার বছর পর পর ইরাকের জনগণ পার্লামেন্ট নির্বাচনে অংশ নেয় এবং পার্লামেন্টে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করেন থাকেন।

ইরাকে অতীতের সরকার বিরোধী বিক্ষোভের সঙ্গে এবারের বিক্ষোভের পঞ্চম পার্থক্য হচ্ছে, বিক্ষোভকারী ও সহিংসতায় জড়িতরা এবং তাদের সমর্থক গণমাধ্যম, বিভিন্ন ব্যক্তিত্ব ও গ্রুপ এমন সময় ইরাক সরকারের পদত্যাগ ও নতুন করে পার্লামেন্ট নির্বাচনের দাবি তুলেছে যখন বর্তমান সরকারের মেয়াদকাল এক বছরেরও কম। নানা কারণে বেশ কিছু ক্ষেত্রে সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ পুঞ্জিভূত হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই অসন্তোষ বিরাজ করছে। এ কারণে ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আদিল আব্দুল মাহদি জনগণকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, "দুর্নীতি বা অন্যান্য সমস্যার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করার অধিকার তাদের রয়েছে কিন্তু যুদ্ধ বিধ্বস্ত ইরাকের বর্তমান অবস্থায় সেসব সমস্যার সমাধান করতে হলে আরো সময়ের প্রয়োজন।"

বিশ্বে তেল রিজার্ভের দিক দিয়ে ইরাক দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। দেশটি প্রতিদিন ৩৬ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করে। সম্পদের দিক দিয়ে ইরাক এ অঞ্চলের অন্যতম ধনি দেশ হলেও যুদ্ধবিধ্বস্ত এ দেশটির জনগণ চরম অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের সম্মুখীন। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ইরাকে শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৪০ শতাংশের বেশি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এবারের সরকার বিরোধীদের মধ্যে শিক্ষিত যুবক শ্রেণীর উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। এ ছাড়া সামাজিক নানা পরিসেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণে জনমনেও অসন্তোষ বিরাজ করছে। ইরাকের জনগণ বহুদিন ধরে বিদ্যুত সংকটে ভুগছে। স্বাস্থ্য পরিসেবার অবস্থা খুবই নাজুক। এমনকি খাদ্য পানির সংকটও বেশ প্রবল।

ইরাকে সাম্প্রতিক বিক্ষোভের দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, প্রশাসনে চলমান দুর্নীতি। আর্থিক দুর্নীতি ও অনিয়ম সেদেশে জনমনে অসন্তোষের অন্যতম কারণ। জনগণের কল্যাণের  বিষয়টি উপেক্ষা করে বাজেটের একটা বিরাট অংশ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।  গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে, ইরাকের বর্তমান সরকার যুবকদের চাকরির প্রতিশ্রুতি এবং জনসেবামূলক কার্যক্রম বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ করতে গিয়ে সরকারের উন্নয়ন বাজেট ও জনসেবামূলক কার্যক্রম ব্যহত হচ্ছে।

যাইহোক, ইরাকে ন্যায়সঙ্গত দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আয়োজিত শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ বিক্ষোভ কেন সহিংসতায় রূপ নিল, কেন জনপ্রিয় ধর্মীয় নেতাদের বিরুদ্ধে শ্লোগান দেয়া হল এবং কেনইবা সরকার পতনের ডাক দেয়া হল সেটা বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।

এ প্রশ্নের জবাবে এর পেছনে ইরাকের ভেতরে ও বাইরের বিভিন্ন কারণের কথা উল্লেখ করা যায়।  অভ্যন্তরীণ দিক দিয়ে ইরাকি সমাজের গঠন কাঠামো বিশৃঙ্খল অবস্থায় রয়েছে এবং বিভিন্ন ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠীর ইরাক ঐক্যবদ্ধ নয়। ইরাকের এ দুর্বলতার সুযোগে দায়েশের মতো উগ্র তাকফিরি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটেছে। অন্যদিকে, ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দামের নিষিদ্ধ ঘোষিত বাথ পার্টির অনেক সদস্য এখনো রয়ে গেছে এবং তাদের প্রতি বাইরের বিভিন্ন মহলের সমর্থন বজায় রয়েছে। এ গোষ্ঠীর সদস্যরা দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এবং তারা বেকারত্ব, দারিদ্রতাসহ নানা সংকটে জর্জরিত যুবকদেরকে সরকার বিরোধী বিক্ষোভ ও সহিংসতায় উস্কানি দিচ্ছে। সম্প্রতি সরকার বিরোধী আন্দোলনের নামে যে সহিংস ঘটনা ঘটেছে এটি ছিল তার অন্যতম কারণ। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ কর্মসূচি সহিংসতায় রূপ নেয়ার আরেকটি কারণ হচ্ছে, ইরাকের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আমেরিকা, সৌদি আরব ও ইসরাইলের হস্তক্ষেপ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ বিক্ষোভকে তারা অনেক বড় ঘটনা হিসেবে তুলে ধরে এটাকে সহিংসতায় রূপ দেয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে।   

ইরাকে সাম্প্রতিক সহিংস বিক্ষোভের পেছনে বিদেশীদের হাত থাকার বহু প্রমাণ রয়েছে। ইরাক সরকার বিভিন্ন ইস্যুতে স্বাধীন নীতি মেনে চলায় অনেক দেশ অসন্তুষ্ট। দেশটির সরকার ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করেছে, পারস্য উপসাগরে মার্কিন নেতৃত্বাধীন যৌথ নৌবাহিনীতে যোগ দিকে অস্বীকৃতি জানিয়েছে এবং সিরিয়ার সঙ্গে ইরাকের সীমান্ত খুলে দিয়েছে। এ ছাড়া, গত মাসে ইরাকের জনপ্রিয় হাশদ আশ্‌ শাবির ঘাঁটিতে হামলার ঘটনার পর ইরাক সরকার রাশিয়ার কাছ থেক এস-৩০০ এবং এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার উদ্যোগ নিয়েছে। নিরাপত্তা বিষয়ে আলোচনার জন্য ইরাকের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ফালাহ ফাইয়াজ রাশিয়া সফর করেছেন। এ ছাড়া, ইরাক সরকার প্রতিরোধ শক্তিগুলোর প্রতি সমর্থন দিচ্ছে। সিরিয়া ও ইয়েমেনে ব্যর্থতাও সৌদি আরবকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। এসব কারণে ইরাক সরকারের প্রতি পাশ্চাত্য ও তাদের মিত্র দেশগুলো খুবই অসন্তুষ্ট। এ অবস্থায় বাগদাদকে কোণঠাসা করার জন্য আমেরিকা, সৌদি আরব ও ইসরাইল ইরাকের সাম্প্রতিক  বিক্ষোভকে কাজে লাগানোর চেষ্টা চালিয়েছে।

রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে কি খালেদা জিয়া মুক্ত হতে পারবেন?

সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া প্রায় ১৮ মাস ধরে কারাগারে। আদালতের রায়ে ১৭ বছরের সাজা হয়েছে তার। খালেদা জিয়া তিন মেয়াদে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। এছাড়া বিরোধী দল বিএনপির প্রধান ছিলেন। পৃথক দু’টি মামলায় তাকে সাজা দেওয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি নিজের প্রয়াত স্বামী ও সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নামে একটি দাতব্য সংস্থার তহবিল আত্মসাৎ করেছেন। খালেদার আইনজীবীরা দ্বিতীয়বারের মতো দেশের সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করেছেন।
বর্তমানে ৭৪ বছর বয়সী এই সাবেক প্রধানমন্ত্রী নিজেকে নির্দোষ প্রমাণে আইনি লড়াইয়ে লড়ছেন। কিন্তু দল থেকে রাজনৈতিক সমঝোতারও চেষ্টা চলছে। রাজনৈতিক আলাপ আলোচনার মাধ্যমে কি খালেদা মুক্ত হতে পারবেন? জার্মান সংবাদ মাধ্যম ডয়েচে ভেলের এক প্রতিবেদনে তারই উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা বলছেন, যদি আদালত তাকে দু’টি মামলায় জামিন দেয়, তবে তিনি মুক্ত হবেন। কিন্তু বিচারকরা বেশ কয়েকবার তার জামিন আবেদন নাকচ করেছেন। বিএনপির নেতারা এখন হাইকোর্টে আপিলের চিন্তাভাবনা করছেন। ডয়েচে ভেলের সঙ্গে এক আলাপচারিতায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেছেন, ‘আদালত যদি তার সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থান ও শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করতো, তাহলে খালেদা জিয়া এতদিনে জামিন পেয়ে যেতেন।’
তবে এমন গুজবও আছে যে, পর্দার আড়ালে শাসক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দরকষাকষি করছে। স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমে বলা হয়েছে যে, বিএনপির এমপি হারুনুর রশিদ শাসক দলের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে এ মাসের শুরুতে দেখা করেছেন। তিনি ডয়েচে ভেলেকে বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ‘আমি খালেদা জিয়ার সাম্প্রতিক অবস্থা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অবহিত করতে ওবায়দুল কাদেরকে অনুরোধ করেছি।’
হারুনুর রশিদকে প্রশ্ন করা হয়, সরকারের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর খালেদা জিয়ার জামিন নির্ভর করে কিনা। জবাবে তিনি বলেন, অনেক সময়ই দেখা গেছে যে, এমনকি খুনের দায়ে দ-প্রাপ্ত ব্যক্তিরাও হাইকোর্টে জামিন পেয়েছেন। কিন্তু খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। শাসক দলের নেতারা অবশ্য অস্বীকার করে বলছেন, এ বিষয়ে তাদের করার কিছু নেই। তাদের বক্তব্য, খালেদা জিয়ার জামিনের বিষয়ে এখতিয়ার বিচার বিভাগের।
ডয়েচে ভেলের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে বিরোধী দলের সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা খুবই সাধারণ বিষয়। অনেক ক্ষেত্রেই আদালত এ ধরণের মামলা খারিজ করে দেয়। বিএনপি নেতাদের বক্তব্য, তাদের নেত্রীর বিরুদ্ধে হওয়া এসব মামলা ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’, যার উদ্দেশ্য তাকে হয়রানি করা ও তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারকে ধ্বংস করা। তবে আওয়ামী লীগ নেতারা এই বক্তব্য অস্বীকার করেছেন।
তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আইনি শাস্তি এড়াতে রাজনৈতিক দরকষাকষি একেবারেই নতুন কিছু নয়। অতীতে দেখা গেছে, বাংলাদেশের সাবেক সামরিক একনায়ক হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদের নয় বছরের শাসনের অবসান হওয়ামাত্রই তার বিরুদ্ধে ২৬টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে সাবেক এই স্বৈরশাসক রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে নিজের অনুকূলে ব্যবহার করে ঠিকই সাজা এড়াতে পেরেছেন।
প্রতিবেদনে একটি প্রশ্ন রাখা হয়েছে: বিএনপির দিন কি ফুরিয়ে এসেছে? এই প্রশ্নের প্রেক্ষিতেই বলা হয়, খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কয়েক মাস আগে। তাকে গ্রেপ্তারের ফলে দলে নেতৃত্ব শূন্যতা দেখা দেয়। তার ছেলে তারেক রহমান, যাকে দলের ভবিষ্যৎ নেতা ভাবা হচ্ছে, তাকেও যাবজ্জীবন সাজা দেওয়া হয়েছে। তিনি বর্তমানে লন্ডনে বসবাস করছেন। এই দুই প্রধান নেতাকে ছাড়া নির্বাচনে গিয়ে বিএনপি  পার্লামেন্টের ৩০০ আসনের মধ্যে মাত্র ৭টি আসনে জয়লাভে সক্ষম হয়।
জার্মানির রাইন-ওয়াল বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ ডিয়েটের রেইনহার্ডও মনে করেন যে, বিএনপি অস্তিত্বহীন হওয়ার পথে। তবে তার ধারণা, বিএনপি ছোট দল হিসেবে সামনের দিনগুলোতে টিকে থাকতে পারবে।
তার মতে, ইসলামপন্থি জামায়াতে ইসলামী, নিজেদের অস্পষ্ট রাজনৈতিক ম্যানিফেস্টো ও তাদের নেতার নির্বাসনে বসবাস, ইত্যাদি বিষয় দলটির অবস্থানকে দুর্বল করে দিয়েছে। অপরদিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক সলিমুল্লাহ খান মনে করেন, বিএনপি হয়তো কঠিন সময় পাড় করছে। তবে এখনও দলটি নিজ সমর্থক গোষ্ঠীকে জাগিয়ে তোলার সুযোগ পেতে পারে। কেননা, এখন পর্যন্ত অন্য কোনো দলই প্রধান বিরোধী দল হিসেবে বিএনপির অবস্থান নিতে পারেনি।

আন্ডার ওয়ার্ল্ডের চাঞ্চল্যকর তথ্য সম্রাটের মুখে by রুদ্র মিজান

আন্ডার ওয়ার্ল্ড। এক বিস্ময়কর নাম। আধিপত্য নিয়ে যেখানে প্রায়ই ঘটে অস্ত্র ও রক্তের খেলা। সবসময়ই শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণে থাকে ঢাকার আন্ডার ওয়ার্ল্ড। এমনকি বিদেশে বসেও আন্ডার ওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করে সন্ত্রাসীরা। আধিপত্য বিস্তার, অর্থের ভাগাভাগি নিয়ে প্রায়ই খুন-খারাবির ঘটনা ঘটে। ২০০৯ সালের পর থেকেই আন্ডার ওয়ার্ল্ডে নজর পড়ে ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের। যুবলীগের ওয়ার্ড পর্যায়ের কর্মী থেকে মহানগরের নেতা হওয়া সম্রাটের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে উঠে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের।
নিজেও গড়ে তোলেন সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী। যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি হওয়ার পর পুরো ঢাকার অপরাধ জগতে আধিপত্য বিস্তার করেন সম্রাট। তার আধিপত্য মেনে নিতে যারাই অস্বীকার করেছেন তাদের ওপর নেমে আসে নির্যাতন। সরকারি দলের প্রভাব খাটিয়ে, সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী দিয়ে সহজেই আন্ডার ওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রনে নেন তিনি। রিমান্ডে থাকা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটকে এসব নানা বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদে আন্ডারওয়ার্ল্ডের চাঞ্চল্যকর তথ্য দিচ্ছেন সম্রাট।
ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটকে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করছে র‌্যাব। র‌্যাবের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের একটি টিম তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। সূত্রে জানা গেছে, কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এড়িয়ে যাচ্ছেন সম্রাট। মাঝে মাঝে ভুলে যাওয়ার ভান করছেন। তার উপার্জিত অর্থ, অস্ত্র ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সম্পর্কে গতকাল জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। তার দেয়া তথ্য নোট করা হচ্ছে। র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন র‌্যাব-১ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সারওয়ার-বিন-কাশেম মানবজমিনকে বলেন, আন্ডারওয়ার্ল্ড, অস্ত্র, মাদক, অবৈধ অর্থ, জবর-দখলসহ সকল অপকর্ম নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। সম্রাট ও আরমানের দেয়া তথ্য যাচাই বাছাই করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান তিনি।
সূত্রমতে, একসময় ঢাকার আন্ডার ওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রন করতেন শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান। ২০০৩ সালে মালিবাগের একটি হোটেলে ডিবি পুলিশের দুই সদস্যকে হত্যা করে জিসান বাহিনী। তারপর দেশের বাইরে আত্মগোপনে যান জিসান। ক্লিন হার্ট অপারেশনসহ বিভিন্ন কারণে ওই সময় থেকেই একে-একে দেশ ছাড়েন ঢাকার অনেক শীর্ষ সন্ত্রাসী। ২০১২ সাল থেকেই আন্ডার ওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করে। ২০১৩ সালে ২৯শে জুলাই রাতে যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াজুল হক খান মিল্কিকে হত্যা করা হয়। গুলশানের ১২৩ নম্বর সড়কের বিপনী বিতান শপার্স ওয়ার্ল্ডের সামনে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করে তাকে  হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। যুবলীগের একটি পক্ষ এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলো। এই হত্যাকাণ্ডের পর থমথমে ছিলো আন্ডাওয়ার্ল্ড। মিল্কি হত্যার পর আসামিরা ছিলো আত্মগোপনে। এরমধ্যেই আন্ডারওয়ার্ল্ডের পুরো নিয়ন্ত্রন চলে যায় যুবলীগের দক্ষিণের সভাপতি সম্রাটের নিয়ন্ত্রনে। শুরু থেকেই সম্রাটের পাশে ছিলেন অস্ত্রের রাজনীতিতে প্রভাবশালী যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূইঁয়া। শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান ও ফ্রিডম মানিকের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত খালেদ মাহমুদ ভূইঁয়ার নাম শুনলেই কেঁপে উঠে খিলগাঁও, শাহজাহানপুর, মতিঝিল এলাকার মানুষ।
দীর্ঘদিন থেকেই সম্রাট ও খালেদ মিলে পুরো ঢাকায় গড়ে তোলেন শক্তিশালী এক ক্যাডার বাহিনী। প্রতিটি ওয়ার্ডে ছিলো তাদের অনুসারীরা। তাদের চাঁদাবাজি, জবর-দখলে কেউ বাধা দিলেই জানানো হতো সম্রাটের দরবারে। কাকরাইলের ভূইঁয়া টাওয়ারে সম্রাটের অফিসেই সকল অপকর্মের পরিকল্পনা করা হতো। যারা বাধা হতো তাদের ডেকে আনা হতো সেখানেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জোর করে তোলে আনা হতো। তারপর ক্যাডার বাহিনীর সদস্যরা নির্যাতন করতো নির্বিঘ্নে। নির্যাতনের ক্ষেত্রে ইলেকট্রিকের শকও দেয়া হতো। শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের সঙ্গে সর্বশেষ যোগাযোগ থেকে শুরু করে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসীদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে রিমান্ডে থাকা সম্রাটকে।
সরকারি বিভিন্ন কাজের টেন্ডার, ক্যাসিনো, অবৈধ মার্কেট ও চাঁদাবাজি থেকেই বেশি টাকা উপার্জন হতো সম্রাটের। এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পেয়েছে র‌্যাব। আন্ডার ওয়ার্ল্ডে সম্রাটের হয়ে প্রভাব বিস্তার করতেন খালেদ। ক্যাসিনো ব্যবসাও দেখাশোনা করতেন তিনি। খালেদের মাধ্যমে যোগাযোগ হয় জিসানের সঙ্গে। জিসানকে নিয়মিত মোটা অঙ্কের টাকা দিতেন সম্রাট। একাধিকবার সিঙ্গাপুরে শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের সঙ্গে সম্রাট, খালেদের বৈঠক হয়।
সম্রাটের দেয়া তথ্যানুসারে, অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থের ভাগ পেয়েছেন অনেকে। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অন্তত ১১ জন সংসদ সদস্য সম্রাটের কাছ থেকে আর্থিক সহযোগিতা নিয়েছেন। ভোলার একজন এমপি নিয়মিত টাকার ভাগ নেন। নির্বাচনের প্রচারণা চালাতে সম্রাটের ক্যাডার বাহিনী নিয়ে এলাকায় গিয়েছিলেন তিনি। ক্যাডার বাহিনীর সদস্যদের নাম, ঠিকানা রয়েছে গোয়েন্দাদের কাছে। তবে জিজ্ঞাসাবাদে সম্রাট জানিয়েছেন, গ্রেপ্তারের বেশ আগে থেকেই খালেদের সঙ্গে দুরত্ব সৃষ্টি হয় তার। টাকার ভাগাভাগি নিয়ে এই দুরত্বের সূত্রপাত। একইভাবে দুরত্ব সৃষ্টি হয় জিসানের সঙ্গে। এজন্য আতঙ্কে ছিলেন। ধারণা ছিলো জিসানের নির্দেশে তাকে হত্যা করা হতে পারে। এজন্য দুবাই থেকে সন্ত্রাসী  ও একে-২২ রাইফেলসহ বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র পাঠান জিসান। গত ২৬শে জুলাই খিলগাঁওয়ের সিপাহীবাগের বায়তুল হুদা মসজিদ সংলগ্ন ফাইভ স্টার নিবাসের সামনে থেকে অস্ত্রসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। এ বিষয়ে ওই সময়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার শাহিদুর রহমান রিপন বলেছিলেন, গ্রেপ্তারকৃতরা পেশাদার সন্ত্রাসী। তারা বিদেশে অবস্থান করা একজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর হয়ে কাজ করে। এই ঘটনার পর থেকে সম্রাট নিজে সন্ত্রাসীদের বহর নিয়ে চলাফেরা করতেন। খালেদের সঙ্গে দুরত্ব সৃষ্টির পর থেকে বিশ্বস্ত হিসেবে যুবলীগ নেতা এনামুল হক আরমান ছিলেন তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী। একইভাবে অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থের হিসাব রাখতেন যুবলীগের ঢাকা দক্ষিণের দপ্তর সম্পাদক এমদাদুল হক। একই বিষয়ে সম্রাট ও আরমানকে পৃথকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করছে র‌্যাব। সম্রাটের এই ক্যাডার বাহিনী, অস্ত্র, অবৈধ অর্থ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করছে র‌্যাব। সম্রাট প্রায়ই অসুস্থতার অজুহাতে প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করছেন। সূত্রমতে, আলাদভাবে জিজ্ঞাসাবাদের পর দু’জনকে মুখোমুখি করা হবে।
উল্লেখ্য, যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটকে ১৫ই অক্টোবর ১০ দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। একইভাবে সম্রাটের সহযোগী ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের বহিষ্কৃত সহ-সভাপতি এনামুল হক আরমানকেও পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়। গত ১৮ই সেপ্টেম্বর ক্যাসিনো বিরোধী অভিযানের প্রথম দিনই গ্রেপ্তার করা হয় সম্রাটের সহযোগী যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে। গত ৬ই অক্টোবর কুমিল্লা থেকে সম্রাট ও তার সহযোগী আরমানকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। ওই দিন দুপুরে তাকে নিয়ে র‌্যাব সদর দপ্তরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলমের নেতৃত্বে কাকরাইল অফিসে তল্লাশি অভিযান করে র‌্যাব। এসময় পাঁচ রাউন্ড গুলি ভর্তি একটি ম্যাগাজিনসহ বিদেশি পিস্তল, ক্রেংক্রারুর চামড়া, এক হাজার ১৬০ পিস ইয়াবাসহ বিপুল মাদক জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় রমনা থানায় দুটি মামলা দায়ের করা হয়। সেইসঙ্গে বন্যপ্রাণীর চামড়া রাখার দায়ে সম্রাটকে ছয় মাস ও গ্রেপ্তারের সময় মদ্যপ অবস্থায় থাকায় আরমানকে ছয় মাসের কারাদন্ড দেয় র‌্যাবের ভ্রাম্যমান আদালত।

শিশু নির্যাতনকারীর ক্ষমা নেই : -প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, শিশু হত্যা এবং নির্যাতনে জড়িতদের কঠোর থেকে কঠোরতম শাস্তি ভোগ করতে হবে। এ ধরনের অন্যায়-অবিচার কখনই বরদাশত করা হবে না। গতকাল রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে শেখ রাসেলের জন্মদিন উপলক্ষে ‘শেখ রাসেল জাতীয় শিশু কিশোর পরিষদ’ আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি একথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা চাই আমাদের শিশুরা আর কখনো যেন এই ধরনের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার না হয়। প্রত্যেকটি শিশু যেন সুন্দরভাবে বাঁচতে পারে।প্রতিটি শিশুর জীবন যেন অর্থবহ হয়। তা নিশ্চিত করাই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য।  প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৭৫ এর খুনীদের বিচার না করে বরং আইন করে বিচারের পথ রুদ্ধ করে সে সময় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে খুনীদের পুরস্কৃত করা শিশু ও নারী হত্যাসহ হত্যা, খুন এবং নির্যাতনকে উৎসাহিত করা হয়। তিনি বলেন, আমি আমার বাবা, মা-ভাইয়ের খুনীদের বিচার চাইতে পারিনি এমনকি একটি মামলাও আমাদের করতে দেয়া হয়নি। তিনি বলেন, আজকে মাঝে মাঝে মনে হয় ৫৪ বছর পূর্ণ করেছে রাসেল।
৫৪ বছর বয়সে রাসেল কেমন হত দেখতে? আমি তার বড় বোন। আমি কোলে পিঠে করে তাকে আসলে মানুষ করেছি সব সময়। অতি আধুনিক ছিল সে, কিন্তু ঘাতকের নির্মম বুলেট তাকে বাঁচতে দেয়নি।
বেদনার সেই স্মৃতিচারণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৮১ সালে আমি ফিরে এসেছিলাম বাংলাদেশে। আমি চেষ্টা করেছিলাম মামলা করার। আমাকে বলা হল, এই হত্যার মামলা করা যাবে না। আমি আমার মায়ের হত্যার বিচার পাব না, ভাই হত্যার বিচার পাব না, আমার বাবার হত্যার বিচার পাব না। আমার প্রশ্ন ছিল, আমি কি এদেশের নাগরিক নই? সবাই যদি বিচার চাইতে পারে আমি বিচার চাইতে পারব না কেন? প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে রাসেল আমাদের মাঝে নেই। আমি রাসেলকে হারিয়েছি। কিন্তু এই শেখ রাসেল জাতীয় শিশু কিশোর পরিষদের মাধ্যমে আমি হাজার হাজার লাখো রাসেলকে পেয়েছি। আমার দোয়া আমার আশির্বাদ সব সময় তোমাদের সাথে থাকবে। সমপ্রতি সমাজে গর্হিত অপরাধ বেড়ে যাওয়ার প্রসঙ্গে একজন বিকৃত মানসিকতা সম্পন্ন পিতার নিজের শিশু পুত্রকে হত্যার প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেদিন নারী-শিশুসহ জাতির পিতা এবং তার পরিবারের সদস্যদের বিচার হলে সমাজে এই ধরনের অপরাধ সংঘটিত হতে পারতো না। শেখ হাসিনা বলেন, স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে জাতির পিতা ‘শিশু অধিকার আইন’ প্রণয়ন করে যান। তারই পদাংক অনুসরণ করে ২১ বছর পর আমরা সরকার গঠন করে নীতিমালা, আইন, শিশুদের চিকিৎসার ব্যবস্থাসহ তাদের বেড়ে ওঠা, খেলাধূলাসহ সবকিছুর ব্যবস্থাই ধীরে ধীরে করেছি। শিশুদের ভেতরকার মেধা, মনন ও শক্তিকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়াই তার সরকারের লক্ষ্য উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, একইসঙ্গে আধুনিক যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য আধুনিক প্রযুক্তিজ্ঞান সম্পন্নভাবে আমাদের শিশুরা যাতে গড়ে উঠতে পারে সেজন্য কম্পিউটার শিক্ষা থেকে শুরু করে প্রযুক্তি শিক্ষাসহ সবধরনের শিক্ষার ওপর আমরা গুরুত্ব দিয়েছি। সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মো.রকিবুর রহমান অনুষ্ঠানে সভাপতিত্বে করেন।
সংগঠনের সদস্য সচিব মাহমুদুস সামাদ এমপি, উপদেষ্টা তরফদার রুহুল আমিন এবং কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক কেএম শহীদুল্লাহ অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে শেখ রাসেলের জন্মদিন উপলক্ষে শেখ রাসেল জাতীয় শিশু-কিশোর পরিষদ আয়োজিত সারাদেশের শিশু-কিশোরদের মধ্যে অনুষ্ঠিত খেলাধূলা, চিত্রাংকন এবং সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করেন। মন্ত্রিপরিষদ সদস্যবৃন্দ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাগণ, সংসদ সদস্যবৃন্দ, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, আমন্ত্রিত অতিথি এবং সারাদেশ থেকে আগত শেখ রাসেল জাতীয় শিশু-কিশোর পরিষদের সদস্যরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিশুরা যাতে ঝুঁকিপূর্ণ কোন কাজ না করে সেই ধরনের ব্যবস্থাও তার সরকার নিয়েছে। এমনকি তাদেরকে শিক্ষা-দীক্ষা দিয়ে, এমনকি ঝরে পড়া শিশু এবং যারা শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল সেসব শিশুদেরও শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছে। আর যারা এতিম এবং প্রতিবন্ধী ও অটিজম আক্রান্ত শিশুদের জন্যও কর্মসূচি নিয়েছে। তিনি অটিজম আক্রান্ত শিশুদের আপন করে নিয়ে সমাজের মূল স্রোতধারায় সম্পৃক্ত করার জন্যও অনুষ্ঠানে উপস্থিত শিশু কিশোরদের প্রতি আহ্বান জানান। শেখ হাসিনা বলেন, আমি আজকে এখানে যেসব শিশুরা উপস্থিত রয়েছে তাদেরকে একটা কথাই বলবো, তোমাদের আশেপাশে যখন কোন প্রতিবন্ধী, অটিস্টিক বা দরিদ্র শিশু দেখবে তাদেরকে কখনও অবহেলা করো না। তাদেরকে আপন করে নিও। তাদের পাশে থেকো, তাদেরকে সহযোগিতা করো। কারণ তারাও তোমাদের মতই একজন। যেন কোনভাবেই তারা অবহেলার শিকার না হয়। তিনি ছোটবেলার শিক্ষা ‘কানাকে কানা, খোঁড়াকে খোঁড়া বলিও না’র প্রসঙ্গও এ সময় উল্ল্যেখ করে বলেন, আসলে এটা করা নিষ্ঠুরতা, এটা বলা অমানবিকতা। আমাদের শিশুরা নিশ্চই তা করবে না। বক্তৃতা পর্ব শেষে প্রধানমন্ত্রী সংগঠনের শিশু-কিশোরদের পরিবেশনায় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও উপভোগ করেন।

যুবলীগের নেতৃত্ব নিয়ে নানা আলোচনা by কাজী সোহাগ

ক্যালেন্ডারের পাতায় আর মাত্র ৩৪ দিন। আগামী ২৩শে নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে কাউন্সিল। ওইদিন থেকেই নতুন নেতৃত্ব হাল ধরবে যুবলীগের। কেমন হবে আগামীর যুবলীগ, কারা আসছেন নেতৃত্বে? শুদ্ধি অভিযানের মতো বড় ধাক্কার পর কেমন হবে যুবলীগের কমিটি এ নিয়ে এখন সরব আলোচনা। দীর্ঘ ৭ বছর পর কমিটি নিয়ে এ আলোচনায় থাকছে নানা দিক। ২০১২ সালে সর্বশেষ যুবলীগের জাতীয় কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ক্যাসিনো কেলেংকারি, অনিয়ম, দুর্নীতি আর টেন্ডারবাজির অভিযোগে যুবলীগের ভাবমূর্তি শূণ্যের কোটায় বলে মনে করছেন খোদ যুবলীগের নেতা-কর্মীরাই। তাদের মতে এখন সময় এসেছে নেতৃত্ব বদলের।
সংগঠন গোছানোর। আমূল পরিবর্তন ছাড়া যুবলীগের অতীত উজ্জল ভাবমূর্তি ফিরবে না বলে তাদের ধারণা। যুবলীগের চেয়ারম্যানসহ শীর্ষ কয়েক নেতার বিতর্কিত কর্মকান্ডে হতাশ ও আশাহত তৃণমুল যুবলীগের নেতা-কর্মীরা। তাই শীর্ষ নেতৃত্বেই আমূল পরিবর্তন চান তারা। ক্লিন ইমেজ আর যুবকদের হাতেই যুবলীগকে ছেড়ে দেয়া হবে বলে তাদের বিশ্বাস।
এজন্য আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার দিকে চেয়ে আছেন তারা। নেতা-কর্মীরা জানিয়েছেন, যুবলীগের ভাবমূর্তি উদ্ধার করতে শেখ হাসিনাই যথেষ্ট। তিনি সঠিক নেতৃত্ব নির্বাচন করবেন বলে আমরা মনে করি। এদিকে রোববার বিকেলে কাউন্সিলের দিক-নির্দেশনা নিতে গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করবেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশিদের নেতৃত্বে প্রেসিডিয়ামের সদস্যরা। বৈঠকে যাবেন না সংগঠনটির চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী। কাউন্সিলের আগে বৈঠকটিকে বিশেষ গুরুত্বপুর্ন বলে মনে করছেন সংগঠনটির নেতা-কর্মীরা। বৈঠক থেকে নেতৃত্ব নিয়ে একটা বার্তা পাবেন বলে তাদের ধারণা। ক্লিন ইমেজের পাশাপাশি মূল নেতৃত্ব যুবকদের হাতে দেয়ার দাবি জানিয়েছেন তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা। প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে ৪০ বছর বয়সীরা যুবলীগের নেতৃত্ব দিতে পারবেন এমন বিধান ছিল গঠনতন্ত্রে। কিন্তু ১৯৭৮ সালের দ্বিতীয় কংগ্রেসের পর এই বিধানটি বিলুপ্ত করা হয়। ৬ষ্ঠ জাতীয় কংগ্রেসে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন ৬৪ বছর বয়সী ওমর ফারুক চৌধুরী, বর্তমানে তার বয়স ৭১। এছাড়াও সংগঠনটির সিনিয়র নেতাদের বেশীর ভাগেরই বয়স ৬০ পার হয়েছে। এই অবস্থান যুবনেতাদের বয়স কত হবে তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
এদিকে যুবলীগের পদ প্রত্যাশীরা এরইমধ্যে নীরবে তাদের তৎপরতা শুরু করেছেন। দিনের বেলায় আওয়ামী লীগের বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের অফিস থেকে তারা ছুটছেন ধানমন্ডির কার্যালয়ে। আর রাতে ছুটছেন নেতাদের বাসায় বাসায়। দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার কাছে নিজেদের নামটা পৌঁছে দেয়া তাদের লক্ষ্য। আবার অনেকে চেষ্টা করছেন প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠানে সামনের সারিতে থাকার। আবার কোন কোন নেতা এরইমধ্যে বিভিন্ন গণমাধ্যমে দৌঁড়ঝাপ শুরু করেছেন। পাঁচ তারকা হোটেলসহ রাজধানীর বিভিন্ন অভিজাত ক্লাবে শুভাকাঙ্খীদের নিয়ে পার্টি দিচ্ছেন। যুবলীগের কমিটি নিয়ে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের বিভিন্ন স্তরের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে অনেকটা মিশ্র অভিপ্রায়ের কথা জানা গেছে। যুবলীগের সাবেক নেতাদের চাওয়া- তরুণ, যুববান্ধব ও সৎ নেতৃত্ব। আর বর্তমানরা চান, ছাত্র ও যুবরাজনীতির অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ কর্মিবান্ধব, গতিশীল ও সহজপ্রাপ্য কাউকে। দলের বেশিরভাগ নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বরাবরের চেয়ে এবার সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন হবে। তারা বলছেন, এবার সরাসরি নেতৃত্ব নির্বাচন করবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাই তিনি নিজেই বিভিন্ন মাধ্যমে সম্ভাব্য প্রার্থীদের সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিচ্ছেন। এবার সংগঠনে স্থান পাবেন পরিচ্ছন্ন ইমেজ, দক্ষ সংগঠক, ত্যাগী নেতারা। এ ছাড়া ছাত্রলীগের ব্যাকগ্রাউন্ড আছে এরকম দেখে নেতৃত্ব নির্বাচন করা হবে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের সম্পর্কে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ইতোমধ্যেই খোঁজ-খবর নেয়া শুরু করেছে। যুবলীগের চেয়ারম্যান ও সাধারণ সম্পাদক পদে অনেকেই আলোচনায় আছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য শেখ ফজলে নুর তাপস, শেখ মারুফ, বতর্মান কমিটির ১ নং সদস্য ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরে আলম চৌধুরী লিটন ও শেখ ফজলে ফাহিম, যিনি এফবিসিসিআইয়ের বর্তমান প্রেসিডেন্ট। এছাড়াও আছেন শহীদ সেরনিয়াবাত, ফারুক হোসেন, মুজিবুর রহমান চৌধুরী, আতাউর রহমান, অ্যাডভোকেট বেলাল হোসেন, শেখ রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি।
এদিকে সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় আছেন, মহিউদ্দিন আহমেদ মহি, মাহবুবুর রহমান হিরন, সুব্রত পাল, আবুল বাশার, ফারুক হাসান তুহিন, মাইনুল হোসেন খান নিখিল প্রমুখ। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনের সম্মেলনের জন্য মুখিয়ে থাকেন সহস্রাধিক সাবেক ছাত্রনেতা। সাবেক ছাত্রলীগ নেতাদের মধ্যে এবার আলোচনায় আছেন- ইসাহাক আলী খান পান্না, বাহাদুর বেপারি, লিয়াকত শিকদার, মাহমুদ হাসান রিপন, মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটন। আওয়ামী লীগের এ সহযোগী সংগঠনের নেতা নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদ বলেন, এখানে কেউ প্রার্থী হন না। অনেকে আলোচনায় থাকার চেষ্টা করেন বা নেতাদের কাছে নিজেকে তুলে ধরেন। আর প্রতিষ্ঠার পর থেকে যুবলীগের কংগ্রেসে কখনো ভোট হয়নি। স্বভাবত, কংগ্রেসের দ্বিতীয় অধিবেশনে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা নতুন নেতাদের নাম ঘোষণা করেন। দলীয় সূত্র বলছে, ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নতুন নেতৃত্ব খুঁজছেন। অনেক নেতার প্রোফাইল তার হাতে।
তিনি বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে তথ্য অনুসন্ধান করছেন। এর মধ্য থেকে বাছাই করে স্বচ্ছ ইমেজের ও সাংগঠনিক দক্ষতা সম্পন্ন দুইজনকে এ বৃহৎ সংগঠনের দায়িত্ব দেয়া হবে। যুবলীগের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ইতিপূর্বে প্রতিটি কংগ্রেসেই যুবলীগের ভেতর থেকেই সংগঠনের চেয়ারম্যান ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন। তবে এবার ব্যতিক্রম হতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে। কারণ হিসেবে সংগঠনের নেতারা বলছেন, যুবলীগের চেয়ারম্যান, সাধারণ সম্পাদক ও প্রেসিডিয়াম সদস্যদের বেশির ভাগই ষাটোর্ধ্ব। যুবলীগের মোট প্রেসিডিয়ামের পদ ২৭।
পদাধিকারবলে চেয়ারম্যান এবং সাধারণ সম্পাদক প্রেসিডিয়াম সদস্য হওয়ায় মোট ২৯ জন। এর মধ্যে একজন মারা গেছেন। ২৮ জন প্রেসিডিয়াম সদস্যদের মধ্যে মাত্র পাঁচজনের বয়স ৬০ বছরের নিচে। বাকি ২৩ জনের বয়সই ষাটের বেশি। পাঁচজন যুগ্ম সম্পাদকের প্রত্যেকের বয়সই ৫৫ বছরের অধিক। নয় সাংগঠনিক সম্পাদকের মধ্যে শুধু একজনের বয়স ৫০-এর কম। বাকি আটজনের বয়সই পঞ্চাশোর্ধ্ব। সম্পাদকমন্ডলীর ৬০ জনের মধ্যে ৪৫ জনই পঞ্চাশোর্ধ্ব। সহসম্পাদক ২০ জনের মধ্যে ১৫ জনেরই বয়স ৫০-এর বেশি। সদস্য ২৬ জনের মধ্যে ১৫ জন ৫০ পার করেছেন। তবে এবার বয়সের এই বিষয়টিকে অধিক গুরুত্ব দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তাই তৃনমূল যুবলীগের নেতা-কর্মীরা মনে করছেন, অপেক্ষাকৃত যুবকদের হাতেই এবার দেয়া হবে নেতৃত্বের ভার।

আন্তর্জাতিক সহায়তা নেই: নিজেই বিশাল আকারের ২০০ জাহাজ তৈরি করবে ইরান

ইরানে তৈরি করা হচ্ছে জাহাজ
ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান ৩০ কোটি ইউরো ব্যয়ে বিশাল আকারের ২০০টি কার্গো জাহাজ তৈরি করার পরিকল্পনা নিয়েছে। যখন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে আন্তর্জাতিক কোনো কোম্পানি জাহাজ তৈরি ও মেরামতের ব্যাপারে ইরানকে কোন রকমের সাহায্য করছে না তখন দেশটির সরকার নিজেই বিশাল এই কর্মযজ্ঞের পরিকল্পনা নিল।

ইরানের শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী রেজা রাহমানি গত বৃহস্পতিবার বলেন, "আমরা ২০০ কার্গো জাহাজ তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছি এবং আমাদের সমুদ্র শিল্প উন্নয়নের অংশ হিসেবে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হবে।" তিনি জানান, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ইরান ৩০ কোটি ইউরো বিনিয়োগ করবে।

ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় বুশেহর শহরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপের সময় রেজা রাহমানি আরো বলেন, গত বছর যখন আমেরিকা ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে তখন থেকে দেশের দক্ষিণ, পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলের বন্দরগুলোতে জাহাজ নির্মাণের ব্যাপারে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ চলছে। তিনি বলেন, “আমাদের কোনো জাহাজ এবং কার্গো এখন আর মেরামতের জন্য বিদেশের ডকইয়ার্ডে যাচ্ছে না।”

তিনি জানান, ২০১৯ সালের মার্চ মাস থেকে এ পর্যন্ত ইরানের শিপইয়ার্ডগুলোতে একশরও বেশি জাহাজের মেরামত ও সংস্কার কাজ সম্পন্ন হয়েছে।

মন্ত্রী রেজা রহমানি আরো জানান, ইরানের সরকার জাহাজনির্মাণ শিল্পের ব্যাপারে যে বিশাল পরিকল্পনা নিয়েছে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে গেলে এ খাতে অন্তত ৬০ হাজার নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। এর পাশাপাশি আরো এক লাখ মানুষ জাহাজ নির্মাণশিল্পের সাপ্লাই চেইনে যুক্ত হবে।

৮৮ পাউন্ডের লুলুলেমন, নির্মাতারা নির্যাতিত by সারা মার্শ ও রেদোয়ান আহমেদ

লুলুলেমন একটি পোশাকের ব্রান্ড নাম। মেয়েদের পোশাক লেগিন্স বিক্রি করে তারা । যারা ইয়োগা করেন, তারা লেগিন্স পরেন। সেলিব্রিটিদের টপ ফেভারিট। যেসব সেলিব্রিটি ইনস্টাগ্রামে ঝড় তোলেন তাদের গায়ে এই জমকালো লেগিন্স দেখা যায়। ৮৮ পাউন্ড দাম।
কিন্তু তাদের এই পোশাক কোত্থেকে আসছে, তার অনুসন্ধানে দেখা গেছে , এই পোশাক তৈরি করেছেন যারা, তারা বাংলাদেশী কারখানায় কর্মরত নারী । যারা প্রায় নিয়মিতভাবে কারখানাগুলাতে প্রহৃত এবং শারীরিকভাবে নির্যাতিত হন ।
জাতিসংঘ ফাউন্ডেশনের সঙ্গে সম্প্রতি কানাডিয় কোম্পানি লুলুলেমনের একটি অংশীদারিত্ব চুক্তি সই হয়েছে।
যার লক্ষ্য হচ্ছে নারী সাহায্য কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন করা । তাদের উপর মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করা।
কিন্তু বাংলাদেশের কারখানায় কর্মরত মেয়ে কর্মীরা মজুরি বঞ্চনার এক দুঃখজনক উপাখ্যান তুলে ধরেছেন । তারা কম বেতন পান। শারীরিক সহিংসতার শিকার হন। আর তাদের যারা ম্যানেজার, তারা সবসময়ই তাদেরকে অবজ্ঞার চোখে দেখেন। এমনকি হরহামেশা তাদেরকে বেশ্যা বলতেও তাদের বাধে না।
শ্রমিকরা যেসব অভিযোগ করেন:
কারখানা শ্রমিকরা যদি কখনো কোনো নিয়ম ভাঙ্গেন, অথবা প্রত্যাশিত সময়ের কাজ করার চেয়ে যদি আগে কর্মস্থল ত্যাগ করেন, তাহলে ম্যানেজাররা তাদেরকে বকাঝকা করেন। এমনকি চড়-থাপ্পড় দিতেও ছাড়েন না । অনেক শ্রমিক বলেছেন, ভগ্নস্বাস্থ্য নিয়েও তাদেরকে অনেক সময় কাজ করতে বাধ্য করা হয়।
অনেক শ্রমিককে মাসে মাত্র ৮৫ পাউন্ড বা ৯১০০ টাকা পরিশোধ করা হয় । এটা হল একজোড়া লেগিন্সের চেয়ে কম। কারণ একজোড়া লেগিন্স কিনতে খরচ পড়ে ১৩৮ দশমিক ৫০ পাউন্ড। ইউনিয়নগুলো নূণ্যতম মজুরি হিসেবে দাবি করে ১৬ হাজার টাকা। সেই দাবি করা টাকা থেকেও এটা যথেষ্ট কম। আর তাদের ন্যায্য মজুরি হিসেবে যা অনুমান করা হয়, সেই হার থেকে ঢের কম।
তাদেরকে ওভারটাইম করতে বাধ্য করা হয়, যাতে তারা টার্গেট পূরণ করতে পারে । এমনকি অনেক সময় উৎপাদনের টার্গেট পূরণ করা না পর্যন্ত তারা কেউ অসুস্থ হলেও কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকতে পারে না।
লুলুলেমন অবশ্য বলেছে, কর্মস্থলে কি ধরনের আচরণ করা হবে, সেই বিষয়ে প্রণীত কোড অনুসরণে তারা অত্যন্ত সতর্ক থাকেন এবং এর কোনো লংঘন তারা সহ্য করেন না । কোম্পানিটি বলেছে, বাংলাদেশে যে এই অভিযোগ উঠেছে, সে বিষয়ে তারা অনতিবিলম্বে তদন্ত শুরু করবে। একজন মুখপাত্র বলেছেন, অভিযুক্ত ফ্যাক্টরির জন্য বর্তমানে কোন ক্রয় ফরমায়েশ দেওয়া নেই। এবং আমরা তদন্তের ভিত্তিতে উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করব।
জাতিসংঘ ফাউন্ডেশনের একজন মুখপাত্র বলেছেন, আমরা বিশ্বাস করি সব শ্রমিকদেরকেই সমানভাবে এবং ন্যায্যতার সঙ্গে ব্যবহার করা হবে। এবং আমরা বাংলাদেশে লুলুলেমনের তদন্তের উদ্যোগকে স্বাগত জানাই।
ওই কারখানার একজন শ্রমিক দাবি করেছেন, একটু আগে কাজ শেষে বাড়ি ফেরার জন্য তাকে থাপ্পড় মারা হয়েছিল । কারণ তার শরীর খারাপ লাগার কারণে সে আগে যেতে চেয়েছে। ওই নারী কর্মী বলেন, আমি আসলে অসুস্থ ছিলাম । একদিন আমি বিকেল পাঁচটায় কর্মস্থল ত্যাগ করি। কিন্তু আমি সেটা লাইন সুপারভাইজারকে জানিয়ে যাই । কিন্তু সে তার বসকে বলেছিল, আমি কাউকে কিছু না বলে কর্মস্থল ত্যাগ করেছি । পরের দিন আমি যখন কাজে যাই, আমার লাইন টেকনিশিয়ান আমাকে থাপ্পড় মেরেছিল । সেই থাপ্পর এতটাই জোরালো ছিল যে , আমার গাল লাল হয়ে যায় এবং প্রত্যেকে আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করেছে , কি ঘটেছে। আমি তাদের কাউকে বলিনি প্রকৃত কি ঘটেছে। আমি তাদের বলেছিলাম, আমার এলার্জি উঠেছে । ওই নারী শ্রমিক আরও দাবি করেছেন, তিনি এই বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে কোনো অভিযোগ করেননি । কারণ তিনি জানেন, এ বিষয়ে অভিযোগ করে কোন লাভ নেই ।
ওই নারী কর্মীটি আরো বলেছেন , গত রমজানে কারখানাটি একটি নতুন লাইন তৈরি করে । আর সেজন্য তারা নতুন মেয়েদেরকে নিয়োগ দিয়েছিল । একদিন একজন টেকনিশিয়ান একজন লেবেল অপারেটরকে বুকে যথেষ্ট জোরালোভাবে আঘাত করেছিল । আমরা দেখেছি সারাদিন সে কিভাবে ব্যথায় কুঁকড়ে থেকেছে । লাইনের পেছনে সে কয়েক ঘন্টা শুয়ে থাকে। কিন্তু তার বিষয়ে আমাদের বসরা কোন কিছুই করেননি।
গত ৮ অক্টোবর জাতিসংঘ ফাউন্ডেশন (ইউএনএফ) এর সঙ্গে একটি অংশীদারিত্বের চুক্তি করেছে লুলুলেমন । তারা বলেছে গত তিন বছর ধরে লেগিন্স কোম্পানি এবং ইউএনএফ একটি এভিডেন্স ভিত্তিক মাইন্ডফুলনেস ইয়োগা এবং সেলফ–কেয়ার প্রশিক্ষণ কারিকুলাম ডেভলপ করার চেষ্টা করছে ।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ আটটি দেশের পাচশ জনেরও বেশি সাহায্যকর্মীদের উপরে তারা এই বিষয়ে পাইলট টেস্টিং করেছে।
লুলুলেমন সম্প্রতি তাদের ব্যবসা ভবিষ্যতে আরও কত বড় হবে, তার একটা ধারণা দিয়েছে । এই কোম্পানিটি তাদের ব্যবসা ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০১৯ সালের শেষে ৩ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে পারবে। ১৯৯৮ সালে ক্যানাডিয়ান বিজনেসম্যান চিপ উইলসন লুলুলেমন শুরু করেছিলেন । সেই থেকে তারা এই ব্যবসা ক্রমাগতভাবে সম্প্রসারিত করে চলছে। কিন্তু তারা এই পোশাক কিনছেন এমন সব দেশ থেকে, যেখানে শ্রম সস্তা । আর এসব দেশের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা , কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনাম।
লুলুলেমন তার ওয়েবসাইটে বলেছে , আমাদের ভেন্ডর কোড অফ এথিক্স বাংলাদেশসহ যেখানেই পণ্য উৎপাদন হয়, সবার জন্য প্রযোজ্য এবং তা নিশ্চিত করছে যে আইনগত এবং সাংস্কৃতিক পার্থক্য নির্বিশেষে আমরা একটি অভিন্ন নীতি অনুসরণ করছি।
লুলুলেমন ২০১৩ সালে বাংলাদেশ সেফটি অ্যাকর্ড সই করতে মাসের-পর-মাস কাটানো নিয়ে সমালোচিত হয়েছিল । ১১৩৬ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছিল রানা প্লাজা দুর্ঘটনায়। আর তার পরপরই ওই সেফটি চুক্তিতে তাকে সই করতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল । তখন একটা পিটিশন প্রকাশ করা হয়েছিল যাতে তারা তাদের ইথিকস এবং দায়িত্বশীলতার বিষয়ে সজাগ থাকে।
দি গার্ডিয়ান একজন পুরুষ শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলেছে । ওই শ্রমিকটি দাবি করেছে, তিনি প্রত্যক্ষদর্শী যে, নারী শ্রমিকদেরকে সাধারনত ’’’প্রস্টিটিউট এবং হোর, স্লাট’’ হিসেবে ডাকা হয়ে থাকে । তার আরও অভিযোগ, পুরুষ কর্মীদেরকেও অবজ্ঞার চোখে দেখে থাকে তারা। অনেক সময় তারা পুরুষ কর্মীদেরকে উপহাস করে । তার কথায়, আমি নিজে কখনো মার খাইনি কিন্তু অন্যদেরকে প্রহৃত হতে দেখেছি।
শ্রমিকরা আরও অভিযোগ করেছেন যে, তারা যখন কর্মক্ষেত্রে কিছুটা অসুস্থ বোধ করেন, তখন তারা চাইলেই কর্মস্থল ত্যাগ করতে পারেন না । মেডিকেল টিম একটি মেয়েকে তার জন্ডিস হওয়ার কারণে তাকে কর্মবিরতির সুবিধা দেয়। তাকে বিশ্রামের পরামর্শ দিয়েছিল। কিন্তু তার প্রোডাকশন ম্যানেজার তাকে জানিয়ে দিয়েছে , তাকে অবশ্যই কাজ অব্যাহত রাখতে হবে। শ্রমিকরা আরও দাবি করেছে, তারা অনেক সময় দেখতে পায় যে , তারা ইচ্ছে করে কম কর্মী নিয়োগ করে। তাদের উপরে তখন কাজের চাপ অনেক বাড়িয়ে দেয়া হয়। তাদের প্রতি নির্দেশনা থাকে , তাদেরকে অবশ্যই টার্গেট পূরণ করতে হবে । একজন শ্রমিকের কথায়- সুতরাং শ্রমিকদের কোন উপায় থাকে না । তাদেরকে বাড়তি কাজ করতে হয়। তারা খাবার সময় পায়না। বিশ্রাম পায় না । যা খুবই খারাপ।
টুমো পুটিয়ানিন বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক লেবার অর্গানাইজেশন (আইএলওর) কান্ট্রি ডিরেক্টর। তিনি বলেছেন, যেকোনো ধরনের বাংলাদেশ গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ এবং সেটা মোকাবেলায় সক্রিয় পদক্ষেপ নেয়া বাঞ্ছনীয়।
লেবার বাহাইন্ড দ্যা লেভেল’’ একটি ক্যাম্পেইন গ্রুপ। এই সংগঠনের এ্যাডভোকেসি পরিচালক আন্না ব্রেহার। তার কথায়, একটি সাপ্লাই চেইনের একেবারে তলানিতে থাকা নারীদেরকে যেভাবে ফ্যাশন তৈরীর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়, তাদের শ্রম শুষে নেওয়া হয়, সেটা আসলেই একেবারে একটা অবসিন( অশ্লীল) ঘটনা। তার কথায়, এইসব গল্প খুবই মর্মান্তিক এবং তা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় । বাংলাদেশের যেসব নারীরা আমাদের জন্য কাপড় তৈরি করে তারা রুটিনমাফিক পদ্ধতিগতভাবে হয়রানি ও নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন । তিনি আরো বলেছেন,
আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর যারা বাংলাদেশে শ্রমিকদের কে ব্যবহার করে সস্তায় কাপড় তৈরি করেন, তাদের কর্মক্ষেত্রে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, ৮০ ভাগ বাংলাদেশি শ্রমিক বলেছেন তারা কর্ম ক্ষেত্রে কোন না কোন ভাবে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন।
লুলুলেমন কোম্পানির একজন মুখপাত্র বলেছেন, আমরা একটি দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান এবং এথিকসের প্রয়োজনে আমরা সজাগ। আমরা যেখান থেকেই আউটসোর্সিং করি না কেন, এথিক্স আমরা সমুন্নত রাখব। এটাই আমাদের বৈশ্বিক অবস্থান এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল খাতে সব থেকে শ্রেষ্ঠ মূল্যবোধ আমরা মেনে চলি। আমরা কখনোই এই কোডের ভায়োলেশন সহ্য করি না । বাংলাদেশে একটি কারখানা সম্পর্কে এ ধরনের রিপোর্ট জানতে পেরেই আমরা তদন্ত শুরু করেছি । বর্তমানে আমরা ওই কারখানাকে আর কোন ধরনের অর্ডার দেইনি । এবং তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে আমরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।
এদিকে ইয়ংগাল কর্পোরেশন বলেছে, তারা কর্মক্ষেত্রে সুষ্ঠু পরিবেশ এবং সব ধরনের ন্যায্য আচার-আচরণ বজায় রাখার ক্ষেত্রে অঙ্গীকারবদ্ধ । বিভিন্ন চ্যানেলের মাধ্যমে কর্মীদেরকে তারা তাদের মতামত এবং তাদের অভিযোগ খতিয়ে দেখার বিষয়টি উৎসাহিত করে থাকে । কোম্পানিটি আরো বলেছে ,যখন কারো কাছ থেকে কোনো অভিযোগ পাওয়া যায় , তারা তা প্রতিকারের উদ্যোগ নেন এবং শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকেন । যে অভিযোগ উঠেছে সে বিষয়ে একটি অভ্যন্তরীণ তদন্তের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
>>>দি গার্ডিয়ানে ১৪ অক্টোবরে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তর্জমা

ভারতের সব রাজ্যে ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরি হচ্ছে

সারা দেশে এনআরসি চালু করার ইঙ্গিত দিয়ে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ রাজ্যে রাজ্যে ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরির কাজ এগিয়ে রাখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার নিউজ১৮-র সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে অমিত শাহ বলেন, দেশের নানা প্রান্তে ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরি করা হচ্ছে।  কারণ, সরকার গোটা দেশে এনআরসি চালু করার জন্য ‘আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছে। সাক্ষাৎকারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে নাগরিকত্ব খারিজ করার প্রক্রিয়াটা সম্পন্ন করার দায়িত্ব ফরেনারস ট্রাইব্যুনালের। কিন্তু তার পরের পর্বটার জন্য প্রস্তুতি প্রক্রিয়াটা সবে শুরু হয়েছে। আসামে এনআরসির চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হওয়ার আগেই অনেকের নাগরিকত্বকে ‘সন্দেহজনক’ আখ্যা দিয়ে তাদের ‘ডি-ভোটার’ করে দেয়া হয়েছিল। অনেককেই পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল ডিটেনশন ক্যাম্পে। আসামে বিভিন্ন জেলায় জেলের মধ্যেই ৬টি ডিটেনশন সেন্টার চালু করে প্রায় হাজার খানেক মানুষকে আটকে রাখা হয়েছে। এ বার গোয়ালপাড়ায় প্রায় তিনহাজার বিদেশিকে রাখার জন্য আলাদা জমি চিহ্নিত করে সেখানে ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরি শুরু হয়েছে।
এদিকে, বিজেপি শাসিত কর্নাটক এবং মহারাষ্ট্রেও তৈরি হচ্ছে ডিটেনশন ক্যাম্প। কর্নাটকে ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরি হচ্ছে বেঙ্গালুরু থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে সোন্ডেকোপ্পায়।
সে রাজ্যের প্রশাসন যদিও ওই পরিকাঠামোর বিষয়ে বলার সময়ে ‘ডিটেনশন ক্যাম্প’ শব্দটি ব্যবহার করছে না। বলা হচ্ছে ‘গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র’ (মুভমেন্ট রেস্ট্রিকশন সেন্টার)। আর মহারাষ্ট্রের নভি মুম্বইতে যে ডিটেনশন সেন্টার তৈরির কাজ শুরু হয়েছে, সে বিষয়ে রাজ্য প্রশাসন সতর্কতার সঙ্গে জানিয়েছে, বেআইনি পাসপোর্ট মামলায় অভিযুক্তদের ওখানে রাখা হবে। অমিত শাহ বুঝিয়ে দিয়েছেন, এনআরসি নিয়ে পিছু হঠার কথা একেবারেই ভাবছে না কেন্দ্রীয় সরকার। উল্লেখ্য, গত জুলাই মাসেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক ভারতের সবকটি রাজ্যকে এক নির্দেশিকা পাঠিয়ে সব রাজ্যের জেলায় একটি করে ডিটেনশন ক্যাস্প তৈরি করতে বলেছে। এদিকে, আসামে ডিটেনশন ক্যাম্পে মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে আসামের বাঙালিরা ফের সোচ্চার হয়েছেন। আসামের তেজপুর, গোয়ালপাড়া, শিলচর, ডিব্রুগড়, কোকড়াঝাড় ও জোরহাট জেলায় জেলের মধ্যে ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরি করে বন্দিদের রাখা হয়েছে। গত ২০১১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ডিটেনশন ক্যাম্পে ২৬ জন বিদেশি চিহ্নিত ব্যক্তি মারা গিয়েছেন। এর মধ্যে তেজপুর ও গোয়ালপাড়ার ডিটেনশন ক্যাম্পে ১০ জন করে বন্দি মারা গেছে। শিলচর ডিটেনশন ক্যাম্পে ৩ জন, কোকড়াঝাড়ে ২ জন এবং জোরহাটে ১ জন মারা গেছে। তবে ডিব্রুগড় ডিটেনশন ক্যাম্পে  এখন পর্যন্ত কেউ মারা যায়নি। এই মৃতের তালিকায় আছে ১২ জন হিন্দু ও ১৩ জন মুসলিম। মৃত অপর ব্যক্তি অন্য সমপ্রদায়ের।
ডিটেনশন ক্যাম্পগুলোতে না খেয়ে ও কারারক্ষীদের জুলুমের শিকার হয়ে বন্দিদের মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। সর্বশেষ মৃত্যুটি ঘটেছে গত রোববার। তেজপুর ডিটেনশন ক্যাম্পে আটক থাকা দুলাল চন্দ্র পাল (৬৪) নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। তার বাড়ি আসামের ঢেকিয়াজুলির আলিসিঙ্গা গ্রামে। তবে তার পরিবারের লোকজন মৃতদেহ নিতে অস্বীকার করেছেন। মৃতের পুত্র আশীষ পালের দাবি, যতক্ষণ পর্যন্ত তার বাবাকে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে ঘোষণা করা হবে না ততক্ষণ পর্যন্ত তারা মৃতদেহ নেবেন না। বাবা যদি বাংলাদেশিই হন তবে তাকে সে দেশেই পাঠিয়ে দিক সরকার। বন্দি শিবিরে মৃত্যুর ঘটনায় আসামের মুখ্যমন্ত্রী সদানন্দ সনোয়ালের বিরুদ্ধে খুনের মামলা করা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন আসামের মানবাধিকার সংগঠন ‘আমরা বাঙালি’ এবং নাগরিক অধিকার রক্ষা কমিটির সচিব সাধন পুরকায়স্থ। তিনি বলেছেন, রাজ্য সরকার সাধারণ মানুষকে ‘বিদেশি’ বানিয়ে হত্যা করছে। তিনি জানান, এই মৃতের তালিকায় ৪৫ দিনের শিশু থেকে ৮৬ বছরের প্রবীণ ব্যক্তিরা রয়েছেন। আসামের আমরা বাঙালি, নাগরিক অধিকার রক্ষা কমিটি, সারা ভারত বাঙালি যুব ছাত্র ফেডারেশনসহ বিভিন্ন সামাজিক ও মানবাধিকার সংস্থা দুলাল পালকে ভারতের নাগরিকত্ব দিয়ে তার দেহের শেষকৃত্য করার দাবি জানিয়েছে। এই দাবিতে গতকাল থেকে দুলাল পালের গ্রাম ঢেকিয়াজুলির আলিসিঙ্গায় শুরু হয়েছে প্রতিবাদ অবস্থান কর্মসূচি।

শেয়ারবাজার টালমাটাল: বিনিয়োগকারীদের কান্না

টালমাটাল দেশের শেয়ারবাজার। অব্যাহত দর পতনে বিনিয়োগকারীদের কান্নায় ভারী হচ্ছে বাতাস। লাখ লাখ বিনিয়োগকারী পুঁজি হারিয়ে পথে বসার উপক্রম। দিন দিন পতন আরো গভীর থেকে গভীর হচ্ছে। প্রায় সব কোম্পানি ক্রমাগত দর হারাচ্ছে। ফলে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই)  প্রধান সূচক প্রায় তিন বছর আগের অবস্থানে ফিরে গেছে। একই সঙ্গে বাজার মূলধন, লেনদেনও তলানিতে নেমে যাচ্ছে। বাজারের স্থিতিশীলতা ফেরাতে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা-বিএসইসির চেয়ারম্যান খায়রুল হোসেনের আশ্বাস এবং তারল্য সংকট কাটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগেও কোন কাজ হচ্ছে না।
সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসেও মূল্য সূচকের পতনেই লেনদেন শেষ হয়েছে পুঁজিবাজারে। এদিন ডিএসইতে লেনদেন কমেছে। অপর বাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সূচক কমলেও লেনদেন বেড়েছে।
বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, বাজারের বর্তমান অবস্থা ১৯৯৬ এবং ২০১০ সালের ধ্বসকেও হার মানিয়েছে। ওই দুই সময়ের ধ্বসে বড় ধরনের সংস্কার এবং প্রণোদনা দেয়া হয়। কিন্তু বর্তমানে পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের দেখার কেউ নেই। এ অবস্থায় পুঁজি হারানো বিনিয়োগকারীরা কাউকে কিছু বলতে পারছেন না। ফলে নীরব কান্না চলছে শেয়ারবাজারে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। কোনো বিনিয়োগকারীই পুঁজি নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারছেন না। নতুন করে বিনিয়োগ তো আসছেই না, উল্টো অনেকে বড় লোকসান দিয়ে সমুদয় শেয়ার বিক্রি করছেন। যাদের লোকসান মাত্রাতিরিক্ত, তারাই লোকসান কমানোর আশায় এক শেয়ার বিক্রি করে অন্য শেয়ার কিনছেন। কিন্তু লোকসান তো কমছেই না, বরং পাল্লা বাড়ছে। ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, ডিএসই প্রধান সূচক প্রায় ৯ মাসে কমেছে ১ হাজার ২০০ পয়েন্ট। একই সময়ের ব্যবধানে বাজার মূলধন বা শেয়ারের বাজারমূল্য কমেছে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা। কারণ বাজারের ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা নেই। সূচক যেমন তলানিতে, আস্থাও তলানিতে।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, অতিমূল্যায়িত আইপিও পুঁজিবাজারকে অস্থির করে তুলেছে। অন্যদিকে নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করছে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা। পাশাপাশি স্টক এক্সচেঞ্জ, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে বাজার প্রাণহীন হয়ে পড়েছে।
জানা গেছে, ডিএসইর প্রধান সূচকটি চলতি বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে ছিল গত ২৪শে জানুয়ারি। ওই দিন সূচক ছিল ৫ হাজার ৯৫০ পয়েন্টে ও বাজার মূলধন ছিল প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। গতকাল সেই সূচক নেমে এসেছে ৪ হাজার ৭৭০ পয়েন্টে আর বাজার মূলধন কমে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৫৯ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ৯ মাসে সূচক কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ আর বাজার মূলধন কমেছে ১৪ শতাংশের বেশি। এছাড়া শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ৩১৯ কোম্পানির মধ্যে ৪৬টি বা প্রায় সাড়ে ১৪ শতাংশ কোম্পানির শেয়ারের দাম এখন ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের নিচে নেমে এসেছে। এসব কোম্পানির বেশির ভাগই বর্তমান নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন নিয়ে বাজারে এসেছে। অনুমোদন দেয়া নিয়েও আছে নানা প্রশ্ন।
ডিএসই ব্রোকার্স এসোসিয়েশনের (ডিবিএ) সভাপতি শাকিল রিজভী বলেছেন, তারল্য সংকট, আর্থিক খাতের খারাপ অবস্থা এবং গ্রামীণফোনের সমস্যার সমাধান না হওয়ার কারণে পুঁজিবাজারে অব্যাহত দরপতন হচ্ছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে যে তারল্য সংকট আছে সেটা রয়ে গেছে। ব্যাংকের সুদের হার এখনও বেশি। এটার নেতিবাচক প্রভাব পুঁজিবাজারে আছে। গ্রামীণফোন পুঁজিবাজারের প্রায় ১০ শতাংশর মত। এটার সঙ্গে কর নিয়ে যে একটি সমস্যা সেটার সমাধান হয়নি। এর বড় প্রভাব ফেলছে বাজারে। শাকিল রিজভী মনে করেন, বাজারে এখন আস্থার সংকটই সবচেয়ে বড় সমস্যা। আর এই তিন সমস্যা দূর না হলে বাজারে আস্থা ফিরবে না। বিনিয়োগকারীরা বাজারমুখি হবেন না। বাজার স্বাভাবিক হবে না।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলামও শাকিল রিজভীর সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, ব্যাংকিং খাত ঠিক না হলে শেয়ার বাজার ঠিক হবে না। দেশের অর্থনীতির স্বার্থে ব্যাংকিং খাতের সুশাসন ফিরিয়ে আনতে সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বৃহস্পতিবার ডিএসই প্রধান বা ডিএসইএক্স সূচক ১০ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ৪ হাজার ৭৭০ পয়েন্টে। গত সোমবার ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) বিনিয়োগের ঘোষণার পর মঙ্গলবার বড় উত্থান হলেও বুধবার আবার পতনে ফিরেছে শেয়ারবাজার। অন্য সূচকগুলোর মধ্যে ডিএসইএস বা শরিয়াহ সূচক ৫ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ১ হাজার ৯৪ পয়েন্টে এবং ডিএস ৩০ সূচক ৬ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৭৯ পয়েন্টে। ডিএসইতে গতকাল টাকার পরিমাণে লেনদেন হয়েছে ৩১৩ কোটি টাকার। যা গত কার্যদিবস থেকে ১১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা কম। এর আগের দিন লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৩২৪ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। গতকাল ডিএসইতে ৩৫০টি কোম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের শেয়ার লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে দর বেড়েছে ১৪৫টির, কমেছে ১৬২টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ৪৩টির।
অপরদিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৪৩ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ১৪ হাজার ৫১১ পয়েন্টে। সিএসইতে টাকার অংকে ১৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। এ সময়ে সিএসইতে লেনদেনে অংশ নিয়েছে ২৫৫টি কোম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ড। এর মধ্যে দর বেড়েছে ১০২ টির, কমেছে ১২৪টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ২৯টির।
বাজারের এমন আচরণে হতাশ সাধারণ বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে শেয়ারবাজার-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরাও। সংশ্লিষ্টরা জানান, মঙ্গলবার গুঞ্জন ছিল শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির শীর্ষ পদে বড় রদবদল হচ্ছে। ওই দিন বিকালেই অবশ্য জানা যায়, এটি গুজব। বাজারের বিপরীতমুখী অবস্থার ক্ষেত্রে এ খবরের যোগসূত্র রয়েছে বলে অনেকেই মনে করছেন। এদিকে শেয়ারবাজার থেকে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যে পরিমাণ টাকার শেয়ার কিনছেন বিক্রি করে দিচ্ছেন তার চেয়ে বেশি।
সূত্র জানায়, শেয়ারবাজার পরিস্থিতি নিয়ে গত ১৬ই সেপ্টেম্বর বৈঠক করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছিলেন, এখানে আশ্বস্ত করব সবাইকে যে, আমরা পুঁজিবাজারকে সুশাসন দেব এবং আমরা গর্ভন্যান্সে ভালো করব। এভাবে আমাদের পুঁজিবাজারকে আমরা একটি শক্তিশালী বাজারে রূপান্তরিত করব। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংক শেয়ারবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ বাড়াতে নগদ অর্থ জোগান দেয়ার উদ্যোগ নেয়। এর বাইরে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের জন্য রাষ্ট্রমালিকানাধীন সোনালী ব্যাংক ২০০ কোটি টাকা দিয়েছে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ বা আইসিবিকে। আইসিবি ওই টাকা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ শুরু করেছে বলে জানা গেছে।
সর্বশেষ ‘বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ’ অনুষ্ঠানে বিএসইসির চেয়ারম্যান খায়রুল হোসেন বলেছিলেন, সরকারি লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলো খুব শিগগিরই পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হবে। কিছু ভালো লাভজনক প্রতিষ্ঠান দু-এক মাসের মধ্যেই বাজারে আসবে। এরপরও বাজারে পতন চলছেই। অর্থাৎ আস্থার সংকটে কোনো উদ্যোগই কাজে আসছে না।
বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা সৃষ্টি করাই এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান কাজ।
অন্যদিকে শেয়ারবাজারে লেনদেন কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন খোদ স্টক ব্রোকার মালিকরা। তাদের ব্যবসা সংকোচনের নামে কর্মী ছাঁটাই শুরু করেছেন।
একজন ব্রোকার মালিক জানান, ২০১০ সালের পর দীর্ঘ সময়ে লোকসান দিয়ে হাউস পরিচালনা করেছেন। এর পর কোম্পানির রিজার্ভ থেকে কর্মকর্তাদের বেতন পরিশোধ করেছেন। এখন রিজার্ভের খাতা শূন্যের কোঠায় নামছে। ফলে বাধ্য হয়েই কর্মী ছাঁটাইয়ে যেতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।
শাকিল রিজভী বলেন, পরিস্থিতি ভালো না। প্রতিদিনই লোকসান দিতে দিতে বিনিয়োগকারীদের পোর্টফোলিও এতটাই কমেছে যে, তারা এর দিকে ফিরে তাকাতেও বিরক্ত বোধ করছেন। অনেক ব্রোকারেজ হাউস বন্ধ হওয়ার উপক্রম। কারণ শেয়ার কেনাবেচা থেকে যে কমিশন আয় হচ্ছে, তা নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দেয়া তো দূরের কথা, দৈনন্দিন অফিস খরচই মেটাতে পারছে না। এভাবে কতদিন চলবে, তা কেউ বলতে পারছেন না।
এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারী সোহেল হাসান বলেন, কয়েক মাস আগে একটি কোম্পানির শেয়ার ৬ টাকা ৭০ পয়সায় কিনেছিলেন। এখন সেই শেয়ারের মূল্য কমে ৪ টাকা ৫০ পয়সায় নেমেছে। আলোচ্য সময়ে তিনি পুঁজি খুইয়েছেন ৩৩ শতাংশ। তিনি বলেন, কোম্পানিটির শেয়ারের মূল্য কমেছে যৌক্তিক কোনো কারণ ছাড়াই।
হাসিবুল হাসিব নামের আরেক বিনিয়োগকারী একটি ভালো কোম্পানির শেয়ার কিনেছিলেন ৭৭ টাকা করে। সর্বশেষ সেই শেয়ারের মূল্য কমে দাঁড়িয়েছে ৪৭ টাকায়। আলোচ্য সময়ে তিনি পুঁজি হারিয়েছেন ৩৯ শতাংশ। আরেক বিনিয়োগকারী আতিকুল ইসলাম জাহিন স্পিনিংয়ের প্রতিটি শেয়ার কিনেছিলেন ৯ টাকা ৬০ পয়সায়। এখন সেই শেয়ারের মূল্য দাঁড়িয়েছে ৫ টাকা ৫ পয়সা। আলোচ্য সময়ে তার পুঁজি হারিয়েছে ৪৩ শতাংশ। তিন মাসের ব্যবধানে তাদের বিনিয়োগ করা পুঁজি খুইয়েছেন। তবে শেয়ারের এই মূল্য কমে যাওয়ার কোনো কারণ কোম্পানি বা স্টক এক্সচেঞ্জের পক্ষ থেকে জানানো হয়নি।
বাজার সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অব্যাহত দরপতনে বেশিরভাগ বিনিয়োগকারীই এখন লোকসানে। লোকসান আরো বাড়বে এমন শঙ্কায় অনেক বিনিয়োগকারী শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছেন। এতে বিক্রির চাপ বেড়ে দরপতন ত্বরান্বিত হচ্ছে। বিক্রির চাপ বাড়লেও তা সামাল দেয়ার জন্য যে সহায়তা দরকার, তা বাজারে নেই।

হ্যালো ডক্টর এশিয়া’ স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে পেল ন্যাশনাল আইসিটি অ্যাওয়ার্ড

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে ন্যাশনাল আইসিটি অ্যাওয়ার্ড ২০১৯ পেয়েছে ‘হ্যালো ডক্টর এশিয়া’। রাজধানীর রেডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেনের গ্র্যান্ড বলরুমে ১০ই অক্টোবর আয়োজিত পুরষ্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। ২০১৭ সাল থেকে প্রতি বছর বেসিস জাতীয় পর্যায়ের এই অ্যাওয়ার্ড প্রদান করে আসছে।
‘সবার জন্য অনলাইন স্বাস্থ্যসেবা’ এ প্রত্যয় নিয়ে চলতি বছর এপ্রিল মাসে যাত্রা শুরু করেছে মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ‘হ্যালো ডক্টর এশিয়া’। স্বাস্থ্যখাতে প্রচলিত প্রায় সব অনলাইন সেবা মিলছে এ মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনে। রোগীরা খুব সহজেই চিকিৎসকদের সঙ্গে ভিডিও কনসালটেসন, চ্যাট কনসালটেসন এবং অনলাইনে প্রেসক্রিপশন ও স্বাস্থ্য তথ্যসমূহ আদান-প্রদান করতে পারছেন। বর্তমানে প্রায় ১২০ জন চিকিৎসক এই মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনে অনলাইন স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে যুক্ত আছেন এবং প্রতিদিনই নতুন নতুন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সেবা প্রদানে যুক্ত হচ্ছেন। আগামী ডিসেম্বর থেকে বিদেশের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা সেবা প্রদানে যুক্ত হবেন।
দেশের বাইরে চিকিৎসা নিতে যারা যাবেন তাদের জন্য ‘হ্যালো ডক্টর এশিয়া’ সম্প্রতি চালু করেছে ‘ইন্টারন্যাশনাল হেলথকেয়ার স্মার্ট কার্ড’।
ফলে মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনের ব্যবহারকারিরা এশিয়ার ১০ হাজারের বেশি বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট, এশিয়ার সেরা ১০০ এর বেশি হাসপাতাল থেকে ফ্রি ভিসা লেটার, নূন্যতম ৩টি বিশেষায়িত হাসপাতাল থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মতামত, বিশেষায়িত হাসপাতালের আনুমানিক স্বাস্থ্যসেবা খরচ সম্পর্কে তথ্য, এয়ারপোর্ট/রেল স্টেশন থেকে হোটেলে যাওয়ার জন্য ফ্রি ট্রান্সপোর্ট সার্ভিস ও সাশ্রয়ী মূল্যে হাসপাতালের কাছাকাছি থাকার ব্যবস্থা/হোটেল বুকিংয়ের সুযোগ পাবেন।
হ্যালো ডক্টর ডট এশিয়ার প্রতিষ্ঠাতা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ফোরকান হোসেন বলেন, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে ন্যাশনাল আইসিটি অ্যাওয়ার্ড ২০১৯ পাওয়ায় আমরা গর্বিত। আমাদের চলার পথে এই অ্যাওয়ার্ড অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। এ ছাড়াও ‘হ্যালো ডক্টর এশিয়া’ স্বাস্থ্যখাতে কিছু সুনির্দিষ্ট টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। আগামীতে ক্যান্সার কেয়ার, কিডনি কেয়ার, যুব সাস্থ্য ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে ‘হ্যালো ডক্টর ডট এশিয়া’ প্রযুক্তি সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

কেমন ছিল ডাইনোসরদের শেষ দিন?

প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগের কোনো এক দিন। রোদ–ঝলমল। মৃদু হাওয়ায় কেঁপে কেঁপে উঠছে গাছের কচি পাতা। পৃথিবীতে বেড়াচ্ছে বিশালদেহী ব্রকিয়োসোরাস (লম্বা গলার তৃণভোজী ডাইনোসর)। তীক্ষ্ম চোখে শিকারের খোঁজে বেরিয়েছে টাইরানোসোরাস রেক্স। নিত্যব্যস্ততা শুরু হয়েছে পৃথিবীজুড়ে। চলছে জীবনের স্পন্দন।
ঠিক এ সময় হাজার কিলোমিটার দূরে মহাকাশে ঘটে আরেকটি ঘটনা, যা বদলে দেয় পৃথিবীকে চিরদিনের মতো। যার পর পৃথিবী আর কখনো আগের অবস্থায় ফিরতে পারেনি। মহাশূন্যে একটি গ্রহাণু কক্ষচ্যুত হয়। প্রচণ্ড গতিতে ধেয়ে আসে পৃথিবীতে। ১২ কিলোমিটার প্রশস্ত গ্রহাণুটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে জ্বলে ওঠে। বাড়তে থাকে গতি, কমতে থাকে ভূমি থেকে দূরত্ব। একসময় তা আছড়ে পড়ে ভূমিতে, এখনকার মেক্সিকো উপসাগরের চিক্সচুলুব এলাকায়।
গ্রহাণুটি ভূমিতে মিনিটে ১ হাজার ৮০ কিলোমিটার গতিতে আঘাত হানে। যেখানে এটি পড়ে, সেখানে প্রায় ৮০ থেকে ১০০ কিলোমিটারজুড়ে ৩০ কিলোমিটার গভীর খাদের সৃষ্টি হয়। গ্রহাণুটির আঘাতের সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত গতিতে বায়ুমণ্ডলে প্রায় ৩২৫ গিগা টন সালফার ও প্রায় ৪২৫ গিগা টন কার্বন ডাই-অক্সাইড ছড়িয়ে পড়ে। এতে পৃথিবীর তাপমাত্র হিমাঙ্কের নিচে নেমে যায়। জমে যায় চারদিক। এ অবস্থা বিরাজ করে কয়েক বছর ধরে। সমুদ্রে এ প্রভাব থাকে কয়েক শতাব্দী। এতে পৃথিবী থেকে হারিয়ে যায় চার ভাগের তিন ভাগ প্রাণী ও গাছপালা। হারিয়ে যায় ডাইনোসর। অনুসন্ধানে উঠে আসা এমন ফলাফল গত বছর প্রকাশ করে একদল ব্রিটিশ বিজ্ঞানী। তবে সম্প্রতি এর সঙ্গে যোগ হয়েছে এক মহা সুনামির আলামত।
কোটি কোটি বছর আগে পৃথিবী কাঁপিয়ে বেড়ানো ডাইনোসরেরা কীভাবে হারিয়ে গেল, বিজ্ঞানীদের কাছে তা এখনো এক রহস্য। এ নিয়ে দুটি বহুল প্রচলিত ধারণা রয়েছে। এর একটি হলো, ব্যাপক হারে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত এবং অন্যটি ‘চিক্সচুলুব ইমপ্যাক্ট’ তত্ত্ব। তত্ত্বটি দাঁড়িয়ে আছে ওই গ্রহাণুর পৃথিবীতে আঘাতের ঘটনার ওপর। তত্ত্বটির উন্নয়ন ঘটিয়েছেন ক্যালিফোর্নিয়ার ভূতত্ত্ববিদ ওয়াল্টার আলভারেজ ও তাঁর বাবা লুই আলভারেজ। আলভারেজ সম্প্রতি আমেরিকার উত্তর ডাকোটায় খনন করে তাক লাগানো কিছু খুঁজে পান, যা তাঁদের তত্ত্বকে আরও সুদৃঢ় করেছে। তাঁরা এ বিষয়ে একটি গবেষণাপত্র রচনা করেছেন, যা সোমবার প্রকাশিত হয়।
আলাভারেজের দল খননের জায়গায় মাটির এমন একটি স্তর খুঁজে পেয়েছে, যেখানে মাছ, গাছপালা ও আরও অনেক সামুদ্রিক প্রাণীর জীবাশ্ম একসঙ্গে জট পাকানো অবস্থায় রয়েছে। তাঁরা মাছের ফুলকায় মটরদানার মতো কিছু পদার্থ পেয়েছেন। পরীক্ষা করে এসব পদার্থের বয়স নির্ধারণ করেছেন আনুমানিক ৬৫ দশমিক ৭৬ মিলিয়ন বছর, যা ওই গ্রহাণুর পতনের সময়কাল।
তাঁদের ধারণা, উত্তর ডাকোটা থেকে ৩ হাজার কিলোমিটার দূরে মেক্সিকো উপসাগরের উপত্যকায় গ্রহাণুটি যখন আঘাত হানে, তখন চারদিকে প্রায় হাজার হাজার কিলোমিটারজুড়ে গলিত পাথর ছড়িয়ে পড়ে। সেসব পাথরের অংশ মাছের ফুলকায় থাকা মটরদানার মতো পদার্থ। মাছগুলো এমন পানিতে শ্বাস নিয়েছিল, যেখানে ওই পদার্থ ছড়িয়ে পড়ে।
এক জায়গায় এত সামুদ্রিক প্রাণী ও গাছপালা এমনভাবে জট পাকিয়ে আছে, যা এক মহা সুনামির কথা বলছে, গ্রহাণুটি আছড়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে যা ঘটেছিল। তবে এ সুনামি ডাকোটায় কোথা থেকে এসেছিল তা অবশ্য নির্ধারণ করা যায়নি।
তবে বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন, স্থানীয় কোনো জলের উৎস থেকে সুনামির ঢেউ এসেছিল। গ্রহাণু যখন আঘাত হানে, তখন রিখটার স্কেলে ১০ থেকে ১২ মাত্রার ভূকম্পন হয়, যা গোটা পৃথিবীকে ঝাঁকি দিয়েছিল। এর ফলেই শুরু হয়েছিল এক মহা সুনামি। যাত্রাপথে সুনামিটি সবকিছুই গুঁড়িয়ে দিয়েছিল।
ক্যানসাস বিশ্ববিদ্যালয়ের রবার্ট ডিপালমা বলেন, মিষ্টি পানির মাছ, স্থলের মেরুদণ্ডী প্রাণী, গাছের শাখা–প্রশাখা, সামুদ্রিক শামুক ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী সবকিছু দলা পাকানো অবস্থায় এ স্তরে পাওয়া গেছে।
আবিষ্কারটি প্রফেসর আলভারেজ ও তাঁর টিমের জন্য উত্তেজনাকর। আলভারেজ বলেন, যখন তাঁরা ‘ইম্প্যাক্ট তত্ত্ব’ দাঁড় করান, তখন তাঁদের হাতে প্রমাণ হিসেবে ছিল শুধু ইরিডিয়ামের (গ্রহাণু বা ধূমকেতুতে পাওয়া একধরনের পদার্থ) অস্বাভাবিক উপস্থিতি। তারপর থেকে ধীরে ধীরে তত্ত্বটি বস্তব রূপ লাভ করছে। এ সময় একটি মহা সুনামি হতে পারে—এমন ধারণা তিনি কখনোই করেননি।
তাঁদের এই আবিষ্কার কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা বোঝাতে ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল ম্যানিং বলেন, প্রকৃত অর্থেই যদি কেউ বুঝতে চায় ডাইনোসরদের শেষ দিনটা কেমন ছিল, তাহলে বলব এটাই সেই দৃশ্য।

সুন্দরবনের খাঁটি মধুর নামে হচ্ছেটা কী

সুন্দরবনের খাঁটি মধুর কদর দেশজোড়া। সেই জনপ্রিয়তা কাজে লাগিয়ে সুন্দরবন–সংলগ্ন বাগেরহাটের মোংলা উপজেলাসহ আশপাশের এলাকায় সুন্দরবনের খাঁটি মধুর নামে চলছে ভেজাল মধুর ব্যবসা।
একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী চক্র অতি মুনাফার আশায় সুন্দরবন থেকে সংগৃহীত মধুতে ভেজাল দিয়ে বাজারে তা উচ্চ দামে বিক্রি করছে। ভেজাল মধু শনাক্ত করার সাধারণত কোনো উপায় না থাকায় পর্যটকসহ ক্রেতাসাধারণ তা কিনে প্রতারিত হচ্ছে।
সুন্দরবনের পূর্ব বিভাগীয় কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, প্রতিবছর এপ্রিল ও মে মাসে বন বিভাগের রাজস্ব প্রদান সাপেক্ষে মৌয়ালরা সুন্দরবন থেকে মধু সংগ্রহের অনুমতি পায়। এই মধু আহরণ মৌসুম শেষ হয়ে যাওয়ার পরপরই একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী চক্র মধুতে ভেজাল দিয়ে বাজার ও দেশের বিভিন্ন স্থানে সুন্দরবনের খাঁটি মধুর মোড়ক লাগিয়ে বিক্রি করা শুরু করে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, অসাধু ব্যবসায়ী চক্রটি সুন্দরবনে মধু আহরণ মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই মৌয়ালদের মোটা অঙ্কের টাকা দাদন দেয়। দাদনবাজ ব্যবসায়ীরা অতি মুনাফা লাভের আশায় বনের অভ্যন্তরে থাকা অবস্থাতেই সংগৃহীত মধুর সঙ্গে চিনির শিরা ও অন্যান্য উপকরণ মিশিয়ে পরে লোকালয়ে আনতে বলে দেয়। মৌয়ালদের একাংশ ভেজাল মধু তৈরির উপকরণ, সরঞ্জামসহ মৌসুমে বনে প্রবেশ করে। সুন্দরবনের চাঁদপাই, ঢাংমারী, শরণখোলা, নলিয়ান ও বুড়িগোয়ালিনী রেঞ্জের বিভিন্ন অফিস থেকে মৌয়ালরা অনুমতি নিয়ে বনে প্রবেশ করে সংগৃহীত মধুর সঙ্গে অন্যান্য উপাদান মিশিয়ের ভেজাল মধু তৈরি করে। এ ছাড়া অনেক সময় বন থেকে আহরিত মধু লোকালয়ে এনে চাষের মধু মিশিয়েও ভেজাল দেওয়া হয়। মাঝেমধ্যে উপজেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালালেও বন বিভাগের এ ক্ষেত্রে তেমন কোনো তৎপরতা নেই।
সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের অন্তর্গত জয়মণি বাজার, বৈদ্যমারী, জিউধরা, ঢাংমারী, বাণীশান্তা, লাউডোব গ্রামের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক গ্রামবাসী জানান, বনে এখন আর আগের মতো মধু পাওয়া যায় না। মধু আহরণ মৌসুমের শুরুতে গরান ও খলসী ফুলের মধুর মৌসুম এবং শেষের দিকে কেওড়া ফুলের মধুর মৌসুম। কিন্তু বনে গরান ও খলসী এই দুই জাতের গাছের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। তাই একশ্রেণির অসৎ মৌয়াল অধিক লাভের আশায় নকল মধু বানানোর জন্য বন বিভাগের চোখ ফাঁকি দিয়ে বস্তাভর্তি চিনি ও বড় বড় পাতিল নিয়ে বনে যায়। এই ভেজাল মধু তৈরির জন্য শরণখোলা, চাঁদপাই, কয়রা, শ্যামনগরসহ বনসংলগ্ন এলাকায় কয়েকটি সংঘবদ্ধ চক্র গড়ে উঠেছে। এর সঙ্গে শতাধিক লোক জড়িত। মোংলায় এ চক্রের শক্তিশালী সিন্ডিকেট রয়েছে।
সুন্দরবন–সংলগ্ন হওয়াতে মোংলায় গড়ে উঠেছে পর্যটন ব্যবসা। এখানে বছরের অধিকাংশ সময়ই পর্যটকদের আনাগোনা থাকে। পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে বিভিন্ন স্থানে সুন্দরবনের মধু বিক্রির দোকান গজিয়ে উঠেছে।
গত ১৫ জুন শনিবার মোংলার মেইন রোড, শেখ আ. হাই সড়কসহ বিভিন্ন স্থানে ঘুরে দেখা যায়, মুদিদোকান, কাপড়ের দোকান, ওষুধের দোকান, ফলের দোকান, পান–সিগারেটের দোকান, বেকারি, জুতার দোকান এমনকি সেলুনেও সুন্দরবনের খাঁটি মধুর লেবেল লাগিয়ে ভেজাল মধু বিক্রি করা হচ্ছে। সব স্থানে প্রকারভেদে প্রতি কেজি ৬০০ থেকে ১০০০ টাকা দরে এ মধু বিক্রি করা হচ্ছে।
সুন্দরবনের মৎস্য ব্যবসায়ী ও দুবলা ফিশারম্যান গ্রুপের সম্পাদক কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, সুন্দরবনের মৌয়ালদের কারও কারও বিরুদ্ধে ভেজাল মধু তৈরির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এ বিষয়ে বন বিভাগের উদাসীনতাও বরাবরেরই। তাদের অবশ্যই এ বিষয়ে কঠোর হওয়া উচিত।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সেভ দ্য সুন্দরবনের চেয়ারম্যান ফরিদুল ইসলাম বলেন, সুন্দরবনের মধু দেশের ঐতিহ্য। সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে বিদেশেও এ মধু রপ্তানি করা সম্ভব। কিছু ব্যবসায়ীর জন্য মধুর এই বাজার ধ্বংস হতে বসেছে।
পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জ কর্মকর্তা শাহিন কবীর বলেন, ভেজাল মধু তৈরির অভিযোগ তিনি শুনেছেন। মোংলাসহ আশপাশের দোকানে প্রশাসন যদি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে, তাহলে মধুতে ভেজাল দেওয়ার প্রবণতা কমবে।
মোংলার ইউএনও মো. রাহাত মান্নান বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে মধুতে ভেজাল দেওয়ার বিষয়টি জানতে পেরেছি। খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যে এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

পরিবর্তন আনছেন ব্রাজিলের নারীরা

লাতিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিলে নারীরা এখনো উপেক্ষিত। এখানকার গানের কথায় বোঝানো হয়, নারীর জন্মই হয়েছে পুরুষের ‘সেবা’ করার জন্য। যে গান দিয়ে তাঁদের ছোট করা হয়, যে গানকে পুরুষের নিজস্ব সম্পদ বলে মনে করা হয়, সে গান দিয়েই এবার নিজেদের অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে নেমেছেন ব্রাজিলের নারীরা।
ক্যারোলিনা ডি অলিভেরা ‘নারীবাদ’ শব্দটি প্রথমবার শুনেছিলেন ২০১৫ সালে। কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া বন্ধুরা শব্দটির সঙ্গে তাঁকে পরিচিত করিয়েছিলেন। সেখান থেকে তাঁর মনে জন্ম নেয় নানা প্রশ্ন। বয়স তাঁর তখন মাত্র ২২। রিও ডি জেনিরোর বিখ্যাত র‍্যাপসংগীত ক্যারিওকা ফাঙ্কজগতের উঠতি তারকা তিনি। ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে জানা যায়, হিপহপ সংগীতে র‍্যাপার ক্যারোল নামে পরিচিতি পান ক্যারোলিনা ডি অলিভেরা।
বছরখানেক পরে ‘১০০% ফেমিনিস্তা’ শিরোনামে একটি গান মুক্তি দেন ক্যারোল। সে গানের কথায় ফুটে উঠেছে তাঁর দুঃসহ শৈশবের কথা। র‍্যাপের তালে তালে বলেছিলেন, ‘মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই বুঝেছিলাম, খাবার না বানালে নারীদের মার খেতে হয়।’ দারুণ জনপ্রিয় হয় গানটি। কিন্তু সেই গানের কথাও তাঁর সাজসজ্জা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নোংরা মন্তব্য থামাতে পারেনি। নিজেকে কৃষ্ণাঙ্গ এবং স্থূল দাবি করা ক্যারোল বলেন, ‘কেবল ফাঙ্ক গান গাওয়া নারী হওয়াই কষ্টসাধ্য নয়, বরং একজন নারী হওয়াই কঠিন।’
আমেরিকান হিপহপ থেকে তৈরি হওয়া ফাঙ্কসংগীতের গায়ক মূলত ছেলেরাই। সমালোচকদের দাবি, এসব গানের কথায় নারীবিদ্বেষ, বিশৃঙ্খলা এবং অপরাধকে উসকানি দেওয়া হয়। ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানের তথ্যানুযায়ী, কান ফাটানো আওয়াজে উদ্দাম নৃত্যের তালে তালে গাওয়া ফাঙ্কসংগীত জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর—এই মর্মে ২০১৭ সালে প্রায় ২০ হাজার ব্রাজিলিয়ান কংগ্রেসে একটি আবেদনপত্রে স্বাক্ষর করেন। তবে এ বিষয়ে আইনসভা কোনো পদক্ষেপ নিতে অস্বীকৃতি জানায়।
র‍্যাপার এমসি (অনুষ্ঠানের ওস্তাদ বা মাস্টার অব সিরিমনি) ক্যারোল এবং তাঁর মতো অন্যান্য নারীবাদী ফাঙ্কসংগীতশিল্পী গানের স্টাইলে পরিবর্তন আনার ওপর প্রাধান্য দিচ্ছেন না। বরং গানটিকে নারীদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নতুন আঙ্গিকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছেন তাঁরা। ক্যারোলরা নতুন করে ‘পুতারিয়া’ গাওয়া শুরু করেছেন। যৌনতা নিয়ে লেখা নিষিদ্ধ গানের একটি শাখা পুতারিয়া। এ ধারার কিছু গানে প্রকাশ্যে উঠে এসেছে নারীবাদ।
এই ধারার একটি গান ‘এন ও সৌ ওব্রিগাদা’ (আমি করতে চাই না) স্পটিফাইয়ের বৈশ্বিকভাবে ভাইরাল হওয়া শীর্ষ ৫০টি গানের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। এই গানের ভিডিওতে এমসি পোকাহোন্তাস মাদকাসক্ত ছেলেবন্ধুকে তাঁর ওপর কর্তৃত্ব জাহির করতে চাওয়ায় ভর্ৎসনা করেন। ২০১৮ সালের আরেকটি জনপ্রিয় পুতারিয়া ‘চাই দে বোকা’ (মুখ বন্ধ রাখো) গানে এমসি রেবেকা নারীদের যৌনসুখে পুরুষের ভূমিকার কথা বলেছেন। যে পৃথিবীতে নারীকে এখনো যৌনদাসী বলে বিবেচনা করা হয়, সেখানে নারীর যৌন স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলেছেন তিনি।
সাও পাওলোতে নারী শিল্পীদের প্রশিক্ষণ দেয় ‘লিগা দা ফাঙ্ক’ নামে একটি দল। এই দলের সদস্য আন্দ্রেসা অলিভিয়েরা বলেন, নারী ফাঙ্কসংগীতশিল্পীদের হাত ধরে নতুন করে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে ফাঙ্কের শাখা ‘বিবেকবান ফাঙ্ক’। সামাজিক ইস্যু নিয়ে ভীষণভাবে রক্ষণশীল ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জাইর বোলসোনারোর বিপরীতে শক্তি সঞ্চয় করছে গানগুলো। টুইটারে উভয় লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ দেখানো এমসি রেবেকা একটি গানের মিউজিক ভিডিওতে রংধনু পতাকায় জড়িয়েছেন নিজেকে। এ সব গান দেদার শুনছেন নারীরা। এক গবেষণায় দেখা গেছে, ইউটিউবের ১৩০টি ফাঙ্ক চ্যানেলের ৪৯ দশমিক ৫ শতাংশ দর্শক নারী। ২০১৪ সালের হিসাব অনুযায়ী তা ছিল মাত্র ৩২ শতাংশ।
নারী তারকাদের হাত ধরে ব্রাজিলের ফাঙ্ক এখন বৈশ্বিক আবেদন সৃষ্টি করেছে। ফাঙ্ক গানের জগতে প্রবেশ করে ল্যারিসা মাকাদোর ইনস্টাগ্রাম অনুসারীর সংখ্যা প্রায় ৩৭ মিলিয়ন, বেশির ভাগ অনুসারীই বাইরের দেশের নাগরিক। ক্যামিলিয়া ফিয়ালহোর মার্কেটিং কোম্পানি কেটুএলের হাত ধরে ল্যারিসার সংগীতজীবন ক্রমেই উন্নতির দিকে ধাবিত হয়। নিজের সাফল্যকে তিনি বিয়ন্স এবং রিয়ানার সঙ্গে তুলনা করেন। রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় এই নারীরা যৌনক্ষমতাকে প্রাধান্য দিয়েছেন।
ক্যামিলিয়ার কোম্পানি এখন এমসি রেবেকাকে অন্যান্য জিনিসের পাশাপাশি ইংরেজি ভাষা শেখাচ্ছে। যৌনতার মতো বিষয় থেকে তরুণ ফাঙ্কেরাদের দূরে থাকতে নিষেধ করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘ভদ্র গান শুনতে চাইলে ক্ল্যাসিক গান শোনো।’
ব্রাজিলের ফাঙ্কসংগীতজগতের অন্যতম পুরোধা আরেথা ফ্রাঙ্কলিন। ছবি: বিবিসি।

জুলিয়ান আসঞ্জ: সত্যানুসন্ধানী, নাকি প্রচারকামী এক মেধা?

লন্ডনের একুয়েডর দূতাবাস থেকে যেভাবে
জুলিয়ান আসঞ্জকে গ্রেফতার করা হলো
আপডেট- ১১ এপ্রিল ২০১৯: লন্ডন পুলিশ বলছে, উইকিলিকসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান আসঞ্জকে গ্রেফতারের পর তাকে এখন লন্ডনের এক থানায় আটকে রাখা হয়েছে। এরপর তাকে 'যত দ্রুত সম্ভব' ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তোলা হবে বলে পুলিশ বলছে।
জুলিয়ান আসঞ্জ ২০০৬ সালে ক'জন সাথীকে নিয়ে চালু করেন উইকিলিকস নামের ওয়েবসাইট।
এই সাইটে তিনি একের পর এক গোপন মার্কিন দলিলপত্র প্রকাশ করতে থাকেন। এই কারণে বিব্রত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার ওপর খুবই ক্রুদ্ধ হয়।
উইকিলিক্‌সের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে উঠে ২০১০ সালে যখন একটি ভিডিও ফুটেজ প্রকাশিত হয় যেখানে দেখানো হয় যে মার্কিন সৈন্যরা ইরাকে হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালিয়ে ১৮ জন বেসামরিক মানুষকে হত্যা করেছে।
পরের বছর যৌন হয়রানির অভিযোগে সুইডেন সরকার তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করলে তাকে লন্ডনে আটক করা হয়।
একুয়েডর দূতাবাসের ব্যালকনিতে জুলিয়ান আসঞ্জ। (ফাইল ফটো)
কিন্তু যৌন হয়রানির মামলাগুলো পরে প্রত্যাহার করা হয়।
ব্রিটেনের সুপ্রিম কোর্ট ২০১২ সালে মি. আসঞ্জকে সুইডেনের হাতে ফিরিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিলে তিনি একুয়েডরের দূতাবাসে ঢুকে রাজনৈতিক আশ্রয় চান এবং তিনি সেটা পেয়েও যান।
তারপর থেকে এই সাত বছর ধরে তিনি দূতাবাসের মধ্যেই বসবাস করছিলেন।
জুলিয়ান আসঞ্জের ভক্তরা তাকে একজন সত্যানুসন্ধানী বলে মনে করলেও তার সমালোচকরা বলেন, তিনি একজন প্রচারকামী।
যারা তার সাথে কাজ করেছেন তারা বলেন, তিনি আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব এবং প্রখর বুদ্ধিমত্তার অধিকারী লোক, যার কম্পিউটারের সাংকেতিক বার্তা ভেদ করার চমকপ্রদ ক্ষমতা আছে।
জানা যায় যে তিনি অনেকদিন না খেয়ে থাকতে পারেন এবং খুবই কম ঘুমিয়েও কাজে মনঃসংযোগ করতে পারেন।
তার জন্ম ১৯৭১ সালে অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সভিলে।
তার পিতামাতা একটি ভ্রাম্যমাণ থিয়েটার দল চালাতেন এবং সে কারণে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ঘুরে তার শৈশব কেটেছে।
আঠারো বছর বয়েসেই মি. আসঞ্জ সন্তানের পিতা হন।
ইন্টারনেটের যুগে কম্পিউটার হ্যাকিং তার নেশা হয়ে দাঁড়ায়, তাতে ধরা পড়লেও শেষ পর্যন্ত তাকে কারাভোগ করতে হয়নি।
পরে তিনি মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যা এবং গণিত পড়েন, এবং তার গাণিতিক প্রতিভা অনেকের নজর কাড়ে।
ভক্তরা বলেন, জুলিয়ান আসঞ্জ একজন সত্যানুসন্ধানী, কিন্তু সমালোচকরা বলেন তিনি একজন প্রচারকামী।

বাউফলে মিন্টুর মাল্টা-কমলালেবু বাগান

উপকূলীয় অঞ্চল পটুয়াখালীর বাউফলে বিদেশি ফল মাল্টা-কমলালেবু চাষে ব্যাপক সফলতা লাভ করেছেন ধূলিয়া ইউনিয়নের মিজানুর রহমান (টিটু) নামে এক যুবক। তিনি পেশায় একজন জুয়েলারি ব্যবসায়ী হলেও শখের বশে ২০১৬ সালে প্রায় ৮ একর জমির ওপর মিজান গার্ডেন নামে একটি বাগান বাড়ি গড়ে তোলেন নিজ গ্রাম ধূলিয়ায়। সেখানে পার্সিমন, রাম্বুটান, ড্রাগন, প্যাশন, জাম্বুরা, পেঁপে, পেয়ারা, কমলার মতো নানা জাতের দেশি বিদেশি ফল গাছের পাশাপাশি বরিশালের স্বরূপকাঠীর একটি নার্সারি থেকে এনে শতাধিক মাল্টা-কমলালেবুর চারা রোপণ করেন। দীর্ঘ তিনবছর নিয়মিত পরিচর্যা ও দেখভাল করার পর এ বছর মিজান গার্ডেনে দেখা গিয়েছে মাল্টার বাম্পার ফলন। মিজানুর রহমান টিটু ঢাকার নিউ মার্কেট এলাকার ব্যবসায়ী। মাঝে মাঝে বাড়িতে এসে বাগান দেখাশোনা করেন তিনি। সার্বক্ষণিক বাগান সৃজন ও পরিচর্যার দায়িত্বে রয়েছেন তুষার ইমরান। তিনি জানান, মাটিতে গোবর মিশিয়ে রোপণ করা হয় নাগপুরী, বারি-১, চায়না, এলাচি, বেড়াকাটা জাতের কমলা ও পাকিস্তানি, ইন্ডিয়ান বারি জাতের শতাধিক মাল্টা চারা।
রাসায়নিক সার ওষুধ ছাড়াই জৈবসার আর প্রাকৃতিক উপায়ে পরিচর্যা ও নিয়মিত পানি দেয়ায় ফল আসে গাছগুলোতে। গাছ গাছে এখন ছবির মতো ঝুলে আছে পাকা-আধাপাকা মাল্টা। প্রতিটি গাছে ঝুলে আছে অন্তত এক মণ মাল্টা। বিক্রির প্রয়োজন না থাকায় পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে আত্মীয়-স্বজনসহ প্রতিবেশী ও স্থানীয় দুস্থ লোকজনের মাঝে এসব মাল্টা বিলিয়ে দিতে পারবেন তারা। গাছে গাছে মাল্টা ঝুলে থাকার দৃশ্য দেখে স্থানীয়দের অনেকেই অভিভূত হচ্ছেন। চারা গাছ কিংবা মাল্টার কলম সংগ্রহ করতে চাচ্ছেন অনেকেই। দেখভালের দায়িত্বে থাকা অরেকজন শিক্ষক আরিফুর রহমান জানান- জলপাই, জাম্বুরা, থাই জাম্বুরা, কামরাঙা, বেড়াকাটা লেবু, বেড়াকাটা পেয়ারা, পার্সিমন, রাম্বুটান, খাটো জাতের থাই নারিকেলসহ নানা জাতের দেশি-বিদেশি ফল গাছ রয়েছে তাদের ওই বাগান বাড়িতে। রয়েছে রেডলেডি জাতের পেঁপে, লাউসহ সবজির বাগানও। নানা জাতের  গোলাপ, রজনীগন্ধা, কামিনী, জবা, জিনিয়া, আলমন্ডা, প্যারাডাইস, মাধবীলতা, গোল্ডেন শাওয়ার, মেফ্লোয়ার, লিলি, সজনেসহ দেশি-বিদেশি শোভাবর্ধক ভেষজ গাছও রয়েছে বাগানে। বাগানে আরো আছে মহাছনক, পালমার, সূর্যডিম, মিসস্পেশাল, পুনাই, পুনাই লাল, ম্যাট্রাস, ম্যাট্রাস তোঁতা, হাঁড়িভাঙা, চিনের কিউজাইসহ নানা জাতের আম গাছ। দেশি-বিদেশি ফুল-ফলের সমারোহে মিজান গার্ডেন নামে ওই বাগান বাড়ি সেজেছে যেন স্বপ্নের মতো। এ ছাড়া বাড়িসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় মাল্টা ও কমলালেবুসহ নানা প্রজাতির দেশি-বিদেশি ফলের চাষ হচ্ছে। এরই মধ্যে শৌলা গ্রামের নুরজাহান গার্ডেন ও কর্পূরকাঠি গ্রামের স্বপ্নচূড়া থিম পার্কে সারি সারি গাছে ঝুলছে নাগপুরী, বারি কমলা-১, চায়না, এলাচি, বেড়াকাটাহ বিভিন্ন জাতের কমলালেবু ও মাল্টা। ক্রমাগত আবহাওয়ার পরিবর্তন এবং রাসয়নিক সার ও বিষমুক্ত ফলের আশায় এখন অনেকেই ঘরের আঙিনায়, পরিত্যক্ত ভিটে-বাড়িসহ বাণিজ্যিকভাবে বিভিন্ন ধরনের ফলদ গাছের চাষে ঝুঁকছেন। পৌর সদরের বাসাবাড়িতে কেউ কেউ আবার টবে ড্রাগন, মাল্টা, কমলাসহ বিভিন্ন ফল গাছ লাগিয়েছেন। গড়ে তুলছেন ছাদ বাগান। কালিশুরী ডিগ্রি কলেজের জীব বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক তাসলিমা বেগম বলেন, ‘সিলেট, চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও পঞ্চগড় জেলাসহ বিদেশের মাটিতেই কেবল ভালো কমলা কিংবা মাল্টা ফলে এমন ধারণা পাল্টে যাচ্ছে। বীজ থেকে সরাসরি চারা তৈরি করা যায়। ভালো জাতের মাল্টা বা কমলালেবুর  চোখ কলম, পার্শ্বকলম ও ১০-১২ মাস বয়সের চারা বাডিং ও গ্রাফটিংয়ের জন্য আদিজোড় হিসেবে ব্যবহার করা ভালো। সোজা ও ভালো বৃদ্ধি সম্পন্ন তরতাজা চারা অথবা কলম বেছে নিয়ে রোপণ করা উচিত। দেশি প্রজাতির বিলুপ্তপ্রায় ফল গাছের পাশাপাশি মিজান গার্ডেনে মাল্টার মতো পুষ্টিমান সম্পন্ন পরিবেশ বান্ধব ফল গাছের পরিকল্পিত বনায়ন করা জরুরি।’ কৃষিবিদ আরাফাত হোসেন বলেন, ‘মাল্টা ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ও জনপ্রিয় ফল। এ অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায়ও এখন কমবেশি মাল্টা ও কমলার চাষ হচ্ছে। পুষ্টির চাহিদা পূরণে অন্য পেশার পাশাপাশি শিক্ষিত লোকজনের এ ধরনের ফল চাষে এগিয়ে আসা উচিত।’ বাউফল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান  বলেন, এ অঞ্চলের মাটি মাল্টা চাষের জন্য খুবই উপযোগী। তার প্রমাণ ইতিপূর্বে যারা মাল্টা চাষ করেছেন তারা সফল হয়েছেন। এ বছরও আমরা ২০টি মাল্টার বাগান দিয়েছি। উপজেলা কৃষি অফিস থেকে মাল্টা চাষিদের সব ধরনের সুযোগ সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে।