Friday, December 6, 2024

গাঁজা গাছ দিয়ে বাড়ি : পরিবেশ রক্ষায় নতুন যুগ

আপনি কী জানেন, গাঁজা গাছ দিয়েও বাড়ি তৈরি করা সম্ভব? জার্মানির প্রকৌশলী হেনরিক পাউলি গত কয়েক বছর ধরে বাড়ি তৈরির উপকরণ হিসেবে গাঁজা গাছ ব্যবহার করে আসছেন।

বৃহস্পতিবার (০৫) ডয়েচে ভেলের এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, গাঁজা গাছ (যাকে জার্মান ভাষায় হেম্প বলা হয়) দিয়ে নির্মিত বাড়িগুলো পরিবেশবান্ধব এবং বেশ কিছু গুণসম্পন্ন।

হেনরিক পাউলি জানান, গাঁজা গাছের এমন কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা বাড়ি তৈরিতে এর ব্যবহারকে আরও কার্যকর করে তোলে। এই গাছ খুব দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং প্রায় সব জায়গায় জন্মায়, বিশেষ করে জার্মানির হেসেন রাজ্যে। গাঁজা গাছ অধিক পরিমাণে কার্বন-ডাই অক্সাইড শোষণ করে, যা পরিবেশের জন্য উপকারী।

পাউলি বলেন, গাঁজা গাছের গুণাবলি অনেক। এটি দিয়ে তৈরি বাড়ি পরিবেশবান্ধব, ভালো ইনসুলেশন সরবরাহ করে, ঘর গরম রাখে এবং অগ্নি-নিরাপদ। এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি স্যাঁতসেঁতে ভাব শোষণ করে এবং আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম।

তবে, গাঁজা গাছ দিয়ে বাড়ি তৈরির এ ধারণাটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। এর অন্যতম কারণ হলো প্রচলিত বাড়ি নির্মাণ উপকরণের তুলনায় এর খরচ ১০-২০% বেশি। এ ছাড়া, জার্মানির অনেক মানুষ এখনো গাঁজা গাছকে মাদক হিসেবে দেখে থাকেন, যা এই উপকরণের ব্যবহারে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে।

তবে পাউলি বিশ্বাস করেন, ভবিষ্যতে আরও মানুষ গাঁজা গাছ ব্যবহার করে বাড়ি নির্মাণ করবেন এবং এতে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির উন্নয়ন হবে। গাঁজা গাছ অনেকভাবে কাজে লাগানো যায়, তিনি বলেন, যারা একে মাদক হিসেবে ব্যবহার করেন, তারা হয়তো অন্যভাবে এর উপকারিতা দেখতে পাবেন।

হেনরিকের আশা, ভবিষ্যতে নির্মাণশিল্পে গাঁজা গাছের ব্যবহার বাড়বে এবং এটি পরিবেশবান্ধব ঘর তৈরির একটি শক্তিশালী উপাদান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

গাঁজা গাছ দিয়ে তৈরি বাড়ি। ছবি : সংগৃহীত
গাঁজা গাছ দিয়ে তৈরি বাড়ি। ছবি : সংগৃহীত



কুমারীত্ব ফিরে পেতে তরুণীর কাণ্ড, সতর্ক করলেন চিকিৎসকরা

কুমারীত্ব ফিরে পেতে অদ্ভুত এক কাণ্ড ঘটিয়েছেন এক তরুণী। এজন্য খরচ করেছেন লাখ লাখ টাকা। এমনকি তার এমন পদক্ষেপের জন্য সতর্ক করেছেন চিকিৎসকরাও।

বৃহস্পতিবার (০৫ ডিসেম্বর) ভারতীয় সংবাদাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

জানা গেছে, অদ্ভুত কাণ্ড করা এ তরুণীর নাম রাভেনা হানিয়েলি। তিনি একজন ব্রাজিলিয়ান ইনফ্লুয়েন্সার। ইনস্টাগ্রামে তাকে ফলো করেন ২ লাখ ৬৬ হাজার মানুষ। সম্প্রতি আত্মসম্মান ফিরে পাওয়ার নাম করে অদ্ভুত এক সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন এই ব্রাজালিয়ান।

তিনি জানান, নতুন করে কুমারীত্ব ফিরে পেতে চান তিনি। এ জন্য হাইমেনোপ্লাস্টিকের পেছনে খরচ করবেন ২২ লাখ ৭২ হাজার টাকা। এই তরুণীর মনে করেন, কুমারীত্ব ফিরে পেলে উদ্ধার হতে তার আত্মসম্মান!অথচ এর তীব্র সমালোচনা করেছেন নেটিজেনরা।

রাভেনা বলেন, এই প্রক্রিয়াটি আমার জন্য বিশেষ অর্থ বহন করে। আমি আমার কুমারীত্ব ফিরে পেতে চাই এবং আবার কুমারী হতে চাই। এটি আমার আত্মসম্মান এবং গভীর ব্যক্তিগত কারণগুলোর সঙ্গে জড়িত। যা আমার জন্য সবসময় গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

হাইমেনোপ্লাস্টি কী?


হাইমেনোপ্লাস্টি মূলত একটি অস্ত্রোপচার প্রক্রিয়া, যেখানে নারী হাইমেনের ছিঁড়ে যাওয়া প্রান্তগুলো সেলাই করে পুনরুদ্ধার করা হয়। রাভেনার জন্য এটি একটি প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে, যা তার জীবনে ‘নতুন অধ্যায়ের সূচনা’ নির্দেশ করে।

তবে রাভেনা স্বীকার করেছেন যে, এ ধরনের অস্ত্রোপচার প্রায়ই সমালোচনার মুখে পড়ে। ২৩ বছরের এই তরুণী বলেন, ‘দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, সবাই এ ধরনের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত বোঝে না বা সমর্থন করে না। আমাদের উচিত এগুলো বিচার করা ছেড়ে মানুষের সিদ্ধান্তকে সম্মান জানানো’।

চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা

এদিকে হাইমেনোপ্লাস্টির সম্ভাব্য শারীরিক, মানসিক এবং নৈতিক ঝুঁকির বিষয়ে চিকিৎসকরা সতর্ক করেছেন। লন্ডনের মেডিসোনাল ক্লিনিকের সিইও ড. হানা সালুসোলিয়া বলেন, এই প্রক্রিয়াটি একটি প্রতীকী সার্জারি, যা প্রকৃতপক্ষে কুমারীত্ব পুনরুদ্ধার করে না। এতে সংক্রমণ, দাগ পড়া, অনিয়মিত নিরাময় এবং ফলাফলে অসন্তুষ্টির ঝুঁকি থাকে।

রাভেনার অবস্থান

এসব সমালোচনা এবং ঝুঁকির বিষয়ে অবগত থাকলেও রাভেনা তার সিদ্ধান্তে অটল। তিনি বলেন, এটি একজন নারীর অনুভূতি এবং আমি নিজের জন্য কী চাই সে বিষয়ে আমি সচেতন। আমি চাই, নারীরা তাদের নিজ নিজ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বহনে সক্ষম হন।

যদিও রাভেনা এখনো অস্ত্রোপচারের তারিখ চূড়ান্ত করেননি। তবে তিনি তার কুমারীত্ব পুনরুদ্ধারের সময় প্রয়োজনীয় সব নির্দেশনা মেনে চলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে শারীরিক সম্পর্ক এড়ানো এবং সঠিক নিরাময়ের জন্য নিজের আরামের প্রতি মনোযোগ দেওয়া।

অদ্ভুত কাণ্ড করা তরুণী। ছবি : সংগৃহীত
অদ্ভুত কাণ্ড করা তরুণী। ছবি : সংগৃহীত



আলেপ্পোর পর হামা শহরও দখলে নিলেন বিদ্রোহীরা

সিরিয়ার বিদ্রোহীরা আলেপ্পোর পর দেশটির মধ্যাঞ্চলের শহর হামাও দখলে নিয়েছেন। হামা শহর থেকে সরকারি বাহিনীর সদস্যদের প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। অল্প সময়ের ব্যবধানে দুই গুরুত্বপূর্ণ শহর হারিয়ে বড় ধরনের চাপে পড়েছে দেশটির প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ এবং তাঁর মিত্রদেশ রাশিয়া ও ইরান।

বিদ্রোহী গোষ্ঠী হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস) ও তার মিত্ররা গত সপ্তাহে দ্রুতগতিতে হামলা চালিয়ে আলেপ্পো দখল করে নেয়। লেবাননে হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি হওয়ার পরপরই এ ঘটনা ঘটে। হিজবুল্লাহ আসাদের মিত্র হিসেবে পরিচিত।

উত্তরাঞ্চলের আলেপ্পো দখলের পর বিদ্রোহীরা মধ্যাঞ্চলের হামা শহরের দিকে যাত্রা শুরু করেন। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস জানায়, বুধবার রাতে হামা শহরে আসার পথে আসাদ বাহিনীর সঙ্গে বিদ্রোহীদের বিভিন্ন সড়কে যুদ্ধ হয়। বিদ্রোহীরা ‘কয়েক দিক থেকে’ হামা শহরে হামলা চালান।

বিদ্রোহীরা জানিয়েছেন, তাঁরা হামার কেন্দ্রীয় কারাগার নিজেদের আয়ত্তে নিয়েছেন এবং বন্দীদের ছেড়ে দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার বিকেলে সিরিয়ার সেনাবাহিনী হামার নিয়ন্ত্রণ হারানোর কথা স্বীকার করেছে। হামা আলেপ্পো ও রাজধানী দামেস্কের মধ্যে অবস্থিত কৌশলগতভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর।

চিন্তক গোষ্ঠী সেঞ্চুরি ইন্টারন্যাশনালের একজন ফেলো অ্যারন লুন্দ হামার দখল হারানোকে ‘সিরিয়া সরকারের জন্য একটি বিশাল ও ব্যাপক ধাক্কা’ বলে অভিহিত করেছেন। কারণ, সেখানে যদি সেনাবাহিনী থেকে যেত, তাহলে বিদ্রোহীদের অগ্রযাত্রা ঠেকানো সহজ হতো, কিন্তু ‘তারা তা পারেনি।’

বিদ্রোহী গোষ্ঠী হায়াত তাহরির আল-শামের নেতা আবু মোহাম্মদ আল-জোলানি এক ভিডিও বার্তায় বলেন, ৪০ বছর ধরে সিরিয়ার যে ক্ষত, তা দূর করতে তাঁর যোদ্ধারা হামায় ঢুকেছেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি ১৯৮২ সালের মুসলিম ব্রাদারহুডকে দমনের নামে যে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছিল সেটির ইঙ্গিত করেন।

২০১১ সালে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। গৃহযুদ্ধের পুরোটা সময় হামা শহর আসাদ সরকারের হাতে ছিল। কিন্তু এখন শহরটির পতন হওয়া দামেস্কের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াল। হামার পতনের পর বিদ্রোহীদের হোমস শহরের দিকে এগোনোর পথ খুলে গেল।

রাস্তায় গুলি ছুড়ছেন এক বিদ্রোহী। সিরিয়ার হামা শহরে, ৫ ডিসেম্বর ২০২৪
রাস্তায় গুলি ছুড়ছেন এক বিদ্রোহী। সিরিয়ার হামা শহরে, ৫ ডিসেম্বর ২০২৪ ছবি : এএফপি

নগ্ন দৃশ্যে দেখে এই অভিনেত্রীর পরিবারের সদস্য কী বলেছিলেন

চলতি বছরের অন্যতম আলোচিত সিনেমা ‘দ্য সাবস্ট্যান্স’। এ বছর কান উৎসবে প্রদর্শিত হওয়ার পর থেকেই কোরেলি ফারজার এই বডি হরর সিনেমার উচ্চকণ্ঠ প্রশংসা করেছেন সমালোচকেরা। গত ২০ সেপ্টেম্বর ওটিটি প্ল্যাটফর্ম মুভিতে মুক্তির পর থেকে সে প্রশংসায় যোগ দিয়েছেন সাধারণ দর্শকেরাও। এই সিনেমা দিয়ে আলোচনায় তরুণ অভিনেত্রী মার্গারেট কোয়ালি। ছবিটিতে একটি দৃশ্যে তাঁকে পুরোপুরি নগ্ন দেখা গেছে। এ প্রসঙ্গে পিপলডটকমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কথা বলেছেন তিনি।

প্রখ্যাত তারকা এলিজাবেথ স্পার্কলসের গল্প। টিভির এই ফিটনেস শো তারকার ক্যারিয়ার পড়তির দিকে। নিজের ৫০তম জন্মদিনের দিনই সে জানতে পারে যে তার বিকল্প খোঁজা হচ্ছে। মরিয়া হয়ে ব্ল্যাক মার্কেট ড্রাগ নিতে চায় সে। কিন্তু ঘটনা ঠিক তার মতো হয় না। এলিজাবেথ চেয়েছিল, ব্ল্যাক মার্কেট ড্রাগ নিয়ে উন্নততর সংস্করণে হাজির হতে। কিন্তু নিজের সিদ্ধান্ত দুঃস্বপ্ন হয়ে ফিরে আসে।

এমন গল্প নিয়ে নির্মিত সিনেমাটির গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন কোয়ালি। ছবিতে আরও আছেন ডেমি মুর। ডেমির সঙ্গে অভিনয় কোয়ালির জীবনের অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা। পর্দায় নগ্ন হওয়া নিয়েও তাঁর তেমন সমস্যা ছিল না। মুশকিলটা হয় ছবির প্রিমিয়ারে। যেখানে হাজির ছিলেন তাঁর মা অভিনেত্রী অ্যান্ডি ম্যাকডাওয়েল। কী হয়েছিল তখন, সেটাই কোয়ালি জানান সাক্ষাৎকারে।

কোয়ালি বলেন, ‘মা প্রিমিয়ারে ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “এই সিনেমা তো আমার বন্ধুরা দেখতে পারবে না, আমার বোনেরাও দেখতে পারবে না। কেউই আসলে এটা দেখতে পারবে না।”’

কেবল তাঁর মা–ই নন, এ ছবির নগ্ন দৃশ্য নিয়ে বছরজুড়েই আলোচনা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে মজা করে কোয়ালি বলেন, ‘আমাদের পরিবারের জন্য এটা খুব কঠিন বছর।’
কেবল নগ্নতাই নয়, কোরেলি ফারজার এই বডি হরর সিনেমায় প্রচুর সহিংসতা আছে। এ জন্য বডি হরর সিনেমাটি সবার জন্য হয়। অনেকের ছবিটি দেখতে গা গুলিয়েও উঠতে পারে। পর্দায় যাঁরা এ ঘরানার সিনেমা দেখতে অস্বস্তি বোধ করেন, তাঁদের ‘দ্য সাবস্ট্যান্স’ এড়িয়ে যাওয়া ভালো।

ঠিক ১০ বছর আগে এইচবিওর সিরিজ ‘দ্য লেফটওভারস’ দিয়ে নজর কাড়েন কোয়ালি। এরপর তাঁকে ‘দ্য নাইস গাই’, ‘গেথ নোট’ প্রভৃতি সিনেমায় দেখা যায়।

পরে কোয়েন্টিন টারান্টিনোর ‘ওয়ানস আপন আ টাইম ইন হলিউড’ আর নেটফ্লিক্সের দুই সিরিজ ‘ফোসে/ভারডন’, ‘মেইড’ সমালোচকদের কাছে তাঁর আলাদা গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করে। ‘দ্য সাবস্ট্যান্স’ দিয়ে কোয়ালি ক্যারিয়ার আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল।

‘দ্য সাবস্ট্যান্স’ সিনেমায় মার্গারেট কোয়ালি। আইএমডিবি
‘দ্য সাবস্ট্যান্স’ সিনেমায় মার্গারেট কোয়ালি। আইএমডিবি

অ্যামাজনে অন্ধকার জীবনের গল্প: স্বর্ণের বিনিময়ে যৌনতা

অ্যামাজনের গভীরে বেআইনি খনি শ্রমিকদের মনোরঞ্জন করে বেঁচে আছেন কিছু নারী। তারা অর্থের বিনিময়ে শরীরকে বিক্রি করেন শ্রমিকদের কাছে। এমনই একজন নারী ডয়েনে লেইতে। কখনো তিনি নিজে যৌনকর্মী হতে চাননি। তার বয়স যখন ১৭ বছর তখন হার্টঅ্যাটাকে মারা যান তার স্বামী। কিন্তু স্বামীর লাশের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করার মতো অর্থ ছিল না তার হাতে। শরীর বিকিয়ে সেই অর্থ সংগ্রহ করতে হয়েছে তাকে। তার বাস ব্রাজিলের উত্তরাঞ্চলে পারা রাজ্যের ইতাইতুবা শহরে। স্বর্ণ খনি থেকে বেআইনিভাবে স্বর্ণ আহরণের জন্য এই শহরটি সুপরিচিত। স্বামী মারা যাওয়ার পর ডয়েনে লেইতে’কে তার বন্ধুরা পরামর্শ দেন খনি শ্রমিকদের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পাদনের অর্থ সংগ্রহ করতে। তিনি তা-ই করেন। সেই থেকে শুরু। গুরুতর অবমাননাজনক এক পরিস্থিতিতে, একদিকে স্বামীর লাশ, অন্যদিকে তার সৎকারের জন্য অর্থের প্রয়োজন- কি এক কঠিন অবস্থার মধ্যদিয়ে যেতে হয়েছে তাকে, ভাবলেই গা শিউরে ওঠে। বর্তমান সময়ের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তিনি বলেন-  বেডরুমে ঘুমাচ্ছিলাম। হঠাৎ জানালা দিয়ে লাফিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলো এক যুবক। অস্ত্র তাক করলো আমার মাথায়। অর্থ দিয়ে শরীর ভোগ করলো।

ডয়েনে লেইতে বলেন, তার ১৭ বছর বয়সে স্বামী মারা যান। ১৮ বছর বয়সে প্রথম সন্তানের জন্ম দেন। তারপর থেকে ইতাইতুবার অন্য নারীদের মতো গত ১৬ বছর ধরে দিন কাটছে তার। তাকে বার বার খনি শ্রমিকদের কাছে একজন রন্ধনশিল্পী, একজন কাপড় কাচার কর্মী, একজন বারবনিতা আবার কখনো যৌনকর্মী হিসেবে ফিরে যেতে হয়। এখন তার পরিবারে আছে ৭ জন। তাদের দেখভালের দায়িত্ব লেইতের। ২৪ বছর বয়সে প্রত্যন্ত এক অঞ্চলের নাতালিয়া কাভালকান্তে যৌনকর্মী হয়েছিলেন। তিনি বলেন, আমি বলছি না যে, এই শহরের সব নারীই যৌনকর্মী। তবে তাদের বেশির ভাগই এই কাজ করেন। এটা এখানে একটি স্বাভাবিক বিষয়। এসব নিয়ে আমরা মাথা ঘামাই না। এক বারের মালিককে বিয়ে করেন তিনি। এর চার বছর পর এক নিষিদ্ধপল্লীর মাসি হয়ে যান তিনি। তবে সম্প্রতি এই দায়িত্ব থেকে সরে এসেছেন। তার ভাতিজিদের দেখভালের জন্য এ পেশা ত্যাগ করেছেন।
অ্যামাজনের রেইনফরেস্ট অঞ্চলে খনি শ্রমিকদের জীবন বড়ই কঠিন। সেখানে দু’একটি সেলুন বার আছে। আর আছে দু’একটা চার্চ। তবে খনি শ্রমিকরা নিজেদেরকে তা থেকে দূরে রাখেন। তারা বসবাস করেন কাঠ ও মোটা ক্যানভাসে তৈরি ঘরসদৃশ ঠিকানায়। এর চারপাশে হানা দেয় সাপ, বাঘ। একবার জেনারেটরের সুইচ বন্ধ হয়ে গেলে পুরোপুরি অন্ধকারে ডুবে যান সবাই। যেসব নারী তাদের জন্য খাবার রান্না করেন তাদেরকে এর মধ্যেই পুরুষদের পাশাপাশি অবস্থান করতে হয়। নাতালিয়া বলেন, শ্রমিকরা যখন কিছু স্বর্ণ খুঁজে পান, তাদের হাতে কিছু অর্থ আসে- তখনই তারা গ্রামে ফেরেন। নারীরা বলেন, এসব শ্রমিক শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের আগে গোসল করেন। ব্রাজিলের আইনে নিষিদ্ধপল্লী চালানো বেআইনি। কিন্তু নাতালিয়া বলেন, তিনি কোনো কমিশন নেননি। তিনি শুধু বার-এর স্টাফদের কাজ দিয়েছেন। খদ্দেরদের কাছে রুম ভাড়া দিয়েছেন। যুবতীরা তার কাছে ‘কাজ’ চেয়ে যোগাযোগ করেন। এসব যুবতীকে অনেক সময় সেখানে যাওয়ার জন্য অর্থ পর্যন্ত দেন তিনি। কারণ মূল ইতাইতুবা থেকে এই স্থান সাত ঘণ্টার গাড়ির পথ। অন্য নারীদের এই কাজে যুক্ত করার জন্য তিনি ভুল করেছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে নাতালিয়া বলেন, কখনো কখনো মনে হয় এ কাজ ছিল না। আবার ভাবি, এসব মেয়েরও তো পরিবার আছে। কারও কারও সন্তান আছে। তাদেরকে মানুষ করতে হয়। অনেক মেয়ের একটি বা দু’টি সন্তান আছে। এ জন্য এটাকে মেনে নিয়েছি।

বিয়ের আগেই নাতালিয়া বেশ অর্থের মালিক হয়ে যান। ইতাইতুবায় এখন তার নিজের একটি বাড়ি আছে। একটি মোটরসাইকেল আছে। উল্লেখযোগ্য পরিমাণে স্বর্ণ আছে। এসব স্বর্ণ অনেক সময় তিনি শারীরিক সম্পর্কের বিনিময়ে পেয়েছেন। এক একবার দুই বা তিন গ্রাম স্বর্ণ পেয়েছেন। তার লক্ষ্য পড়াশোনা করে একজন আইনজীবী বা আর্কিটেক্ট হওয়া। ইতাইতুবাকে গোল্ড নাগেট সিটি নামেও ডাকা হয়। সেখানে এভাবে শরীর বিলিয়ে অনেক মেয়ে নিজের ব্যবসা দাঁড় করেছেন। কিন্তু সেখানে ভয়ের কারণও আছে। জাতিসংঘ বলছে, সেখানে যৌন সহিংসতা আছে। বিপথগামী করানোর ঝুঁকি আছে। পাচারের রিপোর্ট আছে। এসব বিষয়ে তেমন রিপোর্ট প্রকাশ হয় না।

ছবি : সংগৃহীত
ছবি : সংগৃহীত (কালবেলা)

mzamin

লিবিয়ায় ৩ মাস ধরে খোঁজ নেই অপহৃত আলীর by ওয়েছ খছরু

তিন মাস আগের কথা। একদিন জগন্নাথের বাড়িতে থাকা মাকে ভিডিও কলে বার্তা দেন লিবিয়ায় অপহরণকারীদের হাতে বন্দি আলী হোসেন। এ বার্তায় দেখা গেছে, আলী হোসেনের পাশে বসে আছে এক অপহরণকারী যুবক। আর পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল আলী হোসেন। বলছিল; ‘মা টাকা পাঠাও, নতুবা ওরা আমাকে মেরে ফেলবে।’ এই ভিডিও বার্তায় দেশে থাকা স্বজনরা আতঙ্কিত হয়ে উঠেন। কিছু টাকা দিয়েছিলেন সিলেটে থাকা অপহরণকারীদের এজেন্ট ফয়সলের হাতে। তবুও ৩ মাস ধরে খোঁজ নেই আলী হোসেনের। কোথায় আছে- কেমন আছে- জানে না পরিবারও। অন্যদিকে দেশে থাকা এজেন্ট ফয়সল মিয়াও গা-ঢাকা দিয়েছেন। সন্তানের কোনো খোঁজ না পেয়ে কয়েক দিন আগে সিলেটের আদালতে মানব পাচার আইনে ১২ জনকে আসামি করে মামলা করেন আলী হোসেনের পিতা আবুল হক। পরে আদালতের নির্দেশে বুধবার এ মামলাটি রেকর্ড করেছে কোতোয়ালি থানা পুলিশ। লিবিয়ায় থাকা আলী হোসেনের বাড়ি জগন্নাথপুর উপজেলার শ্রীধরপাশা গ্রামে। ৫ বছর আগে স্পেনে নেয়ার কথা বলে তাকে দুবাই হয়ে লিবিয়া নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর থেকে তাকে অজ্ঞাত স্থানে রেখে দফায় দফায় দেশে থাকা পরিবারের কাছ থেকে ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে অপহরণকারীরা। ঘটনার মূল হোতা ফয়সল মিয়া। তাকে মামলার প্রধান আসামি করা হয়েছে। তার বাড়িও শ্রীধরপাশা গ্রামে। বিগত ১৫ বছর সাবেক মন্ত্রী এম এ মান্নানের নিকটজন পরিচয় দিয়ে ঘটিয়ে গেছেন অপরাধ কর্মকাণ্ড। তার বিরুদ্ধে রয়েছে মানব পাচারের গুরুতর অভিযোগ। ফয়ছলের এ সাম্রাজ্য বাংলাদেশ থেকে লিবিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত। ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে তার কাছে টাকা দিয়ে সিলেট বিভাগসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অনেক যুবক আজ নিঃস্ব। এ ছাড়া লিবিয়ায় অনেককে আটকে রেখে পরিবারের কাছ থেকে বার বার টাকা নেয়ারও অনেক অভিযোগ আছে ফয়ছলের বিরুদ্ধে। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে- আবুল হকের ছেলে আলী হোসেনকে লিবিয়ায় নিয়ে গিয়ে মাফিয়া চক্র দিয়ে আটকে রেখে অমানবিক নির্যাতন করে ভিডিও চিত্র ধারণ করে সেই ভিডিও মা-বাবার কাছে পাঠিয়ে ফয়ছল ও তার সহযোগী মকবুল হাতিয়ে নিয়েছেন প্রায় ২৫ লাখ টাকা। টাকা নিয়েও ফয়ছল তার লিবিয়ার এজেন্টদের কাছ থেকে আলী হোসেনকে ছাড়িয়ে আনেননি, বরং আরও ১০ লাখ টাকা দাবি করে আলী হোসেনের ওপর নির্যাতন চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। অবশেষে ছেলেকে জীবিত ফিরে পেতে ২৭শে নভেম্বর সিলেট মানব পাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে ফয়ছল ও  মকবুলসহ মানব পাচারকারী চক্রের নাম উল্লেখ করে মামলার আবেদন করেন আবুল হক। আভিযোগটি আমলে নিয়ে বুধবার সিলেট কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশকে এফআইআরের নির্দেশনা দেন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. সাইফুর রহমান। পরে সেটি কোতোয়ালি থানায় রেকর্ড হয়। মামলার আসামিরা হচ্ছে ফয়সলের বাড়ির মকবুল মিয়া, হাসান নুর, সাইফুল ইসলাম, ছালাতুর রহমান, সিরাজুল ইসলাম শিরু, সামছুল ইসলাম, এনাম আহমদ, নজরুল ইসলাম, সালেহ, শাহীন ও জিলু মিয়া। সবার বাড়ি জগন্নাথপুর উপজেলায় বলে জানান মামলার বাদী আবুল হক। তিনি জানিয়েছেন- ফয়ছল ও মকবুল এবং তাদের সহযোগীরা শুধু আমার ছেলেই নয়- সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকার প্রায় ৭০-৮০ জন যুবককে  ইতালি নেয়ার কথা বলে লিবিয়ায় নিজস্ব মাফিয়া এজেন্টদের কাছে আটক রেখে ফয়ছল ও মকবুল ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে কয়েক কোটি টাকা। বাধ্য হয়ে আমি আদালতের দ্বারস্থ হয়েছি, আমার ছেলেকে জীবিত ফেরত পেতে সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরকে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে জোর দাবি জানাচ্ছি। সিলেটের কোতোয়ালি থানা পুলিশ জানিয়েছে- মানব পাচার আইনে দায়ের করা এ মামলাটি এসআই মুকিত মিয়াকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আদালত আগামী ২রা মার্চের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট জমা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে; মামলার প্রধান আসামি ফয়সল সহ অন্যরা পলাতক থাকায় তাদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হচ্ছে না। মামলা দায়েরের পর থেকে আসামিরা মোবাইল ফোনও বন্ধ রেখেছেন। এ ব্যাপারে প্রধান অভিযুক্ত ফয়সলের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, সিলেটে ফয়সল ও লিবিয়ায় এনাম মিলে মানব পাচার সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে। এনামের নেতৃত্বে তাদের এলাকার কয়েকজন যুবক লিবিয়ায় টাকার বিনিময়ে যুবকদের নিয়ে ইউরোপে পাঠিয়ে বন্দি করে রাখছে। এরপর তাদের পরিবারের কাছ থেকে লুটে নিচ্ছে টাকা। এই অবস্থায় সাড়ে তিন মাস ধরে আলী হোসেনের খোঁজ না পেয়ে পরিবারের সদস্যদের দুশ্চিন্তার অন্ত নেই। আলীর পিতা-মাতা জানান, ছেলেকে দেশে ফিরিয়ে আনতে আমরা দফায় দফায় টাকা দিয়েছি।  স্পেনে পাঠানোর জন্য মোট ১৫ লাখ টাকার চুক্তি হয়। সেই টাকা দেয়ার পরও ছেলেকে ফেরত পেতে আরও অতিরিক্ত টাকা দেয়া হয়েছে। এরপর টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে দেশে থাকা ফয়সলের নেতৃত্বে মানব পাচার সিন্ডিকেট তাদের কাছ থেকে  চেক বইয়ের পাতা ও ব্ল্যাংক স্ট্যাম্পে দস্তখত নিয়ে রেখেছে। এরপরও আলী হোসেনকে তারা ফিরিয়ে দেয়নি। ওই চেক ও স্ট্যাম্প দিয়ে তাদের হয়রানি করা হতে পারে বলে আশঙ্কা করেন পরিবারের সদস্যরা।
mzamin
আলীর পাশে বসে আছে অপহরণকারী

কম দামের পণ্য শেষ হয়ে যায়, লাইন শেষ হয় না by সুদীপ অধিকারী ও আরিফুল ইসলাম

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে বাজারে হাঁসফাঁস অবস্থা। কাঁচা সবজি থেকে মাছ, মাংস, চাল, ডাল, তেল- এমন কোনো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য নেই যা কিনতে ঘাম ঝরছে না সাধারণ মানুষের। তাই একটু স্বস্তিতে পণ্য কিনতে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)-এর ট্রাক সেল ও ওএমএস ট্রাক সেল সেন্টারে ছুটছে সাধারণ মানুষ। তবে চাহিদার তুলনায় জোগান কম থাকায় দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়েও পণ্য না পেয়ে খালি হাতে ফিরছেন অনেকে। টিসিবি-ওএমএস-এর ট্রাকে পণ্য কিনতে আসা ক্রেতারা বলছেন- লাইন শেষ হওয়ার আগেই পণ্য শেষ হয়ে যায়।

সরজমিন দেখা যায়, মোহাম্মদপুর বসিলা এলাকার র‌্যাব ক্যাম্পের ঠিক উল্টো পাশে টিসিবি ট্রাক সেল কার্যক্রম চলছে। ট্রাক সেলের ব্যানারে ৩০ টাকা কেজি দরে চাল, ৬০টাকা কেজি মশুর ডাল ও ১০০ টাকা লিটার তেল বিক্রি করার কথা উল্লেখ থাকলেও চাল পাননি অনেকে। চালের বদলে টিসিবি’র ট্রাকে দেয়া হচ্ছে আলু। আর টিসিবি’র এসব পণ্য নিতেই প্রখর রোদের মধ্যেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঠায় লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন অন্তত এক থেকে দেড়শ’ মানুষ। যাদের বেশির ভাগই নারী। কেউ এসেছেন কোলে বাচ্চা নিয়ে, কেউ আবার ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধা। নিম্ন আয়ের মানুষের পাশাপাশি আছেন মধ্যবিত্ত পরিবারেরও অনেক সদস্য। অনেকে মুখে মাস্ক লাগিয়ে দাঁড়ান লাইনে।

তাদের একজন রাবেয়া বেগম। কোলে তিন মাসের শিশু নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন টিসিবি’র লাইনে। রোদ থেকে শিশুকে রক্ষার জন্য বার বার তার মাথায় কাপড় জড়িয়ে দিচ্ছিলেন। রাবেয়া বলেন, আমার স্বামী আগে ছোটখাটো একটা ব্যবসা করতেন। এখন তার ব্যবসাটা ভালো চলে না। এরপর বাজারে পণ্যের যে দাম কিছু কেনা যায় না। এক কেজি ভালো চাল বর্তমানে ৭৫ টাকার নিচে পাওয়া যায় না। মাছ, মাংস, সবজি এমন কিছু নেই যে, যার দাম বাড়েনি। তাই এখানে এসেছি একটু কম দামে পণ্য কিনবো বলে। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও আমাদের খালি হাতে ফিরতে হয়। সবাই পণ্য পাই না। আমার এই ছোট্ট বাচ্চা নিয়ে লাইনে দেড় ঘণ্টার বেশি সময় দাঁড়িয়ে আছি, তারপরও পণ্য পাবো কিনা জানি না। তিনি বলেন, আমাদের এই এলাকায় হাজার হাজার লোক। কিন্তু এখানে টিসিবি’র গাড়ি আসে সপ্তাহে এক থেকে সর্বোচ্চ দুইবার। আর যা নিয়ে আসে কয়েকজনকে দেয়ার পরই পণ্য শেষ। রাবেয়ার সঙ্গে কথা বলতে বলতেই পেছন দিক থেকে ছুটে আসেন তৈয়বা খানম নামে ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধা। তিনি অভিযোগ করে বলেন, আমি গত সপ্তাহে ৩-৪ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও কিছু পাইনি। সপ্তাহ জুড়ে অনেক কষ্ট করেছি। আজকে আবার এসেছি। ঘণ্টাখানেক দাঁড়িয়ে আছি কোনো খবর নেই। তিনি বলেন, আমার স্বামী প্যারালাইজড। কোনো কাজ করতে পারে না। আমি এদিক ওদিক কাজ করে যা পাই তাই দিয়ে সংসার চালাই। অসুস্থ স্বামীকে বাসায় রেখে এসেছি। কতোবার এদের বললাম-আমি বৃদ্ধ মানুষ। আমাকে বাসায় যেতে হবে, আমাকে একটু আগে দিয়ে দেন। কিন্তু কেউ কথা শোনে না। আজকেও যদি লাইনে দাঁড়িয়ে কিছু না জোটে তাহলে না খেয়েই থাকতে হবে আমাদের দুই বুড়ো-বুড়িকে। রাবেয়া ও তৈয়বার সঙ্গে যখন কথা হচ্ছে এই প্রতিবেদকের তখন মুখে মাস্ক পরে লাইনে দাঁড়িয়ে বাজারের ব্যাগ দিয়ে বার বার মুখ ঢাকছিলেন মধ্য বয়সী এক পুরুষ। তিনি বলেন, আসলে আমি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের এই স্বল্প আয়ের টাকা দিয়ে পুরো সংসারের খরচ চালানো কষ্টসাধ্য হয়ে যাচ্ছে। তাই বাধ্য হয়েই একটু খরচ পোষাতে এই টিসিবি’র লাইনে এসে দাঁড়িয়েছি।

নাসরিন আক্তার নামে আরেক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, টিসিবি’র গাড়ি আসার কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। কখনো ১২টায় আসে, কখনো আবার ২টায়। আগের দিন সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থেকেও মাল পাইনি। তাই আজকে আবার এসেছি। এখানে একজন ২  কেজি ডাল, ২ লিটার তেল আর ৫ কেজি চাল কিনতে পারে। কিন্তু এখন আর টিসিবি’র গাড়িতে চাল পাওয়া যায় না। চালের বদলে আলু দেয়া হচ্ছে। তারও মান ভালো না। এরপর এরা পণ্য অনেক কম আনে। মানুষের দাঁড়িয়ে থাকা লাইন দেখিয়ে তিনি বলেন, এই যে এত মানুষ দাঁড়িয়ে। সামনে যারা আছে তারাই শুধু পাবে। বাকিদের খালি হাতে ফিরে যেতে হবে।

এসব বিষয়ে টিসিবি’র ট্রাক সেলের দায়িত্বে থাকা মো. মামুন ও পরিচালনার কাজে থাকা মো. স্বপন বলেন, শুক্রবার বাদে আমরা সপ্তাহে প্রতিদিনই এই টিসিবি’র পণ্য বিক্রি করি। একেক দিন একেক স্পটে। আজকে এখানে এসেছি। তিনি বলেন, আজকের এই স্পটের ৪শ’ লোকের জন্য ৮শ’ লিটার সয়াবিন তেল, ৮শ’ কেজি মশুর ডাল ও চাল নিয়ে এসেছি। কিন্তু তারপরও অর্ধেকের বেশি মানুষ পণ্য পাবে না। কারণ এর চাহিদার কোনো শেষ নেই। রাত বারোটা পর্যন্তও যদি আমরা বিক্রি করি তখনো পণ্য নিতে আসবে মানুষ। কারণ এখানে যেই দামে পণ্য পাবে তা বাজারে পাবে না। কিন্তু জোগান সীমিত হওয়ায় আমাদের কিছু করার থাকে না। যতটুকু পাই ততটুকুই মানুষের মাঝে সুলভ মূল্যে বিতরণ করি। যতক্ষণ আমাদের মাল থাকবে ততক্ষণ আমরা বিতরণ করবো।

এদিকে একই দিনে মোহাম্মদপুর বুদ্ধিজীবী এলাকায় ওএমএস-এর ট্রাক সেলের আওতায় নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কম দামে চাল ও আটা বিক্রি করা হয়। সেখানে গিয়েও দেখা যায় চাহিদার তুলনায় ক্রেতা বেশি। ১৫০ টাকায় ৫ কেজি চাল ও ১৩০ টাকায় ৫ কেজি আটা নিতে ভিড় করেছেন অসংখ্য মানুষ। আটা-চাল দিতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে ট্রাক সেলের দায়িত্বে থাকারা। ওএমএস-এর লাইনে দাঁড়ানো আঁখি আক্তার নামে বুদ্ধিজীবী এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, ৩৮০ টাকা প্যাকেজে এখানে আমরা একেক জন সর্বোচ্চ ৫ কেজি আটা এবং ৫ কেজি চাল কিনতে পারি। বাজার থেকে অনেক কমে পাওয়া যায়- তাই এখানে আসা। কিন্তু যত মানুষ এখানে আসে তারচেয়ে পণ্য খুব কম থাকে। আজকে কিছু না পেলে আবার তিন দিন অপেক্ষা করতে হবে। তাই চেষ্টা করছি- যেভাবেই হোক না কেন ৫ কেজি চাল নিতেই হবে। তা না হলে না খেয়ে থাকতে হবে।

এলাকাটির ওএমএস-এর ট্রাক সেলের দায়িত্বে থাকা খাদ্য মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শক মো. নান্নু মিয়া বলেন, এই এলাকায় নিম্ন আয়ের মানুষের বসবাস বেশি। তাই আমরা এখানে সপ্তাহে তিন দিন আসি। আজকে রায়েরবাজার বধ্যভূমির সামনে ১ টন চাল ও ২ টন আটা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। কিন্তু পণ্যের জোগানের তুলনায় মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি। তাই সকলকে পণ্য দেয়া সম্ভব হয় না। যতক্ষণ আমাদের মাল থাকে ততক্ষণ আমাদের লোক দিতে থাকবে। তিনি বলেন, মোহাম্মদপুর, আদাবর, তেজগাঁও এলাকা মিলে মোট ২৩টি স্থানে ওএমএস-এর পণ্য সুলভ মূল্যে বিক্রয় করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

অপরদিকে তেজগাঁও রেলগেটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাক থেকে টিসিবি’র পণ্য নিতে আসা শিল্পী বেগম বলেন, সকাল ১০টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। গত দুই/তিন দিন লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও পণ্য নিতে পারিনি। যারা নিয়েছেন অনেকে তিন চারবার করে এসে নিয়ে গেছেন। সাফিয়া বেগম নামে ৭০ বছর বয়সী এক নারী এসেছেন টিসিবি’র পণ্য নিতে। তিনি বলেন, গত দুই দিন আমি এসে কিছুই পাইনি। সকাল থেকে বসে থেকে সন্ধ্যায় খালি হাতে ফিরে গিয়েছি। আগে অন্যজন দিতেন তিনি বেশির ভাগ সময়েই তার পরিচিত মানুষদের দেখে দেখে দিতেন বলেও অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, আমার ছেলে নাই। একা মানুষ আমি। কম দাম হওয়ায় এগুলো নিতে আসি কষ্ট করে। দাঁড়িয়ে থাকতে পারি না, তাই হাতে সিরিয়াল নাম্বার লিখে দিচ্ছেন। পাশে বসে রয়েছি, সিরিয়াল কখন আসবে জানি না। হাতে সিরিয়াল লিখে দেয়ার বিষয়ে টিসিবি পণ্য বিতরণকারী ওয়ালিদ বলেন, লাইনে দাঁড় করিয়ে যাতে কোনো বিশৃঙ্খলা না হয় এজন্য সিরিয়াল নাম্বার হাতের উপরে লিখে দিয়েছি।

এসব বিষয়ে টিসিবি’র মুখপাত্র মো. হুমায়ুন কবির বলেন, ট্রাক সেলে পণ্য বিক্রিতে নানা রকম ভোগান্তি ও বিশৃঙ্খলার কথা আমরাও শুনেছি। এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে আমরা চেষ্টা করছি। খাদ্য অধিদপ্তর থেকে চাল সরবরাহ না করায়, আমরা চাল দিতে পারছি না বলেও জানান তিনি। 

mzamin

আমরা সবাই এক পরিবার: ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার বৈঠক

দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ও ধর্মীয় সম্প্রীতি অক্ষুণ্ন রাখার ব্যাপারে ঐকমত্য হয়েছেন ধর্মীয় নেতারা। বলেছেন, বাংলাদেশে সবাই ভাই-ভাই। এখানে কোনো ভেদাভেদ নেই। পরাজিত শক্তি দেশের বাইরে বসে প্রোগাগান্ডা চালাচ্ছে। তাদের প্রোপাগান্ডায় কেউ পা দেবে না। এ দেশে সব ধর্ম সব মতের সমান অধিকার। দেশ সবার। সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে স্বাধীনভাবে ধর্মীয় চর্চা করবেন। কেউ এতে বাধা দিতে পারবে না। গতকাল প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাতে এসব কথা জানিয়েছেন ধর্মীয় নেতারা। সরকারপ্রধান ধর্ম ও পার্থক্য থাকলেও বাংলাদেশের সব মানুষ একই পরিবারের সদস্য বলে মন্তব্য করেন। বলেন, আমাদের নানা মত, নানা ধর্ম থাকবে, নানা রীতিনীতি থাকবে কিন্তু আমরা সবাই একই পরিবারের সদস্য। আমাদের সবার সমান অধিকার, বলার অধিকার, ধর্মের অধিকার, কাজকর্মের অধিকার। সেটা এসেছে সংবিধান থেকে। যেটা নাগরিক হিসেবে প্রাপ্য, রাষ্ট্রের দায়িত্ব সেটা নিশ্চিত করা। রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে অনুষ্ঠিত এ বৈঠক প্রধান উপদেষ্টার ধারাবাহিক বৈঠকের শেষ পর্ব। বৈঠকে হিন্দু- বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান-মুসলমান, গারোসহ সব ধর্ম ও মতের লোক উপস্থিত ছিলেন। হিন্দু নেতারা যারা এ বৈঠকে উপস্থিত হননি সামনের দিনে তাদেরও নিয়ে আসার দাবি করেন। এছাড়াও দু’-একটি ঘটনা যে ঘটছে সে বিষয়ে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ দাবি করেন। হিন্দু নেতারা ইসকনের সাবেক নেতা চিন্ময় কৃষ্ণ ব্রহ্মাচারীর মুক্তি দাবি করেন। অন্যদিকে এক বৌদ্ধ নেতা একটি আন্তর্জাতিক ধর্মীয় সম্মেলন করার প্রস্তাব দেন। মুসলিম নেতারাও সম্প্রীতির বার্তা দেন। তারা বলেন, পরাজিত শক্তি বিদেশে বসে অপপ্রচার চালাচ্ছে। এদেশে হিন্দু-মুসলিম-খ্রিষ্টান বৌদ্ধ ভাই ভাই। সবার সমান অধিকার। মুসলমানরা দেশের শান্তি-শৃঙ্খলার স্বার্থে কোনো উস্কানিতে পা দেননি। আগামী দিনেও এটি বজায় রাখতে চান তারা। বৈঠকে ইসলামী বক্তা শায়েখ আহমদুল্লাহ, কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার, হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব সাজেদুর রহমান, হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতা মুহিউদ্দিন রাব্বানী, জুনায়েদ আল হাবিব ও মুনির হোসাইন কাসেমী, বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের (বেফাক) মহাসচিব মাহফুজুল হক, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব আবদুল মালেক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রফেসর ড. সুকমল বড়ুয়া, রমনা হরিচাঁদ মন্দিরের সহ-সম্পাদক অমিনাষ মিত্র, গারো সম্প্রদায় থেকে পুরোহিত জনসং ম্রি থমাল, বাংলাদেশ বুদ্ধিস্ট ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ভিক্ষু সুনন্দপ্রিয়, রমনা সেন্ট ম্যারিজ ক্যাথেড্রালের প্রধান পুরোহিত আলবার্ট রোজারিও প্রমুখ। এছাড়া উপদেষ্টাদের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা, ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হাসান, মাহফুজ আলম, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা ডা. বিধান রঞ্জন সাহা প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, শুনলাম এখনো সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা হচ্ছে। তাই আমি সবাইকে নিয়ে বসলাম এটা থেকে কীভাবে উদ্ধার হওয়া যায়। ভুল তথ্যের বিষয়ে সবাইকে সজাগ ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে ড. ইউনূস বলেন, এখন আবার নতুন কথা হামলা হচ্ছে, অত্যাচার শুরু হচ্ছে। বিদেশি গণমাধ্যম বলবো না প্রচার মাধ্যমে প্রচারিত হচ্ছে। আমি খোঁজ নিচ্ছি, কী হচ্ছে। সবদিকে দেখলাম এটা হচ্ছে না। তথ্যের মধ্যে বিশাল ফারাক আছে। এটা ঠিক না। এটার অবসান হতে হবে।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমরা যে তথ্য পাচ্ছি তা ভুল হতে পারে। তথ্যের ওপর বসে থাকার কিছুই নেই, এটার অর্থ অন্ধের মতো বসে থাকা। ভেতরে গিয়ে দেখতে হবে। খোঁজ নিতে হবে তথ্যের গরমিল কেন? তাতে ওরা যা বলছে তা কি মিথ্যা প্রচার? না আমরা যা বলছি তা মিথ্যা প্রচার। সত্যটা কোথায়?

তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্যের কোনো ফারাক নেই। সঠিক তথ্য কীভাবে পাবো, সেটা আমাদের জানা প্রয়োজন। প্রকৃত তথ্যের ক্ষেত্রে অনেক সময় সরকারি তথ্যের ওপর ভরসা করে লাভ নেই। কারণ কর্তা যা চায়, তারা সেভাবে বলে। আসলটা মন খুলে বলতে চায় না। আমরা আসল খবরটা জানতে চাই। সেই প্রক্রিয়াটা প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। এত বড় দেশে যে কোনো ঘটনা ঘটতে পারে, কিন্তু প্রকৃত তথ্য জানতে চাই। তাৎক্ষণিক খবর পেলে যাতে সমাধান করা যায়। যেদিক থেকেই হোক, দোষী দোষীই। তাকে বিচারের আওতায় আনা সরকারের দায়িত্ব।

ড. ইউনূস বলেন, প্রথম কথাটা হলো, এগুলো না হওয়ার পরিবেশ সৃষ্টি করা। আর হয়ে গেলে তাৎক্ষণিক প্রতিকারের ব্যবস্থা করা। আমি যা বলছি তা দেশের বেশির ভাগ মানুষ মনে করে। আমরা এক পরিবারের মানুষ হিসেবে সামগ্রিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারি। সেখানে তথ্য ও প্রতিকার হলো বড় বিষয়।

তিনি বলেন, আমি পেলাম তথ্য কিন্তু প্রতিকার পেলাম না। সমস্যা হয়ে গেলে সমাধান করতে হবে। আজকের আলোচনা খোলাখুলি, আমরা সবাই আলোচনা করবো। আমাদের লক্ষ্যে কোনো বাধা নেই। তথ্যপ্রবাহ কীভাবে পাব, দোষীকে কীভাবে ধরবো। যাতে সবাই সঠিক তথ্যটা পেয়ে যায়।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এমন বাংলাদেশ আমরা গড়ে তুলতে চাই। যার নাম দিয়েছি নতুন বাংলাদেশ। এটা আমাদের করতে হবে। আপনাদের কথা বলে সন্তুষ্ট করে আজকের মতো বিদায় দিলাম, তা নয়। এটা দ্রুত করতে হবে।

মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, আপনাদের কথার মধ্যে যেগুলো এসেছে, একটা হলো ক্ষোভ। আমরা সবাই এমনিতে শান্তিতে আছি। কিছু একটা ঘটনা আমাদের একটা ক্ষোভ সৃষ্টি করে। পানিতে ঢিল ছোড়ার মতো ঢেউ শুরু হয়ে যায়। এই ক্ষোভ যদি আমরা সামাল দিতে না পারি তাহলে আমরা আবার আমাদের মাথায় যত কথাই থাকুক না কেন, এটা থেকে বিচ্যুতি হয়ে যাই। আর ঘটনা যদি ঘটেই যায় তাহলে ক্ষোভটা সংবরণ করা। এটার সঙ্গে সঙ্গে যদি আমরা উত্তেজিত হয়ে যাই তাহলে আমরা যত কিছুই করি, সে সমস্ত কিছু গোলমাল হয়ে গেল।

তিনি বলেন, ঘটনা ঘটবে, আমাদের দেশে কম ঘটবে। কিন্তু আমাদের ক্ষোভ সংবরণ করতে হবে। যাতে এই ক্ষোভের আরেকটা কারণ সৃষ্টি না হয়। ওই ক্ষোভ থেকে আমাদের আত্মসংবরণ করা। এটা আমাদের সবার অত্যন্ত জরুরি জিনিস। দ্বিতীয় হলো- একটা দল ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে আমরা এখান থেকে বিতাড়িত করেছি। তারা কিন্তু তাতে শেষ হয়ে যায়নি। সম্পূর্ণ সমাপ্ত মনে করে নাই। দেশে-বিদেশে তারা অবস্থান করছেন। তারা সুযোগ পেলেই উস্কানিমূলক কিছু একটা করবে। এই উস্কানিকে কীভাবে আমা নিশ্চিহ্ন করতে পারবো এবং উস্কানিতে সাড়া না দেয়া। এটা থেকে আমরা কীভাবে বাঁচবো। আমরা সবদিকেই ঠিক আছি। কিন্তু বাইরে থেকে আসছে। একটা ক্ষোভ ও উস্কানি সৃষ্টি করছে। উস্কানিটা এমনভাবে করে, বোঝা যায় না যে, এটা উস্কানি।

ড. ইউনূস বলেন, আবার বহির্বিশ্বে কেউ কেউ আছে, যারা আমাদের বিভিন্ন উস্কানির সূত্রপাত করে। তাদের দেশের যারা সংখ্যালঘু, তাদের ওপরে যে হয়রানি। সেটা আমাদের মনে ক্ষোভ সৃষ্টি করবে। এটা আমাদের কারণে হচ্ছে? হচ্ছে বাইরে কারণে। পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় এবং রাজনৈতিকভাবে প্রতিকারও সম্ভব হবে। আমরা ওদিকে চলে যেতে পারি কিনা? এই দু’টি জিনিসকে আমি গুরুত্ব দিচ্ছি। যাতে বারবার আমরা স্বীকার না হই।

তিনি বলেন, এখন আমরা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা বলছি। আছে বলেই আমরা একমত হলাম যে, আমাদের সম্প্রীতি আছে। সম্প্রীতির সঙ্গে আমি আরেকটা জিনিস যোগ করতে চাই, সেটা হচ্ছে ভয়। সম্প্রীতি আছে। কিন্তু মনের মধ্যে ভয়ও আছে। এই ভয় থেকে কেমনে আমরা উত্তোলন করবো। আমরা নাগরিক, নির্ভয়ের নাগরিক। ভয়ের সঙ্গে নাগরিক না। এমন পরিস্থিতি আমরা করবো যে, আমরা কেউ কাউকে আর ভয় করছি না। ভয়মুক্ত নাগরিক হবো। নাগরিক অধিকারও থাকবে এবং নিজের মনের ভিতরে ভয়টা আর থাকবে না। এটা যদি আমরা করতে পারি তাহলে এটা হবে আমাদের আদর্শ। যেখানে আমরা যাওয়ার চেষ্টা করছি। আর আমরা সম্প্রীতির কথা বলি, সম্প্রীতির মধ্যেও কিন্তু একটা ভয় আছে। ভয় না থাকলে সম্প্রীতির কথাটা আসতো না।  

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ এখন নতুনভাবে জন্ম লাভ করছে। শুধু যে সামরিকভাবে দুর্ঘটনা ঘটেছে, সেজন্য আমরা আলাপ করছি, শুধু তা না। আমরা এমন একটা বাংলাদেশ করবো, দুর্ঘটনা ঘটবেও না। আর ঘটলেও শান্তিপূর্ণভাবে এটাকে আমরা সামাল দিতে পারবো। এধরনের একটা রাষ্ট্র যাতে আমরা গঠন করতে পারি। একজন নাগিরক আরেকজন নাগরিককে ভয় পাবে না। আমরা নিশ্চিতভাবে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে পারি, ভিন্নভাবে। বর্তমানে যা আছে তার কিছুটা রদবদল করে না। একেবারে কাঠামোগতভাবে পরিষ্কার করে। নতুন সূত্রে গাঁথা।

রমনা হরিচাঁদ মন্দিরের সহ-সম্পাদক অমিনাষ মিত্র বলেন, আমরা বাংলাদেশে সবাই ভালো আছি। এখানে সব ধর্মের লোক আছি। কোনো বিভেদ নেই। তাহলে যে বিভেদ হচ্ছে সেটা কোথায়, কারা করছে? যারা করছে তাদের লোক ওখানে (ভারতে) বসে এ বিভেদটা করছে। আমাদের মধ্যে বিভেদ নেই। সবার লক্ষ্য এক জায়গায়। কিন্তু আমাদের মধ্যে ঢুকে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে বিদেশে তাদের স্বার্থ হাসিল করতে চায় এটা আমরা চাই না। বাংলাদেশে আমরা সব জাতি সমানভাবে বাঁচতে চাই। সেইভাবেই বেঁচে আছি। এখানে কোনো সমস্যা নেই। যদি কেউ এ বিশৃঙ্খলা করে থাকে তাহলে তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। আমাদের এক ভাইকে মেরেছে কারা মেরেছে তাকেও খুঁজতে হবে।

ইসলামী বক্তা শায়খ আহমদুল্লাহ বলেন, আইনজীবী আলিফ হত্যাকাণ্ডের পরেও বাংলাদেশের মুসলমানরা ধৈর্য ও সংযমের পরিচয় দিয়েছে। বিগত সরকারের শেষের দিকে ফরিদপুরে মসজিদের দু’জন নির্মাণ শ্রমিককে নির্মমভাবে অন্য ধর্মাবলম্বীবা হত্যা করার পরেও গোটা দেশের মুসলমানরা সংযমের পরিচয় দিয়েছেন। আমরা এটিকে যেমন সাধুবাদ জানিয়েছি, তেমন এটিকে ধরে রাখার জন্য সংগ্রাম করছি। আমরা সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই। বাংলাদেশের মানুষ যেভাবে ধর্মীয় সম্প্রীতির উজ্জ্বল উদাহরণ তৈরি করেছে এটা পৃথিবীতে আসলেই বিরল। কোনো প্রোপাগান্ডায় যেন কেউ কোনোভাবেই পা না দেই। আমরা যেন সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকি, সবাই এখানে কথা বলেছেন। মুসলিমরা ছাড়াও অন্য ধর্মের নেতৃবৃন্দরা কথা বলেছেন। আমরা আশা করছি, একটা সম্প্রীতির বাংলাদেশ যেটি ইতিমধ্যে আছে, তা আরও ভালো জায়গায় নিয়ে যেতে পারবো এবং পৃথিবীর কাছে উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে দাঁড় করাতে পারবো। তিনি বলেন, ইসলাম আমাদের অন্য ধর্মাবলম্বীদের ব্যাপারে যথেষ্ট দায়িত্বশীল আচরণ করতে বলে। প্রিয় নবী (সা.) আমাদের মানুষ হিসেবে অন্য ধর্মাবলম্বীদের মর্যাদা দিতে শিখিয়েছেন। আমাদের দেশে সংখ্যালঘু ভাইয়েরা নিরাপদে আছেন। তাদের নিরাপদ রাখার জন্য সরকার যেমন কাজ করছে। ধর্মীয় নেতৃত্ববৃন্দরাও কাজ করছেন। আমরা এই বার্তা প্রধান উপদেষ্টাকে দেয়ার চেষ্টা করেছি। আমরা হিন্দু, মুসলিম, বোদ্ধ, খ্রিস্টান ভাই ভাই হয়ে এই দেশকে এগিয়ে নিতে চাই। আমাদের মধ্যে কোনো বিভেদ নেই। কোনো ফাটল নেই। বিভেদ এবং ফাটল যারা দেখানোর চেষ্টা করছে তাদের সেই মিথ্যা প্রোপাগান্ডায় যাতে বিশ্ববাসী বিভ্রান্ত না হয়, দেশের মানুষ বিভ্রান্ত না হয় আমরা সেই বার্তা আজ দেয়ার চেষ্টা করেছি।

বাংলাদেশ বুদ্ধিস্ট ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ভিক্ষু সুনন্দপ্রিয় বলেন, আমাদের আজ প্রধান উপদেষ্টা ডেকেছেন। আমরা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোক সেখানে উপস্থিত ছিলাম। দীর্ঘক্ষণ আমাদের আলোচনা হয়েছে। আমরা তার কাছে জানিয়েছি দেশের সম্প্রীতি যাতে বিরাজ থাকে। সকল সম্প্রদায়ের মানুষ যেন আমরা মিলেমিশে থাকতে পারি।

রমনা সেন্ট ম্যারিজ ক্যাথেড্রালের প্রধান পুরোহিত অলভার্ট রোজারিও বলেন, গতকাল রাজনৈতিক দলগুলো যে কথা বলেছে তার সঙ্গে আমরা একাত্মতা পোষণ করেছি। আমরা একটা স্পর্শকাতর সময় পার করছি। এই সময়ে আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। তিনি বলেন, ইসকনের ঘটনায় মানুষের মনে যে ক্ষত তৈরি হয়েছে, তা দূর করতে হবে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে যারা কষ্টে আছেন, যাদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে তাদের অনেকেই আজ আসেন নাই। তাদেরকে নিয়ে যেন প্রধান উপদেষ্টা বসেন আমি এই কথা বলে এসেছি। পাশাপাশি বলেছি আমরা যেন এমন একটা আয়োজন করি যাতে সারা পৃথিবীর মানুষ জানতে পারে বাংলাদেশের মানুষ সাম্প্রদায়িক সমপ্রীতির মধ্যে আছে, তারা মিলেমিশে থাকে, তারা একসঙ্গে পথ চলে। এডভোকেট মারা যাওয়ার ঘটনায় দেশের মানুষ অনেক ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে। এরপরেও ভারতের কিছু মিডিয়া উস্কানিমূলক সংবাদ প্রচার করেছে যা বাস্তবতার সঙ্গে মিল নেই।
হেফাজত ইসলামের মহাসচিব সাজেদুর রহমান বলেন, আমরা সবাই বাংলাদেশের নাগরিক। ভাই ভাই। কোরআন বলেছে, সব মানবজাতি আদম সন্তান। তাই সম্প্রীতি বজায় রাখা সবার দায়িত্ব। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন হচ্ছে না বলে মত দিয়েছেন বেশ কয়েকজন হিন্দু ভাই। সাম্প্রদায়িক নির্যাতন হচ্ছে পাশের দেশে। এখানে বেশ কয়েকটি উস্কানি দেয়া হলেও কোনো দাঙ্গা হয়নি। আমরা অমুসলিম ভাইদের পাহারা দিই কোনো বিপদ আসলে। আমরা দেশের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ আছি। যারা দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করবে তাদের কঠোরহস্তে দমন করা হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. সুকোমল বড়ুয়া বলেন, আমরা একটা মানবিক রাষ্ট্র চেয়েছিলাম। আমরা শান্তি-সম্প্রীতিতে বসবাস করতে চাই। এজন্য আমি বলেছিলাম, আন্তর্জাতিক সম্প্রীতির সম্মেলন করার জন্য। যেখানে সকল ধর্ম-বর্ণ, জাতিগোষ্ঠী, নৃ-গোষ্ঠী আসবে। যাতে তারা দেখুক আমরা শান্তির মেলবন্ধনের মধ্যে অবস্থান করতে চাই।

গারো সম্প্রদায় থেকে পুরোহিত জনসং ম্রি থমাল বলেন, আমরা আলোচনা করেছি। সবাই আমরা ঐক্যবদ্ধ। কিন্তু যেসব মিডিয়া অপপ্রচার চালাচ্ছে তাদের প্রতিরোধ করবো। আমরা ঐক্যবদ্ধ আছি। এ সরকারকে সহযোগিতা করবো।

উপদেষ্টা মাহফুজ আলম বলেন, আমাদের দেশের সংহতির শক্তি বৃদ্ধি করবো। বাইরে যতই ষড়যন্ত্র হোক না কেন, আমরা যদি এ দেশের মধ্যে রাজনৈতিক ও সামপ্রদায়িকভাবে ঐক্যবদ্ধ থাকি। আরও অন্যান্য ক্ষেত্রবিশেষে ঐক্যবদ্ধ থাকি তাহলে বাইরে যতই অপপ্রচার চলুক বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। এটাই প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন।

মাহফুজ বলেন, এ দেশটা আমাদের সবার। প্রধান উপদেষ্টা শেষে বলেছেন, সমপ্রীতি দরকার। সেটার সঙ্গে ভয় যাতে জড়িয়ে না যায়; বরং নাগরিকেরা নির্ভয়ে চলাফেরা করতে পারে, সবার মধ্যে মেলবন্ধন খুব স্বাভাবিকভাবে হয়। শুধু আমরা ঠেকায় পড়ছি তাই হিন্দু, বৌদ্ধদের ডাকতেছি তা যেন না হয়; বরং ঐক্য ও সমপ্রীতি বজায় থাকে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী যে পথে রওনা দিয়েছে এ পথে যাতে অনেক দূর যেতে পারি। বাংলাদেশের সকল দল, মত, পথ ও ধর্মের মানুষ একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে দাঁড় করাতে পারি। এজন্য ধর্মীয় নেতাদের সমর্থন চেয়েছি। তারা অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছেন। আমরা আশাকরি বাংলাদেশ যে গতিতে আগাচ্ছে এবং বাংলাদেশের জাতীয় ঐক্য হচ্ছে এটা ভবিষ্যতে অনেক দূরে এগিয়ে যাবে।

তিনি বলেন, একটা বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকার যে গণহত্যা চালিয়েছে তার স্বীকৃতি ভারতকে দিতে হবে। এর স্বীকৃতি দেয়ার পর এখানে যত ধরনের নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে, আপনারা ফ্যাক্ট চেক করেছেন, তথ্য সরবরাহ করেছেন, আমরা আমাদের জায়গা থেকে সর্বোচ্চটুকু করবো। তিনি বলেন, দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতের মিডিয়ার ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। আমাদের যখনই কথা বলার সুযোগ হয়েছে আমরা বলেছি যে আপনাদের মিডিয়ার ভূমিকাকে কার্টেইল করতে হবে। এই অপতথ্য দুই দেশের বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে হুমকিস্বরূপ। আমরা এটা বলেছি। আমরা আশা করবো তাদের সুমতি হবে।

তিনি বলেন, সংলাপের মাধ্যমে বিশ্বে বাংলাদেশের পক্ষে ও বিপক্ষে যেসব শক্তি রয়েছে তাদের একটা বার্তা সরকার দিতে চেয়েছে। সেটা হচ্ছে বাংলাদেশের মানুষ সমপ্রদায়গত দিক থেকে একটা পয়েন্টে আছে, এক জায়গায় মিলিত হয়েছেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সরকার যেকোনো মূল্যে, যেকোনো ষড়যন্ত্র রুখতে প্রো-অ্যাক্টিভ কাজ করবে। হঠকারী কাজ এ সরকার আশ্রয় ও প্রশ্রয় দেবে না; বরং আমরা জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির দিকে আগাবো।

সামপ্রদায়িক ইস্যুতে গণমাধ্যমকে সঠিক তথ্য তুলে ধরার আহ্বান জানান মাহফুজ আলম। তিনি বলেন, আমরা প্রেসনোট দিচ্ছি না; বরং বাংলাদেশের যেখানে এ ধরনের ঘটনা ঘটবে সত্যতা তুলে ধরুন। আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেবো। 

mzamin

ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ছিল গণতন্ত্রের ভয়ঙ্কর শত্রু

ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রের ভয়ঙ্কর শত্রু ছিল বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গতকাল এক বাণীতে তিনি এ মন্তব্য করেন।

স্বৈরাচার পতন ও গণতন্ত্র মুক্তি দিবস উপলক্ষে বাণীতে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, স্বৈরাচারী এইচ এম এরশাদ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে। দীর্ঘ নয় বছর আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গণআন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ’৯০-এর ৬ই ডিসেম্বর এই দিনে ছাত্র-জনতার মিলিত শক্তিতে স্বৈরাচারকে পরাজিত করে মুক্ত হয়েছিল গণতন্ত্র। সেই অর্জিত গণতন্ত্রের চেতনায় আবারো ছাত্র-জনতা ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট এক হিংস্র ফ্যাসিবাদী শক্তিকে পরাস্ত করে। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ছিল গণতন্ত্রের ভয়ঙ্কর শত্রু। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার দুঃশাসনের অবসানের পর আবারো গণতন্ত্রের সম্পূর্ণ পুনরুজ্জীবন এবং রাষ্ট্র ও সমাজে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে আমাদের নিরলস সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে হবে।

তিনি বলেন, শেখ হাসিনার দুঃশাসনে ‘গণতন্ত্রের মা’ দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ওপর জেল-জুলুমসহ নানামাত্রিক নিপীড়ন নামিয়ে আনা হয়েছিল। দেশের জাতীয়তাবাদী শক্তির লাখ লাখ নেতাকর্মীকে অত্যাচার ও নির্যাতনের অক্টোপাশে আঁকড়ে রাখা হয়েছিল। সারা দেশকে শ্বাসরুদ্ধকর কারাগারে পরিণত করা হয়েছিল। আজকের এই দিনে আমি ’৮২ থেকে ’৯০ সাল পর্যন্ত রক্তস্নাত স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে আত্মদানকারী বীর শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই এবং তাদের রুহের মাগফিরাত কামনা করি। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের এ স্মরণীয় দিনে আমি শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী গণতন্ত্রের হেফাজতকারী দেশবাসীকে।

তারেক রহমান বলেন, ৬ই ডিসেম্বর আমাদের জাতীয় ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন। ১৯৯০ সালের এই দিনে দীর্ঘ ৯ বছরের রক্তস্নাত আন্দোলনের পর পতন ঘটেছিল স্বৈরশাসনের। এরশাদ ’৮২-এর ২৪শে মার্চ পেশাগত বিশ্বস্ততা ও শপথ ভেঙে অস্ত্রের মুখে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বিচারপতি সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যুত করে গণতন্ত্র নস্যাৎ ও সামরিক শাসন জারির মাধ্যমে সাংবিধানিক রাজনীতির পথচলা স্তব্ধ করেছিলেন। যে সাংবিধানিক রাজনীতি ছিল বহুদলীয় ও বহুমাত্রিক, যার সূচনা করেছিলেন শহীদ  প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান।
তিনি বলেন, স্বৈরাচারী এরশাদের দল আওয়ামী ফ্যাসিবাদের সঙ্গে দীর্ঘ ১৬ বছর একত্রিত হয়ে আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মানুষের মৌলিক মানবাধিকারকে ক্রমাগতভাবে হরণ করেছিল। তারা নিরপেক্ষ, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধান থেকে মুছে দিয়েছিল। ৫ই আগস্ট এই অপশক্তিকে প্রতিহত করে ছাত্র-জনতার বিপুল তরঙ্গ। এই পরাজিত শক্তির যাতে পুনরুত্থান না ঘটে সেজন্য গণতান্ত্রিক শক্তিকে সবসময় ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানাই।

অপর এক বাণীতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ১৯৯০ সালের ৬ই ডিসেম্বর স্বৈরাচার পতনের মধ্যদিয়ে দেশবাসী গণতন্ত্রের স্বর্ণদ্বার অতিক্রম করে। শুরু হয় সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা। এই দিনে গণতন্ত্রের দুশমনেরা পরাজিত হলেও আজও তারা চুপ করে বসে থাকেনি। গণতন্ত্রের জাতশত্রু আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের সঙ্গে চক্রান্ত শুরু করে নিরবচ্ছিন্ন। তাদের মিলিত শক্তি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী না করে বরং ক্রমাগত দুর্বল করতে থাকে। সর্বশেষ ২০০৯ সাল থেকে ফ্যাসিস্ট ও স্বৈরাচার যৌথভাবে বাংলাদেশকে একদলীয় দুঃশাসনের অরাজকতার মধ্যে ঠেলে দেয়। বারবার অপশক্তিগুলো গণতন্ত্রকে বিপর্যস্ত করে আমাদের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করতে চেয়েছে। কিন্তু এদেশের দেশপ্রেমিক জনগণ সে অপচেষ্টাকে শক্ত হাতে প্রতিহত করেছে সব সময়।

মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, কোনোভাবেই যাতে আর ফ্যাসিবাদের উত্থান না হয়, দেশ যেন গুম, গুপ্তহত্যা আর ক্রসফায়ারের নিষ্ঠুর জাঁতাকলের মধ্যে পতিত না হয়, রাষ্ট্র-সমাজের সর্বত্র যেন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা পায়। একদলীয় লুটেরা কর্তৃত্ববাদ আর যাতে মাথাচাড়া দিতে না পারে সেজন্য গণতন্ত্রকামী দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। স্বৈরাচার পতন দিবসে- এটাই হোক আমাদের দৃপ্ত শপথ।

mzamin