Tuesday, August 21, 2018

আজ আরাফাহ দিবস: আদম (আ.)’র তওবা কবুলের ও মুসলিম ইবনে আকিলের শাহাদাতের বার্ষিকী

পবিত্র মক্কায় হজযাত্রীরা পালন করছেন আরাফাহ দিবস
আজ নয়ই জিলহজ বা পবিত্র আরাফাহ দিবস। এই দিনে মানব জাতির আদি পিতা হযরত আদম (আ.)’র তওবা কবুল করেছিলেন  মহান আল্লাহ। একটি নিষিদ্ধ গাছের ফল খাওয়ার জন্য তাঁকে জান্নাত-সদৃশ বাগান থেকে বের করে দেয়া হয়েছিল।
ইসলামী বর্ণনা অনুযায়ী হযরত আদম (আ.) নিজের বংশধর বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের ওয়াসিলা দিয়ে আল্লাহর কাছে তওবা করায় মহান আল্লাহ তওবা কবুল করেন। 
হযরত ইব্রাহিম (আ.) ইবাদত ও মুনাজাতের এই বিশেষ প্রথা পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন মহান আল্লাহর নির্দেশে।পবিত্র মক্কার দক্ষিণপূর্বাঞ্চলে অবস্থিত রহমতের পাহাড় বা ‘জাবাল আর রাহমাত’ নামক পাহাড়ের পাশে অবস্থান করে প্রার্থনার ওই রীতি আবারও ফিরিয়ে আনেন তিনি।
বলা হয় আরাফাহ দিবস শবে কদরের মতোই দোয়া কবুলের ও পূণ্য অর্জনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পবিত্র এ দিবসে আন্তরিক চিত্তে তওবা করলে ছোট-বড় সব পাপ ক্ষমা করা হয়। এমন কোনো পাপ নেই যা এ দিনে ক্ষমা করা হয় না। এ দিনের দান-খয়রাত ও ইবাদতের রয়েছে অশেষ সাওয়াব।
নবী-রাসূলরা এই মহান দিনের তাৎপর্য বা বিশেষ গুরুত্ব সম্পর্কে নিজ নিজ উম্মতকে অবহিত করে গেছেন। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) বিদায় হজ্বে এই পাহাড়ে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দিয়েছিলেন। ওই ভাষণে তিনি বলেছিলেন, মুসলমানরা যদি বিভ্রান্ত হতে না চায় তাহলে তারা যেন পবিত্র কুরআন ও তাঁর পবিত্র বংশধর বা আহলে বাইতের অনুসরণ করে। এই হাদিসটি হাদিসে সাকালাইন নামে খ্যাত। (সহীহ মুসলিম, ৪র্থ খণ্ড, পৃ.১৮০৩ এবং সুনানে তিরমিযি, ৫ম খণ্ড, পৃ. ৬৬৩ দ্রষ্টব্য)
আরাফাহ দিবসে হজযাত্রীরা আরাফাত ময়দানে বিশেষ ইবাদত-বন্দেগী করে থাকেন। এই ময়দানে অবস্থান করে হযরত ইমাম হোসাইন (আ.) আল্লাহর পরিচিতি, দয়া ও কৃতজ্ঞতার উল্লেখ এবং অপূর্ব আধ্যাত্মিক ঔজ্জ্বল্যে সমৃদ্ধ একটি দোয়া উপহার দিয়ে গেছেন মুসলমানদের জন্য। হজযাত্রীসহ বিশ্বের মুসলমানদের অনেকেই এই দিনে দোয়ায়ে আরাফাহ নামে খ্যাত ওই দোয়া পড়ে থাকেন। 
১৩৭৯ অথবা ১৩৮০ চন্দ্র-বছর আগে ৯ জিলহজ  কুফায় শাহাদত বরণ করেন আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.)’র ভাতিজা ও ইমাম হোসাইন (আ.)’র চাচাতো ভাই  হযরত মুসলিম ইবনে আকিল (রা.)।  ইমাম হোসাইন (আ.) তাঁকে রাসূল (সা.)’র আহলে বাইতের প্রতি কুফাবাসীদের আনুগত‍্য ও শ্রদ্ধার মাত্রা কতটুকু তা যাচাই করতে সেখানে পাঠিয়েছিলেন। এর কারণ, কুফাবাসীরা শত শত বা কয়েক হাজার চিঠি পাঠিয়ে ইমামকে বলেছিল তারা ইসলামী বিধানের আলোকে জালিম ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়ার অবৈধ শাসনকে স্বীকৃতি দেয়া থেকে বিরত রয়েছেন এবং তারা একজন ন্যায়পরায়ণ ও ধার্মিক নেতার পথনির্দেশনা কামনা করছেন।
প্রথমদিকে কুফার লোকেরা মুসলিম ইবনে আকিলকে স্বাগত জানায়। কিন্তু ইয়াজিদ যখন নির্দয় স্বভাবের ওবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদকে কুফার গভর্নর করে পাঠান তখন কুফার বেশির ভাগ মানুষই ইবনে জিয়াদের মিথ্যা প্রলোভনে প্রতারিত হয়ে অথবা জীবন ও ধন-সম্পদ রক্ষার আশায় ইমামের প্রতিনিধিকে ত্যাগ করেন। বীরত্বপূর্ণ এক যুদ্ধের পর প্রতারিত হন মুসলিম ইবনে আকিল। তাঁকে নেয়া হয় ইবনে জিয়াদের কাছে। জিয়াদ তাঁকে নির্মমভাবে শহীদ করে।
কুফার বড় মসজিদের পাশে হযরত মুসলিম ইবনে আকিল (রা.)’র মাজার রয়েছে। সোনালী গম্বুজের এই মাজারের পাশেই রয়েছে তাঁর সঙ্গে শহীদ হওয়া কয়েকজনের মধ্যে বিশিষ্ট সহযোগী হানি ইবনে ওরওয়া’র কবর।
উল্লেখ্য, কুফার জনগণ ইয়াজিদের প্রতি ইমাম হুসাইন (আ.)'র আনুগত্য প্রকাশ না করার কথা শুনে তাঁর প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল। এই শহরের জনগণ প্রকৃত ইসলামী খেলাফতের নেতৃত্ব দেয়ার জন্য ও তাঁদেরকে মুক্ত করার জন্য ইমামের প্রতি আকুল আবেদন জানিয়ে অন্তত ১৮ হাজার চিঠি পাঠিয়েছিল। প্রতিটি চিঠিতে অন্তত ১০০ জনের স্বাক্ষর ছিল। কিন্তু তাঁরা প্রয়োজনের সময় ইমামের সাহায্যে এগিয়ে আসেনি। এমনকি কুফার প্রকৃত অবস্থা যাচাই করার জন্য যখন চাচাত ভাই মুসলিম ইবনে আকিল (রা.)-কে কুফায় পাঠান এই মহান ইমাম তখনও তারা ইমামের এই দূতকে সাহায্য করতে ব্যর্থ হয় এবং তিনি নৃশংসভাবে শহীদ হয়েছিলেন।
কিন্তু আকিল (রা.)'র শাহাদতের পরও ইমাম হুসাইন (আ.)  যদি দোদুল-মনা কুফাবাসীদের আহ্বানে সাড়া না দিতেন , তাহলে ইতিহাসে এই ইমামকে কাপুরুষ বলে উল্লেখ করা হত এবং বলা হত লাখো মানুষের মুক্তির আহ্বানকে উপেক্ষা করে ইমাম হুসাইন (আ.) নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করেছিলেন।
কুফার পথে যাওয়ার সময় আকিল (রা.)'র শাহাদতের খবর শুনে কেঁদে ফেলেন ইমাম হুসাইন (আ.)। কিন্তু  তবুও তিনি বিপ্লব চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেন। এ সময় ইমাম আবৃত্তি করেছিলেন পবিত্র কুরআনের একটি আয়াত যেখানে বলা হয়েছে:
"মুমিনদের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদা পূর্ণ করেছে। তাদের কেউ কেউ মৃত্যুবরণ করেছে এবং কেউ কেউ (শাহাদতের জন্য) প্রতীক্ষা করছে। তারা তাদের সংকল্প মোটেই পরিবর্তন করেনি।"(সুরা আহজাব, ২৩)

কোটা আন্দোলনের নেতাদের পরিবারে কান্না by মরিয়ম চম্পা

কেউ আছেন জেলে। কেউ পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। তারা কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা। আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে নানা অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত ঈদ তারা পরিবারের সঙ্গে কাটিয়েছেন। কিন্তু  এবারের ঈদ হয়তো তাদের কাটাতে হবে জেলখানাতে। কারণ ঈদের আগে তাদের জামিন হবে কি হবে না- এ নিয়েও বেশ অনিশ্চয়তা রয়েছে।
এদিকে আদরের সন্তান আর প্রিয়জনকে ছাড়া ঈদ করতে হবে- এমনটা ভাবতে পারছেন না তাদের পরিবারের সদস্যরা। কোটা আন্দোলনের নেতা রাশেদ খানের ছোট বোন সোনিয়া মানবজমিনকে বলেন, মা ও ভাবি গতকাল খুব সকালে উঠে ভাইয়ার সঙ্গে কেরানীগঞ্জ জেলখানায় দেখা করতে গেছেন। একটু বেলা হয়ে গেলে জেলখানার অন্য আসামিদের সঙ্গে মারামারি ও ধাক্কাধাক্কি করে ভাইয়ার কথা বলতে হয়।
বাবা-মা দুজনই ভাইয়ার জন্য অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। মা অসুস্থ শরীর নিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছেন ভাইয়াকে জেল থেকে ছাড়ানোর জন্য। বাবার কিডনির ব্যথাটা বেড়েছে। ডাক্তার বলেছে অপারেশন করতে হবে। কিন্তু বাবার এক কথা রাশেদ জেল থেকে বের না হওয়া পর্যন্ত তিনি অপারেশন করাবেন না। ভাইয়া প্রতিবছর ঈদের এক সপ্তাহ আগে গ্রামের বাড়িতে চলে যেতেন। অথচ এবছর ভাইয়াকে ছাড়া আমাদের প্রথম ঈদ করতে হবে।
এটা ভেবেই মা কান্না করে আর বলে আমার বাবুকে ছাড়া আমি কেমনে ঈদ করবো। এরকম ঈদ যেন আর কখনো না আসে। গত সপ্তাহে ভাইয়া মা’কে বললো মা তুমি ঈদে বাসায় যাবে না। তখন মা বললো মনি তোমাকে ছাড়া আমি বাড়ি যাবো না। আগামী বছর তোমাকে নিয়ে একসঙ্গে ঈদ করবো। সোনিয়া বলেন, ভাইয়াকে ছাড়া ঈদ কি কখনো ভালো হয়। প্রতিবছর ঈদের আগে ভাইয়া বাড়ি যাওয়ার সময় বলতো তোমাদের কি লাগবে, কি নিয়ে আসবো। ভাইয়া ঈদের সময় বাসায় গেলে আমাদের কাছে উৎসব মনে হতো। এখন মনে হয় সবকিছু অন্ধকার।
ভাইয়াকে ছাড়া চারদিক কেবলই ফাঁকা আর শূন্য মনে হয়। এরকম ঈদ আমরা চাই না। ভাইয়ার স্বপ্ন ছিল পড়ালেখা শেষে ভালো একটা চাকরি করবে। তখন আর আমাদের কোনো দুঃখ-কষ্ট থাকবে না। গত সপ্তাহে ভাইয়া মাকে বলেছিল, মা ঈদের আগে তুমি আরেকবার দেখা করতে আসবে। অনেক দিন তোমার হাতে বাসার রান্না করা খাবার খাই না। প্রতিবছর ঈদে বাসায় গেলে যেভাবে রান্না করে খাওয়াতে ঈদের দিন খুব সকালে ঠিক তেমন খাবার রান্না করে নিয়ে আসবে। কোরবানির ঈদে ভাইয়া গরুর মাংস আর খিচুড়ি বেশি পছন্দ করতো। তাছাড়া ঈদের দিন সকালে মায়ের রান্না করা সেমাই খেয়ে নামাজ পড়তে যেতেন।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও কোটা আন্দোলনের নেতা পি এম সুহেলের ছোট ভাই সুমন রহমান বলেন, এটা ভাবতেই কষ্ট হয় ভাইয়াকে ছাড়া এবছর আমাদের ঈদ করতে হবে। আমাদের জীবনে এমন একটি ঈদ আসবে ভাবতেও পারিনি। প্রতিবার ঈদের ৩ থেকে ৪ দিন আগে ভাইয়া বাসায় চলে আসতেন। বাসায় চাচাতো ভাইদের ছেলেমেয়ে, চাচা-চাচী, মা সবার জন্য জামা-কাপড় নিয়ে যেতেন। গরিব লোকদের টাকা ও কাপড় কিনে দিতেন।
ঈদে গরুর মাংস দিয়ে চালের রুটি খেতে ভাইয়া বেশি পছন্দ করতো। গতকাল সকালে ভাইয়াকে দেখে এসেছি। ভাইয়া বললো আমার জন্য চিন্তা করিস না। ঈদের দিন আমরা যারা জেলখানায় আছি তাদের জন্য খাবার নিয়ে আসবি। ভাইয়া বলেছে, তাদের ১০ জনের জন্য মায়ের হাতের খাবার রান্না করে নিয়ে যেতে।
কোটা আন্দোলনের নেতা মশিউরের বাবা মজিবুর রহমান বলেন, এ বছর আমাদের ঈদ হবে না। আমাদের ঈদটা মাটি হয়ে গেছে। তিন ছেলে মেয়েকে নিয়ে একত্রে ঈদ করবো সেটা আমার কপালে নেই। ঈদ নিয়ে আমাদের আনন্দ বলতে কিছু নেই। আছে একবুক কষ্ট আর চোখভর্তি জল। গত শনিবার মশিউরের সঙ্গে দেখা করে এসেছি। ঈদের দিন আমার ছেলেকে জেলখানায় খাবার  দেবে এমন কেউ নেই। বরিশালের ঝালাকাঠিতে তাদের বাড়ি।
মশিউরের বাবা পেশায় একজন রিকশাচালক। তিন ভাইবোনের মধ্যে মশিউর মেজ। বড় ভাই ঢাকাতে প্রাইভেট গাড়ি চালায়। মশিউরের বাবা বলেন, মশিউর ঈদে তার মায়ের হাতে রান্না করা গরুর মাংসটা বেশি পছন্দ করতো। আমরা তো গরিব মানুষ তাই কোরবানি দিতে পারি না। দশজনে যেটুকু মাংস দিতো তাই দিয়ে ছেলেমেয়েকে নিয়ে ঈদ করতাম। এবছর কোরবানি দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু ছেলেকে জেলে রেখে কোরবানি দেই কীভাবে।
উল্লেখ্য, কোটা সংস্কার আন্দোলনে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মামলায় বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের দশ জন নেতা গ্রেপ্তার হন।

পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে ১০ পশ্চিমা দূতের বৈঠক: রাজনীতি, বার্নিকাটের গাড়িতে হামলা, রোহিঙ্গা ইস্যুতে আলোচনা by মিজানুর রহমান

পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হকের সঙ্গে বেশ কয়েকজন পশ্চিমা কূটনীতিক দীর্ঘ বৈঠক করেছেন। গতকাল দিনের শুরুতে ১০ জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকের একটি দল পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে বৈঠক করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যান। ওই দলে ২৮ রাষ্ট্রের জোট ইউরোপীয় ইউনিয়ন ডেলিগেশনের ঢাকাস্থ কার্যালয়ের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সসহ ওই জোটের সদস্য ৮ দেশের আবাসিক মিশনের প্রধান এবং ভারপ্রাপ্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতও ছিলেন। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে- পশ্চিমা দূতরা নিজে থেকেই সচিবের সঙ্গে দেখা করেন।
সচিবের দপ্তর সংলগ্ন সভাকক্ষে তারা বৈঠকে মিলিত হন। এক ঘণ্টা স্থায়ী বৈঠকে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে ঘিরে সৃষ্ট রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সন্দেহভাজনদের আটক-রিমান্ড, মার্কিন রাষ্ট্রদূতের গাড়িতে হামলা, সাংবাদিকদের ওপর আক্রমণ এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হয়। সূত্র মতে, এই মুহূর্তে পশ্চিমা বেশির ভাগ রাষ্ট্রদূতই ঢাকায় নেই।
মূলত চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সরাই সচিবের সঙ্গে কথা বলেন। তারা মোটা দাগে সরকারের প্রতি যে বার্তাটি দেয়ার চেষ্টা করেন তা হলো- রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ যেভাবে তার সীমান্ত এবং হৃদয় খুলে দিয়ে বিশ্বব্যাপী সমাদৃত হয়েছে কোনো একটি ঘটনা বা কঠিন পরিস্থিতি যেন সেই অর্জনকে ম্লান করে না দেয়।
পশ্চিমা কূটনীতিকরা ‘ডিফিক্যাল্ট চ্যালেঞ্জ’ শব্দদ্বয় ব্যবহার করেছেন জানিয়ে বৈঠকে উপস্থিত ঢাকার এক কূটনীতিক মানবজমিনকে বলেন- আসলে তারা সম-সাময়িক ঘটনাগুলোর প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। আরো স্পষ্ট করে বললে- নিরাপদ সড়কের দাবিতে ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিকেই বুঝিয়েছেন তারা।
ভিন দেশি জ্যেষ্ঠ ওই কূটনীতিকরা বরাবরের মতো গতকালের বৈঠকেও সব পক্ষের শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূিচ পালনের অধিকারসহ মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, গণমাধ্যমকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়া এবং রাজনৈতিক সমস্যা রাজনৈতিকভাবে সমাধানের ওপর জোর দিয়েছেন। সচিব ও পশ্চিমা দূতদের আলোচনায় শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলাকালে ফেসবুকে গুজব ছড়ানোর অভিযোগে আটক দেশের খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী শহীদুল আলমের বিষয়টি স্থান পায়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা সচিব ও  দূতদের বৈঠককে ‘অনানুষ্ঠানিক এবং নিয়মিত’ বৈঠক হিসাবেই দেখছেন। এক কর্মকর্তা বলেন- এমন বৈঠক প্রায়ই হয়। তবে এবার সংখ্যায় একটু বেশী এবং তারা একসঙ্গে দেখা করতে চেয়েছেন।
সূত্র মতে, বাংলাদেশের পশ্চিমা বন্ধু ও উন্নয়ন সহযোগী রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধিরা সরকারকে জানিয়েছেন শহীদুল আটকের বিষয়ে তাদের নিজ নিজ দেশের সিভিল সোসাইটি ও গণমাধ্যম খুবই উদ্বিগ্ন। এ নিয়ে ধারাবাহিকভাবে তারা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে চলেছেন। দূতাবাসের দায়িত্বশীল প্রতিনিধিদের কাছেও তারা তার মামলার বিষয়ে প্রায়শই জানতে চান।
তারা এ নিয়ে তাদের হেড কোয়ার্টারের বেশ চাপে আছেন বলেও জানান বিদেশি কোনো কোনো কূটনীতিক। তবে প্রায় সব কূটনীতিকই আন্দোলন চলাকালে সাধারণ শিক্ষার্থী এবং সাংবাদিকদের ওপর হেলমেটধারী বাহিনীর আক্রমণের নিন্দা জানান। তারা এসব ঘটনার স্বচ্ছ তদন্তের অনুরোধ জানান। যদিও সরকারের তরফে ছাত্রদের ব্যাগ থেকে চাপাতি নিয়ে আক্রমণের সচিত্র তথ্য তুলে ধরা হয়। কূটনীতিকরা আক্রমণকারীদের গ্রেপ্তার না করে সাধারণ ছাত্র এবং যারা শান্তিপূর্ণ এ আন্দোলনে সমর্থন দিয়েছিল তাদের হয়রানির বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
এদিকে অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের গাড়ি বহরে হামলার বিষয়েও জানতে চান ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা। বিশেষ করে এ ঘটনা পরবর্তী সরকারের পদক্ষেপ বিষয়েই জানার আগ্রহ ছিল তাদের। এ নিয়ে এক কূটনীতিক বলেন- আলোচনায় বিষয়টি তুলেন ইউরোপের এক কূটনীতিক।
সম-সাময়িক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার মধ্যেই বিষয়টি আসে। এ নিয়ে আলাদা কোনো কথা হয়নি। পররাষ্ট্র সচিব কূটনীতিকদের বলেছেন- হামলার ঘটনাটি অনাকাঙ্ক্ষিত, অপ্রত্যাশিত এবং দুঃখজনক। বিশ্বব্যাপী ‘বিদেশী বান্ধব বাংলাদেশ’ এর যে ঐতিহ্য ও সুনাম রয়েছে, এ হামলা তার সম্পূর্ণ বিপরীত।
সচিব প্রশ্ন রাখেন মোহাম্মদপুর এলাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূতের নৈশভোজে যাওয়ার বিষয়টি কেন আগে থেকে পুলিশকে অবহিত করা হয়নি? যদিও পুলিশের ত্বরিত পদক্ষেপেই রাষ্ট্রদূত এবং তার সহযাত্রীরা নিরাপদে অক্ষত অবস্থায় প্রস্থান করতে পেরেছেন। সচিব এ-ও বলেন, একজন কূটনীতিকের গাড়িতে হামলা বরাবরই নিন্দনীয়। সরকার আনুষ্ঠানিক এবং অনানুষ্ঠানিকভাবে এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
ঘটনার পর থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে তদন্ত করছেন। খানিক অগ্রগতিও আছে। অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তদন্ত কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। তদন্ত শেষ হওয়ার পর উপযুক্ত পদক্ষেপ নেয়ার আশ্বাস দিয়ে সচিব কূটনীতিকদের বলেন, এ হামলার সঙ্গে যারা যুক্ত তাদের কেউই দায়মুক্তি পাবে না। উল্লেখ্য, মার্কিন রাষ্ট্রদূতের গাড়িতে হামলার পরবর্তী সরকারের পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে ওয়াশিংটনস্থ বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে নিয়েছিল স্টেট ডিপার্টমেন্ট।
সেখানে তিনিও পুলিশের তদন্ত চলছে বলে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরকে অবহিত করেছেন। রাষ্ট্রদূতকে ডেকে নেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ওয়াশিংটনে নিযুক্ত বাংলাদেশের এক কূটনীতিক এ নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি না হলেও তিনি বলেন- আমরা সব সময় স্টেট ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে যুক্ত রয়েছি।
বৈঠকে অংশ নেয়া ইতালি, স্পেন ও ডেনমার্কের কূটনীতিকরা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের অগ্রগতি সম্পর্কে  জানতে চান। জবাবে সচিব বলেন- পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ বাংলাদেশের কর্মকর্তারা রাখাইন ঘুরে এসেছেন। তারা মিয়ানমারের তরফে নেয়া প্রস্তুতির অগ্রগতিও দেখেছেন। তবে এটি দ্রুত বাস্তবায়নে এবং রোহিঙ্গাদের নির্ভয়ে নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে অবশ্যই আন্তর্জাতিক চাপ ধরে রাখতে হবে।

জামালকে দেখতে ভিড়, তুলছেন সেলফিও

প্রতিবছরের মতো এবারও রাজধানীর হাটে হাটে ভিন্ন ধাঁচের ও দামের কোরবানির পশু এসেছে। গাবতলীর হাটে এসেছে মরুভূমির জাহাজখ্যাত উট। তার নাম ‘জামাল’। এই উট কেনার চেয়ে দর্শনার্থীর সংখ্যাই বেশি। হাজারো গরুর মাঝে রয়েছে এই উট। ফলে এখানে মানুষের ভিড় একটু বেশি। হাট ঘুরে দেখা যায়, উৎসুক অনেকেই সেলফি তুলছেন, কেউ একনজর দেখার জন্য কাছে এসে উঁকি দিচ্ছেন। কেউ দাম জিজ্ঞেস করছেন।
আবার কেউ জানতে চাইছেন, কোন দেশ থেকে আনা হয়েছে? আমজাদ নামের এক বেপারি উটটির মালিক। তিনি  ভারতের রাজস্থান থেকে ‘জামাল’কে আনেন। প্রতিবছরই আনেন উট ও দুম্বা। মূলত কোরবানির বাজার উপলক্ষেই তার এই উটের ব্যবসা। গত বছর ব্যবসা ভালো যায়নি। তাই এবার একটি উট তুলেছেন হাটে। গত বছর কিনে আনার পর থেকেই উটটি রাখা হয়েছে গাবতলী হাটে। উটটির দাম হাঁকিয়েছেন ১৮ লাখ টাকা। আর দুম্বা দুটির দাম চাইছেন সাত লাখ টাকা।
আফতাব নগরে চমক হিসেবে উঠেছে কুষ্টিয়া থেকে আগত ‘বাদশা’। বিশালাকার এই গরুর মালিক মাহমুদ হাসান ২২ লাখ টাকায় বিক্রি করবেন বলে জানান। তিনি বলেন, এই গরু লম্বায় সাড়ে ছয় ফুট। এর পেছনে প্রতিদিন ৫০০-৬০০ টাকা খরচ হয়েছে। সাড়ে তিন বছর বয়স। এবার পরিণত হওয়ায় হাটে তুলেছি। এদিকে গাবতলীর হাটে ‘রাজা বাবু‘ নামের আরেকটি চমক নিয়ে এসেছেন মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার খাইরুল ইসলাম। সঙ্গে তার মেয়ে ইতিও রয়েছেন রাজা বাবুকে দেখভালের জন্য। তিন বছর দশ বছর বয়সী এই গরু লম্বায় ৬ ফুট ১০ ইঞ্চি। রাজা বাবুর মালিক এর দাম হাঁকাচ্ছেন ১৮ লাখ টাকা।
কোরবানির পশু শুধু যে দেশের মধ্যে বা পাশ্ববর্তী ভারত থেকে আসে তা নয়। বিশেষ কিছু ব্যক্তিরা কোরবানি দেন আমেরিকা থেকে গরু আমদানি করে। বিলাসী ক্রেতাদের জন্য এবার টেক্সাস থেকে বিমানে চড়িয়ে আনা হয়েছে ৭টি গরু। এসব ক্রেতাদের কথা মাথায় রেখে গরুগুলো আনা হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা দিয়ে। গরুগুলো আমদানি করেছে সাদিক অ্যাগ্রো ফার্ম। সবচেয়ে বেশি দামে যে গরুটি বিক্রি করেছে সাদিক অ্যাগ্রো ফার্ম তার দাম ছিলো ২৮ লাখ টাকা। খামারের ম্যানেজার সুমন জানান, সাতটি গরুর সবগুলোই ইতোমধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে। এর মধ্যে বাহাদুর নামের সবচেয়ে বড় গরুটি বিক্রি হয়েছে ২৮ লাখ টাকায়। বাহাদুরের ওজন ১৫’শ কেজি আর লম্বায় ১০ ফুট। ১১’শ কেজি ওজনের আরেকটি গরু বিক্রি হয়েছে ২৫ লাখ টাকায়।

ইয়াবা পরিবহনকারী এক রোহিঙ্গার ভাষ্য

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের একটি অংশ অব্যাহতভাবে ইয়াবা চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়ছে। রোহিঙ্গারা আত্মপক্ষ সমর্থনে বলেছে, বেঁচে থাকার অন্য কোনও অবলম্বন না পেয়েই তারা ইয়াবা পরিবহনের মতো কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। কুতুপালং আশ্রয় শিবিরের থাকা ইয়াবা পরিবহনে জড়িত একজন রোহিঙ্গা মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে জানিয়েছে, অর্থের অভাবে ইয়াবা পরিবহন করলেও সে এই কাজ করতে চায় না। সে মিয়ানমারে ফিরতে চায়, যেখানে তার জমি আছে, সম্পদ আছে। সংশ্লিষ্ট রোহিঙ্গা ইয়াবা পরিবহনকারীর ভাষ্যে উঠে এসেছে কুতুপালং থেকে কক্সবাজারে ইয়াবা পরিবহনের তথ্য: সে কীভাবে ইয়াবা জুতায় ভরে পাহাড়ি পথ ধরে কক্সবাজার যায়, কোথায় চালান হস্তান্তর করে, কীভাবে আশ্রয় শিবিরের নিরাপত্তা কর্মীদের ফাঁকি দিতে কৌশল অবলম্বন করে ইত্যাদি।
যেসব মাদকের কারণে মাদকদ্রব্যের ব্যবহার বাংলাদেশে মহামারির আকার ধারণ করেছে তার কেন্দ্রে এখন রয়েছে ‘মেথ পিল’ নামে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ইয়াবা। থাইল্যান্ডে ‘ক্রেজি মেডিসিন’ আখ্যা পাওয়া ইয়াবা প্রবল আসক্তিমূলক একটি দ্রব্য যা মেথাফেটামিন এবং ক্যাফেইনের সমন্বয়ে বানানো হয়। ট্যাবলেটগুলোতে চকোলেটের মতো রঙ ব্যবহার করা হয়। মিয়ানমার থেকে এসব ইয়াবা বাংলাদেশে পাচার করা হয়। বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মিয়ানমারে উৎপাদিত হওয়া এই মাদক পাচার রুখতে হিমশিম খাচ্ছে। মাদক ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ইয়াবা পরিবহনে ব্যবহার করছে।
বাংলাদেশ মনে করে মিয়ানমারে অন্তত ৫০টি মাদক উৎপাদনের কারখানা রয়েছে। কক্সবাজার জেলায় কর্মরত সহকারী পুলিশ কমিশনার সাইফুল হাসান আল জাজিরাকে বলেছেন, ‘রোহিঙ্গারা যখন পালিয়ে আশা শুরু করেছিল তখন আমরা তাদের খুব একটা চেক করতাম না। প্রথ দিকে ওই সুবিধা পাওয়ার কারণে বেশ কিছু ইয়াবা বাংলাদেশে ঢুকেছে।’ ইয়াবা পাচারের বিষয়ে কিছু এনজিওর পুলিশকে তথ্য দেওয়ার উদাহরণ থাকলেও সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, ইয়াবা ব্যবসায়ীরা কতিপয় এনজিওর নাম ব্যবহার করেও অপতৎপরতা চালায়। ইয়াবা পাচারের সূত্রে ৬০০ রোহিঙ্গাকে এ পর্যন্ত গ্রেফতার করা হয়েছে। ২০ থেকে ৫০ পিস ইয়াবার জন্য ছয় মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ২০১২ সালের হিসেব অনুযায়ী, বাংলাদেশে ইয়াবা আসক্তের সংখ্যা ৪৬ লাখ। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর জানিয়েছে, ছয় বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশে মাদক গ্রহণকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ৭৭ গুণ।
কিন্তু কেন রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে ইয়াবা পাচারে জড়িত হচ্ছে? এ প্রশ্নের উত্তরে একজন ইয়াবা পাচারকারী আল জাজিরাকে বলেছেন, ‘আমি বেঁচে থাকার অন্য কোনও পথ না পেয়ে ইয়াবা পাচার করি। আমাকে আমার পরিবারের ভরণপোষণের জন্য এ কাজ করতে হয়। অর্থে অভাবে আমার পক্ষে সৎভাবে জীবনযাপন করা সম্ভব হচ্ছে না।’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ইয়াবা পাচারকারী রোহিঙ্গার পূর্ণ নাম প্রকাশ না করে আল জাজিরা তাকে ‘এ’ হিসেবে সম্বোধন করেছে। এই প্রতিবেদনে তাকে ‘আলতাফ’ ছদ্মনামে সম্বোধন করা হবে।
গত বছর বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ ইয়াবা পাচারের দায়ে ৬৪৯ জনকে গ্রেফতার করেছে যার মধ্যে ১৫ জন মিয়ানমারের নাগরিক। কিন্তু আলতাফ ধরা পড়েনি। ৩৬ বছর বয়সী আলতাফ এক হাজার পিস ইয়াবা কুতুপালং আশ্রয় শিবির থেকে কক্সবাজারে পাচারের জন্য পাঁচ হাজার টাকা পায়। ইয়াবা পাচারে কীভাবে জড়িয়ে পড়েছিল আলতাফ? প্রথম যখন সে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে কুতুপালং শিবিরে আশ্রয় নিতে গিয়েছিল তখন সেখানে থাই হয়নি তার ও তার পরিবাররে। তখন সে বাধ্য হয়ে স্থানীয় এক ব্যক্তির বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল। পরে যখন সে কুতুপালং আশ্রয় শিবিরে পরিবারসমেত গিয়ে ওঠে, তখন দেখে সেখানে পানি ও থাকার মতো ঘরের প্রচণ্ড সংকট। খাবার অপ্রতুল; দিনে একবেলার মতো হতো। হাতে কোনও অর্থ ছিল না। তাদের যাছে এমন কি বিক্রি করার মতো কিছুও ছিল না।
প্রথমে আলতাফ একটি ছোট দোকান খুলতে চেয়েছিল। কিন্তু কেউ তাকে ঋণ দিতে রাজি না হওয়ায় সে দিকান দিতে পারেনি। এক পর্যায়ে বাধ্য হয়ে শিবিরে ইয়াবা পাচারের সঙ্গে জড়িত দলটির সঙ্গে দেখা করে সে। সেখানেই আলতাফ জানতে পারে কীভাবে ইয়াবা তৈরি হয়, পাচার হয়, খাওয়া হয় এবং বাংলাদেশে বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ইয়াবার উৎপাদন খরচ খুব কম কিন্তু বিক্রি করে লাভ বেশি।
আলতাফ নিশ্চিত করেছেন, মিয়ানমারের কিছু নাগরিক বিশেষ করে বাংলাভাষী নাগরিক টেকনাফ দিয়ে মিয়ানমারে প্রবেশ করে এবং মিয়ানমার থেকে ইয়াবা নিয়ে আবার বাংলাদেশে ঢোকে। তারপর সেগুলো দেওয়া হয় মাদক পরিবহনকারীদের হাতে। তাদের মাধ্যমে ইয়াবা ছড়িয়ে পড়ে পুরো বাংলাদেশ জুড়ে। এ বছরের শুরুতে বিষয়টি কেমনভাবে হয় তা দেখার জন্য আলতাফ পাচারকারীদের সঙ্গে রওনা হয়েছিলেন। তার সঙ্গে ২০ জনেরও বেশি পাচারকারী ছিল। আলতাফের ভাষ্য, ‘আমরা জানতাম কোন কোন চৌকিতে পুলিশ তল্লাসি করে। সুতরাং আমরা এক সঙ্গে না গিয়ে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে রওনা হয়েছিলাম। কেউ হেঁটে, কেউ মোটরসাইকেলে, কেউ বা বাইসাইকেলে চড়ে মিয়ানমার সীমান্তের দিকে গিয়েছিলাম আমরা। মাইক্রবাস বা অটোরিকশায় করে গেলে নিশ্চিতভাবে তল্লাসি চালানো হতো।’
আলতাফের ভাষ্য, ইয়াবা পরিবহনের যে কাজে সে জড়িত, তা কোনও নিয়মিত কাজ নয়। কখনও সপ্তাহে এক বার কখনও ১৫ দিনে একবার বা কখনও কখনও তার চেয়ে বেশি সময়ে পর পর সে চালান নিয়ে যায়। ব্যবসা চাঙ্গা থাকলে মাসে আত থেকে দশ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করে সে। এসব টাকা খরচ হয়ে যায় ঋণ পরিশোধ, মুদি দোকানের বাকি পরিশোধ এবং চিকিৎসার ব্যয় নির্বাহে খরচ হয়ে যায়।
কুতুপালং আশ্রয় শিবির থেকে কক্সবাজারে কীভাবে ইয়াবা পরিবহন হয় তার বর্ণনা দিয়েছে আলতাফ: প্রথমে পাচারকারীদের কেউ একজন আমার ঘরে বা ক্যম্পের ভেতরের দিকের কোনও এলাকায় ইয়াবার চালান হস্তান্তর করে। কোনও কোনও চালানে ১০০/২০০ পিস ইয়াবা থাকে। কোন কোনও চালানে সর্বোচ্চ এক হাজার পিস ইয়াবাও থাকে। এক হাজার পিসের মতো বড় চালান হলে কখনও জুতার মধ্যে আর কখনও পলিথিনে মুড়িয়ে বেল্টের নিচে করে পরিবহন করি। আর চালান ছোট হলে কাগজে মুড়িয়ে হাতে করেই নিয়ে যাই। হাতে ইয়াবার প্যাকেটটি রেখে তার ওপর মোবাইল ফোন রাখলে কেউ টের পায় না যে অন্য কিছু নিয়ে যাচ্ছি।
ক্যাম্প থেকে বের হওয়ার চেয়ে ফিরে আসা সহজ। কারণ কুতুপালং শিবিরে সন্ধ্যার পরে শিবির থেকে বের হওয়ার বিষয়ে নিশেধাঙ্গা রয়েছে। সন্ধ্যার পর কাউকে শিবিরের বাইরে যেত দেখলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এর ফলে আলতাফের জন্য কাজটি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। আলতাফের ভাষ্য, ‘আমি যখন ইয়াবা নিয়ে যাই, তখন মেরিন ড্রাইভের রাস্তা ব্যবহার করি না; পাহাড়ি পথ ধরে যাই। এরপর কক্সবাজার পৌঁছানো খুব সহজ। আমি শুনেছি ইয়াবা পরিবহনকারীদের অনেকে ধরা পড়েছে। কারণ তারা ঠিক মতো বাংলা বলতে পারে না। কিন্তু আমি সবসময়ই বেঁচে গেছি। কক্সবাজার পৌঁছে পূর্বনির্ধারিত স্থানে ইয়াবা হস্তান্তর করি আমি। সাধারণত বিমানবন্দর এলাকার কাছে অবস্থিত বাহারছড়া ও ফিশারি ঘাটে চালানটি বুঝিয়ে দেই।
কাজ শেষে টেকনাফ থেকে বাসে করে সে ফেরত যায় কুতুপালংয়ে। শিবিরের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা নিরাপত্তা কর্মীদের প্রশ্নের মুখে পড়লে যাতে জাবাব দিতে পারে সেজন্য সে তার সঙ্গে কিছু জিনিসপত্র কিনে নিয়ে যায়। দেরিতে শিবিরে ফেরা সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। আলতাফের ভাষ্য, ‘সঙ্গে জিনিসপত্র কিনে নিয়ে গেলে আমি বলতে পারি, আমার কিছু জরুরি জিনিসপত্র কেনার দরকার ছিল।’
আল জাজিরা লিখেছে, আশ্রয় শিবিরে চারশ থেকে পাঁচশ ইয়াবা পরিবহনকারী আছে। কিন্তু তারা নিজেরাও নিজেদের সবাইকে চেনা না। নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে মাদক ব্যবসায়ীরা এই ব্যবস্থা করেছে। আলতাফের ভাষ্য, ‘আমরা একে অপরের সঙ্গে পরিচিত নই। যদি হতাম, তাহলে পুলিশের নজর পড়ত আমাদের ওপর এবং তারা খুব সহজকেই চিহ্নিত করে আমাদের গ্রেফতার করতে পারত।’
নিরাপত্তা বাহিনীর মাদকবিরোধী অভিযানের বিষয়ে আলতাফের ভাষ্য, ‘আমি বন্দুকযুদ্ধে মারা যাওয়ার বিষয়ে শুনেছি। জেলে যাওয়ার বিষয়েও আমি জানি। ভীতি আমাদের সবার মনেই আছে। কিন্তু আমি কি করতে পারি? আমার যদি টাকা থাকত তাহলে আমি এই কাজ করতাম না।’
মিয়ানমারের ফিরে যেতে ইচ্ছুক আলতাফ বলেছে, ‘প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা হলে আমি মিয়ানমারে ফিরে যেতে চাই। এখানে আমরা আটকে পড়েছি। মিয়ানমারে আমাদের জমি আছে, সম্পদ আছে। আমরা সেখানে কৃষিকাজ করতে পারব। এখানে তো একটা মুরগিও পালন করা যায় না।’

ট্রেনের শিডিউল লণ্ডভণ্ড, দুর্ভোগ

প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে সবাই ছুটছে যার যার গন্তব্যে। বাস, ট্রেন-লঞ্চে করে ঢাকা ছাড়ছে মানুষ। গতকাল সকাল থেকেই বাস-লঞ্চ টার্মিনাল রেল স্টেশনে ছিল যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড়। বাড়তি মানুষের চাপে সড়কে কোথাও কোথাও দেখা দিয়েছে যানজট। আবার ভাঙা ও বৃষ্টির কারণে কর্দমাক্ত সড়কে কিছুটা দুর্ভোগ  পোহাতে হয়েছে যাত্রীদের। ঈদ যাত্রায় পথে পথে দুর্ভোগে পড়লেও মানুষের চেহারায় ছিল বাড়ি ফেরার আনন্দ। গতকাল মহাসড়কে কোথাও কোথাও যানজটের কবলে পড়ে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকতে হয়েছে যাত্রীদের। ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে যাত্রীদের।
সরজমিন কমলাপুর রেলস্টেশনে দেখা যায়, সকাল থেকেই মানুষ আর মানুষ। ব্যাগ, লাগেজ হাতে নিয়ে সবাই ছুটছেন কাঙ্ক্ষিত ট্রেনের দিকে। তবে ট্রেন ছাড়তে দেরি হওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন যাত্রীরা। উত্তরবঙ্গের চিলাহাটিগামী নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনটি সকাল ৮টায় ছেড়ে যাওয়ার কথা থাকলেও ১০টা ৪৫ মিনিটেও প্ল্যাটফরমে দাঁড়ানো ছিল। পুরো ট্রেন জুড়েই যাত্রীতে ঠাসা, পা ফেলার জায়গাটুকুও নেই। ট্রেনটি বিলম্বে আসার কারণে আগে থেকেই প্ল্যাটফরমে যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড় ছিল। ট্রেন প্ল্যাটফরমে বিলম্বে পৌঁছানোর পরই যাত্রীদের হুড়োহুড়ি।
মানুষের ভিড় ঠেলে তখন সবার  ট্রেনে ওঠার চেষ্টা। নিমিষেই ট্রেন কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। কেউবা ভিড় ঠেলে গেট দিয়ে ভেতরে উঠছেন, যারা পারেননি তাদের কেউবা জানালা দিয়ে প্রথমে ব্যাগ, পরে পরিবারের সদস্যদের ট্রেনের ভেতরে ঢুকিয়ে দিচ্ছেন, এরপর নিজেও উঠছেন ওই জানালা দিয়েই। মুহূর্তের মধ্যেই ট্রেনে যেন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। ট্রেনের ছাদেও ফাঁকা নেই। পুরো ট্রেনের ছাদ জুড়ে মানুষ আর মানুষ।
ঈদযাত্রার তৃতীয় দিন গতকাল  কমলাপুর স্টেশনের এমনই দৃশ্য চোখে পড়ে। গত ১০ই আগস্ট যারা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষার পর অগ্রিম টিকিট পেয়েছিলেন, তারাই গতকাল ট্রেনযোগে ঢাকা ছাড়ছেন। ঈদ এলেই টিকিটপ্রাপ্তি থেকে শুরু করে বাড়ি পৌঁছা পর্যন্ত পথে পথে ভোগান্তি পোহাতে হয় ঘরমুখো মানুষের। তবুও ঘরে ফেরাতেই যেন সব আনন্দ। নীলসাগর ট্রেনের যাত্রী  কামরুল হাসান বলেন, সকাল ৮টার ট্রেন এটি, ১০টা ৪০ মিনিটেও ট্রেনটি স্টেশনই আছে।
২ ঘণ্টা ৪০ মিনিট বিলম্বেও ট্রেনটি ছাড়তে পারেনি। হাজার হাজার মানুষ স্টেশনে বিরক্তি ভোগান্তি-বিড়ম্বনার মধ্যে আছেন। এই ট্রেনের অগ্রিম টিকিটের জন্য ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা সবাই লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট কেটেছেন। অথচ ঈদযাত্রা দিন আবার ২ ঘণ্টা ৪০ মিনিট লেটেও ট্রেন ছাড়েনি। মানুষের তো ভোগান্তির একটা সীমা আছে! শুধু নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনই নয়; রোববার ঈদযাত্রার তৃতীয় দিনেও সকাল থেকেই বেশ কয়টি ট্রেন দেরিতে এসে দেরিতে ছেড়ে গেছে। এ ছাড়া সকাল ৯টায় কমলাপুর স্টেশন থেকে রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেন ছেড়ে যাওয়ার কথা থাকলেও বেলা ১১টাতেও স্টেশনেই পৌঁছায়নি ট্রেনটি।
দিনাজপুরগামী একতা এক্সপ্রেস ট্রেনটি দাঁড়িয়ে থাকলেও বেলা ১১টাতে ছেড়ে যায়নি ট্রেনটি, অথচ শিডিউল অনুযায়ী ট্রেনটি সকাল ১০টায় ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল। অনেকটা ক্ষোভ প্রকাশ করে রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রীরা বলেন, এই ক্ষোভ কাকে জানাব, এই ভোগান্তির কথা কাকে বলব? রংপুর এক্সপ্রেস টেনটি সকাল ৯টায় ছাড়ার কথা অথচ ১১টা ১৫ মিনিটেও স্টেশনে আসেনি।
স্ত্রী-ছোট সন্তানসহ আর কতক্ষণ অপেক্ষা করবো? গত ১০ই আগস্ট ১৩ ঘণ্টা অপেক্ষা করে আজকের টিকিট পেয়েছিলাম কিন্তু আজকের ভোগান্তিটা আরো বেশি, কারণ সঙ্গে আছে স্ত্রী, ছোট  সন্তান। রাজশাহীগামী ধূমকেতু এক্সপ্রেস সকাল ৬টায় কমলাপুর ছাড়ার কথা থাকলেও সেটি ছেড়ে যায় ৭টার পর। খুলনাগামী সুন্দরবন এক্সপ্রেস সকাল ৬টা ২০ মিনিটে ছাড়ার কথা থাকলেও সেটি ছেড়ে যায় সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে।
ঈদ স্পেশাল ট্রেন ৯টা ১৫ মিনিটে স্টেশন ছেড়ে যাওয়ার কথা থাকলেও বেলা ১১টা ২০ মিনিটেও ছেড়ে যায়নি। ট্রেনের এমন বিলম্ব বিষয়ে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন ম্যানেজার সিতাংশু চক্রবর্তী বলেন, ট্রেনগুলো দেরিতে কমলাপুর স্টেশনে আসার কারণে ছেড়ে যেতে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। ঈদের সময় যাত্রীর চাপ থাকায় ট্রেনে ধীরগতি থাকে, আবার সব স্টেশনে দুই/এক মিনিট বেশি সময় প্রয়োজন হয় যাত্রী ওঠানামার জন্য। তবুও আমরা সবসময় চেষ্টা করছি যাতে কোনো ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় না হয়। কমলাপুর স্টেশন সূত্রে জানা গেছে, রোববার মোট ৬৮টি ট্রেন ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। এর মধ্যে ৩১টি আন্তঃনগর, ৪টি ঈদ স্পেশাল, বাকি ট্রেনগুলো লোকাল ও মেইল সার্ভিস।
এদিকে গাবতলী, মহাখালী ও সায়েদাবাদ টার্মিনালে অগ্রিম টিকিট কিনেও বাসের জন্য বসে ছিলেন যাত্রীরা। সমস্যা হতে পারে এই বিষয়টি মাথায় রেখেই নির্দিষ্ট সময়ের আগে টার্মিনালে আসেন তারা। গাবতলী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল সূত্র জানায় যায়, ঘরমুখো মানুষের চাপ ছিল। বিভিন্ন রুটের যাত্রীর কাউন্টারে কাউন্টারে ভিড় ছিল। কাঙ্ক্ষিত সময়ের বাস আসার অপেক্ষা করছিলেন তারা। ভোর বেলা থেকে বিভিন্ন রুটের বাস যথাসময়ে ছেড়ে গেছে।
তবে কিছু বাস দেরিতে ছাড়ার এবং অতিরিক্ত ভাড়া নেয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। গাবতলীর হানিফ, এসআর, নাবিল, শ্যামলী ছাড়াও প্রত্যেকটি কাউন্টারেই বেশ ভিড় ছিল। অন্যদিকে সকাল থেকেই আস্তে আস্তে সদরঘাটে যাত্রীদের ভিড় বাড়তে থাকে। পরিবার-পরিজন নিয়ে লঞ্চযাত্রীরা আগেভাগেই ঘাটে পৌঁছান। কাঙিক্ষত লঞ্চের অপেক্ষায় হাজার হাজার মানুষ অপেক্ষা করেন টার্মিনালে। বরিশালাগামী যাত্রী  রাইসুল ইসলাম বলেন, ঈদের সময় বাড়ি যেতে বিড়ম্বনা পোহাতে হয়। তারপরেও বাবা-মা এবং আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে ঈদে বাড়ি থাকলে আনন্দের কমতি থাকে না। ঘাটে কোনো লঞ্চ না পেয়ে যাত্রীরা টার্মিনাল থেকে নৌকাযোগে নদীর মাঝখানে নোঙর করে রাখা লঞ্চে উঠেন। পল্টুনে আসার আগেই নদীর মাঝখানেই লঞ্চগুলো পরিপূর্ণ হয়ে যায়। কিছু কিছু লঞ্চে ছাদে উঠে বাড়ি ফিরছেন যাত্রীরা।

লিরার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও আজানের সমালোচনা একই বিষয়: এরদোয়ান

সোমবার তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান বলেছেন, লিরার বিরুদ্ধে চলা ষড়যন্ত্র দেশটির সার্বভৌমত্ব বা আজানের বিরুদ্ধচারনের চেয়ে ভিন্ন কিছু নয়! লিরা সংকটের মূল উদ্দেশ্য ‘তুরস্ক ও তুর্কি জনগণকে পদানত করা, পরাজিত করা।’ বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, দুইটি আন্তর্জাতিক আর্থিক রেটিং সংখ্যা তুরস্কের রেটিং নিচে নামিয়ে দিয়েছে, যার অর্থ দেশটিতে অর্থনৈতিক বিপর্যয় অনিবার্য।
দীর্ঘ সময় ধরে ডলারে ঋণ নেওয়ার পর এখন সেসব ঋণ ফেরত দেওয়ার সামর্থ্য নেই তুরস্কের প্রতিষ্ঠানগুলোর। দেশটির মুদ্রা লিরা দ্রুত মূল্য হারাচ্ছে। ফলে বাড়ছে জিনিসপত্রের দাম। অবস্থা সামাল দিতে এরদোয়ান দেশবাসীকে ডলার বিক্রি করে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন পণ্য বয়কটেরও। এদিকে দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। তুরস্ক সন্ত্রাসের অভিযোগে যে খ্রিস্টান ধর্মযাজককে গ্রেফতার করেছে তার মুক্তি দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ওই ধর্মযাজককে গ্রেফতার করায় তুর্কি স্বরাষ্ট্র ও আইনমন্ত্রীর ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ওয়াশিংটন। তার ওপর তুর্কি ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম পণ্যের ওপর বর্ধিত হারে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আল জাজিরা তাদের এক প্রতিবেদনে লিখেছিল, আগে থেকেই ঝুঁকিতে থাকা তুর্কি অর্থনীতি ঝাঁকুনি খেয়েছে মার্কিন সিদ্ধান্তে।
ঈদ উপলক্ষে টেলিভিশনে প্রচারিত ভাষণে এরদোয়ান বলেছেন, ‘লিরার বিরুদ্ধে যে ষড়যন্ত্র হচ্ছে তা আমাদের পতাকা বা আজানের বিরুদ্ধে হওয়া হামলার চেয়ে ভিন্ন কিছু নয়। এর উদ্দেশ্য একই। লিরা সংকটের মূল লক্ষ্য, তুরস্ক ও তুর্কি জনগণকে পদানত করা, পরাজিত করা। কিন্তু যারা মনে করে লিরার বিনিময় হার নিয়ে ষড়যন্ত্র করে তারা সফল হবে, খুব তাড়াতাড়িই তারা তাদের ভুল বুঝতে পারবে।’ এ সময় এরদোয়ান সরাসরি কোনও দেশ বা সংস্থার নাম উচ্চারণ করেননি। কিন্তু রয়টার্স লিখেছে, আগে তিনি লিরা সংকটের জন্য পশ্চিমা রেটিং সংস্থা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করেছিলেন।
ডলারের বিপরীতে লিরার মান আজ বেড়েছে। কিন্তু এখনও ডলারের সঙ্গে লিরার বিনিময় হার ৬.১। অথচ ২০১১ সালে  ডলারের বিপরীতে লিরার বিনিময় হার ছিল ১.৯! লিরার দরপতনের কারণে রেটিং এজেন্সি মুডিস এবং স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুওর তুরস্কের রেটিং কমিয়ে দিয়েছে। নেদারল্যান্ডের রাবোব্যাংকে কর্মরত বাজার বিশেষজ্ঞ পিওটর মাতিস মন্তব্য করেছেন, রেটিং সংস্থাগুলোর এই রেটিং কমিয়ে দেওয়ার অর্থ হচ্ছে, তাদের বিবেচনায় তুরস্কের অর্থনীতির গতি হারাবার সম্ভাবনা অনেক বেশি এবং লিরার দরপতন দেশটির আর্থিক স্থিতিশীলতার পক্ষে উদ্বেগজনক।