Sunday, October 11, 2015

জাতীয় সরকার গঠনের আহ্বান বি. চৌধুরীর

দেশের সঙ্কটজনক পরিস্থিতিতে অবিলম্বে একটি জাতীয় সরকার গঠনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিকল্পধারা বাংলাদেশের সভাপতি ও সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। সেই সঙ্গে দেশে আইএস-এর অস্তিত্ব আছে কি-না সে বিষয়েও সরকারের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করেন তিনি। নিজের ৮৬তম জন্মদিন পালন উপলক্ষে বারিধারার বাসভবনে আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এ দাবি জানান। সরকারকে উদ্দেশ্য করে সাবেক এ প্রেসিডেন্ট বলেন, ঘুমালে চলবে না। একচোখা নীতি ছাড়তে হবে। দেশের বর্তমান সঙ্কটজনক পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে একটি জাতীয় সরকার গঠন করতে হবে। তবে জাতীয় সরকারে বর্তমান সংসদের লোকজনকে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। কারণ এই সংসদের লোকজন জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়নি। বর্তমান জাতীয় সংসদের আগের সংসদের লোকজন এবং অন্যান্য দল ও শ্রেণী-পেশার মধ্য থেকে ভাল মানুষ নিয়ে এই জাতীয় সরকার গঠন করতে হবে। তিনি বলেন, আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। জিয়াউর রহমানের আমলে কৃষি, শিক্ষা ও শিল্প বিপ্লবের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে। দেশে খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে, দারিদ্র্য বিমোচনে দেশ অনেকদূর এগিয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রেও ভাল সাফল্য এসেছে। কিন্তু এসব রাজনৈতিক ও বৈজ্ঞানিক অর্জন সত্ত্বেও আমরা গণতন্ত্র পেলাম না। মানুষ ভোট দিতে পারে না। ছাপ্পা মেরে মানুষের ভোট দিয়ে দেওয়া হয়। শতকরা পাঁচ ভাগ ভোট নিয়ে সরকার চলছে। দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা নেই। নেই আইনের শাসন। সাগর-রুনির হত্যা, নারায়ণগঞ্জের তকি হত্যা ও সাতখুনের বিচার এখনও হয়নি। সাতখুনের মূল আসামি নূর হোসেনকে এখনও কলকাতা থেকে ফেরত আনতে পারেনি এই সরকার। বিকল্পধারার প্রেসিডেন্ট বলেন, অতীতে ট্রাকে ট্রাকে অস্ত্র আনা হয়েছে। কিন্তু বিচার হয়নি, জড়িতদের ধরা হয়নি। ফলে এদের সাহস বেড়ে গেছে। ইতালি ও জাপানের নাগরিককে হত্যা করা হলো। কিন্তু হত্যার সঙ্গে জড়িত একজনকেও গ্রেপ্তার করা হয়নি। এতে আমাদের প্রতি বিদেশীদের আস্থা নষ্ট হয়ে যাবে। তিনি প্রশ্ন করে বলেন, পুলিশের আগেই যদি প্রধানমন্ত্রী, তার ছেলে ও অন্য মন্ত্রীরা বলে দেন বিএনপি, জামায়াত এ সব হত্যার সঙ্গে জড়িত, তা হলে পুলিশ কি করবে? পুলিশকে পুলিশের কাজ করতে দিতে হবে। বিচারের বিষয়ে বিচারককেই বলতে দিতে হবে। সাবেক এই প্রেসিডেন্ট বলেন, দেশে আইএস’র অস্তিত্ব আছে কি না, তা সরকারকে সুস্পষ্টভাবে বলতে হবে। ক্রিকেটে আমাদের বিশাল মর্যাদা ও অর্জনকে ম্লান এবং পাকিস্তানের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ষড়যন্ত্র চলছে। বাংলাদেশকে দুবাই গিয়ে খেলতে হলে কোথায় যাবে আমাদের ক্রিকেট? অনেক রকম ষড়যন্ত্র চলছে। তিনি সরকারকে উদ্দেশ্য করে বলেন, দেশে আইএস বা অন্য কোন সন্ত্রাসী সংগঠন আছে কিনা বলে দেন না কেন? আলোচনা সভায় অন্যদের মধ্যে বিকল্পধারার মহাসচিব মেজর (অব.) আবদুল মান্নান, প্রফেসর আবু মোজাফফর আহমেদ, ইঞ্জিনিয়ার মো. ইউসুফ, শাহ আহম্মেদ বাদল, বেগ মাহাতাব, সাহিদুর রহমান, মাহবুব আলী, জানে আলম হাওলাদার, আইনুল হক, আসাদুজ্জামান বাচ্চু, মাহফুজুর রহমান, বিএম নিজাম, সাইফুল ইসলাম শোভন, শহীদুল হক ভূইয়া, মামুনুর রশিদ প্রমুখ বক্তব্য দেন। আলোচনা সভা শেষে বি. চৌধুরী ৮৬তম জন্মদিনের কেক কেটে তা নিজে নেতাকর্মীদের মধ্যে বিতরণ করেন। এ সময় বি. চৌধুরীর সহধর্মিণী হাসিনা ওয়ার্দা চৌধুরীও উপস্থিত ছিলেন।

আইএস নেই, জঙ্গি আছে -সাক্ষাৎ​কারে : হারুন-অর-রশিদ by সোহরাব হাসান

হারুন-অর-রশিদ
দুই বিদেশি হত্যায় দেশে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে জঙ্গিদের যোগসূত্র থাকার বিষয়টি সামনে এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. হারুন-অর-রশিদের সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হলো
প্রথম আলো: দুই বিদেশি নাগরিক হত্যার পরই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ। সরকার বলছে, এই হত্যাকাণ্ডে বিএনপি-জামায়াতের হাত আছে। বিএনপি বলছে, জনগণের দৃষ্টি অন্য দিকে ফেরানোর চেষ্টা।
হারুন-অর-রশিদ: এ অভিযোগ নতুন নয়। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই অংশ। তবে প্রধানমন্ত্রী যে দুটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের অর্জন। যারা এই অর্জনকে ভালোভাবে নেয়নি, তাদের দ্বারা এ কাজ হতে পারে। দুই বিদেশি নাগরিককে হত্যা করে তারা দেখাতে চেয়েছে যে বাংলাদেশ বিদেশিদের জন্য নিরাপদ নয়। এ ছাড়া দুজন যুদ্ধাপরাধীর বিচারের প্রক্রিয়া প্রায় শেষ পর্যায়ে। গত কয়েক মাস দেশের অবস্থা মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল। সেটি নষ্ট করাও এর উদ্দেশ্য হতে পারে। হত্যার পেছনে দুটি বিষয়ই পটভূমি হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে আমি মনে করি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার তদন্তের মাধ্যমেই প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে।
প্রথম আলো: কিন্তু তদন্তের আগেই প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এর সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতের হাত থাকতে পারে।
হারুন-অর-রশিদ: এটি তাঁর ধারণা। আর এই ধারণার পেছনে রয়েছে বছরের শুরুতে আন্দোলনের নামে দল দুটির পেট্রলবোমা মেরে বহু মানুষ হত্যার ঘটনা।
প্রথম আলো: বিএনপি বলেছে, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর তদন্তের দরকার হবে না। সরকার যাদের চাইবে, তাদেরই সাজা দেবে।
হারুন-অর-রশিদ: বিএনপি তাদের ধারণার কথা বলেছে। যদিও এর পক্ষে যুক্তি তুলে ধরতে পারেনি। রাজনীতিতে যদি কোনো পক্ষ খেলার নিয়ম না মেনে চলে, তাহলে সুস্থ ও স্বাভাবিক রাজনীতি আশা করা যায় না। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মতাদর্শগতভাবে পরাস্ত করা আর শারীরিকভাবে নিশ্চিহ্ন করা নিশ্চয়ই এক নয়। আমরা ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার ঘটনায় সেটাই দেখেছি। এর আগেও যতগুলো বোমা-গ্রেনেড হামলা হয়েছে, তারও লক্ষ্যবস্তু ছিল আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী।
প্রথম আলো: সরকার এত দিন বলেছিল, জঙ্গিবাদ নির্মূল হয়েছে। এখন দেখা যাচ্ছে নির্মূল হয়নি।
হারুন-অর-রশিদ: জঙ্গিবাদ কেবল জাতীয় বা আঞ্চলিক সমস্যা নয়। আন্তর্জাতিক সমস্যা। যেসব দেশ বাংলাদেশের ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করছে, সেসব দেশেও তো জঙ্গি হামলা হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটেই বাংলাদেশের জঙ্গিবাদী তৎপরতাকে দেখতে হবে। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইও নিরন্তর প্রক্রিয়া। অতীতে বাংলাদেশে জঙ্গিরা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতাও পেয়েছে; এখন সেটি পাচ্ছে না। জঙ্গিবাদ নির্মূল করতে সরকার অভিযান চালাচ্ছে। অনেকে ধরাও পড়েছে।
প্রথম আলো: কিন্তু তাদের বিচার হচ্ছে কি?
হারুন-অর-রশিদ: বর্তমান সরকারের আমলে অনেক জঙ্গির বিচার হয়েছে। শাস্তি পেয়েছে। একই সঙ্গে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারও চলছে।
প্রথম আলো: নিউইয়র্ক যাওয়ার আগে গার্ডিয়ান-এ সাক্ষাৎকার দিয়ে প্রধানমন্ত্রী ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে জঙ্গিবাদের ব্যাপারে সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু এখন তো দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশই সতর্ক নয়।
হারুন-অর-রশিদ: দেখুন, ১৬ কোটি মানুষের দেশ। কোনো অপশক্তি যদি টার্গেট করে কারও ওপর আঘাত করে, সেটি বন্ধ করা কঠিন। তার অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান হয়েছে। জঙ্গিদের ব্যাপারে বর্তমান সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণেই সেটি হবে না।
প্রথম আলো: এত দিন সরকারি দলের নেতারা-মন্ত্রীরা বলেছেন, বাংলাদেশে আইএস আছে। এখন বলছেন, আইএস নেই। কোনটি সত্য?
হারুন-অর-রশিদ: আইএস আছে—সরকারের দায়িত্বশীল মহল থেকে এ রকম কিছু বলা হয়েছে বলে আমার জানা নেই। তবে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম প্রভৃতি সংগঠনের সদস্যরা বলেছে, তারা আইএসের হয়ে কাজ করছে। আইএসের কোনো শাখা বাংলাদেশে কাজ করছে, এমন প্রমাণ নেই। মার্কিন রাষ্ট্রদূতও বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখার কথা বলেছেন।
প্রথম আলো: তাহলে আইএস নেই?
হারুন-অর-রশিদ: আইএস নেই। জঙ্গি আছে। তবে বাংলাদেশের সমাজে কখনোই তারা ঘাঁটি গাড়তে পারবে না। মানুষের সমর্থন পাবে না। যেকোনো দেশে জঙ্গিদের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হলে ভিত্তি ও আশ্রয় লাগে, সেটি এখানে তারা পাবে না।
প্রথম আলো: বাংলাদেশে যেসব জঙ্গিগোষ্ঠী আছে, তারা কি দেশীয় কাঠামোয় কাজ করে, না আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কে?
হারুন-অর-রশিদ: আফগানিস্তানে সোভিয়েতবিরোধী যে মুজাহিদ বাহিনী গড়ে উঠেছিল, তাতে বাংলাদেশ থেকে অনেকে গিয়েছিল, তারা দেশে ফিরে হরকাতুল জিহাদ, জেএমবিসহ বিভিন্ন সংগঠন গড়ে তুলেছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদের সঙ্গে তাদের শক্ত নেটওয়ার্ক আছে বলে মনে হয় না।
প্রথম আলো: জঙ্গিবাদী সমস্যাটি কি নিছক আইনশৃঙ্খলাজনিত, না রাজনৈতিক?
হারুন-অর-রশিদ: রাজনৈতিক সমস্যা তো বটেই। তবে সেই সমস্যার মূলে হলো একাত্তর ও পঁচাত্তর। একাত্তরে যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে, যারা পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে, তাদের সঙ্গে আজকের জঙ্গিদের গভীর যোগসূত্র আছে বলে মনে করি।
প্রথম আলো: অনেকে বলেন, বর্তমান সংকটের মূলে ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচন।
হারুন-অর-রশিদ: নির্বাচন তো জনগণের জন্য। জনগণ এটি মেনে নিয়েছে। বরং আমি বলব, ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে না এসে বিএনপি বড় ভুল করেছে। মানুষ আর গৎবাঁধা রাজনীতি পছন্দ করছে না। বিএনপি-জামায়াত পেট্রলবোমা দিয়ে মানুষ হত্যা না করলে হয়তো মানুষ তাদের পক্ষে থাকত। ব্যাপক জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিএনপি নিজেকেই প্রান্তিক করে ফেলেছে। তারা এখন জনগণ থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন।
প্রথম আলো: বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বিএনপিকে জামায়াতের সঙ্গে ব্রাকেটবন্দী করা ঠিক হবে না। দুই দলের রাজনীতি ভিন্ন। এই বক্তব্যে কি ইতিবাচক কিছু দেখেন?
হারুন-অর-রশিদ: আমরা তো বিএনপিকে জামায়াতে ইসলামী থেকে বিযুক্ত অবস্থায় দেখতে চাই। কিন্তু তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক একটি ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মধ্যেই সূচিত হয়েছে, যা প্রায় অবিচ্ছিন্ন। দল দুটি একই রাজনৈতিক ধারাকে ধারণ করে। বিএনপির তরুণ নেতৃত্ব আরও বেশি হতাশ করেছে। যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রশ্নে তাদের অবস্থানটি দেখুন। বিএনপি যুদ্ধাপরাধী নিজামী-মুজাহিদকে মন্ত্রী করেছে।
প্রথম আলো: কিন্তু আওয়ামী লীগও তো জামায়াতকে নিয়ে আন্দোলন করেছিল?
হারুন-অর-রশিদ: একটি হলো আত্মিক সম্পর্ক; আরেকটি কৌশলগত। বিএনপি জামায়াতের মধ্যে যে যতই বিচ্ছেদ ঘটাতে চান না কেন, তা হবে না।
প্রথম আলো: বিএনপির নীতি ও আদর্শ থেকে সরকারের শরিক জাতীয় পার্টির কোনো ফারাক আছে কি?
হারুন-অর-রশিদ: বাংলাদেশের রাজনীতিতে এরশাদ বা জাতীয় পার্টি কোনো শক্তিই নয়। এটি একটি আঞ্চলিক দল। ভবিষ্যতেও এর সম্ভাবনা নেই।
প্রথম আলো: গণতন্ত্রে বিরোধী দল বা পক্ষের মতপ্রকাশের অধিকার স্বীকৃত। কিন্তু বর্তমানে তারা সেই অধিকার প্রয়োগ করতে পারছে না।
হারুন-অর-রশিদ: আমরা তো দেখলাম, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের নামে বিএনপি-জামায়াত পেট্রলবোমা মেরে মানুষ হত্যা করল। কোনো উন্নত গণতান্ত্রিক দেশ এসব মেনে নেবে না। নির্বাচন বা আন্দোলন উভয় ক্ষেত্রে একটি ধারাবাহিক নীতি থাকতে হয়। বিএনপি সেটি রক্ষা করতে পারেনি। তারা পাঁচ সিটি নির্বাচনে জয়ী হলো, এরপর জাতীয় নির্বাচন বর্জন করল, আবার তিন সিটি নির্বাচনে অংশ নিয়েও মাঝপথে সরে দাঁড়াল। বিএনপিতে দিকনির্দেশনার অভাব রয়েছে। সরকার বিএনপির প্রতি কী রকম আচরণ করে, তার ওপর নির্ভর করলে চলবে না। জনগণের কাছে যেতে হবে।
প্রথম আলো: আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বৈরিতা চলতে থাকলে কি জঙ্গিগোষ্ঠী আরও ভয়ংকর রূপে আবির্ভূত হবে না?
হারুন-অর-রশিদ: বাংলাদেশের মানুষ কখনোই জঙ্গিবাদকে প্রশ্রয় দেবে না। জঙ্গিবাদ প্রসারের সামাজিক পূর্বশর্ত এখানে নেই। তাই, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বৈরিতার সুযোগেও তাদের শক্তি বৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখি না। তবে আমি মনে করি, একটি সুস্থ ও স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সবার অংশগ্রহণ থাকা জরুরি। তবে সেটি হতে হবে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে। অতীতের ভুল সত্ত্বেও এ ক্ষেত্রে বিএনপি বিরাট ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রথম আলো: এই যে দুই বিদেশি নাগরিককে হত্যা করা হলো। এটা কি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি নয়?
হারুন-অর-রশিদ: আমি তা মনে করি না। এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা। রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত কারণেও হামলা হতে পারে। তবে এ জন্য উদ্বিগ্ন হওয়ার কিংবা এটা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি ভাবার কোনো কারণ নেই।
প্রথম আলো: আমাদের নাগরিক সমাজ কেন গণতন্ত্রের সুরক্ষা ও বিকাশে ভূমিকা নিতে পারছে না?
হারুন-অর-রশিদ: এটিও সামাজিক ও রাজনৈতিক বিকাশের যে স্তরে আমরা আছি, তার প্রতিফলন। রাষ্ট্রযন্ত্র ও জনগণের মাঝখানে সংঘবদ্ধ সচেতন জনগোষ্ঠী হলো নাগরিক সমাজ; যার ভিত্তি হবে সংবিধান, মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকার। সেগুলো তারা তুলে ধরবে। কিন্তু আমাদের নাগরিক সমাজ হয় আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপির পক্ষে কথা বলে। স্বতন্ত্র ভূমিকা নিতে পারে না। রাজনৈতিক সমীকরণটাই এখানে বড়। আরেকটি বিষয় হলো, রাজনৈতিক সংযোগ ছাড়া কোথাও প্রবেশাধিকার পাওয়া যায় না।
হারুন–অর–রশিদ: উপাচার্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।

দেশে কালা জঙ্গি না ধলা জঙ্গি? by সোহরাব হাসান

বাংলাদেশে জঙ্গি আছে কি নেই সেটি আর এখন বিতর্কের বিষয় নয়। বিতর্ক হলো সেই জঙ্গিরা আইএস কি না?
কিছুদিন আগ পর্যন্ত বিভিন্ন সূত্রে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা জঙ্গি অথবা বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত জঙ্গিদের সিরিয়াভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন আইএসে যোগদান কিংবা যোগদানের চেষ্টাকালে ধরা পড়ার খবর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীই গণমাধ্যমকে দিয়ে যাচ্ছিল। গত ১৫ মে যাত্রাবাড়ীর একটি সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় পুলিশ যে অভিযোগপত্র দেয়, তাতে তাদের আইএস বা আইসিসের সদস্য হিসেবে উল্লেখ করে। এখন মন্ত্রীরা বলছেন বাংলাদেশে আইএস নেই, জঙ্গি আছে। তারা কালা না ধলা তাতে কিছু আসে যায় না।
আইএসের জঙ্গি সন্দেহে ধরা পড়া এক যুবকের বাবা, যিনি হাইকোর্টের একজন বিচারক, বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তাঁর ছেলে ধরা পড়ে বেঁচে গিয়েছে। ধরা না পড়লে তাঁকে হয়তো আইএস সদস্য হিসেবে জীবন দিতে হতো। এ রকম কত যুবক আইএসে যোগ দিতে বাংলাদেশ থেকে পাড়ি দিয়েছেন বা দেওয়ার চেষ্টা করছেন, তার হিসাব কারও আছে বলে মনে হয় না।
এ খবরের পাশাপাশি আমরা চট্টগ্রামের খবরটি মিলিয়ে নিতে পারি। সম্প্রতি সেখানে গ্রেনেড বিস্ফোরণে নিহত জেএমবি নেতা জাবেদের লাশ নিতে স্বজনদের কেউ না আসায় পুলিশ আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করেছে। জাবেদের বড় ভাইয়ের স্ত্রী বলেছেন, ‘তাঁর এমন পরিচয় ও করুণ মৃত্যু আমরা মেনে নিতে পারছি না।’ বাংলাদেশে এ রকম কত জােবদ জঙ্গিবাদীদের খপ্পরে পড়ে জীবন দিয়েছেন, তার শুমার নেই। জঙ্গিবাদ হলো অনিরামেয় অসুখের নাম।
দুই.
আমরা স্মরণ করতে পারি যে বাংলাদেশের জঙ্গিরা প্রথমে অভিযান চালিয়েছে দেশে নয়, বিদেশের মাটিতে। তারা প্রশিক্ষণও নিয়েছে বিদেশের মাটিতে। সত্তর দশকের শেষ দিকে এবং গোটা আশির দশকজুড়ে বাংলাদেশি জঙ্গিরা লিবিয়া ও আফগানিস্তানকে জঙ্গিবাদের প্রশিক্ষণকেন্দ্র এবং প্রস্তুতিক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে। গাদ্দাফির লিবিয়া সে সময়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পাশাপাশি দেশে দেশে ইসলামি ব্যবস্থা কায়েমের জন্য বিদেশি জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ দিত। দেশটির অন্যতম সামরিক উপদেষ্টা করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি আবদুর রশীদকে।
আর আফগানিস্তানে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটে সত্তরের দশকের শেষ দিকে সোভিয়েত-সমর্থিত কমিউনিস্ট সরকারকে উৎখাতে গঠিত মুজাহিদ বাহিনীর মাধ্যমে। এ বাহিনীর সদস্যদের অঙ্ক শেখানো হতো এভাবে: ‘ধরুন, ২৪ জন মুজাহিদের একটি দল রুশ বাহিনীর ওপর হামলা করল এবং প্রত্যেক মুজাহিদ ১২ জন রুশ সেনাকে কতল করল। তাহলে ২৪ জন মুজাহিদের হাতে কতজন রুশ সেনা মারা পড়ল?’ সূত্র: পাকিস্তান মিলিটারি ইন পলিটিকস, ইশতিয়াক আহমেদ, আমারিলিজ, দিল্লি। মুজাহিদ বাহিনীর হয়ে যুদ্ধ করতে অনেক বাংলাদেশি যুবককে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আর যখন আফগানিস্তানে বিজয়ী মুজাহিদেরা আত্মঘাতী লড়াইয়ে লিপ্ত হলো, তখনো ত্রাতার ভূমিকায় এল যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শাসক জিয়াউল হককে দিয়ে পাকিস্তানের আফগান শরণার্থী শিবিরগুলোতে গড়ে তুলল তালেবান বাহিনী। এ ব্যাপারে পাকিস্তানের আরেক সামরিক শাসক পারভেজ মোশাররফের সাক্ষ্য হচ্ছে:
‘আমেরিকানরা চায় আমরা ইসলামি যোদ্ধা তৈরি করি, আফগানিস্তানে জিহাদ করার জন্য যাদের নিয়োজিত করা যাবে। আমরা তাদের কথা মেনে নিলাম এ ধরনের মস্তিষ্ক ধোলাই আমাদের সমাজে কম প্রভাব ফেলবে সেটি না ভেবেই। আমরা তাদের জিহাদি হিসেবে প্রশিক্ষণ দিলাম। আমরা তাদের হত্যা করার প্রশিক্ষণ দিলাম। আমরা তাদের আফগানিস্তানে ও ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে পাঠালাম। এখন তারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে দেশের মানুষের ওপর।’ সূত্র: পাকিস্তান মিলিটারি ইন পলিটিকস, ইশতিয়াক আহমেদ।
আজ পুতিনের রাশিয়া যে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা সত্ত্বেও সিরিয়ায় আইএস দমনে বিমান হামলা চালাচ্ছে, তাতে মনে হয়, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নয়, ইতিহাসের উচিত শিক্ষা ঘটতে যাচ্ছে। জঙ্গিবাদ, সেটি ধর্মের নামে হোক, আর পরাশক্তির নামে হোক দুটোই মানবতা ও সভ্যতাকে ধ্বংস করে। আজকের আফগানিস্তান ও ইরাক কিংবা ইয়েমেনই তার প্রমাণ।
তিন.
মাওলানা ভাসানী একবার বলেছিলেন, নকশাল কারও গায়ে লেখা থাকে না। তাঁর সেই কথাটি আরেকটু ঘুরিয়ে বলা যায়, জঙ্গিবাদও কারও গায়ে লেখা থাকে না। জঙ্গিরা নিজেরাই তাদের কর্মকাণ্ড দিয়ে প্রমাণ করে তারা জঙ্গি। যেসব বাংলাদেশি আফগানিস্তানে মুজাহিদ বাহিনীতে যোগ দিয়েছিল, সোভিয়েত বাহিনী সেখান থেকে চলে যাওয়ার পর তাদের প্রয়োজনও ফুরিয়ে যায়। এরপর তারা দেশে ফিরে এসে সেই প্রশিক্ষণটি কাজে লাগায়। বাংলাদেশে হরকাতুল জিহাদ বা হুজি প্রধান মুফতি আবদুল হান্নান এবং জেএমবি প্রধান শায়খ আবদুর রহমান—দুজনই ছিলেন আফগান ফেরত। শায়খ অবশ্য সৌদি আরবেও কাজ করেছেন। এসব জঙ্গিগোষ্ঠী কখনো রাষ্ট্রযন্ত্রের সহযোগিতায়, কখনো রাষ্ট্রযন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ করে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাতে থাকে। তবে বাংলাদেশে প্রকাশ্যে অফিস খুলে প্রথম জঙ্গি তৎপরতা চালায় যেই জঙ্গিগোষ্ঠী, তার নাম ফ্রিডম পার্টি। আর এই সংগঠনটিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে তখন ব্যবহার করেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, বর্তমান জঙ্গিবিরোধী সরকারের সহযোগী। এমনকি তিনি নিজের তথাকথিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে জায়েজ করতে বঙ্গবন্ধুর আরেক আত্মস্বীকৃত খুনি ফারুক রহমানকে (পরবর্তীকালে যাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে) প্রার্থী করে তাঁকে রাষ্ট্রীয় বেতার ও টিভিতে ভাষণ দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন, যার নজির বাংলাদেশে নেই। আওয়ামী লীগ নেতারা বিএনপির বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী করা ও রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত করার অভিযোগ এনে থাকেন। এ অভিযোগ অসত্য নয়। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিকে রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী করা যে অারও বেশি গর্হিত কাজ, সে বিষয়টি তাঁরা বেমালুম ভুলে যান।
চার.
ডেইলি স্টার গতকাল ‘ফাইটিং মিলিট্যান্সি, এক্সট্রিমিজম ইন বাংলাদেশ’ শিরোনামে যে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে, তাতে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ টি এম শামসুল হুদার মন্তব্য রয়েছে। মির্জা ফখরুল ও শামসুল হুদা জঙ্গিবাদীদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করার কথা বললেও হানিফ এর বিরোধিতা করেন। এ ধরনের ঐক্য হলে নাকি দেশে জঙ্গিবাদের প্রসার ঘটবে। তাঁর যুক্তি, বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় থাকাকালে জঙ্গিবাদকে মদদ দিয়েছে। তারপরও বিএনপি যদি অতীতের ভুল স্বীকার করে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে চায়, তাতে আওয়ামী লীগের আপত্তি থাকবে কেন? দলটি যদি মনে করে যে বিএনপি এখনো জঙ্গিদের মদদ দিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করতে চাইছে, তাহলেও তো তাদের এ প্রকাশ্য ঘোষণাকে সাধুবাদ জানানো উচিত। আওয়ামী লীগের নেতাদের মনে রাখা দরকার যে জঙ্গিবাদ কেবল দলীয় সমস্যা নয়, জাতীয় সমস্যা। জাতীয় মতৈক্যের মাধ্যমেই এর সমাধান খুঁজতে হবে। জঙ্গি সমস্যাটির রাজনৈতিক দিক আমলে না নিয়ে নিছক আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা হিসেবে দেখলে কিংবা রাজৈনতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে চাইলে কখনোই জঙ্গিবাদ নির্মূল হবে না। যখন দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকে, তখন জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে না। তারা তখনই তৎপর হয়, যখন রাজনৈতিক বৈরিতা–অস্থিরতা এবং জনগণের সঙ্গে সরকারের দূরত্ব বাড়তে থাকে।
বরং আওয়ামী লীগের ওই নেতা যদি বলতেন, জাতীয় মতৈক্যের আগে জামায়াতে ইসলামীর মতো জঙ্গিবাদী দলের সঙ্গে বিএনপিকে সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে; যদি বলতেন যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রশ্নে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে, যদি বলতেন হেফাজতে ইসলামের ব্যাপারে তাদের ভূমিকা স্পষ্ট করতে হবে; যদি বলতেন বিএনপির যেসব নেতার বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদকে মদদ দেওয়ার তথ্য–প্রমাণ আছে, তঁাদের দল থেকে বের করে দিতে হবে, সেটিই হতো অধিক যুিক্তযুক্ত। আসলে আওয়ামী লীগ সে পথে যাচ্ছে না। তাহলে কি তারা যুদ্ধাপরাধের বিচারের মতো জঙ্গিবাদবিরোধী অভিযানকেও দলীয় রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে? তাদের এ চাওয়া কি আখেরে দেশের কল্যাণ আনবে?
আওয়ামী লীগ নেতারা সম্ভবত পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পারছেন না। দুই বিদেশি নাগরিক হত্যার পর যেসব ঘটনা ঘটেছে, বিদেশিরা যেভাবে কঠোর মনোভাব দেখাচ্ছেন, তাতে উদ্বিগ্ন না হয়ে পারা যায় না। সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বাড়তি সতর্ক করে দেওয়া কিংবা নিরাপত্তা জোরদার করার পরও তো বিদেশিরা আশ্বস্ত হচ্ছেন না। এটি কিসের লক্ষণ?
গত কয়েক বছরে জঙ্গিবাদীদের ছোটখাটো তৎপরতা চললেও জেলখানা থেকে আদালতে নেওয়ার পথে এক দুর্ধর্ষ জঙ্গিকে ছিনিয়ে নেওয়া ছাড়া বড় ধরনের ঘটনা ঘটেনি। ঘটনা ঘটার আগেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জঙ্গিদের আস্তানায় হানা দেওয়া এবং পাকড়াও করার খবর আমরা পত্রিকায় পড়েছি এবং টেলিভিশনে দেখেছি। কিন্তু এ পর্যন্ত কয়টির বিচার হয়েছে? এ বছর যে তিনজন লেখক-ব্লগার জঙ্গিদের হাতে খুন হলেন, সেই খুনিদেরও সবাই ধরা পড়েনি। জঙ্গি দমন নিয়ে এত দিন সরকার যে সাফল্য প্রচার করে আসছিল, দুই বিদেশি নাগরিকের হত্যা কি তা অসার করে দেয়নি? স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, হঠাৎ করে তারা এত শক্তি ও সাহস কোথায় পেল যে মাত্র চার দিনের ব্যবধানে জঙ্গিরা ঢাকায় ও রংপুরে দুজন বিদেশি নাগরিককে খুন করতে পারল। দুটি খুনেরই ধরন এবং ব্যবহৃত অস্ত্র একই ধরনের। সরকার জোর তদন্ত চালালেও ঘটনার কিনারা করতে পারছে বলে মনে হয় না।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে জঙ্গিবাদ দমনে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার জন্য বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তাহলে দেশের ভেতরে তিনি কেন সেই ঐক্যের আহ্বান রাখবেন না? বিরোধী দলের মদদেও যদি জঙ্গিবাদের প্রসার ঘটে থাকে, তাহলেও সরকারের উচিত সেই জঙ্গিদের সঙ্গে বিরোধী দলের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া। ক্ষমতাসীনেরা স্বীকার করুন আর না–ই করুন, দুই বিদেশি নাগরিক হত্যার ঘটনায় বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। অনেক বন্ধু দেশের সঙ্গে যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, তা পুনরুদ্ধার করতেই হবে।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com

সিরিয়ার মধ্যপন্থীরা গেল কোথায়? by রবার্ট ফিস্ক

রুশ বিমান হামলায় বিধ্বস্ত সিরিয়ার কয়েকটি ভবন
সিরিয়ার আকাশসীমা পশ্চিমের কাছে অলীক বস্তু, রাশিয়ার বিমানবাহিনী সেখানে সরাসরি ঢুকে গেছে। আমাদের বলা হয়েছে, রাশিয়া সিরিয়ার ‘মধ্যপন্থীদের’ ওপর বোমা হামলা চালাচ্ছে। যে ‘মধ্যপন্থীদের’ অস্তিত্বের কথা যুক্তরাষ্ট্র দুই মাস আগেও স্বীকার করেছিল, তারা আর নেই।
এটা অনেকটা আইসিস যোদ্ধাদের মতো, যারা ‘খিলাফতের’ জন্য লড়াই করতে ইউরোপ ত্যাগ করেছে। পাঠক, তাদের কথা মনে আছে? বড় জোর দুই মাস আগের কথা, আমাদের রাজনৈতিক ও প্রথম সারির লেখকেরা ‘দেশের ভেতরে বেড়ে ওঠা’ ইসলামপন্থীদের ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছিলেন, যারা আইসিসের মতো দানবের হয়ে লড়াই করতে ব্রিটেন, আমেরিকাসহ অন্যান্য ইউরোপীয় দেশ ত্যাগ করছিল। তারপর আমরা দেখলাম, লাখ লাখ শরণার্থী বলকান এলাকা হয়ে ইউরোপের দিকে যাত্রা শুরু করেছে, মাঝপথে তারা ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে জীবনের ঝুঁকিও নিয়েছে। আর সেই একই রাজনৈতিক নেতারা বলেছেন, আমাদের শঙ্কিত হওয়া উচিত, কারণ এই শরণার্থীদের মধ্যে আইসিসের খুনিরা আছে।
ইউরোপীয় মুসলমানেরা আইসিসে যোগ দেওয়ার জন্য যেভাবে তুরস্কে আসছে, তা সত্যিই বিস্ময়কর। কয়েক সপ্তাহ পরেই সাগর পাড়ি দেওয়ার সময় তাদের নৌকা ফুটো হয়ে যাওয়ায় তারা ডুবে মরেছে অথবা ধীর পায়ে দেশে ফিরে গেছে। কেউ কেউ আবার হাঙ্গেরি থেকে ট্রেন ধরে জার্মানিতে গেছে। কিন্তু এই বাজে কথা যদি সত্যি হয়, তাহলে ইউরোপে ফিরে যাওয়ার পর তারা আমাদের ওপর হামলা চালানোর মতো সন্ত্রাসী প্রশিক্ষণ নেওয়ার সময় পেল কোথায়?
আবার এমনও হতে পারে যে ব্যাপারটা স্রেফ গল্প। এর বিপরীতে গত সপ্তাহে সিরিয়ায় রাশিয়ার নির্মম বিমান হামলা যে ভীতি সৃষ্টি করেছে, তা রীতিমতো অসুস্থতার শামিল।
আসুন, বাস্তব পরিস্থিতিটা পরীক্ষা করেই শুরু করি। হামলাকারী রুশ সেনাবাহিনী খুনি। তারা চেচনিয়ায় ইসলামপন্থীদের উত্থান রোধ করতে সেখানকার নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছে, আর এবার তারা বাশার আল-আসাদের সরকারকে রক্ষা করতে এবং এই নব্য ইসলামপন্থীদের প্রতিহত করতে সিরিয়ার নিরীহ মানুষকেও হত্যা করবে। সিরিয়ার সেনাবাহিনীর অনেকেই যুদ্ধাপরাধী, তারা রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে হিংস্র সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে, সেটা করতে গিয়ে তারা ব্যারেল বোমাও ব্যবহার করেছে। সিরিয়ার জন্য তারা আবার জীবনও দিয়েছে।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর অতি প্রিয় ‘মার্কিন কর্মকর্তারা’ দাবি করেছেন, সিরিয়ার সেনাবাহিনী আইসিসের বিরুদ্ধে লড়ছে না। সেটা যদি সত্য হয়, তাহলে সিরিয়ার ৫৬ হাজার সেনাকে কারা হত্যা করেছে? এই পরিসংখ্যানের দাপ্তরিক গোপনীয়তা থাকলেও তা সত্য, সিরিয়ার যুদ্ধে এখন পর্যন্ত কারা মারা গিয়েছে? সেই উদ্ভট ফ্রি সিরিয়ান আর্মি (এফএসএ)?
সিরিয়ার ‘মধ্যপন্থীদের’ নিয়ে যে প্রায়ই বীরগাথা রচিত হচ্ছে, তার মধ্য দিয়েই এই বাজে ব্যাপারটি চরমে পৌঁছেছে। এরা মূলত ছিল এফএসএর দলত্যাগী সদস্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো তাদের সম্ভাব্য পশ্চিমমুখী শক্তি মনে করেছিল, যাদের সিরিয়ার সরকারি সেনাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যায়। কিন্তু এই এফএসএ খণ্ড খণ্ড হয়ে যায়, এরা ছিল দুর্নীতিবাজ। আর সেই ‘মধ্যপন্থীরা’ আবারও দলত্যাগ করে ইসলামিস্ট নুসরা ফ্রন্ট ও আইসিসে যোগ দেয়। তারা মার্কিনদের কাছ থেকে পাওয়া অস্ত্রগুলো সর্বোচ্চ দরদাতার কাছে বিক্রি করে দেয় অথবা নীরবে গ্রামে গিয়ে বসবাস শুরু করে—বিচক্ষণতার সঙ্গেই। সেখানে তারা বিচ্ছিন্নভাবে কিছু চেক পয়েন্ট বসিয়েছে।
রুশ বিমান হামলায় বিধ্বস্ত সিরিয়ার কয়েকটি ভবন
ওয়াশিংটন স্বীকার করে, তারা লাপাত্তা হয়ে গেছে, তাদের দুর্ভাগ্যে শোকও প্রকাশ করে। ওয়াশিংটন সিদ্ধান্তে আসে, তাদের নতুন ‘মধ্যপন্থী’ দরকার। সে লক্ষ্যে তারা সিআইএকে দিয়ে ৭০ জন যোদ্ধাকে এই গ্রীষ্মে সশস্ত্র ও প্রশিক্ষিত করে তুরস্ক সীমান্ত দিয়ে সিরিয়ায় ঢুকিয়ে দেয়। তাদের মধ্যে ১০ জন ছাড়া বাকি সবাই নুসরা ফ্রন্টের হাতে ধরা পড়ে, আর তাদের মধ্যে অন্তত দুজনকে হত্যা করা হয়েছে। সপ্তাহ দুয়েক আগে আমি নিজে শুনেছি, ইরাকে যে জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তারা ছিলেন, তাঁদের মধ্যে ঊর্ধ্বতন একজন ঘোষণা দিয়েছেন, ‘মধ্যপন্থীরা অনেক আগেই ভেঙে পড়েছে।’ কেউ কি এখন তাদের দেখতে পায়? না, দেখতে পায় না।
কিন্তু রাশিয়া সিরিয়ায় হামলা চালানো শুরু করার পর ওবামা প্রশাসন, নিউইয়র্ক টাইমস, সিএনএন ও বৃদ্ধ বেচারা বিবিসি সেই ভূতকে পুনর্জাগ্রত করল! রুশরা সাহসী ‘মধ্যপন্থীদের’ ওপর হামলা শুরু করেছে, যারা বাশারের সেনাদের বিরুদ্ধে লড়ছে। অথচ তারাই
কয়েক সপ্তাহ আগে বলেছিল, এই মধ্যপন্থীদের অস্তিত্ব নেই।
এখন কিছু মামুলি তথ্য দিই। রাশিয়ার বিমানবাহিনীর হামলার লক্ষ্যবস্তুর তালিকা তৈরি করে দিচ্ছে সিরিয়ার সেনাবাহিনী, কিন্তু সিরিয়ায় ভ্লাদিমির পুতিনের নিজস্ব শত্রু রয়েছে।
রাশিয়া যে প্রথম বিমান হামলাটি চালায়, সেটা মার্কিনদের কথিত ‘মধ্যপন্থীদের’ ওপর নয়। সেই হামলাটি তারা চালিয়েছিল সিরিয়ার দূর উত্তর-পশ্চিমে, যে গ্রামটি বহুদিন ধরে চেচেন যোদ্ধাদের দখলে ছিল। এরা কিন্তু সেই চেচেন, যাদের পুতিন খোদ চেচনিয়াতেই খতম করে দিতে চেয়েছিলেন। এই চেচেন সেনারা গত বছর সিরিয়ার কৌশলগত সামরিক স্থাপনা পজিশন ৪৫১-তে হামলা চালিয়েছিল, ফলে বাশারের সেনাবাহিনী যে সেটাকে লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় রেখেছিল, তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই।
রাশিয়ার অন্যান্য হামলার লক্ষ্যবস্তু আইসিস ছিল না, ছিল একই এলাকায় অবস্থানরত জয়েশ আল-শামস বাহিনী। কিন্তু প্রথম ২৪ ঘণ্টায় রাশিয়া পালমিরার ওপরে পর্বতের মধ্য দিয়ে আইসিসের সরবরাহ লাইনের ওপরও বোমা বর্ষণ করেছে।
রাশিয়ার বিমানবাহিনী সুনির্দিষ্টভাবে সালামিয়া শহরের আশপাশের মরু সড়কে হামলা চালিয়েছে। মে মাসে আইসিসের আত্মঘাতী বাহিনীর গাড়িবহর এ পথেই পালমিরায় গিয়ে সিরিয়ার বাহিনীকে পরাজিত করেছিল। তারা হাসাকের আশপাশে ও আইসিস-নিয়ন্ত্রিত রাকা বিমানঘাঁটিতেও হামলা চালিয়েছে। সিরীয় বাহিনী গত বছর রাকায় আইসিসের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে (আত্মসমর্পণের পর তাদের শিরশ্ছেদ করা হয়েছে)।
সিরিয়ায় রাশিয়ার যে স্থলসেনা রয়েছে, তারা শুধু ঘাঁটি পাহারা দিচ্ছে। তাদের উপস্থিতি প্রতীকী, কিন্তু তারা আইসিসের সঙ্গে লড়াই করবে, এমন চিন্তা মিথ্যা। রাশিয়া চায়, তাদের জায়গায় সিরিয়ার সেনাবাহিনী মাঠে লড়াই করে মরুক। না, সিরিয়ার যুদ্ধে ভালো বা খারাপ মানুষের বালাই নেই। বেসামরিক মানুষ হত্যার ব্যাপারে সিরিয়ার সেনা ও ন্যাটোর চেয়ে রাশিয়ার সংবেদনশীলতা বেশি নয়। সিরিয়ার যুদ্ধ নিয়ে ছবি বানানো হলে তার নাম হওয়া উচিত ওয়ার ক্রিমিনালস গ্যালোর!
কিন্তু দোহাই আপনাদের, আকাশকুসুম কল্পনা করা বন্ধ করুন। দিন কয়েক আগে হোয়াইট হাউসের একজন মুখপাত্র বলেছেন, রাশিয়ার বোমাবর্ষণের কারণে ‘মধ্যপন্থীরা চরমপন্থীদের খপ্পরে পড়ছে’।
এ গল্প কে লিখছে? হয়তো একজন ‘মধ্যপন্থীই’ বটে...
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন; দ্য ইনডিপেনডেন্ট থেকে নেওয়া
রবার্ট ফিস্ক: দ্য ইনডিপেনডেন্ট-এর মধ্যপ্রাচ্য সংবাদদাতা।

পালিয়ে বেড়াচ্ছেন দুই সাংসদ

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দুই সাংসদের পালিয়ে থাকা নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। আওয়ামী লীগের এ দুই সাংসদ হলেন টাঙ্গাইলের আমানুর রহমান খান রানা ও গাইবান্ধার মনজুরুল ইসলাম লিটন। আইন প্রণেতা হয়েও আইনকে ফাঁকি দিয়ে তাঁদের পালিয়ে বেড়ানোকে ভালোভাবে দেখছেন না নিজ দলের নেতারাই। অবশ্য সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। আমানুর এক বছর এবং মনজুরুল এক সপ্তাহ ধরে পালিয়ে আছেন।
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে শিশু শাহাদাত হোসেনকে গুলি করে আহত করার ঘটনায় ‘পালিয়ে’ বেড়াচ্ছেন সাংসদ মনজুরুল ইসলাম। পুলিশ বলছে, তারা সাংসদকে খুঁজে পাচ্ছে না। কিন্তু সাংসদ ফোনে প্রথম আলোর সঙ্গে দুই দফা কথা বলেছেন। তিনি ঢাকায় আছেন এবং জামিনের জন্য চেষ্টা করছেন বলে জানিয়েছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সাংবাদিকদের বলেছিলেন, মনজুরুল ইসলামকে আত্মসমর্পণ করতে সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। অবশ্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৪ অক্টোবরের সংবাদ সম্মেলনে সাংসদ মনজুরুলকে ছাড় না দেওয়ার কথা বলেছিলেন।
টাঙ্গাইলের সাংসদ আমানুর রহমান নিজ দলীয় প্রবীণ নেতা ও মুক্তিযোদ্ধা ফারুক আহমেদ হত্যার সন্দেহভাজন। কিন্তু প্রায় এক বছর ধরে তিনি পালিয়ে আছেন। অবশ্য এর মধ্যে গত জুনে একবার সংসদ অধিবেশনের সময় হাজিরা খাতায় সই দিয়ে চলে গেছেন। কিন্তু পুলিশ তাঁকে এখনো খুঁজে পায়নি। তাঁকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কিছু বলা হয়নি।
নিহত ফারুকের স্ত্রী নাহার আহমেদ ও তাঁর সন্তানদের সঙ্গে গণভবনে সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রী তাঁদের এই হত্যার যথাযথ বিচার করার কথা বলেন।
আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের একজন সদস্য ও সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য প্রথম আলোকে বলেন, দলীয় সাংসদের এভাবে পালিয়ে থাকা তাঁদের নিজেদের জন্য যেমন রাজনৈতিক ক্ষতি, তেমনি দলের জন্যও ক্ষতিকর। আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে তাঁদের আত্মসমর্পণ করা উচিত।
কিন্তু মামলা হলেও সরকারদলীয় সাংসদদের সচরাচর গ্রেপ্তার হতে হয় না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও তাঁদের ‘খুঁজে’ পায় না। অনেক ক্ষেত্রে মামলার পর আদালতে হাজির হলে তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়।
গত ১৫ বছরে তিনটি রাজনৈতিক সরকারের সময় সরকারদলীয় চারজন সাংসদকে জেলে যেতে হয়েছে। যাঁদের দুজন আদালতে হাজির হওয়ার পর কারাগারে পাঠানো হয়। অন্য দুজনের গ্রেপ্তারের কারণ দলের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি বা শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব বলে মনে করা হয়।
জেলে যাওয়া ও পালিয়ে বেড়ানো সাংসদদের বিরুদ্ধে হত্যা, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও মারধরের মামলা আছে। সব সরকারের সময়ই সরকারদলীয় সাংসদদের গ্রেপ্তার করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনীহা চোখে পড়ে।
সরকারদলীয় সাংসদদের গ্রেপ্তারের নজির কম থাকলেও বিরোধীদলীয় সাংসদদের ক্ষেত্রে এর উল্টো নজির রয়েছে। রাজনৈতিক কারণেই বিরোধীদলীয় সাংসদেরা বেশি জেলে গেছেন। দুর্নীতির মামলায় জেলে যাওয়ার নজিরও কম নয়।
জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের সরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় আন্তরিক। কাউকে ছাড় দেওয়ার মানসিকতা সরকারের নেই। সাংসদ হোন আর যেই হোন, অপরাধে জড়ালে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।
১৫ বছরে জেলে যাওয়া সরকারদলীয় চার সাংসদের তিনজনই আওয়ামী লীগের। এঁরা হলেন আবদুল লতিফ সিদ্দিকী (টাঙ্গাইল), গোলাম মাওলা রনি (পটুয়াখালী) ও আবদুর রহমান বদি (কক্সবাজার)। অপরজন বিএনপির প্রয়াত নাসিরুদ্দিন আহমেদ পিন্টু। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর তিনি দুবার গ্রেপ্তার হন।
আওয়ামী লীগের সাবেক সাংসদ গোলাম মওলা গ্রেপ্তার হন সাংবাদিক মারধরের মামলায়। অবশ্য এর আগেই বিভিন্ন ধরনের বক্তব্যের কারণে সরকারের বিরাগভাজন হন তিনি।
জেলে যাওয়া অপর দুই সাংসদের মধ্যে আবদুল লতিফ সিদ্দিকী আত্মসমর্পণ করেন। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে কলকাতা থেকে ঢাকায় শাহজালাল বিমানবন্দরে নামলেও পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করেনি।
একই অবস্থা সাংসদ বদির ক্ষেত্রেও। দুর্নীতি দমন কমিশনের করা দুর্নীতির মামলায় আদালতে হাজির হয়ে জামিন চাইলে আদালত তা নামঞ্জুর করে তাঁকে কারাগারে পাঠান।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, সংসদের কোনো বিষয় হলে বা সংসদ ভবন এলাকার মধ্য থেকে কাউকে গ্রেপ্তার করতে হলে স্পিকারের অনুমতি লাগে। এ ছাড়া অধিবেশন চলাকালে কোনো সাংসদ গ্রেপ্তার হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তা স্পিকারকে অবহিত করে। একজন সাংসদ হলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা যাবে না এমন আইন নেই। আইন সবার জন্যই সমান।

ভারতে মুক্ত বাকের ওপর হামলা by সোনিয়া ফ্যালেইরো

এম এম কালবুরগি
আজকের ভারতে ধর্মনিরপেক্ষ উদার শক্তিগুলো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে: জীবন কীভাবে বাঁচানো যায়।
এ বছরের আগস্ট মাসে ৭৭ বছর বয়সী পণ্ডিত এম এম কালবুরগিকে তাঁর বাড়ির দরজায় গুলি করে হত্যা করা হয়েছে, তিনি হিন্দুদের মূর্তিপূজার প্রচণ্ড বিরোধী ছিলেন। আবার গত ফেব্রুয়ারি মাসে কমিউনিস্ট নেতা গোবিন্দ পানসারেকে মুম্বাইয়ের কাছের একটি জায়গায় খুন করা হয়েছে। ২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে নরেন্দ্র দাভোলকারকে হত্যা করা হয়েছে। তাঁর অপরাধ ছিল, তিনি ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাতেন।
ভারতে মুক্ত বাকের ওপর সময় সময় হামলা হয়েছে, কিন্তু এবার ব্যাপারটা ভিন্ন মনে হচ্ছে। এই উৎপীড়নের খবর পত্রিকার প্রথম পাতায় এলেও সরকার সেটা স্বীকার করতে চায় না। বস্তুত, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নীরবতাকে মৌন সম্মতি হিসেবে ধরে নেওয়া যায়। দেখা যাচ্ছে, ২০১৪ সালে তিনি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই এসব হামলা বেড়ে গেছে, আর এ হামলার সঙ্গে হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর সম্পর্ক রয়েছে, যাদের চরম ডানপন্থী মতাদর্শ তিনি নিজেও ধারণ করেন।
এম এম কালবুরগি
এ মাসের শুরুর দিকে চরমপন্থী হিন্দুগোষ্ঠী শ্রীরাম সেনার এক নেতা এ উত্তেজনার আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছেন। ইতিহাস বলে, এ গোষ্ঠী পানশালায় আক্রমণ চালিয়ে ভেতরে যে নারীদের পেয়েছিল, তাঁদের প্রহার করেছিল। তিনি সতর্ক করেছেন, যে লেখকেরা হিন্দু দেবতাদের অবজ্ঞা করেছেন, তাঁদের জিব কেটে নেওয়া হবে। যেসব মানুষ এই চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর চূড়ান্ত লক্ষ্য, অর্থাৎ যঁারা হিন্দু জাতি প্রতিষ্ঠা সমর্থন করেন না, তাঁদের কাছে মোদির নীরবতার অর্থ অশুভ।
পাকিস্তানের উদার রাজনীতিক সালমান তাসির যখন ২০১১ সালে আততায়ীদের হাতে নিহত হন, তখন এম জে আকবর তিরস্কার করেছিলেন, ‘সালমান তাসির একজন ভারতীয় মুসলমান হলে আজ বেঁচে থাকতেন।’ সেই এম জে আকবর আজ বিজেপির সর্বভারতীয় মুখপাত্র। বাংলাদেশে ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে ভারত দেশটির গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল।
ভারতে কী ঘটছে, সে ব্যাপারে আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত। আমাদের বুঝতে হবে, ভারত তার যে প্রতিবেশীদের সমালোচনা করে, তার অবস্থাও সেই তাদের মতো হতে পারে। মুম্বাইয়ের উদার সাংবাদিক নিখিল ওয়াগলে আমাকে বলেছিলেন, ‘ধর্মনিরপেক্ষতা ছাড়া ভারত এক হিন্দু পাকিস্তান হবে’। ভারতের এ খুনের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্লগার খুনের মিল রয়েছে। বাংলাদেশের ব্লগার হত্যা নিয়ে বিশ্বে শোরগোল হলেও ভারত বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ—এ সাইনবোর্ডের আড়ালে সে মুখ লুকাচ্ছে। খুন হওয়া ব্লগারদের মতো ভারতের এ নিহত মানুষগুলোও উদার দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ ছিলেন, কিন্তু তাঁরা বিখ্যাত বা ক্ষমতাবান ছিলেন না।
সরকার হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলোকে আলাদাভাবে অনুসন্ধান করার চেষ্টা করছে, কিন্তু মুক্ত বাকের ওপর যে সামগ্রিক হামলা হয়েছে, সেটা তারা আমলে নিচ্ছে না। এ হুমকি ও হত্যাকাণ্ড ভীতি সৃষ্টি করেছে, মানুষকে নিজে থেকেই বাক্সংযম করতে বাধ্য করছে। এ খুনিদের মধ্যে অনেকেই ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাদের এক হাতে বন্দুক, আরেক হাতে খুনের তালিকা। সাংবাদিক নিখিল ওয়াগলে একটি সূত্র থেকে জানতে পেরেছেন, ডানপন্থী হিন্দু গোষ্ঠী সনাতন সংস্থার ফোন টেপ করে জানা গেছে, গোষ্ঠীটি তাঁকে পরবর্তী শিকার হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আগস্টে যারা কালবুরগিকে খুন করেছে, তারা আরও সরাসরি কাজ করে: গোষ্ঠীটি টুইটার বার্তা ব্যবহার করে অবসরপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক কে এস ভাগওয়ানকে হুমকি দিয়েছে। তিনি ওদের পরবর্তী লক্ষ্যবস্তু। রাজনীতিকেরা নীরবতার মাধ্যমে ভারতকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র থেকে হিন্দু জাতিতে পরিণত করার দুষ্কর্মে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। তবে শুধু তারাই নয়, ক্ষমতাসীন হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপিরও এতে অবদান রয়েছে।
গত কয়েক মাসে ভারতীয় সরকার দেশটির গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধর্মনিরপেক্ষ মানুষমুক্ত করে ফেলেছে, এর মধ্যে আছে ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট ও ইনডিপেনডেন্ট বোর্ড অব নালন্দা ইউনিভার্সিটি। সরকার মাঝারি মাপের লোকদের তাড়াচ্ছে না: নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য ছিলেন নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন। সরকার উজ্জ্বল নক্ষত্রদের সরিয়ে তাঁদের জায়গায় হিন্দুত্ববাদে আস্থাশীল লোকজনকে বসাচ্ছে। নব্য নিয়োগপ্রাপ্ত লোকজন বৈজ্ঞানিক চিন্তা বাদ দিয়ে ধর্মীয় চিন্তাকে বরণ করে নিচ্ছেন, ধর্মনিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানে যার কোনো স্থান নেই।
ভারত সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে দেশটির প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু, তাঁর আদর্শকে আঘাত করা। গত মাসে নয়াদিল্লির নেহরু জাদুঘর ও লাইব্রেরির পরিচালককে সরিয়ে দিয়ে সরকার ঘোষণা দিয়েছে, তারা জাদুঘরটির নাম পরিবর্তন করতে চায়। তারা জাদুঘরটির মাজেজা বদলে দিতে চায়, চায় এটি মোদির অর্জনের ওপর আলো ফেলুক।
বিজেপির সাংসদ সাক্ষী মহারাজ মহাত্মা গান্ধীর খুনি নাথুরাম গডসেকে ‘দেশপ্রেমিক’ আখ্যা দিয়েছেন। যদিও পরবর্তীকালে মহারাজ নিজের বক্তব্য প্রত্যাহার করে নিয়েছেন, এ মতের সঙ্গে তাঁর অনেক সহযোদ্ধাই একমত পোষণ করেছেন। গান্ধীর খুনি সশস্ত্র হিন্দু গোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের একজন সাবেক সদস্য, যে গোষ্ঠীর সঙ্গে মোদি তাঁর আট বছর বয়স থেকেই যুক্ত। এই যে বিজেপি ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধ ধারণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বদলে দিতে চাইছে, সেটা কিন্তু আগেভাগেই বোঝা গেছে। এ মূল্যবোধকে বিজেপি ‘পশ্চিমা’ বলে খারিজ করে। ফলত, সংস্কৃতি ও পর্যটনমন্ত্রী মহেশ শর্মা যখন বলেন, ‘গণবিতর্কের প্রতিটি ক্ষেত্রকে পশ্চিমা প্রভাবমুক্ত করা হবে’, তখন বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই।
গত ডিসেম্বরে প্রথিতযশা লেখক পেরুমাল মুরুগান পুলিশকে বলেছিলেন, ২০১০ সালে লেখা তাঁর এক উপন্যাসের কারণে ক্রুদ্ধ হয়ে হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলো তাঁকে হুমকি দিয়েছে। চরমপন্থীরা প্রকাশ্যেই তাঁর বই পুড়িয়েছে, দাবি করেছে, তাঁকে ক্ষমা চাইতে হবে। পুলিশ তাঁকে নির্বাসনে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। তিনি যে একা তা বুঝতে পেরে এ বছরের জানুয়ারিতে মুরুগান নিজের সাহিত্যকর্ম প্রত্যাহার করার ঘোষণা দেন। ফেসবুকে তিনি লেখালেখি ছেড়ে দেওয়ার শপথ জানান দেন। বস্তুত, তিনি পরিবারের নিরাপত্তার ভয়ে এ ঘোষণা দেন, যার শানে নজুল হচ্ছে তিনি নিজের সাহিত্যকর্মের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন।
ভারতে যা ঘটছে, তা মেনে নেওয়া কঠিন। বিজেপি যত দিন আছে, তত দিন এ হামলা ও হুমকি থাকবে। অথবা এটাকে উদারনীতিক মানুষ হত্যার কাল বলেও চালিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু ভারতে যে মারাত্মক পরিবর্তন ঘটছে, তার প্রতিক্রিয়া সুদূরপ্রসারী হবে।
ভারতের এ হামলাগুলো যে উদার লেখক ও ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ, ব্যাপারটা তা নয়। এগুলো গণতন্ত্রের হৃদ্যন্ত্রের ওপর হামলা। ভারতের জন্মকালীন মূল্যবোধকে যাঁরা মূল্যায়ন করেন, তাঁদের কাছে এটা উদ্বেগের ব্যাপার। যে মূল্যবোধের কারণে মানুষ ভারতকে ভালোবাসে, এটা ধর্মান্ধদের ভারত নয়। সব মতকেই রক্ষা করার আওয়াজ দিতে হবে, নিজেদের মত হারানোর আগেই।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন; নিউইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া
সোনিয়া ফ্যালেইরো: ভারতীয় সাংবাদিক।

সিরিয়ায় পুতিনের অন্তিম খেলা by ফারুক ওয়াসিফ

১০ বছরের মধ্যে এবারই প্রথম পুতিন এলেন জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে। থাকলেন সাত ঘণ্টা। সিরিয়ায় পশ্চিমারা কী ভুল করেছে, সেটা লেকচার দিয়ে দুনিয়ার সামনে দেখালেন। চিনিয়ে দিলেন, আইএস আসলে মার্কিনি ঘাতক-পুতুল। হুমকিও দিলেন, টুইন টাওয়ার ধ্বংসের ‘আসল’ স্যাটেলাইট ভিডিও দেখিয়ে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জারিজুরি ফাঁস করে দেবেন। সাধের ‘আইএস’ ধ্বংসের দর্শক হওয়া ছাড়া আর কিছুই করার থাকল না পেন্টাগনের জেনারেলদের। ইসরায়েল আর কী করবে? আরও কিছু ফিলিস্তিনি বাড়ি ভাঙল, কিছু প্রতিবাদী হত্যা করল। জবাবে আরেকটা ইন্তিফাদার ঘোষণা এল গাজা থেকে।
ওবামার সামনে রইল কেবল আলোচনার টেবিল। পুতিন তাঁকে বলিয়ে ছাড়লেন, আইএস দমনে মার্কিনিরা রাশিয়ার সঙ্গে আছে। আর ইউরোপ? নিজেদের তৈরি করা ভূমধ্যসাগরীয় শরণার্থীদের ধাক্কা সামলাতেই তারা ব্যস্ত। যুদ্ধে জড়ানো মানে ইউরোপীয় দুর্গের দেয়ালে আরও শরণার্থীর ঢল। তুরস্কের হঠাৎ সুলতান এরদোয়ানের উসমানিয়া সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার খোয়াবও খতম। ইয়েমেনের ঈদের জামাতে বোমা ফেলার তৃপ্তিতে ঢেকুর তুলতে গিয়ে হেঁচকি উঠল সৌদি বাদশাহরও। তাঁদের ছড়ানো ওয়াহাবি-সালাফি জঙ্গিদের বিরুদ্ধে রাশান অ্যান্টিভাইরাস ইজ ইন অ্যাকশন।
সিরিয়ায় রাশিয়ার উদ্দেশ্য কেবল বাশার আল-আসাদকে বাঁচানো না। আইএসকে দিয়ে বৈরী সরকার ও স্বাধীন সীমান্ত ধ্বংস করে পশ্চিমারা যে নতুন মধ্যপ্রাচ্য বানাতে চায়, তাতে রাশিয়া, চীন ও ইরানের ঘোরতর বিপদ। বিশ্বের তেলভান্ডার পশ্চিমা তেলকুবের কোম্পানিদের হাতে চলে গেলে রুশ অর্থনীতি ও চীনের উত্থান থামানো যেতে পারে। একদিকে ন্যাটো দিয়ে ঘেরাও হওয়া অবস্থা, অন্যদিকে রুশবিরোধী নতুন মধ্যপ্রাচ্য রাশিয়াকে থমকে দেবে। তাই ইউক্রেনের পর দ্বিতীয়বারের পশ্চিমাদের নাক কাটতেই হলো তাদের।
অন্যদিকে তুরস্ক চায় রাষ্ট্রহীন উত্তর সিরিয়াকে নয়া তুর্কি সালতানাতের অংশ করতে। ভবিষ্যতে কাজে লাগবে ভেবে লাখো সিরীয় উদ্বাস্তু আশ্রয় দিয়ে রেখেছে তারা। পাশাপাশি দক্ষিণ তুরস্কে মার্কিন ঘাঁটিও আরও বড় হয়েছে, ন্যাটোর মদদ তো আছেই। এমন সময়ে এরদোয়ানের বাড়া ভাতে ছাই দিল রুশ বোমারু বিমান। পরপর তিনবার তুর্কি আকাশসীমা লঙ্ঘন করে বুঝিয়ে দিল, সিরিয়ার দিকে নজর দিলে খবর আছে। যুদ্ধের ঝুঁকি নিতে হবে তুরস্ককে। সিরিয়ার ওপর মার্কিন-তুর্কি নেতৃত্বে নো ফ্লাই জোন করার চিন্তাও বরবাদ। এই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে তুরস্কের কুর্দি ওয়ার্কার্স পার্টির (পিকেকে) সিরীয় শাখা। ইতিমধ্যে তারা সিরিয়ার ভেতরে মুক্তাঞ্চল গড়ে নিয়েছে। তুরস্কে অভিযান হলে এখন তারা সিরিয়া থেকে লড়তে পারবে।
মুখ পুড়ল ইসরায়েলেরও। সিরিয়ার পূর্ণ পতনের পরে লেবাননের প্রতিরোধ গুঁড়ানোর ইচ্ছা ছিল তাদের। আইএস নামক ফেউকে সামনে রেখে বৃহত্তর ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যেতে চাইছিল তারা। আর সৌদিরা তো ইয়েমেনকে তছনছ করে ইরানের ডানা ছাঁটছিলই। মোদ্দাকথা, মধ্যপ্রাচ্যকে ভাগ-বাঁটোয়ারা করার পরিস্থিতি তৈরিই ছিল ‘ইসলামিক স্টেট’ লেলিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য। আসল যুদ্ধে নামার আগে পুতিনকে তাই যুক্তির যুদ্ধেও নামতে হলো। বিশ্বদরবারে তিনি বললেন, ‘প্রেসিডেন্ট ওবামা প্রায়ই আইসিসের হুমকির কথা বলেন। ভালো, কিন্তু কে তাদের সশস্ত্র করল? কে এই বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করল? কে ওই এলাকায় অস্ত্র জোগাল? সিরিয়ায় কারা যুদ্ধ করছে, তা আপনারা সত্যিই জানেন না? তাদের বেশির ভাগই ভাড়াটে যোদ্ধা। টাকার বিনিময়ে তারা লড়ে। যে বেশি দেবে, তারা তাদের হয়েই কাজ করবে। আমরা জানি, কত টাকা তাদের দেওয়া হয়েছে...যুক্তরাষ্ট্র বলে, “সিরিয়ার গণতান্ত্রিক সভ্য বিরোধী পক্ষকে আমাদের সাহায্য করা উচিত। ” আর তারা সাহায্য করল, অস্ত্র দিল এবং তারা যোগ দিল আইসিসে। এর থেকে এক ধাপ এগিয়ে ভাবা কি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে অসম্ভব? আমরা এ ধরনের কার্যকলাপ সমর্থন করি না। আমরা মনে করি, এগুলো ভুল।’
ইতিহাস এ মুহূর্তে পুতিনের পক্ষে। একদিকে মার্কিন-ইসরায়েলি-সৌদি-তুর্কি জোট, অন্যদিকে রাশিয়া-চীন-ইরান-সিরিয়া-হিজবুল্লাহ জোট। ইরান ও হিজবুল্লাহর যোদ্ধারাও যোগ দিয়েছে আসাদের সেনাদের সঙ্গে। আসাদ বটেই দুঃশাসক, কিন্তু আসাদহীন সিরিয়ার অবস্থা হবে লিবিয়ার মতো, সেটা কারও চাওয়া হতে পারে? গাদ্দাফি হুঁশিয়ারি করেছিলেন, তাঁকে হত্যা করা হলে লিবিয়া দোজখ হবে। হয়েছেও তাই। কার্যত, সভ্যতার সূতিকাগার সিরিয়া ও ইরাক ধ্বংসের দায় যুক্তরাষ্ট্রের। গণতন্ত্র ও বিপ্লব রপ্তানিযোগ্য নয়, হোক তা লিবিয়ায় বা আফগানিস্তান ও চেকোস্লোভাকিয়ায়। মুক্তি কেউ কাউকে দিতে পারে না, তা স্থানীয় জনগণের নিজস্ব অর্জনের বিষয়।
ক্লিনটন ও বুশ মধ্যপ্রাচ্যে ‘সভ্যতার যুদ্ধ’ আর পূর্ব ইউরোপের বলকান অঞ্চলে ‘গণতন্ত্রের যুদ্ধ’ উসকে দিয়েছিলেন। তার ফল যুদ্ধ ও জাতিগত গণহত্যায় লাখো প্রাণের অপচয়। এই দায় পশ্চিমারা এড়াতে পারে না। ইউক্রেনে এলিট বিপ্লব ঘটিয়ে রাশিয়াকে অপদস্থ করতে গেলে পুতিন রুশ ভালুকের থাবা চালালেন। ইউক্রেন থেকে কেটে ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার অঙ্গীভূত করলেন। সিরিয়ায়ও তারা দেখাল, তারা যা করে, ভেবেচিন্তে করে। আর তা নিরন্তর ও এবং অব্যর্থ। আফগানিস্তানের ভুল তারা এখানে করছে না, মাটিতে রুশ বুটের পাড়া পড়ছে না। মুফতে রুশ সমরাস্ত্রের বিজ্ঞাপনও করা গেল। অস্ত্র-ব্যবসায় কাজে লাগবে।
যাহোক, নতুন মধ্যপ্রাচ্য পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে দেখে সাবেক মার্কিন নিরাপত্তা উপদেষ্টা জবিগনিউ ব্রেজেনিস্কি সামাল সামাল আওয়াজ তুলছেন। বৈশ্বিক মার্কিন আধিপত্য কায়েমে ইসলামি মৌলবাদীদের ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহারের বুদ্ধিটা তাঁরই। এ জন্য তাঁকে বলা হয় জঙ্গিবাদের গডফাদার। গত রোববার পলিটিকো ম্যাগাজিনে তিনি লিখেছেন যে সিরিয়ায় মার্কিন ‘অ্যাসেটে’ রুশ হামলা চলতে থাকলে যুক্তরাষ্ট্র যেন রাশিয়াকে প্রতিশোধের হুমকি দেয়। গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা পরিভাষায় ‘অ্যাসেট’ বলা হয় অন্য দেশে সক্রিয় এজেন্টদের। এ এক দারুণ লুকোচুরি খেলা। সিরিয়ায় কালো মুখোশ পরা জঙ্গিরা মারা পড়ে, উহ্আহ্ করে আমেরিকা!
পুতিন এই প্রক্সি ওয়ার বা ছদ্মযুদ্ধকে সরাসরি করে তুললেন। মার্কিনি রাষ্ট্রের ভূরাজনীতি ধর্মযুদ্ধের মোড়কে আচ্ছাদিত ছিল। মুসলিমদের বিভক্ত ও শাসন করা হচ্ছিল। রুশ হস্তক্ষেপে সবার ছদ্মবেশ মায় গায়ের কাপড় পর্যন্ত খুলে পড়ল। ভালো সন্ত্রাসী আর খারাপ সন্ত্রাসীর মধ্যে তুলনা করার নিষ্ঠুর কৌতুক আর নয়। জেহাদ ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের চাতুরীর ঝালর খসে পড়ার পরে পৃথিবী আর আগের মতো থাকল না। পরাশক্তিদের এই মুখোমুখি অবস্থানে শত্রু-মিত্র নির্ধারণ সহজ হবে বিশ্ববাসীর। জগতের লাঞ্ছিত-ভাগ্যহত মুসলমানদের এখন ভাবতে হবে, মন্দের ভালো নেবে নাকি ভালোর মন্দ? ওয়াহাবি-সালাফি জঙ্গিবাদ ভালো নাকি ইরান‍+হিজবুল্লাহ‍+আসাদ+পুতিন ভালো?
ছাগল তথা জঙ্গিরা নড়ে খুঁটির জোরে। মুক্তিযোদ্ধারা লড়ে জনতার অংশ হয়ে। আর পরাশক্তিরা লড়ে সম্পদ ও ক্ষমতার স্বার্থে। সিরিয়ায় আসাদ সরকার টিকে যাচ্ছে, আইএসের অবসান হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আধিপত্যের যুদ্ধে ধর্মের হিংসাত্মক ব্যবহার শেষ হবে কি?

মুসলমান হবেন সার্ব গ্রামের সব খ্রিষ্টানরা!

চার্চটি ভাঙার জন্য ক্রেন আনা হয়েছে
সার্বিয়ার একটি গ্রামে ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত গীর্জাটি মেরামত না করলে সব বাসিন্দা মুসলমান হবেন বলে কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন। বেলগ্রেডের কাছে সোপিচ নামের ওই গ্রামের গীর্জাটি মেরামত করার জন্য কর্তৃপক্ষের প্রতি দাবি জানায় গ্রামবাসীরা। কিন্তু কর্তৃপক্ষ চাচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত চার্চটি ভেঙে পুননির্মাণ করতে। এ সিদ্ধান্ত মানতে রাজী নয় গ্রামবাসীরা। তারা চাচ্ছেন, চার্চটি না ভেঙে সংস্কার করা হোক। অন্যথায় তারা খ্রিষ্টানরা ধর্ম ছেড়ে দিয়ে মুসলমান হয়ে যাবেন। এ জন্য তারা সার্বিয়ার অর্থডক্স চার্চকে এক চিঠি দিয়ে জানিয়েছেন, পুরোনো গীর্জাটি রক্ষার এ উদ্যোগে তারা যদি সমর্থন না জানান, তাহলে গ্রামের সব লোক একসাথে ধর্মত্যাগ করে মুসলমান হয়ে যাবেন - যাতে সার্বিয়ার আইনের আওতায় তারা বেশি সুরক্ষা পেতে পারেন।
এলো নামের একটি ওয়েবসাইট এ খবর দিয়েছে। গত জুলাই মাসে এক শক্তিশালী ঝড়ে ১৫০ বছরের পুরোনো চার্চটি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তার টাওয়ারটির ছাদ ভেঙে যায়। এর পর স্থানীয় যাজক সিদ্ধান্ত নেন, গীর্জাটি ভেঙে ফেলে নতুন করে বানাতে হবে, কারণ এর ভিত্তির মাটি দুর্বল হয়ে গেছে। কিন্তু গ্রামের একজন বাসিন্দা প্রেদ্রাগ লাজারেভিচ, যিনি ওই চিঠিটির মুসাবিদা করেছেন জানান, তিনি নিজে একজন ভূতত্ববিদ এবং তার মূল্যায়ন অনুযায়ী গীর্জাটির ভিত্তি ঠিকই আছে এবং তা ভেঙে ফেলার কোনো দরকার নেই, সংস্কার করাই যথেষ্ট। লাজারেভিচ রেডিও সারায়েভোকে দেয়া সাক্ষাতকারে বলেছেন, তারা নতুন চার্চ নির্মাণের বিরোধী নন, তবে তা করতে হবে পুরোনো চার্চটি অক্ষত রেখে।
সূত্র : বিবিসি

তিউনিসিয়ার নোবেল, সংলাপ ও গণতন্ত্র by মিজানুর রহমান খান

নোবেল বিজয়ী ন্যাশনাল ডায়ালগ কোয়ার্টলেটের নেতারা
সংলাপের জন্য নোবেল; তা–ও আবার কোনো ব্যক্তিকে নয়, বিবদমান রাজনৈতিক দল, যারা সারাক্ষণ বিবাদ ও হানাহানিতে লিপ্ত, তাদের আলোচনার টেবিলে বসাতে সফল হওয়ার কারণে নাগরিক সমাজের চারটি সংগঠনকে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হলো। নোবেল পুরস্কারের ইতিহাসে এমন ঘটনা সম্ভবত এর আগে ঘটেনি। শুরুতেই দুই দিক থেকে ভূমধ্যসাগর এবং দুপাশে আলজেরিয়া ও লিবিয়া বেষ্টিত তিউনিসিয়ার পেছনের একটু বৃত্তান্ত টানতে চাই। দেশটির ৯৯ শতাংশ সুন্নি মুসলিম, আয়তনে বাংলাদেশের সমান, কিন্তু লোকসংখ্যা মাত্র ১ কোটি ১০ লাখ। ১৭০৫ সালে শুরু হওয়া রাজবংশীয় শাসনের মধ্যেই ফ্রান্স ১৮৮১ সালে দেশটিকে উপনিবেশ বানাল। গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার দাবিতে জনগণ ধীরে ধীরে উচ্চকিত হলো। প্রধান রাজনৈতিক সংগঠনের প্রধান নেতা হাবিব বুরগিবা জনগণ, বিশেষ করে শ্রমিকদের চাপে স্বাধীনতার দাবি তুললেন। বিনা রক্তপাতে দেশটি ১৯৫৬ সালে স্বাধীন হলো।
হাবিব ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ উদার রাজনীতিতে বিশ্বাসী। দেশের মঙ্গল ও উন্নয়নে তাঁর নিষ্ঠা ছিল, কিন্তু গণতন্ত্রে বিশ্বাস ছিল না। তাঁর নেতৃত্বেই রাজতন্ত্রের অপসারণ ঘটল। ১৯৫৭ সালের নতুন সংবিধানে গণপ্রজাতন্ত্র লেখাও হলো। ৮৪ বছর বয়সে ১৯৮৯ সালে এক রক্তপাতহীন বেসামরিক অভ্যুত্থানে তিনি অপসারিত হওয়ার আগে আরব বিশ্বে দেশটিকে তিনি অপেক্ষাকৃত সমৃদ্ধি দিতে পেরেছিলেন। কিন্তু সবকিছুই ছিল ব্যক্তিকেন্দ্রিক। প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলায় তাঁর কোনো আগ্রহ ছিল না। ধর্মনিরপেক্ষতা ও উন্নয়নকে সবার ওপরে স্থান দিয়েছিলেন। ইসলামি মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে তিনি গোড়া থেকেই কঠোর ছিলেন। তাঁর আগ্রহের কারণেই তিউনিসিয়ার নারীরা অবশিষ্ট আরব বিশ্ব থেকে অগ্রসর।
তিউনিসিয়ার শিক্ষার হার ৮০ শতাংশের বেশি। আমরা ব্রিটিশ উপনিবেশ ছিলাম, তবে আমাদের লোকসংখ্যার খুবই অল্পসংখ্যক মানুষ ইংরেজি চর্চা করে। আর তিউনিসিয়ার নারীদের ৭২ শতাংশ মাতৃভাষা আরবির সঙ্গে ফরাসিও রপ্ত করেছে। সুতরাং, দেশটির সংস্কৃতিও যে একান্তভাবে আরবি ভাবধারার নয়, সেখানে যে ফ্রান্সের সংস্কৃতির বিরাট প্রভাব আছে, সেটা অনুমেয়। মাত্র ১ কোটি মানুষ, যার ৮০ শতাংশ শিক্ষিত, তারা কিন্তু স্বাধীন হওয়ার পরে মাত্র দুজন নেতা এবং একদলীয় শাসনের অধীনে ৫৫ বছর কাটিয়ে দিয়েছে। কোনো সামরিক অভ্যুত্থান তাঁদের ক্ষমতাচ্যুত করেনি, তবে বাইরের হস্তক্ষেপ অবশ্যই ছিল। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে আমরা চতুর্থ সংশোধনী করলাম। আর পঁচাত্তরের মার্চে হাবিব বুরগিবা সংবিধান সংশোধন করে নিজেকে আজীবন প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেছিলেন। আশির দশকের শেষ দিকে আমরা যখন এরশাদবিরোধী আন্দোলন করছি, তখন প্রতিষ্ঠাকালীন প্রেসিডেন্ট হাবিব বুরগিবা কট্টর ইসলামি মৌলবাদীদের ফাঁসিতে ঝোলানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন।
কট্টর মৌলবাদীদের শাস্তি দেওয়া নিয়ে দলে মতভেদ ছিল না। কিন্তু মৃত্যুদণ্ড দেওয়া নিয়ে বিরোধ দেখা দিল। প্রতিবেশী এবং বিদেশি মিত্ররাও অতি চরমপন্থা পছন্দ করলেন না। অনেকের মতে, ইসলামি মৌলবাদীদের ফাঁসিতে লটকানোর পরিকল্পনা করাই প্রেসিডেন্ট হাবিবের জন্য কাল হয়েছে। সমুদ্রপথে নিকট প্রতিবেশী ইতালি দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নানা কলকাঠি নাড়তে সক্ষম। ইতালির সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান মার্টিনি ১৯৯৯ সালে তাঁদের একটি সংসদীয় কমিটিকে বলেছিলেন, হাবিবকে সরিয়ে দিতে তাঁরাই কলকাঠি নেড়েছিলেন। হঠাৎ করেই চিকিৎসকেরা মত দেন, হাবিব দায়িত্ব পালনে অসমর্থ। ওই দিনই সেই অজুহাতে জাইন আল আবেদিন বেন আলী প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন। এই বেন আলীও ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী, জঙ্গি দমনে বদ্ধপরিকর। তাঁর পূর্বসূরি প্রেসিডেন্ট হাবিবের মতো তিনিও দেশ ভালোবাসেন, জনগণকে ভালোবাসেন। আর ক্ষমতা ভালোবাসেন।
তবে ১৯৮৯ সালে ক্ষমতা নিয়েই আলী কতগুলো ‘যুগান্তকারী’ পদক্ষেপ নেন। যেমন আজীবন প্রেসিডেন্ট তিনি থাকবেন না, সে কথা বোঝাতে তিনি বিধান করলেন যে এক ব্যক্তি তিন মেয়াদের বেশি প্রেসিডেন্ট হবেন না, আর একাদিক্রমে দুবারের বেশি অবশ্যই নয়। অবশ্য এটা ছিল বুজরুকি। কিছুকাল পরেই আমাদের আবদুস সাত্তারের মতো সংবিধান সংশোধন করে (অবসরপ্রাপ্ত বিচারক হিসেবে লাভজনক পদে আসীন হতে পারতেন না, তাই ষষ্ঠ সংশোধনী এনে তাঁকে যোগ্য করা হয়) নিজেকে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসেবে যোগ্য করেছিলেন।
সংবিধানে আজীবন প্রেসিডেন্ট-ঘোষিত ব্যক্তিও ভোটে দাঁড়াতেন। সর্বদা ভোট পেতেন আমাদের সামরিক পর্বের কায়দায় ৯৯ শতাংশের বেশি। কিন্তু দেখার বিষয় হলো, এ রকম একটি প্রহসনের জন্য হলেও ভোটের বাক্স পাততে হতো। অর্থাৎ, শাসকেরা জনগণের কাছে প্রতীকী হলেও হাত পাতবেন। তিউনিসিয়ার সদাশয় স্বৈরশাসকেরা এই হাত পাতা মুছে দেননি।
হাবিবের তিন দশকের শাসনে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম বিরোধী দলের কোনো খবর ছাপেনি। সেখানে বেন আলী এসেই পরিবর্তন আনলেন। প্রথমবারের মতো বিরোধী দলের খবর ছাপা হলো। বাক্স্বাধীনতার ব্যাপ্তি অনেকটাই তিনি প্রসারিত করলেন। এমনকি নিজের মূল দলটিকেও বিলুপ্ত করলেন। নতুন নামকরণ করলেন ডেমোক্রেটিক কনস্টিটিউশনাল র্যালি। গণতন্ত্র তিনি দেবেন না, সাংবিধানিক শাসনেও আসলে তাঁর আস্থা নেই। ওসব তাঁর ধাতে সয় না। কিন্তু আমজনতাকে তো বোকা বানাতে হবে। তাই দলের নামে গণতন্ত্র ও সংবিধান দুটিই রাখলেন। এখন নাকে তেল দিয়ে ঘুমাও।
তবে মানুষ না ঘুমিয়ে ঘুমের ভান করেছিল। তিউনিসিয়া বিশ্বের প্রথম রাষ্ট্র, যারা নিউ মিডিয়াকে কাজে লাগিয়ে শৃঙ্খল ভেঙেছে। আমরা কেউ কেউ ভাবি, মিডিয়ার স্বাধীনতা যদি না থাকে, তাহলে গণতন্ত্রের হার হবে। মানুষ হেরে যাবে। হয়তো একটু সরলীকরণ হবে, কিন্তু এটাও দেখার বিষয় যে মিডিয়ার স্বাধীনতা না থাকলেও জনগণকে দাবিয়ে রাখা যায় না। তিউনিসিয়ার জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ শিক্ষিত ছিলেন বলেই হয়তো তাঁরা প্রায় রাতারাতি সামাজিক মিডিয়ার ওপর ভর করে বিপ্লব করেছেন। অনেকেই যার নামকরণ করেছেন জেসমিন রেভল্যুশন। এই জেসমিনের সুবাস কি বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ছে?
সেটা ২০১১ সাল। আরব বসন্তের ধারায় বিপ্লব হলো। বেন আলী তাঁর ২২ বছরের শাসনের যবনিকা টেনে সরকার ভেঙে দেন। বিদেশে পালিয়ে যান। তবে এটাই দেখার যে বেন আলী যদি নির্বাচন ও গণতন্ত্রের চর্চা করতেন, তাহলে হয়তো বিপ্লবের পরের, অর্থাৎ দেশটির ইতিহাসের প্রথম অবাধ ও সবার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনটিতেই ‘মৌলবাদীরা’ অত ভালো করতেন না। কিন্তু তা-ই হলো। অবশ্য সে জন্য আক্ষেপ না করে দেখতে হবে যে মৌলবাদী শক্তির সঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির কোয়ালিশন সরকার হয়েছে। বাংলাদেশে যেভাবে সামরিক শাসনের কারণে সংলাপ ও তার পরিবেশ গঠনের প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেভাবে প্রলম্বিত স্বৈরশাসনের কারণে তিউনিসিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তিগুলোর মধ্যে সংলাপের ঘাটতি দেখা গেছে।
তবে দেখার বিষয় হলো, স্বাধীনতায় নেতৃত্বদানকারী দল যা পারেনি, সেই ব্যর্থতা পূরণ করেছেন শ্রমিকেরা। তাঁরা পাশে পেয়েছেন মালিকপক্ষ বা এমপ্লয়ার্সদের সংগঠন এবং মানবাধিকারবাদীদের। পাঁচ দশক পরে কী আশ্চর্য, তাঁরাই বিবদমান দলগুলোকে একত্র করেছেন। অবস্থা কিছুটা হলেও এরশাদ আমলের ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও স্কপের ভূমিকার সঙ্গে তুলনীয়। শ্রমিক, নিয়োগকারী, আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীদের চারটি সংগঠনের একটি মোর্চা আগে নিজেরা বুঝেছে, সবার ওপরে দেশ। তাই আগে নিজেরা মুখ চাওয়াচাওয়ির ব্যাপারে আপস করেছে, তারপর মুখ দেখাদেখি বন্ধ থাকা বড় দলগুলোর কাছে গেছে। আমাদের বিভক্ত নাগরিক সমাজকেও একদিন এই পথে যেতে হবে।
তিউনিসিয়া আপসের রাজনীতির কারণে অবাধ নির্বাচনের পরেও মেয়াদ পূর্ণ করার আগে সংসদ ভেঙেছে। একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হয়েছে। গত বছর তারা একটি সর্বসম্মত সংবিধান করেছে। তার মূলমন্ত্র বিকেন্দ্রীকরণ। তারা দেখেছে, একদলীয় শাসন আসলে দ্রুত এক ব্যক্তির শাসনে পরিণত হয়। আসলে রাজতন্ত্র, পরিবারতন্ত্র বা স্বৈরশাসন থেকে বেরোতে হলে কঠিনভাবে ক্ষমতার পৃথক্করণই হচ্ছে একমাত্র পথ।
সম্প্রতি নেপালও তা-ই করেছে। তিউনিসিয়ার মডেল ওয়েস্টমিনস্টার হলেও তারা ফ্রান্সের কাছ থেকে একটা পাঠ নিয়েছে। নির্বাহী ক্ষমতা প্রেসিডেন্ট ও সরকারের হাতে রেখেছে, আমাদের দেশের মতো এককভাবে প্রধানমন্ত্রীর হাতে নয়। এমনকি মন্ত্রীদের মর্যাদা যাতে বজায় থাকে, তারও রক্ষাকবচ করেছে। যেমন বলেছে, রেগুলেটরি ডিক্রি জারি করতে হলে তাতে মন্ত্রীর প্রতিস্বাক্ষর থাকতে হবে। বিচারক নিয়োগ ও অপসারণে চার ধরনের পৃথক জুডিশিয়াল কাউন্সিল দিয়ে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল করেছে। যাঁরা সংস্কার চান, তাঁদের জন্য এটা একটা অনুসরণীয় মডেল।
নাগরিক সমাজকে দেওয়া প্রথম নোবেল পুরস্কারটি বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ ও রাজনীতিকদের চোখ খুলে দিক। আমরা তিউনিসীয় নাগরিক সংগঠন চতুষ্টয়ের সঙ্গে একমত যে এটা অবশিষ্ট বিশ্বের কাছে এই খবর রটাল, সংলাপ যেকোনো সমস্যার সুরাহা দিতে পারে। কিন্তু হিংসা কাউকে কোথাও পৌঁছে দেবে না।
নির্বাচনসহ যেকোনো সমাধানসূত্রে সবাইকে রাখতে হবে। বেন আলীকে নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হয়েছে। ২০১১ সালের পতনের পর বেন আলীর পলায়নের পরেও তাঁর দলের তিনজনকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে রাখা হয়। এখন আমরা হয়তো মনে করতে পারি যে ১৯৯১ থেকে শুরু করে তত্ত্ববধায়ক সরকারের অধীনে যতগুলো নির্বাচন হয়েছে, সবগুলোতে উচিত ছিল জাতীয় পার্টি, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি বা রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের যুক্ত করেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার করা। সেই বিবেচনায় শেখ হাসিনা সর্বদলীয় নির্বাচনকালীন সরকারের যে রূপকল্প দিয়েছিলেন, পথের বাধা সারাতে সেটা এখনো একটা ভরসা হয়ে আছে।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

'বিদেশী হত্যা' নিয়ে রাজনৈতিক দোষারোপের প্রবণতা

বাংলাদেশে অল্প সময়ের ব্যবধানে দু’জন বিদেশী নাগরিক খুন হওয়ার ঘটনার তদন্তে দৃশ্যত তেমন কোনো অগ্রগতি না হলেও এ নিয়ে দেশটিতে সরকার এবং বিরোধী দল পরস্পরকে দোষারোপ করতে শুরু করেছে। বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে।
এতে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শনিবার অনেকটা সরাসরিই বিদেশী হত্যার ঘটনার জন্যে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে দায়ী করেছেন।
তবে বিএনপির পক্ষ থেকে এই দাবিকে অর্থহীন কথা বলে বর্ণনা করে বলা হয়েছে যে সরকার ব্যর্থতার দায় এড়াতে এ ধরণের দাবী করছে।
ইতালি আর জাপানের দু’জন নাগরিক খুন হওয়ার পর প্রাথমিকভাবে জঙ্গিরা দায়ী এমনটা মনে করা হলেও সরকারের পক্ষ থেকে এসব ঘটনার জন্যে বিএনপি ও জামায়াতকে দায়ী করার প্রবণতাই এখন বেশী লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফিরে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর আগে বলেছিলেন যে বিদেশী হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে বিএনপি-জামায়াত জড়িত থাকতে পারে।
তবে আজ ঢাকায় আইনজীবীদের এক অনুষ্ঠানে তিনি বিদেশী হত্যাকাণ্ডের জন্যে অনেকটা সরাসরিই বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে দায়ী করেন।
বিগত সংসদ নির্বাচন বর্জনকারী দল বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এখন লন্ডনে অবস্থান করছেন। তার ছেলে তারেক রহমানও বিগত তত্বাবধায়ক সরকারের সময় থেকেই লন্ডন প্রবাসী।
ঢাকায় আজ এক অনুষ্ঠানে খালেদা জিয়ার প্রতি ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অভিযোগ করেন, এর আগে তিনি দেশে বসে দেশের মানুষ হত্যা করেছেন। এখন বিদেশে বসে তিনি দেশের মধ্যে বিদেশীদের হত্যা করে আতংক সৃষ্টি করিয়ে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করার চেষ্টা করছেন।
শেখ হাসিনা বলেন, এটা হচ্ছে তার (খালেদা জিয়ার) 'আন্দোলনের নতুন কৌশল'। দেশ ও সরকারের বদনাম করার জন্য খালেদা জিয়া বিদেশে লবিস্ট রেখেছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বাংলাদেশে নিরাপত্তা নিয়ে যখন বিশ্বজুড়ে উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে, তখন সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে যে ইসলামিক স্টেট বা আইএস-এর কোন কর্মকাণ্ড বাংলাদেশে নেই, যদিও এর আগে আইএস-এর সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।
সাম্প্রতিক বিদেশী হত্যাকাণ্ডের দায়িত্ব আইএস স্বীকার করেছে বলে দাবী করা হলেও এসব ঘটনার জন্যে এখন একেবারে উচ্চ পর্যায় থেকে দায়ী করা হচ্ছে বর্তমানে লন্ডনে অবস্থানরত খালেদা জিয়াকে।
কীসের ভিত্তিতে সরকারের এই দাবী, তা জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেন, খালেদা জিয়া বিদেশে যাবার পর থেকেই বিদেশীদের ওপর আক্রমণের ঘটনা ঘটছে। তিনি বলেণ, এর আগে দেশের মানুষকে হত্যা করে যখন সুফল পাওয়া যায় নি - তাই এবার বিদেশীদের ওপর হামলা করে সরকারকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা হচ্ছে।
মি. হানিফ বলেন, মনে হয় তার এবং তার পুত্রের বিরুদ্ধে যে মামলাগুলো রয়েছে তার বিচার বাধাগ্রস্ত করা এবং সরকারকে বিব্রত ও হেয় করার জন্যই এটা ঘটানো হচ্ছে।
তবে বিএনপির নেতারা পাল্টা অভিযোগ করছেন যে সরকার বিদেশীদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, আর এই ব্যর্থতার দায়ভার এখন চাপাচ্ছে বিএনপির ওপর, যাকে তাঁরা বর্ণনা করছেন, সরকারের পুরানো খেলা হিসেবে।
দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলছেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কোন গোপন সফর নয়, বরং চিকিৎসার জন্যে লন্ডনে রয়েছেন।
"যা খুশি তাই বলা তাদের স্বভাবে অংশ হয়ে গেছে, দেশের মানুষও এসব কথা শুনতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এসব অর্থহীন কথা, যার কোন যুক্তি নেই, প্রমাণ নেই" - বলেন বিএনপির এই সিনিয়র নেতা।
নজরুল ইসলাম খান বলেন, এটা দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার যে গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে দায়িত্বহীন কথার জন্যই আমরা সারা বিশ্বে একঘরে হয়ে পড়ছি।
কিন্তু বিদেশী হত্যার জন্যে সরকারের পক্ষ থেকে দোষারোপ কি খালেদা জিয়ার দেশে ফেরাকে কঠিন করে তুলতে পারে? – এমন এক প্রশ্নে নজরুল ইসলাম খান বলেন, এভাবে খালেদা জিয়াকে ভয় দেখানো যাবে না।
আওয়ামী লীগের মাহবুব-উল আলম হানিফও মনে করেন, খালেদা জিয়ার দেশে ফেরার ক্ষেত্রে সরকার কোন বাধার সৃষ্টি করবে না, এবং বিএনপি চেয়ারপারসন যেকোন অভিযোগ দেশে ফিরে আইনী পথে মোকাবেলা করবেন বলে তিনি আশা করেন।
শেখ হাসিনা এমন এক সময় এ কথা বললেন, যখন বিদেশী নাগরিক হত্যাকান্ড ছাড়াও, সম্প্রতি দুটি বিদেশী ক্রিকেট দল নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে বাংলাদেশে খেলতে আসা স্থগিত করেছে।
ঢাকায় কিছু দূতাবাস বিদেশীদের চলাফেরার সময় সতর্কতার পরামর্শ দিয়েছে। সর্বশেষ ব্রিটেনের পররাষ্ট্র দফতর বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদী হামলার উচ্চ ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে বলেছে, সেখানে পশ্চিমা নাগরিকদের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণের মতো আক্রমণের আশংকা আছে।
সূত্র : বিবিসি

পাউবোর শতকোটি টাকার জমি বেদখল by অরূপ রায়

সাভার ব্যাংক কলোনি এলাকায় পাউবোর
জায়গা দখল করে গড়ে তোলা কয়েকটি
বহুতল ভবন l ছবি: প্রথম আলো
ঢাকার সাভারে ব্যাংক কলোনির আই ব্লকের ২৯/১ হোল্ডিং নম্বর ভবনটির মালিক রফিকুল ইসলাম। কিন্তু যে জমির ওপর তিনি ভবনটি নির্মাণ করেছেন, সেটির মালিক পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। জমির মালিক না হয়েও তিনি পেয়েছেন পৌরসভার অনুমোদন ও হোল্ডিং নম্বর। নিয়েছেন বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংযোগ।
রফিকুলের মতো আরও ৩৮ জন ১০০ কোটি টাকার বেশি মূল্যের ১৯ দশমিক ৬ বিঘা সরকারি জমি দখল করে সেখানে পাকা ও আধা পাকা স্থাপনা নির্মাণ করে বসবাস করছেন। আবার কিছু লোক স্থাপনা না বানালেও জমি দখলে রেখেছেন। পাউবো ৬০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করলেও দখলদার উচ্ছেদে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। পাউবোর মামলায় রেকর্ড সংশোধনের প্রার্থনা করা হয়।
ঢাকার জেলা প্রশাসক তোফাজ্জল হোসেন মিয়া প্রথম আলোকে বলেছেন, সরকারি কোনো সংস্থার জমি থেকে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করতে হলে আগে তাদের নোটিশ দিতে হবে।
পাউবো সূত্রে জানা গেছে, বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রের জন্য উঁচু প্ল্যাটফর্ম তৈরির লক্ষ্যে ১৯৫৭ সালে সাভার পৌর এলাকার ছোট বলিমেহের মৌজার ব্যাংক কলোনি এলাকায় তৎকালীন জল ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নামে ৫ দশমিক ৮৮ একর (১৯ দশমিক ৬ বিঘা) জমি অধিগ্রহণ করা হয়। পরে ওই জমি পাউবোর নামে রেকর্ড হয়। কিন্তু কর্তৃপক্ষ সেখানে আশ্রয়কেন্দ্র না করায় দীর্ঘদিন ধরে ওই জমি উন্মুক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে। এ সুযোগে স্থানীয় লোকজন বছর বছর ওই জমি দখল করে নেন। কিন্তু পাউবো তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
গত বছর দুজন অবৈধ দখলদারের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দিলে এক পক্ষ প্রথম আলোর এ প্রতিবেদকের শরণাপন্ন হন। তাঁর নথিপত্র ঘেঁটে ওই জমিতে পাউবোর মালিকানার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। পরে ওই জমিসংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য জানতে চেয়ে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে তথ্য অধিকার আইনে কয়েক দফায় পাউবোর মহাপরিচালকের কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে তথ্য চেয়ে আবেদন করা হয়। এই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পাউবো সব তথ্য সরবরাহ করে।
পাউবোর সরবরাহ করা তথ্য যাচাই-বাছাই করে দেখা যায়, ১৯ দশমিক ৬ বিঘা জমির পুরোটা ৩৮ জন ব্যক্তি অবৈধভাবে দখল করে রেখেছেন। কেউ কেউ একতলা থেকে পাঁচতলা পর্যন্ত পাকা ভবন তৈরি করে বসবাস করছেন। এঁদের মধ্যে সরকারি কর্মকর্তাও রয়েছেন। তবে প্রথম আলোর অনুসন্ধানে দখলদারের সংখ্যা আরও বেশি বলে জানা গেছে। তাঁরা জমি কিনেছেন দাবি করলেও কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি।
সরকারি হিসাবমতে, ছোট বলিমেহের মৌজায় প্রতি শতাংশ জমির দাম ৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা। তবে স্থানীয় লোকজন জানান, ওই মৌজার ব্যাংক কলোনির প্রতি শতাংশ জমির বর্তমান বাজারদর আছে ২০ লাখ টাকা। সেই হিসাবে ১৯ দশমিক ৬ বিঘা জমির দাম ১১৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা।
গত ২০ মে সরেজমিনে গেলে ৫/৩ নম্বর হোল্ডিংয়ের দ্বিতীয় তলার একটি বাড়ি বাইরে থেকে দরজা বন্ধ পাওয়া যায়। বাড়িটির মালিক কবির উদ্দিন শিকদার। তিনি গণপূর্ত বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী বলে জানা গেছে। কবির উদ্দিন শিকদার দাবি করেন, ১৯৯৬ সালে জনৈক আফসার আলীর কাছ থেকে তিনি জমিটি কিনেছেন। রেকর্ড অনুযায়ী ওই জমি ব্যক্তিমালিকানাধীন।
ছয়তলা ভিত্তি (ফাউন্ডেশন) দিয়ে বাড়ি নির্মাণ করছেন সৌদিপ্রবাসী নজরুল ইসলাম। বাড়িটির দোতলা পর্যন্ত নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। কিন্তু বাড়ি নির্মাণের জন্য পৌরসভা বা রাজউকের কোনো অনুমোদন নেননি তিনি। অথচ বাড়িটিতে বিদ্যুতের সাতটি মিটার ও গ্যাসের সংযোগ রয়েছে।
জানতে চাইলে নজরুল ইসলাম বলেন, জনৈক আনসার আলী ও তাঁর স্ত্রী খালেদা খানমের কাছ থেকে ১৯৯৬ সালে তিনি ৬ শতাংশ জমি কিনে বাড়ি করছেন। পাউবোর জমি কীভাবে অন্যের মাধ্যমে হাতবদল বা দলিল হয়—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মালিকানা নিয়ে আদালতে মামলা চলছে। আমাদের পক্ষে রায়ও পেয়েছি।’ কিন্তু নজরুল ইসলাম মামলা ও রায়-সংশ্লিষ্ট কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি।
এক প্রশ্নের জবাবে সাভার ব্যাংক কলোনির আই ব্লকের ২৯/১ হোল্ডিং নম্বর ভবনের মালিক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘পাউবোর কোনো জমিতে আমরা বসবাস করি না। আদালতের মাধ্যমেই তা প্রমাণ হয়ে গেছে।’
কিন্তু সাভার সহকারী কমিশনারের (ভূমি) কার্যালয়ের নথি অনুযায়ী, ওই জমির মালিক পাউবো। আরএস ও বিএস রেকর্ডেও পাউবোকেই মালিক দেখানো হয়েছে।
সাভারের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. জোবায়ের প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী ছোট বলিমেহের মৌজায় অন্তত ১৪ বিঘা জমির মালিক পাউবো। ওই জমি অন্যরা দাবি করে থাকলে তা সঠিক নয়।’
পাউবোর পরিচালক (প্রসেসিং সেকশন) ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফজলুল রশিদ এক পত্রে প্রথম আলোকে বলেন, পাউবোর ওই জমি থেকে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে আইনগত কোনো বাধা নেই। উচ্ছেদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য গত ২৩ মার্চ ঢাকার জেলা প্রশাসকের কাছে দখলদারদের তালিকা পাঠানো হয়েছে। এরপরও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
জেলা প্রশাসক মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়া বলেছেন, ‘পাউবো উচ্ছেদের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করার পর আমাদের অবহিত করবে। এরপর প্রশাসনের পক্ষ থেকে উচ্ছেদে সহায়তা করা হবে। খাস খতিয়ানভুক্ত জমি ছাড়া জেলা প্রশাসনের পক্ষে অন্য কোনো সংস্থার জমি থেকে দখলদার উচ্ছেদে সরাসরি কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই।’

চট্টগ্রামে তরুণদের হাতে মারণাস্ত্র by মহিউদ্দীন জুয়েল

চট্টগ্রামে ২০ থেকে ২৫ বছরের ছেলেদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হচ্ছে দামি অস্ত্র। পাওয়া যাচ্ছে মারণাস্ত্র একে-২২, বিদেশী পিস্তল কিংবা ধারালো রামদা। হাতে হাতে এসব অস্ত্র চলে যাওয়ায় বাড়ছে অপরাধ। খুন হচ্ছে মানুষ।
হঠাৎ করে টগবগে তরুণদের হাতে অস্ত্র দেখে খোদ বিস্মিত নগর পুলিশের কর্মকর্তারা। গ্রেপ্তার হওয়া খুনি, ছিনতাইকারী ও দাগি আসামিদের তালিকায় রয়েছে ২০ বছরের যুবকদের ছবি। চট্টগ্রাম শহরে এই বয়সের অন্তত আরও ৩০ জন দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী তৈরি হয়েছে বলে মানবজমিনের সঙ্গে আলাপকালে জানিয়েছেন নগর পুলিশের এক কর্মকর্তা। পুলিশের তালিকা ঘেঁটে দেখা যায়, ঈদের আগে সন্দ্বীপে গরুর বাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গুলিবিনিময়ে নিহত হয় ২ জন। এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে গত ৯ই অক্টোবর সেখানে অভিযান চালানোর পর  বেরিয়ে আসে কয়েকজন মিলে গড়ে তোলা অস্ত্র ভাণ্ডার।
 গ্রেপ্তার করা হয় খুনের মামলার প্রধান আসামি মিশু গ্রুপের প্রধান ফজলে এলাহী মিশুকে। গ্রেপ্তার হয় আরও ৩ সহযোগী। যাদের সবার বয়স ২০ থেকে ২৫-এর মধ্যে। তাদের কাছ থেকে পাওয়া যায় দুইটি পিস্তল, দুইটি একনলা বন্দুক, দুইটি শটগান, ৫ রাউন্ড থ্রি নট থ্রি রাইফেলের গুলি ও ১০টি কিরিচ।
গ্রেপ্তার হওয়া ৪ জন হলো- সন্দ্বীপ উপজেলার বাউরিয়া গ্রামের মো. রেজাউল মাওলার  ছেলে ফজলে এলাহী মিশু ওরফে মিশন, পৌরসভা ৫ নম্বর ওয়ার্ডের মৃত জামশেদের ছেলে  মো. রুবেল, একই উপজেলার বাউরিয়া গ্রামের হাজী আতাউর রহমানের ছেলে লুৎফর রহমান ও খুলনা জেলার রূপসা উপজেলার সামন্ত সেনা গ্রামের বাহারের ছেলে মাহাবুব আলম রিয়াজ। এদের মধ্যে মিশুকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পরে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার রুবেল ও রিয়াজ জানান, অস্ত্র হাতে থাকলে এলাকায় প্রভাব খাটানো সহজ হয়। প্রতিপক্ষের লোকজন ভয় পায়। এলাকায় রাজনীতি করলেও এসব অস্ত্র আছে বলে খবর ছড়িয়ে দিতে হয়। তা না হলে প্রতিপক্ষের লোকজন তাদের দুর্বল মনে করতে পারে।
অপর সহযোগী লুৎফর বলেন,  যে ঘটনার জন্য তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে সেই ঘটনায় তারা সমর্থন দিতে গিয়ে ধরা পড়েছে। তবে পুরো ঘটনাটি তারা খুব কাছ থেকে দেখেছে। এসব ঘটনায় অনেক রাজনৈতিক নেতা জড়িত। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঘটনার পরপরই মানবজমিনের সঙ্গে কথা বলেন জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বিশেষ শাখার মুহাম্মদ নাঈমুল হাসান। তিনি জানান, ঘটনার সময় দুই ব্যক্তি নিহত হয়। এরপর মিশু খুলনা চলে যায়। সেখান থেকে সে ধরা পড়ে। তার কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া প্রচুর অস্ত্র দেখে বিস্মিত পুলিশ বিভাগ।
তবে কেবল এই ঘটনাই নয়, গত ২৩শে সেপ্টেম্বর রাতে নগরীর মাঝিরঘাট এলাকায় এক ব্যবসায়ী খুন হয়। এই ঘটনায় পাওয়া যায় দুটি অত্যাধুনিক একে-২২ রাইফেল। একইভাবে গত ৪ঠা সেপ্টেম্বর শহরে বায়েজিদ বোস্তামী থানার বাংলাবাজার এলাকার একটি মাজারে খুন করা হয় এক খাদেম ও ফকিরকে। দুটি ঘটনায় আটক আসামিদের মধ্যে অধিকাংশের বয়স ২০ থেকে ২৫ বলে জানিয়েছে পুলিশ।
যাদের মধ্যে রয়েছে বুলবুল আহমেদ সরকার ওরফে ফুয়াদ। তার গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জে। আরও আছে বোমা বিস্ফোরণে নিহত
 তৌফিকুল ইসলাম জাবেদ ওরফে রানা। যার বয়স ২২। গ্রেপ্তার হয়েছে সুজন বাবু (২৫)। যার গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহ জেলার কোটচাঁদপুর থানার হরিণদিয়া মাদরাসাপাড়ায়। পুলিশ জানায়, অত্যন্ত নৃশংসভাবে মাজারে ঢুকে এদের কয়েকজন দুই ব্যক্তিকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করে। অন্যরা বিপথে গিয়ে ছিনতাই করে টাকা কামানোর পথ অবলম্বন করে। এদের সবার মধ্যে নাশকতার অভিযোগ রয়েছে। থানায় হয়েছে ৫টির বেশি মামলা।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে মানবজমিনের সঙ্গে কথা হয় চট্টগ্রাম পুলিশ কমিশনার আবদুল জলিল মণ্ডলের। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, বিভিন্ন সময়ে নানা অভিযানে অনেক অপরাধী ধরতে হয় আমাদের। কিন্তু অল্প বয়সী বিশেষ করে ২০ বছরের টগবগে তরুণদের হাতে অস্ত্র দেখে সত্যিই আমরা হতবাক হই। যেখানে দেশকে দেয়ার সময় তাদের, সেখানে ওরা জড়িয়ে পড়ছে নানা অপকর্মে।
তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় ২০ থেকে ২৫ বছরের তরুণদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে অপরাধী যেই হোক তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে পুলিশ। অপরাধ কমিয়ে আনতে আমরা ব্যাপক তৎপরতা চালাচ্ছি। এই লক্ষ্যে নানামুখী সচেতনতামূলক কার্যক্রমের কথা তিনি উল্লেখ করেন।

পাবনায় যাজক হত্যাচেষ্টা, মোটরসাইকেল রহস্য by আবু সালেহ আকন

প্রথমে যে তথ্য প্রকাশ পেয়েছে সে অনুযায়ী জব্দকৃত মোটরসাইকেলটির নম্বর প্লেট ভুয়া। ওই সিরিয়াল নম্বরে কোনো মোটরসাইকেলের রেজিস্ট্রেশন হয় না। ইঞ্জিন নম্বর অনুযায়ী এক মালিকের সন্ধান পেলেও ওই নামে কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি এখনো।
পুলিশ জানিয়েছে, ওই মোটরসাইকেলটি দুর্বৃত্তরা ব্যবহার করেছে পাবনার যাজক লুক সরকারকে হত্যা চেষ্টায়। তবে গতকাল ঈশ্বরদী থানার ওসি মোটরসাইকেলটির ভিন্ন সিরিয়ালে নম্বর প্লেটের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, মোটরসাইকেলটির মালিক সম্পর্কে এখনো তারা নিশ্চিত নন ।
৫ অক্টোবর পাবনার ঈশ্বরদীতে বাসায় ঢুকে খ্রিষ্টান ধর্মযাজক লুক সরকারকে (৫০) হত্যার চেষ্টা চালায় দুর্বৃত্তরা। ওই দিন সকালে তিন যুবক ধর্মপাঠ শোনার কথা বলে লুক সরকারের কাছে আসে। তারা লুক সরকারের ড্রইংরুমে বসে তার মুখ চেপে ধরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলা কাটার চেষ্টা করে। এ সময় তার আর্তচিৎকারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যাওয়ার সময় বাড়ির কেয়ারটেকার আজগর আলী একজনকে জাপটে ধরেন। বাকি দুই যুবক তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়। দুর্বৃত্তদের অস্ত্রের আঘাতে লুক সরকারের গলা কেটে যায়। এ দিকে দুর্বৃত্তরা তাদের ব্যবহৃত মোটরসাইকেল ফেলে পালিয়ে যায়। মোটরসাইকেলটির নম্বর- ঢাকা মেট্রো ট-১১-৯০৪৫। পুলিশ ওই মোটরসাইকেলটি জব্দ করে । পুলিশের ধারণা ছিল মোটরসাইকেলের সূত্র ধরে দুর্বৃত্তদের আটক করতে পারবে তারা। কিন্তু প্রথমেই দেখা যায় নম্বর প্লেটটি ভুয়া।
ঢাকা মহানগর ট্রাফিক পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, ট সিরিয়ালে মোটরসাইকেলের কোনো নম্বর নেই। দুর্বৃত্তরা পরিকল্পিতভাবে এ সিরিয়াল নম্বর দিয়ে নম্বর প্লেট তৈরি করেছে। প্রথমে ‘ট’ সিরিয়ালের মোটরসাইকেল জব্দ করার কথাই উল্লেখ করা হয়। তবে গতকাল ঈশ্বরদী থানার ওসি বলেছেন, মোটরসাইকেলের নম্বর প্লেটটি ট সিরিয়ালের নয়। ল সিরিয়ালের।
তিনি আরো বলেন, এ সিরিয়াল ধরেই মোটরসাইকেলের মালিক খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, মালিকের সন্ধানে ইতোমধ্যে বিআরটিএ-তে তারা নম্বরটি জমা দিয়েছেন। মোটরসাইকেলের ইঞ্জিন ও চেসিস নম্বর দিয়েও খোঁজা হচ্ছে মোটরসাইকেলটি কার। পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, ওই নম্বর অনুযায়ী তারা খোঁজ পেয়েছেন মোটরসাইকেলটি আলাউদ্দিন নামে এক ব্যক্তির নামে রেজিস্ট্রেশন করা, যার ঠিকানা- শহীদ তাজউদ্দিন সরণি, তেজগাঁও, ঢাকা। কিন্তু ওই ঠিকানায় এ নামে কোনো ব্যক্তিকে এখনো শনাক্ত করতে পারেনি গোয়েন্দারা।
এ দিকে লুক সরকারকে হত্যা চেষ্টার অভিযোগে পুলিশ সন্দেহভাজন এক যুবককে গ্রেফতার করেছে। ওসি বলেছেন, ওই যুবককে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতের নির্দেশে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। তার কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। ওইসব তথ্যের যাচাই-বাছাই চলছে। এ দিকে গ্রেফতার ওবায়দুলকে জামায়াত-শিবিরের লোক বলে পুলিশ উল্লেখ করলেও তার বাবা আব্দুস সালাম বলেছেন, তারা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। তার ছেলেও ছোটবেলা থেকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সাথে ওঠাবসা করে। তার ছেলে রাজধানীর শ্যামলীর একটি প্রতিষ্ঠানে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়ে। মোটরসাইকেল ছিনতাইয়ের একটি মামলায় হাজিরা দিতে সে ঢাকা থেকে বাড়ি গিয়েছিল। পুলিশ তাকে ধরে ধর্মযাজক হত্যা প্রচেষ্টা মামলায় ঢুকিয়েছে।
ওবায়দুলের বাবা তার ছেলেকে এ মামলায় গ্রেফতারের প্রতিবাদও করেছেন। লুক সরকারও বলেছেন, গ্রেফতার হওয়া ওবায়দুলকে তিনি চেনেন না। তবে যারা তার গলা কেটে হত্যার চেষ্টা চালায় তাদের দেখলে তিনি চিনবেন।

ঢাকার টাস্কফোর্স ও স্বপ্নের পুত্রজায়া by মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

রাজধানী ঢাকার নানা সমস্যার সমাধান এবং একটি সুদূরপ্রসারী মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করার জন্য একটি সমন্বয় কমিটি গঠনের দাবি উঠেছে। ঢাকার দুই মেয়রও এই দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। মেয়র হওয়ার পর তাঁরা এখন বুঝতে পেরেছেন, মেয়রের ক্ষমতা খুব সীমিত। হাতে গোনা কয়েকটি ছাড়া বেশির ভাগ কাজই তাঁদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। সম্প্রতি ঢাকার দুই মেয়র প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে রাজধানীর উন্নয়ন ও নাগরিক সমস্যার সমাধানে একটি টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীকে এই টাস্কফোর্সের প্রধান করারও প্রস্তাব দেন দুই মেয়র। প্রধানমন্ত্রীও এই প্রস্তাবে নীতিগত সমর্থন দিয়েছেন বলে সংবাদপত্রের প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে।
আপাতদৃষ্টিতে অনেকের মনে হতে পারে, খুব ভালো প্রস্তাব ও উদ্যোগ। কারণ, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হলে তাতে ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে। এ জন্যই দুই মেয়র এই প্রস্তাব দিয়েছেন। তাঁদের দুজনের লক্ষ্য একটাই: তাঁদের মেয়াদকালে যেন ঢাকার কিছু সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।
কিন্তু রাজধানী ঢাকার বৃহত্তর প্রেক্ষাপট থেকে দেখলে এই প্রস্তাবটি ভালো হয়নি। কারণ, এতে মেয়রের ক্ষমতায়ন হবে না। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শক্তিতে মেয়র শক্তিমান হবেন। এটা কৃত্রিম। আমরা চেয়েছিলাম, ঢাকার নির্বাচিত মেয়র আইনের মাধ্যমে শক্তিশালী হোক। সব কাজে প্রধানমন্ত্রীর পদকে ব্যবহার করা ঠিক নয়। প্রধানমন্ত্রী সব সরকারি কমিটি বা টাস্কফোর্সেরও ওপরে। প্রধানমন্ত্রীকে যদি একটি কমিটি বা টাস্কফোর্সের প্রধান করা হয়, এতে প্রধানমন্ত্রীর পদকে ছোট করা হয়। ম্যাচে জেতার জন্য কোচ বা ম্যানেজারকে মাঠে নামতে বলা যেমন মানানসই হয় না, এটাও অনেকটা সে রকম।
প্রধানমন্ত্রী যদি এই টাস্কফোর্সের প্রধান হতে রাজিও হন, তাহলেও প্রশ্ন থেকে যায়। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনেও সমন্বয়হীনতার সমস্যা রয়েছে। তারা কী দোষ করল? প্রধানমন্ত্রী তো চট্টগ্রামেরও প্রধানমন্ত্রী। তাহলে আমরা প্রস্তাব দেব: প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে চট্টগ্রামেও একটা টাস্কফোর্স গঠন করা হোক। তা কি উচিত হবে? কোনো কিছু প্রস্তাব করার সময় আমরা অতশত ভাবি না। আমরা চাই, আমাদের কাজ উদ্ধার হলেই হলো।
অনেক অদক্ষ মন্ত্রী, মেয়র, এমপি তাঁদের নিজ নিজ কাজ উদ্ধারের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে তাঁদের কাজের সঙ্গে যুক্ত করে ফেলেন। প্রধানমন্ত্রীকে কমিটির প্রধান করেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে মিটিং করেন। প্রধানমন্ত্রীকে সশরীরে কমিটিতে রাখা হলে তাঁর মূল্যবান সময় নষ্ট হবে। প্রত্যেক বড় মাপের আন্তমন্ত্রণালয় কমিটি বা টাস্কফোর্সে প্রধানমন্ত্রী অনুমোদিত তাঁর অফিসের একজন সচিবকে সদস্য রাখলেই তিনি প্রত্যেক কমিটির কাজের অগ্রগতি ও সমস্যা সম্পর্কে অবহিত থাকতে পারবেন। প্রধানমন্ত্রীর অবহিত থাকাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিবের পরামর্শে প্রধানমন্ত্রী যখন যেখানে প্রয়োজন, সেখানে হস্তক্ষেপ করতে পারেন। প্রধানমন্ত্রীকে সারা দেশের নানা উন্নয়ন প্রকল্প এভাবেই তত্ত্বাবধান ও মনিটরিং করতে হয়।
আমাদের মতে, ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বেশি মাথা ঘামাবেন। সে কাজেই তাঁর বেশি সময় দেওয়া উচিত। একাধিক মন্ত্রণালয়, মন্ত্রী, মেয়র, এমপি, বিভাগ, অধিদপ্তর এসব সমস্যার সমাধান করার জন্য রয়েছে। এতগুলো লোক মিলে সমস্যার সমাধান করতে পারবেন না কেন? যদি রাজধানী ঢাকার বা চট্টগ্রামের সমস্যার সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর কোনো নির্দেশ দরকার হয়, সংসদে কোনো নতুন আইন পাস করার দরকার হয়, সে ব্যাপারে মন্ত্রী বা মেয়র কিংবা এমপি প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা চাইতে পারেন। কাজ এগিয়ে নেওয়ার পথে যদি কোনো সরকারি গিঁট লেগে যায়, প্রধানমন্ত্রী সেই গিঁট খুলে দিতে পারেন। যাঁরা প্রধানমন্ত্রীকে বিভিন্ন কমিটি বা টাস্কফোর্সের প্রধান করতে চান, তাঁরা প্রধানমন্ত্রীর পদটি ছোট করছেন।
দেশে একটা যুদ্ধ লাগলে, বড় আকারে বন্যা হলে, বড় আকারে ভূমিকম্প হলে, বড় আকারে দাঙ্গা হলে, হাজার হাজার মানুষ মারা গেলে অবশ্যই প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে টাস্কফোর্স হতে পারে। দেশের সব সরকারি প্রতিষ্ঠানকে তখন একযোগে কাজ করতে হবে। দেশের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। তবে সে ধরনের কাজ সাময়িক। তিন-চার মাসের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে চলে আসবে। এ ধরনের পরিস্থিতি খুবই ব্যতিক্রম।
রাজধানী ঢাকার সমস্যা সমাধান ও উন্নয়নকাজে সমন্বয় করার জন্য একটি স্থায়ী ব্যবস্থা করা দরকার। যেহেতু কাজগুলো বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত, সেহেতু একজন মন্ত্রীর নেতৃত্বে এই সমন্বয় কমিটি হওয়া বাঞ্ছনীয়। মেয়র ও সব সেবা সংস্থার বিভাগীয় প্রধানেরা এর সদস্য হবেন। এই কমিটি যা সিদ্ধান্ত নেবে, তা বাস্তবায়নে কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগ বাধা দিতে পারবে না—এই মর্মে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দেবেন। আপাতত এই নির্দেশই যথেষ্ট। এই কমিটিতে প্রধানমন্ত্রীকে প্রতিনিধিত্ব করবেন তাঁর দপ্তরের একজন কর্মকর্তা। তাতেও কাজ হবে না? প্রতিটি মিটিংয়ে প্রধানমন্ত্রীকে বসতে হবে? প্রধানমন্ত্রী কি শুধু ঢাকার প্রধানমন্ত্রী?
রাজধানী ঢাকার প্রশাসন পরিচালনার জন্য কোনো একক ওÿ ক্ষমতাবান নেতৃত্ব নেই। তাই আমরা ‘নগর সরকার’র কথা বলেছিলাম। বড় দুটি রাজনৈতিক দল এখনো নগর সরকারের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেনি। তাই নগর সরকারের লক্ষ্যে কোনো কাজ বা আইন প্রণয়নের কথা কোনো সরকারই চিন্তা করেনি। এখন যদি নিদেনপক্ষে একটি সমন্বয় কমিটি গঠন করা যায়, তাহলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নগর সরকার বা ঢাকায় একক ও ক্ষমতাবান নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে পারবে।
আমরা আশা করব, প্রধানমন্ত্রী ঢাকার উন্নয়নকাজে সমন্বয় করার জন্য একজন মন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি উচ্চÿক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করে দেবেন। এ জন্য বেশি সময়ক্ষেপণ করার প্রয়োজন নেই।
সচিবালয় স্থানান্তর?
একটা কথা শোনা যাচ্ছে, ঢাকার তোপখানা রোড থেকে সচিবালয় শেরেবাংলা নগরে শিল্প প্রদর্শনীর মাঠে স্থানান্তর করা হবে। যেহেতু এখন পূর্বাচলে চীন সরকার স্থায়ী ‘প্রদর্শনী হল’ নির্মাণ করে দিচ্ছে, কাজেই এই জায়গাটি খালি হয়ে যাবে। শেরেবাংলা নগরে এই জায়গাতে নতুন সচিবালয় নির্মাণ করার ব্যাপারে সরকারের নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তের কথা আমরা জানি না।
আমাদের ধারণা, এ রকম সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে তা ঠিক হবে না। শেরেবাংলা নগর এখন আর অত বড় ভবন করার উপযুক্ত নয়। এত গাড়ি, এত রকম যানবাহন, এত মানুষের চলাচলও ঠিক হবে না। সচিবালয় অনেক বড় একটি অবকাঠামো।
এ ব্যাপারে আমাদের কয়েকটি পরামর্শ রয়েছে। ১. রাজধানীর সচিবালয়, মন্ত্রী পাড়া, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন, সরকারি কর্মকর্তাদের বাসভবন, সেনানিবাস একবিংশ শতাব্দীর ঢাকার কোথায় নির্মাণ করা উচিত হবে, তা নিয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ, স্থপতি, নগর বিশেষজ্ঞ ও প্রকৌশলীদের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত। তাঁদের সঙ্গে আলোচনা না করে এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। ২. অ্যাডহক ভিত্তিতে এসব কাজ করা ঠিক নয়। যা করা হবে তা অন্তত ৫০-৭৫ বছরের ঢাকাকে (নির্মাণের পর) সামনে রেখে পরিকল্পনা করা উচিত। ৩. ঢাকার নতুন ডিটেইল এরিয়া প্ল্যানের মধ্যে সচিবালয়সহ বিভিন্ন বড় সরকারি ভবন চিহ্নিত করা যেতে পারে। ৪. কুয়ালালামপুরের পুত্রজায়ার মতো ঢাকা শহরের বাইরে (পূর্বাচল?) বিভিন্ন সরকারি ভবনের একটি পৃথক উপশহর নির্মাণের কথাও চিন্তা করা যায়। পুত্রজায়া আমাদের সামনে একটি বড় দৃষ্টান্ত।
এসব কাজ কখন শুরু হবে বা শেষ হবে, তা বড় কথা নয়। এ ধরনের কাজ আমাদের করতে হবে—এখন থেকে এই ভাবনা শুরু করা উচিত। কারণ, আমাদের জমির পরিমাণ সীমিত। কৃষিজমি আরও সীমিত। এসব কাজে অনেকগুলো ধাপ থাকে। কোনো একটি সরকার সব কাজ করার সুযোগ পায় না। বর্তমান সরকারের আমলে অন্তত এসব ব্যাপারে সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া যায় কি না, তার চেষ্টা করা উচিত। আমরা গণতান্ত্রিক দেশ বলে দাবি করি। তাই এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সরকার, সংসদের বিরোধী দল, অন্যান্য বড় রাজনৈতিক দল, বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজ, বিভিন্ন পেশাজীবী গোষ্ঠীর প্রতিনিধি—সবার সঙ্গে মতবিনিময় করা যেতে পারে। এতে এই বড় মাপের সিদ্ধান্তে সবার মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হবে। তার মূল্য কম নয়। পরের টার্মে যদি বর্তমান ক্ষমতাসীন দলই নির্বাচিত হয়, তাহলে তারা আরও পাঁচ বছর কাজ এগিয়ে নিতে পারবে। এ ধরনের বড় প্রকল্প ১৫-২০ বছরের আগে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে না।
আমরা আশা করব, সরকার এ ব্যাপারে ভাবনাচিন্তা শুরু করবে। অন্তত নির্দিষ্ট এজেন্ডা দিয়ে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটিকে প্রাথমিক ও খসড়া রূপরেখা তৈরির দায়িত্ব দেবে। প্রাথমিক কাজ হিসেবে সেটাও কম নয়। মনে রাখা দরকার, আমাদের জন্য এই ভাবনা আর কেউ ভাববেন না। আমাদেরই ভাবতে হবে।
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: মিডিয়া ও উন্নয়নকর্মী।