Wednesday, March 21, 2018

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে জাতিসংঘের সম্পৃক্ততা চায় জাপান

বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া জাতিসংঘের সম্পৃক্ততা চায় জাপান। বাংলাদেশ সফররত দেশটির পররাষ্ট্র বিষয়ক সংসদীয় ভাইস-মিনিস্টার ইওয়াও হোরি বলেছেন, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর সম্পৃক্ত থাকা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করি বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকার একে অপরের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ অব্যাহত রাখবে এবং প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া স্থিতিশীলভাবে সম্পন্ন হবে।’
আজ বুধবার ঢাকায় পৌঁছানোর পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলীর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সাক্ষাত করেন ইওয়াও হোরি। আগামীকাল বৃহস্পতিবার কক্সবাজারে শরণার্থী ক্যাম্প পরিদর্শনে যাবেন তিনি। এ সফরের মূল লক্ষ্য হলো রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। আগামী ২৩-২৪শে মার্চ তিনি মিয়ানমার সফর করবেন।
তিনি বলেন, ‘পররাষ্ট্রমন্ত্রী তারা কোনার নির্দেশনা মোতাবেক বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে হওয়া সমঝোতার ভিত্তিতে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় সহায়তা দিতে আমি এ সফর করছি।’
ভাইস মিনিস্টার ইওয়াও হোরি বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা হলো স্থিতিশীল ও দ্রুত প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়াটা যেন নিরাপদ, স্বেচ্ছায় এবং সম্মানজনকভাবে হয় সেটা নিশ্চিত করা।’
বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দেয়ায় বাংলাদেশের প্রশংসা করেন তিনি। শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি মানুষের অবস্থান এবং এতে করে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ঝুঁকি বৃদ্ধির পাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেন ইওয়াও হোরি বলেন, ‘এ কারণে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেই বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের প্রত্যাবাসন তরান্বিত করা প্রয়োজন।’
মিয়ানমার সফরে তিনি দেশটির প্রতি প্রত্যাবাসনের পর বাস্তুচ্যুতদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আরো স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেয়ার আহ্বান জানাবেন। একইসঙ্গে আহ্বান জানাবেন, পুনর্বাসনের পরিবেশ সৃষ্টি, নাগরিকত্ব যাচাই করতে। এসব কাজে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরকে সম্পৃক্ত করতে তিনি মিয়ানমারকে পরামর্শ দেবেন।

রোহিঙ্গা শিবিরে যৌনতার ফাঁদ

বাংলাদেশে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু শিবিরে নারীলোভীদের লোলুপ দৃষ্টি। তারা জাল বিছিয়েছে। তার ফাঁদে ধরা পড়ছে রোহিঙ্গা টিনেজ মেয়েরা। তাদেরকে নামানো হচ্ছে যৌন ব্যবসায়। বিদেশীরা চাহিবামাত্র এমন টিনেজ মেয়েকে সরবরাহ করা হচ্ছে। বিবিসির এক অনুসন্ধানে এসব তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। এ বিষয়ে প্রামাণ্য আকারে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিবিসি। তাতে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু শিবিরের টিনেজ মেয়ে, যুবতী বা নারীদের পাচার করা হচ্ছে। এমনই একজন টিনেজার আনোয়ারা ৯১৪)। তার পরিবারের সবাইকে হত্যা করেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। এখানে এসে আশ্রয় নেয়ার পর সে সহায়তার জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিল। এ বিষয়ে আনোয়ারা বলে, কয়েকজন নারী একটি ভ্যানে করে এলো আমার কাছে। তারা আমার কাছে জানতে চাইলো আমি তাদের সঙ্গে যেতে চাই কিনা। অসহায় থাকায় তাদের প্রস্তাব গ্রহণ করি আমি। আমাকে তাদের গাড়িতে তোলা হয়। প্রতিশ্রুতি দেয়া হয় আমাকে নিরাপদ ও উন্নত একটি জীবন উপহার দেবে তারা। কিন্তু তার পরিবর্তে আমাকে কক্সবাজার শহরের কাছে একটি স্থানে নিয়ে যায় তারা। এর পর বেশি সময় যায় নি। একদিন দুটি ছেলেকে নিয়ে আসে তারা। আমার রুমে ঢুকিয়ে দেয় তাদেরকে। ওই দু’টি ছেলের একজন আমাকে ছুরি দেখায়। আমার পেটে ঘুষি মারে। প্রহার করে। কারণ, আমি তাদেরকে সহযোগিতা করছিলাম না। এরপর ওই দুটি ছেলে আমাকে ধর্ষণ করে। এতে আমার কোনো সম্মতি ছিল না। ওদিকে আশপাশের শিবিরগুলোতেও পাচারের কাহিনী মিলছে। এক্ষেত্রে প্রধান শিকার হলো নারী ও শিশু। তাদেরকে প্রলোভন দেয়া হচ্ছে শিবির থেকে বেরিয়ে আসতে। বিভিন্ন কাজের প্রলোভন দেয়া হচ্ছে। যৌন ব্যবসায় নামার প্রস্তাব দেয়া হচ্ছে। সেখানে অলাভজনক গ্রুপ ফাউন্ডেশন সেন্টিনেলের সঙ্গে বিবিসির একটি টিম শিশুদের বিপথগামী করার বিরুদ্ধে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দিচ্ছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে। বিবিসির অনুসন্ধানে শিশু ও অভিভাবকরা বলেছেন, তাদেরকে বিদেশে চাকরির প্রস্তাব দেয়া হচ্ছে। রাজধানী ঢাকায় হোটেল স্টাফ, রান্নার সহকারী সহ বাসাবাড়ির কাজের প্রস্তাব দেয়া হচ্ছে। উদ্বাস্তু শিবিরজুড়ে চলছে এক অরাজকতা। শিশুদের যৌন ব্যবসায় নামানোর এটাই হলো সবচেয়ে বড় সুযোগ। যেসব পরিবার কঠিন অবস্থায় আছে তাদের কাছে উন্নত জীবনের প্রস্তাব যাচ্ছে। তারা তা লুফেও নিচ্ছে। মাসুদা নামের ১৪ বছর বয়সী একটি বালিকা পাচারের শিকার হয়েছিল। তাকে এখন সহায়তা দিচ্ছে একটি স্থানীয় দাতব্য সংস্থা। মাসুদা বলেছে, আমার জীবনে কি ঘটতে যাচ্ছে তা আমি জানতাম। যে নারী আমাকে কাজের প্রস্তাব দিয়েছিল সবাই তাকে চেনে। সবাই জানে সে লোকজনকে যৌন ব্যবসা চালায়। লোকজনকে অর্থের বিনিময়ে শারীরিক সম্পর্কের সুযোগ করে দেয়। দীর্ঘদিন ধরে এখানে বসবাস করছে সে। সেও একজন রোহিঙ্গা নারী। এতসব জানার পরও আমার কাছে কোনো বিকল্প ছিল না। কারণ, এখানে তো আমার আর কিছুই নেই। আমার পরিবার অদৃশ্য হয়ে গেছে। আমার কাছে কোনো অর্থ নেই। মিয়ানমারে আমাকে ধর্ষণ করা হয়েছে। তারপরও মিয়ানমারে বনের ভিতর ভাই ও বোনদের সঙ্গে আমি খেলা করতাম। এখন আমি ভুলেই গিয়েছি কিভাবে খেলতে হয়।
অনেক শিশু এভাবে হারিয়ে গেছে। তাদের কোনো খোঁজ পাচ্ছেন না অনেক পিতামাতা। তারা আতঙ্কে এখন শুধু কাঁদেন। আবার কেউ এটাকেই মেনে নিয়েছেন। একজন মা বলেছেন, এই উদ্বাস্তু শিবিরের বাইরে যেকোনো জায়গায় জীবন উন্নততর।
কিন্তু এসব শিশুকে কোথায়, কারা নিয়ে গেছে? এমন প্রশ্ন আসতেই পারে। এ তথ্য উদঘাটনের জন্য বিবিসির অনুসন্ধানী টিম ছদ্মবেশ ধারণ করে। তারা সম্প্রতি বাংলাদেশে আসা বিদেশী হিসেবে নিজেদের পরিচয় দেন। শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করার জন্য সুযোগ খুঁজতে থাকেন। উদ্দেশ্য, সত্যিই শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য রোহিঙ্গা শিশুদের ব্যবহার করা হয় কিনা তা প্রামাণ্য আকারে উপস্থাপন করা। এ জন্য টিমের সদস্যরা ৪৮ ঘন্টার মধ্যেই কক্সবাজারের ছোট ছোট হোটেল ও সৈকতের কটেজ মালিকদের কাছে পেয়ে যান স্থানীয়ভাবে যৌন ব্যবসার দালালদের বেশ কিছু নাম্বার। আগে থেকেই অনুসন্ধানকারীরা পুলিশকে বিষয়টি অবহিত করে রাখে। এরপর যোগাযোগ করেন ওই দালালদের সঙ্ঙেগ। তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয় তাদের হাতে একজন বিদেশীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের জন্য কোন মেয়ে আছে কিনা, বিশেষ করে রোহিঙ্গা। জবাবে একজন দালাল বলে, আমাদের কাছে অনেক তরুণী আছে। কিন্তু আপনারা কেন রোহিঙ্গা মেয়ে খুঁজছেন? ওরা তো নোংরা হয়।
রোহিঙ্গা নারীদের এভাবেই দেখা হয়। মনে করা হয়, তারা সবচেয়ে সস্তা। তাদের চাহিদা কম। এ জন্য বিভিন্ন রকম দালালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। অল্প সময়ের মধ্যে অনেক মেয়ের ছবি আসতে থাকে। তাদের বয়স ১৩ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে। যে পরিমাণ মেয়ের ছবি দেখানো হয়েছে এবং বলা হয়েছে তাদের হাতে আছে তা বিস্ময়কর। দালালরা বলে, ছবির মেয়েদের যদি তাদের পছন্দ না হয় তাহলে আরো অনেক মেয়ে আছে। এসব মেয়ের বেশির ভাগই বসবাস করে দালালদের পরিবারের সঙ্গে। যখন তাদের কোনো খদ্দের থাকে না তখন তারা ওই পরিবারে রান্নাবান্না ও পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ করে। অনুসন্ধানকারীদের জানানো হয়, ‘আমরা এসব মেয়ে বেশিদিন আমাদের সঙ্গে রাখি না। এসব মেয়ের কাছে শুধু বাংলাদেশী পুরুষরাই আসে। অল্প সময় পরেই এতে তাদের বিতৃষ্ণা চলে আসে। তবে কিশোরী মেয়েদের চাহিদা আছে’। এসব তথ্য রেকর্ড করে স্থানীয় পুলিশের কাছে প্রামাণ্য হিসেবে উপস্থাপন করেছেন অনুসন্ধানকারীরা। এরপরই দালালকে সনাক্ত করে পুলিশ। তাদেরই একজন কর্মকর্তা বলেন ‘আমি তাকে চিনি। তাকে আমি ভালভাবে চিনি’। তবে এর মাধ্যমে কি বুঝাতে চাইলেন ওই পুলিশ কর্মকর্তা তা পরিষ্কার নয়। এক পর্যায়ে ওই দালালকে ফোন করেন অনুসন্ধানকারীরা। তার কাছে কক্সবাজারের একটি অভিজাত হোটেলে দুটি মেয়েকে পৌঁছে দেয়ার জন্য বলা হয় স্থানীয় সময় রাত আটটায়। এ সময় ছদ্মবেশ ধারণকারী খদ্দের, যিনি হলেন ফাউন্ডেশন সেন্টিনেলের একজন সদস্য, তিনি ওই হোটেলের বাইরে অপেক্ষা করতে থাকে দোভাষী সহ। পাশেই ছদ্মবেশে অপেক্ষায় থাকে পুলিশ কর্মকর্তারা। রাত আটটার কাছাকাছি দালাল ও ছদ্মবেশধারণকারী খদ্দেরের মধ্যে ফোনে কথা হয়। এ সময় দালাল তার খদ্দেরকে হোটেল থেকে বের হয়ে আসতে বলে। কিন্তু খদ্দের তা প্রত্যাখ্যান করেন। ফলে দালালই একজন ড্রাইভার দিয়ে দু’জন কিশোরীকে পাঠিয়ে দেয় হোটেলে। এরপর অর্থ পরিশোধ হয়। এ সময় খদ্দের জানতে চান, আজকের রাতটা যদি ভাল কাটে তাহলে আমরা কি আরো আপনাদের এই সেবা পেতে পারি? এ সময় চালক সম্মতিসূচক মাথা নাড়ান। টাকা হস্তান্তর হওয়ার পরই পুলিশ সদস্যরা এগিয়ে যান। চালককে গ্রেপ্তার করা হয়। উদ্ধার করা হয় ওই দুই কিশোরীকে। এর মধ্যে একজন উদ্বাস্তু শিবিরে ফেরত যেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। অন্যজন সামাজিক সেবা নিচ্ছেন।

‘ধর্ষণ নয়, হত্যা করতে চেয়েছিলাম’ -লম্পটের দম্ভোক্তি

শাহজাদপুর উপজেলার পোরজনা ইউনিয়নের প্রত্যন্ত পল্লী জিগারবাড়িয়া গ্রামে ৩য় শ্রেণি পড়ুয়া এক ছাত্রীকে ধর্ষণ ও হত্যার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় স্কুলছাত্রীর পিতা আকতার হোসেন বাদী হয়ে শাহজাদপুর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করলেও প্রভাবশালীদের ভয়ে ও চাপে কৌশলে ঘটনাটি চেপে যাচ্ছে। ঘটনাটি ঘটেছে গত শুক্রবার সকাল ১০টায়।
জানা গেছে, গত শুক্রবার সকালে উপজেলার দুর্গম এলাকা জিগারবাড়িয়া গ্রামের ৩য় শ্রেণি পড়ুয়া স্কুলছাত্রী তার হতদরিদ্র দিনমজুর পিতাকে বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে ওই গ্রামের দক্ষিণ ঢিবি (মাওলানার বাড়ীর পূর্বে) নামক ফাঁকা মাঠে খাবার পৌঁছে দিয়ে ফিরছিল শিশুটি।   পথে নির্জন ফাঁকা নেপিয়ার ঘাস ক্ষেতের কাছে পৌঁছালে পেছন থেকে ওঁত পেতে থাকা লম্পট একই গ্রামের আজাহার ওরফে আজা (৪৮) স্কুলছাত্রীর গলায় ধারালো অস্ত্র ধরে জোরপূর্বক ধর্ষণের চেষ্টা করে। এ সময় স্কুলছাত্রী লম্পট আজার মুখে নখের আঁচড় দিয়ে চিৎকার করে পালানোর চেষ্টা করে। স্কুলছাত্রীর আর্তচিৎকারে এলাকাবাসী তাকে উদ্ধার করে বাড়ি পৌঁছে দেয়। ঘটনার প্রতিকারে স্কুলছাত্রীর পিতা আকতার বাদী হয়ে থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করে।
কিন্তু গ্রাম প্রধানরা গ্রাম্য শালিসের মাধ্যমে ঘটনাটি ধামাচাপা দেয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এ ব্যাপারে লম্পট আজা গ্রাম্য শালিসে বলেছে, ‘স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণ করতে নয়, গলা কেটে বস্তায় ভরে গুম করার জন্য ঘাস ক্ষেতে নিয়ে গিয়েছিলাম।’ থানার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই জাহিদ বলেন, এ সংক্রান্ত একটি অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত-পূর্বক দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ স্কুলছাত্রীর পিতা আকতার বলেন, চেয়ারম্যান দায়িত্ব নিয়েছে। আমরা মীমাংসা করে নিয়েছি।’

সোনার হরিণ পাওয়ার জন্য লড়াই by সুদীপ অধিকারী

চাকরি। যেন সোনার হরিণ। হন্যে হয়ে খুঁজছেন তরুণেরা। হাহাকার বেশি শিক্ষিত তরুণদের মধ্যেই। উচ্চশিক্ষিত সন্তান। কিন্তু চাকরি না পাওয়ায় বাবা-মায়ের কাছেও দিনকে দিন হয়ে ওঠে বোঝা। এ এক অবিশ্বাস্য যন্ত্রণা। মুখ লুকিয়ে চলা। আর চাকরির ক্ষেত্রে বাড়তি যোগ্যতা হিসেবে প্রয়োজন হচ্ছে মামা-চাচার সুপারিশের। চাকরির বাজারে ঘুষের রেটও চড়া। চাকরির আবেদনের জন্য বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি অনলাইন ওয়েবসাইট বিডি জবস এর তথ্যমতে জানা যায়, এই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে তৈরি করা ১ লাখ ৭০ হাজার জীবনবৃত্তান্তের মধ্যে, প্রতিদিন গড়ে এক থেকে দেড় লাখ মানুষ চাকরির জন্য আবেদন করেন। এর বেশিরভাগ মানুষই জীবনে প্রথম চাকরি খুঁজছেন। ওয়েবসাইটটি ঘেঁটে জানা যায়, সেখানে বেশিরভাগ চাকরিতে ঢোকার ক্ষেত্রেই ১ থেকে ৮ বছর অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়েছে। আর এই অভিজ্ঞতা না থাকায় চাকরি বাজারের নতুন সদস্যদের পড়তে হচ্ছে বিড়ম্বনায়। কথা হয় চাঁদপুর জেলার মো. তানভীর হাসানের সঙ্গে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স-মাস্টার্স শেষ করা তানভীর বলেন, গত দেড়-দুই বছর ধরে চাকরির জন্য আবেদন করেই চলেছি। সকাল-বিকাল অনলাইনে বেসরকারি চাকরির আবেদনের পাশাপাশি চাকরির বিভিন্ন সাপ্তাহিক পত্রিকা কেনাও বাদ দিই না কখনো। কিন্তু যেই চাকরিটাতেই আবেদন করতে যাই না কেন, সেখানেই লেখা থাকে ২-৫ বছরের অভিজ্ঞতা লাগবে। কিন্তু যদি চাকরিতে ঢুকতেই না পারি, তাহলে অভিজ্ঞতা হবে কি করে? তিনি বলেন, আব্বু-আম্মু অনেক কষ্ট করে পড়া-লেখা করিয়েছেন। শিক্ষা জীবন শেষ করে এখন কোথায় বৃদ্ধ পিতা-মাতার দেখাশোনা করবো, তা না এখনো তাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে চলতে হচ্ছে। স্নাতকোত্তর ডিগ্রি পাস করা অনিক বলেন, অনার্স পাস করার পর থেকেই চাকরির জন্য বিভিন্ন ব্যাংক থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে আবেদন করে চলেছি। অনেক জায়গা থেকে ইন্টারভিউ এর ডাক এলেও কিছু কিছু জায়গা থেকে এখনো কোনো খবর আসেনি। পরীক্ষাও দিয়েছি কয়েক জায়গায়। পরে জানাবো বলে কিছুই জানায় না তারা। একটি বেসরকারি ব্যাংকে ইন্টারভিউ দেয়ার কথা উল্লেখ করে অনিক বলেন, আমি সিটি ব্যাংকের কার্ড সেলস ইক্সজিকিউটিভ পোস্টে ইন্টারভিউ দিয়েছিলাম মোট ৫ বার। প্রথম বার ইন্টারভিউ দিতে আসা প্রায় ৪৫০০ জনের মধ্যে, সর্বশেষ আমরা ৭ জনে এসে দাঁড়াই। ১১টি শূন্য পদ পূরণে নতুন লোক নিয়োগের কথা থাকলেও আমাদের ৭ জনের একজনেরও স্থান হয়নি সেখানে। তাহলে কাদের এরা চাকরিতে নিলো প্রশ্ন করে অনিক বলেন, আজকাল পড়া-লেখা করে শুধুমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক সার্টিফিকেটই পাওয়া যায়। কিন্তু তাতে কোনো চাকরি পাওয়া যায় না। চাকরি পেতে হলে চাচা-মামা বা ফোনের জোর লাগে। ছোটবেলা থেকেই পুলিশ অফিসার হওয়ার স্বপ্ন দেখতো যশোরের রাজিব। তাইতো স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেই নিয়মিত কসরত শুরু করেন তিনি। দুই বার মাঠেও দাঁড়ান। শারীরিক যোগ্যতা ও লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও, মৌখিক পরীক্ষায় বাদ পড়ে যান তিনি। পুলিশের উপ-পরিদর্শক পদের পরীক্ষা দিতে যাওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা জানান তিনি। তিনি বলেন, আমার সঙ্গে অনেকেই পরীক্ষা দিয়েছিল। দৌড়, লংজাম্প, রোপ ক্লাম্বিং ঠিকমতো না করেও তারা আজ চাকরিতে বহাল রয়েছেন। কর্মকর্তাদের নাম না বললেও তিনি জানান, ন্যূনতম ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা খরচ করা লেগেছে আমার বন্ধুদের চাকরি পাওয়ার জন্য। আমাকেও বলা হয়েছিল টাকার কথা। কিন্তু পারিবারিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় টাকার জোগাড় করতে পারেনি। আর এই জন্য চাকরিটাও পাওয়া হয়নি। তিনি বলেন, এমন অবস্থা সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকসহ সব ক্ষেত্রেই। সারা জীবন টাকা-পয়সা খরচ করে বাবা-মা পড়ালেখা করিয়েছেন। আর এখন ছেলের চাকরির জন্যও তাদের টাকা দিতে হবে। কিন্তু আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ জমি-বাড়ি বিক্রি করে ঘুষের জন্য যে টাকাটা দেবে, সেটা কার কাছে দেবে। আর টাকা দেয়ার পর যদি চাকরি না হয়, তাহলে কার কাছে বিচার জানাবে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ালেখা শেষ করে বের হওয়া আতিক ইসলাম বলেন, এখন ভাত ছিটালে কাকের দেখা না পাওয়া গেলেও, উচ্চ মাধ্যমিক পাস করা প্রার্থী চেয়ে চাকরির বিজ্ঞপ্তি দিলে, মাস্টার্স পাসের প্রার্থীদের ঠেলে সরানো যায় না। তিনি বলেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিদর্শকের ৯টি শূন্য পদের বিপরীতে আবেদন করেছেন ৭৮ হাজার প্রার্থী। যারা সবাই ন্যূনতম স্নাতক ডিগ্রিধারী। চাকরি পাওয়ার জন্য প্রতিটি ক্ষেত্রেই এমনই মরিয়া হয়ে উঠেছে আমাদের শিক্ষিত সমাজ। তিনি বলেন, যোগ্যতা অনুযায়ী আমার যে চাকরিতে আবেদন করার কথা, সেগুলোর একটাতেও অভিজ্ঞতার অভাবে আবেদন করতে পারছি না। জন্ম থেকেই কেউ অভিজ্ঞতাপূর্ণ হয় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগে তো আমাদের কাজে ঢুকতে হবে। কাজ করতে হবে। তার পরতো আমরা অভিজ্ঞতা অর্জন করবো। তিনি আরও বলে, অনেক ঘোরাঘুরি করে দুই বছর আগে আমার বড় ভাইয়ের একটি সরকারি ব্যাংকে চাকরি হয়েছে তিন লাখ টাকার বিনিময়ে। নিজের যোগ্যতা দিয়ে চাকরি না পেলে, শেষ পর্যন্ত আমাকেও এমন টাকার বিনময়েই চাকরিতে ঢুকতে হবে। এছাড়া কিছু করার নেই। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য অনুযায়ী জানা যায়, ২০১৭ সালে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক-স্নাতকোত্তরসহ উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেছেন কম-বেশি সাড়ে তিন লাখ শিক্ষার্থী। এদের মতো প্রতিবছরই লাখ লাখ মানুষ চাকরির আশায় শ্রমবাজারে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এর হিসাবনুযায়ী বর্তমান এদেশে ১৫ বছরের ঊর্ধ্বে অর্থনৈতিকভাবে কর্মক্ষম শ্রমশক্তি ৬ কোটি ৭ লাখ। এদের মধ্যে ৫ কোটি ৮০ লাখ বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত আছেন। বাকি ২৭ লাখই বেকার। অবশ্য প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিবারের মধ্যে কাজ করে কোনো মজুরি পায় না এমন মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ১১ লাখ। এছাড়া আরো ১ কোটি ৬ লাখ মানুষ দিনমজুর, যাদের কাজের কোনোই নিশ্চয়তা নেই। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এর মতে এরাও বেকার। এ হিসাব মতে, বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী দেশে বেকারের সংখ্যা ২ কোটি ৪৪ লাখ। বিশ্ব ব্যাংকের তথ্য মতে, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৫ ভাগই হচ্ছে বেকার।
এ বিষয়ে দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই’র সাবেক সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমেদ বলেন, সাধারণত বেসরকারি খাতে ৭০ শতাংশ কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন জনবল প্রয়োজন। কিছু অফিসিয়াল কাজের জন্য বাকি ৩০ শতাংশ মানুষের শুধুমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থাকলেই হয়। কিন্তু আমাদের দেশের ৯০ শতাংশ উচ্চশিক্ষিতের মধ্যেই কোনো কারিগরি বা বাস্তবভিত্তিক জ্ঞান নেই। ফলে তারা চাকরি পাচ্ছেন না। আর উচ্চ শিক্ষিতদের এই বেকারত্বের কারণে, সমাজ ও রাষ্ট্রে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রাণলয়ের সচিব মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, এখন প্রয়োজন দেশের জনপ্রশাসন নিয়ে নিবিড় পর্যালোচনা ও গবেষণা করে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। তাহলে এই দেশের এই বিশাল বেকার সমস্যা কিছুটা লাঘব হতে পারে।

শেষ ঠিকানা ভাইভা বোর্ড by হাফিজ মুহাম্মদ

আনিসুজ্জামানের চোখে অন্ধকার। ভবিষ্যৎ কালো মেঘে ঢাকা। দেশের সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেও বেকারের বোঝা মাথায় নিয়ে ঘুরতে হচ্ছে। তার প্রয়োজন একটি চাকরির। বলেন, মেধার জোরেই চাকরি চাই। কিন্তু মেধা দিয়ে কতটুকু যাওয়া যায়? দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় আনিসুজ্জামান বলেন, মামা-খালুই এখন মেধা, নইলে টাকা-পয়সা। আমার এসবের কিছুই নেই। এ পর্যন্ত তিনবার শুধু বিসিএস পরীক্ষায় ভাইভা দিয়েছি। একাধিকবার সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা দিয়েছি। কিন্তু সান্ত্বনা শুধু ভাইভা বোর্ডের মুখোমুখি হওয়া। এটাই আমার শেষ ঠিকানা। এটাই আমার মেধা আর যোগ্যতার ফসল। শেষবার বিসিএস ভাইভায় নন ক্যাডার সিরিয়ালে নাম এসেছে। কিন্তু এখনো পোস্টিং দেয়নি। এটাও প্রায় দুই বছর হলো। এভাবেই চাকরি না পাওয়ার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছিলেন টাঙ্গাইলের মো. আনিসুজ্জামান। কথা বলার সময় তার দুই চোখ পানিতে ছলছল করছিল। বুকের দীর্ঘশ্বাস ফেলে আনিস বলেন, ২০১১ সালে প্রথম বিসিএসে অংশ নিই। সেবার প্রিলিতে টিকলেও লিখিত পরীক্ষায় বাদ পড়ে যাই। এরপরের বার লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ভাইভা বোর্ড পর্যন্ত যাই। আমার আশা ছিল সাধামাটা। শিক্ষক হওয়ার ব্রত নিয়ে প্রথম পছন্দ দিয়েছিলাম শিক্ষা ক্যাডার। কিন্তু ভাগ্যের বিড়ম্বনায় ভাইবা বোর্ড উৎরাতে পারিনি। এর পরের বারও একই কাহিনী। তৃতীয়বার যখন বিসিএসে ভাইভা দিতে যাই, স্বপ্ন ছিল এবার কোনো না কোনো ক্যাডার পাবই। কিন্তু ভাইভার আগেই ঘটে যায় অঘটন। পুলিশ ভেরিফিকেশনে আটকে যায় আমার ফাইল। আনিস জানান, এখন পুলিশ ভেরিফিকেশন মানে নানা ঝামেলা, হয়রানি। সরকারি দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের কাছ থেকে নিদৃষ্ট ব্যক্তি সম্পর্কে তথ্য নেয়া হয়। তারা যদি শত্রুতা করেও কোনো ভুল তথ্য দেয়, সেটাই বিবেচ্য হয়। আমার ক্যাডার না হওয়ার পথের কাঁটা পুলিশ ভেরিফিকেশন। সমস্যটা হয় মূলত এখান থেকেই। রাজনীতির সঙ্গে আমার কোনো দিন বিন্দুমাত্র সম্পর্ক ছিল না। তার পরও স্থানীয় এক নেতা আমাকে বিরোধী ছাত্র সংগঠনের কর্মী বলে জানিয়ে দেন। যার কারণে আমার ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয়নি। আনিস বলেন, একদিকে সরকারি চাকরির জন্য একের পর এক অপেক্ষা। অন্যদিকে বয়সের চাকা ঘুরছে তার মতো করে। সরকারি চাকরির বয়স আছে আর এক বছর। এদিকে পরিবার থেকে বিয়ে দেয়ার জন্য চাপ বাড়ছে। কিন্তু চাকরি না হলে সেটাও করতে পারছি না। এখন নন-ক্যাডারে পোস্টিং দিলে না হয় একটা দিশা হতো। কিন্তু এখনো নাকি পুলিশ ভেরিফিকেশন চলছে। আর কত দিন চলবে তা-ও জানি না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক চাকরি প্রত্যাশী বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি অনার্স শেষ করেই ১০ম জুডিসিয়ারি (বাংলাদেশ জুডিসিয়ারি সার্ভিস কমিশন-বিজেএসসি) পরীক্ষায় অংশ নিই। সবকিছু ঠিকভাবেই এগিয়েছিল। প্রিলি, লিখিত এবং ভাইভা। কিন্তু স্বপ্ন এক জায়গায় এসে আটকে গেল। ভাইভায় উত্তীর্ণ হলেও পুলিশ ভেরিফিকেশনের পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এসে আমার ফাইল আটকে যায়। এ মন্ত্রণালয় থেকে আমার ফাইল আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়নি। আমার সঙ্গের সবাই গত ১লা মার্চ নিজ নিজ কর্মস্থলে যোগ দিয়েছে। অথচ আমি এখনো দিন গুনি কবে সুখবরটা পাবো সে আশায়। তিনি আরো বলেন, প্রথমবার অংশ নিয়ে জুডিসিয়ারি পরীক্ষার সব পর্বে উত্তীর্ণ হওয়ায় আর কোথাও কোনো পরীক্ষায় অংশ নিইনি। এমনকি ১১তম জুডিসিয়ারি পরীক্ষায় অংশ নিইনি। কোর্টে প্রাক্টিসও শুরু করিনি। আমার স্বপ্ন এখন ডুকরে কাঁদে। এখন আমি কী যে করবো তা আর ভাবতে পারছি না। ভাবছি, আমাদের যে কয়জনের পোস্টিং হয়নি তারা মিলে আপিল করবো। সেখানে ফলাফল কী হবে জানি না। তবে সেখানে যদি ফলাফল পক্ষে না যায় তাহলে আমার তিনটি বছর তো মাটি হয়ে গেল।
হতাশা কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘এ দেশে মামু, চাচা না থাকলে শুধু মেধা দিয়ে এগোনো যায় না। অন্যদিকে আবার দেখা হয় বংশে কোনোকালে কেউ সরকারি দলের মতাদর্শী ছিল কি না। পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে করা হয় হয়রানি। তারা ঠিকভাবে তথ্য যাচাইবাছাই না করে স্থানীয় রাজনীতিবিদ থেকে তথ্য নেন। একই কথা বলেন আরেক চাকরি প্রত্যাশী। যিনি দুবার বিজেএসসি এবং একবার বিএমএর ফাইনাল ভাইভা দিয়েও চাকরি পাননি। ক্লাস নাইনে পড়ার সময় থেকে স্বপ্ন ছিল বড় আইনজীবী হবো। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম বছর থেকে সংবাদপত্রে চাকরি করতাম। অনার্স শেষ বর্ষে এসে পরিবারের প্রত্যাশা আর নিজের স্বপ্ন নিয়ে আটঘাট বেঁধে পড়ালেখা শুরু করি। জুডিসিয়ারির পরীক্ষার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করলাম। ২০১৬ সালে ১০তম জুডিসিয়ারিতে প্রিলিতে উত্তীর্ণ হওয়ার পরে পড়ালেখা আরো বাড়িয়ে দিই। ফলে লিখিত পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হলাম। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস ভাইভাতে গিয়ে ফিরতে হলো। আমি মৌখিক পরীক্ষা দিয়ে আশাবাদী ছিলাম ভাইবা পরীক্ষায় আমি টিকবো। অনেক ভালো প্রস্তুতি, আত্মবিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও স্বপ্ন পূরণ হলো না। ভাবলাম, একবার হয়নি তাতে কী? সামনে হবে। এই আশায় আবারো লেখাপড়া অব্যাহত রাখলাম। তুলনামূলকভাবে ১১তম জুডিসিয়ারির জন্য নিজেকে তৈরি করেছিলাম আগের থেকে অনেক ভালোভাবে। কিন্তু আবারো একইভাবে প্রিলি এবং লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হই। কিন্তু ভাইভা থেকে ফেরত। এবারের ভাইভাটা আগের বছরের তুলনায় অনেক ভালো হয়েছিল। মানসিকভাবে আমি সন্তুষ্ট ছিলাম। ভেবেছিলাম আমার স্বপ্ন এবার পূরণ হবে। পরিবারের আশাও রাখতে পারবো। জুডিসিয়ারিতে টিকতে হবে, জজ হতে হবে, এই স্বপ্ন পূরণের জন্য গত ২টি বছর অন্য কোনো চাকরিতে আবেদন করিনি। এমনকি কোর্টে প্র্যাকটিসেও যাইনি। এখন সামনে শুধু হতাশা এবং স্বপ্নভঙ্গের হাতছানি। কোনো কাজে হাত দিলেও কেমন জানি মনে হয়, আমি কি পারবো? নাকি আবারো তীরে এসে তরী ডুববে।

মার্কিন গণমাধ্যম থেকে যা শেখার আছে বাংলাদেশের by নাজমুল আহসান

প্রথম ও একমাত্র বাংলাদেশি হিসেবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন আইরিন জোবায়দা খান। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশের যে জিনিসটি আমাকে সবচেয়ে ব্যথিত করে তা হলোÑ গণমাধ্যমে গণমাধ্যমের প্রতি সংহতির অভাব।
বিশ্বের প্রতিটি দেশে যেখানে গণতন্ত্র দুর্বল হতে শুরু করে, সেখানেই স্বৈরাচারের উদয় ঘটে। এ যেন ‘জিরো-সাম গেইম’। আর দেশে দেশে স্বৈরাচারের একটি অভিন্ন বৈশিষ্ট্য হলো, গণমাধ্যম তার চক্ষুশূল হবেই হবে। এ কারণে সস্তা প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে গণমাধ্যমকে একটি জায়গায় একতাবদ্ধ হতেই হয়। রাষ্ট্র বা ক্ষমতাশালী কোনো গোষ্ঠীর হাতে একটি সংবাদপত্র আক্রান্ত হলে, দেশের প্রতিটি সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবাদ করা অপরিহার্য। শুধু স্বৈরতন্ত্র বা দুর্বল গণতন্ত্রেই নয়। গণমাধ্যমের ঐক্য একটি উন্নত গণতন্ত্রেও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
যারা আমেরিকার রাজনীতি কৌতূহল নিয়ে অনুসরণ করেন, তারা দেখে থাকবেন যে, কীভাবে দেশের প্রেসিডেন্টকে যাচ্ছেতাইভাবে সমালোচনা করছে গণমাধ্যম। এমনকি গালিগালাজ করতেও কারও মুখ কাঁপে না। আমেরিকার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দেশটির সংবিধানে প্রোথিত। আমাদের সংবিধানেও এই মত প্রকাশের নিশ্চয়তা দেয়া আছে। কিন্তু আমেরিকার সঙ্গে আমাদের পার্থক্য কোথায়? তাদের প্রতিটি ছেলেমেয়ে এই সংবিধানকে ধারণ করে বড় হয়। সংবিধানে সুরক্ষিত অধিকার সম্পর্কে তারা অবগত। আমাদের দেশে এমনটা চিন্তাও করা যায় না। দেশের প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের ক্ষুদ্র অংশ হয়তো সংবিধান পড়ে দেখেছে। এদের অনেকে পড়েছে চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে। সংবিধানকে ধারণ করাটা নাগরিকদেরকে শাসকরা কখনও শেখাননি। নাগরিকরাও শিখেননি।
উপনিবেশিক শাসনযন্ত্রের উত্তরাধিকার আমরা। সরকারের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক এখনও শাসক-প্রজার মতো। শুধু ভোটাভুটি ছাড়া গণতন্ত্রের আর কোনো বিষয়ই আমরা আয়ত্ত করতে পারিনি। ভোটাভুটিও এখন হয় নামেমাত্র। যে দেশে গণতন্ত্রই সবল নয়, সেখানে মুক্ত গণমাধ্যমের আশা করাটা বাতুলতা। কিন্তু এ দেশে সংবাদমাধ্যম জগতে কাজ করা প্রায় প্রত্যেকটি মানুষই স্বপ্ন দেখেন মুক্ত ও স্বাধীনভাবে কাজ করার। সেই লক্ষ্য অর্জনে একটি সংবাদ মাধ্যমকে অপর একটি সংবাদ মাধ্যমের বিপদে শামিল হতে হবে। আমাদের দেশই নয়। একটি সুষ্ঠু গণতন্ত্রের গণমাধ্যম যে কোনো সময় শাসকগোষ্ঠীর রোষানলে পড়ে যেতে পারে। তাই আমেরিকার মতো দেশেও সংবাদ মাধ্যমের পারস্পরিক সংহতির গুরুত্ব প্রত্যেকে বোঝেন।
আমেরিকায় প্রায় প্রত্যেকটি সংবাদমাধ্যমই কোনো না কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত। আমাদের দেশে কে বিএনপি করেন বা কে আওয়ামী লীগ করেন, তা নিয়ে কানাঘুষা থাকে। এখন অবশ্য যুগ পাল্টেছে। প্রত্যেকে নিজেকে তীব্র আওয়ামী লীগ প্রমাণ করার প্রতিযোগিতায় আছেন। কিন্তু একটা সময় ছিল, যখন নিজের রাজনৈতিক অবস্থান প্রকাশ করার আগে মানুষ দু’বার ভাবতেন। কিছু বিশেষ পেশার মানুষদের কাছ থেকে সবাই নিরপেক্ষতা আশা করতো বা করে। যেমন, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী, বিচারক, সাংবাদিক, ইত্যাদি। এখন অবশ্য কী সরকারি কর্মচারী কী সাংবাদিক! শাসকদলের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করার সুযোগ পেলে কেউ ছাড়েন না।
আমেরিকায় রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে কেউ লুকোছাপা করেন না। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ ধারণ করেন, সেটিও সবার জানা থাকে। কিন্তু পেশাদারিত্বে কেউ ঘাটতি দেখান না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, এফবিআই’র সাবেক প্রধান জেমস কমি একজন নিবন্ধিত রিপাবলিকান ছিলেন। কিন্তু তিনিই রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের মামলার তদন্ত বেশ জোরেশোরে এগিয়ে নিয়েছিলেন। জেমস কমিকে যখন ট্রাম্প বরখাস্ত করলেন, তখন ট্রাম্পের মামলার প্রধান তদন্ত কর্মকর্তা কিন্তু আইন বা বিচার মন্ত্রণালয়ের কেউ হলেন না। কারণ, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা সবাইকে ট্রাম্প প্রশাসন নিয়োগ দিয়েছে। ফলে তার বিরুদ্ধে মামলা তদন্ত করার জন্য আনা হলো অবসরপ্রাপ্ত এক এফবিআই প্রধানকে। তিনি থমাস মুলার। মুলারও একজন রিপাবলিকান। অথচ, রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে তদন্তে তিনি এক সুঁই ছাড় দিয়েছেন বলে প্রতীয়মান হচ্ছে না।
আমেরিকার কাছ থেকে এখানে তিনটি বিষয় শেখার আছে। এক. পেশাদারিত্ব। যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি পেশা ও দায়িত্বের প্রতি নিষ্ঠাবান থাকবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আপনার রাজনৈতিক মতাদর্শ কোনো সমস্যা নয়। দুই. ক্রেডিবিলিটি বা বিশ্বাসযোগ্যতা। আমেরিকার একজন সাধারণ নাগরিকও নিজের ক্রেডিবিলিটি বা বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সচেতন থাকেন। অবশ্য ট্রাম্পের মতো কিছু ব্যতিক্রম যে নেই, তা নয়। উচ্চপদে আসীন কর্মকর্তা ও বিশেষ পেশাজীবী যেমন সাংবাদিকদের ক্যারিয়ারই ধসে যেতে পারে, যদি তারা এমন কিছু করে বসেন যাতে তাদের ক্রেডিবিলিটি ক্ষুণœ হয়। ট্রাম্প প্রশাসন বিচার মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নিয়োগ দিয়েছে। তাই ট্রাম্পের বিরুদ্ধে মামলায় তৃতীয় একজন কৌসুঁলিকে আনা হলো তদন্ত করতে। কেন? কারণ, ট্রাম্পের নিয়োগকৃত কোনো কৌঁসুলি বা কর্মকর্তা এই মামলা তদন্ত করলে, সেই তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতো। আর আমাদের দেশে কার যে একটু ক্রেডিবিলিটি আছে, সেটি খুঁজে পাওয়া ভার।
তিন. কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট বা স্বার্থের দ্বন্দ্ব। এই ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টে’র ধারণা আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষের কাছেই স্পষ্ট নয়। ট্রাম্পের মামলার তদন্ত থেকেই উদাহরণ টানা যাক। গত মার্কিন নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপের অভিযোগ নিয়ে যে তদন্ত চলছে, তার তত্ত্বাবধান করার কথা কিন্তু অ্যাটর্নি জেনারেলের, যিনি কিনা আইন মন্ত্রণালয়ের প্রধান। বর্তমান অ্যাটর্নি জেনারেল জেফ সেশন্স ছিলেন রিপাবলিকান সিনেটর। গোঁড়া ডানপন্থি। তিনি ট্রাম্পের প্রথম দিককার সমর্থক। নির্বাচনে জেতার পর ট্রাম্প তাকে দেশের অ্যাটর্নি জেনারেল বানিয়েছেন। কিন্তু মাঝেই খবরে প্রকাশ হয় যে, নির্বাচনের আগে সেশন্স রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। কিন্তু অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে তার নিয়োগকালীন সাক্ষাৎকারে সিনেট সদস্যরা তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, রাশিয়ার কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে তিনি সম্প্রতি সাক্ষাৎ করেছিলেন কিনা। জবাবে তিনি নেতিবাচক উত্তর দেন। ফলে যখন খবর প্রকাশ হলো যে, সিনেট সাক্ষাৎকারে সেশন্স মিথ্যা বলেছিলেন, তখন অবধারিতভাবে এই রাশিয়া কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়েন তিনি। অবশেষে নিজের তাগিদ থেকেই তিনি রাশিয়া তদন্তের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। কেউ তাকে বাধ্য করেনি। তিনি চাইলেও থাকতে পারতেন। এমনকি পরে জানা যায়, ট্রা¤প দূত পাঠিয়ে তার সিদ্ধান্ত পাল্টানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন।
নিজের নামই যেই তদন্তের আওতাভুক্ত হয়ে গেছে, সেই তদন্তের তত্ত্বাবধান করাটা সেশন্স সমীচীন মনে করেননি। তিনি যদি দায়িত্বে অটল থাকতেন, তাহলে ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টে’র প্রশ্ন উঠতো। এই বিষয়টি আমেরিকায় খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে যিনি ক্ষমতায় আসেন, তাদের বিরুদ্ধে আগের মামলা বা অভিযোগ এক অঙ্গুলি হেলনে গায়েব হয়ে যায়।
ধান ভানতে এসে শিবের গীত গাওয়ার মতো শোনাচ্ছে হয়তো। কিন্তু একটি দেশের মননে, চিন্তা ও চেতনায় স্বাধীনতা (ফ্রিডম) প্রোথিত না থাকলে, সেই দেশ মুক্ত হয় না, গণতান্ত্রিক হয় না। যেই প্রসঙ্গে এতগুলো কথা বলা হলো, সেটা হলো গণমাধ্যমের মধ্যে পারস্পরিক সংহতি থাকার বিষয়টি। আমেরিকায় সবার মতো গণমাধ্যমেরও মতদর্শগত অবস্থান স্পষ্ট। কেউ কেউ প্রকাশ্যেই তা উল্লেখ করে। কারও কারও অবস্থান তাদের কভারেজ, সম্পাদকীয় নীতি ও টোন থেকে বোঝা যায়। কেউ কেউ আবার একেবারে খুল্লামখুল্লা। যেমন, ফক্স নিউজ। আমেরিকার রিপাবলিকান দল বা রক্ষণশীল গোষ্ঠীর প্রতিনিধি এই টিভি চ্যানেল।
গত বছরের ফেব্রুয়ারির দিকে ট্রাম্প প্রশাসন সিএনএন, নিউ ইয়র্ক টাইমস, বিবিসি, লস এঞ্জেলস টাইমস ও পলিটিকোকে হোয়াইট হাউসের সংবাদ সম্মেলন কাভার করতে না দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কারণটা সহজেই অনুমেয়। এই প্রত্যেকটি সংবাদ মাধ্যমকেই নিজের প্রতিপক্ষ বলে ট্রাম্প মনে করেন। অবশ্য রয়টার্স, ব্লুমবার্গ এবিএস, সিবিএস, এনবিসি ও ওয়ালস্ট্রিট জার্নালের মতো বৃহৎ সংবাদ মাধ্যমকে অনুমতি দেয়া হয়েছিল। অনুমোদিত বাকি মিডিয়াগুলোর মধ্যে প্রায় সবাই ছিল ফক্স নিউজ বা ব্রেইটবার্টের মতো কট্টর ডানপন্থি বা ডানপন্থি মিডিয়া। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়া হয় ভয়াবহ।
বাদ পড়া প্রত্যেক সংবাদ মাধ্যম তো বটেই, হোয়াইট হাউস কভার করার দায়িত্বে থাকা সাংবাদিকদের সংগঠন কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। টাইম ম্যাগাজিন, বার্তা সংস্থা এপি অনুমতি থাকা সত্ত্বেও বাদপড়া সংবাদ মাধ্যমের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে হোয়াইট হাউসের সম্মেলন বয়কট করে। রক্ষণশীল বলে পরিচিত ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল জানায়, তাদের রিপোর্টার নিজের অজ্ঞাতে ওই সম্মেলনে ছিলেন। কিন্তু ভবিষ্যতে বিশেষ কোনো গণমাধ্যমকে টার্গেট করা হলে, সম্মেলন বয়কট করবে ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল। কড়া প্রতিবাদ আসে আমেরিকার বৃহৎ পাঁচটি জাতীয় টিভি চ্যানেলের জোটের পক্ষ থেকে। এই জোটের অংশ কিন্তু ফক্স নিউজও। গণমাধ্যমের মধ্যে পারস্পরিক সংহতির প্রতিক্রিয়া হিসেবেই ট্রাম্প প্রশাসন তাদের অবস্থান থেকে পিছু হটে।
ফক্স নিউজের উপস্থাপক ব্রেট বেইয়ের তখন ব্যবসায়িক ও মতাদর্শগত প্রতিদ্বন্দ্বী সিএনএন ও নিউ ইয়র্ক টাইমসের পক্ষে দাঁড়ান। পুরনো একটি ঘটনার সূত্র ধরে তিনি টুইটারে লিখেন, ২০০৯ সালে বারাক ওবামার প্রশাসন ফক্স নিউজকে হোয়াইট হাউসের সংবাদ কভার করা থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তখন ওই সিদ্ধান্তের কড়া প্রতিবাদ করে সিএনএন ও নিউ ইয়র্ক টাইমস। পাশে দাঁড়ায় ফক্স নিউজের। হোয়াইট হাউসের সংবাদ সম্মেলনে সকল সংবাদ মাধ্যমের প্রবেশাধিকার থাকা উচিত। এই বক্তব্যের মাধ্যমেই ব্রেট বেইয়ের বুঝিয়ে দিলেন গণমাধ্যম সম্প্রদায়ে পারস্পরিক সংহতির গুরুত্ব কতটা।
আমাদের দেশে প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে অন্তত দু’টি বড় পত্রিকার প্রতিনিধিকে উপস্থিত থাকার অনুমতি দেয়া হয় না। কেন যে দেয়া হয় না, সেটা বোঝাটা কঠিন কিছু নয়। যেসব সাংবাদিক উপস্থিত থাকেন, তাদের ‘প্রশ্ন’ শুনলেই তা বোঝা যায়।
কোনো বিশেষ সংবাদ মাধ্যমকে আপনি অপছন্দ করতেই পারেন। তার সমালোচনা করুন। ত্রুটি- বিচ্যুতি নিয়ে প্রশ্ন তুলুন। সংবাদ মাধ্যমের সমালোচনা সংবাদ মাধ্যমকেই করতে হবে। আমেরিকায় ফক্স নিউজের মিথ্যার বেসাতি বা বিভ্রান্তির যে সমালোচনা করা হয় নিউ ইয়র্ক টাইমস, সিএনএন বা ওয়াশিংটন পোস্টে, সেটি না দেখলে বোঝানো সম্ভব নয়। তেমনি, ফক্স নিউজও সুযোগ পেলে প্রতিপক্ষকে এক চোট দেখে নিতে ভোলে না। বৃটেনে দ্য সান বা ডেইলি মেইলকে প্রায়ই সমালোচনায় জর্জরিত করে গার্ডিয়ান। আবার তারাও সুযোগ পেলে সমালোচনা করতে ছাড়ে না। কিন্তু পেশাগতভাবে কেউ হুমকিতে পড়লে, অন্যরা ঠিকই একে-অপরের পাশে এসে দাঁড়ায়।
আমাদের দেশে ‘কাকে কাকের গোস্ত খায় না’ নামে এক অদ্ভুত নীতির আওতায় সংবাদ মাধ্যম অপর সংবাদ মাধ্যমের গঠনমূলক সমালোচনা করে না। অবশ্য, উদ্দেশ্যমূলক সমালোচনা আমরা দেখেছি, যেটাকে সমালোচনা না বলে, শত্রুতার বহিঃপ্রকাশ বলা ভালো।
আবার কারও বিপদে কেউ সংহতিও প্রকাশ করে না। আমেরিকার কাছ থেকে সবচেয়ে বড় যেই জিনিসটি বাংলাদেশের গণমাধ্যম শিখতে পারে সেটি হলো এই সংহতির চর্চা। দেশের শাসক স্বৈরাচার হোন আর গণতান্ত্রিক হোন, ডনাল্ড ট্রাম্প হোন আর বারাক ওবামা হোন, সংবাদ মাধ্যমকে তারা প্রায়ই প্রতিপক্ষ বা শত্রু মনে করেন বা করবেন। তাই শাসকদের বিপরীতে মতাদর্শগত মতপার্থক্য ভুলে গণমাধ্যমকে অন্তত পেশাগত স্বাধীনতার জায়গায় একাট্টা থাকতেই হবে। নয়তো আজ সরকার, কাল গোয়েন্দা বাহিনী নয়তো পরশু জঙ্গিদের আক্রমণে সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা ভূলুণ্ঠিত হবে।
(লেখক: সাংবাদিক।)

রোহিঙ্গাদের ফেরত যাওয়া বন্ধ করছে মিয়ানমার: সীমান্তে বেড়া, কাঁটাতার, স্থল বোমা by জন এমোন্ট

বাংলাদেশের সঙ্গে সীমান্তকে সুরক্ষিত করছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। তারা নতুন নতুন সীমান্ত বেড়া নির্মাণ করছে। মোতয়েন করছে নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের। পাতা হয়েছে স্থল বোমা। এতে প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে তাদের উত্তেজনাকর সম্পর্ককে উস্কে দেয়া হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে উদ্বাস্তু শিবিরগুলোতে আশ্রয় নেয়া কয়েক লাখ রোহিঙ্গাদের কাছে একটি বার্তা পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। তা হলো ‘কিপ আউট’। অর্থাৎ দূরে সরে যাও। এমন বেড়া হলো চেইন-যুক্ত। নতুন করে এ বেড়া নির্মাণ করা হয়েছে। সঙ্গে দেয়া হয়েছে কাঁটাতার। কোথাও কোথাও তা শক্তিশালী করা হয়েছে। নির্মাণ করা হয়েছে বাঙ্কার, সামরিক পোস্ট। তারাই ১৭০ মাইল দীর্ঘ সীমান্ত পরিচালনা করছে।
রোহিঙ্গারা বলছেন, এই অবস্থায় যে দেশ তারা ছেড়ে এসেছেন সেখানে ফিরে যাওয়া অসম্ভব। বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষীরা ও রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুরা বলছেন, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সীমান্তকে অধিকহারে সুরক্ষিত করছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। এটা হতে পারে এমন একটি কর্মতৎপরতা, যাতে রোহিঙ্গাদেরকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার নিশ্চিত করা যায়। বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মিয়ানমার সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গাদের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করে আসছে। ওয়াশিংটনে ন্যাশনাল ওয়্যার কলেজের প্রফেসর জাচারি আবুজা বলেছেন, (মিয়ানমার) মনে করছে তারা সফলতার সঙ্গে বিশাল পরিমাণ রোহিঙ্গাকে দেশ থেকে বের করে দিতে পেরেছে এবং রোহিঙ্গারা ফেরত গেলে তারা যেন নরকের মতো পরিস্থিতিতে পড়েন সে ব্যবস্থাই করতে যাচ্ছে তারা।
মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সুচির সরকার বলেছে, যেসব রোহিঙ্গা প্রমাণ দিতে পারবে যে, তারা মিয়ানমার থেকে গিয়েছে শুধু তারাই ফিরে যেতে পারবে। কিন্তু এতে উচ্চ মাত্রায় একটি বাধা বা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাকে প্রত্যাখ্যান করা হবে। প্রথম ব্যাচের ৮০২৩ জনের তালিকা দেয়া হয়েছিল। তার মধ্য থেকে মাত্র কয়েক শতকে নেয়ার কথা বলেছে তারা, যদিও রোহিঙ্গাদের শিকড় প্রোথিত রয়েছে মিয়ানমারে। সেখানে তারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম বসবাস করে আসছিলেন। ওদিকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সীমান্তের কাছাকাছি রোহিঙ্গাদের গ্রামগুলো জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে নৃশংসতার সময়। সেসব গ্রাম মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে সেখানে নিরাপত্তা রক্ষাকারী বিশেষ করে সেনাবাহিনীর জন্য ঘাঁটি নির্মাণ করা হচ্ছে বলে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। কিন্তু মিয়ানমার বলছে, তারা রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের জন্য অবকাঠামো নির্মাণ করছে। এ মাসে এ জন্য বাংলাদেশে নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছিল বাংলাদেশ। তার কাছে অভিযোগ জানানো হয়েছে, এভাবে সামরিক স্থাপনা নির্মাণের ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে। অং সান সুচির অফিসের একজন মুখপাত্র বলেছেন, সীমান্তের বাইরে যেসব উদ্বাস্তু বসবাস করছে তাদের হুমকি থেকে নিরাপত্তার জন্য ওইসব অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে। এখন সীমান্তের ৪০ মাইল বাদে বাকি অংশে নতুন বেড়া নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। এমনটা বলেছেন রাখাইনে পুলিশের একজন কর্মকর্তা অং মিয়াত মোই। এর আগে ফেব্রুয়ারিতে সীমান্তে বেড়া নির্মাণ বা সেটা আধুনিকায়ন করতে এক কোটি ৫০ লাখ ডলার অনুমোদন দেয় দেশটির পার্লামেন্ট।
ওদিকে ২৫ শে আগস্ট নৃশংসতা শুরু হওয়ার পর মিয়ানমার ছেড়ে প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছেন। আবার তাদের নিজ দেশেও অবরুদ্ধ হয়ে রয়েছে অনেক রোহিঙ্গা। যারা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন তারা ঠাঁই পেয়েছেন বিভিন্ন ক্যাম্পে। তবে তাদের প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া খুব ধীর গতির। এ ছাড়া বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে কোনাপাড়ায় মিয়ানমার অংশে বিপদজনক অবস্থায় অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন প্রায় সাড়ে তিন হাজার রোহিঙ্গা। এর একদিকে সীমান্ত বেড়া। মিয়ানমারের ১৫০ ফুট ভিতরে তা। সেখানে রয়েছে মিয়ানমারের নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা। অন্যদিকে রয়েছে বাংলাদেশ। সেখানে ছোট্ট ছোট্ট চেকপয়েন্টে অবস্থান নিয়ে আছেন বাংলাদেশ বর্ডার গার্ডসরা। তাদের হাতে রাইফেল। তারা পায়ে হেঁটে অথবা ট্রাকে করে প্রহরা দিচ্ছেন। মিয়ানমারে আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের প্রধান ফ্যাব্রিজিও কারবোনি বলেছেন, এই স্থানে (এসব মানুষের) অবস্থান করা নিরাপদ নয়। সেখানে যেসব মানুষ আটকা পড়ে আছেন তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে চাইছে না। তারা বলছে, তারা মিয়ানমারের নাগরিক। নিজের দেশ ছেড়ে যাবে না। কিন্তু রোহিঙ্গাদেরকে নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে না মিয়ানমার। তাদেরকে মিয়ানমার বাংলাদেশী হিসেবে আখ্যায়িত করে।
কিছু রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু বলেছেন, জানুয়ারি পর্যন্ত তারা সীমান্ত অতিক্রম করে মিয়ানমারের বেশ গভীরে প্রবেশ করতে পারতেন। সেখানে গিয়ে তাদের নারকেল, তাল সংগ্রহ করে নিয়ে আসতে পারতেন। আগস্টে যে বাড়ি তারা ফেলে এসেছেন তা দেখে আসতে পরতেন। রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু নেতা নূর আলম বলেন, এখন আমরা আর সীমান্ত অতিক্রম করে সেখানে যেতে পারি না। সীমান্ত এখন আর খোলা নেই। এ অবস্থায় সীমান্ত অতিক্রম করা হবে অত্যন্ত বিপদজনক।
(ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ)

‘বাংলাদেশকে আর কেউ অবহেলা করতে পারবে না’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হয়েছে। আর কেউ বাংলাদেশের মানুষকে অবহেলা করতে পারে না। তিনি বলেন, দেশের আর কেউ গৃহহীন থাকবে না। যাদের ঘর নাই তাদের ঘর করে দেবো। যাদের জায়গা নাই। তাদের জায়গা দেবো। আজ বুধবার বিকেলে পটিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় এসব কথা বলেন তিনি।
এসময় তিনি আরো বলেন, জাতির পিতা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু পাকিস্তানী দোসররা যারা দেশের স্বাধীনতা চায়নি তারা ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে। ‘৭৫ এর পর যুদ্ধপরাধীদের ক্ষমতায় বসানো হয়েছিলো। কারা বসিয়ে ছিলো। যারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে, যারা দেশের স্বাধীনতা মানে নি তারাই করেছে। আওয়ামী লীগ আসলে দেশে উন্নয়ন হয় জানিয়ে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ আসলে দেশে উন্নয়ন হয়। বিএনপি-জামায়াত আসলে মানুষ খুন হয়। কোন ধর্মের লোক বাদ যায় না। তারা জীবন্ত মানুষ পুড়িয়ে মেরেছে। স্কুলের ছাত্রের ওপর পেট্রোল বোমা মেরেছে। খালেদা জিয়ার নির্দেশে মানুষ হত্যা করেছে। মানুষ হত্যা করলে বেহশতে যাবে না। যারা মানুষ হত্যা করে তারা নরকে যাবে। এটা কোরআনের বিধান।
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের মানুষ অনেক কষ্ট ভোগ করেছে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর অনেক দিন দেশে উন্নয়ন হয়নি। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে উন্নয়ন শুরু করি। কিন্তু ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসতে পারি নাই। কেন আসতে পারি নাই? কারণ আমি গ্যাস বিক্রির মুচলেকা দিই নাই। খালেদা জিয়া মুচলেকা দিয়ে ভারতের কাছে গ্যাস বিক্রি করেছে। আমি রাজি হই নি। বলেছি, এটা জনগণের গ্যাস।
তিনি আরো বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবো ওয়াদা করেছিলাম। সেই বিচার আমরা করেছি। রায় কার্যকর করেছি। জাতির পিতার হত্যাকারীদের বিচার করেছি।
দেশ এখন বিদ্যুতে স্বয়ংসম্পন্ন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এবার ক্ষমতায় এসে ১৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছি। যেখানে বিদ্যুতের লাইন যায়নি সেখানে সোলারের ব্যবস্থা করেছি। কোনো ঘর অন্ধকার থাকবে না। তিনি আরো বলেন, বেকার যুবকদের জন্য অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরী করেছি। তরুনরা যাতে নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে পারে সেজন্য তাদের সাহায্য করা হবে। কেউ বেকার থাকবে না। শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৭৫ সালে আমার পরিবারকে হত্যা করা হয়। আমি আর আমার ছোট বোন বিদেশ থাকার কারণে বেঁচে যাই। এরপর ৬টি বছর দেশে আসতে পারি নি। ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের লোকজন দলের সভানেত্রী বানিয়ে ছিলেন। তখন জনগণ আমাকে দেশে ফিরিয়ে এনেছে। আমার একটা ইচ্ছা মানুষের জন্য কাজ করা। সে লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছি। একটাই লক্ষ্য আমার-বাংলার মানুষ উন্নত জীবন পাবে, সুন্দর ভাবে বাঁচতে পারবে। আগামী সংসদ নির্বাচনে নৌকায় ভোট চেয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনাদের কাছে নৌকা মার্কায় ভোট চাই। নৌকায় ভোট দিলে উন্নয়নের ধারবাহিকতা থাকবে। একমাত্র নৌকা মার্কায় ভোট দিলে দেশে উন্নয়ন হবে। হাত তুলে ওয়াদা করেন আপনার নৌকায় ভোট দেবেন। তখন উপস্থিত লোকজন হাত তুলে সায় দেন।

রাজনীতির বাংলাদেশ মডেল by সাজেদুল হক

কথাটা পুরনো শোনায়। এক বিভক্ত এবং ভেঙে পড়া সমাজের বাসিন্দা আমরা। ঢাকার একজন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক প্রায়ই বলেন, বিভক্তিটা এমন একপর্যায়ে গেছে যেন রক্তের গ্রুপও আলাদা। আওয়ামী লীগের রক্তের গ্রুপ একটা। বিএনপির অন্যটা। ভাঙনটা অবশ্য হঠাৎ করে হয়নি। বড় ক্যানভাসে বললে একদিনে হয়নি। সম্ভবত, এ বিভক্তির কারণে বছরের পর বছর ধরে ভিনদেশিরা আমাদের শাসন করে গেছেন। বড় ব্যতিক্রম হয়েছে ওই এক বারই। মহান মুক্তিযুদ্ধে। পুরো বাংলাদেশই যোগ দিয়েছিল সে জনযুদ্ধে। গুটি কয়েক রাজাকার-আল বদরের কথা আলাদা। তারা অবশ্য হিসাবের মধ্যে ছিল না। কিন্তু নেতাদের মধ্যে বিরোধ তখনো ছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখন পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে মহান ভূমিকা রেখেছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। কিন্তু মুজিব বাহিনীর সঙ্গে নানা ব্যাপারেই বিরোধ তৈরি হয়েছিল তার।
মহিউদ্দিন আহমদের ‘জাসদের উত্থান পতন: অস্থির সময়ের রাজনীতি’ বইতে লেখা হয়েছে ‘আমীর-উল ইসলামের সঙ্গে আলাপ করে তাজউদ্দীন আহমদ সিদ্ধান্ত নিলেন, স্বাধীন বাংলার সরকার গঠন করবেন এবং তিনি নিজে সরকারের প্রধানমন্ত্রী হবেন। ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দ্বিতীয় দফা বৈঠক হলে তাজউদ্দীন তাকে সরকার গঠনের ব্যাপারে অবহিত করেন। ততদিনে শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদ কলকাতায় পূর্বনির্ধারিত চিত্তরঞ্জন সুতারের বাড়িতে এসে উপস্থিত। তাদের সঙ্গে আলোচনা না করে তাজউদ্দীন দিল্লি গিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছেন, এটা জেনে তারা খুব ক্ষুব্ধ হন।’
মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক নূরে আলম সিদ্দিকীর বয়ানেও এই ইঙ্গিত মেলে। সাংবাদিক কাজল ঘোষের লেখা ‘এক খলিফার বয়ান’ শীর্ষক বইয়ে পাওয়া যায় নূরে আলম সিদ্দিকীর বর্ণনা-‘এফএফ বাহিনীর কথায় আসি। ফ্রিডম ফাইটার্স সম্পূর্ণ প্রবাসী সরকারি প্রণোদনায় গঠিত এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষিত। এরা সামগ্রিকভাবে মুক্তিবাহিনী হিসেবে পরিচিত এবং বিভিন্ন সেক্টরে; বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এরা সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। এরা ছিলেন অকুতোভয়; মৃত্যুঞ্জয়ী; স্বাধীনতা যুদ্ধের গৌরবের ধন।.....দেশের প্রান্তিক জনতা, লুঙি পরা কাছা বেঁধে থাকা কৃষক এফএফ-এর সংগৃহীত লোকবল ছিল। এরা প্রশিক্ষণের পর তখনকার মেজর খালেদ মোশাররফ, মেজর জিয়া, মেজর জলিলসহ ১১টি সেক্টর কমান্ডারের নেতৃত্বে সক্রিয়ভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। এখানে বাস্তবতার নিরিখে একটা কথা নির্মোহচিত্তে উল্লেখ করা দরকার। মুজিব বাহিনী বলে যে একটি রাজনৈতিক, সামরিক ক্যাডার তৈরি করা হয়, দুর্ভাগ্যক্রমে তাদের মোটিভেশন দেয়া হয় ভিন্ন আঙ্গিকে। মুজিব বাহিনীর নেতৃচতুষ্টয়ের ধারণা ছিল মুজিব ভাইকে আমরা ফিরিয়ে আনতে পারব না। পাকিস্তানিরা তাকে নিশ্চিতভাবেই হত্যা করবে। তখন স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে মুজিব বাহিনীর মাধ্যমে একটি সামাজিক বিপ্লব সংগঠিত করে অনায়াসে তারা তাজউদ্দীন সাহেবের সরকারকে উৎখাত করে সমাজতান্ত্রিক একটি ভ্রান্ত বাম সরকার প্রতিষ্ঠা করবে।’
সে বিভক্তির বীজের কড়া মূল্য অবশ্য পরে চুকাতে হয়েছে বাংলাদেশকে। যুদ্ধবিধস্ত দেশ গড়ার কাজে মনোনিবেশ করেন বঙ্গবন্ধু। কিন্তু বাধা আসতে থাকে নানা দিক থেকে। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয় তাজউদ্দীন আহমদের। বিভক্তির একটা চূড়ান্ত পর্যায়ে সিরাজুল আলম খান এবং তার সহযোগীদের তৎপরতায় বাহাত্তরের ৩১শে অক্টোবর এক সভায় ‘জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) গঠনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। নানা রকম হঠকারী রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে জাসদ। সংঘাত আর রক্তপাতের নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করে বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু বাকশাল গঠন করে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করেন। যদিও তা সফল হয়নি।
রাজনৈতিক বৈরিতার মধ্যে আঘাত হানে শত্রুরা। সপরিবারের হত্যা করা হয় বঙ্গবন্ধুকে। দৃশ্যপটে আবির্ভাব ঘটে খোন্দকার মোশতাকের। তারপর দীর্ঘ এক রক্তক্ষয়ী অধ্যায় অতিক্রম করে বাংলাদেশ। সামরিক ছাউনি থেকে আসা জিয়াউর রহমান শাসক হিসেবে জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন। একাত্তরের কণ্ঠস্বর জিয়া সেনাবাহিনীতেও ছিলেন গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব। যদিও পরে নানা কারণে সমালোচনার মুখে পড়েন। এক পর্যায়ে এক ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানে তিনি নিহত হন। সামরিক শাসক এরশাদ ৯ বছর পর্যন্ত টিকে যান। তার সময়ে রাজনৈতিক ময়দানে জনপ্রিয়তা পান দুই নেত্রী। গণতন্ত্র ফেরানোর লড়াইয়ে বহু ত্যাগ স্বীকার করেন তারা। এক পর্যায়ে সেনাবাহিনী এরশাদের ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়। পতন হয় এরশাদের।
কথিত গণতান্ত্রিক জমানায় ওয়ান ইলেভেনের আগ পর্যন্ত দুই নেত্রীর ছিল সমান দাপট। রাস্তায় তখনো রক্ত ঝরেছে। শেরেবাংলা নগরের অপারেশন থিয়েটারে জন্ম নেয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা মোটামুটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ব্যবস্থা করেছিল। কিন্তু তা শেষ পর্যন্ত টেকেনি। সে দায় কার তা নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক হতে পারে।
২০০৭ সালের ‘বিখ্যাত’ ওয়ান ইলেভেন বাংলাদেশের রাজনীতির খোলনলছেই বদলে দেয়। এক পর্যায়ে গ্রেপ্তার হন দুই নেত্রী। অস্থায়ী কারাগারে সমঝোতার চেষ্টা চলে। শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সঙ্গেই সমঝোতা হয়। বিদেশিদের সবাই তখন দলটির পক্ষই নেয়। নির্বাচন হয়। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে আওয়ামী লীগ। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার সামনে আসে। জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের সবারই ফাঁসি হয়। একই পরিণতি ভোগ করেন কট্টরপন্থি হিসেবে পরিচিতি বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীও। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার মৃত্যু হয়। তা ফেরাতে বিএনপি জোটের আন্দোলন কাজে আসেনি। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয় না। ১৫ই ফেব্রুয়ারির পরিণতি হয়নি ৫ই জানুয়ারির। সরকার টিকে যায়। আরেকটি নির্বাচন দরজায় কড়া নাড়ছে।
কী হবে ডিসেম্বর নির্বাচনে, তা অবশ্য এখনই বেশ পরিষ্কার হয়ে গেছে। খুব সম্ভবত খালেদা জিয়া কারাগারেই থাকবেন। তাকে রেখে তার দল কি নির্বাচনে যাবে অথবা যাওয়ার সুযোগ পাবে? সেটা বুঝতে আরো খানিকটা সময় লাগবে। একটা কথা বলা দরকার, বাংলাদেশের রাজনীতি সম্পর্কে আগে বলা হতো, অনিশ্চয়তাই একমাত্র নিশ্চয়তা। কিন্তু সেদিন এখন আমরা ফেরিয়ে এসেছি। এখন সবকিছুই যেন নিশ্চিত।

কৃষিপণ্য রপ্তানি সংকোচন

পৃথিবীর সব দেশে সাধারণভাবে এ রকম একটা প্রত্যাশা কাজ করে যে অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের নতুন নতুন দিগন্ত খুলে যাবে, সম্ভাবনাময় খাতগুলো দিন দিন সম্প্রসারিত হবে। আমাদের কয়েক দশকের অর্থনৈতিক অগ্রগতির ধারাবাহিকতায় অন্যান্য দ্রব্যপণ্যের পাশাপাশি কৃষিপণ্য ও ফলমূল রপ্তানিও একটা সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে দেখা দিয়েছে। এ দেশ থেকে আলুসহ বিভিন্ন শাকসবজি ও ফলমূল ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে রপ্তানি হচ্ছে। কিন্তু কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, এসব পণ্য রপ্তানির পরিমাণ বাড়ার পরিবর্তে কয়েক বছর ধরে ক্রমাগতভাবে কমে যাচ্ছে। কৃষি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির এক বৈঠকে সম্প্রতি এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এই উদ্বেগ যথার্থ এবং উদ্বেগ দূর করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। কৃষি মন্ত্রণালয়ের যে প্রতিবেদন সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে পেশ করা হয়েছে, তাতে বলা হয়েছে, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে আলু রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ২ হাজার ৯৮৩ টন। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে রপ্তানি কমে যায় অর্ধেকের বেশি: সে বছর মাত্র ৪০ হাজার ২২৯ টন আলু রপ্তানি হয়। শাকসবজির ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা: ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৪০ হাজার ৮৭৮ টন শাকসবজি রপ্তানি হয়েছিল। কিন্তু পরের বছর তা কমে গিয়ে হয় ২৫ হাজার ৪৭০ টন। রপ্তানির এই নিম্নমুখী প্রবণতা বছর বছর বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে। কিন্তু এর কারণ কী? কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওই প্রতিবেদনই বলছে, কৃষিপণ্য ও শাকসবজি রপ্তানির পরিমাণ ক্রমাগতভাবে কমে যাওয়ার কারণ এসব পণ্যের রপ্তানিকারকদের নন-কমপ্লায়েন্স, অর্থাৎ তাঁরা তাঁদের পণ্যের গুণগত মান রক্ষাসহ আমদানিকারকদের বেঁধে দেওয়া মানদণ্ডগুলো অনুসরণ করছেন না। যেমন ২০১৪ সালে রাশিয়ায় রপ্তানি করা আলুতে ব্রাউন রুট ব্যাকটেরিয়া শনাক্ত করা হয়। তারপর রাশিয়া বাংলাদেশ থেকে আলু রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। অথচ আমাদের আলু রপ্তানির জন্য রাশিয়া ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে বাজারসম্ভাবনা বিরাট। কৃষিপণ্য ও ফলমূল রপ্তানির ক্ষেত্রে নন-কমপ্লায়েন্সের অভিযোগ কিন্তু সাম্প্রতিক বিষয় নয়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওই প্রতিবেদনেই দেখা যাচ্ছে ২০১১ সালে নন-কমপ্লায়েন্সের কারণে রপ্তানিকৃত শাকসবজির ১১৫টি চালান বাতিল হয়েছে। তারপর থেকে প্রতিবছরই চালান বাতিলের হিসাব ওই প্রতিবেদনে আছে। দেখা যাচ্ছে, ২০১১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সাত বছরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাতিল করেছে শাকসবজির ৯০৮টি চালান। সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিদেশে বাংলাদেশি কৃষিপণ্যের হারানো বাজার পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণে কৃষি মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করা হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন তোলা উচিত, এই যে বছরের পর বছর ধরে নন-কমপ্লায়েন্সের কারণে রপ্তানিকৃত কৃষিপণ্যের চালান বাতিলের ঘটনা ঘটে আসছে, এর প্রতিকারের জন্য কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে? কৃষিপণ্য রপ্তানিকারকেরা তাঁদের পণ্যের গুণগত মান তথা আমদানিকারক দেশগুলো নির্ধারিত কমপ্লায়েন্স শর্তগুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করছে কি না, সেদিকে দৃষ্টি রাখার দায়িত্ব কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অধীন কৃষিসঙ্গ নিরোধ বিভাগের। তাদের কি এদিকে কোনো দৃষ্টি আছে? এ বিষয়ে কারও কোনো দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহির বোধ আছে কি? পণ্যের গুণগত মানসংক্রান্ত নন-কমপ্লায়েন্সের কারণে রপ্তানির চালান বাতিল হওয়া শুধু ব্যবসায়িক ক্ষতি নয়, দেশের ভাবমূর্তিতেও তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং সেই প্রভাব কাটানো কঠিন ও সময়সাপেক্ষ হয়ে উঠতে পারে। সুতরাং আমাদের কৃষিপণ্যের রপ্তানি বাজার সংকোচনের এই উদ্বেগজনক ধারা এখনই বন্ধ করার জোর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। হারানো বাজার দ্রুত পুনরুদ্ধারের পর তা আরও সম্প্রসারণের পদক্ষেপও নিতে হবে।

আওয়ামী লীগের ঘাড়ে ‘কোন্দলের’ বোঝা by মিজানুর রহমান খান

র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) হাতে মানিকগঞ্জে ধরা পড়া ১০ জনের একটি সশস্ত্র অপহরণ চক্র সম্পর্কে যে তথ্য পাওয়া গেছে, তা রাজনৈতিক নৈরাজ্য ও সামাজিক অবক্ষয় গভীরতর হওয়ার ইঙ্গিতবহ। আওয়ামী লীগ সমাজের অংশ, তাই সেখানেও বড় সমস্যা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। জঙ্গি দমলেও সমাজে চরমপন্থা ক্রমে বাড়ছে। দলীয় কোন্দলের পেছনে আসলে কোনো মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব নেই কিন্তু তথাকথিত কোন্দলে গত এক দশকে দুই শর বেশি আওয়ামী লীগার বা তার সমর্থক খুন হয়েছেন। এর বিচার বিরল, তবে ফেনীর আদালত সম্প্রতি ৩৯ জনকে ফাঁসির দণ্ড দিয়েছেন। নিহত ব্যক্তি উপজেলা চেয়ারম্যান ও দলীয় সভাপতি ছিলেন। তাঁকে গুলি করে, পেট্রল ঢেলে গাড়িসুদ্ধ জীবন্ত হত্যা করল দলীয় সহযোদ্ধারাই। টাঙ্গাইলেও উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা ফারুক হত্যার আসামি সাংসদ আমানুর রহমান। এর বাইরে কোথাও দুষ্কৃতকারীরা দলকে ঢাল হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা দেখাচ্ছে। ১৯৯০ সালের পর প্রতি পাঁচ বছর পর ক্ষমতার পটপরিবর্তনের কারণে কোনো দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল বা দুর্বৃত্তায়নের ধারা স্থায়ী রূপ নেয়নি। মাঝখানে ছেদ পড়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ যখন টানা দুই মেয়াদের শেষ দিকে, তখন স্থানীয় পর্যায়ে নেতা-কর্মীদের রাশ টেনে ধরা যে কঠিন হয়ে পড়েছে, মানিকগঞ্জের ঘটনাই তার প্রমাণ। একজন চতুর্থ শ্রেণির সরকারি কর্মচারীকে রাতারাতি ও বেআইনিভাবে দলের উপজেলা সহসভাপতি করা কি প্রমাণ করে যে দলটি ভেতর থেকে ধসে পড়ছে? এই লোকটির বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ‘ভোট কিনে’ স্কুল কমিটির টানা দুই মেয়াদে সভাপতি হন। এমন ঘটনা বিরল নয়। আগে সরকারি দল এবং তার অঙ্গসংগঠনগুলো চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজির মতো দুর্নীতি ও মাঝেমধ্যে ছোটখাটো সংঘাতে লিপ্ত হতো। সেই চিত্র ভয়ানকভাবে পাল্টেছে। নামে-বেনামে দলটির একটি অংশ নরহত্যার মতো মারাত্মক অপরাধে জড়িয়েছে। কিন্তু এই সত্য স্বীকার করতে তারা কুণ্ঠিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজের চতুর্থ রিপোর্ট বলেছে, দুই মাসে (গত নভেম্বর-ডিসেম্বর) ২৪ ঘটনায় ২৬৭ ব্যক্তি আহত হন, যার মূলে দলীয় কোন্দল। রিপোর্টে দলের নাম নেই; কিন্তু তা উল্লেখ করার দরকার হয় না। মারামারির ঘটনায় দল ব্যবস্থা নেয় না-এমন অভিযোগ সম্পর্কে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্যাহর উক্তি ছিল, ‘ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব পুলিশের। তারা সেটা করে।
দলের লোক মারামারি করেছে, এটা পত্র পত্রিকা বলে। কিন্তু নিজেরা খুঁজতে গেলে পাওয়া যায় না। তাহলে কীভাবে ব্যবস্থা নেব?’ দুই বছর আগে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মিজবাহউদ্দিন সিরাজ বলেছিলেন, ‘আমাদের দলের মধ্যে প্রতিযোগিতা আছে, কোন্দল নাই।’ তাঁরা উভয়ে ভ্রান্ত, কিন্তু তাঁদের সাফাই বক্তব্যের সমর্থকেরা যে দলে সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতীয়মান হবেন, তাতে আর সন্দেহ কী? ২০১৬ সালের ইউপি নির্বাচনে নিহত ১১৬ জনের মধ্যে আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকই ছিলেন ৭১ জন। ফেনীর ওই নৃশংস খুনের নেপথ্যের দুটি বড় কারণ, একজন ইউনিয়ন পরিষদে দলের চেয়ারম্যান প্রার্থী হতে পরেননি, আরেকজন ডায়াবেটিক সমিতির নির্বাচন করতে পারেননি। প্রশ্ন হলো দুজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলেই কি আধিপত্য বিস্তারের যে সর্বনাশা মোহ দলে যাদের পেয়ে বসেছে, তারা ভড়কে যাবে, নাকি দলকে রাজনৈতিক নৈতিকতা প্রতিষ্ঠায়ও মনোযোগ দিতে হবে? আওয়ামী লীগের একজন দায়িত্বশীল নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ‘মারামারি বা অপরাধ করে রাজনৈতিক দলে কারও পদ গেছে, এর নজির কম। পদ যায় রাজনৈতিক কারণে।’ অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের একজন সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য পত্রিকান্তরে বলেছিলেন, ‘দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের বিষয়ে তাঁদের দলীয় ফোরামে আলোচনা হয় না বললেই চলে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে যেটা প্রকাশিত হচ্ছে, সেটা দেখে অনেক সময় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে সাত বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভাগীয় কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদকদের ঢাকায় অবস্থান এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগে তাঁদের প্রভাব না থাকায় কোন্দল কমছে না।’ লক্ষণীয় রূঢ় সত্য বোঝার মতো বিবেকবান ব্যক্তি নিশ্চয়ই আওয়ামী লীগে আছেন, কিন্তু তাঁদের শর্ত অভিন্ন, নাম প্রকাশ করা যাবে না। আশা করব, এই বিবেকবানেরা বিবেচনায় নেবেন যে প্রধান বিরোধী দল খুব বেশি দুর্বল হলে তা ক্ষমতাসীন দলের বৈধ স্বার্থ রক্ষা করে কি না। ফলপ্রসূ ‘একদলীয়’ ব্যবস্থার শক্তি অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রায়ণ ও শৃঙ্খলা রক্ষা, বহুদলীয় ব্যবস্থা থেকে যা আরও বেশি চ্যালেঞ্জিং। নীতিহীন ও দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতির রাশ না টানলে দেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থাকে আরও হুমকির মুখে ঠেলে দেওয়া হবে। ২০১৬ সালের অক্টোবরে তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা সাধারণ ক্ষমা পেয়েছেন। এর মধ্যে যাঁরা মামুলি শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছেন আর খুনখারাবি, চাঁদাবাজির মতো অপরাধ করেছেন, তাঁরা একাকার হয়েছেন। মানিকগঞ্জে আওয়ামী লীগের ছদ্মবেশে নিম্নবিত্ত অবস্থান থেকে উঠে আসা পিতা-পুত্র যেভাবে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় এবং বিদ্যাপীঠের সম্পদ লুটের নেতৃত্ব দিয়েছেন, সেটা সম্ভবত সমাজে আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। মানিকগঞ্জের সেলিম মোল্লার কথিত দলীয় ‘টর্চার সেল’ (জ্ঞাত আয়বহির্ভূত অর্থে গড়া ডুপ্লেক্স) ইতিমধ্যে দেশের বহু স্থানে একটি অশুভ প্রবণতায় রূপ নিয়েছে। তাঁরা হয়তো দেখছেন, একই সঙ্গে বহু বাহিনী গুম বা ‘জিজ্ঞাসাবাদের’ জন্য নাটকীয়ভাবে তুলে নেয়। বেসরকারি বাহিনী দায়টা তখন বিভ্রান্তিকরভাবে অন্যের ঘাড়ে চাপাতে পারে। আইনের শাসন যত দুর্বল হবে, ততই প্রাইভেট বাহিনী বাড়বে। রাশ না টানলে দলের ছত্রচ্ছায়ায়, নামে-বেনামে পদ্ধতিগত প্রাইভেট বাহিনীর বিস্তার ঘটতে পারে। এলিট ফোর্স নয়, দলীয় শুদ্ধি অভিযানই এদের রুখতে পারে। এ জন্য দলের কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে অবিলম্বে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়ে জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নেতা-কর্মীদের জীবনযাপন ও ব্যয়ের অসংগতি যাচাইয়ে একটি বড় ধরনের সাংগঠনিক কর্মসূচি হাতে নেওয়া দরকার। বড় উন্নয়নে বড় দুর্নীতি হওয়ার ধারণা আমরা প্রত্যাখ্যান করি। কারণ, এটা স্বীকৃত ও পরীক্ষিত যে দুর্নীতির গড্ডলিকাপ্রবাহে গা ভাসানো সমাজে উন্নয়ন টেকসই বা সুষম হয় না। দুর্নীতি দলে কোন্দল ও খুনখারাবি বাড়াচ্ছে। গত বছর সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে আওয়ামী লীগের ‘অভ্যন্তরীণ কোন্দলে’ একটা বন্দুকযুদ্ধ হলো, তাতে সমকাল-এর সাংবাদিক প্রাণ দিলেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে ধন্যবাদ, তিনি সাংবাদিকের স্ত্রীকে একটি চাকরি দিয়েছেন। এর একদিকে স্থানীয় সেই সাংসদ (বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত) হাসিবুর রহমান, ১৯৯৬ সালে বিএনপি ত্যাগ করে নৌকায় চেপে উপমন্ত্রী হয়েছিলেন। ২০০৭ সালে ৪২০ ধারায় অভিযুক্ত হওয়ার তথ্য তাঁর গত নির্বাচনী হলফনামায় ছিল না। তাঁর অনুসারী দলের পৌর কমিটির সভাপতির সঙ্গে বর্তমান মেয়রের গ্রুপের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের বন্দুক লড়াই থেকে ওই খুন। সেই হত্যা মামলায় মেয়র দলের পদ থেকে বরখাস্ত ও কারাবন্দী অথচ অন্যজন পৌর কমিটির সভাপতি পদে বহাল। টাঙ্গাইলে মুক্তিযোদ্ধা খুনের আসামি আওয়ামী সাংসদ বন্দী, কিন্তু তিনি দল থেকে বহিষ্কৃত হননি। দল বলেছে, আদালতে ফয়সালার পর সিদ্ধান্ত। তাহলে শাহজাদপুরের আওয়ামী মেয়র কী দোষ করেছেন? ফেনীতে খুনের পরপরই কমিটি হয়, তাতে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা বাদ পড়েন, দল এখনো কাউকে বহিষ্কার করেনি। দলের কমিটিতে অন্তত খুন ও গুমের মতো ঘটনায় অভিযুক্ত এবং দণ্ডিত ব্যক্তিদের থাকতে হলে কী নিয়ম, কী নৈতিকতা, তার একটা ফয়সালা দরকার। আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয়ভাবে নৈতিকতা ও শৃঙ্খলার বার্তা না দিতে পারলে তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা নীরবে অশ্রুপাত করবেন। ‘চূড়ান্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা’ নেওয়ার ক্ষমতা কেবল আওয়ামী লীগ কার্যনির্বাহী সংসদের। আসন্ন সংসদ নির্বাচনকেন্দ্রিক অভ্যন্তরীণ খুনখারাবি প্রতিরোধে দলটির কার্যনির্বাহী সংসদের উদ্যোগ জরুরি।
মিজানুর রহমান খান : প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক
mrkhanbd@gmail. com

পুতিন কেন এত জনপ্রিয়?

রাশিয়ার সদ্য শেষ হওয়া প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ৭৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ২০১২ সালের নির্বাচনের চেয়ে এবার বেশি ভোটে জয়ী হন পুতিন। শেষবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পুতিন পেয়েছিলেন ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ ভোট। অর্থাৎ রাশিয়ায় পুতিনের জনপ্রিয়তা আগের চেয়ে যে বেড়েছে, তা আমরা বলতেই পারি। কিন্তু রাশিয়ায় পুতিনের কেন একচেটিয়া জনপ্রিয়তা? রুশ গণমাধ্যম স্পুতনিক রেডিও এ বিষয়ে কথা বলেছে ভারতের জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর রাশিয়ান অ্যান্ড এশিয়ান স্টাডিজের অধ্যাপক অনুরাধা চেনোইয়ের সঙ্গে। স্পুতনিক নিউজ ডট কমে প্রকাশিত ওই সাক্ষাৎকারের কিছু অংশ দেওয়া হলো।
স্পুতনিক : মূলধারার গণমাধ্যমে থেকে আমরা অনেক অভিযোগ শুনতে পাচ্ছি যে নির্বাচন স্বচ্ছ ছিল না। আপনি কি তাই মনে করেন?
চেনোই : নির্বাচনে পক্ষপাতিত্ব ছিল, আমি তা মনে করছি না। এ বিষয়ে মন্তব্য করার আগে রাশিয়ায় যেভাবে রাজনীতির চর্চা গড়ে উঠেছে, তা জানতে হবে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর রাশিয়া স্বাধীন হলেও সে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো দুর্বলই রয়ে গেছে। যেখানে গণতন্ত্রচর্চা হয়, সাধারণত সেখানে অনেক শক্তিশালী বহু দলগত পদ্ধতি থাকে, কিন্তু রাশিয়ার ক্ষেত্রে আমরা তা দেখতে পাইনি। প্রেসিডেন্ট পুতিন ও তাঁর দল অন্যদের ওপর একচেটিয়া প্রভাব রেখেছে। তবে ভালো হতো যদি রাশিয়ায় আরও শক্তিশালী রাজনৈতিক দল থাকত, কিন্তু এর জন্য অনেক সময়ের প্রয়োজন। গণতন্ত্র বিকশিত হতে সময় দরকার। তাই আমি মনে করি না যে এ কারণে রাশিয়াকে বা প্রেসিডেন্ট পুতিনকে কেউ দোষ দিতে পারে।
স্পুতনিক : রাজনৈতিক দলগুলোর একে অপরের সঙ্গে কেন বৈশিষ্ট্যগত এত ফারাক রয়েছে বলে আপনি মনে করেন?
চেনোই : অনেক রাজনৈতিক দল রয়েছে, কিন্তু গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সত্যিই বণ্টন করা প্রয়োজন। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া উচিত এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় একধরনের আস্থা থাকা উচিত। সবকিছু নিয়ে দোষ দেওয়ার মনোভাব থাকা ঠিক নয়। তরুণ প্রজন্মকে রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট করা উচিত। তরুণদের পথ দেখানো উচিত এবং সৃজনশীলতা রক্ষা করে রাজনৈতিক তর্ক-বিতর্ক বৃদ্ধি করা উচিত। আমি মনে করি, এ দেশে একটা রাজনৈতিক বিতর্ক অবশ্যই রয়েছে। তবে ক্যাডার, সংগঠন, শক্তি ও অর্থের সমন্বয়ে রাজনৈতিক দলগুলো কাঠামোগতভাবে এখনো সংগঠিত হয়নি। বর্তমানে রাশিয়াসহ সব দেশই অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাই অনেক দেশের মানুষই সে দেশে একজন শক্তিশালী ও জনপ্রিয় নেতা চাইছেন। আমি ব্যক্তিগতভাবেই মনে করি, রাশিয়া ভাগ্যবান এই অর্থে, সে দেশের মানুষের প্রেসিডেন্ট পুতিনের মতো একজন চৌকস নেতা রয়েছে। পুতিন রাশিয়াকে স্থিতিশীল করেছেন, তিনি রাশিয়াকে রাষ্ট্র হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছেন। এ কারণেই তিনি রাশিয়ায় এতটা জনপ্রিয়। আমি তাঁকে একজন জনপ্রিয় নেতা বলে মনে করি। আমি মনে করি, সাম্প্রতিক ঘটনাবলি নিয়ে পুতিন তাঁর কথা রাখতে পেরেছেন। যদিও এ নিয়ে রুশ সমাজে ভিন্নমত রয়েছে। তবে অর্থনৈতিক নীতিমালা এবং সিরিয়া ও ইউক্রেন ইস্যু নিয়ে পুতিনের অবস্থান সম্পর্কে তিনি নিজেই বেশ কিছু যুক্তি তুলে ধরেছেন; যা ছিল ন্যায্য এবং রুশ নাগরিকেরা অবশ্যই তাঁকে সমর্থন করেছেন।
রুশ থেকে অনুবাদ : জামিল খান

নির্বাচনে গাদ্দাফির অর্থ, সারকোজি পুলিশের হেফাজতে

ফ্রান্সের সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলা সারকোজিকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। লিবিয়ার প্রয়াত নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির কাছ থেকে বড় অঙ্কের অর্থ নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। বিবিসি ও দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের খবরে বলা হয়েছে, অবৈধ নির্বাচনী তহবিল নিয়ে ওঠা অভিযোগের তদন্তে ফ্রান্সের সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলা সারকোজিকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে নিজ হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ। ২০০৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণায় অবৈধ তহবিল ব্যবহার করা নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। ২০০৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সারকোজির জয়ের পেছনে মুয়াম্মার গাদ্দাফির অর্থের একটি তহবিল ভূমিকা রেখেছে, এ অভিযোগে ২০১৩ সালে বিচার বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয় ফ্রান্সে। অভিযোগ আছে, ২০০৭ সালে নিজের নির্বাচন পরিচালনার জন্য মুয়াম্মার গাদ্দাফির কাছ থেকে পাঁচ কোটি পাউন্ড সহায়তা পেয়েছিলেন সারকোজি।
গত পাঁচ বছর ধরে তদন্ত চলছে। সে বিষয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। অভিযোগের ভিত্তিতে প্যারিসের ন্যান্টের পুলিশ স্টেশনে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। সারকোজির ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও ফ্রান্সের সাবেক মন্ত্রী ব্রাইস হর্টফিয়াক্সকেও ওই তহবিল নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। ২০১২ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট থাকা সারকোজি কোনো অবৈধ নির্বাচনী তহবিল গ্রহণের অভিযোগ বরাবর অস্বীকার করে আসছেন। তিনি লিবিয়ার কাছ থেকে অবৈধ অর্থ পাওয়ার অভিযোগকে অদ্ভুত বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। গত জানুয়ারিতে একজন সন্দেহভাজন ফরাসি ব্যবসায়ীকে যুক্তরাজ্যে গ্রেপ্তার করা হয় এবং লন্ডনের এক আদালতে হাজির করার পর জামিনে বেরিয়ে যান তিনি। তাঁর মাধ্যমেই গাদ্দাফির ওই অর্থ সারকোজির নির্বাচনী শিবিরে পৌঁছায় বলে ধারণা করেন তদন্তকারীরা। নিকোলা সারকোজি ২০০৭ থেকে ২০১২ পর্যন্ত ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ২০১২ সালের নির্বাচনে হেরে যান সারকোজি।

ক্ষমতার মোহময় মসনদ

রাশিয়ায় এই তো হয়ে গেল প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ভাবগতিকে বোঝা গিয়েছিল, ভ্লাদিমির পুতিনই বহাল থাকবেন। বাস্তবে হয়েছেও তাই। পুনরায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন পুতিন। একই সঙ্গে একটি রেকর্ডও পুরেছেন পকেটে। সোভিয়েত ইউনিয়ন-পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে বেশি সময় ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তি হলেন তিনি। এই রুশ নেতা ছাড়াও বিশ্বে আরও অনেক রাষ্ট্রপ্রধান আছেন, যাঁরা অনেক দিন ধরেই ক্ষমতা আঁকড়ে আছেন বা ছিলেন। এমন কয়েকজন ব্যক্তিকে নিয়ে এই আয়োজন:
চার দশকের বেশি সময় ক্ষমতায়
এ তালিকায় সবার ওপরে কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রো। ৪৯ বছর ক্ষমতায় থাকার পর ছোট ভাই রাউল কাস্ত্রোর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন তিনি। ২০০৮ সালে স্বেচ্ছায় ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। তখন তাঁর বয়স আশির ঘরে। ২০১৬ সালের ২৫ নভেম্বর মারা যান কাস্ত্রে। তাইওয়ানের প্রথম প্রেসিডেন্ট ছিয়াং কাই-শেক ক্ষমতায় ছিলেন ৪৭ বছর। ১৯৭৫ সালে মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্ত এই দ্বীপের ক্ষমতা আঁকড়ে ছিলেন। উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা কিম ইল সুং ৪৬ বছর দেশ চালিয়েছিলেন। ১৯৯৪ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনিই ছিলেন উত্তর কোরিয়ার দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। ওই দেশে এখনো ‘শাশ্বত নেতা’ হিসেবে সম্মান জানানো হয় কিম ইল সুংকে। আলবেনিয়ার কমিউনিস্ট শাসক এনভার হোজা আমৃত্যু ক্ষমতায় ছিলেন। বছরে হিসাবে ৪০ বছর। ১৯৮৫ সালে মারা যান তিনি। লিবিয়ার সাবেক শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফি প্রায় ৪২ বছর রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলেন। ২০১১ সালে বিদ্রোহীদের হাতে প্রাণ হারান গাদ্দাফি। গ্যাবন পরিচিত তেলের খনির জন্য। ৪১ বছর দেশটি শাসন করেন ওমর বংগো অনদিম্বা। ২০০৯ সালে মারা যান ওমর।
এখনো যাঁরা ক্ষমতায়
বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্ট হলেন তিওদোরো ওবিয়াং এনগেমা। গিনির প্রেসিডেন্ট তিনি। রাষ্ট্রক্ষমতায় তাঁর ৩৮ বছর চলছে। ১৯৭৯ সালে নিজের চাচাকে অপসারণ করে ক্ষমতায় এসেছিলেন এনগেমা। এখনো চলছে তাঁর শাসন। ক্যামেরুনের প্রেসিডেন্ট পল বিয়া ৩৫ বছর ধরে শাসন করছেন দেশ। কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট ডেনিস সাসৌর চলছে ৩৪ বছর। তবে এর মধ্যে পাঁচ বছরের বিরতি ছিল তাঁর। ওই সময়টাতে ক্ষমতার বাইরে ছিলেন তিনি। কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন সেন টানা ৩৩ বছর ধরে ক্ষমতায় আছেন। উগান্ডার প্রেসিডেন্ট ইওয়ারি মুসাভেনি দেশ শাসন করছেন ৩২ বছর হলো। অন্যদিকে, ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লা আলী খামেনি ২৯ বছর ধরে দেশটির শাসনসংক্রান্ত সব নির্দেশ দিয়ে আসছেন। সুদানের প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশিরের শাসনামলের ২৮ বছর চলছে। চাদের প্রেসিডেন্ট ইদ্রিস দেবি ২৭ বছর ধরে শাসনকাজ চালাচ্ছেন। কাজাখস্তানের নুরসুলতান নজরবায়েভ প্রেসিডেন্ট হিসেবে আছেন ২৮ বছর ধরে। তাজিকিস্তানের প্রেসিডেন্ট এমামোলি রাখমনের চলছে ২৫ বছর। অন্যদিকে, ইসাইয়াস আফওয়ারকি ইরিত্রিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে আছেন ২৪ বছর।

সরকারি প্রকল্পে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি by এএমএম শওকত আলী

প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির কথা অনেকেই বলে থাকেন। এর মানে কি প্রতিষ্ঠানভিত্তিক দুর্নীতি না, অন্য কিছু? সরকারি, আধা সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও দুর্নীতি রয়েছে। অর্থাৎ যে কোনো প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি কমবেশি থাকার বিষয়টি কারও অজানা নয়। দুর্নীতি এককভাবে কখনও হয় না। সরকারি প্রতিষ্ঠানে সেবা গ্রহণের বিনিময়ে বাড়তি অর্থ দিতে হয়। এর কিছু উদাহরণ টিআইবির প্রতিবেদন ছাড়াও সময় সময় মিডিয়ায় উল্লেখ করা হয়। সম্প্রতি সড়ক ও জনপথ বিভাগের দুর্নীতি রোধে দুদক দীর্ঘ তদন্তের পর ২১ দফা সুপারিশ প্রণয়ন করেছে। এ ধরনের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কারণ কোনো প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি বন্ধে সে প্রতিষ্ঠানই উদ্যোগী না হলে একমাত্র জেল-জরিমানা করে দুর্নীতি বন্ধ করা সম্ভব নয়। কারণ জেল-জরিমানার বিষয়টি বিচারসাপেক্ষ। এ প্রক্রিয়া দীর্ঘ। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, দুর্নীতির মামলায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে আসামি প্রমাণের অভাবে মুক্তি পেয়ে যায়। এ জন্য সংশ্নিষ্ট সংস্থাগুলোও একে অপরকে দোষারোপ করে। সংশ্নিষ্ট সংবাদে দেখা যায়, টেন্ডারে উল্লেখ করা শর্ত অমান্য করে অনিয়ম বা দুর্নীতির মাধ্যমে প্রায়ই নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়। বলা বাহুল্য, এ বিষয়টি কারও অজানা নয়। তবে দুদক বলেছে, এ ক্ষেত্রে জবাবদিহির অভাব রয়েছে। জবাবদিহির অভাবের কথা সরকারি সব প্রতিষ্ঠানের প্রতি প্রযোজ্য। এ ক্ষেত্রে দুদকের সুপারিশ হলো, মনিটরিং ইউনিটের চূড়ান্ত প্রতিবেদন ছাড়া ঠিকাদারের বিল পরিশোধ না করা। চূড়ান্ত বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে সব সরকারি ও আধা সরকারি প্রতিষ্ঠানের নিময়-কানুন রয়েছে। এসব নিয়ম-কানুন কি উপেক্ষা করা হচ্ছে- এ বিষয়ে সঠিক কিছু প্রকাশ করা না হলেও অনুমান করা যায়, চূড়ান্ত বিল প্রদানে শিথিলতা রয়েছে। বৃষ্টি, বন্যাসহ প্রাকৃতিক সুর্যোগ মোকাবেলায় কংক্রিটের সড়ক নির্মাণসহ অন্যান্য সুপারিশ করা হয়েছে। স্মরণ করা যায়, সড়ক নির্মাণে কংক্রিটের ব্যবহার বিষয়ে সরকারের অতি উচ্চ পর্যায়ের সূত্রে জানা গিয়েছিল। এ নিয়ে মিডিয়ায় কিছু বিতর্কও হয়েছিল। ওই সময় এ কথাও জানা যায়, সড়ক নির্মাণ বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা এ প্রস্তাব গ্রহণ না করার পক্ষে অভিমত দিয়েছিলেন। এর পর এ বিষয়ে আর কোনো আলোচনার কথা শোনা যায়নি। যে সুপারিশ অতীতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে অগ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছে, সেই একই সুপারিশ কেন পুনরায় করা হয়েছে, তা বোধগম্য নয়। স্থিরকৃত সিদ্ধান্তের প্রায়শ পরিবর্তন বাঞ্ছনীয় নয়।
একদিকে সড়ক নির্মাণে কংক্রিট ব্যবহারের সুপারিশ, অন্যদিকে বিটুমিনের গুণগত মান নিশ্চিত করা ও পর্যাপ্ত বিটুমিন ব্যবহার করার সুপারিশও করা হয়েছে। দুর্নীতির বিষয়টি নিম্নমানের সামগ্রী অথবা প্রয়োজনের তুলনায় কম সামগ্রী ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত। ঠিকাদাররা সাধারণত কম খরচ করে অধিক লাভ করার জন্য প্রয়োজন অথবা নির্ধারিত পরিমাণের তুলনায় কম বা নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করে থাকেন। এ জন্য প্রয়োজন চলমান প্রকল্পের নিবিড় মনিটরিং ও পরিবীক্ষণ। সংশ্নিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্ব-পরিধির মধ্যে এটা বহুকাল ধরেই রয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, এ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালিত হচ্ছে না বা হলেও অনেকটাই দায়সারাভাবে করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে জবাবদিহির অভাবের প্রশ্নটি কতটুকু গ্রহণযোগ্য? সড়ক পরিবহনমন্ত্রী স্বয়ং নির্মাণাধীন সড়ক পরিদর্শনে যে সময় ব্যয় করছেন তা সর্বজনবিদিত। অতীতে কিছু ক্ষেত্রে তিনি একাধিক প্রকৌশলীকে দায়িত্বে অবহেলার দায়ে সাময়িকভাবে বরখাস্তও করেছেন। এর পরও এসব প্রশ্ন কেন উত্থাপিত হচ্ছে, তা আরও গভীরভাবে দেখা প্রয়োজন। সড়ক নির্মাণে দুর্নীতি বন্ধের লক্ষ্যে দুটি নতুন ধরনের সুপারিশ সংশ্নিষ্ট সংবাদে দেখা গেছে। এক, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশলী দ্বারা চূড়ান্ত মেজারমেন্ট গ্রহণ; দুই, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে সামাজিকভাবে নিরপেক্ষ কমিটি গঠন করে মাটি ভরাট কাজের তদারকি। প্রথমোক্ত সুপারিশের গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে পাল্টা যুক্তি দেওয়া সম্ভব। এ ধরনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করা কষ্টসাধ্য হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এ ধরনের দায়িত্ব প্রদানের অর্থ হলো প্রতিষ্ঠান ও কর্মকর্তাভিত্তিক জবাবদিহি শিথিল করা। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিজস্ব দায়িত্ব পালন করে এ ধরনের কাজ করা সঙ্গত কি-না, তাও ভেবে দেখা প্রয়োজন। দ্বিতীয় সুপারিশটিও যৌক্তিক নয় বলে মনে হয়। কারণ এ ধরনের কাঠামো স্থানীয় সরকার পর্যায়ে ষাটের দশক থেকে চালু করা হলেও সম্প্রতি এ ধরনের কমিটির সততা অথবা কার্যকারিতা প্রশ্নাতীত নয়। এছাড়া রয়েছে অন্য একটি প্রশ্ন। সড়ক ও জনপথ বিভাগের প্রকল্পের আকার বৃহৎ। কিছু প্রকল্পে ঠিকাদারের কাজ মানসম্পন্ন ও সঠিক সময়ের মধ্যে শেষ করার বিষয়টি পরিবীক্ষণের জন্য আলাদা কারিগরি পরামর্শক নিয়োগ করতে হয়। অতীতে অনেক প্রকল্পে এটা হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। এসব প্রকল্পের জন্য আলাদা স্থানীয় কমিটি করার প্রয়োজন বা অবকাশ নেই। অন্যান্য সুপারিশের ক্ষেত্রে বলা যায়, সুপারিশের আলোকে নতুন কোনো নীতিমালা করার যে বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে, তার কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ, প্রকল্প শুরু করার আগে যে নিয়ম-কানুন মানার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তার সব ক'টি পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন ও বিধিতে বলা আছে। এ আইন ও বিধি মানা বাধ্যতামূলক। এর বাইরে কোনো নিয়ম-কানুন চাপিয়ে দেওয়া যৌক্তিক নয়। তবে দুদকের প্রতিবেদনে অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ঠিকাদার প্রকৌশলীর যোগসাজশে দুর্নীতি হচ্ছে। যোজসাজশের বিষয়টি অবশ্য নতুন কিছু নয়। যে কোনো দুর্নীতির ঘটনায় দুই পক্ষের সম্মতির প্রয়োজন। তবে সম্মতি যাতে সহজে পাওয়া যায় তার জন্য প্রভাবশালী ঠিকাদারের চাপ প্রধান কারণ হিসেবে দুদক চিহ্নিত করেছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের সূত্রমতে, রাজনৈতিক ঠিকাদারদের দৌরাত্ম্য আর নির্মাণ মেরামতে গলদের কারণে সড়ক টিকছে না। এর বিপরীতে সুপারিশ কী, তা সঠিকভাবে নির্ণয় করা কঠিন। অথচ রাজনৈতিক প্রভাবই প্রকল্পে দুর্নীতির অন্যতম প্রধান উৎস। রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়টি সর্বজনবিদিত হলেও এর যে কুফল, তা বন্ধ করার জন্য তেমন কোনো উদ্যোগ কখনও দৃশ্যমান নয়। সড়ক ও জনপথ ছাড়াও অন্যান্য সরকারি বা আধা সরকারি প্রতিষ্ঠান বিষয়ে মিডিয়ায় এ ধরনের তথ্য পাওয়া যায়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের হাওরে বাঁধ নির্মাণে দলীয় প্রভাব শীর্ষক খবরে এ বিষয়টি ৫ মার্চ দৃশ্যমান ছিল। হাওরে বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম ও দুর্নীতির কথা গত বছরই জানা গিয়েছিল। বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে ১৫৪টি হাওরের বোরো ধান নষ্ট হয়। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তিন লাখ ২৫ হাজার ৯৯০ জন কৃষক। এ বছর যাতে অনিয়ম ও দুর্নীতি না হয়, সে জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপও গ্রহণ করা হয়। এ সত্ত্বেও অনুসন্ধানের মাধ্যমে যে তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে তা হলো- এক. নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাঁধের কাজ শেষ হয়নি এবং দুই. কৃষকের আড়ালে কাজে যুক্ত হয়েছে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা। পত্রিকান্তরে জানা যায়, দুদক অনিয়ম ও দুর্নীতি রোধে ২৫টি দল গঠন করেছে। এ দলগুলো কাজ শেষ করলে বহু তথ্য জানা যাবে। তবে সিংহভাগ তথ্য অনেকেরই অজানা নয়। প্রয়োজন শুধু অনিয়ম ও দুর্নীতি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ। আইনি দৃষ্টিকোণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব দুদকের। এ কথা আংশিকভাবে সত্য। কারণ দুদক তদন্তসাপেক্ষে মামলা শুরু করলে দুদকের দায় শেষ। কিন্তু অনিয়ম ও দুর্নীতি যাতে না হয়, তার জন্য প্রশাসনিক কার্যক্রম শক্তিশালী করার বিকল্প নেই। সব ধরনের সরকারি ও আধা সরকারি প্রতিষ্ঠান এ লক্ষ্যে কাজ করলে দুদকের দায়িত্ব সহজতর হবে। এ জন্য প্রয়োজন মন্ত্রণালয়ভিত্তিক রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও কার্যকর সহায়তা।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা

আফগানিস্তানে মার্কিন উপস্থিতি শেষ হওয়ার পথে by বদরুদ্দীন উমর

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন সে দেশের ইতিহাসের নিকৃষ্টতম প্রেসিডেন্টের অধীনে শাসিত হচ্ছে এবং তার সাম্রাজ্যবাদী হামলায় এখন খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আফ্রিকান আমেরিকান, লাতিনের থেকে নিয়ে গরিব শ্রমজীবীরাসহ সারা দুনিয়ার মানুষের জীবন, বিশেষত উত্তর আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, আফগানিস্তান ইত্যাদি দেশে মানুষের জীবন ছিন্নভিন্ন হচ্ছে। দীর্ঘদিন আগে থেকেই 'গণতান্ত্রিক দেশ' নামে সাম্রাজ্যবাদী প্রচারণার মাধ্যমে পরিচিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রে পরিণত হলেও সে বিষয়ে বিশ্ব গণমাধ্যমে বিশেষ কিছু শোনা যায় না। মার্কসের এক বিখ্যাত উক্তি হচ্ছে, যে রাষ্ট্র অন্য দেশের জনগণের ওপর নির্যাতন করে, সে রাষ্ট্র নিজেদের দেশের জনগণেরও শোষণ-নির্যাতনকারী। এ কথা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো 'গণতান্ত্রিক' রাষ্ট্রের পক্ষে যে সর্বতোভাবে প্রযোজ্য, এটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতির সঙ্গে যারা পরিচিত, তাদের ভালোভাবেই জানা। তাদের সাম্রাজ্যবাদী প্রচারণায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই চরিত্র খুব সাফল্যের সঙ্গে ধামাচাপা দেওয়া হলেও সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে তাদের মিথ্যা ও কুৎসার শেষ নেই। ১৯৪৫ সালে তাদের প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান জাপানে আণবিক বোমা নিক্ষেপ করে মুহূর্তের মধ্যে লাখ লাখ নিরীহ জাপানি নারী, শিশু, বৃদ্ধ নির্বিশেষে হত্যা এবং আরও লাখ লাখ মানুষকে চিরতরে পঙ্গু করে দেওয়া সত্ত্বেও ট্রুম্যানকে তাদের কেউ ভয়ঙ্কর ফ্যাসিস্ট হিসেবে আখ্যায়িত করে না। এ জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তারা ফ্যাসিস্ট আখ্যা দেয় না। ইতিহাসে এই অন্যতম বৃহৎ হত্যাকাণ্ড সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হলো এক 'আদর্শ' গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র! অথচ সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও তার নির্মাতা স্ট্যালিন হলেন তাদের সাম্রাজ্যবাদী প্রচারণায় হিটলারের জার্মানি এবং হিটলারের সঙ্গে তুলনীয়। এ কথা কে না জানে যে, সোভিয়েত ইউনিয়নের জনগণের কোনো কাজের সংকট ছিল না। খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, শিক্ষা, বাসস্থানের কোনো মৌলিক সমস্যা ছিল না। তাদের কাছে সোভিয়েত ইউনিয়নের এই সমাজতান্ত্রিক অর্জন ছিল হিটলারের ফ্যাসিবাদের সঙ্গে তুলনীয়! যে স্ট্যালিনের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট পার্টির শাসনে সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষে জনগণের সব মৌলিক চাহিদা পূরণ করা হয়েছিল, সেই স্ট্যালিন নাকি হলেন লাখ লাখ মানুষ হত্যাকারী। যারা নিজেদের দেশের জনগণের সব মৌলিক সমস্যার সমাধান বড় আকারে করে দেখিয়েছিল, সমাজতন্ত্র মানুষকে কী দিতে পারে, তারা একই সঙ্গে লাখ লাখ মানুষ হত্যা করতে পারে কীভাবে? যদি সেটা তারা করত তাহলে কি সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব হতো? হাজার প্রতিকূলতার মুখে স্ট্যালিন যেভাবে রাশিয়ার মতো একটি চরম পশ্চাৎপদ দেশকে একটি সুপারপাওয়ারে পরিণত করেছিলেন, সেটা তার পক্ষে কি সম্ভব হতো দেশের লাখ লাখ মানুষ হত্যা করে? লাখ লাখ মানুষ হত্যা করলে কি সে দেশের মানুষ কমিউনিস্ট পার্টি ও তার সর্বোচ্চ নেতা স্ট্যালিনকে অনেক আগেই উৎখাত করত না? এ ধরনের হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও জনগণ কি কোনো সরকার ও রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখতে পারে, তাকে সুপারপাওয়ারে পরিণত করা তো দূরের কথা। দেশের জনগণকে এভাবে হত্যা করলে কি সোভিয়েত ইউনিয়ন হিটলারকে পরাজিত করতে পারত? স্ট্যালিনের ও কমিউনিস্ট পার্টির পেছনে জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়ে দাঁড়াত? কিন্তু এটাই হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী প্রচারের চরিত্র। এটাই তাদের এক বিশাল প্রচারণা সাফল্য। এই প্রচারণার শিকারই হয়েছে দশকের পর দশক ধরে আজ পর্যন্ত দুনিয়ার কোটি কোটি মানুষ। এসব কথা এখানে বলা প্রয়োজন হলো, বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের সাম্রাজ্যবাদী মিত্রেরা সারা দুনিয়ার মানুষের ওপর তাদের যে অর্থনৈতিক শোষণ ও ব্যাপক নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে তারই পরিপ্রেক্ষিতে। তারা ২০০১ সালে নিউইয়র্কের আন্তর্জাতিক ট্রেড সেন্টার বিধ্বস্ত হওয়া থেকে, এমনকি বুড়ো বুশ ও ক্লিনটনের আমল থেকে নতুন পর্যায়ে বিশ্ব জনগণের ওপর তাদের হামলা চালিয়ে আসছে। এখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে এটা এক নতুন মাত্রা অর্জন করেছে। তারা আগে আফগানিস্তান, ইরাক ও লিবিয়ার শাসন ব্যবস্থা ধ্বংস করে সে দেশগুলোর জনগণের জীবন ছিন্নভিন্ন করেছে। সিরিয়ায় তারা অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা চালিয়ে এবং তার ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেশটির এমন ব্যবস্থা করেছে, যা আফগানিস্তান, ইরাক ও লিবিয়ার থেকেও ভয়ঙ্কর। আফগানিস্তান, ইরাক ও লিবিয়ায় তারা সেখানকার নেতৃত্ব উৎখাত করলেও রাশিয়ার সমর্থনের কারণে প্রেসিডেন্ট আসাদকে এ পর্যন্ত ক্ষমতাচ্যুত করতে পারেনি। কিন্তু তারা সিরিয়ায় সব থেকে ভয়ঙ্করভাবে সে দেশের সবকিছু ধ্বংস করেছে। জনগণের জীবন প্রত্যেকটি অঞ্চলে বিপর্যস্ত, বিধ্বস্ত ও সম্পূর্ণভাবে ছিন্নভিন্ন করেছে। এর ফলে লাখ লাখ সিরিয়াবাসী দেশ ছেড়ে তুর্কি, জর্ডান, পাকিস্তান এবং ইউরোপীয় দেশগুলোতে উদ্বাস্তু হিসেবে আশ্রয় নিয়েছে। লাখ লাখ লোকের জীবন গেছে, হাজার হাজার সিরিয়াবাসী ইউরোপ যাওয়ার উদ্দেশ্যে ভূমধ্য সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে নৌকাডুবি হয়ে নিহত হয়েছেন। সিরিয়ায় আসাদ প্রেসিডেন্ট হিসেবে টিকে থাকলেও সিরিয়া ধ্বংস হয়ে গেছে। এখন আফগানিস্তানে তাদের সৃষ্ট সংকট আফগানিস্তানে তালেবান শাসন প্রত্যাবর্তনের পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে এনে দাঁড় করিয়েছে, যাতে ২০১৮ সালের মধ্যেই কারজাই সরকারের পতন এবং তালেবানদের সরকার প্রতিষ্ঠা রোধ করার আর কোনো উপায় নেই। আফগান প্রেসিডেন্ট কারজাই নিজেই বলেছেন যে, আফগানিস্তানে তাদের সরকার খুব জোর আর ৬ মাস টিকে থাকতে পারে। এই অবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ১৯৪৭ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে এনেছে। পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে তাদের তৎপরতা যথেষ্ট চালাচ্ছে না, এই অভিযোগে তারা সে দেশে তাদের দুইশ' কোটি ডলারের সামরিক সাহায্য বন্ধ করেছে এবং আরও নানাভাবে পাকিস্তানকে শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুসলিমবিরোধী নীতি যে এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করছে, এতে সন্দেহ নেই। মুসলমানদের চরম শত্রু ইসরায়েল ও ভারতের নরেন্দ্র মোদি সরকারের সঙ্গে মিলে তারা মুসলমানদের ওপর যে আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হলো, তারই একটা দিক।
অন্যথায় পাকিস্তানের মতো একটি ফ্যাসিস্ট এবং দীর্ঘদিন ধরে তাদের অনুগত রাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের অবনতি এ পর্যায়ে তারা নামিয়ে আনত না। পাকিস্তান ডোনাল্ড ট্রাম্প সরকারের বিরুদ্ধে জোর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা সত্ত্বেও একটি কাজ করা থেকে তারা এখনও বিরত আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগান সরকার টিকিয়ে রাখার জন্য সেখানে যে সামরিক সরঞ্জাম পাঠায়, সেটা পাকিস্তানের মধ্য দিয়েই যায়। এই সরবরাহ রুট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আফগান যুদ্ধের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই রুট বন্ধ করলে কারজাই সরকারের পতন আরও ত্বরান্বিত হবে। পর্যবেক্ষকদের মত হলো- পাকিস্তান শেষ পর্যন্ত এ ক্ষেত্রে কী করবে, তার এখনও ঠিক নেই। তবে তারা যদি প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এই সুবিধা দেওয়া বন্ধ করে, তাহলে আফগানিস্তানে কারজাই সরকার তিন মাসের বেশি টিকবে না। তালেবানরা এর মধ্যেই ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হবে। পাকিস্তান ছাড়া অন্য যে পথে আফগানিস্তানে সামরিক সরঞ্জাম পাঠানো যায়, সেটা হলো উত্তরে তাজিকিস্তানের মধ্য দিয়ে; কিন্তু ভৌগোলিক কারণে তার অসুবিধা অনেক। কাজেই সে পথে এত বিশাল সামরিক সরঞ্জাম আফগানিস্তানে পাঠানো ভয়ানক অসুবিধার ব্যাপার। তাছাড়া তাজিকিস্তানের ওপর রাশিয়ার প্রভাব যথেষ্ট। রাশিয়ার সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে সম্পর্ক তাতে সে পথ রাশিয়া ইচ্ছা করলে বন্ধ করতে পারে। সে অবস্থায় আফগানিস্তানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সামরিক ভূমিকা আর থাকার কথা নয় এবং সে ভূমিকা না থাকলে সেখানে কারজাই সরকারের পতন এবং তালেবানদের প্রত্যাবর্তন অপ্রতিরোধ্য। ভারত সরকারকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে সামরিক হস্তক্ষেপের জন্য প্ররোচিত করলেও বাস্তব কারণে ভারতের পক্ষে এটা অসুবিধাজনক ও বিপজ্জনক। কাজেই আফগানিস্তানে ভারতের বড় ধরনের উপস্থিতি থাকলেও সেটা কারিগরি, প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক সাহায্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কাজেই কারজাই সরকারকে রক্ষা করা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে এখন আর সম্ভব নয়। সাম্রাজ্যবাদী প্রতিদ্বন্দ্বী সোভিয়েত ইউনিয়নকে আফগানিস্তান থেকে উৎখাতের উদ্দেশ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তালেবানদের সাহায্য-সহযোগিতা দিয়ে সামরিকভাবে শক্তিশালী করেছিল এবং শেষ পর্যন্ত সেখানে সোভিয়েত প্রভাবাধীন সরকার উৎখাত হয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তালেবানদের ক্ষমতায় বসিয়েছিল। কিন্তু পরে তালেবান নেতা মোল্লা ওমর তেলের পাইপলাইন আফগানিস্তানের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান হয়ে আরব সাগর পর্যন্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের হুকুম মেনে নিতে অস্বীকার করায় তারা পরস্পরের শত্রুতে পরিণত হয় এবং ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী মিত্রদের সহায়তায় আফগানিস্তানে তালেবান সরকার উৎখাত করে। ক্ষমতায় বসানো হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তাঁবেদার সরকার। কিন্তু বিশাল মার্কিন সামরিক ও অর্থনৈতিক সাহায্য সত্ত্বেও তালেবানরা একের পর এক সামরিক বিজয়ের মাধ্যমে এখন ক্ষমতার দোরগোড়ায়। শুধু কারজাই সরকার নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও এখন আফগানিস্তান থেকে উৎখাতের পথে। সেখানে তাদের অবস্থান রক্ষার কোনো সম্ভাবনাই আর নেই। এ প্রসঙ্গে বলা দরকার যে, আফগানিস্তান থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উৎখাত হওয়ার পরিস্থিতির একটা ইতিবাচক দিক হলেও আফগানিস্তানে আবার তালেবান শাসন ফিরে আসা সে দেশের জনগণের জীবনে কোনো সুখ, শান্তি নিয়ে আসা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। এর জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার সাম্রাজ্যবাদী মিত্রদের ছাড়া অন্য কাউকেই দায়ী করার প্রশ্ন ওঠে না।
সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

বলব না তো- পুনর্মূষিকোভব! by অজয় দাশগুপ্ত

নাসিরউদ্দিন হোজা প্রখর রসবোধের জন্য সুপরিচিত ছিলেন। যে কোনো পরিস্থিতি তিনি হাস্যকৌতুকে সামলে নিতে শুধু নয়, নিজের অনুকূলে নিয়ে আসতে পারতেন। একদিন এক লোক তাকে বলেন, হোজা সাহেব, এখানে আসার পথে দেখলাম কয়েকজন লোক অনেক সুস্বাদু খাবার নিয়ে যাচ্ছে। নাসিরউদ্দিন সাহেব উত্তর দিলেন, 'তাতে আমার কী?' ওই লোক তখন বিষয়টি খোলসা করে বললেন, 'তাদের আপনার বাড়ির দিকে আসতে দেখলাম।' নাসিরউদ্দিন সাহেব চটজলদি উত্তর দিলেন, 'তাতে আপনার কী লাভ?' ঠিকই তো, অন্য কারও বাড়িতে উপাদেয় সব খাবার গেলে নাসিরউদ্দিন হোজার কী লাভ এবং তার বাড়িতে এসব খাবার গেলে অন্যের কী লাভ? তবে দুনিয়ার সবকিছুর ফয়সালা তো এভাবে করা যায় না। নাসিরউদ্দিন সাহেব যদি এসব খাবার বিলিয়ে দেন, তাহলে অন্যদের লাভ হতেই পারে। আবার অন্যরা যদি ভালো খাবারগুলোর একটু অংশ তাকে দেয়, সেভাবে তিনিও লাভবান হতে পারেন। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর তালিকায় আর থাকছে না, স্থান হয়েছে উন্নয়নশীল দেশের সারিতে- এটা সুখবর। যে দেশটিকে জন্মলগ্নে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা হতো 'বাস্কেট কেস' হিসেবে, সেটিই কি-না এখন উন্নয়নশীল দেশ! কেউ কেউ নিজেকে নিয়ে রসিকতা করতে পারেন। আবার কেউ কেউ নিজেকে নিজের শক্তির তুলনায় খাটো দেখিয়ে, কিংবা ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করেও মজা পান। বিশ্বব্যাংক ও যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অর্থনীতির পণ্ডিত বলে দাবিদার ব্যক্তি আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের সময় বলেছিলেন, এ দেশটি বাস্কেট কেস, উন্নত দেশগুলোর দান-খয়রাতেই কেবল টিকে থাকতে পারে। জাস্ট ফালান্ড এবং কে আর পারকিনসন নামের দুই পণ্ডিত 'বাংলাদেশ :দি টেস্ট কেস অব ডেভেলপমেন্ট' নামের বইয়ে মন্তব্য করেছিলেন, যদি বাংলাদেশে উন্নয়ন হতে পারে, তাহলে বিশ্বের যে কোনো দেশে এটা হতে পারে। তারা বলেন, বিদেশি সাহায্য না পেলে অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যৌথ উদ্যোগেই কেবল বাংলাদেশ টিকে থাকতে ও উন্নত হতে পারে।আমরা স্কুলে শিক্ষকদের ঠাট্টা শুনেছি 'খারাপ' ছাত্রদের ব্যাপারে- 'ও পাস করলে চেয়ার-টেবিলও পাস করবে!' ফালান্ড-পারকিনসন সাহেবরা ঠিক এমনটিই বলতে চেয়েছেন। বাংলায় প্রবাদ আছে, শকুনের দোয়ায় গরু মরে না। জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি বা সিডিপি স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হওয়ার শর্ত ঠিক করেছে তিনটি- মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ সূচক ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক, এ তিনটির দুটি অর্জন হলেই চলবে। বাংলাদেশ তিনটি শর্তই পূরণ করেছে। কেবল ফালান্ড-পারকিনসনরাই যে বাংলাদেশের বদনাম করেছিলেন তা কিন্তু নয়। 'বাস্কেট কেস'-এর বাংলা এ দেশেরই কিছু লোক করেছিলেন 'তলাবিহীন ঝুড়ি'। আর সেটার অনুবাদ করা হয় 'বটমলেস বাস্কেট'। এভাবে বাস্কেট কেস পরিণত হয় বটমলেস বাস্কেটে। নিজেদের এভাবে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা হয়েছিল কিন্তু রাজনৈতিক কারণে। যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা চায়নি, তারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে অর্জিত বাংলাদেশকে ভিখারির দেশ, দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে তুলে ধরতে সচেষ্ট ছিল স্বাধীন দেশ হিসেবে যাত্রার শুরু থেকেই। তাতে অবশ্য কাঙ্ক্ষিত ফল মেলেনি। বাংলাদেশ কিন্তু এখন নিজের পায়ে ভালোই দাঁড়িয়ে গেছে। নিজের প্রয়োজনীয় খাদ্য নিজেই উৎপাদন করছে। ঘাটতি হলে নিজের অর্থে তা আমদানির মুরোদ রাখে। যমুনায় বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণে মোট ব্যয় ৮০ কোটি ডলারের প্রায় সবটা এসেছে বৈদেশিক ঋণ থেকে। কিন্তু পদ্মা সেতুর ৪০০ কোটি ডলারের সবটাই জোগান দেওয়া সম্ভব হচ্ছে আমাদের নিজস্ব ভাণ্ডার থেকে। প্রকৃত অর্থেই আমরা বলতে পারি পদ্মা সেতু একটি চেতনার নাম, পরনির্ভরতা থেকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পথে বলিষ্ঠ পদক্ষেপের নাম।আমাদের অন্তর্নিহিত শক্তিই ১৯৭১ সালে প্রবল পরাক্রমশালী পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীকে পরাজিত করতে পেরেছে। মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই একটি নিরস্ত্র জাতি নিজেদের সশস্ত্র করে তুলতে পারবে, সেটা পাকিস্তান কিংবা সে সময়ে তাদের অস্ত্র-অর্থ জোগানদাতা যুক্তরাষ্ট্র ধারণা করতে পারেনি। তারা বলেছে, দেশটিতে খাদ্য ঘাটতি প্রবল, নারীরা অবগুণ্ঠনবতী এবং চার দেয়ালে প্রায় বন্দি থাকে। শিক্ষায় পিছিয়ে থাকা দেশটিতে কুসংস্কার-কূপমণ্ডূকতার দাপট। এমন একটি দেশের প্রায় ৪০ লাখ নারী গ্রাম থেকে শহরে এসে কোনো ট্রেনিং ছাড়াই পোশাক শিল্পের হাল ধরবে, সেটা তারা ভাবতে পারেনি। আমাদের ছায়াঢাকা সবুজ-শ্যামল গ্রামের কৃষক পরিবারের লাখ লাখ তরুণ মধ্যপ্রাচ্যের মরু এলাকায় কাজ নিয়ে যাবে এবং দেশে প্রতি বছর বিপুল অর্থ পাঠাবে, সেটাও উন্নত বিশ্বের পণ্ডিতদের চিন্তায় আসেনি। তারা কি এটাও ভাবতে পেরেছিলেন যে স্বাধীনতার চার দশক পার হতে না হতেই প্রায় পাঁচ কোটি ছাত্রছাত্রী স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে? প্রকৃতই আমরা বড় বড় অর্জন করেছি। কিন্তু একইসঙ্গে অনেক প্রশ্ন দেশের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসবে- 'তাতে আমার কী?' বাংলাদেশ অসীম সম্ভাবনাময়- এটা এখন অনেক পণ্ডিত মানছেন। এ দেশ উপচে পড়ছে কাজ করার মতো শক্তি-সামর্থ্য-বুদ্ধি রাখে, এমন অনেক অনেক মানুষে। তাদের অনেকের বাড়তি যোগ্যতা- ইংরেজি ভাষা জানে। ভুল বা অশুদ্ধ ইংরেজি অনেকে বলে, অনেকের উচ্চারণ ঠিক নয়- কিন্তু কাজ চালিয়ে নিতে তাতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। বিশ্বের বহু দেশে দেখা যায়, আমাদের চেয়েও দুর্বল ইংরেজি জ্ঞান নিয়ে চলতে সমস্যা হয় না। কিন্তু কাজ বা চাকরি তো পেতে হবে তাদের? মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কিংবা উন্নত বিশ্বে দক্ষ লোকের যথেষ্ট চাহিদা আছে। উন্নত বিশ্বে এখন 'তারুণ্যের বড় অভাব'। বয়স্ক লোক বেশি। অথচ বাংলাদেশের চিত্র ভিন্ন- ১৫ থেকে ৬০ বছরের নিচের নারী-পুরুষ বেশি।
এটা দেশের বড় সম্পদ। উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে পারলে বিশ্বের নানা দেশেও তারা যোগ্যতার প্রমাণ রাখতে পারবে। কিন্তু দেশে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর চাকরির যে বড় অভাব! গত বছর অক্টোবরে সংবাদপত্রে একটি প্রতিবেদন ছিল এভাবে- 'ব্যাংকে সাত হাজার পদে আবেদন ১০ লাখ ৮৪ হাজার'। গত ২ মার্চ একটি দৈনিকের খবর - 'মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ৯ শূন্য পদে ৭৮ হাজার আবেদন'। ৩৮তম বিসিএসের জন্য ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৪৬৮ জন প্রার্থী আবেদন করেছেন। তাদের জন্য পদ রয়েছে মাত্র ২ হাজার ২৪টি। এসব আবেদনকারীর বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের সনদ রয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই। আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, উদ্যোক্তা এবং অন্য যারা দেশ ও দশের স্বার্থ নিয়ে ভাবেন, তাদের বেকারত্ব দূর করার পথ নিয়ে ভাবতে হবে। উন্নয়নশীল দেশের সারিতে বসার কারণে আমাদের মর্যাদা বিশ্বে বাড়বে, তাতে সন্দেহ নেই। ভিখারির দেশে বিনিয়োগ করতে অনেকে দ্বিধাগ্রস্ত থাকে। এটা ভালো দিক। কিন্তু গরিব বা স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে আমরা কিছু দান-খয়রাত পেতাম সেটা বন্ধ হবে বা সীমিত হবে। এখন অনেক উন্নত দেশ আমাদের পণ্যের ওপর আমদানি শুল্ক্ক আরোপ করে না। এ সুবিধা ক্রমে বন্ধ হয়ে যাবে। এর অর্থ হচ্ছে বিশ্বে আমাদের জন্য পরিস্থিতি প্রতিকূূল হতে পারে। তখন কেউ কি আকুল হয়ে বলবে- 'পুনর্মূষিকোভব!' অর্থাৎ ফের যেন বাংলাদেশ গরিব দেশ হয়ে যায়। এটা বলার প্রশ্ন আসে না। ১৯৭১ সালে আমরা বীরের মতো লড়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছি। পরের বছরগুলোতে আমরা নিজের পায়ে দাঁড়াতে পেরেছি। সামনে বিশ্ববাজারে যে প্রতিযোগিতা তার সঙ্গে পাল্লা দিতে আমাদের দক্ষতা বাড়াতে হবে। এ জন্য একটি শর্ত হচ্ছে মানসম্পন্ন শিক্ষা। প্রশ্ন ফাঁসের সুযোগ নিয়ে কিংবা নকল করে পাস করে লাভ নেই। আমাদের শিক্ষার প্রসার ঘটেছে। এটা বড় অর্জন। এখন মান বাড়াতেই হবে। আমাদের গড় আয়ু বাড়ছে। এটাও বড় অর্জন। তবে কেবল আয়ু বাড়া নয়, প্রতিটি শিশু-কিশোর-কিশোরী যেন সুস্থ-সবল হয়ে বেড়ে ওঠে, সেটা নিশ্চিত করা চাই। আমরা আর কম সুদে এবং অনেক লম্বা সময় ধরে পরিশোধের শর্তে বিশ্বব্যাংক বা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক থেকে ঋণ পাব না। এখন ঋণ নিলে সুদ বেশি গুনতে হবে। তাড়াতাড়ি শোধ দিতে হবে। বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি পথ খোলা- ঋণ গ্রহণ কমিয়ে দেওয়া কিংবা যে ঋণ নেব, সেটা ভালোভাবে কাজে লাগানো। শেষের কাজটি করার জন্য দুর্নীতি কমানো অপরিহার্য। ঋণ নিয়ে ঘি খাওয়ার দিন যে শেষ। সঠিক পথে চলতে হলে এখন অবশ্যই সুশাসনের প্রতি নজর দিতে হবে। দেশের ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে মেরে দেওয়া কিংবা অন্য দেশ বা সংস্থা থেকে ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ- এসব যতটা কমানো যায় ততই মঙ্গল। এতে ব্যর্থ হলে কিন্তু অনেকেই বলতে শুরু করবে- উন্নয়নশীল দেশের তকমা লেগেছে তো আমার কী!
ajoydg@gmail.com

বিশ্বে বাংলাদেশের নতুন পরিচয়, নতুন দিগন্ত by ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম

বাংলাদেশের জন্য একটি আনন্দের উপলক্ষ এসেছে। দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটেছে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বের হয়ে আসার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি-সিডিপি। তারা জানিয়েছে, বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বের হয়ে আসার সব শর্ত পূরণ করেছে। কয়েক দিক থেকে এ বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ। এখন আর বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত ৪৭ দেশের তালিকায় নেই। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ হচ্ছে এমন একটি দেশ, যার জিডিপি স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় থাকা সব দেশের জিডিপির ১৯ শতাংশ, বাণিজ্যের ১৭ দশমিক ৭ শতাংশ এবং লোকসংখ্যা ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। এ ধরনের একটি দেশের এই উত্তরণ বৈশ্বিকভাবে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আরও একটি বিষয় মনে রাখা চাই, বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যারা উত্তরণের সব শর্ত পূরণ করে তালিকা থেকে বের হচ্ছে- মাথাপিছু জাতীয় আয়, অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা ও মানবসম্পদ সূচক। একই সঙ্গে লাওস এবং মিয়ানমারও এ তালিকা থেকে বের হয়ে যাচ্ছে বলে সিডিপি জানিয়েছে। আমাদের এই উত্তরণ অবশ্যই জাতীয় মর্যাদার বিষয়। বিশ্বে আমরা বহুকাল দরিদ্র দেশ হিসেবে বিবেচিত হয়েছি। এভাবেই আমাদের পরিচয়। এখন তা থেকে বের হয়ে যাচ্ছি। স্বভাবতই সমকাতারের দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের নতুন সম্পর্ক গড়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি হবে। এতদিন যেসব আন্তর্জাতিক সংস্থা ও উন্নয়নশীল দেশ বাংলাদেশকে সহযোগী দেশ হিসেবে বিবেচনা করেনি; বিনিয়োগ করতে দ্বিধা করেছে, তারা বাংলাদেশের নতুন পরিচয়ের কারণে নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলার কথা ভাববে। বাংলাদেশের ভাবমূর্তিতে পরিবর্তন আনবে। ঝুঁকির যে রেটিং তাদের পরিবর্তন আসবে। বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাববে। ঋণপ্রাপ্তির জন্য সহজে বিবেচনা পাবে। এতদিন আমরা স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় ছিলাম। অনেক বিনিয়োগকারী দেশ ও সংস্থা বিনিয়োগে ঝুঁকি বোধ করত। বাণিজ্যিক ঋণপ্রাপ্তিতেও সমস্যা দেখা যেত। নতুন পরিচয় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। তবে মনে রাখতে হবে, আনুষ্ঠানিক উত্তরণের ঘোষণা আসবে ২০২৪ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে। আগামী ছয়টি বছর সেখানে আমাদের বর্তমান পরিচয় বহাল থাকবে। আমাদের আগে যে চারটি দেশের স্বল্পোন্নত পরিচয় থেকে উত্তরণ ঘটেছে, তাদের অভিজ্ঞতা নিশ্চয় আমাদের মনে রাখতে হবে। সিপিডির গবেষণায় দেখা গেছে, ওইসব দেশের সামগ্রিকভাবে জাতীয় আয়, ঋণপ্রাপ্তির শতকরা পরিমাণ, রেমিট্যান্সের পরিমাণ প্রভৃতি সূচক উত্তরণের আগের তুলনায় পরের সময়ে শ্নথ হয়েছে কিংবা কমে গেছে।
মোদ্দা কথা, পরবর্তী সময়ে কতক ক্ষেত্রে এক ধরনের চাপে পড়েছে তারা। আমরা মালদ্বীপ, ভানুয়াতু, কেপভার্দে ও বতসোয়ানার কথা বলতে পারি। তাদের অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, বাংলাদেশের উত্তরণ মসৃণ হবে না। তবে মনে রাখতে হবে, ওইসব দেশের তুলনায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামোয় পার্থক্য রয়েছে। আর সেখানেই বাংলাদেশের শক্তি নিহিত। ওই চারটি দেশ আয়তনে ছোট, তারা দ্বীপরাষ্ট্র, ভূ-পরিবেষ্টিত, স্বল্প পণ্যের ওপর প্রবল নির্ভরতা, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দুর্বল সম্পর্ক। এসব সীমাবদ্ধতা নিয়েই তাদের উত্তরণ ঘটেছিল। সে তুলনায় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতের আকার ও বিস্তৃতি যথেষ্ট। কমবেশি ভারসাম্যও রয়েছে। তবে রফতানি পণ্যে প্রধানত তৈরি পোশাকের ওপর রয়েছে ব্যাপক নির্ভরতা। কৃষিতে শস্য উৎপাদন ভালো। তবে সব সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। উন্নয়নশীল দেশের সারিতে দৃঢ় অবস্থান করে নিতে এসব ক্ষেত্রে কাঠামোগত পরিবর্তন জরুরি। বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে বাজার সুবিধা। শুল্ক্কমুক্ত সুবিধার বাজারের কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, চীন, জাপান, ভারত, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি দেশে আমাদের রফতানি বেড়েছে। এ কারণে নারীদের কর্মসংস্থান হয়েছে। রফতানি বাণিজ্যে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হচ্ছে। দারিদ্র্য হ্রাস পাচ্ছে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বের হলে শুল্ক্কমুক্ত সুবিধা কমবে বা থাকবে না। উদাহরণ হিসেবে আমরা ইউরোপীয় ইউনিয়নের কথা বলতে পারি। সেখানে অস্ত্র ছাড়া সবকিছু আমরা বিনা শুল্ক্কে রফতানি করতে পারি। ওই অঞ্চলে রয়েছে আমাদের বড় বাজার- মোট রফতানির ৬২ শতাংশ। স্বল্পোন্নত দেশ না থাকলে নতুন শর্তে সুবিধা পেতে হবে, যাকে বলা হয় জিএসপি কিংবা জিএসপি প্লাস। এ জন্য আমাদের নতুন করে আবেদন করতে হবে। তারা হয়তো সীমিত সংখ্যক পণ্যে সুবিধা দেবে। তার জন্যও কয়েকটি আন্তর্জাতিক কনভেনশন পূরণে বাধ্যবাধকতা থাকবে, যেমন শ্রম-সংক্রান্ত আইএলও কনভেনশন, পরিবেশ মানদণ্ড-সংক্রান্ত কনভেনশন, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট ও ইনটেলেকচুয়াল কনভেনশন, দুর্নীতি দমন কনভেনশন। এটা নিশ্চিত, এখনকার মতো শর্তহীন বাজার সুবিধা ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকবে না। ভারত, কানাডা প্রভৃতি দেশেও সমস্যা হবে। দ্বিতীয়ত গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ওষুধ। বাংলাদেশ ব্যতিক্রমী স্বল্পোন্নত দেশের সারিতে থাকা দেশ, যার রয়েছে শক্তিশালী ওষুধ শিল্প খাত। আমরা জেনেরিক ওষুধ উৎপাদনে সক্ষম। কিন্তু এ জন্য মূল কোম্পানিকে রয়ালটি দিতে হয় না। ফলে উৎপাদন ব্যয় কম থাকে, দেশের বাজারে দামও সঙ্গত কারণে কম পড়ে। এই ইনটেলেকচুয়াল সুবিধা ২০৩৩ সাল পর্যন্ত বহাল থাকার কথা। কিন্তু ২০২৪ সালে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় উত্তরণ ঘটলে জেনেরিক ওষুধ উৎপাদনে মূল কোম্পানিকে রয়ালটি দেওয়ার প্রশ্ন আসবে। এর প্রভাব পড়বে উৎপাদন ব্যয়ে। দেশ-বিদেশের বাজারেও দেখা যাবে বিরূপ প্রতিক্রিয়া। বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা তীব্র হবে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে ঋণপ্রাপ্তি। স্বল্পোন্নত দেশ হওয়ার কারণে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান থেকে ১ শতাংশেরও কম সুদে আমরা ঋণ পাই। এর পরিশোধের মেয়াদ ৪০ বছর, আরও আছে ১০ বছর গ্রেস। বাণিজ্যিক সুদের হার বেশি, কখনও কখনও ৩-৫ শতাংশ, গ্রেস থাকে না, পরিশোধের মেয়াদ হয়ে থাকে অর্ধেক। ফলে ঋণের সুদের হারজনিত দায়-দেনা বাড়ার কথা। এনজিও খাতের জন্যও সমস্যা হবে। অনেক নিম্নআয়ের লোক থাকায় পাশ্চাত্যের বিভিন্ন সংস্থা থেকে সহায়তা মেলে। গবেষণা, আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য ফি কম বা মওকুফ, বিভিন্ন সংস্থার বার্ষিক চাঁদা- এসব সুবিধা নতুন প্রেক্ষাপটে বর্তমানের মতো থাকার কথা নয়। মোট কথা, উত্তরণ পর্বটি মসৃণ হবে না।
এ কারণে বাধাগুলোকে এখন থেকেই গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে। এ জন্য চাই দীর্ঘমেয়াদি কৌশল প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়ন। প্রথমেই নজর দিতে হবে বাজার সুবিধার প্রতি। বাজার সুবিধা যেন অব্যাহত থাকে, সে জন্য অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা চালাতে হবে। কানাডা, জাপান, ভারত, চীন- এসব দেশ থাকবে নজরে। দ্বিতীয় হচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। তাদের কাছ থেকে আমাদের প্রধান প্রধান পণ্যে জিএসপি ও জিএসপি প্লাস সুবিধা চাই। রফতানি বহুমুখী করতে হলে এটা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় পর্যায়ে এফটিএ উদ্যোগ নিতে হবে। ইতিমধ্যে শ্রীলংকার সঙ্গে এ ধরনের উদ্যোগ রয়েছে। মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড প্রভৃতি দেশের সঙ্গেও একই ধরনের উদ্যোগ চাই। চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত প্রভৃতি দেশের সঙ্গে সমন্বিত অর্থনৈতিক সহযোগিতার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। স্বল্প হার সুদে ঋণ সুবিধা পেতে সমস্যা হলে মিশ্র হারের কথা ভাবতে হবে। এর ফলে সুদজনিত ব্যয় কম রাখা সম্ভব হবে। পাশাপাশি খুঁজতে হবে নতুন ঋণের উৎস। এশিয়ান অবকাঠামো ব্যাংক, ব্রিকস ব্যাংক ও অন্যান্য সংস্থার প্রতি আমাদের মনোযোগ বাড়াতে হবে। বিনিয়োগ সম্প্রসারণও গুরুত্বপূর্ণ। দেশি ও বিদেশি সব ধরনের বিনিয়োগ আমাদের বাড়াতে হবে। নতুন যে প্রতিযোগিতায় পড়তে হবে, তার মোকাবেলায় এর বিকল্প নেই। কৃষি, শিল্প, মানবসম্পদ- সব ক্ষেত্রে চাই আরও বিনিয়োগ। আমাদের বড় সমস্যা হচ্ছে নিম্ন উৎপাদনশীলতা। সামগ্রিক অর্থনীতিতে এ সমস্যা আছে, বিভিন্ন খাতেও আছে। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে যে নতুন ধরনের প্রতিযোগিতায় পড়তে হবে, তাতে টিকতে হলে এ নিয়ে এখনই ভাবতে হবে। দক্ষতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। তরুণ ও নারী শ্রমিকদের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। অর্থনীতির বহুমুখীকরণও গুরুত্বপূর্ণ। কৃষিতে শুধু শস্যের ওপর নির্ভরতা নয়। সবজি, ফল, মাছ, গবাদি পশু; যেসব খাত থেকে বেশি আয়ের সুযোগ রয়েছে সেগুলোর প্রতি বাড়তি নজর দিতে হবে। কৃষিভিত্তিক শিল্পও গুরুত্ব্বপূর্ণ। ওষুধ. ইলেকট্রনিক্স, চামড়া, জাহাজ প্রভৃতি শিল্প খাতের সম্ভাবনা যথেষ্ট। রফতানি বহুমুখী করতে হলে আমাদের বাজারের পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের প্রতিও নজর দিতে হবে। যেসব উদ্যোক্তা নিজের চেষ্টায় বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন করছেন কিংবা একক পণ্যের জন্য বাজার সুবিধা সৃষ্টি করেছেন, তাদের প্রতি সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। বলা যায়, শুধু খাতভিত্তিক নয়; ব্যক্তিভিত্তিক পরিকল্পনাও থাকা চাই। এনজিও খাতও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সামাজিক খাতের উন্নয়নে অনেক সংস্থা এতদিন ভালো ভূমিকা রেখেছে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ ঘটলে অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা আফ্রিকার যেসব দেশে দারিদ্র্য বেশি সেখানে চলে যেতে চাইবে। যেহেতু এ খাতে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমবে তাই ট্রাস্ট তহবিল গঠনের কথা ভাবতে হবে। সরকার ইতিমধ্যে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে, যারা উত্তরণ পর্যায়ের যাবতীয় কাজ মনিটর করবে এবং প্রয়োজনে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেবে। এ কমিটিতে উদ্যোক্তা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করার কথা ভাবা যায়। আমরা চাই স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ যতটা সম্ভব মসৃণ হোক এবং এ জন্য সম্ভাব্য সবকিছুই করতে হবে।
গবেষণা পরিচালক, সেন্টার ফর
পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)

মুক্তিদাতাকে নিয়ে কিছু স্মৃতিকথা by আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

আজ ১৭ মার্চ। 'ফাউন্ডিং ফাদার অব বাংলাদেশ' (বাংলাদেশের স্থপতি) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯৯তম জন্মদিন। ২০২০ সালে তার জন্মশতবার্ষিকী পালিত হবে। আমার প্রয়াত সাহিত্যিক বন্ধু সৈয়দ শামসুল হক দুরারোগ্য ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর শেষ ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, 'আমি বঙ্গবন্ধুর জন্মবার্ষিকীর উৎসব দেখে তার পরে মরতে চাই।' তার ইচ্ছা পূর্ণ হয়নি। আমিও নানা রোগে  জর্জরিত অবস্থায় টেনেটুনে জীবনটাকে ২০২০ সাল পর্যন্ত নিয়ে যেতে চাই। আমারও ইচ্ছা পূর্ণ হবে কিনা জানি না। যদিও না হয় বাংলার মানুষ যে বিরাট সম্মান, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা দিয়ে দিনটি স্মরণ করবে, তাতে সন্দেহ নেই। আমার জীবনের পরম গর্ব আমি বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্য ও স্নেহ পেয়েছিলাম। আমার জীবনের পরম গৌরব, বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে আমিই প্রথম তার ছোট জীবনী পুস্তিকা লিখি। যেটি (ইংরেজি অনুবাদ) ১৯৭৩ সালে আলজিয়ার্সে জোটনিরপেক্ষ শীর্ষ সম্মেলনে বিশ্ব নেতাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। আবার তার মৃত্যুর পর (যখন তার নাম উচ্চারণও বাংলাদেশে নিষিদ্ধ) তাকে নিয়ে লেখা সর্বপ্রথম একটি বই (ইংরেজি) লন্ডন থেকে প্রকাশ করেছিলাম। এখন তো বঙ্গবন্ধুর ওপর বইয়ের ছড়াছড়ি। কিন্তু বিনীতভাবে এই গর্বটাও প্রকাশ করতে পারি যে, সেই দুর্দিনে বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ওপর আমিই প্রথম বই প্রকাশ ('ইতিহাসের রক্ত পলাশ') এবং প্রথম ছায়াছবি 'পলাশী থেকে ধানমণ্ডি' তৈরি করেছি। এ জন্য বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী গোষ্ঠী এবং বিএনপি ও জামায়াতের কাছ থেকে যে হুমকির সম্মুখীন হয়েছি, তার সীমা-সংখ্যা নেই। নিজের গৌরবগাথা প্রচারের জন্য এই লেখাটা লিখছি না। লিখছি এ জন্য যে, বঙ্গবন্ধু আমার কাছ থেকে যা আশা করছিলেন, তার সবটা পূরণ করতে না পারলেও কিছু যে করতে পেরেছি, তা বলার জন্য। আজ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কোনো সিরিয়াস আলোচনায় যাচ্ছি না। এটা আমার ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ, তার জন্মদিনে শ্রদ্ধা নিবেদন; তাই ব্যক্তিগত স্মৃতির কিছু কথা আজ লিখছি। সম্ভবত ১৯৭৩ সালের কথা। সন্ধ্যার দিকে বঙ্গবন্ধু পুরনো গণভবনের দোতলায় বিরাট কনফারেন্স রুমটাতে বসে আছেন। আমি সেখানে গিয়ে দেখি, তিনি ঘরোয়া বৈঠকে ব্যস্ত। সেখানে শেখ ফজলুল হক মনি, বদরুন্নেসা আহমদ, কাদের সিদ্দিকীসহ আরও অনেকে আছেন। বঙ্গবন্ধু বললেন, দেশে দুর্নীতিবাজরা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চাইছে। আমার চারদিকেও চাটার দল এসে জুটেছে। এদের আমি শক্ত হাতে দমন করতে চাই। দুর্ভাগ্যের কথা কি জান, এই দুর্নীতি বেশি করছে শিক্ষিত এবং ভদ্রলোকেরাই। আমি এদের সম্পর্কে একটা কবিতা লিখেছি। তোমরা শুনবে? বলেই তিনি তার পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে পড়তে শুরু করলেন। কয়েক লাইন শুনেই বুঝলাম, রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত 'বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে' কবিতাটির প্যারোডি এই কবিতা। তবে ভাষা ও ছন্দের গরমিল আছে। এখানে ভাষা ও ছন্দটাই বড় কথা নয়, বড় কথা, বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য। কবিতার প্রথম দুটি লাইন হলো- 'আমার বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে/বাংলার ভদ্রলোকেরা শুধু চুরি করে, পোটলা বাঁধে।' বেশ দীর্ঘ কবিতা, বঙ্গবন্ধু পাঠ শেষ করলে অনেকেই জিজ্ঞেস করলেন, 'কবিতাটি আপনি কী করবেন?' বঙ্গবন্ধু বললেন, 'তোমাদের কাছেই রেখে যাব। আমার মৃত্যুর পর মানুষ জানবে, এ দেশের একশ্রেণির শিক্ষিত ভদ্রলোকের চুরি, দুর্নীতির ঠেলায় আমি পর্যন্ত বেসামাল হয়ে পড়েছিলাম।' অনেকেই 'কবিতাটা আমাকে দিন' বলে বঙ্গবন্ধুর দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে বদরুন্নেসা আহমদ, শেখ মনি, এমনকি কাদের সিদ্দিকীও ছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাদের দিকে চেয়ে বললেন, 'না, এটা তোমাদের দেব না। গাফ্‌ফারকে দেব। সে এটাকে কাজে লাগাতে পারবে। আমার মৃত্যুর পর নিন্দুকেরা অসত্য প্রচার চালালে গাফ্‌ফার উপযুক্ত জবাব দেবে।' এরপরই তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র সমর্পণ সম্পর্কে কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন। কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গে ছিল একগাদা ফটোগ্রাফ। কাদেরিয়া বাহিনীর অস্ত্র সমর্পণের ছবি, কাদের সিদ্দিকী বঙ্গবন্ধুর সামনে নতজানু হয়ে অস্ত্র রাখছেন, তার ছবিও ছিল। বঙ্গবন্ধু খুশি হয়ে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। বঙ্গবন্ধুকে বলা হয় লৌহকঠিন হৃদয়ের অধিকারী মানুষ। কিন্তু তিনি যে কতটা স্নেহ-কোমল হৃদয়ের অধিকারী মানুষ ছিলেন, তার প্রমাণ বহুবার পেয়েছি। ১৯৫৩-৫৪ সাল। তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে প্রাদেশিক নির্বাচনের জোর প্রস্তুতি চলছে। প্রাদেশিক মুসলিম লীগ সরকারের মুখ্যমন্ত্রী তখন নূরুল আমীন। তার সরকারের অত্যাচারে সাধারণ মানুষ জর্জরিত। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য হক-ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়েছে। নূরুল আমীনকেও পরাজিত করা তখন যুক্তফ্রন্টের লক্ষ্য। ঠিক হলো, নূরুল আমীনের নির্বাচনী কেন্দ্র নান্দাইলে হক, ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দী এই তিন নেতাই পরপর নির্বাচনী প্রচারে যাবেন এবং যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী ছাত্রনেতা খালেক নওয়াজ খানকে সমর্থন দেবেন। নেতাদের সঙ্গে ছাত্র সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরাও যাবেন। একটি ছাত্র-প্রতিনিধি দলে আমিও সদস্য  হয়ে নান্দাইলে গিয়েছিলাম। তখন আমি ঢাকা কলেজের ছাত্র। নান্দাইলে প্রথম গেলেন শেরেবাংলা ফজলুল হক। একটি জিপের আরোহী ছিলেন তিনি। সঙ্গে অন্যান্য গাড়িতে তার দলবলের লোকেরা। নান্দাইলে পৌঁছার আগেই একটি পাহাড়িয়া এলাকা। হক সাহেবের গাড়িবহর সেই এলাকায় পৌঁছতেই মুসলিম লীগের গুণ্ডারা পাহাড়ের ওপর থেকে বিরাট মাটির চাক নিচে গড়িয়ে দেয়।
ওই মাটির চাক হক সাহেবের বা অন্য কোনো গাড়িতে পড়লে যাত্রীদের মৃত্যু ছিল অবধারিত। ভাগ্যক্রমে শক্ত মাটির চাকটি কোনো গাড়ির মাথায় না পড়ে দু-একটা গাড়ির পাশ ছুঁইয়ে রাস্তায় পড়ে। তাতে সাত-আটজন সামান্য আহত হয়। পরের সপ্তাহে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নান্দাইলে যাওয়ার কথা। সকলেই তাকে সতর্ক করলেন। তিনি যেন ট্রেনে বা অন্য পথে নান্দাইলে যান। তাহলে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কম। শহীদ সাহেব তাদের কথা শুনলেন না। বললেন, তিনি ওই পথেই জিপ গাড়িতে চড়ে হক সাহেবের মতো নান্দাইলে যাবেন। শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ভাবশিষ্য তখনকার যুবনেতা শেখ মুজিব বললেন, তিনি কিছু ছাত্র ভলান্টিয়ার নিয়ে সোহরাওয়ার্দীর গাড়ির অনুগামী হবেন। এই ভলান্টিয়ারদের মধ্যে আমাকেও তিনি যুক্ত করলেন। আমি তখন ছাত্র; কিন্তু ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত নই। শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নান্দাইল যাত্রায় কোনো বিঘ্ন ঘটেনি। তাকে থাকতে দেওয়া হলো যুক্তফ্রন্টের এক স্থানীয় নেতার বাসায়। ছাত্র ভলান্টিয়ারদের সঙ্গে আমাদের আশ্রয় একটি ডাকবাংলোর মতো বাড়িতে। সম্ভবত ডাকবাংলোটা এখন সঠিকভাবে মনে নেই। শেখ মুজিবের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে; কিন্তু তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, আমাদের সঙ্গে থাকবেন। লম্বা টানা হলের মতো কক্ষ। তাতে চার-পাঁচজনের থাকার মতো চার-পাঁচটি চৌকি পাতা। তার ওপর বিছানা। মুজিব ভাই আমাদের সঙ্গে একই রুমে। খাওয়া-দাওয়ার শেষে আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ার পর বুঝলাম, নান্দাইলের মশা কত হিংস্র। কিন্তু কোনো বিছানাতেই মশারি নেই। কেবল মুজিব ভাইকে (তখন আমরা কেউ তাকে লিডার, কেউ কেউ মুজিব ভাই সম্বোধন করতাম) একটা কাঁথা দেওয়া হয়েছে; যেটা গায়ে চাপালে মশা আক্রমণ করতে পারবে না। রাতে ঘুমানোর কোনো সুযোগ ছিল না। তবু মশা তাড়াচ্ছি, মশা মারছি- এই অবস্থায় চোখে তন্দ্রা এসে গিয়েছিল। হঠাৎ ঘুম ভেঙে জেগে উঠতেই দেখি, আমার গায়ে একটি কাঁথা। মুজিব ভাই অদূরেই শুয়ে আছেন। তার গায়ে কাঁথা নেই। অর্থাৎ তার গায়ের কাঁথাটি তিনি আমার শরীরে চাপিয়ে দিয়ে গেছেন। আমি তন্দ্রার ঘোরে টের পাইনি। আমি কাঁথাটি তাকে ফিরিয়ে দিতে গেলে তিনি বাধা দিলেন। বললেন, 'ওটা গায়ে দিয়ে ঘুমাও। ভোর হতে বেশি দেরি নেই। আমার জন্য ভেবো না। বাংলার মশা আমাকে কামড়াবে না।' আজ সুদীর্ঘকাল পর বিদেশে বসে সেই রাতের কথা স্মরণ করছি আর ভাবছি, যে মানুষটি বলেছিলেন, বাংলার মশা আমাকে কামড়াবে না, সেই মানুষটিকে বাংলার একদল মানুষরূপী পশুই সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। আরেকদিনের স্মৃতি। ১৯৭৪ সাল। বাংলাদেশে অকাল বর্ষা ও প্লাবনের ফলে বিস্তীর্ণ এলাকা ডুবে গেছে। শস্য, গবাদিপশু ধ্বংস হয়েছে। এই অবস্থার সুযোগ নিয়ে আমেরিকা বাংলাদেশের সঙ্গে খাদ্য সরবরাহ চুক্তি করেও যথাসময়ে খাদ্যবাহী জাহাজ বাংলাদেশে পাঠায়নি। মুজিব সরকারের পতন ঘটানোই ছিল উদ্দেশ্য। এই দুর্ভিক্ষে বহু নর-নারী মারা  যায়। শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর সরকার এই দুর্ভিক্ষের মোকাবেলা করে। এ সময় একদিন গণভবনে গেছি। তিনি শোবার ঘরে বিছানায় শুয়েছিলেন। এ কথা-সে কথার পর বললেন, 'গাফ্‌ফার তুমি বিশ্বাস করবে, এই দুর্ভিক্ষ ঠেকাতে না পারলে আমি আত্মহত্যা করব ভেবেছিলাম। করিনি কেন জান? আমি একজন মুসলমান। আত্মহত্যা করা ইসলাম ধর্মে মহাপাপ। দ্বিতীয়ত, বাংলার মানুষের আমার প্রতি বিশ্বাস আছে। আমি তাদের অসহায় অবস্থায় ফেলে রেখে বিশ্বাসহন্তার কাজ করতে পারি না।' কত বছর আগের কথা, তবু তার এই কথাগুলো এখনও কানে বাজে। চোখে অশ্রু দেখা দেয়। আরেক দিন তিনি আমাকে ইংরেজিতে বলেছিলেন- ও ঐধাব পৎবধঃবফ ধ যরংঃড়ৎু. ও ধিহঃ :ড় ংবব রঃং ংঁপপবংং. ওভ ও ভধরষ ও রিষষ মড় :ড় ড়নষরারড়হ ভড়ৎ ধ ষড়হম :রসব. (আমি একটি ইতিহাস সৃষ্টি করেছি। এর সাফল্য দেখে যেতে চাই। যদি ব্যর্থ হই, তাহলে দীর্ঘদিনের জন্য বিস্মৃতির আড়ালে চলে যাব)। বঙ্গবন্ধু বিস্মৃতির আড়ালে যাননি। তাকে বিস্মৃতির আড়ালে ঠেলে দেওয়ার বহু চেষ্টা হয়েছিল। এই মহানায়কের স্থলাভিষিক্ত করার চেষ্টা হয়েছিল এক খলনায়ককে। সেই শঠতা ও চক্রান্ত ব্যর্থ হয়েছে। ইতিহাস বঙ্গবন্ধুর কপালে রক্ততিলক পরিয়েছে। তা চিরদিনের। প্রতি জন্মদিনে তিনি নতুন করে জন্ম নেন বাঙালির হৃদয়ে।