Tuesday, January 14, 2020

বাঁশের কলমে হাতে লেখা কোরআন শরিফ by আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ

হামিদুজ্জামানের বাঁশের কলম
হামিদুজ্জামান পবিত্র কোরআন শরিফ লিখেছিলেন বাঁশের কলম দিয়ে। এর ওজন প্রায় ৬১ কেজি। পৃষ্ঠাসংখ্যা ১ হাজার ১০০। হামিদুজ্জামানের বাড়ি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার পশ্চিম বামনাইল (ঝিকরাপাড়া) গ্রামে। কোরআন শরিফখানা বর্তমানে ঢাকার ইসলামিক ফাউন্ডেশনের গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত রয়েছে।
হামিদুজ্জামান তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ ও বিন্যাসকরণ বিভাগের এলডিসি (লোয়ার ডিভিশনাল ক্লার্ক) হিসেবে করাচিতে কর্মরত ছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে বাংলাদেশ সরকারের চাকরি পান। চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে দুই বছর চাকরি করেছেন।
হামিদুজ্জামানের জন্ম ১৯৪৪ সালের ১১ জানুয়ারি। মারা গেছেন ২০০৭ সালের ১৬ জানুয়ারি। তিনি ঢাকা বোর্ড থেকে এসএসসি, করাচি থেকে এইচএসসি ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিকম পাস করেন। তাঁর দুই ছেলে এ কে এইচ এম মোফাসসিরুজ্জামান (৪৮) ও নওরিনুজ্জামান (৪৬) স্নাতক পর্যন্ত পড়াশোনা করে এখন গ্রামে কৃষিকাজ করেন। মেয়ে সাইকা শারমিনের (৩৫) বিয়ে হয়েছে। তাঁর স্ত্রী রাশিয়া বেগম (৬৫) সন্তানদের সঙ্গে থাকেন।
চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর ১৯৮২ সালে তিনি এই কোরআন শরিফ লেখা শুরু করেন। আট বছরে তিনি ১ হাজার ১০০ পৃষ্ঠার কোরআন শরিফ লিখে শেষ করেন। আর্ট পেপারে লিখতেন বাঁশের কড়ি কলম দিয়ে।
গত ২৭ মে সোমবার তাঁর গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, হামিদুজ্জামানের পরিবারের লোকজন তাঁর ব্যবহৃত জিনিসপত্র যত্নসহকারে তুলে রেখেছেন। যে কলম দিয়ে তিনি লিখতেন, সেই কলমও পাওয়া গেল ১৬টি। কোরআন শরিফের কয়েকটি পাতা তিনি আলাদা করে লিখেছিলেন। ছেলেরা সেই পাতাগুলো অবিকল সেভাবেই রেখে দিয়েছেন। হামিদুজ্জামান এই কোরআন শরিফের বর্ণনা দিয়ে মুসলিম দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতের কাছে চিঠি পাঠিয়েছিলেন। তার একটি করে ফটোকপিও রেখে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া দেশের প্রধানমন্ত্রীসহ বিভিন্ন দপ্তরে যেসব চিঠি পাঠিয়েছেন, সব কটির অনুলিপি রেখে দেওয়া হয়েছে।
নওরিনুজ্জামান বললেন, বাবা লেখার জন্য ব্যবহার করতেন গুডলাক ও ক্যামেল ব্র্যান্ডের কালি। দোয়াতে কলম ডুবিয়ে লিখতেন। লেখার আগে তাঁরা দুই ভাই মিলে দাগ টেনে দিতেন। একবারে ১০ পৃষ্ঠা করে লিখতেন। যখন লিখতে বসতেন, তখন ঘরে কাউকে ঢুকতে দিতেন না। সাত-আট ঘণ্টা পর্যন্ত লিখতেন। ১৯৯০ সালে ঢাকার গোপীবাগ লেনের একটি দোকানে ৩২ হাজার টাকা দিয়ে হাতে লেখা কোরআন শরিফ বাঁধাই করেন। এটি বাঁধাই করতে দুটি গরুর চামড়া ব্যবহার করা হয়েছে। বাঁধাই শেষে কোরআন শরিফের দৈর্ঘ্য দাঁড়িয়েছে ২৯ ইঞ্চি, প্রস্থ ২৩ ইঞ্চি ও উচ্চতা ৯ ইঞ্চি। তিনি বলেন, এই কোরআন শরিফ বাঁধাই করতে গিয়ে তাঁরা অনেক কষ্ট করেছেন। বাবার সঙ্গে রাতের পর রাত ওই বাঁধাইয়ের দোকানেই ঘুমিয়েছেন।
১৯৯২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে তিনি পবিত্র এই গ্রন্থখানি দেখাতে নিয়ে যান। সেই সময় তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি আবেদনপত্রও দিয়েছিলেন। তিনি তাঁকে তিন অথবা চার সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি করে কোরআন শরিফখানার নির্ভুলতা নির্ণয় করা, ঢাকায় এর প্রদর্শনীর আয়োজন করা, যেখানে সব মুসলিম দেশের কূটনীতিকদের আমন্ত্রণ জানান, মুসলিম দেশগুলোর প্রধান শহরে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা এবং প্রদর্শনী শেষে সরকারের পক্ষ থেকে কোরআন শরিফখানা সৌদি আরব অথবা ব্রুনেইয়ের বাদশাহকে উপঢৌকন হিসেবে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে অনুরোধ করেছিলেন।
হামিদুজ্জামানের ইচ্ছাগুলোর একটি শুধু পূরণ হয়েছে। গ্রন্থখানার নির্ভুলতা নির্ণয় করার জন্য ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে দেওয়া হয়। তাদের একটি কমিটি ২০০৭ সালে কিছু সংশোধনের জন্য হামিদুজ্জামানকে ডাকে। মাত্র তিন দিনেই হামিদুজ্জামান তা সংশোধন করে দেন। তারপর আর এই পবিত্র গ্রন্থখানা হামিদুজ্জামানের ইচ্ছা অনুযায়ী কাউকে উপঢৌকন হিসেবে পাঠানো হয়নি। বাইরে প্রদর্শনীরও ব্যবস্থা করা হয়নি। তাঁকে ফেরতও দেওয়া হয়নি।
হামিদুজ্জামান স্বপ্ন দেখেছিলেন প্রদর্শনী বা উপঢৌকন পাঠানো হলে সেখান থেকে অর্থ আসবে। তা দিয়ে তিনি কোরআন, হাদিস ও বিজ্ঞানের সমন্বয়ে একটি ইনস্টিটিউশন গড়ে তুলবেন। তাঁর এ স্বপ্ন পূরণ না হওয়ায় পরবর্তী সময়ে তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে তাঁর হাতের লেখা কোরআন শরিফখানা ফেরত চেয়ে আবেদন করেন। প্রত্যুত্তরে ২০০৪ সালের ৩ জানুয়ারি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তৎকালীন মহাপরিচালকের পক্ষে গ্রন্থাগারিক মুহাম্মাদ শামসুল হক লিখেছেন,
‘এখন এটি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সম্পত্তি।’
হামিদুজ্জামানের স্ত্রী রাশিয়া বেগম বলেন, ঢাকায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনে তিনি কোরআন শরিফখানা দেখতে গিয়ে মর্মাহত হয়েছেন। তাঁর দাবি, পবিত্র এই গ্রন্থখানা অনেকটা অযত্নে রাখা হয়েছে। যদিও পলিথিন দিয়ে মুড়িয়ে রাখা হয়েছে, তবু অনেক পৃষ্ঠাই জোড়া লেগে গেছে। পাতাগুলোর উজ্জ্বলতা কমে এসেছে। এভাবে রাখলে পাতাগুলো নষ্ট হয়ে যাবে।
বাঁশের কলমে কোরআন শরিফ লিখছেন হামিদুজ্জামান। ছবি: হামিদুজ্জামানের পারিবারিক অ্যালবাম

খোঁজ মিলল নতুন প্রজাতির হিংস্র ডাইনোসরের

দক্ষিণ ব্রাজিলের ছোট্ট শহর ক্রুজেরিও দো ওয়েস্ট। আজ থেকে প্রায় ৯ কোটি বছর আগে সেখানেই মরুভূমিতে দাপিয়ে বেড়াত হিংস্র মাংসাশী ডাইনোসর। ব্রাজিলের এই ছোট্ট শহরে মাটির নিচে সম্পূর্ণ এক নতুন প্রজাতির ডাইনোসরের জীবাশ্মের সন্ধান পেলেন বিজ্ঞানীরা।
জীবাশ্মের নমুনা থেকে প্যালেন্টোলজিস্টরা এই ডাইনোসরের কেমন ছিল তার একটা ধারণা করেছেন। নতুন প্রজাতির এই ডাইনোসর দুই পায়ে চলাফেরা করত।
বিজ্ঞানীদের মতে, থেরোপড নামে ডাইনোসরদের এক মাংসাশী গ্রুপের অন্তর্গত ছিল এই ডাইনোসর। 'জুরাসিক পার্ক' সিনেমার হিংস্র ছোট আকৃতির ডাইনোসর ভেলোসিরাপ্টর ও সেই একই গ্রুপের অন্তর্গত। নতুন প্রজাতির এই ডাইনোসরের নাম রাখা হয়েছে 'ভেসপারসরাস প্যারান্যায়েনসিস।'
ব্রাজিলের পারানা রাজ্যের এই অংশে ডাইনোসরের জীবাশ্মের খোঁজ পাওয়া অবশ্য প্রথম নয়। এর আগে ১৯৭০ সালে ক্রুজেও দো ওয়েস্ট শহরে কিছু ডাইনোসরের পায়ের ছাপ পাওয়া গিয়েছিল। সেই সময়েই এটিকে কোনও অজানা প্রজাতির ডাইনোসর বলে আন্দাজ করতে পেরেছিলেন বিশেষজ্ঞরা। তার জন্য বেশ কিছু বছর ধরে শহরের আশেপাশের বিভিন্ন অংশে চলছিল খননকার্য।
শহরের ডাইনোসর মিউজিয়ামের বিশেষজ্ঞ পাওলো মানজিগ জানান, প্রায় ৫০ বছরের খোঁজের পর অবশেষে সন্ধান পাওয়া গেল এই নতুন প্রজাতির।
পারানা রাজ্যের উত্তর-পূর্ব অংশে গাছপালা ঘেরা সবুজ শহর ক্রুজেরিও ডু ওয়েস্টে। তবে প্রায় ৯ কোটি বছর আগে এই অংশটিতে ছিল রূক্ষ শুষ্ক মরুভূমি। সেই মরুভূমিতেই বসবাস করত এই ডাইনোসর।
বিজ্ঞানীদের মতে, প্রায় ৫ ফুট লম্বা ছিল এই ডাইনোসর। আপাতত, ডাইনোসরটির সম্পর্কে আরও তথ্য জানাতে চাইছেন ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার বিজ্ঞানীরা। ব্রাজিলের বিভিন্ন অংশে এই ধরনের আরও ফসিলের খোঁজ করছেন তারা। জিনিউজ

এরশাদকে ছেড়ে গেছেন ঘনিষ্ঠরা

১৯৮২ সালে ক্ষমতায় বসার চার বছর পর জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি জাতীয় ফ্রন্টের ধানমন্ডির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে ‘জাতীয় পার্টি’ (জাপা) গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়। পাঁচটি শরিক দল এক হয়ে এর আত্মপ্রকাশ ঘটে। এর চার বছর পর ’৯০ সালে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন এরশাদ। এর মধ্য দিয়ে অবসান ঘটে ‘এরশাদ যুগে’র।
তবে ’৯১ সালে দেশে আবারও সংসদীয় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা চালু হওয়ার পর রাজনীতিতে গুরুত্ব বাড়তে থাকে তার। বৃহৎ দুটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ভোটের রাজনৈতিক সমীকরণে জড়িয়ে যান তিনি। অবশ্য এই জোট-রাজনীতিতে সাবেক এই রাষ্ট্রপতি হারিয়েছেন দলের অনেক জ্যেষ্ঠ নেতাকে, নিজের একসময়ের ঘনিষ্ঠ সহকর্মীদের। যাদের মন্ত্রী বানিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই ‘সুযোগ-সুবিধা’র প্রশ্নে পক্ষ ত্যাগ করেছেন।
জাতীয় পার্টির নেতাদের দল পরিবর্তনের প্রসঙ্গে এরশাদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মুহাম্মদ ইসহাক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, কেএম ওবায়দুর রহমান, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনসহ অনেকেই এরশাদ সাহেবকে ত্যাগ করে অন্য দলে ভিড়েছেন।’
প্রবীণ এই রাজনীতিক বলেন, ‘তবে যারা দল ত্যাগ করেছেন, তাদের বেশিরভাগই বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। অনেকে জিয়াউর রহমানের হাত ধরে বিএনপিতে ছিলেন, পরে ক্ষমতা পরিবর্তনের কারণে জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়েছিলেন।’
দল পরিবর্তন ঘটে সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য মন্তব্য করে মাওলানা ইসহাক বলেন, ‘আমাকে এরশাদ সাহেব অনেকবার বলেছেন, কিন্তু আমি যাইনি।’ তার দাবি, সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য তিনি রাজনীতি করেন না।
তথ্যানুসন্ধানে দেখা গেছে, ১৯৮৮ সালে এরশাদ সরকারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। তিনি শিল্প মন্ত্রণালয়ও দেখভাল করেছেন। এখন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য তিনি। ২০০১ সালে জোট সরকারে আইনমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাকালীন মহাসচিব প্রফেসর এমএ মতিন বিএনপি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। এরশাদ সরকারের উপপ্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমেদ পরে নতুন জাতীয় পার্টি গঠন করেন। তবে তিনি অন্য কোনও দলে যোগ দেননি।
’৮৮ সালে এরশাদ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন। বর্তমানে তিনি বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান।
জেপি’র আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ছিলেন এরশাদ সরকারের যোগাযোগমন্ত্রী। বর্তমানে তিনি মহাজোটে আছেন। গত আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় মেয়াদে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য ছিলেন।
১৯৮৬ সালে নবগঠিত জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। মহাসচিব নিযুক্ত হন অধ্যাপক এমএ মতিন। ৬০১ সদস্যের জাতীয় কমিটি গঠিত হয়। ৫৭ সদস্যের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সচিব হন সাংবাদিক আনোয়ার জাহিদ। পরে তিনি ১৯৯৯ সালে ৪ দলীয় জোট গঠনে ভূমিকা রাখেন এবং বিএনপিতে সক্রিয় হন।
এরশাদ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। আওয়ামী লীগ ’৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে তাকে স্পিকার নির্বাচিত করে।
জাপার দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠাকালে ফ্রন্টের শরিক দল জনদল, ইউপিপি, গণতান্ত্রিক পার্টি, বিএনপি (শাহ) এবং মুসলিম লীগ (সা) নিজেদের অস্তিত্ব বিলুপ্ত ঘোষণা করে জাতীয় পার্টিতে একীভূত হয়। পরে ১৯৮৫ সালের ১৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতি এরশাদের নীতি ও আদর্শ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার নিয়ে জাতীয় ফ্রন্ট গঠিত হয়। রাজনৈতিক দলের বাইরেও অনেক বরেণ্য ব্যক্তিত্ব ও নেতা এই ফ্রন্টে যোগ দিয়েছিলেন। পার্টি গঠনের ঘোষণার দিনে তারাও জাতীয় পার্টিতে যোগ করেন।
জাতীয় পার্টি গঠনের দিন ২১ সদস্যের প্রেসিডিয়াম, ৫৭ সদস্যের জাতীয় নির্বাহী কমিটিসহ ৬০১ সদস্যের জাতীয় নির্বাহী কমিটির ঘোষণা দেওয়া হয়। ২১ সদস্যের প্রেসিডিয়ামের মধ্যে ১৮ জনের নাম ঘোষণা করা হয়। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিজানুর রহমান চৌধুরী (আসেন আওয়ামী লীগ থেকে), মওদুদ আহমদ (আসেন বিএনপি থেকে, পরে আবার জাপা ছেড়ে বিএনপি), কাজী জাফর আহমেদ (পৃথক দল), সিরাজুল হোসেন খান, রিয়াজউদ্দিন আহমেদ ভোলা মিয়া, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী (বিএনপিতে যোগ দেন), আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ও হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী।
এরশাদ সরকারের ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ছিলেন মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাছ। বর্তমানে তিনি জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের (একাংশ) চেয়ারম্যান। দল পরিবর্তনের বিষয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘অন্যরা কেন দল ত্যাগ করেছে সেই বিষয়ে তো আমি সঠিক বলতে পারবো না। ১৯৮৬ থেকে ’৯০ সাল পর্যন্ত আমি এরশাদের সঙ্গে ছিলাম। আমি স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে জয়ী হওয়ার পরে জাতীয় পার্টিতে যোগদান করি। কিন্তু আমার মূল দল ছিল জমিয়তে ইসলাম। পরে আমি আবার সেই দলে ফিরে আসি। এরশাদ সাহেব আমাকে যথেষ্ট ভালো জানতেন।’
জাতীয় পার্টিতে যোগদান করার দিনে এরশাদ তাকে ২ লাখ টাকা দিতে চেয়েছিলেন বলে দাবি করেন মুফতি ওয়াক্কাছ। তিনি বলেন, ‘কিন্তু আমি বলেছি টাকা নেবো না। আমরা এলাকার উন্নয়ন দরকার। ফলে যোগদানের দিন আমি ২ লাখ টাকা নিইনি।’ ব্যক্তিগতভাবে এরশাদের অনেক কিছু থাকলেও বাংলাদেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে তার অনেক অবদান আছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

প্রকৌশলী থেকে জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট

মিসরে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রথম ও একমাত্র প্রেসিডেন্ট ড. মোহাম্মদ মুরসি মৃত্যুবরণ করেছেন। ৬৭ বছর বয়সী সাবেক এই প্রেসিডেন্ট সোমবার দেশটির আদালতে শুনানি চলাকালে এজলাসেই মৃত্যুবরণ করেন। মিসরের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত প্রথম বৈধ প্রেসিডেন্ট ছিলেন তিনি।
মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট ড. মোহাম্মদ মুরসির পুরো নাম মোহাম্মদ মুরসি ইসা আল-আইয়াত। তিনি ১৯৫১ সালের ২০ আগস্ট মিসরের শারকিয়া প্রদেশের আল-আদওয়াহ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন কৃষক ও মা ছিলেন গৃহিনী। স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষাগ্রহণ করার পর নিজের মেধার জোরে ১৯৭৫ সালে মোহাম্মদ মুরসি কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং (প্রকৌশল) বিষয়ে স্নাতক পড়া শুরু করেন। কায়রো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে স্নাতক ডিগ্রী সম্পন্ন করেন তিনি। এরপর ১৯৭৮ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন তিনি।
ছাত্রজীবনে তিনি এতই মেধাবী ও সম্ভাবনাময় ছিলেন যে পিএইচডি ডিগ্রী অর্জনের জন্য তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে তৎকালীন সময়ের সর্বোচ্চ স্কলারশিপ নিয়ে ভর্তি হন এবং অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে তিনি ১৯৮২ সালে পিএচডি ডিগ্রী লাভ করেন।
এরপর তিনি কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদানের মধ্য দিয়ে তার কর্মজীবন শুরু করেন। পরে সাউথ ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়সহ ১৯৮২-৮৫ সাল পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। পরে তিনি নাসায় কাজ করার সুযোগ পান এবং সেখানে তিনি সুনামের সাথে স্পেস শাটল ইঞ্জিন উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
কিন্তু পরে নিজ দেশের মায়ায় মার্কির যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে ১৯৮৫ সালে নিজ জন্মভূমি শারকিয়া প্রদেশের জাগাজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসেবে যোগদানের উদ্দেশে মিসর ফিরে আসেন। তিনি শিক্ষকতার পাশাপাশি ১৯৮৫ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত জাগাজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্বপালন করেন।
এরমধ্যে ২০০০ সালে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মুরসি। সে সময় রাজনৈতিকভাবে রাষ্ট্র কর্তৃক মুসলিম ব্রাদারহুড নিষিদ্ধ থাকায় মোহাম্মদ মুরসি মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্য হলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেই নির্বাচনে অংশ নেন এবং নির্বাচিত হন।
পরে ২০১১ সালে মুসলিম ব্রাদারহুডের আদলে ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি (এফজেপি) গঠন করে পার্টির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন মুরসি। ২০১২ সালে মিসরে দুই পর্বে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। উভয়পর্বে সর্বমোট ৫২ শতাংশ ভোট পেয়ে মিসরের ইতিহাসে প্রথমবারের মত গণতান্তিকভাবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন ড. মোহাম্মদ মুরসি।
তিনি ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি (এফজেপি) থেকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেও নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তাকে জয়ী ঘোষণার পর মুসলিম ব্রাদারহুড ও এফজেপি থেকে মোহাম্মদ মুরসিকে অব্যাহতি দিয়ে মিসরের সর্বস্তরের মানুষের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
তবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসার একবছরের মাথায় ২০১৩ সালে অন্যায়ভাবে ড. মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করে মিসরের সেনবাহিনী। আর এই কাজে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সেনাপ্রধান এবং বর্তমান প্রেসিডেন্ট আবদুল ফাত্তাহ আল সিসি।
পশ্চিমাবিশ্বের সহায়তায় প্রেসিডেন্টের পদ ক্ষমতাচ্যুত করার পর আটক ও প্রহসনমূলক বিচারের মুখোমুখি করা হয় ড. মোহাম্মদ মুরসিকে। সেই প্রহসনের বিচারে মুরসিকে একপর্যায়ে মৃত্যুদণ্ডও দেয়া হয়। পরবর্তীতে তার মৃত্যুদণ্ডাদেশ বাতিল করে কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।

পৌষ সংক্রান্তি ও পুরান ঢাকার সাকরাইন উৎসব by শফিক রহমান

পৌষসংক্রান্তি বাঙালি সংস্কৃতিসহ উপমহাদেশে একটি বিশেষ উৎসবের দিন। বাংলা বর্ষপঞ্জির নবম মাস ‘পৌষ’-এর শেষ দিন এই উৎসব পালন করা হয়। তবে উৎসবটি পুরান ঢাকায় সাকরাইন নামে পরিচিত। দিনটি উদযাপনে নানা আয়োজনের মধ্যে আকর্ষনীয় পর্ব দিনভর ঘুড়ি উড়ানো। পশ্চিম ভারতের গুজরাট রাজ্যে দিনটিতে সূর্য দেবতার কাছে নিজেদের ইচ্ছা বা আকূতিকে পৌঁছাতে পালন করা হয় ঘুড়ি উৎসব।
১৭৪০ সালে ঢাকার নবাব নাজিম নওয়াজেস মোহাম্মদ খাঁনের উদ্যেগে ঢাকায় ঘুড়ি উড়ানোর প্রচলন শুরু হয়। আজও উৎসবের দিনে আকাশ ছেয়ে যায় বাহারি রঙ্গে ঘুড়িতে। চলে সুতায় সুতায় কাটাকাটি।
সন্ধ্যায় শুরু হয় মুখে কেরোসিন নিয়ে আগুনে ফু দিয়ে আকাশে অগ্নিকুণ্ড তৈরির খেলা (ফায়ার ব্রিদ), আতশবাজির মেলা আর ফানুস উড়ানো। হালে যোগ হয়েছে লেজার লাইটের আঁকি-বুকি। এভাবে বিদায় জানানো হয় পৌষ মাসকে।
পঞ্জিকার হিসাব মতে গত ১৪ জানুয়ারি ছিল পৌষ সংক্রান্তি। নাটাই, ঘুড়ি আর আতশবাজির কেনাবেচা, সুতোয় কাচের গুড়া ও রং দিয়ে ‘মাঞ্জা’ দেয়া এবং খাবারের আয়োজনের প্রায় ১ মাসের প্রস্তুতি শেষে ওই দিন সকালে পুরান ঢাকার সব কিশোর-যুবক যোগ দেয় ঘুড়ি উড়ানোর উৎসবে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গেণ্ডারিয়া, মুরগীটোলা, ধুপখোলা, দয়াগঞ্জ, যাত্রাবাড়ী, সূত্রাপুর, কাগজিটোলা, বাংলাবাজার, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, কলকতাবাজার, ধোলাই খাল, নারিন্দা ও সদরঘাট এলাকার পুরো আকাশ ছেয়ে যায় ঘুড়িতে।
আগে এ উৎসবটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে পুরান ঢাকায় সাড়ম্বরে পালিত হয়। উৎসবে অংশ নেন সব ধর্মের সব বয়সী মানুষ। সাকরাইন পরিণত হয়েছে পুরান ঢাকায় বসবাসকারী সকল মানুষের উৎসবে। এখন সাকরাইনে অংশ নিতে নতুন ঢাকাসহ নানা এলাকা থেকে মানুষ পুরান ঢাকায় হাজির হয়। আসেন অনেক বিদেশি পর্যটকও।
আমরা যখন পৌঁছালাম তখন বিকাল ৩টা। কিন্তু ঘুড়ি, সুতা ও নাটাইয়ের দোকানে তখনও ভিড়। পাড়া মহল্লার গলিতে গলিতে কিশোর-যুবকরা ছুটছে ঘুড়ি নিয়ে। ছাদে ছাদে তখন বাগট্টা বয়েজ ক্লাব (ঘুড়ির সুতা কেটে দিলে পুরান ঢাকায় বাগট্টা বলা হয়), কাইট বয়েজ ক্লাব, সুতা ক্লাব, রঙ সুতা ক্লাবসহ নানা নামের কিশোর ক্লাবের প্রস্তুতি শেষ। এর মধ্যেই ২/৩টি ছাদ পেড়িয়ে আমাদের ঠাঁই হয় সূত্রাপুরের কাগজিটোলার ‘রুটলেস ক্লাবের’ আয়োজনে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই কিশোরদের এ আয়োজনে যুক্ত হন শিশু থেকে বয়স্ক পুরুষ-মহিলা সবাই। সন্ধ্যায় মাগরিবের নামাজের সামান্য বিরতির পরেই এছাদ-ওছাদের আলোর ঝলকানি, আতশবাজির আলোর বিচ্ছুরণ, রঙিন ফানুস আর লেজার লাইটের আঁকি-বুকিতে ঝলমল করে ওঠে পুরান ঢাকার আকাশ। সঙ্গে চলে কান ফাটা আওয়াজের গান-সঙ্গীত।
তবে সাকরাইন উদযাপনের চলমান এ রীতিতে আপত্তি পুরনোদের। তারা বলেন, এ পদ্ধতিতে ছাদে ছাদে বন্ধুবান্ধবদের দলের টাকা তুলে লাখ লাখ টাকার বাহারি আয়োজনে উদযাপন জমজমাট হচ্ছে কিন্তু হারিয়ে গেছে শৈল্পিক নৈপূন্য।। আগে ঘুড়ি-নাটাই প্রত্যেকে হাতে বানাতো। থাকতো ঢাউস ‘ল্যাঞ্জার’ ঘুড়ি (ঘুড়ির লেজকে পুরান ঢাকায় বলে ল্যাঞ্জা)। একই পদ্ধতিতে সুতায় হাতে মাঞ্জা মারা হতো। আর ঘরে ঘরে বানানো হতো পিঠা বিশেষ করে পাটিসাপটা, দুধ চিতই, মালপোয়া, ক্ষীর পুলি। সঙ্গে থাকতো নলেন গুড়ের পায়েশ। কিন্তু এখন এসবকিছু নেই। জায়গাটি দখল করেছে কারখানায় তৈরি বাণিজ্যিক পণ্য।
তারপরও মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসব ঈদ, হিন্দুদের পুজা, খ্রিস্টানদের বড় দিন আর শিয়া মুসলিমদের আশুরাসহ সব উৎসবেরই উদযাপন মাটির সংস্পর্শে। কিন্তু পৌষসংক্রান্তি বা সাকরাইন উদযাপনে ঢাকাইয়ারা উঠে যায় ওপরে, উদযাপন করে খোলা আকাশের নিচে। বিউটি আর ভাইবরেন্সিতে এই একটি দিনে তারা যেন জানান দেন, ‘ঢাকাইয়ারা আলাদা’।
এশিয়ার অন্যান্য দেশেও বর্ণিল আয়োজনে উৎসবটি পালিত হয়। নেপালে দিবসটি ‘মাঘি’, থাইল্যান্ডে ‘সংক্রান’, লাওসে ‘পি মা লাও’ নামে পরিচিত। এছাড়া মিয়ানমারে ‘থিং ইয়ান’, কম্বোডিয়ায় ‘মহাসংক্রান’ এবং পশ্চিমবঙ্গে মকরসংক্রান্তি নামে উদযাপিত হয়।
এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে মকরসংক্রান্তিতে নতুন ফসলের উৎসব ‘পৌষ পার্বণ’ উদযাপিত হয়। নতুন ধানের চাল, খেজুরের গুড় এবং পাটালি দিয়ে বিভিন্ন ধরনের ঐতিহ্যবাহী পিঠা তৈরি করা হয়।
ফসলের উৎসব বা ‘পৌষ পার্বণ’ ছাড়াও ভারতীয় সংস্কৃতিতে এটি ‘উত্তরায়ণের সূচনা’ হিসেবে পরিচিত। একে অশুভ সময়ের শেষ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই দিনে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার সাগরদ্বীপে কপিল মুনির আশ্রমকে কেন্দ্র করে পুণ্যস্নান ও মেলা অনুষ্ঠিত হয়। আর বীরভূমের কেন্দুলী গ্রামে দিনটিকে ঘিরে হয় জয়দেব মেলা।
গুজরাটে গুড় দিয়ে তৈরি তিলের লাড্ডু এই উৎসবের অন্যতম উপাদেয় খাবার। মহারাষ্ট্রে একে বলা হয় ‘তিলগুল’। কর্ণাটকে একে বলা হয় ‘ইল্লু বিল্লা’।
ভারতীয় জ্যোতিষ শাস্ত্রে ‘মকরসংক্রান্তি’র অর্থ-নিজ কক্ষপথ থেকে সূর্যের মকর রাশিতে প্রবেশকে বোঝানো হয়।