Tuesday, December 15, 2015

বিএনপি তামাশা আর সরকার বেঈমানি করছে : সিপিবি-বাসদ

সিপিবি ও বাস নেতৃবৃন্দ বলেছেন, বিএনপি যেমন বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে জাতির সাথে তামাশা করেছে ঠিক তেমনি আওয়ামী লীগ সরকারও স্বাধীনতার চেতনা-মূল্যবোধ বিসর্জন দিয়ে লাখো শহীদ, মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে বেঈমানি করছে।
মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে সিপিবি এবং বাসদের উদ্যোগে আয়োজিত আলোচনা সভায় নেতৃবৃন্দ সিিিপবি-বাসদ নেতৃবৃন্দ এসব কথা বলেন।
নেতৃবৃন্দ আরো বলেন, স্বাধীনতার সুফল চলে যাচ্ছে লুটেরাদের ঘরে। ফসলের যৎসামান্য পৌঁছাচ্ছে সাধারণ মানুষের ঘরে। ফলে বৈষম্য-শোষণ বঞ্চনা। দিনের পর দিন সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা ও রুটি-রুজির নিশ্চয়তা আরো বেশী করে হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। সাধারণ মানুষের ভাত-কাপড়ের ব্যবস্থা না হলে স্বাধীনতা ‘ষোল আনা ফাঁকি’ হয়ে উঠবে। দেশকে মুক্তিযুদ্ধের পথে ফিরিয়ে আনার জন্য দেশের কমিউনিস্ট ও বামপন্থীদেরকেই দায়িত্ব নিতে হবে।
নেতৃবৃন্দ বলেন, স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরেও দেখা যাচ্ছে যে, চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতি তথা জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতার সম্বলিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-ধারা আজ ভুলুণ্ঠিত। বুর্জোয়ারা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে অবহেলায় পরিত্যাগ করছে। মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক বিজয়ের ৪৪ বছর পরেও দেশের শ্রমিক, কৃষক, মধ্যবিত্ত সাধারণ মানুষ তার সুফল ভোগ করতে পারে নাই। তারা বলেন, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার জন্য দেশবাসীর দীর্ঘ সংগ্রামের পরিণতি ছিল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। গণতান্ত্রিক-অসাম্প্রদায়িকতার পথ থেকে দেশকে বিচ্যুত করা হয়েছে। ‘উন্নয়ন আগে, গণতন্ত্র পরে’- এরূপ তত্ত্ব দিয়ে গণতন্ত্র হরণ করা হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠায় আন্তরিকার অভাবের সুযোগ নিয়ে উগ্র ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসী শক্তি উন্মত্ত ষড়যন্ত্রের খেলায় মেতে উঠেছে।
মঙ্গলবার বিকালে মুক্তিভবনের মৈত্রী মিলনায়তনে সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের সভাপতিত্ব করেন। বিজয় দিবসে সিপিবি-বাসদ-এর আলোচনা সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বাসদ সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান, সিপিবি’র কেন্দ্রীয় কমিটির উপদেষ্টা মনজুরুল আহসান খান। সভা পরিচালনা করেন বাসদ’র কেন্দ্রীয় নেতা বজলুর রশীদ ফিরোজ।

একই অনুষ্ঠানে একসঙ্গে দুই বোনকে বিয়ে!

বিয়ের আসরে দুই স্ত্রীর সঙ্গে আজহার। ছবি : পারহলো ডটকম
একই দিনে দুই বিয়ে এবং দুই বোনকেই একসঙ্গে বিয়ে! ব্যতিক্রমী এই ঘটনাটি ঘটিয়ে আলোচনায় এসেছেন পাকিস্তানের মুলতানের তরুণ আজহার হায়দরি। দুই কনের একজন আবার তাঁর চাচাতো বোন, অন্যজন খালাতো বোন।
পাকিস্তানের এই ব্যতিক্রমী বিয়ে বিষয়ে একটি ‘ভাইরাল’ ভিডিও নিয়ে খবর প্রকাশ করেছে দেশটির সংবাদমাধ্যম পারহলো ডটকম। তাদের মতে, আজহার হায়দরি এখন ‘হিরো নাম্বার ওয়ান’।
সংবাদমাধ্যমটির খবর অনুযায়ী, পাকিস্তানের সমাজব্যবস্থায় পরিবারের পছন্দে বিয়ে করাটাই রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু ছেলের যদি অন্য কোনো পছন্দ থাকে তখনই দেখা দেয় বিপত্তি। এমনই এক পারিবারিক সংকটে পড়েছিলেন আজহার।
২৩ বছর বয়সী আজহারের বিয়ের জন্য পাত্রী ঠিক করে রেখেছিল তাঁর পরিবার। ২৮ বছর বয়সী পাত্রী হুমায়রা কাসিম তাঁর চেনা-পরিচিতই। সম্পর্কে আজহারের চাচাতো বোন। এদিকে আজহারের আবার তাঁর ২১ বছর বয়সী খালাতো বোন রুমানা আসলামের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক।
এই অবস্থায় আজহার প্রথমে হুমায়রাকে বিয়ে করতে রাজি হননি। কিন্তু তাঁর বাবা এরই মধ্যে কথা দিয়ে ফেলেছেন হুমায়রার বাবাকে। এ অবস্থায় পারিবারিক সম্মানের কথা মাথায় রেখে বিয়েতে রাজি হতে হয় তাঁকে। কিন্তু ওই বিয়েতে বাধা হয়ে দাঁড়ান প্রেমিকা রুমানা।
বিয়ের আগে বার্তা সংস্থা এপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আজহার জানান, রুমানা প্রথমে বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন তাঁর (আজহারের) পরিবারের কাছে। পরিবার এতে রাজি না হওয়ায় ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন তিনি। হাসপাতালে রুমানাকে দেখতে গিয়ে আজহার সিদ্ধান্ত নেন, কিছুতেই রুমানার সঙ্গে প্রতারণা করবেন না। এ কথা আবার নিজের পরিবারকে জানাতেই অসুস্থ হয়ে পড়েন আজহারের বাবা শামসুল হায়দরি। আজহার তখন উভয় সংকটে।
এমন সংকট কাটাতে আজহার পরিবারকে জানালেন, তাঁদের পছন্দের পাত্রী এবং নিজের পছন্দের প্রেমিকা দুজনকেই বিয়ে করবেন তিনি। বিষয়টি নিয়ে আইনজীবী ও মসজিদের ইমামের সঙ্গেও কথা বলেন তিনি।
আজহার জানান, ইসলাম ধর্মের বিধান অনুযায়ী এবং পাকিস্তানের আইনেও বহুবিয়ে বৈধ। ফলে আইনগত দিক থেকেও এমন বিয়েতে কোনো বাধা নেই। এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর গত নভেম্বরের শেষদিকের এক বিকেলে হুমায়রা ও রুমানা দুজনকেই আলাদাভাবে একই স্থানে ডেকে পাঠান আজহার।
বার্তা সংস্থা এপিকে আজহার জানান, তাঁরা (হুমায়রা ও রুমানা) কেউই জানতেন না, অপরজনও আসছেন। রেস্তোরাঁয় একজন আরেকজনকে দেখে খুব অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। কারণ তাঁরা ততদিনে একে অপরের সম্পর্কে খুব ভালো করে জানতেন। আজহার বলেন, ‘দেখা হওয়ার পর আমি দুজনকেই বিয়ের প্রস্তাব দিই এবং আমার সমস্যার কথা খুলে বলি। এরপর আমার প্রস্তাবে রাজি হয় দুজনই।’
আজহারের দুই স্ত্রীই এপির সাংবাদিকের কাছে অকপটে স্বীকার করেছেন, সবদিক থেকে আজহারের সিদ্ধান্তটিই ছিল সবচেয়ে ভালো সমাধান। কারণ পরিবারকে সন্তুষ্ট রাখতে এটি ছাড়া তখন আর করার কিছুই ছিল না তাঁর। সংবাদমাধ্যমের কাছে রুমানা ও হুমায়রা দুজনেই জানিয়েছেন, তাঁরা দুই বোন বন্ধুর মতো বাকি জীবনটা একসঙ্গে কাটানোর পরিকল্পনা করছেন।
এদিকে পারহলো ডটকম জানিয়েছে, গত বুধবার আজহারের সঙ্গে রুমানা ও হুমায়রা দুজনেরই বিয়ে হয়েছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত দুই স্ত্রীকে নিয়ে ভালোই আছেন পাকিস্তানের ‘হিরো নাম্বার ওয়ান’।

শরণার্থীরা কাউকে গুলি করে মারে না

কয়েক সপ্তাহ ধরে মার্কিন রাজনীতিকেরা সিরিয়ার শরণার্থীদের সঙ্গে আগত বিপদ নিয়ে অনেক ফোঁস ফোঁস করছেন, যদিও গত ১২ বছরে যুক্তরাষ্ট্রের একজন মানুষও শরণার্থীদের সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হয়নি। গত কয়েক সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুকধারীদের হামলায় দুই হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। এসব হামলার মধ্যে স্যান বার্নার্দিনোর হামলা ও কলোরাডো স্প্রিংয়ের প্ল্যানড প্যারেন্টহুড ক্লিনিকে হামলা ছিল সবচেয়ে নাটকীয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে দৈনিক গড়ে প্রায় ৯২ জন ব্যক্তি বন্দুকের গুলিতে মারা যায়, যার মধ্যে আবার আত্মহত্যা, খুন ও দুর্ঘটনাও রয়েছে। সুতরাং রাজনীতিকেরা যদি হুমকি মোকাবিলা করতে চান, তাহলে বন্দুক হামলায় প্রাণনাশ ঠেকানোর লক্ষ্যে নীতি প্রণয়ন করলে কেমন হয়, যার মধ্যে সন্ত্রাসবিরোধী পদক্ষেপ থাকতে পারে, কিন্তু এই নাজুক মানুষকে বলির পাঁঠা বানানো নয়। সিরিয়ার শরণার্থীদের জিহাদি হিসেবে ব্যঙ্গ করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, তারা ‘আমাদের হত্যা করতে চায়।’ কিন্তু যাঁরা এই শরণার্থীদের সঙ্গে সময় কাটান, তাঁরা জানেন, এসব কথার ভিত্তি নেই। লেসবসের সৈকতে পাঠকেরা যদি আমার সঙ্গে দাঁড়িয়ে রাবারের নৌকায় গাদাগাদি করে আসা শরণার্থীদের মুখোমুখি হন, তাহলে তাদের প্রতি রূঢ়তা আর থাকবে না। শরণার্থীরা আমাদের মতোই মানুষ, তবে তাদের শরীর ভেজা ও ঠান্ডা, তারা ক্ষুৎপিপাসায় কাতর। আমাকে যদি সরল মনে হয়, তাহলে এই ১৬ বছর বয়সী সিরিয়ার ছেলেটির সঙ্গে কথা বলুন, যাকে আমি আহমেদ বলে ডাকি। এই ছেলেটি সিরিয়ার আইএস-নিয়ন্ত্রিত ভূমিতে বসবাস করত। তাদের হাতে মার খেয়ে সে পশ্চিমে পালিয়ে এসেছে। আইএস ওই অঞ্চলে ঢোকার পর থেকেই স্কুল বন্ধ, সে কারণে আহমেদ একটি ওষুধের দোকানে কাজ নেয়। কিন্তু একদিন ওর দোকানের ওষুধ ফুরিয়ে গেলে আহমেদ আরেকটি দোকান থেকে কিছু ওষুধ ধার করতে যায়। কিন্তু দোকানটি চালাত এক নারী, যার ক্রেতাও ছিল শুধু নারীরা।
ফলে আহমেদকে গ্রেপ্তার করা হয়। একসময় ছেলেটিকে ছেড়ে দেওয়া হয়, কিন্তু তার আগেই সে দেখেছে, আইএস কীভাবে অগণিত মানুষের শিরশ্ছেদ করতে চেয়েছিল। প্রতি শুক্রবার শহরের কেন্দ্রস্থলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়, আর সেই দৃশ্য দেখার জন্য মানুষকে সেখানে আহ্বান জানানো হয়। এরপর মরদেহগুলো জনসমক্ষে প্রদর্শন করা হতো, মাঝে মাঝে সেগুলো ক্রুশবিদ্ধ অবস্থায় ঝুলিয়ে রাখা হতো। আহমেদ আরও বলে, ‘কেউ যদি পবিত্র রমজান মাসে রোজা না রাখত, তাহলে তাঁকে একটি খাঁচায় ভরে জনসমক্ষে রাখা হতো, তাঁকে সেখানে তিন দিন না খাইয়ে রাখা হতো।’ আহমেদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ আনা হয়েছিল, সে নামাজ ফাঁকি দিয়েছে। শাস্তি হিসেবে তাঁকে ২০টি বেত্রাঘাত করা হয়েছিল। এক সৌদি নাগরিক ঘোড়ার চাবুক দিয়ে এই দণ্ড কার্যকর করতেন। এত কিছুর পর আহমেদের পরিবার ওকে পালিয়ে যেতে সহায়তা করে, পাছে ছেলেটিকে না আইএসে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়। তাহলে এই ১৬ বছর বয়সী কিশোরকে আমি কী বলব, সে তো চরমপন্থার কবল থেকে বাঁচতে চেয়েছে। আর মার্কিনরাই যে তার ব্যাপারে ভীত, সে ব্যাপারেই বা আমি কী বলব। ওদিকে স্যান বার্নার্দিনোতে যে হত্যাকাণ্ড হলো, তার জন্যও এই শরণার্থীদের প্রতি মার্কিনদের সন্দেহ বাড়বে। আর নির্বাচন এলে তো রাজনীতিকেরা খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ভোটারদের ভীতি বাড়িয়ে দেন। এদিকে লেসবসের সৈকতে সিরিয়ার শরণার্থীরা যে প্রাথমিক চিকিৎসাকর্মীদের সাক্ষাৎ পায়, তারা ছিল ইসরায়েলি। এতে তারা কিছুটা বিস্মিত হলেও একরকম আনন্দিতই হয়েছিল, এই কর্মীরা ইসরাএইড নামের একটি সংগঠনের কর্মী। এটা ঐতিহাসিক সত্য যে মার্কিনরা বাইরের মানুষদের ভুল করে হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে। ১৯৩৮ ও তারপর ১৯৪১ সালে এক বেপরোয়া হয়ে ওঠা ইহুদি পরিবার যুক্তরাষ্ট্রে শরণার্থী মর্যাদা চেয়েছিল, কিন্তু আরও হাজার হাজার পরিবারের সঙ্গে তারাও সেটা পায়নি।
সেটা ছিল আনা ফ্রাঙ্কের পরিবার। ফলে নাৎসিরা আনাকে হত্যা করলেও তার দায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপরও বর্তায়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের শরণার্থী-বিষয়ক কর্মকর্তা পিটার বুকায়ের্ত বলেছেন, ‘আমরা আইএসের মতো ইসলামি চরমপন্থীদের মারাত্মক হুমকির মুখে আছি। ফলে আমাদের অত্যন্ত চৌকসভাবে তাদের মোকাবিলা করতে হবে। আইএসের হাত থেকে যারা পালাচ্ছে, তাদের অপমান করে ও বাতিলের খাতায় ফেলে দিয়ে আমরা মধ্যপ্রাচ্যের অনেক জায়গাতেই মানুষের মধ্যে ক্রোধ সৃষ্টি করছি। সিরিয়ার শরণার্থীদের মুখের ওপর দরজা বন্ধ করার মানে হলো, আইএসের বিজয়ের প্রচারণা চালানো।’ রাজনীতিকেরা যদি আমাদের নিরাপত্তার প্রতি হুমকি মোকাবিলা করতে চান, তাহলে তাঁদের অত দূরে শরণার্থীদের দিকে তাকানোর দরকার নেই, তাঁদের ঘরের আশপাশে তাকাতে হবে। সম্ভাব্য সন্ত্রাসী ও বন্দুকের দিকে তঁাদের নজর দিতে হবে। এটা সত্যিই অদ্ভুত যে সিনেট সন্ত্রাসী নজরদারির তালিকায় থাকা মানুষের বন্দুক কেনা বন্ধ করতে রাজি নয়। অর্থাৎ সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীরা সহজেই বিমানে উঠতে পারে না, কিন্তু তারা সহজেই অ্যাসাল্ট রাইফেল কিনতে পারে? সেলুকাস! প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ও গভর্নরদের শরণার্থীদের ব্যাপারে ভীতি সৃষ্টি করা চলবে না। সর্বোপরি, ৯/১১-এর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ৭ লাখ ৮৫ হাজার শরণার্থী প্রবেশ করেছে, কিন্তু তাদের কেউই এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে সন্ত্রাসী হামলায় অভিযুক্ত হয়নি। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছিল সেদিন, ১৮ বছর বয়সী এক নারী রাফা এক শিবিরে আমাকে বলল, ‘আমারও মানুষ, বেঁচে থাকার অধিকার আমাদের আছে। আমরা সন্ত্রাসী নই, যুদ্ধ থেকে পালানো মানুষ। আমি শুধু চাই, আমার সন্তানেরা যেন শান্তিতে বেড়ে উঠতে পারে।’

নির্বাচন কমিশনের মূল্যায়ন

ব্রিটিশ উন্নয়ন সংস্থা ডিএফআইডি নিয়োজিত স্বাধীন নিরীক্ষকের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (ইসি) সম্পর্কে যে অভিমত দিয়েছে, তাতে বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটেছে। কমিশন সম্পর্কে জনগণের মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। অথচ সংবিধান থেকে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করার সময় নির্বাহী বিভাগ ও সংসদ এই যুক্তি দিয়েছিল যে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে আর কোনো উদ্বেগ নেই। যে কারণে একদা আওয়ামী লীগ আন্দোলন করে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালু করেছিল, সেসব কারণ দূর হয়েছে। মাগুরায় একটি সংসদীয় উপনির্বাচন অনুষ্ঠানে কমিশনের অসহায়ত্ব ফুটে ওঠার প্রেক্ষাপটে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার আন্দোলন দেশে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। সরকার থেকে দাবি করা হয়েছিল যে কমিশনকে যথেষ্ট শক্তিশালী করা হয়েছে। এখন প্রমাণ মিলছে যে এই দাবির ভিত্তি নাজুক থেকে গেছে। ব্রিটিশ নিরীক্ষক হানা রবার্টস প্রতিবেদনটি তৈরি করেন ২০১৪ সালের মার্চে। তাঁর মূল্যায়নের সঙ্গে আমরা একমত যে নির্বাচন কমিশন বিভিন্ন সময়ে সামর্থ্যহীনতার পরিচয় দিয়েছে।
বিশেষ করে কমিশন যে স্বাধীন সাংবিধানিক সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে, তার অন্যতম অকাট্য প্রমাণ হলো নিজস্ব লোকবল থাকা সত্ত্বেও তারা জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রেষণে এনে ভোট পরিচালনা করছে। একই মনোভাব থেকে তারা ভোট গ্রহণকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাদের ওপর তাদের কর্তৃত্ব প্রয়োগ করা থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে বিরত থাকে। সুতরাং ভোট অনুষ্ঠানটি বাস্তবে নির্বাহী বিভাগের এখতিয়ারভুক্ত বিষয় হিসেবেই প্রতীয়মান হয়। এই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে তাদের ক্ষমতা থাকলেও তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা মোটেই প্রয়োগ করে না। আমরা আশা করব, নির্বাচন-সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রকল্পের প্রায় ২৩ লাখ ডলার সহায়তা প্রদানকারী ডিএফআইডির মূল্যায়ন প্রতিবেদনকে সবার যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করা উচিত হবে। কোনো অজুহাতেই একে অগ্রাহ্য করা সমীচীন নয়। নির্বাহী বিভাগ অবশ্যই কমিশনের ব্যর্থতার দায় এড়াতে পারে না।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন by এমাজউদ্দীন আহমদ

এক. ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য এবং অধিকার সংরক্ষণের জন্য যদি রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়ে থাকে তাহলে বিচার বিভাগ হলো এর যথার্থতার মাপকাঠি। ব্রিটেনের সংবিধান বিশেষজ্ঞ লর্ড ব্রাইস (Bryce) বলেছেন, ‘কোনো জাতি রাজনৈতিক অগ্রগতির কোন স্তরে রয়েছে, তা নির্ণয় করার সবচেয়ে উত্তম উপায় হলো নাগরিকদের পরস্পরের মধ্যে এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও নাগরিকদের মধ্যে বিচারব্যবস্থা কতটুকু ন্যায়ানুগ ও আইনানুগ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে তা বিচার করে দেখা। বলা হয়, আইন পরিষদ না থাকলেও রাষ্ট্র চলতে পারে, কেননা আইন পরিষদ ছাড়া আইনের অন্যান্য উৎস রয়েছে। আইন প্রথাভিত্তিকও হতে পারে। কিন্তু বিচার বিভাগ ছাড়া কোনো সুসংগঠিত সমাজ হতে পারে না। বিচার বিভাগ ছাড়া রাষ্ট্র অনেকটা ‘মাৎস্যন্যায়ের’ মতো, যেখানে বলপ্রয়োগই একমাত্র আইন। এসব কারণে যুক্তরাষ্ট্রের আইনবিশারদ রউল (Rawle) বলেছেন, ‘বিচার বিভাগ অপরিহার্য, কেননা তার মাধ্যমে অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। অন্যায়ের শাস্তি বিধান করা হয়। ন্যায় প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়। নির্দোষ ব্যক্তিগণকে অন্যের হস্তক্ষেপ ও অন্যায় থেকে রক্ষা করা যায়।’
এসব যুক্তির ভিত্তিতেই রাষ্ট্রীয় কাঠামো সংগঠিত হয়েছে আইন প্রণয়ন, আইন প্রয়োগ এবং বিচারকার্য সম্পন্ন করার প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃত্বের সমন্বয়ে এবং প্রাচীনকাল থেকেই এই ব্যবস্থা চলে আসছে। সরকারের শ্রেণিবিভাগে ‘আইনভিত্তিক সরকার’ (The Government of Laws) এবং ‘ব্যক্তিকেন্দ্রিক সরকার’ (The Government of Men)-এর মধ্যে যে পার্থক্য অ্যারিস্টটল তার Politics গ্রন্থের তৃতীয় বিভাগে উল্লেখ করেছেন, তা-ও এই প্রেক্ষাপটে তাৎপর্যপূর্ণ। তাই বিচার বিভাগ হচ্ছে সরকারের এক অপরিহার্য অঙ্গ।
কিন্তু বিচার বিভাগকে তার ব্যক্তিত্ব সঠিকভাবে পালন করতে হলে সরকারের জন্য দু’টি বিভাগ- আইন পরিষদ ও নির্বাহী কর্তৃত্ব থেকে শুধু স্বতন্ত্র হলেই চলবে না, স্বাধীনও হতে হবে; যেন তা আইন প্রণেতা এবং নির্বাহী কর্তৃত্বের প্রভাবমুক্ত হয়ে শুধু আইনের নিরিখে বিচারকেরা বিচার্য বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং আইন হলো অ্যারিস্টটলের কথায় ‘এক আবেগমুক্ত যুক্তি’। এই আবেগহীন যুক্তিকে পুরোপুরি ধারণ করতে হলে বিচারকদের শুধু নির্মোহ হলেই চলবে না, রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় তারা যেন কারো ওপর নির্ভরশীল না হন, কারো অনুরাগ অথবা বিরাগের পাত্র হিসেবে পিচ্ছিল পথে চলতে বাধ্য না হন তা নিশ্চিত হতে হবে এবং তা হতে হবে রাষ্ট্রের মাধ্যমে। তাই যুগে যুগে সরকারের তিনটি বিভাগ পৃথক করা এবং তাদের স্বতন্ত্র কার্যক্রমের ওপর জোর দেয়া হয়েছে, বিশেষ করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথা ঘোষণা করা হয়েছে হাজার হাজার মঞ্চ থেকে।
ফেডারালিস্ট পেপার ৫১ (Federalist 51)-তে জেমস ম্যাডিসেন যা লিখেছিলেন তা উল্লেখযোগ্য। তার মতে, জনগণের অধিকার সংরক্ষণের জন্য সরকারের ক্ষমতার সীমারেখা নির্ধারিত হতে হবে এবং সরকার যেন তার ক্ষমতার অপব্যবহার না করতে পারে তারও রক্ষাকবচ থাকতে হবে। মানুষ যে স্বার্থপর এবং ক্ষমতালোভী, সুযোগ পেলেই যে একজন অন্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ করবে এবং এ কারণেই যে সরকারের উৎপত্তি হয়েছে তা যেমন সত্য, তেমনি সত্য যে সরকারও সুযোগ পেলে নাগরিকদের অধিকারে অবলীলাক্রমে হস্তক্ষেপ করবে। তার নিজের কথায়, ‘মানুষ যদি দেবদূত হতো তাহলে কোনো সরকারের প্রয়োজন হতো না। যদি দেবদূতরা শাসনকাজে নিয়োজিত থাকতেন, তাহলে সরকারের ওপর অভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিক কোনো নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হতো না। মানুষের ওপর মানুষের শাসন পরিচালনার জন্য গঠিত সরকারব্যবস্থার এই হলো সবচেয়ে বড় অসুবিধা। শাসিতদের ওপর শাসকদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা সবার আগে করতে হবে এবং এর পরপরই সরকারকে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করতে হবে।’
যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তথা ফাউন্ডিং ফাদার আলেকজান্ডার হ্যামিলটন জেমস ম্যাডিসন থেকে আরো জোরেশোরে ফেডারালিস্ট পেপার-৭৮-এ (Federalist 78) লিখেছেন, ‘ষড়যন্ত্রকারীদের দুষ্কর্ম অথবা বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী প্রভাবশালীদের বক্তব্য-বিবৃতি প্রচারের মুখে সংবিধান এবং জনগণের অধিকার রক্ষার জন্য বিচারকদের স্বাধীনতাই হলো প্রকৃষ্ট রক্ষাকবচ।’
শুধু তখন কেন, সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা সংবিধান বিশেষজ্ঞরা এ সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য উপস্থাপন করে চলেছেন। ১৯৫৫ সালে American Political Science Review-APSR(49)-এ প্রকাশিত ‘Judicial Self Restraint’ শিরোনামে এক প্রবন্ধে জন রচে (John P. Roche) লিখেছেন- ‘জনগণকে জনগণের কাছ থেকে রক্ষা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে বিচারব্যবস্থার অভিভাবকত্ব ছাড়া অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান উপযোগী নয়, কেননা এটি দেশে আইনের শাসনের অঙ্গীকারে নিবেদিতপ্রাণ’। তিনি এখানেই থামেননি। তার কথায় ‘রাষ্ট্রদেহে সত্যের রস সঞ্চারের প্রশ্নাতীতভাবে সবচেয়ে বড় ভরসা হলো যুক্তরাষ্ট্রীয় আদালত, বিশেষ করে সুপ্রিম কোর্টের ওপর আস্থা।’
উনিশ শতকের শেষপ্রান্তে ব্রিটেনের খ্যাতনামা সংবিধান বিশেষজ্ঞ এভি ডাইসি (AV Dicey) তার খধি Law of the Constitution (1885) গ্রন্থে যেভাবে তিনি ব্রিটেনে আইনের শাসনের ব্যাখ্যা দিলেন তাতে বিচার বিভাগের শ্র্রেষ্ঠত্বকে প্রায় আকাশচুম্বী করে তোলেন। তার মতে, জনগণের অধিকার কোনো সাংবিধানিক আইন থেকে উদ্ভূত নয়; বরং গণ-অধিকারের ভিত্তিতেই সাংবিধানিক আইন রচিত হয়েছে। অন্য কথায়, ডাইসির কথায়, অন্যান্য দেশে জনগণের অধিকারের রক্ষাকবচ যেমন সংবিধানে বিধিবদ্ধ আইন, ব্রিটেনে কিন্তু বিভিন্ন আদালতের রায়ে সুনির্দিষ্ট, সুনির্ধারিত ও প্রতিষ্ঠিত অধিকারগুলোই সাংবিধানিক আইনে রূপান্তরিত হয়েছে। ব্রিটেনের সাধারণ আদালতের সিদ্ধান্তে নাগরিকদের অধিকারের সনদ রচিত হয়েছে। সুতরাং ব্রিটেনে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ভিত্তিতেই নাগরিকদের অধিকারমালা সুপ্রতিষ্ঠিত। তাই এখানে অধিকার রক্ষার জন্য বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কোনো দাবি নেই। দাবি করার আগেই তা প্রতিষ্ঠিত, অনেকটা স্বতঃসিদ্ধের মতোই। অনেকটা সুসভ্য জীবনব্যবস্থার মৌল উপাদান রূপেই, উন্নততর রাজনৈতিক সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠ ফল হিসেবে।
সংবিধান গণ-অধিকারের মূল নয়, বরং গণ-অধিকারই সংবিধানের মূল এবং তা সাধারণ আদালতেরই সৃষ্টি। কিন্তু বাংলাদেশে বিচার বিভাগের এই দুরবস্থা কেন? স্বাধীনতার প্রায় তিন দশক পরও কেন বাংলাদেশের জনগণকে আজো বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য মিটিং-মিছিল করতে হয়? কেন এখনো বিচার বিভাগের স্বাধীনতার দাবিতে প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখতে হয়? এ দেশে বুদ্ধিজীবীরা জানেন, পাকিস্তান আমল থেকে এখন পর্যন্ত সার্থক যেকোনো গণ-আন্দোলনে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার দাবি সব সময় উত্থাপিত হয়েছে। প্রত্যেকের মনে রয়েছে, ১৯৫৪ সালের ২১ দফা দাবিনামার ১৫তম দাবিটি ছিল প্রশাসন থেকে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় ছাত্রদের পক্ষ থেকে যে ১১ দফা দাবি উত্থাপিত হয়, এর নবম ও ১১তম দফায় ছিল স্বাধীন বিচার বিভাগের দাবি। এরও আগে পাকিস্তানের রাজনৈতিক দাবির প্রেক্ষাপটে ১৯৫৬ সাল ও ১৯৬২ সালের পাকিস্তানের সংবিধানে বিচার বিভাগ আলাদা করার প্রস্তাব স্থান পায়।
এক রক্তের নদী সাঁতরে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানেরা স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা চিনিয়ে আনলে নতুন সংবিধানে রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ নিশ্চিত করে বাংলাদেশে একটি স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছিল সংবিধানের ১১৫ ও ১১৬ অনুচ্ছেদসহ অন্যান্য অনুচ্ছেদে। নব্বইয়ের গণ-আন্দোলনের সময়ও তিনদলীয় জোটের যে ক’টি ক্ষেত্রে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয় এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল বাংলাদেশে স্বতন্ত্র এবং স্বাধীন বিচার বিভাগ সম্পর্কিত বক্তব্য। সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধন আইনেও এই প্রস্তাবটি স্থান পেয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই জনপদে যে ক’টি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, ১৯৫৪ সালের নির্বাচন থেকে শুরু করে ১৯৯৬ সালের ১২ জুন পর্যন্ত প্রতিটি নির্বাচনে অংশ নেয়া প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারে নির্ভুলভাবে এ দাবিটি স্থান পেয়ে এসেছে যে, বাংলাদেশে বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগ থেকে স্বতন্ত্র ও স্বাধীন হবে। এর পরও এই এলাকা আলোকোজ্জ্বল হয়ে উঠল না এখনো। এর পরও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সম্পর্কে বিভ্রান্তির কোনো অবসান হলো না। বিচার বিভাগ প্রশাসন থেকে পৃথক করা হলো না।
শুধু বাংলাদেশে নয়, বিদেশেও বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে প্রকাশিত হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে প্রচুর হতাশা। বার্লিন-ভিত্তিক ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল এক প্রতিবেদনে বলেছে, ‘বাংলাদেশের বিচার প্রার্থীদের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যক ব্যক্তিকে বিচার কিনতে হয়। অর্থ পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা না থাকলে কর্মকর্তাদের বিন্দুমাত্র আগ্রহের প্রকাশ ঘটে না। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের এই বক্তব্য অবশ্য বাংলাদেশের বিচার বিভাগের নি¤œ পর্যায় সম্পর্কে। এত ঘন অন্ধকারের মধ্যেও কিন্তু বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার শীর্ষ পর্যায়, বিশেষ করে সুপ্রিম কোর্ট জ্বালিয়ে রেখেছে গণমনে আস্থা ও বিশ্বাসের উজ্জ্বল এক দীপশিখা। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে প্রকাশিত ‘কান্ট্রি রিপোর্ট’গুলোতে রয়েছে এর উজ্জ্বল স্বাক্ষর। ১৯৯৯ সালের কান্ট্রি রিপোর্টে লিখিত হয়েছে, ‘বিচার বিভাগের উচ্চতর পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ স্বাধীনতা পরিলক্ষিত হলেও এবং এই পর্যায় থেকে ফৌজদারি, সিভিল, এমনকি বিতর্কিত রাজনৈতিক মামলায় বিচার বিভাগ সরকারের বিরুদ্ধে রায় দিলেও নি¤œপর্যায়ের আদালতগুলো এখনো রয়েছে নির্বাহী বিভাগের চাপের মুখে। আইনগত প্রক্রিয়া দুর্নীতিপূর্ণ, বিশেষ করে নি¤œপর্যায়ে।’
এ দেশের বড় দুর্ভাগ্য, বাংলাদেশের বিচার বিভাগের যে শীর্ষ পর্যায় হাজারো প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও মাথা উঁচু করে রয়েছে তার বিরুদ্ধেও রচিত হচ্ছে ষড়যন্ত্রের কালো কুণ্ডলি। বিষধর সর্প যেন নতুনভাবে ফণা উদ্যত করেছে বিচার বিভাগের শীর্ষের বিরুদ্ধে। নি¤œস্তর তো এরই মধ্যে দুর্নীতি ও নির্বাহী কর্তৃত্বের করালগ্রাসের মধ্যে এসে গেছে, যা এখনো দেশের বিচার প্রার্থীদের শেষ ভরসাস্থল তাও বুঝি নিঃশেষ হয়। ক’বছর আগে, সাধারণ উত্তেজিত জনতা কর্তৃক নয়, বরং ক্ষমতাসীন দলের বেশ ক’জন মন্ত্রী ও দলীয় নেতার নেতৃত্বে পল্টন ময়দান থেকে লাঠি উঁচিয়ে, মাথায় ও গলায় কাফনের কাপড় জড়িয়ে হাইকোর্টের বিচারপতিদের বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে যে মিছিলের আয়োজন হয়, তা কি কোনো সাময়িক উত্তেজনার ফল? প্রধানমন্ত্রী বিদেশ থেকে ফিরে এসে ওই মিছিলের পক্ষ সমর্থন করে যে বক্তব্য দেন, তা কি কোনো অশনিসঙ্কেত? এই নিবন্ধে তার বিস্তৃত আলোচনা রয়েছে।
দুই.
বাংলাদেশে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ইতিহাস মোটেই উজ্জ্বল নয়। অনল কুণ্ড থেকে বাংলাদেশের জনগণ স্বাধীনতার রক্তরঞ্জিত পতাকা ছিনিয়ে আনে। জনগণের প্রত্যাশা ছিল, স্বাধীন বাংলাদেশে স্বাধীন বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। দেশে প্রবর্তিত হবে আইনের শাসন। স্বাধীনতার আগে পাকিস্তানে কারণে-অকারণে সরকার যেভাবে দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে, বাংলাদেশে তার অবসান ঘটবে। তাই ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর বাংলাদেশের যে সংবিধান রচিত হয়, ১৬ ডিসেম্বর থেকে যা কার্যকর হয়, সেই সংবিধান জনগণের ২২টি মৌলিক অধিকার স্বীকার করে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগকে মৌলিক অধিকারগুলো বলবৎ করার ক্ষমতা দিয়ে এবং সংবিধানে জরুরি অবস্থা ঘোষণার কোনো ব্যবস্থা না রেখে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। মনে হয়েছিল, জনগণের প্রত্যাশা এত দিন পরে বুঝি পূর্ণ হলো। কিন্তু না, সে অবস্থা বেশি দিন টেকেনি। বাংলাদেশ সংবিধান কার্যকর হওয়ার মাত্র ৯ মাস সাত দিন পরে, ১৯৭৩ সালের ২২ সেপ্টেম্বর, জাতীয় সংসদ সংবিধান (দ্বিতীয় সংশোধন) আইন প্রণয়ন করে নির্বাহী বিভাগের হাতে মৌলিক অধিকারপরিপন্থী ক্ষমতা অর্পণ করে। সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে সর্বপ্রথম জাতীয় সংসদকে বিনা বিচারে আটক রাখা সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করার ক্ষমতা দেয়া হয় এই সংশোধনী আইনের মাধ্যমে সংবিধানে এই সংশোধনী আইন সংযোজিত হওয়ার মাত্র চার মাস ১০ দিনের মধ্যেই ১৯৭৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইন প্রণীত হয়, যা এখনো বাংলাদেশে বিদ্যমান রয়েছে কুখ্যাত কালাকানুন রূপে। সংবিধানের (দ্বিতীয় সংশোধনী) আইনের মাধ্যমে যুদ্ধ বা বহিরাক্রমণ বা অভ্যন্তরীণ গোলযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বা অর্থনৈতিক জীবন বিপন্ন হলে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে প্রেসিডেন্টকে জরুরি অবস্থা ঘোষণার ক্ষমতা দেয়া হয়। জরুরি অবস্থা জারি করা হলে নাগরিকদের ছয়টি মৌলিক অধিকার স্থগিত করার বিধান সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই ছয়টি মৌলিক অধিকার হলো চলাফেলার স্বাধীনতা, সমাবেশের স্বাধীনতা, সংগঠনের অধিকার, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা ও বাকস্বাধীনতা, পেশা বা বৃত্তির স্বাধীনতা এবং সম্পত্তির অধিকার। যেকোনো গণতান্ত্রিক সমাজের ভিত্তি হলো এসব অধিকার। জরুরি অবস্থায় যেকোনো মৌলিক অধিকার বলবৎ করার লক্ষ্যে আদালতে মামলা করার অধিকার স্থগিত করার ক্ষমতাও দেয়া হয় রাষ্ট্রপতিকে। জরুরি অবস্থা ঘোষণা সংক্রান্ত বিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার এক বছর তিন মাস পরে ১৯৭৪ সালের ২৮ ডিসেম্বরে অভ্যন্তরীণ গোলযোগের ফলে বাংলাদেশের নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক জীবন বিপদের মুখোমুখি হয়েছে, এই অজুহাতে বাংলাদেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়।
জরুরি অবস্থা কার্যকর থাকাকালেই ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ সংবিধান (চতুর্থ সংশোধনী) আইন প্রণয়ন করে বাংলাদেশ থেকে সংসদীয় ব্যবস্থাকে নির্বাসন দিয়ে কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রপতি সরকার প্রবর্তন করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে খর্ব করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের মৌলিক অধিকার বলবৎ করার ক্ষমতা কেড়ে নেয়া হয়। রাষ্ট্রীয় মূলনীতিগুলোর যেকোনো একটিকে কার্যকর করার লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতিকে একটি মাত্র ‘জাতীয় দল’ গঠনের ক্ষমতা দেয়া হয় এবং বিধান থাকে যে, জাতীয় দল গঠিত হলে দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দল আপনাআপনি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এই অবস্থা অব্যাহত তাকে ১৯৭৬ সালের ২৮ মে পর্যন্ত। ২৮ মে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি এবং প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের দ্বিতীয় ঘোষণাপত্র (সপ্তম সংশোধনী) আদেশের ফলে সংবিধান (চতুর্থ সংশোধনী) আইনের মাধ্যমে বিচার বিভাগের যে স্বাধীনতা খর্ব করা হয় এবং সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক মৌলিক অধিকার বলবৎ করার যে এখতিয়ার কেড়ে নেয়া হয়, তা সংবিধানে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭৬ সালের ২৯ নভেম্বর তৃতীয় ঘোষণাপত্র অনুযায়ী মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং এর পাঁচ মাস পরে ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিলে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং মৌলিক অধিকার বলবৎ করার ক্ষেত্রে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।
সংবিধান (চতুর্থ সংশোধনী) আইনের কুপ্রভাব সম্পর্কে অষ্টম সংশোধনীর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ যে রায় ঘোষণা করেছিলেন সেই রায়ে তখনকার অন্যতম বিচারপতি, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ বলেছিলেন, ‘১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারির সংবিধান (চতুর্থ সংশোধনী) বাংলাদেশ সংবিধানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এমন সব পরিবর্তন আনে, যা তার মৌল কাঠামো পর্যন্ত পাল্টে দেয়। বহুদল-ভিত্তিক সংসদীয় গণতান্ত্রিক সরকার রাতারাতি পাল্টে সৃষ্টি করা হয় একদল-ভিত্তিক কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার। সংগঠনের স্বাধীনতার মৌলিক অধিকার কেড়ে নেয়া হয়। সরকারি দল ছাড়া অন্যান্য সব দলকে নিষিদ্ধ করা হয়। জনগণের নির্বাচিত সত্ত্বেও জাতীয় সংসদের যেসব সদস্য এই সরকারি দলে যোগ দেননি তাদের আসন শূন্য হয়। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে হ্রাস করা হয়।’
এই সংশোধনী আইনে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কিভাবে ক্ষুণœ করা হয় তার বিবরণ দিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘প্রধান নির্বাহীর ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর বিচারপতিদের অপসারণ নির্ভরশীল করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কমানো হয়।’ অধস্তন আদালতগুলোর ওপর সুপ্রিম কোর্টের তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার বিলোপ ঘটিয়ে, তা সুপ্রিম কোর্টের পরিবর্তে ন্যস্ত করা হয় সরকারের ওপর। এসব পরিবর্তন এত মারাত্মক এবং তাৎক্ষণিক ছিল যে, স্বাধীনতার বন্ধুরা হন বিভক্ত। স্বাধীনতার শত্রুরা প্রতিশোধ নিলেন। সমালোচকেরা উচ্ছ্বাস ভরে বললেন, ‘গণতন্ত্রের এই বিনাশ সাধনের প্রক্রিয়া একই, তা সে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত ব্যক্তিদের দিয়েই হোক আর সামরিক অভ্যুত্থানের মতো পদ্ধতিতেই হোক।’
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও কিন্তু বিচার বিভাগের স্বাধীনতা তার পূর্বতন অবস্থানে ফিরিয়ে নেয়ার কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়নি। মাঝে মধ্যে ছোটখাটো দু-চারটি পদক্ষেপ নেয়া হয় মাত্র। ১৯৭৬ সালের ২৮ মে রাষ্ট্রপতি সায়েম তার দ্বিতীয় ঘোষণাপত্র (সপ্তম সংশোধনী) আদেশে চতুর্থ সংশোধনী আইনে সুপ্রিম কোর্টের মৌলিক অধিকার বলবৎ করার যে ক্ষমতা কেড়ে নেয়া হয়েছিল, তা পুনঃস্থাপিত হয়। তা ছাড়া চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে সংশোধনী এনে যেখানে বলা হয়েছিলÑ ‘বিচারকর্ম বিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব পালনে রত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি দান ও ছুটি মঞ্জুরীকরণসহ) ও শৃঙ্খলা বিধান রাষ্ট্রপতির ওপর ব্যস্ত থাকিবে’, সে ক্ষেত্রে ১৯৭৯ সালে গৃহীত সংবিধান (পঞ্চম সংশোধনী) আইনের মাধ্যমে ১১৬ অনুচ্ছেদে ‘ন্যস্ত থাকিবে’ শব্দ দু’টির পরে সংযোজিত হয় ‘এবং সুপ্রিম কোর্টের সহিত পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক তাহা প্রযুক্ত হইবে’। ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে কিন্তু ব্যবস্থা ছিল সংবিধানের ১১৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অধস্তন আদালতের বিচার বিভাগীয় পদে অথবা বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব পালনকারী ম্যাজিস্ট্রেট পদে নিয়োগের জন্য সুপ্রিম কোর্টের সুপারিশ ও পরামর্শ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে তারা নিযুক্ত হবেন। চতুর্থ সংশোধনী আইনের বিষক্রিয়া বিচার বিভাগের ওপর এতই মারাত্মক ছিল যে, আজো এতগুলো সংশোধনীর পরও বিচার বিভাগ তার স্বাভাবিক স্বাস্থ্য ফিরে পায়নি।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতার দাবি সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে জোরেশোরে বিঘোষিত হয়েছে। ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১১৫ এবং ১১৬ অনুচ্ছেদ ছিল তার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। ২২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গসমূহ হইতে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ রাষ্ট্র নিশ্চিত করিবেন।’ চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে হাজার হাজার যোজন দূরে ঠেলে ফেলে বরং নির্বাহী বিভাগের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে এই অবস্থার আংশিক পরিবর্তন এসেছিল বটে, কিন্তু স্বাধীনতার কাছাকাছি তা আসেনি।
লেখক : রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সাবেক ভিসি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

দারিদ্র্য বিমোচন : ইসলামের কৌশল by শাহ্ আব্দুল হান্নান

ইসলাম দারিদ্র্য বিমোচনে সক্ষম কিনা, এই প্রশ্নের উত্তর ভাবতে গেলে এক দিকে মনে হয়- প্রশ্নটি সঠিক নয়। কেননা, ঐতিহাসিক বিচারে যদি আমরা দেখি, তাহলে দেখব- ইসলাম যখন বিস্তার লাভ করেছিল, তার খিলাফতের যখন প্রসার ঘটে, তারপর থেকে বিভিন্ন সময়ে পর্যায়ক্রমে সম্পূর্ণভাবে দারিদ্র্য উৎখাত হয়ে গিয়েছিল। ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে, এমন সময় পার হয়েছে যখন জাকাত নেয়ার লোক ছিল না। জাকাত নেয়ার লোক কখন থাকে না? যখন কোনো সমাজে দারিদ্র্য থাকে না। কিন্তু আজকের আধুনিক পাশ্চাত্য সমাজ কি এই দাবি করতে পারবে যে, সাহায্য নেয়ার কেউ নেই? এর থেকে বোঝা যায়, ইসলামের ইতিহাস অনেক গৌরবোজ্জ্বল আর এই অর্থে শ্রেষ্ঠ যে, সে দারিদ্র্য দূর করতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু এই দাবি পুরোপুরিভাবে পশ্চিমা বিশ্ব এখনো করতে পারবে না।
এই প্রসঙ্গে এ কথা বলতে হয় যে, ইসলামের লক্ষ্য হলো জনকল্যাণ। ইসলামের শ্রেষ্ঠ আলেমগণও তাদের পুস্তকাদিতে এই কল্যাণের কথা বলেছেন। তাদের মধ্যে ইমাম গায্যালী, ইমাম শাতিবি, ইবনুল কাইয়ুমের কথা উল্লেখ করা যায়। ‘মাকাসিদ আল-শরিয়াহ’ অর্থাৎ শরিয়াহর লক্ষ্য হচ্ছে জনকল্যাণ। জনকল্যাণ হচ্ছে, যা কিছু ঈমান বা বিশ্বাস, বুদ্ধিবৃত্তি, প্রাণ বা জীবন, মাল বা অর্থনীতি, ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্য কল্যাণকর, সেগুলোকে তারা বলেছেন প্রকৃত জনকল্যাণ। আর যা কিছু এসবকে নষ্ট করে অর্থাৎ জীবনের কল্যাণ, অর্থ বা অর্থনীতি কিংবা মালের কল্যাণের বিরোধী হবে, যা কিছু ঈমানের পরিপন্থী হবে, যা কিছু মানুষের বুদ্ধি-বিবেক নষ্ট করে দেয় সেগুলোকে ‘মাফাসিদ’ বা অকল্যাণ বলে গণ্য করা হবে। (দ্রষ্টব্য : ঈমাম গায্যালী, আল-মুসতাসফা, ১ম খণ্ড; ইবনুল কাইয়ুম, ই’লাম আল-মুয়াক্কিয়িন, তৃতীয় খণ্ড)।
আমরা লক্ষ করেছি, আধুনিক যুগে যারা ইসলামি অর্থনীতি নিয়ে লিখেছেন, যেমন ড. ওমর চাপরা, ড. ফাহিম খান, ড. মনওয়ার ইকবাল, প্রফেসর খুরশীদ আহমদ, ড. তরিকুল্লাহ খান, ড. নাজাতুল্লাহ সিদ্দিকী, ড. মনজের কাহাফ এবং অন্য বড় বড় ইসলামি অর্থনীতিবিদের কথা যদি বলি তাহলে দেখব, তারা যে ইসলামি অর্থনীতির দার্শনিক ভিত্তি খাড়া করেছেন, তার মধ্যে একটি হচ্ছে আদল বা ন্যায়বিচার। তারা কুরআন বিশ্লেষণ করে বলেছেন, কুরআনে প্রায় এক শ’ আয়াত আছে যেখানে আদল, জাসটিস, ইনসাফ বা ন্যায়বিচারের কথা বলা হয়েছে। আবার এক শ’ আয়াত আছে, যেখানে জুলুমের বিরুদ্ধে কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, তারা বোঝাতে চাচ্ছেন, মোটামুটি প্রায় দুই শ’ আয়াতে ইনসাফ করার কথা বলা হয়েছে।
তারা বলেছেন, ইনসাফ করার মূল তাৎপর্য হচ্ছে, মানুষের প্রয়োজন মেটাতে হবে। ইংরেজিতে তারা বলেছেন Need fulfillment করতে হবে। তার মানে এই দাঁড়ায় যে, ইসলামি শরিয়তের লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের কল্যাণ। আবার ইসলামি শরিয়তের যে দর্শন, অর্থনীতির যে দর্শন সেখানেও রয়েছে জাসটিস বা ন্যায়বিচার। আর জাসটিসের অন্যতম তাৎপর্য হচ্ছে প্রয়োজন মেটানো। জাসটিসের এ ছাড়াও অনেক তাৎপর্য আছে। কাজেই যে অর্থনীতির দর্শনে রয়েছে নিড ফুলফিলমেন্ট বা প্রয়োজন পূরণ করা, এটা কী করে বিশ্বাস করা যায় যে, সেই অর্থনীতি দারিদ্র্য বিমোচন করতে চায় না এবং তা দূর করার কর্মকৌশল দেবে না?
এখন প্রশ্ন হলো- ইসলামি অর্থনীতি দারিদ্র্য দূর করার জন্য কী পদ্ধতি গ্রহণ করেছে? কী কৌশল গ্রহণ করেছে? অর্থনীতিতে এভাবেই ইসলাম তার কৌশল ও কর্মপদ্ধতিকে সাজিয়েছে যে, মানুষ অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ভোগ করবে- এটা হবে শরিয়তের সীমার মধ্যে। সে রোজগার করবে। নিজের সম্পত্তির ওপর তার অধিকার রয়েছে এবং থাকবে। ইসলামি শরিয়ত মোতাবেক যে মালিকানা হয়, তা তার থাকবে। সে স্বাধীনভাবেই ব্যবসা-বাণিজ্য এবং শিল্প গড়তে পারবে।
এ কথা সত্য, ইসলামি অর্থনীতিতে এমনভাবে স্ট্রাকচার করা হবে, যাতে মানুষ নিজেরাই তাদের আয়-রোজগারের ব্যবস্থা করতে পারে। এ প্রসঙ্গে আমরা একটু পরেই আলোচনা করব। তারপরও যারা কোনো কারণে রোজগার কিংবা প্রয়োজনীয় আয় করতে পারবে না, তাদের দায়িত্ব ইসলামি ব্যবস্থায় পরিবার বা আত্মীয়স্বজনদের ওপর বর্তায়। আবার তারাও যদি সে দায়িত্ব পালন করতে না পারেন, তাহলে সেই ব্যক্তি বা ব্যক্তি সমষ্টির দায়িত্ব পড়বে রাষ্ট্রের ওপর।
এখানে একটা পার্থক্য রয়েছে- ইসলাম যেটাকে ওয়েলফেয়ার স্টেট বা কল্যাণ রাষ্ট্র বলেছে, এর সাথে পাশ্চাত্যের কল্যাণ রাষ্ট্রের পার্থক্য রয়েছে। পাশ্চাত্যে ওয়েলফেয়ার রাষ্ট্রে (যেমন সুইডেন) যদি কোনো লোক নিজে তার ব্যবস্থা করতে না পারে, তাহলে তার দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপর চলে যায়। এর ফলে সেখানে একটা খারাপ দিক দেখা দেয়- তা হলো, রাষ্ট্রের ওপর অনেক বেশি বোঝা বাড়ে। আর রাষ্ট্রের ওপর যদি বোঝা বেড়ে যায় তাহলে রাষ্ট্রকে সেটা মোকাবেলা করার জন্য জনগণের ওপর বেশি ট্যাক্স বসাতে হয় এবং রাষ্ট্রকে অনেক বেশি ঋণ করতে হয়। আর ঋণ নিলে পাশ্চাত্যের সিস্টেমে সুদ দিতে হয়। কাজেই দেখা যায়, বাধ্য হয়ে ঋণ নিতে হয়, তার ওপর সুদও দিতে হয় অথবা ট্যাক্স আরোপ করতে হয়। না হলে দুটোই করতে হয়। ফলে কিছু দিন এভাবে চলে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে একটা পর্যায়ে যাওয়ার পর এটা আর চলে না, স্থবির হয়ে যায়। এটা খুবই কষ্টসাধ্য হয়ে যায়।
এ জন্য পাশ্চাত্যের ওয়েলফেয়ার ইকনোমি বা জনকল্যাণ রাষ্ট্রগুলো ক্রমেই পিছু হটছে। ক্রমেই তারা পিছিয়ে আসছে জনকল্যাণমূলক প্রোগ্রাম থেকে। এগুলোকে তারা কাটছাঁট করতে বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু ইসলাম এ বিষয়টিকে এভাবে মোকাবেলা করছে যে, কোনো ব্যক্তি যদি নিজে আয়-রোজগার করতে না পারে তাহলে তাৎক্ষণিকভাবেই তার দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপর পড়বে না; বরং তা তার পরিবারের ওপর পড়বে; তার ছেলে, বাবা বা ভাইয়ের ওপর পড়বে। কিংবা অন্য কোনো আত্মীয়ের ওপর পড়বে। আর রাষ্ট্র দেখবে যে, তারা এ দায়িত্ব পালন করছে। এখানে যদি কেউ বেআইনি কাজ করে, তাহলে এ জন্য রাষ্ট্র তাকে শাস্তি দিতে পারে, তাকে বাধ্য করতে পারবে। এর জন্য তার ওপর আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকবে। কিন্তু এসব কিছু করার মতো তার যদি কেউ না থাকে, কেবল তখনই তার দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপরে পড়বে।
কাজেই দেখা যাচ্ছে, পাশ্চাত্যের ওয়েলফেয়ার সিস্টেমে রাষ্ট্রের ওপর যে বিরাট দায়িত্ব চলে আসে তার তুলনায় ইসলামের ওয়েলফেয়ার রাষ্ট্রে দায়িত্ব কমে আসে। ফলে ইসলামের ওয়েলফেয়ার রাষ্ট্র More sustainable, অর্থাৎ এটা বেশি কার্যকর। এটাকে কার্যকর করা সম্ভব। এটা পাশ্চাত্যে দীর্ঘমেয়াদে সম্ভব হয় না বলেই সেখানে ওয়েলফেয়ার সিস্টেম ধসে পড়ছে। নর্থ ইউরোপ, ব্রিটেন, আমেরিকাসহ বিভিন্ন জায়গায় এই ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। ফলে তারা পুরনো ক্যাপিটালিজম সিস্টেমে ফিরে যাচ্ছে কিংবা যেতে বাধ্য হচ্ছে।
এই ওয়েলফেয়ার সিস্টেম যেটার কথা ইসলাম বলছে, তার মধ্যে জাকাত একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইসলামে দারিদ্র্য বিমোচনের যে কর্মসূচি তার মধ্যে জাকাত একটা বিশেষ ভূমিকা পালন করবে।
জাকাতব্যবস্থার সাথে সাথে ‘ওয়াকফ’ তার ভূমিকা পালন করবে। আমাদের ওয়াকফ সিসটেম ধ্বংস হয়ে গেছে। আমরা এটাকে নষ্ট করে ফেলেছি। কিন্তু আমরা জানি, ইসলামের ইতিহাসে ওয়াকফর বিরাট ভূমিকা ছিল, যেটা বর্তমানে নষ্ট হয়ে গেছে। আমরা তা অস্বীকার করতে পারি না। সেটাকে আমাদের পুনরুদ্ধার করতে হবে। এক সময় ইসলামে যে দারিদ্র্য বিমোচন হয়েছে, তা মূলত এক দিকে জাকাত আর এক দিকে ওয়াকফর কারণে। এমন সময় গেছে যখন সবাই চাইত, কিছু না কিছু সম্পত্তি আল্লাহর পথে দিয়ে দিতে। সেটা দিত বলেই সেই সময় সব স্কুল ফ্রি চালানো সম্ভব হতো। ওয়াকফর কারণে সব ইউনিভার্সিটি ফ্রি চালানো হতো; অর্থাৎ গোটা শিক্ষাব্যবস্থাই। ওয়াকফর কারণেই সব চিকিৎসা ফ্রি চালানো হতো। পথিক কিংবা আগন্তুকদের জন্য যে সরাইখানার ব্যবস্থা ছিল, তাও ওয়াকফ সম্পত্তির মাধ্যমেই ফ্রি চালানো সম্ভব হতো।
তেমনিভাবে ওয়াকফকে একটি দীর্ঘ সময় ধরে পুনর্গঠন করার কথা জনগণকে বোঝানো দরকার। জনগণ যদি এটা বুঝতে পারে এবং যদি সত্যিই আগের দিনের যেভাবে আল্লাহর পথে দান করত, সেভাবে প্রত্যেক ধনীই যদি ওয়াকফ করে যান তাহলে ব্যাপকভাবে সমাজে দারিদ্র্য দূরীকরণ ও উন্নয়নে এই ব্যবস্থা একটা ভূমিকা রাখতে পারে।
যা-ই হোক, দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রে জাকাতের ভূমিকা থাকবে, যা আগেই উল্লেখ করেছি। সেই সাথে ওয়াকফ ভূমিকা পালন করবে। নতুনভাবে, নতুন করে আমাদের ওয়াকফ চালু করার ব্যবস্থা করতে হবে। সেই সাথে ব্যাংকিং ব্যবস্থাকেও তার যথাযথ ভূমিকা পালন করতে হবে। আমরা জানি, ইসলাম ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে নতুনভাবে সংগঠিত করার কথা বলে। এটা সুদভিত্তিক হবে না। এটা মুদারাবাভিত্তিক, মুশারাকাভিত্তিক হবে; মুরাবাহাভিত্তিক হবে। ব্যবসাভিত্তিক হবে। এখানে শোষণের সুযোগ কম থাকবে। যদিও এ কথা এখনো পুরোপুরি বলা সম্ভব নয় যে, ইসলামি ব্যাংকিং তার যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারছে। আর এ দাবি এখন করাও সম্ভব নয়। ইসলামের সামাজিক ও অর্থনৈতিক লক্ষ্য পূরণে ইসলামি ব্যাংকিংকে পদক্ষেপ নিতে হবে। ইসলামি অর্থনীতিবিদগণ বলেছেন, ইসলাম যে সামাজিক বিপ্লব চায়, অর্থনৈতিক বিপ্লব বা পরিবর্তন চায়, সেই পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে ব্যাংকিং সিস্টেমের মাধ্যমেই মূল ভূমিকা পালন করতে হবে। কেননা, এই কাজের জন্য অর্থ লাগবে এবং অর্থ আদান-প্রদান হবে ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। সুতরাং ব্যাংককেই এই ভূমিকা পালন করতে হবে। এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে গেলে আমাদেরকে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের ওপর যেসব কাজ হয়েছে, তাত্ত্বিক কাজ হয়েছে এবং তার লক্ষ্য সম্পর্কে যেসব কাজ হয়েছে, তার পলিসি সম্পর্কে যেসব কাজ হয়েছে, সেগুলো আমাদের পড়তে ও জানতে হবে।
তেমনিভাবে, ইসলামি রাষ্ট্র তার রাজস্ব নীতিকে (Fiscal Policy) কাজে লাগাবে। রাজস্ব নীতিতে আয় ও ব্যয়ের নীতিগুলোকে পুরোপুরি কাজে লাগাবে। ব্যয়ের ক্ষেত্রে ইসলামি রাষ্ট্রে ব্যয়ের নীতির ব্যাপক পরিবর্তন হবে। যেমন- ঢাকা শহরে যারা রাস্তাঘাটে থাকে (এর মধ্যে নারীর সংখ্যা অর্ধেক) তাদের জন্য কি আমাদের বাজেট থেকে এক-দুই বছর ৫০০ কোটি টাকা করে বের করতে পারি না? আমরা কি বিশেষ প্রকল্পের মাধ্যমে এদেরকে আবার শহর থেকে যার যার গ্রামে নিয়ে গিয়ে পুনর্বাসন করে দিতে পারি না? কিন্তু এর জন্য দরকার আমাদের সর্বোচ্চ পর্যায়ে Determined Policy।
এখানে ইসলামের যে ব্যয়নীতি (Expenditure Policy), তার একটা বিরাট ভূমিকা আছে। কিন্তু আমরা সেগুলো করতে ব্যর্থ হচ্ছি। সেগুলো আমাদের করতে হবে। তেমনিভাবে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যে মনিটরিং পলিসি এটাতে ইসলামের আলোকে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য। কারণ, সেন্ট্রাল ব্যাংক প্রতি বছরই নতুন অর্থ বাজারে ছাড়ে পাঁচ থেকে ১০ শতাংশ। এটা একটা ক্রিয়েটেড মানি। এতে নতুন অর্থের সৃষ্টি হয়। এই অর্থ জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহার করা যায়। সেন্ট্রাল ব্যাংকের এই নতুন অর্থের জন্য যেহেতু কোনো খরচ করতে হচ্ছে না, এর জন্য তাকে কোনো জিনিস বেচতে হচ্ছে না। এটা একদমই ‘আকাশ থেকে পাওয়া’ অর্থই বলা যায়। এটা নোট প্রিন্টের মাধ্যমে সেন্ট্রাল ব্যাংক প্রতি বছর বাজারে ছাড়ে। সেই টাকা যদি সরকারকে দেয়ার সময় বলে, এটা শুধু জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করতে হবে, দারিদ্র্য বিমোচনে ব্যয় করতে হবে, তাহলে এর মাধ্যমে সামগ্রিক পরিবর্তন সম্ভব। এ টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারকে কর্জ বা বিনা সুদে দিতে পারে। এ ব্যাপারে ড. ওমর চাপরা তার Towards A Just Monetary System গ্রন্থে আলোচনা করেছেন। এর থেকে বোঝা যায়, ইসলামি অর্থনীতিতে ব্যয়নীতি, ক্ষুদ্রানীতির একটা বিরাট ভূমিকা থাকবে। এসব পলিসি ব্যবহার করে আমাদের সার্বিক উন্নয়ন ঘটাতে হবে, যা দারিদ্র্য নিরসনে সাহায্য করবে। যাকে আমরা Hardcore Poverty বলি, তা কম ছিল কিংবা ছিল না। দারিদ্র্যমুক্ত সমাজ তারা গড়তে পেরেছিল। একেবারেই শুরু থেকে ইসলাম সিস্টেমটিকে আস্তে আস্তে গড়ে তোলে যদিও শুরুতে কিছু দারিদ্র্য ছিলই। কিন্তু উমাইয়া, আব্বাসীয়দের সময় থেকে তা কার্যত সম্পূর্ণ দূর হয়ে যায়। আর এ কথা আগেই উল্লেখ করেছি, ইসলামে এমন এক সময় গেছে যখন জাকাত নেয়ার কোনো লোক পাওয়া যায়নি। কিন্তু পশ্চিমা দেশগুলো আজো এ দাবি করতে পারবে না যে, সাহায্য নেয়ার লোক তাদের সমাজে নেই।
যে সরকারই থাকুক সেই সরকার যদি ইসলামকে অগ্রাধিকার দেয় এবং কমিটেড হয় আর সেই সাথে জনগণ যদি তা গ্রহণ করতে রাজি হয়, তাহলে আমার মতে- ইসলামের চেয়ে দারিদ্র্য বিমোচনের আর কোনো ভালো আদর্শ হতে পারে না।
লেখক : সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার

মৃত্যুদন্ড শিথিলের আহ্বান অ্যামনেস্টির

সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদন্ডঅব্যাহত রাখায় বাংলাদেশের নিন্দা জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। তারা বলেছে, এ বছরের শুধু নভেম্বরে এ দেশে কমপক্ষে ৫০টি মৃত্যুদন্ডদেয়া হয়েছে। সংস্থাটি সব রকম মৃত্যুদন্ডকে শিথিল করে যাবজ্জীবন শাস্তি করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। বলেছে, সব মামলাই যেন সুষ্ঠু হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। ‘বাংলাদেশ: দ্য ডেথ পেনাল্টি ডাজ নট ইকুয়েট টু জাস্টিস’ শীর্ষক তিন পৃষ্ঠার এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। গতকাল প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেসব অপরাধে এসব ব্যক্তিকে এ শাস্তি দেয়া হয়েছে তা অত্যন্ত গুরুতর ও এক্ষেত্রে ন্যায় বিচার দিতেই হবে। তবে ফাঁসি দেয়ার মাধ্যমে আরেক জনের জীবন নেয়া নিষ্ঠুর, অমানবিক শাস্তি। প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার তার জীবন রক্ষার। তাই মৃত্যুদন্ডসেই অধিকারকে লঙ্ঘন করে। এতে বলা হয়, মৃত্যুদন্ডএমন একটি শাস্তি যা পরে আর পরিবর্তন বা ভুল হলে তা শুধরানোর কোন পথ থাকে না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভুল বিচারে মৃত্যুদন্ডদেয়া হয়েছে। আবার নিরপরাধের কারণে মৃত্যুদন্ডপাওয়া অনেক আসামীকে প্রতি বছর মুক্তি দেয়া হচ্ছে। ঐশী রহমানকে তার পিতামাতা হত্যার কারণে এ বছরের ১২ই নভেম্বর ফাঁসির রায় দেয়া হয়েছে। তবে এমনও রিপোর্ট আছে যে, সে যখন ওই অপরাধ করেছিল তখন সে ছিল কিশোরী। অপরাধের সময় ঐশীর বয়স ১৮ বছরের ওপরে ছিল এটা নির্ধারণের ক্ষেত্রে যদি কোন ভুল হয়ে থাকে, সে আপিলে ব্যর্থ হয় ও তার ফাঁসি কার্যকর হয় তাহলে তার এ বিষয়ে প্রতিকার পাওয়ার আর কোন পথ থাকবে না। উপরন্তু অপরাধের জন্য যাদেরকে মৃত্যুদন্ডদেয়া হয় তাদেরকে সম্ভাব্য সংশোধন ও সমাজে পুনর্বাসনের সুযোগও অস্বীকার করা হয় এ শাস্তির কারণে, যেখানে পুনর্জাগরণের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক আইন রয়েছে।  আইসিসিপিআর-এর অধীনে শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদন্ডব্যবহার না করার ক্ষেত্রে আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে বাংলাদেশের। একই সঙ্গে এ শাস্তি বাতিলের ক্ষেত্রে তাদের বাধ্যবাধকতা আছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, কিন্তু এ অবস্থান থেকে নিজেকে অনেক দূরে রেখেছে বাংলাদেশ। যারা আরও ফাঁসির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার কার্যকরভাবে তাদের পক্ষ অবলম্বন করেছে। বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে মৃতুদ-ের পক্ষে যুক্তি দেখিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। এ শাস্তি থেকে বিরত থাকা ও বাতিল করার আহ্বানের প্রতি তারা ইতিবাচক সাড়া দেয় নি। ব্যতিক্রম ছাড়া সব ক্ষেত্রেই শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদ-ের বিরোধী অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। বাংলাদেশ ও বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার কর্মী ও সুশীল সমাজের সংগঠনগুলো, যারা মৃত্যুদন্ডবাতিল চেয়ে কাজ করছেন, তাদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।  ১৯৭৭ সাল থেকে চীন, ইরান, পাকিস্তান, সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র সহ যেসব দেশে শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদন্ডবাতিলের দাবিতে কাজ করছে, সেখানে মৃত্যুদন্ডবাতিলের দাবিতে কাজ করছে এ সংগঠন। ২০১৪ সালে বাংলাদেশে কোন ফাঁসির রেকর্ড নেই অ্যামনেস্টির কাছে। তবে এ দেশে কমপক্ষে ১৪১ জন পুরুষ ও একজন নারীকে শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদন্ডদেয়া হয়েছে। ওই বছরের শেষ নাগাদ বাংলাদেশে ফাঁসি কার্যকরের অপেক্ষায় ছিলেন ১২৩৫ জন মানুষ। ২০১৫ সালের শেষ নাগাদ এ সংখ্যা অনেক বেশি হবে।

অনৈতিক কিছু করতে রাজি হইনি তাই ফাইনালে নেই by মারুফ কিবরিয়া

গত এক মাসজুড়ে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগের (বিপিএল) উপস্থাপনা করে আসছিলেন আলোচিত উপস্থাপিকা ও অভিনেত্রী আমব্রিন। কিন্তু আজ ফাইনালে দেখা যাবে না তাকে। নৈতিকতার বিরুদ্ধে যায় এমন কিছু করতে নারাজ ছিলেন বলেই তাকে বাদ দেয়া হয়েছে বলে জানান আমব্রিন। এ প্রসঙ্গে মানবজমিনকে তিনি বলেন, আমি অনৈতিক কোনো কাজ করতে পারবো না। আমার যোগ্যতা দিয়েই যে কোনো কাজ করতে চাই। বিপিএলের ফাইনালের আগে আমাকে এমন কিছু করতে বলা হয়েছে, যা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আপস করিনি বলেই আমাকে বাদ দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, মাসজুড়ে আমি মাঠে কাজ করেছি। কিন্তু শেষ মুহূর্তে আমার বিরুদ্ধে তাদের অভিযোগ আমি উচ্ছৃঙ্খল চলাফেরা করেছি। তাই আমাকে বাদ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু আমাকে ক্লিয়ার করেনি আমি কী এমন উচ্ছৃঙ্খলতা করেছি যে আমাকে বাদ দেয়া হয়েছে? আমি কী মাঠে লেট করে গিয়েছি? কারও সঙ্গে খারাপ আচরণ করেছি? নাকি মদ খেয়ে মাঠে প্রবেশ করেছি? এ ধরনের কোনো অভিযোগ আমাকে নির্দিষ্ট করে বলেনি। বিপিএলের ফাইনালে নেই আমব্রিন। খবরটি নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট করেন তিনি। পোস্টটি করার সঙ্গে সঙ্গেই তোলপাড় লেগে যায় গতকাল। এদিকে বিপিএল শুরুর আগে একাধিক অনুষ্ঠান উপস্থাপনা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন আমব্রিন। এর মধ্যে রয়েছে দেশটিভিতে ‘সিনেমা এক্সপ্রেস’, এনটিভির ‘উদ্দীপন’ ও আরটিভির ‘মিউজিক স্টেশন’ অনুষ্ঠানগুলো। পাশাপাশি ‘নীড় খোঁজে গাঙচিল’ ও ‘আয়নাঘর’ নামে দুটি ধারাবাহিক নাটকের কাজও করছেন আমব্রিন। ২০০৭ লাক্স-চ্যানেল আই সুপারস্টার প্রতিযোগিতার সেরা দশে ছিলেন তিনি। তবে বিজ্ঞাপনে মডেলের পাশাপাশি উপস্থাপিকা হিসেবেই তার উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি। আফজাল হোসেনের ‘চলো বিয়ে করে ফেলি’ নাটকের মাধ্যমে আমব্রিনের মিডিয়ায় অভিষেক ঘটে। বাংলালিংক, বসুন্ধরা গ্রুপ, প্রাণ গ্রুপসহ বেশ কয়েকটি পণ্যের বিজ্ঞাপনে মডেল হয়ে তিনি বেশ সুখ্যাতি অর্জন করেছেন। বাংলালিংক কল ব্লকের বিজ্ঞাপনচিত্রে আমব্রিনকে প্রথম মডেল হিসেবে উপস্থাপন করেন নির্মাতা তানভীর হাসান। এখন পর্যন্ত ১৩-১৪টি বিজ্ঞাপনচিত্রে মডেল হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। এ মাধ্যমে তাকে সব শেষ দেখা গেছে, নাদিমের পরিচালনায় ‘বস ফ্রিজের’ বিজ্ঞাপনচিত্রে। তবে এ সময়ে যেখানে আমব্রিনের শৈল্পিক উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, তা হচ্ছে উপস্থাপনা। তার এ কাজটি দর্শককে মুগ্ধ করছে নিয়মিত। আমব্রিন প্রথম উপস্থাপনা করেন এনটিভির ‘মিউজিক-ই ফোনি’ অনুষ্ঠানে। এতে টানা দুই বছর উপস্থাপনা করে বেশ দর্শকপ্রিয়তা পান তিনি। আমব্রিনের জন্ম লিবিয়ায়, তার মায়ের বাড়ি শ্রীলঙ্কা। তবে পরিবারে মা ও ভাইয়ের অনুপ্রেরণায় লাক্স চ্যানেল আই সুপারস্টার প্রতিযোগিতায় নাম লেখান। আর সেই থেকে মিডিয়ায় নিয়মিত কাজ করে আসছেন তিনি। অবশ্য আমব্রিনের আজকের অবস্থানের পেছনে এ প্রতিযোগিতাই বড় অবদান রেখেছে বলে মনে করেন তিনি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, লাক্স-চ্যানেল আই সুপারস্টার প্রতিযোগিতা আমার জন্য বিশাল একটা প্লাটফরম ছিল। সেখানে শীর্ষ দশে অবস্থান করে এখন মিডিয়ায় নিয়মিত কাজ করছি। সত্যিই ওই প্লাফরমটির কাছে আমি অনেক বেশি কৃতজ্ঞ। আজ আমার অবস্থানের পেছনে এর অবদানের কথা অস্বীকার করা যাবে না। তবে আমি আজকের আমব্রিন হতে পেরেছি কিংবা আজ আমার যা অর্জন তার পেছনে আমি অনেক শ্রম দিয়েছি। প্রতিযোগিতা থেকে বেরিয়ে এসে নিয়মিত কাজের পাশাপাশি অনেক শেখা হয়েছে। অনেক জানাও হয়েছে। প্রতিনিয়ত ভালো কাজটা উপহার দেয়ার জন্য নিজেকে রাতে-দিনে তৈরি করেছি। সব মিলিয়ে বলবো, এই ৮ বছর মিডিয়া ক্যারিয়ারে অনেক পেয়েছি। তবে এখানেই শেষ নয়। আমাকে অনেক দূর যেতে হবে। সেজন্য আরও পরিশ্রম করতে হবে। সুন্দরী প্রতিযোগিতা থেকে দেশের আলোচিত উপস্থাপক হিসেবে খ্যাতি। ভবিষ্যৎ নিয়ে কী ভাবছেন আমব্রিন- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আসলে আমাদের দেশ থেকে তেমন কাউকে বিশ্বমাধ্যমে উপস্থাপনায় সুনাম অর্জন করতে দেখা যায়নি। সে জায়গা থেকে আমি সে চেষ্টায় থাকবো। বিপিএল তো শেষ হয়েছে। যদিও শেষটা ভালো হয়নি। তবুও এ অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আইপিএল কিংবা বিশ্বের অন্য বড় বড় আয়োজনে হোস্ট হিসেবে নিজেকে দেখতে চাই।