Monday, July 9, 2018

বাংলাদেশ ও নির্বাচন by নিতিন এ গোখালে

ভারতীয় উপমহাদেশজুড়ে নির্বাচনী মৌসুম শুরু হয়েছে। ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রতিবেশী পাকিস্তানে সামরিক বুটের ছায়ায় ফের নির্বাচন শুরু হতে যাচ্ছে শিগগিরই। পূর্বের প্রতিবেশী বাংলাদেশেও সম্ভবত ডিসেম্বরে নির্বাচন হবে। এই নির্বাচন এমন সময় অনুষ্ঠিত হবে যখন সমাজ ভীষণভাবে বিভক্ত। ২০১৯ সালের গ্রীষ্মে ভারতেও সাধারণ নির্বাচন হবে। আগামী বছরের মাঝামাঝি থেকে শেষের মধ্যে কোনো এক সময় শ্রীলংকা প্রত্যক্ষ করবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। এই নির্বাচনসমূহ কেবল সংশ্লিষ্ট দেশের জন্যই নয়, বরং এই অঞ্চলের কৌশলগত চিত্রের জন্যেও ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে, পাকিস্তানে নির্বাচনের ফল কী হয়, তা গুরুত্বপূর্ণ, তবে অতটা তাৎপর্যপূর্ণ নয়। কারণ, বেসরকারী প্রশাসনের নেতৃত্বে যে-ই আসুক না কেন, ইসলামাবাদের ভারত নীতি নির্ধারিত হবে রাওয়ালপিন্ডি তথা সেনা সদরদপ্তর থেকে। তবে ঢাকার ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য নয়। প্রচুর ত্রুটি সত্ত্বেও বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বেশ গভীরে প্রোথিত। মানুষ প্রতি পাঁচ বছর অন্তর অন্তর ভোটাধিকার প্রয়োগে অভ্যস্ত। তবে অতি সম্প্রতি অভিযোগ উঠেছে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগ এই পদ্ধতির অপব্যবহার করে বাংলাদেশে একদলীয় শাসনকে স্থায়ী রূপ দিতে চান।
এই অভিযোগ সত্ত্বেও, শেখ হাসিনা নজিরবিহীনভাবে টানা তিনবার ক্ষমতায় আসতেই নির্বাচনে লড়বেন। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির খালেদা জিয়া দুর্নীতির অভিযোগে কারান্তরীন। তবে তার দল চাইলে তিনি তত্বগতভাবে নির্বাচনে লড়তে পারবেন। ২০১৩ সালে অবশ্য বিএনপি নির্বাচন বয়কট করেছিল।
যদি বিএনপি নির্বাচনে আসে, হাসিনা সেক্ষেত্রে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বীতার মুখে পড়বেন। কারণ, তার এক দশকব্যাপী শাসনে বহু ক্ষেত্রে প্রশংসাযোগ্য উন্নয়ন হলেও দেশে ক্ষমতাসীন-বিরোধী মনোভাব বেশ বেড়েছে।
বাংলাদেশে পরিস্থিতি কোনদিকে গড়ায় সেদিকে অবশ্যই তীক্ষ্ম নজর থাকবে ভারতের। ভারত চাইবে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ফিরে আসুন। কারণ, তার শাসনাধীনেই ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে অতুলনীয় সহযোগিতা গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশ ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় বিদ্রোহী নেতাদের গ্রেপ্তার করে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছে। অনেক সন্ত্রাসী চক্র ধ্বংস করেছে। নরেন্দ্র মোদি সরকারের নেতৃত্বে ভারতও বাংলাদেশের সঙ্গে স্থল ও সমুদ্র সীমা নিষ্পত্তির মাধ্যমে অনেক পুরোনো এক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করেছে। এর ফলে দেশে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক অবস্থানও শক্তিশালী হয়েছে। তবে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির আপত্তির কারণে নয়াদিল্লি ও ঢাকার মধ্যকার তিস্তা পানি বন্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি।
গত মাসে ভারত সফরে আসা উচ্চ পর্যায়ের আওয়ামী লীগ প্রতিনিধি দলকে ভারত নিজের সন্তুষ্টির কথা জানিয়েছে। শেখ হাসিনার কাছ থেকে পাওয়া সহযোগিতা ও সাহায্যের জন্য বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় ইস্যুতে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ভারত।
আওয়ামী লীগ প্রতিনিধি দল ভারতের শাসকদল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে। উভয় পক্ষই এই বিষয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে যে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে ঘনিষ্ঠতা গত চার বছরে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে। বিশেষ করে ২০১৭ সালের এপ্রিলে হাসিনার ভারত সফর থেকে পরিস্থিতি তুঙ্গে। ওই সফরে রেকর্ড ৩৬টি চুক্তি সই করে দুই দেশ। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে ৬টি চুক্তি। এর মধ্যে রয়েছে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বিষয়ক রূপরেখামূলক চুক্তি। ৫০ কোটি ডলারের প্রতিরক্ষা ঋণ; মহাকাশ, পারমানবিক জ্বালানি, তথ্য প্রযুক্তি ও সাইবার সিকিউরিটি নিয়ে একটি চুক্তি। আরও আছে ৪৫০ কোটি ডলারের আরেকটি পৃথক ঋণ চুক্তি।
উভয় পক্ষই এই বিষয়টি উল্লেখ করেছে যে নিরাপত্তা, জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে ৬০টির মতো যৌথ প্রকল্প দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এর বাইরেও বেশ কয়েকটি বৃহৎ উদ্যোগের মাধ্যমে নয়াদিল্লি এই সম্পর্ককে আরও সামনে নিয়ে যেতে চায়।
ভারত বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নিরাপত্তা খাত ব্যতিত সবচেয়ে বড় সাফল্যের জায়গাগুলোর অন্যতম হলো বিদ্যুৎ খাত। ভারত থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে বাংলাদেশে যাওয়া বিদ্যুৎ-এর পরিমাণ ১২০০ মেগাওয়াটে উন্নীত হবে।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা ইস্যুতে নয়াদিল্লির অবস্থান নিয়ে বাংলাদেশ তেমন উচ্ছ্বসিত হতে পারেনি। শেখ হাসিনা বিষয়টি যেভাবে সামাল দিয়েছেন তার সঙ্গে তুলনা চলছে ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান থেকে যাওয়া বাঙালি শরণার্থীদেরকে ভারত যেভাবে সামাল দিয়েছিল। এই রোহিঙ্গা ইস্যু নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করে কিনা বা শেখ হাসিনার অনুকুলে যায় কিনা, তা এখনও নিশ্চিত কিছু নয়। তবে এটা যে শেখ হাসিনার জন্য সুবিধাজনক হবে, তা বলা যায়। ডিসেম্বর নাগাদ যখন বাংলাদেশে নির্বাচন শেষ হবে, ভারতে তখন নির্বাচনী ডামাডোল কেবল শুরু হবে। উপমহাদেশের জন্য সামনের কয়েক মাস হবে বেশ চিত্তাকর্ষক।
(নিতিন এ গোখালে একজন কৌশলগত সম্পর্ক বিশ্লেষক এবং ভারতশক্তি.ইন নামে একটি প্রতিরক্ষা বিষয়ক ওয়েবসাইটের লেখক ও প্রতিষ্ঠাতা। তার এই নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে ভারতের ডিএনএ পত্রিকায়। এটি সংক্ষেপিত অনূদিত সংস্করণ।)

হাসপাতাল ও ক্লিনিক মালিকদের এ কেমন প্রহসন! by হুমায়ুন মাসুদ

দুই মাস বয়সী শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে হাউমাউ করে কাঁদছেন লোহাগাড়া উপজেলার বাসিন্দা জেনিয়া। ঠাণ্ডাজনিত কারণে অসুস্থ শিশু সন্তানটিকে ভর্তি করতে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে এসে হাজির হয়েছেন তিনি। দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পরও ছেলেকে ভর্তি করাতে না পেরে কাঁদছেন এই নারী। চট্টগ্রামের ম্যাক্স হাসপাতালে র্যা বের অভিযানে জরিমানার প্রতিবাদে চিকিৎসাসেবা বন্ধ করে দিয়েছে চট্টগ্রামের বেসরকারি সব হাসপাতাল ও ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ। এতে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে রোগীরা।
জেনিয়া বলেন, ‘ঠাণ্ডাজনিত কারণে অসুস্থ হয়ে পড়লে শিশু সন্তানকে নিয়ে স্থানীয় হাসপাতাল-ক্লিনিকে যাই। কিন্তু সেখানে (লোহাগাড়ায়) সব হাসপাতাল ও ক্লিনিক বন্ধ থাকায় অনেক কষ্টে ছেলেকে চট্টগ্রাম শহরে নিয়ে আসি। এখানেও একই অবস্থা। নগরীর সব হাসপাতাল, ক্লিনিক বন্ধ করে দিয়েছেন মালিকরা। তাই বাধ্য হয়ে সরকারি হাসপাতালে এসে ভিড় জমিয়েছি। কিন্তু এখানে যে ভিড় কখন সিরিয়াল পাবো, কখন সন্তানকে ডাক্তার দেখাতে পারবো আল্লাহই জানে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার ছেলের অবস্থা আশঙ্কাজনক। দ্রুত ডাক্তার দেখাতে না পারলে তাকে বাঁচানো সম্ভব হবে না। আমি আমার সন্তানকে বাঁচাতে চাই।’
ভুল চিকিৎসায় সাংবাদিক কন্যা রাইফার মৃত্যুর ঘটনার তদন্তে এসে ম্যাক্স হাসপাতালের নানা অনিয়ম খুঁজে পায় তদন্ত কমিটি। এসব অনিয়মের অভিযোগে রবিবার (৮ জুলাই) ওই হাসপাতালে অভিযান চালায় র্যা বের ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে নগরীর বেসরকারি হপাসাতাল ক্লিনিকের মালিকরা চিকিৎসা সেবা বন্ধের ঘোষণা দেন। তাদের ঘোষণায় রবিবার বিকাল ৩টা থেকে বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকে বন্ধ রয়েছে চিকিৎসা সেবা। এতে চরম বিপাকে পড়েছেন রোগী ও তার স্বজনরা।
অন্যদিকে এ ঘটনায় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। প্রতিদিন যেখানে চমেক হাসপাতালে ৪শ থেকে ৫শ রোগী ভর্তি হয়, সেখানে রবিবার দুপুর ৩টা থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ৭শ থেকে ৮শ রোগী ভর্তি হয়েছেন। এতে চিকিৎসা সেবা দিতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন কর্তব্যরত চিকিৎসকরা।
রাতে চমেক হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, অতিরিক্ত রোগীর চাপে চিকিৎসা নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন চিকিৎসকরা। ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত রোগীকে চিকিৎসা সেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। রোগীর চাপে এদিন জরুরি বিভাগে বাড়ানো হয়েছে চিকিৎসকের সংখ্যা। প্রতিদিন জরুরি বিভাগে একজন চিকিৎসক সেবা প্রদান করলেও এদিন দুইজন চিকিৎসককে জরুরি সেবা প্রদান করতে দেখা গেছে। অধিকাংশ ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছেন ধারণ ক্ষমতার দুই থেকে তিনগুণ বেশি রোগী।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা দিচ্ছেন ডা. ফরিদ উদ্দিন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘স্বাভাবিক সময়ে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২০ থেকে ৩০ জন রোগী ভর্তি হন। কিন্তু আজ বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলো বন্ধ থাকায় এর চেয়ে দুই থেকে তিনগুণ বেশি রোগী হাসপাতালে আসছেন। অতিরিক্ত এই বিপুল সংখ্যক রোগীকে সেবা দিতে গিয়ে আমরা ব্যাপক হিমশিম খাচ্ছি।’
বেসরকারি হাসপাতাল বন্ধ করে দেওয়ায় চিকিৎসকরা যেমন বিপাকে পড়েছেন, তেমনি চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা। হাসপাতালে দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষার পরও তারা কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না।
সিট না পেয়ে হাসপাতালের মেঝেতে শুয়ে আছেন নগরীর লালখান বাজার এলাকা বাসিন্দা সাজিয়া। তিনি অভিযোগ করে বলেন, হাসপাতালে এসেছি এক ঘণ্টার বেশি হয়েছে কিন্তু এখনও কোনও চিকিৎসা পাইনি, কখন পাবো বলতে পারছি না।
একই অভিযোগ জানিয়েছেন হালিশহর আবাসিক এলাকা থেকে আসা চম্পা দাশ। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, উন্নত চিকিৎসা সেবার জন্য বেসরকারি হাসপাতালে গিয়েছিলাম। সেখানে ভর্তি না করায় বাধ্য হয়ে সরকারি হাসপাতালে এসেছি। কিন্তু এখানে রোগীর যে ভিড় তাতে মনে হচ্ছে চিকিৎসা সেবার পরিবর্তে আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়বো।
এদিকে প্যাথলজিগুলো বন্ধ করে দেওয়ায় রোগ নির্ণয়ে পরীক্ষা-নিরিক্ষাগুলো সম্পন্ন করতে পারছেন না রোগীরা।
সকালে নগরীর পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষার জন্য রক্তের নমুনা দিয়ে যান খাগড়াছড়ি জেলার বাসিন্দা ফাতেমা বেগম। বিকেলে রিপোর্ট আনতে গিয়ে বিপাকে পড়েন এই রোগী। ডায়াগনস্টিক সেন্টারটি বন্ধ থাকায় তিনি রিপোর্ট সংগ্রহ করতে পারেননি।
ফাতেমা বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সকালে পরীক্ষার রক্তের নমুনা দিয়ে যায়, তারা রিপোর্টের জন্য সন্ধ্যায় আসতে বলেছিল। কিন্তু এখন এসে দেখি গেটে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, রিপোর্টটা পেলে ডাক্তার দেখিয়ে আমি আজই খাগড়াছড়ি চলে যেতে পারতাম কিন্তু রিপোর্ট না পাওয়ায় আমাকে আজ শহরে থাকতে হবে। শহরে থাকার টাকা কোথায় পাবো।
একই অবস্থা এপিক হেলথ কেয়ারেও। নুর জাহান নামে এক নারী বলেন, দাঁতের ব্যাথার জন্য ডাক্তার আমার নাতিকে এক্স-রে করার কথা বলেন। কিন্তু প্যাথলজি গুলো বন্ধ থাকায় এক্স-রে করা যাচ্ছে না।
অন্যদিকে যারা আগে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হয়েছেন তাদেরকে চিকিৎসা না দিয়ে উল্টো হাসপাতাল থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন রোগীর স্বজনরা।
হালিশহর এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী মনসুর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, প্রসব বেদনা উঠলে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আমার শ্যালিকাকে সিএসসিআর হাসপাতালে ভর্তি করাই। কিন্তু বিকাল সাড়ে তিনটার দিকে তাকে হাসপাতাল থেকে বের করে দেওয়া হয়। কর্তৃপক্ষ এসে জানান তাদের হাসপাতালে অপারেশন করার মতো কোনও ডাক্তার নেই, আমরা যেন রোগীকে অন্য কোথাও নিয়ে যাই।
ম্যাক্স হাসপাতাল থেকেও অনেক রোগীকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
হাসপাতালে রোগীর চিকিৎসা বন্ধ করার বিষয়ে জানতে বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও ম্যাক্স হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. লিয়াকত আলীর সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল রিসিভ করে কেটে দেন। এরপর একাধিকবার ফোন করা হলে তিনি কল রিসিভ করেননি।
অন্যদিকে এ সম্পর্কে জানতে বিএমএ চট্টগ্রাম শাখার সভাপতি ডা. মুজিবুল হকের সঙ্গে কথা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি।

অথচ দেশে ঘৃণিত ক্রোয়েশিয়া দল! by মাহমুদ ফেরদৌস

ক্রোয়েশিয়ায় এত খেলোয়াড় থাকতে বিশ্বকাপে জয়-পরাজয় নির্ধারক পেনাল্টি মিস করতে হলো লুকা মদ্রিচকে! ১লা জুলাই ডেনমার্কের সঙ্গে নকআউট পর্বের প্রথম ম্যাচে পেনাল্টি পেয়ে যায় ক্রোয়েশিয়া। তখন ১-১ গোলে সমতায় ছিল দু’দল। ওই পেনাল্টিতে গোল দিতে পারলেই হয়তো জয় পেয়ে যেত ক্রোয়েশিয়া, কেননা খেলা চলছিল তখন অতিরিক্ত সময়ের; বাকিও ছিল মাত্র ৪ মিনিট। পরে অবশ্য ট্রাইবেকারে ম্যাচটি জিতে ক্রোয়েশিয়া।
তবে এ ধরনের অন্তিম মুহূর্তে কোনো খেলোয়াড় যদি পেনাল্টি মিস করে বসেন, তখন সচরাচর ভক্তরা হতাশ হন। তবে কিছুক্ষণ বাদেই ওই খেলোয়াড়ের জন্য সহানুভূতির জন্ম নেয়। তবে লুকা মদ্রিচের ব্যাপারটা ছিল একেবারে ভিন্ন।
দলের ক্যাপটেন তিনি। ক্লাবে তিনি খেলেন বর্তমানের ও ইতিহাসের অন্যতম সেরা ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদে। তাকে ভাবা হয় বর্তমান সময়ের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার হিসেবে। আর ক্রোয়েশিয়া এখন খেলবে সেমিফাইনাল। ১৯৯৮ সালের পর এই প্রথম দলটি বিশ্বকাপে এত ভালো করছে। ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে গিয়ে বা চ্যাম্পিয়ন হয়ে প্রাক্তন রেকর্ড ভাঙার সুযোগ তো আছেই। সেই হিসেবে ক্রোয়েশিয়ায় মদ্রিচদের পাওয়ার কথা ছিল নায়কোচিত মর্যাদা।
এমনকি ২০ বছর আগের ওই বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের নায়কেরা ক্রোয়েশিয়ায় এখনও আইকনের মর্যাদা পান। অথচ, বর্তমান বিশ্বকাপ দলের অনেক সদস্য, বিশেষ করে মদ্রিচ, দেশে যতটা না ভালোবাসার পাত্র, তার চেয়ে বেশি ঘৃণিত!
ফরেইন পলিসি ম্যাগাজিনের নিবন্ধে উঠে এসেছে এই কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য। এতে বলা হয়, ভক্তদের ক্রোধের মূল লক্ষ্যবস্তু হলেন দ্রাভকো মামিচ। তিনি ক্রোয়েশিয়ান ক্রীড়াঙ্গনে একসময় সবচেয়ে ক্ষমতাধর ও বৈচিত্র্যময় ব্যক্তিত্বদের অন্যতম ছিলেন। এই বছরের জুন মাসে একটি প্রতারণার মামলায় দোষী সাব্যস্ত হন মামিচ। ওই মামলার সঙ্গে মদ্রিচেরও সম্পর্ক ছিল।
২০০৮ সালে স্থানীয় ক্লাব ডায়নামো জাগরেভ থেকে বৃটিশ ক্লাব টটেনহ্যাম হটস্পারে মদ্রিচের দলবদল এবং ২০১০ সালে ডায়নামো থেকে ফ্রান্সের অলিম্পিক লিয়োনাসে দেজান লভরেনের দলবদলই ছিল ওই মামলার মূল ইস্যু। সমস্যাটা হলো, দ্রাভকো মামিচ একাধারে ডায়নামো জাগরেভের প্রধান নির্বাহী ছিলেন, আবার মদ্রিচ ও লভরেনের এজেন্টও ছিলেন! স্বাভাবিকভাবেই তার এই দুই ভূমিকা পরস্পরবিরোধী। অভিযোগ উঠে, ওই দুই দলবদল থেকে অঢেল অর্থের ভাগ পেয়েছেন মামিচ।
মামিচের বিরুদ্ধে মূলত অভিযোগ ছিল যে, ডায়নামো জাগরেভ থেকে খেলোয়াড়দের দলবদল করিয়ে তিনি অবৈধভাবে ব্যক্তিগত লাভ ঘরে তুলেছেন। এখানে সমস্যাটা হলো, ডায়নামো কোনো ব্যক্তি-মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান নয়। এর মালিক হলো ভক্তরা! অনেকটা সমিতির মতো চলে এই ক্লাব। মামিচ এখানে যেই কাজটা করেছেন সেটা হলো, তিনি ক্রোয়েশিয়ান তরুণ প্রতিশ্রুতিশীল খেলোয়াড়দের বিদেশি ক্লাবে চুক্তি পাইয়ে দিতে সহায়তা করতেন। বিনিময়ে তিনি ওই খেলোয়াড়দের প্রাপ্য অর্থ বা বেতন থেকে অর্ধেক অর্থ নিতেন! কিন্তু তিনি নিজে একটি ক্লাবের কর্তা; তার ভূমিকা হওয়া উচিত ছিল, তিনি নিজ ক্লাবের স্বার্থ দেখবেন। অথচ, তিনি ব্যক্তিগত লাভের জন্য ক্লাবের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে খেলোয়াড়দের বেচতে সহায়তা করতেন। এজন্যই প্রতারণা ও বিশ্বাস ভঙ্গের অভিযোগ উঠে তার বিরুদ্ধে।
মমিচের বিচার প্রক্রিয়ায় সাক্ষ্যও দিয়েছিলেন মদ্রিচ। নিজের দেওয়া সাক্ষ্যে মদ্রিচ প্রথমে বলেছিলেন, মামিচের ছেলে বা ভাইকে নিয়ে তিনি ব্যাংকে যেতেন; আর নিজের হাতে লাখ লাখ ডলার উত্তোলন করে তা নগদে তাদের হাতে তুলে দিতেন। এই পর্যন্ত ঠিক ছিল। ভক্তরা বরং এক প্রভাবশালী ফুটবল কর্তার শোষণের শিকার হওয়ায় মদ্রিচ ও লভরেনের প্রতি সহানুভূতিশীলই ছিলেন। কিন্তু সমস্যাটা হলো, পরে মামিচের বিরুদ্ধে দেওয়া এই বক্তব্য থেকে সরে আসেন তারা! তখনই মুহূর্তেই ভীষণ অজনপ্রিয় হয়ে যান মদ্রিচ ও লভরেন। কারণ, মামিচ তখন দেশের প্রায় প্রত্যেক ফুটবল ভক্তের কাছে ঘৃণিত। আর মদ্রিচ ও লভরেন কিনা তাকে রক্ষা করতেই বক্তব্য পালটে ফেলেছেন!
টেলিভিশনে সম্প্রচারিত শুনানিতে দেখা যায়, বিচারক প্রথমে মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী মদ্রিচকে তার পূর্বতন বিবৃতি দেখান। ওই বিবৃতিতে মামিচের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন মদ্রিচ। কিন্তু সেদিন আদালতের সামনে আমতা আমতা করে নিজের পুরোনো বক্তব্য থেকে সরে আসেন মদ্রিচ। এটি ছিল ২০১৭ সালের ঘটনা।
এরপর মদ্রিচ ও লভরেনের বিরুদ্ধে মিথ্যা বিবৃতি দেওয়ার অভিযোগে তদন্ত শুরু হয়। ভাবা হয়, একজন ঘৃণিত ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে বাঁচাতেই তারা মিথ্যা বলছেন। এ ঘটনার প্রতিক্রিয়া হয় ভয়াবহ। যাদারে একটি হোটেলে নব্বইয়ের দশকে শরণার্থী হিসেবে থাকতে হয়েছিল মদ্রিচের পরিবারকে। সেই হোটেলের দেওয়ালে কেউ একজন লিখে যায়, ‘লুকা (মদ্রিচের ডাক নাম), এই একটা দিন তোমার অনেকদিন মনে থাকবে।’
ডায়নামো জাগরেভ দলের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী হাজদুক স্পিøট দলের ভক্তরা মদ্রিচ-বিরোধী সেøাগানও তোলে! যদিও মদ্রিচ ডায়নামো ছেড়েছেন এক দশক আগে, আর এখন খেলেন বিদেশের এক ক্লাবে! মূলত, মামিচকে দমানোর সুযোগ নষ্ট করে দেওয়ায় মদ্রিচের ওপর এত ক্ষোভ ভক্তদের।
তবে মদ্রিচের পল্টি সত্ত্বেও, মামিচকে সাড়ে ছয় বছরের কারাদ- দেয় একটি আদালত। মামিচের ভাই জোরান, যিনি নিজেও ডায়নামোর সাবেক খেলোয়াড় ও কোচ, পান ৫ বছরের সাজা। তবে মামিচ রায় ঘোষণার আগেই পালিয়ে যান প্রতিবেশী দেশ বসনিয়া ও হার্জেগোভেনিয়ায়।
ফুটবল ক্রোয়েশিয়ায় স্রেফ একটি খেলা নয়, বরং ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আর মামিচ কেবল একজন ক্রীড়া নির্বাহীই ছিলেন না। ডায়নামো জাগরেভের প্রধান নির্বাহী হিসেবে তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক ও উঠাবসা ছিল বিচারক, রাজনীতিক, গণমাধ্যম প্রধান ও পুলিশের সঙ্গে। আর ডায়নামো জাগরেভ এতটাই ক্ষমতার কেন্দ্রের নিকটে ছিল, এটি অনেক সময় ছিল জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ও মনোভাবের প্রতীক। ফলে এটি আর দশটা সাদামাটা ফুটবল ক্লাব ছিল না।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্শাল টিটো যখন যুগো¯¬াভিয়াকে ঐক্যবদ্ধ করলেন, তখন ডায়নামোর সঙ্গে সার্বিয়ার বেলগ্রেড-ভিত্তিক রেড স্টার ও পার্টিজান দলের খেলা ছিল ভয়াবহ জাতীয়তাবাদী বৈরিতার বিষয়। এসব খেলাকে ক্রোটসরা দেখতো দেশে সার্ব আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রদর্শনের সুযোগ হিসেবে। ইউরোপজুড়ে ফুটবল ক্লাবে-ক্লাবে যে দ্বৈরথ, তার মধ্যে সবচেয়ে উত্তেজনাকর ছিল ডায়নামো ও রেড স্টারের মধ্যকার ম্যাচ। স্পেনে রিয়াল মাদ্রিদ ও বার্সেলোনা, ইতালিতে রোমা ও লাজিও, স্কটল্যান্ডে গ্লাসগো সেলটিক ও রেঞ্জার্সের মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতাও এতটা তীব্র ছিল না।
১৯৯০ সালের ১৩ই মে, ডায়নামো ও রেড স্টারের মধ্যকার একটি ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ভক্তরা মাঠে নেমে সহিংসতায় লিপ্ত হন। সেদিন সার্বিয়ান এক পুলিশ কর্মকর্তার আঘাত পেয়েও ডায়নামোর তারকা খেলোয়াড় জভোনিমির বোবান পালটা লড়াই করেছেন। সার্বিয়ানপন্থী বলে পরিচিত পুলিশের এক সদস্যকে তিনি কষে লাথি মেরে যে খ্যাতি তিনি পেয়েছিলেন, সেটা তিনি আগে-পরে কোনো গোলও করে পাননি।
১৯৯২ সালে, যুগো¯ে¬াভিয়া থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা ও সার্বদের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে, ক্রোয়েশিয়ান জাতীয়তাবাদ ছিল তুঙ্গে। তখন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঞ্জো টাডজম্যান চাইলেন ক্রোয়েশিয়ার সবচেয়ে বিখ্যাত ক্লাবটির নাম ডায়নামো পরিবর্তন করে হাস্ক গ্রাদজানস্কি রাখবেন। প্রেসিডেন্ট মনে করতেন ডায়নামো হলো কম্যুনিস্ট যুগের প্রতীক। আর নবস্বাধীন দেশে নিজের ব্যক্তিগত ছাপ রাখারও ইচ্ছা ছিল তার। হাস্ক গ্রাদজানস্কির প্রতি টাডজম্যান সরকারের সমর্থন ছিল অসীম। প্রেসিডেন্ট নিজের ঘনিষ্ঠ বন্ধু মিরো¯¬াভ ব্লাজেভিচকে ক্লাবের প্রেসিডেন্ট ও কোচ হিসেবে নিয়োগ দেন। ব্লাজেভিচই পরে ক্রোয়েশিয়াকে ১৯৯৮ সেমিফাইনালে তুলেছিলেন।
তবে সমস্যা ছিল একটাই। ডায়নামো ক্লাবের অনেক একনিষ্ঠ ভক্ত, যারা ১৯৯০ সালের ওই দাঙ্গায়ও অংশ নিয়েছিলেন, তাদের কাছে নতুন নামটা খুবই হাস্যকর মনে হয়। পরে ১৯৯৩ সালে ক্লাবের নাম পরিবর্তন করে ক্রোয়েশিয়া জাগরেভ রাখা হয়। এবার টাডজম্যানের যুক্তি ছিল অকাট্য। তিনি বলেন, ক্রোয়েশিয়ার শীর্ষ ক্লাব এখন থেকে ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে। সুতরাং, ক্লাবের নাম ক্রোয়েশিয়া জাগরেভ রাখা হলে ক্লাবটি বিদেশে দেশের দূতের ভূমিকা পালন করবে। তবে টাডজম্যানের মৃত্যুর পর ২০০০ সালে ফের ক্লাবের নাম পরিবর্তন করে ডায়নামো জাগরেভ রাখা হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অবশ্য ডায়নামো ইউরোপিয়ান ফুটবলে দ্যুতি ছড়াতে পারেনি। তবে ইউরোপের কিছু সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের উত্থান এখানেই, যারা পরে খেলেছেন ইউরোপের সেরা সব ক্লাবে। এদের মধ্যে আছেন মদ্রিচ, লভরেন ও ইতালির শীর্ষস্থানীয় ক্লাব জুভেন্টাসের স্ট্রাইকার মারিও মান্দজুকিচ। এদের সবার সঙ্গেই কিন্তু মামিচের সংশ্লিষ্টতা আছে।
তবে ক্রোয়েশিয়া দলের সবাই এমন ব্রাত্য নয়। বর্তমান দলের অন্তত একজন তারকা খেলোয়াড়, আন্দ্রেজ ক্রামারিচ প্রকাশ্যে মামিচের দুর্নীতির নিন্দা জানিয়েছেন। আন্দ্রেজ ক্রামারিচ যখন তরুণ ছিলেন তখন ডায়নামোতে খেলতেন। সেই সময় তিনি মামিচের সঙ্গে ভবিষ্যৎ আয় ভাগাভাগির চুক্তিতে আসতে অস্বীকৃতি জানান। ২০১৩ সালে, ক্রামারিচ প্রকাশ্যে অভিযোগ করেন, এ কারণে তাকে ডায়নামোতে বেশিক্ষণ খেলতে দেওয়া হচ্ছে না। তবে তখন ক্রামারিচ ডায়নামোতে একঘরে হয়ে পড়েন। তিনি ওই বছরই ক্লাবটি ছেড়ে দেন। পরে ইউরোপের বেশ কয়েকটি দলে খেলা শেষে বর্তমানে তিনি খেলছেন জার্মানির হফেনহেইমে। এছাড়া জাতীয় দলেও এখন তার আসন পাকাপোক্ত।
মামিচের দাবির মুখে ক্রামারিচের নতি স্বীকার না করা এখন ক্রোয়েশিয়া জুড়ে অনেক প্রশংসিত হচ্ছে। অনেকের মতে, এমনই হওয়া উচিত ক্রোয়েশিয়ার প্রত্যেক খেলোয়াড়। তবে বাস্তবতা হলো, ক্রামারিচ স্রেফ একজন ব্যতিক্রম।
ডেনমার্কের বিরুদ্ধে শেষ ষোলোর ম্যাচে মদ্রিচ যখন পেনাল্টি মিস করলেন, খেলা তখন ট্রাইবেকারে গড়ালো। তখন ক্রামারিচ সহজেই নিজের গোলটি করলেন। এরপর মদ্রিচ যখন শ্যুট নিতে আসলেন তখন গোটা স্টেডিয়াম আর টেলিভিশনের কোটি দর্শক উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করছিলেন: মদ্রিচ কি ১৫ মিনিট আগের ভুলটির পুনরাবৃত্তি করবেন নাকি গোল করে ক্ষতি পুষিয়ে দেবেন? ডেনমার্কের কোচ সবাইকে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, এ ধরনের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ খেলায় পেনাল্টি শ্যুটআউট যেই খেলোয়াড় করবেন তার শরীরে এতটাই আড্রেনাইল উৎপন্ন হয় যতটা যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা কোনো ব্যক্তির হয়। তবে দ্বিতীয়বার মদ্রিচ সফলভাবে গোল করেন। ক্রোয়েশিয়ান ভক্তরাও স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়েন। ১৫ মিনিট আগেও মদ্রিচ তাদের হতাশ করেছিলেন; হতাশ করেছিলেন আদালতে সাক্ষ্য দিতে গেলেও, তবে এই বার অন্তত স্বস্তির সুবাতাস এনে দিতে পেরেছেন।
ক্রোয়েশিয়ার কোচ ওই ম্যাচ শেষে তাই প্রশ্ন ছোঁড়েন, ‘আপনারা কেউ একবার চিন্তা করতে পারেন, যদি সে দ্বিতীয়বারও ব্যর্থ হতো, তাহলে কী ঘটতো?’

মধ্য আফ্রিকায় শান্তিরক্ষীদের সম্ভাবনা দেখছেন গুডউইল টিমের সদস্যরা by কাজী সোহাগ

মধ্য আফ্রিকায় কাজ করা বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের সমস্যা ও সম্ভাবনার বিষয়টি পর্যালোচনা করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ প্রতিনিধি দল। ২৭শে জুন থেকে ৬ই জুন পর্যন্ত ৮ সদস্যের দলটি সেখানে অবস্থান করছেন। এ সময়ের মধ্যে তারা বাংলাদেশের তিনটি কন্টিনজেন্ট বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ন (ব্যানব্যাট), বাংলাদেশ স্পেশাল ফোর্স (ব্যানএসএফ) ও বাংলাদেশ মেডিকেল (ব্যানমেড) পরিদর্শন করেছেন। সেখানে কর্মরতদের সঙ্গে সার্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন তাদের সমস্যার কথা। আবার শান্তিরক্ষীদের অর্জন ও সাফল্যের কথা শুনে বাহবা দিয়েছেন। দলটির নেতৃত্বে আছেন মেজর জেনারেল এসএম শামিম-উজ-জামান। মধ্য আফ্রিকায় আসা গুডউইলের টিমের সদস্যরা নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয় ভাগ করে নেন। এর মধ্যে মিশন এলাকার রাজনৈতিক অবস্থা ও সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাফিজ আহসান ফরিদ, কন্টিনজেন্টের অভ্যন্তরীণ সমস্যা ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্ভাবনা নিয়ে দেখভাল করছেন কর্নেল নুরুল হুদা, মিশন এলাকার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের বিষয় নিয়ে কাজ করছেন লে. কর্নেল সিদ্দিকুর রহমান, কন্টিনজেন্টের অস্ত্র ও সরঞ্জামাদির কার্যক্ষমতা পর্যালোচনা করছেন মেজর মঈদুল হায়দার চৌধুরী, কন্টিনজেন্টর আবাসস্থল পরিস্থিতি বিশ্লেষণের দায়িত্বে আছেন মেজর ইসমাইল কবির, কন্টিনজেন্টের লজিস্টিক সাপোর্ট দেখছেন মেজর সাকিবুল হক। এছাড়া অন্যান্য বিষয় পর্যালোচনা করছেন মেজর জেনারেল এসএম শামিম-উজ-জামান। বিশেষ করে মধ্য আফ্রিকার প্রধানমন্ত্রী, স্পিকারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, জাতিসংঘের মিশন পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ ও মিশনে অংশ নেয়া অন্যান্য দেশের কন্টিনজেন্ট প্রধানদের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন তিনি। মধ্য আফ্রিকাতে বাংলাদেশি মিশন পরিচালনায় আরও উন্নয়নে কী কী পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে তা খতিয়ে দেখছে টিমটি। পাশাপাশি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে গুডউইল ভিজিটের টিমের পক্ষ থেকে।
টিমের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রতি বছর নিয়মিত এধরনের গুডউইল ট্যুরে আসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি টিম। মিশনে যারা কর্মরত তাদের কাজের নানা দিক পর্যালোচনা করা হয়। এছাড়া পরবর্তী মিশনে যে টিম কাজ করবে তাদের জন্য করণীয় কী হতে পারে তা নির্ধারণে এই টিম সুপারিশ তৈরি করে। সংশ্লিষ্টরা জানান, ভবিষ্যতে মধ্য আফ্রিকায় শান্তি মিশনে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আরও কী কী কাজ করা যেতে পারে সে বিষয়টিও গভীরভাবে দেখা হবে। মিশন এলাকার রাজনৈতিক ও সার্বিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাফিজ আহসান ফরিদ মানবজমিনকে বলেন, এ দেশের সম্পদের ওপর এখন অনেক দেশের আগ্রহ রয়েছে। সবাই সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করছে। তাই দ্বন্দ্বটা আগের চেয়ে বেড়েছে বলে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি। আগে বিভিন্ন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাত ছিল এখন সেটা কিছুটা ধর্মীয় দিকে মোড় নিয়েছে। তিনি বলেন, বোয়ারের হেড অব অফিস আমাদের জানিয়েছেন, এখানে মুসলমানদের হাতে সব ধরনের অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে কিন্তু তাদের রাজনৈতিক কোনো ক্ষমতা নেই। আর খ্রিস্টানদের কাছে রয়েছে রাজনৈতিক ক্ষমতা কিন্তু অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নেই। তিনি বলেন, বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা এখানে জাতিসংঘের হেলমেট পরার কারণে কোনো দলের হয়ে কাজ করতে পারবেন না। তারা জাতিসংঘের নির্দেশনা মেনে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে চলেছেন। কন্টিনজেন্টের অভ্যন্ত্ররীণ সমস্যা ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্ভাবনা প্রসঙ্গে কর্নেল নুরুল হুদা মানবজমিনকে বলেন, অন্যান্য মিশনের তুলনায় এখানে বাংলাদেশের সক্ষমতার তুলনায় বেশি এলাকাজুড়ে কাজ করতে হচ্ছে। বলা যায়, অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের কাজ করতে হচ্ছে। ব্যবসা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ দেশে বাজার খুব ছোট। এখানে অনেক ভার্জিন ল্যান্ড রয়েছে। এমনও অনেক জায়গা রয়েছে যেখানে মানুষের পা পড়েনি। ভূমিগুলোও অনেক উর্বর। তাই কৃষিনির্ভর ব্যবসা করার সুযোগ রয়েছে। এছাড়া যোগাযোগ সেক্টর বিশেষ করে টেলিকমিউনেকেশন খাতেও ব্যবসা করার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করি।
মিশন এলাকার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের বিষয় প্রসঙ্গে লে. কর্নেল সিদ্দিকুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, মিশনে যারা কাজ করেন তাদের মূলত প্রশিক্ষণ নিতে হয় বাংলাদেশে। কিন্তু দেশের প্রশিক্ষণ নিয়ে এ ধরনের দুর্গম ও বিরূপ পরিবেশে কাজ করাটা দুরূহ বিষয়। বলা যায়, এখানকার পরিস্থিতি প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে। তাই বেসিক প্রশিক্ষণ নিয়ে এখানকার ভিন্ন পরিস্থিতিতে কাজ করাটাই মূল চ্যালেঞ্জের বিষয়। তিনি বলেন, এরই মধ্যে মধ্য আফ্রিকায় মিশন কয়েক বছর হয়ে গেছে। তাই এখানে যারা কাজ করে গেছেন তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে। প্রতি বছর অপারেশনের জন্য অস্ত্রশস্ত্রসহ নানা ইক্যুপমেন্টের প্রয়োজন হয়। এসব সরবরাহ করে বাংলাদেশ। জাতিসংঘ এজন্য বাংলাদেশকে ভাড়া পরিশোধ করে। দ্বন্দ্ব সংঘাত লেগে থাকা এসব অঞ্চলে সব সময় ঝুঁকির মধ্যে থাকতে হয় মিশনে কর্মরত বাংলাদেশিদের। সংঘাতে জড়িতরা প্রতিনিয়ত আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হচ্ছে। তাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এখানে বাড়াতে হচ্ছে আধুনিক অস্ত্রের মজুদ। গুডউইল ভিজিটের টিমের সদস্যরা শান্তিরক্ষী মিশনে আধুনিক অস্ত্র সংযোজনের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখছেন। প্রয়োজন অনুযায়ী তারা অস্ত্র সংযোজনের পরামর্শ দেবেন। এ প্রসঙ্গে মেজর মঈদুল হায়দার চৌধুরী মানবজমিনকে বলেন, এখানে ২১টি দেশ শান্তিরক্ষায় কাজ করছে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তারা অস্ত্র ব্যবহার করছে। তাছাড়া আফ্রিকায় যেসব সন্ত্রাসী আছে তাদের হাতে রয়েছে আধুনিক মারণাস্ত্র। আমাদের শান্তিরক্ষীরা তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজে নিয়োজিত রয়েছে। তাই তাদের হাতে কী ধরনের অত্যাধুনিক অস্ত্র থাকা প্রয়োজন তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তিনি বলেন, এসব পর্যালোচনা করে একটি প্রতিবেদন সেনাসদরে দেয়া হবে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। লজিস্টিক সাপোর্ট প্রসঙ্গে মেজর সাকিবুল হক বলেন, শান্তিরক্ষীদের জন্য বরাদ্দ রসদ সরবরাহে অনেক সময় দেরি হচ্ছে। আবার কিছু জটিলতার কারণে কোনো কোনো শান্তিরক্ষীকে অতিরিক্ত সময় থাকতে হচ্ছে। এসব বিষয় নিয়ে সুপারিশ দেয়া হবে। তিনি বলেন, মধ্য আফ্রিকা হচ্ছে দুর্গম এলাকা। এখানে বিকাল ৫টার পর হেলিকপ্টার সুবিধা পাওয়া যায় না। তাই জরুরি ভিত্তিতে কাউকে উদ্ধার বা চিকিৎসার প্রয়োজন হলে তাতে ব্যাঘাত ঘটছে। এ এলাকায় দ্রুত হেলিকপ্টার সুবিধা আরও বাড়ানো উচিত বলে মনে করি। এদিকে কন্টিনজেন্টের আবাসস্থল পরিস্থিতি বিশ্লেষণের দায়িত্বে থাকা মেজর ইসমাইল কবির সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এখানকার কন্টিনজেন্টগুলো তিন থেকে চার বছর হয়েছে মাত্র। তাই আবাস্থলের জন্য যা নির্মাণ করা হয়েছে তা এখনও নতুন রয়েছে। গুডউইল টিমের অপর সদস্য ক্যাপ্টেন খোরশেদ হাসান বলেন, অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও এখানে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা কাজ করছেন। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবিলা করছেন। এর মাধ্যমে তারা দেশকে করছেন সম্মানিত, লাল-সবুজের পতাকাকে তুলে ধরছেন বিশ্ব শান্তির মঞ্চে।

মধ্য আফ্রিকায় চিকিৎসা সেবায় অনন্য বাংলাদেশ by কাজী সোহাগ

বাংলাদেশি চিকিৎসকদের নিয়ে রীতিমতো বন্দনা হচ্ছে মধ্য আফ্রিকায়। প্রচলিত রয়েছে  , বাংলাদেশি চিকিৎসকদের হাতে পড়লে নাকি রোগ পালিয়ে বাঁচে। কারণ, তাদের ওপর রয়েছে অগাধ আস্থা ও বিশ্বাস। তাই তো শান্তিরক্ষায় নিয়োজিত বিভিন্ন দেশের ১২টি ইউনিটের সদস্যরা অসুস্থ হলেই ছুটে আসেন বাংলাদেশ মেডিকেল লেভেল-টু হাসপাতালে। এ ছাড়া দুর্গম অঞ্চলে কষ্ট স্বীকার করে চিকিৎসা সেবা দিয়ে অনন্য নজির স্থাপন করেছে বাংলাদেশ। মধ্য আফ্রিকার কেন্দ্র কাগা-বান্দোরো নামক স্থানে অবস্থিত মেডিকেলটি ব্যানমেড নামে সবচেয়ে বেশি পরিচিত। ৬৯ জন জনবল নিয়ে ২০ বেডের এ হাসপাতালটি পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশের তিনটি কন্টিনজেন্টের মধ্যে এটা অন্যতম। অপর দুটি কন্টিনজেন্টের একটি রয়েছে রাজধানী বাংগুইতে বাংলাদেশ স্পেশাল ফোর্স বা ব্যানএসএফ ও বোয়ারে রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ন বা ব্যানব্যাট। মঙ্গলবার রাজধানী বাংগুই থেকে হেলিকপ্টারে দেড় ঘণ্টা পর কাগা-বান্দোরোতে পৌঁছে বাংলাদেশ থেকে আসা সেনাবাহিনীর ৮ সদস্যের ডেলিগেশন টিম। এর নেতৃত্ব দিচ্ছেন মেজর জেনারেল এস এম শামিম-উজ-জামান। টিমের অন্য সদস্যরা হলেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাফিজ আহসান ফরিদ, কর্নেল নুরুল হুদা, লে. কর্নেল সিদ্দিকুর রহমান, মেজর মঈদুল হায়দার চৌধুরী, মেজর ইসমাইল কবির, মেজর সাকিবুল হক ও ক্যাপ্টেন খোরশেদ হাসান। ২৭শে জুন থেকে ৬ই জুন পর্যন্ত দলটি এখানে অবস্থান করবে। সরজমিনে ব্যানমেডে গিয়ে দেখা যায়, পাকিস্তান ও রুয়ান্ডার দুই শান্তিরক্ষী চিকিৎসা নিচ্ছেন। অপর পাশে চিকিৎসা নিতে দেখা যায় স্থানীয় কয়েক নারী ও শিশুকে। পেটে তীব্র ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সদস্য মোহাম্মদ ইলিয়াস মানবজমিনকে বলেন, চারদিন আগে ভর্তি হয়েছি। সত্যিই আমি অভিভূত এখানকার চিকিৎসা ব্যবস্থা দেখে। বিশেষ করে চিকিৎসকদের দক্ষতা ও সেবার ধরন একেবারে আলাদা। একই প্রতিক্রিয়া জানালেন রুয়ান্ডা সেনাবাহিনীর সদস্য। মধ্য আফ্রিকার সেন্টারে অবস্থিত সব দেশের শান্তিরক্ষীরা এখানে নিয়মিত চিকিৎসা সেবা নিয়ে থাকেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য দেশ হচ্ছে- মৌরিতানিয়া, বুরুন্ডি, রুয়ান্ডা, নাইজার ও পাকিস্তানের চারটি কন্টিনজেন্ট। সব মিলিয়ে এখানকার ২১৬০ জন শান্তিরক্ষীর চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এ সেবা দিতে গিয়ে প্রতিমুহূর্তে তাদের মুখোমুখি হতে হচ্ছে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বৈরী আবহাওয়া, ভাঙ্গাচুরা রাস্তাঘাট, প্রত্যন্ত ও দুর্গম অঞ্চল এবং টানা ছয় মাস বৃষ্টি। এর উপর রয়েছে নিরাপত্তার শংকা। প্রায় প্রতিদিনই ক্যাম্পের বাইরে গোলাগুলি চলে। নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে সংঘর্ষ এখানে নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়। কথিত আছে গরুর পা ভাঙ্গা নিয়ে লাগা মারামারিতে ১০ জনের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটেছে। এ ধরনের প্রতিকূল পরিবেশে জীবনবাজি রেখে কাজ করে চলেছেন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা। বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের সদস্য চিকিৎসক মেজর সাকিবুল হক মানবজমিনকে বলেন, সাধারণত প্রতিটি কন্টিনজেন্টে লেভেল-১ হাসাপাতাল থাকে। বাংলাদেশ শান্তিরক্ষীদের লেভেল-২ হাসপাতাল রয়েছে মাত্র দুটি। একটি মধ্য আফ্রিকার কাগা-বান্দোরোতে আরেকটি পশ্চিম সাহারাতে। এ ধরনের হাসপাতালে বলা যায় সব ধরনের চিকিৎসা ব্যবস্থা থাকে। বিশেষ করে মেডিসিন, সার্জিক্যাল, ডেন্টাল, শিশু, প্যাথলজি, গাইনোলজি, রেডিওলজি থেকে শুরু করে অবেদন পর্যন্ত। কোনো কারণে লেভেল-২ হাসপাতালে চিকিৎসার সুযোগ না থাকলে তাদের পাঠানো হয় লেভেল-৩ হাসপাতালে।
এ হাসপাতাল রয়েছে উগান্ডায়। বাংলাদেশের লেভেল-২ হাসপাতালের গত বছরের নভেম্বর থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত চিকিৎসা সেবার পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এ সময়ের মধ্যে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে দুই হাজার ৮০২ জনকে। এ ছাড়া বিভিন্ন রোগের জন্য ভর্তি হন ১২২ জন, জটিল অপারেশন করা হয় ২০ জন রোগীকে। পাশাপাশি ছোট অপারেশন করা হয়েছে ৩৯টি, সার্জিক্যাল ড্রেসিং ১৬০ জনের, দাঁতের রোগী দেখা হয়েছে ২৩৯ জন, হেলিকপ্টারে করে লেভেল-৩ হাসাপাতালে পাঠানো হয়েছে ৪ জনকে। এর মধ্যে দুই জন সামরিক ও ২ জন স্থানীয়। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তারা হাসপাতালে ভর্তি হন। ৮ মাসে বিভিন্ন ধরনের ল্যাব টেস্ট করা হয়েছে ৫ হাজার ৫৪৪টি, ম্যালেরিয়া রোগী দেখা হয়েছে ৪০জন, এইডস রোগী ছিল ৪ জন, এক্সরে করা হয়েছে ১ হাজার ১৮০টি ও ইউএসজি ১৬৫টি। হাসপাতালের সিনিয়র চিকিৎসক লে. কর্নেল রাশেদ মিনহাজ সিদ্দিকী মানবজমিনকে বলেন, হাসপাতালে ২০টি বেডের পাশাপাশি আমরা আরো ৫০ জন রোগীকে একবারে চিকিৎসা সেবা দিতে পারি। শান্তিরক্ষী মিশনে থাকা ব্যক্তিদের পাশাপাশি এ হাসপাতালের মাধ্যমে নানা বেসামরিক, স্থানীয় ও এ এলাকায় কাজ করা বিভিন্ন এনজিও কর্মীদের চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়। তিনি বলেন, আমাদের হাসপাতালের দরজা সব সময় সবার জন্য খোলা থাকে। অসুস্থ হয়ে কেউ হাসপাতালে এলে আমরা তাদের ফিরিয়ে দিই না। এখানে মানবতার বিষয়টি গুরুত্ব দেয়া হয় সবচেয়ে বেশি। ২/৩ মাস পরপর প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে মেডিকেল ক্যাম্প স্থাপন করে চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকি। এ ধরনের ৩টি ক্যাম্প করেছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি ব্যানমেডের কাছে আইডিপিতে থাকা মানুষদের স্বাস্থ্য সচেতনতায় কাজ করা হয়। সন্ত্রাসীদের ভয়ে যারা নিজ এলাকায় থাকতে পারেন না তারা শান্তিরক্ষী ক্যাম্পের আশেপাশে আইডিপিতে থাকেন। এরকম ৫ হাজারের বেশি মানুষ রয়েছে আমাদের ক্যাম্পের পাশে থাকা আইডিপিতে। হাসপাতালের নার্সিং অফিসার মেজর নুরুন্নাহার মানবজমিনকে বলেন, বাংলাদেশের চিকিৎসা সেবা পেয়ে এখানকার প্রতিটি মানুষ খুব খুশি। এখানে আমরা দেশের প্রতিনিধিত্ব করছি। তাই সবাই সবার জায়গা থেকে সেরা কাজটা করে দেখাচ্ছেন। বাংলাদেশের সুনাম অর্জনকারী এ হাসপাতালটিতে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন কন্টিনজেন্ট কমান্ডার (সিসি) কর্নেল আমিনা হাসনাত চৌধুরী। মধ্য আফ্রিকায় বাংলাদেশের প্রথম নারী কন্টিনজেন্ট কমান্ডার তিনি। এর আগে ২০১৬ সালে আইভরিকোস্টে প্রথম নারী কন্টিনজেন্ট কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন কর্নেল নাজমা বেগম। তিনি মানবজমিনকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ৬৯ জন কর্মীর মধ্যে ৮ জন রয়েছে নারী শান্তিরক্ষী। সবাই পেশাগতভাবে খুব মনোযোগ দিয়ে কাজ করছেন। সুখের বিষয় এ পর্যন্ত আমাদের কেউ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হননি। সবাই জানেন এখানে ম্যালেরিয়া একটি বড় বাধা। তিনি বলেন, শান্তিরক্ষীদের পাশাপাশি স্থানীয় ব্যক্তিদের নিয়মিত জরুরি চিকিৎসা সেবা হচ্ছে। কাজের চ্যালেঞ্জ হিসেবে বলেন, প্রথম চ্যালেঞ্জ ম্যালেরিয়া, এইচআইভি, চিকিৎসা সেবার অনেক কিছু স্থানীয়ভাবে পাওয়া যায় না। এ ছাড়া দুর্গম এলাকা তো রয়েছেই। মধ্য আফ্রিকায় প্রথম নারী কন্টিনজেন্ট কমান্ডার হিসেবে কাজ করার প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তিনি বলেন, এখানে কন্টিনজেন্ট কমান্ডার হিসেবে কাজ করার সুযোগ দেয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ। এ পদে দায়িত্ব পালন করতে পেরে খুবই গর্বিত। এক্সাইটেড। নিজের মতো করে কাজ করতে পেরে ভালো লাগছে। কয়েক মাস পর চলে যাবো। কিন্তু জায়গাটার ওপর এরই মধ্যে মায়া পড়ে গেছে।

মহিলাবাসের সাহসিকা by মরিয়ম চম্পা

ভোলার মেয়ে সুমি। সাহস যেন তার আষ্টেপৃষ্ঠে। যেমন কথায়, তেমনি চলনবলনে। জীবনযুদ্ধ শুরু হয় জন্মের পরপরই। তিন বোন চার ভাইয়ের মধ্যে সুমি সবার বড়। সুমির আসল যুদ্ধটা শুরু হয় ।
২০১৪ সালে ভালোবেসে জাভেদ আহমেদকে বিয়ে করার পর থেকে। কী কাজ করেনি সুমি! সোয়েটার ফ্যাক্টরি, গার্মেন্ট সর্বত্রই। বিআরটিসিতে মহিলাবাসে নারী কন্ডাক্টর হিসেবে সুমির যোগদানটা ছিল অনেকটা নাটকীয়। ২০১০ সালে গাজীপুরের একটি সোয়েটার ফ্যাক্টরি থেকে কাজ শেষে চৌরাস্তা থেকে সালনা যাচ্ছিলেন। এসময় ডাবল ডেকার বাসের কন্ডাক্টরকে ভাড়ার জন্য ১শ টাকার একটি নোট দেন সুমি। কন্ডাক্টরের ভাড়া কাটা পছন্দ হয়নি সুমির। সে বাসভর্তি লোকের সামনে বলে ফেললো কেমন কন্ডাক্টর আপনে। ঠিকভাবে ভাড়াটাও কাটতে পারেন না। আপনে না পারলে আমাকে দেন, আমি কাটি। এসময় বাসে বসা বিআরটিসির এক সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, আপনে কি সত্যিই এই বাসের সব যাত্রীদের ভাড়া কাটতে পারবেন। জবাবে দৃঢ়চেতা সুমি সাহস নিয়ে বললো কেন পারবো না। এটা কোনো বিষয় হলো। এসময় সুমিকে নিয়ে ওই কর্মকর্তা উত্তরা বিআরটিসির বাস ডিপোতে যান। ডিপো ম্যানেজার তাকে গাজীপুর থেকে ঢাকা পর্যন্ত কয়টি বাসস্ট্যান্ড এবং প্রত্যেক স্ট্যান্ডে কত টাকা ভাড়া জানতে চাইলেন। সুমি অনেকটা মুখস্থ বলে দিলেন। এভাবেই মুখে মুখে চাকরি হয়েছে সুমির।
সুমি যে শুধু বিআরটিসি বাসে জীবিকার তাগিদে কাজ করছেন এমনটি নয়। গত আট বছর ধরে বিআরটিসিতে চাকরির সুবাদে প্রত্যেক নারী যাত্রী তার কাছে সন্তানতুল্য। আর সে যেন মস্ত বড় অভিভাবক। প্রতি পদে পদে সাহসিকতা ও দায়িত্বের পরিচয় দিয়েছেন সুমি। কয়েক মাস আগে কাওরানবাজার সিগনালে এক বয়স্ক নারী যাত্রীকে নামাতে গেলে পেছন থেকে তাকে একটি পুরুষ বাইকার ধাক্কা দেয়। এসময় সুমি তার যাত্রীকে রক্ষা করতে গাড়িতে থাকা অবস্থায়ই মটরসাইকেলটিকে লাথি মেরে ফেলে দেন। সাহসী সুমি একদিকে যেমন কঠোরভাবে দায়িত্বশীল। তেমনি স্নেহময়ীও। কোনো পুরুষ যাত্রী যদি ভুল করে তার বাসে উঠে যায় তখন সুমি উত্তেজিত না হয়ে বরং অনেক সুন্দর করে বুঝিয়ে বলেন বাবা এটা শুধুমাত্র মহিলা যাত্রীদের জন্য। গত কয়েক বছর আগে বনানীতে এক সিএনজি চালক ও তার যাত্রীকে ছিনতাইকারীদের হাত থেকে রক্ষা করে বাহবা কুড়াতে ভোলেননি সুমি। ২০১৪ সালে বিয়ের পরপরই এফডিসির ক্যামেরা সহযোগী জাভেদের সঙ্গে তার বিচ্ছেদ হয়ে যায়। তিন বছর বয়সী এক ছেলেই এখন তার একমাত্র ভরসা। সুমির ইচ্ছা ভবিষ্যতে সে বিআরটিসির বাস ড্রাইভার হবে। ইতিমধ্যে সুমি প্রাইভেট কার চালানো শিখে গেছেন। এখন বিআরটিসি ডাবলডেকার বাসটির স্টিয়ারিংয়ে হাত রাখার অপেক্ষা। সুমি বলেন, একজন নারী হিসেবে কোনো কাজকেই আমি ছোট করে দেখি না। আমি কাজের মাঝে অনেক আনন্দ খুঁজে পাই। সকাল-বিকাল দুই টাইম ডিউটি- বাকিটা সময় বাসায়। তাছাড়া বাসে যতক্ষণ থাকি ততক্ষণ মন খারাপ হওয়ার কোনো সুযোগই নেই। বাসে সকল যাত্রীই যেন আমার আত্মীয়। আমার আপনজন। এমনকি বাসের ভাড়া নিয়েও বাড়াবাড়ির ধারেকাছে নেই সুমি।
রাজধানীতে সব ধরনের কর্মসংস্থানে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা বেড়েই চলছে। এর ফলে পরিবহনের ভেতরেও নারীর সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ বিষয়ে বিআরটিসির ডিজিএম অপারেশন মি. আলমাস বলেন, ঢাকা সিটিতে বর্তমানে ১৫টি রুটে মোট ১৮টি বিআরটিসির মহিলা বাস সার্ভিস চালু আছে। এগুলো মিরপুর-১২ থেকে মতিঝিল, শাহবাগ থেকে আব্দুল্লাহপুর, আব্দুল্লাহপুর থেকে মতিঝিল, খিলক্ষেত থেকে গুলিস্তান। নতুনবাজার, মধ্যবাড্ডা থেকে মতিঝিল, বনশ্রী থেকে মতিঝিল, নারায়ণগঞ্জ থেকে মতিঝিল, মিরপুর-১০ থেকে মতিঝিল, মিরপুর-১৪ থেকে মতিঝিল। মিরপুর-১ থেকে শাহবাগ ভায়া টেকনিক্যাল, মিরপুর-১ থেকে শাহবাগ ভায়া বাংলামোটর, সাভার টু মতিঝিল, শিববাড়ী টু মতিঝিল, শ্যামলী সূচনা কমিউনিটি সেন্টার টু মতিঝিল, মোহাম্মাদপুর টু মতিঝিল ভায়া ঝিগাতলা বাসস্ট্যান্ড। এগুলো খিলক্ষেত, মতিঝিল, কল্যাণপুর, মোহাম্মদপুর ও মিরপুর ডিপো থেকে সকাল ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে ছেড়ে যায় এবং বিকাল ৫-৬টার সময় চলে আসে। এগুলো সবই টু টাইম সার্ভিস অর্থাৎ সকাল ও সন্ধ্যা। এসব বাসের অধিকাংশ যাত্রীই ব্যাংক কর্মকর্তা ও বেসরকারি চাকরিজীবী।
এতগুলো বাস চালু থাকা সত্ত্বেও গত দুই মাস আগে দোলনাচাপা নামে মহিলাদের জন্য নতুন একটি বাস সার্ভিস চালু হয়। যদিও এসব বাসের খবর জানেন না অধিকাংশ নারী। বিকাল ৪টা। ফার্মগেট মোড়ে শত শত যাত্রীর সঙ্গে পরিবহনের অপেক্ষায় কর্মজীবী নারী সানজিদা। গন্তব্য উত্তরা এয়ারপোর্ট টু আব্দুল্লাহপুর। নাকের ডগার সামনে দিয়ে একের পর এক বাস যাচ্ছে। কিন্তু সানজিদা বারবার চেষ্টা করেও উঠতে ব্যর্থ। আধ ঘণ্টার চেষ্টায় ৩ নাম্বার একটি বাসে উঠতে সমর্থ হলেও ততক্ষণে হজম করতে হয়েছে পরিবহন কর্মচারীদের নানা হয়রানিমূলক আচরণ। প্রায় দুই কোটিরও বেশি মানুষের বসবাস রাজধানী ঢাকায়। ঘন বসতিপূর্ণ এই নগরীতে নানা দুর্ভোগ নিয়ে বসবাস মানুষের। তার মধ্যে প্রতিদিনের একটি দুর্ভোগ পরিবহন সংকট। এর সঙ্গে যানজট ঠেলে রাজধানীর জীবনযাপন দুঃস্বপ্ন হিসেবে ধরা দিয়েছে নগরবাসীর কাছে। দুর্ভোগের এই শহরে পরিবহনে পুরুষেরা বাদুড় ঝোলা হয়ে চলাচল করলেও ভোগান্তির শেষ নেই নারীদের। রাজধানীর বিভিন্ন রুটে বিআরটিসি মহিলা বাস সার্ভিস চালু থাকলেও পর্যাপ্ত না হওয়ায় গণপরিবহনে নানাভাবে নিগ্রহের শিকার হয় কর্মজীবী নারীরা। মহিলা বাস সার্ভিস শুধু সকাল-বিকাল দুই সময় নারীদের নিয়ে যাতায়াত করে। বাকি সময় নারীদেরও গণপরিবহনে ভোগান্তির যাতায়াত করতে হয়। অভিযোগ রয়েছে, পুরুষ যাত্রী তোলাসহ পুলিশি হয়রানির। মোহাম্মদপুর ডিপোর মহিলা বাস সার্ভিসের বাসচালক আসলাম শেখ বলেন, গত তিন বছর ধরে মহিলা বাস সার্ভিসে কাজ করছি। এটা সম্পূর্ণ ঝামেলামুক্ত একটি সার্ভিস। নারী যাত্রীরা সবাই অনেক আন্তরিক। আমার বাসে কোনো হেল্পার নেই। বাসের ৪-৫ জন নিয়মিত যাত্রী মিলেমিসে বাসের সবার ভাড়া কাটার কাজটি করে থাকেন। তবে বিড়ম্বনার বিষয় হচ্ছে প্রায় সময়ই পুলিশ বাস থামতে দেয় না। মহিলাদের বাস থেকে নামতে ৩০ সেকেন্ড থেকে ১ মিনিট পর্যন্ত সময় লাগে। এই সময়টায় প্রায়ই পুলিশ ঝামেলা করে মামলা দিয়ে দেয়। ফলে অধিকাংশ নারীকে অনেক ঝুঁকি নিয়ে বাস থেকে নামতে হয়। যেকোনো সময় ঘটে যেতে পারে যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনা।
মিরপুর-১০ থেকে প্রতিদিন সকাল ৮টায় মহিলা বাসে করে কর্মস্থলে যান মতিঝিল জনতা ব্যাংকে কর্মরত সুলতানা রহমান। মহিলা বাসে যাতায়াতের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তিনি বলেন, মহিলা বাস আমার কাছে স্বস্তির নাম। প্রতিদিন ভিড় ঠেলে নারীদের জন্য গণপরিবহনে যাতায়াত করা কঠিন। মতিঝিল থেকে সন্ধ্যায় মহিলা বাস ফিরতি ট্রিপ ছাড়ে। অফিস থেকে বের হতে একটু দেরি হলেই বাস মিস। তখন আবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পর যুদ্ধ করে পাবলিক বাসে ওঠা। এজন্য আরও কিছু মহিলা বাস চালু করলে নারীদের জন্য সুবিধা হয়।

বৃটিশ রাজনীতিতে ঝড়ের আশঙ্কা, ঝুঁকিতে প্রধানমন্ত্রী

ব্রেক্সিট নিয়ে আবার ঝড় উঠেছে বৃটিশ রাজনীতিতে। এবার প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে’র মন্ত্রীপরিষদ থেকে পদত্যাগ করেছেন ব্রেক্সিট বিষয়ে দায়িত্ব দেয়া যে মন্ত্রী সেই ডেভিড ডেভিস।  নাটকীয়ভাবে তিনি পদত্যাগ করেছেন। এর ফলে ক্ষমতাসীন কনজার্ভেটিভ দলের মধ্যে ব্রেক্সিট ইস্যুতে যে চাপা বিদ্রোহ ছিল এতদিন তা প্রকাশ্যে এলো। এর ফলে প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে ক্ষমতা হারাতে পারেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বৃটেনের বেরিয়ে আসা নিয়ে তেরেসা মে যে চুক্তি বা পরিকল্পনা নিচ্ছেন তা অনেকটাই নমনীয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এর ফলে আরো কয়েকজন মন্ত্রী পদত্যাগ করতে পারেন বলে আভাষ দেয়া হচ্ছে। এর আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন বৃটেনকে দাস রাষ্ট্রে পরিণত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন। ব্রেক্সিট সম্পন্ন হলে বৃটেনের কি কি ক্ষতি হবে সে সব তুলে ধরেছেন তিনি। ব্রেক্সিট নিয় কয়েকদিন ধরেই বৃটিশ মন্ত্রীপরিষদে উত্তেজনা বিরাজ করছে। রিপোর্টে বলা হচ্ছে ব্রেক্সিট বিষয়ক জুনিয়র মন্ত্রী স্টিভ বেকার এবং সুয়েলা ব্রেভারম্যানও সরকার থেকে পদত্যাগ করতে পারেন। আজ সোমবার হাউজ অব কমন্সে মিটিং হওয়ার কথা। সেখানে ব্যাকবেঞ্চারদের তীব্র সমালোচনা ও প্রশ্নের মুখোমুখি হবেন তেরেসা মে। এটাকে তার জন্য একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তেরেসা মে বৃটেনকে ব্রেক্সিট সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে সঠিক পথে নিয়ে যাচ্ছেন বলে যখন বলা হচ্ছে তখন ডেভিড ডেভিসের পদত্যাগ সেই সম্ভাব্যতার প্রতি কঠোর এক আঘাত হেনেছে। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ১০ ডাউনিং স্ট্রিট থেকে বলা হয়েছে, অবিলম্বে ব্রেক্সিট বিষয়ক একজন মন্ত্রী নিয়োগ করা হবে এবং তা সোমবার সকালেই হতে পারে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি ও ডেইলি মেইল।  এতে বলা হয়েছে, নিজে পদত্যাগ করেছেন ডেভিড ডেভিস। কিন্তু তিনি প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক জীবনকে এক কঠিন লড়াইয়ের মুখে ফেলে গেলেন। ডেভিড ডেভিস রোববার রাতে পদত্যাগ করেন। এ সময়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে’কে বলেছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বৃটেনকে বের করে আনার ক্ষেত্রে তিনি যেসব নীতি গ্রহণ করেছেন তা অত্যন্ত দুর্বল। সমঝোতা প্রক্রিয়ায় তা গ্রহণযোগ্য নয়। তবে এর দু’দিন আগে ব্রেক্সিট সম্পন্ন করার জন্য মন্ত্রীপরিষদ তেরেসার পরিকল্পনায় সম্মতি দেয়। ফলে এখন বৃটেনের রাজনীতিতে ব্রেক্সিট নিয়ে এক ভয়াবহ কোন্দল সৃষ্টি হতে পারে। তাতে বিপদজনক পর্যায়ে চলে যেতে পারেন তেরেসা মে। সোমবার হাউজ অব কমন্সে ঝড় উঠতে পারে। ডেভিড ডেভিস পদত্যাগ করার আগে তেরেসার সমালোচনা করে বলেছেন, তিনি দেশকে বিক্রি করে দিতে পারেন না। ডেভিসের এমন বক্তব্য ও পদত্যাগকে রোববার রাতেই সমর্থন করেছেন কনজার্ভেটিভ পার্টির এমপি জ্যাকব রিস-মগ সহ আরো কয়েকজন এমপি। তবে নিজের দলকে এক্ষেত্রে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তেরেসা। তবে ইউরোপপন্থিরা তার বিরুদ্ধে একটি কূটকৌশল আঁটছেন বলে শোনা যাচ্ছে। তারা প্রধানমন্ত্রীকে অনাস্থা বিষয়ক চিঠি (নো কনফিডেন্স লেটারস) দিতে পারেন। যদি তাই হয় এবং এমন ৪৮টি আবেদন আসে তাহলে তেরেসার নেতৃত্ব প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়বে। ওদিকে বিরোধী লেবার দলনেতা জেরেমি করবিন রোববার রাতে বলেছেন, ব্রেক্সিট সম্পন্ন করার কোনো কর্তৃত্বই রাখেন নি তেরেসা এবং তিনি এক্ষেত্রে অপারগ। যদি তেরেসা মে পদত্যাগ করেন তাহলে একটি জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার জন্য লড়াই করবে লেবার। তার মধ্য দিয়ে তারা ব্রেক্সিট সমঝোতাকে সামনে এগিয়ে নিতে চায়। তিনি আরো বলেছেন, সরকারে ঝড় উঠেছে। এরপরও যদি প্রধানমন্ত্রী তার পদ ধরে রাখেন স্পষ্টত তা হবে তার নিজস্ব স্বার্থে। সেটা দেশের স্বার্থে নয়। উল্লেখ্য, ডেভিড ডেভিসকে ২০১৬ সালে ব্রেক্সিট বিষয়ক মন্ত্রী নিয়োগ করা হয়। তাকে দায়িত্ব দেয়া হয় ব্রেক্সিট সম্পন্ন করতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সমঝোতা করার।

নির্বাচন নিয়ে সিলেটে বিএনপি-জামায়াতের দ্বন্দ্ব by তুহিনুল হক তুহিন

প্রায় ১৯ বছর ধরে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের জোটবদ্ধ হয়ে রাজনীতি করছে। তবে সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) নির্বাচন নিয়ে দুই দলের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে। এবারের সিটি নির্বাচনে বিএনপির আশা ছিল জামায়াত তাদেরকে সমর্থন দেবে। কিন্তু জামায়াত তা না করে উল্টো তাদের মেয়র প্রার্থী নিয়ে প্রচার চালাচ্ছেন। ২০ দলীয় জোটের শরিক দল বিএনপি-জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতারা সিলেটে জামায়াত প্রার্থীর মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেওয়ার জন্য বারবার তাগিদ দিলেও জেলা জামায়াত তাদের সিদ্ধান্তে অনড়।
জামায়াত নেতারা জানিয়েছেন, সিলেট সিটি নির্বাচন স্থানীয় নির্বাচন, তাই তারা প্রার্থী দিয়েছেন। তারা প্রার্থিতা প্রত্যাহার করবে না।
বিএনপি নেতাদের দাবি, জামায়াত জোটের একটি শরিক দল। তাদের সঙ্গে বিএনপির আদর্শগত রাজনীতির কোনও মিল নেই। তবে তাদেরকে জোটে রাখা হয়েছে নির্বাচনের জন্য।
তবে জামায়াত ছাড়াও সিলেট মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিমও বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে মেয়র পদে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। যার কারণে বিএনপির মেয়র পদপ্রার্থী আরিফুল চৌধুরী খানিকটা বেকায়দায় পড়েছেন।  তবে বিএনপির নেতাকর্মীরা মনে করছেন, সিলেটে জামায়াতের চেয়ে বিএনপি ও জোটের অন্যান্য শরিকদলগুলোর বিশাল ভোট ব্যাংক রয়েছে। জামায়াত তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করলেও নির্বাচনে তেমন কোনও সম্যায় পড়তে হবে না বিএনপি প্রার্থীকে।
সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন বলেন, ‘বিএনপি চাচ্ছে জোটকে ধরে রাখতে। দলের অন্যান্য শরিক দল বিএনপির একক প্রার্থীর পক্ষে থাকলেও জামায়াত তাদের প্রার্থী নিয়ে ব্যস্ত। আমরা আশা করি জোটের ঐক্য ধরে রাখতে জামায়াতের শুভবুদ্ধির উদয় হবে। আমাদের শক্তিশালী জোটে ফাটল ধরাতেই একটি পক্ষ ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। তবে সব ষড়যন্ত্র ভেঙে গত সিটি নির্বাচনের ন্যায় এবারও আমরা জয়ী হবো।’
তার অভিযোগ, আওয়ামী লীগ চাচ্ছে সিলেট সিটি নির্বাচনে প্রভাব খাটিয়ে ফলাফল তাদের পক্ষে নেওয়ার। এজন্য তারা দলের প্রার্থীর পক্ষে সিলেটের দক্ষিণ সুরমার বুধবার (৪ জুলাই) বর্ধিত সভা করে। ওই সময় কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন বলেছিলেন, ‘আর্জেন্টিনার খেলোয়াড় ম্যারাডোনা একটি গোল করেছিল কেউ বলে ঈশ্বরের হাত দিয়ে আবার কেউ বলে পা দিয়ে। যাই হোক এবার নির্বাচনে হয় ঈশ্বরের হাত দিয়ে গোল হবে, না হয় পা দিয়ে।’ এতে প্রতীয়মান হয় জনবিচ্ছিন্ন আওয়ামী লীগ জোরপূর্বক তাদের পক্ষে ফলাফল নিতে চায়।
সিলেট মহানগর জামায়াতের আমির ও মেয়র পদপ্রার্থী এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন,  ‘সিলেট সিটি নির্বাচন একটি স্থানীয় নির্বাচন। জোটের সঙ্গে আমাদের থাকার কারণ সংসদ নির্বাচনকালীন সময়ে। আমাদেরকে বিভিন্নভাবে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে অনুরোধ করা হলেও আমরা আমাদের দলীয় সিদ্ধান্তের ওপর অনড় রয়েছি। বিএনপিকে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয়ভাবে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে আমরা প্রার্থিতা প্রত্যাহার করবো না। ইতোমধ্যে আমাদের নির্বাচনি সব প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে। প্রতীক পাওয়ার পর আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারণা শুরু করবো।’
জামায়াত ও বিএনপির টানাপড়েন নিয়ে সিলেটের রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা বিচার বিশ্লেষণ চলছে। সব মিলিয়ে নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে আরিফুল হক চৌধুরীর চিন্তাও বাড়ছে। কারণ এবার বিএনপির সঙ্গে জামায়াত নেই। এমনকি বিএনপির সঙ্গেও সিলেটের বিএনপির কয়েকটি গ্রুপ চাচ্ছে না আরিফুল হক চৌধুরীকে।
২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত সিটি নির্বাচনে হেফাজত, জামায়াতসহ জোটের অন্যান্য শরিক দলের সার্বিক প্রচেষ্টা ও সিলেট বিএনপির সব নেতারা এক থাকায় আরিফুল হক চৌধুরী প্রায় ৩০ হাজার ভোটের ব্যবধানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বদরউদ্দিন আহমদ কামরানকে পরাজিত করেন। কিন্তু সিলেট সিটি নির্বাচনে জামায়াত বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরীকে কোন ধরনের সমর্থন না জানিয়ে তারা এবার সিলেট মহানগর জামায়াতের আমির এহসানুল মাহবুব জুবায়েরকে মেয়র পদে প্রার্থী করেছে।

থাইল্যান্ডে আবার শুরু রুদ্ধশ্বাস অভিযান

মানবজমিন  | ৯ জুলাই ২০১৮, সোমবার, ১১:১১>> রুদ্ধশ্বাস অভিযানে থাইল্যান্ডের গুহায় আটকে পড়া ১২ টিনেজ ফুটবলার ও তাদের কোচকে উদ্ধার অভিযানের দ্বিতীয় দিন আজ। গতকাল এ অভিযানে ৪টি বালককে উদ্ধার করা হয়। এরপর রাত হয়ে যাওয়ায় অভিযান স্থগিত করা হয়। আজ আবার সকালে তা নতুন করে শুরু হওয়ার কথা। উচ্চ মাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ এই অভিযানে বাকি আটটি বালক ও তাদের কোচকে উদ্ধার করার কথা। ১৫ দিনেরও বেশি সময় ধরে তারা আটকে আছে চিয়াং রাই এলাকায় থাম লুয়াং গুহায়। গুহা মুখে তারা প্রবেশের পর ভারি বর্ষণে এর ভিতর ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। তারা আটকে পড়ে অনেক গভীরে। নিখোঁজ হওয়ার ৯ দিন পর ওই গুহার ভিতর তাদের সন্ধান মেলে। এরপরই শুরু হয় উদ্ধারে বিশাল আয়োজন। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ডুবুরিরা সেখানে উদ্ধার অভিযানে অংশ নিয়েছেন এবং নিচ্ছেন। এরই মধ্যে থাইল্যান্ডের নৌবাহিনির এক ডুবুরি মারা গেছেন। রোববার আটকে পড়া বালকদের মধ্য থেকে চারজনকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়েছে। আজ আবার গুহার ভিতর এয়ার ট্যাঙ্ক বা বাতাস ভর্তি ট্যাংক বসানোর কথা। তারপরই সকালে উদ্ধার অভিযান শুরু হওয়ার কথা। তবে এ অভিযান নিয়ে আশঙ্ক রয়েছে এখনও। সব বালককে ও তাদের কোচকে নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হবে কিনা তা নিয়ে রয়েছে আশঙ্কা। ওদিকে আবার প্রবল বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে। যদি তাই হয় তাহলে গুহার ভিতরে পানি বৃদ্ধি পাবে। উদ্ধার অভিযান থমকে দাঁড়াবে। ফলে ত্বরিত গতিতে শুরু হয়েছে অভিযান। আজ সকালে ঘটনাস্থলে দেখা গেছে, বাকি বালকদেরকে উদ্ধার তৎপরতা চলছিল। যেকোনো সময় তা শুরু হতে পারে। গুহার মুখে এনে প্রস্তুত রাখা হয়েছে কমপক্ষে সাতটি এম্বুলেন্স। প্রথম দফায় রোববার ডুবুরিরা অপ্রত্যাশিত অল্প সময়ের মধ্যে চারটি বালককে বের করে আনেন। উদ্ধার করা বালকদের স্বাস্থ্য ভাল রয়েছে বলে জানিয়েছে থাই কর্তৃপক্ষ। কিন্তু যেহেতু আবারও ভারি বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা করছে কর্তৃপক্ষ তাই ডুবুরিরা দ্রুততার সঙ্গে উদ্ধার অভিযান সম্পন্ন করতে চাইছেন। গুহা থেকে ওই বালকদের উদ্ধারে ডুবুরিদের ৯০ জনের একটি বিশেষজ্ঞ দল কাজ করছেন। এর মধ্যে ৪০ জন থাইল্যান্ডের। ৫০ জন বিদেশী। তারা গুহার মধ্যে ওই বালকদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন কিভাবে অন্ধকারে পানির ভিতর দিয়ে সাঁতরে বাইরে বেরিয়ে আসতে হবে। এসব পথ সব স্থানে মসৃণ নয়। কোথাও কোথাও এতটা সরু যে তার ভিতর দিয়ে বেরিয়ে আসা অনেকটাই ঝুঁকিপূর্ণ। তারপরও গতকাল চারটি বালককে সফলতার সঙ্গে বের করে এনেছেন ডুবুরিরা। এ প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে কিছুটা পথ হেঁটে আসা, হামাগুড়ি দেয়া, পর্বত আরোহনের মতো চলা এবং কিছুটা পথ ডুবুরিদের মতো সাঁতরে পাড়ি দেয়া। এক্ষেত্রে তাদের জন্য গাইড হিসেবে একটি রশি দেয়া হয়েছে। সেই রশি ধরে ধরে তারা গুহা মুখের দিকে অগ্রসর হয়। প্রতিজন বালককে বের করে আনতে সহায়তা করছেন দু’জন করে ডুবুরি। এক্ষেত্রে গুহার মধ্যবর্তী স্থানটি সবচেয়ে বিপদজনক। এ অংশটির নাম দেয়া হয়েছে ‘টি-জংশন’। এ ছাড়া রয়েছে একটি স্থান। এর নাম চেম্বার-৩। এটি হলো ডুবুরিদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে একটি বেস হিসেবে কাজ করছে।
যারা গুহার ভিতরে আটকে পড়েছিল:
চ্যানিন ভিবুলরুঙ্গরুয়াং (১১)। তার ডাকনাম টাইটান। সে সাত বছর বয়স থেকে ফুটবল খেলা শুরু করেছে।
পানুমাস স্যাংডি (১৩)। তার ডাকনাম মিগ। সে তার পিতামাতাকে লিখেছেÑ নেভি সিলের সদস্যরা আমাদের অনেক যতœ নিচ্ছেন।
দুগানপিত প্রোমটেপ (১৩)। তার ডাকনাম ডোম। সে উল্ড বোরসের ক্যাপ্টেন।
সামপোং জিয়াওং (১৩)। তার ডাকনাম পোং। সে থাইল্যান্ডের জাতীয় দলের হয়ে খেলার স্বপ্ন দেখে।
মঙকোল বুনিয়েম (১৩)। তার ডাকনাম মার্ক। তাকে তার শিক্ষকরা অত্যন্ত ভাল ছেলে হিসেবে অভিহিত করেছেন। সে বড়দের, শিক্ষকদের শ্রদ্ধা করে।
নাত্তাউট তাকামরোঙ (১৪)। তার ডাকনাম টার্ন। সে তার পিতামাতাকে তাকে নিয়ে উদ্বিগ্ন না হতে অনুরোধ করেছে।
ইকারাত ওয়সুকচান (১৪)। তার ডাকনাম বিউ। সে তার মার কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে একবার উদ্ধার হতে পারলে সে দোকানে তাকে সহায়তা করবে।
আদুল সাম-অন (১৪)। সে একটি ভলিবল টিমের সদস্য।
প্রজাক সুথাম (১৫)। তার ডাকনাম নোট। তার পরিবার তাকে স্মার্ট ও শান্ত বালক বলে অভিহিত করেছে।
পিপাট ফো (১৫)। তার ডাকনাম নিক। গুহার ভিতর থেকে সে তার পিতামাতাকে চিঠি লিখেছে। তাতে সে লিখেছে, গুহা থেকে বের হতে পারলে পিতামাতাকে সে একটি বারবিকিউতে খেতে নিয়ে যাবে।
পর্নচাই কামলুয়াং (১৬)। ডাকনাম টি। সে তার পিতামাতাকে বলেছে, ভয় পেয়ো না। আমরা ভাল আছি।
পিরাপাত সোমপিয়াংজাই (১৭)। তার ডাকনাম নাইট। যেদিন তারা নিখোঁজ হলো সেটা ছিল তার জন্মদিন। তার পিতামাতা তার জন্মদিন পালন করার জন্য এখনও অপেক্ষায় আছে।
কোচ ইকাপোল চানটাওং (২৫)। ডাকনাম আকি। তিনি এসব টিনেজ বাচ্চার পিতামাতার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন তার কৃতকর্মের জন্য। কিন্তু অভিভাবকরা তাকে জানিয়ে দিয়েছেন তাকে তারা দায়ী করছেন না।
গুহা থেকে উদ্ধার ৪ শিশু, বাকি আরও ৮ শিশু ও কোচ
থাইল্যান্ডের ‘থাম লুয়াং নায় নন’ গুহা থেকে এ পর্যন্ত মোট চার শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে। বাকিদের উদ্ধারের প্রক্রিয়া চলছে। রয়টার্সের খবরে প্রথমে অসমর্থিত সূত্রের বরাত দিয়ে ছয়জনকে উদ্ধারের কথা বলা হলেও পরে সংশোধিত প্রতিবেদনে চারজনকে উদ্ধারের কথা বলা হয়। উদ্ধারকৃতদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তাদের মধ্যে একজনকে বিশেষ পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। প্রাদেশিক গভর্নর জানিয়েছেন, ১০ ঘণ্টা পর পুনরায় উদ্ধার অভিযান শুরু হবে।
গার্ডিয়ানকে সংশ্লিষ্ট সেনা কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, গুহার ভেতরে এখন পানি কম। এজন্য কিছুটা অংশ, যা সাঁতরে পার হওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তা হেঁটেই পার হতে পেরেছে শিশুরা। গুহার ভেতরে এখনও আট শিশু ও তাদের ২৫ বছর বয়সী ফুটবল কোচ রয়েছেন। তারা যে স্থানটিতে আশ্রয় নিয়েছিলেন তা গুহার প্রবেশ মুখ থেকে ৪ কিলোমিটার ভেতরে। গুহাটি ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ।
ওই শিশুদের কেউ সাঁতার জানতো না। তাদের উদ্ধারে বিদেশ থেকে বিশেষভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ডুবুরিদের ডেকে আনা হয়েছিল। শিশুদের উদ্ধার প্রক্রিয়ায় থাই সেনাবাহিনীর একজন সাবেক ডুবুরি প্রাণ হারিয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, উদ্ধার অভিযানে ব্যবহার করার জন্য অক্সিজেন সিলিন্ডার বসানোর কাজ করতে গিয়ে তিনি জ্ঞান হারান। পরে তার মৃত্যু হয়।
ছেলেরা গুহা থেকে যেভাবে সাঁতরে বের হবে
গুহা থেকে ছেলেদের সাঁতরেই বের হতে হবে। তাদের গুহা থেকে বের হওয়ার প্রক্রিয়ার ওপর একটি ইলাস্ট্রেশন প্রকাশ করেছে থাই নিউজ এজেন্সি। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, এক ডুবুরির সঙ্গে একটি ছেলেদের বেঁধে রাখা হয়েছে। আর ডুবুরির অক্সিজেন সিলিন্ডার থেকে তাকে অক্সিজেন সরবরাহ করা হচ্ছে। ডুবুরিদের যাতে পথ ভুল না হয়ে যায় সেজন্য দড়ি বেঁধে রাখা হয়েছে। ওই দড়ি ধরে ধরে তারা সামনে এগোবেন।
২৩ জুন থাইল্যান্ডের স্থানীয় সময় বিকালে ১১ থেকে ১৬ বছর বয়সী ১২ ফুটবলার ও তাদের ২৫ বছর বয়সী কোচ থাইল্যান্ডের উত্তর অংশের প্রদেশ চিয়াং রাইয়ের ‘থাম লুয়াং নায় নন’ গুহায় প্রবেশ করেন। তাদের উদ্ধারে থাইল্যান্ডের স্থানীয় ডুবুরিরা ছাড়াও কাজ করছেন গুহার ভেতরে সাঁতারে বিশেষভাবে পারদর্শী বিদেশি সাঁতারুরা। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, উন্মুক্ত জলে সাঁতার কাটা আর গুহার অন্ধকারে ছোট পরিসরে সাঁতার কাটা এক বিষয় নয়। গুহার ভেতরে সাঁতরে উদ্ধার তৎপরতা চালানোর জন্য তারা বিশেষভাবে দক্ষ।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান লিখেছে, আজ সকালে সেখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়েছে। প্রতিবারের বৃষ্টিপাতে উদ্ধার তৎপরতার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের চোখে-মুখে আতঙ্ক ফুটে উঠতে দেখা গেছে। তবে আশার কথা বৃষ্টিপাত খুব বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। ঘন্টাখানেক ধরে বৃসটি হলেও তা মুশলধারে ছিল না। এখন উদ্ধার ওই পাহাড় ও তার আশেপাশের এলাকায় তেমন পানি নেই।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত একজন ইসরায়েলি ডুবুরি রাফায়েল আরৌশ মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে বলেছেন, ‘মুখ্য বিষয় হচ্ছে গতি। উদ্ধার পরিকল্পনায় হঠাটি যেকোনও পরিবর্তন আনার দরকার হতে পারে। হয়তো আজকের মধ্যেই সবাইকে বের করে আনার সিদ্ধান্ত দিয়ে দেওয়া হবে।’
তার ভাষ্য, গুহাটি চুনাপাথরের। গুহার ভেতরে পানি ঢোকার অনেক পথ রয়েছে। বৃষ্টিপাতের কারণে তাই গুহার ভেতর পানি ঢুকতেই থাকবে, যা উধার তৎপরতার জন্য ভালো কিছু নয়।   এতে এমনকি পুরো উদ্ধার তৎপরতাই হুমকির মুখে পড়তে পারে।

প্রথমে বের হবে কিশোর স্যাম, সবশেষে কোচ

গুহার ভেতরে অবস্থান করছে দেশি ও আন্তর্জাতিক দক্ষ ডুবুরি দল। গুহার বাইরে প্রস্তুত রয়েছে ট্রলি। উদ্ধারকৃতদের ওই ট্রলিতে করেই নেওয়া হবে নিকটস্থ হাসপাতালে। উদ্ধার তৎপরতায় সংশ্লিষ্ট এক সূত্রের বরাত দিয়ে প্রভাবশালী ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, পৃথক কয়েকটি দলে ভাগ করে আটকে পড়াদের বের করে আনার চেষ্টা হবে। ১৪ বছরের কিশোর স্যামকে বের করে আনা হবে সবার আগে, সবশেষে বের হবেন কোচ একাপল চান্থাওং।
গত ২৩ জুন ফুটবল অনুশীলন শেষে ২৫ বছর বয়সী কোচসহ ওই ১২ কিশোর ফুটবলার গুহাটির ভেতরে ঘুরতে গিয়েছিল। কিন্তু বৃষ্টিতে গুহার প্রবেশমুখ বন্ধ হয়ে যাওয়াতে তারা আর বাইরে বের হতে পারেনি। এরপর থেকে টানা ৯ দিন নিখোঁজ থাকার পর গত ২ জুলাই গুহার ভেতরে জীবিত অবস্থায় তাদেরকে শনাক্ত করে ডুবুরিরা। রবিবার (৮ জুলাই) থাইল্যান্ড সরকার তাদের উদ্ধারে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে স্মরণকালের সবচেয়ে বড় উদ্ধার অভিযান শুরু করেছে।
বিবিসির একজন প্রতিবেদক জানিয়েছেন, ১৫ দিন ধরে গুহায় আটকে থাকা কিশোরদেরকে নিয়ে ফেরার পথে গুহার একটি জায়গায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়া হবে। পরে সেখান থেকে শেষ দফা যাত্রায় তাদেরকে বাইরে বের করে আনা হবে। বাইরে বের করে আনার পর সোজা হাসপাতালে পাঠানো হবে কিশোরদের। আরেক ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, অভিযানের শুরুতে পানির নিচ দিয়ে সংকীর্ণ পথ পাড়ি দিতে হবে কিশোরদের, যেটিকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। উদ্ধার অভিযানে কিশোরদের বের করে আনার সময় থেকে তাদের দীর্ঘ সময় অক্সিজেন মাস্ক পরে পানির নিচে ডুব দিতে হবে।
গুহার প্রবেশপথ থেকে ‘তৃতীয় চেম্বার’ বা অভিযান শুরুর এলাকার দিকে যেতে হলে দেড় কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হবে উদ্ধারকারীদের। এ পুরো পথটুকু পুরোপুরি শুকনো নয়, তবে বেশিরভাগটাই হেঁটে পার হওয়া যাবে। আর ‘তৃতীয় চেম্বার’ থেকে শিশুদের কাছে পৌঁছাতে হলে তাদেরকে যেতে হবে আরও ১.৭ কিলোমিটার। এক সূত্র ব্যাংকক পোস্টকে জানিয়েছে, আটকে পড়া ফুটবলারদের চারটি দলে ভাগ করা হবে। প্রথম দলে থাকবে চারজন। আর দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ দলটিতে থাকবে তিনজন করে। বের হয়ে আসার সময় প্রত্যেক শিশুকেই খুব কাছ দেখে পাহারা দেবে দুইজন করে ডুবুরি। উদ্ধারকারী কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, শুরুতে বের হতে যাওয়া চার শিশুর মধ্যে সবার আগে বের হবে ১৪ বছর বয়সী আদুল ‘দুল’ স্যাম। আটকে পড়া ফুটবল দলটির কোচ বের হবেন সবার শেষে।
থাই নেভি সিলস-এর ফেসবুক পেজে উদ্ধার প্রচেষ্টার একটি ছবি পোস্ট করা হয়েছে। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারীরা কিভাবে একত্রিত হয়ে গত ১৫ দিন ধরে আটকে পড়া শিশুদের উদ্ধারে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, সে চিত্রই ফুটে উঠেছে ছবিতে। থাই ভাষায় ছবির বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। গুগল ট্রান্সলেটে তা ভাষান্তর করলে দাঁড়ায়, ‘আমরা....থাই ও আন্তর্জাতিক দল মিলে যৌথভাবে ওয়াইল্ড বোয়ার ফুটবল দলকে বাড়িতে ফিরিয়ে নিতে কাজ করছি।’ ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, আটকে পড়া শিশুদের উদ্ধারের পর তাদেরকে চিয়াংগ্রাই প্রাচানুকরোহ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হবে। গুহা থেকে হাসপাতালটির দূরত্ব প্রায় ৬০ মাইল। গুহার প্রধান প্রবেশপথের বাইরে কয়েকটি ট্রলি প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
গত ২ জুলাই দুজন ব্রিটিশ ডুবুরি গুহার বেশ কয়েক কিলোমিটার ভেতরে গিয়ে আটকে পড়া কিশোর ফুটবলার ও তাদের কোচকে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। এরপর থেকে তাদেরকে খাবার ও চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে। সরবরাহ করা হচ্ছে অক্সিজেন।
গুহার ৪ কিলোমিটার ভেতরে যে কারণে গিয়েছিল ছেলেরা
থাইল্যান্ডের গুহায় আটকে পড়া ফুটবল খেলোয়াড় ছেলেদের নিয়ে সবার কৌতূহল: তারা কেন গুহার অতটা ভেতরে গিয়েছিল? কানাডার সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল নিউজ জানিয়েছে, অতটা ভেতরে তারা যেতে চায়নি। বৃষ্টির পানিতে গুহার বের হওয়ার পথ ডুবে যাওয়ায় তারা নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ভেতরে দিকে যেতে বাধ্য হয়েছিল। যত গুহার ভেতরে পানি বেড়েছে তত তাদের সরে যেতে হয়েছে।
১০ কিলোমিটার দীর্ঘ থাম লুয়াং নাং নন গুহার ৪ কিলোমিটার ভেতরে এখন তাদের অবস্থান। গুহা থেকে বের হওয়ার অনেক স্থানে পানি জমে আছে। তাদের সাঁতরে বের হতে হবে সেখান থেকে। প্রথমে তাদের স্কুবা ডাইভিং শেখানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। এখন পরিকল্পনা করা হয়েছে, ডুবুরিরা তাদের সঙ্গে করে নিয়ে বের হবেন। থাই নিউজ এজেন্সির প্রকাশিত ইলাস্ট্রেশনে দেখানো হয়েছে, ডুবুরিদের অক্সিজেন সিলিন্ডার থেকে শিশুদের পানির নিচে অক্সিজেন সরবরাহ করা হবে।
শিশুদের পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের ফুটবল কোচ অনুশীলনের পর কখনও তাদের সাঁতারের জন্য নিয়ে যেতেন, আবার কখনও ভ্রমণে। এমনই একদিন ছিল গত ২৩ জুন, যেদিন তারা গুহার ভেতরে ঢুকেছিল।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ বলেছেন, কোচের উচিত হয়নি ১১ থেকে ১৬ বছর বয়সী ওই শিশুদের নিয়ে থাম লুয়াং নাং নন গুহায় ঢোকা। কারণ, বর্ষাকালে যে গুহা পানিপূর্ণ হয়ে যায় সে বিষয়ে সতর্কতা জানিয়ে গুহার মুখে সাইনবোর্ড টানানো আছে। তবে শিশুদের পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে কোচকে অপরাধবোধে ভুগতে নিষেধ করা হয়েছে। তারা মনে করেন না এতে কোচের দোষ আছে।

শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান থাইল্যান্ডে

দুর্ধর্ষ ও দুঃসাহসিক এক অভিযানে থাইল্যান্ডে গুহায় আটকে পড়া কিশোরদের চারজনকে উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে  একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তার গায়ের রঙ লাল হয়ে গেছে। একে বিরল একটি ঘটনা বলে বলা হচ্ছে। দুটি বালককে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছিল চিয়াং রাই প্রচানুকরোহ হাসপাতালে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত উদ্ধার অভিযান চলছিল। উদ্ধার করা টিনেজারদের নামও তখন প্রকাশ করা হয় নি। গতকাল সন্ধ্যার দিকে তাদেরকে উদ্ধার করে গুহার বাইরে অস্থায়ী হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছিল।
এই মুহূর্তে বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে মাতামাতিকেও ছাড়িয়ে গেছে ওই বালকদের আটকে পড়া, তাদের দুর্দশা ও উদ্ধারের কাহিনী। প্রতিজন বালককে সরু গুহাপথে বের করে আনতে দু’জন করে ডুবুরি ব্যবহার করা হয়। এসব ডুবুরি উচ্চ মাত্রায় প্রশিক্ষিত। চিয়াং রাইয়ের স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রধান কর্মকর্তা তেসাথেপ বুনথং ওই বালকদের ৪ জনকে উদ্ধারের কথা জানিয়েছেন মিডিয়াকে। তবে কোনো কোনো খবরে ৬ জনের উদ্ধারের কথা বলা হয়। বুনথং বলেছেন, তাদের বিভিন্ন রকম শারীরিক পরীক্ষা করা হচ্ছিল। প্রায় ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ থাম লুয়াং গুহার মধ্যে আটকে পড়া এসব বালকের জন্য প্রার্থনা করা হয় বিভিন্ন উপাসনালয়ে। উদ্বেগে উৎকণ্ঠায় কাটাতে থাকে থাইল্যান্ড। আর বিশ্ব অখণ্ড দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তাদের শেষ পরিণতির দিকে। এমনই অবস্থায় ব্যাপক তৎপরতায় গতকাল শুরু হয় উদ্ধার অভিযান। একে ডি-ডে বা অভিযান শুরুর দিন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। দুই সপ্তাহের বেশি সময় গুহায় আটকে পড়ে ১২ টিনেজ ফুটবলার ও তাদের কোচ। তাদেরকে উদ্ধারে বিপজ্জনক এই উদ্ধার অভিযান গতকাল স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় শুরু করে থাই কর্তৃপক্ষ। তারা বলছে, ১১ ঘণ্টা অভিযান চালানোর পর হয়তো প্রথম কোনো টিনেজারকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হতে পারে। তখন বাংলাদেশের সময় হতে পারে রাত এগারটা।
কিন্তু তার আগেই প্রথমে দুটি বালককে উদ্ধারের খবর জানান কর্মকর্তারা। এর পর পর খবর পাওয়া যায় যে, ৬টি বালককে উদ্ধার করা হয়েছে। এ খবর দিয়েছে বিবিসি, বার্তা সংস্থা রয়টার্স। এতে বলা হয়, এই অভিযানে অংশ নিচ্ছেন বিদেশি ১৩ জন ডুবুরি ও থাইল্যান্ডের নেভি সিল ইউনিটের ৫ সদস্য। তবে বিপদের কথা হলো এ সপ্তাহের শুরুর দিকে ওই গুহায় উদ্ধার অভিযান চালাতে গিয়ে থাইল্যান্ডের নৌবাহিনীর একজন ডুবুরি মারা গেছেন। কারণ, গুহাটি স্থানে স্থানে এতটাই সংকীর্ণ যে, সেখান দিয়ে আসা-যাওয়া করা খুবই কষ্টসাধ্য। এরই একটি পথে আটকা পড়ে পানিতে ডুবে মারা যান ওই ডুবুরি। উদ্ধার অভিযানের প্রধান নারোংসাক ওসোত্তানোকর্ন গতকালের অভিযান সম্পর্কে বলেছেন, এটা হলো ডি-ডে। উল্লেখ্য, দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশ চিয়াং রাইয়ে বৃষ্টি কিছুটা কমেছে। গুহার ভেতর থেকে কয়েক লাখ লিটার পানি সেচ দিয়ে বের করে আনা হয়েছে।
আবার সেখানে বৃষ্টি হতে পারে। এ জন্য এটাকেই উদ্ধার অভিযানের জন্য উপযুক্ত সময় বলে বিবেচনা করা হয়। ফলে শুরু হয় অভিযান। এ অভিযানকে গভর্নর বলেছেন, সময় ও পানির বিরুদ্ধে তাদের যুদ্ধ হিসেবে। গত ২৩শে জুন থেকে ওই টিনেজার ফুটবল টিম ও তাদের ২৫ বছর বয়সী কোচ ওই দীর্ঘ গুহার ভেতরে আটকে ছিলেন। উদ্ধার অভিযানে প্রস্তুত রাখা হয় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা। উপস্থিত রাখা হয়েছে মেডিকেল ইউনিট, অ্যাম্বুলেন্স ও হেলিকপ্টার। গুহার মুখেই এসব প্রস্তুত রাখা হয়, যাতে উদ্ধার করে কোনো বালককে আনা হলেই তাদেরকে চিকিৎসা দেয়া যায়। নারোংসাক বলেছেন, ফুটবল টিমের ওই বাচ্চাদের স্থানীয় সময় রাত ৯টায় উদ্ধার করার সম্ভাবনা থাকলেও এক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা ছিল না। যেকোনো সময় এ অভিযান স্থগিতও হওয়ার আশঙ্কা ছিল। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে গুহা থেকে বেরিয়ে আসতে সময় লাগতে পারে ৬ ঘণ্টা- এমনটা অভিযানের শুরুতে আশঙ্কা করা হয়।
উদ্ধার অভিযানে রয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার একজন চিকিৎসক। তিনি গত রাতে ওই বালকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেছেন এবং তাদেরকে উদ্ধার করা যায় বলে ক্লিয়ারেন্স দিয়েছেন। এরপরই প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়। চীনের ডুবুরি গোয় হুই আছেন এ মিশনে। থাইল্যান্ড ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ১৩০ জনের মতো ডুবুরির ভেতর থেকে তাকে বাছাই করা হয়েছে। তিনি শনিবার রয়টার্সকে বলেছেন, গুহার ভেতরে পানির স্তর অনেকটাই কমেছে। কয়েক লাখ লিটার পানি সেচে ফেলে দেয়ার পর এমন পরিস্থিতি হয়েছে। এ অবস্থায় উদ্ধার অভিযান চালানো সহজ হতে পারে। আটকে পড়া এসব বালকের বয়স ১১ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে। আর তাদের কোচের বয়স ২৫ বছর। ২৩শে জুন তারা ওই গুহার ভেতর প্রবেশ করার পর সেখানে ভারি বৃষ্টি শুরু হয়। এতে গুহার ভেতর প্লাবিত হয়।
বন্যায় ভেসে যায় ওই দীর্ঘ গুহা। এতে ওই বালক ও তাদের কোচ গুহার এক মাইলেরও বেশি ভেতরে গিয়ে একটি সংকীর্ণ স্থানে আশ্রয় নেন। তারা নিখোঁজ হওয়ার ৯ দিন পর খোঁজ মেলে। তারপরই তাদেরকে উদ্ধারে জোর তৎপরতা শুরু হয়। উদ্ধারকারী দল কয়েকদিন ধরে সেখানে রিহার্সেল করে। আটকে পড়া বালকদের অনেকেই সাঁতার জানে না। তাদেরকে এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এর পর ঝুঁকিপূর্ণ উপায়ে তাদেরকে বের করে আনার উদ্যোগ নেয়া হয়, যদিও অনেক বিশেষজ্ঞ এক্ষেত্রে প্রাণহানির আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন।