Thursday, June 19, 2025

ইরান যেভাবে তছনছ করল ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা

ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় সরাসরি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আঘাত হানার পর বিস্মিত বিশ্ব। বহু বছর ধরে পরীক্ষিত ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা যেন এক রাতে প্রশ্নের মুখে পড়ল। আধুনিক প্রযুক্তিতে গড়া ইসরায়েলের বহু স্তরবিশিষ্ট আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এমন পরাজয় দেখবে, তা কল্পনা করেননি অনেক সামরিক বিশ্লেষকই।

ইসরায়েল এত কাল নিজেদের প্রতিরক্ষাবলয়ে গড়ে তুলেছে আয়রন ডোম, ডেভিডস স্লিং, অ্যারো-২ ও ৩, এবং বারাক-৮-এর মতো অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি। এর মধ্যে আয়রন ডোম স্বল্পপাল্লার রকেট ও মর্টার ঠেকাতে দক্ষ, ডেভিডস স্লিং ও অ্যারো সিরিজ ব্যালিস্টিক ও মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করে, আর বারাক-৮ ব্যবহার হয় আকাশপথে আসা হুমকি মোকাবিলায়। বহু স্তরবিশিষ্ট এসব সিস্টেম একসঙ্গে কাজ করে আকাশপথে একটি দুর্ভেদ্য দেয়াল তৈরির লক্ষ্যেই।

কিন্তু ইরান এবার এসব প্রতিরক্ষা ভেদ করতে যে পদ্ধতি ব্যবহার করেছে, তা ছিল প্রযুক্তি ও কৌশলের এক অসাধারণ মিশ্রণ। একইসঙ্গে কয়েকশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে সংখ্যাগতভাবে চাপে ফেলে দেয় তারা। প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র আটকাতে যে পরিমাণ ইন্টারসেপ্টর প্রয়োজন, সেই মজুত দ্রুত ফুরিয়ে যেতে থাকে।

এর পাশাপাশি ইরান ব্যবহার করে ফাত্তাহ-২ নামে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র, যা শব্দের চেয়ে পাঁচগুণ দ্রুত এবং যার গতিপথ অনির্দেশ্য। এই ক্ষেপণাস্ত্র প্রচলিত রাডার ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিকে বিভ্রান্ত করতে সক্ষম। শুধু তা-ই নয়, তারা পাঠায় ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও—যা নিচু দিয়ে উড়ে গিয়ে রাডার ফাঁকি দিয়ে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে।

ইরান কৌশলগতভাবে ভুয়া লক্ষ্যবস্তু পাঠিয়ে ইসরায়েলের রাডার ও প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ককে বিভ্রান্ত করেছে। ফলে আসল ক্ষেপণাস্ত্রগুলো তুলনামূলক সহজেই লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছায়। কিছু ক্ষেপণাস্ত্রে আবার এমন প্রযুক্তিও ছিল, যা রাডারের চোখ এড়িয়ে যায় কিংবা নিজেই রাডার ধ্বংস করতে সক্ষম।

এই পুরো আক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে ইসরায়েল দাবি করেছে, তারা আকাশ নিয়ন্ত্রণে রেখেছে এবং অধিকাংশ হামলা প্রতিহত করতে পেরেছে। তবে একইসঙ্গে তারা এটাও স্বীকার করেছে যে, সব প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শতভাগ কার্যকর নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংঘাত যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে দুপক্ষই অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের ঘাটতিতে পড়বে। বিশেষ করে ইসরায়েলের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সহায়তা ছাড়া যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান এই হামলার মাধ্যমে শুধু ইসরায়েলের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা তুলে ধরেনি, বরং গোটা বিশ্বের জন্য এক বার্তাও দিয়েছে—প্রযুক্তির দেয়াল যতই শক্ত হোক, কৌশলের ধারালো চাবি থাকলে তার তালাও খুলে ফেলা যায়।

তথ্য সূত্র: আল-জাজিরা 

ছবি : সংগৃহীত

ইরান-ইসরাইল যুদ্ধের আবহে ‘অপারেশন সিন্ধু’ শুরু করল ভারত

তেহরান ও ইসরাইলের মধ্যে সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার সাথে সাথে ইরানে আটকে থাকা নাগরিকদের দেশে ফিরিয়ে আনতে ভারত ‘অপারেশন সিন্ধু’ শুরু করেছে। ইরানে পড়াশোনা করা ১০০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থীর প্রথম দলটি বৃহস্পতিবার ভোরে দিল্লিতে পৌঁছেছে। ইরানে প্রায় ৪,০০০ ভারতীয় বসবাস করছেন বলে জানা গেছে। যাদের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই শিক্ষার্থী। ১৩ জুন ইসরাইল অপারেশন রাইজিং লায়ন শুরু করার পর থেকে পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করে। ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে আক্রমণ শুরু করে ইসরাইল। দেশের প্রবীণ সামরিক কর্মকর্তা ও পারমাণবিক বিজ্ঞানীদের হত্যা করা হয়। ইরান অপারেশন ট্রু প্রমিজ ৩-এর মাধ্যমে পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানায়, ইসরাইলে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। এই আবহে অপারেশন সিন্ধু-এর অংশ হিসেবে, ইরান থেকে ১১০ জন ভারতীয় নাগরিককে বহনকারী একটি বিমান বৃহস্পতিবার ভোরে দিল্লিতে পৌঁছেছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (এমইএ) জানিয়েছে যে, অভিযানের প্রথম পর্যায়ে, শিক্ষার্থীদের ইরানের উত্তরাঞ্চল থেকে সরিয়ে ১৭ জুন সড়কপথে আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এরপর তারা ১৮ জুন দুপুর ২:৫৫ মিনিটে একটি বিশেষ বিমানে ওঠেন এবং ১৯ জুন ভোরে নয়াদিল্লিতে অবতরণ করেন

ভারত সরকার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং ইরানে ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপদে থাকার জন্য গত কয়েক দিন ধরে পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে জানিয়েছে বিদেশ মন্ত্রক। ইরানে বসবাসকারী ভারতীয় নাগরিকদের তেহরানে ভারতীয় দূতাবাস এবং নয়াদিল্লিতে বিদেশ মন্ত্রকের কন্ট্রোল রুমের সাথে যোগাযোগ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় যারা এখনও আছেন তাদের সাহায্য ও নির্দেশনা প্রদানের জন্য জরুরি হেল্পলাইনগুলো চালু রয়েছে। সরকার ইরানি এবং আর্মেনিয়ান কর্তৃপক্ষকে সরিয়ে নেয়ার প্রক্রিয়াটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে তাদের সহায়তার জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছে। ১৫ জুনই, ইরানে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস সেখানে থাকা সকল ভারতীয় নাগরিক এবং ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্যক্তিদের অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়াতে এবং গুরুত্বপূর্ণ আপডেট সংগ্রহের জন্য দূতাবাসের সোশ্যাল মিডিয়া অনুসরণ করতে বলে।

জম্মু ও কাশ্মীর সরকার দিল্লি থেকে তাদের বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য যে বাসের ব্যবস্থা করেছিল তাতে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ইরান থেকে ফিরে আসা কিছু ভারতীয় শিক্ষার্থী। কাশ্মীরের বাসিন্দা শেখ আফসা এনডিটিভিকে বলেন যে, বাসগুলোর অবস্থা ভালো ছিল না। তিনি জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহকে আরও ভালো পরিবহনের ব্যবস্থা করার জন্য অনুরোধ করেন। মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, তারা শিক্ষার্থীদের অনুরোধ ‘বিবেচনা করেছে’ এবং যথাযথ ডিলাক্স বাসের ব্যবস্থা করার জন্য জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্য সড়ক পরিবহন কর্পোরেশনের সাথে সমন্বয় রেখে কাজ করছে।

২০২২ সালে যখন ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরু হয়, তখন ভারত সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে, অপারেশন গঙ্গার অধীনে ২২,০০০ এরও বেশি শিক্ষার্থী এবং নাগরিককে বাড়ি ফিরিয়ে আনা হয়। ভারতীয় বিমান বাহিনীর ১৪টি সহ ৯০টিরও বেশি ফ্লাইট পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি এবং রোমানিয়ার মতো পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে উড্ডয়ন করেছিল।

২০২৫ সালে, বিশ্ব আরেকটি সংকটের মুখোমুখি। এবার ঘটনাস্থল ইরান। ইসরাইলি বিমান হামলা এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের আশঙ্কা হাজার হাজার ভারতীয়কে বিপদে ফেলেছে। কিন্তু ইউক্রেনের মতো এখানে একই স্থানান্তর পরিকল্পনা অনুসরণ করা অত্যন্ত কঠিন প্রমাণিত হয়েছে। এর একটা কারণ হলো ভৌগোলিক অবস্থান। ইউক্রেনের সাথে বেশ কয়েকটি বন্ধুত্বপূর্ণ দেশের সীমান্ত রয়েছে এবং যুদ্ধের প্রথম দিকে এর পশ্চিম অংশগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিরাপদ ছিল। এর ফলে ভারতীয় নাগরিকদের জন্য বাস বা ট্রেনে কাছাকাছি সীমান্তে যাতায়াত করা সহজ ছিল। সেখান থেকে কর্মকর্তারা তাদের নিরাপদ স্থানে যেতে সাহায্য করেছিলেন। ইরান থেকে ভারতীয়দের সরিয়ে আনার ক্ষেত্রে ভিন্ন ধরণের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের সাথে পূর্ব সীমান্ত ভাগ করে নেয় ইরান, যার কোনওটিই ভারতীয় নাগরিকদের জন্য সহজ রুট নয়। অপারেশন সিন্দুরের পর থেকে পাকিস্তান ভারতীয় বিমানের জন্য তার আকাশসীমা বন্ধ রেখেছে এবং আফগানিস্তানে নিরাপদে প্রবেশ করা এখনও কঠিন। আরেকটি বিকল্প, আজারবাইজান, আন্তর্জাতিক ফোরামে খোলাখুলিভাবে পাকিস্তানকে সমর্থন করেছে, যার ফলে ভারতের বিকল্পগুলো আরও সীমিত হয়ে পড়েছে। এর ফলে কেবল আর্মেনিয়া এবং তুর্কমেনিস্তানই সম্ভাব্য রুট হিসেবে রয়ে গেছে।

তবে, এই রুটেও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ সড়কপথে ভ্রমণ করতে হয়, তারপরই বিমানের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়।  ১৯৯০ সালে, যখন ইরাক কুয়েত আক্রমণ করে, তখন ভারত সরকার সবচেয়ে বড় স্থানান্তরের কার্যক্রম  পরিচালনা করে। সেই বছরের আগস্ট থেকে অক্টোবরের মধ্যে, প্রায় ১.৭৫ লক্ষ ভারতীয়কে বিমানে করে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। এই প্রচেষ্টা এতটাই ব্যাপক ছিল যে, বেসামরিক বিমান সংস্থা কর্তৃক সর্বাধিক সংখ্যক লোককে স্থানান্তরিত করার জন্য এয়ার ইন্ডিয়া গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে স্থান করে নেয়।

সম্প্রতি, ২০২৩ সালে হামাসের সাথে সংঘর্ষের সময় ইসরাইল থেকে নাগরিকদের ফিরিয়ে আনার জন্য অপারেশন অজয় ​​শুরু করে ভারত। ২০২২ সালে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময়, ভারতীয় শিক্ষার্থীদের সরিয়ে নেওয়ার জন্য অপারেশন গঙ্গা শুরু করা হয়েছিল। এই প্রচেষ্টার সমন্বয় সাধনের জন্য সিনিয়র মন্ত্রীদের চারটি প্রতিবেশী দেশে পাঠানো হয়েছিল। এই অভিযানের মাধ্যমে ১৮,২৮২ জন ভারতীয়কে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল।

২০১৫ সালে, ইয়েমেনের সংঘাতের সময়, অপারেশন রাহাত চালু করা হয়েছিল। ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী ৬,৭১০ জনকে সরিয়ে নিতে সাহায্য করেছিল, যার মধ্যে ৪,৭৪৮ জন ভারতীয় এবং ১,৯৬২ জন বিদেশী ছিল।

এর আগে, ২০১১ সালে, লিবিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় ভারতীয়দের উদ্ধারের জন্য অপারেশন সেফ হোমকামিং পরিচালিত হয়েছিল। এতে ভারতীয় নৌবাহিনী এবং এয়ার ইন্ডিয়া উভয়ই জড়িত ছিল। বিমান ও সমুদ্র পথ ব্যবহার করে নাগরিকদের দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল।  ১৫,০০০ এরও বেশি ভারতীয় নাগরিককে সরিয়ে নেওয়ার পর, অভিযানটি শেষ হয়।

সূত্র :  ফার্স্টপোস্ট

ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলা নিয়ে ট্রাম্প শিবিরেই ঘোর অসন্তোষ-বিভক্তি

ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য মার্কিন হামলার ইঙ্গিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থকদের মধ্যে বিভাজন দেখা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধে জড়ানোর শঙ্কায় তাঁর ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ (মাগা) শিবিরের অনেকেই বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন। দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পেছনে এ শিবিরের বড় ভূমিকা ছিল।

ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ ও প্রভাবশালী কিছু রিপাবলিকান নেতাও তাঁর এমন সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছেন। অনুরোধ করছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে এ যুদ্ধে না জড়াতে। এই ঘনিষ্ঠজন ও নেতাদের মধ্যে রয়েছেন প্রেসিডেন্টের সাবেক শীর্ষ উপদেষ্টা স্টিভ ব্যাননও। তিনি বরাবরই ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ দর্শনের অন্যতম মুখ।

আজ বুধবার ওয়াশিংটনে ‘ক্রিশ্চিয়ান সায়েন্স মনিটর’ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ব্যানন সতর্ক করে বলেন, কূটনৈতিক সমাধানের পথে না গিয়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংসে ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে সামরিক অভিযান চালানো যুক্তরাষ্ট্রের উচিত হবে না।

‘আমরা আবার সেই পথে যেতে পারি না। এটা দেশকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলবে। আরেকটা ইরাক চাই না আমরা,’ বলেন ব্যানন।

ট্রাম্প প্রশাসনের ইরানবিষয়ক নীতির হঠাৎ মোড় ঘুরে যাওয়ায় তাঁরই সমর্থক ‘মাগা’ শিবিরের রক্ষণশীল অংশ উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে। কয়েক সপ্তাহ আগেও ট্রাম্প যেখানে ইরানের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ কূটনৈতিক সমঝোতার কথা বলছিলেন, এখন সেখানে ৩০ হাজার পাউন্ডের মার্কিন ‘বাঙ্কার বাস্টার’ বোমা ব্যবহারের সম্ভাবনা আলোচনায় আসছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইরানবিরোধী পদক্ষেপে গেলে ট্রাম্প তাঁর নিজের শক্তিশালী শিবিরের বিরোধিতার মুখে পড়তে পারেন। এ সমর্থক শিবির মূলত তাঁর পররাষ্ট্রনীতি-সংক্রান্ত সতর্কতা ও যুদ্ধবিরোধী অবস্থানকে সমর্থন করেই পাশে ছিল। ইরান ইতিমধ্যে হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি হামলায় জড়ায়, তবে এর জন্য মার্কিনদের চড়া মূল্য দিতে হবে—যদিও সেই মূল্য কী হবে, তা স্পষ্ট করেনি তেহরান।

সামনে নির্বাচন, সমর্থক হারানো ঝুঁকি

ইরান–ইসরায়েল সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রকে জড়ালে, সেটি হবে বৈদেশিক ঝামেলায় যুক্ত হওয়ার ব্যাপারে ট্রাম্পের সতর্ক থাকার নীতির বিপরীত। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে তাঁর সদ্ভাব গড়ার প্রচেষ্টা এতে বাধাগ্রস্ত হতে পারে। আবার ইউক্রেন যুদ্ধ অবসানের প্রচেষ্টা ও শুল্ক নিয়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তি সইয়ের আলোচনা থেকেও মনোযোগ সরিয়ে নিতে পারে এটি।

সংবিধান অনুযায়ী তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন করতে না পারলেও ২০১৬ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে জয়ী হতে সাহায্য করা ‘মাগা’ জোট ট্রাম্পের জন্য এখনো গুরুত্বপূর্ণ। এ জোটের মনোভাব ক্ষুণ্ন হলে তাঁর জনপ্রিয়তায় ধস নামতে পারে, যা ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে।

‘ইরান পারমাণবিক অস্ত্র পাবে না’: ট্রাম্প

এমন বিভক্তি নিয়ে হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বুধবার ট্রাম্প অবশ্য উদ্বেগহীন ভঙ্গিতে বলেন, ‘আমার সমর্থকেরা আজ আমাকে আগের চেয়ে বেশি ভালোবাসেন, আমিও তাঁদের।’ তাঁর ভাষ্য, ‘আমি শুধু একটা জিনিসই চাই—ইরানের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র যেন না থাকে।’

ট্রাম্প স্বীকার করেন, সমর্থকদের একটা অংশ এখন হয়তো (তাঁর সিদ্ধান্তে) একটু অসন্তুষ্ট। তবে কেউ কেউ আবার তাঁর সঙ্গেই একমত যে ইরানের হাতে পারমাণবিক শক্তি যাওয়া উচিত নয়।

‘আমি যুদ্ধ চাই না। কিন্তু যদি তাদের (ইরান) যুদ্ধ করা অথবা পারমাণবিক অস্ত্র রাখা—এ দুটির মধ্যে একটি বেছে নেওয়ার বিষয় হয়, তাহলে আপনাকে যা করার, তা করতে হবে’, বলেন ট্রাম্প।

বিভাজন প্রকট, কিন্তু সমর্থন ধরে রাখবেন ট্রাম্প

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে আইন প্রণয়নে যুক্ত থাকা এবং সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সের ঘনিষ্ঠ মার্ক শর্ট বলেন, ইরান ইস্যুতে রিপাবলিকানদের মধ্যে ‘গভীর বিভাজন’ দেখা যাচ্ছে। যদিও তাঁর বিশ্বাস, ট্রাম্পের অনুসারীরা শেষ পর্যন্ত তাঁর পাশেই থাকবেন।

শর্ট বলেন, ‘বিভাজন এখন স্পষ্ট হলেও, ট্রাম্পপন্থীরা আদর্শ নয়, মানুষটির প্রতি আনুগত্য বেশি দেখান।’ তবে তাঁর মতে, ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে লাভজনকও হতে পারে।

ঐতিহ্যগতভাবে রক্ষণশীল ভোটাররা (রিপাবলিকান) ইসরায়েলের পক্ষে থাকার বিষয়টিকে সমর্থন করেন।

রয়টার্স/ইপসোসের মার্চ মাসের এক জরিপ বলছে, ৪৮ শতাংশ রিপাবলিকান মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত ইসরায়েলকে যেকোনো হুমকির মুখে সামরিক সহায়তা দেওয়া। এ বিষয়ে মাত্র ২৮ শতাংশ একমত নন। তবে উল্টো চিত্র ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে। তাঁদের ২৫ শতাংশ এ বিষয়ে একমত, ৫২ শতাংশ একমত নন।

‘মাগা’–এর প্রভাবশালী কণ্ঠ এবং মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি মারজোরি টেইলর গ্রিন ও সাবেক ফক্স নিউজ উপস্থাপক টাকার কার্লসনও ইরান ইস্যুতে ট্রাম্পকে সতর্ক হতে বলছেন। গ্রিন গত রোববার সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ‘যারা ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে জড়াতে চাইছে, তারা আমেরিকা ফার্স্ট/মাগা নয়। আমরা বিদেশে যুদ্ধ করা নিয়ে ক্লান্ত।’

তবে ট্রাম্পের আরেক ঘনিষ্ঠজন, সাউথ ক্যারোলাইনার রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম ফক্স নিউজে বলেন, তিনি চান ট্রাম্প যেন ‘ইসরায়েলকে কাজ শেষ করতে সাহায্য করেন’। কারণ তাঁর মতে, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু ‘ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য হুমকি।’

রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে দ্বন্দ্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে গত মঙ্গলবার রাতে টাকার কার্লসন ও টেক্সাসের রিপাবলিকান সিনেটর টেড ক্রুজের বিতর্কে।

বিতর্কে ক্রুজ যখন ইরানে ‘সরকার পরিবর্তনের’ পক্ষে কথা বলেন, তখন কার্লসন তীব্র বিরোধিতা করেন। বলেন, ‘আপনি ইরান সম্পর্কে কিছুই জানেন না!’ উত্তরে ক্রুজ বলেন, ‘আমি তো টাকার কার্লসনের মতো ইরান-বিশেষজ্ঞ নই।’ এরপর কার্লসন বলেন, ‘আপনি একজন সিনেটর, যিনি অন্য দেশের সরকার ফেলে দেওয়ার ডাক দিচ্ছেন।’

 ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (এমএজিএ) লেখাসংবলিত হ্যাট হাতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওয়েস্ট পয়েন্ট মিলিটারি একাডেমির এক অনুষ্ঠানে। ওয়েস্ট পয়েন্ট, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র, ২৪ মে ২০২৫
‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (এমএজিএ) লেখাসংবলিত হ্যাট হাতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওয়েস্ট পয়েন্ট মিলিটারি একাডেমির এক অনুষ্ঠানে। ওয়েস্ট পয়েন্ট, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র, ২৪ মে ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

পাকিস্তানি সেনাপ্রধানকে ট্রাম্পের আপ্যায়ন কেন অস্বস্তি বাড়িয়ে দিয়েছে মোদির by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

সাইপ্রাস, কানাডা ও ক্রোয়েশিয়া সফর শেষ হওয়ার আগেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কূটনৈতিক সাফল্য ও ব্যর্থতা নিয়ে শুরু হয়ে গেছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। সবকিছু ছাপিয়ে যদিও বড় হয়ে উঠেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ভূমিকা ও মনোভাব। ভারত–পাকিস্তান সংঘাত ঠেকানোর যে কৃতিত্ব নিরবচ্ছিন্নভাবে তিনি দাবি করে চলেছেন, নিশ্চিতভাবেই তা মোদির নবতম বিড়ম্বনা।

সেই বিড়ম্বনায় বোঝার ওপর শাকের আঁটি হয়ে উঠেছে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের আপ্যায়ন। মুনিরের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজ সারার পর যেভাবে ট্রাম্প নিজেকে ‘সম্মানিত বোধ’ করেছেন বলে জানিয়েছেন, তা অবশ্যই মোদি সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতার বিজ্ঞাপন। ট্রাম্প স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছেন, ‘আন্তসীমান্ত সন্ত্রাস’ নিয়ে ভারতের নিরন্তর প্রচার তাঁর কাছে বিশ্বাসযোগ্য নয়। গ্রহণযোগ্যও নয়। পাকিস্তান ব্রাত্য তো নয়ই।

গতকাল বুধবার ভারতীয় গণমাধ্যমের সবচেয়ে আলোচিত খবর ছিল মোদি–ট্রাম্প ফোনে আলোচনা। ৩৫ মিনিটের সেই আলোচনার বিষয়বস্তু নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি গণমাধ্যমকে যা বলেছিলেন, মুহূর্তের মধ্যেই তা খণ্ডন করে দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই। ফলে আরেকবার সেই পুরোনো সমালোচনা দেশের রাজনীতিতে মাথাচাড়া দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, ভারত–পাকিস্তান দ্বন্দ্বে তৃতীয় পক্ষ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপকে কেন্দ্র করে।

প্রথম দিন থেকেই ট্রাম্প দাবি করে আসছেন, চার দিনের মাথায় ভারত–পাকিস্তান সংঘাত তিনিই বন্ধ করেছেন। বারবার বলে চলেছেন, দুই দেশকেই তিনি সংঘাত থামাতে বলেছিলেন। দুই দেশকেই বাণিজ্য চুক্তির আশ্বাস দিয়েছিলেন। এত দিন ধরে ভারত সরকারের পক্ষে কেউ বলেননি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ‘অসত্য’ বলছেন।

বরং নরেন্দ্র মোদি দাবি করেছিলেন, ভারতীয় বাহিনীর আক্রমণ থেকে বাঁচতে পাকিস্তানই যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছিল। সেই দাবির কথা এবার অন্যভাবে উপস্থাপিত হলো মোদি–ট্রাম্প ফোনে আলোচনার পর।

পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি গণমাধ্যমকে বলেন, ট্রাম্পকে মোদি বলেছেন পাকিস্তানের তাগিদে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতা ছাড়াই ভারত ও পাকিস্তান যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছিল। তা ছাড়া এ কথাও ট্রাম্পকে বলে দেওয়া হয়, কাশ্মীর নিয়ে তৃতীয় কোনো পক্ষের মধ্যস্থতা ভারত কোনো দিন মানেনি, মানবেও না। এবং এই না–মানা নিয়ে দেশের সব পক্ষ একমত।

কিন্তু নরেন্দ্র মোদির দুর্ভাগ্য, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ট্রাম্প নিজেই আরেকবার জানিয়ে দিলেন, ভারত–পাকিস্তানের যুদ্ধ তিনিই থামিয়েছেন। ট্রাম্প বলেন, ‘যুদ্ধ আমিই থামিয়েছি। আমি পাকিস্তানকে ভালোবাসি। আমি মনে করি, মোদি একজন দারুণ মানুষ। গত রাতে তাঁর সঙ্গে আমি কথা বলেছি। আমরা মোদির ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করতে চলেছি। আমিই কিন্তু ভারত–পাকিস্তানের যুদ্ধ থামিয়েছি।’

আরেকবার যুদ্ধ থামানোর কৃতিত্ব জাহির করাই শুধু নয়, মোদির বিড়ম্বনা আঠারো আনা বাড়িয়ে ট্রাম্প পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে মধ্যাহ্নভোজে আমন্ত্রণ জানান। কানাডা থেকে ফেরার পথে কিছু সময়ের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে এসে তাঁর সঙ্গে দেখা করার প্রস্তাব মোদিকে ট্রাম্প দিয়েছিলেন। ক্রোয়েশিয়া সফর পূর্বনির্ধারিত থাকায় মোদির পক্ষে সেই প্রস্তাব গ্রহণ করা সম্ভবপর হয়নি।

আসিম মুনিরকে মধ্যাহ্নভোজে আমন্ত্রণ জানানো সম্পর্কে ট্রাম্প অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের বলেন, ‘মুনিরকে আমন্ত্রণ জানিয়ে আমি সম্মানিত বোধ করছি। তাঁকে আমন্ত্রণ জানিয়েছি, কারণ যুদ্ধ থামানোর জন্য আমি তাঁকে ধন্যবাদ জানাতে চেয়েছিলাম। প্রধানমন্ত্রী মোদি কিছুক্ষণ আগেই চলে গেছেন। আমরা ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করতে কথাবার্তা চালাচ্ছি। মোদি ও মুনির দুজনেই খুব স্মার্ট। যুদ্ধ না চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে দুজনেই একমত হয়েছিলেন।’

ট্রাম্পের দাবি ও আচরণ ভারতের রাজনীতিতে সরকারবিরোধীদের হাতে তুলে দিয়েছে এক মোক্ষম অস্ত্র। সেই সুযোগ বিরোধীরা হাতছাড়া করেনি। মোদি সরকারকে সরাসরি দাঁড় করিয়েছে কাঠগড়ায়। সরব হয়েছে কূটনৈতিক ব্যর্থতা নিয়ে।

কংগ্রেস মুখপাত্র জয়রাম রমেশ ‘এক্স’ হ্যান্ডলে অভিযোগ তুলেছেন, ‘যে আসিম মুনিরের উসকানিমূলক কথাবার্তা পেহেলগাম–কাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত, সেই মানুষের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজ করছেন ট্রাম্প। উচ্ছন্নে গেছে ভারতের কূটনীতি। অথচ প্রধানমন্ত্রী নির্বাক!’

তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য সাকেত গোখলের মন্তব্য, ‘মোদি ও জয়শঙ্করের কূটনীতি কী অর্জন করল? ট্রাম্প নিয়ে প্রশ্ন উঠলে প্রধানমন্ত্রী মোদিই–বা কেন ভয় পেয়ে চুপ করে যান?’

ভারতের ‘কূটনৈতিক ব্যর্থতা’ নিয়ে বিরোধীদের তোলা প্রশ্নগুলো যে নিতান্তই অসংগত, জোরের সঙ্গে মোদি সরকার বা বিজেপি সেই দাবি করতে পারছে না। কারণ, এত চেষ্টা সত্ত্বেও পাকিস্তানকে ভারত একঘরে করতে পারেনি। তাদের ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্সের (এফএটিএফ) ধূসর তালিকাভুক্ত করতে তিন বছর ধরে চেষ্টা করেও ভারত ব্যর্থ।

২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত এফএটিএফের ধূসর তালিকায় থেকে বেরিয়ে আসা পাকিস্তানকে আবার নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত করতে ভারত শুধু ব্যর্থই হয়নি—বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবি থেকে নতুন ঋণও পাকিস্তান আদায় করতে পেরেছে। ৫৯ জন সংসদ সদস্য ও সাবেক কূটনীতিবিদদের নিয়ে তৈরি ৭টি দল সংঘাত বন্ধের পর ৩৩টি দেশ সফর করলেও সন্ত্রাসবাদের প্রশ্নে একটি দেশও সরাসরি পাকিস্তানের বিরোধিতা করেনি। সবচেয়ে বড় কথা, ভারতের নিরন্তর প্রচার সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের চোখে ভারত ও পাকিস্তান সমান গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশই একই পঙ্‌ক্তিতে।

জেনারেল মুনিরকে তোয়াজ করার পেছনে ট্রাম্পের মননে নিশ্চিতই ইসরায়েল–ইরান যুদ্ধ কাজ করছে। এই যুদ্ধে সরাসরি ইসরায়েলের পক্ষ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র জড়াতে চাইলে পাকিস্তানকে তাদের প্রয়োজন। সেখানে ঘাঁটি গাড়ার দরকার পড়তে পারে। তবু প্রশ্ন উঠছে, ভারত–পাকিস্তান সংঘাত থামানোর কৃতিত্ব প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কেন বারবার দাবি করছেন? দাবি সত্য হলে কেনই–বা তা মেনে নিতে প্রধানমন্ত্রী মোদির এত অনীহা?

উত্তরটা সহজ। ভারতের চিরায়ত নীতি কাশ্মীর সমস্যার সমাধানে তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ না মানা। সেই নীতিতে অটল থাকতে হলে ট্রাম্পের দাবি অস্বীকার করতে হয়। মোদি সরকার সেটাই করছে। কিন্তু তা করতে গিয়ে তাদের অনেক প্রশ্নের মুখেও পড়তে হচ্ছে। যে দল ১৯৭২ সালে সিমলা চুক্তির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসছে, পাকিস্তানকে নতজানু করেও কেন ইন্দিরা গান্ধী পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর দখল না করে চুক্তি সই করলেন বলে তাঁকে সমালোচনা বিদ্ধ করে চলেছে, সেই দলের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কেন সুবিধাজনক অবস্থায় থেকেও যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে রাজি হলেন?

ট্রাম্পের চাপ যদি না–ই থাকে, তাহলে কেন পাকিস্তানের দাবি তিনি মানতে গেলেন? এসব প্রশ্নের জবাব মোদি দেননি। পেহেলগাম–কাণ্ড ও পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘাত নিয়ে সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডাকতে নারাজ বলে সরাসরি প্রশ্ন করার সুযোগও বিরোধীরা পাচ্ছে না।

মোদির ত্রিদেশীয় সফরের প্রাপ্তির ঘর অবশ্যই শূন্য নয়। কানাডার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে তিনি অনেকটাই সফল। প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির আমন্ত্রণ পেয়ে এবং তা গ্রহণ করে তলানিতে ঠেকা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক মোদি আবার স্বাভাবিক করে তুলতে চলেছেন। ২০ মাসের ‘সম্পর্কহীনতা’ কাটিয়ে দুই দেশই হাইকমিশনার নিয়োগে রাজি হয়েছে। এটাই হতে চলেছে প্রথম ধাপ।

আবার মার্ক কার্নি বুঝিয়ে দিয়েছেন, নিজ্জর হত্যাকাণ্ডের তদন্তে ঢিলে না দিয়ে সম্পর্ক ভালো করার রাস্তায় এগোবেন। তদন্ত চলবে তার মতো, সম্পর্কও উন্নত করা হবে পারস্পরিক স্বার্থে। মোদিও সেই বিষয়ে সহমত।

তা সত্ত্বেও সমালোচনামুক্ত হতে পারছেন না নরেন্দ্র মোদি। নিঃসন্দেহে কূটনৈতিক দিক থেকে খুব একটা সুসময়ের মধ্য দিয়ে তিনি হাঁটছেন না।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প,  পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির ও নরেন্দ্র মোদি
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির ও নরেন্দ্র মোদি। ফাইল ছবি: রয়টার্স, এএফপি

হ্যালো আমেরিকা, তোমার দিকে প্রেতাত্মা ছুটে আসছে : যুক্তরাষ্ট্রকে শি জিনপিং

যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে আবারও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। এবারের এক্স পোস্টে তিনি স্পষ্ট ‍বিশ্ব মোড়ল যুক্তরাষ্ট্রের পতনের ভবিষ্যদ্বাণী দেন।

বৃহস্পতিবার (১৯ জুন) এক্সে শি জিনপিং লেখেন, ‘চীন জানে যে মহাশক্তিগুলো তাদের যুদ্ধযন্ত্রের কারণে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।’ তিনি পূর্বেকার রাজবংশের ধ্বংসের ইতিহাস স্মরণ করেন। যুদ্ধবাজ মনোভাব কীভাবে একটি জাতিকে ধ্বংস করেছে তার বর্ণনা দেন।

শি লিখেন, খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে শক্তিশালী কিন রাজবংশ যুদ্ধরত রাজ্যগুলোকে একত্র করে। তারা মহান প্রাচীর নির্মাণ করে এবং চীনের প্রথম সম্রাটের কাছে টেরাকোটা সেনাবাহিনীকে হস্তান্তর করে। কিন্তু সৈন্যদের অবিরাম যুদ্ধে বাধ্য করে এবং সাম্রাজ্যের গৌরবের জন্য জনগণের রক্ত শুষে নেওয়ার পর এই রাজবংশ মাত্র ১৫ বছরের মধ্যে ধ্বংস হয়ে যায়।

অষ্টম শতাব্দীতে পরাক্রমশালী তাং রাজবংশ বিশ্বের দূরবর্তী প্রান্ত থেকে কর আদায় করত। কিন্তু বিজয়ের নেশায় মত্ত হয়ে এর সেনাবাহিনী মধ্য এশিয়ার গভীরে অভিযান চালায়। যার ফলে সামরিক দলগুলো নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বৃদ্ধি পায়। যখন দুর্বল রাষ্ট্র আর তাদের ক্ষুধা মেটাতে পারেনি তখন আন লুশানের বিদ্রোহ রাজধানী চাংআনকে পুড়িয়ে দেয় এবং সাম্রাজ্যকে অপরিবর্তনীয় পতনের দিকে ঠেলে দেয়।

১৩ শতাব্দীতে চেঙ্গিস খানের অজেয় অশ্বারোহী বাহিনী ইউরোপ থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত বিজয় তাড়া করে। কিন্তু অবিরাম সম্প্রসারণ সাম্রাজ্যকে যত দ্রুত বিজয় এনে দেয়, তত দ্রুত তা ক্ষয়প্রাপ্ত করে। এটিকে সবচেয়ে স্বল্পস্থায়ী রাজবংশগুলোর একটিতে পরিণত করে।

৫০০০ বছরের ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে, যা আমেরিকা শিখতে অস্বীকার করে। সাম্রাজ্য শত্রুর কারণে পতন হয় না, তারা তাদের যুদ্ধযন্ত্রের অতৃপ্ত ক্ষুধার নিচে ভেঙে পড়ে।

৭৫০টি সামরিক ঘাঁটি দিয়ে বিশ্বকে ঘিরে রাখা এবং প্রতি বছর প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার ধোঁয়ায় উড়ে যাওয়ার সঙ্গে... আপনি (মার্কিন সাম্রাজ্য) কি ইতিমধ্যে আপনার প্যারেডে সেই প্রেতাত্মার পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছেন? 

শি জিনপিং ও ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি : সংগৃহীত
শি জিনপিং ও ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি : সংগৃহীত

ইরান-ইসরায়েল সংঘাত: হামলায় যুক্তরাষ্ট্রকে জড়াতে চায় ইসরায়েল, ইরানের হুঁশিয়ারি

ইসরায়েল ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকেও ইরানে হামলার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ইরানে হামলায় ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রও যোগ দেবে কি না, সেটা নিয়ে এখন আলোচনা হচ্ছে বেশি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিভিন্ন মন্তব্য ও তৎপরতায়ও সেই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র এই সংঘাতে জড়াতে পারে, এমন আলোচনা শুরু হয় কানাডায় জি-৭ সম্মেলন শেষ না করেই ট্রাম্প ওয়াশিংটনে ফিরে আসায়। ট্রাম্প দেশে ফিরেই যুক্তরাষ্ট্র সময় মঙ্গলবার জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক ডাকেন। মন্ত্রিসভার সদস্য, সামরিক নেতৃত্ব ও উপদেষ্টাদের সঙ্গে ট্রাম্পের ৮০ মিনিটের এই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালাবে কি না, সেই আলোচনা হয়।

তবে গতকাল বুধবার পর্যন্ত ওই বৈঠক নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। আলোচনা সম্পর্কে জানেন, এমন পাঁচটি সূত্র বলেছে, সেই বৈঠকে ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা শুরু করা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে ইরানে হামলা চালানোর বিষয়ে ট্রাম্পের উপদেষ্টাদের কেউ কেউ ভিন্নমত পোষণ করেন।

ইরানে ওয়াশিংটনের হামলার পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছে তেহরান। ইরান আত্মসমর্পণ করবে না মন্তব্য করে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি গতকাল বলেন, এটা করলে যুক্তরাষ্ট্রকে অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে।

এদিকে টানা ষষ্ঠ দিনের মতো গতকাল বুধবার পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়েছে ইরান ও ইসরায়েল। ইরানের একটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায় ইসরায়েল। ইসরায়েলে ব্যালিস্টিকের পাশাপাশি গতকাল হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান।

ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের জ্যেষ্ঠ ফেলো এলি জেরানমায়েহর মতে, ট্রাম্প ইরানে হামলার সিদ্ধান্ত নিলে ইরান সেটা তাদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা হিসেবে বিবেচনা করবে। এতে অভূতপূর্ব এক সংকট তৈরি হবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘যদি এই প্যান্ডোরার বাক্স একবার খুলে যায়, আমরা জানি না পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে।’

আলোচনায় সরকার পরিবর্তন

ইসরায়েল-ইরান সংঘাত নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। তিনি বলেছেন, নতুন করে আরও সামরিক হস্তক্ষেপ ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। গতকাল এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘এই সংঘাত যেন আন্তর্জাতিক পরিসরে ছড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য আমি সবাইকে জোরালোভাবে সতর্ক করছি।’

সংঘাতের বিস্তার ঠেকাতে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। গতকাল তিনি বলেছেন, এই সংকটে মধ্যস্থতা করতে প্রস্তুত মস্কো। এ বিষয়ে অন্যান্য আঞ্চলিক নেতাদের সঙ্গে তাঁর আলোচনা হয়েছে।

ইসরায়েলের হামলার মধ্যে ইরানে সরকার পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। ইসরায়েলি একাধিক মন্ত্রী এ নিয়ে কথা বলছেন। ইরানের শেষ শাহ মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভির ছেলে রেজা পাহলভি বলেছেন, ইরানে খামেনি যুগের অবসান ঘটতে যাচ্ছে। সরকার পতনের পর ১০০ দিনের একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের বিষয়ে প্রস্তুত আছেন বলেও জানান তিনি।

তবে ইরানে সরকার পরিবর্তন হলে তা একটি ‘বড় ভুল’ হবে বলে মনে করেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ। তিনি বলেন, ‘সবাইকে আবার আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে আমাদের প্রয়োজন।’

ইসরায়েলের লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রকে টেনে আনা

জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সঙ্গে বৈঠকের পরই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ফোনে কথা বলেন ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমগুলো এই তথ্য জানালেও, তাঁদের মধ্যে কী আলোচনা হয়েছে, সে সম্পর্কে কিছু জানায়নি।

গতকাল হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলাপকালে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হয় ট্রাম্পকে। এ সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমি এটা বলতে পারছি না। আমি এটা করতে পারি, আবার না–ও পারি। কেউ জানে না আমি কী করতে যাচ্ছি।’

এর আগে মঙ্গলবার ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্পের একাধিক পোস্ট থেকেও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা শুরু করতে পারে—এমন ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে।’ এরপর আরেক পোস্টে ইরানকে ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের’ আহ্বান জানান তিনি। ট্রাম্প আরেক পোস্টে দাবি করেন, ‘আমরা এখন ইরানের আকাশ পুরোপুরি ও সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে নিয়েছি।’ ট্রাম্পের বক্তব্যে ‘আমরা’ শব্দটি দেখে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানে হামলায় যোগ দিচ্ছে—এমন আলোচনা জোরালো হয়।

যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইরানে হামলা চালাবে কি না, এমন প্রশ্ন করা হলে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। গতকাল তিনি বলেন, এটা অত্যন্ত গোপনীয় একটি বিষয়। তাই বেশি কিছু বলা যাচ্ছে না।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালালে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত এক নতুন মোড় নেবে। শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, গোটা বিশ্বেই এর প্রভাব হবে ভয়াবহ।

যুক্তরাষ্ট্রকে এই সংঘাতে যুক্ত করতে ইসরায়েল সব চেষ্টা চালাচ্ছে বলে মনে করেন ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই৬-এর সাবেক প্রধান জন সাওয়ার্স। তিনি বিবিসিকে বলেন, ‘ইসরায়েলের লক্ষ্য আমেরিকানদের এই সংঘাতে সরাসরি যুক্ত করা। কারণ, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালাতে পারলেও সেগুলো ধ্বংস করার ক্ষমতা ইসরায়েলের নেই। এই ক্ষমতা শুধু যুক্তরাষ্ট্রেরই আছে।’

শুক্রবার ইসরায়েলি হামলায় ইরানের নাতাঞ্জ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনার ওপরের অংশ ধ্বংস হয়েছে। কিন্তু ফর্দোয় ইরানের আরেকটি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রের ক্ষতি করতে পারেনি ইসরায়েল। পাহাড়ের ভূগর্ভে ৯০ মিটার (প্রায় ৩০০ ফুট) গভীরের এই কেন্দ্র ধ্বংস করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ১৩ হাজার ৬০০ কেজির বোমা জিবিইউ–৫৭ এবং মার্কিন বোমারু বিমান বি–২ প্রয়োজন।

ইসরায়েলে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

ইসরায়েলের বাণিজ্যিক রাজধানী তেল আবিবসহ দেশটির বিভিন্ন স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করেছে ইরান। গতকাল রাত সাড়ে ১১টার দিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে জানানো হয়, ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে তেহরান। ‘ফাত্তাহ’ নামের হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সফলভাবে ভেদ করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করেছে।

ইরান বলেছে, ইসরায়েলের একাধিক বিমানঘাঁটিতে গতকাল ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় তারা। হাইপারসনিক ছাড়াও খাইবার-শাকান ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে। হামলার লক্ষ্যবস্তুগুলোর একটি ছিল ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলের মেরন বিমানঘাঁটি। এ ছাড়া তেহরান, ইস্পাহানসহ দেশটির বিভিন্ন স্থান থেকে ১৪টি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে।

ইরানের বেশির ভাগ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দাবি করে ইসরায়েল বলেছে, গতকালের এসব হামলায় কারও প্রাণহানি হয়নি।

আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সংঘাত শুরুর প্রথম দিকে একসঙ্গে কয়েক ডজন করে ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ইসরায়েলে হামলা চালাতে দেখা গেছে ইরানকে। কিন্তু গত দুই দিনে সেই সংখ্যাটা কমে গেছে

পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা ইসরায়েলের

ইসরায়েলও ইরানে হামলা অব্যাহত রেখেছে। গতকাল রাত একটায় এই প্রতিবেদন লেখার সময়ও ইরানে হামলা চালাচ্ছিল তারা। এর আগে বিকেলে এক বিবৃতিতে ইসরায়েল জানায়, সর্বশেষ কয়েক ঘণ্টায় অর্ধশতাধিক আকাশযান (যুদ্ধবিমান ও ড্রোন) দিয়ে তেহরানসহ ৪০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে তারা। পাশাপাশি ইরানের ১০টি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে।

তেহরানের অদূরে কারাজ শহরে ইরানের একটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায় ইসরায়েল। জাতিসংঘের পারমাণবিক কর্মসূচি নজরদারিবিষয়ক সংস্থা আইএইএ জানায়, হামলায় পারমাণবিক স্থাপনার দুটি ভবন ধসে পড়েছে।

ইসরায়েল দাবি করেছে, তেহরানের অদূরে খোজিরসহ ১২টি ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে তারা। খোজির ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনকেন্দ্র। গত বছরের অক্টোবরেও ইরানের এই ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনকেন্দ্রে হামলা চালিয়েছিল ইসরায়েল।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনা তেহরানে ‘অবিরত ও তীব্র’ বিস্ফোরণের খবর জানিয়েছে। তেহরানের অদূরে ইমাম হোসাইন বিশ্ববিদ্যালয়েও হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। এদিকে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ দাবি করেন, গতকাল ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সদর দপ্তর ধ্বংস করে দিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী।

ইরান ৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে

ইসরায়েল জানিয়েছে, শুক্রবার থেকে ইসরায়েলে ৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরান। হামলার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এমন স্থানের সংখ্যা ৪০। এসব হামলায় প্রায় ১৬ হাজার অবকাঠামো ও এক হাজারের বেশি যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ইসরায়েলের পক্ষ থেকে দুই দিন আগে জানানো হয়েছিল, ইরানের হামলায় দেশটিতে ২৪ জন নিহত হয়েছেন। তবে এর পর থেকে হালনাগাদ তথ্য দিচ্ছে না ইসরায়েল।

এদিকে ওয়াশিংটনভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস জানায়, ইরানে প্রায় ৬০০ মানুষ নিহত হয়েছেন। যদিও ইরানের দেওয়া সর্বশেষ হিসাবে নিহতের সংখ্যা দুই শতাধিক।

সংস্থাটি বলছে, ইসরায়েলের হামলায় ইরানে ৫৮৫ জন নিহত এবং ১ হাজার ৩২৬ জন আহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ২৩৯ জন বেসামরিক ও ১২৬ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। এর মধ্যে ইরানের সামরিক বাহিনীর দুই ডজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা রয়েছেন।

গত সোমবার ইরানের দেওয়া সর্বশেষ হিসাবে, সেদিন পর্যন্ত হামলায় ২২৪ জন নিহত ও ১ হাজার ২৭৭ জন আহত হয়েছিলেন।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন উপস্থিতি

ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের যুক্ত হওয়ার আলোচনার মধ্যে যুক্তরাজ্যের পূর্বাঞ্চলীয় একটি ঘাঁটি ছেড়েছে বেশ কিছু মার্কিন যুদ্ধবিমান। ছবিতে দেখা যায়, ইংল্যান্ডে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লেকেনহিথ থেকে উড়ে যাচ্ছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের একটি বহর। এসব যুদ্ধবিমানের মধ্যে আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী (রিফুয়েলিং) ট্যাংকারও ছিল।

মধ্যপ্রাচ্যের ১৯টি স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের ৪০ থেকে ৫০ হাজার সেনা মোতায়েন রয়েছে। এর মধ্যে অঞ্চলটিতে সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে রয়েছে মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস কার্ল ভিনসন। ইউএসএস নিমিৎজ নামে আরও একটি রণতরি মধ্যপ্রাচ্যে যাচ্ছে। এ ছাড়া আরব সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি ডেস্ট্রয়ার যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করা রয়েছে।

এর বাইরে সাইপ্রাসে মার্কিন সেনাঘাঁটি আছে। এ ছাড়া বাহরাইনে আছে মার্কিন নৌঘাঁটি। এখন সবটা নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্র কী সিদ্ধান্ত নেয় এবং ইরানে হামলার ক্ষেত্রে কতটা জড়াতে চায় তারা।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চিন্তন প্রতিষ্ঠান স্টিমসন সেন্টারের সম্মাননীয় ফেলো বারবারা স্লাভিনের মতে, ট্রাম্প সব সময় জয়ী হতে চান। তিনি আল–জাজিরাকে বলেন, ইরানের সঙ্গে সংঘাতের বর্তমান যে পরিস্থিতি, তাতে করে ট্রাম্প মনে করছেন ইসরায়েলই জয়ী হতে যাচ্ছে। এ কারণেই তিনি ইরানে সরাসরি হামলার বিষয়ে একটা রহস্য তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থাৎ নিজেকে আলোচনার কেন্দ্রে আনতে চাইছেন।

ইরানের মধ্যাঞ্চলীয় ইস্পাহান এলাকায় ভূমি থেকে আকাশে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ভূপাতিত ইসরায়েলের হার্মিস ড্রোন। গতকাল ইরানের সেনাবাহিনী এ ছবি প্রকাশ করেছে
ইরানের মধ্যাঞ্চলীয় ইস্পাহান এলাকায় ভূমি থেকে আকাশে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ভূপাতিত ইসরায়েলের হার্মিস ড্রোন। গতকাল ইরানের সেনাবাহিনী এ ছবি প্রকাশ করেছে। এএফপি

ট্রাম্পকে চিন্তায় ফেলে দিল ইরান by জাভেদ নাকভি

ইসরায়েলকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অবিনশ্বর জাহাজ’ বলা হয়। কিন্তু ইরানের ভয়ংকর নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইসরায়েলের বিখ্যাত ‘আয়রন ডোম’ ভেদ করে সেই জাহাজের গায়ে আঘাত হেনেছে। ইরানের জন্য হুমকি হিসেবে এ যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, কিন্তু এখন তা উল্টো ইসরায়েলের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইসরায়েলের বৃহস্পতিবার রাতের হামলার জবাবে ইরানের প্রতিক্রিয়ায় পশ্চিমারা হতবাক হয়ে গেছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প গর্ব করে বলে থাকেন, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সেরা সামরিক সরঞ্জাম তৈরি করে আর ইসরায়েলকে সেই সরঞ্জাম দেওয়া হয়েছে। তবে ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, ইসরায়েলের ব্যবহৃত দুই বা তিনটি মার্কিন এফ-৩৫ স্টিলথ জেট ইতিমধ্যে ধ্বংস হয়েছে। এ খবরের সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তবে যদি একটি জেটও ইরান ধ্বংস করে থাকে, তাহলে সেটি নিঃসন্দেহে পশ্চিমা সমর প্রকৌশলীদের এবং ট্রাম্পের জন্য অপমানজনক ব্যাপার হবে।

দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞায় ও আর্থিক সংকটে থাকা একটি দেশ নিজেকে রক্ষায় যে সামর্থ্য অর্জন করেছে, তা ইতিমধ্যেই পশ্চিমাদের মাথা ঘুরিয়ে দিয়েছে। কারণ, একটি অত্যাধুনিক মার্কিন যুদ্ধবিমান ধ্বংসের ফলে বিশ্ব অস্ত্রবাজারে এর প্রভাব পড়তে পারে। মার্কিন বিশ্লেষকেরা সম্প্রতি ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনায় ফ্রান্সে তৈরি রাফাল জেটের সক্ষমতা নিয়ে ঠাট্টা করতে পেরে খুশি ছিলেন। কিন্তু এবার দাবার ঘুঁটি তাঁদের দিকে ঘুরে যেতে পারে।

প্রশ্ন হলো, ইসরায়েল কি পশ্চিমের কাছে কেবল স্নায়ুযুদ্ধের সময়ের একটি পুরোনো অস্ত্র হয়ে আছে, নাকি দেশটি এখনো পশ্চিমাদের আসলেই কোনো কাজে লাগে? একসময় ইসরায়েল আরব দেশগুলোর সঙ্গে দুটি বড় যুদ্ধে জিতেছিল এবং এ অঞ্চলে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব ঠেকাতে সাহায্য করেছিল। তখন পশ্চিমাদের কাছে ইরান ছিল একটি ভারসাম্য তৈরির উপায়।

পশ্চিমা দেশগুলো বলে যাচ্ছে, ইরান নাকি পারমাণবিক বোমা বানাতে চাইছে। তবে পশ্চিমের এ অভিযোগ খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র ঠিক এ ধরনের মিথ্যা কথা বলেই ইরাককে ধ্বংস করেছিল। তারা বলেছিল, সাদ্দাম হোসেন পারমাণবিক বোমা বানাচ্ছেন। পরে প্রমাণিত হয়েছে, তাদের কথা সত্য ছিল না।

ইসরায়েল সৃষ্টির আগেই দেশটির সীমালঙ্ঘন মেনে নেওয়া হয়েছিল। ১৯৪৬ সালে জেরুজালেমের কিং ডেভিড হোটেলে জায়নবাদী চরমপন্থীরা বোমা মেরে ব্রিটিশ সৈন্যদের হত্যা করেছিল।

এরপর ১৯৬৭ সালে ইসরায়েল-আরব যুদ্ধের সময় ভূমধ্যসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা জাহাজ ইউএসএস লিবার্টিতে হামলা চালিয়েও শাস্তি এড়িয়েছিল। মার্কিন জেট বিমান ও টর্পেডো বোট ব্যবহার করে তারা ৩৪ মার্কিন নাবিককে হত্যা করেছিল।

সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ইসরায়েল ১৯৫০ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক গোপন তথ্য চুরি করে গোপনে বোমা বানাচ্ছিল। ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা সরকারগুলো তা দেখেও চোখ বন্ধ করে রেখেছিল। এভাবে ইসরায়েল সব ক্ষেত্রেই সীমা লঙ্ঘন করে পার পেয়ে গেছে।

এসব কারণে নেতানিয়াহুর জন্য ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি অংশগ্রহণ চাওয়া কিছুটা বেমানান। একটি টেলিভিশন ভাষণে নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে যুদ্ধে সরাসরি জড়ানোর জন্য অদ্ভুত যুক্তি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইরান ১৯৮৩ সালে বৈরুতে ট্রাকবোমা মেরে প্রায় ৩০০ মার্কিন ও ফরাসি সৈন্য হত্যা করেছিল। তিনি ট্রাম্পকে বিশ্বাস করাতে চেয়েছেন, ইরান ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় তাঁকে হত্যার চেষ্টা করেছিল।

মার্কিন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা নেতানিয়াহুকে যুক্তরাষ্ট্রকে তাঁর ব্যক্তিগত যুদ্ধে জড়ানোর জন্য তিরস্কার করেছেন। তাঁরা ট্রাম্পকে সতর্ক করে দিয়েছেন, ২০০৩ সাল থেকে ওয়াশিংটন মধ্যপ্রাচ্যে ১২ ট্রিলিয়ন ডলার হারিয়েছে; আর বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ ৩৪ ট্রিলিয়ন ডলার।

সাবেক সেনা কর্মকর্তা কর্নেল ডগলাস ম্যাকগ্রেগর টুইট করেছেন, ‘৭ কোটি ৭০ লাখ লোক ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলেন। কারণ, তিনি বিদেশি সংঘর্ষ বন্ধ এবং তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ রোধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।’

তিনি অনুমান করেছেন, ইসরায়েল যদি ইরানের খার্গ দ্বীপ (যেখান থেকে ইরানের ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি হয়) বা বন্দর আব্বাস টার্মিনালে হামলা করে, তাহলে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে। এটি বিশ্বের তেল সরবরাহের ২০ শতাংশ বন্ধ করে দেবে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে সরবরাহশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হবে এবং মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে।

যদি এ যুদ্ধ চলতেই থাকে, তাহলে এক রাতে গ্যাস বা পেট্রলের দাম প্রতি গ্যালন ৭ ডলারে উঠে যাবে। এতে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে যাবে। ট্রাকচালকেরা তখন খাবার বা জরুরি পণ্য পরিবহন করতে পারবেন না। ফলে দেশের পুরো অর্থনীতি ভেঙে পড়বে।

ম্যাকগ্রেগর প্রশ্ন তুলেছেন, ‘এই ভোগান্তি পোহাতে হবে কেন? শুধু কি এই জন্য যে ইসরায়েল (যে নিজেই এই ভয়ংকর যুদ্ধ শুরু করেছে) আমেরিকাকে জোর করে একটি বড় আঞ্চলিক সংঘর্ষে টেনে আনতে চায়? এই ভোগান্তি সেই আঞ্চলিক যুদ্ধকে পারমাণবিক বিপর্যয়ে গড়াতে দেওয়ার জন্য পোহাতে হবে?’

সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার এবং পারস্য উপসাগরে ৪০ হাজার মার্কিন সেনা আছেন। ম্যাকগ্রেগর সতর্ক করেছেন, ‘তাঁরা সহজ নিশানা হবে। ইরানের শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের দাম ২০ হাজার ডলার আর আমেরিকার প্যাট্রিয়ট মিসাইলের প্রতিটি ইন্টারসেপ্টরের দাম ৪০ লাখ ডলার। হিসাব করুন। এই যুদ্ধে আমরা আমাদের মিসাইলের মজুত শেষ করে দেব আর আমেরিকানরা কফিনে করে বাড়ি ফিরবেন।’

অনেক সাবেক সামরিক ও গোয়েন্দাকর্মী এই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তাহলে ট্রাম্প কী করবেন? তিনি কি নেতানিয়াহুর শেষ চালে যোগ দেবেন, নাকি ভ্লাদিমির পুতিনের প্রস্তাবিত কূটনৈতিক সমাধান মেনে নেবেন?

- ডন থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্ত আকারে অনূদিত
* জাভেদ নাকভি, ডনের দিল্লি সংবাদদাতা

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এএফপি ও রয়টার্স

ইরাকের সেই সাজানো গল্প এবার ইরানেও by উমর সোলায়মান

বিশ্ব এই সাজানো চিত্রনাট্য আগেও দেখেছে। এখানে অস্তিত্বের ওপর হুমকি তৈরি হচ্ছে—এ রকম একটা বয়ান তৈরি করা হয়। সংবাদমাধ্যমগুলো সম্মিলিতভাবে এটি নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলে না। রাজনীতিবিদেরা রণবাদ্য বাজায়, নিরাপত্তার কথা বলে আগ্রাসনের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করায়।

আগেরবার ছিল ইরাক। আর এবারে ইরান।

কিন্তু দৃশ্যপটে স্পষ্ট করে ভেসে থাকা একটা জ্বাজল্যমান সত্য সবাই দেখেও দেখছে না। ইসরায়েলের কাছে পারমানবিক অস্ত্র আছে, অথচ কেউ তাদের জবাবদিহি করছে না।

এবার আসুন বাস্তবতাগুলো স্পষ্ট করে বলা যাক—ইরান পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির (এনপিটি) সদস্যরাষ্ট্র। তারা আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের জন্য আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাকে (আইএইএ) অনুমতি দিয়েছে। ফলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সব সময় নজরদারির মধ্যে থাকে। শুধু সম্ভাব্য পারমাণবিক সক্ষমতার অভিযোগেই ইরানের ওপর বিধ্বংসী নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

অন্যদিকে ইসরায়েল এনপিটিতে স্বাক্ষর করেনি। ইসরায়েল কখনো আইএইএকে তাদের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো পরিদর্শনের অনুমতি দেয়নি। এটা ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয়, ইসরায়েলের কাছে প্রায় ৯০টি পারমাণবিক ওয়্যারহেড রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রে শক্তিধর দেশ ইসরায়েল। দীঘদিন ধরেই তারা বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করার প্রাণঘাতী কৌশল অবলম্বন করে আসছে। তারা ধারাবাহিকভাবে আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করে আসছে।

বিস্ময়কর ভণ্ডামি

এই মুহূর্তে ইসরায়েলের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে তদন্ত চলছে। এটা কোনো তত্ত্ব কিংবা জল্পনা নয়, এখনো সেটা চলমান।

গাজা এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। শিশুদের দেহ খণ্ডবিখণ্ড হচ্ছে। গোটা পরিবার ধরে জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছে। গোটা পাড়া পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আর এসব ভয়ংকর ধ্বংসযজ্ঞের জন্য যে রাষ্ট্র দায়ী, পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত সেই রাষ্ট্রই অন্য রাষ্ট্রকে নজরদারির মধ্যে আনার দাবি জানাচ্ছে।

এ ঘটনা আমাদের সেই তথাকথিত ‘নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা’ সম্পর্কে কী ধারণা দেয়?

এটি আমাদের বলে, নিয়মকানুন শুধু দুর্বলদের জন্য প্রযোজ্য। এটি আমাদের বলে, কিছুর রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইনের বাইরে যেকোনো কিছু করতে পারে। এ কাজে সেই রাষ্ট্রগুলো ভূরাজনৈতিক জোটের প্রশ্রয় পায়, তাদের মদদদাতারা নীরব থাকে।

এটি আরও বলে, যেসব সংবাদমাধ্যমে ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান একসময় দাবি করেছিল, ইরাকের গণবিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে (যা পরে চরমভাবে ভুল প্রমাণিত হয়েছিল), সেসব সংবাদমাধ্যম ও প্রতিষ্ঠান এখনো সবচেয়ে অনিবার্য প্রশ্নগুলো তুলতে ব্যর্থতা দেখাচ্ছে।

ইরানের ক্ষেত্রে বা অন্য কোনো দেশের ক্ষেত্রে যে মানদণ্ড ব্যবহার করা হয়, সেটা কেন ইসরায়েলের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয় না?

একটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশ গণহত্যার অভিযোগে আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারাধীন। কেন সেই দেশ জরুরি বৈশ্বিক উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু নয়?

ইসরায়েলের কাছে পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার আছে, সেটা আতঙ্কের বিষয় নয়, অথচ ইরান পারমাণবিক বোমা বানিয়ে ফেলেছে—এমনটা কল্পনা করে আমরা কেন আতঙ্কিত হচ্ছি?

এই দ্বিচারিতা বিস্ময়কর। বাকি বিশ্বের মানুষেরা এটা ভালো করেই বুঝে ফেলেছে।

ইরাকের চিত্রনাট্য

বৈশ্বিক দক্ষিণ এই ভণ্ডামি দেখছে। মুসলিমরাও এটা দেখছে। আর ফিলিস্তিনের জনগণ দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেটি প্রতিদিন ভোগ করছে।

পশ্চিমা দেশগুলোর নাগরিকেরা তাদের নেতাদের এই দ্বিচারিতা সম্পর্কে ক্রমেই সচেতন হয়ে উঠছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্রদের নৈতিক কর্তৃত্ব ক্রমে ধ্বংস হচ্ছে।

এটি ইরানের পক্ষে দাঁড়ানোর বিষয় নয়। এটি আন্তর্জাতিক নিয়মকানুনের ধারাবাহিক ও বিপজ্জনক অবক্ষয়ের বিষয়।

যদি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সত্যিই পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণকে গুরুত্ব দেয়, তাহলে সব পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে; বিশেষ করে যেসব রাষ্ট্রের কোনো স্বচ্ছতা নেই, যারা যুদ্ধাপরাধে জড়িত এবং আঞ্চলিক অস্থিরতা উসকে দেয়।

ইসরায়েল যদি এভাবে তাদের সহিংসতা ও পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডারের জন্য প্রশ্নহীন সমর্থন পেতেই থাকে, তাহলে এনপিটি অর্থহীন হয়ে পড়বে। আইএইএ নখদন্তহীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। আর ভবিষ্যতে তারা যে ‘রেড লাইন’ বা বিপদের সীমারেখা টেনে দেবে, সেটা ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছুই হবে না।

বিশ্বের যেকোনো নৈতিকতাবোধসম্পন মানুষ স্পষ্টভাবে বলতেই পারে, ইসরায়েলকে শুধু গাজা ও পশ্চিম তীরে তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য নয়, তাদের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডারের জন্যও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

মিথ্যা অজুহাত কারও ক্ষেত্রে নিয়মের দোহাই, আর কারও ক্ষেত্রে দায়মুক্তি—এই পক্ষপাতদুষ্ট অবস্থান থেকে বিশ্বকে আরেকটি যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়া আমরা সহ্য করতে পারি না।

ইরাকে ব্যবহার করা সেই পুরোনো চিত্রনাট্য বহু আগেই বাতিল হয়ে যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু সেটি যদি আবার ফিরিয়ে আনা হয়, তবে আমাদের সম্মিলিত প্রতিরোধও গড়ে তুলতে হবে।

এই দ্বিচারিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা কোনো চরমপন্থা নয়; বরং এটি উপেক্ষা করাটাই সাধারণ নিয়মে পরিণত করা ঠিক নয়।

* উমর সোলায়মান, ইয়াকিন ইনস্টিটিউট ফর ইসলামিক রিসার্চের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি

ইসরায়েলের হামলায় নিহত ব্যক্তিদের কফিন নিয়ে তেহরানে শোকমিছিল।
ইসরায়েলের হামলায় নিহত ব্যক্তিদের কফিন নিয়ে তেহরানে শোক মিছিল। ছবি: এএফপি

কেউই বলছে না শেষটা কেমন হবে?

একজন প্রেসিডেন্ট- ঘটনাপ্রবাহ, গণবিধ্বংসী অস্ত্র ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা এবং নিজের বক্তব্যের পেছনে দাঁড়ানোর চাপে, মধ্যপ্রাচ্যকে এমন এক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে, যার সমাপ্তি অস্পষ্ট। ওয়াশিংটনে প্রত্যাশা বাড়ছে যে ডনাল্ড ট্রাম্প শিগগিরই ইসরাইলের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিরুদ্ধে একটি সুনির্দিষ্ট হামলার চেষ্টা করবেন। এমন ভূগর্ভস্থ-ধ্বংসকারী অস্ত্র ব্যবহার করবেন যা কেবলমাত্র যুক্তরাষ্ট্রই ব্যবহার করতে পারে। ইসরাইলের প্রথম হামলায় শীর্ষ সামরিক নেতা ও পরমাণু বিজ্ঞানীদের হত্যা এবং ইরানের আত্মরক্ষামূলক ক্ষমতা ধ্বংসের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভাষা হঠাৎই আগ্রাসী হয়ে উঠেছে। সিএনএনের খবরে বলা হয়েছে, ট্রাম্প এখন ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলার জন্য মার্কিন সামরিক শক্তি ব্যবহারের বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন এবং পূর্ববর্তী কূটনৈতিক প্রচেষ্টা থেকে বিরক্ত হয়ে সরে এসেছেন।

ট্রাম্প কী আসলেই যুদ্ধ চান, নাকি এটা চাপ সৃষ্টি করার কৌশল: সম্ভবত তিনি ইরানকে আবার কূটনীতিতে ফিরিয়ে আনতে চান, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে যে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ তিনি চেয়েছেন, তার জন্য চাপ সৃষ্টি করছেন। কিন্তু এটা অবাস্তব স্বপ্ন বলেই মনে করছেন অনেকে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্পের পরিচালক আলী ভায়েজ বলেন, যতক্ষণ ট্রাম্প ইসরাইলের আগ্রাসনের সুবিধা নিতে চাচ্ছেন ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে, ততক্ষণ এটা কাজ করবে না। তারা একে দেখে একটি খাদের শেষ প্রান্তে নিয়ে যাওয়া- যেখানে সরকার পতন অনিবার্য। ইসরাইলের এই আগাম হামলার পেছনে যদি যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যাহত করার অভিপ্রায় থাকে, তাহলে ট্রাম্প কি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে থামাতে পারবেন, যিনি রাশিয়ার পুতিন বা চীনের শি জিনপিং-এর মতোই ট্রাম্পের কথায় গুরুত্ব দিচ্ছেন না? নিজের বিরুদ্ধ মতাদর্শে যুদ্ধের দিকে ট্রাম্পের পদক্ষেপ: ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে যে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির পক্ষে, যেখানে অন্য দেশের ঝামেলায় জড়ানো থেকে বিরত থাকা ছিল মূলমন্ত্র, সেখানে এখন তিনি নিজেই সেই ধরনের হস্তক্ষেপকারী নেতায় পরিণত হচ্ছেন, যাদের তিনি এক সময় ঘৃণা করতেন। তবে, ট্রাম্পের অবস্থানে একটি ফাঁক ছিল-  ইরান যেন কখনো পারমাণবিক অস্ত্র না পায়। এ বিষয়ে তিনি সবসময়ই কঠোর ছিলেন।

একটি নতুন যুদ্ধ, তবে পরিকল্পনার অভাব: ট্রাম্প বর্তমানে চিন্তা করছেন ফর্ডো পারমাণবিক কেন্দ্রে হামলার জন্য ৩০ হাজার পাউন্ড ওজনের ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স পেনিট্রেটর ব্যবহার করা হবে কিনা। এই কেন্দ্রটি পাহাড়ের নিচে কংক্রিটে ঘেরা। কিন্তু সবচেয়ে বড় যে বিষয়টির ঘাটতি রয়েছে, তা হলো- এই হামলার পর কী হবে তা নিয়ে কোনো স্পষ্ট সরকারি আলোচনার অনুপস্থিতি। ২১শ’ শতকের ইরাক ও আফগানিস্তানের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ঢুকে আবার বের হতে দুই দশক লেগে গেছে, সেখানে নতুন আরেকটি যুদ্ধের আগে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা না বলা অদ্ভুত। সিনেটর ক্রিস মারফি সিএনএন’কে বলেন, যারা যুদ্ধের পক্ষে স্লোগান দিচ্ছেন, তারা খুব দ্রুত ভুলে গেছেন ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের বিপর্যয়। এই যুদ্ধগুলো হাজার হাজার আমেরিকানকে প্রাণ হারাতে বাধ্য করেছে এবং নতুন জঙ্গিগোষ্ঠী তৈরি করেছে। পূর্বের যুদ্ধগুলো কী শিক্ষা দেয়: ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের মাধ্যমে সাদ্দাম হোসেনকে সরিয়ে দেয়া হলেও, রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়ে এবং এক ভয়ঙ্কর বিদ্রোহ সৃষ্টি হয়। এরপর যুক্তরাষ্ট্রকে পিছিয়ে আসতে হয়।

আফগানিস্তানে তালেবানকে সরিয়ে দিয়েও, ২০ বছরের ‘নেশন বিল্ডিং’ ব্যর্থ হয়ে ২০২১ সালে আমেরিকাকে অপমানজনকভাবে সরে আসতে হয়। ২০১১ সালে লিবিয়ার গাদ্দাফিকে সরিয়ে দিলেও দেশটিতে অরাজকতা ও দারিদ্র্য এখনো বিরাজ করছে। ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় তিনি জেব বুশকে প্রকাশ্যে আক্রমণ করেন ইরাক যুদ্ধের জন্য, বলেন- ইরাক যুদ্ধ ছিল একটি বড় ভুল। গত মাসেই তিনি সৌদি আরবে বলেন, যারা জাতি গঠন করতে গিয়েছিল, তারা আরও বেশি জাতি ধ্বংস করেছে। তবে ট্রাম্প নিজেই কি নিজের পুরনো কথার বিরোধিতা করছেন? ইরানের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া: লিবিয়া, ইরাক বা আফগানিস্তান নয় ইরান। হয়তো এবার সত্যিই একটি সীমিত হামলায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা সম্ভব। কিন্তু ইরানের ধর্মীয় সরকার নিশ্চয়ই প্রতিশোধ নেবে- হয়তো মার্কিন ঘাঁটি বা সেনাদের ওপর হামলার মাধ্যমে। এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধের পালে হাওয়া লাগবে এবং এর শেষ কোথায় তা কেউ জানে না। ইরান হয়তো হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট সৃষ্টি করবে, অথবা সৌদি আরবের তেলক্ষেত্র লক্ষ্য করে হামলা চালাবে।

এমন পরিস্থিতিতে নেতৃত্ব দেয়ার একমাত্র শক্তি হবে যুক্তরাষ্ট্র- অর্থাৎ আরও গভীরভাবে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের মধ্যে জড়িয়ে পড়া। ইরান হয়তো বড় ধরনের সাইবার হামলাও চালাতে পারে- যা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে যুদ্ধ নিয়ে আসবে। যদিও ইরানের বর্তমান শাসনের পতন অনেক আমেরিকানকে খুশি করতে পারে, তবে তার ফলাফল ভয়াবহ হতে পারে- ৯ কোটিরও বেশি মানুষের দেশে অরাজকতা ছড়িয়ে পড়তে পারে। জাতিগতভাবে বিভক্ত ইরান যদি একক নেতৃত্ব হারায়, তাহলে দেশটিতে গৃহযুদ্ধ, সামরিক দখল বা জঙ্গি নিয়ন্ত্রণ দেখা দিতে পারে। সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান এবং লিবিয়া এর জ্বলন্ত উদাহরণ। এ ছাড়া প্রশ্ন ওঠে: পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোতে বোমা বর্ষণের পর অবশিষ্ট পারমাণবিক পদার্থ সুরক্ষিত না থাকলে তা যদি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বা দুষ্ট রাষ্ট্রগুলোর হাতে পড়ে।

ইসরাইলের ভাবনা- এই যুদ্ধ যেকোনো মূল্যে প্রয়োজন:
ইসরাইলের জন্য এই যুদ্ধ হতে পারে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। নেতানিয়াহু মনে করেন, ইরান পারমাণবিক বোমা পেলে ইসরাইল ও ইহুদি জাতির বিলুপ্তি অনিবার্য। তবে ইতিহাস বলছে, যৌথভাবে চালানো যুদ্ধও দীর্ঘ ও জটিল হয়ে উঠতে পারে। গাজায় বহু মাসের হামলার পরেও হামাস নিশ্চিহ্ন হয়নি। ইরান তো আরও বড় চ্যালেঞ্জ। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আগের হস্তক্ষেপ- যেমন ১৯৫৩ সালের সিআইএ-সমর্থিত অভ্যুত্থান, শাহের প্রতি সমর্থন, কিংবা ইরান-ইরাক যুদ্ধে সাদ্দাম হোসেনকে সমর্থন-  সবই পরিস্থিতি আরও খারাপ করেছে।

ট্রাম্পের অবস্থান হঠাৎ কেন বদলালো: সম্ভবত ইসরাইলের প্রাথমিক সাফল্যই ট্রাম্পকে আগ্রহী করে তুলেছে। তিনি বলেছেন, আমরা এখন ইরানের আকাশের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। এমন একটি ‘নিম্ন ঝুঁকির’ পরিবেশ ট্রাম্পকে প্রলুব্ধ করতে পারে- বিশেষত তিনি জেনারেল প্যাটনের ভক্ত। তিনি হয়তো দ্রুত একটি ‘বিজয়’ দেখাতে চান- যেখানে তিনি দাবি করতে পারবেন, আমি ইরান সমস্যার সমাধান করেছি। ওবামা, বুশ বা বাইডেন নয়। ট্রাম্প যুদ্ধের জন্য আমেরিকাকে প্রস্তুত করেননি, বরং দেশের মধ্যে বিভাজনকেই উসকে দিয়েছেন। এমন একজন নেতা- যিনি কেবল নিজের সমর্থকদের কথা ভাবেন, যুদ্ধকালীন জাতীয় ঐক্য আনতে পারবেন কি? অবশেষে, সেই মানুষ- যিনি গর্ব করে বলেন, তিনি কখনো নতুন যুদ্ধ শুরু করেননি- এখন এমন সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, যেখানে আবারো ‘অস্ত্র ব্যবস্থার ভুল তথ্য’-এর ওপর ভিত্তি করে আমেরিকান সেনা পাঠানো হবে মধ্যপ্রাচ্যে। আর্লিংটন ন্যাশনাল কবরস্থানের ৬০ নম্বর সেকশনে যারা ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধে নিহত হয়েছেন, তাদের প্রতি অন্তত এইটুকু ঋণ রয়েছে: যদি ইরানে প্রথম মার্কিন বোমা পড়ে, তাহলে আমাদের জানা দরকার, এরপর কী হবে।

(সিএনএন থেকে অনূদিত)

mzamin

ট্রাম্পের প্রস্তাব নাকচ খামেনির

নিজের অবস্থানে অনড় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। কথা একটাই- ইরানকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করতে হবে। তবে তার এ কথা প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বলেছেন, চাপের মুখে আত্মসমর্পণ করবে না তার দেশ। ইরান-ইসরাইল সংঘাতের পর প্রথমবারের মতো বুধবার হোয়াইট হাউস প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন ট্রাম্প। সেখানে তিনি বলেন, আমি আগে যেটা বলেছি- তাদের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করতে হবে। অন্যথায় এ যুদ্ধ কতোদিন চলবে তা নিশ্চিত নন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তার এ কথায় ইরান-ইসরাইল সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ইঙ্গিত বহন করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ। কার্যত এমন উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের মধ্যদিয়ে দুই নেতা মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছেন। এর আগে ইরানকে লক্ষ্য করে নিজের ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া পোস্টেও নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের কথা জানিয়েছেন ট্রাম্প। 

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ব্যাপক সামরিক প্রস্তুতি দেখা যাচ্ছে। ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের দু’টি এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ প্রস্তুত করা হয়েছে। বৃটেন থেকে আনা হয়েছে যুদ্ধবিমান। ইসরাইলও প্রস্তুত। যেকোনো মুহূর্তে ইরানের ফরদো পারমাণবিক স্থাপনা সহ বিভিন্ন এলাকাকে বোমা মেরে উড়িয়ে দিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। যদিও এতদিন পরে রাশিয়া ও চীন সোচ্চার হয়েছে। মুখ খুলেছে মুসলিমদের যেকোনো বিপদে পাশে দাঁড়ানো তুরস্কও। দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান বলেছেন, ইরান আত্মরক্ষা করছে। তার ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। এ কথা সবাই বলছেন। ইসরাইলকে সামরিক সহায়তা দেয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্কতা দিয়েছে রাশিয়া। অন্যদিকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সাফ জানিয়ে দিয়েছেন একটি দেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও অখণ্ডতা লঙ্ঘনের বিরোধী তিনি। ওদিকে দৃশ্যত এই যুদ্ধে যোগ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।

বিশ্লেষকরা বলছেন, কোনো যুদ্ধে যুক্ত হতে হলে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে অনুমোদন নিতে হয় কংগ্রেসের। সেই অনুমোদন না নিয়েই তিনি যুদ্ধে যুক্ত হবেন কিনা তা নিয়ে বিতর্ক, সমালোচনা চলছে। তবে এর আগে অনুমোদন না নিয়েই মার্কিন সাবেক প্রশাসন বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ করেছে। বলা হচ্ছে,  প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্ষমতাবলে যুক্তরাষ্ট্রের কমান্ডার ইন চিফ। তিনিও তা পারেন। ভয়াবহ যুদ্ধ উত্তেজনায় কাঁপছে মধ্যপ্রাচ্য। সম্ভবত এই যুদ্ধ থেকে যুক্তরাষ্ট্র বিরত থাকছে না। ভয়াবহ এই সংঘাত হয়তোবা পারমাণবিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। এমনটা টের পেয়ে ইরান তার প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে তারা যেন যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের মাটি ব্যবহার করতে না দেয়।

বিশেষ করে পারমাণবিক যুদ্ধের আতঙ্ক বিরাজ করছে এই কারণে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের নজর পড়েছে ইরানের ফরদো পারমাণবিক স্থাপনায়। এটি কোম নগরে অবস্থিত। একটি পাহাড়ের নিচে ভূপৃষ্ঠ থেকে ৮০ মিটার গভীরে এর অবস্থান। খবরে বলা হচ্ছে, এই স্থাপনা ধ্বংস করতে হলে কমপক্ষে ১৩,৬০০ কেজি ওজনের বোমা প্রয়োজন হবে। এই বোমা বহন করে সেখানে ফেলার মতো যুদ্ধবিমান নেই ইসরাইলের হাতে। তা আছে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। নাম বি-২ স্টিলথ যুদ্ধবিমান। এই বিমান ব্যবহার করে যদি ইরানে জিততে পারেন তাহলে আরও শক্তির অধিকারী হয়ে উঠবেন ট্রাম্প। হয়তো তিনি এখন সেই যশ বা খ্যাতির লোভে পড়েছেন। ১৩,৬০০ কেজি ওজনের একটি বোমা বিস্ফোরিত হলো কি ইরান টিকে থাকবে! আগাম বলা যায় না পরিস্থিতি কোনদিকে মোড় নেয়। যেকোনো সময় পাল্টে যেতে পারে দৃশ্যপট।

ইরান-ইসরাইল সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি এখন পুরোপুরি স্পষ্ট। ইতিমধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মধ্যে বাকযুদ্ধ শুরু হয়েছে। তবে ট্রাম্প যেভাবে কথা বলছেন তা গোটা মধ্যপ্রাচ্যের জন্যই আতঙ্কের। ইরানের জন্য তো বটেই। ট্রাম্প সোমবার তার ট্রুথ সোশ্যালে খামেনিকে লক্ষ্য করে একাধিক পোস্ট দিয়েছেন। তার দাবি, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি কোথায় আছেন সেটা তিনি জানেন। এক পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘আমরা ঠিক জানি তথাকথিত ‘সর্বোচ্চ নেতা’ কোথায় লুকিয়ে আছেন। তিনি সহজ লক্ষ্যবস্তু, কিন্তু আপাতত আমরা তাকে হত্যা করবো না।’ খামেনিকে উদ্দেশ্য করে তিনি আরও লেখেন, ‘আমরা চাই না সাধারণ মানুষের ওপর কিংবা মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হোক। আমাদের ধৈর্য ফুরিয়ে আসছে।’ ট্রাম্প এর আগে আরও দুটি পোস্টে বলেন, আমাদের এখন ইরানের আকাশে সম্পূর্ণ ও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। তিনি দাবি করেন, ইরানের কাছে উন্নত স্কাই ট্র্যাকিং সিস্টেম ও প্রচুর প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রয়েছে। কিন্তু আমেরিকান প্রযুক্তির কাছে তা কিছুই না। সর্বশেষ পোস্টে তিনি স্পষ্ট ভাষায় ইংরেজিতে লিখেছেন-আনকন্ডিশনাল সারেন্ডার। অর্থাৎ শর্তহীন আত্মসমর্পণ (করতে হবে ইরানকে)। ইরানকে তিনি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়েছেন এর মধ্যদিয়ে। এদিকে ট্রাম্পের হুমকির কড়া জবাব দিয়েছেন খামেনি। সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, কোনো অবস্থায়ই আত্মসমর্পণ করবে না ইরান। ইরানের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া হয়েছে উল্লেখ করে খামেনি বলেন,  জোর করে চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেবে ইরান। দেশটি দৃঢ় থাকবে জোর করে চাপিয়ে দেয়া শান্তির বিরুদ্ধেও। তিনি আরও বলেন, ইরান কারও কাছে আত্মসমর্পণ করবে না। বুধবার টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক ভাষণে এসব বলেছেন খামেনি। ট্রাম্পের বক্তব্যের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। বলেছেন, যারা ইরান ও এর ইতিহাস জানে তারা জানে, ইরানিরা হুমকির ভাষার প্রতি ভালো সাড়া দেয় না। আর আমেরিকানদের জানা উচিত, যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো সামরিক হস্তক্ষেপ নিঃসন্দেহে অপ্রতিরোধ্য পরিণতি বয়ে আনবে।

এদিকে ইরান-ইসরাইল সংঘাতের ৬ষ্ঠ দিনে নড়াচড়া দিয়েছে রাশিয়া। ইসরাইলকে সামরিক সহায়তা দেয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে হুঁশিয়ার করেছে দেশটি। বুধবার রাশিয়ার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই রিয়াবকভ সতর্ক করে বলেছেন, ইসরাইলকে সরাসরি মার্কিন সহায়তা দেয়া মধ্যপ্রাচ্যকে পুরোপুরি অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। এ ছাড়া এ ধরনের ‘অনুমানমূলক বিকল্প’ বিবেচনা করার বিরুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছেন তিনি। রিয়াবকভ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এমন পদক্ষেপ পুরো পরিস্থিতিকে আরও ব্যাপকভাবে অস্থিতিশীল করে তুলবে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সূত্র জানায়, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে ইসরাইলের সঙ্গে হামলায় অংশ নেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। এসব খবর সামনে আসার পর যুক্তরাষ্ট্রকে লক্ষ্য করে এসব সতর্কবার্তা দিলো মস্কো। রুশ প্রেসিডেন্ট সমঝোতা চাচ্ছেন। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরাতে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকট নিয়ে ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছেন পুতিন। ফোনালাপে পুতিন জানিয়েছেন, এই সংকটে মধ্যস্থতা করতে প্রস্তুত রাশিয়া। এক্ষেত্রে অন্যান্য আঞ্চলিক মিত্রদেরও এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। 

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ৩০ বছর ধরে একই কথা বলে আসছেন নেতানিয়াহু

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তিন দশকের বেশি সময় ধরে বারবার একটি কথা বলে আসছেন, ইরান শিগগিরই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে ফেলবে।

নেতানিয়াহু কখনো বলেছেন কয়েক বছর, কখনো বলেছেন কয়েক মাসের মধ্যে ইরান পরমাণু বোমা তৈরির সক্ষমতা অর্জন করে ফেলবে। কিন্তু কখনোই তাঁর সেই কথার সত্যতা পাওয়া যায়নি।

ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের সদস্য হিসেবে ১৯৯২ সালে নেতানিয়াহু এক অধিবেশনে বক্তব্য দেন। ওই অধিবেশন থেকেই তিনি দাবি করে আসছেন, তেহরান মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই পারমাণবিক বোমা বানাতে সক্ষম হবে।

ওই বছর নেসেটের অধিবেশনে নেতানিয়াহু বলেন, আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে ইরান নিজেরাই পারমাণবিক বোমা তৈরি করতে পারবে।

নেতানিয়াহু ১৯৯৫ সালে তাঁর লেখা বই ‘ফাইটিং টেরোরিজম’ বইয়েও উল্লেখ করেছিলেন।

নেতানিয়াহুর এই ‘আসন্ন হুমকির বোধ’ মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তৈরিতে বেশ প্রভাব ফেলেছে। ২০০২ সালে তিনি মার্কিন একটি কংগ্রেশনাল কমিটির সামনে বক্তব্য দেন। তখনও তিনি দাবি করেন, ইরাক ও ইরান—দুই দেশই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। তখন তিনি ইরাকে হামলা চালাতেও যুক্তরাষ্ট্রকে পরামর্শ দেন।

এর কিছুদিন পরই গণবিধ্বংসী অস্ত্রের মজুত রয়েছে—এমন অভিযোগ এনে যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে হামলা চালায়। কিন্তু পরে সেখানে কোনো গণবিধ্বংসী অস্ত্র পাওয়া যায়নি।

২০০৯ সালে উইকিলিকসের ফাঁস করা মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক গোপন তারবার্তায় দেখা যায়, নেতানিয়াহু কংগ্রেস সদস্যদের বলেন, ইরান এক-দুই বছরের মধ্যেই পারমাণবিক ক্ষমতা অর্জন করে ফেলবে।

এর তিন বছর পর ২০১২ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে নেতানিয়াহু একটি কার্টুন বোমার ছবি দেখিয়ে বলেন, পরের বসন্তে, সর্বোচ্চ আগামী গ্রীষ্মেই ইরান মাঝারি মাত্রার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শেষ করে পরমাণু বোমা তৈরির চূড়ান্ত ধাপে চলে যাবে।

ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে উগ্রবাদী ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর সেই প্রথম সতর্কবার্তা দেওয়ার পর ৩০ বছরের বেশি সময় পার হয়ে গেছে। কিন্তু ইরান পরমাণু বোমা তৈরি করেনি।

গত শুক্রবার ভোররাতে ইসরায়েল ইরানে সরাসরি হামলা চালিয়েছে। আর নেতানিয়াহু এখনো বলছেন, যদি ইরানকে থামানো না যায়, তারা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পারমাণবিক অস্ত্র বানিয়ে ফেলতে পারে। এমনকি ‘কয়েক মাস বা কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এই সক্ষমতা অর্জন করতে পারে’।

তবে এসব দাবির বিপরীতে এই বছরের গোড়ার দিকে মার্কিন জাতীয় গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক বলেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে না।

তবুও নেতানিয়াহু ৩০ বছর আগে যেমন বলেছিলেন, এখনো তাঁর বার্তা তেমনই থাকছে। এ যেন গোয়েন্দা তথ্য বা কূটনৈতিক ঘটনাবলির বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা এক দীর্ঘস্থায়ী সতর্কবার্তা।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে পরমাণু বোমার কার্টুন দেখাচ্ছেন নেতানিয়াহু। সেখানে তিনি দাবি করেন, ইরান পরমাণু বোমা তৈরির দ্বারপ্রান্ত। ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১২, নিউইয়র্ক
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে পরমাণু বোমার কার্টুন দেখাচ্ছেন নেতানিয়াহু। সেখানে তিনি দাবি করেন, ইরান পরমাণু বোমা তৈরির দ্বারপ্রান্ত। ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১২, নিউইয়র্ক। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

রাখাইন রাজ্যের দখল নিতে লড়াইয়ে যোগ দিচ্ছে রোহিঙ্গা জঙ্গিরা, শরণার্থীদের জীবন ঝুঁকিতে

মিয়ানমার জুড়ে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো গত ১৮ মাসে যেভাবে অগ্রসর হয়েছে, তাতে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশটির রাখাইন রাজ্যের অনেক ভূমিই সামরিক সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।  রাখাইন রাজ্যটি বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী পশ্চিম উপকূল বরাবর অবস্থিত। ৪৫,০০০ সদস্যের শক্তিশালী আরাকান সেনাবাহিনী (এএ) উত্তর রাখাইনের বেশির ভাগ অংশের নিয়ন্ত্রণ দখল করেছে।  পুরো রাজ্যটি দখলের জন্য তারা প্রস্তুতি নিচ্ছে।  যদিও জান্তা প্রতিক্রিয়ায় অধিকৃত শহরগুলোতে পাল্টা  বিমান হামলা চালিয়েছে এবং এএ-এর বিরুদ্ধে তার সাবেক শত্রুকে একত্রিত করার চেষ্টা করছে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (আইসিজি)-এর একটি নতুন প্রতিবেদন অনুসারে, গত বছর থেকে রোহিঙ্গা জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো  প্রায়শই জান্তা সেনা বা মিত্র মিলিশিয়াদের সঙ্গে এএ-এর বিরুদ্ধে লড়াই করছে। মিয়ানমারে মুসলিম প্রধান জাতিগত গোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়নের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।  ২০১৬ সালে সামরিক বাহিনী তাদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন চালায়, যাকে গণহত্যা অভিযান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। অভিযানে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয় এবং অবশিষ্ট জনসংখ্যার বেশির ভাগই প্রতিবেশী বাংলাদেশে চলে যায়।  তখন থেকেই তারা সেখানে বিস্তৃত এবং ক্রমবর্ধমানভাবে  বিশৃঙ্খল শরণার্থী শিবিরে বসবাস করে আসছে। বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন এবং প্রতিরোধ বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত মিয়ানমারের সমান্তরাল জাতীয় ঐক্য সরকার- রোহিঙ্গাদের প্রতি পূর্ববর্তী প্রশাসনের আচরণের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং ভবিষ্যতের ফেডারেল গণতন্ত্রে তাদের অন্তর্ভুক্তির আহ্বান জানিয়েছে। আরাকান সেনাবাহিনী, যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ রাখাইন জাতিগত গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে, তাদের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা বেসামরিক নাগরিকদের গণহত্যা এবং অঞ্চল থেকে তাদের তাড়িয়ে দেয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। মেলবোর্নে অবস্থিত মিয়ানমার ও বাংলাদেশের আইসিজির সিনিয়র কনসালট্যান্ট থমাস কিন বলেন, “গত ছয় মাস ধরে, রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো  দক্ষিণ বাংলাদেশের শিবিরগুলোতে তাদের যুদ্ধ থামিয়ে দিয়েছে এবং শরণার্থীদের যুদ্ধে নিয়োগ বাড়িয়েছে। তাদের বলেছে যে, আরাকান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করলে তবেই তারা দেশে ফিরতে পারবে। এই ধরনের বিদ্রোহ সফল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম, তবে সীমান্তের উভয় পাশেই এটি ব্যাপক ক্ষতি করতে পারে এবং বাংলাদেশে থাকা দশ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীর প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।” এর মূলে রয়েছে একটি ইসলামপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠী-আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (অজঝঅ)। ২০১৬ সালে মিয়ানমারের সামরিক পোস্টে এই ইসলামপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠীর আক্রমণকে পরবর্তী গণহত্যার ন্যায্যতা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। তখন থেকেই নির্বাসনে থেকে  ব্যাপকভাবে সক্রিয় আরসা, কক্সবাজারে প্রভাবশালী শক্তিতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ সীমান্তে অবস্থিত একটি বিস্তৃত শিবির নিজেদের প্রভাব খাটাতে শুরু করেছে, যেখানে বেশির ভাগ রোহিঙ্গা শরণার্থী বাস করে। বছরের পর বছর ধরে, আরসা ক্যাম্পগুলো  নিয়ন্ত্রণে নেয়ার  জন্য বাংলাদেশি নিরাপত্তা বাহিনী এবং অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে লড়াই করেছে এবং তাদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ানো বেসামরিক নেতাদের হত্যার অভিযোগ রয়েছে। এএ এবং এআরএসএ উভয়ের প্রতিনিধিরা এ বিষয়ে মন্তব্য করতে চায়নি। অতীতে, উভয় দলই বহুজাতিক রাখাইনের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছে। সামপ্রতিক বছরগুলোতে  বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি ক্রমশ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প তার দেশের বৈদেশিক সাহায্য ব্যয়ের বেশির ভাগ অংশ কমানোর জেরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। কারণ তার আগে থেকেই  আন্তর্জাতিক তহবিল  পর্যাপ্ত ছিল না। সাহায্যকারী  গোষ্ঠীগুলোর  একাধিক প্রতিবেদন অনুসারে, কক্সবাজারে ক্রমবর্ধমান হতাশার কারণে আরসা’র মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোতে  নিয়োগ সহজ হয়ে উঠেছে। স্থানীয় গণমাধ্যম এবং এআরএসএ প্রতিনিধিদের অনলাইন বিবৃতি অনুসারে, গত বছর থেকে, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিরোধিতা সত্ত্বেও, এআরএসএ বাহিনী একাধিক অভিযানে জান্তার সঙ্গে এএ-এর বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। আইসিজি রিপোর্টে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে যে,  রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং আরাকান আর্মির মধ্যে সংঘর্ষ, সেইসঙ্গে  সরকার-নিয়ন্ত্রিত মিলিশিয়াদের মধ্যে রোহিঙ্গাদের উপস্থিতি সামপ্রদায়িক সম্পর্কের উপর ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় উস্কানিমূলক বক্তব্য বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা ২০১৬-২০১৮ সালের ক্র্যাকডাউনের সময়কার  পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনীয়। সেই সময়ে  ফেসবুক এবং অন্যান্য প্ল্যাটফরমে গণহত্যা সংক্রান্ত উস্কানিমূলক বার্তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। আইসিজি’র মতে, গত এক বছরে সংঘাতের ফলে প্রায় ২০০,০০০ রোহিঙ্গা রাখাইন থেকে পালিয়ে এসেছে। প্রায় ৪০০,০০০ এখনো এএ নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে বাস করে, এবং এই গোষ্ঠীটি এই অঞ্চলে প্রভাবশালী শক্তি হয়ে উঠেছে। তাই  যেকোনো আলোচনার ক্ষেত্রে শরণার্থীদের ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে, যা বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই চায়। যদিও জাতিসংঘ এবং অন্যান্য সংস্থাগুলো  মিয়ানমারের পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থিতিশীল বলে সতর্ক করে দিয়েছে। থমাস কিন মনে করেন যে,  রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মধ্যে সশস্ত্র সংগ্রামের প্রতি ঝোঁক কমাতে, আরএকে বাংলাদেশ এবং রোহিঙ্গা উভয়ের কাছেই প্রমাণ করতে হবে যে, তারা সকল সমপ্রদায়ের স্বার্থে রাখাইন রাজ্য পরিচালনা করতে চায়। আইসিজি রিপোর্টে  সতর্ক করা হয়েছে যে,  রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং আরাকান সেনাবাহিনীর মধ্যে আরও সংঘাত রোহিঙ্গা জনগণ, বাংলাদেশ বা আরাকান সেনাবাহিনী কারোর জন্য মঙ্গলজনক হবে না। আরাকান আর্মির সামরিক শক্তির কারণে, রোহিঙ্গাদের রাখাইন রাজ্যে ফিরে যাবার  সশস্ত্র সংগ্রাম সফল হবে না। এর  পরিণতিও ভয়াবহ  হতে পারে।  কারণ এখন আরাকান আর্মি রোহিঙ্গাদের অবস্থানকারী বেশির ভাগ এলাকা এবং শরণার্থীরা যে সমস্ত এলাকায় ফিরে যাবে সেসবই  নিয়ন্ত্রণ করে।

সূত্র: দা গ্লোব অ্যান্ড মেইল

গোপন বন্দিশালায় ২ বছর, কীভাবে ফিরলেন সুব্রত বাইন: গুম কমিশনের প্রতিবেদনে গোপন বন্দিবিনিময়ের চিত্র

ছাত্র-জনতার গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরপর ঢাকার অপরাধজগতে হঠাৎ সক্রিয় হন শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন। দীর্ঘদিন ভারতে পলাতক এই অপরাধী কীভাবে দেশে ঢুকলেন, তা নিয়ে ছিল নানা জল্পনা। তবে সম্প্রতি জমা দেওয়া গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের দ্বিতীয় অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দাগি এই সন্ত্রাসী দুই বছরের বেশি সময় বাংলাদেশেই ছিলেন। এখানকার আইন প্রয়োগকারী সংস্থা পরিচালিত গোপন বন্দিশালায় ছিলেন। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্যদের সঙ্গে সুব্রত বাইনকেও ছেড়ে দেওয়া হয়।

গুম কমিশনের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে ২০২২ সালের এপ্রিলে এই কুখ্যাত সন্ত্রাসীকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ গোপনে র‍্যাবের গোয়েন্দা শাখার হাতে তুলে দেয়। বিনিময়ে র‍্যাব আরেকজন বন্দীকে ভারতের কাছে গোপনে হস্তান্তর করে। দুই দেশের নিরাপত্তা সংস্থার এ লেনদেন গোপনে ও বেআইনিভাবে সম্পন্ন হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, এর পর থেকে সুব্রত বাইন র‍্যাবের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন সেলে (টিএফআই) বন্দী ছিলেন। উত্তরায় র‍্যাব-১–এর সদর দপ্তরের অভ্যন্তরে থাকা টিএফআই সেল হচ্ছে শেখ হাসিনা সরকারের সময় যে কয়টি গোপন বন্দিশালা ছিল, তার একটি। এসব গোপন বন্দিশালায় বিভিন্ন ব্যক্তিকে দীর্ঘদিন আটক রাখা হতো। যাঁদের অনেককে পরবর্তী সময়ে খুন করা হয়েছে। অনেকের কোনো সন্ধান এখনো পাওয়া যায়নি।

গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন ৪ জুন ‘আনফোল্ডিং দ্য ট্রুথ: আ স্ট্রাকচারাল ডায়াগনসিস অব এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স ইন বাংলাদেশ’ শিরোনামের ওই প্রতিবেদন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দেয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গণ–অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গত বছরের ৫ থেকে ৭ আগস্টের মধ্যে ডিজিএফআই পরিচালিত জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল (জেআইসি) থেকে তিনজন এবং র‍্যাব পরিচালিত টিএফআই সেল থেকে অন্তত পাঁচজন মুক্তি পেয়েছিলেন।

সুব্রত বাইনের বিষয়ে গুম–সংক্রান্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইন্টারপোলের রেড নোটিশপ্রাপ্ত এক ব্যক্তিকে গোপনে ভারত থেকে এনে আটকে রাখার সিদ্ধান্ত কেবল র‍্যাবের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত হতে পারে না। এমন সিদ্ধান্ত তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অথবা তখনকার সরকারের আরও উচ্চপর্যায় থেকে আসতে পারে। সুব্রত বাইনকে ২০২২ সালের এপ্রিল মাসের শেষ দিকে গোপনে ভারতের কলকাতা থেকে দেশে আনা হয়। তার পর থেকে তাঁকে পুরোপুরি আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হয়। ফলে তাঁর মুক্তি আইনগতভাবে নিয়ন্ত্রিত ছিল না বা চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ ছিল না। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ৬ অথবা ৭ আগস্ট র‍্যাব তাঁকে ছেড়ে দেয়।

কমিশন মনে করে, র‍্যাবের মতো আইন প্রয়োগকারী সংস্থার এমন বেআইনি, গোপন এবং অনানুষ্ঠানিক কৌশল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাব্যবস্থা মজবুত না করে উল্টো দুর্বল করেছে। এ ধরনের গোপন বন্দিবিনিময়ের অর্থ হচ্ছে, ভারতের ওই গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে র‍্যাবের গোয়েন্দা শাখার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।

তবে সুব্রত বাইনের বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে যাঁকে গোপনে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে, তাঁর পরিচয় গুম–সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন প্রকাশ করেনি। কমিশন সুব্রত বাইনের বিনিময়ে ভারতে হস্তান্তরিত হওয়া সেই বাংলাদেশি নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছে। তাঁর ব্যাপারে কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘আমরা জানতে পেরেছি, তিনি ভারতে পৌঁছানোর পর তাঁর নামে একটি মামলা হয় এবং তিনি সেখানকার কারাগারে দণ্ড ভোগ করে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। তিনি ভারতে তাঁর বিরুদ্ধে হওয়া মামলার নথিগুলো দিয়েছেন, যেগুলোর মাধ্যমে তিনি যে ভারতে ছিলেন, তা নিশ্চিত হওয়া যায়।’ সুব্রত বাইনের দাবি, ২০২২ সালের ২৭ রমজান তাঁকে বাংলাদেশে আনা হয়। ভারতীয় মামলা-সংক্রান্ত নথির সঙ্গে এ তারিখ মিলে যাওয়ায় তাঁর দাবিকে সত্য বলে ধরে নিয়েছে কমিশন।

বন্দী থাকাকালে র‍্যাব কেন সুব্রত বাইনকে হত্যা করেনি, সেটিও বোঝার চেষ্টা করেছে কমিশন। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘র‍্যাব গোয়েন্দারা কেন সুব্রত বাইনকে এত দিন ধরে সম্পূর্ণ গোপনে, বাইরের জগতের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ ছাড়াই বন্দী রেখেছিল, তা স্পষ্ট না। এর চেয়ে অনেক কম অপরাধের জন্য বন্দীদের হত্যা করেছে তারা। তাঁকে হত্যা করারও পরিকল্পনা ছিল বলে জানতে পেরেছি আমরা। তবে সে পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। আমাদের ধারণা, একবার টিএফআই সেলে আটক হওয়ার পর সুব্রত বাইন আর তাদের অগ্রাধিকার তালিকায় ছিলেন না।’

সুব্রত বাইনকে গত ২৭ মে আরও এক শীর্ষস্থানীয় সন্ত্রাসীসহ কুষ্টিয়া থেকে গ্রেপ্তার করে সেনাবাহিনী। পরদিন তাঁকে ঢাকার আদালতে হাজির করা হয়। আদালতে নেওয়ার পর তাঁর আইনজীবী সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন, সুব্রত বাইন ‘আয়নাঘরে’ (গোপন বন্দিশালা) ছিলেন। গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তাঁকে নারায়ণগঞ্জের ভুলতায় ফেলে যাওয়া হয়।

ওই দিন সুব্রত বাইনও আদালত চত্বরে সাংবাদিকদের দেখে বলতে থাকেন, ভারতে থাকা অবস্থায় তিনি তিনবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। ২০২২ সালে তাঁকে ভারত থেকে বাংলাদেশে পাঠানোর পর ‘আয়নাঘরে’ ছিলেন।

বেআইনিভাবে সুব্রত বাইনকে গোপন বন্দিশালায় আটক রাখার যে তথ্য বের হয়েছে, এ বিষয়ে র‍্যাবের বর্তমান কর্মকর্তারা কিছু বলতে রাজি নন। সুব্রত বাইনকে যখন দেশে আনা হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে, তখন র‍্যাবের মহাপরিচালক ছিলেন চৌধুরী আবদুল্লাহ আল–মামুন (৫ আগস্ট সরকার পতনের সময় তিনি পুলিশের মহাপরিদর্শক ছিলেন)। তিনি এখন কারাগারে আছেন। তাঁর পর র‍্যাবের মহাপরিচালক হন এম খুরশীদ হোসেন। তিনি ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ৪ জুন পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর সময়েও সুব্রত বাইনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরবর্তী সময়ে র‍্যাবের মহাপরিচালক হন মো. হারুন অর রশিদ। সুব্রত বাইনকে যখন ছেড়ে দেওয়া হয় বলা হচ্ছে, তখনো তিনি দায়িত্বে ছিলেন।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে র‍্যাবের সাবেক দুই মহাপরিচালক এম খুরশীদ হোসেন ও হারুন অর রশিদের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। দুজনের ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। তবে তাঁদের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরটি সক্রিয় আছে। দুজনের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে ফোন করে এবং বার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

খুনোখুনিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে নব্বইয়ের দশকে ব্যাপক আলোচনায় আসেন সুব্রত বাইন। ২০০১ সালের ২৫ ডিসেম্বর যে ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত সরকার ঘোষণা করেছিল, তাঁদের অন্যতম ছিলেন সুব্রত বাইন। তাঁর নামে এখনো ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারি রয়েছে। তাঁকে ধরিয়ে দিতে তখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। এরপর সুব্রত বাইন ভারতে পালিয়ে যান।

বিবিসি বাংলা এবং কালকাতা ও ঢাকাভিত্তিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, সুব্রত বাইনকে কলকাতা পুলিশ ২০০৮ সালের ১১ অক্টোবর গ্রেপ্তার করে। পরে তিনি জামিনে মুক্ত হয়ে সে দেশে গা ঢাকা দেন। ২০০৯ সালের ২২ সেপ্টেম্বর কলকাতা পুলিশের স্পেশাল টাস্কফোর্সের (এসটিএফ) কর্মকর্তাদের পিছু ধাওয়ায় নেপাল সীমান্তের কাকরভিটা শহরে পালিয়ে যান এবং নেপালি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। তাঁকে পূর্ব নেপালের ভাদ্রপুর জেলে এবং পরে ঝুমকা কারাগারে পাঠানো হয়। ২০১২ সালের ৮ নভেম্বর ওই কারাগার থেকে ৭৭ ফুট লম্বা সুড়ঙ্গ কেটে অন্য আরও ১০ জনের সঙ্গে সুব্রত বাইনও পালিয়ে যান। নেপালের কারাগার থেকে পালিয়ে কলকাতায় ফিরে যান তিনি। ২০১২ সালের ২৭ নভেম্বর কলকাতা থেকে তাঁকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়। ভারতে তাঁর বিরুদ্ধে অনুপ্রবেশ ও অস্ত্র রাখার অভিযোগে মামলা হয়।

তবে সেসব মামলা থেকে কবে কীভাবে সুব্রত বাইন মুক্তি পেলেন, তারপর গোপনে বাংলাদেশে হস্তান্তরের আগপর্যন্ত ভারতের কোথায়, কোন সংস্থার হেফাজতে ছিলেন, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য এখনো বের হয়নি।

গুম–সংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, একজন চিহ্নিত অপরাধীকে বেআইনি প্রক্রিয়ায় দেশে আনা এবং তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা না নেওয়ায় শেষ পর্যন্ত সুব্রত বাইনকে আটকে রাখা যায়নি। র‍্যাবের এমন ব্যর্থতা সুব্রত বাইনকে নতুন করে অপরাধের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার সুযোগ দিয়েছে।

সুব্রত বাইনকে গোপনে, বেআইনি প্রক্রিয়া এবং অনানুষ্ঠানিক সমঝোতার মাধ্যমে নিয়ে আসার কারণে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাব্যবস্থাকে শক্তিশালী না করে দুর্বল করেছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতীয় নিরাপত্তার নামে গুমকে এভাবে সমর্থন করা হলে বাস্তবে জননিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। এ ধরনের কার্যক্রম প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য ক্ষতিকর।

সুব্রত বাইন
সুব্রত বাইন। ছবি: আইএসপিআর

প্রতারক থেকে সাবধান by শুভ্র দেব

সন্ধ্যা পৌনে ৬টা। ০১৩৩৭৫৪১৪০৩ মোবাইল নম্বর থেকে কল আসে দেশের একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার সম্পাদকের কাছে। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে এক ব্যক্তি ফোন দিয়েই বলেন ‘কেমন আছেন’। অপরিচিত মোবাইল নম্বর আবার কণ্ঠও অপরিচিত। তাই সম্পাদক তাকে বললেন, ‘আপনি কে? আপনার পরিচয় কী? কেন ফোন দিয়েছেন?’ ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে বলা হয় ‘আমি পুলিশ অফিসার ফারুক হোসেন বলছি, আপনার ছেলের সঙ্গে একটা ঝামেলা হয়েছে তাই কথা বলা’ তখন সম্পাদক কিছুটা বিব্রতবোধ করে বলেন, ‘আমার ছেলে কোথায় থাকে জানেন? তার সঙ্গে আপনার ঝামেলা হবে কেন? প্রতারণা করার জন্য ফোন দিয়েছেন? ব্ল্যাকমেইল করার আর জায়গা পাচ্ছেন না? এসব কথা শুনে ফোনের অপরপ্রান্তের ব্যক্তি কল কেটে দেন।

শুধু ওই সম্পাদক নন। অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন দিয়ে এভাবে প্রতারণা করার জন্য রাজধানীসহ সারা দেশে বেশ কিছু চক্র গড়ে উঠেছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ রাহি। থাকেন রাজশাহীতে। তার বাবা থাকেন কুড়িগ্রামে। গত রমজানের ইফতারের ঠিক আগ মুহূর্ত। হঠাৎ একটা ফোনকল আসে রাহির বাবার কাছে। রাহির বড় ভাই আহসান হাবিব রাভি বলেন, আব্বু চিৎকার করে উঠলো- তোমার কাছে মাদক মানে! আব্বুর কাছে গেলাম। আব্বু ফোনে কথা বলছে। ফোন লাউড স্পিকারে দিলাম। অপরপ্রান্ত থেকে জানানো হচ্ছে, রাহিকে ছাড়াতে হলে ২২ হাজার টাকা চার্জ দিতে হবে এখনই। রাভি বলেন, আমি ফোনটা নিলাম। অপরপ্রান্তে পুলিশের গাড়ির সাইরেন, ওয়াকিটকির শব্দ আর ব্যস্ত পুলিশ স্টেশনের আবহ। রাহি কাঁদছে। একদম রাহির কণ্ঠ। মনে হলো- অনেক মার খেয়েছে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছে- পুলিশ ধরেছে। মাদক পেয়েছে। আমাকে ছাড়াও। শব্দ শুনে মনে হলো, ফোনটা কেড়ে নিলো। এখন কয়েকজনের কথা শোনা যাচ্ছে। ওয়াকিটকির শব্দ আসছে। একজন বলছে, কোন ধারায় মামলা দেবো? আলোচনা চলছে। মাদকের কঠিন মামলা হবে। হঠাৎ একজন ফোনটা নিলেন। ভরাট গলা। বললো- আমি এসআই শফিক। রাহিকে ধরেছি। ওর সঙ্গের দু’জনের শরীর থেকে ৩০০ পিস ইয়াবা পাওয়া গেছে। ওর কাছে পাওয়া যায়নি। মামলা হবে। রাহি হবে ৩ নম্বর আসামি। আমি বললাম, কোন থানায় আছে এখন? এবারও ওপাশ থেকে সাড়া নেই। তারা আলোচনা করছেন। ৭২ ধারায় মামলা দেন। এসপি স্যারের রুমে যান। স্যারকে জানান। আবার ওয়াকিটকির শব্দ। খানিক বাদে আর একজন ফোন নিলেন। সে জানালো রাহি এখন রাজশাহী ডিবিতে আছে। মামলা হচ্ছে। কোর্টে তোলা হবে।

রাহির বড় ভাই বলেন, আমার গলা শুকিয়ে গেছে। ফোনটা কেটে গেল। আমরা নির্বাক। আব্বু চিন্তাগ্রস্ত। আমার স্ত্রী জানতে চাইলে বলি, রাহির কাছে মাদক পাওয়া যায়নি তবে ছাড়াতে হলে টাকা দিতে হবে। বিকাশ বা নগদ নম্বরে টাকা পাঠাতে হবে। আমার স্ত্রী বলে, পুলিশকে চার্জ দিতে হবে মানে? চার্জ নাকি ঘুষ চায়। ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। আমরা চেনা পরিচিতদের ফোন করা শুরু করি। এরপর কোনো উপায়ান্তর পাই না। আমার স্ত্রী বললো, রাহিকে ফোন দাও। আমি আর আব্বু বললাম, রাহির সঙ্গের দুজনেরই কথা হয়েছে এসআই এর ফোন থেকে। তবুও আরেকবার ফোন দিলাম। রাহির একটা নম্বর ব্যস্ত পাওয়া গেল। এবার আব্বুর ফোনে রাহির ফোন এসেছে। আমরা সবাই আরও তটস্থ হলাম। কিছু হলো নাকি। আব্বু কথা বলছে। বুঝলাম রাহি নিরাপদেই আছে। আব্বুর বিশ্বাস হচ্ছে না। আমি ফোন নিলাম। ও নিশ্চিত করলো ও রুমে আছে। ‘এসআই শফিকে’র নম্বরে ফোন দিলাম। নম্বর বন্ধ। আবার ফোন দিলাম। এসআই পরিচয় দেয়া শফিকের নম্বর বন্ধ। রাহির কাছে ফোন এসেছিল ০১৪০২৫০৩৪০৮ নম্বর থেকে।

একই রকম আরেকটি ঘটনা ঘটেছিল সুলতানা মাহির সঙ্গে। তিনি থাকেন রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকায়। তারা দু’জনই চাকরিজীবী। ছুটির দিন শুক্রবার তার স্বামী সজীব বন্ধুদের সঙ্গে ইফতারের জন্য ধানমণ্ডি যায়। মাহিও যায় ইফতারে ভার্সিটির অ্যালামনাইদের একটি ফোরাম ইফতারে, লালমাটিয়ায়। একসঙ্গেই মোটরসাইকেলে আসে তারা। লালমাটিয়ায় মাহিকে নামিয়ে দিয়ে সজীব যায় ধানমণ্ডিতে। ইফতারের ঠিক আগ মুহূর্তে অচেনা নম্বর থেকে ফোন আসে। মাহিকে বলা হয়, সজীব একটি বাচ্চাকে মোটরসাইকেল দিয়ে হিট করেছে। বাচ্চার অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। এখন বাঁচাতে চাইলে জরুরি ২০ হাজার টাকা পাঠালে ছেড়ে দেবে। এরপর সজীবের সঙ্গে কথা বলিয়ে দেয়। সজীব জানায়- বিকাশে যা আছে আপাতত দিয়ে দাও। আরও টাকার ব্যবস্থা করো। ওয়াকিটকির একটি শব্দ ধীর থেকে প্রবল হলো। কেটে গেল ফোন। মাহি বলেন, আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো। কোনো কিছু না ভেবেই বিকাশে টাকা রিচার্জ করতে যাচ্ছিলাম। তখন বিষয়টি বুঝতে পেরে এক বন্ধু সজীবকে ফোন দিতে বলে। ইফতারের আগে ব্যস্ততার কারণে হয়তো ফোন ধরছিল না। আমি তার এক বন্ধুকে ফোন দেই- জানতে পারি যা ফোনে বলা হয়েছিল সব ভুয়া। তিনি বলেন, আমার কাছে যা টাকা ছিল আমি সব দেয়ার জন্যই দোকানে যাচ্ছিলাম। আমার সঙ্গে এমনভাবে কথা বলেছে যে, বিশ্বাস করতে বাধ্য। শুধু তাই নয়, সজীবের সঙ্গে প্রায় ৩০ সেকেন্ড কথা হলো আমার। তাকেও ০১৪০২৫০৩৪০৮ এই নম্বর থেকেই ফোন দেয়া হয়েছিল।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে এখন রোবোকল নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। ০১৮৯৮৯১৬২০৩ নম্বরসহ আরও কয়েকটি নম্বর থেকে কল দিয়ে নানা ধরনের কথা বলা হচ্ছে। অনেকের ক্ষেত্রে কোনো কথাই বলা হচ্ছে না। যারা কল দিয়ে কথা বলেন না তারা চান যাকে কল দেয়া হয়েছে তিনি কথা বলেন। কথা বললেই সেটি রেকর্ড করে রাখবেন। পরে প্রযুক্তির কেরামতিতে কণ্ঠটি টোপ হিসেবে ব্যবহার করে তার পরিবারের সঙ্গে প্রতারণা করবেন। ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া বিভিন্ন ধরনের পোস্ট থেকে জানা যায় অনেককেই ফোন দেয়া হয়েছে বিভিন্ন নম্বর থেকে। আবার কয়েকজনকে একই নম্বর থেকে ফোন দেয়া হয়েছে। রোবোকল ছাড়াও সরাসরি কল করেও প্রতারণা করা হচ্ছে। একেক পরিবারের একেক ধরনের সমস্যার কথা বলা হয়। যারা এই কাজ করছেন তারা বিষয়টি এমনভাবে সাজিয়ে উপস্থাপন করেন বিশ্বাস না করার উপায় থাকে না। কাউকে বলা হয়েছে চাকরির কথা, রং নম্বর, ড্রাইভিং লাইসেন্স আপডেট, অগ্রিম ঈদের শুভেচ্ছা, বিপণিবিতানের অফার এসব উল্লেখযোগ্য।

সাইবার সংশ্লিষ্টসূত্রগুলো বলছে, এটি প্রতারণার নতুন এক কৌশল। আগে বিভিন্ন মানুষকে অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন দিয়ে তার কণ্ঠ রেকর্ড করে রাখা হয়। প্রতারকরা ফোন দিয়ে অনেক সময় কথা বলে না। আবার অনেক সময় বিভিন্ন অজুহাতে কথা বলে। মূল উদ্দেশ্য হলো কণ্ঠ রেকর্ড করে রাখা। পরে সেই কণ্ঠ ব্যবহার করে তাদের পরিবারে ফোন দিয়ে বিভিন্ন বিপদে বা সমস্যায় পড়ার কথা বলা হয়। তাৎক্ষণিকভাবে নিজের স্বজনের বিপদের কথা তার নিজের মুখে শুনে অনেকেই টাকা পাঠিয়ে দেন। আবার অনেকেই টাকা পাঠানোর আগে একটু কৌশলী হয়ে সত্যতা জানতে পারেন। টাকা নেয়ার পর প্রতারকরা মোবাইল  ফোন বন্ধ করে রাখে। পুলিশের সূত্রগুলো বলছে, মূলত এআই ব্যবহার করে এসব কাজ করছে কিছু চক্র। মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক ছড়িয়ে দুর্বলতার জায়গায় আঘাত করে প্রতারণা করাই তাদের কাজ। এটি প্রতারকদের নতুন কৌশল। তবে যাদের কাছেই ফোন যাবে তারা সতর্ক থাকবে। যার কথা বলে ফোন দেয়া হবে তার নিজের নম্বরে ফোন দিয়ে কথা বলে নিশ্চিত হতে হবে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের মুখপাত্র উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, পুলিশ কাউকে এভাবে কখনো কল করে না। এ ধরনের ফোনকল আসলেই ধরে নিতে হবে এরা প্রতারক। প্রতারণার উদ্দেশ্যে ফোন দিয়েছে। তাই ভুলেও প্রতারণার ফাঁদে পা দেয়া যাবে না। যখনই এ ধরনের ঘটনা ঘটবে তখন নিকটস্থ থানায় অভিযোগ দিতে হবে। অভিযোগ দিলে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা  নেবো।

mzamin