Tuesday, January 27, 2026

রাফা ক্রসিং ‘সীমিত আকারে’ খুলে দিতে রাজি ইসরায়েল

ইসরায়েল বলেছে, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে থাকা শেষ জিম্মির দেহাবশেষ উদ্ধারের পর তারা গাজা ও মিসরের মধ্যকার রাফা সীমান্ত ক্রসিং ‘সীমিত আকারে’ আবার খুলে দেওয়ার অনুমতি দেবে।

গাজায় সহায়তা প্রবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার রাফা সীমান্ত। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বছর অক্টোবরে গাজায় যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। রাফা সীমান্ত আবার খুলে দেওয়া ট্রাম্পের ওই যুদ্ধবিরতি কাঠামোর অংশ। গাজা যুদ্ধ শুরুর পর ইসরায়েলি বাহিনী রাফা সীমান্তের দখল নেয়। এর পর থেকে গুরুত্বপূর্ণ এই ক্রসিংটি বন্ধই আছে।

জানা গেছে, সপ্তাহান্তে জেরুজালেম সফরে গিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা। ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে তাঁরা রাফা সীমান্ত ক্রসিং আবার খুলে দিতে চাপ দিয়েছেন।

বিশ্বনেতারা এবং ত্রাণ সংস্থাগুলো গাজায় আরও বেশি ত্রাণ প্রবেশের অনুমতি দিতে ইসরায়েলকে চাপ দিচ্ছে। দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে বিধ্বস্ত গাজার বাসিন্দারা এখন অত্যাবশ্যক চিকিৎসা সরঞ্জাম, খাদ্য ও অন্য জিনিসপত্রের সরবরাহের জন্য ত্রাণের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করছেন।

সোমবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে বলা হয়, ইসরায়েল (রাফা) সীমান্ত আবার খোলার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। তবে এখন ‘শুধু পায়ে হেঁটে যাতায়াত করা যাবে এবং পারাপার সম্পূর্ণরূপে ইসরায়েলি তল্লাশিব্যবস্থার অধীন থাকবে’।

নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে আরও বলা হয়, ‘সব জীবিত জিম্মির ফিরে আসা এবং নিহত সব জিম্মির দেহাবশেষ খুঁজে বের করে তা ফিরিয়ে দিতে হামাসের শতভাগ প্রচেষ্টার ওপর এই সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে।’

ইসরায়েলি সেনারা আগের দিন রোববার জানিয়েছে, তারা গাজা উপত্যকায় একটি কবরস্থানে শেষ ইসরায়েলি জিম্মি র‍্যান গভিলির মরদেহ খুঁজছে।

নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে বলা হয়েছে, ‘এই অভিযান সম্পন্ন হওয়ার পর এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া চুক্তি অনুযায়ী ইসরায়েল রাফা ক্রসিং খুলে দেবে।’

নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে এ ঘোষণা আসার আগে গাজার নতুন প্রশাসক আলী শাথ এই সপ্তাহে উভয় দিক থেকে রাফা ক্রসিং খুলে দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। আলী শাথকে গাজার নতুন প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

শাথ গত বৃহস্পতিবার দাভোসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে (ডব্লিউইএফ) বলেছিলেন, ‘গাজার ফিলিস্তিনিদের জন্য রাফা শুধু একটি প্রবেশদ্বার নয়, এটি একটি জীবনরেখা এবং সুযোগের প্রতীক।’

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমগুলোর খবরে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের দূত স্টিভ উইটকফ ও জারেড কুশনার জেরুজালেমে অনুষ্ঠিত আলোচনার সময় নেতানিয়াহুকে রাফা আবার খোলার জন্য অনুরোধ করেছেন।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-26%2Fldom1fqu%2FRafah.avif?rect=0%2C0%2C540%2C360&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
গাজার দক্ষিণে রাফা ক্রসিং অবস্থিত। ফাইল ছবি: রয়টার্স

ট্রাম্প কেন ‘নতুন বিশ্বব্যবস্থা’র কথা বলছেন by আদিত্য চক্রবর্তী

ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীন বাঁচার সবচেয়ে জরুরি নিয়ম একটাই—তাঁর কথা বিশ্বাস করবেন না। তিনি যা বলেন, তা সরলভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। প্রতিটি বক্তব্য খুঁটিয়ে যাচাই করতে হয়। অনেকে ভদ্রভাবে বলেন, ট্রাম্পকে নাকি ‘গুরুত্বের সঙ্গে’ নিতে হবে, ‘আক্ষরিকভাবে’ নয়। কথাটা শেষ পর্যন্ত একই। কারণ, ট্রাম্পের কথার ভেতরে সাধারণত সত্য কম, অজুহাত বেশি।

ট্রাম্প যেসব বড় বড় পরিকল্পনার কথা বলেন, সেগুলো ভালো করে দেখলে বোঝা যায়—এগুলো কোনো দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নয়, বরং পরিস্থিতি সামলানোর ছোট ছোট চাল। আজ এক কথা, কাল আরেক কথা।

ট্রাম্পের রাজনৈতিক জীবনই তার উদাহরণ। তিনি একসময় ম্যানহাটানের ডেমোক্র্যাট ছিলেন, পরে ফ্লোরিডায় গিয়ে রিপাবলিকান হয়ে যান। যে মানুষ একসময় বারাক ওবামার জন্মসনদ নিয়ে ষড়যন্ত্র ছড়িয়েছিলেন, তিনিই এখন এপস্টিন-সংক্রান্ত নথি প্রকাশে গড়িমসি করছেন। রিয়েল এস্টেট হোক বা ট্রাম্প ইউনিভার্সিটি—যে উদ্যোগগুলোর তিনি বড়াই করেছিলেন, সেগুলোর বেশির ভাগই শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতা আর কেলেঙ্কারিতে ডুবে গেছে।

এখন যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট কোনো বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানকে অপহরণ করে তাঁকে কোকেন চক্রের নেতা বলে দাগিয়ে দেন, তখন একটা বিষয় মনে রাখা দরকার। মাত্র এক মাস আগেই ট্রাম্প বলেছিলেন, তাঁর প্রধান চিন্তা ফেন্টানিল। এটিকে তিনি ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’ বলেছিলেন। কারণ, এই মাদকসহ কৃত্রিম আফিম যুক্তরাষ্ট্রে মোট মাদকজনিত মৃত্যুর প্রায় ৭০ শতাংশের জন্য দায়ী।

ট্রাম্প দাবি করেন, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোর বিরুদ্ধে অভিযান ছিল নিছক আইনশৃঙ্খলা রক্ষার অংশ। কিন্তু বাস্তবে সেখানে ব্যবহার করা হয়েছে ডেলটা ফোর্সের হেলিকপ্টারসহ দেড় শতাধিক বিমান, বোমা ও বিশেষ বাহিনী। এটাকে আইনশৃঙ্খলা অভিযান না বলে একতরফা সামরিক হামলা বলাই বেশি যুক্তিসংগত।

গত সেপ্টেম্বর থেকে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন বিমান হামলায় অন্তত ১১৫ জন মানুষ নিহত হয়েছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে শুধু মাদক পাচারের সন্দেহ ছিল। দ্য আটলান্টিক জানিয়েছে, এমন একটি হামলার ভিডিও দেখে ওয়াশিংটনে এক আইনপ্রণেতা প্রায় অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। এসব অভিযানের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। তিনি একজন কট্টর ডানপন্থী ও বাস্তব রাজনীতিকে সিনেমার মতো দেখেন।

অন্য কোনো দেশ যদি এমন কাজ করত, তবে সেই দেশটিকে দুষ্কৃতি রাষ্ট্র বলা হতো। সেই দেশটির ধনীদের বিদেশে থাকা সম্পদ জব্দ করা হতো। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে তা হচ্ছে না, এটাই আসল দ্বিচারিতা।

তারপরও অনেক বিশ্লেষক ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডে নাকি কোনো বড় কৌশল খুঁজে পাচ্ছেন। বলা হচ্ছে, পরের ধাপে যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ড দখল করবে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য আসলে উপনিবেশ গড়া নয়; তারা চায় অন্য দেশগুলো তাদের কথা মেনে চলুক।

ভেনেজুয়েলায়ও নতুন কিছু হয়নি। সেখানে পুরোনো ক্ষমতাবান গোষ্ঠীই রয়ে গেছে, শুধু নেতৃত্বে সামান্য বদল এসেছে। এটি কোনো নতুন সাম্রাজ্যবাদ নয়, বরং দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করার সস্তা ব্যবস্থা।

ট্রাম্প যে এসব সামরিক অভিযান উপভোগ করেন, তা স্পষ্ট। মার-আ-লাগোতে বসে তিনি মাদুরোর বাড়িতে হামলাকে ‘দারুণ অভিযান’ বলেছেন। নির্বাচনের সময় যদি এতে লাভ হয়, তিনি এমন আরও অভিযান চাইতেই পারেন। কিন্তু পরে সেসব দেশের ধ্বংসস্তূপ সামলানোর দায়িত্ব তিনি নিতে চান না। ইরাক ও আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা সবাইকে সে শিক্ষা দিয়েছে।

ট্রাম্প কি ভেনেজুয়েলা বা গ্রিনল্যান্ড শাসন করবেন? বরং তিনি যদি যুক্তরাষ্ট্রটাকেই ঠিকভাবে শাসন করতেন, সেটাই বড় কথা হতো। দ্বিতীয় মেয়াদের অনেকটা সময় পার হলেও ‘ট্রাম্পবাদ’ বাস্তবে কেমন, তা যুক্তরাষ্ট্রেই স্পষ্ট নয়।

তার শাসন মানে সরকারি প্রতিষ্ঠান দুর্বল করা, অপছন্দের শহরে সেনা নামানো, ফেডারেল সরকার অচল করে দেওয়া। চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তও তিনি প্রথম ছয় মাসে পাঁচবার বদলেছেন। এর ফল—তাঁর জনপ্রিয়তা এখন জো বাইডেনের থেকেও কম।

এই অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা থেকে নজর ঘোরাতেই ট্রাম্প ‘নতুন বিশ্বব্যবস্থা’র কথা বলেন। কিন্তু বাস্তবে এ ব্যবস্থায় নতুন কিছু নেই।

যুক্তরাষ্ট্র আগেও বহুবার অন্য দেশের সরকার পরিবর্তন করেছে। চিলি, ব্রাজিল, পানামা তার উদাহরণ। হার্ভার্ডের এক গবেষণা বলছে, ১৮৯৮ থেকে ১৯৯৪ সালের মধ্যে লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্র অন্তত ৪১ বার সরকার বদলাতে হস্তক্ষেপ করেছে।

নতুনত্ব কেবল এটুকু—আগে এসব কাজকে ‘গণতন্ত্র রক্ষা’র নামে ঢেকে রাখা হতো। আর ট্রাম্প এখন খোলাখুলি টাকা আর চুক্তির কথা বলছেন। তিনি কোনো মতবাদে বিশ্বাসী নন, তিনি সুযোগ দেখেন আর চুক্তি করেন। আজ এক কথা, কাল আরেক কথা—এই হলো ট্রাম্পের নীতি।

কারাকাসে হামলা আন্তর্জাতিক আইন ও যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান—দুটোই ভেঙেছে। কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই অভিযান চালানো হয়েছে। অথচ ট্রাম্প আগে কিছু ব্যবসায়ীকে খবর দিয়েছেন, পরে রাজনীতিকদের।

ভেনেজুয়েলার তেল লুটের কথাও বাস্তবসম্মত নয়। তেলের দাম এখন এত কম যে বড় কোম্পানিগুলোর সেখানে বিনিয়োগের আগ্রহ নেই। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের পরিমাণও এত বেশি, যা যুক্তরাষ্ট্রের সব বড় তেল কোম্পানি মিলেও এক বছরে খরচ করে না।

সব মিলিয়ে এটি কোনো নতুন বিশ্বব্যবস্থা নয়। এটি হলো ধনী ব্যবসায়ী, প্রযুক্তি বিলিয়নিয়ার, ক্রিপ্টো ব্যবসায়ী ও ছদ্ম ব্যাংকারদের এক বিশৃঙ্খল জোট, যাদের লক্ষ্য ক্ষমতা নয়, দ্রুত লাভ।

এই চিত্র ভয়ংকর ঠিকই, কিন্তু একে প্রতিরোধ করা অসম্ভব নয়, যদি ইউরোপসহ অন্য দেশগুলো সত্যিই তা চায়।

* আদিত্য চক্রবর্তী, দ্য গার্ডিয়ান–এর কলাম লেখক
- দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

ভেনেজুয়েলায় মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দেশে দেশে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে
ভেনেজুয়েলায় মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দেশে দেশে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। ছবি: রয়টার্স

ইরানে এবারের বিক্ষোভ কোনো সাদাকালো গল্প নয়

তেহরান ঘুরে এসে লেখাঃ ইরানে এবারের বিক্ষোভের ধরন ও নানা বাস্তবতা নিয়ে আন্দোলনের সময় দেশটি ঘুরে এসে লিখেছেন এম নাতেকনুরি (ছদ্মনাম)।

তিন সপ্তাহ ইরানে কাটিয়ে আমি ১৪ জানুয়ারি বুধবার রাতে ফিরে এসেছি। তেহরানে কাটানো সময় নিয়ে আমি এখন যে লেখা লিখছি, ধরেই নিতেন পারেন, তা আমি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দিইনি। কারণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন খুব বিষাক্ত। সেখানকার সবকিছু আমাদেরই কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার কড়া নজরদারিতে থাকে।

আমি সাধারণত ইংরেজিভাষী জগতে ইরানে কী হচ্ছে, তা নিয়ে নিজেকে কোনো মুখপাত্র বানাতে চাই না। বিষয়টা ভীষণ জটিল, আর অনেকেই ব্যক্তিগত কষ্ট আর ট্রমা থেকে কথা বলেন। কিন্তু ইরানে বিক্ষোভের সময় ফেসবুক খুলেই আমার খারাপ লেগেছে। কারণ, সেখানে আলোচনা হচ্ছে খুব সাদাকালো ভাষায়। সেখানে সবকিছুকে দুই ভাগে ভাগ করে দেখার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে; যদিও অনেকেই মনে কোনো দোষ না রেখেই করছে।

আমি এখানে যা লিখছি, তা এমন একজন মানুষের অবস্থান থেকে, যিনি ইরানকে গভীরভাবে ভালোবাসেন এবং ইরানের সংস্কৃতি ও ইতিহাস নিয়ে কয়েক দশক গবেষণা করেছেন। আমি পাঠকদের অনুরোধ করছি, নিচের প্রতিটি বিষয়কে একসঙ্গে ধরে দেখবেন। একটিকে অপরের বিপরীতে দাঁড় করাবেন না; যেমনটা আমি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পড়া বহু বয়ানে দেখেছি।

ইরানের মানুষ সরকারের দুর্নীতির কারণে ভীষণ ক্ষুব্ধ। তারা মনে করে, এই দুর্নীতিই বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থার জন্য দায়ী। আর এই পরিস্থিতিতে অনেক মানুষের জীবন দিন দিন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। এই অর্থনৈতিক দুর্নীতির সঙ্গে কয়েক দশক ধরে একের পর এক নেমে আসা দম আটকানো নিষেধাজ্ঞা আংশিকভাবে জড়িত। আমার মতে, এসব নিষেধাজ্ঞা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। এর সঙ্গে আরও যুক্ত হয়েছে সেই বৈশ্বিক প্রবণতা, যেখানে অল্পসংখ্যক দুর্নীতিগ্রস্ত অলিগার্কের হাতে সমস্ত সম্পদ কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। এর দায় ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান (আইআরআই) এড়াতে পারে না।

ক্ষুব্ধ মানুষ দলে দলে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করেছে। তাদের মধ্যে আবার আরও অনেক গোষ্ঠীও ছিল, যাদের সামরিক প্রশিক্ষণ ছিল এবং তারা সাধারণ প্রতিবাদকারীদের থেকে আলাদাভাবে প্রতিবাদ করছিল। আমি তেহরান, রাশত, কিশ, ইয়াজদ, শুশতার, বুশেহরসহ বিভিন্ন শহর ও জনপদে থাকা মানুষের কাছ থেকে এ বিষয়ে শুনেছি।

৮ ও ৯ জানুয়ারির পরের দিনগুলোতে যাঁদের সঙ্গে কথা বলেছি, তাঁদের অনেকেই বলেছেন—এই প্রতিবাদগুলো আলাদা ছিল। রাস্তায় এমন কিছু প্রশিক্ষিত মানুষ ছিলেন, যাঁদের খুব নির্দিষ্ট এজেন্ডা ছিল। তাঁরা বিক্ষোভকে নিজেদের দখলে নেওয়ার এবং বিক্ষোভকারীদের নিজেদের মতো চালিত করার চেষ্টা করছিলেন। বিক্ষোভ করার সময় আমার এক বন্ধুকে ‘জাভিদ শাহ’ (অর্থাৎ ‘রাজা চিরজীবী হোন’—রেজা পাহলভির প্রতি ইঙ্গিত) বলে স্লোগান না দেওয়ায় হুমকি দেওয়া হয়েছে।

আমি নিজে রাতের বেলা রাস্তার ওপার থেকে একজন মানুষকে প্রায় ২০ ফুট উঁচু দেয়াল বেয়ে প্রশিক্ষিত সেনাদের মতো উঠতে দেখেছি। সে কী দিয়ে উঠছিল, গ্র্যাপল হুক নাকি অন্য কিছু দিয়ে, আমি বুঝতে পারিনি। কিন্তু এটা নিশ্চিত, ওই লোক কোনো সাধারণ মানুষ ছিলেন না। এ রকম আরও অনেক উদাহরণ আমি দিতে পারব।

কারা ক্ষুব্ধ বিক্ষোভকারীদের ভেতরে মিশে ছিল—এ নিয়ে কিছু ব্যাখ্যা ও তত্ত্ব আছে। সেগুলোকে আমি বিশ্বাসযোগ্য মনে করি। এর মধ্যে ছিল ইসরায়েলি সরকারের এজেন্ট, ইসরায়েল-সমর্থিত রাজতন্ত্রপন্থী গোষ্ঠী, যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত এমইকে (মুজাহিদিন-ই খালক—যাদের ইরানের ভেতরে ব্যাপকভাবে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করা হয়) এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অস্ত্র পাওয়া বিচ্ছিন্নতাবাদীরা। এই গোষ্ঠীগুলো বিক্ষোভকে নিজেদের লক্ষ্য অনুযায়ী চালিত করার চেষ্টা করছিল। প্রতিবাদকারীদের দিক থেকে যে সহিংসতার বড় অংশ দেখা গেছে, তার উৎসও মূলত তারাই।

কিছু সাধারণ মানুষ ছিলেন, যাঁরা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি আগ্রহভরে ইরান ইন্টারন্যাশনাল (এটি ইসরায়েলি সরকারের অর্থায়নে চালিত একটি স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল, যা প্রায়ই তথ্য বিকৃত করে বা সরাসরি ভুল তথ্য দেয়) দেখছিলেন। এই দর্শকেরা মনে করছিলেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপই তাঁদের উদ্ধার করবে। তাঁরা আমাকে বলেছিলেন, ‘এটা তো বেঁচে থাকা নয়।’

তাঁরা ভুলভাবে বিশ্বাস করছিলেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় মানুষের জীবন ভালো করার বা মানুষকে বাঁচানোর জন্য কাজ করছে। তাঁরা ভুলভাবে বিশ্বাস করেছিলেন, প্রবাসী গোষ্ঠীগুলো তাঁদের কামানের গোলা ছাড়া অন্য কিছু হিসেবে দেখে। সামনে কী হবে, সে বিষয়ে তাঁদের কোনো ভাবনাই ছিল না। তাঁদের কথাটা ছিল এমন—‘এই সরকারটা সরিয়ে দাও, এরপর যা হয় হোক; এর চেয়ে খারাপ কিছু তো আর হতে পারে না।’

আমি তাঁদের উদ্দেশে বলতে চাই, ‘উঁহু, পারে।’ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি সরকার আমাদের জীবনের চেয়ে তেলাপোকার জীবনকে বেশি গুরুত্ব দেয়। তাদের আগের হস্তক্ষেপগুলোর দিকে তাকান, সেগুলো মৃত্যু, ধ্বংস, অস্থিরতা আর বিপুল শরণার্থী জনগোষ্ঠী ছাড়া কিছুই তৈরি করেনি। কিন্তু মানুষ এতটাই মরিয়া ও হতাশ এবং তাঁদের সহ্যক্ষমতার শেষ সীমা এতটাই ছাড়িয়ে গেছে যে তারা এসব কথা শুনতেই পারে না। ইরানের ভেতরের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিলে এটা বোঝা যায়, কিন্তু তবু এই পথ থেকে ভালো কিছু আসার কোনো সম্ভাবনা নেই।

এই বিক্ষোভগুলো ছিল নজিরবিহীনভাবে সহিংস। ২০০৯ সাল থেকে যারা নিয়মিত প্রতিবাদে অংশ নিচ্ছেন—এমন বহু মানুষের কাছ থেকেই আমি এ কথা শুনেছি। অনেক শহর ও জনপদে সরকারি দপ্তর, ব্যাংক ইত্যাদিতে আগুন দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অসংখ্য দোকান লুট হয়েছে, সরকারি বাস পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, তেহরানে মেট্রোস্টেশন ভাঙচুর করা হয়েছে।

রাস্তায় মানুষ, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য কিংবা সন্দেহভাজন নিরাপত্তাকর্মীদের (যাঁদের কেউ কেউ আসলে সাধারণ মানুষ ছিলেন) ওপর নৃশংস হামলা হয়েছে। কাউকে কুপিয়ে জখম করা হয়েছে, কাউকে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কাউকে মারাত্মকভাবে পেটানো হয়েছে। কাউকে পিটিয়ে হত্যা পর্যন্ত করা হয়েছে।

বিরোধীদের এই সহিংসতা এমন অনেক মানুষকে হতবাক করেছে, যাঁরা নিজেরাও সরকারের বিরোধী। এই আন্দোলনকে আগেরগুলোর থেকে আলাদা মনে হওয়ার এটাও ছিল বড় কারণ। কিছু শহর ও এলাকা অন্যগুলোর তুলনায় অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও কোথাও অবস্থা ছিল যুদ্ধক্ষেত্রের মতো। বহু এলাকায় গুলির শব্দ শোনা গেছে।

আমি বুশেহরের পুরোনো শহরের একটি হোটেলে ছিলাম। এটি একটি বড় পুরোনো বাড়ি। মাঝখানে খোলা উঠান। সংঘর্ষ বন্ধ হলে আমি মাঝেমধ্যে রাস্তায় বের হতাম। সেখানে আমি কাঁদানে গ্যাস, ফ্ল্যাশ-ব্যাং গ্রেনেড, গুলির শব্দ, এমনকি আধা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র থেকে দ্রুত গুলিবর্ষণের আওয়াজ পেয়েছি। অনেককে গুলি করতেও দেখেছি। পরদিন আমি পুড়ে যাওয়া দোকান ও ব্যাংক, লুট হওয়া ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দেখেছি। রাস্তায় পড়ে থাকা শটগানের গুলির খোসা দেখেছি। দেয়ালে লেখা দেখেছি—‘জাভিদ শাহ’ (শাহ জিন্দাবাদ)।

সেখানকার মানুষজন সহিংসতায় হতবাক ছিল। এক দোকানদার, যিনি আগুন লাগাতে আসা লোকদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, তিনি আমাকে বলেছিলেন, তিনি তাঁদের অনুরোধ করেছিলেন যেন তাঁর দোকানে আগুন না দেওয়া হয়। কারণ, তাঁর পরিবার দোকানের ওপরের তলায় থাকে। বিক্ষোভকারীরা দোকানে আগুন না দিলেও জানালা ভেঙে দোকান লুট করে। তিনি বলেছিলেন, ‘এটা ছোট জায়গা, আমরা সবাই সবাইকে চিনি। কিন্তু এই লোকগুলোকে আমরা চিনতাম না।’

তেহরানের হাসপাতালগুলোতে কাজ করেন, এমন বন্ধুরা আমাকে জানিয়েছেন, আহত ব্যক্তিরা বলছিলেন, ভিড়ের মধ্যে বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের অনেকের উচ্চারণ অস্বাভাবিক ছিল। এতে ইরানের মাটিতে বিদেশি শক্তির উপস্থিতির ধারণা আরও জোরালো হয়। যখন সবকিছু খুব গোলমেলে মনে হয়, তখন সেটিই স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। বাস্তবতাও ঠিক সেটাই। ইরানে ওই সময়ে সর্বত্র ছিল গভীর বিশৃঙ্খলা।

এই বিক্ষোভের ঘটনায় স্তরের পর স্তর রয়েছে। তেহরানের বাজার এলাকা থেকে যে প্রতিবাদ শুরু হয়েছিল, তা স্পষ্টতই অর্থনৈতিক অসন্তোষ থেকে জন্ম নিয়েছে। কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হলো এর পরপরই একেবারে ভিন্ন কিছু ঘটতে শুরু করে সীমান্তবর্তী শহরগুলোতে। ঘটতে থাকে এমন কিছু ছোট ছোট জায়গায়, যেসব স্থানের নাম কেউ কখনো শোনেনি (যেমন লোরেস্তানের আজনা)।

এই জায়গাগুলো খুব দ্রুত সহিংস হয়ে ওঠে। সেখানে প্রতিবাদকারীদের হাতে অস্ত্র ছিল। লোরদের মতো কিছু গোষ্ঠীর হাতে ঐতিহ্যগতভাবেই অস্ত্র থাকে। তবে এখন যে আরও বেশি অস্ত্র ছড়িয়ে পড়েছে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। জানুয়ারির শুরু থেকেই আমি দক্ষিণ ইরানে ভ্রমণ করছিলাম। অনেকেই আমাকে মেসেজ করে জানতে চেয়েছিল, আমি ঠিক আছি কি না। তখনো প্রতিবাদগুলো স্থানভিত্তিক ছিল এবং সরকার সংযম দেখানোর চেষ্টা করছিল। আমি মানুষকে বলেছিলাম, ‘সব ঠিক আছে।’

কিন্তু পশ্চিমা গণমাধ্যম বরাবর যা করে, এ ক্ষেত্রেও সেটাই করেছে। তারা প্রায় কোনো প্রেক্ষাপট ছাড়াই কিংবা বিকৃত প্রেক্ষাপটে সবকিছুকে আসন্ন বিপ্লব হিসেবে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, তারা সব সময় সরকারি দুর্নীতির কথা তোলে। কিন্তু সেই দুর্নীতির আলাপকে তারা কয়েক দশক ধরে একের পর এক ইরানের ওপর নেমে আসা বিধ্বংসী নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষাপট থেকে আলাদা করে ফেলে। এই নিষেধাজ্ঞাগুলো দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রকে কার্যত এক বিশাল কালোবাজারে পরিণত করেছে। (এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের মদ নিষিদ্ধকরণ যুগের কথা মনে করুন।)

এতে অবশ্যই শাসনব্যবস্থার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। নিজেদের নাগরিকদের কল্যাণ নিশ্চিত করার দায় অবশ্যই সরকারের। কিন্তু এটিই বাস্তব প্রেক্ষাপট। পণ্য সরবরাহ নিয়ন্ত্রণকারী অনেক মাফিয়াই পুরোপুরি সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই। তারপরও সরকারি ও বেসরকারি অভিজাত শ্রেণি ক্রমেই দুর্লভ হয়ে ওঠা মার্কিন ডলারের জন্য হন্যে হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে তারা আরও বেশি দেশীয় মুদ্রা ছাপাচ্ছে। এতে ইরানি রিয়ালের মূল্য দিন দিন কমছে। এর চাপ পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর।

পরের দিনগুলোতে (বুধবার দেশ ছাড়ার আগপর্যন্ত) শহরটা ছিল চাপা, স্তব্ধ। মানুষ যতটা পারছিল স্বাভাবিক জীবন চালানোর চেষ্টা করছিল। তারা দৈনন্দিন কাজকর্মে মন দিচ্ছিল। রাতে লোকজন কমে যেত, যদিও শনি ও রোববারের মতো একেবারে জনশূন্য ছিল না। আমি সোম ও মঙ্গলবার সন্ধ্যার শুরুতে বাইরে গিয়েছিলাম। ইন্টারনেট না থাকায় ব্যবসা ও দৈনন্দিন জীবন খুব কঠিন হয়ে পড়েছিল।

আমরা সবাই যেন ১৯৯৯ সালে ফিরে গিয়েছিলাম, সেভাবেই কাজ চালিয়ে নিতে হচ্ছিল। তবে আশ্চর্যজনকভাবে এই বিচ্ছিন্নতা কিছুটা শান্তিও এনে দিয়েছিল। এটা আমাদের নিজেদের সঙ্গে এবং একে অপরের সঙ্গে উপস্থিত থাকতে সাহায্য করেছিল। শনিবারের মধ্যেই ব্যাংকিং বা গাড়ি অর্ডারের মতো সেবার জন্য অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্ক চালু করা হয়।

মঙ্গলবারের দিকে কিছু মানুষ (আবারও বলি, আমি তাদের কথাই বলছি, মূলত যারা ইরান ইন্টারন্যাশনাল টিভি দেখছিল) মনে করতে শুরু করে, ডোনাল্ড ট্রাম্প বা রেজা পাহলভি হঠাৎ এসে কোনো রক্তপাত ছাড়াই তাদের শাসনব্যবস্থা থেকে উদ্ধার করবে। কিন্তু কিছু মানুষ (এমনকি উত্তর তেহরানের লোকজনও, যাদের মুখে এমন কথা শোনার কথা ভাবা যায় না) সাবেক যুবরাজকে গালাগালি করছিল।

অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছিলেন, ‘সে কীভাবে বিক্ষোভের ডাক দেয়, তারপর এত তরুণের মৃত্যু হয়? তার কোনো পরিকল্পনাই তো নেই।’ এই অভিযোগ আসলে অমূলক নয়। কারণ, পাহলভি আগে কখনো কোনো বড় কিছু পরিচালনা করেননি, আর নিজেও ইরানে স্থায়ীভাবে থাকতে চান না বা পরিবার নিয়ে ফিরতে প্রস্তুত নন।

পাহলভিকে ঘিরে মানুষের অতিরিক্ত আশা, কিংবা ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্র এসে সবকিছু ঠিক করে দেবে—এ ধরনের ভাবনা আসলে দেখায় মানুষ কতটা হতাশ ও ক্ষুব্ধ। বর্তমান শাসনব্যবস্থা আর ভয়াবহ অর্থনৈতিক অবস্থার চেয়ে তারা যেকোনো ভালো কিছুর জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। আরেক দল মানুষ, যাঁরা একটু বেশি ভাবেন বা বোঝেন, তাঁরা ভয় পাচ্ছিলেন সামনে কী হবে তা নিয়ে। তাঁদের আশঙ্কা, দেশে গৃহযুদ্ধ বা বড় ধরনের অরাজকতা শুরু হতে পারে, যা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাকে ধ্বংস করে দেবে।

যাঁদের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে, তাদের কেউই শাসনব্যবস্থাকে সমর্থন করেননি। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁরা বুঝতে পারছিলেন, ভেতরে কোনো শক্ত বিরোধী নেই, আর বাইরে নানা স্বার্থান্বেষী বিদেশি শক্তি সক্রিয়। এ অবস্থায় শান্তিপূর্ণভাবে ভালো কোনো সরকারের দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। এই ভয় আমার নিজেরও। পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। অনেক মানুষ এতটাই রাগে অন্ধ যে তারা এ মুহূর্তের বাস্তব ঝুঁকি আর সীমাবদ্ধতাগুলো দেখতে পাচ্ছে না। বিরোধী পক্ষ হোক বা সরকার—কারও কাছেই বাস্তবসম্মত, সুস্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা চোখে পড়ছে না।

● এম নাতেকনুরি, ইরানি অধিকারকর্মী, যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক
- অনুবাদ ও সংক্ষিপ্তকরণ: সারফুদ্দিন আহমদ 

ইরানের আবদানান শহরে বিক্ষোভ
ইরানের আবদানান শহরে বিক্ষোভ। ছবি: টেলিগ্রাম চ্যানেল থেকে সংগৃহীত

গাজায় ১৮০টি আকাশচুম্বী ভবন করার মাস্টারপ্ল্যান ট্রাম্পের জামাতা কুশনারের

‘আমাদের একটি মাস্টারপ্ল্যান আছে।...কোনো প্ল্যান বি নেই।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে এ ঘোষণা দেন। গত বৃহস্পতিবার তিনি ওই ফোরামে যুদ্ধপরবর্তী গাজার জন্য তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার উপস্থাপনা (প্রেজেন্টেশন) তুলে ধরেন।

কুশনার বলেন, হামাস যদি নিরস্ত্র না হয়, তাহলে সেটিই হবে গাজার জনগণের আকাঙ্ক্ষা অর্জন না হওয়ার কারণ।

ট্রাম্পের গাজা ‘শান্তি পর্যদ’ সনদ স্বাক্ষরের ঠিক পরেই ওই পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন কুশনার।

কুশনারের গাজা পরিকল্পনায় কী আছে

জ্যারেড কুশনার যে পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন, তাতে গাজায় উপকূলীয় পর্যটন, বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর, দুটি শহর, ১৮০টি আকাশচুম্বী ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, চিকিৎসা স্থাপনা নির্মাণের কথা তুলে ধরেন। এসব নির্মাণে অর্থায়নের প্রসঙ্গও এসেছে সেই উপস্থাপনায়।

গাজার কোথায় হবে আকাশচুম্বী ভবন ও বিমানবন্দর

কুশনারের উপস্থাপনায় গাজার একটি মানচিত্র তুলে ধরে দেখানো হয়, কীভাবে গাজার উন্নয়ন করা হবে।

বলা হয়, সমুদ্র উপকূলে ‘উপকূলীয় পর্যটন’ অঞ্চল গড়ে তোলা হবে। ১৮০টি আকাশচুম্বী ভবন নির্মাণের জন্য যা যথেষ্ট। এই ভবনগুলোর বেশ কটিই হোটেল হতে পারে।

মিসরের সঙ্গে সীমান্তের ঠিক পাশে গাজার দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে একটি সমুদ্রবন্দর দেখানো হয়। এ ছাড়া মানচিত্রে বন্দর থেকে ভেতরের দিকে বিমানবন্দরের জায়গা দেখানো হয়। (এর কয়েক মাইল দক্ষিণে ছিল গাজা বিমানবন্দর; যা ২০ বছরের বেশি আগে আগে ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংস হয়।)

নতুন শহর দুটির নাম কী

কুশনার তাঁর পরিকল্পনায় দুটি শহর গড়ার কথা উল্লেখ করেছেন। শহর দুটির একটিকে তিনি ‘নিউ রাফা’, অন্যটিকে ‘নিউ গাজা’ বলেছেন। ‘নিউ রাফা’ শহরে এক লাখের বেশি স্থায়ী আবাসিক ইউনিট নির্মিত হবে, সঙ্গে ২০০টির বেশি স্কুল এবং ৭৫টির বেশি চিকিৎসাসুবিধা থাকবে জানিয়ে কুশনার আশা প্রকাশ করেন, এই নির্মাণকাজ দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে সম্পন্ন হবে। গাজার ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি।

‘নিউ গাজা’ শিল্পের কেন্দ্র হবে, যার লক্ষ্য শতভাগ কর্মসংস্থান অর্জন, বলেন কুশনার। কম্পিউটারের সাহায্যে তৈরি করা যে ছবিগুলো কুশনার উপস্থাপন করেন, তা দোহা ও দুবাইয়ের মতো পারস্য উপসাগরীয় শহরের সঙ্গে মিলে যাওয়া মহানগরের ইঙ্গিত দেয়।
নিঃসন্দেহে এটা বিশাল কর্মযজ্ঞ। এই কর্মযজ্ঞ কীভাবে বাস্তবায়িত হবে—কুশনারের উপস্থাপনায় সে বিষয়টি ছিল খুব সংক্ষিপ্ত।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর দুই বছর ধরে গাজায় চালানো ইসরায়েলি হামলায় ৮০ শতাংশের বেশি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।

গাজার এই ‘উন্নয়নে’ অর্থ দেবে কে

গাজায় এই নির্মাণকাজের জন্য সরকারগুলো প্রথম অবদান রাখবে, বলেন কুশনার। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ওয়াশিংটনে একটি সম্মেলনে প্রাথমিক ঘোষণা আসবে বলেও জানান তিনি।

এ সময় কুশনার বেসরকারি খাতকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে ‘অসাধারণ বিনিয়োগ সুযোগের’ প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি বলেন, ‘এটা জানি যে এ ধরনের স্থানে বিনিয়োগ করা একটু ঝুঁকিপূর্ণ, কিন্তু আপনার আসা দরকার, আস্থা রাখুন, মানুষের জন্য বিনিয়োগ করুন।’

যদিও ফিলিস্তিনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা কুশনারের উপস্থাপনায় ধীর প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। অন্যরা সমালোচনা করে বলছেন, ফিলিস্তিনিদের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে তাদের শোষণ করা হচ্ছে।

কুশনারের পরিকল্পনা কি এবারই প্রথম

ট্রাম্পের জামাতা কুশনার এর আগেও গাজা নিয়ে এমন উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন। ২০১৯ সালে, তিনি বাহরাইনে ‘ফ্রম পিস টু প্রসপারিটি’ শিরোনামের এক সম্মেলনে গাজা এবং পশ্চিম তীরে ‘একটি প্রাণবন্ত বাণিজ্যিক এবং পর্যটনকেন্দ্র’ করার কথা বলেছিলেন। তাঁর মতে, এতে সেখানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আসবে এবং গাজা ও পশ্চিম তীর সমৃদ্ধ হবে।

গাজার নতুন টেকনোক্রেটিক কমিটির প্রধান আলী শাত্ দাভোসের এক ভিডিও বার্তায় বলেছেন, এই সময়টাকে কাজে রূপ দেওয়াই এখন গুরুত্বপূর্ণ।

কুশনারের গাজা পরিকল্পনা বিষয়ে মানবাধিকার সংগঠন ইউরো-মেডিটেরানিয়ান হিউম্যান রাইটস মনিটর গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ফিলিস্তিনি রামি আবদু এক্সে এক পোস্টে বলেন, এটা ফিলিস্তিনিদের স্বকীয়তা নির্মূল করার পরিকল্পনা।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর জামাতা জ্যারেড কুশনার। দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে গাজা নিয়ে মাস্টারপ্ল্যান উপস্থাপন করেন তিনি
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর জামাতা জ্যারেড কুশনার। দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে গাজা নিয়ে মাস্টারপ্ল্যান উপস্থাপন করেন তিনি। ফাইল ছবি

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কয়টি সামরিক ঘাঁটি আছে, সৈন্যের সংখ্যা কত?

বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। রয়টার্স, আল-জাজিরা এবং সেন্টকম- এর তথ্য অনুযায়ী, এই অঞ্চলে প্রায় ১৯টি স্থানে ৪০ থেকে ৫০ হাজার মার্কিন সৈন্য মোতায়েন রয়েছে।

কাতারে রয়েছে আল উদেইদ বিমান ঘাঁটি। এটি মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার বৃহত্তম সামরিক ঘাঁটি। এখানে প্রায় ১০ হাজার সৈন্য অবস্থান করে। এটি মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান ফরওয়ার্ড সদরদপ্তর হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সম্প্রতি ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এখানে একটি নতুন সমন্বিত বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সেল খোলা হয়েছে।

বাহরাইনে রয়েছে ন্যাভাল সাপোর্ট অ্যাক্টিভিটি। এখানে মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের  সদরদপ্তর অবস্থিত। পারস্য উপসাগর, লোহিত সাগর এবং আরব সাগরে নৌ-নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই ঘাঁটিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে প্রায় ৯ হাজার সৈন্য নিয়োজিত।

কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি বড় ঘাঁটি রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম ক্যাম্প আরিফজান। এটি মার্কিন সেনাবাহিনীর লজিস্টিক এবং অপারেশনাল হাব। অন্যটি আলী আল সালেম বিমান ঘাঁটি। এটি ইরাক সীমান্তের কাছে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমান ঘাঁটি। আরও আছে ক্যাম্প বুয়েহরিং। ইরাক ও সিরিয়ায় মোতায়েন হওয়া সেনাদের ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

সংযুক্ত আরব আমিরাতে রয়েছে আল ধাফরা বিমান ঘাঁটি। এখানে মার্কিন বিমান বাহিনীর ৩৮০তম এয়ার এক্সপেডিশনারি উইং মোতায়েন থাকে। ড্রোন অপারেশন এবং গোয়েন্দা নজরদারির জন্য এটি অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। আরও আছে জেবেল আলী পোর্ট। যদিও এটি কোনো স্থায়ী ঘাঁটি নয়, তবে এটি মার্কিন নৌবাহিনীর সবচেয়ে বড় এবং ব্যস্ততম বন্দর ব্যবহারের সুযোগ দেয়।

ইরাকে আছে আইন আল-আসাদ নামের ঘাঁটি। এটি পশ্চিম ইরাকের আনবার প্রদেশে অবস্থিত। ইরবিল বিমান ঘাঁটিটি কুর্দিস্তান অঞ্চলে অবস্থিত। বর্তমানে ইরাকে প্রায় আড়াই হাজার মার্কিন সেনা প্রশিক্ষক ও উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছে।

সৌদি আরবে রয়েছে প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটি। রিয়াদের দক্ষিণে অবস্থিত। এখানে প্যাট্রিয়ট মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম এবং থাড মোতায়েন রয়েছে। ২০২৪-২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, এখানে দুই হাজারের বেশি মার্কিন সেনা অবস্থান করছে।

জর্ডানে আছে মুয়াফফাক আল-সালতি বিমান ঘাঁটি। আজরাক অঞ্চলে অবস্থিত। এটি আইএসবিরোধী অভিযানে একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এছাড়া ‘টাওয়ার ২২’ নামক একটি ছোট লজিস্টিক ঘাঁটিও জর্ডানে অবস্থিত। সিরিয়ায় আমেরিকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বড় ঘাঁটি না থাকলেও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে প্রায় ৯০০ সৈন্য মোতায়েন রয়েছে। এর মধ্যে আল-তানফ গ্যারিসন অন্যতম।

https://mzamin.com/uploads/news/main/198708_Kaium-4.webp

বিশ্বব্যবস্থা এক বছরেই ওলট–পালট করে দিয়েছেন ট্রাম্প

ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বছরের শুরুতে দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন। এর পর থেকে এক বছরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী স্থিতিশীল বিশ্বব্যবস্থাকে কার্যত তছনছ করে দিয়েছেন তিনি। তাঁর নেওয়া একের পর এক আগ্রাসী পদক্ষেপ বিশ্বরাজনীতিকে এমন এক অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হতে হতে বিশ্ব হয়তো সম্পূর্ণ অচেনা এক রূপ ধারণ করবে।

আগামী জুনে ৮০ বছরে পদার্পণ করতে যাওয়া এই রিপাবলিকান নেতা নতুন বছরের শুরু থেকেই যুদ্ধংদেহী মনোভাবে অবতীর্ণ হয়েছেন। ৩ জানুয়ারি তেলসমৃদ্ধ দেশ ভেনেজুয়েলায় তাঁর নির্দেশে সামরিক অভিযান চালানো হয়। এতে শতাধিক মানুষ নিহত হন। দেশটির বামপন্থী প্রেসিডেন্ট ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের শত্রু নিকোলা মাদুরোকে তুলে নিয়ে যায় মার্কিন বিশেষ বাহিনী।

ভেনেজুয়েলায় অভিযানের পর থেকে শত্রুমিত্র–নির্বিশেষে সবার বিরুদ্ধেই শক্তি প্রয়োগের হুমকি দিচ্ছেন ট্রাম্প। তিনি আবারও ন্যাটোর সদস্যদেশ ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড দখল করার দাবি তুলেছেন। ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে কড়াকড়ি শুরু হলে সেখানেও হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। এমনকি প্রতিবেশী দেশ মেক্সিকো ও কলম্বিয়াতেও সামরিক হস্তক্ষেপের চিন্তা করছেন বলে মাঝেমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন। পরে অবশ্য ওই দুই দেশের প্রেসিডেন্টদের সঙ্গে কথা বলা পর তাঁর এ মনোভাবে পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে হয়েছে। ট্রাম্পের সমর্থকেরা বলছেন, তিনি নিজের অনুকূলে কোনো ফলাফল পাওয়ার আগপর্যন্ত কোনো কূটনৈতিক সমাধানের পথে হাঁটেন না।

ট্রাম্প ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বা সবার আগে যুক্তরাষ্ট্র রূপকল্প বাস্তবায়নে রাষ্ট্র পরিচালনার চিরাচরিত পদ্ধতিগুলো ভেঙে ‘একলা চলো’ নীতি গ্রহণ করেছেন। এ ধারাবাহিকতায় সবশেষ জাতিসংঘের সংস্থাসহ ডজনখানেক আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন তিনি। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ট্রাম্পের এ পদক্ষেপকে সমর্থন করে বলেছেন, অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা এখন শুধু বিশ্বায়নবাদীদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে।

শুধু দেশের বাইরে নয়, ভেতরেও ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন চালানোর অভিযোগ উঠেছে। তাঁর প্রশাসন সম্প্রতি মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে মিনিয়াপোলিসে অভিবাসনবিরোধী অভিযান চালায়। সেখানে এক অভিবাসন কর্মকর্তা রেনি গুড (৩৭) নামের এক নারীকে গুলি করে হত্যা করেন। এ ঘটনায় ট্রাম্প কিংবা তাঁর প্রশাসন লোকদেখানো সহানুভূতিও দেখায়নি, উল্টো দমন-পীড়নের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে।

হোয়াইট হাউসের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ এবং ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী নীতির রূপকার স্টিফেন মিলার সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, বাস্তব পৃথিবী চলে শক্তি ও ক্ষমতা দিয়ে। এখন আর আন্তর্জাতিক সৌজন্য দেখানোর সময় নেই।

পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, অতীতের মার্কিন প্রেসিডেন্টদের সঙ্গে ট্রাম্পের মূল পার্থক্য হলো, তিনি কোনো আদর্শ বা গণতন্ত্র রক্ষার ভানটুকুও করেন না, যেমন ভেনেজুয়েলায় গণতন্ত্র ফেরানোর চেয়ে দেশটির তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেওয়াকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন তিনি।

ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এ নীতি ‘নব্য উপনিবেশবাদ’ ও ‘সাম্রাজ্যবাদের’ নতুন যুগের সূচনা করতে পারে। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্র নিজের তৈরি আন্তর্জাতিক নিয়মগুলো নিজেই ভেঙে ফেলছে।

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের বিশেষজ্ঞ মেলানি সিসন মনে করেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সেই চেনা বিশ্বব্যবস্থা আর ফিরে আসার সম্ভাবনা কম। ট্রাম্প বিশ্বরাজনীতিতে যে পরিবর্তন আনছেন, তা দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং অন্য শক্তিগুলোও এখন শুধু নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করতে ব্যস্ত থাকবে।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যুক্তরাষ্ট্রের এক মিত্রদেশের কূটনীতিকের মতে, বিশ্বব্যবস্থা যে আগে থেকেই ভেঙে পড়েছিল, ট্রাম্প সেটাই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন মাত্র।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

এই সিজনে দুরন্ত টিভিতে যা যা পাচ্ছে ছোটরা

প্রকাশ ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ঃ শিশু-কিশোরদের বিনোদন ও শেখার জগতে নতুন উদ্দীপনা নিয়ে শুরু হচ্ছে দুরন্ত টিভির ৩৪তম সিজন। প্রতিবারের মতো এবারও ছোটদের জন্য নিরাপদ, শিক্ষণীয় ও আনন্দঘন কনটেন্টের সমাহার সাজিয়েছে চ্যানেলটি। নতুন এই সিজনে থাকছে একেবারে নতুন কুইজ অনুষ্ঠান ‘দুরন্ত মেধাবী’, সঙ্গে ১১টি জনপ্রিয় ও নতুন কার্টুন সিরিজ, নাটক, পাপেট শো এবং দুরন্ত টিভির নিয়মিত শিশুতোষ অনুষ্ঠান। পাশাপাশি ‘দুরন্ত সিনেমা’ সময়ে প্রচারিত হবে দেশি ও বিদেশি নানা জনপ্রিয় শিশুতোষ সিনেমা। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে চ্যানেলটি।

কুইজে নতুন মাত্রা: ‘দুরন্ত মেধাবী’
৩৪তম সিজনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ নতুন কুইজ শো ‘দুরন্ত মেধাবী’। ২৬ পর্বের এই অনুষ্ঠানে সারা দেশ থেকে বাছাই করা মেধাবী শিশু-কিশোরেরা অংশ নিচ্ছে। অনুষ্ঠানটির কাঠামো সাজানো হয়েছে পাঁচটি চ্যালেঞ্জিং রাউন্ডে। প্রতিটি রাউন্ডে তিনটি করে প্রশ্ন, যেখানে শুধু বইয়ের পড়া নয়; বরং প্রতিযোগীর উপস্থিত বুদ্ধি, বিশ্লেষণক্ষমতা, ধাঁধা সমাধানের দক্ষতা এবং চারপাশের বিশ্ব সম্পর্কে জানাশোনাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি ধাপ পেরোতে পারলেই থাকছে পুরস্কার এবং পরের রাউন্ডে খেলার সুযোগ। চূড়ান্ত রাউন্ডে প্রতিযোগীদের খেলতে হবে ‘হাই রিস্ক’ নিয়ে, যেখানে জিতলে মিলবে মেগা পুরস্কার।

কুইজের ফাঁকে ফাঁকে প্রতিযোগীদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও মজার গল্প অনুষ্ঠানটিকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলবে। জামাল হোসেন পরিচালিত এবং পার্থ প্রতিম হালদারের সঞ্চালনায় ‘দুরন্ত মেধাবী’ প্রচার শুরু হবে ৩০ জানুয়ারি থেকে প্রতি শুক্র ও শনিবার দুপুর ১২টা ও রাত ৯টায়।

পাপেট, শেখা আর বর্ণমালার আনন্দ
শিশুদের শেখার আনন্দকে গল্পের ভেতর দিয়ে তুলে ধরছে পাপেট ধারাবাহিক ‘বর্ণমালার ঘর’। একটি পাপেট পরিবার ও তাদের আশপাশের চরিত্রদের দৈনন্দিন জীবনের গল্পে গল্পে শেখানো হবে বাংলা বর্ণমালা। সঙ্গে থাকবে গান, অ্যানিমেশন ও অক্ষর দিয়ে অরিগ্যামি। এ অনুষ্ঠানে অভিনয় করেছেন সৈয়দ হাসান ইমাম, চিত্রলেখা গুহ, আনন্দ খালেদ, আনোয়ারুল আলম সজল ও রোকসানা রুমা। পার্থ প্রতিম হালদার ও জামাল হোসেন আবির পরিচালিত ‘বর্ণমালার ঘর’ প্রচার শুরু হবে ২৫ জানুয়ারি।

কল্পনা, রূপকথা ও অ্যাডভেঞ্চারের কার্টুনজগৎ
নতুন সিজনে দুরন্ত টিভির পর্দায় ফিরে আসছে একাধিক জনপ্রিয় কার্টুন সিরিজ। এর মধ্যে রয়েছে রূপকথা আর জাদুর মিশেলে কিশোরী মেয়ের অভিযানের গল্প ‘মিয়া অ্যান্ড মি’, প্রাণীদের দলগত বন্ধুত্ব ও সমস্যার সমাধানের গল্প ‘জিগি অ্যান্ড দ্য জুট্রাম’, জাদুর বেল্ট নিয়ে ট্রিটোপলিসে উড়ে বেড়ানো টমের কাহিনি ‘ট্রি ফু টম’ এবং ছোট্ট ড্রাগনদের দুষ্টুমি আর বন্ধুত্বের গল্প ‘কোকোনাট দ্য লিটল ড্রাগন’।
এ ছাড়া দেখা যাবে সাহসী কুকুরের অভিযানের গল্প ‘ল্যাসি–সিজন ২’, ঐতিহাসিক ও রোমাঞ্চকর ‘ভিক দ্য ভাইকিং’, প্রকৃতি ও বন্ধুত্বের গল্প ‘হাইডি’, হাস্যরসাত্মক ‘বিগ অ্যান্ড স্মল’, বহুল জনপ্রিয় ‘দ্য স্মার্ফস’ ও ‘মায়া দ্য বি’। প্রতিটি কার্টুনেই রয়েছে বন্ধুত্ব, সাহস, সহমর্মিতা ও নৈতিক শিক্ষার বার্তা।

শিল্প, ব্যায়াম ও আনন্দের সময়
হাতের কাছে থাকা সাধারণ উপকরণ দিয়ে সৃজনশীল কিছু তৈরি করার কৌশল শেখাবে ক্র্যাফটিং অনুষ্ঠান ‘দ্য আর্ট রুম’। এখানে লালনের সঙ্গে থাকবে তার বন্ধু বিপিন, যে গান আর মজার কথায় অনুষ্ঠানকে প্রাণবন্ত করে তোলে। শিশুদের সুস্থতা ও সক্রিয়তার কথা মাথায় রেখে ফিরছে ‘দুরন্ত সময়–সিজন ৩’। ছড়া ও গানের তালে সহজ ব্যায়াম, যোগব্যায়াম, ক্র্যাফট, ছবি আঁকা এবং অতিথির গল্প—সব মিলিয়ে এটি হয়ে উঠেছে শেখা আর আনন্দের এক সুন্দর মেলবন্ধন।

সিনেমার পর্দায় বাড়তি আনন্দ
নতুন সিজনে ‘দুরন্ত সিনেমা’ সময়ে প্রচারিত হবে দেশি ও বিদেশি নানা জনপ্রিয় শিশুতোষ সিনেমা। ছুটির দিনে পরিবারসহ বসে দেখার মতো এসব সিনেমা ছোটদের কল্পনা ও আনন্দের জগৎকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তির ভাষ্য অনুযায়ী, সব মিলিয়ে নতুন কুইজ, কার্টুন, পাপেট শো, ব্যায়াম ও সিনেমার সমাহারে শিশু-কিশোরদের জন্য আনন্দঘন এক মৌসুম উপহার দিতে যাচ্ছে দুরন্ত টিভির ৩৪তম সিজন।

রয়েছে জাদুর বেল্ট নিয়ে ট্রিটোপলিসে উড়ে বেড়ানো টমের কাহিনি ‘ট্রি ফু টম’
রয়েছে জাদুর বেল্ট নিয়ে ট্রিটোপলিসে উড়ে বেড়ানো টমের কাহিনি ‘ট্রি ফু টম’। দুরন্ত টিভি

তাহাজ্জুদের পরেই তারা সিল মারার পরিকল্পনা করছে: নাহিদ ইসলাম

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করে বলেছেন, বলা হচ্ছে তাহাজ্জুদ নামাজের পর ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত থাকতে। তাহজ্জুদের পরেই তারা সিল মারার পরিকল্পনা করছে। ভোটকেন্দ্র দখলের পাঁয়তারা করছে। তিনি বলেন, ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশের নেতা–কর্মীরা এসব ষড়যন্ত্র রুখে দেবেন।

সোমবার রাত ৯টার দিকে লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ) আসনের রামগঞ্জ পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয় মাঠে এক সমাবেশে এ কথা বলেন নাহিদ ইসলাম।

নাহিদ ইসলাম বলেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি যাতে ভোটাররা উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেন, সে জন্য ১১–দলীয় জোটের নেতা–কর্মীরা ভোটকেন্দ্র পাহারায় থাকবেন। যারা ভোটদানে বাধা সৃষ্টি করবে কিংবা নানামুখী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হবে, তাদের কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, ‘কৃষক কার্ড ও ফ্যামিলি কার্ড একটি প্রতারণার প্যাকেজ। বাংলাদেশের সংকট এখন ফ্যামিলি কার্ড নয়। দেশের প্রকৃত সংকট হলো অর্থনীতিকে চাঙা করা, ঋণখেলাপি ও লুটেরাদের বিচারের আওতায় আনা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা। আমরা এসব বিষয় সামনে রেখে পরিকল্পনা ও ইশতেহার নিয়ে কথা বলছি।’

নাহিদ ইসলাম বলেন, এনসিপি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলছে। নির্বাচনের সময় ঘরে ঘরে গিয়ে মানুষের আস্থা অর্জন এবং ভোটের দিন সবাইকে কেন্দ্রে আনার জন্য নেতা–কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বানও জানান নাহিদ ইসলাম।

নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, এবারের নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদলের নয়; এটি রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কার, গণতন্ত্র ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার নির্বাচন।

সমাবেশে নাহিদ ইসলাম এনসিপির প্রার্থী মাহবুব আলমের পক্ষে শাপলা কলি প্রতীকে ভোট চান। মাহবুব আলম সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের ভাই। তিনি রামগঞ্জ উপজেলা বিএনপির ইছাপুর ইউনিয়ন শাখার সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমানের ছেলে।

সমাবেশ শেষে নাহিদ ইসলাম দলীয় প্রার্থী মাহবুব আলমকে শাপলাকলি প্রতীক হাতে তুলে দিয়ে উপস্থিত জনতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন।

সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন রামগঞ্জ উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির নাজমুল হাসান পাটোয়ারী। বক্তব্য দেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র ও কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সজীব ভুইয়া, কেন্দ্রীয় যুবশক্তির আহ্বায়ক তারিকুল ইসলাম, লক্ষ্মীপুর-১ আসনের প্রার্থী ও এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাহবুব আলমসহ অন্যরা।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-26%2Fmijh6jhk%2FNahid.jpg?rect=0%2C58%2C1280%2C853&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয় মাঠে সমাবেশে বক্তব্য দেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। আজ রাতে। ছবি: প্রথম আলো

ট্রাম্পের ‘অপমানজনক’ বক্তব্যে ক্ষুব্ধ ইউরোপ

* স্টারমার বলেন, ট্রাম্পের এই মন্তব্য শুধু অপমানজনক নয়, বরং অত্যন্ত নিন্দনীয়। যাঁরা স্বজনদের হারিয়েছেন, তাঁদের মনে এই বক্তব্য গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে।

* ট্রাম্পের পক্ষ নিয়ে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র টেলর রজার্স বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একদম সঠিক কথা বলেছেন।

আফগানিস্তান যুদ্ধে ন্যাটোভুক্ত দেশের সেনারা সম্মুখসমরে না থেকে ‘পেছনে নিরাপদ দূরত্বে’ ছিলেন বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এমনিতেই গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে ট্রাম্পের উত্তেজনা চলছে। এবার ন্যাটো সদস্যদের নিয়ে তাঁর এমন মন্তব্যের কঠোর সমালোচনা করেছেন ন্যাটোভুক্ত বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশের নেতারা। তাঁরা ট্রাম্পকে এমন বক্তব্যের জন্য ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

গত বৃহস্পতিবার ফক্স নিউজে সম্প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, আফগান যুদ্ধে ন্যাটোর সদস্যদেশগুলো খুব একটা সাহসী ভূমিকা রাখেনি। তিনি বলেন, তারা (ন্যাটোভুক্ত দেশ) বলবে যে আফগানিস্তানে সেনা পাঠিয়েছিল। পাঠিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তারা সম্মুখসমর থেকে কিছুটা দূরে নিরাপদ অবস্থানে থাকত।

ট্রাম্পের এসব মন্তব্যে যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার নিহত ব্রিটিশ সেনাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেছেন, ‘আফগানিস্তানে আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর ৪৫৭ জন সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। আরও অনেকে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন।’

স্টারমার বলেন, ট্রাম্পের এই মন্তব্য শুধু অপমানজনক নয়, বরং অত্যন্ত নিন্দনীয়। যাঁরা তাঁদের স্বজনদের হারিয়েছেন, তাঁদের মনে ট্রাম্পের এই বক্তব্য গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে। তিনি নিজে এমন ভুল তথ্য দিলে অবশ্যই ক্ষমা চাইতেন।

তবে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর এই সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করেছে হোয়াইট হাউস। ট্রাম্পের অবস্থানের পক্ষ নিয়ে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র টেলর রজার্স এএফপিকে বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একদম সঠিক কথা বলেছেন। ন্যাটো জোটের অন্য সব দেশ সম্মিলিতভাবে যা করেছে, যুক্তরাষ্ট্র একাই তার চেয়ে বেশি করেছে।

যুক্তরাজ্যের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২১ সালের আগস্ট পর্যন্ত আফগানিস্তানে ১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি ব্রিটিশ সেনা দায়িত্ব পালন করেছেন। যুদ্ধে প্রাণ হারানো ৪৫৭ জন ব্রিটিশ সেনার মধ্যে ৪০৫ জনই সরাসরি শত্রুসেনার হামলায় নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ২ হাজার ৪০০ জনের বেশি সেনা প্রাণ হারিয়েছেন বলে দেশটি জানিয়েছে।

যুক্তরাজ্যজুড়ে ট্রাম্পের সমালোচনা

শুধু স্টারমার নন, ট্রাম্পের এমন বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছেন যুক্তরাজ্যের বর্তমান ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তারা। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি এক্সে (সাবেক টুইটার) নিহত সেনাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে লিখেছেন, তাঁরা ছিলেন বীর। তাঁরা জাতির সেবায় নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন।

যুক্তরাজ্যের সশস্ত্র বাহিনীবিষয়ক মন্ত্রী আল কার্নস আফগানিস্তানে পাঁচটি মিশনে সরাসরি যুদ্ধ করেছেন। তিনি ট্রাম্পের দাবিকে ‘পুরোপুরি হাস্যকর’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। কনজারভেটিভ পার্টির নেতা কেমি বেইডনক ট্রাম্পের বক্তব্যকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে আখ্যা দিয়েছেন। এটি ন্যাটো জোটকে দুর্বল করে দিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি। আফগান যুদ্ধে সম্মুখসমরে অংশ নেওয়া ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য প্রিন্স হ্যারিও এক বিবৃতিতে ট্রাম্পের সমালোচনা করেছেন।

জোটের ইউরোপীয় নেতাদের ক্ষোভ

এমনিতেই গ্রিনল্যান্ড দখল নিয়ে তাঁর সাম্প্রতিক বক্তব্য চরমে পৌঁছেছে। ট্রাম্পের এমন মন্তব্য ইউরোপজুড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। নেদারল্যান্ডসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ভ্যান উইল আফগানিস্তান নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্যের নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, এসব বক্তব্য অসত্য ও অসম্মানজনক। পোল্যান্ডের অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ও সাবেক বিশেষ বাহিনীর কমান্ডার রোমান পোলকো আফগানিস্তান ও ইরাকে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি রয়টার্সকে বলেন, ‘এই জোটের জন্য আমরা রক্ত দিয়ে মূল্য দিয়েছি। আমরা সত্যিই আমাদের জীবন উৎসর্গ করেছি।’

ন্যাটোর চুক্তি অনুযায়ী কোনো সদস্যদেশের ওপর আক্রমণ হলে সেটি সবার ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হয়। পোল্যান্ডের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিস্লাভ কোসিনিয়াক বলেছেন, আফগান যুদ্ধে পোল্যান্ডের ত্যাগ ‘কখনোই ভুলে যাওয়া যাবে না এবং তা খাটো করে দেখানোরও সুযোগ নেই।’

অপরদিকে ডেনমার্কের পার্লামেন্টের বিরোধী দল কনজারভেটিভ পার্টির সদস্য রাসমুস জারলভ ট্রাম্পের এমন বক্তব্যকে ‘অজ্ঞতাপূর্ণ’ বলে মন্তব্য করেছেন। যুদ্ধে ডেনমার্ক তাদের ৪৪ জন সেনাকে হারিয়েছে, যা ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে জনসংখ্যা অনুপাতে অন্যতম সর্বোচ্চ মৃত্যুহার। এ ছাড়া ফ্রান্সের ৯০ জন সেনা এবং জার্মানি, ইতালি ও অন্যান্য দেশের অনেক সেনা প্রাণ হারিয়েছেন।

ইউরোপের বাইরে আফগানিস্তানে ১৫০ জনের বেশি কানাডীয় সেনা নিহত হয়েছেন।

২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুদ্ধে অন্তত ৪৬ হাজার ৩১৯ জন আফগানিস্তানের নাগরিক নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে অসুস্থ, খাদ্য, পানি এবং অবকাঠামো সুবিধার অভাবে সৃষ্ট পরোক্ষ মৃত্যু অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি: এএফপি

৮ ঘণ্টার বৈঠকে হঠাৎ কীভাবে এলেন সাকিব by মাহমুদুল হাসান

গত শনিবার বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) পরিচালকদের সভা হয়েছে প্রায় আট ঘণ্টা। দীর্ঘ এ আলোচনার এক ফাঁকে অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানকে জাতীয় দলে আবার খেলানোর কথা তোলেন প্রভাবশালী এক পরিচালক, তাঁকে সমর্থন দেন আরও দুজন। হঠাৎ তাঁদের ওই আলোচনা তুলতে দেখে বিস্মিত হন বৈঠকে উপস্থিত কেউ কেউ।

সাধারণত বোর্ড পরিচালকদের সভায় কী কী আলোচনা হবে, তা আগেই জানিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু সেদিন সবাইকে সাকিবের বিষয়টি জানানো হয়নি। সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে এসে বিসিবি পরিচালক আমজাদ হোসেন দাবি করেন, পরিচালকদের ‘সর্বসম্মতিক্রমে’ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সাকিব এখন থেকে জাতীয় দলে খেলার জন্য বিবেচিত হবেন।

টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের না খেলা, পরিচালক ইশতিয়াক সাদেকের পদত্যাগের আলোচনার ভিড়ে হঠাৎ তাঁর এমন ঘোষণায় বিস্ময় ছড়িয়ে পড়ে সবার মধ্যে। সংবাদ সম্মেলনেই জানানো হয়, সাকিবের ‘ফর্ম-ফিটনেস’ ঠিকঠাক থাকলে, নির্বাচকেরা চাইলে দলে নিতে পারবেন তাঁকে। সঙ্গে বলা হয় আরও একটি শর্তের কথাও, ‘যে ভেন্যুতে খেলা হবে, সেখানে উপস্থিত থাকার সক্ষমতা থাকতে হবে।’

সাকিবের জাতীয় দলে খেলা নিয়ে জটিলতা এখানেই। বাংলাদেশের মাঠে খেলার ‘সক্ষমতা’  তাঁর তো প্রায় দেড় বছর নেই। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের সময়টায় সাকিব ছিলেন দেশের বাইরে। এরপর আর দেশে ফিরতে পারেননি নৌকা প্রতীকে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য হওয়া সাকিব। বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের আরও অনেকের মতো সাকিবের নামেও হত্যা মামলা হয়েছে, তাঁর বিরুদ্ধে শেয়ার কেলেঙ্কারির অভিযোগ আছে, আছে দুদকের মামলাও। এমনকি জারি হয়েছে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। দেশে এলে এসব মামলায় গ্রেপ্তার হতে পারেন সাকিব। তাই জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকেই তিনি ‘প্রবাসী’।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের বিপক্ষে সর্বশেষ জাতীয় দলের হয়ে খেলেছিলেন। ওই বছরের অক্টোবরে দেশের মাঠে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্ট খেলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানানোর কথা ছিল তাঁর। সেই ম্যাচ খেলার জন্য দেশের পথে থাকলেও পরে নিরাপত্তাশঙ্কায় তাঁকে থমকে যেতে হয় মাঝপথেই। এরপর আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাকিবের দেওয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক পোস্ট নিয়েও আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে।

সেসবের পরিপ্রেক্ষিতে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া গত বছরের সেপ্টেম্বরে স্পষ্ট করেই জানিয়েছিলেন, সাকিবকে দেশে ফিরতে না দিয়ে তিনি সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছেন। এটাও বলেছিলেন, সাকিবকে আর বাংলাদেশের পতাকা বহন করতে দেওয়া যাবে না। সাকিব যাতে আর বাংলাদেশের হয়ে খেলতে না পারেন, সেই স্পষ্ট নির্দেশনাও তিনি বোর্ডকে দিয়েছেন বলে জানান।

আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়ার পদত্যাগের পর ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পান অধ্যাপক আসিফ নজরুল। এখন কি সাকিবের ব্যাপারে সরকারের অবস্থান বদলেছে? সংবাদ সম্মেলনে বিসিবির পক্ষ থেকে এ প্রশ্নের কোনো সরাসরি উত্তর দেওয়া হয়নি। বিসিবির পক্ষ থেকে শুধু জানানো হয়, দেশের হয়ে আবার খেলার জন্য সাকিবের বাধাগুলো নিয়ে সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সভাপতি আমিনুল ইসলামকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

তবে বিসিবির একটি সূত্রের দাবি, এ আলোচনা শুরু হয়েছে আরও ১০-১২ দিন আগে। নিরাপত্তা–সংকটে ভারতে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ না খেলতে চাওয়ার সিদ্ধান্তের সময় সরকারের সঙ্গে সাকিবকে খেলানোর বিষয়ে যোগাযোগ করা হয় বিসিবির পক্ষ থেকে। সাকিবের ব্যাপারে সরকারের কয়েক মাস আগের অবস্থান এখন বদলে গেছে বলে মনে করে বিসিবি সূত্র। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন পরিচালকের দাবি, সরকারের কাছ থেকে সবুজ সংকত পেয়েই বিসিবি সাকিবকে খেলানোর বিষয়টি সামনে এনেছে।
সাকিবও কয়েকটি সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, দেশের মাটিতে খেলেই তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরে যেতে চান। তাঁর সেই চাওয়া এখন বিসিবিও পূরণ করতে চায়। নতুন করে বিসিবর এ অবস্থানের বিষয়ে মন্তব্য জানতে সাকিবের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।

টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ না খেলার বিষয়টি আড়াল করতেই সাকিবকে হঠাৎ খেলানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে কি না, এমন প্রশ্ন উঠেছে। অন্তর্বর্তী সরকার আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর বিদায় নেবে, এই সময়ের মধ্যে সাকিবের মামলাগুলো কীভাবে সরিয়ে নেওয়া হবে—এসব প্রশ্নের উত্তরও নেই বিসিবির কারও কাছে।

সাকিব কি তাঁর মামলাগুলো প্রত্যাহার না হলে দেশে এসে খেলতে রাজি হবেন? গ্রেপ্তার হওয়ার ঝুঁকি নেবেন? যদি এসব বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা তিনি না পান, তাহলে তাঁকে দলে বিবেচনার ক্ষেত্রে যে শর্তগুলোর কথা বলা হয়েছে, সেসবের সঙ্গে তার আগের বাস্তবতার কোনো পার্থক্য নেই।

এসব ব্যাপারে বিসিবির কয়েকজন পরিচালকের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তাঁদের দাবি, সাকিবকে খেলানোর বিষয়ে সরকারের বর্তমান দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা এখন ইতিবাচক। তাঁর আইনি জটিলতাগুলো সমাধানের আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়ে সরকারের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সাকিব এলে তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হবে, ঝিমিয়ে পড়া ক্রিকেটের জন্য তা জরুরি। তাতে বিশ্বকাপ না খেলতে পারার যে আক্ষেপ, সেটাও কিছুটা আড়ালে যাবে হয়তো। তবে এর সঙ্গে ক্রিকেটীয় ব্যাপারও আছে—সাকিব সাদা বলের ক্রিকেটে আরও কিছুদিন ভালোভাবেই খেলতে পারবেন বলে মনে করে বোর্ড।

বর্তমানে বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে খেলে বেড়ানো সাকিবের ফর্ম ও ফিটনেস নিয়েও তাদের তেমন সংশয় নেই। সর্বশেষ আইএল টি-টুয়েন্টি পর্যন্ত সব কটি টুর্নামেন্টই সাকিব খেলেছেন বিসিবির কাছ থেকে অনাপত্তিপত্র নিয়ে।

সাকিব যদি শেষ পর্যন্ত দেশে আসেন এবং জাতীয় দলের হয়ে খেলেন, সে ক্ষেত্রে ওয়ানডেকে তিনি যেন গুরুত্ব দেন, বোর্ডের চাওয়া থাকবে সেটি। এ বছর টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলা হচ্ছে না বাংলাদেশের, পরের বৈশ্বিক টুর্নামেন্ট ২০২৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ।

কিন্তু এই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের সরাসরি খেলা নিয়েও ঝুঁকি আছে। ওই বছরের ৩১ মার্চের মধ্যে বাংলাদেশকে র‍্যাঙ্কিংয়ের সেরা দশে থাকতে হবে। সাকিব এ ক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারেন বলে মনে করে বোর্ড। তবে এর আগে অনেক যদি-কিন্তু পাড়ি দিতে হবে সাকিব ও বিসিবিকে।

সাকিব আল হাসান
সাকিব আল হাসান। প্রথম আলো