Thursday, October 1, 2009

চূড়ান্ত খসড়া প্রসঙ্গে কিছু বিনীত প্রশ্ন by কাবেরী গায়েন

শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ শিক্ষানীতির ২০০৯-এর চূড়ান্ত খসড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে তুলে দিয়েছেন এবং দেশবাসীর মন্তব্য আহ্বান করে খসড়া নীতিটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়েছে, ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যে কেউ মতামত দিতে পারবেন। ওয়েবসাইট ছাড়াও অন্যান্য কার্যকর ফোরামে, যেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশযোগ্যতা এবং মতামত ধারণ সম্ভব, এই খসড়াটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। বাংলাদেশের কত শতাংশ মানুষের পক্ষেই বা ওয়েবসাইট থেকে এত বড় শিক্ষানীতি ডাউনলোড করে পড়ে ওয়েবসাইটেই মতামত দেওয়া সম্ভব?
সরকার থেকে বলা হচ্ছে, এটি একটি যুগান্তকারী নীতি। মৌলিক, বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা হয়েছে। এটিকে উচ্চাভিলাষী শিক্ষানীতিও বলছেন কেউ কেউ। বিশেষ করে মাধ্যমিক পর্যন্ত সাধারণ শিক্ষা, মাদ্রাসা শিক্ষা এবং ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষায় কতগুলো মূল বিষয়ের অভিন্ন পাঠ্যক্রম সুপারিশ এবং তার মাধ্যমে বিভিন্ন ধারার মধ্যে একটি সমন্বয় চেষ্টা প্রশংসনীয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্তিও অভিনন্দনযোগ্য। শিক্ষানীতির চূড়ান্ত খসড়া পাঠ শেষে আমি কিছু প্রশ্নে আলোড়িত হচ্ছি, বিশেষ করে ঘোষিত নীতি এবং কৌশলের মধ্যে অসংগতির বিষয়ে, সেসব প্রশ্নের বিনীত উত্থাপনই এই লেখার উদ্দেশ্য।
শিক্ষা-দর্শনটি কী?
যেকোনো শিক্ষানীতিরই একটি দর্শন থাকা জরুরি এবং থাকেও। সেই দর্শনটি, বলাই বাহুল্য, মূলত ক্ষমতাসীন সরকার কীভাবে তার জনগণ ও রাষ্ট্রের শিক্ষা প্রয়োজনকে দেখে তার প্রতিফলন। প্রস্তাবিত শিক্ষানীতির চূড়ান্ত খসড়ায় এই দর্শনটি খুব পরিষ্কার নয়। ভূমিকায় বলা হয়েছে, ‘আজকের পৃথিবী দ্রুত পরিবর্তনশীল, তীব্র এর ছুটে চলার গতি, প্রবল প্রতিযোগিতাপূর্ণ এর যাবতীয় অর্থনৈতিক বিধিব্যবস্থা ও কর্মকাণ্ড। অগ্রসরমাণ প্রক্রিয়া এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির, বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তির বৈপ্লবিক বিকাশ বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থাকে বাংলাদেশের মতো একটা উন্নয়নশীল দেশের জন্য আরও কঠিন চ্যালেঞ্জের ব্যাপার করে তুলছে। এ হেন পৃথিবীতে ‘যোগ্যতমের টিকে থাকা’ কথাটা বিজ্ঞানীর কল্পনা নয়, অতি নির্মম, কঠিন, বাস্তব সত্য বটে। আর এই পৃথিবীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে কেবল টিকে থাকা বা কোনোমতে আত্মরক্ষাই নয়; বরং দৃঢ় পদক্ষেপে উন্নত শিরে এগিয়ে যেতে হলে শিক্ষা ও দক্ষতায় বলীয়ান, শক্ত মেরুদণ্ডের অধিকারী হতে হবে।’ (পৃ. ৩)। আপাতদৃষ্টিতে বাক্যগুলো চমত্কার। প্রশ্ন হলো, এই শিক্ষানীতি তবে কোন উদ্দেশে প্রণীত? ‘বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থা’র চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য, ‘এই পৃথিবীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে’ চলার জন্য, “এহেন পৃথিবীতে ‘যোগ্যতমের টিকে থাকা’র জন্য”, নাকি আজ থেকে পাঁচ/দশ/পনের/কুড়ি বছর পরে দেশকে কোন জায়গায় দেখতে চাই, সে ব্যাপারে একটি দিকনির্দেশনা এবং কর্মকৌশল পাওয়ার জন্য? দর্শন হিসেবে ‘যোগ্যতমের টিকে থাকা’র নীতি খুব গ্রহণযোগ্য মানবিক নীতি বোধহয় নয়। কার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে ‘যোগ্যতমের টিকে থাকা’ প্রতিষ্ঠিত করব আমরা? ‘বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থা’র চ্যালেঞ্জগুলো আসলে কী? কিছু বলা হয়নি এ বিষয়ে। তাদের মোকাবিলাই বা কী? বিশ্ব পুঁজিবাদের চূড়ান্ত অবস্থানে অবস্থান করছে যেসব দেশ, সেসব দেশের পাঠ্যক্রমকে আমার দেশের শিক্ষানীতিতে ঢুকিয়ে দেওয়া, তাদের যেসব বাজার উন্মুক্ত হচ্ছে এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে, সেসব বাজারে ঢোকার যোগ্যতা অর্জন সস্তা শ্রমিক হিসেবে, নাকি এই উন্মুক্ত বাজারের আগ্রাসনের মুখে নিজস্ব মেধা, সম্পদ আর নীতির সৃজনশীল বিকাশ ঘটিয়ে দেশকে একটি পর্যায়ে উন্নীত করার চেষ্টা? শিক্ষানীতিটি কি আমার দেশের সম্পদের সাপেক্ষে, আমার প্রয়োজনকে সর্বোচ্চ বিবেচনায় রেখে, নাকি বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলানোর জন্য, তাদের চাহিদার সাপেক্ষে? এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর মীমাংসা খুবই জরুরি। বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের পদ্ধতিগত অনেক সুপারিশ এই খসড়া নীতিমালায় পাওয়া গেলেও দশ/পনের/কুড়ি বছর পরে দেশকে ঠিক কোন জায়গায় দেখতে চাই, সে ব্যাপারে কোনো পরিষ্কার ছবি শিক্ষানীতির এই খসড়ায় পাওয়া যায় না। শিক্ষানীতির মৌলিক দর্শনটি কী হবে সেটি ফয়সালা করে নেওয়া হয়নি বা নেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলাফলও তাই অস্বচ্ছই থেকে গেছে।
বৃত্তিমূলক শিক্ষার লক্ষ্য কি কেবল রেমিট্যান্স অর্জন?
খসড়া নীতিতে বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষার ওপর জোরারোপ করা হয়েছে। সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত যেখানে ১:৩০, বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষার ক্ষেত্রে সেটি ১:১২। উদ্দেশ্য হিসেবে রেমিট্যান্স অর্জনের কথা বলা হচ্ছে একেবারে ভূমিকা থেকে। তাই ‘আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে চাহিদা রয়েছে এমন দক্ষতা অর্জনের’ ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। (পৃ. ৪)। এমনকি বয়স্ক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার ক্ষেত্রেও (পৃ. ১৯) ‘স্থানীয় ও প্রবাসী জনমানুষের চাহিদা’কে বিবেচনায় নেওয়ার সুপারিশ। তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষায় বলা হয়েছে, ‘তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ জনশক্তি সরবরাহসহ সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাত হিসেবে সফটওয়্যার, ডেটা প্রসেসিং বা কলসেন্টার জাতীয় service industry বিকাশে আলাদাভাবে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা আছে।’ (পৃ. ৪০)। রেমিট্যান্স অর্জনের জন্য সরকারি উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই; স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা হিসেবে এসবের কার্যকারিতা আছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, শুরুতে কলসেন্টারগুলোতে চীনের প্রাধান্য ছিল, ওখানে মজুরি চাহিদা বেড়ে গেলে ভারত সে স্থান দখল করতে থাকে, হয়তো আরও সস্তা মজুরির কারণে আমাদের দেশেও এই কলসেন্টারগুলো প্রসারিত হচ্ছে। কী হবে যদি কিছু দিন বাদে সোমালিয়ায় আরও সস্তা মজুরি পাওয়া যায়? বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষায় যেহেতু বিপুল বিনিয়োগ করা হবে, তাই ‘আন্তর্জাতিক চাহিদা’ মিটিয়ে রেমিট্যান্স আয়ের পাশাপাশি সেখান থেকে আমাদের জাতীয় সম্পদ তৈরির এবং সেখানে তাদের কীভাবে নিয়োজিত করা যাবে তার কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রাখা যায় কি না ভাবতে হবে। যদি এই শিক্ষার লক্ষ্য হয় বাংলাদেশের বাজার ও তার বিস্তার, তাহলে কিন্তু ফোকাসটি কৃষিকেন্দ্রিক হওয়ার কথা। কৃষিভিত্তিক কারিগরি শিক্ষার বিস্তার এখনো সেভাবে ঘটেনি। পাট ও প্রাকৃতিক তন্তুর ব্যবহারের ব্যাপারে যখন সারা পৃথিবীতে সচেতনতা এবং অঙ্গীকার তৈরি হচ্ছে, সেই বাজারটি ধরার জন্য আমার কারিগরি শিক্ষার ফোকাসটি আছে কি না, আমার কাছে সেটি জরুরি। পুঁজিঘন প্রযুক্তির দেশগুলো ভারী শিল্প থেকে সার্ভিস সেক্টর ইকোনমিতে ঢুকেছে সত্তরের দশক থেকে তাদের অর্থনৈতিক বিকাশের গতিধারায়, আমার অবস্থা কি তা-ই? আমাদের ভুলে যাওয়া বোধহয় ঠিক হয় না উত্তর-ঔপনিবেশিক দেশগুলো, এক ভারত ছাড়া উন্নয়নের আন্তর্জাতিক প্রেসক্রিপশনে এবং আন্তর্জাতিক চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে নিজস্ব শিক্ষা কিংবা অর্থনীতি কোনোটিই আর গড়ে তুলতে সক্ষম হয়নি।
শিক্ষানীতিটি কি ‘সেক্যুলার’?
খসড়া নীতির প্রথম অধ্যায় শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য। এখানে প্রথম স্তবকেই বলা হয়েছে, ‘এই শিক্ষানীতি সংবিধানের নির্দেশনা অনুযায়ী দেশে সেক্যুলার, গণমুখী, সুলভ, সুষম, সর্বজনীন, সুপরিকল্পিত এবং মানসম্পন্ন শিক্ষাদানে সক্ষম শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার ভিত্তি ও রণকৌশল হিসেবে কাজ করবে।’ (পৃ. ৭)। খুবই আশাব্যঞ্জক প্রস্তাবনা, ছাত্রসমাজের দীর্ঘদিনের আন্দোলনেও একটি সেক্যুলার শিক্ষানীতির দাবি বরাবরের। এই আশা হোঁচট খায় মাত্র দুই পৃষ্ঠা পরেই। অধ্যায় দুই, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার চার নম্বর কৌশলে বলা হয়েছে, ‘মসজিদ, মন্দির ও প্যাগোডায় ধর্ম মন্ত্রণালয় কর্তৃক পরিচালিত সব ধর্মের শিশুদের ধর্মীয় জ্ঞান, অক্ষরজ্ঞানসহ আধুনিক শিক্ষা ও নৈতিকতা শিক্ষা প্রদানের কর্মসূচি প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার অংশ হিসেবে গণ্য করা হবে।’ (পৃ. ১০)। বুঝতে সত্যিই অসুবিধা হচ্ছে, জীবনের শুরুতেই, এমনকি অক্ষরজ্ঞানেরও আগে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী শিশুদের ভিন্ন ভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ে পাঠিয়ে ‘ধর্মীয় জ্ঞান, অক্ষরজ্ঞানসহ আধুনিক শিক্ষা ও নৈতিকতা শিক্ষা প্রদানের’ কর্মসূচি জারি রেখে কীভাবে একটি শিক্ষানীতিকে ‘সেক্যুলার’ শিক্ষানীতি দাবি করা সম্ভব। ‘ধর্মীয় জ্ঞান’ না হয় এসব ধর্মীয় উপাসনালয় দিতে পারে, ‘আধুনিক শিক্ষা ও নৈতিকতা শিক্ষা প্রদানের কর্মসূচি’ কীভাবে এসব উপাসনালয়ের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায়? আর পাঁচ বছরের শিশুদের আলাদা উপাসনালয়ে সোপর্দ করে ‘ধর্মীয় জ্ঞান’ দেওয়া কীভাবে একটি ‘সেক্যুলার’ শিক্ষানীতির অংশ হতে পারে? খসড়া নীতির ভূমিকায় বলা হয়েছে, নীতিটি প্রণয়নের ক্ষেত্রে কুদরাত-এ-খুদা কমিশনের রিপোর্ট (১৯৭৪) বিশেষভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। খুদা কমিশনের রিপোর্টে (৬.৭) এ বিষয়ে বলা হয়েছিল, “প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার জন্য আমাদের দেশে প্রয়োজনমতো ‘শিশু ভবন’ ও ‘শিশু উদ্যান’ স্থাপন করা যেতে পারে।” খুদা কমিশনের রিপোর্টে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্গে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের কোনো ধরনের যোগসূত্র রাখা হয়নি।
প্রাথমিক শিক্ষায় তৃতীয় শ্রেণী থেকেই ‘ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা’ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে সাধারণ শিক্ষার ক্ষেত্রে। ওদিকে প্রথম শ্রেণী থেকে ইংরেজি শিক্ষাও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বিনয়ের সঙ্গে বলি, মজিদ খানের শিক্ষানীতিতেও ঠিক এই দুই বিষয়ের একই মিশ্রণ ছিল।
(আগামীকাল শিক্ষার বহুমুখী ধারা ও মান)
ড. কাবেরী গায়েন: সহযোগী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
kgayenbd@yahoo.com

পিএসসি-২০০৮: সহজ পাঠ by মোহাম্মদ গোলাম রাব্বানী

গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৮ সালে বাংলাদেশের সমুদ্র অঞ্চলে প্রাকৃতিক জ্বালানি (বিজ্ঞানের অভিধানে হাইড্রোকার্বন) অনুসন্ধান এবং আবিষ্কৃত হলে উত্তোলনসংক্রান্ত একটি চুক্তিপত্র তৈরি করা হয়। এই চুক্তিপত্রেই তার নাম দেওয়া হয় ‘প্রোডাকশন শেয়ারিং কনট্রাক্ট’, যার সংক্ষিপ্ত নাম ‘পিএসসি-২০০৮’; যেটা এই লেখার শিরোনামের প্রথমাংশ এবং চুক্তিটির সহজ পাঠ এই লেখাটির বিষয়বস্তু। মূল চুক্তিপত্রটি এ-ফোর সাইজের ৭৩ পৃষ্ঠা এবং তাতে ৩৫টি অনুচ্ছেদ আছে এবং প্রতিটি অনুচ্ছেদে অনেক ধারা ও সেগুলোর অনেকটিরই উপধারা আছে, এই লেখায় চুক্তিপত্রটির আদ্যোপান্ত আলোচনা করা যাবে না। সে জন্য লিখতে হবে শতাধিক পৃষ্ঠার পুস্তক। লেখাটি অতি সংক্ষিপ্ত সহজ পাঠ এবং তাতেই চুক্তিপত্রটির অন্যায্য ও জনস্বার্থবিরোধী চরিত্র দিবালোকের মতো স্পষ্ট হবে এবং প্রিয় পাঠক-পাঠিকা, এতে আপনার ক্ষোভ আর ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ যে ঘটবে, সেটি আমি নিশ্চিত।
জ্বালানির সংজ্ঞা
চুক্তিপত্রটিতে লিখিত জ্বালানির সংজ্ঞা একই ধরনের হলেও সম্পূর্ণ এক নয়, যা হওয়া সঠিক হতো এবং সেখানেই প্যাঁচটি। ‘অভীষ্ট লক্ষ্য’ শিরোনামের ২ অনুচ্ছেদের ১ ধারায় বলা আছে, এই চুক্তিপত্রের উদ্দেশ্য ‘পেট্রোলিয়াম’ অনুসন্ধান করা। ‘সংজ্ঞাসমূহ’ শিরোনামের ১ অনুচ্ছেদের ৬৪ ধারায় বলা আছে, ‘পেট্রোলিয়াম’ অর্থ ‘হাইড্রোকার্বন’, সেটা গ্যাসীয় কিংবা তরল কিংবা নিরেট অবস্থায় থাকতে পারে। একই অনুচ্ছেদের ৪৯ ধারায় বলা আছে, ‘তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস’ অর্থ মাইনাস ১৬১ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে তরলীকৃত প্রধানত মিথেন গ্যাস। এখানে আমাদের জানা জরুরি, মিথেন গ্যাস একজাতীয় হাইড্রোকার্বন। গ্রামের বদ্ধ জলাশয়ের বাতাসে রাতে আচমকা যে আগুন জ্বলে ওঠে, যাকে আলেয়া বলি, সেটাই বাতাসের স্পর্শে জ্বলে ওঠা মিথেন গ্যাসের বুদ্বুদ। ‘প্রাকৃতিক গ্যাস’ শিরোনামের ১৫ অনুচ্ছেদের ৫ ধারার (গ) উপধারার অর্থ পেট্রোবাংলা অনুসন্ধানে পাওয়া প্রাকৃতিক গ্যাসের লভ্যাংশ পাবে। তাহলে কি সন্দেহ হয় না যে তরল হাইড্রোকার্বন, যার সহজ নাম পেট্রোলিয়াম, চুক্তির অন্তর্ভুক্ত কূপে পাওয়া গেলে বাংলাদেশ সেটা পাবে না? এই সন্দেহ আরও বেড়ে যায়, যদি ১ অনুচ্ছেদের ৫৮ ধারা পড়া যায়; যেখানে বলা আছে, ‘অয়েল অর্থাত্ তেল বলতে বোঝাবে তরল অবস্থায় হাইড্রোকার্বন, যার সাধারণ পরিচিতি অশোধিত তেল এবং যার অন্তর্ভুক্ত অশোধিত খনিজ তেল, অ্যাসফ্যাল্ট, ওজোকারাইট, বিটুমিন—কঠিন ও তরল উভয় অবস্থায়।’
ভাগাভাগি
প্রাকৃতিক গ্যাস শিরোনামের ১৫ অনুচ্ছেদের ৫ ধারার উল্লেখ এর আগে করেছি। এটি ভাগাভাগির অনুচ্ছেদ এবং গভীরভাবে লক্ষ করার বিষয়টি হচ্ছে অনুচ্ছেদটির শিরোনাম করা উচিত ছিল, ‘পেট্রোলিয়াম’, কিন্তু সেটা না করে লেখা হয়েছে ‘প্রাকৃতিক গ্যাস’। এর আগে বলেছি, চুক্তিপত্রে প্রাকৃতিক গ্যাস ও পেট্রোলিয়ামের কী অর্থ বা সংজ্ঞা দেওয়া আছে। ১৫ অনুচ্ছেদের শিরোনাম ওই সংজ্ঞা দুটি ও ১৫ অনুচ্ছেদের ৫ ধারার ১ উপধারা একত্রে বিবেচনা করলে এই চাতুরিটি সহজেই ধরা পড়বে যে চুক্তিভুক্ত কূপে যত রকমই খনিজ পদার্থ পাওয়া যাক না কেন, বাংলাদেশ তার ভাগে পাবে কেবল প্রাকৃতিক গ্যাসের লভ্যাংশ। সেটির পরিমাণ কত? প্রশ্নটির উত্তরে প্রথমে পড়তে হবে ১৫ অনুচ্ছেদের ৫ ধারার ১ উপধারা, যার সংক্ষিপ্ত বঙ্গানুবাদ: ‘বিক্রয়যোগ্য প্রাকৃতিক গ্যাস তরলীকৃত অবস্থায় এই অনুচ্ছেদের ৪, ৫ ও ৬ ধারার সাপেক্ষে রপ্তানি করার অধিকার ঠিকাদার কোম্পানির থাকবে। এই গ্যাসের পরিমাণভুক্ত থাকবে (ক) ঠিকাদারের প্রাপ্য কস্ট রিকভারি অর্থাত্ বিনিময়কৃত খরচ বাবদ প্রাকৃতিক গ্যাস, (খ) ঠিকাদারের প্রাপ্য লাভের প্রাকৃতিক গ্যাস ও (গ) পেট্রোবাংলার লাভের প্রাকৃতিক গ্যাস।’ এর পর পড়তে হবে একই অনুচ্ছেদের একই ধারার ৪ উপধারা, যার সংক্ষিপ্ত বঙ্গানুবাদ: ‘যে ক্ষেত্রে পেট্রোবাংলা স্থানীয় চাহিদা মেটাতে প্রয়োজনীয় পাইপলাইন স্থাপন করবে, সে ক্ষেত্রে পেট্রোবাংলার তার প্রাপ্য লাভের গ্যাস রাখার অধিকার থাকবে, তবে সেটার পরিমাণ কোনোক্রমেই বাজারজাত করা মোট গ্যাসের ২০ শতাংশের বেশি হবে না। প্রিয় পাঠক-পাঠিকা, লক্ষ করুন, উপরিউক্ত ভাগাভাগির ১ উপধারায় লাভের প্রাকৃতিক গ্যাস ঠিকাদার কোম্পানি ও পেট্রোবাংলার মধ্যে কে কী পরিমাণ পাবে, উল্লেখ করা হয়নি। তবে ৪ উপধারা পড়লে স্পষ্ট হয় যে উত্তোলিত প্রাকৃতিক গ্যাসের লাভের অংশে ঠিকাদার কোম্পানি ও পেট্রোবাংলা যথাক্রমে ৮০ শতাংশ ও ২০ শতাংশ পাবে।
গ্যাস রপ্তানি
চুক্তিপত্রটির ১৬ অনুচ্ছেদের শিরোনাম হচ্ছে ‘পাইপলাইন’। এই অনুচ্ছেদে বলা আছে, ঠিকাদার কোম্পানি চুক্তিকৃত কূপ এলাকা থেকে বাংলাদেশের উপযুক্ত এক কিংবা একাধিক স্থানে পেট্রোলিয়াম পরিবহনের জন্য এক কিংবা একাধিক পাইপলাইন নির্মাণ করতে পারবে, তবে তার খরচ ঠিকাদারের কস্ট রিকভারি হিসেবে গণ্য হবে এবং পাইপলাইনের মালিকানা পেট্রোবাংলার থাকবে। কিন্তু শুভঙ্করের ফাঁকিটি হচ্ছে পেট্রোবাংলা কেবল তার প্রাপ্য পেট্রোলিয়াম এবং সেটা এর আগে আলোচ্য চুক্তিপত্রের ধারা অনুযায়ী কেবল প্রাকৃতিক গ্যাস ওই পাইপলাইন মারফত পরিবহন করতে পারবে এবং তার খরচও ঠিকাদার কোম্পানির কস্ট রিকভারির সঙ্গে যোগ করা হবে। ১৫ অনুচ্ছেদের ৫ ধারার ৬ উপধারায় বলা আছে, ঠিকাদার কোম্পানি তার প্রাপ্য কস্ট রিকভারি গ্যাস ও লাভের গ্যাস খরিদের জন্য পেট্রোবাংলাকে সর্বপ্রথম প্রস্তাব দেবে, যার অর্থ পেট্রোবাংলা খরিদ না করলে ওই ৮০ শতাংশ গ্যাস ঠিকাদার কোম্পানি রপ্তানি করার সুযোগ পাবে। কিন্তু কখনই পেট্রোবাংলা সে গ্যাস খরিদ করতে সক্ষম হবে না। কারণ পেট্রোবাংলাকে সে ক্ষেত্রে সমুদ্রবক্ষের কূপ থেকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নিজস্ব পাইপলাইন নির্মাণ করতে হবে, অথচ ঠিকাদার কোম্পানি কর্তৃক এর মধ্যে নির্মিত পাইপলাইন, যার খরচের ভার পেট্রোবাংলাকেই বহন করতে হবে এবং চুক্তিপত্রের ১৬ অনুচ্ছেদের ৬ ধারা অনুযায়ী পেট্রোবাংলাই সে পাইপলাইনের মালিক—সেটা ব্যবহার করা যাবে না। প্রিয় পাঠক-পাঠিকা, আপনি কি জানেন, একটি সে রকম পাইপলাইন নির্মাণের খরচ হচ্ছে ৩৫০ মিলিয়ন ডলার, যা গরিব বাংলাদেশের পক্ষে খরচ করা আদৌ সম্ভব নয়? তা ছাড়া বাংলাদেশের গ্যাস ব্যবহারের ক্ষমতা বিবেচনায় রেখে গ্যাস উত্তোলনের সীমা নির্দিষ্ট করা উচিত ছিল। কিন্তু আলোচ্য চুক্তিপত্রে সে রকম ধারা না থাকায় ঠিকাদার কোম্পানি দ্রুত গ্যাস তুলতে থাকবে এবং পেট্রোবাংলার পক্ষে সে অনুপাতে খরিদ করা ও খরচ করা সম্ভব হবে না। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গ্যাস উত্তোলনের চুক্তিগুলোতে গ্যাস উত্তোলনের সীমা সাড়ে পাঁচ শতাংশ নির্দিষ্ট রাখা আছে।
ন্যায্য উপায় কী
বর্তমান সরকারের উপলব্ধিতে আসতে হবে, ভোটবিপ্লব মারফত তারা ক্ষমতায় এসেছে এবং জনগণের স্বার্থরক্ষার জন্য তারা দায়বদ্ধ। আলোচ্য চুক্তিটি তাদের তৈরি নয় এবং চুক্তিটির খুঁটিনাটি পরীক্ষা করা তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিশন অবিলম্বে দ্রুত গঠন করতে হবে চুক্তিটি পর্যালোচনা করার জন্য। কমিশনের কাজ হবে চুক্তিটি কে বা কারা তৈরি করেছে, তার বা তাদের এবং পেট্রোবাংলার পক্ষে পদস্থ কর্মকর্তার সাক্ষ্য গ্রহণ করা। চুক্তিটির পক্ষে ও বিপক্ষে নাগরিকদের মধ্যে থেকে সাক্ষী আহ্বান করা। এর পর সাক্ষীদের বক্তব্যের ভিত্তিতে চুক্তিটি পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন প্রদান। কমিশনের শুনানি প্রকাশ্যে হবে এবং প্রতিবেদনটিও প্রকাশ করতে হবে। সর্বশেষে প্রতিবেদনটি জাতীয় সংসদে আলোচনা করে সাংসদেরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন। গণতন্ত্র এক অর্থে যুক্তিশীলতা, এটি অস্বীকার করার পরিণতিতেই দেশে ফ্যাসিবাদ খুঁটি গাড়ার সুযোগ পায়—এটা ইতিহাসেরই শিক্ষা।
মোহাম্মদ গোলাম রাব্বানী: অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, আপিল বিভাগ, সুপ্রিম কোর্ট।

হাটের চাঁদ -গদ্যকার্টুন by আনিসুল হক

ঢাকাবাসীর জন্য বিশাল খবর। পানির অভাবে আমরা আর মারা যাচ্ছি না। পানির সন্ধান পাওয়া গেছে।
আপনারা জানেন, ঢাকা শহরে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। প্রতিবছর প্রায় ১০ ফুট করে এই পানি নেমে যায়। ১০ বছর পর ঢাকায় ডিপ টিউবওয়েলেও আমরা পানি পাব না। আর ঢাকার চারপাশের নদ-নদীর পানি আমরা এমনভাবেই দূষিত করে ফেলেছি যে তা শোধনেরও অযোগ্য হয়ে পড়েছে। আমাদের নদীগুলো দিয়ে পানি নয়, কালো রাসায়নিক একটা আধা তরল পদার্থ প্রবাহিত হয়। আর ঢাকা শহরের তো বটেই, সারা দেশের খাল, পুকুর, নিচু ভূমি ও জলাশয় আমরা বুজিয়ে ফেলছি। কাজেই খাবার পানি এই দেশে আর পাওয়া যাবে না।
ফলে ১০ বছর পর আমরা কী পান করব, এই দুশ্চিন্তায় আমাদের ঘুম হারাম হওয়ার দশা। অবশ্য কর্তৃপক্ষেরও ঘুম কমে গেছে, সেটা দুশ্চিন্তায় নয়, নতুন সম্ভাবনার আনন্দে। আমাদের ফসিল ওয়াটার কীভাবে তোলা যাবে মাটির অনেক গভীর থেকে, সে জন্য আমাদের দেশটাকে কয়েকটা ব্লকে ভাগ করে বহুজাতিক কোম্পানির কাছে সেসব ব্লকের দায়িত্ব কীভাবে কোন শর্তে দেওয়া যাবে, আর তা থেকে কে কত ভাগ পাবে, উত্তোলিত পানি বিদেশে রপ্তানি হবে কি না, হলে কী শর্তে হবে—এই রকম নানা হিসাবনিকাশ নিয়ে তাঁদের চিত্তে মধুর তরঙ্গ খেলা করছে। তাঁরা পুলকিতই আছেন।
কিন্তু কবে আমাদের ভূগর্ভস্থ ফসিল ওয়াটার ক্ষেত্র আবিষ্কৃত হবে, কবে সেটা বিদেশি কোম্পানি তুলবে, সেটা তুলতে গিয়ে দেশের জলসম্পদ পাচার রোধ কমিটি আবার হরতাল ডেকে বসবে কি না, এসব নিয়ে চিন্তামুক্ত হওয়া দেশের সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। পানির অপর নাম জীবন। পানি ছাড়া যে আমরা বাঁচব না, সে তো জানা কথাই।
তো এখন পানি পাব কোথায়? ১০ বছর আগে কি আমরা অভিযোজিত হয়ে উট হয়ে যাব? আমাদের কুঁজ থাকবে, আমরা পানি ছাড়াই বেশ কয়েক দিন কাটিয়ে দিতে পারব? নাকি আমাদের বিশেষ অঙ্গ গজাবে, আমরা বাতাস থেকে জলীয় বাষ্প গ্রহণ করে আমাদের শরীরকে বাঁচিয়ে রাখব?
চিন্তাই যখন একমাত্র জিনিস, যা আমাদের ভাবনাজগেক ছিনতাই করে ফেলেছে, তখন সমস্ত দুশ্চিন্তার অবসান ঘটালেন ভারতীয় নভোবিজ্ঞানীরা, তাঁরা জানালেন, চাঁদে পানি পাওয়া গেছে।
ঢাকাবাসীর চিন্তা নেই, আমরা যদি আর কোথাও থেকে পানি না পাই, চাঁদের পানিই আমাদের ভরসা।
এক সুসংবাদই যখন আত্মস্থ করা কঠিন, তখন আরও একটা সুসংবাদ হাজির আমাদের সামনে। মঙ্গলগ্রহেও পানি পাওয়া গেছে।
দুই উপায়ে আমরা চাঁদ ও মঙ্গলগ্রহের পানি থেকে উপকৃত হতে পারি। এক. আমরা চাঁদ ও মঙ্গল থেকে বোতলজাত পানি আমদানি করে ঢাকাবাসীর প্রয়োজন মেটাব। দুই. চাঁদের পানিকে বিশ্লেষিত করলেই অক্সিজেন পাওয়া যাবে। কাজেই চাঁদে মানববসতি স্থাপিত হবে। আমরা সেখানে আমাদের জনশক্তি রপ্তানি করব। ঢাকার দুই কোটি মানুষকেই আমরা চাঁদে পাঠিয়ে দেব।
আমি জানি, এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের আদম বেপারিরা আনন্দে লাফিয়ে উঠেছেন। ডাংকি হিসেবে আদমদের আমরা ইউরোপে, আমেরিকায়, মালয়েশিয়ায়, আন্দামানে নানা জায়গায় পাঠাতে পাঠাতে সব পুরোনো করে ফেলেছি। এবার পাঠানোর জন্য একটা নতুন জায়গা পাওয়া গেল। রকেটের চাকায় নিজেকে বেঁধে আমরা চাঁদের দেশে যাব।
আপনারা ভাবছেন এ অসম্ভব। মোটেও না।
চাঁদে সবার আগে নিল আর্মস্ট্রং নয়, বাঙালি গেছে।
নিল আর্মস্ট্রং চাঁদে নেমে দেখতে পেলেন একটা সুভেনির শপ বা স্মারকদ্রব্যের দোকান। সেখানে কাজ করছে একজন দোকানদার। নিল আর্মস্ট্রং অবাক হয়ে বললেন, ‘ভাই তুমি কী করছ?’
‘আমি চাঁদের ছবিওয়ালা উপহারসামগ্রী বিক্রি করছি।’ দোকানদার বলল।
নিল আর্মস্ট্রং বললেন, ‘তুমি কোন দেশ থেকে এসেছ?’
‘বাংলাদেশ থেকে।’
‘কীভাবে?’
‘সে এক বিরাট হিস্ট্রি। তোমরা যখন চাঁদে মানবশূন্য নভোযান পরীক্ষামূলকভাবে পাঠাচ্ছিলে সেটার চাকায়... সে এক বিরাট দুঃখের কাহিনী...।’
নিল আর্মস্ট্রং একটা সুভেনির বা উপহারদ্রব্য কিনলেন। সেখানে লেখা, মেইড ইন চায়না। নিল আর্মস্ট্রং মৃদু হাসলেন। বললেন, ‘তোমার দোকান কেমন চলছে?’
দোকানদার বলল, ‘না, ভালো না। আমার দোকানটা বাংলাদেশি, খদ্দের নানান দেশের। এর মধ্যে পাকিস্তানিগুলান আমার দোকান থেকে জিনিস নিয়ে গেছে, একটু পরে দাম পাঠিয়ে দেবে বলে সেই যে কেটে পড়েছে আজ কত দিন পার হয়ে গেল, দাম দেওয়ার নাম নাই।’
কাজেই আপনারা নিশ্চিত থাকুন, চাঁদে পানি পাওয়ার সুফল বাংলাদেশিরা ভালোভাবেই ভোগ করবে।
অতএব আর দুশ্চিন্তার কোনোই কারণ নাই, আসুন, আমরা বেশি করে পানি নষ্ট করি, আমাদের ভূগর্ভস্থ পানি পুরোটাই বিনষ্ট করে ফেলি, আমাদের নদ-নদী খাল-বিলের পানিকে চিরকালের মতো দূষিত করে ছাড়ি।
পানির অপর নাম জীবন, জীবন মানে আশা, কাজেই পানির অপর নাম আশা। হতাশ হবেন না।
(একটাই ভয়ের কথা আছে। আগামীকালই বিভিন্ন পত্রিকায় ও টেলিভিশন চ্যানেলে বিজ্ঞাপন বেরিয়ে যাবে, চাঁদে জমি কিনুন। রাজউক অনুমোদিত। বাইশ শতকের আবাসন। প্লট বিক্রি হচ্ছে। ঈদ উপলক্ষে ২০ পারসেন্ট ছাড়। একটা প্লট কিনলে একটা কালার টিভি ফ্রি। ‘চন্দ্রিমা সিটি’র জমির একটাই ভালো দিক, দুই বছরে দাম বাড়ে দিগ্বিদিক। টিভি বিজ্ঞাপনে কম্পিউটার গ্রাফিক্সে নির্মিত চাঁদে মানব বসতির ত্রিমাত্রিক ছবি দেখে দর্শকেরা নিশ্চিত প্রতারিত হবেন। রাজউক বিবৃতি দেবে, আমরা চাঁদের আবাসন প্রকল্প এখনো অনুমোদন দিইনি। যাঁরা যাঁরা ঠকবেন, দয়া করে নিজ দায়িত্বে ঠকবেন। আপনার হারানো টাকা ফিরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব রাজউকের নয়।)
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

একটি রেফারেন্স ও প্রজাতন্ত্রে মেধার দৈন্য by মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী,পেনসিলভানিয়া,যুক্তরাষ্ট্র

গত ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় বিডিআর সদর দপ্তরে নারকীয় হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের ইতিহাসে কলঙ্কিত ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে নিসন্দেহে। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষী এবং তাদের মদদদাতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিটি জাতীয় দাবিতে পরিণত হয়। কিন্তু বিদ্রোহীদের বিচার বিডিআর, সেনা আইন, নাকি প্রচলিত সাধারণ আইনে হবে, তা নিয়ে দেশব্যাপী সৃষ্টি হয় এক অনাকাঙ্ক্ষিত ধূম্রজালের। এই উদ্ভূত পরিস্থিতির জটিলতা এড়ানোর প্রয়াসে সরকার রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টে রেফারেন্স পাঠিয়ে মতামত চান এবং সুপ্রিম কোর্ট ১১ জন এমিকাস কিউরির মতামতের ভিত্তিতে প্রচলিত আইনে বিচারের পক্ষে মত দেন।
মিজানুর রহমান খান ২৮ সেপ্টেম্বরের প্রথম আলোর সম্পাদকীয়তে ‘রাষ্টপতির রেফারেন্স ও সেকেলে সামরিক বিচার’ শীর্ষক সরল গরল নিবন্ধে যে ব্যাপক তথ্য-উপাত্ত, উদাহরণ ও উদ্বৃতির সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন, তাকে এককথায় চমত্কারই বলতে হয়। তিনি রাষ্ট্রপতির রেফারেন্সের অপরিপক্বতা, এমিকাস কিউরিদের ঔপনিবেশিক আমলে চাপিয়ে দেওয়া সেনা আইনের যুগোপযোগিতা অনুধাবনের অক্ষমতা কিংবা জবরদস্তিমূলক কাঠামোর প্রতি আনুগত্য, বিডিআর আইনের অসম্পূর্ণতা, প্রজাতন্ত্রের নিরাপত্তা রক্ষায় নিয়োজিত কর্মচারীদের মানবাধিকারের প্রশ্ন তুলে পুরো সিস্টেমের অন্তর্নিহিত গলদকে যথার্থই পরস্ফুিট করতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি ব্রিটিশ প্রণীত সেনা আইনের অমানবিক চরিত্র উদ্ঘাটন করতে গিয়ে বলেছেন, ‘২৫০ বছরের পুরোনো সেনা আইনটির উত্স ছিল বিদ্রোহ দমন। ভারতবর্ষ ও দক্ষিণ আটলান্টিক সমুদ্রের দ্বীপ হেলেনার জন্য তা প্রযোজ্য ছিল। ইউরোপীয় ভাবধারায় প্রণীত আমাদের সেনা আইনের গায়ে ঔপনিবেশিক শাসনের গন্ধ তাই প্রকট।’ স্বাধীনতা অর্জন করলেও আমরা ঔপনিবেশিক আমলের চাপিয়ে দেওয়া আইনেই দেশ পরিচালনা করছি।
মিজানুর রহমান খান মূলত পিলখানা হত্যাকাণ্ডে দোষীদের বিচারের ক্ষেত্রে ‘প্রিন্সিপল অব ন্যাচারাল জাস্টিস’ বাস্তবায়নে রাষ্ট্র কতটুকু আন্তরিক, তার চিত্র উন্মোচন করতে গিয়ে বিদ্যমান মানবতাবিরোধী কোর্ট মার্শালের যুক্তিহীনতা তুলে ধরেছেন। কারণ, প্রচলিত সেনা আইনের আলোকে বিডিআর বিদ্রোহীদের বিচারের লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্টে অজ্ঞতায় পরিপূর্ণ রেফারেন্স পাঠিয়েছিলেন, যা ছিল পরস্পরবিরোধী। সেনা আইনে বিচার করা না গেলে সেনা আইনের ৫(২) ধারায় প্রজ্ঞাপন জারির বিষয়ে মতামত চাওয়াটা সর্বতোভাবে দণ্ডবিধি সম্পর্কে অজ্ঞতার পরিচায়ক। তা ছাড়া সুপ্রিম কোর্ট নিয়োজিত এমিকাস কিউরিরা কর্তৃক বিদ্যমান সেনা আইনের যুগ অনুপযোগিতা বিবেচনায় নিয়ে মানবতাবিরোধী কোর্ট মার্শাল-ব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্যে আইন সংস্কারের যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিলো তা মেধাহীনতা শুধু নয়, ক্ষমতাভোগী, ক্ষমতালোভী ও ক্ষমতার সুবিধাভোগী আইনবিদ ও রাজনীতিবিদদের ভবিষ্যত্ স্বার্থের নীলনকশায় পরাভূত হয়েছে।
জনাব খান ভারত, ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের সেনা আইনের পরিবর্তনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উপস্থাপন করে বাংলাদেশ প্রজাতন্ত্রের মেধাহীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সুশীল সমাজ ও আইনবিদদের হীন স্বার্থান্ধতা, উপনিবেশপ্রিয়তা ও মেরুদণ্ডহীনতাকে দেশবাসীর সামনে তুলে অপরিসীম উপকার করেছেন।
বিডিআর বিদ্রোহের সুষ্ঠু বিচার আমাদের সবারই দাবি। জাতির অস্তিত্বের স্বার্থেই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের শৃঙ্খলাভঙ্গের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া প্রয়োজন এবং তা দ্রুতই হওয়া উচিত। কিন্তু ঘৃণ্য অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত হোক না কেন, প্রজাতন্ত্রের সব নাগরিকের মতো সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদেরও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে। তাদের দিতে হবে আপিল করার সুযোগ। রাষ্ট্রের প্রতিটি পর্যায়ে মানবাধিকার সমুন্নত রাখা না হলে বাঙালি জাতির গণতন্ত্রের স্বপ্ন শুধু স্বপ্নই থেকে যাবে।
msiddiquee@aol.com

জাতীয় শিক্ষানীতিতে জেন্ডার প্রসঙ্গ by জোবাইদা নাসরীন,শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

জাতীয় শিক্ষানীতির (চূড়ান্ত খসড়া) প্রতিবেদনটি ৭ সেপ্টেম্বর থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়েছে এবং এই প্রতিবেদনের ওপর মতামত আশা করছে সরকার।
এ লেখায় শিক্ষানীতিতে জেন্ডার প্রসঙ্গটির মধ্যেই দৃষ্টি সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা করা হবে। শিক্ষানীতির এই খসড়া প্রতিবেদন মোট ২৮টি অধ্যায়ে সাজানো হয়েছে। আলোচনায় ও নীতিতে যুক্ত করা হয়েছে শিক্ষা ও শিক্ষাসংক্রান্ত নানা দিক। এই খসড়াতে নারী শিক্ষা (অধ্যায় ১৭) আলাদাভাবে স্থান পেয়েছে। এই বিষয়ে এসেছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জও। নারী শিক্ষা অধ্যায় ছাড়াও অন্য বেশ কিছু অধ্যায়েও যোগ হয়েছে নারী শিক্ষাকেন্দ্রিক বেশ কিছু ধারা। যেমন অধ্যায় ২ (প্রাক-প্রাথমিক এবং প্রাথমিক শিক্ষা) অংশের ১৪ নম্বর ধারায় দেওয়া হয়েছে ‘মেয়েশিশুদের মধ্যে ঝরে পড়ার প্রবণতা তুলনামূলকভাবে অধিক, তাই এই সকল শিশু যাতে ঝরে না পড়ে সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। মেয়ে শিক্ষার্থীরা যেন বিদ্যালয়ে কোনোভাবে উত্ত্যক্ত না হয় সেই বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।’ এর কাছাকাছি আরেকটি ধারার উল্লেখ রয়েছে নারী শিক্ষা (অধ্যায় ১৭)-এর ২ নম্বর অনুচ্ছেদে, ‘ছাত্রীদের বিদ্যালয় ত্যাগের হার কমানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং ঝরেপড়া ছাত্রীদের মূলধারায় ফিরিয়ে আনার পদক্ষেপ নিতে হবে। যাদের এভাবে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না তাদের বিভিন্ন বৃত্তিমূলক কর্মসূচির আওতায় আনতে হবে।’
এই ক্ষেত্রে যে কথাটি গুরুত্বপূর্ণ সেটি হলো, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিদ্যালয়গুলো থেকে ছেলে ও মেয়েদের ঝরে পড়ার কারণ, ধরন ও সংখ্যা কোনোটিই এক নয়। আবার প্রাথমিক পর্যায়ের স্কুল ও মাধ্যমিক স্কুল থেকে মেয়েশিশু ঝরে পড়ার কারণও অনেকাংশেই ভিন্ন। তাই মেয়ে শিক্ষার্থীর ঝরে পড়া কমানোর জন্য ছেলে শিক্ষার্থীর মতো শুধু বৃত্তিমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমেই এই সমস্যার সমাধান করা যাবে না। তাই একে পৃথকভাবে দেখা একান্তভাবেই প্রয়োজন।
অধ্যায় ২ (প্রাক-প্রাথমিক এবং প্রাথমিক শিক্ষা) অংশের ১৪ নম্বর ধারাটির দ্বিতীয় ভাগে যুক্ত হওয়া অংশটি ততোধিক গুরুত্বপূর্ণ যেখানে গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গিয়েছে যে মাধ্যমিক পর্যায়ে ছয় শতাংশ মেয়ে শিক্ষার্থী স্কুল ছাড়ে বখাটেদের উত্পাতে। কিন্তু এ খসড়ায় মেয়ে শিক্ষার্থী এবং নারী শিক্ষক উভয়ই কীভাবে উত্ত্যক্ততার হাত থেকে রক্ষা পাবে তার কোনো নির্দেশনা নেই।
নারী শিক্ষা অধ্যায়ের ১ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘বাজেটে নারীশিক্ষা খাতে নির্দিষ্ট বরাদ্দ দিতে হবে। শিক্ষার সকল স্তরে নারীশিক্ষার হার বাড়ানোর জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করতে হবে এবং বেসরকারি উদ্যোগ ও অর্থায়নকে উত্সাহিত করার ব্যবস্থা থাকতে হবে।’ কিন্তু নারীশিক্ষার জন্য নির্দিষ্টভাবে অর্থনৈতিক সহায়তার কথা বলা হলেও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কার্যকর পদক্ষেপের ধরনের কথা বলা হয়নি।
বলা হয় যে সামাজিক নির্মাণের পাশাপাশি একজন ছেলে এবং একজন মেয়ে সামাজিক লিঙ্গীয় ভূমিকা সম্পর্কে ধারণা লাভ করে পাঠ্যপুস্তক থেকে। বিশেষ করে অঙ্কের মতো বিষয়ে যেখানে উল্লেখ থাকে, ‘একজন পুরুষ সমান দুইজন নারী’র মতো হিসেবের বাহানা। এই বিষয়ে যদিও একটি ধারা আছে, ‘প্রাথমিক শিক্ষা স্তরে পাঠ্যসূচিতে যথাযথ পরিবর্তনের মাধ্যমে নারীর ইতিবাচক ও প্রগতিশীল ভাবমূর্তি ও সমান অধিকারের কথা তুলে ধরতে হবে এবং ইতিবাচক দিকগুলো পাঠ্যসূচিতে আনতে হবে, যাতে নারীর প্রতি সামাজিক আচরণের পরিবর্তন হয়।’ (ধারা ৫, নারী শিক্ষা, অধ্যায় ১৭)। কিন্তু এর সঙ্গে সঙ্গে যদি বইতে ব্যবহূত বিভিন্ন ছবি (যেখানে নারী-পুরুষকে সমানভাবে উপস্থাপন করা হবে), উদাহরণ এবং ভাষার ক্ষেত্রে লিঙ্গনিরপেক্ষ শব্দ ব্যবহার করা হয় সেদিকে দৃষ্টি দেওয়ার জন্য শিক্ষানীতিতে একটি ধারা যুক্ত হওয়া প্রয়োজন।
এই অধ্যায়ের ৬ নম্বর ধারাটিও আলোচনার দাবি রাখে, যেখানে বলা হয়েছে ‘প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যসূচিতে আরও অধিক সংখ্যক মহীয়সী নারীর জীবনী ও নারীদের রচিত লেখা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।’ সে ক্ষেত্রে একটি বিষয় খেয়াল রাখা প্রয়োজন এটি যেন ধর্মীয়, জাতিগত কিংবা শ্রেণীনিরপেক্ষ হয়, কেননা বাংলাদেশে সব ধর্ম, বহু জাতি এবং একাধিক শ্রেণীর শিক্ষার্থী বিরাজমান।
এই অধ্যায়ের ৭ ও ৮ নম্বর ধারা অত্যন্ত প্রশংসনীয় দুটি ধারা, যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যক্রমে জেন্ডার স্টাডিজ এবং প্রজনন-স্বাস্থ্য অন্তর্ভুক্ত করার বিষয় এবং মাধ্যমিক শিক্ষাস্তরে বিষয় নির্বাচনে ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে সবার পুরো স্বাধীনতা থাকতে হবে এবং সব বিষয়ের ওপর সমান গুরুত্ব দিতে হবে। মেয়েদের কোনো বিশেষ বিষয়ের দিকে (যেমন গার্হস্থ্য অর্থনীতি) উত্সাহিত করা বা ঠেলে দেওয়া যাবে না।
এই অধ্যায়ে আরও বেশ কিছু ইতিবাচক অনুচ্ছেদ রয়েছে, যার মধ্যে দৃষ্টি দেওয়া হয়েছে ছাত্রীদের যাতায়াত ও বাসস্থানের সুবিধা, বিজ্ঞান ও পেশাদারি শিক্ষার সুবিধা, স্বল্প সুদে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থাসহ নীতি-নির্ধারণী ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যায়ে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য প্রণীত যৌন নিপীড়ন ও নির্যাতনসংক্রান্ত প্রণীত বিধিবিধান কঠোরভাবে অনুসরণ করার জন্য নির্দেশ।
তবে এই খসড়ায় নারী শিক্ষা বিষয়ক আলোচনায় কোথাও খেলাধুলার প্রসঙ্গ নেই। তার মানে কি নারীশিক্ষার সঙ্গে খেলাধুলার কোনো সম্পর্ক নেই? এই শিক্ষানীতির ১৯ নম্বর অধ্যায়ে রাখা হয়েছে ক্রীড়াশিক্ষা। সেখানেও নারীর খেলাধুলার কোনো বিষয় নেই। এর বাইরে আরেকটি অধ্যায় রাখা হয়েছে ‘বিশেষ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও শারীরিক শিক্ষা, স্কাউট ও গার্লস গাইড এবং ব্রতচারী’ নামে (অধ্যায় ১৮)। এখানে মেয়ে ও ছেলেদের জন্য শুধু একটি ধারা আছে সেটি হলো ‘শরীরচর্চা বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের শারীরিক শিক্ষা দিতে হবে’ (অনুচ্ছেদ ২)। শারীরিক শিক্ষা এবং খেলাধুলা কিছুতেই এক বিষয় নয়। বাংলাদেশের বাস্তবতায় স্কুল মাঠে শুধু ছেলে শিক্ষার্থীরাই খেলে। খেলাধুলার বিষয়টি অনেকাংশেই লিঙ্গীয় পক্ষপাতমূলক। যাতে মেয়ে ও ছেলে উভয়ই খেলাধুলা করার সুযোগ পায়। কারণ শারীরিক সুস্থতা সবারই প্রয়োজন। শিক্ষানীতিতে নারীদের খেলাধুলার প্রতি জোর দেওয়া দরকার।

বিডিআর সদস্যদের মৃত্যু-স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া যাচ্ছে না

স্বাভাবিক আর অস্বাভাবিক—এ দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য বোঝার ক্ষমতা দেশবাসী ও গণমাধ্যমের রয়েছে; দেশের সচেতন নাগরিকদের রয়েছে তো বটেই। বিডিআর বিদ্রোহের পর গত সাত মাসে ৪৬ জন জওয়ানের মৃত্যু কারও কাছেই স্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছে না। গত সোম ও মঙ্গলবারের পত্রিকায় পর পর ‘আরেকজন বিডিআর সদস্যের মৃত্যু’ ও ‘রাজশাহীতে আরও ১ বিডিআরের মৃত্যু’ শিরোনামে দুটি খবর ছাপা হয়েছে। এখন প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, সমাজ বা বর্তমান সময় কি বিষয়টি নিয়ে নীরব থাকবে? এ প্রশ্ন তোলার উদ্দেশ্য একটাই—মানবাধিকার, আইনের শাসন ও দায়িত্বশীলতার প্রতি সবার মনোযোগ আকর্ষণ করা।
দেশের সব মানুষই চায় বিডিআরের সদর দপ্তরে ঘটে যাওয়া বিদ্রোহ ও সে সময়ে সেনা কর্মকর্তাদের হত্যাসহ তাঁদের পরিবারের ওপর নির্যাতনের যে বর্বর ঘটনা ঘটেছে তার যথাসম্ভব দ্রুত বিচার। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের নৃশংস ঘটনা আর না ঘটে, সে জন্য দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। বিডিআর বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ডের বিচার-প্রক্রিয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হওয়ার পর এখন দেশবাসী দ্রুত এই বিচারকাজ শেষ এবং দোষী ব্যক্তিদের শাস্তির মুখোমুখি দেখতে চায়। এ অবস্থায় আটক ও নিরাপত্তা হেফাজতে থাকা বিডিআর সদস্যদের একের পর এক মৃত্যুর ঘটনাকে কোনোভাবেই স্বাভাবিক বলে মেনে
নেওয়া যাচ্ছে না।
বিডিআর কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, হূদরোগ, আত্মহত্যা ও নানা অসুস্থতায় এসব বিডিআর সদস্যের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু অভিযোগ আছে, বিদ্রোহের ঘটনার পর আটক সদস্যদের পিলখানার ভেতর জিজ্ঞাসাবাদের নামে নির্যাতন করা হয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়া বিডিআর সদস্যরা প্রকাশ্য আদালতে এসব অভিযোগ করেছেন। কেউ আটক থাকলে তাঁর দায়দায়িত্ব যারা বা যে কর্তৃপক্ষ তাদের আটকে রেখেছে তাদের নিতে হবে। কেউ যদি আত্মহত্যাও করে থাকেন, সেই দায়িত্ব এড়ানো সম্ভব নয়। তাই কর্তৃপক্ষের এ ধরনের ব্যাখ্যা মেনে নেওয়া কঠিন।
বিডিআর বিদ্রোহের পর এ পর্যন্ত যেসব বিডিআর সদস্য মারা গেছেন, তাঁদের মধ্যে দুজনের ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে এ দুই মৃত্যুকে ‘হত্যা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে প্রমাণিত হয়, হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটার মতো পরিস্থিতির মধ্যে বিডিআর সদস্যরা আটক রয়েছেন। বিডিআর বিদ্রোহের সময় পিলখানায় ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো মানবতার বিরুদ্ধে এক বর্বর অপরাধ। কিন্তু এর প্রতিক্রিয়ায় পাল্টা কিছু ঘটুক তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সবার সতর্ক থাকা জরুরি ছিল। বিডিআর জওয়ানদের এ ধরনের মৃত্যু মানবাধিকারের দিক থেকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, যা আইনের শাসন কার্যকর আছে এমন একটি দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থানকে নড়বড়ে করে দিচ্ছে।
বিডিআর বিদ্রোহ ও সেনা কর্মকর্তাদের হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার ও অভিযুক্ত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হোক—দেশবাসী এটা যেমন চায়, তেমনি বিডিআর সদস্যদের এ ধরনের আর কোনো মৃত্যুর ঘটনাও দেখতে চায় না। একই সঙ্গে আমরা বিডিআর বিদ্রোহের পর মৃত্যুর সব কটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত জরুরি মনে করছি। কারণ, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মারা যাওয়া বিডিআর সদস্যদের পরিবারের পক্ষ থেকে নানা অভিযোগ তোলা হয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মিললে দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। বিডিআর সদস্যদের এই মৃত্যুর ঘটনাগুলোর ব্যাপারে নিশ্চুপ থাকার কোনো সুযোগ নেই। নিশ্চুপ থাকার অর্থ দাঁড়াবে মানবাধিকার ও আইনের শাসন উপেক্ষা করা।

মাথার চুল নয়, মগজই মূল্যবান -সহজিয়া কড়চা by সৈয়দ আবুল মকসুদ

রমজানের রোজার শেষে ঈদ এল এবং চলেও গেল। ঈদ মুসলমানদের খুশির উত্সব। সব মুসলমান অবশ্য খুশি-আনন্দ করেনি। সেটা সম্ভবও নয়। তবে কেউ কেউ খুব বেশি করেছে। যেমন ব্রুনাই দারুস সালামের সুলতান। ঈদের আনন্দ করতে গেলে অর্থের দরকার। সেই অর্থ অনেক মুসলমানের মতো তাঁর আছে। এমনকি এই দীন-দুনিয়ায় অন্য কোনো মানুষ বা শাসকের যে ক্ষমতা নেই, ব্রুনাইয়ের মহামান্য সুলতানের তা আছে।
মুসলিম উম্মার কারও কারও কীর্তি দেখে একজন মুসলমান হিসেবে মাঝেমধ্যে গর্বে বুক ১০ হাত উঁচু হয়। অন্য কোনো ধর্মের কোনো ব্যক্তি বা শাসক যা পারেন না, একজন মুসলমান তা পারেন। সে জন্যই আমাদের অহঙ্কার। ব্রুনাইয়ের সুলতান বিশ্বের বিরাট শাসনকর্তা। তাঁর প্রাসাদের মতো প্রাসাদ স্পেনের মুসলমান শাসকদের তাঁদের সেই স্বর্ণকালেও ছিল না। শত শত প্রকোষ্ঠবিশিষ্ট প্রাসাদের হাম্মামখানার পানির কলগুলো খাঁটি গিনি সোনার; কোনো কমদামি ধাতুর নয়।
প্রধান ধর্মীয় উত্সবের আগে মানুষ চুল-দাড়ি ছেঁটে ছিমছাম পরিপাটি হয়। ছোটবেলায় আমরা দেখেছি, ঈদের দু-চার দিন আগে নাপিত খেউরি করার জন্য আমাদের বাড়ি আসত। ক্ষৌরকারও ছিল বংশানুক্রমিক। কোনো সময় তাদের খানিকটা জমি দিয়ে দেওয়া হতো, বিনিময়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম তারা বাড়িশুদ্ধ লোকের চুল কাটত। তবে ঈদ বা পূজার সময় নাপিত একখানা ধুতি এবং তার স্ত্রীর জন্য একটা সস্তা শাড়ি পেত। এখন আর সেই সামাজিক অবস্থা নেই। এখন সেলুনে গিয়ে মানুষ চুল কেটে আসে। ইচ্ছা হলে বকশিশ দেয়। তবে বাংলাদেশের মতো দেশে ১০-১২ টাকা দিয়ে বাটিছাঁট দেওয়ার মানুষই বেশি। সেলুনে স্বাভাবিক ছাঁট ৪০ টাকা। কেউ যদি ঘাড়-গর্দান দাবিয়ে মাথাটা বানিয়ে নেয়, তার শখানেক টাকা খরচা হতে পারে।
তবে রাজা-বাদশা, আমির-সুলতানদের চুল কাটায় একটু বেশি ব্যয় হবে, তাতে সন্দেহ কী? কিন্তু সেটাই বা কত? দু-চার পাঁচ হাজার টাকা হওয়া স্বাভাবিক।
মুসলিম উম্মার ধনী দেশ ব্রুনাইয়ের সুলতান ঈদের আগে চুল কাটান। দেশীয় নাপিতের চুল ছাঁটা তাঁর পছন্দ নয়। বিলেত থেকে নাপিত আনান। নরসুন্দরের নাম কেন মোডেস্তু (Ken Modestu)। ধর্মে ইহুদি না খ্রিষ্টান, প্রোটেস্ট্যান্ট না ক্যাথলিক জানা যায়নি। তার মজুরি ১৫ হাজার পাউন্ড-স্টার্লিং অর্থাত্ বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৬ লাখ টাকা। কিন্তু তার পেছনে সুলতানের ব্যয় হয়েছে আরও বেশি। সে জন্য সুলতান নন, সোয়াইন ফ্লু দায়ী। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে প্রথম শ্রেণীতে তাঁর টিকিট কেনা হয়েছিল। সুলতানের সভাসদেরা বললেন, হে আলমপনা, সুলতানাতের মালিক, আমাদের সন্দেহ হচ্ছে ওই ফ্লাইটে মি. মোডেস্তুর আশপাশের কোনো আসনে যদি সোয়াইন ফ্লুর রোগী থাকে, তাহলে ওই সংক্রামক ব্যাধির জীবাণু আপনার শরীরেও প্রবেশ করতে পারে। আপনার চুলও বড় হয়ে যাচ্ছে, সামনে ঈদ, এখন কী উপায়?
এয়ারলাইনসের বড় কর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করায় তিনি বললেন, কোনো সমস্যা নেই। সুলতানের জীবন রক্ষায় আমরা যেকোনো ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত। সুলতানের নাপিতের জন্য বিমানে একটি বিশেষ কেবিন করে দেওয়া হবে, যার মধ্যে সোয়াইন ফ্লুর জীবাণুর বাবারও সাধ্য নেই ঢোকে। সে জন্য বাড়তি কিছু টাকা দিতে হবে। ১১ হাজার পাউন্ড-স্টার্লিং অর্থাত্ বাংলাদেশি মুদ্রায় ১২ লাখ টাকা। সুলতানাতের ওমরাওরা বলেন, এ তো সামান্য টাকা। ওষুধ-টষুধ ছিটিয়ে নাপিতকে ওই কেবিনেই বসিয়ে আনা হোক। অর্থাত্ নরসুন্দরের পেছনে লন্ডন থেকে দারুস সালাম পৌঁছানোর খরচ ২৮ লাখ টাকা। সাত তারা হোটেলে থাকা-খাওয়া, বকশিশ ইত্যাদি বাবদ সবসুদ্ধ এবার ঈদে সুলতানের চুল ছাঁটায় ব্যয় হয়েছে ৫০ লাখ টাকার ওপর।
বিশ্বমিডিয়ায় এ খবর জানার পর থেকে একজন মুসলমান হিসেবে যেমন আনন্দে আত্মহারা হয়েছি, তেমনি ব্যক্তিগতভাবে ধিক্কার জন্মেছে নিজের ওপর। ভাবছি, দিনের পর দিন কলাম রচনায় কলম না গুঁতিয়ে যদি কাঁচি চালিয়ে চুল কাটতে শিখতাম, তাহলে হয়তো কোনো দিন কোনো মুসলমান শাসকের খেউরি করার সুযোগ পেলেও পেতে পারতাম। কোনো সুলতান বা বাদশার বছর দুই চুল কাটতে পারলে ছয় পুরুষ বসে বসে খেতে পারত।
আরেকটি কথাও মনে পড়ছে। ব্রুনাইয়ের সুলতানের চুল কাটতে একেকবারে ৫০ লাখ টাকা ব্যয় হলে আমেরিকার প্রেসিডেন্টের খরচ হওয়ার কথা পাঁচ কোটি ডলার, ভারতের প্রধানমন্ত্রীর (যদি তিনি শিখ না হন) ব্যয় হওয়া উচিত এক কোটি রুপি, ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর এক মিলিয়ন পাউন্ড, জার্মান চ্যান্সেলর যদি পুরুষ হন তাঁর হতে পারে ১০ মিলিয়ন মার্ক। সৌদি বাদশার চুল কাটায় কী রকম খরচ হয়, সে সম্পর্কে আমি অনুমান করতে পারব না। তাঁরাই ভালো বলতে পারবেন, যাঁরা পবিত্র ওমরাহ ও রাজনৈতিক কারণে বছরে কয়েকবার সে দেশে যান।
চুল কাটার ব্যয়ের কথা যাক। এখন বাংলাদেশে ব্রুনাইয়ের সুলতানের ছোট সংস্করণ আছেন অন্তত কয়েক লাখ। তাই জলবায়ুর বৈশ্বিক উষ্ণতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঈদের আগে গরম হয়ে ওঠে দেশের কাপড়চোপড় ও খাদ্যদ্রব্যের বাজার। ভারত, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকং, জাপান, তাইওয়ান থেকে আসা কাপড়চোপড়ে বাংলাদেশের বাজার প্লাবিত। ভারতের শাড়ি, লেহেঙ্গা, সালোয়ার-কামিজ; থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের ব্রা প্রভৃতি; তাইয়ান ও থাইল্যান্ডের জুতা-স্যান্ডেল ছাড়া ঈদ হয় না। ভারতের কোনো কোনো মেয়েদের পোশাক নাকি ২৫ হাজার থেকে এক লাখ ২৫ হাজার টাকায় দেদার বিক্রি হয়েছে। অমিতাভ বচ্চনের পুত্রবধূ অ্যাশ (ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন) যে রকম দামি কাপড় পরেন, ওই রকম কাপড় পরার শখ আমাদের বালিকা থেকে বুড়ির। দুই দোকানদার বললেন, ২৫ থেকে ৬০ হাজার টাকা রেঞ্জের মধ্যেই শাড়ি ও সালোয়ার-কামিজ বেশি চলেছে।
ঈদের আনন্দ কত রকম, তা বাংলাদেশে জন্মের পর থেকেই দেখছি। ঘটনাক্রমে কয়েকটি ঈদের দিন আমি ছিলাম কলকাতা, দিল্লি, কুয়ালালামপুর, করাচি ও সিঙ্গাপুর। কলকাতা ও দিল্লির দুটি ঈদের দিন আমার কাছে স্মরণীয় হয়ে আছে। সকালবেলা পিলপিল করে যাচ্ছে অগণিত মানুষ ঈদের জামাতে। আমার বারবার মনে হচ্ছিল এই প্রাণীগুলোর নাম নাকি আশরাফুল মুখলুকাত! ধারণা করি, আসল মুসলমান ও সাচ্চা আশরাফুল মুখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা জীব ব্রুনাইয়ের সুলতান ও মধ্যপ্রাচ্যের আমির-ওমরাও-বাদশারা। তাঁদের সঙ্গে যোগ হয়েছে বাংলাদেশের নতুন আমির-ওমরাওরা।
বাংলাদেশে রোজার ঈদের আনন্দ মাথা থেকে পা পর্যন্ত; কোরবানির ঈদের আনন্দ মুখ ও পেটে। ওই ঈদেও কাপড়চোপড়ের কমতি নেই। সেগুলো পার্শ্ববর্তী সব দেশ থেকেই আসে। কিন্তু আসল জিনিসটা আসে ভারত থেকে; থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর বা তাইওয়ান থেকে নয়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ইউরোপের এক দেশ থেকে আরেক দেশে যেমন জার্মান সৈন্যদল মার্চ করত, তেমনি ভারত থেকে মার্চ করে আসতে থাকে গরু। ১০টি যদি আসে আইন মোতাবেক, ৯০টি আসে স্বাধীনভাবে। ওই গরুগুলোকে জিজ্ঞেস করলে তারা বলত, ‘আমরা কোনো সীমান্ত মানি না। আমার মানুষ নই। গরুর আবার পাসপোর্ট ভিসা কী?’ ওপার থেকে লেজে মোচড় দিয়ে ওগুলোকে যারা এপার পাঠায় এবং এপারে রাংতার মালা দিয়ে যারা ওদের সাদরে বরণ করে, তারাও সমস্বরে বলে উঠত, ‘আমরাও গরুগুলোর বক্তব্যের সঙ্গে একমত।’
দেশে গবাদিপশুর সংখ্যা এখন সর্বকালের সবচেয়ে কম। কিন্তু ৫০ হাজার থেকে এক লাখ-সোয়া লাখ টাকা দিয়ে কোরবানি দেওয়ার মানুষের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। গতবার দেখলাম, ধানমন্ডি মাঠ থেকে ৮৫ হাজার টাকায় একজন একটি প্রকাণ্ড ষাঁড় কিনে জাতীয় পতাকা দিয়ে ঢেকে নিয়ে যাচ্ছেন। তিনি যে শুধু ধর্মপরায়ণ নন, একজন বড় ধরনের দেশপ্রেমিক, তা-ই হয়তো বোঝাতে চেয়েছিলেন। আমি সাহস করে গরুওয়ালাকে কিছু না বলে দুঃসাহস করে র্যাবের সদস্যদের বললাম, ভদ্রলোককে বলুন গরুটির শরীর থেকে জাতীয় পতাকা সরিয়ে ফেলতে। র্যাব পরে কালো কাপড়, আমি পরি সাদা, তারা আমার কথা গ্রাহ্য করবে কেন?
প্রায় প্রতিবার বকরি ঈদের পরদিন থেকে আমাকে দৌড়াতে হয় বিভিন্ন হূদরোগ হাসপাতালে। গিয়ে দেখি, সেখানে মেঝেতেও ঠাঁই নেই। অতি ভরাট পাকস্থলীর চাপে হূদযন্ত্র বিকল। তবু খাওয়া চাই। কারণ ঈদ, মানে আনন্দ।
আমদানিনির্ভর বাংলাদেশ। চাল-চিনি-গম তো হতেই পারে, পরোটা পর্যন্ত আমদানি হচ্ছে মালয়েশিয়া থেকে। ভারত থেকে ডিম। মিয়ানমার থেকে কৃত্রিম ডিম। পাকিস্তান থেকে সেমাই। তবে ভুনা-গোশত ও কাবাবের সব উপাদান ভারত থেকে আসে। শেষ পর্যন্ত ভারত গরু ও উট সাপ্লাই দিয়ে কুলিয়ে উঠবে না। অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও ডেনমার্ক থেকে শুধু গুঁড়ো দুধ নয়, বিরাট বিরাট কার্গো বিমানে কোরবানির গরু আসা শুরু হলো বলে!
তবে কোরবানির ঈদের একটি লাভজনক দিকও আছে। বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত হয়তো একটি জিনিসই রফতানি করবে। তা হলো কোরবানির গরুর অণ্ডকোষ। শুনেছি, কোরবানির ষাঁড়ের অণ্ডকোষ রপ্তানির পরিমাণ সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বেড়েছে। ওই জিনিসটির সুপ নাকি ব্যাংকক-হংকংয়ের হোটেল-রেস্তোরাঁর খদ্দেরদের বেজায় প্রিয়। ষাঁড়ের অণ্ডকোষের সুপের নাম শুনলে তাদের জিভে পানি আসে।
মুসলমানদের সঙ্গে খানাপিনা, কাপড়চোপড়, ভোগবিলাস ও অপচয়ে আর কোনো সম্প্রদায় পাল্লা দিয়ে পারবে? আগে কাপড়, খাদ্য ও বিলাসদ্রব্যে ব্যয় করত। এখন যার টাকা আছে সে মাথার চুল ছাঁটতে লাখ লাখ টাকা ব্যয় করে। মুসলমান ধর্মশাস্ত্রে বলা হয়েছে, যে অপব্যয় করে, সে শয়তানের ভাই। এখন তো দেখছি শয়তানের ভাইবেরাদারের সংখ্যা মুসলিম উম্মাতেও কম নেই। মুসলমানপ্রধান দেশগুলোয় প্রাকৃতিক সম্পদ প্রচুর। শিল্পোন্নত দেশগুলোকে সস্তায় কাঁচামাল সরবরাহ করে তারাই। অথচ দুনিয়ায় সবচেয়ে গরিব হলো মুসলমানেরাই—বিত্তে ও বিদ্যায়, ধনে ও জ্ঞানে। বিত্ত নেই, জ্ঞানের চর্চা নেই বলে আজ তারা নির্যাতিত, নিপীড়িত, পদানত।
মুসলমানেরা তো এমনটি ছিল না। সাত থেকে চৌদ্দ শতক পর্যন্ত তারা ছিল শিল্প-সংস্কৃতি-সভ্যতায় সবচেয়ে অগ্রসর। ১৯৫২ সালে প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ স্যার আর্নল্ড টোয়েনবি বিবিসিতে দেওয়া তাঁর দেওয়া রীথ বক্তৃতায় (Reith Lectures) ‘ইসলাম অ্যান্ড দ্য ওয়েস্ট’-এ বলেন, ‘কমিউনিজমকে বলা হয় খ্রিষ্টধর্মের প্রতিদ্বন্দ্বী মত। ইসলামও ছিল খ্রিষ্টধর্মের প্রতিদ্বন্দ্বী। কমিউনিজমের মতো ইসলামও তার প্রথম দিকের কর্মসূচিতে তত্কালীন খ্রিষ্টজগতের দুর্নীতি ও অনাচার উচ্ছেদের ভূমিকা গ্রহণ করে সাধারণ মানুষের মন জয় করেছিল। ইসলামের প্রথম যুগের সাফল্য থেকে এটাই প্রমাণিত যে সংস্কারকামী বিরুদ্ধ ধর্ম অন্য ধর্মের গোঁড়ামির ভিত্তিতে আঘাত হেনে কতটা দুর্বার গতিতে সফল হতে পারে, কারণ আক্রান্ত ধর্ম নিজের পথ পরিষ্কার করতে ব্যর্থ হয়ে টিকে থাকতে পারে না। খ্রিষ্টীয় সাত শতক থেকে আরবের মুসলমানেরা সিরিয়া থেকে উত্তর আফ্রিকা ও স্পেন পর্যন্ত বিশাল ভূখণ্ডকে খ্রিষ্টান গ্রেকো-রোমান আধিপত্য থেকে মুক্তি দিয়েছিল। মহাবীর আলেকজান্ডার যখন পারস্য সাম্রাজ্য জয় করেন এবং রোমানরা কার্থেজ অধিকার করে, তখন থেকে প্রায় হাজার বছর এসব দেশ গ্রিক বা রোমানদের অধিকারে ছিল। তার পর ১১ থেকে ১৬ শতকের মধ্যে মুসলমানেরা গোটা ভারতীয় উপমহাদেশ জয় করে। ইসলাম ধর্মও শান্তিপূর্ণভাবে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে থাকে পরে ইন্দোনেশিয়া ও চীন মহাদেশ এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে আফ্রিকার দেশগুলোতে। আমরা দেখেছি, মধ্যযুগের শেষের দিকে রাশিয়াও সাময়িকভাবে মুসলমানদের হস্তগত হয়েছিল। এবং পূর্ব ইউরোপের খ্রিষ্টরাজ্য তুরস্ক ওসমানীয় শাসনে চলে যায়।’
প্রথম পাঁচ-সাত শ বছরের মুসলমানদের সম্পর্কে অমুসলমান ইতিহাসবিদেরা আরও অনেক কথাই লিখেছেন। মুসলমানেরা শুধু ঘোড়া দাবড়িয়ে দেশ জয় করেনি, করেছে অনেক কিছু। বাগদাদে মুসলমানেরা যে সভ্যতা ও সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিল, এখনো আমেরিকা সে পর্যায়ে যায়নি। বিশ্বের ইতিহাসে মুসলমানেরাই প্রথম সবচেয়ে বড় পাবলিক লাইব্রেরি গড়ে তোলে বাগদাদে। মুসলমানেরাই প্রথম হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা। চীন ও ভারতবর্ষে ধর্মভিত্তিক বিদ্যাপ্রতিষ্ঠান ছিল, কিন্তু আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জনক মুসলমানেরা। আব্বাসীয় খলিফা মামুনের (৮১৩—৩৩) সময় থেকে মুসলমানেরা যে বিজ্ঞান ও দর্শনের চর্চা শুরু করে, তা অব্যাহত ছিল ইতালীয় রেনেসাঁর আগ পর্যন্ত।
আল কিন্দি, আল ফারাবি, আল রাজি, ইবনে সিনা, আল গাজ্জালিদের মতো অসংখ্য দার্শনিক-বিজ্ঞানী; সমরখন্দের আল খোয়ারিজমি বা আল কাশির মতো গণিতবিদ; ওমর খৈয়াম বা নাসিরউদ্দিন আত তুসির মতো কবি ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী, ইবনে আল হায়তামের মতো পানিবিজ্ঞানী আজ কোথায় মুসলমান দেশগুলোয়?
১৮ শতকের শেষার্ধ থেকে মুসলিম দেশগুলো খ্রিষ্টীয় ইউরোপ দখল করতে থাকে। বাংলায় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও জাভায় ডাচ্ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এসে বসে যায়। ওদিকে মিসর, সুদান, মালয়, তিউনিশিয়া, মরোক্কো প্রভৃতি দেশের কোথাও ইংরেজ, কোথাও ওলন্দাজ, কোথাও ফরাসি, কোথাও স্পেনিয়ার্ডরা গিয়ে গ্যাট হয়ে বসে। ২০ শতক থেকে তাদের সঙ্গে যোগ হয়েছে আমেরিকার নয়া সাম্রাজ্যবাদ।
তবে মুসলমানদের ক্ষতি অমুসলমানেরা যত না করেছে, তার চেয়ে ঢের বেশি করেছে মুসলমান শাসকেরা নিজেরাই। তাঁদের কাছে মাথার চুলই গুরুত্বপূর্ণ, মগজ নয়। তাই লন্ডন থেকে নাপিত এনে প্রতিবার ৫০ লাখ টাকা করে বছরে তিন কোটি টাকা চুল কাটায় ব্যয় করেন। তা না করে লন্ডন থেকে প্রকাশিত বার্নার্ড লুইস লিখিত-সম্পাদিত ইসলাম-এর মতো একটি বই যদি কোনো মুসলমান দেশ প্রকাশ করত, তার শাসককে কুর্নিশ করতাম। বিজ্ঞান, চিকিত্সা বিজ্ঞান বা শিল্পচর্চায় মুসলিম দেশগুলো পিছিয়ে। অনেক দিন থেকেই মুসলমানজগতে তত্ত্বজ্ঞানী নেই, দার্শনিক নেই, পদার্থবিজ্ঞানী নেই, বড় শিল্পী-সাহিত্যিক নেই। এখন দেখছি ভালো নাপিত পর্যন্ত নেই। বিত্তবান মুসলমানদের বিমারি হলে তার চিকিত্সা করে অমুসলমান হেকিম, চুল বড় হলে কাটে অমুসলমান নাপিত। মুসলমানেরা জানে না, মাথার সুন্দর চুলের চেয়ে ভালো মগজটার মূল্য বেশি। এই স্বভাবের বদল না হলে মুসলমানদের ধ্বংস অনিবার্য।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

পূর্ণাঙ্গ রূপ পেতে আর কত সময় লাগবে -আশুগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

আশুগঞ্জের উপজেলায় উন্নীত হওয়ার পর নয় বছরেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু এ উপজেলায় আজও কোনো স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মিত হয়নি। উপজেলার দেড় লাখেরও বেশি অধিবাসীকে চিকিত্সাসেবার জন্য নির্ভর করতে হচ্ছে উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের ওপর। এখানে শুধু প্রাথমিক চিকিত্সা পাওয়ার সুযোগ আছে। জরুরি প্রয়োজনে চিকিত্সা নিতে হলে অন্যত্র যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। সময়মতো হাসপাতালে না পৌঁছাতে পারার কারণে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুও ঘটে।
সোমবারের প্রথম আলোর এক সরেজমিন প্রতিবেদনে উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রটির বেহাল দশা ফুটে উঠেছে। চিকিত্সার দায়িত্বে আছেন একজন চিকিত্সা কর্মকর্তা, একজন উপসহকারী চিকিত্সা কর্মকর্তা ও একজন ফার্মাসিস্ট। প্রতিবেদক এই কেন্দ্রে গিয়ে দেখতে পান, চিকিত্সা নিতে আসা লোকের সংখ্যা অত্যধিক হওয়ায় এখানকার উপসহকারী চিকিত্সা কর্মকর্তা গড়ে প্রতি ১৬ সেকেন্ডে একজন রোগী দেখছেন। এত কম সময়ে কাউকে ব্যবস্থাপত্র দেওয়া থেকেই ধারণা করা যায়, কী ধরনের সেবা এখান থেকে পাওয়া যায়। আধুনিক ও মানসম্মত চিকিত্সাসেবা প্রাপ্তি উপজেলাবাসীর জন্য স্বপ্নই রয়ে গেছে।
উপজেলা ঘোষণার পর এত দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও প্রস্তাবিত স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জমি অধিগ্রহণ ছাড়া নির্মাণকাজের কোনোই অগ্রগতি হয়নি। এই কালক্ষেপণ কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলারই নামান্তর। জনস্বাস্থ্যের মতো জরুরি বিষয়ে এমন অবহেলা আর কত দিন দেখে যেতে হবে?
স্বাস্থ্য মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। জনগণ যেন স্বাস্থ্যের সর্বোচ্চ স্তর অর্জন করতে পারে এবং তা ধরে রাখতে পারে, এর জন্য উপযুক্ত আয়োজন রাষ্ট্রীয়ভাবেই করতে হবে। এতে অবহেলা, অযথা কালক্ষেপণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আর কালবিলম্ব না করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

একটি স্থায়ী পর্যালোচনা পরিষদ গঠন করা উচিত -সংবিধান সংশোধন

কিছু দিন ধরে সরকারের তরফে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগের কথা শোনা যাচ্ছে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী শফিক আহমেদ এ নিয়ে মোটামুটি পরিষ্কারভাবে বললেন, সংবিধান সংশোধনের কাজে তাঁরা হাত দিতে যাচ্ছেন। এ বিষয়ে প্রাথমিক কাজ করবে আইন কমিশন। তাদের তৈরি করা সংশোধনীর খসড়া নিয়ে জাতীয় সংসদের ভেতরে ও বাইরে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে সংশোধনী আনা হবে।
৩৭ বছরে আমাদের সংবিধানে সংশোধনী আনা হয়েছে ১৪ বার। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সংবিধান সংশোধন করা হয় তাকে আরও উন্নত ও গণমুখী করার লক্ষ্যে। কিন্তু আমাদের সংবিধানের সংশোধনীগুলো রাষ্ট্রের এই সর্বোচ্চ দলিলের অবনমন ঘটিয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে এমন সংশোধনীও আনা হয়েছে, যার ফলে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো, এর অন্তর্নিহিত চেতনা নেতিবাচক দিকে বদলে গিয়েছে। এসব অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিলে সংবিধান সংশোধনীর প্রসঙ্গ ওঠামাত্র উদ্বেগ জাগতে পারে, প্রশ্ন উঠতে পারে সংশোধনীর উদ্যোক্তাদের উদ্দেশ্য নিয়ে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপির মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন তো বলেই ফেললেন, ‘আবারও ক্ষমতায় আসার পথ পরিষ্কার করতেই সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিচ্ছে আওয়ামী লীগ সরকার।’
সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন দেখা দিতেই পারে, বিরোধী দলের তাতে আপত্তি জানাতেই হবে এমন নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ভারতসহ বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলোয় সময়ে সময়ে অনেকবার সংবিধান সংশোধিত হয়েছে। আমাদের সাংবিধানিক যাত্রা অগ্রমুখী না হয়ে পশ্চাত্মুখী হয়েছে; গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা, আইনের শাসন, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও ভারসাম্য বাড়ানোর লক্ষ্যে অতীতের ভুলগুলো শোধরানোর লক্ষ্যে আমাদের সংবিধানে সংশোধনী আনা প্রয়োজন।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়নি, সংবিধানে কী কী বিষয়ে সংশোধনী আনার কথা ভাবা হচ্ছে। তবে এমন ধারণা আছে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা, সরকার ও স্থানীয় সরকারের মেয়াদ পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে চার বছর করা ইত্যাদি বিষয়ে সংশোধনী আনা হবে। যে বিষয়ে যা-ই করা হোক না কেন, সব পক্ষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে তা করা দরকার; স্রেফ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে নয়। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম যথার্থই বলেছেন, ‘জাতীয় ঐকমত্য ছাড়া সংবিধানে হাত দেওয়া সঠিক হবে না।’ এই দৃষ্টিভঙ্গি যেন পুরো সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি হয়। অন্যদিকে বিরোধী দলের মনোভাবও শুধু বিরোধাত্মক হলে চলবে না। এটা স্বীকার না করে উপায় নেই যে সংবিধানকে যুগোপযোগী করা প্রয়োজন। সে লক্ষ্যে এর হালনাগাদের প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলেরও সক্রিয় অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ।
দলীয় বা মহলবিশেষের রাজনৈতিক স্বার্থে নয়, আরও গণতন্ত্র, আরও শক্তিশালী আইনের শাসন, নাগরিকদের আরও অধিকার নিশ্চিত করতে, সংবিধানে বিদ্যমান অসংগতি বা অসম্পূর্ণতাগুলো দূর করতে সব পক্ষের রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, সুবিবেচনাও প্রয়োজন। অভিজ্ঞ ও সর্বজনশ্রদ্ধেয় আইনজ্ঞ, সংবিধান-বিশেষজ্ঞ এবং সাংসদের সমন্বয়ে এ বিষয়ে একটি স্থায়ী সংবিধান পর্যালোচনা পরিষদ গঠন করলে ভালো হয়; যাঁরা প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সংবিধান সংশোধনীর সুপারিশ করবেন।