Thursday, February 5, 2015

পেট্রলবোমায় ট্রাক চালক দগ্ধ: ফেসবুকে ‘দায় স্বীকার’ ছাত্রলীগের

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের ফেসবুকের অফিসিয়াল পেজে পেট্রলবোমা ও ককটেল বিস্ফোরণের দায় স্বীকার করে পোস্ট দেয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার বেলা ১২টার দিকে ওই পোস্ট দেয়া হয়। এর প্রায় ৪০ মিনিট পর আবার ওই পোস্টটি ডিলিট করা হয়েছে। তবে ছাত্রলীগের দাবি, ‘একজন এডমিনের ব্যক্তিগত এ্যাকাউন্ট হ্যাক’ করে কেউ ওই পোস্ট করেছে।
প্রসঙ্গত, গত বুধবার রাত ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে ঢাকাগামী মালবাহী ট্রাকে পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করে দুবৃর্ত্তরা। এতে গাড়ির সামনের অংশ পুড়ে যায় এবং ট্রাক চালক দগ্ধ হয়েছে। এছাড়া গত ৩ থেকে ৪ দিন ধরে রাবির আবাসিক হলসহ ক্যাম্পাসের ভিতরে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে। তবে এসব ঘটনায় পুলিশ এখনও পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারে নি। এ বিষয়ে ছাত্রলীগের একটি গোপন সূত্র জানিয়েছে, ‘ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের স্বার্থে বিভিন্ন সময় ছাত্রলীগের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে।’
সূত্র জানায়, ‘বাংলাদেশ স্টুডেন্ট লীগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিট’ নামে একটি ফেসবুক পেজে বেলা ১১টা ৫০ মিনিটের দিকে একটি পোস্ট আপডেট করা হয়। ওই পোস্টে উল্লেখ করা হয়, “চিন্তা কর মামা কি ব্রেইন। পেট্রল বোমা ককটেল মারছি আমরা আর দোষ হচ্চে বিএনপি ছাত্রদল জামায়াত শিবীর এর। একেই বলে পলিটিক্স।” প্রায় সাড়ে ৮ হাজার লাইকের ওই ফ্যান পেজে এই পোস্ট দেয়ার ১২ মিনিটের মাথায় ১২ টি লাইক পড়ে। প্রায় ৪০ মিনিট পর ওই পোস্ট ডিলিট করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি মিজানুর রহমান রানা রাবি ছাত্রলীগের নামে খোলা ওই পেজটি ছাত্রলীগের অফিসিয়াল পেজ বলে স্বীকার করেছেন। তবে এ্যাকাউন্টটি হ্যাক করা হয়েছিল দাবি করে তিনি বলেন, ‘পেজের এ্যাডমিন ছাত্রলীগের দু’জন কর্মীর সঙ্গে পরে এ বিষয়ে আমার কথা হয়েছে। একজন  এ্যাডমিনের ব্যক্তিগত একাউন্ট হ্যাক হওয়ায় তার একাউন্ট থেকে ওই পোস্ট দেয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে আমরা পুলিশ প্রশাসনের নিকট মৌখিকভাবে জানিয়েছি।’

বৃটিশ হাইকমিশনারের উদ্বেগ

চলমান সহিংসতায় অব্যাহত প্রাণহানি আর হতাহতের ঘটনায় উদ্বগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত বৃটিশ হাই কমিশনার রবার্ট ডব্লিউ গিবসন। সহিংসতা থেকে বেরিয়ে আসতে তিনি সকল পক্ষকে এক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। চলমান সহিংসতায় দেশের উন্নয়ন এবং স্থীতিশীলতা ব্যহত হচ্ছে বলে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, শিশুদের পড়াশোনা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। অর্থনীতিতে প্রভাব পড়ছে প্রতিদিন। এতে দেশের উন্নয়ন ও স্থিতির ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে। সহিংস কর্মকা- ও ভয় ভীতি প্রদর্শন করা এবং এসব কাজে উস্কানি দেয়া থেকে বিরত থাকতে তিনি সকল পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। বৃটেন থেকে বাংলাদেশে ফিরে দেয়া এক বিবৃতিতে গিবসন এসব কথা বলেছেন। বিবৃতির শুরুতে তিনি বলেন, গত এক মাসে বাংলাদেশ জুড়ে সহিংস কর্মকা-ে ৫০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে আহত হয়েছে কয়েক শত। এতে আমি গভীরভাবে মর্মাহত। চলমান পরিস্থিতিতে চুড়ান্ত মূল্য যে নিরপরাধ মানুষকে দিতে হচ্ছে- মঙ্গলবার কুমিল্লায় এতোগুলো মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু তার উদাহরণ বলে তিনি উল্লেখ করেন। শোকাহত পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করে গিবসন বলেন, যুক্তরাজ্য বাংলাদেশ সরকারসহ সকল দলকে সংযম প্রদর্শন এবং আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে অব্যাহতভাবে আহ্বান জানাচ্ছে। সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলার এ চক্র ভাঙতে তিনি সকল পক্ষকে এক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

সংলাপের সম্ভাবনা অন্ধকারে ঢাকা by এস এম ফজলে আলী

বিএনপি সংলাপ চায়। তারা সংলাপের জন্য দীর্ঘ একটি বছর অপেক্ষা করেছেÑ কোনো আন্দোলনে যায়নি। কিন্তু আওয়ামী লীগ ও তার জোট সরকার নির্বাচনের আগে ও পরে সে সংলাপ করার ওয়াদা করেও তা থেকে সরে গেছে। এরা এখন বলছে, তাদের সরকারের মেয়াদ শেষ হলে ২০১৯ সালে এ ব্যাপারে ভেবে দেখবে। সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও ড. বদরুদ্দোজা চৌধুরীসহ প্রায় সবাই সংলাপে বসার তাগিদ দিচ্ছেন। একই আহ্বান জানাচ্ছেন বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশী কূটনীতিকেরাও। জাতিসঙ্ঘ সঙ্ঘাত থামিয়ে সংলাপে বসার অনুরোধ জানিয়েছে উভয় দলকে। কিন্তু শাসক দল আওয়ামী লীগ সংলাপের বিপক্ষে অনড়। সংলাপের দাবিতে আন্দোলনরত বিএনপিকে মোকাবেলা করার জন্য পাড়ায় পাড়ায় কমিটির নামে দলীয় লাল বাহিনীকে আন্দোলনরতদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিচ্ছে। অধিকন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোকে আওয়ামী লীগ সরকারের পেটোয়া বাহিনীতে পরিণত করে আন্দোলনকারীদের গুম, খুন, মামলা-হামলা দেশের সংবিধানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সমানে চালিয়ে যাচ্ছে। এরা যে জনগণের টাকায় লালিতপালিত ও তাদের সেবক, সে কথা বেমালুম ভুলে গেছে। পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবির প্রধানেরা রাজনৈতিক নেতাদের মতো ধর মার কাটের মতো বক্তব্য দিচ্ছেন। এরা জনগণকে গ্রেফতারের বাণিজ্য সমানে চালিয়ে যাচ্ছেন। এ অবস্থায় বিভিন্ন মহলের আশঙ্কা, শিগগিরই সংলাপ হচ্ছে না। চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা করছেন এরা।
অবরোধের ২১তম দিন আজ (২৪ জানুয়ারি ২০১৫)। শনিবার ১৭ জানুয়ারি রাজনৈতিক বক্তব্য দেয়া সরকারের তিন শীর্ষ কর্মকর্তা পুলিশের আইজি শহিদুল হক, র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ এবং বিজিবির মহাপরিচালক আবদুল আজিজের বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা বিএনপিসহ দেশের সব সচেতন মহল করে যাচ্ছে। এরা জনগণের সেবক হয়ে এ ধরনের উসকানিমূলক রাজনৈতিক বক্তব্য কিভাবে দেন? তাদের রাজনীতি করার খায়েশ হলে এরা উর্দি ছেড়ে, সরকারের পদ-পদবি ছেড়ে মাঠে নামছেন না কেন? জনগণ তাদেরকে কোনো একটি দলীয় সরকারের লেজুড়বৃত্তি করার জন্য কোষাগার থেকে তাদের পেছনে খরচ করার নজির বিশ্বের কোথাও নেইÑ আছে শুধু বাংলাদেশে। মিথ্যা মামলা দিয়ে বাড়িঘরে হানা দিয়ে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ধরে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন, গুম ও হত্যার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে দেশের সুশীল ও সচেতন নাগরিকেরা। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া তো প্রথম থেকেই বলে আসছেন, ‘সফলতা না আসা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে’। সবশেষে তিনি বলেছেন, উন্মুক্ত জনসভা করতে দিলে তিনি আন্দোলন প্রত্যাহার করবেন। শাসক দলের জনসভা করতে দিতে এত আপত্তি কেন? তিনি তো বলেছেন, জনসভা হবে শান্তিপূর্ণ। এর আগে তিনি ১১টি মহাসমাবেশ করেছেন; কোনোটায় তো কোনো অশান্তি হয়নি। তার গাজীপুরের সমাবেশকে অন্যায় ও অবৈধভাবে শাসক দল ও তাদের সাঙাতরা বানচাল করে দেয়ায় বিরোধের সৃষ্টি হয়। ২০ দল ৫ জানুয়ারি ঢাকায় সমাবেশ করতে চাইলে তার অনুমোদন সরকারের ইঙ্গিতে ডিএমপি দেয়নি। শুধু তা-ই নয়, বেগম খালেদা জিয়াকে তার অফিস কার্যালয়ে এমনভাবে বন্দী করে রাখা হয় যেন তিনি দেশদ্রোহী কোনো নেতা। এ ধরনের নজিরবিহীন বন্দী অবস্থা বাংলাদেশে এর আগে আর কখনো কেউ দেখেনি। খালেদা জিয়া কি শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন? সরকারের এসব অমানবিক কাণ্ডে খালেদা জিয়া ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছেনÑ ‘সফলতা না আসা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে’। এরপর তিনি বলেন, ২০ দলকে সভা করতে দিলে তিনি আন্দোলন প্রত্যাহার করবেন। কিন্তু সরকার নিজেদের এমন নাজুক অবস্থায় মনে করছে যে, তা করতে দিলে তাদের মহা বিপর্যয় হয়ে যাবে।
শান্তির জন্য সংলাপের আহ্বান দেশের নেতৃত্বের পক্ষ থেকে আসছে। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ উভয় দলকে সংলাপে বসার আহ্বান জানিয়েছেন। দেশে যা চলছে তা থেকে মুক্তি পেতে হলে দুই দলকেই আলোচনায় বসতে হবে। এরশাদের আগে আরেক সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। সম্প্রতি তিনি দুই দলকে উদ্দেশে করে সাংবাদিকদের বলেন, আলোচনায় বসুন। নিজেরা না বসলে বিদেশী চাপে বসতে হতে পারে। সেটা হবে খুবই লজ্জার ব্যাপার। চলমান রাজনৈতিক অচলাবস্থায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছে জাতিসঙ্ঘ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা দেশগুলো। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলেছে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কয়েক দফা বৈঠক করেছেন নিজেদের মধ্যে। তাদের বৈঠকের পর সম্প্রতি কূটনীতিকদের ডেকে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। পরিস্থিতি নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খানের গুলশানের বাসায় বৈঠক করেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রভাবশালী আটটি দেশের কূটনীতিকেরা। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হচ্ছে, বিএনপি বিদেশী কূটনীতিকদের নিয়ে ষড়যন্ত্র করছে। অথচ ওই কূটনীতিকদের নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফলাও করে বৈঠক করেছেন, তাতে কি দোষের কিছু নেই? আমরা মনে করি, দেশের রাজনৈতিক সমস্যা দেশের রাজনীতিবিদদেরই সমাধান করতে হবে। বিদেশী প্রেসক্রিপশনে এর আগেও কোনো সঙ্কটের সমাধান হয়নি।
দেশের সাধারণ জনগণ চায় অর্থপূর্ণ সংলাপ। দেশের বিশিষ্ট নাগরিকেরা নানাভাবে বলে যাচ্ছেন অতি দ্রুত অর্থপূর্ণ সংলাপ শুরু করার জন্য। সংলাপ শুরু হলে সমঝোতার পথও বেরিয়ে আসবে। এর মধ্য দিয়ে আগাম নির্বাচনের কথাও উঠে আসছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ও বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ প্রশ্ন তুলেছেন, দেশে যখন রাজনৈতিক সঙ্কট রয়েছে তখন আলাপ-আলোচনা ছাড়া ভিন্ন কোনো পথ আছে কি? এ ছাড়া বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল-হক, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা আকবর আলি খান, রাশেদা কে. চৌধুরী এবং টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এক বাক্যে বলেছেন, সমঝোতা ছাড়া সঙ্কট নিরসনের অন্য কোনো উপায় নেই।
দেশে কোনো রাজনৈতিক সঙ্কট দেখা দিলে তা সমাধান করার জন্য সরকারকে উদ্যোগী হতে হয়। গণতান্ত্রিক সরকারের এটাই নিয়ম। আর স্বৈরাচারী সরকার হলে গায়ের জোরে সব কিছু করতে চায়। ভবিষ্যতে এর পরিণতি হয় ভয়াবহ। সরকার যেভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করছে, একদিন এর জন্য তাকেই তার মাশুল দিতে হবে। দেশের রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান রাজনৈতিকভাবে না হলে আগের মতো আবার তৃতীয় শক্তি এসে স্থান দখল করতে পারে। তখন সরকারি দলকেই বেশি খেসারত দিতে হয়।
সংলাপের ধোঁয়াসা দূর করার পদক্ষেপ নিয়ে হানাহানি, কাটাকাটি থেকে দেশকে মুক্তি দিন। এ কাজটি সরকারি দলের উদ্যোগেই হতে হবে। ইতোমধ্যে সাধারণ মানুষ দেশের রাজনীতিতে বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠছে। একে যদি আপনারা আরো উসকে দেন তাতে দেশ জ্বলেপুড়ে ছারখার হওয়ার আগেই জনগণ কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আশা করি, রাজনীতিবিদেরা সে পথে আর এগোবেন না। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে হারজিত কোনো ব্যাপারই নয়। এটা মেনে নিয়েই রাজনীতি করতে হয়।
লেখক : প্রকৌশলী

মিঠাপুকুরের ভাইস চেয়ারম্যানসহ নিখোঁজ চার জনের সন্ধান দাবি

রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলা পরিষদের নির্বাচিত ভাইসÑচেয়ারম্যান আবদুল বাসেত মারজানসহ নিখোঁজ চার জনের সন্ধান চান তাদের পরিবারে সদস্যরা।  গতকাল  জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সাংবাদ সম্মেলনে পুলিশের হাতে আটক আবদুল বাসেত মারজানের স্ত্রী রোকাইয়া খানম লুকি একই এলাকার আল-আমীন, তার স্ত্রী বিউটি বেগম ও তাদের প্রতিবেশী মৌসুমীর সন্ধান দাবি করেন। রোকাইয়া খানম লুকি বলেন, ১৪ই জানুয়ারী মিঠাপুকুর উপজেলায় যাত্রীবাহী বাসে পেট্রোলবোমা হামলায় ৪জন নিহত হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে যৌথবাহিনী সাধারণ মানুষের বাড়িÑঘরে হামলা, ভাংচুর ও গণহারে গ্রেপ্তার করে। ঘটনা স্থল থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সিটলি গ্রাম থেকে গত ১৫ই জানুয়ারী প্রকাশ্য দিবালোকে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে যৌথবাহিনী আল-আমিনকে গ্রেপ্তার করে। এ সময় তার স্ত্রী বিউটি বেগম ও প্রতিবেশী মৌসুমী আল-আমিনকে ছেড়ে দেয়ার জন্য অনুরোধ করলে তাদের সবাইকে আটক করে র‌্যাব অফিসে নিয়ে আসা হয়। ঘটনার পর প্রায় ২২ দিন অতিবাহিত হচ্ছে, অথচ তাদেরকে আদালতে সোপর্দ করা হয়নি এবং পরিবারের কাছেও ফেরৎ দেয়া হয়নি। তিনি বলেন, ৩১শেজানুয়ারী আমার স্বামী মিঠাপুকুর উপজেলার ভাইস-চেয়ারম্যান আবদুল বাসেত মারজান পরিষদের কাজে ঢাকায় আসেন। তিনি মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডে এক আত্মীয়ের বাসায় অবস্থান করছিলেন। ১লা ফেব্রুয়ারী ভোর রাতে সাদা পোশাকধারী ডিবি পুলিশ বিনা ওয়ারেন্টে আমার স্বামীকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। এরপর ৫ দিন অতিবাহিত হচ্ছে তাকে এখনো কোন আদালতে সোপর্দ করা হয়নি এবং পরিবারের কাছেও ফেরৎ দেয়া হয়নি। তিনি বলেন, আমরা এ ঘটনার পর পুলিশ, ডিবি ও র‌্যাবের সাথে বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে যোগাযোগ করেছি। কিন্তু তাদের কোন সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তারা যদি কোন অন্যায় করে থাকে তাহলে তাদের বিচারের জন্য আদালত আছে। তারা কোন অন্যায় করলে আমরা যে কোন শাস্তি মাথা পেতে নিতে প্রস্তুত আছি। কিন্তু বিনা-বিচারে দিনের পর দিন তাদেরকে আটকিয়ে রাখা সম্পূর্ণ অন্যায়, অমানবিক ও মানবাধিকার পরিপন্থী। আমাদের পরিবারের মাঝে সর্বদা অশান্তি, উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। আমার শিশু সন্তানরা তাদের পিতার জন্য এবং আল-আমিন ও বিউটি বেগমের সন্তানরা তাদের বাবা-মায়ের জন্য সর্বদা কান্না-কাটি করছে। তাদের খাওয়া-দাওয়া প্রায় বন্ধ।

ব্যবসায়ীদের বৈঠকে হট্টগোল

দেশের বিরাজমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে এফবিসিসিআইয়ের দেয়া কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য ডাকা সমন্বয় সভায় ব্যবসায়ীদের মাঝে হট্টগোল হয়েছে। সভায় এক ব্যবসায়ী ‘খালেদা জিয়া মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানে ভোগবিলাস করেছেন’ এমন বক্তব্য দেয়ায় এ হট্টগোলের সৃষ্টি হয়। গতকাল এফবিসিসিআই ‘দেশ বাঁচাও, অর্থনীতি বাঁচাও, হরতাল-অবরোধ আইন করে বন্ধ কর’ শীর্ষক এক আলোচনা সভার আয়োজন করে। সংগঠনের সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমদ সভায় সভাপতিত্ব করেন। এতে তিনি রোববার ১৫ মিনিটের জন্য সারা দেশের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ও সাদা পতাকা হাতে নিয়ে আইন করে হরতাল-অবরোধ বন্ধ করার আহ্বান জানান। বৈঠকে উপস্থিত ব্যবসায়ীরা জানান, ফজলে এলাহী নামের এক ব্যবসায়ী খালেদা জিয়াকে নিয়ে কটূক্তি করে বক্তব্য দেন। এ সময় সংগঠনের অন্য নেতারা প্রতিবাদ করেন। এতে দুই পক্ষের নেতাদের উচ্চ-বাক্যে হট্টগোলের সৃষ্টি হয়। প্রতিবাদকারীরা বলেন, এখানে কোন রাজনৈতিক বক্তব্য দেয়া যাবে না। কোন জাতীয় নেতার বিরুদ্ধে কোন ব্যবসায়ী মন্তব্য করতে পারবেন না। যার যে দলের প্রতি আনুগত্য রয়েছে তা মনে মনে রাখবেন। অন্তত এ জায়গায় রাজনৈতিক বক্তব্য দেয়া থেকে বিরত থাকবেন। এ অবস্থায় বেশ কিছুক্ষণ হট্টগোল চলতে থাকে। একপর্যায়ে সংগঠনের সহসভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, সভার শুরুতেই বলা হয়েছে কোন রাজনৈতিক বক্তব্য দেয়া যাবে না। তিনি বলেন, আমরা ব্যবসা করতে চাই, রাজনীতি নয়। সঙ্গে সঙ্গেই সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদের নির্দেশে সংগঠনটির সহসভাপতি হেলাল উদ্দিন আনুষ্ঠানিকভাবে ওই বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করেন। হেলাল বলেন, আমরা সবাই এক আছি। আমরা কোন জ্বালাও-পোড়াও চাই না। এদিকে আলোচনা সভা শেষে এফবিসিসিআই সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, আগামী রোববার ১৫ মিনিটের জন্য সারা দেশের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের সামনের রাস্তায় অবস্থান করে হরতাল-অবরোধের প্রতিবাদ জানাবেন ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে সাদা পতাকা হাতে নিয়ে আইন করে হরতাল-অবরোধ বন্ধ করার দাবিও জানাবেন তারা।
কাজী আকরাম বলেন, রোববার দেশব্যাপী পতাকা হাতে অবস্থান কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে আমরা রাজনীতিবিদদের জানাতে চাই, আমরা ব্যবসায়ী; সংঘাত চাই না, ব্যবসা করতে চাই। দেশকে এগিয়ে নিতে চাই। এদিন দুপুর ১২টা থেকে ১২.১৫মি. পর্যন্ত সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। উপস্থিত ব্যবসায়ীদের তিনি জানান, এফবিসিসিআইয়ের নির্ধারিত লেখা দিয়েই সবাইকে বেনার-ফেস্টুন বানাতে হবে। এর বাইরে কোন সংগঠন কিংবা রাজনৈতিক ভাষা ব্যবহার করা যাবে না।
চলমান অস্থিতিশীল রাজনীতি প্রসঙ্গে কাজী আকরাম বলেন, কখন কোথায় আগুন দেয়া হলো তা নিয়ে প্রতিদিনই আতঙ্কে থাকি। হরতাল-অবরোধে সাধারণ মানুষকে জীবন দিতে হচ্ছে। ব্যবসা-বাণিজ্য ধ্বংস হচ্ছে। সরকারের কাছে আমাদের দাবি আইন করে এসব বন্ধ করা হোক। তিনি বলেন, এ মুহূর্তে আইন করা না গেলে হরতাল-অবরোধ বন্ধে অন্তত এমন আইন করা হোক যে, যারাই বিরোধী দলে থাকুক না কেন ব্যবসায়ীদের যেন কোন ক্ষতি করতে না পারে। দুই নেত্রীর সংলাপ প্রসঙ্গে এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, ২০১৩ সালে আমরা ব্যবসায়ীরা দুই নেত্রীকে চেষ্টা করেও আলোচনায় বসাতে পারিনি। আবারও চেষ্টা করবো। কর্মসূচি পালনের পর সময় নির্ধারণ করে দুই নেত্রীকে স্মারকলিপি দেয়া হবে। আলোচনায় বসার অনুরোধ করা হবে।
বক্তারা বলেন, ব্যবসায়ী নেতাদের আরও কঠোর হতে হবে। তাদের প্রতিবাদী ভাষা কেবল জাতীয় পতাকা উত্তোলন বা জাতীয় সংগীত গাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। কারণ গত এক মাসের হরতাল-অবরোধে ব্যবসা খাতে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এ সময় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের তালিকা প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছানোর দাবি জানান তারা। হরতাল-অবরোধ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত সরকারকে কোন ভ্যাট না দেয়ার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান ব্যবসায়ীরা। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এফবিসিসিআই’র  সাবেক প্রথম সহসভাপতি আবুল কাশেম আহমেদ, বর্তমান প্রথম সহসভাপতি মনোয়ারা হাকিম আলী, সহসভাপতি হেলাল উদ্দিন ও পরিচালক এমএ মোমেন প্রমুখ।

‘র‌্যাট ট্রাইবস’দের বিচিত্র জীবন

এক স্বপ্ন নিয়ে বেইজিং নামক শহরটিতে গিয়েছিলেন তারা। কিন্তু গ্রামের অধিবাসীদের জন্য বেইজিং-এ জীবনযাত্রা অত সস্তা ছিল না। সুতরাং উপায় কী? মাটির নিচে চলে যাও! বলছি চীনের কথিত ‘র‌্যাট ট্রাইবস’দের কথা। র‌্যাট ট্রাইবস কোন উপজাতিদের নাম নয় বা কোন জাতিও নয়। তারা এসেছেন চীনের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। অনেকে আবার প্রতিবেশী দেশ থেকে ভাগ্যের সন্ধানে এসেছেন বেইজিং-এ। মাটির নিচে বাংকারে নিজেদের বসত বানিয়ে নিয়েছেন প্রায় এরকম ১০ লাখ মানুষ। এ মানুষগুলোর থাকার জন্য সবচেয়ে সেরা বিকল্প যেন এটিই। প্রতি মাসে ৩০০ ইউয়ান (৪৮ ডলার) খরচ হয় তাদের। মাটির উপরে যে দালানকোঠা, তার ভাড়ার তুলনায় মাটির নিচের ঘরগুলোর ভাড়া নিতান্তই কম। মাটির নিচে তাদের বসতি বলে কৌতুক করে তাদেরকে অনেকে ডাকে ‘র‌্যাট ট্রাইবস’। কথিত এ র‌্যাট ট্রাইবসদের গল্প ছাপা হয়েছে বৃটেনের ডেইলি মেইল পত্রিকায়। ১৯৬৯ সালে চীনের চেয়ারম্যান মাও সেতুং-এর আমলে শীতল যুদ্ধের সময় বানানো হয়েছিল বাংকারগুলো। সোভিয়েত হামলা হতে পারে আশঙ্কায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে রাখার জন্য শহরের বাসিন্দাদের প্রতি আদেশ জারি করা হয়েছিল। সে সময় প্রায় ২০ হাজার বাংকার খনন করা হয়েছিল মাটির নিচে। মাও মারা যাবার পর দেং শিয়াওপিং ক্ষমতায় এলেন। মাওয়ের আমলে নেয়া রক্ষণাত্মক কৌশল পরিহার শুরু হলো। এরপর বাড়ির মালিকরা হোটেল রুম হিসেবে বাংকারগুলো ভাড়া দিতে লাগলেন। ৯০-এর দশকের দিকে সরকার এসব অধিগ্রহণ শুরু করে। ওই রুমগুলোর বেশির ভাগ এখন লাভজনক আবাসন ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত। এর মানে, মঙ্গোলিয়া থেকে চীনে যাওয়া অভিনেতা ঝাং শি’র মতো অনেকে এখন আরও ভালোভাবে বাঁচতে পারবেন, স্বপ্নগুলো বুনতে পারবেন। তার পিতা-মাতা চেয়েছিলেন, তিনি পুলিশের চাকরি করবেন। কিন্তু তিনি সেটা চাননি। অভিনেতা হিসেবেই নিজেকে কল্পনা করে আসছেন সবসময়। কিন্তু এ পেশায় প্রতিষ্ঠিত হওয়াটা খুব কষ্টের। ভাড়া কম হওয়ায় তিনি থাকেন যুদ্ধের সময় খনন করা ওই ভূগর্ভস্থ রুমগুলোতে। শিল্পী সিম চি ইনের একটি শর্ট ফিল্মে দেখানো হয় ভূগর্ভস্থ ওই বাংকারগুলো। ঝাং জানান, যখন আমার বাবা আমাকে দেখতে এলেন, তখন আমার অবস্থা দেখে তিনি কেঁদেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, বাবা, আমি এমনটা প্রত্যাশা করিনি। কিন্তু আমি তাকে বলেছিলাম, যখন আমি বের হয়ে মানুষের সঙ্গে মিশি, তখন আমাকে বেশ মার্জিত দেখায়। তখন কে বলতে পারবে যে, আমি মাটির নিচে এমন একটি ঘরে থাকি? এরকম একটি রুমে থাকেন চেন লেক্সিউ নামের আরেকজন। ৫০ বছর বয়সী এ নারী সেখানে গিয়েছেন কয়লা খনির জন্য বিখ্যাত শহর লিউপানশুই থেকে। কৃষিকাজ আর লাভজনক মনে না হওয়ায়, নিজের ছেলের কাছে থাকতে বেইজিং-এ পাড়ি জমান তিনি। ঝাং জিনওয়েন নামের আরেকজন হাইস্কুল পার হওয়ার পরই হুবেই প্রদেশ থেকে চলে গিয়েছেন বেইজিং-এ। শিল্পী হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ার ইচ্ছে তার, তিনিও থাকছেন ওই মাটির নিচের ঘরগুলোয়। লি ইয়াং গিয়েছেন টংঝৌ থেকে। তিনি এখন কাজ করছেন কার মেকানিক হিসেবে। টাকা বাঁচানোর জন্য তিনিও থাকছেন বাংকারে। একই অবস্থা শু জুনিপিং-এর। তার পুরো পরিবার থাকছে সেখানে। পরিবার বলতে ১৭ বছর বয়সী ছেলে ঝোউ ঝেংদি ও তার স্বামী ঝোউ হাইলিন। এটি অবস্থিত উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় মরুভূমির পাশে। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, সব ঋতুতেই সুবিধাজনক আবহাওয়া বিরাজ করে এখানে। শীতকালে গরম লাগে, গরমকালে শীত অনুভূত হয়। তবে বেশির ভাগ বাসিন্দাই স্বপ্ন দেখেন, একদিন তারা মাটির উপরের দালানে থাকবেন। তবে তাদের স্বপ্ন বড়সড়ো প্রশ্নবোধক চিহ্নের সম্মুখীন। কেননা, ২০১০ সালেই কর্তৃপক্ষ ঘোষণা দিয়ে রেখেছে, শহরের বাসিন্দাদের নিরাপত্তা ও সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে শহরজুড়ে অভিযান চালানো হবে। এছাড়া, আদি বাসিন্দারা এই ‘র‌্যাট ট্রাইবস’দের বাইরের লোক বলে মনে করেন। সরকার ২০১২ সালের মধ্যে এসব বাংকার বিলুপ্ত করার ঘোষণা দিয়ে রেখেছিল। কিন্তু কম ভাড়ার প্রশ্নে বেইজিং-এ এ বাংকারগুলোই যেন সমাধান। তাই হয়তো এসব সরকার এখনও বিলুপ্ত করেনি। কিন্তু কখন শুরু হয়ে যায় সরকারি অভিযান, এ আশঙ্কায় অনিশ্চিত ভবিষ্যৎকে সঙ্গী করে পথ চলছে ১০ লাখ মানুষ।

চাপে আমি নত হব না: খালেদা জিয়া

‘অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানো না পর্যন্ত আন্দোলন চলতে থাকবে’ এমন মন্তব্য করে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছেন, “কোনো অনৈতিক চাপ বা ভীতির মুখে আমি নত হব না।যেকোনো পরিণতির জন্য আমি তৈরি আছি।” বৃহস্পতিবার বিকেলে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বিএনপির চেয়ারপারসন এমনটা জানিয়ে সবাইকে আন্দোলনে শরিক হওয়ার আহ্বান জানান।
বিবৃতিতে খালেদা জিয়া বলেন, “আমি পরিষ্কার ভাষায় আবারও বলতে চাই, মানুষের জীবন নিয়ে অপরাজনীতি আমরা করি না। হত্যা ও লাশের রাজনীতির সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। এমন হীন ও নৃশংস অপরাজনীতি আমরা কখনো করব না। এখন যারা ক্ষমতা আঁকড়ে আছে, তারাই অতীতে আন্দোলনের নামে যাত্রীবাহী বাসে গান পাউডার দিয়ে আগুন লাগিয়ে ডজন খানেক মানুষ পুড়িয়ে মেরেছে। লগি-বৈঠার তাণ্ডবে মানুষ হত্যা করে লাশের ওপর নৃত্য করেছে। লাগাতার হরতালে এসএসসি পরীক্ষা তিন মাস পর্যন্ত পেছাতে বাধ্য করেছে।”
খালেদা জিয়া অভিযোগ করেন, “অতীতের ধারাবাহিকতায় নিরপরাধ মানুষকে নৃশংস পন্থায় হত্যাকাণ্ড চালানো হচ্ছে। এর দায় চাপিয়ে আন্দোলনের বিরুদ্ধে প্রচার মাধ্যমে অপপ্রচার ও বিরোধী দলকে এ সুযোগে দমন করার অপরাজনীতি ব্যর্থ হবে। বাংলাদেশের মানুষ এত বোকা নেই।”
খালেদা জিয়া অভিযোগ করেন, “তার ছোট ছেলের মৃত্যুতে তিনি শোকাবহ অবস্থার মধ্যে রয়েছেন। এ বিপর্যয়ের ধকল কাটিয়ে ওঠার আগেই তার সঙ্গে নিষ্ঠুর আচরণ করা হয়েছে।”
তিনি বলেন, “সুপরিকল্পিতভাবে সর্বমুখী চাপ ও অনিরাপদ পরিস্থিতি তৈরি করে তারা আমাকে জনগণ ও নেতা-কর্মী থেকে বিচ্ছিন্ন করতে সচেষ্ট। কিন্তু আমি সবাইকে পরিষ্কার ভাষায় বলতে চাই, কোনো অনৈতিক চাপ বা ভীতির মুখে আমি নত হব না, ইনশা আল্লাহ। যেকোনো পরিস্থিতি বা পরিণতির জন্য আমি তৈরি আছি।”
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান স্বাক্ষরিত খালেদা জিয়ার পুরো বিবৃতিটি এখানে তুলে ধরা হলো:
“সকলের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে একটি সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে আন্দোলন চলছে। আমরা দেশবাসীর আশা-আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটিয়ে শান্তিপূর্ণ এ আন্দোলনের ডাক দিয়েছি। আমরা বলেছি, একটি যৌক্তিক পরিণতিতে না পৌঁছা পর্যন্ত এ আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। দেশের সাধারণ মানুষ এবং গণতন্ত্রের সংগ্রামে অবতীর্ণ নেতা-কর্মীরা অনেক কষ্ট সয়ে এবং বিচার বহির্ভূত হত্যা, গুম, গুলি করে আহত করা, অত্যাচার, নির্যাতন, লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস, পাইকারি গ্রেফতার, পুলিশি রিমান্ড, বাড়িতে হামলার মতো ভয়ংকর ত্রাসের রাজত্বের মধ্যেও আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রবল বাঁধা ও অত্যাচারের মুখেও যখন যেখানেই সম্ভব হচ্ছে, মিছিল ও প্রতিবাদে সোচ্চার হচ্ছেন তারা। আমি তাদের ধন্যবাদ জানাই।
জনগণ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে মুষ্টিমেয় স্তাবক ও সুবিধাভোগীদের দ্বারা বেষ্টিত সরকার জনগণের আন্দোলনে ভীত হয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এইসব বাহিনীর নিয়ন্ত্রণভার দলবাজ ও বিতর্কিত কতিপয় কর্মকর্তার হাতে তুলে দিয়ে তাদের মাধ্যমে জনগণ ও প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলসমূহের ওপর চরম জুলুম-নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চালানো হচ্ছে। গত ৬ জানুয়ারি দেশব্যাপী অবরোধ কর্মসূচি শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৩৩ জন বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মীকে আওয়ামী সন্ত্রাসী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলি, সাজানো বন্দুকযুদ্ধ ও নৃশংস অন্যান্য পন্থায় হত্যা করা হয়েছে। গুলি করে ও অন্যান্য পন্থায় আহত করা হযেছে শত শত নেতা-কর্মীকে। আটকের পর নিখোঁজ রয়েছে অসংখ্য নেতা-কর্মী। ১৭ হাজারের বেশি নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মিথ্যা মামলায় গ্রেফতারের ভয়ে ঘর-বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন কয়েক লক্ষ। অনেকের বাড়ি-ঘরে গভীর রাতে হানা দিয়ে ভাঙচুর, লুঠতরাজ, অগ্নিসংযোগের পাশাপাশি মহিলাসহ পরিবারের সদস্যদের নির্যাতন ও হেনস্তা করা হচ্ছে। এভাবে সারাদেশে এক ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে।
জনগণের ওপর এমন চরম জুলুম-অত্যাচারের পাশাপাশি গণমাধ্যমকে সম্পূর্ণভাবে সরকারি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আন্দোলনরত বিরোধী দল, জনগণ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বিরুদ্ধে একতরফা অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। সকলের মৌলিক-মানবিক সমস্ত অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। ক্ষমতাসীন ছাড়া প্রায় সকল রাজনৈতিক দলের স্বাভাবিক ও নিয়মতান্ত্রিক কার্যক্রম পরিচালনাও অসম্ভব করে তোলা হয়েছে। অফিস বন্ধ করে দেয়া, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করতে না দেয়া, এমনকি দলের পক্ষে কেউ বক্তব্য-বিবৃতি প্রদান করলেই সেই নেতাকে আটক করে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে হেনস্তা করা বর্তমানে নিয়মিত রীতিতে পরিণত হয়েছে। অপর দিকে রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে শাসক দলের সন্ত্রাসীরা লাঠিসোটা এমনকি মারণাস্ত্র নিয়ে আইন-শৃংখলা বাহিনীর ছত্রছায়ায় প্রকাশ্যে মহড়া দিয়ে বেড়াচ্ছে। তারা আমাদের দলের সিনিয়র নেতাদের ওপর গুলি করছে। তাদের গাড়ি, বাড়ি ও অফিসে বোমা হামলা চালাচ্ছে।
আমরা বারবার বলে এসেছি, আমাদের আন্দোলন সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক। এ আন্দোলন আমরা জনগণকে সঙ্গে নিয়েই অগ্রসর করে নেয়ার নীতিতে বিশ্বাস করি। কিন্তু আমাদের আন্দোলন চলাকালে যাত্রীবাহী ও অন্যান্য যানবাহনে পেট্রলবোমা মেরে ইতোমধ্যে নারী-শিশুসহ বেশ কয়েকজন নাগরিকের জীবন কেড়ে নেয়া হয়েছে। এই শোচনীয় মৃত্যুর পাশাপাশি বার্ণ ইউনিটে ঝলসানো দেহ নিয়ে অনেকে যন্ত্রনায় কাৎরাচ্ছেন। নিরপরাধ মানুষের ওপর এই বীভৎস আক্রমণের আমরা তীব্র নিন্দা জানাই। যারা হতাহত হয়েছেন তাদের প্রতি গভীর সহানুভূতি ও সমবেদনা জানাই। এইসব হীন ও নৃশংস হামলায় জড়িত প্রকৃত অপরধীদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি আমরা আগেই জানিয়েছি, আজ আবারো তার পুনরাবৃত্তি করছি।
তবে জীবন-বিনাশী এই সব ঘৃণ্য হামলার ব্যাপারে ইতোমধ্যেই জনমনে গভীর সন্দেহ ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। কারণ পরিপূর্ণ নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়ে আইন-শৃংখলা বাহিনীর প্রহরায় এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে জবরদস্তি করে শাসকগোষ্ঠী কিছু কিছু যানবাহন রাস্তায় নামাচ্ছে। সেই সব যানবাহনে কেমন করে ঘাতক বোমার নৃশংস হামলায় হতাহতের ঘটনা ঘটে, তা এক জ্বলন্ত প্রশ্ন। দ্বিতীয়ত, এইসব হামলার ঘটনায় ঘটনাস্থল থেকে আজ পর্যন্ত তেমন কাউকে হাতে নাতে ধরা সম্ভব হয়নি। কোথাও কোথাও বোমা, গুলি, আগ্নেয়াস্ত্রসহ শাসক দলের চেলা-চামুণ্ডারা পুলিশের হাতে ধরা পড়লেও উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে তাদেরকে ছেড়ে দেয়ার ঘটনা ঘটছে। অথচ ঘটনার পরপরই বিরোধী দল ও আন্দোলনের বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীনরা একতরফা প্রচারণা শুরু করে দিচ্ছে। কোনো তদন্ত ও তথ্য প্রমান ছাড়াই আমিসহ বিরোধী দলের শীর্ষস্থানীয় ও স্থানীয় নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে পুলিশ মামলা দায়ের করছে। কারারুদ্ধ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধেও এসব ঘটনায় মামলা হচ্ছে। বিভিন্ন বিষয়ে আমাকে সহায়তাকারী অরাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ এমনকি প্রবীণ শিক্ষাবিদ অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমদকে পর্যন্ত বোমাবাজির মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে। আমাদের পার্টির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব, আমার উপদেষ্টা ও দলের যুগ্ম-মহাসচিবসহ সিনিয়র নেতাদেরকে পর্যন্ত রিমান্ডে নেয়া হয়েছে।
আমি পরিষ্কার ভাষায় আবারো বলতে চাই, মানুষের জীবন নিয়ে অপরাজনীতি আমরা করিনা। হত্যা ও লাশের রাজনীতির সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। এমন হীন ও নৃশংস অপরাজনীতি আমরা কখনো করবো না। এখন যারা ক্ষমতা আঁকড়ে আছে তারাই অতীতে আন্দোলনের নামে যাত্রীবাসে গান পাউডার দিয়ে আগুন লাগিয়ে ডজন ডজন মানুষকে পুড়িয়ে মেরেছে। লগি-বৈঠার তা-বে মানুষ হত্যা করে লাশের ওপর নৃত্য করেছে। একটার বদলে দশটা লাশ ফেলার প্রকাশ্য নির্দেশ দিয়েছে। অফিসগামী কর্মকর্তাদের প্রকাশ্য রাজপথে বিবস্ত্র করেছে। সমুদ্রবন্দর অচল করেছে। রেলস্টেশন পুড়িয়ে দিয়েছে। লাগাতার হরতালে এসএসসি পরীক্ষা ৩ মাস পর্যন্ত পিছাতে বাধ্য করেছে। পবিত্র রমজান মাসে পর্যন্ত হরতাল করেছে। কর্তব্যরত পুলিশ অফিসারের মাথা ইট দিয়ে থেতলে দিয়েছে। ইয়াসমিন হত্যার প্রতিবাদের নামে দিনাজপুরে পুলিশ ব্যারাক জ্বালিয়ে দিয়েছে। তদানীন্তন বিডিআর-এর পানি সরবরাহের লাইন কেটে দিয়েছে। এখনকার নৃশংস ঘটনাবলীও তাদের অতীত কার্যকলাপের সঙ্গেই মিলে যায়। কাজেই দেশবাসী মনে করেন যে, আন্দোলন দমন ও বিরোধী দলের ওপর জুলুম-নির্যাতনের মাত্রা আরো বাড়াবার উদ্দেশ্যে শাসকদলই সুপরিকল্পিতভাবে এইসব সন্ত্রাসী ও নাশকতামূলক হামলার ঘটনা ঘটাচ্ছে। আমি এ ধরনের নৃশংস অপরাজনীতি বন্ধের আহ্বান জানাই। আমরা মনে করি, অতীতের ধারাবাহিকতায় নিরাপরাধ মানুষকে নৃশংস পন্থায় হত্যা করে তার দায়ভার চাপিয়ে আন্দোলনের বিরুদ্ধে প্রচার-মাধ্যমে অপপ্রচার এবং বিরোধী দলকে সেই সুযোগে দমন করার অপরাজীতি ব্যর্থ হবে ইনশাআল্লাহ্। বাংলাদেশের মানুষ আর এত বোকা নেই।
দেশবাসী জানেন, সম্প্রতি আমার কনিষ্ঠপুত্রের আকস্মিক অকাল মৃত্যুতে আমি মানসিকভাবে এক চরম শোকাবহ পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছি। এই বিপর্যয়ের ধকল কাটিয়ে ওঠার আগেই আমার সঙ্গে কী ধরনের নিষ্ঠুর আচরণ করা হয়েছে এবং হচ্ছে তা-ও সকলেই দেখছেন। সুপরিকল্পিতভাবে সর্বমুখী চাপ ও অনিরাপদ পরিস্থিতি তৈরি করে  তারা আমাকে জনগণ ও নেতা-কর্মী থেকে বিচ্ছিন্ন করতে সচেষ্ট। কিন্তু আমি সকলকে পরিষ্কার ভাষায় বলতে চাই, কোনো অনৈতিক চাপ বা ভীতির মুখে আমি নত হবো না ইনশাআল্লাহ্। যে-কোনো পরিস্থিতি বা পরিণতির জন্য আমি তৈরি আছি।
আওয়ামী শাসকদের একদলীয় ধাঁচের স্বৈরশাসন কায়েমের অপতৎপরতার কারণে অতীতে দেশ জঙ্গীবাদের কবলে পড়েছিল। আমরা তা দমন করেছিলাম। আজ আবার তারা একই কায়দায় উদারনৈতিক রাজনীতির ধারাকে নিশ্চিহ্ন করতে যে চ-নীতি অবলম্বন করছে তাতে আবারো সেই একই আশংকা দেখা দিয়েছে। এতে শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে। আমরা এই কঠিন বাস্তবতার দিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও গণতান্ত্রিক বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে এবং জনগণের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পক্ষে সোচ্চার হবার জন্য তাদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।
গত একটি বছর ধরে আমরা শান্তিপূর্ণভাবে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার ক্রমাগত আহ্বান জানিয়েছি। তারা কোনো কিছুতে কর্ণপাত করেনি। বরং সীমাহীন অত্যাচার উৎপীড়ন চালিয়ে গেছে। অবৈধভাবে করায়ত্ব করা রাষ্ট্রক্ষমতা টিকিয়ে রাখার হীন অভিপ্রায়ে তারা কোনো রকম সমঝোতায় রাজী হয়নি। এমনকি নির্বাচনী প্রহসনের মাধ্যমে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার কারণে সৃষ্ট রাজনৈতিক সংকটের কথা তারা স্বীকার করতেও রাজী নয়। তারা মনে করে, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের পথেই জনগণের আশা-আকাঙ্খাকে দমিয়ে দেয়া সম্ভব।  আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। আন্দোলন ছাড়া দেশবাসীর সামনে আর কোনো পথ খোলা রাখা হয়নি। তাই ক্ষমতার জন্য নয়, গণতন্ত্র, দেশবাসীর ভোটাধিকার ও হৃত মৌলিক মানবিক অধিকার ফিরিয়ে আনতে, শান্তি, নিরাপত্তা, আইনের শাসন ও সুবিচার নিশ্চিত করতে আমাদের এ আন্দোলন অভীষ্ট লক্ষে না পৌঁছা পর্যন্ত চলতে থাকবে। আমি এ আন্দোলনে সকলকে শরীক হতে আবারো উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি।
একদলীয় বাকশালী স্বৈরশাসনের অবসানের পটভূমিতে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এদেশের মানুষকে বহুদলীয় গণতন্ত্র ও অপহৃত অধিকার সমূহ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। আমরাই স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়ে ‘৯০এর ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের পথে গনতন্ত্র পুণপ্রতিষ্ঠা করেছিলাম। আজ আবারো আমরা গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার ফিরিয়ে আনার সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছি। ন্যায়ের এ সংগ্রাম অবশ্যই অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাবে ইনশাআল্লাহ্।
তারিখঃ ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

ঝড় তুলবে ঝাড়ু?

(অরবিন্দ কেজরিওয়ালের নেতৃত্বাধীন আম আদমি পার্টির (এএপি) প্রতীক ঝাড়ু। দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে ঝাড়ু প্রতীক ঝড় তুলতে পারবে কি না, তা জানা যাবে ১০ ফেব্রুয়ারি ফলাফল ঘোষণার দিন। ছবি: এএফপি) কাল বাদে পরশু দিল্লি বিধানসভার নির্বাচন। কে আসছেন মসনদে—এ নিয়ে চলছে শেষ মুহূর্তের হিসাব-নিকাশ। গতকাল বুধবার বিবিসি অনলাইনে প্রকাশিত এক নিবন্ধে জানানো হয়, নির্বাচনপূর্ব জরিপ ও গুঞ্জন যদি সত্যি হয়, তবে দিল্লির ক্ষমতায় আবার আসছে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের নেতৃত্বাধীন আম আদমি পার্টি (এএপি)।
৭০ আসনের দিল্লি বিধানসভায় ৭ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হবে। তিনটি প্রতিষ্ঠিত সংস্থার জরিপ বলছে, নির্বাচনে এএপি ৩৭টি আসন পেতে পারে। সরকার গঠন করতে প্রয়োজনীয় আসনের চেয়ে তা দুটি বেশি। ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ও এর মিত্ররা পেতে পারে ২৯টি আসন। আর কংগ্রেস পেতে পারে চারটি আসন।
জরিপের আভাসের চেয়েও বেশি আসন পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী এএপি। দলের অন্যতম শীর্ষ নেতা ও নির্বাচন-বিশ্লেষক যোগেন্দ্র যাদবের দাবি, এএপি ৪০-৫০টি আসন পাবে। যাদবের দাবি অনুযায়ী ফলাফল হলে সেটি হবে এএপির জয়জয়কার। আর বিজেপির হবে ভরাডুবি।
৪৬ বছর বয়সী সাবেক আমলা কেজরিওয়ালের রাজনীতিতে অভিষেক হয় ২০১৩ সালে। তখনকার দিল্লি বিধানসভার নির্বাচনে তাঁর দল ২৮টি আসন পেয়ে একক বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। কংগ্রেসের সমর্থনে সরকার গঠন করে এএপি। মুখ্যমন্ত্রী হন কেজরিওয়াল। তবে তাঁর ক্ষমতা বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। দুর্নীতিবিরোধী বিলকে কেন্দ্র করে মাত্র ৪৯ দিনের মাথায় তাঁর সরকার পদত্যাগ করে।
গত বছর ভারতের সাধারণ নির্বাচনে এএপির ভরাডুবি হয়। দলটি মাত্র চারটি আসন পায়। দলের ৯৬ শতাংশ প্রার্থী জামানত হারান। বিজেপির নরেন্দ্র মোদির কাছে লজ্জাজনকভাবে হারেন কেজরিওয়াল। তখন পত্রিকায় শিরোনাম হয়, ‘দলকে ধ্বংস করেছেন কেজরিওয়াল’।
বছর না ঘুরতেই ঘুরে দাঁড়িয়েছে এএপি। সবার ধারণা ভুল প্রমাণিত করেছেন কেজরিওয়াল। দিল্লি বিধানসভার নির্বাচনে জয়ের সম্ভাবনা তৈরি করতে পেরেছে দলটি। কেজরিওয়ালের ইতিবাচক নির্বাচনী প্রচারে গুরুত্ব পেয়েছে দিল্লির উন্নয়ন।
গতবার ক্ষমতা পেয়েও তা ছেড়ে দেওয়ার জন্য ভোটারদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন দিল্লির সাবেক এই মুখ্যমন্ত্রী। এখন তিনি বলছেন, আবার নির্বাচিত হলে পুরো মেয়াদ দায়িত্ব পালন করবেন।
কেজরিওয়ালের ভক্ত নন—এমন একজন বিশ্লেষকের ভাষ্য, এএপির প্রধান অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজের উন্নতি ঘটিয়েছেন। শব্দ চয়নে আগের চেয়ে বেশ সতর্ক তিনি। বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ব্যাখ্যা করছেন। এ বিষয়গুলো তাঁর ক্ষেত্রে নতুন।
অনেকের মতে, এবার কেজরিওয়ালকে তাঁর সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে বাস্তববাদী মনে হচ্ছে। রাজনৈতিক ভিত্তি ও সুনাম নির্মাণে তাঁকে যত্নশীল দেখা গেছে।
বিশ্লেষক আজাজ আশরাফ বলেন, ক্ষমতা সম্পর্কে কেজরিওয়ালের ধারণা বদলছে। ভোটারদের শ্রদ্ধা ও শাসন ক্ষমতায় থাকার বিষয়টি বুঝতে পেরেছেন তিনি।
এএপির প্রধানের বিরুদ্ধে ব্যাপক নেতিবাচক প্রচারণা চালাচ্ছে কেন্দ্রের ক্ষমতায় থাকা বিজেপি। কিন্তু তাতে খুব একটা কাজ দিচ্ছে বলে মনে হয় না।
অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, বিজেপি ভড়কে গেছে। তারা রীতিমতো আতঙ্কিত। এ কারণেই কেজরিওয়ালের বিপরীতে কিরণ বেদিকে ভাবী মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছে মোদি-শাহ জুটি।
ইতিহাসবিদ মুকুল কাসাভানের মতে, বিজেপির কিরণ বেদিকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তটি ভালো হয়নি।
এখানেই থেমে নেই বিজেপি। দিল্লি বিধানসভার নির্বাচনে দলটি সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পর্যন্ত মাঠে নেমেছেন। মোদির জন্য এ নির্বাচনকে একটি কঠিন রাজনৈতিক পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চিরাচরিত জাতিপ্রথা ও পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতিতে দিল্লির ভোটাররা ত্যক্তবিরক্ত। সেই প্রেক্ষাপটে ভোটারদের মনের আশার সঞ্চার ঘটিয়েছেন কেজরিওয়াল। বেড়েছে তাঁর সমর্থন।
কেজরিওয়ালের দলের প্রতীক ঝাড়ু। শনিবার দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে ঝাড়ু প্রতীক কি ঝড় তুলতে পারবে? এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হবে ফলাফল ঘোষণার দিন—১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।

বার্ন ইউনিটে শুটিং! by মানসুরা হোসাইন

(ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চলছে বাসে পেট্রলবোমার আগুনে দগ্ধ হওয়া রোগীদের নিয়ে মিউজিক ভিডিও তৈরির কাজ। পর্যবেক্ষণ কক্ষে যন্ত্রণায় কাতর একজন রোগীর পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন মডেল। তাঁদের দাবি, বিটিভিকে সরবরাহের জন্য এই ভিডিওচিত্র ধারণ করা হচ্ছে। ছবি: মনিরুল আলম) গ্রামের মেয়েদের ঢঙে পুরোনো একটি চেক সুতি শাড়ি পরেছেন তিনি। পায়ে সামান্য উঁচু হিলের জুতো। চেহারা সুরত আর শাড়িতে তাঁকে মেলানো যাচ্ছিল না। এ জন্যই নজর কাড়লেন তিনি। তাঁর পাশেই একজন চেঁচালেন, ‘অ্যাই গ্লিসারিন কই? তাড়াতাড়ি গ্লিসারিন লাগান।’ সেই নারী চোখে গ্লিসারিন লাগানোর পর চালু হলো ক্যামেরা। শুরু হলো দৃশ্য ধারণ। আশপাশে কিছু লোকও জমে গেল। এভাবে খানিকক্ষণ চলল শুটিং। তারপর তাঁরা বের হয়ে গেলেন। এটি একটি গানের দৃশ্য। তবে লোকেশন নয়নাভিরাম দৃশ্যে ভরা আহামরি কোনো জায়গা নয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিট। আজ দুপুরে সেখানে অবজারভেশন ওয়ার্ডে এই গানের দৃশ্য ধারণ করা হয়। গ্রামীণ নারীর বেশধারী পেট্রলবোমায় দগ্ধ হয়ে চিকিৎসাধীন একজনের মাথায় হাত রেখে শট দেন। এই রোগী গতকাল বুধবার গাজীপুরে বাসে পেট্রলবোমায় দগ্ধ হয়েছেন। সেই রোগী বা তাঁর আত্মীয়স্বজন কিছু বুঝে ওঠার আগেই শুটিং শেষ হয়। এ সময় বিভিন্ন গণমাধ্যমের ক্যামেরা এবং সাংবাদিকেরাও ব্যস্ত ছিলেন পেট্রলবোমায় দগ্ধ লোকজনকে নিয়ে। তাই বিষয়টি অনেকেরই তেমনভাবে চোখে পড়েনি। শুটিং যিনি পরিচালনা করছিলেন তিনি নিজেকে রফিকুল ইসলাম বুলবুল বলে পরিচয় দেন। তাঁর পরিচয় জানতে চাইলে প্রথমে তিনি নিজেকে সাংবাদিক দাবি করেন। কোন পত্রিকা? জানতে চাইলে তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) জন্য কাজ করছেন বলে দাবি করেন। তাঁকে বলা হলো, বিটিভির তো নিজস্ব লোকবল থাকে, এভাবে ব্যক্তিগত উদ্যোগে কাজ করছেন কেন? তখন তিনি বলেন, ‘অই তো হলো। আমি পারসোনালি কাজ করছি, তারপর বিটিভিকে দেব।’ রফিকুল ইসলামের দেওয়া ভিজিটিং কার্ডে ইংরেজিতে প্রেস লেখা। রাজধানীর ২৬ মণিপুরীপাড়া ঠিকানায় পত্রিকার নাম হিসেবে দৈনিক এই বাংলা (সারা বাংলার মানুষের কথা), সাপ্তাহিক দূর্নীতি রিপোর্ট এবং ইংরেজিতে উইকলি ফ্রাইডে রিভিউ লেখা কার্ডে। সাপ্তাহিকের নামটাও (দুর্নীতি) ভুল বানানে লেখা। আর রফিকুল ইসলামের পদবি লেখা রয়েছে সিনিয়র এডিটর/অথর অ্যান্ড ফিল্ম ডিরেক্টর। তিনি যখন শুটিং নিয়ে ব্যস্ত, তখন অন্য এক রোগীর এক স্বজন এসে জানতে চান, তিনি সরকারের কোনো মন্ত্রী কি না? বিটিভির নাম ভাঙিয়ে শুটিং হলেও বিটিভি কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে অবগত নয়। এ ব্যাপারে টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলে বিটিভির উপমহাপরিচালক (অনুষ্ঠান) বাহার উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিটিভি সরকারি প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানের নাম ভাঙিয়ে হরতাল অবরোধের শিকার রোগীদের নিয়ে ব্যবসা করার জন্য কেউ এ কাজটি করছে। এই ব্যক্তি বা তাঁর প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিটিভির কোনো সম্পর্ক নেই। বিটিভির প্যাকেজ নীতির আওতায় কেউ কিছু দিতে চাইলে তাঁদেরকে বিভিন্ন প্রক্রিয়া বা ধাপ পার হতে হয়। হুট করে কেউ বিটিভিকে কিছু দিতে পারে না।’ জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের অবৈতনিক উপদেষ্টা সামন্ত লাল সেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ ধরনের শুটিংয়ের জন্য আমার কাছ থেকে কোনো অনুমতি নিতে কেউ আসেনি।’ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বার্ন ইউনিটের একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, বার্ন ইউনিটে রোগীদের নিয়ে শুটিং করার অনুমতি দেওয়ার তো প্রশ্নই আসে না।

‘রাজনীতির বেড়াজালে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী’ -ডয়চে ভেলে

দেশের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী রাজনীতিবিদদের দ্বারা অনেক আগে থেকেই নিয়ন্ত্রিত৷ রাজনৈতিক নেতাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছায় পরিচালিত হয় প্রশাসন৷ ফলে পুলিশ-ব়্যাব কার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে বা নেবে না, তাও ঠিক করেন সরকার পক্ষের রাজনীতিকরা৷ বাংলাদেশে স্বাধীনতা পরবর্তী সব সময়ই সরকারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী৷ তারা সব সময়ই বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়ন চালিয়েছে, মূলত সরকারকে খুশি করতে৷ এত কিছুর পরও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধানদের কখনও রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে শোনা যায়নি৷ নিরবে কাজ করলেও মুখ খুলে কিছু বলেননি তাঁরা৷ তবে এখন শুধু কাজ নয়, রাজনীতিবিদদের মতো বক্তব্যও দিচ্ছেন তাঁরা৷ সরকার কতদিন ক্ষমতায় থাকবে, বিরোধী দল থাকবে কিনা – তাও বলছেন পুলিশ-ব়্যাব প্রধানরা৷ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নুরুল হুদা ডয়চে ভেলেকে বলেন, ১৯৭৯ সালের সরকারি কর্মচারী আইনে বলা আছে, কে কতটুকু কথা বলতে পারবেন৷ আইনে বাইরে যাওয়ার কারো কোনো সুযোগ নেই৷ যদি কেউ বলেন তাহলে তিনি তা নিজ দায়িত্বে বলবেন৷ তাই এখনকার ব়্যাব ও পুলিশ প্রধান যা বলছেন, তা তাঁরা নিজ দায়িত্বেই বলছেন৷ তবে তাঁরা যে সীমা অতিক্রম করে ফেলছেন, তা বোঝাই যাচ্ছে৷ তাঁদের উচিত রাজনৈতিক বিষয়ে কোনো বক্তব্য না দেয়া৷ তাঁরা জনগণের ইচ্ছ-অনিচ্ছার প্রতিফলন ঘটাবেন৷ কিন্তু এখন যা ঘটছে তা দুঃখজনক৷
তিনি বলেন, আমি যখন পুলিশ প্রধান ছিলাম তখন রাজনৈতিক সংস্কৃতি কিন্তু এরচেয়ে খুব একটা ভালো ছিল না৷ তারপরও আমি বা আমার আগে-পরে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা কিন্তু রাজনীতি নিয়ে কথা বলতেন না৷ বুধবার কুমিল্লায় নাশকতা প্রতিরোধ ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন বিষয়ক মত বিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ব়্যাব-এর মহাপরিচালক বেনজির আহমেদ বলেন, খুন করে ক্ষমতায় যাবেন? শেইম, শেইম৷ আপনারা নিরীহ ও শান্তিপ্রিয় মানুষ খুন করে ক্ষমতায় যেতে চান৷ আমরা সহিংসতা সৃষ্টিকারীদের সমাজ থেকে বিদায় করবো৷ তাদের বিরুদ্ধে একাত্তরের পর আরেকবার একটি সর্বাত্মক যুদ্ধ করতে হবে৷ সেই যুদ্ধে আপনারা সাধারণ জনগণ আমাদের পাশে থাকবেন৷ চৌদ্দগ্রামে যারা যাত্রীবাহী বাসে পেট্রোল বোমা মেরে সাতজনকে হত্যা করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি প্রতিশোধ নেওয়া হবে৷ তারা (হামলাকারী) পাকিস্তানের দোসর৷
একই অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) শফিকুল ইসলাম বলেন, একটি লাশ পড়লে এর পরিবর্তে দুটি লাশ ফেলে দেয়ার ক্ষমতা পুলিশের আছে৷ তারপরও অবশ্য মহাসড়ক পাহারা দিতে তিনি স্থানীয় জনগণকে অনুরোধ জানান৷
এর একদিন আগে মঙ্গলবার পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক গাবতলিতে শ্রমিকদের সঙ্গে এক আলোচনা সভায় বলেন, সন্ত্রাসীর কাছে সরকার হার মানবে না৷ সরকার যদি এদের কাছে আত্মসমর্পণ করে, তাহলে বিএনপি ক্ষমতায় আসবে৷ আর তারপর আওয়ামী লীগও একই কাজ করবে৷
সাবেক তত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ডয়চে ভেলেকে বলেন, পুলিশ বা ব়্যাব প্রধান যে ভাষায় কথা বলছেন, সোটা প্রজাতন্ত্রের কোনো কর্মচারীর ভাষা নয়৷ তাঁরা আওয়ামী লীগ নেতাদের মতো করে কথা বলছেন৷ এটা একেবারেই ঠিক নয়৷ রাজনীতি আর প্রশাসন এক হয়ে গেলে দেশের সামনে ভয়াবহ খারাপ উদাহরণ হয়ে যাবে৷ কিছুদিন পরে দেখা যাবে সচিবরাও রাজনীতির ভাষায় কথা বলছেন৷ তাতে আমলাতন্ত্র বলে কিছু থাকবে না৷ সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার পর রুদ্ধ হয়ে যাবে৷
তাই তিনি পুলিশ ও ব়্যাব প্রধানদের রাজনীতির ভাষা ছেড়ে সাধারণ মানুষের পক্ষে কথা বলার অনুরোধ করেন৷ হাফিজ উদ্দিন বলেন, কয়েকদিন আগে ব়্যাব মহাপরিচালক রংপুরে এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ২০১৯ সাল পর্যন্ত সরকার ক্ষমতায় থাকবে৷ এটা কি তাঁর বলার কথা? কে কতদিন ক্ষমতায় থাকবে সেটা রাজনীতিবিদরাই ঠিক করবেন৷ তিনি কেন এটা করছেন?
হাফিজ উদ্দিন বলেন, রাজনীতিবিদরা এখন যে আচরণ করছেন, তা হয়ত এক সময় বদলে ফেলবেন৷ কিন্তু আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাঠামো একবার ধ্বংস হয়ে গেলে সেটা কিন্তু আর ঠিক করা যাবে না৷ ফলে সরকারের ঊর্ধতনদের উচিত পুলিশ ও ব়্যাব প্রধানকে সতর্ক করা৷ না হলে সামনে আরো খারাপ সময় আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে৷

এক ছাদের নিচে বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতের সব যন্ত্রপাতি

রাজধানীতে বস্ত্র ​ও পোশাক খাতের যন্ত্রপাতি প্রদর্শনী
কাপড়ের ওপর একের পর এক নকশা এঁকে দিচ্ছে বিশালকায় স্ক্রিন প্রিন্টের মেশিন বা যন্ত্র। পাশেই বুনন হয়ে বের হয়ে আসছে গজের পর গজ ইলাস্টিকের ফিতা। এমব্রয়ডারি মেশিনও চলছে বিরামহীন, কাপড়ের ওপর কারুকাজ হচ্ছে। অন্যদিকে গেঞ্জির কাপড় তৈরি কিংবা ডাইং ও ওয়াশিংয়ের যন্ত্রগুলো চলছে থেমে থেমে।
রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র এখন যেন পুরোটাই একটা বড়সড় বস্ত্র বা পোশাক তৈরির কারখানা। সেখানে গতকাল বুধবার থেকে পোশাক ও বস্ত্র খাতের যন্ত্রপাতির সবচেয়ে বড় প্রদর্শনী শুরু হওয়ার সুবাদেই এমন দৃশ্য দেখা গেছে। প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছে ৩৩টি দেশের বস্ত্র ও পোশাকশিল্পের যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারী ৮৮০টি প্রতিষ্ঠান। সম্মেলন কেন্দ্রের ১৬টি হলে এসব প্রতিষ্ঠানের স্টলের সংখ্যা ১ হাজার ৬০টি।
আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে দেশীয় উদ্যোক্তাদের পরিচয় ঘটানো এবং স্থানীয়ভাবে তা সংগ্রহের সুযোগ করে দিতে ঢাকা আন্তর্জাতিক বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতের যন্ত্রপাতির প্রদর্শনীটি (ডিটিজি) আয়োজন করা হয়েছে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ), তাইওয়ানের চ্যান চাও ইন্টারন্যাশনাল ও হংকংয়ের ইয়োর্কার্স ট্রেড অ্যান্ড মার্কেটিং সার্ভিস কোম্পানি যৌথভাবে চার দিনব্যাপী এই প্রদর্শনীর আয়োজক। এবার এই আয়োজনের ১২ বছর পূর্তি হচ্ছে।
প্রদর্শনীতে বিশ্বখ্যাত বারুডান, জ্যাকব মুলার, এলএমএল, তাজিমা, এম অ্যান্ড আর, সীমা সিকিসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ড অংশ নিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের স্টল থেকে বস্ত্র ও পোশাকশিল্পের প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা স্পিনিং, উইভিং, ডাইং-প্রিন্টিং-ফিনিশিং টেস্টিং, ওয়াশিং, এমব্রয়ডারি ও সেলাই-সংক্রান্ত সর্বশেষ প্রযুক্তি ও উন্নত মানের যন্ত্রপাতি সম্পর্কে জানতে পারবেন। গতকাল বেলা তিনটার দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রদর্শনীটির উদ্বোধন করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিটিএমএর সভাপতি তপন চৌধুরী বলেন, বর্তমানে নিট পোশাকের ৮০-৮৫ শতাংশ এবং ওভেন পোশাকের ৩৫-৪০ শতাংশ কাপড় দেশের বস্ত্রকলগুলোই জোগান দিচ্ছে। বস্ত্র খাতের এই অবদান আরও বাড়ানোর সুযোগ আছে। গত বছর বস্ত্র খাতে ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ হয়েছে। তিনি বলেন, চাহিদামতো গ্যাস-বিদ্যুৎ ও সরকারের সহায়তা পেলে এই বিনিয়োগ আরও বাড়বে। অবশ্য এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি আতিকুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের রপ্তানি এখন ২৫ বিলিয়ন বা আড়াই হাজার কোটি ডলারের। এ জন্য ১ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের ফেব্রিকস বা কাপড় প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে দেশীয় বস্ত্রকলগুলো জোগান দিচ্ছে এক হাজার কোটি ডলারের। বাকি ৬০০ কোটি ডলারের কাপড় আমদানি করতে হয়। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ২০২১ সালে ৫০ বিলিয়ন বা ৫ হাজার কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছি। এটি হলে ৩০ বিলিয়ন ডলারের ফেব্রিকস লাগবে। ফলে বস্ত্র খাতের অনেক সুযোগ আছে।’
আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘পোশাকশিল্পে ফ্যাশন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেক মাসেই ফেব্রিকসের ধরন পরিবর্তন হয়। এর সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হলে স্থানীয় কারখানাগুলোর উন্নয়ন করতে হবে।’
এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহ্মদ বলেন, দেশের বস্ত্র ও পোশাকশিল্পের সম্ভাবনা দিন দিন বাড়ছে। এ জন্য কারখানার উন্নয়ন খুবই প্রয়োজন। এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে দেশের উদ্যোক্তারা সরাসরি বিভিন্ন প্রযুক্তি সম্পর্কে জানতে পারবেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। আরও বক্তব্য দেন বস্ত্রমন্ত্রী এমাজ উদ্দিন প্রামাণিক, নিট পোশাকমালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সহসভাপতি আসলাম সানি ও চ্যান চাও ইন্টারন্যাশনালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক টাইগার লিন।
আয়োজকেরা জানান, আগামী শনিবার পর্যন্ত প্রদর্শনী প্রতিদিন দুপুর ১২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এ ক্ষেত্রে কোনো প্রবেশ ফি লাগবে না।

অচল মহাসড়ক, পুড়ছে মানুষ- ব্লেইম গেইম এর সমাধান নয়

বিশ দলীয় জোটের ডাকা টানা অবরোধ ও থেমে থেমে হরতালে বিপর্যস্ত দেশের যোগাযোগব্যবস্থা। বিপর্যস্ত অর্থনীতি। তারচেয়েও মর্মান্তিক হলোÑ একের পর এক পেট্রলবোমা হামলায় বাসযাত্রীরা পুড়ে মারা যাচ্ছেন, পঙ্গু হচ্ছেন। এ ধরনের সর্বশেষ ঘটনা হচ্ছে কুমিল্লায় বাসে পেট্রলবোমায় সাতজন নিহত ও ২০ জনের মতো দগ্ধ হওয়া। এ ঘটনা যেমন মর্মান্তিক, তেমনি বর্বরোচিত। এ ধরনের ঘটনা কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না। এ ধরনের ঘটনার নিন্দা জানানোর ভাষা আমাদের নেই। কোনো বিবেকবান মানুষই এ ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতা মেনে নিতে পারে না। সবার প্রত্যাশা, অবিলম্বে এর অবসান হওয়া দরকার। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হলো, এর অবসানের কোনো সম্ভাবনা আমরা দেখতে পাচ্ছি না। কারণ, বিষয়টি নিয়ে চলছে একধরনের রাজনৈতিক ব্লেইম গেইম। সরকারপক্ষ জোর প্রচারণায় ব্যস্ত ২০ দলীয় জোট মানুষকে পুড়িয়ে মারছে। অপর দিকে, ২০ দলীয় জোটের কথা হচ্ছে, সরকার বিরোধী জোটের চলমান ভোটের অধিকার আন্দোলনকে স্তিমিত করতে এ ধরনের অমানবিক ঘটনা ঘটিয়ে বিরোধী জোটের ওপর দোষ চাপানোর অপপ্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। এ ধরনের পারস্পরিক বিপ্রতীপ দাবির মধ্যে অন্ধকারে থেকে যাচ্ছে দেশের মানুষ। মানুষ জানতে পারছে না আসলে এর পেছনে সত্যিকার অর্থে কারা। কারা এর জন্য দায়ী। তবে জনগণের প্রত্যাশা, এ ধরনের অমানবিক কর্মকাণ্ড বন্ধ হোক। এ জন্য প্রকৃতপক্ষে যারা দায়ী, তাদের আইনের মুখোমুখি করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হোক। কিন্তু দেশের মানুষ দেখছে, যারা যানবাহনে আগুন দিচ্ছে, তাদের কাউকে হাতেনাতে ধরে বিচারের মুখোমুখি করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হচ্ছে প্রশাসন। অপর দিকে, শুধু সন্দেহের বশে কিংবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিরোধী জোটের হাজার হাজার রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে আটক করছে, তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হচ্ছে। আমরা মনে করি, এ পথ সমাধানের পথ নয়। রাজনৈতিক কারণে নিরপরাধ মানুষ যেমন হয়রানির শিকার হতে পারে না, তেমনি প্রকৃত দোষীদের শাস্তির মুখোমুখি করাও জরুরি। কুমিল্লায় সর্বসাম্প্রতিক পেট্রলবোমায় সাতজন পুড়ে মৃত্যুর ঘটনায় ২০ দলীয় জোট দোষীদের বিচারের দাবি জানিয়েছে। অপর দিকে, এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বেগম খালেদা জিয়াকে দায়ী করেছেন বর্তমান সরকারের এমপিরা। একই সাথে তাকে গ্রেফতার ও দ্রুত বিচারের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে প্রয়োজনে ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী দমনে প্রণীত ‘টাডা’ আইনের মতো কঠোর নতুন আইন প্রণয়নের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানানো হয়। এই ব্লেইম গেইমে এ সমস্যা সমাধান নয়। এমনি পরিস্থিতিতে দেশের সাধারণ মানুষ সংলাপ-সমঝোতার জন্য আকুতি জানাচ্ছে। কারণ, মানুষ আজ কাটাচ্ছে দুঃসহ এক সময়। অব্যাহত হরতাল-অবরোধ, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, পেট্রলবোমা, ক্রসফায়ার কিছুই থামছে না। মরছে মানুষ; কেউ বোমা, কেউ গুলিতে। বার্ন ইউনিটে আর্তনাদ। আহাজারি ক্রসফায়ারে নিহত স্বজনদের। অচল অর্থনীতির চাকা। চলছে ব্লেইম গেইম। এমনি পরিস্থিতিতে ব্লেইম গেইম ছেড়ে সংলাপ-সমঝোতায় বসতে হবে। রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধানের এটাই শান্তিপূর্ণ পথ।
আরেকটি প্রশ্ন, কুমিল্লায় পেট্রলবোমা হামলার শিকার ‘আইকন পরিবহন’ নামে বাসগুলোর কক্সবাজার রুটে চলাচলের অনুমোদন নেই। এ ছাড়া কক্সবাজারে পর্যটক পরিবহনে পুলিশ-বিজিবির নিরাপত্তাব্যবস্থার বাইরেই চলাচল করছিল এ পরিবহন। কক্সবাজারে তাদের সুনির্দিষ্ট কোনো কাউন্টার নেই। নেই কোনো সুনির্দিষ্ট বুকিংম্যানও। কক্সবাজার থেকে ঢাকা যাওয়ার পথে দুর্বৃত্তদের পেট্রলবোমা হামলার শিকার হওয়ার পর এই পরিবহন নিয়ে আজ কক্সবাজারের সর্বত্র দিনভর আলোচনা চলে। ঘটনা ঘটার আগে কক্সবাজারের কেউ এ পরিবহনের নামও শোনেনি। এ ছাড়া পর্যটক পরিবহনে প্রশাসনের নিরাপত্তাব্যবস্থার বাইরে গিয়ে আইকন পরিবহন কেন চলাচল করছিল, তা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন উঠেছে। কেউ কেউ এটাকে রহস্যজনকও বলছেন।

রাজনীতি- গণতন্ত্রের বারোটা বাজতে কত বাকি? by এ কে এম জাকারিয়া

২০১০ সালে মিসরের পার্লামেন্ট নির্বাচনের পর ‘ইজিপ্টস রিয়েল স্টেট অব ইমার্জেন্সি ইজ ইটস রিপ্রেসড ডেমোক্রেসি’ শিরোনামে এক লেখা লিখেছিলেন দেশটির নোবেল (শান্তি) পুরস্কার বিজয়ী মোহাম্মেদ এল বারাদি। মিসরে আরব বসন্তের ছোঁয়া লাগার ঠিক আগে আগে। লেখাটির শুরুর লাইনটি হচ্ছে ‘মিসরে আরও একটি প্রতারণামূলক ও প্রহসনের নির্বাচন হয়ে গেল।’ আর মূল বিষয় হচ্ছে, তাত্ত্বিকভাবে মিসরের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় কী আছে আর বাস্তবে কী হয় বা হচ্ছে। হোসনি মোবারক তখনো ক্ষমতায়। এল বারাদি যা লিখেছেন তা অনেকটা এ রকম, তাত্ত্বিকভাবে মিসরে একটি সংবিধান ও আইন কার্যকর রয়েছে এবং সেখানে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন রয়েছে, কিন্তু বাস্তবে ক্ষমতাসীন দলের ইচ্ছাই সব। হোসনি মোবারক একজন সম্রাটের মতো ক্ষমতা ভোগ করেন। তাত্ত্বিকভাবে মিসরে বহুদলীয় ব্যবস্থা রয়েছে, কিন্তু বাস্তবে কোনো দল গঠন করতে হলে এমন একটি কমিটির কাছ থেকে অনুমতি নিতে হয়, যে কমিটির নিয়ন্ত্রক হচ্ছে ক্ষমতাসীন দল।
এল বারাদি আরও লিখেছেন, মিসরে তাত্ত্বিকভাবে একজন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট রয়েছেন, কিন্তু গত ৫০ বছরেরও বেশি সময়ে দেশটি পেয়েছে মাত্র তিনজন শাসককে। তিনজনের শাসন পদ্ধতি ও দৃষ্টিভঙ্গিতে হয়তো পার্থক্য রয়েছে, কিন্তু তাঁরা সবাই কর্তৃত্ববাদী ও নিপীড়নমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থারই নিয়ন্ত্রক ছিলেন। ২৯ বছর ধরে মিসর দেশটি একটি ‘জরুরি অবস্থার’ মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জরুরি অবস্থার এই অস্ত্র ব্যবহার করে প্রেসিডেন্ট সংবিধানে দেওয়া জনগণের মৌলিক অধিকারকে সহজেই স্থগিত করতে পারেন। এবং এই অস্ত্রের যথেচ্ছ ব্যবহার হয়েছে। কেউ ভিন্নমত প্রকাশের সাহস দেখালে তা ব্যবহার করে তাকে আটক, নির্যাতন বা কখনো হত্যাও করা হয়েছে। এ ধরনের আরও অনেক প্রসঙ্গই এল বারাদি তাঁর প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন, যেগুলো দেশটিতে তাত্ত্বিকভাবে কার্যকর আছে, কিন্তু বাস্তবে নেই।
পাঠকদের অনেকেরই এটা জানা যে মিসরে ২০১০ সালের এই ‘প্রতারণাপূর্ণ ও প্রহসনের’ নির্বাচনের মাস খানেক পর ২০১১ সালের জানুয়ারি মাসেই শুরু হয়েছিল তাহরির স্কয়ারের জাগরণ। দীর্ঘদিনের ‘কর্তৃত্ববাদী ও নিপীড়নমূলক’ শাসন যে ধরনের রাজনৈতিক শক্তি বিকাশের সুযোগ ও পরিস্থিতি তৈরি করে, মিসরের ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে। এখানে তলে তলে শক্তিশালী হয়ে ওঠে মুসলিম ব্রাদারহুড। মিসরের জনগণ ও তরুণদের গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা ও গণজাগরণের প্রথম ফসলটি মুসলিম ব্রাদারহুড নিজেদের ঘরে তুলতে পেরেছিল।
৮০০-রও বেশি গণতন্ত্রকামী বিক্ষোভকারীর মৃত্যু এবং দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলা এই গণ-আন্দোলন স্বৈরশাসক মোবারকের পতন ঘটায়। এরপর যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, সেখানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন মুসলিম ব্রাদারহুডের মোহাম্মদ মুরসি। কিন্তু গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ফসল হিসেবে যে নির্বাচন হলো, সেখানে বিজয়ী হয়ে নিজেদের মুখোশ খুলে ফেলতে খুব সময় নেয়নি মুসলিম ব্রাদারহুড। ক্ষমতার এক বছর পূর্তি না হতেই শুরু হয় মুরসির পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন। বিপ্লবের ফসল এককভাবে নিজেদের ঘরে তোলা, পুরোনো কায়দায় ক্ষমতা কুক্ষিগত করা এবং ইসলামি আইন চালুর চেষ্টার প্রতিবাদে মিসরে উদারনৈতিক, সেক্যুলার ও বাম ধারার রাজনৈতিক দলগুলো আন্দোলন শুরু করে। এর সুযোগে সেনাবাহিনী প্রেসিডেন্ট মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করে। ক্ষমতার পালাবদলে মিসরের শাসনক্ষমতা এখন সাবেক সেনাপ্রধান প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসির হাতে। অনেকটা মোবারক স্টাইলের সেই পুরোনো কাঠামোতেই আবার ফিরে গেছে মিসর।
মিসরের গণতন্ত্রের বারোটা বেজে আছে শুরু থেকেই। গণতন্ত্রের ঘড়ি সেখানে সেই বারোটা বাজা অবস্থাতেই অচল হয়ে আছে। তাহরির স্কয়ারের গণজাগরণ, আন্দোলন বা বিপ্লব যা-ই বলা হোক না কেন, কিছুই তাকে সচল করতে পারল না! মুরসির ব্রাদারহুড মিসরকে ‘ধর্মীয় রাষ্ট্র বানিয়ে চরিত্র বদলে দেওয়ার’ যে চেষ্টা শুরু করেছিল, তা রুখতে সিসি দিনে দিনে আরও কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠছেন। এর প্রতিক্রিয়ায় সরকারের বিরুদ্ধে সহিংস বিক্ষোভের পথই ধরেছে মুসলিম ব্রাদারহুড। গত ২৫ জানুয়ারি তাহরির স্কয়ার গণজাগরণের চার বছর পূর্তির দিনে পুলিশ, সেনাবাহিনী ও সহিংস বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষে মারা গেছে ২৫ জনেরও বেশি।
এমন পরিস্থিতিতে এখন বিভ্রান্তি আর চরম হতাশার মধ্যে পড়েছেন মিসরের সেই তরুণেরা, যাঁরা মুসলিম ব্রাদারহুডের ‘ইসলামি’ বা পুরোনো কায়দায় গণতন্ত্রের নামে কর্তৃত্ববাদী ও নিপীড়নমূলক শাসন—কোনোটাই দেখতে চান না। তাহরির স্কয়ার জাগরণের চার বছর পূর্তির ঠিক আগেই যখন ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক ও তাঁর দুই ছেলে আদালতের সিদ্ধান্তে ছাড়া পান, তখন এই তরুণদের বা দেশটির গণতন্ত্রকামী জনগণের হতাশা কোথায় গিয়ে ঠেকতে পারে, তা আমরা অনুমান করতে পারি।
বাংলাদেশ মিসর নয়। এখানে গণতন্ত্রের ঘড়ি হয়তো থেমে যায়নি, তবে গণতন্ত্রের বারোটা বাজানোর সব উদ্যোগ-আয়োজনই চলছে। এর লক্ষণগুলোও দিনে দিনে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এক বছর হলো আমাদের দেশে তাত্ত্বিকভাবে একটি ‘নির্বাচন’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন বলতে যা বোঝায়, তার ধারেকাছ দিয়েও যায়নি ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন। তাত্ত্বিকভাবে দেশে সংসদ আছে এবং বিরোধী দলও আছে। কিন্তু বাস্তবে এটা সরকারি দল ও তাদের সহযোগীদের মিলমিশের এক সংসদ।
এখানে সাংবিধানিকভাবে বহুদলীয় গণতন্ত্র কায়েম রয়েছে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সভা-সমাবেশ করার অধিকার রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে যারা বিবেচিত, তাদের সভা-সমাবেশ করার কোনো অধিকার নেই। তাত্ত্বিকভাবে যে সরকারটি ‘নির্বাচিত’ ও ‘গণতান্ত্রিক’ হিসেবে বিবেচিত, সেটি বাস্তবে কতটা কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠছে তা এখন সবার কাছেই দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। সরকারের আচরণে মনে হচ্ছে তারা তা লুকাতেও চাইছে না। আলোচনা, সংলাপ বা সমঝোতা—এসব কোনো কিছুতেই সরকারের সায় নেই।
আর যাদের আমরা বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিবেচনা করছি, সেই বিএনপি বা তাদের জোট এসব কী
করছে! সরকারের সঙ্গে না পেরে জনগণকে মাঠে নামিয়ে গণ-আন্দোলন করার শক্তি হারিয়ে বা কৌশল না নিয়ে সাধারণ মানুষকে তারা তাদের শিকারে পরিণত করছে। তারা এখন মানুষ পুড়িয়ে মারছে এবং এভাবে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশল নিয়েছে। এটা সাধারণ গণ-আন্দোলন বা সহিংস রাজনৈতিক আন্দোলনও নয়, এটা স্রেফ সন্ত্রাস। দুনিয়াজুড়ে সন্ত্রাসী দলগুলো এ ধরনের কাজ করে।
বিএনপি যদি সরকারের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধ’ ঘোষণাও করে, তার পরও তো তারা মানুষ পুড়িয়ে মারার মতো কাজ করতে পারে না। যুদ্ধেরও একটা নিয়ম আছে, কিছু বিষয় মেনে চলতে হয়। বেসামরিক ও সাধারণ নাগরিকেরা যুদ্ধের সময়ও ছাড় পায়। আর এখানে তারাই প্রধান শিকার। এটা এখন পরিষ্কার যে ‘গণতন্ত্র উদ্ধার’ বিএনপির লক্ষ্য নয়, তারা আসলে অন্য কিছু চায়। এ ধরনের সন্ত্রাস আর মানুষ পোড়ানোর কৌশল ধরে রাখার মানে হচ্ছে সরকারকে আরও কঠোর ও কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠতে এবং এর পক্ষে যুক্তি তৈরির সুযোগ করে দেওয়া। বিএনপি কি সেটাই চাইছে?
মিসরের জনগণের মতো বাংলাদেশের জনগণও এখন এক চরম হতাশা ও বিভ্রান্তির মধ্যে পড়েছে। জনগণ গণতন্ত্র চায়, চায় সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অবাধ নির্বাচন। তারা সরকারের কাছ থেকে যেমন গণতান্ত্রিক আচরণ আশা করে, তেমনি দেশে শাস্তি–শৃঙ্খলা বাজায় থাকুক, সেটাও চায়। তারা চায় যেকোনো রাজনৈতিক সমস্যা আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে মিটমাট হোক। সরকার এসব বিষয় বিবেচনায় নিচ্ছে না। অন্যদিকে বিরোধীরা রাজনীতি বাদ দিয়ে সন্ত্রাস ও মানুষ পোড়ানোর যে বর্বরতা শুরু করেছে, তাতে দুটি পক্ষের কোনোটির প্রতিই নিঃশর্ত সমর্থন বা পক্ষপাত দেখানোর সুযোগ আছে কি?
গত এক মাসের অবরোধ কর্মসূচি ৬০ জনের জীবন নিয়েছে। এর মধ্যে ৩৪ জন মরেছেন পেট্রলবোমা, ককটেল ও আগুনে পুড়ে। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে গত সোমবার রাতের বাসে পেট্রলবোমার ঘটনা প্রমাণ করেছে যে এসব বর্বরতা নিয়ে দেশবাসীর বিলাপ ও হাহাকার বিএনপি ও তাদের সহযোগীদের নরম করতে পারেনি। অবরোধ অব্যাহত থাকা মানে এসব বর্বরতা চলতেই থাকা। সরকার যে আরও কঠোর হওয়ার পথ ধরবে সেটা পরিষ্কার, শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত কোনো পদক্ষেপই হয়তো নেবে। এতে কোন পক্ষ কীভাবে লাভবান হবে, সেই হিসাব–নিকাশ হয়তো তাদের কাছে আছে, তবে গণতন্ত্রের যে বারোটা বাজবে, সেটা নিশ্চিত। দুই পক্ষই যেন সেই সময়টির জন্যই অপেক্ষা করছে!
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com

আমরা সবাই অসুস্থ হয়ে পড়ছি by শাহদীন মালিক

৩ ফেব্রুয়ারি বেলা সোয়া ১১টা, বেশ কয়েকটি টিভি চ্যানেলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের চিকিৎসকদের সংবাদ সম্মেলন। চিকিৎসাধীন দগ্ধ রোগীদের অবস্থার বিবরণী। বার্ন কারও ২০ শতাংশ, কারও ৪০ শতাংশ। নাম, বয়স, কোথা থেকে এসেছেন—এসব তথ্য। মোট চিকিৎসা নিতে এসেছেন ১১১ জন। হাসপাতালে এখন আছেন ৬১ জন। ৩ তারিখ ভোরে ঢাকা-চট্টগ্রাম রোডে বাসে পেট্রলবোমা হামলায় ইতিমধ্যে নিহত হয়েছেন সাতজন। সেখান থেকে আরও ছয়জন আগুনে পোড়া রোগী সকালে ঢাকা মেডিকেলে এসেছেন। চিকিৎসক বিভিন্ন হিসাব দিচ্ছেন। আমাদের বীভৎসতার হিসাব। আমাদের নির্মমতার হিসাব। আর সরাসরি টিভিতে সম্প্রচার করা হচ্ছিল এসব খতিয়ান। অধমের মতো নিশ্চিত হাজার হাজার টিভি দর্শক এ হিসাব দেখছিলেন, শুনছিলেন।
আমরা সবাই অসুস্থ হয়ে পড়ছি। নির্মম, নির্দয়, অসুস্থ জাতি। কয়েক দিন আগে নরসিংদীর এক গ্রামের বাসিন্দারা সাতজন ডাকাতকে পিটিয়ে মেরেছে। একজন বেঁচে গেছে। পুলিশ, র্যাব, ডিবি প্রায় প্রতিদিন গুলি করে মানুষ মারছে। বিজিবিপ্রধানের আস্ফালনের পর সহসা বিজিবি যদি গুলি করে মানুষ না মারে, তাহলে তো তাদের বীরত্ব নিয়ে গুঞ্জন শুরু হবে। সবাই মানুষ মারে। আমরা অসুস্থ হয়ে পড়ছি। আমরা ক্ষমতায় থাকব, থাকবই। আমরা ওদের হটিয়ে ক্ষমতায় যাবই! এটাই এখন আমাদের ‘রাজনীতি’।
এমন যদি হতো, এক পক্ষ হঠাৎ বলে বসল, ‘আসুন, কথা বলি’। অন্য পক্ষ নির্ঘাত আঁতকে উঠত, ‘শর্ত কী?’ ‘না, কোনো শর্ত নেই। আসুন, কথা বলি।’ আমাদের রাজনীতিতে এটা হওয়ার নয়। সভ্য লোকেরা কথা বলে, আলাপ-আলোচনা করে, কথা রাখে, ছাড় দেয়। কিন্তু আমরা সবাই অসুস্থ হয়ে পড়ছি। অসুস্থ মানুষের হিতাহিত জ্ঞান থাকে না, থাকার কথাও না। বরং প্রতিযোগিতা হচ্ছে কে কত হিংস্র কথা বলতে পারে, তা নিয়ে।
‘গুগল’-এর এক সুবিধা—সহজেই অনেক কিছু জানা যায় সেখান থেকে। সবকিছুই যেন আঙুলের ডগায়। খুবই প্রচলিত ও জনপ্রিয় ধারণা, ‘রোম যখন পুড়ছিল তখন সম্রাট নিরো বাঁশি বাজাচ্ছিলেন।’ খারাপ অর্থে নিরো এক দয়া-মায়াহীন হিংস্র শাসকের প্রতীক। গল্পে আছে, সম্রাট নিরো নিজেই আগুন লাগানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। রোম যখন পুড়ছিল, সম্রাট নিরো তখন ব্যালকনি-বারান্দায় দাঁড়িয়ে মনের সুখে বাঁশি বাজাচ্ছিলেন। ঘটনা ঘটেছিল ৬৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৮-১৯ জুলাই তারিখে। অবশ্য অনেকে বলেন, আগুন জ্বলেছিল চার-পাঁচ দিন ধরে। উল্টো কেচ্ছাও আছে। বলা হয়, যখন আগুন লেগেছিল তখন বা সেই দিন সম্রাট নিরো রোমেই ছিলেন না। দুদিন পর রোমে ফিরে এসে আগুন নেভানোর ব্যবস্থা তদারকি করেন, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের মাঝে সাহায্য বিতরণ করেন, ইত্যাদি ইত্যাদি।
অর্থাৎ ইতিহাসের একটা আওয়ামী লীগ ভাষ্য, আরেকটা বিএনপি ভাষ্য। অধমের ভাষ্য আরেকটা, বাংলায় নিরোর বাঁশি বাজানোর কথা কোথা থেকে কেমনে চালু হলো? অধম ল্যাটিন ভাষা জানে না। সভ্যতার উৎপত্তি ল্যাটিন ভাষায়। তাই এখন বুঝি ছাত্রাবস্থায় এই ভাষাটি রপ্ত করা দরকার ছিল। চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে—ভাষা শেখার বয়স পেরিয়ে গেছে।
ইংরেজিতে বলা হয়, নিরো ফিডল বাজাচ্ছিলেন। পরে দেখা গেল ‘ফিডল’ অর্থাৎ বেহালা গোছের সরু তারের বাদ্যযন্ত্র, যেটা মোটামুটিভাবে দশম বা একাদশ শতাব্দীর আগে আবিষ্কৃত হয়নি। তাই নিরো আর যা বাজান না কেন, ‘ফিডল’ বাজাচ্ছিলেন না। ধারণা করছি, একটা যন্ত্রতে একদিকে ফুঁ দেবেন আর অন্য দিকে সুরেলা আওয়াজ বের হবে এমন যন্ত্র। অর্থাৎ বাঁশি। দুই হাজার বছর আগে আবিষ্কৃত, যা ব্যবহৃত হতো না। আগুনে সম্রাট নিরোর একটা প্রধান প্রাসাদ পুড়ে গিয়েছিল। যাহোক, যতটা রটে, তত না, নিশ্চয় না; আবার একদমও যা, তা–ও না।
লেখার মাঝখানে এক প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা কিছু কাগজ নিয়ে এল। দেখে, সই করার জন্য। ‘স্যার, প্রতিদিন সকালে বাসে অথবা ট্রেনে নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকায় আসি। জানি না আজ সন্ধ্যায় বাসায় ফিরতে পারব, নাকি আত্মীয়স্বজনদের আমার পোড়া শরীর দেখতে ঢাকা মেডিকেলে আসতে হবে। চাকরি তো করতে হবে, সকাল-বিকেল তাই ঝুঁকি নিতে হবে?’
তরুণ কর্মকর্তাটি দুই নেত্রী সম্পর্কে তারপর যা মন্তব্য করল, সেটা লিখে সবাই মিলে জেলে যাওয়ার খায়েশ নেই। সে কথাগুলো বলে ফেলেছিল বেফাঁস। নিজেই মাফ চাইল তার অতি কড়া মন্তব্যের জন্য। বুঝলাম, যুক্তিতাড়িত নয়, অনুভূতিতাড়িত মন্তব্য। এটাও অসুস্থতার লক্ষণ। সবাই অসুস্থ হয়ে পড়ছি।
মানুষ যখন ভেঙে পড়ছে, তখন প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়তে বাধ্য। হচ্ছেও তা-ই। অধমের ধারণা, পুলিশের গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্যতা আমাদের দেশের চল্লিশোর্ধ্ব বছরের মধ্যে অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে কম। কোনো প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা, গ্রহণযোগ্যতা যত কমে, তার কর্তাব্যক্তিদের হাঁকডাক, লম্ফঝম্ফ তত বাড়ে। তা-ই হচ্ছে। আর মনে হচ্ছে, পুলিশের প্রধান কাজ হচ্ছে বিএনপির নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া, গড়ে ৫০টির কম মামলা নিশ্চয় কোনো বড় মাপের বিএনপির নেতার বিরুদ্ধে নেই। কম থাকলেও অচিরেই পুলিশ সেটা নিশ্চয় পূরণ করবে। অর্থাৎ মামলার সংখ্যা জনপ্রতি ৫০ পার করে দেবে।
আর আদালত নির্বিচারে সব মামলা গ্রহণ করছেন, রিমান্ড দিচ্ছেন। প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে। বিশ্বের বহু দেশে এ গোছের রাজনৈতিক সংকট উত্তরণের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরাট বিরাট অংশকে বিলুপ্ত করতে হয়েছে। এই গত সপ্তাহেই আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট ক্রিশ্চিনা কির্চনার তাঁর দেশের এসআইউই নামে পরিচিত গোয়েন্দা সংস্থার বিলুপ্তি ও নতুন আইন করে নতুন গোয়েন্দা সংস্থা তৈরির ঘোষণা দিয়েছেন।
অসুখ অল্প-বিস্তর হলে চিকিৎসা দিয়ে সেরে ওঠা যায়। অনেক দিন চিকিৎসা না করলে বা অবহেলা করলে সাধারণ রোগবালাই দুরারোগ্য ব্যাধিতে পরিণত হতে পারে বা হয়েই যায়। অবস্থা এভাবে চললে আমরা সবাই ভীষণ ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে পড়ব।
সরকারকে বুঝতে হবে যে ২০১৪-এর নির্বাচনের ওপর ভর করে পাঁচ বছর সরকার চালানো যাবে না। চালাতে গেলে আমও যাবে, ছালাও যাবে। ২০ দলকেও বুঝতে হবে যে পেট্রলবোমা, তা আপনারা মারেন বা না মারেন, (নিরোর মতো) তা দিয়ে আপনাদের জনপ্রিয়তা বা গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে না, আর এর মাধ্যমে সরকার উৎখাত করা অসম্ভব। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থেকেই তাঁর সরকারের অধীনে মধ্যবর্তী নির্বাচনই এখন একমাত্র পথ। অন্য পথও হয়তো আছে। অধম এই মুহূর্তে তার হদিস পাচ্ছে না।
মধ্যবর্তী নির্বাচন পরিচালনাকারী সরকারের কলেবর অবশ্যই ছোট হতে হবে, তাতে দু-চারজন মন্ত্রী থাকবেন বিএনপির পছন্দ অনুযায়ী। বিএনপি হয়তো চাইবে স্বরাষ্ট্র ও জনপ্রশাসন। দেনদরবার হতে পারে। দেনদরবার হতে হবে নির্বাচন কমিশন নিয়ে। নির্বাচন কমিশনকে ভালো গ্রহণযোগ্য অংশীদারত্বমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য কী কী করতে হবে, কাকে দিয়ে করতে হবে, সে অভিজ্ঞতা জাতির আছে। তাই কাজটা কঠিন হবে না।
উভয় পক্ষের রাজনীতিবিদেরা ভাবছেন, তাঁরা ঠিক করছেন। তাঁরা ভুল ভাবছেন। তবে যিনি সরকার চালান, দায়িত্বটা তাঁর বেশি। দেশ এমনভাবে চালাবেন না, যাতে পুরো জাতি দীর্ঘস্থায়ী রোগবালাইেয় আক্রান্ত হয়। আক্রান্ত আমরা সবাই হয়ে গেছি। তবে ওষুধ পেলে তাড়াতাড়ি সেরে উঠতে পারব।
অর্থনীতি ভেঙে পড়ছে। পুলিশ, র্যাব, বিজিবি দিয়ে অর্থনীতিকে চাঙা করতে পারবেন না। শক্তি প্রয়োগ না করে বিকল্প ব্যবস্থায় দেশের সমস্যা সমাধান করতে পারেন কেবল সত্যিকারের নেতারা। আমাদের দুর্ভাগ্য, দেশে এখন সত্যিকার নেতার বড়ই অভাব। আছে বিস্তর ক্ষমতাধর এবং ক্ষমতালোভী রাজনীতিবিদ। তাঁদের খপ্পরে পড়ে আমরা ক্রমান্বয়ে একটা অসুস্থ জাতিতে পরিণতি হচ্ছি, অচিরে যাদের স্বাভাবিক মৃত্যুর নিরাপত্তা থাকবে না।
সুস্থতার আশা তো আর ছাড়া যায় না। মধ্যবর্তী নির্বাচনই এখন একমাত্র ট্রিটমেন্ট। হয়তোবা।
ড. শাহদীন মালিক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট।

রাজনীতি আজ আদর্শ বিবর্জিত by নূরে আলম সিদ্দিকী

অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় দুই নেত্রীর মধ্যে একটা অলিখিত চুক্তি হয়ে আছে যে, আজীবন আমাদের মধ্যেই ক্ষমতা ভাগাভাগি হয়ে কেন্দ্রীভূত থাকবে। বাংলাদেশের মানুষকে এতটা নির্বোধ ভাবা উচিত নয়। এই মানুষই ’৬৯-এ ভিসুভিয়াসের মতো বিস্ফোরিত হয়েছিল, এই মানুষই ’৭০-এর নির্বাচনে ভোট দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে একক নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত করেছিল, পঁচিশে মার্চের পৈশাচিক আক্রমণকে শুধু প্রতিরোধই করে নি, তাদেরকে পরাভূত করেছিল। অথচ বেদনাদায়ক হলেও আজকের বাস্তবতায় লক্ষণীয়, জনগণ রাজনৈতিক অবক্ষয়ের দীপ্তিহীন আগুনের নির্দয় দহনে দগ্ধীভূত হলেও আজ নির্লিপ্ত, নির্বিকার। এর সমাধানে যেভাবে বিস্ফোরিত হওয়ার কথা ছিল তা তো হচ্ছেই না, বরং সবকিছুই যেন তাদের কাছে গতানুগতিক বা স্বাভাবিক নিয়তি হিসেবে তারা নীরবে সহ্য করে যাচ্ছে।
আজকে সরকারদলীয় শীর্ষনেতৃত্ব থেকে শুরু করে পাতি নেতারাও চরম দাম্ভিকতায় নির্লজ্জ উচ্চারণ করছেন- ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে আপনারা ভুল করেছেন, প্রায়শ্চিত্তও আপনাদেরকেই করতে হবে। ২০১৯ সালের আগে নির্বাচন সম্পর্কিত কোন আলোচনা হবে না। অথচ সচেতন নাগরিকের কে না জানে, তারা নির্বাচনের আগেই অসংখ্যবার বলেছেন, যেহেতু সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাটি বিলুপ্ত হয়ে গেছে (যদিও পঞ্চদশ সংশোধনীটাই শাসনতন্ত্রের মৌলিক সত্তার পরিপন্থি) সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য নির্বাচনটি করতে হচ্ছে। ফোন করা, অনুরোধ করা, পীড়াপীড়ি করা (রেফারেন্স) তাও হাস্যকর এই কারণে যে, এর সবই ছিল বিএনপিকে ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে অংশগ্রহণ করানোর জন্য। শুধু খালেদা জিয়ার দৃষ্টিকোণ থেকেই নয়, ওই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার কোন বাস্তবতাও ছিল না। বিএনপি প্রথমে নির্বাচনটি বর্জনের কথা বলে পরে প্রতিহতেরও ঘোষণা দেয়। কিন্তু এর কোনটাই তাদের পক্ষে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় নি। বরং ২০১৩-এর ২৯শে ডিসেম্বর মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’র নিদারুণ ব্যর্থতা রাজনৈতিকভাবে বিএনপিকে বিধ্বস্ত ও বিকলাঙ্গ করে দেয়। বান কি মুন থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহ- যারা সকল দলের অংশীদারিত্বের নির্বাচন চেয়েছিলেন তারাও বিএনপির সাংগঠনিক বেহাল অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যান। এখানে আরেকটি মজার বিষয় হলো-  ৬৭টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল থাকা সত্ত্বেও কেন তিনি ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত করে আনলেন, বিবেকের দর্পণের সামনে দাঁড়িয়ে আত্মজিজ্ঞাসা করলে তিনি এর সদুত্তর খুঁজে পাবেন আমি নিশ্চিত।
খালেদা জিয়ার অফিসের বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন করে বলা যায় আধুনিক সভ্যতা থেকে তাকে বিযুক্ত করে রাখা হয়েছে। ৫ই জানুয়ারির সমাবেশকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে যে ঘটনাগুলো ঘটে গেল এই ঘটনাটির পর সেটাকে আর ভুল হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। এটা কোন রাজনৈতিক আচরণের মধ্যে তো পড়েই না- সম্পূর্ণভাবে শিষ্টাচার-বহির্ভূত। সরকারের এই অদূরদর্শিতা ও অপরিণামদর্শিতা কোন মারাত্মক পরিণতি ডেকে নিয়ে আসতে পারে।
বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিত অনেক ব্যক্তিত্ব ও রাষ্ট্রস্বীকৃত ব্যক্তিত্ব এত দিন যারা অজানা আশঙ্কায় নীরব, নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন, কাছিমের মতো পেটের মধ্যে মাথা লুকিয়েছিলেন, টক-শোতে, লেখনিতে, বিশ্লেষণে অকষ্মাৎ তারা প্রচ-ভাবে মুখর হয়েছেন একচ্ছত্র ক্ষমতাধারী নেত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণের নিমিত্তে। গোটা দেশ আজ দুটি শিবিরে বিভক্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক, সরকারি কর্মকতা-কর্মচারী, চিকিৎসক, আইনজীবী, বুদ্ধিজীবী, কবি ও কেরানি সকলেই কোন না কোন দলের কাছে নিজেদের সত্তা বিক্রি করে বসে আছেন। কেউ কেউ সুবিধা নেয়ার জন্য আর সাধারণ জনগোষ্ঠি নিজেদের নিরাপত্তার জন্য। কারণ তারা আজ বড়ই অসহায়। যেকোন অজুহাতে জঙ্গি বা সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত হয়ে নির্যাতনের স্বীকার হওয়ার আশঙ্কায় তারা শঙ্কিত থাকেন। সামাজিক এই অনিশ্চয়তার মুহূর্তে রবি ঠাকুরের উক্তিটি আমার বারবার মনে পড়ছে- ‘অলক্ষুণের এই দুর্যোগে বেঁচে থাকাটাই সব’।
কোকোর মৃত্যুতে প্রেসিডেন্ট এবং স্পিকার যারা দলের ঊর্ধ্বে, জাতির অভিভাবক- নিঃসন্দেহে তাঁরা সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়াকে সমবেদনা জানাতে পারতেন। কিন্তু তাও হয় নি। বিএনপি’র পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি ন্যূনতম সম্মান না দেখানো রাজনৈতিক শিষ্টাচার-বিবর্জিত। যেকোন সুনাগরিক নৈতিকতার খাতিরে এটা স্বীকার করতে বাধ্য। কিন্তু এটা নিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলোতে যে তর্ক-বিতর্কের ঝড় উঠলো সেটাও নিতান্তই বাড়াবাড়ি। রাজনীতির সুষ্ঠু চর্চা ও পরিচর্যা নেই বলেই ‘নেই কাজ তো খই ভাজ’ -এর মতো অবস্থা। দেশবাসী আশ্চর্যান্বিত হয়েছে যে, কোকোর মৃত্যুর দিনে এমনকি জানাজার দিনেও বিএনপি তথা ২০ দলীয় জোট তাদের অবরোধ কর্মসূচি তো প্রত্যাহার করেই নি এমনকি সাময়িক শিথিলও করে নি! এতে করে তারা দেশবাসীর কাছে জোরালোভাবে প্রমাণ করলো যে ক্ষমতার মোহে তারা কতটা অন্ধ। অন্যদিকে কোকো রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। পিতা-মাতার উত্তরাধিকার ছাড়া অন্য কোন পরিচয়ও তার নেই, তবুও তার জানাজায় বিশাল সমাগমটি নিদারুণ উপেক্ষা না করে বিশ্লেষণের দাবি রাখে- অবহেলার বিষয় তো নয়ই।
দেশ যখন অগ্নিদগ্ধ হচ্ছে- সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ যখন সাধারণ মানুষের জীবনকে চরম আতঙ্কের মধ্যে নিপতিত করেছে তখনও এ নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে কোনরকম উদ্বেগ আছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে না। বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচিতে জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোন কথাই নেই। থাকলে আসন্ন ২রা ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হতে যাওয়া এসএসসি পরীক্ষার বিষয়টি তাদের বিবেচনায় থাকতো। দেশের মানুষের প্রত্যাশা ছিল কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার গুরুত্ব বিবেচনা করে হরতাল-অবরোধ বা নেতিবাচক কোন রাজনৈতিক কর্মসূচি তারা স্থগিত রাখবেন। উভয় জোটেরই কর্মসূচির শেষ কথা- ক্ষমতা। একদল ক্ষমতায় থাকবেনই, আরেক দল ক্ষমতায় আসবেনই। দেশ কোথায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে সেটি তাদের কাছে বিবেচ্য বিষয় নয়।
গত ৫ই জানুয়ারি জাতির উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণটি আমি গভীর মনোযোগের সঙ্গে শ্রবণ করেছি। সেখানে তার এক বছরের অর্জন-সফলতার চিত্র আর খালেদা জিয়ার চৌদ্দ-গুষ্টি উদ্ধার করা হয়েছে। শুধু দেশে বিদ্যমান সীমাহীন দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি শব্দও উচ্চারিত হয় নি। বিএনপিও দুর্নীতির বিরুদ্ধে টুঁ শব্দটি করে না। এই সমীকরণের অর্থ জনগণ বুঝতে অক্ষম মনে করা নির্বুদ্ধিতার পরিচয়। শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার জন্য এটি ভয়াল কোন বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।
বিএনপি কিভাবে গণতন্ত্র রক্ষা করতে চায় তা কি তারা কখনো বলেছে। মানুষ হত্যা করে তো গণতন্ত্র রক্ষা করা যায় না। ২৭ দিন লাগাতার অবরোধ কর্মসূচিতে এ পর্যন্ত নৃশংসতায় নিহত হয়েছে ৪৫ জন সাধারণ নিরীহ মানুষ। একটি জরিপ মতে, অর্থনীতির ক্ষতি কমপক্ষে ৫৫,০০০ কোটি টাকা। প্রতিটি সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা হুমকির সম্মুখীন। দেশের রপ্তানি খাত থেকে শুরু করে পর্যটন শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্যের সর্বক্ষেত্রে প্রচ- স্থবিরতা বিরাজ করছে। কৃষক তার উৎপাদিত ফসল বিক্রি করতে পারছে না- পারলেও সঠিক মূল্য পাচ্ছে না, সাধারণ খেটে-খাওয়া শ্রমিক কাজ পাচ্ছে না। বাসের নিরীহ যাত্রীটি- দুই পক্ষের কারও রাজনীতির সঙ্গে যার কোন সংশ্লিষ্টতা নেই- অতর্কিত পেট্রলবোমায় পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাচ্ছে। নিষ্পাপ শিশু থেকে নারী কেউই সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবাদীদের নৃশংসতা, পৈশাচিকতা থেকে রেহাই পাচ্ছে না।  যেন সাধারণ মানুষ হয়ে এ দেশে জন্ম নেয়াটাই তার অপরাধ! ধরে নিলাম এই সন্ত্রাসে খালেদা জিয়ার কোন হাত নেই, কিন্তু তার বিরামহীন অবরোধ-হরতালের ছত্রচ্ছায়ায়ই তো এই নাশকতা, নৃশংসতা ও পাশবিক হত্যাকা-ের পটভূমি তৈরি হয়েছে। আর চোরাগুপ্তা জঙ্গি হামলা ছাড়া অন্য কোন রাজনৈতিক কর্মকা- তো সাধারণ জনগণের কাছে দৃশ্যমানও হচ্ছে না। অন্যদিকে প্রশাসনযন্ত্রের শীর্ষকর্তাদের দম্ভোক্তি রাজনীতিতে শুধু আতঙ্ক আর সংশয়ই নয়- একটা মারাত্মক বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি করেছে।
নূর হোসেন, ডা. মিলনদের মতো আত্মাহুতি দেয়ার জন্য এখন আর কেউ নেই। কেন-না দেশের শতকরা ৮৫ ভাগ লোক বিশ্বাস করে, রাজনৈতিক আদর্শের প্রশ্নে দুজন মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। এ যেন জলে কুমির, ডাঙায় বাঘ। দেশে যা কিছুই ঘটুক তিনি ক্ষমতা ছাড়বেন না- কোন সমাধানের দিকেও যাবেন না। আর বেগম জিয়ার অবস্থান হচ্ছে- ‘তোরা যে যা বলিস ভাই, আমার সোনার হরিণ চাই’- দেশ সোমালিয়াই হোক আর জাহান্নামেই যাক। রাজনীতিকে কুক্ষিগত রাখার দাবাখেলায় তারা উভয়েই সমান পারদর্শী। উভয়েই তরুণ সমাজকে সুকৌশলে অবক্ষয়ের অতলান্তে নিক্ষেপ করেছেন, বিকল্প কোন নতুন শক্তির উত্থান ঘটতে দেননি। একমাত্র এখানেই তাদের সাফল্য আকাশছোঁয়া।
’৬০-এর দশক থেকে ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত এদেশের ছাত্র-সমাজ বিশেষ করে ছাত্রলীগ বাঙালি চেতনার উন্মেষ, বিকাশ, ব্যাপ্তি ও স্বাধীনতার চেতনা ও সফলতার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে তার সঙ্গে বর্তমান ছাত্র রাজনীতির কোন চেতনাগত ও চারিত্রিক যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সন্ত্রাস এবং অর্থ এখন সংগঠনের পদলাভের প্রধানতম যোগ্যতা। এর আগে বিশ্বজিৎ হত্যাকা-ের সঙ্গে যুক্ত একটি ছেলে তার জবানবন্দিতে বলেছিল, মূল নেতৃত্বের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য সে এটি করেছে। মাত্র ক’দিন আগে পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করতে গিয়ে ধরা পড়া ছাত্রদলের একটি ছেলে বলেছে যে, ‘তাদেরকে দল থেকে আশ্বাস দেয়া হয়েছে, যে যত বেশি গাড়ি পোড়াতে পারবে তাকে তত ভাল পদ দেয়া হবে। কি ভয়াবহতাপূর্ণ অপরিণামদর্শিতা! যে কারণে শুভ বোধসম্পন্ন অংশটি সম্পূর্ণভাবে রাজনীতিবিমুখ হয়ে পড়ছে। আর স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক অঙ্গনটি দুর্বৃত্তদের অভয়ারণ্যে পরিণত হচ্ছে। এটি দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্যও একটি মারাত্মক অশনি সংকেত।
স্বায়ত্তশাসন থেকে স্বাধিকার, স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতার মূল কারিগর ছাত্রলীগই, আর বঙ্গবন্ধু এর স্থপতি। ছাত্ররাই এখানে সবসময় সকল রাষ্ট্রীয় দুঃশাসন ও অপশাসনের বিরুদ্ধে প্রজ্বলিত মশাল বহন করেছে, রুখে দাঁড়িয়েছে। আমি নিশ্চিত এই বাস্তবের আলোকেই সুপরিকল্পিতভাবে নতুন প্রজন্মকে অবক্ষয়ের গভীরে নিমজ্জিত করে দেয়া হয়েছে। ’৯০ পর্যন্ত সামরিক শাসনের সময়ও দেশের কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র সংসদ ছিল। কিন্তু এরপর ক্রমান্বয়ে সুকৌশলে তা বিলুপ্ত  করা হয়েছে। সেই ছাত্রদেরকে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এখন যে যত বড় সন্ত্রাসী সে তত বড় নেতা। নির্বাচনের মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের ভোটে নেতৃত্ব নির্বাচিত হলে কোনভাবেই এ অবস্থাটি তৈরী হতো না, কেন না- সেক্ষেত্রে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের সমর্থন পাওয়ার জন্য আদর্শ ও নৈতিকতার চর্চার মাধ্যমে তাদের আস্থা ও শ্রদ্ধা অর্জন করতে হতো।
এ কথা বলার অধিকার আমি রাখি এই কারণে যে, স্বায়ত্তশাসন থেকে স্বাধিকার, স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা অর্জনের আন্দোলনের উত্তরণে আমি সক্রিয় ছিলাম। আমাদের সময়ে ছাত্ররা মূল রাজনৈতিক আন্দোলনের ধারাকে তৈরি করেছে বঙ্গবন্ধুকে সামনে নিয়ে। কিন্তু কোন অবস্থাতেই কারও অঙ্গসংগঠন ছিল না। সেই আমি কখনোই তাদের ৬০ দশকের রাজনৈতিক পথ পরিক্রমণের ধারায় আর দেখতে চাই না। কারণ, তখনকার ও এখনকার প্রেক্ষাপট ভিন্ন। কিন্তু অবশ্যই তারা জ্ঞান ও প্রদীপ্ত আলোকচ্ছটায় শিক্ষাঙ্গনে উদ্ভাসিত হবে এবং দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে- এটিই এখন আমার মতোই দেশবাসীরও কাম্য। গোটা দেশটা আজ সরকার ও বিরোধী পক্ষের শুধু জেদেরই শিকার নয়, জাহান্নামের আগুনে দগ্ধীভূত। এই অসহ্য অসহনীয় পরিবেশ থেকে দেশবাসী আমার মতোই আল্লাহর কাছে নিষ্কৃতি প্রার্থনা করছেন বলেই আমার বিশ্বাস।
==================
আপডেট >>  ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, বুধবার

বগুড়ায় পেট্রলবোমায় নিহত ২

(বগুড়া শহরের তিনমাথার নিরালা ফিলিং স্টেশন এলাকায় আজ বৃহস্পতিবার একটি ট্রাকে দুর্বৃত্তদের ছোড়া পেট্রলবোমায় দুজন নিহত হয়েছেন। ছবি: সোয়েল রানা, বগুড়া) বগুড়া শহরের তিনমাথার নিরালা ফিলিং স্টেশন এলাকায় আজ বৃহস্পতিবার একটি ট্রাকে দুর্বৃত্তদের ছোড়া পেট্রলবোমায় দুজন নিহত হয়েছেন। ঢাকা-রংপুর মহাসড়কে এ ঘটনায় আহত হয়েছেন একজন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তিনি বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। নিহত দুজন হলেন বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার বন্তেঘড়ি গ্রামের আফজাল হোসেনের ছেলে পান ব্যবসায়ী শহীদুল ইসলাম (৩৮) এবং ট্রাকের চালক ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার ধূপখোলা গ্রামের পলাশ হোসেন। আহত পান ব্যবসায়ী মামুনুর রশীদের বাড়ি দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে। ট্রাকে আগুন লাগার পর হাসপাতালে নেওয়ার পথে শহীদুল মারা যান এবং দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পলাশ মারা যান। শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) শাহ আলম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। বগুড়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) নূরে আলম সিদ্দিকীর ভাষ্য, আজ ভোর পৌনে পাঁচটার দিকে বগুড়ার নিরালা ফিলিং স্টেশন এলাকায় দুর্বৃত্তরা একটি ট্রাকে পেট্রলবোমা ছোড়ে। এতে পানবোঝাই ট্রাকটির চালক নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাকটি রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা অন্য চারটি বাসের সঙ্গে ধাক্কা লাগালে বাসগুলোতেও আগুন ধরে যায়। ট্রাকটি পান নিয়ে ঝিনাইদহের শেখেরহাট থেকে দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে যাচ্ছিল। আগুনে ট্রাকের চালক ও পান ব্যবসায়ীর গায়ে আগুন ধরে যায়।

৩৮ থেকে ৪৬ আসনে ক্ষমতায় বসছে এএপি

দিল্লির বিধানসভা নির্বাচনে কেন্দ্রীয় ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) তোড়জোড় হারিয়ে যেতে বসেছে আম আদমি পার্টির (এএপি) কাছে। নির্বাচন-পূর্ব সবক’টি জরিপই জানান দিচ্ছে, মোদি ম্যাজিক এবার খাটছে না। সর্বশেষ ইন্ডিয়া টুডের জরিপ অনুযায়ী, ৩৮-৪৬টি আসন নিয়ে দিল্লির মসনদে আসীন হচ্ছে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের এএপি। মোট ৭০টি আসনের মধ্যে বিজেপি পেতে পারে ১৯ থেকে ২৫টি আসন। ২০১৩ সালের নির্বাচনে এএপি ২৮টি ও বিজেপি ৩১টি আসন পেয়েছিল। সে বার কংগ্রেসের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় বসেছিলেন কেজরিওয়াল।
এদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও কেজরিওয়ালের নেতৃত্বাধীন দলটিকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গেই নিয়েছেন। কৌশলগতভাবে দলটির বিরুদ্ধে জয়ী হতে পরিচিত রাজনীতিকদের বাইরে গিয়ে মনোনয়ন দিয়েছেন ভারতীয় পুলিশের প্রথম নারী কর্মকর্তা ও সাবেক টেনিস খেলোয়াড় কিরণ বেদিকে। শুধু তাই নয়, নির্বাচনী প্রচারণায় নিজে নামার পাশাপাশি নামিয়েছেন দলের কেন্দ্রীয় নেতাদেরও। তারপরও এএপির কাছে অনেকটা ম্রিয়মাণ দেখাচ্ছে বিজেপিকে। এমনকি নির্বাচনী বিজ্ঞাপনেও মার খেয়েছে এএপির কাছে। অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের রাজনীতি বিশ্লেষক সতীশ মিশ্র বলেন, ‘এই প্রথমবারের মতো আমরা দেখতে পাচ্ছি মোদি ম্যাজিক থামতে যাচ্ছে। এটা হলে (ক্ষমতাসীন দলের জন্য) বেশ দুর্ভাগ্যজনকই হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘শেষ বিন্দু দিয়ে প্রচারণা চালালেও মনে হচ্ছে বিজেপি পরাজয়ের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে।’ শ্রেণী বিভাজন : মধ্যবিত্ত, নিুবিত্ত ও বস্তিবাসী কেজরিওয়ালের ওপরেই আস্থা রাখছেন।
তাদের ৫৩ শতাংশই এএপিকে পছন্দ করেন। অন্যদিকে মোদির ভরসা এলিট শ্রেণী। বয়স বিভাজন : অনূর্ধ্ব ২৫ বছর বয়সীদের ৫১ শতাংশ এএপির প্রতি আগ্রহী। আবার ৪০-এর বেশি বয়স্কদের ৩৮ শতাংশ বিজেপিকে ও ৩৯ শতাংশ কেজরিওয়ালকে পছন্দ করেন। জাত বিভাজন : মুসলিম, হিন্দু দলিত, গুজ্জার ও অন্যান্য ওবিসি সম্প্রদায় কেজরিওয়ালকে ক্ষমতায় দেখতে চান। অন্যদিকে শিখ ও হিন্দু উঁচু জাতের মানুষের সমর্থন বিজেপি ও এএপির প্রতি সমান (৪৪ শতাংশ)। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে : নারীদের মধ্যে ৪৫ শতাংশ ও পুরুষদের মধ্যে ৪৩ শতাংশ এএপিকে পছন্দ করে। বিজেপি ও কংগ্রেস অনেক নিচে রয়েছে।

ভারতে আসছেন সিরিসেনা শ্রীলংকায় যাবেন মোদি

শ্রীলংকার সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতেও পিছিয়ে থাকছেন না মোদি। একমাস পরই শ্রীলংকা সফর করবেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। গত ২৫ বছরের মধ্যে এই প্রথম কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রীলংকা সফরে যাবেন। সিকি শতক পর এই প্রথম ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কেউ দ্বীপরাষ্ট্র সফরে যেতে চলেছেন। তবে, শুধু কলম্বো নয়, তামিল অধ্যুষিত নর্দার্ন প্রভিন্সের জাফনাতেও যাওয়ার কথা মোদির। সেখানেই যুদ্ধ বিধ্বস্তদের জন্য প্রায় ৫০ হাজার বাড়ি তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে ভারত। মোদির শ্রীলংকা সফরের সময় উদ্বাস্তুদের ফেরানোর ব্যাপারে কথাবার্তা হওয়ার আশা দেখছে দু’পক্ষই। এদিকে শ্রীলংকার নতুন প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা এ মাসের শেষের দিকে নয়াদিল্লি সফরে আসছেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি তার প্রথম বিদেশ সফর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বুধবার এ ঘোষণা দেন। শ্রীলংকার স্বাধীনতা দিবস পালন উপলক্ষে টুইটারে এক শুভেচ্ছা বার্তায় মোদি বলেন, ‘আমি এ মাসের শেষের দিকে প্রেসিডেন্ট সিরিসেনাকে ভারতে স্বাগত জানানোর অপেক্ষায় রয়েছি।’ মোদি আরও বলেন, ‘দু’দেশের মধ্যে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের যে বন্ধন রয়েছে তা অটুট থাকবে।’ শ্রীলংকা সূত্র জানায়, সিরিসেনা আগামী ১৬ ফেব্রুয়ারি দু’দিনের সফরে নয়াদিল্লি যাচ্ছেন। এর আগে সিরিসেনা বলেছিলেন, প্রেসিডেন্ট হিসেবে ভারত হবে তার প্রথম সফর। এএফপি। সিরিসেনা ও মোদির পিঠাপিঠি এই সফরকে রাজনৈতিক দিক থেকে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে বিশেষজ্ঞ মহল। এর আগে ১৯৮৭ সালে কলম্বো সফরে গিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী। উদ্দেশ্য ছিল, শ্রীলংকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেআর জয়বর্ধনের সঙ্গে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর। কিন্তু এর পর যত সময় গেছে, ততই জটিল হয়েছে দু’দেশের সম্পর্ক। শ্রীলংকায় তামিলদের ওপর অত্যাচারের অভিযোগে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রাজাপক্ষের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক খারাপ হয়েছে। কমনওয়েলথ গেমসের সম্মেলন উপলক্ষে তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের শ্রীলংকায় যাওয়ার কথা থাকলেও তামিল দলগুলোর চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত সফর বাতিল করেন তিনি।

সেতুতে ধাক্কা খেয়ে বিমান নদীতে

ট্রান্স এশিয়া এয়ারওয়েজের একটি যাত্রীবাহী বিমান নদীতে বিধ্বস্ত হয়েছে। রাজধানী তাইপের কাছেই এ ঘটনাটি ঘটে। বিমানটি অবতরণের সময় একটি সেতুর সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে নদীতে পড়ে যায়। এ দুর্ঘটনায় অন্তত ২৩ জন নিহত হয়েছেন। আহত অবস্থায় ১৫ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। ২০ জন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। বিমানটিতে মোট আরোহী ছিল ৫৮ জন। তাইপের উত্তরাঞ্চলীয় বিমানবন্দর সংশান থেকে ৫ ক্রুসহ ৫৮ আরোহী নিয়ে ছেড়ে আসা বিমানটি কিনমেন দ্বীপ যাওয়ার পথে স্থানীয় সময় বেলা ১১টার কিছু আগে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
কয়েক মাসের মধ্যে এই নিয়ে ট্রান্সএশিয়া এয়ারওয়েজ কোম্পানির দুটি বিমান বড় ধরনের দুর্ঘটনায় পড়ল। এর আগে জুলাই মাসে ঝড়ের কবলে পড়ে এই কোম্পানীর আরেকটি অভ্যন্তরীণ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ৪৮ জনের প্রাণহানি ঘটে। এক সৌখিন ক্যামেরাম্যান বুধবারের এই দুর্ঘটনার ভিডিওচিত্র ধারণ করেন। এই ফুটেজে নদীর পানিতে বিধ্বস্ত হওয়ার আগে বিমানটিকে সেতুর সঙ্গে ধাক্কা খেতে দেখা যায়। এই ঘটনায় একটি ট্যাক্সি সম্পূর্ণভাবে দুমড়ে যায় এবং সেতুটির ব্যাপক ক্ষতি হয়। এসময় বিমানের পাইলট, “শেষ দিন, শেষ দিন, ইঞ্জিনে আগুন ধরে গেছে বলে চিৎকার করে যাত্রীদের সতর্ক করেছিলেন বলে জানিয়েছেন ক্ররা। চীনের জিয়ামেন ডেইলি পত্রিকা একটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে জানিয়েছে, বিমানটিতে চীনের মূল ভূখ­ের ৩১ বাসিন্দা ছিল। এরা চীনের পূর্বাঞ্চলীয় নগরী থেকে দুটি দলে ভাগ হয়ে সফর করে।
পত্রিকাটি একটি ট্যুরিজম কোম্পানির এক প্রতিনিধির বরাত দিয়ে জানায়, ‘যাত্রীদের সকলের মোবাইল ফোন বন্ধ ছিল। তাই আমরা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছিলাম না।’ একটি ট্যুরিজম কোম্পানির কর্মী ওয়েন জানান, বিমানটিতে ১০ বছরের কম বয়সী ৩ শিশুসহ তাদের ১৫ ক্লায়েন্ট ও একজন ট্যুর লিডার ছিল। এএফপি’র এক সাংবাদিক ঘটনাস্থল থেকে জানান, নৌকায় করে আট জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। ১৫ জনের বেশি লোককে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। উদ্ধার তৎপরতায় প্রায় ১শ’ সৈন্য মোতায়েন করা হয়েছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত বিমানটির ধ্বংসাবশেষ নদীর মাঝখানে রয়েছে। উদ্ধার কার্যক্রম এখনও চলছে। এএফপি।

নেইমারকে নিয়ে নোংরা রাজনীতি!

দেড় বছর হয়ে গেল সান্তোস থেকে বার্সেলোনায় যোগ দিয়েছেন নেইমার। কিন্তু তার দলবদল নিয়ে বিতর্ক যেন শেষ হওয়ার নয়। নেইমার বিতর্কে জেরবার বার্সেলোনার পক্ষ থেকে এবার পাল্টা তোপ দাগা হল। অভিযোগটা বেশ গুরুতর। বার্সাকে বিপদে ফেলতে পর্দার আড়াল থেকে নাকি কলকাঠি নাড়ছে রিয়াল মাদ্রিদ! নেইমারকে দলে ভেড়াতে ব্যর্থ হওয়ায় নাকি রিয়ালের এই আক্রোশ। বিতর্কের সূত্রপাত নেইমারের ট্রান্সফার ফি নিয়ে। প্রথমে বলা হয়েছিল, অংকটা ৫৭.১ মিলিয়ন ইউরো। পরে জানা যায় সেটা ৮৬.২ মিলিয়ন ইউরো। কর ফাঁকি দিতেই নাকি বার্সেলোনার এই মিথ্যাচার। জালিয়াতির অভিযোগে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন বার্সেলোনার সাবেক প্রেসিডেন্ট সান্দ্রো রোসেল। ছাড় পাচ্ছেন না বর্তমান প্রেসিডেন্ট হোসেপ মারিয়া বার্তোমেউও। ২.৮৫ মিলিয়ন ইউরো কর ফাঁকির অভিযোগে ১৩ ফেব্র“য়ারি মাদ্রিদের একটি আদালতে তলব করা হয়েছে তাকে। আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনের আগে বার্তোমেউ বললেন, স্পেনের নোংরা রাজনীতির শিকার বার্সেলোনা। নেইমারের চুক্তি নিয়ে যে নাটক চলছে, তার পেছনে রিয়াল মাদ্রিদের হাত রয়েছে বলে দাবি করলেন বার্সা প্রেসিডেন্ট, ‘নেইমারকে ঘিরে কী হচ্ছে, তা আমার বোধগোম্য নয়।
আমরা কোনো অন্যায় কারিনি। এক্ষেত্রে নিশ্চয় কোনো রাজনীতি হচ্ছে। নেইমারকে কিনতে বার্সেলোনার মতো রিয়াল মাদ্রিদও আগ্রহী ছিল। বার্সার বিরুদ্ধে চলমান তদন্তের পেছনে নিশ্চয় তাদের হাত রয়েছে। নেইমারকে তারা কিনতে পারেনি বলেই হয়তো এমনটা করছে। এক বছর আগে নেইমার যখন খুব ভালো খেলছিল, তখনই প্রথম কর ফাঁকির অভিযোগ ওঠে। নেইমার আবারও যখন খুব ভালো খেলছে, ফের তদন্ত শুরু হল। সম্ভবত কোনো একটি পক্ষ চায় না, সে ভালো খেলুক। আমি বলছি না যে রিয়ালই সব করিয়েছে, কিন্তু নেইমারকে পেতে তারাও যথেষ্ট আগ্রহী ছিল।’ তবে রিয়ালের ঘাড়ে সব দোষ চাপিয়ে রেহাই পাচ্ছেন না বার্তোমেউ। আগামী নির্বাচনে যিনি বার্সেলোনার প্রেসিডেন্ট হতে চান, সেই অগাস্তি বেনেদিতো সবকিছুর জন্য ক্লাবের বর্তমান পরিচালনা পর্ষদকেই দায়ী করেছেন, ‘রোসেল ও বার্তোমেউয়ের দুর্নীতি ও ব্যর্থতার আরেকটি উদাহরণ এটি। এভাবেই তারা ক্লাব চালাচ্ছে। প্রকৃত সত্য গোপন করে সবকিছুর অর্ধেক ব্যাখ্যা দেয় তারা। ১৭ মিলিয়ন থেকে ৫৭ মিলিয়ন, এরপর শোনা গেল ৮৭ মিলিয়ন। এখন শুনছি অংকটা ১১০ মিলিয়ন ইউরো! অস্বচ্ছ এই চুক্তির জন্য কর ফাঁকির অভিযোগও উঠেছে ক্লাবের বিরুদ্ধে। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এখানে নেইমারের কোনো দায় নেই। বার্সেলোনার ভবিষ্যৎ সে। সব দায় কর্তৃপক্ষের। এজন্য শাস্তি হওয়া উচিত তাদের।’ ওয়েবসাইট।

বিশ্বখ্যাত গায়িকার বর বারম্যান!

জাপানের সঙ্গীত শিল্পী হিকারু উতাদা বিয়ে করতে যাচ্ছেন। নিজের ওয়েবসাইটে তিনি এ ঘোষণা দেন। জাপানি সংবাদ মাধ্যম জানায়, হিকারুর হবু বর ইতালির এক বারম্যান। বারম্যান হিকারু থেকে আট বছরের ছোট। ১৯৯৯ সালে বাজারে আসা হিকারুর প্রথম অ্যালবাম ‘ফার্স্ট লাভ’ লাখ লাখ ডলার ব্যবসা করে। ৩১ বছর বয়সী হিকারু তার ওয়েবসাইটে এক বার্তায় বলেন, ‘শিগগিরই আমি বিয়ে করতে যাচ্ছি। আমার পার্টনার একজন ইতালীয়।’ যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেয়া হিকারু চমৎকার ইংরেজিতে কথা বলেন। তিনি বিয়ের খবর জানালেও তার বন্ধুর নাম প্রকাশ করেননি।
তবে পার্টনারকে তিনি আন্তরিক ও চমৎকার হিসেবে উল্লেখ করেন। জাপানের সংবাদ মাধ্যম জানায়, আগামী ২৩ মে উভয়ে বিয়ে করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। হিকারু জাপানি আলোকচিত্রী কাজুয়াকি কিরিয়াকে প্রথম বিয়ে করেন। কিন্তু মতপার্থক্যের কারণে ২০০৭ সালে তাদের বিয়ে ভেঙে যায়। ইংরেজি ও জাপানি উভয় ভাষায় গাওয়া তার গান তাইওয়ান, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড ছাড়াও ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি ও উত্তর আমেরিকায় ব্যাপক ব্যবসা সফল হয়।

জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটি ও মোবাইল কোর্ট by আলী ইমাম মজুমদার

সরকারের অনেক অঙ্গ থাকে। এসব অঙ্গ বিভাগ, সংস্থা, অধিদপ্তর, পরিদপ্তর ইত্যাদি নামে পরিচিত। প্রতিটির ভূমিকা আইনের গণ্ডি বা ক্ষেত্রবিশেষে নির্বাহী আদেশ দ্বারা নির্ধারিত। সে ভূমিকা ভিন্ন ভিন্ন হলেও মূলত লক্ষ্য জনস্বার্থ। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন অঙ্গ যথাযথ ভূমিকা রাখতে সময়ে সময়ে অধিকতর ক্ষমতায়নের প্রয়োজন অনুভব করে। দাবি জানায় সরকারের কাছে। কখনো বা বিভিন্ন অঙ্গের দায়িত্বের পরিসরে পরিবর্তনও আসে। ক্ষেত্রবিশেষে একটি অঙ্গ অপর অঙ্গের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ মনে করে না। এ নিয়ে বিতর্কেও জড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন বিভাগ বা সংস্থা। এ প্রবণতা শুধু আমাদের দেশে আছে তা-ই নয়, আছে অন্যত্রও। বিশেষ করে একই প্রশাসনিক সংস্কৃতির দেশগুলোতে। কিছুদিন আগে ভারতে কেন্দ্রীয় সরকারে পরিবর্তন আসার কয়েক মাস পর নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তির্যক মন্তব্য করেছিলেন; বিভিন্ন বিভাগ ও সংস্থার পারস্পরিক কোন্দল এতটা তীব্র যে পারলে তারা আদালতে যেত।
দুর্বল প্রশাসনিক পরিকাঠামো আমাদের দেশে। সদা রাজনৈতিক কলহ-কোন্দলের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে জনগণের চাহিদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করে শক্ত ভিত দেওয়া যায়নি। নিয়োগ, পদোন্নতি, পদ সৃষ্টি ইত্যাদি অনেক কিছুই হয় অ্যাডহক চিন্তাভাবনা থেকে। তাই এগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থার অভাবও কিছুটা বেশি বটে। কেউ কেউ ভাবেন, অপর একটি সংস্থার ক্ষমতা তঁাদের দেওয়া হলে অধিকতর কার্যকর অবদান রাখা যেত। এসব ভাবনা বা দাবির পেছনে শুধু গোষ্ঠীস্বার্থ কাজ করছে, এমনটি বলা সংগত হবে না। নিজস্ব উপলব্ধি থেকে প্রশাসনকে অধিকতর কার্যকর করার জন্য তা আসতে পারে। দাবি এলে দেখা দরকার, প্রচলিত ব্যবস্থা কোনো বিঘ্ন সৃষ্টি করছে কি না, আর তা কীভাবে প্রতিকার করা সম্ভব।
ঠিক তেমনই কিছু দাবিদাওয়া এসেছে সম্প্রতি শেষ হওয়া পুলিশ সপ্তাহে। এর বেশির ভাগই প্রাতিষ্ঠানিক। লোকবল, সরঞ্জাম ও সুবিধাদি বৃদ্ধিসংক্রান্ত। দু-একটি বিষয় আন্তবিভাগীয় সম্পর্কের পারস্পরিক অবস্থান নিয়েও রয়েছে। যেমন: দাবি এসেছে, যেহেতু ‘এসপি জেলার আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য দায়ী’, সেহেতু তাঁদের জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি করা হোক। তেমনই আরেকটি দাবি, প্রতিটি জেলায় আইনশৃঙ্খলাজনিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য এসপিদের অধীনে দুজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ন্যস্ত করা হোক। এসব দাবিদাওয়া মুক্ত আলোচনাকালে হয়। বিভিন্ন কর্মকর্তা বিভিন্ন দাবি করেন। হয়তোবা তেমনি এ দুটো দাবির বিষয় উত্থাপিত হতে পারে। তবে বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর। তাই যৌক্তিকতা আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
প্রথমে আলোচনায় আসতে পারে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি পদে এসপিকে নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাবটি। এখন এ পদে ডিসি দায়িত্ব পালন করছেন। উল্লেখ করা যায়, এ কমিটি আইনের কোনো অনুশাসনে গঠিত নয়। এর ভিত্তি সরকারের নির্বাহী আদেশ। উল্লেখ্য, জেলার আইনশৃঙ্খলার সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা প্রতি মাসে সভায় মিলিত হয়ে থাকেন। সেখানে আলোচিত হয় আইনশৃঙ্খলাজনিত বিদ্যমান পরিস্থিতি। পরামর্শ আসে তার উন্নতি বিধান ও প্রতিকারের।
আইনানুযায়ী জেলার আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে পুলিশ সুপার রয়েছেন, এটা সত্য। ঠিক একই আইনে এ কার্যক্রমে ডিসিরও সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব রয়েছে। শুধু পুলিশ আইন বা পুলিশ প্রবিধান নয়, ফৌজদারি কার্যবিধিতে জনশৃঙ্খলা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ম্যাজিস্ট্রেটের। বেআইনি জনতা ছত্রভঙ্গ করা থেকে শুরু করে গণ-উপদ্রব দূরীকরণে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রধান দায়িত্ব ম্যাজিস্ট্রেটের। এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে জেলায় সামরিক বাহিনী তলবের ক্ষমতাও ফৌজদারি কার্যবিধিমতে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্বের অংশ। আধা সামরিক বাহিনী নিয়োগের বিষয়েও একই সমীকরণ কাজ করে। শুধু পুলিশ আইন বা ফৌজদারি কার্যবিধি নয়, অস্ত্র আইনসহ জনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত বহুবিধ আইনে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের মুখ্য ভূমিকা রয়েছে। সুতরাং, সংগতভাবে সব দিক বিবেচনা করে ডিসিকে আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি রাখা অযৌক্তিক বলা যাবে না। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য, ফৌজদারি কার্যববিধির ১০ ধারায় জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে জেলার নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগের প্রধান কর্মকর্তা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপর আলোচনা করা যেতে পারে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করার জন্য এসপিদের অধীনে ম্যাজিস্ট্রেট ন্যস্ত করার বিষয়টি। বর্তমানে চলমান এসব আদালতের আইনি উৎস ২০০৯ সালের মোবাইল কোর্ট আইন। এ আইন বিচার বিভাগ পৃথক্করণের পরে জারি করা একটি অধ্যাদেশকে প্রতিস্থাপন করেছে। আইনটির প্রয়োগ ভেজালবিরোধী অভিযান, বাল্যবিবাহ, ইভ টিজিং রোধ ইত্যাদি ক্ষেত্রে যথেষ্ট ফলপ্রসূ বলে প্রশংসিত হচ্ছে। পাশাপাশি ‘রাজনৈতিক কর্মসূচি’ চলাকালে হিংসাশ্রয়ী ও ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপের জন্য ধৃত অপরাধীদের তাৎক্ষণিক শাস্তি দেওয়ার সুফলও লক্ষণীয় হচ্ছে। পাশাপাশি ক্ষেত্রবিশেষে এর অপপ্রয়োগ সমালোচিতও হচ্ছে। তবে বর্তমানে হিংসাশ্রয়ী যে কার্যক্রম চলছে, তা নিবারণে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা জোরদার করা যেতে পারে। এসপিরা অনুরোধ করলে এটা করতে কোনো ডিসি অস্বীকৃত হবেন বা ম্যাজিস্ট্রেট দেবেন না, এমন মনে করার সুযোগই নেই। বরং অগ্রাধিকার ভিত্তিতেই দেওয়ার কথা। ভিন্ন কিছু ঘটলে এসপি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেও পারবেন।
পরিবেশ অধিদপ্তর, বিদ্যুৎ বিভাগ, ওয়াসা, রাজউক, বিমানবন্দর, সিটি করপোরেশন এমনকি র্যাব জেলা প্রশাসনের পাশাপাশি কাজ করে না। তাই সেসব সংস্থার কার্যক্রমকে গতিশীল রাখতে সংঘটিত অপরাধের দ্রুত বিচারের জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়া আছে। তাঁরা প্রয়োজনমতো মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেন। ওই সব বিভাগ বা সংস্থা আদালতকে সহায়তা দিয়ে থাকে। উল্লেখ্য, ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসারে জেলায় কার্যরত সব নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অধস্তন। সুতরাং, উপরিউক্ত সংস্থাগুলোতে কর্মরতদের অবস্থানও তা-ই। জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে তাঁদের কাজের তত্ত্বাবধান ও আইনি নির্দেশনা দেওয়ার কথা। এটি একটি দিক। অপর দিকে, ডিসি ও এসপি জেলার আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় একই উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করেন। নিত্য তাঁদের যোগাযোগ। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরাও পুলিশের সঙ্গে বিভিন্ন কাজ করছেন। সুতরাং, সেখানে এসপির অধীনে মোবাইল কোর্টের জন্য পৃথক ম্যাজিস্ট্রেট ন্যস্ত করার প্রস্তাবটি প্রাসঙ্গিক—এমনটা বলার সুযোগ নেই। যেসব বিষয় নিয়ে এ দাবিগুলো, তা পুলিশ বাহিনীর কর্তব্য সম্পাদনে কতটা সহায়ক হবে, এটা বোধগম্য নয়।
কয়েক বছর যাবৎ জেলা প্রশাসন ও পুলিশের মধ্যে সমন্বয়হীনতার বিষয়টি লক্ষণীয় হচ্ছে। আবার এ–ও দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে তারা বেশ গোছালোভাবে মিলেমিশে কাজ করছে। প্রকৃতপক্ষে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কার কী ভূমিকা, এটাই মূল বিতর্কের বিষয়। ডিসিকে বুঝতে হবে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় তাঁরা একটি যুগবাহিত কার্যকর পদ্ধতি পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় আছেন। এখানে এসপিরও ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সেই ভূমিকা পালনে তাঁকে সহায়তা করতে হবে ডিসিকে। ঠিক তেমনই আইনে ডিসির যে ভূমিকা রয়েছে, তা পালনে তিনি যেন বাধার সম্মুখীন না হন, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব এসপির। শাসনব্যবস্থার ভারসাম্য রাখার জন্যই এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। অবশ্য আইন অলঙ্ঘনীয় দলিল নয়। প্রয়োজনে এর সংশোধন হবে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের পুলিশের কার্যক্রম তদারকির দায়িত্ব উপমহাদেশে শাসনব্যবস্থার ঐতিহ্য। ভারত এটাকে জোরদার করেছে।
পক্ষান্তরে, পাকিস্তান ভিন্ন একটি আইন করে এটা কার্যত রদ করেছে। বলা হয়ে থাকে, এটাসহ এ ধরনের বেশ কিছু কারণে সে দেশে কার্যকর বেসামরিক শাসনব্যবস্থা একরূপ নেই বললেই চলে। পাশ্চাত্যে যেখানে শাসনব্যবস্থা ভিন্ন ধরনের, সেখানে পুলিশ স্থানীয়ভাবে নিয়োগকৃত এবং জনপ্রতিনিধিদের কাছে দায়বদ্ধ। আদালত আর নিজেদের বিভাগীয় নিয়ন্ত্রণ তো রয়েছেই। প্রকৃতপক্ষে, কাউকে নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী করা সুশাসনের পরিপন্থী। যার যত ক্ষমতা, তার ওপর সে অনুপাতে রাখতে হবে নিয়ন্ত্রণ। শাসনব্যবস্থায় ভারসাম্য রক্ষার্থে বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে এর বিকল্প নেই।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

ফিলিস্তিনে নাড়া দেওয়া সেই কিশোরী

(ইসরায়েলের সশস্ত্র সেনাদের ওপর হামলার ‘দায়ে’ ফিলিস্তিনের ১৪ বছর বয়সী স্কুলপড়ুয়া কিশোরী মালাক আল-খতিবকে দুই মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এ নিয়ে ফুঁসে ওঠেছে ফিলিস্তিনিরা। তারা বলছে, এই কিশোরী ফিলিস্তিনের বর্তমান পরিস্থিতির প্রতীক। ছবি: এএফপি) ইসরায়েলের সশস্ত্র সেনাদের ওপর হামলার ‘দায়ে’ ফিলিস্তিনের ১৪ বছর বয়সী স্কুলপড়ুয়া কিশোরী মালাক আল-খতিবকে দুই মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। করা হয়েছে দেড় হাজার ডলার জরিমানা। ইসরায়েলের আদালতের দেওয়া এ শাস্তির আদেশ নিয়ে ফিলিস্তিনিরা ক্ষুব্ধ। তারা বলছে, দণ্ড পেয়ে কারাবন্দী থাকা এই কিশোরী ফিলিস্তিনের বর্তমান পরিস্থিতির প্রতীক হয়ে উঠেছে। ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলিরা কীভাবে শোষণ-নিপীড়ন চালাচ্ছে—এ ঘটনার মধ্য দিয়েই তা প্রকাশ পাচ্ছে। বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে জানানো হয়, ইসরায়েলের সেনাদের লক্ষ্য করে পাথর ছোড়া ও ছুরি নিয়ে হামলার ‘দায়ে’ কিশোরী মালাককে এই শাস্তি দেওয়া হয়। তবে শাস্তির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়েছে।
রামাল্লার কাছে বেইতিন শহরে কিশোরী মালাকের পরিবারের বাস। মালাকের ৫০ বছর বয়সী মা খাওলা আল-খতিব বলেন, ‘এই শীতের মধ্যে গরম কাপড় ছাড়া ডাণ্ডাবেরি পরিয়ে আমার মেয়েটিকে আদালতে হাজির করা হয়। এ অবস্থা দেখে মা হিসেবে আমার হৃদয় ভেঙে গেছে। আমি তার জন্য বাড়ি থেকে শীতের কাপড় নিয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু বিচারকের বাধার কারণে আমি পোশাকটি আমার মেয়েকে দিতে পারিনি।’
মানবাধিকার সংগঠন ডিফেন্স ফর চিলড্রেন ইন্টারন্যাশনাল প্যালেস্টাইনের (ডিসিআই প্যালেস্টাইন) হিসাব মতে, পাথর নিক্ষেপের অভিযোগে দখলকৃত পশ্চিম তীর থেকে ইসরায়েলি বাহিনী প্রতিবছর গড়ে হাজার খানেক শিশুকে আটক করে। তবে মালাক মেয়ে হওয়ায় বিষয়টি গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের মনকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়।
রামাল্লাভিত্তিক প্যালেস্টিনিয়ান প্রিজনার্স ক্লাব নামের একটি সংগঠনের হিসাবে, ইসরায়েলের কারাগারে ২০০ ফিলিস্তিনি শিশু-কিশোর বন্দী আছে। এর মধ্যে মাত্র চারটি মেয়ে আছে। এদের মধ্যে মালাকের বয়সই সবচেয়ে কম। সংগঠনটির মুখপাত্র আমানি সারাহনা বলেন, ইসরায়েলের কারাগারগুলোতে সাড়ে ছয় হাজারের মতো ফিলিস্তিনি আছে।
মালাকের গ্রেপ্তার ও সাজার ঘটনা নিয়ে ফিলিস্তিনের নেতৃত্ব জাতিসংঘের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছে। ওই চিঠিতে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ বলেছে, ইসরায়েল রাতের আঁধারে শিশুদের ধরে নিয়ে যাওয়ার যে অভ্যাস গড়ে তুলেছে, তা বন্ধে পদক্ষেপ নিতে হবে।
পুরো ঘটনায় ক্ষুব্ধ মালাকের বাবা আলী আল-খতিব বলেন, অস্ত্রশস্ত্রে সমৃদ্ধ ইসরায়েলের মতো একটি ক্ষমতাশীল রাষ্ট্র কেন তার ১৪ বছরের মেয়েকে ধরে নিয়ে গেল, তিনি তা বুঝতে পারছেন না। ইসরায়েলের সেনারা বলছে, আমার মেয়ে এক সেনাসদস্যকে ছুরিকাঘাত করার চেষ্টা করেছে। ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত একটি বাহিনীর সেনার বিরুদ্ধে কোনো কিশোরীর পক্ষে কি এমন করা সম্ভব? তাঁর দাবি, গত ৩১ ডিসেম্বর বেতিনে বিদ্যালয় থেকে বাড়ি ফেরার পথে তাঁর মেয়েকে ইসরায়েলি বাহিনী ধরে নিয়ে গেছে।
তবে সামরিক আদালতে মালাকের বিরুদ্ধে পাঁচজন সেনা কর্মকর্তা সাক্ষ্য দিয়েছেন, মালাক ইসরায়েলের সেনা বহরের গাড়িতে নিক্ষেপের জন্য পাথর তুলেছিল এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের আঘাত করার জন্য ছুরি নিয়ে যাচ্ছিল।
ইসরায়েলে ১২ বছরের কম বয়সীদের শিশু বলা হয়। এতে বিচার করার সময় মালাক শিশু হিসেবে বিবেচিত হয়নি। যদিও ইউনিসেফের হিসাবে, ১৮ বছর পর্যন্ত ছেলে বা মেয়ে শিশুর মর্যাদা পায়। ইসরায়েল এর তোয়াক্কা না করেই ফিলিস্তিনের শিশুদের আটক, গ্রেপ্তার ও শাস্তি দিয়ে থাকে। জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ফিলিস্তিনের শিশুদের প্রতি অমানবিক আচরণের জন্য ইসরায়েলের সমালোচনা করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব শিশুকে মৃত্যুর হুমকি দেওয়া হয় এবং শারীরিক নিপীড়ন, নির্জন কারাবাস ও যৌননিপীড়ন করা হয়।