Showing posts with label জ্বালানি. Show all posts
Showing posts with label জ্বালানি. Show all posts

Sunday, November 24, 2024

সরকারের তিন মাসে জ্বালানি খাতে সাশ্রয় হয়েছে ৩৭০ কোটি টাকা

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের ৩ মাসে জ্বালানি খাতে ৩৭০ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। গতকাল ‘দেশের শিল্প খাতে জ্বালানি সংকট সমাধানের পথ’- শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ তথ্য জানান। সেমিনারটি আয়োজন করে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই)। এতে বিভিন্ন শিল্প খাতের শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতা ও প্রতিষ্ঠানের মালিকরা উপস্থিত ছিলেন। ফাওজুল কবির খান বলেন, জ্বালানি তেলের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের স্পেসিফিকেশন ছিল, যিনি জ্বালানি তেল সরবরাহ করবেন তাকে রিফাইনারির মালিক হতে হবে। আমি এটাকে ক্ষাণিকটা পরিবর্তন করে দিলাম যে, রিফাইনারির মালিক হলে ভালো, যদি আপনি বড় সরবরাহকারী হন তাহলেও হবে। এর ফলে ৩ মাসে যে জ্বালানি আমদানি করেছি, তাতে ৩৭০ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে। যেটার বার্ষিক ভ্যালু প্রায় ১৫শ’ কোটি টাকা। এজন্য আমাদের সরকারি জ্বালানি ক্রয় প্রতিযোগিতার মধ্যে নিয়ে আসতে হবে এবং এটাই সবথেকে বড় সুযোগ। আমরা ব্যবসায়ীদের জন্য সবকিছু উন্মুক্ত করে দিয়েছি। তিনি বলেন, আমাদের অর্থনীতির দুইটা সমস্যা হলো- একটা প্রতিযোগিতার অভাব, আরেকটি অপচয়। এখানে ব্যবসা করতে হলে মন্ত্রী, সচিবকে চিনতে হয়। আমাদের ভোলাতে যে গ্যাস আছে, সেটা আমরা পাইপলাইনের কারণে আনতে পারছি না। ওখান থেকে আপনারা গ্যাস এলএনজি অথবা সিএনজি ফর্মে আনেন এবং ব্যবহার করতে পারেন। আমাদের সহজ সমাধানের কথা না ভেবে প্রকৃত সমাধানের কথা ভাবতে হবে। প্রকৃত সমাধান হলো- আমাদের রিনিউয়েবল এনার্জিতে যেতে হবে। অনেকে বলে জায়গার অভাব, এটা সম্পূর্ণ ভুল তথ্য। অপ্রয়োজনীয় জায়গায় বিনিয়োগ করা হয়েছে উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, আমরা যদি বিদ্যুৎ ছাড়াও সেতু ও রেলওয়ে দেখি- যেখানে বিনিয়োগ দরকার ছিল সেখানে হয়নি, আর যেখানে বিনিয়োগ অপ্রয়োজনীয় ছিল সেখানে করা হয়েছে। কিন্তু আমাদের সবার পার ক্যাপিটা জিডিপি বাড়ছে। যখন এগুলো বন্ধ করে দিচ্ছি, এখন গ্রোথ রেট কমে যাচ্ছে। অনেকে বলছে, এই উপদেষ্টারা তো কিছুই পারে না। এ সময় তিনি ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন রেখে বলেন, আপনারা কি অপচয়ের গ্রোথ রেট চান নাকি প্রকৃত গ্রোথ রেট চান? আমরা উন্নয়নটা মানুষের সঙ্গে সম্পর্কিত করতে চাচ্ছি।

দেশের অর্থনীতিকে ‘ক্রনি ক্যাপিটালিজম’ মুক্ত করার আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, আপনারা এটাতে অংশ নেবেন। আরেকটা জিনিস, ‘ক্রনি ক্যাপিটালিজম’ বা অন্যের পরিচয়ে ব্যবসা খুব দীর্ঘস্থায়ী হয় না। আমাদের দেশে সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়ের কোনো ভিত্তি হতে পারে না।

ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আপনারা সরকারের সখ্যতার ভিত্তিতে না ব্যবসা করে প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসা করেন। আমাদের অর্থনীতি উন্মুক্ত করার যে প্রচেষ্টা হাতে নিয়েছি, সেটার সঙ্গে আপনারা যুক্ত হবেন। আমাদের ভালো ব্যবসায়ীরা এগিয়ে আসবেন। এতে অর্থনৈতিক সংকট থেকে আমরা পরিত্রাণ পাবো।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দিন বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্য ও জ্বালানি খাতে দেশ নৈরাজ্যের চরম সীমায় পৌঁছেছিল। সে সময় ব্যবসায়ীদেরও কোনো মর্যাদা ছিল না। তবে এখন সে পরিস্থিতি বদলেছে। বিগত সরকারের সময়ে গ্যাস সংযোগ পাওয়া নিয়ে নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সাবেক জ্বালানি মন্ত্রীর কাছে আমি গিয়েছিলাম। ওই সময় ওনার বাসার সামনে বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়েছিলাম, যেন আমি কোনো চাকরি চাইতে গিয়েছি। এর কারণ, এত টাকা বিনিয়োগ করেছি, কিন্তু গ্যাস সংযোগ পাচ্ছিলাম না। তখন গ্যাস সংযোগ পাওয়া আমার কাছে মনে হতো ব্যাংকের নিবন্ধন পাওয়ার মতো।

জ্বালানি খাত দুর্নীতির অন্যতম জায়গা উল্লেখ করে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার পরে কিছু আর্থিক অপরাধী সম্পর্কে জানতে পারছি। এসব জেনে আমার কিছু কিছু মানুষের ব্রেন স্ক্যান করে দেখতে ইচ্ছা করে, যে এরা এতটা ক্রিমিনাল কী করে হতে পারে! শেখ বশিরউদ্দিন আরও বলেন, জ্বালানি খাতের বর্তমানে যে দুর্বলতা রয়েছে তা কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটি পরিকল্পনা করে করা হয়েছে। তবে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে বাস্তবতাকে অস্বীকার করার প্রবণতা নেই। আমরা বিদ্যমান সমস্যার সম্ভাব্য সমাধানের দিকেও যেতে পারবো বলে আশা করছি।
সেমিনারে বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজের সভাপতিত্বে আরও বক্তব্য রাখেন জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ড. ইজাজ হোসেন, পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান জনেন্দ্র নাথ সরকার প্রমুখ।

mzamin

Friday, August 30, 2024

তুরস্কের হাতে যাচ্ছে ইউরোপের জ্বালানির নিয়ন্ত্রণ

পশ্চিমা মদদপুষ্ট ইউক্রেন ও অন্যতম পরাশক্তি রাশিয়ার মধ্যকার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ময়দানে যেন তুরস্কের ভাগ্য লেখা হচ্ছে। এ যুদ্ধ নিয়ে বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলো প্রকাশ্যে দুই ভাগ হয়ে গেলেও দুই নৌকায় পা দিয়ে দিব্যি চালিয়ে যাচ্ছেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। সবশেষ রুশ জ্বালানি রপ্তানি থেকেও বিপুল সুবিধা পেতে যাচ্ছে তুরস্ক।

তুর্কি সংবাদমাধ্যম ডেইলি সাবাহর প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্যাস রপ্তানি নিয়ে ইউরোপিয়ান ভোক্তাদের সতর্ক করেছে রাশিয়া। বলা হচ্ছে, ইউক্রেন যদি রাশিয়ার সঙ্গে গ্যাস ট্রানজিট চুক্তি নবায়ন না করে তবে ইউরোপীয় ভোক্তাদের চড়া মূল্যে গ্যাস কিনতে হবে। রাশিয়া-ইউক্রেনের এ চুক্তি চলতি বছরের শেষ দিন সমাপ্ত হবে।

এদিকে, চলমান যুদ্ধের মধ্যে গ্যাস ট্রানজিট চুক্তি নবায়ন করার কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছে ইউক্রেন। এমনটা হলে রুশ গ্যাস রপ্তানির অন্যতম ট্রানজিট হয়ে উঠতে পারে তুরস্ক। এমনটা জানিয়েছেন ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ। বুধবার (২৮ আগস্ট) নিয়মিত সম্মেলনে পেসকভ জানান, যদি ইউক্রেন চুক্তি বাড়াতে সম্মত না হয় তবে তুরস্কে একটি গ্যাস হাব তৈরির পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে এ সংক্রান্ত কার্যক্রম অগ্রগতির দিকে আছে বলেও জানান তিনি।

রাশিয়ার কুরস্ক অঞ্চলে ইউক্রেন বাহিনী ঢুকে পড়ায় হুমকির মুখে পড়েছে রুশ গ্যাস ট্রানজিট। সেখানে গ্যাস ট্রানজিট পয়েন্ট সুডজা অবস্থিত। ফলে হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হলে ইউরোপে গ্যাস রপ্তানি সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

পেসকভ জানান, ইউক্রেন যদি নেতিবাচক কোনো সিদ্ধান্ত নেয় তবে তা ইউরোপীয় ভোক্তাদের জন্য চরম খারাপ খবর ডেকে আনবে। কারণ অন্য বিক্রেতাদের কাছ থেকে জ্বালানি ক্রয়ের জন্য তাদের প্রচুর অর্থ খরচ করত হবে। এমনকি মার্কিন এলএনজি কিনতে চাইলেও তারা সস্তায় তা পাবে না।

২০২২ সালে ইউরোপের হারিয়ে যাওয়া ভোক্তাদের ফিরে পেতে তুরস্কে একটি গ্যাস হাব স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছিল রাশিয়া। দীর্ঘদিন ধরে আঙ্কারাও চাইছিল জ্বালানি খাতের অন্যতম বিনিময়কারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে। এ বিষয়ে এখনো রুশ ও তুর্কি কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা চলছে বলে জানা যায়। তারা বর্তমানে এ প্রকল্পের রোডম্যাপ নিয়ে কাজ করছেন।

Monday, September 26, 2011

নিশ্চিত মূল্যবৃদ্ধি, অনিশ্চিত জ্বালানি-নিরাপত্তা by মোশাহিদা সুলতানা

সরকার জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধির প্রধান কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেছে। এ বছর জ্বালানি আমদানির খরচ দিতে গিয়ে সরকার সংকটে পড়েছে মূলত ব্যালান্স অব পেমেন্ট ঘাটতির কারণে। ব্যাংকে তারল্যসংকট তৈরি হওয়ায় সরকার আমদানি ব্যয়ের টাকা পরিশোধ করতে দেশীয় ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ নিতে পারছে না, উপরন্তু টাকার মূল্য কমে যাওয়ায় বেশি দামে ডলারে বিল দিতে হচ্ছে। এ বছর জ্বালানি তেল আমদানি ব্যয় ২৫৫৫ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৪১০৯ দশমিক ১ মিলিয়ন ডলার হয়েছে। ধরে নিলাম, এই সংকটময় মূহূর্তে সরকারের অব্যবস্থাপনার কারণে এই ভার বহন করতে হবে জনগণকে। ধরে নিলাম, সরকার যা চায়, জনগণ তা-ই করল। বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনল, বেশি দামে জ্বালানি কিনল, করও দিল, বেশি দামে প্রয়োজনীয় দ্রব্য কিনল, বাড়িভাড়া ও পরিবহনভাড়া বাড়ার কারণে মধ্যবিত্তরা বিলাসিতা করল না; নিম্নবিত্তরা কম খেয়েও থাকল। কিন্তু এত কষ্টের বিনিময়ে জনগণ সরকারের কাছ থেকে কী পাচ্ছে এবং পাবে?
অনেকে ভাবছেন, কুইক রেন্টালের মাধ্যমে দেশের জ্বালানির চাহিদা পূরণ হবে, নিশ্চিত হবে জ্বালানি-নিরাপত্তা। কিন্তু জ্বালানি-নিরাপত্তা মানে শুধু চাহিদার সমান জোগান দেওয়া নয়, চাহিদার সমান জোগান থাকা এবং অধিকাংশ জনগণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা। সরকার যদি চাহিদার সমান জোগান দিতে গিয়ে কুইক রেন্টালকে সমাধান হিসেবে বেছে নেয় এবং কয়েক মাস পর পর বলে যে সরকার সংকটে আছে, আমদানি ব্যয় বহন করতে পারছে না বলে জনগণকে বেশি দামে কিনতে হবে, তাহলে এ রকম দিন আসতে পারে, যখন আমাদের দেশে চাহিদা অনুযায়ী জোগান থাকবে কিন্তু ক্রয়ক্ষমতা থাকবে না।
সরকার যখন ২২টি কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকল্প হাতে নেয়, তখন কথা ছিল ডিজেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো চার মাসের মধ্যে এবং ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো নয় মাসের মধ্যে চালু হবে। কিন্তু এ বছরের আগস্ট মাস পর্যন্ত চালু হয়েছে মোট ১২টি প্রকল্প, এর মধ্যে চারটিতে নানা রকম যান্ত্রিক সমস্যা দেখা দিয়েছে এবং বেশির ভাগ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্ধারিত পরিমাণে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে না। ২২টির মধ্যে মোট ১৮টি প্রকল্পের চুক্তি সম্পন্ন হয়, যেখানে ডিজেলচালিত কেন্দ্র থেকে গড়ে প্রতি ইউনিট ১৪ টাকা এবং ফার্নেস অয়েল চালিত কেন্দ্র থেকে প্রতি ইউনিট আট টাকা দর ঠিক হয়। সরকারি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের গড় উৎপাদন ব্যয় তিন-চার টাকা। সরকার গড়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ বিক্রি করে ৩ দশমিক ৬৬ টাকায়। কিন্তু জরুরি ভিত্তিতে জোগান দেওয়ার জন্য সরকার অনেক বেশি দামে বেসরকারি বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি করে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, জরুরি ভিত্তিতে কুইক রেন্টাল দেওয়ার কারণে আমাদের বিদ্যুৎসমস্যা খানিকটা মিটেছে এবং সরকারের এই বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনা ও বেশি দামে ভর্তুকি দেওয়ার সংগত কারণ আছে, কিন্তু একটু খতিয়ে দেখলে বোঝা যায় যে ভর্তুকি দেওয়া না-দেওয়ার প্রশ্নের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ভর্তুকি কাদের দেওয়া হচ্ছে, এই বিশাল পরিমাণ ভর্তুকির টাকা দিয়ে বেশি দামে বহুজাতিক কোম্পানির কাছ থেকে জ্বালানি না কিনে এই ভতুর্কি জ্বালানি-নিরাপত্তা অর্জনে ব্যয় করা কি যেত না?
আমরা যদি যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাকাই, তাহলেই দেখব, যুক্তরাষ্ট্র সরকার জনগণের কাছে কম দামে তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ করার জন্য বিভিন্নভাবে ২০১০ সালে ৩৭ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার শুধু ভর্তুকিই দেয়নি, বহু দিন ধরে সুপরিকল্পিতভাবে তেল উৎপাদক দেশগুলোর ওপর আধিপত্য নিশ্চিত করে রেখেছে। এর জন্য তারা কোটি কোটি ডলার ব্যয় করতে দ্বিধা করে না। বুঝলাম, আমাদের দেশ আর যুক্তরাষ্ট্র এক নয় এবং আধিপত্য কায়েম করে জ্বালানি-নিরাপত্তা রক্ষা আমাদের কাজও নয়। কিন্তু আমাদের নিজেদের জ্বালানি সম্পদ আছে। এই সম্পদ উত্তোলনে জাতীয় সক্ষমতা অর্জনের মধ্য দিয়ে আমরা বিশাল ভর্তুকি ও জনগণের অর্জিত অর্থ বিদেশে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর হাতে তুলে দেওয়া থেকে মুুক্ত হতে পারি। সরকারের ওপর চাপ পড়লে সরকার যেমন জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে সমস্যা থেকে বের হয়ে আসে, তেমনি আমাদের ইতিহাস বলে, জনগণের ওপর জ্বালানি ব্যয়ের বোঝা চাপালে জনগণ কষ্ট করে হলেও তার দায় বহন করে। কিন্তু স্বল্প মেয়াদে সংকট উত্তরণের সময়টা দিন দিন দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে। দ্রুত সংকট উত্তরণের জন্য দীর্ঘ মেয়াদে সক্ষমতা অর্জনের পদক্ষেপ যদি এভাবে পিছিয়ে পড়তে থাকে, তাহলে জনগণের ওপর এই বোঝা বাড়তে বাড়তে পাহাড়সমান হয়ে যাওয়ার পরও ভবিষ্যৎ সরকার একই যুক্তি দেখিয়ে দাম বাড়িয়ে চলবে। সরকারকে এই নিরাপত্তাহীনতার কথা ভেবে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে।
এ মুহূর্তে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে মুদ্রাস্ফীতি। আমাদের অর্থমন্ত্রী যদি জানেন, কী কৌশল অবলম্বন করলে অর্থনীতির সব সূত্রের বাইরে গিয়ে জ্বালানির দাম বাড়ার পর মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তাহলে সেই বিষয়ে জনগণকে জানাতে হবে। জনগণ এখনো এই অভিনব পদ্ধতি সম্পর্কে জানে না। অন্যদিকে গ্যাসক্ষেত্রগুলো আবারও বিদেশি কোম্পানির হাতে দিয়ে দেওয়ার জন্য এরই মধ্যে নতুন পিএসসি চুক্তি করার প্রস্তুতি চলছে। ভর্তুকির দায় জনগণের ওপর চাপিয়ে জনগণের অর্থ বিদেশি কোম্পানির কাছে দিয়ে দেওয়াটা খুব সহজ কাজ। দেশীয় সক্ষমতা অর্জনের প্রসঙ্গ উঠলেই কাজটি আর সহজ থাকে না। তাই সহজ পথ অবলম্বন করে, অদূরদর্শী পরিকল্পনা করে এই ঘন ঘন তেলের মূল্যবৃদ্ধি তো আসলে আশ্চর্য হওয়ার ঘটনা নয়। সরকার যে সংকটের কথা বলছে, সাধারণ নিয়মে তো এ রকমই হওয়ার কথা ছিল। বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করার মধ্য দিয়েই দেশ ১৯৯৩ সাল থেকে শুরু করে ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পথ বন্ধ করে দিচ্ছে এবং যত দিন যাচ্ছে, সে তার করণীয় কাজগুলো আরও কঠিন করে ফেলছে। সরকারের এই সংকট মুহূর্ত এবং জনগণের এই ভোগান্তি—দুই পক্ষকেই যদি প্রশ্নবিদ্ধ না করে, তাহলে শুধু ভর্তুকির পক্ষের বা বিপক্ষের যুক্তি দেখানো হবে অর্থহীন কাজ। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি কি জ্বালানি-নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে?
মোশাহিদা সুলতানা: প্রভাষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Wednesday, June 8, 2011

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে রোডম্যাপ প্রয়োজন by এম তামিম

বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ক্ষেত্রে কোনো প্রকল্পই স্বল্প মেয়াদে করা সম্ভব নয়। এখানে সবই দীর্ঘমেয়াদি। তাই অন্য যেকোনো খাতের চেয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির বাজেট বেশ ব্যতিক্রমধর্মী। অবকাঠামোগত অন্য অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, স্বল্প সময়েই একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব। যেমন ধরা যাক, একটি সেতু তৈরি হবে। এখন সেতু তৈরির জন্য আমাদের কী কী লাগবে? পাথর, সিমেন্ট, রড ইত্যাদি। অর্থাৎ, সবকিছুই চাইলে আমরা পেয়ে যাব, হাতের নাগালে। কিন্তু বিদ্যুৎ বা জ্বালানির উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিষয়টি এমন নয়। ধরুন, একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হবে। এখন এ কাজের জন্য যা যা লাগবে, চাইলেই তার সবকিছু হাতের নাগালে পাওয়া যাবে না। আর বিদুৎকেন্দ্র নির্মাণ বা উৎপাদন যেহেতু অনেক ব্যয়বহুল একটি বিষয়, তাই এ ক্ষেত্রে প্রকল্পের জন্য অর্থের সংস্থান করাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়ত, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য লাগবে প্রয়োজনীয় প্রাথমিক জ্বালানি, সেটারও নিশ্চয়তা থাকতে হবে বা তার ব্যবস্থা করতে হবে। পুরো প্রক্রিয়াটি যেহেতু দীর্ঘমেয়াদি, তাই বিদ্যুৎ ও জ্বালানির বাজেটের ক্ষেত্রেও এই বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। কোনো রকম পরিকল্পনাহীন বাজেট দিয়ে আর যা-ই হোক, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের কার্যকর উন্নয়ন সম্ভব নয়। আগের বাজেটগুলোর মতো এবারও এর ব্যতিক্রম হবে বলে মনে হচ্ছে না।
বাজেটের আগে অবশ্যই পরিকল্পনা জরুরি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদি হলেও কমপক্ষে পাঁচ বছরের কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন। আর দীর্ঘমেয়াদি হলে সর্বোচ্চ ১০ বছর। আপনি কী ধরনের বিদ্যুৎ উৎপাদন করবেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের অর্থ আসবে কোত্থেকে কিংবা প্রাথমিক জ্বালানিটাই বা কী হবে—এ বিষয়গুলো অবশ্যই আগে ভেবে রাখতে হবে।
এবারের বাজেটে আগামী চার বছরের বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। এবং তারই ভিত্তিতে ঘোষণা করা হচ্ছে এবারের বিদ্যুৎ-জ্বালানির বাজেট। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ২০১৫ সালের মধ্যে তেল ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে দুই হাজার ২২০ মেগাওয়াট, কয়লাভিত্তিক প্রায় দুই হাজার ৬০০ মেগাওয়াট, চার হাজার মেগাওয়াট গ্যাসভিত্তিক এবং সৌরশক্তিভিত্তিক এক হাজার মেগাওয়াট। পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে, কিন্তু বড় প্রশ্ন হলো—এই উৎপাদনের জন্য জ্বালানি আসবে কোত্থেকে? এখানেই বড় দুর্বলতা। ধরা যাক গ্যাসের কথা। যদি তা আমদানি করা হয়, তবে বিশাল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন। এ ব্যাপারে বিদ্যুৎ বিভাগ যে পরিকল্পনা দিয়েছে, তার কোনো রকম বাস্তবতা খুঁজে পাওয়া কঠিন।
যদি ধরে নিই, সরকারের পক্ষে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব, সে ক্ষেত্রে যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দেবে তা হলো, অর্থের জোগান আসবে কোথা থেকে। এই বিষয়টি সবার আগে ঠিক করা জরুরি। হিসাব করলে দেখা যায়, যে পরিমাণ গ্যাস আমদানি করতে হবে, তার দাম পড়বে গড়ে ১৫ বিলিয়ন ডলার। আগামী চার বছরের মধ্যে এর সংস্থান আমরা কী করে করব? তাই পরিকল্পনা করার আগে সবকিছু সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকা চাই। পরিকল্পনা ও সামর্থ্যের সমন্বয় করতে না পারলে সবকিছুই বিফল। তাই প্রথমেই বলেছি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিক্ষেত্রের বাজেট একদম ব্যতিক্রমী। এখানে সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া সুফল পাওয়া অসম্ভব।
বাজেটের আগে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের একটি নির্দিষ্ট রোডম্যাপ থাকা প্রয়োজন। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ভালো অনুশীলনও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনই তো শেষ কথা নয়, এটার সুষ্ঠু বিতরণও অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হিসাব করলে দেখা যায়, আগামী চার বছরের জন্য যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে, তা বিতরণের জন্যও আরও ১০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। মানে মোটমাট আমাদের দরকার ২৫ বিলিয়ন ডলার!
এ ছাড়া বেসরকারি খাতকে যদি আমরা যুক্ত করতে চাই, তাহলে কী প্রয়োজন? প্রয়োজন পরিকল্পনার সঠিক বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা। কিন্তু অতীতে যেমনটা দেখা গেছে, এবারও তেমন অনিশ্চিত বাস্তবতা সামনে। সুতরাং এ ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা কী করবেন? নিশ্চয়ই উৎসাহ দেখাবেন না! তাই বিনিয়োগকারীদের ব্যাপারেও ধারণা রাখা প্রয়োজন।
এর আগে দেখা গেছে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ক্ষেত্রে বরাদ্দ করা অর্থ ফেরত গেছে, অন্যান্য ক্ষেত্রেও অবশ্য এমনটা ঘটেছে। এটাও গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। ভর্তুকির বিষয়ে বললে, ভর্তুকি বেড়ে গেলে উৎপাদন-খরচ বাড়বেই। বাজেটে ভর্তুকির বড় প্রভাব আছে। এখন বাজারে ফার্নেস তেলের দাম বেড়েছে, তাই ফার্নেসভিত্তিক বিদ্যুতের দামও বেড়ে যাবে নিঃসন্দেহে।
এ বছর বার্ষিক ভর্তুকির ব্যাপারটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এর থেকে বের হওয়ার উপায় হলো সর্বজনীন ভর্তুকি বন্ধ করে দেওয়া। যেসব ক্ষেত্র বা যারা ভর্তুকি পাওয়ার যোগ্য, তাদেরই ভর্তুকি দিলে সমস্যা কমে যায়। সরাসরি ভর্তুকিটাও গ্রহণযোগ্য। এটা ধীরে ধীরে করতে হবে। উৎপাদনমূল্যের চেয়ে ক্রয়মূল্য বেশি হলে সমস্যা বাড়বে, এটা সবাই জানেন। ভর্তুকি কী পরিমাণ এবং কত দিন দেওয়া হবে, তা-ও ঠিক করতে হবে।
সব সময় দেখা যায়, বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনেই বেশি বাজেট বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। কিন্তু সমস্যা তো এখানে নয়, প্রাথমিক জ্বালানির স্বল্পতাই সমস্যার কারণ। এখান থেকে সমাধান খুঁজতে চাইলে আমাদের গ্যাস অনুসন্ধান করতে হবে। কয়লা উত্তোলনের দিকে নজর দিতে হবে। মোট কথা, এখন যেটা চলছে, সেটাকে ঠ্যাক দিয়ে কাজ চালানো বলা যায়। এক কথায় উচ্চমূল্যে আমরা সময় কিনছি! স্থায়ী সমস্যা সমাধানের জন্য গ্যাস ও কয়লা অনুসন্ধান জরুরি। আর উচ্চমূল্যে যদি প্রাথমিক জ্বালানি আমদানি করতেই হয়, তার আগে আমাদের অর্থনীতির ভিত আরও শক্ত করতে হবে।
ড. এম তামিম: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ); অধ্যাপক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)।

Thursday, January 14, 2010

কয়লা বাদ দিলে কোন জ্বালানি -জ্বালানি by নাসরিন সিরাজ

৫/৮/২০১২-এর প্রথম আলোয় ‘কয়লা আমাদের ভবিষ্যৎ নয়, অতীত’ শিরোনামে আমার একটি অভিমত প্রকাশিত হয়েছিল। লেখাটিতে দেখিয়েছিলাম, কয়লা ক্ষতিকারক জ্বালানি বলে বিবেচিত হওয়ায় এবং কয়লাবিরোধী আন্দোলনকারীদের চাপের মুখে ইউরোপ ও আমেরিকায় সরকার ও ব্যাংকগুলো এই খাতে বিনিয়োগ অলাভজনক মনে করছে; সেখানে একের পর এক কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হচ্ছে। লেখাটিতে কয়লার মতো বাতিল জ্বালানি নয় বরং নতুন প্রজন্মের কথা চিন্তা করে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে বাংলাদেশের সরকার তথা জনগণ ও বিনিয়োগকারীর মন দেওয়া উচিত বলে উল্লেখ করেছিলাম। বিষয়টির পক্ষে জোর দিতে আবার লিখতে বসা।
এবার আরেকটি আন্তর্জাতিক অধিবেশনে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা লিখব। ‘সাউথইস্ট এশিয়ান রিনিউয়েবল এনার্জি পিপল্স অ্যাসেমব্লি’ শিরোনামে অধিবেশনটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২৯ অক্টোবর-২ নভেম্বর, ২০১২ সালে মালয়েশিয়ায়। এতে বিশ্বের ১১টি দেশের ৮০টি সংগঠনের ১৩০ জন প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন। এই অধিবেশনে যোগ দিয়ে যে উপলব্ধি হয়েছে তা হচ্ছে, শুধু নতুন প্রযুক্তি কেনার ক্ষমতা তৈরি কাজের কথা নয়। দেশের জনগণকে যদি জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলো থেকে অন্ধকারে রাখা হয়, যদি নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবক হিসেবে জনগণকে সক্ষম করে তোলা না হয়, তাহলে আমাদের আসল সংকট নিরসন হবে না। বাংলাদেশ বাতিল প্রযুক্তির ক্রেতাই থেকে যাবে। লাভ আবারও যাবে মুনাফালোভীদের কাছে। সাধারণের কাছে নয়।
প্রথমে বলছি মালয়েশিয়ার কালিমাস্তান দ্বীপ অঞ্চলের খেটে খাওয়া মানুষের কথা। এই দ্বীপবাসীরা মাত্র দুই বছর ধরে তাদের গ্রামে বিদ্যুতের সুবিধা পাচ্ছে। এদের কথা শুনলে বুঝতে পারবেন ‘উন্নত বিশ্ব’ গরিব মানুষকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে গবেষণাগারের গিনিপিগ বানিয়েছে। জলস্রোত এই দ্বীপবাসীদের নতুন বিদ্যুতের উৎস। বিশাল আকারের বাঁধ তৈরি করে নদীর স্রোত আটকে বিদ্যুৎ তৈরির বিশাল প্রকল্প নয়, তারা ব্যবহার করে এনজিওগুলোর বিতরণ করা ছোট প্ল্যান্ট। গ্রামের আশপাশের ঝরনায় বসানোর উপযোগী এগুলো। ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানির নেতিবাচক দিক ও প্রযুক্তি আদান-প্রদান’ বিষয়ে আলোচনায় যা উঠে এসেছে তা হচ্ছে, কাঁচা পণ্যের ব্যবসায়ীদের ফ্রিজ ব্যবহার করে পণ্য মজুত করার সুবিধা হয়েছে; ছাত্ররা রাত জেগে লেখাপড়া করার সুযোগ পাচ্ছে; বাচ্চাদের দেখাশোনা করার জন্য মাকে আর মাঠে মাঠে দৌড়াতে হচ্ছে না। কারণ, বাচ্চারা খেলাধুলা ছেড়ে টেলিভিশনের সামনেই অবসর সময়ে বসে থাকে। অসুবিধা খালি একটাই। তাদের নিরবচ্ছিন্ন ও ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানোর জন্য আরও উন্নত প্রযুক্তি চাই। বিদ্যুৎ সরবরাহ তো সবাই-ই চায়। কিন্তু ওই এলাকার ৮০ শতাংশ লোকই শিক্ষা-দীক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত।
যাঁদের সঙ্গে আমার কথা বলার সুযোগ হয়েছে, তাঁরা কেউ দ্বাদশ শ্রেণীর বেশি পড়েননি। এলাকাটি এতই গরিব যে কর্মসংস্থানের অভাব বলে ওই এলাকার পুরুষেরা গ্রামে প্রায় থাকেনই না, অর্থনৈতিকভাবে উন্নত দেশে দিনমজুর হিসেবে অভিবাসন করেন। এখানে নতুন প্রযুক্তি এনে দিয়েছে এনজিও। সুবিধাভোগীদের প্রকৌশলী বা বিজ্ঞানী বানানোর প্রকল্প নেই এনজিওগুলোর। তারা কমিউনিটিকে যন্ত্র ইনস্টলমেন্ট ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দরকারি কিছু প্রশিক্ষণ দিয়েছে মাত্র। ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়ান ছোট ওয়াটার প্ল্যান্টের টার্বাইন বানানোর কোম্পানিগুলোর সঙ্গে এনজিওগুলোর যোগাযোগ আছে। অ্যাসেমব্লিতে একজনকে উপস্থিতও দেখলাম। তিনি জেনে নিচ্ছিলেন যন্ত্র ব্যবহারে কমিউনিটির সুবিধা-অসুবিধাগুলো। যেগুলোর ভিত্তিতে যন্ত্রকে আরও উন্নত করা হবে।
অনেকে বলতে পারেন উন্নত বিশ্বের ফেলে দেওয়া প্রযুক্তি দিয়ে বা গবেষণার গিনিপিগ হিসেবে টুকটাক সাহায্য পেয়েও হয়তো অল্প অল্প করে উন্নতি করা সম্ভব। এই অধিবেশনে নারীদের অভিজ্ঞতাগুলো শোনার পর এই দাবির অসারতা আরও পরিষ্কার হয়ে যায়। আলোচনা থেকেই জানতে পারি, নতুন প্রযুক্তি নারীদের লিঙ্গ নির্ধারিত বৈষম্যমূলক সামাজিক ভূমিকা ও অবস্থান থেকে সরাতে পারেনি। কালিমাস্তান দ্বীপাঞ্চলের ওই জলবিদ্যুৎ প্ল্যান্টগুলো নারীরা চালান না। কমিউনিটি সম্মিলিতভাবে যেখানে প্ল্যান্টের মালিক, সেখানে কমিটিতে নারীরা অংশগ্রহণ করেন না। এমনকি আন্তর্জাতিক অধিবেশনে অংশগ্রহণের বিষয়টি ‘নারী দূরে ভ্রমণ করতে পারে না’ কিংবা ‘সংসার ও চাষের মাঠে নারীর কর্মব্যস্ততা রয়েছে’ এই অজুহাতে খারিজ হয়ে যায়। নতুন প্রযুক্তি চালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে এমনকি উদ্ভাবন থেকে নারীরা রয়েছে অনেক অনেক দূরে। কালিমাস্তানে কর্মরত একজন এনজিওকর্মী বায়োগ্যাস ব্যবহার করে উনুন জ্বালান, এ রকম কয়েকজন নারীর অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন আমাকে। তিনি বলেন, এই প্রযুক্তি সুবিধাভোগী নারীরা বরং এখন আগের তুলনায় বেশি অবরুদ্ধ। কারণ, সাধারণ উনুনের জ্বালানি জোগাড় করতে নারীরা আগে ঘরের বাইরে যেতে পারতেন, সেটা এখন আর তাঁরা পারছেন না। আবার, উন্নত চুলা ব্যবহারের ফলে নারীদের অবসর সময় বেড়েছে। কিন্তু তখন প্রশ্ন উঠেছে, অবসরে সোপ অপেরা দেখলে নারীর এতে কী লাভ হলো? ফিলিপাইনের যাঁর সঙ্গে কথা হলো, তিনি কাজ করেন নবায়নযোগ্য জ্বালানিচালিত গাড়ি নিয়ে। তাঁর সংগঠন নারীদের গাড়ি চালনা ও মেরামতের কাজ শেখায়, ‘সবুজ-পরিচ্ছন্ন’ জ্বালানির গাড়ি বিক্রি করে। তিনি বলেন, যেভাবে প্রাইভেট গাড়ির চাহিদা বাড়ছে, তাতে বিকল্প জ্বালানির পাশাপাশি পাবলিক ট্রান্সপোর্টের কথা না ভাবলে আমাদের আর চলবে না। অনেক লোক এক গাড়িতে চড়লেই একমাত্র বিদ্যুতের চাহিদা কমবে। ফ্লাইওভার বানিয়ে প্রাইভেট গাড়ির জন্য বিকল্প রাস্তা তৈরি রাজকোষের অপচয় বলে তিনি মনে করেন।
সম্প্রতি সুন্দরবনের খুব কাছে রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করার পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। আমরা জানি, বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীরা ও সমাজকর্মীরা কয়লাকে বাতিল করেছেন। কয়লা না, বিকল্প জ্বালানি আমাদের বের করতে হবে। তাই নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে আমাদের চেয়ে এগিয়ে আছে প্রতিবেশী যে মানুষগুলো, তাদের অভিজ্ঞতা আমাদের পর্যবেক্ষণ করতে হবে। ‘গরিব’ বলে ‘উন্নত বিশ্বের’ পরীক্ষা-নিরীক্ষার বলি হওয়ার সুযোগ নেই। কোন জ্বালানি দিয়ে আমাদের ভবিষ্যৎ চলবে, সেটা আমাদেরই ঠিক করতে হবে।
নাসরিন সিরাজ: নৃবিজ্ঞানী, চলচ্চিত্রনির্মাতা।

Tuesday, December 22, 2009

ভারত বা বাংলাদেশ নয়, মিয়ানমারের গ্যাস পাবে চীন by বদরূল ইমাম

সম্প্রতি বাংলাদেশ মিয়ানমারের সাগরবক্ষে অবস্থিত গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস পরিবহনের জন্য মিয়ানমার-বাংলাদেশ-ভারত ত্রিদেশীয় পাইপলাইন প্রকল্প প্রস্তাবটি পুনর্জীবিত করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ মনে করছে, মিয়ানমার থেকে ত্রিদেশীয় এই পাইপলাইন নির্মাণ প্রকল্প দুভাবে বাংলাদেশের জন্য লাভজনক হতে পারে। প্রথমত, এই পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সঞ্চালন চার্জ বাবদ বাংলাদেশ প্রতিবছর অর্থ অর্জনের সুবিধা লাভ করবে, যা কিনা ডলারে বা সমমানের গ্যাস পাওয়ার মাধ্যমে হতে পারে। দ্বিতীয়ত, ওই পাইপলাইন কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানি করতে পারবে। কিন্তু বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এর আগে প্রথমত প্রকল্পটির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে দীর্ঘসূত্রতা এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ-ভারতের দ্বিপক্ষীয় কিছু বিষয়ে মতৈক্য না হওয়ার কারণে তা আর বাস্তবায়নের পথে এগোয়নি। ইতিমধ্যে মিয়ানমার ভারতের পরিবর্তে চীনের কাছে গ্যাস বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেয়। এ লক্ষ্যে মিয়ানমারের আরাকান প্রদেশ থেকে উত্তর-পূর্ব দিকে চীনের ইউনান প্রদেশ পর্যন্ত পাইপলাইন নির্মাণের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। এ বিষয়ে এক পশ্চিমা পর্যবেক্ষক মন্তব্য করেন, বাংলাদেশ যে ট্রেনটি ধরতে চাইছে, তা ইতিমধ্যেই স্টেশন ছেড়ে চলে গেছে।
বাংলাদেশে কোনো কোনো মহল মনে করে, ত্রিদেশীয় পাইপলাইন বাংলাদেশের জন্য তেমন সুবিধা বয়ে আনবে না; বরং ভারতের সঙ্গে গ্যাস পাইপলাইন যোগসূত্র স্থাপন করলে তা ভবিষ্যতে সময় ও ক্ষেত্রবিশেষে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে বিরোধমূলক সংকট সৃষ্টির আশঙ্কাকে বাড়াতে পারে। আবার অন্য মহল মনে করে, আন্তদেশীয় গ্যাস পাইপলাইন বিশ্বের অন্যান্য দেশের মধ্যে যে রকম পারস্পরিক অর্থনৈতিক সুবিধা বয়ে এনেছে, মিয়ানমার-বাংলাদেশ-ভারত ত্রিদেশীয় পাইপলাইনও দেশ তিনটির মধ্যে সেভাবে লাভ বয়ে নিয়ে আসবে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো স্বল্প জ্বালানি সম্পদের দেশে বর্তমানের গ্যাসের ঘাটতি ও আসন্ন ভবিষ্যত্ জ্বালানিসংকটের প্রেক্ষাপটে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর জ্বালানি মজুদ ব্যবহারের সুবিধা ভোগ করতে ত্রিদেশীয় গ্যাস পাইপলাইন মোক্ষম ভূমিকা পালন করতে পারে। তাই এ প্রশ্ন এসে পড়ে যে বাংলাদেশ কি একটি সুযোগ হাতছাড়া করছে?
মিয়ানমারের আরাকান প্রদেশসংলগ্ন বঙ্গোপসাগরবক্ষে আবিষ্কৃত হয় বিরাট আকারের গ্যাসক্ষেত্র সুউ, সুউফু এবং মিয়া। কোরিয়ার তেল কোম্পানি দেওউ ইন্টারন্যাশনাল আবিষ্কৃত এই গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে ভারতীয় কোম্পানিরও অংশীদারি রয়েছে (দেওউ ৫১%, ভারতের ওএনজিসি ১৮.৫%, ভারতের গেইল ৮.৫%)। আবিষ্কারের পর থেকেই ভারত এই গ্যাস আমদানি করার ইচ্ছা প্রকাশ করে। বাংলাদেশের একটি প্রাইভেট কোম্পানি মোহনা হোল্ডিং লিমিটেড মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশ হয়ে ভারত পর্যন্ত একটি পাইপলাইন স্থাপনের প্রস্তাব নিয়ে তিন দেশের সরকারের কাছে পেশ করে। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন এ প্রস্তাবে কোনো আগ্রহ প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকে। পরবর্তী সময়ে তিন দেশের সরকারই এ প্রস্তাব গ্রহণে নীতিগতভাবে সম্মত হয়। বাংলাদেশের বর্তমান ও ভবিষ্যত্ গ্যাসসংকটের প্রেক্ষাপট এবং মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানির সম্ভাবনা বাংলাদেশকে ওই পাইপলাইন প্রকল্পে আগ্রহী করে।
পাইপলাইন প্রকল্প নিয়ে বাংলাদেশ-ভারত-মিয়ানমার মন্ত্রী পর্যায়ে সমঝোতামূলক সভার পর সিদ্ধান্ত হয় যে, একটি ত্রিদেশীয় কারিগরি কমিটি বিষয়টির বিস্তারিত রূপরেখা প্রণয়ন করবে। ২০০৫ সালে মিয়ানমারের রাজধানী ইয়াঙ্গুনে কারিগরি কমিটি সভায় মিলিত হয়। বাংলাদেশ প্রস্তাব করে যে ১. পাইপলাইনটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সীমান্ত দিয়ে নয়, টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করে তা চট্টগ্রাম হয়ে ভারতের দিকে এগোবে। চট্টগ্রাম অঞ্চলে ভবিষ্যতে গ্যাস সরবরাহের সুযোগ বাড়ানো ছিল এ প্রস্তাবের লক্ষ্য, ২. চুক্তি সাপেক্ষে বাংলাদেশ পাইপলাইনে নির্ধারিত পয়েন্ট থেকে গ্যাস নেওয়ার অধিকার রাখবে, ৩. ভারতের তত্ত্বাবধানে নয়, বরং পাইপলাইনটি নির্মাণ করবে একটি আন্তর্জাতিক কনসোর্টিয়াম এবং ৪. বাংলাদেশের ভেতর পাইপলাইন অপারেটর হিসেবে বাংলাদেশি সংস্থা নিয়োজিত থাকবে, যার জন্য বাংলাদেশকে চার্জ দিতে হবে। এসব প্রস্তাবে ভারত ও মিয়ানমার উভয়েই আরও আলোচনা সাপেক্ষে সম্মতিসূচক প্রতিক্রয়া ব্যক্ত করে।
বাংলাদেশ ভারতের প্রতি আরও দুটি শর্ত দেয় যে, নেপাল ও ভুটান থেকে বিদ্যুত্ আমদানির জন্য ভারত করিডর-সুবিধা দেবে এবং উপরিউক্ত দুটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশকে বাণিজ্য-পণ্য বিনিময়ের জন্য ভারত করিডর দিয়ে যাতায়াত করার অধিকার দেবে। ভারত এই শেষোক্ত শর্ত দুটি মানতে রাজি না হলে বাংলাদেশের সঙ্গে সমঝোতা সভা ব্যর্থ হয়। এভাবে ২০০৫ সালে বাংলাদেশ প্রস্তাবিত ত্রিদেশীয় পাইপলাইন প্রকল্প কার্যক্রম থেকে সরে আসে ।
এদিকে বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে ভারত নতুন পাইপলাইন পথ খুঁজতে সচেষ্ট হয়। নতুন পথ হিসেবে মিয়ানমার থেকে মিজোরাম, ত্রিপুরা, আসাম হয়ে পশ্চিমে শিলিগুড়ি; অতঃপর দক্ষিণে ঘুরে কলকাতার প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু যেখানে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে পাইপলাইন গেলে তা ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ হবে ও চার হাজার ৫০০ কোটি টাকায় নির্মাণ করা যাবে, অন্য পথটি বেছে নিলে পাইপলাইনের দৈর্ঘ্য আরও ৫০০ কিলোমিটার বেশি হবে ও তাতে খরচ হবে আরও দুই হাজার ৫০০ কোটি টাকা। তা ছাড়া ত্রিপুরা-আসাম এলাকার বিদ্রোহীদের কাছ থেকে পাইপলাইনটির নিরাপত্তা বিশেষ উদ্বেগের কারণ হিসেবে দেখা দেয়। এসব কারণে ভারত পাইপলাইন প্রকল্প বাস্তবায়নে আর অগ্রসর হতে পারেনি।
ইতিমধ্যে মিয়ানমার তার গ্যাস বিক্রি-বাণিজ্যে স্থগিত অবস্থার অবসান ঘটিয়ে চীনের কাছে গ্যাস বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়। ২০০৮ সালের আগস্ট মাসে দেওউ কোম্পানি মিয়ানমার সরকারের সম্মতিক্রমে চীনের সরকারি তেল কোম্পানি চায়না পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের কাছে গ্যাস বিক্রি করার চুক্তি করে। দেওউ ও তার কনসোর্টিয়াম এই গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়ন প্রকল্পে ৫ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার খরচ করবে। চুক্তি অনুযায়ী এই গ্যাসক্ষেত্র থেকে চীনকে ৩০ বছর গ্যাস সরবরাহ করা হবে। ২০১৩ সালে গ্যাস সরবরাহ শুরু হবে ও প্রতিদিন ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাইপলাইনে সরবরাহ করা হবে।
বাংলাদেশের দক্ষিণ প্রান্ত থেকে কিছু দূরত্বে অবস্থিত মিয়ানমারের সাগরবক্ষে নব-আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্রগুলো প্রমাণ করেছে, এশিয়ার উদীয়মান দেশগুলোর বিরাট গ্যাস-চাহিদা মেটাতে তাদের নিজস্ব গ্যাস ছাড়াও পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে গ্যাস জোগাড় করতে কতটা তত্পর। এ ক্ষেত্র থেকে গ্যাস আমদানি করার প্রতিযোগিতায় ভারত, চীন, থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশ পরস্পর প্রতিযোগী। বর্তমান প্রতিযোগিতায় ভারত যেমন জয়ী হতে পারেনি, তেমনি বাংলাদেশের গ্যাস আমদানির প্রস্তাবও মিয়ানমার সরকার নাকচ করেছে। তবে মিয়ানমার জানিয়েছে, ভারত ও বাংলাদেশ ভবিষ্যতে আবিষ্কৃত নতুন ক্ষেত্র থেকে গ্যাস আমদানি করতে পারবে। ভারতের বর্তমান গ্যাসের চাহিদা বিশাল, আর ভবিষ্যতের চাহিদা ততোধিক এবং তা মেটাতে গ্যাস আমদানি আবশ্যক হবে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই গ্যাস-ঘাটতির দেশ হয়ে পড়েছে আর ভবিষ্যতের গ্যাস-চাহিদার তুলনায় নিজস্ব সম্ভাব্য সরবরাহ অপ্রতুল। সে কারণে বাংলাদেশকে এখন থেকে ভবিষ্যত্ চাহিদা মেটানোর পন্থা ও পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে।
বাংলাদেশকে বিশেষ করে ভবিষ্যত্ জালানিসংকট মেটানোর জন্য গ্যাস আমদানির প্রয়োজনীয় ছক বা পথ মানচিত্র আকারে নির্ধারণ করতে হবে। যেহেতু ভারত কখনোই গ্যাস রপ্তানি করবে না, বাংলাদেশের গ্যাস আমদানির একমাত্র উত্স হবে মিয়ানমারের আরাকান উপকূলে সমুদ্রবক্ষে আগামী দিনে আবিষ্কৃত নতুন গ্যাস, যা বাংলাদেশ থেকে সুবিধাজনক দূরত্বে অবস্থিত হবে এবং বাংলাদেশে রপ্তানি করতে মিয়ানমার রাজি হবে বলে জানিয়েছে। বাংলাদেশ হয় ভারত-বাংলাদেশ-মিয়ানমার ত্রিদেশীয় পাইপলাইন দিয়ে অথবা মিয়ানমার-বাংলাদেশ দ্বিদেশীয় পাইপলাইন কাজে লাগিয়ে গ্যাস আমদানির পরিকল্পনা করতে পারে।
ত্রিদেশীয় পাইপলাইনের সুবিধা হবে যে, তা আন্তর্জাতিক কনসোর্টিয়াম কর্তৃক নির্মাণ করতে বাংলাদেশকে অর্থ জোগান দিতে হবে না; বরং তা রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকি বাবদ বাংলাদেশ অর্থ অর্জন করতে পারে এবং পাইপলাইন দিয়ে ভারতে গ্যাস সঞ্চালন বাবদ প্রতিবছর নির্দিষ্ট হারে অর্থ পাবে, যা নগদের পরিবর্তে গ্যাস হিসেবে নিতে পারে। একটি ত্রিদেশীয় পাইপলাইন স্থাপনে বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য ও চুক্তির প্রাথমিক শর্ত হওয়া উচিত মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে গ্যাস আমদানি। অন্য বিকল্প পন্থা হলো, বাংলাদেশ নিজস্ব উদ্যোগে ও অর্থায়নে মিয়ানমার-বাংলাদেশ দ্বিদেশীয় পাইপলাইন নির্মাণ করে গ্যাস আমদানি করা, যে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিনামূল্যে কোনো গ্যাস পাবে না; বরং সব গ্যাসই বাংলাদেশকে ক্রয় করতে হবে। ত্রিদেশীয় বা দ্বিদেশীয় উভয় ক্ষেত্রেই গ্যাস পাইপলাইন মিয়ানমার থেকে টেকনাফ পথে বাংলাদেশে ঢুকে কক্সবাজার-চট্টগ্রাম হয়ে এগিয়ে গেলে বাংলাদেশের বেশি লাভ হবে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যত্ জ্বালানিসংকটের রূপ কতটা ব্যাপক হতে পারে তা অনেকে যথার্থ অনুধাবন করেন না। কিন্তু দেশের পরিকল্পিত অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারা বাস্তবায়ন করতে হলে তা যে পাহাড়সম, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানির চাহিদা মেটাতে স্বল্প আয়তনের ও বিশাল জনগোষ্ঠীর এই দেশকে জ্বালানি সম্পদের ভবিষ্যত্ রূপরেখা তৈরি করতে অভ্যন্তরীণ সম্পদের অতিরিক্ত বাইরের জ্বালানি সম্পদ কাজে লাগানোর প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করা আবশ্যক।
বদরূল ইমাম: অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, রেজাইনা বিশ্ববিদ্যালয়, কানাডা।

Thursday, October 1, 2009

পিএসসি-২০০৮: সহজ পাঠ by মোহাম্মদ গোলাম রাব্বানী

গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৮ সালে বাংলাদেশের সমুদ্র অঞ্চলে প্রাকৃতিক জ্বালানি (বিজ্ঞানের অভিধানে হাইড্রোকার্বন) অনুসন্ধান এবং আবিষ্কৃত হলে উত্তোলনসংক্রান্ত একটি চুক্তিপত্র তৈরি করা হয়। এই চুক্তিপত্রেই তার নাম দেওয়া হয় ‘প্রোডাকশন শেয়ারিং কনট্রাক্ট’, যার সংক্ষিপ্ত নাম ‘পিএসসি-২০০৮’; যেটা এই লেখার শিরোনামের প্রথমাংশ এবং চুক্তিটির সহজ পাঠ এই লেখাটির বিষয়বস্তু। মূল চুক্তিপত্রটি এ-ফোর সাইজের ৭৩ পৃষ্ঠা এবং তাতে ৩৫টি অনুচ্ছেদ আছে এবং প্রতিটি অনুচ্ছেদে অনেক ধারা ও সেগুলোর অনেকটিরই উপধারা আছে, এই লেখায় চুক্তিপত্রটির আদ্যোপান্ত আলোচনা করা যাবে না। সে জন্য লিখতে হবে শতাধিক পৃষ্ঠার পুস্তক। লেখাটি অতি সংক্ষিপ্ত সহজ পাঠ এবং তাতেই চুক্তিপত্রটির অন্যায্য ও জনস্বার্থবিরোধী চরিত্র দিবালোকের মতো স্পষ্ট হবে এবং প্রিয় পাঠক-পাঠিকা, এতে আপনার ক্ষোভ আর ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ যে ঘটবে, সেটি আমি নিশ্চিত।
জ্বালানির সংজ্ঞা
চুক্তিপত্রটিতে লিখিত জ্বালানির সংজ্ঞা একই ধরনের হলেও সম্পূর্ণ এক নয়, যা হওয়া সঠিক হতো এবং সেখানেই প্যাঁচটি। ‘অভীষ্ট লক্ষ্য’ শিরোনামের ২ অনুচ্ছেদের ১ ধারায় বলা আছে, এই চুক্তিপত্রের উদ্দেশ্য ‘পেট্রোলিয়াম’ অনুসন্ধান করা। ‘সংজ্ঞাসমূহ’ শিরোনামের ১ অনুচ্ছেদের ৬৪ ধারায় বলা আছে, ‘পেট্রোলিয়াম’ অর্থ ‘হাইড্রোকার্বন’, সেটা গ্যাসীয় কিংবা তরল কিংবা নিরেট অবস্থায় থাকতে পারে। একই অনুচ্ছেদের ৪৯ ধারায় বলা আছে, ‘তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস’ অর্থ মাইনাস ১৬১ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে তরলীকৃত প্রধানত মিথেন গ্যাস। এখানে আমাদের জানা জরুরি, মিথেন গ্যাস একজাতীয় হাইড্রোকার্বন। গ্রামের বদ্ধ জলাশয়ের বাতাসে রাতে আচমকা যে আগুন জ্বলে ওঠে, যাকে আলেয়া বলি, সেটাই বাতাসের স্পর্শে জ্বলে ওঠা মিথেন গ্যাসের বুদ্বুদ। ‘প্রাকৃতিক গ্যাস’ শিরোনামের ১৫ অনুচ্ছেদের ৫ ধারার (গ) উপধারার অর্থ পেট্রোবাংলা অনুসন্ধানে পাওয়া প্রাকৃতিক গ্যাসের লভ্যাংশ পাবে। তাহলে কি সন্দেহ হয় না যে তরল হাইড্রোকার্বন, যার সহজ নাম পেট্রোলিয়াম, চুক্তির অন্তর্ভুক্ত কূপে পাওয়া গেলে বাংলাদেশ সেটা পাবে না? এই সন্দেহ আরও বেড়ে যায়, যদি ১ অনুচ্ছেদের ৫৮ ধারা পড়া যায়; যেখানে বলা আছে, ‘অয়েল অর্থাত্ তেল বলতে বোঝাবে তরল অবস্থায় হাইড্রোকার্বন, যার সাধারণ পরিচিতি অশোধিত তেল এবং যার অন্তর্ভুক্ত অশোধিত খনিজ তেল, অ্যাসফ্যাল্ট, ওজোকারাইট, বিটুমিন—কঠিন ও তরল উভয় অবস্থায়।’
ভাগাভাগি
প্রাকৃতিক গ্যাস শিরোনামের ১৫ অনুচ্ছেদের ৫ ধারার উল্লেখ এর আগে করেছি। এটি ভাগাভাগির অনুচ্ছেদ এবং গভীরভাবে লক্ষ করার বিষয়টি হচ্ছে অনুচ্ছেদটির শিরোনাম করা উচিত ছিল, ‘পেট্রোলিয়াম’, কিন্তু সেটা না করে লেখা হয়েছে ‘প্রাকৃতিক গ্যাস’। এর আগে বলেছি, চুক্তিপত্রে প্রাকৃতিক গ্যাস ও পেট্রোলিয়ামের কী অর্থ বা সংজ্ঞা দেওয়া আছে। ১৫ অনুচ্ছেদের শিরোনাম ওই সংজ্ঞা দুটি ও ১৫ অনুচ্ছেদের ৫ ধারার ১ উপধারা একত্রে বিবেচনা করলে এই চাতুরিটি সহজেই ধরা পড়বে যে চুক্তিভুক্ত কূপে যত রকমই খনিজ পদার্থ পাওয়া যাক না কেন, বাংলাদেশ তার ভাগে পাবে কেবল প্রাকৃতিক গ্যাসের লভ্যাংশ। সেটির পরিমাণ কত? প্রশ্নটির উত্তরে প্রথমে পড়তে হবে ১৫ অনুচ্ছেদের ৫ ধারার ১ উপধারা, যার সংক্ষিপ্ত বঙ্গানুবাদ: ‘বিক্রয়যোগ্য প্রাকৃতিক গ্যাস তরলীকৃত অবস্থায় এই অনুচ্ছেদের ৪, ৫ ও ৬ ধারার সাপেক্ষে রপ্তানি করার অধিকার ঠিকাদার কোম্পানির থাকবে। এই গ্যাসের পরিমাণভুক্ত থাকবে (ক) ঠিকাদারের প্রাপ্য কস্ট রিকভারি অর্থাত্ বিনিময়কৃত খরচ বাবদ প্রাকৃতিক গ্যাস, (খ) ঠিকাদারের প্রাপ্য লাভের প্রাকৃতিক গ্যাস ও (গ) পেট্রোবাংলার লাভের প্রাকৃতিক গ্যাস।’ এর পর পড়তে হবে একই অনুচ্ছেদের একই ধারার ৪ উপধারা, যার সংক্ষিপ্ত বঙ্গানুবাদ: ‘যে ক্ষেত্রে পেট্রোবাংলা স্থানীয় চাহিদা মেটাতে প্রয়োজনীয় পাইপলাইন স্থাপন করবে, সে ক্ষেত্রে পেট্রোবাংলার তার প্রাপ্য লাভের গ্যাস রাখার অধিকার থাকবে, তবে সেটার পরিমাণ কোনোক্রমেই বাজারজাত করা মোট গ্যাসের ২০ শতাংশের বেশি হবে না। প্রিয় পাঠক-পাঠিকা, লক্ষ করুন, উপরিউক্ত ভাগাভাগির ১ উপধারায় লাভের প্রাকৃতিক গ্যাস ঠিকাদার কোম্পানি ও পেট্রোবাংলার মধ্যে কে কী পরিমাণ পাবে, উল্লেখ করা হয়নি। তবে ৪ উপধারা পড়লে স্পষ্ট হয় যে উত্তোলিত প্রাকৃতিক গ্যাসের লাভের অংশে ঠিকাদার কোম্পানি ও পেট্রোবাংলা যথাক্রমে ৮০ শতাংশ ও ২০ শতাংশ পাবে।
গ্যাস রপ্তানি
চুক্তিপত্রটির ১৬ অনুচ্ছেদের শিরোনাম হচ্ছে ‘পাইপলাইন’। এই অনুচ্ছেদে বলা আছে, ঠিকাদার কোম্পানি চুক্তিকৃত কূপ এলাকা থেকে বাংলাদেশের উপযুক্ত এক কিংবা একাধিক স্থানে পেট্রোলিয়াম পরিবহনের জন্য এক কিংবা একাধিক পাইপলাইন নির্মাণ করতে পারবে, তবে তার খরচ ঠিকাদারের কস্ট রিকভারি হিসেবে গণ্য হবে এবং পাইপলাইনের মালিকানা পেট্রোবাংলার থাকবে। কিন্তু শুভঙ্করের ফাঁকিটি হচ্ছে পেট্রোবাংলা কেবল তার প্রাপ্য পেট্রোলিয়াম এবং সেটা এর আগে আলোচ্য চুক্তিপত্রের ধারা অনুযায়ী কেবল প্রাকৃতিক গ্যাস ওই পাইপলাইন মারফত পরিবহন করতে পারবে এবং তার খরচও ঠিকাদার কোম্পানির কস্ট রিকভারির সঙ্গে যোগ করা হবে। ১৫ অনুচ্ছেদের ৫ ধারার ৬ উপধারায় বলা আছে, ঠিকাদার কোম্পানি তার প্রাপ্য কস্ট রিকভারি গ্যাস ও লাভের গ্যাস খরিদের জন্য পেট্রোবাংলাকে সর্বপ্রথম প্রস্তাব দেবে, যার অর্থ পেট্রোবাংলা খরিদ না করলে ওই ৮০ শতাংশ গ্যাস ঠিকাদার কোম্পানি রপ্তানি করার সুযোগ পাবে। কিন্তু কখনই পেট্রোবাংলা সে গ্যাস খরিদ করতে সক্ষম হবে না। কারণ পেট্রোবাংলাকে সে ক্ষেত্রে সমুদ্রবক্ষের কূপ থেকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নিজস্ব পাইপলাইন নির্মাণ করতে হবে, অথচ ঠিকাদার কোম্পানি কর্তৃক এর মধ্যে নির্মিত পাইপলাইন, যার খরচের ভার পেট্রোবাংলাকেই বহন করতে হবে এবং চুক্তিপত্রের ১৬ অনুচ্ছেদের ৬ ধারা অনুযায়ী পেট্রোবাংলাই সে পাইপলাইনের মালিক—সেটা ব্যবহার করা যাবে না। প্রিয় পাঠক-পাঠিকা, আপনি কি জানেন, একটি সে রকম পাইপলাইন নির্মাণের খরচ হচ্ছে ৩৫০ মিলিয়ন ডলার, যা গরিব বাংলাদেশের পক্ষে খরচ করা আদৌ সম্ভব নয়? তা ছাড়া বাংলাদেশের গ্যাস ব্যবহারের ক্ষমতা বিবেচনায় রেখে গ্যাস উত্তোলনের সীমা নির্দিষ্ট করা উচিত ছিল। কিন্তু আলোচ্য চুক্তিপত্রে সে রকম ধারা না থাকায় ঠিকাদার কোম্পানি দ্রুত গ্যাস তুলতে থাকবে এবং পেট্রোবাংলার পক্ষে সে অনুপাতে খরিদ করা ও খরচ করা সম্ভব হবে না। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গ্যাস উত্তোলনের চুক্তিগুলোতে গ্যাস উত্তোলনের সীমা সাড়ে পাঁচ শতাংশ নির্দিষ্ট রাখা আছে।
ন্যায্য উপায় কী
বর্তমান সরকারের উপলব্ধিতে আসতে হবে, ভোটবিপ্লব মারফত তারা ক্ষমতায় এসেছে এবং জনগণের স্বার্থরক্ষার জন্য তারা দায়বদ্ধ। আলোচ্য চুক্তিটি তাদের তৈরি নয় এবং চুক্তিটির খুঁটিনাটি পরীক্ষা করা তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিশন অবিলম্বে দ্রুত গঠন করতে হবে চুক্তিটি পর্যালোচনা করার জন্য। কমিশনের কাজ হবে চুক্তিটি কে বা কারা তৈরি করেছে, তার বা তাদের এবং পেট্রোবাংলার পক্ষে পদস্থ কর্মকর্তার সাক্ষ্য গ্রহণ করা। চুক্তিটির পক্ষে ও বিপক্ষে নাগরিকদের মধ্যে থেকে সাক্ষী আহ্বান করা। এর পর সাক্ষীদের বক্তব্যের ভিত্তিতে চুক্তিটি পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন প্রদান। কমিশনের শুনানি প্রকাশ্যে হবে এবং প্রতিবেদনটিও প্রকাশ করতে হবে। সর্বশেষে প্রতিবেদনটি জাতীয় সংসদে আলোচনা করে সাংসদেরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন। গণতন্ত্র এক অর্থে যুক্তিশীলতা, এটি অস্বীকার করার পরিণতিতেই দেশে ফ্যাসিবাদ খুঁটি গাড়ার সুযোগ পায়—এটা ইতিহাসেরই শিক্ষা।
মোহাম্মদ গোলাম রাব্বানী: অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, আপিল বিভাগ, সুপ্রিম কোর্ট।

Tuesday, September 8, 2009

গ্যাস রপ্তানির ধারাটি সোজা ভাষায় বলবেন কি? by বদরূল ইমাম

গ্যাস রপ্তানির বিষয়টি নিয়ে আবারও আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছে। অনেকের মনেই প্রশ্ন, শেখ হাসিনা ২০০১ সালে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের মুখের ওপর গ্যাস রপ্তানির প্রস্তাব ‘না’ করে দিয়েছিলেন। তাঁর আমলেই আবার এ আন্দোলনের প্রয়োজন হচ্ছে কেন? ২০০১ থেকে ২০০৯ সময়ে দেশের গ্যাসচিত্রে আশাপ্রদ মজুদও বাড়েনি, আবার নিজস্ব চাহিদাও কমেনি, বরং গ্যাসসংকট দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। আবার এ আন্দোলনের বিরুদ্ধে সরকারের এ রকম কঠোর দমননীতিই বা কেন? পুলিশ আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের পা ভেঙে দিয়ে এবং অন্যদের জখম করে যে অবস্থার সৃষ্টি করেছে তাতে সরকার-সমর্থিত জনগোষ্ঠীর মধ্যেও বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে দেখা গেছে।
গ্যাস রপ্তানির বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে বিএনপি আমলের আন্দোলনের পটভূমি ছিল বিদেশি কোম্পানি কর্তৃক পাইপলাইন মারফত সুনির্দিষ্ট গ্যাস রপ্তানির প্রস্তাব। আর আন্দোলনের বর্তমান প্রেক্ষাপট হলো বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে গ্যাস অনুসন্ধান চুক্তি করার জন্য বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রণীত নীতিমালায় গ্যাসকে তরলীকৃত করে রপ্তানির সুযোগ রাখার কয়েকটি ধারা। এ নীতিমালাসংক্রান্ত নথিটি ‘মডেল পিএসসি ২০০৮’ নামে পরিচিত। পুরো নাম Model Production Sharing Contract 2008। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে বিদেশি কোম্পানিগুলো প্রথম থেকে প্রোডাকশন শেয়ারিং চুক্তির অধীনে অনুসন্ধান কাজ করে আসছে। তাই বর্তমান ‘মডেল পিএসসি ২০০৮’ যে কোনো নতুন নথি তা নয়, বরং এটি ইতিপূর্বে প্রণীত নীতিমালা বা মডেল পিএসসির পরিমার্জিত সংস্করণ।
উপরিউক্ত নীতিমালায় বর্ণিত গ্যাস রপ্তানিসংক্রান্ত ধারাগুলো নিয়ে সরকার ও বিরোধী পক্ষ পরস্পরবিরোধী মতপ্রকাশ করে। আন্দোলনরত বিরোধী পক্ষ বলে, এ নীতমালায় গাস রপ্তানির ধারা সুস্পষ্ট, এতে গ্যাস রপ্তানি অনিবার্য এবং গ্যাস রপ্তানির লক্ষ্য নিয়েই এটি প্রণীত হয়েছে। তাই সরকার এটি বাতিল না করলে আন্দোলন অপরিহার্য। সরকার বা পেট্রোবাংলা কর্তৃপক্ষ ভিন্নতর ব্যাখ্যা দিয়ে থাকে। তাদের মতে, গ্যাস রপ্তানির ধারায় প্যাঁচ রাখা হয়েছে, যাতে প্রকৃতপক্ষে তা কখনো বাস্তবায়িত হবে না। দেশের গ্যাসসম্পদের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে নীতিমালায় ভিন্নতর ব্যাখ্যার অবকাশ কাম্য নয়, বরং এ ব্যাখ্যা হতে হবে একক, সুস্পষ্ট ও বোধগম্য। কেউ কেউ বলতে পারেন, আইনি বিষয়ের ব্যাখ্যা সাধারণের জন্য কখনো বা সরল নাও হতে পারে। কিন্তু দেশের গ্যাসসম্পদ রপ্তানি করব কি করব না এ নীতিমালায় এমন জটিলতা থাকবে কেন, যা জনগণের কাছে সহজবোধ্য হবে না? উপরিউক্ত বিষয়টি নিয়ে সুস্পষ্ট আলোচনা করতে হলে ‘মডেল পিএসসি ২০০৮’-এ বর্ণিত গ্যাস রপ্তানিসংক্রান্ত ধারাগুলো আলোচনা করা প্রয়োজন। ‘মডেল পিএসসি ২০০৮’-এ রপ্তানিসংক্রান্ত ধারাগুলোয় (Articles) কী বলা আছে? পাঠকের সুবিধার্থে নিচে প্রাসঙ্গিক ধারাগুলো উল্লেখ এবং এ নিয়ে আলোচনা করা হলো।
Articles 15.5.1 : Subject to article 15.5.4, 15.5.5 and 15.6 Contractor shall have the right to export any marketable natural gas produced from the contract area in the form of Liquified natural gas (LNG). ...Where contractor intent to export the natural gas as LNG, the related LNG facilities shall be constructed and operated on the basis of a special LNG export agreement between contractor and Petrobangla. এর মূল অর্থ দাঁড়ায়, ধারা ১৫.৫.৪, ১৫.৫.৫ এবং ১৫.৬ বিবেচনায় এনে কোম্পানি গ্যাস রপ্তানি করতে পারবে, তবে গ্যাসকে তরলীকরণ অর্থাত্ এলএনজি করে রপ্তানি করতে হবে। এখন দেখা যাক ধারা ১৫.৫.৪, ১৫.৫.৫ এবং ১৫.৬তে কী উল্লেখ করা হয়েছে।
Article 15.5.4 Where Petrobangla has installed necessary facilities to transport and use gas to meet domestic requirements, Petrobangla shall be entitled at its option to retain in kind any natural gas produced up to Petrobangla’s share of profit gas, but in no event more than 20% of the total marketable natural gas. এর মূল অর্থ দাঁড়ায়, যেখানে পেট্রোবাংলা দেশের চাহিদা মেটাতে গ্যাস পরিবহনের ব্যবস্থা করে নেবে, সে তার অংশের প্রফিট গ্যাস নিতে পারবে, তবে তা কখনো মোট প্রাপ্ত গ্যাসের ২০ শতাংশের এর বেশি হবে না।
Article 15.5.5. Contractor shall not enter into any agreement for LNG export unless the price or the pricing formula and the agreement itself are previously approved by Petrobangla. Such approval shall not be withheld where Contractor can demonstrate that the price received... represent the fair market value... এর মূল অর্থ দাঁড়ায়, কোম্পানি তরলীকৃত গ্যাস রপ্তানির কোনো চুক্তি করবে না, যদি না পেট্রোবাংলা গ্যাসের নির্ধারিত মূল্য ও চুক্তিটি অনুমোদন করে।
Article 15.6. (a) Contractor shall offer its share of cost recovery gas and profit gas to Petrobangla, and Petrobangla shall undertake that it or its affilities will purchase the gas... (b) If a written notice of a market outlet is not given by Petrobangla within six months after the date of submission of the Evaluation report..., the contractor will be free to find a market outlet within Bangladesh... (c) Contractor has the option to sell contractor’s share of natural gas in the domestic market to a third party, subject to Petrobangla’s right of first refusal. মূল অর্থ দাঁড়ায়, কোম্পানি তার অংশের গ্যাস পেট্রোবাংলার কাছে বিক্রয়ের প্রস্তাব দেবে, পেট্রোবাংলা তা কেনার সম্মতি জানাবে। ছয় মাসের মধ্যে পেট্রোবাংলা ক্রয়-সম্পর্কিত নোটিশ না দিলে কোম্পানি নিজে ক্রেতা খুঁজে নেবে। পেট্রোবাংলার গ্যাস কেনার ব্যাপারে প্রথম অসম্মতি দেওয়ার অধিকার থাকবে এবং কেবল তারপর কোম্পানি অন্যত্র গ্যাস বিক্রি করতে পারবে।
এবার উপরিউক্ত ধারাগুলো নিয়ে কিছুটা আলোচনা করা যাক। আন্দোলনকারীরা বলছেন, ১৫.৫.১ ধারায় গ্যাস রপ্তানির সুস্পষ্ট অনুমোদন দেওয়া আছে। অপরপক্ষ বলছে, না, ওই ধারাটি বাস্তবায়নের আগে ১৫.৬ ধারাটি বিবেচনায় আনতে হবে আর সেখানেই রয়েছে প্যাঁচ, subject to Petrobangla’s right of first refusal, অর্থাত্ কোম্পানি গ্যাস রপ্তানি তখনই করতে পারবে, যদি পেট্রোবাংলা গ্যাস কিনতে রাজি না হয়। আর বাংলাদেশ কখনো গ্যাস কিনতে অস্বীকার করবে না, যেহেতু গ্যাসের চাহিদা দিনে দিনে বেড়েই চলবে ও গ্যাসের বিকল্প পর্যাপ্ত কোনো জ্বালানি আসবে না। তদুপরি তরলীকৃত গ্যাস রপ্তানি করতে হলে অতি বড় মজুদ প্রয়োজন হবে এবং তরলীকরণ প্লান্ট তৈরিতে বিশাল বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে। তাই কোনো কোম্পানির পক্ষে এককভাবে এ পথ লাভজনক হবে না। আন্দোলনকারীদের মতে, দেশে সমুদ্রবক্ষে কখনো বিরাট গ্যাসক্ষেত্র পাওয়া গেলে অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে। কিন্তু তখন বাংলাদেশ ভবিষ্যতের জন্য বাড়তি গ্যাস সংরক্ষণ করতে পারবে না, কারণ পেট্রোবাংলা গ্যাস না কিনলে তা রপ্তানিযোগ্য।
১৫.৫.৪ ধারা অনুযায়ী বাংলাদেশকে গ্যাস নেওয়ার জন্য নিজস্ব পরিবহনব্যবস্থা অর্থাত্ পাইপলাইন তৈরি করে নিতে হবে। আন্দোলনকারীরা প্রশ্ন করেছেন, যদি গভীর সমুদ্রে অনেক দূরবর্তী স্থানে গ্যাস পাওয়া যায় তাহলে কি বাংলাদেশের পক্ষে গভীর সমুদ্রে অতি ব্যয়বহুল পাইপলাইন তৈরি করা সম্ভব হবে? তার মানে কি এই নয় যে কোম্পানি ওই গ্যাস রপ্তানি করতে পারবে? আর প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের প্রাপ্য গ্যাসের সীমা মোট প্রাপ্ত ২০ শতাংশের বেশি হবে না, তার মানে কী?
আন্দোলনকারীরা বলছেন, মডেল পিএসসি ২০০৮ বিদেশি কোম্পানির স্বার্থ বজায় রাখতে ও গ্যাস রপ্তানির সুযোগ করে দিতে প্রণয়ন করা হয়েছে। পেট্রোবাংলা বলছে, রপ্তানির লোভ না দেখালে বিদেশি কোম্পানি আকৃষ্ট হবে না, বিশেষ করে সমুদ্রবক্ষে যেখানে বাংলাদেশের পক্ষে নিজস্ব অনুসন্ধান চালানো সম্ভব নয়। অতীতের মডেল পিএসসিগুলোয়ও গ্যাস তরলীকৃত করে রপ্তানির বিধান দেওয়া ছিল, কিন্তু ওই পন্থায় কোনো কোম্পানিই গ্যাস রপ্তানি করতে পারেনি, ভবিষ্যতেও পারবে না।
‘মডেল পিএসসি ২০০৮ ও গ্যাস রপ্তানি’—এ বিষয়টি নিয়ে তর্কবিতর্ক থেকেই যাবে। নিঃসন্দেহে এর একাধিক ধারা প্রশ্নসাপেক্ষ, কোনো কোনো সরকারি ব্যাখ্যা বিভ্রান্তিমূলক। প্রশ্ন হলো, নীতিমালার ধারাগুলো কি আরও সুস্পষ্টভাবে বিভ্রান্তি এড়িয়ে করা যায় না? বিষয়টি নিয়ে একদিকে যেমন খোলা আলোচনা প্রয়োজন, প্রাতিষ্ঠানিকভাবেও এর ধারাগুলোর পরিমার্জনা বিবেচনাযোগ্য। আন্দোলনের কারণে গ্যাস অনুসন্ধান বিলম্বিত হোক তা কারও কাম্য নয়। কিন্তু চুক্তি যদি দেশের স্বার্থের চেয়ে বিদেশি স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়, তা কেবল অমঙ্গল ডেকে আনবে। সরকারের উচিত হবে মডেল চুক্তিকে জনগণের কাছে যথার্থ ব্যাখ্যা করা ও জনগণকে আস্থায় এনে তা প্রণয়ণ করা। নিশ্চয়ই তা পুলিশ দিয়ে লাঠিপেটা করে অধ্যাপকের পা ভাঙার চেয়ে উত্তম পন্থা।
ড. বদরূল ইমাম: অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, রেজাইনা বিশ্ববিদ্যালয়, কানাডা।