Monday, September 28, 2015

কুন্দুজ দখল করে নিচ্ছে তালেবান

আফগানিস্তানের সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, শত শত তালেবান যোদ্ধার একটি দল উত্তরাঞ্চলীয় কুন্দুজ শহরের ওপর আক্রমণ চালিয়েছে। বিবিসির সংবাদদাতা বলছেন শহরটির অর্ধেক এলাকাই এখন তালেবানের দখলে।
সেখানে তীব্র লড়াই চলছে এবং পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, উভয় পক্ষেই বেশ কিছু লোক নিহত হয়েছে।
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই শহরটির ওপর ভোরবেলা একাধিক দিক থেকে সাঁড়াশি আক্রমণ চালায় তালেবান যোদ্ধারা। তারা শহরে ঢোকার প্রধান পথগুলো দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে, বেশ কিছু ভবনে আগুন লাগিয়ে দেয় এবং কিছু সময়ের জন্য একটি হাসপাতাল দখল করে রাখে।
পুলিশের একজন মুখপাত্র বলেন, অন্তত চারটি জায়গায় সরকারি বাহিনীর সাথে জঙ্গীদের তীব্র লড়াই চলছে। আফগান সরকার বলছে, সেখানে বাড়তি সৈন্য পাঠানো হেচ্ছ।
বিবিসির সংবাদদাতা বলছেন, শহরের অর্ধেক এলাকাই এখন তালেবানের দখলে। একটি রিপোর্টে বলা হয়, কৃন্দুজের প্রধান স্কোয়ারে তালেবান একটি পতাকা উড়িয়ে দিয়েছে।
তালেবানের ওয়েবসাইটে এক সংক্ষিপ্ত পোস্টেও বলা হয়, মুজাহিদীরা কুন্দুজ শহরের কেন্দ্রীয় স্কোয়ারে এসে গেছে, এব শহরের চারটি অংশ এখন পুরোপুরি তাদের দখলে। 'শত্রপক্ষের অনেকে নিহত হয়েছে' বলেও এতে দাবি করা হয়।
কুন্দুজ থেকে একজন স্থানীয় এমপি ফাতেমা আজিজ জানান, শহরে এসময় বিভিন্ন রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়, শহরের লোকজন বাড়িঘর ছেড়ে রাস্তার ওপর নেমে আসতে বাধ্য হয়।
"তীব্র লড়াইয়ের কারণে অনেক লোক বাড়ি ছেড়ে রাস্তায় নেমে এসেছে - যার মধ্যে মহিলা ও শিশুরাও রয়েছে, তারা বুঝতে পারছে না কিভাবে নিরাপদ থাকা যাবে।"
কোন প্রাদেশিক রাজধানী শহরের ওপর এটি অন্যতম বড় জঙ্গী হামলা। বিশেষ করে তালেবান ও অন্যান্য কিছু বিদ্রোহী গোষ্ঠী একত্রীভূত হবার পর আফগান সরকারি বাহিনীর সাথে তাদের বেশ কয়টি লড়াই হয়েছে। বিবিসির সংবাদদাতা জোয়ানা জলি জানাচ্ছেন তালেবানের সাথে যোগ দিয়েছে এমন কিছু বিদেশী যোদ্ধা ইসলামিক স্টেটের প্রশিক্ষণ পেয়েছে।
এ ছাড়া কুন্দুজের ওপরও গত এপ্রিল মাস থেকে একাধিক আক্রমণ হয়েছে।
তাজিকিস্তান সীমান্তের কাছে এ শহরটি ২০০১ সালের আগে পর্যন্ত তালেবানের প্রধান ঘাঁটি ছিল। কুন্দুজ এমন কিছু রাস্তার সংযোগস্থলে অবস্থিত - যার সাথে আফগানিস্তানের সব অংশের যোগাযোগ রয়েছে।
সূত্র : বিবিসি

আরএসএসের ছায়ায় বিজেপি by কুলদীপ নায়ার

ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে যদি কারও মধ্যে বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকে, তা হলে নরেন্দ্র মোদি নিজেই সেটা দূর করেছেন। তিনি তাঁর গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীদের আরএসএস-প্রধান মোহন ভাগওয়াতের সামনে হাজির করে নিজেদের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম সম্পর্কে তাঁকে অবহিত করতে বলেছেন। এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর অস্বস্তিবোধ নেই, পুরো অনুষ্ঠানটি একটি সংবাদ চ্যানেলে সম্প্রচারিত হওয়ায় সেটা বোঝা গেছে। হ্যাঁ, মোদি আরএসএসের রাজনৈতিক শাখা বিজেপিতে যোগ দেওয়ার আগে প্রথমোক্ত সংগঠনটির উৎসাহী প্রচারক ছিলেন।
বিজেপি আরএসএসের সঙ্গে সম্পর্কের ব্যাপারটা লুকিয়ে রাখতে চায়। কারণ, তারা বোঝে, গড়পড়তা ভারতীয়দের মধ্যে আরএসএসের গ্রহণযোগ্যতা নেই। এই প্রশ্নের কারণেই জনতা পার্টি ভেঙে গেছে। বিজেপির পূর্ববর্তী রূপ জন সংঘ জনতা পার্টিতে যোগ দেওয়ার আগে আরএসএসের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করার অঙ্গীকার করেছিল। তারা গান্ধীবাদী জয়প্রকাশ নারায়ণকে কথা দিয়েছিল, জনতা পার্টিতে ঠাঁই পেলে তারা আরএসএসের সঙ্গ ত্যাগ করবে। কিন্তু বাস্তবে এই সম্পর্ক ত্যাগের ব্যাপারটা ঘটেনি, তারা জয়প্রকাশ নারায়ণের বিশ্বাস ভঙ্গ করেছিল।
মনে পড়ে, আমি জয়প্রকাশ নারায়ণকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তিনি কেন আরএসএসের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ না করা সত্ত্বেও জন সংঘকে জনতা পার্টিতে স্থান দিয়েছিলেন। উত্তরে তিনি বলেছিলেন, জন সংঘ কথা না রেখে তাঁর সঙ্গে প্রতারণা করেছিল।
এট নিশ্চয়ই সত্য হবে, কিন্তু এ প্রক্রিয়ায় জন সংঘ ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তি পেয়েছিল। জয়প্রকাশ যে গুরুতর ভুল করেছিলেন, তার জন্য জাতিকে বড় মূল্য দিতে হয়েছে, আর গতকালের জন সংঘ আজ বিজেপি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, লোকসভায় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে।
এই পরিস্থিতি থেকে কংগ্রেসের লাভবান হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু পরিবারতন্ত্র নিয়ে দলটির আচ্ছন্নতা এবং রাহুলকে নিজের উত্তরসূরি বানানোর ব্যাপারে সোনিয়া গান্ধীর পীড়াপীড়ির কারণে তারা এ সুযোগ হারিয়েছে। মুসলমানরা দলটির নির্ভরযোগ্য ভোটব্যাংক ছিল, দলটি তাদের হারিয়েছে। সমাজ এখন আঞ্চলিক দলগুলোর ওপর নির্ভর করতে শুরু করেছে, এমনকি ওয়াসিকে সমর্থন করার চিন্তাও নাড়াচাড়া করছে। ওয়াসি নিজেকে মুসলমানদের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছেন, ঠিক যেমন দেশভাগের আগে মুসলিম লীগ চেষ্টা করেছিল। সমাজ সংকীর্ণ রাজনীতির কাছে ফেরত যেতে চায় না।
যা হোক, টেলিভিশনের পর্দায় যখন লোকে দেখল আরএসএস-প্রধান মোহন ভাগওয়াতের সামনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজের মন্ত্রীদের হাজির করেছেন, তখন বোঝা গেল, নেতা কে। এটা সত্য যে ভোটাররা মোদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়েছে, কিন্তু নির্বাচনী প্রচারণার সময় তিনি কখনো বলেননি, দেশশাসনের বেলায় আরএসএসও তাদের সঙ্গে থাকবে।
সত্য হলো, নির্বাচনী প্রচারণার সময় মোদি সংখ্যালঘুদের, বিশেষ করে মুসলমানদের আশ্বস্ত করেছিলেন, ইতিপূর্বে পার্টির অবস্থান যা হোক না কেন, নতুন স্লোগান হবে, সব ক্যা সাথ, সব ক্যা বিকাশ। কিছু জনসভায় তিনি একটু ভিন্নপথে গিয়ে বলেছিলেন, তিনি মুসলমানদের সবচেয়ে ভালো রক্ষক হবেন।
স্বাধীনতাসংগ্রামের ও বহুত্ববাদের দর্শনের প্রতি আবেগের ঘাটতি দেখে মনোবেদনা সৃষ্টি হয়। এমনকি আধুনিক ভারতের স্থপতি জওহরলাল নেহরুর নাম পর্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে
সত্যি কথা বলতে, এখন পর্যন্ত তাঁর কাজের মধ্যে বৈষম্যমূলক কিছু দেখা যায়নি। যদিও এটা দৃশ্যমান যে আরএসএস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে গেরুয়াকরণ করছে আর গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নিজেদের লোক বসাচ্ছে। এতে বোঝা যায়, মোদি খুব ধীরগতিতে ও অবিশ্রান্তভাবে আরএসএসের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন। এটাও পরিষ্কার যে শাসনব্যবস্থায় মুসলমানদের ভূমিকা আর নেই। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় মাত্র একজন মুসলমান মন্ত্রী আছেন, তা-ও আবার গুরুত্বহীন মন্ত্রণালয়ে। তা ছাড়া, সরকারের ভেতরে ও বাইরে এমন ধারণা আছে যে শাসনব্যবস্থায় একরকম মৃদু হিন্দুত্ব কায়েম হয়েছে।
আরএসএসের লক্ষ্য হচ্ছে হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা, সেটা হয়তো এখন দূর অস্ত মনে হতে পারে। কিন্তু মোদির হাতে এখনো সাড়ে তিন বছর সময় রয়েছে। তিনি ও আরএসএস-প্রধান এখন প্রায়ই জনসমক্ষে মিলিত হচ্ছেন। তাঁদের কাজকর্ম দেখে মনে হচ্ছে, তাঁরা নাগপুরে আরএসএস সদর দপ্তরে প্রণীত পরিকল্পনা অনুসারে কাজ করে যাচ্ছেন। বিজেপি ও তার ছাত্রসংগঠন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের স্বাধীন চিন্তা নেই, তারা শুধু নাগপুরে রচিত পাণ্ডুলিপি পাঠ করে, আর কিছু নয়।
এর আবার নানা রকম বহিঃপ্রকাশ আছে। কখনো কখনো সেটা মাংসের ওপর নিষেধাজ্ঞা রূপে হাজির হয়, কখনো পোশাক বিধান এবং কখনো বিদ্যালয়ে সংস্কৃত শিক্ষা ও কখনো সেখানকার অ্যাসেম্বলিতে সকালের বিশেষ প্রার্থনা বাধ্যতামূলক করার মধ্য দিয়ে তার প্রকাশ ঘটে। দিল্লির নেহরু স্মৃতি জাদুঘর সংস্কার করার সিদ্ধান্তও এর একটি অংশ। ব্রিটিশ তাড়ানোর আন্দোলনে যেখানে আরএসএসের টিকিটি পর্যন্ত দেখা যায়নি, সেখানে এখন তারা সব স্থান দখল ও নিজেদের স্বাধীনতার চ্যাম্পিয়ন হিসেবে প্রদর্শন করতে চায়।
স্বাধীনতাসংগ্রামের ও বহুত্ববাদের দর্শনের প্রতি আবেগের ঘাটতি দেখে মনোবেদনা সৃষ্টি হয়। এমনকি আধুনিক ভারতের স্থপতি জওহরলাল নেহরুর নাম পর্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে, যেমন এরা নেহরু ও ইন্দিরা গান্ধীর ছবি ডাকটিকিট থেকে মুছে ফেলছে। শিক্ষা খাতের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এরা ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা করছে, পাঠ্যবই নতুন করে লিখছে। সেখানে স্বাধীনতাসংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের ভূমিকা খাটো করা হচ্ছে। ফলে এতে বিস্ময়ের কিছু নেই যে সীমান্ত গান্ধী খান আবদুল গাফফার খান ও মাওলানা আবুল কালাম আজাদের মতো যে নেতারা মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে সাহস নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁদের নাম আর তেমন একটা উচ্চারণ করা হয় না।
আসল ব্যাপারটা বোধগম্য, স্বাধীনতাসংগ্রামের কথা বললে আরএসএস ও তার সদস্য বিজেপি ও বজরঙ্গি দল বিচ্ছিন্ন বোধ করে। কিন্তু স্বাধীনতাসংগ্রামকে খাটো করা তাদের উচিত হবে না, সেটা আগামী প্রজন্মের জন্য বড় রকম ক্ষতির কারণ হবে। গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে স্বাধীনতাসংগ্রাম, আর তার জন্য যে অসংখ্য মানুষ ত্যাগ স্বীকার করেছে, সেই মানুষেরা।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
কুলদীপ নায়ার: ভারতীয় সাংবাদিক।

গঙ্গায় আরো বাঁধ দেবে ভারত! by প্রকৌশলী এস এম ফজলে আলী

গঙ্গার উজানে আরো ১৬টি বাঁধ দেবে ভারত। ভারত ইতোমধ্যে ৩০টি বাঁধ দিয়ে গঙ্গা নদীর পানি প্রত্যাহার করে তার গতিপথের উভয় পাশে সেচসহ সেসব এলাকার শহরগুলোতে পানি সরবরাহ করছে। ফলে গঙ্গার পানিতে এমনিতেই টান পড়ছে। ফারাক্কা বাঁধের নিচে গঙ্গাপ্রবাহে বাংলাদেশকে তার ন্যায্য হিস্যা দিতে পারছে না। এখন আরো ১৬টি বৃহদাকার বাঁধ গঙ্গা নদীতে ভারত দিলে নিম্নাঞ্চলে আরো পানি পাওয়ার কোনো সম্ভাবনাই থাকবে না।
প্রায় ১৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ গঙ্গা-হুগলি নদীর ওপর ১০০ কিলোমিটার অন্তর এসব বাঁধ নির্মাণ করা হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের বাঁধ নির্মাণের ফলে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে ভাটির বাংলাদেশ। কৃষি, সেচ, জীববৈচিত্র্যে এ বাঁধ মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে।
ভারতের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক পত্রিকা টাইমস অব ইন্ডিয়ায় গঙ্গার উজানে আরো ১৬টি বাঁধ নির্মাণের খবর প্রকাশিত হয়েছে। এতে জানানো হয়, দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার এলাহাবাদ থেকে হলদিয়ার ১৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ গঙ্গা-হুগলির ১০০ কিলোমিটার পরপর বাঁধ দেবে। বাঁধগুলো হবে মূলত ব্যারাজ-ভিত্তিক। ব্যারাজের মাধ্যমে ধরে রাখা পানি থেকে শুষ্ক মওসুমে কৃষি সেচ সুবিধা নেয়া হবে। এর পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। এ ছাড়া দেশটি অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহনের জন্য একটি নৌরুটও তৈরি করবে। ভারতের মোদি সরকার এসব বাঁধ নির্মাণে বেশি আগ্রহী। দেশের কৃষি উৎপাদন বাড়ানোই তার লক্ষ্য। এতে ভাটির বাংলাদেশ মহাবিপর্যয়ে পড়বে। এতে বাংলাদেশে কার্যত গঙ্গার পানি আসার প্রায় সব পথ বন্ধ হয়ে যাবে। ফারাক্কার কারণে বাংলাদেশ এমনিতেই ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। এরপর নতুন করে গঙ্গার বাঁধ নির্মাণের খবর সত্যিই বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগজনক।
ভারত ২০০৫ সালে গঙ্গার উজানে তেহারি ড্যাম নির্মাণ করে। উত্তর প্রদেশের তেহারি-গাড়ওয়াল জেলায় গঙ্গার উজানে তেহারি ড্যামে বিপুল পানি জমিয়ে রেখে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে ভারত। সেচের জন্যও এ বাঁধের পানি ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি পৃথিবীর পঞ্চম বৃহৎ ড্যাম, যার বিস্তৃতি ৪৫ কিলোমিটার জুড়ে। এ বাঁধ হচ্ছে গঙ্গার ওপর ভারতের বড় ধরনের সর্বশেষ প্রকল্প। তেহারি ড্যামের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকে ভাটিতে, বিশেষ করে ফারাক্কা পয়েন্টে পানির প্রবাহ অনেক কমে গেছে। তবে এ বাঁধের আগেও ভারত গঙ্গা নদীর উজানে বহু পয়েন্টে বহু ড্যাম ও ব্যারাজ নির্মাণ করেছে। ড্যাম, ব্যারাজ ছাড়াও ভারত গঙ্গার উজানের বহু পয়েন্টে পাইপ বসিয়ে নদীর পানি উজান থেকে টেনে নেয়ার ব্যবস্থা করেছে। জানা গেছে, উজানে বর্তমানে প্রায় ৪০০ ড্যাম-ব্যারাজসহ বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, এভাবে একের পর এক বাঁধ নির্মাণ করে দেশটি গঙ্গার মতো একটি আন্তর্জাতিক নদীর পানির ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। ভাটির দেশ বাংলাদেশের কথা একবারও ভেবে দেখল না। গঙ্গার উজানে বাঁধ নির্মাণের ফলে নদীটির উজানেই পানির স্থিরতা বাড়বে এবং ভাটিতে পানির অভাব দেখা দেবে- তাই প্রবাহ কমে যাবে। নদীর পানিতে প্রবাহিত কার্বন, ফসফরাসসহ বিভিন্ন পুষ্টি-উপাদান উজানের জমিতে জমা হতে থাকবে। ভাটিতে বাংলাদেশ শুষ্ক মওসুমে পানি কম পাবে।
ইতোমধ্যেই গঙ্গা নদীর পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় নদীর লবণাক্ততা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে দৌলতদিয়া-বাঘাবাড়ী পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। এতে নদীতে জলজ প্রাণী ও মিঠাপানির মাছ মারাত্মকভাবে কমেছে। ভূমির লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় ফসলাদির উৎপাদনও কমে যাচ্ছে। বিশ্বের ঐতিহ্যবাহী সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ অরণ্য সুন্দরবনের বিভিন্ন জাতের গাছ অতিরিক্ত লবণাক্ততায় মরে যাচ্ছে। ফলে একসময় কালের স্রোতে হয়তো সুন্দরবন হারিয়ে যাবে। তাই পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের জন্য বাংলাদেশ সরকারকে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে।
যেকোনো নদীর ওপর বাঁধ বা অন্য কোনো প্রক্রিয়ায় তার স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধা দিলে তার অববাহিকায় বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। তা উজানের লোকের জন্যও মঙ্গল বয়ে আনে না। প্রকৃতির বৈরিতা অসময় বন্যা, প্রবল বৃষ্টি ও নদীভাঙনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। ভারত বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ট্রানজিট বা ট্রানশিপমেন্ট পেতে চায়। তাদেরও বাংলাদেশকে কিছু দিতে হবে। তার মধ্যে প্রধান ও প্রথম কাজ হলো, শুষ্ক মওসুমে বাংলাদেশকে পর্যান্ত পানি দিতে হবে। ভারত আজ ৫৪টি অভিন্ন নদীর ৫৩টিতেই ড্যাম-বাঁধ ও মাটির বাঁধ দিয়ে পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। তার একতরফা পানি প্রত্যাহার আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন। পানির জন্য বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্ত নিয়ে জাতিসঙ্ঘ ও আন্তর্জাতিক আদালতে যেতে হবে। সমুদ্রসীমা নির্ধারণে আমরা আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার চেয়ে মিয়ানমার ও ভারতের বিরুদ্ধে যে রায় পেয়েছি, তা আমাদের অভিন্ন নদীর পানি সমতার ভিত্তিতে পাওয়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করবে। তবে এ জন্য চাই জাতীয় ঐক্য। দুর্ভাগ্য আমাদের যে, রাজনৈতিক ঐক্য নেই। জাতীয় ইস্যুতে রাজনীতিকেরা ও রাজনৈতিক দলগুলো দ্বিধাবিভক্ত। এ সুযোগই ভারত নিচ্ছে। বিশ্বের উন্নত দেশে এমন নজির নেই। সেখানে জাতীয় ইস্যুতে সব দল ও মানুষ এক হয়ে যায়। আজকে আমাদের দরকার একজন সাহসী, মজলুম জননেতা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর। ১৯৭৬ সালের মে মাসে ফারাক্কা মার্চে তিনি যে অটল ভূমিকা নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট পর্যন্ত জনতার লংমার্চ করেছেন তা অসাধারণ। এতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ‘লৌহমানবী’ ইন্দিরা গান্ধী পর্যন্ত ভীত হয়েছিলেন। পরে তিনি বাংলাদেশের সাথে গঙ্গা নদীর পানিবণ্টনে ফারাক্কা চুক্তি করতে বাধ্য হন।
আন্তঃসীমান্ত নদীর ৫৩টিতে বাঁধ নির্মাণ করে একতরফা পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে ভারত। টিপাইমুখ ও সারির উজানে বাঁধ দিয়ে আরো আটটি নদীর পানি প্রত্যাহার করার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করেছে। ফলে শুকনো মওসুমের শুরুতেই বড় বিপর্যয়ে পড়বে বাংলাদেশ। বিশেষজ্ঞরা জানান, ভারতের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সদস্যদের হিসাব অনুযায়ী, ভারতে প্রাকৃতিক উপায়ে বিভিন্ন উৎস থেকে প্রতি বছর প্রায় ৬৫০০ বিলিয়ন কিউবিক মিটার পানি পাওয়া যায়। ২০২৫ সাল পর্যন্ত বছরে গড়ে তাদের সর্বোচ্চ ৯০০ বিলিয়ন কিউবিক মিটার পানি প্রয়োজন। অর্থাৎ তাদের প্রাপ্য মোট পানির মাত্র শতকরা ১৫ ভাগ পানি ব্যবহার করা সম্ভব। এর পরও ভারত বাংলাদেশকে বঞ্চিত রেখে একতরফা যৌথ নদীগুলোতে বাঁধ দিয়ে পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে।
৬০টি নদী ভারত ও মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ভারত-বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশনের হিসাবে আন্তঃসীমান্ত নদী ৫৭টি। এর মধ্যে ৫৪টি ভারত থেকে, তিনটি মিয়ানমার থেকে এসেছে। যৌথ নদীগুলোর বড়গুলোতে স্থায়ী বাঁধ এবং ছোট নদীগুলোতে অস্থায়ী মাটির বাঁধ দিয়ে ভারত শুকনো মওসুমে পানি প্রত্যাহার করে নেয়। বর্ষায় সেগুলো ভেঙে দিলে বাংলাদেশে বন্যাপরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এ দিকে আমাদের অভ্যন্তরীণ নদীগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে এবং পানির অভাবে বিপর্যয় সৃষ্টি হচ্ছে। স্বাধীনতার পর আমাদের দেশে যেখানে ২৪ হাজার কিলোমিটার নৌপথ ছিল বিআইডব্লিউর হিসাবে, এখন তা বর্ষা মওসুমে ছয় হাজার ও শুকনো মওসুমে মাত্র দুই হাজার ৪০০ কিলোমিটারে নেমে এসেছে।
জানা গেছে, গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, দুধকুমার, ধরলা, মহানন্দা ও বরাক নদীতে ভারত ৫০০টি বাঁধ তৈরি করেছে। তাদের ‘বৃহত্তম আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প’ এর সাথে সম্পৃক্ত। এর আওতায় ভারতে ৪৫০টি, নেপালে ৩০টি ও ভুটানে ২০টি বাঁধ তৈরি করা হবে। এরই মধ্যে এ প্রকল্পের প্রায় ১০০টি বাঁধ নির্মাণ হয়ে গেছে।
জানা গেছে, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে মাথাভাঙ্গা, বেতনা (সেনামুখী), ভৈরব, রায়মঙ্গল, ইছামতি- এ পাঁচটি অভিন্ন নদী রয়েছে। এসব নদীর প্রবাহের ওপর নির্ভর করছে সাতক্ষীরা ও যশোর এলাকার অন্যান্য নদীতে মিঠা পানির প্রবাহ। ভারতের নদীয়া জেলার করিমপুর থানার গঙ্গারামপুরে সীমান্তের প্রায় কাছাকাছি ভৈরব নদের উৎসমুখে একটি ক্রসবাঁধ নির্মাণ করেছে ভারত। ওই বাঁধের উজানে ভৈরব নদের উৎসমুখে জলঙ্গী নদীর ওপর নির্মাণ করা হয়েছে একটি রেগুলেটর। ওই বাঁধ ও রেগুলেটর দিয়ে ভারত জলঙ্গী নদীর পানি একতরফাভাবে প্রত্যাহার করছে। ফলে ভাটিতে বাংলাদেশের ভৈরব নদী মরে গেছে। ভৈরব শুকিয়ে যাওয়ায় পানি পাচ্ছে না কপোতাক্ষ। কপোতাক্ষ নদী ভরাট হয়ে পড়ায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে স্থায়ী জলাবদ্ধতাসহ মারাত্মক বিপর্যয় নেমে আসছে।
রায়মঙ্গল সাতক্ষীরার শ্যামনগর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত এ নদী বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিভক্ত করেছে সুন্দরবনকে। ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ নদীতে নদীশাসনের উন্নত কলাকৌশল প্রয়োগ করে দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপের দখল নিয়েছে ভারত। অথচ প্রাকৃতিকভাবে দ্বীপটি বাংলাদেশের অংশে পড়ে। নদীর পানি আটকে রাখায় পানির অভাবে বাংলাদেশের বেতনা ও কোদালিয়া নদীর মধ্যবর্তী ৩০ বর্গমাইল এলাকা শুকিয়ে যায়। আবার বর্ষায় পানি ছেড়ে দিলে ওই অঞ্চলে প্লাবন দেখা দেয়। সীমান্ত নদী মাথাভাঙ্গা গঙ্গার একটি প্রধান শাখা। এ নদীটি ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রভাবের শিকার। ফারাক্কা ব্যারাজ হওয়ার পর নদীটি দিনে দিনে মরা গাঙে পরিণত হয়েছে। ফলে এ অববাহিকায় পরিবেশ বিপর্যয় নেমে আসছে।
বাংলাদেশের প্রধান নদী পদ্মা ও ব্রহ্মপুত্র। এ দুটো নদীতে বর্ষা মওসুমে ৬০ থেকে ৬৫ ভাগ পানি আসে নেপাল থেকে। শুকনো মওসুমে ৬০ থেকে ৭০ ভাগ। ১০ ভাগ পানি আসে চীন থেকে ও ২০ ভাগ আসে ভারত থেকে। অথচ ভারত ফারাক্কা বাঁধ ও রেগুলেটর তৈরি করে এবং এর উজানে আরো বেশ ক’টি বাঁধ তৈরি করে একতরফা পুরো পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। ১৯৭৫ সালে পরীক্ষামূলক ফারাক্কা বাঁধ চালু করলেও তা আজ পর্যন্ত আর বন্ধ হয়নি। বাঁধটি চালু হওয়ার দুই বছরের মধ্যেই শুকিয়ে যেতে থাকে পদ্মা নদী। আর দুর্ভোগ শুরু হয় বাংলাদেশের অংশে পদ্মার বেসিন এলাকার মানুষের। অভিন্ন নদী গঙ্গার উজানে ফারাক্কা বাঁধ দেয়া এবং পানি প্রত্যাহার করায় বড় বিপর্যয় নেমে আসে বাংলাদেশের উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলেও। বিপদে পড়েছেন বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার কোনো গ্যারান্টি ক্লজ ছাড়াই ভারতের সাথে পানিচুক্তি করায় বাংলাদেশ আর পানি পাচ্ছে না। তারা ফারাক্কা পয়েন্টে পানি ভাগাভাগি করে। অথচ উজানে গঙ্গায় ৩০টির অধিক বাঁধ দিয়ে গঙ্গার পানির শতকরা ৯০ ভাগই ফারাক্কা পয়েন্টে আসার আগে প্রত্যাহার করছে। তাই ফারাক্কা পয়েন্টে পানি ভাগাভাগির কোনো যুক্তি নেই। চুক্তিটি যদি এমন হতো, যেকোনো পরিস্থিতিতেই ভারত ফারাক্কা পয়েন্ট থেকে বাংলাদেশকে অন্তত ৪০ হাজার কিউসেক পানি দিতে বাধ্য থাকবে; তাহলে চুক্তির সুফল বাংলাদেশ পেত। গুগল আর্থ ম্যাপে দেখা যায়, ফারাক্কার উজানে গঙ্গার ভরা যৌবন, আর ভাটিতে গঙ্গা মৃত। ফারাক্কার খানিকটা উজানে ক্যানাল কেটে গঙ্গার পানি ভারত সরকার ভাগীরথী নদীতে সঞ্চালন করছে।
গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা পেতে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় কোনো কাজ হবে না। সে চেষ্টা বিগত ৩০ বছর ধরে হয়েছে, কিন্তু ফলাফল শূন্য। তাই সঠিক তথ্য-উপাত্তসহ বাংলাদেশকে জাতিসঙ্ঘ ও আন্তর্জাতিক আদালতে যেতে হবে। এ নদীর পানি আমাদের বাঁচা-মরার বিষয়।
লেখক :প্রকৌশলী এস এম ফজলে আলী। পানি বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদ

সত্য বাবুর মৃত্যু এবং... by অমিত রহমান

পাক্কা দুই বছর পর লিখছি। বন্ধুবান্ধব,  শুভাকাঙ্ক্ষী এমনকি সহকর্মীরাও মানা করেন। বলেন, কি দরকার ঝুঁকি নেয়ার। এখনতো ঝুঁকি নানা কিছিমের। লিখে কি হবে? কেউ কি শুনে? অনেক তো লেখা হলো। বলা হলো। দেশ-বিদেশ থেকে কত কিছুই বলা হচ্ছে। কেউ তো আমলেই নিচ্ছে না। তাই না লেখাই ভাল, বিপদ ডেকে আনার চেয়ে। তাদের কথা শুনে লেখাই বন্ধ করে দিলাম। বাহবাও পেলাম অনেকের কাছ থেকে। কেউ কেউ বললেন, কিছুদিন বিশ্রামে থাকেন। দেখেন না কি হয়। আবার অনেকেই বললেন, টকশোতে গিয়ে অনেকে নীতিকথা বলেন বা বলার চেষ্টা করেন। লিখছেন না কেন? সামাজিক নেটওয়ার্কেও তো লিখতে পারেন। অন্যরা তো লিখছে। তাদের বলি, ফেসবুকে আমার অ্যাকাউন্টই নেই। ইচ্ছে থাকলেও খুলি না। এতে ভাল আছি। আজগুবি খবর শুনে আৎকে উঠি না। কোনটা সত্য, কোনটা মিথ্যা তা খোঁজার চেষ্টা করে অযথা সময় নষ্ট করি না। উত্তেজনা ছড়াতে নিজেকে ব্যস্ত রাখি না। যাক গে, ওসব কথা বলে লাভ নেই। সাংবাদিকতা যদি করতে হয় তাহলে লিখতে হবে। এতে কেউ খুশি হবেন কেউবা হবেন বিরক্ত। কারও পক্ষে গেলে বস্তুনিষ্ঠ, আর বিপক্ষে গেলে একদম বিরোধী শিবিরভুক্ত। ইদানীংতো একটি বিশেষ দলের তকমা পাওয়া যায় সহজেই। এ জন্য অবশ্য আমরা সাংবাদিকরা অনেকখানি দায়ী। আমরা নিজেদেরকে দলের বাইরে রাখতে পারিনি। দলের কাছে আত্মসমর্পণ করেছি। কিছু পেয়ে আবার অনেক সময় পাওয়ার আশায়। এতে করে বাংলাদেশে সাংবাদিকতা এখন নানা প্রশ্নের মুখে। প্রয়াত মূসা ভাই বলতেন, যখন কলম হাতে নিই তখন আমার সামনে গোটা বাংলাদেশ। দলমত এখানে নেই। যা সত্য তাই লিখবো। যদি না পারি তাহলে ভাববো আমি কম্প্রোমাইজ করছি। এখানে কম্প্রোমাইজ বলতে বোঝায়, আমি নিজেকে সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করাতে পারিনি। সত্য যদি না বলতে পারি তাহলে সাংবাদিকতা না করে আলু-পটলের ব্যবসা করাই ভাল। মূসা ভাই দলের লোক হয়েও কোনদিন সত্যের সঙ্গে আপস করেননি। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত সত্য বলে গেছেন। টেলিভিশন টকশোতে এসে স্বার্থের কাছে নিজেকে বিলিয়ে দেননি। সত্য নির্মম, নিষ্ঠুর। মূসা ভাই আমাদের শিখিয়ে গেছেন সত্য বলতে না পারলে চুপ করে বসে থাকো। দেখবে সময় তোমাকে বাধ্য করবে কথা বলতে বা লিখতে। প্রয়াত আরেকজন শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক ফয়েজ ভাই তো ‘সত্য বাবু মারা গেছেন’ শিরোনামে বই লিখে গেছেন। তিনি মারা গেছেন অনেকদিন হয়ে গেল। অতীতের অভিজ্ঞতা দিয়ে বই লিখেছেন। এখন বেঁচে থাকলে কি লিখতেন তা আল্লাহ মালুম। তবে অনুমান করি, চুপ করে বসে থাকতেন না। এই দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে তার অবদান চির স্মরণীয় হয়ে আছে। নব্বই দশকে যখন এরশাদবিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে তখন দুই নেত্রী নিরাপদ দূরত্বে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। জনদাবি ছিল দুই নেত্রীকে এক করার। অন্তত এক টেবিলে বসানোর। দেশী-বিদেশী অনেক চেষ্টা যখন ব্যর্থ হলো তখন শ্রদ্ধেয় ফয়েজ ভাই উদ্যোগী হয়ে সফল হয়েছিলেন। তখনও সাংবাদিকদের মধ্যে রাজনীতি ছিল। নোংরা দলবাজি ছিল না। কর্তৃত্ববাদী শাসনের দিকে দেশ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা সবাই তাকিয়ে দেখছি। কিছু বলছি না। লিখছি না। বিদেশী গণমাধ্যমের মূল্যায়ন ছেপে নিজেদেরকে ধন্য ভাবছি। তা-ও আবার সবাই নয়। ক্রিকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার মুখের ওপর আমরা অনেক কিছু বলতে পারতাম। কিন্তু আমরা যে পত্রিকায় সাক্ষাৎকার দিয়ে নিজেরাই বলেছি- এখানে জঙ্গি আছে।
যাই হোক, মূসা ভাই বা ফয়েজ ভাই ছিলেন ব্যতিক্রম। যে দিন খালেদা জিয়া শেখ হাসিনার সংলাপ প্রস্তাবকে শর্তের জালে আটকে দিলেন, সেদিন মূসা ভাই বলেছিলেন, এ কি করলেন খালেদা। সুযোগ হাতছাড়া করে দিলেন! হতে পারে এটা ছিল কূটচাল। তাতে কি? আরেকটা চাল তিনি দিতে পারতেন। দাবার গুটি তো চলমান থাকে না। রাজার সামনে যখন আর চাল থাকে না তখন তো কিস্তিমাত। নতুন করে খেলতে হয়। দাবার পরিভাষায় যাকে বলা হয় চেকমেট। শেখ হাসিনা এক চালেই সব উড়িয়ে দিতে পারবেন তিনিও হয়তো তখন ভাবেননি। কথাও নয়। কারণ রাজনীতি বড় জটিল। মুহূর্তেই রঙ বদলায়। বলে রাখা ভাল, আওয়ামী লীগের নেতারাও দুশ্চিন্তায় ছিলেন। অনেকেই পরিবারের অনেক সদস্যকে বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। কানাডার বেগমপাড়ার খ্যাতি সেখান থেকেই। প্রশাসনিক অনেক কর্মকর্তার ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছিল। যাই হোক, নেতাদের ছিল অন্তহীন ভাবনা। যদি খালেদা রাজি হয়ে যান। আর বলেন, আমি সংলাপে রাজি। নির্বাচনেও যাবো। তবে শর্ত হচ্ছে নির্বাচনটা হবে জাতিসংঘের সরাসরি তত্ত্বাবধানে। তখন শেখ হাসিনা বিপদেই পড়ে যেতেন। চেকমেট হয়ে যেতো সরকার। দুনিয়াকে কি বোঝাতেন শেখ হাসিনা। দেশের মানুষও বলতো, খালেদা রাজি হয়েছেন তার অধীনে নির্বাচনে যেতে। জাতিসংঘের কথা নাকচ করতেন কিভাবে। রাজনৈতিক পণ্ডিতরা এখন বলছেন, হাসিনা ঠিকই জানতেন খালেদা তার প্রস্তাবে রাজি হবেন না। কারণ, বিএনপির ভেতরে আওয়ামী লীগের অনেক শেয়ার হোল্ডার রয়েছেন। যারা শেয়ার হোল্ডার নন, তারা ভূমিকা রাখবেন। ঠিকই রেখেছিলেন। এখন তো বিএনপি নেতারাই কবুল করেন একবাক্যে। সে জন্যই হয়তো জীবনের অনেক ঝুঁকিপূর্ণ চালটা হাসিনা দিয়েছিলেন। একেই বলে রাজনীতি। এ যেন চার গোলে হেরে খেলায় ফিরে আসার এক অনন্য নজির। সেদিন গণতন্ত্র ঝুঁকিতে পড়েছিল। কেউ কেউ বলেন মহাসংকট। এই সংকট থেকে কে উদ্ধার করবে? রাষ্ট্রের বিবেক বলে যারা পরিচিত তারা কি করবেন? তারা কি নীরব দর্শক হয়ে থাকবেন। একটা দেশ যখন রাজনীতিশূন্য হয়ে যায় তখন বিপদ আসতে থাকে চারদিক থেকে। সবকিছু রাজনীতিকদের ওপর ছেড়ে দেয়ার পরিণতি কি হয় আমরা বারবার প্রত্যক্ষ করছি দেশে দেশে। দিনের শেষে নাগরিক সমাজ এগিয়ে আসে। দুর্ভাগ্য হচ্ছে আমাদের নাগরিক সমাজ বিভাজনের কবলে পড়ে একদম কাবু। অন্যের ওপর দোষ চাপিয়ে তারা অন্ধকারকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন।

কুতুবদিয়া হবে লবণ শিল্প নগরী

কুতুবদিয়াকে লবণ শিল্প নগরী হিসেবে গড়ে তোলা হবে বলে জানিয়েছেন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু। ইতোমধ্যে এ নিয়ে সরকার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে কাজও শুরু হবে বলে জানান তিনি।
বৃহস্পতিবার বেলা ১টার দিকে কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত লবণ চাষীদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে মন্ত্রী এ কথা জানান।
লবণ শিল্প নিয়ে অতীতের কোনো সরকার কোনো কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করেনি উল্লেখ্য করে শিল্পমন্ত্রী বলেন, ‘সরকার নীতিগতভাবে লবণ আমদানির পক্ষে নয়। কিন্তু এ মওসুমে বিশেষ কারণে যে লবণ আমদানি করার কথা ছিল তার এক-তৃতীয়াংশ লবণ আমদানি করা হতে পারে। তবে তাও চূড়ান্ত নয়।’
লবণ চাষীদের মান উন্নয়নে চাষীদের জন্য প্রশিক্ষণের পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে। লবণ চাষীরা যাতে নায্য মূল্য পায় তার দিকে নজর রেখেছে। তিনি চাষীদের আরও বেশি লবণ উৎপাদনের পরামর্শ দেন মন্ত্রী।
এর আগে একই স্থানে বেলা ১১টার দিকে শুরু হয় জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটি সংক্রান্ত একটি বিশেষ বৈঠক। বৈঠকে জেলার সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে মন্ত্রী কথা বলেন।
এসব বৈঠকে এমপি আশেক উল্লাহ রফিক, সাইমমু সরওয়ার কমল, আওয়ামী লীগ নেতা, প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

লেবার পার্টির ‘ছায়া সরকারে’ টিউলিপ

বৃটেনের বিরোধী দল লেবার পার্টির ছায়া সরকারে স্থান পেয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাতনি টিউলিপ সিদ্দিক। তিনি সংস্কৃতি, গণমাধ্যম ও ক্রীড়া বিষয়ক শ্যাডো মিনিস্টার মাইকেল ডুগারের স্থায়ী ব্যক্তিগত সচিবের (পিপিএস) দায়িত্ব পেয়েছেন, যা সামনের কাতারে দায়িত্ব পালনের আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রথম ধাপ।   টিউলিপের দপ্তরের একজন মুখপাত্র শনিবার বলেন, “তিনি সংস্কৃতি, গণমাধ্যম ও ক্রীড়া বিষয়ক ছায়া মন্ত্রণালয়ে কাজ করবেন। সরকারের ওই দপ্তরের ওপর নজরদারি ও পার্টির নীতিকে সামনে এগিয়ে নেওয়াই হবে এ দলের কাজ।” ৩২ বছর বয়সী টিউলিপ সিদ্দিক বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহানার মেয়ে। চলতি বছর ৭ মে অনুষ্ঠিত বৃটিশ পার্লামেন্ট নির্বাচনে লন্ডনের হ্যাম্পস্টেড অ্যান্ড কিলবার্ন আসন থেকে তিনি এমপি নির্বাচিত হন। ভোটে জয়ী হয়ে বৃটিশ পার্লামেন্টের সদস্য হন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানার মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিক। লেবার পার্টির প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তিনি। দলের নেতৃত্ব নির্বাচনে টিউলিপ সমর্থন দিয়েছিলেন অ্যান্ডি বারহ্যামকে, যাকে ছায়া মন্ত্রিসভায় হোম সেক্রেটারির দায়িত্ব দিয়েছেন লেবার নেতা জেরেমি করবিন।   গত নির্বাচনে লন্ডন থেকে যে তিন বাঙালি কন্যা এমপি নির্বাচিত হয়েছেন, তাদের মধ্যে কেবল টিউলিপের নামই করবিনের ছায়া সরকারে এসেছে। লন্ডনের ক্যামডেনের কাউন্সিলর থাকাকালে টিউলিপ কাউন্সিল সংস্কৃতি ও ক্রীড়া বিষয়ক কেবিনেট সদস্য ছিলেন।   এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর নারী ও সমতা বিষয়ক যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টারি সিলেক্ট কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন টিউলিপ সিদ্দিক।– ওয়েবসাইট

শিক্ষক, শিক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম by গোলাম ফারুক

বহুদিন আগে একটা গল্প পড়েছিলাম। আমি নিজে ছাপোষা শিক্ষক বলে শিক্ষক-সম্পর্কিত ঘটনাটা ঠিকই মনে আছে। কোনো এক অজপাড়াগাঁয়ে এক হতভাগা শিক্ষক ছাত্র পড়ানোর কাজ পেলেন। ছাত্রদের বাগানের লাউটা-মুলাটা ছাড়াও পারিতোষিক হিসেবে সামান্য কিছু অর্থপ্রাপ্তি হতো বলে কষ্টেসৃষ্টে তাঁর দিন চলে যেত। এই স্বল্প বেতনটুকুও যে তিনি নিয়মিত পেতেন তা নয়, তবু ঘাড় গুঁজে নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি তাঁর কাজ করে যাচ্ছিলেন।
কয়েক মাস ওঁর গোবেচারা স্বভাব লক্ষ করে গ্রামের বুদ্ধিমান মাতব্বরটির মনে হলো যে বেতন না দিয়েও তো ওঁকে দিয়ে বেগার খাটানো যায়। বেতন বন্ধ হলো। মাতব্বরটি যা ভেবেছিলেন তা-ই। তিনি প্রতিবাদ করেন না, যানও না। পেটেভাতে থাকেন আর ছাত্র পড়ান। এর বেশ কিছুদিন পর, বলা নেই কওয়া নেই, বাক্স-পেটরা নিয়ে একদিন তিনি হঠাৎ উধাও। তাতে যে কোনো ক্ষতি বৃদ্ধি হলো, তা নয়। চতুর মাতব্বর কয়েক দিনের মাথায় আরেকজন শিক্ষক জোগাড় করে ফেললেন। কিন্তু মাথায় হাত পড়ল সেদিন, যেদিন নতুন শিক্ষক দেখলেন, ছেলেমেয়েরা সব বর্ণমালা উল্টো করে লেখে। ওদের এভাবেই শেখানো হয়েছে; পুরোনো গোবেচারা শিক্ষকটি এভাবেই বেগার খাটানোর প্রতিশোধ নিয়ে গেছেন।
বেচারা শিক্ষকের প্রসঙ্গ আপাতত থাক। তার আগে ১৯৭০ দশকের সমাজতত্ত্ববিদ ওয়ালরস্টাইনের চোখ দিয়ে গোটা শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে অর্থনীতির সম্পর্কটা একটু ঝালিয়ে নিই। ওয়ালরস্টাইন বলেছেন, পৃথিবী তিন ভাগে বিভক্ত। সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ হচ্ছে ‘সেন্টার’, যা গঠিত হয় উন্নত রাষ্ট্রগুলো দিয়ে। সবচেয়ে দুর্বল অংশ হচ্ছে ‘পেরিফেরি’, যেখানে দরিদ্র দেশগুলো অবস্থান করে। আর মাঝখানের জায়গাটা হচ্ছে ‘সেমি–পেরিফেরি’, যার প্রায় সব কটি রাষ্ট্র ‘পেরিফেরি’ থেকে উঠে এসে অনিবার্যভাবে যত দ্রুত সম্ভব ‘সেন্টারের’ দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
এখন দেখা যাক, যে উন্নত রাষ্ট্রটি ‘সেন্টারে’ যায়, তা কীভাবে যায় বা টিকে থাকে। ওয়ালরস্টাইন বলছেন, তার আসল জোরটা শিক্ষায়, গবেষণায়, আবিষ্কারে। তারা এসব ক্ষেত্রে প্রভূত বিনিয়োগ করে বাজারে একেবারে আনকোরা নতুন পণ্য ছেড়ে একচেটিয়া ব্যবসা করে। একচেটিয়া ব্যবসার থলথলে মুনাফা ছাড়া ‘কেন্দ্রে’ টিকে থাকা যায় না। ফলে, নতুন পণ্যটির উৎপাদন-কলাকৌশল যখন জানাজানি হয়ে যায়, তখন তাদের আরেকটি পণ্য আবিষ্কার করতে হয়। সে জন্য সেখানে শিক্ষায় বিপুল বিনিয়োগ একটি অনিবার্য ও নিরন্তর প্রক্রিয়া।
উল্টো দিকে কিছু রাষ্ট্র ‘পেরিফেরিতে’ পড়ে থাকে, কারণ তাদের অদক্ষ শ্রম ও সামান্য কিছু প্রাকৃতিক সম্পদ ছাড়া বলতে গেলে আর কিছুই নেই। তবু এখান থেকে কিছু রাষ্ট্র যে ‘সেমি–পেরিফেরিতে’ যেতে পারে, তার কারণ তাদের শ্রমদক্ষতার উন্নয়ন। শ্রমদক্ষতার পূর্বশর্ত যেহেতু শিক্ষা, তাই যারাই ‘সেমি-পেরিফেরিতে’ গেছে বা যেতে চাইছে, তারাই সাধ্যমতো বা কখনো সাধ্যের বাইরে গিয়ে শিক্ষায় বিনিয়োগ করছে। যেমন: মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, কিউবা ইত্যাদি। এমনকি সৌদি আরবের মতো দেশ প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও বাজেটের বৃহদংশ ব্যয় করে শিক্ষায়। এ তো গেল বাংলাদেশের চেয়ে যাদের জিডিপির আকার বড়, তাদের কথা। বাংলাদেশের চেয়ে দরিদ্র অনেক দেশও এ ব্যাপারে অনেক এগিয়ে গেছে। যেমন: উগান্ডা তার বাজেটের ১৬ শতাংশ, টোগো ১৭, বুরুন্ডি ২২, লেসেথো ২৪ ও তাঞ্জানিয়া ২৬ শতাংশ শিক্ষার জন্য ব্যয় করে। অথচ বাংলাদেশ, যা ২০২১ সালে ‘সেমি-পেরিফেরিতে’ ঢোকার আশা করে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করেছে তার বাজেটের মাত্র ১০ দশমিক ৭ শতাংশ, যা জিডিপির ২ শতাংশ।
অবশ্য বাজেট বেশি হলেই যে শিক্ষা উন্নত হবে বা সে কারণে অর্থনীতি শক্তিশালী হবে, তার নিশ্চয়তা নেই। বিশ্বব্যাংকের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা–বিষয়ক এক প্রতিবেদনের ‘ইকোনমিক রিটার্নস টু ইনভেস্টমেন্ট ইন এডুকেশন’ অধ্যায়ে বলা হয়েছে, অনেক দেশেই শিক্ষা-বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক উন্নতির মধ্যে পজিটিভ কোরিলেশন পরিলক্ষিত হয়নি। এর কারণ, বিনিয়োগ হয়েছে শিক্ষার প্রসারে, মানে নয়। কোথাও হয়তো অনেক আয়োজন করে ছাত্রদের শুধু মুখস্থ করার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু উন্নত চিন্তা-দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি করা হয়নি; কোথাও হয়তো ঝোঁকটা ছিল শুধু ছাত্রসংখ্যা বাড়ানোর দিকে, কিন্তু শিক্ষককুল রয়ে গেছেন আগের মতো অদক্ষ, অপ্রতুল, অবহেলিত, নিম্ন আয়ের ‘গোবেচারা’ আজ্ঞাবাহক।
বাংলাদেশ ২০২১ ও ২০৪১ সালে যথাক্রমে ‘সেমি–পেরিফেরি’ ও ‘সেন্টারে’ যাওয়ার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে সে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে এবং শিক্ষা-বিনিয়োগও বাড়াচ্ছে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, তা জিডিপির আকার অনুযায়ী বাড়ছে না। ২০০৯-১০ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ছিল বাজেটের ১৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ, সেখান থেকে পরের বছর কমে হলো ১৩ দশমিক ৬১, তারপর ক্রমান্বয়ে ১৩ দশমিক ১৩, ১২ দশমিক ৩২, ১১ দশমিক ৫৮, ১১ দশমিক ৭ এবং সর্বশেষ এ বছর তা কমে দাঁড়ায় ১০ দশমিক ৭ শতাংশে। ফলে বলা যায়, অর্থনৈতিক অগ্রগতির তুলনায় শিক্ষায় বিনিয়োগ ক্রমাগত পিছিয়ে যাচ্ছে।
এখন কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, তাতে কী এমন ক্ষতি হচ্ছে? শিক্ষার যেটুকু উন্নতি হচ্ছে, তাতেই তো নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা পেয়েছে বাংলাদেশ। খাঁটি কথা। কিন্তু ভবিষ্যতে কি এই গতি ধরে রাখা যাবে? জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যাবে না। তাঁদের মতে, সন্তোষজনক অগ্রগতি চাইলে, অর্থাৎ একটি দেশের জনশক্তিকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে চাইলে তার জিডিপির ৬ শতাংশ বা বার্ষিক বাজেটের ২০ শতাংশ শিক্ষায় ব্যয় করা উচিত। এর কম হলেই যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হবে না তা নয়—বাংলাদেশ তার প্রমাণ—কিন্তু টেকসই উন্নয়ন চাইলে অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে সমান্তরালভাবেই শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
এবার দেখা যাক জিডিপির যে সামান্য অংশ বাংলাদেশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করে, তা সঠিকভাবে ব্যয় হচ্ছে কি না। সুখের কথা, অনেকটাই হচ্ছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা ‘যুগান্তকারী’ পরিবর্তন আনতে পারে বললেও ভুল হবে না। যেমন: শিক্ষানীতি প্রণয়ন, কারিকুলামের আধুনিকায়ন ও নতুন পাঠ্যপুস্তক তৈরি, বিনা মূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি প্রবর্তন, ডিজিটাল ক্লাসরুম স্থাপন, ই-বুক প্রণয়ন, নারীশিক্ষার প্রসার, মাদ্রাসাশিক্ষা আধুনিকীকরণ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ইত্যাদি। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি, যা না হলে উপর্যুক্ত সব অর্জনই শেষ পর্যন্ত অর্থহীন হয়ে পড়বে, সেই শিক্ষকদের বেতন-মান-মর্যাদা বৃদ্ধির কথা নিয়ে সরকার তেমন কিছু করছে না। অবশ্য একেবারে ভাবছে না বললে ভুল হবে। শিক্ষামন্ত্রী বারবারই এ প্রসঙ্গ তোলেন, কিন্তু বাজেটে তার প্রতিফলন ঘটে না।
শিক্ষকদের বেতন-মান-মর্যাদা বৃদ্ধি না হলে শিক্ষাক্রমের আধুনিকায়ন যে কার্যকর হয় না, তার অন্তত দুটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। যেমন ইংরেজি শিক্ষার ক্ষেত্রে কমিউনিকেটিভ অ্যাপ্রোচ চালু এবং প্রশ্নের ক্ষেত্রে সৃজনশীল পদ্ধতি প্রবর্তন—এই চমৎকার উদ্যোগগুলো উপযুক্ত শিক্ষকের অভাবে শুধু যে মাঠে মারা যাচ্ছে তা নয়, শিখন-শেখানোর প্রক্রিয়াতেও তা বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এ কথা এখন প্রায় কেউই অস্বীকার করেন না যে বাংলাদেশে শিক্ষার ‘প্রসার’ সন্তোষজনক। কিন্তু ‘মান’ নিয়ে যে দ্বিমত আছে, তা এ কারণেই। শিক্ষকেরা ক্লাসে পড়াতে পারছেন না, এমনকি ঠিকমতো প্রশ্নও করতে পারছেন না, ফলে দায় এড়ানোর জন্য পরীক্ষার খাতায় বেশি বেশি নম্বর দিয়ে ছাত্রদের খুশি করে নিজেরা নিরাপদে থাকছেন।
শিক্ষাক্ষেত্রে যেসব উল্লেখযোগ্য সাফল্য ইতিমধ্যে অর্জিত হয়েছে, তা অর্জন করতে শিক্ষকদের সাহায্যের প্রয়োজন হয়নি। এসব কাজ আমলা, দেশপ্রেমিক বুদ্ধিজীবী বা বিদেশি কনসালট্যান্টরাই করেছেন। কিন্তু এর পরের ধাপ—শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন, নতুন পাঠ্যবই পড়ানো, সৃজনশীল প্রশ্ন তৈরি করা, আধুনিক পদ্ধতিতে পাঠদান করা—তো শিক্ষকদেরই বাস্তবায়ন করতে হবে। সেখানেই সমস্যা। কম বেতনে, বিনা পুরস্কারে এবং নামমাত্র প্রশিক্ষণ নিয়ে ক্লাস উপচে পড়া ছাত্রছাত্রীদের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করা অপ্রণোদিত শিক্ষকদের পক্ষে একেবারে অসম্ভব না হলেও দুরূহ তো বটেই।
শিক্ষকদের এই বেহাল অবস্থা নতুন নয়। প্রায় সব দেশে শিক্ষকেরা চিরকালই অবহেলার শিকার হয়েছেন। কারণ, শিক্ষা কখনো সরাসরি উৎপাদনশীল খাত বলে বিবেচিত হতো না। যখন থেকে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির ধারণা জনপ্রিয় হলো বা শিক্ষা আধুনিক পুঁজিবাদী রাষ্ট্র উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়াল, তখন থেকে রাষ্ট্রগুলো শিক্ষাব্যবস্থার মেরুদণ্ডে (শিক্ষকদের) গুরুত্ব দেওয়া শুরু করল। খোঁজ নিলে দেখা যাবে, উন্নত ও সত্যিকার অর্থে উন্নয়নপিপাসু প্রায় সব দেশ গত কয়েক দশকে শিক্ষকদের বেতন-মান-মর্যাদা প্রায় কয়েক গুণ বৃদ্ধি করেছে। বাংলাদেশ সরকারও যে তা উপলব্ধি করেনি তা নয়, কিন্তু হয় অর্থাভাবে বা অন্য কোনো অজানা কারণে তা বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না।
কিন্তু যেভাবেই হোক, শিক্ষকদের বেতন-মান-মর্যাদা বাড়াতেই হবে। দারিদ্র্য ও অবহেলায় পীড়িত, কুণ্ঠিত, ন্যুব্জদেহ এই শিক্ষককুলের পক্ষে সরকার-পরিকল্পিত আধুনিক শিক্ষার গুরুভার বহন করা সম্ভব নয়। তাঁরা হয়তো জোরেশোরে এর প্রতিবাদ করবেন না। কিন্তু গল্পের সেই ‘গোবেচারা’ শিক্ষকের মতো ক্লাসে না পড়িয়ে, খাতা না দেখে কেবল সোজা প্রশ্ন করে এবং বেশি বেশি নম্বর দিয়ে ছাত্রদের পাস করিয়ে দেবেন—অথর্ব প্রজন্ম তৈরি করে, ইচ্ছায় হোক কিংবা অনিচ্ছায়, নীরবে, নিভৃতে এক নিষ্ঠুর প্রতিশোধ নিয়ে নেবেন।
সবাইকে লক্ষ রাখতে হবে যে এই প্রলয়ংকরী ঘটনা যেন না ঘটে। শিক্ষকেরা যেন মনপ্রাণ দিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলার সুযোগ ও প্রণোদনা পান। একমাত্র তাঁদের তৈরি শিক্ষিত দক্ষ জনশক্তিই বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে পারে।
গোলাম ফারুক: ফলিত ভাষাতত্ত্ববিদ, গবেষক, অধ্যাপক।
faruk.golam@yahoo.com

মিনায় পদদলনের আসল কারণ কী?

মিনায় পদদলিত হয়ে ৭৬৯ জন হাজির মৃত্যুর ঘটনার পর বিশ্ববাসীর মনে এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—আসলে কী ঘটেছিল সেখানে? কেমন করে এত মানুষ পদদলিত হয়ে মারা গেল?
সৌদি সরকার দাবি করে আসছে হজ ব্যবস্থাপনায় তাদের গাফিলতি ছিল না। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বড় জামারায় কঙ্কর মারার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্নের জন্য হজ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ যে গাইডলাইন দিয়েছিল হাজিদের একটা অংশ সে নির্দেশনা মানেনি। ফলে এই ট্র্যাজেডি ঘটে গেছে। তবে ইরান সরকার ও লেবানন ভিত্তিক হিযবুল্লাহসহ বহির্বিশ্বের বিভিন্ন মহল এ ঘটনার জন্য সৌদি সরকারকেই দায়ি করেছে।
হজের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার স্থানগুলোতে গণমাধ্যমের সংবাদ সংগ্রহ করার সুযোগ না থাকায় এ বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের সরবরাহ করা তথ্যের ওপরই মূলত সংবাদকর্মীদের নির্ভর করতে হচ্ছে। এর ফলে ঘটনার কারণ নিরপেক্ষ সূত্রের আলোকে বিশ্লেষণ করা যাচ্ছে না।
তবে প্রত্যক্ষদর্শী ও বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে ঘটনার সম্ভাব্য কারণ সম্পর্কে সিএনএন একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
ওই প্রতিবেদনে সম্ভাব্য কারণ সম্পর্কে বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে হজের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করার বাধ্যবাধকতার কারণে হাজিদের মধ্যে তাড়াহুড়ো ছিল। মিনায় ওই দিন ছিল প্রচণ্ড গরম আবহাওয়া। যেদিকে যাওয়ার কথা অনেকে তার বিপরীত দিকে যাওয়ায় মুখোমুখি অবস্থার কারণে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। আবার প্রথমবারের মতো হজে যাওয়া হাজিদের অনেকে খানিকটা বিভ্রান্ত ছিলেন।
সাংবাদিক ও ব্লগার ইথার আল-কাতানি হজে গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, অনেকে যে পথে যাওয়ার কথা তার বিপরীত দিক দিয়ে গিয়ে ঠেলাঠেলিতে পড়ে যান। অনেকে শয়তানকে পাথর মারার দিকে যাচ্ছিলেন। আবার অনেকে পাথর নিক্ষেপ শেষে বিপরীত দিকে ফিরে আসছিলেন।
আহমেদ মোহাম্মদ আমির নামের এক হাজি বলেন, ‘একটি দল ২০৪ নম্বর সড়ক দিয়ে যাচ্ছিল। এ সময় বিপরীত দিক থেকে আরেকটি দল ২০৬ সড়ক থেকে এই পথে চলে আসে। এ সময় বিপরীতমুখী দুটি দলের মধ্যে প্রচণ্ড ধাক্কাধাক্কি হয়। এর পর কী হয়েছিল, আমি তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না। এই প্রচণ্ড ধাক্কাধাক্কিতে হতাহতের সংখ্যা অনেক বেশি বেড়ে যায়।’
ঘটনার পর উদ্ধারকাজ শুরু হতে বেশ দেরি হয় বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, অ্যাম্বুলেন্স আর সাইরেনের শব্দে গোটা এলাকায় ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এই প্রচণ্ড গরমে ধাক্কাধাক্কিতে যখন কেউ পড়ে যাচ্ছিল, অন্যরা তার ওপর দিয়েই চলে যাচ্ছিল। এভাবেই ঘটে পদদলনের ঘটনা। এর সঙ্গে তিনি যোগ করেন, মিনায় শয়তানকে লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপের জন্য খুব একটা সময় দেওয়া হয়নি। সময় স্বল্পতা হাজিদের মধ্যে এক ধরনের চাপ সৃষ্টি করে।
সাংবাদিক খালেদ আল মায়েনার মতে, ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্নে হাজিদের তাড়া থাকার বিষয়টি এই দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। বেশির ভাগ হাজি সকাল সকাল শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করার আনুষ্ঠানিকতাটা সম্পন্ন করে ফেলতে চেয়েছিলেন। সেই তাড়াই শেষ পর্যন্ত কাল হয়ে দাঁড়াল।
এ ব্যাপারে সাংবাদিক ও ব্লগার ইথার আল-কাতানি বলেন, ওই দিন ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ছিল। দীর্ঘ সময় এই রোদে কেউ থাকলে শরীর থেকে ঘাম ঝরতে ঝরতে তার মূর্ছা যাওয়াটা ছিল স্বাভাবিক বিষয়। নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমি ছবি তোলা, ভিডিও ধারণের জন্য ঘণ্টা দুয়েক ওই রোদে দাঁড়িয়েছিলাম। আমার মনে হচ্ছিল, আমি যে কোনো সময় মূর্ছা যাব।’ রোদে ক্লান্ত হয়ে পড়া হাজিদের মধ্যে যারা একবার পড়ে গেছেন, ভিড়ের মধ্যে তাদের পক্ষে আর দাঁড়ানো সম্ভব হয়নি বলে তিনি জানান।
সৌদি আরবের আল-আরবিয়া টেলিভিশনের জামাল খাসোগি বলেন, হজে চলাচলের ব্যবস্থাটা এমন যে, কোনো একটি দল যদি ভুল দিকে যেতে থাকে সেখানে বিপর্যয় না হয়ে আর কোনো উপায় থাকে না।
সৌদির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিরাপত্তা-বিষয়ক মুখপাত্র মেজর জেনারেল মনসুর আল তুর্কি বলেন, কিছু হাজি সম্ভবত চলাচলের জন্য নির্দেশিত পথ অনুসরণ করেননি। তাঁরা নিজেদের মতো পথে চলেছেন কিংবা সংক্ষিপ্ত কোনো পথ ধরে গন্তব্যে পৌঁছাতে চেয়েছিলেন। এ থেকেই দুর্ঘটনাটা ঘটে।

পবিত্র হজের সময় যত প্রাণহানি

সৌদি আরবের মিনায় হজের শেষ পর্যায়ের আনুষ্ঠানিকতার সময় শয়তানকে লক্ষ্য করে প্রতীকী পাথর ছুড়তে যাওয়ার সময় পদদলিত হয়ে প্রায় আট শ হাজির মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন দেশ-বিদেশের বেশ কয়েক শ হাজি।
সারা বিশ্ব থেকে এবার ২০ লাখের মতো মুসলমান হজ পালন করেন। এর আগেও হজ পালন করতে গিয়ে নানা সময়ে পদদলিত হওয়াসহ বিভিন্ন কারণে হাজিদের মৃত্যু হয়েছে। নিচে এর একটি তালিকা দেওয়া হলো:
১৯৯০ সালে: মক্কায় পদদলিত হয়ে ১ হাজার ৪২৬ জন হাজির মৃত্যু
১৯৯৪ সালে: মিনায় শয়তানকে লক্ষ্য করে পাথর ছুড়ে মারার সময় ২৭০ জন হাজির মৃত্যু
১৯৯৭ সালে: মিনায় হাজিদের থাকার তাঁবুতে আগুন লেগে ৩৪০ জনের মৃত্যু। এ ঘটনায় ১ হাজার ৫০০ জন আহত হন
১৯৯৮ সালে: মিনায় শয়তানকে লক্ষ্য করে পাথর ছুড়ে মারার সময় ১৮০ জন হাজির মৃত্যু হয়। পদদলিত হয়ে এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে
২০০১ সালে: মিনায় পদদলিত হয়ে ৩৫ জনের মৃত্যু
২০০৪ সালে: হজ চলাকালে ২৪৪ জন হাজির মৃত্যু এবং শতাধিক আহত
২০০৬ সালে: মিনায় শয়তানকে পাথর নিক্ষেপের সময় দুর্ঘটনায় ৩৬০-এর বেশি হাজির মৃত্যু
২০১৫ সালে: এ বছরের ১১ সেপ্টেম্বর হজ চলাকালে মক্কায় মসজিদুল হারামে নির্মাণকাজে ব্যবহৃত ক্রেন ভেঙে পড়ে ১১১ জন নিহত হন। এ ঘটনায় আহত হন আরও ৪০০ জন।
সূত্র: পাকিস্তানের বহুল প্রচারিত ডন পত্রিকা

বাশারের পতন রুখতেই সিরিয়ায় রুশ সহযোগিতা: ইইউ পররাষ্ট্রনীতি প্রধান মগেরিনি

সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ সরকারের পতন রুখতেই রাশিয়া দেশটিতে তার সামরিক সহযোগিতা বাড়িয়ে দিয়েছে। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সার্গেই লাভরভের সঙ্গে আলোচনার সূত্র ধরে এ কথা বলেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্রনীতি-বিষয়ক প্রধান ফেদেরিকা মগেরিনি। এদিকে সিরিয়া সংঘাতের সমস্যার সমাধান খুঁজতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন গত শনিবার সৌদি বাদশাহ সালমানের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। খবর আল-জাজিরা ও এএফপির।
মিত্র রাশিয়া কিছুদিন ধরে সিরিয়ায় নতুন সামরিক অস্ত্রসরঞ্জাম ও বিশেষজ্ঞ সহায়তা পাঠাচ্ছে। শনিবার দেশটি সিরিয়ার বন্দর শহর লাটাকিয়ায় ৫০০ সেনা পাঠায়। এ বিষয়ে মগেরিনি আল-জাজিরাকে বলেন, রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁকে বলেছেন, সিরিয়া সরকারের পতন রুখতে চায় পুতিন সরকার। মগেরিনি আরও বলেন, তাঁর (লাভরভ) আশঙ্কা সিরিয়ার রাষ্ট্রব্যবস্থা পুরো ধ্বংসের মুখে। আর সেটিই দেশটিতে রাশিয়ার সেনা পাঠানোর অন্যতম কারণ। আবার রাশিয়া হয়তো নিজেদের গুরুত্বকেও তুলে ধরতে চায়।
সিরিয়াকে দেওয়া রাশিয়ার সাম্প্রতিক সামরিক সহায়তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির কিছুটা টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে। নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ নেতাদের বৈঠকেও বাশার আল-আসাদের বিষয়ে অবস্থান নিয়ে বিভক্তি দেখা দেয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ সিরিয়ার সংকটের সমাধান খুঁজতে ইরানের সহযোগিতা চেয়েছে।
এদিকে রুশ প্রেসিডেন্টের দপ্তর ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, বিশেষ করে সিরিয়ার সংকটের সমাধান খুঁজতে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সৌদি বাদশাহ সালমানের সঙ্গে কথা বলেছেন। দুই নেতা জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটসহ (আইএস) সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করেন।
তবে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থার পক্ষ থেকে ওই টেলিফোন আলাপের কথা নিশ্চিত করা হলেও বলা হয়েছে, পুতিন সৌদি বাদশাহকে ঈদের শুভেচ্ছা জানান। এ ছাড়া পবিত্র হজ পালনের সময় পদপিষ্ট হয়ে নিহত হওয়ার ঘটনায় শোক প্রকাশ করেন।
সিরিয়ায় আইএসের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে চলমান বিমান হামলায় সৌদি আরবও অংশ নিয়েছে। তবে বাশার সরকারকে কোনো সহায়তা করতে রাজি নয় দেশটি। মনে করা হচ্ছে, আজ সোমবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সিরিয়া নিয়ে রাশিয়ার অবস্থানের বিষয়ে বক্তব্য দেবেন পুতিন।
বাশারকে আপাতত থাকতে দেওয়ার পক্ষে ক্যামেরন: এদিকে রয়টার্স জানায়, যুক্তরাজ্যের সানডে টেলিগ্রাফ পত্রিকা গতকাল খবর দিয়েছে, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন স্বল্প মেয়াদে বাশারকে ক্ষমতায় থাকতে দেওয়ার পক্ষে। এ সময়ের মধ্যে দেশটিতে একটি ঐকমত্যের সরকার গঠন করা যাবে। সরকারের একটি বেনামী সূত্র উল্লেখ করে পত্রিকাটি লিখেছে, ‘ক্যামেরন মনে করেন, প্রেসিডেন্ট বাশার আসাদকে ক্ষমতায় রেখে সিরিয়ার মানুষ ঘরে ফিরতে পারে—দেশটির এ রকম দীর্ঘমেয়াদি, স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ নেই।’
বাশার আসাদের সঙ্গে কোনো ধরনের সংলাপে না যাওয়ার এত দিনের মার্কিনসহ পশ্চিমা নীতি থেকে ক্রমেই সরে যাচ্ছেন ব্রিটিশ সরকারি কর্মকর্তারা। এতে করে চার বছরের বেশি সময় ধরে চলা গৃহযুদ্ধের পর সিরীয় নেতার ভূমিকা নিয়ে ইউরোপের প্রধান শক্তিগুলোর মধ্যে মতপার্থক্যই ফুটে উঠেছে। জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেলও গত সপ্তাহে বলেন, অনেক পক্ষের সঙ্গেই কথা বলা উচিত, যার মধ্যে থাকবেন আসাদও।

সিলেটের রেজাউলকে ঘিরে রহস্যের জাল by ওয়েছ খছরু

সিলেটে নিখোঁজের ১৭ দিন পর উদ্ধার হওয়া রেজাউলকে নিয়ে এলাকায় রহস্য ঘনীভূত হচ্ছে। ইতিমধ্যে রেজাউল আদালতে দেয়া স্বেচ্ছায় জবানবন্দিতে জানিয়েছেন, ঋণগ্রস্ত হওয়ার কারণে তিনি নিজ থেকেই আত্মগোপনে ছিলেন। আদালতে দেয়া রেজাউলের বক্তব্য মেনে নিতে পারছেন না এলাকাবাসী। তার মানসিক অবস্থা এখনও বিপর্যস্ত বলে দাবি তাদের। রেজাউলের মনে ভয় ঢুকে গেছে। তিনি মুখ খোলে কিছু বলতে চাচ্ছেন না। এ কারণে শনিবার স্থানীয় এলাকাবাসী রেজাউলকে ডেকেছিলেন। তাদের সামনে রেজাউল একই কথা বলেছেন। এলাকাবাসীর ধারণা, রেজাউল নিখোঁজের বিষয়টি এখনও রহস্যময়। সে এখনও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। সে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠলে তবেই বেরিয়ে আসতে পারে আসল কাহিনী। সাহেববাজারের স্থানীয় সমিতির সভাপতি মতিউর রহমান গতকাল জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায়ই রেজাউল বাড়ি চলে যায়। এরপর থেকে টানা দুই দিন সে ঘুমিয়ে কাটিয়েছে। শনিবার এলাকাবাসী তাকে ডেকেছেন। ওখানে সে এসেছে। তিনি বলেন, এখনও পুরোপুরি সুস্থ নয় রেজাউল। এ কারণে তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হবে। তিনি বলেন, রেজাউল তার বন্ধুকে ২০ হাজার টাকা দিয়েছে বলে জানিয়েছে। কিন্তু এখন সে সুমনের কোন ফোন নাম্বার দিচ্ছে না। ফলে তার বক্তব্য নিয়ে রহস্য থেকেই যাচ্ছে। রেজাউল করিম সিলেটের সালুটিকরের এফআইভিডিবির মাঠকর্মী। রেজাউল করিম ৬ই সেপ্টেম্বর প্রতিদিনের মতো কিস্তির টাকা তুলতে গোয়াইনঘাটের পাইকরাজ গ্রামে যায়। সেখানে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এরপর অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তাকে পাওয়া যায়নি দীর্ঘ ১৬ দিন। অবশেষে গত বুধবার রাতে রেজাউলকে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা থেকে উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারের পর বৃহস্পতিবার দুপুরে সিলেটের আদালতে হাজির করা হয় রেজাউলকে। ওখানে দেয়া জবানবন্দিতে সে জানিয়েছে, তাকে কেউ অপহরণ করেনি। ঋণে জর্জরিত হয়েই তিনি আত্মগোপণ করেছিলেন। আদালতের কাছে দেয়া জবানবন্দিতে রেজাউল বলেন, ‘আমি এফআইভিডিবির একজন কর্মসূচি সংগঠক। আমার কর্মস্থল সালুটিকরে। আমি অত্যধিক ঋণগ্রস্ত হয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ি। ঋণের মধ্যে কিছু আমার ব্যক্তিগত ও কিছু পারিবারিক। তাই আমি প্রতিষ্ঠানের অর্থ সংগ্রহ করে ৬ই সেপ্টেম্বর গোয়াইনঘাট থেকে বিকাল সাড়ে তিনটায় সিএনজি অটোরিকশাযোগে কানাইঘাট যাই। ওখান থেকে বিয়ানীবাজার যাই। ওই দিনই রাতে বাসে করে চলে যাই ঢাকাতে। তিনি জানায়, ‘৭ই সেপ্টেম্বর ঢাকার কল্যাণপুরে আমার বন্ধু সুমনের পাওনা ২৩ হাজার টাকা পরিশোধ করি। এরপর কমলাপুর রেলওয়ে  স্টেশনে পরপর দুই রাত অবস্থান করি। ওখান থেকে একটি মেইল ট্রেনে করে চলে যাই চট্টগ্রামে। আবার চট্টগ্রাম রেল স্টেশনে তিন রাত অবস্থান করি। ওখান থেকে আসি কুমিরা রেল স্টেশনে। ওখানে কিছুসময় থাকার পর জালালাবাদ ট্রেনে করে ২৩শে সেপ্টেম্বর মাইজগাঁও রেলস্টেশনে আসি। সেখান থেকে পুরানবাজার বিআইডিসিতে গিয়ে বাড়িতে ফোন দিই। পরে পুলিশ আমাকে উদ্ধার করে। ঋণগ্রস্ত হওয়ার কারণে ভেবেছিলাম আর বাড়িতে ফিরে আসবো না। পরে অসহায় বাবা-মার কথা চিন্তা করে আবার বাড়িতে ফিরে আসি।’ বুধবার রাত সাড়ে আটটার দিকে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পুরানবাজার বিআইডিসি থেকে তাকে উদ্ধার করে পুলিশ। সিলেট পুলিশ সুপারের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে নিখোঁজ রেজাউল করিমকে উদ্ধার করে ফেঞ্চুগঞ্জ থানা পুলিশ। বৃহস্পতিবার দুপুরে তাকে আদালতে নেন পুলিশ সদস্যরা। এর আগে ফেঞ্চুগঞ্জ থানা পুলিশ তাকে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে নিয়ে আসে। ওখান থেকেই তাকে আদালতে তোলা হয়। ফেঞ্চুগঞ্জ থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নন্দন কান্তি ধর জানান, রেজাউলের শারীরিক অবস্থা ভাল আছে। তবে তাকে দুর্বল মনে হচ্ছে। তার শরীরে কোন আঘাত ছিল না। উদ্ধারের পর রেজাউল পুলিশের কাছে বলেছিল, ছিনতাইকারীরা তাকে ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানা সংলগ্ন শাহ্‌ মাইয়াম শাহ (রহ.) মাজারের সামনে রাস্তায় ফেলে গেছে। পরে তিনি ওখান থেকে পুরানবাজার এসে মোবাইল ফোনে তার ভাইকে বিষয়টি জানান। তার ভাই পুলিশ সুপারকে বিষয়টি জানালে, পুলিশ সুপার ফেঞ্চুগঞ্জ থানাকে   রেজাউলের বিষয়টি অবগত করেছিলেন। এদিকে, রেজাউলকে ঘিরে এলাকায় রহস্য দেখা দিয়েছে। রেজাউল বাড়ি চলে যাওয়ার পর থেকে নীরব হয়ে রয়েছে। বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার বিকেল পর্যন্ত সে ঘুমিয়েছে। শুধু খাওয়ার সময় তাকে ডেকে তোলা হয়। রাতে সে এলাকাবাসীর ডাকে গেছে। কিন্তু রেজাউল আর আগের মতো নেই বলে জানান তারা। এ কারণে আজকালের মধ্যে তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হবে।

সাদামাটা এক রাজকন্যা

সত্যিকারের রাজকন্যা তিনি। এক বছর ধরে গোপনে বসবাস করে আসছেন বৃটেনের লেইচেস্টারে। অতিরিক্ত মনোযোগ এড়ানোর জন্য আর দশটা মানুষের মতো অনাড়ম্বর জীবনযাপন বেছে নিয়েছেন তিনি। তিনি জাপানের প্রিন্সেস মাকো অব আকিশিনো। নিজ দেশে ব্যাপক জনপ্রিয় এ রাজকন্যা। সেখানে তার জীবনযাত্রা বিলাসবহুল। জনসমক্ষে বের হলে মানুষের চোখের আড়াল হওয়ার সুযোগ সেখানে নেই। বৃটেনে তিনি এসেছিলেন উচ্চশিক্ষা গ্রহণে। ‘আর্ট মিউজিয়াম অ্যান্ড গ্যালারি স্টাডিজ’ বিষয়ে তিনি মার্স্টার্স সম্পন্ন করতে ভর্তি হন ইউনিভার্সিটি অব লেইচেস্টারে। এখানে অন্য শিক্ষার্থীদের ভিড়ে অনেকটা প্রকাশ্যে গোপন রেখেছেন নিজের রাজপরিচয়। পড়াশোনা চলাকালে আর দশটা শিক্ষার্থীর মতো ডরমেটরিতে থেকেছেন। মিররের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ রাজকন্যার ঘটনা। প্রিন্সেস মাকো প্রিন্স আকিশিনো ও প্রিন্সেস কিকোর জেষ্ঠ কন্যাসন্তান। তার দাদা-দাদি হলেন জাপানের সম্রাট আকিহিতো ও সম্রাজ্ঞী মিচিকো। বৃটেনে পড়াশোনার জন্য প্রিন্সের মাকো এর আগেও এসেছেন। ২০১০ সালে ডাবলিন ইউনিভার্সিটি কলেজে ইংরেজি নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। ২০১২ সালে ইউনিভার্সিটি অব এডিনবরায় পড়াশোনা করেছেন। মাস্টার্স সম্পন্ন করে সম্প্রতি জাপানে ফিরে গেছেন প্রিন্সেস মাকো। এখন মাস্টার্সের ফলের জন্য অপেক্ষা করছেন তিনি। ইউনিভার্সিটি অব লেইচেস্টারের প্রেসিডেন্ট ও ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর পল বয়েল সম্প্রতি গিয়েছিলেন জাপান সফরে। সেখান থেকে ফিরে তিনি বলেন, প্রিন্সেস মাকো পড়াশোনার জন্য আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেছে নেয়ায় আমরা খুশি। আমার বিশ্বাস তিনি লেইচেস্টারে দারুণ সময় পার করেছেন। ভবিষ্যতেও বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে প্রিন্সেস মাকো সম্পৃক্ততা রাখবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

প্রমিথির মৃত্যু নানা প্রশ্ন

রাজধানীর ইস্কাটনে সরকারি কোয়ার্টারে যুগ্ম সচিবের ফ্ল্যাট থেকে তার বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া মেয়ের লাশ উদ্ধার করেছে রমনা থানা পুলিশ। মৃতের নাম প্রমিথি রহমান (২৫)। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ছিলেন। শনিবার মধ্যরাতে ফ্ল্যাট থেকে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠায় পুলিশ। প্রমিথির মা আলম আরা প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব। মেয়ে প্রমিথিকে নিয়ে তিনি ইস্কাটনের সরকারি অফিসার্স কোয়ার্টারের ‘তমাল’ ভবনের দ্বিতীয় তলার ফ্ল্যাটে থাকতেন। তবে, ঘটনার সময় তিনি দেশের বাইরে ছিলেন। এ ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে রমনা থানায় অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা করা হয়েছে। রমনা থানার পুলিশ জানিয়েছে, এটি আত্মহত্যা নাকি হত্যা তা ময়নাতদন্তের পর বলা যাবে। তবে, হত্যা করা হয়েছে এমন কোন আলামত পাওয়া যায়নি। শরীরে কোন জখমের চিহ্নও ছিল না। মৃতের পারিবারিক সূত্র জানায়, প্রমিথির বাবা মাহবুবুর রহমান একজন ব্যবসায়ী। মা ও বাবার মধ্যে তালাক হওয়ায় তারা পৃথকভাবে বাস করতেন। তবে, প্রমিথি ইস্কাটনের ফ্ল্যাটে তার মায়ের সঙ্গে থাকতেন। প্রমিথির মায়ের একজন সহকর্মী জানান, আলম আরা দশ দিনের জন্য দেশের বাইরে যান। শনিবার রাত ১২টার দিকে বাসায় ফেরেন তিনি। এসময় খাটের ওপর মেয়ের নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখেন। পরে রমনা থানায় খবর দিলে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে মর্গে পাঠায়।
রমনা থানার এসআই মোশারফ জানান, শনিবার রাতে খবর পেয়ে রমনা ইস্কাটনের অফিসার্স কোয়ার্টারের বি/১২/ই-২ নম্বর তমাল ভবনের দোতলার বাসা থেকে প্রমিথির লাশ উদ্ধার করা হয়। পরে ময়নাতদন্তের জন্য লাশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়। এ ব্যাপারে থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। তিনি আরও জানান, ১৯শে সেপ্টেম্বর মেয়েকে ফ্ল্যাটে রেখে দেশের বাইরে যান আলম আরা বেগম। এক সপ্তাহ পরে শনিবার রাতে বাসায় ফিরে মেয়েকে খাটের ওপর মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে পুলিশে খবর দেন। লাশটি উদ্ধারের সময় তার মুখের ডান পাশে পয়জন জাতীয় কালো দাগ দেখা গেছে। পেট ফুলে থাকায় ধারণা করা হচ্ছে কয়েক দিন আগেই তার মৃত্যু হয়েছে। তাছাড়া, তার গায়ে কোন আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তবে প্রমিথি আত্মহত্যা করেছেন, নাকি কেউ তাকে খুন করেছে সেটা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেলে বিষয়টি পরিষ্কারভাবে জানা যাবে বলে জানান এ কর্মকর্তা।
এদিকে গতকাল দুপুরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে প্রমিথির লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। প্রমিথির মুখ থেকে বের হওয়া রাসায়নিক জাতীয় পদার্থের রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য মহাখালী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। লাশ ময়নাতদন্তের পর বারডেম হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়েছে। এদিকে একমাত্র সন্তান প্রমিথির এমন মৃত্যুতে তার মা আলম আরা মুষড়ে পড়েছেন। বারবার বিলাপ করছেন তিনি। প্রমিথির আত্মীয়স্বজন ও সহপাঠীরাও কাঁদছেন। প্রমিথির সহপাঠী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাইম জানান, প্রমিথি তাদের ভাল বন্ধু ছিল। সে ছিল সবার প্রিয়। আবৃত্তি সংগঠনের সঙ্গেও সম্পৃক্ত ছিল সে।

সিরিয়ায় ফ্রান্সের প্রথম বিমান হামলা

জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বিরুদ্ধে সিরিয়ায় প্রথমবারের মতো বিমান হামলা শুরু করেছে ফ্রান্স। টানা প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে বিমান থেকে নজরদারির পর ফ্রান্স গতকাল রোববার থেকে এই হামলা শুরু করল। খবর এএফপির।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদের দপ্তর থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ৮ সেপ্টেম্বর থেকে চলা পর্যবেক্ষণের সময় নির্ধারণ করা লক্ষ্যবস্তুগুলোতেই বিমান হামলা করা হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘সন্ত্রাসীদের হামলা মোকাবিলায় পরিচালিত এই অভিযানে আঞ্চলিক সহযোগীদের সহায়তা নেওয়া হয়েছে। আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা যখনই হুমকির মুখে পড়বে, তখনই আমরা হামলা চালাব।’
এ মাসের শুরুতে ফ্রান্স আইএসের বিরুদ্ধে আসন্ন হামলার ঘোষণা দিয়ে এর পেছনে নিজের নিরাপত্তাকেই মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিল। ফ্রান্স তখন বলেছিল, স্থলপথে কোনো আক্রমণ চালানো হবে না।
ফরাসি প্রেসিডেন্টের দপ্তর থেকে দেওয়া বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে,‘সিরিয়ায় চলমান সংঘাতের পরিপ্রেক্ষিতে একটি বড় ধরনের সহযোগিতার অংশ হিসেবেই এই হামলা। আইএস এবং অন্য সন্ত্রাসীদের হাত থেকে সিরিয়ার সাধারণ মানুষকে অবশ্যই রক্ষা করা হবে। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের বোমা হামলার বিরুদ্ধেও আমাদের অবস্থান।’
ফ্রান্স এর আগে পার্শ্ববর্তী ইরাকে জঙ্গি আইএসের বিরুদ্ধে হামলা চালিয়েছিল। প্রেসিডেন্ট ওলাঁদ নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেওয়ার এক দিন আগে সিরিয়ায় ফ্রান্সের এই হামলা শুরু হলো। মনে করা হচ্ছে, ওই অধিবেশনে আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে চার বছর ধরে গৃহযুদ্ধের মধ্যে থাকা সিরিয়া।
ইরান এবং রাশিয়া বাশার সরকারকে ব্যাপকভাবে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্সসহ ইউরোপীয় দেশগুলো বলছে, বাশারকে সমর্থন দিয়ে এ অঞ্চলকে আরও অস্থিতিশীল করে তোলা হচ্ছে।
সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরুর আগে গত শনিবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভেদ জারিফের সঙ্গে সিরিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠক করেন।

মিনায় ১৬ বাংলাদেশী হাজি নিহত, নিখোঁজ ১০৪

সৌদি আরবে মিনায় গত বৃহস্পতিবারের পদদলিত হওয়ার ঘটনায় ১৬ জন বাংলাদেশী নিহত এবং ১০৪ জন নিখোঁজ রয়েছেন। জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট অবশ্য চারজন বাংলাদেশী হাজির মৃত্যু নিশ্চিত করেছে। এই চারজন হলেন- খুলনার মো. শহিদুল ইসলাম, সাভারের আমিনুর রহমান, জামালপুরের ফিরোজা খানম এবং অজ্ঞাতনামা একজন বাংলাদেশী রয়েছেন। এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১০৪ জন নিখোঁজের তালিকা প্রস্তুত করেছে জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট অফিস। তবে সাভারের আমিনুর রহমানের নিহতের ঘটনা নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। তার পরিবার জানিয়েছে, সাভারের আমিনুর বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যে ব্যক্তির লাশের খোঁজ দিয়েছে, সেটি তার লাশ নয়।
এদিকে, যুগান্তরের প্রতিনিধিরা আত্মীয় স্বজনের বরাত দিয়ে আরও নিহতের খবর দিচ্ছেন। প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য মোতাবেক, ফেনীর পাঁচজন হাজির নিহতের খবর নিশ্চিত করছেন তাদের স্বজনরা। তারা হলেন- সোনাগাজীর সুজাপুর গ্রামের তহুরা বেগম তার ভাই নূরুন্নবী, সদর উপজেলার ধলিয়া ইউনিয়নের কলঘর গ্রামের জয়নব বিবি, তার ছোট ভাই শহরের পাঠানবাড়ী এলাকার নূরুল হুদা ও মাস্টার আবুল কাশেম ও পরশুরামের খালেদা খানমের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন।
শরীয়তপুরের তিনজন হাজির মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তারা হলেন- জাজিরা উপজেলার জাজিরা ইউনিয়নের জব্বার আকনকান্দি গ্রামের এম এ রাজ্জাক আকন্দ (৬৫), তার স্ত্রী হাসিনা আকতার (৫৫), গোসাইরহাট উপজেলার চরধিপুর গ্রামের আহম্মেদ আলী মৃধা (৬৫)।
মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার হাজি বারেক মোড়ল (৭৫) নিহত হয়েছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার বাদৈর ইউনিয়নের মান্দারপুর গ্রামের গোলাম মোস্তফা খালেক (৬০) স্ত্রীকে বাঁচাতে গিয়ে পদদলিত হয়ে মারা যান।
দিনাজপুরের ষাটোর্ধ্ব কেরামত আলী দুর্ঘটনার সময় ঘটনাস্থলেই মারা গেছেন বলে তার সঙ্গে থাকা হাজীরা পরিবারের সদস্যদের জানিয়েছেন। মিনার ঘটনায় বগুড়ার নন্দীগ্রামের নূরজাহান বেগম (৭০) নিহত হয়েছেন।
কর্মকর্তারা বলছেন, নিহত বাংলাদেশীর সংখ্যা বাড়তে পারে। কেননা সৌদি কর্তৃপক্ষ নিহতদের মধ্যে এখন পর্যন্ত যে ৬৫০টি মরদেহের ছবি প্রকাশ করেছে, তার মধ্যে ৯০টি মরদেহের চেহারা বাংলাদেশী বলে মনে হচ্ছে। এসব ছবি মক্কায় বাংলাদেশ হজ মিশনের সামনে টানিয়ে দেয়া হয়েছে। হজ এজেন্সি, আত্মীয়-স্বজন এবং হজ গাইডদের এসব ছবি থেকে বাংলাদেশীদের সনাক্ত করার জন্যে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
মিনায় পদদলিত হয়ে সাড়ে শতাধিক হাজি নিহত হওয়ার পর যে বাংলাদেশীরা নিখোঁজ রয়েছেন, পরিবারের সদস্যরা এখন হন্যে হয়ে তাদের হদিস খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন।
অনেকে বলছেন, তাদের চোখের সামনেই মারা যাওয়ার পর মৃতদেহ পুলিশ নিয়ে গেছে, কিন্তু তারপরে কী হয়েছে তা তাদের জানা নেই।
মক্কায় অবস্থিত বাংলাদেশ হজ অফিসের কনসাল (হজ কাউন্সিলর) মো. আসাদুজ্জামান রোববার টেলিফোনে যুগান্তরকে জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশের ১২৮ জন আমাদেরকে টেলিফোনে এবং অন্যান্য উপায়ে আমাদেরকে তথ্য দিয়েছিলেন যে, তারা হজ করতে আসা তাদের আত্মীয়-স্বজনকে খোঁজে পাচ্ছেন না। তারপর তাদের মধ্য থেকে ৩০ জন জানিয়েছেন, তারা তাদের আত্মীয়-স্বজনদের সন্ধান পেয়েছেন। আত্মীয়-স্বজনদের তথ্য মোতাবেক, এখন পর্যন্ত ৯৮জন বাংলাদেশী হাজী নিখোঁজ রয়েছেন।
তিনি আরও জানান, সৌদি সরকার নিহতদের ছবি প্রকাশ করেছে। তাদের মধ্য থেকে ৯০ জনের ছবি দেখে বাংলাদেশী বলে মনে হচ্ছে। এখন তাদের ছবি আত্মীয়-স্বজনদের মাধ্যমে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এই তালিকায় কতজন নিশ্চিতভাবে মৃত্যুবরণ করেছেন সেটা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। মিনার ঘটনায় আহতদের কোনো তালিকা আমাদের হাতে নেই।
মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, মিনায় একটি একমুখী রাস্তা আছে। কিন্তু ওই ঘটনার সময় একমুখী রাস্তায় উভয় দিক থেকে মানুষ চলাচল শুরু করে। ওই সময়ে প্রচণ্ড গরম ছিল। সৌদি কর্তৃপক্ষ আমাদের জানায় যে, আতঙ্কিত হয়ে লোকজন ছোটাছুটি শুরু করে। গরমে দুই দিক থেকে ছুটে আসা মানুষের চাপে প্রচণ্ড ভিড়ে হিটস্ট্রোকে অনেকেই মারা গেছেন। মিনার ঘটনায় নিখোঁজ বাংলাদেশীদের তালিকা জেদ্দায় বাংলাদেশ কনসুলেট জেনারেল দফতরে দিয়েছি।
সৌদি আরবের জেদ্দায় অবস্থিত বাংলাদেশের কনসুলেট জেনারেল দফতরের কনসাল জেনারেল এ কে এম শহিদুল করিম রোববার বাংলাদেশ সময় বেলা আড়াইটায় টেলিফোনে যুগান্তরকে বলেন, মিনার ঘটনায় সৌদি কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত ৬৫০টি লাশের ছবি প্রকাশ করেছে। ওই সব ছবি দেখে বাংলাদেশী কতজন আছেন সেটা সনাক্ত করার চেষ্টা করছি। এটা সনাক্ত করার ক্ষেত্রে যেসব আত্মীয়-স্বজন এবং হজ এজেন্সি নিঁখোজ থাকার ব্যাপারে রিপোর্ট করেছেন, তাদের সহায়তা গ্রহণ করছি।
তিনি আরও বলেন, এখন পর্যন্ত তিনজন বাংলাদেশী নিহত হয়েছেন বলে আমরা নিশ্চিত হয়েছি। নিহতদের মধ্যে খুলনার মো. শহিদুল ইসলাম এবং সাভারের আমিনুর রহমানের লাশের ছবি দেখে তাদের আত্মীয়-স্বজনেরা তাদের পরিচয় নিশ্চিত করেছেন। নিহত তৃতীয় ব্যক্তির গলায় বাংলাদেশী ট্যাগ দেখে তা নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে এই তৃতীয় ব্যক্তির নাম ও বিস্তারিত পরিচয় আমরা নিশ্চিত হতে পারিনি। এই তিন জনের বাইরে জামালপুরের ফিরোজা খানম নামের একজন নিহত হয়েছেন বলে তার আত্মীয়-স্বজন আমাদেরকে জানিয়েছেন। তবে এ ব্যাপারটি আমরা নিজেরা নিশ্চিত নই।
এ কে এম শহিদুল করিম বলেন, যে সব ব্যক্তি ও হজ এজেন্সি তাদের লোক নিখোঁজ রয়েছেন বলে রিপোর্ট করেছেন, তাদের সবাইকে ডাকা হয়েছে। তাদেরকে লাশের ছবি দেখে নিহতদের সনাক্ত করতে বলা হয়েছে।
এদিকে, সৌদি কর্তৃপক্ষ নিহতদের আরও ছবি আজ কিংবা কালের মধ্যে প্রকাশ করবে। তারপর বাংলাদেশী নিহতদের বিষয়ে একটা পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাবে।
তিনি বলেন যে, মিনার ঘটনায় কোনো প্রকার ক্ষতিপূরণ দেয়ার কথা সৌদি সরকার ঘোষণা করেনি। সৌদি কর্তৃপক্ষ চান নিহতদের দাফন সৌদি আরবেই সম্পন্ন হোক। তবে এ ব্যাপারে নিহতদের পরিবারের সম্মতি প্রয়োজন হবে। তবে নিহতদের পরিবার যদি মরদেহ দেশে ফিরিয়ে নিতে চান তবে সেটাও সম্ভব। তবে এই ক্ষেত্রে মরদেহ দেশে ফেরত পাঠানোর কাজটি দীর্ঘ মেয়াদি এবং সময় সাপেক্ষ ব্যাপার।
মিনার ঘটনায় পদদলিত হয়েই হাজিরা নিহত হয়েছেন বলে উল্লেখ করে শহিদুল করিম বলেন, নিখোঁজ বাংলাদেশীদের একটি তালিকা আমাদের হাতে আছে। এই তালিকা মোতাবেক, ১০৪ জন বাংলাদেশী এখন পর্যন্ত নিখোঁজ আছেন। নিখোঁজদের এই তালিকা আমরা প্রকাশ করব কিনা সেটা এখনই বলতে পারছি না।
তিনি বলেন, এ ব্যাপারে কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা একটি বৈঠকে বসছি। সৌদি আরবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মহোদয় এই বৈঠক ডেকেছেন। বৈঠকে রাষ্ট্রদূত মহোদয় এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত জানাবেন।
শহিদুল করিম আরও বলেন, নিখোঁজ হওয়া মানে সবাই মিনার ঘটনায় নিখোঁজ হয়েছেন এমন নয়। আরাফাতের ময়দানে প্রতি বছরেই বিভিন্নভাবে বাংলাদেশীরা নিখোঁজ হয়ে থাকেন। ফলে নিখোঁজ সবাই মিনার ঘটনায় নিখোঁজ হয়েছেন এমন বলা যাবে না।
রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাস, জেদ্দায় বাংলাদেশের কনসুলেট জেনারেল দফতর এবং মক্কায় বাংলাদেশ হজ মিশন আরও তথ্য পাওয়ার জন্যে কাজ করছে এবং ভিকটিমদের সহায়তার চেষ্টা করছে।
হাজী, তাদের সহযাত্রী, আত্মীয়-স্বজন, হজ গাইড এবং হজ এজেন্টদের নিখোঁজ হাজিদের ব্যাপারে রিপোর্ট করার জন্যে ০০৯৬৬(০)৫৩৭৩৭৫৮৫৯ এবং ০০৯৬৬(০)৫০৯৩৬০০৮২ টেলিফোন নম্বরে যোগাযোগ করার জন্যে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

ভারতের আজ্ঞাবহ হবো না : - পুষ্প কমল দাহাল প্রচন্দ

পুষ্প কমল দাহাল প্রচন্দ
ইউনাইটেড কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (এম)-ইউএনপিএন মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টি হিসেবে বেশি পরিচিত। দলটির প্রধান পুষ্প কমল দাহাল প্রচন্দ নেপালের একজন আলোচিত রাজনীতিবিদ। রাজতন্ত্র অবসানের পর প্রথম গণপরিষদ নির্বাচনে তিনি হন নেপালের প্রধানমন্ত্রী। প্রেসিডেন্ট ও সেনাবাহিনীর সাথে বিরোধকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট রাজনৈতিক টানাপড়েনে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেন। পরে একপর্যায়ে তারই ডেপুটি বাবু রাম ভট্টরাই দেশটির প্রধানমন্ত্রী হন। ভারতপন্থী হিসেবে পরিচিত মাওবাদী নেতা ভট্টরাইয়ের সাথে তার রাজনৈতিক মতপার্থক্য একেবারে অপ্রকাশ্য ছিল না। বিবিসি নেপালি সার্ভিসের রবীন্দ্র মিশ্রের সাথে পুষ্প কমল দাহাল প্রচন্দের এই সাক্ষাৎকারে নেপালের নতুন সংবিধান গ্রহণ ছাড়াও ভট্টরাইয়ের বিষয়ও উঠে এসেছে। এই সাক্ষাৎকার যখন প্রকাশ হচ্ছে তখন ভট্টরাই মাওবাদী দলের সাথে তার সম্পর্ক ছেদ করেছেন। তিনি নতুন রাজনৈতিক শক্তির পত্তন ঘটাতে চান। কতটা এ ক্ষেত্রে সফল হবেন এ ব্যাপারে সংশয় রয়েছে প্রচন্দের। মাওবাদী নেতা প্রচন্দের এই সাক্ষাৎকার খুব বড় পরিসরের না হলেও নেপালের সঙ্কটময় পরিস্থিতি বোঝার জন্য এটির রয়েছে বিশেষ তাৎপর্য। নয়া দিগন্তের পাঠকদের জন্য নেপালি টাইমস পত্রিকা থেকে সাক্ষাৎকারটির অনুবাদ করেছেন মাসুমুর রহমান খলিলী
বাবু রাম ভট্টরাই
বিবিসি নেপালি সার্ভিস : আপনি দেশকে প্রজাতন্ত্র করা, গণপরিষদের মাধ্যমে সংবিধান প্রণয়ন, ফেডারেল ব্যবস্থার প্রবর্তন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা তৈরির মতো যুদ্ধের প্রায় সব উদ্দেশ্য অর্জন করেছেন। এরপর আপনার জন্য কী কাজ বাকি আছে বলে মনে করছেন?
পুষ্প কমল দাহাল : গণপরিষদে যখন নতুন সংবিধান গৃহীত হয় তখন আমি খুবই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি। সেই রাতে আমি যখন বাড়ি পৌঁছি তখন আমার নিরাপত্তা কর্মকর্তা সিংহ দরবার, বালুওয়াটার ও ব্যানশোর বা এ ধরনের কোথাও যাওয়ার ব্যাপারে আমাকে সতর্ক করে দেন। কিন্তু আমি তাকে বলি এখন মৃত্যুকে আমার আর কোনো ভয় নেই। আমি এখন শান্তিতে বিশ্রাম করতে পারি, কারণ নেপাল একটি প্রজাতন্ত্র হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিকতা লাভ করেছে এবং নতুন অভিযাত্রা শুরু করেছে আমাদের প্রিয় দেশটি।
মিশ্র : নেপালের রাজনৈতিক রূপান্তরের একটি পর্ব হয়তো শেষ হয়েছে, কিন্তু এটি এখনো একটি অনুন্নত দেশই রয়ে গেছে। আপনার মিশন কি সত্যিই শেষ হয়ে গেছে?
দাহাল : কিন্তু এই রাজনৈতিক রূপান্তর অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য একটি আবশ্যিক পূর্বশর্ত ছিল।
মিশ্র : আপনি আমাদের সম্প্রতি বলেছেন, অন্তত সাত-আট বছর ধরে আপনি সক্রিয় রাজনীতিতে থাকতে চান। এই সময়ে আপনি নেপালে কী হিসেবে অবদান রাখতে চান?
দাহাল : হ্যাঁ, আমি মনে করি অন্তত আরো সাত-আট বছর ধরে রাজনীতিতে সক্রিয় থাকতে হবে আমাকে। আমি পরবর্তী নির্বাচনে জিততে চাই যাতে সংবিধানের ফেডারেল প্রদেশের সৃষ্টি এবং এর বাস্তবায়নে যে ব্যবস্থা রয়েছে সেই রাজনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার বিষয়টিতে তত্ত্বাবধান করতে পারি।
মিশ্র : এসব কাজ করার প্রয়োজনে কি আপনাকে প্রধানমন্ত্রী হতে হবে না?
দাহাল : আমি এই মুহূর্তে কোনো পদ নিয়ে চিন্তা করছি না। কিন্তু আমি এটা স্পষ্ট করতে চাই যে, আমাদের দলকে আগামী জোট সরকারের অংশীদার হতে হবে।
মিশ্র : তাহলে বাবুরাম ভট্টরাই শিগগিরই পার্টির সভাপতি হওয়ার কোনো সুযোগ পাচ্ছেন না?
দাহাল : আমি পার্টির নেতত্বে হস্তান্তর করার ওপর একটি প্রস্তাব প্রস্তুত করেছি। আমার সক্রিয় রাজনীতিতে থাকার জন্য পার্টির সভাপতি থাকতেই হবে এমন নয়। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, আমি এক্ষুনি পদত্যাগের জন্য তৈরি হয়ে আছি।
মিশ্র : ভট্টরাই একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তি গঠনের প্রতিজ্ঞার কথা বলেছেন। তিনি আপনাকে তার পার্টি ছাড়ার ব্যাপারে কিছু বলেছেন কি?
দাহাল : তার নতুন রাজনৈতিক শক্তি তৈরির বিষয়টি একটি পুরনো গল্প এবং আমি মনে করি না তিনি দল থেকে বিদায় নেবেন। আমি বিস্মিত হই যখন দেখি তার পর্যায়ের একজন নেতা নতুন সংবিধানের বিরুদ্ধে জনসমক্ষে কথা বলছেন এবং লিখছেন। এটা আমার কাছে একেবারে অস্বাভাবিক মনে হয়।
মিশ্র : এটি সম্ভবত এ কারণে হচ্ছে যে, তিনি দল থেকে পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন?
দাহাল : যদি তিনি দল থেকে পদত্যাগ করেন, তাহলে তিনি কিংবা দেশ কেউই তার কাজ থেকে উপকার পাবে না। আমি ৩০ বছর ধরে তাকে সাথে নিয়ে কাজ করছি। আমার চেয়ে কেউ তার অধিক ঘনিষ্ঠ নেই। তার অনেক গুণ আছে কিন্তু তিনি এক জটিল চরিত্রের ব্যক্তি।
মিশ্র : আপনি প্রকাশ্যে বলেন, ভারত যদি আমাদের সম্মান চায় তাহলে আমাদেরকেও তাদের সম্মান করতে হবে। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে ভারতীয় বিশেষ দূত এস জয়শঙ্করকে আপনি কী বলেছেন?
দাহাল : আমি সম্প্রতি যখন নয়া দিল্লি যাই তখন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে বলেছি আমরা ভারতের ভালো বন্ধু হতে চাই, ইয়েস ম্যান বা আজ্ঞাবহ নয়। আমরা আমাদের দেশকে ভালোবাসি এবং সেভাবে যাতে তারা কাজ করে। নয়াদিল্লিতে যাদের সাথে কথা হয়েছে তাদের আমি বলেছি নেপাল ভালো প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের উদ্বেগের সুরাহা করতে পারে, কিন্তু কোনোভাবেই আজ্ঞাবহ হিসেবে নয়।
মিশ্র : আসলে আপনি এবং জয়শঙ্করের মধ্যে কী কথা বা বাক্য বিনিময় ঘটেছিল?
দাহাল : তিনি আমাকে স্পষ্টভাবে বলেছেন, সবার সম্মতি না থাকলে ভারত নতুন সংবিধানকে স্বাগত জানাবে না। তিনি আরো বলেছেন, কয়টি দেশ স্বাগত জানাল সেটি কোনো বিষয় নয়, ভারতের স্বীকৃতি ছাড়া নেপালের নতুন সংবিধান একেবারে অর্থহীন হবে। আমি শুধু তাকে বলেছি, আপনার সফরটি বড় অসময়োচিত হয়ে গেছে, আপনার হয় ১৫ দিন আগে অথবা ১৫ দিন পরে নেপালে আসা উচিত ছিল।
মিশ্র : এখন মাধেশি দলগুলোর সাথে কিভাবে আপনি মোকাবেলা করবেন?
দাহাল : আমরা শুধু মাধেশিই নয়, থারু ও জনজাতির ক্ষোভ নিরসনের জন্যও সংবিধান সংশোধনের ব্যবস্থা রেখেছি। এটি আমরা দ্রুত করে ফেলতে চাই। কারণ যেকোনো বিলম্ব এখন যে গতি এসেছে তা নষ্ট করে দিতে পারে। আমি যখন মাধেশি নেতাদের সাথে ওয়ান টু ওয়ান বৈঠকে বসেছি তখন তারা আমাকে বলেছেন তাদের নির্বাচনী এলাকায় বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে বলে এ সংবিধান অনুমোদন তারা করবেন না। কিন্তু তারা আমাদেরকে এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করেছেন।
মিশ্র : আপনি কি তরাই অঞ্চলে কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছেন?
দাহাল : তরাই অঞ্চলে একদল স্পষ্টভাবে বিচ্ছিন্নতাবাদকে উসকে দিতে চাইছে, কিন্তু এটি মাধেশি জনগণের দৃঢ় কোনো সমর্থন পাবে না। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, মাধেশি জনগণ নেপাল থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চায় না। নেপালি রাষ্ট্রের প্রতি তাদের আনুগত্য অত্যন্ত গভীর ও সুদৃঢ়।
মিশ্র : আপনি কি মনে করেন ভারত তরাই অঞ্চলের রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়াতে উসকানি দেবে?
দাহাল : আমি এ সম্পর্কে একটু চিন্তিত। ভারতীয় বিশেষ দূত জয়শঙ্করের সাথে দেখা হলে তিনি আমাকে বলেন, তরাইয়ের অস্থিরতা বিহার, উত্তর প্রদেশ ও ভারতের পুরো সীমান্তে ছড়িয়ে যেতে পারে। তিনি সীমান্ত শব্দটি উচ্চারণ করেন। আমি তাকে বলি, আপনার উদ্বেগ জেনুইন, কিন্তু ভারতের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ হবে ভারতের নিজস্ব সীমানা ছাড়িয়ে ভাবা এবং বৃহত্তর নেপালের বিষয়টি চিন্তা করা।