Friday, February 14, 2014

লোকসভায় মরিচের গুঁড়া, মারামারি

মরিচের গুঁড়ায় অসুস্থ এক পার্লামেন্ট সদস্যকে
হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে। ছবি: এএফপি
তেলেঙ্গানা বিল নিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার ভারতের লোকসভা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। পৃথক তেলেঙ্গানা বিলের বিরোধী পার্লামেন্ট সদস্য রাজা গোপাল অধিবেশন চলাকালে মরিচের গুঁড়া ছিটিয়েছেন। তেলেঙ্গনাবিরোধীরা অন্যদের সঙ্গে মারপিট করেছেন, সেক্রেটারি জেনারেলের টেবিলের কাচ ভেঙেছেন এবং স্পিকারের মাইক উপড়ে দিয়েছেন। মরিচের গুঁড়ায় লোকসভার সদস্য ও সাংবাদিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। দফায় দফায় গোলমালের কারণে স্পিকার মীরা কুমার অধিশেন মুলতুবি করতে বাধ্য হন। ঘটনার পর তিনি কংগ্রেস, তেলেগু দেশম এবং ওয়াইএসআর কংগ্রেসের মোট ১৮ জন পার্লামেন্ট সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করার ঘোষণা দেন। পার্লামেন্টে দিনভর চলা এই গোলমালের মধ্যেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুশীল কুমার সিন্ধে দাবি করেন, তিনি তেলেঙ্গানা বিল উত্থাপন করেছেন। এই দাবিকে কেন্দ্র করেই শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। কারণ, সভার কার্যতালিকায় তেলেঙ্গানা বিলের উল্লেখ ছিল না। গত বুধবার রাতে কংগ্রেস আচমকা তেলেঙ্গানা বিলটি বৃহস্পতিবার পার্লামেন্টে পেশ করার সিদ্ধান্ত দেয়।
কংগ্রেসের কাছে খবর ছিল, বিল উত্থাপনে বাধা দিতে তেলেঙ্গানাবিরোধী পার্লামেন্ট সদস্যরা সহিংসতার আশ্রয় নিতে পারেন। এমনকি রক্তারক্তি কাণ্ড ঘটাতেও বিরোধীরা প্রস্তুত বলে সরকারের কাছে খবর ছিল। সরকার তাই আগেই পার্লামেন্ট ভবন চত্বরে চারটি অ্যাম্বুলেন্স মজুত রাখে। ছিল কয়েক গণ্ডা অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, মজুত রাখা হয় গাদা গাদা কম্বল। স্পিকারকে গোয়েন্দারা খবর দিয়েছিল, কেউ কেউ গ্যালারি থেকে সভাকক্ষে ঝাঁপও দিতে পারেন। ফলে এই প্রথম লোকসভার গ্যালারি খালি রাখা হয়। কংগ্রেসের কৌশল ছিল, দিনের কার্যতালিকায় তেলেঙ্গানা বিলের উল্লেখ রাখা হবে না। আলাদা একটি কাগজে তেলেঙ্গানা বিল পেশের উল্লেখ করা হবে এবং সভার শুরুতেই সেটি পেশ করবেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুশীল কুমার সিন্ধে। গতকাল বেলা ১১টায় বসার এক মিনিটের মধ্যেই অধিবেশন মুলতবি হয়ে যায়। দুপুর ১২টায় ওয়েলে পার্লামেন্ট সদস্যদের ভিড়। স্পিকার আসার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয়ে যায় তাণ্ডব। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই সভা মুলতবি হয়ে যায়। লোকসভায় দিনভর গোলমালের জন্য বিরোধীরা সরকারকেই দায়ী করছে। বিজেপির লালকৃষ্ণ আদভানি, সুষমা স্বরাজ, অরুণ জেটলি, সিপিএমের বাসুদেব আচারিয়া, তৃণমূল কংগ্রেসের কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, জনতা দলের (সংযুক্ত) শারদ যাদব কংগ্রেসকেই দোষী মনে করছেন। সবাই বলছেন, কংগ্রেস নিজের দলকেই সামলাতে পারল না। এতবার নতুন রাজ্য গঠিত হয়েছে, এমন অবস্থা কখনো হয়নি।

লোকসভায় গোলমাল, ধাক্কাধাক্কি

ভারতের তেলেগু দেশম পার্টির (টিডিপি) সদস্যরা
পৃথক তেলেঙ্গানা রাজ্য বিলের প্রতিবাদে গতকাল
ব্যানার-পোস্টার নিয়ে পার্লামেন্টে
বিক্ষোভ করেন ছবি: এএফপি।
অন্ধ্র প্রদেশকে দুই টুকরা করে পৃথক তেলেঙ্গানা রাজ্য গঠনের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ভারতের পার্লামেন্টে গতকাল বুধবার বিক্ষোভ হয়েছে। বিক্ষুব্ধ পার্লামেন্ট সদস্যরা ওয়েলে নেমে প্ল্যাকার্ড-পোস্টার নিয়ে স্লোগান দেন, সভার কাগজপত্র ছিঁড়ে উড়িয়ে দেন, এমনকি পক্ষে-বিপক্ষের সদস্যদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কিও হয়েছে। পৃথক তেলেঙ্গানা রাজ্যকে কেন্দ্র করে ব্যাপক বিশৃঙ্খলার মধ্যে রেলমন্ত্রী অন্তর্বর্তী রেল বাজেট পেশ করলেও তা পড়া শেষ করতে পারেননি।
বিরোধীদের ক্ষোভের হাত থেকে বাঁচাতে সোনিয়া গান্ধী, শারদ পাওয়ার, কমলনাথ, লাল সিং রেলমন্ত্রীকে আড়াল করে রাখেন। অধিবেশন মুলতবি করার পর প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বললেন, ‘আমার হূদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। গণতন্ত্রের পক্ষে আজ অত্যন্ত বেদনার দিন।’ তেলেঙ্গানা রাজ্য গঠনের প্রশ্নে লোকসভার উভয় কক্ষই কয়েক দিন ধরে উত্তাল। দুই কক্ষের কোনোটিতেই কোনো কাজ হচ্ছে না। ২১ ফেব্রুয়ারি এই অধিবেশন শেষ হওয়ার কথা। এর মধ্যে তেলেঙ্গানা বিল দুই কক্ষে পাস করানো না গেলে রাজ্য ভাগ করা সম্ভব হবে না। কংগ্রেসদলীয় অন্ধ্র প্রদেশের পার্লামেন্ট সদস্যরাও এই বিষয়ে দলের বিরোধিতা করছেন। গতকাল অন্তর্বর্তী রেল বাজেট পেশ করানোর বিষয়ে বিরোধী দলগুলো রাজি হওয়ায় মনে করা হচ্ছিল, অন্তত এদিনের অধিবেশন নির্বিঘ্ন হবে। কিন্তু তেলেঙ্গানাবিরোধীদের প্রবল বিরোধিতায় রেলমন্ত্রী মল্লিকার্জুন খারগে তাঁর বাজেট ভাষণ শেষ করতে পারলেন না। বিরোধীদের ক্রোধের হাত থেকে তাঁকে আড়াল করতে এই প্রথম লোকসভার প্রথম সারিতে না দাঁড়িয়ে রেলমন্ত্রী দ্বিতীয় সারিতে দাঁড়িয়ে ভাষণ শুরু করেন। প্রথম সারিতে তাঁর সামনে বসে থাকলেন সোনিয়া গান্ধী, কৃষিমন্ত্রী শারদ পাওয়ার ও সংসদীয় মন্ত্রী কমলনাথ। কংগ্রেসদলীয় সদস্য লাল সিং দুহাতে রেলমন্ত্রীকে আড়াল করে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলেন। রেলমন্ত্রীর ভাষণের পাশাপাশি দেখা গেল অন্ধ্র প্রদেশের চার কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কে এস রাও, কে সূর্যপ্রকাশ, ডি পুরান্ডেশ্বরী ও অভিনেতা রাজনীতিবিদ চিরঞ্জীবী তেলেঙ্গানার বিরোধিতায় হাতে পোস্টার নিয়ে ওয়েলে নেমে স্লোগান দিচ্ছেন।
রাজ্যের অন্য দুই মন্ত্রী এম পাল্লাম রাজু ও কৃপারিনী নিজেদের আসনের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁদের সমর্থন দিতে থাকেন। তেলেঙ্গানার পক্ষের পার্লামেন্ট সদস্যরা এই সময় প্রতিরোধে নামেন। কংগ্রেসের এম জগন্নাথের সঙ্গে তেলুগু দেশমের এন শিবপ্রসাদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি হয়। তাঁদের নিবৃত্ত করতে ওয়েলে নেমে আসেন জনতা দলের নেতা শারদ যাদব, তৃণমূল কংগ্রেসের সৌগত রায় ও কংগ্রেসের জগদম্বিকা পাল। ব্যাপক গোলমালে রেলমন্ত্রীর ভাষণের কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না। একসময় সোনিয়া তাঁকে পুরো ভাষণ না পড়ে পার্লামেন্টে পেশ করতে বলেন। কিন্তু এর আগেই তেলেঙ্গানাবিরোধীরা বিলি করা বাজেট-ভাষণ ছিঁড়ে উড়িয়ে দিতে থাকেন। কেউ কেউ লোকসভার সচিবদের জন্য রাখা চেয়ারে উঠে পড়েন। এ পরিস্থিতিতে অধিবেশন মুলতবি করা হয়। প্রধানমন্ত্রী দুপুরেই প্রধান বিরোধী নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। কীভাবে তেলেঙ্গানা বিল পাস করানো যায়, সেটাই সরকারের সবচেয়ে বড় চিন্তা। সরকার প্রথমে ভেবেছিল, বিলটি রাজ্যসভায় পেশ করাবে, যাতে বিলটি পরবর্তী পার্লামেন্টেও প্রাসঙ্গিক থাকে। কিন্তু বিলটিতে আর্থিক প্রসঙ্গ থাকায় রাজ্যসভার চেয়ারম্যান সেটি লোকসভায় পেশের পক্ষে মত দেন। এর ফলে কংগ্রেসের সংকট বাড়ল। কারণ, লোকসভায় বিল পেশ করা হলে তা এই অধিবেশনেই রাজ্যসভায়ও পাস করাতে হবে। তা না হলে বিলটি খারিজ হয়ে যাবে। তেলেঙ্গানাবিরোধীদের যা মনোভাব, তাতে এই কঠিন কাজ কীভাবে কংগ্রেস করবে, সেটাই চিন্তার বিষয়।

দেখতে তাঁরা একই রকম

পারভেজ মোশাররফ (বাঁয়ে) ও ওয়াসিম উদ্দিন
পাকিস্তানের করাচি শহরের ক্লিফটন এলাকার ইবনে কাশিম পার্কে গত রোববার একটি বইয়ের দোকানে গিয়ে ক্ষণিকের জন্য হতবুদ্ধি হয়ে পড়েন কয়েকজন নারী। দোকানের প্রচারণার স্বার্থে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছেন ওয়াসিম উদ্দিন নামের এক ব্যক্তি। ওয়াসিম উদ্দিন মুখে মৃদু হাসির রেখা টেনে জানান দিলেন, তাঁকে যে সবাই চিনতে পেরেছেন, সে বিষয়টি তিনি বুঝে ফেলেছেন। আর ওই নারীদের অভিব্যক্তিতেও এরই মধ্যে পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগল। তাঁরা যখন বুঝতে পারলেন, লোকটি আসলে পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ নন, তখন তাঁরাও হাসিতে ফেটে পড়লেন।
এরপর তাঁরা ওয়াসিমের কাছে তাঁদের সন্তানদের সঙ্গে ছবি তোলার আবদার রাখলেন। ওয়াসিম তাঁদের বিমুখ করেননি। স্যুট পরা এবং নাকের ওপরে ট্রেডমার্ক চশমা পরা ওয়াসিমকে প্রথম দেখায় যে কেউ ভেবে বসবেন, তিনি পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ। তাঁর মাথার চুলের গঠন থেকে শুরু করে বাচনভঙ্গি পর্যন্ত মোশাররফের মতো। ব্যতিক্রম কেবল উচ্চতায়; মোশাররফ যেখানে পাঁচ ফুট ১১ ইঞ্চি, সেখানে ওয়াসিমের উচ্চতা পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চি। অনুষ্ঠানের পর বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখলেন ওয়াসিম। এক ব্যক্তি তাঁকে বলে বসলেন, ‘আপনি কি সিদ্ধান্ত নিলেন? আদালতে হাজিরা দেবেন?’ ওয়াসিমের জবাব, ‘আমি এখনো সিদ্ধান্ত নিইনি।’ ডন।

জেনেভায় অগ্রগতি নেই, প্রভাব পড়ছে অবরুদ্ধ হোমসে

লাখদার ব্রাহিমি
সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় সিরিয়ার দুই পক্ষের মধ্যে দ্বিতীয় পর্বের শান্তি সম্মেলনের দুই দিন পার হয়ে গেছে। তবে এ পর্যন্ত তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে স্বীকার করেছেন জাতিসংঘ ও আরব লিগের মধ্যস্থতাকারী লাখদার ব্রাহিমি। জেনেভা আলোচনায় অগ্রগতি না হওয়ায় সিরিয়ার অবরুদ্ধ হোমস শহর থেকে বেসামরিক নাগরিকদের বের করে আনা ও সেখানে ত্রাণসহায়তা পাঠানো নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। জেনেভায় শান্তি আলোচনার দ্বিতীয় পর্ব গত সোমবার শুরু হলেও সিরিয়ার সরকার ও বিদ্রোহীদের প্রতিনিধিরা মুখোমুখি বৈঠকে বসেন এক দিন পর মঙ্গলবার। শুরুতে সিরিয়ায় সহিংসতায় নিহত প্রায় এক লাখ ৩০ হাজার মানুষের আত্মার শান্তি কামনায় এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। পরে আলোচ্যসূচি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ শুরু হয়। বিদ্রোহীরা শুরুতেই প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পদত্যাগ ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন নিয়ে আলোচনা করার পক্ষে তাঁদের দৃঢ় অবস্থান তুলে ধরেন। অন্যদিকে সরকারি প্রতিনিধিরা শুরুতেই দেশে ‘সন্ত্রাসবাদ’ বন্ধের বিষয়টি নিয়ে আলোচনার দাবি তোলেন। তাঁরা প্রেসিডেন্ট বাশারের পদত্যাগের দাবিও নাকচ করেন।দুই পক্ষের বিরোধের এক পর্যায়ে জাতিসংঘ ও আরব লিগের বিশেষ দূত লাখদার ব্রাহিমি প্রস্তাব দেন, মঙ্গলবার সন্ত্রাসবাদ আর পরদিন বুধবার অন্তর্বর্তী সরকার নিয়ে আলোচনা হোক। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আলোচ্যসূচি নিয়ে কোনো সুরাহা না হওয়ায় মঙ্গলবার আলোচনা পণ্ড হয়।
পরে ব্রাহিমি সাংবাদিকদের বলেন, ‘জেনেভায় মঙ্গলবারের মুখোমুখি আলোচনায় আমরা তেমন অগ্রগতি করতে পারিনি।’ সরকার ও বিদ্রোহী পক্ষের মধ্যে আলোচ্যসূচি নিয়ে বিরোধের কারণে প্রথম দিনের মুখোমুখি আলোচনা পণ্ড হয়ে গেছে। জেনেভার প্রভাব পড়েছে হোমসেও। জেনেভায় মঙ্গলবার আলোচনা পণ্ড হওয়ার পর হোমসের গভর্নর তালাল বারাজি ঘোষণা দেন, ‘সরবরাহব্যবস্থা কঠিন হয়ে ওঠায়’ অবরুদ্ধ ব্যক্তিদের বের করে আনা ও ত্রাণ সরবরাহ এক দিনের জন্য বন্ধ রাখা হতে পারে। হোমসে প্রথম দফার তিন দিনের যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার পর গতকাল বুধবার ছিল দ্বিতীয় দফার যুদ্ধবিরতির শেষ দিন। ইতিমধ্যে শহরটি থেকে এক হাজারের বেশি বেসামরিক ব্যক্তিকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, যাদের অধিকাংশই নারী, শিশু ও বৃদ্ধ। সাহায্য সংস্থা রেড ক্রিসেন্টের সিরিয়া শাখার প্রধান খালেদ এর্কসৌসি জানান, তাঁদের কর্মী বাহিনী কাজ বন্ধ রেখেছে। তিনি আশা করেন, আবারও ত্রাণ সরবরাহ ও লোকজনকে উদ্ধারের কাজ শুরু করতে পারবেন। বেসমারিক লোকজনকে বের করে আনা ও ত্রাণ পাঠানোর জন্য জাতিসংঘসহ সাহায্য সংস্থাগুলো সেখানে কাজ করছিল। ভেটো দেবে রাশিয়া: সিরিয়ার অবরুদ্ধ শহরগুলোতে ত্রাণ সরবরাহ করতে প্রবেশপথের ব্যবস্থার জন্য জাতিসংঘে প্রস্তাব তোলা হলে তাতে ভেটো দেবে রাশিয়া। মস্কো ইতিমধ্যে এ-সংক্রান্ত একটি খসড়া প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছে। রুশ উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী গেন্নাদি গাতিলভ বলেন, প্রস্তাবে যেভাবে ত্রাণসহায়তার জন্য প্রবেশপথের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তা ভবিষ্যতে বাশারের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের ভিত্তি তৈরি করবে। আল-জাজিরা, বিবিসি, এএফপি ও রয়টার্স।

রানির নেকলেসে কেট

কেট মিডলটন
প্রিন্স উইলিয়ামের স্ত্রী ডাচেস অব কেমব্রিজ কেট মিডলটন গত মঙ্গলবার যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল পোর্ট্রেট গ্যালারি (এনপিজি) পরিদর্শন করেন। এই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তিনি রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের হীরার নেকলেস ধার নেন, যা তাঁর গলায় শোভা পাচ্ছে। ডাচেস অব কেমব্রিজ কেট এনপিজির পৃষ্ঠপোষক। সে হিসেবে ওই গ্যালারিতে তাঁর ছবি ঝোলানো হবে। টেলিগ্রাফ

মেধা ও তারুণ্যের প্রতি রাষ্ট্রের উপেক্ষা

গত বছরের এপ্রিল-মে মাসে এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। বিরোধী দলের আন্দোলন, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘাতের কারণে দীর্ঘ সময় নিয়ে এই পরীক্ষা নিতে হয়েছে। বেশির ভাগ পরীক্ষা হয়েছে শুক্র ও শনিবার। অন্য দিন বিরোধী দলের হরতাল-অবরোধ থাকায় পরীক্ষা হতে পারেনি। গত বছর একই সমস্যা হয়েছিল এসএসসি, জেএসসি ও পিএসসি পরীক্ষার বেলায়ও। এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয় গত বছর আগস্টের মাঝামাঝি। এখন ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি। এর মধ্যে ছয় মাস চলে গেলেও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ভর্তির প্রক্রিয়া শেষ হয়নি। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন পর্যন্ত ভর্তির প্রক্রিয়া শুরুই হয়নি। মার্চ নাগাদ ভর্তির প্রক্রিয়া শেষ হলেও ক্লাস শুরু হতে এপ্রিল-মে পর্যন্ত গড়াবে। মাঝখানে পুরো একটি বছর হারিয়ে যাবে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জীবন থেকে। সাধারণত একটি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর নতুন শ্রেণীতে ভর্তির প্রক্রিয়া তিন মাসের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। গত এক বছরে রাজনৈতিক সহিংসতার অজুহাত দেওয়া হলেও ভর্তি প্রক্রিয়ার এই বিলম্ব সব সময় ঘটে থাকে। কেন ঘটে, কারা ঘটান, তার ব্যাখ্যা নেই। ইতিমধ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একাধিক সেমিস্টার শেষ করেছে।
আমাদের প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনগুলোও এ নিয়ে আন্দোলন করে না। আর সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠনের নেতারা মনে করেন, পরীক্ষা যত বিলম্বে হবে, তত তাঁদের লাভ। নেতৃত্ব প্রলম্বিত হবে; সেই সঙ্গে চাঁদাবাজি আর দখলবাজিও। কেবল ভর্তি পরীক্ষা নয়, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের সব পরীক্ষা, ক্লাস ও কোর্স শেষ হয় নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে। সব বিশ্ববিদ্যালয়েই কম-বেশি সেশনজট আছে। তবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এ ক্ষেত্রে রেকর্ড সৃষ্টি করে চলেছে। গড়ে দুই থেকে তিন বছর সেশনজট চলছে এই প্রতিষ্ঠানটিতে। এর কুফল ভোগ করতে হচ্ছে গরিব ও সুবিধাবঞ্চিত ছাত্রছাত্রীদেরই এবং বলা বাহুল্য, তাঁদের সংখ্যাই বেশি। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে স্নাতক ও স্নাতক সম্মান, স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষার্থীসংখ্যা ২১ থেকে ২২ লাখ। যার মধ্যে ১৩ থেকে ১৪ লাখ পড়াশোনা করেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। অন্যরা অর্থাৎ তুলনামূলক সুবিধাভোগীরা ভর্তি হন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজে। কেউ কেউ উচ্চতর মাদ্রাসায়ও পড়েন। কিন্তু অর্ধেকের বেশি ছাত্রছাত্রী যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আওতায় পড়েন, সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির মা-বাপ আছে বলে মনে হয় না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজট অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব হলেও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় চলছে সেই পুরোনো নিয়মেই। সেখানে অধ্যয়নরত প্রত্যেক শিক্ষার্থী গড়ে দুই বছর সেশনজটে পড়লে জাতীয় ক্ষতির পরিমাণটি ভাবা যায়। ১৩-১৪ লাখ ছাত্রছাত্রীর জীবন থেকে দুটি বছর করে হারিয়ে যাচ্ছে। কমপক্ষে ২৬ লাখ ইউনিট বছর। গত বছর এইচএসসিতে পাস করেছেন পাঁচ লাখ ৭৯ হাজার। এঁদের সবাই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে না পড়লেও অধিকাংশ পড়বেন। কিন্তু তাঁদের জীবনের হারিয়ে যাওয়া দিন, মাস ও বছরগুলোর হিসাব কে দেবেন?
দুই প্রতিদিন পাঠকের কাছ থেকে বহু চিঠি পাই। তরুণদের চিঠির বেশির ভাগই চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ও বিসিএস পরীক্ষা-সংক্রান্ত। গতকাল প্রথম আলোয় খবর বের হয়েছে, প্রিলিমিনারি পরীক্ষার ফল প্রকাশের সাত মাস পার হলেও ৩৪তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করা হয়নি। ফলে দুশ্চিন্তায় আছেন ৪৬ হাজার ২৫০ জন পরীক্ষার্থী। ভাবা যায়! এই কর্মকমিশন নিয়ে আমরা কী করব? সরকারি চাকরিতে প্রবেশের আগের বয়সসীমা ছিল ২৮ বছর। এখন করা হয়েছে ৩০ বছর। কিন্তু অনেকেরই অভিযোগ, এই সময়ের মধ্যে তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হতে পারেন না। পারলেও চাকরি খোঁজার বয়স থাকে না। সে জন্য চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩২ বা ৩৫ করার দাবি তাঁদের। পৃথিবীর আর কোনো দেশে তরুণদের নিয়ে রাষ্ট্র ও সরকার এমন তামাশা করতে পারে না। সব সম্ভবের দেশে সবকিছু করে পার পাওয়া যায়। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ আছে। আছে পথ ও মতের বিস্তর ফারাক। কিন্তু একটি জায়গায় তাদের মধ্যে অদ্ভুত মিল দেখা যায়। সেটি হলো, তরুণ প্রজন্মকে ক্রমাগত উপেক্ষা করা। তাদের তারুণ্য, প্রাণশক্তি ও মেধাকে অগ্রাহ্য করা। আর এই কাজটি শুরু হয় প্রাথমিক স্তর থেকেই। স্বাধীনতার ৪৩ বছরেও অভিন্ন প্রাথমিক শিক্ষা চালু হয়নি। প্রাথমিক শিক্ষা অতিশয় বাণিজ্যিকীকরণ হয়ে পড়েছে। প্রথম শ্রেণীতে পড়ার আগেই ছেলেমেয়েকে দুই থেকে তিন বছর পড়তে হয়, প্লে গ্রুপ, কেজি ওয়ান, কেজি টু। তাই একটি শিশুকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চৌকাঠ পার হতেই আট থেকে নয় বছর লেগে যায়। চার বছর বয়সেও শিশুটি বিদ্যালয়ে ভর্তি হলে এসএসসি পাস করতে লাগে ১৮-১৯ বছর। এরপর কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে আরও ছয়-সাত বছর।
আর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের খপ্পরে পড়লে তো বাড়তি দুই বছর যোগ করতে হবে। এরশাদের আমলে আশির দশকে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি নৈরাজ্য চলছিল। তখন আমাদের এক অনুজ শিক্ষার্থী এইচএসসি পাস করার পর এখানে ভর্তির প্রক্রিয়া বিলম্ব দেখে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন ইংরেজি বিভাগে। সেখানে চার বছরে অনার্স ও এমএ করার পর দেশে এসে দেখেন, তাঁর সতীর্থরা অনার্সই শেষ করতে পারেননি। এই অপচয়ের জবাব কী? আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার এই মস্ত বড় দুর্বলতার দিক নিয়ে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা কিংবা শিক্ষাবিদেরা ভাবেন না। ভাবলে প্রতিবছর লাখ লাখ পরীক্ষার্থীকে এভাবে পরীক্ষা, ফল প্রকাশ কিংবা ভর্তি পরীক্ষার তারিখের জন্য হয়রানি ও দুর্ভোগে পড়তে হতো না। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যে ভয়াবহ অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, তা তাঁরা একবারও চিন্তা করেন না। আমাদের নতুন প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেকেই বড় বড় কথা বলেন। তাঁদের হাতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বলে দাবি করেন, কিন্তু নতুন প্রজন্মের প্রায় প্রত্যেকের জীবন থেকে যে তিন-চারটি বছর হারিয়ে যাচ্ছে, সে সম্পর্কে তাঁরা কেউ কিছু বলেন না। এর পেছনে শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ যেমন দায়ী, তেমনি দায়ী শিক্ষার এবং তরুণ প্রজন্মের প্রতি রাষ্ট্রের ও শিক্ষার অভিভাবকদের চরম উদাসীনতা। ১৯৯২ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল কলেজ পর্যায়ের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে। আগে যার দায়িত্ব ছিল কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর। এসব বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব শিক্ষাক্রম পরিচালনার পাশাপাশি কলেজগুলোর তদারকির কাজ করত; বিশ্ববিদ্যালয় সনদও প্রদান করত তারা। কিন্তু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষায় শৃঙ্খলা আনার বদলে দুর্গতি এনেছে। এই বিশ্ববিদ্যালয় সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত ও কলঙ্কিত হয় বিগত বিএনপি সরকারের আমলে, যখন আফতাব উদ্দিন আহমাদ উপাচার্য ছিলেন। পরবর্তীকালে পদ্মা-যমুনায় অনেক পানি গড়িয়েছে। একাধিকবার সরকার ও উপাচার্য বদল হয়েছেন। কিন্তু এই বিশ্ববিদ্যালয়টির দুর্নীতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা কমেছে এমন দাবি করা যাবে না। সেশনজট আগেও ছিল, এখনো আছে।
দলীয়করণ আগেও ছিল, এখনো আছে। আর এসব রোগের উপসর্গ এখন আর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়েই সীমিত নেই, প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণের মচ্ছব চলছে। যখন যাঁরা ক্ষমতায় থাকেন, তাঁরাই বিশ্বদ্যািলয়গুলোকে দলীয় কর্মীদের কর্মসংস্থান কেন্দ্রে পরিণত করেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র ও শিক্ষক-কর্মচারী অনুপাত কত হওয়া উচিত? উন্নত বিশ্বে ছাত্র ও শিক্ষকের অনুপাত ১০:১। অর্থাৎ ১০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক। আমাদের দেশে সেটি সম্ভব না হলেও ইউজিসি এই অনুপাত বেঁধে দিয়েছে ১৪:১। কিন্তু যেখানে ছাত্র ও কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনুপাত বেশি হওয়ার কথা, সেখানে অনেক কম। উপাচার্য মহোদয়েরা দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম যে কাজটি করেন সেটি হলো, কিছু অপ্রয়োজনীয় কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে দল ভারী করা। বিশ্ববিদ্যালয় মানেই এখন মাথাভারী প্রশাসন। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ও কর্মচারী অনুপাত ৪: ১। অর্থাৎ চারজন ছাত্র বা ছাত্রীকে দেখাশোনার জন্য একজন কর্মকর্তা বা কর্মচারী রয়েছেন। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ফি ও বেতন বাড়ানোর বিরুদ্ধে আন্দোলন হচ্ছে। এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্ধিত ফি ও বেতন থেকে আয় বাড়বে ৫০ লাখ টাকারও কম। অথচ বাড়তি শ্রমিক-কর্মচারী নিয়োগ করে তাঁদের পেছনে ব্যয় করা হচ্ছে কয়েক কোটি টাকা। জনগণের অর্থ নিয়ে এমন স্বেচ্ছাচারিতা চালানোর সাহস পান কীভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা? একটি দেশের মানবসম্পদ তৈরি করার প্রধান মাধ্যম হলো বিশ্ববিদ্যালয় বা সমমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। অথচ আমাদের দেশে এর মানই নাজুক। পশ্চিমের উন্নত বিশ্ববিদ্যালয় দূরে থাক, প্রতিবেশী দেশগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গেও আমরা প্রতিযোগিতায় পেরে উঠছি না। বিশ্ব, এমনকি এশীয় সূচকেও বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান ক্রমেই নিচের দিকে নামছে। আর কত নিচে নামলে মহাত্মনদের চৈতন্যোদয় হবে?
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

তারুণ্যের জাগরণ ও আমাদের মুক্তিযুদ্ধ

সুড়ঙ্গের অপর প্রান্তে আলোর ছটা
১৯৯৬ সালে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠাকালে আমরা আটজন ট্রাস্টি একটি স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছাই। আমাদের প্রধান লক্ষ্য হবে নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের বস্তুনিষ্ঠ সমগ্র ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত করা, যাতে তারা এ ইতিহাসের আলোকে বর্তমানকে বিশ্লেষণ করে এবং ভবিষ্যতের পথনির্দেশ পায়। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে বিষয়টিতে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া সম্ভব হয়নি; আর পঁচাত্তরের পর প্রায় দুই সামরিক শাসনামলে পরিকল্পিত ও ধূর্ততার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করা হয়েছে। পাঠ্যপুস্তক ও তথ্যমাধ্যমে কার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে আমরা মুক্তিযোদ্ধারা দেশ স্বাধীন করলাম, সেটি বোঝার উপায় ছিল না। মুক্তিযুদ্ধ বহুমাত্রিক বিপুল কর্মযজ্ঞ—এ ইতিহাস যেমন বীরত্ব ও গৌরবের, তেমন নৃশংসতা ও বেদনার। পাঠ্যপুস্তকে বীরত্বের বিষয়টি স্থান পায়, কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা, বিশেষত তাদের সহযোগী এদেশীয় কুলাঙ্গারদের নৃশংসতা অনুল্লেখিত রয়ে যায়। ফলে, আমাদের প্রজন্মের আশঙ্কা ছিল সম্ভবত আমরা অন্তত একটি প্রজন্মকে হারালাম। গণজাগরণ মঞ্চের তরুণেরা আমাদের এ ধারণা ভুল প্রমাণ করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেই স্বল্পতম সময়ে সর্বাধিক মানুষ গণহত্যায় নিহত হয়; জাতিসংঘের উদ্বাস্তু প্রতিষ্ঠানের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ছিল বিশ্বযুদ্ধের পর সর্বোচ্চসংখ্যক শরণার্থীর দেশত্যাগের ঘটনা।
৩০ লাখ শহীদ কেবল সংখ্যার পরিমাপ নয়, প্রতিটি জেলা ও উপজেলা সদর, এমনকি গ্রামে বধ্যভূমি রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সব সভ্য দেশে এ ধরনের মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধের বিচার হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট দল, গোষ্ঠী তথ্যমাধমে নিষিদ্ধ হয়েছে। আর এ দুর্ভাগা দেশে আমরা কয়েক দশক ধরে তাদের বিচারের সম্মুখীন করতে সক্ষম হইনি। স্বস্তির বিষয়, ২০০৯ সালে নির্বাচিত সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকাজ শুরু করেছে এবং আন্তর্জাতিক মানের আইনে স্বচ্ছতার সঙ্গে শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার অব্যাহত রয়েছে। কয়েক বছর ধরে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম ও প্রজন্ম ’৭১ এ দাবি সমুন্নত রেখেছে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের স্কুলভিত্তিক কর্মসূচিও বিশেষ ভূমিকা রেখে গণজাগরণ মঞ্চের জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে। তবে গত বছর প্রতিষ্ঠিত গণজাগরণ মঞ্চ এ দাবি পূরণের কার্যক্রমে প্রচণ্ড গতিবেগ সঞ্চার করেছে। মূলত গণজাগরণ মঞ্চের দাবির ফলেই জাতীয় সংসদে উভয় পক্ষের সমতাভিত্তিক আপিলের বিধান সংযোজিত হয়েছে এবং তার ফলে আপিল বিভাগের পক্ষে কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ শাস্তির রায় প্রদান সম্ভব হয়েছে। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে গণজাগরণ মঞ্চের এই বিশাল অর্জন জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে প্রাপ্তির যোগ ঘটিয়েছে। বাংলাদেশে যে মীমাংসিত বিষয়টি বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে পরিবর্তন করার কয়েক দশকের অপপ্রয়াস চলেছে, সেটি হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের ভাবাদর্শ, যা ১৯৭২ সালের সংবিধানে চার নীতির মধ্যে নিহিত রয়েছে। বায়ান্ন থেকে একাত্তর অবধি মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি পর্বে এই অঞ্চলের মানুষ যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক আন্দোলন করেছে, তার মধ্য দিয়ে এ নীতিগুলো উৎসারিত হয়েছে। আর এ নীতিগুলো একবিংশ শতাব্দীতে সব আধুনিক রাষ্ট্রের মৌলনীতি ও সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত মূল্যবোধ। আমরা এমন একটি দেশ চেয়েছি, যে দেশে সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘু বিবেচনায় দেশে জনগোষ্ঠী থাকবে না, সব ধর্ম, আদিবাসীনির্বিশেষে সবাই সম-অধিকারের ভিত্তিতে বসবাস করবে।
পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর এ নীতিগুলো ব্যবচ্ছেদ করা হয়েছে; কেবল ইতিহাস বিকৃতি নয়, দেশকে পাকিস্তানের আদলে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পিত অপচেষ্টা চলেছে। ২০০৯ সালের সরকার রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম রেখে কিছুটা গোঁজামিল দিয়ে হলেও এ নীতিগুলো সংবিধানে প্রতিস্থাপিত করেছে। তবে, এ নীতিগুলো আজও সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। স্বাধীনতার পর আমরা আত্মতুষ্টিতে আক্রান্ত হয়েছি এবং ক্ষমতায় আরোহণ করার পর অনেকে ক্ষমতার অপব্যবহার করে অর্থ উপার্জনে অতিরিক্ত মনোযোগী হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে পঁচাত্তরের পর পুনর্বাসিত পরাজিত শক্তি পরিকল্পিতভাবে অগ্রসর হয়েছে; তারা আর্থিক ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে, আন্তর্জাতিক জঙ্গি নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, ধর্মের উগ্রবাদী ব্যাখ্যা নিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে সর্বসাধারণের কাছে পৌঁছেছে এবং বহুজনের মনোজগতে প্রভাব রাখতে সমর্থ হয়েছে। আজ এই অপশক্তির পরিকল্পিত প্রয়াসের ফলে সমাজের একাংশে জীবনাচারের ক্ষেত্রে তার ধর্মবিশ্বাস কিংবা জাতি-পরিচয়ের মধ্যে কোনটি প্রাধান্য পাবে, সে বিষয়ে দ্বিধা লক্ষ করা যায়। এর ফলে সমাজের অভ্যন্তরে গভীর ও বিস্তীর্ণ বিভাজনও লক্ষ করা যাচ্ছে। সাম্প্রদায়িক হামলার পর জনপ্রতিনিধিরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় যান না, নির্বাচনী কৌশলের কাছে নীতি পরাস্ত হয়, একটি মানবিক সমাজ গড়ার জন্য সামাজিক ও সাংস্কৃতিক শক্তিও ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণে সমর্থ হয় না। সমাজের এই সংকটকালে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শাণিত গণজাগরণ মঞ্চ মুক্তিযুদ্ধের ভাবাদর্শকে হূদয়ে ধারণ করেছে। নির্বাচনোত্তর সাম্প্রদায়িক হামলার পর তাদের রোডমার্চ তার সাক্ষ্য বহন করে। প্রায় পাশাপাশি সময় বাংলাদেশ রুখে দাঁড়াও-এর পক্ষ থেকে দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁও পরিদর্শনের সময় আমার মনে হয়েছে, তাদের এ কর্মসূচি স্থানীয় তরুণসমাজকে উদ্দীপ্ত করেছে এবং হিন্দুধর্মাবলম্বীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হয়েছে। দুই আমার বিবেচনায় গণজাগরণ মঞ্চ কোনো সংগঠন বা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি একটি ফেনোমেনোন।
ইতিহাস বিকৃতি সত্ত্বেও সেক্যুলার শিক্ষায় শিক্ষিত যে তরুণসমাজ মুক্তিযুদ্ধের ভাবাদর্শকে হূদয়ে লালন করেছে, কয়েক বছর ধরে অনলাইন নেটওয়ার্কে লক্ষাধিক তরুণদের কাছে এ বাণী পৌঁছে দিয়েছে, এটি তার স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ। এটি যথেষ্ট ফোকাসড কার্যক্রম; মূল দাবি যুদ্ধাপরাধীদের প্রচলিত আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা, জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা, তাদের বিপুল অর্থের উৎস রোধ করা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমাজ ও রাষ্ট্রে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। এই নতুন প্রজন্ম গত চার দশকের প্রতিবাদী সমাবেশের সংস্কৃতি বদলে দিয়েছে। শাহবাগসহ সারা দেশে মানুষ যোগ দিয়েছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। তাদের অর্থের বিনিময়ে কিংবা ভাড়া করা যানবাহনে আনতে হয়নি, মহাসমাবেশে অগুনতি মানুষ এসেছে কাঁধে শিশুসন্তান নিয়ে, দিবারাত্রি সবাই খাবার ভাগ করে নিয়েছে, মানিব্যাগ কিংবা মুঠোফোন নিয়ে দুশ্চিন্তা নেই। এ জনসমুদ্রের অংশগ্রহণকারী কারা? তারা যুদ্ধাপরাধের বিচার চায়, অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখে, কিন্তু প্রচলিত সাংঘর্ষিক রাজনীতির নিরন্তর কূটকচালে বীতশ্রদ্ধ। তারা মুক্তিযুদ্ধের ভাবাদর্শে সাধারণভাবে বিশ্বাসী ও সমর্থক, কিন্তু ক্ষমতার অপব্যবহারের তীব্র সমালোচক। তারা কর্মজীবী ও শ্রমজীবী মানুষ, যারা জনসভা কিংবা মিছিলে যোগ দেয় না, তাদের চাহিদা একটি নির্দলীয় প্ল্যাটফর্ম, যা গণজাগরণ মঞ্চের প্রাথমিক পর্ব পূরণ করেছে। অবশ্য গণজাগরণ মঞ্চকে এক বছর ধরে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে কাজ করতে হয়েছে। সারা বছর ধরে যুদ্ধাপরাধের বিচার কার্যক্রম বানচাল করতে আন্তর্জাতিক জঙ্গি নেটওয়ার্কের অর্থ ও সমর্থনপুষ্ট হয়ে জামায়াত-শিবির চরম নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চালিয়েছে এবং তাদের প্রশ্রয় দিয়েছে প্রধান বিরোধী দল। বিশ্বব্যাপী গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়েছে তথাকথিত মানবাধিকার সংস্থাসহ কিছু তথ্যমাধ্যম। নিহত হয়েছে গণজাগরণ মঞ্চের বেশ কয়েকজন মেধাবী কর্মী। বহুবার বাইরের বৃত্তে দাঁড়িয়ে তাদের বক্তব্য শুনেছি, কখনোই ধর্ম সম্পর্কে কোনো কটূক্তি শুনিনি; অথচ তাদের নাস্তিক আখ্যায়িত করা হয়েছে এবং কিছু মানুষ এ অপপ্রচারে বিভ্রান্তও হয়েছে।
রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার ধর্ম ও রাজনীতি উভয়কেই কলুষিত করেছে; এর ফলে অতি সতর্ক এবং শতভাগ আনুগত্যপ্রত্যাশী রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে তাদের দূরত্ব বেড়েছে। তরুণদের এ জাগরণ নতুন নয়। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে এই অঞ্চলের প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা। ষাটের দশকে ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় থাকার সুযোগ হয়েছে, তরুণসমাজের সেই আন্দোলন ছিল মূল ধারার সংগ্রামে বর্শাফলকের মতো। আমাদের মুক্তিবাহিনীতেও তরুণেরাই প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। বাংলাদেশের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনেও তারা বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। যৌবনে বৈষয়িক চিন্তা প্রাধান্য পায় না, তরুণদের নৈতিক ভিত্তি ও আবেগ অনেক সবল ও প্রবল থাকে। আর আজ ক্ষমতার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার ফলে কিছু তরুণের অধোগতি সত্ত্বেও সামগ্রিকভাবে তরুণসমাজ নৈতিক অবস্থানে দৃঢ় রয়েছে। তবে গণজাগরণ মঞ্চের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের আরব বসন্তের তুলনা যথার্থ নয়। মিসরসহ অন্যান্য দেশে প্রায় ছয় দশক ধরে প্রকারান্তরে সামরিক শাসন চলেছে এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। সেই দেশে একমাত্র সংগঠিত শক্তি ইসলামিক ব্রাদারহুড। অন্যদিকে, বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ঐতিহ্য রয়েছে, শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের উপস্থিতি লক্ষণীয় এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে। আর মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রশাসনের নতুন ‘রেজিম চেঞ্জের’ তত্ত্ব আল-কায়েদার অনুপ্রবেশ নিশ্চিত করেছে। অবশ্য গণজাগরণ মঞ্চের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ব্যক্তিরা নানা ধারার নেতা-কর্মী, বাংলাদেশের জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক মহলের দ্বৈত নীতি বিবেচনায় নিয়ে তাদের অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন। কয়েক দশক ধরে রাজনীতি ও সমাজের নানা ধারা ও প্রবণতায় প্রায়ই হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ি। গণজাগরণ মঞ্চে সুড়ঙ্গের অপর প্রান্তে আলোর ছটা দেখছি, যে আলো উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হচ্ছে।
সারওয়ার আলী: মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি।

ভালোবাসা দিবস মানি না!

“কিসের ভালবাসা দিবস?
এসব মানিনা!
সভ্যতার কানাগলি ফসকে বের হওয়া এসব বখাটে দিনগুলো ধর্ম মেনে নেবে না। গীতা, পুরাণ কিংবা অন্য কোন কেতাবে এমন কোন দিনের ইতিহাস আছে কিনা আমাদের জানা নেই”- বিশ্বভালবাসা দিবসের একদিন আগে বুধবার অমৃতসরসহ ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদী প্রভাবিত অঞ্চলগুলো রাজপথে ভালোবাসা দিবস বিরোধী এসব স্লোগানে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে উগ্রবাদীরা। তাদের মতে, দিবসটি তাদের উপর সাংস্কৃতিক আক্রমণ। দিবসটি তাদের হিন্দু জীবনবিধানেরও পরিপন্থী। তাই তারা প্ল্যাকার্ড-এ আগুন জ্বালিয়ে উল্লাস করে

বিশ্বের বয়সী পরিবারের বয়স ৮৫৫ বছর

ব্রিটেনে বসবাসকারী ১১ ভাই-বোন যাদের মোট বয়স ৮৫৫ বছর তারা খুব সম্ভবত পৃথিবীর সব থেকে বয়স্ক পরিবার। মিডিলসব্রাগ্র থেকে আগত ব্র“ডেনেল পরিবারের ওই ১১ ভাই-বোনের বয়স ৮৯ থেকে ৬৮ এর মধ্যে। দ্য ডেইলি এক্সপ্রেসের বরাত দিয়ে বুধবার এনডিটিভি জানায়,
গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড কমিটির তথ্য অনুযায়ী পৃথিবীতে সম্ভবত এমন আর কোনো ভাই-বোনের দল নেই যারা একই পিতা-মাতার সন্তান এবং তাদের মোট বয়স ৮৫৫ এর বেশি। ১১ ভাই-বোনের মধ্যে পাঁচজন ভাই ও ছয় জন বোন। তারা হলেন- রবার্ট (৬৮), জন (৬৯), জেন (৭১), ম্যারিয়ন (৭৪), জেমস (৭৬), ভিসেন্ট (৭৮), মে (৭৯), মেরি (৮০), উইনিফ্রেড (৮৩), উইলিয়াম (৮৮) এবং বের্নাডেট (৮৯)।

ঋণশোধে কন্যাদান

নাম সানিদা; বয়স ৫ বছর। সোয়াত উপত্যকায় বসবাসরত এই কন্যাশিশুর বাবা তাকে বিয়ে দিতে চান এমন এক ব্যক্তির সঙ্গে যাকে সে কখনোই দেখেনি। যদিও এটি কোনো বিয়ে নয়। এটা হল ‘ঋণশোধ’, ‘ক্ষতিপূরণ’। কয়েক মাস আগে সানিদার বাবা ‘আলি আহমদ’ অন্য একটি উপত্যকার এক মেয়ের সঙ্গে পালিয়ে যান। ওই মেয়ের পরিবার প্রতিশোধ নিতে চাইলে তাদের খুশি করার জন্য তিনি তার মেয়ে ও ভাইঝিকে বিয়ে দেয়ার ওয়াদা করেন। উপত্যকায় প্রচলিত এ ঐতিহ্যকে ‘সাওয়ারা’ বলে। সরকারি তথ্য মতে এ প্রথা সোয়াত উপত্যকায় ক্রমশ বাড়ছে।
২০১৩-তে এ ধরনের ঘটনা রেকর্ড করা হয় ১২টি যেখানে ২০১২ সালে ছিল ১টি। সানিদার মা আপত্তি জানালেও কিছু করার ছিল না কারণ এ বিয়ে আয়োজন করা হয়েছে ‘জিগরার’ মাধ্যমে। জিগরা হল একটি বৈঠক যেখানে স্থানীয় বয়স্করা যে কোনো ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেন। সানিদা ভাগ্যক্রমে বেঁচে যায়। পুলিশ সানিদার বাবা ও জিগরা সদস্যদের আটক করে। কিন্তু সবার ভাগ্য সানিদার মতো না। ‘সাওয়ারার ঘটনা প্রায়শই ঘটে এখানে। কিন্তু কেউ পুলিশকে জানায় না। কারণ মেয়েদের/মেয়েলি ব্যাপারগুলোতে আমরা পুলিশের কাছে যাই না।’ বলছিলেন সানিদার মামা। সানিদার বাবা তার অন্য মেয়ে ‘স্বপনা’কে একইভাবে বিয়ে দিয়েছিল। সিনিয়ন পুলিশ অফিসার নাবিদ খান জানান, স্থানীয়রা এ ব্যাপারে সাক্ষ্য দিতে চায় না। প্রত্যক্ষদর্শীদের মাঝে তীব্র অনিচ্ছা দেখা যায়। বর্তমান আধুনিক সভ্যতায় এসেও এ ধরনের বর্বরতা খুবই দুঃখজনক।