Tuesday, October 21, 2014

মিয়ানমারে গুপ্তসম্পদের সন্ধানে -আলজাজিরা by মীম ওয়ালীউল্লাহ

এক মুঠো কাদা নিয়ে জ মিন্ত আগ্রহের সাথে এর গন্ধ শুঁকছেন। কালো স্বর্ণের মিষ্টি ঘ্রাণ পাওয়ার আশায় মিয়ানমারের দারিদ্র্যপীড়িত পশ্চিম উপকূলীয় এলাকায় খুঁড়তে থাকা তেলখনির নিচ থেকে এই কাদামাটি তুলে এনেছেন জ মিন্ত। একটি ছোট্ট খাদের পানিতে তেলের প্রলেপ চকচক করছে। এর পাশে দাঁড়িয়ে মিন্ত জানালেন, এখানে কাজ করে ভালোই টাকা পাই; কিন্তু তার এই সার্থকতা শিগগির পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে। কেননা বিগ অয়েল কোম্পানি তেল অনুসন্ধানের পেছনে লেগে আছে। দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে সঙ্ঘাতপূর্ণ সীমান্ত বাজার মিয়ানমারে লুকিয়ে থাকা খনিজসম্পদের সন্ধান দ্রুত জোরদার হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, জাপান ও সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন কোম্পানি দেশটিতে আসতে চাচ্ছে। অথচ দুই দশক আগেও মানবাধিকারের মারাত্মক লঙ্ঘনের কারণে মিয়ানমার থেকে ওই সব কোম্পানি মুখ ফিরিয়ে রেখেছিল। দুই দশক ধরে চীনের সাথে মিয়ানমারের সখ্যতা গড়ে ওঠে; কিন্তু এর দ্বারা দেশটি খুব বেশি লাভবান হতে পারেনি। চীনের তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত হতে চলেছে এমন আশঙ্কায় মিয়ানমার ২০১১ সালে উদার অর্থনৈতিকপ্রক্রিয়া শুরু করে। এ সময় বৈদেশিক সম্পর্কে আবার ভারসাম্যের পথ অনুসরণ ও রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দেয়া শুরু করে দেশটি। মিয়ানমার গণতন্ত্রের পথে সামান্য পা বাড়াতেই পশ্চিমা দেশগুলো এর ওপর থেকে অর্থনৈতিক অবরোধ শিথিল করে। গত বছর হোয়াইট হাউজে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সাথে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন সাক্ষাৎ করেন। গত ৫০ বছরের মধ্যে এই প্রথম কোনো মিয়ানমার প্রেসিডেন্ট যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন। এখন মিয়ানমারের আর একমাত্র বন্ধু শুধু চীন নয়, এর সাথে অন্যান্য দেশও যোগ হয়েছে। ফলে বিষয়টি জটিল হয়ে পড়েছে।

>>রামরি দ্বীপের এক কৃষক তেলের সন্ধানে মাঠি খুঁড়ে গন্ধ শুঁকছে
মিয়ানমার বিশ্বের অন্যতম জ্বালানি তেল উৎপাদনকারী পুরাতন দেশ। সর্বপ্রথম ১৮৫৩ সালে তেল রফতানি করে মিয়ানমার। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকেরা মিয়ানমারে তেল আবিষ্কারের পর বার্ম অয়েল কোম্পানি গঠন করে। অনেক আগে তেল উৎপাদন শুরু করলেও ১৯৪৮ সালে ব্রিটেন থেকে স্বাধীন হওয়ার পর পাঁচ দশক ধরে দেশটিতে অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা চলে আসছে। ফলে দেশটির তেল উৎপাদন উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছতে পারেনি। তবে কয়েক প্রজন্ম ধরে এখানে বাঁশ দিয়ে গর্ত করে স্থানীয় পদ্ধতিতে তেল উঠানো হয়। আর এই তেল বিক্রি করেই জীবনধারণ করে চলেছেন মিয়ানমারের রামরি দ্বীপের অধিবাসীরা। এই তেল কিয়াউকফিউ শহরে স্থানীয় প্রযুক্তি দিয়ে পরিশোধন করা হয়। কিন্তু পরিশোধন প্রক্রিয়াটি মারাত্মক। তবে এখানকার লোকেরা এ জ্বালানিই মোটরসাইকেল ও মোটরগাড়িতে ব্যবহার করেন। বর্তমানে দেশটির বাণিজ্যিক রাজধানী ইয়াংগুনে ট্রাকে পেট্রল সরবরাহ হচ্ছে।
তেলসমৃদ্ধ গ্রাম রামশেকলের বাসিন্দা তেলসমৃদ্ধ জমির মালিক ইউ তুন থেন বলেন, ১০ বছর আগে এখানে প্রচুর তেল পেতাম। তার মেয়ের একটি ছবি দেখিয়ে তিনি বলেন, স্থানীয় ঠিকাদারদের এই জমি ভাড়া দিয়ে আমার মেয়ের গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রি সম্পন্ন হয়েছে। তেলসমৃদ্ধ দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় প্রতিবেশী চীনের সাথে সম্পর্কের কেন অবনতি এবং পশ্চিমাদের সাথে কেন সম্পর্ক বৃদ্ধি হচ্ছে তা সহজেই বুঝা যায়। অনেকের মতো ইউ তুনও চীনের জাতীয় পেট্রলিয়াম করপোরেশনের প্রতি ক্ষুব্ধ। তিনি বলেন, চীনারা স্থানীয়দের প্রতি লক্ষ রাখে না, তারা যা ইচ্ছা তা-ই করে। মিয়ানমারের অর্থনৈতিক দীর্ঘসূত্রতা জ মিন্তদের মতো তেলশ্রমিকদের সমস্যায় প্রতিফলিত হচ্ছে। দুই বছর আগে উপকূলবর্তী শহর থেকে চীনের ইউনান প্রদেশ পর্যন্ত এক হাজার ২৪০ কিলোমিটার তেল ও গ্যাস পাইপ লাইন নির্মাণের কারণে তিনি উৎখাত হয়েছেন।
গত বছর সমুদ্র তীরবর্তী পাইপের মাধ্যমে ৬৬.৫ বিলিয়ন কিউবিক ফুট গ্যাস গেছে চীনে। আর আগামী বছর প্রতিদিন ৪৪ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পাইপ লাইনের মাধ্যমে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে। জ মিন্ত বলেন, আমার পরিবারের জীবন-জীবিকা নির্ভর করে এ জমির ওপর। হারানো জমি আমি ফিরে পেতে চাই। স্থানীয়দের অভিযোগ, এত গ্যাস সম্পদের পরও খুব কম রাজস্ব পাওয়া যায়। সুশীলসমাজের এক নেতা সো শু বলেন, আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে স্থানীয়রা লাভবান হচ্ছেন না। জ মিন্ত নতুন এক সমস্যায় পড়েছেন। তার জমিতে ১৭ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে তেলের একটি শিল্প পার্ক নির্মাণ করা হচ্ছে। বিশেষ এই অর্থনৈতিক জোনের মধ্যে থাকবে গভীর সমুদ্রবন্দর, তেল ও গ্যাসের জন্য রসদ সরবরাহ ব্যবস্থা এবং উন্নয়ন ও উৎপাদন সুবিধা। চীনের কোম্পানিগুলো দৃশ্যত এখানে অনুপস্থিত। এ থেকে বুঝা যায় যে, মিয়ানমারে খুব সুবিধাজনক অবস্থানে নেই চীন। এ মাসের প্রথম দিকে মিয়ানমার ব্যাংকিং সেক্টরের পরিধি বৃদ্ধি করেছে। এর মধ্যে জাপান তিন ও সিঙ্গাপুর দু’টি ব্যাংকের অনুমোদন পেয়েছে। অন্য দিকে চীন মাত্র একটি ব্যাংকের অনুমোদন পেয়েছে। ইতোমধ্যে চীনের সমরাস্ত্রের প্রতি আগ্রহ না দেখিয়ে রাশিয়ার বিমান ও হেলিকপ্টারের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছে মিয়ানমার।
২০১১ সালে চীনের একটি নির্মাণাধীন ড্যামের কাজ স্থগিত করে দিয়েছেন থেইন সেইন। এই ড্যামের মাধ্যমে উৎপাদিত ৯০ শতাংশ বিদ্যুৎ চীনে সরবরাহের কথা ছিল। চার বছর আগে মিয়ানমারে ৮.২৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল চীন। এর পরের বছর দেশটি পশ্চিমাদের জন্য তার দ্বার উন্মোচন করে দেয়। এ বছর দেশটির পোলট্রি খাতে ৫৬.৯ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে চীন। সিঙ্গাপুরের ইনস্টিটিউট অব সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের সিনিয়র ফেলো আয়ান স্টোরি বলেন, মিয়ানমারে চীনের বিনিয়োগ বিফলে গেছে। বৈদেশিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বৃদ্ধির মাধ্যমে চীনের ওপর নির্ভরতা কমিয়েছে মিয়ানমার। তবে এটি ভাবার কোনো কারণ নেই যে, চীন-মিয়ানমার সম্পর্ক একবারে শেষ হয়ে গেছে। সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ কমে যাওয়ার পরও দেশটির দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পর্ক এখনো ভালো এবং এটি অব্যাহতভাবে বাড়তে থাকবে। ২০১২ সালে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য প্রায় অর্ধেক বেড়ে ৬৫০ কোটি ডলারে পৌঁছে। আয়ান বলেন, চীন এখনো সব দিক থেকে মিয়ানমারের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। দেশটি বেইজিংয়ের সাথে আন্তরিক ও ফলপ্রসূ সম্পর্ক বজায় রাখবে।
এশিয়ার উদীয়মান পরাশক্তি চীন ২০১২ সালে কাচিন বিদ্রোহ দমনে মিয়ানমারকে কূটনৈতিক চাপ দেয়। এ সময় মার্কিন তেল কোম্পানি শেল সীমান্তের ভুল দিকে জাহাজ নোঙর করে।  কিয়ুকফিও অর্থনৈতিক কেন্দ্র থেকে তেল ও গ্যাস লাইনের পাশাপাশি মহাসড়ক ও রেলপথ নির্মাণ করতে চায় চীন। এর মাধ্যমে চীনের ইউনান প্রদেশ থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক পথ তৈরি হবে। সিডনির ম্যাকুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ সিন টার্নেল বলেন, ২০১১ সাল থেকে চীনের সাথে শিথিল সম্পর্ক যাচ্ছে মিয়ানমারের। তবে দেশটির সাথে চীনের অবস্থান কাছাকাছি থাকবে। পুরাতন ঘনিষ্ঠতা হয়ত আর ফিরে আসবে না; কিন্তু মিয়ানমারের সাথে চীনের সম্পর্ক ভালো থাকবে। সূত্র-আলজাজিরা।
অনুবাদ- মীম ওয়ালীউল্লাহ

গুম বাড়ছে বাংলাদেশে

প্রায় এক বছর আগে রাজধানীর বসুন্ধরা এলাকা থেকে কালো পোশাক পরা কিছু লোক জোর করে তুলে নিয়ে যায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) স্থানীয় নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমনকে। তার পর থেকে এখন পর্যন্ত তিনি কোথায় আছেন কেউ জানে না। ঘটনার প্রত্যদর্শীরা বলেন, আধা সামরিক বাহিনী র‌্যাবের পোশাক পরা কিছু লোক সুমন ও অন্য ছয়জনকে মাথা ঢেকে জোর করে তাদের গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। এর মধ্যে ছিলেন সুমনের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় তানভির। তাদেরকে গাড়িতে তুলে নেয়ার পর পরই গাড়ি ঘটনাস্থল থেকে দ্রুত চলে যায়। এ জন্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকারবিষয়ক সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বাংলাদেশ গবেষক আব্বাস ফয়েজ বলেন, নিরাপত্তা রাকারীদের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারকে সুদূরপ্রসারী ও কঠোর অবস্থান নিতে হবে। এসব মামলায় তাদের জবাবদিহির যে অভাব রয়েছে তার ইতি ঘটাতে হবে। অপহৃত সাজেদুল ইসলাম সুমনের ছোট বোন সানজিদা বলেন, ভাইয়াকে তুলে নেয়ার আধা ঘণ্টার মধ্যে আমার মা ও পরিবারের অন্য সদস্যরা উত্তরায় র‌্যাব-১ অফিসে যান। কিন্তু সেখানকার ডিউটি অফিসার এ ঘটনায় র‌্যাব জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেন। তিনি আরো বলেন, সুমন কোথায় থাকতে পারেন সে বিষয়ে কোনো তথ্য নেই তাদের কাছে। ওই ঘটনার পর অপহৃতদের কাউকেই আর দেখা যায়নি। ওই দিকে সুমন অপহরণের পর পরিবারের সদস্যরা র‌্যাবের কাছে কোনো সদুত্তর না পেয়ে থানায় যান। সেখানেও তারা একই জবাব পান। এমনকি তাদেরকে লিখিত অভিযোগ দিতেও দেয়া হয়নি।
গতকাল অনলাইন আল জাজিরায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়। ‘ফোর্সড ডিজঅ্যাপেয়ারেনসেস সার্জ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এ প্রতিবেদনটির লেখক ডেভিড বার্গম্যান। এতে বলা হয়েছে, স্থানীয় মানবাধিকারবিষয়ক সংগঠন অধিকার-এর মতে গত দুই বছরে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো বাংলাদেশে অপহরণ করেছে ৭৫ জনকে। এর মধ্যে ২৮ জন অপহরণের পর ফিরে এসেছেন। ১২ জনকে পাওয়া গেছে মৃত অবস্থায়। বাকি ৩৫ জন এখনো নিখোঁজ। প্রত্যদর্শীরা এসব অপহরণের জন্য দায়ী করেছেন র‌্যাব অথবা পুলিশের গোয়েন্দা শাখাকে।
মানবাধিকারবিষয়ক সংগঠন আইন ও সালিস কেন্দ্রের মতে, আগের একই সময়ের তুলনায় গুম দ্বিগুণের চেয়ে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এ বছরের এপ্রিলে শীতল্যা নদী থেকে উদ্ধার করা হয় সাতজনের লাশ। তাদেরকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। এ ঘটনার চার দিন আগে তাদেরকে অপহরণ করেছিল র‌্যাবের কিছু সদস্য। এ ঘটনায় দেশজুড়ে তোলপাড় হয়। হাইকোর্টের বিরল হস্তেেপ র‌্যাবের ৯ সদস্য এখন আটক আছেন। তদন্ত চলছে পুলিশের। অধিকার-এর সম্পাদক আদিলুর রহমান খান বলেন, এমন গুমের সাথে পুলিশ বা অন্য কোনো তদন্তকারী সংস্থার যেকোনো রকম সম্পৃক্ততা অত্যন্ত অস্বাভাবিক। যেসব মানুষকে গুম করা হয়েছে তাদের বেশির ভাগই বিরোধী রাজনৈতিক দলের সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত। সাজেদুল ইসলাম সুমন ছিলেন ঢাকার শাহীনবাগ এলাকার বিএনপির একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা। তার বোন সানজিদা বিশ্বাস করেন, রাজনীতি করার কারণেই তার ভাইকে অপহরণ করা হয়েছে। নিজের এলাকায় সুমন ভালো একজন রাজনৈতিক সংগঠক ছিলেন। নিজেদের পরিবারের অবস্থা প্রকাশ করতে এমন গুমের শিকার পরিবারগুলো এখন একজোট হওয়ার চেষ্টা করছে। সুমনের মা এ জন্য নতুন একটি গ্রুপ গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। এর নাম দেয়া হয়েছে ‘মাদারস কল’ বা মায়ের ডাক। এ েেত্র সুমনের মাকে সহায়তা করছেন সানজিদা। যেসব ব্যক্তিকে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার লোকজন অপহরণ করেছে তাদেরকে নিয়ে এ সংগঠন দাঁড় করানো হচ্ছে। ৬০ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত শিক রুহুল আমিন চৌধুরী। তার ছেলে আদনান চৌধুরীকে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তারা জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তুলে নিয়ে যায়। এ ঘটনা ঘটে ২০১৩ সালের ৫ ডিসেম্বর। ওই দিন মধ্যরাতের দিকে শাহীনবাগের বাসা থেকে তাকে তুলে নেয়া হয়। তার বাড়িতে বেশ কিছু লোক প্রবেশ করে সে রাতে। এ সময় তাদের অনেকে ছিল সশস্ত্র। কারো কারো পরনে ছিল র‌্যাবের পোশাক। রুহুল আমিন চৌধুরী বলেন, তারা আমার কাছে জানতে চায় আমার ছেলের বেডরুম কোনটি। আমি তাদেরকে দেখিয়ে দিই। তারপর তারা আমাকে আমার রুমে বসতে বলে। তারা আমার টিনশেডের বাসার সব রুম তল্লাশি করে। তারা বলে, আমরা আদনানকে নিয়ে যাচ্ছি। সে পরদিন সকালে ফিরে আসবে। সুমনের মতো আদনানও বিএনপির রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। সকালে আদনান ফিরে না এলে তার বাবা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, এ সময় তিনি র‌্যাব কার্যালয়সহ বিভিন্ন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার অফিসে, গোয়েন্দা অফিসে ও থানায় গেছেন। কিন্তু কেউই তাকে কোনো তথ্য দিতে পারেনি। রুহুল আমিন বলেন, কেউ আমার সন্তানের খোঁজ দিতে না পারায় আমি হতাশ হয়ে পড়ি। যখন আমি দেখেছি, এলাকার অন্য মানুষ দেখেছে কিভাবে আদনানকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে তখন কিভাবে র‌্যাব ও অন্যরা মিথ্যা বলতে পারে? তারা তো আমার ছেলেকে ফেরত দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তারা আমার সাথে প্রতারণা করেছে। উচ্চশিার জন্য মালয়েশিয়া যাওয়ার কথা ছিল আদনানের। ৫ ডিসেম্বর শুধু আদনানকেই নিয়ে যাওয়া হয়নি, বিএনপির আরেকজন সমর্থক কাওসার আহমেদকেও তুলে নেয়া হয়। তারপর থেকে তাদের কাউকেই আর দেখা যায়নি। এসব ঘটনায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছে র‌্যাব। র‌্যাবের মিডিয়া ও লিগ্যাল উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান বলেন, এসব ঘটনায় র‌্যাব মোটেও জড়িত নয়। মানুষ বলতে পারে, তারা র‌্যাবের গাড়ি দেখেছে। কিন্তু ঘটনা তা নয়। যখন আমরা কাউকে আটক করি তাদেরকে আমরা আইনি পদপে নিতে তুলে দিই পুলিশের কাছে। এ মাসের শুরুর দিকে বাংলাদেশে গুম বৃদ্ধির নিন্দা জানিয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। এ সংস্থার বাংলাদেশ গবেষক আব্বাস ফয়েজ বলেন, নিরাপত্তা রাকারীরা গুমের জন্য দায়ী থাকলেও তারা তা অস্বীকার করে। এটা একটি বিরক্তিকর প্রবণতা। বাংলাদেশে গুমের ঘটনার তদন্ত বিরল ঘটনা। যথারীতি পুলিশ মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানায়। তবে মামলা তখনই নেয় যদি আদালত তদন্ত করার নির্দেশ দেন। তারপরও পুলিশ খুব সামান্যই তদন্ত করে।

চার শর্ত পূরণ ছাড়া তুরস্ক আইএসবিরোধী জোটে অংশ নেবে না -এরদোগান

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান আবারো বলেছেন, তার দেশের দাবি বাস্তবায়ন করা না হলে তুরস্ক সিরিয়া ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে অংশ নেবে না। তিনি বলেন, ‘আইএস-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধরত সিরিয়ার কুর্দিরা আমাদের চোখে কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির (পিকেকে) মতোই। যুক্তরাষ্ট্র, ন্যাটো জোটের আমাদের বন্ধু ও মিত্ররা তাদের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন ঘোষণা করার পর আমরাও তার প্রতি সমর্থন জানাব এটি আশা করা তাদের জন্য ভুল হবে। আমাদের কাছ থেকে এমন কিছু আশা করা উচিত হবে না এবং এ ব্যাপারে আমাদের পক্ষে সম্মত হওয়াও সম্ভব হবে না।’ আলমাতা অনলাইন নিউজ রোববার এ খবর জানায়।
এরদোগান বলেছেন, আইএসের বিরুদ্ধে মার্কিন নেতৃত্বাধন আন্তর্জাতিক জোটের কাছে তুরস্ক চারটি বিষয়ে অনুরোধ জানিয়েছে। তা হলো: নোফাই জোন ঘোষণা করা, নিরাপদ এলাকা প্রতিষ্ঠা করা, সিরীয়দের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্রপ্রদান এবং খোদ সিরিয়া সরকারের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা। এসব দাবি পূরণ করা ছাড়া আমরা কোনো সামরিক অভিযানে শরিক হতে পারব না। আফগানিস্তানে এক দিনের সরকারি সফর শেষে রোববার দেশে ফেরার পথে বিমানে থাকা অবস্থায় সংবাদমাধ্যমকে দেয়া এক বিবৃতিতে এ মন্তব্য করেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট। এ সময় তিনি তুরস্কসম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন।
তুরস্কের দক্ষিণে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের বিষয়ে আন্তর্জাতিক জোটের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হয়েছে কি না প্রশ্নের জবাবে তুর্কি প্রেসিডেন্ট আরো বলেন, ইনসিরলিক সামরিক ঘাঁটি সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধও স্পষ্ট নয়। আমরা যখন বিষয়টি জানতে পারব তখন তা নিয়ে আমাদের নিরাপত্তা ইউনিটের সাথে আলোচনা করে তার আলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করব। আমাদের জন্য ভালো হলে তার সেভাবেই সিদ্ধান্ত আমরা গ্রহণ করব। আর তা না হলে আমরা এ অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করব।
কোনো কোনো দেশ আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত সিরিয়ার কুর্দিস ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়নকে অস্ত্র দিতে চায় বলে খবর সম্পর্কে এরদোগান বলেন, ‘আমাদের কাছে এ সংগঠনটি পিকেকের থেকে ভিন্ন কিছু নয়। এর প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন ঘোষণার পর আমরা তাকে সমর্থন জানাব এমনটি যুক্তরাষ্ট্র, ন্যাটোতে আমাদের মিত্র ও বন্ধুরা আশা করতে পারে না। এ ধরনের কিছু সম্মত হওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।’
পিকেকে তুরস্কের অবস্থিত কুর্দিদের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে তুর্কি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সময় ধরে সশস্ত্র বিদ্রোহ করে আসছে।
এরদোগান বলেন, ‘আমরা যে নিরাপদ এলাকার প্রস্তাব দিয়েছি তা কোনো জায়গা দখলের ঘটনা হবে না বরং সিরীয় উদ্বাস্তুদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল হবে। যুদ্ধের কারণে এসব উদ্বাস্তু তুরস্কে এসেছে। এর মধ্য দিয়ে তারা তাদের দেশ ও ভূখণ্ডে ফিরতে পারবে।’ সিরীয় উদ্বাস্তুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এটি করা দরকার বলে তিনি উল্লেখ করেন। এরদোগান সাংবাদিকদের আরো বলেন, সিরিয়া সীমান্তের অভ্যন্তরে নিরাপদ অঞ্চল গঠনের বিষয়ে তুরস্কের সশস্ত্র বাহিনী ও পররাষ্ট্র দফতর মার্কিন কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা করেছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, তার দেশ আন্তর্জাতিক জোটে যোগদানের জন্য ঘোষিত এ চার শর্তের বিষয়ে কোনো আপস করবে না।

আবারো র‌্যাব ভেঙে দেয়ার আহ্বান হিউম্যান রাইটস ওয়াচের

আবারো র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) ভেঙে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে নিউইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডাব্লিউ)। একই সাথে ২০১১ সালে ঝালকাঠির লিমনকে গুলি করে পঙ্গু করার ঘটনায় স্বাধীন তদন্ত কমিটি করে দোষী র‌্যাব সদস্যদের শাস্তির আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। সোমবার সংস্থার ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ : নো জাস্টিস ফর উন্ডেড চাইল্ড’ শীর্ষক এক নিবন্ধে এ আহ্বান জানানো হয়। এতে বলা হয়, লিমনকে গুলির ঘটনায় র‌্যাবের তৎকালীন মহাপরিচালক বলেঠিনন, সন্ত্রাসী ও র‌্যাবের মধ্যকার গোলাগুলির শিকার হয়েছেন লিমন। তবে এ ঘটনায় পুলিশ আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। উপরন্তু র‌্যাবকে এ ঘটনা থেকে বাঁচাতে তারা লিমনের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি সন্ত্রাসী মামলা দায়ের করা।
সংস্থাটির এশিয়া পরিচালক ব্রাড অ্যাডামস বলেন, লিমনকে চূড়ান্ত পর্যায়ে মামলাগুলো থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে, এটা অবশ্যই ভালো দিক। তবে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনাই উচিত হয়নি। সরকারের উচিত লিমনকে গুলিকারী র‌্যাব সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া। একই সাথে লিমনের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলাকারীর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া উচিত। নিবন্ধে বলা হয়, র‌্যাবের বিরুদ্ধে শতাধিক বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং অন্যান্য সংগঠনের কাছে এ ব্যাপারে অনেক তথ্য আছে। তাছাড়াও মারাত্মক ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও আছে র‌্যাবের বিরুদ্ধে। এসব ঘটনার সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণ থাকলেও এখনো পর্যন্ত কোনো র‌্যাব সদস্যকে সফলভাবে বিচারের আওতায় আনা হয়নি।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ নারায়ণগঞ্জে ৭ খুনের ঘটনায় জড়িত র‌্যাব সদস্যদের সফল বিচারের মাধ্যমে দায়মুক্তির চক্র ভেঙে ফেলতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। এইচআরডাব্লিউ বলছে, মিডিয়ায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে র‌্যাবের তিন কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মনে হচ্ছে, ভিকটিমদের একজনের পরিবার বলিষ্ঠভাবে রাজনীতির সাথে জড়িত থাকার কারণেই এটা করা হয়েছে। ২০০৪ সালে সেনা ও পুলিশ সদস্যদের নিয়ে এলিট ফোর্স হিসেবে র‌্যাব প্রতিষ্ঠিত হয়। তার পর থেকেই এ ফোসটিকে দায়মুক্তি ও মারাত্মক ব্যবস্থাগত অপব্যবহারের মধ্য দিয়ে এর কার্যক্রম চলছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বাংলাদেশ পুনরায় সরকারের কাছে র‌্যাব ভেঙে দেয়ার আহ্বান জানাচ্ছে। সরকারের উচিত সেনা সদস্যদেরকে নিজ বাহিনীতে ফেরত নেয়া এবং তাদের পরিবর্তে সম্পূর্ণ বেসামরিক ফোর্স দিয়ে  বাহিনীটি পুনর্গঠন করা। সংস্থাটির এশিয়া বিষয়ক পরিচালক ব্রাড অ্যাডামস বলেছেন, র‌্যাবের সংস্কার করে লাভ হবে না, এটা মৃত্যু স্কোয়াডে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, র‌্যাব মতার অপব্যবহার করলে তিনি জিরো টলারেন্স দেখাবেন। কিন্তু তিনি র‌্যাব ভেঙে দিতে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ না নিলে তা অন্তঃসারশূণ্য কথায় পরিণত হবে।

কোষ প্রতিস্থাপনে সাফল্য : আবার হাঁটতে পারছেন প্যারালাইজড ব্যক্তি

পোল্যান্ডে চিকিৎসা গ্রহণের পর এক বুলগেরীয় নাগরিক আবার হাঁটতে পারছেন। কোষ প্রতিস্থাপনের এই বিস্ময়ী সাফল্যকে এক ব্রিটিশ বিজ্ঞানী ‘চাঁদের বুকে মানুষ হাঁটার চেয়েও চিত্তাকর্ষক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। মঙ্গলবার সেল ট্রান্সপ্লানটেশন জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১০ সালে এক ছুরিকাতের ঘটনায় ডারেক ফিদিকা নামে ওই বুলগেরীয় নাগরিকের বুক থেকে নিচের অংশ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে যায়। এক বৈপ্লবিক চিকিৎসায় সাফল্যের পর তিনি একটি স্ক্রেসে ভর করে এখন আবার হাঁটতে পারছেন। তার নাক থেকে নার্ভ সেল নিয়ে তার ছিঁড়ে যাওয়া মেরুদন্ডে প্রতিস্থাপন করা হয়। রোক’র অ্যাকরন নিউরো-বিহ্যাব্লিটেশন সেন্টারে চিকিৎসা গ্রহণরত এই রোগী বিবিসি’র প্যানোরামা অনুষ্ঠানে বলেন, শরীরের প্রায় অর্ধেক অংশের অনুভূতি হারিয়ে আমি একেবারেই নিরাশ হয়ে পড়েছিলাম। যখন এই অনুভূতি ফিরে পেতে শুরু করলাম, তখন মনে হচ্ছে আমি আবার নতুন করে জীবন শুরু করছি। রোক’ ইউনিভার্সিটির নিউরো সার্জন পাওয়েল তাবাকো এই কোষ প্রতিস্থাপন চিকিৎসায় একটি টিমের নেতৃত্ব দেন। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, আঘাতপ্রাপ্ত স্থানের ওপরে ও নিচে সেল প্রতিস্থাপন বিচ্ছিন্ন তন্তুর জোড়া লাগাতে সহায়ক হয়েছে। এই যৌথ প্রকল্পের ব্রিটিশ গবেষক দলের প্রধান ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ইনস্টিটিউট অব নিউরোলজির নিউরাল রিজেনারেশনের চেয়ার পার্সন জিওফ রেইসম্যান বলেন, ‘আমার কাছে এটি চাঁদের বুকে মানুষ হাঁটার চেয়েও আকর্ষণীয়। আমি মনে করি, এটি প্যারালাইসিস সরানোর মুহূর্ত। তাবাকো বলেন, দীর্ঘকাল ধরে অসম্ভব বলে মনে করা হলেও স্পাইনাল কর্ড রিজেনারেশন দেখতে পাওয়া আশ্চর্যজনক। এক সময়ের অসম্ভব বলে ভাবা বিষয়টি বাস্তব হয়েছে। বিজ্ঞানীরা ব্রিটেন ও পোল্যান্ডে ১০ জন রোগীর ওপর পরীক্ষামূলকভাবে এটি প্রয়োগ করার কথা ভাবছেন।

বাংলাদেশের গণতন্ত্র, ধর্ম, সাম্প্রদায়িকতা ও পিয়াস করিমের লাশ by এরশাদ মজুমদার

আমরা যে গণতন্ত্র চর্চা করি তা এসেছে ব্রিটেন থাকে। শোষক ও অত্যাচারী ব্রিটিশ আমাদের অনেক ভালো মন্দ জিনিস, নিয়ম-কানুন, বিদ্যা, আদব কায়দা দিয়ে গেছে। এর মধ্যে তথাকথিত গণতন্ত্র একটি। এটি নাকি জনগণের সরকার ব্যবস্থাপনার অন্যতম শ্রেষ্ঠ পদ্ধতি। এর চেয়ে ভালো কিছু এখনো নাকি আবিষ্কার হয়নি। অনেকেই বলবেন সুপ্রাচীন কালে গ্রিক দেশে একধরনের গণতন্ত্র ছিল। আমি মনে করি জগতে জনগণের প্রথম রাষ্ট্র ও সরকার গঠন করেছিলেন জগতের আলো হজরত মুহাম্মাদ সা:। সেখানে মজলিসে শূরা ছিল। মানে আলোচনা সভা/মজলিস বা কাউন্সিল। পশ্চিমা বিশ্বে এখন ঘুণেধরা তথাকথিত গণতন্ত্রের জয়জয়কার চলছে। হুবহু পশ্চিমা গণতন্ত্র অনুসরণ করে না এমন দেশও আছে। গণচীন তার মধ্যে একটি। এখানে একদলীয় গণতন্ত্র জারি রয়েছে। জনগণের কথা বলার অধিকার কম। দলের কথাই প্রধান। চীন সে দেশের মুসলমানসহ ভিন্ন মতের মানুষের ওপর অত্যাচার চালায়। আমেরিকা সারা বিশ্বকে সন্ত্রাসক্ষেত্রে পরিণত করেছে। ৬০-এর দশকের দিকে এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোতে আমেরিকা কমিউনিস্ট দমনের নামে সামরিক অভ্যূত্থান ঘটিয়েছে। দেশপ্রেমিক হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছে। কমিউনিজম দমনের জন্য মুসলমানদের ব্যবহার করেছে। রাশিয়া কমিউনিজম রফতানির নামে বিভিন্ন দেশে রক্তয়ের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে হত্যা করেছে। অবস্থাটা ছিল আমেরিকা কমিউনিজম বা সমাজতন্ত্র চায় না, আর রাশিয়া পশ্চিমা গণতন্ত্র চায় না। এ লড়াইয়ে বিশ্বব্যাপী লাখ লাখ মানুষ নিহত হয়েছে। বাংলাদেশে সফরে এসে মাহাথির মোহাম্মদ বলেছিলেন, পশ্চিমা গণতন্ত্র এশিয়ার দেশগুলোতে অচল। হুবহু পশ্চিমা গণতন্ত্রকে অনুসরণ করা যাবে না। মালয়েশিয়া একটি বহুজাতিক বহু ধর্মের দেশ। সেখানে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অর্থনৈতিক উন্নতির কারণে। সিঙ্গাপুরের উন্নতি হয়েছে প্রচলিত আইনকে কঠোরভাবে প্রয়োগের কারণে। বাংলাদেশে প্রতিনিয়তই আইন তৈরি হচ্ছে আর ভাঙা হচ্ছে। সরকারি দলের জন্য এক রকম আইন আর বিরোধী দলের জন্য আরেক রকম। গরিব ও মতাহীনদের জন্য কোনো আইন নেই। সামান্য ট্রাফিক আইনের প্রয়োগ দেখলেই বোঝা যায়। পুলিশ নিজেই ট্রাফিক আইন মানে না। প্রয়োজনে উল্টো দিকে চলতে থাকে। মন্ত্রীরা তো নিয়মিত ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করেন। প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধ বা সুপারিশে আসামিদের মা করে দেন। বিরোধী দলকে শাস্তি দেয়ার জন্য হাজার হাজার মামলা। ভোটার না থাকলেও নির্বাচন করে মতায় থাকা যায়। যিনি মতায় থাকবেন তার জন্য রাষ্ট্রের সব শক্তি আছে। থিওরি হলো সরকারি দল বা সরকারের অনুগত ছাড়া আর কেউ দেশপ্রেমিক নেই।
আমরা ঐতিহ্য সূত্রে ব্রিটিশ দেয়া গণতন্ত্র পেয়েছি। এক সময়ে ছিল শিতি লোকেরা ভোটার ছিলেন। তারপর হলো যারা চৌকিদারি ট্যাক্স দেন শুধু তারাই ভোটার হবেন। অনেক পরে এলো সার্বজনীন ভোটাধিকার। এর মানে প্রত্যেক নাগরিকের ভোট দেয়ার অধিকার থাকবে। আমি ৫৪ সাল থেকে নির্বাচন দেখে আসছি। ভোটার না হয়েও ’৫৪-এর নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের পে কর্মী হিসেবে কাজ করেছি। যুক্তফ্রন্ট ছিল মুসলিম লীগ বিরোধী সর্বদলীয় নির্বাচনী জোট। মাত্র সাত বছরের মধ্যেই মুসলিম লীগ একেবারেই অপ্রিয় ও ধিকৃত হয়ে গেল। এমনকি চিফ মিনিস্টার নুরুল আমিনও নির্বাচনে হেরে গেলেন। মাত্র কিছু দিনের মধ্যেই ৯২ক ধারা জারি করে নির্বাচিত সরকারকে নির্বাসনে পাঠানো হলো। ১৯৫৮ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণতন্ত্র বিদায় নিলো। জেনারেলেরা দেশ শাসন করতে লাগল। আমেরিকা সামরিক নেতাদের সমর্থন দিয়ে যেতে লাগল। কারণ, আমেরিকা পাকিস্তানে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নিজের স্বার্থ হাসিল করতে পারে না। সেই শাসনের মাধ্যমেই ’৭০ সালে একটি নির্বাচন হলো; কিন্তু পাকিস্তান টিকল না। ভারত ও রাশিয়ার পূর্ণ সমর্থনে পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হয়ে বাংলাদেশ হলো। ৭০-এর নির্বাচনে নির্বাচিত পাকিস্তান জাতীয় সংসদের প্রতিনিধিদের নিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ গঠিত হলো। জনমতের চাপে ’৭৩-এ একটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। ৫৪, ৭০ ও ৭৩-এর নির্বাচনের ফলাফলের প্রকৃতি ও গতি একই রকম ছিল। ’৫৪ সালে ছিল মুসলিম লীগকে কবর দাও। ৭০ এ ছিল বাঙালিদের জয়যুক্ত করো। ৭৩-এ কী স্লোগান ছিল? মুক্ত নির্বাচন হলে বিরোধীদল বেশ কিছু সিট পেতে পারে; কিন্তু আওয়ামী লীগ বা বঙ্গবন্ধুর সরকারই মতায় থাকবে; কিন্তু আমলারা ও ভারত বুদ্ধি দিলো মুক্ত নির্বাচনে বামপন্থীরা বেশি এগিয়ে যেতে পারে। ফলে মুক্ত নির্বাচন হলো না। সংসদে বিরোধী দলের ছয়-সাতটি সিট ছিল মাত্র। নির্বাচন নিয়ে বিশদ আলোচনা করা এই কলামের উদ্দেশ্য নয়।
আধুনিক গণতন্ত্রের একটি নমুনা হাজির করছি। আমার এক মামা পৌর নির্বাচনে প্রায়ই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতেন। শুনেছি, তিনি প্রতিপকে নমিনেশন প্রত্যাহারের জন্য বাধ্য করতেন। ফলে তিনিই জনপ্রিয় নেতা হিসেবে নির্বাচিত হতেন। আইউব খানের মৌলিক গণতন্ত্রে ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যদের কিনেই সংসদ সদস্য হওয়া যেত। শুনেছি, ৩৭ সালে অখণ্ড বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচনের প্রার্থীরা পাঁচ শ’ থেকে এক হাজার টাকার বেশি খরচ করেননি। তখনো কোটি কোটি ভোটার গরিব ছিলেন। তখন তাদের  দৈনিক আয় ৫০ পয়সার বেশি ছিল না। কিন্তু গরিবেরা ভোট বিক্রি করেননি। ৫৪-এর নির্বাচনে একজন প্রার্থী তিন-চার হাজার টাকা খরচ করে নির্বাচিত হয়েছেন। ৭০-এর নির্বাচনে ৩০-৩৫ হাজার টাকা খরচ করে নির্বাচিত হয়েছেন। আর এখন কত টাকা লাগে তা আপনারা খুবই ভালো জানেন। প্রসঙ্গত, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহার কথা উল্লেখ করতে চাই। শুনেছি, তিনি অতি সাধারণ জীবনযাপন করেন। তার স্ত্রী নাকি এখনো বাসের জন্য রাস্তায় কিউ/লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন। মানিক বাবু একেবারে পিছিয়ে পড়ে থাকা রাজ্য ত্রিপুরার গরিবি চেহারা পাল্টে দিয়েছেন। গ্রামগুলোকে শহর বানিয়ে দিয়েছেন। ক’দিন আগে অমিতাভ বচ্চনের কৌন বনেগা ক্রোড়পতি অনুষ্ঠানে ভারতের গরিব মুখ্যমন্ত্রী কে জানতে চেয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। সঠিক উত্তর এসেছিল মানিক সরকার। তিনি এখনো চপ্পল পায়ে চলাফেরা করেন। চায়ের দোকানে বসে লোকজনের সাথে চা পান করেন। বাংলাদেশে এমন একটি চিত্র কল্পনা করুন তো দেখি। এখানে ছাত্রনেতারাই গাড়ি বাড়ি করেন পড়ালেখা শেষ হওয়ার আগে। সাবেক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ বলেছিলেন, লেখাপড়া না করে যদি মন্ত্রী-এমপি হওয়া যায় তা হলে ছাত্ররা পড়বে কেন। লোকে বলে একবার কেউ যদি এমপি হন তারপর সারা জীবন সে বা তিনি বসে বসে খেতে পারবেন। যে মন্ত্রী বা নেতা উপনেতা যতবেশি খিস্তিখিউর করতে পারবেন, তিনি বা তারা নাকি বারবার নমিনেশন পান বা নেতাগিরি করতে পারেন। স্বাধীন বাংলাদেশে আমি তেমন মুক্ত কোনো নির্বাচন দেখিনি। বঙ্গবন্ধু নিজেই একদলীয় শাসনব্যবস্থা চালু করে গণতন্ত্রের কবর রচনা করেছিলেন। কেন করেছিলেন তা হয়তো আপনারা ভালো জানেন। তিনি হয়তো মনে করতেন একদলীয় শাসনব্যবস্থা হলে তিনি জনগণের উন্নতি সাধন করতে পারবেন। বেশ কিছু বামপন্থী নেতাকর্মীরা সেই একদলীয় ব্যবস্থাকে সমর্থন জানিয়েছিলেন। এমনকি মহা গণতন্ত্রের দেশ ভারতও সমর্থন করেছিল। এর পরে বাংলাদেশ কেমন আছে, কেমন চলছে তা আপনারা খুব ভালো জানেন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির বাংলাদেশের নির্বাচনের সুনাম এখন জগৎব্যাপী। ১৫৪ জন বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় জাতীয় সংসদে নির্বাচিত হয়েছেন এবং বহাল তবিয়তে সংসদে বসে আইন বানাচ্ছেন।
সম্প্রতি প্রথম আলোতে কবি সোহরাব হাসানের একটি উপসম্পাদকীয়তে গণতন্ত্র, ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে তিনি নিজের মত প্রকাশ করেছেন। তিনি গণতন্ত্রের স্বার্থে আলোচনার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। শুরুতেই সোহরাব উল্লেখ করেছেন সাংবাদিক জাহিদুল আহসানের সাহসী লেখার কথা। সিরাজগঞ্জের চৌহালীতে নাকি আওয়ামী লীগসহ সব দল মিলে লতিফ সিদ্দিকীর নিন্দা করেছে। কারণ লতিফ সিদ্দিকী ইসলামের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। সনাতন ধর্মের বিরুদ্ধে কিছু বললে নাকি এমন ঐক্য হয় না। এতে জাহিদুল আহসান সাম্প্রদায়িকতার গন্ধ পেয়েছেন। বাংলাদেশে সনাতনধর্মীসহ সংখ্যালঘুর সংখ্যা দশ ভাগের বেশি নয়। যদি ধরে নিই বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যা এখন ১৬ কোটি। তা হলে সংখ্যালঘুর সংখ্যা এক কোটি ৬০ লাখের মতো। জাহিদ আহসান বলতে পারেন সংখ্যালঘুর সংখ্যা আরো অনেক বেশি। ভারতে সংখ্যালঘুর সংখ্যা ২০-২৫ কোটির মতো হবে। অনেকে বলেন, ভারতে ৩০ কোটি মুসলমান আছেন সেখানে বছরে কয়েক শ’ দাঙ্গা হয়। (শৈলেশকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাঙ্গার ইতিহাস পড়ুন)। ভারত বা অখণ্ড বাংলাদেশ খণ্ড হয়েছে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কারণে। প্রশ্ন হলো এ রাজনীতির লালন পালন করছে কারা? কেন করছে? বাংলাদেশে মাইনরিটির ওপর যে অত্যাচার হয় তা-ও রাজনৈতিক। নিশ্চয়ই এতে ফায়দা হয়। এখানে যারা ধর্মীয় কারণে অত্যাচারিত হন, তারা সবাই গরিব ও শক্তিহীন। শক্তিমানেরাই তাদের ওপর অত্যাচার করেন। সনাতন ধর্মের মন্দিরে আক্রমণ করা হয় ইচ্ছাকৃতভাবে বাংলাদেশের মুখে চুনকালি মাখাবার জন্য। তবে সরকারি দলিলে দেখা যায় মাইনরিটি বা সনাতনধর্মীরা সরকারি চাকরিতে রয়েছে বিশ শতাংশের মতো। ভারতে এই সংখ্যা হলো এক শতাংশের মতো। রাজনীতি ও সরকারগুলো যতদিন অসাম্প্রদায়িক না হবে, ততদিন এ অবস্থার অবসান হবে না। অধ্যাপক পিয়াস করিমের কথাই ধরুন, তিনি সেমিনার ও টকশোতে সরকারের সমালোচনা করতেন। হয়তো তিনি সরকারি চিন্তার বিপরীত চিন্তার লোক ছিলেন। অধ্যাপক হিসেবে তিনি ছাত্রপ্রিয় ছিলেন। তিনি একটি উন্নত পরিবারের সন্তান। তার স্ত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক। তার লাশ শহীদ মিনারে নেয়ার ব্যাপারে সরকারি দলের সমর্থক কিছু সুবিধাভোগী বিতর্ক তুলেছেন। এতে নেপথ্যে ভূমিকা পালন করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর সাথে রয়েছেন সনাতনপন্থী এ দেশের মেজরিটি মানুষের ধর্মবিরোধী কিছু লোক। তাই তারা নানা অজুহাতে একজন সম্মানিত মানুষের লাশের প্রতি এমন অশ্রদ্ধা দেখাতে সাহস করেছে। এরা সাম্প্রদায়িক, যেকোনো অজুহাতে মেজরিটি মানুষের মনে আঘাত দিতে সাহস করে। পিয়াস করিমের মরহুম পিতা নাকি ‘রাজাকার’ ছিলেন। সে জন্য সন্তানকে শাস্তি ভোগ করতে হবে। সরকারি দলের বা জোটের বহু নেতা ও উপনেতার বাপদাদারা রাজাকার, ডানপন্থী, পাকিস্তানপন্থী, ধর্মপন্থী ছিলেন। তাদের সন্তানেরা লাশ দাফন করতে চান না, জানাজা করতে চান না, রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে চান। এমনও শুনতে পাচ্ছি লাশ শ্মশানে নেয়ার জন্য নাকি অছিয়ত করেন। এসব প্রাণীর জন্য সরকার ধর্মহীন বিয়ের ব্যবস্থা করেছেন। ধর্মমুক্ত কাজী বা ম্যারেজ রেজিস্টারের ব্যবস্থা করেছেন। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে লাশ শহীদ মিনারে নেয়ার পপাতী নই। এটি অতি সম্প্রতি চালু করা বুদ্ধিজীবীদের শবযাত্রার ব্যবস্থা চালু করেছেন। ধর্মমুক্ত বুদ্ধিজীবীদের জানাজাও বলতে পারেন। সরকার বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘোষণা করার দরকার এখন থেকে শহীদ মিনারে (ধর্মহীন/ধর্মমুক্ত মন্দির) শুধুমাত্র সরকারি দল, তাদের অনুগত ও ধর্মহীনদের বেশির ভাগই বুদ্ধিজীবী) জন্য খোলা থাকবে।
বাংলাদেশের চলমান সরকার সনাতন ধর্ম বান্ধব বলে দেশবাসী জানে। তবুও ছোটখাটো সাম্প্রদায়িক ঘটনা ঘটছে কেন? কিছু হলেই তো সরকার দাবি করে বিরোধী দল এসব করছে। পাকিস্তান আমলেও এসব কথা বলা হতো। ব্রিটিশ আমলে নাকি শাসক গোষ্ঠীর ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতি নাকি এজন্য দায়ী ছিল। তা হলে এখনো কেন ভারতে দাঙ্গা হচ্ছে। পাকিস্তানে শিয়া সুন্নি ও কাদিয়ানি দাঙ্গা এখনো হয়। ভারতে সনাতনধর্মীরা শিখ, বৌদ্ধ, জৈন ও খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে দাঙ্গা করে। এখন তো ভারতে ধর্মপন্থী রাজনৈতিক দল মতায় আছে। আমরা তো জানি ভারত সেক্যুলার (non religious, earthly/worldly,do not believe in after world) রাষ্ট্র। তা হলে এত দাঙ্গা হয় কেন? ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদিজী তো দাঙ্গার আসামি। রাজনীতিতে সমঝোতা, আন্ডারস্ট্যান্ডিং, আলোচনা, দেশের স্বার্থে সব দলের একমত হওয়া ভদ্র সমাজের কাজ। আমাদের রাজনীতিতে সে সমাজ চিন্তা এখনো গড়ে ওঠেনি। বাংলাদেশের অবস্থা দেখে আমি এখন রাষ্ট্রের রূপ নিয়ে গবেষণা করার জন্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের আহ্বান জানাব। এ দেশে রাষ্ট্র নাগরিক বা মানুষের চেয়ে বড়। আমাদের প্রধানমন্ত্রী নাকি জার সম্রাটদের চেয়েও মতাবান। কারণ সংবিধান প্রধানমন্ত্রীকে সে মতা দিয়েছে। তাই তিনি সে মতা ভোগ করছেন। সে মতা বলেই প্রধানমন্ত্রী ৫ জানুয়ারির নির্বাচন করেছেন। সে মতা বলেই তিনি ভোটারবিহীন নির্বাচন করে সরকার গঠন করে দেশ চালাচ্ছেন। রাষ্ট্রের সব শক্তিই এখন তার হাতের মুঠোয়। গণতন্ত্রও এখন তার হাতে। তাই সমঝোতার কী প্রয়োজন? তিনি কি সংবিধানের বাইরে কিছু করছেন? এ ধরনের রাষ্ট্রব্যবস্থায় সমঝোতার কোনো প্রয়োজন হয় না। ভারত নিজের স্বার্থেই আওয়ামী লীগ ও চলমান ধর্মমুক্ত সরকারকে সমর্থন করে। এটি ভারতের নীতি। তাদের এ নীতির কারণেই ভারত ও অখণ্ড বঙ্গ ভাগ হয়েছে; কিন্তু বাংলাদেশের ৮০ শতাংশ মানুষ ভারতের অবলম্বিত নীতির বিরোধী; কিন্তু দল দাসত্বের কারণে তারা অনেক সময় নিজেদের মনের কথা প্রকাশ করতে পারে না। বাংলাদেশে যদি সামরিক সরকারও থাকে তা হলে ভারতের কী আসে যায়। তারা চায় অনুগত স্বার্থ রায় অযোগ্য সরকার। তা না হলে এখানে ক্যু ঘটাবে। জেনারেল মইন তার জ্বলন্ত উদাহরণ। তিনি ছিলেন ভারতের অন্ধ সেবাদাস। তিনি এবং ভারত মিলে ২০০৮ সালের নির্বাচন করেছেন। ল্য, যেকোনোভাবেই হোক বঙ্গবন্ধুর কন্যাকে মতায় রাখতে হবে। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পেছনে ছিল ভারতের গোয়েন্দা ও বাংলাদেশের গোয়েন্দারা। ভারতপ্রেমী বা পন্থীদের আমি অনুরোধ জানাব, দয়া করে বুকে হাত দিয়ে বলুন, বিগত ৪৪ বছরে ভারত বাংলাদেশকে কি দিয়েছে আর কী নিয়েছে। দেখুন পাল্লা কোন দিকে ভারী।
লেখক : কবি ও ঐতিহ্য গবেষক
ershadmz@gmail.com

তালপট্টি হারাল, না জাতীয় নিরাপত্তা অরক্ষিত by প্রকৌশলী এস এম ফজলে আলী

ভারতের সাথে সমুদ্রসীমা নিয়ে নেদারল্যান্ডসের স্থায়ী সালিসি আদালতের রায়ে বাংলাদেশ ১৯ হাজার ৪৬৭ বর্গকিলোমিটার সমুদ্রাঞ্চল পেয়েছে। তবে দক্ষিণ তালপট্টি থেকে বাংলাদেশ বঞ্চিত হয়েছে। ভারতের সাথে বাংলাদেশের বিরোধপূর্ণ সমুদ্রাঞ্চল ছিল ২৫ হাজার ৬০২ বর্গকিলোমিটার। মিয়ানমারের সাথে সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তি হওয়ার পর এ রায়ের ফলে ৯ লাখ ২৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার আঞ্চলিক সমুদ্র, ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৮ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহিসোপানে অবস্থিত সব ধরনের প্রাণীজ ও অপ্রাণীজ সম্পদের ওপর বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
স্থায়ী সালিসি আদালতের রায়ে বঙ্গোপসাগরের ওপর টানা রেখায় দক্ষিণ তালপট্টি ভারতের অংশে পড়েছে। আদালতের রায়ে বঙ্গোপসাগরের ৫০ বর্গকিলোমিটারের একটি ‘গ্রে জোন’ রয়েছে, যার মৎস্যসম্পদ ভারতের এবং সমুদ্র তলদেশের সম্পদ বাংলাদেশের অধিকারে থাকবে। এটা একটি ‘গোঁজামিলের রায়’ বলে প্রতীয়মান হয়। কারণ ওই এলাকায় তলদেশে তেমন খনিজসম্পদ নেই। আর ওপরে তো মাছ সারা বছরই থাকবে। সে মাছ ধরা নিয়ে বাংলাদেশের সাথে যেকোনো সময় বিরোধের সৃষ্টি হতে পারে। এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ নেই। এই রায়ের মাধ্যমে ২০০৯ সালে আন্তর্জাতিক আদালতে দায়ের করা, ভারত ও মিয়ানমারের সাথে সমুদ্রসীমাসংক্রান্ত বাংলাদেশের মামলার নিষ্পত্তি হলো।
এ রায় ঠেকানোর জন্য ভারত বহু চেষ্টা-তদবির করেছে; কিন্তু এ নিয়ে আর বেশি আগায়নি, যেহেতু তারা দক্ষিণ তালপট্টি পেয়ে গেছে। এটা ভারতের বড় অর্জন। ভূ-রাজনৈতিক কৌশলগত কারণে তালপট্টি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। ভারত এখানে তার নৌবাহিনী মোতায়েন করে পুরো বঙ্গোপসাগরে আধিপত্য খাটাবে। এই অঞ্চল চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের শ্যেন দৃষ্টিতে আছে। আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে ভারতের যে নৌবহর আছে, দক্ষিণ তালপট্টির সাথে এর সংযোগ করে ভারত এ অঞ্চলে এর আধিপত্য মজবুত করতে পারবে।
অপর দিকে বাংলাদেশের উপকূল ভাগ অরক্ষিত হয়ে যাবে। ভারতের নৌবহর বা যুদ্ধযানের ওপর বাংলাদেশের নজরদারির সুযোগ থাকবে না। অধিকন্তু চীন, ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বঙ্গোপসাগরে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার যে লড়াই শুরু হবে, তখন বাংলাদেশের নিরাপত্তা অবশ্যই বিঘ্নিত হবে।
ভারতীয় উপমহাদেশ বিভাগের সময় স্যার র‌্যাডকিফ হাড়িয়াভাঙ্গা নদীর মধ্যবর্তী যে সীমারেখা টেনে ছিলেন, তা বঙ্গোপসাগরে প্রলম্বিত করার পর তালপট্টি হাড়িয়াভাঙ্গা নদীর মধ্যস্রোতের পুব পাশে ছিল, অর্থাৎ এটি বাংলাদেশের অংশেই ছিল। ইদানীং আকাশ থেকে ল্যান্ডস্যাটের যে চিত্রের কথা বলা হয়, তা সঠিক বলে বিবেচনায় আনা যায় না। বলা হচ্ছে, দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপটির কোনো অস্তিত্ব নেই। যদি তাই হয়, তাহলে আশির দশকে ভারত তার সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে সে দ্বীপটি দখল করেছিল কিভাবে? ভারতের চৌকি তো সেখানে এখনো আছে বলে জানা যায়।
২০১৩ সালের ২৪ অক্টোবর হেগের আদালতের বিচারকেরা সরেজমিন বাংলাদেশ ও ভারতের দাবি অনুযায়ী বেইজ পয়েন্ট দেখে গেছেন। সমুদ্রসীমা নির্ধারণে আদালত ভারতের সমদূরত্ব ও বাংলাদেশের সমতা পদ্ধতি বিবেচনায় নিয়ে রায় দিয়েছেন। বাংলাদেশ ১৮০ ডিগ্রিতে বঙ্গোপসাগরে সমুদ্র সীমারেখা টানার দাবি করেছিল। ভারতের দাবি ছিল ১৬২ ডিগ্রিতে। আদালত ১৭৭ দশমিক ৫ ডিগ্রিতে সমুদ্র সীমারেখা টেনেছেন।
বাংলাদেশের সাথে সমুদ্রসীমার রায় আটকাতে ভারত সব ধরনের চেষ্টা করেছে। সর্বশেষ, নেদারল্যান্ডসে অবস্থিত স্থায়ী সালিসি আদালতের (পিসিএ) ব্যয়ের অর্থ পরিশোধে গড়িমসি করে তারা রায় প্রকাশ ২০ দিন ঠেকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়। এর আগে বাংলাদেশের অনুরোধ সত্ত্বেও দেশটি পিসিএ’র বদলে জার্মানির হামবুর্গে অবস্থিত সমুদ্র আইনবিষয়ক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে (ইটলস) মামলা স্থানান্তর করতে রাজি হয়নি। পিসিএ’র বিচারক নিয়োগেও ভারত যতটা সম্ভব বিলম্ব করার চেষ্টা চালায়।
হেগে অবস্থিত পিসিএতে বাংলাদেশ ও ভারত গত বছর ৯ থেকে ১৮ ডিসেম্বর সমুদ্রসীমা নির্ধারণে যার যার অবস্থানের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেছিল। শুনানি শেষে আদালতের পক্ষ থেকে বলা হয়, কার্যবিধির ১৫ ধারা অনুযায়ী ছয় মাস পর সমুদ্রসীমা নির্ধারণের রায় দেয়া হবে। সে হিসেবে ১৮ জুনের মধ্যে এ রায় হওয়ার কথা; কিন্তু ভারত পিসিএতে বিচারপ্রক্রিয়া চালাতে তার অংশের অর্থ পরিশোধ না করায় রায় দিতে বিলম্ব হয়। পিসিএতে বিচারক নিয়োগসহ বিচারকার্যের আনুষঙ্গিক খরচ বিবদমান পক্ষগুলোকে সমান ভাগে দিতে হয়; কিন্তু আর্থিক সক্ষমতাসহ সমুদ্রসীমার কারিগরি তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ এবং সমুদ্র আইনসংক্রান্ত বিশেষজ্ঞের ক্ষেত্রের বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে থাকার কারণে ভারত পিসিএতে দ্বিপক্ষীয় সালিসির মাধ্যমে বিষয়টির নিষ্পত্তি চেয়েছে। ভারত এর আগে বেশ কিছু দেশের সাথে তার সমুদ্রসীমা নির্ধারণ করেছে। তাই এ ক্ষেত্রে ভারতীয়দের পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল।
বঙ্গোসাগরে ভারত ও মিয়ানমারের পাল্টাপাল্টি দাবির মুখে সমুদ্রে বাংলাদেশের জন্য প্রায় কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের ২৮টি ব্লকের মধ্যে ১০টিতে ভারত ও ১৭টিতে মিয়ানমার আপত্তি দিয়ে রেখেছিল। তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য ২০০৮ সালে তিনটি ব্লক (৫, ১০ ও ১১) বাংলাদেশ বিদেশী কোম্পানির কাছে দেয়ার উদ্যোগ নিলেও এই প্রতিবেশীদের কাছ থেকে আপত্তি আসে। বাংলাদেশ এই পরিপ্রেক্ষিতে ভারত ও মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আরবিট্রেশনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
মিয়ানমারের সাথে সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তির পর ১৭টি ব্লকের মধ্যে ১২টি পুনর্গঠন করতে হয়েছে বাংলাদেশের। আর ভারতের সাথে সমুদ্রসীমার নিষ্পত্তির পর পাঁচটি ব্লক পুনর্গঠন করতে হবে। এগুলো হলো ৫, ৯, ১৪, ১৯ ও ২৪। এই ব্লকগুলো পুনর্গঠন করে শিগগিরই বাংলাদেশ তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগ নিচ্ছে। এর আগে বঙ্গোপসাগরের অধিকার নিয়ে আমাদের প্রতিবেশী দেশের বিরোধ থাকায় কোনো আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানি বাংলাদেশের আহ্বানে সাড়া দেয়নি। সমুদ্রসীমার নিষ্পত্তি হওয়ায় এখন তেল-গ্যাস অনুসন্ধানকারী কোম্পানিগুলো আগ্রহ দেখাচ্ছে। বর্তমানে উৎপাদন বণ্টন চুক্তির আওতায় (PSC) কনকো ফিলিপস ১০ ও ১১ নম্বর ব্লকে অনুসন্ধান চালাচ্ছে। মার্কিন কোম্পানিটির সিসমিক সার্ভে অনুযায়ী ব্লক দুটোতে পাঁচ থেকে সাত টিসিএফ (ট্রিলিয়ন ঘনফুট) গ্যাসের মজুদ পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। অবশ্য সমুদ্রে বাংলাদেশের একমাত্র গ্যাসক্ষেত্র সাংগু দুই বছর আগেই পরিত্যক্ত হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে গ্যাস ঘাটতির পরিমাণ দৈনিক ৬০ কোটি ঘনফুট, যা মোট চাহিদার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। ১৯৯৮ সালে হবিগঞ্জে বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের পর এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য তেমন কোনো সাফল্য পায়নি। গ্যাসের অভাবে বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দিকে ঝুঁকছে আর অন্তর্বর্তী চাহিদা মেটানোর জন্য সরকার অত্যন্ত ব্যয়বহুল তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করে যাচ্ছে। এর ফলে গ্রাহকপর্যায়ে বিদ্যুতের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে।
২০০৮ ও ২০১০ সালের পর ব্লক পুনর্গঠন শেষে বাংলাদেশ আগামী বছর বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য তৃতীয় দফা আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানে যাবে বলে জানা গেছে। দুই প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমারের সাথে সমুদ্রসীমানা ঠিক হওয়ায় বাংলাদেশ নিজ এলাকায় তেল-গ্যাসের অনুসন্ধান চালাতে পারবে ঠিকই; কিন্তু আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি ও ভৌগোলিক অবস্থানের দরুন বঙ্গোপসাগর অস্থিতিশীল হতে পারে। সে ব্যাপারে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। আমাদের নীতি হতে হবে ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে শত্রুতা নয়।’
লেখক : পরিবেশবিদ

অস্থিতিশীল রাজনীতি ও অর্থনীতি by গোলাপ মুনীর

আমাদের জাতীয় জীবনে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বিভাজন সময়ের সাথে চরম থেকে চরমতর আকার ধারণ করছে। ফলে কোথাও কোনো জাতীয় ঐকমত্য খুঁজে পাওয়া ভার। দুঃসহ বিভক্তি সবখানে। বিভক্তি সরকারি, আধাসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে। পেশাজীবীদের মধ্যে। গ্রামীণ সমাজ থেকে শুরু করে শহুরে সমাজে। এমনকি বিভক্তি নিজেদের মধ্যেও। যদিও বলা হয়, এ বিভক্তি রাজনৈতিক আদর্শকে কেন্দ্র করে; কিন্তু বাস্তবে এ বিভক্তি সরকারের পক্ষ নেয়া কিংবা সরকারের বিপক্ষে অবস্থানের প্রক্রিয়ার মধ্যে বৃত্তবন্দী। এক পক্ষে সরকার সমর্থক, অন্যপক্ষে সরকারের বিরোধিতাকারী। সরকারপক্ষে থাকাদের লক্ষ্য সরকারের সুনজরে থেকে বৈধ-অবৈধ, নৈতিক-অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা আদায়ের পথ খোলা। এর বিপরীতে থাকা সরকারবিরোধী পক্ষের তেমনি লক্ষ্য হচ্ছে বর্তমান সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে বিরোধী দল ক্ষমতায় এলে যাতে তাদের পক্ষেও এ ধরনের সুযোগ-সুবিধা আদায় করতে যেন অসুবিধা না হয়। এভাবেই গোটা জাতি আজ সরকারি মহল ও সরকারবিরোধী মহলে বিভক্ত। ফলে দেশে নেই সর্বসম্মত কোনো জাতীয় ইতিহাস, নেই জাতীয় ঐকমত্যের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কর্মসূচি। তেমনি ঐকমত্যের সামাজিক কিংবা সাংস্কৃতিক কর্মসূচিও নেই। জাতীয় মসজিদের ইমাম ও খতিব নিয়োগ, দেশের বৃহত্তম ঈদগাহ শোলাকিয়া মাঠের ঈদের জামাতের ইমাম নিয়োগসহ দেশের বিভিন্ন মসজিদ ও ঈদগাহের ইমাম নিয়োগে চলে নোংরা রাজনীতি। ইমাম নিয়োগে যোগ্যতা যেখানে প্রাধান্য পাওয়ার কথা, সেখানে প্রাধান্য পায় রাজনৈতিক আনুগত্য। বিবেচনায় আসে, নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি ক্ষমতাসীনদের স্বার্থরক্ষায় থাকবেন কতটুকু অনুগত, যেখানে ঈমান-আকিদা ও ইসলামের প্রতি তার আনুগত্যের বিষয় হয়ে ওঠে গৌণ।
রাজনৈতিক বিশ্বাস আজ গুরুত্ব পায় ধর্মীয় বিশ্বাসের চেয়ে বেশি। ফলে আমরা দেখতে পাই এক পক্ষের রাজনীতিবিদেরা বিপরীত মেরুর রাজনীতিতে বিশ্বাসীদের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ তো করেই না, এমনকি তার নামাজে জানাজায়ও যোগ দেয় না। পারলে অন্যদেরও এ নামাজে জানাজায় অংশ নেয়া থেকে বিরত রাখার প্রয়াস চালায়। সুযোগ পেলে ওই মৃত ব্যক্তির চরিত্র হননেও লিপ্ত হয়, যা মৃতজনের স্বজনদের কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ ধরনের বিভাজন রাজনীতির মাঠে অসহিষ্ণুতার মাত্রা বেড়ে চলার প্রক্রিয়া যেন থামতে চাইছে না। এর ফলে প্রতিপক্ষ দমন-পীড়নও সমাজে হাজির হচ্ছে নতুন নতুন অভাবনীয় মাত্রা নিয়ে। খুন, গুম, অপহরণ, রাজনৈতিক নিপীড়ন যেন থামতেই চাচ্ছে না। এর ফলে রাজনৈতিক বিভাজন এক দুঃসহ পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। যে কারণে কেউ কাউকে সহ্য করতে পারছে না। রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে না কোনো ক্ষেত্রে। এর সবচেয়ে দুঃখজনক উদাহরণ হচ্ছে গত ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচন। একটি জাতি জাতীয় জীবনে কতটুকু চরম মাত্রায় বিভাজিত হতে পারে, তার ঐতিহাসিক উদাহরণ হয়ে থাকবে ওই ৫ জানুয়ারির নির্বাচন। একমাত্র আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কারো কাছে এ নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়েছে, এমন সাক্ষ্যপ্রমাণ মেলেনি। ভারত এ নির্বাচনে প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে সমর্থন জুগিয়েছে সত্য, তবে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে কখনো বলেনি, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণের জনমতের প্রতিফলন ঘটেছে, কিংবা এই নির্বাচন ছিল গণতন্ত্রসম্মত। কেমন ছিল এ নির্বাচন, তা আমাদের চোখের সামনেই ঘটেছে। এমনকি বর্তমান সরকারের নীতি-সমর্থক পত্রপত্রিকা ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে ভোট ডাকাতির যেসব চিত্র দেশবাসীর সামনে উন্মোচিত হয়েছে, তা বিশ্ববাসীর কাছে আমাদের জাতীয় ভাবমর্যাদা ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছে। কেন্দ্র দখল, ব্যালট বাক্স দখল, ব্যালট পেপার ছিনতাই, সরকারি দলের প্রার্থীদের এজেন্টের মাধ্যমে ব্যালটে সিল দিয়ে প্রকাশ্যে হাস্যমুখে ব্যালট বাক্স ভর্তি করা, সরকারবিরোধী প্রার্থীদের এজেন্টের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হুমকি দেয়া, কিংবা কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়াসহ এমন কোনো অনিয়ম নেই, যা ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ঘটেনি। তা ছাড়া সরকার বিরোধী জোটের নির্বাচন বর্জনের আহ্বানের মুখে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩টি আসনেই সরকারি দলের ও তাদের সমর্থিত প্রার্থীরা বিজয়ী ঘোষিত হয়েছেন বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায়। এই বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী আসন সংখ্যা আরো অনেক বেশি হতো যদি না নানা কূটকৌশলের মাধ্যমে রওশন এরশাদকে হাত করে ও জেনারেল এরশাদকে সিএমএইচে ক’দিন আটকে রেখে ও গলফ মাঠে পাঠিয়ে জাতীয় পার্টির প্রার্থীদের নির্বাচনে যেতে বাধ্য করা না হতো। সে যাই হোক, এ নির্বাচনের আগে আওয়ামী নেতানেত্রীরা একাধিকবার বক্তব্য দিয়ে দেশবাসীকে এ বার্তা দিয়েছিলেনÑ ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার নির্বাচন। এ নির্বাচন শেষে সরকার বিরোধী দলগুলোর সাথে আলোচনা করে সব দলের অংশগ্রহণে একটি মধ্যবর্তী নির্বাচনের ব্যবস্থা করবে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর সরকারবিরোধী দলগুলো সে অনুযায়ী সংলাপে বসার আহ্বান জানায়; কিন্তু সরকারপক্ষ জানায়, বিএনপি ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের সাথে কোনো আলোচনায় যাবে না। পুরো পাঁচ বছর ক্ষমতায় থেকে ২০১৯ সালে পরবর্তী সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করবে শেখ হাসিনার দলীয় সরকারের অধীনে। এর আগে কোনো নির্বাচন নয়।
এ ধরনের অবস্থান নিয়ে এরই মধ্যে প্রায় ১০ মাস সরকার পরিচালনা করছে এ সরকার। একইভাবে সরকারবিরোধী আন্দোলন যাতে কোনো মতেই দানা বাঁধতে না পারে সেজন্য বিরোধী দলমতের লোকদের ধরপাকড়, মামলা হামলা সময়ের সাথে বাড়ানো হচ্ছে। এ কঠোরতা আরো বাড়ানো হবে সরকারি দলের নেতানেত্রীরা বক্তৃতা-বিবৃতিতে প্রকাশ করছেন। অপর দিকে আমাদের প্রধানমন্ত্রী ও তার অন্য মন্ত্রীরা বিভিন্ন দেশ চষে বেড়াচ্ছেন কূটনীতিক তৎপরতার মাধ্যমে তার সরকারের প্রতি অন্যান্য দেশের সমর্থনের পারদমাত্রা বাড়িয়ে তোলার মানসে। এসব কূটনৈতিক বৈঠক-সাক্ষাতে বিদেশীরা কথা বলছেন কূটনৈতিক কায়দায়। সেই সাথে এরা আদায় করে নিচ্ছেন যার যার জাতীয় স্বার্থ। আসলে কোনো দেশে জনসমর্থনহীন ও বিতর্কিত সরকার থাকলে বিদেশীরা তাকে স্বার্থ আদায়ের সহজ সূত্র পায়। কূটনৈতিক সতর্ক শব্দ ব্যবহার করে এরা সে স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রটি প্রশস্ত করে। বর্তমানে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঘটছে তাই। সে যা-ই হোক, বিভিন্ন কূটনৈতিক বৈঠকের পর আমাদের সরকার এমন ভাব দেখাচ্ছে যেন বিশ্বের সব দেশ ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে মেনে নিয়েছে। অতএব এ সরকারের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নে দেশের বাইরে কোনো সমস্যা নেই। এখন দরকার শতভাগ কঠোরতা অবলম্বন করে দেশে সরকারবিরোধী দলমতকে অস্তিত্বহীন করে দিয়ে দেশে দীর্ঘ দিনের আওয়ামী প্রত্যাশামতে একদলীয় শাসন কায়েমের মধ্যে চিরদিন ক্ষমতায় টিকে থাকার পথ পাকাপোক্ত করা; কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ভারতের কথা বাদ দিলে বাকি সব দেশই আগের মতোই মনে করে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন কোনো মতেই একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ছিল না। এ নির্বাচনে জনমতের বিন্দুমাত্র প্রতিফলন ঘটেনি। এ নির্বাচন গণতন্ত্রের ন্যূনতম চাহিদা পূরণ করতে পারেনি। গত ১৭ অক্টোবরে দেশের জাতীয় গণমাধ্যমগুলোয় একটি খবর প্রকাশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়Ñ ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ব্যাপারে যুক্তরাজ্যের হতাশা এবার প্রকাশ করা হয়েছে আনুষ্ঠানিকভাবে। গত ১৬ অক্টোবর যুক্তরাজ্য সরকারের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক রিপোর্টে তাদের এ অবস্থান তুলে ধরা হয়। এর আগে গত ২২ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন এ হতাশার কথা জানিয়েছেন। ওই সময় গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সম্মান পায়Ñ এমন একটি মুক্তসমাজ ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার গুরুত্বের প্রশ্নে একমত হন উভয়ে। তবে দেশে ফিরে প্রধানমন্ত্রী সে গুরুত্বের কথা ভুলেই গেছেন বলে মনে হয়।
গত ১৬ অক্টোবর বাংলাদেশের মানবাধিকার সম্পর্কে যুক্তরাজ্যের ‘ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ অফিস’ থেকে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ-কান্ট্রি কেস স্টাডি আপডেট’ শীর্ষক এ রিপোর্টে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি ছাড়াও বলা হয়, বাংলাদেশের মিডিয়া বা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা বিধিনিষেধের আওতায় আনা হয়েছে। সরকারের সমালোচনাকারী বা ভিন্নমতাবলম্বীদের আটক করা হচ্ছে। সীমিত করা হয়েছে এনজিও কার্যক্রম। এতে বাংলাদেশের সবার অংশগ্রহণমূলক একটি রাজনৈতিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করার আহ্বান জানানো হয় বিশেষভাবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে বৈঠকে ডেভিড ক্যামেরন এ বিষয়টির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। এ রিপোর্টে বলা হয়, রাজনৈতিক সহিংসতায় ঝুঁকি অব্যাহত রয়েছে বাংলাদেশে। এনজিওগুলোর রিপোর্টে বলা হচ্ছে, নির্বাচন পরবর্তী মাসগুলোয় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুম বেড়েছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সম্পর্কে এ রিপোর্টের অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে বলা হয়েছেÑ এ নির্বাচনে সংসদের অর্ধেকেরও বেশি আসনে প্রার্থীরা জিতেছেন বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায়। নির্বাচনের দিন নিহত হন ২১ জন। অপর দিকে গত ৬ অক্টোবর ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ সম্পর্কিত এক সেমিনারে এক প্রশ্নের জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক ভারপ্রাপ্ত উপসহকারী মন্ত্রী টেড ব্রাউন বলেনÑ গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এর অবস্থান পরিবর্তন করেনি। এ সেমিনারে বাংলাদেশের সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও নিরাপত্তা উভয় বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। টেড ব্রাউন ছিলেন ‘বাংলাদেশ : সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক সেমিনারের প্রধান বক্তা। তিনি বলেন, গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্র অবিলম্বে সত্যিকারের একটি নির্বাচন চায় এবং এ জন্য যুক্তরাষ্ট্র তাগিদ অব্যাহত রেখেছে। এখানেই শেষ নয়, ৫ জানুয়ারির দশম সংসদ নির্বাচন এবং চতুর্থ উপজেলা নির্বাচন গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নির্বাচন ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা সংক্রান্ত প্রকল্পে (এসইএমবি) অনুদান কমিয়ে দিয়েছে দাতা সংস্থা। এ প্রকল্পের পুরো অর্থের জোগান দেয় ইউএসএ আইডি, ইউকে এ আইডি ও ইউরোপীয় কমিশন। প্রকল্পটির সমন্বয়কারী জাতিসঙ্ঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)। ইতোমধ্যেই ইউএনডিপি ইসিকে আনুষ্ঠানিক জানিয়ে দিয়েছে, ২০১৬ সালে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত টাকা ছাড়ের পরিমাণ আরো কমে যাবে। বিজ্ঞপ্তির পটভূমিতে ইউএনডিপি বলেছে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন একতরফাভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এতে অর্ধেকেরও বেশি আসনে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। এ অবস্থায় দাতারা এ প্রকল্পে অর্থ কমিয়ে দেয়ার কথা বলেছে। এরপরও ৫ জানুয়ারির প্রবল বিতর্কিত নির্বাচন সূত্রে গঠিত সরকার পুরো পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার গোঁ ধরেছে, বিরোধী মতাবলম্বীদের মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবিকে একেবারেই আমলে নিচ্ছে না। বিরো ধীদলের সংলাপের দাবিকে অবহেলা করে যা ইচ্ছে তাই বলছে। সে সাথে জোরজবরদস্তি করে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য নানা কূটকৌশলে লিপ্ত হচ্ছে। যেমনি ইচ্ছে আইন-কানুন তৈরি করছে, সংবিধান কাটাছেঁড়া করছে। আর দেশকে উন্নয়নের জোয়ারে ভাসিয়ে দেয়ার গোয়েবলসীয় প্রচারে লিপ্ত হয়েছে; কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। এখনো বাংলাদেশে চার কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। এদের মধ্যে চরম দরিদ্র দুই কোটি। প্রতিনিয়ত দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে এদের বাঁচতে হয়। ুধা-অপুষ্টি এদের নিত্যসঙ্গী। এরা বঞ্চিত সব ধরনের মৌলিক অধিকার থেকে।
আসলে জাতিকে বিভাজিত রেখে জনবিচ্ছিন্ন কোনো সরকার দিয়ে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন কখনোই সম্ভব নয়। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়। সরকার নিজেকে যতই বাহবা দিক দেশবাসী কিন্তু সে বাস্তবতারই প্রতিফলন দেখছে। সমাজে, অর্থনীতিতে, রাজনীতিতে বিরাজ করছে দুঃসহ অস্থিতিশীলতা। সর্বত্রই শুধু বিশৃঙ্খলা আর বিশৃঙ্খলা। ধারাবাহিকভাবে কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার পর এবার বিনিয়োগের পরিমাণ কমছে। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে দেশের বিনিয়োগ কমছে আড়াই হাজার কোটি টাকার চেয়ে বেশি। একই সাথে কমে গেছে, বিদেশে বাংলাদেশীদের কর্মসংস্থান। অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে সাময়িকভাবে কিছুটা বাণিজ্য উদ্বৃত্ত হলেও দ্ইু মাসের মিলিত হিসাবে জুলাই-আগস্টে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১০০ কোটি ডলার। অর্থনীতি হয়ে উঠছে অস্থির। মূল্যস্ফীতি এখনো উদ্বেগজনক। ধারাবাহিকভাবে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হচ্ছে। গ্যাসের দাম বাড়ানো হচ্ছে শতভাগেরও বেশি। মোবাইল ফোন কলে বসানো হয়েছে সারচার্জ। এভাবে যেখানে পারছে সরকার জনগণের পকেট কাটছে। জনগণের ওপর করের বোঝা চাপিয়ে সরকার খরচের টাকা জোগাড় করছে। এই অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র উপায় দেশে একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির সৃষ্টি। সে জন্য অপরিহার্য হচ্ছে সব দলের অংশগ্রহণে দেশের ভেতরে-বাইরে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে সর্বজনসম্মত জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করা। যত দিন ভোটারবিহীন জনবিচ্ছিন্ন সরকার ক্ষমতায় থাকবে, জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরজবরদস্তি করে ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রয়াস যত দিন জারি থাকবে, ভিন্ন মতাবলম্বীদের ওপর অমানবিক রাজনৈতিক নিপীড়ন যত দিন চলবেÑ তত দিন সমাজ, অর্থনীতি ও রাজনীতিতে কোনো ধরনের স্থিতিশীলতা আসবে না। গণতন্ত্রের দেশ ছেড়ে পালানো ছাড়া কোনো গত্যন্তর থাকবে না।

একটি বিতর্কিত উক্তি : সত্য কোনটি? by এ এম কায়েস চৌধুরী

সম্প্রতি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এ কে খন্দকার রচিত ‘১৯৭১ : ভেতরে বাইরে’ বইটির কিছু উক্তি ও তথ্য নিয়ে বিতর্ক চলছে। এসব কিছুর মধ্যে একটি উক্তি নিয়ে জোর বিতর্ক চলছে। সেটি হলো, ৭ মার্চ ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধু যে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন সেই ভাষণ সমাপনান্তে ‘জয় বাংলা, জয় পাকিস্তান’ শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করেছিলেন।
সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ আবুল মনসুর আহমদের কোনো পরিচিতির প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। তার রচিত ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ বইয়ে এ বিষয়ে তার ভাষ্য তুলে ধরা হলো। “স্বাধীনতা ঘোষণার দাবিদার তরুণদের খুশি করিবার জন্য শেখ মুজিব আরো দু’ইটা কাজ করিলেন। প্রথমত, উপসংহারে তিনি বলিলেন : আজিকার সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম। দ্বিতীয়ত, কিছু দিন ধরিয়া তিনি সব বক্তৃতার শেষ করিতেন এক সঙ্গে ‘জয় বাংলা’, ‘জয় পাকিস্তান’ বলিয়া। এই দিনকার সভায় প্রথম ব্যতিক্রম করিলেন। শুধু ‘জয় বাংলা’ বলিয়া বক্তৃতা শেষ করিলেন। যাঁরা নিজেরা উক্ত সভায় উপস্থিত ছিলেন বলিয়া দাবি করেন, তাঁদের কেউ কেউ আমার এই কথার প্রতিবাদ করেন। তাঁরা বলেন, শেখ মুজিব ৭ মার্চের সভাতেও ‘জয় বাংলা’, ‘জয় পাকিস্তান’ বলিয়া বক্তৃতা শেষ করিয়াছিলেন। আমি যখন বলি যে পরদিন আমি রেডিও টেলিভিশনে নিজ কানে তাঁর বক্তৃতা শুনিয়াছি এবং তাতে ‘জয় পাকিস্তান’ ছিল না, তার জবাবে তাঁরা বলেন, পরদিন রেকর্ড ব্রডকাস্ট করিবার সময় ঐ কথাটা বাদ দেওয়া হইয়াছিল। যাক আমি নিজ কানে যা শুনিয়াছিলাম, তাই লিখিয়েছি। বক্তৃতা শেষ করিয়াই মুজিব সভামঞ্চ ত্যাগ করিলেন। ... এটা নিঃসন্দেহে বোঝা গেল যে, তথাকথিত ছাত্রনেতা ও তরুণদের জবরদস্তি ও হুমকি ধমকেও সেদিন শেখ মুজিবের স্বাধীনতা ঘোষণার ইচ্ছা ছিল না। আমার বিবেচনায় এটা শেখ মুজিবের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতারই প্রমাণ।’ (চতুর্থ সংযুক্ত ৩ সেপ্টেম্বর ১৯৮৪ পৃ: ৫৪২) ‘এ বইটি আবুল মনসুর আহমদের আত্মজীবনীর রাজনৈতিক ভাষ্য। এক দিকে যেমন একটি জাতির অতীত রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসের বেসিক ডকুমেন্ট, অপর দিকে তেমনি জাতিকে ভবিষ্যতের জন্য পথনির্দেশনা।”
বইটির প্রথম সংস্করণ নিশ্চয়ই আবুল মনসুর আহমদের মৃত্যুর আগেই প্রকাশিত হয়েছিল। সেদিন যারা ৭ মার্চের সভায় উপস্থিত ছিলেন বলে দাবি করে তাঁর কথার প্রতিবাদ করেছিলেন তারা নিশ্চয়ই আওয়ামী লীগের প্রথম সারির নেতারা হবেন। আবুল মনসুর আহমদ আওয়ামী লীগের শীর্ষপর্যায়ের নেতা ছিলেন। তারা না শুনলে তাঁর কথার প্রতিবাদ করলেন কেন? তখন তো আর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) জন্ম হয়নি। বিএনপির জন্ম হয় ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর। আবুল মনসুর আহমদ যা শুনতে পেরেছিলেন তাই লিখেছেন। বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের আরো কিছু দিন ধরে যে ‘জয় বাংলা’, ‘জয় পাকিস্তান’ বলে সব বক্তৃতা শেষ করতেন সে কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন। আবার কোনো পণ্ডিত এমনও বলতে পারেন যে, প্রথম সংস্করণে তথ্যটি ছিল না। এটি চতুর্থ সংস্করণে সংযোজিত হয়েছে। চতুর্থ সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯৮৪ সালে। তখন তিনি জীবিত ছিলেন না। কাজেই চতুর্থ সংস্করণে সংযোজন করার কোনো প্রশ্নই আসে না।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বিচারাপতি মো: হাবিবুর রহমান তার রচিত ‘বাংলাদেশের তারিখ’ নামে বইয়ের প্রথম সংস্করণে বঙ্গবন্ধু ‘জয় পাকিস্তান’ বলেছিলেন বলে উল্লেখ করেছেন। লন্ডন প্রবাসী সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরী (আগাচৌ) সাক্ষী দিয়েছেন যে, বিচারপতি হাবিবুর রহমান তাকে বলেছেন তিনি ৩ জানুয়ারি ও ৭ মার্চের মধ্যে গুলিয়ে ফেলেছিলেন বয়সের ভারে স্মৃতিভ্রমের কারণে (বাংলাদেশ প্রতিদিন ১৪-৯-২০১৪)। বিচারপতি হাবিবুর রহমান এখন আর নেই। আগাচৌয়ের কথায় প্রতীয়মান হয়, বিচারপতি হাবিবুর রহমান আর কাউকে না পেয়ে শুধু আগাচৌকে অগ্রিম জানিয়ে দিলেন যে, তিনি বয়সের কারণে স্মৃতিভ্রমের শিকার ছিলেন বলে ৩ জানুয়ারি আর ৭ মার্চের মধ্যে গুলিয়ে ফেলেছিলেন।
ওই পত্রিকায় একই দিনে জনৈক অধ্যাপক লিখেছেন, যারা বঙ্গবন্ধুর ভাষণে ‘জয় বাংলা’ ও ‘জয় পাকিস্তান’ শুনেছেন তারা হলেন বিচারপতি হাবিবুর রহমান ও শাজাহান সিরাজ। এ দু’জন ছাড়া ১০ লাখের শ্রোতার কেউই এমন শব্দগুচ্ছ শোনেনি; তারা শুধু ‘জয় বাংলা’ শুনেছেন। শাজাহান সিরাজ রেসকোর্সে উপস্থিত হয়ে শুনলেন যে, বঙ্গবন্ধু ‘জয় বাংলা’, ‘জয় পাকিস্তান’ বলে তার ৭ মার্চের ভাষণ শেষ করেন। তার এমন উচ্চারণের প্রয়োজন ছিল। কেননা সেটা তার মন্ত্রী হওয়ার কাজে লেগেছে। “তার বক্তব্যে বোঝা যায়, এ ধরনের শব্দগুচ্ছ শোনার কথা বলায় শাজাহান সিরাজ মন্ত্রী হয়েছেন। শাজাহান সিরাজ মন্ত্রী হয়েছেন ৩০ বছর পরে ২০০১ সালে। এটা কি যুুক্তির কথা কিংবা বিশ্বাসযোগ্য যে, এ শব্দগুচ্ছ শোনার কথা বললে তিনি মন্ত্রী হবেন। ওই অধ্যাপকের মতে, বিচারপতি হাবিবুর রহমান ও শাজাহান সিরাজ ছাড়া ‘১০ লাখের শ্রোতার কেউই এমন শব্দগুচ্ছ না শুনলে’ কারা সেদিন আবুল মনসুর আহমদের কাছে তার কথার প্রতিবাদ করেছিলেন।”
স্মতর্ব্য, বিচারপতি হাবিবুর রহমান বর্তমান সরকারের সুশাসন দেখে মন্তব্য করেছিলেন, ‘দেশ এখন বাজিকরদের হাতে’। এ কারণে আওয়ামী লীগের কাছে তিনি আর গ্রহণযোগ্য নন, যদিও অতীতে ছিলেন তাদের একান্ত শ্রদ্ধাভাজন।
এম আর চৌধুরী লিখেছেন, ‘‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম/এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম বললেন, সে সঙ্গে ‘জয় বাংলা, জয় পাকিস্তান’ বলে বক্তব্য শেষ করলেন।’’ (বাংলা বাজার পত্রিকা ১৮-৩-২০০৬) এ বিষয়ে আরো অনেক উদ্ধৃতি দেয়া যায়। যা হোক, সত্য কখনো চিরদিন ঢাকা যায় না। পলাশীর যুদ্ধের এক শত বছর পরে আমরা জানতে পারি যে, অন্ধকূপ হত্যার ঘটনাটি বানোয়াট ছিল। যা সত্য, আজ না হোক কাল তা প্রকাশ হবেই। আপাতত কিছু বিতর্ক ও বিতণ্ডা চলবে মাত্র।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা
পশ্চিম মাসদাইর, নারায়ণগঞ্জ

বিএনপির শক্তি তৃণমূল by মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন

দৃশ্যত ৫ জানুয়ারি দেশে যে নির্বাচন হয়েছে এটা আসলে কোনো নির্বাচন না। এ নির্বাচনে একটি মাত্র ভোট পড়ার আগেই নির্বাচিত হয়েছে পরবর্তী সরকার। এই নির্বাচনে ভোট দেয়ার সুযোগ হয়নি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের। এই নির্বাচনে ভোট দেননি রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, প্রধান বিচারপতি ও বিরোধীদলীয় নেতা। কারণ তাদের এলাকায় ভোট ছাড়াই নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এই নির্বাচনে ভোট দেননি দেশের অনেক খ্যাতিমান মানুষ। কারণ তারা বিবেকের কাছে বন্দী। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নামে পৃথিবীর ইতিহাসে অভূতপূর্ব এই নির্বাচনী তামাশা নীরবে সহ্য করতে হয়েছে জাতিকে। তবে ১৯৯০-এর পরের প্রজন্ম, অর্থাৎ আজকে যাদের বয়স ২০-২৫, স্বৈরাচারী শাসন কি তারা তা দেখেনি; কিন্তু বর্তমান সরকারের কর্মকাণ্ডে সেটি তারা প্রত্য করছে, অর্থাৎ আজকের প্রজন্মের কাছে আওয়ামী লীগ সরকার একটি স্বৈরাচারী সরকার হিসেবে পরিচিত হচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ আওয়ামী রাজনীতির জন্য এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়ে থাকবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন। কাজেই এখনো সময় আছে সংশোধন হওয়ার এবং পরিস্থিতি অনুধাবন করার, সময় আছে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফিরে যাওয়ার এবং একটি পপাতহীন ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথ প্রশস্ত করার। মনে রাখা ভালো, একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে কাউকে অসম্ভব শক্তিশালী মনে হতে পারে, আবার আরেকটি বিশেষ পরিস্থিতিতে তিনি হয়ে যেতে পারেন দুর্বলতম মানুষ। আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকেও সম্ভবত শক্তিশালী মানুষ মনে হয়। তিনি রাজনীতি নিয়ে একতরফা খেলে যাচ্ছেন অবলীলায়। তার রাজনৈতিক দাপটের কাছে বিশ্ব মোড়ল আমেরিকাও অসহায়, অসহায় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব ড. মুহাম্মদ ইউনূস, অসহায় প্রতিপ রাজনৈতিক দলও। বিএনপিসহ ১৮ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতাদের পাইকারি হারে জেলে নিয়ে তিনি তার মতার পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন দেশবাসীকে। দেশে সর্বগ্রাসী সঙ্কট, শেয়ার মার্কেট কেলেঙ্কারি, রেল মন্ত্রণালয়ের কেলেঙ্কারি, পদ্মা সেতু কেলেঙ্কারি, হলমার্ক কেলেঙ্কারি, ডেসটিনি কেলেঙ্কারিসহ আরো অসংখ্য কেলেঙ্কারি ও নজিরবিহীন দুর্নীতি এবং সীমাহীন ব্যর্থতার পরও প্রধানমন্ত্রী অনায়াসে সরকার চালিয়ে যাচ্ছেন। রাজনীতিতে এটি একটি নজির বলা যায়; কিন্তু জনগণের খেলার কাছে কোনো খেলাই দাঁড়াতে পারে না। জনগণের খেলা যখন শুরু হবে, তখন দেখা যাবে কত ধানে কত চাল।
বাংলাদেশের সরকারপ্রধান অসীম মতাধর। তাদের ধারে কাছের মানুষও মতার স্পর্শ পেয়ে বদলে যান। তারা হয়ে ওঠেন দুর্নীতিপরায়ণ ও স্বেচ্ছাচারী। তাদের গাম্ভীর্য বাড়ে, চেহারায় পরিবর্তন আসে; হয়ে ওঠেন অঢেল অর্থসম্পদের মালিক; কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হলো, মতা ছাড়ার আগেই তাদের দেশ ছাড়তে হয়। বিগত সরকারের প্রধানমন্ত্রীর ধারে কাছের বহু লোক এখনো দেশ ছাড়া। দেশে এখনো দুর্নীতির জয়জয়কার চলছে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে দুর্নীতিবাজদের অবাধে দুর্নীতির সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। এমন কোনো সেক্টর নেই যেখানে ফ্রি স্টাইলে দুর্নীতি হচ্ছে না। নজিরবিহীন ও সীমাহীন দুর্নীতিতে অর্জিত টাকা বিদেশে নির্দ্বিধায় পাচার হচ্ছে বলে পত্রপত্রিকায় খবর বের হচ্ছে। রাজনৈতিক ছত্রছায়ার থেকে প্রায় ৩৩ লাখ ুদ্র বিনিয়োগকারীর প্রায় এক লাখ কোটি টাকা শেয়ারমার্কেট থেকে লুট করে নিয়ে গেছে লুটেরা ব্যবসায়ীরা। কুইক রেন্টাল নির্ভর জ্বালানিনীতি সাধারণ মানুষের রক্ত চুষে নিচ্ছে। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন মধ্যবিত্ত ও সাধারণ মানুষ। ঘরে ঘরে অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল আসছে। কয়েক মাস আগেও যে পরিমাণ বিল হতো এখন তা দ্বিগুণ, তিন গুণ হয়েছে। কোনো কোনো গ্রাহকের বিল দাঁড়িয়েছে চার-পাঁচ গুণ। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে আতঙ্ক ও নানা প্রশ্ন। এ ব্যাপারে বিএনপিকে সোচ্চার হতে হবে এবং রাখতে হবে কার্যকর ভূমিকা।
সরকারের গণবিরোধী কাজে গণমাধ্যম সক্রিয় ও সাহসী ভূমিকা পালন করায় শাসকগোষ্ঠী ভীষণ ুব্ধ। নতুন নীতিমালার নামে গণমাধ্যমের কণ্ঠ রোধ করার প্রক্রিয়া চলছে। সরকারকে বলি, গণমাধ্যমের ওপর চড়াও হয়ে লাভ নেই। কারণ গণমাধ্যম সরকারকে পরোভাবে সাহায্যই করছে। সমাজে যা কিছু ঘটে, তা গণমাধ্যমকে অনিবার্যভাবেই প্রভাবিত করে। ইদানীং সমাজ ও রাষ্ট্রে বাস্তব যা কিছু ঘটছে, তার সত্য ও সহজ-সরল প্রতিচ্ছবিই গণমাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে।
বিরোধী দলকে রাজনৈতিকভাবে আরো সক্রিয় হতে হবে। রাজপথে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে প্রতিদিন কোনো-না-কোনো কর্মসূচি তালিকায় থাকতে হবে। নির্দলীয়-নিরপে সরকারের অধীনে একটি পপাতহীন, অবাধ, সুষ্ঠু মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকারকে বাধ্য করা এখন বিএনপির সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ। এই জন্য বিএনপিকে মাঠের রাজনীতিতে সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে। এ েেত্র নির্লিপ্ততা বিএনপির রাজনীতির জন্য মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। লণ দেখে মনে হচ্ছে সরকার আরো বেপরোয়া হবে, অবর্ণনীয় দমন-পীড়ন চালাবে। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের অকারণে হয়রানি, মামলা ও গ্রেফতার করে চরম হেনস্তা করবে। তাতে ভয় পেলে চলবে না। মানুষের ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে যেকোনো ত্যাগের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। ঐক্যবদ্ধ হবে কৃষক-শ্রমিকসহ সর্বস্তরের মানুষ। তখন পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা ভাবাই শাসকদলের জন্য সমীচীন। কাজেই শাসকদলকে জনগণের চিন্তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে। বাংলাদেশের মানুষ লোক দেখানো ও আঙুল হেলানো গণতন্ত্র পছন্দ করে না। তারা গণমাধ্যমের ওপর কোনো খরবদারি মেনে নেবে না, মেনে নেবে না আইনের শাসনের ওপর কোনো অযাচিত হস্তপে; মেনে নেবে না প্রতিবাদের ভাষা স্তব্ধ করে দেয়ার মতো কোনো আইন।
বাংলাদেশ রাজনৈতিকভাবে এক যুগ সন্ধিণে দাঁড়িয়ে। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও অস্থিরতা বিরাজমান। এ অবস্থায় দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেকোনো দিকে ঘুরে যেতে পারে। সৃষ্টি হতে পারে দেশে এক বেদনাবহ পরিস্থিতির, যা মোকাবেলা করার মতা বর্তমান সরকার রাখে না; কেননা বর্তমান সরকার প্রবলভাবে প্রশ্নবিদ্ধ এবং জনসমর্থন অতিসামান্য, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সরকারের অবস্থান দুর্বল। সুতরাং বাংলাদেশের বর্তমান প্রোপটে দরকার একটি জনবান্ধব শক্তিশালী সরকারের, যা সম্ভব হতে পারে সব দলের অংশগ্রহণে একটি পপাতহীন ও গ্রহণযোগ্য মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাধ্যমে। এ বাস্তবতা শাসকদল যত তাড়াতাড়ি অনুধাবন করবে, ততই দেশের মঙ্গল হবে; মঙ্গল হবে মতাসীন দলেরও।
belayete_1@yahoo.com

রাজনীতিক অলি আহাদ by সাইফুদ্দিন আহমেদ মনি

গতকাল ২০ অক্টোবর ছিল বিশিষ্ট রাজনীতিক অলি আহাদের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। এ দেশে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৫২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে যে চারজন নেতা সোচ্চার হয়ে একুশে ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ইতিহাস সৃষ্টি করেন, অলি আহাদ তাদের অন্যতম। মুক্তিযুদ্ধে তার অবদানের জন্য সরকার ২০০৪ সালে স্বাধীনতা পদক প্রদান করে। সামরিক-বেসামরিক স্বৈরাচার-দুঃশাসকের বিরুদ্ধে তার বজ্রকণ্ঠ সদা উচ্চকিত ছিল। সুবিধাবাদ ও আপসকামিতা তার চরিত্রকে স্পর্শ করতে পারেনি। দীর্ঘ দিন রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে থেকেও নীতিহীন ক্ষমতার রাজনীতি তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। দেশের স্বার্থকে উপেক্ষা করে অসৎ ও ক্ষমতালোভীদের সাথে আপস করেননি।
অলি আহাদের সাথে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৭৩ সালে ফরওয়ার্ড স্টুডেন্ট ব্লকের সক্রিয় কর্মী হিসেবে মিছিল শেষে বিজয় নগর বাংলা জাতীয় লীগ কার্যালয়ে। সে দিনই আমাকে বললেন, ‘ছাত্রদের প্রথম কাজ লেখাপড়া করা। লেখাপড়ার ফাঁকে ছাত্র রাজনীতি করতে চাইলে পাঠ্যপুস্তকের বাইরে রাজনীতির বই, প্রতিদিনের একাধিক দৈনিক পত্রিকা মনোযোগের সাথে পড়তে হবে। লেখাপড়া বাদ দিয়ে ছাত্ররাজনীতির আমি ঘোর বিরোধী। দেশকে যদি ভালোবাস, তবে তোমাকে সময় বের করে কাজ করতে হবে। জ্ঞান আর ত্যাগ না থাকলে দেশকে কিছু দেয়া যায় না, সমাজও কিছু পায় না।’ ছাত্রজীবন শেষ করে এ নেতার মৃত্যুর দিন পর্যন্ত তার সাথে ছিলাম। পত্রিকার প্রয়োজনীয় অংশ মার্ক করে তা আমাদের পাঠাতেন। বিদেশী ম্যাগাজিন, বিশেষত টাইমস ও নিউজ উইক সাময়িকীর তিনি নিয়মিত পাঠক ছিলেন। পত্রিকা পড়ার পর আমরা তার সাথে বসতাম। রাজনীতির গতিবিধি, পত্রিকার খবরের পর্যালোচনা এবং দলীয় কর্মকাণ্ড ছিল আলোচ্যসূচি। রাজনীতির আলোচিত সব বই তার সংগ্রহে ছিল এবং উল্লেখযোগ্য বইগুলো নিয়ে পর্যালোচনা হতো। হরতালের দিন অলি আহাদ হেঁটে চলতেন, হরতাল শেষ হওয়ার এক মিনিট আগেও রিকশায় চড়তেন না। কোনো নেতা নিজেদের হরতালে যানবাহনে এলে ভর্ৎসনা করতেন। তার জীবন ছিল খুবই সাদামাটা। হরতালের দিন আমরা অফিসে একসাথে সাধারণ মানের খিচুড়ি এবং মাঝে মধ্যে লবণ দিয়ে শুধু আলু সিদ্ধ খেয়েছি অনেক দিন।
মেধাবী ছাত্র অলি আহাদ ১৯৪৪ সালে প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকা কলেজে ভর্তি হন। ১৯৪৬ সালে আইএসসি পরীক্ষা দেয়া সম্ভব হয়নি। কারণ, তিনি তখন পাকিস্তান আন্দোলনে মুসলিম ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে ব্যস্ত ছিলেন। ১৯৪৭ সালে প্রথম বিভাগে আইএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিকম কাসে ভর্তি হন। আইএসসিতে ভালো রেজাল্ট করার জন্য তিনি হাজী মুহম্মদ মুহসীন ট্রাস্টের মাসিক ২০ টাকা হারে বৃত্তি লাভের জন্য নির্বাচিত হন। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ভাষা আন্দোলনে প্রথম কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন তিনি। দফায় দফায় বিভিন্ন সরকারের আমলে তিনি প্রায় এক যুগ কারাবরণ করেছেন। আত্মগোপন করে থেকেছেন আরো কয়েক বছর। ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৮৬ সাল প্রর্যন্ত অলি আহাদ অন্যায়ের বিরুদ্ধে, জনতার অধিকার আদায়ের সংগ্রামে কারারুদ্ধ হন বারবার। এরশাদের আমলে ছয়বার গ্রেফতার হয়ে ৩৫৭ দিন জেলে ছিলেন। ১৯৪৮ সালে তাকে দুইবার আটক করা হয়। ’৪৯ সালের ২০ এপ্রিল আবার গ্রেফতার হন। ’৫০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি, ’৫২ সালের ৭ মার্চ, ’৬৯-এর ৩১ জানুয়ারি, ’৭৪-এর ৩০ জুন এবং তৎপরবর্তী প্রতিটি আমলেই কারাগারে আটক ছিলেন তিনি।
অলি আহাদের বই জাতীয় ‘রাজনীতি ৪৫ থেকে ৭৫’ আমাদের রাজনীতির ইতিহাসে এক নির্ভেজাল দলিল। তিনি ‘ইত্তেহাদ’ নামে সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন অনেক দিন।
অলি আহাদ ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগের আহ্বায়ক, ১৯৫০ সালের গণতান্ত্রিক যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক, ১৯৫৩ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রচার সম্পাদক, ১৯৫৫-৫৬ সালে সাংগঠনিক সম্পাদক। ১৯৫৭ সালের আওয়ামী লীগের কাগমারী সম্মেলনের প্রাক্কালে মওলানা ভাসানীর নির্দেশে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ভূমিকা গ্রহণ করায় অলি আহাদের সদস্য পদ স্থগিত করা হয়। এর প্রতিবাদে আটজন আইন পরিষদ সদস্য পদত্যাগ করেছিলেন। দল থেকে বেরিয়ে এলেন মওলানা ভাসানী। প্রতিষ্ঠিত হলো ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি। অলি আহাদ হলেন এ সংগঠনের যুগ্ম সম্পাদক। পরে অলি আহাদ জাতীয় লীগের ও বাংলা জাতীয় লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং শেষে ডেমোক্রেটিক লীগের সভাপতি ছিলেন। আপসহীন সংগ্রামী এই নেতা আমাদের রাজনীতির ইতিহাসে ধ্রুবতারা হয়ে জ্বলবেন চিরকাল।
লেখক : ডেমোক্রেটিক লীগের সাধারণ সম্পাদক

স্মরণ- সাহিত্যিক-সাংবাদিক খালেকদাদ চৌধুরী by ফজলুল হক রোমান

১৬ অক্টোবর ছিল সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক মরহুম খালেকদাদ চৌধুরীর মৃত্যুবার্ষিকী। তার সম্পাদিত এবং নেত্রকোনা থেকে প্রকাশিত বহুল আলোচিত উত্তর আকাশ পত্রিকাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল কবি, সাহিত্যিক ও সাংবাদিকদের এক মিলনমেলা। তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় নেত্রকোনায় গড়ে ওঠা সাধারণ গ্রন্থাগারের সম্পাদক হিসেবে ‘সৃজনী’ নামে সাহিত্য পত্রিকা তিনি সম্পাদনা করতেন। তার লেখা ও প্রকাশিত ডজনখানেক বইয়ের মধ্যে রক্তাক্ত অধ্যায় এবং শতাব্দীর দুই দিগন্ত উল্লেখযোগ্য। তিনি বিখ্যাত গ্রন্থ ‘বাহার-ই-স্তান-ই গায়েবী’র অনুবাদক।
মরহুম খালেকদাদ শুধু সাহিত্য অঙ্গনেই অবদান রাখেননি, মহান মুক্তিযুদ্ধে একজন সংগঠক হিসেবে মেঘালয় রাজ্যে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সমাজসেবক হিসেবে ১৯৭২ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত নেত্রকোনা রেড ক্রসের সভাপতি এবং জেলা বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন। মরহুম খালেকদাদ চৌধুরী ১৯০৭ সালে মদন উপজেলার চানগাঁও গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।  ১৯২৪ সালে তিনি নেত্রকোনা দত্ত হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। কলকাতা রিপন কলেজ থেকে ১৯২৬ সালে তিনি আইএ পাস করেন। ইসলামিয়া কলেজে ইংরেজিতে অনার্সে ভর্তি হন। ১৯২২ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত কবি বন্দে আলী মিয়ার বিকাশ পত্রিকায় তার লেখা প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল। কলকাতা করপোরেশনের একটি স্কুলে কিছু দিন শিকতার পর ১৯৪১ সালে তথ্য অফিসার হিসেবে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করেন। ১৯৬১ সালে চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে সাহিত্যে মনোনিবেশ এবং নেত্রকোনা শহরে উত্তর আকাশ নামে মাসিক পত্রিকা বের করেন।  ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত পত্রিকাটি চালু ছিল। ১৯৪১ সালে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম সম্পাদিত দৈনিক নবযুগ পত্রিকায় খালেকদাদ চৌধুরী শিশু বিভাগ পরিচালনা করতেন। সেই সূত্রেই নজরুলের সাথে ঘনিষ্ঠতা। ১৯৮৩ সালে সাহিত্যে অবদানের জন্য খালেকদাদ চৌধুরীকে বাংলা একাডেমি পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। নেত্রকোনার এই কৃতী সন্তান ১৯৮৫ সালের ১৬ অক্টোবর ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন। বাংলা ১৪০৩ সাল থেকে ‘খালেকদাদ স্মৃতি পরিষদ’ তার নামে সাহিত্য পুরস্কার প্রদান করে আসছে।

WE টিউব (লাইটস)! by শায়ের খান

সকাল সকাল এ ভুলে কোন লজ্জা নেই। আর বোম আঙ্কেল হলে তো কথাই নেই। ভুলে দিন শুরু, ভুলেই শেষ। ভোর ৫টায় ঘরের দরজায় টুক টুক করে টোকা দেন। খুলে দেখি আঙ্কেল। মুখে তর্জনি দিয়ে বলেন, ‘শ্‌ শ্‌ শ্‌। তোর আন্টি যেন না জানে। একটা হেল্‌প করবি?’ ফিসফিসিয়ে বলি, ‘কি?’ বলেন, ‘কাল ভুলে সুপার শপে টুথপেস্ট আর শেভিং জেল দুটোই ফেলে এসেছি। এখন তো আমার দুটোই দরকার। দেয়ার ইজ আ মিটিং। ঠাণ্ডা করি আঙ্কেলকে। ‘আমার দুটো নিয়ে যাও। একটু পরে দিয়ে যেও।’ ‘থ্যাঙ্কস’ বলে দুটো টিউব নিয়ে উধাও হন আঙ্কেল। আমি আবার বিছানায় গিয়ে পড়ি। পাশে কাফি ভাই উঠি উঠি করছেন। ঘণ্টাখানেক পর ফ্রেশেনিং কর্ম সেরে ফেরেন আঙ্কেল। এক হাতে দুই টিউব, আরেক হাত গালে। মুখ হা করে মুখ দিয়ে অনবরত ‘হা-হা’ করে হাঁপাচ্ছেন। পেস্ট আর জেলের টিউব ফেরত দিয়ে বলেন, ‘কোন টুথপেস্ট ব্যবহার করিসরে তুই? নামটা তো দেখলাম না।’ বলি, ‘আদি ও অকৃত্রিম কোলগেট।’ কয়লার ইঞ্জিনের মতো ‘হা-হা-হা’ শব্দ করতে করতে গালে হাত দিয়েই আবার উধাও আঙ্কেল। উঠে পড়েন কাফি ভাই। ঢুকে পড়েন বাথরুমে। আজ সকাল সকাল উনারও কি যেন ধান্ধাবাজি আছে, তাই এই আর্লি মর্নিং শেভ আর টুথব্রাশ ফায়ারিং। মেম আন্টির শব্দ পাই। হাঁটা আর গলা খাকারি। ব্রেকফাস্ট দিয়ে উনার কিচেন অ্যাকশন শুরু করবেন বোধ হয়। কার সাথে কথা বললেন যেন। সম্ভবত মিলিও উঠে এসেছে মায়ের সাথে। আমি বেডে গড়াগড়ি খাই। আজ কাজ নেই। স্বঘোষিত ছুটি। কাফি ভাই হঠাৎ বাথরুমের দরজা খুলে উঁকি দেন। বলেন, ‘মামা তো টুথপেস্ট একেবারে শেষ করে ফেলেছে রে। ব্রাশে কি লাগাব?’ বলি, ‘ঐ চিপে চুপে যা পাও তা দিয়েই ব্রাশ ফায়ার কর।’ কাফি ভাই তাই-ই করেন। ঠাস করে বাথরুমের দরজা বন্ধ করে ফেলেন আবার। আধা ঘণ্টা যায়নি, বাথরুমের দরজা দড়াম করে খুলে হঠাৎ আঙ্কেলের মতোই গালে হাত দিয়ে মুখে ‘হা-হা-হা’ শব্দ তুলে উদভ্রান্তের মতো দৌড় লাগান ডাইনিং রুমের দিকে। আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমার দরজা বন্ধ হয়ে ভেতর থেকে লক্‌ড হয়ে যায়। যা হচ্ছে হোক। ছুটির দিন। একটু গড়িয়ে নেই।
চোখ বন্ধ করেছি মাত্র, ডাইনিং রুমে যেন একটা মৃদু শোরগোল শুনতে পাই। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমার বন্ধ দরজায় দড়াম দড়াম ঘুষির শব্দ। সাথে মেম আন্টি আর মিলির অস্পষ্ট চিৎকার! তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠে দরজা খুলি। সর্বনাশ। একি? মেম আন্টির রুদ্র মূর্তি। চিৎকার করে বলেন, ‘এ্যাই, তোর আঙ্কেল কে কি খাইয়েছিস ঠিক করে বল্‌।’ আন্টির ওপর আরেক স্কেল গলা চড়ায় মিলি, ‘কাফির অবস্থা তো আরও খারাপ!’ বলেই ওরা আবার ডাইনিং রুমে ছোটে। মানে? গিয়ে দেখি আঙ্কেল চেয়ারে গালে হাত দিয়ে বসে চামচ দিয়ে আধমরার মতো ঠাণ্ডা ক্ষির পায়েশ খাওয়ার চেষ্টা করছেন। মনে হচ্ছে ডেন্টাল পেশেন্ট। কিছুটা মেন্টাল-ও। আন্টি আদর করে বলছেন, ‘খাও, আরেক চামচ খাওয়ার চেষ্টা কর।’
আর ওদিকে ফ্রিজের সামনে তো ভয়াবহ অবস্থা। ফ্রিজ খোলা। কাফি ভাই ফ্লোরে বসে পাগলের মতো ফ্রিজের ভেতর হাত ঢুকিয়ে ভেতরের বাটি থেকে গপাগপ কয়েকটি রসগোল্লা গিলছেন আর মিলি ভেজা টিস্যু দিয়ে আস্তে আস্তে ওনার গাল মুছে দিচ্ছে। আমাকে দেখে প্রায় কেঁদেই ফেলেন কাফি ভাই। বলেন, ‘কল্লোল রে, তোর শেভিং ক্রিমটা কি গুলিস্তানের ফুটপাথ থেকে কিনেছিস নাকিরে ভাই? যত ঘষি, একটুও ফেনা ওঠে না। রেজারের টানে গালের ছাল উঠে গেছে রে!’ আর মেম আন্টি আকাশ ফাটিয়ে চিৎকার করে ওঠেন, ‘টুথপেস্টটা কতদিনের পুরনো অ্যাঁ? তোর আঙ্কেলের ঠোঁট থেকে গলা পর্যন্ত মোচড় দিচ্ছে?’ ‘গলা না, পেট পর্যন্ত’, কেঁদে কেঁদে কাফি ভাই বলেন আর তেতো পেটে আরেকটি রসগোল্লা চালান দেন।
ধপাস করে বসে পড়ি। মাথা চুলকাই। কিছুই বুঝে উঠতে পারি না। আমার টুথপেস্ট, শেভিং জেল, হেয়ার অয়েল সব-ই তো ব্র্যান্ডেড? হঠাৎ কি মনে হয়। গট ইট্‌! দৌড়ে গিয়ে প্রথমে কাফি ভাইয়ের আর তারপর আঙ্কেলের গাল শুঁকি। আর তার পরপরই দৌড়ে বাথরুমে গিয়ে আবার ফিরে আসি হাতে দু’টো টিউব নিয়ে। কাফি ভাইকে একটা টিউব দেখিয়ে বলি, ‘তুমি এটা দিয়ে শেভ করেছিলে!’ বাচ্চা ছেলের মতো কেঁদে ফেলে বলেন কাফি ভাই, ‘হ্যাঁ- অ্যাঁ- অ্যাঁ-!’ মিষ্টি মেশানো থাকায় সেটা ভেড়ার ‘ভ্যাঁ-অ্যা’র মতো শোনায়। এবার দৌড়ে বোম আঙ্কেলের সামনে আরেক টিউব তুলে বলি, ‘তুমি এটা দিয়ে দাঁত ব্রাশ করেছো?’ আঙ্কেল নির্লিপ্তের মতো গালে হাত রেখে কেবল মাথা ওঠান আর নামান। এবার চিৎকার করে আমি-ই বলে উঠি, ‘তো তোমরা টুথপেস্ট দিয়ে শেভ করবে আর শেভিং জেল দিয়ে দাঁত ব্রাশ করবে- তোমাদের পেট মোচড়াবে না তো কি মাথা মোচড়াবে?’ ইলেকট্রিক শখ খাওয়ার মতো মেম আন্টি, বোম আঙ্কেল, মিলি, আর কাফি ভাই আমার দিকে তাকান। কোরাসে বলে ওঠে সবাই, ‘অ্যাঁ- অ্যাঁ- অ্যাঁ?’

অপেক্ষার তেতাল্লিশ বছর by কাজল ঘোষ

আজ এমন ক’জন মানুষের কথা বলবো যারা নিজেদের সম্ভ্রম বিলিয়ে দিয়েছিলেন স্বাধীনতার জন্য। যাপিত জীবনের অসংখ্য ঘটনায় এই সমাজ তাদের খোঁজ নিতে পারেনি যুগের পর যুগ। দেশ এগিয়েছে। রাজনীতির খোলনলচে বদলে গেছে বহুভাবে। দেশে যে হারে ধনীর তালিকা দীর্ঘ হয়েছে। একইভাবে খেলাপি ঋণ গ্রহীতার তালিকাও দীর্ঘ হয়েছে। কিন্তু উন্নয়ন সমীকরণ আর মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা, রাজাকার-আলবদরদের লড়াইয়ে যাদের শ্রেষ্ঠ সম্পদ কেড়ে নিয়েছিল পাক হানাদার বাহিনী সেই সব নির্যাতিত মায়েদের খোঁজ কি রেখেছে এই রাষ্ট্র?
এসনু বেগম। সিলেটের সীমান্ত এলাকা জকিগঞ্জের। একাত্তরে ১৩-১৪ বছরের কিশোরী। এখন আটান্নতে পা দিয়েছেন। পাকিস্তানি নরপিসাচদের লালসার শিকার হয়েছিলেন এদেশীয় দালালদের বেঈমানির জন্য। নতুন দেশ। চারদিকে আনন্দ। কিন্তু এসনু বেগম লুকালেন। নানা মানুষের নানা কথা। সামাজিকভাবে হেয় আর অপদস্ত হওয়াই যেন নিয়তি। দরিদ্র পরিবার। অনেকদিন পর্যন্ত বিয়েও দিতে পারেনি। কেউ এগিয়ে আসেনি এই মানুষটির জন্য। পরে এক বিপত্নীকের সঙ্গে সংসার। বিয়ের পনের বছরের মাথায় আশ্রয় বলতে স্বামীও মারা যান। নানা রোগ কুরে কুরে খাচ্ছে এসনু বেগমকে। এই তেতাল্লিশ বছরে কেউ তার খোঁজ নেয়নি। একবার কারা যেন এসে এসনু বেগমের নাম লিখে নিয়েছে। এইটুকুনই। বছরের পর বছর পেয়েছে শুধু গঞ্জনা।
লাইলি বেগম। মাগুরার মদনপুরের বাসিন্দা। রঙিন স্বপ্ন নিয়ে ঘর বেঁধেছিলেন। এক বুক আশা দিয়ে। যুদ্ধ  শুরু হলে যোগ দেয় স্বপ্নের মানুষ। যুদ্ধ শেষে বাড়ি ফেরে স্বামী মুক্তিযোদ্ধা মনোয়ার হোসেন। নয় মাসের যুদ্ধ চলাকালে লাইলি বেগমের স্বপ্ন কেড়ে নেয় পাক হানাদার বাহিনী। তার সকল স্বপ্নকে দুমড়ে মুচড়ে জীবনকে চির অন্ধকারে ঠেলে দেয়। যুদ্ধ শেষে নতুন জীবনের তাড়নার বদলে অসীম লাঞ্ছনা নিয়ে অপেক্ষায় থাকে। নতুন আশায় বুক বাঁধে লাইলি-মনোয়ার। স্বামী মনোয়ার কখনও রিকশা কখনও ভ্যান চালিয়ে যা আয় করতেন তাতেই সংসার চলতো। তার ওপর সমাজের নানা মানুষের কটূক্তি। স্বামী মনোয়ার-লাইলির এই আত্মত্যাগ নিয়ে গৌরব করলেও রাষ্ট্র তাদের পাশে দাঁড়ায়নি। দেয়নি সম্মান। দেশের জন্য এত বড় আত্মত্যাগ করে লাইলি খেয়েছে কচু ঘেচু; রোগে চিকিৎসা না পেয়ে কষ্ট ভোগে জীবন কাটাবার অধিকার।
লাইলির ক্ষেত্রে যা হয়েছিল সিরাজগঞ্জের রাহেলার তা হয়নি। জেলার বেলগাতি গ্রামে স্বামীর সামনেই নির্যাতনের শিকার হন রাহেলা। দেশমাতৃকার জন্য সম্ভ্রম হারানো এই মানুষটি প্রত্যাখ্যাত হন স্বামীর কাছ থেকেও। একদিকে সামাজিক লাঞ্ছনা আর অন্যদিকে তালাকনামা। দ্বিমুখী বিপর্যয়ে রাহেলা সমাজের নিচুতলার মানুষ হিসেবে বাঁচার অধিকারটুকুও হারাতে বসেন। স্বাধীনতার পাঁচ বছর পরে বিয়ে করে বাঁচার নতুন লড়াইয়ে নামলেও সে সুখ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। অকালে দ্বিতীয় স্বামীকেও হারান। ছেলেপুলে নিয়ে চরম দরিদ্র অবস্থায় কাল কাটাতে হয়। সঙ্কট শেষ হয়নি রাহেলার। ২০১৩ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি শাহবাগের জাগরণ মঞ্চে নিজের দুঃসহ জীবনযন্ত্রণা তুলে ধরে শাস্তি দাবি করেন যুদ্ধাপরাধীদের। কিন্তু নিজের এলাকায় যারা স্বাধীনতার সুফল ভোগ করছেন- তারা সমাজের খারাপ মেয়ে বলে আখ্যায়িত করে সামাজিকভাবে তাকে একঘরে করে দেন। নিজের মেয়েকে বিয়ে দিয়েছিলেন যে পরিবারে সেখান থেকেও তাকে তালাকনামা নিয়ে ফিরতে হয়। মায়ের যন্ত্রণা বংশপরম্পরায় মেয়েকেও বইতে হচ্ছে। এ যেন ধারাবাহিক আত্মত্যাগ। কিন্তু এ ত্যাগের বিনিময়ে এই রাষ্ট্র কি দিয়েছে রাহেলাকে?
পাক বাহিনীর চোখে অপরাধ করেছে স্বামী। আর তার সাজা ভোগ করছেন রওশন আরা। স্বামী আইনুদ্দিন হাওলাদার মুক্তিযোদ্ধাদের নৌকা পারাপারের কাজ করতেন। পাক বাহিনীর কাছে সে খবর পৌঁছলে তারা চড়াও হয় রওশন আরার ওপর। তারা রওশন আরাকে কোলের সন্তানসহ ধরে নিয়ে যায়। তিন দিন আটকে ক্যাম্পে নিয়ে নির্যাতন করে। বাড়ি ফিরলে আশেপাশের কেউ কথা বলে না। শ্বশুর-শাশুড়ি, আত্মীয়স্বজন তাকে পরিবারে রাখতে রাজি নয়। স্বামী নির্বিকার। হাতে পায়ে ধরে আশ্রয় মিলে পরিবারে। এ যেন নিজগৃহে পরবাসী। অযত্ন আর অবহেলায় কোলের সন্তানটি রোগে ভুগে বিনা চিকিৎসায় মারা যায়। দুয়ারে দুয়ারে ভিক্ষা করে জীবন কাটাচ্ছেন রওশন আরা। বার্ধক্যের আঘাতে এখন তাও পারছেন না।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ার আব্দুল্লাপুরের জোহরা বেগম। এক শীতের সকালে জোহরার জীবনে নেমে আসে কালো ছায়া। বাড়ির আঙিনায় আগুনে তাপ নিচ্ছিলেন দাদি আর নাতি। সেখানেই ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকসেনারা। নিয়ে যায় ক্যাম্পে। বর্ণনাতীত এক নির্যাতনের পর ফিরিয়ে দেয়। দেশ স্বাধীন হয়। চলে ভাঙাগড়ার খেলা। জোহরা পায় শুধু অপমান আর লাঞ্ছনা। বিয়ে নিয়ে পোহাতে হয় অসহনীয় যন্ত্রণা। তেতাল্লিশ বছর চলে যায় জোহরা জানেন না এই রাষ্ট্র তাকে কি বলে সম্মান দেবে?
একই রকমের বঞ্চনার শিকার ঝরনা রানী মণ্ডল, আসমা বেগম, হালিমা বেগম, সাজেদা বেগম, তীর্থবালা পাল, জামেলা বেওয়া, নূরজাহান বেগম, টেপরি রানীসহ আরও নাম না জানা অনেকেই। যারা ছড়িয়ে আছেন এই ছাপান্ন হাজার বর্গমাইলের লাল-সবুজের জমিনে। যারা জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ দিয়েও সামান্য সম্মানটুকু পেতে অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে তেতাল্লিশ বছর। কখনও কখনও মনে হয় বাংলাদেশে আজকের যে পরিস্থিতি তা কি অল্প সময়ের স্বাধীনতা প্রাপ্তিতে। সাত কোটি মানুষ কি হঠাৎ করেই এই বিজয় অর্জন করেছে। হয়তো তা নয়। একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়েই আমাদের এই মহান স্বাধীনতা। কিন্তু এই অভূতপূর্ব এই অর্জনে আমাদের বীরকন্যাদের এতো দুঃখ ভোগ কেন? এত লাঞ্ছনা কেন? অর্থ-বিত্ত নয়। গাড়ি-বাড়ি বা ফ্ল্যাগ নয়। হাজার কোটি টাকা নয়। একজন মুক্তিযোদ্ধার সামান্য মর্যাদাটুকুও পেতে এত কার্পণ্য এই রাষ্ট্রের। এর চেয়ে দুঃখজনক অধ্যায় আর কি হতে পারে?
অনেক অপেক্ষা। এই মানুষগুলো লাঞ্ছনা নিয়েই কাটিয়ে দিয়েছে যুগের পর যুগ। অবশেষে সুখবর আসে আদালত থেকে। বীরাঙ্গনাদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও প্রাপ্য সুবিধা দিতে রুল জারি করে হাইকোর্ট। সিরাজগঞ্জের সালেহা ইসহাক উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রী সংগঠন ও বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতি এই লড়াইয়ে একের পর এক পদক্ষেপ নেয়। বিশেষত সিরাজগঞ্জের সালেহা ইসহাক উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রীরা সত্যিকার অর্থেই একটি অনুকরণীয় কাজ করেছে। যা আমাদের ভবিষ্যতে প্রাক্তন যেকোন সংগঠনের জন্যই ভাল কাজের প্রেরণা যোগাবে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে বীরকন্যাদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু কথা থাকে, এর একটি নীতিমালা রয়েছে। ছাপান্ন হাজার বর্গমাইলের জনপদে অসংখ্য নারী মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন যারা অল্পশিক্ষিত। ডিসি অফিসের বারান্দায় তারা ধরনা দেয়ার শক্তি ও সাহস ইতিমধ্যেই খুইয়েছেন। অনেকেরই বয়স হয়ে গেছে ষাটের কোঠায়। রাষ্ট্র নিজ তাগিদে এই বীরকন্যাদের খুঁজে বের করার মহতী উদ্যোগ নিলে হয়তো আরও একটি বড় কাজ হবে। কারণ ব্যক্তিগতভাবে এই কাজ কোন একক মানুষ বা সংগঠনের পক্ষে সফল করা খুবই কঠিন। শেষ করতে চাই বীরকন্যাদের গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে। অবনত মস্তকে এ কথাই বলতে চাই, এদেশের সবকিছুই হয়তো বদলে যাবে। দেশ একদিন উন্নতির শিখরে আরোহণ করবে। আমরা হয়তো তখন কেউই থাকবো না। কিন্তু ইতিহাসের সত্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম বয়ে বেড়াবে। যারা নিজেদের সম্ভ্রম বিলিয়ে দিয়েছেন স্বাধীনতার জন্য, প্রত্যাশা রইলো- ইতিহাস তাদের প্রতি অবিচার করবে না।

আত্মহত্যার কথা ভেবেছিলেন মনিকা লিউনস্কি!

বিল ক্লিনটনের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ফাঁসের পর একপর্যায়ে আত্মহত্যার কথা ভেবেছিলেন মনিকা লিউনস্কি। ঘটনার ১৩ বছর পর প্রথমবারের মতো কোনো অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে গতকাল সোমবার তিনি এমন কথাই জানালেন। আজ মঙ্গলবার এনডিটিভি অনলাইনে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, ওই ঘটনার পর ইন্টারনেটের মাধ্যমে সেসব সংবাদ ও গাল-গপ্প ছড়িয়েছিল, সেগুলোর কারণে এক সময় আত্মহত্যার কথা ভেবেছিলেন মনিকা। তিনি বলেন, ‘কম্পিউটারের পর্দায় লেখাগুলো দেখে “ও ঈশ্বর” বলে চিৎকার করতে করতে সারাটা দিন পার করতাম আমি। তখন শুধু মাথায় ঘুরত, আমি মরতে চাই।’
বিল ক্লিনটন যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট তখন তাঁর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের কারণে আলোচনায় এসেছিলেন মনিকা লিউনস্কি। তিনি সে সময় হোয়াইট হাউসে ইন্টার্ন হিসেবে কাজ করতেন। দুজনের প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে ইন্টারনেটে যেসব মুখরোচক আর মনের মাধুরী মেশানো তথ্য প্রকাশ পেয়েছিল, সেসব দিনের কথা মনে করে নিজেকে প্রথম দিককার ‘সাইবার-পীড়নের’ শিকার বলে দাবি করলেন মনিকা। যোগ দিলেন এই পীড়নের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে।

যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়াতে ফোর্বসের ‘আন্ডার ৩০’ সম্মেলনের উদ্বোধনকালে আবেগঘন বক্তৃতায় ১৯৯৮ সালের ওই ঘটনা তাঁর জীবন কীভাবে বিষিয়ে তুলেছিল তা তুলে ধরেন মনিকা। বর্তমানে ৪১ বছর বয়সী মনিকা অনলাইনভিত্তিক পীড়নের সমাপ্তি ঘটাতে প্রচার চালানোর ঘোষণা দেন।
মনিকা লিউনস্কি বলেন, ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী যেসব ব্যক্তির সুনাম একেবারে ধ্বংস হয়ে গেছে, তাঁদের মধ্যে তিনি প্রথম দিকে আছেন। তিনি বলেন, ‘আমি রোগী নম্বর ০। তখন কোনো ফেসবুক, টুইটার বা ইনস্ট্রাগ্রাম ছিল না। কিন্তু গাল-গপ্প, সংবাদ ও বিনোদনভিত্তিক ওয়েবসাইটগুলোর কমেন্ট সেকশন ও ইমেইলের মাধ্যমে সেগুলো ছড়িয়েছিল।’
মনিকা জানালেন, ২০১০ সালে নিউজার্সির ১৮ বছর বয়সী এক তরুণের এক ব্যক্তিকে চুমু খাওয়ার দৃশ্য গোপনে ধারণ করে তা ইন্টারনেটে প্রকাশের ঘটনা ঘটে। এর পর ওই তরুণ আত্মহত্যা করে। বিষয়টি ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছে বলেই তিনি সাইবার-পীড়নবিরোধী প্রচারে নেমেছেন বলে জানালেন।

অনলাইনে শিশুদের যৌন নিপীড়ন বন্ধে সুইটি সৃষ্টির নেপথ্যে

সুইটির কথা নিশ্চয়ই আপনাদের অনেকের জানা। ভারচুয়াল জগতের আলোচিত এক শিশু চরিত্র সুইটি। যাকে অনলাইনে শিশুদের যৌন নিপীড়ন বন্ধের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছিল নেদারল্যান্ডসভিত্তিক দাতব্য সংস্থা তেরে দেস হোমস। ১০ বছর বয়সী ফিলিপাইনের এক শিশু হিসেবে ভারচুয়াল সুইটিকে তৈরি করেছিল নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামভিত্তিক সংস্থা লেমজ। সংস্থাটি গত বছরে ১০ সপ্তাহের অনুসন্ধান করে ৭১ টি দেশের এক হাজার যৌন নিপীড়ককে চিহ্নিত করেছে, যারা অর্থের বিনিময়ে ওয়েব ক্যামের মাধ্যমে সুইটিকে নিপীড়ন করার চেষ্টা চালিয়েছে।

>>১০ বছরের ভারচুয়াল শিশু সুইটি
শুরু হয়েছে নিপীড়কদের বিচার
এক খবরে বিবিসি জানিয়েছে, সুইটির নিপীড়কদের বিচার শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার এক ব্যক্তিকে সুইটিকে নির্যাতনের জন্য প্রথম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। অর্থের বিনিময়ে ওয়েব ক্যামের সামনে সুইটিকে যৌন আচরণ করতে বলেছিলেন স্কট রবার্ট হ্যানসেন নামের ওই অস্ট্রেলীয় নাগরিক। ব্রিসবেনের ডিসট্রিক্ট কোর্টে তাঁর বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ আনা হয়। আদালত তাঁকে দুই বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন। কিন্তু এরই মধ্যে আট মাস কারাভোগ করায় তাকে জেল খাটতে নাও হতে পারে। এর মধ্যে এক বছর তাকে আচরণগত পরিবর্তন ও চিকিৎসার মধ্য যেতে হবে।
সুইটি তৈরির নেপথ্যে
সৃজনশীলতাই পৃথিবী বদলে দিতে পারে। এই মূলমন্ত্র নিয়ে কাজ করছে নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামভিত্তিক ক্রিয়েটিভ ডিজাইন সংস্থা লেমজ। সুইটিকে তৈরির জন্য এ বছর নেদারল্যান্ডসের ডিজাইন বিভাগের শীর্ষ পুরস্কার পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। নেদারল্যান্ডসভিত্তিক দাতব্য সংস্থা তেরে দেস হোমসকে সাহায্য করতে এবং ওয়েবক্যামে শিশু যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি ও নিপীড়কদের ধরতে এই প্রকল্প শুরু করে লেমজ।
শীর্ষ ডিজাইন নির্বাচনের দায়িত্বে ছিলেন নেদারল্যান্ডসের বিজ্ঞান গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ডিএসএমের চেয়ারম্যান অ্যাটজো নিকোলাই। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘ডিজাইন আমাদের জন্য কী করতে পারে সুইটি কেবল তার একটি বিশ্বাসযোগ্য উদাহরণ।’
লেমজ সদস্যদের দাবি, উন্নত দেশগুলোর অনেক মানুষ দরিদ্র দেশের শিশুদের ওয়েব ক্যামের সামনে যৌন আচরণের জন্য অর্থ খরচ করে। লেমজ থ্রিডি কম্পিউটার মডেল ব্যবহার করে ১০ বছর বয়সী ফিলিপাইনের শিশু হিসেবে সুইটির নকশা করেছিল। এই ভারচুয়াল শিশু তৈরিতে সত্যিকারের শিশুদের মুখভঙ্গি ও আচরণ কেমন হয় তা ব্যবহার করা হয়।
নিপীড়কদের ধরতে এ দলের সদস্যরা অনলাইন চ্যাট রুমে ঢুকে সুইটি সেজে চ্যাট করতে থাকেন এবং মুখভঙ্গির বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করে সুইটির সঙ্গে কে চ্যাট করছেন তাকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেন। ২০১৩ সালের মে মাস থেকে শুরু করে ১০ সপ্তাহে ৭১টি দেশের এক হাজারেরও বেশি নিপীড়ককে চিহ্নিত করা হয় এবং তাদের পরিচয় ইন্টারপোলের কাছে হস্তান্তর করা হয়। নিপীড়কদের ধরা শুরু হলে এই খবর সংবাদমাধ্যমগুলোতে গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়।
লেমজের এগিয়ে আসা
অবশ্য এ প্রকল্পে জড়িত থাকার কথা প্রথমে প্রকাশ করতে রাজি ছিল না নেদারল্যান্ডসের লেমজ টিম। কিন্তু তাদের অভিজ্ঞতার কথা জানানোর জন্য জাতিসংঘের অনুরোধের পর তারা জনসমক্ষে আসে। লেমজের সহ-প্রতিষ্ঠাতা মার্ক ওয়ার্ডি এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘আমরা মনে করি ব্যবসা ও ক্রিয়েটিভ সংস্থাগুলোকে তাদের প্রতিভা ও সম্পদ পৃথিবীকে আরও সুন্দর করে গড়ে তোলার কাজে ব্যবহার করা উচিত। সুইটির এই অভিযান প্রমাণ করে এই শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা না থাকলেও ক্রিয়েটিভ প্রতিষ্ঠানগুলো বৈশ্বিক সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।’
ইন্টারনেটে নজরদারি বাড়াতে হবে
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুইটি অপারেশনে হ্যানসেনের বিচারটিই প্রথম বিচার বলে মনে করা হচ্ছে। তেরে দেস হোমসের এই কর্মসূচির প্রধান হ্যান্স গাইট বলেন, ‘আমি ও আমার সহকর্মীরা সব সময় মনে করি নিজস্ব অপারেশন চালানোর সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তথ্য ব্যবহার করবে। তারা এখন নিশ্চয়ই জানে, আমরা তাদের যে তথ্য দিয়েছি তা কতখানি প্রয়োজনীয়।’
তাঁর মতে, পুলিশকে আরও বেশি সক্রিয় হতে হবে এবং এ ধরনের নিপীড়কদের ধরার একমাত্র পথ হচ্ছে ইন্টারনেটে নজরদারি করে তাদের খুঁজে বের করা। ২০১৩ সালে এই প্রকল্পে মাত্র চারজন গবেষকের একটি দল ১০ সপ্তাহ কাজ করেছিল। ফিলিপাইনের একটি মেয়ে সেজে তারা চ্যাট রুমে বসে কখনো ভারচুয়াল চরিত্র হাজির করে ওয়েব ক্যামের মাধ্যমে দেখিয়েছে।
নিপীড়কদের আচরণ যেন দুঃস্বপ্ন
নিপীড়কদের ধরতে কাজ করেছেন এমন এক গবেষকের সঙ্গে কথা বলেছে বিবিসি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বিবিসিকে নিপীড়কদের সম্পর্কে তথ্য দিয়েছেন। তিনি সুইটির অপারেটর সেজে নিপীড়কদের সঙ্গে চ্যাট করেছিলেন। ওই গবেষক বলেন, ‘কয়েকজন এমন বাজেভাবে যোগাযোগ করেছে, যা রীতিমতো দুঃস্বপ্ন।’ স্কট হ্যানসেন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ওই লোকটি খুব সরাসরি সুইটিকে যৌন সম্পর্কের প্রস্তাব দিয়েছে। হ্যানসেনের মতো লোকের সঙ্গে আলাপচারিতার পর রাতে ঘুমাতে যাওয়া সত্যিই দুঃস্বপ্নের ব্যাপার।’

ইন্টারভিউ বোর্ডে যখন শিক্ষামন্ত্রী

সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে পদায়নের জন্য শিক্ষকদের যোগ্যতা যাচাইয়ে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও দলবাজি বন্ধ করতেই এই সাক্ষাৎকার বলে দাবি করেছেন শিক্ষামন্ত্রী। তবে অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ পেতে ইচ্ছুক শিক্ষকরা বলেছেন, মন্ত্রী নিজে এ সাক্ষাৎকার নিয়ে অনিয়ম বন্ধ করতে পারবেন না। কারণ, তদবিরবাজরা মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে তদবিরের কাজ সেরে ফেলেছেন। তবে শিক্ষামন্ত্রী বলছেন, অনিয়ম বন্ধ করতে আমাদের এ উদ্যোগ। এটা কোন পরীক্ষা না। কেবল অধ্যক্ষ পদায়নের জন্য তাদের সাক্ষাৎকার নেয়া। মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গত ১৫ই অক্টোবর অধ্যক্ষ পদে সাক্ষাৎকারের জন্য ১৬৫ জন কর্মকর্তার একটি তালিকা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। আবেদনকৃত কর্মকর্তাগণকে নমুনা ছকে তথ্য ও উত্তরসহ সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়ার কথা বলা হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় তথ্যমতে, দেশের ৬৬টি সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ পদ বর্তমানে শূন্য রয়েছে। এসব পদে আসীন হতে ইচ্ছুক শিক্ষকদের রোববার সাক্ষাৎকার নেন শিক্ষামন্ত্রী। সকাল ৮টা থেকে শুরু হয়ে এ সাক্ষাৎকার চলে রাত ৮টা পর্যন্ত। নমুনা সাক্ষাৎকারের আবেদনপত্রে নাম, পদবি, জন্ম তারিখ ও বর্তমান কর্মস্থল ছাড়া তিনটি প্রশ্ন জুড়ে দেয়া হয়। সেখানে একজন অধ্যক্ষকে বলা হয়, আপনি প্রিন্সিপাল হলে আগামী এক বছর কলেজের কি কি ইনোভেটিভ (সৃষ্টিশীল) কাজ করবেন? দুই নম্বরে লেখা ছিল আপনার কলেজের শিখন-শেখানোর উন্নয়নের আগামী এক বছরে কি কি পদক্ষেপ নেবেন এবং তৃতীয় প্রশ্নে জানতে চাওয়া হয়, শিক্ষায় আইটি ব্যবহারে আপনি কি কি পদক্ষেপ নেবেন?  সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি কলেজে অধ্যক্ষ পদায়নের বিষয়টি একটি রুটিন কাজ। এ ধরনের প্রক্রিয়ায় একজন মন্ত্রীর একটি দিন ব্যয় করার কোন মানে নেই। এ বিষয়টি অনেকটা ‘মশা মারতে কামান দাগানোর মতো’। কেননা, যে কাজটি ফাইল নোটের মাধ্যমে সচরাচর দাপ্তরিক পর্যায়ে হয়ে থাকে, সেটা নিয়ে রাষ্ট্রের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির মূল্যবান সময় ব্যয় শুধু অনর্থক নয়, অপ্রয়োজনীয় বটে। এ ধরনের পদক্ষেপকে প্রশাসনিক ব্যর্থতার সর্বশেষ দৃষ্টান্ত বলে আখ্যায়িত করে শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রশাসন যদি এ বিষয়টি করতে ব্যর্থ হতো, তবেই শিক্ষাক্ষেত্রে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় এই ব্যক্তি হস্তক্ষেপ করতে পারেন। মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, এর আগে ৬৭টি কলেজে অধ্যক্ষ ও ৯টি কলেজে উপাধ্যক্ষ নিয়োগের ক্ষেত্রে সাক্ষাৎকার নেন শিক্ষামন্ত্রী। এতে কোন ভাল ফল বয়ে আনতে পারেনি তিনি। রোববার সাক্ষাৎকারের পর কক্সবাজার সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যাপক মোহাম্মদ নূর নবী বলেন, সাক্ষাৎকার তেমন কিছু না। শুধু নাম, পরিচয়, কেমন আছেন ইত্যাদি বিষয়। তিনি বলেন, চাকরির শেষ জীবনে এসে এ ধরনের সাক্ষাৎকারে আমাদের শুধু অসম্মানই করা হয়নি, রীতিমতো অপমান করা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রমতে, অধ্যক্ষ নিয়োগের ব্যাপারে ২০১২ সালের ২৬শে এপ্রিল মন্ত্রী নাহিদেরই? তত্ত্বাবধানে একটি নীতিমালা তৈরি হয়। সেখানে বলা হয়, এ কাজটি সম্পন্ন করতে সর্বোচ্চ একজন অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তাকে মনোনীত করা হয়েছে। অর্থাৎ এটি সচিবেরও কাজ নয়। মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ডের মহাপরিচালক এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিবের সমন্বয়ে তিন সদস্যের কমিটি একটি ফিটলিস্ট (উপযুক্ত ব্যক্তি নির্বাচন) তৈরি করবেন। অথচ সেই কাজে মন্ত্রী নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করতে যাচ্ছেন। বাংলাদেশ বিসিএস শিক্ষক সমিতির এক নেতা বলেন, বিভিন্ন সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ নিয়োগে যে নীতিমালা করা হয়েছে তাতে পরিষ্কার ভাষায় কর্মকর্তা (অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ) নির্বাচনের কথা বলা আছে। এরপরও এ ধরনের সাক্ষাৎকার  শুধু স্বজনপ্রীতি, দলপ্রীতি এবং অনিয়ম-দুর্নীতির লক্ষ্য হতে পারে। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ জানান, এটা কোন পরীক্ষা না। তাদের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ করা মাত্র। এটিকে নেগেটিভভাবে দেখার কিছু নেই। 
তিনি বলেন, আমরা তাদের সঙ্গে কথা বলে তাদের আইডিয়াগুলো জানার চেষ্টা করছি। এ বিষয়ে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ড. ওসমান ফারুক বলেন, কলেজের অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ পদায়নের মতো বিষয়ে সাক্ষাৎকার খোদ শিক্ষামন্ত্রীর নেয়ার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। একজন মন্ত্রী কেন এ কাজটি করবেন প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, মন্ত্রীকে যদি এ কাজ করতে হয় তবে নীতিনির্ধারণী কাজ করবেন কে? তিনি বলেন, প্রশাসন যদি এ কাজটি করতে ব্যর্থ হয় তবেই সংশ্লিষ্ট সর্বোচ্চ ব্যক্তি এখানে হাত দিতে পারেন। তিনি মন্ত্রী থাকার সময় এ ধরনের কোন সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কিনা জানতে চাইলে ওসমান ফারুক জানান, আমি মন্ত্রী থাকাকালে কোন দিন এ ধরনের সাক্ষাৎকার নেইনি। বর্তমানে সারাদেশে সরকারি কলেজ ও সমমানের প্রতিষ্ঠান রয়েছে ৩০৫টি। এর মধ্যে কলেজ ২৭১টি, শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ (টিটিসি) ১৪টি, সরকারি কমার্শিয়াল কলেজ ১৬টি এবং সরকারি মাদরাসা ৪টি। 

গার্মেন্ট কারখানা ‘পরিদর্শনই যথেষ্ট নয়’ -দ্য গার্ডিয়ান

বাংলাদেশের গার্মেন্ট কারখানাগুলোর সমস্যা ঠিক করতে পরিদর্শনই যথেষ্ট নয়। এমনই দাবি উঠেছে যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে। সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের গার্মেন্ট কারখানাগুলোর কয়টি থেকে বিদেশে পোশাক রপ্তানি হয় সেটি বের করা হয় নি। কারখানার অবস্থার উন্নতি ঘটানোয় কোন প্রতিশ্রুতিও দেয়া হয়নি। এসব ছাড়া সমস্যা সমাধানে যে বাংলাদেশের অ্যাকর্ড-এর কথা বলা হচ্ছে, সেটি সফল হতে এখনও অনেক দেরি। ১৭৫টিরও বেশি ইউরোপিয়ান ব্র্যান্ড ও খুচরা বিক্রেতারা ‘বাংলাদেশ অ্যাকর্ডে’ যোগ দিয়েছেন। অপরদিকে ২৬ মার্কিন ও কানাডিয়ান কোম্পানি গঠন করেছে ‘অ্যালায়েন্স ফর বাংলাদেশ ওয়ার্কার সেফটি’। বাংলাদেশের গার্মেন্ট কোম্পানিগুলোতে শ্রমিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত সাধারণ ইস্যুগুলো সমাধানে কোম্পানিগুলো এক হয়েছে। দুই গ্রুপ বাংলাদেশের প্রায় ১৭০০ গার্মেন্ট কারখানা পরিদর্শন করেছে এবং পৃথক কিছু পদক্ষেপও নিয়েছে। কারখানা পরিদর্শন হচ্ছে কারখানা ও শ্রমিকদের নিরাপদ রাখার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু এটাই যথেষ্ট নয়। রানা প্লাজা ধসের ১৮ মাস পরেও বাংলাদেশের কারখানার নিরাপত্তা নিয়ে দু’টি প্রশ্নের উত্তর এখনও পাওয়া যায়নি। প্রথমটি হচ্ছে ঠিক কতটি গার্মেন্ট কারখানায় বাইরের দেশের জন্য পোশাক বানানো হয়। অপর প্রশ্নটি হচ্ছে, কিভাবে বাংলাদেশের কারখানাগুলোর নিরাপত্তা সমস্যা সমাধান করা হবে। কোন কর্তৃপক্ষই এখনও পরিষ্কার করে জানায়নি, ঠিক কতটি গার্মেন্ট কারখানায় রপ্তানির উদ্দেশ্যে পোশাক বানানো হয়। কিন্তু এর মধ্যে ১৮০০টি কারখানার ক্ষেত্রে ‘অ্যাকর্ড’ ও ‘অ্যালায়েন্স’ দায়িত্ব নিয়েছে। কিন্তু সমপ্রতি প্রকাশিত একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, রপ্তানির উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার কারখানায় পোশাক তৈরি করা হয়। এ প্রতিবেদনে অনেক কারখানার কথা বলা হয়েছে, যেখান থেকে বিদেশী কোম্পানিগুলোর অর্ডার কম দামে তৈরি করা হয়। সেসব কারখানা এখানে তৃতীয় পক্ষ। এসব কারখানার দায়িত্ব নিতে রাজি নয় বিদেশীরা। তবে এসব কারখানাগুলোতেও পরিদর্শনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ইউরোপ ও আমেরিকান কোম্পানিদের দু’টি গ্রুপ। কিন্তু সেসব বাস্তবে হয়েছে খুব কম। এ দু’টি গ্রুপের দায়িত্বের বাইরে যেসব কারখানা রয়ে গেছে, সেসবের দায়িত্ব পড়ে সরকারের উপর। কিন্তু অনিরাপদ কারখানাগুলো পরিদর্শন করতে যে লোকবল বা সামর্থ্য প্রয়োজন, তার অভাব রয়েছে সরকারের। দ্বিতীয় যে প্রশ্নের উত্তর এখনও জানা যায় নি, সেটি হচ্ছে, কারখানা স্থানান্তর কিংবা অবস্থার উন্নতি ঘটাতে কিভাবে তহবিল গঠন করা হবে। দু’টি পরিদর্শনকারী গ্রুপই কারখানাগুলোতে হাজারো সীমাবদ্ধতা খুঁজে পেয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোন বড় ব্র্যান্ড বা খুচরা বিক্রেতারা এসব কারখানার সীমাবদ্ধতা পূরণে বা সংস্কারে কোন প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলে জানা যায় নি। হ্যাঁ, উভয় গ্রুপই কোন কোন জায়গায় সংস্কার করা হবে, সেটি খুঁজে বের করছে। একই সঙ্গে কোন কারখানার সংস্কার কাজ চলার সময় সেটির শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণে কিছু অর্থ প্রদানে সম্মত হয়েছে। কিন্তু যেসব সংস্কারের খরচ দেবে কে? মার্কিন ও কানাডিয়ান কোম্পানিদের অ্যালায়েন্স অনুমান করে বলেছে, প্রতি কারখানায় আড়াই লাখ ডলার লাগতে পারে। সেক্ষেত্রে ইউরোপিয়ান, মার্কিন ও কানাডিয়ান কোম্পানিগুলোর আওতাধীন কারখানাগুলো সংস্কারে মোট খরচ আসবে প্রায় ৪০ কোটি ডলার। কিন্তু কেউই এখনও প্রকাশ্যে এ অর্থ পরিশোধের ঘোষণা দেয় না। ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) ১ কোটি ডলার এ সংক্রান্ত সংস্কারে গার্মেন্ট মালিকদের দিতে অনুমোদন দিয়েছে। কিন্তু পশ্চিমা ব্র্যান্ড ও খুচরো বিক্রেতাদের কাছে ঋণ পরিশোধবিষয়ক নিশ্চয়তা চেয়েছে আইএফসি। কিন্তু কোন কোম্পানিই এ ক্ষেত্রে রাজি হয়েছে বলে জানা যায় নি। পরিদর্শন ও নিরাপত্তা ত্রুটি খুঁজে বের করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শ্রমিক ও কারখানার মালিকদের পরবর্তী পদক্ষেপ সমপর্কে জানা উচিত। পশ্চিমা ব্র্যান্ড ও খুচরা বিক্রেতাদের উচিত গোটা গার্মেন্ট সেক্টরের উন্নতির জন্য বাংলাদেশী পোশাক উৎপাদনকারী, বাংলাদেশ সরকার, বিদেশী সরকার, উন্নয়ন সংস্থার সঙ্গে কাজ করা।
স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি টাস্কফোর্স তৈরি করতে হবে। এর কাজ হবে সমস্যা সমাধানের উপায় বিশ্লেষণ এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও বাস্তবিক পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণে কাজ করা। এ প্রক্রিয়ার অংশ হওয়া উচিত পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর দু’টি গ্রুপেরও। কিন্তু এর নেতৃত্ব থাকা উচিত স্থানীয়দের হাতে। বাংলাদেশের শ্রমিক অধিকারের মতো বিষয়ে উন্নতি আনতে হলে, আরও বড় লক্ষ্য, আরও ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা এবং আরও বড় তহবিল নিয়ে কাজ করতে হবে।

এফবিআইকে ঘুষ দেয়ার কথা স্বীকার করলো রিজভি আহমেদ ওরফে সিজার

বাংলাদেশের প্রথম সারির একজন রাজনীতিকের গোপন তথ্য বের করতে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের এক এজেন্টকে ঘুষ দিয়েছিলেন আরেক বাংলাদেশী রিজভি আহমেদ ওরফে সিজার (৩৫)। শুধু তা-ই নয়, এ পরিকল্পনায় জড়িত হয়েছিলেন আরেক মার্কিনি জোহানেস থ্যালার (৫১)। সিজারের প্রতিপক্ষের এক রাজনীতিকের বিরুদ্ধে এমন ষড়যন্ত্রে বিপুল পরিমাণ অর্থের লেনদেন নিয়ে দর কষাকষি হয় থ্যালার ও রিজভির মধ্যে। এতে বলা হয় তথ্য দেয়ার জন্য দিতে হবে ৪০০০০ ডলার। এর পর মাসে দিতে হবে ৩০ হাজার ডলার। এসব ঘটনা ঘটে ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১২ সালের মার্চ মাসের মধ্যে। ঘটনা পুরনো হলেও রিজভি ও থ্যালার তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ স্বীকার করেছেন ১৭ই অক্টোবর, শুক্রবার। আগামী ২৩শে জানুয়ারি এ মামলার রায় দেয়ার কথা। এ মামলায় বলা হয়েছে রিজভি আহমেদ ওরফে সিজার একজন বাংলাদেশী। তিনি ও জোহানেস থ্যালারের বসবাস যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাটে। শুক্রবার তাদের বিরুদ্ধে নিউ ইয়র্কের একটি ফেডারেল আদালতে শুনানি হয়। এ সময় দু’জনেই আনীত অভিযোগ স্বীকার করেন। তারা বলেন, বাংলাদেশে রিজভির বিরুদ্ধ দলীয় একজন প্রথম সারির রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য সংগ্রহের জন্য এফবিআইয়ের সাবেক এজেন্ট রবার্ট লুসতিয়িকের সঙ্গে তিনি যোগাযোগ করেন। এক্ষেত্রে ঘুষের আশ্রয় নেয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রের জাস্টিস ডিপার্টমেন্টের ক্রিমিনাল ডিভিশনের সহকারী এটর্নি জেনারেল লেসলি আর ক্যাল্ডওয়েল, নিউ ইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্টে যুক্তরাষ্ট্রের এটর্নি প্রিত ভারারা ও জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট ইন্সপেক্টর জেনারেল মাইকেল ডি হরোউইটজ এ ঘোষণা দিয়েছেন। তারা বলেছেন, রিজভি আহমেদ ও থ্যালার স্বীকার করেছেন যে, ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১২ সালের মার্চের মধ্যে ওই রাজনীতিকের বিষয়ে অভ্যন্তরীণ, গোপনীয় দলিল ও অন্যান্য গোপনীয় বিষয় বের করে আনতে রিজভির কাছ থেকে ঘুষ নেন থ্যালার ও লুসতিয়িক। এক্ষেত্রে লুসতিয়িককে ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কারণ তিনি তখন এফবিআইয়ের স্পেশাল এজেন্ট। ফলে রিজভির কাঙ্ক্ষিত তথ্য বের করে আনা তার পক্ষে সহজ। উল্লেখ্য, লুসতিয়িকের বন্ধু থ্যালাস। রিজভি আহমেদ ও থ্যালার স্বীকার করেছেন, রিজভি আহমেদ যে তথ্য চাইছেন সেই গোপনীয় তথ্য দিয়ে তার বিরুদ্ধ রাজনীতিককে ঘায়েল করতে সহায়তা করতে চুক্তিবদ্ধ হন থ্যালার। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের শুধু ওই রাজনীতিবিদেরই নয়, তার যেসব সহযোগী আছেন তাদেরও ক্ষতি করার উদ্দেশ্য ছিল রিজভির।
 কিন্তু তাকে এ সব তথ্য দেয়ার ক্ষেত্রে তার কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে নেয়ার ফন্দি আঁটে থ্যালার ও লুসতিয়িক। এ জন্য তারা নিজেদের মধ্যে বেশ কিছু টেক্সট মেসেজ বিনিময় করে। তাতে পরিষ্কার হয়ে ওঠে যে, তারা রিজভির কাছ থেকে কিভাবে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করেছিল। ২০১২ সালের জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে লুসতিয়িক জানতে পারে যে, কাঙ্ক্ষিত তথ্য সংগ্রহের জন্য রিজভি আহমেদ ব্যবহার করছে অন্য সোর্স। এ কথা জানার পর থ্যালারের কাছে একটি টেক্টস মেসেজ পাঠায় লুসতিয়িক। তাতে সে লেখে- আমি রিজভি আহমেদকে হত্যা করতে চাই। তুমি রিজভিকে বলো আমি তার কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির সিরিয়াল নাম্বার পেয়েছি। তা আমি তাড়াতাড়িই বের করে আনবো। এ মামলায় লুসতিয়িকের বিরুদ্ধে শুনানি হবে আগামী ১৭ই নভেম্বর।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বাংলাদেশ কার্ড আসছে!

দু’টি বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির বিজয়ের পরে পশ্চিমবঙ্গ রাজনীতিতে বাংলাদেশ কার্ড আচমকা তীব্র হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। ২০১৬ সালের নির্বাচনে বিজেপির বাংলাদেশ কার্ড যে অবশ্যম্ভাবী তাতে আর সন্দেহের অবকাশ কম। আগে ছিল অনুপ্রবেশ, এবার যুক্ত হচ্ছে জঙ্গিবাদ। এ কার্ডের বিপরীতে মমতা যাতে না দাঁড়াতে পারেন, সেজন্য তার সামনে বিকল্প জানালাগুলো বন্ধ করে দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। সিপিএম ইতিমধ্যে বিজিপিঘেঁষা একটি লাইন নিয়ে ফেলেছে। তারা তাই বাংলাদেশের ওড়াকান্দি থেকে যাওয়া মতুয়াদের নাগরিকত্ব চাইছে। বর্ধমান বিস্ফোরণ মনে হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির ছক অনেকটাই পাল্টে দিতে পারে। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তজুড়ে ধারপাকড়কে বিজেপি যে ভাবে কোলে টানছে সেটা ক্রমশ তৃণমূলের অবস্থানকেই নাজুক করছে। সাবেক সিপিএম সদস্য আবদুর রাজ্জাক মোল্লা গত শনিবার একটি নতুন দল খুলেছেন ভারতীয় ন্যায়বিচার পার্টি। তিনি সিপিএমের সমালোচনা করে বলেন, ‘এখন তারা মতুয়া নিয়ে মাঠে নামছে। কিন্তু এটা তাদের অনেক আগেই ভাবা উচিত ছিল।’  
দি ইকোনমিক টাইমস তার ১৯শে অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে বলেছে, মমতা ব্যানার্জি বলছেন, সন্ত্রাসীদের কোন দল নেই। তিনি রাজ্যের মৌলবাদী দলগুলোকে সতর্ক করে বলেছেন, তারা যেন ধর্মীয় কার্ড ব্যবহার করে রাজ্যকে বিভক্ত না করে। অন্যদিকে বিজেপি বলছে, মমতা রাজ্যের সামনের বিপদকে খাটো করতে চাইছেন। এ প্রেক্ষাপটে সিপিএম-ও মাঠে নেমেছে। তারা হিন্দু নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের জন্য উদ্বাস্তু মর্যাদা দাবি করেছেন। এদের বেশির ভাগই ওড়াকান্দি ভিত্তিক মতুয়া সম্প্রদায়, সিপিএম বলছে, এরা মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি অনুযায়ী ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের ‘কাটঅফ’ তারিখের পরে সীমান্ত অতিক্রম করেছে। সত্তুরের দশকে জ্যোতি বসুর সরকার মরিচঝাঁপিতে ওই তারিখের পরে বাংলাাদেশী অভিবাসী গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। 
এদিকে প্রদেশ কংগ্রেসও সক্রিয়। তারা এক বিৃবতিতে উদ্বাস্তুদের বিষয়ে সরকারের কাছে তার অবস্থান পরিষ্কার করতে বলেছে। তাদের যুক্তি আর্থ-সামজিক দৃষ্টিকোণ থেকে এ ইস্যুকে দেখতে হবে। প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি অখিল চৌধুরী বলেন, বিজেপি ‘হিন্দু উদ্বাস্তু’ ও ‘মুসলিম অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে ভাগ করতে চাইছে। একে অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে। সারা বিশ্ব এভাবেই দেখে। তার প্রশ্ন বিজেপি এর আগের আমলে কতজন অনুপ্রবেশকারীকে পুশব্যাক করেছিল সেই তথ্য আমরা জানতে চাই।’
প্রদেশ বিজেপি নেতা বসিরহাটের নির্বাচিত এমএলএ শমীক ভট্টাচার্য তার ওই যুক্তি নাকচ করে বলেন, এমন যুক্তি বহু শুনেছি। ঘরের কাছে বিপদ ঘনিয়ে এসেছে।  মেক্সিকোতে যে ধরনের অভিবাসন ঘটে তার সঙ্গে এর মিল নেই। সীমান্তের ৮টি জেলার দিকে নজর দিলে দেখা যাবে সেখানে তারা কিভাবে আসন গেড়ে বসেছে। প্রত্যেক জাতীয়তাবাদীর এটা দায়িত্ব সর্বশক্তি দিয়ে একে প্রতিহত করা।
টাইমস লিখেছে, তবে বিজেপি যাই বলুক, নরেন্দ্র মোদি সরকার ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্বের সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। ২০০৩ সালের নাগরিকত্ব আইন বিজেপি যা সংসদে সংশোধন করেছে তাতে বলা হয়েছে প্রত্যোক ভারতীয় পিতামাতার সন্তুান ভারতের নাগরিকত্ব পাবে। আর সেই আইনে ৭১ পরবর্তী আইনে কাট-অফ তারিখের পরে আসা হিন্দু বাবা-মায়ের কথা স্বীকার করেনি। 
সিপিএম নেতা গৌতম দেব বাংলাাদেশের ওড়াকান্দি থেকে আসা মতুয়া সম্প্রদায়কে স্বীকৃতি প্রদানের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর যুক্তি: মুজিব-ইন্দিরা চুক্তিতে কাট-অফ তারিখ নির্দিষ্ট হয়েছিল এই ভিত্তিতে যে দু’দেশের মধ্যে কোন ধর্মীয় ভেদাভেদ সৃষ্টি হবে না। কিন্তু শেখ মুজিবের নিহত হওয়ার পরে তা থাকেনি। সেখানে হিন্দুদের ওপর নির্যাতন চলেছে। আর ভারত সরকারকে তাই তাদের ঠাঁই দিতে হবে। কিন্তু তিনি বাংলাদেশ থেকে আসা মুসলিম উদ্বাস্তুদের বিষয়ে নীরবতা পালন করেন। তিনি বলেন, আগামী ডিসেম্বরে আমরা মতুয়া সম্প্রদায়ের স্বীকৃতির জন্য আন্দোলন করবো। উত্তর ২৪ পরগনার ডিসি অফিস ঘেরাও হবে।

স্বামীকে বাসায় ডেকে খুন

রাজধানীর মিরপুরে এক ব্যক্তিকে ছুরিকাঘাত করে নিজ বাসায় হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনার আগে বাসার বাইরে থাকা ওই ব্যক্তিকে বাসায় ডেকে নিয়েছিলেন স্ত্রী। নিহতের স্বজনদের অভিযোগ, স্ত্রীর পরকীয়ার কারণেই তিনি খুন হয়েছেন। তাকে পরিকল্পিতভাবে স্ত্রীর প্রেমিকসহ কয়েকজন হত্যা করেছে। নিহত ব্যক্তির নাম গিয়াস উদ্দিন (৩৬)। এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী লাভলি ইয়াসমিন লিনা (২৮)-কে আটক করেছে পুলিশ। গতকাল ময়নাতদন্ত শেষে নিহতের লাশ দাফন করা হয়েছে। রোববার রাত সাড়ে ১১টার পর মিরপুর-১০ নম্বরের সি ব্লকের ১৫ নম্বর লেনের নিজের ছয়তলা বাড়ির পাঁচতলার বাসা থেকে গিয়াস উদ্দিনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। সূত্র জানায়, রাত ১১টার দিকে গিয়াস উদ্দিনের ৯ বছর বয়সী কন্যা ইশিকা আক্তার সুমি প্রতিবেশীর বাসায় গিয়ে জানায়, তাদের ঘরে ডাকাত এসেছে। ডাকাতরা তার বাবাকে মেরেছে। তাৎক্ষণিকভাবে ওই বাসার গৃহকর্ত্রী গিয়াসের বাসায় গিয়ে দেখতে পান রক্তাক্ত গিয়াস বাসার ঘরের মেঝেতে পড়ে আছেন। পাশে তার স্ত্রী বসে আছেন। ঘরের মেঝে রক্তে ভিজে গেছে। তিনি চিৎকার করলে নিচতলা থেকে গিয়াসের স্বজনরা ছুটে যান। এ সময় গিয়াসের স্ত্রী লিনা তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলেন। প্রথমে মিরপুর ৬-এর আজমত হাসপাতাল পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক গিয়াসকে মৃত ঘোষণা করেন। নিহতের শরীরে বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাত ছিল। এর মধ্যে মাথায় একটি আঘাত ছিল। যা প্রায় এক ইঞ্চি গভীর। এছাড়া তার বাম হাতে কামড়ের চিহ্ন রয়েছে। লাশ উদ্ধারের সময় নিহতের গলায় ওড়না ও বুকে কাপড় বাঁধা ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, গিয়াসকে হত্যার আগে তার হাত পেছন থেকে বেঁধে রাখা হয়। এছাড়া গলায় ওড়না  পেঁচিয়ে তাকে শ্বাসরুদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে পুলিশের ধারণা। এছাড়া তার হাতের কামড়টি তার স্ত্রী লিনার না অন্য কারও তা নির্ণয়ের জন্য ডিএনএ পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। ঘটনার সময় বাসায় ছিলেন গিয়াস উদ্দিনের স্ত্রী লিনা ও তার দুই শিশু সন্তান। এর মধ্যে গিয়াস উদ্দিনের বড় সন্তান ইশিকা জানায়, তিন-চার যুবক তাদের দুই ভাই-বোনকে বাসার একটি কক্ষে আটকে রেখেছিল। তাদের মা লিনা কোথায় ছিলেন তা তারা স্পষ্ট করে জানাতে পারেনি। লিনা দাবি করেছেন, কিলাররা তাকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে রেখেছিল। তিনি এই খুনের সঙ্গে জড়িত নন। 
মিরপুর মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) ইমানুর হোসেন বলেন, প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে তিন থেকে চার যুবক ঘরে ঢুকে গিয়াসকে হত্যা করেছে। তবে তার শরীরের খামচি ও কামড়ের আঘাতও রয়েছে। কামড় ও খামচি তার স্ত্রী লিনার কিনা এজন্য ডিএনএ টেস্টের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করার জন্য স্ত্রীর পরকীয়া ছাড়া পারিবারিক বিভিন্ন বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আজ লিনাকে আদালতে হাজির করে রিমান্ড চাওয়া হবে বলে জানান তিনি।
হত্যাকাণ্ডের আগে রাত সাড়ে ১০টার দিকে গিয়াস উদ্দিন তার বাসার নিচে আল-আমিন সমিতির অফিসে বসা ছিলেন। এসময় তার স্ত্রী লিনা মোবাইল ফোনে জানান, বাসায় মেহমান এসেছে। পোলাও’র চাল ও পানীয় নিয়ে যেতে বলেন গিয়াসকে। নিচতলার মুদির ব্যবসায়ী কামাল উদ্দিন জানান, তার দোকান থেকে পোলাও’র চাল নিয়ে বাসায় যান গিয়াস। এর পরেই এই ঘটনা ঘটে। আনুমানিক ১১টার দিকে ওই বাড়ি থেকে বোরকা পরা একজনকে বেরিয়ে যেতে দেখেছেন আশপাশের লোকজন। প্রতিবেশীদের বরাত দিয়ে নিহতের মেজো ভাই মাসুদুর রহমান জানান, ওই বোরকা পরা লোকের পায়ে লাল রঙের কেডস ছিল। কিছুদূর যাওয়ার পর তা লক্ষ্য করেন আশপাশের লোকজন। ধারণা করা হচ্ছে বোরকা পরা লোকটি কিলারদের একজন। মাসুদুর রহমান আরও জানান, ঘটনার দিন রাত ৮টায় গিয়াস বাসায় এসেছে কিনা দেখতে ওই বাসায় যান তার মা। এসময় বাসার ভেতরে দরজার পাশে এক জোড়া জুতা দেখে তিনি জানতে চান, এটি কার জুতা? তখন লিনা জানান, এটি গিয়াস উদ্দিনের পুরনো জুতা। ওই সময়ে বাসার দু’টি ঘুমানোর কক্ষের দরজা বন্ধ দেখে তিনি জানতে চান, কক্ষ দুটি বন্ধ কেন? লিনা জানান, এসি ছাড়া হয়েছে এজন্য তা বন্ধ রাখা হয়েছে। এসময় গিয়াস-লিনা দম্পতির পাঁচ বছর বয়সী পুত্র নেহাল তার দাদুকে এসি কক্ষে নিয়ে যেতে বললে তাকে ধমক দেন লিনা। দীর্ঘ প্রায় দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত ওই বাসায় ছিলেন গিয়াস উদ্দিনের মা। ওই সময়ের মধ্যে একবারও লিনা তার শ্বাশুড়ির সামনে থেকে অন্যত্র যাননি। গিয়াস উদ্দিন নিয়মিত তার মায়ের ওষুধ কিনে আনতেন এবং নিজে খাওয়াতেন। ওষুধ সংক্রান্ত কাজেই গিয়াসের মা তার  খোঁজে ওই বাসায় যান। সূত্র জানায়, উজ্জ্বল নামে মিরপুর ১১-এর বাসিন্দা এক যুবকের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে লিনার। একাধিকবার লিনাকে বিভিন্ন স্থানে উজ্জ্বলের মোটরসাইকেলে আরোহী হিসেবে দেখা গেছে। এমনকি প্রায় পাঁচ বছর আগে নির্জন বাসায় লিনার কক্ষে উজ্জ্বলকে দেখতে পান গিয়াস উদ্দিনের বোন শাহিদা। এ নিয়ে তখন লিনা ও গিয়াসের পরিবারের লোকদের মধ্যে সালিশ-বৈঠক হয়। লিনা তখন প্রতিশ্রুতি দেন যে ভবিষ্যতে তিনি আর এমন কিছু করবেন না। প্রায় ১১ বছর আগে মিরপুর ১১-এর বাসিন্দা লিয়াকত মোল্লার কন্যা লাভলি ইয়াসমিনের সঙ্গে বিয়ে হয় গিয়াস উদ্দিনের। বিয়ের কয়েক বছর পরেই গিয়াস ও তার পরিবারের লোকজন জানতে পারেন বিয়ের আগে উজ্জ্বল নামে এক যুবকের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল লিনার। তার অমতেই গিয়াসের সঙ্গে তাকে বিয়ে দেয়া হয়েছে। গিয়াস-লিনা দম্পতির সংসারে ইশিকা ও  নেহাল নামে দুই শিশু সন্তান রয়েছে। মিরপুর-১০ বি-ব্লকের নেহাল গার্ডেনে গিয়াস সুতার ব্যবসা করতেন। নিহত গিয়াস উদ্দিনের পিতা ওই এলাকার বাসিন্দা সিরাজ মাতব্বর। গিয়াসসহ তারা চার ভাই ও চার বোন। গতকাল সন্ধ্যায় সেনপাড়ায় পারিবারিক কবরস্থানে নিহতের লাশ দাফন করা হয়েছে।

পারিবারিক হত্যাকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ by নুরুজ্জামান লাবু

একের পর এক ঘটছে খুনের ঘটনা। আপনজনের হাতেই খুন হচ্ছে আপনজন। নিজের পরিবারের সদস্যরাই হয়ে উঠছে ঘাতক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারিবারিক বন্ধন শিথিল হয়ে আসা, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ের ফলে আশঙ্কাজনক হারে একের পর এক ঘটে চলছে পারিবারিক হত্যাকাণ্ড। তুচ্ছ ঘটনার জের ধরে খুন করতে দ্বিধা করছে না কেউ। স্বামী খুন করছে স্ত্রীকে, স্ত্রী খুন করছে স্বামীকে। ভাইয়ের হাতে খুন হচ্ছে ভাই, সন্তানের হাতে খুন হতে হচ্ছে মা-বাবাকে। আবার নিজ সন্তানকেও হত্যা করতে হাত কাঁপছে না বাবা-মায়ের। এক ধরনের সামাজিক ও পারিবারিক অস্থিরতা বিরাজ করছে দেশজুড়ে। ক্রমবর্ধমান পারিবারিক হত্যাকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তি, অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও সমাজবিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, বিরোধ নিষ্পত্তিতে আইনি প্রক্রিয়ায় বিলম্বসহ প্রশাসনকি কাঠামোর নানা দুর্বলতা সহিংসতাকে উসকে দিচ্ছে। এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইনি পদক্ষেপের পাশাপাশি সামাজিক-পারিবারিক মূল্যবোধ জোরালো করতে হবে। প্রতিষ্ঠিত করতে হবে পারিবারিক অনুশাসন। পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় করতে হবে। তা না হলে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
পুলিশের সাবেক আইজিপি এ এস এম শাহজাহান বলেন, পারিবারিক বন্ধন এমন দুর্বল হয়ে গেছে যে পারিবারিক অনুশাসন এখন আর কেউ মানতে চায় না। এ কারণে পারিবারিক সহিংসতা বাড়ছে। তিনি বলেন, এই বন্ধন সুদৃঢ় করতে পরিবার, সমাজ তথা রাষ্ট্রকে কার্যকরী উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে সবাইকে সচেতন হতে হবে। তিনি বলেন, পারিবারিক হত্যাকাণ্ড কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় মাদকাসক্ত সন্তান বাবা-মা বা ভাইবোনকে হত্যা করছে। এক্ষেত্রে মাদক নির্মূল করতে পারলে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে না। এ ছাড়া পারিবারিক কোন ঘটনা গুরুত্ব দিয়ে থানা পুলিশ আমলে নিয়ে সমাধান বা আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
অপরাধ ও সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, সমাজে এখন চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। এর প্রভাব পড়ছে পরিবারে। এ কারণে আপনজনেরাই হয়ে উঠছে ঘাতক। সামপ্রতিক নানা ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দাম্পত্য ও পারিবারিক কোন্দল দ্রুতই গড়াচ্ছে সহিংসতার দিকে। হত্যাকাণ্ডের ধরনও পাল্টেছে। পারিবারিক বিরোধের শিকার বেশি হচ্ছে নারী ও শিশু। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে প্রতিদিনই রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের কোন না কোন স্থানে এমন ঘটনা ঘটছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও সমাজ বিজ্ঞানীদের মতে, পারিবারিক হত্যাকাণ্ড বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ মাদক ও পরকীয়া। এ ছাড়া যৌতুক, সামাজিক ও পারিবারিক বৈষম্য, আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব, তথ্য প্রযুক্তির অপব্যবহার, সমাজ পরিবর্তনের অসুস্থ ধারা, অস্বাভাবিক অর্থনৈতিক বৈষম্য ও পরিবর্তনসহ নানা কারণেও অসহিষ্ণু পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। এরই প্রকাশ ঘটছে সহিংসরূপে। সর্বোপরি এসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় উদাসীনতাকেও দায়ী করেছেন অনেকে। 
বিশিষ্ট কলামনিস্ট ও গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, মানুষের মধ্যে নিষ্ঠুরতার প্রবণতা বেড়ে গেছে। মানুষের মন থেকে স্নেহ-মায়া-মমতা ও সুকুমার বৃত্তি লোপ পাচ্ছে। এ কারণে পারিবারিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। তিনি বলেন, ঘরের ভেতর প্রিয়জনের হাতেই আরেক প্রিয়জন যে হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছে তার জন্য দায়ী আমাদের সমাজ। আমাদের সমাজই এই হত্যাকারীদের তৈরি করেছে। তাই যতদিন সমাজের চরিত্র পরিবর্তন না ঘটানো যাবে বা মূল্যবোধের পরিবর্তন না ঘটানো যাবে ততদিন এমন ঘটনা ঘটতেই থাকবে। অপরাধ বিশেষজ্ঞ সাবেক আরেক আইজিপি মোহাম্মদ নূরুল হুদা বলেন, সমাজে বৈষম্য বেড়ে যাওয়া আর মানুষের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এসব ঘটনা ঘটছে। একই সঙ্গে আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব ও বিচারিক দীর্ঘসূত্রতার কারণে অন্যরা উৎসাহিত হয়। মোট কথা পারিবারিক হত্যাকাণ্ড বন্ধ করতে হলে সামগ্রিক উদ্যোগ প্রয়োজন।
এদিকে পারিবারিক হত্যাকাণ্ড নিয়ে বেকায়দায় রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও। সাধারণত পারিবারিক হত্যাকাণ্ডের আগাম কোন তথ্য হাতে থাকে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কাছে। এ কারণে পারিবারিক হত্যাকাণ্ড  রোধে আগাম কোন পদক্ষেপ নিতে পারে না তারা। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে যে সব হত্যাকাণ্ড ঘটছে তার বেশির ভাগই পারিবারিক হত্যাকাণ্ড। পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, পারিবারিক হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্র বিরোধী অভিযান ও মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে পারিবারিক হত্যাকাণ্ড রোধে সচেতনতা বৃদ্ধিসহ নানারকম কৌশল অবলম্বন করা হচ্ছে। পারিবারিক হত্যাকাণ্ডের পরপরই দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়েও জোর দিচ্ছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এক বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনাও হয়েছে। পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেন, পুলিশকে আরও বেশি জনবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। মানুষ যেন নিজেরা আইন হাতে তুলে না নিয়ে সহজেই আইনি সুবিধা পায় সেই প্রচেষ্টা চলছে। মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ আশরাফুল আলম বলেন, পরিবার ও সমাজের নিয়ন্ত্রণ কাঠামো ভেঙ্গে পড়ায় এমন অবস্থা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে অপরাধ করে কেউ যেন পার না পায় সে বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে। অপরাধ করে অপরাধী পার পেয়ে গেলে সমাজে খারাপ প্রভাব পড়ে। এ ছাড়া বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা দূর করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।