Sunday, September 15, 2024

আবহাওয়ার অস্বাভাবিক পরিবর্তন : সবুজ হয়ে উঠছে সাহারা

সাহারা মরুভূমিতে খুব বেশি সবুজ নেই।  তবে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের পর মহাকাশ থেকে বিশ্বের সবচেয়ে শুষ্ক স্থানগুলির কিছু অংশে সবুজ রঙ দেখা যাচ্ছে। মৌসুমি ঝড়ের গতিপথ পরিবর্তন হওয়ায় সাহারায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ব্যাপক বেড়েছে। এমনকি মাঝে মাঝে বন্যাও দেখা দিচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন জীবাশ্ম জ্বালানি দূষণের কারণে সৃষ্ট বিশ্ব উষ্ণায়ন এর জন্য দায়ী। জলবায়ুর পরিবর্তনে কেবল মরুভূমি সবুজ হচ্ছে তা নয়, এর ফলে আটলান্টিকে ঘূর্ণিঝড়ের গতি-প্রকৃতি প্রভাবিত হয়েছে। ফলে নাইজেরিয়া, ক্যামেরুনসহ বেশ কয়েকটি আফ্রিকান দেশে বৃষ্টিপাত ও বন্যা বেড়ে গেছে। এ বিষয়ে জার্মানির লাইপজিগ ইউনিভার্সিটির জলবায়ু গবেষক কার্স্টেন হাউস্টেইন বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এমনটা ঘটছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মরুভূমির সবুজ হয়ে যাওয়া এলাকা অন্য অংশের চেয়ে ছয় গুণ বেশি ভেজা থাকে। তাছাড়া এল নিনো (উষ্ণ সামুদ্রিক জলস্রোতের পরিবর্তন) থেকে লা নিনোর (বন্যা-খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ) রূপান্তরের প্রভাব তো রয়েছেই।’  হাউস্টেইন ব্যাখ্যা করেছেন -'আন্তঃট্রপিক্যাল কনভারজেন্স জোন, যা (আফ্রিকার) সবুজায়নের কারণ, পৃথিবী যত উষ্ণ হয় ততই উত্তর দিকে চলে যায়,  অন্তত, বেশিরভাগ মডেলের ক্ষেত্রে এটিই দেখা গেছে ।" এই জুনে নেচার জার্নালে প্রকাশিত একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে এই অঞ্চলে উত্তরমুখী স্থানান্তর পরবর্তী কয়েক দশকে আরও ঘন ঘন ঘটতে পারে। স্থানান্তরটি কেবল মরুভূমিকে সবুজ করে তুলছে না, এটি আটলান্টিক হারিকেন মৌসুমকে ব্যাহত করেছে এবং বেশ কয়েকটি আফ্রিকান দেশের জন্য গত কয়েক মাসে করুণ পরিণতি ডেকে এনেছে। সাধারণত নাইজার, চাদ, সুদান, লিবিয়া ও দক্ষিণ মিসরের কিছু অংশে প্রতিবছর জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে প্রচুর বৃষ্টিপাত দেখা দিচ্ছে। সাধারণ বৃষ্টিপাতের চেয়ে যা ৪০০ শতাংশ বেশি। এতে এ অঞ্চলে প্রতিবছর ভয়াবহ বন্যা দেখা দিচ্ছে। চাদের উত্তর অংশ নিন, যা সাহারা মরুভূমির অংশ। এখানে সাধারণত জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে সেপ্টেম্বরের শুরু পর্যন্ত মাত্র এক ইঞ্চি পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়। কিন্তু এই বছর একই সময়সীমার মধ্যে ৩ থেকে ৮ ইঞ্চি পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়েছে। এই অত্যধিক বৃষ্টিপাতের কারণে চাদে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। জাতিসংঘের একটি তথ্য অনুসারে, এই গ্রীষ্মে দেশে বন্যায় প্রায় ১.৫ মিলিয়ন মানুষ প্রভাবিত হয়েছে এবং কমপক্ষে ৩৪০ জন নিহত হয়েছেন।ভয়ঙ্কর বন্যায় নাইজেরিয়ায় লক্ষাধিক লোক বাস্তুচ্যুত হয়েছে, ২২০  জনেরও বেশি লোক নিহত হয়েছে। আগস্টের শেষের দিকেও মারাত্মক বন্যায়  সুদান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্তত ১৩২ জনের মৃত্যু হয় এবং ১২,০০০ এরও বেশি ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে যায় । গোটা বিশ্ব উষ্ণ হওয়ার সাথে সাথে  আর্দ্রতা বাড়বে।   হাউস্টেইন ব্যাখ্যা করেছেন যে  এতে সামগ্রিক বর্ষা আরো আর্দ্র হতে পারে এবং এই মৌসুমের মতো আরও বিধ্বংসী বন্যা দেখা দিতে  পারে। তবে প্রতিটি বন্যার পেছনে  জলবায়ু পরিবর্তন কতটা ভূমিকা পালন করেছে তা নির্ধারণ করার জন্য আরও গবেষণার প্রয়োজন হবে বলে মনে করেন হাউস্টেইন।

সূত্র :সিএনএন

mzamin

এত অসম্মান কেন করছো? কালীঘাটের বাড়িতে জুনিয়র ডাক্তারদের মমতা by সেবন্তী ভট্টাচার্য্য

শনিবার সন্ধ্যায় কালীঘাটে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসায় বৈঠক করতে গিয়েও শেষমেশ ফিরে এলেন জুনিয়র ডাক্তাররা। উঠোনে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে তারা দাবি করেন, বৈঠকের ভিডিও রেকর্ডিং সরকার যেমন করছে, তেমনই তারাও করবে। জুনিয়র ডাক্তাররা নিজেরাই চেয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করতে। তাদের মেইল পাওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ডেকে নেওয়া হয় কালীঘাটে মুখ্যমন্ত্রীর বাসাতে। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর বাড়িতে গিয়ে ফের বেঁকে বসেন চিকিৎসকরা। লাইভ স্ট্রিমিং না হলে বৈঠক হবে না। এই দাবিতে অনড় রয়ে গেলেন আন্দোলনকারীরা। ফলে বৈঠক শুরু করা যায়নি  নির্ধারিত সময়ের দুঘণ্টার পরও। মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ির সামনে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকেন  আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধিরা।

এদিকে ভিতরে অপেক্ষায় মুখ্যমন্ত্রী। এই দাবি নিয়ে গোঁ ধরে যখন প্রায় দু’ঘণ্টা কাটিয়ে দিয়েছেন ডাক্তাররা, দেখা যায় মুখ্যমন্ত্রী উঠোনে নেমে আসেন। তার পর হাতজোড় করে তাদের বলেন, ‘লক্ষ্ণী ভাইবোনরা তোমরা বাইরে দাঁড়িয়ে ভিজো না। ভিতরে এসো। তোমরা তো মিটিংয়ে আসার আগে বলোনি যে লাইভ স্ট্রিমিং করতে হবে বা ভিডিও রেকর্ডিং করতে হবে। তোমাদের চিঠিতে তো লেখা ছিল না। আমরা যে চিঠি দিয়েছিলাম তাতেও লেখা ছিল না। এর আগেও তোমাদের জন্য তিন দিন অপেক্ষা করেছি। আজও দু’ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করালে আমাকে।  আমাকে এত অসম্মান কেন করছো ?’

জুনিয়র ডাক্তারদের সঙ্গে বৈঠকের জন্য এদিন মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনে ছিলেন মুখ্য সচিব মনোজ পন্থ, রাজ্য পুলিশের ডিজি রাজীব কুমার ও স্বরাষ্ট্র সচিব নন্দিনী চক্রবর্তী। তারা প্রায় ২ ঘণ্টা ধরে ডাক্তারদের বোঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু জুনিয়র ডাক্তাররা বলতে থাকেন, তাদের সতীর্থরা ধর্নাস্থলে রয়েছেন। তারা দেখতে চান, বৈঠকে কী হল।

মুখ্যমন্ত্রী তখন বলেন, বিষয়টি বিচারাধীন। সরকার ভিডিও রেকর্ডিং করবে। তার পর সুপ্রিম কোর্টের অনুমতি নিয়ে তবেই রিলিজ করবে সেই ভিডিও। তা ছাড়া সরকার এটা করতে পারে না। মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, বৈঠকে স্বচ্ছতা থাকবে। কার্যবিবরণী লেখা হবে। সেই কার্যবিবরণীতে আমি সই করে দেব। আপনারাও সই করবেন। কিন্তু দেখা যায়, এর পরেও মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে তর্ক করতে থাকেন জুনিয়র ডাক্তাররা। তাতে কিছুটা হতাশ হয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, তোমরা যখন আলোচনা করবে না তখন এলে কেন?' শেষমেষ   নিজেদের অবস্থানে অনড় থেকে বৈঠক না করেই বেরিয়ে যান জুনিয়র চিকিৎসকরা।
mzamin

৪৮ ঘণ্টার মধ্যে মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা কেজরিওয়ালের

দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলেন অরবিন্দ কেজরিওয়াল। দিল্লির আবগারি দুর্নীতি মামলায় প্রায় ৬ মাস জেলে ছিলেন তিনি। শীর্ষ আদালতের নির্দেশে শুক্রবারই তিহাড় থেকে মুক্তি পেয়েছেন। তবে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনে বেশ কিছু বিধিনিষেধ এবং শর্ত আরোপ করা হয় তার ওপরে। এই আবহে বিতর্কের মাঝেই পদত্যাগ করার ঘোষণা দিলেন তিনি। দুদিনে তিনি এই পদক্ষেপ নেবেন বলে আজ জানালেন আম আদমি পার্টির প্রধান।

রোববার দিল্লিতে পার্টির কর্মীদের উদ্দেশে ভাষণ দেয়ার সময় কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকে তীব্র আক্রমণ করার পাশাপাশি তিনি বলেন, 'দু'দিনের মধ্যে মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিতে চলেছি। মানুষ রায় না দেয়া পর্যন্ত আমি চেয়ারে বসব না। প্রত্যেক বাড়িতে যাব, দরজায় দরজায় পৌঁছব। মানুষের রায় না পাওয়া পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসব না।'

একইসঙ্গে দিল্লিবাসীর উদ্দেশেও কেজরিওয়ালের অনুরোধ, যদি মানুষ তাকে নির্দোষ বলে মনে করেন, যদি মানুষ ভাবেন তিনি দিল্লির জন্য কাজ করেছেন, তবে তাকে যেন পুনরায় ভোট দেয়া হয়।

কেন এমন সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তা ব্যাখ্যা করে কেজরিওয়াল বলেন, ‘আদালত জামিন দিয়েছে। এই মামলা চলবে। আইনজীবীদের বললাম, আদালত থেকে মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসব না। কিন্তু ওরা বললেন, মামলা  বেশ কয়েক বছর চলতে পারে। আদালত যা করতে পারত করেছে। যে আইনে জামিন হয় না, সেই আইনে আদালত থেকে জামিন পেয়েছি। কিন্তু আজ আমি জনতার আদালতে এসেছি। আপনারা বলুন, আপনারা আমাকে দোষী মনে করেন না নির্দোষ? কেজরিওয়াল সৎ না অসৎ? ‘ আপ  কর্মীদের উদ্দেশ্যে তার ভাষণে কেজরিওয়াল কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদি সরকারকে বৃটিশদের চেয়েও কর্তৃত্ববাদী বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, গণতন্ত্র বাঁচাতে চেয়েছিলাম  বলে গ্রেপ্তার হওয়া সত্ত্বেও  মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করিনি। তারা (কর্নাটকের মুখ্যমন্ত্রী) সিদ্দারামাইয়া, (কেরলের মুখ্যমন্ত্রী) পিনারাই বিজয়ন, (পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী) মমতা দিদির (ব্যানার্জি) বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে। আমি অ-বিজেপিদের  কাছে আবেদন করতে চাই, তারা (বিজেপি) যদি আপনার বিরুদ্ধে মামলা নথিভুক্ত করে তাহলে পদত্যাগ করবেন না। এটি তাদের নতুন খেলা।’

যদিও বিজেপির দাবি কেজরিওয়াল নাটক করছেন। বিজেপির হরিশ খুরানা প্রশ্ন তোলেন, ‘৪৮ ঘণ্টা পরে কেন? তার আজই পদত্যাগ করা উচিত। অতীতেও তিনি এমন করেছেন। দিল্লির মানুষ জিজ্ঞাসা করছে, তিনি সচিবালয়ে যেতে পারবেন না, নথিতে সই করতে পারবেন না, তাহলে লাভ কী?’

বিজেপি আগাম নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে   খুরানা বলেন, ‘আজ হোক বা কাল হোক আমরা প্রস্তুত। আমরা ২৫ বছর পর দিল্লিতে ক্ষমতায় ফিরব।’

সূত্র : এনডিটিভি

দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। ছবি : সংগৃহীত
দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। ছবি : সংগৃহীত



আরও ২০০ মিলিয়ন সহায়তা দেবে যুক্তরাষ্ট্র : অর্থ উপদেষ্টা

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আগে যে চুক্তি হয়েছিল সেটার সঙ্গে আরও ২০০ মিলিয়ন সহায়তা যোগ করা হবে বলে জানিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ।

রোববার (১৫ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় মার্কিন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

তিনি বলেন, আমরা আজকে মার্কিন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আলোচনা করেছি। আমাদের মূল আলোচনা বিষয় ছিল তাদের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট ও ইউএসএআইডির সঙ্গে। বিশেষ করে আর্থিক সংস্কার, আর্থিক খাতে যে সহযোগিতা দরকার সেটা। দ্বিতীয় বাণিজ্যের, আমরা এক্সপোর্ট ডাইভারস্টিফিকেশন এবং বাণিজ্য বিভিন্ন কারিগরি সহায়তা বা বাজার এক্সপ্লোর করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আমরা কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগোবো, তারা সে ব্যাপারে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।

উন্নয়ন সহযোগিতা চুক্তির বিষয়ে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, এটা যে চুক্তি আগে হয়েছিল সেটার সঙ্গে আরও ২০০ মিলিয়ন যোগ করা হয়েছে। আগে যা ছিল তার সঙ্গে এটি যুক্ত হয়েছে। তারমানে আরও বাড়তি টাকা তারা দেবে।

পাচার হওয়া অর্থ ফেরতে আনতে সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এগুলো সব আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে আমরা পরে বিস্তারিত জানাবো।

কর সংস্কারের বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, সব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

এরআগে রোববার (১৫ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১ টায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল।

শনিবার (১৪ সেপ্টেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ দপ্তরের সহকারী আন্ডার সেক্রেটারি ব্রেন্ট নেইম্যানের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি ঢাকায় আসেন।

প্রনিধিধি এই দলে আরও রয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক অ্যাসিস্টেন্ট সেক্রেটারি ডোনাল্ড লু, যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ, ইউএসএআইডি এবং মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি কার্যালয়ের প্রতিনিধি।

ড. ইউনূস ছাড়াও আজ পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন এবং অর্থ ও বাণিজ্য উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন মার্কিন প্রতিনিধিদলটি।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, সফরকালে সহকারী সেক্রেটারি লু মার্কিন অংশীদারদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সমগ্র ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলজুড়ে স্থিতিশীলতাকে সমর্থন করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করবেন।

এদিকে, গত ১০ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্রের দপ্তর এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, আর্থিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের চাহিদা মেটাতে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে সহায়তা করতে পারে, তা নিয়ে আলোচনার জন্য ওয়াশিংটন থেকে একটি প্রতিনিধিদল ঢাকা সফর করবে। 

মার্কিন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ। ছবি : সংগৃহীত
মার্কিন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ। ছবি : সংগৃহীত

নির্বাচন কমিশন নিয়োগে বিদ্যমান আইন সংস্কারের প্রস্তাব -ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের পলিসি ডায়ালগ

বিদ্যমান আইন দিয়ে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন সম্ভব নয় বলে মনে করছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা, রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ ও বিশিষ্টজনরা। নির্বাচন কমিশন নিয়োগে বিদ্যমান আইন সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছেন তারা।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ বিষয়ে শনিবার এক সংলাপ অনুষ্ঠানে বক্তারা এ মত দেন। রাজধানীর একটি হোটেলে ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল এ সংলাপের আয়োজন করে।

নির্বাচন কমিশনের নিয়োগ প্রক্রিয়া ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু’ উল্লেখ করে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, ‘যত ভালো কমিশন গঠন হোক ভালো নির্বাচন করতে হলে একটি অন্তর্বর্তী সরকার প্রয়োজন।’ এ সময় তিনি নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য তিন স্তরের একটা সার্চ কমিটির প্রস্তাব করেন।

অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত নির্বাচন কমিশন সংস্কার কমিটির প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘দায়মুক্তির বিধানযুক্ত করে ২০২২ সালের প্রণীত আইনে যাকে খুশি তাকে নিয়োগ দেয়া সম্ভব।’

তিনি বলেন, ‘এর আগের নির্বাচন কমিশন পোস্ট অফিসের ভূমিকা পালন করেছেন, তারা সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন। রাজনৈতিক ঐক্যমতের ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে ইসি গঠনে তার কমিটি প্রস্তাব করবে।’

ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের মুখ্য পরিচালক ড. আব্দুল আলিম উপস্থাপিত পলিসি ব্রিফে (নীতি প্রস্তাবনা) বলেন, ‘যেকোনো নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্বাচন কমিশন নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকেই শুরু হয়। স্বাধীন কমিশন গঠনে তিনি এসময় সুনির্দিষ্ট পাঁচটি প্রস্তাব তুলে ধরেন।’

জাতীয় নাগরিক কমিটির সদস্যসহ আরও বক্তব্য রাখেন বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী, এবি পার্টি, গণঅধিকার পরিবষদ, গণফোরাম, গণসংহতি আন্দোলন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন-এনডিএমসহ ১০ দলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ। এছাড়া নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও আলোচনায় অংশ নেন।

সংলাপে জাতীয় নাগরিক কমিটির পক্ষ থেকে অংশ নেন, আরিফুল ইসলাম আদিব মো. মিরাজ মিয়া ও নাহিদা সারওয়ার চৌধুরী সামান্তা। তাদের বক্তব্য হলো, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগের মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে শুধু নির্বাচন কমিশন দিয়ে নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়া সম্ভব না। কমিশনকে ডি ফ্যাক্টো অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ পাওয়ার দেয়া হলে নির্বাচন পরিচালনা সহজ হবে। ছোট বড় সকল দলের মতামতকে সমান গুরুত্ব দেয়ার কথা বলেন তারা।

গণ অধিকার পরিষদের প্রেসিডেন্ট নূরুল হক নূর সাত শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধি নিয়ে সাত সদস্যের সার্চ কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেন। এছাড়াও তিনি দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট সংসদ এবং আনুপাতিক নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রস্তাব করেন।

বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান নবীন প্রবীনের সমন্বয়ে আগামীর নির্বাচন কমিশন দেখতে চান। আর, বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহকারী সম্পাদক রুমিন ফারহানা বলেন, সার্চ কমিটির মাধ্যমে পাওয়া নাম নিয়ে আবার রাজনৈতিক দলের কাছে ফিরে যেতে হবে, কারণ রাজনৈতিক দলগুলো এর সবচেয়ে বড় স্টেক হোল্ডার।

জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, সবার আগে প্রয়োজন বিদ্যমান আইনটি বাতিল করা। তিনি আরও বলেন, এমনভাবে কমিশন গঠন প্রক্রিয়া প্রণয়ন করতে হবে যাতে কোনো সরকার তা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে।

এনডিএম চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ বলেন, স্থায়ী সমাধান এখন চিন্তা না করে কি করে পরবর্তী নির্বাচন ভালো করা যায় সেই পদক্ষেপ এখন ভাবতে হবে।  

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মতিউর রহমান আকন্দ বলেন, বিচারবিভাগকে কোনো অবস্থাতেই নির্বাচন কমিশন গঠনে যুক্ত করা ‍উচিত হবে না। সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, রাজনৈতিকদল, সুশীল সমাজ ও ছাত্র প্রতিনিধির সমন্বয়ে সার্চ কমিটি গঠনের তিনি প্রস্তাব করেন।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রেসিডিয়াম সদস্য প্রফেসর আশরাফ আলী আকন্দ, বিগত কমিশনকে দায়িত্ব পালনের ব্যর্থতার দায়ে আইনের আওতায় আনার তাগিদ দেন। গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকী বলেন, অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা নয়, বাংলাদেশের বাস্তবতার আলোকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রফেসর ড. রওনক জাহান। সংলাপে স্বাগত বক্তব্য রাখেন ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের চিফ অব পার্টি ডানা এল. ওল্ডস।

mzamin

মাহসা আমিনির মৃত্যুবার্ষিকীর আগেই হিজাব ছাড়াই পথে ইরানের নারীরা

মাহসা আমিনির দ্বিতীয় মৃত্যু বার্ষিকীর আগেই আরও একবার হিজাব-বিধি অমান্য করার রাস্তায় হাঁটছেন ইরানের নারীরা। সম্প্রতি ইরানের রাস্তায় হিজাব ছাড়া বহু নারীকেই  অবাধে ঘুরতে দেখা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নানা ছবি ও ভিডিওতেও  মাথায় আবরণ দৃশ্যমান ছিল না। যদিও   কোনো সরকারি কর্মকর্তা  এ ধরনের ঘটনার কথা  স্বীকার করেনি।

২০২২ সালের ১৬ অক্টোবর ঠিকমতো হিজাব না পরার ‘অপরাধে’ মাহসা আমিনি নামের ২২ বছরের এক তরুণীকে গ্রেপ্তার করে ইরানের নীতিপুলিশ। ২৪ ঘণ্টা যেতে না যেতেই পুলিশি হেফাজতে রহস্যজনক মৃত্যু হয় তার। মাহসার উপরে অত্যাচারের অভিযোগ উঠে পুলিশের বিরুদ্ধে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে হিজাব-বিরোধী আন্দোলন শুরু হয় ইরানের নানা প্রান্তে।

সাবেক ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লা খমেনি এবং বর্তমান ধর্মীয় নেতা আলি খামেনির ফতোয়া উড়িয়ে ইরানের মেয়েরা ঘোষণা করেন, দেশ জুড়ে হিজাব পরার বাধ্যতামূলক নিয়ম তারা মানবেন না। সরকারি ক্র্যাকডাউনের জেরে  ৫০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত  এবং ২২,০০০ জনকে আটক করা হয়। গত মে মাসে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় ইরানের কট্টরপন্থী সাবেক প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির মৃত্যুর পর মাসুদ পেজেশকিয়ান ইরানের নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই হিজাব-বিধিতে শিথিলতা এসেছে।

 নতুন সংস্কারবাদী প্রেসিডেন্ট  নীতিপুলিশ কর্তৃক নারীদের হয়রানি বন্ধ করার প্রতিশ্রুতিতে প্রচারণা চালাচ্ছেন। কিন্তু দেশটির চূড়ান্ত কর্তৃত্ব রয়ে গেছে ৮৫বছর বয়সী সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হাতে , যিনি অতীতে বলেছিলেন "হিজাব না পরা ধর্মীয়ভাবে   এবং রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ।"

কিছু পর্যবেক্ষক বলছেন,  মুসলিম নারীদের জন্য, মাথা ঢেকে রাখা সৃষ্টিকর্তার সামনে ধার্মিকতা এবং তাদের পরিবারের বাইরে পুরুষদের সামনে শালীনতা মেনে চলার একটি চিহ্ন।  ইরানে, হিজাব পরিধান দীর্ঘকাল ধরে একটি রাজনৈতিক প্রতীকও ছিল৷  ইতিমধ্যে, সরকার ব্যক্তিগত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিহ্নিত করেছে যেখানে নারীদের হিজাব ছাড়াই দেখা যায়।

নজরদারি ক্যামেরার মাধ্যমে হিজাবহীন নারীদের খুঁজে বের করা হচ্ছে  যারা গাড়ির মধ্যে তাদের মাথা অনাবৃত রাখছেন।  তাদেরকে জরিমানা করা হচ্ছে এবং  গাড়ি জব্দ করা হচ্ছে । জাতিসংঘ বলেছে, দেশটির সরকার ২০২৪ সালের তেহরান আন্তর্জাতিক বইমেলা এবং কিশ দ্বীপে মাথা অনাবৃত রাখা নারীদের পর্যবেক্ষণের জন্য এরিয়াল ড্রোন ব্যবহার করার মতন ঘটনাও ঘটিয়েছে। তবুও কেউ কেউ মনে করেন জুলাই মাসে পেজেশকিয়ানের নির্বাচন,  হিজাব নিয়ে উত্তেজনা কমাতে সাহায্য করেছে । হামিদ জারিনজুই  নামের   একজন  বই বিক্রেতা বলছেন - 'পেজেশকিয়ান দায়িত্ব নেওয়ার পরে দেশে অনেকটাই শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ফিরে এসেছে। '
সূত্র : দ্য উইক

mzamin

‘আমার মতো কষ্ট দুনিয়াতে কারু নাই’

মাইনসের বাড়ি কাম কইর‌্যা একসের চাইল দিচে, আরেক বাড়ি থিক্যা এল্লা তেল চাইয়্যা আনচি, আরেকজন একটা পল্যা (ঝিঙে) দিচে। চাইল কয়ডা রানচি কিন্তু তা দিয়্যা অইবো না, তাই ১০ ট্যাহার আটা কিন্যা আইন্যা ফ্যান রাইনত্যাছি।

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে হাঁট পাচিল এলাকায় যমুনা নদীর ওয়াপদা বাঁধের ঢালে একটি টঙ ঘরে আটা দিয়ে ফ্যান রান্না করছিলেন আর কথাগুলো বলছিলেন প্রায় আটচল্লিশ বছর বয়সী বিধবা মাজেদা খাতুন। পাশে তার ছোট ছোট তিন শিশু সন্তানকে ফ্যান খেতে দিয়েছেন। আরও তিন ছেলে তখনও বাড়ির বাইরে।

শনিবার (১৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে হাটপাচিল ওয়াপদা এলাকায় সরেজমিনে গেলে মাজেদা খাতুনের অসহায়ত্বের এমন চিত্র দেখা যায়।

মাজেদা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছিলেন, ‘আমার মতো কষ্ট দুনিয়াতে কারু নাই’। তিন বছর আগে সোয়ামী মইর‌্যা যায়, তার দুই বছর পর বসতবাড়ি যমুনার প্যাটে যায়। মাইনসের দ্বারে দ্বারে ৮ ছওয়াল-মেয়ে নিয়্যা ঘুরত্যাছি। এক বাড়িত আশ্রয় নিলে কয়েকদিন পর বাইর কইর‌্যা দেয়, আরেক বাড়ি যাই, এইভাবে ৭ বাড়িতে আশ্রয় নেই। এ্যাহন ওয়াপদার বাঁধে আরেকজন গরীব মানুষ টঙ ঘর তুইলচে, বেড়া দেয় নাই। ছওয়ালপাল নিয়্যা এহেনেই কষ্ট কইর‌্যা আচি। কয়দিন পর এহেন থিক্যাও চইল্যা যাওয়া লাইগবো। কোনে যামু তাও জানি না।

মাজেদা আরও বলেন, দুইডা মিয়্যা মাইনসের বাড়িত কামে থুছি। কিন্তু থাইকপ্যার চায় না। কাইন্দা-কাইন্দা বাড়িত আইসে, আবার মাইর‌্যা-ধইর‌্যা থুইয়্যা আসি। তারা ভাত-তরকারি দেয়ই, আবার ঈদ আইলে জাকাত দেয়, এসব দিয়্যাই চলি।

স্থানীয় একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হাট পাঁচিল গ্রামের পূর্ব পাড়ায় মাজেদা খাতুনের বাড়ি ছিল। সম্প্রতি যমুনার ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। বছর তিনেক আগে তার স্বামী রমজান আলী মারা যাওয়ার পর থেকেই পরিবারটি কুল কিনারা হারিয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে। তাদের ৬ ছেলে ও ৩ মেয়ের মধ্যে রমজান আলী বেঁচে থাকতেই বড় মেয়েটার বিয়ে হয়। বাকী ৮ সন্তান নিয়ে সীমাহীন দুর্ভোগের মধ্যে দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন মাজেদা। কোনো সন্তানকে স্কুলে দেওয়ার মতো অবস্থা নেই। কোরবান আলী নামে ১৭ বছর বয়সী এক ছেলে থাকলেও সে সংসারের কোনো কাজ করে না। ১৪ বছর বয়সী আরেক ছেলে রতন যমুনায় নদীতে মৎস্যজীবীদের জাল ঠেলে ৫০ থেকে ১শ টাকা পায় আর অন্যের বাড়িতে কাজ করে মাজেদা খাতুন কখনো ৫০ টাকা, কখনো বা এক সের চাল পায় এ দিয়েই কোনোমতে সংসারের ৮ জনের মুখে আহার তুলে দেন।

স্থানীয় সমাজসেবক জয়নাল আবেদীন বাচ্চু বলেন, মাজেদা খাতুনসহ এখানকার বেশ কিছু পরিবার যমুনার ভাঙনে নিঃস্ব হয়ে কষ্টে দিনপাত করছে। তাদের সরকারি সহযোগিতা এবং একটি গুচ্ছগ্রাম করে দেওয়া প্রয়োজন।

স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. শাহজাহান আলী কালবেলাকে বলেন, মাজেদা খাতুন এখন খুব অসহায় অবস্থায় আছে। আগে ঝুরি বানিয়ে সংসার চালাতো। বর্তমানে যমুনার ভাঙনে ঝুরি বানানোর জায়গা বিলীন হয়ে যাওয়ায় তারা কোনো কাজ করতে পারছে না। এই মুহূর্তে ইউনিয়ন পরিষদে কোনো বরাদ্দ নেই, তাই আমরা তার জন্য কিছুই করতে পারছি না। বরাদ্দ এলে আমরা তাকে দেব।

সন্তানদের নিয়ে যমুনার ভাঙনে নিঃস্ব মাজেদা। ছবি :কালবেলা
সন্তানদের নিয়ে যমুনার ভাঙনে নিঃস্ব মাজেদা। ছবি :কালবেলা

‘নয় বিঘা জমি গ্যাছে, এহন বাড়িটাও গিলতে শুরু করেছে’

‘নয় বিঘা জমি আছিল, কয়েক বছর ধইর‌্যা যমুনার ভাঙনে সব বিলীন অইয়্যা গ্যাছে। এহন বাড়িডাও গিলতে শুরু করেছে রাক্ষসী যমুনা। কয়েকদিন ধইর‌্যা ভাঙনে বাড়ির সিকি অংশ বিলীন অইয়া গ্যাছে।’

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার কৈজুরী ইউনিয়নের হাঁট পাচিল গ্রামের ৬৫ বছর বয়সী কৃষক ময়নাল সরদার এভাবেই নিজের নিঃস্ব হওয়ার গল্প বলছিলেন।

তিনি বলেন, ‘পালের গরুবাছুর বেইচা খাইয়্যা শ্যাষ করছি, এহন আমি নিঃস্ব, ভাত পাওয়াই কঠিন। বাড়িটা চইলে গেইলে মাইনসের দ্বারে যাইয়া থাকা লাইগবো।’

শুধু ময়নাল সরদার নয়, ভাঙনের মুখে রয়েছে ওই এলাকার আরও শতাধিক বসতবাড়ি। এদের মধ্যে অনেকেই বসতঘরসহ জিনিসপত্র সরিয়ে নিরাপদ দূরত্বে নিয়ে গেছেন।

মাসখানেক আগে কোবাদ মাস্টার নামে মধ্যবিত্ত কৃষকের দোতলা ভবন তার চোখের সামনেই নদীতে বিলীন হয়েছে। নদীগর্ভে চলে গেছে তার বিশাল গরুর খামারটিও।

ফজিলা খাতুন নামে এক বিধবা বলেন, আগে হাঁট পাচিল গ্রামে তার বাড়ি ছিল। চার বছর আগে সেটা ভেঙে যায়। এরপর বাঁধের ওপর আশ্রয় নেয়। পরে স্বামীর চড়ায় জমি ছিল নিজস্ব জমিতে মাটি ফেলে বাড়ি করে। সেই বাড়িটিও নদীগর্ভে যাওয়ার পথে।

জানা যায়, বর্ষা মৌসুম শেষ হয়েছে অনেক আগেই। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে কমছে যমুনার পানি। পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে নদীটির পশ্চিম তীরে ভাঙন চলছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে কখনো মৃদু কখনো বা তীব্র ভাঙনে একের পর এক বিলীন হচ্ছে বসতবাড়ি ও ফসলি জমি। ভাঙন হুমকিতে রয়েছে কবরস্থান, মসজিদসহ বিভিন্ন স্থাপনা।

হাট পাঁচিলের পাশাপাশি একই উপজেলার জালালপুর ইউনিয়নের সৈয়দপুর, পাকড়তলাতেও একইভাবে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। গত একমাসে ধারাবাহিক ভাঙনে ৭শর বেশি বসতবাড়ি, কয়েকশ বিঘা কৃষিজমি, রাস্তাঘাট ও ব্যক্তিগত স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বিপুল আবাদি জমি নদীগর্ভে চলে যাওয়ায় শত শত পরিবার এখন ভূমিহীন।

এদিকে ২০২২ সালে শুরু হওয়া পাউবোর নদী তীর সংরক্ষণ বাঁধ নির্মাণকাজে গাফিলতির কারণে এ অঞ্চলটি ভাঙনের হাত থেকে মুক্তি পাচ্ছে না বলে দাবি ভুক্তভোগীদের।

নদী তীরবর্তী বাসিন্দাদের দাবি, আমরা কোনো সাহায্য চাই না। তাড়াতাড়ি আমাদের বাঁধ নির্মাণ করে আমাদের বাড়িঘরগুলো ভাঙন থেকে রক্ষা করা হোক।

সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোখলেসুর রহমান বলেন, ওই এলাকায় নদী তীর সংরক্ষণ বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। যমুনায় পানির স্রোত বেশি থাকায় কাজ বন্ধ আছে। এক মাসের মধ্যে কাজ শুরু হবে। ভাঙনরোধে আমরা আপাতত সেখানে কিছু জিওব্যাগ ডাম্পিং করেছি। এখন ভাঙনের তীব্রতা কিছুটা কমে এসেছে।

যমুনার ভাঙনে সব বিলীন হচ্ছে একের পর এক বসতভিটা। ছবি : কালবেলা
যমুনার ভাঙনে সব বিলীন হচ্ছে একের পর এক বসতভিটা। ছবি : কালবেলা

আলোচিত ‘রাজাকার’ স্লোগানের ব্যাখ্যা দিলেন উপদেষ্টা নাহিদ

‘তুমি কে? আমি কে?, রাজাকার রাজাকার’ গত ১৫ জুলাই রাতে হঠাৎ এমন স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। সেসময় স্লোগানটি নিয়ে অনেকেই সমালোচনা করলেও এর ওপর ভর করে গতি বাড়ে আন্দোলনের।

তুমুল আলোচিত এই স্লোগানের আজ দুমাস পূর্ণ হয়েছে। যে কারণে স্লোগানটিকে স্বরণ করে এর পূর্ণ ব্যাখ্যা দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম।

রোববার (১৫ সেপ্টেম্বর) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে স্লোগাননামা শিরোনামে একটি পোস্ট দিয়েছেন নাহিদ ইসলাম।

যেখানে তিনি লিখেছেন, ‘তুমি কে? আমি কে?, রাজাকার রাজাকার’ এই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে শক্তিশালী ও সাহসী স্লোগান ছিল। আওয়ামী লীগের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে যে বিভাজনের রাজনীতি ছিল তা এই স্লোগানের মাধ্যমে সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে গেছিলে সেই রাতে। আওয়ামী লীগের ন্যারেটিভ সেই রাতেই ভেঙে গেছিল। অস্ত্র ও বুলেটের মাধ্যমে আরও কয়েকটা দিন টিকে থাকার প্রাণপণ চেষ্টা ছিল কেবল।

নাহিদ ইসলাম লিখেছেন, ইতিহাসতো একরোখা কোনো বিষয় না। ‘তুই রাজাকার, তুই রাজাকার’ ; ‘আমি নই, তুমি নই; রাজাকার, রাজাকার’ স্লোগানও সেই রাতে বহুবার দেওয়া হইছে। আন্দোলনে বহুস্রোত ও কন্ঠস্বর এসে মিলেছে। সবাই সবসময় এক বক্তব্য ধারণ করেছে এরকম নয়। বাস্তবতা ও প্রেক্ষাপট অনুযায়ীও বক্তব্য-কর্মকৌশল বদল হইছে বহুবার। ‘বঙ্গবন্ধুর বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই’ স্লোগানও হইছে। স্মার্ট বাংলাদেশের পক্ষেও বহু গুণগান গাওয়া হইছে একসময়। ১৮ সালেও হাসিনা ও মুজিবের ছবি বুকে নিয়ে আন্দোলন হইছে। পরে বুকে রাজাকার লিখে সেই আন্দোলন গতি পাইছে। একটা আন্দোলনে অনেক ডাইমেনশন থাকে এবং বহু পরস্পর বিরোধী ঘটনাও একসাথে ঘটতে পারে। এই সামগ্রিকতাকে ধারণ করেই প্রকৃত ইতিহাস রচিত হয়।

আরও লিখেছেন, রাজাকার ইস্যুটিকে পরিকল্পিতভাবে প্রাসঙ্গিক করা হয়েছিল এবং শিক্ষার্থীদের রাজাকার ট্যাগ দিয়ে আন্দোলনকে নিষ্ঠুরভাবে দমন করার প্রস্তুতি নেওয়া হইছিল। এবং তার ফলশ্রুতিতেই পরদিন মিছিলে হামলা করা হয়। আর এ আন্দোলনে যেহেতু নারী শিক্ষার্থীরা ছিল মূল শক্তি তাই মেয়েদের উপর নির্মমভাবে আক্রমণ করা হয়। তারপরের ঘটনা সকলেই জানেন। ফ্যাসিস্টদের শেষ রক্ষা হয়নি।

১৫ তারিখ সকালে আমাকে বহু মিডিয়া ফেস করতে হইছে রাজাকার স্লোগানের ব্যাখ্যা দিয়ে। আমার ব্যাখ্যাটি ছিল অনেকটা এরকম— রাজাকার শব্দের কোনো প্রাসঙ্গিকতা এই আন্দোলনে ছিল না। প্রধানমন্ত্রী নিজেই রাজাকার ইস্যুর অবতারণা করেছেন এবং শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারদের রাজাকার আখ্যা দিয়ে অপমান করেছেন। প্রতিউত্তরে শিক্ষার্থীরা নিজেদেরকে ‘রাজাকার’ বলে প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যকে বিদ্রুপ করেছে, ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। শিক্ষার্থীদের কোনো প্রকার ট্যাগ দিয়ে এই আন্দোলনকে দমন করা যাবে না। মূলত আন্দোলনকে দমন করার জন্যই রাজাকার ইস্যুকে সামনে আনা হয়েছে। শেখ হাসিনাকে এ বক্তব্য অবশ্যই প্রত্যাহার করতে হবে। 

অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম। পুরোনো ছবি
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম। পুরোনো ছবি

রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে ২০৬ বন্দি বিনিময়

সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) মধ্যস্থতায় আরও ২০৬ বন্দি বিনিময় করেছে রাশিয়া ও ইউক্রেন। দেশ দুটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আলাদাভাবে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। এর আগে গত আগস্ট মাসে ৩০০ বন্দি বিনিময় করেছিল কিয়েভ-মস্কো।

শনিবার রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়, রাশিয়ার ১০৩ বন্দির বিনিময়ে ইউক্রেনের সমান সংখ্যক সেনাকে মুক্তি দিয়েছে তারা। এদিন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও এক এক্স পোস্টে বলেন, সফলতার সঙ্গে আমাদের আরও ১০৩ যোদ্ধাকে রাশিয়ার বন্দিত্ব থেকে ইউক্রেনে ফিরিয়ে এনেছি।

রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ইউক্রেনের কাছ থেকে মুক্ত ১০৩ রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর সদস্য। রাশিয়ার কুরস্ক অঞ্চল থেকে ইউক্রেনের সেনারা সম্প্রতি তাদের আটক করেছিলেন। গত মাসের শুরুর দিকে ইউক্রেনের সেনারা কুরস্ক অঞ্চলে অভিযান শুরু করেন।

ইউক্রেনের হাত থেকে মুক্ত রাশিয়ার যুদ্ধবন্দিরা বর্তমানে বেলারুশে রয়েছেন। সেখানে তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

উল্লেখ্য, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে দুদেশের মধ্যে বন্দি বিনিময়ে মধ্যস্থতা করে আসছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। আরব আমিরাতের দেওয়া তথ্যমতে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তাদের মধ্যস্থতায় রাশিয়া ও ইউক্রেন ১ হাজার ৯৯৪ বন্দি বিনিময় করেছে। 

২০৬ বন্দি বিনিময় করেছে রাশিয়া ও ইউক্রেন। ছবি : সংগৃহীত
২০৬ বন্দি বিনিময় করেছে রাশিয়া ও ইউক্রেন। ছবি : সংগৃহীত

নির্বাচন ইস্যু: বিএনপি-জামায়াত এখন দুই মেরুতে

রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে মতের মিল থাকলেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা ইস্যুতে বড় দুই রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে। সম্প্রতি তৃণমূল থেকে শুরু করে দল দুটির শীর্ষ নেতাদের বক্তব্য ও কথাবার্তায়ও নানা বিষয়ে বৈরীভাব স্পষ্ট হয়েছে। যেটি প্রকাশ্যে আসে গত আগস্টের মাঝামাঝি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে নির্বাচন আয়োজনে সময় দেওয়া নিয়ে শীর্ষ নেতাদের বাহাস চলছে। তাদের বক্তব্যেই তা ফুটে উঠছে। মূলত ক্ষমতায় যাওয়ার লক্ষ্যে বড় দুই দলই যার যার অবস্থান থেকে তৎপরতা চালাচ্ছে।

ছাত্র-জনতার সফল গণঅভ্যুত্থানের মুখে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। এরপর গত ৮ আগস্ট রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর রাষ্ট্র সংস্কারের দাবি উঠেছে সর্বস্তরে। শুরুতে সরকারকে তিন মাসের সময় দেওয়ার কথা বললেও পরে দলটির নেতারা জাতীয় নির্বাচনের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে ‘যৌক্তিক’ সময় দেওয়ার কথা জানান। তবে বিএনপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সঙ্গী জামায়াতে ইসলামী তাড়াহুড়ো না করে টেকসই সংস্কারের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে পর্যাপ্ত সময় দিতে চায়। এসব ছাড়াও এখন আরও কিছু ভিন্ন ইস্যু এতেযোগ হয়েছে। অবশ্য দুই দলের মাঝে আর রাজনৈতিক জোট নেই। অনেকেই বলছেন, এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে। দীর্ঘদিন একসঙ্গে আন্দোলন করা দল দুটি এখন যেন মুখোমুখি অবস্থানে। এ ছাড়া পটপরিবর্তনের পর রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড নিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা বিভিন্ন বক্তব্য দিচ্ছেন, তা পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি বিভিন্ন ইস্যুতে কথা বলার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের কৌশল নিয়েছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছেড়ে কথা বললেও একেবারে চুপ থাকছেন না দল দুটির নেতারা।

এদিকে ছাত্র-জনতার দাবির পরিপ্রেক্ষিতে দেশের মৌলিক ছয়টি খাতে কাঠামোগত সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। গত বুধবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে এ পদক্ষেপের কথা জানান ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সংবিধান, নির্বাচন, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কারে কমিশন গঠনের ঘোষণা দেন তিনি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর আওয়ামী লীগও মাঠে নেই। রাজনীতির মাঠে একধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে। ফাঁকা জায়গায় একটি বড় শক্তি হিসেবে রাজনীতিতে সামনে আসার লক্ষ্যে নানামুখী তৎপরতা চালাচ্ছে জামায়াত।

এদিকে শেখ হাসিনার পতনের পর দীর্ঘ ২৫ বছরের রাজনৈতিক মিত্রদের মধ্যে হঠাৎ কেন এমন বৈরী সম্পর্ক তৈরি হলো, সেটি নিয়েও নানা প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে। গত সপ্তাহে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেবেন না—এমন একটি বক্তব্য দেন। সেই বক্তব্য নিয়েও বিএনপির মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। তবে দুই দলের পক্ষে বলা হচ্ছে তারা ভিন্ন আদর্শ ও লক্ষ্যে রাজনীতি করেন। বিএনপি-জামায়াত দুটি আলাদা রাজনৈতিক দল।

সাম্প্রতিক বক্তব্যে নানা আলোচনা

জানা গেছে, গত বছর দেলাওয়ার হুসাইন সাঈদীর মৃত্যুতে বিএনপির শোক এবং তারেক রহমান ও তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানের সাজার প্রতিবাদে জামায়াতের বিবৃতির পর দুই দল পরস্পরের কাছাকাছি আসতে শুরু করে। সর্বশেষ জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার তুমুল আন্দোলনের সময় জাতীয় ঐক্যের আহ্বানে সাড়া দিলে জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক আরও নিবিড় হয় বিএনপির। কিন্তু ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা নিয়ে উভয় দলের মাঝে মতপার্থক্য তৈরি হয়। বিএনপি নির্বাচন নিয়ে রোডম্যাপ জানতে অতিদ্রুত সংলাপের দাবি জানালেও ভিন্ন অবস্থান নেয় জামায়াত। গত ৩ সেপ্টেম্বর ঢাকায় সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গত ১৫ বছরে জামায়াতে ইসলামীর ওপর আওয়ামী লীগ সরকার ‘নির্যাতন’ করেছে। তার জন্য প্রতিশোধ না নিয়ে ক্ষমা করে দেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি। তার ওই বক্তব্য নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখা যায় রাজনীতির মাঠে। যদিও এক দিন পরে পৃথক অনুষ্ঠানে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান স্পষ্ট করে বলেন, প্রতিশোধ না নেওয়ার মানে হচ্ছে আমরা আইন হাতে তুলে নেব না। কিন্তু সুনির্দিষ্ট অপরাধ যিনি করেছেন, তার বিরুদ্ধে মামলা হবে। শাস্তিও হতে হবে।

জামায়াত আমিরের এসব বক্তব্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয় বিএনপিতে। গত ২৮ আগস্ট গুলশানে দলীয় চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমি আগেই বলেছি, এটা সুপরিকল্পিত একটা চক্রান্ত। কারণ, আমরা তো এক-এগারোর কথা ভুলে যাইনি। এক-এগারোতে যেটা হয়েছিল, বিরাজনীতিকীকরণের প্রচেষ্টা। যাদের জনসমর্থন নেই, জনগণ মনে করে না যে, এরা সরকার চালাতে পারবে। তারা এ ধরনের বিভিন্ন চিন্তাভাবনা করে, আমি কোনো দলের নাম বলছি না। সবচেয়ে বড় জিনিস হচ্ছে, আমাদের লড়াইটা গণতন্ত্রকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য। সেটার জন্যই তো নির্বাচন। আমরা তো নির্বাচনের জন্যই এতদিন লড়াই করেছি। জামায়াতকে ইঙ্গিত করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার যে বাতিল করা হলো, এর জন্য ওই দলগুলো মিলেই তো আমরা আন্দোলন করেছি। অনেককে নির্যাতন ভোগ করতে হয়েছে। এমনকি তাদের অফিস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এখন ওই বিষয়কে বাদ দিয়ে আমি তো অন্য রাজনৈতিক চিন্তা এ মুহূর্তে করব না।

গত ৮ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরায় বিএনপির এক সমাবেশে লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি বক্তব্যে দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সরাসরি জামায়াতে ইসলামীর নাম উল্লেখ না করলেও দলটির আমিরের বক্তব্যের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গত কয়েকদিনে দেখেছি কিছু রাজনৈতিক দল একটি প্রতিবেশী দেশের ফাঁদে পা দিয়েছে। সে কারণে তারা বিভ্রান্ত ছড়ায়—এ রকম কিছু কথাবার্তা বলছে। এমন অবস্থায় নেতাকর্মীদের সজাগ থাকারও আহ্বান জানান তিনি। এ ছাড়া জামায়াতের আমিরের এসব বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জয়নুল আবদিন ফারুক ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীও।

নির্বাচন ইস্যুতে বিপরীতমুখী অবস্থান

গত ৮ আগস্ট জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ওই ভাষণে জাতীয় নির্বাচন কবে কিংবা নির্বাচন কতদিন পর হতে পারে—এমন কোনো বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা ছিল না। যে কারণে এই বক্তব্য নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল বিএনপি। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রধান উপদেষ্টার ভাষণে নির্বাচনের রোডম্যাপ না থাকায় অসন্তোষ জানান। এমন অবস্থায় বিএনপি মহাসচিবের বক্তব্যের সমালোচনা করে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, এখনো শত শত মানুষ হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছে। রক্তের দাগ মোছেনি। বন্যায় দেশ আক্রান্ত। এই সময়ে কেউ নির্বাচন নির্বাচন জিকির তুললে জাতি তা গ্রহণ করবে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জামায়াত নেতার এই বক্তব্য ভালোভাবে নেয়নি বিএনপি। দলটি নির্দিষ্ট সময় না বললেও দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষ করে নির্বাচন চায়। কারণ, নির্বাচিত সরকার ছাড়া দেশে স্থিতিশীলতা আসবে না। আর জামায়াতে ইসলামী অন্তর্বর্তী সরকারকে সময় দিতে চায়। কারণ, আওয়ামী লীগের আমলে গত ১৬ বছরে দলটি সাংগঠনিকভাবে এগোতে পারেনি। এখন সরকারকে সময় দেওয়ার পাশাপাশি নিজেদের প্রার্থী ঠিক করাসহ ভিত্তি মজবুত করতে চায়।

মতবিরোধের আরও যেসব কারণ

জানা যায়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর প্রশাসন, পুলিশ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন জায়গা থেকে আওয়ামী লীগ সমর্থিতরা সরে যাচ্ছেন। সেসব জায়গায় নিজস্ব লোকের পদায়ন নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেও এক ধরনের নীরব মনোমালিন্য চলছে। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি পদে নিয়োগ নিয়ে এই জটিলতা দেখা দেয় গত মাসে। এ ছাড়া জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমের ছেলে আবদুল্লাহিল আমান আযমী গুম অবস্থা থেকে ফেরত আসার পর গত সপ্তাহে জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের দাবি তোলেন। বিএনপি সমর্থকদের অনেকেই এর কড়া সমালোচনা করেন। এসব নানা ইস্যুতে দল দুটির মধ্যে গত এক মাসে দূরত্ব বেড়েছে অনেকটা।

বিএনপি-জামায়াত সম্পর্কের আড়াই দশক

দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ প্রথম ক্ষমতায় আসার পর থেকেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে বেশ বিরোধপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয় জামায়াতের। এরপর বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপির সঙ্গে ১৯৯৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর জোট বাঁধে জামায়াতে ইসলামী। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বাধীন চারদলীয় ঐক্যজোট রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসার পর থেকে বিভিন্ন ইস্যুতে দল দুটির মধ্যে কিছু টানাপোড়েন তৈরি হলেও জোট নিয়ে কোনো ধরনের সংকট তৈরি হয়নি। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও একসঙ্গে অংশ নেয় দল দুটি। ২০০৯ থেকে ২০২৪ একটানা সাড়ে ১৫ বছর রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় আওয়ামী লীগ বিএনপি-জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের বিচারের মুখোমুখি করেছে। যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে জামায়াতের শুধু না বিএনপিরও এক নেতার ফাঁসি হয়েছে। ক্ষমতা ছাড়ার আগ পর্যন্ত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও সাজাপ্রাপ্ত হয়ে গৃহবন্দি ছিলেন। এই সময় জামায়াত-বিএনপির মধ্যে নানা সংকট হলেও রাজনৈতিক জোট ছিল দুই বছর আগ পর্যন্ত। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে দুই দল আনুষ্ঠানিকভাবে জোট ভেঙে দিয়ে সরকার পতনের যুগপৎ আন্দোলন শুরু করে। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকার পতনের পরই সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে বৈঠক, নতুন সরকার গঠন প্রক্রিয়া কিংবা শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান—সব জায়গায় বিএনপি ও জামায়াত একসঙ্গেই অংশ নিয়েছে। তাদের সঙ্গে ছিল গত ১৫ বছরে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে থাকা অন্য আরও কয়েকটি রাজনৈতিক দল। কিন্তু এক মাসের মাথায় নানা ইস্যুতে দল দুটির মতবিরোধ রাজনীতির মাঠে আলোচনার অন্যতম বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দুই দলের নেতারা যা বলছেন

দুটি দলের শীর্ষ পর্যায়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার গতকাল কালবেলাকে বলেন, আমরা মনে করি, আমাদের মধ্যে কোনো দূরত্ব বা টানাপোড়েন নেই। যারা এ ধরনের কথা বলছেন, তার ব্যাখ্যা তারাই দিতে জানেন। বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আমাদের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। নির্বাচন ইস্যুতে বিপরীতমুখী অবস্থান নিয়ে দলের অবস্থান স্পষ্ট করে তিনি বলেন, নির্বাচনের সময় আসুক, ঘোষণা হোক, তখন রোডম্যাপ ও ইশতেহারের প্রশ্ন আসবে। এখনো সেই সময়টা ম্যাচিউরড হয়নি। সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে বিভিন্ন সংশোধন ও সংস্কারে মিনিমাম একটা সময় লাগবে সরকারের। এজন্য আমরা বলেছি একেবারে অল্প সময় দিলেও তারা পেরে উঠবে না, একটা যৌক্তিক সময় দেওয়ার কথাই জামায়াত বলছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী কালবেলাকে বলেন, জামায়াত অন্য রাজনৈতিক দলের মতোই একটা দল। বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের বিরোধের প্রশ্ন আসবে কেন? অনেক নেতা বক্তব্য দিতে পারে, অন্যদের দিকে তাকিয়ে থাকার দরকার হয় না, আমরা আমাদের মতো করে পলিটিক্স করছি। মৌলিক কয়েকটি বিষয়ে সংস্কারের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকারকে একটা যৌক্তিক সময় তো দিতেই হবে।

বিশ্লেষক যা বলেন

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রাহমান মনে করেন, রাজনৈতিক দলের ভিন্নতা থাকতেই হবে। তবে, যে উদ্দেশ্যে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়েছে, সেই বৃহত্তর লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এগিয়ে যাওয়া উচিত। আওয়ামী লীগ যখন প্রতিপক্ষ ছিল, তখন বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে একটা জোট ছিল। রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ না থাকায় এখন ভিন্ন সমীকরণে এই মতপার্থক্য থাকা অস্বাভাবিক নয়।

বিএনপি-জামায়াত এখন দুই মেরুতে

অতীত বিবেচনায় ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে বার্তা দেবে যুক্তরাষ্ট্র: প্রতিনিধিদল ঢাকায় by মিজানুর রহমান

ছাত্র-জনতার রক্তাক্ত অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের চাহিদা মেটাতে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে সহায়তা করতে পারে, তা নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে আলোচনায় ওয়াশিংটনের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদল এখন ঢাকায়। প্রতিনিধিদলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হচ্ছেন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডনাল্ড লু। মার্কিন প্রতিনিধিদলের সব সদস্য শনিবার ঢাকায় পৌঁছান পৃথক ফ্লাইটে। সফরের প্রথমদিনে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তাদের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়েছে। আজ প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ছাড়াও অর্থ উপদেষ্টা, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, পররাষ্ট্র সচিবসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে বৈঠক করবেন তারা। আলোচনায় দু’দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়ন, অর্থনীতি ও অংশীদারিত্বের বিষয় থাকবে বলে কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে। প্রতিনিধিদলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ডনাল্ড লু বাংলাদেশে আসার আগে ৩ দিন ভারতে ছিলেন। তিনি শনিবার বিকালে বাংলাদেশে পৌঁছান।

ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদার বিশেষত ভারত ও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং স্থিতিশীলতা নিশ্চিতে ওয়াশিংটন কীভাবে কাজ করতে পারে তা নিয়ে আলোচনাই লু’র এবারের সফরের মুখ্য উদ্দেশ্যে। দায়িত্বশীল সূত্রের বরাতে এরইমধ্যে খবর বেরিয়েছে, গত ৩ দিনে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সিরিজ আলোচনা হয়েছে সফরকারী মার্কিন প্রতিনিধিদলের। ছাত্র-জনতার সর্বাত্মক আন্দোলনে ভারতের বর্ডার লাগোয়া বন্ধুরাষ্ট্র বাংলাদেশে যে অভাবনীয় রাজনৈতিক পরিবর্তন এসেছে, সেটি তাদের আলোচনার বাইরে ছিল না। যদিও এ নিয়ে এখনো কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলেনি। বাংলাদেশ ও ভারতের অভিন্ন বন্ধু যুক্তরাষ্ট্র। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনাকে দিল্লি পাঠিয়েছিল ওয়াশিংটন। কিন্তু কাজ হয়নি। বিরোধী দলকে বাইরে রেখে অনুষ্ঠিত সেই নির্বাচন নিয়ে যে যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের অবস্থানে ভিন্নতা ছিল সেটি তাদের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংয়ের সফরে প্রমাণ হয়। অনেকে এখন বলছেন, সেই সময়ে বাংলাদেশে সব দলের অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হলে আজ শেখ হাসিনার এই পরিণতি হতো না। বিশ্লেষকরা বলছেন, রাশিয়া থেকে তেল কেনাসহ নানা কারণে সম্পর্কের টানাপড়েন থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র এখনো এ অঞ্চলে ভারতকে তাদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু মনে করে। লু’র দিল্লি সফরে তার ইঙ্গিত রয়েছে। তবে ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজির কেন্দ্রস্থলে থাকা বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের স্বাতন্ত্র্যতা রয়েছে সেটি ট্রাম্প আমল থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত দফায় দফায় স্পষ্ট করেছে ওয়াশিংটন। এটা প্রতিষ্ঠিত যে, এক সময় দিল্লির চোখেই বাংলাদেশকে দেখতো যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু না, গত ক’বছরে সম্পর্কের চরম টনাপড়েনের মধ্যেও ঢাকার সঙ্গে সরাসরি ডিল করেছে ওয়াশিংটন। বিশেষ করে ২০১৬ সালে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের ঢাকা সফরের পর থেকে। পর্যবেক্ষকরা বলছে, নানা কারণে মার্কিন ফরেন পলিসিতে বাংলাদেশ স্বতন্ত্র জায়গা করে নিয়েছে। গণতন্ত্রকামী বাংলাদেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষা এবং ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানই এখানে মুখ্য। বাংলাদেশের পট পরিবর্তনে নানা কথা চাউর রয়েছে। কিন্তু ওয়াশিংটন এটা স্পষ্ট করেছে যে, যেটুকু পরিবর্তন এসেছে তা বাংলাদেশের দেশের মানুষই ঘটিয়েছে। পরিবর্তিত বাংলাদেশ তথা নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে কাজ করতে যে যুক্তরাষ্ট্র সর্বোতভাবে প্রস্তুত, সেটি স্টেট ডিপার্টমেন্টের বিফ্রিংয়ে বারবার পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে অতীতের টানাপড়েন বিবেচনায় নিয়ে অর্থাৎ নিকট অতীতে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। যা বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে ছায়া ফেলেছ। সেটি মনে রেখেই পরিবর্তিত বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেবে যুক্তরাষ্ট্র। এই বার্তা দিতেই নতুন সরকারের এক মাসের মাথায় মার্কিন প্রতিনিধিদলের এবারের সফর হচ্ছে।  

সফর নিয়ে মার্কিন কূটনীতিক জন ড্যানিলোভিজের মূল্যায়ন: এদিকে মার্কিন প্রতিনিধিদলের সফরের সম্ভাব্য দিক বিশ্লেষণ করেছেন স্বাধীন বৈদেশিক নীতি বিশ্লেষক এবং অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র ফরেন সার্ভিস অফিসার জন ড্যানিলোভিজ। একযুগ আগে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে গেছেন তিনি। একটি নিবন্ধে তিনি বলেন, বাইডেন প্রশাসনের আন্তঃএজেন্সি প্রতিনিধিদল শিগগিরই  বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং তার সহকর্মীদের সঙ্গে দেখা করবেন। যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যতের পথ নির্ধারণের উদ্দেশ্যেই এই সাক্ষাৎ। মার্কিন ট্রেজারির ডেপুটি আন্ডার সেক্রেটারি ব্রেন্ট নেইম্যানের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল এখন ঢাকায়। বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লবের পর থেকে দুই দেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে এই প্রথম  আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ হতে চলেছে, তথাপি এই বৈঠক পরবর্তী মাসগুলোর জন্য একটা দিশা দেখাতে পারে (অন্তত ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে একটি নতুন মার্কিন প্রশাসন দায়িত্ব না নেয়া পর্যন্ত)। যদিও বৈঠকের ফোকাস থাকবে সামনের দিকে, তবে উভয়পক্ষই সামপ্রতিক ইতিহাস সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত। ইতিবাচক দিক হলো, সামপ্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র (বিশেষ করে সাবেক রাষ্ট্রদূত পিটার হাস্‌) বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের সমর্থনে সোচ্চার ছিল। একই সময়ে, মার্কিন নীতির সমালোচকরা  উল্লেখ করেছেন যে, ওয়াশিংটন তার বক্তব্যের সমর্থনে আরও কিছু করতে পারতো, বিশেষ করে বাংলাদেশে  ২০২৪ সালের জানুয়ারির নির্বাচনের ঠিক আগে এবং পরের মাসগুলোতে। তা সত্ত্বেও অন্তর্বর্তী সরকার গঠন এবং প্রধান উপদেষ্টা পদে অধ্যাপক ইউনূসের নিয়োগকে স্বাগত জানিয়েছে ওয়াশিংটন।

ঢাকায় একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল পাঠানোর সিদ্ধান্তটি অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে জড়িত থাকার ওয়াশিংটনের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। এর থেকে বোঝা যায় যে,  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র   দু-দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের দিকে মনোনিবেশ করতে চাইছে। একটি ইস্যু যা এই সফরে বড় হয়ে উঠবে তা হলো ভারতের নজরে না দেখে বাইডেন  প্রশাসন কি তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে  বাংলাদেশের সমস্যার মোকাবিলা করতে প্রস্তুত?  ওয়াশিংটন পোস্ট এবং বেশকিছু  রিপোর্ট  প্রমাণ করে যে বিষয়টি নিয়ে কিছু সংশয় রয়েছে। আসলে বাংলাদেশ সফরের আগে মার্কিন প্রতিনিধিদলের  ভারতে পা রাখার বিষয়টি এই জল্পনাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে যে দুই প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য কীভাবে রাখতে হয় সেই পাঠ এখনো শেখেনি যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিনপক্ষের তরফে  তাদের বাংলাদেশি প্রতিপক্ষদের আশ্বস্ত করা গুরুত্বপূর্ণ যে তারা অন্য কারও সুরে কথা বলছে না। সামপ্রতিক বছরগুলোতে, যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সংলাপের বেশির ভাগই চীন এবং ওয়াশিংটনের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে। চীনের কথা মাথায় রেখে জাতীয় নিরাপত্তার ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছেন মার্কিন কর্মকর্তারা।  হাসিনা সরকার এবং তার সমর্থকরা বেইজিংয়ের  কাছাকাছি যাওয়ার কৌশল নিয়ে বাংলাদেশের  গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের প্রতি আমেরিকার মনোযোগ সরাতে চেয়েছিলেন।   কখনো কখনো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেই  ফাঁদে পা দিয়েছিল বলেও  মত বিশেষজ্ঞদের।  ৫ই আগস্ট হাসিনা সরকারের পতনের সঙ্গে সঙ্গে, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তার উন্নয়নে বাংলাদেশের ভূমিকাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার সুযোগ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে। বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাব্য সামরিক ভূমিকার দিকে মনোনিবেশ করার পরিবর্তে, চীনকে ঠেকাতে জুলাই বিপ্লবের প্রতিশ্রুতি পূরণ করা একটি শক্তিশালী বিকল্প হয়ে উঠতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে। একটি পারস্পরিক  অংশীদারিত্বের বিকাশে প্রতিশ্রুতি প্রদর্শনের জন্য উভয়পক্ষের কাছে বেশ কয়েকটি সুযোগ রয়েছে। প্রথমত, গত পনেরো বছরে সংঘটিত অপরাধের জন্য বাংলাদেশের জবাবদিহিতার আকাঙ্ক্ষাকে সমর্থন করার ক্ষেত্রে  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ  অবস্থানে রয়েছে (জুলাই/আগস্টে বিশেষ ফোকাসসহ)। এর মধ্যে রয়েছে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘনের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের ফৌজদারি বিচারের আওতায় আনার পাশাপাশি আর্থিক অপরাধের জন্য দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি দেয়ার প্রচেষ্টা। সহযোগিতার অন্যান্য ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার এজেন্ডাকে সমর্থন (দ্বিপক্ষীয় এবং বহুপক্ষীয় সংস্থার মাধ্যমে) অন্তর্ভুক্ত। নিঃসন্দেহে, রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যার  আরও টেকসই সমাধান নিয়ে উভয় দেশ  আলোচনা করবে। 

mzamin

জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে বিএনপির ৪২২ জন নিহত: ফখরুল

‘জুলাই গণহত্যায়’ গত ১৩ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্যমতে সমগ্র বাংলাদেশে ৮৭৫ জন মানুষ শহীদ হয়েছেন বলে জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ‘এরমধ্যে কমপক্ষে ৪২২ জন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। দেশজুড়ে শহীদ হওয়া সকল শ্রেণি-পেশা ও রাজনীতির মানুষগুলোর এ বিশাল অংশ যে বিএনপিরই নেতাকর্মী-এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং আমাদের সুদীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের অনিবার্য ফল।’

রোববার বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘পোশাকশ্রমিক কিংবা রিকশাচালক, পাবলিক কিংবা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, বাম কিংবা ডান আদর্শের অনুসারী, সকল মত ও পথের রাজনৈতিক কিংবা অরাজনৈতিক ব্যক্তি হতাহতের পরিচয় যাই হোক না কেন, প্রতিটি প্রাণের মূল্য ও রক্তের মর্যাদা সমান। আর তাই সমান গুরুত্বের সঙ্গেই প্রণয়ন করতে হবে প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের তালিকা এবং নিশ্চিত করতে হবে সুবিচার। শেখ হাসিনার পদত্যাগের জন্য যে জাতীয় ঐকমত্য আমরা দেখতে পাই, তা কিন্তু হঠাৎ করে গড়ে ওঠেনি। এটি মূলত অবৈধ সরকারের অত্যাচার-অবিচার, দুর্নীতি-দুঃশাসন, বঞ্চনা-অবজ্ঞা ও শোষণ-নির্যাতনের বিরুদ্ধে মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।’

তিনি বলেন, ‘১৬ জুলাই রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে নির্মমভাবে হত্যা করে পুলিশ; একই দিন চট্টগ্রামে চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ওয়াসিম আকরামকেও হত্যা করা হয়। এ হত্যাকাণ্ডগুলোতে সমগ্র বাংলাদেশ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে, বেগবান হয় আন্দোলন। ১৮ জুলাই ঢাকার উত্তরায় আন্দোলনে পানি বিতরণ করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের ছাত্র মীর মুগ্ধ, একই দিন যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের গুলিতে নিহত হন ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ছাত্রদল নেতা ইরফান ভূঁইয়া ও সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির ছাত্রদল নেতা ইমতিয়াজ আহমেদ জাবির।’

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘স্বৈরাচারের পতন ঠেকাতে আওয়ামী লীগ বরাবরের মতোই বিএনপিকে প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে চিহ্নিত করে এবং আন্দোলনকে দমন করতে নিপীড়নের মাত্রা বাড়ায়। বহুমাত্রিক নিপীড়ন মোকাবিলা করেই বিএনপি নিরবিচ্ছিন্নভাবে রাজপথের অগ্রভাগে ছিল। বিশেষত, আগস্টের ৪ ও ৫ তারিখে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে শেখ হাসিনাকে পদত্যাগে বাধ্য করার সংগ্রামে জীবন দেন ঢাকা মহানগর পূর্ব ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুর রহমান রাসেল, জালাল উদ্দিন ডিগ্রি কলেজের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আসিফ হোসেন, সোনারগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল নেতা রাসেল মাহমুদ, যশোর জেলা ছাত্রদল নেতা সাকিবুল হাসান মাহি প্রমুখ। এভাবে শুধু ছাত্রদল থেকেই একে একে কমপক্ষে ১১৩টি তাজা প্রাণ ঝরে পড়ে ছাত্র-জনতার সফল অভ্যুত্থানে।’

তিনি বলেন, ‘কুমিল্লায় ছাত্রদল নেতা পারভেজ হোসেনকে হত্যা করে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা, আর ছাত্রলীগ-যুবলীগের গুলিতে শেরপুরে পাকুরিয়া ইউনিয়ন ছাত্রদল নেতা মাহবুব আলম নিহত হন। কারাবন্দি নাসিরুদ্দিন পিন্টু ও বিএম বাকির হোসেনকে হত্যার মাধ্যমে যে নৃশংস সংস্কৃতি সূচনা করে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা, তারই ধারাবাহিকতায় রংপুরের লক্ষ্মিটারী ইউনিয়নের বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মনোয়ারুল ইসলাম ও অন্তত আরও ২০ জন বিএনপি নেতাকে নির্যাতনের মাধ্যমে কারাগারে খুন করা হয়। এসব হৃদয়বিদারক ঘটনায় ২০১৩ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হন বিএনপির ১ হাজার ৫৫১ জন নেতা-কর্মী। তাদের রক্তের ঋণ শোধ করতে হলে আমাদেরকে যেকোনো মূল্যে বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’

ফখরুল বলেন, ‘এ বিজয়ের পেছনে রয়েছে অসংখ্য নির্যাতিত মানুষের বেদনার অপ্রকাশিত ইতিহাস, গুম হওয়া ছেলের ফেরার প্রতীক্ষায় ব্যথাতুর মায়ের ডাক, স্বামী হারানো বেদনাবিধুর স্ত্রীর অনন্ত আর্তনাদ, পঙ্গু বাবার জন্য সন্তানের হৃদয়বিদারক হাহাকার, আর কারাগারে বন্দী ভাইয়ের জন্য বোনের নীরব প্রার্থনা। তাদের সকলের ১৬ বছরের রক্ত, শ্রম ও অশ্রু দিয়ে, প্রতিটি পরিবারের ক্ষোভ, ক্রোধ ও অব্যক্ত বিস্ফোরণ বুকে ধারণ করে চলমান ছিল শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই। বস্তুত, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ৪২২ জন, ২০২৩ সাল পর্যন্ত শহীদ ১ হাজার ৫৫১ জন, গুম ৪২৩ জন (সকল রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষ মিলিয়ে প্রায় ৭০০ জন), আসামি ৬০ লাখ ও মামলা দেড় লাখ-এসব কেবল বিএনপির ত্যাগের পরিসংখ্যানই নয়। বরং বাংলাদেশের দ্বিতীয় স্বাধীনতা অর্জনের পথে দলটির অবিচল সংগ্রাম ও অবদানের প্রতিফলন।’

বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি যারা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনে যুক্ত ছিল-গণতান্ত্রিক প্রতিটি ব্যক্তি, দল, সংগঠন ও গোষ্ঠী তাদের সকলের আত্মত্যাগের যথাযথ স্বীকৃতি না দিলে তা হবে ইতিহাসের প্রতি অবিচার। সকল শ্রেণি-পেশা ও মতের মানুষের অংশগ্রহণকে সম্মান জানিয়ে জনগণের লুণ্ঠিত ভোটাধিকার ফিরিয়ে এনে একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাই আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। সেই পথযাত্রায় ও রাষ্ট্র সংস্কারে বিএনপি ঘোষিত ৩১ দফা বাস্তবায়ন করে গড়ে তুলতে হবে একটি নিরাপদ ও মেধাভিত্তিক বাংলাদেশ, যেখানে প্রতিফলন ঘটবে জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশার।’

সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, ড. আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, সালাহউদ্দিন আহমেদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
mzamin

সফলভাবে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের দাবি ইরানের

মহাকাশে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের দাবি করেছে ইরান। নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই প্রযুক্তি খাতে নিজেদের সক্ষমতা জানান দিলো দেশটি। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে উদ্ধৃত করে এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এপি। এতে বলা হয়, শনিবার দেশটির আধাসামরিক বিপ্লবী গার্ড দ্বারা নির্মিত একটি রকেটের মাধ্যমে মহাকাশে ওই স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করেছে তেহরান। মহাকাশের কক্ষপথে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের এটি তেহরানের দ্বিতীয় প্রচেষ্টা বলে দাবি করা হয়েছে। দেশটির মহাকাশ বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছে যে, স্যাটেলাইটটি নির্দিষ্ট দূরত্ব পরিভ্রমণ করে কক্ষপথে পৌঁছেছে। স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত ফুটেজে দেখা গেছে, মোবাইল লঞ্চার থেকে রকেট বিস্ফোরণ হয়েছে। এপির বিশ্লেষণে বেরিয়ে এসেছে যে, তেহরানের প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার পূর্বে শাহরুদ শহরের উপকণ্ঠে বিপ্লবী গার্ডের একটি ঘাঁটি থেকে এই উৎক্ষেপণ প্রক্রিয়া পরিচালনা করা হয়েছিল। স্যাটেলাইট বহনকারী রকেটটি কায়েম-১০০ নামে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর আগে জানুয়ারিতে একই নামের স্যাটেলাইট বহনকারী রকেট ব্যবহার করেছিল ইরান।

রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বলছে, তিন স্তর বিশিষ্ট এই রকেটটির ৬০ কিলোগ্রাম ওজনের চামরান-১ নামের স্যাটেলাইটটিকে ৫৫০ কিলোমিটার কক্ষপথ ঘুরে গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছে। রকেটটিতে পবিত্র কুরআনের একটি আয়াত লিখা ছিল। ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেছে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সহায়ক সংস্থা এবং মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞরা ‘অরবিটাল ম্যানুভার প্রযুক্তির বৈধতার জন্য হার্ডওয়্যার এবং সফটওয়্যার সিস্টেমগুলো পরীক্ষা করে এই স্যাটেলাইটটি তৈরি করা হয়েছে।’ বিপ্লবী গার্ডের প্রধান জেনারেল হোসেইন সালামি এক বিবৃতিতে মহাকাশে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেছেন, নিপীড়ক বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে বিজ্ঞানীরা দারুণ সফলতা পেয়েছে।

গাজা উপত্যকায় চলমান ইসরাইল-হামাস সংঘাতে গোটা মধ্যপ্রাচ্য ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে ইরানের মহাকাশে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের খবর এল। এর কয়েক মাস আগেই তেহরান ইসরাইলকে লক্ষ্য করে শতাধিক ড্রোন হামলা চালিয়েছিল। এদিকে ইরান অস্ত্র-গ্রেড স্তরে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করে চলছে। এতে পশ্চিমাদের উদ্বেগ বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরও ইরানের স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা জানিয়েছে, ইরান আমাদের দীর্ঘদিনের উদ্বেগ স্পষ্ট করে দিয়েছে। তেহরানের মহাকাশ উৎক্ষেপণ যানের প্রোগ্রামগুলো দেশটির দূর-পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার পথ প্রসারিত করছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর আরও বলেছে, ‘আমরা ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির আরও অগ্রগতি এবং ক্ষেপণাস্ত্র বিস্তারের ক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির মোকাবিলায় আমাদের মিত্র ও অংশীদারদের সাথে সমন্বয় করে কাজ করে যাচ্ছি।’ ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে দূর-পাল্লার অস্ত্র সরবরাহ করার অভিযোগে গত সপ্তাহে ইরানকে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্র দেশগুলো। এর মাধ্যমে ইরানের সাথে ইউরোপের দেশগুলোর বাণিজ্য কঠিন হয়ে পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তাদের দেশে ইরান থেকে সরাসরি বাণিজ্যিক ফ্লাইট বাতিল হতে পারে। যদিও ইরানের জন্য মার্কিন এই নিষেধাজ্ঞা নতুন কিছু নয়।

‘নিষেধাজ্ঞা আরোপকারীদের বিরুদ্ধে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ একটি সুস্পষ্ট জবাব’

পদত্যাগ করছেন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল

আগাম নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আকস্মিক পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। রোববার (১৫ সেপ্টেস্বর) দুপুরে দলীয় সম্মেলনে নিজেই একথা ঘোষণা করেন তিনি। এসময় তিনি জানান, পুনরায় ভোটে না জেতা পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রীর পদে আর ফিরবেন না। খবর এনডিটিভির।

সংবাদমাধ্যম বলছে, জামিনে মুক্তির পর এবার দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন অরবিন্দ কেজরিওয়াল। রোববার দুপুরে দলীয় এক সম্মেলনে আম আদমি পার্টির (আপ) প্রধান জানিয়েছেন, দুদিন পরেই মুখ্যমন্ত্রী পদ ছেড়ে দেবেন তিনি।

দিল্লির আবগারি দুর্নীতি মামলায় প্রায় ৬ মাস জেলে ছিলেন কেজরিওয়াল। শীর্ষ আদালতের নির্দেশে গত শুক্রবার কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন দিল্লির এই মুখ্যমন্ত্রী। জেলমুক্তির দুদিনের মধ্যেই এবার মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি।

রোববার দুপুরে দলীয় বৈঠকে কেজরিওয়াল বলেন, দুদিন পরে আমি মুখ্যমন্ত্রী পদে ইস্তফা দেব। যতদিন না জনতার রায় পাচ্ছি, ততদিন আমি এই আসনে আর ফিরব না। কয়েক মাস পরেই দিল্লিতে ভোট রয়েছে। আদালতে আমি বিচার পেয়েছি। এবার জনতার আদালতে বিচার পাওয়ার অপেক্ষায় আছি। মানুষ যে দিন চাইবে, সে দিনই আমি আবার মুখ্যমন্ত্রীর পদে ফিরব।

একইসঙ্গে দিল্লিবাসীর উদ্দেশেও কেজরিওয়ালের অনুরোধ, যদি মানুষ তাকে নির্দোষ বলে মনে করেন, যদি মানুষ ভাবেন তিনি দিল্লির জন্য কাজ করেছেন, তবে তাকে যেন পুনরায় ভোট দেওয়া হয়।

এদিকে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীর পদে ইস্তফা দেওয়ার পর কেজরিওয়ালের আসনে কে বসবেন তা নিয়ে এখনো স্পষ্ট কিছু জানা যায়নি। তবে কেজরিওয়াল জানিয়েছেন, দলের মধ্যে থেকেই কাউকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বেছে নেওয়া হবে। তবে কে হতে পারেন তা নিয়ে ধোঁয়াশা রেখে দিয়েছেন আম আদমি পার্টির এই প্রধান।

সংবাদমাধ্যম বলছে, সব কিছু ঠিক থাকলে প্রায় পাঁচ মাস পরেই দিল্লিতে বিধানসভা নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মূলত নির্বাচন হতে পারে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে। তবে কেজরিওয়াল দাবি জানিয়েছেন যনে সেই নির্বাচন এগিয়ে আনা হয়।

দিল্লির বিদায়ী এই মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, আগামী নভেম্বরে মহারাষ্ট্রের ভোটের সঙ্গেই দিল্লিতে নির্বাচন আয়োজন করা হোক। কেজরিওয়ালের বক্তব্য, মুখ্যমন্ত্রীর পদ ছাড়ার পর থেকে ভোটের আগে পর্যন্ত যেটুকু সময় পাবেন, ওই সময়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাইবেন তিনি।

দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। ছবি : সংগৃহীত
দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। ছবি : সংগৃহীত

মাকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদলেন মুশফিক আনসারী by ওয়েছ খছরু

সময় বড় কঠিন ছিল। একদিকে দেশ। অন্যদিকে মায়ের টান। সিলেটে থাকা মাকেও নানা সময় গোয়েন্দা জেরার মুখে পড়তে হয়েছে। পরিবার নিয়ে ছিল দুশ্চিন্তা। এই ক্যালকুলেশনে দেশের পক্ষেই থাকলেন সাংবাদিক মুশফিকুল ফজল আনসারী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউস কিংবা স্টেট ডিপার্টমেন্ট সবখানে দেশের মানুষের জন্য দৌড়ঝাঁপ করলেন। বিগত ১৬ বছরের দুঃশাসনের চিত্র তুলে ধরলেন বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক মহলে। দীর্ঘ ১০ বছর পর তার এই সাধনায় ফলাফল এলো। ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মুক্ত হলো পরিবেশ। দীর্ঘদিন এই পরিবেশের অপেক্ষায় ছিলেন মুশফিকুল। শেখ হাসিনামুক্ত দেশ হওয়ার পরপরই তিনি দেশে আসার প্রস্তুত নিলেন। শুক্রবার এলেন ঢাকায়। আর গতকাল শনিবার ছুটে এলেন জন্মভূমি সিলেটে। এখানে বসবাস করেন তার বৃদ্ধ মা মজমুনা বেগম চৌধুরী। দুপুর তখন একটা। নগরের বনকলাপাড়াস্থ মুয়াল্লিম মঞ্জিলে তখন পিনপতন নীরবতা। বিমানবন্দর থেকে গাড়ি নিয়ে ছুটে এলেন বাসায়। সেখানে অপেক্ষায় ছিলেন অসুস্থ মা। ঘরে ঢুকেই মাকে সালাম করে জড়িয়ে ধরলেন মুশফিকুল। মা ও ছেলে কাঁদলেন দীর্ঘক্ষণ।

দীর্ঘদিন পর দেখা। এমন পরিবেশে সবার চোখে জল। উপস্থিত স্বজনরা মানবজমিনকে জানিয়েছেন, মা ও ছেলের এই দেখা আবেগময় পরিবেশের জন্ম দেয়। ছেলের জন্য অস্থির ছিলেন মা। আর মায়ের দেখা পেতে অস্থির ছিলেন মুশফিকুল ফজল আনসারীও। ফলে ১০ বছর পর দেখায় তাদের চোখে কেবলই জল। বেশি আবেগাপ্লুত ছিলেন মুশফিক। বার বার ফিরে ফিরে মাকেই দেখছিলেন। স্বজনদের সঙ্গে কথা বলছিলেন। দুপুরের দিকে বিএনপি’র কয়েকজন নেতাকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকা থেকে বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসেন মুশফিকুল। এ সময় সেখানে দুই বোন সহ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। তবে; উপস্থিতির মধ্যে বেশির ভাগই ছিলেন বিএনপি’র নেতাকর্মী। ছিলেন সিলেটের সাংবাদিকরাও। বিমান থেকে নামার পরপরই ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত হন মুশফিকুল। একে একে সিলেট বিএনপি’র নেতারা তাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। সাবেক মেয়র ও বিএনপি’র চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আরিফুল হক চৌধুরী গিয়েছিলেন সাংবাদিক মুশফিককে বরণ করতে। দেখা হতেই করমর্দন ও কোলাকুলি করেন। জেলা ও নগর বিএনপি’র নেতারা তাকে রিসিভ করে গাড়ি পর্যন্ত নিয়ে আসেন। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন; প্রায় ১০ বছর আগে বাংলাদেশ ছেড়েছিলেন সাংবাদিক মুশফিকুল ফজল আনসারী। শেষ বার যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আগে বাসায় মায়ের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। ভার্চ্যুয়ালি কথা হলেও সরাসরি দেখা হয়নি। সাংবাদিক হিসেবে যখন হোয়াইট হাউস ও স্টেট ডিপার্টমেন্টে ভূমিকা রাখছিলেন তখন দেশে থাকা মা মজমুনা বেগম চৌধুরী, বোন আফিয়া সুলতানা, খালেদা আনসারীকে বার বার গোয়েন্দা জেরার মুখে পড়তে হয়েছে। প্রতি মাসেই একবার গোয়েন্দারা তার বাসায় আসতো।

নানা ধরনের প্রশ্নবাণে মা ও বোনদের জর্জরিত করতো। পুরুষশূন্য বাসায় অনেক সময় গায়ের জোরে ঢুকে পড়তো। অনেক সময় হুমকির সুরেও কথা বলতো। স্বজনদের মতে; সিলেটের গোয়েন্দাদের এই তৎপরতার কারণ ছিল দেশে থাকা স্বজনদের মাধ্যমে মুশফিকুল ফজল আনসারীকে চাপের মুখে রাখা। কিন্তু শত চাপেও তিনি মাথা নত করেননি। বিগত সরকারের নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকেন যুক্তরাষ্ট্রে। এ কারণে সাংবাদিক মুশফিকুলও দেশের মানুষের কাছে আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেন। তার এই ভূমিকার কারণে এখন পতিত সরকারের পতনের অন্যতম নায়ক হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে তাকে। সিলেটে এসেই মায়ের সঙ্গে দেখা করার আগে সিলেটের প্রাচীন গোরস্থান হযরত মানিকপীর (রহ.) কবরস্থান জিয়ারতে যান মুশফিকুল। সেখানে শায়িত আছেন তার দাদা, চাচা সহ পরিবারের স্বজনরা। সেখানে তিনি আত্মীয়স্বজন ও বিএনপি’র নেতাকর্মীদের নিয়ে কবর জিয়ারত করেন। সাংবাদিক মুশফিকুলের বড় বোন আফিয়া সুলতানার স্বামী সিলেটের সাংবাদিক ও সাহিত্যিক সেলিম আউয়াল।

 সিলেটে ফেরার পর থেকে তাকে সব সময় সঙ্গ দিচ্ছেন তিনি। সংবাদ সংস্থা বাসসের এই সাংবাদিক মানবজমিনকে জানিয়েছেন, ১০ বছর আগে যেমনি সাদামাটা ছিলেন মুশফিকুল, এখনো তেমনটিই রয়েছেন। সিলেটে তাকে থাকার জন্য উন্নত সুযোগ-সুবিধায় সমৃদ্ধ একটি রিসোর্ট বুকিং দিয়ে রাখা হয়েছিল। কিন্তু মুশফিকুল সেই রিসোর্টে উঠবেন না বলে জানিয়েছেন। মায়ের কাছে নিজ বাসাতেই তিনি থাকছেন। এ ছাড়া, পাশের বাসায় সবাইকে নিয়ে এক সঙ্গে খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সেখানেও যাননি তিনি। মাকে সঙ্গে নিয়ে নিজ বাসায় বসেই দুপুরের খাবার খেয়েছেন। সিলেটে ফেরা সাংবাদিক মুশফিক ফজল আনসারী খুব দ্রুতই নিহত সাংবাদিক এটিএম তুরাবের বাসায় যাবেন বলে জানিয়েছেন। এ ছাড়া, সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন।

গতকাল শনিবার বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় সাংবাদিক মুশফিকুল ফজল আনসারী এক সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছেন; সিলেটে আমার জন্মভূমিতে আসতে পেরেছি সেজন্য আমি আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জানাই। যারা বিমানবন্দরে কষ্ট করে এসেছেন সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। বিপ্লব ও বাংলাদেশের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে যারা তাদের নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। যারা আহত অবস্থায় আছেন তাদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করছি। এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করছি। তিনি বলেন- বিশ্বে আমরা একটি সমৃদ্ধ, বৈষম্যমুক্ত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়তে সকলের সম্মিলিত সহযোগিতায় সক্ষম হবো। আমি মনে করি যদিও আমি পলিসি লেভেলের কেউ না তবুও সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়তে পারবো।

mzamin

এনটিআরসিএ: পদে পদে অনিয়ম হয়রানি by পিয়াস সরকার

দুর্নীতি ও হয়রানির জন্যই যেন এই প্রতিষ্ঠান। প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চাকরি দেয়াই কাজ বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)’র। হাজার হাজার শূন্যপদ রেখেও পদায়ন না করা, ভুয়া সনদ, গণবিজ্ঞপ্তি জারিতে কালক্ষেপণ, বদলির ব্যবস্থা না রাখা এসবই করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। চাকরিপ্রত্যাশীদের দিনের পর দিন করে যেতে হচ্ছে দাবি আদায়ের আন্দোলন। আদালত পাড়াতেও গুনতে হচ্ছে লাখ লাখ টাকা। আর প্রতিষ্ঠানটি আয় করছে কোটি কোটি টাকা। ঘুষ ছাড়া কোনো ফাইল নড়ে না প্রতিষ্ঠানটির।

চেয়ারম্যান আসে, চেয়ারম্যান যায়। কিন্তু বন্ধ হয় না হয়রানি। চাকরিপ্রত্যাশী বেকার কেউ নিবন্ধন পরীক্ষায় পাসের মধ্যদিয়েই যেন নাম লেখান ভোগান্তির খাতায়। শুরুতেই আন্দোলন করতে হয় গণবিজ্ঞপ্তির জন্য। বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে শিক্ষক নিয়োগে জটিলতা ও দুর্নীতি নিরসনে শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা চালু করা হয় দেড় দশক আগে। আর এসব শিক্ষক নিয়োগের জন্য সরকার ২০০৫ সালে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ এনটিআরসিএ প্রতিষ্ঠা করে। দেশের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে চাকরির জন্য আবেদন একবার করতে হলেও এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম এনটিআরসিএ। তাদের নিয়ম জটিলতায় কয়েক ধাপে আবেদন করতে হয় প্রার্থীদের। ২০২২ সালে এনটিআরসিএ কর্তৃক বৈধ সনদ পান মো. আশরাফুল ইসলাম। তিনি বলেন, প্রায় তিন বছর অপেক্ষা ও টেবিলে টেবিলে ঘুরতে হয়েছে। এমনকি করতে হয়েছে দলগত আন্দোলন। এরপর সনদ পাওয়ার পরও স্বস্তি মেলেনি আমাদের। শূন্যপদ থাকা সাপেক্ষে করতে হয়েছে আবেদন। এরপর আমাকে প্রায় ৪০০ পদের জন্য আবেদন করতে হয়েছে। তাতে আমার খরচ হয়েছে প্রায় ৬০ হাজার টাকা। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন- আমাকে কেন আলাদা আবেদন করতে হবে। আমি সনদ দেখিয়ে আবেদন করবো, পছন্দক্রম দেবো- এটা তো হওয়ার কথা।

আশরাফুলের মতো হাজারো প্রার্থীকে গুনতে হয়েছে হাজার হাজার টাকা। যাতে আকাশচুম্বী আয়ও হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। তৃতীয় গণবিজ্ঞপ্তিতে ৩৪ হাজার শিক্ষক নিয়োগের আগে এসব আবেদনের প্রেক্ষিতে এনটিআরসিএ আয় করে প্রায় ২০৩ কোটি টাকা। এনটিআরসিএ’র নিয়মই যেন এক একটা ফাঁদ। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শূন্যপদের প্রেক্ষিতে নিয়োগের জন্য প্রিলিমিনারি, লিখিত, মৌখিক ও জাতীয় সম্মিলিত মেধা তালিকায় স্থান পেতে হয়। এরপর নিয়োগের জন্য গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশের জন্য প্রার্থীদের কাছে আবেদন নেয়া হয়। শেষ ধাপে মেধা তালিকার শীর্ষ সারি থেকে শূন্যপদে একজন শিক্ষককে সুপারিশ করা হয়। এসব ধাপে ভোগান্তি চরম মাত্রায় ঠেকেছে। এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি পর্যায়েই মামলার খড়গে আটকে গেছে প্রায় সকল সিদ্ধান্ত। বেকার চাকরিপ্রত্যাশীদের আশা দেখিয়ে নিয়মের মারপ্যাঁচে আটকে রাখা হয়। এনটিআরসিএ শিক্ষক হিসেবে নিবন্ধিত হওয়ার জন্য প্রথম ধাপে পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। সেখানে স্কুল বা কলেজ ক্যাটাগরিতে প্রার্থীরা আবেদন করেন। একটি আবেদনের খরচ ৩৫০ টাকা। আবার শিক্ষক হিসেবে চূড়ান্ত উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য প্রতিটি শূন্যপদের বিপরীতে আবেদন ফি ১০০ টাকা।

আদালতের সিদ্ধান্তে ২০১৮ সালে প্রকাশিত দ্বিতীয় গণবিজ্ঞপ্তিতে ৪০ হাজার শিক্ষক পদে নিয়োগ দেয় এনটিআরসিএ। এরপর বিভিন্ন ব্যাচের চাকরিপ্রত্যাশীরা আদালতের দ্বারস্থ হন। এ নিয়ে তৎকালীন সময়ে রিট হয়েছিল ১৬৬টি। এমনকি এসব নিষ্পপ্তি হওয়ার পরও ১৩তম নিবন্ধনধারীদের নিয়ে দু’রকম আদেশ আসায় সেটি নিয়েও ধোঁয়াশা তৈরি হয়। শুধু এটি নয়, জটিলতা ছিল ২০১৮ সালে নিয়োগ পাওয়া প্রার্থীরা ছিলেন ২০১৫ সালের সনদধারী। ফলে পিছিয়ে থাকায় দ্বিতীয় এবং তৃতীয় গণবিজ্ঞপ্তিতে তারা শত শত বিদ্যালয়ের শূন্যপদে আবেদন করেও চাকরির সুপারিশ পাননি।

তৃতীয় গণবিজ্ঞপ্তি প্রত্যাশীরা আরও কঠিন সময়ের মধ্যদিয়ে সময় পার করেন। তারা পরীক্ষার উত্তীর্ণ হওয়ার পর দেশে করোনার কারণে স্থবিরতা চলে আসে। এ সময়টায় তারা দীর্ঘ সময় আন্দোলন করেন। শুধু তাই নয়, এই নিয়োগ প্রক্রিয়া এতটাই জটিল ছিল যে, কোনো কোনো পক্ষকে আন্দোলনের মাঝেই থাকতে হয়। প্রায় ১০০ দিনের মতো অনশন করেছেন নিবন্ধনধারীরা। এমনকি ঈদের দিনও তারা সড়কে কাটিয়েছেন। তাদের দাবি প্যানেল ভিত্তিতে প্রথম নিবন্ধনধারীদের অগ্রাধিকার দিয়ে ক্রমান্বয়ে সকলকে নিয়োগ দেয়া। আবার এই ৩৪ হাজার শিক্ষকের মধ্যে প্রায় ২০ হাজার ইনডেক্সধারী আবেদন করেন।

এখনো আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন হাজারো শিক্ষক। শূন্যপদের বিপরীতে দ্রুত বদলির প্রজ্ঞাপন জারি এবং বদলি চালু না হওয়া পর্যন্ত বিশেষ গণবিজ্ঞপ্তি না দেয়ার দাবি জানিয়েছেন ইনডেক্সধারী শিক্ষকদের বদলি গণবিজ্ঞপ্তি প্রত্যাশী ঐক্যপরিষদ। তারা বলছেন, এনটিআরসিএ গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সুপারিশ করে আসছে। তাই ২য় ও ৩য় গণবিজ্ঞপ্তিতে অনেক নিবন্ধনধারী নিজ এলাকায় পোস্ট না থাকায় বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবার জন্য দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে আবেদন করে সুপারিশ পেয়েছেন। কিন্তু গত ২৭শে আগস্ট শিক্ষা উপদেষ্টার কাছে বদলি প্রজ্ঞাপনের স্মারকলিপি প্রদান করলে শিক্ষকদের যৌক্তিক দাবি হিসেবে তিনি তা মেনে নেন এবং শূন্য পদের বিপরীতে বদলি চালুর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত শূন্যপদের বিপরীতে বদলির প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়ায় আমরা সব শিক্ষক অত্যন্ত উদ্বিগ্ন।

সংগঠনের সভাপতি প্রভাষক মো. সরোয়ার বলেন, শিক্ষা উপদেষ্টা আদেশ দেয়ার পরও কেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পরিপত্র জারির বিষয়ে গড়িমসি করছেন, বদলি প্রত্যাশী শিক্ষকরা তা স্পষ্ট জানার পাশাপাশি দ্রুত প্রজ্ঞাপন চায়। বদলি প্রত্যাশী শিক্ষকরা বলেন, শিক্ষকদের বদলি না থাকায় একজন শিক্ষককে তার পেশাগত জীবনে নানা প্রতিকূলতার মধ্যদিয়ে যেতে হয়। ১২ হাজার ৫০০ টাকা বেতন উত্তোলন করে বাসা ভাড়া এবং কোনো রকম খেয়ে না খেয়ে যেমন জীবন অতিবাহিত করতে হয়। পাশাপাশি স্থানীয় প্রধান শিক্ষক এবং স্থানীয় শিক্ষকদের রোষানলে পড়ে মানসিক কষ্ট নিয়ে চাকরি করতে হয়। এমনকি আমাদের অনেকে আছেন, স্বামী এবং স্ত্রী চাকরির সুবাদে দু’জন দু’প্রান্তে আছেন, কিন্তু শূন্যপদে বদলির ব্যবস্থা না থাকায় একে অপরের মাঝে মনোমালিন্য, পারিবারিক অশান্তি থেকে শেষে ডিভোর্স পর্যন্ত গড়াচ্ছে। যদি ৭ নং ধারা চালু থাকতো তাহলে গণবিজ্ঞপ্তিতে আবেদনের মাধ্যমে শিক্ষকরা তাদের নিজ এলাকায় যেতে পারতেন।

শুধু তাই নয়, পদায়নের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন ৯৪ জন সহকারী মৌলভি পদপ্রত্যাশী শিক্ষক। গণবিজ্ঞপ্তিতে চাহিদা প্রদানের পরও তারা চাকরিবঞ্চিত। মো. মাজেদ নামে এক চাকরিপ্রত্যাশী বলেন, আমরা কোনো কারণ ছাড়াই চাকরি থেকে বঞ্চিত। আমরা নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করেছি। বিভিন্ন দরবারে দরবারে ঘুরেও কোনো সুরাহা হয়নি। আবার বিগত সরকারের আমলে আমাদের জামায়াত-শিবিরও আখ্যা দিয়ে চাকরি থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। তিনি দাবি জানিয়ে বলেন, আমরা যোগ্যতা বলেই এই জায়গায় এসেছি। আমরা চাকরি চাই।

আবার শুধুমাত্র একবার আবেদনের জন্য দীর্ঘদিন আন্দোলন করে আসছেন ১৭তম শিক্ষক নিবন্ধনে উত্তীর্ণ হয়েও আবেদনবঞ্চিত ৭৩৯ জন প্রার্থী। তাদের দাবি ৫ম গণবিজ্ঞপ্তিতে ১৭তম নিবন্ধনের ৭৩৯ জন প্রার্থীকে আবেদনবঞ্চিত করায় এবং দ্রুত বিশেষ গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে একটিবার আবেদনের সুযোগ চান তারা। চাকরিপ্রত্যাশী মো. ইমরান বলেন, ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে ১৭তম নিবন্ধনের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। প্রিলি, রিটেন ও ভাইভার পর চূড়ান্ত ফল প্রকাশিত হয় গত বছরের ডিসেম্বরে। ১ বছরের একটি নিবন্ধনের কার্যক্রম শেষ করতে প্রায় চার বছর লেগেছে। এতে আমাদের ৭৩৯ জনের বয়স পার হয়ে গেছে। অথচ সনদের মেয়াদ ৩ বছর থাকা সত্ত্বেও ১ বার আবেদনের সুযোগ দেয়া হলো না। কিন্তু বিগত গণবিজ্ঞপ্তিতে সবগুলোতেই ছাড় দেয়া হলেও ১৭তমদের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেয়া হয়নি। চাকরি হবে না তাহলে পাস কেন করানো হলো? সনদ-ই বা কেন দেয়া হলো?
নিয়মের মারপ্যাঁচের বাইরেও আছে প্রতিষ্ঠানটির দুর্নীতি। গেল বছর এনটিআরসিএ’র একজন গাড়িচালকের দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ হয়। তিনি তদবির ও জালিয়াতি করে আয় করেন কোটি কোটি টাকা। এরপর সনদ বাণিজ্য নিয়ে কথা বলেন একাধিক নিয়োগ পাওয়া ও নিয়োগ প্রত্যাশী শিক্ষক। মাগুরায় নিয়োগ পাওয়া এক শিক্ষক বলেন, সনদেই মূলত প্রধান বাণিজ্য হয়। ২০২০ সালে সনদের আবেদন রিজেক্ট হয় আমার। সনদ পাইয়ে দেয়ার জন্য কয়েক শ্রেণির দালাল থাকে। তারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতো। তারা সর্বনিম্ন এক লাখ টাকা থেকে শুরু করে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত রাখতো।

এনটিআরসিএ’তে টাকা ঢাললেই মেলে স্বাক্ষর, বাড়িয়ে নেয়া যায় নম্বর। এতসব দুর্নীতির চিত্র গণমাধ্যমে প্রায়শই উঠে আসার পরও ব্যবস্থা নেইনি এনটিআরসিএ। এনটিআরসিএ পার হওয়ার পরও থেমে থাকে না হয়রানি। প্রতিষ্ঠানপ্রধান, ম্যানেজিং কমিটি, উপজেলা, জেলা ও আঞ্চলিক শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তারা এমপিও ফাইল নানাভাবে আটকিয়ে রাখছেন। ঘুষ না দিলে সেই ফাইল ছাড়ছেন না। এসব নানা কারণে ও নিয়োগপ্রাপ্তদের হয়রানি রোধে এনটিআরসিএ তুলে দিতে মত দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সিদ্ধান্ত মতে, সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) আদলে বেসরকারি শিক্ষকদের নিয়োগ দিতে নতুন কমিশন গঠন করা হবে। এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি খসড়া আইন তৈরির নির্দেশ দেয়। এনটিআরসিএ বিলুপ্ত করে বেসরকারি শিক্ষক নির্বাচন কমিশন (এনটিএসসি) গড়ে তোলা হবে।

শুধু তাই নয় সারা দেশে ৬০ হাজার শিক্ষক জাল সনদে চাকরি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তাদের চিহ্নিত করার পর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি প্রতিষ্ঠানটি। এনটিআরসিএ নিবন্ধিত নিয়োগবঞ্চিত শিক্ষক ফোরাম এই অভিযোগ করার পরও কোনো পদক্ষেপ নেয়নি এনটিআরসিএ। তারা দাবি করে আমাদের রোল, রেজিস্ট্রেশন নম্বর ব্যবহার করে এনটিআরসিএ ৬০ হাজার জাল সনদ দিয়েছে। তাদের আবার এমপিওভুক্ত করেছে। জাল সনদধারীরা বহাল তবিয়তেই স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শাখায় এখনো শিক্ষকতা করছেন। জাল সনদধারীদের চিহ্নিত করার পরও তাদের চাকরিচ্যুত করা হলো না কেন? আমাদের নিয়োগ এখনো দেয়া হয়নি কেন?
এদিকে এনটিআরসিএ’কে ঢেলে সাজাতে মোহাম্মাদ মফিজুর রহমানকে গত ৯ই সেপ্টেম্বর দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনি সাবেক চেয়ারম্যান মো. সাইফুল্লাহিল আজমের স্থলাভিষিক্ত হন। তবে সবশেষ তথ্যানুযায়ী এখনো তিনি যোগদান করেননি।
mzamin

বরকত উল্লাহ বুলুর ছেলের উপর চলা পাশবিক নির্যাতনের করুণ কাহিনি

কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে আদালত চত্বরে প্রিজনভ্যানে তোলার সময় এক সন্তানকে পিঠে হাত চাপড়ে মায়ের ভরসা দেওয়ার একটি ভিডিও রীতিমতো ভাইরাল হয়েছিল। ভাইরাল হওয়া ভিডিওর সেই তরুণ বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলুর ছেলে সানিয়াত। আদালত চত্বরে মা ও সন্তানের এমন দৃশ্য সবার প্রশংসায় ভাসছিল। এবার সামনে এসেছে তার ওপর নির্যাতনের নির্মম বর্ণনা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ফরিদ উদ্দিন রনি (Farid Uddin Rony) নামে এক ব্যক্তির ফেসবুক পোস্টে নির্যাতনের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।

পোস্টে বলা হয়েছে, সানিয়াতের চেহারা মোটামুটি আপনাদের কাছে পরিচিত। আদালতে তাকে যেদিন তোলা হয়, সেদিন প্রিজন ভ্যানে উঠানোর আগ মুহূর্তে আন্টি (তার মা) পেছন থেকে এসে তার পিঠ চাপড়ে ভরসা দেওয়ার সেই মুহূর্তের ভিডিয়োটি ফেসবুকে ভাইরাল হয়। সবার প্রশংসায় ভাসছিল আন্টি এবং সানিয়াত। বাট এর পর থেকে সানিয়াতের সাথে যা ঘটেছিল তার বর্ণনা শুনলে আপনাদের গা শিউরে ওঠবে।

ফরিদ উদ্দিন রনি লিখেন, রিমান্ডে প্রতিটি দিন তার জন্য ছিল জাহান্নাম। সে কষ্ট সহ্য করতে না পেরে প্রতিনিয়ত মরার জন্য দোয়া করতো। রাত আড়াইটা বাজে আন্টিকে (তার মাকে) কল দিয়ে অন এয়ারে রেখে সানিয়াতকে নির্মমভাবে পেটাচ্ছে আর তার আর্তনাদ শোনানো হচ্ছে। ভাবতে পারেন? মাকে কলে ওপাশে রেখে ছেলেকে নির্মম টর্চার করা হচ্ছে, এটা কোনো মায়ের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব?

শুরুর ঘটনা বলি— সানিয়াতের মা অসুস্থ থাকায় তার বাবা হাসপাতালে নিয়ে যায় মাকে। ছোট ভাইকে নিয়ে বাসায় ছিল সানিয়াত। তার ছোট ভাই আবার ডাউন সিন্ড্রোমের রোগী। রাতের বেলা পেস্ট্রি খাওয়ার আবদার করে। ডাউন সিন্ড্রোমের রোগীদের আবদার তৎক্ষণাৎ পূরণ না করলে এরা অস্থির হয়ে যায়। সানিয়াত ছোট ভাইকে শান্ত করতে রাত একটার দিকে বাসা থেকে বের হয় পেস্ট্রি কিনতে। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে 'উডেন স্পুন' নামক একটি খোলা দোকান পেয়ে ঐখানে ঢুকে।

কেক নিয়ে দোকান থেকে বের হতেই ডিবি'র জ্যাকেট পরা একদল তাদের ঘিরে ধরলো। নামটাম জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ঘাড় ধরে গাড়িতে তুলে ফেলে। সানিয়াত টেনশন করছিল তার ছোট ভাইকে নিয়ে। তাকে দেখভাল করবে কে! তার বাবার খোঁজে ডিবি তাদের গাড়িতে করেই হাসপাতালে নিয়ে যায়, যেখানে তার মাকে ভর্তি করানো হয়। সেখানে গিয়ে তার বাবাকে পেল না। মায়ের রুমে নার্সরা ঢুকতে দিল না ডিবিকে। পরে সানিয়াতকে নিয়ে চলে যায়।

তিনি লিখেন, তার কাছ থেকে জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি নেয়ার চেষ্টা করা হয় তারেক রহমানের সাথে তার যোগাযোগ ছিল। রামপুরা থেকে উত্তরা সব সহিংসতার নেতৃত্ব দিয়েছে সে—এটা জোর করে স্বীকারোক্তি নিতে চাইল।

এদিকে সানিয়াতকে কোথায় নিয়ে গেল তার কোনো খোঁজ পাচ্ছিলো না মা-বাবা। এক দিন পর তার মা ঢাকা মেডিকেল মর্গে গিয়ে তার লাশ খোঁজে। কোথাও সানিয়াতকে দেখতে না পেয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে পড়েন। জ্ঞান ফেরার পর আদালতে খোঁজ নিতে যান।

সানিয়াতকে ওই দিনেই আদালতে তোলা হয়। পাঁচ দিনের রিমান্ড দেওয়া হয়। আদালত থেকে বের করে প্রিজন ভ্যানে তোলার সময়ই তার মা দেখতে পায় তাকে। তিনি পেছনে থেকে দৌড়ে গিয়ে পিঠে চাপড়ে তাকে সাহস দেয়।

তুলে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে তো অনবরত টর্চার চলছেই, নতুন করে তার মায়ের সাথে এই ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর আরও ক্ষিপ্ত হয়ে যায় ডিবি। বেড়ে যায় টর্চারের মাত্রা। তাকে ঝুলিয়ে উল্টো করে দৈনিক ১৫-১৬ ঘণ্টা করে টর্চার করেছে। তার শরীরের নিচের অংশ ফুলে রক্ত জমাট বেঁধে যায়। চিৎকার করলে নির্যাতনের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিত। বাঁচার একমাত্র উপায় ছিল সেখানেই পড়ে থেকে চুপচাপ মারধর সহ্য করা।

তিনি আরও লিখেন, তার নখের ওপর প্লায়ার ব্যবহার করার চেষ্টা করেছিল। সে একটু একটু হাঁটতে পারতো, এটা দেখেই হারুন ক্ষিপ্ত হয়ে যায় কর্মকর্তাদের উপর। মানে কী মারতেছোস তোরা, ও এখনো হাঁটতে পারে কেমনে!!

পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, আদালত চত্বরে মায়ের ভিডিওর কথা বলেই তাচ্ছিল্যে করে মারধর শুরু করতো। পানি খেতে চাইলে, পানি তো দিতো না বরং শাস্তি হিসেবে তাকে দুইজন লোকের সাহায্য হাঁটতে বাধ্য করে।

ভিডিওর কথা সানিয়াত কিছু জানতো না। যখন সে জিজ্ঞেস করতো, কীসের ভিডিও? শুরু করতো আবার টর্চার। তখন উপহাস করে বলতো, হারুন স্যার তোমার জন্য অনেক কিছু পরিকল্পনা করেছে। তুমি এখানে অনেক দিন থাকবে।

কখন রাত কখন দিন, কিছুই বুঝতো না। কালো কাপড়ে চোখ বেঁধে রাখা হতো। যখন ইচ্ছে তখন এসেই মারধর শুরু করতো।

ফরিদ উদ্দিন রনি লিখেন, কিছুদিন আগে দেখেছি রাজনৈতিক কোনো কোনো নেতা আগ বাড়িয়ে ক্ষমার কথা বলায় আওয়ামী লেসপেন্সাররা মাথা ছাড়া দিয়ে উঠছে। কেউ কেউ পুনর্বাসন করতে চেষ্টাও করছে। ক্ষমা করা ভালো। এটা করতে পারাটা মহৎ হৃদয়ের কাজ। কিন্তু অপরাধ করতে করতে এমন পর্যায় চলে যাওয়ার পর যার জন্য আর ক্ষমা অবশিষ্ট থাকে না, তাকে আপনি কীভাবে ক্ষমা করার কথা বলবেন!

তিনি লিখেন, শেখ হাসিনা এবং তার লেসপেন্সাররা গত ১৬ বছর এতো সব অপরাধ করেছে যে, তাদের জন্য আর ক্ষমা অবশিষ্ট থাকে না। এদের প্রতি বিন্দুমাত্র দয়া কারো হৃদয়ে থাকতে পারে না। চোখের সামনে এদের করুণ পরিণতি না দেখতে পারলে আমাদের হৃদয় শান্ত হবে না। আমরা যারা সহপাঠী, আশপাশের মানুষকে মরতে দেখেছি; তাদের হাতে নির্মম নির্যাতন সহ্য করতে দেখেছি। 

মায়ের সঙ্গে সানিয়াত। ছবি : সংগৃহীত
মায়ের সঙ্গে সানিয়াত। ছবি : সংগৃহীত

বৈষম্যহীন একটি রাষ্ট্র গড়তে সংবিধান সংস্কার করতে হবে -ফরহাদ মজহার

গণতন্ত্র একটি রাষ্ট্রের বিশেষ ধর্ম। এটা রাষ্ট্রের বিশেষ রূপ। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্র তার কর্মকাণ্ড সুষ্ঠুভাবে নির্ধারণ করলেই একটি রাষ্ট্র সুচারুভাবে গঠন করা হয়। ১৯৭২ সালের যে সংবিধান তা ছিল পাকিস্তান আমলের, সেই সংবিধান প্রণেতারা সেই সময়ের আলোকে সংবিধান রচনা করেছিলেন। বর্তমানে যে সংবিধানের আলোকে রাষ্ট্র চলছে তা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তৈরি সংবিধান। বৈষম্যহীন একটি রাষ্ট্র গড়তে হলে প্রথমে সংবিধান সংস্কার করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন  সমাজচিন্তক ও গবেষক ফরহাদ মজহার। নতুন বাংলাদেশ বৈষম্যহীন কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি একথা বলেন। জাতীয় প্রেস ক্লাবের তৃতীয় তলায় আকরাম খাঁ হলে প্রফেসর কে আলী ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় ফরহাদ মজহার আরও বলেন, রাষ্ট্রের প্রত্যেকটা সেক্টরে সংস্কার করতে হবে। জনগণকে রাষ্ট্র ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। সুতরাং দেশের গণতন্ত্র বজায় রাখতে প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে জনগণের অংশগ্রহণ ও সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে হবে। স্ব স্ব ক্ষেত্রে সবাইকে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে। সেমিনারে লিখিত প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. নুরুল ইসলাম। প্রবন্ধে বলা হয়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে চরম গণ-অসন্তোষে ৫ই আগস্ট স্বৈরাচার সরকারের পতনের ফলে জনমানুষের মধ্যে রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবে রূপায়ণের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। প্রবন্ধে আরও বলা হয়, ছাত্র জনতার বিপ্লব একটি শোষণহীন, বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার বাস্তবতা এখন। দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকই তরুণ ও যুবা। তাদের প্রত্যাশা নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলা। বাংলাদেশের সংবিধানের আলোকে রাষ্ট্র সংস্কারের ১২ দফা রূপরেখা-২০২৪ পেশ করা হয়। ১২ দফার প্রস্তাবে রয়েছে, রাষ্ট্রের ৩টি প্রধান অঙ্গ নির্বাহী বিভাগ, আইনসভা ও বিচার বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা, যাতে একে অপরের উপর ক্ষমতা বা কর্তৃত্বের প্রয়োগ থেকে বিরত থাকে। বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ নিশ্চিত করা এবং বিচারপতি নিয়োগে আলাদা কমিশন বা আইন প্রণয়ন করা। কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য করবে না। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবে। অধ্যাপক ড. শেখ আকরাম আলীর সভাপতিত্বে সেমিনারে আরও বক্তৃতা করেন- সাবেক সচিব ও এনবিআর এর চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ, রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল (অব.) আবুল কালাম, অর্থনীতিবিদ ড. রেজা কিবরিয়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের সাবেক ডীন অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান খান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সলজার রহমান ও ফরিদ উদ্দিন প্রমুখ।
mzamin

মধ্যপ্রাচ্য থেকে পিছু হটছে মার্কিন রণতরী

মধ্যপ্রাচ্য থেকে নিজেদের রণতরী প্রত্যাহার করে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন অঞ্চলে অতিরিক্তি মোতায়েনের অংশ হিসেবে নিয়োজিত ছিল।

শুক্রবার (১৩ সেপ্টেম্বর) কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলিতে ইরানের সঙ্গে জোটবদ্ধ সশস্ত্র গোষ্ঠীর কথা উল্লেখ করে মধ্যপ্রাচ্যে দুটি মার্কিন নৌবাহিনীর বিমানবাহী রণতরী রাখার জন্য পেন্টাগনের একটি বিরল পদক্ষেপের পরে এটি করা হয়েছে। কারণ বাইডেন প্রশাসন ইরান এবং তার ‘প্রক্সি’ দ্বারা সম্ভাব্য আক্রমণ থেকে ইসরায়েলকে রক্ষা করতে এই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে।

সামরিক বিশ্লেষক এলিজাহ ম্যাগনিয়ার বলেন, ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন বিমানবাহী রণতরীকে যুক্তরাষ্ট্রে ফেরত পাঠানোর অন্যতম কারণ হলো ইসরায়েলকে বার্তা পাঠানো।

এর আগে গাজা থেকে পরিচালিত হামাস ও ইসলামী জিহাদের অভিযানের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত বিমানবাহী রণতরী আইজেনহাওয়ার লোহিত সাগরে ছুটে এসেছিল। কিন্তু জলদানবটি এই অঞ্চল ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়।

ইয়েমেনিরা মার্কিন বিমানবাহী বিশাল রণতরী ‘ইউএসএস আইজেনহাওয়ার’-এর ওপর হামলা করেছে বলে খবর প্রকাশের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এই বিশাল সাগর-দানবের ওপর ইয়েমেনি হামলার খবরকে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে পেন্টাগন। কিন্তু ইয়েমেনিরা এই খবরের বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করলে পেন্টাগনের বিশেষজ্ঞরা ইজ্জত বাঁচানোর জন্য ঘোষণা করেন যে, মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী লোহিত সাগরে এই রণতরীর মিশন শেষ করা হয়েছে!

এই ঘটনার পর অনেক মার্কিন সংবাদমাধ্যম ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান বলেছে যে ইহুদিবাদী ইসরায়েলের প্রতি পাশ্চাত্যের অস্ত্র সাহায্য অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও ইসরায়েলের অবস্থা এখনো নাজুক ও তা দৃশ্যমান এবং বিখ্যাত মার্কিন রণতরীর এখনো সেখানে থাকা উচিত। কিন্তু ইয়েমেনিদের নতুন হামলার পর অস্টিন ঘোষণা করেন যে, আইজেনহাওয়ারের পিছু হটা দরকার এবং সম্ভবত ‘থিওডোর রুজভেল্ট’ রণতরী সেখানে যাবে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরে হামাসের নজিরবিহীন হামলায় দখলদার ইসরায়েল বিপর্যস্ত হলে এ অঞ্চলে পাঠানো হয় আইজেনহাওয়ার। জ্বালানি পরিবহনের নিরাপত্তার কথা বলে এ অঞ্চলে এলেও আসলে এর মূল লক্ষ্য ছিল ইসরায়েলের আশপাশে একটি ভাসমান বিমানঘাঁটি হিসেবে কাজ করা যাতে কখনো দরকার হলে এর যুদ্ধবিমানগুলো খুব অল্প সময়ে নানা ধরনের অভিযান চালাতে পারে। 

সাগরে মার্কিন রণতরী। ছবি : সংগৃহীত
সাগরে মার্কিন রণতরী। ছবি : সংগৃহীত

ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধান, স্পেনে বৈঠক

গাজা যুদ্ধের অবসান ও ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত নিরসনে দ্বিরাষ্ট্র সমাধান এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে স্পেনে একটি বৈঠক হয়েছে। ইউরোপীয় দুই দেশের পাশাপাশি কয়েকটি মুসলিম দেশের নেতারা শুক্রবার ওই বৈঠকে অংশ নেন। খবর এএফপির।

সম্প্রতি নরওয়ে ও আয়ারল্যান্ডের পাশাপাশি স্পেনও ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের লক্ষ্যে এই বৈঠক আয়োজন করল দেশটি।

বৈঠকে নরওয়ে ও স্লোভেনিয়ার দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পাশাপাশি অংশ নেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রধান জোসেফ বোরেলও। মন্ত্রী পর্যায়ের এই বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও নিরাপত্তার বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্পৃক্ততা জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা এবং দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের ভিত্তিতে এগিয়ে যাওয়ার পথে একটি আন্তর্জাতিক ঐকমত্য তৈরির চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা হয়।

মুসলিম দেশগুলোর প্রতিনিধির মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ফিলিস্তিনের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মুস্তাফা। পাশাপাশি অংশ নেন মিসর, সৌদি আরব, কাতার, জর্ডান, ইন্দোনেশিয়া, নাইজেরিয়া ও তুরস্কের সমন্বয়ে গঠিত আরব-ইসলামিক কনট্যাক্ট গ্রুপ ফর গাজার সদস্যরা। তবে ইসরায়েলের কোনো প্রতিনিধি ওই বৈঠকে ছিলেন না।

যুদ্ধের শুরু থেকেই গাজায় ইসরায়েলের আক্রমণের বিরুদ্ধে সোচ্চার স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। মূলত তার তৎপরতায় স্পেন গেল ২৮ মে আয়ারল্যান্ড ও নরওয়ের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়। 

ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের বিষয়ে আলোচনা করতে স্পেনে বৈঠক। ছবি : সংগৃহীত
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের বিষয়ে আলোচনা করতে স্পেনে বৈঠক। ছবি : সংগৃহীত

এক হেলিকপ্টার থেকে ত্রাণ, অন্যটি থেকে গুলি

ভারি বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত মিয়ানমার। দেশটিতে বন্যায় অন্তত ৩৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া বন্যার কারণে ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন অন্তত ‍দুই লাখ ৩৬ হাজার মানুষ। এমন পরিস্থিতিতে দেশটিতে হেলিকপ্টারে ত্রাণ দিচ্ছে প্রতিবেশী দেশ। একই সময়ে হেলিকপ্টার থেকে বেসামরিক লোকদের ওপর গুলিবর্ষণও করা হয়েছে।

শুক্রবার (১৩ সেপ্টেম্বর) মিয়ানমারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইরাবতির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্যার্তদের জন্য ত্রাণ সহায়তা নিয়ে এগিয়ে এসেছে থাইল্যান্ডের বিমানবাহিনী। তারা হেলিকপ্টার থেকে বন্যার্তদের ত্রাণ সহায়তা দিয়ে আসছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেও বেসামরিক লোকদের ওপর হেলিকপ্টার থেকে গুলি করছে মিয়ানমারের জান্তা বাহিনী।

ইরাবতি জানিয়েছে, জান্তার মুখপাত্র জাও মিন তুন জানিয়েছেন, বন্যায় ৫৯ হাজার ৪১৩টি পরিবারের ২ লাখ ৩৬ হাজার ৬৪৯ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এ ছাড়া সারা দেশে ৩৩ জন মারা গেছেন। অডিও বার্তায় তিনি এ তথ্য জানিয়েছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্যার্তদের ত্রাণ সহায়তায় এগিয়ে এসেছে দ্য রয়্যাল থাই এয়ার ফোর্স। হেলিকপ্টার, উড়োজাহাজ ও ড্রোন দিয়ে বন্যার্ত এলাকায় তারা খাবার ও ওষুধ ফেলছে। মূলত মিয়ানমার সীমান্তের থাই কমিউনিটির মধ্যে ত্রাণ সহায়তা দিচ্ছে তারা।

ইরাবতি জানিয়েছে, বন্যায় মিয়ানমারের প্রায় অর্ধেক এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সুপার টাইফুন ইয়াগির প্রভাবে ভারি বর্ষণের কারণে এ বন্যা দেখা দিয়েছে। মান্দালয় ও রাজধানী নাইপিডো বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বন্যায় অনেকে বাড়ির ছাদ বা উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন। সেখানে দিন কাটাতে হচ্ছে তাদের। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে দেখা গেছে, বন্যার্তদের মাঝে হেলিকপ্টার থেকে ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া ড্রোন দিয়ে ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে।

বন্যায় যখন দেশবাসী নাজেহাল তখনো মরিয়া মিয়ানমারের জান্তা। গত কয়েক মাসে বিদ্রোহীরা তাদের থেকে বেশকিছু এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। সেসব এলাকা তারা পুনঃদখলে নিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে জানিয়েছেন মিয়ানমারের জান্তাপ্রধান।

মিয়ানমারে বন্যার্ত একটি এলাকা। ছবি : সংগৃহীত
মিয়ানমারে বন্যার্ত একটি এলাকা। ছবি : সংগৃহীত

বাছুর কোলে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন মোদি

বাড়িতে ঘটেছে নতুন অতিথির আগমন। তাকে নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। শনিবার নিজের এক্স হ্যান্ডেলে একটি ভিডিও পোস্ট করেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী। ভিডিওর শুরুতেই দেখা যায়- সদ্য জন্ম নেওয়া গরুর বাছুরটিকে সঙ্গে নিয়ে ঘরের মধ্যে হাঁটছেন নরেন্দ্র মোদি।

এরপর বাছুরটির গলায় একটি মালা এবং উত্তরীয় পরিয়ে দেন পূজায় উপবিষ্ট মোদি। এ সময় সদ্যজাত বাছুরটিকে কোলে তুলে নিয়ে চুমুও দেন তিনি।

এক্সে পোস্ট করা ওই ভিডিওর পরের সিকোয়েন্সে দেখা যায়- অভিজাত একটি সোফায় বাছুরটিকে নিয়ে বসে আছেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী। তার ডানকোলে শুয়ে আছে প্রাণীটি। এ সময় এটির কপালে হালকা করে হাত বুলিয়ে দেন মোদি। বাছুরটিও চুপচাপ নিচ্ছিল এই উষ্ণ আদর।

এরপর ফিল্মি কায়দায় বাছুরটিকে কোলে নিয়ে ঘর থেকে বের হতে দেখা যায় নরেন্দ্র মোদিকে। পরের অংশেই দেখা যায়- গাছপালাবেষ্টিত একটি উদ্যানে আদুরে সদ্যজাত বাছুরটিকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি।

ভিডিওর ক্যাপশনে নরেন্দ্র মোদি লেখেন, বাছুরটির মাথায় রয়েছে সাদা একটি দাগ। যেটির সঙ্গে আলোর সাদৃশ্য রয়েছে। আর মাথায় সুন্দর দাগ থাকায় তিনি বাছুরটির নাম দিয়েছেন ‘দীপজ্যোতি’। 

বাছুর কোলে নিয়ে হাঁটছেন নরেন্দ্র মোদি। ছবি : সংগৃহীত
বাছুর কোলে নিয়ে হাঁটছেন নরেন্দ্র মোদি। ছবি : সংগৃহীত

চাঁদের মাটিতে সম্পদের খোঁজে যাচ্ছে রাশিয়া?

মহাকাশে একের পর এক অভিযান ও নতুন নতুন আবিষ্কারের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত পৃথিবীর শক্তিশালী দেশগুলো। রাশিয়াও সেই প্রতিযোগিতা থেকে পিছিয়ে থাকতে চাইছে না। সোভিয়েত আমলে সর্বশেষ চন্দ্রাভিযানের পর গত বছর আবারও চাঁদে মহাকাশযান পাঠায় মস্কো। তবে ব্যর্থ হয় সেই অভিযান।

লুনা-২৫ চন্দ্রাভিযান নিয়ে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্যে ছিল রাশিয়া। কিন্তু রাশিয়াকে হতাশ করে মহাকাশযানটি চাঁদে বিধ্বস্ত হয়। এরপর প্রায় এক বছর কোনো আলোচনা না হলেও এবার লুনা-২৬ এবং লুনা-২৭ মিশন নিয়ে কথা বলেছে দেশটি।

রাশিয়ান একাডেমি অব সায়েন্সেসের (আরএএস) মহাকাশ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইকেআই) বৈজ্ঞানিক পরিচালক শিক্ষাবিদ লেভ জেলেনি জানিয়েছেন, লুনা-২৬ এবং লুনা-২৭ মিশনের জন্যে বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম তৈরির কাজ প্রায় শেষ করেছে পুতিনের দেশ। তাই খুব দ্রুতই হতে পারে পরবর্তী অভিযান।

রাশিয়ার চন্দ্র কর্মসূচির প্রথম পর্যায়ের বৈজ্ঞানিক পরিচালক হিসেবেও দায়িত্বপালনকারী লেভ জেলেনি বলেছেন, লুনা-২৬ এবং লুনা-২৭ মিশনের জন্যে বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম তৈরির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

জেলেনির মতে, রসকসমস দুটি কক্ষপথ নির্মাণের ধারণাকে সমর্থন করলেও অপর্যাপ্ত তহবিলের কারণে এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়নি। লুনা-২৬ অরবিটারের উদ্দেশ্য হলো প্রাকৃতিক চন্দ্র সম্পদের সন্ধান এবং পরিমাপ করা যা ভবিষ্যতে ল্যান্ডিং মিশন দ্বারা শোষণ করা যেতে পারে। খুব দ্রুতই হতে পারে এই অভিযান।

আর চাঁদের উত্তর মেরুতে বা তার দূরের দিকে একটি মহাকাশ ফ্লাইটে ২০২৮ সালের দিকে লুনা-২৭ মিশন চালানোর কথা রয়েছে।

প্রতীকী ছবি।

‘আমার মতো কষ্ট দুনিয়াতে কারু নাই’

মাইনসের বাড়ি কাম কইর‌্যা একসের চাইল দিচে, আরেক বাড়ি থিক্যা এল্লা তেল চাইয়্যা আনচি, আরেকজন একটা পল্যা (ঝিঙে) দিচে। চাইল কয়ডা রানচি কিন্তু তা দিয়্যা অইবো না, তাই ১০ ট্যাহার আটা কিন্যা আইন্যা ফ্যান রাইনত্যাছি।

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে হাঁট পাচিল এলাকায় যমুনা নদীর ওয়াপদা বাঁধের ঢালে একটি টঙ ঘরে আটা দিয়ে ফ্যান রান্না করছিলেন আর কথাগুলো বলছিলেন প্রায় আটচল্লিশ বছর বয়সী বিধবা মাজেদা খাতুন। পাশে তার ছোট ছোট তিন শিশু সন্তানকে ফ্যান খেতে দিয়েছেন। আরও তিন ছেলে তখনও বাড়ির বাইরে।

শনিবার (১৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে হাটপাচিল ওয়াপদা এলাকায় সরেজমিনে গেলে মাজেদা খাতুনের অসহায়ত্বের এমন চিত্র দেখা যায়।

মাজেদা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছিলেন, ‘আমার মতো কষ্ট দুনিয়াতে কারু নাই’। তিন বছর আগে সোয়ামী মইর‌্যা যায়, তার দুই বছর পর বসতবাড়ি যমুনার প্যাটে যায়। মাইনসের দ্বারে দ্বারে ৮ ছওয়াল-মেয়ে নিয়্যা ঘুরত্যাছি। এক বাড়িত আশ্রয় নিলে কয়েকদিন পর বাইর কইর‌্যা দেয়, আরেক বাড়ি যাই, এইভাবে ৭ বাড়িতে আশ্রয় নেই। এ্যাহন ওয়াপদার বাঁধে আরেকজন গরীব মানুষ টঙ ঘর তুইলচে, বেড়া দেয় নাই। ছওয়ালপাল নিয়্যা এহেনেই কষ্ট কইর‌্যা আচি। কয়দিন পর এহেন থিক্যাও চইল্যা যাওয়া লাইগবো। কোনে যামু তাও জানি না।

মাজেদা আরও বলেন, দুইডা মিয়্যা মাইনসের বাড়িত কামে থুছি। কিন্তু থাইকপ্যার চায় না। কাইন্দা-কাইন্দা বাড়িত আইসে, আবার মাইর‌্যা-ধইর‌্যা থুইয়্যা আসি। তারা ভাত-তরকারি দেয়ই, আবার ঈদ আইলে জাকাত দেয়, এসব দিয়্যাই চলি।

স্থানীয় একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হাট পাঁচিল গ্রামের পূর্ব পাড়ায় মাজেদা খাতুনের বাড়ি ছিল। সম্প্রতি যমুনার ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। বছর তিনেক আগে তার স্বামী রমজান আলী মারা যাওয়ার পর থেকেই পরিবারটি কুল কিনারা হারিয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে। তাদের ৬ ছেলে ও ৩ মেয়ের মধ্যে রমজান আলী বেঁচে থাকতেই বড় মেয়েটার বিয়ে হয়। বাকী ৮ সন্তান নিয়ে সীমাহীন দুর্ভোগের মধ্যে দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন মাজেদা। কোনো সন্তানকে স্কুলে দেওয়ার মতো অবস্থা নেই। কোরবান আলী নামে ১৭ বছর বয়সী এক ছেলে থাকলেও সে সংসারের কোনো কাজ করে না। ১৪ বছর বয়সী আরেক ছেলে রতন যমুনায় নদীতে মৎস্যজীবীদের জাল ঠেলে ৫০ থেকে ১শ টাকা পায় আর অন্যের বাড়িতে কাজ করে মাজেদা খাতুন কখনো ৫০ টাকা, কখনো বা এক সের চাল পায় এ দিয়েই কোনোমতে সংসারের ৮ জনের মুখে আহার তুলে দেন।

স্থানীয় সমাজসেবক জয়নাল আবেদীন বাচ্চু বলেন, মাজেদা খাতুনসহ এখানকার বেশ কিছু পরিবার যমুনার ভাঙনে নিঃস্ব হয়ে কষ্টে দিনপাত করছে। তাদের সরকারি সহযোগিতা এবং একটি গুচ্ছগ্রাম করে দেওয়া প্রয়োজন।

স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. শাহজাহান আলী কালবেলাকে বলেন, মাজেদা খাতুন এখন খুব অসহায় অবস্থায় আছে। আগে ঝুরি বানিয়ে সংসার চালাতো। বর্তমানে যমুনার ভাঙনে ঝুরি বানানোর জায়গা বিলীন হয়ে যাওয়ায় তারা কোনো কাজ করতে পারছে না। এই মুহূর্তে ইউনিয়ন পরিষদে কোনো বরাদ্দ নেই, তাই আমরা তার জন্য কিছুই করতে পারছি না। বরাদ্দ এলে আমরা তাকে দেব।

সন্তানদের নিয়ে যমুনার ভাঙনে নিঃস্ব মাজেদা। ছবি :কালবেলা
সন্তানদের নিয়ে যমুনার ভাঙনে নিঃস্ব মাজেদা। ছবি :কালবেলা


মুজিবুলে ভর করে কোটিপতি তারা by মরিয়ম চম্পা

সাবেক রেলমন্ত্রী মো. মুজিবুল হক দায়িত্বে থাকার সময়ে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন তার শ্বশুরবাড়ির লোকজন। স্ত্রী হনুফাকে খুশি করতে শ্বশুরবাড়ির লোকদের কোটিপতি বানিয়েছেন সাবেক রেলমন্ত্রী। স্ত্রী হনুফা ছিল তার দুর্নীতির ক্যাশিয়ার। সম্প্রতি সাবেক রেলমন্ত্রী মুজিবুলের বিছানায় টাকার বান্ডিলের ছড়াছড়ি এমন ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে নতুন করে আলোচনায় আসেন তিনি। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের সাবেক সংসদ সদস্য ও রেলপথমন্ত্রী মুজিবুল হক অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে গড়ে তোলা সম্পদের পাহাড়ের নমুনা হিসেবে শুক্রবার বিকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মুজিবুল হকের বিছানায় ছড়িয়ে থাকা টাকার বান্ডিলের একটি ছবি ভাইরাল হয়েছে। তবে ভাইরাল ওই ছবিটি কবেকার সে সময় সম্পর্কে জানা যায়নি। ছবিতে দেখা যায়, বিছানায় বসে আছে মুজিবুল হকের তিন শিশু সন্তান। সন্তানদের সামনে ৫০০ এবং ১০০০ টাকা নোটের কয়েকটি বান্ডিল পড়ে আছে। মুজিবুল হক তার এক সন্তানকে কোলে নিচ্ছিলেন। এক শিশু একটি শপিং ব্যাগে থাকা টাকার বান্ডিল নিয়ে খেলা করছে। মুজিবুল হকের স্ত্রী হনুফা আক্তার দাঁড়িয়ে সে দৃশ্য দেখছেন। ধারণা করা হচ্ছে, সাবেক সংসদ সদস্য মুজিবুল হকের কোনো এক সন্তানের জন্মদিনের ছবি এটি। সন্তানের জন্মদিন উৎসবকে আরও আনন্দময় করতে কয়েক বান্ডিল টাকা ছড়িয়ে দেন বিছানায়। এ সময় মুজিবুল হকের খুব কাছের কেউ সেই ছবিটি তুলেছেন। গত ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর গা ঢাকা দেন চৌদ্দগ্রাম আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী মুজিবুল হক। সূত্র জানায়, নির্বাচনী হলফনামায় নগদ ২০ হাজার টাকাসহ স্থায়ী-অস্থায়ী সম্পদের পরিমাণ প্রায় এককোটি টাকার হিসেব দেখালেও এখন তার শত শত কোটি টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। রেলমন্ত্রী হওয়ার পরই তিনি অবৈধ পন্থায় এসব সম্পদ গড়ে তুলেছেন। তার এই অবৈধ টাকায় শ্বশুরবাড়ির লোকজন আলিশান ফ্ল্যাট-বাড়ি, জমির মালিক হয়েছেন এবং বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন। মুজিবুলের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, নিয়োগ বাণিজ্য, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কমিশন বাণিজ্য, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলিসহ বিদেশে ব্যবসা, নেতাকর্মীদের কাছ থেকে ব্যবসার মুনাফা, টেন্ডারের কমিশন, চাঁদাবাজির ভাগসহ নানা উপায়ে শত শত কোটি টাকা অর্জন করেছেন মুজিবুল হক। এগুলো দেখভাল করতেন রেলমন্ত্রীর স্ত্রী হনুফা বেগম।

মুজিবুল হকের শাশুড়ির নামেও কিনে দিয়েছেন ফ্ল্যাট- বাড়ি। তার স্ত্রীর অন্য তিন বোন আগে সাধারণ জীবনযাপন করলেও মুজিবুল হকের সঙ্গে বোনের বিয়ের পর তাদেরও কপাল যেন খুলে যায়। তারা এখন আলিশান বাসায় থাকেন এবং বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন। শ্বশুরের পরিবারের সকলকে বিলাসবহুল চলাচলের অর্থের জোগানদাতা সাবেক এই মন্ত্রী। আর এসব কাজে সহায়তা করেছেন সাবেক এই মন্ত্রীর স্ত্রী হনুফা বেগম, তার ভাগ্নে এবং শ্যালক নাসির। সূত্র জানায়, রেলের বেশির ভাগ নিয়োগ বাণিজ্যের লেনদেনের সঙ্গে জড়িত মুজিবুল হকের স্ত্রী হনুফা বেগম ও তার নিকটাত্মীয়রা। মিষ্টির প্যাকেটে করে, মাছের ঝুড়িতে করে লাখ লাখ টাকা নিকটাত্মীয়রা হনুফা বেগমের কাছে হস্তান্তর করতেন। মুজিবুল হক অবৈধ সম্পত্তির বেশির ভাগ শ্বশুরবাড়ির লোকজনের নামে গড়ে তুলেছেন যাতে কেউ তাকে ধরতে না পারে। তার এই কাজে সহযোগিতা করেছেন মুজিবুলের ফুফাতো ভাই লুৎফর রহমান খোকন। খোকন একটি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে একটি ফ্ল্যাট ক্রয়ের জন্য নগদ ৭৬ লাখ টাকা খোকনকে দেন মুজিবুল হক। যদিও এখন পর্যন্ত খোকনকে ওই ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেননি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পরই রেলমন্ত্রী হন মো. মুজিবুল হক। মন্ত্রী হওয়ার পরই ধানমণ্ডির ২৮ নম্বরে  (রোড-এ) বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ক্রয় করেন তিনি। যার বর্তমান বাজারমূল্য আনুমানিক ১২ কোটি টাকা। এটি তার শাশুড়ির নামে ক্রয় করা হয়। রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় জমি ক্রয় করে ১০ তলা ফাউন্ডেশন দিয়ে ৪ তলা বাড়ি নির্মাণ করেন। যার ঠিকাদার মো. লুৎফর রহমান খোকন। কুমিল্লার ঝাউতলায় ২৯৫ নম্বর বাড়িতে ২/৩টি ফ্ল্যাট, কালীগঞ্জ এলাকায় বাণিজ্যিক জায়গাতে কয়েকটি দোকান ক্রয় করেন। রাজধানীর কমলাপুরে বহুতল ভবন প্রথমে স্ত্রী ও ভাগ্নে বিপ্লবের নামে ক্রয় করা হয়। পরে শাশুড়ির নামে স্থানান্তর করা হয়। এ ছাড়াও কুমিল্লার নিমসার কাবিলাতে স্ত্রীর দ্বিতীয় বোন শিরীন আক্তারকে বিলাসবহুল ভবন নির্মাণ করে দিয়েছেন সাবেক এই মন্ত্রী। চান্দিনার মিরাখলা শ্বশুরবাড়ির অন্যসব বসতি তুলে দিয়ে রাজকীয় বাড়ি নির্মাণ করে দিয়েছেন তিনি। একইভাবে চান্দিনার মিরাখলাতে মন্ত্রী তার স্ত্রীর তৃতীয় বোনকে বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ করে দিয়েছেন। তারা এর আগে খুব সাদামাটা জীবনযাপন করতেন। সূত্র জানায়, চান্দিনার বিলাসবহুল কমপ্লেক্স এলাকায় মন্ত্রী তার স্ত্রীর চতুর্থ বোনকে জমি ক্রয় করে বাড়ি নির্মাণ করে দিয়েছেন। রাজধানীর ৬০ ফিট আগারগাঁওয়ে বাড়ি ক্রয় করেন মন্ত্রী। যেখানে মন্ত্রীর স্ত্রীর বড় বোন বসবাস করছেন। বগুড়াতে বিভিন্ন কমার্শিয়াল ভবনে দোকান ক্রয় করেছেন মন্ত্রী। যার পরিচালনা করেন মন্ত্রীর স্ত্রীর ভাগ্নে বিপ্লব। বিভিন্ন নেতাকর্মীকে নগদ টাকা দিয়ে ব্যবসার সুযোগ করেও দিয়েছেন মন্ত্রী। যেখান থেকে প্রতি মাসে মুনাফা নিয়ে থাকেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে। দেশের বাইরে অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবসা পরিচালনা করছেন মুজিবুল হক। তার বিরুদ্ধে এ বিষয়ে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ উঠেছে। অধিকাংশ সম্পত্তি মন্ত্রীর শাশুড়ি জ্যোৎসা বেগমের নামে দিয়েছেন। এ ছাড়াও শ্যালক নাসির মুন্সী, শাহপরান মুন্সীসহ অন্যদের নামে- বেনামে কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি ক্রয় করা হয়েছে বলে জানা গেছে। মুজিবুল হক চৌদ্দগ্রাম থেকে টানা তিনবারসহ মোট চারবারের সংসদ সদস্য ছিলেন। ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তিনি জাতীয় সংসদের হুইপ ছিলেন। ২০১৪ সালের ৬ই জানুয়ারি থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সরকারের রেলপথমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মুজিবুল হক ৬৭ বছর বয়সে দীর্ঘ কুমার জীবনের ইতি টেনে ২০১৪ সালের ৩১শে অক্টোবর হনুফা আক্তার রিক্তাকে বিয়ে করেন। তিনি ২০১৬ সালের মে মাসে ৬৯ বছর বয়সে প্রথম কন্যাসন্তানের বাবা হন। ২০১৮ সালের ১৫মে তার জমজ সন্তানের জন্ম হয়। সাবেক রেলমন্ত্রী সম্পর্কে স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতা মানবজমিনকে বলেন, সম্প্রতি সাবেক রেলমন্ত্রীর বিছানায় টাকার দৃশ্য এটা আমাদের কাছে খুব স্বাভাবিক মনে হয়েছে। কারণ তার দুর্নীতি ও সম্পদের পরিমাণ এর চেয়েও শতগুণ বেশি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন যখন তুঙ্গে ঠিক তখনই স্ত্রী-সন্তান নিয়ে দুবাই পাড়ি জমান। মুজিবুলের পরিবার ছিল দরিদ্র এবং কৃষক পরিবার। যেটা তিনি বিভিন্ন সভা সমাবেশে নিজেই বলে বেড়াতেন। একসময় ভাত খাবার প্লেট না থাকলেও তিনি হুইপ নির্বাচিত হওয়া পর্যন্ত আদর্শগত দিক থেকে পরিচ্ছন্ন ছিলেন। শেষ বয়সে এসে স্ত্রী হনুফাকে বিয়ে করার পর তিনি ধীরে ধীরে দুর্নীতিতে জড়ান। স্ত্রী হনুফা ছিলেন মূলত তার দুর্নীতির ক্যাশিয়ার। এলাকায় ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচন করতে হলে তাকে ২ কোটি টাকা দিয়ে মনোনয়ন নিতে হতো। এরপর থেকে তার সঙ্গে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের দূরত্ব তৈরি হয়। ঘুষ দুর্নীতির কারণে তিনি স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করেন এবং কোনঠাসা হয়ে পড়েন। মুজিবুল হক কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। এ বিষয়ে জানতে সাবেক রেলমন্ত্রী মুজিবুলকে মুঠোফোনে ফোন দিলে বন্ধ পাওয়া যায়। পরে হোয়াটসঅ্যাপে ফোন ও এসএমএস পাঠালেও তিনি সাড়া দেননি। 

mzamin

গল্প- কাচঠোকরা by আশান উজ জামান

জরুরি একটা কাজে গিয়েছিলাম। শহর থেকে দূরে। অন্য শহরে। ওখানেই এক বন্ধুর বাড়ি। ওর কাছে উঠব। স্টেশন থেকে নিয়ে যাবে আমায়। এই ছিল কথা।

নেমেই খোঁজ করলাম। আসেনি।

অপেক্ষা করলাম। এলো না।

যাওয়ার পথে মোবাইল হারিয়েছি। ফলে যোগাযোগও করা গেল না।

কী করব?

তখন রাত। বাড়ছে। বিদেশবিভুঁই।

কে যেন বলেছেন, যার কোথাও থাকার জায়গা নেই, তার হোটেল আছে!

তা-ই সই। কিন্তু একা থাকার কোনো সিট ফাঁকা নেই। দুজনের রুম আছে। চাইলে ভাগাভাগি করে থাকতে পারি। পরে কেউ এলে থাকবে, না এলে নাই। এক সিটেরই ভাড়া দিতে হবে।

উঠে গেলাম। না, অন্য হোটেলে খোঁজ নেওয়ার অবস্থা তখন ছিল না আমার। সারাদিন রাস্তায়। না খাওয়া, না দাওয়া, নাড়ি চোঁ চোঁ করছে, চোখ লেগে আসছে।

খেলাম। তারপর ঘুম।

বড় ক্ষুধায় খাওয়া যেমন, বেশি ক্লান্তির ঘুমও তেমন। হয় না বেশি। হুটহাট ভেঙে যায়। তবে আমি বেঘোরে ঘুমুচ্ছিলাম। ডাকলেন এক ভদ্রলোক। আমার রুমমেট। ওপাশের আলোটা জ্বেলে লিখছিলেন। কাগজ শেষ! আমার কাছে চাইছেন। কাগজ একটা ছিল। মেদভুঁড়ি কমানোর উপায় – একটা পোস্ট দেখেছিলাম এফবিতে, প্রিন্ট করেছিলাম। ব্যাগেই আছে। এক পৃষ্ঠায় লেখা যাবে। লেখক মানুষ, পেয়ে বসেছে লেখায়, লিখুন। আমি ঘুমাই। ল্যাঠা চুকে গেল।

কিন্তু চুকল না আসলে।

সকালে দেখি মাথার কাছে একটা গল্প। শেষ অংশটা লেখা হয়েছে আমার ওই কাগজে!

ভদ্রলোককে দেখলাম না কোথাও। হয়তো ব্যস্ততা ছিল। উঠে গেছেন ভোরে।

রুমবয়কে জিজ্ঞেস করলাম। জানে না। ম্যানেজারকে বললাম। তিনি তো অবাক। একাই ছিলাম আমি! কেউ ওঠেনি রুমটাতে!

তা হলে?

কেউ তো নিশ্চয়ই ছিল। না হলে কে ডাকল আমায়? কাগজ চাইলে কে? গল্পটাই-বা এলো কোত্থেকে! ভাবছেন, আমি নিজেই লিখেছি, এখন ভুলে গেছি?

না, অসম্ভব। ডান হাতে লিখতাম, হাতটা কেটে ফেলতে হয়েছে এক দুর্ঘটনার পর। এখন টাইপ করে কাজ চালাই। বাঁহাতে। হ্যাঁ, এক হাতেই।

গল্পটাও অদ্ভুত! এমন লেখা লেখা তো দূরের কথা, পড়িওনি আগে।

----দুই-----

শহরের এদিকটায় খুব একটা আসেন না বোধ হয়, না? এলে চোখ এড়াত না বাড়িটা।

নজরে পড়ার মতো বিশেষ কিছু নয় যদিও। চারতলা ফ্ল্যাটবাড়ি। সাদাসিধে। ঘিঞ্জি এলাকায় গড়ে ওঠা আঁটসাঁট আর দশটা বাড়ির মতো। বারান্দা নেই। ব্যালকনি নেই। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে গেলে আড়মোড়া যে ভাঙবে, তার সুযোগও নেই। চারপাশের প্রাচীর ঘেঁষে দেয়াল।

সাধারণ বাড়ি। কিন্তু আপনার নজরে এটা পড়তই। এড়াত না।

প্রতিবেশী বাড়িগুলো মান্ধাতা আমলের। দেয়ালে দেয়ালে শ্যাওলা। জানালায় কাঠের পাল্লা। কিছু ভেঙে গেছে। কিছু ভাঙছে। ছাদগুলো ভাঙব ভাঙব করছে। প্রথম দেখায় অবাক হতে হয়, এখনো ভাঙেনি! বাড়িগুলো নিজেরাও অবাক হয় এই টিকে থাকা দেখে। শেষ হওয়ার পরও শেষ না হওয়া ভালো কিছু নয়। এ এক যন্ত্রণা। যন্ত্রণা বুকে নিয়েই ওরা দাঁড়িয়ে আছে। এ দিন একদিন ফুরোবে, এই আশায়।

বাড়িগুলোর মাঝখানের জায়গাটা ফাঁকা ছিল। ভরে উঠেছিল ময়লা-আবর্জনায়। কচুঘেচু বনগাছ দখল গিয়েছিল। আড্ডা বসত বেওয়ারিশ কনডম, ব্যবহৃত-অব্যবহৃত প্যাড, চিপসের প্যাকেটসহ সমমনাদের। মশা-মাছি আর রোগজীবাণুর অভয়ারণ্য হয়ে নিশ্চুপ ঘুমুচ্ছিল জায়গাটুকু। হঠাৎ সেখানে নড়েচড়ে উঠল জীবন। ইট-বালু-সিমেন্ট এলো। দু-মাস না যেতেই দাঁড়িয়ে গেল নতুন বাড়িটা। সাদা ধবধবে দেয়াল। মাঝে মাঝে জানালা। চৌকোনা থাই গ্লাসে মোড়া। নীলচে মুখোশে ঢাকা জানালাগুলো হাসতে থাকে। সবাইকে সে দেখে অথচ তাকে কেউ দেখে না – হাসির এটাই কারণ। জীর্ণ প্রতিবেশীদের দেখে ভেংচি কাটে। রোদ এলে ফিরে ফিরে যায় আলোর সংকেত হয়ে। সে-আলোয় ধাঁধা লাগে চোখে।

বিশেষণহীন হয়েও তাগড়া জোয়ান বাড়িটা তাই নজরে আসে। আসেই।

আপনারও আসত।

গল্পটা যদিও বাড়িটাকে নিয়ে নয়।

এর নায়ক একটি কাঠঠোকরা। সচল সাধারণ স্বাভাবিক একটি কাঠঠোকরা। বাড়িটার দিকে তাকালেই চোখে পড়ে।

আট ফ্ল্যাটের ওই নতুন দুনিয়া এখনো জমে ওঠেনি। ভাড়াটিয়া এসেছে তিনটাতে। আরগুলো খালি। খালিগুলোর জানালা বন্ধ। এমনই চোখ-না-ফোটা এক জানালায় দেখা পাখিটাকে। আপন মনে ঠক্ ঠক্ করতে থাকে। কাচের ওপর। এই শহুরে রোদে যেখানে পাখির ছায়াই বিরল, সেখানে কাঠঠোকরা! তাও আবার থাই গ্লাসে ঠোঁট কুটে মরছে! সকালের পর সকাল। বিকেলের পর বিকেল।  মাতাল না হলে এমন হয়?

তীক্ষè পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার অধিকারী আপনি। আপনার চোখে নিশ্চয়ই পড়ত ঘটনাটা।

এবং আপনার মনে হতো নিশ্চয় কোনো রহস্য আছে এর পেছনে।

এবং আবিষ্কার করতেন, আপনি চেষ্টা করছেন রহস্যটা ভেদ করতে।

-----তিন-----

জানালাটার বয়স কত হবে?

কতগুলো নতুন বছর যে জানালাটা গলে ভেতরে ঢুকেছে আর   পুরনো হয়ে বেরিয়েছে, তার হিসাব নেই। আমরা শুধু দেখি জং ধরেছে লোহার শিকগুলোয়। অনেক বছর ধরে থাকতে থাকতে জংগুলোর হাত লেগে গেছে। তাই কোনোমতে জড়াপিষ্টি করে আছে তারা। আলগোছে ধরে আছে ভেতরের ক্ষীয়মাণ লোহাটুকুকে। আলতো করে টানলেও হালকা হালকা পরতে ওঠে। হেলান দিয়ে দাঁড়ালে জংয়ের নকশা আঁকা হয় কাপড়ে। বাতাসেও ঝরে যায় কিছুটা। প্রতি সকালেই তাদের মিছিল ছত্রভঙ্গ করতে দেখা যায় বাড়ির বউটাকে। ঝাড়– দিয়ে। সে-সময় মধুর সুরে একটা গান গায় মেয়েটা। বাড়িটায় থাকতে আর মন চাইছে না তার। কিন্তু তার অকম্মার ঢেঁকি বর কোনোভাবেই বাসা বদলায় না। পুরো শহরে এত কম ভাড়ায় এত ভালো বাসা নাকি নেই। ভাড়া একটা ছুতো। ওপরতলার ভাবির সঙ্গে তার জমে যাওয়া ভাবই আসল কথা। না হলে এই এতটা পথ পাড়ি দিয়ে ক্লাস করতে যায় তার বউ, এই ঘিঞ্জি ঘরে থাকে, এই স্যাঁতসেঁতে মেঝেয় হাঁটে, বর্ষায় মাছ ধরা যায় ঘরে, গরমে পোকামাকড় এসে আত্মীয়তা করে, ঠান্ডায় ভিজে যায় লেপ-তোশক, তবু কেন গা করে না সে? এই হলো গানের কথা। বাড়ির কর্তার ভাষায় এর নাম গ্যাজর গ্যাজর। কখনো কখনো ঘ্যানর ঘ্যানর। আজ সকালেও গানটা শুনেই ঘুম ভেঙেছে।

গান করতে করতেই ক্লাসে গেল বউটা।

বরটার কাজ আছে বাইরে; কিন্তু যাবে না। ঘ্যানঘ্যানানিতে ঘুমভাঙা দিন ভালো যায় না।

বারান্দায় এলো সে। জানালা বরাবর শুয়ে আছে একটা বিছানা। দুটো তোশক। একটা বেডশিট। দুটো বালিশ। তেল চিটচিটে ভাবটা তার কালও ছিল। ধুয়ে দিয়েছে বউ। বাতাসে আজ লেবুর সুবাস। গন্ধটা আরেকবার টেনে নিয়ে গা এলিয়ে দিলো। হাতে পত্রিকা। বালিশের পাশেই কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স।

পড়তে পড়তে তার মনে হলো কিসের যেন আওয়াজ আসছে নতুন বাড়িটা থেকে। ভাড়াটিয়া এলো নাকি? চোখ বাড়াল সে। এবং অবাক হলো। একটা কাঠঠোকরা, কাচ ঠুকছে! কোনোদিকে খেয়াল নেই। ঠুকেই যাচ্ছে।

এটা তো অস্বাভাবিক! কী হয়েছে পাখিটার?

ভাবতে থাকল সে।

তার মনে হলো প্রেমের বিয়ে কাঠঠোকরাটার।

ছাত্রজীবনেই সঙ্গী হয়েছে দাম্পত্য। গরিব ঘরের সন্তান। টিউশনির অল্প টাকায়, কাঠের চাকায়, নিজেরই ঠিকমতো চলে না, চালাতে হয় মাকেও। তার ওপর সোনার ডিম পাড়া বড় টিউশনিটা হাতছাড়া হলো ছাত্রীটাকে ঘরে তোলার কারণে। ফলে আবেগটা থিতিয়ে যাওয়ার পর তার ওপর কষ্টের বুদবুদ আর হতাশার যে-সর জমে তার আড়ালে ঢাকা পড়ে জীবন। বড়লোক বাবার বড় মেয়েটা তার বউ, যে কি না সব ছেড়ে তার ছায়া হয়েই উড়াল দিয়েছে এবং বয়সে ছোট, তাই দেহ-মন চিন্তা অপরিণত এখনো, তাই হাঁপিয়ে উঠেছে। ফলে লেগেই থাকে খিটিমিটি। জীবনটা দুজনের গলাতেই ফাঁস হয়ে ওঠে, তা না যায় খোলা, না যায় আটকানো।

কিন্তু রোদ থাক না থাক দিন পার হয়ই। রাতও।

পড়া শেষ হয়েছে পাখিটার। কিন্তু চাকরি হচ্ছে না।

জীবনধারণ জটিল হয়ে গেছে বড়। আগে যেখানে-সেখানে খাবার মিলত। এখন সব মালিকানায় চলে। কিনতে হয়।

বউয়ের পড়া শেষ হয়নি। তার খরচ আছে। সঙ্গে খাওয়া-পরা আর বাসাভাড়া। পাহাড় হয়ে দাঁড়ায় সামনে। অথচ টিউশনিই সম্বল তার। চলছে তাই না চলার মতো।

কিন্তু কীই-বা করার আছে আর? আশার পায়ে ভর দিয়ে হাঁটা ছাড়া? প্রতিদিনই চাকরির সন্ধানে যায় সে। আর ফিরে আসে। আর যায়। আর আসে। জোটে না। এক ভোরে এক সাক্ষাৎকারের স্বপ্ন দেখল সে। চাকরিটা হয়েই যাচ্ছ এমন সময় বাগড়া বাধল। চাকরিদাতা বললেন, যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হবে। ভাঙতে হবে তার ঘরের জানালাটা। পারলে তার চাকরি।

লেখাপড়ায় ভালো ছিল বরাবরই। ব্যবহারিক পরীক্ষার ফলও ভালো। কাঠ তার কাছে শোলা। শুধু যোগ্যতায় হয় না বলেই চাকরি হয়নি আজো। কিন্তু এ কেমন পরীক্ষা! কাচের জানালা কীভাবে ভাঙবে সে?

তবু। চেষ্টা করতে দোষ কী?

তাই লেগে পড়ে কাজে। বীরবিক্রমে ঠোকরাতে থাকে। কিন্তু কাচ ভাঙে না, ভাঙে ঘুম।

সেই থেকে স্বপ্নটাকেই তার সত্য মনে হয়। মনে হয় কাচটা ভাঙলেই তো চাকরি। অন্যান্য চেষ্টার সঙ্গে সঙ্গে তাই এটাও চলে। নিয়ম করে। কখনো সকাল। কখনো বিকেল। দিন যায়। মাস যায়। কিন্তু ভাঙে না জানালাটা। তবু হাল ছাড়ে না সে। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিখেছিল যার যত শব্দ, তা ততই হালকা। কাচটার আওয়াজ শুনে সাহস পায় তাই। আর ঠোকর মারে।

তাই কি? এটাই কি কারণ ওই পাগলামির?

ভাবনাটা আর এগোল না।

মেঝেতে খবরের কাগজ পাতা। তাতে সাজানো তার বই। তার মধ্যে একটা ইঁদুর ঢুকতে দেখা গেল। তাড়াতে হবে। নইলে একটা  বইও আস্ত রাখবে না।

ইঁদুর তাড়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল ছেলেটা।

----চার----

ওই দালানেরই দ্বিতীয় তলার কথা।

আগেরটার মতোই জানালা। কাঠের পাল্লা। লোহার শিক। গরাদের মতো। লম্বালম্বি দাঁড়িয়ে আছে। সামনে কেউ দাঁড়ালে বাইরে থেকে কয়েদি মনে হয়।

এ-মুহূর্তে একজন বসে আছেন জানালাটার সামনে।

একটা বেসরকারি অফিসে চাকরি করেন ভদ্রলোক।

বউ পোয়াতি। আট মাস চলছে। বাপের বাড়ি আছে।

আজ ছুটির দিন না। কিন্তু ইচ্ছে করছিল না যেতে। তাই যাননি অফিসে। অসুস্থ বলে থেকে গেছেন।

এই যুগে অফিসই ঘর। ঘরই অফিস। কাজ থাকেই।

কিছু কাজ বাকি আছে। করতে হবে। ল্যাপটপটা চালু করলেন। শুরু হলো কাজ। হঠাৎ খেয়াল হলো অনেকদিন কিছু দেখা হয় না। তার সংগ্রহ ভালো। বেছে বেছে একটা চালিয়ে দিলেন। বাসায় কেউ না থাকলে এ এক সুবিধা। উপভোগ করা যায় সময়টাকে।

যেভাবে খুশি সেভাবে। যখন খুশি তখন।

আয়োজন সম্পন্ন। এবার ডুব। দেবেন দেবেন করছেন। এমন সময় খেয়াল করলেন কাঠঠোকরাটার আওয়াজ। মনোযোগ        দিলেন সেদিকে। আগের ছেলেটা, আপনি এবং আমি অবাক হয়েছি। তারও হওয়ার কথা। হতেনও। কিন্তু নতুন বাড়িরই নিচতলার একটি   জানালা সুযোগটা দিলো না।

জানালা বরাবর ড্রেসিং টেবিল। তার সামনে ও-বাড়ির মেয়েটা। নিজেকে আবিষ্কারে মত্ত। এদিকে ঘুরছে। ওদিকে ঘুরছে। এটা ধরছে। ওটা মাপছে। চোখদুটো আয়নায়। আয়নাটাতে নেচে যাচ্ছে তার ছায়া। ছায়াটার পায়ে জুতো নেই। হাতে চুড়ি নেই। গলায় হার নেই। পোশাক নেই পরনে। সব ছাড়াও ছায়াটা এত সুন্দর! এত রূপসী! অবাক হয়ে তাই দেখছে ছায়ার অধিকারী দেহটা। আশ মিটছে না তার। বারবার দেখছে।

হঠাৎ থামল সে। কী যেন ভেবে ঘুরে তাকাল।

এ-বাড়ির ভদ্রলোক তখনো হাঁ। চোখ ঠিকরে আছে তার।       গোগ্রাসে উপভোগ করছেন কচি দেহটার নড়াচড়া। অকস্মাৎ ওই দৃষ্টির আঘাত তিনি প্রত্যাশা করেননি। অপ্রস্তুত হলেন। চোখ ফিরিয়ে নিতে পারলেন না। ধরা পড়লেন। একটু কি লজ্জা তাতে পেলেন? বোঝা গেল না।

মেয়েটার রং কিন্তু বদলে গেল। মনে হলো তার মাথাটা কাটা গেছে। লজ্জায়। কিছুই অনুভব করতে পারছে না সে। কিন্তু আড়াল যে নিতে হবে, সেটা বুঝল।

খুব গরম বোধ হচ্ছিল এ-বাড়ির কর্তার। ঠান্ডা হওয়া দরকার। একটু ভেজা দরকার। ভিজবেন। কিন্তু মনোযোগ হারালেন। আবার। রিংটোন বাজছে।

একটা গালি দিলেন। গালিটা দেখা যায় না কোনোভাবেই।

ফোন করেছেন তার বস।

-----পাঁচ-----

কিসের যেন আওয়াজ। ঘুম ভেঙে গেল। আওয়াজের উৎস খুঁজতে বাইরে তাকালেন ভদ্রলোক।

ঠক্ ঠক্ ঠক্।

ঠক্ ঠক্ ঠক্।

কাঠঠোকরা।

অসময়ে অজায়গায় পাখিটাকে দেখে খুব আগ্রহ বোধ করলেন তিনি।

কতদিন গ্রামে যান না। কোনো পাখি দেখেন না। কাঠবিড়ালি দেখেন না। পানকৌড়ি দেখেন না। কতদিন! পাখিটাকে খুব আপন মনে হলো। শৈশবের মতো।

আরেকটু ভালোভাবে দেখতে চাইলেন তাই; কিন্তু ক্ষমতা নেই। যে-হাত দিয়ে জানালাটা খুললেন, সেটা কাঁপছে। জানালার পাশে দাদুভাইর পরীক্ষার রুটিন সাঁটা। চোখ পড়ল। স্পষ্ট দেখতে পেলেন না। সবকিছু ঝাপসা। চশমাটা ও-ঘরে। নিয়ে আসতে আসতে যদি উড়ে যায় পাখিটা! তাই গেলেন না। আনলেও লাভ হতো না। পাওয়ার ঠিক নেই। দেখা যায় না ঠিকমতো।

চশমার চিন্তা বাদ দিয়েই তিনি দেখছেন পাখিটাকে। অস্পষ্ট লাগছে। তাতে কী? চিন্তা করতে পারলে দেখতে পারতে হয় না। ভাবলেন।

মনে হচ্ছে পাখিটার একটা ছেলে আছে।

ছেলেটা খুব ভালো কাঠ ঠুকতে পারে। চাকরি করে একটা কোম্পানিতে। কোম্পানিটা বাসা বানায়। অন্য পাখিদের জন্য। তার বেতন ভালো। কিন্তু উন্নতি হচ্ছে না। বাবার অসুখ। মার অসুখ। ছেলে পড়ছে। বউ আবার পোয়াতি হয়েছে। কাজে যেতে পারে না। চিকিৎসার খরচ আছে। অন্যান্য ব্যয় আছে। সব মেটাতে হাবুডুবু হাবুডুবু।

একটা কোচিং আছে তার। বাসার ডালে অফিস। কাজ থেকে ফিরে কোচিংয়ে যায়। গোটাপাঁচেক তরুণ কাঠঠোকরা পড়তে আসে। স্যার হিসেবেও ভালো সে। দারুণ করে পড়ায়। কীভাবে কাঠ ঠুকতে হয় পড়ায়। কীভাবে উড়তে হয় পড়ায়। কীভাবে হাসতে হয় পড়ায়। কীভাবে কষ্ট গোপন করে ভালো থাকতে হয় পড়ায়।

পড়ানো শেষে বাসায় ফিরে আবার পড়ায় :

বাবাকে। কীভাবে ওষুধ খেতে হয়। কীভাবে চশমার কাচ মুছতে হয়। কীভাবে চলতে হয়!

মাকে। কীভাবে ছানা পাখিদের কোলে নিতে হয়! বড় করতে হয়!

বউকে। কীভাবে খাবার তৈরি  করতে হয়! শ্বশুর-শাশুড়ির মধ্যে কীভাবে খুঁজে নিতে হয় বাবা-মাকে।

তারপর খায়। তারপর শুতে যায়। তখন তার বড় ছেলেটা তাকে পড়ায়। বাতাসে কিসের গন্ধ থাকলে ঝড় হয়। কোন তারা কোথায় থাকলে ভোর হয়। কোন গাছের ছাল শক্ত কিন্তু কাঠ নরম। তার কোন স্যার সবচেয়ে ভালো। কোন ম্যাডামটা বেশি সুন্দর। ইত্যাদি। পড়তে পড়তে ঘুম আসে তার। ঘুমিয়ে যায়। তারপর রাত গভীর হয়। তারপর ফ্যাকাশে হয়। তারপর সকাল। তারপর কাজে যায় সে।

যায়, বিকেলে ফেরার আশায়।

যায়, ওষুধ নিয়ে আসবে বলে।

যায়, বাইরে গেলে ঘরে ফেরা নিয়ম বলে।

দিনশেষে ফিরেও আসে।

আবার পড়ায়। আবার ঘুমোয়। আবার ওঠে। আবার যায়। আবার আসে। আবার যায়।

একদিন হোঁচট খায় নিয়মটা। ফেরা হয় না তার।

ফেরা হয় না পরের দিনও।

তার পরের দিনও।

তার পরের দিনও।

ফেরে না সে।

তার বাবা, মানে ওই কাঠঠোকরাটা, চিন্তায় পড়ে যায়। ছেলে তার আসে না কেন। ওষুধ শেষ। তার মা, মানে কাঠঠোকরাটার বউ, চিন্তায় পড়ে। ছেলে তার আসে না কেন। বাত বেড়েছে।

তার বউ, মানে কাঠঠোকরাটার ছেলের বউ, চিন্তা করে। স্বামী তার আসে না কেন। খাবার নেই। তার ছেলে, মানে ওই কাঠঠোকরার নাতি, চিন্তায় পড়ে। কাল পরীক্ষা। বেতন নাকি। বাবা তার আসবে কবে।

কী হলো তার? কোথায় গেল? এমন কেন? কেন আসে না?

সব চিন্তা বোঝা হয়। আশ্রয় নেয় কাঠঠোকরাটার মাথায়। অচল পাখি সে। পাখা মেলতেই হাঁপিয়ে ওঠে। তবু প্রতিদিন বের হয়। খুঁজে আসে ছেলেকে। পায় না।

একজনের কাছে জানতে চায়। দেখো হয়তো পেট্রল বোমায় পুড়েছে। সে বলে।

আরেকজনের  কাছে জানতে চায়। দেখো কেউ কুপিয়েছে কি না। সে বলে।

আরেকজন বলে অন্য কথা। দেখো মাদক বেচার দায়ে পুলিশে ধরেছে কি না।

দেখো গুলিতে মরল পড়ল কি না। শিশুহত্যার দায়ে গণপিটুনিতে মরল কি না। গুম হলো কি না। আরেকটা বিয়ে করে পালিয়ে গেল কি না।

সবাই যার যার মতো সমাধান দেয়। কিন্তু ছেলে তার ফেরে না।

তাই আবার বের হয়। পায় না।

আবার বের হয়। পায় না।

বাবার বুক ছিঁড়ে যায়। মার বুক ছিঁড়ে যায়। বউয়েরও। আর কারো কিছু হয় না। না প্রতিবেশীদের। না পথচারীদের। তাদের যেন বুকই নেই! কাঁপবে কী! অথবা পাখিটা যেন কেউ না। তার জীবনের কোনো দাম নেই। তার থাকা-না-থাকার কোনো গুরুত্ব নেই! এ কেমন সময়! অবাক লাগে বাবার।

একদিন বেরিয়েছে বাবা পাখিটা। ছেলের কারখানায় যাবে। কিন্তু ঠিকানা জানে না। উড়তে উড়তে এদিকে চলে এসেছে। যাওয়ার সময় থামল নতুন বাড়িটা দেখে। বাকশোর মতো বাড়ি। সাদা। গায়ে খোপ খোপ। খোপগুলো নীল। এমনই এক নীল খোপের ভেতর ছেলের দেখা পাওয়া গেল। কিন্তু এ কি? ছেলেটা যে বুড়ো হয়ে গেছে! তার মতো। তার পাখনা তার পা তার চোখ তার ঝুঁটি সব তো তার মতো। তার মতো করে উড়ছে। তার মতো করে ডানা ঝাপটাচ্ছে। কী করে হলো! এই কদিনে!

এত চিন্তার সময় এখন না। ওকে বের করতে হবে আগে।

সেই থেকে ঠুকরিয়ে যাচ্ছে সে। ভেতর থেকে ছেলেও ঠোকরাচ্ছে। তার মতো করেই। দেখছে সে। কিন্তু দেয়ালটা ভারি শক্ত। ছিদ্র হচ্ছে না। হাল ছাড়ার পাত্রও সে নয়। ছেলেটাকে বাঁচাতে হবে। যদি না পারে? যদি সে দমবন্ধ হয়ে মরে?

এটুকু ভেবেই পড়ে গেলেন লোকটা। জানালার একটা শিক ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সেটা খুলে গেছে বলেই পড়ে গেছেন। উঠতে হবে তাকে। কাঠঠোকরাটার কী হলো জানা দরকার। কিন্তু মাথা তুলতে পারছেন না। চোখজুড়ে অন্ধকার।

-----ছয়-----

পাখিটার সমস্যা গুরুতর।

চাকরি করে সে। করে তার সঙ্গীও।

সংসার দেখে সে। দেখে তার সঙ্গীও।

তার বাবা-মা গরিব। গরিব তার সঙ্গীর বাবা-মাও। সবাই থাকে গ্রামে।

তার সঙ্গী তার মা-বাবার খরচ দেয়। কিন্তু সে দিলে দোষ। নিষেধাজ্ঞা এসেছে। কিছুই করা যাবে না।

সঙ্গীটা তার যখন-তখন বাইরে যায়, যখন-তখন আসে, যার-তার সঙ্গে মেশে। ঠিক আছে। কিন্তু তার কাজ একটু দেরিতে শেষ হলে বা মেঘ করলে বাসায় ফিরতে দেরি হলে, হতেই পারে, বা অফিসের কোনো আয়োজন তার বিলম্ব ঘটালে, টেকা যায় না। চাকরিটা তাই ছেড়ে দিতে হলো! কারো সঙ্গে কথা বলা যাবে না। হাসা তো যাবেই না। তার কোনো বন্ধু বা বান্ধবী বা আত্মীয় বাসায় আসতে পারবে না।

না।

হুট হাট করে বাসায় চলে আসে সঙ্গীটা। খুঁজে দেখে কেউ আছে কি না! সন্দেহ সারাক্ষণ।

কিছু হলেই বাপ-মা তুলে গালাগাল। বাবা-মা গরিব বলেই হয়তো।

সহ্য হয় না এই কারাগার জীবন। বুক ভেঙে যায়।

ভালো লাগে না কিছুই। মন বসে না। বাড়ির কথা মনে পড়ে। ছোট ভাইটার কথা মনে পড়ে। খেতে বসলেই মনে হয় ওরা না খেয়ে আছে। পরতে গেলেই প্রশ্ন জাগে ওরা পরছে কী? মাখতে গেলেও চিন্তা হয়। কিন্তু কিছু করতেও পারছে না। দুই ডানা বাঁধা। প্রিয় টিং টংয়ের কথা মনে পড়ে। পড়ে আছে গ্রামে।

কত স্মৃতি কত কথা কত খুশি মেঘে মেঘে আঁকা হয়, ও দেখে। ছুঁতে পারে না। তাই বৃষ্টি ঝরে চোখে।

টিংটংয়ের সঙ্গে ঘর হলে নিশ্চয় এমন হতো না। মনে হয় ছুটে যায় তার কাছে। মানুষ যদি হতো, হেঁটেই পাড়ি দিত হাজার মাইল, বাড়ি চলে যেত।

কিন্তু পারে না। কাজে যাওয়ার সময় বাসা বন্ধ করে যায় সঙ্গীটা!

কথা বলা যায় না। বের হতে পারে না। পাখিটা তাই মাথা কুটে মরে। কাচের দেয়ালে।

ভাবছিল একটি মেয়ে। আগের বাড়িটার পাশের বাড়িতে বাস তার। বাড়িটার অবস্থা বেশ ভালো। আগেরটার মতো পুরনো নয়। জানালার শিকে জং নেই। আছে রঙের নকশা। সেই নকশার ভেতর দিয়ে দেখা যাচ্ছিল মেয়েটাকে। রঙিন পোশাকে ঢাকা শ্যামলা রঙের গা। মুখটা বেজার। চোখটা আরো বেজার। বেজার সেই চোখদুটোয় কাঠঠোকরাটার ছায়া নাচছিল। আর সে ভাবছিল পাখিটার কাহিনি।

ভাবতে ভাবতে থামল মেয়েটা। পাখিটা মাথা কুটছে না, কুটছে ঠোঁট। শুধরে নিল। তাছাড়া বের হতে না পারাটাও ভুল। পাখিটা জানালার বাইরে থেকেই ঠোকরাচ্ছে। গ্রামে যাওয়ার ইচ্ছে হলে সে তো যেতেই পারে। তার মানে ঘটনা অন্য। কী হতে পারে? সেটা খোঁজার সুযোগ সে পেল না। চুলায় দুধ ছিল। পোড়া লেগেছে। গন্ধ ছুটেছে। ছুটতে হলো তাকেও।

কয়েকবার পড়লাম গল্পটা। ইনিয়ে-বিনিয়ে। বুঝলাম না কিছুই! কিন্তু ও নিয়ে পড়ে থাকলে চলবে না। কাজ ছিল। করলাম। একটু ঘুরলাম শহরটাতে। বিকেলে চেক আউট করলাম। বাড়ি ফিরব। বাসস্ট্যান্ডে দেখা হলো বন্ধুটির সঙ্গে! কাল থেকে অপেক্ষা করছে আমার জন্য! কী এক ঝামেলায় আটকে গিয়েছিল। তাই আসতে পারেনি সময়ে। তারপর থেকে ওঠেনি আর। যদি আমি আসি! কী গাধামিটাই না করেছি।

ফেরা হলো না। যা হোক। বন্ধুর বাড়ি শহরের কাছেই। নতুন গড়ে ওঠা আবাসিক এলাকায়।

চমৎকার বাড়ি! আধুনিক ফিটিংস। পরিবারটাও দারুণ। বোনটা তো আপু আপু করে পাগল করে তুলল। একটা ঘর দেওয়া হলো আমাকে। তিনতলায়।

দুদিন ছিলাম।

দুদিনই দেখেছি একটা কাঠঠোকরা ঠোকরাচ্ছে আমার জানালার কাচ। ওই গল্পের মতো করে! আগে থেকেই কি ঠোকরায়? জিজ্ঞেস করেছিলাম। না। সেদিনই প্রথম দেখল ব্যাপারটা। সবকিছু খুব অদ্ভুত ঠেকল আমার কাছে। কিন্তু কোনো বিষয় নিয়ে বেশি চিন্তা করলে সেটা পেয়ে বসে। তাই পাত্তা দিলাম না।

তবু রেহাই নেই।

বাড়ি এলাম যেদিন, তার পরদিন বিকেল থেকে আমার জানালায়ও তার দেখা মিলছে। প্রথমে শুধু ঘুরত। উড়ত। এখন ঠোকরায়!

যখন খুশি, তখন। প্রতিদিন।

বছর ঘুরতে চলল, কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি।

এবং এ-কারণেই কিনা জানি না। আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি। সম্ভবত।

যেখানেই থাকি, যতদূরেই থাকি, ঠক্ ঠক্ আওয়াজটা শুনতে পাই। বুকে ব্যথা হয় ঠোকরের তালে। মনে হয় প্রতিটা ঠোকর পড়ছে আমার বুকে। কাচে নয়।

বিশ্বাস করছেন না, তাই না? দোষ দেবো না আপনাকে। আমার বর বিশ্বাস করেনি। পরিবার করেনি। প্রতিবেশী না, ডাক্তারও না। অথচ আমি এখন বাড়ি নেই। আছি অনেক দূরে। আপনার কাছে।

এই যে শুনুন। ঠক্ ঠক্ আওয়াজটা! শুনতে পাবেন।

একটু খেয়াল করুন!