Wednesday, October 30, 2013

ছোট মন নিয়ে গণতন্ত্র চর্চা করা যায় না

যে আগুনে পুড়ছে বাংলাদেশ
সবাই প্রশ্ন করছেন—কী হবে, কী ঘটতে যাচ্ছে বাংলাদেশে? দর্শক-পাঠকেরা সাংবাদিকদের কাছে প্রশ্নটা করেন, আর সাংবাদিকেরা করেন বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে। একটু আগে একজন টিভি সাংবাদিকও আমাকে এই একই প্রশ্ন করছিলেন। আমি একজন গোবেচারা সমাজবিজ্ঞানী। আমার বিদ্যা আমাকে সমাজের মূল প্রবণতাসমূহ বিশ্লেষণ করতে শিখিয়েছে। কিন্তু এখন কী হবে, সেটা বিশ্লেষণ করার মতো ক্ষমতা আমার নেই। অনেকে প্রশ্ন করেন, আবার এক-এগারো হবে কি না।
অর্থাৎ ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হবে কি না। ইতিহাসে কখনো কখনো পুনরাবৃত্তি ঘটে। তবে বেশির ভাগ সময়ই ঘটে না। আর ঘটলেও ভিন্ন অবয়বে ঘটে। তাহলে এই প্রশ্নের উত্তর কাদের কাছে খুঁজব? পেশাগতভাবে এই প্রশ্নের জবাব দেওয়ার জন্য সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি হলেন জ্যোতিষীরা। আমি ঠাট্টা করছি না। ভারত উপমহাদেশেই জ্যোতিষীরা একটি চাঞ্চল্যকর ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, যা সম্পূর্ণভাবে ফলে গিয়েছিল। ঘটনাটা বর্ণনা করা হয়েছে ল্যারি কলিন্স ও দোমিনিক ল্যাপিয়েরের ফ্রিডম অ্যাট মিডনাইট গ্রন্থে। ঘটনাটা হচ্ছে এ রকম: ১৯৪৭ সালে ভারতকে যখন স্বাধীনতা দেওয়া হয়, তখন কংগ্রেস নেতাদের বলা হয় যে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা আগে ঘোষণা করা হবে। এরপর ১৪ আগস্ট রাতে অথবা ১৫ আগস্ট লর্ড মাউন্টব্যাটেন করাচি গিয়ে পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন। কংগ্রেসের নেতারা ছিলেন খুবই হুঁশিয়ার। তাঁরা এই খবর পেয়ে তাড়াতাড়ি জ্যোতিষীর কাছে গেলেন। জ্যোতিষীরা লগ্ন হিসাব কষে বললেন, ১৪ আগস্ট মধ্যরাতের আগে ভারতের স্বাধীনতা ঘোষিত হলে মহাবিপদ ঘটবে। ভারতের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। কংগ্রেসের নেতারা জওহরলাল নেহরুর কাছে দৌড়ালেন।
নেহরু তুকতাক মানেন না। তবু তাঁকে বাধ্য করা হলো মাউন্টব্যাটেনকে অনুরোধ করতে, যাতে ভারতের স্বাধীনতা ১৪ আগস্ট মধ্যরাতের পরে ঘোষিত হয়। এর পর মাউন্টব্যাটেনের দপ্তর থেকে জিন্নাহকে আগে স্বাধীনতার সনদ গ্রহণে অনুরোধ করা হয়। জিন্নাহ মহানন্দে রাজি হন। ফলে ১৪ আগস্টের দিনের বেলা পাকিস্তান স্বাধীন হয়। আর রাত ১২টার পরে ভারত স্বাধীনতা লাভ করে। পরবর্তী ইতিহাস থেকে জ্যোতিষীরা অভ্রান্ত প্রমাণিত হন। ১৪ আগস্ট রাত ১২টার আগে স্বাধীনতাপ্রাপ্ত পাকিস্তান নামের যে রাষ্ট্র জন্ম নেয় তা ভেঙে যায়, আরও কত ভাঙবে তা জানি না। অথচ রাত ১২টার পর জন্ম নেওয়া ভারত তার অস্তিত্ব এখনো অটুট রেখেছে। আমি তাই গণমাধ্যমের বন্ধুদের অনুরোধ করব, তাঁরা যেন শুধু বিজ্ঞজনদের কাছে দৌড়াদৌড়ি না করে জ্যোতিষীরা এ সম্পর্কে কী বলছেন, তা যেন আমাদের অবহিত করেন। যদি জ্যোতিষশাস্ত্রে বিশ্বাস না করেন, তাহলে ঐতিহাসিকদের কাছে যেতে পারেন। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত মর্মান্তিক হলেও বাংলাদেশের ইতিহাসে অভিনব নয়। ঐতিহাসিকেরা আপনাদের নিয়ে যাবেন অষ্টম শতাব্দীতে। এই শতাব্দীর প্রায় প্রথম ৫০ বছর ধরে বাংলায় মাৎস্যন্যায় বিরাজ করেছিল। মাৎস্যন্যায়ের সরল অর্থ হলো মাছের মতো অবস্থা। অর্থাৎ বড় মাছ ছোট মাছকে খেয়ে ফেলে। সমাজে যখন নৈরাজ্য থাকে, তখন যাঁরা সমাজে শক্তিশালী, তাঁরা দুর্বল মানুষকে অত্যাচার ও নিপীড়ন করে থাকেন। বাংলাদেশের ইতিহাসের আদিকালে যে নৈরাজ্য দেখা দিয়েছিল,
তার সমাধান অস্ত্রের বলে করা সম্ভব হয়নি। এর সমাধান হয়েছিল সর্বসম্মতিক্রমে গোপালকে রাজা নির্বাচনের মাধ্যমে। অর্থাৎ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নৈরাজ্যের অবসান করা হয়েছিল। আমার মনে হয়, আমাদের আজকের সমস্যা সমাধানে যদি গণভোটের ব্যবস্থা করা হতো, সেটাই আমাদের জন্য সবচেয়ে টেকসই ও মঙ্গলজনক হতো। তবে বাংলাদেশের ইতিহাস প্রমাণ করে যে কখনোই এখানে অগণতান্ত্রিক শক্তি দীর্ঘকাল টিকে থাকতে পারেনি। এমনকি ১৯৭১ সালে আমরা যে মুক্তিযুদ্ধ করেছি, সেটাও ছিল একটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কাজেই এখানে মানুষের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থাই নেওয়া হোক না কেন, তা কখনোই টেকসই হবে না। আবার ইতিহাস এই সাক্ষ্যও দেয়, মানুষের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কখনো কাউকে বসানো হলে তার বিরুদ্ধে বাংলার মানুষ বারবার বিদ্রোহ করেছে। যদি জ্যোতিষী ও ঐতিহাসিকদের পছন্দ না হয়, তাহলে আপনাকে যেতে হবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের কাছে। তাঁরা আমাদের বলবেন, এই সংকট সাময়িক সংকট নয়। আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থার গভীরে এই সংকটের মূল নিহিত।
আমাদের দেশে নির্বাচন নিয়ে বারবার এ সংকটের কারণ হলো, এখানে যে গণতন্ত্র কার্যকর রয়েছে, সেটা অনেকাংশেই একটি খোলস। এর ভেতরে কোনো প্রাণশক্তি নেই। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উদারনৈতিক মূল্যবোধের দরকার। ছোট মন নিয়ে গণতন্ত্রের মতো মহৎ আদর্শের বাস্তবায়ন করা যায় না। কিন্তু সমস্যাটা আরও জটিল। বাংলাদেশের গণতন্ত্র কায়েমি স্বার্থবাদীদের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। কয়েকটি কারণে এখানে রাষ্ট্রব্যবস্থা দখল করলে কেউ ছাড়তে চায় না। প্রথম কারণ হলো, এখানে কেন্দ্রীয় সরকারের নির্বাহী বিভাগের শীর্ষবিন্দুতে সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত। এই কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার প্রতিষেধক ও নিবারক নেই। এর ফলে সমাজে ক্ষমতার ভারসাম্যও (চেক অ্যান্ড ব্যালান্স) নেই। দ্বিতীয় সমস্যাটা হলো, বাংলাদেশে খারাপ কাজ করলে কোনো বিচার হয় না, আর ভালো কাজ করলেও পুরস্কার থাকে না। কাজেই রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করলে অভূতপূর্ব সব কর্মকাণ্ড অবলীলায় করা সম্ভব হয়। তৃতীয়ত, যে নির্বাচনব্যবস্থা, তাতে কোনোমতে এক ভোট বেশি পেয়ে নির্বাচিত হলেই পাঁচ বছরের জন্য সাংসদ নির্বাচিত হওয়া সম্ভব। এর ফলে নির্বাচনে জাল-জালিয়াতির আকর্ষণ অনেক বেশি। এ ধরনের নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও জালিয়াতি ঘটে। পৃথিবীর অনেক দেশেই আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাংলাদেশের বড় দুই জোটই এ সম্পর্কে কোনো কথা বলছে না বা কেউ বললেও গুরুত্ব দেয় না। সবশেষে, এখানে সরকার ও দলের মধ্যে ব্যবধান ঘুচিয়ে ফেলা হয়েছে।
যিনিই সরকারপ্রধান, তিনিই দলের প্রধান। তাই দলের কোনো স্বতন্ত্র অস্তিত্ব থাকে না। দল ও সরকার একাকার। বড় দুই রাজনৈতিক জোটের কেউই দীর্ঘস্থায়ী ও মৌলিক পরিবর্তন সম্পর্কে কখনোই কোনো কথা বলেন না। দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন না করার মতো ব্যাপারে দুটি দলই একেবারে একমত। সুতরাং মৌলিক ব্যাপারে তাঁদের মধ্যে কোনো ভিন্নতা নেই। ভিন্নমত শুধু স্বল্পস্থায়ী নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়ে। কাজেই আমাদের একই সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী ও স্বল্পমেয়াদি পরিবর্তনের কথা চিন্তা করতে হবে। যদি জ্যোতিষী, ঐতিহাসিক বা সমাজবিজ্ঞানী—তাঁদের কাউকেই আপনার পছন্দ না হয়, তাহলে আপনাকে যেতে হবে ক্রীড়াতত্ত্ববিদ বা গেম হিরোইস্টদের কাছে। তাঁরা বলবেন, এটি একটি হার-জিতের (জিরো-সাম গেম) খেলা। এই খেলায় কী ধরনের রণকৌশল অবলম্বন করলে জেতা যায়, সেটা তাঁরা বাতলে দিতে পারবেন। আমার অবশ্য এ খেলায় আগ্রহ নেই। কারণ, এ খেলা খেলতে গেলে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জীবনে যে দুর্যোগটা নেমে আসবে, তা নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন। বাংলাদেশে আজ যে সমস্যা, তা রাজনীতিকেরা সৃষ্টি করেছেন। নাগরিক হিসেবে আমাদের দাবি যে তাঁদের তৈরি সমস্যার সমাধান তাঁদেরই বের করতে হবে।
আকবর আলি খান: তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা।

যে ফোনালাপটি না হলেই ভালো হতো

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার মধ্যে ফোনালাপ হবে—এমন কথা চাউর হয়ে গিয়েছিল কয়েক দিন আগেই। সরকারের মন্ত্রী-নেতারা আগাম ঘোষণা দিয়েছিলেন, দুই নেত্রীর মধ্যে সংলাপ হবে। দেশের মানুষও আশান্বিত হয়েছিলেন। তাঁরা ভেবেছিলেন, আগামী নির্বাচন নিয়ে দেশে যে সংকট তৈরি হয়েছে, দুই নেত্রীর আলোচনায় তার শান্তিপূর্ণ সমাধান হলেও হতে পারে। বিদেশি কূটনীতিকদের কেউ কেউ বলেছিলেন, এবার বরফ গলবে। না, বরফ গলেনি। বরং গত শনিবার রাতে দুই নেত্রীর মধ্যে যে টেলিফোন সংলাপ হলো, তাতে বরফ আরও জমাটবদ্ধ হয়েছে। সংকট ঘনীভূত হয়েছে। তিন দিনের হরতাল এবং হরতাল-পরবর্তী সহিংসতায় ১৩টি প্রাণ ঝরে গেছে। আরও কত হরতাল হবে। আরও কত প্রাণ যাবে, আরও কত মানুষ বোমা-ককটেলের ঘায়ে পঙ্গু হবে, তার হিসাব নেই। দুই নেত্রী কথা বলবেন, এ কথা শুনে মানুষ যতটা আশান্বিত হয়েছিলেন, টেলিফোন আলাপের পর তাঁরা তার চেয়ে অনেক বেশি হতাশ হয়েছেন। আহত হয়েছেন। তার চেয়েও বড় কথা, জাতি হিসেবে আমরা লজ্জিত হয়েছি। মাথা হেঁট হয়ে গেছে।
আমাদের শীর্ষ নেতৃত্ব এই ভাষায় কথা বলেন! গতকাল দুই নেত্রীর টেলিফোন আলাপ ছিল টক অব দ্য টাউন। টক অব দ্য কান্ট্রি। জনসভায়, রাজনৈতিক মঞ্চে নেতা-নেত্রীরা যে ভাষায় কথা বলেন, পরস্পরকে আক্রমণ করেন, সেই একই ভাষায় কি তাঁরা টেলিফোনে কথা বলতে পারেন? ১৯৭১ সালের মার্চে পাকিস্তানি বাহিনী যখন নিরস্ত্র বাঙালির ওপর গুলি চালাল, তখন বঙ্গবন্ধু জানতেন, ওরা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, ক্ষমতা দেবে না। পাকিস্তান থেকে সেনা ও সমরাস্ত্র এনে গণহত্যা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। তার পরও তিনি ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে বৈঠকে অসামান্য সৌজন্য দেখিয়েছেন। তাঁকে বাংলাদেশের অতিথি বলে অভিহিত করেছেন। এমনকি একাত্তরের খলনায়ক জুলফিকার আলী ভুট্টোর সঙ্গেও হাসিমুখে কথা বলেছেন। তিনি নিজের পরিকল্পনার কথা যেমন ওদের বুঝতে দেননি, তেমনি আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের জন্য শেষ পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। কিন্তু আমাদের দুই নেত্রীর মধ্যে যে টেলিফোন আলাপ হলো, তাতে সামান্যতম সৌজন্যবোধের পরিচয় পাওয়া গেল না। টেলিফোনটি করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী।
কেমন আছেন—বলে তিনি কথা শুরু করেন। ওপার থেকে বিরোধী দলের নেত্রী বললেন, ‘ভালো। ভালো আছি।’ প্রত্যুত্তরে ‘আপনি কেমন আছেন’ সে কথাও জিজ্ঞেস করেননি। এরপর দুই নেত্রীর মধ্যে দুপুরে টেলিফোন করা না-করা, ধরা না-ধরা এবং লাল টেলিফোন সেট বন্ধ থাকা না-থাকা নিয়ে অনেকক্ষণ বাহাস চলতে থাকে। একটি বিনীত আমন্ত্রণ পরিণত হয় দুর্বিনীত ঝগড়ায়। প্রধানমন্ত্রী যতই বলেন তিনি দুপুরে লাল টেলিফোন করেছেন। রিং বেজেছে। আপনি হয়তো যেকোনো কারণে ধরতে পারেননি। বিরোধীদলীয় নেত্রী ততই জোর দিয়ে বলেন, টেলিফোনের রিং হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। তাঁর টেলিফোন সেটটি অনেক দিন ধরেই ডেড হয়ে আছে। এরপর শেখ হাসিনা ২৮ অক্টোবর তাঁর সরকারি বাসভবনে আমন্ত্রণ জানালে খালেদা জিয়া অপারগতা প্রকাশ করেন এবং বলেন, হরতালের মধ্যে তাঁর পক্ষে গণভবনে আমন্ত্রণ গ্রহণ করা বা আলোচনায় অংশ নেওয়া সম্ভব নয়। সরকার সৎ ও আন্তরিক হলে ২৯ অক্টোবরের পর যেকোনো সময় আলোচনা হতে পারে। দুই নেত্রীর ৩৭ মিনিটের কথোপকথনে ঘুরেফিরে যুদ্ধাপরাধের বিচার, যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানো, একাত্তরের পর ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগের মানুষ হত্যা, ১৫ আগস্টের খালেদা জিয়ার জন্মদিন পালন ও কেক কাটা, ১৯৯৫-৯৬ সালে জামায়াতকে নিয়ে আওয়ামী লীগের তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন, ২০০১ সালের পর আওয়ামী লীগের ওপর সরকারের দমন-পীড়ন, ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা, ২০০৬ সালের লগি-বইঠার আন্দোলন, এরশাদের সামরিক শাসন ও ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দিনের ক্ষমতাকে বৈধতা দানের বিষয় ঘুরেফিরে আসে এবং প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁরা একে অপরকে তীব্র ভাষায় অভিযুক্ত করেন।
আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী যত আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা করেন, বিরোধী দলের নেত্রী তত অভিযোগের মাত্রা বাড়িয়ে দেন। তাঁর সুর ছিল চড়া। কে কার প্রতি অন্যায় আচরণ করেছেন, জনসভার অনুমতি দিতে কত বিলম্ব করেছেন, সেসব নিয়েও দুজনের মধ্যে তর্ক হয়। ফলে টেলিফোন করার মূল উদ্দেশ্য হারিয়ে যায়। প্রধানমন্ত্রী যখন ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা করে তাঁকে হত্যাচেষ্টার কথা বললেন, তখন খালেদা জিয়া এই হামলার দায় আওয়ামী লীগের ওপর চাপান। আমন্ত্রণ গ্রহণ করা না-করার স্বাধীনতা আমন্ত্রিত ব্যক্তির আছে। আবার কখন, কাকে কীভাবে আমন্ত্রণ জানাবেন, সেটি পুরোপুরি নির্ভর করে আমন্ত্রকের ইচ্ছার ওপর। সেসব নিয়ে আমরা কোনো প্রশ্ন করব না। আমাদের আপত্তি হলো, দেশের দুই শীর্ষ নেত্রীর মধ্যে যে টেলিফোনে আলাপ হলো তার ভাষাভঙ্গি নিয়ে। পুরো টেলিসংলাপটি পরিণত হয় রাজনৈতিক কূটতর্কে। মনে হয়েছে, এক পক্ষের কাছে আমন্ত্রণ জানানোর চেয়ে আমন্ত্রণের বার্তাটি দেশবাসীর কাছে প্রচার করাই মুখ্য ছিল। অপরপক্ষ সেই সুযোগে মনের যত রাগ ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। এখানে জনগণের আকাঙ্ক্ষার কোনো প্রতিফলন ঘটেনি। নিজেদের জেদ বজায় রেখেছেন। সারাক্ষণ একে অপরকে কথা ও বাক্যবাণে ঘায়েল করতে সচেষ্ট ছিলেন। তাই মনে হয়, এই সংলাপ না হলেই ভালো হতো। দুই নেত্রী টেলিফোনে যেসব বিষয়ের অবতারণা করেছেন, তা নতুন নয়। দুই দশক ধরেই একে অপরের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন। এ ব্যাপারে দুজনেরই ব্যক্তিগত ক্ষোভ ও বেদনা থাকতে পারে। কিন্তু তাঁদের মনে রাখা উচিত ছিল, তাঁরা কেবল ব্যক্তি নন, বাংলাদেশের দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতা। তাঁদের একজন বর্তমানে দেশ শাসন করছেন, আরেকজন অতীতে দেশ শাসন করেছেন এবং ভবিষ্যতেও শাসন করবেন বলে আশা করেন। বাংলাদেশের সিংহভাগ মানুষের আস্থা ও ভরসা তাঁদের ওপরই।
কেবল দেশের সাধারণ মানুষ নয়, দুই দলেরই হাজার হাজার নেতা-কর্মীও তাঁদের দিকে তাকিয়ে আছেন। তাঁর এমন কোনো আচরণ করতে পারেন না, যাতে জাতি হিসেবে আমরা লজ্জিত ও ছোট হই। রাজনীতিতে মত ও পথের ভিন্নতা থাকবে। নীতি ও আদর্শের পার্থক্য থাকবে। কিন্তু রাজনীতিকে বৈরিতা ও শত্রুতার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া কখনোই সমীচীন নয়। বর্তমানে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে যে ঝগড়া চলছে, তা নীতিগত নয়। এমনকি যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয়টিও এখন মীমাংসিত। কয়েকজন যুদ্ধাপরাধীর বিচার হয়েছে, রায় কার্যকরের অপেক্ষায় আছে। বাকিদের বিচারও চলছে। বিরোধীদলীয় নেতা নির্দলীয় সরকারের প্রস্তাব উত্থাপনকালে যেভাবে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সহযোগিতা কামনা করছেন, তাতে বলার উপায় নেই যে তিনি দেশটির বন্ধুত্ব চাওয়ার আওয়ামী লীগের চেয়ে পিছিয়ে আছেন। বর্তমান সংকটের মূল বিষয় হলো নির্বাচন। আর এই নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও সবার জন্য গ্রহণযোগ্য করতে দুই নেত্রী দুটি ফর্মুলা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর সর্বদলীয় সরকার। আর বিরোধীদলীয় নেতার নির্দলীয় সরকার। সংবিধান বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দুই নেত্রীর দুই প্রস্তাবকে সমন্বয় করে সবার জন্য একটি সমাধান বের করা কঠিন নয়। সে ক্ষেত্রে সবারই প্রত্যাশা ছিল, দুই নেত্রী বসবেন, কথা বলবেন এবং সেই শান্তিপূর্ণ সমাধান বের করে আনবেন। কিন্তু তাঁরা টেলিফোনে সংলাপের নামে অহেতুক বৈরিতার সৃষ্টি করলেন। তাঁদের এই সংলাপ শুনে শৈশবে পড়া যোগীন্দ্র নাথ সরকারের সেই বিখ্যাত কবিতার কথাই মনে পড়ে, ‘বাহবা বাহবা ভোলা ভুতো হাবা/ খেলিছে তো বেশ/ দেখিব কে হারে কে জেতে/ খেলা হলে শেষ’। সবশেষে নিজেদের প্রতি ধিক্কার দিতে ইচ্ছে হয়। আমরা হয়তো এর চেয়ে উন্নত নেতৃত্বের পাওয়ার যোগ্য নই। সেই জাতি সেই নেতৃত্বই পায়, তারা যার উপযুক্ত!
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

‘টু ফিঙ্গার টেস্ট’ বাতিল হোক

ধর্ষণ একটি মানবতাবিরোধী অপরাধ। সামাজিক বয়ানে এবং রাষ্ট্রীয় আইনে একটি গুরুতর অপরাধ। কিন্তু এই অপরাধের ক্ষেত্রে অপরাধের শিকার নারী যখন এই অপরাধের বিচার চায়, তখন তাকে যেতে হয় ধর্ষণ প্রমাণের রাষ্ট্রের বাতলে দেওয়া পুরুষালি পথ ধরে। কোনটি ধর্ষণ হিসেবে বিবেচিত হবে আর কোনটি হবে না, সেটির চরিত্রও নির্ধারিত হবে এই সমাজ, এই রাষ্ট্র কোনটিকে ধর্ষণ হিসেবে দেখতে চায় আর কোনটিকে চায় না তার মধ্য দিয়ে। ৯ অক্টোবর ধর্ষণের শিকার ক্ষতিগ্রস্ত নারীর ক্ষেত্রে হাতের দুই আঙুলের মাধ্যমে (টু ফিঙ্গার টেস্ট) ধর্ষণ পরীক্ষার পরিবর্তে একটি নীতিমালা করতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। হাইকোর্ট এ জন্য একটি কমিটি গঠন করতে বলেছেন। কমিটিকে তিন মাসের মধ্যে খসড়া নীতিমালা আদালতে দাখিল করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দুই আঙুলের মাধ্যমে ধর্ষণ পরীক্ষা পদ্ধতির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ৮ অক্টোবর ব্লাস্ট, আসক, মহিলা পরিষদ, ব্র্যাক, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, নারীপক্ষসহ দুই চিকিৎসক রিট আবেদনটি করেন। এতে দুই আঙুলের মাধ্যমে ধর্ষণ পরীক্ষার পদ্ধতিকে সংবিধানের ২৭, ২৮, ৩১, ৩২ ও ৩৫(৫) ও সাক্ষ্য আইনের ১৫৫ ধারার পরিপন্থী দাবি করা হয়। গত ১৬ এপ্রিল ধর্ষণ ও ধর্ষণের শিকার নারীর বয়স নির্ধারণের জন্য ফরেনসিক পরীক্ষা পুরুষ চিকিৎসক দিয়ে করানোকে কেন অবৈধ ও বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন আদালত। একই সঙ্গে এই বিষয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ও ফরেনসিক বিভাগের প্রধানকে ২৮ এপ্রিল তলব করেছিলেন আদালত।
একে ধর্ষণের অভিজ্ঞতা, তারপর ধর্ষণ প্রমাণ করার পরীক্ষা হিসেবে মেডিকেল পরীক্ষার নিপীড়ন, বিরক্তি, অস্বস্তি কিংবা আপত্তি। কোনো কিছুকেই আমলে নিতে এত দিন অস্বীকৃতি জানিয়ে প্রশ্নাতীতভাবেই জারি রাখা হয়েছিল দীর্ঘদিন ধরে চর্চিত পুরুষালি ধর্ষণ প্রমাণের প্রক্রিয়াটি। গত ১৬ এপ্রিল প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদন বলেছে, ‘ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগে কোনো নারী চিকিৎসক, কোনো নারী নার্স এমনকি কোনো আয়াও নেই। এমনকি নারীর শারীরিক পরীক্ষার জন্য কোনো পৃথক কক্ষও নেই। চিকিৎসকদের বসার কক্ষের সামনের বারান্দায় একটি টেবিল রাখা। পুরুষ চিকিৎসক পুরুষ ওয়ার্ডবয়ের সাহায্যে সেই টেবিলের ওপর ধর্ষণের শিকার নারীকে রেখে তাঁর পরিধেয় কাপড় খুলে শারীরিক পরীক্ষা করেন। সবুজবাগ থানার এসআই বিকাশ কুমার ঘোষ আদালতের নির্দেশে বয়স নির্ধারণের জন্য একটি মেয়েকে ফরেনসিক বিভাগে আনলে খোলা বারান্দার টেবিলের ওপর পুরুষ ওয়ার্ডবয় আগত নারীটির কাপড় খুলতে শুরু করলেই তিনি চিৎকার করে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।’ কেন এই ফিঙ্গার টেস্ট বাতিল হওয়া জরুরি? বলার অপেক্ষা রাখে না যে প্রচলিত ধর্ষণের মেডিকেল পরীক্ষার ফরমেট নিজেই একটি পুরুষালি মতাদর্শিক উৎপাদন। ব্যবহূত টু ফিঙ্গার টেস্ট ধর্ষণের সারভাইভার নারীর যোনিপথের ঘনত্ব পরিমাপ করে, তার হাইমেনের উপস্থিতি-অনুপস্থিতি নির্দিষ্ট করে। চিকিৎসাপদ্ধতি অনুযায়ী পরীক্ষার সময় নারীর হাইমেনকে একটি গোলাকার ঘড়ির ফ্রেম হিসেবে দেখা হয়।
ঘড়ির কাঁটার ৩ বা ১০-এর অবস্থানে যদি ধর্ষিতার হাইমেন ছেঁড়া থাকে, তবে চিকিৎসক ধরে নেন, এখানে জোরাজুরি বা অসম্মতির সেক্স হয়নি। আর যদি হাইমেন নিচের দিকে অর্থাৎ ঘড়ির কাঁটার ৫ অথবা ৮-এর দিকে ছিঁড়ে, তবে চিকিৎসক এটা ঘোষণা করেন যে এই হাইমেন ছেঁড়ায় জোরারোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি টু ফিঙ্গার টেস্টে ব্যবহূত চিকিৎসকের হাতের আঙুল তাঁর শরীরের আকার, গড়ন ইত্যাদির ভেদে ভিন্ন হওয়াই স্বাভাবিক। ফলে এই ভীষণ সাবজেকটিভ পরীক্ষণপদ্ধতি কখনোই নারী শরীরের ভিন্নতর গঠন বাস্তবতাকে নির্ণয় করার কোনো ক্ষমতা রাখে না। মেডিকেল পরীক্ষার সময় ধরেই নেওয়া হয় যে ধর্ষণ হতে পারে রাতের আঁধারে, অস্ত্রের মুখে, অচেনা মানুষ কর্তৃক এবং ‘হাইমেন অক্ষত থাকা’ সমাজের ‘কুমারী’ নারীর সঙ্গে, যা কিনা নিচের দিকে, নতুন করে হাইমেন ছিঁড়লে এবং যোনিপথ শক্তপোক্ত হলেই কেবল ঘটতে পারে। ফলে যে নারীর হাইমেন আগে ছিঁড়েছে, সে যে কারণেই হোক মেডিকেল এভিডেন্স তার প্রসঙ্গে ‘হাইমেন ওল্ড রেপচার’, ‘হেবিচুয়েট টু সেক্স’ এই বিশেষণগুলো ব্যবহার করবে। আর কোর্টে মেডিকেল পরীক্ষার এই ওল্ড রেপচার, হেবিচুয়েট টু সেক্স বিশেষণগুলো নারীর পূর্বেকার যৌন ইতিহাসের বয়ান হাজির করে, বিচারকক্ষে ধরে নেওয়া হয়, নারীটি আগেও যৌনকাজে লিপ্ত হয়েছে।
ফলে তার ‘সতীত্ব’ নেই, পুরুষালি আইনি পরিসর ধর্ষকের তরফ থেকে নারীর ধর্ষণকেন্দ্রিক অসম্মতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ তৈরি করে দেয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, টু ফিঙ্গার টেস্ট কোন বয়সের ধর্ষণের শিকার নারীর সঙ্গে সম্পাদন করা যাবে, এ নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা প্রণীত হয়নি, আর তাই মেডিকেল পরীক্ষার সনদে আট, ছয় এমনকি পাঁচ বছরের মেয়েশিশুও (টু ফিঙ্গার টেস্টের পরে) ‘হাইমেন ওল্ড রেপচার,’ হেবিচুয়েট টু সেক্স—এই বিশেষণে বিশেষায়িত হতে পারে। আর বিবাহিত হলে তো কথাই নেই, সে ক্ষেত্রে ধর্ষণ প্রমাণ করা অত্যন্ত কঠিন বা হাইমেন পরীক্ষার সাপেক্ষে ধর্ষণ প্রমাণ করা সম্ভবই হবে না। হেবিচুয়েট টু সেক্স-এর সঙ্গে ধর্ষণ শব্দটি একেবারেই যেন মানা যায় না। এখানে মতাদর্শিক বোধটি হলো, ধর্ষণ মামলার মেডিকেল সনদের সামগ্রিক পদ্ধতিগুলো ধর্ষণের শিকার নারীর প্রতি যৌন আক্রমণ, হয়রানি এবং নারীর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ইতিহাস নয়, বরং নারীর অতীত যৌন ইতিহাস দেখতে আগ্রহী। তাই ধর্ষণ পরীক্ষার মেডিকেল টেস্টের পুরুষালি গলিতে নারীর এত দিনকার অস্বস্তিকর এবং পুনরায় নিপীড়নভিত্তিক বাধ্যতামূলক অবস্থান থেকে মুক্তি পেতে আদালতের এই নির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমরা মনে করছি।
ফাতেমা সুলতানা ও জোবাইদা নাসরীন: লেখকদ্বয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক। fatama.suvra@gmail.com, zobaidanasreen@gmail.com

রাজনীতির দাসত্বে বাংলাদেশের মানুষ by একেএম শাহনাওয়াজ

প্রাচীন বিশ্বে দাসত্ব প্রথা একটি বড় সামাজিক ক্ষত ছিল। এলেক্স হ্যালির ‘রুটস’ আধুনিক বিশ্বের সামনে সে ক্ষতের কথা স্পষ্ট করেছে। বিশ্ব সভ্যতার ইতিহাস বলছে স্পার্টাকাসের দাস বিদ্রোহ দাসত্ব প্রথার বিরুদ্ধে ছিল প্রথম সরব প্রতিবাদ। দাস শ্রমের ওপর দাঁড়িয়েছিল রোমের অর্থনীতি। তাই দাসত্ব প্রথার ভাঙনে প্রাচীন রোমের পতন অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। জার্মান বার্বারদের আক্রমণ ছিল শেষ উপলক্ষ মাত্র। মধ্যযুগের সামন্ত সমাজে ইউরোপের ছোট ছোট রাজ্যগুলোর সামর্থ্য ছিল না দাস প্রতিপালন করা। ফলে ক্রীতদাস প্রথা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই অকার্যকর হয়ে যায়। তাই বলে দাসত্বের অবসান ঘটল না। সামন্ত সমাজে ভূমিদাসদের অবস্থান স্পষ্ট হল। অন্যদিকে আফ্রিকার অনেক অঞ্চলে ক্রীতদাস প্রথা চলতে থাকল আধুনিক যুগের প্রাক্কাল পর্যন্ত। পনের শতকের শেষ দিকে বাংলার সুলতান বারবক শাহ আবিসিনিয়া থেকে একদল দাস কিনে আনেন। সামরিক বাহিনীতে যুক্ত করা হয় এদের। সুলতানদের দুর্বলতার সুযোগে ষোল শতকের প্রথমদিকে এই আফ্রিকান দাসদের অভ্যুত্থান ঘটে। ফলে কয়েক বছর বাংলা দাস বা হাবশি শাসনের অধীনে চলে আসে। এরও কয়েকশ’ বছর আগে (চৌদ্দ শতকের মাঝামাঝি) সোনারগাঁয়ে গৃহকর্মী হিসেবে দাস-দাসী বেচাকেনা হতো বলে ইবনে বতুতা বর্ণনা করেছেন। সুতরাং বোঝা যাচ্ছে বাংলাদেশের মানুষ দাসত্ব ব্যবস্থার সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে জড়িয়ে ছিল। ফলে কারও মনোজগতে দাস মালিকের চরিত্র আছে আর কারও মধ্যে দাসের। মানতে হবে স্পার্টাকাসের মতো বিদ্রোহ করার স্বভাবও রয়েছে এ দেশের মানুষের। এটি বাংলার মাটির স্বাভাবিক প্রবণতা। তাই মনোজগতে দাস মালিক হয়ে যারা তাকিয়ায় হেলান দিয়ে আয়েসে গুড়গুড়ি টানেন, শেষ পর্যন্ত তাদের স্বস্তিতে থাকা সম্ভব নয়।
আমাদের ক্ষমতার রাজনীতিকরা এখন দাস মালিকদের চরিত্র বজায় রাখছেন। দেশের সব মানুষ তাদের হুকুমের দাস। তাই তারা নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য, ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছার জন্য মই হিসেবে ব্যবহার করেন দেশবাসীকে। ক্রীতদাস গণ্য করে মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর চালিয়ে দেন শানানো ছুরি। নিজেদের মোক্ষে পৌঁছার জন্য বিপর্যস্ত করেন জনজীবন। আর এসব করতে এতটুকু বিব্রতবোধ করেন না তারা।
গণতন্ত্র তো আমাদের সব পক্ষের নেতা-নেত্রীদের কাছে একটি স্লোগান মাত্র। প্রতারণার বাতাবরণে স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছেন তারা। নির্বাচন ছাড়া আর কোনো দৃশ্যমান গণতান্ত্রিক আচরণ নেই আমাদের রাজনৈতিক দল আর নেতানেত্রীদের মধ্যে। দেশপ্রেমের প্রমাণ তারা তাদের আচরণে কখনও দেখাতে পেরেছেন বিপন্ন মানুষ তা মনে করতে পারে না। জনগণের কষ্ট, ভালো লাগা-মন্দ লাগা কখনও তাদের ছুঁয়ে যায় না। নিজেদের মোক্ষ লাভের জন্য একের পর এক প্রাণঘাতী-সম্পদঘাতী কর্মসূচি চাপিয়ে দেন। আর তা বৈধ করতে চান অপ্রাসঙ্গিক শব্দ চয়নের মধ্য দিয়ে।
স্বাধীনতার ৪২ বছর পার হয়ে গেল; কিন্তু আজ পর্যন্ত একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কাঠামো দাঁড় করাতে পারলেন না কোনো পক্ষ। একটি কাজই সাফল্যের সঙ্গে করতে পারলেন, তা হচ্ছে যার যার দলের পক্ষে একদল দলান্ধ অনুসারী তৈরি। এরা বোকা আÍঘাতী আলোর পোকার মতো যার যার দলের সুবিধাবাদী নেতা-নেত্রীদের মরীচিকার পেছনে জীবনপাত করে ছুটতে থাকেন। দেশপ্রেমের চেয়ে দলপ্রেম যখন বড় হয়ে যায় তখন অন্ধত্ব পেয়ে বসে। আর প্রতারক নেতৃত্ব এসব অন্ধকে ব্যবহার করে মানবতার বুক বিদীর্ণ করেন।
ক্ষমতার দৌড়ে ছোটা দলগুলো নির্বাচন ব্যবস্থাতেও কোনো স্থিতি দিতে পারেনি। গণতান্ত্রিক বোধের উপলব্ধি নেই বলে নির্বাচনে গণরায় মেনে নেয়ার মানসিক শক্তি কারও নেই। সবার দৃষ্টি শুধু মসনদের দিকে। তাই বিবদমান দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস এখন চরমে। এভাবে একপক্ষ শিলের চরিত্রে থাকলে অন্যপক্ষ থাকে নোড়ার চরিত্রে। আর শিল-নোড়ার প্রবল ঘর্ষণে প্রাণপাত হয় সাধারণ মানুষের।
নির্বাচনে আমাদের দেশে পরাজিত পক্ষের অভ্যাস রয়েছে ফলাফল বর্জন করার। নির্বাচন গড়াপেটা করার সুনির্দিষ্ট বা প্রামাণ্য অভিযোগ না থাকলেও নির্বাচনের ফলাফল বর্জন বা বিরূপ মন্তব্য যে গণরায়কে অবজ্ঞা করা, তা গণতান্ত্রিক আচরণ-বিচ্ছিন্ন নেতা-নেত্রীদের বোঝানো কঠিন। পরাজিত পক্ষের একান্ত দলান্ধ মানুষ ছাড়া দেশী-বিদেশী পর্যবেক্ষকসহ দেশের সব ভোটার গত জাতীয় নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি। তারপরও বিপুল গণরায়ে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের মহাজোটকে স্বাগত জানাতে পারেনি বিএনপি আর তার মিত্ররা। গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা যে রাজনীতিকদের দায়িত্ব, তারাই নির্বাচনের পরদিন থেকেই শত্র“তায় লেগে গেল সরকার পক্ষের বিরুদ্ধে। চেষ্টা চলতে থাকল সংসদ অকার্য করার। গণরায়ে অভিষিক্ত সরকারি দলও জণকল্যাণমুখী হতে পারল না। সব দলের এমন আচরণ প্রতিদিন হতাশ করছে সাধারণ মানুষকে।
এসবের পরও আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের সরকার যখন পাঁচ বছর পূর্ণ করছে, তখন আশাবাদী মানুষের আশা করতে ইচ্ছে হয়েছিল যে, নির্বাচন একটি নিজস্ব গণতান্ত্রিক পথ পেয়ে যাবে। কিন্তু যে দেশে রাজনীতিকরা গণআস্থায় বিশ্বাসী নন, গণরায়ের প্রতি ভরসা রাখেন না, তারা নানা ঘোট পাকাবেনই। ফলে সাংবৎসর গণতান্ত্রিক আচরণ না করলেও হঠাৎ নির্বাচনকালীন সরকারের প্রশ্নে অতি বেশি গণতান্ত্রিক হয়ে গেল আওয়ামী লীগ। আদালতের নির্দেশনায় সুযোগ থাকলেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা উঠিয়ে দিয়ে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করার পথে হাঁটতে লাগল। জানা কথা, পারস্পরিক অবিশ্বাসের রাজনীতিতে ঝড় উঠবেই। আর সে ঝড়ে দলগুলোর রাজনীতিতে কী লাভ-ক্ষতি হবে তা তারা বুঝবেন, তবে সাধারণ মানুষের জীবন ও দেশের অর্থনীতি যে বিপন্ন হবে এতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। কিন্তু তাতে কি এসে যায় আমাদের নেতা-নেত্রীদের? তারা তো দেশের মানুষকে বিশেষ এক ধরনের দাস বিবেচনা করেন। এ দাসদের ঘাড়ে যা চাপিয়ে দেবেন তাই মুখ বুজে বহন করতে হবে।
রাজনীতিকদের স্বেচ্ছাচারিতা এতটা উলঙ্গ হয়ে গেছে যে, জনজীবন ও অর্থনীতির ক্ষতি জেনেও দরকারে-অদরকারে মুড়ি-মুড়কির মতো হরতাল দেয়া শুরু হয়েছে। এখন আর জাতীয় ইস্যুর দরকার পড়ে না। একজন বিএনপি বা ছাত্রদল নেতাকে পুলিশ গ্রেফতার করল তো তার জেলায় হরতাল ডাকা হয়ে যায়। ছাত্রশিবিরের নেতা গ্রেফতার হয়েছে তো দুটো জেলায় ডেকে ফেলা হল হরতাল। এতে গাড়ি-ঘোড়া ভাঙা হয়। জ্বালাও-পোড়াও হয়। এসব হরতালের রাজনৈতিক ফায়দা কী তাও বোঝা যায় না। এ ধারার হরতালে সরকার আদৌ কোনো চাপে পড়ে কিনা তা ভাবার বিষয়। কিন্তু যা দৃশ্যমান তা হচ্ছে, হরতাল-অঞ্চলের জনজীবন আর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিপর্যস্ত হয়। আমাদের রাজনীতিকরা সাধারণ মানুষকে দাস বিবেচনা করেন বলেই এসব অনৈতিক-অযৌক্তিক হরতাল অবলীলায় চাপিয়ে দিতে পারেন তাদের ঘাড়ে।
নির্বাচনী সরকার পদ্ধতি নিয়ে আওয়ামী লীগ-বিএনপির মধ্যে চলছিল অনড় অবস্থান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দাসরূপ দেশবাসীর প্রতি সামান্য কৃপা করে একটু নড়ে বসেছিলেন। জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে নিজের দলীয় সরকারের ধারণা থেকে খানিকটা সরে সর্বদলীয় সরকারের মাধ্যমে নির্বাচনের প্রস্তাব করলেন। আমরা বলব, এ দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটি একটি বড় অগ্রগতি। তবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করলেন না এ সরকারের প্রধান কে হবেন। আমরা যৌক্তিক কারণে ধরে নেই, এ প্রশ্নের সুরাহার জন্য আলোচনার টেবিল খোলা রয়েছে। আওয়ামী লীগের প্রগলভ নেতারা কী বললেন না বললেন সেদিকে নজর দেয়া খুব জরুরি ছিল না। বিএনপি নেতা-নেত্রীরা যদি দেশপ্রেম দ্বারা চালিত হতেন, তবে মানুষের দুর্ভোগ না বাড়িয়ে সংলাপের মধ্য দিয়ে একটি ফয়সালা বের করে আনতেন। কিন্তু বিএনপি এখন চালিত হচ্ছে জামায়াত-শিবিরের পরামর্শ ও পেশিশক্তি দিয়ে। ফলে ফয়সালার চেয়ে দেশজুড়ে হিংসার আগুন ছড়িয়ে দিতে চাইলেন তারা। এমন পরিকল্পনা সামনে এনে ২৫ অক্টোবর জনসভার নামে দেশজুড়ে ছড়িয়ে দেয়া হল আতংক। এ জনসভার অগ্রভাগে বিএনপি আর ছাত্রদল তেমন পাত্তা পেল না। শিবিরের অবস্থানই স্পষ্ট হল। দুর্বল হয়ে যাওয়া ছাত্রদল এর প্রতিবাদের সাহসও পায়নি। বেগম জিয়াও তার ভাষণে জামায়াত আর ছাত্রশিবিরকেই তোষণ করলেন বেশি। দু’দিন বললেও বাহ্যত দেড় দিনের আলটিমেটাম দিলেন সরকারকে। এর মধ্যে সংলাপের সূত্রপাত না করলে তিন দিনের লাগাতার হরতালের ডাক দিয়ে রাখলেন। অর্থাৎ আবারও নিজেদের লভ্যাংশ ঘরে তুলতে দাসসম দেশবাসীকে পায়ে মাড়িয়ে, দেশের অর্থনীতির চরম ক্ষতি করে, কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার কথা না ভেবে, গরিব শ্রমজীবী মানুষের দুর্ভোগের কথা বিবেচনা না করে দেশনেত্রী সহাস্য বদনে হরতালের ডাক দিলেন।
বিএনপির আলটিমেটামের ভেতরেই প্রধানমন্ত্রী টেলিফোনে সংলাপ করলেন বিএনপি নেতার সঙ্গে। সংলাপের জন্য আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানালেন। একই কারণে হরতাল কর্মসূচি প্রত্যাহারের অনুরোধ করলেন। অথচ খালেদা জিয়া জানালেন, এত অল্প সময়ে জোট নেতাদের তিনি পাবেন না। এ মোবাইলের যুগে কথাটি খুব হাস্যকর লাগল। খুব বিস্ময় হল যখন জানানো হল তিন দিন হরতালের পর তারা সংলাপের বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন। অর্থাৎ সংলাপের আগে হরতালীয় ওয়ার্মআপের দরকার আছে। বিষয়টা অনেকটা রবীন্দ্রনাথের রাজ মহীষীর মতো, ‘জ্বেলে দে আগুন ওলো সহচরী/শীত নিবারিব অনলে।’ অর্থাৎ শিবিরের সন্ত্রাসীদের মাঠে নামিয়ে গাড়ি-ঘোড়া ভেঙে, সাধারণ মানুষকে আহত-নিহত করে, দেশের অর্থনীতির কোটি কোটি টাকার ক্ষতি করে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হবে। আর এর পুরো খেসারতটিই দিতে হবে সাধারণ মানুষকে। দাসসম সাধারণ মানুষকে এসব অনাচার মুখ বুজে সইতে হবে।
কিন্তু মুদ্রার অন্য পিঠটি কখনও দেখেন না প্রভুরূপী রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীরা। এ দেশের মানুষ শুধু দাসত্ব বরণ করতেই শেখেনি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে নানা যুগপর্বেই ফুঁসে উঠেছে তারা। মানুষের দ্রোহ মোকাবেলার শক্তি নৈতিকভাবে দুর্বল এসব নেতা-নেত্রীর আছে বলে মনে হয় না। তাই সময় বয়ে যাওয়ার আগেই মেকি প্রভুত্বের খোলস পাল্টে সব পক্ষের রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীর উচিত হবে গণদুর্ভোগের কারণ না ঘটিয়ে গণমুখী হওয়া।
ড. একেএম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

তিন উদ্দিনের পদধ্বনি! by অরবিন্দ রায়

২০০৭ সালের সূচনালগ্নে এদেশে নতুন এক ধরনের সরকার গঠিত হয়। সরকারটি ছিল- না সামরিক, না সিভিল, না স্বৈর। আমলকী, হরীতকী ও বহেরা মিলিয়ে কবিরাজরা যেমন ত্রিফলা নামের মহৌষধ বানায়, সে সময়ে সিভিল-সামরিক-স্বৈর এ তিন ‘স’-এর মিলনে অদ্ভুত এক সরকার পয়দা হয়। যদিও সরকারটি তিন মাসের কথা বলে গদিনসীন হয়েছিল। কিন্তু তাদের কাজ-কারবার দেখে জনগণ বুঝতে পেরেছিল, এ সরকার অক্ষয় কোম্পানির টায়ারের জুতার মতো লাইফ লাস্টিং হতে চায়। কিন্তু তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। শুরুর দিকে সাধারণ মানুষের চাওয়ার সঙ্গে তাল মেলাতে পারলেও পরবর্তী সময়ে পাওয়ার সঙ্গে মিল রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় সরকারটি দু’বছরের মাথায় ক্ষমতার সরাব থেকে চুমুক সরাতে বাধ্য হয়। জনগণের চাওয়া ও পাওয়া এ দুইয়ের ব্যাট-বলে সংযোগ ঘটাতে না পারলে কোনো সরকার যত জনপ্রিয় হয়েই আসুক, তার জনপ্রিয়তা যে বালুর বাঁধের মতো ধসে পড়বে- সে সময়ের তিন উদ্দিন সরকারই তার প্রমাণ।
কেউ চলে গেলে কিছু না কিছু চিহ্ন রেখে যায়। এমনকি ফকিরের ডাকে সাড়া দেয়া ভূত চলে যাওয়ার সময়ও নাকি গাছের ডাল ভেঙে দিয়ে যায়। তথাকথিত তিন উদ্দিন সরকারও চলে যাওয়ার সময় মনের গভীরে ক্ষত রেখে গেছে। সে ক্ষতটি হচ্ছে ভয়। এ ভয় অনির্বাচিত ব্যক্তির হাতে ক্ষমতা চলে যাওয়ার। পুনরায় আসা সরকারটিও যে তিন উদ্দিনের মতো লাইফ লাস্টিংয়ের খায়েশ পোষণকারী হবে না, এ নিশ্চয়তা কে দেবে! কারণ দিন যতই গড়াচ্ছে, মানুষের মনে অনৈতিক বাসনার মাত্রা ততই বাড়ছে। তাই ২০০৭ সালের অনির্বাচিত সরকারটি দু’বছর লাস্টিং করলেও এবারের সরকার এক যুগের মনমানসিকতা নিয়ে এসে পাঁচ বছর লাস্টিং করলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না। আবার বিদায়ের আগে মাল্টি ফ্যাসাদ বাধিয়ে দিয়ে যাওয়াও বিচিত্র কিছু নয়। প্রবাদ আছে, বর্জ্য সব সময়েই বর্জ্যরে জন্ম দেয়। কাজেই সেই অনির্বাচিত সরকারটি চলে যাওয়ার সময় নির্বাচিতদের হাতে ক্ষমতা তুলে না দিয়ে যদি কোনো ষণ্ডা-গুণ্ডার হাতে দিয়ে যায়, তাহলে আশংকার ষোলকলা পূর্ণ হওয়ার আর বাকি থাকবে না।
কথায় বলে, ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে আগুন দেখে চমকায়। মূলত সেই ঘর পুড়ে যাওয়ার স্মৃতিকে ভুলতে না পারার কারণে হয়তো তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রথার বিলোপ ঘটানো হয়েছে। এ বিলোপ কাজটি পাকাপোক্ত করার জন্য সংবিধানেও সংশোধনী আনা হয়। সংবিধানকে ডিঙিয়ে এক কথায় উড়ে এসে জুড়ে বসার মতো কেউই যেন ক্ষমতার সরাবে এসে আমরণ চুমুক বসানোর দিবাস্বপ্নে বিভোর হতে না পারে, তা ঠেকানোই এ সরকার প্রথা বিলোপের অন্যতম কারণ বলে দাবি করা হয়। কিন্তু বিরোধী দল সরকারের এ সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর থেকেই প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে। তাদের তরিকাবাহী কতিপয় সুশীল ব্যক্তিরও ধারণা, সরকার তার জনপ্রিয়তা হ্রাসের বিষয়টি আঁচ করতে পেরে অর্থাৎ আসন্ন নির্বাচনে পরাজয়ের ভয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করেছে। কেননা সরকার ক্ষমতাসীন অবস্থায় যদি নির্বাচন পরিচালনা করে, তাহলে সে নির্বাচন কখনোই নিরপেক্ষ হবে না। অর্থাৎ নির্বাচনে প্রভাব অক্ষুণ্ন রাখার জন্যই তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির বিলুপ্তি ঘটিয়েছেন।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে সম্পন্ন হওয়া সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন বিরোধী দলের এ ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করেছে। দলীয় সরকারের অধীনেও যে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব, এ পরীক্ষায় ক্ষমতাসীনরা জিপিএ-৫ পেয়ে সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছে। তারপরও বিরোধী দল সরকারের এ স্বচ্ছতায় আস্থা রাখতে পারছে না। তাদের ধারণা, ওস্তাদের শেষ রাতের মারটা সরকার নিজ হাতেই রেখেছে। সেই শেষ রাতের মারটা হচ্ছে দশম সংসদ নির্বাচন। প্রশ্ন জাগতে পারে, সরকারের নিরপেক্ষ থাকার মনমানসিকতা যদি না থাকত, তাহলে মান রক্ষার জন্য হলেও একটি সিটি কর্পোরেশনকে নিজেদের করে রাখতে পারত। সেটি তারা করেনি। সুবোধ যোদ্ধার মতো পরাজয় মেনে নিয়েছে। তারপরও কেন এই সন্দেহ? অনেকের ধারণা, পাঁচটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে নিরপেক্ষ থাকার বিষয়টি সরকারের একটা কৌশল মাত্র। সরকারের নিরপেক্ষতায় সন্দিহান হয়ে কেউ যেন তত্ত্বাবধায়কের দাবিকে যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসতে না পারে তারই কূটকৌশল হিসেবে সরকার এ পাঁচ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে শতভাগ নিরপেক্ষ থেকেছে। শেয়ালের ওপর প্রতিশোধ নেয়ার জন্য কুমির যেমন মরার অভিনয় করে নদীর ধারে শুয়েছিল। শেয়াল কুমিরকে মৃত ভেবে তাকে খাওয়ার জন্য এগিয়ে আসা মাত্রই খপ করে ধরে ফেলবে। সিটির নির্বাচনগুলোতে সরকারের নিরপেক্ষ থাকার বিষয়টিও কুমিরের মরার অভিনয়ে শুয়ে থাকার মতো। সংসদ নির্বাচন এলেই এ সরকার নিরপেক্ষতাকে বিসর্জন দিয়ে খপ করে ক্ষমতাকে গিলে ফেলবে। কিন্তু কুমিরের এ কূটচাল যে সফলতার মুখ দেখেনি, গল্পকারই তার দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন। তারপরও কেন এই ভয়। এখানে আরও একটি অপ্রিয় সত্য উল্লেখ না করলেই নয়। সেটি হচ্ছে, সম্পন্ন হওয়া পাঁচটি সিটি নির্বাচনে সরকার নিরপেক্ষ থেকেছে নাকি চাতুরী করার সুযোগ পায়নি এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কেউ কোনো মন্তব্য করেনি। এমন তো হতে পারে, সরকার পক্ষপাতিত্বের চেষ্টা করেও জনরায়ের স্রোতে কুলিয়ে উঠতে পারেনি। গাজীপুর সিটি নির্বাচনে সরকার সমর্থিত টিভি চ্যানেল যেখানে গুটিকয়েক কেন্দ্রের ফলাফল ফিসফাস করে প্রকাশ করছিল, তখন বিরোধী দল সমর্থিত চ্যানেল তার ১০-১২ গুণ কেন্দ্রের ফলাফল প্রকাশ করে তার সমর্থিত প্রার্থীকে ধরাছোঁয়ার বাইরে উন্নীত করতে পেরেছিল। ক্ষমতার জাল রন্ধ্রে রন্ধ্রে থাকা অবস্থাতেও যখন জনরায় উপেক্ষিত হওয়ার সুযোগ পায়নি, তখন সর্বদলীয় অর্থাৎ উভয় দলের পাঁচজন করে এবং একজনকে (তিনি যেই হোন) প্রধান বানিয়ে নির্বাচন করলে জনরায় উল্টে যাবে এ আশংকা মনে হয় না ততটা সঠিক।
আমার ব্যক্তিগত অভিমত, সরকার তত্ত্বাবধায়কের বদলে যে সর্বদলীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে, সেটি তাদের জন্য একটি মরণঘাতী প্রস্তাব। পাঁচ সিটির নির্বাচনী ফলাফলই বলে দেয় এটি কতটা মরণঘাতী। প্রেক্ষাপটের চুলচেরা বিশ্লেষণে তত্ত্বাবধায়ক ও সর্বদলীয় সরকার পদ্ধতিকে পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে তুলনা করা হলে তত্ত্বাবধায়ককে বলা হবে ডালডা আর সর্বদলীয়কে বলা যেতে পারে চলনসই ঘি। সরকার আবেগের বশে বিরোধী দলের হাতে ডালডার বদলে ঘিয়ের পাত্রটি তুলে দিতে চেয়েছে। সেই সর্বদলীয় সরকারপ্রধান যদি শেখ হাসিনা হন, তাহলে সেই ঘি যে ঘোষপাড়ার খাঁটি গাওয়া ঘি তাতে কোনো সন্দেহ থাকবে না। কেননা সর্বদলের পাঁচকে প্লাস মাইনাসে শূন্য ধরা হলে অবাধ মিডিয়ার যুগে একজন মহিলার পক্ষে গোটা দেশের নির্বাচনী ফলাফল উল্টে দেয়া কতটা সম্ভব, তা বোঝার জন্য চিন্তাশক্তিকে বেশি গভীরে নেয়ার প্রয়োজন পড়ে না। তারপরও বিরোধী দল সরকার ঘোষিত এ প্রস্তাবকে গ্রহণ না করে অসময়ের আন্দোলনে নেমে নিরীহ মানুষের প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়ালে পাঁচ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনী ফলাফলকে অপমান করা হবে।
পরিশেষে আবারও সেই তিন উদ্দিন প্রসঙ্গে আসা যাক। বর্তমান প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যে প্রেক্ষাপটে ২০০৭ সালে অনির্বাচিত সরকার তিন মাসের কথা বলে দু’বছর পার করেছিল, সেই একই আবহ কিন্তু ২০১৩ সালে তৈরি হতে চলেছে। সরকার চাইছে সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন পদ্ধতি। বিরোধী দল বলছে, সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে হবে। একটি বিষয় ভাবা উচিত- সরকার তত্ত্বাবধায়কের প্রশ্নে রাজি হলেই যে সব সমস্যার সমাধান হবে, তা নয়। তত্ত্বাবধায়ক ইস্যু শেষ হতে না হতেই সিইসিসহ আরও অনেক ইস্যু দেখা দেবে। এরকম ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যেই কিন্তু আবির্ভাব ঘটতে পারে তিন উদ্দিন কিসিমের লাইফ লাস্টিং মানসিকতা সম্পন্ন সরকারের। তাকে শেষটায় ক্রেন লাগিয়েও গদি থেকে তোলা যাবে কি-না সন্দেহ।
অরবিন্দ রায় : একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কারিগরি পরিচালক

সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি by আল আমীন চৌধুরী

স্বাধীনতার প্রায় ৪১ বছর এবং সামরিক শাসন অবসানের ২৩ বছর পর আজও নির্বাচন ঘিরে সহিংস হরতাল, সশস্ত্র সংঘর্ষ ও ব্যাপক জানমালের ক্ষতিপূর্ণ নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি যেমন চিন্তার অতীত, তেমনি নির্বাচন আদৌ হবে কি-না, হলে অবাধ ও সুষ্ঠু এবং সব দলের অংশগ্রহণে হবে কি, কোন সরকারের অধীনে হবে- এমনতর মৌলিক প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দেবে, তা ভাবতে অবাক লাগে। বস্তুত এটা তো চাকার পুনঃআবিষ্কার নয়। বিলেতের সংসদীয় গণতন্ত্রের যে আদলে আমাদের শাসনব্যবস্থা গড়ে উঠেছে এবং উন্নত বিশ্বে ও মালয়েশিয়া, ভারতসহ অন্যান্য উন্নয়নশীল গণতান্ত্রিক দেশে যেভাবে নির্বাচন ও শাসনভার হস্তান্তর হয়ে থাকে- সেখানে এসব মৌলিক প্রশ্নের কিংবা এহেন নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি উদ্ভবের প্রশ্নই ওঠে না। এখানেও সেরূপ ব্যবস্থা চালু ছিল। কিন্তু সামরিক শাসনামলে এবং পরে আমাদের তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়। ধারণা ছিল, বার তিনেক এ ব্যবস্থা চললে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভিত মজবুত হবে। তারপর নির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া যাবে। তবে আমাদের অননুকরণীয় সৃজনশীলতা ও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কারণে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা দারুণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয় এবং পরে সেনাসমর্থিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে বিগত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
এরই মধ্যে সুপ্রিমকোর্টের খসড়া রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে সংবিধানসম্মত নয় মর্মে রায় দেয়া হয়। তবে সংসদ ইচ্ছা করলে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে দু’বার ওই ব্যবস্থার অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠান করা যেতে পারে বলে নির্দেশনাও রাখা হয়। কিন্তু সংসদ সে মর্মে কোনো আইন পাস করেনি এবং ওই ব্যবস্থা সংবিধানেও রাখা হয়নি। এসব ইতিবৃত্ত প্রায় সবারই জানা। এখন সরকার পক্ষ বলছে, সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর অধীনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে আর বিরোধী দল বলছে, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই নির্বাচন হতে হবে। এ বিবাদ-বিরোধ নিয়েই হরতাল ও নৈরাজ্যকর অবস্থা। এমন পরিস্থিতিতে আলোচনা-সভা ও টকশোর বিজ্ঞ ব্যক্তিত্ববর্গ, রাজনীতির পণ্ডিত কিংবা জনমত বিশেষজ্ঞরা অহর্নিশি নানা মতামত ও পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। কেউ বলেছেন, বিরোধীদলীয় নেত্রীর কাছে প্রধানমন্ত্রীর একটি টেলিফোন করতে কতক্ষণ সময় লাগে?
প্রধানমন্ত্রী এরই মধ্যে নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকার গঠনের জন্য বিরোধী দলের প্রতিনিধিদের নাম চেয়েছেন এবং সেই কাক্সিক্ষত টেলিফোনটি করেছেন। বিরোধী দলও ইতিমধ্যে তাদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি সংসদে উত্থাপন করেছে। জাতিসংঘ মহাসচিব, মার্কিন রাষ্ট্রদূতসহ অনেক দেশের প্রতিনিধিরাও সংলাপের মাধ্যমে বিরোধ নিরসনের পরামর্শ দিচ্ছেন। কেউ কেউ সালিশদার হতেও রাজি আছেন মর্মে জানা গেছে। তবে দুই নেত্রীর ফোন আলাপে বা চলমান কর্মকাণ্ড বিচারে মনে হয় না যে তারা ‘সালিশ মানি তবে তালগাছটা আমার’ এ অবস্থানের বাইরে যাবেন। সে কথায় পরে আসব। তার আগে আমার বেশ কিছু প্রশ্ন আছে।
প্রথম প্রশ্ন হল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যাপারে। রাজনীতি, টকশো ব্যক্তিত্ব, সুশীল সমাজ বা অন্যরা যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা বলেন কিংবা যে তত্ত্বাবধায়কের ব্যাপারে সংবাদপত্রসহ কয়েকটি জরিপ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান জরিপ করে বলেছে যে, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী ওই সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচন চায়, তারা কি ত্রয়োদশ সংশোধনীতে সংবিধানে সন্নিবেশিত এবং ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার কথা বলছেন, নাকি সংশোধিত কোনো তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার কথা বলছেন? সংশোধিত হলে কোন কোন স্থানে কী কী সংশোধনী আনার প্রস্তাব হয়েছে, তা কি সবিস্তারে বর্ণনা করা হয়েছে? উল্লেখ্য, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবেন বা ওই সরকার কীভাবে গঠিত হবে, সংবিধানে তা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ আছে এবং ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে সেভাবে গঠিত সরকারের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় (যদিও পরাজিত দল ফলাফলের ব্যাপারে আপত্তি করেছে) বলেই জনগণ সেরূপ সরকারের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। আমার বিশ্বাস, পত্রিকা বা অন্যান্য জরিপ পরিচালনাকারী জনগণের কাছে পরিচিত এবং পূর্ব-পরীক্ষিত সেই তত্ত্বাবধায়কের ধারণার ওপরই জনমত যাচাই করেছেন। এখানে আরও উল্লেখ্য, বিরোধী দল সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পুনঃস্থাপন চায় না। বিশেষ করে সে বিধান অনুযায়ী সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে তারা মেনে নেবে না বলে বহু আগেই ঘোষণা দিয়েছে। তাছাড়া তাদের সর্বশেষ প্রস্তাবেও ওই সরকারপ্রধান হিসেবে সর্বজন শ্রদ্ধেয় সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একজন নিরপেক্ষ বিশিষ্ট নাগরিকের কথা বলা হয়েছে। অনুরূপ প্রস্তাব রাজনীতিক, গণমাধ্যম, বিশেষজ্ঞ ও স্বনামধন্য অনেক ব্যক্তির কাছ থেকেও এসেছে। এরূপ একজন ব্যক্তি ১৯৯৫ সালে কমনওয়েলথের সেক্রেটারি জেনারেল চিফ এমেকা আনিয়াওকু বা পরে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী কমনওয়েলথের সেক্রেটারি জেনারেলের বিশেষ দূত স্যার নিনিয়ান স্টিফেন বহু চেষ্টা করেও খুঁজে পাননি। ঠিক তেমনি ২০০৬ সালে বিএনপির মহাসচিব মান্নান ভূঁইয়া ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিলের মধ্যে দীর্ঘ সংলাপের সময়ও সর্বজন শ্রদ্ধেয়, সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একজন নিরপেক্ষ বিশিষ্ট নাগরিকের সাক্ষাৎ মেলেনি। মেলার কথাও নয়। দুই দল ও নেতৃত্বের মধ্যে যে চরম অবিশ্বাস ও আস্থার অভাব রয়েছে তাতে একপক্ষ রাজি হলে অন্যপক্ষ তাকে প্রতিপক্ষের লোক মনে করবে। প্রকৃতপক্ষে আলোচ্য ব্যক্তি যত শ্রদ্ধেয় ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিই হোন না কেন, দুই পক্ষের প্রত্যেকেই তাদের প্রতি অনুগত বা তাদের পক্ষ সমর্থনকারীকেই শুধু মেনে নিতে রাজি, অন্য কাউকে নয়। বিদ্যমান অবস্থায় একমাত্র বিধাতার পক্ষেই মনে হয় সে ভূমিকা পালন করা সম্ভব। সে ক্ষেত্রেও নির্বাচনের পর পরাজিত দল সূক্ষ্ম কারচুপি হয়েছে বা আমাদের বিজয় ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে- এরূপ অভিযোগ যে উত্থাপন করবে না, তা হলফ করে বলা যাবে না। কেউ কেউ সার্চ কমিটির মাধ্যমে সরকারপ্রধান মনোনয়নের প্রস্তাব দিয়েছেন। কারা সে কমিটির সদস্য হবেন? কেইবা তাদের নিয়োগ দেবে? সেসব প্রশ্ন ছাড়াও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে, সেই কমিটির সুপারিশকৃত প্রার্থীকে দুই দল কি সমর্থন দেবে? সম্ভাব্য উত্তর : না। তাই কার্যকর কোনো তত্ত্বাবধায়ক সরকারে প্রস্তাব করতে হলে এ ধরনের উন্মুক্ত প্রস্তাবের পরিবর্তে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব অধিকতর যুক্তিসঙ্গত।
আমার দ্বিতীয় দফার প্রশ্নগুলো হচ্ছে সুপ্রিমকোর্টের খসড়া রায়ের নির্দেশনামূলক পরামর্শ অনুযায়ী আরও দু’বার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তাব সম্পর্কে। অনেক বিশেষজ্ঞ ও পণ্ডিত ব্যক্তির সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি ও বাসদসহ আরও দু’-একটি দল ওই প্রস্তাব দিয়েছে। এখানে তাদের কাছে প্রথম প্রশ্ন : তারা কি সত্যিই মনে করেন, আগামী দু’বারের পর বর্তমান সংবিধানের আলোকে ক্ষমতাসীন দলের অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান করার মতো গণতান্ত্রিক ভিত রচিত হবে এবং সব দল সে নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেবে?
১৯৯১ সালে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিনের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনসহ মোট চারটি নির্বাচন নির্দলীয় অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হওয়ার পরও যেখানে একটি শক্তিশালী নির্বাচনী কাঠামো গড়ে ওঠেনি, স্বাধীন ও প্রকৃত ক্ষমতাবান নির্বাচন কমিশন প্রতিষ্ঠিত হয়নি, রাজনৈতিক দল ও জোটগুলো নিজেদের মধ্যে যেমন আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারেনি তেমনি নির্বাচন কমিশনের ওপরও আস্থা স্থাপন করতে পারেনি, সেখানে আগামী দু’বার অনুরূপ সরকারের অধীনে নির্বাচন হলেই অন্য কোনোরূপ মৌল পরিবর্তন ছাড়াই অবস্থা বদলে যাবে- তেমনটি বিশ্বাস করার কোনো কারণ দেখি না। ওই প্রস্তাব বাস্তবায়নের সম্ভাব্য চিত্রটি একবার চিন্তা করে দেখুন। ১৯৯০ পরবর্তী নির্বাচনগুলোর ফলাফলে দেখা যায়, ক্ষমতাসীন দল পরপর দু’বার ক্ষমতায় আসতে পারেনি। সে অনুযায়ী যে দুটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠানের প্রস্তাব করা হয়েছে তার প্রথমটিতে অর্থাৎ আগামী নির্বাচনে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের জায়গায় বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট জয়লাভ করে সরকার গঠন করবে। আর দ্বিতীয়বারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় যাবে এবং এরপর থেকে ক্ষমতাসীন দল বা জোটের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে। তখন আওয়ামী লীগের দলীয় সরকারের অধীনে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো বিনা আপত্তিতে নির্বাচন মেনে নেবে- এরকম বিশ্বাস করা দুষ্কর। প্রতিটি দলের কার্যক্রম, আচার-আচরণ, মনমানসিকতার আমূল পরিবর্তন করে গণতান্ত্রিক চর্চা, পরস্পরের প্রতি আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি, সবাই মিলে স্বাধীন নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ এবং নিরপেক্ষ ও ন্যায়নিষ্ঠ প্রশাসন গড়ে তুললেই কেবল অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশের মতো নির্বিঘ্নে ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং শাসনভার হস্তান্তর করা সম্ভব হবে। এর জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা ও দৃঢ় সংকল্প। কিন্তু বিরাজমান অবস্থায় সে লক্ষণ কোনো দল বা জোটের মধ্যেই দেখা যায় না। তাছাড়া চার চারটি নির্বাচনে এমনকি সেনাসমর্থিত দু’বছর মেয়াদের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কঠিন অভিজ্ঞতার পরও যখন আমাদের দলীয় রাজনীতির কৃষ্টি বদলায়নি, আরও দু’বারের বিতর্কিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন যে দেশকে দৃঢ় গণতান্ত্রিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করাবে এবং সব দলকে নির্বাচিত অন্তর্বর্তীকালীন দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচন অকুণ্ঠচিত্তে গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত করবে, সে ভরসা কোনোক্রমেই করা যায় না। এখানে ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ বিভাগের পর পাকিস্তান ও ভারতের রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক ধারা বিকাশের উদাহরণ একান্ত প্রাসঙ্গিক মনে করি। পাকিস্তান নিজেকে শিশুরাষ্ট্র হিসেবে গণ্য ও ঘোষণা করে প্রথম ৯ বছর পর্যন্ত জাতীয় সাধারণ নির্বাচন যেমন দেয়নি, তেমনি একটি শাসনতন্ত্র বা সংবিধানও রচনা করেনি পাছে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের টানাপোড়েনে শিশুরাষ্ট্রটি সবল ও পুষ্ট হতে বাধাপ্রাপ্ত হয়। তারপর যাও একটি সংবিধান রচিত হল, নানা অজুহাতে তার বাস্তবায়ন ও নির্বাচন অনুষ্ঠান স্থগিত করে সামরিক শাসন জারি করা হল। এরপর গণতন্ত্র বা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকারের মতো ন্যায্য দাবিগুলো শিশুরাষ্ট্রের দোহাই দিয়ে নাকচ করা হল। শেষ পর্যন্ত ২৩ বছরেও যখন দুর্বল শিশুটি সাবালক হল না, তখন গণতন্ত্র ও ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য এক রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হল এবং সেই শিশুরাষ্ট্রটির মৃত্যু হল। অন্যদিকে ভারত প্রথমেই সংবিধান রচনায় এবং গণতন্ত্রের প্রথায় জাতীয় সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানে ব্যাপৃত হল এবং অল্প সময়ের মধ্যেই একটি সবল ও কার্যকর গণতান্ত্রিক দেশে পরিণত হল। নতুন রাষ্ট্রের দুর্বল গণতান্ত্রিক ভিতের দোহাই দিয়ে তারা নির্বাচিত দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠান থেকে বিরত থাকেনি। আসলে গণতন্ত্রে কোনো সমস্যা দেখা দিলে তা নিরসনে চাই আরও বেশি গণতন্ত্র- রাষ্ট্র কাঠামোয়, সরকারে, দলে ও প্রশাসনিক স্তরে। তার সঙ্গে চাই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থার পরিবেশ এবং জাতির বৃহত্তর স্বার্থে ঐকমত্য।
আমার দ্বিতীয় প্রশ্নটি হচ্ছে রাজনীতিবেত্তা, সুশীল সমাজ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পণ্ডিত ও বিশ্লেষক এবং প্রগতিবাদী রাজনীতিকদের কাছে। প্রতিবার যখন নির্বাচন ঘনিয়ে আসে, ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর সঙ্গে বিরোধী দলের ক্ষমতার লড়াই চরম সহিংসতায় রূপ নিয়ে বিপর্যয়কর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে, তখন তারা স্থায়ী কোনো সমাধানের ব্যবস্থার কথা না বলে আপাত প্রশমনের ব্যবস্থা হিসেবে কেন সেবারের মতো একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করে কোনোমতে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের সুপারিশ করে থাকেন? এতে প্রতিবারই একই অচলাবস্থার সৃষ্টি হবে। প্রতিবারই সেই দুই বিবদমান দলকে সংলাপে বসতে আহ্বান করা হবে। দুই নেতাকে ফোনালাপ করতে অনুরোধ করা হবে। নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে অভিমান ভাঙানোর চেষ্টা হবে। এরই মধ্যে গত তিন দিনের হরতালের মতো বা তার আগেরবারের মতো হালি হালি মানুষ মরবে, শত শত আহত হবে, কোটি কাটি টাকার সম্পদ নষ্ট হবে, অগণিত মানুষ আয় হারাবে, শান্তি হারাবে। আর তাতেও কাজ না হলে তৃতীয় কোনো অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এ অচলাবস্থার অবসান হবে। এ দুষ্ট চক্র থেকে মুক্তির উপায় বোধ করি রাজনীতিকদেরই বের করতে হবে। সে লক্ষ্যে আমার মনে হয়, সার্চ কমিটির মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের পরিবর্তে অনুরূপ কোনো সর্বসম্মত ব্যবস্থায় শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠন, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা ও নিরপেক্ষ প্রশাসন গড়ে তোলার দিকেই তাদের সর্বাÍক চেষ্টা চালানো সমীচীন হবে।
বড় বড় দল ও জোটগুলোর পালাক্রমে ক্ষমতায় থাকার সময় সব ধরনের বাজিকরি (বিচারপতি হাবিবুর রহমানের ভাষায়) কর্মকাণ্ড দেখার পরও বলছি, প্রধানমন্ত্রীর সর্বদলীয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের প্রস্তাব সব রাজনৈতিক দলের পক্ষে বিবেচনার দাবি রাখে। ওই প্রস্তাবের আলোকে আলোচনার মাধ্যমে ভবিষ্যতে নির্বাচিত সরকারের অধীনে আবার সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য একটি স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ আছে। উন্নত ও উন্নয়নশীল অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশের মতো এবার থেকেই শুরু হতে পারে সে ব্যবস্থা। এতে নির্বাচনে মানুষের উৎসাহ বাড়বে, উৎকণ্ঠা নয়। রাজনীতিকরাও জনসমর্থন আদায়ে বেশি সময় ব্যয় করতে পারবেন, জনদুর্ভোগ বাড়াতে নয়।
আল আমীন চৌধুরী : কলাম লেখক ও সাবেক সচিব

কুতুবদিয়ায় পুলিশের সাথে সংঘর্ষে নিহত ৪, আহত ২৩

কক্সবাজারের সাগরদ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়া ধুরুংবাজারে এলাকায় পুলিশ ও ১৮ দলের নেতা কমীদের মাঝে ব্যাপক সংঘর্ষে ৪ জন নিহত হয়েছে। এসময় আহত হয়েছে পুলিশ সহ আরো অন্তত ২৩ জন।
মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ধুরুংবাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটেছে। দু’পুলিশ নিখোঁজ হলেও পরে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। কুতুবদিয়া ও চকরিয়া হত্যা কান্ডের প্রতিবাদে জেলায় আগামী বৃহস্পতিবার সকাল সন্ধ্যা হরতালের ডাক দিয়েছে।
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী সুত্রে জানা গেছে, ৬০ ঘন্টার হরতাল শেষে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় স্থানীয় বিএনপি ও জামায়াত ধুরুংবাজারে প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করে। মাগরিবের নামাজের পরপরই কুতুবদিয়া থানার একদল পুলিশ এসে সভা করতে বাধা দিয়ে ওই মঞ্চ দখলে নেন। এতে পুলিশ ও জামায়াত শিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ লেগে যায়। জামায়াত শিবিরের কর্মীরা পুলিশের উপর হামলা চালালে পুলিশ ব্যাপক গুলি বর্ষণ করে। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলে উত্তর ধুরুং ইউনিয়নের আবু আহম্মদ (৫৫) ও লেমশিখালী ইউনিয়নের আজিজুর রহমান (২০) মারা যান । সাড়ে ৭টার দিকে মারা যান গুলিবিদ্ধ মোঃ পারভেজ (২৪) । এ ছাড়া রাত ৯টার দিকে তাজুল ইসলাম (২৯) নামের আরো একজন মারা যায়। এ পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা দাড়ালো ৪ জনে। নিহত ৪ জনের মধ্যে একজন জামায়াত ও ২ জন শিবির কর্মী বলে দাবী করেছেন উপজেলা জামায়াত সেক্রেটারী শাহরিয়ার চৌধুরী।
ধুরুং ইউপি চেয়ারম্যান মো. আজাদ সত্যতা স্বীকার করে বলেন, এ পর্যন্ত ৩ জন নিহত ও আরো ৬ জন গুলিবিদ্ধ সহ ২৪ জন আহত হয়েছে। আহতদের মধ্যে বেশীর ভাগকে চট্টগ্রাম ুমেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পুরো এলাকায় থেমে থেমে গুলি বর্ষণ হচ্ছে। বিরাজ করছে চরম উত্তেজনা।

এদিকে, সংঘর্ষ চলাকালে দু’পুলিশ নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেলেও এর সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কক্সবাজার পুলিশ সুপার মো.আজাদ মিয়ার মোবাইলে বার বার ফোন করার পরেও তিনি রিসিভ করেননি।
কুতুবদিয়া ধুরুংবাজারে এলাকায় পুলিশ ও ১৮ দলের নেতা কমীদের মাঝে সংঘর্ষ চলাকালে নিখোঁজ হওয়া ২ পুলিশ কনষ্টেবলকে রাত ৮ টায় উদ্ধার করা হয়েছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬ টায় কুতুবদিয়া থানার ২ পুলিশ নিখোঁজ হয়েছিল। কুতুবদিয়ায় পুলিশের গুলিতে ৪ জন এবং গত রবিবার চকরিয়ায় ২ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় ১৮ দল কক্সবাজার জেলায় বৃহস্পতিবার সকাল সন্ধ্যা হরতালের ডাক দিয়েছে।
জেলা বিনেপির দপ্তর সম্পাদক ইউছুপ বদরী জানান, বৃহস্পতিবার ডাকা হরতাল কুতুবদিয়া, চকরিয়া সহ পুরো জেলা আওতায় থাকবে।
কুতুবদিয়া থানার ওসি জানিয়েছেন, নিখোঁজ ২ পুলিশ সদস্যকে থানায় নিয়ে আসা হয়েছে।
এদিকে, কুতুবদিয়ায় পুলিশের সাথে সংঘর্ষে জামায়াত শিবিরে সংঘর্ষে ৪ জন নিহত হওয়ার ঘটনার জের ধরে মঙ্গলবার রাত ৯ টায় কক্সবাজার শহরেও ব্যাপক বিক্ষোভ করেছে জামায়াত শিবির। জামায়াত শিবির কর্মীরা কক্সবাজার শহরের লালদীঘির পাড়, কৃষি অফিস রোড, ফায়ার সার্ভিস এলাকা ও বাজার ঘাটায় বেশ কিছু যান বাহন ভাংচুর করা হয়েছে। এসময় চলে পুলিশের সাথে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া। তবে হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। । শহরের সব ধরনের দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়।

সংসদ সদস্য এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ এমপির বিবৃতি>>
কক্সবাজার জেলার কুতুবদিয়া উপজেলার ধুরং বাজারে হরতাল পরবর্তী সমাবেশ পুলিশের হামলা ও গুলীবর্ষণে ৪ জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীসহ ৫ জনকে হত্যা, ২০ জন গুলীবিদ্ধসহ অর্ধশতাধিক আহত হওয়ার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও কক্সবাজার-২ ( মহেশখালী-কুতুবদিয়া) আসনের সংসদ সদস্য এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ এমপি।

এক বিবৃতিতে হামিদ আযাদ এমপি বলেন, সরকার গণআন্দোলনে ভীত হয়ে হত্যা, সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যের পথ বেছে নিয়েছে। টানা ৬০ ঘন্টার হরতালে পুলিশের গুলীতে সারা দেশে ১৩ জন প্রাণ হারিয়েছে। শত শত মানুষকে আহত করা হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে হাজার হাজার মানুষকে। সে ধারাবাহিকতায় আজ কুতুবদিয়া উপজেলার ধুরং বাজারে জামায়াত-শিবিরের হরতাল পরবর্তী সমাবেশে পুলিশ বিনা উস্কানীতে গুলীবর্ষণ করে আবু আহমদ, আজিজুর রহমান, তাজুল ইসলাম ও পারভেজসহ ৫ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। পুলিশের উপর্যুপরি হামলা ও গুলীবর্ষণে ২০ জন গুলীবিদ্ধ হয়ে গুরতর আহতসহ অর্ধশতাধিক নেতাকর্মীকে আহত করেছ। কিন্তু জুলুম-নির্যাতন চালিয়ে, গুলীবর্ষণ ও হত্যা করে গণআন্দোলন দমন করা যাবে না বরং শহীদের রক্তের পথ ধরেই গণআন্দোন বিজয় লাভ করবে।

তিনি ধুরং বাজার হত্যাকান্ডের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান এবং দায়ী পুলিশ সদস্যদের বিচারের আওতায় জোর দাবী জানান। অন্যথায় গণআন্দোলনকে বিজয়ী করে শহীদের রক্তের বদলা নেয়া হবে।

কুতুবদিয়ায় হত্যার প্রতিবাদে বুধবার বিক্ষোভ বৃহষ্পতিবার কক্সবাজারে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল

জামায়াত প্রেরিত প্রেস রিলিজ :

কুতুবদিয়ায় ১৮দলীয় জোটের শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ৩ জামায়াত-শিবির কর্মীকে নৃশংসভাবে হত্যা এবং অসংখ্য নেতাকর্মী গুলিবিদ্ধ হওয়ায় তীব্র নিন্দা প্রতিবাদ জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও কক্সবাজার জেলা আমীর মুহাম্মদ শাহজাহান, নায়েবে আমীর মাওলানা মোস্তাফিজুর রহমান, সেক্রেটারি জিএম রহীমুল্লাহ। ২৫ অক্টোবর চকরিয়ায় বিজিবির গুলিতে ৩ বিএনপি কর্মী এবং আজ (২৯ অক্টোবর) কুতুবদিয়ায় ৩ জামায়াত -শিবির কর্মী হত্যার প্রতিবাদে ১৮দলীয় জোটের আহবানে আগামীকাল বুধবার বিক্ষোভ এবং ৩১ অক্টোবর বৃহষ্পতিবার কক্্সবাজারে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালিত হবে। জেলাবাসীকে ১৮দল ঘোষিত কর্মসূচী স্বত:স্ফূর্তভাবে পালন করার জন্য ১৮দলীয় জোটের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়েছে।

১৮ দলীয় জোটের বিবৃতি : চকরিয়ায়-কুতুবদিয়া হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে  বৃহস্পতিবার জেলাব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা সর্বাত্বক হরতাল

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি কক্সবাজার জেলা শাখার সভাপতি সাবেক সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক এড. শামীম আরা স্বপ্না, বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামী কক্সবাজার জেলা শাখার আমীর মোহাম্মদ শাহজাহান, সেক্রেটারী জেনারেল জি.এম রহিম উল্লাহ, বাংলাদেশ নেজামে ইসলামী সভাপতি হাফেজ ছালামত উল¬াহ, সাধারণ সম্পাদক মৌলানা ইয়ছিন হাবিব, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস সভাপতি মৌলানা নূরুল আলম আল-মামুন, সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক সরওয়ার কামাল মঞ্জু, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি- এল.ডি.পির সভাপতি ছালামত উল্লাহ খাঁন, সাধারণ সম্পাদক গোলাম কিবরিয়া, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির সভাপতি আর. এ. এম. ইসমাঈল ফারুক, সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ তৌহিদুল¬াহ চৌধুরী, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি-এন.পি.পি সভাপতি মোহাম্মদ ইফতেকার উদ্দিন শিবলী, সাধারণ সম্পাদক জাহেদুল আলম এক যৌথ বিবৃতিতে আওয়ামী সন্ত্রাসী কর্তৃক চকরিয়ায় ২ (দুই) জন এবং কুতুবদিয়ায় ৪ (চার) জন হত্যাকান্ড সহ অসংখ্য নেতাকর্মীদের আহত করার প্রতিবাদে ১৮ দলীয় জোটের ডাকে কক্সবাজার জেলাব্যাপী বৃহস্পতিবার (৩১ অক্টোবর) সকাল-সন্ধ্যা সর্বাত্মক হরতাল আহবান করা হয়েছে। নেতৃবৃন্দ স্বতঃস্ফুর্তভাবে হরতাল পালনে জেলাবাসীর প্রতি আহবান জানিয়েছেন। জেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক ইউসুফ বদরী স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই তথ্য জানা

রোমের নাগরিকত্ব পেলেন সুচি

মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থী ও বিরোধীদলীয় নেত্রী অং সান সুচি রোববার রোমের সম্মানসূচক নাগরিক হলেন। দীর্ঘ ১৯ বছর পর তাকে এ সম্মান দেয়া হল। এর আগে ২০০৭ সালে কানাডা ও ২০১২ সালে ফ্রান্সের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন সুচি। এএফপির খবরে বলা হয়, নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অং সান সুচিকে ১৯ বছর আগে ১৯৯৪ সালে এ নাগরিকত্ব দেয়া হলেও দীর্ঘ দুই দশকের অধিকাংশ সময় মিয়ানমারে গৃহবন্দি থাকায় তিনি এ পুরস্কার গ্রহণ করতে পারেননি। রোমের মেয়র ইগনাজিও মারিনো তার টুইটার অ্যাকাউন্টে বলেন, এ নগরী অবশেষে মুক্ত অংসান সুচিকে সম্মানসূচক নাগরিকত্ব দিতে পেরেছে।
টাউন হলে এক অনুষ্ঠানে বিনম্র সুচি জীবনে বিশেষ কিছু করার কথা অস্বীকার করে বলেন, তিনি তার জীবনে পছন্দকে প্রাধান্য দিয়েছেন, বিসর্জনকে নয়। সুচি সোমবার ইতালির প্রধানমন্ত্রী এনরিক লেত্তা ও প্রেসিডেন্ট জিওরগিও ন্যাপোলি তানোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন বলে কথা রয়েছে। এ খবর লেখা পর্যন্ত বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি। অপর একটি নাগরিকত্ব সনদ গ্রহণে বোলোগনা নগরীতে যাওয়ার আগে তার পোপ ফ্রান্সিসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করারও কথা রয়েছে। তথ্যসূত্র : এএফপি।

প্রথম পোলিশ প্রধানমন্ত্রী তাদেউসজ চলে গেলেন

সমাজতন্ত্রের অবসানের পর পোল্যান্ডের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাদেউসজ মাজোউয়েককি পোল্যান্ডের নাগরিকদের শোকের সাগরে ভাসিয়ে চল গেলেন। সোমবার সকালে হাসপাতালে তিনি মারা যান বলে জানিয়েছেন তার একান্ত সচিব। মারা যাওয়ার সময় তাদেউসজ মাজোউয়েককির বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। কমিউনিস্ট নেতা ও বিরোধীদের মধ্যে ‘গোলটেবিল বৈঠকের’ এ স্থপতিকে বুধবার প্রচণ্ড জ্বরের কারণে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় বলে জানান তার একান্ত সচিব।
ওই গোলটেবিল বৈঠকের মাধ্যমে ১৯৮৯ সালের নির্বাচনের পথ প্রশস্ত হয়েছিল। এ নির্বাচনে জয় পেয়ে প্রধানমন্ত্রী হন তাদেউসজ। নির্বাচনে তার সলিডারিটি পার্টির জয়ের মাধ্যমে পূর্ব ইউরোপজুড়ে কমিউনিস্ট সরকারের পতন শুরু হয়। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন তাদেউসজ। ইউরোপীয় ইউনিয়নে পোল্যান্ডের অন্তর্ভুক্তির পক্ষে ভূমিকা পালনকারীদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। তাদেউসজের মৃত্যুতে শোকাহত পোল্যান্ডবাসী। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাডোস্ল সিকোরস্কি তাদেউসজকে পোল্যান্ডের মুক্তি ও স্বাধীনতার জনকদের একজন হিসেবে অভিহিত করেন।