Showing posts with label ইরান. Show all posts
Showing posts with label ইরান. Show all posts

Thursday, August 27, 2026

ইয়েমেনের আল-মাখা বন্দরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

ইয়েমেনি সেনাবাহিনী একটি সূত্রের বরাতে দাবি করেছে যে, ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতি সশস্ত্র গোষ্ঠী দেশটির আল-মাখা (মোখা) বন্দরে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে । খবর আলজাজিরার।

বুধবার হামলায় শহরের বন্দর এলাকায় অন্তত তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। আরেকটি ক্ষেপণাস্ত্র আল-বারাহ মোড়ের দিকে গিয়ে পড়ে।

হামলায় কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, তাৎক্ষণিকভাবে তা জানা যায়নি। হুতিরাও এখন পর্যন্ত হামলার দায় স্বীকার করেনি।

এদিকে ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলীয় হোদেইদা গভর্নরেটের আল-খাওখাহ এলাকায় অন্তত পাঁচটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। সূত্রগুলো জানিয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্রগুলো তাইজের পূর্বে হুতিদের নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে ছোড়া হয়েছে।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মাখা ও এর বন্দর এলাকায় হুতিদের হামলা বেড়েছে। এর আগে আগস্টেও বন্দরনগরীটিতে হুতি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় হতাহতের ঘটনা ঘটে। 

হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী ট্যাংকারে আগুন
হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী ট্যাংকারে আগুন > হরমুজ প্রণালিতে একটি ট্যাংকারে আগুন ধরে গেছে। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) এ তথ্য জানিয়েছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে ইউকেএমটিও বলেছে, ট্যাংকারটিতে লাগা আগুন পরে নিভিয়ে ফেলা হয়েছে। জাহাজটির সব ক্রু নিরাপদে আছেন এবং তাদের অবস্থান নিশ্চিত করা হয়েছে। ঘটনায় এখন পর্যন্ত পরিবেশের ওপর কোনো ক্ষতিকর প্রভাবের খবর পাওয়া যায়নি। তবে ট্যাংকারটিতে আঘাত করা বস্তুটি কী ছিল, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ইউকেএমটিওও ঘটনাটিকে ‘অজ্ঞাত বস্তুর’ আঘাত হিসেবে উল্লেখ করেছে। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোর একটি। এই সমুদ্রপথে চলাচলকারী একটি ট্যাংকারে আগুন লাগার ঘটনায় জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

মার্কিন শক্তি প্রদর্শনের মিশনে ব্যর্থ রণতরী আব্রাহাম লিংকন : ইরান

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, দীর্ঘ সময় মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন থাকার পর সমস্যাগ্রস্ত মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন-এর নাবিকরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। খবর আলজাজিরার।

বুধবার এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বাঘাই বলেন, ‘আমেরিকানরা শক্তি প্রদর্শনের জন্য ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনকে এই অঞ্চলে পাঠিয়েছিল।’

এরপর তিনি ইঙ্গিত দেন যে মার্কিন বিমানবাহী রণতরীটি তার মিশনে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, “কয়েক মাসের যুদ্ধের পর – এবং ২০০ দিনেরও বেশি সময় ধরে কোনো বন্দরে না ভেড়ার পর – এটি এখন নাবিকদের [বিশ্রাম ও বিনোদনের জন্য] থাইল্যান্ডের দিকে যাচ্ছে।

থাই কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ সামরিক মিশন শেষে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন আগামী সপ্তাহে থাইল্যান্ডে সংক্ষিপ্ত বিরতি নেবে। রণতরীটি টানা ২৫০ দিনেরও বেশি সময় সমুদ্রে থাকার পর সেখানে নোঙর করবে।

থাই প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সফরটির উদ্দেশ্য মূলত নাবিকদের বিশ্রাম ও পুনরুদ্ধার। এ সময়ে থাই নৌবাহিনীর সঙ্গে কোনো যৌথ সামরিক মহড়া বা অভিযান হবে না।

এদিকে, দীর্ঘ সময়ের এই মোতায়েন রণতরীটির প্রায় ৫ হাজার নাবিক ও মেরিনের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। নাবিকদের পরিবারের সদস্যরা মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির পাশাপাশি খাবার ও ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার সামগ্রীর ঘাটতির কথা জানিয়েছেন। 

মার্কিন শক্তি প্রদর্শনের মিশনে ব্যর্থ রণতরী আব্রাহাম লিংকন : ইরান

Wednesday, August 26, 2026

হরমুজ প্রণালিতে ছয় মাসে ২০ নাবিক ও বন্দরকর্মী নিহত

৬৮ জাহাজে হামলাঃ ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধে হরমুজ প্রণালি ও আশপাশের জলসীমায় অন্তত ৬৮টি নৌযানে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত ২০ নাবিক ও বন্দরকর্মী নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ৩৫ জন। একজন এখনো নিখোঁজ। ইরাকি সংবাদমাধ্যম শাফাক নিউজ এ খবর প্রকাশ করেছে।

আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে গড়ে প্রতি ২ দশমিক ৬ দিনে একটি করে এই হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার প্রায় অর্ধেকই ছিল তেলবাহী জাহাজকে ঘিরে। কনটেইনারবাহী জাহাজ আক্রান্ত হয় ২০ শতাংশ ঘটনায় এবং বাল্ক ক্যারিয়ার ১৫ শতাংশ ঘটনায়।

যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস বা ইউকেএমটিও ৬৮টি ঘটনার মধ্যে ৪৭টিকে হামলা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

ঘটনাগুলোতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী জাহাজ। এসব দেশের পতাকাবাহী ১৩টি জাহাজ বিভিন্ন ঘটনায় জড়িয়েছে। পানামা ও মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের পতাকাবাহী ১০টি করে জাহাজও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ইরানের পতাকাবাহী চারটি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও অন্যান্য পণ্য পরিবহনের বড় অংশ এই পথ দিয়ে চলাচল করে। ফলে এ অঞ্চলে সামরিক সংঘাত ও নৌ-হামলার ঘটনা আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

সূত্র: শাফাক নিউজ

হরমুজ প্রণালি। ছবি: রয়টার্স
হরমুজ প্রণালি। ছবি: রয়টার্স

ইরানের ওপর নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় মুখ খুলল চীন ও কাতার

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করেছে চীন ও কাতার। দুই দেশই বলেছে, একতরফা নিষেধাজ্ঞা সংকটের সমাধান নয়; বরং কূটনৈতিক আলোচনার পথ খোলা রাখা প্রয়োজন। ইরাকি সংবাদমাধ্যম শাফাক নিউজ এ খবর প্রকাশ করেছে।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বেইজিংয়ে সাংবাদিকদের বলেন, আন্তর্জাতিক আইন বা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়া কোনো একতরফা নিষেধাজ্ঞা চীন সমর্থন করে না। তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে এবং বেইজিং নিজের বৈধ স্বার্থ রক্ষা করবে।

চীন বর্তমানে ইরানের সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতা। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার প্রথম দফায় বড় কোনো চীনা ব্যাংককে লক্ষ্যবস্তু করা হয়নি।

একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের সমালোচনা করে কাতারও। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি বলেন, কাতার এখনো ওয়াশিংটন ও তেহরানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে এবং দুই দেশের মধ্যে আলোচনা পুনরায় শুরু করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, উত্তেজনা আরও বাড়লে তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, পুরো বিশ্বেই পড়বে।

গত ২৪ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্র ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ নামে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন অর্থনৈতিক অভিযান শুরু করে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানান, এই অভিযানের লক্ষ্য ইরান এবং দেশটির অর্থনীতিকে সহায়তা করা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ বাড়ানো।

এই পদক্ষেপের আওতায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র সংগ্রহ, তেল খাত ও অন্যান্য নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত প্রায় ৬০ জন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ডিজিটাল সম্পদ, প্রযুক্তি, স্বর্ণ, বিমান পরিবহন ও নৌপরিবহন খাতেও সম্ভাব্য গৌণ নিষেধাজ্ঞার পরিধি বাড়ানো হয়েছে।

স্কট বেসেন্ট সতর্ক করে বলেন, যেসব দেশ বা কোম্পানি নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকবে, ভবিষ্যতে তারা মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার হারাতে পারে। তবে কিছু ক্ষেত্রে নিয়ম মেনে চলার জন্য নির্দিষ্ট সময় দেওয়া হবে।

এদিকে ইরানের অর্থমন্ত্রী আলী মাদানিজাদেহ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় তেহরান পুরোপুরি প্রস্তুত। তিনি দাবি করেন, চীন, রাশিয়াসহ ইরানের মিত্র দেশগুলো ওয়াশিংটনের এই চাপের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে।

অন্যদিকে পাকিস্তানও সমান্তরালভাবে মধ্যস্থতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তেহরানে পাকিস্তান সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের বৈঠকের পর দেশটির সেনাবাহিনী জানিয়েছে, উত্তেজনা কমানো এবং হরমুজ প্রণালি আবার পুরোপুরি খুলে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।

আইআরজিসির পাহাড়ায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল করছে। ছবি : এএফপি
আইআরজিসির পাহাড়ায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল করছে। ছবি : এএফপি > হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের ক্ষেত্রে ইরানের নির্ধারিত নিয়ম লঙ্ঘনকারী জাহাজের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে বলে সতর্ক করেছে তেহরান। এসব জাহাজকে জরিমানা, আটক এমনকি জব্দও করা হতে পারে। খবর রয়টার্সের। সোমবার (২৪ আগস্ট) পারস্য উপসাগরীয় প্রণালি কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে এ সতর্কবার্তা দিয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের ক্ষেত্রে ইরানের নির্ধারিত ব্যবস্থা না মানা জাহাজের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি। ফলে ইরানের এ হুঁশিয়ারিতে এই জলপথ ব্যবহারকারী জাহাজের মালিক ও ভাড়াকারীদের ঝুঁকি আরও বেড়েছে। প্রণালিটি ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে ইরান সম্প্রতি পারস্য উপসাগরীয় প্রণালি কর্তৃপক্ষ নামে নতুন একটি সংস্থা গঠন করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, পারস্য উপসাগরসংক্রান্ত যাত্রার ক্ষেত্রে নিয়ম না মানা হিসেবে চিহ্নিত জাহাজগুলোর হালনাগাদ তালিকা অনুসরণ করতে হবে পণ্য মালিকদের।

ইরান সেনাদের বড় অংশকে বেতন দিতে পারছে না: ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে দাবি করেন, অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত ইরান তার সামরিক বাহিনীর বড় একটি অংশের সদস্যদের নিয়মিত বেতন দিতে পারছে না। একই সময়ে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী নজিরবিহীন মাত্রায় নির্যাতন করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। ট্রাম্পের দাবি, বিক্ষোভে অংশ না নেওয়া ব্যক্তিরাও সহিংসতার শিকার হচ্ছেন।

ট্রাম্প বলেন, ইরানের পরিস্থিতি এখন একটি গুরুতর মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে এবং তা অবিলম্বে বন্ধ করা প্রয়োজন। এদিকে ইরানের ওপর এ যাবৎকালের সবচেয়ে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন।

এর আগে সোমবার দেওয়া আরেক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান সম্পূর্ণ ধ্বংস বা পতনের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

ইরান সেনাদের বড় অংশকে বেতন দিতে পারছে না: ট্রাম্প

Tuesday, August 25, 2026

যে ৩টি কৌশল ব্যর্থ হওয়ায় ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হার by ব্র্যাট ডেভরোক্স

ইরান ও হরমুজ প্রণালি ঘিরে সংঘাত এখনো শেষ হয়নি; কিন্তু বিশ্লেষকেরা এর মধ্যেই এ থেকে কী শিক্ষা নেওয়া উচিত, তা ঘোষণা করতে তাড়াহুড়া শুরু করে দিয়েছেন। নিরাপত্তা নীতি–সংক্রান্ত একটি নতুন ধারার নিবন্ধে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পরিচালিত সামরিক অভিযানের বিভিন্ন রসদ–সংক্রান্ত ও কৌশলগত ঘাটতিগুলো তুলে ধরা হচ্ছে। যেমন জ্বালানি তেল ও সার পরিবহনে বিঘ্ন ঘটার প্রস্তুতি না থাকা, নিখুঁত অস্ত্র ও প্রতিরোধক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে যাওয়া, সস্তা একমুখী আক্রমণকারী ড্রোন মোকাবিলার কার্যকর প্রস্তুতির অভাব, পর্যাপ্ত মাইন অপসারণকারী জাহাজের ঘাটতি ইত্যাদি।

ভবিষ্যতের সংঘাতগুলোর প্রস্তুতিতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এগুলো হয়তো দরকারি শিক্ষা হতে পারে। কিন্তু হরমুজ প্রণালিতে দেশের চরম ব্যর্থতার মূল কারণ এগুলো নয়। সংঘাতের অনেক আগেই যদি এই বিষয়গুলো সমাধান করা যেত, তাহলেও ট্রাম্প প্রশাসন তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য—অর্থাৎ শাসনব্যবস্থার পতন, ইরানের দূরপাল্লার আঘাত হানার ক্ষমতা ধ্বংস করা বা পারমাণবিক অস্ত্র ও আঞ্চলিক প্রক্সিগুলোর বিষয়ে তাদের নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা—অর্জন করতে পারত কি না, তা বলা কঠিন।

অস্ত্রের মজুত বাড়ানো কিংবা তেলসংকটের প্রস্তুতি হয়তো দীর্ঘমেয়াদি বোমাবর্ষণ অভিযান বা অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির সুযোগ দিত। কিন্তু গত ছয় মাসে যা অর্জিত হয়নি, তা যে আরও সাত মাসের বোমাবর্ষণ বা অবরোধে অর্জিত হতো—এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। কৌশলগত ব্যর্থতার ফলে ইরানের পারমাণবিক আকাঙ্ক্ষা পূরণে আরও উন্মুক্ত সুযোগ পাওয়া, হরমুজ প্রণালিতে আগের চেয়ে অনেক বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা এবং এর ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর প্রভাব বৃদ্ধির সম্ভাবনাই এখন সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এখনো অত্যন্ত সক্ষম। এমনকি এই ভুলভাবে পরিকল্পিত যুদ্ধেও তারা এমন প্রযুক্তিগত সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে, যা বিশ্বের অন্য কোনো সামরিক বাহিনীর নেই। তারা নিজস্ব উপকূল থেকে সাত হাজার মাইলের বেশি দূরে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করেছে এবং ইরানের আকাশসীমার ওপর একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে।

এর ফলে ক্ষয়ক্ষতির চিত্রটি অত্যন্ত একপেশে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে অন্তত ১৮ জন নিহত এবং ৬০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন, যেখানে ইরানের পক্ষে মৃতের সংখ্যা নিশ্চিতভাবেই হাজার ছাড়িয়ে গেছে (যদিও সুনির্দিষ্ট তথ্য জানা নেই)। সংক্ষেপে বলতে গেলে, পরিকল্পনা ও সরবরাহের ব্যর্থতা সত্ত্বেও মার্কিন সামরিক বাহিনী দেখিয়েছে যে তারা এখনো অত্যন্ত বিপজ্জনক।

তবে কোনো প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বই সেই কৌশলগত অক্ষমতার ক্ষতিপূরণ করতে পারে না, যা সামরিক বাহিনীর কাছে অসম্ভব কিছু দাবি করে বসে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামরিক বাহিনীর কাছে একটা নয়, তিন-তিনটি অসম্ভব কাজ চেয়েছেন এবং সেগুলো করতে ব্যর্থ হলে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

প্রথম অসম্ভব কাজ ছিল—কোনো ধরনের পদাতিক বা স্থল অভিযান ছাড়াই বোমাবর্ষণ করে শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো। কেবল বিমানশক্তি দিয়ে কৌশলগত বিজয় অর্জনের স্বপ্ন স্বাধীন বিমানবাহিনীগুলো ১৯২১ সাল থেকেই দেখে আসছে, যখন ইতালীয় তাত্ত্বিক জিউলিও দুহেত ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে কেবল বোমারু বিমান দিয়েই ভবিষ্যৎ যুদ্ধে জয় পাওয়া সম্ভব। তিনি ১৯২৮ সালে এমনকি এটাও দাবি করেছিলেন যে একটি মাঝারি আকারের দেশে মাত্র ৩০০ টন বোমা ফেললেই এক মাসের মধ্যে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটবে।

কেবল আকাশপথেই যুদ্ধ জেতা যায়—এই তত্ত্ব আধুনিক শিল্পযুদ্ধের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি পরীক্ষিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে লন্ডনের ওপর জার্মানির ফেলা ৪০ হাজার টন বোমা কেবল ব্রিটিশদের প্রতিরোধ গড়ে তোলার মানসিকতাকে আরও শক্ত করেছিল। জবাবে অক্ষশক্তির ওপর মিত্রবাহিনীর ফেলা ২৫ লাখ টন বোমা অ্যাডলফ হিটলারের রাজত্বকে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত করলেও তা কিন্তু তাদের পতন ঘটাতে পারেনি; বরং যুদ্ধের প্রতি সাধারণ জনগণের সমর্থনকে আরও চাঙা করেছিল।

ভিয়েতনাম যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ফেলা ৮০ লাখ টন বোমায় কাজের কাজ কিছুই হয়নি; বরং তা সেখানে কমিউনিস্টদের প্রতি সাধারণ মানুষের সমর্থন বাড়াতে সাহায্য করেছিল।

পারমাণবিক হামলা ছাড়া কেবল বিমান থেকে বোমাবর্ষণ করে কোনো শাসনব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলা হয়তো অসম্ভব। এর কাছাকাছি যা গিয়েছিল, তা হলো স্লোবোদান মিলোসেভিচের অধীনে সার্বিয়ার ওপর ন্যাটোর বিমান হামলা। কিন্তু ১৯৯৯ সালের জুনেই সেখানে বোমাবর্ষণ বন্ধ হয়েছিল, আর মিলোসেভিচ সরকারের পতন ঘটেছিল ২০০০ সালের অক্টোবরে গণবিক্ষোভের মুখে।

কেবল বিমান হামলার মাধ্যমে ইরানি সরকারের পতন ঘটানোর সম্ভাবনা ছিল শূন্যের কোঠায়। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর কাছে পরবর্তী অসম্ভব দাবি ছিল ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা অকার্যকর করা—সেটিও কেবল আকাশপথ থেকে। কিন্তু সামান্য পদাতিক বাহিনী ব্যবহার করে মোবাইল লঞ্চার অকার্যকর করার এই চেষ্টাও অতীতে বারবার করা হয়েছে এবং প্রতিবারই ব্যর্থ হয়েছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও আমেরিকান ও ব্রিটিশ বিমানবাহিনী একটি বিস্তৃত বোমাবর্ষণ অভিযান চালিয়ে জার্মানির ভি-১ ও ভি-২ রকেটের উৎপাদন ও উৎক্ষেপণকেন্দ্রগুলো ধ্বংস করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তারা উৎক্ষেপণ বন্ধ করতে পারেনি। এগুলো লুকিয়ে রাখা বা শক্ত আবরণে ঢেকে রাখা খুবই সহজ ছিল।

নিখুঁত লক্ষ্যভেদী অস্ত্রের বিকাশ এই হিসাবকে পাল্টে দিতে পারেনি। কারণ, এর বিপরীতে চলে এসেছে মোবাইল লঞ্চব্যবস্থা। প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় আকাশ থেকে ইরাকি স্কাড ক্ষেপণাস্ত্রের লঞ্চার ধ্বংস করার চেষ্টা একটিও নিশ্চিত ধ্বংসের প্রমাণ দিতে পারেনি।

একইভাবে ইসরায়েলও গাজা ও দক্ষিণ লেবানন থেকে হামাস ও হিজবুল্লাহর রকেট হামলা ঠেকাতে দুই দশক ধরে ব্যাপক বিমান অভিযান চালিয়েছে, কিন্তু কেবল স্থল অভিযান চালিয়েই সেই রকেটগুলোকে নীরব করা সম্ভব হয়েছিল।

ইয়েমেন থেকে হুতিদের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন বন্ধ করতে একাধিক দেশের জোট চেষ্টা করেছে, অথচ এখনো সেই আক্রমণ অব্যাহত রয়েছে। সুতরাং নিখুঁত লক্ষ্যভেদী অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও কেবল আকাশ থেকে মোবাইল উৎক্ষেপণব্যবস্থাগুলোকে ধ্বংস করা সম্ভব নয়, যা সহজে আড়াল থেকে নিক্ষেপ করে দ্রুত নতুন জায়গায় সরে যেতে পারে। শাসনব্যবস্থার পতনের মতোই, রকেট হামলা পুরোপুরি বন্ধ করতেও স্থলবাহিনীর প্রয়োজন হয়।

ট্রাম্প প্রশাসনের শেষ ভরসা ছিল পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে এক নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা চালু রাখা, যাতে জিসিসিভুক্ত (গালফ কো–অপারেশন কাউন্সিল) দেশগুলোর অবকাঠামো ইরান ধ্বংস করতে না পারে। কারণ, এই দেশগুলোর আতিথেয়তার ওপরই মার্কিন সামরিক অভিযান নির্ভর করছিল। আক্রমণ রোখার সস্তা উপায়ে বেশি বিনিয়োগ এবং স্বল্পপাল্লার বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েন করলে হয়তো মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানি আক্রমণের বড় একটি অংশ প্রতিহত করতে পারত।

কিন্তু যেখানে ড্রোন এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা সেগুলোকে ঠেকানোর ব্যবস্থার চেয়ে অনেক বেশি সস্তা এবং দ্রুতগতির, সেখানে ইরান শেষ পর্যন্ত আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে ভাসিয়ে দেবে—এটাই ছিল স্বাভাবিক। দুটি ব্যর্থতার পর তৃতীয় আরেকটি অসম্ভব কাজ মার্কিনদের রক্ষা করতে পারল না।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর যদি ড্রোন এবং রণতরি, মাইন অপসারণকারী জাহাজ ও সুরক্ষিত বিমানঘাঁটি–সম্পর্কিত কেনাকাটার দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো নিয়ে চোখ খোলার প্রয়োজন থেকে থাকে, তবে সেই শিক্ষা তারা পেয়ে গেছে। কিন্তু এই যুদ্ধ পেন্টাগনের ভেতরে হারেনি; এটি হেরেছে হোয়াইট হাউসের অলিন্দে।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর কাছে অসম্ভব কিছু দাবি করার ঝুঁকি যদি ট্রাম্পের মাথায় না ঢোকে, তবে তা মনে করিয়ে দেওয়া ছিল তাঁর প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব। অবশ্য ট্রাম্প কোনো অভিজ্ঞ ও যোগ্য প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে বেছে নেননি; বরং পিট হেগসেথের মতো একজন অনুগত তোষামোদকারীকে বসিয়েছেন, যাঁর চরম অক্ষমতা তাঁকে কেবল আরও বেশি অনুগত করে তুলেছে।

হেগসেথ পেন্টাগনের শীর্ষ পদে থাকা এমন যেকোনো অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের ছেঁটে ফেলার জন্য বহুদূর হেঁটেছেন, যিনি অন্য কোনো মতামত দিতে পারেন। মার্কিন অফিসার কোর কখনোই রাজনীতিবিদের কাছে অপ্রিয় খবর পৌঁছে দেওয়ার কাজে খুব একটা পারদর্শী ছিল না, কিন্তু হেগসেথের এই কৌশলের কারণে প্রেসিডেন্টকে থামানোর মতো কেউ পেন্টাগনে অবশিষ্ট ছিল না।

বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা যায়, জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন কাঠখড় পুড়িয়ে কোনোমতে সমস্যার সংকেত দেওয়ার চেষ্টা করলেও হেগসেথের অন্ধ সমর্থনের মুখে তা ধামাচাপা পড়ে যায়।

এর সবই পূর্বানুমানযোগ্য ছিল এবং বস্তুত এর অনেকটাই আগেভাগে বলা হয়েছিল। ফলে ইরানে এই বিপর্যয়ের তাৎক্ষণিক দায় ট্রাম্প এবং তাঁর অপদার্থ উপদেষ্টাদের ওপর বর্তালেও, চূড়ান্ত দায় এমন এক জায়গায় গিয়ে ঠেকে, যা কোনো রাজনীতিবিদ স্বীকার করবেন না—আর তা হলো দেশটির ভোটাররা।

ট্রাম্পকে হোয়াইট হাউসে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত ছিল মার্কিন সাধারণ ভোটারদের। একজন ব্যক্তি, যিনি স্পষ্টতই অক্ষম, যিনি অপ্রিয় বা ভিন্ন কোনো তথ্য গ্রহণে চরমভাবে অক্ষম এবং যিনি নিজেকে তোষামোদকারীদের দিয়ে ঘিরে রাখতে পছন্দ করেন।

বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর নেতা নির্বাচন করা আর কোনো রিয়্যালিটি শোর বিনোদনমূলক উপস্থাপক নির্বাচন করা যে এক কথা নয়, সেটাই এখন প্রমাণিত। পেন্টাগনের ভেতরে হয়তো ভুলগুলো নিয়ে প্রতিবেদন লেখা শুরু হয়ে গেছে।

কিন্তু তেলের মূল্যবৃদ্ধি থেকে শুরু করে মার্কিন সম্পদের ক্ষয়—এই ব্যর্থতার কৌশলগত পরিণতিগুলো যখন আরও ঘনীভূত হতে থাকবে, তখন দেখার বিষয় একটাই: আমেরিকান ভোটাররা আদৌ বুঝতে পেরেছেন কি না যে ব্যালট বাক্সে করা ভুল পছন্দ থেকে কেবল সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব কখনোই তাদের সুরক্ষা দিতে পারে না।

* ব্র্যাট ডেভরোক্স, একজন সামরিক ইতিহাসবিদ, রোমান অর্থনীতি ও সামরিক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। ফরেন পলিসি থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির ছবিসংবলিত একটি ব্যানার। তেহরান, ইরান। ২ জুলাই ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির ছবিসংবলিত একটি ব্যানার। তেহরান, ইরান। ২ জুলাই ২০২৬ ছবি: রয়টার্স

Monday, August 24, 2026

মার্কিন কোম্পানিগুলোয় হামলার হুমকি দিল ইরান

ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্র তেহরানকে যুদ্ধ বন্ধে চুক্তিতে বাধ্য করতে অর্থনৈতিক যুদ্ধ শুরু করলে মার্কিন কোম্পানিগুলোয় হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছে ইরান। খবর দ্য টেলিগ্রাফের।

ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান মোহসেন রেজায়ি একই সঙ্গে সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা যদি ওয়াশিংটনের অর্থনৈতিক যুদ্ধে অংশ নেয়, তাহলে তাদেরও শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং তাদের স্বার্থে আঘাত হানা হবে।

বুধবার ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, ইরানের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন মাত্রায় ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ ও বিচ্ছিন্নতা’ আরোপ করা হবে। এর পর শনিবার রেজায়ি দাবি করেন, যুদ্ধে ইরানের হাতে এখনো অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগের সুযোগ রয়েছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমরা শুধু সামরিক ঘাঁটিগুলোয় হামলা চালিয়েছি। কিন্তু তারা যদি আমাদের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে চায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের তেল ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো ইরানের আশপাশে এবং অন্যান্য জায়গায় রয়েছে। আমরা সেগুলোয় হামলা চালাব।’

ট্রাম্প তার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সংঘাত ভূমিকম্পের মতো হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন রেজায়ি।

কয়েক মাসের মধ্যে এই প্রথম ইরান মার্কিন ও পশ্চিমা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার হুমকি দিল বলে মনে করা হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশটির তেল কোম্পানিগুলোর কথাও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

শনিবার দ্য টেলিগ্রাফ জানায়, ইরানি সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হ্যাকাররা সাইবার হামলা চালিয়ে যুক্তরাজ্যের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র চার দিন বন্ধ রাখতে সক্ষম হয়েছে।

এর আগে বুধবার ট্রাম্প সতর্ক করেছিলেন, যেসব দেশ ইরানকে যেকোনো ধরনের সহায়তা দেবে, তাদের ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিণতি ভোগ করতে হবে। ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি তেহরানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক অভিযান চালানোর ঘোষণা দেন এবং মিত্র দেশগুলোকে ইরানকে বিচ্ছিন্ন ও পরাজিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।

ইরান অবশ্য কোন কোন মার্কিন প্রতিষ্ঠান বা স্থাপনা হামলার লক্ষ্য হতে পারে, তা নির্দিষ্ট করে জানায়নি। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন কোম্পানিগুলোর বড় ধরনের বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণ হয়েছে।

যুদ্ধ শুরুর পর ফেব্রুয়ারিতে ইরান বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অ্যামাজনের কয়েকটি তথ্যকেন্দ্রে ড্রোন হামলা চালিয়েছিল। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোতেও হামলার হুমকি দিয়েছিল তারা। তবে সামরিক ও কূটনৈতিক স্থাপনার বাইরে মার্কিন স্বার্থে বড় ধরনের হামলা থেকে এত দিন তেহরান বিরত ছিল।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর ওপর হামলার আশঙ্কা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বিশেষ উদ্বেগের কারণ হতে পারে। কারণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার মধ্যে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমেছে।

ইরান এর আগে উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোতেও হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে কাতারের রাস লাফান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস কেন্দ্র এবং সৌদি আরবের আরামকোর বিভিন্ন স্থাপনা রয়েছে।

শনিবার ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজায়িও মার্কিন বিমান ও জ্বালানি পরিবহনকারী ট্যাংকারকে আশ্রয় দেওয়া উপসাগরীয় দেশগুলোকে সতর্ক করে বলেছেন, পরে হামলার শিকার হলে তারা যেন অভিযোগ না করে। এমনকি বেসামরিক অবকাঠামোতেও হামলা হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

এদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান যুদ্ধ শেষ করতে চুক্তির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। শনিবার তিনি দাবি করেন, বিশ্ব ইতোমধ্যে ইরানের বিজয় মেনে নিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ঘৃণিত হয়ে পড়েছে।

ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা চালু থাকলেও তাতে তেহরানকে নত করা সম্ভব হয়নি। নতুন করে অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়ে ইরানকে চুক্তিতে বাধ্য করার চেষ্টা তাই কতটা সফল হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

সূত্র : দ্য টেলিগ্রাফ

তেহরানের জমহুরি সড়কের পাশে একটি বিশাল মার্কিন-বিরোধী বিলবোর্ড। ছবি: দ্য টেলিগ্রাফ
তেহরানের জমহুরি সড়কের পাশে একটি বিশাল মার্কিন-বিরোধী বিলবোর্ড। ছবি: দ্য টেলিগ্রাফ

ইরানের বিরুদ্ধে ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধে’ যোগ দিলে তিন ধাপে ব্যবস্থা নেবে তেহরান

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধে’ কোনো দেশ যোগ দিলে তাদের শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। দেশটির শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজাই হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যারা শত্রু হিসেবে বিবেচিত হবে তাদের বিরুদ্ধে ‘ভূমিকম্পসম’ পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে তেহরান তিনটি ধাপ অনুসরণ করবে।

গত শনিবার রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব রেজাই এ হুঁশিয়ারি দেন।

তিনি বিশ্বের সব দেশ, বিশেষ করে ইরানের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধে’ অংশ না নেওয়ার আহ্বান জানান। রেজাই বলেন, কোনো দেশ ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপে অংশ নিলে তাকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করবে তেহরান।

ইরানের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপের সঙ্গে কোনো প্রতিবেশী দেশ যুক্ত হলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে ‘এক ফোঁটা তেলও’ বের হতে দেওয়া হবে না। এমনকি হরমুজ প্রণালির বিকল্প রপ্তানি পথও এর আওতায় আসতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।

তিন ধাপে পাল্টা ব্যবস্থা

ইরানের পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার কৌশল তিন ধাপে এগোবে বলে জানিয়েছেন রেজাই। প্রথম ধাপে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতাকারী দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করবে তেহরান।

তিনি বলেন, প্রথমে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে তাদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে দূরে সরে আসার আহ্বান জানানো হবে। তারা এতে সাড়া না দিলে পরবর্তী ধাপে হামলা চালিয়ে ওই দেশের স্বার্থে আঘাত করা হবে।

রেজাইয়ের বক্তব্যে বিকল্প রপ্তানি পথের কথা উল্লেখ করায় বিশ্লেষকদের ধারণা, এর মধ্যে বাব আল-মান্দেব প্রণালিও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। লোহিত সাগরে প্রবেশের এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে তেহরানের নিয়ন্ত্রণ এবং এর ওপর আরোপিত অবরোধকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ আরোপ করেছে, যার ফলে দেশটির আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

নেদারল্যান্ডসভিত্তিক ক্লিঙ্গেনডেল ইনস্টিটিউটের ইরানবিষয়ক গবেষক হামিদরেজা আজিজির মতে, তেহরান আগেভাগেই প্রতিরোধমূলক বার্তা দিতে চাইছে। তার ভাষ্য, কোনো সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতিকেও ইরান পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়ার কারণ হিসেবে বিবেচনা করতে পারে।

আজিজির মতে, ইরানের নতুন সামরিক কৌশলে দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে। একটি হলো সম্ভাব্য হুমকি বাস্তবে রূপ নেওয়ার আগেই তা ঠেকাতে আগাম পদক্ষেপ নেওয়া। অন্যটি হলো হামলা হলে তার চেয়ে বেশি মাত্রায় পাল্টা আঘাত করে প্রতিপক্ষের জন্য ব্যয় বাড়িয়ে দেওয়া।

তার ভাষায়, উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক যুদ্ধে যোগ দিলে ইরানের হুঁশিয়ারি মূলত একটি ‘চূড়ান্ত সতর্কবার্তা’। ইরানের সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামো আরও এক দফা সংঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেও তিনি মনে করেন।

চাপে উপসাগরীয় দেশগুলো

ইরানের প্রতিবেশী এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র উপসাগরীয় দেশগুলো এই সংঘাতের কারণে ক্রমেই কঠিন অবস্থার মুখে পড়ছে। তারা একদিকে ইরানের হামলার নিন্দা করছে, অন্যদিকে তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি নষ্ট করতেও চাইছে না।

কারণ ভৌগোলিক বাস্তবতায় ইরানের সঙ্গে তাদের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক বজায় রাখা প্রয়োজন। উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতিও হরমুজ প্রণালির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তেল ও গ্যাস রপ্তানির বড় অংশ এই জলপথ দিয়ে পরিচালিত হয়।

গত সপ্তাহে ইরানের একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অভিযোগ তুলে সংযুক্ত আরব আমিরাত তেহরানের ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তবে ওই হামলার দায় অস্বীকার করেছে ইরান। এর আগে ২০২২ সালে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপিত হয়েছিল।

অন্যদিকে চীনের মধ্যস্থতায় ২০২৩ সালে সৌদি আরব ও ইরান সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চুক্তি করে। স্থায়ী সংঘাতের চেয়ে ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ ও সম্পর্ক বজায় রাখাই নিরাপদ, এমন হিসাব থেকেই ওই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

ল্যাঙ্কাস্টার ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক সাইমন মাবন বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর সামনে ভৌগোলিক বাস্তবতা পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই। ইরানের সঙ্গে তাদের পাশাপাশি বসবাস ও কাজ করতেই হবে।

তার মতে, ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন হলে যে অস্থিতিশীলতা তৈরি হবে, উপসাগরীয় দেশগুলো তা চায় না। বরং তারা ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কট্টরপন্থী অংশকে দুর্বল করতে কঠোর পদক্ষেপের পক্ষে থাকতে পারে।

কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পারসি বলেন, সংকট সমাধানে কূটনীতির ওপর আস্থা কম থাকলেও এ অঞ্চলের কোনো দেশই আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ব্যয় বহন করতে পারবে না।

তার মতে, এই বাস্তবতাই সংঘাতকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া থেকে ঠেকাবে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক তেল মজুতের পরিমাণও কমে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত কারও জন্যই আকর্ষণীয় নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার প্রস্তুতি

ইরানের হুঁশিয়ারির মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আজ সোমবার (২৪ আগস্ট) নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করা হতে পারে। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে সংকটে থাকা ইরানের অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়বে।

এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ‘ধ্বংসাত্মক অর্থনৈতিক অভিযান’ চালানোর ঘোষণা দেন। ইরানকে যেকোনো ধরনের সহায়তা বা ‘লাইফলাইন’ দেওয়া দেশগুলোর বিরুদ্ধেও বড় ধরনের অর্থনৈতিক পরিণতির হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

পরদিন মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও একই সুরে বলেন, ‘আপনি হয় আমাদের সঙ্গে, নয়তো আমাদের বিরুদ্ধে।’

ইরানের অন্যতম বড় তেল ক্রেতা চীনের প্রতিও সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে ওয়াশিংটন। ইরানের তেল রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি চীন কিনে থাকে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান রোববার বলেন, তার দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘পূর্ণমাত্রার অর্থনৈতিক, সামরিক ও নিরাপত্তা যুদ্ধে’ রয়েছে।

তিনি বলেন, যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্র ধারণা করেছিল, মার্কিন হামলার মুখে ইরানের সরকার ভেঙে পড়বে এবং দেশটি ভেনেজুয়েলার মতো পরিস্থিতিতে পড়বে। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। বরং ইরানের প্রতিরোধ, সংহতি ও ঐক্য বিশ্বকে বিস্মিত করেছে বলে দাবি করেন তিনি।

কয়েক দশক ধরে নিষেধাজ্ঞার মুখে ইরান

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে ইরান। জাতিসংঘও বিভিন্ন সময়ে তেহরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

ইরানি বিপ্লবের পর মার্কিন দূতাবাসে মার্কিন নাগরিকদের জিম্মি করার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে প্রথম বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। একই সঙ্গে ইরান থেকে তেল আমদানি বন্ধ এবং দেশটির প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ জব্দ করা হয়। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে ইরানি পণ্য আমদানিও নিষিদ্ধ করা হয়।

১৯৯৫ সালে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ইরানের তেল ও গ্যাস খাতে মার্কিন বিনিয়োগ এবং দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের ওপর আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। পরের বছর মার্কিন কংগ্রেস এমন আইন পাস করে, যাতে ইরানের জ্বালানি খাতে বছরে ২০ মিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগকারী বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিধান রাখা হয়।

২০০৬ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উপকরণ ও প্রযুক্তি বাণিজ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সম্পদও জব্দ করা হয়। পরবর্তী বছরগুলোয় জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইরানের ওপর আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

২০১৫ সালে ইরান যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া, চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি বা জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ) সই করে। চুক্তির আওতায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধতা আরোপের বিনিময়ে দেশটির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার কথা ছিল।

তবে ২০১৮ সালে ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রকে ওই চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করে নেন এবং ইরানের ওপর আবারও সব নিষেধাজ্ঞা ফিরিয়ে আনেন। তেহরানের বিরুদ্ধে শুরু করেন ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি।

২০১৯ সালে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে (আইআরজিসি) ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে যুক্তরাষ্ট্র। একই সময়ে ইরানের পেট্রোকেমিক্যাল, ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও তামা খাত এবং দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।

২০২০ সালে বাগদাদে ড্রোন হামলায় আইআরজিসির কুদস ফোর্সের প্রধান কাসেম সোলেইমানিকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র। এরপর ইরানের বিরুদ্ধে আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।

২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত জো বাইডেনের প্রশাসনও ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত অধিকাংশ মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখে।

গত সেপ্টেম্বরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞাও পুনর্বহাল করা হয়। এর ফলে দীর্ঘ কয়েক দশকের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপের মধ্যে নতুন করে যুক্ত হয়েছে বর্তমান সামরিক সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা।

এ পরিস্থিতিতে ইরানের সর্বশেষ হুঁশিয়ারি উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য নতুন করে বড় ধরনের কৌশলগত চাপ তৈরি করেছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কতটা অর্থনৈতিকভাবে যুক্ত হবে এবং একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক কতটা ধরে রাখবে, সেটিই এখন আঞ্চলিক উত্তেজনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

সূত্র: আল জাজিরা

ছবি: আলজাজিরা থেকে নেওয়া।
ছবি: আল জাজিরা থেকে নেওয়া।

মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে ইরানকে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের উদ্যোগে সম্প্রতি গঠিত নতুন নিরাপত্তা জোট ‘মক্কা পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’-তে যোগ দেওয়ার জন্য ইরানকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

শনিবার লেবাননভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল মায়াদিনের এক প্রতিবেদনে জ্যেষ্ঠ এক ইরানি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এ তথ্য তুলে ধরা হয়।

তবে ইরান সরকার কিংবা জোটভুক্ত তিন দেশের (সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ আমন্ত্রণের বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।

পর্যালোচনা করছে তেহরান

ইরানের পার্লামেন্টের সংবাদ সংস্থা ‘খানে মিল্লাত’-এর প্রধান মেহদি রাহিমী আল মায়াদিনকে জানান, ‘মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার জন্য ইরান একটি আমন্ত্রণপত্র পেয়েছে এবং বিষয়টি বর্তমানে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।’

তিনি আরো বলেন, মধ্যপ্রাচ্য ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের দেশগুলো এখন একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় আসার দিকে এগোচ্ছে।

এটিকে ইরানের কৌশলগত বিজয় হিসেবে বর্ণনা করে তিনি দাবি করেন, তেহরান দীর্ঘদিন ধরেই এ ধরনের একটি সমন্বিত আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর আহ্বান জানিয়ে আসছিল।

মক্কা চুক্তি কী?

গত ৭ আগস্ট সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ যৌথভাবে ঐতিহাসিক ‘মক্কা চুক্তি’ সই করেন। আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদার ও প্রতিরক্ষা খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে জোটটি গঠন করা হয়।

এই চুক্তিতে একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা নীতি নির্ধারণ করা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, জোটের তিন দেশের যেকোনো একটি দেশের ওপর আক্রমণকে সবকটি দেশের ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান এই মেকানিজমকে ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

তবে তিনি স্পষ্ট করেন, এই জোট ইরান বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে গঠিত হয়নি।

ইতোমধ্যেই সদস্য দেশগুলো তাদের মধ্যে কূটনৈতিক ও সামরিক সমন্বয় জোরদার করতে কাজ শুরু করেছে। এর আওতায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সামরিক প্রধানদের নিয়মিত বৈঠক, যৌথ সামরিক মহড়া এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের পারস্পরিক সহযোগিতা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

জোটের সম্প্রসারণ ও নতুন সমীকরণ

তুরস্কের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জোটটি ভবিষ্যতে অন্যান্য দেশের জন্য উন্মুক্ত রাখা হতে পারে। এমনকি সম্ভাব্য সদস্য হিসেবে মিশরের নাম প্রকাশ্যে আলোচনা করা হয়েছে।

ইরান এখন পর্যন্ত এই চুক্তি নিয়ে সতর্ক ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। গত ১০ আগস্ট দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, নতুন এই নিরাপত্তা জোট নিয়ে তেহরানের ‘উদ্বেগের কোনো কারণ নেই’।

তার মতে, এই পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা এখন অন্যান্য দেশগুলোও উপলব্ধি করছে।

ইরানের অন্তর্ভুক্তির খবরটি আনুষ্ঠানিকভাবে সত্য প্রমাণিত হলে মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। কারণ, পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকা তিনটি দেশের উদ্যোগে এই জোট তৈরি হলেও ইরান যুক্ত হলে এটি একটি বিস্তৃত আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোটে পরিণত হবে।

সূত্র: দ্য জেরুজালেম পোস্ট 

মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে ইরানকে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ
মক্কায় ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষরের পর সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান (মাঝে), তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোয়ান (বাঁয়ে) এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। ৭ আগস্ট ২০২৬। ছবি: রয়টার্স

হরমুজ প্রণালিতে ভাঙল মার্কিন শক্তির দম্ভ

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার মধ্য দিয়ে ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে যুদ্ধ শুরু করার পর ওয়াশিংটনের হিসাব ছিল সরল—বিপুল সামরিক শক্তির প্রয়োগে তেহরানকে দ্রুত আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যাবে। কিন্তু প্রায় ছয় মাস পর সেই হিসাব বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়েছে হরমুজ প্রণালির জলসীমায়।

একটি ডুবে যাওয়া টাগবোট, প্রায় এক ডজন নাবিকের মৃত্যু বা নিখোঁজ হওয়া এবং বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত জ্বালানি তেলের প্রায় এক-চতুর্থাংশের গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে অচলাবস্থা এখন দেখিয়ে দিচ্ছে—সামরিক আধিপত্য থাকলেই যে রাজনৈতিক বিজয় নিশ্চিত হয় না, হরমুজ সংকট তারই বড় উদাহরণ।

আত্মসমর্পণের বদলে প্রণালি বন্ধ করল ইরান

খামেনি হত্যার জবাবে ইরান আত্মসমর্পণ না করে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দেয়। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ঘোষণা করে, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল বা তাদের মিত্রদের মালিকানাধীন কোনো জাহাজ প্রণালি অতিক্রম করলে সেটিকে বৈধ লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

এরপর শুরু হয় দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো ও ড্রোন স্থাপনায় হামলা চালায়। পাল্টা ইরান বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোন হামলা এবং সমুদ্রপথে মাইন স্থাপনের মতো পদক্ষেপ নেয়। নৌ অবরোধ কখনো কঠোর হয়েছে, কখনো শিথিল হয়েছে, আবার কূটনৈতিক আলোচনা ভেঙে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা পুনরায় আরোপ করা হয়েছে।

এপ্রিলের মধ্যে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের হিসাবে, কয়েক ডজন জাহাজকে বাধা দেওয়া ও কয়েকটি জাহাজ জব্দ করা হয়। ওয়াশিংটনের হিসাব অনুযায়ী, এতে ইরানের দৈনিক প্রায় ৫০ কোটি ডলার ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু এত চাপের পরো হরমুজ প্রণালি যুক্তরাষ্ট্রের শর্তে পুনরায় খুলে যায়নি।

মার্কিন নৌবহরেও বাড়ছে চাপ

দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের প্রভাব এখন দৃশ্যমান মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোতেও। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ জাহাজের নাবিকদের কেউ কেউ ২৫০ দিনেরও বেশি সময় ধরে মোতায়েন রয়েছেন।

দীর্ঘ সময়ের এই মোতায়েনে খাদ্যসংকট, দূষিত পানি, নষ্ট পাইপলাইন এবং আবাসিক এলাকায় ছত্রাকের মতো সমস্যার কথা উঠে এসেছে। নাবিকদের পরিবারের সদস্যরা জাহাজে মানসিক চাপ ও অবসাদ বাড়ার কথাও জানিয়েছেন। এমনকি কয়েকজন নাবিক জাহাজ থেকে সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন নৌবাহিনী প্রায় ১ হাজার ৬০০ নাবিকের ঘুম ও বায়োমেট্রিক তথ্য পর্যবেক্ষণ শুরু করেছে।

এসব ঘটনা অবশ্যই প্রমাণ করে না যে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে হেরে গেছে। তবে এগুলো এমন একটি সামরিক ব্যবস্থার দৃশ্যমান চাপের প্রমাণ, যা পরিকল্পনার তুলনায় অনেক দীর্ঘ সময় ধরে সংঘাতে আটকে আছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—এই যুদ্ধের কোনো সুস্পষ্ট সমাপ্তির সময়সীমা বা প্রকাশ্য ‘এক্সিট প্ল্যান’ নেই। ফলে সামরিক সক্ষমতার আগে রাজনৈতিক ধৈর্য ক্ষয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

হরমুজ নিয়ন্ত্রণে নতুন দাবি তেহরানের

অন্যদিকে সংকটকে কাজে লাগিয়ে ইরান এমন একটি দাবি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে, যা যুদ্ধের আগে খুব কম মানুষই সম্ভব বলে মনে করতেন। তেহরান এখন কার্যত হরমুজ প্রণালির পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করছে। মে মাসে ইরান ‘পারস্য উপসাগরীয় প্রণালি কর্তৃপক্ষ’ প্রতিষ্ঠা করে এবং ঘোষণা দেয়, তাদের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ প্রণালি অতিক্রম করতে পারবে না।

তবে আন্তর্জাতিক আইনের বাস্তবতায় হরমুজ প্রণালির জলসীমা ইরান ও ওমানের মধ্যে বিভক্ত। ওমানও ইরানের এই একতরফা দাবিকে সমর্থন করেনি। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফসহ দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তারা অবশ্য স্পষ্ট করে দিয়েছেন, যুদ্ধের আগে যে ব্যবস্থায় হরমুজ পরিচালিত হতো, সেখানে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা তেহরানের নেই।

প্রণালি পুনরায় খুলতে ইরানের দাবিও কঠোর। এর মধ্যে রয়েছে—মার্কিন নৌ অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, অঞ্চল থেকে মার্কিন বাহিনীর পূর্ণ প্রত্যাহার, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং জব্দ করা ইরানি সম্পদ মুক্ত করা।

এসব দাবি এমন কোনো রাষ্ট্রের অবস্থান নয়, যে রাষ্ট্র দ্রুত পতনের মুখে রয়েছে। বরং এতে এমন একটি দেশের আত্মবিশ্বাস ফুটে উঠছে, যারা মনে করছে প্রতিপক্ষই তাদের আগে বিকল্পহীন হয়ে পড়ছে।

ওয়াশিংটনের সামনে তিনটি কঠিন পথ

যুদ্ধের প্রায় ছয় মাস পর হরমুজ সংকট ওয়াশিংটনের জন্য একটি বড় কৌশলগত ডিলেমা তৈরি করেছে। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ১১০টি জাহাজ এই প্রণালি দিয়ে চলাচল করত। অথচ এত সামরিক শক্তি প্রয়োগের পরও সেই নৌপথ পুরোপুরি স্বাভাবিক করা যায়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল সামরিক শক্তি অবকাঠামো ধ্বংসে কার্যকর হলেও একটি রাজনৈতিক সমঝোতা আদায়ে ততটা কার্যকর প্রমাণিত হয়নি।

এখন ওয়াশিংটনের সামনে মূলত তিনটি ঝুঁকি—আরো উত্তেজনা সৃষ্টি করলে উপসাগরীয় দেশগুলো সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে আরো বড় ধাক্কা আসতে পারে। অন্যদিকে কোনো সমঝোতা ছাড়াই পিছু হটলে সেটিকে পরাজয় হিসেবে দেখা হতে পারে। আর যুদ্ধ চালিয়ে গেলে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক ও রাজনৈতিক ব্যয়ের বোঝা বাড়বে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একদিকে দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি যুদ্ধে জড়ানো এড়িয়ে চলার কথা বলেছেন, অন্যদিকে তেহরানের বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক অবস্থানও নিয়েছেন। ফলে এখন এমন একটি সংঘাত তৈরি হয়েছে, যেখানে বিজয়ের সংজ্ঞা যেমন অস্পষ্ট, তেমনি বেরিয়ে আসার পথও অনিশ্চিত।

সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি মানচিত্র প্রকাশ করে হরমুজ প্রণালিকে নিজের দের এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু এমন বক্তব্য সামরিক বা কূটনৈতিক প্রভাবের চেয়ে ওয়াশিংটনের হতাশাই বেশি প্রকাশ করছে—এমন ব্যাখ্যাই জোরালো হচ্ছে।

বদলে যাচ্ছে উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা কৌশল

হরমুজ সংকট উপসাগরীয় দেশগুলোর দীর্ঘদিনের ‘হেজিং’ বা ভারসাম্য রক্ষার কৌশলকে আরো ত্বরান্বিত করেছে। নিরাপত্তার ক্ষেত্রে তারা এখনো ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রই সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে। তবে একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলো বিকল্প সম্পর্কও গড়ে তুলছে।

চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার, দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং সৌদি আরবের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের সঙ্গে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি এই পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

এই চুক্তি ভবিষ্যতে উপসাগরীয় নিরাপত্তার একটি বাস্তব দ্বিতীয় স্তম্ভে পরিণত হবে, নাকি কেবল কৌশলগত ‘হেজ’ হিসেবে থাকবে—তা আগামী দিনের আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

নতুন সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে পাকিস্তান

এই পরিবর্তিত সমীকরণে পাকিস্তানের অবস্থান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান এমন জায়গায়, যেখানে উপসাগর, ইরান, চীন ও মধ্য এশিয়ার স্বার্থ পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হয়েছে।

ইসলামাবাদ একদিকে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনা আয়োজন করেছে, অন্যদিকে রিয়াদের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে। একই সময়ে বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি ইরানের সঙ্গেও সম্পর্ক ধরে রেখেছে পাকিস্তান।

আফগানিস্তানের সঙ্গেও সম্পর্ক স্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে ইসলামাবাদ। মধ্য এশিয়ার সঙ্গে স্থলপথে যোগাযোগ সম্প্রসারণের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার জন্য এটিও গুরুত্বপূর্ণ।

সবকিছু মিলিয়ে পাকিস্তানের কৌশলটি কোনো একটি শক্তির সঙ্গে পুরোপুরি জোটবদ্ধ হওয়ার বদলে একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির সঙ্গে একই সময়ে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা। তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এই ভারসাম্য কতটা টেকসই হবে এবং তা পাকিস্তানের জন্য দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সুবিধা বয়ে আনবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।

মুসলিম বিশ্বে পাকিস্তানের বাড়তি গুরুত্ব

মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি অঞ্চল যখন নিজেদের নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবছে, তখন পাকিস্তানের এই ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানের গুরুত্ব তার নিজস্ব সীমারেখা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তানের উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রয়েছে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগ কার্যকর এবং একই সঙ্গে বেইজিং ও তেহরানের সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রয়েছে। ফলে এমন একটি অঞ্চলে, যেখানে একাধিক শক্তির মধ্যে অবিশ্বাস বাড়ছে, পাকিস্তান বিরল একটি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

ইসলামাবাদ এই অবস্থান ব্যবহার করে হরমুজ সংকটের একটি বাস্তবসম্মত রাজনৈতিক সমাধানের পথ তৈরি করবে, নাকি দ্বিপক্ষীয় সুবিধা আদায়েই বেশি মনোযোগ দেবে—তা পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হবে।

সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতার বড় শিক্ষা

হরমুজ প্রণালির সংকট ছয় মাসে একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে—যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি হারিয়ে যায়নি, কিন্তু সামরিক শক্তি একা রাজনৈতিক সমাধান নিশ্চিত করতে পারে না।

যে নৌপথ যুদ্ধের আগে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচলের কেন্দ্র ছিল, তা এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। মার্কিন নৌবহরে দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েনের চাপ দৃশ্যমান, ইরান তার দাবি আরও জোরালো করছে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোও ওয়াশিংটনের ওপর একক নির্ভরতা কমানোর পথ খুঁজছে।

অর্থাৎ হরমুজ সংকটের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো ইরান বা যুক্তরাষ্ট্রের তাৎক্ষণিক জয়-পরাজয় নয়। বরং এটি দেখিয়ে দিয়েছে, রাজনৈতিক সমাপ্তির পথ ছাড়া সামরিক শক্তি একটি যুদ্ধকে শেষ করার বদলে দীর্ঘায়িত করতে পারে।

আর সেই বাস্তবতার মধ্যেই বদলে যাচ্ছে উপসাগরীয় নিরাপত্তার পুরোনো কাঠামো—যেখানে ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তই একসময় ছিল প্রধান নির্ধারক। এখন সেই একক নিয়ন্ত্রণের জায়গায় ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে বহু-মেরুকেন্দ্রিক এক নতুন আঞ্চলিক সমীকরণ।

সূত্র: মিডলইস্ট মনিটর

হরমুজ প্রণালিতে ভাঙল মার্কিন শক্তির দম্ভ
হরমুজে জাহাজ চলাচল নিয়ে ইরানের হুঁশিয়ারি:- নির্ধারিত নিয়ম লঙ্ঘন করলে জরিমানা, জাহাজ আটক বা বাজেয়াপ্তের মতো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। দেশটির পারস্য উপসাগরীয় প্রণালি কর্তৃপক্ষ (পিজিএসএ ইরান) জানিয়েছে, কয়েকটি জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের ক্ষেত্রে তেহরানের নির্ধারিত ব্যবস্থা লঙ্ঘন করেছে। এ কারণে ভবিষ্যতে এসব জাহাজের চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে। এক্সে দেওয়া এক পোস্টে কর্তৃপক্ষ জানায়, নিয়ম লঙ্ঘনকারী জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে ভবিষ্যৎ চলাচলের ক্ষেত্রে জরিমানা, জাহাজ আটক কিংবা বাজেয়াপ্তের মতো ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। এছাড়া, নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত জাহাজগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা করা অন্য জাহাজকেও নিয়ম লঙ্ঘনকারী হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হতে পারে বলে সতর্ক করেছে কর্তৃপক্ষ। কোনো জাহাজ বা কার্গো মালিককে ওই তালিকা থেকে বাদ দিতে হলে প্রয়োজনীয় সহায়ক নথিপত্রসহ আবেদন করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। শিপিং কোম্পানি ও কার্গো মালিকদের সম্ভাব্য জরিমানা বা অন্যান্য বিধিনিষেধ এড়াতে জাহাজ ব্যবহারের আগে কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত ‘নন-কমপ্লায়েন্ট ভেসেলস লিস্ট’ বা নিয়ম না মানা জাহাজের তালিকা যাচাই করার আহ্বান জানিয়েছে ইরান। সূত্র: জিও নিউজ

হিজাব ছাড়াই রাস্তায় ইরানের তরুণীরা, কট্টরপন্থীদের চাপে সরকার

ইরানে যুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে নারীদের হিজাব পরা বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি আবারও বড় বিতর্কে পরিণত হয়েছে। দেশটির কট্টরপন্থী ধর্মীয় নেতা ও রাজনীতিকরা হিজাব আইন কঠোরভাবে কার্যকর করার দাবি তুললেও বহু নারী প্রকাশ্যে নিয়ম অমান্য করছেন।

সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আপাতত বড় ধরনের দমন অভিযান চালাতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে কর্তৃপক্ষ।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতের তীব্র সময়ে সরকারি সমাবেশ ও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমেও হিজাব ছাড়া বহু নারীকে দেখা গেছে। তখন সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে যুদ্ধ ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি ছিল বড় অগ্রাধিকার।

তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হিজাববিহীন নারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জোরালো হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে হিজাব আইন না মানার অভিযোগে ক্যাফে, রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়ার খবরও গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করা হচ্ছে।
মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএ’র তথ্য অনুযায়ী, গত ১৯ জুলাই তেহরানে বাধ্যতামূলক হিজাব আইন প্রয়োগ না করার অভিযোগে অন্তত ৭টি ক্যাফে ও রেস্তোরাঁ বন্ধ করে দেয়া হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোশাকবিধি অমান্য করার অভিযোগে বেশ কিছু অ্যাকাউন্টও ব্লক করা হয়েছে।

তেহরানের প্রসিকিউটর অফিসও জানিয়েছে, কিছু ক্যাফে-রেস্তোরাঁয় ‘অশালীনতা’ এবং অনুমোদিত পোশাকবিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। অপ্রচলিত বা অনুপযুক্ত পোশাক বিক্রির অভিযোগে কিছু দোকানের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছে।
পূর্ব ইরানের দক্ষিণ খোরাসান প্রদেশে ‘সামাজিক রীতি ও বাধ্যতামূলক হিজাব আইন’ লঙ্ঘনের অভিযোগে ১০টি ক্যাফে বন্ধ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে মেহর নিউজ এজেন্সি।
চার বছর আগে তরুণী মাহসা আমিনির পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর পর ইরানে ‘ওম্যান, লাইফ, ফ্রিডম’ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। অনুপযুক্ত পোশাক পরার অভিযোগে তাকে আটক করা হয়েছিল। পরে আন্দোলনটি কঠোরভাবে দমন করা হয়।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ২০২৪ সালের শেষ দিকে জানিয়েছিল, বাধ্যতামূলক হিজাব আইন অমান্যকারী নারী ও কিশোরীদের বিরুদ্ধে ইরানি কর্তৃপক্ষ ক্রমবর্ধমান সহিংস দমন অভিযান চালাচ্ছে।

তবে সেই আন্দোলনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়েছে দেশটির সমাজে। সতর্কবার্তা ও বিচ্ছিন্নভাবে আইন প্রয়োগের পরও বিশেষ করে তরুণীদের মধ্যে হিজাব আইন অমান্য করার প্রবণতা ব্যাপকভাবে দেখা যাচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে হেলমেট পরা কিন্তু হিজাব ছাড়া তরুণীদের মোটরবাইক চালানোর ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও দলবদ্ধভাবে নারীদের মোটরবাইক চালাতেও দেখা যাচ্ছে।
এক পোস্টে শিরাজের একদল নারী নিজেদের ‘শিরাজের মোটরবাইক গার্লস’ বলে পরিচয় দিয়েছে। ইসফাহানে প্রায় ২০ জন নারী মোটরসাইকেল চালানোর একটি ভিডিওকে ‘ইসফাহানে সবচেয়ে বড় নারী মোটরসাইকেল আয়োজন’ হিসেবে প্রচার করা হয়েছে।
যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে হিজাবকে অগ্রাধিকার দেয়ার বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও। এক রক্ষণশীল আলেমের মন্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি প্রশ্ন করেন, আইন করে কি সত্যিই মানুষের আচরণ পরিবর্তন করা যায়?
তিনি আরও বলেন, তার মেয়ের সঙ্গে অনেক বিষয়ে তার মতপার্থক্য রয়েছে। তাহলে কি তাকে জোর করে নিজের মত মানাতে হবে- এমন প্রশ্নও তোলেন তিনি।

দেশটির সাবেক সংসদ সদস্য গোলামালি জাফরজাদেহ ইমানাবাদিও কর্মকর্তাদের হিজাবের পরিবর্তে মূল্যস্ফীতি ও মানুষের জীবনযাত্রার সমস্যার দিকে বেশি মনোযোগ দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে দেশটির কট্টরপন্থীরা হিজাব আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের জন্য সরকারের ওপর চাপ বাড়াচ্ছেন। কেহান পত্রিকার সম্পাদক হোসেইন শরিয়তমাদারি বলেছেন, হিজাব আইন কার্যকর করা কর্মকর্তাদের জন্য একই সঙ্গে আইনি ও ধর্মীয় দায়িত্ব।

তেহরান পৌরসভার তৈরি ‘পার্ক ওয়েস্ট’ নামের একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানেও নারীদের পোশাক নিয়ে কয়েকটি পর্ব প্রচার করা হয়েছে এবং অনুমোদিত পোশাকবিধি অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরানে নারীদের হিজাব পরার ওপর জোর দেয়া শুরু হয়। এর আগে রাজতন্ত্রের সময়ে নারীদের তুলনামূলকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ ও পশ্চিমা ধাঁচের জীবনযাপনের চিত্র তুলে ধরা হতো।
বর্তমানে দেশটির সরকার হিজাব আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের দাবি এবং তরুণীদের ব্যাপক অনীহার মধ্যে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।

হিজাব ছাড়াই রাস্তায় ইরানের তরুণীরা, কট্টরপন্থীদের চাপে সরকার

‘অনেক সমস্যায়’ ইরান, স্বীকার করলেন পেজেশকিয়ান

যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলতে একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আরোপের উদ্যোগ নেয়ার মধ্যে দেশটির জনগণ বর্তমানে ‘অনেক সমস্যার’ মুখোমুখি বলে স্বীকার করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।

রোববার (২৩ আগস্ট) রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক ভাষণে পেজেশকিয়ান বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে ‘পূর্ণমাত্রার অর্থনৈতিক, সামরিক ও নিরাপত্তা যুদ্ধে’ ঠেলে দিয়েছেন।
তিনি বলেন, আমি বুঝতে পারছি, বর্তমানে আমাদের সমাজে অনেক সমস্যা রয়েছে। আমরা যতটা সম্ভব এসব সমস্যা প্রতিরোধের চেষ্টা করছি।

এদিন পেজেশকিয়ান আরও বলেন, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, বেকারত্বসহ বিভিন্ন সমস্যা কাটিয়ে উঠতে সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা করছে, যাতে ইরানের মানুষ মর্যাদা ও আত্মমর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে ইরানে একাধিক বড় বিক্ষোভ হয়েছে। মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রার বিনিময়মূল্যের ওঠানামার কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়াও এসব বিক্ষোভের অন্যতম কারণ। গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রতিবাদে শুরু হওয়া আন্দোলন পরে তেহরানে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভে রূপ নেয়।
ইরানি কর্তৃপক্ষ সেই সময় জানায়, ওই অস্থিরতায় ৩ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে সহিংসতা উসকে দেয়ার জন্য দায়ী করে। তবে বিদেশভিত্তিক বিভিন্ন এনজিওর দাবি, ইরানি কর্তৃপক্ষের দমন-পীড়নে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছে।

এদিকে গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেজেশকিয়ানের এই বক্তব্যের একদিন পরই মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ঘোষণা করতে পারেন।
তিনি সম্ভাব্য নতুন নিষেধাজ্ঞাকে ইরানের বিরুদ্ধে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
অন্যদিকে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের কট্টরপন্থী নেতা মোহসেন রেজাই দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের কোনো দেশ যুক্তরাষ্ট্রের ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধে’ যোগ দিলে তাদের শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় প্রতিবেশী দেশগুলো সহযোগিতা করলে হরমুজ প্রণালির বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত উপসাগরের তেল পরিবহন রুটগুলোতে হামলা চালানো হতে পারে। এসব দেশের ‘স্বার্থে আঘাত’ করা হবে বলেও হুমকি দেন তিনি।

‘অনেক সমস্যায়’ ইরান, স্বীকার করলেন পেজেশকিয়ান

ট্রাম্পের ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধে’ যোগ দিলে প্রতিবেশীদের শত্রু গণ্য করবে ইরান, ইউরোপের মার্কিন মিত্রদের ওপর হামলার ভাবনা

যুক্তরাষ্ট্রের ইরানবিরোধী অর্থনৈতিক অবরোধে যোগ দিলে প্রতিবেশী দেশগুলোকে শত্রু হিসেবে গণ্য করে তাদের স্বার্থে আঘাত হানার হুমকি দিয়েছে তেহরান। তারা বলেছে, ইরানের অর্থনীতি পঙ্গু করার মার্কিন চেষ্টায় কোনো আঞ্চলিক দেশ অংশ নিলে তাদের পরিণতি ভোগ করতে হবে।

ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি মোহসেন রেজাই গতকাল শনিবার দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ হুঁশিয়ারি দেন।

আইআরআইবিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রেজাই বলেন, ‘আমরা সব প্রতিবেশী দেশকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক যুদ্ধে যোগ না দেওয়ার জন্য বলছি। অন্যথায়, আমরা তাদের শত্রু হিসেবে বিবেচনা করব।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইরানবিরোধী অর্থনৈতিক হুমকি ক্রমাগত বাড়তে থাকার মুখে রেজাই এ মন্তব্য করলেন।

দুই দেশের মধ্যে চলমান শত্রুতার অংশ হিসেবে গত বুধবার ট্রাম্প ঘোষণা করেন, তাঁর সরকার ইরানের বিরুদ্ধে এযাবৎকালের ‘সবচেয়ে বিধ্বংসী অর্থনৈতিক অভিযান’ শুরু করতে যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। ওই দিন এ দুই মিত্রদেশ যৌথভাবে তেহরানের বিরুদ্ধে প্রথম দফায় হামলা চালায়।

চলতি সপ্তাহে ইরানের অর্থনীতিকে বিপদে ফেলার হুমকির পাশাপাশি ট্রাম্প এক নতুন হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। ইরানকে যেকোনো ধরনের ‘লাইফলাইন’ বা সহায়তা দেওয়া দেশগুলোকে ‘ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিণতি’র শিকার হওয়ার হুমকি দেন তিনি।

এর পরের দিনই ট্রাম্পের সঙ্গে সুর মেলান মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। অন্য দেশগুলোর উদ্দেশ্যে তাঁর স্পষ্ট বার্তা ছিল, ‘আপনারা হয় আমাদের সঙ্গে আছেন, না হয় আমাদের বিরুদ্ধে।’

গতকাল দেওয়া সাক্ষাৎকারে মোহসেন রেজাই ইরানের আঞ্চলিক কৌশলকে তিন পর্যায়ের একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করেন। এ কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে উত্তেজনা কমানো।

রেজাই বলেন, ‘প্রথমত আমরা আলোচনা করব। তারপর সুন্দর ভাষায় তাদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করব। কারণ, আমরা আসলে যুদ্ধ ছড়াতে চাই না। এরপরও যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ নেওয়া বজায় রাখবে, তাদের পুনর্বিবেচনার জন্য কিছুটা সময় দেব। তবে তৃতীয় পর্যায়ে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।’

যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে তাদের সামরিক অভিযান বন্ধ না করলেও রেজাই মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসন প্রকৃতপক্ষে ইরানের সমাজব্যবস্থাকে অর্থনৈতিক চাপের মুখে ভেঙে ফেলার বাজি ধরেছে। এর উদ্দেশ্য, (ইরানিদের) বিক্ষোভের মুখে যুদ্ধাবস্থার অবসান ঘটানো।

একটি বিশেষ যুদ্ধবিমানের প্রসঙ্গ টেনে রেজাই বলেন, ‘তারা আশা করছে যে অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে আমাদের ঐক্য ভেঙে দেওয়া সম্ভব হলে একদল বিক্ষোভকারী রাস্তায় নামবে। এতে তারা প্রকারান্তরে যুক্তরাষ্ট্রের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের কাজটাই সহজ করে দেবে।’

গত ১৭ জুনের একটি সমঝোতা স্মারক ব্যর্থ হওয়ার পর সাম্প্রতিক মাসগুলোয় যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা স্থবির হয়ে পড়েছে। ওই সমঝোতায় ‘অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান বন্ধের’ আহ্বান জানানো হয়েছিল।

বিশ্বের অন্যতম প্রধান নৌপথ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের শুরুর দিকে ইরান দ্রুত এ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়। ফলে বিশ্ববাজারে তেল, সারের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের যেসব দেশ আগে রপ্তানির জন্য এ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল ছিল, তারা বিকল্প বাণিজ্য পথ খুঁজতে শুরু করে।

কিন্তু রেজাই সতর্ক করে দিয়েছেন, আঞ্চলিক দেশগুলো যদি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক যুদ্ধের পরিকল্পনায় অংশ নেয়, তবে পারস্য উপসাগরের বাইরের বিকল্প তেল পরিবহন পথগুলোও লক্ষ্যবস্তু করবে ইরান।

এদিকে মার্কিন এ নতুন পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। জাতিসংঘভুক্ত সদস্যদেশগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের এ নীতিকে ‘বাহ্যিক সার্বভৌমত্ব’ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা বলে গতকাল মন্তব্য করেছে তারা।

তেহরান এখন মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও তাদের লক্ষ্যবস্তুর তালিকা বাড়ানোর কথা ভাবছে বলে জানা গেছে। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পের অভিযানকে সমর্থন দেওয়া ইউরোপের মার্কিন মিত্রদের ওপরও আঘাত হানতে পারে ইরান।

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের সাবেক প্রধান মোহসেন রেজাই সম্প্রতি দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পর্ষদের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের সাবেক প্রধান মোহসেন রেজাই সম্প্রতি দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পর্ষদের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

Sunday, August 23, 2026

ইরানের অবরোধ রুখতে যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের নতুন কৌশল

সংকেত নিভিয়ে তেলের গোপন চালানঃ ইরানের ড্রোন হামলা ও দীর্ঘমেয়াদি নৌ অবরোধ মোকাবিলা করে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখতে নতুন এক কৌশল গ্রহণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলো। মার্কিন নৌবাহিনীর পাহারায় মধ্যপ্রাচ্যের তেলবাহী সুপারট্যাংকারগুলো স্বয়ংক্রিয় ট্র্যাকিং সংকেত (এআইএস ট্রান্সপন্ডার) বন্ধ করে রাতে হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিচ্ছে। এই গোপন অভিযানের মাধ্যমে ইরানের দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনাকে একপ্রকার ব্যর্থ করে দেয়া সম্ভব হচ্ছে। এ খবর জানিয়েছে সিএনএন।

মাঝসমুদ্রে তেল স্থানান্তর: পারস্য উপসাগরীয় তেলবাহী জাহাজগুলো হরমুজ প্রণাণিতে পৌঁছানোর আগেই নিজেদের ট্রান্সপন্ডার বা ট্র্যাকিং সংকেত বন্ধ করে দিয়ে রাডার নজরদারি এড়ানোর চেষ্টা করছে। ওমান উপসাগরে নিরাপদ দূরত্বে পৌঁছানোর পর তারা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের জন্য অপেক্ষমাণ বড় জাহাজে সরাসরি তেল স্থানান্তর করে (শিপ-টু-শিপ ট্রান্সফার)। এরপর খালি ট্যাংকারগুলো পুনরায় সংকেত বন্ধ করে নিজেদের বন্দরে ফিরে আসে। সম্প্রতি গ্রিসের মালিকানাধীন সুপারট্যাংকার ‘কিকু’ এই কৌশলে সফলভাবে তেল পরিবহন সম্পন্ন করেছে। মার্কিন জ্বালানি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, এই কৌশলের ফলে বর্তমানে হরমুজ প্রণালি দিয়ে দৈনিক ৮০ থেকে ৯০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবাহিত হচ্ছে, যা স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং পূর্বাভাসের দ্বিগুণেরও বেশি।

বিকল্প রুট ও বিশ্ববাজারে উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগ:
ইরানের সংঘাতময় জলসীমা এড়াতে সৌদি আরব দৈনিক প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল পারস্য উপসাগরের বদলে নিজস্ব ‘ইস্ট-ওয়েস্ট’ পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে পাঠিয়ে দিচ্ছে। এছাড়া ব্রাজিল, গায়ানা ও ভেনিজুয়েলা দৈনিক অতিরিক্ত ১০ লাখ ব্যারেল তেল বাজারে সরবরাহ করছে। অন্যদিকে সংকট সামাল দিতে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের জরুরি মজুদ (এসপিআর) থেকে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছেড়েছে এবং চীন তাদের নিজস্ব তেলের মজুদ ব্যবহার করে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাচ্ছে।

দীর্ঘমেয়াদি সংকট
তবে এই ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয় বলে সতর্ক করেছেন অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। টানা ছয় মাস ধরে চলা এই যুদ্ধে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৯০ কোটি ব্যারেল তেলের জরুরি মজুদ শেষ হয়ে গেছে। এছাড়া সংঘাত ও হামলার কারণে মধ্যপ্রাচ্য, রাশিয়া ও ইউরোপের প্রধান তেল শোধনাগারগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বাজারে ডিজেল ও জেট ফুয়েলের তীব্র ঘাটতি দেখা দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের নতুন অর্থনৈতিক অবরোধের ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে, যা বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির বড় চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে এইসকল ব্যবস্থা কতদিন সফলভাবে চলবে তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

ইরানের অবরোধ রুখতে যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের নতুন কৌশল

Saturday, August 22, 2026

ইরানের বড় বাণিজ্য অংশীদার কারা?

অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় বিচ্ছিন্ন করার হুমকি ট্রাম্পেরঃ ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রাখা দেশগুলোর বিরুদ্ধে নজিরবিহীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানকে সহায়তা করা যে কোনো দেশের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অর্থনৈতিক পরিণতি ভোগ করতে হবে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্পের এমন হুমকিতে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার দেশগুলোও যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে পড়তে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকা কয়েকটি দেশ হলো :

চীন

ইরানের সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতা চীন। গত বছর ইরান থেকে গড়ে প্রতিদিন ১৩ লাখ ৮০ হাজার ব্যারেল তেল কিনেছে চীন বলে জানিয়েছে জ্বালানি বাজারবিষয়ক প্রতিষ্ঠান কেপলার। ইরানের রপ্তানি হওয়া তেলের ৮০ শতাংশের বেশি চীনে যায়।

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে চীনের কিছু স্বাধীন শোধনাগার দীর্ঘদিন ধরে ইরানের তেল কিনে আসছে। এসব লেনদেনে চীনা মুদ্রা ব্যবহার ও বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ করা হয়।

এপ্রিল মাসে ইরানের তেল কেনার অভিযোগে একটি চীনা স্বাধীন শোধনাগারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের তেল বাণিজ্যে সহায়তা করা চীনা ব্যাংকগুলোকেও ভবিষ্যতে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ওয়াশিংটন।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বলেন, নিষেধাজ্ঞা ও চাপ সমস্যার সমাধান করবে না। রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উপায়ে সংকট সমাধানে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সংযুক্ত আরব আমিরাত

ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার সংযুক্ত আরব আমিরাত। ২০২৪ সালে ইরানের মোট আমদানির প্রায় ৩০ শতাংশ, যার মূল্য প্রায় ২১ বিলিয়ন ডলার, এসেছে আমিরাত থেকে। একই বছরে ইরানের রপ্তানির ১৩ শতাংশের গন্তব্যও ছিল দেশটি।

২০২৪ সালে দুই দেশের তেলবহির্ভূত বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। এর বড় অংশই ছিল পুনঃরপ্তানি।

তবে ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের মধ্যে তেহরানের সঙ্গে সব ধরনের আর্থিক ও অর্থনৈতিক লেনদেন সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে আমিরাত।

তুরস্ক

ইরান ও তুরস্কের মধ্যে দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। তুরস্ক ইরান থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করে এবং ইরানে বিভিন্ন শিল্পপণ্য রপ্তানি করে।

দুই দেশের বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৫ থেকে ৬ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে তুরস্কের রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার। তুরস্কের মোট গ্যাস আমদানির প্রায় ১৩ শতাংশ আসে ইরান থেকে।

ইরাক

ইরাকও ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার। ২০২৫ সালে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ছিল।

ইরান থেকে খাদ্যপণ্য, ভোগ্যপণ্যসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি করে ইরাক। তবে ২০২৬ সালে সংঘাত শুরু হওয়ার পর সীমান্তে নিরাপত্তা ঝুঁকি, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্নের কারণে দুই দেশের বাণিজ্য কমেছে।

ওমান

ইরানের সঙ্গে ওমানের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। বিভিন্ন সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকাও পালন করেছে মাসকাট।

২০২৫ সালে দুই দেশের পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৪৫ মিলিয়ন ডলারে।

পাকিস্তান

ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়িয়ে ১০ বিলিয়ন ডলারে নেওয়ার লক্ষ্যে কাজ করছে পাকিস্তান। তবে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ব্যবস্থা নিলে ইসলামাবাদ চাপের মুখে পড়তে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

আগের মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সময় দুই দেশের আনুষ্ঠানিক বাণিজ্য প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবে অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আদান-প্রদান হয় বলে বিভিন্ন পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইরান ও পাকিস্তানের মধ্যে তেল, গম, চাল, গবাদিপশু ও ওষুধের বাণিজ্য রয়েছে।

ভারত

মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ২০২০ সাল থেকে ভারত-ইরান বাণিজ্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দুই দেশের বাণিজ্য যেখানে প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলার ছিল, ২০১৯-২০ অর্থবছরে তা কমে প্রায় ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ আরও কমে ১ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। এর বড় অংশই ভারতের রপ্তানি, যার মধ্যে রয়েছে শস্য, চা, কফি ও মসলা।

ভারতীয় কর্মকর্তারা অতীতে এসব পণ্য রপ্তানিকে মানবিক প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করে নিষেধাজ্ঞার আওতামুক্ত রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

আর্মেনিয়া

২০২৫ সালে আর্মেনিয়ার মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের ৩ দশমিক ৬ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৭৬৮ মিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ইরানের সঙ্গে হয়েছে।

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দুই দেশের বাণিজ্য ৩৭১ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি।

ইরান-আর্মেনিয়ার মধ্যে ‘গ্যাসের বিনিময়ে বিদ্যুৎ’ চুক্তিও রয়েছে। ইরান আর্মেনিয়ায় গ্যাস সরবরাহ করে এবং এর বিনিময়ে আর্মেনিয়া বিদ্যুৎ সরবরাহ করে।

আজারবাইজান

চলতি বছরের জানুয়ারি-জুন সময়ে ইরান ও আজারবাইজানের বাণিজ্য ৪ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ৩১২ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ২৯৯ দশমিক ১ মিলিয়ন ডলার।

এ সময়ে ইরান থেকে আজারবাইজানের আমদানি ১ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ২৯৭ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে আজারবাইজানের ইরানে রপ্তানি বেড়েছে প্রায় আড়াই গুণ।

ইরানের সঙ্গে এসব দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের কারণে ট্রাম্প প্রশাসন নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে শুধু তেহরান নয়, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ব্যাংক, তেল ব্যবসা ও সরবরাহ ব্যবস্থাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

সূত্র: রয়টার্স 

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ। ওমানের মুসান্দাম থেকে ড্রোনের সাহায্যে ছবিটি তুলেছে রয়টার্স
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ। ওমানের মুসান্দাম থেকে ড্রোনের সাহায্যে ছবিটি তুলেছে রয়টার্স

ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসঃ বহু বছর ধরে নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত ইরানের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভরসার জায়গা ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা থাকলেও অর্থনৈতিক সম্পর্ক টিকে ছিল। তবে মঙ্গলবার ইউএই ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য ও সব ধরনের লেনদেনে পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দেওয়ায় সেই সম্পর্ক বড় ধরনের সংকটে পড়েছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে ইরান শুধু তাদের পণ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার হারাবে না, বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম প্রধান পথও হারাবে।

ইউএইর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আফরা আল হামেলি বলেছেন, ‘আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে’ এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ইরানের সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং সেই সম্পর্কের ওপর তৈরি হওয়া চাপকে এই সিদ্ধান্ত সামনে এনেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। এরপর ইরান হরমুজ প্রণালি অবরোধ করে। এতে উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমেছে। এসব দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি জ্বালানি রপ্তানিও বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

ইরানের অর্থনীতির ‘ফুসফুস’

ইরান থেকে পারস্য উপসাগরের ওপারে মাত্র প্রায় ৫০ মাইল দূরে ইউএই। দেশ দুটির মধ্যে শত শত বছর ধরে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। বর্তমানে ইউএইতে কয়েক লাখ ইরানি বসবাস করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার ইউএই।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইরানের আমদানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এসেছে ইউএই থেকে। ইলেকট্রনিক পণ্য, মূল্যবান ধাতু ও ভোগ্যপণ্যসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পণ্য ইউএইর মাধ্যমে ইরানে গেছে।

ইরানের পণ্যের অন্যতম বড় রপ্তানি গন্তব্যও ইউএই। বিশেষ করে খাদ্য ও মসলার মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সেখানে রপ্তানি করে ইরান।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা এই বাণিজ্যিক সম্পর্ক ইউএইকে, বিশেষ করে দেশটির সবচেয়ে বড় শহর দুবাইকে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। দুবাই ইরানি পণ্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পুনঃরপ্তানির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ অ্যান্ড্রু লেবার বলেন, ‘ইউএইকে ইরানের ফুসফুস বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে ইরানের অর্থনীতি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রবেশের সুযোগ পায়।’

অবশ্য ইরানের সঙ্গে ইউএইর এই সম্পর্ক নিয়ে অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা অভিযোগ ও চাপ দিয়েছেন। ইউএইর কর্মকর্তারা বলেন, তারা নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের ঘটনা শনাক্ত হলে ব্যবস্থা নেন। ইরানকে নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইউএই সহায়তা করে—এমন অভিযোগও তারা অস্বীকার করেছেন।

নিষেধাজ্ঞায় কতটা ক্ষতি হবে ইরানের

রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত নানা বিষয়ে ইরান ও ইউএইর মধ্যে মতবিরোধ থাকলেও পারস্পরিক স্বার্থে দুই দেশ বছরের পর বছর বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে।

অ্যান্ড্রু লেবারের মতে, ইউএইর নিষেধাজ্ঞা দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘বড় ধরনের বিচ্ছেদ’ তৈরি করবে। তবে ইরানের অর্থনীতিতে এর প্রভাব কতটা হবে, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

আরব গালফ স্টেটস ইনস্টিটিউটের উপসাগরীয় অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ রবার্ট মোগিয়েলনিকি বলেন, ইউএইর এই পদক্ষেপ ইরানের অর্থনীতির জন্য এমন বড় আঘাত হবে না, যা পুরো অর্থনীতিকে ভেঙে দেবে।

তার মতে, ইরান তার অর্থনীতিকে বহিরাগত ধাক্কা মোকাবিলার উপযোগী করে গড়ে তুলেছে। দেশটি ‘স্বনির্ভরতা’কে অগ্রাধিকার দেয়। তাই ইরানের অর্থনীতি ইউএইর ওপর অতটা নির্ভরশীল নয়।

তবে ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিজের মিয়াদ মালেকি ভিন্নমত পোষণ করেছেন। তার মতে, এই যুদ্ধে ইরানের বিরুদ্ধে ইউএইর নিষেধাজ্ঞা হবে ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক পদক্ষেপ’। এমনকি এটি যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা নিষেধাজ্ঞার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

তিনি বলেন, এ অঞ্চলে অন্যান্য নৌ অবরোধের সঙ্গে ইউএইর বাণিজ্য বন্ধের সিদ্ধান্ত যুক্ত হওয়ায় ইরানের ওপর এর প্রভাব আরো বেশি হতে পারে।

তবে ইউএই সরকার কতটা দ্রুত এবং কঠোরভাবে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্থগিত করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

ইরানি হামলার পর ইউএইর অবস্থান

ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপর হামলা চালানোর সময় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়া দেশগুলোর একটি ইউএই। দেশটি হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করেছে।

ইউএই সরকার বাণিজ্য বন্ধের সিদ্ধান্ত ঠিক কখন নেওয়া হয়েছে বা এর পেছনে নির্দিষ্ট কী কারণ রয়েছে, তা জানায়নি।

তবে গত সপ্তাহে ইউএই অভিযোগ করে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী তাদের একটি তেলবাহী জাহাজে ইরান হামলা চালিয়েছে। এরপর ইউএইর ভূখণ্ডের দিকে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে বলেও অভিযোগ করে দেশটি। ইরান অবশ্য এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

ইরানের হামলার মুখে ইউএই ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের জোট আরো জোরদার করেছে।

এই নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ভূমিকা ছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়। তবে ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউএইর নেতা শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন।

অন্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক

অ্যান্ড্রু লেবার বলেন, উপসাগরের আরব অংশের বিভিন্ন বাণিজ্যিক গোষ্ঠীর সঙ্গে ইরানের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। ওমান এর একটি উদাহরণ। গত কয়েক দশকে ইরান ও ওমানের মধ্যে বাণিজ্য বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার সময়ও দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় ছিল।

তবে ইউএইর তুলনায় অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের সঙ্গে ইরানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক অনেক কম। রবার্ট মোগিয়েলনিকির মতে, এসব দেশের সঙ্গে ইরানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক মূলত ‘সীমিত ও গুরুত্বহীন’।

তবু যুদ্ধ ও ইরানের আঞ্চলিক হামলার প্রভাব উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতিতে পড়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, ইউএই ও ওমানের অর্থনীতিতে সংকোচনের পূর্বাভাস দিয়েছে।

আইএমএফের হিসাবে, আগামী পাঁচ বছরে উপসাগরীয় অঞ্চলের মোট উৎপাদন ৭ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।

ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো
ছবি: রয়টার্স

ইরান শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে, এবার যুদ্ধ শেষ করার সময়: পেজেশকিয়ান

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে মাসব্যাপী চলা যুদ্ধের অবসান ঘটানোর সময় এসেছে, কারণ ওয়াশিংটনের তুলনায় তেহরান এখন শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।

শুক্রবার চিকিৎসকদের সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি এ মন্তব্য করেন।

ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের শুরু করা এই যুদ্ধের উভয় পক্ষই অচলাবস্থায় আটকে আছে। বর্তমানে দেশ দুটির মধ্যকার আলোচনাও স্থগিত রয়েছে।

তেহরান গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি আংশিকভাবে বন্ধ রেখেছে এবং ওয়াশিংটন ইরানের ওপর পাল্টা নৌ অবরোধ অব্যাহত রেখেছে।

পেজেশকিয়ান বলেন, ‘এখনই যুদ্ধের অবসান ঘটানো ভালো, কারণ আমরা শক্তি ও মর্যাদার অবস্থানে আছি।’

তিনি বলেন, ‘সারা বিশ্ব আমাদের বিজয়কে স্বীকার করে এবং আমেরিকা সমস্ত নিয়মকানুন লঙ্ঘন করে আমাদের স্কুল, হাসপাতাল এবং অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে এবং সারা বিশ্বে ঘৃণিত।’

ওয়াশিংটন তেহরানের ওপর চাপ বাড়াতে নিষেধাজ্ঞা বাড়ানোর কথা বলার পর ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ এবং ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’-এর অভিযোগ তোলে। এরপরই পেজেশকিয়ানের এই মন্তব্য আসে।

রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘এই নিষেধাজ্ঞার প্রণেতা ও প্ররোচনাকারীরা এমন জঘন্য অপরাধ করার জন্য বিচার ও শাস্তির যোগ্য।’

যুদ্ধ শুরুর প্রায় ছয় মাস পর, বৃহস্পতিবার মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট অঙ্গীকার করেছেন যে, ওয়াশিংটন তার হুমকি দেওয়া অভিযানের মাধ্যমে ইরানি শাসনব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেবে।

এই মন্তব্যগুলো এটা স্পষ্ট যে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের শুরু করা অজনপ্রিয় যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সাথে সাথে ট্রাম্প প্রশাসন তেহরানের ওপর সামরিক চাপের পরিবর্তে অর্থনৈতিক চাপের দিকে ঝুঁকছে।

এদিকে চীনও ওয়াশিংটনের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার সমালোচনা করে বলেছে যে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও চাপ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের সমাধান করবে না।

সূত্র: আরব নিউজ

ইরান শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে, এবার যুদ্ধ শেষ করার সময়: পেজেশকিয়ান
মাসুদ পেজেশকিয়ান

ইরানকে কাবু করতে ট্রাম্পের ‘অ্যানাকোন্ডা কৌশল’

আল–জাজিরা, বিশ্লেষণঃ যুদ্ধক্ষেত্রে কৌশল বদলে এখন অর্থনীতিকে হাতিয়ার করেছে ওয়াশিংটন ও তেহরান। মধ্যপ্রাচ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাত কিছুটা থমকে গেলেও শুরু হয়েছে এক অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে কূটনৈতিক টেবিলে নতি স্বীকারে বাধ্য করতে এক কঠোর ‘অ্যানাকোন্ডা কৌশল’ নিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হচ্ছে—কোনো জাতীয় পরিকাঠামো ধ্বংস না করে, অর্থনৈতিকভাবে শ্বাসরোধ করে তেহরানের শাসনব্যবস্থাকে কোণঠাসা করা।

এই কৌশলের সবচেয়ে প্রধান ও মূল হাতিয়ার হলো নৌ-অবরোধ। মার্কিন নৌবাহিনী কেবল হরমুজ প্রণালিতেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং ভারত মহাসাগরেও অবস্থান নিয়ে ইরানের জ্বালানি তেল চোরাচালানের ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বা গোপন জাহাজের বহর জব্দ করছে।

চীন ও ভারতে সস্তায় তেল পাঠানো আটকানোর পাশাপাশি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কাঁচামাল আমদানি বন্ধ করে দিয়েছে ওয়াশিংটন। ফলে ইরানের তেলখনি ও খারগ দ্বীপের ট্যাংকারগুলো ধারণক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছে যাওয়ায় দেশটির খনি থেকে অপরিশোধিত তেল উত্তোলন পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে, যা তাদের অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদি ধসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

নৌ-অবরোধের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ডিজিটাল অর্থনীতির ওপর আঘাত হেনেছে। সম্প্রতি মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) ব্যবহৃত লাখ লাখ ডলার সমমূল্যের ক্রিপ্টোকারেন্সি অ্যাকাউন্ট জব্দ করেছে। পাশাপাশি যেসব ছোট ছোট চীনা শোধনাগার ইরানের কাছ থেকে গোপনে তেল কিনছিল, সেগুলোর ওপরও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

মার্কিন নীতিনির্ধারকদের মতে, অবকাঠামোতে হামলা চালালে সাধারণ ইরানিরা বর্তমান সরকারের পক্ষে জাতীয়তাবাদী শক্তিতে ঐক্যবদ্ধ হতে পারে। কিন্তু এই অর্থনৈতিক অবরোধ অব্যাহত রাখলে যুদ্ধ–পরবর্তী সময়ে সাধারণ জনগণের তীব্র গণবিক্ষোভের মুখে তেহরানের আয়াতুল্লাহ সরকার বা আইআরজিসির অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়বে।

তবে ইরানও বসে নেই। তেহরান মূলত সময়ের সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে। হরমুজ প্রণালিতে সংকট বজায় রেখে জ্বালানির বিশ্ববাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার ফায়দা তুলতে চায় তারা। তেহরানের বাজি হলো, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের ওপর চাপ বৃদ্ধি পেলে ওয়াশিংটনই নতি স্বীকার করতে বাধ্য হবে।

তবে ইসরায়েলি গোয়েন্দা ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, শুধু অর্থনৈতিক অবরোধ দিয়ে তেহরানের কট্টরপন্থী শাসনব্যবস্থাকে কাবু করা কঠিন। তাঁরা মনে করছেন, শেষ পর্যন্ত মূল অবকাঠামোতে কঠোর সামরিক আঘাত ছাড়া ইরানকে তার পারমাণবিক কর্মসূচি থেকে পুরোপুরি সরিয়ে আনা সম্ভব না–ও হতে পারে।

তেহরানের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের বিশ্লেষক আলী আকবর দারে ইনি বলেছেন, এ পর্যন্ত যে যুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্প জিততে ব্যর্থ হয়েছেন, তা শেষ করতে তিনি ‘অ্যানাকোন্ডা কৌশল’ ব্যবহার করছেন।

দারে ইনি আল–জাজিরাকে বলেন, সামরিক হামলা চালানোর আগে শত্রুকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে দমবন্ধ করে দেওয়াই এই কৌশলের লক্ষ্য। অ্যানাকোন্ডা যেভাবে শিকারকে পেঁচিয়ে ধরে তার শ্বাসরোধ করে হত্যা করে, ঠিক তেমনি যুক্তরাষ্ট্রও এই কৌশল অনুসরণ করছে। কারণ, গত পাঁচ মাসে তারা যা করেছে, তা ব্যর্থ হয়েছে।

তবে দারে ইনি যুক্তি দেন, ইরান অতীতেও নিষেধাজ্ঞা সহ্য করতে পেরেছে এবং ভবিষ্যতেও তা করবে। তিনি বলেন, ট্রাম্প এমন এক যুদ্ধে আটকে গেছেন, যেখানে তিনি জিততেও পারছেন না, আবার বেরিয়ে আসতেও পারছেন না।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি : এএফপি

Friday, August 21, 2026

ইরানকে কোনঠাসা করার ট্রাম্পের পরিকল্পনা আটকে দিতে পারে চীন ও রাশিয়া

ইরানকে আর্থিক সুবিধা বা সহযোগিতা দিলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। দেশটিকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। তেহরানের বিরুদ্ধে একটি অর্থনৈতিক অভিযানের ডাক দিয়ে তিনি এই কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা দেন। ট্রাম্প নিজের বৈদেশিক নীতি বাস্তবায়নে মার্কিন অর্থনৈতিক শক্তিকে ব্যবহারের এই নতুন চেষ্টা শুরু করেছেন। এ খবর দিয়েছে আল জাজিরা।

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের দুটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার চীন ও রাশিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব খাটানোর সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। রাশিয়া ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকায় তারা মার্কিন নেতৃত্বাধীন অর্থনৈতিক কাঠামোর বাইরে থেকেই তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। অন্যদিকে চীন বারবার প্রমাণ করেছে যে, নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তারা মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে উপেক্ষা করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না। কাতারের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক পল মাসগ্রেভ জানান, ট্রাম্পের পক্ষে এই চাপ প্রয়োগের অভিযান কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন হবে। তিনি বলেন, ট্রাম্প এককভাবে এমন একটি সমন্বিত নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছেন, যার জন্য ঐতিহাসিকভাবে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচ সদস্যসহ চীন ও রাশিয়ার যৌথ বহুপাক্ষিক সমন্বয়ের প্রয়োজন হয়।
ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের বিরুদ্ধে তার এই অর্থনৈতিক পদক্ষেপ হবে যেকোনো দেশের বিরুদ্ধে পরিচালিত ইতিহাসের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক অভিযান।

তিনি জানান, তেল চোরাচালান, মুদ্রা বিনিময়, নগদ অর্থ স্থানান্তর, মুদ্রা রুপান্তর, ভুয়া কোম্পানি ও জাহাজের নিবন্ধনের মাধ্যমে যেসব দেশ ইরানকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সহায়তা করবে, তাদের ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিণতি ভোগ করতে হবে। এর আগে একই দিনে তেহরানের ওপর অনির্দিষ্টকালের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে সংযুক্ত আরব আমিরাত। ব্রান্ডেইস ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্য অর্থনীতি বিষয়ক অধ্যাপক নাদের হাবিবি জানান, সংযুক্ত আরব আমিরাতকে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা দিতে যুক্তরাষ্ট্র জোরালোভাবে প্ররোচিত করেছে এবং ওয়াশিংটন এখন ইরানের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার চীনের ওপরও একই ধরনের চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে।

তবে চীন ও ইরানের বাণিজ্য সম্পর্কে বিঘ্ন ঘটানোর মার্কিন পরিকল্পনা বড় ধরনের বাধার মুখে পড়তে পারে। ২০২৫ সালে ইরানের রপ্তানি করা তেলের ৮০ শতাংশই কিনেছে চীন। এই তেল প্রক্রিয়াকরণ করা চীনের বেশিরভাগ শোধনাগার স্বাধীন এবং মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার ওপর তারা নির্ভরশীল নয়। এছাড়া ইরানি লেনদেন নিষ্পত্তির অভিযোগে চীনের প্রধান ব্যাংকগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে তা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে বড় ধাক্কা দিতে পারে। চ্যাথাম হাউসের জ্যেষ্ঠ গবেষক ইউ জিয়ে জানান, ট্রাম্পের এই হুমকি ইরানের সাথে চীনের বর্তমান বাণিজ্যিক সম্পর্কে কোনো পরিবর্তন আনবে না। তিনি উল্লেখ করেন, বেইজিং যেমন ওয়াশিংটনের সাথে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি বা স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে চায়, ট্রাম্পও চীনের সাথে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখতে আগ্রহী। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান জানান, নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ কোনো সমস্যার সমাধান করবে না। কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক পথেই এই সংকট সমাধানের আহ্বান জানান তিনি। আগামী মাসে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য ওয়াশিংটন সফরের আগে যুক্তরাষ্ট্রও বেইজিংয়ের সাথে সম্পর্কের অবনতি চাইছে না।

অন্যদিকে রাশিয়ার সাথে ইরানের সমান্তরাল কৌশলগত সম্পর্ক ওয়াশিংটনের জন্য ভিন্ন একটি চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। মস্কো ও তেহরান বহু বছর ধরেই পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাকে পাশ কাটিয়ে বাণিজ্যিক ও সামরিক বন্ধন গড়ে তুলেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে দুই দেশ একটি ২০ বছর মেয়াদী অংশীদারিত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করে, যার ফলে ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসেই তাদের বাণিজ্য বেড়ে ৪৮০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। এমনকি কাস্পিয়ান সাগর দিয়ে রাশিয়া ইরানকে ড্রোনের যন্ত্রাংশ, গোলাবারুদ ও টিএনটি সরবরাহ করেছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন নিষেধাজ্ঞার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি একে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থ নীতির ধারাবাহিকতা বলে অভিহিত করেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি লেখেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ বৈশ্বিক অর্থনীতি ও সার্বভৌমত্বকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। এদিকে ব্রিকস জোটের সদস্য হিসেবে ইরান বিকল্প অর্থনৈতিক পথের সন্ধান করছে। ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদোলনাসের হেম্মতি জানিয়েছেন, পশ্চিমা বাজারের বাইরে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করতে ইরান ব্রিকস নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে যোগ দেয়ার পরিকল্পনা করছে এবং জোটের দেশগুলোর নিজস্ব মুদ্রায় দ্বিপাক্ষিক লেনদেন বৃদ্ধির উদ্যোগ নিচ্ছে।

ইরানকে কোনঠাসা করার ট্রাম্পের পরিকল্পনা আটকে দিতে পারে চীন ও রাশিয়া

ইরানের অর্থনীতি পঙ্গু করতে ট্রাম্পের নতুন পরিকল্পনা: কতটা অবিচল থাকবেন তিনি?

সিএনএনের বিশ্লেষণঃ চরম অর্থনৈতিক অভিযানের হুমকি দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন যুদ্ধকৌশল ঘোষণা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তবে রাজনৈতিক চাপ ও ব্যয় বাড়তে থাকলে তিনি এই সিদ্ধান্তে শেষ পর্যন্ত অবিচল থাকবেন নাকি পিছিয়ে যাবেন, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বুধবার ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প যেকোনো দেশের বিরুদ্ধে এযাবৎকালের সবচেয়ে কঠোর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তবে এমন অঙ্গীকার এবারই প্রথম নয়। এর আগেও ট্রাম্প নানান কঠোর পদক্ষেপের কথা বলেছিলেন, যাতে তিনি শেষ পর্যন্ত অবিচল থাকেননি। তাই এবারের সিদ্ধান্ত তিনি কতদিন ধরে রাখেন সেটিই দেখার বিষয়।

বোমাবর্ষণ করে ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে কিংবা সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে তাদের সাথে পারমাণবিক আলোচনায় বসতে ব্যর্থ হওয়ার পর ট্রাম্পের এই নতুন কৌশলকে নিজেদের মুখ রক্ষার একটি চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক মিত্রদের জানানো হয়েছে যে, ইরানের সাথে সব ধরনের আলোচনা বন্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশটি যাতে সম্পূর্ণ নতি স্বীকার করে, সেজন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক যুদ্ধের পথ বেছে নেয়া হয়েছে। এক বিবৃতিতে ট্রাম্প জানান, যেসব আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বিমানবন্দর বা সরকারি সংস্থা ইরানকে যেকোনো ধরণের সুবিধা দেবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। একই সাথে তেল চোরাচালান, অর্থ স্থানান্তর, ভুয়া কোম্পানি ও জাহাজের নিবন্ধনের মতো সমস্ত পথ অবিলম্বে বন্ধ করার তাগিদ দেন তিনি।

ইসরাইল ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্সের গবেষণা ও বিশ্লেষণ বিভাগের প্রাক্তন ইরান বিষয়ক প্রধান ড্যানিয়েল সিট্রিনোভিচ জানান, তীব্র অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও ইরান ভেঙে পড়বে এমনটি ভাবা হবে চরম ভুল। আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর চাপ সৃষ্টি করার যে কৌশল তেহরান নিয়েছে, তা পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ নেই এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত ইরানের মূল রাজনৈতিক অবস্থানের কোনো পরিবর্তন আসবে না।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই পরিকল্পনা কার্যকর করতে হলে দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত ধৈর্যের প্রয়োজন হবে। এছাড়া ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলেশনারি গার্ড করপসের (আইআরজিসি) রাজস্ব এবং আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক বন্ধ করতে ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের সমন্বয়ে একটি বড় কূটনৈতিক পদক্ষেপ দরকার। হাডসন ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো লুদোভিক হুড মনে করেন, অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের উচিত ইরানের তেলের বড় ক্রেতা চীনের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানো। তবে আগামী সেপ্টেম্বরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র সফরের আগে ওয়াশিংটন এমন কোনো পদক্ষেপ নেবে কিনা, তা নিয়ে বড় সংশয় রয়েছে।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র দুই মাস আগে ইরানেরও পাল্টা জবাব দেয়ার রাজনৈতিক সুযোগ রয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে নতুন ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে মার্কিন ভোটারদের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করতে পারে তেহরান। ডেমোক্রেট প্রতিনিধি জেমস ওয়াকিনশ এই বিষয়ে বলেন, তিনি এমন কোনো অর্থনৈতিক ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধে আগ্রহী নন, যেখানে মার্কিন জনগণকে গ্যাস স্টেশন ও মুদি দোকানে এর চূড়ান্ত মূল্য দিতে হয়। ফলে ট্রাম্পের এই নতুন অর্থনৈতিক যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত কার্যকর কোনো সমাধান আনবে, নাকি রাজনৈতিক চাপে তিনি পিছু হটবেন, তা এখনও একটি বড় প্রশ্ন।

ইরানের অর্থনীতি পঙ্গু করতে ট্রাম্পের নতুন পরিকল্পনা: কতটা অবিচল থাকবেন তিনি?