Friday, March 25, 2022
আইনস্টাইনের থিওরি অফ হ্যাপিনেস: দেড় মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হওয়া “সুখের মূলমন্ত্র” by সাদমান ফাকিদ

১৯২২ সালের নভেম্বর মাসে আইনস্টাইন ইউরোপ থেকে জাপানে যাচ্ছিলেন একটি লেকচার সিরিজ ডেলিভারির জন্য। এই ভ্রমণে থাকা অবস্থাতেই আইনস্টাইন খবর পান, তিনি পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল প্রাইজ পেয়ে গেছেন। তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে অভূতপূর্ব অবদানের জন্য তাঁকে এই সম্মানে ভূষিত করা হয়।
তাই আইনস্টাইন যখন জাপানে এসে পৌঁছান তখন তাঁর খ্যাতি হঠাৎ-ই অনেকগুণ বেড়ে গেছে। পুরো জাপান জুড়ে ছড়িয়ে গেছে তাঁর নোবেল প্রাইজ প্রাপ্তির ঘটনা। হাজার হাজার মানুষ জায়গায় জায়গায় ভিড় করছেন নোবেল লরিয়েটকে এক পলক দেখার জন্য। এই খ্যাতির বিড়ম্বনায় পড়ে আইনস্টাইন টোকিওর ইম্পেরিয়াল হোটেলে একা একা বসে জীবন সম্পর্কে লেখার চেষ্টা করছিলেন, লিখছিলেন নিজের একান্ত ব্যক্তিগত ভাবনা।
ঠিক সেসময়ই তাঁর কাছে একজন বার্তাবাহক আসে, একটি ডেলিভারি দিয়ে যেতে তাঁকে। বার্তাবাহককে বখশিশ দিতে গিয়ে আইনস্টাইন দেখেন তাঁর কাছে খুচরা অর্থ নেই, তাই তিনি তাকে বখশিশ না দিয়ে একটি অভিনব কাজ করেন।
এর মধ্যে একটি কাগজে লেখা ছিল, “একটি শান্তিপূর্ণ ঝঞ্ঝাটমুক্ত জীবন নিরবিচ্ছন্ন অস্থিরতা নিয়ে সফলতার পেছনে দৌড়ানো জীবনের থেকে অনেক বেশি সুখ এনে দেয়।“ একেই এখন বলা হচ্ছে, “আইনস্টাইন্স থিওরি অফ হ্যাপিনেস।”
এই কাগজটির বিক্রি হয় ১.৫৬ মিলিয়ন ডলারে। অথচ নিলামের আগে ধরা হয়েছিল ৫ থেকে ৮ হাজার ডলারের মত দাম পড়বে চিঠিটার। ওই নিলাম হাউজের চিফ এক্সিকিউটিভ গ্যাল উইনার জানিয়েছিলেন, নোটটির দাম ডাকা শুরু হয়েছিল ২ হাজার ডলার থেকে। আর ২৫ মিনিট ধরে চলেছিল সেই নিলাম।
![]() |
| জাপানে আলবার্ট আইনস্টাইন |
সেই ১৯২২ সালে, এই নোটগুলো লেখার পর, আইনস্টাইনের ছয় সপ্তাহব্যাপী জাপান ট্যুরটা বেশ সফল হয়। আইনস্টাইন জাপান দেশটিকে অনেক ইতিবাচকভাবে দেখতে শুরু করেন। তিনি তার ছেলেদের কাছে চিঠিতে লিখেন,
***“এখন পর্যন্ত যত মানুষের সাথে আমি মিশেছি, তাদের মধ্যে জাপানিজ মানুষদেরই আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছ, কারণ তারা একই সাথে ভদ্র, চৌকস, বুঝদার, এবং শিল্পেরও সমঝদার।”
কিন্তু এত বছর পর এসে আইনস্টাইনের “সুখের তত্ত্ব”-টি আসলে কতটুকু সময়োপযোগী? কারণ সুখ তো আসলে বৈজ্ঞানিক আপেক্ষিকতার থেকেও অনেক বেশি আপেক্ষিক, তাই এর রহস্য এখনো বিজ্ঞানীরা ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারেননি। কিছু কিছু গবেষণায় দেখা যায়, গড়পড়তা চাকরি-বাকরির চেয়ে স্বনির্ভর উদ্যোক্তা হওয়ার সংগ্রামশীল জীবন আসলে বেশি সুখকর। এটি আসলে আইনস্টাইনের তত্ত্বটির সাথে কিছুটা সাংঘর্ষিক। এর বিপরীতে আরেকটি বড়সড় গবেষণায় দেখা গেছে ভারসাম্যযুক্ত জীবন হচ্ছে সুখী জীবন, পরিবারকে, ক্যারিয়ারকে, নিজেকে সবকিছুকেই সমানভাবে সময় দেওয়া মানুষেরা বেশি সুখী। এটি আসলে আইনস্টাইনের তত্ত্বটির সাথে মিলে যায়।

সুখের পেছনে অন্যতম একটি গবেষণা প্রকাশ হয় ২০০৫ সালে। সেখানে বিজ্ঞানী সুখের পেছনে হওয়া এর আগের ২২৫টি গবেষণার উপর গবেষণা করে সিদ্ধান্তে আসেন, সফলতা আসলে সুখ নিয়ে আসে না, বরং সুখ নিয়ে আসে সফলতা। অর্থাৎ, “সুখ মানুষের আচরণে এমন সব পরিবর্তন আনে যা কাজ, সম্পর্ক, স্বাস্থ্য সবখানেই মানুষকে সফল করে তুলে।”
এখান থেকে আমরা বলতে পারি, হয়তো আইনস্টাইন তার তত্ত্ব অনুযায়ী নির্ঝঞ্ঝাট জীবন কাটিয়ে সুখী ছিলেন বলেই তিনি তার কাজে এতটা সফল হয়েছিলেন, এতকিছু অর্জন করেছিলেন পদার্থবিদ্যায়।অনেক মনস্তত্ত্ববিদই আসলে দেখেছেন, আমরা আসলে কখনোই সুখী হই না, বরং “সুখের চরকি”-তে ঘুরতে থাকি।
নক্স কলেজের সাইকোলজির প্রফেসর ফ্রাংক টি ম্যাকএন্ড্রু তাঁর একটি লেখায় বলেছেন,
***“আমরা একটি উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে অনেক পরিশ্রম করি, সেই উদ্দেশ্যটি আমাদের কতটা সুখ এনে দিবে সেই আশায়, কিন্তু উদ্দেশ্যটিতে সফল হলেই কিছুদিনের মধ্যে আমরা নতুন অবস্থানে থিতু হয়ে যাই, আবার নতুন উদ্দেশ্য তৈরি করি, তার পেছনে ছুটতে থাকি কারণ আমরা নিশ্চিত এই উদ্দেশ্য হাসিল হলেই আমাদের সুখ নিশ্চিত।”
বেশিরভাগ মানুষের জীবনটা আসলে এই চক্রের মধ্যেই কেটে যায়। একারণে লটারি বিজয়ী কিংবা সফল উদ্যোক্তা কিংবা তারকারা, কাউকেই আসলে ব্যক্তিগত জীবনে তেমন সুখী দেখা যায় না। এটি মুখের কথা নয়, একটি গবেষণারই সিদ্ধান্ত।

তাই নোবেল প্রাইজ পেয়ে সফলতার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছার পর হয়তো আইনস্টাইন বুঝেছিলেন এই সাফল্য আসলে তাঁকে তেমন কোনো সুখ এনে দেয়নি, বরং চক্রের মধ্যেই ফেলে রেখেছে। তাই হয়তো তিনি চক্রের বাইরে বের হওয়ার একটি তত্ত্ব আমাদের সামনে এনে দিয়েছেন। বলেছেন সফলতার পেছনে না ছুটে নীরব নির্ঝঞ্ঝাট জীবন কাটাতে যা হয়তো আসলেই আমাদের এই অস্থির চরকি থেকে বের করে নিয়ে আসবে। তাই বলতে হয়, আইনস্টাইনের অন্যান্য সব যুগান্তকারী তত্ত্বের মতোই তার সুখের তত্ত্ব বা “থিওরি অফ হ্যাপিনেস”-ও এখনো সময়োপযোগী।
কিন্তু আইনস্টাইনের উপদেশ কি আমরা আসলেই শুনছি? উদ্যোক্তা এবং মোটিভেশনাল স্পিকাররা কিন্তু উল্টো কথাটা বলছে। সফল উদ্যোক্তা এবং লেখক বিল পেসি’র কথাই ধরুন। তার নির্দেশনা-
***“সফল হয়েই সন্তুষ্ট থাকা যাবে না, বরং সাফল্যকে কিভাবে আরও ছাড়িয়ে যাওয়া যায় সেই চেষ্টায় লেগে থাকতে হবে অবিরত”।
এখন সিদ্ধান্ত আপনার, আপনি কোন পথে এগোবেন।
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
Thursday, March 24, 2022
হাতের কব্জির ব্যথা : কারণ ও চিকিৎসা by ডা: মিজানুর রহমান কল্লোল

কব্জির ব্যথার উপসর্গ বিভিন্ন ধরনের হয়। এটি নির্ভর করে ঠিক কী কারণে ব্যথা হচ্ছে তার ওপর। যেমন- অস্টিও আর্থ্রাইটিসের ব্যথা ঠিক ভোঁতা ধরনের দাঁত ব্যথার মতো, অথচ টেনডনের প্রদাহ বা টেনডিনাইটিসের ব্যথা সাধারণত তীক্ষ ও ধারালো ধরনের।
কব্জির ব্যথার কারণ
কব্জি বা রিস্টজয়েন্ট হলো একটি জটিল সন্ধি যা তৈরি হয়েছে কয়েকটি হাড়ের সমন্বয়ে যেমন রেডিয়াস ও আলনা হাড়ের নিম্নাংশ এবং আটটি ছোট ছোট কারপাল হাড়। এই কারপাল হাড়গুলো দুই সারিতে সাজানো। লিগামেন্টের শক্ত ব্যান্ড কব্জির হাড়গুলোকে একে অন্যের সাথে, রেডিয়াস ও আলনা হাড়ের নিম্নাংশ এবং হাতের হাড়গুলোকে সংযুক্ত করে। টেনডনগুলো হাড়ের সাথে মাংসপেশিকে সংযুক্ত করে। কব্জির যেকোনো অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে ব্যথা হতে পারে এবং হাত ও কব্জির ব্যবহারের সক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
কব্জি ব্যথার সাধারণ কারণগুলো এখানে বর্ণিত হলো :
১. ইনজুরি
হাতের ওপর ভর দিয়ে সামনের দিকে পড়ে গেলে কব্জিতে খুব বেশি ইনজুরির ঘটনা ঘটে। এ ক্ষেত্রে কব্জি মচকে যায়, কব্জিতে টান পড়ে এবং কব্জির হাড় ভেঙেও যায়। কব্জির বুড়ো আঙ্গুলের দিকে হাড়টির নাম স্কাফয়েড। এটি অনেক সময় ভেঙে যায়। এ ধরনের হাড় ভেঙে গেলে সাথে সাথে সেটা এক্স-রেতে নাও দেখা যেতে পারে। ব্যথা অনেক দিন থাকে, কব্জি নাড়াচাড়া করলে ব্যথা বাড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে হাত দিয়ে কাজ করা যায় না। প্লাস্টার করেও ব্যথার উপশম হয় না। অপারেশন করতে হয়। অনেক সময় স্কাফয়েড হাড় ভাঙলে হাড়ের মধ্যে রক্ত চলাচল ব্যাহত হয় এবং হাড়ের জোড়া লাগতে সমস্যা হয় যার ফলে ব্যথা হয় ও কব্জি নাড়তে অসুবিধা হয়। তখন অপারেশনের প্রয়োজন হয়। হাতের ওপর ভর দিয়ে পড়ে গেলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কলিস ফ্রাকচার হয়। এ ক্ষেত্রে রেডিয়াসের নিচের অংশ ভেঙে যায়। কব্জি ফুলে যায়।
কব্জি বারবার নাড়াতে হয় এমন যেকোনো কাজ যেমন- টেনিস বল খেলা থেকে শুরু করে বেহালা বহন করতে করতে কব্জির সন্ধির চার পাশের টিস্যুতে প্রদাহ হতে পারে কিংবা হাড় ভেঙে যেতে পারে। বিশেষ করে কোনো বিরতি ছাড়া ঘণ্টার পর ঘণ্টা কব্জির কাজ করলে। বারবার চাপের ফলে হাতের কব্জির ব্যথার আরেকটি কারণ হলো ডি কোয়ার ভেইন’স ডিজিজ। ব্যথা বুড়ো আঙ্গুলের মূলে অনুভূত হয়। ডি কোয়ার ভেইন’স ডিজিজে কব্জি নাড়তে খুব ব্যথা হয়, কাজ করতে অসুবিধা হয় এবং অনেক সময় কাজের পর ব্যথা বেশ বেড়ে যায়। বুড়ো আঙ্গুলে চাপ দিলে প্রচণ্ড ব্যথা হয়।
২. আর্থ্রাইটিস বা বাতের ব্যথা
অস্টিও আর্থ্রাইটিস
সাধারণত কব্জিতে অস্টিও আর্থ্রাইটিস খুব কম হয়। কোনো লোকের কব্জিতে আগে ইনজুরি হয়ে থাকলে পরে অস্টিও আর্থ্রাইটিস হয়। এ ক্ষেত্রে কার্টিলেজ বা তরুণাস্থি ছিঁড়ে যায় বা ক্ষয় হয়।
রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস: এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা তার নিজস্ব টিস্যুগুলোকে আক্রমণ করে। কব্জিতে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস খুব বেশি পরিলক্ষিত হয়। যদি একটি কব্জি আক্রান্ত হয়, তাহলে সাধারণত অন্য কব্জিতেও এটি ঘটে।
৩. অন্যান্য রোগ ও অবস্থা
কারপাল টানেল সিনড্রোম: আপনার কব্জির তালুর দিকের অংশে একটি পথ রয়েছে যার নাম কারপাল টানেল; এর মধ্য দিয়ে মিডিয়ান নার্ভ অতিক্রম করে। মিডিয়ান নার্ভে চাপ পড়লে কব্জি ও হাতে প্রচণ্ড ব্যথা হয়। এ অবস্থার নাম কারপাল টানেল সিনড্রোম।
গ্যাংলিয়ন সিস্ট: কব্জির ব্যথার অন্যতম কারণ হলো এক ধরনের টিউমার জাতীয় ফোলা বস্তু থাকে যাকে গ্যাংলিয়ন বলে। এটি ওঠে টেনডনের আবরণী থেকে কব্জির পেছনে অথবা সামনের দিকে। কব্জি নাড়লে ব্যথা হয়। বড় গ্যাংলিয়ন সিস্টের চেয়ে ছোটগুলো বেশি ব্যথা সৃষ্টি করে।
কিয়েন বক্স ডিজিজ : এটি সাধারণত তরুণদের হয়। এ ক্ষেত্রে কব্জির লুনেট নামের ছোট হাড়টিতে রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়ে হাড়টি কোলাপস করে। লুনেট হাড়ের ওপরে চাপ দিলে ব্যথা লাগে এবং রোগী হাত মুঠো করে ধরতে পারে না।
কব্জি ব্যথার ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়গুলো হলো
কারো হাতের কব্জিতে ব্যথা হতে পারে- তা অল্প কাজ করুক কিংবা বেশি কাজ করুক না কেন। কিন্তু কিছু ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়ের কারণে এ ব্যথা বেড়ে যেতে পারে, যেমন-
খেলাধুলা করা: বিভিন্ন খেলাধুলায় কব্জিতে ইনজুরি হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে বোলিং, গলফ, জিমন্যাস্টিক, টেনিস প্রভৃতি।
বারবার কাজ করা: বেশির ভাগ ক্ষেত্রে হাত ও কব্জির যেকোনো কাজ বারবার করলে কব্জির ব্যথা বেড়ে যেতে পারে। যেসব মহিলা হাঁড়ি-পাতিল ধোয়াধুয়ি করেন বা বুননের কাজ করেন তাদের কব্জির ব্যথা বেশি হয়। যারা চুল কাটার কাজ করেন তাদেরও কব্জির ব্যথা বেশি হয়। যারা কম্পিউটার কিবোর্ডে টাইপ করেন, কম্পিউটার মাউস ব্যবহার করেন, হ্যান্ডবল খেলেন, সেলাই করেন, আঁকাআঁকি করেন, লেখালেখি করেন বা ভাইব্রেটিং যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেন তাদের কব্জির ব্যথা বেড়ে যায়। আবার যাদের ডায়াবেটিস, লিউকেমিয়া, স্ক্লেরোডার্মা, লুপাস থাকে কিংবা থাইরয়েড গ্রন্থি ঠিকমতো কাজ না করে তা হলে তাদের কব্জির ব্যথা বেড়ে যেতে পারে। প্রাথমিকভাবে ফ্যামিলি ফিজিসিয়ানের সাথে পরামর্শ করলে তারা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যেমন- রিউমাটোলজিস্ট, স্পোর্টস মেডিসিন বিশেষজ্ঞ কিংবা অর্থোপেডিক সার্জনের কাছে রেফার করতে পারেন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে উপসর্গের বিস্তারিত বর্ণনা যেমন আপনার কোনো রোগ আছে কি না, বাবা-মা, ভাই-বোনের অন্য রোগ আছে কি না, আপনি কোনো ধরনের ওষুধ খেতে থাকলে তাও জানাতে হবে। কী ধরনের খাবার গ্রহণ করেন তা জানাবেন।
চিকিৎসা : হাতের কব্জির ব্যথার চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ভর করে ইনজুরির গ্রণ, স্থান ও তীব্রতা সর্বোপরি বয়স ও সার্বিক স্বাস্থ্যের ওপর। প্রথমত, আক্রান্ত হাতের কব্জিকে বিশ্রামে রাখতে হবে এবং যদি কোনো নির্দিষ্ট রোগের কারণে কব্জিতে ব্যথা হয়ে থাকে তাহলে তার উপযুক্ত চিকিৎসা দিতে হবে। ব্যথানাশক ওষুধ যেমন- আইবুপ্রফেন ও অ্যাসিটামিনোফেন কব্জির ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। প্রয়োজনে শক্তিশালী ব্যথানাশক ওষুধ দেয়া যেতে পারে। হাড় ভাঙলে হাড়ের টুকরোগুলো সঠিক বিন্যাসে রাখতে হবে যাতে ঠিকমতো জোড়া লাগে; এ ক্ষেত্রে কাস্ট বা স্প্লিন্ট ব্যবহার করা যেতে পারে। কব্জিতে টান লাগলে বা মচকে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত টেনডন বা লিগামেন্ট যাতে সুরক্ষা পায় সে জন্য স্প্লিন্ট ব্যবহার করা যেতে পারে। আক্রান্ত হাতের কব্জিকে নড়াচড়া থেকে রক্ষা করার জন্য রিস্টব্যান্ড ব্যবহার করা যেতে পারে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অপারেশনের প্রয়োজন হয়। যেমন- মারাত্মকভাবে হাড় ভাঙলে, কারপাল টানেল সিনড্রোমের উপসর্গ তীব্র হলে এবং টেনডন বা লিগামেন্ট ছিঁড়ে গেলে।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, অর্থোপেডিকস ও ট্রমা বিভাগ, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল। চেম্বার : পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার লি:, ২, ইংলিশ রোড, ঢাকা।
ফোন: ০১৭২২৯১৬৪৭৯ (সঞ্জয়)
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
Wednesday, March 23, 2022
তাকদিরে বিশ্বাস কী ও কেন by মুফতি মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম

তাকদির কি পরিবর্তিত হয়?
তাকদির বা ভাগ্যলিপি দুই প্রকার; যথা—১. তাকদিরে মুবরাম (অপরিবর্তনীয় ভাগ্যলিপি) ও ২. তাকদিরে মুআল্লাক (ঝুলন্ত ভাগ্যলিপি)। তাকদিরে মুবরাম কখনোই পরিবর্তিত হয় না। আর তাকদিরে মুআল্লাক বান্দার নেক আমল, দোয়া ইত্যাদির মাধ্যমে পরিবর্তিত হয়। হজরত সালমান (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, দোয়া আল্লাহর ফয়সালাকে পরিবর্তন করাতে পারে। আর নেক আমল বয়সকে বৃদ্ধি করাতে পারে।’ (তিরমিজি, হাদিস নম্বর : ২১৩৯)
তাকদির কি মানুষের কাজের কারণ ও উপকরণ?
তাকদির মানুষের কাজের কারণ নয় এবং তাকদির লিপিবদ্ধ আছে বলে মানুষ ভালো-মন্দ ইত্যাদি কাজ করছে—বিষয়টি এমন নয়; বরং ভবিষ্যতে মানুষ যা করবে, আল্লাহ তাআলা তা আগে থেকেই জানেন, ফলে তিনি তা আদিতেই লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। আল্লাহ তাআলা আদিতে লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন বলে মানুষ লেখা অনুযায়ী কর্ম করছে—এ কথা মোটেও ঠিক নয়। বরং আমরা কখন কী করব, কী খাব, কোথায় কী ঘটবে—এগুলো আল্লাহ তাআলা পূর্ব থেকে জানেন। কারণ তিনি ইলমে গায়েবের অধিকারী। তাঁর পূর্বজ্ঞান অনুযায়ী তা লিখে রেখেছেন। উদাহরণস্বরূপ—
১. একজন শিক্ষক পাঁচজন ছাত্রকে শিক্ষাদানের পর তাঁর অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি যদি তাঁর ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ করেন যে অমুক ছাত্র ‘এ প্লাস’ পাবে, অমুক ছাত্র ‘এ’ পাবে, অমুক ছাত্র ‘এ মাইনাস’ পাবে, অমুক ছাত্র ‘বি’, অমুক ছাত্র ‘সি’ পাবে। এখন পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর যদি শিক্ষকের আগের লেখা অনুযায়ী ফলাফল হয়, তাহলে কি শিক্ষকের লেখার কারণে এই ফলাফল হলো? অবশ্যই না। তাকদিরের বিষয়টিও এমনই।
২. একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার তাঁর রোগীর অবস্থা বুঝে অভিজ্ঞতার আলোকে তাঁর ডায়েরিতে লিখে রেখেছেন যে এই রোগী অমুক দিন, অমুক অবস্থায় মারা যাবে। কার্যত যদি তা-ই হয়, তাহলে ডাক্তারের লিখে রাখার কারণেই কি তার মৃত্যু হলো? নিশ্চয়ই না। ঠিক তেমনই আল্লাহ তাআলা মানুষের অবস্থা আদি থেকেই জানেন বলে সব কিছু লিখে রেখেছেন। কিন্তু এই লিপিবদ্ধকরণ মানুষের কার্যের কারণ নয়। বরং কার্যের কারণ হলো তার ইচ্ছা। ফলে ব্যক্তির কজের জন্য সে নিজেই দায়ী।
তাকদিরের প্রতি ঈমানের স্বরূপ
তাকদিরের প্রতি বিশ্বাস করা ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাকদিরের ওপর সন্তুষ্ট থাকা ফরজ। তাকদিরে বিশ্বাসের অর্থ হলো—
১. আল্লাহর ব্যাপারে এই বিশ্বাস রাখা যে তিনি আদি থেকে সব কিছুর ব্যাপারে ওয়াকিফহাল।
২. তিনি লাওহে মাহফুজে (সংরক্ষিত ফলকে) সব কিছু লিখে রেখেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তাআলা সৃষ্টিকুল সৃষ্টির ৫০ হাজার বছর আগে সৃষ্টিকুলের তাকদির লিখে রেখেছেন।’ (মুসলিম) তিনি আরো বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা প্রথমে কলম সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর কলমকে বললেন—লেখো। কলম বলল, হে রব! কী লিখব? তিনি বলেন, কিয়ামত পর্যন্ত প্রত্যেক জিনিসের তাকদির লেখো।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৭০০) আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তুমি কি জানো না যে নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলে যা কিছু আছে আল্লাহ সব কিছু জানেন। নিশ্চয়ই এসব কিতাবে লেখা আছে। অবশ্যই এটা আল্লাহর কাছে সহজ।’ (সুরা : হজ, আয়াত : ৭০)
৩. আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে কোনো কিছু ঘটে না। তাঁর বাণী হলো, ‘আপনার পালনকর্তা যা ইচ্ছা করেন এবং (যা ইচ্ছা) মনোনীত করেন।’ (সুরা : কাসাস, আয়াত : ৬৮)
৪. সব কিছুর সত্তা, বৈশিষ্ট্য, গতি, স্থিতি—সবই আল্লাহর সৃষ্টি। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহ সব কিছুর স্রষ্টা এবং তিনি সব কিছুর তত্ত্বাবধায়ক।’ (সুরা : জুমার, আয়াত : ৬২) কোরআনের অন্য আয়াতে এসেছে, ‘তিনি (আল্লাহ) সব কিছু সৃষ্টি করেছেন এবং প্রত্যেককে যথোচিত আকৃতি দান করেছেন।’ (সুরা : ফুরকান, আয়াত : ২)
আরো ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহ কোনো ব্যক্তিকে তার সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না। সে যা অর্জন করে, তা-ই তার জন্য এবং সে যা কামাই করে তা তারই ওপর বর্তাবে।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৮৬)
আলী (রা.) থেকে আরো বর্ণিত আছে, মহানবী (সা.) বলেন, কোনো বান্দাই মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না চারটি বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপন করে। তা হলো—১. এ সাক্ষ্য দেওয়া যে আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই এবং আমি তাঁর প্রেরিত রাসুল। ২. মৃত্যুতে বিশ্বাস করা, ৩. মৃত্যুর পর পুনরুত্থানে বিশ্বাস করা, ৪. তাকদিরে বিশ্বাস করা। (বায়হাকি)
ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসী হওয়া তাকদিরের বিশ্বাসের ওপর নির্ভরশীল। ফলে যে ব্যক্তি ঈমান আনে, কিন্তু তাকদিরে অবিশ্বাস করল, সে প্রকৃতপক্ষে একত্ববাদকেই অস্বীকার করল। (সূত্র : তাবলিগে দ্বিন, ইমাম গাজালি (রহ.)
তাকদিরে অবিশ্বাসীদের রাসুলুল্লাহ (সা.) লানত করেছেন। রাসুল (সা.) বলেন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন, যদি কেউ আমার নির্ধারিত তাকদিরের ওপর সন্তুষ্ট না থাকে এবং বিপদাপদে ধৈর্যধারণ না করে, তাহলে সে যেন আমি ছাড়া অন্য কাউকে রব বানিয়ে নিল। (বায়হাকি)
তাকদির প্রসঙ্গে বিতর্কের বিধান
হাদিস শরিফে তাকদির প্রসঙ্গে বিতর্ক করতে বারণ করা হয়েছে। যেমন—হজরত ইয়াহইয়া ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আবি মুলাইকা তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি একদা হজরত আয়েশা (রা.)-এর দরবারে যান। তিনি তাঁকে তাকদির প্রসঙ্গে কিছু জিজ্ঞাসা করেন, তখন হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, আমি রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি তাকদিরের বিষয়ে কথা বলে, কিয়ামতের ময়দানে এ কারণে সে জিজ্ঞাসিত হবে। আর যে এ বিষয়ে আলোচনা করবে না, তাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হবে না। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৮৪)
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, একবার রাসুল (সা.) আমাদের কাছে এলেন, আমরা তখন তাকদির প্রসঙ্গে আলোচনা করছিলাম। তখন রাসুল (সা.) প্রচণ্ড রেগে গেলেন। রাগে তাঁর চেহারা আনারের মতো রক্তিম বর্ণ হয়ে গেল। তিনি বলেন, তোমরা কি এসব করতে আদিষ্ট হয়েছ? নাকি আমি এসবের জন্য প্রেরিত হয়েছি? এর আগের লোকজন এ বিষয়ে আলোচনা করে ধ্বংস হয়েছে, আমি তোমাদের দৃঢ়তার সঙ্গে বলছি, তোমরা এ বিষয়ে বিবাদে লিপ্ত হয়ো না। (তিরমিজি, হাদিস : ২১৩৩)
তাকদিরের সঙ্গে তদবিরের সম্পর্ক
কাজ সম্পাদন করার জন্য উপায়-উপকরণের সহযোগিতা নেওয়াকে তদবির বলে। তাকদিরের সঙ্গে তদবিরের কোনো সংঘাত নেই। কেননা তাকদিরের ওপর ঈমান আনার সঙ্গে কাজের ওপর তদবির করার কথাও লিখিত আছে। হাদিস শরিফে রয়েছে, জনৈক সাহাবি আরজ করেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমরা যে ঝাড়ফুঁক করে থাকি, চিকিৎসায় ওষুধ ব্যবহার করে থাকি কিংবা আত্মরক্ষার জন্য যেসব উপায় অবলম্বন করে থাকি, তা কি তাকদিরের কোনো কিছুকে পরিবর্তন করতে পারে? প্রত্যুত্তরে রাসুল (সা.) বলেন, তোমাদের এসব চেষ্টাও তাকদিরের অন্তর্ভুক্ত। (বায়হাকি)
শাহ ওয়ালি উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভি (রহ.) বলেন, তাকদির ও তদবিরের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। কেননা তদবির তাকদিরের আওতাধীন। এর প্রমাণ হলো, ইয়াকুব (আ.) স্বীয় পুত্রদের মিসর পাঠানোর প্রাক্কালে অসিয়ত করেন, ‘হে আমার পুত্ররা! তোমরা এক দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে না। বরং ভিন্ন ভিন্ন দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে...।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৬৭) এটি ছিল তদবির। পরে তাকদির প্রসঙ্গে বলেন, ‘...আল্লাহর বিধানের বাইরে আমি তোমাদের জন্য কিছুই করতে পারব না। বিধান আল্লাহরই।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৬৭)
ইয়াকুব (আ.) তাকদির ও তদবিরের মধ্যে সমন্বয় সাধন করেছেন। আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসুল (সা.) মানুষকে কাজ করার জন্য তাগিদ দিয়েছেন, তাকদিরের ওপর ভরসা করে বসে থাকতে নিষেধ করেছেন।
>>>লেখক : প্রধান ফকিহ, আল-জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদরাসা, ফেনী
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
দ্য ড্যান্সিং গার্ল! by শাঈখ আল মাহমুদ বনি

- *“তার ঘন দীর্ঘ চুল নান্দনিক ভঙ্গিমায় গুটিয়ে ঘাড়ের কাছে খোঁপার মতো নিবদ্ধ। মূর্তিটি নগ্ন, কিন্তু কামোদ্দীপক নয় বরং অত্যন্ত সারল্যমাখা।“
*“এই ভাস্কর্যটি আদতে আরো বড় কোন ভাস্কর্যের অংশবিশেষ, যেটা তার হাতের দিকে তাকালে বোঝা যায়, যেনবা সেখানে কোন খুঁটির মতো কিছু ধরে রাখার জায়গা ছিল।”
![]() |
| দ্যা ডান্সিং গার্ল |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
Friday, March 18, 2022
গল্প- শশশ… by সাখাওয়াত হোসেন

মোবাইলে টাইম দেখে বরাবরের মতো অবাক হলাম আমি। চারটা বেজে চুয়াল্লিশ মিনিট। অবাক হওয়ার মতো কোনো বিষয় না হলেও অবাক হচ্ছি কারণ এটা প্রথমবার নয়। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে ব্যাপারটা ঘটছে। হঠাৎ করে মোবাইল হাতে নিয়ে টাইম দেখছি, দেখা গেলো টাইম দেখানোর তিনটা কিংবা চারটা সংখ্যাই এক।
প্রথমবার পাত্তা দিইনি, কাকতালীয় ব্যাপার ভেবেছি। কিন্তু একনাগাড়ে বারবার একই ব্যাপার দেখে অবাক হচ্ছি এখন। অবশ্য নিতু হেসে উড়িয়ে দিচ্ছে ব্যাপারটা। গতরাতে ঘুম ভাঙ্গলো হুট করে, পানি খেয়ে এসে মোবাইল হাতে নিয়ে দেখি ১১ টা বেজে ১১ মিনিট! নিতু কে জাগিয়ে বললাম,
— দেখো। তুমি তো পাত্তা দিচ্ছোনা! যখনই সময় দেখছি, তখনই এই অবস্থা!
নিতু ঘুম জড়ানো গলায় বললো,
— তো কি হয়েছে? ঐ সংখ্যাগুলো তোমায় কামড় দিচ্ছে?
— তুমি বুঝতে পারছো না কেন, সামথিং ইজ রং। কাকতালীয় ব্যাপার হলে একবার দু’বার হবে, বারবার হবেনা!
নিতু মুখে এসে পড়া চুল- ঘাড় সামান্য তুলে দু’হাতে পেছনে সরিয়ে দিতে দিতে বলে,
— ওকে, বলছি আসলে কি হচ্ছে। ব্যাপারটা সময় নয়, তুমি সৃষ্টি করেছো! তুমি একটা নির্দিষ্ট সময়ে টাইম দেখছো। আমরা যখন ঘড়িতে একটা নির্দিষ্ট সময়ে এলার্ম দিয়ে রোজ উঠি, অভ্যেস হয়ে যাওয়ার পর একদিন এলার্ম না বাজলেও ঐ সময়টায় ঘুম ভেঙ্গে যায়। তোমার সাথেও একই ব্যাপার ঘটছে। তুমি ঠিক সেইম টাইমেই তোমার নিজের অজান্তেই মোবাইল হাতে নিচ্ছো, সময় দেখছো…
নিতুর ব্যাখ্যা আমার মনঃপুত হয়না কখনো, এখনো হলোনা। বলি,
— অভ্যেস দু’দিনে সৃষ্টি হয়না নিতু! এর আগে কখনো হয়নি, পাঁচ ছয়দিন হলো এমন হচ্ছে। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, এই সময়টা আশ্চর্য একটা সময়। আশ্চর্য কিছু একটা ঘটবে আমার সাথে।
নিতু আমার দিকে তাকায়, যেন এলিয়েন দেখছে। তাকিয়ে বলে,
— তুমি একটা ডাক্তার। অর্ধেক জীবন বিজ্ঞান পড়ে কাটিয়েছো। আমার কিছুই বলার নাই তোমায় আর। ঘুমাও।
….
চেম্বারে আছি চারটা থেকে ছয়টা পর্যন্ত। সিরিয়ালে আছে বিশ- ত্রিশেক লোক। এখন একজন বসে আছেন টেবিলের ওপাশের চেয়ারে।
একজন মহিলা। কালো বোরকা- হিজাব পরা। চোখ দু’টো দেখা যাচ্ছে শুধু। কাজল দেয়া। চোখ ছলছল করছে। মহিলা কাঁদছেন কিনা বুঝা যাচ্ছেনা। মহিলার কোলে একটা বাচ্চা। সাদা চাদর দিয়ে বাচ্চার সমস্ত শরীর জড়ানো, বাচ্চা চাদরের ভেতর থেকে হাত পা নড়াচড়া করছে। মহিলা চুপ করে আছেন। আমি আরেকবার জিজ্ঞেস করলাম,
— বলুন কি সমস্যা?
মহিলা হাত সামান্য উঁচু করে কোলের বাচ্চাটিকে দেখালেন আমায়। বাচ্চার বয়স সম্ভবত সাত- আট মাস। আমি প্রথমে ভেবেছি, সমস্যাটা মহিলার। ভুল ভাঙ্গলো। বাচ্চাকে দেখাতে নিয়ে এসেছেন তিনি। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম,
— হ্যাঁ বলুন, বাচ্চার কি সমস্যা?
মহিলা ডানপাশের দরজার দিকে তাকালেন, তারপর আমার দিকে। একবার বাচ্চার দিকে এবং তারপর টেবিলের দিকে তাকালেন। মনে হলো, মহিলা ঠিক গুছিয়ে উঠতে পারছেন না কোথা থেকে শুরু করবেন। ডাক্তারদের ধৈর্যশক্তি প্রচন্ড, আমি ধৈর্য ধরে রইলাম। তারপর মহিলা চট করে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট স্বরে বললেন,
— আমার বাচ্চাটা মাঝে মাঝে পরিষ্কার বাংলায় কথা বলে…
থতমত খেয়ে জিজ্ঞেস করলাম আমি,
— মানে?
মহিলা কোলের বাচ্চাটিকে আবারো সামান্য উঁচু করে আমায় দেখালেন। তারপর হতাশ তবে স্পষ্ট স্বরে বললেন,
— আমার বাচ্চা…। ওর বয়স সাত মাস। ও আর দশটা স্বাভাবিক বাচ্চার মতো নয়। জন্মাবার পর চিৎকার করে কাঁদেনি, এখনো কাঁদেনা। কান্না পেলে ঠোঁট কাঁপে, আর চোখ দিয়ে সমানে পানি বের হয়। হাসে; হাসিতে শব্দ হয়না।
আমি চুপ করে হা হয়ে মহিলার কথা শুনছি, কে জানতো, আমার ডাক্তারি জীবনের সবচেয়ে অদ্ভুত সময়টার মুখোমুখি হতে যাচ্ছি আমি!
….
— আমার নাম রাবেয়া। আমার বাচ্চাটার এখনো নাম রাখিনি, একেকজনে একেক নামে ডাকে। ওর বাবা ডাকে, পুঁটি। দাদা- দাদী ডাকে, মনি। চাচা ডাকে জয়ী। চাচা অবশ্য ঘোষণা করে দিয়েছে, ওর নাম জয়ীই রাখা হবে। আমি ডাকি, চুপকথা। আমরা বাবা- মা, স্বামী আর স্বামীর ছোটভাই সবাই একসাথে। আমার বাচ্চার প্রথম কথা বলার ঘটনাটা বলি। সেদিন শুক্রবার। দুপুরবেলা। সবাই জুমআ পড়তে গেলো। বাসায় আমি ছাড়া আর দু’জন। মা এবং স্বামীর ছোট ভাই। সে জুমআ পড়েনা। নাম জুনায়েদ। বয়স পঁচিশ- ছাব্বিশ হবে। চাকুরি খুঁজছে, আপাতত বেকার। দুপুরে আমি বাচ্চাকে ঘুম পাড়িয়ে স্নান করতে ঢুকি, বের হয়ে দেখি রুমে জুনায়েদ। বিছানায় বসে আছে। আমি লজ্জার চেয়েও বেশি ভয় পাই। গা কাঁপতে থাকে আমার। তারপরেও গায়ের কাপড় টেনে আরেকটু জড়িয়ে নিয়ে জোর করে স্বাভাবিক থেকে কাঁপা কাঁপা স্বরে বলি, ‘কি ব্যাপার জুনায়েদ? জুমআ পড়োনা কেন তুমি?’ জুনায়েদ আমার দিকে ঘোর লাগা চোখে তাকায়। আমি বুঝতে পারি ওর চোখের ভাষা। ভয়ে গা শিউরে উঠে। আমার চিৎকার করতে ইচ্ছে করে। অথচ চিৎকার করে লাভ নেই। মা কানে তেমন শুনেন না, শুনলেও উঠে যে এই রুমে আসবেন সেই ক্ষমতাও উনার নেই। আমি কি করবো ভেবে পাইনা। জুনায়েদ আমার দিকে এগিয়ে আসে, আমি হাতজোড় করে বলি। ‘প্লিজ জুনায়েদ, তুমি আমার ছোট ভাইয়ের মতো। পাপ হবে, প্লিজ।’ জুনায়েদ মুচকি হাসে, আমার গা শিউরে উঠে। জুনায়েদ এসে আমার ভয়ে কাঁপতে থাকা শরীর স্পর্শ করে। ঠিক তখনিই প্রথমবার চিৎকার করে কেঁদে উঠে আমার বাচ্চাটা! আমার মতো জুনায়েদও ভীষণ চমকে উঠে, প্রথমবারের মতো বাচ্চার কান্নার আওয়াজ শুনে। আমি ঝটকা দিয়ে ওর হাত সরিয়ে বাচ্চাকে কোলে নিয়ে পাশের বাসায় চলে যাই। তবে কাউকে কিছু বলিনা, বাসায় আসলে কি ঘটছে।
রাবেয়া থামলো, আমি পানি এগিয়ে দিলাম। পানি খাওয়ার জন্যে রাবেয়া হিজাব খুললো। আমার চোখ ধাঁধিয়ে গেলো একমুহূর্তের জন্যে। স্নিগ্ধ একটা মুখ, চিকন নাক, নাকের উপর একটা তিল রাবেয়ার। পানি খেয়ে আবার হিজাব পরে রাবেয়া বলতে শুরু করলো,
— আমি বাচ্চার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে আল্লাহকে ধন্যবাদ দিই। বাচ্চার এতোটুকুন চেহারায় আমি স্পষ্ট দেখি লালচে আভা। প্রচন্ড রাগে কান্না করলে ফর্সা মানুষের চেহারা যেমন লালচে হয়ে যায়, ঠিক তেমন। কেন যেন বাচ্চা রেগে আছে! কি অদ্ভুত! আমি বাচ্চার কপালে, তুলতুলে নাকে, গালে চুমুতে ভরিয়ে দিই। বাচ্চার লালচে চেহারা আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হয়ে আসে। সে রাতে স্বামীকে অনেকবার বলতে যেয়েও থমকে থমকে গেলাম। তারপর বললাম না আর, আরো অনেক কিছুর মতো এটাও চেপে গেলাম। কেননা, সবার সামনে জুনায়েদ আমাকে ভীষণ শ্রদ্ধা- সন্মান করে। স্বামী কখনোই বিশ্বাস করবেনা, তাছাড়াও স্বামীর সাথে আমার সম্পর্ক টা অতোটা মধুর ও নয়! উল্টো আমাকেই দোষী ভাববে। সে রাতের অনেকক্ষণ পর্যন্ত চুপিচুপি বাথরুমে গিয়ে কাঁদলাম। তারপর বাচ্চাকে কোলে নিয়ে বারান্দায় হাঁটলাম কিছুক্ষণ। কোলের মধ্যে বাচ্চার হাত পা নড়াচড়া বন্ধ হলো, ভাবলাম বাচ্চা ঘুমিয়েছে। তাকিয়ে দেখি বাচ্চা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে আছে, আমি অবাক হই, কি অদ্ভুত দৃষ্টি! আমি কপালে চুমু খাই। বাচ্চা ঐভাবেই আমার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে স্পষ্ট স্বরে স্পষ্ট বাংলায় স্পষ্ট উচ্চারণে বললো, ‘তোমার সব খুলে বলা উচিৎ ছিলো…!’
…..
পানির গ্লাস নিয়ে পানি খাই আমি, আমার মনে নেই রাবেয়ার পরে সিরিয়ালে আরো অনেকজন বাইরে অপেক্ষা করছে। রাবেয়া থামলো। তারপর বললো,
— আমি আবার আসবো। এখন যাই।
আমি বাচ্চাকে ইশারায় দেখাই, রাবেয়া বলে,
— পুরোটা না শুনলে বাচ্চার সমস্যাটা বুঝবেন না। আজ এতোটুকুন থাক, আমি আসবো আবার..
আমি শুধু মাথা নাড়লাম, রাবেয়া চলে গেলো। আমার মনে নেই কখন সব কাজ মিটিয়ে বাসায় ফিরলাম। মাথায় শুধু রাবেয়া ঘুরছে। নিতু আমার উদভ্রান্ত চেহারা দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলো কি হয়েছে। কিছু বলতে পারলাম না ও কে।
আমি বৃহস্পতিবারের অপেক্ষায় আছি, রাবেয়া আসবে আবার। একটা বাচ্চা কোলে নিয়ে। বাচ্চাটার অদ্ভুত ক্ষমতা।
রাতে নিতু কে জিজ্ঞেস করলাম,
— আচ্ছা নিতু, ধরো একটা সাত মাস বয়সী বাচ্চা পরিষ্কার বাংলায় স্পষ্ট স্বরে স্পষ্ট উচ্চারণে কথা বলছে! তাও উপদেশমুলক! কিভাবে সম্ভব?
নিতু প্রথমে মুখ টিপে হাসলো, তারপর আমার গলা জড়িয়ে বললো,
— ভুল করেছো! তোমায় ডাক্তারি নয়, সাহিত্য নিয়ে এগুনো উচিৎ ছিলো।
আমি কিছু বললাম না আর, কিছুক্ষণ পর নিতুই নিজ থেকে বললো,
— ছোট্ট বাচ্চার কথা বলা নিয়ে আমি এর আগে পড়েছি। একটা ধর্মীয় বইয়ে। একটা বাচ্চার কথা জানি আমি। একজন নবীর নিষ্পাপ এবং পবিত্রতা ঘোষণার জন্যে যে বাচ্চাটি কথা বলেছিলো।
আমি চুপ করে রইলাম। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত। চেম্বারে পৌঁছালাম সময়ের আগেই। প্রথম সিরিয়াল রাবেয়ার। আজ বাচ্চাটিকে কোলে নিবো একবার। রাবেয়া এলো একটু দেরী করে, আজ সে শুরু করলো গল্পের অন্য জায়গা থেকে,
— ছোটবেলায় মোসাদ্দেক হুজুর নামে একজন এসে আমায় বাসায় আরবী পড়াতো। স্কুলের বাইরে আমাকে কোথাও যেতে দেয়া হতোনা। প্রাইভেট ও বাসায় এসে পড়াতো টিচার। আমার বয়স তখন নয় বৎসর। হুজুরের সামনে আমি গুটিয়ে থাকতাম, কেননা সামান্য ভুলে তিনি প্রচন্ড শাস্তি দিতেন। তার প্রিয় উক্তি ছিলো, ‘আরবী পড়া নিয়া তামাশা করবা না!’ তিনি আরবী পড়াতেন সকালে। বাবা অফিস যেতো, বাসায় মা আমি আর দাদী। মা দিনের অর্ধেক সময় রান্না ঘরেই থাকতেন, দাদী শুয়ে। মোসাদ্দেক হুজুর আমায় শাস্তি দিতেন অদ্ভুত এবং উদ্ভট টাইপের। তখন আমি ঠিক করে কিছুই বুঝতাম না। এখন ঘৃণায় গা শিউরে উঠে। তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি প্রথমবার সুযোগ বুঝে আমার স্পর্শকাতর জায়গাগুলোয় হাত দিয়েছেন!
….
রাবেয়া আজ চোখে কাজল দেয়নি, চোখ গতকালের মতোই ছলছল করছে, তবে এখন রাবেয়া কাঁদছে। আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি। ওর শরীর দুলছে। রাবেয়ার কিছুক্ষণ লাগলো নিজেকে সামলাতে, তারপর বললো,
— আমি অনেকদিন পর্যন্ত চেপে গেলাম। তারপর একদিন সহ্যের বাইরে চলে যায়, আমি মাকে জানালাম ব্যাপারটা। মা চোখ বড় করে ঠোঁটের উপর তর্জনী আঙ্গুল লাগিয়ে সেই প্রথমবার বললেন, ‘শশশ… কাউকে বলোনা!’ মা, সেদিনই বাবাকে অন্য হুজুর দেখতে বললেন, তবে ঘটনা কিছুই খুলে বললেন না। ফলে বাবা ও কিছুই বুঝলেন না। মায়ের এই অদ্ভুত আচরণ আমায় ভোগালো অনেক। তিনি কেন চেপে গিয়েছিলেন ব্যাপারটা বাবার কাছে, ভেবে ভেবে প্রচন্ড মন খারাপ করেছি। হুজুর এটার কাছেই আমায় পড়া লাগলো। তবে এইবার মা কাছাকাছি দুরত্বে বসে থাকলেন পড়ানোর সময়টায়। তাও সবসময় বসে থাকতে পারতেন না, দু’মিনিটের জন্যে রান্নাঘরে গেলে আমি টের পেতাম এই পৃথিবী আর পৃথিবীর মানুষগুলো কতোটা নোংরা! সারা রাত কাঁদতাম, এতোটুকুন বয়স আমার অথচ বুঝতে শিখে গিয়েছি… জীবনের অনেকটা সময় আমায় ঠোঁটের উপর তর্জনী লাগিয়ে ‘শশশ…’ শুনে চেপে যেতে হবে অনেক ব্যথা- কষ্ট- কথা!
রাবেয়া থামলো আরেকবার। কোলের বাচ্চাটা স্বাভাবিক আর দশটা বাচ্চার মতোই খেলছে, চুপচাপ। গায়ে জড়ানো সাদা চাদর নড়ছে। রাবেয়া বললো,
— সেই ভয় ঢুকলো। তারপর বড় হলাম। স্কুল- কলেজ। ফ্রেন্ড। মেয়ে বন্ধু হলো, তবে কোনো ছেলে বন্ধু নয়। পুরুষ শব্দটায় ভয় ঢুকে গেছে ততদিনে। তাড়াতাড়িই আমার বিয়ে ঠিক হয়। স্বামীরা দুইভাই। আর বাবা- মা। চারজনের ছোট্ট সুন্দর পরিবার। আর্থিক অবস্থা ভালো, স্বামী একটা সরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করে। আমি ফুলশয্যায় স্বামীকে ছুঁতে দেইনি শরীর। কতো স্বপ্ন থাকে এ রাত নিয়ে, অথচ একটা প্রচন্ড ভীতি আঁকড়ে ধরে রেখেছে ও রাতে আমায়। আমি আমার শরীরে একটা লোমশ হাতের স্পর্শে শিউরে উঠি। ঐ স্পর্শ, যেটা আমার প্রানবন্ত শৈশবকে গলা টিপে হত্যা করেছিলো! স্পর্শ করতে না দেয়ায় স্বামী প্রচন্ড অপমানিত বোধ করলো। ওপাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়লো। আমি অর্ধেক রাত পর্যন্ত কাঁদলাম। আমার জীবনটা এমন হলো কেন?
…..
— আমায় কখনো বুঝেনি স্বামী, বুঝতে চায়নি, শুনতে চায়নি কিছুই। আমি আমার স্বামীর হাতে ধর্ষিত হই বিয়ের চার দিন পর। তারপর অসংখ্যবার। আমার পেটে আমার ছোট্ট চুপকথা আসে। আমার কান্না পায়। এই বাচ্চাটি ভালোবাসায় জন্মায়নি! বারান্দায় বসে রাতভর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদি। চিৎকার করতে ইচ্ছে করে। পারিনা। আমার পাশে আমারিই একটা বিচ্ছিরি ছায়া ঠোঁটে তর্জনী লাগিয়ে বলে, ‘শশশ…!’ স্বামীর সাথে সম্পর্ক বিয়ের প্রথমদিন থেকেই ভালো ছিলোনা, পরবর্তীতে তা আরো খারাপ হয়। আমি চেপে যাই আমার ভয়ংকর অতীত। আমাদের কখনো ভালোবাসা বাসি হয়নি। চুপকথা দ্বিতীয় বার কথা বলে, যখন স্বামীর হাতে কোনো একটা তুচ্ছ কারণে থাপ্পড় খেয়ে এসে আমি তার দিকে মুখ করে শুয়ে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়েছি। আমার গালে চুপকথার তুলতুলে কোমল হাতের স্পর্শ লাগে, চোখ খুলি আমি। চুপকথা আগের মতো করেই স্পষ্ট স্বরে বলে, ‘তোমার সব বলা উচিৎ ছিলো।’
অনেকক্ষণ হয়ে গেছে, রাবেয়া ইতস্তত করে। আমি বলি,
— সমস্যা নেই, আপনি বলুন। আজ আর কাউকে দেখছিনা আমি…
রাবেয়া বলতে শুরু করে আবার,
— আমি হতভম্ব হই, প্রথমবার বাচ্চার আওয়াজ স্পষ্ট শুনেও মনকে বুঝিয়েছি, ওটা বিভ্রম। এতোটুকুন একটা বাচ্চা আবার কথা বলতে পারে নাকি! কিন্তু এবার! আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করি, ‘তুমি কথা কিভাবে বলছো?’ বাচ্চা আগের মতো খেলতে শুরু করে, প্রশ্ন শুনে আমার নিজেরই নিজেকে বোকা বোকা মনে হয়! চুপকথা তৃতীয়বার কথা বলে, তারপর আরো বেশ কয়েকবার। খেয়াল করলাম, বাক্যটা ক্রমশ আরো ছোট হয়েছে। ‘তোমার বলা উচিৎ ছিলো…!’ ‘বলা উচিৎ ছিলো!’ ‘বলো…!’
রাবেয়া থামে, কিছু কথা গুছিয়ে নিয়ে বললো,
— শেষবার চুপকথা কথা বলে, যখন স্বামী আমায় জুনায়েদের কাছ থেকে মন গড়া গল্প শুনে অবিশ্বাস করে চরিত্রহীন বলে গাল দেয়। আমি চুপ করে সব শুনে যাই। মাঝে মাঝে এখন রাতে বাড়ি ফিরেনা স্বামী, কোথায় থাকে জানিনা। আমি চুপকথাকে বুকে জড়িয়ে ধরে ঘুমোই। চুপকথা বলে, ‘বলো…!’ আমি জিজ্ঞেস করি, ‘তুমি কথা কেন বলো আম্মু?’ চুপকথার স্পষ্ট স্বর শুনি, ‘কারণ, তুমি কখনোই বলোনি….!’
রাবেয়া থামে। আমি হা হয়ে শুনি। রাবেয়া বাচ্চাকে আমার কোলে দেয়। অনেকদিন কথা বলছেনা আর চুপকথা। আমি চুপকথাকে কোলে নিই।
পাঁচটা বেজে পঞ্চান্ন মিনিট তখন। পাঁচ পাঁচ পাঁচ। ম্যাজিক সংখ্যা। চুপকথা হাত বাড়িয়ে আমার গাল স্পর্শ করে। একটা কথাও বলছেনা সে। যেন অভিমান জমে আছে! আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকি।
রাবেয়া কে আমি কিছুই বলতে পারিনি। কেন বাচ্চাটা কথা বলছে এটাই আশ্চর্য, কেন বাচ্চাটা কথা বলছেনা সেটা নয়! আমরা অস্বাভাবিক কিছুতে অতিদ্রুত স্বাভাবিক আর অভ্যস্ত হয়ে যাই। রাবেয়া ও হয়েছে। ছোটবেলা থেকেই। একটা শব্দে। যে শব্দ অস্বাভাবিক- চেপে রাখে যা, গোপনে। খুন করে- আস্তে আস্তে মেরে ফেলে যেটা। একটা নোংরা- বিচ্ছিরি- গলা টিপে দেওয়া শব্দ। ‘শশশ….!’
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
Tuesday, March 15, 2022
শিশুকে কতোক্ষণ স্ক্রিন ব্যবহার করতে দেওয়া উচিত?
![]() |
| শিশুটিও স্ক্রিন ব্যবহার করছে |
শিশু সন্তানকে খাওয়ানোর কাজটা সহজ করতে অনেকে পিতামাতা এসব স্ক্রিনের সাহায্য নিয়ে থাকেন। দেখা গেছে, বাচ্চাদের হাতে এসব তুলে দিলে তারা এগুলোতে বুদ হয়ে থাকে এবং তখন তাদেরকে খাওয়াতে খুব একটা ঝামেলা হয় না।
কিন্তু শিশুকে এসব স্ক্রিনের সামনে খুব বেশি সময় কাটাতে দিলে তার পরিণতি কী হতে পারে সেবিষয়ে কি আপনি সচেতন?
কানাডায় এসম্পর্কে চালানো বড় একটি গবেষণায় দেখা গেছে, এর ফলে শিশুদের দক্ষতার বিকাশে বিলম্ব ঘটতে পারে যার মধ্যে রয়েছে কথা বলতে শেখা এবং অন্যান্যদের সাথে মেলামেশা।
দুই বছর বয়সী প্রায় আড়াই হাজার শিশুর উপর নজর রাখার মাধ্যমে এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে।
বাচ্চাদেরকে আসলে ঠিক কতোটুকু সময় স্ক্রিনের সামনে থাকতে দেওয়া নিরাপদ সেনিয়ে যখন কথাবার্তা চলছে তখনই এই গবেষণাটির ফলাফল প্রকাশ করা হলো।
কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাচ্চার বয়স দেড় বছর হওয়ার আগ পর্যন্ত তাদেরকে স্ক্রিন ব্যবহার করতে দেওয়া ঠিক নয়।
তবে কোন কোন বিশেষজ্ঞ অবশ্য বলছেন, এজন্যে সুনির্দিষ্টভাবে কোন বয়সসীমা বেঁধে দেওয়া খুব কঠিন।
এই গবেষণায় পাঁচ বছর ধরে মায়েদের ওপরেও জরিপ চালানো হয়েছে। বাচ্চাদের স্ক্রিন ব্যবহারের ওপর তাদেরকে প্রশ্ন করা হয়েছে। জানতে চাওয়া হয়েছে কোন বয়সে তাদের আচরণ ও দক্ষতা কেমন ছিল।
এসব স্ক্রিনের মধ্যে রয়েছে টেলিভিশনের অনুষ্ঠান দেখা, কম্পিউটার, ফোন এবং ট্যাবলেটের মতো ডিভাইসে ভিডিও দেখা ও গেম খেলা।
দেখা গেছে, দুই বছর বয়সী বাচ্চারা প্রতি সপ্তাহে গড়ে ১৭ ঘণ্টা করে স্ক্রিনের সামনে কাটায়। কিন্তু তাদের বয়স যখন তিনে পৌঁছায় তখন তাদের স্ক্রিন টাইমও বেড়ে দাঁড়ায় সপ্তাহে ২৫ ঘণ্টা। আবার যখন পাঁচ বছর হয় তখন সেটা কমে হয় ১১ ঘণ্টা। সাধারণত শিশুরা এই সময়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়া শুরু করে।
গবেষণার ফলাফলে বলা হয়েছে, স্ক্রিন টাইম বেড়ে যাওয়ার কারণে শিশুদের বিকাশে যে দেরি হয় সেটা খুব সহজেই চোখে পড়ে। দেখা গেছে, ঠিক তখনই স্ক্রিন টাইম আরো বেড়ে গেছে।
কিন্তু এর জন্যে স্ক্রিনের সামনে কতোটুকু সময় কাটাচ্ছে বা তারা স্ক্রিনে কী দেখছে- এর কোনটা সরাসরি দায়ী সেটা পরিষ্কার নয়। এর সাথে হয়তো আরো অনেক কিছুর সম্পর্ক থাকতে পারে। যেমন শিশুটি কিভাবে বেড়ে উঠছে অথবা শিশুটি কিভাবে তার সময় কাটাচ্ছে।
![]() |
| আজকাল শিশুদের হাতে তাদের বাবা মায়েরাই স্ক্রিন তুলে দেন নিজেদের ঝামেলা এড়াতে। |
তারা বলছেন, এই সময়ে আরেকজনের সাথে কথা বলা ও শোনার দক্ষতা তৈরি হতে পারে। দৌড়ানো, কোন কিছু বেয়ে উপরে ওঠার মতো শারীরিক দক্ষতাও সে অর্জন করতে পারতো।
তবে এও বলা হচ্ছে যে, দেরি হয়ে গেলেও বাচ্চারা হয়তো পরে এসব দক্ষতা অর্জন করে ফেলতে পারে।
গবেষক ড. শেরি মেডিগ্যান এবং তার সহকর্মীরা বলছেন, শিশুরা যাতে খুব বেশি সময় স্ক্রিনের সামনে না কাটায় সেদিকে নজর রাখা ভালো। এই বিষয়টি যাতে বাচ্চাদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ কিম্বা পারিবারিক সময়কে কমিয়ে দিতে না পারে সেদিকেও খেয়াল রাখা জরুরী।
তারা আরো বলছেন, এই গবেষণাটিতে হয়তো আরো কম বয়সী শিশুদের উপর নজর রাখার প্রয়োজন ছিল। কারণ দেখা গেছে, সাধারণ এক বছরের মাথায় শিশুরা বেশি সময় ধরে স্ক্রিন ব্যবহার করতে শুরু করে।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে কতোটুকু সময়কে খুব বেশি সময় বলে ধরা হবে?
এই প্রশ্নের আসলে সন্তোষজনক কোন উত্তর নেই।
নতুন এই গবেষণায় এরকম কোন সুপারিশও করা হয়নি যে শিশুকে কতো সময়ের বেশি স্ক্রিন দেখতে দেওয়া উচিত নয়।
মায়েদের দেওয়া তথ্যে দেখা গেছে যে দুই বছর বয়সী এসব শিশুর কেউ কেউ দিনে চার ঘণ্টারও বেশি এবং সপ্তাহে ২৮ ঘণ্টার মতো স্ক্রিন ব্যবহার করছে।
তবে এবিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের শিশু বিশেষজ্ঞদের কিছু পরামর্শ আছে:
যেসব শিশুর বয়স দেড় বছরের কম তাদেরকে স্ক্রিন ব্যবহার না করতে দেওয়াই ভালো। তবে তাদের সাথে ভিডিও চ্যাট করা যায়।
দেড় থেকে দুই বছর বয়সী শিশুর যেসব পিতামাতা তাদের সন্তানকে ডিজিটাল মিডিয়ার সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে চান তাদের উচিত বাচ্চাদেরকে মানসম্মত অনুষ্ঠান দেখতে দেওয়া। এসময় বাবা মায়েরও উচিত তাদের সাথে বসে এসব দেখা এবং তারা কী দেখছে সেটা বুঝতে তাদেরকে সাহায্য করা।
দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদেরকে দিনে এক ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন দেখতে দেওয়া উচিত নয়। এবং যা দেখবে সেটাও যাতে মানসম্মত হয়। পিতামাতাকেও তাদের সাথে বসে এসব অনুষ্ঠান দেখতে হবে।
ছয় বছরের বেশি শিশুদের জন্যেও স্ক্রিন ব্যবহারের ব্যাপারে সময়সীমা বেঁধে দেওয়া উচিত। সেটা সবসময় একই রকম থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে স্ক্রিন যাতে ঘুমানোর কিম্বা খেলার সময় কেড়ে না নেয়।
তবে কানাডার শিশু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুই বছরের নিচে কোন শিশুকে স্ক্রিন দেখতে দেওয়া ঠিক নয়।
![]() |
| এসব স্ক্রিনের মধ্যে রয়েছে টেলিভিশনের অনুষ্ঠান দেখা, কম্পিউটার, ফোন এবং ট্যাবলেটের মতো ডিভাইসে ভিডিও দেখা ও গেম খেলা। |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
গল্প- মেহেরজান by ওয়াসি আহমেদ

এবার পদ্মর পাঠানো টাকার পরিমাণ বেশি। একুশ হাজার সাতশো হয়ে কিছু খুচরাও। বরাবর মাসে মাসে যা পাঠায় তাতে বাংলা টাকায় দশ-এগারো হয়। এবার যে বেশি পাঠাল, ফোনে তো কিছু বলল না। দিনতিনেক আগে শেষ ফোন। কথা বেশি বলেনি, টাকা পাঠাচ্ছে, মেহেরজান যেন ব্যাংকে সুকুমার স্যারের কাছে গিয়ে খোঁজ করে, বলেই পরে কথা বলবে বলে লাইন কেটে দিয়েছিল। খোদা হাফেজ, ভালা থাইকো, দুয়া কইরো – এসব কথার কথা ফোন ছাড়ার আগে বরাবর বললেও সেদিন বলেনি। হয়তো ডিউটির টাইম, বা হতে পারে তার ম্যাডামের পার্লি পার্লি ডাক শুনে খাস আরবি জবানে জবাব দিতে দিতে ছুটে গেছে।
মেয়ের নামটাও মেহেরজানের মনে থাকে না। সারাক্ষণ মনের মধ্যে পদ্ম পদ্ম। ফোনে যখন কথা হয়, মেহেরজান সোহাগ করে পদ্মসোনা ডাকে, পার্লি আপত্তি করে না। তবে একবার মনে আছে – বলেছিল, পদ্মরে ভুলতে পারতেছ না, ঠিকাছে মন চায় ডাইকো। ডাকনাম ইলু বিলু কতকিছুই অয়, কিন্তু আমার গুডনেম মানে ভালা নাম মনে রাখবা পার্লি আক্তার। পাসপুটের নাম। আর ভোটার আইডি যে করছিলাম, কেরামত হারামি দুই মাস ঘুরাইয়া চাইর হাজার টেকা দালালি খাইলো, ওইখানেও নাম পার্লি, পার্লি আক্তার। আরো আছে, ব্যাংকে সুকুমার স্যার অ্যাকাউন্ট খুইলা বই দিলো, নাম একই। তুমি আমারে পদ্ম কইতে চাও কও, মাইনষ্যেরে গুডনেম বলবা। বলবা আকিকা কইরা এই নাম রাখছো।
বুক তড়পায় মেয়ের কথায়। পদ্ম আকিকার কথা বলতে পারল! জন্মানোর পর তো যায়-যায় অবস্থা। তিন-চার মাস বসিত্মর পাতানো খালা জয়তুনবুড়িই পালল, কী মনে করে যে পদ্ম ডাকত সে-ই জানে। আর মেহেরজানের নিজেরও তখন বাঁচা-মরার ঠিক ছিল না। তোরাব আগে থেকেই ভাগার তালে ছিল; যেই দেখল ঘরের এমন হাল – একে বাচ্চা, মেয়ে বাচ্চা, তার ওপর বউ মরোমরো, বাঁচে যদি, বাসাবাড়ির কাম-কাজ ধরার ভরসা কম – সে তখন অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নিতে, মানে বেপাত্তা হতে দেরি করেনি। আকিকা করে নাম রাখতে হয় এ-খবর তাহলে পদ্ম জানে! নিজের তার আকিকা হয়নি, নামও রাখা হয়নি, তারপরও বাচ্চার নাম রাখতে আকিকার মতো ঘটনার খবর পদ্ম জানে না – কী করে হয়! পদ্ম কি আগের পদ্ম আছে!
সুকুমার স্যার বলল, কী গো, মেয়ের রোজগার সব শেষ করে দিবা নাকি? বিদেশে খাটনি খেটে টাকা পাঠায়, মাসে মাসে কিছু জমাও। মেয়ে সারাজীবন বিদেশে থাকব নাকি!
পদ্ম সারাজীবন বিদেশে থাকবে না এ-কথা মনে হলেই মেহেরজানের বুক ধড়ফড় করে। চার বছরের বেশি পদ্ম দেশছাড়া। চার বছর কম সময় নয়। মেয়েকে একনজর দেখতে সারাক্ষণ ভেতরে জ্বালাপোড়া, তাই বলে ফিরে আসবে ভাবলেই মাথায় বুঝি আসমান ভেঙে পড়ে। রুজি-রোজগারের ধান্ধা বাদ দিয়ে গত চার বছর মেয়ের টাকায় চলছে, বয়স বাড়ায় শরীর-গতর ভারী হয়েছে। বসে বসে খেলে যা হয়। এদিকে মেয়ের কড়া হুকুম – কাম করতে পারবা না। আমি আছি না? কথায় কী জোর, আর পরান-উথালি মায়া! কী কপালেই-না এমন সোনার টুকরা পেটে ধরেছিল, আগে যদি জানত!
কাজ করতে দিতে পদ্মর আপত্তি নিয়ে কথা বলে লাভ হয়নি। যেন জ্ঞান হওয়ার পর থেকে মাকে কাজ করতে দেখে দেখে সে অতিষ্ঠ। পদ্ম তখন সবে দুই-চার পা হাঁটে, জয়তুনবুড়ি মেহেরজানকে রোজগারের বুদ্ধি বাতলালো। বাসাবাড়ির কাম তো করছস, কয়টা টেকাই-বা, তোর বেশি বেশি রুজি দরকার। সেই বেশির পথ ছিল খোয়া ভাঙা। জয়তুনখালা একসময় করেছে। খাটনি যেমন, পয়সাও তেমন। তোর আর তোর মাইয়ার খাওন-পরন ভালাই চালাইতে পারবি, বুদ্ধি কইরা খরচ করলে কিছু জমাইতেও পারবি। মেহেরজান রাজি। খোলা আসমানের নিচে আগুন-রোদে মাথায় গামছা পেঁচিয়ে হাতুড়ি-ঘাই মেরে ইট ভেঙে সাইজমতো খোয়া বানানো। প্রথম প্রথম ব্যথার চোটে কনুই-ঘাড়-কোমর মনে হতো খুলে খুলে পড়বে। ব্যথা কমার বড়ি খেয়েও রাতে ঘুমাতে পারত না। তার ওপর ভয়ডরও কম ছিল না। ইটের টুকরা-ধরা হাতে বা আঙুলে একটা ঘা পড়লে হাড়-হাড্ডি মিসমার হতে কতক্ষণ! টায়ারের টিউব কেটে আঙুল-বাঁচানি হাতা কত আর ঠেকাতে পারত। কপাল ভালো যে অঘটন কিছু ঘটেনি। তবে রুজি যে বেশি হবে বলেছিল জয়তুনখালা, কথা ঠিক। প্রথম যখন কাজ ধরল তখনই দিনে দুইশো টাকা। সেই আমলে সোজা কথা! ঘরভাড়া ম্যালা বাকি পড়েছিল, এছাড়া নানাজনের কাছে ধারকর্জ। আসেত্ম আসেত্ম মিটিয়েছে। টাকার গন্ধ শুঁকে তোরাব ভিড়তে নানা কায়দাকানুন করেছে। মেহেরজান পাত্তা দেয়নি, মনে মনে বলেছে, সামনে যুদি পাই এই আতুড়ির তলে কলস্না খুয়াইবি হারামির বাচ্চা।
সুকুমার স্যারের কথা ঠিক; কিন্তু নিজের খোরাকির খরচ আর ঘরভাড়া মিটিয়ে পদ্মের দশ-এগারো থেকে হাতে কী-ই-বা থাকে! তবে একেবারে কিছুই যে মেহেরজান জমায় না তা-না। জমাতে পারত আরো, যদি নিজে কিছু করত। মেয়ে বাগড়া দিয়েছে ঠিক, কিন্তু যদি কিছু একটা করার পথ পায় পদ্ম জানবে কী করে! সেলাই-ফোঁড়াই জানলে কিসিত্মতে একটা মেশিন কিনে বাড়তি রোজগারের পথ বের করতে পারত। কিন্তু এ-বয়সে কার কাছে সেলাই শিখবে! বাসাবাড়িতে ছোটা-কাজ চাইলেই পাওয়া যায়। বসিত্মতে কতজনই তো করে। মুখ ফুটে বললেই কাজ জুটবে। কিন্তু পদ্মর কানে যদি যায়? মাঝে মাঝে ভেবেছে পদ্মকে বুঝিয়ে-সুজিয়ে রাজি করাবে, সাহসে কুলায়নি। এ পদ্ম আগের পদ্ম না, শুনে কী করবে বলা মুশকিল। পদ্ম নিজে অবশ্য যে-কাজ করে সেও বাসাবাড়ির কাজ, তবে বিদেশ তো বাংলাদেশ না যে বাসাবাড়ির কাজ মানে ঝিগিরি। পদ্ম যে-কাজ করে সেটা বাচ্চা রাখার, ইংরেজি নাম বেবিসিটিং – পদ্ম বলেছে। তার ম্যাডামের দুই বাচ্চা, দুইটাই মেয়ে। কাজ বলতে বাচ্চাদের মম-ড্যাডি মানে মা-বাবা বাইরে কাজে চলে গেলে ওদের খাওয়ানো, জামাকাপড় বদলানো, ওদের নিয়ে টিভিতে কার্টুন ছবি দেখা, আর দুনিয়ার খেলার জিনিস নিয়ে ওদের সঙ্গে খেলা। ঝিগিরি যে নয়, তার প্রমাণ পদ্মর পাঠানো ছবি। কে বলবে এ আগের পদ্ম! পার্লি, হ্যাঁ পার্লি বললে মানায়। পরনে জিনসের প্যান্ট, গাঢ় গোলাপি টিশার্ট, আর পায়ে যে-জুতা এদেশে কয়জন বড়লোকের মেয়ে এমন তুলতুলে লোম-লোম জুতা পায়ে দেয়! পুরু গদির সোফায় বসে মেয়ে তার টিভি দেখে, হাতের পাঞ্জায় বেড় না পাওয়া চ্যাপ্টা মোবাইল। চেয়ার-টেবিলে বসে খায়। চেহারা-সুরত আগেও খারাপ ছিল না, যত্নের অভাবে আসল চেহারা চাপা পড়ে ছিল। এখন দেখলে, নিজের মেয়ে বলে না, চোখ ফেরানো কঠিন। পথেঘাটে কত মেয়েই তো দেখে, কয়জনের ক্ষমতা আছে তার পদ্মর পাশে দাঁড়ায়! লেখাপড়া তো বসিত্মর ইশকুলে ফাইভ পর্যন্ত, কেউ বলবে এখন এ-কথা! আর আরবি জবান যে ও শিখল, কেউ শিখিয়েছে? নিজে নিজে এর-ওর মুখে শুনে এখন তো তার জবান পাক্কা সে-দেশের মানুষের জবানের মতোই।
এই পদ্মর কারণে একটা সময় গেছে মেহেরজানের শান্তিতে শ্বাস ফেলার ফুরসত মিলত না। সারাদিন খাটনি খেটে ঘরে ফিরতে না ফিরতে নালিশ আর নালিশ। একে মেরেছে, ওর খেলনা চুরি করেছে। কিছুটা বয়স বাড়তে বড় বড় নালিশও আসতে শুরু করল। বসিত্মর উঠতি মাস্তানদের সঙ্গে ফুসুর-ফুসুর, ঢলাঢলি। দু-একবার বেকায়দায় ধরা পড়ে বিচার-সালিশ পর্যন্ত গড়িয়েছে। এ-অবস্থায় মেহেরজান হাত গুটিয়ে থাকে কী করে! খোয়া-ভাঙা হাতে হাতুড়ি থাকলে বুঝি সুবিধা হতো, মাথা গুঁড়ো করে মাপমতো খোয়া বানাতে না পারলেও ছেঁচতে অসুবিধা কী!
কী মারটা না মারত! মার খেয়ে খেয়ে ও হয়তো ঠিক করে ফেলেছিল – মারবা মারো, কত আর মারবা, আমার মন যা চায় করুম। খোয়াভাঙা রুজি তোমার, আমার পথ আমার। অনেকদিন ধরেই হয়তো মনে এমন জেদ বাসা বাঁধতে শুরু করেছিল, মেহেরজান টের পায়নি। পরিবর্তনটা নজরে পড়ল পদ্মর বয়স যখন পনেরো-ষোলো, শরীরে বাড় বেশি বলে মনে হতো সতেরো-আঠারো – একদিন ঘোষণা দিলো সে কাজ ধরবে, কাজ নাকি ঠিকও
করে ফেলেছে। না, খোয়া ভাঙাভাঙি না, বাসাবাড়িতে ঝিগিরিও না। সে করবে চাকরি, চাকরির নাম সেলসগার্ল। এক বড়লোক মহিলার এলাহি দোকান, মেহেরজান বুঝবে না তাই বলেছিল দোকান, আসল নাম শোরুম। বাচ্চাদের, মহিলাদের জামাকাপড়, অলংকার, ঘর সাজানোর হাজারো জিনিসে ঠাসা। আরো বলেছিল – দোকান বড়লোকগো পাড়ায়, ধানম–তে। মাস গেলে বেতন পাঁচ হাজার, লাঞ্চ মানে দুইফরের খাওয়া ফিরি, উপরি ওভারটাইমও আছে।
মেহেরজান শুনছিল আর ভাবছিল কোন গুণ্ডা-বদমাইশের খপ্পরে পড়ল কে জানে! চাকরিটা তাকে দিলো কে, খোঁজই-বা পেল কী করে – এসবের সোজাসাপটা জবাব – তুমার চিমন্তা করন লাগব না গো, বুইজা-শুইনা আগাইছি। কথাবার্তার ধরন নতুন। বুইজা-শুইনা আগাইছি কথাটা কানে আঠার মতো লেগে থাকলেও কী বুঝেছে জানতে মেহেরজান কী করবে! খুব যে বলল বড়লোকের দোকান, তো চাকরিতে যে যাবে, ভালো জামাকাপড় কোথায় পাবে, খালি কি জামাকাপড়, কিছু সাজগোজও তো লাগবে। পদ্মর সেই এক কথা – তুমার চিমন্তা করন লাগব না।
সেই শুরু। দেখা গেল মুখে যা বলেছিল তার থেকে এক চুলও এদিক-ওদিক না। মেহেরজান একদিন চুপিচুপি বাইরে থেকে দোকান দেখে তাজ্জব হয়েছে, সত্যিই বড়লোকি কারবার। সকাল আটটায় পদ্ম বেরিয়ে যেত, প্রথমদিকে নিজের পুরনো জামাকাপড়ই ধুয়ে আবুলের লন্ড্রি থেকে ইস্ত্রি করিয়ে পরত। মাস-দুই যেতে নতুন সালোয়ার-কামিজ, স্যান্ডেল, মোবাইল। সেইসঙ্গে শ্যাম্পু, সাবান, ক্রিম, লিপস্টিক, এমনকি সেন্টও। প্রথম মাসের বেতন পেয়ে মেহেরজানের জন্য নিয়ে এলো কমলা রঙের টাঙ্গাইল শাড়ি। বলল, ঈদের বোনাস দিয়ে ঘরে ফ্যান লাগাবে, রাতে গরমে ঘুমাতে পারে না, সারাদিন এসির ঠান্ডায় পার করে এমন দোজখের গরম।
এক ঘরে, এক চৌকিতে পাশাপাশি শুয়েও মেহেরজানের উপায় ছিল না পদ্মর মতিগতির হদিস পায়। খুব ইচ্ছা করত জানতে সারাদিন কী করল; বড় দোকান, আরো নিশ্চয় মেয়েরা আছে, ওদের সঙ্গে ওর সম্পর্ক কেমন। দুপুরে কী খায়? আরো কত কী! তবে একটা কথা মাথায় ঘুরপাক খেলেও মুখে আনার সাহস পেত না। পদ্ম যদি দোকান থেকে চুরি-টুরি করে তাহলে জেলখাটা ছাড়া পথ থাকবে না – কথাটা দুদিন আগে হলে বলতে মুখে আটকাত না। মুখে আটকানোর মতো আরো কত কথা! মারগুলো যে দিত উঠতে-বসতে, এতে তার নিজের কষ্টও কম হতো না। বলতে পারলে বুক হালকা লাগত; কিন্তু পদ্ম বিশ্বাস করবে এমন কথা? আর কথাটা কি সত্যি? মারত যখন, বিলাইর জান বলত, তখন তাকে বিলাই ভেবেই পেটাত।
বছর না ঘুরতে সংসারের চেহারা বদলে গিয়েছিল। মেহেরজানের খটকা লাগত, বেতন মোটে পাঁচ হাজার, কিন্তু খরচের সঙ্গে পাঁচ হাজারের হিসাব মেলাতে পারত না। বসিত্মতে যে ঘুপচিঘরে তারা থাকত, সেটা ছেড়ে কাছেই বড় একটা ঘর নিল পদ্ম। ফ্যানের ব্যবস্থা আগেই হয়েছিল, নতুন ঘরে খাট-জাজিম ঢুকল, চোদ্দ ইঞ্চি টিভি, এমনকি বেঁটেখাটো ফ্রিজও। সবই নাকি কিসিত্মতে। তো কিসিত্মতে হোক বা বিনা পয়সায়ই হোক, এমন পরিবর্তনে মানুষের চোখ টাটাবে জানা কথা। শুরু হলো কানাঘুষা। মেহেরজানের কানে সব না এলেও কিছু কিছু যা আসত সেসব আমলে না নিলেও নিজের মনের খটকাই তাকে সময়-অসময় খোঁচাত। পদ্মর চাকরি বুঝি নামেই, ওটা নাকি সাইনবোর্ড, রুজির আসল পথ অন্য। না হলে দুদিনে কী করে প্রিন্সেস বনে যায়! আড়ালে-আবডালে না, সামনাসামনিই বলাবলি করত – এমুন পিন্সেস থাকতে খোয়া ভাঙো!
নিজে থেকে জানতে চাওয়ার দরকার পড়ল না, পদ্মই মুখ খুলল – মাইনষ্যের কতা কানে তুলবা না। আমার যা উচিত মনে অয়, করি। মাইনষ্যের খাই না, পিন্দিও না। আমার মন যা চায় করুম। আমার ভালা আমি বুজুম, না হেরা বুজব! চিমন্তা করবা না, ভালা খবর আছে, বিদেশ যাওয়ার পথ পাইছি।
কথাটা কানে নিয়ে মেহেরজান থ হয়ে বসে থাকল। কথার কথা যে না, বলার ঢংয়ে পরিষ্কার। মাসখানেক যেতে একরাতে ঘটনা খুলে বলতে মেহেরজান থম ধরে শুনে গেল। পদ্ম জানাল, কামাই-রুজির জন্য বিদেশ যাওয়া ছাড়া গতি নেই। অনেকদিন ধরেই নাকি পাত্তা লাগাচ্ছিল, এতদিনে যাওয়ার ব্যবস্থা প্রায় ঠিক হয়ে গেছে। যাচ্ছে সে লেবাননে, একা না, সঙ্গে আরো মেয়ে যাবে। তবে যাওয়ার পর কাজের জায়গা যার যার আলাদা। কেউ কারখানায়, কেউ হাসপাতালে, কেউ বাসাবাড়িতে। তবে বাসার কাজ মানে বাংলাদেশের চাকরানিগিরি নয়। বেবিসিটিং। কাজটা যে কী বুঝিয়ে বলে এও বলেছিল, বিদেশে এই কাজ ভালো ঘরের শিক্ষিত মেয়েরা করে। তাকে এ-কাজে নেওয়া হচ্ছে তার কপালের জোরে। কথায় কথায় পদ্ম আরো বলল, যেন বলাটা তেমন জরুরি নয়, টাকা লাগবে ম্যালা। তবে একসঙ্গে দিতে হবে না, যারা পাঠাচ্ছে তারা মাসে মাসে বেতন থেকে কেটে রাখবে। সত্য-মিথ্যা মেহেরজান কী বুঝবে! বোঝার মধ্যে এটুকু – মেয়েকে হারাচ্ছে। বিদেশে যাবে, কিন্তু টাকা-পয়সার এমন সোজাসরল ফয়সালা! তার মন বলল, পদ্ম পাচার হয়ে যাচ্ছে, নিজের ইচ্ছাতেই হচ্ছে। মানুষ যা নিয়ে কানাঘুষা করে তা তবে সত্যি। পদ্ম খানকি হয়ে গেছে। দিন কয়েক আগে সে তার ব্যাগ ঘাটতে গিয়ে রাঙতায় মোড়ানো বেশকিছু রঙিন বড়ি পেয়ে কিসের ওষুধ জানতে চাইলে ব্যাগ হাতড়ানোর জন্য পদ্ম তেড়েমেড়ে এক চোট নিয়েছে। কিছু সময় পর গলা নরম করে বলেছে – মাথা ধরার ওষুধ, সারাদিন এসির ঠান্ডা।
তেমন তোড়জোড় ছাড়াই পদ্ম মাসতিনেক পর চলে গেল। যাওয়ার আগে মেহেরজানকে ধরে খুব কাঁদল, আর একটা খামভর্তি টাকা হাতে গছিয়ে বলল – কাম ছাইড়া দিবা, যতদিন টেকা না পাঠাইছি এই দিয়া চলবা। নিজের মোবাইলটা দিয়ে বলল – ফোন দিমু।
পদ্ম চলে যাওয়ার পর বেশ কিছুদিন ধন্ধ কাটেনি। কাজ মেহেরজান ছাড়েনি। খরচ কমাতে ছোট একটা ঘর নেওয়ার কথা চিমন্তা করছিল, আর টিভি-ফ্রিজ বেচে দেবে ভেবেছিল। মাঝে মাঝে এমনও ভাবত, অন্য কোথাও গিয়ে ঘর নেয়। পদ্ম না থাকলেও তাকে নিয়ে কথাবার্তা কানে আসত। নতুন জায়গায় গেলে এ থেকে অন্তত রেহাই পাবে, যদিও জানত তার নিজের মাথার পোকা ঠিকই কামড়াবে। কিন্তু যেই পদ্মর ফোন আসা শুরু করল, মেহেরজান অবাক হলো – সে যা ভেবেছিল তা কি সত্যি নয়? পদ্ম তবে পাচার হয়নি? এক বড়লোকের বাড়িতে নাদুসনুদুস দুইটা বাচ্চা দেখাশোনা করছে। বাচ্চাদের সঙ্গে, তাদের মায়ের সঙ্গে তার নিজের ছবি পাঠিয়েছে।
ধন্ধ কাটানো মুশকিল। তারপর যখন মাসে মাসে টাকা পাঠানো ধরল, পাঠিয়েই ফোন, যেন টাকার অভাবে তার মা না খেয়ে মরছে, মেহেরজানের মাথায় তখন অন্য পোকা – এ পদ্ম কোন পদ্ম! মায়ের সঙ্গে এক বিছানায় শুয়েও যে-কথা বলার দরকার মনে করত না, সে-ই বিদেশে পা দিয়ে সারাক্ষণ মাকে নিয়ে দুশ্চিমন্তায়! দিনে দিনে মেহেরজানেরও জড়তা কেটেছে। আগে মেয়ের সঙ্গে ভালোমন্দ কিছু বলার ইচ্ছা থাকলেও পারত না; যখন তখন চুলমুঠি পাকড়ে আছড়ানোর ঘটনাগুলো মনে পড়ামাত্র সে কুঁকড়ে যেত। সমস্যা থেকে পদ্মই তাকে বের করে আনল। তারপর যেদিন মেহেরজান পদ্মসোনা ডাকল, বুকটা হুহু করে উঠল। শুনে ওপাশে পদ্মর কী হয়েছিল বলতে পারবে না, তবে ডাকটা মেহেরজানের জ্বালাপোড়ায় মলমের কাজ দিয়েছিল। ওদিকে পদ্মও যেন হঠাৎ করে মায়ের আদর-সোহাগের কাঙাল। কোনোদিন যেসব কথা বলেনি, বলত। আইজ রান্দা কী গো মা বলে এমনভাবে ফোনের ওপাশে জবাবের অপেক্ষায় থাকত যেন মেহেরজান ভাত বেড়ে দিতে দেরি করায় তার তর সইছে না।
এবার কী ভেবে টাকা বেশি পাঠাল? অন্য এক ব্যাংকে পদ্মর আলাদা অ্যাকাউন্ট আছে, মেহেরজান জানে। সেখানে সে নিশ্চয় কিছু না কিছু জমায়। কিছু কিছু কেন, বেশি বেশিই জমানোর কথা। নিজের ভবিষ্যতের কথা ভেবে পদ্ম যদি তাই করে – করা অবশ্যই উচিত – সেটা খুবই ভালো খবর।
ঘরে ফিরে সারাদিন ফোনের অপেক্ষায় থেকে ফোন না পেয়ে মেহেরজান টাকার চিমন্তাতেই ফিরে গেল। অন্যান্যবারের চেয়ে যে বেশি পাঠাল! সে তো বাড়তি কোনো খরচের কথা বলেনি, পদ্মও জানতে চায়নি। পদ্মর ফোন এলো আরো দুদিন পর। ব্যস্ত ছিল তাই ফোন দিতে পারেনি বলে জানতে চাইল মেহেরজান টাকা তুলেছে কি না। টাকা বেশি কেন পাঠিয়েছে এর জবাবে পদ্মর গলায় অভিমান – আমি আমার মারে টেকা বেশি পাঠামু আমার ইচ্ছা। এখন থাইকা এরমই পাইবা। তুমার শখ মিটাইয়া খরচ করবা।
মেহেরজানের মুখে কথা ফোটে না। এই পাগলিকে কী বলবে! মাকে বেশি টাকা পাঠাচ্ছে এ তার ইচ্ছা – এ কেমন যুক্তি! খাটনির রোজগার, সাবধানে আগলে রাখতে হয়। অবশ্য মেহেরজান মাথায় কিছু বুদ্ধিশুদ্ধি রাখে, টাকা বেশি পাঠালেই খরচ করে ফেলতে হবে কোন আহ্লাদে! দরকারের বেশি ব্যাংক থেকে না তুললেই হলো। তারপরও মেহেরজান না বলে পারল না, সব কামাই যদি মাকে দিয়ে দেয় তার কী থাকে? এক সুযোগে কায়দা করে কথাটা বলে ফেলে সে অপেক্ষা করল পদ্ম কী বলে। পদ্ম হাসল। আমার জইন্য একদম চিমন্তা করবা না বলে মেহেরজানের দুশ্চিমন্তাকে এক ফুঁতে উড়িয়ে দিয়ে জানাল, সে তার টাকাকড়ির ভালোই ব্যবস্থা করে রাখছে। কথা শেষ করেই বলল – সামনে বকরি ঈদে একটা ছাগল কোরবানি দিবা। কুচকুইচা কালা। পারবা না?
পদ্ম চলে যাওয়ার পর বসিত্মতে তাকে নিয়ে কথাবার্তা কানে কম আসে। তারপরও ইতর পোলাপান পথেঘাটে খোঁচায় – ও খালা পিন্সেসের খবর কী, কবে আসব? পড়শিরা তার সুখে জ্বলেপুড়ে খাক হলেও জানতে চায় – মাস-মাস কত জানি পাডায়? জয়তুনবুড়ি একমাত্র যে পদ্মর খোঁজ নিতে গিয়ে মেহেরজানকে হিংসা করে বলে মনে হয় না। ছোটবেলা পদ্মকে সে-ই দেখেছে, পদ্ম নামটাও তার দেওয়া। পদ্ম সেসব ভোলেনি। দেশে যখন চাকরি করত, প্রায়ই বুড়িকে এটা-ওটা এনে দিত। এবার পদ্ম যে এতগুলো টাকা পাঠাল, এর থেকে বুড়িকে হাজার দুয়েক দিলে পদ্ম খুশি হবে।
ঈদে ছাগল কোরবানির কথা পদ্মর মাথায় কেন এলো বুঝতে পারছে না। বসিত্মতে কেউ কোনোদিন কোরবানি দিয়েছে মেহেরজান শোনেনি। পদ্মর টাকায় এবার সে-ই প্রথম দেবে। মানুষের চোখ টাটায়, টাটাক। অন্যের ভালো দেখতে-না-পারা মানুষের রক্তের দোষ। বড়লোক ছোটলোক এ-জায়গায় সমান।
টাকা পেয়ে জয়তুনবুড়ি কেঁদে ফেলল। সে এখন বলতে গেলে ঘরবন্দি, হাঁটাচলা তেমন করতে পারে না, শরীরে একশটা অসুখ। বুড়ি বিড়বিড় করে কতক্ষণ পদ্ম পদ্ম করল, তারপর চোখ মুছে গলা নামিয়ে বলল – আইচ্ছা ক তো পদ্ম ওইখানে কী করে? তোরে কাম ধরতে মানা করে, মাস-মাস টেকা পাডায়, ও কত রুজি করে? তোরে কী কমু, মাইনষ্যে কত কতা কয়! বুড়ি থেমে গলার সুর বদলে বলল, ভালা আছে আমাগো পদ্ম? দেখতে দেখতে কত বড় অইয়া গেল, বিদেশে একলা থাকে, কামাই করে। কী মাইর না মারতি গো! দোয়া করি ভালা থাউক। আওনের সুময় আমার লাইগা একখান পশমের কম্বল আনতে কইবি। মারপিটের কথা মনে করিয়ে দেওয়ায়, না-কি মানুষের মুখে পদ্মকে নিয়ে আকথা-কুকথা শুনেছে বলে মেহেরজানের ইচ্ছা করল বুড়ির হাত থেকে টাকাগুলো কেড়ে নেয়।
বেশ রাতে ঘরে বসে তার মনে হলো বুড়ি শুনেছে বলে বলেছে, বিশ্বাস করেছে বলেনি। সে নিজেও তো শুনেছে, আগে বেশি বেশি শুনত, এখন পদ্ম এখানে নেই বলে কম শোনে। একসময় তো এমন ছিল, সে মা হয়েও ধন্ধে ছিল। ভাবতে ভাবতে একসময় সে আনমনা হয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ পর গা ঝাড়া দিয়ে উঠে যা ভাবল তা তাকে চমকে দিলো। পদ্মকে নিয়ে যা শোনে সেসব যদি সত্যি হয়, হয়ই যদি, কার কী! কোন হারামির বাচ্চার কী! পদ্মর নিজের মুখের কথা মনে করে ভাবল, পদ্ম কারো খায় না, পিন্দেও না, ওর যা মন চায় করুক, তোগো কী! চমকানোর ধাক্কাটা সয়ে নিয়ে সে অন্য কথা ভাবল। দুনিয়ায় পদ্মর মতো কে আছে যে মার কথা চিমন্তা করে এমন আছাড়িপিছাড়ি করে, তাও যে মা কথায় কথায় কিল-লাথি ছাড়া কিছু বুঝত না! বুকে দুধ ছিল না বলে জন্মানোর পর মায়ের এক ফোঁটা দুধ পর্যন্ত পায়নি। চোখ ভাসিয়ে কান্না চাপতে তার ইচ্ছা জাগল, গোটা বসিত্মর লোকজনের ঘুম ছুটিয়ে চিল্লিয়ে কাঁদে। কেন কাঁদছে বলবে না। কাউকে না, কেউ জানবে না। প্রাণভরে গলা খুলে কাঁদবে। সবাই ভাববে, পদ্ম মরে গেছে। পদ্ম ছাড়া তার কে আছে যে কাঁদবে! ভাবুক, যার যেমন খুশি ভাবুক। কেবল সে জানবে পদ্ম ওরফে পার্লি মরবে কোন দুঃখে, তার মা আছে না? যেমন পদ্ম তাকে বলে, বলেছিল, আমি আছি না?
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
Monday, March 14, 2022
‘কেন আমি ভয় পাবো?’ -প্রফেসর কে এস ভগবান by বিখার আহমেদ সাঈদ
![]() |
| প্রফেসর কে এস ভগবান |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
Thursday, March 10, 2022
বাংলার বাম আন্দোলনের অতীত ও বর্তমান

About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1347)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...





