Friday, March 25, 2022

আইনস্টাইনের থিওরি অফ হ্যাপিনেস: দেড় মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হওয়া “সুখের মূলমন্ত্র” by সাদমান ফাকিদ

ইতিহাসের অন্যতম সেরা পদার্থবিদ হিসেবে আমরা চিনি তাঁকে। তাঁর তত্ত্বগুলো পৃথিবী সম্পর্কে আমাদের ধারণাই বদলে দিয়েছিল। তবে শুধু বিজ্ঞান নিয়েই নয়, জীবন নিয়েও আলবার্ট আইনস্টাইনের ছিল স্বতন্ত্র মতবাদ। বিশেষ করে তিনি তাঁর “থিওরি অফ হ্যাপিনেস”-এর জন্যেও নামজাদা হয়েছেন এই শতাব্দীতে এসে। এর পেছনের গল্পটাও বেশ মজার।
১৯২২ সালের নভেম্বর মাসে আইনস্টাইন ইউরোপ থেকে জাপানে যাচ্ছিলেন একটি লেকচার সিরিজ ডেলিভারির জন্য। এই ভ্রমণে থাকা অবস্থাতেই আইনস্টাইন খবর পান, তিনি পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল প্রাইজ পেয়ে গেছেন। তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে অভূতপূর্ব অবদানের জন্য তাঁকে এই সম্মানে ভূষিত করা হয়।
তাই আইনস্টাইন যখন জাপানে এসে পৌঁছান তখন তাঁর খ্যাতি হঠাৎ-ই অনেকগুণ বেড়ে গেছে। পুরো জাপান জুড়ে ছড়িয়ে গেছে তাঁর নোবেল প্রাইজ প্রাপ্তির ঘটনা। হাজার হাজার মানুষ জায়গায় জায়গায় ভিড় করছেন নোবেল লরিয়েটকে এক পলক দেখার জন্য। এই খ্যাতির বিড়ম্বনায় পড়ে আইনস্টাইন টোকিওর ইম্পেরিয়াল হোটেলে একা একা বসে জীবন সম্পর্কে লেখার চেষ্টা করছিলেন, লিখছিলেন নিজের একান্ত ব্যক্তিগত ভাবনা।
ঠিক সেসময়ই তাঁর কাছে একজন বার্তাবাহক আসে, একটি ডেলিভারি দিয়ে যেতে তাঁকে। বার্তাবাহককে বখশিশ দিতে গিয়ে আইনস্টাইন দেখেন তাঁর কাছে খুচরা অর্থ নেই, তাই তিনি তাকে বখশিশ না দিয়ে একটি অভিনব কাজ করেন।
তিনি দু’টো কাগজে কিছু কথা লিখে বার্তাবাহককে দেন। বলেন, যদি ভাগ্য তোমার সাথে থাকে, তবে এই কাগজের লেখা কথাগুলোই আজকের দেওয়া কিছু খুচরা অর্থের তুলনায় তোমার কাছে অনেক মূল্যবান হবে। এই আইনস্টাইনের অটোগ্রাফবাহী কাগজগুলোই গত বছর অক্টোবরের ২৪ তারিখ নিলামে বিক্রি হয়েছিল ১.৮ মিলিয়ন ডলারে।
এর মধ্যে একটি কাগজে লেখা ছিল, “একটি শান্তিপূর্ণ ঝঞ্ঝাটমুক্ত জীবন নিরবিচ্ছন্ন অস্থিরতা নিয়ে সফলতার পেছনে দৌড়ানো জীবনের থেকে অনেক বেশি সুখ এনে দেয়।“ একেই এখন বলা হচ্ছে, “আইনস্টাইন্স থিওরি অফ হ্যাপিনেস।”
এই কাগজটির বিক্রি হয় ১.৫৬ মিলিয়ন ডলারে। অথচ নিলামের আগে ধরা হয়েছিল ৫ থেকে ৮ হাজার ডলারের মত দাম পড়বে চিঠিটার। ওই নিলাম হাউজের চিফ এক্সিকিউটিভ গ্যাল উইনার জানিয়েছিলেন, নোটটির দাম ডাকা শুরু হয়েছিল ২ হাজার ডলার থেকে। আর ২৫ মিনিট ধরে চলেছিল সেই নিলাম।
জাপানে আলবার্ট আইনস্টাইন
আরেকটি নোটে লেখা ছিল, “ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়”, ইংরেজিতে। এর দাম উঠেছিল ২ লাখ ৪০ হাজার ডলারে বিক্রি হয়েছিল সেই নোটটি। এসবই জানা গেছে নিলাম হাউজের কর্মকর্তা এবং তাদের ওয়েবসাইট থেকে। ক্রেতা এবং বিক্রেতা উভয়ের পরিচয়-ই এখনো সাধারণের থেকে গোপন রাখা হয়েছে।
সেই ১৯২২ সালে, এই নোটগুলো লেখার পর, আইনস্টাইনের ছয় সপ্তাহব্যাপী জাপান ট্যুরটা বেশ সফল হয়। আইনস্টাইন জাপান দেশটিকে অনেক ইতিবাচকভাবে দেখতে শুরু করেন। তিনি তার ছেলেদের কাছে চিঠিতে লিখেন,
***“এখন পর্যন্ত যত মানুষের সাথে আমি মিশেছি, তাদের মধ্যে জাপানিজ মানুষদেরই আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছ, কারণ তারা একই সাথে ভদ্র, চৌকস, বুঝদার, এবং শিল্পেরও সমঝদার।”
কিন্তু এত বছর পর এসে আইনস্টাইনের “সুখের তত্ত্ব”-টি আসলে কতটুকু সময়োপযোগী? কারণ সুখ তো আসলে বৈজ্ঞানিক আপেক্ষিকতার থেকেও অনেক বেশি আপেক্ষিক, তাই এর রহস্য এখনো বিজ্ঞানীরা ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারেননি। কিছু কিছু গবেষণায় দেখা যায়, গড়পড়তা চাকরি-বাকরির চেয়ে স্বনির্ভর উদ্যোক্তা হওয়ার সংগ্রামশীল জীবন আসলে বেশি সুখকর। এটি আসলে আইনস্টাইনের তত্ত্বটির সাথে কিছুটা সাংঘর্ষিক। এর বিপরীতে আরেকটি বড়সড় গবেষণায় দেখা গেছে ভারসাম্যযুক্ত জীবন হচ্ছে সুখী জীবন, পরিবারকে, ক্যারিয়ারকে, নিজেকে সবকিছুকেই সমানভাবে সময় দেওয়া মানুষেরা বেশি সুখী। এটি আসলে আইনস্টাইনের তত্ত্বটির সাথে মিলে যায়।

সুখের পেছনে অন্যতম একটি গবেষণা প্রকাশ হয় ২০০৫ সালে। সেখানে বিজ্ঞানী সুখের পেছনে হওয়া এর আগের ২২৫টি গবেষণার উপর গবেষণা করে সিদ্ধান্তে আসেন, সফলতা আসলে সুখ নিয়ে আসে না, বরং সুখ নিয়ে আসে সফলতা। অর্থাৎ, “সুখ মানুষের আচরণে এমন সব পরিবর্তন আনে যা কাজ, সম্পর্ক, স্বাস্থ্য সবখানেই মানুষকে সফল করে তুলে।”
এখান থেকে আমরা বলতে পারি, হয়তো আইনস্টাইন তার তত্ত্ব অনুযায়ী নির্ঝঞ্ঝাট জীবন কাটিয়ে সুখী ছিলেন বলেই তিনি তার কাজে এতটা সফল হয়েছিলেন, এতকিছু অর্জন করেছিলেন পদার্থবিদ্যায়।অনেক মনস্তত্ত্ববিদই আসলে দেখেছেন, আমরা আসলে কখনোই সুখী হই না, বরং “সুখের চরকি”-তে ঘুরতে থাকি।
নক্স কলেজের সাইকোলজির প্রফেসর ফ্রাংক টি ম্যাকএন্ড্রু তাঁর একটি লেখায় বলেছেন,
***“আমরা একটি উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে অনেক পরিশ্রম করি, সেই উদ্দেশ্যটি আমাদের কতটা সুখ এনে দিবে সেই আশায়, কিন্তু উদ্দেশ্যটিতে সফল হলেই কিছুদিনের মধ্যে আমরা নতুন অবস্থানে থিতু হয়ে যাই, আবার নতুন উদ্দেশ্য তৈরি করি, তার পেছনে ছুটতে থাকি কারণ আমরা নিশ্চিত এই উদ্দেশ্য হাসিল হলেই আমাদের সুখ নিশ্চিত।”
বেশিরভাগ মানুষের জীবনটা আসলে এই চক্রের মধ্যেই কেটে যায়। একারণে লটারি বিজয়ী কিংবা সফল উদ্যোক্তা কিংবা তারকারা, কাউকেই আসলে ব্যক্তিগত জীবনে তেমন সুখী দেখা যায় না। এটি মুখের কথা নয়, একটি গবেষণারই সিদ্ধান্ত।

তাই নোবেল প্রাইজ পেয়ে সফলতার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছার পর হয়তো আইনস্টাইন বুঝেছিলেন এই সাফল্য আসলে তাঁকে তেমন কোনো সুখ এনে দেয়নি, বরং চক্রের মধ্যেই ফেলে রেখেছে। তাই হয়তো তিনি চক্রের বাইরে বের হওয়ার একটি তত্ত্ব আমাদের সামনে এনে দিয়েছেন। বলেছেন সফলতার পেছনে না ছুটে নীরব নির্ঝঞ্ঝাট জীবন কাটাতে যা হয়তো আসলেই আমাদের এই অস্থির চরকি থেকে বের করে নিয়ে আসবে। তাই বলতে হয়, আইনস্টাইনের অন্যান্য সব যুগান্তকারী তত্ত্বের মতোই তার সুখের তত্ত্ব বা “থিওরি অফ হ্যাপিনেস”-ও এখনো সময়োপযোগী।
কিন্তু আইনস্টাইনের উপদেশ কি আমরা আসলেই শুনছি? উদ্যোক্তা এবং মোটিভেশনাল স্পিকাররা কিন্তু উল্টো কথাটা বলছে। সফল উদ্যোক্তা এবং লেখক বিল পেসি’র কথাই ধরুন। তার নির্দেশনা-
***“সফল হয়েই সন্তুষ্ট থাকা যাবে না, বরং সাফল্যকে কিভাবে আরও ছাড়িয়ে যাওয়া যায় সেই চেষ্টায় লেগে থাকতে হবে অবিরত”।
এখন সিদ্ধান্ত আপনার, আপনি কোন পথে এগোবেন।

Thursday, March 24, 2022

হাতের কব্জির ব্যথা : কারণ ও চিকিৎসা by ডা: মিজানুর রহমান কল্লোল

কব্জির ব্যথা খুব সাধারণ একটি সমস্যা। হঠাৎ ইনজুরির কারণে কব্জিতে বিভিন্ন ধরনের ব্যথা হয়ে থাকে। মচকে গেলে কিংবা হাড় ভেঙে কব্জিতে বেশ ব্যথা হয়। তবে অনেক দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার জন্য কব্জিতে ব্যথা হতে পারে, যেমন- বারবার কব্জিতে চাপ, বাত ও কারপাল টানেল সিনড্রোম। যেহেতু অনেক কারণে কব্জিতে ব্যথা হতে পারে, তাই কখনো কখনো দীর্ঘমেয়াদি কব্জির ব্যথার সঠিক কারণ নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়ে। সঠিক রোগ নির্ণয় করাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তার ওপর নির্ভর করে আপনার কব্জির ব্যথার সঠিক চিকিৎসা। লিখেছেন ডা: মিজানুর রহমান কল্লোল।
কব্জির ব্যথার উপসর্গ বিভিন্ন ধরনের হয়। এটি নির্ভর করে ঠিক কী কারণে ব্যথা হচ্ছে তার ওপর। যেমন- অস্টিও আর্থ্রাইটিসের ব্যথা ঠিক ভোঁতা ধরনের দাঁত ব্যথার মতো, অথচ টেনডনের প্রদাহ বা টেনডিনাইটিসের ব্যথা সাধারণত তীক্ষ ও ধারালো ধরনের।
কব্জির ব্যথার কারণ
কব্জি বা রিস্টজয়েন্ট হলো একটি জটিল সন্ধি যা তৈরি হয়েছে কয়েকটি হাড়ের সমন্বয়ে যেমন রেডিয়াস ও আলনা হাড়ের নিম্নাংশ এবং আটটি ছোট ছোট কারপাল হাড়। এই কারপাল হাড়গুলো দুই সারিতে সাজানো। লিগামেন্টের শক্ত ব্যান্ড কব্জির হাড়গুলোকে একে অন্যের সাথে, রেডিয়াস ও আলনা হাড়ের নিম্নাংশ এবং হাতের হাড়গুলোকে সংযুক্ত করে। টেনডনগুলো হাড়ের সাথে মাংসপেশিকে সংযুক্ত করে। কব্জির যেকোনো অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে ব্যথা হতে পারে এবং হাত ও কব্জির ব্যবহারের সক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
কব্জি ব্যথার সাধারণ কারণগুলো এখানে বর্ণিত হলো :
১. ইনজুরি
হাতের ওপর ভর দিয়ে সামনের দিকে পড়ে গেলে কব্জিতে খুব বেশি ইনজুরির ঘটনা ঘটে। এ ক্ষেত্রে কব্জি মচকে যায়, কব্জিতে টান পড়ে এবং কব্জির হাড় ভেঙেও যায়। কব্জির বুড়ো আঙ্গুলের দিকে হাড়টির নাম স্কাফয়েড। এটি অনেক সময় ভেঙে যায়। এ ধরনের হাড় ভেঙে গেলে সাথে সাথে সেটা এক্স-রেতে নাও দেখা যেতে পারে। ব্যথা অনেক দিন থাকে, কব্জি নাড়াচাড়া করলে ব্যথা বাড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে হাত দিয়ে কাজ করা যায় না। প্লাস্টার করেও ব্যথার উপশম হয় না। অপারেশন করতে হয়। অনেক সময় স্কাফয়েড হাড় ভাঙলে হাড়ের মধ্যে রক্ত চলাচল ব্যাহত হয় এবং হাড়ের জোড়া লাগতে সমস্যা হয় যার ফলে ব্যথা হয় ও কব্জি নাড়তে অসুবিধা হয়। তখন অপারেশনের প্রয়োজন হয়। হাতের ওপর ভর দিয়ে পড়ে গেলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কলিস ফ্রাকচার হয়। এ ক্ষেত্রে রেডিয়াসের নিচের অংশ ভেঙে যায়। কব্জি ফুলে যায়।
কব্জি বারবার নাড়াতে হয় এমন যেকোনো কাজ যেমন- টেনিস বল খেলা থেকে শুরু করে বেহালা বহন করতে করতে কব্জির সন্ধির চার পাশের টিস্যুতে প্রদাহ হতে পারে কিংবা হাড় ভেঙে যেতে পারে। বিশেষ করে কোনো বিরতি ছাড়া ঘণ্টার পর ঘণ্টা কব্জির কাজ করলে। বারবার চাপের ফলে হাতের কব্জির ব্যথার আরেকটি কারণ হলো ডি কোয়ার ভেইন’স ডিজিজ। ব্যথা বুড়ো আঙ্গুলের মূলে অনুভূত হয়। ডি কোয়ার ভেইন’স ডিজিজে কব্জি নাড়তে খুব ব্যথা হয়, কাজ করতে অসুবিধা হয় এবং অনেক সময় কাজের পর ব্যথা বেশ বেড়ে যায়। বুড়ো আঙ্গুলে চাপ দিলে প্রচণ্ড ব্যথা হয়।
২. আর্থ্রাইটিস বা বাতের ব্যথা
অস্টিও আর্থ্রাইটিস
সাধারণত কব্জিতে অস্টিও আর্থ্রাইটিস খুব কম হয়। কোনো লোকের কব্জিতে আগে ইনজুরি হয়ে থাকলে পরে অস্টিও আর্থ্রাইটিস হয়। এ ক্ষেত্রে কার্টিলেজ বা তরুণাস্থি ছিঁড়ে যায় বা ক্ষয় হয়।
রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস: এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা তার নিজস্ব টিস্যুগুলোকে আক্রমণ করে। কব্জিতে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস খুব বেশি পরিলক্ষিত হয়। যদি একটি কব্জি আক্রান্ত হয়, তাহলে সাধারণত অন্য কব্জিতেও এটি ঘটে।
৩. অন্যান্য রোগ ও অবস্থা
কারপাল টানেল সিনড্রোম: আপনার কব্জির তালুর দিকের অংশে একটি পথ রয়েছে যার নাম কারপাল টানেল; এর মধ্য দিয়ে মিডিয়ান নার্ভ অতিক্রম করে। মিডিয়ান নার্ভে চাপ পড়লে কব্জি ও হাতে প্রচণ্ড ব্যথা হয়। এ অবস্থার নাম কারপাল টানেল সিনড্রোম।
গ্যাংলিয়ন সিস্ট: কব্জির ব্যথার অন্যতম কারণ হলো এক ধরনের টিউমার জাতীয় ফোলা বস্তু থাকে যাকে গ্যাংলিয়ন বলে। এটি ওঠে টেনডনের আবরণী থেকে কব্জির পেছনে অথবা সামনের দিকে। কব্জি নাড়লে ব্যথা হয়। বড় গ্যাংলিয়ন সিস্টের চেয়ে ছোটগুলো বেশি ব্যথা সৃষ্টি করে।
কিয়েন বক্স ডিজিজ : এটি সাধারণত তরুণদের হয়। এ ক্ষেত্রে কব্জির লুনেট নামের ছোট হাড়টিতে রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়ে হাড়টি কোলাপস করে। লুনেট হাড়ের ওপরে চাপ দিলে ব্যথা লাগে এবং রোগী হাত মুঠো করে ধরতে পারে না।
কব্জি ব্যথার ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়গুলো হলো
কারো হাতের কব্জিতে ব্যথা হতে পারে- তা অল্প কাজ করুক কিংবা বেশি কাজ করুক না কেন। কিন্তু কিছু ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়ের কারণে এ ব্যথা বেড়ে যেতে পারে, যেমন-
খেলাধুলা করা: বিভিন্ন খেলাধুলায় কব্জিতে ইনজুরি হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে বোলিং, গলফ, জিমন্যাস্টিক, টেনিস প্রভৃতি।
বারবার কাজ করা: বেশির ভাগ ক্ষেত্রে হাত ও কব্জির যেকোনো কাজ বারবার করলে কব্জির ব্যথা বেড়ে যেতে পারে। যেসব মহিলা হাঁড়ি-পাতিল ধোয়াধুয়ি করেন বা বুননের কাজ করেন তাদের কব্জির ব্যথা বেশি হয়। যারা চুল কাটার কাজ করেন তাদেরও কব্জির ব্যথা বেশি হয়। যারা কম্পিউটার কিবোর্ডে টাইপ করেন, কম্পিউটার মাউস ব্যবহার করেন, হ্যান্ডবল খেলেন, সেলাই করেন, আঁকাআঁকি করেন, লেখালেখি করেন বা ভাইব্রেটিং যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেন তাদের কব্জির ব্যথা বেড়ে যায়। আবার যাদের ডায়াবেটিস, লিউকেমিয়া, স্ক্লেরোডার্মা, লুপাস থাকে কিংবা থাইরয়েড গ্রন্থি ঠিকমতো কাজ না করে তা হলে তাদের কব্জির ব্যথা বেড়ে যেতে পারে। প্রাথমিকভাবে ফ্যামিলি ফিজিসিয়ানের সাথে পরামর্শ করলে তারা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যেমন- রিউমাটোলজিস্ট, স্পোর্টস মেডিসিন বিশেষজ্ঞ কিংবা অর্থোপেডিক সার্জনের কাছে রেফার করতে পারেন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে উপসর্গের বিস্তারিত বর্ণনা যেমন আপনার কোনো রোগ আছে কি না, বাবা-মা, ভাই-বোনের অন্য রোগ আছে কি না, আপনি কোনো ধরনের ওষুধ খেতে থাকলে তাও জানাতে হবে। কী ধরনের খাবার গ্রহণ করেন তা জানাবেন।
চিকিৎসা : হাতের কব্জির ব্যথার চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ভর করে ইনজুরির গ্রণ, স্থান ও তীব্রতা সর্বোপরি বয়স ও সার্বিক স্বাস্থ্যের ওপর। প্রথমত, আক্রান্ত হাতের কব্জিকে বিশ্রামে রাখতে হবে এবং যদি কোনো নির্দিষ্ট রোগের কারণে কব্জিতে ব্যথা হয়ে থাকে তাহলে তার উপযুক্ত চিকিৎসা দিতে হবে। ব্যথানাশক ওষুধ যেমন- আইবুপ্রফেন ও অ্যাসিটামিনোফেন কব্জির ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। প্রয়োজনে শক্তিশালী ব্যথানাশক ওষুধ দেয়া যেতে পারে। হাড় ভাঙলে হাড়ের টুকরোগুলো সঠিক বিন্যাসে রাখতে হবে যাতে ঠিকমতো জোড়া লাগে; এ ক্ষেত্রে কাস্ট বা স্প্লিন্ট ব্যবহার করা যেতে পারে। কব্জিতে টান লাগলে বা মচকে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত টেনডন বা লিগামেন্ট যাতে সুরক্ষা পায় সে জন্য স্প্লিন্ট ব্যবহার করা যেতে পারে। আক্রান্ত হাতের কব্জিকে নড়াচড়া থেকে রক্ষা করার জন্য রিস্টব্যান্ড ব্যবহার করা যেতে পারে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অপারেশনের প্রয়োজন হয়। যেমন- মারাত্মকভাবে হাড় ভাঙলে, কারপাল টানেল সিনড্রোমের উপসর্গ তীব্র হলে এবং টেনডন বা লিগামেন্ট ছিঁড়ে গেলে।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, অর্থোপেডিকস ও ট্রমা বিভাগ, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল। চেম্বার : পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার লি:, ২, ইংলিশ রোড, ঢাকা।
ফোন: ০১৭২২৯১৬৪৭৯ (সঞ্জয়)

Wednesday, March 23, 2022

তাকদিরে বিশ্বাস কী ও কেন by মুফতি মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম

কালের কণ্ঠ অনলাইন, ১৪ জুলাই, ২০১৯: তাকদির শব্দটি আরবি। এর অর্থ নির্ধারণ করা, নির্দিষ্ট করা, ধার্য করা, নিয়তি, ভাগ্য, ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি। এই মহাবিশ্বে ভবিষ্যতে যা কিছু ঘটবে, প্রজ্ঞাময় আল্লাহ তাআলা তাঁর পূর্বজ্ঞান ও প্রজ্ঞা অনুযায়ী সেসব নির্ধারণ করে রাখাকে তাকদির বলে। পৃথিবীর সব বস্তু তথা মানব-দানবসহ যত সৃষ্টি রয়েছে, সব কিছুর উত্থান-পতন, ভালো-মন্দ, উপকার-অপকার, লাভ-ক্ষতি ইত্যাদি কোথায়, কোন সময়, কিভাবে ঘটবে—আল্লাহ তাআলা নির্ধারণ করে রেখেছেন। তাকদিরের বাইরে কোনো কিছু নেই। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক জিনিসই তাকদির অনুযায়ী সংঘটিত হয়ে থাকে। এমনকি অক্ষমতা ও বুদ্ধিমত্তাও।’ (মুসলিম, রিয়াদুস সলিহিন. পৃষ্ঠা ২৮২)
তাকদির কি পরিবর্তিত হয়?
তাকদির বা ভাগ্যলিপি দুই প্রকার; যথা—১. তাকদিরে মুবরাম (অপরিবর্তনীয় ভাগ্যলিপি) ও ২. তাকদিরে মুআল্লাক (ঝুলন্ত ভাগ্যলিপি)। তাকদিরে মুবরাম কখনোই পরিবর্তিত হয় না। আর তাকদিরে মুআল্লাক বান্দার নেক আমল, দোয়া ইত্যাদির মাধ্যমে পরিবর্তিত হয়। হজরত সালমান (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, দোয়া আল্লাহর ফয়সালাকে পরিবর্তন করাতে পারে। আর নেক আমল বয়সকে বৃদ্ধি করাতে পারে।’ (তিরমিজি, হাদিস নম্বর : ২১৩৯)
তাকদির কি মানুষের কাজের কারণ ও উপকরণ?
তাকদির মানুষের কাজের কারণ নয় এবং তাকদির লিপিবদ্ধ আছে বলে মানুষ ভালো-মন্দ ইত্যাদি কাজ করছে—বিষয়টি এমন নয়; বরং ভবিষ্যতে মানুষ যা করবে, আল্লাহ তাআলা তা আগে থেকেই জানেন, ফলে তিনি তা আদিতেই লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। আল্লাহ তাআলা আদিতে লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন বলে মানুষ লেখা অনুযায়ী কর্ম করছে—এ কথা মোটেও ঠিক নয়। বরং আমরা কখন কী করব, কী খাব, কোথায় কী ঘটবে—এগুলো আল্লাহ তাআলা পূর্ব থেকে জানেন। কারণ তিনি ইলমে গায়েবের অধিকারী। তাঁর পূর্বজ্ঞান অনুযায়ী তা লিখে রেখেছেন। উদাহরণস্বরূপ—
১. একজন শিক্ষক পাঁচজন ছাত্রকে শিক্ষাদানের পর তাঁর অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি যদি তাঁর ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ করেন যে অমুক ছাত্র ‘এ প্লাস’ পাবে, অমুক ছাত্র ‘এ’ পাবে, অমুক ছাত্র ‘এ মাইনাস’ পাবে, অমুক ছাত্র ‘বি’, অমুক ছাত্র ‘সি’ পাবে। এখন পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর যদি শিক্ষকের আগের লেখা অনুযায়ী ফলাফল হয়, তাহলে কি শিক্ষকের লেখার কারণে এই ফলাফল হলো? অবশ্যই না। তাকদিরের বিষয়টিও এমনই।
২. একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার তাঁর রোগীর অবস্থা বুঝে অভিজ্ঞতার আলোকে তাঁর ডায়েরিতে লিখে রেখেছেন যে এই রোগী অমুক দিন, অমুক অবস্থায় মারা যাবে। কার্যত যদি তা-ই হয়, তাহলে ডাক্তারের লিখে রাখার কারণেই কি তার মৃত্যু হলো? নিশ্চয়ই না। ঠিক তেমনই আল্লাহ তাআলা মানুষের অবস্থা আদি থেকেই জানেন বলে সব কিছু লিখে রেখেছেন। কিন্তু এই লিপিবদ্ধকরণ মানুষের কার্যের কারণ নয়। বরং কার্যের কারণ হলো তার ইচ্ছা। ফলে ব্যক্তির কজের জন্য সে নিজেই দায়ী।
তাকদিরের প্রতি ঈমানের স্বরূপ
তাকদিরের প্রতি বিশ্বাস করা ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাকদিরের ওপর সন্তুষ্ট থাকা ফরজ। তাকদিরে বিশ্বাসের অর্থ হলো—
১.  আল্লাহর ব্যাপারে এই বিশ্বাস রাখা যে তিনি আদি থেকে সব কিছুর ব্যাপারে ওয়াকিফহাল।
২.  তিনি লাওহে মাহফুজে (সংরক্ষিত ফলকে) সব কিছু লিখে রেখেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তাআলা সৃষ্টিকুল সৃষ্টির ৫০ হাজার বছর আগে সৃষ্টিকুলের তাকদির লিখে রেখেছেন।’ (মুসলিম) তিনি আরো বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা প্রথমে কলম সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর কলমকে বললেন—লেখো। কলম বলল, হে রব! কী লিখব? তিনি বলেন, কিয়ামত পর্যন্ত প্রত্যেক জিনিসের তাকদির লেখো।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৭০০) আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তুমি কি জানো না যে নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলে যা কিছু আছে আল্লাহ সব কিছু জানেন। নিশ্চয়ই এসব কিতাবে লেখা আছে। অবশ্যই এটা আল্লাহর কাছে সহজ।’ (সুরা : হজ, আয়াত : ৭০)
৩.  আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে কোনো কিছু ঘটে না। তাঁর বাণী হলো, ‘আপনার পালনকর্তা যা ইচ্ছা করেন এবং (যা ইচ্ছা) মনোনীত করেন।’ (সুরা : কাসাস, আয়াত : ৬৮)
৪.  সব কিছুর সত্তা, বৈশিষ্ট্য, গতি, স্থিতি—সবই আল্লাহর সৃষ্টি। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহ সব কিছুর স্রষ্টা এবং তিনি সব কিছুর তত্ত্বাবধায়ক।’ (সুরা : জুমার, আয়াত : ৬২) কোরআনের অন্য আয়াতে এসেছে, ‘তিনি (আল্লাহ) সব কিছু সৃষ্টি করেছেন এবং প্রত্যেককে যথোচিত আকৃতি দান করেছেন।’ (সুরা : ফুরকান,  আয়াত : ২)
আরো ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহ কোনো ব্যক্তিকে তার সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না। সে যা অর্জন করে, তা-ই তার জন্য এবং সে যা কামাই করে তা তারই ওপর বর্তাবে।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৮৬)
আলী (রা.) থেকে আরো বর্ণিত আছে, মহানবী (সা.) বলেন, কোনো বান্দাই মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না চারটি বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপন করে। তা হলো—১. এ সাক্ষ্য দেওয়া যে আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই এবং আমি তাঁর প্রেরিত রাসুল। ২. মৃত্যুতে বিশ্বাস করা, ৩. মৃত্যুর পর পুনরুত্থানে বিশ্বাস করা, ৪. তাকদিরে বিশ্বাস করা। (বায়হাকি)
ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসী হওয়া তাকদিরের বিশ্বাসের ওপর নির্ভরশীল। ফলে যে ব্যক্তি ঈমান আনে, কিন্তু তাকদিরে অবিশ্বাস করল, সে প্রকৃতপক্ষে একত্ববাদকেই অস্বীকার করল। (সূত্র : তাবলিগে দ্বিন, ইমাম গাজালি (রহ.)
তাকদিরে অবিশ্বাসীদের রাসুলুল্লাহ (সা.) লানত করেছেন। রাসুল (সা.) বলেন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন, যদি কেউ আমার নির্ধারিত তাকদিরের ওপর সন্তুষ্ট না থাকে এবং বিপদাপদে ধৈর্যধারণ না করে, তাহলে সে যেন আমি ছাড়া অন্য কাউকে রব বানিয়ে নিল। (বায়হাকি)
তাকদির প্রসঙ্গে বিতর্কের বিধান
হাদিস শরিফে তাকদির প্রসঙ্গে বিতর্ক করতে বারণ করা হয়েছে। যেমন—হজরত ইয়াহইয়া ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আবি মুলাইকা তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি একদা হজরত আয়েশা (রা.)-এর দরবারে যান। তিনি তাঁকে তাকদির প্রসঙ্গে কিছু জিজ্ঞাসা করেন, তখন হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, আমি রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি তাকদিরের বিষয়ে কথা বলে, কিয়ামতের ময়দানে এ কারণে সে জিজ্ঞাসিত হবে। আর যে এ বিষয়ে আলোচনা করবে না, তাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হবে না। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৮৪)
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, একবার রাসুল (সা.) আমাদের কাছে এলেন, আমরা তখন তাকদির প্রসঙ্গে আলোচনা করছিলাম। তখন রাসুল (সা.) প্রচণ্ড রেগে গেলেন। রাগে তাঁর চেহারা আনারের মতো রক্তিম বর্ণ হয়ে গেল। তিনি বলেন, তোমরা কি এসব করতে আদিষ্ট হয়েছ? নাকি আমি এসবের জন্য প্রেরিত হয়েছি? এর আগের লোকজন এ বিষয়ে আলোচনা করে ধ্বংস হয়েছে, আমি তোমাদের দৃঢ়তার সঙ্গে বলছি, তোমরা এ বিষয়ে বিবাদে লিপ্ত হয়ো না। (তিরমিজি, হাদিস : ২১৩৩)
তাকদিরের সঙ্গে তদবিরের সম্পর্ক
কাজ সম্পাদন করার জন্য উপায়-উপকরণের সহযোগিতা নেওয়াকে তদবির বলে। তাকদিরের সঙ্গে তদবিরের কোনো সংঘাত নেই। কেননা তাকদিরের ওপর ঈমান আনার সঙ্গে কাজের ওপর তদবির করার কথাও লিখিত আছে। হাদিস শরিফে রয়েছে, জনৈক সাহাবি আরজ করেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমরা যে ঝাড়ফুঁক করে থাকি, চিকিৎসায় ওষুধ ব্যবহার করে থাকি কিংবা আত্মরক্ষার জন্য যেসব উপায় অবলম্বন করে থাকি, তা কি তাকদিরের কোনো কিছুকে পরিবর্তন করতে পারে? প্রত্যুত্তরে রাসুল (সা.) বলেন, তোমাদের এসব চেষ্টাও তাকদিরের অন্তর্ভুক্ত। (বায়হাকি)
শাহ ওয়ালি উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভি (রহ.) বলেন, তাকদির ও তদবিরের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। কেননা তদবির তাকদিরের আওতাধীন। এর প্রমাণ হলো, ইয়াকুব (আ.) স্বীয় পুত্রদের মিসর পাঠানোর প্রাক্কালে অসিয়ত করেন, ‘হে আমার পুত্ররা! তোমরা এক দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে না। বরং ভিন্ন ভিন্ন দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে...।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৬৭) এটি ছিল তদবির। পরে তাকদির প্রসঙ্গে বলেন, ‘...আল্লাহর বিধানের বাইরে আমি তোমাদের জন্য কিছুই করতে পারব না। বিধান আল্লাহরই।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৬৭)
ইয়াকুব (আ.) তাকদির ও তদবিরের মধ্যে সমন্বয় সাধন করেছেন। আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসুল (সা.) মানুষকে কাজ করার জন্য তাগিদ দিয়েছেন, তাকদিরের ওপর ভরসা করে বসে থাকতে নিষেধ করেছেন।
>>>লেখক : প্রধান ফকিহ, আল-জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদরাসা, ফেনী

দ্য ড্যান্সিং গার্ল! by শাঈখ আল মাহমুদ বনি

নৃত্যরতা মেয়েটি, বা দ্য ড্যান্সিং গার্ল – আমাদের ভারতবর্ষের পুরাকীর্তিগুলোর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি নিদর্শন। বইয়ে অনেক পড়েছি এই ভাস্কর্যের কথা, সামনাসামনি এই পাঁচ হাজার বছরের পুরনো নিদর্শন দেখে নির্বাক হয়ে গিয়েছিলাম।
সিন্ধু সভ্যতার শিল্পসৌকর্যের অনুপম এই নিদর্শনটির বয়স প্রায় পাঁচ হাজার বছর! (২০০০-২৭০০ খ্রিঃপূঃ)। জন ম্যাকে নামে একজন প্রথিতযশা পুরাতাত্ত্বিক ১৯২৬ সালে এই নিদর্শনটি আবিষ্কার করেন মোহেনজোদারো এলাকাতে, প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখননের পরে পাওয়া এক বাড়ির উনুনের কাছে।
এই ভাস্কর্যটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? একটু সময় নিয়ে তাকাই এই ভাস্কর্যের দিকে, দেখতে পাবো এর চমৎকার বৈশিষ্ট্যগুলো। দুই হাত ভরা বালা পরে সম্পূর্ণ নিরাবরণ একজন নারী খুবই আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন কোমরে হাত দিয়ে। এই ভাস্কর্য থেকে সিন্ধু সভ্যতার নারীদের পরিধেয় অলঙ্কার প্রসঙ্গে কিছুটা ধারণা করা যায়। এই যে একহাত ভর্তি চুড়ি, এইরকম কিন্তু এখনো দেখা যায় রাজস্থানে, বাঞ্জারা নামের যাযাবর গোষ্ঠীর নারীদের মাঝে। দাঁড়ানোর ভঙ্গিমার মাঝে যে আত্মবিশ্বাস আছে, এ থেকে সেই সময়ের সামাজিক পরিমণ্ডলে নারীদের উঁচু অবস্থান সম্পর্কে কিছুটা আঁচ করা যায় কি? এর ইন্টারপ্রিটিশান নিয়ে একেক বিশেষজ্ঞ একেক মন্তব্য করেছেন। ধারণা করে নেয়া হলো, এই ভাস্কর্যের নারীটি পেশায় একজন নৃত্যশিল্পী, তার চারুময় ভঙ্গিমা দেখে এবং এ থেকেই এর নাম হয়ে গেল ড্যান্সিং গার্ল।
প্রত্নতাত্ত্বিক শিরিন রত্নাগর বলছেন,
  • *“তার ঘন দীর্ঘ চুল নান্দনিক ভঙ্গিমায় গুটিয়ে ঘাড়ের কাছে খোঁপার মতো নিবদ্ধ। মূর্তিটি নগ্ন, কিন্তু কামোদ্দীপক নয় বরং অত্যন্ত সারল্যমাখা।“
এই ভাস্কর্যটি সিন্ধু সভ্যতার মানুষজনের কারিগরি দক্ষতা নিয়েও একটি ধারণা দেয়। এটি ব্রোঞ্জে তৈরি। এই ভাস্কর্য থেকেই আমরা প্রথম জানতে পারি যে সিন্ধু সভ্যতার অধিবাসীরা মেটাল কাস্টিং সম্পর্কে খুব ভালোমতোই ওয়াবকিবহাল ছিল। এ ভাস্কর্যটি বানানোর জন্যে প্রথমে একটি কাদামাটির নমুনা তৈরি করা হয়েছিল। এরপর সেই নমুনার গায়ে মোমের একটি পাতলা আস্তরণ দিয়ে দেয়া হলো। এরপর তার উপর কাদামাটির আরেকটি স্তর চাপিয়ে দেয়া হলো। এখন কাদামাটির দুইস্তরের মাঝামাঝি মোমের যে পাতলা স্তর আছে, সেখানে গলিত উত্তপ্ত ব্রোঞ্জকে ঢালা হলো। মোম সহজেই বাষ্পীভূত হয়ে গেল এবং ব্রোঞ্জের একটি চমৎকার পাতলা আস্তরণের অসাধারণ ভাস্কর্য আমরা পেয়ে গেলাম।
প্রত্নতত্ত্ববিদ শিরিন রত্নাগর অবশ্য বলছেন,
*“এই ভাস্কর্যটি আদতে আরো বড় কোন ভাস্কর্যের অংশবিশেষ, যেটা তার হাতের দিকে তাকালে বোঝা যায়, যেনবা সেখানে কোন খুঁটির মতো কিছু ধরে রাখার জায়গা ছিল।”
এই ভাস্কর্যটি আরো সাক্ষ্য বহন করে যে, সিন্ধু সভ্যতায় নৃত্যকলার কদর ছিল, বিনোদন ছিল তাদের জীবনধারার অংশ।
এর সমসাময়িক আরেকটি নিদর্শন পাওয়া গেছে মোহেনজোদারোতেই। আরেকটি মেয়ের ভাস্কর্য কিন্তু সে যেন এই ড্যান্সিং গার্লের সৌন্দর্যপ্রভার কাছে অনেকটাই ম্লান হয়ে আছে। সেটি এখন আছে পাকিস্তানের করাচির জাদুঘরে। মোহেনজোদারো এখন পড়েছে পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশে। পাকিস্তান ও ভারতের মাঝে এই ড্যান্সিং গার্লকে নিয়ে বেশ বিবাদ আছে, পাকিস্তান দাবি করে যে এই ড্যান্সিং গার্ল এর উত্তরাধিকারী তারা। তাকে যেন এই অমূল্য নিদর্শন ফিরিয়ে দেয়া হোক। ২০১৬ সালে এই নিয়ে বেশ কোর্টকাচারিও হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে ইতালির কাছে মোনালিসা যেমন, পাকিস্তানের কাছেও এই ড্যান্সিং গার্ল তেমনই।
পাঁচ হাজার বছরে আমাদের কি বিপুল পরিবর্তন! সিন্ধু সভ্যতার খুবই উন্নতমানের পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ছিল, পানির বিতরণ নিয়ে তারা রীতিমতো অবসেসড ছিল। জলপ্রকৌশলের আদিমতম কিছু নিদর্শন পাওয়া গেছে সেখানে। অথচ আমরা এক ঘণ্টা বৃষ্টি হলে মিরপুরকে পানির নীচ থেকে তুলতে পারি না। এই নৃত্যরতা রমণী যে নির্ভয়ে যে আত্মবিশ্বাসে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের সময়ে আমাদের আধুনিক শহরে কি কোন নারী এতটা আত্মবিশ্বাস নিয়ে দাঁড়াতে পারে?
দ্যা ডান্সিং গার্ল

Friday, March 18, 2022

গল্প- শশশ… by সাখাওয়াত হোসেন

— বলুন কি সমস্যা?
মোবাইলে টাইম দেখে বরাবরের মতো অবাক হলাম আমি। চারটা বেজে চুয়াল্লিশ মিনিট। অবাক হওয়ার মতো কোনো বিষয় না হলেও অবাক হচ্ছি কারণ এটা প্রথমবার নয়। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে ব্যাপারটা ঘটছে। হঠাৎ করে মোবাইল হাতে নিয়ে টাইম দেখছি, দেখা গেলো টাইম দেখানোর তিনটা কিংবা চারটা সংখ্যাই এক।
প্রথমবার পাত্তা দিইনি, কাকতালীয় ব্যাপার ভেবেছি। কিন্তু একনাগাড়ে বারবার একই ব্যাপার দেখে অবাক হচ্ছি এখন। অবশ্য নিতু হেসে উড়িয়ে দিচ্ছে ব্যাপারটা। গতরাতে ঘুম ভাঙ্গলো হুট করে, পানি খেয়ে এসে মোবাইল হাতে নিয়ে দেখি ১১ টা বেজে ১১ মিনিট! নিতু কে জাগিয়ে বললাম,
— দেখো। তুমি তো পাত্তা দিচ্ছোনা! যখনই সময় দেখছি, তখনই এই অবস্থা!
নিতু ঘুম জড়ানো গলায় বললো,
— তো কি হয়েছে? ঐ সংখ্যাগুলো তোমায় কামড় দিচ্ছে?
— তুমি বুঝতে পারছো না কেন, সামথিং ইজ রং। কাকতালীয় ব্যাপার হলে একবার দু’বার হবে, বারবার হবেনা!
নিতু মুখে এসে পড়া চুল- ঘাড় সামান্য তুলে দু’হাতে পেছনে সরিয়ে দিতে দিতে বলে,
— ওকে, বলছি আসলে কি হচ্ছে। ব্যাপারটা সময় নয়, তুমি সৃষ্টি করেছো! তুমি একটা নির্দিষ্ট সময়ে টাইম দেখছো। আমরা যখন ঘড়িতে একটা নির্দিষ্ট সময়ে এলার্ম দিয়ে রোজ উঠি, অভ্যেস হয়ে যাওয়ার পর একদিন এলার্ম না বাজলেও ঐ সময়টায় ঘুম ভেঙ্গে যায়। তোমার সাথেও একই ব্যাপার ঘটছে। তুমি ঠিক সেইম টাইমেই তোমার নিজের অজান্তেই মোবাইল হাতে নিচ্ছো, সময় দেখছো…
নিতুর ব্যাখ্যা আমার মনঃপুত হয়না কখনো, এখনো হলোনা। বলি,
— অভ্যেস দু’দিনে সৃষ্টি হয়না নিতু! এর আগে কখনো হয়নি, পাঁচ ছয়দিন হলো এমন হচ্ছে। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, এই সময়টা আশ্চর্য একটা সময়। আশ্চর্য কিছু একটা ঘটবে আমার সাথে।
নিতু আমার দিকে তাকায়, যেন এলিয়েন দেখছে। তাকিয়ে বলে,
— তুমি একটা ডাক্তার। অর্ধেক জীবন বিজ্ঞান পড়ে কাটিয়েছো। আমার কিছুই বলার নাই তোমায় আর। ঘুমাও।
….
চেম্বারে আছি চারটা থেকে ছয়টা পর্যন্ত। সিরিয়ালে আছে বিশ- ত্রিশেক লোক। এখন একজন বসে আছেন টেবিলের ওপাশের চেয়ারে।
একজন মহিলা। কালো বোরকা- হিজাব পরা। চোখ দু’টো দেখা যাচ্ছে শুধু। কাজল দেয়া। চোখ ছলছল করছে। মহিলা কাঁদছেন কিনা বুঝা যাচ্ছেনা। মহিলার কোলে একটা বাচ্চা। সাদা চাদর দিয়ে বাচ্চার সমস্ত শরীর জড়ানো, বাচ্চা চাদরের ভেতর থেকে হাত পা নড়াচড়া করছে। মহিলা চুপ করে আছেন। আমি আরেকবার জিজ্ঞেস করলাম,
— বলুন কি সমস্যা?
মহিলা হাত সামান্য উঁচু করে কোলের বাচ্চাটিকে দেখালেন আমায়। বাচ্চার বয়স সম্ভবত সাত- আট মাস। আমি প্রথমে ভেবেছি, সমস্যাটা মহিলার। ভুল ভাঙ্গলো। বাচ্চাকে দেখাতে নিয়ে এসেছেন তিনি। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম,
— হ্যাঁ বলুন, বাচ্চার কি সমস্যা?
মহিলা ডানপাশের দরজার দিকে তাকালেন, তারপর আমার দিকে। একবার বাচ্চার দিকে এবং তারপর টেবিলের দিকে তাকালেন। মনে হলো, মহিলা ঠিক গুছিয়ে উঠতে পারছেন না কোথা থেকে শুরু করবেন। ডাক্তারদের ধৈর্যশক্তি প্রচন্ড, আমি ধৈর্য ধরে রইলাম। তারপর মহিলা চট করে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট স্বরে বললেন,
— আমার বাচ্চাটা মাঝে মাঝে পরিষ্কার বাংলায় কথা বলে…
থতমত খেয়ে জিজ্ঞেস করলাম আমি,
— মানে?
মহিলা কোলের বাচ্চাটিকে আবারো সামান্য উঁচু করে আমায় দেখালেন। তারপর হতাশ তবে স্পষ্ট স্বরে বললেন,
— আমার বাচ্চা…। ওর বয়স সাত মাস। ও আর দশটা স্বাভাবিক বাচ্চার মতো নয়। জন্মাবার পর চিৎকার করে কাঁদেনি, এখনো কাঁদেনা। কান্না পেলে ঠোঁট কাঁপে, আর চোখ দিয়ে সমানে পানি বের হয়। হাসে; হাসিতে শব্দ হয়না।
আমি চুপ করে হা হয়ে মহিলার কথা শুনছি, কে জানতো, আমার ডাক্তারি জীবনের সবচেয়ে অদ্ভুত সময়টার মুখোমুখি হতে যাচ্ছি আমি!
….
— আমার নাম রাবেয়া। আমার বাচ্চাটার এখনো নাম রাখিনি, একেকজনে একেক নামে ডাকে। ওর বাবা ডাকে, পুঁটি। দাদা- দাদী ডাকে, মনি। চাচা ডাকে জয়ী। চাচা অবশ্য ঘোষণা করে দিয়েছে, ওর নাম জয়ীই রাখা হবে। আমি ডাকি, চুপকথা। আমরা বাবা- মা, স্বামী আর স্বামীর ছোটভাই সবাই একসাথে। আমার বাচ্চার প্রথম কথা বলার ঘটনাটা বলি। সেদিন শুক্রবার। দুপুরবেলা। সবাই জুমআ পড়তে গেলো। বাসায় আমি ছাড়া আর দু’জন। মা এবং স্বামীর ছোট ভাই। সে জুমআ পড়েনা। নাম জুনায়েদ। বয়স পঁচিশ- ছাব্বিশ হবে। চাকুরি খুঁজছে, আপাতত বেকার। দুপুরে আমি বাচ্চাকে ঘুম পাড়িয়ে স্নান করতে ঢুকি, বের হয়ে দেখি রুমে জুনায়েদ। বিছানায় বসে আছে। আমি লজ্জার চেয়েও বেশি ভয় পাই। গা কাঁপতে থাকে আমার। তারপরেও গায়ের কাপড় টেনে আরেকটু জড়িয়ে নিয়ে জোর করে স্বাভাবিক থেকে কাঁপা কাঁপা স্বরে বলি, ‘কি ব্যাপার জুনায়েদ? জুমআ পড়োনা কেন তুমি?’ জুনায়েদ আমার দিকে ঘোর লাগা চোখে তাকায়। আমি বুঝতে পারি ওর চোখের ভাষা। ভয়ে গা শিউরে উঠে। আমার চিৎকার করতে ইচ্ছে করে। অথচ চিৎকার করে লাভ নেই। মা কানে তেমন শুনেন না, শুনলেও উঠে যে এই রুমে আসবেন সেই ক্ষমতাও উনার নেই। আমি কি করবো ভেবে পাইনা। জুনায়েদ আমার দিকে এগিয়ে আসে, আমি হাতজোড় করে বলি। ‘প্লিজ জুনায়েদ, তুমি আমার ছোট ভাইয়ের মতো। পাপ হবে, প্লিজ।’ জুনায়েদ মুচকি হাসে, আমার গা শিউরে উঠে। জুনায়েদ এসে আমার ভয়ে কাঁপতে থাকা শরীর স্পর্শ করে। ঠিক তখনিই প্রথমবার চিৎকার করে কেঁদে উঠে আমার বাচ্চাটা! আমার মতো জুনায়েদও ভীষণ চমকে উঠে, প্রথমবারের মতো বাচ্চার কান্নার আওয়াজ শুনে। আমি ঝটকা দিয়ে ওর হাত সরিয়ে বাচ্চাকে কোলে নিয়ে পাশের বাসায় চলে যাই। তবে কাউকে কিছু বলিনা, বাসায় আসলে কি ঘটছে।
রাবেয়া থামলো, আমি পানি এগিয়ে দিলাম। পানি খাওয়ার জন্যে রাবেয়া হিজাব খুললো। আমার চোখ ধাঁধিয়ে গেলো একমুহূর্তের জন্যে। স্নিগ্ধ একটা মুখ, চিকন নাক, নাকের উপর একটা তিল রাবেয়ার। পানি খেয়ে আবার হিজাব পরে রাবেয়া বলতে শুরু করলো,
— আমি বাচ্চার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে আল্লাহকে ধন্যবাদ দিই। বাচ্চার এতোটুকুন চেহারায় আমি স্পষ্ট দেখি লালচে আভা। প্রচন্ড রাগে কান্না করলে ফর্সা মানুষের চেহারা যেমন লালচে হয়ে যায়, ঠিক তেমন। কেন যেন বাচ্চা রেগে আছে! কি অদ্ভুত! আমি বাচ্চার কপালে, তুলতুলে নাকে, গালে চুমুতে ভরিয়ে দিই। বাচ্চার লালচে চেহারা আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হয়ে আসে। সে রাতে স্বামীকে অনেকবার বলতে যেয়েও থমকে থমকে গেলাম। তারপর বললাম না আর, আরো অনেক কিছুর মতো এটাও চেপে গেলাম। কেননা, সবার সামনে জুনায়েদ আমাকে ভীষণ শ্রদ্ধা- সন্মান করে। স্বামী কখনোই বিশ্বাস করবেনা, তাছাড়াও স্বামীর সাথে আমার সম্পর্ক টা অতোটা মধুর ও নয়! উল্টো আমাকেই দোষী ভাববে। সে রাতের অনেকক্ষণ পর্যন্ত চুপিচুপি বাথরুমে গিয়ে কাঁদলাম। তারপর বাচ্চাকে কোলে নিয়ে বারান্দায় হাঁটলাম কিছুক্ষণ। কোলের মধ্যে বাচ্চার হাত পা নড়াচড়া বন্ধ হলো, ভাবলাম বাচ্চা ঘুমিয়েছে। তাকিয়ে দেখি বাচ্চা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে আছে, আমি অবাক হই, কি অদ্ভুত দৃষ্টি! আমি কপালে চুমু খাই। বাচ্চা ঐভাবেই আমার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে স্পষ্ট স্বরে স্পষ্ট বাংলায় স্পষ্ট উচ্চারণে বললো, ‘তোমার সব খুলে বলা উচিৎ ছিলো…!’
…..
পানির গ্লাস নিয়ে পানি খাই আমি, আমার মনে নেই রাবেয়ার পরে সিরিয়ালে আরো অনেকজন বাইরে অপেক্ষা করছে। রাবেয়া থামলো। তারপর বললো,
— আমি আবার আসবো। এখন যাই।
আমি বাচ্চাকে ইশারায় দেখাই, রাবেয়া বলে,
— পুরোটা না শুনলে বাচ্চার সমস্যাটা বুঝবেন না। আজ এতোটুকুন থাক, আমি আসবো আবার..
আমি শুধু মাথা নাড়লাম, রাবেয়া চলে গেলো। আমার মনে নেই কখন সব কাজ মিটিয়ে বাসায় ফিরলাম। মাথায় শুধু রাবেয়া ঘুরছে। নিতু আমার উদভ্রান্ত চেহারা দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলো কি হয়েছে। কিছু বলতে পারলাম না ও কে।
আমি বৃহস্পতিবারের অপেক্ষায় আছি, রাবেয়া আসবে আবার। একটা বাচ্চা কোলে নিয়ে। বাচ্চাটার অদ্ভুত ক্ষমতা।
রাতে নিতু কে জিজ্ঞেস করলাম,
— আচ্ছা নিতু, ধরো একটা সাত মাস বয়সী বাচ্চা পরিষ্কার বাংলায় স্পষ্ট স্বরে স্পষ্ট উচ্চারণে কথা বলছে! তাও উপদেশমুলক! কিভাবে সম্ভব?
নিতু প্রথমে মুখ টিপে হাসলো, তারপর আমার গলা জড়িয়ে বললো,
— ভুল করেছো! তোমায় ডাক্তারি নয়, সাহিত্য নিয়ে এগুনো উচিৎ ছিলো।
আমি কিছু বললাম না আর, কিছুক্ষণ পর নিতুই নিজ থেকে বললো,
— ছোট্ট বাচ্চার কথা বলা নিয়ে আমি এর আগে পড়েছি। একটা ধর্মীয় বইয়ে। একটা বাচ্চার কথা জানি আমি। একজন নবীর নিষ্পাপ এবং পবিত্রতা ঘোষণার জন্যে যে বাচ্চাটি কথা বলেছিলো।
আমি চুপ করে রইলাম। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত। চেম্বারে পৌঁছালাম সময়ের আগেই। প্রথম সিরিয়াল রাবেয়ার। আজ বাচ্চাটিকে কোলে নিবো একবার। রাবেয়া এলো একটু দেরী করে, আজ সে শুরু করলো গল্পের অন্য জায়গা থেকে,
— ছোটবেলায় মোসাদ্দেক হুজুর নামে একজন এসে আমায় বাসায় আরবী পড়াতো। স্কুলের বাইরে আমাকে কোথাও যেতে দেয়া হতোনা। প্রাইভেট ও বাসায় এসে পড়াতো টিচার। আমার বয়স তখন নয় বৎসর। হুজুরের সামনে আমি গুটিয়ে থাকতাম, কেননা সামান্য ভুলে তিনি প্রচন্ড শাস্তি দিতেন। তার প্রিয় উক্তি ছিলো, ‘আরবী পড়া নিয়া তামাশা করবা না!’ তিনি আরবী পড়াতেন সকালে। বাবা অফিস যেতো, বাসায় মা আমি আর দাদী। মা দিনের অর্ধেক সময় রান্না ঘরেই থাকতেন, দাদী শুয়ে। মোসাদ্দেক হুজুর আমায় শাস্তি দিতেন অদ্ভুত এবং উদ্ভট টাইপের। তখন আমি ঠিক করে কিছুই বুঝতাম না। এখন ঘৃণায় গা শিউরে উঠে। তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি প্রথমবার সুযোগ বুঝে আমার স্পর্শকাতর জায়গাগুলোয় হাত দিয়েছেন!
….
রাবেয়া আজ চোখে কাজল দেয়নি, চোখ গতকালের মতোই ছলছল করছে, তবে এখন রাবেয়া কাঁদছে। আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি। ওর শরীর দুলছে। রাবেয়ার কিছুক্ষণ লাগলো নিজেকে সামলাতে, তারপর বললো,
— আমি অনেকদিন পর্যন্ত চেপে গেলাম। তারপর একদিন সহ্যের বাইরে চলে যায়, আমি মাকে জানালাম ব্যাপারটা। মা চোখ বড় করে ঠোঁটের উপর তর্জনী আঙ্গুল লাগিয়ে সেই প্রথমবার বললেন, ‘শশশ… কাউকে বলোনা!’ মা, সেদিনই বাবাকে অন্য হুজুর দেখতে বললেন, তবে ঘটনা কিছুই খুলে বললেন না। ফলে বাবা ও কিছুই বুঝলেন না। মায়ের এই অদ্ভুত আচরণ আমায় ভোগালো অনেক। তিনি কেন চেপে গিয়েছিলেন ব্যাপারটা বাবার কাছে, ভেবে ভেবে প্রচন্ড মন খারাপ করেছি। হুজুর এটার কাছেই আমায় পড়া লাগলো। তবে এইবার মা কাছাকাছি দুরত্বে বসে থাকলেন পড়ানোর সময়টায়। তাও সবসময় বসে থাকতে পারতেন না, দু’মিনিটের জন্যে রান্নাঘরে গেলে আমি টের পেতাম এই পৃথিবী আর পৃথিবীর মানুষগুলো কতোটা নোংরা! সারা রাত কাঁদতাম, এতোটুকুন বয়স আমার অথচ বুঝতে শিখে গিয়েছি… জীবনের অনেকটা সময় আমায় ঠোঁটের উপর তর্জনী লাগিয়ে ‘শশশ…’ শুনে চেপে যেতে হবে অনেক ব্যথা- কষ্ট- কথা!
রাবেয়া থামলো আরেকবার। কোলের বাচ্চাটা স্বাভাবিক আর দশটা বাচ্চার মতোই খেলছে, চুপচাপ। গায়ে জড়ানো সাদা চাদর নড়ছে। রাবেয়া বললো,
— সেই ভয় ঢুকলো। তারপর বড় হলাম। স্কুল- কলেজ। ফ্রেন্ড। মেয়ে বন্ধু হলো, তবে কোনো ছেলে বন্ধু নয়। পুরুষ শব্দটায় ভয় ঢুকে গেছে ততদিনে। তাড়াতাড়িই আমার বিয়ে ঠিক হয়। স্বামীরা দুইভাই। আর বাবা- মা। চারজনের ছোট্ট সুন্দর পরিবার। আর্থিক অবস্থা ভালো, স্বামী একটা সরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করে। আমি ফুলশয্যায় স্বামীকে ছুঁতে দেইনি শরীর। কতো স্বপ্ন থাকে এ রাত নিয়ে, অথচ একটা প্রচন্ড ভীতি আঁকড়ে ধরে রেখেছে ও রাতে আমায়। আমি আমার শরীরে একটা লোমশ হাতের স্পর্শে শিউরে উঠি। ঐ স্পর্শ, যেটা আমার প্রানবন্ত শৈশবকে গলা টিপে হত্যা করেছিলো! স্পর্শ করতে না দেয়ায় স্বামী প্রচন্ড অপমানিত বোধ করলো। ওপাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়লো। আমি অর্ধেক রাত পর্যন্ত কাঁদলাম। আমার জীবনটা এমন হলো কেন?
…..
— আমায় কখনো বুঝেনি স্বামী, বুঝতে চায়নি, শুনতে চায়নি কিছুই। আমি আমার স্বামীর হাতে ধর্ষিত হই বিয়ের চার দিন পর। তারপর অসংখ্যবার। আমার পেটে আমার ছোট্ট চুপকথা আসে। আমার কান্না পায়। এই বাচ্চাটি ভালোবাসায় জন্মায়নি! বারান্দায় বসে রাতভর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদি। চিৎকার করতে ইচ্ছে করে। পারিনা। আমার পাশে আমারিই একটা বিচ্ছিরি ছায়া ঠোঁটে তর্জনী লাগিয়ে বলে, ‘শশশ…!’ স্বামীর সাথে সম্পর্ক বিয়ের প্রথমদিন থেকেই ভালো ছিলোনা, পরবর্তীতে তা আরো খারাপ হয়। আমি চেপে যাই আমার ভয়ংকর অতীত। আমাদের কখনো ভালোবাসা বাসি হয়নি। চুপকথা দ্বিতীয় বার কথা বলে, যখন স্বামীর হাতে কোনো একটা তুচ্ছ কারণে থাপ্পড় খেয়ে এসে আমি তার দিকে মুখ করে শুয়ে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়েছি। আমার গালে চুপকথার তুলতুলে কোমল হাতের স্পর্শ লাগে, চোখ খুলি আমি। চুপকথা আগের মতো করেই স্পষ্ট স্বরে বলে, ‘তোমার সব বলা উচিৎ ছিলো।’
অনেকক্ষণ হয়ে গেছে, রাবেয়া ইতস্তত করে। আমি বলি,
— সমস্যা নেই, আপনি বলুন। আজ আর কাউকে দেখছিনা আমি…
রাবেয়া বলতে শুরু করে আবার,
— আমি হতভম্ব হই, প্রথমবার বাচ্চার আওয়াজ স্পষ্ট শুনেও মনকে বুঝিয়েছি, ওটা বিভ্রম। এতোটুকুন একটা বাচ্চা আবার কথা বলতে পারে নাকি! কিন্তু এবার! আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করি, ‘তুমি কথা কিভাবে বলছো?’ বাচ্চা আগের মতো খেলতে শুরু করে, প্রশ্ন শুনে আমার নিজেরই নিজেকে বোকা বোকা মনে হয়! চুপকথা তৃতীয়বার কথা বলে, তারপর আরো বেশ কয়েকবার। খেয়াল করলাম, বাক্যটা ক্রমশ আরো ছোট হয়েছে। ‘তোমার বলা উচিৎ ছিলো…!’ ‘বলা উচিৎ ছিলো!’ ‘বলো…!’
রাবেয়া থামে, কিছু কথা গুছিয়ে নিয়ে বললো,
— শেষবার চুপকথা কথা বলে, যখন স্বামী আমায় জুনায়েদের কাছ থেকে মন গড়া গল্প শুনে অবিশ্বাস করে চরিত্রহীন বলে গাল দেয়। আমি চুপ করে সব শুনে যাই। মাঝে মাঝে এখন রাতে বাড়ি ফিরেনা স্বামী, কোথায় থাকে জানিনা। আমি চুপকথাকে বুকে জড়িয়ে ধরে ঘুমোই। চুপকথা বলে, ‘বলো…!’ আমি জিজ্ঞেস করি, ‘তুমি কথা কেন বলো আম্মু?’ চুপকথার স্পষ্ট স্বর শুনি, ‘কারণ, তুমি কখনোই বলোনি….!’
রাবেয়া থামে। আমি হা হয়ে শুনি। রাবেয়া বাচ্চাকে আমার কোলে দেয়। অনেকদিন কথা বলছেনা আর চুপকথা। আমি চুপকথাকে কোলে নিই।
পাঁচটা বেজে পঞ্চান্ন মিনিট তখন। পাঁচ পাঁচ পাঁচ। ম্যাজিক সংখ্যা। চুপকথা হাত বাড়িয়ে আমার গাল স্পর্শ করে। একটা কথাও বলছেনা সে। যেন অভিমান জমে আছে! আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকি।
রাবেয়া কে আমি কিছুই বলতে পারিনি। কেন বাচ্চাটা কথা বলছে এটাই আশ্চর্য, কেন বাচ্চাটা কথা বলছেনা সেটা নয়! আমরা অস্বাভাবিক কিছুতে অতিদ্রুত স্বাভাবিক আর অভ্যস্ত হয়ে যাই। রাবেয়া ও হয়েছে। ছোটবেলা থেকেই। একটা শব্দে। যে শব্দ অস্বাভাবিক- চেপে রাখে যা, গোপনে। খুন করে- আস্তে আস্তে মেরে ফেলে যেটা। একটা নোংরা- বিচ্ছিরি- গলা টিপে দেওয়া শব্দ। ‘শশশ….!’

Tuesday, March 15, 2022

শিশুকে কতোক্ষণ স্ক্রিন ব্যবহার করতে দেওয়া উচিত?

শিশুটিও স্ক্রিন ব্যবহার করছে
শিশুকে সামলানোর জন্যে তার হাতে কি প্রায়শই স্মার্ট ফোন, ট্যাব বা ল্যাপটপ তুলে দেন? কিম্বা নিজে কোন একটা কাজে ব্যস্ত বলে টেলিভিশনে চালু করে দেন কোন কার্টুন?
শিশু সন্তানকে খাওয়ানোর কাজটা সহজ করতে অনেকে পিতামাতা এসব স্ক্রিনের সাহায্য নিয়ে থাকেন। দেখা গেছে, বাচ্চাদের হাতে এসব তুলে দিলে তারা এগুলোতে বুদ হয়ে থাকে এবং তখন তাদেরকে খাওয়াতে খুব একটা ঝামেলা হয় না।
কিন্তু শিশুকে এসব স্ক্রিনের সামনে খুব বেশি সময় কাটাতে দিলে তার পরিণতি কী হতে পারে সেবিষয়ে কি আপনি সচেতন?
কানাডায় এসম্পর্কে চালানো বড় একটি গবেষণায় দেখা গেছে, এর ফলে শিশুদের দক্ষতার বিকাশে বিলম্ব ঘটতে পারে যার মধ্যে রয়েছে কথা বলতে শেখা এবং অন্যান্যদের সাথে মেলামেশা।
দুই বছর বয়সী প্রায় আড়াই হাজার শিশুর উপর নজর রাখার মাধ্যমে এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে।
বাচ্চাদেরকে আসলে ঠিক কতোটুকু সময় স্ক্রিনের সামনে থাকতে দেওয়া নিরাপদ সেনিয়ে যখন কথাবার্তা চলছে তখনই এই গবেষণাটির ফলাফল প্রকাশ করা হলো।
কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাচ্চার বয়স দেড় বছর হওয়ার আগ পর্যন্ত তাদেরকে স্ক্রিন ব্যবহার করতে দেওয়া ঠিক নয়।
তবে কোন কোন বিশেষজ্ঞ অবশ্য বলছেন, এজন্যে সুনির্দিষ্টভাবে কোন বয়সসীমা বেঁধে দেওয়া খুব কঠিন।
এই গবেষণায় পাঁচ বছর ধরে মায়েদের ওপরেও জরিপ চালানো হয়েছে। বাচ্চাদের স্ক্রিন ব্যবহারের ওপর তাদেরকে প্রশ্ন করা হয়েছে। জানতে চাওয়া হয়েছে কোন বয়সে তাদের আচরণ ও দক্ষতা কেমন ছিল।
এসব স্ক্রিনের মধ্যে রয়েছে টেলিভিশনের অনুষ্ঠান দেখা, কম্পিউটার, ফোন এবং ট্যাবলেটের মতো ডিভাইসে ভিডিও দেখা ও গেম খেলা।
দেখা গেছে, দুই বছর বয়সী বাচ্চারা প্রতি সপ্তাহে গড়ে ১৭ ঘণ্টা করে স্ক্রিনের সামনে কাটায়। কিন্তু তাদের বয়স যখন তিনে পৌঁছায় তখন তাদের স্ক্রিন টাইমও বেড়ে দাঁড়ায় সপ্তাহে ২৫ ঘণ্টা। আবার যখন পাঁচ বছর হয় তখন সেটা কমে হয় ১১ ঘণ্টা। সাধারণত শিশুরা এই সময়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়া শুরু করে।
গবেষণার ফলাফলে বলা হয়েছে, স্ক্রিন টাইম বেড়ে যাওয়ার কারণে শিশুদের বিকাশে যে দেরি হয় সেটা খুব সহজেই চোখে পড়ে। দেখা গেছে, ঠিক তখনই স্ক্রিন টাইম আরো বেড়ে গেছে।
কিন্তু এর জন্যে স্ক্রিনের সামনে কতোটুকু সময় কাটাচ্ছে বা তারা স্ক্রিনে কী দেখছে- এর কোনটা সরাসরি দায়ী সেটা পরিষ্কার নয়। এর সাথে হয়তো আরো অনেক কিছুর সম্পর্ক থাকতে পারে। যেমন শিশুটি কিভাবে বেড়ে উঠছে অথবা শিশুটি কিভাবে তার সময় কাটাচ্ছে।
আজকাল শিশুদের হাতে তাদের বাবা মায়েরাই স্ক্রিন তুলে দেন নিজেদের ঝামেলা এড়াতে।
গবেষকরা বলছেন, বাচ্চারা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে যে সময়টা পার করছে, এই সময়ে তারা গুরুত্বপূর্ণ আরো অনেক কিছু শিখতে পারতো।
তারা বলছেন, এই সময়ে আরেকজনের সাথে কথা বলা ও শোনার দক্ষতা তৈরি হতে পারে। দৌড়ানো, কোন কিছু বেয়ে উপরে ওঠার মতো শারীরিক দক্ষতাও সে অর্জন করতে পারতো।
তবে এও বলা হচ্ছে যে, দেরি হয়ে গেলেও বাচ্চারা হয়তো পরে এসব দক্ষতা অর্জন করে ফেলতে পারে।
গবেষক ড. শেরি মেডিগ্যান এবং তার সহকর্মীরা বলছেন, শিশুরা যাতে খুব বেশি সময় স্ক্রিনের সামনে না কাটায় সেদিকে নজর রাখা ভালো। এই বিষয়টি যাতে বাচ্চাদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ কিম্বা পারিবারিক সময়কে কমিয়ে দিতে না পারে সেদিকেও খেয়াল রাখা জরুরী।
তারা আরো বলছেন, এই গবেষণাটিতে হয়তো আরো কম বয়সী শিশুদের উপর নজর রাখার প্রয়োজন ছিল। কারণ দেখা গেছে, সাধারণ এক বছরের মাথায় শিশুরা বেশি সময় ধরে স্ক্রিন ব্যবহার করতে শুরু করে।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে কতোটুকু সময়কে খুব বেশি সময় বলে ধরা হবে?
এই প্রশ্নের আসলে সন্তোষজনক কোন উত্তর নেই।
নতুন এই গবেষণায় এরকম কোন সুপারিশও করা হয়নি যে শিশুকে কতো সময়ের বেশি স্ক্রিন দেখতে দেওয়া উচিত নয়।
মায়েদের দেওয়া তথ্যে দেখা গেছে যে দুই বছর বয়সী এসব শিশুর কেউ কেউ দিনে চার ঘণ্টারও বেশি এবং সপ্তাহে ২৮ ঘণ্টার মতো স্ক্রিন ব্যবহার করছে।
তবে এবিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের শিশু বিশেষজ্ঞদের কিছু পরামর্শ আছে:
যেসব শিশুর বয়স দেড় বছরের কম তাদেরকে স্ক্রিন ব্যবহার না করতে দেওয়াই ভালো। তবে তাদের সাথে ভিডিও চ্যাট করা যায়।
দেড় থেকে দুই বছর বয়সী শিশুর যেসব পিতামাতা তাদের সন্তানকে ডিজিটাল মিডিয়ার সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে চান তাদের উচিত বাচ্চাদেরকে মানসম্মত অনুষ্ঠান দেখতে দেওয়া। এসময় বাবা মায়েরও উচিত তাদের সাথে বসে এসব দেখা এবং তারা কী দেখছে সেটা বুঝতে তাদেরকে সাহায্য করা।
দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদেরকে দিনে এক ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন দেখতে দেওয়া উচিত নয়। এবং যা দেখবে সেটাও যাতে মানসম্মত হয়। পিতামাতাকেও তাদের সাথে বসে এসব অনুষ্ঠান দেখতে হবে।
ছয় বছরের বেশি শিশুদের জন্যেও স্ক্রিন ব্যবহারের ব্যাপারে সময়সীমা বেঁধে দেওয়া উচিত। সেটা সবসময় একই রকম থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে স্ক্রিন যাতে ঘুমানোর কিম্বা খেলার সময় কেড়ে না নেয়।
তবে কানাডার শিশু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুই বছরের নিচে কোন শিশুকে স্ক্রিন দেখতে দেওয়া ঠিক নয়।
এসব স্ক্রিনের মধ্যে রয়েছে টেলিভিশনের অনুষ্ঠান দেখা, কম্পিউটার, ফোন এবং ট্যাবলেটের মতো ডিভাইসে ভিডিও দেখা ও গেম খেলা।

গল্প- মেহেরজান by ওয়াসি আহমেদ

চোখের আড়াল হতে না হতে পদ্ম এমন বদলে যাবে, পদ্ম ওরফে পার্লির মা মেহেরজান যদি আগে আন্দাজ করতে পারত! পরের ঘটনা আগে জানার উপায় নেই; তবু ভাবে যদি জানত, অন্তত একটা ইশারাও মিলত, তাহলে কি দিনের পর দিন চুলমুঠি টেনে মাটিতে আছড়ে মুগুরছেঁচা দিত! কিল, লাথি-উষ্টা, ডালঘুটনির বাড়ি। লম্বা, ঘন কোঁকড়া চুল – ধরার সুবিধা বলে শুরুতেই হাতদুটো চুল পাকড়ে ফেলত। মারধর হজম করার তাকত ছিল গায়ে; তবে চিলস্নাত, চিল্লিয়ে খিসিত্ম করতেও ছাড়ত না। বেশিক্ষণ না – রাগ হোক, মার খাওয়ার কষ্ট হোক, ভুলে যেতে সময় লাগত না। এতে মেহেরজানের রোখ আরো চাপত। মেরে হাতে সুখ পেত না। মরে না ক্যান, বিলাইর জান। মুখে হরহামেশা বললেও মন থেকে বলত – এ কী করে হয়! আজকাল এরকমই ভাবে মেহেরজান।

এবার পদ্মর পাঠানো টাকার পরিমাণ বেশি। একুশ হাজার সাতশো হয়ে কিছু খুচরাও। বরাবর মাসে মাসে যা পাঠায় তাতে বাংলা টাকায় দশ-এগারো হয়। এবার যে বেশি পাঠাল, ফোনে তো কিছু বলল না। দিনতিনেক আগে শেষ ফোন। কথা বেশি বলেনি, টাকা পাঠাচ্ছে, মেহেরজান যেন ব্যাংকে সুকুমার স্যারের কাছে গিয়ে খোঁজ করে, বলেই পরে কথা বলবে বলে লাইন কেটে দিয়েছিল। খোদা হাফেজ, ভালা থাইকো, দুয়া কইরো – এসব কথার কথা ফোন ছাড়ার আগে বরাবর বললেও সেদিন বলেনি। হয়তো ডিউটির টাইম, বা হতে পারে তার ম্যাডামের পার্লি পার্লি ডাক শুনে খাস আরবি জবানে জবাব দিতে দিতে ছুটে গেছে।

মেয়ের নামটাও মেহেরজানের মনে থাকে না। সারাক্ষণ মনের মধ্যে পদ্ম পদ্ম। ফোনে যখন কথা হয়, মেহেরজান সোহাগ করে পদ্মসোনা ডাকে, পার্লি আপত্তি করে না। তবে একবার মনে আছে – বলেছিল, পদ্মরে ভুলতে পারতেছ না, ঠিকাছে মন চায় ডাইকো। ডাকনাম ইলু বিলু কতকিছুই অয়, কিন্তু আমার গুডনেম মানে ভালা নাম মনে রাখবা পার্লি আক্তার। পাসপুটের নাম। আর ভোটার আইডি যে করছিলাম, কেরামত হারামি দুই মাস ঘুরাইয়া চাইর হাজার টেকা দালালি খাইলো, ওইখানেও নাম পার্লি, পার্লি আক্তার। আরো আছে, ব্যাংকে সুকুমার স্যার অ্যাকাউন্ট খুইলা বই দিলো, নাম একই। তুমি আমারে পদ্ম কইতে চাও কও, মাইনষ্যেরে গুডনেম বলবা। বলবা আকিকা কইরা এই নাম রাখছো।

বুক তড়পায় মেয়ের কথায়। পদ্ম আকিকার কথা বলতে পারল! জন্মানোর পর তো যায়-যায় অবস্থা। তিন-চার মাস বসিত্মর পাতানো খালা জয়তুনবুড়িই পালল, কী মনে করে যে পদ্ম ডাকত সে-ই জানে। আর মেহেরজানের নিজেরও তখন বাঁচা-মরার ঠিক ছিল না। তোরাব আগে থেকেই ভাগার তালে ছিল; যেই দেখল ঘরের এমন হাল – একে বাচ্চা, মেয়ে বাচ্চা, তার ওপর বউ মরোমরো, বাঁচে যদি, বাসাবাড়ির কাম-কাজ ধরার ভরসা কম – সে তখন অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নিতে, মানে বেপাত্তা হতে দেরি করেনি। আকিকা করে নাম রাখতে হয় এ-খবর তাহলে পদ্ম জানে! নিজের তার আকিকা হয়নি, নামও রাখা হয়নি, তারপরও বাচ্চার নাম রাখতে আকিকার মতো ঘটনার খবর পদ্ম জানে না – কী করে হয়! পদ্ম কি আগের পদ্ম আছে!

সুকুমার স্যার বলল, কী গো, মেয়ের রোজগার সব শেষ করে দিবা নাকি? বিদেশে খাটনি খেটে টাকা পাঠায়, মাসে মাসে কিছু জমাও। মেয়ে সারাজীবন বিদেশে থাকব নাকি!

পদ্ম সারাজীবন বিদেশে থাকবে না এ-কথা মনে হলেই মেহেরজানের বুক ধড়ফড় করে। চার বছরের বেশি পদ্ম দেশছাড়া। চার বছর কম সময় নয়। মেয়েকে একনজর দেখতে সারাক্ষণ ভেতরে জ্বালাপোড়া, তাই বলে ফিরে আসবে ভাবলেই মাথায় বুঝি আসমান ভেঙে পড়ে। রুজি-রোজগারের ধান্ধা বাদ দিয়ে গত চার বছর মেয়ের টাকায় চলছে, বয়স বাড়ায় শরীর-গতর ভারী হয়েছে। বসে বসে খেলে যা হয়। এদিকে মেয়ের কড়া হুকুম – কাম করতে পারবা না। আমি আছি না? কথায় কী জোর, আর পরান-উথালি মায়া! কী কপালেই-না এমন সোনার টুকরা পেটে ধরেছিল, আগে যদি জানত!

কাজ করতে দিতে পদ্মর আপত্তি নিয়ে কথা বলে লাভ হয়নি। যেন জ্ঞান হওয়ার পর থেকে মাকে কাজ করতে দেখে দেখে সে অতিষ্ঠ। পদ্ম তখন সবে দুই-চার পা হাঁটে, জয়তুনবুড়ি মেহেরজানকে রোজগারের বুদ্ধি বাতলালো। বাসাবাড়ির কাম তো করছস, কয়টা টেকাই-বা, তোর বেশি বেশি রুজি দরকার। সেই বেশির পথ ছিল খোয়া ভাঙা। জয়তুনখালা একসময় করেছে। খাটনি যেমন, পয়সাও তেমন। তোর আর তোর মাইয়ার খাওন-পরন ভালাই চালাইতে পারবি, বুদ্ধি কইরা খরচ করলে কিছু জমাইতেও পারবি। মেহেরজান রাজি। খোলা আসমানের নিচে আগুন-রোদে মাথায় গামছা পেঁচিয়ে হাতুড়ি-ঘাই মেরে ইট ভেঙে সাইজমতো খোয়া বানানো। প্রথম প্রথম ব্যথার চোটে কনুই-ঘাড়-কোমর মনে হতো খুলে খুলে পড়বে। ব্যথা কমার বড়ি খেয়েও রাতে ঘুমাতে পারত না। তার ওপর ভয়ডরও কম ছিল না। ইটের টুকরা-ধরা হাতে বা আঙুলে একটা ঘা পড়লে হাড়-হাড্ডি মিসমার হতে কতক্ষণ! টায়ারের টিউব কেটে আঙুল-বাঁচানি হাতা কত আর ঠেকাতে পারত। কপাল ভালো যে অঘটন কিছু ঘটেনি। তবে রুজি যে বেশি হবে বলেছিল জয়তুনখালা, কথা ঠিক। প্রথম যখন কাজ ধরল তখনই দিনে দুইশো টাকা। সেই আমলে সোজা কথা! ঘরভাড়া ম্যালা বাকি পড়েছিল, এছাড়া নানাজনের কাছে ধারকর্জ। আসেত্ম আসেত্ম মিটিয়েছে। টাকার গন্ধ শুঁকে তোরাব ভিড়তে নানা কায়দাকানুন করেছে। মেহেরজান পাত্তা দেয়নি, মনে মনে বলেছে, সামনে যুদি পাই এই আতুড়ির তলে কলস্না খুয়াইবি হারামির বাচ্চা।

সুকুমার স্যারের কথা ঠিক; কিন্তু নিজের খোরাকির খরচ আর ঘরভাড়া মিটিয়ে পদ্মের দশ-এগারো থেকে হাতে কী-ই-বা থাকে! তবে একেবারে কিছুই যে মেহেরজান জমায় না তা-না। জমাতে পারত আরো, যদি নিজে কিছু করত। মেয়ে বাগড়া দিয়েছে ঠিক, কিন্তু যদি কিছু একটা করার পথ পায় পদ্ম জানবে কী করে!  সেলাই-ফোঁড়াই জানলে কিসিত্মতে একটা মেশিন কিনে বাড়তি রোজগারের পথ বের করতে পারত। কিন্তু এ-বয়সে কার কাছে সেলাই শিখবে! বাসাবাড়িতে ছোটা-কাজ চাইলেই পাওয়া যায়। বসিত্মতে কতজনই তো করে। মুখ ফুটে বললেই কাজ জুটবে। কিন্তু পদ্মর কানে যদি যায়? মাঝে মাঝে ভেবেছে পদ্মকে বুঝিয়ে-সুজিয়ে রাজি করাবে, সাহসে কুলায়নি। এ পদ্ম আগের পদ্ম না, শুনে কী করবে বলা মুশকিল। পদ্ম নিজে অবশ্য যে-কাজ করে সেও বাসাবাড়ির কাজ, তবে বিদেশ তো বাংলাদেশ না যে বাসাবাড়ির কাজ মানে ঝিগিরি। পদ্ম যে-কাজ করে সেটা বাচ্চা রাখার, ইংরেজি নাম বেবিসিটিং – পদ্ম বলেছে। তার ম্যাডামের দুই বাচ্চা, দুইটাই মেয়ে। কাজ বলতে বাচ্চাদের মম-ড্যাডি মানে মা-বাবা বাইরে কাজে চলে গেলে ওদের খাওয়ানো, জামাকাপড় বদলানো, ওদের  নিয়ে টিভিতে কার্টুন ছবি দেখা, আর দুনিয়ার খেলার জিনিস নিয়ে ওদের সঙ্গে খেলা। ঝিগিরি যে নয়, তার প্রমাণ পদ্মর পাঠানো ছবি। কে বলবে এ আগের পদ্ম! পার্লি, হ্যাঁ পার্লি বললে মানায়। পরনে জিনসের প্যান্ট, গাঢ় গোলাপি টিশার্ট, আর পায়ে যে-জুতা এদেশে কয়জন বড়লোকের মেয়ে এমন তুলতুলে লোম-লোম জুতা পায়ে দেয়! পুরু গদির সোফায় বসে মেয়ে তার টিভি দেখে, হাতের পাঞ্জায় বেড় না পাওয়া চ্যাপ্টা মোবাইল। চেয়ার-টেবিলে বসে খায়। চেহারা-সুরত আগেও খারাপ ছিল না, যত্নের অভাবে আসল চেহারা চাপা পড়ে ছিল। এখন দেখলে, নিজের মেয়ে বলে না, চোখ ফেরানো কঠিন। পথেঘাটে কত মেয়েই তো দেখে, কয়জনের ক্ষমতা আছে তার পদ্মর পাশে দাঁড়ায়! লেখাপড়া তো বসিত্মর ইশকুলে ফাইভ পর্যন্ত, কেউ বলবে এখন এ-কথা! আর আরবি জবান যে ও শিখল, কেউ শিখিয়েছে? নিজে নিজে এর-ওর মুখে শুনে এখন তো তার জবান পাক্কা সে-দেশের মানুষের জবানের মতোই।

এই পদ্মর কারণে একটা সময় গেছে মেহেরজানের শান্তিতে শ্বাস ফেলার ফুরসত মিলত না। সারাদিন খাটনি খেটে ঘরে ফিরতে না ফিরতে নালিশ আর নালিশ। একে মেরেছে, ওর খেলনা চুরি করেছে। কিছুটা বয়স বাড়তে বড় বড় নালিশও আসতে শুরু করল। বসিত্মর উঠতি মাস্তানদের সঙ্গে ফুসুর-ফুসুর, ঢলাঢলি। দু-একবার  বেকায়দায় ধরা পড়ে বিচার-সালিশ পর্যন্ত গড়িয়েছে। এ-অবস্থায় মেহেরজান হাত গুটিয়ে থাকে কী করে! খোয়া-ভাঙা হাতে হাতুড়ি থাকলে বুঝি সুবিধা হতো, মাথা গুঁড়ো করে মাপমতো খোয়া বানাতে না পারলেও ছেঁচতে অসুবিধা কী!

কী মারটা না মারত! মার খেয়ে খেয়ে ও হয়তো ঠিক করে ফেলেছিল – মারবা মারো, কত আর মারবা, আমার মন যা চায় করুম। খোয়াভাঙা রুজি তোমার, আমার পথ আমার। অনেকদিন ধরেই হয়তো মনে এমন জেদ বাসা বাঁধতে শুরু করেছিল, মেহেরজান টের পায়নি। পরিবর্তনটা নজরে পড়ল পদ্মর বয়স যখন পনেরো-ষোলো, শরীরে বাড় বেশি বলে মনে হতো সতেরো-আঠারো – একদিন ঘোষণা দিলো সে কাজ ধরবে, কাজ নাকি ঠিকও
করে ফেলেছে। না, খোয়া ভাঙাভাঙি না, বাসাবাড়িতে ঝিগিরিও না। সে করবে চাকরি, চাকরির নাম সেলসগার্ল। এক বড়লোক মহিলার এলাহি দোকান, মেহেরজান বুঝবে না তাই বলেছিল দোকান, আসল নাম শোরুম। বাচ্চাদের, মহিলাদের জামাকাপড়, অলংকার, ঘর সাজানোর হাজারো জিনিসে ঠাসা। আরো বলেছিল – দোকান বড়লোকগো পাড়ায়, ধানম–তে। মাস গেলে বেতন পাঁচ হাজার, লাঞ্চ মানে দুইফরের খাওয়া ফিরি, উপরি ওভারটাইমও আছে।

মেহেরজান শুনছিল আর ভাবছিল কোন গুণ্ডা-বদমাইশের খপ্পরে পড়ল কে জানে! চাকরিটা তাকে দিলো কে, খোঁজই-বা পেল কী করে – এসবের সোজাসাপটা জবাব –  তুমার চিমন্তা করন লাগব না গো, বুইজা-শুইনা আগাইছি। কথাবার্তার ধরন নতুন। বুইজা-শুইনা আগাইছি কথাটা কানে আঠার মতো লেগে থাকলেও কী বুঝেছে জানতে মেহেরজান কী করবে! খুব যে বলল বড়লোকের দোকান, তো চাকরিতে যে যাবে, ভালো জামাকাপড় কোথায় পাবে, খালি কি জামাকাপড়, কিছু সাজগোজও তো লাগবে। পদ্মর সেই এক কথা – তুমার চিমন্তা করন লাগব না।

সেই শুরু। দেখা গেল মুখে যা বলেছিল তার থেকে এক চুলও এদিক-ওদিক না। মেহেরজান একদিন চুপিচুপি বাইরে থেকে দোকান দেখে তাজ্জব হয়েছে, সত্যিই বড়লোকি কারবার। সকাল আটটায় পদ্ম বেরিয়ে যেত, প্রথমদিকে নিজের পুরনো জামাকাপড়ই ধুয়ে আবুলের লন্ড্রি থেকে ইস্ত্রি করিয়ে পরত। মাস-দুই যেতে নতুন সালোয়ার-কামিজ, স্যান্ডেল, মোবাইল। সেইসঙ্গে শ্যাম্পু, সাবান, ক্রিম, লিপস্টিক, এমনকি সেন্টও। প্রথম মাসের বেতন পেয়ে মেহেরজানের জন্য নিয়ে এলো কমলা রঙের টাঙ্গাইল শাড়ি। বলল, ঈদের বোনাস দিয়ে ঘরে ফ্যান লাগাবে, রাতে গরমে ঘুমাতে পারে না, সারাদিন এসির ঠান্ডায় পার করে এমন দোজখের গরম।

এক ঘরে, এক চৌকিতে পাশাপাশি শুয়েও মেহেরজানের উপায় ছিল না পদ্মর মতিগতির হদিস পায়। খুব ইচ্ছা করত জানতে সারাদিন কী করল; বড় দোকান, আরো নিশ্চয় মেয়েরা আছে, ওদের সঙ্গে ওর সম্পর্ক কেমন। দুপুরে কী খায়? আরো কত কী! তবে একটা কথা মাথায় ঘুরপাক খেলেও মুখে আনার সাহস পেত না। পদ্ম যদি দোকান থেকে চুরি-টুরি করে তাহলে জেলখাটা ছাড়া পথ থাকবে না – কথাটা দুদিন আগে হলে বলতে মুখে আটকাত না। মুখে আটকানোর মতো আরো কত কথা! মারগুলো যে দিত উঠতে-বসতে, এতে তার নিজের কষ্টও কম হতো না। বলতে পারলে বুক হালকা লাগত; কিন্তু পদ্ম বিশ্বাস করবে এমন কথা? আর কথাটা কি সত্যি? মারত যখন, বিলাইর জান বলত, তখন তাকে বিলাই ভেবেই পেটাত।

বছর না ঘুরতে সংসারের চেহারা বদলে গিয়েছিল। মেহেরজানের খটকা লাগত, বেতন মোটে পাঁচ হাজার, কিন্তু খরচের সঙ্গে পাঁচ হাজারের হিসাব মেলাতে পারত না। বসিত্মতে যে ঘুপচিঘরে তারা থাকত, সেটা ছেড়ে কাছেই বড় একটা ঘর নিল পদ্ম। ফ্যানের ব্যবস্থা আগেই হয়েছিল, নতুন ঘরে খাট-জাজিম ঢুকল, চোদ্দ ইঞ্চি টিভি, এমনকি বেঁটেখাটো ফ্রিজও। সবই নাকি কিসিত্মতে। তো কিসিত্মতে হোক বা বিনা পয়সায়ই হোক, এমন পরিবর্তনে মানুষের চোখ টাটাবে জানা কথা। শুরু হলো কানাঘুষা। মেহেরজানের কানে সব না এলেও কিছু কিছু যা আসত সেসব আমলে না নিলেও নিজের মনের খটকাই তাকে সময়-অসময় খোঁচাত। পদ্মর চাকরি বুঝি নামেই, ওটা নাকি সাইনবোর্ড, রুজির আসল পথ অন্য। না হলে দুদিনে কী করে প্রিন্সেস বনে যায়! আড়ালে-আবডালে না, সামনাসামনিই বলাবলি করত – এমুন পিন্সেস থাকতে খোয়া ভাঙো!

নিজে থেকে জানতে চাওয়ার দরকার পড়ল না, পদ্মই মুখ খুলল – মাইনষ্যের কতা কানে তুলবা না। আমার যা উচিত মনে অয়, করি। মাইনষ্যের খাই না, পিন্দিও না। আমার মন যা চায় করুম। আমার ভালা আমি বুজুম, না হেরা বুজব! চিমন্তা করবা না, ভালা খবর আছে, বিদেশ যাওয়ার পথ পাইছি।

কথাটা কানে নিয়ে মেহেরজান থ হয়ে বসে থাকল। কথার কথা যে না, বলার ঢংয়ে পরিষ্কার। মাসখানেক যেতে একরাতে ঘটনা খুলে বলতে মেহেরজান থম ধরে শুনে গেল। পদ্ম জানাল, কামাই-রুজির জন্য বিদেশ যাওয়া ছাড়া গতি নেই। অনেকদিন ধরেই নাকি পাত্তা লাগাচ্ছিল, এতদিনে যাওয়ার ব্যবস্থা প্রায় ঠিক হয়ে গেছে। যাচ্ছে সে লেবাননে, একা না, সঙ্গে আরো মেয়ে যাবে। তবে যাওয়ার পর কাজের জায়গা যার যার আলাদা। কেউ কারখানায়, কেউ হাসপাতালে, কেউ বাসাবাড়িতে। তবে বাসার কাজ মানে বাংলাদেশের চাকরানিগিরি নয়। বেবিসিটিং। কাজটা যে কী বুঝিয়ে বলে এও বলেছিল, বিদেশে এই কাজ ভালো ঘরের শিক্ষিত মেয়েরা করে। তাকে এ-কাজে নেওয়া হচ্ছে তার কপালের জোরে। কথায় কথায় পদ্ম আরো বলল, যেন বলাটা তেমন জরুরি নয়, টাকা লাগবে ম্যালা। তবে একসঙ্গে দিতে হবে না, যারা পাঠাচ্ছে তারা মাসে মাসে বেতন থেকে কেটে রাখবে। সত্য-মিথ্যা মেহেরজান কী বুঝবে! বোঝার মধ্যে এটুকু – মেয়েকে হারাচ্ছে। বিদেশে যাবে, কিন্তু টাকা-পয়সার এমন সোজাসরল ফয়সালা! তার মন বলল, পদ্ম পাচার হয়ে যাচ্ছে, নিজের ইচ্ছাতেই হচ্ছে। মানুষ যা নিয়ে কানাঘুষা করে তা তবে সত্যি। পদ্ম খানকি হয়ে গেছে। দিন কয়েক আগে সে তার ব্যাগ ঘাটতে গিয়ে রাঙতায় মোড়ানো বেশকিছু রঙিন বড়ি পেয়ে  কিসের ওষুধ জানতে চাইলে ব্যাগ হাতড়ানোর জন্য পদ্ম তেড়েমেড়ে এক চোট নিয়েছে। কিছু সময় পর গলা নরম করে বলেছে – মাথা ধরার ওষুধ, সারাদিন এসির ঠান্ডা।

তেমন তোড়জোড় ছাড়াই পদ্ম মাসতিনেক পর চলে গেল। যাওয়ার আগে মেহেরজানকে ধরে খুব কাঁদল, আর একটা খামভর্তি টাকা হাতে গছিয়ে বলল – কাম ছাইড়া দিবা, যতদিন টেকা না পাঠাইছি এই দিয়া চলবা। নিজের মোবাইলটা দিয়ে বলল – ফোন দিমু।

পদ্ম চলে যাওয়ার পর বেশ কিছুদিন ধন্ধ কাটেনি। কাজ মেহেরজান ছাড়েনি। খরচ কমাতে ছোট একটা ঘর নেওয়ার কথা চিমন্তা করছিল, আর টিভি-ফ্রিজ বেচে দেবে ভেবেছিল। মাঝে মাঝে এমনও ভাবত, অন্য কোথাও গিয়ে ঘর নেয়। পদ্ম না থাকলেও তাকে নিয়ে কথাবার্তা কানে আসত। নতুন জায়গায় গেলে এ থেকে অন্তত রেহাই পাবে, যদিও জানত তার নিজের মাথার পোকা ঠিকই কামড়াবে। কিন্তু যেই পদ্মর ফোন আসা শুরু করল, মেহেরজান অবাক হলো – সে যা ভেবেছিল তা কি সত্যি নয়? পদ্ম তবে পাচার হয়নি? এক বড়লোকের বাড়িতে নাদুসনুদুস দুইটা বাচ্চা দেখাশোনা করছে। বাচ্চাদের সঙ্গে, তাদের মায়ের সঙ্গে তার নিজের ছবি পাঠিয়েছে।

ধন্ধ কাটানো মুশকিল। তারপর যখন মাসে মাসে টাকা পাঠানো ধরল, পাঠিয়েই ফোন, যেন টাকার অভাবে তার মা না খেয়ে মরছে, মেহেরজানের মাথায় তখন অন্য পোকা – এ পদ্ম কোন পদ্ম! মায়ের সঙ্গে এক বিছানায় শুয়েও যে-কথা বলার দরকার মনে করত না, সে-ই বিদেশে পা দিয়ে সারাক্ষণ মাকে নিয়ে দুশ্চিমন্তায়! দিনে দিনে মেহেরজানেরও জড়তা কেটেছে। আগে মেয়ের সঙ্গে ভালোমন্দ কিছু বলার ইচ্ছা থাকলেও পারত না; যখন তখন চুলমুঠি পাকড়ে আছড়ানোর ঘটনাগুলো মনে পড়ামাত্র সে কুঁকড়ে যেত। সমস্যা থেকে পদ্মই তাকে বের করে আনল। তারপর যেদিন মেহেরজান পদ্মসোনা ডাকল, বুকটা হুহু করে উঠল। শুনে ওপাশে পদ্মর কী হয়েছিল বলতে পারবে না, তবে ডাকটা মেহেরজানের জ্বালাপোড়ায় মলমের কাজ দিয়েছিল। ওদিকে পদ্মও যেন হঠাৎ করে মায়ের আদর-সোহাগের কাঙাল। কোনোদিন যেসব কথা বলেনি, বলত। আইজ রান্দা কী গো মা বলে এমনভাবে ফোনের ওপাশে জবাবের অপেক্ষায় থাকত যেন মেহেরজান ভাত বেড়ে দিতে দেরি করায় তার তর সইছে না।

এবার কী ভেবে টাকা বেশি পাঠাল? অন্য এক ব্যাংকে পদ্মর আলাদা অ্যাকাউন্ট আছে, মেহেরজান জানে। সেখানে সে নিশ্চয় কিছু না কিছু জমায়। কিছু কিছু কেন, বেশি বেশিই জমানোর কথা। নিজের ভবিষ্যতের কথা ভেবে পদ্ম যদি তাই করে –  করা অবশ্যই উচিত – সেটা খুবই ভালো খবর।

ঘরে ফিরে সারাদিন ফোনের অপেক্ষায় থেকে ফোন না পেয়ে মেহেরজান টাকার চিমন্তাতেই ফিরে গেল। অন্যান্যবারের চেয়ে যে বেশি পাঠাল! সে তো বাড়তি কোনো খরচের কথা বলেনি, পদ্মও জানতে চায়নি। পদ্মর ফোন এলো আরো দুদিন পর। ব্যস্ত ছিল তাই ফোন দিতে পারেনি বলে জানতে চাইল মেহেরজান টাকা তুলেছে কি না। টাকা বেশি কেন পাঠিয়েছে এর জবাবে পদ্মর গলায় অভিমান – আমি আমার মারে টেকা বেশি পাঠামু আমার ইচ্ছা। এখন থাইকা এরমই পাইবা। তুমার শখ মিটাইয়া খরচ করবা।

মেহেরজানের মুখে কথা ফোটে না। এই পাগলিকে কী বলবে! মাকে বেশি টাকা পাঠাচ্ছে এ তার ইচ্ছা – এ কেমন যুক্তি! খাটনির রোজগার, সাবধানে আগলে রাখতে হয়। অবশ্য মেহেরজান মাথায় কিছু বুদ্ধিশুদ্ধি রাখে, টাকা বেশি পাঠালেই খরচ করে ফেলতে হবে কোন আহ্লাদে! দরকারের বেশি ব্যাংক থেকে না তুললেই হলো। তারপরও মেহেরজান না বলে পারল না, সব কামাই যদি মাকে দিয়ে দেয় তার কী থাকে? এক সুযোগে কায়দা করে কথাটা বলে ফেলে সে অপেক্ষা করল পদ্ম কী বলে। পদ্ম হাসল। আমার জইন্য একদম চিমন্তা করবা না বলে মেহেরজানের দুশ্চিমন্তাকে এক ফুঁতে উড়িয়ে দিয়ে জানাল, সে তার টাকাকড়ির ভালোই ব্যবস্থা করে রাখছে। কথা শেষ করেই বলল – সামনে বকরি ঈদে একটা ছাগল কোরবানি দিবা। কুচকুইচা কালা। পারবা না?

পদ্ম চলে যাওয়ার পর বসিত্মতে তাকে নিয়ে কথাবার্তা কানে কম আসে। তারপরও ইতর পোলাপান পথেঘাটে খোঁচায় – ও খালা পিন্সেসের খবর কী, কবে আসব? পড়শিরা তার সুখে জ্বলেপুড়ে খাক হলেও জানতে চায় – মাস-মাস কত জানি পাডায়? জয়তুনবুড়ি একমাত্র যে পদ্মর খোঁজ নিতে গিয়ে মেহেরজানকে হিংসা করে বলে মনে হয় না। ছোটবেলা পদ্মকে সে-ই দেখেছে, পদ্ম নামটাও তার দেওয়া। পদ্ম সেসব ভোলেনি। দেশে যখন চাকরি করত, প্রায়ই বুড়িকে এটা-ওটা এনে দিত। এবার পদ্ম যে এতগুলো টাকা পাঠাল, এর থেকে বুড়িকে হাজার দুয়েক দিলে পদ্ম খুশি হবে।

ঈদে ছাগল কোরবানির কথা পদ্মর মাথায় কেন এলো বুঝতে পারছে না। বসিত্মতে  কেউ কোনোদিন কোরবানি দিয়েছে মেহেরজান শোনেনি। পদ্মর টাকায় এবার সে-ই প্রথম দেবে। মানুষের চোখ টাটায়, টাটাক। অন্যের ভালো দেখতে-না-পারা মানুষের রক্তের দোষ। বড়লোক ছোটলোক এ-জায়গায় সমান।

টাকা পেয়ে জয়তুনবুড়ি কেঁদে ফেলল। সে এখন বলতে গেলে ঘরবন্দি, হাঁটাচলা তেমন করতে পারে না, শরীরে একশটা অসুখ। বুড়ি বিড়বিড় করে কতক্ষণ পদ্ম পদ্ম করল, তারপর চোখ মুছে গলা নামিয়ে বলল – আইচ্ছা ক তো পদ্ম ওইখানে কী করে? তোরে কাম ধরতে মানা করে, মাস-মাস টেকা পাডায়, ও কত রুজি করে? তোরে কী কমু, মাইনষ্যে কত কতা কয়! বুড়ি থেমে গলার সুর বদলে বলল, ভালা আছে আমাগো পদ্ম? দেখতে দেখতে কত বড় অইয়া গেল, বিদেশে একলা থাকে, কামাই করে। কী মাইর না মারতি গো! দোয়া করি ভালা থাউক। আওনের সুময় আমার লাইগা একখান পশমের কম্বল আনতে কইবি। মারপিটের কথা মনে করিয়ে দেওয়ায়, না-কি মানুষের মুখে পদ্মকে নিয়ে আকথা-কুকথা শুনেছে বলে মেহেরজানের ইচ্ছা করল বুড়ির হাত থেকে টাকাগুলো কেড়ে নেয়।

বেশ রাতে ঘরে বসে তার মনে হলো বুড়ি শুনেছে বলে বলেছে, বিশ্বাস করেছে বলেনি। সে নিজেও তো শুনেছে, আগে বেশি বেশি শুনত, এখন পদ্ম এখানে নেই বলে কম শোনে। একসময় তো এমন ছিল, সে মা হয়েও ধন্ধে ছিল। ভাবতে ভাবতে একসময় সে আনমনা হয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ পর গা ঝাড়া দিয়ে উঠে যা ভাবল তা তাকে চমকে দিলো। পদ্মকে নিয়ে যা শোনে সেসব যদি সত্যি হয়, হয়ই যদি, কার কী! কোন হারামির বাচ্চার কী! পদ্মর নিজের মুখের কথা মনে করে ভাবল, পদ্ম কারো খায় না, পিন্দেও না, ওর যা মন চায় করুক, তোগো কী! চমকানোর ধাক্কাটা সয়ে নিয়ে সে অন্য কথা ভাবল। দুনিয়ায় পদ্মর মতো কে আছে যে মার কথা চিমন্তা করে এমন আছাড়িপিছাড়ি করে, তাও যে মা কথায় কথায় কিল-লাথি ছাড়া কিছু বুঝত না! বুকে দুধ ছিল না বলে জন্মানোর পর মায়ের এক ফোঁটা দুধ পর্যন্ত পায়নি। চোখ ভাসিয়ে কান্না চাপতে তার ইচ্ছা জাগল, গোটা বসিত্মর লোকজনের ঘুম ছুটিয়ে চিল্লিয়ে কাঁদে। কেন কাঁদছে বলবে না। কাউকে না, কেউ জানবে না। প্রাণভরে গলা খুলে কাঁদবে। সবাই ভাববে, পদ্ম মরে গেছে। পদ্ম ছাড়া তার কে আছে যে কাঁদবে! ভাবুক, যার যেমন খুশি ভাবুক। কেবল সে জানবে পদ্ম ওরফে পার্লি মরবে কোন দুঃখে, তার মা আছে না? যেমন পদ্ম তাকে বলে, বলেছিল, আমি আছি না?

Monday, March 14, 2022

‘কেন আমি ভয় পাবো?’ -প্রফেসর কে এস ভগবান by বিখার আহমেদ সাঈদ

প্রফেসর কে এস ভগবান
মাইসুরুতে কানাড়া ভাষার সাহিত্যিক ৭৩ বছর বয়সি প্রফেসর কে এস ভগবান দীর্ঘ ৩৭ বছর মাইসুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপনা করেছেন। ২০০৫ সালে অবসরে যাওয়া এই অধ্যাপক কানাড়া ভাষায় উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের নাটকগুলো অনুবাদ করেন। সাহিত্য ও সামাজিক ইস্যুতে ৪০টির বেশি বই লিখেছেন তিনি, পেয়েছেন কর্নাটক রাজ্যসভা ও কর্নাটক সাহিত্য একাডেমিসহ অসংখ্য পুরষ্কার।
অষ্টম শতকের হিন্দু দার্শনিক সানকারাকে নিয়ে ১৯৮২ সালে তার একটি গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। এতে ভগবান বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি তুলে ধরেন যেগুলো চরমপন্থী হিন্দুরা মানতে পারেনি। ফলে তাকে নানাভাবে হুমকি দেয়া হয়। কিন্তু হুমকির কাছে মাথা নত করার বদলে প্রফেসর ভগবান তার ইতিহাস ও ধর্মীয় সাহিত্যের উপর ব্যাপক পড়াশুনার ভিত্তিতে হিন্দু ধর্মীয় মতবাদের বিরুদ্ধে বক্তব্য অব্যাহত রাখেন। বাস্তবতাবাদ ও মানবতাবাদের দৃঢ় সমর্থক এই ব্যক্তিত্ব অনেক হিন্দু দেব-দেবীর অসারত্ব নিয়ে কথা বলতে দ্বিধা করেননি। এমনকি মনুসংহিতা ও ভগবত গীতার ত্রুটিগুলোও তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন।
২০১৫ সালে আরেক বিখ্যাত ব্যক্তি এম এম কালবর্গি খুন হওয়ার পর থেকে পুলিশ প্রহরায় চলতে বাধ্য হচ্ছেন প্রফেসর ভগবান। গৌরি লংকেশ খুন হওয়ার পর প্রমাণিত হয় এ ব্যাপারে সিদ্ধান্তটি ঠিক ছিলো। খুনীরা মাইসুরে তার কুভেমপুনগরের বাড়িতেও এসেছিলো। কিন্তু পুলিশ প্রহরা দেখে ফিরে যায়। চরম হিন্দুবাদী সন্ত্রাসীগ্রুপগুলোর হিটলিস্টে তার নাম রয়েছে। প্রফেসর ভগবান তার বাড়িতে বসে ফ্রন্টলাইনকে এই সাক্ষাতকার দেন।
সানকারা বইটি প্রকাশের পর থেকেই চরমপন্থী হিন্দুদের টার্গেটে রয়েছেন আপনি? বইতে কী লিখেছেন?
আমি ‘সনকরাচারিয়া ও প্রতিক্রিয়শীল দর্শন’ শীর্ষক বইটি লিখি ১৯৭৯ সালে এবং এটি প্রকাশিত হয় ১৯৮২ সালে। আমি দেখিয়েছি যে সানকারা কোন দার্শনিক বা আদভাইতিন বা যে কিনা সবকিছুর সমতায় বিশ্বাস করেন, এমন কেউ ছিলেন না। তিনি এগুলো প্রচার করতেন কিন্তু নিজে অনুসরণ করতেন না। আমি তার অনেক সংস্কৃত উদ্ধৃতি দিয়েছি যেখানে তিনি বলেছেন যে শূদ্রদের জ্ঞান অর্জনের অধিকার নেই। সানাকারা ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মের শত্রু। তিনি বৌদ্ধস্থাপনা ধ্বংস করেছেন, ভারত থেকে বৌদ্ধ ধর্মকে নিশ্চিহ্ন করেছেন। অন্য ধর্মের প্রতি তার বিদ্বেষ ছিলো অসীম। অত্যন্ত অসহিষ্ণু ছিলেন তিনি এবং পুরোপুরি বর্ণবাদের পক্ষে। তিনি ব্রাহ্মণদের শ্রেষ্ঠত্বে বিশ্বাস করতেন এবং অব্রাহ্মণরা তার কাছে ছিলো দাস। তাই আমি যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছি যে একজন দার্শনিকের এমন চরিত্র হতে পারে না এবং আমরা সানকারাকে কোন আলোকপ্রাপ্ত ব্যক্তি হিসেবে মানতে পারি না।
বইটি প্রকাশের পর ১৯৮০’র দশকে চরমপন্থী হিন্দু গ্রুপগুলোর কাছ থেকে আমাকে খুন করার হুমকি দিয়ে অনেক ফোন পাই। কয়েক বছর আগে আবারো এই হুমকি দেয়া শুরু হয়েছে।
কেন আবার শুরু হলো?
২০১৬ সালে আমি ভগবত গীতার উপর একটি বক্তৃতা দেই এবং সেখানে বলি যে এর কিছু অংশ পুড়িয়ে ফেলতে হবে কারণ সেখানে সকল অব্রাহ্মণ, শূদ্র ও নারীকে পাপী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আমাকে হুমকি দেয়া হয়। আমি বলেছি যে আমাদের মতো অব্রাহ্মণরা পাপী নই কারণ আমরা সবার জন্য সম্পদ ও খাবার উৎপাদন করছি। তাই আমরাই পূণ্যের অধিকারী। বরং যারা এসব সম্পদ ও খাবার শোষণ করছে তারাই পাপী। আমি আরো অনেক সেমিনারে একই কথা বলেছি এবং সুষমা স্বরাজ যখন ভগবত গীতাকে দেশের ধর্মীয় গ্রন্থ করার কথা বলেন আমি তার বিরোধিতা করেছি।
বর্তমান বিজেপি সরকার ক্ষমতায় থাকলে আপনার বিরুদ্ধে হুমকি আরো বেড়ে যাবে বলে কি মনে করেন?
হ্যা, অবশ্যই! সম্প্রদায়িকতা, গোড়ামি, ইত্যাদির বিকাশ ঘটায় এমন উপাদানগুলোর মহোৎসব শুরু হবে। গত সপ্তাহে পুনে পুলিশ পাঁচ একটিভিস্টকে গ্রেফতার করেছে। আমি এর নিন্দা করি। কেন্দ্রিয় সরকারের ব্যর্থতার জন্যই এসব হচ্ছে। কারণ এই সরকার জনগণের প্রত্যাশা জাগিয়ে তুলতে পারেনি। তারা তাদের ইশতেহারে ঘোষিত অঙ্গীকারগুলো পূরণ করতে পারেনি। এটা ঠাকতেই জনগণের দৃষ্টি ভিন্নদিকে ফেরাতে চাচ্ছে।
আপনার নাম হিন্দু চরমপন্থীদের হিটলিস্টে রয়েছে। এরা আপনার মতো লেখক, বুদ্ধিজীবী ও এক্টিভিস্টদের হুমকি দিচ্ছে।
হ্যা, কারণ আমরা জীবনকে তুচ্ছ করে জনগণকে শিক্ষিত করার চেষ্টা করছি। তাদেরকে সামাজিক বৈষম্য ও দারিদ্রের কারণের ব্যাপারে সচেতন করছি। আর তথাকথিত হিন্দু ধর্মের দেবতারা তাদেরকে বিভ্রান্ত করছে এবং শোষণ করছে। আমি রামের উপর বই লিখেছি: ‘কেন আমাদের রামমন্দির প্রয়োজন নেই’। কয়েকমাস আগে বইটি প্রকাশিত হয়েছে। রাম, কৃষ্ণের নামে শোষকরা ভুল বার্তা ছড়াচ্ছে। ভগবত গীতা দেখুন, সেখানে কৃষ্ণ নিজেই অসাম্যের কথা বলছে। কৃষ্ণ নিজেই যখন অসাম্যের পক্ষে তখন আপনি কীভাবে বলবেন হিন্দু ভালো ধর্ম? রামের ক্ষেত্রেও তাই। রামায়নে বাল্মিকি স্পষ্টভাবে বলেছেন যে সমাজে চার বর্ণ বা জাত রক্ষা করা রামের দায়িত্ব। রাজা হিসেবে এই ব্যবস্থা রক্ষার দায়িত্ব রামের।
গবেষণার জন্য আমি সবকিছুর মূল সংস্করণ অধ্যয়ন করেছি। রামের সাতটি খণ্ডে ২৪,৬০০ শ্লোক রয়েছে। এতদিন যা আড়ালে ছিলো আমি জনগণের সামনে তা তুলে ধরেছি। আপনি কি জানের যে বুদ্ধের নিন্দা করেছেন রাম? আমার বইয়ের বক্তব্যের ব্যাপারে চরমপন্থী হিন্দুদের কেউই মতামত প্রকাশ করেনি।
তাহলে আপনি কি বলবেন যে বাবরি মসজিদ ধ্বংস করা ধর্মীয়ভাবে ন্যায্য হয়নি?
হ্যা, কেউ আমার বই পড়লে রামের প্রতি তার ভক্তি থাকবে না। আমিও তাই চাই, এসব দেবতাকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। তারা দেবতা নন কারণ মনুসংহিতা বলেছেন যে ব্রাহ্মণরা দেবতার চেয়েও শ্রেষ্ঠ এবং ব্রাহ্মণরাই দেবতা সৃষ্টি করেছেন। সব দেবতা তাদের নিয়ন্ত্রণে। তাই আমি বলবো রাম ছিলেন ব্রাহ্মণদের দাস।
সম্প্রতি আপনি বলেছেন যে বিজেপি চায় ভারতের সংবিধানকে একপাশে রেখে মনুসংহিতাকে সামনে আনতে। এটা হবে বলে আপনি বিশ্বাস করেন?
হ্যা, আমাদের জনগণ যদি সতর্ক না থাকে এবং বিজেপি’র বিরুদ্ধে ভোট না দেয় তাহলে এটাই ঘটবে। এটা সত্যিকারের আশংকা। আমরা জনগণকে সচেতন করতে চাই। ২০১৯ সালে বিজেপি সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে কেউ শান্তিতে থাকতে পারবে না। এটা যে ঘটবেই সে বিষয়ে আমার কোন সন্দেহ নেই। বিরোধীদলগুলো এক হতে পারলে বিজেপিকে বিতাড়িত করা সম্ভব।
আপনি শুধু হিন্দু ধর্মেরই সমালোচনা করেন, অন্য ধর্মগুলোর করেন না। এ ব্যাপারে কি বলবেন?
হ্যা, এটা ঠিক কারণ আমি হিন্দু ধর্মকেই শুধু জানি। আপনি ইসলাম, খ্রিস্টান ধর্ম সম্পর্কে জানলে, সে ব্যাপারে বলুন। আমি হিন্দু ধর্মের মধ্যে বাস করছি এবং দেখছি এখানে কি ঘটছে। আমি আমার ঘর পরিস্কার করার পরেই কেবল অন্যদের ঘরের প্রতি নজর দেব। আমি ইসলামের দিকে তাকালে দেখি একজন মুসলমান আরেকজন মুসলমানকে দেখলে কোলাকুলি করে। হিন্দু ধর্মে এই অনুশীলন কোথায়? আপনি দলিতদের আপনার কাছ থেকে দুর দুর করে তাড়িয়ে দেন। আমি মানবতাবাদী, কোন ইজমের বিশ্বাস করিনা।
বিবেকান্দকে চরমপন্থী হিন্দুবাদের প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়, এটা ভুল। বিবেকানন্দের লেখাগুলো পড়লেই দেখবেন সেখানে হিন্দু ধর্মের বিস্তর সমালোচনা। এটা সবাই কেন জানে না। বিবেকানন্দ কোন ধর্মের লোক ছিলেন না, তিনি ছিলেন মানবতার।
হুমকির মুখে আপনাকে পুলিশী সুরক্ষার মধ্যে থাকতে হচ্ছে, এর অর্থ কি?
কালবর্গি খুন হওয়ার পর কর্নাটক সরকার আমাকে পুলিশ প্রটেকশন দিলো। আমি আমার বাড়িতে পুলিশ দেখে অবাক হয়েছিলাম। যখন জানতে পারলাম তাদের হিটলিস্টে আমার নাম রয়েছে আমার বেশ ভালো লেগেছিলো।
তাহলে আপনি ভয় পাননি?
মোটেই না! কোন আমি ভয় পাবো? আমি কোন ভুল করিনি, আমি কোন অপরাধ করিনি। আমি জনগণকে শিক্ষা দিচ্ছি। আমি সংবিধানের ৫১এ ধারা অনুযায়ী একজন নাগরিকেই দায়িত্ব পালন করছি। মানুষ যেখানে তার অধিকার আদায়ের জন্য লড়াই করে সেখানে আমি আমার দায়িত্ব পালনের জন্য লড়াই করছি। এটা ভারতে প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব। কালবর্গির হত্যাকাণ্ডের পরও আমি অনেক প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে গিয়েছি।
লেখক হিসেবে জরুরি অবস্থা আপনি দেখেছেন, এখন কি পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে বলে মনে করেন?
হ্যা, পরিস্থিতি আগের চেয়েও খারাপ। লেখক, এক্টিভিস্ট ও বুদ্ধিজীবীদের সবসময় হুমকির মধ্যে থাকতে হচ্ছে। কেউ একজন আমার স্ত্রীর কাছে এসে বলেছিলো: “দয়া করে আপনার স্বামীকে প্রকাশ্যে এসব কথা বলতে নিষেধ করুন।” আমার স্ত্রী জবাব দিয়েছিলো: “সবাই কোন না কোনভাবে মারা যাবে। ভালো কোন কারণে যদি তার মৃত্যু হয়, তাহলে আমি খুশি হবো।”

Thursday, March 10, 2022

বাংলার বাম আন্দোলনের অতীত ও বর্তমান

ভূমিকাঃ
ভারতের প্রগতি আন্দোলনে বাংলা এক উল্লেখযোগ্য নাম। স্বাধীনতা সংগ্রামে উজ্জ্বল ভূমিকার পাশাপাশি বামপন্থী আন্দোলনের শুরু থেকেই পশ্চিমবঙ্গ এক অনন্য ভূমিকা নিয়ে উপস্থিত। বাংলাকে এদেশের বাম আন্দোলনের সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় পীঠস্থান বললেও অত্যুক্তি করা হবে না। ভারতে বামপন্থী আন্দোলন গড়ে ওঠা থেকে আজ পর্যন্ত বামপন্থী আন্দোলনের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে বাংলার বাম আন্দোলন, দেশে এক বিশেষ স্থান অধিকার করে রেখেছে। সেই পশ্চিমবঙ্গের বাম আন্দোলন আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে এসে পৌঁছেছে। বাংলা যে প্রগতির ঝাণ্ডা নিয়ে প্রায় দুই শতাব্দী ধরে শিল্প-সাহিত্য-সঙ্গীত- রাজনৈতিক-সামাজিক ক্ষেত্রে অগ্রগতির পথ দেখাচ্ছিল – একবিংশ শতকের শুরুতে তারা নিজেরাই যেন রাস্তা হারিয়ে ফেলেছে। এক সার্বিক নিরাশা, বেদনাবোধ, দিশাহীনতা গ্রাস করছে নানান ধরনের বাম ও প্রগতিশীল সংগঠন-নেতৃত্ব-সংগঠক-কর্মী-ব্যক্তি-সাংস্কৃতিক কর্মী-নাট্যকর্মী সকলকে। এই নিরাশা আর দিশাহীনতারই অন্যতম প্রতিফলন হল সংগঠন ও গোষ্ঠীগুলির মধ্যে অর্থহীন বিতর্ক ও বিবাদ, সম্পর্কের মারাত্মক অবনতি, সংগঠনগুলির অভ্যন্তরের পরিবেশেও দমবন্ধ করা বাতাবরণ এবং সর্বোপরি মারাত্মক জনবিচ্ছিন্নতা। বর্তমান প্রবন্ধে আমরা এই পরিস্থিতির সমাধান প্রসঙ্গে নয়, আলোচনা করতে চাই এর সম্ভাব্য উৎসগুলি সম্পর্কে। আর তার থেকেই বুঝতে চাই আগামীতে বাংলার প্রগতি-রাজনীতি তথা বাম আন্দোলনের সম্ভাব্য অভিমুখ ও পরিণতি ।
বাংলার বাম আন্দোলন বিকাশের প্রেক্ষাপট
বাংলার সংগ্রাম-বিদ্রোহের এক সুদীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ধর্মসংস্কার আন্দোলনে শ্রীচৈতন্যের লড়াই যেমন বাংলার এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য, তেমনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কৃষক বিদ্রোহ বাংলার অপর ঐতিহ্য। একদিকে সন্ন্যাসী বা ফকির বিদ্রোহ, তাঁতী ও মালঙ্গীদের সংগ্রাম, চুয়ার বিদ্রোহ, ময়মনসিংহের পাগলাপন্থী বিদ্রোহ, তিতুমীরের ওয়াহাবী আন্দোলন, ফরিদপুরে দুদুমিঞার নেতৃত্বে শুরু হওয়া ফরাজী আন্দোলন, সাঁওতাল বিদ্রোহ, সিপাহী বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহের মতো ঐতিহাসিক সংগ্রাম এবং অন্যদিকে ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলার নবজাগরণ-উভয় ধারাই ভারতে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাংলাকে এক অগ্রগণ্য স্থানে হাজির করেছিল। বাংলার বুকে এই দুই ধারা পরিপূরক ও সহায়ক হয়ে উঠেছিল বলেই, ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অভ্যন্তরে একটি বিপ্লবী ধারা গড়ে উঠতে তা সাহায্য করেছিল। অন্যদিকে, ১৮৫৩ সালে ভারতে প্রথম রেলপথ চালু হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ১৮৬২ সালের এপ্রিল-মে মাসে হাওড়া রেলওয়ে-তে ১২০০ রেলশ্রমিক ৮ ঘন্টা কাজের দাবিতে ধর্মঘট বাংলার নব্য শ্রমিকশ্রেণীর লড়াকু মনোভাবকে প্রতিফলিত করে। শিকাগোর হে মার্কেটের ঐতিহাসিক লড়াইয়ের ২৪ বছর আগেই বাংলার শ্রমিকরা এই দাবিতে ধর্মঘট সংগঠিত করেছিলেন। ১৮৯৫ সালে বজবজ জুট মিলে ৬ সপ্তাহব্যাপী ধর্মঘট চালান শ্রমিকরা এবং পরের বছর আবার ধর্মঘট করেন। ১৮৭১ সালে মার্কস-এঙ্গেলস কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত প্রথম আন্তর্জাতিকের কাছে জনৈক কলকাতাবাসী চিঠি পাঠান শাখা গঠনের অনুমতি চেয়ে। প্রথম আন্তর্জাতিকের সাধারণ সভায় সে চিঠি নিয়ে আলোচনা হয়। আন্তর্জাতিকের সাধারণ পরিষদ ১৮৭১ সালের ১৫ আগষ্ট মার্কস ও এঙ্গেলস-এর উপস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেয় যে পত্রলেখককে শাখা গঠনের পরামর্শ দেওয়া হোক; বলা হয় যে এই শাখা হবে স্বনির্ভর এবং এই সমিতিতে স্থানীয় অধিবাসীদের অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছিল।
কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে বাংলায় বাম আন্দোলন ও শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলন বিকাশের সমস্যা বুঝতে গেলে আগের পর্বে শ্রেণি-আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি ও তাতে বাংলার সমাজে প্রগতির সূত্রটি বোঝা দরকার। এর সূত্রটিকে শুধু শহুরে মধ্যবিত্ত সমাজের ব্রিটিশ-বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্যে দেখলে এক বিরাট ভুলের মধ্যে পড়ে যেতে হয়। তাই এ প্রসঙ্গে এক সংক্ষিপ্ত আলোচনা জরুরী।
দ্বাদশ শতাব্দীতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ভক্তি আন্দোলন বিস্তার লাভ করে। তার একটি অংশ চতুর্দশ শতাব্দীতে বাংলায় নতুন রূপ পরিগ্রহ করে। যদিও চৈতন্যের আগে বাংলায় ঈশ্বরপুরী, কেশব ভারতী প্রভৃতিরা ছিলেন, তবু চৈতন্যের নেতৃত্বেই বাংলার ধর্মসংস্কার আন্দোলন রূপ পেল। তার প্রবর্তিত নতুন ভক্তি ধর্মে হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের সকল অংশকে গ্রহণ করাতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি । কিন্তু সমাজের অভ্যন্তরে যে জাতিভেদ প্রথার গভীর শিকড়, তাকে তিনি উপড়ে ফেলতে পারেন নি। মার্কস ভারত সম্পর্কে তাঁর গভীর আগ্রহের পরিপ্রেক্ষিতে যে রসদ সংগ্রহ করেছিলেন, তার ভিত্তিতে চৈতন্যের ভূমিকাকে অতি উচ্চ স্থান দিয়েছেন। মার্কসের মতে, “ চৈতন্য প্রচার করতেন শুদ্ধতা, তপস্যা এবং ঈশ্বরের চোখে জাতি-সম্প্রদায় নির্বিশেষে সব মানুষের সাম্য। এই সম্প্রদায়ের মধ্যে এখনও জাতপাতের বন্ধন থেকে কিছুটা স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান সম্পর্কে অবজ্ঞা লক্ষ্য করা যায়”। মার্কস তাঁর সময়ে দাঁড়িয়ে বিশ্লেষণ করেছিলেন, “বৈষ্ণবরা শাক্তদের বিরুদ্ধে ‘প্রতিবাদী’(প্রটেস্ট্যান্ট)”। চৈতন্যের সংস্কার আন্দোলনে জাতিভেদপ্রথার বিরুদ্ধে অবস্থান, ধর্মীয় উদারতা, সমসাময়িক কালে নারীদের অধিকার সম্পর্কে মধ্যযুগীয় অচলায়তন ভাঙ্গার যে প্রচেষ্টা ছিল , তা নিঃসন্দেহে বাংলার ভবিষ্যত সচেতন মনন নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেছিল। এই শতাব্দীর শেষ দিক থেকে বাংলায় সুফি মতবাদ প্রবেশ করেছিল। এর কিছু পরেই বাংলা ‘মুসলিম শাসক শক্তি’র করায়ত্ত হলে এই প্রভাব ব্যাপকতর হয়ে ওঠে। বাংলায় প্রথম সুরাবর্দীয়াহ ও পরে চিশতিয়াহ সম্প্রদায়ভুক্ত সুফিরা আত্মপ্রকাশ করেন। পরে কালক্রমে আরো বিভিন্ন শাখার সৃষ্টি হয়। সুফি মতবাদের বিকাশের ধারায় পীর বাবাদের আবির্ভাবের মূলে বৌদ্ধধর্মত্যাগী মুসলমানদের প্রচ্ছন্ন বৌদ্ধ ও হিন্দু মানসিকতা ক্রিয়াশীল ছিল বলে অনেক গবেষণাকারী মনে করেছেন।
১৭৬০ সাল থেকে ১৭৯৭ সাল পর্যন্ত বাংলার সন্ন্যাসী ও ফকিররা ইস্ট কোম্পানির সাথে এক তীব্র লড়াইয়ে লিপ্ত হয়েছিলেন, যা ইতিহাসে সন্ন্যাসী বিদ্রোহ বা ফকির বিদ্রোহ নামে পরিচিত। ফকির ও সন্ন্যাসীদের মধ্যে কিছু কিছু সংঘর্ষের কথা ইতিহাসে পাওয়া গেলেও কোম্পানির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তারা ক্রমশ একটি ঐক্যবদ্ধ শক্তি হিসেবেই উপস্থিত হতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই বিদ্রোহ ছিল খাজনা আদায়, লুন্ঠন, বাংলার কুটির শিল্প ও বস্ত্রশিল্প ধ্বংসের বিরুদ্ধে। বুরহানপন্থী ফকির মজনু শাহ ছিলেন ফকির বিদ্রোহীদের নেতা। মাদারিয়াপন্থী ফকিররাই এই লড়াইয়ের মূল শক্তি ছিলেন। মজনু শাহ-এর অনুগামী হাজার হাজার সন্ন্যাসী ও ফকিরদের প্রধান কর্মক্ষেত্র ছিল উত্তরবঙ্গ। মজনু শাহ-এর সঙ্গে দেবী চৌধুরানী, ভবানী পাঠক-দের যোগাযোগ ছিল বলে কেউ কেউ মনে করেন। ক্রমাগত লোকক্ষয় ও সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ায় এই আন্দোলন স্তিমিত হয়ে আসে।
সমসাময়িক কালের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিদ্রোহ হল চুয়ার বিদ্রোহ। মেদিনীপুর, বাঁকুড়া ও ধলভূমের জঙ্গলমহলের অধিবাসীরা, কৃষকরা ও অরণ্যবাসী সমাজের নিম্নবর্গ তথা বর্ণের মানুষদের বিদ্রোহ ছিল এটি। অরণ্যের ওপর দীর্ঘদিন ও বংশ-পরম্পরায় ভোগদখলের অধিকার কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে এবং উচ্চহারে খাজনা আদায় করার বিরুদ্ধে চুয়ার বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিল। চুয়ারদের এই বিদ্রোহের সাথে যোগ দিয়েছিল পাইকরা। এই সময়েই গড়বেতায় শুরু হয়েছিল লায়েক বিদ্রোহ। ১৮১৬ সালে লায়েক বিদ্রোহ হয়। এখানে লায়েক প্রজারা অচল সিং-এর নেতৃত্বে গেরিলা কায়দায় শালবনীর জঙ্গলে ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়েছিল। ১৮১২ সালে ময়মনসিংহে গারো উপজাতির কৃষকরা জমিদারদের বিরুদ্ধে পাগলাপন্থী টিপুর নেতৃত্বে বিদ্রোহ করেছিল। এমন কী গারো উপজাতির মানুষরা ১৮২৫ সালে স্বাধীন গারো রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে।
বারাসাত, স্বরূপনগর, বাদুরিয়া, গোবরডাঙা প্রভৃতি স্থানে তিতুমীরের নেতৃত্বে কৃষক বিদ্রোহ হয়েছিল কৃষকদের শোষণমুক্তি ও ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে। নারকেলবেড়িয়া গ্রামে তিতুমীরের অনুগামীরা বাঁশের কেল্লার দুর্গ তৈরী করে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ১৮৩১ সালে প্রবল লড়াই চালায়। তিতুমীর ছিলেন ওয়াহাবী সম্প্রদায়ের নেতা। ওয়াহাবী ধর্মপ্রচারক সৈয়দ আহমেদের শিষ্য, যার লক্ষ্য ছিল পুনরায় মুসলমান রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করা। তিতুমীরের মূল লক্ষ্য ছিল প্রচলিত ইসলাম ধর্মের সংস্কারসাধন। কিন্তু কৃষকেরা তাঁর নেতৃত্বে সংগঠিত হচ্ছিলেন বলে জমিদাররা তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ বিপন্ন হবার ভয় করছিলেন। তাই তারা তাকে দমন করতে চেয়েছিলেন। ঘটনাক্রমে কৃষকরা ছিলেন মুসলমান ও জমিদাররা প্রধানত হিন্দু। তিতুমীরের নেতৃত্বে ২৪ পরগনা ও নদীয়ার লড়াইয়ের পাশাপাশি বর্তমান বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলায় হাজী শরিয়তউল্লার নেতৃত্বে সেখানকার মুসলমান কৃষকরা জমিদার ও নীলকরদের বিরুদ্ধে এক তীব্র লড়াই গড়ে তোলে যা ইতিহাসে ফরাজী আন্দোলন নাম বিখ্যাত। কৃষক ও কারিগর শ্রেণীর মুসলমানদের মধ্যে তিনি ইসলামের সংস্কার আন্দোলনকে পরিচালনা করার উদ্যোগ নেন। অসাধারণ দ্রুত গতিতে তাঁর মতাবলম্বীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ফরিদপুর, বাখরগঞ্জ ও ময়মনসিংহের ছ’ভাগের এক ভাগ ও ঢাকার এক তৃতীয়াংশ মুসলমান তার অনুসারী হয়ে পড়ে। এই আন্দোলন চলেছিল ১৮৩৮ সাল থেকে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত। এই আন্দোলনেও ধর্মীয় প্রভাব একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। তার মৃত্যুর পর পুত্র দুদুমিঞার নেতৃত্বে ফরাজী আন্দোলন আরো বিকশিত হয়। শিষ্যদের মধ্যে তিনি সমতার আদর্শ প্রচার করতেন। জমিদারদের অন্যায় খাজনার বিরুদ্ধে তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে সমস্ত জমির মালিক আল্লা–সুতরাং এতে কারো খাজনা চাইবার অধিকার নেই। গরীব কৃষক যাদের বেশিরভাগটাই ছিল মুসলমান, তারা ব্যাপকভাবে এই আন্দোলনে যোগ দেয়। শ্রেণীস্বার্থের বিরোধ ধর্মীয় শত্রুতার রূপ নিয়ে সমাজে উপস্থিত হয়। জমিদার ও নীলকর বনাম কৃষকদের দ্বন্দ্বে ব্রিটিশ সরকার জমিদার-নীলকরদের পক্ষেই দাঁড়াত। কৃষকরা এই ঘটনাকে দেখল হিন্দু বাঙালীর সাথে খ্রিষ্টান ইংরেজদের মৈত্রী হিসেবে। শ্রেণীদ্বন্দ্ব-জনিত লড়াই ‘ধর্মীয় প্রতিরোধ আন্দোলনে’ রূপ পেয়েছিল।
 নিজভূমি থেকে উচ্ছেদ, চড়াহারে সুদ, নজরানা, সাঁওতাল রমনীদের ওপর নির্যাতন-এসবের বিরুদ্ধে সিধো-কানহুদের নেতৃত্বে সাঁওতাল পরগনার সাঁওতাল আদিবাসীরা বিদ্রোহ করে। তা ছড়িয়ে পড়েছিল মুর্শিদাবাদ-বীরভুম-বাঁকুড়া অঞ্চলে। চরিত্রের দিক থেকে এটিও একটি কৃষক বিদ্রোহ ছিল। সাঁওতাল কৃষকদের সংগ্রামের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল কামার, কুমোর, তাঁতী, তেলী, ডোম, চামার প্রভৃতি সম্প্রদায়।
 বাংলার মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগে বিবর্তনের পর্বে সমাজে উপস্থিত শ্রেণী-সংঘাতের রূপগুলি নানাভাবে ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক বিরোধের মধ্যে দিয়েও প্রকাশিত হয়েছে। বরং বহুক্ষেত্রে ধর্মীয় উগ্রতা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে , জাতপাতভিত্তিক শোষণের বিরুদ্ধে, নারীদের ওপর চলতে থাকা শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে ছোট-বড় অসংখ্য লড়াই বাংলার নিজস্ব পরিসরে নিজস্ব ধরনে বিকশিত হয়েছে। কালের গহ্বরে চাপা পড়ে থাকা শ্রেণীদ্বন্দ্বের সেই স্বরূপকে, তার ধারাবাহিকতাকে খুঁজে বার করার দায়দায়িত্ব ছিল সর্বহারার অগ্রণী অংশের ওপরেই। এই কাজ মূলত উপেক্ষিত থেকে গেছে বলেই মনে হয়।
বাংলাদেশের শ্রমজীবী জনগণের প্রতি ইংরেজী শিক্ষার আলোকপ্রাপ্ত মধ্যশ্রেণীর বুদ্ধিজীবীদের এক সহানুভুতির মনোভাব ঊনবিংশ শতকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বঙ্কিমচন্দ্র, শিবনাথ শাস্ত্রী, তরুণ রবীন্দ্রনাথ এমনকী বিবেকানন্দ-এর লেখাতেও দেশের শোষিত-নিপীড়িত মানুষের প্রতি ‘সহানুভূতির এক মনোভাব’ বিভিন্নভাবে প্রকাশিত হয়েছে। তাতে বহু বিকৃতি-বিভ্রান্তি-অসম্পূর্ণতা সত্ত্বেও ওই সন্ধিক্ষণে ভারতের রাজনৈতিক সংগ্রামের ধারাকে রূপ দিতে এই প্রেক্ষাপট এক গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে। নব্যশিক্ষিত মধ্যশ্রেণীর প্রতিনিধিরা জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে যে রাস্তায় হাঁটতে শুরু করেন, তা, কোনো অর্থেই, সমাজের বৈপ্লবিক রূপান্তরের পথ নয়। বরং ইংরেজদের থেকে কিছু সুবিধা আদায়ের প্রচেষ্টার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। বৃটিশ ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশন(১৮৫১), ইন্ডিয়ান লীগ(১৮৭৫), সুরেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ভারত সভা(১৮৭৬) ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে যে প্রচেষ্টা শুরু হয়েছিল, তা ১৮৮৫ সালে ফিরোজ শাহ মেহেতা, দাদাভাই নওরোজি প্রমুখ ব্যক্তিদের সহযোগিতায় এবং তদানীন্তন বৃটিশ ভাইসরয় লর্ড ডাফরিনের কর্মচারী হিউমের পৃষ্ঠপোষকতায় সর্বভারতীয় ভিত্তিতে জাতীয় কংগ্রেস গঠনের মধ্যে দিয়ে পরিণতি পেল। বাংলার উমেশচন্দ্র ব্যানার্জি, রমেশ চন্দ্র দত্ত, সুরেন্দ্রনাথরা এই ধারায় মিলিত হলেন। সংগঠনের নেতৃত্বে ছিল পুঁজিপতি, জমিদার আর বিত্তবান মানুষেরা। এর বিপরীতে ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে কংগ্রেসের অভ্যন্তরে যেমন একটি ‘চরমপন্থী ধারা’র জন্ম হচ্ছিল, তেমনি কংগ্রেসের বাইরেও বাংলার শ্রমিক-কৃষক, প্রগতিশীল মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীদের একটি অসংগঠিত ও দুর্বল ধারা উপস্থিত ছিল।
বিংশ শতকের গোড়ার দিকে দুটি ঘটনা এদেশের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ওপর গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল। ১৯০৪-০৫ সালে জার-শাসিত রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে এশীয় দেশ হিসেবে জাপানের জয়লাভ। এই জয় এশীয়দের বিজয় অর্জন—এই বোধ বাঙালী শিক্ষিত সম্প্রদায়কে উল্লসিত করে তোলে। অন্য ঘটনাটি হল লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গের প্রচেষ্টা। এর বিরুদ্ধে লক্ষ লক্ষ বাঙালী যেভাবে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পথে নেমেছিল, তা বাংলার এক অভূতপূর্ব ঐতিহ্য। একদিকে যেমন রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর আহ্বানে বাংলার ঘরে ঘরে অরন্ধন পালিত হল, রবীন্দ্রনাথের আহ্বানে হিন্দু-মুসলিমদের রাখীবন্ধন, তেমনি হাওড়ার বার্ন কোম্পানির শ্রমিকরা, রেল, চটকল ও ট্রামের শ্রমিকরা, প্রেসের শ্রমিকরা বিক্ষোভে নামে। এই সময় থেকেই ব্রিটিশবিরোধী আরেকটি ধারা বাংলায় জন্ম নেয়। ইতিহাসে এটিকে সন্ত্রাসবাদী ধারা বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। ১৯০১ সালে ব্যারিস্টার পি মিত্রের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ‘অনুশীলন সমিতি’। পরে আরেকটি সংগঠন তৈরি হয় ‘যুগান্তর’ দল নামে। ১৯০৫ সাল থেকেই বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে এই আন্দোলন তীব্র আকারে ছড়িয়ে পড়ে। অরবিন্দ ঘোষ, বারীন্দ্রনাথ ঘোষ, প্রফুল্ল চাকি, ক্ষুদিরাম বসুরা ছিলেন এর নেতৃত্ব বা সবচেয়ে সক্রিয় অংশ। ১৯০৭ সাল থেকে ১৯১৭ সাল সময়পর্বে সারা ভারতে মোট ৩৮৫টি বৈপ্লবিক অ্যাকশন সংঘটিত হয়েছিল যার বেশীরভাগটাই হয়েছিল বাংলায়।
এর সাথে সাথেই আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের সাথে এক ধরনের যোগাযোগ, আদানপ্রদান ভারতের স্বাধীনতাকামী রাজনৈতিক শক্তি বা ব্যক্তিবর্গের ছিল। এর প্রমাণ পাওয়া যায় ১৯০৪ সালে আমস্টারডাম-এ অনুষ্ঠিত ২য় আন্তর্জাতিকের সম্মেলনে দাদাভাই নওরোজি যোগদান ও বক্তৃতা করার ঘটনায়। ১৯০৭ সালের স্টুটগার্ট সম্মেলনে যোগদান করেন মাদাম ভিকাজি কামা, বাংলার বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ। ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকির আত্মবলিদানকে মহান বর্ণনা করে প্রচার করায় ১৯০৮ সালে বাল গঙ্গাধর তিলককে ব্রিটিশ সরকার ৬ বছরের জন্য কারাদন্ডে দন্ডিত করে। লেনিন তাঁর এক প্রবন্ধে এই ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। অন্যদিকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ একের পর এক মামলা রুজু করে সন্ত্রাসবাদী স্বাধীনতা আন্দোলনকে দমনের চেষ্টা করলে তা আরো তীব্র রূপ ধারণ করে। এই সময়েই বাংলায় স্বদেশী নেতাদের নেতৃত্বে শ্রমিক আন্দোলনের এক বিকাশ ঘটতে দেখা যায়। অন্যদিকে ১৯১৭ সালে মহান রুশ বিপ্লব গভীরভাবে প্রভাবিত করে ভারতের প্রগতিশীল ও বাম-মনোভাবাপন্ন একটা অংশকে। অনুশীলন সমিতি ও যুগান্তর পার্টি উভয়ের সংগ্রামের মধ্যে থেকে উঠে আসা যে অংশটি বাংলার বামপন্থী আন্দোলন গড়ে তোলার কাজে ক্রমশ অগ্রণী ভুমিকা নিয়েছিলেন, তাদের মধ্যেকার একটি অংশ ক্রমশ দেশের প্রধান বামপন্থী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। বিশেষ উল্লেখ্য যে, অনুশীলন সমিতির মধ্যে প্রথম থেকেই রুশ বিপ্লবীদের ( যারা ‘এনার্কিস্ট’ নামে পরিচিত ছিল ) বিপ্লব প্রচেষ্টা ও তাদের সংগঠন পদ্ধতি গভীর অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করেছিল। বিশেষত যারা সশস্ত্র উপায় ছাড়া ব্রিটিশ শক্তিকে পরাজিত করা সম্ভব নয় বলে মনে করতেন, তাদের মধ্যে এই প্রভাব অত্যন্ত গভীর ছিল। অভীষ্ট লক্ষ্যপূরণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ও অস্ত্রের ব্যবস্থাপনা করতে এরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যাতায়াত শুরু করেছিলেন। জার্মানিতে ভারতীয় বিপ্লবীদের নিয়ে গঠিত হয়েছিল বার্লিন কমিটি। এই কমিটির প্রধান নেতা বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় ও ভুপেন্দ্রনাথ দত্ত গভীরভাবে রুশ বিপ্লব ও বলশেভিকবাদের প্রতি আকৃষ্ট হন। এদের উদ্যোগে ১৯১৫ সালে কাবুলে গঠিত হয় ‘অস্থায়ী এক স্বাধীন সরকার’। এই সময়ের ‘বৈপ্লবিক উদ্যোগে’র সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা ছিলেন যতীন দাস বা বাঘা যতীন। তার নেতৃত্বে অনুশীলন সমিতি সারা বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই বড় পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এম এন রায় সারা পৃথিবীর বিপ্লবীদের সাথে যোগাযোগ করতে নামেন। ১৯১৫ সালে বাঘা যতীনের নির্দেশে তিনি অস্ত্রের সন্ধানে ইন্দোনেশিয়া, মালয়, চীন, জাপান, জার্মানি হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যান। সেখান থেকে মেক্সিকোতে গিয়ে ওখানকার সমাজতন্ত্রী দলে যোগ দেন এবং তার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। বাংলার কমিউনিস্ট আন্দোলন গড়ার পথে যে সমস্ত বাঙালী বিপ্লবীরা প্রথম যুগে ভুমিকা পালন করেছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, ভুপেন্দ্রনাথ দত্ত, এম এন রায় প্রমুখ। প্রবাসেই প্রথম ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলেন এম এন রায়-রা। ১৯২০ সালে তৃতীয় আন্তর্জাতিকের ২য় কংগ্রেসের পর ১৭ অক্টোবর তাসখন্দে ৭ জন মিলে প্রতিষ্ঠা করলেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি নামক সংগঠনটির। যদিও এই পার্টির দেশের ভেতর চলমান শ্রেণী আন্দোলন বা স্বাধীনতা সংগ্রাম-কোনো ব্যাপারেই কোনো কার্যকরী প্রতিনিধিত্ব ছিল না। অন্যদিকে রুশ বিপ্লবের প্রভাবে অনুশীলন সমিতি ও যুগান্তর পার্টির বহু সদস্য, যাদের মধ্যে একটা বড় অংশ দীর্ঘকাল কারারুদ্ধ ছিলেন, কমিউনিস্ট ভাবধারার প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হন এবং কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ গ্রহণ করেন। দেশের ভেতর কলকাতা, মুম্বই, চেন্নাই ও লাহোরে চারটি আলাদা আলাদা কমিউনিস্ট উদ্যোগ গড়ে ওঠে, যেগুলো প্রবাসের কমিউনিস্ট পার্টির থেকে স্বতন্ত্র ছিল। পরবর্তীকালে এই উদ্যোগগুলিকে কেন্দ্রীভূত করার উদ্যোগ শুরু হয়। ১৯২৫ সালের ডিসেন্বর মাসে কানপুর শহরে এক সর্বভারতীয় সম্মেলনে এই শক্তিগুলি ঐক্যবদ্ধভাবে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের কথা আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করে। প্রসঙ্গত পরবর্তীকালে সিপিআই –সিপিআই(এম) ভাঙ্গনের পরে দুই পার্টির মধ্যে প্রবল বিতর্ক হয় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা দিবস নিয়ে। ১৯২০ সালের ১৭ অক্টোবর না ১৯২৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর ? এই পর্বের কোনো বিস্তারিত মূল্যায়ন এই প্রবন্ধের লক্ষ্য নয়। কিন্তু কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখানে উঠে আসছে ।
১৯২৫ সালে যখন ভারতের কমিউনিস্ট মনোভাবাপন্ন শক্তিগুলি ঐক্যবদ্ধ হয়ে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের কথা ঘোষণা করলেন, তখন কী তাতে দেশের সমস্ত কমিউনিস্ট মনোভাবাপন্ন শক্তি বা ব্যক্তিবর্গ যোগ দিলেন? ইতিহাসে আমরা পাচ্ছি যে গুপ্ত বিপ্লবী অনুশীলন সমিতির বহু বিপ্লবী এই প্রক্রিয়াটির সম্পর্কে সন্দিহান ছিলেন। জেলের ভেতরে বন্দী থাকা বিপ্লবীরা তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক চালিয়েছেন। মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের প্রতি প্রবল আস্থা গড়ে উঠলেও তৃতীয় আন্তর্জাতিকের হস্তক্ষেপ নিয়ে তারা সংশয়ী ছিলেন অনেকেই। অন্যদিকে অপর গুরুত্বপূর্ণ ধারাটি হলো ভগৎ সিং-এর নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী আন্দোলন যারা রুশ বিপ্লব, সমাজতন্ত্রের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হলেও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির ধারাটির থেকে নিজেদের স্বতন্ত্রতা বজায় রেখেই বৈপ্লবিক কার্যকলাপ চালিয়েছেন। জেল থেকে ভগৎ সিং লিখেছিলেন যে এক গদর পার্টি ছাড়া অন্যদের দেখে (তিনি দেশের কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের সম্পর্কে বলতে চেয়েছিলেন) মনে হয় না যে তারা তাদের নিজেদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট বোঝাপড়া নিয়ে কাজ করছেন। এছাড়া ছিল গদর পার্টির ধারা। ১৯২৬-১৯৩০ সাল পর্যন্ত সময়পর্বে একদিকে যেমন মীরাট ষড়যন্ত্র মামলার পরিপ্রেক্ষিতে কমিউনিস্টদের কার্যকলাপের গুরুত্ব ও প্রচার দেশের গন্ডী পেরিয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়ে, তেমনি কাকোরি ও লাহোর ষড়যন্ত্র মামলার মধ্যে দিয়ে ভগৎ সিং-দের কর্মকান্ড ও আত্মত্যাগ গোটা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করে।
অপরদিকে সশস্ত্র জাতীয় বিপ্লবীরা সশস্ত্র অভ্যুত্থানের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। ১৯২৯ সালে রংপুরে বঙ্গীয় প্রাদেশিক বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স বিপ্লবী দলের রাষ্ট্রীয় সম্মেলনে বিপ্লবীরা ঠিক করেন যে, চট্টগ্রাম,ময়মনসিংহ ও বরিশাল–এই তিনটে জেলায় একসঙ্গে অস্ত্রাগার আক্রমণ করে একই দিনে সশস্ত্র অভ্যুত্থান ঘটানো হবে। যতীন দাস প্রমুখরা ছিলেন এই আন্দোলনের নেতৃত্বে। ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল চট্টগ্রামের অস্ত্রাগার অভ্যুত্থান ঘটে। এই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে কংগ্রেসের আর রাস্তায় না নেমে উপায় ছিল না। ১৯৩০ সালের ১২ মার্চ গান্ধীজির নেতৃত্বে যে অসহযোগ ও আইন অমান্য আন্দোলন শুরু হয়, তা আর নিছক অসহযোগ বা আইন অমান্য আন্দোলন ছিল না। সারা দেশে তা গণ অভ্যুত্থানের চেহারা নিল। অন্যদিকে বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন আরো ছড়িয়ে পড়ল ডালহৌসি স্কোয়ার ষড়যন্ত্র মামলা, কলকাতা রাইটার্স বিল্ডিং অলিন্দ যুদ্ধ, চট্টগ্রাম ইউরোপিয়ান ক্লাবের ওপর আক্রমণ ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে। বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদীরা দমনের মুখে পড়ে শহীদ হলেন বা কারারুদ্ধ হলেন। গোটা পরিস্থিতির রাশ ক্রমশ কংগ্রেসের হাতেই সমর্পিত হল। ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের এ এক দুর্ভাগ্যময় অতীত যে তৃতীয় আন্তর্জাতিকের অবস্থান দ্বারা যারা প্রভাবিত ও অনুপ্রাণিত হলেন তারা এই গণজাগরণ থেকে নিজেদের সম্পূর্ণ সরিয়ে রাখলেন। তারা পরবর্তীতে ভুল স্বীকার করলেও এই ঘটনার ফলে আদিপর্বেই বাংলার প্রগতি আন্দোলনের স্রোত থেকে নিজেদের এক মৌলিক বিচ্ছেদ ঘটিয়ে ফেলেছিলেন। ভারতে কমিউনিস্ট আন্দোলনের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া কী হবে তা নিয়েও যথেষ্ট পরিমানে দিশাহীনতা ছিল। কংগ্রেস পরিচালিত কংগ্রেস সোশালিস্ট পার্টির মধ্যে ঢুকে কাজ করাই হোক বা কমিউনিস্ট পার্টির পাশাপাশি শ্রমিক-কৃষক পার্টির মধ্যে দিয়ে কাজ চালাবার যে রণকৌশল সিপিআই গ্রহণ করেছিল, বহুসময়েই তার কোনো সামগ্রিক রূপরেখা ছিল না। তাই এক চূড়ান্ত ধরনের আন্তর্জাতিক-নির্ভরতার কারণে জাতীয় কংগ্রেসের মধ্যেকার বামপন্থী অংশটিকে কীভাবে ঘনিষ্ঠ করে তোলা যাবে তার কোনো রূপরেখা কোনোভাবেই কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বের কাছে ছিল না। ১৯৩০ সালের ভুল ১৯৩৪ সালে স্বীকার করার পর আবার তাদের একই ভুল করতে দেখা যায় ১৯৩৯-এর ত্রিপুরি কংগ্রেস অধিবেশনে ‘নিরপেক্ষ’ অবস্থান গ্রহণে অথবা ১৯৪২-এর ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলনে ‘মিত্রশক্তিকে সাহায্য করার’ অজুহাতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের অনুগ্রহ লাভে। বিপ্লবী সমাজবাদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেও অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের একাংশ ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান না করে বিকল্প সমাজতান্ত্রিক দল হিসেবে আরএসপি-র জন্ম দিয়েছিলেন ১৯৪০ সালে। যদিও আরএসপি কখনই একটি কমিউনিস্ট শক্তি হিসেবে গড়ে ওঠার কোন কার্যকরী প্রক্রিয়া গ্রহণ করতে পারে নি। বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের এই অগ্রণী অংশটির এহেন পরিণতির দায় মূলত বর্তায় তৃতীয় আন্তর্জাতিক-পন্থী কমিউনিস্ট নেতৃত্বের ওপরেই।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ভারতের বৃহৎ বুর্জোয়া শ্রেণী ও সামন্তপ্রভুদের হাতে যে রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্পণ করতে বাধ্য হয়, ভারতীয় সমাজে তা যে কোনো বৈপ্লবিক রূপান্তর ঘটায় নি, সেকথা বলাই বাহুল্য। কিন্তু যে সম্ভাবনাটি ভারতের কমিউনিস্টদের সামনে উপস্থিত হয়েছিল, তাকে বিকশিত করার মতো চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারেন নি তারা। তৃতীয় আন্তর্জাতিকের ওপর অতি-নির্ভরতা, কমিউনিজমের শিক্ষাগ্রহণের ক্ষেত্রে জোরালো ঔপনিবেশিকতার ছাপ থেকে যাওয়ায় তারা ভারতীয় সমাজে প্রগতির প্রবাহটিকে বুঝতে মূলত ব্যর্থ হন। পাশাপাশি কোনো নতুন সমাজ-সভ্যতার গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে, বিশেষ করে শ্রমিকশ্রেণির এবং সাধারণভাবে আপামর শ্রমিক-কৃষক-মেহনতিদের যে এক সার্বিক সৃজনশীল, চালক ও নিয়ন্ত্রণকারীর ভূমিকা থাকে তা খারিজ করে দেওয়ায় (যার পরিবর্তে স্থান করে নেয় পার্টির সর্বময় আধিপত্য ও অস্তিত্ব) ভারতীয় বিপ্লবের সঠিক রণনীতি ও রণকৌশল নির্ধারণ ও অনুশীলন এক গুরুতর ব্যর্থতা এবং ভ্রান্তির মধ্যে পড়ল। সিপিআই, আরএসপি বা তাদের থেকে আলাদা হওয়া ক্ষুদ্র বামপন্থী দলগুলোর কেউই চীন বিপ্লবের সমসাময়িক সময়ে ভারতীয় সমাজে প্রবহমান প্রগতিশীলতার ধারাটিতে, বিপ্লবী রাজনীতি ও শ্রেণীসংগ্রামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলিতে সঠিকভাবে অগ্রগতির দিশা হাজির করতে পারে নি। অথচ এই বামপন্থীরাই ফ্যাসিবাদবিরোধী সাংস্কৃতিক আন্দোলনে, দাঙ্গা প্রতিরোধে, নৌবিদ্রোহে, সোলাপুর কমিউনের লড়াইয়ে, তেভাগায়, তেলেঙ্গানায় নিজেদের উজাড় করে দিয়েছে শ্রেণীসংগ্রামের ময়দানে–সেই গৌরবময় অতীতকে কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। এই ঐতিহ্য আর দুর্বলতা নিয়ে ১৯৪৭-পরবর্তী ভারতের তথা বাংলার বাম আন্দোলনের যাত্রা।
১৯৪৭-পরবর্তী পর্বে বাংলার বাম আন্দোলন
আন্তর্জাতিক বাম রাজনীতিতে তখন এক ভয়ানক টালমাটাল পরিস্থিতি। স্তালিনের মৃত্যুর পর রুশ পার্টির বিংশতিতম পার্টি কংগ্রেসে পার্টি নেতা নিকিতা ক্রুশ্চভ-এর নেতৃত্বে সিপিএসইউ বিপ্লবী সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তাকেই অস্বীকার করে বসল। পুঁজিবাদের সাথে শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান আর শান্তিপূর্ণ পথে সমাজতন্ত্রে উত্তরণের কথা বলে শ্রমিকশ্রেণীর মুক্তির প্রশ্নটিকে তারা নস্যাৎ করল। ১৯৫৭ সালে কম: মাও-এর নেতৃত্বাধীন সিপিসি তার বিরুদ্ধে মতাদর্শগত মহাবিতর্ক শুরু করে। যদিও ১৯৫৭-১৯৬১ সাল পর্যন্ত সিপিসি বিতর্কের তুলনায় আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে ঐক্যস্থাপনের প্রবল প্রচেষ্টা চালিয়েছে। ১৯৬০ সালে ৮১ টি কমিউনিস্ট পার্টির মস্কো সম্মেলনে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তাকে যখন সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হল, তখন সিপিসি বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তার সপক্ষে তীব্র বিতর্ক চালায়। ক্রুশ্চেভের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের তত্ত্ব যে সংশোধনবাদের ‘পুরনো বোতলে নতুন মদ’ ছাড়া আর কিছুই নয়–তা সিপিসি বিতর্কের ছত্রেছত্রে প্রতিষ্ঠা করে। এই মহাবিতর্কের পরিণামে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলন প্রধানত দুটি শিবিরে বিভক্ত হয়ে গেছিল। ফলস্বরূপ, ক্রুশ্চভের সোভিয়েত রাশিয়া সমাজতান্ত্রিক চীন থেকে কারিগরী ও অন্যান্য সাহায্য সরিয়ে নিল আর মাও-এর নেতৃত্বাধীন সিপিসি মতাদর্শের প্রশ্নে আপস না করে সমাজতন্ত্রের বিপ্লবী পতাকাকে অমলিন রাখার লড়াই চালিয়ে গেল।
এদিকে ভারতে স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই কমিউনিস্ট পার্টির তত্কালীন প্রধান নেতা রনদিভের শহরভিত্তিক অভ্যুত্থানের যে লাইন পার্টিতে গৃহীত হয়, তা প্রয়োগ করতে গিয়ে কঠোর রাষ্ট্রীয় দমনের মুখে পড়েছিল পার্টি। এর ফলে পার্টি যে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়, তা সি পি আই-এর মধ্যে ভারতীয় বিপ্লবের রণনীতি ও রণকৌশলগত প্রশ্নগুলিকে আবারো সামনে নিয়ে আসে। বাংলা এই বিতর্কের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল। বাংলার ১৯৫৯ সালের খাদ্য আন্দোলন আবারো বামপন্থীদের লড়াকু ঐতিহ্যকে সামনে নিয়ে আসে। একইসঙ্গে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির(সিপিআই) মধ্যে মতাদর্শগত ও রাজনৈতিক প্রশ্নে বিতর্ক-মতপার্থক্য গুরুতর রূপ পেতে থাকে। তৃতীয় আন্তর্জাতিক ভেঙ্গে দেওয়ার পরবর্তীতে সোভিয়েত রাশিয়ার ওপর অতি-নির্ভরতার যে চিত্রটি জনসমক্ষে উঠে আসে, তা প্রতিফলিত হয় তত্কালীন কেন্দ্রের শাসক দল নেহেরু পরিচালিত কংগ্রেসকে প্রগতিশীল বুর্জোয়া হিসেবে সমর্থন করার মধ্যে দিয়ে। সিপিআই-এর পালঘাট কংগ্রেসে সিপিএসইউ-এর বিংশতি কংগ্রেসকে সমর্থন দিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, ১৯৫৮-এর অমৃতসর কংগ্রেস ও ১৯৬১-এর বিজয়ওয়াড়া কংগ্রেস তার সেই দক্ষিণপন্থী যাত্রাকে অব্যাহত রাখল। শান্তিপূর্ণ উপায়ে পার্লামেন্টারী পথে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লাইন পার্টির অভ্যন্তরে ক্রমশ সংহত হল। ১৯৫৭ সালে কেরলে নাম্বুদ্রিপাদের নেতৃত্বে সরকার গড়ার অভিজ্ঞতাকে সারসংকলন করে ভারতীয় বিপ্লবের রণকৌশলকে প্রধানত সরকার গড়ার রাজনীতিতে পরিণত করার প্রচেষ্টা শুরু হল। এর মধ্যে দিয়ে পার্টির একাংশ বিপ্লবের পথের বিপরীতে সংশোধনবাদের রাস্তায়, সরকার-সর্বস্বতার রাস্তায় সেদিন হাঁটতে শুরু করেছিল।
এমনি এক আন্তর্জাতিক ও সর্বভারতীয় প্রেক্ষাপটে এদেশের বিপ্লবকামী বামপন্থীরা সি পি আই-এর ক্রুশ্চভপন্থী সংশোধনবাদী অবস্থানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল। চীন-ভারত যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তা পরিণতি পেয়েছিল সিপিআই ভেঙ্গে সিপিআই(এম) গড়ে তোলার ঘোষণার মধ্যে দিয়ে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বিপ্লবকামী বামপন্থী কর্মীরা সিপিআই ছেড়ে বেরিয়ে এসে সেদিন সি পি আই(এম)-এ যোগ দিয়েছিলেন। যদিও সিপিআই(এম) কখনোই ক্রুশ্চভপন্থী সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থান নিতে পারেনি। বরারবই সে সংশোধনবাদের বীজ বয়ে বেড়িয়েছে। যাই হোক, সে সময়ে সিপিআই-এর সুস্পষ্ট সংশোধনবাদী আপসকামী চরিত্রের বিরুদ্ধে বাম-আন্দোলনের কর্মীদের মধ্যেকার প্রতিবাদী ও বিদ্রোহী চেতনাটি গোটা দেশে শুধুমাত্র বিচ্ছেদ ঘোষণাতেই থেমে থাকে নি। তা নির্দিষ্ট করতে চেয়েছে নতুন যাত্রাপথকেও। সারা দেশ জুড়ে এই ঘটনা ঘটলেও পশ্চিমবঙ্গ ছিল এই লড়াইয়ের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রস্থল। দেশের বাম রাজনীতির পীঠস্থান বাংলায় এই ঘটনার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়েছিল, যা অতি দ্রুতই সিপিআই(এম)-এর আপসকামী চরিত্রের বিরুদ্ধেও পার্টির ভেতরেই বিক্ষোভের রূপ নেয়।
এই সময়েই পশ্চিমবঙ্গের জনজীবনে নানাদিক থেকে সঙ্কট ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠছিল। বেকারিত্ব-দারিদ্র্য-মূল্যবৃদ্ধির বোঝা ক্রমশ গরীব–নিম্নবিত্ত জনগণের ঘাড়ে চেপে বসছিল। এরই মধ্যে চীন-ভারত যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে উঠল। এই সময়ের এক গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ঘটনা ভিয়েতনামের মুক্তিযুদ্ধ। এই লড়াই বাংলার ছাত্র-যুব সমাজের তীব্র সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধিতার ঐতিহ্যকে আবার সামনে নিয়ে এসেছিল। এই পর্বেই চীনে সংঘটিত হচ্ছে সর্বহারার সাংস্কৃতিক বিপ্লব, যা বাংলার প্রগতিশীল-বিপ্লবকামী অংশের মধ্যে এক আলোড়ন সৃষ্টি করছে। কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিতর্কগুলোতে আলোড়িত হচ্ছে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসগুলো। খাদ্যের দাবিতে বুভুক্ষু কৃষকরা দখল নিচ্ছে রাজপথের। শ্রমিকদের বিক্ষোভ-হরতালে মালিকরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে উঠেছিল। বাংলা উত্তাল হয়ে উঠছিল সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে; মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে, যুদ্ধের বিরুদ্ধে, খাদ্যের দাবিতে এ রাজ্যের লক্ষ লক্ষ মেহনতী মানুষ-ছাত্র-যুবদের লড়াই এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণের দিকে বাংলাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল।
১৯৬৬ সালের খাদ্য আন্দোলন বামপন্থীদের নেতৃত্বে এক ব্যাপক জনজোয়ার সৃষ্টি করল। কিন্তু এই প্রতিবাদী জাগরণকে দেশব্যাপী বিপ্লবী আন্দোলনের ধারায় এক উন্নত স্তরে বিকশিত করার কোনো সচেতন রণকৌশল তত্কালীন সিপিআই(এম) নেতৃত্বের ভাবনায় উপস্থিত ছিল না। ফলে সমাজের নিপীড়িত শ্রমজীবীদের মধ্যে প্রতিবাদী গণজাগরণের সুনির্দিষ্ট বাস্তবতাটি কোন রণকৌশল গ্রহণের মাধ্যমে এক বিপ্লবী গণজাগরণের স্তরে বিকশিত হবে তা নির্ণয় করার জন্য কোনো সচেতন উদ্যোগ বা বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া গ্রহণ করতেও দেখা যায় নি। শোষিত-নিপীড়িতদের একটি প্রতিবাদী গণ-জাগরণকে বৈপ্লবিক অভিমুখে বিকশিত করতে শ্রমিকশ্রেণির নিজস্ব জাগরণ ও তার নেতৃত্ব কী ভূমিকা রাখে–সে বিষয়েও কমিউনিস্ট বোঝপড়াটিকে সুস্পষ্ট করে তোলা যায় নি। এই সমস্যাগুলি থাকা সত্ত্বেও তত্কালীন আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পরিস্থিতির প্রভাবে এবং বাংলার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের কারণে গণ-আলোড়নের পর্বটি দীর্ঘায়িত হতে থাকে। শ্রমিক-কৃষকের আন্দোলন, ছাত্র-যুবদের আন্দোলন এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য নিয়ে বাংলায় উপস্থিত থাকে।
১৯৬৭ সালের শুরুর দিকে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে প্রথমবারের জন্য জাতীয় কংগ্রেস পরাজিত হয়। তৈরি হয় প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকার যার অন্যতম শরিক ছিল সিপিআই(এম)। রাজ্যের বামপন্থী রাজনীতির ইতিহাসে এ ছিল আরেক যুগসন্ধিক্ষণ। একদিকে আন্তর্জাতিক স্তরে কমিউনিস্ট আন্দোলনে সংশোধনবাদী ও বৈপ্লবিক অবস্থানে মেরুকরণ ও তার প্রভাবে এদেশের কমিউনিস্ট পার্টিতে বিভাজন, অন্যদিকে দেশ তথা রাজ্যে শ্রমিক-কৃষক-ছাত্র-যুবদের গণআন্দোলনের এক অভূতপূর্ব জোয়ার-এমন এক সন্ধিক্ষণে প্রচলিত সংসদীয় কাঠামোয় সরকারী ক্ষমতায় আসীন হলে বিপ্লবী শক্তির ভুমিকা কী হবে-এ প্রশ্নটি জীবন্ত হয়ে উঠল। নকশালবাড়ির কৃষক অভ্যুত্থানকে ঘিরে এই প্রশ্নটি ভীষণভাবে সামনে চলে এল। সিপিআই(এম) ভারতীয় বিপ্লবের যে রণনীতি ও রণকৌশল গ্রহণ করেছিল, তাতে অঙ্গরাজ্যে সরকার গড়ার কর্মসূচী অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু সিপিআই(এম) নেতৃত্ব গণ- আন্দোলনের স্বতঃস্ফূর্ত জোয়ারকে সরকার গড়ার পরিণতিতে পৌঁছে দিলেও গণ আন্দোলনের জোয়ার তখনও স্তিমিত হয় নি। নকশালবাড়ি কৃষক অভ্যুত্থান তার সবথেকে বড় প্রমাণ। কিন্তু সিপিএম নেতৃত্ব যে আর কোনোভাবেই চলমান সংগ্রামের কোনো বৈপ্লবিক বিকাশ চাইছিলেন না, তা নকশালবাড়ি আন্দোলন নিয়ে তাদের অবস্থানের মধ্যে দিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এখানে নেতৃত্বের আপসকামিতা, সংস্কারমুখীনতার দিকটি একটি পরিণতিতে পৌঁছে গেল।
চলমান গণআন্দোলনগুলির মধ্যে যে বৈপ্লবিক সম্ভাবনা সুপ্ত থাকে, তাকে বিকশিত করাটাই তো কমিউনিস্টদের সামনে আশু কর্তব্য হয়ে ওঠে। বিশেষ করে তা যখন ছাত্র-যুব-শ্রমিক-কৃষক-সহ সমাজের বিভিন্ন অংশের প্রতিবাদের মধ্যে দিয়ে একইসাথে ধ্বনিত হয়, এই বৈপ্লবিক রণকৌশলের প্রশ্নটি তখন অনেক বেশী প্রাধান্যের জায়গায় চলে আসে। প্রশ্ন ছিল, একটি অঙ্গরাজ্যের ক্ষেত্রে কোন রণকৌশলের সাহায্যে আন্দোলনকে আরও বিকশিত স্তরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব? এই প্রশ্নটি যে কোনো দেশের বৈপ্লবিক আন্দোলনেরই এক অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। অনেক বড় দেশেই এমন পরিস্থিতি বহু সময়ই দেখা গেছে যে দেশের একটি প্রান্তে যখন বিপ্লবী আন্দোলন ও মানুষের বৈপ্লবিক চেতনা বেশ কিছুটা এগিয়ে যায়, দেখা যায় দেশটির বিস্তীর্ণ অঞ্চল তখনও ততটা জেগে ওঠেনি। এর জন্য মার্ক্স–এঙ্গেলস-লেনিন বা কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিককে কখনও এমন সমাধান দিতে দেখা যায় নি যে–কী আর করা যাবে, একটা রাজ্যে তো আর বিপ্লব করে ফেলা যায় না, সুতরাং সরকারে যাও আর জনগণকে রিলিফ দিতে থাকো! এমন সমাধান যে আসেনি তার কারণটাও খুব স্পষ্ট–রাষ্ট্রটা যদি শ্রমজীবী জনগণের শত্রু শ্রেণির হাতে থাকে, তবে একটি অঙ্গরাজ্যে সেই জনগণের ‘বন্ধুদের’কে(কমিউনিস্টদের কথা বলা হচ্ছে) ‘রিলিফ দেওয়া’র কাজ কোনোমতেই শাসকশ্রেণির রাষ্ট্র চালাতে দেবে না। প্রথম বা দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকারের আমলে বিশেষত বাংলার গ্রামাঞ্চলের সংগ্রামী কৃষকদের রিলিফ দেওয়ার লক্ষ্যে যে পুঁজিবাদী ভূমিসংস্কারের কাজ আংশিক রূপে সরকারের পক্ষ থেকে শুরু করা হয়েছিল, তাতেই শাসকশ্রেণী সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। কেন্দ্রীয় সরকার দু’বারই যুক্তফ্রন্ট সরকারকে ভেঙ্গে দেয়। এখন যদি এই সত্যিটাকে জনগণের সামনে তুলে ধরার জন্যই শুধু সরকারে যেতে হয়, তবে তো অতি দ্রুতই সেই সত্য জনগণের সামনে চলে আসবে। সেক্ষেত্রে দীর্ঘদিন সরকারে বসে থাকার কোনো সুযোগই থাকবে না। অন্য যে রাস্তাটি পড়ে ছিল—বিপ্লবের সম্ভাবনা যেহেতু নেই, তাই এই শোষণকারী ব্যবস্থাতেও সরকারে গিয়ে জনগণকে যতটা রিলিফ দেওয়া যায়, তা করার জন্যই দীর্ঘমেয়াদীভাবে সরকারে টিকে থাকার ব্যবস্থাপনা। বাম রাজনীতির মর্মবস্তু যদি এখানে এসে দাঁড়ায়, তবে তাকে শাসকশ্রেণীকে ক্রমাগত এটাই বোঝাতে হবে যে নামে ‘বাম’ হলেও তারা এই ব্যবস্থাটিকেই টিকিয়ে রাখতে চায়, বিপ্লব করার প্রস্তুতি বা পরিকল্পনা কোনোটাই তাদের নেই। সিপিআই এবং সিপিআই(এম) এই দ্বিতীয় রাস্তাটি গ্রহণ করল।
যে কোন দেশেই বিপ্লবী রণকৌশল দেশটির রাষ্ট্রচরিত্র, পুঁজিবাদী বিকাশের স্তর, যোগাযোগ ব্যবস্থার অগ্রগতি ইত্যাদির ওপর বহুলাংশে নির্ভর করবে। কিন্তু, তৃতীয় আন্তর্জাতিকের ধারায় দেশে দেশে গড়ে ওঠা কমিউনিস্ট বা সোশ্যালিস্ট পার্টিগুলির মধ্যে সিপিআই(এম)-ই সম্ভবত প্রথম পার্টি, যারা একটি অঙ্গরাজ্যে সরকার গঠন করে জনগণকে রিলিফ দেওয়ার ‘বিনম্র কর্মসূচী’টিকে রণকৌশলগত লাইন হিসেবে গ্রহণ করে এবং তা প্রবলভাবে অনুশীলন করে। আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে যাদের ‘সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট’ বলা হয়, বিভিন্ন দেশে তারা এমন সরকার তৈরি করেছেন—যাদেরকে কমঃ লেনিন ও তাঁর-পরবর্তী আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলন শ্রমিক-আন্দোলনে পুঁজিপতিদের এজেন্ট বলেই চিহ্নিত করেছে। দেশের ক্ষমতাদখলের জন্য অভ্যুত্থানের ডাক দেওয়ার মত পরিস্থিতি না থাকলে যে গণআন্দোলন ও সশস্ত্র আন্দোলনের দীর্ঘকালীন আঁকাবাঁকা পথেই বিপ্লবী আন্দোলনের বিকাশ ঘটাতে হবে–এ হল মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী রণকৌশলের অ-আ-ক-খ। সারা ভারতে বাম আন্দোলন অনেক পিছিয়ে রয়েছে–সমস্যার প্রাণকেন্দ্র যদি এটা হয়, তবে বাংলাসহ যেসব রাজ্যে বাম আন্দোলন এগিয়ে গিয়েছিল সেইসময়, সেখান থেকে পিছিয়ে থাকা রাজ্যগুলিতে দ্রুত বিকাশ ঘটানোর লক্ষ্যে বড় সংখ্যায় সংগঠকদের নিয়োগ করাটাই তো প্রথম জরুরী পদক্ষেপ ছিল। স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়েও বাংলা ও পাঞ্জাবে এমন অজস্র উদাহরণ দেখা গেছে। অন্য যে প্রশ্নটি তোলা হয়েছিল, সেটি হল কোনো একটি অঙ্গরাজ্যে জনগণ যদি কমিউনিস্টদের ভোট দিয়ে জিতিয়ে দেয়, তবে কমিউনিস্টরা কী করবে? এই প্রশ্নটিকে নানান দিক থেকে দেখার আছে, এই আলোচনায় তা করার সুযোগ নেই। কিন্তু নিশ্চয়ই একথা বলা দরকার যে, পাকাপাকিভাবে এই শোষণমূলক ব্যবস্থার অংশ হয়ে না যেতে চাইলে, ব্যতিক্রমমূলক কোন পরিস্থিতিতে কমিউনিস্টরা সরকারে অংশগ্রহণ করলেও তাদের মৌলিক কর্মসূচিগুলিকেই তারা দ্রুত লাগু করতে উদ্যোগী হবে; অর্থনৈতিক নীতি, আইন-আদালতের মৌলিক সংস্কার করতে উদ্যোগী হবে–যাতে সারা দেশের শ্রমজীবী মানুষ বুঝতে পারে কমিউনিস্টরা কী চায়। এমনকী কোনো ব্যতিক্রমমূলক পরিস্থিতিতে কমিউনিস্টরা কোনো অঙ্গরাজ্যে সরকার গঠন করার মতো পরিস্থিতির সম্মুখীন হলেও জনগণকে রিলিফ দেওয়ার কথা বলে বা সেই চেষ্টা করে জনগণকে সংসদীয় ব্যবস্থার প্রতি মোহগ্রস্ত করে তুলবে না।
১৯০৫-পূর্ববর্তী রাশিয়ায় শ্রমিক আন্দোলনের যে অভূতপূর্ব বিকাশ ঘটেছিল, তাকে শ্রমিক-কৃষকের বৈপ্লবিক একনায়কত্ব অবধি বিকশিত করার যে আশু কর্তব্যটি লেনিন দেখতে পেয়েছিলেন, তার মধ্যেই ছিল বলশেভিকবাদের বীজ। সেই বিকাশের সম্ভাবনাকে রূপ দিতে গিয়ে লেনিন একদিকে কমিউনিস্ট সংগঠনের সাংগঠনিক নীতি নির্মাণ করলেন, অন্যদিকে চূড়ান্ত রূপ দিয়েছিলেন রুশ বিপ্লবের রণনীতি ও রণকৌশলের। বিপ্লবী আন্দোলনের ইতিহাসে এরকম উদাহরণ আরো আছে। সিপিআই তো আগেই ঘটিয়েছে, সিপিআই(এম) নেতৃত্বও ভারতের বাম আন্দোলনের বিপ্লবী দিশায় এগোনোর প্রশ্নে এক মৌলিক বিচ্ছেদ ১৯৬৭-তেই ঘটিয়ে ফেলল। সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা বা প্রতারণা, যাই বলা হোক, তা এখানেই যে, তারা ভারতের বিপ্লবী আন্দোলনের বিকাশের সবথেকে সম্ভাবনাপূর্ণ অধ্যায়টিকে প্রধানত সরকার গড়ার কর্মসূচীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে দিলেন। ভারতের জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করতে কমিউনিস্টদের সামনে যে কৃষিবিপ্লবী কর্তব্যটি দায়িত্ব এসে উপস্থিত হয়েছিল, দেশের কোনো একটি-দুটি অঙ্গরাজ্যে জনগণকে রিলিফ দেওয়ার নামে সরকার গঠন করে আংশিক পুঁজিবাদী ভূমি-সংস্কারের প্রচেষ্টাকে কোনোভাবেই তার অনুশীলন হিসেবে দেখা উচিত হবে না। আর কর্মসূচীতে সংসদ-বহির্ভূত সংগ্রামের কথা লিখলেই তা যে বাস্তবে অনুশীলিত হবে এমন কোনো কথা নেই। ইতিহাসে এর ভুরি ভুরি উদাহরণ আছে। এটা অত্যন্ত স্পষ্ট ব্যাপার যে সিপিএম নেতৃত্ব এই সরকার গড়ার মধ্যেই সেই সময়ের সমস্ত বিকাশের সম্ভাবনাকে আটকে রাখতে চেয়েছিলেন, এবং তা সচেতনভাবেই। সরকারের সাফল্য হিসেবে যে ভূমিসংস্কারের পরিসংখ্যান তারা দেন, তা যে কোনোভাবেই শ্রেণী সংগ্রামের বিকাশে, বিপ্লবী আন্দোলনের অগ্রগতিতে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে নি বাস্তব ইতিহাসই তার প্রমাণ। মহাবিতর্কে সোভিয়েত পার্টি-চীন পার্টির থেকে সমদুরত্বের লাইন নিলেও রুশ পার্টির সঙ্গে সখ্যে সিপিআই-এর কাছে প্রতিযোগিতায় হেরে যাওয়ার আশঙ্কাতেই হোক আর সিপিসি-র অভ্যন্তরে দুই লাইনের লড়াইয়ে ক্রমশ সংশোধনবাদীদের শক্তিশালী হয়ে পড়াকে মেনে নেওয়ার কারণেই হোক, ‘বাস্তববোধসম্পন্ন’ সিপিএম নেতারা বিপ্লব বা বৈপ্লবিক কর্মসূচীর তাত্পর্য সম্পর্কেই নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করতে শুরু করেছিলেন। বিপ্লবের প্রতি আগ্রহ ও আস্থা দুটোই সিপিআই(এম) নেতৃত্বের নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে নকশালবাড়ি অভ্যুত্থান ও তাকে কেন্দ্র করে সমাজে যে বৈপ্লবিক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল, তা তত্কালীন সিপিএম নেতৃত্বের পক্ষে ধারণ করা সম্ভব ছিল না।
বিপরীতে নকশালবাড়ির অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে যে সামাজিক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল, তা ভারতে বৈপ্লবিক সংগ্রামের বিকাশের সম্ভাবনা ও সমস্যা, উভয়কেই সামনে এনে দিয়েছিল। একটি আধা-সামন্ততান্ত্রিক ও আধা ঔপনিবেশিক (১৯৪৭-পরবর্তী ভারত আদৌ আধা-ঔপনিবেশিক ছিল কিনা তা ভিন্ন প্রশ্ন) দেশে কৃষিবিপ্লবকে অক্ষ করে নয়া গণতান্ত্রিক বা জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব সফল করার যে চালু মডেল চীন থেকে ভারতের কমিউনিস্টদের একাংশ শিখেছিলেন, তা কীভাবে ভারতের বুকে প্রয়োগ করা সম্ভব, তা জীবন্ত করে তুলেছিল নকশালবাড়ি অভ্যুত্থান। সশস্ত্র উপায়ে ঘাঁটি এলাকা গঠন করে দীর্ঘস্থায়ী জনযুদ্ধের মাধ্যমে ভারতীয় বিপ্লবকে সাফল্যের পথে নিয়ে যাওয়ার যে চিত্র উপস্থিত হয়েছিল সেদিন দেশের বিপ্লবকামী কমিউনিস্টদের সামনে, তেলেঙ্গানার লড়াইয়ের পরবর্তীতে তেমন কোনো সুনির্দিষ্ট বিপ্লবকামী প্রচেষ্টা ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনে ছিল না। সিপিএম-নেতৃত্বের সংস্কারবাদী-সংশোধনবাদী পরিণতির কারণেই তারা এই বিপুল জাগরণকে ‘হঠকারী’ চিহ্নিত করে পশ্চাদপসারণ করলেও দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পোড়খাওয়া লড়াকু কমিউনিস্টরা দেশজোড়া বিপ্লবী কৃষক আন্দোলনের সম্ভাবনাকে অনুভব করে সিপিআই(এম) থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। এই ঘটনার অভিঘাতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শ্রমিক-কৃষক-ছাত্র-যুবদের মধ্যে যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল, তাকে ধারণ করার কোনো উপযোগী আধার সেদিন তৈরী ছিল না। আধারের আশু প্রয়োজনীয়তা থেকে ১৯৬৮ সালে জন্ম নিল কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের সারা ভারত কো-অর্ডিনেশন কমিটি বা এ আই সি সি সি আর ।
এই আন্দোলনকে প্রাথমিকভাবে যে পুলিশী দমনপীড়নের মুখে ফেলা হল, সেই পুলিশের মন্ত্রী ছিলেন সিপিআই(এম)-এর কেন্দ্রীয় নেতা জ্যোতি বসু। নকশালবাড়ি আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সরকারের ভূমিকায় তত্কালীন সিপিআই(এম) কর্মসূচীর ১১২ নং ধারার ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যে সরকার গড়ার লাইন নিয়ে দলের অভ্যন্তরে বিতর্ক শুরু হল। এই বিতর্কে এরাজ্যের সিপিআই(এম)–এর প্রধান মুখ প্রমোদ দাশগুপ্ত-জ্যোতি বসু-হরেকৃষ্ণ কোঙাররা নকশালবাড়িতে সরকারের গুলিচালনার পক্ষে দাঁড়ালেন। পার্টির দার্জিলিং জেলা কমিটির নেতৃত্বে এই অভ্যুত্থান পরিচালিত হলেও রাজ্য নেতৃত্ব সেই আন্দোলনকে ‘হঠকারী’ বলে ঘোষণা করলেন। সিপিআই(এম) নেতৃত্বের এই শোধনবাদী অবস্থানের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের কমিউনিস্ট কর্মীরা দলত্যাগ করতে থাকেন। নকশালবাড়ির কৃষকদের লড়াইয়ের প্রতি সমর্থন রাজ্যের অগণিত শ্রমিক-কৃষক-ছাত্র-যুবদের মধ্যে বিপ্লবী আদর্শের বোধকে ছড়িয়ে দিয়েছিল। সেই উত্তাল সময়েই এদেশের বিপ্লবী বামপন্থীরা জন্ম দিয়েছিলেন কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের সারা ভারত কো-অর্ডিনেশন কমিটি(AICCCR)-এর।
বিপ্লবী পার্টি গড়ার সংগ্রাম
সিপিআই-সিপিআই(এম)-এর শোধনবাদী অবস্থানের বিপরীতে নতুন করে দেশের বুকে একটি বিপ্লবী পার্টি গঠনের উদ্যোগ শুরু হয়েছিল সেদিন। কিন্তু অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয় হল, অচিরেই এই উদ্যোগটিতে ভাঙ্গন এসে উপস্থিত হয়েছিল। নিজেদের মধ্যেকার বিতর্কের কোনো ধৈর্যশীল মীমাংসা উপস্থিত না করেই চারু মজুমদারের নেতৃত্বাধীন অংশটি সি পি আই(এম-এল) পার্টি গঠনের ঘোষণা করে দিলেন। বিপরীতে নাগি রেড্ডি-ডি ভি রাও-দের নেতৃত্বাধীন অংশটি সি পি আই (এম এল) পার্টি গঠনের প্রক্রিয়াটিকে বিরোধ করে তা থেকে সরে দাঁড়ালেন। সি পি আই (এম এল)-এর কর্মকান্ডের প্রধান কেন্দ্র যেহেতু বাংলা ছিল, ফলে তাদের সমস্ত অনুশীলনের গভীরতম প্রভাব বাংলার বামপন্থী আন্দোলনে পড়েছে। এই বিপ্লবী শক্তিটির মধ্যে ভারতীয় বিপ্লবে সর্বহারাশ্রেণীর নেতৃত্বের স্তরে বিকশিত হওয়ার প্রশ্নটিকে কার্যত অস্বীকার করা, ভারতের কৃষিবিপ্লবের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যগুলিকে আয়ত্ত করে তদুপযোগী অনুশীলনের পরিবর্তে চীনা মডেলের অন্ধ অনুকরণ করার প্রচেষ্টা, গণ সংগঠন–গণআন্দোলন বয়কট, খতম-লাইন ও তার বিকৃততম অনুশীলন, কর্তৃত্ববাদের চরম আধিপত্য, পরিস্থিতিকে বাড়িয়ে দেখা, পার্টির অভ্যন্তরে উপদলীয় চক্রান্তের মধ্যে ডুবে যাওয়া প্রভৃতি সমস্যাগুলি প্রকট হয়ে উঠলো প্রধানত এক গভীর মতাদর্শজনিত সমস্যার কারণে। এরই সাথে শাসকশ্রেণীর নির্মমতম দমনের কারণে অতি অল্পসময়ের মধ্যেই সি পি আই(এম এল) ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। কয়েক হাজার বিপ্লবীর আত্মবলিদানের বিনিময়ে যে পার্টি (আমাদের মতে, একে কমিউনিস্ট পার্টি বলা চলে না–কিন্তু এটি একটি বিপ্লবী পার্টি ছিল) ভারতের বুকে প্রথমবারের জন্য বিপ্লব প্রচেষ্টায় অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে ব্রতী হয়েছিল, সে শক্তির নির্মমভাবে দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া-টা অসংখ্য বিপ্লবকামী জনতার কাছে স্বপ্নের অপমৃত্যুর মতো মনে হয়েছিল। একথা অনস্বীকার্য যে, সিপিআই(এম)-এর শোধনবাদী রাজনীতির বিপরীতে সমাজের বুকে তারা বৈপ্লবিক অবস্থানকে অত্যন্ত সজোরেই উত্থাপন করেছিলেন। কিন্তু বাংলা তথা ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনে যতধরনের মতাদর্শগত পশ্চাদপদতা, ভ্রান্তি, বিকৃতি ও মৌলিকত্বের অভাব জমা হয়েছিল, নতুনভাবে বিপ্লবী পার্টি গঠন ও চরমতম আত্মত্যাগের মাধ্যমে বিপ্লবপ্রচেষ্টার এই কালপর্বটিতে, তার সাথে মৌলিকভাবে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে এগোনোর ইঙ্গিত উপস্থিত করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। চীনা পার্টির থেকে তারা একভাবে বিপ্লবী অনুপ্রেরণা নিয়েছিলেন। দেশের বিপ্লবকামী কমিউনিস্টদের মধ্যে তা সঞ্চারিত করতেও সক্ষম হয়েছিলেন একটা দূর পর্যন্ত। কিন্তু তৎকালীন বিশ্ব-পরিস্থিতি বুঝতে, ভারতীয় সমাজ-সভ্যতাকে বুঝতে, ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের সমস্যা ও জটিলতাকে বুঝতে এই আন্দোলন অগ্রণী কমিউনিস্ট বিচক্ষণতা দেখাতে পারেনি। কমিউনিস্ট পার্টি যে শ্রমিক শ্রেণির অগ্রণী অংশের পার্টি–এই মৌলিক ধারণাটিকেই নানান দিক থেকে খারিজ করে দেওয়া হয়েছিল। তত্ত্বগত চর্চাকেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কোন রকম প্রশ্ন তোলাকেই বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। বাম-সঙ্কীর্ণতাবাদী রাজনীতির করাল গ্রাসে আক্রান্ত হয়েছিল সেদিনের সেই মহান উদ্যোগ ও উজ্জ্বল সম্ভাবনাটি।
স্বপ্নভঙ্গের পরেও
কিন্তু শাসকশ্রেণীর দিবাস্বপ্নকে পদদলিত করে শহীদদের স্মৃতিকে সামনে রেখে, অনিচ্ছাকৃত ভুলের থেকে শিক্ষা নিয়েই ভারত তথা বাংলার বাম আন্দোলন নিজেকে পুনঃসংগঠিত করার নানা চেষ্টা চালিয়ে গেছে। জরুরি অবস্থার কালো দিনগুলোকে পেরিয়ে ভারতের বাম আন্দোলনের বিপ্লবী ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা করেছে আপ্রাণভাবে। এই সময়ে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের বিপর্যয়, ১৯৭৬-এ কম: মাও-এর মৃত্যু এবং চীনা পার্টির ভেতরে কার্যকরী বিপ্লবী নেতৃত্বের অভাব পার্টির অভ্যন্তরে দেং জিয়াও পিং-দের নেতৃত্বাধীন সংশোধনবাদী নেতৃত্বের ক্ষমতাদখলকে ত্বরান্বিত করল। দেং-রা প্রচার করতে শুরু করলো ‘বেড়াল সাদা হোক বা কালো, ইঁদুর ধরতে পারলেই হোলো’। পুঁজিবাদী পথে ফেরার লক্ষ্যে সংস্কারের রাস্তায় চীনা পার্টি এক ‘বিরাট বিপরীত যাত্রা’ শুরু করল। আন্তর্জাতিক স্তরে আর কোনো বিপ্লবী কেন্দ্র রইল না। ভারতের বুকে তথাকথিত “সমাজতান্ত্রিক” রাশিয়া দ্বারা সমর্থিত ইন্দিরা স্বৈরতন্ত্র নির্বাচনে পরাজিত হল। জরুরি অবস্থার অবসানে এরাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ কংগ্রেসের অপশাসনের বিরুদ্ধে নির্বাচনে সিপিআই–সিপিআই(এম)-এর মতো সরকারসর্বস্ব সংস্কারবাদী বামেদের প্রতিই তাদের সমর্থন জানালো। অঙ্গরাজ্যের ক্ষমতা নিয়ে সি পিআই(এম) সর্বভারতীয় রাজনীতিতে নিজেদের প্রাসঙ্গিক করে তুলতে এমনকী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দেশের প্রধান শাসক দল কংগ্রেসকে সমর্থন করার লাইন নিল, অন্যদিকে তারা রাজ্যের প্রধান শাসক দল হিসেবে সরকারী ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে সরকারী বামপন্থাকেই একমাত্র বামপন্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠার কাজে লাগলো। ১৯৭৭-পরবর্তী পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থী আন্দোলনের ক্ষেত্রে একদিকে বিপ্লবী শক্তির চরম বিপর্যয় ও জনবিচ্ছিন্নতা এবং অন্যদিকে সিপিআই(এম)-এর নেতৃত্বে সংশোধনবাদী শক্তির বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সরকারী ক্ষমতালাভ এক নতুন যাত্রাপথের সূচনা করল। বিপ্লবী বামপন্থার প্রতি নানানস্তরে জনসমর্থন উপস্থিত থাকলেও সিপিআই(এম)-এর বিপরীতে তার কোনো সংগঠিত উপস্থিতি পরিলক্ষিত হয় নি।
সংশোধনবাদের পরিনতি
অন্যদিকে সিপিআই(এম) সরকার পরিচালনার প্রশ্নে রাজ্যের প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের বঞ্চনার বিষয়টিকে জনসমর্থন ধরে রাখার প্রাথমিক কেন্দ্রবিন্দু করল। ‘বামফ্রন্ট সরকার সংগ্রামের হাতিয়ার’-ধরনের প্রচার কেন্দ্রীয় সরকারের বঞ্চনার প্রতি বিরোধিতার মধ্যেই আটকে রইল। পাশাপাশি তত্কালীন কৃষিনির্ভর পশ্চিমবাংলায় তারা গ্রামাঞ্চলে কোনো মৌলিক ধরনের ভূমি সংস্কার কর্মসূচীকে সংগ্রামের নতুন রূপ হিসেবে সামনে নিয়ে আসার পরিবর্তে ‘অপারেশন বর্গা’ জাতীয় আংশিক কর্মসূচীকে সামনে রেখে দরিদ্র কৃষিজীবী জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা অর্জনেই অনেক বেশি মনোযোগী হয়েছিল। এরাজ্যের শ্রমিকশ্রেণীর লড়াকু ঐতিহ্যকে সচেতনভাবে বদলে দেওয়ার ভাবনায় কারখানায় অথবা শিল্পে শ্রমিক-মালিক বিরোধে সমঝোতাকারীর ভূমিকা নিল পার্টি। শ্রমিকশ্রেণীর স্বাধীন উদ্যোগ, লড়াইয়ের আগ্রহ ক্রমশ কমতে শুরু করল। সি পি আই (এম)-এর উদ্যোগে শ্রেণী-সমঝোতার তত্ত্বায়ন করা হল। তদুপযোগী বাতাবরণ সৃষ্টি করার জন্য পার্টির উদ্যোগকে ব্যাপকভাবে কেন্দ্রীভূত করা হল।
১৯৭৭-পরবর্তী বাংলায় ছাত্র আন্দোলনের এক নতুন অগ্রগতি শুরু হয়েছিল। সি পি আই(এম) ক্ষমতায় বসলেও শুরুতেই পার্টিতন্ত্র ততটা জাঁকিয়েবসতে পারে নি। ছাত্র আন্দোলনের ওই বিকাশটি তাদের ক্ষমতার বৃত্তের বাইরে দাঁড়িয়ে ঘটেছিল, চরিত্রের দিক থেকে যা ছিল সংগ্রামী, স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক। পশ্চিমবঙ্গে কর্মরত কমিউনিস্ট বিপ্লবী শক্তিগুলি এই বিকাশের সাথে তুলনামূলক বেশি সম্পৃক্ত থাকলেও এটিকে বিকশিত করা ও স্থায়ী রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে তারা অনেকটাই সীমাবদ্ধ ছিল। ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে এই বিকাশ ক্রমশ স্তিমিত হতে থাকে। বিপরীতে কলেজে-বিশ্ববিদ্যালয়ে পার্টিতন্ত্র সরকারী ক্ষমতার জোরে সংহত হতে থাকে। ছাত্রছাত্রী আন্দোলনের যে লড়াকু অতীত বাংলার এক নিজস্ব বৈশিষ্ট্য হিসেবে গড়ে উঠেছিল, তা সরকারী ক্ষমতার ঘেরাটোপে পড়ে ‘পাইয়ে দেওয়া-মানিয়ে চলা’র এক আপসকামী মতাদর্শের আবহে হারিয়ে যেতে থাকে। সিপিআই(এম) বামফ্রন্ট সরকারকে ‘সংগ্রামের হাতিয়ার’ থেকে বদলে দিয়ে ‘নয়নের মণির মতো রক্ষা করার’ কথা বলে ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করে তোলার দিকে আরো জোরালোভাবে ঝুঁকে পড়তে থাকে। সরকারী ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলার বামপন্থার সংগ্রামী ও বিপ্লবী ঐতিহ্যের বিপরীতে জনগণকে ‘পাইয়ে দেবার রাজনীতি’তে নিষ্ক্রিয় সমর্থক করে তোলার কাজে সমগ্র সিপিআই(এম) পার্টি আত্মনিয়োগ করে। ফলে বাংলার শোষিত–বঞ্চিত কৃষকরা বা গ্রামীণ মেহনতী জনগণ সিপিএম-জমানার প্রথম পঁচিশ বছরে গ্রামাঞ্চলে ‘অপারেশন বর্গা’-ধরনের পুঁজিবাদী ভুমি-সংস্কার আইনের কিছুটা উৎসাহী প্রয়োগ দেখে আস্বস্ত হলেন – যাক পার্টি তাহলে ঠিক রাস্তাতেই আছে! আদতে চীনবিপ্লবের তাড়িয়ে বেড়ানো আতঙ্ক এবং বাংলায় পাঁচ ও ছয়ের দশকের উত্তাল কৃষক আন্দোলনের উত্তাপে বাংলায় পুঁজিবাদী ভুমিসংস্কার কর্মসূচী লাগু করা কোনো কঠিন কাজ ছিল না। কারণ ভারত রাষ্ট্রের শাসনক্ষমতায় বৃহৎ পুঁজিপতিশ্রেণির ক্ষমতা ছিল সামন্তশ্রেণির তুলনায় অনেক বেশী। তাই অপারেশন বর্গা কখনই রাষ্ট্রের প্রতিরোধের মুখে পড়ে নি। মাথায় রাখতে হবে তার এক দশক আগেই মার্কিন সহায়তায় ভারত সরকার ‘সবুজ বিপ্লব’ কর্মসূচী গ্রহণ করেছিল। এই উদ্যোগ ভুমিসংস্কারের কাজে সিপিআই(এম)-কে কয়েক দশকের জন্য এক বিশেষ সুবিধা করে দিল। মেহনতি মানুষ ভাবতে থাকল যে বামফ্রন্ট যেভাবেই হোক, খেটেখাওয়া মানুষের সমস্যার সমাধান করবে! আর বাম আন্দোলনের পুরোনো পোড়খাওয়া কর্মীদেরও পার্টিতে অপ্রয়োজনীয় হয়ে যেতে বা অধঃপতিত হতে সময় লেগেছে ঐ দু-দশক। কংগ্রেস জমানাতেই ওপর থেকে শুরু হওয়া খর্বিত ধরনের ভূমি-সংস্কার ও পরবর্তীতে বামফ্রন্ট সরকারের ‘অপারেশন বর্গা’ গ্রাম বাংলায় শ্রমজীবী জনগণের লড়াকু মেজাজকে অনেকটাই নষ্ট করে দিতে সক্ষম হল। বামপন্থার মানে দাঁড়ালো–নির্বাচনে বামফ্রন্টকে বিপুল ভোটে জয়ী করা। বাকী কাজ পার্টির নেতারাই করে দেবেন- জনগণের কাজ হল সেগুলিকেই মহান কাজ বলে মেনে নেওয়া।
এমনিতেই সিপিএম-এর সংগঠন এরাজ্যে বেশ বড় ছিল। নকশালপন্থীদের সঙ্গে লড়াইয়ে হোক বা কংগ্রেসের শ্বেতসন্ত্রাসের মধ্যেও মোটামুটি সংগঠনকে টিকিয়ে রাখতে পারায় ১৯৭৭ সালের নির্বাচনী সুযোগটাকে তারাই সবথেকে কাজে লাগাতে সক্ষম হল। পরবর্তীতে সরকারী ক্ষমতাকে ভালোরকম ব্যবহার করে রাজ্যের প্রায় সর্বত্র পার্টিকে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হল। পরবর্তীকালে এই ব্যাপারটাই দলতন্ত্র হিসেবে পরিচিতি পেল। অন্যদিকে আগের পর্বের লড়াই-সংঘাতের মধ্যে দিয়ে যাওয়া পোড়খাওয়া অংশটির ক্লান্ত হয়ে পড়ার একটা দিকও এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছিল। ফলে শ্রেণী-সমঝোতার লাইনটি আরো শক্তিশালীভাবে সিপিআই(এম) পার্টির মধ্যে গেড়ে বসল। কোনোমতেই যাতে আর সরকারী ক্ষমতা হারাতে না হয়, তা রাজনৈতিক লাইন নির্ধারণের প্রশ্নে নির্ণায়ক হয়ে উঠল। পুরো বাতাবরণটিই সমস্ত দিক থেকে সিপিআই(এম)-এর এক বুর্জোয়া পার্টিতে রূপান্তরের পক্ষে অনুকূল হয়ে উঠল। ১৯৯৪ সালে এরাজ্যে বাম সরকারের নয়া শিল্পনীতি, নয়া কৃষিনীতি, নয়া বাণিজ্যনীতি পরবর্তী ১০ বছরে পার্টি তথা সরকারকে নয়া উদারনীতির পথে হাঁটার সীলমোহর দিল। এমন ভাবার কোনো কারণ নেই যে ব্যাপারটা সিপিএম-এর মধ্যেকার কয়েকজন স্বার্থন্বেষীর অভিলাষ ছিল, এটা ছিল সিপিআই(এম)-এর কেন্দ্রীয় কমিটি দ্বারা গৃহীত পার্টির কেন্দ্রীয় লাইন। ফলে তারাই যে দেশে ‘নব-উদারবাদ’ লাগু করার পক্ষে সবচেয়ে সক্ষম রাজনৈতিক দল–তা প্রমাণ করতে সিপিআই(এম) উঠে পড়ে লাগল! পুঁজিপতি শ্রেণীকে আশ্বাস দেওয়া হলো যে তাদের প্রয়োজনীয় সবই করা হবে, কিন্তু তা করা হবে মানুষকে সঙ্গে নিয়ে। অর্থাৎ, মানুষকে সাথে নিয়ে ‘নব-উদারবাদ’! ২০০৩ সালে পশ্চিমবঙ্গে দেশের মধ্যে প্রথম এস ই জেড বিল পাশ করালেন বুদ্ধবাবুরা। পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি ও রাজ্য কমিটির পূর্ণ সম্মতিতে দেশের মধ্যে প্রথম একটি অঙ্গরাজ্যে ‘বিশেষ আর্থিক অঞ্চল’ বানিয়ে বুদ্ধবাবুরা যে যে কোনো রঙের বেড়াল ধরতে নেমেছেন, তা বুঝিয়ে দিতে কসুর করেন নি। চুক্তিচাষ, কর্পোরেট চাষ, লাভজনক কৃষি এসব দেশী-বিদেশী বৃহৎ পুঁজিপতিদের স্বার্থবাহী কৃষিনীতিকে সিপিএম ‘সৃজনশীল’ভাবে প্রয়োগ করা শুরু করেবাংলায়! ‘নব-উদারবাদ’ এগুলো ছাড়া পশ্চিমবঙ্গে পল্লবিত হতে পারত না। এই ‘ভিত্তি’র ওপর দাঁড়িয়েই তারা টাটা-সালিমদের শিল্পীয় ‘ভবিষ্যত’ গড়ে তুলছিলেন। বামপন্থার এই ‘সৃজনশীল সংস্করণ’টিই সিপিআই(এম)-সৃষ্ট ও পরিচালিত বামপন্থা!
আশির দশকে কেন্দ্রের বঞ্চনার বিরুদ্ধে আন্দোলন-আন্দোলন খেলা, পুঁজিবাদী ভূমিসংস্কার কর্মসূচিকে লাগু করার নিরাপদ প্রচেষ্টার আড়ালে যে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষমতার লালসা ক্রমশ তার ডালপালা ছড়িয়েছিল বাংলার কোণে কোণে, সিপিআই(এম) সেই পথের অবধারিত পরিণতিতে পৌঁছেছিল নব্বইয়ের দশকে। নয়া-উদারবাদের পথে যাত্রায় ভারতের শাসকশ্রেণীর পরিকল্পনাকে বাম মোড়কে উপস্থিত করার অভিমুখ ঐ দশকের গোড়াতেই যে স্পষ্ট হয়ে উঠছিল, একথা আগেই আলোচনা করা হয়েছে। সিপিএম-এর ক্ষমতায় থাকার শেষদশক-টা এই বুর্জোয়া রূপান্তরের নির্মম অনুশীলনের দশক ছিল। কিন্তু যে পরিমাণে এই অনুশীলনটির জনবিরোধী চরিত্রটি সমাজে ব্যাপকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাচ্ছিল, তাতে শাসকশ্রেণীর কাছে বিকল্প খোঁজাটাও জরুরী হয়ে উঠেছিল। শাসকশ্রেণী যে ‘বাম’ নামটাকেও যে কোনো মূল্যে পরিহার করতে চায়, তা বুঝতে পেরে বুদ্ধদেবরা যে কোনো মূল্যে দেশী-বিদেশী বৃহৎ পুঁজিপতিদের মরিয়া আস্থা অর্জনে নেমেছিলেন। কিন্তু শেষরক্ষা হয় নি। সিপিআই(এম) ২০১১-য় রাজ্যের শাসনক্ষমতা হারানোর পর তিন বছর অতিক্রান্ত। সিপিএম গত তিনবছরে কী কোনোভাবে তাদের বুর্জোয়া রূপান্তর থেকে বেরোনোর প্রচেষ্টায় আছে ? একেবারেই না।
রাষ্ট্রপতি পদে কংগ্রেসকে সমর্থন করা, কুড়ানকুলামে পারমানবিক চুল্লী স্থাপনের পক্ষে দাঁড়ানো, এসইজেড লাগু করা থেকে পুঁজিপতি শ্রেণীর নয়া শোষণ-প্রকল্প দেশজোড়া ‘ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল করিডোর’-এর সপক্ষে অবস্থান নেওয়া, কৃষিতে দ্বিতীয় সবুজ বিপ্লবের সপক্ষে দাঁড়ানো, আফস্পা, ইউএপিএ, এনআইএ-মতো কুখ্যাত কালা আইন ও সংস্থার পক্ষে নির্লজ্জ সমর্থন জুগিয়ে তারা যেমন প্রমাণ করেছে যে কেন্দ্রীয়ভাবেই সিপিএম বদলায় নি, তেমনি বাংলার সিপিএম নেতারা সারদাসহ চিটফান্ড দুর্নীতির কালিমা থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতে পারে নি। ক্ষমতায় থাকাকালীন পশ্চিমবঙ্গের শ্রমজীবী মানুষের জীবনে যে অপরিসীম দুর্দশা তারা চাপিয়ে দিয়েছিল–কী কারখানায়, কী ক্ষেতেখামারে, সর্বত্রই আজও তারা সেই দুর্দশার মধ্যেই জনতাকে ডুবিয়ে রাখতে চায়। মালিকদের প্রতি আনুগত্যে কার্পণ্য ধরে নি একফোঁটাও। তাই মূল্যবৃদ্ধি থেকে কর্মহীনতার বিরুদ্ধে কোনো কার্যকরী লড়াই গড়ে তোলার তাদের চিন্তার-ও অতীত। বড়জোর কিছু লোকদেখানো কর্মসূচী তারা নিতে পারে। নারীদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতনে তারা কার্যত নিশ্চুপ। নিজেদের জমানাতে দলিত-আদিবাসী-নিপীড়িত জাতিসত্তাদের ওপর নিপীড়নের যে কু-ঐতিহ্য তারা মরিচঝাঁপি থেকে লালগড় পর্যন্ত তৈরী করেছে, আজ সেইসব বঞ্চনার বিরুদ্ধে লড়তে গেলে যে সিপিএম-কে খোলনলচে বদলাতে হবে। রাজ্যের মুসলিম জনগণের যে ভয়াবহ পশ্চাদপদতাকে তারা বছরের পর বছর ধরে কাজে লাগিয়েছে নিছক ভোটব্যাঙ্কের স্বার্থে, আজকে তারা কোন মুখে সেই পশ্চাদপদতার বিরুদ্ধে লড়াই করবে ? শিক্ষা-স্বাস্থ্যক্ষেত্রকে যারা বছরের পর বছর ধরে দলীয় সুবিধাভোগীদের আর নব-উদারবাদের ফর্মুলা মেনে দেশী-বিদেশী একচেটিয়া পুঁজির লুণ্ঠনের মৃগয়াক্ষেত্র বানিয়ে দিয়েছে, তারা কী করে জনশিক্ষা বা জনস্বাস্থ্যের লড়াই গড়ে তুলবে ? তাদেরই শেখানো দলীয় সন্ত্রাস যখন তৃণমূল তাদের ওপরই কায়েম করেছে, তখন নিজেদের কর্মীদের পাশে গিয়ে পর্যন্ত দাঁড়াবার দম নেই ‘নব-উদারবাদী বামেদের’! আর পারবেই বা কী করে? বিগত ৩৪ বছরের শাসনে পার্টির নেতা থেকে ক্যাডারবাহিনীর একটা সিংহভাগ অংশ হয়ে উঠেছে সম্পূর্ণ আদর্শহীন, স্বার্থপর, লোভী, অলস আর ভীরু। তাদের পক্ষে কী আর লাঠি-গুলির সামনে গিয়ে দাঁড়ানো সম্ভব? এসব নিয়ে কোনো কার্যকরী আত্মসমালোচনা (যা এমনকী অনেক বুর্জোয়া পার্টিও করে থাকে) তো তারা করেই নি, উল্টে তারাপীঠে পুজো দেওয়া, পাড়ায় পাড়ায় পুজোর কর্মকর্তা হওয়া, ভোটভিক্ষায় ধর্মীয় মোড়ক নিয়ে কখনো বিজেপির তালে তাল দিয়ে, তারা হিন্দু সাম্প্রদায়িকতাকে প্রশ্রয় দিয়ে হিন্দু ভোট পাবার অক্ষম প্রচেষ্টায় মাতছে, কখনো বা ডুবন্ত কংগ্রেসের হাত ধরে বাঁচতে চাইছে, এমন কী ক্ষমতালোভী ছোট ছোট বাম দলগুলোকেও নানাভাবে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করছে। এসব কিছুর পরেও তাদের মধ্যে কেউ যদি ভাবেন যে নতুন করে আদর্শবাদী বামপন্থাকে ফিরিয়ে আনতে হবে, মনে করেন যে নয়া-উদারবাদের বিরুদ্ধে কার্যকরী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হলে প্রকৃত বামপন্থী শক্তির সংহত হওয়া-টা আজকের সময়ের চাহিদা—তবে তাদের প্রথম কর্তব্য হওয়া উচিত অবিলম্বে এই ‘নব-উদারবাদী’ সিপিআই(এম) ছেড়ে বেরিয়ে আসা। সংবাদে প্রকাশ, পশ্চিমবঙ্গে বুদ্ধদেবদের ‘নব-উদারবাদী লাইন’ অর্থাৎ কংগ্রেসের সঙ্গে যাওয়ার লাইন নাকি সংখ্যাগুরু! বৃহত্তর বামঐক্যের লাইন নাকি এখানে সংখ্যালঘু! যেটা বোঝা প্রয়োজন, সিপিএম-এর অভ্যন্তরের এই সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু বিতর্কের ‘গল্প’টি কখনোই সংসদীয় ক্ষমতার ‘আগ্রহ’ থেকে বেরোতে পারে নি। আজ তো ওদের পরিস্থিতি বড়ই খারাপ। এখন তো আর এসব কিছু ভাবার মতো অবস্থাতেই ওরা নেই। তাই এবারের পার্টি কংগ্রেস থেকে তথাকথিত ‘বৃহত্তর বাম ঐক্যের লাইন’ আর ‘কংগ্রেসসহ ধর্মনিরপেক্ষ-গণতান্ত্রিক শক্তির সঙ্গে যাওয়ার লাইন’ গলা জড়াজড়ি করেই বেরোবে-একথা বলাই বাহুল্য।
বাংলার গণ আন্দোলনের নিজস্বতাশক্তি ও সীমাবদ্ধতা
লিঙ্গ-সাম্যের জন্য আন্দোলন বা নারীর প্রতি বৈষম্যের বিরুদ্ধে ও তাদের অধিকারের দাবিতে নারীদের স্বাধীন-স্বতন্ত্র চরিত্রের আন্দোলন গড়ে তোলার উদ্যোগ কোনোদিনই বাংলার বাম আন্দোলনে জায়গা পায় নি। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ থেকেই বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী নারীদের কন্ঠস্বর বাংলার নানান প্রান্তে ধ্বনিত হতে থাকে। কেউ কেউ নারীর অধিকার নিয়ে সরাসরি বক্তব্য উপস্থিত করেন, অনেকে স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নিতে গিয়ে পুরুষ-কেন্দ্রিক সাংগঠনিক নীতির বিরুদ্ধে জোরালো বক্তব্য উপস্থিত করেন। কিন্তু নারী নেত্রীদের এই যুক্তিপূর্ণ ও ধারালো বক্তব্য যে পরবর্তীকালের বাম আন্দোলনে বিশেষ কোনো প্রভাব তৈরি করতে পেরেছিল—তা বলা চলে না। কমিউনিস্ট সংগঠনগুলির ভেতরে নারীকর্মীদের মানোন্নয়নে বিশেষ জোর ও অগ্রগতি, বা গণসংগঠনগুলিতে নারীকর্মীদের নেতৃত্বের স্তরে উঠে আসা, বামকর্মীদের পরিবারগুলিতে উন্নত লিঙ্গ-সাম্যের অনুশীলন বা সমাজের নানা ক্ষেত্রে ও স্তরে লিঙ্গ-সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ–এগুলির কোনোটির ক্ষেত্রেই বাংলার বাম আন্দোলন লিঙ্গ-সচেতনতার গড়পড়তা মানটিও পেরোতে পারেনি। কোন সমাজেই প্রগতির ঝান্ডা যে শুধু পুরুষরা বয়ে নিয়ে যেতে পারে না—এই সরল সত্যটি অনুধাবন করতে, যে কোন কারণেই হোক, বাংলার সমস্ত ধরনের বাম ও বিপ্লবী নেতৃত্ব ব্যর্থ হয়েছেন। এর প্রধান ভিত অবশ্যই অতীতের আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের নারীপ্রশ্নে মতাদর্শগত দুর্বলতা ও ক্রমাগত সময়ের থেকে পিছিয়ে পড়ার মধ্যে রয়েছে। কিন্তু বিগত ৬০-৭০ বছরে সারা পৃথিবীতে লিঙ্গ-সাম্যের প্রশ্নটি যেভাবে প্রগতিশীলতার এক প্রাথমিক শর্ত হয়ে উঠে এসেছে, তার প্রতি যথাযথ মনোযোগ ও গুরুত্ব দেওয়ার অক্ষমতা বাংলার বাম আন্দোনের নিজস্ব সমস্যা হিসেবেও উপস্থিত রয়েছে।
১৯৮০-র দশকে দার্জিলিং জেলায় গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে জাতিসত্তার আন্দোলন নতুন করে এরাজ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনের ধারা হিসেবে উপস্থিত হয়। ঝাড়খন্ড আন্দোলনও সমসাময়িক সময়ে বাংলায় কিছু প্রভাব তৈরী করেছিল। পরবর্তীতে উত্তরবঙ্গের কামতাপুরী-সহ আরো অন্যান্য নিপীড়িত জাতিসত্তার লড়াই নানাভাবে এরাজ্যে উপস্থিত হয়েছে। কিন্তু এই লড়াইগুলি রাজ্যের গণ-আন্দোলনের অন্যতম ধারা হয়ে উঠতে পারে নি। এটা বাংলায় বাম আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতাকেই সামনে নিয়ে আসে। সিপিআই-সিপিআই(এম)-এর মতো সংশোধনবাদী দলগুলি জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের পক্ষে বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে শুরু করেছে অনেক আগে থেকেই—যখন থেকে তারা বামপন্থার মূল কর্মকাণ্ডকে সংসদীয় রাজনীতির অক্ষে নিয়ে এসে ফেলেছে। অন্যদিকে কমিউনিস্ট বিপ্লবী শক্তিগুলি, সাধারণভাবে, জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রশ্নে সমাজে সঠিক অবস্থান উপস্থিত করলেও কাশ্মীর, গোর্খাল্যান্ড, ঝাড়খন্ড বা অন্য কোনো রাজ্যের জাতিসত্তার অধিকারের লড়াইগুলির ক্ষেত্রে বাংলার সাধারণ জনগণের মধ্যে কোনো সমর্থনমূলক অবস্থান গড়ে ওঠে নি। জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রশ্নটি যে আন্তর্জাতিকভাবেই কমিউনিস্টদের একটি সর্বজনগ্রাহ্য অনুসিদ্ধান্ত, মার্ক্সবাদী পাঠের এই অ আ ক খ–টি আশির দশকেই বাংলার বাম-মনোভাবাপন্ন মানুষের চেতনা থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছিল। এতেই বোঝা যায় বাংলার ‘বামমার্গীতা’ কত অগভীর আর ঠুনকো – কত আগে থেকেই তা রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েছিল!
বাংলার গণআন্দোলনের গত এক দশক : নতুন কিছুর পদধ্বনি?
বাংলার গণ-আন্দোলনের স্তিমিতপ্রায় ঐতিহ্য গত একদশকে আবার নতুনভাবে নতুন রূপে জেগে উঠেছে। সিপিআই(এম) নেতা-কর্মীদের দ্বারা চরমভাবে নিয়ন্ত্রিত রাজ্য গণবন্টন ব্যবস্থার দূর্নীতি-স্বজনপোষণের বিরুদ্ধে ২০০৪ সালে রাজ্যের গ্রামীণ গরীব জনগণের মধ্যে যে স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছিল এবং বিস্তৃতিলাভ করছিল, তা বাংলার গত এক দশকের গণআন্দোলনের বিকাশে খুব-ই গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখে গেছে। এই আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল, প্রায় ৩০ বছর ধরে চলা সিপিআই(এম)-এর প্রায় নিরঙ্কুশ স্বৈরতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে গ্রামবাংলার প্রান্তিক শ্রমজীবীদের এক স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহ। এই লড়াইয়ে একজন শহীদ হন পুলিশী আক্রমণে। ‘বাম’জমানায় বর্ধমান, বীরভুম, নদীয়া, মুর্শিদাবাদের বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে রেশন ডিলার-পুলিশ-সিপিএম নেতাদের মিলিত পরিচালনায় যে দূর্নীতি–স্বজনপোষণের ঘুঘুর বাসা তৈরি হয়েছিল, তার বিরুদ্ধে বাংলার গ্রামীণ মেহনতীরা প্রথম বড়সড় ধাক্কা দেন রেশন বিদ্রোহে। কিন্তু এই আন্দোলন পরিচালনায় কোনোধরনের সংগঠিত রাজনৈতিক উদ্যোগ অনুপস্থিত ছিল। অচিরেই এই স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ পার্টি ও প্রশাসনের দমনের মুখে পড়ে স্তব্ধ হয়ে যায় বটে, কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য রেখে যায় গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
এরপর ঘটে রিজওয়ানুর কান্ড। একটি সাধারণ নিম্নবিত্ত ঘরের মুসলিম ছেলের সঙ্গে হিন্দু শিল্পপতির মেয়ের প্রেম-বিবাহকে কেন্দ্র করে পুলিশী হস্তক্ষেপের ফলে রিজওয়ানুর আত্মহত্যা করেন। ‘ইনসাফ’-এর আওয়াজ তুলে, পুলিশী হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে জনমানসে যে স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ সেদিন শহরাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল, তার দুটি দিক ছিল। এক, বাম শাসনে দলতন্ত্র ও পুলিশ প্রশাসনের মাত্রাতিরিক্ত হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে জনমানসে ক্রমশ ক্ষোভ সঞ্চারিত হচ্ছিল। তার এক স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল রিজওয়ানুর কান্ডে। দ্বিতীয়ত, পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মনোজগতে যে দীর্ঘ বঞ্চনার অনুভূতি জমা হয়েছিল, সেই ক্ষোভেরও এক জোরালো বহিঃপ্রকাশ ঘটে এই স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদে। পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের মধ্যে পুলিশী বাড়াবাড়ি ও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতাদের উচ্চবিত্ত ক্ষমতাশালীদের প্রতি পক্ষপাতিত্বের বিরুদ্ধে তীব্র জনমত প্রকাশিত হয়।
এই দুটি ঘটনার পরম্পরায় আমরা সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম-লালগড়ের লড়াইয়ের দিকে দৃষ্টি দিতে পারি। ‘নব-উদারবাদী’ সিপিআই(এম) সপ্তমবার বিধানসভায় জেতবার দাম্ভিকতায় শপথগ্রহণের সাথে সাথেই টাটা-র গাড়ি কারখানা বানানোর জন্য জোর করে জমি অধিগ্রহণ করতে নামে। ‘বাম’ সরকারের এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সিঙ্গুরের কৃষক-ক্ষেতমজুরদের স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভ ক্রমশ প্রকাশ পেতে থাকে। প্রাথমিকভাবে এই আন্দোলন কোনো রাজনৈতিক দলের দ্বারা পরিচালিত ছিল না। বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির সমর্থনে গড়ে উঠেছিল লড়াইয়ের মঞ্চ ‘সিঙ্গুর কৃষিজমি রক্ষা কমিটি’। ২০০৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর চেক বিলির প্রতিবাদে কৃষক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভের ওপর বামফ্রন্ট সরকারের পুলিশ যে ভয়াবহ নিপীড়ন নামিয়ে আনে, তা পশ্চিমবঙ্গের জনমানসে এক গভীর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। গণ-আন্দোলনের নিজস্ব প্রক্রিয়ার দিক থেকেও সিঙ্গুর আন্দোলনের এই নির্দিষ্ট দিনটির ঘটনাবলী খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখান থেকেই তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের হস্তক্ষেপ সিঙ্গুরে জমি অধিগ্রহণের বিরোধী আন্দোলনে প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। রাজ্য রাজনীতিতে এই আন্দোলন একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে। ১ ডিসেম্বর,২০০৬ থেকে সিপিএম-এর পরিকল্পনায় রাজ্য প্রশাসন বিশাল পুলিশবাহিনী নিয়ে জোর করে জমি অধিগ্রহণ করতে নামলে প্রতিরোধ শুরু হয়। ২ ডিসেম্বর আন্দোলনকারী কৃষক-ক্ষেতমজুর ও সহযোগীরা এই বলপূর্বক অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করলে সিপিএম-জমানার ভয়াবহ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের অন্যতম রূপটি প্রত্যক্ষ করে রাজ্য তথা দেশের জনগণ। আন্দোলনের বার্তা বিশ্বের বিভিন্নপ্রান্তেও ছড়িয়ে পড়ে। সিঙ্গুরের কৃষক, ক্ষেতমজুরসহ কৃষির ওপর নির্ভরশীল অন্যান্য খেটেখাওয়া মানুষের এক স্বতঃস্ফূর্ত গণ আন্দোলনের চেহারায় সিঙ্গুর আন্দোলন নতুন পর্বে প্রবেশ করে যায়। এমন কী কলকাতায় মমতা ব্যানার্জীর অনশন-আন্দোলন চলাকালীনও আমরা দেখেছি যে লড়াকু কৃষক-ক্ষেতমজুর ও তাদের পরিবারের সদস্যরা গ্রামে গ্রামে নিজেরাই আলাদাভাবে অনশন শুরু করেছিলেন। বারবার ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে, অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে আন্দোলনকে জারি রেখেছিলেন। তাপসী মালিকের খুনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন সিঙ্গুর থানায়। সহস্রাধিক কৃষক প্রবল স্বতঃস্ফূর্ততায় চন্দননগর আদালতে অনিচ্ছুক কৃষকের হলফনামা করতে নিজেরাই উদ্যোগী হয়েছিলেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, ক্রমশই সেই আন্দোলন সিঙ্গুরের লড়াকু কৃষিজীবীদের হাতের বাইরে চলে গেল। নব-উদারবাদী সিপিআই(এম)-এর বল্গাহীন মালিকতোষণ আর সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যে জনমত গড়ে উঠছিল, কর্পোরেট মিডিয়ার পরিকল্পিত প্রচারে এবং তৃনমূল কংগ্রেসের পরিকল্পিত রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে সিঙ্গুর আন্দোলন ক্রমশ মমতা ব্যানার্জীর আন্দোলনে রূপান্তরিত হল। আরো একবার পশ্চিমবঙ্গের গণ-আন্দোলনে ‘রাজনৈতিক রঙ’ তার প্রবল গুরুত্বে উপস্থিত হয়েছিল।
শুরুর দিকে রাজ্যের বিপ্লবী সংগঠনগুলি এই আন্দোলনে যাতায়াত শুরু করলেও সে সময়ে আন্দোলনের গতিপথ নির্ধারণে তাদের তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল না। পরবর্তীতে অনশন আন্দোলন, বেড়াভাঙ্গার লড়াই, দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে অবরোধ প্রভৃতি কর্মসূচীর মধ্যে দিয়ে সিঙ্গুর আন্দোলন গেছে। একাধিক বিপ্লবী সংগঠন (বিশেষত ‘মজদুর ক্রান্তি পরিষদ’ ও ‘সিপিআইএমএল-নিউ ডেমোক্রেসি) এসময়ে এই আন্দোলনে নেতৃত্বের অংশ হিসেবেও ভূমিকা পালন করেছে, কর্মীরা পুলিশি তান্ডবের শিকার হয়েছে। এর সাথে সিপিআই(এম)-এর নেতা ও কর্মীরা সংগঠিত উদ্যোগে আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী তাপসী মালিক-কে খুন করে (সম্ভবত খুন করার আগে তাকে ধর্ষণও করা হয়েছিল) জ্বালিয়ে দেওয়ার ভয়াবহ নৃশংসতাটি ‘মানবিক কায়দায়’ ‘নয়া উদারনীতি’ লাগু করার ভাবমূর্তিকে সারা দেশের বাম-মনোভাবাপন্ন মানুষের কাছে তছনছ করে দেয়। সিঙ্গুর আন্দোলন সর্বত্র ‘মমতার আন্দোলন’ হিসেবেও পরিচয় পেয়েছে এটা যেমন সত্যি, তেমনি এমন একটা পর্বও গেছে যখন সিঙ্গুরের গ্রামে গ্রামে বিপ্লবী কর্মীরাই মাটি কামড়ে পড়ে থেকেছে, কৃষক-ক্ষেতমজুরদের ঘরে ঘরে লড়াইয়ের বার্তা নিয়ে পৌঁছেছে ( তৃণমূল নেতারা তখন পুলিশি নির্যাতনের ভয়ে গ্রামে ঢুকছিলেন না), পুলিশি জুলুমকে মোকাবিলা করেছে। ১৪৪ ধারা অমান্য করা থেকে বেড়া ভেঙ্গে দেওয়ার মতো লড়াইগুলিতে সিঙ্গুরের কৃষক আর যুবক-যুবতীদের সাথে সামনের সারিতে বিপ্লবী কর্মীরাই (সিঙ্গুরের মাটিতে তৃণমূল কংগ্রেসের সাথে বিরোধ প্রকট করে তুলে) পুলিশী অত্যাচারের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছে। অনশন আন্দোলনের পর্বে নয়া-উদারবাদ বিরোধী অবস্থানটিকে শক্তিশালীভাবে উপস্থিত করা গেলেও আন্দোলনটির কোনো সংগ্রামী বাম-চরিত্রায়ন ঘটানো সম্ভব হয় নি। গণ-আন্দোলনের নিরিখে, নব-উদারবাদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সিঙ্গুর আন্দোলন যে সফলতার দিকটিকে সমাজে উপস্থিত করেছিল, বিপ্লবী বা সংগ্রামী বাম চরিত্রের রাজনীতি তার সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পারে নি। এর অন্যতম কারণ হলো আন্দোলনের একটি একক শক্তি হিসেবে বাংলার বিপ্লবী/সংগ্রামী সংগঠনগুলি ঐক্যবদ্ধভাবে এই লড়াইয়ে উপস্থিত হতে পারে নি। সিপিআই(এমএল) লিবারেশন থেকে সিপিআই(মাওবাদী) অথবা এসইউসি থেকে অন্যান্য শক্তি প্রায় সকলেই নিজ নিজ সামর্থ্যে এই আন্দোলনকে নিজেদের প্রভাবাধীন করতে অনেক বেশি সচেষ্ট ছিল। এই সময় কয়েকটি বিপ্লবী সংগঠনগুলি নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া বাড়ানোর প্রচেষ্টা শুরু করলেও সেই অর্জিত বোঝাপড়ার স্তর এতই নিচু ছিল যে বাস্তব আন্দোলনে একটা শক্তিশালী পক্ষ হিসেবে তা নিজেকে উপস্থিত করার উপযোগী হয়ে ওঠে নি। স্বতঃস্ফূর্ত গণ-আন্দোলনের মধ্যে থেকে যে লড়াইয়ের মঞ্চ জন্ম নিয়েছিল, তাকে সর্বোচ্চ রূপে বিকশিত করার দায়িত্ব অবশ্যই বিপ্লবী শক্তির ওপর বর্তায়। সর্বহারাশ্রেণী ছত্রভঙ্গ অবস্থায় থাকলে যে একাজে সর্বোচ্চ সাফল্য আসতে পারে না-একথা ঠিক। কিন্তু সর্বহারাদের এই কর্তব্যটিকে শ্রেণী তথা সমাজের প্রগতিশীল অংশের সামনে তুলে ধরার দায় অগ্রণীরা কখনোই এড়াতে পারে না। প্রাথমিকভাবে বিপ্লবীরা সেই কাজে সঠিকভাবেই মনোনিবেশ করেছিলেন। কিন্তু মমতা ব্যানার্জি তথা তৃণমূল কগ্রেসের সচেতন পরিকল্পনায় লড়াইয়ের মঞ্চটি যখন ক্রমশ ভোটে জেতার হাতিয়ারে পরিণত হতে শুরু করল, তখন বিপ্লবী সংগঠনগুলির তা থেকে বেরিয়ে আসাটা অনিবার্য হয়ে দাঁড়াল। এ সময়ে বিপ্লবী আন্দোলনের সাথে যুক্ত কিছু ব্যক্তি বুর্জোয়া রাজনীতিতে জায়গা করে নিতে এবং মন্ত্রীত্বের লোভে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিলেও তাদের অধঃপতন অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছিল। বিপ্লবী সংগঠনগুলিতে এর কোন প্রভাব পড়েনি।
নন্দীগ্রাম আন্দোলন গণ-আন্দোলনের নানান নিরিখে যে এক বিশেষ উচ্চতা অর্জন করেছিল–একথা বলাই বাহুল্য। সিঙ্গুরের গায়ে গায়েই নয়া-উদারবাদী সিপিআই(এম)-এর পক্ষ থেকে উদ্যোগ ছিল বিদেশী বহুজাতিকের সাথে হাত মিলিয়ে নন্দীগ্রামে কেমিক্যাল-হাব এসইজেড বানানো। এসইজেড-বিরোধী আন্দোলন হিসেবে পরিচিতি লাভ করলেও এই আন্দোলনে কৃষিজমি বা ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধেই প্রাথমিকভাবে জনজাগরণ ঘটেছিল। হিন্দু ও মুসলমান উভয় ধর্মীয় সম্প্রদায়ের এক বড়সংখ্যক কৃষিজীবী জনগণ উচ্ছেদের বিরুদ্ধে প্রবল স্বতঃস্ফূর্ততায় আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। তারা সিপিএম-এর সশস্ত্রবাহিনী ও রাষ্ট্রীয়বাহিনীর মোকাবিলা করতে নামে জনগণের পাল্টা সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলে। ফলত এই সংগ্রাম শুরু থেকেই তীব্র সংঘর্ষ-রক্তাক্ত লড়াই-শহীদের মৃত্যুবরণের মধ্যে দিয়ে এগোতে থাকে। শুরু থেকেই এই আন্দোলনে নানা রাজনৈতিক শক্তি, ধর্মীয় সংখ্যালঘু সংগঠন প্রভৃতির অংশগ্রহণ ছিল। সিঙ্গুর আন্দোলন ঘটে যাওয়ার কারণে আন্দোলনে ‘বহিরাগত’-দের অংশগ্রহণের বিষয়টি সমাজে বহুল পরিমাণে আলোচিত-ও বটে। অনেক দক্ষিণপন্থী দল-সহ বিভিন্ন কমিউনিস্ট বিপ্লবী গোষ্ঠী এবং তৃনমূল কংগ্রেস এই আন্দোলনের সক্রিয় শক্তি ছিল। নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সশস্ত্র গণপ্রতিরোধের বিষয়টি সিপিআই(মাওবাদী) দ্বারা পরিচালিত হয়েছে বলে অনেক মহলেই দাবি করা হয়। সেদিক থেকে মাওবাদীদেরও সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হিসেবে গণ্য করা যায়। এখানে প্রথম যে বিষয়টি আলোচনায় করার দরকার, তা হলো সিঙ্গুর আন্দোলনের প্রত্যক্ষ অনুপ্রেরণা নন্দীগ্রামের মানুষকে লড়াইয়ে অনুপ্রাণিত করেছিল। উচ্ছেদ-বিরোধী আন্দোলন এদেশে বহুবারই হয়েছে। সাধারনভাবে বহুক্ষেত্রে উচ্ছেদ-বিরোধী আন্দোলনের একটা বড় মীমাংসাসূত্র থাকে ক্ষতিপূরণ বা পুনর্বাসন অথবা দুটোই। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম উভয় আন্দোলনেই আন্দোলনকারী জনতা ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নিয়ে দরকষাকষিতে কোনোভাবেই রাজী ছিল না। আন্দোলনের শক্তিগুলির মধ্যে একমাত্র মেধা পাটেকর-সহ কিছু এনজিও এবং পরে সিপিআই(এম)-এর বন্ধু হয়েছেন এমন একটি বাম সংগঠন এস ই জেড বাতিলের দাবি, কৃষকদেরকে জমি ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি ছেড়ে দিয়ে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নিয়ে দরকষাকষি করার পক্ষে লাগাতার সওয়াল করে গেছেন। সিঙ্গুরের আন্দোলনে কৃষকদের জমিকেন্দ্রীক জীবিকার প্রতি মমত্ব এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছিল। কৃষকরা নিজেরাই বারবার বহুফসলি জমিকে রক্ষা করার প্রশ্নটিকে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার সমার্থক করে উপস্থিত করেছেন। এমনকী কৃষক পরিবারের কর্মহীন তরুণ-তরুণীদের কাছেও টাটার কারখানায় চাকরি পাওয়ার কোনো তীব্র তাড়না এই আন্দোলনের বিপরীতে লক্ষ্য করা যায় নি। ফলে টাটা-র কারখানার সপক্ষে জমিদাতাদের নিয়ে সিপিআই(এম)-এর আন্দোলনের পরিকল্পিত প্রচেষ্টাটিও মাঠে মারা যায়। সরকার জোর করে কৃষকদের থেকে বহুফসলি জমি কেড়ে নিচ্ছে–এটাই আন্দোলনের মূল আবেগ হিসেবে একটা স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। অন্যদিকে নন্দীগ্রামে কেমিক্যাল হাব হলে তাদের কী কী উন্নতি হবে—আন্দোলনকারীরা তা নিয়ে আলোচনা করতেই প্রস্তুত ছিলেন না। সিঙ্গুরে বহুফসলি জমির ওপর জীবিকা-কেন্দ্রীক নির্ভরশীলতার বিষয়টি আন্দোলনের বস্তুগত ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছিল, নন্দীগ্রামে তেমন কোনো যুক্তির তুলনায় বিদেশি বহুজাতিকের স্বার্থে সিপিআই(এম)-এর উচ্চ্ছেদ-প্রকল্পের বিরুদ্ধে জনরোষ অনেকটাই উচ্চগ্রামে বাঁধা ছিল। এলাকার বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এই উচ্ছেদকে প্রতিরোধ করার প্রশ্নে এতটাই আবেগতাড়িত ছিলেন যে তা অচিরেই এক স্বতঃস্ফূর্ত সশস্ত্র আন্দোলনের রূপ নিয়েছিল, যাকে নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস বা মাওবাদী বা ধর্মীয় সংখ্যালঘু সংগঠন নিজ নিজ রাজনৈতিক লক্ষ্যপূরণের রাস্তায় এগোবার চেষ্টা করতে থাকে। আন্দোলনের তীব্রতায় যে রাজ্য সরকার এসইজেড প্রকল্প নন্দীগ্রাম থেকে বাতিল করতে বাধ্য হল–তা এরাজ্যের গ্রামীণ গরীব মেহনতীদের মধ্যে গভীর প্রভাব সৃষ্টি করল।
সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রাম আন্দোলনের প্রভাবকে ভোটের বাক্সে গুছিয়ে তুলতে মমতা ব্যাণার্জী সফল হলেও একই সাথে এটাও প্রমাণ হল যে পশ্চিমবঙ্গে বিপ্লবীরা খুব দুর্বল হলেও বাংলার গণ-আন্দোলনে এই শক্তি নিয়েও তারা যে কোনো মুহূর্তে নির্ধারক শক্তি হয়ে উঠতে পারে। দুটি আন্দোলনেই বিপ্লবী শক্তির এমন ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও সামাজিক-রাজনৈতিক প্রভাবের দিক থেকে বিপ্লবীদের তেমন কোন শক্তিবৃদ্ধি হল না। এর কারণ একদিকে যেমন শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলনের অতি-দুর্বল অবস্থা, তেমনি অন্য এক অতি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হল, সিপিআই(এম)-এর প্রতারণাময় ও নব-উদারবাদী ‘বামপন্থা’র কল্যাণে বাম রাজনীতির সাধারণ গ্রহণযোগ্যতা পশ্চিমবাংলার মেহনতী মানুষের কাছে অনেকখানি কমে যাওয়া। পশ্চিমবাংলার বিশেষ পরিস্থিতিতে কীভাবে নতুন করে বিপ্লবী বামপন্থাকে আজকের সময়ের মেহনতি মানুষের একমাত্র বিকল্প হিসেবে হাজির করতে হবে, তাও বিপ্লবী শক্তিগুলির কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি। অন্যদিকে, শ্রমিকশ্রেণি বা ছাত্রসমাজ–যারা বারবার বাংলার প্রগতির পথে যাত্রায় বারবার প্রভাবশালী ভূমিকা রেখেছে, তারা এই গোটা পর্বটিতে ছিলেন নীরব দর্শক। অন্য যে বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ–সিপিআই(এম)-এর ৩৪ বছরের শাসনের দমবন্ধ করা পরিবেশ থেকে মুক্তি পেতে রাজ্যের এক বড় অংশের শিল্পী-বুদ্ধিজীবী এমনকী প্রগতিশীল ও বাম-মনোভাবাপন্ন অগণিত মানুষ এতটাই আকুল হয়ে উঠেছিলেন যে প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বিকাশের তুলনাতেও যে কোনো মূল্যে সিপিআই(এম)-এর অপসারণ তাদের কাছে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। তৃণমূল কংগ্রেসকে শক্তিশালী করতে এমন হাজার হাজার মানুষ সারা রাজ্যে সক্রিয় হয়ে উঠছিল যারা কোনোদিন লালঝাণ্ডা ছাড়া অন্য কোনোদিকে ফিরে তাকান নি। পঞ্চাশোর্ধ বয়সের এমন অনেককে পাওয়া গেছে যারা জীবনে প্রথমবার ভোট দিতে এসেছেন–শুধু সিপিআই(এম)-কে হারাতে হবে বলে। এমনকী প্রতিবাদ-প্রতিরোধের সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত মানুষেরাও ‘দ্রুত স্বস্তি পাওয়ার’ আশায় সিপিআই(এম)-কেও গদিচ্যুত করার প্রশ্নটিকেই একমাত্র প্রশ্ন করে তোলে। সংসদীয় ব্যবস্থার এই ‘খেলাটা’ এতই শক্তিশালী যে শাসকশ্রেণির অর্থবল, মিডিয়া সমর্থন ইত্যাদির দ্বারা পুষ্ট হয়ে শাসকশ্রেণির আশীর্বাদধন্য এক দলের জায়গায় আরেক দল নির্বাচন জিতে শাসনভার সামলাতে আসে। ৫ বছর পর আবারও তাদেরই কেউ ফিরে আসে নতুন প্রতিশ্রুতির সাথে ও নতুন মোড়কে। এই খেলায় ‘টান’ এতটাই তীব্র যে একটা প্রতিষ্ঠিত প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিকেও নির্বাচনে জিতিয়ে নিয়ে আসার জন্য তখনকার মতো সর্বশক্তি নিয়োগ করতেও মানুষ পিছপা হয় না। সংসদীয় গণতন্ত্রের এই চক্রটিকে অতিক্রম করে বিপ্লবী দিশায় গণ-আন্দোলন কীভাবে বিকশিত হবে সেটা গোটা দেশেই আজকের বাম-আন্দোলনের এক বড় চ্যালেঞ্জ।
আমরা যদি এই পর্বের তৃতীয় গণজাগরণটিকে নিয়ে আলোচনায় ঢুকি, তা হলে সমসাময়িক বাংলার লড়াই-আন্দোলনের ধরন বা বৈশিষ্ট্যগুলির বৈচিত্র্যকে আরো গভীরতায় অনুধাবন করতে সক্ষম হব। লালগড় আন্দোলন সাধারণভাবে আগের দুটি আন্দোলনের মতো কোনো উচ্ছেদবিরোধী লড়াইয়ের স্বতঃস্ফূর্ততায় জন্ম নেওয়া আন্দোলন নয়। এ আন্দোলনের উৎস হল পুলিশী সন্ত্রাস। আদিবাসী জনতার ভেতর জমতে থাকা বঞ্চনার বিস্ফোরণ ছিল এটা। পুলিশী সন্ত্রাস-বিরোধী জনসাধারণের কমিটির মধ্যে শুরু থেকে মাওবাদীরা থাকতে পারেন, আর ছিল আদিবাসী সমাজের সামাজিক–সাংস্কৃতিক সংগঠন। আরো অন্য কোনো রাজনৈতিক শক্তিও এই লড়াইয়ে সামিল হতে পারে। কিন্তু একটা বড় অঞ্চল জুড়ে আদিবাসী সমাজ ও তাদের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা অন্যান্য গ্রামীণ শ্রমজীবী জনতা পুলিশী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যে স্বতঃস্ফূর্ততায় ফেটে পড়লেন, তার তুলনা শুধু লালগড় গণজাগরণই হতে পারে। কিন্তু এই আন্দোলনের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে মাওবাদীরা তাদের লাইন অনুশীলন করার মনোগত আকাঙ্ক্ষায় এই গণজাগরণকে যে পর্যন্ত নিয়ে যাবার চেষ্টা করলেন, তা আন্দোলনটির স্বাভাবিক বিকাশের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াল। পরিণামে মাওবাদী পার্টিও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হল। কিন্তু রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস বিরোধী জনজাগরণ, বিশেষত তা যখন একদিকে শ্রেণীচরিত্রের বিচারে গ্রামীণ সর্বহারা-আধা সর্বহারাদের লড়াই, অন্যদিকে আবার দীর্ঘকাল ধরে বঞ্চিত সমাজের পশ্চাদপদ অংশের নিজস্ব লড়াইয়ের রূপ নেয়, তখন তার সম্ভাবনা ও সমস্যা দুটোই কিছু বিশেষত্ব নিয়ে হাজির হয়। সম্ভাবনার দিক থেকে দেখলে, এই আন্দোলন পুলিশী সন্ত্রাস বিরোধিতার গন্ডী থেকে বেরিয়ে রাজ্যের পশ্চাদপদ সামাজিক অংশের সামাজিক-অর্থনৈতিক অধিকার সম্প্রসারণের লড়াইয়ের দিকে যেতে পারত কী না সে প্রশ্নটি তো গভীরভাবে উপস্থিত থেকেই যাচ্ছে। দুটি সম্ভাবনা এই আন্দোলন থেকে বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। এক, যুগ যুগ ধরে বঞ্চিত আদিবাসী বা তপশিলী জাতিভুক্ত সামাজিক পশ্চাদপদ অংশটির প্রকৃত দাবিগুলিকে সামনে নিয়ে আসা, তা নিয়ে আরো বড় ধরনের সামাজিক আলোড়ন সৃষ্টির প্রচেষ্টা নেওয়া, যার বস্তুগত ভিত্তি সমাজে উপস্থিত রয়েছে। দুই, গ্রামীণ শ্রমজীবী জনতার জীবনযন্ত্রণার যে সার্বিক ছবিটি সমাজে উপস্হিত, তার বিরুদ্ধে এক বৃহত্তর লড়াই গড়ে ওঠার সম্ভাবনা। এই আন্দোলনের সমস্যাগুলিকে দেখা প্রয়োজন দু’দিক থেকেই। আদিবাসী সমাজের নিজস্ব আকাঙ্ক্ষা হিসেবে পুলিশের ‘নাকখত’ দেওয়ার দাবিতে এক অনড় প্রকৃতির লড়াই যে ব্যাপ্তিতে অন্যত্রও ছড়িয়ে পড়েছিল, তা এই গণজাগরণটির স্বকীয় বৈশিষ্ট্য ছিল। কিন্তু আদিবাসী সমাজের সামাজিক সংগঠনগুলি যখন এই সম্ভাবনাকে কোনোভাবে একটা সমঝোতা করে মিটিয়ে নিতে নিতে চেয়েছে, তখন মাওবাদীরা এই গণজাগরণকে তাদের রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের অংশ করে নিতে চেয়েছেন। এই আন্দোলনের প্রধান বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে একমাত্র সাবজেক্টিভ শক্তি হিসেবে তাদের উপস্থিতির কারণে এই আন্দোলনের অন্য কোনো অভিমুখ সৃষ্টি হওয়া যথেষ্টই কঠিন ছিল। এই পর্বে আগে উল্লেখিত আন্দোলনগুলি ছাড়াও আরো বেশ কিছু আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে। সেগুলি মাত্রায় এবং গভীরতায় তুলনামূলকভাবে কম শক্তিশালী। কিন্তু এই পর্বের অত্যন্ত মনোযোগ আকর্ষণকারী বিষয় হল, এই গণআন্দোলনগুলির রূপ ও বৈশিষ্ট্যগুলি।
অতীতের কিছু জরুরি পর্যালোচনা
১৯৮০-র দশকে সার-বীজ-বিদ্যুতের দাবিতে, ফসলের ন্যায্য দামের দাবিতে কিছু কিছু বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত বিক্ষোভ আন্দোলন হয়ে থাকলেও তা রাজ্যে কোনো বড়মাপের কৃষক আন্দোলনের চেহারা নেয় নি। ক্ষেতমজুরদের মজুরিবৃদ্ধির আন্দোলন রাজ্যস্তরে কোনো সংগঠিত রূপ পায় নি। ক্রমশ একদিকে প্রায় বিরোধীহীন গ্রামাঞ্চলে পার্টির নিরঙ্কুশ ক্ষমতার কাছে আত্মসমর্পণ অন্যদিকে সরকারী নেতাদের অনুগ্রহলাভ—বাংলার গ্রামীণ মেহনতী জনগণ একটা বড় সময় জুড়ে এতেই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। সাধারণভাবে কৃষক আন্দোলনের যে স্বতঃস্ফূর্ততা এর আগের দশকগুলোতে বাংলার একটা নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ছিল, তা পরিবর্তিত হতে শুরু করল। সরকারী ক্ষমতায় বসার আগে যে কৃষক আন্দোলন ছিল বামপন্থীদের সামাজিক পরিচিতির এক প্রধান জায়গা, সেখানে যে আর্থ–সামাজিক পরিবর্তনগুলি এসে উপস্থিত হল, তাতে বাংলার গ্রামাঞ্চলে শ্রেণীদ্বন্দ্বের রূপটি কোথাও পরিবর্তিত হল কী না তা নিয়ে সরকারী ও একাডেমিক মহলে নানা চর্চা বা গবেষণা হলেও বিপ্লবী বামেদের মধ্যে তা নিয়ে চর্চা হয় নি। অথচ বাস্তবে পুরোনো ধরনের কৃষক আন্দোলনগুলি অবলুপ্ত হতে শুরু করল।
শ্রমিক আন্দোলন হল বাম আন্দোলনের প্রকৃত প্রাণশক্তি। বর্তমান প্রবন্ধটিতে এ রাজ্যের শ্রমিক আন্দোলনের একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনার সুযোগ নেই। কিন্তু শ্রমিক আন্দোলনের গতি, তার বন্ধ্যাত্ব বা বিকাশ বাম আন্দোলনের চরিত্রকে সবচেয়ে মৌলিকভাবে প্রভাবিত করে। বর্তমান আলোচনায় এতক্ষণ পর্যন্ত শ্রমিক আন্দোলন ব্যতীত পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক জীবনের আরও নানান ক্ষেত্রের প্রতিক্রিয়া ও প্রগতির প্রবণতার দ্বান্দ্বিকতাকে আমরা বুঝতে চেয়েছি। ওইসব ক্ষেত্রগুলিতে পরিবর্তনের ধারাটি অবশ্যই শ্রমিক আন্দোলনের বিকাশের দ্বারা জোরালোভাবে প্রভাবিত হয়। কিন্তু এই পরিবর্তনগুলিও যে শ্রমিক আন্দোলনকে একটা দূর পর্যন্ত প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে তা আমরা প্রায়শই ভুলে যাই। শ্রমের সাথে পুঁজির দ্বন্দ্ব অনিবার্যভাবে যে সংঘাত, প্রতিবাদ বা বিদ্রোহের জন্ম দেয়, তা কোনো একটি দেশে বা সমাজে কীভাবে প্রকাশিত হবে, বিকশিত হবে বা শুকিয়ে যাবে তা সমাজটির গণতান্ত্রিকতার মাত্রা ও প্রকৃতির ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল। আর এই গণতান্ত্রিকতা প্রধানত নির্ধারিত হয় সেই সমাজটির বিকাশের ইতিহাস দিয়ে–ছাত্র-যুবদের লড়াই, বৈষম্যের বিরুদ্ধে নারীর প্রতিবাদ, সামন্তবাদের বিরুদ্ধে কৃষক ও মেহনতি জনতার সংগ্রাম, শ্রমিক আন্দোলন, সাংস্কৃতিক আন্দোলন, শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃতি ও জনসাধারণের ওপর তার প্রভাব, দেশীয় ও বিদেশী পুঁজির হস্তক্ষেপ ও বিকাশ ইত্যাদি আরও অনেক কিছুর দ্বারা। বাংলার বাম আন্দোলনের ইতিহাস তাই শুধুই বাংলার শ্রমিক আন্দোলন বা শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনের ইতিহাস হতে পারে না।
বৃটিশ আমল ও স্বাধীনতা-পরবর্তী শিল্পায়নের ফলে এরাজ্যে নব্য শিল্পশ্রমিকদের যে জমায়েত সৃষ্টি হয়েছিল, তা শ্রমিক আন্দোলনের একটা নিজস্ব ধারাও তৈরি করেছিল। ১৯৬০-এর দশকে পোর্ট ও ডক শ্রমিকদের লড়াই, হিন্দুস্তান মোটর্স, জয় ইঞ্জিনিয়ারিং বা জেসপ-এর লড়াই , ১৯৭০-এর দশকে গেস্টকীনের লড়াই, রেল শ্রমিকদের লড়াই, দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলে হিন্দুস্তান স্টিলের লড়াই, ১৯৮০-দশকে হিন্দুস্তান লিভারের লড়াই, ১৯৯০-এর দশকে ভিক্টোরিয়া-কানোরিয়া সহ জুট শ্রমিকদের লড়াইগুলি রাজ্যের শ্রমিক আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ মাইলস্টোন। পশ্চিমবঙ্গের জুট, কটন, ইঞ্জিনিয়ারিং, কয়লা, পোর্ট ও ডকের শ্রমিকদের লড়াই স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়পর্বে বারবার সামনে এসেছে। রাজ্যের শ্রমিক আন্দোলনগুলির একটা গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল কারখানাভিত্তিক বা শিল্পভিত্তিক অর্থনৈতিক দাবিদাওয়ার লড়াই। কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে ওঠার সময় থেকেই আমাদের দেশে শ্রমিকশ্রেণির রাজনৈতিক লড়াই হিসেবে পার্টির লড়াইকেই দেখে আসা হয়েছে। ভারতীয় বিপ্লবের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে এদেশের শ্রমিকশ্রেণির ভূমিকার কথা তাত্ত্বিকভাবে স্বীকৃত হলেও শ্রমিকশ্রেণির রাজনৈতিক সংগ্রামে পরিচালক হয়ে ওঠার প্রশ্নটি সর্বদাই এখানে অবহেলিত থেকেছে।
১৯৬০-এর দশকের গৌরবোজ্জ্বল সংগ্রামী অতীতের দিকে চোখ ফেরালে আমরা খেয়াল করতে পারি, ঐতিহাসিক শ্রমিক আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ সফলতাগুলো ক্রমশ আটকে পড়েছিল নির্বাচনী সংগ্রামের ঘেরাটোপে। সাধারণভাবে এই ট্রেড ইউনিয়ন সংগ্রামগুলি শ্রমিকদের ইউনিয়ন করার অধিকার, বেতনবৃদ্ধি, ওভারটাইম, বোনাস, দেশের অন্যান্য শ্রমআইন লাগু করার আইনী গন্ডীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এই অধিকারগুলি বহু সময়েই যেহেতু মালিক বা সরকার বা উভয়েই দিতে প্রস্তুত ছিল না, তাই তা আদায়ের জন্য সংগ্রাম করতে হত। বহুক্ষেত্রেই তা জঙ্গী সংগ্রামে পরিণত হত। কিন্তু আমাদের দেশে কৃষক আন্দোলনের অর্থনৈতিক সংগ্রামের সাথে সাথে যেভাবে জমিদখল ও পুনর্বন্টনের শ্লোগান উঠে এসেছিল ‘লাঙ্গল যার জমি তার’ ইত্যাদির মাধ্যমে, শ্রমিক আন্দোলনের সামনে নির্বাচনী সংগ্রাম ছাড়া অন্য কোনো রাজনৈতিক সংগ্রাম বা সামাজিক প্রশ্নে তেমন সুস্পষ্ট শ্রেণীগত সক্রিয়তার প্রশ্ন উপস্থিত হয় নি। ফলে শ্রমিকরা যখন নিজেদের সর্বোচ্চ উদ্যোগ ও সক্রিয়তা দেখিয়েছেন পুঁজিপতিদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে, তখন উপযুক্ত অগ্রণী প্রক্রিয়ার অভাবে তা জঙ্গী ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। নকশালবাড়ি আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে শ্রমিকদের বিপ্লবী কর্তব্য সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে কমরেড চারু মজুমদার অগ্রণী শ্রমিকদের কৃষি বিপ্লবের কর্মসূচী নিয়ে গ্রামের যাবার আহ্বান রেখেছেন। ‘শ্রেণীশত্রু খতমের অভিযানে’ অংশ নিতে বলেছেন। কিন্তু কৃষিবিপ্লবের নেতা হিসেবে, ভারতীয় বিপ্লবের চালিকাশক্তি হিসেবে কীভাবে ভারতের বা পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিকশ্রেণি নিজেকে সংগঠিত করবে বা সমাজে বৈপ্লবিক আলোড়নের প্রক্রিয়া চালাবে তা নিয়ে তত্কালীন সিপিআই(এমএল) নেতৃত্ব কোনো দিকনির্দেশ করেন নি। ব্যক্তিগতভাবে গ্রামে চলে যাওয়া বা শহরে থেকে গেলে সক্রিয় সমর্থকের ভূমিকা পালন করার বেশি শ্রেণি-সচেতন শ্রমিকদের কোন শ্রেণীগত সক্রিয়তার ক্ষেত্র ছিল না।
ষাট ও সত্তরের দশক জুড়ে কমিউনিস্ট আন্দোলনের যে দ্বিমুখী প্রবণতা আমরা দেখতে পাই, তার প্রতিফলন তীব্রভাবে পড়েছে শ্রমিক আন্দোলনে। একপক্ষ তাকে বানাতে চেয়েছে বছর বছর নির্বাচনী বৈতরণী পার করা আর ‘নয়নের মণি’ সরকারকে অন্ধের মতো রক্ষা করে যাওয়ার গোঁড়া সমর্থক। অন্যপক্ষ তার শ্রেণীগত রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলার প্রচেষ্টা ও তার শ্রেণীগত ভূমিকার জায়গায় ব্যক্তিগতভাবে শ্রমিককে ‘খতম অভিযানে’ সামিল করেছে। এমনও নয় যে এই ‘খতম অভিযানে’র বেঠিক লাইনটি তারা শ্রেণীর একটি সুসংগঠিত অংশ হিসেবে প্রয়োগ করতে যাচ্ছে। সংশোধনবাদ-বিরোধী মেরুকরণের ফলশ্রুতিতে কারখানায় কারখানায় শ্রমিকদের মধ্যে যে স্বাভাবিক মেরুকরণ শুরু হয়েছিল, ‘খতম অভিযান’ তাকে শ্রেণীগত সক্রিয়তায় রূপ দেওয়ার সমস্ত সম্ভাবনাকে সচেতনভাবে খারিজ করে দিয়েছিল। কারণ রাজনৈতিক লাইনটি-ই ছিল এই যে কারখানার স্তরে শ্রমিকদের সংগঠিত করার বা সক্রিয় করার যে কোন প্রয়াসই সংশোধনবাদের জন্ম দিতে বাধ্য। বৈপ্লবিক সংগ্রামে শ্রমিকশ্রেণির যোগদানের সমস্ত রাস্তা কার্যত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।
১৯৭৭-পরবর্তী বাংলায় বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় থাকার ফলে শ্রমিক আন্দোলনের রসায়নে বেশ কিছু পরিবর্তন ঘটল। কারখানায় কারখানায় সিটুর ক্ষমতাকে নতুন জমানায় প্রতিষ্ঠা করার জন্য মালিকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করার প্রয়োজন ছিল। শ্রমিকদের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে নিজেদের ক্ষমতাকে নিশ্চিত করার জন্য শ্রমিকদের সমস্ত উদ্যোগকে শ্রমিক নেতা ও পার্টির হাতে কুক্ষিগত করার প্রচেষ্টা করা হল। সময়ের সাথে সাথে পরিস্থিতি বদলাল । এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হল যে লড়াকু শ্রমিকের কাছে তিনটি ভীতি একসাথে উপস্থিত হল। কারখানায় মালিকপক্ষ, ইউনিয়ন নেতা(প্রধানত সিটু) আর পুলিশ প্রশাসনের ভয়। এলাকায় গেলে সিপিআই(এম) লোকাল কমিটির নজরদারি। আর উল্টোদিকে মালিকরা দেখল শ্রমিক নেতাদের হাতে উত্পাদনের দায়দায়িত্ব ছেড়ে দিলে লাভের পরিমাণ বাড়তে পারে। পার্টি নেতারা মালিকদের আশ্বস্ত করল। মালিকরাও দেখল যে স্বতঃস্ফূর্ত শ্রমিক-বিক্ষোভ দমন করার নতুন পন্থাটি তাদের পক্ষে লাভজনক। শ্রমিকরা বড় সংখ্যায় লড়াইয়ের রাস্তা থেকে পিছু হঠতে শুরু করল। আপস, শ্রমিকদের ন্যায্যপাওনা থেকে বঞ্চিত করা, নেতাদের সহায়তায় কাজে ফাঁকি দেওয়া থেকে শুরু করে নানাধরনের বেআইনী সুবিধাঅর্জন প্রলুব্ধ করে তুলল শ্রমিকদের মধ্যেকার ক্ষুদ্র একটা অংশকে। সাধারণ শ্রমিকদের বেশিরভাগ অংশটার মধ্যে নিষ্ক্রিয়তা এবং মেনে চলা-মানিয়ে চলার অভ্যস্ততা শুরু হল। এই নতুন ব্যবস্থাপনা একদশক ধরে নিজেকে ক্রমশ শক্তিশালী করে তুলেছে। সমস্ত শ্রেণীদ্বন্দ্বকে সিপিআ(এম) পরিচালিত পার্টিতন্ত্র দিয়ে লাগাতার নিস্তেজ করে দেওয়ার কাজ করা হয়েছে। কিন্তু শেষরক্ষা করতে পারে নি আর তা সম্ভবও ছিল না। গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় ভারতের অর্থনীতিতে নয়া উদারীকরণের দৌড় এমনভাবেই শুরু হল যে পুরোনো সমস্ত পন্থা-রেওয়াজ-অভ্যাস এবং কৌশল ও চালাকি—সবকিছুই প্রবল ঝড়ের মুখে পড়ে কুটোর মতো উড়ে গেল। সরকারী ক্ষমতার শিখরে বসে, মালিকদের চাপে রেখে আর শ্রমিকদের ফুটোকড়ি পাইয়ে দিয়ে, শ্রমিক আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ করার দিন শেষ হতে শুরু করল।
সিপিআই(এম)-এর বৃত্তের বাইরে শ্রমিক আন্দোলনের স্বাধীন উদ্যোগ বিকাশের নানা প্রচেষ্টা ১৯৭৭-পরবর্তী পর্বে এরাজ্যে নানান মাত্রায় চলেছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের সামগ্রিক রাজনৈতিক বাতাবরণটি ছিল শ্রমিক আন্দোলন বিকাশের পক্ষে সম্পূর্ণ প্রতিকূল। পশ্চিমবঙ্গ তার আগের তিন-চার দশকে দেশের শ্রমিক আন্দোলনের প্রধান প্রাণকেন্দ্র ছিল। কিন্তু আশির দশকের মাঝামাঝি চিত্রটা ছিল অনেকটা এরকম–কারখানায় কারখানায় ২ থেকে ৩০টি ইউনিয়ন শ্রমিকদের কাছে কোনো বিস্ময়কর ব্যাপার ছিল না। শ্রমিকরা দু’দশক জুড়ে নিজের কারখানায় বা আশপাশের কারখানায় দেখেছে কী করে লড়াকু শ্রমিক নেতা মালিকের দালালে পরিণত হয়। পুলিশ এবং ট্রেড ইউনিয়ন নেতা, উভয়েই সমাজের সবচেয়ে বড় ঘুষখোর হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল ক্রমশ। আর মালিকপক্ষও ক্রমশ দক্ষ হয়ে উঠেছিল লড়াকু নেতাদের ‘বশে’ আনতে। তাই শ্রমিকনেতাদের ওপর ভরসা বা তাদের থেকে আশা-আকাঙ্ক্ষা, উভয়ই, কমে গেছিল অনেকটা। শ্রমিকরা যখন শ্রমিকরাজ বা কমিউনিস্ট নীতি-নৈতিকতা বা উন্নত জীবনশৈলীর কথা শুনত (তা যেই প্রচার করুক না কেন), তাদের কাছে নিজেদের পারিবারিক অভিজ্ঞতা বা বয়স্কদের থেকে জানতে পারা তিন দশকের আত্মসমর্পণ-আপস-প্রতারণার ইতিহাস প্রবলভাবে ফিরে ফিরে আসত। পুঁজিপতিদের শোষণ–জুলুমের বিরুদ্ধে সংগঠিত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করলেও লড়াইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় স্বতঃস্ফূর্ত আবেগগত দিকটির ওপর এইসব প্রতিকূল উপাদানগুলি সর্বদা জোরালো বিপরীত প্রভাব জারি রাখত। দেশের বাম আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্র বাংলায় শ্রমিক আন্দোলনের বিকাশের সম্পূর্ণ প্রতিকূল এই পরিস্থিতিটি বিচারের মধ্যে না রাখলে ৮০-র দশক বা তার পরবর্তীতে হওয়া এ রাজ্যের শ্রমিক আন্দোলনকে সঠিকভাবে বোঝা সম্ভব নয়। এর সঙ্গে অবশ্যই রয়েছে দুনিয়া জুড়ে বিপ্লবী আন্দোলন ও শ্রমিক আন্দোলনের হার ও ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়ার সর্বগ্রাসী প্রভাব।
পশ্চিমবঙ্গে কর্মরত বিভিন্ন কমিউনিস্ট বিপ্লবী শক্তি এমনই এক পরিস্থিতির মধ্যে শ্রমিকদের সংগঠিত করার কঠিন কাজটিতে নিজেদের নিয়োজিত করেছিল। ৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে গার্ডেনরীচে হিন্দুস্তান লিভারের ঠিকা শ্রমিকদের বীরত্বপূর্ণ লড়াই, পাহাড়পুর কুলিং টাওয়ারের শ্রমিকদের লড়াই, নব্বইয়ের গোড়ায় ভিক্টোরিয়া জুট-কানোরিয়া জুট মিলের লড়াই, শেষের দিকে হিন্দুস্তান মোটর্স-এর লড়াই-সহ অসংখ্য ছোট-বড় শ্রমিক আন্দোলন বিগত তিন দশকে এরাজ্যে ঘটেছে। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগবে যে কমিউনিস্ট বিপ্লবী শিবিরের শক্তিগুলির ভূমিকা স্বাধীন শ্রমিক আন্দোলনকে কোন দিশায় আন্দোলিত করতে চাইল আর তার ফলাফলই বা কী দাঁড়াল?
১৯৮০-এর দশকে পশ্চিমবঙ্গের কারখানায় কারখানায় বা শিল্পে স্থায়ী শ্রমিকদের জন্য বেতনবৃদ্ধি, স্থায়িত্ব, বেশি বোনাস, ওভারটাইম ইত্যাদি বিষয়ে সিটু এবং সরকারকে দিয়ে সিপিআই(এম) মালিকদের সঙ্গে যে দরকষাকষির প্রক্রিয়া শুরু করে, সাধারণভাবে এ রাজ্যের শ্রমিকরা তাকে বিরোধিতা করেন নি। সুবিধাপ্রাপ্ত একটা ক্ষুদ্র অংশের অতি-সক্রিয়তা ও বেশিরভাগ শ্রমিকের আপাত-নিষ্ক্রিয় মনোভাব শ্রমিক আন্দোলনের সুবিধাবাদী ধারাটিকে ক্রমশ প্রকট ও শক্তিশালী করে তুলেছিল। এই পরিস্থিতিতে হিন্দুস্তান লিভারের ঠিকা শ্রমিকদের সিটুর পতাকা ছেড়ে বেরিয়ে এসে স্বাধীন লড়াই গড়ে তোলার ঘটনাটি গভীর মনোযোগের দাবি করে। শ্রমিকদের স্বাধীন স্বতন্ত্র ধারায় সংগঠিত হতে হবে-এই বক্তব্যে কেন্দ্রীভূত হয়ে একটি কমিউনিস্ট বিপ্লবী শক্তি পশ্চিমবঙ্গে শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যে কাজকে সংহত করে। সে কাজের ফসল হিসেবে কিছু কিছু কারখানার শ্রমিকরা জমায়েত হতে শুরু করেন। আবার হিন্দুস্তান লিভারের ঠিকা শ্রমিকদের অসম লড়াইয়ের সাফল্য গোটা শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যে এমন কোনো গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারে নি যাতে শ্রমিক আন্দোলনের সরকারসর্বস্ব আপসকামী ধারাটির বিপরীতে শ্রেণীসংগ্রাম বিকাশের লক্ষ্যে একটি স্বাধীন-স্বতন্ত্র ধারার প্রতি তাদের স্বাভাবিক আকর্ষণ জন্মায়। শ্রমিকদের মধ্যে লড়াই করার স্বতঃস্ফূর্ততা সেই উচ্চতায় ওঠেনি কখনই। তারফলে বহুক্ষেত্রেই স্বাধীনভাবে সংগঠিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও সিপিআই(এম) অচিরেই তাকে বাগে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে পার্টিভিত্তিক ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের যে গভীর প্রভাব দেখতে পাওয়া যায়, তা ভারতের যে কোনো রাজ্যের থেকেই যথেষ্ট স্বতন্ত্র। এটাকে সিপিআই(এম)-এর অবদান হিসেবে দেখাটা অতি-সরলীকরণ হয়ে যাবে। যে কমিউনিস্ট বিপ্লবী গোষ্ঠীটি স্বাধীন স্বতন্ত্র শ্রমিক আন্দোলনের বিকাশের প্রক্রিয়ার ওপর সঠিকভাবে জোর রাখছিলেন, তারা সেই সময় স্বাধীন রেড ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে তোলার আন্তর্জাতিক অবস্থানটির সমর্থক ছিলেন। পার্টি বা কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তাকে স্বীকৃতি দিলেও তার বস্তুগত পরিস্থিতি হাজির নেই বলেই তাদের বোঝাপড়া ছিল। এই বোঝাপড়াটি মূলগতভাবে সঠিক ছিল বলি আমরা মনে করি। কিন্তু যে বিষয়টি আলোচনার বাইরে থেকে গিয়েছিল, তা হল এই পর্যায়ে সমাজে শ্রমিকশ্রেণির রাজনৈতিক আলোড়নের প্রক্রিয়াটি কেমনভাবে চলবে? শ্রমিকশ্রেণি সমাজে তার শ্রেণীগত আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করার কাজটি কীভাবে করবে? সেটা কি শুধুমাত্র কমিউনিস্ট বিপ্লবী স্তরের আজকের অবস্থান দিয়ে মিটিয়ে ফেলা যাবে ? না কী এই অন্তর্বর্তীকালীন মুহূর্তে এমন একটি সমান্তরাল রাজনৈতিক প্রক্রিয়া অগ্রণী অংশের পক্ষ থেকে উপস্থিত করা প্রয়োজন যাতে অন্তত শ্রেণীর আগুয়ান বাহিনীটি একটি বিকল্প রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে স্বাধীনভাবে অনুধাবন করে উঠতে পারে। একটা পরিমানে নিজেদের জীবনে এবং অন্য লড়াকু শ্রমিকদের কাছে এক বিকল্প হিসেবে উপস্থিত করতে পারে। নারীর প্রতি বৈষম্যের প্রশ্নে, জাতপাতের বৈষম্যের প্রশ্নে বা জাতিসত্ত্বার আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে কমিউনিস্ট পার্টির নিজস্ব প্রচার-কর্মসূচীর বাইরে শ্রমিকরা এক ক্ষুদ্র শক্তি হিসেবেও তাদের মতামতকে সমাজে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছেন – এমন উদ্যোগ নেই বললেই চলে। শ্রমিকদের মধ্যে কাজ বলতে মূলত শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন দাবীদাওয়ার লড়াইকে দেখা-বোঝা-সহায়তা বা নেতৃত্ব দেওয়া হিসেবে দেখা হয়েছে। অন্যান্য মেহনতি শ্রেণিগুলির প্রতিবাদ, বিদ্রোহ বা লড়াইয়ের সাথে একাত্মতার প্রশ্নটি বরাবরই উপেক্ষিত থেকে গেছে। কমিউনিস্ট বিপ্লবীরাও শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন লড়াইকে অনেকবেশি গুরুত্ব দিতে গিয়ে আশপাশের বাতাবরণটির গণতান্ত্রিকতার বিকাশের প্রশ্নটিকে, তাকে সর্বহারার অনুকূলে প্রভাবিত করার প্রশ্নটিতে শুধু শ্রমিকদের একান্ত নিজস্ব দাবী-দাওয়ার আন্দোলনের তীব্রতার অভিঘাত সৃষ্টির দ্বারাই ঘটার ভাবনার ওপর মাত্রাতিরিক্ত জোর দিয়ে ফেলেছেন। জনতার অন্যান্য নিপীড়িত অংশের আন্দোলনের সাথে লড়াকু শ্রমিকদের আদানপ্রদান ও একাত্ম হওয়ার প্রশ্নটিকে মারাত্মকভাবে উপেক্ষা করেছেন।
পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিক আন্দোলনের সংগ্রামী ধারায় গার্ডেনরীচ শিপবিল্ডার্স, হিন্দুস্তান লিভার, হিন্দুস্তান ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন-এর ট্রেড ইউনিয়ন নির্বাচনে জয়লাভ নিঃসন্দেহেই এক অগগ্রতি বলে বিবেচিত হবে। সাথে সাথে এই সময়ের শ্রমিক আন্দোলন কেন একটা পর্যায়ের পর আরও বিকশিত হতে পারল না তা নিশ্চয়ই গভীর বিশ্লেষণ দাবী করে। হাওড়া জেলায় কানোরিয়া, বাউড়িয়া, লাডলো, ন্যাশানাল জুটমিল, ফুলেশ্বর কটন মিল বা হুগলী জেলায় হিন্দুস্তান মোটর্স-এর আন্দোলন একটা দূর পর্যন্ত এগোনোর পরে কেন ও কোথায় আটকে পড়ল–একটা সময়ের পর কী কারণে অন্যান্য নতুন ক্ষেত্রে শ্রমিকদের নতুন ইউনিয়ন গঠন বা লড়াই করার প্রবণতা কমতে থাকল তার বিস্তারিত বিশ্লেষণ হওয়া দরকার। ১৯৭৭-পরবর্তী পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিক আন্দোলনে যে স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশের সম্ভাবনা সৃষ্টি হচ্ছিল, তা পরবর্তী সময়ে আর কেন বিকশিত হতে পারল না– আজকের বাম আন্দোলনের সঙ্কটের স্বরূপ নির্ণয়ে তা এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সারা দেশেই ‘নব-উদারবাদ’-এর যুগে, ১৯৯০-এর পরবর্তী সময়ে, অসংগঠিত ক্ষেত্রে শ্রমিকদের আনুপাতিক হার (সংগঠিত ক্ষেত্রের তুলনায়) ব্যাপকভাবে বাড়তে লাগল। এর বড় অংশটাই একচেটিয়া পুঁজির প্রত্যক্ষ শোষণের বাইরে। কিন্তু এই শ্রমিকদের জীবনের দুর্দশা দেশে কর্মে-নিযুক্ত মানুষদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। এই দুর্দশার কারণ এ দেশে দেশি-বিদেশি একচেটিয়া পুঁজির লুঠ ও শোষণ। দেশের এই বিশালসংখ্যক শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়নে সংগঠিত করা এবং রাজনৈতিক আন্দোলনের শরিক করে তোলা হল এই পর্বে এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কর্তব্য। অথচ, সারা দেশের মতো পশ্চিমবঙ্গেও এদের সংগঠিত করার কাজ করেন সাম্রাজ্যবাদীদের আর্থিক-মদতপুষ্ট এনজিওগুলি এবং প্রতিষ্ঠিত কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলি। এ কাজে বিপ্লবী বামেদের উপস্থিতি নামমাত্র। এই অংশের মানুষদের সাথে সমস্তধরনের বামেদের সম্পর্কই বিগত দুই দশকে ক্রমশ দুর্বল হয়েছে।
সমাজে যখন বিপ্লবী পরিস্থিতি থাকে না, তখন শ্রমিকশ্রেণিকে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত করার প্রক্রিয়াটি ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের বাইরে কীভাবে হবে তা নিয়ে ৮০ বা ৯০-এর দশকেও কমিউনিস্ট বিপ্লবী নেতৃত্বের বোঝাপড়া সুস্পষ্টভাবে উপস্থিত হয় নি। বিশেষ করে কমিউনিস্ট পার্টিকে যখন মূলত গোপন সাংগঠনিক কাঠামোয় কাজ করতে হয়, তখন এমনকি পার্টির সাথে যুক্ত হয়ে গেলেও শ্রমিকরা তাদের প্রকাশ্য শ্রেণীগত রাজনৈতিক সক্রিয়তা কীভাবে প্রকাশ করবে সে ব্যাপারে কোন সুস্পষ্ট দিশা উপস্থিত ছিল না।
১৯৯৩ সালের কানোরিয়া আন্দোলন শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলনের কোনো সুনির্দিষ্ট সূত্রায়নের ওপর দাঁড়িয়ে শুরু না হলেও যে কমিউনিস্ট বিপ্লবী শক্তিটি এই আন্দোলনে নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেছেন, তারা শ্রমিকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও লড়াই করার আকাঙ্ক্ষাকে সঠিকভাবেই চিন্হিত করেছিলেন। এই আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল আক্রান্ত শ্রমিক, তার পরিবার ও সংলগ্ন এলাকার শ্রমজীবী মানুষের ঐক্যবদ্ধ শক্তির বহিঃপ্রকাশ। কারখানা সংলগ্ন গ্রামগুলিতে এই আন্দোলনের স্বতঃস্ফূর্ততা এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল যে গ্রামে গ্রামে ‘যৌথ রান্নাঘর’ পরিচালনায় আঞ্চলিক জনগণের অংশগ্রহণ ছিল অভাবিত। এই আন্দোলনে ব্যক্তি নেতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও শ্রমিকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল প্রশ্নাতীত। সমগ্র আন্দোলনে কমিউনিস্ট নেতৃত্বের দক্ষ ভূমিকা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে নির্ধারক লড়াইকে বিস্তৃত করার প্রশ্নে ও আন্দোলনের সাথে একাত্মতা ও অংশগ্রহণের প্রশ্নে শ্রমিকদের চিন্তার স্বকীয়তা, উদ্যোগ ও কার্যকরী ভূমিকা নেওয়া এই আন্দোলনের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। একটি জুট মিলের কাটৌতি-বিরোধী সংগ্রাম যে মাত্রায় ব্যাপ্তিলাভ করেছিল, তার মধ্যে বস্তুগতভাবে শ্রমিকদের মধ্যে স্বাধীনভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর নিজস্ব উপাদান না থাকলে বিকাশের ওই স্তরে পৌঁছনো সম্ভব হত না। কিন্তু এই স্বতঃস্ফূর্ততার অন্তর্বস্তু কি শুধু এক কারখানার শ্রমিকদের কাটৌতি বিরোধিতা? রাজ্যের জুট মিলগুলোতে মালিকদের মধ্যযুগীয় অত্যাচার-নিপীড়ন আর সিপিএম-সহ প্রতিষ্ঠিত নেতাদের দালালির বিরুদ্ধে জুট শ্রমিকদের যে গভীর ক্ষোভ তলে তলে বাসা বাঁধছিল, তা আক্রোশের রূপ নিয়ে ফেটে পড়েছিল ভিক্টোরিয়ায়, আর তার সংগঠিত বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল কানোরিয়া আন্দোলনে। তার তীব্রতা এতটাই যে কারখানা দখল করে পুনরায় উত্পাদন চালু করার মতো উচ্চগ্রামের আহ্বান বড় সংখ্যক শ্রমিককে আকৃষ্ট করেছে। আন্দোলনের প্রথম পর্বে শ্রমিকরা নেতৃত্বের প্রতি সম্পূর্ণ আস্থা রেখেও এই আন্দোলন যে তাদেরই নিজেদের গড়ে তোলা ও নিজেদের পরিচালিত আন্দোলন, একটা দূর পর্যন্ত তা অনুভব করেছিলেন। স্বতঃস্ফুর্ততার এই মাত্রাটি কানোরিয়া আন্দোলনে একটা ঐতিহাসিক মাত্রা সংযোজন করেছিল। যে কোনো একটি গণ-আন্দোলনেই স্বতঃস্ফূর্ততার এই মাত্রাটি উপস্থিত থাকে না। এখানেও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল এই আন্দোলনের সামাজিক-রাজনৈতিক সমর্থনের দিকটি নিয়ে। প্রথম পর্বের তীব্রতা আন্দোলনটির সামাজিক সমর্থনের ভিত গড়ে দিয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক শক্তির প্রশ্নটির মীমাংসা হয় নি। এই ধরনের আন্দোলনগুলির মধ্যে কমিউনিস্ট বিপ্লবী শিবিরের সক্রিয়তার কথা আলোচিত হলেও সেই শক্তিগুলি শ্রমিকশ্রেণির এক শক্তি হিসেবে সংসদীয় অক্ষের ভেতরে বা বাইরে, কোনোক্ষেত্রেই, একটি রাজনৈতিক শক্তির স্বীকৃতি কখনোই অর্জন করতে পারে নি। যে পরিমাণে আন্দোলনের স্বতঃস্ফূর্ততা কমতে শুরু করেছে, সাধারণভাবে এই বিশেষ আন্দোলনগুলি সমাজের বুকে গভীর ছাপ রেখেই ক্রমশ সাধারণে রূপান্তরিত হয়েছে।
বাংলার গণসংগ্রামের আলোকে রাজনৈতিক বিকল্পের খোঁজে…..
১৯৯০ সালে পশ্চিমবঙ্গে ভাড়াবৃদ্ধি ও মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে ১৩ টি সংগ্রামী বাম সংগঠন মিলিতভাবে গণআন্দোলন পরিচালনায় সচেষ্ট হয়। লাগাতারভাবে দীর্ঘস্থায়ী ধরনের আন্দোলনের তুলনায় ভাড়াবৃদ্ধির বিরুদ্ধে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভের ওপর এই আন্দোলনের সামাজিক প্রভাব তৈরী হয়েছিল। বিশাল প্রতিবাদী মিছিলের ওপর জ্যোতি বসু সরকারের গুলিচালনা, মৃত্যু ও সর্বোপরি সিপিআই(এম)-এর ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের বিরুদ্ধে ১৯৯০ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ১৩ পার্টির ডাকা একদিনের বাংলা বনধ অভূতপূর্ব সাফল্য পেয়েছিল। কিন্তু ওই সাফল্যবিন্দু থেকেই আন্দোলনের শুকিয়ে যাওয়া শুরু হল। ১৩ পার্টি রাজ্য-রাজনীতিতে কোনো সংগঠিত শক্তি হিসেবে উপস্থিত হতে পারে নি। বিপ্লবী বামপন্থা সেদিনও কোনো পথনির্দেশকারী ভুমিকা রাখতে পারে নি। তাদের মধ্যে থেকে আন্দোলনের কেন্দ্রশক্তি হিসেবে কোনো স্বাভাবিক নেতৃত্ব সৃষ্টি হয় নি। সংগ্রামী বামপন্থার যে ভাষ্যটিকে ন্যুনতম রূপে হলেও সমাজে উপস্থিত করার বস্তুগত ভিত্তি এসে উপস্থিত হয়েছিল, তাকে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিষয়ীগত যোগ্যতার অভাব-ই প্রকট ছিল। মনে রাখা প্রয়োজন,বাংলার শ্রমিকশ্রেণীর তখনও এক ধরনের নড়াচড়ার মধ্যে ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক পরিসরে তার প্রতিফলন ঘটানোর যে দায় অগ্রণী শক্তির থাকে, তা নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে একটা অক্ষমতা কাজ করেছিল।
২০০৬ সালে সিঙ্গুর, ২০০৭-এ নন্দীগ্রাম, ২০০৯-এ লালগড়–বাংলার গণ-আন্দোলনের ইতিহাসে আবারো এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ হিসেবে উপস্থিত হয়েছিল। এই লড়াইগুলির ব্যাপ্তি, গভীরতা, পরিসর–সবকিছুই পূর্ববর্তী ৩০ বছরের যে কোনো সময়ের তুলনায় গুণগতভাবে আলাদা। কিন্তু এর কোনোটিই রাজনৈতিক পরিসরে শ্রমিকশ্রেণীসহ বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মেহনতী জনগণের মধ্যে প্রচলিত সংসদীয় ব্যবস্থাকে অতিক্রম করে যাওয়ার মতো কোনো উপাদান সৃষ্টি করে নি। ফলে শেষপর্যন্ত এই আলোড়নগুলির পরিণতি ঘটেছে গণতান্ত্রিক পরিসরকে পুনঃসম্প্রসারিত করার তাড়নার মধ্যেই। প্রধানত তার প্রতিফলন ঘটেছে সংসদীয় ব্যবস্থার মধ্যে পরিবর্তনের প্রতি নানানমাত্রায় সমর্থন জানানোর মাধ্যমে। এই পরিবর্তনে তৃণমূল কংগ্রেসের বিকল্প রাজনৈতিক কর্মসূচী বলে কোনো কিছু ছিলই না–তো তাতে জনগণের আকর্ষিত হওয়ার কোনো প্রশ্নই থাকে না! যে প্রশ্নটা উঠে আসে আমাদের সামনে–১৯৬৭ সালে প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকার যে ন্যুনতম রাজনৈতিক কর্মসূচীর ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল, তাও কী গণআন্দোলনের ধারাবাহিকতায় কোনো সংসদীয় বিকল্পকে খুঁজে নেওয়ার তাড়নাই ছিল না ? পরবর্তী সংসদীয় প্রক্রিয়া কী তারই প্রতিফলন রেখে যায় নি ইতিহাসে ? বাংলার বামপন্থী আন্দোলনের গৌরবময় অতীতকে সংসদীয় রাজনৈতিক ক্ষমতাঅর্জনের কাজে সবচেয়ে সুচারুভাবে ব্যবহার করেছে সিপিআই(এম) দলটি। ১৯৭৭ সালে তাদের নেতৃত্বে বামফ্রন্ট গঠন তুলনামূলক একটি স্থায়ীধরনের সংসদীয় রাজনৈতিক ঐক্যকে জনগণের সামনে উপস্থিত করতে সক্ষম হয়েছিল। যদিও তা দাঁড়িয়েছিল অত্যন্ত দৃঢ় সংশোধনবাদী ভিত্তির ওপর। দীর্ঘকালীন শাসক হিসেবে কংগ্রেস দলের যে প্রাতিষ্ঠানিকতা অর্জিত হয়েছিল, তার বিপরীতে আগের বাম আন্দোলনের সমস্ত সুফলগুলিকে এই অবস্থানটির মধ্যে দিয়ে সংহত করার এক সচেতন প্রচেষ্টা নিয়েছিল সিপিআই(এম)। তার ফলে এই রাজনৈতিক প্রক্রিয়াটির একটি সামাজিক ভিত্তি তৈরী হয়েছিল। সত্তরের ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময় পেরিয়ে কমিউনিস্ট বিপ্লবী শিবিরের ব্যর্থতার ইতিহাস বাংলার বাম-মেরুকরণে যে গভীর প্রভাব ফেলেছিল, তা বামপন্থার সপক্ষে দাঁড়ানো বাংলার অগণিত মানুষকে সমালোচনা-সহই সিপিআই(এম)-এর পক্ষ নিতে বাধ্য করেছিল। সিপিআই(এম)-ও অত্যন্ত সুকৌশলে বন্দীমুক্তির মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলিতে সদর্থক সিদ্ধান্ত নিয়ে এই পরিসরে সমর্থন আদায় করে নিতে সক্ষম হয়েছিল।
বাংলার বামপন্থী আন্দোলনকে সংসদীয় ক্ষমতাঅর্জনের কাজে ব্যবহার করা ও তার পরিণতিতে একটি শাসকশ্রেণীর দলে রূপান্তরিত হওয়ার যে ইতিহাস সিপিআই(এম) সৃষ্টি করেছে, তার বিপরীতে বাংলার কমিউনিস্ট বিপ্লবী শক্তি বিগত তিন-চার দশক জুড়ে এ রাজ্যে উপস্থিত থাকলেও বৈপ্লবিক ধারার কোনো কার্যকরী বিকাশ-প্রক্রিয়ার জন্ম দিতে পারে নি। ১৩ পার্টির আন্দোলনের ক্ষুদ্র পরিসরের কথা আমরা আগে আলোচনা করেছি। সিঙ্গুর আন্দোলনে যে সমস্ত কমিউনিস্ট বিপ্লবী শক্তিগুলি নানানমাত্রায় অংশ নিলেন, তারা নিজেদের মধ্যে এই আন্দোলনের দাবি, লড়াইয়ের রূপ ও করণীয় নিয়ে ন্যুনতম স্তরের ঐক্য অর্জন করতেও ব্যর্থ হলেন। আন্দোলনের গভীরতার নিরিখে নিজেদের উদ্যোগের মাত্রাটি অনেকটাই শিথিল ছিল। নন্দীগ্রাম আন্দোলনের ক্ষেত্রেও বিষয়টা একই রকমভাবে সত্যি। সিঙ্গুর আন্দোলনের সময় থেকে বিপ্লবীদের যে যৌথ প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছিল, তাতে ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠলো যে পশ্চিমবঙ্গে বিপ্লবী বামপন্থার মধ্যেকার বিভিন্ন শক্তির ক্ষয় ও দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি মতাদর্শগত বিভ্রান্তি ও পারস্পরিক মতপার্থক্য ক্রমাগত বেড়েছে। গণ-আন্দোলনে সম্মিলিত হস্তক্ষেপের ফলে সেটির অগ্রগতি এবং বিপ্লবীদের সাংগঠনিক শক্তিবৃদ্ধির যে দ্বিবিধ লক্ষ্য সাধারণভাবে থাকে, তা কোনো কার্যকরী ঐক্যের রূপ নিয়ে উপস্থিতই হতে পারল না। বাস্তবে যে কোনো যৌথ প্রয়াসই শেষপর্যন্ত নিজস্ব শক্তিকে জাহির করার এবং অন্তহীন বিতর্ক-বিবাদের এক আবর্তে প্রবেশ করে যাচ্ছে।
২০০৬ সালে সিঙ্গুর আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে বিপ্লবী সংগঠনগুলির ঐক্যবদ্ধ কার্যক্রমের প্রয়াস অসফল হওয়ার পর ২০০৭ সালে আরও সুনির্দিষ্ট ভিত্তিতে রাজ্যস্তরে বৃহত্তররূপে ‘সংগ্রামী বামপন্থী’দের ঐক্যবদ্ধ করার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়, ২০০৮ পর্যন্ত লাগাতার প্রচেষ্টার পর তা কেবলমাত্র ২০০৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে ৪টি সংগ্রামী বাম সংগঠনের যৌথ বিবৃতিদানের মধ্যে সীমায়িত থাকে। এরপরেও পশ্চিমবঙ্গে লালগড় আন্দোলনের সমর্থনে, বন্দীমুক্তির প্রশ্নে, ইউএপিএ বিরোধিতার প্রশ্নে এবং ইস্যুভিত্তিক অগণিত প্রশ্নে যুক্ত-আন্দোলন হয়েছে বা যুক্তমঞ্চ গড়ে উঠেছে। আজ অবধি এই প্রচেষ্টা জারি আছে। কিন্তু বিগত বছরগুলির অভিজ্ঞতা এই সত্যকে সামনে এনে দিয়েছে যে বিপ্লবী শক্তিগুলির মধ্যে বহু বিষয়ে মতৈক্য থাকলেও বর্তমান বাস্তবতাকে বোঝা ও গণআন্দোলন বিকাশের নীতি ও কৌশল নিরূপণের ব্যাপারে এমন গভীর দৃষ্টিভঙ্গীগত ভিন্নতা রয়েছে যা গুরুতর প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। পশ্চিমবাংলার বিশেষ পরিস্থিতিতে স্থায়ীরূপের কার্যকরী ধরনের যুক্তমঞ্চ গড়তে গেলে গণ-আন্দোলন বিকাশের বর্তমান গতিপথ নিয়ে এক দৃঢ় ঐক্যের ভিত্তি চাই। ধীরে ধীরে এই সত্য আজ ক্রমশ প্রকট হয়ে উঠেছে যে আজকের পরিস্থিতিতে সকল বিপ্লবী বামেদের যৌথ প্রক্রিয়া নয়, বরং যারা পশ্চিমবাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির স্বরূপ ও এ রাজ্যে গণ-আন্দোলন বিকাশের আশু পদক্ষেপগুলির বিষয়ে এক ন্যূনতম মতৈক্য অর্জন করতে পারবে তাদের মধ্যে সংগ্রামী বামঐক্য গড়ে তোলাই সময়ের দাবি।
অতএব
আজ শ্রমজীবী জনগণ যদি সত্যি সত্যিই এই নয়া-উদারবাদের প্রতি, এমনকী গোটা পুঁজিবাদী ব্যবস্থা-টার প্রতি বিরূপ হয়ে ওঠেন(যার বস্তুগত সম্ভাবনা জথথেষ্ট পরিমাণে সমাজে উপস্থিত রয়েছে), তাহলে তাদের সামনে বিকল্প-টা কী ? আমরা অবশ্যই বলব-সমাজতন্ত্র। কিন্তু অগণিত উত্থানপতনের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার পর আজ রুশবিপ্লব ঘটে যাওয়ার ১০০ বছর বাদে বর্তমান প্রজন্মের শ্রমজীবীরা অবশ্যই ভেবে দেখতে চাইবেন যে তা আদৌ সম্ভব কি না। ‘রাশিয়া ও চীনে যে প্রমাণ হয়ে গেছে সমাজতন্ত্র সম্ভব নয়’–সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাস শ্রমজীবী জনতার কাছে এইভাবেই পৌঁছেছে। আজ যদি আমরা তাকে বোঝাতেও সক্ষম হই যে রাশিয়া আর চীনের অভিজ্ঞতায় তেমন কিছুই প্রমাণ হয় নি, তখন পরের প্রশ্ন-টা আসবে। আচ্ছা সত্যিই কি আগের থেকেও ভালো কিছু, উন্নত কিছু সম্ভব ? এর উত্তরে আমরা আবারও যুক্তি-তথ্য দিয়ে বোঝাব-হ্যাঁ, সম্ভব। কিন্তু তারও পরের প্রশ্ন হলো–আজ সেটা কীভাবে সম্ভব আর কারাই বা তা সম্ভব করে তুলতে পারে ? কারাই বা নেতৃত্ব দেবে আগামী এই পরিবর্তনে আর কীভাবে ? এখানে এসে ব্যাপারটা থমকে দাঁড়াচ্ছে। দেশে দেশে মানুষের সংগ্রাম থেকেই যে অগ্রণীরা তৈরি হয়, শেখে এবং শেখায়, এগোয় এবং এগিয়ে নিয়ে যায়–এই সত্যটা শ্রমজীবীরা তো বটেই, এমনকী অনেক সময় বিপ্লবীরাও ভুলে যান। পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে খারিজ করে দেওয়ার প্রধান প্রবণতাটি সেই সমাজের চলার পথে আপন নিয়মে তৈরি হয়। কমিউনিস্টদের কাজ হল সেই যাত্রাপথকে সুগম করা। আজ সারা দুনিয়া জুড়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পর্বের সবচেয়ে জোরালো বিক্ষোভ-প্রতিবাদ ধ্বনিত হচ্ছে। কিন্তু কোথাও কমিউনিস্টদের কন্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে না। কমিউনিস্টরা শক্তিশালী হয়ে উঠছেন তেমনও শোনা যাচ্ছে না। কেন? রাস্তা সুগম করার দায়িত্ব যারা স্বেচ্ছায় কাঁধে নেন, প্রতিবাদী মানুষ তাদের চাইছে না কেন? আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের এক গভীরতম পর্যালোচনার মধ্যে দিয়ে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা আজ বড় জরুরি হয়ে উঠেছে। আরো জরুরি হয়ে উঠেছে সেই উত্তরের নির্যাস নিয়ে কমিউনিস্ট বিপ্লবী মর্মবস্তুর অনুশীলনকে সময়োপযোগী করে তোলা। সময় যখন আসছে তখন যদি আন্দোলনের স্লোগান বা পদ্ধতি কমিউনিস্টদের সব অচেনা লাগে, এগোবার রাস্তাটাই খুঁজে পাওয়া মুশকিল হবে। এই জটিল ধাঁধার জবাব খুঁজতে না পারলে আজকের সময়ের কোনো অঙ্কই যে মিলবে না।
বাংলার গণ-আন্দোলন আজ এক নতুন আরম্ভের ইঙ্গিত অবশ্যই দিচ্ছে। হয়ত সারা দুনিয়ার প্রতিবাদের সাথে তাল মিলিয়ে তা আরও সোচ্চারও হয়ে উঠবে। যাদবপুরের সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ছাত্রসমাজের যে কলরব ধ্বনিত হল কলকাতার রাজপথে, তার মধ্যে বাংলার নতুন বাম আন্দোলনের কন্ঠস্বর আছে। সিঙ্গুর থেকে যাদবপুর, রেশন বিদ্রোহ থেকে কামদুনি—গণআন্দোলনের যে বহুমাত্রিকতা নিয়ে গত এক দশকের বাংলা নতুন করে আলোড়িত হচ্ছে ছোট-বড় নানান মাত্রায়, তার পদধ্বনি তো অগ্রণীদের আগাম শুনতে পেতেই হবে। কিন্তু সাচ্চা কমিউনিস্টরাও যদি ভাবেন যে তাদের ‘তৈরি করে দেওয়া পথে চলার’ জন্য বাংলার নতুন প্রজন্মের ছাত্রছাত্রীরা অথবা শ্রমজীবী জনতা ঘরে ঘরে তৈরি হচ্ছে, তবে তা মারাত্মক ভুল হবে। তারা যদি ভাবেন যে আগের শতাব্দীর কমিউনিস্ট আন্দোলনগুলি থেকে তাদের তৈরি হওয়া উপলব্ধিগুলোর সাথে এবার নতুন প্রজন্মের শ্রমিকশ্রেণী একাত্ম হতে শুরু করে দেবে, তবে সম্ভবত শুধু নিরাশাই জুটবে। শুধু আগের শতাব্দীর পাঠ নেওয়ায় নয়, আজকের সময়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ পাঠ নিতেও আজ কমিউনিস্টদের মনযোগী ছাত্র হতে হবে।