Friday, September 4, 2015

শিশু আয়লানকে সিরিয়ায় দাফন

তুরস্কের উপকূলে পড়ে থাকা সিরিয়ার যে শিশুটির লাশ সারা বিশ্বকে নাড়া দিয়েছে সেই আয়লানকে আজ তার নিজের শহরে দাফন করা হয়েছে। এর আগে আয়লান কুর্দীর পিতাকে তার তিন বছর বয়সী পুত্রের কফিনসহ তুরস্ক থেকে সীমান্তবর্তী সিরিয়ার কোবানি শহরে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেয় কর্তৃপক্ষ। শিশু আয়লানের পাশাপাশি তার মা ও বড় ভাইকেও দাফন করা হয়েছে। তুরস্কের একটি সমুদ্র সৈকতে আয়লানের নিথর মলাশ পড়ে থাকার ছবি সিরিয়ার শরণার্থীদের দুঃখ দুর্দশার কথা সারা বিশ্বের মানুষকে মনে করিয়ে দিয়েছে। ছবিতে দেখা যায় সমুদ্র সৈকতে লাল জামা গায়ে একটি ছোট শিশুর নিথর দেহ উপুড় হয়ে পড়ে আছে। তুরস্কের বদ্রুম উপকূলে সাগর সৈকত থেকে এই ছবি তুলেছে সে দেশের একটি বার্তা সংস্থা। শিশু আয়লানসহ অভিবাসীদের একটি দল নৌকায় করে গ্রিসের একটি দ্বীপে যাওয়ার চেষ্টা করলে নৌকাটি ডুবে যায় এবং ১২ জন নিহত হয়। তার মা এবং পাঁচ বছর বয়সী বড় ভাই এই ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। আয়লানের পিতা আবদুল্লাহ জানিয়েছেন, নৌকাটি তুরস্ক ছেড়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই বড় বড় ঢেউয়ের মুখে পড়ে। তখন চালক সাতরে চলে যান। পরে নৌকাটি ডুবে যায়। সূত্র : বিবিসি

লতিফ সিদ্দিকীর পদত্যাগ সাংবিধানিকভাবে হয়নি : সুরঞ্জিত

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেছেন, দশম সংসদ থেকে লতিফ সিদ্দিকীর পদত্যাগের বিষয়টি মোটেও সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক উপায়ে নিষ্পত্তি হয়নি। স্পিকার নির্বাচন কমিশনে পাঠালেন বিষয়টির সমাধানের জন্য। কিন্তু কমিশন পুনরায় তা সংসদে পাঠালো। এ অধিকার সংবিধান তাকে দেয়নি।
আজ শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে বঙ্গবন্ধু একাডেমী আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি একথা বলেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও আয়োজক সংগঠনের উপদেষ্টা হাজী মোহাম্মদ সেলিম।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যাটা সঙ্কটে পরিণত হওয়ার আগেই শিক্ষামন্ত্রীকে দ্রুত সমাধান করার পরামর্শ দিয়ে সুরঞ্জিত সেন বলেন, ভিসি নিজ স্বার্থে ছাত্রদের ব্যবহার করে শিক্ষকদের সাথে দুর্ব্যবহার করেছেন। এর দায় নিয়ে হয় তিনি নিজ থেকে পদত্যাগ করবেন, না হয় শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাকে অপসারণ করবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘আইআরআই’র জরিপ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের এই উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য বলেন, সরকারের জনপ্রিয়তা বেড়েছে; প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা আরো বেড়েছে। এটা আমাদের কথা নয়, আমেরিকার গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জরিপ এটা বলেছে। সুতরাং বিএনপির মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে আর প্রশ্ন থাকার কথা নয়। আশা করি বিএনপি তাদের দল গোছানোয় ব্যস্ত থাকবেন। যথাসময়েই নির্বাচন হবে।
রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিয়ে মেয়রদের উদ্দেশ সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, খাল বন্ধ হয়ে গেছে এই অজুহাত দেখিয়ে চোখ বন্ধ থাকলে কেমন করে বন্ধ খাল খুলবে। প্রয়োজনে আইন করে যেসব ব্যবসায়ীরা খাল বন্ধ করেছে টাস্কফোর্স গঠন করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। সমস্যার সমাধান করতে হবে। জনগণকে দুর্ভোগ থেকে রেহাই দিতে হবে।

আফজাল-মেমনের ফাঁসি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত : বিচারপতি এ পি শাহ

আফজাল গুরু এবং ইয়াকুব মেমন, ইনসেটে বিচারপতি এ পি শাহ
আফজাল গুরু এবং ইয়াকুব মেমনের ফাঁসি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মন্তব্য করেছেন দিল্লি হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি এ পি শাহ। ভারতে এই দুই মুসলিম ব্যক্তিত্বের ফাঁসি নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। অনেকে মনে করছেন, তারা মুসলিম বলেই তাদের এই শাস্তি দেয়া হয়েছে।
ভারতের জাতীয় আইন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি অজিত প্রকাশ শাহ (এ পি শাহ) এক সংবাদ চ্যানেলে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, আফজাল গুরুর ক্ষমা প্রার্থনার আবেদনপত্র দীর্ঘ সময় ধরে মুলতুবি রাখা হয়েছিল। পরে সরকার আচমকাই তার ফাঁসি কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেয়।
ইয়াকুব মেমন প্রসঙ্গে বিচারপতি অজিত প্রকাশ শাহ বলেন, ‘মেমনের ক্ষেত্রে সবকিছু খতিয়ে দেখলে তার ফাঁসি হওয়ার কথা নয়।’ সুপ্রিম কোর্টের রায়ের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বহু বছর ধরে কারাগারে থাকলে তার ফাঁসি হওয়া দুষ্কর হয়।
বিচারপতি বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের মধ্যে এ নিয়ে মতাদর্শগত পার্থক্য ছিল। পরে সুপ্রিম কোর্টের তিন সদস্যের বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চে পাঠানো হয়।’
তিনি বলেন, ‘প্রাণ ভিক্ষার আবেদন খারিজ হওয়ার পরে ১৪ দিনের মধ্যে ফাঁসি কার্যকর করা যায় না। এক্ষেত্রে সেই নিয়ম মানা হয়নি। আর ফাঁসি এমন এক রায় যার উপরে কোনো শাস্তি হয় না।’ ফাঁসি দিয়ে সন্ত্রাস ঠেকানো যায় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তার দাবি, সরকার এ ব্যাপারে তাড়াহুড়ো করে পদক্ষেপ নিয়েছে এবং এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিষয়।
১৯৯৩ সালে মুম্বাইতে ধারাবাহিক বোমা হামলার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় গত ৩০ জুলাই ইয়াকুব মেমনের ফাঁসি হয়। ২০০১ সালের ১৩ ডিসেম্বর পার্লামেন্টে হামলা চালানোর দায়ে আফজাল গুরু দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় ২০১৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি তাকে ফাঁসি দেয়া হয়।
গত ফেব্রুয়ারিতে কংগ্রেস নেতা শশী থারুর, আফজাল গুরুর ফাঁসি দেয়া ভুল ছিল বলে মন্তব্য করেন। একইভাবে ইয়াকুব মেমনের ফাঁসির বিরোধিতা করেছিলেন বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।
এবার দিল্লি হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি এবং জাতীয় আইন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি অজিত প্রকাশ শাহ বললেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই আফজাল গুরু এবং ইয়াকুব মেমনকে ফাঁসি দেয়া হয়েছিল।
সূত্র : রেডিও তেহরান

মুসলিম দম্পতির দুটির বেশি সন্তান হলে শাস্তি দেয়া উচিত : তোগাড়িয়া

ধর্মভিত্তিক জনগণনায় গত দশ বছরে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের প্রসঙ্গ তুলে বিতর্কিত মন্তব্য করলেন ভারতের বিশ্ব হিন্দু পরিষদের শীর্ষ নেতা প্রবীণ তোগাড়িয়া। বর্ষীয়াণ এই ভিএইপি নেতা বললেন, মুসলিম দম্পতির দুটির বেশি সন্তান হলে শাস্তি পাওয়া উচিত। তার যুক্তি শাস্তির ভয় না থাকলে মুসলিমরা কিছুতেই জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগী হবে না। ক দিন আগে তোগাড়িয়া বলেছিলেন, জনসংখ্যা জিহাদের ফলে হিন্দু বিলুপ্ত হতে পারে, এজন্য সারা দেশে দুটি সন্তান আইন বাস্তবায়ন করা উচিত। সঙ্গে বলেছিলেন, 'হিন্দু জনসংখ্যা দ্রুত বিলুপ্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে মুসলমানদের জনসংখ্যা পদ্ধতিগতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।'
তিনি এর আগে বলেছিলেন, 'যদি এরকম পরিস্থিতি চলতে থাকে তাহলে ভারত থেকে হিন্দু ওইভাবে সাফাই হয়ে যাবে যেরকম আফগানিস্তান এবং কাশ্মীরে হয়েছে। ৫ সেপ্টেম্বর সাধু সম্মেলনে এই বিষয়টি তোলা হবে বলেও জানিয়েছিলেন তোগাড়িয়া।
প্রসঙ্গত, ২০০১ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত আদমসুমারি রিপোর্টে প্রকাশ, ভারতের মোট জনসংখ্যা ১২১.০৯ কোটি। এরমধ্যে হিন্দু জনসংখ্যা ৯৬.৬৩ কোটি। অন্যদিকে, মুসলিম জনসংখ্যা মাত্র ১৭ কোটি ২২ লাখ।
২০০১ সালে মুসলিম জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার ছিল ২৯.৫২ শতাংশ। ২০১১ সালে এই বৃদ্ধির হার কমে ২৪.৬০-এ দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, ২০০১ সালে হিন্দু জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল ১৯.৯২ শতাংশ। ২০১১ সালে এই বৃদ্ধির হার ১৬.৭৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ৫ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে, হিন্দু জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমেছে মাত্র ৩ শতাংশ।

বাংলাদেশে গরু না পাঠালে ভারতের ক্ষতি বছরে ৩১ হাজার কোটি রুপি

গরু নিয়ে সিদ্ধান্ত ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষতি করছে? ঠিক এই প্রশ্নটিই উত্থাপন করেছে ভারতের একটি সংবাদমাধ্যম৷ আর বাংলাদেশের একটি সংবাদমাধ্যম বলছে ভারতের সিদ্ধান্তে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দুই দেশই৷
সিদ্ধান্তটি হচ্ছে গত চার দশক ধরে ভারত থেকে চোরাই পথে বাংলাদেশে যে গরু পাচার হয়ে আসছে সেটা পুরোপুরি বন্ধ করতে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন সে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং৷ এর পেছনে যে অবৈধ কাজ বন্ধের লক্ষ্য কাজ করেছে তা নয়, ভারতীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন নির্দেশের কারণ, ‘বাংলাদেশের মানুষ যেন গরুর মাংস খাওয়া ছাড়তে বাধ্য হয়৷'
ভারতীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্ত দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষতির কারণ হচ্ছে কিনা সে বিষয়ে একটি বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ভারতের সংবাদমাধ্যম ‘ফার্স্টপোস্ট'৷ ভারতের এই সিদ্ধান্তে বাংলাদেশিরা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে কারণ এর ফলে মাংসের দাম অনেক বেড়ে গেছে৷ তাছাড়া সামনেই কোরবানির ঈদ৷ তার আগে গরুর সংকটে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ৷
এদিকে, ভারতের আরেকটি সংবাদমাধ্যম ‘টাইমস অফ ইন্ডিয়া' গত এপ্রিল মাসে হিসেব করে দেখিয়েছে যে, বিএসএফ যদি বাংলাদেশে গরু পাচার পুরোপুরি বন্ধ করতে সমর্থ হয় তাহলে ভারত সরকারকে প্রতি বছর ৩১ হাজার কোটি রুপি খরচ করতে হবে৷ কারণ স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী, একটি গরু মারা যাওয়ার পাঁচ বছর আগে থেকে দুধ দেয়া বন্ধ করে দেয়৷ এতদিন এই গরুগুলোই বাংলাদেশে পাচার করতো৷ কিন্তু এখন যদি সেটি বন্ধ হয়ে যায় তাহলে এই গরুগুলোকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত লালনপালন করে যেতে হবে৷ এবং সেজন্যই এত বিশাল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হবে৷
বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম ডেইলি স্টার তিন পর্বের একটি সিরিজ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে৷ ভারতের সিদ্ধান্তের কারণে দুই দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে৷
সূত্র : ডয়চে ভেলে।

ত্রুটি সত্ত্বেও, গণতন্ত্রেই আস্থা বাংলাদেশীদের -মার্কিন সংস্থার জরিপ

গণতন্ত্রে নানা অসঙ্গতি, ত্রুটি ও সমস্যা থাকা সত্ত্বেও, বাংলাদেশের মানুষ গণতন্ত্রকামী। অন্য যে কোন সরকার ব্যবস্থার চেয়ে তারা গণতন্ত্রের ওপর অধিক আস্থাশীল। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট নামে একটি সংস্থার এক জনমত জরিপে এমন চিত্রই উঠে এসেছে। গতকাল জরিপটি প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হচ্ছে, গণতন্ত্রে ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশী গণতন্ত্রে আস্থা রাখেন। নানা সমস্যার আবর্তে থাকা সত্ত্বেও, অন্য যে কোন সরকার ব্যবস্থার চেয়ে গণতন্ত্র শ্রেয়তর বলে মনে করছেন জরিপে অংশ নেয়া ৮১ শতাংশ মানুষ। তাদের ৫৩ শতাংশ দৃঢ়ভাবে গণতন্ত্রকে সমর্থন করেন। বাকি ২৮ শতাংশ মানুষও কোন না কোনভাবে সমর্থন করছেন গণতন্ত্রকেই। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় গণতন্ত্রকে ভালো বলে মনে করছেন ৮৩ শতাংশ মানুষ। একনিষ্ঠভাবে বিষয়টিকে সমর্থন করছেন ৪১ শতাংশ মানুষ। বাকি ৪২ শতাংশ মানুষ দৃঢ়ভাবে বিষয়টিকে সমর্থন না করলেও, তারা এর সঙ্গে একমত। অবশ্য, অপর এক প্রশ্নের প্রতিক্রিয়ায় ৬৮ শতাংশ মনে করেন, গণতন্ত্র ভীষণভাবে কলহপূর্ণ এবং ৪৫ শতাংশের ধারণা, গণতন্ত্রে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বেশ খারাপভাবেই পরিচালিত হয়। নিয়েলসেন-বাংলাদেশ জরিপটি চালায় এ বছরের ২৩শে মে থেকে ১০ই জুন পর্যন্ত। ১৮ বছর বয়সী ও তদুর্ধ্ব ২ হাজার ৫৫০ জনের মতামতের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করে আইআরআই। গ্লোবাল স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারসের রব ভ্যারসালোন ও আইআরআই জনমত জরিপটির তত্ত্বাবধানে ছিলেন। গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা ও সমৃদ্ধ অর্থনীতির মধ্যে একটি বেছে নেয়ার মাধ্যমেও জরিপে অংশগ্রহণকারীরা তাদের পছন্দের অগ্রাধিকারের বিষয়টি সুস্পষ্ট করেন। সমৃদ্ধ অর্থনীতির চেয়ে তারা অনেকটাই এগিয়ে রাখছেন গণতন্ত্রকে। গত বছর যেখানে ৬৫ শতাংশ মানুষ দ্ব্যর্থহীনভাবেই গণতন্ত্রকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছিলেন, সেখানে এ বছর ৩ শতাংশ বেড়ে এ হার দাঁড়িয়েছে ৬৮ শতাংশে। অন্যদিকে, গত বছর সমৃদ্ধ অর্থনীতির পক্ষে ছিলেন ৩০ শতাংশ মানুষ। এ বছর সে সমর্থন কমে দাঁড়িয়েছে ২৭ শতাংশে। এদিকে জনমত জরিপে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, সেনাবাহিনী, গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ ও র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) প্রতি সমর্থন অনেক বেড়েছে। জরিপে অংশ নেয়া উত্তরদাতাদের ৮৬ শতাংশ সেনাবাহিনী, ৮৩ শতাংশ গণমাধ্যম, ৮০ শতাংশ সুশীল সমাজ ও র‌্যাবের পক্ষে রয়েছেন ৭৬ শতাংশ মানুষ। তবে সম্প্রতি রাজনৈতিক দলসমূহ, পুলিশ ও সংসদের ওপর থেকে আস্থা হারিয়েছেন অধিকাংশ মানুষ। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় তারা হাতাশাগ্রস্ত। ৮৮ শতাংশ মানুষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পক্ষে। ৬৭ শতাংশ দৃঢ়ভাবে এবং ২১ শতাংশ মানুষ একনিষ্ঠভাবে না হলেও, এর সঙ্গে সহমত পোষণ করছেন। তারা মনে করেন, নির্বাচনে অংশ নেয়ার মাধ্যমে দেশে রাজনৈতিক পালাবদলের সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়টি প্রভাবিত করার সুযোগ পান তারা। তবে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে ৯৪ শতাংশ মানুষ সাধারণ নির্বাচন আয়োজনের পক্ষে ছিলেন। পরবর্তী সংসদ নির্বাচন আয়োজনের পূর্বে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে ৬৭ শতাংশ উত্তরদাতা। ৪৩ শতাংশ মানুষ অবিলম্বে জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের পক্ষে। অপরদিকে, ৪০ শতাংশ মনে করছেন, বর্তমান সরকারের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পরই সাধারণ নির্বাচন দেয়া উচিত।

‘সাইফুর রহমান দেশের আর্থিক সু-ব্যবস্থার প্রধান স্থপতি’

সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড.এটিএম শামসুল হুদা বলেছেন, প্রয়াত সাবেক অর্থমন্ত্রী ও বিএনপি নেতা এম সাইফুর রহমান বাংলাদেশর আর্থিক সু-ব্যবস্থার প্রধান স্থপতি।
দেশের অর্থনীতির জন্য সাইফুর রহমান যে অবদান রেখে গেছেন চাইলেই কেউ এ অবদান অস্বীকার করতে পারবে না। ব্যাংকিং সেক্টরে যে বিশৃঙ্খলা ছিল, তা শৃঙ্খলায় এনেছেন তিনি। ঋণ খেলাপীর বিষয়ে তার ছিল শক্ত অবস্থান। এছাড়া বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালকের ক্ষেত্রে কোন নিয়ম-কানুনের বালাই ছিল না। সাইফুর রহমান সেটাকে নিয়মের ভেতরে এনেছেন।
শুক্রবার জাতীয় প্রেসক্লাবের কনফারেন্স লাউঞ্জে সাইফুরের রহমানের ৬ষ্ঠ মৃত্যু বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। শামছুল হুদা বলেন,  সাইফুর রহমান  দেশের জন্য যা কল্যাণ মনে করেছেন, তাই করার চেষ্টা করেছেন। তিনি সিলেট জেলার সন্তান হলেও কাউকে জেলা দিয়ে মূল্যায়ণ করতেন না।  কাজ ও সুনাম দিয়ে সবাইকে মূল্যায়ণ করতেন। এজন্য তার প্রতি সরকারি কর্মচারীদের যে শ্রদ্ধা ও ভক্তি ছিলো, তা বিরল। সাবেক এই সিইসি আরো বলেন, সাইফুর রহমানকে বাইরে থেকে অনেকেই খুব কঠিন হিসেবে জানতেন। কিন্তু তার ভেতরের প্রকৃতিটা কত সরল, তা কাছে না গেলে বুঝা যেতো না। শামছুল হুদা বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ব্যক্তি স্বার্থ বলে একটা কথা থাকে। কিন্তু সাইফুর রহমান এর থেকে অনেক দূরে ছিলেন।
আলোচনা সভায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, সাইফুর রহমান বাংলাদেশের সফল অর্থমন্ত্রী ছিলেন। তিনি খুটিনাটি বিষয়গুলি খুব সহজে বুঝতেন। তিনি ছিলেন অনেক প্রজ্ঞাবান ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য। ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও ডাকসুর সাবেক ভিপি সুলতান মুহাম্মদ মনসুর আহমেদ বলেন, সাইফুর রহমানের মধ্যে দলকানা ব্যাপারটি ছিল না। তিনি নিজেকে সব সময় রাজনীতির উর্ধে রাখতেন। তিনি বলেন, সাইফুর রহমান এমন একজন ব্যাক্তিত্ব, যাকে আঞ্চলিক পরিসরে আবদ্ধ করে রাখা ঠিক হবে না। তিনি গোটা দেশর সম্পদ। যার মৃত্যুতে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ শোকবার্তা পাঠিয়েছিলেন। সাবেক অর্থ সচিব ও বিশ্ব ব্যাংকের বিকল্প নির্বাহী পরিচালক জাকির আহমদ খান বলেন, সাইফুর রহমান দেশের জন্য যে অবদান রেখে গেছেন। তা চিরদিন অবস্মরনীয় হয়ে থাকবে।
দূররে সামাদ রহমান ও সাইফুর রহমান ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সাইফুর রহমানের পূত্র এম নাসের রহমানের সভাপতিত্বে সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন- বিএনপি নেতা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল ও সাবেক অর্থসচিব ছিদ্দিকুর রহমান।

গোর by সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম

সিন্দুক কবরের ভেতরটা বেশ আঁটসাঁট। দূর থেকে শরীর বাঁকিয়ে উঁকি দিয়েই ঘাবড়ে গিয়েছেন ফয়েজ আহমেদ। নতুন কবর। বৃষ্টিতে নিচ থেকে পানি উঠছে দেখে কেমন শিরশিরে অনুভূতি শিরদাঁড়া দিয়ে নামল; অথবা আটকে রইল বুকের একপাশে। মাত্র কয়েক হাত দৈর্ঘ্য-প্রস্থ কিন্তু তাকালে মনে হয়, ভেতরের চারকোনা বরফের মতো অন্ধকারটা পৃথিবীর অন্যপাশ অবধি পৌঁছে গিয়েছে। আশপাশের দু-এক দিন বয়সী কবরগুলো সদ্য মা হওয়া নারীর তলপেটের মতো ফুলে আবার চুপসে গেছে পানিতে। ফয়েজ এবার গেটের দিকে খানিক এগিয়ে দাঁড়ালেন গাছের নিচে। বৃষ্টি ধরে এসেছে কিন্তু ওপর থেকে পাতা চুইয়ে পানি আসছে ফোঁটায় ফোঁটায়। একটু আগেই খুব বৃষ্টি ছিল এদিকে। সিদ্দিকের সঙ্গে দৌড়ে এসে গোরস্তানের অফিসঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়েছিলেন ফয়েজ। বারান্দা থেকে কয়েক পা নামতেই বাঁ দিকের দ্বিতীয় সারির একপাশে সদ্য খোঁড়া কবরে চোখ পড়ল তাঁর। সেই দৃষ্টি অনুসরণ করে আগ বাড়িয়ে বলল সিদ্দিক, ‘স্যার, হিন্দুক কব্বরটার কামই হ্যাস করলাম হপায়, আরেট্টা আছে, ওইডা বাক্স কব্বর।’
নেহাত দুর্ভাগ্য না হলে এমন ভরসন্ধ্যায় বৃষ্টির ভেতর কোনটা সিন্দুক আর কোনটা আলমারি, ওয়ার্ড-রোব কবর—এসব মারফতি জ্ঞান ফয়েজের নেওয়ার কথা না। এটুকু সময়ের মধ্যেই তিনি যে বাইরে রাখা ফ্রিজের পানির বোতলের মতো ঘেমে উঠেছেন, সেটা টের পাচ্ছেন। রুমাল হাতড়ালেন পাঞ্জাবির পকেটে। নেই। একটা জিনিস যদি শিরিন মনে করে দিত! বৃষ্টি-ঘামে ভিজে ক্যাতকেতে সারা শরীর। কপালের ঘাম মুছলেন হাত দিয়ে। হাতের তালুতে লোনাপানিটা ঘোলাটে আলোয় দেখতে কেমন লাল রঙের মতো। সেই সকালে বেরিয়েছেন বাসা থেকে। এখন ভাবনাগুলোও কাজ করছে না ঠিকঠাক। এখান থেকে বের হওয়া দরকার, কিন্তু সিদ্দিক কথা বলেই যাচ্ছে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও তিনি স্বাভাবিক মুখে শুনে যাচ্ছেন সব।
এক মাপে ধার কেটে চার ফুটের মতো গহ্বর তৈরি। কোদাল চালিয়ে ভেজা সুতি শাড়ির মতো মোলায়েম করে মেঝেটা বানানো।—সিদ্দিক কবর বোঝাতে খুব উন্মুখ; আর এটাই ভয় ধরিয়ে দিচ্ছে ফয়েজকে।
: স্যার, হিন্দুক কব্বরে লাশ ঠিক মধ্যিখানে থাকে না। নামায়া ধাক্কা দিয়া ভিতর দিক ঢুকায় দিওয়া লাগে।
: কেন?
: হিয়াল-কুত্তার ভয়ে। এই কব্বরে টাইন্না বাইর করা যায় না।
: সবাই এ রকম কাটলেই পারে?
: জমি না কিনলি অনুমতি নাই। বড়লোকগো কব্বর।
: ও আচ্ছা।
কথাটি বলে খানিক চুপচাপ ফয়েজ। চাইলেও প্রসঙ্গটা এড়াতে পারছেন না। সিদ্দিক কথা বলেই যাচ্ছে, ‘কব্বর যেমনই কাডুক রক্ষা নাই, দ্যাহেন না তলের থ্যা পানি উডছে ক্যামায়!’
কপালে ভাঁজ তুলে সিদ্দিকের দিকে ঘুরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘পানি যদি না নামে তাহলে কী হবে?’ নিজের পান খাওয়া দাঁত বের করে নিষ্ঠুর প্রশস্ত হাসি দিয়ে বলল সিদ্দিক, ‘এইডা মুর্দার পরিবারের ধৈর্যের পর নিব্বর করতেছে। হেরা অপেক্ষা করলি এট্টু না শুহান পর্যন্ত থ্যুয়া দিবি আর নইলি দুইডা কলাগাছ ফ্যালায়া বা এক বস্তা বালি ঢাইলা দিবেনে নামায়া।’
‘নামানো’ শব্দটা খুব নিষ্ঠুর শোনাল কানে। আগে কোনো গোরখোদকের সঙ্গে ফয়েজের আলাপ হয়নি। তাঁকে আশ্রয় দেওয়ার নামে সিদ্দিক ইচ্ছে করে আতঙ্ক তৈরি করছে মনে হচ্ছে। অবশ্য সেটা অমূলক নয়। এই কাজটা সে করতেই পারে। আর তাকে অন্য কিছু জিজ্ঞেস করার সাহসও ফয়েজের এখন নেই। তবু প্রসঙ্গ পাল্টে জানতে চাইলেন, ‘তুমি না ফলের ব্যবসা করতে। এখানে কাজ করছ কত দিন?’
: আমিও জানতাম নিকি এই কাম করা লাগবি? বছর দুই ধইরা, স্যার।
: আয় বেশি হয়?
: না, অন্য হিসাব আছে।
গোপনে ঢোঁক গিললেন ফয়েজ। সিদ্দিকের পরিবারের কথা জানতে চেয়েও সামলে নিলেন। এর মধ্যে তিনি যে সিদ্দিককে দুবার খুঁজেছেন, চেপে গেলেন তা-ও। ওর সঙ্গে আজ দ্বিতীয়বার দেখা। চিনতে পারার কথা না, কিন্তু মনে আছে একটা কারণে।
সেদিন রাতে বাসায় অনেক অতিথি খাবে বলে তিনি বাজার করতে গিয়েছিলেন কারওয়ান বাজারে। এফডিসির পাশে ভোরবেলা বেশ ভালো মাছ পাওয়া যায়। আড়তে তোলার আগেই পাইকারি দরে মাছ ব্যবসায়ীরা ভাগে বড় বড় মাছ তুলে দেয় পাল্লায়। দেখেশুনে মেহমানদের জন্য মাছ কিনে কাজের ছেলেটার হাতে ব্যাগটা দিয়ে হেঁটে এলেন ভেতর দিকটায়। সবজির দামদর করে প্রগতি ভবনের সামনে দিয়ে আসার সময় দেখলেন, ফল নিয়ে বসেছে কয়েকজন। এরা চতুর্থ শ্রেণির দোকানদার। যারা আড়তের পাশে টিউব লাইট জ্বালিয়ে ফ্যানের নিচে দাঁড়িয়ে বিক্রিবাট্টা করে, তারা হলো প্রথম শ্রেণির। চতুর্থ শ্রেণির দোকানদারদের মুখে পোড় খাওয়া বলিরেখা চিত্রাঙ্কন করা থাকে। চারুকলার ছেলেমেয়েদের প্রথম প্রথম এমন সোজা, বাঁকানো দাগ আঁকতে শেখানো হয়। চোখের কোণে বাসি পিচুটি লাগানো এসব মুখ দেখলেই বোঝা যায়, তাদের পণ্যের অর্ধেক দামও বলা যায়। ঝাঁকা থেকে পাকা বেল আর পেঁপে তুলে যাচাই-বাছাই করলেন ফয়েজ।
: গিরস্ত বাড়ির, ওষুধপাত্তি দিয়া নাই, নিচ্চিন্তে ন্যান।
: সবগুলো কত রাখবা?
: ঠেইক্কা গেছি, এক টাহাও বেশি চাইতাম না, পনেরোডা বেল আর দুই হালি কম্ফা—সবগুলা বারো শ দিয়েন। খাইয়া আমারে বিচরাইবেন।
: ধুর মিয়া দাম বুইঝা চাও, কততে দিবা বলো?
: স্যার, মাইয়াডার পরীক্ষার ফি লাগব বইলা হেই বিহানে আইছি। বিশ্বাস করেন, বেশি চাই নাই।
: তোমাদের এই সমস্যা, সবকিছুতে সুযোগ খোঁজো। ফিসের সঙ্গে কী সম্পর্ক? একদাম বলো।
: আল্লার কিরা স্যার, কাইলকা লাস্ট তারিখ। ফি না দিলি পরীক্ষা দিতে দিবিন্যা। বারো শ— বেশি চাই নাই। জিনিস ভালো, নিয়া যান।
কার্তিক মাসেও গরমে প্রাণ ওষ্ঠাগত। ফলগুলো ডিপ ফ্রিজে রেখে দিলে অনেক দিন খাওয়া যাবে। এই ভেবে সিদ্ধান্ত নিলেন নাকি দোকানদারের বারবার স্যার ডাকায় কাজ হয়েছে, কে জানে। পাকা দরদাম করে ফয়েজ বললেন, ‘ঠিক আছে কথা বাড়িয়ো না। এক হাজার টাকা। ব্যাগে তোলো।’
প্যান্টের পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে চকচকে নোটটা দিয়ে মনে মনে বেশ স্বস্তি বোধ করলেন। কোমরের লুঙ্গির গিঁটে টোপলামতো জায়গার প্যাঁচ খুলে টাকা রাখল লোকটা।
সিদ্দিককে তিনি আবার খুঁজতে এসেছিলেন দুদিন পর। অতিথিরা চলে যাওয়ার পরদিন ড্রয়িংরুমের সোফায় ক্যালকুলেটর আর কাগজপত্র নিয়ে ব্যবসার হিসাব মেলাচ্ছিলেন। ঠিক সে সময় সিঁড়িতে প্রথম শব্দটা শুনলেন। ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ে দরজা খুলে যা দেখলেন, তাঁর বিশ্বাস হলো না। দীপ্র মেঝেতে পড়ে আছে। তার মাথার পেছনের রক্ত। দীপ্র অসম্ভব দুরন্ত বাচ্চা। ধারেকাছে কেউ নেই দেখেই হয়তো তার মাথায় বুদ্ধিটা এসেছে—নিজের সর্বোচ্চ মেধা খাটিয়ে দৌড়াদৌড়ি করছে পাশের ফ্লাটের বাচ্চার সঙ্গে। সিঁড়ির হাতলে বসে পিছলে পিছলে কার আগে কে নামতে পারে—প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে হাতল থেকে ছিটকে পড়েছে সিঁড়ির দুই স্তরের মাঝখানের সমান প্রশস্ত অংশে। মাথা ফেটে জামা-কাপড় রক্তে মাখামাখি। ছেলের মাথায় সেলাই-ব্যান্ডেজ দিয়ে আনলেন ফয়েজ। সকালে কাগজে-কলমে যে হিসাব নিয়ে বসেছিলেন, সেটা মিলেছে কিন্তু অন্য একটা হিসাব মেলাতে পারলেন না সারা রাতেও। পরদিন গেলেন কারওয়ান বাজারে। রাস্তার পাশের ফলের দোকানগুলোতে খুঁজলেন সেই ফলবিক্রেতাকে। নাম জানেন না, তাই ভালোভাবে জিজ্ঞেস করতে পারলেন না কাউকে। দুদিন পর আবারও গেলেন। ওই একই জায়গায় সেদিন এক বুড়ো ফলওয়ালাকে পেয়ে লোকটির বর্ণনা দিতেই শুনলেন ঘটনাটা। ফল নিয়ে বসা লোকটার মেয়ে মারা গেছে শুক্রবারে। অস্বাভাবিক মৃত্যু। আত্মহত্যা করেছে ১৬ বছরের মেয়েটা। এর বেশি কেউ জানে না। একজন আবার টিপ্পনী কাটল, ‘সিয়ানা মাইয়া প্যাট-পুট বাধায় হালাইছিল নাকি কইব কিডা, কিন্তু আপনে খুঁজেন ক্যা সিদ্দিকরে? টাহা পাননি?’
সব শুনে স্তব্ধ ফয়েজ। তখনই তিনি জেনেছেন, ভ্রাম্যমাণ ওই ফলবিক্রেতার নাম—সিদ্দিক। সে-ও তো বছর দুই আগের কথা।
হ্যাঁ, সেই সিদ্দিকের সামনে সন্ধ্যায় এই কবরস্থানে দাঁড়িয়ে অবশ হয়ে আসছে তাঁর শরীর। এখন বৃষ্টিও কমেছে অনেকটা। হিজলগাছের নিচে দাঁড়িয়ে ভয় পেতে পেতে কেন যেন ফয়েজ মুগ্ধ হয়ে উঠেছেন গোরস্তানের নীরবতায়। দূরে দূরে টিউব লাইট জ্বলছে, তাই অন্ধকারের বদলে একটা ঘোলাটে আলো ছড়িয়ে আছে পুরো জায়গাটায়। সব কবরের মাপ যে সমান নয়, তিনি এই প্রথম লক্ষ করলেন। চোখে পড়ল কিছু ছোট কবর। আহারে, এগুলো বাচ্চাদের হবে। কিছুটা দূরে নীল রঙের প্লাস্টিক টাঙিয়ে আরও একটা কবর খোঁড়া হচ্ছে। বৃষ্টি ঠেকাতেই এই ব্যবস্থা। গর্তের ভেতর থেকে দুজন মানুষের মাথা ওঠানামা করছে, অনেকটা কচ্ছপের খোলের ভেতর থেকে মাথা বেরিয়ে আসার মতো। এরা নিচ থেকে মাটি তুলে রাখছে কবরের বাইরের দুপাশে।
প্রাচীরের চারপাশে লাগানো হিজল আর দেবদারুগাছের দিকে হঠাৎ তাকালে মনে হয়, সোনালি সাপ নামছে গা বেয়ে। বৃষ্টি হওয়ায় গোরস্তানের ভেতর কাঁচামাটি আর বাঁশের ঘ্রাণের মিথস্ক্রিয়া। প্রাণপণে কবরের ভাবনা ঝেড়ে ফেলার প্রস্তুতি নিলেন ফয়েজ। প্রায় এক ঘণ্টা হয়েছে এখানে আটকা পড়েছেন।
মোহাম্মদপুর থেকে বাসে নীলক্ষেত নামার পরই বৃষ্টি শুরু হয়েছিল। নিউমার্কেট ক্রস করতেই পুরুষ্ট হলো পানির ফোঁটা। দৌড়ে আজিমপুর কবরস্থানের গেটের টিনশেডের নিচে দাঁড়ালেন। তখনই সিদ্দিকের সঙ্গে দেখা। নতুন কবর খুঁড়ে ছাতা নিয়ে বিড়ি খেতে বেরিয়েছে সিদ্দিক। পরিচয় না দিলে হঠাৎ চিনতেনও না, কিন্তু সিদ্দিক তাঁকে মনে রেখেছে দেখে এখন অস্বস্তিটা বেশি হচ্ছে।
সিদ্দিকই এগিয়ে এসে বলল, ‘স্যার, চিনছেন? আপনি তো পুরাই ভিজ্জা গেছেন। ভিতরে আইসা অফিসরুমের বারান্দায় খাড়ান।’
দীর্ঘ সময় দম আটকে থাকার পর এখন তাঁর অস্থির লাগছে বাইরে যাওয়ার জন্য। মনে হচ্ছে, দ্রুত বাসায় ফেরা দরকার। এই বৃষ্টি-বাদলার মধ্যে ছেলেটা না আবার বেরিয়ে যায় সাইকেল নিয়ে। এখন নিশ্চয়ই দু-একটা রিকশা পাওয়া যাবে। চলে যাওয়ার আগে তবু মনে হলো, তিনি যে সিদ্দিককে খুঁজতে গিয়েছিলেন, খবরটা তাকে জানানো দরকার, তা ছাড়া তার মেয়ের কথাটা একবার জিজ্ঞেস না করাও অন্যায় হবে। অস্বস্তি নিয়েই সিদ্দিকের কাঁধে হাত রাখলেন ফয়েজ, ‘তোমার মেয়েটার কী হয়েছিল? আমি খুঁজতে গিয়েছিলাম তোমাকে।’
হাত সরিয়ে দিল সিদ্দিক।
: বাসি গতর স্যার, ধইরেন না। কব্বর কাটছি তো।
: কী হয়েছিল মেয়েটার?
সিদ্দিকের চোখের মণিতে কোনো মায়া নেই, বরং যেন আগুন জ্বলে উঠল।
: গরিবের পুলাপান। আপনে যেমতে পরথম বিশ্বাস করেন নাই ফলগুলানে ওষুধ দেই নাই, হের মাস্টারও বিশ্বাস করে নাই ফিয়ের একখান এক হাজার টাকার জাল নোট বাপে ইচ্ছা কইরা দেয় নাই। কেলাশের ছাত্রছাত্রীগো সামনে অপমান করছিল। আদুইরা মাইয়া তো...।
সিদ্দিকের কথায় নির্বাক ফয়েজ কেবল আমতা আমতা করে বললেন, ‘ভুলটা আমারই, কিন্তু না বুঝে হয়েছে ভুলটা। আমি তোমাকে খুঁজতে গিয়েছিলাম।’
: না বুইজঝা করেন নাই। চালায় দিতে চাইছিলেন।
শক্ত করে ‘না’ বলার শক্তিটা এতক্ষণে হারিয়ে ফেলেছেন ফয়েজ। তাঁর বিদায় নেওয়া জরুরি। তবে এমন অপরাধী হয়ে ‘যাই’ বলেই তো আর যাওয়া যায় না। সামান্য দায় লাঘবের শেষ চেষ্টায় স্বগতোক্তি করলেন তিনি, ‘মেয়েটা তাই বলে আত্মহত্যা করে বসল!’
: বাপের মতো ঘিন সহ্য করা শিখে নাই। আমিই ঝুলা শরীলডা দড়ি কাইড্ডা নামাইছিলাম। এরপর থিকাই কব্বর কাটি, স্যার।
: কেন?
বুকের ভেতর জমাট আতঙ্ক ফয়েজের।
: আত্মহত্যার মাইনষের নাকি জানাজা হয় না। গ্রামের বাড়ি নিয়া গেছিলাম। নিজের মাইয়ার কব্বর নিজেই কাটছি। হেরপর থিকা কাডি আর অপেক্ষা করি।
: কিসের অপেক্ষা?
একটা হাসি দিল সিদ্দিক। মানুষের পক্ষে শব্দহীন সেই হাসি সহ্য করা অসম্ভব। ঘাড়ের রগটা দপদপ করছে ফয়েজের, বুঝতে পারছেন প্রেশার বেড়েছে। নিশ্বাস আটকে আসছে তাঁর। একমুহূর্তও দাঁড়িয়ে থাকতে পারছেন না গোরস্তানে। বৃষ্টি কমে আসায় এবার যাবেন বলেই সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু পা বাড়াতেই তাঁর হাতে একটা হ্যাঁচকা টান দিল সিদ্দিক, ‘কই যান স্যার? আমার কব্বরের লাশ আইছে। দাফন দেইখা যান।’
স্থাণু হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন ফয়েজ আহমেদ। গোরস্তানের গেটে থেমেছে পিকআপ ভ্যানটা। অন্ধকার গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। পিকআপ থেকে মরদেহ নামাচ্ছে মৃতের আত্মীয়রা। আবার শুরু হয়েছে বৃষ্টি। তিনি কি ভুল দেখলেন! সাদা পাঞ্জাবি গায়ে কাকে দেখলেন তিনি? শিরিনের ছোট ভাই আফাজ এখানে কী করে! আর আফাজের পাঞ্জাবির কোনা ধরে কি দীপ্র দাঁড়িয়ে আছে? অসম্ভব। হতেই পারে না। তিনি এগিয়ে যেতে চাইলেন, গাছের শিকড়ের মতো কিছু একটা মাটির নিচ থেকে আঁকড়ে ধরল তাঁর পা।
শব্দ করে ডাকলেন; কিন্তু এইমাত্র মুর্দা নিয়ে আসা পিকআপের যাত্রীরা তাকাল না কেউই। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন, দীপ্রর পাঞ্জাবি ভিজে যাচ্ছে বৃষ্টিতে। ছেলেটা আবার জ্বর বাধাবে। তিনি আবারও ডাকলেন দীপ্রকে। না, কেউ তাকায়নি। তাঁর শব্দ শুনছে না কেউ!
শবযাত্রীর দলে আরও পরিচিত মুখ দেখতে পাচ্ছেন ফয়েজ। তারই গা ঘেঁষে মরদেহের খাটিয়া নিয়ে সবাই গেল নতুন কাটা সিন্দুক কবরটার কাছে। সিদ্দিককে দেখা যাচ্ছে। লাশ নামাতে কবরের ভেতরে নেমেছে সে। পানির ভেতরই কি নামাচ্ছে ওরা? কিন্তু কার লাশ? কাফনের কাপড়ে মৃতদেহের মাথার কাছটায় গেরো দেওয়া। মুখ দেখার উপায় নেই।
কবরের চারপাশে দাঁড়িয়ে পড়েছে সবাই। চাটাই দেওয়া হচ্ছে। ফয়েজ আহমেদের নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। তিনি কি আসলে বাসা থেকে বের হয়ে বাসে উঠেছিলেন? মনে পড়ছে না।
পুরোপুরি নিশ্বাস আটকে আসছে ফয়েজের। সামনে ঘিরে ধরছে অন্ধকার। আশ্চর্য, এতক্ষণ যে গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ছিলেন, দেখতে পাচ্ছেন না সেটা! পায়ের আওয়াজ পাচ্ছেন। গুম গুম শব্দ হচ্ছে সবার ফিরে যাওয়ার। চিৎকার করে ছেলের নাম ধরে ডাকলেন তিনি, জবাব না পেয়ে ডাকলেন সিদ্দিককে। অবাক ব্যাপার, সবার পায়ের শব্দ ক্ষীণ হয়ে যাওয়ার আওয়াজ পাচ্ছেন; কিন্তু তাঁর ডাক শুনছে না কেউ! একবার মনে হলো, অল্প বয়সী একটা মেয়ে দ্রুত সরে গেল পাশ দিয়ে। তখনই ‘আইজ থিকা আর কব্বর কাটুম না’ বলে অট্টহাসি দিল কেউ একজন।

নির্বাক মানবতা

শিশুটির বয়স হতে পারে বছর খানেক। কিংবা তার চেয়ে কিছুদিন বেশি। বাঁ দিকে উপুড় হয়ে চোখ বুজে শুয়ে আছে শুভ্র এক শিশু। গায়ে ভেজা লাল শার্ট, নেভি-ব্লু হাফ প্যান্ট আর পা জোড়ায় ছোট্ট জুতা। দেখে মনে হবে ঘুমিয়ে আছে। চারপাশে খেলা করছে পবিত্র এক আভা। কিন্তু বাস্তবে এ এক ভিন্ন দৃশ্য। তার নিথর প্রাণহীন দেহের চারপাশে সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ছে। তার মাথা খানিকটা ডেবে গেছে সৈকতের বালিতে। এই শিশুটিই ভূ-মধ্যসাগরে ডুবে যাওয়া ১২ জন ইউরোপগামী অভিবাসন-প্রত্যাশীর একজন। বিশাল সমুদ্রেরও হয়তো নিজের ভেতর তাকে ধারণ করতে বুক কাঁপছিল। এজন্যই ঢেউয়ের তোড়ে সৈকতে ঠেলে দিয়েছে তার দেহকে। আর শিশুটির এমন ছবিই ছড়িয়ে পড়েছে তুরস্কের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। তাকে অভিহিত করা হচ্ছে ‘ভাসমান ধ্বংসপ্রাপ্ত মানবতা’র প্রতিচ্ছবি হিসেবে। বৃটেনের বেশির ভাগ সংবাদপত্রের প্রধান শিরোনাম এ ছবিটিকে ঘিরে। এ খবর দিয়েছে সিএনএন ও আল-জাজিরা।
কেউ বলছেন, তাদের আশা ছিল, এ ছোট্ট ছেলেটির নিস্তেজ শরীরের ছবিটির কারণে ইউরোপগামী শরণার্থীদের স্রোত মোকাবিলার উপায় নিয়ে চলমান বিতর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক বাঁক নেবে। চোখে আঙ্গুল দিয়ে রাজনীতিকদের ব্যর্থতা দেখিয়ে দেবে ছবিটি। আত্ম-ব্যর্থতায় দগ্ধ হবে কিছুটা মানবিক হবেন দোর্দণ্ড প্রতাপশালীরা। কিন্তু অচিরেই তারা বুঝেছেন, আশা কুহকিনী বৈ অন্য কিছু নয়। এজন্যই হয়তো প্রভাবশালী দৈনিক দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের শিরোনাম- ‘এ ছবিগুলোও যদি ইউরোপকে পাল্টাতে না পারে, তবে কি পারবে?’।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের উপ-পরিচালক নাদিম হওরি ছবিটিকে বলছেন, ‘গা ছমছমে’। আসলেই তাই। এ ছবি হয়তো অনেকদিন তাড়িয়ে বেড়াবে বিশ্বজুড়ে অসংখ্যা মানবতাবাদীকে। নাদিমের মতে, এটিই সামগ্রিক ব্যার্থতার সবচেয়ে সপষ্ট প্রতিবিম্ব। তুরস্কের বুরহান আকমান শুধু লিখেছেন, গোটা পৃথিবীর জন্য একরাশ লজ্জা। আমি ছবিটিতে শুধু মানুষ দেখছি, মানবতার ছোঁয়া দেখছি না।
লন্ডনের প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রথম পৃষ্ঠাজুড়ে ছেপেছে হতভাগা এ শিশুর ছবি। সেখানে ক্যাপশন আকারে মাত্র চারটি লাইন লেখা হয়েছে। এতে লেখা হয়েছে ‘সামবডিজ চাইল্ড’। এতে ওই শিশুটিকে সিরিয়ান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তুরস্ক থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে পরিবারের সঙ্গে সে ডুবে মারা গেছে। ইউরোপে প্রবেশ করতে মানবতার সঙ্কট বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে ডেইলি এক্সপ্রেস লিখেছে, ‘মানবিক এ সঙ্কটের জন্য ইইউ দায়ী’। মেট্রো পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠাজুড়ে শিশুটির ছবি প্রকাশ করা হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, একজন উদ্ধারকর্মী শিশুটিকে দুই হাতে কোলে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। শিরোনামে বলা হয়েছে- ‘ইউরোপ তাকে বাঁচাতে পারেনি’। দ্য টাইমসেও প্রায় একই রকম ছবি ছাপা হয়েছে। এর শিরোনাম ‘ইউরোপ ডিভাইডেড’। ডেইলি মেইলও একই কাজ করেছে। এর শিরোনাম ‘ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের শিকার ছোট্ট শিশু’। দ্য সানের শিরোনাম ‘জীবন এবং মৃত্যু’। ডেইলি মিররের শিরোনাম ‘অসহনীয়’। দ্য গার্ডিয়ানের শিরোনাম ‘হতাশাজনক, নিষ্ঠুরতায় ইউরোপে শরণার্থী সঙ্কট’।
শিশুটির নাম জানা যায়নি। কেউ জানে না, তার যাত্রা শুরু হয়েছিল কোথা থেকে। তবে তুরস্কের মুগলা প্রদেশের গভর্নরের কার্যালয় বলেছে, একদল সিরিয়ান শরণার্থীদের সঙ্গে ছিল শিশুটি। দুইটি নৌকায় করে তারা ভূ-মধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিক দ্বীপ কোসে পৌঁছতে চেয়েছিলেন। নৌকার কয়েকজনকে উদ্ধার করতে পেরেছে তুরস্কের উদ্ধারকারী দল। কিন্তু এখন পর্যন্ত ওই দলের ২ পুরুষ ও ১ শিশু নিখোঁজ। প্রসঙ্গত, ভূমধ্যসাগর পার হয়ে ইউরোপে পাড়ি জমাতে গিয়ে কেবল এ বছরই মারা গেছে ২৬০০ জনেরও বেশি। বিশ্বে এ বছর যত অভিবাসী বা অভিবাসন-প্রত্যাশীর মৃত্যু হয়েছে, গড়ে তাদের চার জনের তিন জনই মারা গেছেন ভূ-মধ্যসাগরে। গত বছরের (২২২৩) চেয়ে এ বছর মৃত্যুর পরিমাণ ২০ শতাংশ বেশি। এদের কেউ ডুবে গেছেন অতল সমুদ্রে। কেউবা মারা গেছেন পদপিষ্ট হয়ে। কেউ আবার নৌকার ইঞ্জিনের ধোঁয়ায় নিঃশ্বাস নিতে না পেরে। নাম না জানা ওই শিশুটিও হয়তো এদের কোনো এক দলের হবে।

আইআরআইয়ের জরিপ- দুর্নীতি নিয়ে উদ্বেগ বাংলাদেশীদের: দ্রুত নির্বাচনের পক্ষে তারা

বাংলাদেশীদের উদ্বেগ দুর্নীতি নিয়ে। এই সমস্য সমাধানে সরকারের গৃহীত উদ্যোগ কম বলে মনে করে দেশবাসী। দ্রুত জাতীয় নির্বাচনের পক্ষে বেশির ভাগ মানুষ। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের চেয়ে জনসমর্থন বেশি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। এসব কথা বলা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট নামের একটি সংস্থার মতামত জরিপে। এতে বলা হয়েছে পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে জনগণের মধ্যে বিভক্তি আছে। জরিপে অংশগ্রহণকারী ২৪ শতাংশ মানুষ মনে করেন বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা দুর্নীতি। তবে ১৬ শতাংশ মনে করেন প্রধান সমস্যা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। অন্যদিকে ১৫ শতাংশ মানুষ মনে করেন নিরাপত্তা সমস্যাই বড়। আইআরআই এ বছরের মে ও জুন মাসে ২৫২৫ জনের ওপর এ জরিপ পরিচালনা করে। এ জরিপের ফল প্রকাশ হয় যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় বুধবার। এতে বলা হয়েছে, জরিপে মতামত দেয়া শতকরা ৬২ শতাংশ বিশ্বাস করেন দেশ সঠিক নেতৃত্বেই চলছে। এর আগের জরিপে এ ব্যাপারে মত ছিল শতকরা ৫৬ শতাংশের। শতকরা ৭২ শতাংশ মানুষ মনে করেন দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ইতিবাচক। ৬৮ শতাংশ মানুষ মনে করেন দেশের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ভালো। বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ইতিবাচক বলে মনে করেন ৬৪ শতাংশ মানুষ। নির্বাচনী সহিংসতা ও হরতাল কমে আসার ব্যাপারটিও জরিপে উঠে এসেছে। জরিপে দেখা গেছে দুর্নীতি রোধে সরকার সম্পৃক্ত। তবে দুর্নীতি রোধ সরকার করতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয়ে আছেন ৪৭ শতাংশ উত্তরদাতা। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠানের দেড় বছর পার হলেও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি সমর্থন বেড়েছে। সরকারের প্রতি ৬৬ শতাংশ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি সমর্থন ৬৭ শতাংশে পৌঁছেছে। স্থানীয় এক মিডিয়ায় বলা হয়, আগামী জাতীয় নির্বাচনের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে উত্তরদাতারা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েন। ৪৩ শতাংশ মনে করেন শতাংশ অতিসত্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়া দরকার। ৪০ শতাংশ অংশগ্রহণকারী মনে করেন, এই সরকার মেয়াদ পূর্ণ করেই তবেই নতুন সংসদ নির্বাচন দেয়া উচিত। এর আগে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে আইআরআইয়ের জরিপে দেখা গিয়েছিল যে,৪০ শতাংশ চান অবিলম্বে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হোক। অপরদিকে ৪৫ শতাংশ চান বর্তমান সরকার তার মেয়াদ পূর্ণ করুক। এক্ষেত্রে অতিসত্বর নির্বাচনের পক্ষে রায় পড়েছে বেশি। দুর্নীতির প্রশ্নে জরিপে অংশ নেয়াদের ১১ শতাংশ বলেছেন তারা ঘুষ দিয়েছেন। তাদের প্রায় অর্ধেকেরও বেশি বলেছেন তারা অন্তত ৫ হাজার টাকা (প্রায় ৬৫ ডলার) ঘুষ দিয়েছেন।

ভারতের সেনাপ্রধানের হুমকি ফাঁকা বুলি

ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল দলবীর সিং সোহাগের হুমকিধমকি ফাঁকা বুলি ছাড়া কিছুই না। ভারতও পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে প্রস্তুত- মঙ্গলবার দলবীরের ওই উসকানিমূলক বক্তব্য এমন তাচ্ছিল্য ভাষায় উড়িয়ে দিয়েছে পাকিস্তান। মঙ্গলবার ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের ‘গোল্ডেন জুবলি’ উদযাপন অনুষ্ঠানে দলবীর সিং বলেছিলেন, জম্মু ও কাশ্মীরে অস্থিরতা সৃষ্টির আভাস পাওয়া গেছে। পাকিস্তান থেকে এমন ক্রিয়াকলাপ লক্ষণীয় হলে তা প্রতিহত করতে ভারত ‘সীমিত যুদ্ধের’ জন্য প্রস্তুত বলে হুমকি দেন তিনি। এর জবাবে বুধবার পাকিস্তান পাল্টা হুশিয়ারি দিয়ে জানায়, ইসলামাবাদের সেনাবাহিনী তাদের ভূখণ্ডের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা রক্ষা করতে যথেষ্ট শক্তিশালী। খবর ইন্ডিয়া টুডের।
পাকিস্তানের সরকারি কার্যালয় থেকে বুধবার ঘোষণা দেয়া হয়, পরমাণু শক্তিধর পাক-ভারতের মাঝে কোনো সীমিত যুদ্ধের সম্ভাবনা নেই। দলবীর সিং যা বলেন তা নিতান্তই ফাঁকা বুলি। গত সপ্তাহে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী খাজা মোহাম্মদ আসিফ ভারতকে হুশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, ইসলামাবাদকে যুদ্ধে জড়ানোর চেষ্টা করলে তার পরিণাম হবে ভয়াবহ। তিনিও বলেছিলেন, দেশ দুটির মাঝে কোনো খণ্ড যুদ্ধের সম্ভাবনা নেই। আসিফ আরও বলেছিলেন, ‘আমাদের ওপর যে কোনো হামলার ধরন নির্ভর করবে আমাদের চাওয়া ও প্রতিক্রিয়ার মধ্যে।’ ২০০৩ সালের যুদ্ধ বিরতি চুক্তির পর বারবার দুই দেশ তা লংঘনের কারণে সম্পর্ক তলায় ঠেকেছে। এরই মাঝে পরস্পরের মধ্যে নানা উসকানিমূলক বাক্যবাণ ছোড়াছুড়ির ফলে অবস্থার অবনতি আরও ত্বরান্বিত হচ্ছে। আগস্টে জাতীয় পর্যায়ের উপদেষ্টাদের মধ্যে বৈঠকটিও অনুষ্ঠিত হয়নি দরকষাকষির রোষানলে পড়ে।

বেসরকারি খাতে গেল তিন কনটেইনার জাহাজ

চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পানগাঁওয়ে নৌপথে কনটেইনার পরিবহনে প্রত্যাশিত সাড়া না পেয়ে অবশেষে নিজেদের কেনা ৩টি জাহাজ পরিচালনা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিল চট্টগ্রাম বন্দর। বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে ৩টি জাহাজ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সামিট গ্র“পের কাছে নৌপরিবহনমন্ত্রীর মাধ্যমে হস্তান্তর করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। এ সময় মন্ত্রী শাজাহান খান বলেন, জাহাজ পরিচালনা বন্দরের কাজ নয়। এছাড়া বন্দরের সে পরিমাণ লোকবলও নেই। তাই জাহাজগুলো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে ভাড়া দেয়া হয়েছে।
এতে মাসে ৪২ লাখ টাকা আয় হবে বন্দরের। জাহাজ কেনাকে টাকার অপচয় বলে যারা সমালোচনা করেছে তাদের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে মন্ত্রী বলেন, এটা কোনোভাবেই টাকার অপচয় নয়। যে কোনো কাজই শুরুর দিকে কিছুটা লোকসান গুণতে হয়। এখানেও শুরুর দিকে কিছুটা লোকসান গুণতে হবে। হরতাল ও অবরোধে সড়ক পথের বিকল্প হিসেবে ২০১৩-এর ডিসেম্বরে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পানগাঁও রুটে কনটেইনার পরিবহন শুরু হয়। অথচ ৫০ কোটি টাকায় কেনা বন্দরের ৩টি জাহাজ গত দেড় বছরে এই রুটে মাত্র ১ হাজার ২শ’ টিইইউস কনটেইনার পরিবহন করেছে। অতিরিক্ত ভাড়া, সময় বেশি লাগাসহ নানা সমস্যায় আমদানি ও রফতানিকারকরা এই রুট ব্যবহার করছে না।

আমি একটা নীল নয়না চাই!

‘আমি একটা নীল নয়না চাই, যার গায়ের রং ধূসর, গড়নে হালকা-পাতলা, জাতিতে ইয়াজিদি, বিনিময়ে যে কোনো মূল্য মেটাব’Ñ ইসলামিক স্টেটের (আইএস) যৌনদাসী ক্রয়-বিক্রয় হাটে এভাবেই নিজের মতো দাসীর বায়না দিচ্ছেন এক ক্রেতা। ইরাক-সিরিয়ার আইএস মুল্লুকের যৌন হাটগুলোতে এমন দৃশ্য এখন হরহামেশাই চোখে পড়ে। দাস বাজারগুলোতে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে হরদমে চলছে এ রমরমা ব্যবসা। সম্প্রতি এ বর্বর জঙ্গিগোষ্ঠীর হাত থেকে পালিয়ে এসেছেন ইয়াজিদি তরুণী জিনান (১৮)। ২০১৪ সালে এ গোষ্ঠীর হাতে বন্দি হওয়ার পর থেকে যেসব লোমহর্ষক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন তা তার রচিত ‘দায়েস’স স্লেভ’ নামক বইয়ে তিনি বর্ণনা করেছেন। এই বইয়ে বর্ণিত একটি ঘটনাই এটা। ফরাসি সাংবাদিক থিয়েরি ওবেরলের সহযোগিতায় রচিত বইটি শুক্রবার প্যারিস থেকে প্রকাশ করা হবে। বুধবার এ খবর প্রকাশ করেছে এএফপি। অপহরণ, অত্যাচার, ধর্ষণ নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে এ জঙ্গিদের। জিনান তার বইটিতে বলেন, যৌনদাসী হিসেবে নারীদের ক্রয়-বিক্রয় ব্যবসায় রামরাজত্বের লীলায় মেতে আছে আইএস। সম্প্রতি এ ব্যবসা বেশ জমজমাট। আর সুন্দরী,
লাবণ্যময়ী, অপরূপ আকর্ষণীয় মেয়েদের বিশেষ ভোক্তা হল সিরিয়া, তুরস্ক ও উপসাগরীয় রাষ্ট্রের ক্রেতারা। সামান্য একটি পিস্তল বা ১৫০ ডলারের বিনিময়ে হয় একটি শ্যামাঙ্গিনী। ঘৃণ্য ও জঘন্য এসব অপকর্মের মাধ্যমেই যুদ্ধের পুঁজি জোগার করছে আইএস। সবচেয়ে আকর্ষণীয় ললনাদের বিক্রি করা হয় উপসাগরীয় দেশগুলোর ক্রেতাদের কাছে। আইএসের ‘যৌন হাটের’ এক ক্রেতা এ কথা বলছিল বলে তিনি বইটিতে উল্লেখ করেছেন। আইএসের হাতে বন্দিদশায় একটি ঘরে আটকে আরও অনেক মেয়েদের অমানুষিক অত্যাচার করা হয়। জোর করে ধর্মান্তরের চেষ্টা করে তারা। অস্বীকার করলে প্রহার ও শেকল বাঁধা অবস্থায় রোদে দাঁড় করিয়ে রাখা হতো। পান করানো হতো গ্লাসে ইঁদুর মরা ডোবানো পানি। এমনকি বৈদ্যুতিক শক দেয়ারও হুমকি দেয়া হতো। এসব অত্যাচারের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে জিনান এখন ইরাকের কুর্দিস্তানে একটি ইয়াজিদি আশ্রয় শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে। খুঁজে পেয়েছে তার স্বামীকে। এখন তার একটাই প্রার্থনা, একটাই কামনা, একটাই অভিশাপ- আইএস যেন ধ্বংস হয়!

দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের চ্যালেঞ্জ by আনু মুহাম্মদ

দেড় শ কোটিরও বেশি মানুষের বাস এই দক্ষিণ এশিয়ায়। যেসব বহুল প্রচলিত কাঠি ব্যবহার করা হয় উন্নয়ন মাপার জন্য, তার কয়েকটিতে বেশ সন্তোষজনক চেহারাই দেখা যায় অঞ্চলের। বিশ্বের গড় হার বিবেচনায় এই অঞ্চলের দেশগুলোর প্রবৃদ্ধির হার ভালো, কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিরাপদ, মুদ্রাস্ফীতি আয়ত্তের মধ্যে, বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে যোগাযোগ সম্প্রসারণশীল, সব কটি অর্থনীতিই আমদানি-রপ্তানি উদারীকরণে এগিয়ে, বিনিয়োগ হার ভালো ইত্যাদি ইত্যাদি। তা ছাড়া উর্বর জমি, মৎস্যসম্পদ, পানিসম্পদ, খনিজ সম্পদ, ভূবৈচিত্র্য, সমুদ্রসম্পদ, প্রাণবৈচিত্র্য, ভাষা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ইত্যাদি সবদিক থেকেই এই অঞ্চল অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ‘উন্নয়ন’ নামে মুনাফা উন্মাদনার আগ্রাসনে অনেক ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও এখনো এই অঞ্চল অনেক সম্ভাবনাময়।
প্রচলিত মাপকাঠিতে পরিসংখ্যান অনেক ভালো খবর দিলেও পাশাপাশি তা এটাও বলছে যে পুরো দক্ষিণ এশিয়া এখন বিশ্বের চরম দরিদ্র জনগোষ্ঠীর শতকরা প্রায় অর্ধেক মানুষের অঞ্চল, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি গরিব মানুষ কেন্দ্রীভূত এই অঞ্চলে। জাতিসংঘের ‘বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচক’ (Multidimensional Poverty Index) অনুযায়ী বিশ্বের দরিদ্রদের এক-চতুর্থাংশ আফ্রিকায় বাস করে, আর অর্ধেক বাস করে দক্ষিণ এশিয়ায়। এই সমীক্ষায় আরও বলা হয়েছে, আফ্রিকার ২৬টি দরিদ্রতম দেশের চেয়ে বেশিসংখ্যক দরিদ্র মানুষ ভারতের আটটি রাজ্যে বাস করে। বলা হয়, এই সূচক অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ায় দরিদ্র মানুষের অনুপাত শতকরা ৫৫। যদি দিনপ্রতি আয় দুই ডলার ধরে দারিদ্র্য পরিমাপ করা হয়, তাহলে জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী এই অঞ্চলের শতকরা ৭৭ জন মানুষই দারিদ্র্যসীমার নিচে। বিশুদ্ধ পানি, শিক্ষা, চিকিৎসা, আশ্রয়—সব কটিতেই এসব দেশের বেশির ভাগ মানুষ বিপন্ন অবস্থায় আছে। শ্রেণিগত, জাতিগত, লিঙ্গীয়, ধর্মীয়, বর্ণগত বৈষম্য নিপীড়নে ক্ষতবিক্ষত শতকোটি মানুষ। প্রচলিত মানব উন্নয়ন সূচক বিবেচনা করলে শ্রীলঙ্কা ছাড়া সব কটি দেশই ১২০-এর পরে।
শ্রেণি ও লিঙ্গীয় বৈষম্য নিপীড়নে সব কটি দেশেই কমবেশি একই চিত্র। এ ছাড়া ভারতে বিশেষভাবে বর্ণ ও জাতিগত বৈষম্য ও নিপীড়ন, পাকিস্তানে শিয়া-সুন্নি-আহমদিয়া, বাংলাদেশে জাতিগত নিপীড়ন, শ্রীলঙ্কায় জাতিগত নিপীড়ন ও সংঘাত এবং এসব দেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। গত কয়েক দশকে, বিশেষত নব্বইয়ের পর সব কটি দেশেই জাতিবিদ্বেষী, সাম্প্রদায়িক-ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী শক্তির উত্থান ঘটেছে।
গত কয়েক দশকের উন্নয়ন ধারায় এই দেশগুলোয় খুবই ক্ষুদ্র অংশের মধ্যে বিপুল ঐশ্বর্যের ছড়াছড়ি, নির্লজ্জ মাত্রার ভোগবিলাস ও চোরাই অর্থনীতির দাপট বেড়েছে। ভারত ও পাকিস্তানে শুধু যুদ্ধ উন্মাদনাতেই বিপুল সম্পদ ব্যয় হয়। দারিদ্র্য-নিরক্ষরতা-বঞ্চনাভরা দুটো দেশের শাসকেরাই বিপুল অর্থব্যয়ে ভয়ংকর পারমাণবিক বোমা বানিয়ে গর্বিত এবং জনগণের মধ্যে এই গর্ব উন্মাদনা ছড়ানোতে তৎপর।Õ স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিপরি) সংকলিত তথ্য অনুযায়ী ভারত বর্তমান বিশ্বের সর্ববৃহৎ অস্ত্র আমদানিকারক এবং পাকিস্তান তৃতীয় বৃহত্তম দেশ। দারিদ্র্যের পাশাপাশি ঐশ্বর্যের আর ধ্বংস উন্মাদনার এ রকম অশ্লীল সহাবস্থান খুব কম অঞ্চলেই আছে।
বাংলাদেশ, ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের মধ্যে তাই যোগাযোগ বাড়ানো দরকার, কথা বলা দরকার, সংহতি দৃঢ় করার জন্য বিতর্ক করা দরকার দারিদ্র্য বঞ্চনার কদর্য চেহারা আর প্রাচুর্যের জৌলুশ; মুক্ত চিন্তার পাশাপাশি উগ্র সাম্প্রদায়িকতা ও বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি; ক্রমবিস্তারমান বিরাজনীতিকৃত মধ্যবিত্তের পাশে বিভিন্ন প্রান্তে অপমানিত-বঞ্চিত কোটি মানুষের অদম্য লড়াই; গণতন্ত্রের চর্চার পাশাপাশি নিপীড়নের বর্বরতা ও ক্রমবর্ধমান সামরিকীকরণ ইত্যাদি বৈপরীত্য নিয়েই দক্ষিণ এশিয়া। এই অঞ্চলে মিয়ানমার ছাড়া আর কোনো দেশেই এখন প্রত্যক্ষ সামরিক শাসন নেই, কিন্তু সব দেশেই সামরিকীকরণ বেড়েছে। প্রায় সব কটি দেশেই নির্বাচিত সরকারের অধীনে একের পর এক ‘নিরাপত্তা আইন’, ‘নিরাপত্তা ব্যবস্থা’ আর দমনমূলক নানা ব্যবস্থার সম্প্রসারণ দেখা যাচ্ছে।
পুরো দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়ন ও মূলধন সংবর্ধনের ধরন, বিশ্ব পুঁজি ও সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে তার যুক্ততা, করপোরেট স্বার্থে মানুষ ও প্রকৃতিবিরোধী আগ্রাসন ইত্যাদিতে রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের ঐক্য আছে। ঐক্য আছে নিপীড়নমুখী রাষ্ট্রের শক্তি বৃদ্ধির অবিরাম চেষ্টায়। মার্কিন নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থায় কমবেশি অঙ্গীভূত সব কটি দেশই। ‘সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধ’ এখন সব দেশের শাসকদেরই নিজ দেশের জনগণের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস বিস্তারের প্রিয় কৌশলসূত্র।
রাষ্ট্র ও জনগণ সমার্থক নয়। অখণ্ড কোনো দেশ নেই, একক সত্তা বলে কোনো কিছু নেই। জাতীয়তাবাদী কিংবা ধর্মান্ধ আওয়াজ তুলে রাষ্ট্র নিজের পেছনে মানুষকে জমায়েত করতে চায়, সংঘাত আর বৈরিতার দেয়াল তুলতে চায় জনগণের মধ্যে। কিন্তু সব দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের স্বার্থ অভিন্ন। সব দেশেই করপোরেট জগতের একটি অভিন্ন প্রচার আছে। যারা মানুষের জীবন-জীবিকার পক্ষে দাঁড়ায়, যারা ভুল প্রতিশ্রুতিতে নির্মিত বাঁধের জন্য উচ্ছেদ হওয়া কোটি কোটি মানুষের লড়াইয়ে শামিল, যারা নির্বিচার রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড, লক্ষ কোটি মানুষ উচ্ছেদ করে ‘করপোরেট হাব’ বানানোর বিরোধী, যারা জনগণের শিক্ষা ও চিকিৎসা অধিকার নিয়ে সোচ্চার, তাদেরই, বাংলাদেশের মতোই, ভারতেও ‘উন্নয়নবিরোধী’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। উন্নয়ন দর্শনে রাষ্ট্রগুলোর সংহতি আছে, সেখানে কাঁটাতার নেই। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভারতের সঙ্গে অন্য দেশের জনগণের যোগাযোগ খুবই কম, মাঝখানে দৃশ্যমান অদৃশ্য অনেক রকম কাঁটাতার।
সব দেশে পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকলেও আমরা যারা অভিন্ন স্বপ্ন নিয়ে লড়াই করি, তারা মানুষের জীবনকে কেন্দ্রে রেখে উন্নয়ন বিচার করি। আর তাই প্রকৃতি-পানি-মাটি রক্ষা আমাদের কর্তব্য জ্ঞান করি। আমাদের কাছে শিক্ষা-চিকিৎসা অধিকার, ব্যবসায়ীর পণ্য নয়। আমরা নদী, পানি, বন ও খনিজ সম্পদকে আমাদের সবার সম্পত্তি মনে করি; এগুলো কোনোভাবে মুনাফাখোরদের হাতে যেতে দিতে চাই না। আমাদের কাছে মানুষের মর্যাদা সবার ওপরে, লিঙ্গ বা ধর্ম বা বর্ণ বা ভাষা বা জাতি নয়। আমরা মনে করি, এই বিশ্বে মানুষের জন্য সম্পদের কোনো অভাব নেই, কিন্তু লুটেরা দস্যুদের জন্য সেই সম্পদ মানুষের হাতছাড়া অথবা বিপর্যস্ত। তাদের দখল লোভের জন্যই যুদ্ধ সংঘাত নিপীড়ন আর এই রাষ্ট্রব্যবস্থা। এর বিরুদ্ধে মানুষের দক্ষিণ এশিয়ার কণ্ঠ অভিন্ন, জীবন ও মরণ অভিন্ন লক্ষ্যে নিয়োজিত।
আশার কথা এই যে মানুষ নির্দিষ্ট মডেলের পতনে থেমে নেই, সব দেশেই জনগণের বিভিন্ন মাত্রার লড়াই আছে জল-জমি-জঙ্গলের ওপর নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, লড়াই আছে করপোরেট আগ্রাসন ও সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের বিরুদ্ধে, লড়াই আছে শ্রেণি, জাতি, ধর্মীয়, লিঙ্গীয় নিপীড়ন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে, লড়াই আছে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিরুদ্ধে। এসব লড়াইয়ের মধ্যে যে ঐক্যসূত্র আছে, তা থেকেই আমরা একটি মুক্ত দক্ষিণ এশিয়ার স্বপ্ন দেখতে পারি, যেখানে করপোরেট স্বার্থ নয়, বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের স্বার্থে সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারের মধ্য দিয়ে উন্নয়নের নতুন চেহারা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। গণতন্ত্র, সাম্য ও মর্যাদা নিয়ে নতুন ইতিহাস পর্বে প্রবেশ করবে এই এলাকার মানুষ। কিন্তু এর জন্য জনগণের লড়াই ও মুক্ত চিন্তার যে সংহতি দাঁড় করা দরকার, সেখানে বড় ঘাটতি আছে।
বাংলাদেশ, ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের মধ্যে তাই যোগাযোগ বাড়ানো দরকার, কথা বলা দরকার, সংহতি দৃঢ় করার জন্য বিতর্ক করা দরকার। প্রাথমিক পর্যায়ে নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় ঐক্যবদ্ধভাবে কাজের ক্ষেত্র তৈরি করে আমরা এই যাত্রা জোরদার করতে পারি। যেমন: প্রথমত, সর্বজনের মুক্ত বিশ্বের রূপকল্পের সঙ্গে সংগতিপূর্ণভাবে মুক্ত দক্ষিণ এশিয়ার রূপকল্প দাঁড় করানো এবং তা মানুষের চিন্তা ও সক্রিয়তায় আনার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া। দ্বিতীয়ত, দক্ষিণ এশিয়ার সব সম্পদ, বিশেষত খনিজ সম্পদ ও পানিসম্পদ যাতে সব মানুষের কাজে সর্বোত্তম ব্যবহার করা সম্ভব হয়, সে জন্য আঞ্চলিকভাবে পরিকল্পনা প্রণয়ন বা নকশা তৈরির কাজ। এটা হবে বিশ্বব্যাংক, ইউএসএআইিড ও দেশি-বিদেশি ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর মুনাফামুখী উন্নয়ন কৌশলের পাল্টা নকশা। তৃতীয়ত, নদী ও পানিপ্রবাহ নিয়ে, সবার অধিকারে স্বীকৃতি দিয়ে, সমন্বিত চিন্তা ও পরিকল্পনা মূর্ত করা। চতুর্থত, সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ, শ্রেণি-লিঙ্গ-জাতি-বর্ণগত নিপীড়ন ও বৈষম্যবিরোধী আমাদের চিন্তা ও লড়াইকে পরস্পরের কাছে পরিষ্কার রাখা এবং সমন্বয় করা।
কয়েক হাজার একর জমি নিয়ে ভারত-বাংলাদেশ বিরোধ জিইয়ে ছিল ৬৮ বছর। ১৯৭৪ সালে মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির পর বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও ভারত এত দিন এটা আটকে রেখেছিল। এর জন্য দুই দেশের ছিটমহলে আটকে থাকা দুই দেশের মানুষের অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে এত বছর। ভারতের লোকসভা ও রাজ্যসভায় প্রায় সর্বসম্মতিক্রমে এ-সংক্রান্ত বিল পাস হওয়ার মধ্য দিয়ে এটা পরিষ্কার হলো যে ইচ্ছা করলে সহজ কাজ কত সহজে করা যায়! এত বছর পরে হলেও অচলাবস্থার অবসান ঘটেছে, সে জন্য আমরা খুশি। আমরা চাই এখন সীমান্ত হত্যা বন্ধ হবে, কাঁটাতারের বেড়া থেকেও বাংলাদেশ মুক্ত হবে। আমরা চাই অভিন্ন নদী নিয়ে আমাদের বিপর্যয়ের অবসান হবে। আমরা চাই ট্রানজিট নিয়ে লুকোচুরি, অস্বচ্ছতা ও আগ্রাসী তৎপরতা বন্ধ হবে। আমরা চাই, সুন্দরবনধ্বংসী সব প্রকল্প থেকে বাংলাদেশ ও ভারত যৌথ ঘোষণা দিয়ে সরে যাবে এবং সুন্দরবন বিকাশে মন দেবে।
আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
anu@juniv.edu