Saturday, May 4, 2019

চীনা শিল্পীর স্কেচে খালেদার কারাজীবন

ইন্দোনেশিয়ার ব্যানার নিউজ নামক একটি সংবাদ মাধ্যম বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জেল জীবন নিয়ে কয়েকটি স্কেচ প্রকাশ করেছে। স্কেচগুলো এঁকেছেন চীনের খ্যাতিমান শিল্পী ওয়াং লিমিং। খালেদা জিয়ার জেল জীবন কেমন তা ফুটিয়ে তুলতে কল্পনার আশ্রয় নিয়েছেন এই শিল্পী।
এ ছাড়া সত্যিকারে খালেদা জিয়া কেমন আছেন তা জানতে তিনি নানাভাবে তথ্য সংগ্রহ করেছেন। ওয়াং লিমিং রাজনৈতিক কার্টুন এঁকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। বর্তমানে তিনি রেডিও ফ্রি এশিয়াতে কর্মরত। তিনি নিজেকে ‘রেবেল পিপার’ নামে পরিচয় দেন। স্কেচগুলো আঁকতে তাকে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করেছেন বাংলাদেশে ব্যানারের প্রতিবেদক কামরান রেজা চৌধুরী।

ব্যানার নিউজের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে দুর্নীতির দায়ে খালেদা জিয়া ১ বছর ধরে বন্দি।
তার কক্ষে কারও প্রবেশের অনুমতি নেই। ফলে সেখানকার অবস্থা সমপর্কে জানার সুযোগ কম। প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি বন্দি হওয়ার পর থেকে কোনো সাংবাদিক বা ফটোগ্রাফার সেখানে তার সঙ্গে দেখা করতে পারেননি। ফলে ৭৩ বছর বয়সী সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেমন কক্ষে রয়েছেন সে সমপর্কে সপষ্ট ধারণা পাওয়া যায় না। স্কেচগুলোর মধ্যদিয়ে সেই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করেছেন ওয়াং লিমিং।

এতে দেখা যায়, ২২৮ বছরের পুরনো কারাগারে আটক আছেন খালেদা জিয়া। সেখানে একটি ১০ঢ৮ ফুট কক্ষে অবস্থান করছেন তিনি। যাতে একটি টিভিও রয়েছে বিটিভি দেখার জন্য। একটি স্কেচে তাকে বাংলাদেশের একটা জাতীয় দৈনিক পড়তে দেখা যায়। ছবিতে আছে খালেদা জিয়ার জন্য ৬ঢ৬ ফুট বিছানা। এ ছাড়া দুটি চেয়ারসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র।

আরেকটি ছবিতে দেখা যায়, খালেদা জিয়ার কক্ষে একটি বিড়াল ইঁদুর শিকার করেছে। গত বছর জুন মাসে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, খালেদা জিয়ার কক্ষে বড় বড় ইঁদুর রয়েছে। তার ভিত্তিতেই এই কাল্পনিক চিত্রটি স্কেচে তুলে এনেছেন ওয়াং লিমিং। এ ছাড়া ব্যানার নিউজ কারাগারে খালেদা জিয়ার বিচারে আদালত স্থাপন এবং বর্তমানে তার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন থাকার তথ্যও উল্লেখ করা হয়।

চীনা গুপ্তচরের বয়ানে মুসলিম উইঘুর নির্যাতন

হ্যাঁ, প্রত্যেক দেশের নিজস্ব আইন রয়েছে। কিন্তু সর্বব্যাপী একটা আন্তর্জাতিক আদর্শও রয়েছে।
আমার মতে, ওরা এ আদর্শ চরমভাবে লঙ্ঘন করছে। নিজেদের মতো স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের অধিকার উইঘুরদের নেই আমাত একজন উইঘুর। ২০১২ সালে গুপ্তচরবৃত্তি শুরু করেন। কারণ কর্মকর্তারা তার মাকে গ্রেপ্তার করে নির্যাতন করছিল। আমাত ওদের হয়ে কাজ না করলে তাকে বন্দি করে রাখারও হুমকি দেয় কর্তৃপক্ষ।
‘আমি ছোটবেলা থেকেই ঠিক করেছিলাম মাকে সুরক্ষিত রাখব। কিন্তু আমি সেটা করিনি। ওরা যখন উনার সঙ্গে আমাকে দেখা করতে নিয়ে যায়, আমার এমন কষ্ট হয়েছিল!’ জানান আমাত।
আমাতের নিয়োগকর্তা ওকে গুপ্তচরবৃত্তির জন্য বিদেশেও পাঠিয়েছিলেন। বিশ্বজুড়ে গুপ্তচরবৃত্তির নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করতে আমাতকে ২০১২ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও তুরস্কের উইঘুরদের সঙ্গে মিশতে বলা হয়। বিশ্বজুড়ে বেইজিংয়ের ‘অসংখ্য’ ইনফর্মার রয়েছে বলে জানান তিনি।
‘আমি কারামায় নামের ছোট একটা টাউন থেকে এসেছি। আমার মতো আরও বহুজনকে পরিচালনা করেন আমার নিয়োগকর্তা। জিঞ্জিয়াংজুড়ে কয়েক ডজন এরকম ছোট শহর রয়েছে। আর বড় শহর তো আছেই। তার ওপর আছে আন্তর্জাতিক কার্যক্রম। আপনি ভাবতেই পারছেন কতগুলো চোখ নজরদারি করছে।’
চীন আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আরও সাহসী হয়ে উঠছে দাবি করে আমাত বলেন, ‘সরকার বিদেশেও উইঘুরদের অপহরণ করেছে।’ চীনে ফিরে যাওয়ার পর অনেকেই পুনঃশিক্ষা কেন্দ্রে নিখোঁজ হয়ে যান, বলেন তিনি।
উইঘুরদের যথেচ্ছভাবে গ্রেপ্তার করে আটকে রাখার অভিযোগ অস্বীকার করেছে চীনের সরকার। তারা বলছে, এসব কেন্দ্রে মানুষ ‘স্বেচ্ছায়’ পেশাগত প্রশিক্ষণ নিতে যায় এবং ‘চরমপন্থি’ মনোভাব দূর করার জন্য কাজের প্রশিক্ষণ দিতে এসব জায়গার নকশা করা হয়েছে।
আমাত বলেন, সরকার ‘ডাহা মিথ্যা’ বলছে এবং তিনি নিজে এমন বন্দিশালায় দেড় বছর আটক ছিলেন। মধ্যপ্রাচ্যে পালিয়ে গিয়ে মুসলিম যোদ্ধাদের সঙ্গ দিতে চাওয়ার অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
সাজাভোগ করার সময় কর্তৃপক্ষ তাকে গুপ্তচর হিসেবে নিযুক্ত করে। ইনফর্মার হতে রাজি হওয়ার পর তাকে বন্দিশালা পরিষ্কার করার কাজ দেওয়া হয়।
এ কাজ করার সময় এ কেন্দ্রগুলোর অনেক জায়গায় প্রবেশের সুযোগ পান তিনি।
‘ভেতরে জিজ্ঞাসাবাদের সময় অনেক মানুষকে মার খেতে দেখেছি। কোনো কোনো সময় খালি বৈদ্যুতিক তার (ইলেকট্রিক কর্ড) ব্যবহার করা হতো, যাতে কল্পনাতীত ব্যথা লাগে। যাদের মারা হয়, বিশেষ করে আমার মতো বয়সের নারীরা, তারা ভয়ানক চিৎকার করেন। আমি যেটা ভুলতে পারি না, সেটা হচ্ছে রক্তÑ মেঝেতে, দেয়ালে সব জায়গায় পড়ে থাকত মানুষের রক্ত,’ বলেন আমাত।
প্রায় এক ডজনেরও বেশি সাবেক বন্দির সঙ্গে কথা বলেছে কাতারের সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা। তাদের অনেকেই এসব কেন্দ্রে নির্যাতন ও টর্চার দেখেছে বা ভোগ করেছে।
চীনা কর্তৃপক্ষ নির্যাতনের সব অভিযোগ ঢালাওভাবে অস্বীকার করে আসছে এবং এ ‘পুনঃশিক্ষা’ কেন্দ্রগুলো বন্ধ করতে আন্তর্জাতিক মহলের আহ্বান উপেক্ষা করছে।
সরকার বলছে, তারা জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের এসব কেন্দ্র ঘুরে দেখতে দেবে, যদি তারা ‘চীনের আইন মেনে চলে, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করে এবং এর বদলে নিরপেক্ষ বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে।’
আমাত বলেন, তার পক্ষে আর তার জনগোষ্ঠীর ওপর নির্যাতনের বিষয়ে চুপ করে থাকা সম্ভব নয়।
‘চীন মনে করছে ওরা যেটা করছে, সেটা সঠিক। কিন্তু ওরা ভুল করছে,’ বলেন তিনি। ‘হ্যাঁ, প্রত্যেক দেশের নিজস্ব আইন রয়েছে। কিন্তু সর্বব্যাপী একটা আন্তর্জাতিক আদর্শও রয়েছে।’
আমার মতে, ‘ওরা এ আদর্শ চরমভাবে লঙ্ঘন করছে। নিজেদের মতো স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের অধিকার উইঘুরদের নেই।’
সগোত্রীয় উইঘুরদের ওপর গুপ্তচরবৃত্তি করায় আমাত অনুশোচনায় ভুগছেন বলেও জানান।
এখন তিনি এসব তথ্য কেন প্রকাশ করছেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তার এখন হারানোর বিশেষ কিছু নেই। ওর গুপ্তচরবৃত্তির কারণে তার পরিবারের বেশিরভাগ লোককেই বিভিন্ন বন্দিশালায় রাখা হয়েছে।’
‘আমার বোন, আমার মা, আমার দুলাভাই, ওর ভাই, ওদের বাবা-মা, আমার মামা... এরা সবাই কারাগারে। সবাই ওখানে রয়েছে।’
আমাত বলেন, তিনি জঙ্গুলডাকে চলে এসেছেন। কারণ এখানে অল্প কিছু উইঘুর বাস করে। এখানে চীনা কর্মকর্তারা তাকে বেশি গুপ্তচরবৃত্তি করতে বলতে পারবেন না।
কিন্তু এখন সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলায় তাকে কর্তৃপক্ষের রোষের মুখে পড়তে হতে পারে বলেও মনে করেন আমাত। তবে তিনি এজন্য প্রস্তুত আছেন বলে জানান, এটা শুধু আমার নিজের পরিবারের জন্য করিনি, প্রতিটি উইঘুরের হয়ে কথা বলার জন্য আমি এটা করেছি। ওরা সবাই আমার পরিবার। আমার নিজের জীবন কোনো ব্যাপার না। যা হবে, হবেই। আমি যথেষ্ট বেঁচে থেকেছি।
সূত্র : আলজাজিরা ও অন্যান্য

জনবল ও অত্যাধুনিক যন্ত্র সংকটে ফায়ার সার্ভিস by রুদ্র মিজান

বড় কোনো অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে হিমশিম খায় ফায়ার সংশ্লিষ্ট সার্ভিস স্টেশন। জরুরি ঘণ্টি বাজাতে হয় বিভিন্ন ফায়ার স্টেশনে। ততক্ষণে আগুন বাড়তেই থাকে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া অগ্নিকাণ্ডগুলোতে জনবল সংকটের বিষয়টি তীব্রভাবে অনুভব করেছেন কর্তৃপক্ষ। অনেক কিছুতেই পরিবর্তন এসেছে। উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে। কিন্তু ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কাঙ্খিত তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। মহকুমা থেকে জেলা হয়েছে ১৯৮২ সালে।
কিন্তু জেলার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পদ বাড়েনি ফায়ার সার্ভিসের। এমনকি অগ্নি নির্বাপনের অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি সঙ্কটেও রয়েছে এই অধিদপ্তর।
২১টি মহকুমা থেকে হয়েছে ৬৪ জেলা। ফায়ার সার্ভিসের মহকুমাগুলোর দায়িত্ব পালন করতেন ২১ জন সহকারী পরিচালক। মহকুমা ব্যবস্থা পরিবর্তন হলেও পদ বাড়েনি। সমপর্যায়ের সরকারি অন্যান্য বিভাগের কর্মরতদের চেয়ে তারা বেতনও পান কম। সেভাবে বাড়েনি ফায়ারম্যানের সংখ্যাও। তবে বেড়েছে ফায়ার স্টেশন। নয় বছর আগে সারাদেশে ফায়ার সার্ভিস স্টেশন ছিলো ২০৬টি। এখন ৪৪২টি। সারা দেশে প্রায় ১০ হাজারের মতো জনবল থাকলেও ফায়ারম্যানের সংখ্যা কম। যে কারণে অপারেশনে কাজ করেন ছয় সহস্রাধিক ফায়ারম্যান। ২০শে ফেব্রুয়ারি পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড নিয়ন্ত্রন করতে হিমশিম খাচ্ছিলেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। একে একে  নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ ও গাজীপুর থেকেও ফায়ারম্যানরা অগ্নিনির্বাপনে অংশ নেন। ২৭টি ইউনিটের সদস্যরা সারারাত চেষ্টা চালিয়ে পরদিন সকালে আগুন নিয়ন্ত্রন করেন। একইভাবে গত ২৮ শে মার্চ বনানীর এফ আর টাওয়ারের অগ্নিকাণ্ডে ঢাকার বারিধারা, কুর্মিটোলা, মিরপুরসহ সদর দপ্তরের ফায়ারম্যানরা অংশ নেন।
এতে ফায়ার সার্ভিসের ২৫টি ইউনিটের সদস্যরা আগুন নিয়ন্ত্রনে কাজ করেন। সারা দেশে গত বছরের হিসেবে প্রথম শ্রেণির ফয়ার স্টেশন ৭৩টি। বাকিগুলো দ্বিতীয় শ্রেণির। প্রথম শ্রেণির ফায়ার স্টেশনগুলোতে ৩৫ জন করে জনবল থাকার কথা। এরমধ্যে ফায়ারম্যান থাকার কথা ২২ জন। কিন্তু বাস্তবে ১৫-১৬ জনের বেশি ফায়ারম্যান নেই প্রথম শ্রেণির স্টেশনেও। একইভাবে দ্বিতীয় শ্রেণির ফায়ার স্টেশনগুলোতে মোট জনবল থাকার কথা ২৭ জন করে। এরমধ্যে ফায়ারম্যান থাকার কথা ১৬ জন করে। কিন্তু এসব স্টেশনে ৮-১০ জনের বেশি ফায়ারম্যান নেই।
সংশ্লিষ্টরা জানান, জনসংখ্যা বেড়েছে। অগ্নিকাণ্ডের সংখ্যাও বেড়েছে। কিন্তু ফায়ার সার্ভিসের জনবল বাড়েনি। ফায়ার সার্ভিসের অন্তত ৩০ হাজার জনবল প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সে কর্মরতরা জানান, প্রতিটি বিভাগে একজন করে আট জন পরিচালক থাকার কথা। সেখানে ফায়ার সার্ভিসের সদর দপ্তরে মাত্র তিন জন পরিচালক রয়েছেন। বিভাগীয় পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছেন উপ-পরিচালকরা। এই অধিদপ্তরে উপ-পরিচালক রয়েছেন ১৪ জন। জেলা পর্যায়ে সহকারী পরিচালকদের দায়িত্ব পালনের নিয়ম থাকলেও সেখানে দায়িত্ব পালন করছেন উপ-সহকারী পরিচালকরা। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সে সহকারী পরিচালক রয়েছেন ২৭ ও উপ-সহকারী পরিচালক রয়েছেন ৭৭ জন। 
সূত্রমতে, জনবল সঙ্কট থাকায় ফায়ারম্যানরা টানা দুই থেকে তিন দিন অপারেশনে থাকলেও প্রয়োজনীয় বিশ্রাম ও খাবারের সুযোগ পান না। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সে কর্মরতদের বেতন নিয়েও রয়েছে অসন্তোষ। একজন ফায়ারম্যান জানান, ফায়ারম্যানদের বেতন স্কেল-পুলিশ কনস্টেবল, বিজিবি জোয়ান ও কারারক্ষীদের চেয়ে এক গ্রেড নিচে। তিনি জানান, ফায়ার স্টেশন অফিসারদের নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রায় পুলিশের সাব ইন্সপেক্টরদের মতোই। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের চাকরিও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের অধীনে। ১৯৮২ সাল পর্যন্ত এই দুটি পদে বেতনও সমান ছিলো। পর্যায়ক্রমে পুলিশের উপ-পরিদর্শকদের বেতন বেড়েছে, কিন্তু সেভাবে বাড়েনি ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসারদের বেতন। স্টেশন অফিসারদের বেতন দ্বাদশ গ্রেডে, অন্যদিকে পুলিশের উপ-পরিদর্শকদের বেতন দশম গ্রেডে। তবে কর্মরতরা জানান, বেতন আরও কমে গিয়েছিলো। ১৩ তম গ্রেডে বেতন পাচ্ছিলেন তারা।
সম্প্রতি সরকার এক গ্রেড উন্নীত করায় তারা বেতন পাচ্ছেন ১২তম গ্রেডে। জনবলের পাশাপাশি বাড়ানো দরকার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিও। সারা দেশে ল্যাডার (মই) রয়েছে ২০টি। ঢাকায় রয়েছে মাত্র ৯টি। এরমধ্যে সম্প্রতি সর্বোচ্চ ৬৪ মিটারের দুটি ল্যাডার কেনা হয়েছে।  টেকনিক্যাল কারণে এখনও তা ব্যবহার করা হয়নি। এছাড়াও ৫৪ মিটার ও ২৭ মিটারের ল্যাডার রয়েছে। বিশেষায়িত গাড়িও বাড়ানো হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসে বিশেষায়িত গাড়ি এখন প্রায় ৬শ’ টি। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা মনে করেন, ল্যাডারসহ অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি আরও প্রয়োজন।
এসব প্রয়োজনের বিষয়ে অবগত আছেন সরকারের সংশ্লিষ্টরা। ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা আশা করেন, শিগগিরই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ইতিমধ্যে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরকে দ্রুত আধুনিকায়ন করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২৯শে মার্চ গণভবনে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর বৈঠকে তিনি এমন নির্দেশনা দেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন অগ্নিনির্বাপণের জন্য আধুনিক সব যন্ত্রপাতি শিগগিরই যুক্ত হবে ফায়ার সার্ভিসে। দ্রুততার সঙ্গে এ প্রতিষ্ঠানকে আধুনিকায়ন করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে। ফায়ার সার্ভিস যতটুকু সমৃদ্ধ হয়েছে, তার সরকারের আমলেই হয়েছে বলে বৈঠকে মন্তব্য করেন তিনি।

উবারের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় by জিয়া চৌধুরী ও শাহনেওয়াজ বাবলু

তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে চালু রয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ‘রাইড শেয়ারিং সার্ভিস অ্যাপ’। মোটরসাইকেল ও গাড়িতে নগরীর বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াতে শুরুর দিকে এসব অ্যাপ স্বস্তি দিলেও এখন মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ২৩শে এপ্রিল রাজধানীর শ্যামলী এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী লাবণ্য নিহত হলে রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠানগুলোর নানা অনিয়ম ও সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ওই ঘটনায় শিক্ষার্থীকে বহনকারী ‘উবার মোটো’র চালক নিজের তথ্য গোপন করে রাইড শেয়ারিং অ্যাপে নিবন্ধন করেন বলে জানান, ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার। গত রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, উবার চালক সুমন হাসপাতালে যে ঠিকানা দিয়েছিলেন সে ঠিকানা ছিল ভুয়া। এমনকি যে ঠিকানা দিয়ে বিকাশ অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে সেই ঠিকানায়ও তাকে পাওয়া যায়নি।
এছাড়া উবার অফিসে যে ঠিকানা দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করেছিলেন সেটিও ভুয়া। তিনি বলেন, উবারের অফিসে ভুয়া ঠিকানা দিয়ে রাইডাররা নিবন্ধন করে সড়কে রাইড শেয়ারিং করার অনুমতি পায়।
রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলো কোন রকম যাচাই বাছাই ছাড়া চালকদের অনুমতি দিচ্ছে। এসব চালকদের মধ্যে অনেকেই দক্ষ চালক না। তাদের মধ্যে কেউ কেউ মাদক সেবন করে। নারীদের বাইকে তুলে তারা উদ্দেশ্যমূলকভাবে অযথা ব্রেক ধরে। আরোহীদের জন্য নিম্নমানের হেলমেট দেয়া হয়। সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও বলেন, চালক সুমন ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করায় তাকে খুঁজে পেতে পুলিশকে বেগ পেতে হয়েছে। তাকে আটক করতে পুলিশের অনেক সময়ও লেগেছে। উবার কর্তৃপক্ষও প্রথম দিকে কোন সহযোগিতা করেনি বলেও অভিযোগ করেন বিপ্লব কুমার সরকার। এই পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্যের সূত্র ধরে মানবজমিন গত দুই দিন ধরে রাজধানীতে রাইড শেয়ারিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান উবারের নানা অনিয়ম বিষয়ে খোঁজ নেয়া শুরু করে। অন্তত ৫০ জন চালক ও যাত্রীর সঙ্গে কথা বলে।
অনুসন্ধানে দেখা যায় ‘রাইড শেয়ারিং সার্ভিস নীতিমালা ২০১৭’র বেশিরভাগ নিয়ম মানছে না রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠান উবার ও তাদের অধীনে থাকা চালকরা। অন্যের ড্রাইভিং লাইসেন্সে নিবন্ধন, ভুল ঠিকানায় নিবন্ধন, মোটরসাইকেল ও গাড়ি চালনায় অভিজ্ঞতা না থাকা, পরীক্ষা না করেই যাকে-তাকে নিবন্ধনের সুযোগ করে দেয়া, যাত্রীদের অভিযোগের বিষয়ে ব্যবস্থা না নেয়াসহ নানা অভিযোগ পাওয়া গেছে উবারের বিরুদ্ধে। রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠানটির চালকরাই মানবজমিনকে এসব অভিযোগের কথা বলেছেন। অনেকে বলছেন এখন কিছুটা কড়াকড়ি করা হলেও শুরুর দিকে যারা ভুয়া কাজগপত্র ও তথ্য দিয়ে নিবন্ধন করেছেন তারা প্রতিষ্ঠানটির সুনাম নষ্ট করছে। এছাড়া কাঙ্খিত গন্তব্যে না যেতে চাওয়া, একই দুরত্বে অন্য কোম্পানির চেয়ে দ্বিগুন ভাড়া নেয়া ও বিভিন্ন অভিযোগে তেমন কোন ব্যবস্থা নেয়ার অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। মাগুরা থেকে ঢাকায় আসা কামরুল ইসলাম(ছদ্মনাম) মাস তিনেক হয় উবারে মোটরসাইকেল চালাচ্ছেন।
নগরীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে মানুষকে পৌঁছে দেন। তিনি গতকাল মানবজমিনকে জানান, নিজের মোটরসাইকেল ও ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকলেও উবার তাকে নিবন্ধন করেছে। সেক্ষেত্রে অন্য আরেকজনের নামে নিবন্ধন নিতে হয়েছে তাকে। অনেক দিন ধরে বেকার জীবনযাপন করায়, বাধ্য হয়ে অনিয়ম করেই উবারে নিবন্ধন করতে হয়েছে বলেও দাবি করেন কামরুল। তিনি বলেন, আমি ভুল কাগজপত্র দিয়ে নিবন্ধন করলেও উবার এজন্য কোন অংশে কম দায়ী নয়। এর আগে কখনো মোটরসাইকেল চালনার অভিজ্ঞতা না থাকলেও শুধুমাত্র রাইডার বাড়ানো ও নিজেদের মুনাফার জন্য উবার এরকম শ’ শ’ তরুণদের নিবন্ধন করাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি। আরেকজন চালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, উবারের ধানমন্ডি অফিস থেকে তিনি নিবন্ধন নিয়েছেন। ড্রাইভিং পরীক্ষার কোন ব্যবস্থা বা কাগজপত্র যাচাইয়ের কোন বালাই নেই বলেও জানান নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেকজন চালক।
‘রাইড শেয়ারিং সার্ভিস নীতিমালা ২০১৭’র অনুচ্ছেদ ক: রাইড শেয়ারিং সার্ভিস পরিচালনার শর্তাবলী’র ৬ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, রাইড শেয়ারিং সার্ভিসের ব্যবহৃত মোটরযানের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যেমন: রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট, ফিটনেস সার্টিফিকেট, ট্যাক্স টোকেন, ইনসিওরেন্স ও এনলিস্টমেন্ট সার্টিফিকেট ইত্যাদি হালনাগাদ থাকতে হবে। তবে, বেশিরভাগ মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে এমন নিয়ম মানা হচ্ছে না। কেন নিয়ম মানা হচ্ছে না জানতে চাইলে বেশ কয়েকজন চালক বলেন, এসব বিষয়ে উবারের তেমন একটা ভ্রুক্ষেপ নেই। তারা শুধু নিবন্ধন করাতে চায়, যত বেশি নিবন্ধন তত বেশি মুনাফা। এছাড়া নীতিমালার ক অনুচ্ছেদের আট ধারায় বলা আছে, নির্ধারিত স্ট্যান্ড/অনুমোদিত পার্কিং স্ট্যান্ড ব্যতীত কোন রাইড শেয়ারিং মোটরযান যাত্রী সংগ্রহের উদ্দেশ্যে রাস্তায় যেখানে-সেখানে অপেক্ষমান থাকতে পারবে না অর্থাৎ যাত্রী উঠানামা ব্যতীত এরূপ মোটরযানকে সর্বদা চলাচলরত অবস্থায় থাকতে হবে। এই নিয়মের কোন ধরনের তোয়াক্কাই করছে না উবার মোটোর চালকরা। যেখানে-সেখানে পার্কিং, মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে থেকে যানজট বাড়াচ্ছে এসব চালকরা। তাদের কারণে ট্রাফিক পুলিশের মামলার হারও আগের চেয়ে বেড়েছে।
১০ নম্বর ধারায় উল্লেখিত মোটরযান লাইসেন্স প্রাপ্তির এক বছর সময় অতিক্রান্ত না হলে রাইড শেয়ায়িং সার্ভিসে কেউ নিবন্ধন না পাওয়ার কথা থাকলেও এক্ষেত্রে নিয়ম মানা হচ্ছে না। উবার মোটোর বেশিরভাগ মোটরসাইকেলই নতুন করে কেনা এবং অনেকে ঢাকার বাইরে থেকে এসে নতুন মোটরসাইকেল কিনে কাজে নেমে পড়ছেন। নীতিমালার অনুচ্ছেদ ‘খ’র ৫ ধারায় বলা আছে, বিআরটিএ’র ওয়েবসাইট ও রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠানের অ্যাপসে অভিযোগ দায়ের ও নিষ্পত্তির গতিবিধি অনুসরণের সুবিধাসহ সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা থাকতে হবে। অভিযোগে বলা হয়, বিআরটিএ ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান এসব বিষয়ে অনলাইনে অবহিত করে দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে হবে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ শুধু দুঃখ প্রকাশ করে দায় সারে বলে দাবি করেন অনেক অভিযোগকারী। একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এক নারী জানান, একবার মোটরবাইকে সেবা নিলে আমাকে চালক নানা ধরনের কুরুচিপূর্ণ অঙ্গভঙ্গি করে।
পরে, অভিযোগ করলেও উবার থেকে তেমন কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। একবার শুধু আমার সঙ্গে মেইলে যোগাযোগ করে বলা হয়েছিল তারা এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিচ্ছে। এরপর কোন ব্যবস্থার বিষয়ে আমাকে জানানো হয়নি। এছাড়া, নীতিমালার অনুচ্ছেদ ‘ছ’-এ ধূমপান ও মাদকাসক্ত কেউ রাইড শেয়ারিংয়ে নিবন্ধন নিতে পারবে না বলেও উল্লেখ থাকলেও উবার তাদের নিবন্ধন দেয়ার ক্ষেত্রে এসব বিষয়ে কোন প্রশ্ন ও পরীক্ষার উদ্যোগ নেয়নি। পাশাপাশি, নির্দিষ্ট দুরত্বে অন্য অ্যাপের চেয়ে দ্বিগুনেরও বেশি ভাড়া কাটা, ক্রেডিট কার্ড সংযুক্ত করলে যাত্রা শুরুর আগেই টাকা কেটে নেয়া, রাইডাররা বার বার ট্রিপ ক্যান্সেল করে দিলেও রাইডারদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয় না বলেও অভিযোগ করেছেন অনেক যাত্রী। এছাড়া চালকের দুর্ব্যবহারের শিকার হয়েছেন বলেও অভিযোগ করেছেন অনেকে। বেশিরভাগ ড্রাইভারের রাজধানীর পথঘাট সম্পর্কে ধারণা নেই। আর শহরের অলিগলি না চেনার পাশাপাশি গ্রাম ও শহরে রাইডের গতিবিধি না বুঝেই নিজেদের ইচ্ছেমতো রাইড দেয়ায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন যাত্রীরা। একাধিক সূত্র জানায়, অ্যাপসভিত্তিক রাইড শেয়ারিং পাঠাও-উবারে একই দূরুত্বে সময়ের সঙ্গে ওঠানামা করছে ভাড়ার পরিমাণ। নির্দেশিত ভাড়ার তুলনায় বেশ বাড়তি ভাড়া গুণতে হচ্ছে যাত্রীদের।
উবারে পাঁচ কিলোমিটার দুরুত্বে প্রথম দিন যেখানে ১৮০ টাকা ভাড়া গুণতে হয়েছে যাত্রীদের, পরেরদিন একই দূরুত্বের পথে সেই ভাড়া ২৭৫ টাকা। কিন্তু উবার কল করার সময় সম্ভাব্য ভাড়া দেখানো হয়েছিল ১৭১ টাকা। এমন সব অভিযোগের বর্ণনা দিয়ে উবারের ফেসবুক পেজে আপত্তি জানাচ্ছেন অনেক গ্রাহক। তবে এতে উবার কর্তৃপক্ষ এবং চালকদের তোপের মুখে পড়তে হচ্ছে যাত্রীদের। মো. আশরাফুল ইসলাম নামে একজন যাত্রী মানবজমিনকে বলেন, মিরপুর সাত নম্বর থেকে নাবিস্কোতে প্রতিদিন যাতায়াত করি। সকাল আটটায় ভাড়া আসে ২৩০ টাকা আর রাতে ফেরার সময় ভাড়া লাগে ১২০ টাকা। এমন পার্থক্যের বিষয়ে উবাররে বক্তব্য সকালে ডিমান্ড বেশি থাকে। আমার কথা হলো, তাহলে সিএনজি আর উবারের মধ্যে কোন পার্থক্য আছে কিনা? আবার কোন কোন রাইডার আছেন যাদের নামে রাইড শেয়ারিংয়ের কোন ডকুমেন্ট বা লাইসেন্স নেই। দেখা গেছে গাড়ির লাইসেন্স এবং ডকুমেন্ট রয়েছে একজনের নামে আর রাইডার আরেকজন।
নামে প্রকাশে অনিচ্ছুক এমনই এক রাইডার বলেন, আমি এই পেশায় এসেছি প্রায় ছয় মাস হলো। আমার কোন মোটরবাইক নেই। এক বড় ভাইয়ের মোটরবাইক এবং তার নামে রাইড শেয়ার কোম্পানির সব কাগজপত্র রয়েছে। আমি তার নাম করে এটা ব্যবহার করছি। এমন সব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চেয়ে উবারের বাংলাদেশে থাকা একাধিক অফিসে যোগাযোগ করা হলে কর্মকর্তারা এসব বিষয়ে মন্তব্য করতে পারবেন না বলে জানান। কোন অভিযোগ থাকলে উবারের সেন্ট্রাল মেইলে পাঠানোর জন্য অনুরোধ করে রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠানটি। উবারের নানা অনিয়ম নিয়ে বিআরটিএ’তে যোগাযোগ করা হলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বেশ কিছু অনিয়মের বিষয়ে তারা অবগত বলে জানান। তবে নানা জটিলতায় এসব ব্যাপারে উবারকে তাগাদা দিলেও কোন সুফল মিলছে না বলেও দাবি এই কর্মকর্তার।

পাহাড়ে সেনাক্যাম্প বাড়ানোর দাবি by কাজী সোহাগ

বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলার হুমকি রয়েছে তিন পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ হুমকি দেয়া হচ্ছে। ১৮ই মার্চ বাগাইছড়িতে উপজেলা নির্বাচনী কর্মকর্তাদের গাড়িতে জেএসএস (সন্তু লারমা) এবং ইউপিডিএফ (প্রসিত) এর সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের অতর্কিত হামলায় ৮ জন নিহত এবং ১৮ জন আহত হয়। এরপরই পাল্টা-পাল্টি হামলার হুমকি দেয়া হচ্ছে ওই দুই সশস্ত্র গ্রুপের পক্ষ থেকে।
পার্বত্য অঞ্চল নিয়ে কাজ করা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিষয়টি আমলে নিয়ে তৎপর রয়েছেন। তারা জানিয়েছেন, এখানকার সশস্ত্র গ্রুপগুলো অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত। পাহাড়কে অশান্ত করতে তারা সবসময় তৎপর থাকে। নিজেদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার করতে একে অপরকে নিজেদের শক্তিমত্তার প্রমাণ দেয়।
এতে প্রাণহানি ও ভোগান্তির শিকার হন নিরীহ মানুষ। ভয়ে ও নিরাপত্তাহীনতায় তটস্থ থাকেন তারা। গত কয়েক মাসে প্রায় অর্ধশত হত্যকান্ডের ঘটনা ঘটে পার্বত্য জেলাগুলোতে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, শান্তিচুক্তির আওতায় সেনাবাহিনী এরইমধ্যে অনেক ক্যাম্প প্রত্যাহার করে নিয়েছে। আর এ সুযোগটি কাজে লাগাচ্ছে সশস্ত্র গ্রুপের সদস্যরা।
যেসব এলাকা থেকে ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হচ্ছে সেসব এলাকায় রাতারাতি আইনশৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। সশস্ত্র গ্রুপগুলো ওইসব এলাকা দখল ও পাল্টা দখলের খেলায় মেতে উঠছে। এতে বাড়ছে খুনোখুনি, চাঁদাবাজি আর অপহরণ ধর্ষণের মতো ঘটনা। সংশ্লিষ্টরা জানান, পার্বত্য চুক্তির শর্ত অনুযায়ী এ পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে ২৪০টি নিরাপত্তা বাহিনীর ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে। পাশাপাশি একটি ব্রিগেড সরিয়ে নেয়া হয়েছে। বর্তমানে পার্বত্য অঞ্চলে চারটি ব্রিগেড কাজ করছে। এগুলো রয়েছে-রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও গুইমারায়। ২০০৮ সালে কাপ্তাই থেকে ব্রিগেডটি সরিয়ে নেয়া হয়। ফলে অরক্ষিত এ অঞ্চলের সন্ত্রাসীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। সাধারণ মানুষ হয়ে পড়েছে নিরাপত্তাহীন। এ অবস্থায় প্রত্যাহার করা ক্যাম্পগুলো পূণঃস্থাপন করা হলে শান্তি ও নিরাপত্তায় সহায়ক হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। রাঙ্গামাটি শহরের বাসিন্দা শামসুদ্দিন মানবজমিনকে জানান, আগে এখানে বুক ফুলিয়ে চলাফেরা করতে পারলেও এখন পরিস্থিতি খুবই খারাপ। যে কোন সময় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হতে পারে। সন্ধ্যা নামার আগেই বাড়ি ফিরে যাই। কিন্তু সেখানেও যে খুব নিরাপদ তা নয়।
শহরের তুলনায় প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে অবস্থা আরও বেশি খারাপ। দূর্গম এলাকা হওয়ায় সেসব জায়গা সশস্ত্র গ্রুপগুলোর নিরাপদ আস্তানা হিসেবে  বেছে নিয়েছে। তিনি বলেন, যেসব সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে সেসব জায়গা দখল করে নিয়েছে উপজাতি সন্ত্রাসীরা। সেখানে তৈরি করছে নিজেদের আধিপত্য। এতে বাড়ছে চাঁদাবাজি আর খুনোখুনি। তিনি নিরাপত্তার স্বার্থে অবিলম্বে প্রত্যাহার করা সেনাক্যাম্পগুলো আবারও স্থাপনের দাবি জানান। স্থানীয়রা জানান, পাহাড়ে প্রতিযোগিতা করে চলছে সশস্ত্র গ্রুপগুলোর চাঁদাবাজি। এসব সংগঠন সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজিতে শান্তিপ্রিয় পার্বত্যবাসির জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। সন্ত্রাসীরা টোকেন কিংবা রশিদ দিয়ে নিয়মিত চাঁদা আদায় করছে। কৃষক, শ্রমিক ও ব্যবসায়ী, সরকারী বেসরকারী অফিসিয়ালস কেউই সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজির হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের ধারাবাহিকতায় ১৯৯৮ সালের ১০ই ফেব্রুয়ারী খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে আনুষ্ঠানিকভাবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে গেরিলা নেতা সন্তু লারমার নেতৃত্বে অস্ত্র সমর্পন করে জনসংহতি সমিতির সদস্যরা। আর ঐদিনই প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বে খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে শত শত উপজাতি পতাকা উত্তোলন করে অস্ত্র সমর্পন অনুষ্ঠানকে ধিক্কার জানান।
তারই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালের ২৬শে ডিসেম্বর ঢাকায় সম্মেলনের মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের পূর্ণ স্বায়ত্ত্বশাসনের দাবীতে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রণ্ট (ইউপিডিএফ) গঠিত হয়। শুরু হয় সন্তু ও প্রসীতের  নেতৃত্বে দুই সংগঠনের আধিপত্য রক্ষার লড়াই। দ্বিমুখী,পাল্টা-পাল্টি হামলা। ২০১০ সালের ১০ই এপ্রিল জেএসএস ভেঙ্গে সুধা সিন্দু খীসার নেতৃত্বে গঠিত হয় জেএসএস (এমএন) গ্রুপ। এবার শুরু হয় ত্রিমুখী সংঘাত। কখনো জেএসএস-ইউপিডিএফ আবার কখনো জেএসএস (সন্তু)- জেএসএস (এমএন)। কখনো কখনো নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংশ্লিষ্টরা জানান, চুক্তির পর গত ২১ বছরে সশস্ত্র গ্রুপগুলোর দ্বন্ধে  ৮ শতাধিক খুন হয় এবং ১৫শ’ গুম হয়েছে। এছাড়া এসব সংগঠনগুলোর পৃথক অংগসংগঠন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, হিল উইমেন্স ফেডারেশন, যুব সমিতি, মহিলা সমিতি ও গণতান্ত্রিক যুবফোরামসহ একাধিক শাখার সংগঠন রয়েছে। সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর হাতে রয়েছে, এম-১৬, একে-৫৬, একে-৪৭, উজি গান, জি- থ্রি, মার্ক ফোর এলএমজি, এসএমজি ও রকেট লাঞ্চারসহ আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিমত, পার্বত্য  চুক্তির পর পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি বেড়েই চলেছে। চুক্তির আগে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন জেএসএসকে চাঁদা দিলে ব্যবসা- বাণিজ্য নির্বিঘ্নে করা যেতো।
কিন্তু চুক্তির পর  পার্বত্য চট্টগ্রামের আনাচে-কানাচে এসব সংগঠনের নামে ব্যাপক চাঁদাবাজি করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, এমন কোন সেক্টর নেই যেখান থেকে সন্ত্রাসীরা চাঁদা আদায় করছে না। তবে সবচেয়ে বেশি চাঁদা আদায় করা হয় বনজ সম্পদ ও উন্নয়ন প্রকল্প থেকে। এছাড়াও যানবাহন, বিভিন্ন টোল কেন্দ্র,বাজার ডাক, ফসলের জমি, জুম চাষ, গবাদিপশু এমনকি চাকরিজীবিদেরও বার্ষিক চাঁদা দিতে হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে চলাচলকারী প্রতিটি যানবাহনের মালিক, ব্যবসায়ি ও ঠিকাদাররা একাধিক সংগঠনকে ডিসেম্বর মাসে বাৎসরিক চাঁদা দিয়ে পরবর্তী বছরের টোকেন সংগ্রহ করতে হয়। সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন বিদেশী দাতা গোষ্ঠী ও সংস্থা এবং এনজিওদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করছে।
চাঁদা না দিলে অপহরণের শিকার হতে হয় । সূত্র মতে, ট্রাক, বাস বা কোষ্টার প্রতিটি বাৎসরিক চাঁদা  হিসাবে সংগঠনগুলোকে ৬ হাজার  থেকে ৯ হাজার টাকা, জীপ ২ থেকে ৩ হাজার টাকা, বেবিটেক্সি ১ থেকে ১৫শ টাকা, রিক্সা ২শ ও ৩শ, ব্যবসায়িক পাশ ২০ থেকে ৩০  হাজার টাকা, বড় সাইজের বাঁশ প্রতি হাজার ৪শ থেকে ৬ শ, উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যে স্কুল,কলেজ ও মাদ্রাসা ১০% থেকে ১৫%, রাস্তা, সেতু কালভার্ট ও বিল্ডিং জেএসএস ১০%, কড়ই কাঠ, গর্জন, চাপালিশ ও সেগুন প্রতি ঘনফুট ৪০ টাকা থেকে ৬০ টাকা, প্রতিটি শ্রেণীর গোলকাঠ ফুট প্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা, কলা, আদা হলুদ, সবজি, ধান ও চাল ভর্তি প্রতি ট্রাক ৪শ থেকে ৬শ টাকা, প্রতিটি বাছুর ৫০ টাকা থেকে ৭৫ টাকা, ষাড় বা গরু ১শ থেকে ১৫০ টাকা, ছাগল ৪০টাকা থেকে  ৫০ টাকা,রাইচ মিল ২০ হাজার থেকে  ৩০ হাজার টাকা করে আদায় করছে। এছাড়াও কৃষক ও জুম চাষীদের একর হিসাব করে চাঁদা দিতে হয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে যেসব উপজাতী চাকরিজীবী রয়েছেন তাদেরকেও বার্ষিক হারে চাঁদা দিতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এর বাইরে রয়েছে-মৌসুমী চাঁদা। যেমন-বৈসাবি উপলক্ষে পাহাড়ে ব্যাপক চাঁদাবাজি হয়।
কিছুদিন আগে সমাপ্ত হওয়া সংসদ ও উপজেলা নির্বাচন উপলক্ষে নির্বাচনী খরচের জন্য বিপুল অংকের চাঁদা আদায় করা হয়েছে। আবার নির্বাচনে হেরে গিয়েও নির্বাচনী ক্ষয়ক্ষতি ওঠানের জন্য চিঠি দিয়ে নতুন করে চাঁদাবাজি করা হয়েছে। এভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রতি বছর প্রায় ৩শত কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় হচ্ছে। সশস্ত্র সংগঠনগুলো বিভিন্ন পদ্ধতিতে চাঁদা আদায় করে থাকে। চাঁদা আদায় করার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামের ২৬টি উপজেলা ছাড়াও ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ে  তাদের  রয়েছে কালেক্টর। স্থানীয়রা জানান,সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় নিলে পরবর্তীতে অপহরণসহ  বড় ধরনের বিপদে পড়তে হয়। ফলে অনেকে নিরবে-নিভৃতে চাঁদা দিয়ে যাচ্ছে। প্রশাসনের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, পাহাড়ে চাঁদাবাজি হচ্ছে এটা সবাই জানে। তবে কেউ অভিযোগ করছে না। যেখানে অভিযোগ পাচ্ছে প্রশাসন তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছে। প্রশাসন চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের ধরতে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। ধরাও পড়ছে। সাধারণ মানুষ ঘুরে দাঁড়ালে এবং প্রশাসনকে সহযোগিতা করলে চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীরা পালাতে বাধ্য হবে বলে জানান তিনি।

গুলিস্তানে পুলিশের ওপর হামলা: পাইপের ফিঙ্গার প্রিন্টের সূত্র ধরে চলছে তদন্ত by জিয়া চৌধুরী

রাজধানীর গুলিস্তান বঙ্গবন্ধু স্কয়ারে গত ২৯শে এপ্রিল তিন পুলিশ সদস্যের ওপর হামলার ঘটনায় এখনো কোনো ক্লু উদঘাটন করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। কোনো উগ্রবাদী সংগঠন এমন হামলা করে থাকতে পারে বলে ধারণা পুলিশের। তবে, কারা কিংবা কোন সংগঠন এমন ঘটনা ঘটিয়েছে তা এখনো স্পষ্ট নয়। ওই রাতে ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) সদৃশ বিস্ফোরিত বস্তুটির মূল অংশ ধাতব পাইপে থাকা ফিঙ্গারপ্রিন্টের সূত্র ধরে তদন্ত কাজ এগিয়ে চলছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম(সিটিটিসি) ইউনিট ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন(পিবিআই) সূত্রে এমন তথ্য জানা গেছে। এদিকে, ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া আইইডি সদৃশ বিস্ফোরকের ধাতব পাইপ ও আলামত ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। সেই সঙ্গে এর আগে বিভিন্ন সময় আইইডিসহ গ্রেপ্তার হওয়া বিভিন্ন জঙ্গি ও উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্যদের বিষয়েও নজর রাখা হচ্ছে। ঘটনার রাতে পাশের একটি বিপনি বিতানের ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তেমন কাউকে সনাক্ত করা যায়নি।
ডিএমপির মতিঝিল বিভাগের এক কর্মকর্তা মানবজমিনকে জানান, ঘটনাস্থলের আশপাশে কোন সিসিটিভি ক্যামেরা ছিলো না। আমরা পাশের একটি মার্কেটের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করেছি।
যাতে কাউকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় না। তবে আমরা তদন্ত কাজ চালিয়ে যাচ্ছি, এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। সূত্র জানায়, সেদিন রাতে গুলিস্তান পুলিশ বক্সের উল্টো পাশে সড়ক বিভাজকের ওপরে একটি বেঞ্চে বসেছিলেন পুলিশ সদস্যরা। বিস্ফোরণের সময়কালের সিসিটিভির ফুটেজে রাস্তায় একটি বাস চলে আসায় তেমন কিছু শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তবে, ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া বিস্ফোরক ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস সদৃশ বলে সিটিটিসি ও ডিএমপির মতিঝিল সূত্র নিশ্চিত করেছে। হামলাকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করেই আইইডি সদৃশ বিস্ফোরক ঘটনাস্থলে ফেলে চলে যায় একটি সূত্রের ধারণা। অন্য আরেকটি সূত্রের মতে, বিস্ফোরকটি আগেও পেতে রাখা হতে পারে। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া আলামত পর্যালোচনা করে সিআইডি ও সিটিটিসি ধারণা করছে টাইমার দেয়া কোন বিস্ফোরক আগে থেকে পেতে রাখতে পারে হামলাকারীরা।
যা নির্ধারিত সময়ে বিস্ফোরণ। তবে স্বশরীরে হামলাকারী এক বা একাধিক ব্যক্তি পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্য করে বিস্ফোরকটি ছুঁড়ে মারতে পারে বলেও জানিয়েছে আরেকটি সূত্র। সেক্ষেত্রে মোটরসাইকেল ব্যবহার করে এমন মিশন সম্পন্ন করা হয় বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। সিটিটিসি সূত্র জানায়, ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে থাকা বিভিন্ন ভিডিও থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে হামলাকারীরা আইইডি’র মতো বিস্ফোরক বানানোর চেষ্টা করতে পারে। তবে এক্ষেত্রে তারা খুব একটা সফল হতে পারেনি। হুবহু আইইডির মতো বিস্ফোরক বানাতে সক্ষম হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর এমন বিস্ফোরণের ঘটনায় ভয়াবহতা ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরো বেশি হতে পারতো। এদিকে, শ্রীলঙ্কার ভয়াবহ জঙ্গি হামলার পর বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যদের ওপর এমন বিস্ফোরণের ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) দায় স্বীকারের বিষয়টিকেও সন্দেজনকভাবে দেখছে পুলিশ। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ‘সাইট ইন্টিলিজেন্স’র খবরে বলা হয়, বাংলাদেশে হোলি আর্টিজান হামলার পর গত দুই বছরের মধ্যে প্রথম কোন ঘটনায় দায় স্বীকার করে আইএস।
তবে বাংলাদেশে আইএসের মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ কোন জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা এমন হামলা করে থাকতে পারে বলেও ধারণা করছে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। পুলিশ সদস্যদের ওপর এমন হামলার ঘটনায় পল্টন মডেল থানায় বিস্ফোরক আইনে একটি মামলা করা হয়েছে। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ঘটনাস্থল থেকে ছোট-বড় ১৫ টুকরা ঢালাই লোহা, বৈদ্যুতিক তার, ব্যাটারি, প্লাস্টিকের বোতলের ভাঙ্গা অংশ, লোহার পেরেক ও রেসিডিও পাউডার উদ্ধার করা হয়। পল্টন থানা পুলিশের পাশাপাশি ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট ও র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নও (র‌্যাব) বিস্ফোরক আইনে দায়ের হওয়া মামলায় ছায়া তদন্ত করছে।

‘ট্রাম্প বিশ্ব ব্যবস্থার জন্য হুমকি’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘বিশ্ব ব্যবস্থার জন্য হুমকি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন যুক্তরাজ্যের ছায়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী এমিলি থর্নবেরি। গত ২৬ এপ্রিল শুক্রবার টুইটারে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এমন মন্তব্য করেন।
এমিলি থর্নবেরি বলেন, জাতিসংঘের অস্ত্র বাণিজ্য চুক্তি সম্পর্কে ট্রাম্পের বক্তব্যে এটি চূড়ান্তভাবে প্রমাণ হয়েছে যে, তিনি মুক্ত বিশ্বের নেতা নন, কখনও ছিলেন না। তিনি যুক্তরাজ্যে রাষ্ট্রীয় সফরের মতো সম্মান পাওয়ার যোগ্য নন। তিনি আমাদের বিশ্ব ব্যবস্থার জন্য হুমকি ছাড়া আর কিছুই নন।
এর আগে জাতিসংঘের অস্ত্র বাণিজ্য চুক্তি (এটিটি) থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেন ট্রাম্প। গত ২৬ এপ্রিল শুক্রবার ন্যাশনাল রাইফেল অ্যাসোসিয়েশন (এনআরএ)-তে দেওয়া ভাষণে এ ঘোষণা দেন তিনি। তার ভাষায়, আমরা আমাদের সাক্ষর ফিরিয়ে নিচ্ছি।
২০১৩ সালে জাতিসংঘের উদ্যোগে ১৩০টি দেশ এ চুক্তিতে সাক্ষর করে। দুনিয়াজুড়ে অস্ত্রের কেনাবেচা নিয়ন্ত্রণে আনাই ছিল এ চুক্তির লক্ষ্য। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা জাতিসংঘের এ চুক্তিটিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। তখন এনআরএ-সহ যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি কট্টরপন্থী গোষ্ঠী ও লবিস্ট গ্রুপ এর বিরোধিতা করেছিল।
ট্রাম্পের দাবি, এ চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মর্যাদাহানি হয়েছে। এখন শিগগিরই এ চুক্তি থেকে আমেরিকার নাম প্রত্যাহারের জন্য জাতিসংঘকে আনুষ্ঠানিক নোটিস দেওয়া হবে। তার ভাষায়, আমার মেয়াদকালে আমেরিকা কারও কাছে তার সার্বভৌমত্ব সমর্পণ করবে না। অস্ত্র আইনের সংশোধনীতে বিদেশি কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপের অনুমতি কিছুতেই দেওয়া হবে না।
ওই চুক্তিতে বলা হয়েছিল, অস্ত্র রফতানিকারক দেশগুলোকে জাতিসংঘের কাছে তাদের অস্ত্র বাণিজ্যের প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। রফতানিকৃত অস্ত্র কোনওভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে কিনা তা যাচাইবাছাই করতে হবে। গণহত্যা বা যুদ্ধাপরাধের মতো কর্মকাণ্ডে ব্যবহার অথবা সন্ত্রাসীদের হাতে পড়লে রফতানিকারক দেশকেই ওই অস্ত্র হস্তান্তর ঠেকানোর কথা বলা হয়েছে চুক্তিতে।
বিশ্বের বৃহত্তম অস্ত্র রফতানিকারক দেশ যুক্তরাষ্ট্র। তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা রাশিয়ার চাইতে প্রায় ৫৮ শতাংশ বেশি অস্ত্র বিক্রি করে থাকে দেশটি। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই জাতিসংঘের অস্ত্র বাণিজ্য চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেওয়ার ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
এদিকে ট্রাম্পের সঙ্গে নৈশভোজের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছেন যুক্তরাজ্যের বিরোধী দল লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিন। রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের আমন্ত্রণে আগামী জুনের গোড়ার দিকে তিন দিনের সফরে যুক্তরাজ্য যাওয়ার কথা রয়েছে ট্রাম্পের। সফরে তার সম্মানে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে-র একটি নৈশভোজের কর্মসূচি রয়েছে। আর ওই নৈশভোজের আমন্ত্রণই ফিরিয়ে দিয়েছেন করবিন। শুক্রবার এক বিবৃতিতে তিনি নিজেই এ তথ্য জানিয়েছেন।
যুক্তরাজ্য সফরে ট্রাম্পকে লালগালিচা সংবর্ধনা না দেওয়ার পক্ষেও মত দেন করবিন। তিনি বলেন, বর্ণবাদী ও নারীবিদ্বেষী কথা বলা, জলবায়ু পরিবর্তন প্রত্যাখ্যানকারীদের সমর্থন, গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সব চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়া একজন প্রেসিডেন্টের রাষ্ট্রীয় সফরে তাকে লালগালিচা দেওয়া উচিত হবে না।
লেবার নেতা বলেন, স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে যে কোনো বৈঠককে তিনি স্বাগত জানাবেন। তবে ওয়াশিংটনের সঙ্গে মিত্রতা টেকানোর জন্য ‘রাষ্ট্রীয় সফরের আনুষ্ঠানিকতা’ নিষ্প্রয়োজন।
বিবিসি জানিয়েছে, তিন দিনের সফরে আগামী ৩ থেকে ৫ জুন সস্ত্রীক যুক্তরাজ্যে অবস্থান করবেন ট্রাম্প। সফরে ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প ব্রিটিশ রানির আতিথেয়তা গ্রহণ করবেন। ডাউনিং স্ট্রিটে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে-এর সঙ্গেও বৈঠকে মিলিত হবেন তিনি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রপক্ষ কর্তৃক ইউরোপের মূল ভূখন্ডে স্থল অভিযান শুরুর ৭৫তম বার্ষিকী উপলক্ষ্যে পোর্টসমাউথে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানেও অংশ নেবেন ট্রাম্প-মেলানিয়া দম্পতি।
১৯৪৪ সালের ৬ জুন, নাৎসি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিতে মিত্র বাহিনীর প্রায় ১ লাখ ৫৬ হাজার সদস্য ফ্রান্সে অবতরণ করেন। দিনশেষে প্রায় সাড়ে চার হাজার সেনার মৃত্যু হয়। ফ্রান্সের নরম্যান্ডির উপকূলে ডি-ডে নামে খ্যাত ওই অভিযানের মধ্যে দিয়ে নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে মিত্র বাহিনীর বিজয়ের সূচনা হয়।
২০১৭ সালের ২০ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বিদেশি নেতা হিসেবে ওয়াশিংটন সফর করেছিলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে। তবে ট্রাম্পকে রাষ্ট্রীয় সফরে যুক্তরাজ্যে আমন্ত্রণ না জানানোর দাবিতে ২০১৭ সালে একটি অনলাইন পিটিশন খোলা হয়েছিল। এতে স্বাক্ষর করেন প্রায় ১৯ লাখ ব্রিটিশ নাগরিক। পরে ২০১৮ সালের জুলাইয়ে তিন দিনের যুক্তরাজ্য সফরকালে রানি এলিজাবেথের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ট্রাম্প। তবে সে সময় রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের বাসভবনে রাজকীয় অনেক রেওয়াজ না মানার অভিযোগ উঠে তার বিরুদ্ধে।

রায়বেরিলির শিরায় শিরায় লেখা সোনিয়ার নাম by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

বেরিলিকে কে বিখ্যাত করেছেন? রাজা মেহদি আলি খান, নাকি সুরকার মদন মোহন?
এভাবে জিজ্ঞেস করলে কারও মগজের ঘণ্টি না–ও বেজে উঠতে পারে। বেরিলি কী? কোনো জায়গা বা জনপদ হলে সেটা ভারতের কোন জেলায়, তেমন প্রশ্নও উঠতে পারে। কিন্তু একটু খেই ধরিয়ে দেওয়ার মতো যদি মুম্বাইয়ের পুরোনো দিনের ডাকসাইটে সুন্দরী অভিনেত্রী সাধনার নামটি উচ্চারণ করা হয়, আশি কি নব্বই শতাংশ মানুষ সঙ্গে সঙ্গে গুনগুনিয়ে উঠবেন সেই অমর গানের কলি, ‘ঝুমকা গিরা রে, বেরিলি কি বাজার মে ঝুমকা গিরা রে’। মেরা সায়া সিনেমার জন্য গানটি লিখেছিলেন রাজা মেহদি আলি খান। সুর দিয়েছিলেন মদন মোহন। কণ্ঠ আশা ভোঁসলের। পর্দায় নেচে–গেয়ে মাত করেছিলেন সাধনা। উত্তর প্রদেশের অকিঞ্চিৎকর জনপদ বেরিলির বিখ্যাত হওয়া সেই প্রথম।
তবে, বেরিলির মতোই যদি প্রশ্ন করা হয়, ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রে রায়বেরিলিকে কে চিরবিখ্যাত করে গেছেন, তাহলে ব্যক্তির জায়গায় উঠে আসবে এক পরিবারের নাম। গান্ধী পরিবার। রায়বেরিলির সঙ্গে গান্ধী পরিবারের সম্পর্ক হলো শীতের সঙ্গে লেপের মতো। সম্পর্কের সেই পারিবারিক ধারাবাহিকতা রক্ষার দায়িত্বে এখন রয়েছেন সোনিয়া গান্ধী।
এই সোনিয়া বৃহস্পতিবার রায়বেরিলি আসবেন বলে ঘুম উবে গেছে কিশোরীলাল শর্মার। পঞ্চমবারের মতো সোনিয়ার নির্বাচন পরিচালনার প্রধান দায়িত্ব তাঁর বলেই নয়, কবে থেকে যে তিনি ম্যাডামের ‘ম্যান ফ্রাইডে’ হয়ে গেছেন নিজেই ভুলে গেছেন। রায়বেরিলি শহরের তিলক ভবনে বুধবার দুপুরে তিলধারণের স্থান নেই। গমগম করছে গোটা চত্বর। সব ব্লকের সব বুথের ভোট পরিচালকদের ডেকে পাঠানো হয়েছে। হাতে হাতে ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে বুথভিত্তিক ভোটার তালিকা। আগামী রোববার তাঁদের করণীয় কী কী সবাইকে পাখি পড়ানোর মতো করে বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সোনিয়া গান্ধী এই কেন্দ্রে এবারের মতো শেষ জনসভাটি করতে আসছেন। অসুস্থ শরীর সত্ত্বেও এটা হবে তাঁর তৃতীয় রায়বেরিলি সফর। কিন্তু তাতে কী, ভোটের এই শেষ প্রহরে রায়বেরিলি ও আমেথির মাটি কামড়ে পড়ে রয়েছেন প্রিয়াঙ্কা। প্রচারের শেষ দিন শুক্রবার তিনি ফিরে যাবেন অন্যত্র।
কিশোরীলাল বললেন, সম্পর্কটা ১০০ বছরের বেশি পুরোনো। ১৯৫৭ সালে এখান থেকে জেতেন ফিরোজ গান্ধী। ১৯৬৭ থেকে পরপর দুবার জিতে ইন্দিরা গান্ধী রায়বেরিলিতে হারেন রাজ নারায়ণের কাছে, ১৯৭৭ সালে। তারপর এখানে আর ফেরেননি ইন্দিরা। কিন্তু গান্ধী পরিবারের আত্মীয় শীলা কল ১৯৮০ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত পরপর পাঁচবার এই কেন্দ্রের সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন। শীলার পর দুবার এখান থেকে ভোটে যেতেন রাজীব গান্ধীর বন্ধু ক্যাপ্টেন সতীশ শর্মা। এরপর মাত্র দুবার কেন্দ্রটি দখল করেছিল বিজেপি। কিন্তু ১৯৯৯ সাল থেকে ফের কংগ্রেসের কবজায়। সোনিয়ার খাসতালুকও সেই ১৯৯৯ থেকে।
অর্থাৎ, রায়বেরিলিতে মোট ভোট হয়েছে কুড়িবার। মাত্র তিনবার কংগ্রেসের হাত থেকে বেরিয়ে কেন্দ্রটা কোল পেতে দিয়েছিল বিরোধীদের। কিশোরীলাল বললেন, ‘অসুস্থ শরীর নিয়েও সোনিয়া ভোটে দাঁড়াতে রাজি হয়েছেন। এবার এটা তাঁর তৃতীয় সফর। রায়বেরিলির মানুষ তাঁকে বলেছেন, আসার প্রয়োজন নেই। কেন্দ্রের মানুষজনের হৃদয়ে তাঁর বাস।’
ঠিক এই কথাটাই অদ্ভুতভাবে বললেন গোকুলপুর গ্রামের রামস্বরূপ জয়সোয়াল ও শিবপ্রতাপ। ‘রায়বেরিলির ডিএনএতে সোনিয়া গান্ধীর নাম লেখা রয়েছে। তাঁকে হারানোর স্বপ্ন কারও তাই না দেখাই ভালো।’
এই স্বপ্নটা এবার যিনি দেখছেন, এই তল্লাটের তামাম কংগ্রেসির কাছে তিনি এক ‘নির্ভেজাল গদ্দার’।
এবার সোনিয়ার প্রতিপক্ষ যিনি, গান্ধী পরিবারের ছত্রচ্ছায়ায় তিনি লালিত। দীনেশ প্রতাপ সিং স্থানীয় ব্যবসায়ী। কংগ্রেস ও ব্যবসা তাঁর জীবনে এই সেদিন পর্যন্ত সমান্তরাল রেললাইনের মতো চলেছে। দুই বছর আগে হঠাৎ দলত্যাগ করে তিনি বিজেপিতে যোগ দেন। বিজেপি তাঁকে বিধান পরিষদের সদস্য করে দেয়। এত দিন কংগ্রেস করে আসা দীনেশ প্রচারে প্রকাশ্যে সোনিয়া বা গান্ধী পরিবারের নিন্দে করছেন না। কিন্তু মোদি–মাহাত্ম্য প্রচারের মধ্য দিয়ে বোঝাতে চাইছেন, গান্ধী পরিবারের আর কিছু দেওয়ার ক্ষমতা নেই। বিকাশ ও উন্নয়ন এখন নরেন্দ্র মোদির মুখাপেক্ষী এবং কংগ্রেসের কক্ষচ্যুত।
সোনিয়াবিরোধী প্রচারটা এবার কী রকম, তার একটা নমুনা বরং দিই। উড়ুয়া বলে একটা গ্রাম আছে রায়বেরিলি জেলায়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সব সাংসদকে একটা করে গ্রাম দত্তক নিতে বলেছিলেন। সোনিয়া দত্তক নেন উড়ুয়াকে। আদর্শ গ্রাম গড়ে তোলার জন্য যা যা কাজ দরকার, যে পরিমাণ অর্থ খরচের প্রয়োজন এবং পরিকল্পনা রূপায়ণে কেন্দ্র ও রাজ্যের যে সহযোগিতা প্রয়োজন, সদিচ্ছা সত্ত্বেও সোনিয়া তা করতে পারছেন না অসহযোগিতার জন্য। এই না পারাকেই বড় করে তুলে ধরছেন প্রতিপক্ষ দীনেশ প্রতাপ সিংয়েরা, অসহযোগিতার কথাটি অনুচ্চারিত রেখে। কংগ্রেস আবার বড় করে তুলে ধরছে ওই অসহযোগিতার কথাই।
ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের মতোই আমেথি ও রায়বেরিলি পাশাপাশি দুই জনপদ। একনিশ্বাসে উচ্চারিত হয়ে আসছে সেই কবে থেকে। একটা সময় ছিল, যখন একই সঙ্গে এই দুই অঞ্চলের বিকাশ চোখ ধাঁধিয়ে দিত। জাতীয় সড়কের দুপাশে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে রয়েছে তার প্রমাণ। রাজ্যে টানা তিরিশ বছর কংগ্রেস ক্ষমতার বাইরে। ২০১৪ পর্যন্ত কেন্দ্রে ক্ষমতায় থাকলেও রাজ্য সরকারের অসহযোগিতায় এই দুই ভিভিআইপি কেন্দ্রের জৌলুশ অসহযোগিতার কারণে অনেকটাই ফিকে হয়েছে। আমেথি ও রায়বেরিলির মানুষজনের কাছে আজ আর সেই সুদিন নেই। কিন্তু গান্ধী পরিবার তাঁদের যে গরিমা দিয়েছে, সেটাও যে ভোলার নয়! কৃতজ্ঞতাবশত রাজ্যের দুই প্রতিপক্ষ সমাজবাদী পার্টি ও বহুজন সমাজ পার্টি বহু বছর ধরে এই দুই কেন্দ্রে প্রার্থী দেয় না। এবারেও দেয়নি। দিলেও সোনিয়ার জয় ঠেকানো সম্ভবত অসম্ভব। সোনিয়ার অপারগতা, তাঁর দলের ক্রমাগত শক্তিহীনতায় রায়বেরিলির মানুষ ক্ষুণ্ন। কিন্তু ক্ষুব্ধ নন। ক্ষুব্ধ হলে কেউ ওভাবে বলতে পারে না, ‘রায়বেরিলির শিরায় শিরায় সোনিয়া গান্ধীর নাম লেখা আছে। তাঁকে হারানোর স্বপ্ন কারও না দেখাই ভালো।’