Sunday, February 15, 2015

রাজধানীতে ৪ গাড়িতে আগুন, ককটেল বিস্ফোরণে আহত ২

রোববার হরতালে রাজধানীতে ৪ গাড়িতে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। তবে এসব ঘটনায় কোন হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে ককটেল ও হাতবোমার বিস্ফোরণে আহত হয়েছেন দুইজন। বিকাল পৌনে ৫টার দিকে পুরান ঢাকার তাঁতী বাজার মোড়ে স্কাইলাইন (ঢাকা মেট্রো জ ১৪-০০৯৩) পরিবহনের একটি বাসে আগুন দেয়া হয়। সন্ধ্যা পৌনে ৭টায় মালিবাগ বাজারে তুরাগ পরিবহনে বাসে আগুন দেয়া হয়। প্রায় একই সময়ে যাত্রাবাড়ির মানিকনগর সড়কে তুরাগ পরিবহনের বাসে অগ্নিসংযোগ করে দুর্বৃত্তরা। রাত ৮ টার দিকে মৎস্য ভবন এলাকায় তানজিল পরিবহনের বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নেভায়। এছাড়াও পল্লবীর সিম্ফনী শো রুমের সামনে, পূরবী সিনেমা হলের পাশে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এতে কোন হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। এসব ঘটনায় পুলিশ কাউকে আটক করতে পারেনি। এদিকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬ টার দিকে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের পাশে হাতবোমা বিস্ফোরণে ১ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) ভর্তি করা হয়েছে। তার পরিচয় পাওয়া যায়নি। অপরদিকে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে খিলগাঁওয়ের রেলগেট এলাকায় কার্টনভর্তি হাতবোমা নিয়ে যাওয়ার সময় বিস্ফোরিত হয়ে মো. কবির (৩০) নামের এক যুবক আহত হন। পুলিশ জানিয়েছে, কবির একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পণ্য পরিবেশক। সে সকালে খিলগাঁওয়ের আমানুল্লাহ সুপার মার্কেট থেকে একটি বড় কার্টন নিয়ে ইসলামপুরের দিকে যাচ্ছিলেন। এ সময় কার্টনটি বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়। এতে আহত হলে কবিরকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়। রাজধানীর গুলশান-১ এর ডিসিসি মার্কেটের সামনে একটি ককটেল বিস্ফোরণ করেছে দুর্বৃত্তরা। দুপুর আড়াইটার দিকে এ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটায় কেউ আহত হননি। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ।

মুসলিম মেয়েকে বিয়ে করলে লাখ টাকা পুরস্কার!

ভ্যালেন্টাইন ডে’র পর এবার নয়া কর্মসূচি হাতে নিয়েছে অখিল ভারত হিন্দু মহাসভা।‘বেটি বাঁচাও, বহু লাও’ নামে এই কর্মসূচিতে হিন্দু যুবকদের অন্য ধর্মের মেয়েকে বিয়ে করার জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে। অন্য ধর্মে বিয়ে করা ছেলেকে হিন্দু মহাসভার পক্ষ থেকে এক লাখ টাকা পুরস্কার দেয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে।
হিন্দু মহাসভা নেতা ধরমপাল সিওয়াচ রোববার এই অভিযানের সূচনা করে বলেছেন, ‘হিন্দুরা আর ব্যাচেলর থাকবে না, হিন্দুরা এখন নিজের ধর্মের মেয়েদের বাদ দিয়ে অন্য ধর্মের মেয়েদের নিজেদের বাড়িতে পুত্রবধু করে সম্মান এবং স্বীকৃতি দেয়ার জন্য কাজ করবে।’
ধরমপাল সিওয়াচ বলেন,‘যে হিন্দু ছেলে মুসলমান মেয়েকে বিয়ে করবে তাকে হিন্দু মহাসভার পক্ষ থেকে এক লাখ টাকা আর্থিক সাহায্য দেয়া হবে।’ তার দাবি,‘মুসলমানরা ‘লাভ জিহাদ’-এর মাধ্যমে বিয়ে করে মেয়েদের নিপীড়ন করছে। কিন্তু আমরা তাদের মেয়েদের সম্পূর্ণ স্বীকৃতি দেব। তাছাড়া বিয়ে করলে তাদের কর্মসংস্থানের জন্যও সহযোগিতা করা হবে।’
এরআগে ভ্যালেন্টাইনডে উপলক্ষে ‘হিন্দু মহাসভার পক্ষ থেকে বলা হয়, যদি কোনো মুসলমান বা খ্রিস্টান ছেলেকে হিন্দু মেয়ের সাথে দেখা যায়, তাহলে প্রথমে ভালোভাবে ধর্মান্তরকরণের জন্য বলা হবে, যদি তা না মানে তাহলে তাকে অপহরণ করে জোর করে হিন্দু রীতি অনুসারে বিয়ে দেয়া হবে।’
সূত্র : রেডিও তেহরান।

দগ্ধ ব্যক্তিরা মানসিক যন্ত্রণায় by পার্থ শঙ্কর সাহা

পেট্রলবোমা হামলায় আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন ব্যক্তিদের ৫৮ শতাংশ মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। এ তথ্য দিয়েছে চিকিৎসা সহায়তাদানকারী আন্তর্জাতিক দাতব্য সংগঠন মেদসো সঁ ফ্রঁতিয়েখ (এমএসএফ-সীমান্ত–বিহীন চিকিৎসক দল)। সংগঠনটি অগ্নিদগ্ধ ব্যক্তিদের জখম-পরবর্তী মানসিক সমস্যার (পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার-পিটিএসডি) শুশ্রূষা দিচ্ছে।
এমএসএফের মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, হঠাৎ আক্রমণের শিকার হওয়ায় আহত ব্যক্তিদের মানসিক সমস্যার সৃষ্টি হয়। এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি। এ সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা দরকার। নইলে এই ভীতিজনিত মানসিক সমস্যা বড় ধরনের রোগে পরিণত হতে পারে।
তবে বার্ন ইউনিটের চিকিৎসকেরা বলছেন, অগ্নিদগ্ধ ব্যক্তিদের মানসিক সমস্যা নিয়ে তাঁরা চিন্তিত হলেও এঁদের পরিচর্যায় পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই।
এমএসএফের বাংলাদেশ শাখার হেড অব মিশন পার্থসারথি রাজেন্দ্রন প্রথম আলোকে জানান, গত ৩১ জানুয়ারি থেকে বার্ন ইউনিটে কাজ শুরু করেছেন তাঁরা। তাঁদের হিসাবে, বার্ন ইউনিটে ভর্তি হওয়া ৬৮ জন রোগীর মধ্যে ৪০ জন মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। এটি দুর্ঘটনায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ৫৮ শতাংশের বেশি। তিনি বলেন, হঠাৎ আক্রমণের শিকার হলে মানুষের মনে ভীতি তৈরি হয়, এটি স্বাভাবিক। এটি কারও কারও মধ্যে গভীর প্রভাব ফেলে। তাঁরাই মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হন।
এমএসএফের দুজন মনোবিজ্ঞানী এবং তিনজন কাউন্সেলর বার্ন ইউনিটের মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের এখন নিয়মিত শুশ্রূষা দিচ্ছেন। মনোবিজ্ঞানী ক্যাথরিন ম্যাকগারভা প্রথম আলোকে বলেন, ‘মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা দুর্ঘটনার স্মৃতি ভুলতে পারেন না। দুর্ঘটনার স্মৃতি মনে হলে তাঁরা দুঃস্বপ্ন দেখেন। বিচলিত হয়ে পড়েন। তাঁদের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসে ব্যাঘাত হয়। দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হওয়ার পরপরই যে এসব উপসর্গ দেখা দেবে, তা না-ও হতে পারে। এটি ধীরে ধীরে দেখা যেতে পারে।’
এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে ক্যাথরিন বলেন, মানসিক সমস্যা যদি সারানোর চেষ্টা না হয়, তবে এসব উপসর্গ স্থায়ী হয়ে যায়। যেসব কাজ করে এসব ব্যক্তি আনন্দ পেতেন বা উপভোগ করতেন, তা থেকে তাঁরা আগ্রহ হারান, অপ্রয়োজনীয় নিরাপত্তা অবলম্বন করেন, অনুভূতি কমে যায়। মাথাব্যথা হতে পারে। মেজাজ খিটখিটে হতে পারে।
অবরোধ চলাকালে ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে বাসে পেট্রলবোমা হামলার শিকার হয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের নাজমুল হোসেন। মামাতো বোনের বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন কলেজছাত্র নাজুমল। পেট্রলবোমা হামলায় নাজমুলের দুই হাত, মাথা ও পিঠ পুড়ে গেছে। বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন নাজমুল প্রথম আলোকে বলেন, ‘রাতে ঘুমানোর মধ্যে থাইক্যা জাইগ্যা উঠি। মনে হয় আগুনের মধ্যে ঝাঁপ দিছি। সব সময় ভয় লাগে।’
নাজমুলের মা হানিফা বেগম বলছিলেন, ‘ছেলের মধ্যে ভয় ঢুকছে। ভয় আমিও পাইছি। তবে এখানকার লোকজন বলছে, ছেলে যেন ভয় না পায় সেদিকে খেয়াল রাখার জন্য।’
এমএসএফ আক্রান্ত ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাঁদের আত্মীয়স্বজনকেও পরামর্শ (কাউন্সেলিং) দিচ্ছে। মনোবিজ্ঞানী ক্যাথরিন ম্যাকগারভা বলছিলেন, মানসিক সমস্যায় থাকা ব্যক্তিদের দুর্ঘটনার কথা স্মরণ না করানো উত্তম। এ সময় নিকটজনের সহায়তা খুব দরকার। তাঁদের উচিত আক্রান্ত ব্যক্তিকে সব সময় ইতিবাচক কথা বলা।
এমএসএফ এসব রোগীকে নিয়মিত সহায়তা দেওয়ার জন্য তাদের ঠিকানা ও যোগাযোগের নম্বর রেখে দিচ্ছে। তারা মানসিক শুশ্রূষা অব্যাহত রাখতে চায়।
পেট্রলবোমায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে গত বুধবার পর্যন্ত ১২৬ জন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন আটজন। রাজশাহী, চট্টগ্রাম, বগুড়া ও রংপুরে অগ্নিদগ্ধ হয়েছেন ৮৪ জন।
এমএসএফ ঢাকা মেডিকেলের বাইরে মানসিক পরিষেবা আর কোথাও দিচ্ছে না। তবে পার্থসারথি জানান, ‘ঢাকার বাইরে রোগীদের তথ্য সংগ্রহ করছি আমরা। তাদেরও এই সেবা দিত চাই।’
ঢাকাসহ কোনো জায়গায় মানসিক সমস্যায় থাকা ব্যক্তিদের পরিচর্যার কোনো উদ্যোগ সরকারি স্তরে নেই। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্লাস্টিক অ্যান্ড রিকনস্ট্রাকটিভ সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মো. আবুল কালাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা এখানে ধারণক্ষমতার চেয়েও বেশি রোগী নিয়েছি। আর ঢাকার বাইরে বার্ন ইউনিটের পরিষেবা অনেক কম। এমএসএফ তাই সহযোগিতার প্রস্তাব দেওয়ায় আমরা রাজি হয়েছি।’
এমএসএফ ৩১ জানুয়ারির পর ভর্তি রোগীদের সেবা দিচ্ছে। আগে যেসব রোগী চলে গেছেন, তাঁদের মানসিক সেবা দিতে কোনো পরিকল্পনা নেই বার্ন ইউনিটের। তবে ইনস্টিটিউটের শিক্ষক হেলালউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমাদের এখানে এসব পরামর্শ দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। সেটি চাইলে আমরা দিতে প্রস্তুত। তবে বার্ন ইউনিট কর্তৃপক্ষ এখন কঠিন সময় পার করছে, সে জন্য হয়তো এ বিষয়টি তাদের প্রাধান্যের মধ্যে নেই।’
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতায় আগুনে পুড়ে আহত হয়ে ওই সময় বার্ন ইউনিটে ভর্তি হয়েছিলেন ১০১ জন। এঁদের মধ্যে মারা গেছেন ৩৭ জন। ৬ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোর পক্ষ থেকে আহত এসব ব্যক্তির মধ্যে সাতজনের সঙ্গে কথা বলা হয়। এঁদের মধ্যে চারজন এখনো দুর্ঘটনাজনিত ভীতির কথা জানান। সে সময়ের আহত ব্যক্তিদের একজন রাজধানীর বনশ্রীর বাসিন্দা এহসানুল হাসান। তিনি মালিবাগের একটি বিপণিকেন্দ্রে কাজ করেন। তিনি জানান, এবার নতুন করে পেট্রলবোমা হামলা শুরু হওয়ার পর বাসে যাতে না চড়তে হয়, তাই বাসা ছেড়ে তিনি তাঁর কর্মস্থলের একেবারে কাছে মালিবাগে একটি মেসে উঠেছেন।
২০১৩ সালের ২৮ নভেম্বর কর্মস্থল বংশাল থেকে ফেরার সময় রাজধানীর শাহবাগে বাসে পেট্রলবোমা হামলায় আহত হন একটি বেসরকারি ব্যাংকের চাকুরে মো. শফিকুল ইসলাম (৩৬)। তিনি বলেন, ‘দুর্ঘটনার আগে আমার কোনো অসুখ ছিল না। দুর্ঘটনার পরপরই ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপ বাসা বেঁধেছে।’
শফিকুলের এ অসুস্থতা নিয়ে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের শিক্ষক হেলালউদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, এটি নিশ্চিত করে বলার উপায় নেই যে দুর্ঘটনার কারণেই দুটি রোগ হয়েছে। তবে এটি ঠিক, যেসব মানুষের মানসিক চাপ বেশি, তাঁদের ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপের আশঙ্কা অনেক বেশি থাকে। সে ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার পর মানসিক চাপ থেকে তিনি আক্রান্ত হতে পারেন। হেলালউদ্দিন বলেন, যেসব ব্যক্তি মানসিক সমস্যায় ভুগছেন, পরিবারের উচিত তাঁদের পরিচর্যা নেওয়া। তাঁদের সঙ্গ দেওয়া।

জাতীয় সংলাপের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে ২০ দল

নির্দলীয় সরকারের অধীনে অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের লক্ষ্যে জাতীয় ঐকমত্য, জাতীয় সংলাপ ও জাতীয় সনদ রচনার যেকোন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। রোববার বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমেদ এক বিবৃতিতে এ কথা জানান। চলমান সঙ্কট সমাধানে গত ৯ই ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসনকে জাতীয় সংলাপের উদ্যোগ নেয়ার অনুরোধ জানিয়ে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে চিঠি দেন সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এটিএম শামসুল হুদা। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়।
ওই চিঠির জবাবে আজ গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে সালাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বিশ্ব স্বীকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক ও দৃঢ় ভিত্তির ওপর নবনির্মাণের জাতীয় স্পৃহা পূরণে আজ সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ ঐক্যবদ্ধ। ক্ষমতায় আরোহনের জন্য নয়, বরং স্থিতিশীল, গণতান্ত্রিক, সমৃদ্ধ, উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে পরিণত করার অদম্য বাসনা নিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন  বেগম খালেদা জিয়া গণতন্ত্র মুক্তির চলমান আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। শত জুলুম-নির্যাতন নিপীড়ণসহ সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে তিনি প্রস্তুত রয়েছেন।
তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মূল ভিত্তি সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায় বিচারের উপর ভিত্তি করে জনগণের অভিপ্রায়ের অভিব্যক্তিকে চূড়ান্ত রুপদানের লক্ষ্যে জাতীয় সনদ রচনা ও প্রয়োজনে সংবিধান পূণ:লিখন বর্তমান সময়ের দাবি। জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক ভিত্তিক সামাজিক পরিবর্তনের এই সুযোগকে অবশ্যই জনস্বার্থে ফলপ্রসূ করতে হবে। প্রত্যেক সৃষ্টির এবং বিজয়ের প্রসব বেদনা থাকে, সমগ্র জাতি আজ কষ্টসাধ্য বেদনাকে স্বীকার করেই প্রকৃত গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণে বদ্ধপরিকর।
পোশাক শিল্প মালিকদের অনশনে ব্যবসায়ী নেতৃবন্দ কর্তৃক সরকারকে পানি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল এবং ট্যাক্স প্রদান বন্ধ করে দেয়ার হুঁশিয়ারিকে স্বাগত জানিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, অগণতান্ত্রিক অবৈধ সরকারকে রাজস্ব প্রদানের বৈধতা থাকতে পারেনা। বিজিএমইএ এর অনুষ্ঠানে সরকারীগোষ্ঠীর মদদে বোমা হামলা হয়েছে বলে আমরা মনে করি। এ ধরণের ঘৃণ্য ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই।

‘৫ দিন ধরে অভুক্ত খালেদা জিয়া’ -সেলিমা রহমান

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া পাঁচ দিন ধরে অভুক্ত রয়েছেন বলে জানিয়েছেন দলের ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান। আজ রোববার দলের কার্যালয়ের নিচ তলায় এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। দুপুরে কার্যালয়ে খাবার নিয়ে প্রবেশ করতে চাইলে পুলিশ তাতে বাধা দেয়। এর প্রতিবাদে এ সংবাদ সম্মেলন করেন সেলিমা রহমান। এসময় তিনি আরও বলেন, স্টাফদের অভুক্ত রেখে খাবার খান না খালেদা জিয়া। গত পাঁচ দিন ধরে পুলিশ কার্যালয়ে খাবার ঢুকতে দিচ্ছে না। পুলিশকে উদ্দেশ করে সেলিমা রহমান বলেন, কার নির্দেশে কার্যালয়ে খাবার প্রবেশে বাধা দেয়া হচ্ছে জানতে চাই? কারাগারে ফাঁসির আসামিকেও খাবার দেয়া হয়। সরকারের মন্ত্রী এমপিরা  চেয়ারপারসনের কার্যালয়ের খাবার প্রবেশের ব্যাপারে মিথ্যাচার করছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন। এর আগে দুপুর আড়াইটার দিকে ৩০ প্যাকেট খাবার নিয়ে কার্যালয়ে প্রবেশ করতে চাইলে পুলিশ তা ফেরত পাঠায়। খাবার ফেরত পাঠানোর বিষয়ে পুলিশের কাছে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তারা জানান- ওপরের নিদের্শ আছে ঊর্ধ্বতন অফিসাররা জানেন কেন খাবার দেয়া যাবে না। এদিকে হরতাল অবরোধ প্রত্যাহারের দাবি খালেদা জিয়ার কার্যালয় এলাকায় মিছিল, সমাবেশ ও মানবন্ধন করা হয়েছে। সকাল ১০ টায় কার্যালয়ের দক্ষিণ পাশে বাড্ডা গার্লস হাই স্কুলের শতাধিক শিক্ষার্থী মানববন্ধন করেন। পরে বেলা ১১টা ১৫ মিনিটের দিকে বিএনএফ এর সভাপতি ও গুলশান এলাকার এমপি আবুল কালাম আযাদের নেতৃত্বে কার্যালয়ের গেটের সামনে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করেন অর্ধশতাধিক লোক। ৪৫ মিনিট অবস্থান করে তারা চলে যান। বেলা ১২ টার দিকে কার্যালয় এলাকার ৯০ নম্বর সড়কে মুজিব সেনা ঐক্য লীগের প্রায় শতাধিক কর্মী একটি বিক্ষোভ করে। বেলা সাড়ে ১২ টার দিকে কার্যালয়ের উত্তর দিকে মানববন্ধন করেন কালা চাদপুর হাই স্কুল এন্ড কলেজের শতাধিক শিক্ষার্থী। তারা ৩০ মিনিট অবস্থান করে চলে যান। ঠিক একই সময় কার্যালয়ের দক্ষিণ দিকে বিক্ষোভ করে তাঁতী লীগের নেতা কর্মীরা।

মারমাদের কেয়াংকেন্দ্রিক চর্চা by রাজীব নূর

বান্দরবান জেলা সদর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে রোয়াংছড়ি গিয়ে আলাপ হলো উপজেলা পরিষদের কয়েকজন নির্বাচিত প্রতিনিধির সঙ্গে। সরেজমিনে ১৪ থেকে ২৩ জানুয়ারি পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি ঘোরার মাঝামাঝি পর্যায়ে একদিন সেখানে থামা হয়। বর্ণমালা নিয়ে রাঙামাটিতে চাকমাদের সঙ্গে আলাপের অভিজ্ঞতার কারণে সংশয়ের সঙ্গে ওই জনপ্রতিধিদের কাছে মারমা বর্ণমালায় তারা নিজেদের নাম লিখতেপারেন কি-না জানতে চাওয়া হলো। চাকমাদের শতাধিক শিক্ষিতজনের মাত্র দু'জন চাকমা বর্ণমালায় নিজের নাম লিখতে পারলেও রোয়াংছড়ি উপজেলা পরিষদে উপস্থিত উপজেলা চেয়ারম্যান ক্য বা মং, ভাইস চেয়ারম্যান ক্যসাইনু মার্মা, নারী ভাইস চেয়ারম্যান মাউসাং ও সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান পুহ্লাঅং মার্মা অবলীলায় মারমা বর্ণমালায় লিখে দিলেন নিজেদের নাম।
বিস্ময় কাটানোর জন্য ক্য বা মং জানালেন, মূলত কেয়াংকেন্দ্রিক চর্চার কারণে মারমাদের বেশিরভাগেরই নিজেদের বর্ণমালাটা জানা আছে। এমন কী বাংলা-ইংরেজি কিছুই পড়তে না জানা মারমাদেরও অনেকে মাতৃভাষায় পড়তে ও লিখতে পারেন। প্রয়োজনীয় হিসাব-নিকাশও রাখতে পারেন। পরে আলাপ হলো বান্দরবান সদর উপজেলার কুহালং ইউনিয়নের উজিমুখ হেডম্যানপাড়া বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ উ সই ওয়াই না মহাথেরের সঙ্গে। তিনি বিহারে মারমা ভাষা শিক্ষাদান করছেন। আড়াই বছর ধরে সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন রাতের বেলা আগ্রহী বয়স্ক শিক্ষার্থীদেরও মারমা ভাষায় শিক্ষা দিচ্ছেন এই ধর্মযাজক। মহাথের নিজে বাংলা ভাষা তেমন একটা বোঝেন না, বলতেও অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। তবে নিজের মাতৃভাষা মারমায় অনর্গল বলতে ও লিখতে পারেন। মারমা ভাষা বিষয়ে তাকে একজন বিশেষজ্ঞ বলে মানেন সেখানকার লোকজন।
মারমা ভাষায় শিক্ষাদানের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে উ সই ওয়াই না মহাথের বলেন, আমরা যারা কেয়াং পরিচালনা করি, তারা ভাষা শেখানোর ব্যাপারে উদ্যোগী না হলে এতদিন দিনে এই ভাষাটায় লিখতে জানা মানুষ হারিয়ে যেত। এখনও মারমাদের বেশিরভাগ মানুষ মারমা ভাষা বলতে পারলেও লিখতে জানে না। তাই মারমা শিশু-কিশোর, যুবক, বৃদ্ধ নির্বিশেষে সবাইকে ভাষা শেখার জন্য ডেকে আনি আমি।
বান্দরবান শহরের উজানিপাড়া মহা বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ উ চাই দাইনদা উয়ারা মহাথের জানান, এখানে কেয়াং পরিচালিত পাঠশালায় মারমাদের ভাষা শিক্ষা দানের পাশাপাশি বাংলা, ইংরেজি ও অঙ্ক শেখানো হয়। তবে বৃহস্পতি ও শুক্রবার বিশেষভাবে মারমা ভাষা শেখানো হয়। ভাষা রক্ষার্থে বান্দরবানের অন্য কেয়াংগুলোতে এ কার্যক্রম চালু রাখা হয়েছে বলে জানালেন মহাথের।
পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলার মধ্যে বান্দরবানে সবচেয়ে বেশি মারমার বসবাস। পার্বত্য চট্টগ্রামে যেসব আদিবাসীর বসতি রয়েছে, তাদের মধ্যে সংখ্যার দিক থেকে মারমারা দ্বিতীয় বৃহত্তম জনগোষ্ঠী। কিছুসংখ্যক মারমা উপকূলীয় জেলা কক্সবাজার ও পটুয়াখালীতে বাস করে। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের বঙ্গু, খোয়ে, শিলো, থৌলে ও সাব্রুম এলাকায়, মিজোরামের রাইনক্ষ্যং ও সাংলাকক্ষ্যং এলাকায়, মিয়ানমারের আরাকান প্রদেশের লেমাই গোয়ং, পুলুতং ও নাজিরোওয়া এবং ইয়াঙ্গুন শহরে মারমা জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে।
গবেষক মংক্যশোয়েনু নেভি বলেন, ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী বাংলাদেশে এক লাখ ৫৪ হাজার ২১৬ জন মারমা ভাষাভাষী রয়েছেন, যার মধ্যে ৫১ হাজার ২৩৫ জন পার্বত্য চট্টগ্রামে বাস করেন। মারমা ভাষা বিষয়ক এই গবেষক জানান, এটি তিব্বতি-বর্মি শাখার বর্মি দলভুক্ত একটি ভাষা। ১৩টি স্বরবর্ণ ও ৩৬টি ব্যঞ্জনবর্ণ নিয়ে মারমা বর্ণমালা। এ বর্ণমালাকে ম্রাইমাজা বলা হয়। মারমা বর্ণমালার উৎস মন খমের নাকি না ব্রাহ্মী লিপি- এ নিয়ে বিতর্ক শেষ হয়নি। মারমা সমাজে সঙ্গীত ও গীতিনাট্যে মারমা লিপির ব্যবহার সুপ্রাচীন। পবিত্রগ্রন্থ ত্রিপিটক থেকে শুরু করে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সব কিছুরই মারমা অনুবাদ রয়েছে।
বান্দরবানের কবি চৌধুরী বাবুল বড়ূয়া বলেন, মারমাদের লিখিত সাহিত্যের সমান্তরালে রয়েছে লোকসাহিত্যের দীর্ঘ ঐতিহ্য। মারমাদের মধ্যে কাইপ্যা, পাংখুংসহ নানান ধরনের লোক গান ও নাটকের প্রচলন রয়েছে। মারমা সমাজে প্রচলিত এক ধরনের লোকগীতিকে বলা হয় চাগায়াং। কাহিনীভিত্তিক আরেক ধরনের গানকে বলে সাইংগ্যাই। রদুও এক ধরনের কাহিনীনির্ভর মারমা লোকগীতি। বাংলা জারিগানের মতো তালে তালে একই সুরে ও ছন্দে দলীয়ভাবে এক দল কর্তৃক অন্য দলের উদ্দেশে বিভিন্ন ধরনের বিবরণমূলক যে গান গাওয়া হয় তাকে সাইংগ্যাই বলে ডাকে। ভগবান বুদ্ধের জীবন নিয়ে রচিত সাহিত্যকে বলা হয় লুংদি। তিনি দীর্ঘদিন ধরে পার্বত্যাঞ্চলের শিল্পসাহিত্য নিয়ে কাজের অভিজ্ঞতা থেকে এটি নিশ্চিত করেছেন যে বাংলাদেশে মারমাদের মৌখিক রীতির লোকসাহিত্য এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী। তবে তুলনায় লিখিত সাহিত্য পিছিয়ে যাচ্ছে।
নিরবচ্ছিন্ন রাষ্ট্রীয় উপেক্ষার পরিণতিতে এমনটা হয়েছে বলে মনে করেন মারমা ভাষায় শিক্ষা প্রবর্তনের জন্য গঠিত অ্যাডহক কমিটির সভাপতি ক্য শৈ প্রু। তিনি বলেন, মারমারা ধর্ম, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি রক্ষার্থে এখনও বর্ণমালা শেখার চর্চা টিকিয়ে রেখেছে। বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষরা বিহারে থাকা ছাত্রদের মারমা ভাষার শিক্ষা দিয়ে থাকেন। কিন্তু আদিবাসীদের মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের সরকারি উদ্যোগ এখনও ইটিং-মিটিং পর্যায়ে রয়ে গেছে। তবে সাম্প্রতিককালে সেভ দ্য চিলড্রেন ও ইউএস এইডের সহযোগিতায় পার্বত্যাঞ্চলে শিক্ষা নিয়ে কর্মরত জাবারাং কল্যাণ সমিতি ও ইকো ডেভেলপমেন্ট মারমা ভাষাসহ আরও দুটি ভাষায় পাঠ্য উপকরণ তৈরির কাজ শেষ করে এনেছে বলে তিনি জানান।
শুধু পাঠ্যপুস্তক হলেই তো চলবে না, তাই চলছে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণও। এরই মধ্যে ইউএস এইডের সহযোগিতায় পার্বত্য বান্দরবান জেলা পরিষদের অনুমোদনক্রমে ইকো ডেভেলপমেন্ট বান্দরবানের ১২৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩৫০ জন শিক্ষককে প্রথম ধাপে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। এ প্রশিক্ষণ চলতে থাকবে। তার বিশ্বাস এই সব কিছুই মারমাদের ভাষার জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

নাগরিকসমাজের চিঠি ও আজকের বাস্তবতা by হারুন-আর-রশিদ

১০ ফেব্রুয়ারি অবরোধের ৩৭তম দিবস। ওই দিন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ৮৭, আহত সহস্রাধিক। পেট্রলবোমা ও আগুনে দগ্ধ হয়ে নিহত হয় ৫২ জন, সংঘর্ষে নিহত ১৩ জন, ক্রসফায়ার ও বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় (১৯+২৩) ৪২ জন। এই সংখ্যা যোগ করলে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১০৭। আগুনে পুড়ে বা পেট্রলবোমায় দগ্ধ হয়ে মৃত্যু যেমন অমানবিক, বিনাবিচারে ক্রসফায়ারের নামে গুলি করে হত্যা আরো অমানবিক। পেট্রলবোমা যারা মারে তারা সন্ত্রাসী। সে যে দলের বা মতাদর্শেরই হোক না কেন।
কিন্তু গভীর উদ্বেগের বিষয় হলো- আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। জনগণের জানমালের হেফাজতকারী; তারা যদি বলেন, দেখামাত্র গুলি, বিচারের প্রয়োজন নেই- এ ধরনের শব্দবোমায় মানুষকে সন্ত্রস্ত করা কি অন্যায় নয়? এ কথা এখন মানুষের মুখে মুখে আলোচিত হচ্ছে (টক অব দ্য সিটি)। সত্য কথা বলা এখন বিপজ্জনক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোনো দলের কর্মচারী হতে পারে না। তারা রাষ্ট্রের কর্মচারী। আর এই রাষ্ট্রের মালিক শুধু বড় দলের নেতা-নেত্রী নন, এই রাষ্ট্র ১৬ কোটি মানুষের, যাদের ট্যাক্সের টাকায় শীর্ষ থেকে শুরু করে প্রশাসনের প্রতিটি কর্মকর্তা-কর্মচারী বেতনভাতা পেয়ে থাকেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি দলীয় বাহিনীর মতো আচরণ করে জনগণের সাথে তাহলে তাদের কর্মকাণ্ড আইনি দৃষ্টিতে প্রশ্নবিদ্ধ হবে। সেটিই এখন হচ্ছে। আইনেই আছেÑ দেখামাত্র গুলি করা যাবে না। অপরাধীকে জীবিত অবস্থায় যেভাবেই হোক ধরতে হবে। সে যদি সন্ত্রাসী হয়েই থাকে, তাহলে তার কাছ থেকে অনেক তথ্য সংগ্রহ করা যাবে; এতে সন্ত্রাসের হোতাদের ধরা সহজ হবে। আর যদি সে নিরপরাধ প্রমাণিত হয়, আইনি বিধানে সে খালাস পাবে। কিন্তু আমরা দেখছি, ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধের নামে অনেক মানুষ নিহত হচ্ছে। আগের সরকারের আমলেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। বর্তমানে এর মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের অপরাধ-বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড যারা ঘটাচ্ছেন, তারাও অপরাধী। সেহেতু তাদেরও বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। সরকার বিশেষ কোনো দলের হতে পারে না। সব দল, ধর্ম, মত, বর্ণ ও ভাষার মানুষদের নিয়েই চলতে হবে। একই দৃষ্টিতে দেখতে হবে সবাইকে। তা হলেই সে সরকার হবে জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী সরকার। ব্যক্তি ও দলের ঊর্ধ্বে উঠে বৃহত্তর স্বার্থে বিগত ৪৩ বছর কোনো সরকার দেশ পরিচালনা করতে পারেনি। এ কারণেই দেশে নানা বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে।
৯ ফেব্রুয়ারি একটি পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠার লিড নিউজ : ‘শুধু ঢাকায় বিগত এক মাসে রাজনৈতিক গ্রেফতার এক হাজার’। গ্রেফতার হওয়া সবাই বিএনপি-জামায়াতকর্মী। রাজধানীর থানাগুলোতে মামলা করা হয়েছে ২২৭টি, আসামি ১০ হাজার। ভিন্ন মতের লোকদের ঢালাওভাবে গ্রেফতার ও মামলা দেয়া গণতান্ত্রিক আচরণ হতে পারে না। সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে জনপ্রিয় টকশো ‘ফ্রন্ট লাইন’ প্রচার করে আসছিল বেসরকারি টিভি চ্যানেল বাংলাভিশনÑ সেটিও ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। দীর্ঘ দিন ধরে বন্ধ আছে বেসরকারি টিভি চ্যানেল দিগন্ত টিভি, ইসলামিক টিভি, চ্যানেল ওয়ান, একুশে টিভি, দৈনিক আমার দেশ পত্রিকাসহ কিছু সাপ্তাহিক পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। সাংবাদিক নেতাদের বিরুদ্ধেও মামলা দেয়া হয়েছে। জেল খেটেছেন, জরিমানা দিয়েছেন এমন সাংবাদিকের সংখ্যাও এ আমলে কম নয়। সাগর-রুনি, ফরহাদসহ প্রায় ৩২ জন সাংবাদিক বিগত ছয় বছরে খুন হয়েছেন। মামলা-হামলার শিকার হয়েছেন গণমাধ্যমের বহু সংবাদকর্মী। সাংবাদিকদের রাজনৈতিক বলয়ে বিভক্ত করে দেয়া হয়েছে। পেশাজীবী, ব্যবসায়ী, আইনজীবী, মহান পেশার শিক্ষকসমাজকেও রাজনৈতিক বলয়ে আবদ্ধ করা হয়েছে। ফলে দেশ ও জনগণের বৃহত্তর স্বার্থের চিন্তাচেতনার কথা একই প্লাটফরমে দাঁড়িয়ে কেউই বলতে পারছেন না। আমরা ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছি। এ চিত্রটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতসহ বহু গণতান্ত্রিক দেশে দেখা যাবে না। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ভারত সফরে এসেছিলেন। ভারতের বিরোধী দলের কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বারাক ওবামা এক টেবিলে বসে চা খাচ্ছেন, ডিনার করেছেন। মোদি নিজেই দাওয়াত দিয়েছেন সোনিয়া গান্ধীকে। এ দৃশ্য আমাদের দেশে চিন্তাও করা যায় না। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া দু’জনই তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। অথচ চলমান জাতীয় সমস্যা নিয়ে আলোচনাকে প্রেস্টিজ ইস্যু হিসেবে অবলোকন করছেন। এ দিকে প্রতিদিন লাশের মিছিল বাড়ছে। দেশের অভিভাবক এখন প্রধানমন্ত্রী। স্বরাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষাসহ কয়েকটি মন্ত্রণালয় তার একক দায়িত্বে। সুতরাং রাষ্ট্রপক্ষ বলতে মূলত মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকেই বোঝায়। তাই চলমান সঙ্কটের তালাবদ্ধ দরজার চাবি তার হাতেই। মহানবী হজরত মুহাম্মাদ সা: ইহুদি বুড়ির দীর্ঘ দিনের অনুপস্থিতিতে তার খোঁজখবর নেয়ার জন্য তার বাড়িতে উপস্থিত হতে পেরেছেনÑ যিনি রাসূল সা:-এর চলার পথে বিষাক্ত কাঁটা বিছিয়ে রাখতেন। বিশ্বনবী যদি এত বড় মহানুভবতা দেখাতে পারেন, তাহলে দেশের দুই নেত্রী মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও কেন উদারতার এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারবেন না? দুই নেত্রীর অনড় অবস্থা দেখে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হাফিজ উদ্দিন খান বলেছেনÑ দেশে এখন ‘দেখে নেয়া’র রাজনীতি চলছে। আজকের বাংলাদেশটা এ রকম : প্রতিদিন দুর্ঘটনায় বহু হতাহত, সন্তানহারা বাবা-মায়ের হৃদয়বিদারক কান্না, নিরীহ মানুষের ভোগান্তি, ক্ষমতাসীন দলে দুর্নীতির মহোৎসব, দলের কর্মীদের খুনোখুনি, পুলিশের প্রধান কাজ বিএনপি-জামায়াতের বিরুদ্ধে মামলা দেয়া।
১৯৭১-এর পর যার জন্ম সেও আজ ‘রাজাকার’ যদি সরকারি দলের সদস্য বা সমর্থক না হন। ভিন্ন মতের মানুষ, যাদের সাথে সরকারি দলের মতের সাথে অমিল রয়েছেÑ তারাও নাকি পাকিস্তানপন্থী। তিনি যদি মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর কমান্ডার বা বীর উত্তম উপাধিতে ভূষিতও হন তার পরও তিনি রাজাকার। দেশের বৃৃহত্তম বিরোধী দলের সমর্থক যাদের বেশির ভাগের জন্ম ৭১-এর পর, তারা সবাই আজ রাজাকার। আওয়ামী মতাদর্শের সাথে যাদের অমিল রয়েছে তারাও সবাই আজ রাজাকার। সেই হিসেবে আজ বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী রাজাকার, মরহুম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান রাজাকার, মরহুম মেজর জলিল রাজাকার। এ কে খন্দকার, মরহুম সিরাজ সিকদার, স্টুয়ার্ড মুজিব অগণিত মুক্তিযোদ্ধা আজ একটি দলের তালিকায় রাজাকার হিসেবে ‘নিবন্ধিত’। আমাদের প্রত্যাশা, বঙ্গবন্ধুর কন্যা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজ দলের তোষামোদকারী নেতাদের এ ধরনের বক্তব্য থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেবেন। এ ধরনের বক্তব্য একসময়ে বুমেরাং হয়ে নিজ দলের মারাত্মক ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান থেকে মুক্ত হয়ে স্বদেশে এসে জাতিকে বিভক্তির রাজনীতির মধ্যে ব্র্যাকেটবন্দী করে রাখেননি।
‘মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি’ বলে যারা নিজেদের জাহির করেন, তারাই আজ মুক্তিযোদ্ধাদের একটি অংশকে রাজাকার বলছেন। তাদের ‘দোষ’, তারা আওয়ামী লীগ করেন না- বিএনপি বা অন্যদলের সমর্থক। একজন রাজাকার যার বয়স ষাটোর্ধ্ব তিনি আওয়ামী লীগের সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন, ছবিসহ এ সংবাদ পত্রিকায় উঠেছে। তখন স্থানীয় লোকজন বলাবলি করছিলÑ একজন রাজাকার যদি আওয়ামী লীগ করে তখন সে হয়ে যায় মুক্তিযোদ্ধার সপক্ষের লোক। আর আওয়ামী লীগ না করলে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হয়ে যায় রাজাকার। এই কদর্য রাজনীতির চর্চা এখনো বেগবান। মিথ্যা রাজনীতির অনুসারীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে হীন রাজনীতি করার কারণে। মুক্তিযোদ্ধারা দেশের শ্র্রেষ্ঠ সন্তান, যেমন ভাষা সৈনিকরাÑ তারা সব দলের জন্য অহঙ্কার, তারা দেশের গর্বিত সন্তান। তাদের রাজনীতির কূটকচালে ব্যবহার করা অমার্জনীয় অপরাধ। আমরা জাতীয় ইস্যুতেও এক হতে পারছি না। একদল নিরপেক্ষ ব্যক্তি যাদের আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্টতা নেই, এসব বিশিষ্ট নাগরিক মহামান্য প্রেসিডেন্ট, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কাছে পত্র দিয়েছেনÑ চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনে গ্রহণযোগ্য সংলাপের আয়োজনের জন্য। দেশের মঙ্গলের জন্য নেয়া এই উদ্যোগকেও নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন ক্ষমতাসীনেরা।
৯ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিশিষ্ট নাগরিকদের এই উদ্যোগকে কঠোর ভাষায় নিন্দা করা হয়েছে। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন ‘এক-এগারো’র কুশীলবেরা সংলাপের এজেন্ডা নিয়ে মাঠে নেমেছেন। বিএনপির দোষ তাদের চোখে পড়ছে না। প্রশ্ন হলো- বিএনপি তো সংলাপের জন্য আগেই প্রস্তাব দিয়ে রেখেছে। এখন প্রধানমন্ত্রী সাড়া দিলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য দেশের তিনজন অভিভাবকের কাছে একটি পত্র দেয়া নিয়ে শুধু সরকারি দল থেকেই আপত্তি উঠেছে। সংলাপে ‘হ্যাঁ’ শব্দটি বললেই তো অবরোধ ও হরতালের অবসান এবং সহিংসতা বন্ধের সুযোগ ঘটবে। দুই দলই ভালো উদ্যোগকে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে এবং মানুষের দুঃখকষ্ট লাঘবে গ্রহণ করা উচিত। রাষ্ট্রক্ষমতায় যারা থাকেন, তাদের দায়িত্ব বেশি। উদারতার উদাহরণ সৃষ্টি করার এই সুযোগ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর গ্রহণ করা উচিত বলে আমরা মনে করি।
লেখক : গ্রন্থকার ও কলামিস্ট
Email:harunrashid ar@gmail.com

ময়মনসিংহে পুলিশের গুলিতে যুবক নিহত, সিলেট, বগুড়া ও লক্ষ্মীপুরে জামায়াত-পুলিশ সংঘর্ষ

২০ দলীয় জোটের ডাকা ৭২ ঘন্টা হরতালের সমর্থনে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ করেছে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীরা। সিলেটে পিকেটারদের হামলায় এক পুলিশ সদস্য আহত হয়েছে। বগুড়া ও লক্ষ্মীপুরে পুলিশের গুলিতে আহত হয়েছে দুইজন।
স্টাফ রিপোর্টার, সিলেট থেকে জানান, সিলেট নগরীতে পুলিশবাহী দুটি গাড়িতে হামলা চালিয়েছে শিবিরকর্মীরা। এতে এক পুলিশ সদস্যসহ ২ জন আহত হয়েছেন। রোববার সকাল ৬টা ৪০ মিনিটের সময় নগরীর শেখঘাট এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রোববার সকালে নগরীর মিরের ময়দানস্থ পুলিশ লাইন থেকে একটি লেগুনা ও একটি টেম্পুযোগে কয়েকজন পুলিশ সদস্য তাদের দায়িত্ব পালনে যাচ্ছিলেন। গাড়িটি শেখঘাট পয়েন্টে আসামাত্র কয়েকজন শিবির কর্মী গলির ভেতর থেকে বের হয়ে এসে গাড়ি দুটির গতিরোধ করে। পরে তারা লাঠিসোটা ও রাম দা নিয়ে পুলিশের উপর চড়াও হয় এবং গাড়ি ভাঙচুর করে। এ সময় এক পুলিশ সদস্য ও চালক আহত হন।
স্টাফ রিপোর্টার, বগুড়া থেকে জানান, রোববার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে হরতালের সমর্থনে বগুড়ার শেরপুর উপজেলার হামছায়াপুরে মহাসড়ক অবরোধ করে জামায়াত শিবির কর্মীরা। এসময় পুলিশ বাধা দিলে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। পুলিশকে লক্ষ্য করে ৩-৪টি ককটেল নিক্ষেপ করে অবরোধকারীরা। এতে পিছু হটতে বাধ্য হয় পুলিশ। কিছুক্ষণ পর অতিরিক্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে রাবার বুলেট ছুঁড়ে শিবির কর্মীদের ছত্রভঙ্গ করতে চাইলে দু’পক্ষের মধ্যে আবারও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। রাবার বুলেটের আঘাতে শিবির কর্মী রানা আহম্মেদ আহত হলে পুলিশ তাকে আটক করে। রানার কোমরে গুলিবিদ্ধ হয়েছে। তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে  প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। এসময় আরও ২ শিবির কর্মীকে আটক করে পুলিশ।
লক্ষ্মীপুর থেকে প্রতিনিধি জানান, হরতালের সমর্থনে মিছিল বের করলে লক্ষ্মীপুরে জামায়াত-শিবিরের মিছিলে গুলি চালায় পুলিশ। এ ঘটনায় একজন গুলিবিদ্ধসহ ৩ জামায়াত-শিবির নেতাকর্মী আটক হয়েছে। রোববার সকাল ৯ টায় লক্ষ্মীপুর শহরে ২০ দলের ডাকা ৭২ ঘণ্টার হরতালের সমর্থনে জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীরা মিছিল বের করলে পুলিশ তাদেরকে ধাওয়া দেয়। এসময় উভয় পক্ষের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পুলিশ জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীদের লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়লে একজন গুলিবিদ্ধ হয়।
স্টাফ রিপোর্টার গাজীপুর থেকে জানান, গাজীপুর সিটি মেয়র ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা অধ্যাপক এমএ মান্নানের মুক্তির দাবিতে ও হরতালের সমর্থনে আজ রোববার সকালে গাজীপুরে বিক্ষোভ মিছিল করেছে বিএনপি। সদর উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক বশির আহমেদ বাচ্চুর নেতৃত্বে নগরের নাওজোর এলাকার ঢাকা- টাঙ্গাইল মহাসড়কে মিছিল শুরু করলে পুলিশের ধাওয়ায় কিছুক্ষণের মধ্যেই তা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। অন্যদিকে ৭২ ঘন্টা হরতালের প্রথম দিনে গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা এলাকার ঢাকা- ময়মনসিংহ মহাসড়কে শিবিরের নগর সেক্রেটারি আহমদ ইমতিয়াজ এর নেতৃত্বে পিকেটিং করেছে ছাত্রাশিবির। এতে মহানগর শিবিরের প্রচার সম্পাদক হাসান মেহরাবে, জেলা শিবিরের এইচ আর ডি সম্পাদক তারেকুজ্জামান, ভাওয়াল কলেজ সভাপতি আসরাফুল ইসলাম  শিবির নেতা মুনাব্বির, সাকেরসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
ময়মনসিংহে পুলিশের গুলিতে যুবক নিহত
ময়মনসিংহ শহরে গভীর রাতে পুলিশের গুলিতে অজ্ঞাত এক যুবক নিহত হয়েছে। পুলিশের দাবি, নিহত যুবক একজন ছিনতাইকারী। শনিবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে শহরের পাদ্রি মিশন রোডে এ ঘটনা ঘটে। এসময় সেলিম নামে অপর এক যুবককে আটক করেছে পুলিশ।
ময়মনসিংহ ১ নং ফাড়ির টাউন সাব ইন্সপেক্টার আব্দুল কাদের খান পিপিএম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, শনিবার রাত ২টার সময় ভাটিকাশর পাদ্রীমিশন গেইটে একদল ছিনতাইকারী ব্যবসায়ী আব্দুল ওয়াহাবকে ছুরিকাঘাতে আহত করে। পরে ঘটনাস্থলে পুলিশ পৌঁছলে পুলিশকে দেখে ছিনতাইকারীরা ছুরি নিয়ে তেড়ে আসে। আত্মরক্ষার্থে পুলিশ শটগান দিয়ে গুলি করে। এ সময় মিশনের দেয়াল টপকে ভিতরে পরে যায় আহত ছিনতাইকারী । পরে তার লাশ উদ্ধার করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠায় পুলিশ।

রাজাপক্ষের পতনের গভীরে

শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে অন্যতম ক্ষমতাধর প্রেসিডেন্ট ছিলেন মাহিন্দা রাজাপক্ষে। দোর্দণ্ড দাপটে দেশটিকে প্রায় এক দশক শাসন করেছেন। দীর্ঘ দিনের গৃহযুদ্ধের কারণ বিচ্ছিন্নতাবাদী তামিল টাইগার বিদ্রোহীদের নির্মূল করেছেন। শুধু বিরোধীদের নয়, নিজ দলের ভিন্নমতাবলম্বী ব্যক্তিদের নানাভাবে শায়েস্তা করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস নিজ মন্ত্রিসভার সদস্যরাও করতেন না। কিন্তু তাঁরই ডাকা আগাম নির্বাচনেই গো-হারা হেরেছেন তিনি।
অনেকেরই প্রশ্ন—আটঘাট বেঁধে নামার পরও কেন রাজাপক্ষের এই পরাজয়?
এ ব্যাপারে ইন্ডিয়া টুডে সাময়িকীর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গত ৯ জানুয়ারি সকালে রাজাপক্ষে যখন বুঝতে পারলেন যে নির্বাচনে তিনি হেরে যাচ্ছেন, তখন তিন লাখ অনুগত সেনার দ্বারস্থ হন। উদ্দেশ্য ছিল ছলচাতুরি করে ভোট গণনায় বিঘ্ন ঘটানো এবং এর জেরে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা। কিন্তু এমন প্রস্তাবে বেঁকে বসে সেনাবাহিনী। তখন প্রতিদ্বন্দ্বী মাইথ্রিপালা সিরিসেনার বিজয় মেনে নিয়ে প্রেসিডেন্টের ভবন ত্যাগ করা ছাড়া রাজাপক্ষের আর কোনো উপায় ছিল না।
প্রভাবশালী রাজাপক্ষের জনপ্রিয়তায় চিড় ধরেছিল আগেই। গত নভেম্বর থেকে তাঁর জনপ্রিয়তা নিম্নগামী হলেও তাঁকে সরানো একরকম অসম্ভব মনে করা হতো। দ্বীপরাষ্ট্রটিতে তাঁর পরিবার ছিল সবকিছুর নিয়ন্ত্রক। প্রায় এক দশক ধরে দেশ শাসন করার পরও সুপ্রিম কোর্টের নমনীয়তার সুযোগে বিতর্কিতভাবে ২০১০ সালে সংবিধান সংশোধন করেন। নজিরবিহীনভাবে তৃতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হন রাজাপক্ষে। নির্বাচনে বিজয় নিয়ে প্রবল আত্মবিশ্বাসী রাজাপক্ষে মেয়াদপূর্তির দুই বছর আগেই আগাম নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেন।
নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক প্রচারণা শুরু হওয়ার পর রাজাপক্ষকে সবচেয়ে বড় অবাক করেন তাঁর সাবেক বিরোধী চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা। বিরোধীদের সঙ্গে যোগ দেওয়া রাজাপক্ষের সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী সিরিসেনাকে কুমারাতুঙ্গা বিরোধী জোটের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেন। নির্বাচনে সিরিসেনা বিপুল ভোটে রাজাপক্ষেকে হারিয়ে দেন।
২০০৯ সালের মে মাসে তামিলদের হটিয়ে দেওয়ার পর রাজাপক্ষের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে ওঠে। ২০১০ সালে রাজাপক্ষে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ঘোষণা দেন। তামিলবিরোধী যুদ্ধে নেতৃত্বে থাকা সেনাপ্রধান শরৎ ফনসেকা নির্বাচনে রাজাপক্ষের বিরুদ্ধে লড়েন। কিন্তু নির্বাচনে হেরে যান ফনসেকা। এরপর দীর্ঘ দিনের সহচর ফনসেকাকে অযৌক্তিক মামলায় দোষী সাব্যস্ত করে কারাগারে দিতে দেরি করেননি রাজাপক্ষে। তবে তাঁর এমন কর্মকাণ্ডকে মোটেও ভালোভাবে নেয়নি সাধারণ মানুষ। দেশটির অনেকের ধারণা, ফনসেকার সঙ্গে এমন আচরণে পেশাজীবী, বুদ্ধিজীবী ও মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের মধ্যে রাজাপক্ষের জনপ্রিয়তা ক্রমশ হ্রাস পেতে থাকে। নতুন মহাসড়ক নির্মাণ আর বড় অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি রাজাপক্ষে তাঁর ক্ষমতাকে আরও কুক্ষিগত করতে থাকেন।
রাজনৈতিক বিরোধীদের নানাভাবে দমন করেন রাজাপক্ষে। তাঁর ভয়ে অনেক সাংবাদিক দেশত্যাগে বাধ্য হন। তিনি পরিবারের সদস্য ও মিত্রদের চীনের নির্মাণপ্রতিষ্ঠান থেকে কমিশন গ্রহণের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সম্পদ গড়ার ব্যবস্থা করে দেন। শ্রীলঙ্কার মধ্যবিত্ত শ্রেণি দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির বিপক্ষে সরব হলেও রাজাপক্ষেকে ক্ষমতা থেকে টলাতে পারেনি।
তৃতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত না হতে পেরে হতাশ রাজাপক্ষে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, তাঁর ২৮ বছর বয়সী ছেলে নির্মলের জন্য ক্ষমতায় আরোহণের পথ করতে চেয়েছিলেন তিনি। ২০২১ সালে বয়স ৩৫ বছর হলে নির্মল প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হতে পারতেন।
শ্রীলঙ্কায় রাজাপক্ষের প্রভাব ছিল সর্বত্র। বন্ধুত্ব করে বা ভয় দেখিয়ে গণমাধ্যম ও হোটেল, শিল্প ও ব্যাংকিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা তিনি নিয়ন্ত্রণ করতেন। পরম বিশ্বস্ত বন্ধু বা স্বজনদের বিদেশে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। জাতীয়তাবাদী বৌদ্ধ ভিক্ষুরা রাজাপক্ষের ভাই প্রতিরক্ষামন্ত্রী গোটাবায়ার মদদে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের নিয়ে একটি শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তোলে। সংগঠনটি সংখ্যালঘু হিন্দু, মুসলিম ও খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ায়।
ওই সংগঠনের সদস্যদের লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠেন মুসলিম ও খ্রিষ্টান নাগরিকেরা। তারা কলম্বোতে বৌদ্ধদের তুলনায় মুসলিম জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে বলে উসকানি দেয়। গত জুনে বিবিএস বলে পরিচিত এই সংগঠনের বৌদ্ধ ভিক্ষু ও তাদের সমর্থকেরা মুসলমান-নিয়ন্ত্রিত বেরুওয়ালা শহরে হামলা চালায়। এতে কমপক্ষে তিনজন নিহত হন। এর বিপক্ষে মুসলিম রাজনীতিকেরা তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলে ঘটনার বিচার দাবি করেন। কিন্তু রাজাপক্ষের সরকার দোষী কাউকে গ্রেপ্তার করেনি।
এর মধ্যে রাজাপক্ষের মন্ত্রিসভায় অসন্তোষ দেখা দেয়। মন্ত্রিসভার জ্যেষ্ঠ সদস্যদের বাদ দিয়ে রাজাপক্ষে নতুনদের প্রাধান্য দেন। অগ্রাধিকার দেন নতুনদের মতামতে। সেই অনুযায়ী অন্যায্য কিছু চুক্তিও করেন। কিন্তু রাজাপক্ষের ভয়ে জ্যেষ্ঠ সদস্যরা ছিলেন নিশ্চুপ।
দেশটির তামিল-অধ্যুষিত উত্তরাঞ্চলের মানুসৈল মন জয়েও ব্যর্থ হন রাজাপক্ষে। ২০১৩ সালে দেশটির প্রধান বিচারপতি শিরানি বন্দোরনায়েকেকে তাঁর বিরুদ্ধে রায় দেওয়ায় তাঁকে তিনি অপসারণ করেন। রাজাপক্ষের ওই সিদ্ধান্তের বিপক্ষে নতুন সামাজিক আন্দোলন শুরু হয়। গত বছর সর্বজনশ্রদ্ধেয় বৌদ্ধ ভিক্ষু মধুলোলুভি সোবিথা বিভিন্ন ক্ষেত্রের সুশীল সমাজের সদস্যদের এক করে সামাজিক ন্যায়বিচারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আগাম নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেন রাজাপক্ষে।
এরপর কুমারাতুঙ্গা তাঁর কারিশমা দেখান। কয়েক সপ্তাহের প্রস্তুতির পর তাঁর বাসায় বিরোধীরা মিলিত হন। সেখানে সিরিসেনা প্রেসিডেন্ট পদে লড়বেন বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা দুই মেয়াদের শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট ছিলেন। কিন্তু রাজাপক্ষের কারণে তাঁর বাবার প্রতিষ্ঠিত শ্রীলঙ্কা ফ্রিডম পার্টি (এসএলএফপি) থেকে তিনি বিতাড়িত হন। এ জন্য রাজাপক্ষের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়াতে সিরিসেনা ও মিত্রদের উদ্বুদ্ধ করেন।
রাজাপক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীন গোয়েন্দাদের ফাঁকি দিতে বিরোধীরা বিশেষ প্রযুক্তির ফোন ব্যবহার করেন। পরিকল্পনা মতো, বিরোধীরা গণমাধম্যে কয়েকজন সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেন। এতে রাজাপক্ষে একক কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হন। বিরোধীদের এমন কৌশল প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তাঁদের প্রত্যাশিত ফলাফল নিয়ে আসে।
প্রায় দশক ধরে একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী রাজাপক্ষে খাদের কিনারায় এসে ঠেকেছেন। গত ১৩ জানুয়ারি ক্ষমতাসীন জোটের মিত্র পিপল লিবারেশন ফ্রন্ট দেশটির দুর্নীতিবিরোধী সংস্থায় রাজাপক্ষে ও তাঁর ভাই গোটাবায়া, বাসিল ও নামালের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা ঠুকেছে। বাসিল ও তাঁর স্ত্রী ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে দেশ ছেড়েছেন। রাষ্ট্রীয় কৌঁসুলি রাজাপক্ষে ও তাঁর মিত্রদের বিপক্ষে মামলা করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। এমনটি হলে রাজাপক্ষে ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা বড় ধরনের আইনি খাঁড়ার নিচে পড়বেন।

সেতুর সংযোগ সড়ক অবৈধভাবে ইজারা by খলিল রহমান

(সুনামগঞ্জের তাহিরপুর-বাদাঘাট সড়কের হুছনারঘাট সেতুর সংযোগ সড়কের ভাঙা অংশে বাঁশের খুঁটির ওপর চাটাই বিছিয়ে চলাচলের উপযোগী করা হয়েছে l প্রথম আলো) গত বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সুনামগঞ্জের তাহিরপুর-বাদাঘাট সড়কের তিনটি সেতুর সংযোগ সড়কে বাঁশের সাঁকো তৈরি করে তিন মাস ধরে লোকজনের কাছ থেকে টাকা আদায় করা হচ্ছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আওতাধীন হলেও টাকা তোলার জন্য স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সংযোগ সড়ক ইজারা দিয়েছে বলে জানা গেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত বন্যায় তাহিরপুর-বাদাঘাট সড়কের দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়নের টাকাটুকিয়া সেতুর উত্তর পাশের সংযোগ সড়ক ভেঙে যায়। একইভাবে সড়কের বাদাঘাট ইউনিয়নের পাতারাগাঁও ও হুছনারঘাট এলাকার আরও দুটি সেতুর এক পাশের সংযোগ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর এসব সেতুর সংযোগ সড়কে বাঁশের চাটাই বিছিয়ে মানুষজনের চলাচলের ব্যবস্থা করে দিয়ে দুই পক্ষ টাকা আদায় করছে। জনপ্রতি পাঁচ টাকা এবং প্রতিটি মোটরসাইকেলের জন্য ১৫ টাকা করে দিতে হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, টাকাটুকিয়া এলাকায় সেতুর পাশে একটি অস্থায়ী ঘর তৈরি করে কয়েকজন টাকা আদায় করছেন। আবদুস সালাম নামের এক ব্যক্তি জানান, তাঁর বাবা স্থানীয় ইউপির সদস্য জহির আহমদ এই জায়গাটি জেলা পরিষদের কাছ থেকে ১৪ হাজার টাকায় ইজারা নিয়েছিলেন। পরে এই জায়গাটি আরেক পক্ষ ইউনিয়ন পরিষদের কাছ থেকে ২৫ হাজার টাকায় ইজারা নিয়েছে। এখন দুই পক্ষ মিলে টাকা আদায় করছে।
হুছনারঘাট ও পাতারগাঁও এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানে ছোট ছোট দুটি সেতুর ক্ষতিগ্রস্ত সংযোগ সড়কের একটি বাঁশের আড় দিয়ে মাটি ফেলা হয়েছে। অন্যটিতে দেওয়া হয়েছে বাঁশের সাঁকো। এখানে টাকা আদায়ের জন্য বাদাঘাট ইউপির কাছ থেকে এই স্থানটি ইজারা নিয়েছেন মোবারক হোসেন নামের এক ব্যক্তি। টাকা আদায়কালে ইউনুছ মিয়া নামের এক ব্যক্তি বলেন, ‘আমরা ইউনিয়ন পরিষদের কাছ থেকে ১ লাখ ৭৭ হাজার টাকায় এটি ইজারা এনেছি। এখানে সড়ক মেরামত করতেই ৫০ হাজার টাকার মতো খরচ হয়ে গেছে। আমরা বৈধভাবে টাকা নিচ্ছি।’
টাকাটুকিয়া এলাকায় মনিরুল হক নামের এক ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে মোটরসাইকেলে যাতায়াত করি। মাত্র ছয় কিলোমিটার পথ। এর মধ্যে দুই স্থানে আসা-যাওয়ায় ৬০ টাকা দিতে হয়।’
বাদাঘাট ইউপির চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘স্থানীয় সরকার হিসেবে আমরা সরকারের স্বার্থে ইজারা দিতে পারি। তবে ১ লাখ ৭৭ হাজার টাকার কথা সঠিক নয়। আরও কম টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে।’ তবে কত টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে সেটা তিনি জানাতে পারেননি। এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য দক্ষিণ বড়দল ইউপির চেয়ারম্যান সবুজ আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মুঠোফোন ধরেননি।
তাহিরপুর উপজেলা প্রকৌশলী মোহাম্মদ ফজলুর রহমান বলেন, এলজিইডির সড়ক এভাবে কেউ ইজারা দিতে পারে না। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী কেঁদেছেন, কান্না থামাবেন কি? by সোহরাব হাসান

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম অনেক বছর আগে লিখেছিলেন, ‘বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে, আমরা তখনও বসে/ বিবি তালাকের ফতোয়া খুঁজেছি, ফিকাহ ও হাদিস চষে।’
গেল শতকের তৃতীয় দশকে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটে আমাদের প্রিয় কবি এই পঙ্ক্তিগুলো উচ্চারণ করলেও এখনো সমভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি কথাগুলো বলেছিলেন ভারতবর্ষের, আরও নির্দিষ্ট করে বললে বাংলার মুসলমান সম্প্রদায়ের অজ্ঞানতা ও কুসংস্কারকে ইঙ্গিত করে। তিনি যে বাঙালি মুসলমানদের মনোজগতে আঘাত দিয়ে তাদের চৈতন্যোদয় ঘটাতে চেয়েছিলেন, সেই বাঙালি মুসলমান এখনো জেদ ও ফতোয়াবাজিতে ব্যস্ত। তখন ধর্মীয় ফতোয়া জোরদার ছিল, এখন রাজনৈতিক ফতোয়া। কথায় কথায় প্রতিপক্ষকে গালমন্দ না করলে, বিদেশের দালাল না বানাতে পারলে নেতা-নেত্রীদের পেটের ভাত হজম হয় না।
গণতন্ত্রের জন্য আমরা ভারতবর্ষ ভেঙেছি। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে পাকিস্তান ভেঙে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছি। কিন্তু গণতন্ত্র অধরাই রয়ে গেছে। গণতন্ত্র বলতে আমরা গোষ্ঠীতন্ত্র ও দলতন্ত্রকেই প্রাধান্য দিয়ে চলেছি। আমাদের নেতা-নেত্রীরা জর্জ ডব্লিউ বুশের সেই কুখ্যাত উক্তিকেই অনুসরণ করে চলেছেন, ‘যে আমার সঙ্গে নেই, সেই আমার শত্রু।’ আমার দল ছাড়া সব দলই বিদেশের দালাল।
যখন দেশ জ্বলছে, মানুষ পুড়ছে, অর্থনীতির চাকা থেমে আছে, তখন এসব রাজনৈতিক তত্ত্বকথা আওড়ানোর সুযোগ নেই। এই মুহূর্তে দেশ বাঁচাতে হবে। আগুনে মানুষ পোড়া বন্ধ করতে হবে। অন্যথায় নেতা-নেত্রীদের জেদ ও গোঁয়ার্তুমি বজায় থাকলেও দেশের অর্থনীতি বলতে কিছুই থাকবে না। খোদ অর্থমন্ত্রী দেশের পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, ঢাকার অবস্থা ভালো হলেও বাইরের পরিস্থিতি নাজুক। যেখানে এই মহাদুর্যোগ থেকে বাঁচার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর আশু কর্তব্য ছিল আলোচনায় বসে সমস্যার সমাধান করা, সেখানে তারা তো বসছেই না, যারা আলোচনার কথা বলছে, তাদেরই একহাত নিচ্ছে। কে কত অনড় ও আপসহীন, সেটি প্রমাণের জন্য নেতা-নেত্রীরা মরিয়া হয়ে উঠেছেন। মানুষের কল্যাণের জন্য যে রাজনীতি, সেই রাজনীতি সব মানবিক মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলেছে।
দেশের এই ভয়াবহ সংকটে জাতিসংঘসহ বিশ্ব সম্প্রদায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করলেও আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব নির্বিকার। এক পক্ষ মাসাধিককাল দেশ মহাসন্ত্রাসের কবলে পড়লেও সেটিকে আমলে নিচ্ছে না। তাদের কাছে এটি নিছকই আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা এবং বলপ্রয়োগের মাধ্যমেই তার সমাধান খুঁজছে। কিন্তু তারা বুঝতে পারছে না যে পরীক্ষায় পাসের জন্য সহজ বা সংক্ষিপ্ত সিলেবাস থাকলেও রাজনৈতিক সংকট উত্তরণে সে রকম কিছু নেই। আরেক পক্ষ লাগাতার অবরোধ–হরতালের নামে নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে। পেট্রলবোমা ছুড়ে মানুষ মারছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত বুধবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিট পরিদর্শনকালে দগ্ধ মানুষের আহাজারি দেখে নিজেও কেঁদেছেন। তাঁর এই অনুভূতি দেশের সাধারণ মানুষকেও স্পর্শ করেছে। পরদিন প্রথম আলোসহ প্রায় সব পত্রিকার প্রথম পাতায় প্রধানমন্ত্রীর এই কান্নারত ছবিটি ছাপা হয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আহত ও যন্ত্রণাকাতর মানুষগুলো এবং তাদের স্বজনদের আকুতি প্রধানমন্ত্রীর হৃদয়কে নাড়া দিয়েছে।
সন্ত্রাসীদের পেট্রলবোমায় মারাত্মকভাবে আহত হয়ে যাঁরা বার্ন ইউনিটে ভর্তি হয়েছেন, তাঁদের আর্তনাদ প্রধানমন্ত্রী শুনেছেন। আমরাও প্রতিদিন টিভিতে, পত্রিকায় তাঁদের আহাজারির খবর দেখছি ও পড়ছি। আমাদের যেসব সহকর্মী বার্ন ইউনিটে গিয়ে খবর সংগ্রহ করছেন, ছবি তুলছেন, তাঁদের মুখে শুনেছি কী ভয়ংকর, কী বেদনাদায়ক সেই দৃশ্য। বেঁচে থাকা মানুষগুলো মৃত ব্যক্তিদের ঈর্ষা করছিলেন। যাঁরা কোনো দিন রাজনীতি করেননি, যাঁরা সরকারি বা বিরোধী দল বোঝেন না, কেবল জীবন ও জীবিকার তাগিদে পথে নেমে পেট্রলবোমাধারী যমদূতদের শিকার হয়েছেন। কারও শরীরের ৭০ শতাংশ পুড়ে গেছে, কারও শরীরের ৫০ শতাংশ। কী দুঃসহ যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে তাঁদের প্রতিটি ক্ষণ, প্রতিটি মুহূর্ত কাটছে!
আমরা কী সান্ত্বনা দেব এই দগ্ধ-পোড়া মানুষগুলোকে, তাঁদের স্বজনদের। আমরা কী করে ভুলে যাব সেই নারীর কথা, যিনি কক্সবাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে স্বামী ও মেয়েকে হারিয়েছেন। আমরা কী করে ভুলে যাব কুড়িগ্রামের সেই ছোট্ট শিশুটির কথা, যে মাকে বলেছিল, ‘ওরা আমার গায়ে কেন বোমা মারল?’ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের বাইরেও অনেক সন্তানহারা মায়ের, স্বামীহারা স্ত্রীর, বাবাহারা সন্তানের কান্না শুনছি। এদের স্বজনদের হাসপাতালেও ঠাঁই হয়নি। ঠাঁই হয়েছে মর্গে। আমরা নীরব কান্না শুনছি ১৫ লাখ এসএসসি পরীক্ষার্থীর। দফায় দফায় যাদের পরীক্ষা পিছিয়ে এখন কবে শেষ হবে, কেউ বলতে পারে না। আমরা নীরব কান্না শুনছি লাখ লাখ দিনমজুরের, যাঁদের রুটি–রুজি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। আমরা কান্না শুনছি লাখ লাখ পরিবহনশ্রমিকের, যাঁরা বোমার ভয়ে রাস্তায় বের হতে পারছে না, না খেয়ে মরছে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও নিশ্চয়ই ওই সব মূঢ় ম্লান মুখ মানুষের নীরব কান্নাও শুনছেন। অনুভব করছেন তাঁদের দুঃখ, বেদনা ও দীর্ঘশ্বাস। কিন্তু এই লাখো-কোটি মানুষের সরব কান্না ও নীরব দীর্ঘশ্বাস মোচনের কথা কী একবারও ভেবে দেখেছেন? প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘কাদের সঙ্গে আলোচনা? খুনিদের সঙ্গে আলোচনা করব না।’...‘বিএনপি-জামায়াত যা করেছে, তা জঙ্গি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। আমরা এই দানবদের কোনো ছাড় দেব না। আমরা এই দানবদের প্রতিহত করে দেশে শান্তি আনব।’
প্রধানমন্ত্রী খুনিদের সঙ্গে আলোচনা করবেন না, দানবদের কাছে হার মানবেন না। খুবই ভালো কথা। আমরা তাঁর এই প্রত্যয়ের সঙ্গে পুরোপুরি একমত। প্রশ্ন হলো, কতিপয়ের দুর্বৃত্তপরায়ণতার জন্য একটি স্বীকৃত রাজনৈতিক দলকে কি দানব বা খুনি আখ্যায়িত করা যায়? (সংগত কারণেই আমি জামায়াতে ইসলামীকে এই হিসাবে আনছি না। এই দলটি একাত্তরে কেবল যুদ্ধাপরাধই সংঘটিত করেনি, এর রাজনৈতিক দর্শনও গণতন্ত্রের পরিপন্থী।) বিএনপিকে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ যদি নিশ্চিহ্ন করতে চায়, তাহলে বিএনপিও একই কাজ করবে। এর পরিণাম হবে ভয়ংকর। এ থেকে উত্তরণের পথ কী? গণতন্ত্রে প্রতিপক্ষকে হারাতে হয় ভোটের মাধ্যমে। যেমনটি দিল্লিতে আম আদমি পার্টির নেতা কেজরিওয়াল করেছেন। কোনো দলের মন্দ নীতিকে পরাস্ত করতে হবে উত্তম নীতি দিয়ে। কিন্তু কোনোভাবেই তার কথা বলার, সভা-সমাবেশ করার অধিকার খর্ব করা যাবে না। আবার বিএনপি নেত্রীও সরকারের স্বৈরাচারী নীতির প্রতিবাদ করতে গিয়ে আন্দোলনের নামে যেভাবে মানুষ পুড়িয়ে মারছেন, দেশকে জিম্মি করছেন, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
এই মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রীর কাছে সবার দাবি শান্তি ও স্থিতি। এই মুহূর্তে সবার চাওয়া উন্নয়নের ধারা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু সরকার বলপ্রয়োগের ও মুখ বন্ধ করার যে কৌশল নিয়েছে, তা ফল দেবে না। বিএনপি ক্ষমতায় থাকতেও একই কৌশল নিয়েছিল। বর্তমান সরকারও যদি সেটি করতে চালিয়ে যায়, তাহলে মারাত্মক ভুল করবে।
প্রধানমন্ত্রী একটি কথা প্রায়ই বলেন, খালেদা জিয়ার ভুলের খেসারত কেন জনগণ দেবে? আমরাও মনে করি, একজন রাজনৈতিক নেত্রী বা দলের ভুলের খেসারত কোনোভাবেই জনগণ দিতে পারে না। তারা সেই ভুলের দায় নেবে না। কিন্তু একজন প্রধানমন্ত্রী যদি ভুল করেন, পুরো দেশকেই তার জন্য কাফফারা দিতে হয়। বিএনপি-জামায়াত আমলে দেশ কী ভয়ংকর অবস্থায় গিয়েছিল, সেটি আমরা জানি। কিন্তু তখন কিন্তু ক্ষমতাসীনেরা সবকিছুর দায় আওয়ামী লীগের ষড়যন্ত্র বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। তার ফলও তাঁরা ভোগ করেছেন। এখন যদি ক্ষমতাসীনেরা সে রকম কোনো ভুল করেন, ভবিষ্যতে তার দায়ও তাঁদের নিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বার্ন ইউনিটের দগ্ধ মানুষের আহাজারি শুনে নিজে স্থির থাকতে পারেননি। কেঁদেছেন। এখন যেটি করণীয় সেটি হলো আর যাতে কাউকে পেট্রলবোমায় দগ্ধ হয়ে বার্ন ইউনিটে আসতে না হয়, সেই ব্যবস্থা নেওয়া। এবং তার একটিই উপায় হলো সমঝোতা। ২০০৭ সালে বিএনপি সমঝোতা করলে বিরোধী দলে থাকলেও সম্মানজনক আসন পেত। কিন্তু সেদিন তাদের গোঁয়ার্তুমির জন্য কেবল নির্বাচনটিই ভন্ডুল হয়নি, এক-এগারোর অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও ঘটেছে। এবার সে ধরনের কোনো অশুভ তৎপরতা বন্ধ করতেই সরকারকে সমঝোতার পথে আসতে হবে। দেশের উদ্বিগ্ন মানুষ এবং বিদেশের বন্ধুরা সে কথাটিই জোর দিয়ে বলছেন।
আওয়ামী লীগের নেতারা বড় গলায় বলেন, আওয়ামী লীগ বিএনপি নয়। তারা জনগণের দল। জনগণকে নিয়ে অান্দোলন করে। আমরাও মনে করি, আওয়ামী লীগ জনগণের ভেতর থেকে উঠে আসা একটি দল, যারা এই দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে। নেতৃত্ব দিয়েছে স্বাধীনতাযুদ্ধে। এই দলটি কেন জনগণের মুখোমুখি হতে ভয় পাবে? কেন ৫ জানুয়ারি বিতর্কিত নির্বাচনের রায়ের ভিত্তিতে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকবে? তবে আলোচনার অর্থ এই নয় যে বিএনপির সব দাবি মেনে নিতে হবে। আলোচনার মাধ্যমে সংবিধানের ভেতরেই সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচনের উপায় খুঁজে বের করা যেতে পারে। যেমন আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ এই মুহূর্তে ক্ষমতা ছেড়ে নির্বাচন দেবে, সেটি আমি মনে করি না। দুই পক্ষকেই ছাড় দিতে হবে। শেখ হাসিনার অধীনেই মধ্যবর্তী নির্বাচন হতে পারে। নির্বাচন কখন ও কীভাবে হবে সেটি আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করা যেতে পারে। আমরা মনে করি, এটিই এই মুহূর্তে বিরোধী দলের হরতাল–অবরোধ বন্ধ এবং সাধারণ মানুষের কান্না থামানোর পথ।
প্রধানমন্ত্রী সেটি করতে প্রস্তুত আছেন কি?
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab০3@dhaka.net

ভারতে ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত

ভারতে বেঙ্গালুরুর আনেকুলার কাছে শুক্রবার ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হয়ে কমপক্ষে ১১ জনের প্রাণহানি ও ৬০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর।
রেলওয়ে কর্মকর্তারা জানান, শুক্রবার স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে বেঙ্গালুরু থেকে কেরালার আরনাকুলামগামী বেঙ্গালুরু-আরনাকুলাম আন্তঃনগর ট্রেনটি কর্ণাটক-তামিলনাড়– সীমানার কাছাকাছি আনেকালের বেলাগোন্ডাপল্লি নামক স্থানে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। এতে আন্তঃনগর ট্রেনের নয়টি বগি লাইনচ্যুত হয়। ঘটনার পরপরই কর্ণাটক সরকার দ্রুত ঘটনাস্থলে অ্যাম্বুলেন্স পাঠায় এবং উদ্ধার অভিযান শুরু করে। বগির নিচ থেকে ১১ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, আরও অনেকে সেখানে আটকে আছেন। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

পাকিস্তানে আবারও শিয়া মসজিদে হামলা

পাকিস্তানের পেশোয়ারে শুক্রবার আবারও একটি শিয়া মসজিদে জঙ্গি হামলায় অন্তত ২২ জন নিহত এবং ৬৩ জন আহত হয়েছেন। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত (৬.২০) মসজিদ চত্বরে পুলিশ-জঙ্গি সংঘর্ষ চলছিল। মসজিদে জুমার নামাজ চলাকালে প্রথমে আÍঘাতী বিস্ফোরণ হয়। পরপর ৬-৭টি বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে মসজিদ চত্বর। সে সময় অন্তত একশ’ মুসল্লি মসজিদে উপস্থিত ছিলেন। উদ্ধার কাজ শুরু হয়েছে। মৃতের সংখ্যা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে পুলিশ গুলি চালানোয় ও ব্যারিকেড করে আটকে দেয়ায় কাতারে কাতারে মানুষ মসজিদ থেকে বেরিয়ে আসছেন। সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা রানা উমর হায়াত এএফপিকে বলেন, পেশোয়ারের ইমামিয়া মসজিদে শুক্রবারের জুমার নামাজ চলার সময় নিরাপত্তা রক্ষীর পোশাকে ৫-৬ জন সশস্ত্র জঙ্গি মসজিদে ঢুকে পড়ে গ্রেনেড হামলা চালায়।
এদের মধ্যে একজন আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ঘটানোর পর বাকিরা বিক্ষিপ্ত গুলি চালাতে থাকে। হায়াতাবাদ মেডিকেল কমপ্লেক্সের ডাক্তার মুমতাজ খান জানান, অন্তত ২২ জন নিহত এবং ৬৩ জন আহত হয়েছে। সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা মিয়া সাঈদ মৃত্যুর সংখ্যা নিশ্চিত করে আহতের সংখ্যা ৬০-এর বেশি বলে উল্লেখ করেন। প্রত্যক্ষদর্শী মোহাম্মদ রাজা সংবাদ সংস্থাকে জানিয়েছেন, ‘খুব জোরে একবার বিস্ফোরণের আওয়াজ শুনতে পাই। তারপরই দেখলাম অনেক মানুষ জখম হয়েছেন।’ পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ প্রধান ইমরান খান পেশোয়ারে গিয়েছেন। পাকিস্তানের জঙ্গি গোষ্ঠি তেহরিক-ই-তালেবান এ হামলা দায় স্বীকার করেছেন। উল্লেখ্য, মাত্র দু’সপ্তাহ আগে দক্ষিণ পাকিস্তানের অপর এক শিয়া মসজিদে আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণে ৬১ জন নিহত হন। এনডিটিভি, জিওটিভি।

বাঁশের খুঁটি দিয়ে বিদ্যুৎ–সংযোগ by এ বি সফিউল আলম

(লালমনিরহাটের পাটগ্রাম-বুড়িমারী রেলপথের বুড়িমারী ইউনিয়নের গুড়িয়াটারী এলাকায় রেললাইনের দুপাশে বাঁশের খুঁটি বসিয়ে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ-সংযোগ নেওয়া হয়েছে l প্রথম আলো) লালমনিরহাটে পাটগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের অদূরে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার রেলপথের পূর্ব পাশের এলাকায় বিদ্যুৎ রয়েছে। তবে খুঁটি না থাকায় পশ্চিম পাশের এলাকায় বিদ্যুৎ-সংযোগ নেই। তাই পশ্চিমের লোকজন বাঁশের খুঁটি দিয়ে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ-সংযোগ নিয়েছে। এতে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে ট্রেন। গতকাল শনিবার সরেজমিনে দেখা গেছে, পাটগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের অদূরে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার রেলপথের দুই পাশে এলোমেলোভাবে বাঁশের খুঁটি বসিয়ে লাইনের ওপর দিয়ে বিদ্যুৎ-সংযোগ নিয়েছে বুড়িমারী ও পাটগ্রাম ইউনিয়নের ধবলসুতি, খানপাড়া, বেলতলী, ঘণ্টিঘর, গুড়িয়াটারী ও বুড়িমারী বাজারের লোকজন। রেললাইনের কারণে এই ছয় এলাকা বিভক্ত হয়ে পড়েছে। পূর্ব পাশের এলাকায় বিদ্যুৎ থাকলেও পশ্চিম পাশের এলাকায় খুঁটি না থাকায় বিদ্যুৎ নেই। তাই এসব এলাকার বাসিন্দারা পূর্ব পাশ থেকে বাঁশের খুঁটি বসিয়ে তার ওপর দিয়ে বিদ্যুৎ-সংযোগ নিয়েছে। ওই রেললাইনের ওপর দিয়ে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) বৈদ্যুতিক খুঁটি না বসানোয় সেখাকার মানুষ এভাবে বিদ্যুৎ-সংযোগ নিয়ে জমিতে সেচ দেওয়াসহ নৈমিত্তিক কাজে বিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন।
বিদ্যুৎহীন এলাকার বাসিন্দারা বলেন, তাঁরা বিদ্যুতের জন্য ছয়-সাত বছর ধরে পিডিবির কার্যালয়, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানসহ অনেকের কাছে ধরনা দিয়েছেন। কিন্তু ফল পাচ্ছেন না।
পাটগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের ব্যবস্থাপক মোকলেছুর রহমান বলেন, প্রায় তিন বছর আগে ট্রেনের ছাদে বসায় অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তি ওই তারে জড়িয়ে মারা যান। এসব অবৈধ বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা প্রয়োজন। তবে এটা দেখভালের দায়িত্ব রেলওয়ে লালমনিরহাট বিভাগের।
লালমনিরহাট-বুড়িমারী সেকশনের তত্ত্বাবধায়ক লালমনিরহাট রেলওয়ে বিভাগের জ্যেষ্ঠ উপসহকারী প্রকৌশলী (ওএ) আবদুল লতিফ বলেন, এসব বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার জন্য পিডিবির স্থানীয় কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হয়েছে।
বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আছির উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, গ্রামগুলোতে গরিব কৃষকেরা বিদ্যুতের লাইন টেনে শুধু কৃষিজমিতে সেচ দেয়। এরপর লাইন খুলে রাখে। এতে তেমন সমস্যা হয় না। তবে সেখানে খুঁটির প্রয়োজন রয়েছে।
পাটগ্রাম দোয়ানী বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্রের আবাসিক প্রকৌশলী (আরই) আনিছুর রহমান বলেন, ‘নতুন যোগদান করেছি। তাই রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ পত্র দিয়েছে কি না তা জানা নেই। এ ছাড়া ওই এলাকায় গিয়েছিলাম। সেখানে বৈদ্যুতিক খুঁটির প্রয়োজন রয়েছে।’

চট্টগ্রাম কারাগারের মালী- মনের বাগানও ভরে যাক ফুলে

চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরে আট কয়েদির গড়ে তোলা ফুলবাগান নিয়ে শুক্রবারের সমকালে যে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে, তা বহুমাত্রিক ভাবনার খোরাক জোগায় বৈকি। সীমাবদ্ধ ভূমির বন্দিজীবনেও বিভিন্ন অপরাধের কারণে দণ্ডিত তো বটেই, এমনকি খুনের দায়ে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত একদল মানুষ যেভাবে সুন্দরের সাধনা করে যাচ্ছেন, তা কারাজীবনের গতানুগতিক চিত্রে যেন চিড় ধরায়। আমরা জানি নাজিমুদ্দিন রোডে অবস্থিত কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দিজীবন কাটানোর সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ফুলের গাছ লাগিয়েছিলেন। অন্য রাজবন্দিরাও এ ধরনের কাজ করতেন। তারা যথার্থই মনে করতেন_ কেবল সময় কাটানো নয়, সুস্থ-সবলভাবে বেঁচে থাকার প্রেরণাও এতে মেলে। সমকালের প্রতিবেদনসূত্রে জানা যাচ্ছে, ২০১১ সালে এক চিলতে জমিতে জনৈক কারাবন্দি প্রথমে বাগান শুরু করেন। পরে তার সঙ্গে যোগ দেন অন্য সাতজন। সম্প্রসারিত হয়েছে বাগানও। এখন কারাগারের ভেতরেই বিভিন্ন প্লটে আটটি ফুলবাগান গড়ে তুলেছেন তারা। নানা ঋতুতে সেখানে হেসে ওঠে ও সুগন্ধ ছড়ায় অন্তত ৪১ প্রজাতির ফুল। স্বউদ্যোগে কাজটি বেছে নেওয়া এবং কোনো শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ছাড়া এভাবে ফুল ফোটানো তাদের হৃদয়ের সৌন্দর্যই পরিস্ফুট করেছে। কারা কর্তৃপক্ষের সহযোগিতাও স্মরণ করতে হবে বৈকি। তারা যেভাবে জমি দিয়েছেন এবং উৎপাদিত ফুল বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি না করে কারাগারের বিভিন্ন দপ্তর ও স্থাপনার সৌন্দর্য বর্ধনের কাজে ব্যবহার করছেন, তা ব্যতিক্রমী। স্থান ও আগ্রহী বা দক্ষ 'মালী' থাকলে বাণিজ্যিকভাবেও ফুলের উৎপাদন হতে পারে। সশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্তদের দিয়ে যদি অন্যান্য উপকরণ তৈরি করা যায়, ফুল চাষ হবে না কেন? বিনাশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদিরাও ইচ্ছা করলে যাতে যুক্ত হতে পারেন, সে সুযোগ রাখা উচিত। বস্তুত ইউরোপে এমন নজির অনেক রয়েছে। বিশেষত প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কয়েদিদের রাখা হতো বিরানভূমিতে তৈরি অস্থায়ী কারাগারে। যেখানে অনেকেই 'শখের' বাগান গড়ে তোলেন। ফুল ছাড়াও শাক-সবজি জন্মানো হতো। কারাগার থেকে মুক্ত হয়েও সেই 'চাষিরা' সমিতি গড়ে তুলে ফুল ও ফল উৎপাদন অব্যাহত রেখেছেন_ এমন উদাহরণ কম নয়। চট্টগ্রাম কারাগারকে কেন্দ্র করেও অনুপ্রেরণাদায়ক সেসব নজিরের পুনরাবৃত্তি হতে পারে। আমরা চাইব, কারাগারে অবস্থানকালেও ফুলের সৌন্দর্যের এই চর্চা 'সংশোধনের' জন্য থাকা কয়েদিদের জীবনে প্রতিফলিত হোক। তাদের হৃদয় ফুলের মতোই পবিত্র হয়ে উঠুক। সেজন্য কারা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব নেহাত কম নয়। ফুল চাষের জন্য যেভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন, সেভাবে কয়েদিদের হৃদয়-বাগান ফুলে ভরিয়ে তোলার জন্যও আন্তরিকতার সঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। কারাগারের অমানবিক পরিবেশ অনেক ক্ষেত্রে কয়েদিদের সংশোধনের বদলে আরও অন্ধকারে ঠেলে দেয়। এ ব্যাপারে সতর্কতা ও নজরদারি চাই। চাই পরিবার-পরিজন, বন্ধুহীন মানুষগুলোর প্রতি ভালোবাসা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার 'মনের বাগানবাড়ি' প্রবন্ধে বলেছেন, 'ভালবাসার একটি মহান্ গুণ এই যে, সে প্রত্যেককে নিদেন এক জনের নিকটেও আদর্শ করিয়া তুলে। এইরূপে সংসারে আদর্শ ভাবের চর্চা হইতে থাকে। ভালবাসার খাতিরে লোককে মনের মধ্যে ফুলের গাছ রোপণ করিতে হয়, ইহাতে তাহার নিজের মনের স্বাস্থ্য-সম্পাদন হয়, আর তাহার মনোবিহারী বন্ধুর স্বাস্থ্যের পক্ষেও ইহা অত্যন্ত উপযোগী।' চট্টগ্রাম কারাগারের কিছু কয়েদি ভূমিতে ফুলের বাগান তৈরি করছেন। বিনিময়ে কারা কর্তৃপক্ষ তাদের 'মনের মধ্যে ফুলের গাছ রোপণ' কিন্তু করতেই পারে!

পায়রা নদীতে ট্রলারডুবি- এ মৃত্যুর সান্ত্বনা নেই

তারা পটুয়াখালীর সমুদ্রসৈকতের এলাকা কুয়াকাটা থেকে এসেছিলেন বরগুনা জেলার বামনা উপজেলার চলাভাঙা দরবার শরিফের বার্ষিক ওয়াজ মাহফিলে যোগ দিতে। নিজেরাই ভাড়া করেছিলেন মাছ ধরার ট্রলার। কিন্তু নিষ্ঠুর নিয়তি তাদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিল। শুক্রবার পায়রা ও বিষখালীর মোহনায় ট্রলারটি নিমজ্জিত হলে সাতজনের মৃত্যু হয়। নিখোঁজ রয়েছেন একজন। দিনের বেলা দুর্ঘটনাটি সংঘটিত হওয়ার কারণে বেশিরভাগ যাত্রী বেঁচে গেছেন। মাছ ধরার ট্রলার হওয়ায় এর কোনো ছাউনি ছিল না। ফলে নৌকা থেকে বের হতে তেমন সমস্যা হয়নি। নদীবিধৌত এলাকা হওয়ায় ট্রলারের দেড়শ' থেকে দুইশ' যাত্রীর বেশিরভাগ সম্ভবত সাঁতারও জানতেন। উদ্ধার পাওয়া যাত্রীরা বলছেন, ধারণ ক্ষমতার তুলনায় বেশি যাত্রী ওঠার কারণেই ডুবেছে ট্রলারটি। ট্রলারটিকে ডুবতে দেখে আশপাশ থেকে কয়েকটি ট্রলার ছুটে আসে। কোস্টগার্ড সদস্যরাও উদ্ধার কাজে অংশ নেন। এ মৃত্যুর জন্য কাকে আমরা দায়ী করব? ট্রলারটি ব্যবহার হচ্ছিল মাছ ধরার জন্য। আমাদের দেশে দূর-দূরান্ত এলাকা থেকে ওয়াজ মাহফিল কিংবা এ ধরনের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নিতে নানা বয়সের লোকজন আগ্রহী থাকেন। প্রতি বছর টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমায় দেখা যায় এমনকি বয়স্ক ব্যক্তিরাও সব কষ্ট উপেক্ষা করে প্রত্যন্ত অঞ্চল থকে ছুটে আসেন। এ বছর রাজনৈতিক অশান্তি-অস্থিরতার মধ্যেও এ আয়োজনে শামিল হয়েছিলেন লাখ লাখ মানুষ। বরগুনার চলাভাঙা দরবার শরিফের ওয়াজ মাহফিলের প্রতি বিপুলসংখ্যক লোকের আকর্ষণ রয়েছে, এটা ধরে নেওয়া যায়। তারা কোনো বাধাই মানতে রাজি নন। ধর্মীয় নেতাদের বক্তব্য শোনার জন্য অনুষ্ঠানস্থলে পেঁৗছানোর ব্যবস্থা তারা নিজেরাই করেছিলেন। নিহতদের স্বজনরা তাই কাউকে অব্যবস্থাপনা কিংবা প্রয়োজনীয় যানবাহন সংগ্রহ না করার জন্য দায়ী করতে পারবেন না। অবশ্য এমন দাবিও কেউ করেননি। কিন্তু ঘটনাটি মর্মান্তিক। কয়েকটি পরিবার এভাবে শোকের সাগরে নিমজ্জিত হলো। শুধু পটুয়াখালী ও বরগুনার প্রশাসনের জন্য নয়, দেশের সর্বত্রই এ ধরনের যানবাহন ব্যবহারের বিষয়ে সতর্ক থাকা বাঞ্ছনীয়। জনসচেতনতাও গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় সরকারে যারা নির্বাচিত হন, তাদের এ ব্যাপারে দায়িত্ব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গোপসাগরের মোহনার নদীগুলোতে এমনকি শীত মৌসুমেও চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়। শুক্রবার নৌযানটি ঝড়-বৃষ্টি ছাড়াই বিপদে পড়া তাই একেবারে অস্বাভাবিক ছিল না। আমরা শোকাহত পরিবারগুলোর প্রতি শোক ও সমবেদনা জানাই। নিহতদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ প্রদানে সরকার এবং স্থানীয় বিত্তবানরা উদ্যোগী হবেন, এটাই প্রত্যাশা।

সাদিয়ার গুগল–যাত্রা by মেহেদী হাসান

বুয়েটের শিক্ষার্থী সাদিয়া চাকরি নিয়ে যাচ্ছেন গুগলে
‘আমি ওকে বলেছিলাম গুগল জয় করে দেখাও। ও দেখিয়েছে!’ কথাগুলো ফৌজিয়া রহমানের, তাঁর মেয়ে সাদিয়া নাহ্রীন বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গুগল ইনকরপোরেটেডে নিয়োগ পেয়েছেন।
চলতি বছর বাংলাদেশ থেকে যে সাতজন শিক্ষার্থীর গুগলে চাকরি নিশ্চিত হয়েছে, তাঁদের মধ্যে একমাত্র মেয়ে সাদিয়া। স্নাতক পর্যায় থেকে সরাসরি গুগলে বাংলাদেশের কোনো মেয়ে হিসেবে সাদিয়াই প্রথম সুযোগ পেলেন। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি সম্পন্ন করে গুগেল যোগ দিয়েছেন বাংলাদেশের ফারহানা আশরাফ।
৯ ফেব্রুয়ারি কথা হয় সাদিয়া নাহ্রীনের সঙ্গে। কক্সবাজারে জন্ম, কিন্তু সাদিয়া বেড়ে উঠেছেন ঢাকায়। হলিক্রস বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি আর হলিক্রস কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ২০০৯ সালে ভর্তি হন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার-কৌশল বিভাগে। চলতি বছরের মাঝামাঝি সাদিয়ার স্নাতক শেষ হবে। তার পরেই পাড়ি জমাবেন যুক্তরাষ্ট্রের মাউনটেইন ভিউয়ে, গুগলের প্রধান কার্যালয়ে।
গুগল সার্চ, ইউটিউব ও জিমেইলের মতো জনপ্রিয় সেবাগুলো যে প্রতিষ্ঠানের, সেখানে বিশ্বের মানুষের জন্য কাজ করা যায়। এই রোমাঞ্চ থেকেই গুগলে কাজ করার কথা ভাবতে থাকেন সাদিয়া। তিনি বলেন, ‘গুগলে কাজের ক্ষেত্র অনেক বড়। নিজের মেধার পূর্ণ ব্যবহার করা যাবে ওখানে।’
গুগলের নিয়োগ পাওয়ার প্রক্রিয়া জানালেন সাদিয়া। এবারই প্রথমবারের মতো অনলাইনে চারটি পরীক্ষা নিয়েছে গুগল, যেকোনো একটিতে অংশ নিলেই হলো। পরীক্ষাগুলো প্রোগ্রামিং সমস্যা সমাধানের প্রতিযোগিতা ‘কোড জ্যাম’-এর মতো। অ্যালগরিদম-ভিত্তিক সমস্যা দেওয়া থাকে, খুঁজে বের করতে হবে সম্ভাব্য সমাধান। উত্তীর্ণ হলে ডাক পড়বে সাক্ষাৎকারের জন্য। এ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগে সাক্ষাৎকারপর্ব সেরেছে গুগল। প্রতিটি ৪৫ মিনিট করে মোট চারটি সাক্ষাৎকার নিয়েছে।
সাদিয়া বললেন, ‘এবার যাঁরা গুগলে সুযোগ পেয়েছেন, তাঁদের সবাই প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। আমরা এই পরিবেশের সঙ্গে আগে থেকেই পরিচিত। নির্দিষ্ট সময়ে সেরা সমাধানটা দেওয়ার অনুশীলনে আমরা অভ্যস্ত।’
সাদিয়া নাহ্রীনের বাসায় ঢুকে প্রথম চোখে পড়ে তাঁর বাইসাইকেল, যা এখন তাঁর নিত্যদিনের সঙ্গী। বিড়াল পুষতেও ভালোবাসেন তিনি। স্কুল-কলেজে গান করলেও প্রোগ্রামিংয়ে হাতেখড়ি বুয়েটে এসে। প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতার ওয়েবসাইট কোডফোর্সেস ডটকমে তৃতীয় বাংলাদেশি রেড কোডার (গ্র্যান্ডমাস্টার) হিসেবে নাম লিখিয়েছেন সম্প্রতি।
জানুয়ারি মাসে সাদিয়াদের সাক্ষাৎকার নিতে যে দলটি আসে গুগল থেকে, সেটিতে ছিলেন গুগলের কারিগরি পণ্য ব্যবস্থাপক মোহাম্মাদ শিশির খান। এক দশকের বেশি সময় ধরে তিনি কাজ করছেন গুগলে। টেলিফোনে শিশির জানালেন, গুগলে নিয়োগের ক্ষেত্রে দেখা হয় বুদ্ধিমত্তা। বললেন, ‘প্রোগ্রামিং সমস্যা সমাধানের বেলায় প্রার্থী “আউট অব দ্য বক্স” কতটা ভাবতে পারে, সেটা বিশেষভাবে দেখি আমরা। সাদিয়া দ্রুত বুঝতে পারে, প্রচলিত সমাধানের বাইরে ভাবতে পারে।’ িশশির জানালেন, গুগল চাইছে নারীদের অংশগ্রহণ আরও বাড়ুক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে। নারীদের আরও বেশি উৎসাহ দিতে চাইছে গুগল।
ফরিদ আহমেদ আখতার ও ফৌজিয়া রহমান দম্পতির দুই সন্তানের মধ্যে বড় সাদিয়া নাহ্রীন। বাবাও ছিলেন বুয়েটের শিক্ষার্থী, এখন বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনে কর্মরত। 
ভবিষ্যৎ পেশাজীবন নিয়ে এখনই ভাবতে চাইছেন না সাদিয়া। কোন কাজে বেশি পারদর্শী, কী করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, অর্থাৎ নিজের যোগ্যতা যাচাই করে তারপর ভবিষ্যৎ ঠিক করবেন। তবে একটা সময় অবশ্যই দেশে ফিরে আসবেন, জানালেন সাদিয়া।

খালেদা জিয়ার অফিসে ভাত বন্ধ by ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী

(গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের কর্মকর্তা ও নিরাপত্তারক্ষীদের জন্য আনা খাবার নিয়ে আজ শনিবার দুপুরে দুই ব্যক্তি ভেতরে প্রবেশ করতে চাইলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাঁদের বাধা দেন। ছবি: সাজিদ হোসেন, প্রথম আলো) পৃথিবীতে কোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলনই যেমন দিনক্ষণ বেঁধে দিয়ে শুরু বা শেষ হয়নি, তেমনি শনি-মঙ্গলবারের চিন্তা করেও সফলভাবে আন্দোলন শুরু করা বা তাতে সাফল্য অর্জন করা যায়নি। একটি নিরপেক্ষ কর্তৃপক্ষের অধীনে মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি ২০ দলীয় জোট করে আসছিল ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন-পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ে। কার্যত এই প্রতিবাদের ধারা সূচিত হয়েছিল সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করার মধ্য দিয়ে। সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক ওই ব্যবস্থা বাতিলের রায় ঘোষণা করেছিলেন। সে রায়ে তিনি অবশ্য আরো বলেছিলেন, পরবর্তী দু’টি সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলো চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার অধীনেই হতে পারে। এ রায়টি এসেছিল সদরঘাটের স্টার সিনেমা হলের মালিকানা নির্ধারণ করতে গিয়ে। এ কারণে তা অত্যন্ত অপ্রাসঙ্গিক ও অসঙ্গত।
২০০৮ সালে সাজানো নির্বাচনের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট ক্ষমতায় আসীন হয়। এর আগে ২০০৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাওয়ার লালসায় ঘটিয়েছিল নজিরবিহীন পৈশাচিক তাণ্ডব। সে সময় সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় গঠিত রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে প্রত্যাখ্যান করেছিল দলটি। এমনকি সংবিধানে দেয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কোনো অপশনই তারা মেনে নিতে অস্বীকার করে। শেষ অপশন ছিল রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন। ওই সরকার গঠিত হওয়ার বিষয়কে আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক মরহুম আবদুল জলিল মেনে নিয়েছিলেন। আর শেখ হাসিনা বলেছিলেন, দেখা যাক, উনি কতটা নিরপেক্ষভাবে তার দায়িত্ব পালন করেন।
কিন্তু সে সময় ইন্দো-মার্কিন ষড়যন্ত্র ছিল ভিন্ন উদ্দেশ্যে। তারা চাইছিলেন, একটি অরাজনৈতিক সামরিক সরকার। এর অংশীদার ছিল আওয়ামী লীগও। রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনকে তাদের কথায় উঠবস করানোর জন্য ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর আওয়ামী লীগের লগি-বৈঠাধারীরা রাজধানীর পল্টন এলাকায় নরহত্যাযজ্ঞের আয়োজন করে। সেখানে নিরস্ত্র নিরীহ প্রতিপক্ষকে পিটিয়ে যে বর্বরতা ও পৈশাচিকতার নজির তারা স্থাপন করেছে, তা ইতিহাসে বিরল ঘটনা। টিভির পর্দায় সেই শত শত লোকের সামনে হত্যাযজ্ঞের দৃশ্য লাইভ প্রচারিত হয়েছিল। পরে ওই হত্যাযজ্ঞকে আওয়ামী লীগ যৌক্তিক বলে প্রচারণা চালাতে থাকলেও ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, সন্ত্রাসীরা লগি-বৈঠার পাশাপাশি আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে গুলিও চালাচ্ছে। সেটা ছিল ইয়াজউদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে এ বার্তা পৌঁছে দেয়া যে, তাদের কথামতো কাজ না করলে তারা দেশব্যাপী এমন সহিংসতা চালানোর সামর্থ্য রাখে। শুধু এটা নয়, বর্তমান সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এই বলে হুমকি দিয়েছিলেন, তাদের কথামতো না চললে বঙ্গভবনের খাদ্য, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহ, এমনকি অক্সিজেন পর্যন্ত তারা বন্ধ করে দেবেন।
সে সময় সাম্রাজ্যবাদী ও আধিপত্যবাদী শক্তির লেজুড় হিসেবে দাঁড়িয়েছিল কথিত একটি সুশীলসমাজ। তারা পরবর্তী নির্বাচনের জন্য রাজনীতিবিদদের বাদ দিয়ে দেশব্যাপী ‘সৎ’ প্রার্থী অনুসন্ধানে নেমেছিলেন। তদুপরি, এমন একটি ধারণা দেয়ার চেষ্টা করছিলেন যে, রাজনীতিক মাত্রই অসৎ ও দুর্নীতিবাজ। অতএব, প্রার্থী হবেন রাজনৈতিক দল করেন না, এমন ব্যক্তিরা। অবশ্য বহু জায়গায় তাড়া খেয়ে এসব সুশীলকে দ্রুত ঢাকায় ফিরে আসতে হয়েছিল। তাদের ছিল দু’টি প্রভাবশালী পত্রিকাÑ একটি বাংলা। অপরটি ইংরেজি। এই মিডিয়া সদ্যবিদায়ী বিএনপির মন্ত্রী, এমপি, নেতানেত্রীদের বিরুদ্ধে অসঙ্গত ও অসংলগ্ন প্রচার চালায়। তাদের লোক নাকি কোনো কোনো এলাকায় মুদি, তরিতরকারির দোকানে গিয়েছিল, দোকানিরা তাদের নাকি জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, তারা বঙ্গভবনের জন্য কোনো পণ্য বিক্রি করবেন না। এসব হাস্যকর গল্প। এভাবে তারাও দেশকে রাজনীতিশূন্য করার ষড়যন্ত্রের শরিক হলেন।
আওয়ামী লীগও সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, কোনো ধরনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে না। বিরোধী দলে থেকেও যে গণবিরোধী তৎপরতায় তারা লিপ্ত ছিল, তাতে নিরপেক্ষ ভোট হলে সে নির্বাচনে তাদের জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। এ দিকে তাদের দাবির তালিকাও বাড়তে থাকেÑ ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার মানি না। অমুক উপদেষ্টা মানি না। নির্বাচন কমিশন মানি না। জনপ্রশাসনের পরিবর্তন মানি না।’ ফলে এমন এক অচল অবস্থা সৃষ্টি হলো যে, সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক উপায়ে মার্কিন নাগরিকত্ব গ্রহণকারী বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ফখরুদ্দীন আহমদকে সামনে রেখে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল মইন উদ্দিন কৌশলে ক্ষমতা দখল করলেন।
এরপরই তারা সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান একে একে অকার্যকর করে দিতে শুরু করেন। হস্তক্ষেপ করতে থাকেন বিচার বিভাগের ওপরও। বিএনপির হাজার হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা শুরু হলো; আওয়ামী লীগের ডজন ডজন। একপর্যায়ে তারা বেগম খালেদা জিয়া এবং তার দুই পুত্র তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান, তার মন্ত্রীবর্গ এবং শেখ হাসিনা ও তার কিছু মন্ত্রীকে গ্রেফতার করেন। তা সত্ত্বেও শেখ হাসিনা যখন ঘোষণা দেন, ওই সরকার তাদের আন্দোলনের ফসল, তখন আর বুঝতে বাকি থাকেনি যে, এমন একটি অসাংবিধানিক সরকার ক্ষমতায় নিয়ে আসার পেছনে কাদের মদদ কতটা প্রবল ছিল।
এরপর শেখ হাসিনা নানা অজুহাতে কারামুক্তি লাভ করেন এবং কয়েকটি দেশে সফর করে বেড়াতে থাকেন। অপর দিকে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত যে ছদ্মবেশী সরকার ক্ষমতায় আসীন হয়েছিল, তারা ক্রমান্বয়ে সর্বগ্রাসী দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়ে বিদায় নিয়েছিল। শেখ হাসিনা ঘোষণা দেন, ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে তিনি তাদের দায়মুক্তি দেবেন। তিনি সে কথা রেখেছেন। ওই অসাংবিধানিক শাসনের হোতা মইন-ফখর ও অন্যদেরকে নিরাপদে বিদেশে চলে যেতে দিয়েছেন। অনেককে নিরাপদেই রেখেছেন। আর জেনারেল মাসুদ উদ্দিন ছয় বছর ধরে অস্ট্রেলিয়ায় রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োজিত থেকে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে নির্বিঘœ জীবন যাপন করছেন।
যদিও শেখ হাসিনা মাঝে মধ্যেই অভিযোগ করেছেন যে, ওই তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাকে হত্যার জন্য আর্সেনিক বিষ প্রয়োগ করেছিল, তার কানের পর্দা ফেটে গিয়েছে ইত্যাদি। কিন্তু একই সাথে দেখা গেছে, তিনি দুই কানে দুই মোবাইল নিয়ে কথা বলছেন। তার সরকার ফেসবুকে ‘কটূক্তি’ করার জন্য তরুণদের ছয় থেকে আট বছর পর্যন্ত জেল দিচ্ছে, আর্সেনিক বিষ প্রয়োগ করে তাকে হত্যার চেষ্টাকারীদের বিরুদ্ধে টুঁ-শব্দটিও নেই। তাহলে ওই অভিযোগ কি নিতান্তই লোক দেখানো ছিল?
২০০৮ সালের পাতানো নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় আওয়ামী লীগ যেকোনো কৌশলে ২০১৪ সালে একতরফা নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছিল। এ নির্বাচন ছিল অর্থহীন, অগ্রহণযোগ্য ও অবিশ্বাস্য। ফলে খুব স্বাভাবিকভাবেই বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোট নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছিল। ১৫৪টি আসনে যারা বিজয়ী হয়েছিলেন তাদের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। এমনকি শেখ হাসিনার দীর্ঘকালের সঙ্গী জাতীয় পার্টির হুসেইন মুহম্মদ এরশাদও এই নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পরে তাকে জোর করে সিএমএইচে বন্দী রাখা হয়। জাতীয় পার্টি নির্বাচনের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করলেও বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্বাধিক সমালোচিত নির্বাচন কমিশন সেই চিঠি গ্রহণ করেনি।
ওই নির্বাচনে ৫ শতাংশের বেশি ভোট পড়েনি। ৪৯টিরও বেশি কেন্দ্রে একজন লোকও ভোট দেয়নি। অথচ নির্বাচনকেন্দ্র আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের এজেন্ট, পোলিং এজেন্টসহ তাদের প্রচারবিদেরা উপস্থিত ছিলেন। তারা উপস্থিত থেকেও ভোট দেয়ার প্রয়োজন অনুভব করেননি। নির্বাচনটি ছিল এমনই বিস্ময়কর। অথচ সেই নির্বাচন নিয়ে এখন সরকারের গর্বের সীমা নেই। সরকারের নির্বাচন কমিশন চার দিন পর ঘোষণা দেয়, প্রায় ৪০ শতাংশ ভোট পড়েছে। কিন্তু সে হিসাবের গরমিল নিয়েও সংবাদপত্রে রিপোর্ট চোখে পড়েছে। চার দিকে কেবলই অসত্য আর বানোয়াট কথা। এ থেকে বাদ নেই কেউÑ সরকার, নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন।
কথিত ওই ইলেকশনের নামে সিলেকশনের বর্ষপূর্তি ছিল গত ৫ জানুয়ারি। এ উপলক্ষে ঢাকায় দু’টি সমাবেশের ডাক দিয়েছিল বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট, বর্তমানে যারা সরকারে আছেন। কিন্তু ২০ দলীয় জোটকে ওই জনসভা করতে দিতে রাজি ছিল না সরকার। তাদের উদ্দেশ্য ছিল যেকোনো মূল্যে ওই জনসভা ভণ্ডুল করতেই হবে। তাই তারা নাক কেটে যাত্রাভঙ্গ করলেন। ৩ জানুয়ারি থেকে ঢাকামুখী সব যান চলাচল সরকার বন্ধ করে দেয়, যেন ২০ দলীয় জোটের জনসভায় কেউ হাজির হতে না পারেন। ১৪ দলীয় জোট যে জনসভা ডেকেছিল, তা যে নিতান্তই প্রহসন, সেটিও আর ঢাকা থাকেনি। কারণ, ঢাকামুখী যান চলাচল বন্ধ হলে তাদের লোকজনও তো ঢাকায় আসতে পারবে না। বিষয়টা সরকারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। কেননা তার আগে তারা যত অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন, সবই ছিল ফপ। অতএব, ‘রোখো ২০ দল তথা বিএনপি।’ কারণ, এর আগে তাদের অন্তত ১১টি জনসভায় লাখ লাখ লোক যোগ দিয়েছিল। অথচ প্রধানমন্ত্রীসহ আওয়ামী শীর্ষ নেতানেত্রীদের জনসভায় লোকসংখ্যা ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
গত ৩ জানুয়ারি সরকার পুলিশ দিয়ে ঘোষণা করিয়ে দিলো, সারা দেশে ওই মুহূর্ত থেকে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ, আর ১৪ দল বলল, আমরা আইন মান্যকারী। অতএব আমরা জনসভা করছি না। এর মধ্য দিয়ে যে কথা বলা হয়ে গেল, সেটা ২৭ ডিসেম্বর গাজীপুরে ২০ দলীয় জোটের জনসভা ভণ্ডুল করার মধ্য দিয়ে জানান দেয়া হয়েছিলÑ “আমাদের জনসভা করার ‘মুরোদ’ নেই। অতএব, আমরা পুলিশ ও প্রশাসন ব্যবহার করলাম। কিন্তু বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটকে তো আর জনসভা করতে দেয়া যায় না।” বাংলাদেশে অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ৪০-৪১তম দিন চলছে। এর মধ্যে সরকার নাটকের পর নাটক করেছে। অবরোধে অচল হয়ে গেছে গোটা দেশ। বাসে আগুন দেয়া হয়েছে। প্রথম দিকে আগুন দেয়ার সময় বলা হতো, ‘ভাই, বাস থেকে নামেন। আমরা আগুন দেবো।’ যাত্রী সব নেমে যেত। বাসে আগুন দিলে বড় ক্ষতি। তবে আন্দোলন-সংগ্রামে বাসে আগুন দেয়ার ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহু দিনই ঘটছে। এ অবস্থা যখন চলতে থাকে তখন এসে হাজির হলো পেট্রলবোমা কালচার। এতে সৃষ্টি হয়েছে বিশাল মানবিক বিপর্যয়। আর জনমনে এ বিশ্বাসই প্রবল হতে থাকে, এই পেট্রলবোমার সাথে সরকারি দলের লোকজন জড়িত। অথচ এর জন্য এ পর্যন্ত ২০ দলীয় জোটের প্রায় ২০ হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে সরকার। সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই। তাতে কী? ‘হুকুমের আসামি’ হিসেবে গ্রেফতার করা হয়েছে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ কেন্দ্রীয় অনেক নেতাকে। বেগম জিয়াও বহু স্থানে হুকুমের আসামি। তাই যদি হয় তাহলে ক্রসফায়ারে ইতোমধ্যে যে প্রায় ১০০ লোকের মৃত্যু হয়েছে, এর হুকুমের আসামি কে? তারও কি একদিন বিচার হবে না?
৩ জানুয়ারি থেকে বেগম খালেদা জিয়া তার কার্যালয়ে অবরুদ্ধ। সরকার তার কার্যালয়ের টিঅ্যান্ডটি, ডিশ, ইন্টারনেট লাইন কেটে দিয়ে তাকে জনবিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। তার কার্যালয়ে প্রবেশে কড়াকড়ি। কার্যালয়ে কর্মচারী-কর্মকর্তাদের জন্য দলের তরফ থেকে যে খাবার পাঠানো হয়, তা সরকার ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছে না। ফলে কার্যালয়ের ভেতরে অবস্থানকারী বেগম খালেদা জিয়াসহ প্রায় ৩০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রায় অভুক্ত অবস্থায় রয়েছেন। তারা মুড়ি-চিঁড়া-গুড়-বিস্কুট খেয়ে কোনোমতে দিনানিপাত করছেন।
আমরা এক দারুণ দৃশ্য দেখলাম ১৩ ফেব্রুয়ারি দুপুরে। বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ের নির্ধারিত ক্যাটারার খাবার নিয়ে এলেন। পুলিশ থামিয়ে দিলো। খাবার নিয়ে আসা ভ্যানগাড়িওয়ালার সাথে কী যেন হম্বিতম্বি করল। তারপর খাবারসহ ওই ভ্যানগাড়িতেই উঠে বসলেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা। সেই খাবার নিয়ে তারা ঢুকল গুলশান থানার ভেতরে। মনে হলো, সরকার পুলিশকে যথাযথ খাবারও দিচ্ছে না। ফলে বিএনপি চেয়ারপারসনের অফিসের খাবার লুট করে তাদের খেতে হচ্ছে। এটি বিপজ্জনক। সাংবাদিকেরা যাকেই প্রশ্ন করেন, উত্তর একটাই- ওপরের নির্দেশে। আর ওপরওয়ালা বলেন, আমি তো কিছু জানি না।
কিন্তু খালেদা জিয়া ও তার কার্যালয়ের প্রায় অর্ধশত কর্মকর্তা-কর্মচারীর ভাত বন্ধ করে সরকার এক ঐতিহাসিক নজির স্থাপন করল। যেন কোথাও সমতা নেই, সততা নেই; মনে হয়, জন্মান্ধ সরকার জন্মান্ধই রয়ে গেছে।

কেউ কথা রাখেনি- সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের সহযোগিতা প্রয়োজন

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে পেট্রলবোমায় দগ্ধ হয়ে যে ২৪ মানুষ মারা গেছেন, তাঁরা যেন মরে গিয়েই বেঁচে গেছেন। কিন্তু কষ্টে আছেন তাঁদের স্বজনেরা। আরও কষ্টে আছেন যে ৭৪ জন মানুষ পেট্রলবোমায় দগ্ধ হয়ে বেঁচে আছেন, তাঁদের অধিকাংশই আর স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাননি। অনেকে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন। তাঁদের প্রতি যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সেসব প্রতিশ্রুতিও রক্ষা করা হয়নি। বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন দগ্ধ ব্যক্তিদের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে মাথাপিছু ১০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছিল। আর ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই প্রত্যেক নিহত ব্যক্তির স্বজনদের ৫০ হাজার টাকা করে দিয়েছিল এবং তাঁদের স্বজনদের চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এ পর্যন্ত মাত্র একজনকে লিফট অপারেটরের চাকরি দেওয়া হয়েছে। আর কেউ চাকরি পাননি। চাকরির প্রতিশ্রুতিদাতাদের সঙ্গে অনেকে যোগাযোগ করে ব্যর্থ হয়েছেন। এফবিসিসিআই সম্প্রতি বলেছে, চাকরি দেওয়ার বিষয়টি এখনো প্রক্রিয়াধীন আছে; নিহত ব্যক্তিদের পরিবারগুলোতে চাকরিযোগ্য কেউ আছেন কি না, সে বিষয়ে তারা খোঁজখবর নিচ্ছে।
নিহত ব্যক্তিদের অধিকাংশই ছিলেন উপার্জনক্ষম ব্যক্তি, যাঁদের আয়ের ওপর পরিবার নির্ভরশীল ছিল। ফলে পরিবারগুলো আর্থিক দুর্দশায় পড়েছে। তাদের অর্থনৈতিক পুনর্বাসন জরুরি। ইতিমধ্যে এক বছর পেরিয়ে গেছে; তাদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়ানো রাষ্ট্রের দায়িত্ব। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বলা হচ্ছে, পুনর্বাসন প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। নতুন সমস্যা হচ্ছে, আবারও রাজনৈতিক সহিংসতায় গত এক মাসের বেশি সময়ে প্রায় অর্ধশত মানুষ পেট্রলবোমা, ককটেল ও আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা গেছেন। এই পরিবারগুলোর দিকেও তাকাতে হবে, নিহত ব্যক্তিদের স্বজনদের যথাসম্ভব সহযোগিতা দেওয়া কর্তব্য। সপ্তাহ দুই আগে তথ্যমন্ত্রী এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী অসহায় পরিবারগুলোকে দেখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। চলমান রাজনৈতিক সহিংসতায় আহত মানুষের সংখ্যা হাজারের বেশি। তাঁদেরও সাহায্য-সহযোগিতা প্রয়োজন।

স্বাভাবিক জীবনের গ্যারান্টি চাই by আনু মুহাম্মদ

চার দশক আগে নির্মল সেন দাবি জানিয়েছিলেন, ‘স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই’। এত বছর পরেও এই দাবি পূরণ হয়নি। কিন্তু এটাই তো একটি সভ্য গণতান্ত্রিক সমাজের নাগরিকদের ন্যূনতম দাবি। আমাদের নাগরিকদের অস্বাভাবিক মৃত্যুর বহু পথ চালু রেখেছে এ দেশের ক্ষমতাবানেরা। হরতাল, অবরোধ বা রাজনৈতিক সহিংসতা ছাড়াও তার কমতি নেই। কিছুদিনের মধ্যে একটি কারখানায় আগুন লেগে ১৩ জন মানুষ পুড়ে মরলেন, গার্মেন্টসে পানি খেয়ে অসুস্থ হলেন শতাধিক, কতজন মরেছেন তার হিসাব নেই, কাজের খোঁজে বেপরোয়া হয়ে বিদেশে যাওয়ার পথে ট্রলারডুবি হয়ে মরেছেন, হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় শিশুসহ জানা-অজানা অকালমৃত্যু ঘটেছে, নিরাপত্তাহীন নির্মাণশ্রমিক মরেছেন, বস্তিতে আগুন লেগে মরেছেন। আগুন লেগে আর ভবনধসে বাংলাদেশের শ্রমিকদের লাশের সারি এখন বিশ্বজোড়া খবর। ফিটনেস ছাড়া বাস-ট্রাক দুর্ঘটনায় অকালমৃত্যু তো অবিরাম। আর ধর্ষণ-হত্যা? তারও বিরতি নেই। সীমান্তবর্তী মানুষের নিয়মিত অকালমৃত্যুর শিকার হতে হচ্ছে ভারতীয় সীমানারক্ষী বাহিনীর হাতে। কয়েক দিন আগে দেশের অভ্যন্তরে ঢুকে স্ত্রীর আনা ভাত মুখে দেওয়ার সময় বিএসএফের গুলি খেয়ে মরতে হয়েছে বাংলাদেশের কৃষককে।
এসবের সঙ্গে গত ৬ জানুয়ারি থেকে যোগ হয়েছে পেট্রলবোমা। আর তাকে মোকাবিলার কথা বলে নতুন উদ্যমে চলছে গ্রেপ্তার এবং ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধ’। ৬ জানুয়ারি থেকে ৩৯ দিনে রাজনৈতিক সহিংসতার বলি হয়েছেন মোট ৮৭ জন। এর মধ্যে পেট্রলবোমা ও আগুনে দগ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন ৫২ জন। এঁদের মধ্যে শিশু, নারী, তরুণ, বৃদ্ধ, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, পেশাজীবী, শ্রমজীবী—সব ধরনের মানুষই আছেন। সংঘর্ষ ও ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছেন ৩৫ জন। এর মধ্যে ক্রসফায়ারে বা বন্দুকযুদ্ধের নামে পুলিশ বা র্যাবের গুলিতে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৯। গ্রেপ্তারের সঠিক সংখ্যা বলা কঠিন। সম্ভাব্য গ্রেপ্তারের সংখ্যা অগণন। কেননা, একেকটি মামলায় যতজনের নাম দেওয়া হয়, তার থেকে বেশি থাকে অজানা। সুতরাং যে কেউ সেই মামলায় গ্রেপ্তার হতে পারেন। পত্রপত্রিকার বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে ধারণা করা যায়, এর সংখ্যা ১৭ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
তবে গ্রেপ্তার করা ব্যক্তিদের কেউ কেউ এর মধ্যে ছাড়াও পেয়েছেন, টাকার বিনিময়ে ছাড়া পাওয়ার অভিযোগ আছে। গ্রেপ্তার এবং রিমান্ড-বাণিজ্যের কথা আগেও আমরা শুনেছি। এখন আরও বেশি বেশি শোনা যাচ্ছে। সুতরাং বিভিন্ন বয়সের মানুষের এখন একদিকে বিএনপি-জামায়াতের হরতাল-অবরোধে পেট্রলবোমার আশঙ্কার মধ্যে চলাফেরা করতে হচ্ছে, অন্যদিকে গ্রেপ্তার বা ক্রসফায়ারের আশঙ্কাও মাথায় নিয়ে ঘুরতে হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস আর দলীয় সন্ত্রাসের মুখে বাংলাদেশের মানুষ।
বিএনপির মূল দাবি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন। ৪৪ বছর হতে চলেছে এ দেশ স্বাধীন হয়েছে। এখন পর্যন্ত রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়ার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দাঁড়ায়নি, যে কারণে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রতিবারই অশািন্ত ও সহিংসতা তৈরি হয়। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার দাবির আন্দোলনকে কেন্দ্র করেই সৃষ্ট সহিংসতায় নিহত হয়েছিলেন ৮২ জন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ২০০১ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরে ৯৬ জন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে সৃষ্ট সহিংসতায় ২০০৬ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরে ৩২ জন এবং ২০১৩ সালের ২৫ নভেম্বর থেকে ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫৯ জন নিহত হন (প্রথম আলো, ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৫)। এ ছাড়া জখম ও সম্পদ ধ্বংসের সব হিসাব পাওয়াও প্রায় অসম্ভব। নির্বাচন, ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় এলেই কেন মানুষ বিপদাপন্ন হবে? কেন তাকে জীবন দিতে হবে? জীবন দেয় মানুষ, সরকার বদলায় কিন্তু মানুষের স্বাভাবিক জীবনের গ্যারান্টি আসে না।
৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে খোদ সরকারেরই সন্তুষ্ট থাকার কথা নয়। আওয়ামী লীগ, যার জনভিত্তি সবচেয়ে বেশি, সাংগঠনিক কাঠামো সবচেয়ে বিস্তৃত এবং ঐতিহাসিক কারণে বিদ্বৎসমাজের মধ্যে যার সমর্থন বেশি, সেই দলের পক্ষে এ রকম ভোটারবিহীন নির্বাচন করে ক্ষমতায় থাকা সম্মানজনকও নয়। এই আওয়ামী লীগ দুই দফা ১৯৯৬ ও ২০০৬ সালে বিএনপির বিরুদ্ধে কঠিন আন্দোলন করেছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের সঙ্গী ছিল জামায়াতে ইসলামী। দুটোরই ফলাফল আওয়ামী লীগের পক্ষে গেছে। দুটো সময়েই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করেছে। এখন আওয়ামী লীগ বলছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বেমানান। এর পক্ষে ÿযথেষ্ট যুক্তি আছে। কিন্তু তার জন্য দরকার হবে নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করা এবং স্বাধীনভাবে তার কাজ করার ক্ষেত্র তৈরি করা। সরকার তো সে পথেই যেতে পারে।
অনেকেই এসব বিষয় সমাধানের জন্য সংলাপের কথা বলছেন। এর প্রস্তাব দিয়ে কতিপয় ‘বিশিষ্ট নাগরিক’-এর পক্ষে একটি প্রস্তাব জমাও দেওয়া হয়েছে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও খালেদা জিয়ার কাছে। সরকার এটাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রধানমন্ত্রীর পুত্র ও উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় সংলাপের প্রস্তাবকদের পাগল বলে অভিহিত করেছেন। বস্তুত কাজ হলে সংলাপের দরকারও হয় না। উদ্যোগ নিতে হবে তাদেরই, যারা এই পরিস্থিতি তৈরি করেছে। আগেও বলেছি, এখনো বলছি, বর্তমান সংকট দূর করতে তিনটি কাজ অপরিহার্য—প্রথমত, বিএনপি জোট কর্তৃক অবরোধ-হরতাল প্রত্যাহার, সন্ত্রাসী তৎপরতা বন্ধ করা। পেট্রলবোমা, আগুন, চোরাগোপ্তা হামলা বন্ধ করে সভা-সমাবেশে আসা। এটি নিশ্চিত করার জন্য। দ্বিতীয়ত, সরকারের দমন-পীড়ন বন্ধ করা, ঘোষিত-অঘোষিত সব অগণতান্ত্রিক বিধিনিষেধ প্রত্যাহার, ‘ক্রসফায়ার’, গ্রেপ্তার-বাণিজ্য বন্ধ করা। আর তৃতীয়ত, নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন ও শক্তিশালী কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলে এই বছরের মধ্যে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ব্যবস্থা করা; যাতে যুদ্ধাপরাধী, সন্ত্রাসী ও লুটেরা বাদে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
এই করণীয়গুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো নিজ নিজ উদ্যোগ গ্রহণ করলেই পরিস্থিতির উন্নতি হবে, আনুষ্ঠানিক সংলাপ না করলেও চলবে। কিন্তু সেই পথে না গিয়ে একদিকে হরতাল-অবরোধ-সহিংসতা আর অন্যদিকে দমন-পীড়নের পথ অব্যাহত রাখলে তা শুধু পাগলামি হবে না, তা হবে জনগণের বিরুদ্ধে ভয়ংকর অপরাধও।
এত দিনে এতটুকু পরিষ্কার যে এ যাবৎ সরকারের গৃহীত পথ ও পদ্ধতিগুলো পরিস্থিতির ভয়াবহতা দূর করতে কাজে আসছে না। কিন্তু তা সত্ত্বেও মন্ত্রী ও সরকারের নেতাদের কথাবার্তায় উসকানি ও দমনমূলক কথাবার্তার কমতি নেই। পুলিশ ও র্যাবের কর্মকর্তাদের মুখেও এখন কঠিন হুমকির কথাই শোনা যায়। আমরা বহুবার শুনেছি, সব সন্ত্রাসীর তালিকা করা হয়েছে, িশগগিরই সব দমন করা হবে। দেখামাত্র গুলির কথা তাঁরাও বলেছেন। পুলিশের ডিআইজি সবাইকে স্তম্ভিত করে ৭ ফেব্রুয়ারি বলেছেন, অপরাধীদের শুধু নয়, তাদের বংশধরদেরও নিশ্চিহ্ন করা হবে। ‘দেখামাত্র গুলি’তে মানুষ মরছে, নির্বিচারে গ্রেপ্তার হচ্ছে, দমন-পীড়ন অব্যাহত আছে, কিন্তু চোরাগোপ্তা হামলা কমছে না। পথঘাটে পেট্রলবোমা হামলার শিকার যেমন সাধারণ মানুষ, সঙ্গে সঙ্গে নির্বিচারে গ্রেপ্তার ও দমন-পীড়নের শিকারও সাধারণ মানুষই।
রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস দিয়ে অচলাবস্থা কাটবে না। বরং তাতে আত্মঘাতী জমিন তৈরি হবে, নিরপরাধ মানুষের জীবনে বিপন্নতাই বাড়বে। সন্ত্রাসীদের ভিত টলবে না। নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনায় যখন র্যাবের কর্মকর্তার যুক্ত থাকার খবর প্রকাশিত হলো, তখন এই বাহিনীর উচ্চতর এক কর্মকর্তা বলেছিলেন, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উত্থাপিত হলেই তা প্রমাণিত হয় না। তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই প্রকৃত দোষী শনাক্ত হবে। খুবই ঠিক। আমরা সেটাই বারবার বলতে চাই। কিন্তু এই যুক্তি কেন বাংলাদেশের সব নাগরিকের জন্য প্রযোজ্য হবে না? বিএনপি-জামায়াত আমল থেকে ১২ বছর ধরে হার্টঅ্যাটাক, ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ, এনকাউন্টার ইত্যাদি নামে বহু মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। তাদের অনেকের নামে কোনো অপরাধের প্রমাণও নেই। তদন্ত-বিচার ছাড়া তাদের নামের সঙ্গে সত্য-মিথ্যা সন্ত্রাসী শব্দ লাগিয়ে দিলেই, ধরে নিয়ে মিথ্যা গল্প বানিয়ে প্রেস বিজ্ঞপ্তি পাঠালেই, হত্যা করা জায়েজ?
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক কর্মকর্তা বলেছেন, আমরা কি অস্ত্র নিয়ে হাডুডু খেলব? নিশ্চয়ই না, অস্ত্র নিয়ে কেন হাডুডু খেলবেন? তবে মনে রাখবেন, আপনার হাতের অস্ত্র আপনার বা আওয়ামী লীগ-বিএনপির নেতা–নেত্রীদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এই অস্ত্র, গোলাবারুদ, পোশাক, গাড়ি, বেতন-বোনাস, নানা সুযোগ-সুবিধা এমনকি সরকারের প্রতিমুহূর্তের সব ব্যয়, পুরোটাই বাংলাদেশের জনগণের টাকায়। তাদের জীবনও হাডুডু খেলার বস্তু নয়।
আমরা প্রতিদিনের আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার মধ্যে নির্মল সেনের স্বাভাবিক মৃত্যুর দাবি স্মরণ করি। কিন্তু মানুষের জীবন যেখানে তুচ্ছ, যেখানে মানুষের স্বাভাবিক জীবনের গ্যারান্টি নেই, সেখানে কী করে স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি থাকবে? আসলে স্বাভাবিক জীবনের গ্যারান্টি নিশ্চিত করতে গেলে রাজনীতির মানচিত্র বদলাতে হবে।
আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
anu@juniv.edu

বাহিনীপ্রধানদের বক্তব্য ও রাষ্ট্রের পেশাদারত্ব by শেখ হাফিজুর রহমান

রাজনীতি কবে ও কীভাবে এতটা নীতিহীন ও নিষ্ঠুর হয়ে উঠল? নৈতিকতা, মানবিকতা, সুস্থ বোধ—সবকিছু উধাও! ১৫ লাখ কিশোর-কিশোরীর পরীক্ষার কী হবে, ৫০ লাখ পরিবহনশ্রমিক, ২৩ লাখ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ২৬ লাখ নির্মাণশ্রমিকের রুটি-রুজির কী হবে, দেশের অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়বে কি না, সেসব ব্যাপারে কোনো বিবেচনা নেই? সরকারপক্ষ ও বিরোধীপক্ষ যে যার ‘এজেন্ডা’ নিয়ে মশগুল, নিজস্ব রাজনৈতিক ‘এজেন্ডা’ বাস্তবায়ন করে ক্ষমতায় থাকা এবং ক্ষমতায় যাওয়াটাই মুখ্য এবং মোক্ষ, বাকি সবই ‘সেকেন্ডারি’। বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থায় এখন সুশাসন, পেশাদারত্ব, প্রাতিষ্ঠানিকতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বড্ড অভাব। সরকার এখন বিরোধী দলকে সমাবেশ করতে দিতেও রাজি নয়। আর বিরোধী রাজনীতি থেকে আদর্শ, নৈতিকতা, মানবিক বোধ—সবকিছু উধাও! এরই মধ্যে বিজিবি, র্যাব ও পুলিশ বাহিনীর প্রধানেরা যেসব বক্তব্য দিয়েছেন, তাতে যেমন সমালোচনার ঝড় বইল, তেমনি তা আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থায় পেশাদারত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিকতার অভাবকে আবারও প্রকট করে তুলল।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ ১৫ জানুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘বিজিবির সবই “লিথ্যাল” বা প্রাণঘাতী অস্ত্র... বিজিবি মানুষ হত্যা করতে চায় না... তবে মানুষ হত্যা করতে দেখলে এবং নিজে আক্রান্ত হলে জীবন বাঁচানোর তাগিদে যেকোনো আক্রমণ প্রতিহত করবে। আক্রান্ত হলে সে নিজের অস্ত্র ব্যবহার করতে পারবে...’ (প্রথম আলো, ১৬ জানুয়ারি, ২০১৫)
বাংলাদেশ পুলিশের আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক ১৬ জানুয়ারি রংপুরের মিঠাপুকুরে এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেন, ‘যারা হরতাল ও অবরোধের নামে মানুষ পুড়িয়ে মারছে এবং সম্পদ ধ্বংস করছে, তাদের রেহাই দেওয়া হবে না। তাদের হাত থেকে বাঁচার জন্য মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব শক্তিকে পুলিশের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।’ (দ্য ডেইলি স্টার, ২৯ জানুয়ারি, ২০১৫) ওই একই মতবিনিময় সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে র্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘যারা গণতন্ত্রের নামে সহিংসতা করছে ও বোমা বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছে, আমরা তাদের নির্মূল করব।’ (দ্য ডেইলি স্টার, ২৯ জানুয়ারি, ২০১৫)
প্রতিনিয়ত যেখানে পেট্রলবোমায় দগ্ধ হয়ে মানুষের নিষ্ঠুর মৃত্যু হচ্ছে, নাশকতা, হরতাল ও অবরোধে যখন শিক্ষা ও অর্থনীতি বিপর্যস্ত, তখন পুলিশপ্রধান, র্যাবের মহাপরিচালক ও বিজিবির প্রধানের উৎকণ্ঠিত হওয়ার যৌক্তিক কারণ রয়েছে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, রাষ্ট্রের তিনটি প্রধান শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর (পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি) প্রধান হিসেবে তাঁরা এভাবে কথা বলতে পারেন কি না? তাঁদের কথার ধরন ও সারবস্তু যা-ই হোক না কেন, এতে শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চাকরির শর্তাবলি লঙ্ঘন হয় কি না, ক্ষুণ্ন হয় কি না রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের পেশাদারত্ব?
বিজিবির মহাপরিচালক বলেছেন যে মানুষ হত্যা করতে দেখলে এবং নিজেরা আক্রান্ত হলে বিজিবির সদস্যরা তাঁদের ‘লিথ্যাল’ অস্ত্র ব্যবহার করতে পারবেন। প্রশ্ন হচ্ছে, ওই কথাগুলো প্রকাশ্যে এভাবে বলা ঠিক হয়েছে কি না? আমরা তো জানি যে সংবিধান, সাধারণ আইন ও আন্তর্জাতিক ‘ইনস্ট্রুমেন্টের’ (UN Code of Conduct for Law Enforcement Officials, 1979 এবং UN Basic Principles on the Use of Force and Firearms, 1990) ভাষ্য হচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জনগণের জান-মাল ও সম্পত্তির নিরাপত্তা দেবে এবং অপরাধ প্রতিরোধ ও নির্মূলে কাজ করবে। তাদের প্রশিক্ষণ, কর্তৃত্ব, শক্তি প্রয়োগের ক্ষমতা এ জন্য দেওয়া হয়েছে যে তারা যেন ওই কাজগুলো সুষ্ঠুভাবে ও দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করতে পারে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে গিয়ে বাহিনীগুলোর সদস্যরা কোনোভাবেই শক্তি প্রয়োগ করবেন না, শান্তিপূর্ণভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করবেন এবং অবশ্য অবশ্যই সংবিধান প্রদত্ত মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবেন। কিন্তু বিশৃঙ্খলা, নৈরাজ্য, অথবা অপরাধী ও চরমপন্থীদের তাণ্ডবে যদি প্রাণহানির আশঙ্কা দেখা দেয় এবং সরকারি ও জনগণের সম্পত্তি ধ্বংস হতে থাকে, তাহলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা শক্তি প্রয়োগ করতে পারবেন। এবং এতে যদি কোনো ‘ক্যাজুয়ালটি’ বা হতাহত হয় তা বৈধ এবং আইনসংগত। এ জন্য সংবিধানের ৪৬ অনুচ্ছেদে দায়মুক্তির ব্যবস্থাও রয়েছে।
২০০১ সালে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির পরিপ্রেক্ষিতে ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’-এর অধীনে সারা দেশে সেনাবাহিনী নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ওই অপারেশনের সময় সেনাবাহিনীর সদস্যদের হাতে শতাধিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছিল। পরে আইন করে তাঁদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। ওই সময় সেনাবাহিনীর সদস্যদের হাতে প্রাণহানির ঘটনাগুলোকে দেশি-বিদেশি নানা সংস্থা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছিল। অনেকে দায়মুক্তির বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে কেউ শেষ পর্যন্ত আদালতে যাননি।
বিজিবির প্রধানের বক্তব্য, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বিষয়ে সীমাবদ্ধ থাকলেও পুলিশপ্রধান ও র্যাবের মহাপরিচালকের বক্তব্য সরকারি দলের নেতাদের বক্তব্যের মতো মনে হয়েছে, যা রাষ্ট্রীয় বাহিনীর প্রধানদের কাছ থেকে কাম্য নয়। বাহিনীর প্রধানরা কেন ভুলে যান যে তাঁরা রাষ্ট্রের সম্মানিত কর্মকর্তা। সরকার আসবে সরকার যাবে, তাঁরা তাঁদের চাকরির শর্ত অনুযায়ী নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত তাঁদের পদে বহাল থেকে তাঁদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করবেন। কিন্তু তাঁরা যদি সরকারি দলের ‘সিপাহসালার’ হয়ে যান, তাহলে পেশাদারির জায়গাটি যেমন নড়বড়ে হয়ে যায়, তেমনি ওই বাহিনীগুলোর ইমেজও প্রশ্নবিদ্ধ হয়। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর প্রধান হিসেবে তাঁরা শুধু সরকারের আদেশ-নির্দেশ পালন করতেই বাধ্য নন, সমগ্র রাষ্ট্রের এবং দলমত-নির্বিশেষে সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যাপারে তাঁদের আইনসংগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেই রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তারা, বাহিনীর প্রধানেরা যখন সরকারি দলের ‘যুযুধান’ হয়ে যান, তখন পেশাদারত্ব মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয় বৈকি!
সরকারি দলের নেতাদের মতো বক্তব্য না দিয়ে পুলিশের আইজিপি শহীদুল হক যদি বলতেন, পেট্রলবোমা ও চোরাগোপ্তা হামলা এবং ট্রেনের ফিশপ্লেট খুলে ফেলার মতো নজিরবিহীন নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ করতে গিয়ে পুলিশ বাহিনীর কী ধরনের সমস্যা হচ্ছে, দু-তিন বছর ধরে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী চরমপন্থীদের এসব নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের নতুন কোনো প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে কি না, এসব ধ্বংসাত্মক ও জীবনসংহারী কর্মকাণ্ডের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের আগেভাগে চিহ্নিত করে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নতুন কোনো কৌশল আবিষ্কার করতে পেরেছে কি না এবং তা কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যাচ্ছে। তাহলে আমরা উপকৃত হতাম, পুলিশের প্রধান হিসেবে শহীদুল হকের ইমেজও উজ্জ্বল হতো।
র্যাবের মহাপরিচালক হিসেবে বেনজীর অহমেদ যদি বলতেন, নারায়ণগঞ্জে সাত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে র্যাবের কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার ঘটনায় র্যাবের ইমেজ যে তলানিতে এসে ঠেকেছিল, সেই ইমেজ কী করে পুনরুদ্ধার করবেন, র্যাবকে কীভাবে চরমপন্থী ও অপরাধী নির্মূলে পেশাদারত্বের সঙ্গে কাজে লাগাবেন, তাহলে নতুন মহাপরিচালক হিসেবে তাঁর কাছ থেকে আমরা দিকনির্দেশনা পেতাম।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক নেতারা ‘গণতন্ত্র’ ‘গণতন্ত্র’ বলে গগন বিদীর্ণ করে ফেলছেন, কিন্তু গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তুলছেন না। ক্ষমতায় যাওয়ার পর প্রতিটি সরকার পুলিশ, র্যাবসহ সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে এমনভাবে দলীয়করণ করেছে যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে কোনো পেশাদারত্ব যেমন গড়ে উঠছে না, জনগণের সেবা পাওয়ার বিষয়টিও থেকে যাচ্ছে উপেক্ষিত।
শেখ হাফিজুর রহমান: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক, মানবাধিকার ও অপরাধবিজ্ঞান গবেষক।