Saturday, June 13, 2026
ট্রাম্পের সমর্থক ইভানজেলিক্যাল খ্রিষ্টানদের বড় অংশ ইরান যুদ্ধ নিয়ে অসন্তুষ্ট
ইভানজেলিক্যাল খ্রিষ্টানরা (প্রটেস্ট্যান্ট শাখার অন্তর্গত একটি প্রধান ও প্রভাবশালী ধর্মীয় ধারা) ট্রাম্পের ২০২৪ সালের নির্বাচনী জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা প্রায়ই নিজেদের নীতি ও লক্ষ্য ব্যাখ্যা করতে ধর্মীয় ভাষা ব্যবহার করেন। আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য মধ্যবর্তী নির্বাচনেও এই ভোটার গোষ্ঠী ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন।
৩ থেকে ৮ জুন পরিচালিত ওই জরিপে অংশ নেওয়া ইভানজেলিক্যাল খ্রিষ্টানদের ৫৪ শতাংশ বলেছে, ইরানে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত তাদের খ্রিষ্টধর্মের ব্যাখ্যার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। বিপরীতে ৪১ শতাংশ মনে করে, এটি খ্রিষ্টীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
একইভাবে ৫১ শতাংশ বলেছে, ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসননীতি খ্রিষ্টীয় মূল্যবোধের সঙ্গে যায় না। ৪৪ শতাংশ এর বিপরীত মত দিয়েছে।
তবে এসব মতপার্থক্য সত্ত্বেও ইভানজেলিক্যালদের মধ্যে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা তুলনামূলকভাবে এখনো বেশি। সর্বশেষ জরিপে এ গোষ্ঠীর মধ্যে তাঁর সমর্থন হার ৫২ শতাংশ। গত আগস্টে তা ছিল ৬১ শতাংশ। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের সব প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের মধ্যে ট্রাম্পের প্রতি সমর্থনের হার ৩৫ শতাংশ।
সাম্প্রতিক মাসগুলোয় ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় কিছুটা প্রভাব পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে ইভানজেলিক্যাল খ্রিষ্টানদের বড় অংশ রিপাবলিকান পার্টির সমর্থক। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের নির্বাচনে শ্বেতাঙ্গ ইভানজেলিক্যাল ভোটারদের ৮১ শতাংশ ট্রাম্পকে ভোট দেন।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে তাঁর একটি বড় পদক্ষেপ ছিল সুপ্রিম কোর্টে রক্ষণশীল বিচারকদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করা। পরে সেই আদালত গর্ভপাতের সাংবিধানিক অধিকার স্বীকৃত একটি ঐতিহাসিক রায় বাতিল করে দেন, যা বহু ইভানজেলিক্যালের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল।
দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প নিয়মিত ধর্মীয় নেতাদের হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। পাশাপাশি সরকারি কর্মচারীদের কর্মস্থলে নিজেদের ধর্মীয় মতপ্রকাশের ক্ষেত্রেও নীতিগত কিছু পরিবর্তন এনেছেন।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র টেলর রজার্স দাবি করেন, ধর্মপ্রাণ মার্কিন নাগরিকদের জন্য ট্রাম্পের চেয়ে বড় কোনো প্রেসিডেন্ট কখনো ছিলেন না। তাঁর ভাষায়, ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা এবং গর্ভপাতবিরোধী আন্দোলনকারীদের ক্ষমা করার মাধ্যমে ট্রাম্প খ্রিষ্টধর্মে বিশ্বাসীদের বড় অংশের মনে জায়গা করে নিয়েছেন।
মধ্যবর্তী নির্বাচন এগিয়ে আসছে
জরিপের ফলাফল রিপাবলিকান পার্টির জন্য কিছুটা উদ্বেগের কারণ হতে পারে। কারণ, মধ্যবর্তী নির্বাচনে দলটিকে কংগ্রেসে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে হবে।
ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের বাসিন্দা ৬৩ বছর বয়সী ইভানজেলিক্যাল ভোটার স্যান্ডি মিলার বলেন, সুযোগ পেলে তিনি আর ট্রাম্পকে ভোট দিতেন না। স্যান্ডির ২৪ বছর বয়সী মেয়ের স্বাস্থ্যসেবা-সংক্রান্ত সরকারি সহায়তা ট্রাম্প প্রশাসনের সময় কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে ব্যক্তিগত আর্থিক ক্ষতির চেয়েও তাঁর ভোটের সিদ্ধান্তে ধর্মীয় বিশ্বাস বেশি প্রভাব ফেলবে।
স্যান্ডির মতে, ট্রাম্প হয়তো খ্রিষ্টান। কিন্তু তাঁর আচরণে সেটি সব সময় প্রতিফলিত হয় না। তিনি আরও বলেন, ‘আমি মনে করি না, সব সমস্যার সমাধান যুদ্ধ করে হয়। কখনো কখনো যুদ্ধ প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু এ ক্ষেত্রে সেটি অপরিহার্য ছিল কি না, আমি নিশ্চিত নই।’
স্যান্ডি বলেন, দেশের নেতারা যেন সঠিক সিদ্ধান্ত নেন, সে জন্য তিনি প্রতিদিন প্রার্থনা করেন। তাঁর ভাষায়, ‘আমি চাই, আমাদের রাজনীতিকেরা কথা বলার চেয়ে বেশি প্রার্থনা করুন।’
জরিপে দেখা গেছে, জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও ট্রাম্পের সক্ষমতা নিয়ে অনেক ইভানজেলিক্যাল সন্তুষ্ট নন।
ইরান যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খরচে। ফলে অর্থনৈতিক বিষয়েও ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় চাপ তৈরি হয়েছে।
তবে সব ইভানজেলিক্যাল ভোটার ট্রাম্পের সমালোচক নন। আইওয়া অঙ্গরাজ্যের ৭৭ বছর বয়সী ভোটার কনি রিস মনে করেন, ইরানে ট্রাম্পের সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে বাইবেলভিত্তিক যুক্তি রয়েছে। তিনি বলেন, কোনো দেশের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে। আর ইসরায়েলের অস্তিত্বকে তিনি ধর্মীয় ভবিষ্যদ্বাণী পূরণের অংশ হিসেবে দেখেন।
কনি রিসের ভাষায়, ‘ইসরায়েল রাষ্ট্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ঈশ্বরের বাণীতে বর্ণিত একটি ভবিষ্যদ্বাণীর বাস্তব রূপ। সে কারণে আমি ইসরায়েলকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে সমর্থন করি।’
রয়টার্স/ইপসোসের এই জরিপে যুক্তরাষ্ট্রের ৪ হাজার ৫৩১ জন প্রাপ্তবয়স্ক অংশ নেন।
| মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি : এএফপি |
Thursday, May 7, 2026
লেবাননে যিশুর পর এবার মাতা মেরির মূর্তি অবমাননা ইসরায়েলি সেনার, ছবি ভাইরাল, ক্ষোভ
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের খ্রিস্টান শহর দেবলে ছবিটি তোলা। ছবিতে মুখে সিগারেট নিয়ে একজন ইসরায়েলি সেনাকে মাতা মেরির মূর্তির পাশে বসে থাকতে দেখা যাচ্ছে। তাঁর হাতে আরেকটি সিগারেট। ওই সেনা সেটি মাতা মেরির মূর্তির মুখের কাছে ধরে আছেন।
গত মাসে লেবাননের একই শহরে অভিযানের সময় ইসরায়েলি সেনারা যিশুর একটি মূর্তি ভাঙচুর করেছিলেন। ওই ছবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। পরে ক্ষোভের মুখে দুজন ইসরায়েলি সেনাকে শাস্তি দেওয়া হয়।
ওই ঘটনায় ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী জানায়, যে সেনা মূর্তি ভাঙচুর করেছেন ও যিনি ছবি তুলেছেন—উভয়কে ৩০ দিনের সামরিক আটকাদেশ দেওয়া হয়েছে।
তথ্যসূত্র: আল–জাজিরা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে লেবাননে মাতা মেরির মূর্তি অবমাননা করে তোলা ইসরায়েলি সেনার এই ছবিটি। ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়টি বিবেচনা করে ছবিটির অংশবিশেষ অস্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। ছবি: রয়টার্স লেবাননে ইসরায়েলি সেনার যিশুর মূর্তি ভাঙচুর, স্বীকার করল নেতানিয়াহু সরকার দক্ষিণ লেবাননে এক ইসরায়েলি সেনা যিশুখ্রিষ্টের মূর্তি ভাঙচুর করছে—এমন একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। পরে ছবিটি সত্য কি না, তা যাচাইয়ে ইসরায়েল সেনাবাহিনী তদন্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
|
Monday, March 30, 2026
দক্ষিণ এশিয়ায় কেন ‘খ্রিষ্টান রাষ্ট্রের’ গুঞ্জন by আলতাফ পারভেজ
প্রায় ২ লাখ বর্গকিলোমিটারের বিশাল বলয়!
দক্ষিণ এশিয়ায় খ্রিষ্টান ধর্মের প্রচার ও প্রসার শুরু কেরালা, তামিলনাড়ুর দিকে। কেউ কেউ এ ক্ষেত্রে তক্ষশীলার কথাও বলে। পুরোনো তক্ষশীলা এখন পড়েছে পাকিস্তানের পাঞ্জাবে। এর মধ্যে কেরালায় এখন প্রায় ২০ শতাংশ জনসংখ্যা খ্রিষ্টান। তামিলনাড়ুতে সেটা ৬ শতাংশের মতো। পাকিস্তানে ১ শতাংশের কম।
খ্রিষ্টান রাষ্ট্রের গুঞ্জনটা অবশ্য এসব পরিসংখ্যান থেকে তৈরি হয়নি। এ গুঞ্জনের ভরকেন্দ্র দক্ষিণ এশিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় জনপদগুলো। মিয়ানমারের সন্নিহিত অঞ্চলও তাতে যুক্ত হয়েছে। উত্তর–পূর্ব জনপদগুলোর মধ্যে মেঘালয় (৭১ শতাংশ), মিজোরাম (৮৭ শতাংশ) এবং নাগাল্যান্ডে (৮৮ শতাংশ) খ্রিষ্টানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ।
এই তিন জনপদ যে লাগোয়া, তা নয়, তবে কাছাকাছি। মিয়ানমারের চিন এস্টেট এদের কাছের জনপদ। চিন এলাকায় ৯৬ শতাংশ মানুষ একই ধর্মাবলম্বী।
দক্ষিণ এশিয়ায় চারটি জায়গা হলো খ্রিষ্টানপ্রধান। চারটি জায়গাতেই খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী রাজনীতিবিদদের রাজ্য চালানোর অভিজ্ঞতা আছে। তবে জনপদগুলো আয়তনে ও লোকসংখ্যায় ছোট।
এই চারটি এলাকার পাশাপাশি মণিপুর ও অরুণাচলকেও যদি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক খ্রিষ্টান জনসংখ্যার (৪১ ও ৩০ শতাংশ) কারণে কাছে টানা হয়, তাহলে বেশ বড় একটা বলয় তৈরি হয়। আয়তনে যা দুই লাখ বর্গকিলোমিটারও ছাড়িয়ে যায়।
ভিন্ন ভিন্ন নামে কাছাকাছি থাকা বেশ বড় একটি এলাকার জনবিন্যাসের এ রকম প্রবণতা নিশ্চিতভাবে চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান তিন ধর্ম হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ ‘মুরব্বিদের’ এটা ভালোভাবে নজরে পড়েছে। মিজোরাম ও চিনসংলগ্ন বাংলাদেশের বান্দরবানের সীমান্তবর্তী উপজেলাগুলোয় (রুমা, থানচি, রোয়াংছড়ি) খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতির কারণে বিষয়টা ঢাকায়ও মনোযোগের বিষয় হয়েছে। বান্দরবানে খ্রিষ্টান জনসংখ্যা ১০ শতাংশের মতো।
গুঞ্জনের বহু কারণ
দক্ষিণ এশিয়ায় খ্রিষ্টান রাজ্যের গুঞ্জন কেবল এই বিশ্বাসীদের সংখ্যাগত বৃদ্ধির কারণে নয়; উল্লিখিত এলাকাগুলোর অনেক বৈশিষ্ট্যও এ বিষয়ে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, চিন, মণিপুর, বান্দরবানের একাংশ এবং অরুণাচলের মধ্যে অনেক এলাকায় নানা ধরনের দাবিতে নিরস্ত্র-সশস্ত্র ব্যাপক আন্দোলন-সংগ্রাম চলছে।
কোথাও কোথাও সশস্ত্রতার ধরন অনেক ব্যাপক ও গভীর, কোথাও তা মৃদু, কিন্তু অগ্রাহ্য করার মতো নয়। এসব সশস্ত্রতার আবার প্রধান একটা ধরন দেখা যাচ্ছে, এ অঞ্চলের ‘রাষ্ট্র’গুলোর পরিচালকদের প্রতি আস্থার গভীর এক সংকট। এ রকম অনাস্থার পটভূমি তৈরি করেছে উপরিউক্ত প্রতিটি এলাকার উন্নয়ন-প্রান্তিকতা। ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পর থেকে এ রকম প্রতিটি জনপদের মানুষ নিজেদের ক্রমে সংকুচিত ও সীমিত গণ্ডিতে আবিষ্কার করছে। ফলে তাদের মধ্যে একধরনের আত্মরক্ষার বোধ বাড়ছে।
এসব জনপদের মানুষ জানে তারা কোনো দেশের কেন্দ্রীয় সরকারের নীতিসিদ্ধান্তকে খুব একটা প্রভাবিত করতে পারবে না। যেমন ৫৪৩ আসনের ভারতীয় লোকসভায় অরুণাচল-মণিপুর-মেঘালয়-মিজোরাম-নাগাল্যান্ড মিলে আসন ৯টি। অথচ সেখানে শুধু উত্তর প্রদেশের জন্য আসন ৮০টি। মিয়ানমারের পার্লামেন্টের (দুই কক্ষ মিলে) ৬৬৪ আসনে চিন এস্টেটের জন্য আসন আছে ২১টি। বাংলাদেশে ৩০০ আসনের পার্লামেন্টে বান্দরবানের জন্য আসন ১টি। যেহেতু আসন বণ্টিত হয় জনসংখ্যার হিস্যায়, তাই এই বাস্তবতাটা শিগগিরই বদলাবেও না। ফলে এসব জনপদের মানুষ জানে, নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় তাদের উপস্থিতি সীমিত থাকতে বাধ্য।
অতীতে বিশেষ করে ঔপনিবেশিক শাসনামলের আগে ও তার মধ্যে এসব জায়গার জাতিসত্তাগুলো সমতলের মানুষদের থেকে দূরে পাহাড়ি এলাকায় যে রকম ট্রাইবাল স্বশাসন ভোগ করেছে, তার ঘাটতিও তাদের মধ্যে একধরনের হতাশার বোধ তৈরি করে।
এখন নিজেদের চারপাশে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধদের সংখ্যাবৃদ্ধির মুখে তারা স্বধর্ম রক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে শুরু করেছেন। দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে বিভিন্ন সময় চার্চগুলোয় আক্রমণ এবং এই ধর্মবিশ্বাসীদের ওপর হামলার ঘটনাও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় জনপদের মানুষদের আত্মরক্ষার বোধে একটা ধর্মীয় ধরন যুক্ত করেছে। একেই ভারত, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মূলধারার অনেক মানুষ খ্রিষ্টবলয় তৈরির চেষ্টা আকারে ভাবেন। এ রকম ভাবনার কারণ এটাও যে ওপরের এলাকাগুলোয় খ্রিষ্টান রাজনীতিবিদদের সঙ্গে চার্চের সম্পর্কও বেশ নিবিড়।
আবার কিছু কিছু এলাকায় খ্রিষ্টান জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি এবং তার অতি প্রচারও কথিত গুঞ্জনের একটা উপাদান হয়েছে। তবে এরপরও ভারতে খ্রিষ্টান জনসংখ্যা ৩ শতাংশেরও কম। কিন্তু বিষয়টি আরএসএস পরিবারের কাছে এত স্পর্শকাতর যে খ্রিষ্টানমুখী ধর্মান্তরকরণ ঠেকাতে অন্তত ৯টি রাজ্যে ধর্মান্তরকরণবিরোধী আইন করা হয়েছে। সেখানে আরএসএস-বিজেপি পরিবারের অন্যতম সাংস্কৃতিক প্রতিপক্ষ হলো গির্জামণ্ডলী।
তবে ধর্মান্তরকরণ ও খ্রিষ্টান জনসংখ্যা বাড়ার প্রচার দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে অনেক সময় একপেশে চেহারাও নেয়। যেমন বাংলাদেশে অনেকে বান্দরবানের খ্রিষ্টান জনসংখ্যার বৃদ্ধি নিয়ে বলেন। কিন্তু শুমারির তথ্যে দেখা যায়, সেখানে ৯-১০ শতাংশ খ্রিষ্টানের বিপরীতে মুসলমান জনসংখ্যা প্রায় ৫৩ শতাংশ এবং সর্বশেষ দুটি শুমারির মধ্যে শেষোক্তরা প্রায় ৮ শতাংশ বেড়েছে। অথচ একই সময়ে খ্রিষ্টান জনসংখ্যা ১ শতাংশও বাড়েনি সেখানে।
কিন্তু খ্রিষ্টানরা কি নতুন দেশ চাইছে?
প্রশ্ন হলো, এত কিছুর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার খ্রিষ্টান সমাজ বা উল্লিখিত জনপদগুলো কি কখনো ধর্মভিত্তিক নতুন কোনো রাষ্ট্রের দাবি তুলেছে? এর জন্য কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন আছে? এ রকম দাবির সপক্ষে খ্রিষ্টান সমাজের বা গির্জামণ্ডলীর কোনো ইশতেহার আছে? সচরাচর এসব প্রশ্নের বিশ্বাসযোগ্য উত্তর পাওয়া যায় না।
তারপরও ক্রমাগত এ রকম দাবি ও গুঞ্জন উঠছে। সেটা ঘটছে মুখ্যত অখ্রিষ্টানদের তরফ থেকে। দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশে বিশেষ বিশেষ মতাদর্শের বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে মাঝেমধ্যেই বিষয়টি সক্রিয় হয়ে ওঠে। ভারতে ‘স্বরাজমার্গ’ নামে হিন্দুত্ববাদী একটা বিখ্যাত মিডিয়া এই ইস্যুতে বেশ এগিয়ে।
কৌতূহলোদ্দীপক হলো, ভারতের হিন্দুত্ববাদীদের মতো আশপাশের অন্যান্য দেশের বৌদ্ধ ও ইসলামপন্থী অনেক মহলও এ প্রচারণায় উৎসাহী। বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গির সংস্থাগুলোর এ রকম একই ধরনের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ায় সামাজিক আর কোনো বিষয়ে তেমন দেখা যায় না। ভারতসহ সর্বত্র ভোট এলে দেখা যায়, খ্রিষ্টানরা প্রধানত মধ্যপন্থী কংগ্রেস বা মধ্য-বাম আঞ্চলিক দলগুলোকে ভোট দিচ্ছে। এটাও তাদের প্রতি ডানপন্থী প্রচারণা বাড়িয়ে দিয়ে থাকতে পারে।
খ্রিষ্টান রাষ্ট্রের গুঞ্জনকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে কথিত ওই রাষ্ট্রের জন্য ইউরোপ-আমেরিকার আগ্রহের কথাও বলা হয় প্রচারে। কিন্তু তার সপক্ষে কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না এখনো। কিন্তু এ রকম প্রচার খ্রিষ্টানদের জন্য নানাভাবে বিব্রত অবস্থা তৈরি করছে।
বাংলাদেশ খ্রিষ্টান অ্যাসোসিয়েশনের নেতা অ্যালবার্ট ডি কস্টা কয়েক মাস আগে এ বিষয়ে এক বিবৃতিতে বলেছিলেন, খ্রিষ্টান রাষ্ট্রের প্রচার তাদের সঙ্গে অন্যান্য সম্প্রদায়ের দূরত্ব সৃষ্টির ঝুঁকি তৈরি করছে।
তারপরও যে এ রকম একটা প্রচারের পালে সম্প্রতি আরও বাতাস লেগেছে, তার কারণ মণিপুর ও চিন প্রদেশের ঘটনাবলি। মাসের পর মাস ধরে চলমান মণিপুর দাঙ্গায় হিন্দু মৈইতৈইদের হাতে খ্রিষ্টান কুকিরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পার্শ্ববর্তী মিজোরামে তাদের প্রতি সহানুভূতির নীরব এক ঢেউ তৈরি হয়েছে। সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে যুদ্ধরত মিয়ানমারের চিন প্রদেশের স্থানীয়দের প্রতিও মিজোরামের অনুরূপ সহানুভূতি রয়েছে।
এই তিন জায়গার মানুষই ‘জো’ জাতির শাখা-উপশাখা। বান্দরবানের বম খ্রিষ্টানরাও একই জাতিসত্তার দূরবর্তী অংশীদার। উত্তর-পূর্বাঞ্চলজুড়ে জো সমাজের এ রকম ঘটনাবলিতে এতদঞ্চলে খ্রিষ্টান রাষ্ট্রের গুঞ্জন তীব্রতা পেলেও কার্যত এ ধারণা বাস্তবসম্মত না হওয়ার কারণ একই জনপদগুলোয় নাগাদের উপস্থিতি।
নাগারাও খ্রিষ্টান, কিন্তু জোদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক খুব বেশি প্রীতিকর নয়। ফলে নাগাল্যান্ড, মণিপুরসহ আশপাশে কেবল খ্রিষ্টান ধর্মীয় বিশ্বাস সামনে রেখে নাগা ও কুকিরা (জো) একটা রাষ্ট্র গড়তে চাইবে বা পারবেন সেটা খুব কম রাজনৈতিক ভাষ্যকারের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়।
এমনকি কেবল জো–অধ্যুষিত অঞ্চলগুলো নিয়ে কোনো রাষ্ট্রের ধারণাও মিজো নেতা জোরামথাংঙা কিছুদিন আগে (২১ জুন) প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নাকচ করেছেন। তাঁর মতে, দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ‘জো’দের বিভক্তি অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও এটা এখন এক বাস্তবতা। কারণ, তিনটি পৃথক রাষ্ট্রের সীমান্তে আছে তারা।
মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ইন্ধন দিচ্ছে
মিয়ানমারের চলতি গৃহযুদ্ধ এবং তার সম্ভাব্য পরিণতিও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় খ্রিষ্টান রাষ্ট্রের গুঞ্জনে একধরনের উসকানি হিসেবে কাজ করছে বলা যায়। এই গৃহযুদ্ধে সবচেয়ে সক্রিয় তিনটি প্রান্তিক অঞ্চল হলো দক্ষিণ-পূর্বের কারেন, উত্তরের কাচিন এবং পশ্চিমের চিন অঞ্চল। এই তিন এলাকায় গেরিলা যুদ্ধ সবচেয়ে বেশি সুসংগঠিত এবং এই তিন অঞ্চলে খ্রিষ্টান ধর্মবিশ্বাসের মানুষও অনেক।
এ রকম মনে করা হয় যে দেশটির কেন্দ্রীয় অঞ্চলে গণতন্ত্রপন্থীদের সশস্ত্র সংগ্রাম যদি বিজয়ী হয় তাহলে প্রান্তিক এলাকা যে বাড়তি স্বায়ত্তশাসন ভোগ করবে, সেটা অনেকটা স্বাধীন রাষ্ট্রের চেহারা নিতে পারে। আবার গণতন্ত্রপন্থীদের সংগ্রাম অনিশ্চিতভাবে দীর্ঘায়িত হলেও গেরিলা-দৃঢ়তা এ তিন অঞ্চলকে অনুরূপ চেহারা দিতে পারে।
মিয়ানমারের এ রকম সম্ভাবনায় ভারত উদ্বিগ্ন। সে কারণে তারা ওই দেশের সঙ্গে তার সীমান্ত অনেকটাই বন্ধ করে দিতে চায় বলে খবর বেরিয়েছে। সীমান্ত এলাকার ট্রাইবালরা অবশ্য এর ঘোর বিরোধী। কারণ, এতে তারা জাতিগতভাবে চিরস্থায়ীভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ার শঙ্কায় পড়েছে।
উল্লেখ্য, ১৯৫০-এর এক চুক্তির বলে সীমান্তবর্তী ট্রাইবাল জনগোষ্ঠী পাসপোর্ট-ভিসাবিহীন একধরনের সাধারণ ভ্রমণ পাস নিয়ে অপর দেশের ১৬ কিলোমিটার ভেতর পর্যন্ত আসা-যাওয়া করতে পারে। শুরুতে চুক্তি অনুযায়ী ৪০ কিলোমিটার ভেতর পর্যন্ত এই সুবিধা ছিল। পরে কমিয়ে ১৬ কিলোমিটার করা হয় সেটা।
মিজোরাম, মণিপুর, নাগাল্যান্ড ও অরুণাচলের ১ হাজার ৬৪৩ কিলোমিটার সীমান্তজুড়ে এ সুবিধা রয়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বলছে, তারা এ সুবিধা আর রাখতে চায় না। কারণ, এটা তাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
অন্যদিকে এ ঘোষণার পর জো সংগঠনগুলো বলছে, এটা করার আগে ভারত-মিয়ানমার-বাংলাদেশে বিভক্ত হয়ে থাকা তাদের জাতির মানুষদের একত্র করে দেওয়া হোক। তা না হলে তারা এ রকম পদক্ষেপের বিরোধিতা করবে। জো-রিইউনিফিকেশন অর্গানাইজেশন (জো-রো) নামের একটা সংগঠন দেশ-বিদেশে এ বিষয়ে কথা বলছে। দক্ষিণ এশিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে খ্রিষ্টান রাষ্ট্রের গুঞ্জন বাড়ার এটাও এক কারণ।
তবে এ রকম যাবতীয় গুঞ্জন অতিক্রম করে সরেজমিনে আরও গভীরে মনোযোগ দিলে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রায় সব পাহাড়ি উপত্যকায় ধর্মের বদলে একধরনের অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্বের আকুতিই বেশি শোনা যায়। কিন্তু মূলধারার রাজনীতি তার স্বার্থেই যেন কেবল খ্রিষ্টান রাষ্ট্রের গুঞ্জনে বেশি আগ্রহী, সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক সুশাসন বা স্বশাসনে নয়।
● আলতাফ পারভেজ, দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস বিষয়ে গবেষক

Saturday, March 28, 2026
যুক্তরাষ্ট্রকে ‘খ্রিষ্টান রাষ্ট্র’ বানাতে কেন মরিয়া ট্রাম্প by জোসেফ মাসাদ
ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে আবারও ঈশ্বরের অধীনে এক জাতি হিসেবে উৎসর্গ করব।’ তিনি জোর দিয়ে বলেন, আমেরিকানদের জীবন ও স্বাধীনতার অধিকার সরকার দেয় না, এই অধিকার এসেছে সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের কাছ থেকে। তিনি আরও মন্তব্য করেন, একজন বিশ্বাসী মানুষ কীভাবে ডেমোক্র্যাট পার্টিকে ভোট দিতে পারেন, তা তিনি বুঝতে পারেন না। শীতল যুদ্ধের সময় কমিউনিস্টদের যেমন যুক্তরাষ্ট্রের খ্রিষ্টধর্ম ও গণতন্ত্রের শত্রু হিসেবে দেখানো হতো, আজ সেই জায়গায় ডেমোক্র্যাট ও উদারপন্থীদের দাঁড় করানো হচ্ছে।
হেগসেথ তাঁর বক্তব্য শুরু করেন বাইবেল থেকে মার্কের সুসমাচার থেকে পাঠ করে। তিনি বলেন, নাগরিকদের অধিকার এসেছে এক দয়ালু ও মমতাময় ঈশ্বরের কাছ থেকে, সরকারের কাছ থেকে নয়।
হেগসেথ স্পষ্টভাবে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র একটি খ্রিষ্টান জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং এখনো রক্তে আমরা সেই পরিচয় বহন করি। সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ঈশ্বরকে মহিমান্বিত করা।’
ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতাদের অনেকেই এই অনুষ্ঠানকে কার্যত কংগ্রেসের অনুমোদিত এক ধর্মীয় সমাবেশ বলে সমালোচনা করেন। তাঁদের দাবি, সংবিধান প্রণেতারা এমন উদ্যোগে হতাশ হতেন। উদারপন্থী সংগঠনগুলোও ট্রাম্পের বক্তব্যকে খ্রিষ্টান জাতীয়তাবাদ বলে আখ্যা দেয় এবং ধর্মকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার অভিযোগ তোলে।
ট্রাম্প ও হেগসেথ আসলে যুক্তরাষ্ট্রের পুরোনো এক খ্রিষ্টান ঐতিহ্যই ধরে রেখেছেন, যা কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট কখনো পুরোপুরি অস্বীকার করেননি। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে খ্রিষ্টধর্মের উপস্থিতি দীর্ঘদিনের। ট্রাম্প তাঁর প্রথম নির্বাচনী প্রচারণা থেকেই ভোটারদের কাছে নিজেকে খ্রিষ্টান মূল্যবোধের রক্ষক হিসেবে তুলে ধরেছেন। তিনি এমনও বলেছেন, তিনি স্বর্গে যেতে পারবেন কি না জানেন না, তবে ধর্মের জন্য তিনি অন্য যেকোনো প্রেসিডেন্টের চেয়ে বেশি কাজ করেছেন।
ট্রাম্প বারবার দেশের মূলমন্ত্র ‘ইন গড উই ট্রাস্ট’ বা ‘ঈশ্বরেই আমাদের বিশ্বাস’-এর কথা স্মরণ করিয়ে দেন। এই স্লোগান এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ধর্মের অংশ। গৃহযুদ্ধের সময় আব্রাহাম লিংকনের প্রশাসনে মুদ্রায় ইন গড উই ট্রাস্ট লেখার প্রস্তাব ওঠে। ১৮৬৪ সালে এটি চালু হয়। তখন রাজনীতির সব পক্ষই বিশ্বাস করত ঈশ্বর তাদের পক্ষেই আছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর শীতল যুদ্ধের সময় প্রেসিডেন্ট ডুইট আইজেনহাওয়ার সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে ধর্মীয় উসকানি ব্যবহার করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের আনুগত্যের শপথবাক্যে ‘আন্ডার গড’ বা ঈশ্বরের অধীনে শব্দ দুটি ১৯৫৪ সালে যোগ করা হয়। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডুইট ডি আইজেনহাওয়ার কংগ্রেসে পাস হওয়া যৌথ প্রস্তাবে স্বাক্ষর করে এই পরিবর্তন কার্যকর করেন। এর আগে শপথবাক্যটি ছিল:
‘আমি যুক্তরাষ্ট্রের পতাকার প্রতি এবং যে প্রজাতন্ত্রের প্রতিনিধিত্ব করে তার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করছি, যা একটি অবিভাজ্য জাতি, সবার জন্য স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে।’
১৯৫৪ সালের সংশোধনের পর বাক্যটি হয়: ‘আমি যুক্তরাষ্ট্রের পতাকার প্রতি এবং যে প্রজাতন্ত্রের প্রতিনিধিত্ব করে তার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করছি, যা ঈশ্বরের অধীনে এক অবিভাজ্য জাতি, সবার জন্য স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে।’
এই পরিবর্তনটি শীতল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে করা হয়েছিল। তখন সোভিয়েত ইউনিয়নকে নাস্তিক কমিউনিস্ট শক্তি হিসেবে তুলে ধরা হতো। যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে ধর্মবিশ্বাসী জাতি হিসেবে আলাদা করে দেখাতে চেয়েছিল।
ফলে ‘আন্ডার গড’ বা ‘ঈশ্বরের অধীনে’ সংযোজনটি শুধু ধর্মীয় অনুভূতির প্রকাশ ছিল না, এটি ছিল একটি রাজনৈতিক ও আদর্শিক অবস্থানের ঘোষণাও। ১৯৫৬ সালে কংগ্রেস ইন গড উই ট্রাস্টকে জাতীয় মূলমন্ত্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন খুব নম্রভাবে এতে আপত্তি জানিয়েছিল। ২০১১ সালেও কংগ্রেস আবারও এই মূলমন্ত্রের পুনঃসমর্থন জানায়। আইসেনহাওয়ার প্রশাসন ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিল। এর ফলে ১৯৪০ সালে যেখানে ৪৯ শতাংশ আমেরিকান নিজেকে ধর্মে বিশ্বাসী বলতেন, ১৯৬০ সালে তা বেড়ে হয় ৬৯ শতাংশ।
ট্রাম্প দাবি করেন, ২০২৫ সালে গত ১০০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাইবেল বিক্রি হয়েছে। অনেক গির্জায় উপস্থিতি বেড়েছে। তিনি ২০২৬ সালের ১৭ মে ন্যাশনাল মলে জাতীয় প্রার্থনার আহ্বান জানান। ট্রাম্পের খ্রিষ্টান পরিচয়ের জোরালো ঘোষণায় বিভিন্ন আন্তধর্মীয় সংগঠন আপত্তি জানায়। তিনি গত বছর বিচার বিভাগে রিলিজিয়াস লিবার্টি কমিশন গঠন করেন। বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠন অভিযোগ তোলে যে এই কমিশন খ্রিষ্টান জাতীয়তাবাদকে উৎসাহ দিচ্ছে।
ওই কমিশনের সহসভাপতি জেডি ভ্যান্স দাবি করেন, ধর্মীয় সহনশীলতাও খ্রিষ্টান ধারণা। অন্যদিকে ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণায় ইহুদি ভোটারদের নিয়ে মন্তব্যও বিতর্ক সৃষ্টি করে।
হেগসেথ নিজেকে আরও প্রকাশ্যভাবে খ্রিষ্টান হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর শরীরে ক্রুসেডের প্রতীকী ট্যাটু রয়েছে। তিনি ট্রাম্পকে ক্রুসেডার ইন চিফ বলেছেন। তবে এটি নতুন কিছু নয়। বাইডেন প্রশাসনও খ্রিষ্টান জায়নবাদে সমর্থন দিয়েছে।
হেগসেথের নিয়োগে মুসলিম সংগঠনগুলো আপত্তি জানালেও ইসরায়েলপন্থী ইহুদি গোষ্ঠীগুলো তাকে সমর্থন করে। ইতিহাসে ক্রুসেডের সময় মুসলিম, ইহুদি ও অর্থোডক্স খ্রিষ্টান সবাই হামলার শিকার হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের খ্রিষ্টান প্রজাতন্ত্রের ধারণা ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিতেও প্রভাব ফেলেছে। বড়দিন উপলক্ষে ট্রাম্প নাইজেরিয়ায় বোমা হামলা করেছেন। একদিকে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আনার কথা বলেন, অথচ যুদ্ধবিরতির পরও শত শত ফিলিস্তিনিকে হত্যা তার অনুভূতি স্পর্শ করে না। এসব মৃত্যু যেন যুক্তরাষ্ট্রের খ্রিষ্টান ঈশ্বরের বেদিতে উৎসর্গ করা বিষয়।
* জোসেফ মাসাদ, নিউইয়র্কের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক আরব রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের অধ্যাপক।
- মিডিল ইস্ট মিরর থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত
![]() |
| ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি |
Wednesday, March 25, 2026
ইরানে ট্রাম্পের আমেরিকার ধর্মযুদ্ধ! by রায়ান জিকগ্রাফ
প্রায় ৫০ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ইভানজেলিক্যাল খ্রিষ্টানদের মধ্যে একটি বিশ্বাস প্রচলিত আছে। তারা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে শুধু রাজনীতি বা ভূরাজনীতির ঘটনা হিসেবে দেখে না; তাদের অনেকেই মনে করে, এসব ঘটনার মধ্যেই বাইবেলের ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তব হয়ে উঠছে। এ বিশ্বাসে লাখ লাখ মানুষকে বড় করা হয়েছে। একসময় আমিও সেই বিশ্বাসে বিশ্বাসীদের একজন ছিলাম।
সম্প্রতি
খবর এসেছে, যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক ইউনিটের কমান্ডার গত সোমবার এক
ব্রিফিংয়ে কর্মকর্তাদের বলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ নাকি ঈশ্বরের পরিকল্পনারই
অংশ। তাঁর মতে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে যিশু বেছে নিয়েছেন ইরানে
সেই আগুন জ্বালানোর জন্য, যেখান থেকে আরমাগেডনের শুরু হবে এবং যিশুর
পৃথিবীতে ফিরে আসার পথ তৈরি হবে।
খ্রিষ্টান বিশ্বাস অনুযায়ী,
আরমাগেডন হচ্ছে শেষ সময়ের এক চূড়ান্ত যুদ্ধ। বাইবেলের রেভেলেশন গ্রন্থে বলা
আছে, পৃথিবীর শেষ দিকে ভালো ও মন্দ শক্তির মধ্যে একটি বড় যুদ্ধ হবে। এ
যুদ্ধকে আরমাগেডন বলা হয়। অনেকের বিশ্বাস, এই যুদ্ধের পর যিশু ফিরে আসবেন
এবং পৃথিবীতে নতুন শান্তির যুগ শুরু হবে।
ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক
অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর বিভিন্ন সদস্য এমন
আরও অনেক ঘটনা নিয়ে অভিযোগ করেছেন। এসব অভিযোগ পেয়েছে মিলিটারি রিলিজিয়াস
ফ্রিডম ফাউন্ডেশন নামের একটি সংগঠন। সেনাবাহিনীর বিভিন্ন শাখার সদস্যরা
জানিয়েছেন, কিছু কমান্ডারের মধ্যে অদ্ভুত এক উচ্ছ্বাস দেখা যাচ্ছে। অনেকে
মনে করছেন, তাঁরা শুধু যুদ্ধ করছেন না, বরং বাইবেলের ‘বুক অব রেভেলেশন’-এ
বলা শেষ সময়ের ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবায়নের কাজ করছেন।
আয়ারল্যান্ডে
জন্ম নেওয়া প্রচারক জন নেলসন ডারবি আঠারো শতকের ত্রিশের দশকে বাইবেল
ব্যাখ্যার একটি নতুন ধারণা দেন। এ ধারণার নাম ডিসপেনসেশনালিজম। তাঁর মতে,
মানব ইতিহাস সাতটি আলাদা যুগে ভাগ করা। প্রতিটি যুগে ঈশ্বর মানুষের সঙ্গে
ভিন্নভাবে সম্পর্ক রাখেন। যেমন আদম ও হাওয়ার সময়, মহাপ্লাবনের সময় ও যিশুর
ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার সময়।
এই বিশ্বাস অনুযায়ী, শেষ জামানায় পৃথিবীতে বড়
অস্থিরতা দেখা দেবে। এরপর ঘটবে ‘র্যাপচার’। অর্থাৎ বিশ্বাসীরা অলৌকিকভাবে
স্বর্গে চলে যাবেন। তারপর কিছু সময় পৃথিবী শাসন করবে অ্যান্টিক্রাইস্ট বা
ধর্মদ্রোহীরা। শেষে যিশু ফিরে এসে পৃথিবীতে হাজার বছরের শান্তির রাজত্ব
প্রতিষ্ঠা করবেন।
ডারবির এ ধারণাই পরে যুক্তরাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়ে এবং
ইভানজেলিক্যাল সম্প্রদায়ের মধ্যে বেশ প্রভাব ফেলে। তবে অধিকাংশ খ্রিষ্টান
এই ব্যাখ্যা মানেন না। ক্যাথলিক, অর্থোডক্স ও অনেক প্রোটেস্ট্যান্ট গির্জা
‘রেভেলেশন’ গ্রন্থকে প্রতীকীভাবে ব্যাখ্যা করে। অনেক গবেষকের মতে, সেখানে
উল্লেখিত ‘বিস্ট’ বা পশু আসলে রোমান সম্রাট নিরোর প্রতীক, যিনি প্রাচীন
খ্রিষ্টানদের ওপর নির্যাতনের জন্য কুখ্যাত ছিলেন।
১৯০৯ সালে
প্রকাশিত ‘স্কোফিল্ড রেফারেন্স বাইবেল’-এ ডারবির ব্যাখ্যাগুলো বাইবেলের
পাশে নোট হিসেবে ছাপা হয়। এতে অনেক পাঠক বাইবেলের ভবিষ্যদ্বাণীকে
বিশ্বরাজনীতির একধরনের সংকেত হিসেবে দেখতে শুরু করেন। এই ধারণা আরও জনপ্রিয়
হয় ১৯৭০ সালে প্রকাশিত হাল লিন্ডসের বই ‘দ্য লেট গ্রেট প্ল্যানেট আর্থ’-এর
মাধ্যমে। বইটিতে তিনি বলেন, ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্রের সৃষ্টি এবং পরে
জেরুজালেমের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া শেষ যুগের গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।
এ
ব্যাখ্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাইবেলের ‘ইজেকিয়েল’ গ্রন্থের ৩৮ নম্বর
অধ্যায়। সেখানে বলা হয়েছে, কিছু দেশ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে জোট বাঁধবে। অনেকের
মতে, সেখানে উল্লেখ করা পারস্য বলতে আজকের ইরানকে বোঝানো হয়েছে। লিন্ডসে
মনে করেছিলেন, সেই জোটের উত্তরের শক্তি হতে পারে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং আশির
দশকেই আরমাগেডন ঘটতে পারে।
আজ অনেকেই ভুলে গেছেন, কিন্তু ষাটের
দশকের অস্থিরতা, শীতল যুদ্ধের ভয় ও পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কার সময় এই বই
আমেরিকায় বড় আলোড়ন তুলেছিল। ১৯৭৪ সালে হাল লিন্ডসে এ বিষয়ে একটি টেলিভিশন
অনুষ্ঠান করেন, যা প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ মানুষ দেখেছিল। পরে এ নিয়ে একটি
প্রামাণ্যচিত্রও তৈরি হয়।
১৯৭৬ সালের হরর চলচ্চিত্র ‘দ্য ওমেন’-এ
অ্যান্টিক্রাইস্টকে শয়তানের সন্তান হিসেবে দেখানো হয়, যার শরীরে ৬৬৬
সংখ্যার জন্মচিহ্ন থাকে। আশির দশকে কিছু হেভি মেটাল ব্যান্ডও বাইবেলের
ভবিষ্যদ্বাণী নিয়ে গান করে। এর একটি উদাহরণ হলো জনপ্রিয় মেটাল ব্যান্ড আয়রন
মেইডেনের গান ‘নাম্বার অব দ্য বিস্ট’।
আমার বাবা স্কোফিল্ড বাইবেল ও
হাল লিন্ডসের বই পড়ে ধীরে ধীরে এই ধরনের ভবিষ্যদ্বাণীমুখী ভাবনায় আচ্ছন্ন
হয়ে পড়েন। একসময় তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে বারাক ওবামা হলেন
অ্যান্টিক্রাইস্ট।
ওবামা মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর
অনেক ভবিষ্যদ্বাণী বিশ্লেষকের কাছে ঘটনাটি বিশেষ গুরুত্ব পায়। শীতল যুদ্ধ
শেষ হওয়ার পর তারা নতুন প্রতিপক্ষ খুঁজতে থাকে এবং ধীরে ধীরে তাদের দৃষ্টি
ঘুরে যায় ইরানের দিকে।
এই ধারার একজন পরিচিত প্রচারক ওকলাহোমার
পাদ্রি মার্ক হিচকক। তিনি বিভিন্ন বইয়ে দাবি করেছেন, আধুনিক ইরানই বাইবেলে
উল্লেখ করা পারস্য এবং ইরানই ভবিষ্যতের শেষ যুদ্ধের কেন্দ্র হতে পারে। তাঁর
মতে, বর্তমান আন্তর্জাতিক উত্তেজনা সেই ঘটনারই প্রস্তুতি।
অনেক
ইভানজেলিক্যাল গির্জায় যে খ্রিষ্টান জায়নবাদ দেখা যায়, তার শিকড়ও এই
বিশ্বাসে। সেখানে মনে করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মিলেই শেষ যুগের
ঘটনাগুলো শুরু করবে, যার মধ্যে ইরানের সঙ্গে সংঘাত গুরুত্বপূর্ণ।
ডোনাল্ড
ট্রাম্পের প্রথম প্রশাসনে এই গোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রভাবও বাড়ে। ভাইস
প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স তাদের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। ২০১৮ সালে ইসরায়েল সফরে গিয়ে
তিনি ইরান চুক্তি বাতিল এবং জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস দ্রুত খোলার
প্রতিশ্রুতি দেন। তখন ইসরায়েলের একটি পত্রিকা লিখেছিল, অনেক ইভানজেলিক্যাল ও
মেসিয়ানিক ইহুদির কাছে এটি যেন নতুন যুগের ইঙ্গিত।
কিছু বছর এই
ধর্মীয় ভাষা কম শোনা গেলেও ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তা আবার
জোরালো হয়েছে। মিলিটারি রিলিজিয়াস ফ্রিডম ফাউন্ডেশন জানিয়েছে,
যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ৩০টি সামরিক ঘাঁটির ৪০টির বেশি ইউনিট থেকে এ ধরনের
অভিযোগ এসেছে। এতে বোঝা যায়, ধর্মীয় বিশ্বাস ও রাষ্ট্রনীতির মিশ্রণ এখন
পেন্টাগন পর্যন্ত পৌঁছেছে।
এদিকে সম্প্রতি সিনেটর জন করনিন সান
আন্তোনিওতে একটি ধর্মসভায় অংশ নেন, যার শিরোনাম ছিল ‘এন্ড অব ডেজ অপারেশন
এপিক ফিউরি’। যার অর্থ দাঁড়ায় ‘শেষ সময়ের মহা অভিযান’। সভাটি পরিচালনা করেন
টেলিভিশন প্রচারক জন হাগি, যিনি ‘ক্রিশ্চিয়ানস ইউনাইটেড ফর ইসরায়েল’-এর
প্রতিষ্ঠাতা।
ট্রাম্প নিজে ধর্মতত্ত্বে খুব একটা আগ্রহী নন। তবে
তিনি ধর্মীয় প্রতীকের রাজনৈতিক গুরুত্ব বোঝেন। বাইবেল হাতে ছবি তোলা বা
নিজের বেঁচে যাওয়াকে ঈশ্বরের ইচ্ছা বলা—এ ধরনের কাজ তিনি প্রায়ই করেছেন।
তাই ইরান যুদ্ধ ঘিরে তৈরি হওয়া ভবিষ্যদ্বাণীর আলোচনায় ট্রাম্প এক অদ্ভুত
অবস্থানে আছেন। কারও কাছে তিনি বাইবেলের সাইরাস রাজার মতো, যাঁকে ঈশ্বর
ইতিহাসের শেষ অধ্যায় শুরু করার জন্য ব্যবহার করছেন। আবার অন্যদের কাছে তিনি
সেই আকর্ষণীয় নেতার প্রতীক, যাঁর কথা ‘রেভেলেশন’ গ্রন্থে বলা হয়েছে; যিনি
বিশৃঙ্খলার সময়ে উঠে এসে মানুষের আনুগত্য অর্জন করেন।
মার্কিন
সিনেটর মার্কো রুবিও প্রায়ই বলেন, ইরানের শিয়া ধর্মগুরুদের ধর্মীয় বিশ্বাস
তাঁদের নীতিকে প্রভাবিত করছে। কিছু ক্ষেত্রে তা সত্যও হতে পারে।
কিন্তু
যখন মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারাই ব্রিফিংয়ে আরমাগেডনের কথা বলেন এবং
সিনেটররা ‘শেষ দিনের’ ধর্মসভায় অংশ নেন, তখন মনে হয়, ভবিষ্যদ্বাণীর প্রভাব
শুধু এক পক্ষের রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ নয়।
* রায়ান জিকগ্রাফ, আটলান্টাভিত্তিক একজন সাংবাদিক
- ইংরেজি সাময়িকী জ্যাকবান থেকে নেওয়া, সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত
![]() |
| বাইবেল ছুঁয়ে শপথ নিচ্ছেন ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স |
Thursday, January 1, 2026
ভারতে হিন্দুত্ববাদীরা যেভাবে খ্রিষ্টানদের কোণঠাসা করছে by অমল চন্দ্র
লোক ভবনকে ঘিরে বিতর্ক আরও তীব্র হয় এর আগে প্রকাশিত তাদের সরকারি ক্যালেন্ডার নিয়ে। সেই ক্যালেন্ডারের ফেব্রুয়ারি মাসের পাতায় ভি ডি সাভারকরের প্রতিকৃতি ছাপা হয়েছিল। এই অন্তর্ভুক্তি তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে এবং অনেকের কাছে এটি নিরপেক্ষ ইতিহাসের বদলে একটি আদর্শগত বার্তা বলেই মনে হয়। এই দুই ঘটনা একসঙ্গে দেখলে স্পষ্ট হয় যে এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি ধারাবাহিক প্রবণতার অংশ।
যদিও ২৫ ডিসেম্বরের কর্মসূচিকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়মিত সরকারি কার্যক্রম হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল, তবু এর রাজনৈতিক প্রতীকী অর্থ উপেক্ষা করা যায় না। বড়দিন কেবল একটি সাধারণ তারিখ নয়। এটি খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের সবচেয়ে পবিত্র ধর্মীয় উৎসব। সেই দিনে বাধ্যতামূলক উপস্থিতির নির্দেশ বিশেষ করে এমন একটি প্রতিষ্ঠানে, যা উল্লেখযোগ্য খ্রিষ্টান জনসংখ্যার রাজ্যকে প্রতিনিধিত্ব করে—তা নিরপেক্ষতার নয় বরং সংখ্যাগরিষ্ঠের আধিপত্য জাহির করার একটি সচেতন বার্তা দেয়।
এই ঘটনাপ্রবাহ আসলে আরও গভীর ও উদ্বেগজনক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি—ক্রমে শক্তিশালী হয়ে ওঠা হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক সংস্কৃতির অধীনে জনজীবনে ধর্মীয় সহনশীলতা ও সমন্বয়ের জায়গা ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
এই ধারা নতুন নয় এবং শুধু কেরালাতেই সীমাবদ্ধ নয়। চলতি বছর উত্তর প্রদেশে যোগী আদিত্যনাথ সরকার ঘোষণা করে যে ২৫ ডিসেম্বর বড়দিনের ছুটি না দিয়ে স্কুল খোলা রাখা হবে। ওই দিন শিক্ষার্থীদের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ীর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত বাধ্যতামূলক কর্মসূচিতে অংশ নিতে বলা হয়।
এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে খ্রিষ্টান সংগঠন ও নাগরিক অধিকারকর্মীরা তীব্র প্রতিবাদ জানান। তাঁদের বক্তব্য ছিল, এতে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়কে কোণঠাসা করা হচ্ছে এবং সরকারি শিক্ষাব্যবস্থায় ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ চেতনা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তবে প্রতীকী অবহেলা আসলে আরও ভয়াবহ বাস্তবতার কেবল বাইরের দিক। ভারতে খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে লক্ষ্যভিত্তিক সহিংসতা ধারাবাহিকভাবে এবং প্রমাণযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ইভানজেলিক্যাল ফেলোশিপ অব ইন্ডিয়ার রিলিজিয়াস লিবার্টি কমিশনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ তথ্য। হেট অ্যান্ড টার্গেটেড ভায়োলেন্স এগেইনস্ট ক্রিশ্চিয়ানস ইন ইন্ডিয়া ইয়ারলি রিপোর্ট ২০২৪ অনুযায়ী খ্রিষ্টানদের লক্ষ্য করে হামলার নথিভুক্ত ঘটনার সংখ্যা ২০২৩ সালের ৬০১ থেকে ২০২৪ সালে অন্তত ৮৩০ তে পৌঁছেছে। গত এক দশকে এটি অন্যতম সর্বোচ্চ বার্ষিক সংখ্যা এবং এটি কোনো বিচ্ছিন্ন অস্থিরতার ফল নয় বরং একটি কাঠামোগত প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়।
এই সহিংসতার ভৌগোলিক বিস্তারেও একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক ছক দেখা যায়। সবচেয়ে বেশি হামলার খবর পাওয়া যাচ্ছে উত্তর প্রদেশে। এরপর রয়েছে ছত্তিশগড়, রাজস্থান, পাঞ্জাব ও হরিয়ানা। এসব রাজ্যে ক্রমে উগ্র সংখ্যাগরিষ্ঠবাদী বক্তব্য স্থানীয় শাসনব্যবস্থা, পুলিশি আচরণ ও রাজনৈতিক সংগঠনের ভেতরে প্রবেশ করেছে। এই রাজ্যগুলোতে হামলার ঘটনার ঘনত্ব দেখায় যে খ্রিষ্টানবিরোধী সহিংসতা কোনো প্রান্তিক ঘটনা নয় বরং হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির আদর্শিক পরিবেশের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
ছত্তিশগড় সম্ভবত সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখায় কীভাবে শারীরিক সহিংসতা ও আইনি চাপ একসঙ্গে কাজ করছে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে একাধিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, রেলস্টেশন ও বিভিন্ন গণপরিবহন কেন্দ্রে খ্রিষ্টান সন্ন্যাসিনী ও যাজকদের মানবপাচার বা জোরপূর্বক ধর্মান্তরের অভিযোগে আটক করা হয়েছে। এসব অভিযোগ তাঁরা ধারাবাহিকভাবে অস্বীকার করেছেন এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর পক্ষে কোনো জোরালো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
নাগরিক স্বাধীনতা বিষয়ক সংগঠনগুলোর মতে, এই গ্রেপ্তারগুলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষার চেয়ে বেশি ভয়ভীতি প্রদর্শনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যার উদ্দেশ্য জনপরিসরে খ্রিষ্টানদের উপস্থিতিকে অপরাধ হিসেবে তুলে ধরা।
এই সবকিছুই যে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ঘটছে, তা থেকে আলাদা করে দেখা যায় না। বিজেপি শাসিত একাধিক রাজ্যে কার্যকর হওয়া ধর্মান্তর বিরোধী আইন খ্রিষ্টানদের জন্য আইনি অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি করেছে। এর ফলে স্বাভাবিক ধর্মীয় কার্যক্রমও সহজেই অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। বাস্তবে এসব আইন অনেক সময় জোরজবরদস্তি রোধের চেয়ে বেশি করে উগ্র নজরদারি ও জনতার হস্তক্ষেপকে বৈধতা দেয়। এই সময়টিকে বিশেষভাবে বিপজ্জনক করে তুলছে এই ধরনের ‘বর্জন’ ও বৈষম্যের ক্রমবর্ধমান স্বাভাবিকীকরণ।
যখন ধর্মীয় ছুটি বাতিল, যাজকদের ওপর হামলা বা গির্জা ভাঙচুর আর সাংবিধানিক সংকট হিসেবে নয় বরং নিয়মিত খবর হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তখন তা গণতন্ত্রের অবক্ষয়ের ইঙ্গিত দেয়। এটি শুধু খ্রিষ্টানদের নয়, সব ভারতীয় নাগরিকের জন্যই উদ্বেগের বিষয়। ভারতের সংবিধান ধর্মের স্বাধীনতা ও সমান নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা দেয়, কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা ক্রমশ দেখাচ্ছে যে এই অধিকারগুলো রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
এই প্রেক্ষাপটে কেরালা লোক ভবনে বড়দিনের ছুটি না দেওয়ার সিদ্ধান্তকে কোনো সাধারণ প্রশাসনিক বিষয় হিসেবে দেখা যায় না। বরং এটি একটি বৃহত্তর আদর্শিক পরিবর্তনের স্পষ্ট লক্ষণ। এমন এক পরিবর্তন যেখানে জনপরিসর ধীরে কিন্তু পরিকল্পিতভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠের অগ্রাধিকারের দিকে ঝুঁকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে জাতির সামষ্টিক কল্পনায় সংখ্যালঘুদের প্রতীকী ও বাস্তব জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
• অমল চন্দ্র, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
- দ্য ওয়্যার থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত
![]() |
| ভারতের খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের ওপর ক্রমাগত হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ। ফাইল ছবি: রয়টার্স |
Wednesday, December 31, 2025
খ্রিষ্টানদের ওপর হামলার নিন্দায় ভারতের দুই প্রভাবশালী দৈনিক, মোদি–বিজেপি নীরব
বড়দিন উপলক্ষে গত বৃহস্পতিবার সকালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নয়াদিল্লির এক গির্জায় প্রার্থনা জানান। প্রার্থনা শেষে সামাজিক মাধ্যমে শান্তি, ভালোবাসা, সম্প্রীতি ও শুভেচ্ছার বার্তা দেন। অথচ তার আগের দিন থেকে বিজেপিশাসিত বিভিন্ন রাজ্যে বজরঙ্গ দল ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের (ভিএইচপি) মতো উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী ও হিন্দুদের ওপর আক্রমণ হানতে শুরু করে। প্রধানমন্ত্রীর বার্তা অগ্রাহ্য করে বড়দিনের দিনেও হামলা অব্যাহত থাকে।
বিস্ময় এই যে ভারতজুড়ে ওই তাণ্ডবের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আজ শনিবার দুপুর পর্যন্ত একটি কথাও বলেননি। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে বিজেপিও ঘটনাপ্রবাহের নিন্দা করে কোনো বিবৃতি প্রচার করেনি। শুধু মধ্যপ্রদেশ বিজেপির জব্বলপুর শাখা দলের অন্যতম নেত্রী অঞ্জু ভার্গবকে একটি চিঠি দিয়ে বলেছে, তাঁকে ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে যে ভিডিও ভাইরাল হয়েছে তার ব্যাখ্যা দিতে হবে।
মধ্যপ্রদেশের ওই ভিডিওতে দেখা যায়, বড়দিন উদ্যাপন উপলক্ষে এক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী খ্রিষ্টান নারীর সঙ্গে অঞ্জু দুর্বব্যহার করছেন।
চলতি বছর বজরঙ্গ দল ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদ দেশজুড়ে যেভাবে বড়দিন উদ্যাপনের বিরোধিতা করেছে, অতীতে তা হয়নি। বিজেপিশাসিত রাজ্য আসাম, উত্তর প্রদেশ, হরিয়ানা, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, রাজস্থান, ওডিশা এবং দিল্লির পাশাপাশি বামশাসিত রাজ্য কেরালা ও আম আদমি পার্টি শাসিত (আপ) পাঞ্জাবে এই দুই সংগঠনের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘও (আরএসএস) বড়দিন উদ্যাপনের বিরোধিতা করেছে। বড়দিনের উৎসবে মেতে ওঠা হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকেও বাধা দেওয়া হয়।
বিপণিবিতান থেকে শুরু করে সাধারণ ব্যবসায়ীদের দোকানে বিক্রির জন্য রাখা ক্রিসমাস ট্রি, সান্তার টুপিসহ অন্য সামগ্রীতে আগুন ধরিয়ে দেয় হিন্দুত্ববাদীরা। গির্জায় ঢুকে ক্যারল গাওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়।
সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিক দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া ও দ্য হিন্দুস্তান টাইমস উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের এই আচরণের তীব্র নিন্দা জানিয়ে আজ শনিবারের কাগজে সম্পাদকীয় লিখেছে।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার সম্পাদকীয়র শিরোনাম ‘পানিশ দ্য গুনস্, হোয়াই বিজেপি শুড রেসপন্ড স্ট্রংলি টু ক্রিসমাস অ্যাটাক্স’ এবং হিন্দুস্তান টাইমসের শিরোনাম ‘নো প্লেস ফর ফেথ ভিজিল্যান্টেস: অ্যাটেম্পটস টু ডিসরাপ্ট ক্রিসমাস সেলিব্রেশনস গো অ্যাগেইনস্ট ইন্ডিয়াস সিভিলাইজেশনাল ইথস’।
দেশজোড়া তাণ্ডবের বর্ণনা দিয়ে টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখেছে, বজরঙ্গ দল ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের (ভিএইচপি) আচরণ ঘৃণ্য বেদনাদায়ক ও লজ্জার। তারা ক্রিসমাসের জন্য জমায়েত মানুষদের হয়রান করেছে। ক্যারল গাইয়েদের ভয় দেখিয়ে গান থামিয়েছে। স্কুল ও গির্জায় জবরদস্তি ঢুকে পড়েছে। সান্টা ক্লজের টুপি বিক্রেতা গরিব মানুষদের মারধর করেছে।
টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখেছে, কেরালা ছাড়া আর কোথাও পুলিশ কি এই অপরাধ নজরে এনেছে? ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১৯৬(২) ও ২৯৯ ধারায় এফআইআর দাখিল করেছে, যে ধারায় মানুষে মানুষে শত্রুতা বাড়ানো বা ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত দেওয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে? ভিডিও দেখে যাদের সহজেই শনাক্ত করা যাচ্ছে, তাদের কাউকে কি গ্রেপ্তার করা হয়েছে? এরা সবাই উৎসবের সময় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের জন্য দায়ী।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার সম্পাদকীতে উল্লেখ করা হয়েছে, বিজেপি ও আরএসএসকে এই জঙ্গিপনা বন্ধ করতে হবে। এরা শুধু দলের ক্ষতিই করছে না, এরা হিন্দু বিরোধীও। ধর্মের নামে কোনো হিন্দু এই বর্বরতা অনুমোদন করে না। ইউনাইটেড ক্রিশ্চান ফোরাম অভিযোগ জানিয়েছে, এই বছর বড়দিনের সময় সারা দেশে এমন ধরনের ৬০০–এর বেশি ঘটনা ঘটেছে। গুন্ডাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতেই হবে। একটি ছাড়া সব কটি রাজ্যই বিজেপিশাসিত। দলটি দেশেরও শাসক। এতে বিশ্বে তার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সেই কারণে আরও বেশি করে বিজেপি নেতৃত্বের সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার তুলনায় হিন্দুস্তান টাইমসের সম্পাকদীয় দীর্ঘ। প্রধানমন্ত্রীর গির্জায় যাওয়া, প্রার্থনা করা এবং সম্প্রীতির বার্তা দেওয়ার উল্লেখের পর তারা লিখেছে—আসাম ও ছত্তিশগড়ে সংঘ পরিবারের ধর্মপ্রহরীরা কীভাবে বড়দিনের আগে থেকেই খ্রিষ্টানদের হয়রান করেছে, উদ্যাপন বানচাল করেছে।
মধ্যপ্রদেশের জব্বলপুরের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নারীকে বিজেপি নেত্রীর হেনস্তা করার ভিডিওটি বিরক্তিকর জানিয়ে হিন্দুস্তান টাইমস সম্পাদকীয়তে লিখেছে, ছত্তিশগড়ে বড়দিনের দিন বন্ধ্ পালনের বিরুদ্ধে প্রচার চালানো হয়েছে। হিন্দুত্ববাদী প্রহরীরা ভয়ের যে বাতাবরণ সৃষ্টি করেছিল, যা উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিল, সেটার নিন্দা জানানোর পাশাপাশি ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি বলে মত দেয়। শুধু আইনগতভাবে নয়, রাজনৈতিক দিক থেকেও এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
খ্রিষ্টান সম্প্রদায় ভারতের মোট জনসংখ্যার ৩ শতাংশেরও কম। প্রধানত উত্তর–পূর্বাঞ্চল ও কেরালায় তাদের অবস্থান জানিয়ে উপসম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছে, সংবিধান সবাইকে বাধাহীন ধর্মাচরণের স্বাধীনতা দিয়েছে। সর্বভারতীয় স্তরে ধর্মান্তরণ বিরোধী কোনো আইন নেই। কোনো কোনো রাজ্য এই সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করেছে, জবরদস্তি অথবা লোভ দেখিয়ে ধর্মান্তরণ বন্ধ করতে। ধর্মপ্রহরীরা সেই আইনকেই হাতিয়ার করে অহিন্দুদের হেনস্তা করছে।
সম্পাদকীয়তে বলা হয়, রাষ্ট্রের উচিত এই ধরনের ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। পাশাপাশি রাজনৈতিক দিক থেকেও সক্রিয় হওয়া জরুরি, যাতে কেউ লক্ষ্মণরেখা অতিক্রম না করে। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ক্ষতের প্রলেপ হবে।
সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছে, বিজেপির বোঝা উচিত, ধর্মপ্রহরীরা তাদের ক্ষতি করছে। বিজেপি নেতৃত্বের বোঝা উচিত এদের প্রশ্রয় দিলে সম্প্রীতির জন্য দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর বার্তা বিফলে যাবে। ভারতীয় সভ্যতার মূল মন্ত্র ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’, যার অর্থ—গোটা পৃথিবীই এক পরিবার।
![]() |
| ভারতের বিহারে ক্যাথলিক গির্জায় শিশু জেসাসকে চুমু দিচ্ছেন খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের এক নারী। ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫, পাটনা। ছবি: এএনআই |
Sunday, December 28, 2025
খ্রিষ্টানদের ওপর হামলা, বড়দিনের ছুটি বাতিল—ভারত সরকারের নীরবতা কী বার্তা দিচ্ছে by অমল চন্দ্র
বড়দিনের ছুটি বাতিল কেবল একটা ‘ছুটি বাতিল’ নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতীকীভাবে বর্জন এবং তাঁদের ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তাহীনতার এক গভীর চিত্র।
ভারতের কেরালা রাজ্যের লোক ভবনের কর্মীদের বড়দিনের ছুটি বাতিলের সিদ্ধান্তটি কেবল প্রশাসনিক শিষ্টাচারের প্রশ্ন নয়, বরং এটি ভারতজুড়ে জনরোষের সৃষ্টি করেছে। লোক ভবনের কর্মীদের ২৫ ডিসেম্বর সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ির জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ‘সুশাসন দিবস’-এর সরকারি কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
লোক ভবনের এই বিতর্ক আরও তীব্র হয়। কারণ, এর আগে তাদের সরকারি ক্যালেন্ডারে ফেব্রুয়ারি মাসের পাতায় ভি ডি সাভারকারের প্রতিকৃতি দেখা যায়। বিষয়টিকে নিছক ঐতিহাসিক তথ্য হিসেবে না দেখে বরং একটি নির্দিষ্ট আদর্শ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই দুটি ঘটনাকে বিশ্লেষণ করলে বড় দিনের ছুটি বাতিলকে আর কাকতালীয় কোনো ঘটনা বলে মনে হয় না। ২৫ ডিসেম্বরের কর্মসূচিকে দাপ্তরিক রুটিন কর্মসূচি বলা হলেও এর রাজনৈতিক তাৎপর্য এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বড়দিন কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়, এটি ভারতের খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের জন্য সবচেয়ে পবিত্র দিন। বিশেষ করে যে রাজ্যে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মানুষ অনেক বেশি, সেই কেরালা রাজ্যে বড়দিনে বাধ্যতামূলক উপস্থিতির নির্দেশ দেওয়াকে নিরপেক্ষতা নয়, বরং সংখ্যাগুরুবাদী আধিপত্যের প্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি বর্তমানে ভারতের ক্রমবর্ধমান ‘হিন্দুত্ববাদী’ রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি ক্ষুদ্র নমুনা, যেখানে জনজীবনে ধর্মীয় সহনশীলতা দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে।
এই ধারাটি কেবল কেরালায় সীমাবদ্ধ নয়। উত্তর প্রদেশেও যোগী আদিত্যনাথ সরকার ঘোষণা দিয়েছে, বড়দিনে স্কুলগুলো বন্ধ থাকবে না এবং শিক্ষার্থীদের অটল বিহারি বাজপেয়ির জন্মশতবার্ষিকী অনুষ্ঠানে যোগ দিতে হবে। খ্রিষ্টান সংগঠন এবং মানবাধিকারকর্মীরা এর তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, এটি খ্রিষ্টান সম্প্রদায়কে কোণঠাসা করছে এবং ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
কেরালার ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ঐতিহাসিকভাবে এই রাজ্যটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে পরিচিত। অথচ এখানেও ইদানীং বড়দিনের উৎসবে বাধা দেওয়ার ঘটনা বাড়ছে। ক্যাথলিক বিশপ ও বিভিন্ন ধর্মীয় সংস্থা সংঘ পরিবারের সমর্থকদের বড়দিনের প্রদর্শনী এবং ক্যারল-সংগীত অনুষ্ঠানে বাধা দেওয়ার চেষ্টার প্রতিবাদ জানিয়েছে। তাদের মতে, এটি জনসমক্ষে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের উপস্থিতি কমিয়ে দেওয়ার একটি সুপরিকল্পিত উসকানি।
প্রতীকীভাবে একঘরে করার বাইরেও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সহিংসতার পরিসংখ্যান আরও ভয়াবহ। ‘ইভানজেলিক্যাল ফেলোশিপ অব ইন্ডিয়া’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা ২০২৩ সালে হয়েছিল ৬০১টি। আর ২০২৪ সালে সেটা বেড়ে অন্তত ৮৩০টিতে দাঁড়িয়েছে। এটি গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। চলতি বছর কত হামলা হয়েছে, সেই পরিসংখ্যান এখনো পাওয়া যায়নি।
এসব সহিংসতার মধ্যে রয়েছে শারীরিক আক্রমণ, প্রার্থনায় বাধা, গির্জা ভাঙচুর, সামাজিকভাবে বর্জন এবং জোরপূর্বক ধর্মান্তরের অভিযোগ তুলে যাজকদের হেনস্তা করা।
সহিংসতার এই মানচিত্রটি লক্ষ করলে একটি রাজনৈতিক ধরন চোখে পড়ে। এবার সবচেয়ে বেশি সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে উত্তর প্রদেশ থেকে। এরপর রয়েছে ছত্তিশগড়, রাজস্থান, পাঞ্জাব ও হরিয়ানা। এসব রাজ্যে চরমপন্থী বয়ান এখন স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের কাজেও প্রভাব ফেলছে।
এসব আক্রমণের নিষ্ঠুরতা এখন ব্যক্তিগত পর্যায়েও পৌঁছেছে। ওডিশার বালাসোর জেলায় বহুল আলোচিত এক ঘটনায় ক্যাথলিক যাজক ও সন্ন্যাসিনীরা ধর্মীয় অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পথে একদল উগ্রবাদীর আক্রমণের শিকার হন। কোনো প্রমাণ ছাড়াই তাঁদের বিরুদ্ধে ‘জোরপূর্বক ধর্মান্তরের’ অভিযোগ আনা হয়েছিল। ক্যাথলিক বিশপস কনফারেন্স অব ইন্ডিয়া এই হামলাকে একটি উদ্বেগজনক জাতীয় প্রবণতার অংশ বলে বর্ণনা করেছেন, যেখানে ধর্মীয় গুরুদের ক্রমেই সন্দেহ ও সহিংসতার লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
মধ্যপ্রদেশের জাবালপুরে পরিস্থিতি আরও খারাপ। সেখানে স্থানীয় ডায়োসিসের ভিকার জেনারেলসহ জ্যেষ্ঠ যাজকেরা থানার ভেতরেই লাঞ্ছিত হন বলে অভিযোগ উঠেছে। তাঁরা মূলত সন্দেহজনক অভিযোগে আটক খ্রিষ্টান পুণ্যার্থীদের পক্ষে কথা বলতে সেখানে গিয়েছিলেন। জনরোষের মুখে একটি এফআইআর দায়ের করা হলেও সঙ্গে সঙ্গে কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। এই পরিস্থিতি প্রাতিষ্ঠানিক যোগসাজশ এবং আইনের পক্ষপাতমূলক প্রয়োগ নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
শারীরিক সহিংসতা ও আইনি বলপ্রয়োগ কীভাবে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করে, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হতে পারে ছত্তিশগড়। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে অসংখ্য প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পাচার বা জোরপূর্বক ধর্মান্তরের অভিযোগে রেলস্টেশন ও গণপরিবহন পয়েন্টগুলো থেকে খ্রিষ্টান যাজক ও সন্ন্যাসিনীদের আটক করা হয়েছে। তাঁরা বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে এবং খুব কমই এসব অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।
নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলো যুক্তি দিয়েছে, আইন প্রয়োগের চেয়েও এসব ব্যক্তির গ্রেপ্তারের মাধ্যমে ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য হলো জনপরিসরে খ্রিষ্টানদের উপস্থিতিকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা।
এমনকি গির্জাগুলোও হামলার নিশানায় পরিণত হয়েছে। ছত্তিশগড়ের ধামতরি জেলায় গত ৮ জুন বোর্সি গ্রামে রোববার সকালের প্রার্থনার সময় একদল হিন্দু চরমপন্থী পিনিয়েল প্রেয়ার ফেলোশিপে হামলা চালায়। তারা গির্জা ভাঙচুর করে, চেয়ার ও বাদ্যযন্ত্র ভেঙে ফেলে, বাইবেল পুড়িয়ে দেয় এবং প্রার্থনারত ব্যক্তিদের ওপর হামলা চালায়।
উগ্রবাদী হিন্দুদের হামলার সময় একজন যাজক অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন। হামলাকারীরা সে সময় ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান দিচ্ছিল এবং সেখানে সমবেত হতে নিষেধ করছিল। এরপর ভয়ে অনেক খ্রিষ্টান ভক্ত সেখানে আসা বন্ধ করে দিয়েছেন। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, কীভাবে পবিত্র স্থানগুলো এখন সহিংসতার মুখে নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েছে।
এই বৈরী আবহাওয়া সামাজিক ও সাংস্কৃতিক হুমকির মাধ্যমে আরও শক্তিশালী হচ্ছে, যা সহিংসতার পর্যায়ে না গেলেও সামাজিকভাবে খ্রিষ্টানদের বর্জনকে স্বাভাবিক করে তুলছে। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো বিবৃতি দিয়ে হিন্দুদের বড়দিন পালন থেকে বিরত থাকতে বলছে। এর মাধ্যমে খ্রিষ্টানদের সাংস্কৃতিক প্রকাশকে ‘বিদেশি’ ও ‘সন্দেহজনক’ হিসেবে চিত্রায়িত করা হচ্ছে।
উত্তরাখন্ডের হরিদ্বারে বড়দিনের সব অনুষ্ঠান বাতিল করতে হয়েছে। কারণ, হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো সেগুলোকে ‘হিন্দুবিরোধী’ বলে দাবি করে প্রতিবাদ জানিয়েছিল।
এসব ঘটনার কোনোটিই বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। বেশ কিছু বিজেপিশাসিত রাজ্যে এখন ধর্মান্তরবিরোধী আইন বলবৎ আছে, যা খ্রিষ্টানদের জন্য একটি আইনি ঝুঁকি তৈরি করেছে। ফলে সাধারণ ধর্মীয় কর্মকাণ্ডকেও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র হিসেবে সাজানো সম্ভব হচ্ছে। এসব আইন জোরজবরদস্তির বিরুদ্ধে খ্রিষ্টানদের সুরক্ষার চেয়ে বরং অনেক সময় উগ্রপন্থীদের আইন হাতে তুলে নেওয়াকে বৈধতা দিচ্ছে। হিন্দুত্ববাদী জনতাকে হস্তক্ষেপ করতে উৎসাহিত করছে।
এই ধারাবাহিক শত্রুতার মানবিক মূল্য অপরিসীম। শারীরিক আঘাতের বাইরেও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মানুষ মনস্তাত্ত্বিক চাপ ও ভয়ের মধ্যে বসবাস করছেন। তাঁদের পরবর্তী প্রার্থনা সভা বা উৎসবের অনুষ্ঠান পুলিশের তল্লাশি নাকি উগ্র জনতার হামলার শিকার হবে—এসব নিয়ে তাঁরা অনিশ্চয়তায় ভোগেন।
বর্তমান সময়টিকে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক করে তুলছে, তা হলো এ ধরনের সামাজিক বর্জনকে ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে মেনে নেওয়া। যখন ধর্মীয় ছুটি বাতিল, যাজকদের ওপর হামলা বা গির্জা ভাঙচুরের ঘটনাকে কোনো সাংবিধানিক জরুরি অবস্থা হিসেবে না দেখে কেবল প্রতিদিনের নিয়মিত সংবাদ হিসেবে দেখা হয়, তখন বুঝতে হবে গণতন্ত্রের অবনমন ঘটছে। এই পরিস্থিতি কেবল খ্রিষ্টান সম্প্রদায় নয়, সব ভারতীয় নাগরিকের জন্যই চিন্তার বিষয়।
ভারতের সংবিধান ধর্মের স্বাধীনতা এবং সমান নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা দেয়। অথচ বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, এই অধিকারগুলো এখন রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপরই বেশি নির্ভরশীল।
তাই কেরালার লোক ভবনে বড়দিনের ছুটি বাতিলের ঘটনাকে কেবল একটি প্রশাসনিক ভুল হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি আসলে একটি বৃহত্তর আদর্শিক পরিবর্তনের লক্ষণ। এখানে জনপরিসরকে সূক্ষ্ম ও ধারাবাহিকভাবে সংখ্যাগুরুবাদী অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে পুনর্গঠিত করা হচ্ছে। জাতির সামগ্রিক কল্পনায় এটি সংখ্যালঘুদের প্রতীকী ও বস্তুগত জায়গা সংকুচিত হওয়ারই চিহ্ন।
এ ধারা পরিবর্তনের জন্য কেবল মাঝেমধ্যে নিন্দা জানানো যথেষ্ট নয়। এ জন্য প্রয়োজন এমন রাজনৈতিক নেতৃত্ব যারা দ্ব্যর্থহীনভাবে সাংবিধানিক ধর্মনিরপেক্ষতাকে রক্ষা করবে। দরকার এমন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, যারা নিরপেক্ষভাবে কাজ করবে। সর্বোপরি দরকার এমন গণমাধ্যম, যা সংখ্যালঘুদের ওপর হামলাকে প্রান্তিক খবর হিসেবে না দেখে ভারতীয় গণতন্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করবে। ধর্মীয় উগ্রবাদ থেকে উৎপন্ন স্বেচ্ছাচারী আইন লঙ্ঘনকে যুক্তি দিয়ে খণ্ডন না করে সরাসরি মোকাবিলা করতে হবে।
যে দেশ বৈচিত্র্য ও সভ্যতাগত বহুত্ববাদ নিয়ে গর্ব করে, সেখানে বড়দিনের ছুটি বাতিল থেকে শুরু করে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর শারীরিক আক্রমণ গুরুতর এক কলঙ্ক। একটি ছুটির দিন বাতিল হওয়া হয়তো ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু এটি একটি গভীর অসুস্থতাকে ধারণ করে। আর তা হলো রাজনৈতিক সংখ্যাগুরুবাদের যুগে অন্যকে বাদ দেওয়ার সংস্কৃতিকে স্বাভাবিক করে তোলা।
ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিশ্রুতি শেষ পর্যন্ত ঐক্যের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মাধ্যমে বিচার করা হবে না। বরং ঘৃণা ছড়ানোর মতো কাজ থেকে দেশটি তার সবচেয়ে অসহায় নাগরিকদের কতটা দৃঢ়ভাবে সুরক্ষা দিচ্ছে, তা দিয়েই বিচার করা হবে।
ছত্তিশগড়ের ধামতরি জেলায় গত ৮ জুন একটি প্রার্থনা সভায় হিন্দুত্ববাদীরা হামলা চালিয়ে গির্জা ভাঙচুর করেছে, বাইবেল পুড়িয়ে দিয়েছে এবং প্রার্থনারত ব্যক্তিদের মারধর করে। সেখানে ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান দিয়ে উগ্রবাদী হিন্দুরা ভবিষ্যতে আর প্রার্থনা না করার হুমকি দেয়।
এই বৈরী পরিবেশ কেবল শারীরিক সহিংসতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের (ভিএইচপি) মতো সংগঠনগুলো হিন্দুদের বড়দিনের উৎসব থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানাচ্ছে। উত্তরাখন্ডের হরিদ্বারে বিক্ষোভের মুখে বড়দিনের অনুষ্ঠান বাতিল করতে হয়েছে।
বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে কার্যকর হওয়া ‘ধর্মান্তরবিরোধী আইন’ খ্রিষ্টানদের আরও ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। সাধারণ ধর্মীয় কর্মকাণ্ডকেও অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। এসব আইন অনেক সময় সাধারণ মানুষকে আইন নিজের হাতে তুলে নিতে উৎসাহিত করছে।
এই শত্রুতার মানবিক মূল্য অনেক। শারীরিক আঘাতের বাইরেও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মানুষ ভারতে সব সময় এক মনস্তাত্ত্বিক চাপের মধ্যে বসবাস করছেন। তাঁরা জানেন না, পরবর্তী প্রার্থনা বা উৎসবে কখন পুলিশি ঝামেলা বা হামলার শিকার হতে হবে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো এসব ঘটনা এখন ভারতে ‘স্বাভাবিক’ হয়ে উঠছে। বড়দিনের ছুটি বাতিল বা গির্জা ভাঙচুরের খবর যখন আর সাংবিধানিক সংকট হিসেবে দেখা হয় না, তখন বুঝতে হবে গণতন্ত্রের অবনমন ঘটছে। ভারতের সংবিধান ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সমনাগরিকত্বের নিশ্চয়তা দিলেও বাস্তবে তা রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
কেরালা লোক ভবনের একটি ছুটির ঘটনা আসলে একটি বড় আদর্শিক পরিবর্তনের লক্ষণ। যেখানে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধীরে ধীরে সংখ্যাগুরুদের অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সাজানো হচ্ছে। সংখ্যালঘুদের জন্য প্রতীকী ও বাস্তব জায়গা সংকুচিত হয়ে আসছে।
ভারতের বৈচিত্র্য ও বহুত্ববাদের যে অহংকার রয়েছে, সেখানে খ্রিষ্টানদের ওপর এই ক্রমাগত আক্রমণ এক বড় কলঙ্ক। একটি ছুটির দিন বাতিল হওয়া হয়তো ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু এটি এক গভীর অসুস্থতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। আর সেটি হচ্ছে সংখ্যাগুরুবাদী রাজনীতির যুগে অন্যকে বাদ দেওয়ার সংস্কৃতিকে স্বাভাবিক করে তোলা। ভারতের গণতন্ত্রের সার্থকতা কেবল মুখে ঐক্যের কথায় নয়, বরং এটি তার দুর্বলতম নাগরিকদের কতটা সুরক্ষা দিতে পারছে, তার ওপরই নির্ভর করছে।
![]() |
| ভারতের পাতিয়ালায় সেন্ট পিটার গির্জায় বড়দিনের উৎসবে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মানুষ। ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫, পাতিয়ালা। ছবি: এএনআই |
Monday, November 3, 2025
আমার স্ত্রী খ্রিস্টান নন, ধর্ম পরিবর্তনেরও কোনো পরিকল্পনা নেই: জেডি ভ্যান্স
এতে বলা হয়, এর আগে তিনি বলেছিলে তার স্ত্রী ভারতীয় বংশোদ্ভূত। হিন্দু পরিবারে বেড়ে ওঠা। তিনি যদি একদিন খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হন, তা তিনি পছন্দ করবেন। তিনি আরও বলেন, তার স্ত্রী তার সঙ্গে এবং তাদের সন্তানদের নিয়ে গির্জায় যান। কারণ তাদের সন্তানদের খ্রিস্টান হিসেবে বড় করা হচ্ছে। এক্সে এক পোস্টে একজন লিখেছেন, মাত্র কিছু মানুষের স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য প্রকাশ্যে নিজের স্ত্রীর ধর্মকে ছোট করা অদ্ভুত। এই মন্তব্যের জবাবে ভ্যান্স তার পোস্টে তিনটি পয়েন্টে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। তিনি লিখেছেন, কী ঘৃণ্য মন্তব্য! এবং এটিই এমন একমাত্র নয়। প্রথমত, প্রশ্নটি এসেছে আমার ‘বামদিকের’ কারো কাছ থেকে, আমার আন্তঃধর্মীয় বিবাহ নিয়ে। আমি একজন জনসাধারণের প্রতিনিধি, তাই মানুষ কৌতূহলী হবে, এবং আমি প্রশ্নটি এড়িয়ে যেতে চাইনি।
দ্বিতীয় অংশে ভ্যান্স বলেন, খ্রিস্টধর্মের মাধ্যমেই তিনি বুঝেছেন যে ‘গসপেল’ মানুষের জন্য কল্যাণকর। তিনি উল্লেখ করেন, বহু বছর আগে তার স্ত্রীই তাকে আবার নিজের বিশ্বাসের পথে ফিরে যেতে উৎসাহ দিয়েছিলেন। তিনি লিখেছেন, সে খ্রিস্টান নয়, এবং ধর্ম পরিবর্তনের কোনো পরিকল্পনাও নেই। কিন্তু আন্তঃধর্মীয় বিবাহে থাকা অনেক মানুষের মতো, আমি আশা করি একদিন সে বিষয়গুলো আমার মতো করেই দেখবে। ভ্যান্স আরও লেখেন, এই ধরনের পোস্টগুলো ‘খ্রিস্টান-বিরোধী পক্ষপাতিত্বে ভরা’। হ্যাঁ, খ্রিস্টানদের বিশ্বাস আছে। এবং হ্যাঁ, সেই বিশ্বাসের কিছু ফল আছে, যার একটি হলো আমরা অন্যদের সঙ্গে সেই বিশ্বাস শেয়ার করতে চাই। এটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক বিষয়। যারা বিপরীত বলছে, তাদের নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে।
উল্লেখ্য, বুধবার মিসিসিপির একটি টার্নিং পয়েন্ট ইউএসএ ইভেন্টে ভ্যান্স বলেন, প্রায় প্রতি রবিবারই উষা আমার সঙ্গে গির্জায় আসে। আমি যেমন তাকে বলেছি, যেমন প্রকাশ্যেও বলেছি, তেমনই এখন এখানে আমার দশ হাজার ‘সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের’ সামনে বলছি- আমি কি আশা করি একদিন সে গির্জায় আমার মতো একইভাবে অনুপ্রাণিত হবে? হ্যাঁ, সত্যিই আমি তা চাই, কারণ আমি খ্রিস্টান গসপেলে বিশ্বাস করি এবং আশা করি একদিন আমার স্ত্রীও সেটি একইভাবে দেখবে। তিনি আরও যোগ করেন, কিন্তু যদি সে তা না-ও করে, তবে তাতেও কোনো সমস্যা নেই। ঈশ্বর বলেছেন, প্রত্যেকেরই স্বাধীন ইচ্ছা আছে। তাই এটা কোনো বিরোধের কারণ নয়- বরং এটা বন্ধু, পরিবার ও প্রিয়জনের সঙ্গে মেলবন্ধনের একটি বিষয়।

Monday, August 11, 2025
নারীর ভোটাধিকার বাতিল চেয়ে যাজকদের মন্তব্যে হেগসেথের সমর্থন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট
ভিডিওতে একটি খ্রিষ্টান জাতীয়তাবাদী গির্জার একাধিক যাজক মত দেন, নারীদের আর ভোট দেওয়ার অনুমতি দেওয়া উচিত নয়।
গত বৃহস্পতিবার রাতে এক্সে পুনঃপ্রকাশ করা হেগসেথের পোস্টে দেখা গেছে, তিনি খ্রিষ্টান জাতীয়তাবাদী এক যাজকের সঙ্গে গভীর ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক রাখেন, যাঁর ধর্ম ও নারীর ভূমিকা বিষয়ে চরমপন্থী দৃষ্টিভঙ্গি আছে।
হেগসেথ তাঁর পোস্টে সিএনএনের প্রায় সাত মিনিটের এক প্রতিবেদন নিয়ে মন্তব্য করেন। কমিউনিয়ন অব রিফর্মড ইভানজেলিক্যাল চার্চেসের (সিআরইসি) সহপ্রতিষ্ঠাতা ডগ উইলসনের কর্মকাণ্ড নিয়ে এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে সিএনএন। প্রতিবেদনে উইলসনস চার্চের একজন যাজক মার্কিন সংবিধান থেকে নারীর ভোটাধিকার বাতিলের পক্ষে মত দেন। অন্য আরেকজন যাজক বলেন, তাঁর প্রত্যাশিত ‘আদর্শ সমাজে’ মানুষ পরিবারভিত্তিক ভোট দেবে। ভিডিওতে একজন নারী সদস্যকেও বলতে শোনা যায়, তিনি তাঁর স্বামীর প্রতি অনুগত।
ভিডিওটি পোস্ট করে হেগসেথ লিখেছেন, জীবনের সব ক্ষেত্রে খ্রিষ্টধর্মের বিধান প্রভাব বিস্তার করবে। হেগসেথের পোস্টে ১২ হাজারের বেশি লাইক ও ২ হাজারের বেশি শেয়ার হয়। কিছু ব্যবহারকারী ভিডিওতে থাকা যাজকদের মতের সঙ্গে একমত হলেও অনেকে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর খ্রিষ্টান জাতীয়তাবাদী ধারণা প্রচারের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তবে প্রগ্রেসিভ ইভানজেলিকাল সংগঠন ‘ভোট কমন গুড’-এর নির্বাহী পরিচালক ও যাজক ডগ পাগিট বলেন, ভিডিওতে প্রচারিত মতামত শুধু ‘খ্রিষ্টানদের এক ক্ষুদ্র প্রান্তিক অংশের’ ধারণা এবং হেগসেথের এগুলো প্রচার করাকে তিনি ‘খুবই বিরক্তিকর’ বলে উল্লেখ করেন।
পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পারনেল গত শুক্রবার অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেছেন, হেগসেথ এমন ‘একটি চার্চের গর্বিত সদস্য’, যা সিআরইসির সঙ্গে যুক্ত। তিনি উইলসনের অনেক লেখা ও শিক্ষাকে অত্যন্ত মূল্যায়ন করেন।
গত মে মাসে হেগসেথ তাঁর ব্যক্তিগত যাজক ব্রুকস পোটেইগারকে পেন্টাগনে আমন্ত্রণ জানান। সেখানে তিনি সরকারি কর্মঘণ্টায় একাধিক খ্রিষ্টান প্রার্থনাসভার প্রথমটি পরিচালনা করেন। প্রতিরক্ষা দপ্তরের কর্মী ও সামরিক সদস্যরা বলেন, তাঁরা এ অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্র সরকারি ই–মেইলে পেয়েছিলেন।
সিএনএনের প্রতিবেদনে উইলসন বলেন, ‘আমি এ দেশকে একটি খ্রিষ্টান দেশ হিসেবে দেখতে চাই এবং চাই বিশ্বও খ্রিষ্টান বিশ্ব হোক।’
![]() |
| মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। ছবি: এএফপি |
Thursday, June 20, 2024
হিন্দু , ইহুদি ও খ্রিষ্টধর্মে পশু উৎসর্গের রীতি নিয়ে কী আছে? by অর্চি অতন্দ্রিলা
বলা হয়, তাদের দুই সন্তান হাবিল ও কাবিল (কুরআন), ইংরেজিতে Able & Cain (পুরাতন বাইবেল) ছিল যথাক্রমে রাখাল ও কৃষক। সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্যে দুই ভাই একটি করে কুরবানি হাজির করেছিল যার একজনেরটা কবুল হয় বলে উল্লেখ রয়েছে কুরআনে।
ইহুদি ধর্মগ্রন্থ বা আদি বাইবেল অনুযায়ী এবল তার পালের শ্রেষ্ঠ মেষ নিয়ে যায়, আর কেইন নিয়ে যায় নিজ ক্ষেতের কিছু শস্য। এর মাঝে এবলেরটা গ্রহণ করা হয়, কেইনেরটা নয়। কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়, এবল যেমন শ্রেষ্ঠ উপকরণ বেছে নিয়েছিল, কেইন তেমনটি করেনি।
পরবর্তীতে প্রতিহিংসায় এবলকে হত্যা করে কেইন। তবে পশু কোরবানি নিয়ে ইসলামে যে ব্যাপক প্রচলন সেটি অবশ্য এসেছে আরও অনেক পরে ভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে।
কিন্তু অন্য ধর্মে বিষয়গুলো কীভাবে রয়েছে? বিশেষত হিন্দু ধর্ম, ইহুদি ধর্ম ও খ্রিষ্টধর্মে পশু উৎসর্গের রীতি বা প্রচলন সম্পর্কে কেমন ব্যাখ্যা রয়েছে?
হিন্দু বা সনাতন ধর্ম
হিন্দু ধর্মে পশু বলি বিষয়টা নিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই মতভেদ থাকলেও এর চর্চা যে নেই তেমনটাও নয়। যেমন বাংলাদেশের অনেক জায়গাতেই দুর্গাপূজা বা কালিপূজা ছাড়াও অনেক ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে পশু বলি দেয়া হয়।
বিশেষত ‘শাক্ত’ মতাবলম্বী, অর্থাৎ ‘শক্তি’ বা দেবীকেন্দ্রিক উপাসনায় এই প্রথার প্রচলনের কথা উল্লেখ করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. কুশল বরণ চক্রবর্তী।
“বিবিধ শাস্ত্রে এই পশু বলির কথা উল্লেখ রয়েছে, যেমন রামায়ণ, মহাভারত, বিবিধ পুরাণ; পশু বলি বিষয়টি সনাতন ধর্মে বৈদিক যুগ থেকেই আছে। ঋগ্বেদের প্রথম মন্ডলে ১৬২ নম্বর সূক্তে অথবা যজুর্বেদের মধ্যেও আছে, সেখানে বলির যে পশু আছে সে মুক্তি লাভ করে, বন্ধন থেকে মুক্ত হয়” এমন উদাহরণ দেন তিনি।
এমন ক্ষেত্রে ছাগল অথবা মহিষ উৎসর্গের প্রচলনটাই বেশি।
বেদ থেকে সনাতন ধর্মের দুই ধরনের উপাসনা পদ্ধতি আসে, সাকার ও নিরাকার। সাকারের মধ্যে পাঁচটি মতের একটি শাক্ত। আর বাঙ্গালিদের মধ্যে শাক্ত মতাবলম্বী বেশি থাকায় দুর্গাপূজা বা কালীপূজার প্রাধান্য দেখা যায়।
বাঙ্গালিদের অনেক প্রাচীন মন্দিরগুলোতে এখনও বলির প্রচলন দেখা যায়।
যেমন বাংলাদেশে ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দির, চট্টগ্রামের চট্টেশ্বরী মন্দির, ভারতের ত্রিপুরার বড় মন্দির ত্রিপুরা সুন্দরী, আসামের কামাখ্যা, কোলকাতার কালীঘাট এমন বেশ কিছু মন্দিরের কথা উল্লেখ করেন ড. চক্রবর্তী।
ঐতিহাসিক দিক বিবেচনায় হিন্দু ধর্মে যেটি বহুল আলোচিত সেটি অশ্বমেধ যজ্ঞ। ভারতের পৌরাণিক বিষয়ক লেখক ড. রোহিণী ধর্মপাল রামায়ণ ও মহাভারতের উদাহরণ দিয়ে বিবিসিকে বলেন, সেই যজ্ঞের নিয়মটাই ছিল যে ঘোড়া ছেড়ে দেয়া হতো, এবং যিনি সম্রাট হবেন তার প্রতিনিধিরা সেই ঘোড়ার সঙ্গে থাকতেন।
সেই ঘোড়া যে যে রাজ্য ঘুরবে, সেই রাজ্যগুলির লোক যদি ঘোড়াকে আটকাতো তাহলে যুদ্ধ হতো ঐ রাজার প্রতিনিধির সঙ্গে। কোনও রাজ্যে যদি ঘোড়াকে না আটকানো হতো তাহলে ধরে নেয়া হতো এই ঘোড়াটি বা সেই রাজা এই রাজ্যটিকে জয় করে নিচ্ছে।
পরিক্রমা করে সেই ঘোড়াটি যখন ফিরতো, সেই ঘোড়াটিকে কিন্তু যজ্ঞের আগুনে দেয়া হতো এবং সেই মাংস সবাই খেতেন।
এছাড়া, “মহাভারতের সময়ও ব্রাহ্মণরাও মাংস খেতেন, রাম নিজেই রীতিমত ননভেজ মানুষ ছিলেন এবং মাংস ছাড়া থাকতে পারতেন না। যখন সীতাকে রাবণ নিয়ে চলে গেছিল তখন বিরহে মদ-মাংস খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিল,” উল্লেখ করেন ড. ধর্মপাল।
যদিও তিনি নিজে পশু বলি না বরং মানুষের ভেতরকার নেতিবাচক দিকগুলো বলির বিষয়ে জোর দেন এবং বর্তমানে ভারতে তেমন প্রকাশ্য পশু বলির প্রচলনও তিনি লক্ষ্য করেন না বলে জানান।
শ্রীলঙ্কা এবং নেপালে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পশু বলি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে সেটা যে একেবারেই পালন হয় না তেমনটাও নয়।
অবশ্য এক্ষেত্রে মিঃ চক্রবর্তীর অভিজ্ঞতা ভিন্ন। বাংলাদেশে বড় পরিসরে বেশিরভাগ পূজাতেই বলির প্রচলন দেখেছেন তিনি।
এর মাঝে কালী পূজা, দুর্গাপূজা তো আছেই, এছাড়াও কাত্যায়নী পূজা বা কার্ত্তিক মাসের দুর্গাপূজা, বাসন্তী পূজা বা বসন্তের দুর্গাপূজা, মনসাপূজা, এমনকি বৈষ্ণবরা - যারা সাধারণত পশু বলির পক্ষে না তাদের জগন্নাথ মন্দিরেও সীমিত পরিসরে বা উৎসবে পশু বলির উদাহরণ রয়েছে।
যদিও ইদানিংকার ক্ষেত্রে যেভাবে মাংস খাওয়ার আয়োজন বা বছরব্যাপি ফ্রিজে তুলে রাখতে, সমর্পণ বা দরিদ্রদের দানের দিকে জোর না দিয়ে অনেকটাই আত্মতুষ্টি, প্রতিযোগিতা বা ভোগের প্রবণতা লক্ষ্য করছেন সেটাতে বলির আধ্যাত্মিক মাহাত্মের জায়গা সংকুচিত হয়ে আসছে বলে মনে করছেন তিনি।
ইহুদি ধর্ম
ইসলামের ইতিহাসের সাথে অনেকটাই মিল আছে ইহুদি ও খ্রিস্টধর্মের। তবে পশু উৎসর্গ বা কোরবানির দিকটা ইহুদিদের উৎসবেই ছিলো বেশি।
ইহুদি ধর্মে মূলত ৩টি তীর্থযাত্রার উৎসব পেসাহ (Passover), শাভুওয়াত (Feast of Weeks, সপ্তাহের উৎসব), এবং সুখট (Feast of Tabernacles, কৃষি সংক্রান্ত উৎসব) এর সাথে পশু উৎসর্গের রীতির মাহাত্ম রয়েছে।
আর এর বাইরে ‘রশ হাশানাহ’ বা ইহুদি নববর্ষ এবং ‘ইয়ম কিপুর’ (Day of Atonement, প্রায়শ্চিত্তের দিন), এমন সব উৎসবেই পশু উৎসর্গের রীতি থাকার কথা উল্লেখ করেন যুক্তরাজ্যের একজন ইহুদী পণ্ডিত বা র্যাবাই গ্যারি সমারস, যিনি লিও বিক কলেজের একাডেমিক সার্ভিসের প্রধান।
মুসলিমদের কোরবানির ইতিহাসের সাথে যে নবী ইবরাহীমের ঘটনা আসে, সে ইতিহাস ইহুদি ধর্মগ্রন্থেও রয়েছে। তবে ইহুদিদের জন্য পশু উৎসর্গের নির্দেশ আসে আরও পরে একটু ভিন্নভাবে।
প্রাথমিক ইতিহাসের দিকে দেখলে যেমনটা তোরাহ বা তাওরাতে উল্লেখ রয়েছে, ৩০০০ বছরেরও বেশি সময় আগে মিশরের ফারাও বা ফেরাঊন রাজারা ইসরায়েলাইটস নামে একদল ইহুদিকে দাস করে রেখেছিল।
ইহুদি ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ নবী মোশি (আরবীতে মূসা, গ্রীক মোসেস) ফারাওদের কাছে বেশ কয়েকবার দাসকে মুক্ত করতে চেষ্টা করেন।
এরপর বলেন যদি তাদের মুক্তি না দেয়া হলে ঈশ্বর মিশরীয়দের উপর মহামারী ঘটাবেন। ফেরাউনরা না মানায় মহামারী আসে। সে সময়ের দশটি মহামারীর একটি ছিল মিশরীয় পরিবারে প্রথম জন্ম নেওয়া শিশুটিকে মৃত্যুর দেবদূতের হাতে হত্যা।
সেসময় “ভেড়া কোরবানি দিয়ে তার রক্তচিহ্ন দরজার বাইরে এঁকে দিতে নির্দেশ দেয়া হয়, যেন মৃত্যুর দূত মিশরের প্রথমজাত সন্তানকে নিতে আসলে তারা সেই চিহ্ন দেখে ইসরায়েলিদের চিনে তাদেরকে বাদ দিতে পারে,” এভাবেই প্রথমবারের মতো পশু উৎসর্গের নির্দেশ আসে যেটা ‘পেসাহ’ বা ‘পাসওভার’ হিসেবে পরিচিত বলে জানান মিঃ সমারস।
বলা হয় এই শেষ মহামারিতে ফেরাউনের নিজ সন্তানের মৃত্যুর পর মূসাকে ডেকে ইহুদি দাসদের নিয়ে মিশর থেকে চলে যেতে বলেন এবং ইহুদিদের ২০০ বছরের বেশি সময়ের দাসত্বের অবসান হয়।
কিতাব অনুসারে ইহুদিদের বেশিরভাগ উৎসবেই নিজস্ব ধরনের উৎসর্গ বা বিসর্জনের উল্লেখ রয়েছে যার নির্দিষ্ট সময় এবং স্থানের নিয়ম রয়েছে বলে উল্লেখ করেন র্যাবাই সমারস।
“এখন অবশ্য আমাদের এমন উৎসর্গের রেওয়াজ নেই কারণ আমাদের সেই মন্দিরটি নেই যেখানে গিয়ে প্রাণী উৎসর্গ করার নিয়ম ছিল। এখন প্রার্থনায় এই উৎসর্গের দিকটা উঠে আসে যেন আমরা সেটা মনে রাখি যে এটা ইহুদি ধর্মের অপরিহার্য অংশ,” বলছিলেন তিনি।
সেই মন্দির বলতে টেম্পল মাউন্টকে বোঝানো হচ্ছে যেখানে এখনকার আল আকসা মসজিদ রয়েছে। ইহুদিরা সেই মন্দির পুনর্গঠনের জন্য প্রার্থনা করেন এবং বিশ্বাস করেন সেই মন্দির পুনর্গঠন হলে তারা ধর্মীয়ভাবে পশু উৎসর্গের রীতিতে ফেরত যেতে পারবেন।
মন্দির না থাকায় বেশির ভাগ ইহুদি পশু উৎসর্গ না করলেও জেরুজালেমে কিছু গোষ্ঠী আছে যারা এখনও পশু উৎসর্গ করেন। যেমন সামারিটান গোষ্ঠী পাসওভারে পশু উৎসর্গ করে থাকেন।
আবার অনেকে আছেন যারা একটি প্রাণী উৎসর্গ করতে যে খরচ হতো সেটা দান করে থাকেন।
আর মেষ, মহিষ, গরু, ভেড়া যেই প্রাণীই হোক না কেন, উৎসর্গের জন্য প্রাণী ধর্মীয়ভাবে নির্দেশিত সুস্থ, নিখুঁত ধরনের বা উপযুক্ত হতে হবে যেটাকে ‘কোশার’ বলা হয়। আর ঠিক উৎসর্গ না করা হলেও অনেক উতসবেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ মাংস খাওয়া।
ইহুদি ধর্মে পশু উৎসর্গের অনেক ধরনের রীতিনীতি এবং নিয়মকানুন রয়েছে যেগুলো উদ্দেশ্যভেদে ভিন্ন ভিন্ন হয়।
খ্রিষ্টধর্ম
ইহুদি ধর্মের সূত্র ধরে খ্রিস্টধর্ম আসায় খ্রিষ্টধর্মের যে পুরনো বাইবেল রয়েছে তার সাথে অনেকটাই মিল রয়েছে ইহুদি ধর্মগ্রন্থের। ইহুদিদের যে 'পাসওভার' রীতি সেটার জায়গা খ্রিস্টধর্মেও রয়েছে, যদিও এর ব্যাখ্যা বা পালনের ধরন ভিন্ন। সময়টা কাছাকাছি হলেও খ্রিষ্ট পাসওভার বলতে নিস্তারপর্ব বা যিশুখ্রিষ্টের পুনরুত্থানের মাহাত্ম্য থেকে দেখা হয়।
“পুরাতন নিয়মের মধ্যে যে কয়েকটা বই আছে বিশেষত লেবীয় পুস্তকের ১৭ অধ্যায় এবং দ্বিতীয় বিবরণে এ বিষয়গুলো উল্লেখ আছে যে, কী রকম পশু বলি দিতে হবে। ওটা দেয়া হতো সকালে এবং বিকেলে, বিভিন্ন উৎসবে এবং অনেক পশু দেয়া হতো” উল্লেখ করেন ড. প্রশান্ত টি রিবেরু যিনি ঢাকায় কাফরুল ক্যাথলিক চার্চের যাজক।
সেসময় ঐ পশু বলি দিয়ে নেতিবাচক প্রবণতার বিপরীতে অনুতাপ প্রকাশ এবং ক্ষমার আশায় এমনটা করা হতো।
তবে সেই রীতির প্রচলন এখন আর ধর্মীয়ভাবে নেই কারণ যিশুখ্রিস্টের মৃত্যুকেই মূলত সবচেয়ে বড় উৎসর্গ হিসেবে দেখা হয়। যিশু খ্রিষ্টকেই খ্রিষ্টধর্মে 'ল্যাম্ব অফ গড' বা ঈশ্বরের মেষশাবক হিসেবে দেখা হয়।
ধর্মীয়ভাবে বলির বিধান না থাকলেও অনেক ক্ষেত্রেই "কেউ যদি মানতি করে (মানত), কোনও প্রতিশ্রুতি দেয় ঈশ্বরের কাছে সেটা অন্যভাবে দেয়া হয়। কিন্তু আগের মতো সেটা বেদিতে নিয়ে যজ্ঞ উৎসর্গ করে ঈশ্বরের কাছে উৎসর্গ করা হয়না," বলছিলেন মিঃ রিবেরু।
ইহুদি ধর্মের যোগসূত্র বাদ দিয়ে শুধু খ্রিষ্ট ধর্ম বিবেচনায় নিলে সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্যে পশু উৎসর্গের রীতি কখনও ছিলই না বলে জানান মিঃ রিবেরু।
তবে মাংস খাওয়ার বিষয়ে বিধিনিষেধ নেই। অনেক দেশে উৎসবের অংশ হিসেবে পাসওভারে মেষের মাংস খাওয়ার রীতিও রয়েছে। যেমন মিঃ রিবেরুর ইতালি থাকার অভিজ্ঞতায় ইস্টারের আগে পাসওভার মেষের মাংস খাওয়াটা অনেকটা বাধ্যতামূলক মনে হয়েছে।
তবে ধর্মীয় উদ্দেশ্যে কোরবান বা পশু বলিদানের রীতি খ্রিষ্টধর্মে নেই।
![]() |
| পশু উৎসর্গের রীতি প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন সমাজে ছিল। |
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
-
▼
2026
(1918)
-
▼
September
(125)
-
▼
Sep 12
(7)
- শাকিব খানের সঙ্গে কাজের সুযোগটা হারাতে চাইনি...
- ইরাক থেকে আসা ড্রোনের হামলায় সৌদির তেল পাইপলাইন বন্ধ
- সৌদি সমর্থিত শত শত যোদ্ধাকে হত্যা ও আটকের দাবি হুত...
- ২৪ মিনিট ৩০ সেকেন্ড ধরে দাঁড়িয়ে করতালি! ভেনিসে রেক...
- ফিলিস্তিনিদের ব্যাপকভাবে হত্যায় কোন গোপন পদ্ধতি ব...
- হুতিদের অগ্রগতিতে সংকট বাড়বে সৌদির
- শক্তি, হজম ও ওজন নিয়ন্ত্রণে কলা খাওয়ার সঠিক সময়
-
▼
Sep 12
(7)
-
▼
September
(125)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...






