Tuesday, August 25, 2026
শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে আবারো উত্তাল ভারত
মঙ্গলবার বিপুলসংখ্যক বিহার পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (বিপিএসসি) চাকরিপ্রার্থীসহ অন্যান্য শিক্ষার্থী পাটনার গান্ধী ময়দান থেকে পূর্বঘোষিত মিছিল শুরু করেন। পরে তারা ডাক বাংলো মোড়ে পৌঁছালে পুলিশ কয়েকজনকে আটক করে। এ সময় পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ধাক্কাধাক্কি হয় এবং একপর্যায়ে তারা ব্যারিকেড ভেঙে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
পুলিশ জলকামান ছুড়লে আন্দোলনকারীদের অনেকে ভিজে স্লোগান দিতে থাকেন। পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হলে কয়েকজন শিক্ষার্থী পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর ছোড়েন বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের অনেকের হাতেই ছিল জাতীয় পতাকা।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পাটনার গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ডাক বাংলো মোড়ে অতিরিক্ত বাহিনীর পাশাপাশি কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স (সিআরপিএফ) ও র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সের (আরএএফ) সদস্যদেরও মোতায়েন করা হয়।
যেসব দাবিতে আন্দোলন
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা কয়েক সপ্তাহ ধরে পাটনার গার্দানিবাগ এলাকায় অবস্থান ও বিক্ষোভ করছেন। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা এক ধাপে নেওয়া, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, বিহার স্টাফ সিলেকশন কমিশনের (বিএসএসসি) নিয়োগ পরীক্ষা আয়োজন এবং হিন্দি মাধ্যমের প্রার্থীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা।
এ ছাড়া ৭০তম বিপিএসসি পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে পরীক্ষাটি বাতিলের দাবিও জানিয়েছেন তারা।
পুলিশের আইনশৃঙ্খলা বিভাগের সাব-ডিভিশনাল পুলিশ অফিসার কামাখ্যা নারায়ণ সিং বলেন, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং আলোচনার ফল ইতিবাচক। তার দাবি, শিক্ষার্থীদের বেশ কিছু দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে। এরপরও যারা মিছিল নিয়ে এগিয়ে আসবেন, তাদের থামানো হবে এবং সামনে যেতে দেওয়া হবে না।
সরকারের সঙ্গে সংলাপের দাবি
বিক্ষোভস্থলে কংগ্রেস নেতা সুশীল কুমার বলেন, শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় এক ধাপের ব্যবস্থা এবং নেগেটিভ মার্কিং বাতিলসহ বিপিএসসি, বিএসএসসি ও সাব-ইন্সপেক্টর নিয়োগসংক্রান্ত বিভিন্ন দাবি জানিয়ে আসছেন।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা কয়েক দিন ধরে অনশন করলেও সরকার তাদের সঙ্গে কার্যকর সংলাপে বসেনি। মুখ্যমন্ত্রীকে আন্দোলনকারীদের একটি প্রতিনিধিদলকে আলোচনায় আমন্ত্রণ জানানোর আহ্বান জানান তিনি।
এদিকে চলমান বিপিএসসি পরীক্ষাবিরোধী আন্দোলন নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরীকে চিঠি দিয়েছেন বিহারের বিরোধীদলীয় নেতা তেজস্বী যাদব। তিনি আন্দোলনকারীদের দাবি উপেক্ষা না করে তাদের সঙ্গে গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন।
তেজস্বী যাদবের দল রাষ্ট্রীয় জনতা দল (আরজেডি) আন্দোলনকে সমর্থন করেছে। এছাড়া রেভল্যুশনারি ইয়ুথ অ্যাসোসিয়েশন, এসএসএআই ও ছাত্র যুব সংগ্রাম মোর্চাসহ ১৪টি ছাত্র ও যুব সংগঠনও বিক্ষোভে সমর্থন জানিয়েছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ জানাতে ‘বিদ্যার্থী সহযোগ শিবির’
বিক্ষোভের মধ্যে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ হিসেবে মাসিক ‘বিদ্যার্থী সহযোগ শিবির’ চালুর ঘোষণা দিয়েছে বিহার সরকার। মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, প্রতি মাসের চতুর্থ মঙ্গলবার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এসব শিবির আয়োজন করা হবে। সেখানে শিক্ষার্থীরা সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে সরাসরি নিজেদের অভিযোগ ও সমস্যার কথা জানাতে পারবেন।
এ ছাড়া অনলাইনে অভিযোগ নিবন্ধন এবং তার অগ্রগতি অনুসরণের সুবিধাও থাকবে। এ জন্য একটি অনলাইন পোর্টাল ও ১১০০ হেল্পলাইন চালুর কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের মন্তব্য ঘিরেও ক্ষোভ
এর আগে বিপিএসসি পরীক্ষায় অনিয়ম ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে পরীক্ষার নিয়ন্ত্রক রাজেশ কুমার বিতর্কিত মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘হাতি চলে বাজার, কুকুর ভোকে হাজার’—এই মন্তব্যকে আন্দোলনকারীদের প্রতি অবমাননাকর হিসেবে দেখছেন বিরোধীরা।
তেজস্বী যাদব ওই কর্মকর্তাকে অবিলম্বে অপসারণ এবং প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তার অভিযোগ, পরীক্ষায় বারবার অনিয়ম ও বাতিলের ঘটনা ঘটলেও দায় নির্ধারণ বা জবাবদিহি নিশ্চিত করা হচ্ছে না।
শিক্ষার্থীদের দাবি ও সরকারের অবস্থান নিয়ে অচলাবস্থা কাটাতে দ্রুত সংলাপ না হলে পাটনায় আন্দোলন আরও জোরালো হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সূত্র: এনডিটিভি

About: Kutubi Cox
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
হিজাব পরা ইসলামে অপরিহার্য আচার নয়: ভারতের হাইকোর্ট
প্রয়াগরাজের আটারসুইয়ার ‘টাগোর পাবলিক স্কুল’-এর একাদশ শ্রেণির নাবালিকা ছাত্রী সুকাইনা রিজভীর দায়ের করা রিট আবেদনের শুনানিতে বিচারপতি জে জে মুনীর এবং বিচারপতি ইন্দ্রজিৎ শুক্লার সমন্বয়ে গঠিত দ্বৈত বেঞ্চ এ রায় দেন।
আবেদনকারী সুকাইনা রিজভী আদালতকে জানান, তিনি শৈশব থেকেই হিজাব পরেন। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ওই স্কুলে পড়ার সময়ও তিনি ইউনিফর্মের সঙ্গে হিজাব পরার অনুমতি পেয়েছিলেন। একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির সময়ও হিজাব পরার অধিকার বজায় রাখার দাবি জানান তিনি।
সুকাইনা রিজভীর দাবি ছিল, তাকে হিজাব পরতে না দেওয়া সংবিধানের ১৪ নম্বর ধারা এবং ১৯(১)(এ) নম্বর ধারার লঙ্ঘন। তবে হাইকোর্ট স্পষ্ট করে বলেছেন, শুধু মৌখিক দাবি বা বক্তব্যের ভিত্তিতে সংবিধানের ২৫ নম্বর ধারার অধীন সুরক্ষা দাবি করা যায় না।
আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, সংবিধানের ২৫ নম্বর ধারার ওপর নির্ভর করে করা কোনো দাবি পর্যাপ্ত তথ্য ও আইনি ভিত্তি ছাড়া কেবল মৌখিক সমর্থনের ভিত্তিতে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।
দ্বৈত বেঞ্চ তাদের রায়ে বিদ্যালয়ের ড্রেস কোড এবং নিরপেক্ষ পরিবেশ বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেন। হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণে বলেন, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ড্রেস কোড যদি নিরপেক্ষ, সর্বজনীন ও বৈষম্যহীন হয়, তাহলে শৃঙ্খলা এবং প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পরিচয় বজায় রাখতে সেটি কার্যকর করার পূর্ণ অধিকার কর্তৃপক্ষের রয়েছে।
আদালত আরও বলেন, ইউনিফর্ম শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমতা এবং ধর্মীয় দিক থেকে নিরপেক্ষ পরিবেশ বজায় রাখতে সহায়তা করে। অতীতে স্কুল কর্তৃপক্ষ আপত্তি জানায়নি বলেই ভবিষ্যতেও ছাড় দিতে হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা তৈরি হতে পারে না।
স্কুল কর্তৃপক্ষ আদালতে যুক্তি দেয়, একজন শিক্ষার্থীকে ড্রেস কোডে ছাড় দেওয়া হলে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হবে। তাছাড়া ওই স্কুলের অন্যান্য মুসলিম ছাত্রীরাও নির্ধারিত ড্রেস কোড মেনে চলছেন।
রায়ে কর্নাটক হাইকোর্টের ২০২২ সালের একটি রায়েরও উল্লেখ করেন এলাহাবাদ হাইকোর্টের বেঞ্চ। ওই রায়ে হিজাবকে ইসলামের অপরিহার্য অঙ্গ নয় বলে গণ্য করা হয়েছিল উল্লেখ করে বেঞ্চ বলেন, বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে।
এভাবেই প্রয়াগরাজের টাগোর পাবলিক স্কুলে ইউনিফর্মের সঙ্গে হিজাব পরার অনুমতি চেয়ে করা মুসলিম ছাত্রীর রিট আবেদন খারিজ করে দেন এলাহাবাদ হাইকোর্ট।
![]() |
| প্রতীকী ছবি: সংগৃহীত |
About: Kutubi Cox
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
যে ৩টি কৌশল ব্যর্থ হওয়ায় ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হার by ব্র্যাট ডেভরোক্স
ভবিষ্যতের সংঘাতগুলোর প্রস্তুতিতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এগুলো হয়তো দরকারি শিক্ষা হতে পারে। কিন্তু হরমুজ প্রণালিতে দেশের চরম ব্যর্থতার মূল কারণ এগুলো নয়। সংঘাতের অনেক আগেই যদি এই বিষয়গুলো সমাধান করা যেত, তাহলেও ট্রাম্প প্রশাসন তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য—অর্থাৎ শাসনব্যবস্থার পতন, ইরানের দূরপাল্লার আঘাত হানার ক্ষমতা ধ্বংস করা বা পারমাণবিক অস্ত্র ও আঞ্চলিক প্রক্সিগুলোর বিষয়ে তাদের নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা—অর্জন করতে পারত কি না, তা বলা কঠিন।
অস্ত্রের মজুত বাড়ানো কিংবা তেলসংকটের প্রস্তুতি হয়তো দীর্ঘমেয়াদি বোমাবর্ষণ অভিযান বা অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির সুযোগ দিত। কিন্তু গত ছয় মাসে যা অর্জিত হয়নি, তা যে আরও সাত মাসের বোমাবর্ষণ বা অবরোধে অর্জিত হতো—এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। কৌশলগত ব্যর্থতার ফলে ইরানের পারমাণবিক আকাঙ্ক্ষা পূরণে আরও উন্মুক্ত সুযোগ পাওয়া, হরমুজ প্রণালিতে আগের চেয়ে অনেক বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা এবং এর ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর প্রভাব বৃদ্ধির সম্ভাবনাই এখন সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এখনো অত্যন্ত সক্ষম। এমনকি এই ভুলভাবে পরিকল্পিত যুদ্ধেও তারা এমন প্রযুক্তিগত সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে, যা বিশ্বের অন্য কোনো সামরিক বাহিনীর নেই। তারা নিজস্ব উপকূল থেকে সাত হাজার মাইলের বেশি দূরে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করেছে এবং ইরানের আকাশসীমার ওপর একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে।
এর ফলে ক্ষয়ক্ষতির চিত্রটি অত্যন্ত একপেশে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে অন্তত ১৮ জন নিহত এবং ৬০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন, যেখানে ইরানের পক্ষে মৃতের সংখ্যা নিশ্চিতভাবেই হাজার ছাড়িয়ে গেছে (যদিও সুনির্দিষ্ট তথ্য জানা নেই)। সংক্ষেপে বলতে গেলে, পরিকল্পনা ও সরবরাহের ব্যর্থতা সত্ত্বেও মার্কিন সামরিক বাহিনী দেখিয়েছে যে তারা এখনো অত্যন্ত বিপজ্জনক।
তবে কোনো প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বই সেই কৌশলগত অক্ষমতার ক্ষতিপূরণ করতে পারে না, যা সামরিক বাহিনীর কাছে অসম্ভব কিছু দাবি করে বসে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামরিক বাহিনীর কাছে একটা নয়, তিন-তিনটি অসম্ভব কাজ চেয়েছেন এবং সেগুলো করতে ব্যর্থ হলে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
প্রথম অসম্ভব কাজ ছিল—কোনো ধরনের পদাতিক বা স্থল অভিযান ছাড়াই বোমাবর্ষণ করে শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো। কেবল বিমানশক্তি দিয়ে কৌশলগত বিজয় অর্জনের স্বপ্ন স্বাধীন বিমানবাহিনীগুলো ১৯২১ সাল থেকেই দেখে আসছে, যখন ইতালীয় তাত্ত্বিক জিউলিও দুহেত ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে কেবল বোমারু বিমান দিয়েই ভবিষ্যৎ যুদ্ধে জয় পাওয়া সম্ভব। তিনি ১৯২৮ সালে এমনকি এটাও দাবি করেছিলেন যে একটি মাঝারি আকারের দেশে মাত্র ৩০০ টন বোমা ফেললেই এক মাসের মধ্যে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটবে।
কেবল আকাশপথেই যুদ্ধ জেতা যায়—এই তত্ত্ব আধুনিক শিল্পযুদ্ধের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি পরীক্ষিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে লন্ডনের ওপর জার্মানির ফেলা ৪০ হাজার টন বোমা কেবল ব্রিটিশদের প্রতিরোধ গড়ে তোলার মানসিকতাকে আরও শক্ত করেছিল। জবাবে অক্ষশক্তির ওপর মিত্রবাহিনীর ফেলা ২৫ লাখ টন বোমা অ্যাডলফ হিটলারের রাজত্বকে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত করলেও তা কিন্তু তাদের পতন ঘটাতে পারেনি; বরং যুদ্ধের প্রতি সাধারণ জনগণের সমর্থনকে আরও চাঙা করেছিল।
ভিয়েতনাম যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ফেলা ৮০ লাখ টন বোমায় কাজের কাজ কিছুই হয়নি; বরং তা সেখানে কমিউনিস্টদের প্রতি সাধারণ মানুষের সমর্থন বাড়াতে সাহায্য করেছিল।
পারমাণবিক হামলা ছাড়া কেবল বিমান থেকে বোমাবর্ষণ করে কোনো শাসনব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলা হয়তো অসম্ভব। এর কাছাকাছি যা গিয়েছিল, তা হলো স্লোবোদান মিলোসেভিচের অধীনে সার্বিয়ার ওপর ন্যাটোর বিমান হামলা। কিন্তু ১৯৯৯ সালের জুনেই সেখানে বোমাবর্ষণ বন্ধ হয়েছিল, আর মিলোসেভিচ সরকারের পতন ঘটেছিল ২০০০ সালের অক্টোবরে গণবিক্ষোভের মুখে।
কেবল বিমান হামলার মাধ্যমে ইরানি সরকারের পতন ঘটানোর সম্ভাবনা ছিল শূন্যের কোঠায়। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর কাছে পরবর্তী অসম্ভব দাবি ছিল ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা অকার্যকর করা—সেটিও কেবল আকাশপথ থেকে। কিন্তু সামান্য পদাতিক বাহিনী ব্যবহার করে মোবাইল লঞ্চার অকার্যকর করার এই চেষ্টাও অতীতে বারবার করা হয়েছে এবং প্রতিবারই ব্যর্থ হয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও আমেরিকান ও ব্রিটিশ বিমানবাহিনী একটি বিস্তৃত বোমাবর্ষণ অভিযান চালিয়ে জার্মানির ভি-১ ও ভি-২ রকেটের উৎপাদন ও উৎক্ষেপণকেন্দ্রগুলো ধ্বংস করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তারা উৎক্ষেপণ বন্ধ করতে পারেনি। এগুলো লুকিয়ে রাখা বা শক্ত আবরণে ঢেকে রাখা খুবই সহজ ছিল।
নিখুঁত লক্ষ্যভেদী অস্ত্রের বিকাশ এই হিসাবকে পাল্টে দিতে পারেনি। কারণ, এর বিপরীতে চলে এসেছে মোবাইল লঞ্চব্যবস্থা। প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় আকাশ থেকে ইরাকি স্কাড ক্ষেপণাস্ত্রের লঞ্চার ধ্বংস করার চেষ্টা একটিও নিশ্চিত ধ্বংসের প্রমাণ দিতে পারেনি।
একইভাবে ইসরায়েলও গাজা ও দক্ষিণ লেবানন থেকে হামাস ও হিজবুল্লাহর রকেট হামলা ঠেকাতে দুই দশক ধরে ব্যাপক বিমান অভিযান চালিয়েছে, কিন্তু কেবল স্থল অভিযান চালিয়েই সেই রকেটগুলোকে নীরব করা সম্ভব হয়েছিল।
ইয়েমেন থেকে হুতিদের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন বন্ধ করতে একাধিক দেশের জোট চেষ্টা করেছে, অথচ এখনো সেই আক্রমণ অব্যাহত রয়েছে। সুতরাং নিখুঁত লক্ষ্যভেদী অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও কেবল আকাশ থেকে মোবাইল উৎক্ষেপণব্যবস্থাগুলোকে ধ্বংস করা সম্ভব নয়, যা সহজে আড়াল থেকে নিক্ষেপ করে দ্রুত নতুন জায়গায় সরে যেতে পারে। শাসনব্যবস্থার পতনের মতোই, রকেট হামলা পুরোপুরি বন্ধ করতেও স্থলবাহিনীর প্রয়োজন হয়।
ট্রাম্প প্রশাসনের শেষ ভরসা ছিল পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে এক নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা চালু রাখা, যাতে জিসিসিভুক্ত (গালফ কো–অপারেশন কাউন্সিল) দেশগুলোর অবকাঠামো ইরান ধ্বংস করতে না পারে। কারণ, এই দেশগুলোর আতিথেয়তার ওপরই মার্কিন সামরিক অভিযান নির্ভর করছিল। আক্রমণ রোখার সস্তা উপায়ে বেশি বিনিয়োগ এবং স্বল্পপাল্লার বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েন করলে হয়তো মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানি আক্রমণের বড় একটি অংশ প্রতিহত করতে পারত।
কিন্তু যেখানে ড্রোন এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা সেগুলোকে ঠেকানোর ব্যবস্থার চেয়ে অনেক বেশি সস্তা এবং দ্রুতগতির, সেখানে ইরান শেষ পর্যন্ত আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে ভাসিয়ে দেবে—এটাই ছিল স্বাভাবিক। দুটি ব্যর্থতার পর তৃতীয় আরেকটি অসম্ভব কাজ মার্কিনদের রক্ষা করতে পারল না।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর যদি ড্রোন এবং রণতরি, মাইন অপসারণকারী জাহাজ ও সুরক্ষিত বিমানঘাঁটি–সম্পর্কিত কেনাকাটার দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো নিয়ে চোখ খোলার প্রয়োজন থেকে থাকে, তবে সেই শিক্ষা তারা পেয়ে গেছে। কিন্তু এই যুদ্ধ পেন্টাগনের ভেতরে হারেনি; এটি হেরেছে হোয়াইট হাউসের অলিন্দে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর কাছে অসম্ভব কিছু দাবি করার ঝুঁকি যদি ট্রাম্পের মাথায় না ঢোকে, তবে তা মনে করিয়ে দেওয়া ছিল তাঁর প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব। অবশ্য ট্রাম্প কোনো অভিজ্ঞ ও যোগ্য প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে বেছে নেননি; বরং পিট হেগসেথের মতো একজন অনুগত তোষামোদকারীকে বসিয়েছেন, যাঁর চরম অক্ষমতা তাঁকে কেবল আরও বেশি অনুগত করে তুলেছে।
হেগসেথ পেন্টাগনের শীর্ষ পদে থাকা এমন যেকোনো অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের ছেঁটে ফেলার জন্য বহুদূর হেঁটেছেন, যিনি অন্য কোনো মতামত দিতে পারেন। মার্কিন অফিসার কোর কখনোই রাজনীতিবিদের কাছে অপ্রিয় খবর পৌঁছে দেওয়ার কাজে খুব একটা পারদর্শী ছিল না, কিন্তু হেগসেথের এই কৌশলের কারণে প্রেসিডেন্টকে থামানোর মতো কেউ পেন্টাগনে অবশিষ্ট ছিল না।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা যায়, জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন কাঠখড় পুড়িয়ে কোনোমতে সমস্যার সংকেত দেওয়ার চেষ্টা করলেও হেগসেথের অন্ধ সমর্থনের মুখে তা ধামাচাপা পড়ে যায়।
এর সবই পূর্বানুমানযোগ্য ছিল এবং বস্তুত এর অনেকটাই আগেভাগে বলা হয়েছিল। ফলে ইরানে এই বিপর্যয়ের তাৎক্ষণিক দায় ট্রাম্প এবং তাঁর অপদার্থ উপদেষ্টাদের ওপর বর্তালেও, চূড়ান্ত দায় এমন এক জায়গায় গিয়ে ঠেকে, যা কোনো রাজনীতিবিদ স্বীকার করবেন না—আর তা হলো দেশটির ভোটাররা।
ট্রাম্পকে হোয়াইট হাউসে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত ছিল মার্কিন সাধারণ ভোটারদের। একজন ব্যক্তি, যিনি স্পষ্টতই অক্ষম, যিনি অপ্রিয় বা ভিন্ন কোনো তথ্য গ্রহণে চরমভাবে অক্ষম এবং যিনি নিজেকে তোষামোদকারীদের দিয়ে ঘিরে রাখতে পছন্দ করেন।
বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর নেতা নির্বাচন করা আর কোনো রিয়্যালিটি শোর বিনোদনমূলক উপস্থাপক নির্বাচন করা যে এক কথা নয়, সেটাই এখন প্রমাণিত। পেন্টাগনের ভেতরে হয়তো ভুলগুলো নিয়ে প্রতিবেদন লেখা শুরু হয়ে গেছে।
কিন্তু তেলের মূল্যবৃদ্ধি থেকে শুরু করে মার্কিন সম্পদের ক্ষয়—এই ব্যর্থতার কৌশলগত পরিণতিগুলো যখন আরও ঘনীভূত হতে থাকবে, তখন দেখার বিষয় একটাই: আমেরিকান ভোটাররা আদৌ বুঝতে পেরেছেন কি না যে ব্যালট বাক্সে করা ভুল পছন্দ থেকে কেবল সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব কখনোই তাদের সুরক্ষা দিতে পারে না।
* ব্র্যাট ডেভরোক্স, একজন সামরিক ইতিহাসবিদ, রোমান অর্থনীতি ও সামরিক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। ফরেন পলিসি থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।
![]() |
| যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির ছবিসংবলিত একটি ব্যানার। তেহরান, ইরান। ২ জুলাই ২০২৬ ছবি: রয়টার্স |
About: Kutubi Cox
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
পথ হারিয়ে ফেলা সেই ইয়ামিই এখন...
টেলিভিশন থেকে বড় পর্দা
টেলিভিশনে কাজের মাধ্যমে অভিনয়জীবন শুরু হলেও ইয়ামির স্বপ্ন ছিল বড় পর্দা। ধারাবাহিক ও বিজ্ঞাপনচিত্রের পরিচিত পরিসর পেরিয়ে তিনি যখন সিনেমার দিকে এগোলেন, শুরুটা কিন্তু হিন্দি ছবি দিয়ে নয়। তাঁর প্রথম বড় পর্দার অভিজ্ঞতা কন্নড় ছবিতে। ভাষা, সংস্কৃতি—সব মিলিয়ে সেই শুরুটা সহজ ছিল না। তবে লড়াইয়ের মধ্যেই তৈরি হচ্ছিল প্রস্তুতি।
২০১২ সালে সুজিত সরকারের ‘ভিকি ডোনার’ দিয়ে হিন্দি ছবিতে তাঁর আগমন। আয়ুষ্মান খুরানার বিপরীতে সেই ছবিতে ইয়ামিকে দেখা গেল সাবলীল, সংযত অথচ দৃঢ় এক নারীর ভূমিকায়। ছবির সাফল্য তাঁকে রাতারাতি পরিচিত করে দেয়; কিন্তু এখানেই শেষ নয়, বরং এখান থেকেই শুরু হয় আরেক রকম সংগ্রাম।
সাফল্যের পরেও বিভ্রান্তি
প্রথম বড় সাফল্যের পর ইয়ামি নিজেই স্বীকার করেছেন এক অদ্ভুত মানসিক অবস্থার ভেতর দিয়ে যাওয়ার কথা। তিনি বলেন, ‘মনে হয়েছিল নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি। বুঝতে পারছিলাম না, কোন পথে যাব।’ সফলতার পরপরই কাজের ঝাঁপটা, প্রত্যাশার চাপ—সব মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধায় ছিলেন তিনি। অভিনয় করবেন, নাকি সেই সফলতার সুযোগকে অন্যভাবে ব্যবহার করবেন—নিজের কাছেই প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছিলেন।
এই সময়টা তাঁর কাছে ছিল নিজের সঙ্গে নিজের বোঝাপড়ার। কেন তিনি নিজের শহর ছেড়ে মুম্বাই এসেছিলেন, অভিনয়ের উদ্দেশ্যই বা কী—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজছিলেন। সময় লেগেছে; কিন্তু সেই থেমে যাওয়ার মধ্যেই তৈরি হয়েছেন পরিণত ইয়ামি।
মঞ্চভীতি থেকে ক্যামেরার সামনে
হিমাচল প্রদেশের বিলাসপুরে জন্ম ইয়ামির। বেড়ে ওঠা চণ্ডীগড়ে, এক মধ্যবিত্ত পরিবারে। তিনি নিজেই বলেছেন, স্কুলে থাকার সময় মঞ্চে উঠতে ভয় পেতেন। কবিতা আবৃত্তি তো দূরের কথা, অনেক মানুষের সামনে দাঁড়ালেই ঘাবড়ে যেতেন। আত্মবিশ্বাসের অভাব ছিল স্পষ্ট। অথচ পড়াশোনায় ছিলেন ভালো।
সময়ের সঙ্গে সেই ভয় কাটতে শুরু করে। সিনেমা দেখার পর প্রিয় দৃশ্যগুলো তিনি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অভিনয় করতেন—নীরবে, একান্তে। সেখান থেকেই হয়তো ধীরে ধীরে তৈরি হয় ক্যামেরার সামনে আত্মবিশ্বাসী ইয়ামি গৌতম।
পরিণত অভিনয়ের দিকে যাত্রা
‘উরি: দ্য সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’, ‘বালা’, ‘থার্সডে’—এই ছবিগুলোর মাধ্যমে ইয়ামি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ভিন্ন ভিন্ন রূপে। দেশপ্রেমের আবেগ, সামাজিক বক্তব্য কিংবা মনস্তাত্ত্বিক উত্তেজনা—সব জায়গাতেই তিনি ভরসাযোগ্য। হিন্দির পাশাপাশি তামিল, তেলেগু, মালয়ালম, কন্নড় ও পাঞ্জাবি ভাষার ছবিতেও কাজ করেছেন। প্রায় ২৭টি সিনেমার ক্যারিয়ারে তিনি নিজেকে প্রমাণ করেছেন দক্ষ অভিনেত্রী হিসেবে।
প্রচারবিমুখ হওয়াটাও ইয়ামির ব্যক্তিত্বের অংশ। তিনি মনে করেন, মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষা তাঁকে মাটিতে পা রাখতে শিখিয়েছে। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকার চেয়ে কাজের মাধ্যমেই নিজেকে তুলে ধরতে চান তিনি।
আজকের ইয়ামি
২০২১ সালের জুনে হিমাচলের বাড়িতে ব্যক্তিগত আয়োজনে পরিচালক আদিত্য ধরকে বিয়ে করেন ইয়ামি। তাঁদের পরিচয় ও সম্পর্কের শুরু ‘উরি: দ্য সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’–এর সেটে। দুই বছরের প্রেমের পর সেই বন্ধন আরও দৃঢ় হয়েছে।
‘আর্টিকেল ৩৭০’–এ বন্দুক হাতে এনআইএ এজেন্টের চরিত্রে সবাইকে চমকে দিয়েছিলেন ইয়ামি। আর এবার সুপর্ণ ভার্মার ‘হক’ ছবিতে দেখা গেছে তাঁকে বাস্তব ইতিহাসের এক সাহসী নারীর ভূমিকায়। ১৯৮৫ সালের ঐতিহাসিক সাহো বানু বেগম মামলাকে অবলম্বন করে নির্মিত ছবিতে ইয়ামি অভিনয় করেছেন সাহো বানুর চরিত্রে, আর তাঁর বিপরীতে আহমেদ খান হিসেবে আছেন ইমরান হাশমি। ছবিটি নভেম্বরেই মুক্তি পেয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
টেলিভিশনের সেই লাজুক মুখ থেকে আজকের সাহসী, পরিণত অভিনেত্রী—ইয়ামি গৌতমের এই উত্তরণ সহজ ছিল না। মঞ্চভীতি, আত্মবিশ্বাসের সংকট, সাফল্যের পর বিভ্রান্তি—সব পেরিয়ে তিনি আজ স্থির, সংযত ও নিজের জায়গায় আত্মবিশ্বাসী।
হিন্দুস্তান টাইমস, টাইমস অব ইন্ডিয়া অবলম্বনে
![]() |
| ইয়ামি গৌতম। ইনস্টাগ্রাম থেকে |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
আমেরিকায় ‘ভালো’ মুসলিম নেই!
ফলে আজকের আমেরিকায় ‘ভালো’ মুসলিম হওয়ার অর্থ হচ্ছে ইসরাইলের বিষয়ে নীরব থাকা। কারণ ইসরাইলের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে কোনো মুসলমান ভিন্নমত পোষণ করলেই তার ওপর নেমে আসে অপবাদ, সন্দেহ ও একঘরে করে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি। আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় মুসলিম নাগরিক অধিকার সংগঠন কাউন্সিল অন আমেরিকান ইসলামিক রিলেশনসের তথ্য অনুযায়ী দেশটিতে ইসলাম ও আরব বিদ্বেষের কারণে বৈষম্য এবং হয়রানির অভিযোগ সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। রাজনৈতিক প্রচারণায় ইসলামবিরোধী বক্তব্য এবং ভুল তথ্যের প্রচারণার কারণে কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মুসলিমরা নানা ধরনের বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন প্রতিনিয়ত।
২০০৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরলোকগত রিপাবলিকান সিনেটর জন ম্যাককেইন ডেমোক্র্যাট দলের প্রার্থী বারাক ওবামার বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। সে সময় তাকে তার এমন কিছু সমর্থককে সামলাতে হয়েছিল, যারা ছিল নির্লজ্জ বর্ণবাদী ও কট্টর ইসলামবিদ্বেষী। ম্যাককেইনের নিজের মধ্যেও গোঁড়ামি ছিল এবং তার পররাষ্ট্রনীতি ছিল কট্টরপন্থি, যার জন্য তার কিছুটা বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও তার ভোটারদের একাংশের চরম ও ভারসাম্যহীন আচরণ তাকে হতবাক করেছিল।
ম্যাককেইনের নির্বাচনি প্রচারণার এক সভায় শ্রোতাদের মধ্য থেকে এক নারী গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘আমি ওবামাকে বিশ্বাস করতে পারছি না। আমি তার সম্পর্কে পড়েছি এবং তিনি আসলে... তিনি একজন আরব।’ কথাটি বলার সময় তার কণ্ঠস্বর ধরে আসে। একজন ‘আরব’ ব্যক্তি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হতে পারেন এই চিন্তাই তাকে প্রায় কান্নার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল। তখন ম্যাককেইন ওই নারীকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, ম্যাডাম, ওবামা একজন ভালো পারিবারিক মানুষ ও আমেরিকার নাগরিক। রাষ্ট্রীয় মৌলিক কিছু বিষয়ে তার সঙ্গে আমার মতপার্থক্য রয়েছে এবং এই নির্বাচনি প্রচারণার মূল বিষয়বস্তু সেটাই।’
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনি প্রচারণায় মূলত সেসব বিষয়ই প্রাধান্য পায়, যা নিয়ে সেই নারী ২০০৮ সালেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, মিশিগানে সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী আব্দুল আল-সায়েদকে আক্রমণ করার জন্য রিপাবলিকান সিনেটররা শুধু তার নামের ওপরই বেশি জোর দিয়ে বলেছিলেন, ‘মিশিগানের সমাজতন্ত্রী অবশেষে নিজের পুরো নাম প্রকাশ করলেন। তার নাম আবদুল রহমান মোহাম্মদ আল-সায়েদ।’ যদি একজন ‘আরব’ ব্যক্তির প্রেসিডেন্ট হওয়া উদ্বেগের বিষয় হয়, তবে একজন ‘মোহাম্মদ’-এর প্রেসিডেন্ট হওয়া নিশ্চয়ই আরো ভয়াবহ কিছু হবে উগ্রপন্থি আমেরিকানদের কাছে।
নির্বাচনি প্রচারণাসহ সর্বক্ষেত্রেই আল-সায়েদের ওপর বিরোধীদের আক্রমণ এতটাই তীব্র ছিল যে, প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিরাও তাকে ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিতে দ্বিধা করেননি। এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচনে তার রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী মাইক রজার্স গর্ব করে বলেছিলেন, তিনি তার সারা জীবন ‘সন্ত্রাসীদের শিকার’ করেই কাটিয়েছেন। একই মনোভাব নিয়ে রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান ন্যান্সি মেস আল-সায়েদ ও নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানির দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘আমরা কি আমেরিকায় সরকারি পদে ‘সন্ত্রাসীদের’ নির্বাচিত করা বন্ধ করতে পারি না?’ এরপর তিনি বলেন, ‘আমেরিকায় সরকারি পদে আসীন প্রতিটি মুসলিমই হলো এক একটি ‘ট্রোজান হর্স’ (ছদ্মবেশী শত্রু) এবং তারা জাতীয় নিরাপত্তা ও আমাদের প্রজাতন্ত্র উভয়ের জন্যই হুমকি।’
আজকের দিনে আমেরিকাসহ পশ্চিমা বিশ্বে ইসলামকে তীব্রভাবে ঘৃণা না করলে কেউ আধুনিক ও প্রগতিশীল হতে পারে না। সিআইএর সাবেক পরিচালক মাইক পম্পেও এর মতো একজন ব্যক্তি যখন খুব অনায়াসেই আল-সায়েদকে ‘হামাস সমর্থক’ বলে অভিহিত করেন, তখন বোঝা যায় যে, মুসলিমবিদ্বেষের পরিধি অনেক বিস্তৃত। এই বিদ্বেষ থেকে বাঁচতে হলে আমেরিকান মুসলিমদের বেশ কিছু শর্ত মেনে চলতে হবে। এর মধ্যে একটি হলো ইসরাইলের প্রতি আনুগত্য, যে শর্তটি পূরণ করতে আল-সায়েদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হ্যালি স্টিভেনসের কোনো বেগ পেতে হয়নি। তিনি আগেই জানিয়েছিলেন, তিনি স্বপ্নেও ইসরাইল নিয়ে ভাবেন। এর বিপরীতে, গাজায় ইসরাইলের গণহত্যার কঠোর সমালোচনা করে এসেছেন আল-সায়েদ। ফলে তিনি যে উগ্রপন্থি ও ইসরাইল সমর্থক আমেরিকানদের শত্রু হবেন তা বলাই বাহুল্য।
আমেরিকান রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ‘ভালো মুসলিম’ হওয়ার সংজ্ঞা ক্রমেই সংকীর্ণ হয়ে আসছে। এ ক্ষেত্রে শুধু ‘চরমপন্থা’ থেকে নিজেকে দূরে রাখলেই চলে না, বরং ইসরাইলের বিরোধিতা করা থেকেও বিরত থাকতে হয়। আমেরিকায় ভালো মুসলমান হওয়ার জন্য ইসরাইলের প্রতি আনুগত্যের এই যোগসূত্রটি মোটেও গোপন বিষয় নয়। দেশটির কট্টর নব্য-রক্ষণশীল (নিও-কনজারভেটিভ) চিন্তাবিদ রবার্ট কাগান সম্প্রতি বিষয়টি স্বীকার করেছেন, ‘আমেরিকা সামগ্রিকভাবে ইসলামবিদ্বেষী, তাই অনেক আমেরিকানের কাছে ইসলামের যেকোনো শত্রুই আমাদের বন্ধু। আমি মনে করি যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামবিদ্বেষ একটি বাস্তবতা এবং ইসরাইলকে ইসলামের বিরুদ্ধে এক ধরনের ‘রক্ষাকবচ’ হিসেবে দেখা হয়।’ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই যুক্তি শুধু মুসলিমদের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং ইসরাইলের সমালোচনা করলে একজন ইহুদিও ‘খারাপ ইহুদি’ হিসেবে চিহ্নিত হতে পারেন।
ইসরাইলের পক্ষে সোচ্চার প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অন্যতম অ্যালান ডারশোভিটজ সম্প্রতি সেসব ‘বাজে ইহুদি’র সমালোচনা করেছেন যারা আল-সায়েদ ও মামদানির মতো প্রার্থীদের সমর্থন করার সাহস দেখান। তিনি ঘোষণা করেন, ‘আসল সমস্যাটা হলো ইহুদিরাই’ এবং ‘তারা আসলে কী করছে, সে বিষয়ে তাদের কোনো ধারণাই নেই।’
ডারশোভিটজের মতে, ‘যেকোনো ইহুদি যদি মামদানিকে ভোট দেন তবে তিনি আসলে নিজেকেই ঘৃণা করেন।’ তার এই অবস্থানের সঙ্গে সুর মিলিয়েছেন ইসরাইলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবিও। একজন অ-ইহুদি হওয়া সত্ত্বেও তিনি ওইসব ‘বাজে ইহুদি’র চেয়ে নিজেকে ‘অনেক বেশি কার্যকর ইহুদি নেতা’ হিসেবে দাবি করেন।’
এই প্রবণতাটি শুধু আমেরিকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বেহালাবাদক মাইকেল বারেনবোইম তার পর্যবেক্ষণ বলেছেন, ‘জার্মানিতে যেসব ইহুদি জায়নবাদকে প্রত্যাখ্যান করেন তাদের আর প্রকৃত ইহুদি হিসেবে গণ্য করা হয় না।’ অন্যদিকে ব্রিটিশ পত্রিকা ‘জুইশ ক্রনিকল’ একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছিল, যার শিরোনাম ছিল ‘এড মিলিব্যান্ড আসলে কতটা ইহুদি?’
পশ্চিমা বিশ্বজুড়ে এই বার্তাটি অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ যে, একজন ‘ভালো মুসলিম’ বা ‘ভালো ইহুদি’ হওয়ার জন্য শুধু ইসরাইলের প্রতি অবিচল আনুগত্যই যথেষ্ট নয়, বরং যারা ইসরাইলের গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করে সেসব মুসলিমের প্রতি বৈরী মনোভাব পোষণ করাও ইহুদিদের জন্য জরুরি। ফলে আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্বে ‘ভালো’ মুসলিম হওয়ার সংজ্ঞা হচ্ছে তাকে অবশ্যই ইসরাইলের বিরুদ্ধে কথা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে।
* ডেইলি সাবাহ অবলম্বনে মোতালেব জামালী

About: Kutubi Cox
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
খলিফা ওমর (রা.)-এর বাজার ব্যবস্থাপনা by নাসরুল্লাহ ইবনে ইলিয়াস
বাজারের ভেতরে জনতার ভিড় ঠেলে হেঁটে যাচ্ছেন এক দীর্ঘদেহের প্রবীণ ব্যক্তি; হাতে তার চামড়ার চাবুক। তিনি অন্য কেউ নন, মুসলিম জাহানের দ্বিতীয় খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)। হাঁটতে হাঁটতে তিনি তীক্ষ্ণ চোখে লক্ষ করছেন পণ্যের মান, পরখ করছেন মাপের পাত্র এবং আড়চোখে খেয়াল করছেন কোনো ব্যবসায়ী গোপনে ভেজাল দিচ্ছে বা অতিরিক্ত মুনাফার লোভে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে কি না।
এই দৃশ্য-ইতিহাস কল্পনা করলে পাঠকের মতে একটা মৌলিক প্রশ্ন জাগবে, বাজার কি শুধু ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যকার সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত লেনদেনের স্থান, নাকি সেখানে ন্যায়নিষ্ঠা, স্বচ্ছতা এবং সততা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রেরও এক অনিবার্য দায়িত্ব?
প্রথম খলিফা আবু বকর (রা.)-এর সংক্ষিপ্ত শাসনকালে রিদ্দা যুদ্ধ-পরবর্তী যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জিত হয়েছিল, ওমর (রা.)-এর ১০ বছরের খেলাফতকালে (১৩-২৩ হিজরি/৬৩৪-৬৪৪ খ্রিষ্টাব্দ) তা এক বিশাল আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যেও রূপ নেয়। আজকের আলোচনা সেই রূপান্তর নিয়ে।
বিশ্ব অর্থনীতির প্রধান কেন্দ্র
ওমর (রা.)-এর শাসনকালে খেলাফত রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমানা অভূতপূর্ব গতিতে সম্প্রসারিত হয়। রোম ও পারস্য সাম্রাজ্যের সমৃদ্ধ এলাকা—সিরিয়া, ইরাক, ইরান ও মিসর মুসলিম রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয়। এই ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে তৎকালীন আরবের প্রথাগত মরু-অর্থনীতি ও ক্ষুদ্র আঞ্চলিক বাজার ব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক রূপান্তর ঘটে।
সিরিয়ার কৃষিপণ্য, মিসরের খাদ্যশস্য এবং পারস্যের ধাতু ও পোশাকশিল্প এখন একক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ছাতার নিচে চলে আসে। এর ফলে খোলাফায়ে রাশেদিনের অধীনে একটি বৃহৎ ‘একীভূত অর্থনীতি’ (Unified Economy) গড়ে ওঠে, যেখানে বাণিজ্য শুল্কের জটিলতা কমে যায় এবং সীমান্তহীন বাণিজ্য যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়।
নববিজিত অঞ্চলগুলোতে সামরিক ও বেসামরিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নগর অর্থনীতির দ্রুত বিকাশ ঘটে। সামরিক কেন্দ্র ও সেনানিবাস হিসেবে গড়ে ওঠা বসরা এবং কুফা অল্প সময়ের মধ্যেই অর্থনীতি ও বাণিজ্যের মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়। ওমর (রা.) এই নতুন নগরগুলোতে বাজার পরিকল্পনার ক্ষেত্রে বিশেষ নকশা বাস্তবায়ন করেন। যেমন : কুফার বাজার পরিকল্পনা করার সময় তিনি নির্দেশ দেন যেন বাজারগুলো জামে মসজিদের কাছে এবং প্রশস্ত সড়কের পাশে উন্মুক্ত স্থানে গড়ে ওঠে, যাতে পণ্য পরিবহন ও তদারকি সহজ হয়।
একই সঙ্গে তিনি মুদ্রাব্যবস্থায় প্রশাসনিক শৃঙ্খলা আনেন। প্রচলিত সাসনি ও বাইজেন্টাইন মুদ্রা সচল রেখে তিনি দিরহামের ওজন সুনির্দিষ্ট করেন, যেখানে ১০টি দিরহামের ওজন ৭টি স্বর্ণ-দিনারের (মিছকাল) সমান নির্ধারণ করা হয়। পারস্যের দিরহামে ‘আলহামদুলিল্লাহ’, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর মতো আরবি বাক্য খোদাই করে খেলাফত রাষ্ট্রের আর্থিক মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই মুদ্রানীতি বাণিজ্যিক লেনদেনে স্থিতিশীলতা আনে এবং মধ্যপ্রাচ্যের দূরবর্তী বাজারগুলোকে একীভূত লেনদেন সূত্রে গ্রথিত করে।
শরিয়ত জেনে আসতে হবে
একটি অতিদ্রুত সম্প্রসারণশীল অর্থনীতিতে শুধু নৈতিক উপদেশ দিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। ওমর (রা.) গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন, ব্যবসায়ী যদি বাণিজ্য-সংক্রান্ত শরিয়তের বিধিবিধান না জানে, তবে অজ্ঞতাবশতই সে বিভিন্ন অন্যায্য ও হারাম লেনদেনে জড়িয়ে পড়বে।
মুসলিম আইন শাস্ত্রে ‘ইবাদত’-এর মতোই ‘মুয়ামালাত’ (অর্থনৈতিক লেনদেন) ঈমানের বাস্তব প্রয়োগক্ষেত্র। বাজারে ব্যবসা করা শুধু মুনাফা অর্জনের মাধ্যম নয়, বরং সামাজিক দায়িত্বও বটে। ওমর (রা.)-এর অর্থনৈতিক প্রশাসনে ব্যবসায়ীদের জন্য মোটাদাগে চার বিষয়ের জ্ঞান বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল—
রিবা (সুদ) ও তার সূক্ষ্ম রূপ : ‘রিবা আলফজল’ (সমজাতীয় পণ্য বিনিময়ে কমবেশি করা) এবং ‘রিবা আননাসিআহ’ (মেয়াদের কারণে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা) বাণিজ্যের এই জটিল নিয়মগুলো না জানলে সাধারণ ব্যবসায়ী সহজেই সুদের খপ্পরে পড়তে পারে।
গিশ ও তাদলিস (প্রতারণা ও ত্রুটি লুকানো) : ভালো পণ্যের নিচে নিম্নমানের পণ্য লুকিয়ে রাখা বা পণ্যের অভ্যন্তরীণ কোনো ত্রুটি গোপন করে বিক্রি করা শরিয়তে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
তাতফিফ (ওজনে কারচুপি) : মাপে বা ওজনে ক্রেতাকে ঠকানো, যা কোরআনে সরাসরি অভিশাপযোগ্য অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত।
মিথ্যা তথ্য ও কৃত্রিম অসততা : পণ্যের কৃত্রিম গুণগান গাওয়া, মিথ্যা কসম খেয়ে পণ্য বিক্রি করা বা বাজারে কৃত্রিমভাবে পণ্যের চাহিদা বাড়াতে ক্রেতা সেজে দাম হাঁকানো (নজশ)।
ওমর (রা.)-এর সুনির্দিষ্ট শাসননীতি ছিল—আইন না জেনে বাজারে নামলে ব্যবসায়ী অজান্তেই সুদে লিপ্ত হবে এবং ক্রেতার অধিকার হরণ করবে। ফলে প্রতিটি পেশাদার ব্যবসায়ীর জন্য নির্দিষ্ট ব্যবসার আইনকানুন জানা ‘ফরজে আইন’ (বাধ্যতামূলক আইনি দায়িত্ব) হিসেবে গণ্য হতো।
আধুনিক অনেক আলোচনায় এই ঘটনাটিকে একটি ‘আমলাতান্ত্রিক বাণিজ্যিক লাইসেন্সিং ব্যবস্থা’ হিসেবে চিত্রিত করার প্রবণতা দেখা যায়। বলা হয়, ওমর (রা.) নাকি বাজারে ঢোকার মুখে পরীক্ষা কেন্দ্র বসিয়েছিলেন এবং ফিকহ পরীক্ষায় পাস না করলে কাউকে ব্যবসা করতে দিতেন না। তবে প্রাথমিক ঐতিহাসিক গ্রন্থ অনুসন্ধান করলে এমন কোনো লিখিত সনদ প্রদান বা প্রশাসনিক প্রবেশ পরীক্ষার প্রমাণ পাওয়া যায় না।
তিনি ব্যবসায়ীদের জন্য ব্যবসার বিধিবিধান (ফিকহ) জানা বাধ্যতামূলক করেছিলেন, তবে তা বাস্তবায়ন হতো বাজারে সরেজমিনে তদারকি, শিক্ষা ও সংশোধনের মাধ্যমে। খলিফা নিজে এবং নিযুক্ত কর্মকর্তারা ভুল লেনদেন সংশোধন করতেন; আর বারবার প্রতারণা, সুদি বা অবৈধ লেনদেন করলে তাজিরস্বরূপ শাস্তি দিতেন এবং প্রয়োজনে বাজার থেকে বহিষ্কার করতেন। অর্থাৎ, এটি আধুনিক অর্থে কোনো লাইসেন্সিং ব্যবস্থা নয়; বরং জ্ঞানভিত্তিক বাজার তদারকি ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের একটি কার্যকর ব্যবস্থা ছিল।
বাজার মনিটরিং
পরবর্তীকালের সুসংগঠিত ‘মুহতাসিব’ (মার্কেট ইন্সপেক্টর) বা ‘হিসবাহ’ নামক যে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশাসনিক রূপ গড়ে উঠেছিল, তার প্রত্যক্ষ সূচনা ঘটেছিল ওমর (রা.)-এর খেলাফতকালে। ওমর (রা.) নিজে ছিলেন রাষ্ট্রের প্রধান নীতি-তদারককারী। তিনি নিয়মিত মদিনার বাজার পরিদর্শন করতেন। তবে রাষ্ট্রের আকার বৃদ্ধি পাওয়ায় তিনি বিশেষ ব্যক্তিবর্গকে বাজার তদারকির জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেন।
এই প্রক্রিয়ায় ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) নিজেই সমগ্র রাষ্ট্রের বাজার ব্যবস্থার সর্বোচ্চ তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন। তিনি নিয়মিত বাজার পরিদর্শন, ব্যবসায়িক নীতিনির্ধারণ এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন। পাশাপাশি মদিনার বাজার পরিচালনার জন্য তিনি আবদুল্লাহ ইবনে উতবা ও সায়িব ইবনে ইয়াজিদকে দায়িত্ব প্রদান করেন, যারা যৌথভাবে বাজারের শৃঙ্খলা ও লেনদেন তদারকি করতেন। শিফা বিনতে আবদুল্লাহও বাজার তদারকির দায়িত্ব পালন করতেন। তিনি ব্যবসায়িক নৈতিকতা নিশ্চিত করা, প্রতারণা প্রতিরোধ এবং বাজারে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ভূমিকা পালন করেন। অন্যদিকে, সামরা বিনতে নুহাইক মক্কার বাজারে নিয়মিত পরিদর্শন করে অনিয়ম প্রতিরোধ, ওজন-পরিমাপ পরীক্ষা এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের সতর্ক করার দায়িত্ব পালন করতেন।
মনিটরিংয়ের প্রধান পয়েন্টগুলো
তদারককারীদের মূল প্রশাসনিক নজরদারির বিষয় ছিল তিনটি—
ক. মাপ ও ওজন : বাজারের বাটখারা ও মাপের পাত্রগুলো নিয়মিত পরীক্ষা করা হতো, যাতে কোনো ব্যবসায়ী পরিমাপে কম দিতে না পারে।
খ. পণ্যের মান ও ভেজাল প্রতিরোধ : পচা, বাসি বা নিম্নমানের পণ্য ভালো পণ্যের সঙ্গে মিশিয়ে বিক্রি করা রোধ করা হতো।
গ. মজুতদারি প্রতিরোধ : বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানোর উদ্দেশ্যে খাদ্যদ্রব্য আটকে রাখা খলিফা ওমর কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেন। বিভিন্ন হাদিস গ্রন্থে বর্ণিত আছে, ওমর (রা.) স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমাদের বাজারে কোনো মজুতদারি চলবে না।’ যে ব্যক্তি দূর থেকে বাজারে খাদ্যশস্য আমদানি করত, তাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে উৎসাহিত করা হতো আর যে ব্যক্তি কৃত্রিম সংকটের জন্য মজুত করত, তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হতো।
সংকটকালে ওমরের নীতি
হিজরি ১৮ সালে আরবে যে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ (আমুর রামাদাহ) দেখা দেয়, তখন ওমর (রা.) বাজার নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তিনি ব্যবসায়ীদের ওপর জোরপূর্বক দাম চাপিয়ে না দিয়ে, মিসর ও ইরাক থেকে সরকারি তহবিলে শস্য আমদানি করে বাজারে সরবরাহ বৃদ্ধি করেন। ফলে পণ্যের আকাশচুম্বী দাম স্বতঃস্ফূর্তভাবেই কমে আসে। এটি ছিল সরকারি মূল্য নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে সরবরাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে বাজার স্থিতিশীল করার আধুনিক অর্থনৈতিক কৌশল।
ব্যবসায় উৎসাহ প্রদান
ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতাকে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের শক্তির অন্যতম ভিত্তি মনে করতেন। তাই তিনি মানুষকে শ্রম, পেশা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে বৈধ উপার্জনে উৎসাহিত করতেন। ব্যবসায় সফল হওয়ার জন্য তিনি মানুষকে অধ্যবসায়, দক্ষতা ও বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত গ্রহণের শিক্ষা দিতেন। তিনি বলতেন, কোনো ব্যক্তি যদি একটি ব্যবসায় বারবার চেষ্টা করেও সফল না হয়, তবে তার উচিত অন্য কোনো ব্যবসা করা। একই সঙ্গে তিনি প্রত্যেককে অন্তত একটি পেশা বা কারিগরি দক্ষতা অর্জনের পরামর্শ দিতেন এবং সতর্ক করতেন, একদিন এর প্রয়োজন হবেই। তার মতে, ব্যবসা ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান না থাকলে মানুষ অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ে। তাই তিনি বলতেন, মানুষের কাছে হাত পাতার চেয়ে পরিশ্রমের মাধ্যমে সামান্য উপার্জনও অধিক মর্যাদাপূর্ণ। দরিদ্রদের উদ্দেশে তার আহ্বান ছিল, ‘মাথা উঁচু করে ব্যবসা করো; মানুষের বোঝা হয়ে থেকো না।’
ওমর (রা.) শুধু ব্যক্তিগত জীবিকার জন্য নয়, বরং মুসলিম সমাজের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্বাধীনতার জন্যও ব্যবসাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। একদিন তিনি মদিনার বাজারে এসে লক্ষ করলেন, অধিকাংশ ব্যবসায়ী নাবাতি (বিদেশি) জনগোষ্ঠীর। এতে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। লোকরা যখন বলল যে, ইসলামি বিজয়ের ফলে প্রাপ্ত সম্পদ তাদের বাজারমুখী হওয়ার প্রয়োজন কমিয়ে দিয়েছে, তখন ওমর (রা.) দৃঢ়ভাবে সতর্ক করে বলেন, ‘আল্লাহর কসম! যদি তোমরা এমন করো, তবে একদিন তোমাদের পুরুষরা তাদের পুরুষদের এবং তোমাদের নারীরা তাদের নারীদের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়বে।’
এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, কোনো জাতি যদি উৎপাদন, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে সরে দাঁড়ায়, তবে একসময় তাকে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হতে হয়। ওমর (রা.)-এর দৃষ্টিতে ব্যবসা শুধু ব্যক্তিগত আয়ের মাধ্যম নয়; বরং মুসলিম সমাজের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, মর্যাদা ও রাষ্ট্রশক্তি সংরক্ষণের অন্যতম প্রধান ভিত্তি ছিল।
ইসলামি বাজার ও আধুনিক বাজার
ওমর (রা.)-এর বাজার ব্যবস্থাপনা ও আধুনিক বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মধ্যে উদ্দেশ্যগত মিল থাকলেও তাদের ভিত্তিগত দর্শনে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। আধুনিক বাজার তদারকি প্রধানত রাষ্ট্রপ্রণীত আইন, প্রশাসনিক বিধান ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। এছাড়া এর অসংখ্য ফাঁকফোকর নিয়ে আলোচনা তো আছেই; পক্ষান্তরে ওমর (রা.)-এর নীতি প্রতিষ্ঠিত ছিল ওহির নির্দেশনা, নৈতিক জবাবদিহি, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের সমন্বয়ে। খেলাফতের লক্ষ্য শুধু বাজার নিয়ন্ত্রণ ছিল না, বরং এমন একটি ব্যবসায়িক পরিবেশ গড়ে তোলা, যেখানে ব্যবসায়ী আল্লাহভীরু হবে, ভোক্তা নিরাপদ থাকবে এবং বাজার হবে ন্যায় ও আমানতের প্রতীক। তাই খেলাফতের এই তদারকি শুধু আইন প্রয়োগ নয়, ছিল চরিত্র গঠনও।
অকথ্য বাস্তবতা হলো, আধুনিক বিশ্বের প্রতিটি বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এখনো প্রতারণা, মজুতদারি, কৃত্রিম সংকট, ভেজাল ও একচেটিয়া বাণিজ্যের ওপর টিকে আছে। জনগণ এবং জনগণের স্বার্থে কাজ করা কিছু সমাজচিন্তকরা এর প্রতিকার খুঁজে চলেছেন এর-ওর কাছে। অথচ চৌদ্দ শতাব্দী আগে ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) যে নীতিমালা প্রয়োগ করেছিলেন, তা বাজারকে শুধু নিয়ন্ত্রিতই করেনি; বরং নৈতিকতা, জবাবদিহি ও জনকল্যাণের ভিত্তিতে একটি টেকসই অর্থনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিল। এ কারণেই তাঁর বাজারনীতি শুধু একটি ঐতিহাসিক প্রশাসনিক মডেল নয়; বরং ইসলামের অর্থনৈতিক প্রজ্ঞা, ন্যায়ভিত্তিক শাসন এবং মানবকল্যাণমুখী রাষ্ট্রচিন্তার এক উজ্জ্বল ও কালজয়ী দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
![]() |
| মসজিদে নববির কাছে অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘সুক সুয়াইকা’ বা ‘সুক আল-কামাশাহ’ |
About: Kutubi Cox
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
নবীজীবনচর্চায় নতুন আলো by ড. ইসাম তালিমা
মুসলিম সভ্যতার প্রতিটি যুগেই মহানবী (সা.)-এর জীবন নিয়ে গবেষণা ও রচনাকর্ম হয়েছে। কখনো তার সমগ্র জীবনকে ধারাবাহিক ও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে; কখনো বিভিন্ন বর্ণনার সত্যতা যাচাই, সনদ পরীক্ষা এবং ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে; আবার কখনো তার জীবনের কোনো বিশেষ ঘটনা, বৈশিষ্ট্য বা দিককে কেন্দ্র করে আলোচনা করা হয়েছে। তার প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাশীল ব্যক্তিরা যেমন তার জীবনচরিত রচনা করেছেন, তেমনি বিদ্বেষী এবং বিরোধীরাও তাকে নিয়ে লিখেছে। এমনকি নিরপেক্ষ ও ন্যায়নিষ্ঠ গবেষকরাও তার জীবন এবং কর্মকে তাদের গবেষণার বিষয় করেছেন। ফলে মহানবী (সা.)-এর সিরাত যুগে যুগে ভালোবাসা, বিরোধিতা ও নিরপেক্ষ অনুসন্ধান—তিন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির মানুষেরই আগ্রহের বিষয় হয়ে থেকেছে।
সিরাতচর্চার দুটি ধারা
মহানবী (সা.)-এর সিরাত নিয়ে প্রচলিত চর্চাকে মূলগতভাবে দুটি প্রধান ধারায় ভাগ করা যায়। প্রথম ধারা হলো ‘ঐতিহাসিক বর্ণনাভিত্তিক সিরাতচর্চা’। এ ধারায় মহানবী (সা.)-এর জন্ম, জন্মের পূর্ববর্তী সময় ও তৎকালীন পরিবেশ থেকে শুরু করে তার ইন্তেকাল এবং ইন্তেকাল-পরবর্তী ঘটনাবলি ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করা হয়।
এই ধারার মধ্যেও রয়েছে একাধিক গবেষণাপদ্ধতি। সনদ যাচাইয়ের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন না করেই কেউ আলোচিত সব তথ্য একত্র করেছেন। আবার কেউ তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি সনদ নিরীক্ষা ও পর্যালোচনা করেছেন; যেসব বর্ণনা বিশুদ্ধ, সেগুলো গ্রহণ করেছেন এবং যেগুলো প্রমাণিত নয় বা দুর্বল, সেগুলোর ব্যাপারেও পাঠককে সতর্ক করেছেন। এই ধারার আরেকটি প্রবণতা হলো, সিরাতের ঘটনাবলি আলোচনা করে সেখান থেকে শিক্ষা, উপদেশ ও জীবনের নানা দিকনির্দেশনা আহরণ করা। কারো আলোচনায় সাধারণ শিক্ষাগুলো গুরুত্ব পেয়েছে, আবার কেউ বিশেষ কোনো শিক্ষা বা তাৎপর্যের ওপর জোর দিয়েছেন।
সিরাতচর্চার দ্বিতীয় ধারাটিও প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে। এ ধারায় মহানবী (সা.)-এর জীবনের কোনো একটি বিশেষ দিককে বেছে নিয়ে সেটিকে গভীরভাবে অধ্যয়ন করা হয়। মুসলিম ঐতিহ্যে এর প্রাথমিক দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় মহানবী (সা.)-এর শামায়েল (বাহ্যিক ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য) এবং খাসায়েস (বিশেষ বৈশিষ্ট্য) নিয়ে রচিত গ্রন্থগুলোয়। কাজী ইয়াজ, মাকরিজি প্রমুখের রচনায় এ ধরনের চর্চার উদাহরণ রয়েছে।
আধুনিক যুগে মহানবী (সা.)-এর জীবনের বিশেষ কোনো দিক নিয়ে গবেষণার এই ধারা আরো বিকশিত হয়েছে। সিরাতের নির্দিষ্ট বিষয়কে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে অনেক বইপত্র। আব্বাস মাহমুদ আক্কাদ, খালিদ মুহাম্মদ খালিদ, ইউসুফ আল-কারজাবি, মাহমুদ শিত খাত্তাব ও অন্যরা এই ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন।
পাশাপাশি পাশ্চাত্য লেখকদের মধ্যেও মহানবী (সা.)-এর জীবন নিয়ে গবেষণা করেছেন। এসব রচনার মধ্যে যেমন ন্যায়নিষ্ঠ ও ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায়, তেমনি পক্ষপাতদুষ্ট ও বিদ্বেষপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থিতিরও প্রমাণ পাওয়া যায়।
সিরাতচর্চার তৃতীয় ও নতুন আরেকটি ধারা
সিরাতচর্চায় তৃতীয় একটি ধারা রয়েছে, যে ধারায় তেমন বিস্তৃত চর্চা হয়নি। বরং অল্প কয়েকজন লেখক এ পদ্ধতিতে কাজ করেছেন। এই ধারার বিষয় শুধু মহানবী (সা.)-এর জীবনচরিত নয়; বরং যারা লেখক ও গ্রন্থকার হিসেবে নবীজির সিরাত নিয়ে কাজ করেছেন, তাদের নানা দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে সিরাতকে নতুন করে পাঠ করা।
এ পদ্ধতিকে আমরা বলতে পারি ‘তুলনামূলক সিরাতচর্চা’—অর্থাৎ সিরাতের কোনো একটি নির্দিষ্ট ঘটনা ভিন্ন ভিন্ন লেখক কীভাবে উপস্থাপন করেছেন, তা পাশাপাশি রেখে তুলনামূলক আলোচনা করা। কারণ প্রত্যেক লেখক তার নিজস্ব সংস্কৃতি, সাহিত্যিক পরিমণ্ডল, ভাষাশৈলী এবং মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতার আলোকে সিরাতের ঘটনা বিশ্লেষণ করেন। ফলে একই ঘটনা নিয়ে তাদের লেখায় বৈচিত্র্যময় চিন্তা, সৃজনশীলতা ও অন্তর্দৃষ্টির প্রকাশ ঘটে।
ফিকহের ক্ষেত্রে যেমন তুলনামূলক ফিকহ রয়েছে, যেখানে বিভিন্ন ফকিহের মতামত ও ফিকহি সিদ্ধান্তের তুলনা করা হয়; এসব মতের পেছনের প্রেরণা, কারণ ও যুক্তি বিশ্লেষণ করা হয়; কোনো একটি মতের পেছনে থাকা ফিকহি দর্শন এবং তার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা বিধানগুলোও পর্যালোচনা করা হয়। তাফসির শাস্ত্রেও এই পদ্ধতির প্রয়োগ দেখা যায়।
তাই সিরাতের ক্ষেত্রেও যদি এ ধরনের তুলনামূলক পদ্ধতিতে গবেষণা করা হয়, তাহলে মহানবী (সা.)-এর সিরাতচর্চায় নতুন ও স্বতন্ত্র একটি ধারা সৃষ্টি হবে। এর মাধ্যমে সিরাতের অনেক দিক ও তাৎপর্য সামনে আসবে, বিচ্ছিন্নভাবে পাঠ করলে যা হয়তো আমাদের দৃষ্টিতে ধরা পড়বে না। ফলে মহানবী (সা.)-এর জীবন ও আদর্শকে বোঝার ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি সিরাতচর্চাকে আরো সমৃদ্ধ এবং গভীর করে তুলতে পারে।
বিয়ুমির দৃষ্টান্ত
ড. মুহাম্মদ রজব আল-বায়ুমি ছাড়া এ ধরনের প্রচেষ্টা আর কারো মধ্যে আমার চোখে পড়েনি। তবে তিনি তুলনামূলক সিরাতচর্চার কোনো স্বতন্ত্র পদ্ধতি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে এই পদ্ধতিতে লেখেননি; বরং সিরাত রচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন মাত্র। তার প্রবন্ধটির শিরোনাম ছিল من روائع السيرة النبوية: الرسول يبكي ولده إبراهيم (সিরাতের অনুপম সৌন্দর্য : সন্তান ইব্রাহিমের জন্য রাসুলের কান্না)। প্রবন্ধটি ‘ফি মিজানিল ইসলাম’ গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। এতে তিনি মারিয়া কিবতিয়ার গর্ভে জন্ম নেওয়া নবীজি (সা.)-এর ছেলে ইব্রাহিমের অল্প বয়সে ইন্তেকালের ঘটনা আলোচনা করেছেন।
বায়ুমি সমকালীন সাহিত্যিক ও চিন্তক আব্বাস আল-আক্কাদ, তাহা হুসাইন, আহমদ হাসান আল-জাইয়াত ও মুহাম্মদ হুসাইন হাইকলের সিরাতগ্রন্থে এ ঘটনাটির উপস্থাপন নিয়ে তুলনামূলক আলোচনা করেছেন।
সিরাতের গ্রন্থগুলোতে ঘটনাটি বড়জোর আধা থেকে এক পৃষ্ঠার হলেও, এই চার সাহিত্যিকের কলমে তা অসাধারণ মূল্যবান হয়ে উঠেছে। প্রত্যেকের দৃষ্টিভঙ্গিও ছিল ভিন্ন। আক্কাদ প্রথমে যুক্তি ও বুদ্ধির মাধ্যমে বিষয়টি দেখেছেন, এরপর আবেগের দিকে গেছেন; তাহা হুসাইন ঠিক বিপরীতভাবে আবেগ দিয়ে শুরু করে যুক্তিতে পৌঁছেছেন। যাইয়াত নিজের সন্তান হারানোর অভিজ্ঞতা থেকে এ ঘটনায় সান্ত্বনা ও শিক্ষা খুঁজে পেয়েছেন। আর হাইকল ঘটনাটিকে প্রবহমান সাহিত্যিক ভাষায় বর্ণনা ও বিশ্লেষণ করেছেন।
এই ধারণার পক্ষে আরো কিছু দৃষ্টান্ত
বায়ুমি যে আঙ্গিকে আলোচনা করেছেন, সেটি ছাড়াও এ ধারার গবেষণা পদ্ধতির পক্ষে অসংখ্য দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। দেখা যায়, প্রত্যেক ফকিহ বা সাহিত্যিক মহানবী (সা.)-এর জীবনের কোনো ঘটনা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখেছেন। এসব দৃষ্টিভঙ্গিকে পাশাপাশি রেখে তুলনা করলে নবুয়তের আরো পূর্ণাঙ্গ ও স্পষ্ট চিত্র আমাদের সামনে বিকশিত হবে।
এর একটি দৃষ্টান্ত ইউসুফ আল-কারজাবি ও খালিদ মুহাম্মদ খালিদের রচনায় পাওয়া যায়। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি প্রথম আঘাতে একটি কাকলাস (টিকটিকি জাতীয় একধরনের সরীসৃপ) হত্যা করবে, তার জন্য একশ নেকি লেখা হবে। দ্বিতীয় আঘাতে এর চেয়ে কম এবং তৃতীয় আঘাতেও এর চেয়ে কম (নেকি পাবে)।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর : ৫৭৪০)
প্রথম আঘাতের জন্য ১০০ নেকি এবং পরবর্তী আঘাতের জন্য ক্রমহ্রাসমান নেকি কেন, এর ব্যাখ্যায় ইউসুফ কারজাবি একজন আইনজ্ঞের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলেছেন, এটা মূলত সঠিকভাবে লক্ষ্যভেদ করার দক্ষতার পুরস্কার। শত্রুর মোকাবিলায় কাজে লাগাতে মুসলমানের এ ধরনের দক্ষতা থাকা প্রয়োজন।
অন্যদিকে খালিদ মুহাম্মদ খালিদের ব্যাখ্যা ভিন্ন। তার মতে, এখানে নেকির পুরস্কারের মধ্য দিয়ে মূলত দয়ার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। যদি কাকলাসকে হত্যা করতেই হয়, তবে যেন দ্রুত হত্যা করা হয়; কারণ বারবার আঘাত করলে প্রাণীটি অযথা কষ্ট পাবে।
আমরা যে পদ্ধতিকে ‘তুলনামূলক সিরাতচর্চা’ নামে অভিহিত করছি, তা সিরাতের বিস্তৃত ভান্ডারে ছড়িয়ে থাকা অমূল্য রত্নগুলোকে পাঠকের সামনে তুলে আনার একটি কার্যকর পথ হতে পারে। বিশেষত সিরাতের এমন সব পার্শ্বঘটনা ও অপেক্ষাকৃত কম আলোচিত বিষয় রয়েছে, যেগুলোর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ও শিক্ষা অনেক সময় বৃহৎ বর্ণনার আড়ালে পড়ে যায়।
সিরাতের লেখক ও কবিরা সাধারণত মহানবী (সা.)-এর জীবনের বড় ঘটনাগুলোর প্রতিই বেশি মনোযোগ দেন। নবীজির জন্ম, নবুয়তপ্রাপ্তি, হিজরত ও গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধের মতো ঘটনাগুলো তাদের রচনায় প্রাধান্য পায়। অথচ তার জীবনের অনেক ছোট ও আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ ঘটনার মধ্যেও নিহিত রয়েছে গভীর তাৎপর্য, মূল্যবান শিক্ষা এবং গুরুত্বপূর্ণ ঈমানি ও জাগতিক দিকনির্দেশনা। সেই বিস্মৃত বা আড়ালে থাকা রত্নগুলো খুঁজে বের করে বিভিন্ন লেখকের দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে একত্র করা গেলে মহানবী (সা.)-এর জীবন ও আদর্শকে আরো গভীর, পূর্ণাঙ্গ ও বহুমাত্রিকভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব হবে।
আরবি থেকে বাংলা : আহমাদ ফাহমি

About: Kutubi Cox
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
খলিফা ওমর (রা.)-এর অর্থব্যবস্থা ও সংস্কার by কাজী যুবাইদা তোহফা
মানবসভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যেকোনো বড় সাম্রাজ্যের উত্থানের পেছনে থাকে সামরিক পরাক্রম। আর তার দীর্ঘস্থায়িত্বের আসল রহস্য লুকিয়ে থাকে একটি সুসংহত অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর। সাত শতকে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর শাসনকাল ছিল বৈশ্বিক ইতিহাসে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও অনন্য জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকাল। কোরআন ও সুন্নাহর মৌলিক দর্শন ও নীতির ওপর ভিত্তি করে তিনি যে অর্থনৈতিক কাঠামো দাঁড় করিয়েছিলেন, তা সমকালীন রোমান বা পারস্য সাম্রাজ্য তো বটেই, আধুনিক অর্থনৈতিক চিন্তায়ও তার ন্যায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক নীতিমালা গভীর গবেষণার বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়। এই অর্থব্যবস্থার মূল ভিত্তি ছিল সম্পদকে শুধু ধনীদের মধ্যে আবর্তিত হতে না দিয়ে সমাজের প্রান্তিক স্তরে পৌঁছে দেওয়া এবং রাষ্ট্রে কঠোর প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
খলিফা উমর (রা.)-এর প্রবর্তিত এই বৈপ্লবিক অর্থনৈতিক কাঠামোর মূল গভীরতা অনুধাবন করতে হলে তার পূর্ববর্তী শাসনকালের বাস্তব পরিস্থিতির দিকে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। ইসলামের প্রাথমিক যুগে রাষ্ট্র পরিচালনার পেছনে কোনো স্থায়ী বা প্রাতিষ্ঠানিক আমলাতন্ত্র গড়ে ওঠেনি। তখন পর্যন্ত রাষ্ট্রে সুনির্দিষ্ট কোনো কর কাঠামো, জাতীয় বাজেট কিংবা স্থায়ী অর্থনৈতিক নীতিমালার কোনো অস্তিত্ব ছিল না। কারণ, খেলাফতের ভৌগোলিক পরিধি তখন প্রধানত আরবের মরুভূমির মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল এবং রাজস্বের আকারও ছিল তুলনামূলক ছোট। কিন্তু উমর (রা.) যখন খেলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করলেন, তখন পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যের বিজয়ের মাধ্যমে খেলাফত রাষ্ট্রের সীমানা বিশাল রূপ ধারণ করে। কোটি কোটি দিরহামের রাজস্ব এবং লাখ লাখ নতুন অনারব নাগরিকের অন্তর্ভুক্তির ফলে আগের সেই অনানুষ্ঠানিক ও সাময়িক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। দূরদর্শী খলিফা উমর (রা.) অনুধাবন করতে পেরেছিলেন, একটি বিশাল আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রকে শুধু সামরিক পরাক্রমের জোরে টিকিয়ে রাখা যাবে না, যদি না তার পেছনে একটি সুশৃঙ্খল, স্থায়ী এবং সুসংহত প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কাঠামো থাকে। ঠিক এই প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক প্রয়োজনেই তিনি প্রথাগত আরবীয় সাময়িক রাজস্ব বণ্টন পদ্ধতি থেকে বের হয়ে এসে রাষ্ট্রের সামগ্রিক অর্থব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ আধুনিক ও নিয়মতান্ত্রিক রূপ দেওয়ার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
বাইতুল মালের প্রাতিষ্ঠানিক আধুনিকায়ন
ইসলামের শুরুর যুগে রাষ্ট্রীয় কোষাগার বা ‘বাইতুল মালে’র কোনো স্থায়ী অবয়ব ছিল না; রাজস্ব এলে তাৎক্ষণিকভাবে বণ্টন করে দেওয়া হতো। বাহরাইন থেকে আসা ৮ লাখ দিরহামের বিশাল রাজস্বও মহানবী (সা.) এক বৈঠকে সর্বসাধারণের মধ্যে বিতরণ করেছিলেন। কিন্তু খেলাফত রাষ্ট্রের পরিধি বৃহৎ পরিসরে বৃদ্ধি পাওয়ায় খলিফা উমর স্থায়ী ও সুসংহত কেন্দ্রীয় বাইতুল মাল ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। মদিনায় কেন্দ্রীয় সুবৃহৎ কোষাগার ভবন নির্মাণের পাশাপাশি প্রতিটি বিজিত প্রদেশে এর শাখা বিস্তৃত করা হয় এবং সুরক্ষায় সার্বক্ষণিক পাহারাদার নিযুক্ত করা হয়। কর আদায়ের প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও নিয়মতান্ত্রিক করতে তিনি ‘সাহেবুল খারাজ’ বা কর সংগ্রাহক এবং কোষাগার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ‘সাহিবে বাইতুল মাল’ বা কোষাধ্যক্ষ নিয়োগের মতো সম্পূর্ণ নতুন প্রশাসনিক পদের সৃষ্টি করেন। বাহরাইন থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আসার পর উমর (রা.) সাহাবিদের নিয়ে পরামর্শ সভায় বসেন এবং ওয়ালিদ ইবনুল মুগিরার প্রস্তাব অনুযায়ী পারস্য ও রোমানদের আদলে হিসাব সংরক্ষণের স্থায়ী দপ্তর চালু করেন। এই নতুন কেন্দ্রীয় কোষাগারের প্রধান কোষাধ্যক্ষ বা ‘সাহেবে বাইতুল মাল’ হিসেবে তিনি প্রখ্যাত আমানতদার সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আরকাম (রা.)-কে নিযুক্ত করেন।
দেওয়ান ব্যবস্থা ও নিয়মতান্ত্রিক আদমশুমারি
প্রশাসনিক দূরদর্শিতার আলোকেই খলিফা উমর (রা.) আরবে প্রথম সুশৃঙ্খল আমলাতান্ত্রিক বাজেট ব্যবস্থাপনা হিসেবে ‘দেওয়ান’ বা রাষ্ট্রীয় রেজিস্ট্রি বিভাগ গঠন করেন। এই ব্যবস্থার নিখুঁত বাস্তবায়নে তিনি খেলাফত রাষ্ট্রে প্রথম নিয়মতান্ত্রিক আদমশুমারির ব্যবস্থা করেন। নাগরিকদের সংখ্যা ও প্রকৃত আর্থিক অবস্থা তালিকাভুক্ত করার পর তিনি বীরত্ব ও ইসলামের ত্যাগের তারতম্য অনুযায়ী ভাতার বৈজ্ঞানিক স্তরবিন্যাস করেন। তিনি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের প্রত্যেকের জন্য বার্ষিক ৫ হাজার দিরহাম, ওহুদ যুদ্ধের শহীদদের পরিবার ও হাবশায় হিজরতকারীদের জন্য ৪ হাজার দিরহাম এবং তরুণদের জন্য ২ হাজার দিরহাম করে নিয়মিত বৃত্তির ব্যবস্থা করেন। এই ব্যবস্থার লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের আর্থিক অধিকার নিশ্চিত করা। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ ইবনে সাদের ‘আত-তবাকাতুল কুবরা’ গ্রন্থের ৩৬০৫ নম্বর বর্ণনা অনুযায়ী, খলিফা উমর ঘোষণা করেছিলেন, ‘(আমি প্রদান করি কিংবা না-ই বা করি) পৃথিবীর সব স্বাধীন মুসলিমের রাষ্ট্রীয় সম্পদে অধিকার রয়েছে। আর আমি যদি বেঁচে থাকি, তবে অবশ্যই ইয়েমেনের মেষপালকের কাছেও তার প্রাপ্য অধিকার পৌঁছে যাবে তার মুখ লাল হওয়ার আগেই (নিজের হকের জন্য কষ্ট করে দাবি করার আগেই)।’ এই দেওয়ানব্যবস্থা ও ভাতা নির্ধারণের শুরুর সময়ে খলিফা উমর (রা.) আরবের বংশ তালিকা ও বীরত্ব অনুযায়ী নির্ভুল তালিকা প্রস্তুত করার জন্য আকিল ইবনে আবু তালেব, মাখরামাহ ইবনে নাওফাল এবং জুবাইর ইবনে মুতইমকে দায়িত্ব দেন। তালিকা প্রস্তুতের পর ভাতা বণ্টনের ক্ষেত্রে তিনি নিজের পরিবার বা গোত্রকে নয়, বরং ইসলামের প্রথম যুগের ত্যাগকে অগ্রাধিকার দিয়ে সর্বপ্রথম মহানবী (সা.)-এর পরিবার এবং বদরি সাহাবিদের নাম রাষ্ট্রীয় খাতায় সবার ওপরে তালিকাভুক্ত করেন।
নিয়মিত সামরিক বাহিনী গঠন ও আর্থিক নিরাপত্তা
উমর (রা.)-এর আগে খেলাফতে নিয়মিত কোনো বেতনভুক্ত সামরিক বাহিনীর অস্তিত্ব ছিল না। তিনি খেলাফতের ইতিহাসে প্রথম নিয়মিত বেতনভুক্ত ও সুশৃঙ্খল সামরিক বাহিনী গঠন করেন। পদাতিক, অশ্বারোহী ও তীরন্দাজদের বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত করে তাদের নাম রাষ্ট্রীয় রেজিস্ট্রি বা দেওয়ানে তালিকাভুক্ত করা হয় এবং বাইতুল মাল থেকে নিয়মিত বেতন ও উন্নতমানের পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যবস্থা করা হয়।
যুদ্ধের ময়দানে থাকা সেনাদের পরিবার-পরিজনের সার্বিক অর্থনৈতিক দায়িত্ব খলিফা নিজে তদারকি করতেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের নিয়মিত বেতন-ভাতা বৃদ্ধির বৈপ্লবিক ব্যবস্থা করেছিলেন। সৈন্যদের পারিবারিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে খলিফা উমরের এই নীতি শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এর পেছনে ছিল স্পর্শকাতর ঐতিহাসিক ঘটনা।
এক রাতে খলিফা উমর মদিনার অলিগলিতে সাধারণ প্রজাদের অবস্থা তদারকি করছিলেন। সে সময় একটি বাড়ি থেকে এক নারীর কণ্ঠে গভীর বিরহ ও আকুলতার কবিতা শুনতে পান, যার স্বামী দীর্ঘ সময় ধরে খিলাফতের সীমান্ত রক্ষায় যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়োজিত ছিলেন। এ ঘটনা খলিফার মনকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। পরদিন সকালেই তিনি উম্মুল মুমিনিন হাফসা (রা.)-এর কাছে গিয়ে জানতে চান, একজন বিবাহিত নারী তার স্বামী ছাড়া সর্বোচ্চ কতদিন ধৈর্য ধরে থাকতে পারে? উত্তরে তিনি জানান, এই সময়সীমা সর্বোচ্চ চার মাস।
এ ঘটনার ওপর ভিত্তি করেই খলিফা উমর (রা.) তৎক্ষণাৎ একটি ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় ফরমান জারি করেন—কোনো বিবাহিত সৈনিককে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে চার মাসের বেশি সময় পরিবার থেকে দূরে যুদ্ধক্ষেত্রে রাখা যাবে না। একই সঙ্গে তিনি আইন করেন, যুদ্ধকালীন এই চার মাস সৈন্যদের পরিবারের যাবতীয় ভরণপোষণ ও অর্থনৈতিক ব্যয়ভার রাষ্ট্রীয় কোষাগার বা বাইতুল মাল থেকে সুনিশ্চিত করা হবে।
খলিফা নিজে রাতের আঁধারে যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা সৈন্যদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খাদ্যসামগ্রী ও নগদ অর্থ পৌঁছে দিতেন এবং দূরবর্তী যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আসা সৈন্যদের চিঠিপত্র নিজে বহন করে তাদের পরিবারের কাছে পৌঁছে দিতেন।
এই নিয়মতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ফলেই খেলাফত রাষ্ট্রে সৈন্যদের বীরত্ব এবং তাদের পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা অভূতপূর্ব এক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।
নবজাতকের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা
উমর (রা.)-এর অর্থব্যবস্থায় ‘শাসক’ পদের চেয়ে নিজেকে জনগণের ‘পাহারাদার’ ভাবা খলিফা মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে ছিলেন আপসহীন। মদিনার এক অসহায় মায়ের কষ্ট দেখে তিনি নীতি পরিবর্তন করে রাষ্ট্রের প্রতিটি নবজাতক শিশুর জন্যই মায়ের বুকের দুধপানের সময় থেকেই নিয়মিত রাষ্ট্রীয় ভাতার নিয়ম চালু করেন। এই মানবিক রাষ্ট্রদর্শনের পেছনে মদিনার উপকণ্ঠে ঘটে যাওয়া এক স্পর্শকাতর বাস্তব চিত্র বিদ্যমান। এক গভীর রাতে খলিফা উমর এবং আবদুর রহমান ইবনে আওফ যখন মদিনার বাইরে তাঁবু খাটিয়ে থাকা এক কাফেলার নিরাপত্তায় নিয়োজিত ছিলেন, তখন দূর থেকে একটি শিশুর কান্নার আওয়াজ খলিফার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তিনি ঘরের দরজায় গিয়ে মাকে সান্ত্বনা দিতে বললেও দীর্ঘক্ষণ পর আবার কান্নার তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় খলিফা নিজে গিয়ে এর কারণ অনুসন্ধান করেন। খলিফাকে চিনতে না পেরে সেই দুঃখী মা অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে জানান, খলিফা শুধু দুধ ছাড়ানো শিশুদের জন্য রাষ্ট্রীয় ভাতার ঘোষণা দিয়েছেন; তাই পেটের দায়ে তিনি জোরপূর্বক তার এই দুগ্ধপোষ্য শিশুকে মায়ের বুক থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করছেন, যাতে দ্রুত সরকারি সাহায্য পাওয়া যায়।
অসহায় মায়ের এই নিদারুণ স্বীকারোক্তি খলিফার বিবেককে প্রচণ্ড নাড়া দেয় এবং অনুশোচনায় জর্জরিত হয়ে তিনি ফজরের নামাজে এতটাই কান্না করছিলেন যে মুসল্লিদের পক্ষে তার কিরাত বোঝা কঠিন হয়ে পড়েছিল। মোনাজাত শেষে তিনি বিলাপ করে বলতে থাকেন যে উমরের ভুলের কারণে আজ কত নিষ্পাপ শিশু কষ্টের শিকার হয়েছে। এ ঘটনার পরদিনই খেলাফতে জরুরি ফরমান জারি করা হয়, এখন থেকে কোনো শিশুকে জোর করে দুধ ছাড়াতে হবে না, বরং প্রতিটি নবজাতক পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হওয়ার মুহূর্ত থেকেই বাইতুল মালের নিবন্ধিত নাগরিক হিসেবে স্থায়ী ভাতার অধিকার লাভ করবে।
স্বজনপ্রীতি রোধ ও মিতব্যয়িতার আদর্শ
দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি রোধে সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত ব্যবসা করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। কোনো গভর্নর বা সরকারি কর্মকর্তা নিযুক্ত হওয়ার আগে সম্পদের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব নেওয়া হতো এবং দায়িত্ব ছাড়ার সময় অতিরিক্ত বা অবৈধ কোনো সম্পদ পাওয়া গেলে বাজেয়াপ্ত করা হতো। আর এই জবাবদিহির সবচেয়ে বড় উদাহরণ ছিলেন খলিফা নিজে, যিনি বাইতুল মাল থেকে সাধারণ একজন নাগরিকের সমপরিমাণ সর্বনিম্ন ভাতা গ্রহণ করতেন। অগণিত তালি দেওয়া সাধারণ পোশাক পরে বিশ্ব কাঁপানো এই রাষ্ট্রনায়ক প্রমাণ করেছিলেন, শাসকের ভোগবিলাস নয়, বরং মিতব্যয়িতাই রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি। এই কঠোর প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও মিতব্যয়িতার নীতিটি খলিফা শুধু মুখে বলেননি, বরং তা প্রয়োগের ক্ষেত্রে নিজের পরিবার কিংবা রাষ্ট্রের প্রভাবশালী সেনাপতিদের প্রতিও কোনো ছাড় দেননি। খেলাফতের অন্যতম সফল ও প্রভাবশালী গভর্নর আমর ইবনুল আস যখন মিসরের দায়িত্ব পালন করছিলেন, তখন তার ব্যক্তিগত সম্পদে আকস্মিক প্রবৃদ্ধি লক্ষ করে খলিফা উমর (রা.) তৎক্ষণাৎ হিসাব তলব করেন। গভর্নর তার এই অতিরিক্ত সম্পদকে বৈধ ব্যবসা ও ব্যক্তিগত উপার্জনের ফসল বলে দাবি করলেও, খলিফা তার নীতিতে অটল থাকেন এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদের প্রভাব খাটিয়ে অতিরিক্ত উপার্জনের আশঙ্কার কারণে গভর্নরের সেই বর্ধিত সম্পদের অর্ধেক অংশ রাষ্ট্রীয় ফরমান বলে বাইতুল মালে বাজেয়াপ্ত করেন। এমনকি নিজের প্রিয় পুত্র আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) রাষ্ট্রীয় চারণভূমি ব্যবহার করে চড়া দামে উট বিক্রি করে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন করলে, খলিফা সরকারি চারণভূমির অনৈতিক সুবিধার কারণে পুত্রের সেই লভ্যাংশের পুরোটা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা করে দেন। নিজের পরিবারের প্রতি রাষ্ট্রপ্রধানের এমন নজিরবিহীন ও আপসহীন অর্থনৈতিক জবাবদিহি সমগ্র খিলাফতে দুর্নীতি এবং স্বজনপ্রীতির পথ চিরতরে রুদ্ধ করে দিয়েছিল।
![]() |
| মুসলিমদের বাইতুল মুকাদ্দাস বিজয়ের স্মৃতিবাহী ঐতিহাসিক ‘ওমর ইবনুল খাত্তাব ময়দান’ |
About: Kutubi Cox
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
পুরুষ বন্ধ্যত্ব কেন হয়, সমাধান কী by ডা. অবন্তি ঘোষ
কারণ
● অতিরিক্ত ধূমপান করা।
● অ্যালকোহল, নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণ করা।
● কম সক্রিয় জীবনযাপন।
● ওজনাধিক্য।
● অতিরিক্ত স্ট্রেস।
● হরমোনজনিত সমস্যা (টেস্টোস্টেরন, থাইরয়েড, প্রোলাকটিন)।
● জিনগত কারণ।
● সংক্রমণ যেমন ক্ল্যামাইডিয়া, গনোরিয়া ইত্যাদি।
● শুক্রনালির ব্লকেজ।
● অণ্ডকোষের টিউমার, ভেরিকোসিলি, মামস অরকাইটিস।
● দীর্ঘ সময় গরম আবহাওয়ায় কাজ করা।
কীভাবে শনাক্ত করা হয়
বীর্য পরীক্ষার মাধ্যমে পুরুষ বন্ধ্যত্ব শনাক্ত করা সম্ভব। এর নির্দিষ্ট নিয়ম আছে। তিন দিন সহবাস বন্ধ রেখে বীর্য পরীক্ষা করতে হবে। একটি বীর্য পরীক্ষার রিপোর্ট যদি খারাপ আসে তাহলে এক মাস পরে আরেকটি বীর্য পরীক্ষা করতে হবে। সেটিও যদি খারাপ আসে তাহলে অণ্ডকোষের আলট্রাসনোগ্রাফি ও হরমোন পরীক্ষা করতে হবে।
যা করতে হবে
* ওজন কমানো, প্রতিদিন ৩০ মিনিট হাঁটাচলা করা, সবুজ শাকসবজি ও ফলমূল খাওয়া, তৈলাক্ত ও চর্বিজাতীয় খাবার এড়িয়ে চলা।
* স্ট্রেস কমানো এবং রাতে পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা।
* ধূমপান, মদ্যপান পরিহার করা।
* শুক্রাণুর সংখ্যা ও গতির উন্নতির জন্য কিছু মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট দেওয়া হয়। যেমন লেবোকারনিটিন, ভিটামিন সি, ই, ডি, বি কমপ্লেক্স, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড।
* তিন মাস পর্যবেক্ষণের পর যদি শুক্রাণুর সংখ্যার উন্নতি না হয়, তাহলে ইন্ট্রাইউটেরাইন ইনসেমিনেশন বা আইভিএফ/ইকসি করা যেতে পারে।
* ভেরিকোসিলি (অণ্ডকোষের শিরা ফুলে যাওয়া) বা শুক্রনালি বন্ধ। এ-জাতীয় সমস্যা থাকলে অনেক ক্ষেত্রে সার্জারি লাগতে পারে।
* হরমোনজনিত সমস্যা থাকলে এর চিকিৎসা করতে হবে।
* যদি শুক্রাণুর সংখ্যা বা গতির মাঝারি ধরনের সমস্যা থাকে, তবে সাধারণত আইইউআই এবং যদি শুক্রাণুর সংখ্যা বা গতির অনেক বেশি সমস্যা থাকে তবে ইকসি করা হয়।
* কিছু ক্ষেত্রে বীর্যে কোনো শুক্রাণুই পাওয়া যায় না, যাকে অ্যাজোস্পারমিয়া বলা হয়, সে ক্ষেত্রে অণ্ডকোষ থেকে শুক্রাণু নিয়ে ইকসি করা হয়।
* ডা. অবন্তি ঘোষ, গাইনি, প্রসূতি ও বন্ধ্যত্ব রোগবিশেষজ্ঞ, আলোক হেলথকেয়ার, মিরপুর-১০, ঢাকা
| সব বন্ধ্যত্ব-দম্পতির ক্ষেত্রে ৩০-৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে পুরুষজনিত কারণই দায়ী। ছবি: আনস্প্ল্যাশ |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
-
▼
2026
(1943)
-
▼
August
(340)
-
▼
Aug 25
(9)
- শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে আবারো উত্তাল ভারত
- হিজাব পরা ইসলামে অপরিহার্য আচার নয়: ভারতের হাইকোর্ট
- যে ৩টি কৌশল ব্যর্থ হওয়ায় ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হার ...
- পথ হারিয়ে ফেলা সেই ইয়ামিই এখন...
- আমেরিকায় ‘ভালো’ মুসলিম নেই!
- খলিফা ওমর (রা.)-এর বাজার ব্যবস্থাপনা by নাসরুল্লাহ...
- নবীজীবনচর্চায় নতুন আলো by ড. ইসাম তালিমা
- খলিফা ওমর (রা.)-এর অর্থব্যবস্থা ও সংস্কার by কাজী ...
- পুরুষ বন্ধ্যত্ব কেন হয়, সমাধান কী by ডা. অবন্তি ঘোষ
-
▼
Aug 25
(9)
-
▼
August
(340)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...



-এর-বাজার-ব্যবস্থাপনা-2c4045.jpg)
